‘আজ ফির জীনে কি তমন্না হ্যায়/আজ ফির মরনে কা ইরাদা হ্যায়’ – ওয়াহিদা রহমানের মত অনাবিল আনন্দে এই মারাত্মক লাইন দুটো গাইতে গাইতে নাচতে নাচতে তমন্না খাতুন পুকুরে চান করতে যাচ্ছিল কিনা, সে খবর কোথাও পেলাম না। হতেও পারে। ন-দশ বছরের শিশুর পক্ষে চারপাশের তাণ্ডবের মধ্যেও কতটা সরল এবং আপনমনে থাকা সম্ভব – তা আমি ৩৩ বছরের অনভ্যাসে ভুলে গেছি, ফলে আন্দাজ করতে পারছি না। কিন্তু দেখাই যাচ্ছে, এই স্মার্টফোন যুগেও ৯-১০ বছরের শিশু এতটা চৌখস হয়নি যে আঁচ করতে পারবে – বাবা যে দলের লোক তার প্রতিপক্ষ দলের বিজয় মিছিলের ধারেকাছে গেলে বাঁচার অভিলাষ বা তমন্না ‘মরনে কা ইরাদা’, অর্থাৎ মরার ইচ্ছা, হয়ে দাঁড়ায়। পিতামহ ভীষ্মের ছিল ইচ্ছামৃত্যু। মহাভারতের যুগ চলে গেছে; এখন বাপ ঠাকুর্দার বয়সী লোকেদের ইচ্ছা হলেই শিশুদের মৃত্যু হয়। যখন তখন যেখানে সেখানে। গাজা থেকে শুরু করে কালীগঞ্জ।
কী বলছেন? ‘বামফ্রন্টের ৩৪ বছরে’ ইত্যাদি? জানতাম ওটাই বলবেন। তাই তো সোজা মহাভারত থেকে শুরু করলাম। সবাই জানে চক্রব্যূহের সাতজন বীর ছিলেন অভিমন্যুর বাপ-ঠাকুর্দার বয়সী, তুলনায় অভিমন্যু নেহাত বালক। সুতরাং এ পাপের শুরু যে আজ নয় তা বলাই বাহুল্য। কিন্তু কী করব? মহাকালের চক্রান্তই বলুন, অথবা বাবা-মায়ের তমন্না, আমাকে এই কালখণ্ডেই বাঁচতে হচ্ছে। ফলে আজকের শিশুমৃত্যুর ঘা-ই আমার কাছে সবচেয়ে দগদগে। মানুষ নিজের বাবা-মা-ছেলেমেয়ের মৃত্যুশোকই কয়েক দিনে কাটিয়ে ওঠে, আর আপনারা বলছেন, দেড় দশক আগে শেষ হয়ে যাওয়া বামফ্রন্ট আমলে যে শিশুরা খুন হয়েছে তাদের মৃত্যু নিয়ে কথা বললে, তবেই তমন্নার মৃত্যু নিয়ে রেগে ওঠা বৈধ? বনলতা সেনকে লজ্জা দেবেন না মাইরি!
