মরে বেঁচে গেল তমন্না

ওর মত মেয়ের জন্যে আমাদের গ্রামে পড়ার স্কুল নেই, কলেজগুলোও ধুঁকছে। কলেজ পেরিয়ে আরও বড় কোথাও, ভাল কোথাও সে পৌঁছতে পারত – এমন ভাবনাও হাস্যকর।

‘আজ ফির জীনে কি তমন্না হ্যায়/আজ ফির মরনে কা ইরাদা হ্যায়’ – ওয়াহিদা রহমানের মত অনাবিল আনন্দে এই মারাত্মক লাইন দুটো গাইতে গাইতে নাচতে নাচতে তমন্না খাতুন পুকুরে চান করতে যাচ্ছিল কিনা, সে খবর কোথাও পেলাম না। হতেও পারে। ন-দশ বছরের শিশুর পক্ষে চারপাশের তাণ্ডবের মধ্যেও কতটা সরল এবং আপনমনে থাকা সম্ভব – তা আমি ৩৩ বছরের অনভ্যাসে ভুলে গেছি, ফলে আন্দাজ করতে পারছি না। কিন্তু দেখাই যাচ্ছে, এই স্মার্টফোন যুগেও ৯-১০ বছরের শিশু এতটা চৌখস হয়নি যে আঁচ করতে পারবে – বাবা যে দলের লোক তার প্রতিপক্ষ দলের বিজয় মিছিলের ধারেকাছে গেলে বাঁচার অভিলাষ বা তমন্না ‘মরনে কা ইরাদা’, অর্থাৎ মরার ইচ্ছা, হয়ে দাঁড়ায়। পিতামহ ভীষ্মের ছিল ইচ্ছামৃত্যু। মহাভারতের যুগ চলে গেছে; এখন বাপ ঠাকুর্দার বয়সী লোকেদের ইচ্ছা হলেই শিশুদের মৃত্যু হয়। যখন তখন যেখানে সেখানে। গাজা থেকে শুরু করে কালীগঞ্জ।

কী বলছেন? ‘বামফ্রন্টের ৩৪ বছরে’ ইত্যাদি? জানতাম ওটাই বলবেন। তাই তো সোজা মহাভারত থেকে শুরু করলাম। সবাই জানে চক্রব্যূহের সাতজন বীর ছিলেন অভিমন্যুর বাপ-ঠাকুর্দার বয়সী, তুলনায় অভিমন্যু নেহাত বালক। সুতরাং এ পাপের শুরু যে আজ নয় তা বলাই বাহুল্য। কিন্তু কী করব? মহাকালের চক্রান্তই বলুন, অথবা বাবা-মায়ের তমন্না, আমাকে এই কালখণ্ডেই বাঁচতে হচ্ছে। ফলে আজকের শিশুমৃত্যুর ঘা-ই আমার কাছে সবচেয়ে দগদগে। মানুষ নিজের বাবা-মা-ছেলেমেয়ের মৃত্যুশোকই কয়েক দিনে কাটিয়ে ওঠে, আর আপনারা বলছেন, দেড় দশক আগে শেষ হয়ে যাওয়া বামফ্রন্ট আমলে যে শিশুরা খুন হয়েছে তাদের মৃত্যু নিয়ে কথা বললে, তবেই তমন্নার মৃত্যু নিয়ে রেগে ওঠা বৈধ? বনলতা সেনকে লজ্জা দেবেন না মাইরি!

কী বলছেন? বড় বড় কথা বলছি, নিজেও কদিন পরেই তমন্নাকে ভুলে যাব? আজ্ঞে এই কথাটি যথার্থ বলেছেন। মাথাটা পচে যাচ্ছে, পচে গেছে স্ক্রোল করতে করতে। তমন্নাকে নিয়ে কদিন পোস্ট করা আর লাইক দেওয়া হয়ে গেলেই ঠিক স্ক্রোল করে এগিয়ে যাব। নিজের বাবার মৃত্যুশোকের ভার শ্মশানে দাঁড়িয়ে চিতায় তোলার আগেই ফেসবুকে পোস্ট করে নামিয়ে ফেলতে পারছি, আর কোথাকার কোন গণ্ডগ্রামের মেয়ে তমন্না – তার শোকে কদিন মুহ্যমান থাকব? হত কলকাতার কাছাকাছি এলাকার ভদ্দরলোকের মেয়ে, যে লেখাপড়া শিখে নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে গেছিল, কোনো পার্টির সঙ্গে যার গোটা পরিবারের কোনো সম্পর্ক ছিল না – তাহলে অন্তত কয়েক মাস তমন্নার মৃত্যু নিয়ে উত্তেজিত হয়ে থাকতাম। আমাদের দলহীন নারীবাদীরা (নয়-দশে কি নারী হয়? এ বিষয়ে কোনো মত দেব না; শেষে ম্যানস্প্লেনিংয়ের অভিযোগ উঠবে) রাত দখলের ডাক দিতেন, মেয়ে বউয়ের হাত ধরে চলে যেতাম গটগটিয়ে। সেখানে দাঁড়িয়েই গাদা ছবি, ভিডিও তুলে পোস্ট করে দিতাম ফেসবুকে। দায়িত্ব মিটে যেত। সপ্তাহান্তে আন্দোলন করে সোমবার থেকে যথারীতি অফিস কাছারি। এই মেয়েটার বেলায় অত কাণ্ড কেন করতে যাব? ওর তো বাবা সিপিএম করে। আন্দোলন-টান্দোলন করতে হলে সিপিএমই করুক। পশ্চিমবঙ্গে রাজনৈতিক হত্যার ইতিহাস তো লম্বা। ক দল খ দলের ঘর জ্বালিয়ে দেবে, খ দল ক দলের বাড়িতে বোম মারবে, কখনো ক দলের লোক মরবে আর কখনো খ দলের লোক মরবে। এ তো চিরকালই দেখছি। এর মধ্যে আমি ঢুকতে যাব কেন?

সাতে পাঁচে না থাকা মধ্যবিত্তও কি নতুন নাকি? মোটেই না। স্বাধীনতা সংগ্রাম বলুন, নকশাল আন্দোলন বলুন আর সিদ্ধার্থশঙ্কর রায়ের শাসনের দিনগুলোই বলুন। কোনোদিনই সকলে সুখী গৃহকোণ ফেলে পথে নেমে যায়নি। রূপকথায় বিশ্বাস করবেন না। ‘আমার নাম তোমার নাম, দেশের নাম ভিয়েতনাম’ বলে মিছিল করতেও মোটেই সকলে যায়নি। কেউ কেউ গেছিল। মুশকিল হচ্ছে, অনুপাত হিসাব করলে আমাদের মত এ যুগের বাম, প্রগতিশীল প্রমুখকে লজ্জায় পড়তে হবে। অবশ্য সেকালে না গিয়ে উপায় ছিল না। তখন তো মার্ক জুকেরবার্গ, ইলন মাস্কের মত মহাপুরুষদের জম্ম হয়নি, তারা নিজেদের সুসজ্জিত বাগানের গেট খুলে দেয়নি পুঞ্জীভূত গোষ্ঠীবদ্ধ ঘৃণার ব্যক্তিগত প্রকাশের জন্যে। তাই তখন নিদেনপক্ষে বামপন্থী নেতা কর্মী সমর্থকরা কিছু হলেই রাস্তায় নামতেন। মিছিল, মিটিং, পথসভাকেই প্রতিবাদ বা আন্দোলন বলে জানতেন। এখন তাঁরাও শিখে গেছেন – আন্দোলন মানে হল সোশাল মিডিয়া পোস্ট। মিছিল, মিটিং হলেও সেখানে গিয়ে স্লোগান দেওয়ার চেয়ে ফেসবুক লাইভ করা বেশি জরুরি। ওখান থেকেই ৮৮৮ বার কোট করা কবিতা বা গানের লাইন ক্যাপশন হিসাবে দিয়ে মিছিলের ছবি ও ভিডিও পোস্ট করাই রাজনীতি।

ব্যাপারটা সবচেয়ে মন দিয়ে শিখেছেন সবচেয়ে বড় বামপন্থী দল সিপিএমের শহুরে মধ্যবিত্ত নেতা কর্মী সমর্থকরা। গ্রামের দিকে পার্টির গরিবগুরবো সদস্য সমর্থক আক্রান্ত হলে, তাদের ছেলেমেয়েরা তমন্নার মত বেঘোরে প্রাণ হারালে, গিয়ে হাজির হতে হবে ঠিকই। কিন্তু সে দায়িত্ব কেবল একজনের – মীনাক্ষী ছাই ফেলতে ভাঙা কুলো মুখার্জি। বাকিরা ভীষণ ব্যস্ত। কারোর টালিগঞ্জ পাড়ার বন্ধুবান্ধবদের সঙ্গে সোশালাইজ করার দরকার আছে। কারোর গিটার বাজিয়ে ‘বেল্লা চাও’ গেয়ে বা রবীন্দ্রনৃত্য করে হাজার হাজার লাইক পাওয়ার আছে। কারোর বন্ধুর জন্মদিনে পিটার ক্যাট বা মেইনল্যান্ড চায়নায় হুল্লোড় করে কমরেড যেন বিপ্লবের মতই দীর্ঘজীবী হন, তা পোস্ট করা প্রয়োজন। কেউ টিভি চ্যানেলে তৃণমূলের মুখপাত্রের সঙ্গে তুমুল ঝগড়া করেই সমর্থকদের মোহিত রাখতে ব্যস্ত, সত্যিকারের সংঘর্ষে জড়াবেন না। কারণ তাহলে থিয়েটার করতে গিয়ে সরকারি হল পাবেন না, সিনেমা বানানোর পর নন্দনে শো পাবেন না। কেউ আবার জয়দেব বসুর জন্মদিন, মৃত্যুদিন এসে পড়লেই ‘রাজার সঙ্গে আঁতাত করেন যিনি/আমাদের সেই গুহকের প্রতি ঘেন্না’ ইত্যাদি পোস্ট করেন। কিন্তু তিনিও জানেন, তাঁর সরকারপক্ষের বন্ধুরাও জানেন, যে ওসব রান্নাবাটি খেলা। তাই কবিতা পাঠ, গল্প পাঠের আসরে ডাক এসে যায় যথাসময়ে। সে চিঠি সরকারবিরোধী সাহিত্যিক সগর্বে ফেসবুকে পোস্টও করেন। অনেকের আবার বিক্ষোভ বিদ্রোহ বিপ্লব সবই সাহিত্যজগতের দখল ঘিরে। বাম আমলে ওটার রাশ নিজেদের হাতে ছিল, এখন বেরিয়ে গেছে। যত আক্রোশ তাই নিয়ে। কোথায় কোন প্রাণ হাতে করে সিপিএম করা কর্মীর বাচ্চা মেয়েটা বোম খেয়ে মরে গেল – তাতে এঁদের কী? কয়েকটা ফেসবুক পোস্ট করে দেবেন, না হয় একখানা আবেগে থরোথরো কবিতাই লিখে দেবেন। তাতে সাপও মরবে, লাঠিও ভাঙবে না। অর্থাৎ বামপন্থী পরিচয়টাও বজায় থাকবে, আবার শিল্পী বা সাহিত্যিক হিসাবে ক্ষীর খাওয়াও বন্ধ হবে না।

এঁরাই বঙ্গ সিপিএম নেতৃত্বের কাছের লোক, ভালবাসার লোক। এঁরাই বিবেকবান ধর্মনিরপেক্ষ বুদ্ধিজীবী হিসাবে রিপাবলিক বাংলায় গিয়ে গিয়ে চ্যানেলটিকে ভদ্রলোক সদস্য সমর্থকদের মধ্যে বৈধতা পাইয়ে দিয়েছেন। ফলে সেই ভদ্রলোকরা দিনরাত প্রাক্তন এসএফআই অ্যাংকরের বিষ গিলে গিলে সিপিএমের মিছিলে যান, ফেসবুকে মীনাক্ষীর বক্তৃতা শেয়ার করেন আর ভোট দেন বিজেপিকে। তমন্নার মৃত্যুতে এই ভদ্রলোকদের কোনো তাপ উত্তাপ নেই, কারণ ‘এ তো ওদের নিজেদের মধ্যে ঝামেলা। ওরা তো এইসবই করে। ভোটের দিন মারামারিগুলোও তো ওরাই করে।’ বোঝাই যাচ্ছে, এই ‘ওরা’ কিন্তু তৃণমূল কংগ্রেস নয়। যতই সিপিএম ও অন্য বামেরা ফেসবুকে ডিমের কুসুমের ছবি দিয়ে ময়ূখ ঘোষকে নিয়ে হাসিঠাট্টা করুন, বাঙালি ভদ্রলোক ভোটারদের অনেকের মস্তিষ্ক কিন্তু ময়ূখের পায়েই জমা পড়েছে। তাই এই ভদ্রলোক ভদ্রমহিলাদের কাছে তমন্না কোনো বাচ্চা মেয়ে নয়, মুসলমান মেয়ে। এই শ্রেণির ভোটের জন্যেই আবার আজকের সিপিএমের যৎসামান্য সাধনা। নইলে তমন্নার মৃত্যু নিয়ে শুধু কালীগঞ্জ নয়, পশ্চিমবঙ্গের পাড়ায় পাড়ায় মিছিল হওয়া উচিত ছিল। রাস্তা অবরোধ, রেল অবরোধ হওয়া উচিত ছিল। কবে বামপন্থীরা এক পয়সা ট্রামভাড়া বৃদ্ধি নিয়ে আক্ষরিক অর্থে আগুনে আন্দোলন করেছিল, সে ইতিহাস জানতে হবে না। তাপসী মালিকের মৃত্যু নিয়ে মমতা ব্যানার্জি কী করেছিলেন মনে করুন, তাহলেই বোঝা যাবে কী বলছি। অমন করেছিলেন বলেই তাপসীকে কেউ ভোলেনি, কিন্তু তমন্নাকে আমরা আজই ভুলে যাব দিঘার রথযাত্রা দেখতে দেখতে। শুধু তাই নয়, অমন করেছিলেন বলেই পশ্চিমবঙ্গের ইতিহাসে সবচেয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত সরকার চালানো সত্ত্বেও, তৃণমূল স্তরের মানুষ তাঁর দলের তোলাবাজিসহ নানাবিধ অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে গেলেও, প্রশাসন বলে রাজ্যে কার্যত কিছু না থাকলেও, স্কুল থেকে হাসপাতাল পর্যন্ত নৈরাজ্যের চূড়ান্ত হলেও মমতার জনপ্রিয়তা কমছে না।

অন্যদিকে প্রত্যেকটা নির্বাচন, উপনির্বাচনের পরে সিপিএম কর্মীরা কী করেন? কংগ্রেসের সঙ্গে জোট থাকা উচিত কি উচিত নয়, অন্য বাম দলগুলোর সঙ্গে ঐক্য গড়ে তোলা উচিত কি উচিত নয় – এই নিয়ে ফেসবুকে নিজেদের মধ্যে তর্ক করেন। বড়জোর ‘এত কিছুর পরেও যদি লোকে এদের ভোট দেয়, তাহলে আর কিছু বলার নেই’ বলে বিলাপ করেন। গত লোকসভা নির্বাচন পর্যন্ত লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের নাম করে পশ্চিমবঙ্গের গরিব মানুষকে ভিখিরি বলাও চালু ছিল, সেবার রাজ্য সম্পাদকের কড়া মন্তব্যের পর ওটা বন্ধ হয়েছে। কালীগঞ্জের উপনির্বাচনে বিপুল ভোটে হারের পরেও একই ঘূর্ণিতে ঘটনা ঘুরপাক খাচ্ছে। তমন্নার মৃত্যু দেখার পর আরও বেশি করে এক দল সিপিএম সোশাল মিডিয়ায় ঝড় তুলছেন এই বলে, যে বামফ্রন্ট ব্যাপারটা আর রাখার দরকার নেই। যেন ওটা ভেঙে দিলেই লোকে হইহই করে ওঁদের ভোট দিয়ে দেবে আর ২০২৬ সালে অষ্টম বামফ্রন্ট, থুড়ি, প্রথম সিপিএম সরকার এসে যাবে। আসল সমস্যা হল, এখন বাংলায় সিপিএম বলতে পড়ে আছেন নিচের তলার কিছু লড়াকু কর্মী, যাঁদের নেতারা নানা অজুহাতে লড়তে দেন না। আর আছে সোশাল মিডিয়ার শম সিপিএম, যাদের কথা এতক্ষণ সবিস্তারে বললাম। বিশ্বাস হচ্ছে না? রাগ হচ্ছে? আচ্ছা দেখুন।

তমন্না খুন হল ২৩ জুন, আর ২৬ জুনের সংস্করণে সিপিএমের দলীয় মুখপত্র গণশক্তি খবর দিল ‘কালীগঞ্জে নিহত শিশুকন্যা তামান্না খাতুনের গ্রামে আগামী শনিবার যাবেন সিপিআই(এম)’র রাজ্য সম্পাদক মহম্মদ সেলিম, পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য মীনাক্ষী মুখার্জি সহ পার্টি নেতৃবৃন্দ। স্থানীয় মানুষজনকে নিয়ে সেখানে প্রতিবাদ সভায় অংশ নেবেন তাঁরা। বুধবার সিপিআই(এম)’র রাজ্য কমিটির বৈঠকের শেষে সাংবাদিক বৈঠক করে একথা জানিয়ে মহম্মদ সেলিম বলেছেন, খুনের অভিযোগে এফআইআর-এ নাম থাকা দুষ্কৃতীদের এখনও গ্রেফতার করা হয়নি। তৃণমূলের ঝাণ্ডা নিয়ে তারা এখনও ঘুরে বেড়াচ্ছে।’ অর্থাৎ কমরেডের শিশুকন্যাকে কারা খুন করেছে তা জানেন রাজ্য সম্পাদক। ফলে ধরে নেওয়া যায় রাজ্য কমিটির সকলেই জানেন। পুলিস যে নিষ্ক্রিয় তাও জানেন। তবু তাঁরা কমরেডের পরিবারের কাছে ছুটে না গিয়ে, পুলিসের কৈফিয়ত না চেয়ে রাজ্য কমিটির বৈঠক চালিয়ে যাচ্ছিলেন। সাংবাদিক নয়, স্রেফ নাগরিক কৌতূহল থেকেই জানতে ইচ্ছে করে – কী এমন গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা চলছিল রাজ্য কমিটিতে? ২৫ তারিখ রাজ্য কমিটির বৈঠক শেষ হয়ে যাওয়ার পরেও কালীগঞ্জ পৌঁছতে ২৮ তারিখ হবে কেন? কলকাতা থেকে কালীগঞ্জের দূরত্ব কি রেলপথে কোচির চেয়েও বেশি? নাকি ২৬, ২৭ জুড়ে পশ্চিমবঙ্গে বিপ্লব করে তৃণমূল সরকারকে উচ্ছেদ করে ফেলবে বঙ্গ সিপিএম? তারপর ২৮ তারিখ তমন্নার বাড়ি গিয়ে তার মা-বাবার হাত ধরে সেলিম বলবেন ‘কমরেডস, আপনাদের মেয়েকে তো ফিরিয়ে আনতে পারব না, কিন্তু যারা তাকে খুন করেছে তাদের শাস্তির পাকা ব্যবস্থা করে এসেছি’? সত্যি সত্যি এমন ঘটা দূরে থাক, টলিপাড়ার কোনো মার্কামারা সিপিএম পরিচালকের এই দৃশ্যটা লেখার পরিস্থিতিও কি তৈরি করতে পারা গেছে রাজ্য কমিটির মিটিংয়ে?

