অনির্বাণ কাজ পাচ্ছেন না: টালিগঞ্জের অর্ধসত্য বা হিমশৈলের চূড়া

অর্ধসত্য যে মিথ্যার চেয়েও ভয়ঙ্কর সে তো সকলেই জানেন। কিন্তু ক্লিকটোপের যুগে অর্ধসত্য আবার সত্যের চেয়ে সুবিধাজনকও বটে। অর্ধসত্যে ক্লিক পাওয়া যায় বেশি, তাই সংবাদমাধ্যমের সুবিধা। অর্ধসত্য নিয়ে কয়েকদিন সোশাল মিডিয়ায় রাগ-টাগ দেখিয়ে বিবেক দংশন থেকে মুক্তি পাওয়া যায়, তাই যে সংবাদ গিলছে তার সুবিধা। আবার পুরো সত্যটা জেনে গেলে হয়ত ব্যক্তির এত বেশি রাগ হবে বা গ্লানি হবে যে সত্যিকারের কিছু একটা করতে ইচ্ছে হবে। সেটা ব্যক্তির পক্ষে বিপজ্জনক, ব্যক্তি সমষ্টি হয়ে উঠলে ক্ষমতার পক্ষেও। এরকমই একটা অর্ধসত্য নিয়ে কদিন ধরে বাংলার নিস্তরঙ্গ সংস্কৃতি জগৎ কিছুটা উত্তাল – অনির্বাণ ভট্টাচার্য কাজ পাচ্ছেন না। গোটা ব্যাপারটা যা, তাতে এই খবরটাকে অর্ধসত্য না বলে সোয়া সত্য বা এক দশমাংশ সত্য বললেও ভুল হয় না।

ব্যাপারটা কী আসলে? ব্যাপার হল, টলিউডের কিছু শিল্পীকে কলাকুশলীরা (আজকাল বাংলায় যাঁদের টেকনিশিয়ান বলা হয়) বয়কট করেছেন। কী করে জানা গেল বয়কট করা হয়েছে? কেউ ঘোষণা করেছে? না। কিন্তু ওই শিল্পীরা কোনো ফিল্মের বা ওয়েব সিরিজের নির্দেশক, চিত্রনাট্যকার, অভিনেতা, গীতিকার, গায়ক বা অন্য যে ভূমিকাতেই থাকুন না কেন – শুটিংয়ের জন্য ডাকলে কোনো কলাকুশলী যাচ্ছেন না। এই বয়কটের আওতায় পড়ে যাওয়া শিল্পীদেরই একজন অনির্বাণ। এমনকি তিনি তাঁদের গানের দল হুলিগানইজমের মিউজিক ভিডিও শুট করতে গিয়েও দেখেন কোনো কলাকুশলী আসেননি। কিন্তু মূলধারার সংবাদমাধ্যম যেভাবে শুধু অনির্বাণের নাম নিয়ে হইচই করেই ব্যাপারটা মিটিয়ে ফেলতে চাইছে, তাতে বোঝা যায় যে গভীরে যাওয়ার সাধ নেই। হয়ত সাধ্যও নেই, কারণ সেটা করতে গেলে সরাসরি এ রাজ্যের ক্ষমতাসীনদের চটাতে হবে।

ঘটনা হল, অনির্বাণের একার ভাত মারার চেষ্টা চলছে না টালিগঞ্জে। কোনো কোনো সংবাদমাধ্যমে তাঁর পাশাপাশি বাংলা ছবি ও সিরিজের দর্শকদের পরিচিত মুখ পরমব্রত চট্টোপাধ্যায়ের নামোল্লেখ করা হয়েছে। বিকল্প সংবাদমাধ্যমগুলো এঁদের পাশাপাশি নির্দেশক ইন্দ্রনীল রায়চৌধুরীর নামও করেছে, কোনো কোনো সংবাদমাধ্যমে টিভির এক সময়কার পরিচিত মুখ এবং বড় পর্দার বেশকিছু ছবির পরিচালক সুদেষ্ণা রায়ের উল্লেখও করা হয়েছে। এও সেই সোয়া সত্যেরই বেসাতি। এর সুবিধা হল, পাঠক/দর্শক ভাববেন বা তাঁদের ভাবানো যাবে যে এই দু-চারজনের সঙ্গে দণ্ডমুণ্ডের কর্তাদের কোনো ব্যক্তিগত ঠোকাঠুকি লেগেছে। একেকজনের অতীত কার্যকলাপ উল্লেখ করে ‘যা হচ্ছে ওদের নিজেদের মধ্যে হচ্ছে, আমাদের ভাবার দরকার নেই’ – এরকম একটা বয়ান খাড়া করে দেওয়া যাবে। ফলে কয়েকদিন হইচইয়ের পরে সবাই ব্যাপারটা ভুলে যাবে, সোশাল মিডিয়ার যুগে হইচই করার মত নতুন কিছু ঠিক এসে পড়বে (এক্ষেত্রে যেমন প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়ের মাতৃভাষা সম্পর্কে হীনমন্যতা এসে পড়েছে)। ফলে কেউ আর খুঁজে দেখতে যাবে না, আসলে কী হয়েছে।

এই কুচক্র থেকে বেরোতে প্রথমেই বলা যাক যে বয়কট হচ্ছেন মূলত ১৩ জন। কোন ১৩ জন? যে ১৩ জন কলকাতা হাইকোর্টে রিট পিটিশন দাখিল করেছেন এই মর্মে, যে ভারতের একজন নাগরিকের এদেশে কাজ করে উপার্জন করার যে সংবিধানস্বীকৃত মৌলিক অধিকার রয়েছে, তা লঙ্ঘন করা হচ্ছে তাঁদের বেলায়। কাজ করতে বাধা দেওয়া হচ্ছে। এই ১৩ জন কারা? সুদেষ্ণা রায়, সুব্রত সেন, কিংশুক দে, বিদুলা ভট্টাচার্য, আশিস সেন চৌধুরী, সুমিত দাম, পরমব্রত চট্টোপাধ্যায়, অভিষেক সাহা, অনির্বাণ ভট্টাচার্য, দেবাশীষ চক্রবর্তী, ইন্দ্রনীল রায়চৌধুরী, প্রসেনজিৎ মল্লিক, সৌরভ ভট্টাচার্য।

বাংলা সিনেমার যাঁরা রীতিমত খোঁজখবর রাখেন, তাঁদের কাছেও হয়ত বেশিরভাগ নাম অচেনা। কিন্তু তার মানে তো এই নয় যে এই তালিকার কারোর কাজ করার অধিকার অন্যদের চেয়ে কম। সুতরাং বোঝা দরকার, একটা বিরাট অন্যায় ঘটে চলেছে পশ্চিমবঙ্গের সিনেমা শিল্পে এবং সেই অন্যায় ঘটছে রাজ্য সরকারের মদতে। এটা আমার মতামত নয়। পিটিশনাররা এই দাবিটাই করেছেন। বস্তুত, রিট পিটিশন সরকারের বিরুদ্ধেই দাখিল করা যায়। কারণ নাগরিকের যে কোনো সাংবিধানিক অধিকার রক্ষার দায়িত্ব সরকারের। ফলে এই শিল্পীদের কাজ করতে না দেওয়ার পিছনে টলিউডের কুখ্যাত ফেডারেশন – যার কর্তা মন্ত্রী অরূপ বিশ্বাসের ভাই স্বরূপ বিশ্বাস – আছেন বলে অভিযোগ থাকলেও, পিটিশন কিন্তু করা হয়েছে সরকার পিটিশনারদের অধিকার রক্ষা করছে না, এই অভিযোগে। এতে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের প্রতিক্রিয়া কী?

গতবছর এই জুলাই মাসেই যখন টালিগঞ্জে ফেডারেশন বনাম পরিচালক টানাপোড়েন শুরু হয় শ্রী ভেঙ্কটেশ ফিল্মস প্রযোজিত এবং রাহুল মুখার্জি নির্দেশিত একটি ছবির শুটিং নিয়ে এবং তার জেরে কাজ বন্ধ হয়ে যায় পুরো সিনেমাপাড়ায়, তখন মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি স্বয়ং সব পক্ষকে ডেকেছিলেন। সেই সভায় প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন যে সরকার একখানা কমিটি গঠন করে দেবে এবং সেই কমিটি সব মিটিয়ে দেবে। সে কমিটিও গঠন হল না আর তা নিয়ে বিস্তর ইমেল পাঠানোর পরেও কোনো জবাব পাওয়া গেল না দেখে পরিচালকরা আদালতে এই পিটিশন দাখিল করলেন। মজার কথা, হাইকোর্টে বিচারপতি অমৃতা সিনহার এজলাসে এই মামলার শুনানিতে কিন্তু রাজ্য সরকারের কৌঁসুলি কেবলই প্রমাণ করার চেষ্টা করে গেছেন যে এই মামলার দুটি পক্ষ হল ফেডারেশন আর পরিচালকরা। এতে সরকারের কোনো ভূমিকা নেই, কিছু করার নেই। বিচারপতি অবশ্য সেকথায় আমল দেননি। ডিভিশন বেঞ্চে আবেদন জানিয়েও রাজ্য সরকার সুবিধা করতে পারেনি। মামলা আবার ফেরত এসেছে বিচারপতি সিনহার এজলাসেই। ইতিমধ্যে বিচারপতি সিনহার পশ্চিমবঙ্গ সরকারের তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রকের সচিবকে দেওয়া স্পষ্ট নির্দেশ সত্ত্বেও পিটিশনারদের কাজে বাধা পড়ায় তাঁরা আদালত অবমাননার মামলাও করেছেন। সে মামলার শুনানি হওয়ার কথা আগামীকাল। তাহলে ভাবুন, রাজ্য সরকার ফেডারেশনের স্বার্থরক্ষায় কতখানি মরিয়া আর পরিচালকদের নাগরিক অধিকার রক্ষায় কতখানি উদাসীন। অর্থাৎ ব্যাপারটা স্রেফ অনির্বাণ বা কয়েকজন শিল্পীকে কলাকুশলীদের বয়কট করার ব্যাপার নয়। এ রাজ্যে যে কোনো নাগরিক আইনি পথে নিজের কাজকর্ম করতে পারবেন কি পারবেন না – প্রশ্নটা সেইখানে।