কী বলছেন? বড় বড় কথা বলছি, নিজেও কদিন পরেই তমন্নাকে ভুলে যাব? আজ্ঞে এই কথাটি যথার্থ বলেছেন। মাথাটা পচে যাচ্ছে, পচে গেছে স্ক্রোল করতে করতে। তমন্নাকে নিয়ে কদিন পোস্ট করা আর লাইক দেওয়া হয়ে গেলেই ঠিক স্ক্রোল করে এগিয়ে যাব। নিজের বাবার মৃত্যুশোকের ভার শ্মশানে দাঁড়িয়ে চিতায় তোলার আগেই ফেসবুকে পোস্ট করে নামিয়ে ফেলতে পারছি, আর কোথাকার কোন গণ্ডগ্রামের মেয়ে তমন্না – তার শোকে কদিন মুহ্যমান থাকব? হত কলকাতার কাছাকাছি এলাকার ভদ্দরলোকের মেয়ে, যে লেখাপড়া শিখে নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে গেছিল, কোনো পার্টির সঙ্গে যার গোটা পরিবারের কোনো সম্পর্ক ছিল না – তাহলে অন্তত কয়েক মাস তমন্নার মৃত্যু নিয়ে উত্তেজিত হয়ে থাকতাম। আমাদের দলহীন নারীবাদীরা (নয়-দশে কি নারী হয়? এ বিষয়ে কোনো মত দেব না; শেষে ম্যানস্প্লেনিংয়ের অভিযোগ উঠবে) রাত দখলের ডাক দিতেন, মেয়ে বউয়ের হাত ধরে চলে যেতাম গটগটিয়ে। সেখানে দাঁড়িয়েই গাদা ছবি, ভিডিও তুলে পোস্ট করে দিতাম ফেসবুকে। দায়িত্ব মিটে যেত। সপ্তাহান্তে আন্দোলন করে সোমবার থেকে যথারীতি অফিস কাছারি। এই মেয়েটার বেলায় অত কাণ্ড কেন করতে যাব? ওর তো বাবা সিপিএম করে। আন্দোলন-টান্দোলন করতে হলে সিপিএমই করুক। পশ্চিমবঙ্গে রাজনৈতিক হত্যার ইতিহাস তো লম্বা। ক দল খ দলের ঘর জ্বালিয়ে দেবে, খ দল ক দলের বাড়িতে বোম মারবে, কখনো ক দলের লোক মরবে আর কখনো খ দলের লোক মরবে। এ তো চিরকালই দেখছি। এর মধ্যে আমি ঢুকতে যাব কেন?
সাতে পাঁচে না থাকা মধ্যবিত্তও কি নতুন নাকি? মোটেই না। স্বাধীনতা সংগ্রাম বলুন, নকশাল আন্দোলন বলুন আর সিদ্ধার্থশঙ্কর রায়ের শাসনের দিনগুলোই বলুন। কোনোদিনই সকলে সুখী গৃহকোণ ফেলে পথে নেমে যায়নি। রূপকথায় বিশ্বাস করবেন না। ‘আমার নাম তোমার নাম, দেশের নাম ভিয়েতনাম’ বলে মিছিল করতেও মোটেই সকলে যায়নি। কেউ কেউ গেছিল। মুশকিল হচ্ছে, অনুপাত হিসাব করলে আমাদের মত এ যুগের বাম, প্রগতিশীল প্রমুখকে লজ্জায় পড়তে হবে। অবশ্য সেকালে না গিয়ে উপায় ছিল না। তখন তো মার্ক জুকেরবার্গ, ইলন মাস্কের মত মহাপুরুষদের জম্ম হয়নি, তারা নিজেদের সুসজ্জিত বাগানের গেট খুলে দেয়নি পুঞ্জীভূত গোষ্ঠীবদ্ধ ঘৃণার ব্যক্তিগত প্রকাশের জন্যে। তাই তখন নিদেনপক্ষে বামপন্থী নেতা কর্মী সমর্থকরা কিছু হলেই রাস্তায় নামতেন। মিছিল, মিটিং, পথসভাকেই প্রতিবাদ বা আন্দোলন বলে জানতেন। এখন তাঁরাও শিখে গেছেন – আন্দোলন মানে হল সোশাল মিডিয়া পোস্ট। মিছিল, মিটিং হলেও সেখানে গিয়ে স্লোগান দেওয়ার চেয়ে ফেসবুক লাইভ করা বেশি জরুরি। ওখান থেকেই ৮৮৮ বার কোট করা কবিতা বা গানের লাইন ক্যাপশন হিসাবে দিয়ে মিছিলের ছবি ও ভিডিও পোস্ট করাই রাজনীতি।