অবশ্য ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদের এই রমরমার যুগে কে কার কমরেড? শব্দটা এখন বাম বৃত্তে কোনো কারণে ঢুকে পড়া নারী পুরুষের মুখস্থ বুলি মাত্র। সত্যি সত্যি সিপিএমে কমরেড কথাটার কোনো দাম থাকলে রাজ্য কমিটির অফিসে বসে সাংবাদিক সম্মেলন করে কীভাবে একজন কমিউনিস্ট পার্টির নেতা বলতে পারেন, তিনি নিজের বাবার টাকায় বিলাসবহুল গাড়ি কিনেছেন বেশ করেছেন? বিজেপির নির্বাচনী প্রচারের ভিডিওতে মুখ দেখানো শিল্পীদের পার্টির কর্মসূচিতে নিয়ে আসার পরেও তিনি শাস্তিই বা এড়ান কী করে? কোন সম্মেলনে কে কাকে ভোটে হারিয়ে পদাধিকারী হলেন, কার সঙ্গে কার হাতাহাতি হল – সে খবরই বা সংবাদমাধ্যমে দিনের পর দিন এসে পড়ে কী করে? কীভাবে সামান্য যুব সংগঠনের সম্মেলনে কোনো পদ না পেয়ে কেউ সোশাল মিডিয়ায় পোস্ট করতে পারে, সে নেতা হল না বলে আগামীদিনে সংগঠনের কাছে কেউ মূত্রত্যাগ করতেও যাবে না?

লেখাটায় সাংবাদিকসুলভ নৈর্ব্যক্তিকতা থাকছে না, তাই না? থাকা উচিতও নয়। কারণ সাংবাদিকও মেয়ের বাবা। রাজ্যটার হাল দেখে স্পষ্ট বুঝতে পারছি, সর্বাঙ্গ পচে গেছে। এই রাজ্যে আমি থাকি, আমার মেয়ে থাকে। কেন নৈর্ব্যক্তিক হতে যাব? ‘সর্বাঙ্গ’ কথাটা পছন্দ হচ্ছে না? আচ্ছা সবিস্তারে বলি। সিপিএম তো শূন্য, আপনারা যাদের ভোট দিয়ে রাজ্যের বিরোধী দল বানিয়েছেন তাদের দিকেই তাকিয়ে দেখুন। শুভেন্দু অধিকারী, সুকান্ত মজুমদাররা সারাক্ষণ গরম লোহার মত বাক্যবাণ নিক্ষেপ করেন পশ্চিমবঙ্গ সরকারের দিকে, অথচ দু-চার লাইন আইসক্রিমের মত ঠান্ডা বিবৃতি দিয়েছেন তমন্নার ঘটনা নিয়ে। তৃণমূল বিধায়কের আনা টাকা ফিরিয়ে দেওয়ার জন্যে কিঞ্চিৎ প্রশংসা করেছেন তমন্নার মায়ের। তাঁকে কোনো অজ্ঞাত কারণে বেগম রোকেয়ার সঙ্গে তুলনা করেছেন। বোধহয় আরবি নামের জন্যে। আসলে তমন্না, সাবিনারা রোকেয়ার মত আরবি নামের বাঙালি বলেই তো এই নিয়মরক্ষা। যদি মেয়েটার নাম হত তৃণা বা মণি, তাহলেই ব্যাপারটাকে জাতীয় স্তরে নিয়ে ফেলতেন ওঁরা। প্রধানমন্ত্রী এক্সে পোস্ট করতেন, অমিত মালব্য ও সম্প্রদায় পশ্চিমবঙ্গে হিন্দুরা কত বিপন্ন – তার অজস্র বানানো প্রমাণ ছড়াতে শুরু করতেন।

কিন্তু ভেবে দেখুন তো, দোষগুলো কি শুধু তৃণমূল-সিপিএম-বিজেপির মধ্যে সীমাবদ্ধ? মেয়েটার নাম তমন্না বলে আর সুদূর নদিয়ার কালীগঞ্জের বাসিন্দা বলেই কি ‘কোনো রাজনৈতিক দলকে আমাদের আন্দোলনে ঢুকতে দেব না’ বলে চিৎকার করা নারীবাদী নেত্রীরা আজ চুপ নন? যে কোনো দলের কলকাতার নেতার মেয়ে এভাবে খুন হলেও কি চুপ থাকতেন তাঁরা? ‘ওকে সেই ছোট থেকে দেখেছি’ বলে টিভি ক্যামেরায় বাইট দেওয়া শুরু হত না? তৃণমূলের নেতা, কর্মীরা যে দুর্নীতি করেন তাকে কি গোটা বঙ্গসমাজই আসলে প্রশংসার দৃষ্টিতে দেখে না? বছর বিশেক আগেও পাড়ায় ঘুষখোর সরকারি অফিসার বা দু নম্বরি ব্যবসায়ী থাকলে, তার ধোপা নাপিত বন্ধ না করলেও, সকলে তাকে একটু এড়িয়ে চলত। সে বাড়িতে ঘটা করে লক্ষ্মীপুজো, সরস্বতীপুজো বা লোকনাথ বাবার জন্মতিথি পালন করে লোক খাওয়ালে বাড়ি ফিরে নিমন্ত্রিতরাই আলোচনা করত ‘পাপের টাকা তো, এসব করে পাপ ধোয়ার চেষ্টা করে আর কি।’ আজ কিন্তু কারোর আঙুল ফুলে কলাগাছ হলে কেউ খোঁজ করে না – এত টাকা পেল কোত্থেকে। বরং তাকেই সফল লোক বলে মেনে নেয় সকলে। কেউ প্রশ্ন তুললে তার সম্পর্কে বলাবলি করে ‘যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে হবে তো। নিজে পারেনি বলে হিংসে করছে।’ সিপিএমের মত আলস্য, দিশাহীনতা এবং কোনো ত্যাগস্বীকার না করেই দাবি আদায় করা যাবে – এরকম মনোভাবও তো আমাদের সকলেরই।

দেখে শুনে মনে হয়, তমন্না মরে গিয়ে বেঁচে গেল। ওর মত মেয়ের জন্যে আমাদের গ্রামে পড়ার স্কুল নেই, কলেজগুলোও ধুঁকছে। কলেজ পেরিয়ে আরও বড় কোথাও, ভাল কোথাও সে পৌঁছতে পারত – এমন ভাবনাও হাস্যকর। অল্প বয়সে বিয়ে হয়ে অপুষ্টিতে ভোগা বাচ্চার মা হওয়া ছাড়া আর কোন ভবিষ্যৎ রেখেছিলাম আমরা ওর জন্যে? সে ভবিষ্যৎও তো সুস্থ শরীরে বড় হলে। তার আগেই নির্জন মাঠে বা বনে বাদাড়ে নিয়ে গিয়ে যদি ওকে ফুর্তি করে শেষ করে দিত কোনো নরপশু? এমন তো হামেশাই হচ্ছে আমাদের চারপাশে। অপরাধীরা অনেকে আবার গায়ে হাওয়া লাগিয়ে ঘুরেও বেড়াচ্ছে। যদি ধরে নিই, এসব কিছুই হত না, বড় হয়ে একটা সুস্থ স্বাভাবিক জীবন পেত আমাদের তমন্না, তাতেও কি শান্তি থাকত? চারদিকে ব্যাঙের ছাতার মত এত ঘৃণার ফসল ফলেছে আমাদের এই বাংলায়, যে একটা মেয়ে অন্য ধর্মের ছেলেকে বিয়ে করেছে বলে সম্প্রতি তার শ্রাদ্ধ করেছে পরিবার। এই ঘৃণা কখন কাকে গিলে ফেলে কোনো ঠিক আছে? আমাদের কি আর কোনো অধিকার আছে সন্তানের জন্ম দেওয়ার? আমাদের ‘জীনে কি তমন্না’ তো ‘মারনে কা ইরাদা’ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

নাগরিক ডট নেট ওয়েবসাইটে প্রকাশিত

মহিলা ভোটাররা কি এখনো ততটা মানুষ নন পশ্চিমবঙ্গে?

ভারত জুড়ে মহিলা ভোটারদের গুরুত্ব ক্রমশ বাড়ছে। লোকসভা নির্বাচনের সঙ্গেই বিধানসভা নির্বাচন আছে অন্ধ্রপ্রদেশে। প্রায় সব বিশ্লেষক বলছেন, ওই রাজ্যে কে ক্ষমতায় আসবে তা নির্ধারিত হবে মহিলাদের হাতে। পশ্চিমবঙ্গেও যে মহিলাদের ভোট অতি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়িয়েছে, তা জানতে কারোর বাকি নেই। নির্বাচন কমিশনের তথ্য বলছে, পশ্চিমবঙ্গে এখন ৩.৭৩ কোটি মহিলা ভোটার। পুরুষদের চেয়ে মাত্র ১২ লক্ষ কম। ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে আমাদের রাজ্যে পুরুষদের চেয়ে বেশি মহিলা ভোট দিয়েছিলেন। বলা হয়, তৃণমূল কংগ্রেসের বারবার ভোটে জেতার অন্যতম কারণ মমতা ব্যানার্জির মহিলা ভোটব্যাঙ্ক। সেই ভোটব্যাঙ্ককে আরও জোরদার করতেই নাকি লক্ষ্মীর ভাণ্ডার প্রকল্পের কথা ভাবা হয়েছিল। সাধারণ বুদ্ধি বলে, এমন একটা রাজ্যে ভোটের সময়ে মহিলাদের গুরুত্ব সব দলের কাছেই আকাশছোঁয়া হবে। নির্বাচনী প্রচার ভরে থাকবে মহিলাদের দাবিদাওয়া নিয়ে। কিন্তু দুঃখের বিষয়, ভারত এমন একটা দেশ যে দেশে সাধারণ বুদ্ধি বিশেষ কাজে লাগে না। এখানে সারাক্ষণই অসাধারণ ব্যাপারস্যাপার ঘটতে থাকে। এখন যেমন পশ্চিমবঙ্গে আলোচনার কেন্দ্রে মহিলারাই, কিন্তু রাজনৈতিক দলগুলো তাঁদের ভোট পাওয়ার জন্যে ‘এই করব, সেই দেব, তাই বানিয়ে দেব’ বলছে বলে নয়। বরং দুই প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী দল মহিলাদের সম্মানকে দড়ি টানাটানির বিষয়বস্তু করে তুলেছে বলে।

আমরা যখন কলেজে পড়ি, তখন গরীবের সম্মান নামের এক বাংলা ছবির পোস্টার লেগেছিল আমাদের হোস্টেলের পাড়ার বেশকিছু দেওয়ালে। তা দেখে আমার এক বন্ধু বলেছিল, ‘এ থেকেই বোঝা যায় যে দেশে গরিবের কোনো সম্মান নেই।’ পশ্চিমবঙ্গে এই মুহূর্তে বহু আলোচিত মহিলাদের সম্মান সম্পর্কে একই কথা প্রযোজ্য। তৃণমূল কংগ্রেস আর বিজেপি – দুপক্ষ থেকেই যত ফিল্মি সংলাপ ছোড়া হচ্ছে, তত পরিষ্কার হচ্ছে আসলে মহিলাদের সম্মান নয়, তাঁদের ভোটই অভীষ্ট লক্ষ্য। সন্দেশখালিতে আসলে কোনো ধর্ষণ হয়নি, বিজেপি মহিলাদের দিয়ে মিথ্যা অভিযোগ দায়ের করিয়েছে – এই মর্মে বিজেপিরই অঞ্চল সভাপতি গঙ্গাধর কয়ালের ভিডিও ভাইরাল হওয়ার পর সোমবার এক সভায় মুখ্যমন্ত্রী বলেছেন ‘মেয়েদের কাছে টাকার চেয়ে শাড়ির আঁচল অনেক গুরুত্বপূর্ণ, সম্মান গুরুত্বপূর্ণ। বেশি চক্রান্ত করো না। সব কিছু পরিকল্পনা (করে) করেছে।’ পালটা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ বলেছেন ‘মমতা দিদি আপনার লজ্জা হওয়া উচিত। আপনি মহিলা মুখ্যমন্ত্রী, আপনার নাকের ডগায় হাজার হাজার বোনের উপর অত্যাচার, ধর্ষণ হয়েছে। কিন্তু আমি আজ বলতে চাই, সন্দেশখালিতে যে অত্যাচার করেছে, সে যদি পাতালেও লুকিয়ে থাকে… মমতা দিদি তাঁদের পাতালে লুকিয়ে রাখলেও সেখান থেকে খুঁজে বের করে জেলে ঢোকাব।’

শাহের বক্তব্যের পুরোটাই ফেনা, অতএব তা নিয়ে আলোচনা নিষ্প্রয়োজন। মুখ্যমন্ত্রীর নাটকীয় প্রথম বাক্য বাদ দিয়ে বাকিটা বিচার করা যাক। তাঁর বক্তব্য সত্যি হওয়া মোটেই অসম্ভব নয়। নাগরিক ডট নেট যেহেতু বিজেপি নেতার ভাইরাল ভিডিও সম্পর্কে তদন্ত করেনি, করার উপযুক্তও নয়, সেহেতু ওতে প্রযুক্তিগত কারিকুরি আছে কিনা তা আমরা বলতে পারি না। কিন্তু যেভাবে ভিডিও প্রকাশ্যে আসার কিছুক্ষণের মধ্যেই এক খবরের চ্যানেলে গঙ্গাধর স্বীকার করেছিলেন – ছবিতে যাকে দেখা যাচ্ছে সেই ব্যক্তি উনিই এবং ওই কথোপকথন সত্যিই হয়েছিল, তাতে পরবর্তীকালে স্পষ্টতই দলের নির্দেশে তিনি যে ভিডিও বিবৃতি দিয়েছেন তাকে বিশ্বাস করা শক্ত হয়ে পড়ে।

তিনি এখানে কোনোমতে আত্মপক্ষ সমর্থনে এটুকুই বলতে পেরেছেন যে তাঁকে দিয়ে কথাগুলো বলানো হয়েছিল। কীভাবে? প্রলোভন দেখিয়ে, নাকি ভয় দেখিয়ে? সে ব্যাপারেও কিছু বলেননি তখন। এমনকি পরে বিবৃতি বদলে ফেলেও তা বলেননি, বলেছেন এতে যান্ত্রিক কারচুপি আছে। অর্থাৎ দুটো বিবৃতি পরস্পরবিরোধী। গঙ্গাধরের কথা অনুযায়ী যে ব্যক্তি এসবের পরিকল্পনা করেছিলেন, সেই শুভেন্দু অধিকারীও এই ভিডিও অসত্য – এ কথার অকাট্য প্রমাণ এখন পর্যন্ত দিতে পারেননি। যাঁরা ধর্ষণের অভিযোগে আন্দোলন শুরু করেছিলেন তাঁদের অন্যতম এবং বসিরহাট লোকসভা কেন্দ্রের বিজেপি প্রার্থী রেখা পাত্র তবু টিভি ক্যামেরার সামনে বলেছেন, গঙ্গাধরকে ভয় দেখিয়ে তৃণমূল এসব করে থাকতে পারে। কিন্তু সে তো তাঁর বিশ্বাস। এখন কথা হল, মুখ্যমন্ত্রী যদি মনে করেন এই ভিডিও বিজেপির ষড়যন্ত্রের অকাট্য প্রমাণ, তাহলে নির্বাচনী প্রচারে তাদের বদমাইশি ধরিয়ে দেওয়ার পাশাপাশি ফৌজদারি মামলা দায়ের করা হচ্ছে না কেন? ধর্ষণের মিথ্যা অভিযোগ দায়ের করিয়ে একটা এলাকায় অশান্তি সৃষ্টি করা, সাম্প্রদায়িক বিভাজনের চেষ্টা করা – এগুলো তো মারাত্মক অপরাধ। কেউ এই অপরাধ করেছেন জানলে স্রেফ বাদানুবাদে থেমে থাকবে কেন একটা রাজ্যের সরকার? কেনই বা যে মহিলারা ধর্ষণের অভিযোগ দায়ের করেছেন, পুলিস তাঁরা কী বলছেন তা জানার চেষ্টা করবে না? একথা তো সত্যি, যে আইনত গঙ্গাধর সত্যি বলে থাকলেও প্রমাণ হয় না সব সাজানো। একজন অভিযোগকারী মহিলা কী বলছেন সেটাই বিচার্য।

এখানেই সন্দেহ হয়, সন্দেশখালিতে সত্যিই মহিলারা ধর্ষিত হয়েছেন কি হননি তা নিয়ে মুখ্যমন্ত্রীর ততটা মাথাব্যথা নেই। তিনি শুধু রাজ্যের মহিলা ভোটারদের কাছে একথা প্রমাণ করতে চান যে বিজেপি এতই হীন একটা দল, যে মহিলাদের মানসম্মানের তোয়াক্কা করে না। রাজনৈতিক ফায়দার জন্যে তাঁদের দিয়ে ধর্ষণের মিথ্যা অভিযোগ করাতেও পিছপা হয় না। রাজ্যের আরেকটা ঘটনাতেও এই একই সন্দেহ হয় মুখ্যমন্ত্রীর উদ্দেশ্য সম্পর্কে। সেটাও চমকে দেওয়ার মত ঘটনা।

রাজ্যপাল সিভি আনন্দ বোসের বিরুদ্ধে শ্লীলতাহানির অভিযোগ এনেছেন রাজভবনের এক অস্থায়ী কর্মচারী। হেয়ার স্ট্রিট থানায় এফআইআর করেছেন। এই খবর প্রকাশ হওয়ার পর থেকে রাজ্যপাল এমন একটা কাজও করেননি যাতে তিনি যে নির্দোষ তা প্রমাণ করার আন্তরিকতা বোঝা যায়। তিনি কেবল রাজভবনে পুলিসের আর মন্ত্রী চন্দ্রিমা ভট্টাচার্যের প্রবেশ নিষেধ করেছেন। বিবৃতি দিয়ে বলেছেন এটা রাজনৈতিক চক্রান্ত। এমন নয় যে অতীতে কখনো কোনো রাজ্যের রাজ্যপালের বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ ওঠেনি। কিন্তু তাঁদের প্রতিক্রিয়া আনন্দ বোসের মত হয়নি।

২০০৯ সালে অন্ধ্রপ্রদেশের রাজ্যপাল পদ ছাড়তে হয়েছিল নারায়ণ দত্ত তিওয়ারিকে। কারণ রাজভবনে তাঁর যৌন কীর্তিকলাপের টেপ প্রকাশ্যে এসেছিল এবং বিরোধীরা সমস্বরে তাঁর পদত্যাগ দাবি করেছিল। সিপিএম নেত্রী বৃন্দা কারাত রাষ্ট্রপতি প্রতিভা পাতিলকে চিঠি লিখে জানিয়েছিলেন, যদি তিওয়ারি পদত্যাগ করতে রাজি না হন তাহলে তাঁকে বরখাস্ত করা উচিত। অভিযোগ ওঠার পরে আনন্দ বোসের মত বুক ফুলিয়ে চলা তিওয়ারির পক্ষে সম্ভব হয়নি। অনস্বীকার্য যে অভিযোগ উঠেছে মানেই বোস অপরাধী তা নয়। অপরাধ প্রমাণিত হতে হয়। কিন্তু সে তো তদন্তসাপেক্ষ, আর রাজ্যপাল পদের সাংবিধানিক রক্ষাকবচ থাকায় বোসের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা দায়ের করে তদন্ত শুরু করাও সম্ভব নয়। কিন্তু নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করতে পদত্যাগ করার নামটি নেই; উল্টে রাজভবনের কর্মীদেরও এ বিষয়ে শমন অগ্রাহ্য করার নির্দেশ দেওয়া, পুলিসকে সিসিটিভি ফুটেজ না দেওয়ার আদেশ করার মত ঔদ্ধত্য রাজ্যপালের আসে কোথা থেকে?