সমস্যার গভীরতা বোঝার জন্যে আরও দুটো তথ্য খুব জরুরি। এই পিটিশন যখন দাখিল করা হয় তখন পিটিশনার ছিলেন ১৫ জন, এখন ১৩। গত এক বছরে আরও একটি মামলা দায়ের করেছেন বয়কট হয়ে যাওয়া শিল্পীরা। সেটা সরাসরি ফেডারেশনের দণ্ডমুণ্ডের কর্তা স্বরূপের বিরুদ্ধে মানহানির মামলা, কারণ তিনি সংবাদমাধ্যমকে বলেছিলেন যে বেশিরভাগ নির্দেশকের নামেই নাকি যৌন হয়রানির অভিযোগ জমা পড়েছে তাঁর কাছে। সেই মামলা করেছিলেন ২৩০-৩৫ জন। মামলার শুনানি এখনো শুরুই হয়নি, অথচ ৭০-৮০ জন মামলাকারী মামলা প্রত্যাহার করে ফেলেছেন।

কেন এমন হল? ঠিক যে কারণে প্রকাশ্য দিবালোকে ব্যস্ত রাস্তায় খুন হওয়ার পরেও পুলিস একজন সাক্ষী পায় না খুনিকে দোষী সাব্যস্ত করার জন্যে। ঠিক যে কারণে আর জি কর কাণ্ডের সময়ে সারা রাজ্যের মেডিকাল কলেজের জুনিয়র ডাক্তাররা হুমকি সংস্কৃতির কথা বলছিলেন; যে কারণে সাউথ ক্যালকাটা ল কলেজে ছাত্রীর ধর্ষণের পর জানা যাচ্ছে, ম্যাংগো কুমার আগেও বিস্তর কুকর্ম করেছে। কিন্তু কেউ তার টিকি স্পর্শ করতে পারেনি। উপরন্তু সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হতে শুরু করেছে যে রাজ্যের বহু কলেজই নানা জাতের ম্যাংগোর গন্ধে বারো মাস ম ম করে। এহেন ম্যাংগোরাই এ রাজ্যের সর্বময় কর্তা এখন। গত ২০ জুন উত্তরবঙ্গ সংবাদের পাতায় বর্ষীয়ান সাংবাদিক রূপায়ণ ভট্টাচার্যকে লিখতে হয়েছে

মমতা রাত জেগে টিভি সিরিয়াল দেখেনতাঁর মতো করে সাহিত্যচর্চা করেনসবার জানা। অথচ টালিগঞ্জ ইন্ডাস্ট্রিই সবচেয়ে বিপন্ন শিল্প। সাহিত্য আকাদেমিনাট্য আকাদেমিতেও হাত মিলিয়ে অনেক কাজ চলছেযা দিদিই জানেন না। যে কোনও সময় টালিগঞ্জ ইন্ডাস্ট্রিতে তালাচাবি লেগে যাবে মন্ত্রী অরূপ বিশ্বাসের ভাই স্বরূপের দাদাগিরিতে। এই স্বরূপ কাউন্সিলারও ননঅথচ মমতা-অরূপকে তুড়ি মেরে উড়িয়ে প্রসেনজিৎ-দেব-সৃজিত-কৌশিক-পরমব্রত-অনির্বাণদের কাজ বন্ধ করতে এক মিনিট লাগে তাঁর। এক বছর ধরে স্বরূপ তাঁর স্বরূপ বোঝাচ্ছেন মিটিং না ডেকে। মুখ্যমন্ত্রীর নির্দেশ না মেনে। মমতা রহস্যজনক চুপ। মাঝে তিনি নিজের ভাই বাবুনকে পর্যন্ত কিছুদিনের জন্য ত্যাজ্য করেছিলেন। এখানে এসব হয় না।

দেব-শতাব্দী-জুন থেকে শুরু করে সায়নী-লাভলি-সায়ন্তনীরা তৃণমূলের এমপিএমএলএ। অথচ মমতা স্থানীয় বিধায়কের কীর্তিমান ভাইকে টালিগঞ্জ সামলাতে দিলেন কেনসাহিত্যজগৎ কি তাহলে কলেজ স্ট্রিটের বিধায়কের ভাই সামলাবেনযাত্রাপাড়া চিৎপুরের বিধায়কের ভাইখেলার ময়দান চৌরঙ্গির বিধায়কের ভাইঅরূপকে দিদি অনেক জায়গায় জট খুলতে পাঠান। অধিকাংশ ক্ষেত্রে অরূপ সফলসবাইকে নিয়ে চলার গুণের জন্য। শুধু ভাইকেই সামলাতে চূড়ান্ত ফ্লপ। অভিনেতারা বলেনভাই এখন দাদাকেই পাত্তা দেয় না। মমতার প্রতি সহানুভূতি সম্পন্নদের সঙ্গে রাজ্য সরকারের ঝামেলা লাগিয়ে দিতে ওস্তাদ স্বরূপ কোম্পানি।

এরপরেও যদি আপনি কেন-র উত্তর না পান, তাহলে দেখে নিন স্বরূপের নেতৃত্বাধীন ফেডারেশনের গুণগান করে তৈরি বাংলা ছবির তথাকথিত ফার্স্ট বয় সৃজিত মুখার্জি, গতবছর জুলাইয়ে যাঁর ছবির কাজ বয়কট নিয়ে এই বিবাদের সূত্রপাত সেই রাহুল মুখার্জি এবং সঙ্গীত পরিচালক তথা পরিচালক ইন্দ্রদীপ দাশগুপ্তের ভিডিও।

এই ভিডিও পোস্ট করা হয়েছিল গত ১১ জুন, যুযুধান পরিচালকরা তাঁদের বক্তব্য জানিয়ে দুখানা ভিডিও ৩০ এপ্রিল ও ২৮ মে প্রকাশ করার পর। মজার কথা, মামলাকারী পরিচালকরা ভিডিওগুলো পোস্ট করেছেন একখানা স্বতন্ত্র ইউটিউব চ্যানেলে এবং নিজ নিজ সোশাল মিডিয়া হ্যান্ডেলগুলোতে। ফেডারেশনের গুণগান করা ত্রয়ীর ভিডিও কিন্তু পোস্ট হয়েছে ফেডারেশনেরই ফেসবুক পেজ থেকে। আরও মজার কথা, পর্দায় এক কোণে তিন পরিচালককে দেখা যাচ্ছে, বেশিরভাগ জায়গা জুড়ে আছে একটি বাণী

আমরা একসাথে
কাজ করার পক্ষে
মিথ্যা মামলার বিপক্ষে।
ফেডারেশনে ছিলাম
আছি থাকবো

এই ভিডিওতে কলাকুশলীরা যে ছবি বানানোর কাজে নির্দেশকদের সমান জরুরি, সেকথা বলা হয়েছে। গোটা টলিউড যে পরিবারের মত, তাও বলা হয়েছে। এমনকি ‘স্বরূপদা’ কত ভাল – সেকথাও বলেছেন সেই রাহুল, যিনি ফেডারেশনের অনুমতি না নিয়ে বাংলাদেশে গিয়ে একখানা ওয়েব সিরিজের শুটিং করে এসেছিলেন বলে তাঁর এখানকার ছবির শুটিং করতে দেওয়া হচ্ছিল না। তা থেকেই গোটা গোলমালের সূত্রপাত। তাঁর পাশে দাঁড়িয়েই ফেডারেশনের গা জোয়ারির প্রতিবাদ আরম্ভ করেছিলেন সুদেষ্ণা, ইন্দ্রনীল, সুব্রত, পরমব্রত, অনির্বাণ, বিদুলা প্রমুখ। সৃজিত প্রথম থেকেই ধারেকাছে ঘেঁষেননি; কৌশিক গাঙ্গুলি, শিবপ্রসাদ মুখার্জিরা মাঝপথে সরে পড়েছেন। রাহুল স্বয়ং ‘স্বরূপদা’-র ভক্ত হয়ে গেছেন। তা হোক, সকলের মেরুদণ্ড কখনো সমান শক্ত হয় না। কিন্তু উপরের ভিডিওতে লক্ষ করার মত বিষয় হল, রাহুল বলছেন, তিনি ‘স্কেপগোট’ হয়েছিলেন, ফেডারেশনের সঙ্গে তাঁর ‘সম্পর্কে ফাটল ধরেছিল’ এবং তারপর তিনি প্রায় ২২২ দিন বেকার ছিলেন। অর্থাৎ প্রকারান্তরে স্বীকার করে নেওয়া হল যে ফেডারেশন (বা স্বরূপদা) হল কুমীর। টালিগঞ্জের জলে থেকে তার সঙ্গে বিবাদ করলে কাজ পাওয়া যায় না। সৃজিত আর ইন্দ্রদীপ ফেডারেশনকে খুব প্রয়োজনীয় সংস্থা বলেছেন, কেন প্রয়োজনীয় তা বলেননি। টালিগঞ্জের কলাকুশলীদের জন্য কী কী ভাল কাজ ফেডারেশন করেছে বা করছে – তা বলার বিন্দুমাত্র চেষ্টা নেই। সৃজিত ভিডিওর শুরুতেই ছিলেন। তিনি তো যা বলছেন তা কেন বলছেন তা-ই ভেবে পাচ্ছেন না বলে মনে হয়। কথা আটকে যায়, তারপর অনেক কষ্টে খুঁজে বার করেন ‘অসুবিধা হচ্ছে’ শব্দবন্ধ। কী অসুবিধা, কেন অসুবিধা – সেসবের মধ্যে যাননি। ইনিয়ে বিনিয়ে তিনজনেই বলেছেন, যে অসুবিধাই হয়ে থাক তা আলাপ আলোচনা করে মিটিয়ে নেওয়াই উচিত। আদালতে যাওয়া অন্যায় হয়েছে।