ব্যাপারটা সবচেয়ে মন দিয়ে শিখেছেন সবচেয়ে বড় বামপন্থী দল সিপিএমের শহুরে মধ্যবিত্ত নেতা কর্মী সমর্থকরা। গ্রামের দিকে পার্টির গরিবগুরবো সদস্য সমর্থক আক্রান্ত হলে, তাদের ছেলেমেয়েরা তমন্নার মত বেঘোরে প্রাণ হারালে, গিয়ে হাজির হতে হবে ঠিকই। কিন্তু সে দায়িত্ব কেবল একজনের – মীনাক্ষী ছাই ফেলতে ভাঙা কুলো মুখার্জি। বাকিরা ভীষণ ব্যস্ত। কারোর টালিগঞ্জ পাড়ার বন্ধুবান্ধবদের সঙ্গে সোশালাইজ করার দরকার আছে। কারোর গিটার বাজিয়ে ‘বেল্লা চাও’ গেয়ে বা রবীন্দ্রনৃত্য করে হাজার হাজার লাইক পাওয়ার আছে। কারোর বন্ধুর জন্মদিনে পিটার ক্যাট বা মেইনল্যান্ড চায়নায় হুল্লোড় করে কমরেড যেন বিপ্লবের মতই দীর্ঘজীবী হন, তা পোস্ট করা প্রয়োজন। কেউ টিভি চ্যানেলে তৃণমূলের মুখপাত্রের সঙ্গে তুমুল ঝগড়া করেই সমর্থকদের মোহিত রাখতে ব্যস্ত, সত্যিকারের সংঘর্ষে জড়াবেন না। কারণ তাহলে থিয়েটার করতে গিয়ে সরকারি হল পাবেন না, সিনেমা বানানোর পর নন্দনে শো পাবেন না। কেউ আবার জয়দেব বসুর জন্মদিন, মৃত্যুদিন এসে পড়লেই ‘রাজার সঙ্গে আঁতাত করেন যিনি/আমাদের সেই গুহকের প্রতি ঘেন্না’ ইত্যাদি পোস্ট করেন। কিন্তু তিনিও জানেন, তাঁর সরকারপক্ষের বন্ধুরাও জানেন, যে ওসব রান্নাবাটি খেলা। তাই কবিতা পাঠ, গল্প পাঠের আসরে ডাক এসে যায় যথাসময়ে। সে চিঠি সরকারবিরোধী সাহিত্যিক সগর্বে ফেসবুকে পোস্টও করেন। অনেকের আবার বিক্ষোভ বিদ্রোহ বিপ্লব সবই সাহিত্যজগতের দখল ঘিরে। বাম আমলে ওটার রাশ নিজেদের হাতে ছিল, এখন বেরিয়ে গেছে। যত আক্রোশ তাই নিয়ে। কোথায় কোন প্রাণ হাতে করে সিপিএম করা কর্মীর বাচ্চা মেয়েটা বোম খেয়ে মরে গেল – তাতে এঁদের কী? কয়েকটা ফেসবুক পোস্ট করে দেবেন, না হয় একখানা আবেগে থরোথরো কবিতাই লিখে দেবেন। তাতে সাপও মরবে, লাঠিও ভাঙবে না। অর্থাৎ বামপন্থী পরিচয়টাও বজায় থাকবে, আবার শিল্পী বা সাহিত্যিক হিসাবে ক্ষীর খাওয়াও বন্ধ হবে না।