উত্তরটা খুব শক্ত নয়। তিওয়ারির বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠার সময়ে কেন্দ্রে ছিল কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন ইউপিএ সরকার। কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভার পরামর্শে রাজ্যপাল নিয়োগ করেন রাষ্ট্রপতি। তিওয়ারি অবশ্যই বুঝেছিলেন যে কেন্দ্রের সরকার তাঁর পদ বাঁচানোর চেষ্টা করবে না। তাই মানে মানে কেটে পড়েন। বোস নির্ঘাত জানেন, এই অভিযোগের কারণে নরেন্দ্র মোদীর নেতৃত্বাধীন সরকারের পরামর্শে রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মু তাঁকে সরে যেতে বলবেন না। শুধু বোস কেন, আপনি-আমিও জানি যে যৌন অপরাধের অভিযোগ বিজেপির কাছে কোনো অভিযোগের মধ্যেই পড়ে না। তাদের সরকার বিলকিস বানোর ধর্ষক বলে শাস্তিপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের ক্ষমা করে দেয়, জেল থেকে বেরোবার পর মালা পরিয়ে বরণ করে। ওই দলের নেতা আট বছরের মেয়ে আসিফাকে ধর্ষণ করে খুন করায় অভিযুক্তদের সমর্থনে মিছিল করে। পদক জয়ী অলিম্পিয়ানরা রাস্তায় বসে আন্দোলন করলেও ব্রিজভূষণ শরণ সিং গ্রেফতার হন না। ঝামেলা খুব বেড়ে যাওয়ায় তাঁকে কুস্তি ফেডারেশনের সর্বোচ্চ পদ থেকে সরিয়ে তাঁরই ডানহাতকে ওই পদে বসানোর ব্যবস্থা করে দেওয়া হয় আর নির্বাচনের টিকিটটা তাঁকে না দিয়ে তাঁর ছেলেকে দেওয়া হয়। উত্তরপ্রদেশের হাথরাসের মেয়েটার কী হাল করা হয়েছিল তাও আমরা জানি। সোমবার উত্তরবঙ্গ সংবাদ কাগজের প্রথম পাতায় এক প্রতিবেদনে রূপায়ণ ভট্টাচার্য জানিয়েছেন, তার পরিবারকে আজও নজরবন্দি করে রাখা হয়েছে আর ধর্ষকরা বহাল তবিয়তে ঘুরে বেড়াচ্ছে। কর্ণাটকে তো বিজেপির নেতাই অভিযোগ করেছেন, প্রোজ্জ্বল রেবন্ন নামক নরকের কীটটি সম্পর্কে তিনি আগেই নেতৃত্বকে জানিয়েছিলেন এবং জেডিএসের সঙ্গে জোটে থাকা উচিত হচ্ছে না বলেছিলেন। কেউ কান দেয়নি। সবচেয়ে বড় কথা, যে প্রধানমন্ত্রী এক বছরে একবারও মণিপুরে যাওয়ার প্রয়োজন বোধ করেননি, কুকি মহিলাদের উলঙ্গ করে হাঁটানোর নিন্দা করতে সময় নেন আড়াই মাস, তিনি সামান্য শ্লীলতাহানির অভিযোগেই একজন রাজ্যপালকে সরতে বলবেন? যাঃ!

প্রমাণ হয়ে গেছে, বোসের অনুমান নির্ভুল। প্রধানমন্ত্রী ওই অভিযোগ ওঠার পরে পরেই পশ্চিমবঙ্গে এসে ভোটের প্রচার করে গেছেন, রাজভবনের আতিথ্য গ্রহণ করেছেন। কিন্তু সেখানকার কর্মচারীর অভিযোগ নিয়ে উচ্চবাচ্য করেননি। মানে সন্দেশখালির প্রধান অভিযুক্তের নাম শাহজাহান না হলে বা সে বিজেপির সদস্য হলে সিবিআই তদন্তের কথা হয়ত উঠত না। গঙ্গাধর সত্যি বলছেন না মিথ্যে, তা নিয়েও মাথা ঘামানোর দরকার হত না। কিন্তু এখন নির্বাচনের মরসুম, সন্দেশখালিতে বিজেপির ‘দোনো হাথ মে লাড্ডু’ হয়ে গেছে। একে হিন্দু বনাম মুসলমান বয়ান তৈরি করা গেছে (গোদি মিডিয়ার সহায়তায় দিব্যি চেপে যাওয়া গেছে যে শাহজাহানের দুই প্রধান স্যাঙাতই হিন্দু), তার উপর ভোটের বাজারে পশ্চিমবঙ্গের মহিলা ভোটারদের সামনে তৃণমূলকে নারীবিরোধী প্রমাণ করার সুযোগ পাওয়া গেছে। সত্যিই নারীর সম্মান মূল্যবান মনে করলে আনন্দ বোসকে আপাতত পদ ছেড়ে দিতে বলা হত।

কিন্তু এ তো বিজেপির সন্দেহাতীত ব্যবহার। এই ঘটনাতেও মুখ্যমন্ত্রীর উদ্দেশ্য নিয়ে সন্দেহ আছে বলছি কেন? তার কারণ মুখ্যমন্ত্রী প্রচারে এই কাণ্ড নিয়ে বলতে গিয়ে বলেছেন, এরকম আরও অনেক ঘটনা সম্পর্কে তিনি আগেই জানতেন। প্রশ্ন হল, জানলে আগেই কেন্দ্রীয় সরকারকে জানিয়ে এই রাজ্যপালকে সরানোর ব্যবস্থা করেননি কেন? তাহলে কি তিনি নির্বাচনের অপেক্ষায় ছিলেন? রাজভবনের কর্মচারী মহিলার অভিযোগকে কি তিনি স্রেফ বিজেপিকে মহিলাবিরোধী এবং নিজের দলকে মহিলাবান্ধব প্রমাণ করার কাজে লাগাচ্ছেন? অর্থাৎ সন্দেহ হয়, এখানেও উদ্দেশ্য সেই মহিলাদের ভোট, মহিলাদের সম্মানরক্ষা নয়।

আলোচনাটা এখানেই শেষ করে দিলে বিজেপি-তৃণমূল বাইনারিকে উৎসাহ দেওয়া হয়ে যাবে হয়ত। যারা রাজ্যের তৃতীয় শক্তি এবং এই নির্বাচনে আরও শক্তিশালী তৃতীয় শক্তি হয়ে ওঠার চেষ্টা চালাচ্ছে তাদের ভূমিকা সম্পর্কেও কিছু বলা দরকার।

বামফ্রন্টের বড় শরিক সিপিএম, আর কংগ্রেস, দুই দলের নির্বাচনী ইশতেহারেই মহিলাদের সম্পর্কে প্রচুর পরিকল্পনার কথা আছে। সিপিএমের ইশতেহারে ‘women’ শব্দটা আছে ৪৯ বার, কংগ্রেসের ইশতেহারে ৪০ বার। দুই দলেরই ক্ষমতায় এলে মহিলাদের জন্যে অনেক ভাল ভাল পরিকল্পনা আছে, যা পশ্চিমবঙ্গের মহিলাদেরও যে কাজে লাগবে তা বলাই বাহুল্য। সিপিএম এবারে মহিলা ভোটারদের গুরুত্ব দিয়ে আলাদা করে সাংবাদিক সম্মেলনও করেছে। কিন্তু এখানে আমরা যে দুটো ঘটনা নিয়ে আলোচনা করছি, সেগুলো সম্পর্কে দুই দলেরই অবস্থান অস্পষ্ট বা আপত্তিকর।

সন্দেশখালির শাহজাহানবিরোধী আন্দোলনে সিপিএম তথা সিপিএম-কংগ্রেস জোটের বসিরহাট কেন্দ্রের প্রার্থী নিরাপদ সর্দার উল্লেখযোগ্য ভূমিকা নিয়েছিলেন। পুলিস তাঁকে গ্রেফতারও করেছিল। মীনাক্ষী মুখার্জি সমেত অন্যান্য বাম নেতৃত্বকে সন্দেশখালি যেতে বাধাও দেওয়া হয়েছিল। বিজেপির মত কেবল হিন্দু মহিলা ধর্ষিত হয়েছেন এমন দাবি না করে থাকলেও মহিলাদের উপর নির্যাতন নিয়ে সিপিএমও সরব ছিল। কংগ্রেস ওই এলাকায় প্রায় অস্তিত্বহীন। কিন্তু তারাও ওই আন্দোলনের পক্ষে দাঁড়িয়েছিল। এখন গঙ্গাধরকে নিয়ে কী করা হবে সেটা দুই দলের নেতৃত্ব কি বুঝে উঠতে পারছেন না?

প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি এবং বহরমপুর কেন্দ্রের প্রার্থী অধীররঞ্জন চৌধুরী ভিডিওর প্রতিক্রিয়ায় ঘুরে ফিরে মমতাকেই দায়ী করেছেন। কেন তা বোঝা শক্ত। সিপিএমের রাজ্য সম্পাদক তথা মুর্শিদাবাদ কেন্দ্রের প্রার্থী মহম্মদ সেলিম বলেছেন রাজ্যের যেখানে যা কুকর্ম হয় সবেতেই হয় তৃণমূল, নয় বিজেপি অথবা দুই দলই যুক্ত থাকে। বিজেপি নিজের সুবিধা করতে গিয়ে তৃণমূলের দুঃশাসনের সুবিধা করে দিয়েছে গত দশ বছরে। এ কথারই বা মানে কী? গঙ্গাধরের কথায় সিপিএম বিশ্বাস করছে, নাকি ওটা তৃণমূলের চক্রান্ত বলেই ধরছে? সত্যিই ধর্ষণ হয়নি, নাকি হয়েছিল? স্থানীয় সিপিএম জানে না সত্যিটা কী? কিছুই পরিষ্কার হল না। বর্ষীয়ান সিপিএম নেতা এবং দমদম কেন্দ্রের কংগ্রেস সমর্থিত প্রার্থী সুজন চক্রবর্তী যা বলেছেন তা আরও অদ্ভুত।

সেলিমের বক্তব্য শুনলে মনে হয়, তিনি জিমন্যাস্টের মত ব্যালান্স বিমের উপরে রয়েছেন। একটু এদিক ওদিক হলেই পড়ে যাবেন, প্রতিযোগিতার বাইরে চলে যাবেন। আইন এবং সহবত বলে, তদন্ত ছাড়াই কোনো মহিলার লাঞ্ছনার অভিযোগ উড়িয়ে দেওয়া উচিত নয়। তার উপর রাজ্যের প্রায় অর্ধেক ভোটার মহিলা। তাই সেলিম ধর্ষণের অভিযোগগুলোকে এখনই মিথ্যে বলতে পারছেন না। ওদিকে গঙ্গাধরের ভিডিওটাও যে উড়িয়ে দেওয়া যায় না তা না বোঝার লোক তিনি নন। এর উপর আছে তৃণমূল ও বিজেপি, দুপক্ষই খারাপ – এই অবস্থান বজায় রাখার দায়িত্ব। সুজন যা বলেছেন তাতে আবার মনে হয় তিনি সেলিমের সঙ্গে একমত নন। তিনি নিশ্চিত জানেন যে গঙ্গাধরের ভিডিও ভুয়ো। একই পার্টির দুজন নেতা যদি এরকম প্রায় পরস্পরবিরোধী বিবৃতি দেন, তাহলে পার্টির মত কোনটা তা বোঝা দায় হয়ে পড়ে। যদি স্রেফ ভোট বৈতরণী পার হওয়াই উদ্দেশ্য হয়, তাহলেও এমন গোলমেলে অবস্থান কোনো দলের পক্ষে স্বাস্থ্যকর নয়।

তবে এ নিয়ে তবু বাম-কংগ্রেস কোনো একটা অবস্থান নিয়েছে। রাজভবনের কাণ্ডে তাদের অবস্থান কী তা এখন পর্যন্ত অজানা। একমাত্র বিমান বসু ‘অন রেকর্ড’ মতামত দিয়েছেন, যদি একে কোনো মতামত বলা যায় – ‘রাজ্যপালের ঘটনা দুর্ভাগ্যজনক। সবটা না জেনে এখনই কোনো মন্তব্য করব না।’ অধীর চৌধুরীর রাজ্যপালকে আক্রমণ না করা তবু মেনে নেওয়া যায়। হাজার হোক তিনি কংগ্রেস নেতা। কেন্দ্রে কংগ্রেসের সরকার থাকার সময়ে রাজ্যপালদের দিয়ে কী কী করানো হয়েছে তা হয়ত তাঁর মনে আছে। তাই তিনি রাজ্যপালের খুব একটা দোষ ধরেন না। কিন্তু সিপিএম নেতাদের রাজ্যপালের প্রতি এত সম্ভ্রম কৌতূহলোদ্দীপক।

আরও পড়ুন শুধু কুস্তির পদক নয়, দেবতার গ্রাসে আজ সবার সন্তান

ক্ষমতা চলে যাওয়ার পর থেকেই বঙ্গ সিপিএমের নেতারা রাজ্যপালদের সম্পর্কে খুব সাবধানী হয়ে উঠেছেন। বরাবর কিন্তু এমন ছিল না। সিপিএম দল একসময় রাজ্যপাল পদটারই অবলুপ্তি দাবি করত। এবারের ইশতেহারেও লেখা রয়েছে ‘It [CPI(M)] stands for a Governor to be chosen out of a panel of three eminent persons proposed by the chief minister…’। অর্থাৎ সিপিএম চায়, রাজ্যপাল বেছে নিক মুখ্যমন্ত্রী দ্বারা প্রস্তাবিত তিন বিশিষ্ট ব্যক্তির এক প্যানেল। কেরালার রাজ্যপালের সঙ্গে গত কয়েকমাস ধরে ধুন্ধুমার চলছে সে রাজ্যের সিপিএম নেতৃত্বাধীন সরকারের। পার্টির ছাত্র সংগঠন রাজ্যপালের বিরুদ্ধে একের পর এক কর্মসূচি গ্রহণ করে চলেছে। অথচ এ রাজ্যের সিপিএম নেতারা সেই জগদীপ ধনখড়ের আমল থেকেই রাজ্য সরকার আর রাজ্যপালের সংঘাত হলে দুপক্ষই খারাপ – একথা বলতে ভীষণ ব্যস্ত হয়ে পড়েন। জ্যোতি বসু আর তাঁর প্রথম অর্থমন্ত্রী অশোক মিত্র কিন্তু দ্ব্যর্থহীন ভাষায় কেন্দ্র-রাজ্য সংঘাতে রাজ্যের পক্ষ নিতেন। বিরোধীশাসিত রাজ্যগুলোকে একজোট করে কেন্দ্র-রাজ্য সম্পর্কের পুনর্বিন্যাসের জন্য তাঁরা দীর্ঘদিন পরিশ্রম করেছেন। সারকারিয়া কমিশন অনেকটা সেই পরিশ্রমের ফসল। মোদী সরকারের আমলে যে রাজ্যপাল আর কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের লেফটেন্যান্ট গভর্নররা সাংবিধানিক অধিকারের সীমা লঙ্ঘন করেছেন বারবার, সেকথা কিন্তু সিপিএমের নির্বাচনী ইশতেহারে পর্যন্ত লেখা হয়েছে। অথচ মমতা সরকারের সঙ্গে যতবার ধনখড়ের সংঘাত হয়েছে, সিপিএম নেতারা ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন দোষ যে দুজনেরই তা প্রমাণ করতে। বোস আসার পরেও প্রথম দিকে ব্যাপারটা বদলায়নি, ইদানীং অবশ্য কিছু ব্যতিক্রম দেখা যাচ্ছে। বোস যখন গতবছর রাজনৈতিক হিংসায় আক্রান্তদের বাড়ি বাড়ি ঘুরে বেড়াচ্ছিলেন, তখন সেলিম বলেছিলেন, এটা রাজ্যপালের কাজ নয়। রাজ্যপাল শাহের নির্দেশে বিজেপি নেতা হওয়ার চেষ্টা করছেন। রাজ্যের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে দুর্নীতি এবং হিংসা চলছে অভিযোগ করে বোস বিচারবিভাগীয় তদন্তের নির্দেশ দেন গতমাসে। কংগ্রেস, সিপিএম, তৃণমূল একযোগে বলে – রাজ্যপালের এ কাজ করার এক্তিয়ার নেই।