টলিউড যদি সত্যিই একটা পরিবার হয়, তাহলে বলতেই হবে যে এ হল গার্হস্থ্য হিংসায় লিপ্ত পরিবারের ভাষা। দীর্ঘদিন নির্যাতিত বাড়ির বউ যেই থানায় গিয়ে ডায়রি করে দেয়, অমনি শ্বশুরবাড়ির লোক বলতে শুরু করে ‘বাড়ির ঝামেলা বাড়িতেই মেটানো উচিত ছিল। এসব নিয়ে কেউ থানা-পুলিস করে? ছি ছি! পরিবারের একটা মানসম্মান নেই?’ উপরন্তু, আলোচনায় যে ফেডারেশনই বসেনি, সেকথাও চেপে গেছেন পরিচালক ত্রয়ী। আর ‘মিথ্যা মামলা’ কথাটা কিন্তু কলকাতা হাইকোর্টের বিচারপতিরা এখন পর্যন্ত মানেননি।

এবার প্রশ্ন উঠবে, কী এমন নির্যাতন করা হয়েছিল যে পিটিশনার পরিচালকরা আদালতে গেলেন? এই প্রশ্নের উত্তর গত এক বছরে বিভিন্ন সময়ে প্রতিবাদী পরিচালকরা সাংবাদিক সম্মেলন করে দিয়েছেন, বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের ক্যামেরার সামনেও বলেছেন। পুনরাবৃত্তি করে লেখার কলেবর বাড়াব না এবং পাঠকের আলস্যকেও প্রশ্রয় দেব না। যাঁরা বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির বর্তমান ও ভবিষ্যৎ নিয়ে বিন্দুমাত্র ভাবিত, প্রসেনজিৎ বাংলা বলতে বুক ফুলিয়ে লজ্জিত হওয়ায় যাঁরা সত্যিই ক্রুদ্ধ, তাঁরা নিজ আগ্রহে জেনে নেবেন। যাঁরা কিছু না জেনেই বোদ্ধা, তাঁদের জন্যে এ লেখা নয়। তাঁরা তো মনেই করেন না বাংলা ছবি কোনো দেখার মত জিনিস। কেন দেখার মত হয় না, তা নিয়েও এতদিন তাঁরা কোনো প্রশ্ন তোলেননি। এখন অনির্বাণ, পরমব্রতর নাম জড়িয়ে যাওয়ায় সোশাল মিডিয়ায় ‘এনগেজমেন্ট ফার্মিং’ করতে সুবিধা হবে বলে হঠাৎ এ বিষয়ে আগ্রহী হয়েছেন। ওঁরা ‘ওয়ার্ল্ড সিনেমা’ নিয়ে থাকেন, সোশাল মিডিয়ার উত্তেজনা থিতিয়ে গেলে নির্ঘাত আবার ওতেই ফিরে যাবেন।

তবে যে পাঠকরা বোদ্ধা নন তাঁদের সাধারণ বুদ্ধি আছে। তাঁরা নিশ্চয়ই বোঝেন যে পশ্চিমবঙ্গের বাংলা সিনেমা একটি রুগ্ন শিল্প। এখানে ছবির বাজেট কম, তাই শুটিংয়ের সময় কম, তাই নির্দেশক ও অভিনেতাদের পারিশ্রমিক কম, ফলে কলাকুশলীদের পারিশ্রমিক আরও কম। এমতাবস্থায় ফেডারেশনের উদ্যোগের ফলে কলাকুশলীরা খুব ভাল আছেন – একথা বলা অর্থহীন। এরকম একটা ইন্ডাস্ট্রিতে সক্রিয় শিল্পীদের কাজ করতে না দিলে কাজ যে আরও কমে যায়, তা বুঝতেও বোদ্ধা হওয়ার দরকার নেই। কারখানায় কাজ না হলে শ্রমিক কী করে ভাল থাকতে পারেন? যে ট্রেড ইউনিয়ন কাজ কমিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করে, সে শ্রমিক দরদী, সে প্রয়োজনীয় – একথারই বা মানে কী? আসলে যা চলছে তা যে ট্রেড ইউনিয়নের নামে গুন্ডামি বা আমির খান অভিনীত গুলাম ছবির মত মাফিয়ারাজ, তা বুঝতে অনুসন্ধানমূলক সাংবাদিকতা লাগে না।

আরো পড়ুন বাংলা মাধ্যম স্কুলের পর বাংলা সিনেমা উঠে যাওয়ার পালা?

বলিউডের অনেক হিট ছবির মতই ওই ছবিটাও একখানা হলিউডি ছবির পুনর্নির্মাণ। অন দ্য ওয়াটার ফ্রন্ট নামের সেই ছবিতে নায়কের চরিত্রে ছিলেন মার্লন ব্রান্ডো, পরিচালক এলিয়া কাজান। মূল ছবি আর তার পুনর্নির্মাণ – দুটোতেই নায়ককে অনেককিছু খোয়াতে হয়, আক্ষরিক অর্থে মারও খেতে হয়। ওটা কিন্তু গল্প হলেও সত্যি। কাজান ছবিটা বানিয়েছিলেন পুলিৎজার পুরস্কারপ্রাপ্ত সাংবাদিক ম্যালকম জনসনের একগুচ্ছ প্রতিবেদনের উপর ভিত্তি করে। সেসব যদি বাদও দেন, ২০২০-২১ সালের কৃষক আন্দোলনের দিকে তাকালেও বুঝবেন যে আন্দোলনকারীদের ত্যাগ ছাড়া কোনো আন্দোলন হয় না। আজকাল ও জিনিসটারই অভাব, তাই কোনো প্রতিবাদই ফেসবুকের বাইরে বেশিদূর ছড়ায় না, অভীষ্ট লক্ষ্যেও পৌঁছয় না। কারণ আজকাল রাজনৈতিক দলের নেতা কর্মীরাও প্রতীকী প্রতিবাদের বেশি কিছু করতে চান না। এই ১৩ জন পিটিশনার কিন্তু নিজেদের রুজি রোজগার বাজি রেখে লড়তে নেমেছেন। আর জি কর আন্দোলনে কেন মুখ খোলেননি, কেন একটা কথাও বলেননি – এসব বলে অনির্বাণকে আক্রমণ করতে পারেন। তৃণমূল সরকার গঠিত কমিটিতে ছিলেন বলে পরমব্রত, সুদেষ্ণাকেও গাল দিতে পারেন। কিন্তু নিজের অফিসে একটা সামান্য দাবির জন্যে লড়ে দেখুন, টের পাবেন যে মোমবাতি হাতে কদিন রাতে মিছিলে যাওয়া আর ক্যামেরার সামনে বাইট দেওয়া অতি সহজ কাজ। খেয়াল করবেন, আর জি কর আন্দোলনের সময়ে টলিউডের যে তারকারা ও কাজটা গোড়ায় করেছিলেন এবং পরে চেপে গিয়েছিলেন, তাঁদের কিন্তু তৃণমূল নেতা পরিচালিত ফেডারেশন বয়কট করছে না। কারণ ওতে ক্ষমতার কাঁচকলা।

ভাবুন, ভাবা প্র্যাকটিস করুন। আর যদি মনে হয় বাংলা সিনেমার ভবিষ্যতের জন্যে, বাঙালি সংস্কৃতির জন্যে এই লড়াইয়ের এক কণাও দাম আছে – তাহলে তির্যক মন্তব্য বন্ধ রাখুন। যদি এই লড়াইয়ের গুরুত্ব আরও বেশি বলে মনে করেন, তাহলে পাশেও দাঁড়াতে পারেন। বাংলা সিনেমার পাশে দাঁড়ানোর চেয়ে অনেক জরুরি কাজ হবে সেটা। আইনি লড়াইয়ে কীভাবে পাশে দাঁড়াবেন? আগ্রহ থাকলে প্রশ্নটা নিজেই তুলুন, উত্তর পেয়ে যাবেন।

নাগরিক ডট নেট ওয়েবসাইটে প্রকাশিত

বাংলা মাধ্যম স্কুলের পর বাংলা সিনেমা উঠে যাওয়ার পালা?

নয়ের দশক থেকে কলকাতার বড় বড় সংবাদমাধ্যম যে শহুরে দরকচা মারা ছবিগুলোকে বাংলা ছবির পুনরুত্থান বলে দাগিয়ে দিল, সেগুলো বস্তুত বিভিন্ন মেজ সেজ ফেস্টিভালে পুরস্কার জেতা ছাড়া বাংলা ছবির হোমেও লাগেনি যজ্ঞেও লাগেনি।

এখনো বছরে যে দু-চারটে দিন পশ্চিমবঙ্গের বাঙালির নিজস্ব সংস্কৃতির জন্য গর্ববোধ হয় এবং সেটাকে বাঁচানো প্রয়োজন বলে মনে হয়, আজ তার মধ্যে এক দিন। আজ বাংলা সিনেমার আন্তর্জাতিকভাবে সবচেয়ে উদযাপিত পরিচালক সত্যজিৎ রায়ের জন্মদিন। মুর্শিদাবাদোত্তর, পহলগামোত্তর বাঙালি ভদ্রলোক-ভদ্রমহিলার সহসা নিজের হিন্দু সত্তা আবিষ্কার এবং দিঘার উপকূলে তাঁদের আদরের রামমোহন-বিদ্যাসাগর-রবীন্দ্রনাথ-নজরুলের প্রগতিশীলতা জগন্নাথদেবের পায়ে সঁপে দেওয়ার পর বলতে হবে, কপাল জোরে এই দিনটা পাওয়া গেছে। কেবল আজকের দিনেই বাংলা সিনেমা সম্পর্কে কখানা কথা লিখলে কেউ কেউ হয়ত গুরুত্ব দিয়ে পড়বেন। আগামীকালই আর তা হবে না। কারণ বিষয় হিসাবে কাশ্মীর-মুসলমান-পাকিস্তানের সহজ সমীকরণ বা কার বাড়িতে দিঘার মন্দিরের প্রসাদ পৌঁছল আর কোথায় পৌঁছল না, তা বাংলা সিনেমার হাল হকিকতের চেয়ে অনেক বেশি মুখরোচক।