এঁরাই বঙ্গ সিপিএম নেতৃত্বের কাছের লোক, ভালবাসার লোক। এঁরাই বিবেকবান ধর্মনিরপেক্ষ বুদ্ধিজীবী হিসাবে রিপাবলিক বাংলায় গিয়ে গিয়ে চ্যানেলটিকে ভদ্রলোক সদস্য সমর্থকদের মধ্যে বৈধতা পাইয়ে দিয়েছেন। ফলে সেই ভদ্রলোকরা দিনরাত প্রাক্তন এসএফআই অ্যাংকরের বিষ গিলে গিলে সিপিএমের মিছিলে যান, ফেসবুকে মীনাক্ষীর বক্তৃতা শেয়ার করেন আর ভোট দেন বিজেপিকে। তমন্নার মৃত্যুতে এই ভদ্রলোকদের কোনো তাপ উত্তাপ নেই, কারণ ‘এ তো ওদের নিজেদের মধ্যে ঝামেলা। ওরা তো এইসবই করে। ভোটের দিন মারামারিগুলোও তো ওরাই করে।’ বোঝাই যাচ্ছে, এই ‘ওরা’ কিন্তু তৃণমূল কংগ্রেস নয়। যতই সিপিএম ও অন্য বামেরা ফেসবুকে ডিমের কুসুমের ছবি দিয়ে ময়ূখ ঘোষকে নিয়ে হাসিঠাট্টা করুন, বাঙালি ভদ্রলোক ভোটারদের অনেকের মস্তিষ্ক কিন্তু ময়ূখের পায়েই জমা পড়েছে। তাই এই ভদ্রলোক ভদ্রমহিলাদের কাছে তমন্না কোনো বাচ্চা মেয়ে নয়, মুসলমান মেয়ে। এই শ্রেণির ভোটের জন্যেই আবার আজকের সিপিএমের যৎসামান্য সাধনা। নইলে তমন্নার মৃত্যু নিয়ে শুধু কালীগঞ্জ নয়, পশ্চিমবঙ্গের পাড়ায় পাড়ায় মিছিল হওয়া উচিত ছিল। রাস্তা অবরোধ, রেল অবরোধ হওয়া উচিত ছিল। কবে বামপন্থীরা এক পয়সা ট্রামভাড়া বৃদ্ধি নিয়ে আক্ষরিক অর্থে আগুনে আন্দোলন করেছিল, সে ইতিহাস জানতে হবে না। তাপসী মালিকের মৃত্যু নিয়ে মমতা ব্যানার্জি কী করেছিলেন মনে করুন, তাহলেই বোঝা যাবে কী বলছি। অমন করেছিলেন বলেই তাপসীকে কেউ ভোলেনি, কিন্তু তমন্নাকে আমরা আজই ভুলে যাব দিঘার রথযাত্রা দেখতে দেখতে। শুধু তাই নয়, অমন করেছিলেন বলেই পশ্চিমবঙ্গের ইতিহাসে সবচেয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত সরকার চালানো সত্ত্বেও, তৃণমূল স্তরের মানুষ তাঁর দলের তোলাবাজিসহ নানাবিধ অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে গেলেও, প্রশাসন বলে রাজ্যে কার্যত কিছু না থাকলেও, স্কুল থেকে হাসপাতাল পর্যন্ত নৈরাজ্যের চূড়ান্ত হলেও মমতার জনপ্রিয়তা কমছে না।
অন্যদিকে প্রত্যেকটা নির্বাচন, উপনির্বাচনের পরে সিপিএম কর্মীরা কী করেন? কংগ্রেসের সঙ্গে জোট থাকা উচিত কি উচিত নয়, অন্য বাম দলগুলোর সঙ্গে ঐক্য গড়ে তোলা উচিত কি উচিত নয় – এই নিয়ে ফেসবুকে নিজেদের মধ্যে তর্ক করেন। বড়জোর ‘এত কিছুর পরেও যদি লোকে এদের ভোট দেয়, তাহলে আর কিছু বলার নেই’ বলে বিলাপ করেন। গত লোকসভা নির্বাচন পর্যন্ত লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের নাম করে পশ্চিমবঙ্গের গরিব মানুষকে ভিখিরি বলাও চালু ছিল, সেবার রাজ্য সম্পাদকের কড়া মন্তব্যের পর ওটা বন্ধ হয়েছে। কালীগঞ্জের উপনির্বাচনে বিপুল ভোটে হারের পরেও একই ঘূর্ণিতে ঘটনা