সেসব না হয় সাংবিধানিক অধিকারের ব্যাপার। বোসের বিরুদ্ধে শ্লীলতাহানির অভিযোগ নিয়ে মতামত দেওয়া তো তুলনায় সহজ। যে সহবতের কারণে সেলিম সন্দেশখালির মহিলাদের অভিযোগ উড়িয়ে দিতে পারছেন না, সেই সহবত অনুযায়ীই বলতে পারার কথা যে রাজ্যপালের উচিত সরে গিয়ে তদন্তের পথ করে দেওয়া। তিনি দোষী না নির্দোষ তা পরে দেখা যাবে। রাজ্যের প্রায় ৫০% মহিলা ভোটারের কথা ভেবেও বাম, কংগ্রেস নেতারা এইটুকু বলে উঠতে পারছেন না।

নাগরিক ডট নেটে প্রকাশিত

সঙ্কোচের বিহ্বলতায় নিজেরে অপমান করছে সিপিএম

সরকারবিরোধী মানুষ এত অসহায় যে এই সময়কালে অনেকের মনে বিরোধী নেতাদের শূন্য আসনে শুধু বিজেপি নেতারাই নয়, বিচারকরাও বসে পড়েছেন।

সালটা ১৯৯৬। জ্যোতি বসুকে প্রধানমন্ত্রী করতে উদগ্রীব দেশের অকংগ্রেস, অবিজেপি দলগুলো। এই প্রস্তাবে সায় দেওয়া উচিত কিনা তা নিয়ে বিতর্ক চলছে সিপিএমের মধ্যে। সেইসময় আমাদের এলাকার সিপিএমের একেবারে নিচুতলার এক তরুণ কর্মী বলেছিলেন, ছোট থেকে শুনে আসছি আমাদের দলের নামে একটা ‘আই’ আছে। সেটার গুরুত্ব কী তা তো কোনোদিন টের পেলাম না। জ্যোতিবাবু প্রধানমন্ত্রী হলে গোটা দেশ টের পাবে। সেদিনের আড্ডায় অন্য এক কর্মী কংগ্রেসের সমর্থনে সরকারে যাওয়ার বিরোধিতা করে বলেছিলেন, আজ কংগ্রেসের সমর্থন নিয়ে কেন্দ্রে সরকার গড়ব, তারপর বিধানসভা নির্বাচনের সময়ে কোন মুখে ভোট চাইতে যাব লোকের কাছে? শেষপর্যন্ত যিনি ‘আই’-এর প্রভাব দেখার আশা করেছিলেন তাঁকে আশাহত হতে হয়েছিল। জ্যোতিবাবু স্বয়ং সেই নিচুতলার কমরেডের চেয়ে কিছু কম নিরাশ হননি। সরকারে না যাওয়ার পার্টিগত সিদ্ধান্ত মেনে নিয়েও বলেছিলেন, ঐতিহাসিক ভুল হল। জ্যোতিবাবুর জাতীয় দৃষ্টিভঙ্গির শরিক সেই কমরেড অতি সম্প্রতি প্রয়াত হলেন আর যিনি বিরোধিতা করেছিলেন তিনিও এখন বয়সের কারণে খানিকটা নিষ্প্রভ। ইতিমধ্যে সাতাশটা বছর কেটে গেছে, কিন্তু সিপিএমের ‘আই’ কতটা গুরুত্বপূর্ণ তা নিয়ে পার্টির নিজেরই দ্বিধা এখনো কাটল না। ইন্ডিয়া জোটের ‘আই’-তে ‘আই’ মেলানো নিয়ে সাম্প্রতিক টানাপোড়েন তারই প্রমাণ।

সেইসময় সরকারে না যাওয়ার সিদ্ধান্তের পিছনে ঘোষিত যুক্তি ছিল, এমন কোনো সরকারে যাব না যে সরকার মার্কসবাদী কর্মসূচি লাগু করে উঠতে পারবে না। কিন্তু সংবাদমাধ্যম থেকে জানা গিয়েছিল, পশ্চিমবঙ্গের বহু নেতা সরকারে যাওয়ার পক্ষে ছিলেন এবং তাঁরা মনে করেন ‘কেরালা লবি’ জ্যোতিবাবুকে প্রধানমন্ত্রী হতে দেয়নি। কথাটা সত্যি হোক বা না হোক, পশ্চিমবঙ্গের সব নেতাও যে সরকারে যাওয়ার পক্ষপাতী ছিলেন না তা সর্বজনবিদিত। এবারেও দেখা যাচ্ছে পশ্চিমবঙ্গের নেতৃত্ব সর্বভারতীয় হয়ে ওঠার পক্ষপাতী নয়। ইন্ডিয়া জোটে সিপিএম এবং তৃণমূল কংগ্রেস – দুই দলই থাকলেও, রাজ্য সম্পাদক মহম্মদ সেলিম এবং অন্যতম নেতা সুজন চক্রবর্তী বারবারই বলছেন পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি আর তৃণমূলের বিরুদ্ধে লড়াই চলবে। সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক সীতারাম ইয়েচুরিও একই কথা বলছেন, কিন্তু তৃণমূলের সঙ্গে এক জোটে থাকা ঠিক হচ্ছে কিনা তা নিয়ে সিপিএম নেতৃত্বের দ্বিধা স্পষ্ট হয়ে গেছে কো-অর্ডিনেশন কমিটিতে সদস্য না রাখার সিদ্ধান্তে। যদি গোড়াতেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হত তাহলে তবু বোঝা যেত। ইন্ডিয়া জোটের সব দল ওই কমিটিতে নেই। কিন্তু যখন কো-অর্ডিনেশন কমিটির সদস্যদের নাম ঘোষণা হয়, তখন সিপিএমের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল তাদের প্রতিনিধির নাম পরে জানানো হবে। পরবর্তীকালে হঠাৎ কমিটিতে না থাকার সিদ্ধান্ত হল কেন?

সিপিএম নেতৃত্বের এই দ্বিধার সমালোচনায় অনেক কথা বলা যায়। কিন্তু অনস্বীকার্য যে বিজেপিবিরোধিতা আর তৃণমূলবিরোধিতার মধ্যে একটি বেছে নেওয়া আজকের সিপিএমের পক্ষে কঠিন। তাদের বিজেপিবিরোধিতার ইতিহাসে কোনো ছেদ নেই। তৃণমূল কংগ্রেসের মত তারা কখনো বিজেপির সঙ্গে জোট সরকার গড়েনি, বিজেপির মন্ত্রিসভায় মন্ত্রী হননি কোনো সিপিএম নেতা। ১৯৮৯ সালে বিশ্বনাথ প্রতাপ সিংয়ের সরকারকে বিজেপি, সিপিএম দুই দলই সমর্থন দিয়েছিল। কিন্তু সেবার নির্বাচনে ভোটাররা কংগ্রেসকে ক্ষমতাচ্যুত করার পক্ষে মত দিয়েছিলেন। উপরন্তু স্বল্প সময়ে ভিপি সিংয়ের সরকার মণ্ডল কমিশনের সুপারিশ লাগু করা, একজন মুসলমানকে ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী করার মত অভূতপূর্ব কাজ করেছিল। সেই সরকারের অন্যতম নিয়ন্ত্রক শক্তি হওয়া সত্ত্বেও বিজেপি বাবরি মসজিদ ভেঙে উঠতে পারেনি, বাধা পেয়েই সমর্থন প্রত্যাহার করে। অর্থাৎ বিজেপির কোনো কর্মসূচি বাস্তবায়িত করতে দেওয়া হয়নি, উল্টে হিন্দুত্ববাদের অতি অপছন্দের গোটা দুয়েক কাজ সেই সরকার করে ফেলেছিল। স্বভাবতই সিপিএম বিজেপিবিরোধী জোটের স্বাভাবিক সদস্য।

অন্যদিকে পশ্চিমবঙ্গের বেশকিছু মানুষ যে এই মুহূর্তে তৃণমূল কংগ্রেসের বিরুদ্ধে ভোট দিতে মুখিয়ে আছেন তা বুঝতে বড় নেতা হতে হয় না। ট্রেনে বাসে বাজারে দোকানে খুচরো কথাবার্তায় গরিব, বড়লোক নির্বিশেষে মানুষের সরকারকে গাল দেওয়ার এরকম উৎসাহ শেষ দেখা গিয়েছিল বামফ্রন্ট আমলের শেষ পর্বে। এই অসন্তোষের কারণ যেমন ফ্ল্যাট থেকে টাকার পাহাড় উদ্ধার হওয়া অর্থাৎ যাবতীয় নিয়োগ দুর্নীতি, তেমনই প্রধানমন্ত্রী আবাস যোজনা নিয়ে দুর্নীতি, একশো দিনের কাজ না পাওয়ার মত বিষয়ও। পরের দুটি বিষয় সরাসরি গ্রামের গরিব মানুষের গায়ে লাগে। তা না হলে মনোনয়ন পর্ব থেকে শুরু করে গণনা পর্যন্ত পুকুর চুরির পরেও পঞ্চায়েত নির্বাচনে বিরোধীরা এতগুলো আসনে জিততে পারত না, বাম-কংগ্রেসের ভোটও বাড়ত না। সংসদীয় রাজনীতিতে জনমতের এই স্রোতকে কোনো সুস্থ মস্তিষ্কের বিরোধী দল অগ্রাহ্য করতে পারে না।

এমতাবস্থায় সিপিএম কী করতে পারত? ইন্ডিয়া জোটে না গিয়ে বলতে পারত আমরা নিজেদের মত করে বিজেপির বিরুদ্ধে লড়ব। সেক্ষেত্রে তৃণমূল তো বটেই, সব রঙের সমালোচক সিপিএমকে বিজেপির দালাল বলে দেগে দিত। ইন্ডিয়া জোটে থাকায় যেমন বিজেপি তৃণমূলের দালাল বলছে এবং নিজেদের সদস্য, সমর্থকরাও সন্দেহের চোখে দেখছে। কথা হল, সমালোচকরা কী বলবে তা ভেবে রাজনীতি করা দিশাহীনতার লক্ষণ। এতদিনের দিশাহীনতাই আজকের গাড্ডায় ফেলেছে সিপিএমকে। ইন্ডিয়া জোটে না গেলেই সিপিএমকে বিজেপির দালাল বলার সুযোগ পাওয়া যাবে কারণ ২০১১ সালের পর থেকে রাজ্যে সিপিএমের সক্রিয়তার অভাবে বিরোধী পরিসর দখল করতে শুরু করে বিজেপি। তৃণমূল ২০১৮ সালের পঞ্চায়েত নির্বাচনকে গায়ের জোরে প্রহসনে পরিণত করার পর নিচের তলার হতাশ সদস্য, সমর্থকরা বিজেপির দিকে ভিড় জমান এবং ২০১৯ সালের লোকসভা আর ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপি তার ফায়দা তোলে। সিপিএম শূন্যে পৌঁছয়। ফলে ‘পার্টি লাইন’ যা-ই হোক, সিপিএমই বিজেপিকে পুষ্ট করছে – একথা পাটিগাণিতিক সত্য হয়ে যায়। সেই বদনামের ভারে সিপিএম এখন ন্যুব্জ।

আরও পড়ুন নয়া বার্তা ছাড়া পরিশ্রমের ফল পাবে না সিপিএম

এই পরিস্থিতি তৈরিই হত না, যদি ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর থেকে নেতৃত্ব বাম রাজনীতির লড়াকু বিরোধিতার ঐতিহ্য বজায় রাখতেন। তৃণমূল ক্ষমতায় আসার পর অনতিবিলম্বে সারদা কেলেঙ্কারির পর্দাফাঁস হয়। অথচ সিপিএম একদিনের জন্যও তা নিয়ে জনজীবন অচল করে দেওয়ার মত আন্দোলন করেনি। নারদের ক্যামেরায় শাসক দলের নেতাদের নগদ টাকা ঘুষ নিতে দেখা যায়। সেইসময় বিরোধী নেত্রীর নাম মমতা ব্যানার্জি হলে কলকাতা অচল হয়ে যেত, সূর্যকান্ত মিশ্ররা কেবল বিবৃতি দিয়ে গেছেন। গতবছর মার্চে সেলিম রাজ্য সম্পাদক হওয়ার পরে এবং মীনাক্ষী মুখার্জির উদ্যোগে সিপিএমের আন্দোলনে ঝাঁজ আসে। তার আগে পর্যন্ত রাস্তার চেয়ে টিভির পর্দায় এবং ফেসবুক লাইভেই বেশি দেখা যেত সিপিএম নেতাদের। সরকারবিরোধী মানুষ এত অসহায় যে এই সময়কালে অনেকের মনে বিরোধী নেতাদের শূন্য আসনে শুধু বিজেপি নেতারাই নয়, বিচারকরাও বসে পড়েছেন।

এই দীর্ঘ নিষ্ক্রিয়তার মূল্য হিসাবে আসন্ন লোকসভা নির্বাচনেও শূন্য পাওয়া তেমন বড় কিছু নয়, যদি বিরোধী হিসাবে বিশ্বাসযোগ্যতা কিছুটা হলেও ফেরত আনা যায়। সিপিএম নেতৃত্বের এবং বিজেপিবিরোধী সিপিএম সমালোচকদেরও ভেবে দেখা উচিত, সিপিএম ইন্ডিয়া জোট থেকে আলাদা হয়ে লড়লেই ভাল হয় কিনা। কারণ সিপিএম তৃণমূলবিরোধিতা না করলে আখেরে বিজেপিরই লাভ, তারা আরও বেশি করে তৃণমূলবিরোধী ভোট পাবে। মনে রাখা ভাল, ধূপগুড়ি বিধানসভার উপনির্বাচনে বিজেপি হেরেছে মাত্র হাজার চারেক ভোটে। ওই কেন্দ্রের সিপিএম প্রার্থীর (কংগ্রেস সমর্থিত) জামানত জব্দ হলেও তিনি পেয়েছেন তেরো হাজারের বেশি ভোট। এতগুলো তৃণমূলবিরোধী ভোট কিন্তু বিজেপির ঝুলিতে যেত তৃতীয় পক্ষ না থাকলে। এভাবে ভাবতে হলে অবশ্য সিপিএম নেতৃত্বকে ঠিক করতে হবে লোকসভা নির্বাচনে মূল লক্ষ্য কোনটা। জ্যোতি বসু, হরকিষেণ সিং সুরজিৎদের অন্তত সেই দ্বিধা ছিল না। তাঁরা বিজেপির ক্ষমতায় আসা আটকাতে ১৯৯৬ পর্যন্ত নরসিমা রাওয়ের সংখ্যালঘু সরকারকে চলতে দিয়েছিলেন।

উত্তরবঙ্গ সংবাদে প্রকাশিত

ব্যাকফুটে গোদি মিডিয়া

পবন খেরা, সুপ্রিয়া শ্রীনাতেরা লাইভ টিভিতে গোদি মিডিয়ার অ্যাঙ্করদের ধমকাতে শুরু করলেন – বিজেপির দালালি করবেন না।

প্রাক-নির্বাচনী সমীক্ষা আর বুথফেরত সমীক্ষার দৌলতে লোকনীতি-সিএসডিএস নামটা এখন ওয়াকিবহাল পাঠকদের কারোর অজানা নয়। কিন্তু এই সংস্থাটি আরও কিছু সমীক্ষা করে থাকে যেগুলো নিয়ে মূলধারার সংবাদমাধ্যমে শুধু যে হইচই হয় না তা নয়, আদৌ কোনো খবরই প্রকাশ করা হয় না। কারণ করলে হাটে হাঁড়ি ভেঙে যাবে। তেমনই এক সমীক্ষার ফল প্রকাশিত হয়েছে গত সপ্তাহে। এই সমীক্ষার মজা হল, এখানে উত্তরদাতা সাংবাদিকরাই। যে কোনো গণতন্ত্রপ্রেমী মানুষের সমীক্ষাটির ফল দেখে আতঙ্কিত হওয়ার মত নানা বিষয় আছে, তবে এই লেখার পক্ষে যা সবচেয়ে প্রাসঙ্গিক তথ্য তা হল, ৮২% সাংবাদিক বলেছেন তাঁরা মনে করেন তাঁদের নিয়োগকর্তা বিজেপিকে সমর্থন করেন।

এমনিতে স্বাধীন, সংসদীয় গণতন্ত্রের দেশে যে কোনো ব্যক্তিরই যে কোনো দলকে সমর্থন করার অধিকার আছে। উপরন্তু উদারনৈতিক গণতন্ত্রের গালভরা বাণীগুলোর গলদ বুঝে ফেলা যে কোনো মানুষই জানেন কোনো দেশেই কোনো সংবাদমাধ্যম সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ হতে পারে না। বস্তুত, হওয়া উচিতও নয়। কারণ রাজনীতিহীন সাংবাদিকতা হল অর্থহীন তথ্যের সমাহার। ও জিনিস হোমেও লাগে না, যজ্ঞেও লাগে না। সম্প্রতি নেটফ্লিক্সে মুক্তি পাওয়া স্কুপ নামক ওয়েব সিরিজে একজন আদর্শবাদী সম্পাদকের একটি সংলাপ আছে। তিনি চাকরি ছাড়ার আগে মালিককে মনে করিয়ে দিচ্ছেন, যখন কেউ বলে বাইরে বৃষ্টি হচ্ছে আর অন্য একজন বলে হচ্ছে না, তখন সাংবাদিকের কাজ দুজনকেই উদ্ধৃত করা নয়। জানলা খুলে দেখা কোনটা ঠিক এবং সেটাই লেখা। সাংবাদিকের কাজ কোনটা তা ঠিক করা কিন্তু শতকরা একশো ভাগ রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত। সুতরাং সাংবাদিকের এবং সংবাদমাধ্যমের রাজনৈতিক প্রবণতা থাকতে বাধ্য। সেই প্রবণতা কোনদিকে থাকবে তা অনেককিছুর ভিত্তিতে ঠিক হয়, যার একটা অবশ্যই মালিকের ব্যবসায়িক স্বার্থ। ফলে কোনো তথাকথিত নিরপেক্ষ সংবাদমাধ্যমই যে কোনোদিন সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ ছিল না একথা বলাই বাহুল্য। যেমন কেউ বলে না দিলেও পশ্চিমবঙ্গে নেহাত বালক-বালিকারাও চিরকাল জানত আনন্দবাজার পত্রিকা এবং ওই সংস্থারই ইংরিজি কাগজ দ্য টেলিগ্রাফ কংগ্রেসপন্থী; বর্তমান, দ্য স্টেটসম্যান বামফ্রন্ট সরকারের বিরোধী; আবার আজকাল বাম ঘেঁষা। তাহলে লোকনীতি-সিএসডিএস সমীক্ষার ফল আলাদা করে আলোচনা করার মত কেন? কারণ ভারতের মত এত বড় একটা দেশ, যেখানে এতগুলো রাজনৈতিক দল রয়েছে, সেখানে চালানো সমীক্ষায় দেখা যাচ্ছে এই বিপুল সংখ্যক সাংবাদিক মনে করছেন তাঁদের সংস্থা একটা দলকেই সমর্থন করে। অর্থাৎ বিভিন্ন নাগরিক বিভিন্ন দলকে সমর্থন করার মত বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে বিভিন্ন দলের দিকে ঢলে থাকলে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় যে ভারসাম্য বজায় থাকে তা সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে গেছে বলে ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে এই সমীক্ষা থেকে।