সাংবাদিকতার সাবেকি নিয়ম মেনে সাম্প্রতিকতম ঘটনাটার উল্লেখ করেই আলোচনা শুরু করা যাক। গত বুধবার (৩০ এপ্রিল) বাংলা ছবির ছজন পরিচালক – অনির্বাণ ভট্টাচার্য, ইন্দ্রনীল রায়চৌধুরী, কিংশুক দে, পরমব্রত চট্টোপাধ্যায়, বিদুলা ভট্টাচার্য, সুদেষ্ণা রায় – একখানা মিনিট পনেরোর ভিডিও বার্তা প্রকাশ করেছেন। সে বার্তা টালিগঞ্জের কলাকুশলীদের প্রতি। ভিডিওতে বলা হয়েছে যে টালিগঞ্জ পাড়ার ফেডারেশন – যার সভাপতি পশ্চিমবঙ্গ সরকারের মন্ত্রী অরূপ বিশ্বাসের ভাই স্বরূপ বিশ্বাস – এবং এই পরিচালকরা, এখন বিবদমান। যাঁরা বাংলা কাগজগুলোর বিনোদনের পাতায় নিয়মিত চোখ বোলান, তাঁদের কাছে এটা খবর নয়। কিন্তু পরিচালকরা বলছেন – কলাকুশলীদের ফেডারেশনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে যে পরিচালকরা কলাকুশলীদের বিপক্ষে। এই ভিডিও নির্মাণের উদ্দেশ্য – সেই ‘ভুল’ ধারণা দূর করা।

ভিডিওটা না দেখে থাকলেও, এই পর্যন্ত পড়েই বুঝতে অসুবিধা হওয়ার কথা নয় যে গণ্ডগোল এতদূর গড়িয়েছে, এ রাজ্যের সমস্ত বিবাদেরই নিষ্পত্তি করে দেওয়ার ক্ষমতা ধরেন যিনি, তাঁর উপরেও ভরসা রাখতে পারেনি কোনো পক্ষই। টালিগঞ্জ মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জির বাসস্থান থেকে বেশি দূরে নয়। তার উপর ফেডারেশন সভাপতি তাঁরই মন্ত্রিসভার সদস্যের ভাই। তা সত্ত্বেও তাঁরা দিদির হস্তক্ষেপে পরিচালকদের সঙ্গে বিবাদ মিটিয়ে নেননি। নিলে পরিচালকরা এই অভিযোগ করতেন না। আবার পরিচালকরাও মুখ্যমন্ত্রীর ছত্রছায়ায় গেলেই নিজেদের অভাব অভিযোগ দূর হবে – এ বিশ্বাস রাখতে পারেননি। ফলে ভিডিও করে ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির ভিতরের বিবাদ প্রকাশ্যে এনে ফেলেছেন। পুরো ভিডিও দেখলে মালুম হয় – বাধ্য হয়েছেন।

কেন হল এরকম?

সংবাদমাধ্যমে আগে প্রকাশিত হয়েছে, এই ভিডিওতেও পরিচালকরা জানিয়েছেন যে তাঁরা মুখ্যমন্ত্রীর কাছে যাননি তা নয়। মুখ্যমন্ত্রী তাঁদের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন যে তিনি একটি কমিটি তৈরি করে দেবেন, যে কমিটি সব পক্ষের কথাবার্তা শুনে বিবাদ মেটানোর ব্যবস্থা করবে। কিন্তু সেই কমিটি গঠন করতে গেলে যে সরকারি বিজ্ঞপ্তি জারি করতে হয়, সেটাই পরবর্তী তিন মাসে হয়নি। পরিচালকরা তারপরেও এক মাস অপেক্ষা করেন। সরকার নট নড়নচড়ন। পরিচালকদের একাধিক ইমেলেরও জবাব দেওয়া হয়নি। অতঃপর তাঁরা সাংবাদিক সম্মেলন করে ফেডারেশনের কীর্তিকলাপ সম্পর্কে সর্বসমক্ষে অভিযোগ করেন। এই তাঁদের মহাপাপ। পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন প্রান্তে বিভিন্ন পেশার মানুষ জানেন, কর্মস্থলে যা অত্যাচার অবিচার হয় সেসব নিয়ে প্রকাশ্যে কথা না বলাই দস্তুর। সমাধান চাইলে যাঁরা অত্যাচার অবিচার করলেন তাঁদের কাছেই হাতজোড় করে দাঁড়ানো নিয়ম। তাঁরা সদয় না হলে খুব বড় অপরাধেও পুলিস এফআইআর নিতে চায় না। সেখানে এই পরিচালকরা একেবারে সাংবাদিক সম্মেলন করে বসলেন! ঘাড়ে কটা মাথা! ভিডিওতে পরিচালকদের অভিযোগ – এরপর থেকেই শুরু হয় সেই সাংবাদিক সম্মেলনে উপস্থিত পরিচালকদের কাজ করতে না দেওয়ার ব্যবস্থা। ওঁদের শুটিংয়ে কলাকুশলীদের কাজ করতে বারণ করা হয়। তার ফলেই নাকি তাঁরা (এই ছজন সমেত মোট ১৫ জন পরিচালক) আদালতের দ্বারস্থ হয়েছেন।

যে বাংলায় পুলিসে যাওয়াই সাধারণ মানুষের পক্ষে স্থানে স্থানে মহাপাতক, সেখানে একেবারে কলকাতা হাইকোর্টে ফেডারেশনের সর্বময় কর্তার বিরুদ্ধে মানহানির মামলা করে বসেছেন এঁরা। সে মামলার ইতিমধ্যেই দুটি শুনানি হয়েছে, সে খবর সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিতও হয়েছে। বিচারপতি অমৃতা সিনহা যে নির্দেশগুলো দিয়েছেন তাতে পরিচালকদের হাত শক্ত হয়েছে। তিনি স্পষ্ট বলেছেন, পরিচালকদের কাজে ফেডারেশন কোনো হস্তক্ষেপ করতে পারবে না। এমনকি যে ইউনিক কার্ড ফেডারেশনের তুরুপের তাস, যা না থাকলে সিনেমাপাড়ায় কাউকে কাজ করতে দেয় না তারা, সেই কার্ডকেও মূল্যহীন বলেছেন বিচারক। কিন্তু হলে হবে কী? আদালত নির্দেশ দিলেই মানব – এত সুবোধ বালকদের রাজ্য পশ্চিমবঙ্গ নয়। ওই নির্দেশের পরেও সুদেষ্ণা রায়ের ছবির শুটিং শুরু করতে গিয়ে ঠিক তাই ঘটেছে, যা রাহুল মুখার্জির ছবির শুটিং নিয়ে গতবছর জুলাই মাসে ঘটায় টলিপাড়ার সমস্ত কাজ বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। অর্থাৎ শুটিং সূচি ঘোষণা হওয়ার পরেও একজন কুশীলবও কাজ করতে আসেননি।

সেই থেকে অচলাবস্থা চলছে টালিগঞ্জে। মুখ্যমন্ত্রী হয় মেটাননি, অথবা ধরে নিতে হবে, তাঁর নির্দেশকেও অগ্রাহ্য করার মত শক্তি টলিপাড়ার দণ্ডমুণ্ডের কর্তা স্বরূপবাবুর আছে। আদালতের নির্দেশের পরেও সুদেষ্ণার ছবির কাজ বাতিল হয়ে যাওয়ায় আদালত অবমাননা হয়েছে কিনা, হয়ে থাকলে স্বরূপবাবু বা অন্য কেউ শাস্তির পাত্র কিনা, নাকি গোটা ঘটনায় তাঁর কোনো ভূমিকাই নেই – তার বিচার আদালতে হবে। কিন্তু সাড়ে ১৫ মিনিটের ভিডিওতে পরিচালকরা অভিযোগ করেছেন যে ফেডারেশনের ভয়েই কুশীলবরা নির্দিষ্ট কিছু পরিচালকের ছবিতে কাজ করতে আসছেন না। একথা সত্যি না মিথ্যা তা বলা মুশকিল, তবে হাইকোর্ট যে এই অভিযোগকে সত্যি বলেই গণ্য করেছে তার ইঙ্গিত বিচারপতির নির্দেশে রয়েছে। স্বরূপবাবু অবশ্য প্রকাশ্যে খুবই ভদ্রলোক। যতবার সংবাদমাধ্যম তাঁর কাছে এই গণ্ডগোল নিয়ে কিছু জানতে চায়, তিনি হয় বলেন আদালতে বিচারাধীন বিষয়ে কোনো মন্তব্য করবেন না, নতুবা বলেন এসব তাঁর ফেডারেশনের বিরুদ্ধে চক্রান্ত। যেমনটা বুধবারের ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পরে বলেছেন

পশ্চিমবঙ্গে এখন বিরাট বিরাট ঘটনা ঘটছে। শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মীদের নিয়োগ দুর্নীতির ফলে এক লপ্তে ২৬,০০০ মানুষের চাকরি গেছে। এদিকে মুর্শিদাবাদের দাঙ্গা এবং পহলগামের সন্ত্রাসবাদী হামলার পর সাম্প্রদায়িকতার সমস্যাও বাংলার বাসিন্দাদের এ রাজ্যে এবং ভিনরাজ্যে নানাভাবে বিপদে ফেলছে। সরকারি টাকায় মন্দির তৈরি এবং তার উদ্বোধন উপলক্ষে ঘুরপথে আমিষ খাওয়াদাওয়া বন্ধ করার চেষ্টার মত অভূতপূর্ব ঘটনাও ঘটে গেছে। এতকিছুর মধ্যে বাংলা সিনেমার জগতে কী হচ্ছে না হচ্ছে তা নিয়ে দীর্ঘ লেখা ফেঁদে বসার কী দরকার? প্রশ্নটা সঙ্গত এবং উত্তরটা জরুরি।