ঘুরপাক খাচ্ছে। তমন্নার মৃত্যু দেখার পর আরও বেশি করে এক দল সিপিএম সোশাল মিডিয়ায় ঝড় তুলছেন এই বলে, যে বামফ্রন্ট ব্যাপারটা আর রাখার দরকার নেই। যেন ওটা ভেঙে দিলেই লোকে হইহই করে ওঁদের ভোট দিয়ে দেবে আর ২০২৬ সালে অষ্টম বামফ্রন্ট, থুড়ি, প্রথম সিপিএম সরকার এসে যাবে। আসল সমস্যা হল, এখন বাংলায় সিপিএম বলতে পড়ে আছেন নিচের তলার কিছু লড়াকু কর্মী, যাঁদের নেতারা নানা অজুহাতে লড়তে দেন না। আর আছে সোশাল মিডিয়ার শম সিপিএম, যাদের কথা এতক্ষণ সবিস্তারে বললাম। বিশ্বাস হচ্ছে না? রাগ হচ্ছে? আচ্ছা দেখুন।
তমন্না খুন হল ২৩ জুন, আর ২৬ জুনের সংস্করণে সিপিএমের দলীয় মুখপত্র গণশক্তি খবর দিল ‘কালীগঞ্জে নিহত শিশুকন্যা তামান্না খাতুনের গ্রামে আগামী শনিবার যাবেন সিপিআই(এম)’র রাজ্য সম্পাদক মহম্মদ সেলিম, পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য মীনাক্ষী মুখার্জি সহ পার্টি নেতৃবৃন্দ। স্থানীয় মানুষজনকে নিয়ে সেখানে প্রতিবাদ সভায় অংশ নেবেন তাঁরা। বুধবার সিপিআই(এম)’র রাজ্য কমিটির বৈঠকের শেষে সাংবাদিক বৈঠক করে একথা জানিয়ে মহম্মদ সেলিম বলেছেন, খুনের অভিযোগে এফআইআর-এ নাম থাকা দুষ্কৃতীদের এখনও গ্রেফতার করা হয়নি। তৃণমূলের ঝাণ্ডা নিয়ে তারা এখনও ঘুরে বেড়াচ্ছে।’ অর্থাৎ কমরেডের শিশুকন্যাকে কারা খুন করেছে তা জানেন রাজ্য সম্পাদক। ফলে ধরে নেওয়া যায় রাজ্য কমিটির সকলেই জানেন। পুলিস যে নিষ্ক্রিয় তাও জানেন। তবু তাঁরা কমরেডের পরিবারের কাছে ছুটে না গিয়ে, পুলিসের কৈফিয়ত না চেয়ে রাজ্য কমিটির বৈঠক চালিয়ে যাচ্ছিলেন। সাংবাদিক নয়, স্রেফ নাগরিক কৌতূহল থেকেই জানতে ইচ্ছে করে – কী এমন গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা চলছিল রাজ্য কমিটিতে? ২৫ তারিখ রাজ্য কমিটির বৈঠক শেষ হয়ে যাওয়ার পরেও কালীগঞ্জ পৌঁছতে ২৮ তারিখ হবে কেন? কলকাতা থেকে কালীগঞ্জের দূরত্ব কি রেলপথে কোচির চেয়েও বেশি? নাকি ২৬, ২৭ জুড়ে পশ্চিমবঙ্গে বিপ্লব করে তৃণমূল সরকারকে উচ্ছেদ করে ফেলবে বঙ্গ সিপিএম? তারপর ২৮ তারিখ তমন্নার বাড়ি গিয়ে তার মা-বাবার হাত ধরে সেলিম বলবেন ‘কমরেডস, আপনাদের মেয়েকে তো ফিরিয়ে আনতে পারব না, কিন্তু যারা তাকে খুন করেছে তাদের শাস্তির পাকা ব্যবস্থা করে এসেছি’? সত্যি সত্যি এমন ঘটা দূরে থাক, টলিপাড়ার কোনো মার্কামারা সিপিএম পরিচালকের এই দৃশ্যটা লেখার পরিস্থিতিও কি তৈরি করতে পারা গেছে রাজ্য কমিটির মিটিংয়ে?