২০১৪ সালের পর থেকে বিভিন্ন খবরের চ্যানেল দেখার অভিজ্ঞতা যাঁদের আছে তাঁরা সমীক্ষার এই ফলাফলে অবিশ্বাস করবেন না। কেউ কেউ বলবেন বেশ হয়েছে, এমনটাই হওয়া উচিত কারণ বিজেপিই একমাত্র জাতীয়তাবাদী পার্টি। আর বিজেপিবিরোধী শঙ্কিত হবেন। এই যা তফাত। কিন্তু কে নিজের রাজনৈতিক পছন্দ অনুযায়ী সংবাদমাধ্যমের এই একপেশে হয়ে যাওয়াকে কীভাবে দেখবেন তার চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ হল দেশের সংবাদমাধ্যমের এতখানি একচোখামির ফল কী হচ্ছে? অর্ণব গোস্বামী, রাহুল শিবশঙ্কর, রাহুল কাঁওয়াল, শিব অরুর, সুধীর চৌধুরী, রুবিকা লিয়াকত, দীপক চৌরাসিয়া, অঞ্জনা ওম কাশ্যপ, সুরেশ চওনঙ্কে বা অমন চোপড়ারা যে পরিমাণ ঘৃণা ছড়িয়েছেন গত এক দশকে – তার ফল আর শুধু উত্তেজনা সৃষ্টি করে দাঙ্গা ছড়ানোয় সীমাবদ্ধ নেই। ও কাজ তো হোয়াটস্যাপ, ফেসবুকও করে। ধর্মান্ধ টিভি অ্যাঙ্করদের অবদানে উঠে এসেছে চেতন সিংয়ের মত ভয়ঙ্কর অপরাধী, যে সরকারি উর্দি পরে সরকারি বন্দুক দিয়ে ট্রেনের কামরায় প্রথমে নিজের ঊর্ধ্বতন অফিসারকে খুন করে। তারপর এক কামরা থেকে আরেক কামরায় গিয়ে ইসলাম ধর্মাবলম্বী যাত্রী খুঁজে বার করে খুন করে। অবশেষে সেখানে দাঁড়িয়ে বাকি যাত্রীদের হুমকি দেয়, ভারতের দুজনই আছে – মোদীজি আর যোগীজি। এখানে থাকতে হলে এদেরই ভোট দিতে হবে।

এতদ্বারা ২০২৪ লোকসভার নির্বাচনের জন্য বিজেপির প্রচার শুরু হয়ে গেল কি? রবীশ কুমার যাদের গোদি মিডিয়া বলেন, তারা যখন অমিত শাহকে বিধায়ক কেনাবেচা করার গুণে ‘মডার্ন চাণক্য’ আখ্যা দিতে পারে তখন এই প্রণালীকেও ব্যাপারটা থিতিয়ে গেলে যে বিজেপির ‘অ্যাগ্রেসিভ ক্যাম্পেনিং’ নাম দেবে না তার নিশ্চয়তা কী? আপাতত খাঁটি আমেরিকান কায়দায় চেতন সিংকে মানসিক ভারসাম্যহীন বলা চলছে। যদিও রেলমন্ত্রীকে কোনো সাংবাদিক প্রশ্ন করবে না, একজন মানসিক ভারসাম্যহীন ব্যক্তিকে বন্দুক হাতে ট্রেনযাত্রীদের নিরাপত্তা রক্ষার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছি কেন? কারণ বিজেপি সরকারকে প্রশ্ন করা বারণ, করলে চাকরি যায়। লোকনীতি-সিএসডিএস সমীক্ষা যে সঠিক, এই তার হাতে গরম প্রমাণ।

নিজের বৃত্তের বাইরে বেরিয়ে আশপাশের লোকের সঙ্গে কথা বললেই টের পাওয়া যায় মূলধারার মিডিয়ার ছড়ানো ভুয়ো খবর এবং একচোখা খবর ইতিমধ্যেই কতখানি ক্ষতি করে ফেলেছে। দিন দুয়েক আগে একজন প্রাইভেট গাড়ির চালকের সঙ্গে কথা হচ্ছিল। সেদিন কাগজে বেরিয়েছে বিজেপি মণিপুরের এই টালমাটাল অবস্থার মধ্যেই এনআরসি করার কথা ঘোষণা করেছে। চালকের পাশে বসে কাগজ পড়তে গিয়ে সক্ষোভে আমার স্ত্রীকে বলতেই চালক বলে উঠলেন “ঠিক হয়েছে। এনআরসি তো করাই উচিত।” কেন করা উচিত জিজ্ঞাসা করায় তাঁর উত্তর “বর্ডার পেরিয়ে বাংলাদেশ থেকে মুসলমানগুলো এসেই তো মণিপুরে অশান্তিটা করছে।” তাঁকে বলা গেল যে মণিপুরে মুসলমান প্রায় নেই বললেই চলে এবং ওই রাজ্যের সীমান্ত মায়ানমারের সঙ্গে, বাংলাদেশের সঙ্গে নয়। তাঁর নাছোড়বান্দা উত্তর “মুসলমান সব জায়গাতেই আছে।” অতঃপর তাঁকে জিজ্ঞেস করতে হল, মণিপুর সম্পর্কে তাঁর তথ্যের উৎস কী? উত্তর “খবরেই তো দেখাচ্ছে।” কোন চ্যানেলের খবরে দেখাচ্ছে সে প্রশ্ন করে আর সময় নষ্ট করিনি, কারণ কোন খবর মুসলমান বিদ্বেষ ছড়ায় না সে প্রশ্নের উত্তর দেওয়া বরং সহজ। তাই তাঁকে মণিপুরের ভূগোল, ইতিহাস এবং বর্তমান অশান্তি যে মেইতেই আর কুকিদের মধ্যে তা জানাতে খানিকটা সময় ব্যয় করলাম। এনআরসি যে এর প্রতিকার নয় তাও বোঝানোর চেষ্টা করলাম। সফল হলাম কিনা জানি না, ব্যর্থ হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। কারণ মানুষ বহুবছর ধরে সারাদিন যা দেখে চলেছে তার প্রভাব কয়েক মিনিটের কথায় দূর হওয়া অসম্ভব।

ভারতীয় সমাজকে এই খাদের কিনারে নিয়ে আসার দোষ সবটাই টিআরপিখোর টিভি চ্যানেলগুলোর ঘাড়ে চাপিয়ে দিলে অবশ্য অন্যায় হবে। খবরের কাগজগুলোও কোনো অংশে কম যায়নি। ‘পেইড নিউজ’ নিয়ে সাংবাদিক পি সাইনাথের যে কাজ আছে তা প্রমাণ করে টাকার জন্যে ভারতের বড় বড় কাগজগুলো সবকিছু করতে রাজি। ২০১৮ সালে কোবরাপোস্টের স্টিং অপারেশনেও তেমনই দেখা গিয়েছিল। কোবরাপোস্টের প্রতিনিধিরা একটি হিন্দুত্ববাদী সংগঠনের প্রতিনিধি সেজে ভারতের অনেকগুলো বড় বড় সংবাদমাধ্যমের কর্তাদের কাছে গিয়েছিলেন। প্রস্তাব ছিল, আমরা টাকা দেব, সাম্প্রদায়িক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত খবর করতে হবে এবং ২০১৯ লোকসভা নির্বাচনে ক্ষমতাসীন দলের সুবিধা হয় এমন খবর করতে হবে, নানারকম ইভেন্টের আয়োজন করতে হবে। দুটো মাত্র সংবাদমাধ্যম রাজি হয়নি – পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান আর ত্রিপুরার দৈনিক সংবাদ।

সংবাদমাধ্যমের প্রাতিষ্ঠানিক অর্থলোলুপতা এবং বিজেপি সরকারের ভয় দেখানো, সরকারবিরোধী খবর করলে সরকারি বিজ্ঞাপন বন্ধ করে দেওয়া ইত্যাদি নানা কৃৎকৌশলের ফল হল দেশের মূলধারার সংবাদমাধ্যমে বিজেপি-আরএসএসের বয়ানের একাধিপত্য। স্বাধীন ভারতের ইতিহাসে কখনো যা হয়নি ২০১৪ সালের পর থেকে ঠিক তাই হয়ে চলেছে। সংবাদমাধ্যম কেবলই বিরোধী রাজনৈতিক শক্তিগুলোকে প্রশ্নের মুখে ফেলে। যাদের হাতে দেশ চালানোর দায়িত্ব তাদের প্রশ্ন করে না। অর্থাৎ কয়েকশো বছর ধরে সারা পৃথিবীতে উদারনৈতিক গণতন্ত্রে সাংবাদিকতার মূল কর্তব্য বলে যা স্থির হয়েছে – ক্ষমতাকে প্রশ্ন করা – সেই কাজটাই বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। প্রশ্ন করা অপরাধ, যে সংবাদমাধ্যম বা সাংবাদিক ক্ষমতাকে প্রশ্ন করে না তারাই সঠিক কাজ করে – একথাই সারা দেশে সব ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠা পেয়ে গেছে। সাংবাদিকরা ক্ষমতাসীন দলের নেতাদের সঙ্গে গদগদ সেলফি তুলে সোশাল মিডিয়ায় পোস্ট করেছেন। কে কত বড় সাংবাদিক তার মানদণ্ড হয়ে দাঁড়িয়েছে শাসক দলের নেতাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা। পশ্চিমবঙ্গে মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি প্রশাসনিক বৈঠকে দাঁড়িয়ে সাংবাদিকদের বলেছেন “পজিটিভ (ইতিবাচক) খবর করুন। বিজ্ঞাপন পাবেন।” এত বড় খবর সর্বাধিক বিক্রীত বাংলা দৈনিকের এক কোণে ১৭৮ শব্দে প্রকাশিত হয়েছে এবং পশ্চিমবঙ্গের বাঘা বাঘা সাংবাদিকদের একজনও এর প্রতিবাদে একটি শব্দও লেখেননি বা বলেননি।

এভাবে চলছিল ভালই, কিছুদিন হল এই ধামাধরা মিডিয়া কিঞ্চিৎ ফাঁপরে পড়েছে। এমনিতে পৃথিবীর যে কোনো ব্যবসায় নিয়ম হল কাক কাকের মাংস খায় না। কিন্তু ভারতের সাংবাদিকতায় সেই নিয়ম বারবার ভেঙেছে গোদি মিডিয়া। অর্ণব গোস্বামী টাইমস নাওতে থাকার সময়েই বিজেপির পক্ষে বলে না এনডিটিভির মত যেসব চ্যানেল তার সাংবাদিকদের ‘অ্যান্টি-ন্যাশনাল’ বলা আরম্ভ করেছিলেন। একেবারে আরএসএসের তত্ত্ব অনুসরণ করে কংগ্রেস, কমিউনিস্ট, মুসলমান তো বটেই, যে কোনো ইস্যুতে সরকারের সামান্যতম বিরোধিতা করা ব্যক্তিদেরও দেশদ্রোহী বলা শুরু হয়ে গিয়েছিল ২০১৪ সাল থেকে। টিভি বিতর্কে বিরোধী দলের একজন মুখপাত্রকে ডেকে চিৎকার করে তাঁকে কথা বলতে না দেওয়া, অন্যদিকে নানা পরিচয়ে বিজেপি-আরএসএসপন্থী একাধিক লোককে প্যানেলে বসিয়ে একতরফা প্রচার চালিয়ে যাওয়া দস্তুর হয়ে দাঁড়িয়েছিল। ইন্দিরা গান্ধীর জরুরি অবস্থার সময়টুকু বাদ দিলে ভারতের সংবাদমাধ্যম এমন কখনো করেনি বলেই সম্ভবত বিরোধী দলগুলোর নেতারা হতবুদ্ধি হয়ে গিয়েছিলেন। ইংরেজিতে যাকে ‘ওয়াল টু ওয়াল কভারেজ’ বলে, সমস্ত নির্বাচনী প্রচারে এবং সারাবছরই বিজেপি তাই পেয়ে চলছিল আর বিরোধীদের কথা সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছবার রাস্তা প্রায় বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছিল। এর পাল্টা কৌশল কারোর মাথায় আসেনি। কোনো কোনো রাজনৈতিক দলের সদস্য, সমর্থকরা ভেবে বসেছিলেন সোশাল মিডিয়া দিয়ে মাত করে দেবেন। কিন্তু বিপুল অর্থবলের কারণে সেখানেও বিজেপির সঙ্গে এঁটে ওঠা শক্ত। উপরন্তু আমাদের মত শহুরে মধ্যবিত্তদের নিজের চারপাশ দেখে যা-ই মনে হোক, ভারতের বেশিরভাগ মানুষের কাছেই এখনো স্মার্টফোন নেই, থাকলেও শস্তা ডেটা নেই, কানেক্টিভিটি নেই। ফলে ফেসবুক বা টুইটার দিয়ে তাঁদের কাছে পৌঁছনো যায় না।

নেপথ্যে কে আছেন জানি না, কিন্তু বিজেপির এই সর্বগ্রাসী প্রচারের বিকল্প পথ প্রথম দেখালেন রাহুল গান্ধী – ভারত জোড়ো যাত্রা। শুধু যে সাবেকি ভারতীয় কায়দায় মাইলের পর মাইল হেঁটে নিজের ভাবমূর্তি খানিকটা পুনরুদ্ধার করলেন এবং কংগ্রেসকে জাতীয় স্তরে ফের প্রাসঙ্গিক করে তুললেন তাই নয়, রাহুল ওই যাত্রায় এমন একটা জিনিস করলেন যা এমনকি বিজেপিও ভেবে উঠতে পারেনি। ভারত জোড়ো যাত্রাকে মূলধারার সংবাদমাধ্যম কোনো কভারেজ দেবে না বুঝে রাহুল ছোট বড় বিচার না করে বিকল্প সংবাদমাধ্যম, এমনকি ইউটিউবারদেরও সাক্ষাৎকার দেওয়া শুরু করলেন। কিছুদিনের মধ্যেই দেখা গেল, বড় বড় কাগজে রাহুল নেই। টিভিতে রাহুল নেই। অথচ কর্ণাটকে চলা ভারত জোড়ো যাত্রা নিয়ে পশ্চিমবঙ্গের মানুষও আলোচনা করছেন। আসলে রাহুল (বা কংগ্রেস) যথার্থই বুঝতে পেরেছিলেন যে একটা বড় অংশের মানুষ খবরের জন্য আর কাগজ বা টিভির উপর ভরসা করেন না। বিশেষত যাঁদের মস্তিষ্কের সবটাই এখনো হিন্দুত্ব গ্রাস করতে পারেনি, তাঁরা অনেকেই এখন ধ্রুব রাঠি বা আকাশ ব্যানার্জির মত ইউটিউবারের দিকে তাকিয়ে থাকেন খবর সংগ্রহের জন্য। পশ্চিমবঙ্গের বিকল্প সংবাদমাধ্যম এখনো সঠিক অর্থে বিকল্প হয়ে উঠতে পারেনি বলেই হয়ত এই ধারা এখনো শীর্ণকায়। কিন্তু উত্তরপ্রদেশের মত বুলডোজারশাসিত রাজ্যেও হিন্দি ভাষার ইউটিউবাররা প্রবল জনপ্রিয়। যোগী সরকারকে বেগ দেওয়ার মত খবর, হাস্যকৌতুক, গান সবই তাঁরাই তৈরি করছেন। কাশ্মীর থেকে কন্যাকুমারী পর্যন্ত বহু রাজ্যেই ঘটনা তাই। এই প্রবণতার পূর্ণ সদ্ব্যবহার করা হল ভারত জোড়ো যাত্রায়।

এর সঙ্গে কংগ্রেস আরও একটি কৌশল নিল, যা প্রথম চোটে যে কোনো গণতন্ত্রপ্রেমী মানুষের আপত্তিকর মনে হবে। শাস্ত্রে বলা আছে, দূত অবধ্য। সাহেবরাও বলে থাকে “Don’t shoot the messenger”। কিন্তু রাহুল ভারত জোড়ো যাত্রা চলাকালীন একটি সাংবাদিক সম্মেলনে এক সাংবাদিককে সরাসরি বলে দিলেন, বিজেপির হয়ে কাজ করতে হলে বুকে বিজেপির লোগো লাগিয়ে আসুন। তাহলে ওদের যেভাবে উত্তর দিই আপনাদেরও সেভাবেই উত্তর দেব। সাংবাদিক হওয়ার ভান করবেন না। সাংবাদিক দমে যেতে আরও আক্রমণাত্মক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, হাওয়া বেরিয়ে গেল?