যা যা ঘটছে সবই রাজনৈতিক এবং সিনেমাপাড়ায় যা ঘটছে তাও মোটেই অরাজনৈতিক নয়। একেবারে গোদা অর্থে রাজনৈতিক তো বটেই, কারণ পরিচালকদের অভিযোগের তির শাসক দলের নেতা স্বরূপবাবুর দিকে। কিন্তু কেবল দলীয় রাজনীতির কথা ভাবলে চলবে না। জুলাই মাস থেকে এ পর্যন্ত ঘটনা পরম্পরা লক্ষ করলে বোঝা যায় যে টালিগঞ্জের এই ‘বিদ্রোহী’ পরিচালকরা যে অভিযোগ করছেন, তার সঙ্গে আর জি কর কাণ্ডের পর রাজ্যের বিভিন্ন মেডিকাল কলেজের ডাক্তাররা যে অভিযোগ করেছিলেন তার কোনো মৌলিক তফাত নেই। দুই ক্ষেত্রেই মূল অভিযোগ হল – হুমকি সংস্কৃতি চলছে। চোখ রাঙিয়ে, ভয় দেখিয়ে এক পক্ষ তাদের যা ইচ্ছে তাই করিয়ে নিতে চাইছে। প্রতিবাদ করলে কাজ করতে দেওয়া হচ্ছে না। ঠিক যেভাবে সেকালে গ্রামদেশে মোড়লের বিরুদ্ধাচরণ করলে ধোপা নাপিত বন্ধ করিয়ে দেওয়া হত।

আমি, আপনি কোন ছার; রুপোলি পর্দার লোকেরা, তারকারা, এরকম ভয়ের পরিবেশে কাজ করতে হচ্ছে বলে অভিযোগ করছেন। ব্যাপারটা এই রাজ্যের শুভাকাঙ্ক্ষী সকলকে ভাবিয়ে তোলার মত। শাসক দলের অনুগতরা টালিগঞ্জ পাড়ায় কলাকুশলী হিসাবে কাজ পায়, ছবিতে কাজ করতে যত লোক লাগা উচিত চাপ দিয়ে তার চেয়ে বেশি লোককে কাজ পাইয়ে দেওয়া হয় – এসব অভিযোগ যে তৃণমূল সরকারের আমলেই প্রথম উঠছে এমন নয়। কিন্তু কথা হল, স্বাস্থ্যবান মানুষের খানিকটা রক্ত মশা খেলে বিশেষ ক্ষতি হয় না। কিন্তু যে রক্তাল্পতায় ভুগছে তাকেও যদি রোজ একপাল মশা ছেঁকে ধরে, তাহলে অল্পদিনেই মৃত্যু অবশ্যম্ভাবী। ইন্ডাস্ট্রি হিসাবে বাংলা ছবি এখন সেই স্তরে পৌঁছে গেছে, অথচ ফেডারেশনের প্রতাপ কমছে না। ফলে কাজ আরও কমে যাচ্ছে। ২০২৪ সালে মাত্র ৩৬ খানা ছবি তৈরি হয়েছে, যা নাকি গত ১৫ বছরে সর্বনিম্ন। ফেডারেশনের উদ্ভট সব নিয়মের ঠ্যালায় (পড়ুন দাবির ঠ্যালায়, কারণ আইনত কোনো নিয়ম বানানোর অধিকার ফেডারেশনের নেই) বাংলা ছবির প্রযোজকের সংখ্যা কমছে, বাইরের কোনো ফিল্ম ইউনিটও আর পারতপক্ষে কলকাতায় শুটিং করতে আসছে না। বাংলা ছবির অভিনেতারা কাজের অভাবে কেউ মুম্বাই পাড়ি দিচ্ছেন, কেউ ইউটিউব চ্যানেল খুলে টক শো চালাচ্ছেন, কেউ অন্য ব্যবসাপত্র খোলার কথা ভাবছেন। বেশকিছু উল্লেখযোগ্য ছবির পরিচালক ইন্দ্রাশিস আচার্য, কেবল সিনেমা করে জীবিকা নির্বাহ করা শক্ত হয়ে দাঁড়াচ্ছে – একথা স্পষ্টাস্পষ্টি বলে গতবছর কর্পোরেট চাকরিতে যোগ দিয়েছেন। কিন্তু অভিনেতা, পরিচালকদের হাতে না হয় এসব বিকল্প রয়েছে। যাঁরা মেক আপ করেন, আলোর কাজ করেন, জুনিয়র আর্টিস্ট হিসাবে কাজ করেন অথবা স্রেফ সেটে ফাইফরমাশ খাটেন – তাঁদের তো আর নেই। এমন চললে তাঁরা যাবেন কোথায়? ফেডারেশন নিজেদের যাদের লোক বলে দাবি করছে, তাঁদেরই তো আক্ষরিক অর্থে পথে বসতে হবে। সান্ত্বনা হিসাবে তখন বড়জোর বলা যাবে ‘মনখারাপ করবেন না। আপনাদের আগে ডাক্তার আর শিক্ষকরাও পথে বসেছেন।’

গুন্ডামিই আইন হয়ে দাঁড়াবে, তার সঙ্গে আপোস করে স্রেফ নিজেরটুকু নিয়ে ভেবে তথাকথিত ‘ফার্স্ট বয়’-রা ছবি বানাবেন, বিশেষ ক্ষমতাশালী নায়কের ছবি নিয়ে বিপুল সোশাল মিডিয়া প্রচার চলবে – মাঝরাতে অমুক জায়গায় শো হাউসফুল, তমুক ছবি ব্লকবাস্টার। আর যাঁরা ইন্ডাস্ট্রির দমবন্ধ করা বর্তমান ও ভয়াবহ ভবিষ্যৎ ভেবে প্রতিবাদ করবেন তাঁদের একঘরে করা হবে। ফলে ইন্ডাস্ট্রিতে ক্রমশ কাজ কমবে। এভাবে ধুঁকতে ধুঁকতে একটা ভাষার ছবি কতদিন বেঁচে থাকতে পারে? এমনিতেই দুনিয়া জুড়ে সিনেমাশিল্পের এক ধরনের সংকট চলছে। হলিউড বা বলিউডও তার বাইরে নয়। তার উপর টলিউডের মত ছোট বাজারসম্পন্ন, আগে থেকেই দুর্বল হয়ে থাকা ইন্ডাস্ট্রিতে যদি সিনেমার বাইরের লোকেদের গা জোয়ারিই শেষ কথা হয়ে দাঁড়ায়, তাহলে বাংলা ছবি বাঁচবে কী করে?

বাঙালিদের মধ্যে এমন সিনেমাবোদ্ধার অভাব নেই, যাঁরা নাকটা আকাশের দিকে তুলে বলবেন ‘বাংলা ছবি না বাঁচলেই বা কী? যা সব ছবি বানায়…’। একথার উত্তর দেওয়ার আগে কতকগুলো তেতো কথা বলা দরকার।

প্রথমত, ফেডারেশন বনাম পরিচালকদের দ্বন্দ্ব টলিউডের যে কঙ্কালসার চেহারা তুলে ধরেছে তা দিয়ে শৈল্পিক দিক থেকে ভাল ছবি হওয়া অসম্ভব বললেই চলে। প্রয়াত অশোক মিত্রের কথা ধার করে বলতে হয়, অভাবের সংসারে ‘তেইশ বছরের আপাত-উঠতি শরীরেও, স্তন আর স্তন থাকে না, দুদিনেই তা হেলে প’ড়ে মাই হয়ে যায়।’ আজকাল বাংলা পূর্ণদৈর্ঘ্যের ছায়াছবির শুটিং হয় ১৪-১৫ দিনে। এতেই মাস্টারপিস বানাতে গেলে নির্দেশক, চিত্রগ্রাহক, সঙ্গীত পরিচালক, অভিনেতা – সকলকেই জিনিয়াস হতে হবে। একসঙ্গে এত জিনিয়াস কোনো দেশে কোনোকালেই সুলভ ছিল না।

আরও পড়ুন সিনেমার হাত ধরে ভারতীয়দের বিশ্বজয় চলছে বহুকাল ধরে 

দ্বিতীয়ত, যে তিন বাঙালি পরিচালককে জিনিয়াস গণ্য করে আজকাল আমরা বুক ফোলাই, তাঁদের কর্মজীবনে মোটেই সমস্ত ছবি হল ভরে দেখতে যায়নি বাঙালি দর্শক। গেলে ঋত্বিক ঘটক হতাশায় ক্রমশ বেশি বেশি করে মদে ডুবে যেতেন না, অকালে মারাও যেতেন না হয়ত। তাঁর মৃত্যুর পরেও কলকাতা এমন কিছু উদ্বেল হয়নি। সত্যজিৎই বাণিজ্যিক সাফল্যের মুখ দেখেছেন অনেকটা। তাও তাঁর সবচেয়ে শৈল্পিক কাজগুলোর চেয়ে বেশি জনপ্রিয় হয়েছে গুগাবাবা, হীরক রাজার দেশে আর ফেলুদার ছবিগুলো। মৃণাল সেনের ছবি তো খুব জনপ্রিয় হওয়ার কথাও নয়। তাঁর বক্তব্য আলাদা, শৈলীও আলাদা। বাংলা ছবিকে বাঁচিয়ে রেখেছিল আসলে সিনেমাবোদ্ধাদের হেলাশ্রদ্ধার পাত্র হয়ে থাকা ছবিগুলো। সেসব ছবি বানাতেন তপন সিংহ, অজয় কর, দীনেন গুপ্ত, অরবিন্দ মুখোপাধ্যায়, তরুণ মজুমদার, প্রভাত রায়, অঞ্জন চৌধুরী প্রমুখ। নিখাদ প্রেমের ছবি বা মজার ছবি, আটপৌরে সাংসারিক জটিলতার ছবি, সাধারণ মানুষের রোজকার সমস্যার ছবি – এসব দেখতে দর্শক হল ভরাত বলে শিল্পী ও কলাকুশলীদের সংসার চলত, প্রযোজকদের ঘরে টাকা আসত। তাই তাঁরা হিট হবে না ধরে নিয়েই সত্যজিৎ বা মৃণালের মত শিল্পীদের ছবিতে টাকা ঢালতে পারতেন। নয়ের দশক থেকে কলকাতার বড় বড় সংবাদমাধ্যম যে শহুরে দরকচা মারা ছবিগুলোকে বাংলা ছবির পুনরুত্থান বলে দাগিয়ে দিল, সেগুলো বস্তুত বিভিন্ন মেজ সেজ ফেস্টিভালে পুরস্কার জেতা ছাড়া বাংলা ছবির হোমেও লাগেনি যজ্ঞেও লাগেনি। এক পর্দার সিনেমা হলগুলো উঠে যাওয়ার আগে থেকেই ওইসব ছবি গ্রাম আর শহরের দর্শকের মধ্যে কাঁটাতার বসিয়ে দিয়েছে। মাল্টিপ্লেক্স এসে সর্বনাশ সম্পূর্ণ করেছে। বিপুল সংখ্যক দর্শক বাংলা ছবির হাতছাড়া হয়ে গেছেন অত টাকার টিকিট কাটার ক্ষমতা নেই বলে আর গ্রামেগঞ্জে সিনেমা হল প্রায় নেই বলে। যাঁরা আছেন, তাঁদের পক্ষে হাতে ইয়াব্বড় পপকর্নের বালতি নিয়ে বাংলা ছবি কেন, কোনো ছবির পাশেই দাঁড়ানো কঠিন। মনোযোগ স্বভাবতই ৪০০ টাকার পপকর্ন নষ্ট না হওয়ার দিকেই রাখতে হবে।