অবশ্য ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদের এই রমরমার যুগে কে কার কমরেড? শব্দটা এখন বাম বৃত্তে কোনো কারণে ঢুকে পড়া নারী পুরুষের মুখস্থ বুলি মাত্র। সত্যি সত্যি সিপিএমে কমরেড কথাটার কোনো দাম থাকলে রাজ্য কমিটির অফিসে বসে সাংবাদিক সম্মেলন করে কীভাবে একজন কমিউনিস্ট পার্টির নেতা বলতে পারেন, তিনি নিজের বাবার টাকায় বিলাসবহুল গাড়ি কিনেছেন বেশ করেছেন? বিজেপির নির্বাচনী প্রচারের ভিডিওতে মুখ দেখানো শিল্পীদের পার্টির কর্মসূচিতে নিয়ে আসার পরেও তিনি শাস্তিই বা এড়ান কী করে? কোন সম্মেলনে কে কাকে ভোটে হারিয়ে পদাধিকারী হলেন, কার সঙ্গে কার হাতাহাতি হল – সে খবরই বা সংবাদমাধ্যমে দিনের পর দিন এসে পড়ে কী করে? কীভাবে সামান্য যুব সংগঠনের সম্মেলনে কোনো পদ না পেয়ে কেউ সোশাল মিডিয়ায় পোস্ট করতে পারে, সে নেতা হল না বলে আগামীদিনে সংগঠনের কাছে কেউ মূত্রত্যাগ করতেও যাবে না?
লেখাটায় সাংবাদিকসুলভ নৈর্ব্যক্তিকতা থাকছে না, তাই না? থাকা উচিতও নয়। কারণ সাংবাদিকও মেয়ের বাবা। রাজ্যটার হাল দেখে স্পষ্ট বুঝতে পারছি, সর্বাঙ্গ পচে গেছে। এই রাজ্যে আমি থাকি, আমার মেয়ে থাকে। কেন নৈর্ব্যক্তিক হতে যাব? ‘সর্বাঙ্গ’ কথাটা পছন্দ হচ্ছে না? আচ্ছা সবিস্তারে বলি। সিপিএম তো শূন্য, আপনারা যাদের ভোট দিয়ে রাজ্যের বিরোধী দল বানিয়েছেন তাদের দিকেই তাকিয়ে দেখুন। শুভেন্দু অধিকারী, সুকান্ত মজুমদাররা সারাক্ষণ গরম লোহার মত বাক্যবাণ নিক্ষেপ করেন পশ্চিমবঙ্গ সরকারের দিকে, অথচ দু-চার লাইন আইসক্রিমের মত ঠান্ডা বিবৃতি দিয়েছেন তমন্নার ঘটনা নিয়ে। তৃণমূল বিধায়কের আনা টাকা ফিরিয়ে দেওয়ার জন্যে কিঞ্চিৎ প্রশংসা করেছেন তমন্নার মায়ের। তাঁকে কোনো অজ্ঞাত কারণে বেগম রোকেয়ার সঙ্গে তুলনা করেছেন। বোধহয় আরবি নামের জন্যে। আসলে তমন্না, সাবিনারা রোকেয়ার মত আরবি নামের বাঙালি বলেই তো এই নিয়মরক্ষা। যদি মেয়েটার নাম হত তৃণা বা মণি, তাহলেই ব্যাপারটাকে জাতীয় স্তরে নিয়ে ফেলতেন ওঁরা। প্রধানমন্ত্রী এক্সে পোস্ট করতেন, অমিত মালব্য ও সম্প্রদায় পশ্চিমবঙ্গে হিন্দুরা কত বিপন্ন – তার অজস্র বানানো প্রমাণ ছড়াতে শুরু করতেন।