এরপর থেকে একই ঢঙে কথা বলা শুরু করলেন তাঁর দলের অন্য মুখপাত্ররাও। পবন খেরা, সুপ্রিয়া শ্রীনাতেরা লাইভ টিভিতে গোদি মিডিয়ার অ্যাঙ্করদের ধমকাতে শুরু করলেন – বিজেপির দালালি করবেন না। কর্ণাটকের বিধানসভা নির্বাচনের ফল প্রকাশের দিন ইন্ডিয়া টুডের শোতে সুপ্রিয়া সটান রাহুল কাঁওয়াল এবং রাজদীপ সরদেশাইকে বলে দিলেন, আপনাদের স্টুডিওতে তো সকাল থেকে শোকপালন চলছে বলে মনে হচ্ছে। এই আক্রমণাত্মক মেজাজ কংগ্রেসের মুখপাত্ররা বজায় রেখে চলেছেন। সম্প্রতি টাইমস নাওয়ের সাক্ষাৎকারে কপিল সিবাল নাভিকা কুমারকে ল্যাজেগোবরে করে ছেড়েছেন। ভারি মোলায়েম গলায় বলেছেন, আশা করি এখন পর্যন্ত নাভিকা প্রধানমন্ত্রীর মাউথপিস নয়?

ক্রমশ এই রণনীতি অন্য বিরোধী দলের নেতাদেরও নিতে দেখা যাচ্ছে। পশ্চিমবঙ্গে সবকিছুই বাকি দেশের চেয়ে একটু দেরিতে হয় আজকাল। তাই হয়ত সিপিএমের রাজ্য সম্পাদক মহম্মদ সেলিম অতি সম্প্রতি একেবারে পার্টিজান হয়ে যাওয়া সংবাদমাধ্যমকে কড়া ভাষায় প্রত্যুত্তর দেওয়া শুরু করেছেন। লাইভ অনুষ্ঠানে জি ২৪ ঘন্টার অ্যাঙ্কর মৌপিয়া নন্দীকে সটান বলে দিয়েছেন, দালালি করা চলবে না। ওই চ্যানেলের মালিক সুভাষ চন্দ্র যে রাজ্যসভার বিজেপি সমর্থিত সাংসদ, টেনে এনেছেন সেকথাও।

আত্মপক্ষ সমর্থনে মৌপিয়া প্রথমে ওই তথ্যটাই অস্বীকার করেছেন, তারপর সেটা সফল হবে না বুঝে জাঁক করে বলেছেন, সেলিম চাইলেও ২৪ ঘন্টা গণশক্তির মত রিপোর্টিং করবে না। তারপর, যেন হঠাৎ খেয়াল হওয়ায়, যোগ করেছেন, জাগো বাংলার মত রিপোর্টিংও করবে না।

স্বাভাবিক অবস্থায় রাজনৈতিক নেতাদের এইভাবে সাংবাদিকদের তথা সংবাদমাধ্যমকে আক্রমণ করা একেবারেই সমর্থনযোগ্য নয়। কিন্তু ভারত যে স্বাভাবিক অবস্থায় নেই তা নিয়ে সন্দেহের কোনো অবকাশ নেই এবং এই অস্বাভাবিক অবস্থা তৈরি করতে মূলধারার সংবাদমাধ্যমের ভূমিকা অস্বীকার করারও কোনো উপায় নেই। বস্তুত অধিকাংশ তথাকথিত নিরপেক্ষ সংবাদমাধ্যম এখন এতটাই একচোখো হয়ে দাঁড়িয়েছে যে তাদের খবর না দেখে বা না পড়ে কেউ যদি গণশক্তি আর জাগো বাংলা পড়ে নিজের মত করে ঠিক কী ঘটেছে বুঝে নেওয়ার চেষ্টা করেন, তাহলে হয়ত সত্যের বেশি কাছাকাছি পৌঁছবেন।

একথা পাঠক/দর্শক মাত্রেই আজকাল উপলব্ধি করেন। সেই কারণেই রবীশ কুমারের ইউটিউব চ্যানেলের গ্রাহক সংখ্যা লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে, এমনকি কুণাল কামরার মত ঋজু বিদূষক, যাঁর মূল কাজ লোক হাসানো, তাঁর পডকাস্টও মানুষ আগ্রহ নিয়ে দ্যাখেন। সেদিক থেকে যে বাঙালি হিন্দি বা ইংরিজিতে স্বচ্ছন্দ নন তাঁদের দুর্ভাগা বলতে হবে। বাংলা ভাষায় ওই মানের কাজ এখনো হচ্ছে না।

যা-ই হোক, ধামাধরা মিডিয়ার সংকটের কথা ফেরত আসি। সম্প্রতি রিপাবলিক চ্যানেলের কর্ণধার অর্ণব মণিপুর নিয়ে মোদী সরকারের সমালোচনা করেছেন, রাষ্ট্রপতি শাসনের দাবিও তুলেছেন। তা নিয়ে বিজেপিবিরোধী মানুষ যুগপৎ হাসাহাসি করছেন এবং বিস্মিত হচ্ছেন। আসলে এতে বিস্ময়ের কোনো কারণ নেই। বিজেপিকে তো বটেই, এমনকি বিজেপিবিরোধীদেরও বিস্মিত করে পরস্পরবিরোধী স্বার্থ থাকা সত্ত্বেও ২৬টি দলের ইন্ডিয়া জোট গড়ে উঠেছে। শেষপর্যন্ত সে জোট টিকবে কিনা সেটা পরের কথা, কিন্তু গোদি মিডিয়ার কাছে আশু সমস্যা হল এই দলগুলির অধীনে থাকা রাজ্য সরকারগুলো। গোটা দক্ষিণ ভারতে কোথাও বিজেপি সরকার নেই, অথচ ওই রাজ্যগুলোর অর্থনৈতিক অবস্থা ভাল, প্রচুর বিজ্ঞাপন পাওয়া যেতে পারে। বাড়াবাড়ি করলে বিজেপির দেখানো পথে ওই সরকারগুলো বিজ্ঞাপন দেবে না। গোবলয়ের রাজ্যগুলোর মধ্যেও বিহার, ঝাড়খণ্ড, রাজস্থানের সরকার ইন্ডিয়া জোটের দলগুলোর হাতে। দিল্লি, পাঞ্জাবের সরকারও তাই। বলা বাহুল্য, পশ্চিমবঙ্গের মত বড় রাজ্য, ছত্তিসগড়ের মত উন্নতি করতে থাকা রাজ্যও ইন্ডিয়ার হাতে। তাহলে গোদি মিডিয়ার হাতের পাঁচ বলতে রইল মডেলের হাড়গোড় বেরিয়ে পড়া গুজরাট, মহারাষ্ট্র, ধুঁকতে থাকা অর্থনীতির উত্তরপ্রদেশ, উত্তরাখণ্ড, ছোট্ট রাজ্য হরিয়ানা আর মধ্যপ্রদেশ। শেষেরটি আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনের পর বিজেপির হাতে থাকবে কিনা তা নিয়েও ঘোর সন্দেহ দেখা দিয়েছে। উত্তর-পূর্বাঞ্চলের রাজ্যগুলো থেকে তেমন ব্যবসা হয় না নয়ডাকেন্দ্রিক তথাকথিত সর্বভারতীয় মিডিয়ার। কারণ তারা ওই অঞ্চল এবং তার মানুষজনকে চেনেই না। স্বভাবতই তাঁরাও এদের পাত্তা দেন না। এমতাবস্থায় স্রেফ দাঙ্গাবাজি করে চলে কী করে অর্ণব, রুবিকাদের?

লাইভ টিভিতে বিরোধী দলের নেতাদের প্রতিআক্রমণের ফলে হিন্দুত্বে একান্ত দীক্ষিত দর্শক ছাড়া আর সকলের কাছেই বিশ্বাসযোগ্যতা যে তলানিতে ঠেকেছে একথা বুঝতে সর্বভারতীয় সংবাদমাধ্যমগুলোর পাকা মাথাদের কারোর বুঝতে বাকি নেই। বিকল্প সংবাদমাধ্যম বিপুল সরকারি বাধা সত্ত্বেও যে প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠছে তাতেও সন্দেহ নেই। অতএব মাঝেমধ্যে বিজেপিবিরোধী ভান করতে হবে বইকি। মুশকিল হল, অনেক দেরি হয়ে গেছে। এখন সম্ভবত বিজেপিও ভাবতে শুরু করেছে, এদের দিয়ে প্রোপাগান্ডা করালে তা আর আগের মত প্রভাবশালী হবে না। তাই তারাও এখন ‘সোশাল মিডিয়া ইনফ্লুয়েন্সার’ ধরার চেষ্টা করছে। সম্প্রতি বিজেপিপন্থী লেখক, সাংবাদিক, এমনকি মন্ত্রীরাও বেশকিছু ইউটিউবারকে সাক্ষাৎকার দিতে শুরু করেছেন। এমনটা বিজেপি আগে কখনো করেনি। এই ইউটিউবারদের অন্যতম beerbiceps বলে একজন। ইউটিউবে তার প্রায় ছয় মিলিয়ন ফলোয়ার। অতীতে সে ক্রিকেটার যজুবেন্দ্র চহল, সানি লিওন, সারা আলি খান জাতীয় মানুষের সাক্ষাৎকার নিত। এমনকি ডিমনেটাইজেশনকে ব্যঙ্গ করেও ভিডিওও বানিয়েছে একসময়। ইদানীং দেখা যাচ্ছে সে পরম সাত্ত্বিক হয়ে উঠেছে। বারবার ভুয়ো খবর ছড়িয়ে ভ্রম সংশোধন করা এজেন্সি এএনআইয়ের সম্পাদক স্মিতা প্রকাশ থেকে শুরু করে অমুক প্রভু, তমুক দক্ষিণপন্থী স্ট্র্যাটেজিস্ট – সকলেই বিয়ারবাইসেপসের শোতে উপস্থিত হচ্ছেন। বিজেপি যদি ২০২৪ নির্বাচন জিতেও যায়, রাহুল, সেলিমরা মূলধারার সংবাদমাধ্যম সম্পর্কে তাঁদের তিরিক্ষে মেজাজ বজায় রাখলে হয়ত বিয়ারবাইসেপসদেরই পোয়া বারো হবে, কপাল পুড়বে অর্ণব, মৌপিয়াদের।

তবে আক্রমণের ধারাবাহিকতা থাকা চাই। সেলিম জি নেটওয়ার্কের অ্যাঙ্করকে হাঁকড়াবেন আর তাঁর দলের মুখপাত্র ও বুদ্ধিজীবীরা রিপাবলিক টিভির মত আরও উগ্র দক্ষিণপন্থী চ্যানেলের বিতর্কে হাসিমুখে অংশগ্রহণ করবেন, অনুষ্ঠানের আগে পরে দিলদরিয়া হয়ে ছবিও তুলবেন – তা কী করে হয়?

পিপলস রিপোর্টার ওয়েবসাইটে প্রকাশিত

সিপিএম পথে ফিরেছে, কিন্তু ব্যালটে ফিরবে কি?

আইএসএফের সঙ্গে সিপিএম তথা বামফ্রন্টের এখন ঠিক কী সম্পর্ক? কংগ্রেসের সঙ্গে কি আবার জোট করা হবে?

খবরে প্রকাশ, সিপিএম নেত্রী মীনাক্ষী মুখার্জি শিলিগুড়িতে এক সভায় বলেছেন, শিলিগুড়ি পৌর নিগম বামেদের হাতছাড়া হয়েছে সবে কয়েক মাস। কিন্তু এর মধ্যেই তা দুর্বৃত্তদের হাতে চলে গেছে। সিপিএম তথা বাম আমলে পশ্চিমবঙ্গের সমস্ত প্রশাসনিক কার্যকলাপ বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের ধুতি পাঞ্জাবির মত শ্বেতশুভ্র ছিল, কোথাও দুর্নীতির লেশমাত্র ছিল না – এমনটা নিশ্চয়ই নয়। কিন্তু কোনো সন্দেহ নেই, দুর্নীতির যে পরিমাণ এবং দুর্নীতি করে বুক ফুলিয়ে ঘুরে বেড়ানোর যে নির্লজ্জা এ রাজ্যে দেখা যাচ্ছে তা একান্তই তৃণমূল কংগ্রেসের দান। তার মধ্যে কংগ্রেসের উত্তরাধিকার খুঁজতে যাওয়াও বৃথা। আবু বরকত আলি গনিখান চৌধুরীরা সেকালের জমিদারদের কায়দায় রাজনীতি করতেন, অধীর চৌধুরীর মত লোকেরা তার সঙ্গে মিশিয়েছিলেন পেশিশক্তির ব্যবহার। কিন্তু সেখানেও পরিমাণ মত দুষ্টের দমন শিষ্টের পালন করে রবিন হুড মার্কা ভাবমূর্তি তৈরি করার প্রয়াস থাকত। বাম আমলেও রাজনৈতিক মদতপুষ্ট সমাজবিরোধীরা অন্তত নিজের এলাকায় গরীবের মেয়ের বিয়ে দেওয়া, অমুক বড়লোককে ‘চমকে’ দিয়ে তমুক গরীবকে একটু স্বস্তি দেওয়া – এসব করত।

কিন্তু মাত্র এগারো বছরের শাসনেই দেখা যাচ্ছে তৃণমূলের শীর্ষনেতাদের ফ্ল্যাট থেকে নগদ কোটি কোটি টাকা উদ্ধার হচ্ছে, তদন্ত এগোলে অগাধ গোপন সম্পত্তির হদিশ পাওয়া যাচ্ছে। অনুব্রত মন্ডলের মত বাহুবলীরা নিজেরাই নেতা হয়ে উঠেছে। পশ্চিমবঙ্গের বাইরে তো বটেই, এমনকি দেশের বাইরেও নেতাদের সম্পত্তি রয়েছে বলে জানা যাচ্ছে। এতৎসত্ত্বেও স্বয়ং মমতা ব্যানার্জি প্রকাশ্যে অনুব্রতর মত নেতার পাশে দাঁড়াচ্ছেন, ববি হাকিম বাঘ বেরিয়ে এলেই শেয়ালরা পালাবে ইত্যাদি আক্রমণাত্মক কথাবার্তা বলছেন। সাধারণ মানুষ টিভির পর্দায় পাহাড়প্রমাণ টাকা দেখে ফেলায় কদিন নিচু হয়ে থাকা শাসকের গলা আবার সপ্তমে চড়েছে। সুতরাং সাধারণ মানুষ যদি ভেবে নেন, শীর্ষ নেতৃত্বের আশীর্বাদেই এত দুর্নীতি চলছে রাজ্যে, তাহলে দোষ দেওয়া যাবে না। উপরন্তু মহারাষ্ট্র বা তামিলনাড়ুর মত পশ্চিমবঙ্গের চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী অর্থনীতির রাজ্যে দুর্নীতি সাধারণ মানুষের যতটা চোখে লাগে, কর্মসংস্থানের হাহাকার পড়ে যাওয়া পশ্চিমবঙ্গে শাসক দলের নেতাদের বিপুল সম্পত্তি এবং তা নিয়ে বিন্দুমাত্র অপরাধবোধের অভাব অনেক বেশি গায়ে লাগাই স্বাভাবিক।

ফলে মীনাক্ষীর কথা বেশকিছু শ্রোতাকে স্পর্শ করতে পারলে অবাক হওয়ার কিছু নেই। সম্ভবত পারছেও। সেই কারণেই ইদানীং সিপিএমের মিছিল, মিটিংয়ে আবার ভিড় হতে দেখা যাচ্ছে। স্রেফ কৌতূহলী জনতার ভিড় নয়, মধ্যবয়স্ক বা পাকা চুলের মানুষের ভিড় নয় – তরুণ তরুণীদের ভিড়। স্কুল নিয়োগে দুর্নীতির বিরুদ্ধে আন্দোলন চলছে বছর দশেক হতে চলল, কিন্তু গত এক বছরে যে তীব্রতা এসেছে আন্দোলনে – তাও আগে দেখা যায়নি। এর পিছনেও যে সিপিএমের সক্রিয়তা বৃদ্ধি অন্যতম কারণ, তা এই আন্দোলনকে নিয়মিত নজরে রাখা সাংবাদিকরা সকলেই জানেন। মীনাক্ষী, ইন্দ্রজিৎ ঘোষ, কলতান দাশগুপ্তের মত সিপিএমের ছাত্র, যুব সংগঠনের নেতারা যে এই আন্দোলন নিয়ে পথে নেমে পড়েছেন, কম্পাস ঠিক করতে সাহায্য করছেন তা তো কারোর কাছেই অবিদিত নেই। যে রাত্রে করুণাময়ী থেকে আন্দোলনকারীদের বলপূর্বক তুলে দেওয়া হল কলকাতা হাইকোর্টের নির্দেশকে সাক্ষী গোপাল করে, সে রাত্রেও এঁরা পৌঁছে গিয়েছিলেন উচ্ছেদ আটকাতে। চাকরিপ্রার্থীদের আন্দোলন সম্পর্কে সিপিএমের হাবভাব বদল চোখে পড়ার মত। পূর্বতন রাজ্য সম্পাদক সূর্যকান্ত মিশ্রের আমলে এই আন্দোলন চলছিল নিজের মত করে। কলকাতার মাঝখানে গান্ধীমূর্তির পাদদেশে চাকরিপ্রার্থীরা যখন অনশন করছিলেন, তখন পথচারীরা পর্যন্ত উঁকি মেরে দেখতেন না এরা কারা, কেন এখানে বসে আছে। সিপিএম বলত তারা আন্দোলনটাকে হাইজ্যাক করতে চায় না বলে ওর মধ্যে প্রবেশ করছে না, কিন্তু আন্দোলনকারীদের পাশে আছে। পাশে থাকা মানে কোনোদিন বিমান বসু, কোনোদিন অন্য কোনো নেতার মেয়ো রোড গমনের ফেসবুক লাইভ। মহম্মদ সেলিম রাজ্য সম্পাদক হওয়ার পর থেকে স্বয়ং বেশ কয়েকবার আন্দোলনকারীদের কাছে গেছেন, এই ইস্যু নিয়ে পার্টির পতাকা নিয়ে অথবা নাগরিক মিছিলের নাম দিয়ে একাধিক কর্মসূচি পালন হয়েছে। বিচারপতি অভিজিৎ গঙ্গোপাধ্যায়ের কড়া রায় তৃণমূল সরকারকে বিপদে ফেলেছে আদালতের ভিতরে। কিন্তু আদালতের লড়াইকে রাস্তায় নিয়ে আসার কৃতিত্ব অবশ্যই সিপিএমের।

কিন্তু রাজ্যের পরিস্থিতির সাপেক্ষে যে প্রশ্ন এখন গুরুত্বপূর্ণ, তা হল পথে ঘাটে সিপিএমের প্রতি সমর্থন ফেরত এলেও, ব্যালট বাক্সে আসবে কি? কোনো সন্দেহ নেই, কলকাতার ধর্মতলায় সারা রাজ্যের ছাত্র, যুবদের একত্র করে শক্তি প্রদর্শন আর ভোট আদায় এক জিনিস নয়। ২০২৪ এখনো ঢের দেরি, সামনেই পঞ্চায়েত নির্বাচন। সে নির্বাচনে চাকরিপ্রার্থীদের আন্দোলন কতটা প্রভাব ফেলবে বলা মুশকিল। হয়ত বেশি প্রভাবশালী হবে সিপিএমের হেল্পলাইন, যেখানে মানুষ ফোন করে স্থানীয় দুর্নীতির কথা বলতে পারেন। সিপিএম নেতাদের দাবি দারুণ সাড়া পাওয়া যাচ্ছে। এছাড়া রাজ্যের প্রত্যেক পঞ্চায়েত এলাকায় গোটা নভেম্বর মাস জুড়ে পদযাত্রা এবং ডেপুটেশনের কর্মসূচিও নেওয়া হয়েছে, যা শুভেন্দু-অভিষেক কাদা ছোড়াছুড়ি এবং রাজ্যজুড়ে তৃণমূলের গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব পেরিয়ে কলকাতার সংবাদমাধ্যমে এখনো জায়গা করে নিতে পারেনি।

রাস্তাঘাটে সাধারণ মানুষের সঙ্গে কথা বললে স্পষ্ট টের পাওয়া যাচ্ছে, তৃণমূলের স্থানীয় প্রশাসন এবং রাজ্য নেতাদের বিরুদ্ধে যথেষ্ট ক্ষোভ জমেছে। কিন্তু তেমন ক্ষোভ ২০২১ বিধানসভা নির্বাচনের আগেও ছিল। সে নির্বাচন অনেকটা সাম্প্রদায়িক রাজনীতি সম্পর্কে গণভোটে পরিণত হওয়ায় এবং দুয়ারে সরকার আর লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের কল্যাণে তৃণমূল শেষপর্যন্ত হইহই করে জিতেছিল। কিন্তু পঞ্চায়েত ভোট অন্য ব্যাপার। ইতিমধ্যে দুয়ারে সরকার নিয়েও দুর্নীতি হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠছে। তৃণমূলেরই একাধিক গোষ্ঠীকে কারা কী পেল, কারা পেল না তা নিয়ে প্রকাশ্যে ঝগড়া করতে দেখা যাচ্ছে। বিজেপি এখন পর্যন্ত নিষ্প্রভ। এই পরিস্থিতির সুযোগ নিতে কি পারবে সিপিএম?

এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে উঠে আসবে আরেকটি জরুরি প্রশ্ন। বামফ্রন্ট, তুমি আজিও আছ কি? কারণ সিপিএম যখন মধ্যগগনে, তখনো বহু জায়গায় তাদের চেয়ে ফরোয়ার্ড ব্লক, আরএসপির মত ফ্রন্টের অন্য দলগুলোরই আধিপত্য বেশি ছিল। তা নিয়ে নিজেদের মধ্যে খুনোখুনি যেমন হয়েছে, তেমনি নির্বাচনের সময়ে এই সমীকরণ বামফ্রন্টের হাত শক্তও করেছে। মুর্শিদাবাদে কী অবস্থা আরএসপির? কোচবিহারে উদয়ন গুহর প্রস্থানের পর কেমন আছে ফরোয়ার্ড ব্লক? প্রবাদপ্রতিম চিত্ত বসুর পার্টির উত্তর ২৪ পরগণাতেই বা কী হাল? বিধানসভা নির্বাচনের সময়ে যে সংযুক্ত মোর্চা তৈরি হয়েছিল তাতে ছিল কংগ্রেস আর ইন্ডিয়ান সেকুলার ফ্রন্টও। পশ্চিমবঙ্গের গ্রামীণ মুসলমান এবং হিন্দু নিম্নবর্গীয় মানুষের হাত ধরার জন্যই নাকি শেষোক্ত দলটিকে নেওয়া হয়েছিল। তাদের সঙ্গেই বা সিপিএম তথা বামফ্রন্টের এখন ঠিক কী সম্পর্ক? কংগ্রেসের সঙ্গে কি আবার জোট করা হবে?

আরও পড়ুন সেলিব্রিটি কাল্ট দরদী সিপিএমকে খোলা চিঠি

এইসব প্রশ্নেই লুকিয়ে আছে বামেরা এ রাজ্যে ঘুরে দাঁড়াতে পারবে কিনা তার উত্তর। কারণ এ রাজ্যে যেভাবে ভোট হয়, তাতে সবকিছু ঠিকঠাক করেও নির্বাচনের দিন খড়্গ হাতে দাঁড়িয়ে থাকা উন্নয়নের মোকাবিলা করতে না পারলে ভোটে জেতা যায় না। গোটা রাজ্যে একা তার মোকাবিলা করার মত সংগঠন সিপিএমের এখন নেই, আগামী কয়েক মাসের মধ্যে হবেও না।

উত্তরবঙ্গ সংবাদে প্রকাশিত

অলক্ষ্মী না হলে বাঁচবে না আমাদের লক্ষ্মী মেয়েরা

পুলিস যেখানে মিটিং করার অনুমতি দেয়নি ঠিক সেখানটাই পার্টিকর্মী, সমর্থকদের দিয়ে ভরিয়ে ফেলে ম্যাটাডোরের উপর দাঁড়িয়ে বলতে পারেন, মিটিং কোথায় হবে মানুষ ঠিক করবে। পুলিস ঠিক করবে না। এমন দস্যি মেয়েদেরই আমরা লক্ষ্মীছাড়া বলতে অভ্যস্ত।

লক্ষ্মীপুজো কবে? দুর্গাপুজোর পরেই তো? নাকি দিওয়ালি নাগাদ? প্রশ্নটা এই পুজোর মরসুমে রীতিমত ভাবিয়েছে। দিনকাল যেভাবে বদলাচ্ছে। হাফপ্যান্ট পরা বয়স থেকে দেখে আসছি বাঙালি গণেশপুজো করে অক্ষয় তৃতীয়ায়। কিছু দোকান হালখাতা পয়লা বৈশাখে করে না, করে সেইদিন। এখন চুল পাকতে শুরু করার পর দেখছি বাঙালির ঘরে ঘরে, ফেসবুকের ওয়ালে ওয়ালে গণেশ চতুর্থীর হিড়িক। দুর্গাপুজোর ঢাকের বাদ্যিও শুরু হয়ে যাচ্ছে অকালবোধনের একমাস আগে। পঞ্চমী তো বটেই, আমাদের আমলে জাঁদরেল বাবা-মায়েরা ষষ্ঠীর দিনও সকালে পড়তে বসাতেন, বিকেল থেকে ছুটি। এখনকার বাবা-মা মহালয়ার দিনই ছেলেমেয়েকে সাজিয়ে গুজিয়ে বাতানুকূল গাড়িতে চাপিয়ে ঠাকুর দেখতে নিয়ে যাচ্ছেন। এতকিছু যখন বদলাচ্ছে, তখন মেঝেতে সারি সারি লক্ষ্মীর পায়ের আলপনা দেওয়ার পুজো ধনতেরাসে বিলীন হতেই পারে। তাই চোখকান খোলা রাখতে হয়। আগে অবশ্য আমাদের বছরে একদিন লক্ষ্মীপুজো করে আশ মিটত না, বাড়িতে লক্ষ্মী মেয়ে তৈরি করার প্রকল্প চলত সারাবছর। শ্বশুরবাড়িতে লক্ষ্মী মেয়েদের চাহিদা এখনো কম নয়, তবে বাবা-মায়েদের কাছে আজকাল অলক্ষ্মী মেয়েদের যথেষ্ট আদর হয়েছে। ছেলের মত বা ছেলের চেয়েও বেশি করে বংশের মুখ উজ্জ্বল করতে যে অলক্ষ্মীরাই পারে, তার ভুরি ভুরি প্রমাণ পাওয়া গেছে। সুতরাং কাল পর্যন্ত যাদের অলক্ষ্মী বলা আমাদের অভ্যাস ছিল, এখন তাদেরই লক্ষ্মী মেয়ে বলে মেনে নেওয়ার দিন। যেমন

মীরাবাঈ চানু, পিভি সিন্ধু, লভলীনা বরগোহাঁই: পিটি ঊষা বা অঞ্জু ববি জর্জ মান্ধাতার আমলের মহিলা নন, কিন্তু কেরিয়ারের সেরা সময়েও তাঁদের যদি বলা হত, আর মাত্র দুই দশকের মধ্যেই কোনো অলিম্পিকে ভারতের জেতা পদকের অর্ধেক জিতবে মেয়েরা, ঊষা আর অঞ্জু নিশ্চয়ই হেসে উড়িয়ে দিতেন। কিন্তু ভারোত্তোলক চানু, ব্যাডমিন্টন খেলোয়াড় সিন্ধু আর মুষ্টিযোদ্ধা লভলীনা ঠিক সেটাই করে দেখিয়ে দিয়েছেন গত বছরের টোকিও অলিম্পিকে। একজন পেশি ফুলিয়ে লোহা তোলেন, একজন জনসমক্ষে ছোট ছোট জামাকাপড় পরে লম্ফঝম্প করে ঠাঁই ঠাঁই করে শাটল পেটান। তৃতীয় জন আরও এক কাঠি সরেস – ঘুঁষোঘুঁষি করেন। কী ভীষণ অলক্ষ্মী! আরেকটু হলে মেয়েদের হকি দলও পদক জিতে ফেলছিল। ভারতীয় মেয়েরা এখনো অলিম্পিকে সোনা জেতেননি। অলক্ষ্মীরা এভাবে দলে ভারি হতে থাকলে ২০২৪ সালে প্যারিসে সে অভাবও মিটে যেতে পারে।

দীপ্তি শর্মা, হরমনপ্রীত কৌর: ক্রিকেট খেলার জন্ম বিলেতে আর বিলেতে খেলার দেবভূমি হল লর্ডসের মাঠ। সেই মাঠে সাহেবদের জব্দ করে দিতে পারা কত বড় কাণ্ড তা আজ থেকে কুড়ি বছর আগে জামা খুলে মাথার উপর বনবন করে ঘুরিয়ে বুঝিয়ে দিয়েছিলেন ভারতের পুরুষদের ক্রিকেট দলের অধিনায়ক সৌরভ গাঙ্গুলি। কদিন আগে সেই লর্ডসেই ইতিহাসে প্রথমবার মেমদের তিনটে একদিনের ম্যাচের তিনটেতেই হারিয়ে দিল ভারতের মহিলা ক্রিকেট দল। উপরন্তু ইংরেজদের কাটা ঘায়ে ঠান্ডা মাথায় নুন ঘষে দিলেন অফস্পিনার দীপ্তি আর অধিনায়িকা হরমনপ্রীত। ইংল্যান্ড ব্যাটার চার্লি ডিন বারবার আগেভাগেই ক্রিজ ছেড়ে বেরিয়ে যাচ্ছিলেন। দীপ্তি বল করতে গিয়ে বেল ফেলে দিলেন। তৃতীয় আম্পায়ার খতিয়ে দেখে জানালেন এখন যে নিয়ম বলবৎ হয়েছে সে নিয়ম অনুযায়ী চার্লি আউট, ম্যাচ খতম। কিন্তু ব্যাপারটা কেবল ইংরেজ নয়, আরও অনেকেরই হজম হয়নি। সাহেবদের তৈরি খেলা, ফলে তারা দাবি করে আইনটাই শেষ কথা নয়, কেতাও বজায় রাখতে হবে (কেতার গালভরা নাম ‘স্পিরিট অফ ক্রিকেট’)। দীপ্তি যদি কাণ্ডটা করেও থাকেন, হরমনপ্রীতের উচিত ছিল আউটের আবেদন ফিরিয়ে নেওয়া। ক্যাপ্টেন বলে কথা। ম্যাচের শেষে টিভির প্রতিনিধি হরমনপ্রীতকে এ নিয়ে প্রশ্নও করলেন। দেখা গেল হরমনপ্রীত, ‘বসন্ত বিলাপ’ ছবির অপর্ণা সেনের মতই, ‘অত্যন্ত ইমপোলাইট’। বললেন যা করা হয়েছে আইন মেনেই হয়েছে। এরকম হলে আমি আমার বোলারকেই সমর্থন করব। ২৪ সেপ্টেম্বরের ঘটনায় ইংরেজরা মনে এত ব্যথা পেয়েছে যে পুরুষদের একদিনের দলের অধিনায়ক জস বাটলার হপ্তাখানেক পরেও বলেছেন, আমি হলে কখনো এমন হতে দিতাম না। বিশ্বকাপ ফাইনালে আমার দলের কোনো বোলার এমন করলেও আমি আউট হওয়া ব্যাটারকে ফিরিয়ে আনব।

মীনাক্ষী মুখার্জি: ইনি যাদবপুর, প্রেসিডেন্সি বা জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তনী নন, বিদেশ থেকে ডিগ্রি বা ব্র্যান্ডেড হাতব্যাগ – কোনোটাই নিয়ে আসেননি। রবীন্দ্রসঙ্গীত বা ‘বেলা চাও’ গাইতে পারেন না, ‘কৃষ্ণকলি আমি তারেই বলি’ গানে নাচতেও পারেন না। কলকাতার ভদ্রলোকেদের বাংলায় কথা বলতে পারেন না, চোস্ত ইংরেজি বলার তো প্রশ্নই ওঠে না। কী পারেন তাহলে? পুলিস লক আপে মার খেয়েও সোজা থাকতে পারেন, যেখানে তাঁর পার্টির তেমন সংগঠন নেই সেখানে দাঁড়িয়েও পুলিসকে ধমকাতে পারেন, জনতাকে উদ্বেল করতে পারেন। পুলিস যেখানে মিটিং করার অনুমতি দেয়নি ঠিক সেখানটাই পার্টিকর্মী, সমর্থকদের দিয়ে ভরিয়ে ফেলে ম্যাটাডোরের উপর দাঁড়িয়ে বলতে পারেন, মিটিং কোথায় হবে মানুষ ঠিক করবে। পুলিস ঠিক করবে না। এমন দস্যি মেয়েদেরই আমরা লক্ষ্মীছাড়া বলতে অভ্যস্ত। পশ্চিমবঙ্গের দশ বছর ধরে মিইয়ে থাকা শান্ত বিরোধী রাজনীতিতে অশান্তি হানতে পেরেছেন মীনাক্ষী। মধ্যবিত্তপ্রধান সিপিএমে গরীব ঘর থেকে উঠে আসা এই মেয়ে নূতন যৌবনের দূত। যে পথে এ রাজ্যের বামপন্থীরা আর কোনোদিন হাঁটতে পারবে না বলে মনে হচ্ছিল, সে পথের হদিশ যে পাওয়া গেছে বলে মনে হচ্ছে তাতে রাজ্য সম্পাদক মহম্মদ সেলিমের অবদান অনেকখানি, কিন্তু মীনাক্ষীর অবদানও কম নয়।

আরও পড়ুন ঝুলন সেরা বাঙালি ক্রিকেটার? মোটেই না

রিয়া কুমারী: প্রচলিত অর্থে লক্ষ্মী মেয়ে বোধহয় বিহারের মহিলা উন্নয়ন কর্পোরেশনের চেয়ারপার্সন হরজোৎ কৌর ভামরা। বহুদূর লেখাপড়া করে আইএএস পরীক্ষায় পাস করে চাকরি পায় যে মেয়ে তাকেই তো লক্ষ্মী মেয়ে বলে। কিন্তু সম্প্রতি বিহার সরকারের উদ্যোগে মেয়েদের ক্ষমতায়ন নিয়ে এক কর্মশালায় ধরা পড়ে গেছে, যে হরজোৎ মানসিকতায় একজন প্রবল পিতৃতান্ত্রিক পুরুষমানুষ। তাঁকে ধরে ফেলেছেন ১৯ বছর বয়সী ঠোঁটকাটা রিয়া কুমারী, যাঁকে কেউ লক্ষ্মী মেয়ে বলবে না হয়ত। রিয়া জানতে চেয়েছিল সরকার ২০-৩০ টাকায় স্যানিটারি ন্যাপকিনের ব্যবস্থা করতে পারে কিনা। হরজোৎ বলেছেন, এরপর তোমরা সরকারের কাছে জিনস চাইবে। তারপর সুন্দর জুতো চাইবে। তারপর কি কন্ডোমও চাইবে? রিয়া তাতে দমে যায়নি। আমলাকে মনে করিয়ে দিয়েছে, সরকার নির্বাচিত হয় নাগরিকদের ভোটে। নাগরিকদের দাবিদাওয়া থাকতেই পারে।

ভারত রাষ্ট্র যে পথে চলেছে তাতে রিয়া নয়, রাষ্ট্র্বের কাছে হরজোৎই লক্ষ্মী মেয়ে। কিন্তু ভারতীয় মেয়েদের বাঁচতে হলে রিয়ার মত অবাধ্য, অলক্ষ্মী হতে হবে। লক্ষ্মীঠাকুরে যাঁদের বিশ্বাস আছে তাঁরা বরং প্রার্থনা করতে পারেন, এ দেশের মেয়েদের যেন ইরানের মেয়েদের মত লক্ষ্মীছাড়া হয়ে উঠে প্রাণ দিতে না হয়।

বৃদ্ধতন্ত্র নয়, সিপিএমের সমস্যা মধ্যবিত্ততন্ত্র

মিঠুদা (নাম পরিবর্তিত) পেশাদার ড্রাইভার। বাসচালক ছিলেন, এখন প্রাইভেট গাড়ি চালান। সম্প্রতি যে শতাধিক পৌরসভায় নির্বাচন হল, উনি তারই একটার বাসিন্দা। পার্টি সদস্য না হলেও, সক্রিয় সিপিএম সমর্থক। নির্বাচনের ফল বেরোবার আগের দিন দেখা হল, বললেন “দাদা, মনে হচ্ছে অন্তত আমাদের ওয়ার্ডটায় জিতে যাব। ওরা অনেক চেষ্টা করেছিল, ভয় দেখিয়েছিল, কিন্তু আমরা বুক দিয়ে বুথ আগলেছি।” মিঠুদার আশা পূর্ণ হয়নি। রাজ্যের অন্য অনেক পৌরসভার মত ওঁদের পৌরসভাও বিরোধীশূন্য হয়েছে। দিন সাতেক পরে আবার দেখা। দুঃখ করে বললেন “কাজকর্ম ফেলে, টিএমসির গালাগাল খেয়ে ভোটের আগে কদিন রাত জেগে পোস্টারিং করলাম। এখন ভোটের পরে পার্টি অফিসে গেলে নেতারা ভাব করছে যেন চেনেই না। আর ওদের কাছে যাবই না ভাবছি। আগেও দেখেছি, মিছিলে লোক দরকার হলে আমাকে ডাকে। আর এসডিও অফিসে ডেপুটেশন দিতে যাওয়ার সময়ে ফরসা দেখতে লেখাপড়া জানা ছেলেগুলোকে ডাকে। আমি পাশে দাঁড়িয়ে থাকি, একবার বলেও না ‘মিঠু, তুইও যাস।’ কেন বলবে? আমার কালোকোলো চেহারা, লেখাপড়া জানি না অত, আমার আর কী দাম?”