এবার বলা যাক, বাংলা ছবি না বাঁচলে কী হবে। শুধু শিল্পী আর কলাকুশলীদের রুজি রোজগার বন্ধ হবে তা নয়। পৃথিবীর বিশিষ্ট সংস্কৃতিবান জাতিগুলোর অন্যতম হিসাবে বাঙালির যে পরিচিতি, তা অনেকটাই মুছে যাবে। আজ গোটা ভারতকে এক ধর্ম, এক ভাষা, এক সংস্কৃতির দেশ করে তোলার যে আপ্রাণ লড়াই চালাচ্ছে সংঘ পরিবার, তাতে সেটা হবে তাদের গুরুত্বপূর্ণ জিত। আপনি আজ সত্যজিতের অস্কার আর ঋত্বিকের মৃত্যুর এতবছর পরে তাঁকে নিয়ে মার্টিন স্করসেসির মুগ্ধতার কথা শতমুখে বলে সম্মান পান বাংলা সিনেমা বলে একটা কিছুর অস্তিত্ব আছে বলে। না থাকলে যাকেই বলতে যাবেন, সে বলবে ‘হ্যাঁ হ্যাঁ, তোমাদের একসময় নাকি সবই ছিল। এখন কী আছে বলো?’ বাংলা মাধ্যম স্কুলগুলোকে উঠে যাওয়ার দ্বারপ্রান্তে এনে দাঁড় করিয়েছে পশ্চিমবঙ্গ সরকার। এর সঙ্গে বাংলা সিনেমাশিল্পটা তুলে দিতে পারলে সোনায় সোহাগা। পাড়ায় পাড়ায় রবীন্দ্র জয়ন্তী কমে এসেছে অনেকদিন হল, আজ থেকে ৫০ বছর পরে সত্যজিতের জন্মদিন পালন করার লোকও পাওয়া যাবে না।

ব্যাপারটা কিন্তু গভীরভাবে রাজনৈতিক। আপনি মাছি তাড়ানোর ভঙ্গিতে বলতেই পারেন ‘পরমব্রত চাটুজ্জে তো সরকারের দেউচা-পাঁচামির কমিটিতে ঢুকেছিল। এখন বুঝুক ঠ্যালা’, অথবা ‘অনির্বাণ ভটচায্যি তো আর জি করের বেলায় চুপ ছিল। এখন কেন?’, কিম্বা ‘সুদেষ্ণা রায় তো সরকারের কীসব কমিশনের মেম্বার। এদের পাত্তা না দেওয়াই উচিত।’ কিন্তু আপনি যত উদাসীন থাকবেন, আপনার ভাষা-সংস্কৃতির বারোটা বাজানোর জন্যে যে বড় রাজনীতিটা চলছে তার পথ তত পরিষ্কার হবে।

নাগরিক ডট নেট ওয়েবসাইটে প্রকাশিত

পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতি: আর জি কর পেরিয়ে

২০১১ সালে পশ্চিমবঙ্গে মমতা ব্যানার্জির সরকার আসার পরে আর ২০১৪ সালে দিল্লিতে নরেন্দ্র মোদীর সরকার আসার পরে ভারতীয় রাজনীতিতে, সমাজে এবং সংবাদমাধ্যমে একটা নতুন কায়দা চালু হয়েছে। প্রশ্ন যা করার বিরোধীদের করা হয়, সরকারকে নয়। অথচ গণতন্ত্র মানে ঠিক উলটো। অন্তত ১৯৪৭ সাল থেকে ভারতে গণতন্ত্র মানে ছিল – প্রশ্ন সরকারকে করা হবে, আন্দোলন হবে সরকারের নীতির বিরুদ্ধে বা কাজের বিরুদ্ধে। সেটা উলটে গেছে। এখন সরকার অপকর্ম করলে সরকার আর সরকারি দলের সুরে সুর মিলিয়ে সংবাদমাধ্যম, এমনকি সাধারণ মানুষও ফিরিস্তি দেন – বিরোধীরা সরকারে থাকার সময়ে কী কী অপকর্ম করেছিল। বিজেপি এবং গোদি মিডিয়ার এই কাজটা করার জন্যে আছে দুটো হাতিয়ার – ‘নেহরু’ আর ‘কংগ্রেস কে ৬০ সাল’। তৃণমূল আর তাদের সোচ্চার ও নিরুচ্চার সমর্থকদের জন্যে আছে ‘বামফ্রন্টের ৩৪ বছর’। আপনি বলতেই পারেন, ‘বাপু, ওই কারণেই তো ওদের সরিয়ে তোমাদের ক্ষমতায় এনেছি। তোমাদের এতদিন হয়ে গেল সরকারে, তাও ওরা কবে কী করেছিল কেন শুনব?’ ওই ফাটা রেকর্ড কিন্তু বেজেই চলবে।

এবারের লোকসভা ভোটে দেশের মানুষ বিজেপির ফাটা রেকর্ড বাজানো অনেকটা বন্ধ করে দিয়েছেন। তার কৃতিত্ব খানিকটা অবশ্যই বিকল্প সংবাদমাধ্যম এবং সাংবাদিকদের। কিন্তু বেশিটাই দেশের বিরোধী দলগুলোর। কোনো সাংবাদিক বা বিকল্প সংবাদমাধ্যম, তাদের যত লক্ষ ফলোয়ারই থাকুক না কেন, যদি ভাবে রাজনৈতিক দলগুলোর কর্মীদের তুলনায় তারা বেশি পরিশ্রম করে বা সাধারণ মানুষ তাদের উপর বেশি নির্ভর করেন, তাহলে সেই সাংবাদিক বা ওয়েবসাইট মাটির সঙ্গে সম্পর্কহীন। রাজনীতির র-ও তারা বোঝে না। তবে তাদের অবদান অন্যূন নয়। ঘটনা হল, বিরোধীদের আন্দোলন করার মত একটা সুস্থ স্বাভাবিক গণতান্ত্রিক ব্যাপারকে ভারতে দশবছর ধরে অস্বাভাবিক, দেশবিরোধী বলে তুলে ধরা হত। ওটাই যে স্বাভাবিক, ওভাবেই যে সরকার বদলায় এবং ওভাবেই যে নরেন্দ্র মোদীও ক্ষমতায় এসেছিলেন, সেকথা মানুষকে ভুলিয়ে দেওয়া হয়েছিল। গত এক-দেড় বছরে মানুষের সেই মনোভাব অনেকটাই কেটেছে। আরএসএস-বিজেপি ও তাদের বশংবদ মিডিয়া, বিরোধীরা আন্দোলন করলেই তাকে নানাভাবে বদনাম করে আর পার পাচ্ছে না। মানুষের মানসিকতার এই পরিবর্তনের কৃতিত্ব অনেকটাই বিকল্প ওয়েবসাইট, স্বাধীন সাংবাদিক, ইউটিউবারদের।

কিন্তু পশ্চিমবঙ্গ এখনো বাকি দেশের চেয়ে পিছিয়ে আছে। এখানে একে বিজেপি ক্ষমতায় নেই, তার উপর এখানেও দিদি মিডিয়া সেই ২০১১ সাল থেকেই আছে। সরকারি বিজ্ঞাপন বন্ধ করে, বন্ধ করার হুমকি দিয়ে বা বিজ্ঞাপন দেওয়ার লোভ দেখিয়ে মমতা ব্যানার্জির সরকার পশ্চিমবঙ্গে দিদি মিডিয়া তৈরি করেছে সচেতনভাবে। উপরি সমস্যা হিসাবে আছেন বাম এবং/অথবা প্রগতিশীল মানুষদের একাংশ। তাঁরা ‘বিজেপি এসে যাবে’, এই যুক্তিতে তৃণমূল সরকারের যাবতীয় অপকর্ম চাপা দেন। বিরোধীরা (বামেদের কথা বলছি, এ রাজ্যে বিজেপি বিরোধীসুলভ কোন কাজটা করে?) গত ১৩ বছরে পর্যাপ্ত পরিমাণে বা তীব্রতায় আন্দোলন করেননি এটা যেমন সত্যি, তেমন এটাও সত্যি যে কোনো বিষয়ে তাঁরা প্রতিবাদ করলেই, মমতা বা তৃণমূল কংগ্রেসের অন্য কোনো নেতা কিছু বলারও আগে খবরের কাগজে বা সোশাল মিডিয়ায় লেখা শুরু হয়ে যায় ‘ওরা আবার কথা বলছে কী? ওরা তো অত সালে অমুকটা করেছিল।’ সংবাদপত্রের উত্তর সম্পাদকীয় লেখক, বিকল্প ওয়েবসাইটগুলোর লেখক এবং জনপ্রিয় ফেসবুকারদের মধ্যে বেশকিছু মানুষ সর্বদা তালিকা নিয়ে তৈরি থাকেন – কবে, কোথায়, কখন তৃণমূল দল বা সরকারের করা কোন অন্যায়টা বামফ্রন্ট সরকারের আমলে সিপিএম বা জোট শরিক অন্য কোনো দল করেছিল। যুক্তি হিসাবে এটা অবশ্যই বনলতা সেনগিরি (whataboutery), যা আজকাল সারা পৃথিবীতে বাম, মধ্য, ডান – সব পক্ষের লোকেরাই করে থাকেন। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সর্বাধিক বিক্রীত বাংলা দৈনিক আনন্দবাজার পত্রিকা ও অন্যান্য মিডিয়ার কয়েক দশকের যত্নে গড়ে তোলা এই নাগরিক বিশ্বাস, যে রাজনীতি অত্যন্ত নোংরা একটা ব্যাপার এবং শুধুমাত্র বদ লোকেরাই রাজনৈতিক দলের সদস্য হয়।