কিন্তু ভেবে দেখুন তো, দোষগুলো কি শুধু তৃণমূল-সিপিএম-বিজেপির মধ্যে সীমাবদ্ধ? মেয়েটার নাম তমন্না বলে আর সুদূর নদিয়ার কালীগঞ্জের বাসিন্দা বলেই কি ‘কোনো রাজনৈতিক দলকে আমাদের আন্দোলনে ঢুকতে দেব না’ বলে চিৎকার করা নারীবাদী নেত্রীরা আজ চুপ নন? যে কোনো দলের কলকাতার নেতার মেয়ে এভাবে খুন হলেও কি চুপ থাকতেন তাঁরা? ‘ওকে সেই ছোট থেকে দেখেছি’ বলে টিভি ক্যামেরায় বাইট দেওয়া শুরু হত না? তৃণমূলের নেতা, কর্মীরা যে দুর্নীতি করেন তাকে কি গোটা বঙ্গসমাজই আসলে প্রশংসার দৃষ্টিতে দেখে না? বছর বিশেক আগেও পাড়ায় ঘুষখোর সরকারি অফিসার বা দু নম্বরি ব্যবসায়ী থাকলে, তার ধোপা নাপিত বন্ধ না করলেও, সকলে তাকে একটু এড়িয়ে চলত। সে বাড়িতে ঘটা করে লক্ষ্মীপুজো, সরস্বতীপুজো বা লোকনাথ বাবার জন্মতিথি পালন করে লোক খাওয়ালে বাড়ি ফিরে নিমন্ত্রিতরাই আলোচনা করত ‘পাপের টাকা তো, এসব করে পাপ ধোয়ার চেষ্টা করে আর কি।’ আজ কিন্তু কারোর আঙুল ফুলে কলাগাছ হলে কেউ খোঁজ করে না – এত টাকা পেল কোত্থেকে। বরং তাকেই সফল লোক বলে মেনে নেয় সকলে। কেউ প্রশ্ন তুললে তার সম্পর্কে বলাবলি করে ‘যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে হবে তো। নিজে পারেনি বলে হিংসে করছে।’ সিপিএমের মত আলস্য, দিশাহীনতা এবং কোনো ত্যাগস্বীকার না করেই দাবি আদায় করা যাবে – এরকম মনোভাবও তো আমাদের সকলেরই।
দেখে শুনে মনে হয়, তমন্না মরে গিয়ে বেঁচে গেল। ওর মত মেয়ের জন্যে আমাদের গ্রামে পড়ার স্কুল নেই, কলেজগুলোও ধুঁকছে। কলেজ পেরিয়ে আরও বড় কোথাও, ভাল কোথাও সে পৌঁছতে পারত – এমন ভাবনাও হাস্যকর। অল্প বয়সে বিয়ে হয়ে অপুষ্টিতে ভোগা বাচ্চার মা হওয়া ছাড়া আর কোন ভবিষ্যৎ রেখেছিলাম আমরা ওর জন্যে? সে ভবিষ্যৎও তো সুস্থ শরীরে বড় হলে। তার আগেই নির্জন মাঠে বা বনে বাদাড়ে নিয়ে গিয়ে যদি ওকে ফুর্তি করে শেষ করে দিত কোনো নরপশু? এমন তো হামেশাই হচ্ছে আমাদের চারপাশে। অপরাধীরা অনেকে আবার গায়ে হাওয়া লাগিয়ে ঘুরেও বেড়াচ্ছে। যদি ধরে নিই, এসব কিছুই হত না, বড় হয়ে একটা সুস্থ স্বাভাবিক জীবন পেত আমাদের তমন্না, তাতেও কি শান্তি থাকত? চারদিকে ব্যাঙের ছাতার মত এত ঘৃণার ফসল ফলেছে আমাদের এই বাংলায়, যে একটা মেয়ে অন্য ধর্মের ছেলেকে বিয়ে করেছে বলে সম্প্রতি তার শ্রাদ্ধ করেছে পরিবার। এই ঘৃণা কখন কাকে গিলে ফেলে কোনো ঠিক আছে? আমাদের কি আর কোনো অধিকার আছে সন্তানের জন্ম দেওয়ার? আমাদের ‘জীনে কি তমন্না’ তো ‘মারনে কা ইরাদা’ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