পশ্চিমবঙ্গে বিধায়ক, সাংসদ নেই; ভোটও দু-আড়াই শতাংশে নেমে এসেছে সিপিএমের। তবু যে তারা এখনো কয়েক হাজার মানুষের মিছিল করতে পারে, আনিস খান হত্যার যথাযথ বিচার চেয়ে যে মাঝে কয়েকদিন রাজ্য তোলপাড় করে দিতে পেরেছিল, তা এই মিঠুদাদের জন্যই। মিঠুদার পেশায় মাস মাইনে নেই, ডি এ নেই, টি এ নেই, অবসরের পর পেনশন নেই, প্রভিডেন্ট ফান্ড নেই। গাড়ি চালালে রোজগার, না চালালে হাত খালি। সেই মানুষ ভোটের আগে গাড়ি না চালিয়ে দেয়ালে দেয়ালে পোস্টার লাগিয়ে বেড়িয়েছেন। একথা জানতে পারলে যে কোনো মানুষের মনে হতে বাধ্য, বর্তমান যেমনই হোক, সিপিএমের এখনো ভবিষ্যৎ আছে। কোনো পার্টির যদি শ্রমজীবী মানুষের মধ্যে নিবেদিতপ্রাণ কর্মী সমর্থক থাকে, তাহলে তার কিসের অভাব?

অভাব আছে। মিঠুদাদের উপযুক্ত মর্যাদার অভাব। সিপিএমে বৃদ্ধতন্ত্র চলছে বলে প্রায়ই হইচই হয়। রাজ্য সম্মেলন চলাকালীন কয়েকজন বয়স্ক নেতা ঝিমোচ্ছেন — এই ছবি প্রকাশ হওয়ার পর আরও বেশি করে হচ্ছে। চাপা পড়ে যাচ্ছে যে কথা, তা হল বিমান বসু এখনো যে কোনো ২৫-৩০ বছরের ছেলের চেয়ে বেশি হাঁটতে পারেন মিছিলে, হান্নান মোল্লা দিল্লির রাস্তায় বসে এক বছরের বেশি কৃষক আন্দোলন করলেন সদ্য, তপন সেন এখনো গোটা ভারত চষে শ্রমিক সংগঠনের কাজ করেন। যা সত্যিই সিপিএমের সমস্যা, তাকে বলা চলে মধ্যবিত্ততন্ত্র। মিঠুদার অভিজ্ঞতা তার জলজ্যান্ত প্রমাণ। মূলত শ্রমিক-কৃষকের পার্টি হওয়ার কথা যে দলের, সেই দলের রাজ্য নেতৃত্বে দীর্ঘকাল ছাত্র, যুব নেতারা প্রাধান্য পাচ্ছেন। চক্রান্ত করে শ্রমিক নেতা, কৃষক নেতাদের সামনে আসতে দেওয়া হচ্ছে না এমন হয়ত নয়। আসলে পার্টিতে শ্রমজীবী মানুষের অংশগ্রহণ কমে যাচ্ছে। যাঁরা আসতে চাইছেন তাঁরা মিঠুদার মত ব্যবহার পাচ্ছেন। গুরুত্ব পাচ্ছেন লেখাপড়া জানা চাকুরীজীবী বা ব্যবসায়ীরা। মিঠুদার মত লোকেদের আদর দল ভারী করার সময়ে, অন্য সময়ে তারা অপ্রয়োজনীয়।

মিঠুদা মার্কস, এঙ্গেলস, লেনিন, স্তালিন বা মায়াকভস্কি পড়েননি। তিনজনের সংসারের খাওয়া, পরা আর ছেলের লেখাপড়ার সংস্থান করতে উদয়াস্ত খেটে ওসব পড়াও যায় না। কিন্তু না পড়েই মার্কসবাদ যাকে শ্রেণিচরিত্র বলে, তার ধারণা ওঁর কাছে পরিষ্কার। বলেই দিলেন “চাকরি করা ফ্যামিলির ছেলেকে যতই তোল্লাই দিক, সে ভাল কেরিয়ার পেলেই চলে যাবে। পার্টির জন্যে আমরাই থাকব।” কিন্তু পার্টি এঁদের জন্য থাকবে কিনা এঁরা বুঝতে পারছেন না।  আশা করা যায় সিপিএমের নবনির্বাচিত রাজ্য সম্পাদক মহম্মদ সেলিম জানেন, এই মুহূর্তে তাঁর পার্টির এ এক বড় সংকট। প্রতিষ্ঠার পর থেকে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্ব দীর্ঘদিন ছিল মুসলমান, নিম্নবর্গীয় মানুষের হাতে। মুজফফর আহমেদ, আব্দুল হালিম, মহম্মদ ইসমাইলের মত নেতারা প্রবাদপ্রতিম। স্বাধীনতার পর থেকে, বিশেষত পার্টি ভাগ হওয়ার পর থেকে কিন্তু পশ্চিমবঙ্গে সব কমিউনিস্ট পার্টিই ক্রমশ হয়ে দাঁড়িয়েছে উচ্চবর্গীয় হিন্দুদের দল। ভারতের আর্থসামাজিক পরিস্থিতিতে যার অর্থ গরীব, প্রান্তিক মানুষের থেকে দূরে সরে যাওয়া। এখন কি মাটির টানে ফিরতে পারবে সিপিএম?

তারুণ্য নেই এমন কথা আর বলা যাবে না। বিধানসভা নির্বাচনে এক ঝাঁক অল্পবয়সীকে প্রার্থী করা হয়েছিল, সদ্যগঠিত নতুন রাজ্য কমিটিতেও অনেক নতুন মুখ। আনিসের জন্য বিচার চেয়ে আন্দোলনের নেত্রী মীনাক্ষী মুখার্জি বহুকাল পরে মনে করিয়ে দিলেন সেই স্লোগান “পুলিসের লাঠি ঝাঁটার কাঠি/ভয় করে না কমিউনিস্ট পার্টি”। কিন্তু আশ্চর্য! তাঁকে এবং আরও একগুচ্ছ পার্টিকর্মীকে হাস্যকর অভিযোগে হপ্তা দুয়েক আটকে রাখা হল, উপরন্তু শারীরিক নির্যাতন চলল; সিপিএম আইনের উপর আস্থা রেখে নিরামিষ প্রতিবাদ ছাড়া কিছুই করল না!

আরও পড়ুন সেলিব্রিটি কাল্ট দরদী সিপিএমকে খোলা চিঠি

এই মুহূর্তে পশ্চিমবঙ্গে বিরোধী রাজনীতির জন্যে ইস্যুর কিন্তু অভাব নেই। দেউচা পাঁচামিতে খনি করতে দেবেন না – এই দাবিতে স্থানীয় মানুষ আন্দোলনে, স্কুলের নিয়োগব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে, পুলিস আনিসের পর ঝালদার কংগ্রেস কাউন্সিলরের হত্যাতেও প্রশ্নের মুখে, শাসক দলে গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব এমন পর্যায়ে যে নির্বাচিত কাউন্সিলর খুন হয়ে যাচ্ছেন, নেতৃত্ব মনোনীত চেয়ারম্যানকে বিজেপির সমর্থনে হারিয়ে দিয়ে পৌরসভার চেয়ারম্যান হয়ে যাচ্ছেন অন্য একজন, ধর্মনিরপেক্ষতার ধ্বজা ধরে সরকারে ফিরে মার্কামারা সাম্প্রদায়িক প্রাক্তন বিজেপিদের নির্বাচনে প্রার্থী করছে তৃণমূল। অথচ সিপিএম কিছুতেই মমতার কপালে ভাঁজ ফেলার মত বিরোধিতা করে উঠতে পারছে না। অন্য সবকিছু ভুলে সম্মেলন নিয়ে মেতে থাকা দেখে সন্দেহ হয়, পার্টির জন্য সম্মেলন নয়, সম্মেলনের জন্য পার্টি। বিপ্লবকেও ওয়েটিং রুমে বসিয়ে রাখা যেতে পারে, সম্মেলনটা লগ্ন মেনে ষোড়শোপচারে করতে হয়।

বোধ করি কমিউনিস্ট পার্টিতে মধ্যবিত্ততন্ত্র চালু হয়ে গেলে এমনটাই ঘটে। পশ্চিমবঙ্গে আন্দোলন হয় না, এ অভিযোগ স্বয়ং হান্নান মোল্লা মাসখানেক আগে করেছেন। আসলে আন্দোলন হবে কি হবে না — তা ঠিক করছেন মাথায় ছোট বহরে বড় ভদ্রসন্তানরা, এবং অধিকাংশ সময়েই সিদ্ধান্ত হচ্ছে, হবে না। লড়াকু, গরীব কর্মী সমর্থকরা আছেন কেবল হুকুম তামিল করতে। অথচ মাস দশেক আগে নির্বাচনের প্রচারে টুম্পাসোনা গানের প্যারডি প্রকাশ করে বলা হয়েছিল সাধারণ মানুষের ভাষায় তাঁদের কাছে পৌঁছবার চেষ্টা চলছে। সিপিএমের ভোটের ফলাফলে বোঝা গিয়েছিল, সাধারণ মানুষের ভাষা সিপিএম আদৌ বোঝেনি। লাভের লাভ এই, পার্টির শিল্পবোধও এখন এমন জায়গায় পৌঁছেছে যে শুভেন্দু মাইতির মত প্রবীণ গণশিল্পী তথা পার্টিকর্মীকে নেতৃত্ব মনে করছেন হুকুমের চাকর।

সিপিএমের ভবিষ্যৎ যদি এঁদের হাতেই থাকে, সে ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল নয়।

উত্তরবঙ্গ সংবাদে প্রকাশিত

প্রতিবাদের ভাষা, প্রতিরোধের নিভু নিভু আগুন

গত দশ বছরে তৃণমূল নেত্রীর উচ্চারণের ত্রুটি নিয়ে খোদ সূর্যকান্ত মিশ্রের টুইটার হ্যান্ডেল থেকে কম কটাক্ষ করা হয়নি। ‘টুম্পা’ তেমন উচ্চারণকেই বাম রাজনীতির ভাষা করে দিল।

বেশিদিন আগের কথা নয়। মাত্র কয়েক বছর আগে হোয়াটস্যাপ, ফেসবুক ভরে গিয়েছিল নারী কণ্ঠে গাওয়া ভূপেন হাজারিকা খ্যাত ও গঙ্গা তুমি গানে। সেখানে গায়িকা প্রথমে পল রোবসনের ‘ওল্ড ম্যান রিভার’ গাইছিলেন। তারপর ঐ গানের অনুসরণে রচিত ‘ও গঙ্গা তুমি’। বলা হচ্ছিল গলাটা কলম্বিয়ান শিল্পী শাকিরার। কয়েক দিন পরে জানা গেল, আসলে ঐ কণ্ঠ পূরবী মুখার্জির। যিনি এক সময়কার পরিচিত শিল্পী, প্রচুর গণসঙ্গীত গেয়েছেন। বাঙালি, বিশেষত বামপন্থী বাঙালি, নিজেদের সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার কত দ্রুত হারিয়ে ফেলছে তা দেখে অবাক লেগেছিল। সেই বিস্মৃতি আরো কুৎসিত চেহারায় প্রতিভাত হয়েছে গত কয়েক দিনে। বামফ্রন্টের ডাকা ব্রিগেড সমাবেশের প্রাক্কালে ঐ সভায় যোগ দেওয়ার আহ্বান হিসাবে মোবাইল থেকে মোবাইলে ছড়িয়ে পড়েছে জনপ্রিয় গান টুম্পার প্যারডি

কুৎসিত বলায় সিপিএম কর্মীরা রাগ করবেন। কাগজে পড়ছি কেবল শতরূপ ঘোষের মত তরুণ তুর্কিরাই নয়; মহম্মদ সেলিম, শমীক লাহিড়ির মত বর্ষীয়ান নেতারাও “শতফুল বিকশিত হোক”, “বয়সের নিজস্ব ভাষা” প্রভৃতি যুক্তিতে সিপিএম ডিজিটালের সদস্যদের তৈরি এই প্যারডির পক্ষে চেতেশ্বর পূজারার মত ব্যাট করছেন।

বিধানসভা নির্বাচনের আগে পশ্চিমবঙ্গে অকথা কুকথার বান ডেকেছে। লাইভ টিভিতে বিজেপি আর তৃণমূলের দুই নেতা একে অপরের জন্মদাতাকে পর্যন্ত গালাগালি করেছেন। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর চেহারা নিয়ে কটাক্ষ করেছেন মুখ্যমন্ত্রী। তাঁকে এবং তাঁর ভাইপোকে ব্যক্তিগত আক্রমণ করা হয়েছে বিজেপির দিক থেকেও। বামপন্থীরা সঙ্গত কারণেই দুপক্ষেরই সমালোচনা করছিলেন, বলছিলেন সাধারণ মানুষের ইস্যু বাদ দিয়ে কদর্য ভাষায় কুৎসিত রাজনীতি করা হচ্ছে, যা বাংলার সংস্কৃতির পরিপন্থী। সেই আবহে হিন্দি মিশ্রিত, অভিধান বহির্ভূত শব্দ সম্বলিত টুম্পাকে ব্রিগেডে নিয়ে যাওয়ার সঙ্কল্প কোন সংস্কৃতিকে ধারণ করছে কে জানে! ইদানীং কিছু ভোজপুরি গান নানা উপলক্ষে বাজতে শোনা যায়। সেগুলোর অন্যতম বৈশিষ্ট্য কয়েকটা শব্দ পরে পরেই শিল্পীর কণ্ঠের সাথে এক যান্ত্রিক আওয়াজের ক্যাকোফোনি। মূল ‘টুম্পা’ গানটা সেই ধারা অনুসরণ করেছে, প্যারডিও তাই। বামপন্থীরা যে ইস্যুভিত্তিক বিতর্কের কথা বলছিলেন, এ গানে তা-ই বা কোথায়? কেবল তৃণমূল-বিজেপির ‘সেটিং’-এর কথা রয়েছে, মমতা বা মোদী সরকারের কার্যকলাপের কড়া সমালোচনাও নেই। শুধু বার দুয়েক চাকরির প্রসঙ্গ আছে। অর্থাৎ এই প্যারডি রাজনৈতিক বক্তব্যে দুর্বল এবং আঙ্গিকে অবাঙালি। তবুও ভাইরাল, সুতরাং জনপ্রিয়। এতেই বাম নেতারা উল্লসিত। ভাইরাল মানেই ভোট বলে ভাবছেন হয়ত। ঠিক ভাবছেন কিনা তা সময় বলবে। তবে মজা লাগল অন্য কারণে।

আরও পড়ুন বাঙালির চেতনার রঙে শিল্প হল গো অ্যাজ ইউ লাইক

গত দশ বছরে তৃণমূল নেত্রীর উচ্চারণের ত্রুটি নিয়ে খোদ সূর্যকান্ত মিশ্রের টুইটার হ্যান্ডেল থেকে কম কটাক্ষ করা হয়নি। ‘টুম্পা’ তেমন উচ্চারণকেই বাম রাজনীতির ভাষা করে দিল। নীচের তলার বাম কর্মীদের আকছার বলতে শোনা যায়, তৃণমূল কংগ্রেসের আমলে বাঙালির “কালচারে আলকাতরা মিশে গেছে”। টুম্পার প্রেমে পড়ে এখন দেখছি কালচারের ধারণাটাকেই তাঁরা “এলিটিস্ট” আখ্যা দিচ্ছেন। মুখ্যমন্ত্রীর লেখা কবিতা নিয়ে বিস্তর হাসাহাসি করতেন ওঁরা, আর মমতাপ্রেমী বুদ্ধিজীবীরা বলতেন কে কবি কে নয়, তা দাগিয়ে দেওয়া ভদ্রলোকদের এলিটিজম। জীবনানন্দ দাশের ভাষায় এমন অসাহিত্যিক প্রলাপ শুনে শিউরে উঠতাম। এখন ‘টুম্পা’-র পক্ষে দেখছি একইরকম যুক্তি দেওয়া হচ্ছে। শমীকবাবু বলেছেন “উচ্চাঙ্গসঙ্গীতই যে একমাত্র সংস্কৃতি, সেটা কোথায় সিদ্ধান্ত হল?”

উচ্চাঙ্গসঙ্গীত মনে পড়ল অথচ গণসঙ্গীত মনে পড়ল না! জনপ্রিয় সাংস্কৃতিক প্রতীক ব্যবহার করে প্রতিবাদী গান বাঁধার কথা বললেই যে কোন ইতিহাস সচেতন কমিউনিস্টের মাউন্টব্যাটেন মঙ্গলকাব্য মনে পড়ার কথা। লর্ড মাউন্টব্যাটেনের কংগ্রেসের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরকে ব্যঙ্গ করে তৈরি সেই গান মঙ্গলকাব্যের ভাষায় হওয়ায় অক্ষর পরিচয় না থাকা মানুষকেও ছুঁয়ে ফেলত।

আর আজ কমিউনিস্টরা মনে করছেন সাধারণ মানুষের ভাষা মানে কিছু অভিধান বহির্ভূত শব্দ।

অবশ্য হেমাঙ্গ বিশ্বাস, জ্যোতিরিন্দ্র মৈত্র, সলিল চৌধুরীদের যুগ কবেই চলে গেছে। তখন সম্ভবত সংসদীয় কমিউনিস্টরাও চাইতেন মানুষকে বিকল্প বৈপ্লবিক সংস্কৃতির খোঁজ দিতে। এখন পাবলিক যা খাচ্ছে, সেটাকেই ব্যবহার করে ভোটে জিততে চান।

টুম্পা দীর্ঘজীবী হোক।

উত্তরবঙ্গ সংবাদে প্রকাশিত