ফলে সরকারের বিরুদ্ধে কোনোরকম আন্দোলনে যুক্ত হতে গেলেই রাজ্যের প্রতিষ্ঠিত বাম দলগুলোকে আন্দোলনকারীরাই বাধা দেন। শিক্ষক নিয়োগে দুর্নীতির বিরুদ্ধে আন্দোলনে এ জিনিস ঘটেছে, সরকারি কর্মচারীদের মহার্ঘ ভাতা বৃদ্ধির দাবিতে আন্দোলনও বামপন্থীদের বাইরে রাখতে গিয়ে দুভাগ হয়ে গিয়েছিল – বামফ্রন্টের সদস্য দলগুলোর সংগঠনের যৌথ মঞ্চ, বাকিদের সংগ্রামী যৌথ মঞ্চ। তারপর কোন মঞ্চ দিল্লিতে বিক্ষোভ দেখাতে গিয়ে হিন্দু মহাসভার আতিথ্য গ্রহণ করল তা নিয়ে ভুল খবরও রটেছিল তৃণমূলের উদ্যোগে। যেহেতু সিপিএমের শিক্ষক সংগঠন নিখিল বঙ্গ শিক্ষক সমিতির নাম ওই পেশার বাইরের মানুষের কাছে বেশি পরিচিত এবং আন্দোলনের বাইরে থাকা অনেক শিক্ষকও খবর রাখতেন না আন্দোলনের কতগুলো ভাগ হয়েছে, সেহেতু অনেকে সাক্ষ্যপ্রমাণ না দেখেই ধরে নিয়েছিলেন কাজটা সিপিএমের সংগঠনের নেতৃত্বে থাকা অংশেরই। তৃণমূল নেতা কুণাল ঘোষও সুযোগ বুঝে সোশাল মিডিয়ায় রাম-বাম-কং আঁতাত প্রমাণিত হল বলে ধুয়ো তুলেছিলেন। অথচ ঘটনা ছিল উলটো

সবচেয়ে বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে যে বিরোধীরা, তাদের এইভাবে যে কোনো আন্দোলন থেকে দূরে রাখার এই কৌশল কংগ্রেস সম্পর্কে সেই ২০১৪ সাল থেকে সারা দেশে প্রয়োগ করে যাচ্ছিল বিজেপি। তাদের দ্বারা শাসিত কোনো রাজ্যে ধর্ষণ নিয়ে অসন্তোষ তৈরি হলেই বিজেপি নেতারা এবং গোদি মিডিয়া মনে করিয়ে দিত – নির্ভয়া কাণ্ড হয়েছে কংগ্রেস আমলে। অতএব কংগ্রেসের ও নিয়ে কোনো কথা বলার অধিকার নেই। নরেন্দ্র মোদী সরকারের কোনো অগণতান্ত্রিক কাজ নিয়ে প্রতিবাদ করলেই ইন্দিরা গান্ধীর জরুরি অবস্থা মনে করিয়ে দেওয়া হত। ধর্মনিরপেক্ষতা নিয়ে কথা বললেই শাহ বানো মামলার নাম করা হত। দেশের সাধারণ মানুষও এই একপেশে ধারণায় বিশ্বাস করছিলেন, যে কংগ্রেসের ৬০ বছরের শাসনে দেশে একটাও ভাল কাজ হয়নি। উপরন্তু বিজেপি এমন কিছুই করছে না, যা কংগ্রেস আগে করেনি। পশ্চিমবঙ্গের মতই কোথাও কোনো আন্দোলন দানা বাঁধলেই সংগঠকরা আগেভাগে বলে দিতেন ‘আমাদের এখানে কোনো রাজনৈতিক দল নেই। আমরা আন্দোলনের রাজনীতিকরণ চাই না।’ ফলে কংগ্রেসও হয়ে পড়েছিল রক্ষণাত্মক। যখন সারা দেশে এনআরসি-সিএএবিরোধী আন্দোলন চলছে, তখন এআইসিসি অফিসে বসে সাংবাদিক সম্মেলন করা ছাড়া ওই আন্দোলনে কোনো ভূমিকা নিতে ভয় পেয়েছে। সংগঠনকে কাজে লাগায়নি। কখনো দিল্লিতে অনুষ্ঠিত কোনো আন্দোলনে কংগ্রেসের কেউ গিয়ে হাজির হলেই সমবেত গোদি মিডিয়া এবং বিজেপি সেই আন্দোলনকে ‘রাজনৈতিক সুবিধাবাদ’ বলে দেগে দিয়েছে। এমনকি আন্দোলনকারীরাও আপত্তি করেছেন। ২০১৫ সালে যন্তর মন্তরে প্রাক্তন সেনাকর্মীদের আন্দোলনে রাহুল হাজির হওয়ায় তাঁকে আন্দোলনকারীরাই চলে যেতে বলেন।

২০২০-২১ সালের কৃষক আন্দোলনের সময়ে পাঞ্জাবে কংগ্রেস সরকার থাকা সত্ত্বেও দিল্লির আন্দোলনে কংগ্রেসের কোনো ভূমিকা ছিল না বললেই চলে। পাঞ্জাবের মুখ্যমন্ত্রী ক্যাপ্টেন অমরিন্দর সিং (পরে কংগ্রেস ছেড়ে নিজের দল খোলেন, এখন আবার বিজেপিতে যোগ দিয়েছেন) আন্দোলনকে মৌখিক সমর্থন জানিয়েছিলেন কেবল। কংগ্রেসের এই নিজের মধ্যে গুটিয়ে থাকা বিজেপিকে ভয়ানক হয়ে উঠতে সাহায্য করেছে। কংগ্রেস শেষমেশ এই সংকোচ কাটিয়ে ওঠে রাহুলের ভারত জোড়ো যাত্রার মধ্যে দিয়ে।

পশ্চিমবঙ্গে সিপিএম তথা বাম দলগুলোর সংকোচ আজও কাটেনি। তার অন্যতম কারণ, তাঁরা কংগ্রেসের মত কোনো নতুন বয়ান খাড়া করতে পারেননি। যে শিল্পায়ন হয়নি তার জন্য এবং ব্যর্থ মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের জন্য অশ্রুপাত করা ছাড়া তাঁদের বক্তব্য বলতে তৃণমূলের দোষগুলো দেখিয়ে দেওয়া। সিপিএম সদস্য, সমর্থকরা এখনো ‘গর্বের ৩৪’ নিয়ে বিভোর। এখনো নিজেরাই মেনে নিতে পারেননি যে ৩৪ বছরের সবটাই গর্বের হলে সংখ্যাটা উনচল্লিশে পৌঁছত, চৌত্রিশে থেমে যেত না। ফলে এখনো তাঁদের আমল নিয়ে বনলতা সেনগিরি করে সিপিএম নেতাকর্মীদের স্তব্ধ করে দেওয়া যায়। কোনো আন্দোলনের নেতৃত্ব হাতে তুলে নেওয়ার সাহস তাঁরা করে উঠতে পারেন না, পতাকাহীন মিছিলের ডাক দেন। বড়জোর ছাত্র সংগঠন বা যুব সংগঠনের নামে মিছিল, জমায়েত ইত্যাদি করা হয়। এই সংকোচের ফলে পশ্চিমবঙ্গে এক অদ্ভুত রাজনীতি রমরমিয়ে চলছে।

তৃণমূল সরকারের আমলে সরকারি হাসপাতালের ভিতরে সরকারি ডাক্তার ধর্ষিত হয়ে খুন হলেন। ইতিমধ্যেই পরিষ্কার যে প্রথম থেকে ঘটনাটা চেপে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে হাসপাতাল ও পুলিসের তরফ থেকে। স্বাস্থ্য আর স্বরাষ্ট্র – দুটো দফতরই স্বয়ং মুখ্যমন্ত্রীর হাতে। খুনের ঘটনা ৯ অগাস্ট সকালে প্রকাশ্যে আসার পর থেকেই হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ও পুলিসের কাজে, অর্থাৎ সরকারি কাজে, এত অসঙ্গতি যে কলকাতা হাইকোর্টে তো বটেই, সুপ্রিম কোর্টে পর্যন্ত ‘হ্যাঁ স্যার, ভুল হয়ে গেছে স্যার’-এর বাইরে যেতে পারেননি রাজ্য সরকারের কৌঁসুলি।

তবু এখনো তৃণমূল তো বটেই, পশ্চিমবঙ্গের নাগরিক সমাজের একটা অংশও এই আলোচনায় বানতলা, ধানতলা টেনে আনছেন। রাত দখল আন্দোলনের অন্যতম নেত্রী বলে পরিচিত শতাব্দী দাশ গত বুধবারের আনন্দবাজার পত্রিকায় ‘অ-দলীয়, প্রবল রাজনৈতিক’ শীর্ষক প্রবন্ধে লিখেছেন ‘সাধারণ মানুষই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, তাঁদের কাঁধে চেপে কাউকে রাজনৈতিক আখের গোছাতে দেবেন না তাঁরা। বর্তমান শাসনহীনতার বিরুদ্ধে সংগঠিত মিছিল থেকেই হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে, মনুবাদী পিতৃতান্ত্রিক বিজেপিকে এই আন্দোলনের সুবিধা তুলতে দেওয়া হবে না। মনে করিয়ে দেওয়া হয়েছে সিপিএম যুগের বানতলা আর তৃণমূলের কামদুনি, একই সঙ্গে।’ পড়ে গুলিয়ে গেল – আন্দোলনের দাবিটা কী? অনেকের হাতে পোস্টার ছিল এবং মুখে স্লোগান ছিল ‘We want justice’, অর্থাৎ ‘আমরা ন্যায়বিচার চাই’। কার জন্য ন্যায়বিচার? আর জি করে মৃত মেয়েটার জন্যে ন্যায়বিচার, নাকি কামদুনির ধর্ষিতার জন্য ন্যায়বিচার, নাকি বানতলার ধর্ষিতার জন্য ন্যায়বিচার, নাকি এদের সকলের জন্য ন্যায়বিচার? মুশকিল হল, বানতলা আর কামদুনি – দুটো মামলারই নিষ্পত্তি হয়ে গেছে আগেই। ন্যায়বিচার হয়েছে কিনা তা ভিন্ন প্রশ্ন, কিন্তু আর জি করের ঘটনার পরে ওইসব ঘটনার জন্যে আন্দোলন করার তো মানে নেই। বিশেষত বানতলার ন্যায়বিচার তৃণমূল সরকারের কাছে তো চাওয়া যেতে পারে না। চাইলে বামফ্রন্ট সরকারের কাছে চাইতে হয়। যে সরকারের এখন আর অস্তিত্বই নেই, তার বিরুদ্ধে আন্দোলন মোদীর ভারত আর দিদির পশ্চিমবঙ্গেই শুধু সম্ভব। অবশ্য শতাব্দী বা সমমনস্করা বলতেই পারেন, ওই বাক্যগুলোর অর্থ তা নয়। অর্থ হল – এসব অনাচার সিপিএমও আগে করেছে, তৃণমূলও করেছে। অতএব তাদের এই আন্দোলনে প্রবেশ নিষেধ। পশ্চিমবঙ্গের নাগরিক সমাজের অরাজনৈতিক নেতারা এরকমই বলেন সাধারণত। কিন্তু একথা বললে আন্দোলনের লক্ষ্য আরও অস্পষ্ট হবে।

রাজনৈতিক দলগুলোর প্রবেশ না হয় আটকানো গেল, তাদের সহযোগিতা অগ্রাহ্য করা গেল কি? কামদুনির তৃণমূল সরকার রাত দখলের আন্দোলনের বিরোধিতা করেনি। বরং তাদের দখলে থাকা অটো, টোটো ইউনিয়ন বেশি রাতেও যানবাহন সচল রেখে সাহায্য করেছে। বানতলার সিপিএমের শ্রমিক সংগঠন সিটুর দখলে থাকা অ্যাপ ক্যাব চালকদের ইউনিয়নও সহযোগিতা করেছে। তার উপর আন্দোলনকারীরা নিজেরাই মনুবাদী পিতৃতান্ত্রিক বিজেপি সরকারের অধীনে থাকা মেট্রো রেলকে ইমেল করে অনুরোধ জানিয়েছিলেন মেট্রো চালু রাখতে। মেট্রো রেল সে দাবি পূরণ করেছে। এসব না হলে ১৪ তারিখ রাতে কলকাতায় অমন জমায়েত হত কি? হয়েছে ভাল কথা। কিন্তু মেয়েদের রাত দখল কি সফল হয়েছে? প্রশ্নটা তুলতে হচ্ছে, কারণ কদিন পরেই রাজ্য সরকার মহিলাদের রাতে সুরক্ষিত রাখতে যেসব ব্যবস্থা ঘোষণা করেছে, তার অন্যতম হল – মহিলাদের নাইট ডিউটি কম দেওয়া, সম্ভব হলে না দেওয়া। অর্থাৎ রাতের যেটুকু দখল মেয়েদের হাতে এখন আছে, সরকার নিজের অক্ষমতা ঢাকতে সেটুকুও কেড়ে নিতে চায়। তাহলে ‘শাসনহীনতার বিরুদ্ধে সংগঠিত মিছিল’ থেকে দেওয়া হুঁশিয়ারিটা যথেষ্ট জোরদার ছিল কিনা – এই প্রশ্নটা ওঠা উচিত নয় কি?

ঘটনা হল, তথাকথিত নাগরিক আন্দোলনের হুঁশিয়ারি এর চেয়ে বেশি জোরদার হয় না। সেকথা সরকারও জানে। সেই কারণেই কোনো রাজনৈতিক দলের সভা, সমাবেশ, মিছিল হলে যত পুলিস মজুত করা হয় তা এই ধরনের আন্দোলনের জন্য করা হয় না। ২০ অগাস্ট মোহনবাগান-ইস্টবেঙ্গল ম্যাচ বাতিলের পর সমর্থকরা যে প্রতিবাদী জমায়েতের ডাক দিয়েছিলেন, সেটাও অ-দলীয় কিন্তু রাজনৈতিক জমায়েত। অথচ তার প্রতি সরকারের অবিশ্বাস অনেক বেশি ছিল। তাই জমায়েতের ঘোষিত জায়গা (যুবভারতী ক্রীড়াঙ্গন) পর্যন্ত কাউকে যেতেই দেওয়া হয়নি। উপরন্তু কেবল পুলিস নয়, ইস্টার্ন মেট্রোপলিটান বাইপাসে র‍্যাফ পর্যন্ত নামানো হয়। লাঠিও চালানো হয়।

যা-ই হোক, ১৪ অগাস্টের কর্মসূচি অন্তত একটা ব্যাপারে সফল। সরকার ভেবেছিল ওইদিন ওই প্রতিবাদ হতে দিলে পরদিন থেকে প্রতিবাদ থিতিয়ে যাবে। কিন্তু তা ঘটেনি। ফলে এখন দেখা যাচ্ছে সরকার বলছে, সাধারণ মানুষের আন্দোলনে বিরোধীরা ঢুকে পড়ে সরকারের বিরুদ্ধে চক্রান্ত করছে। মৃতার জন্যে ন্যায়বিচার আদায় করা নয়, এর উদ্দেশ্য সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করা। যেহেতু বিজেপি নেতা শুভেন্দু অধিকারী, পরে বামেরাও, মমতার পদত্যাগের দাবি তুলেছেন, সেহেতু একথা আরও বেশি করে বলা হচ্ছে। এতে তৃণমূল আপত্তি করতেই পারে, শঙ্কিতও হতে পারে। কিন্তু তৃণমূলের স্বার্থ যাঁদের স্বার্থ নয়, তাঁরা আপত্তি করবেন কেন? অথচ করছেন। এখানেই পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতির জটিলতা, দ্বিধা।

একনায়কতন্ত্রের সঙ্গে মিল বাড়ছে পশ্চিমবঙ্গের

লক্ষণীয় যে ২০১১ সালের পর থেকে পশ্চিমবঙ্গে একাধিক ভয়ানক ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে এবং পার্ক স্ট্রিট থেকে হাঁসখালি – প্রায় কোথাও মুখ্যমন্ত্রী ধর্ষিতাকে নিয়ে কুমন্তব্য করে ব্যাপারটাকে লঘু করে দিতে ছাড়েননি। তবু বিরোধীরা তাঁর পদত্যাগ দাবি করেনি। তুলনায় এবারে মুখ্যমন্ত্রী অনেক সংযত। প্রথমদিনই বলে দিয়েছিলেন যে মৃতার বাবা-মা চাইলে সিবিআই তদন্তে তাঁর আপত্তি নেই। তাহলে এবার বিরোধীরা পদত্যাগ চাইছেন কেন? কারণটা সহজবোধ্য। মুখ্যমন্ত্রীর কাজের চেয়ে তো আর কথার গুরুত্ব বেশি নয়। এবারের ঘটনায় যুক্ত দুটো দফতরই মুখ্যমন্ত্রীর নিজের হাতে এবং তারা নিজেদের কাজে বিস্তর গাফিলতি করেছে তা ঘটনার দিন থেকেই বোঝা যাচ্ছিল। পরবর্তীকালে হাইকোর্ট এবং সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিরাও সেই মতই ব্যক্ত করেছেন। এ রাজ্যে এমনিতে তৃণমূলের রাজনৈতিক বিরোধীরা ছাড়া প্রায় সকলেই যে কোনো দুর্নীতি, আইনশৃঙ্খলার অবনতির ঘটনায় বলেন – দোষীরা তৃণমূলের লোক হলেও মুখ্যমন্ত্রীর দোষ নেই। সাধারণ ভোটাররাও সাধারণত তাই মনে করেন। হাজারো কেলেঙ্কারি সত্ত্বেও একের পর এক নির্বাচনে তৃণমূলের জয়ের বড় কারণ মমতার এই ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা। রাজ্যের সবচেয়ে গরিব মানুষ, যিনি হয়ত স্থানীয় তৃণমূল নেতাদের দৌরাত্ম্যে অতিষ্ঠ, তাঁরও বিশ্বাস ‘দিদির পার্টির ছেলেগুলো বদমাইশ। দিদি কী করবে?’ কিন্তু আর জি করের ঘটনায় এরকম বলার কোনো উপায় নেই।

শিক্ষা দুর্নীতিতে সব দোষই শিক্ষামন্ত্রী পার্থ চ্যাটার্জি এবং আমলাদের উপর চাপিয়ে দেওয়া গিয়েছিল। গরু পাচার, কয়লা পাচার ইত্যাদি মামলায় তো অভিযুক্ত বা গ্রেফতার হওয়া ব্যক্তিদের সঙ্গে মুখ্যমন্ত্রীর সংযোগ আবিষ্কার করার প্রশ্নই নেই। অনুব্রত মণ্ডল তৃণমূল নেতা বলেই যে মমতা তাঁর থেকে টাকা পান – এমন কথা ইডিও বলেনি। সারদা কেলেঙ্কারিতে দু-একবার মুখ্যমন্ত্রীর নাম এলেও তা গুজবের বেশি এগোয়নি। নারদ কেলেঙ্কারির অভিযুক্তদের সম্পর্কেও মমতা বলতে পেরেছিলেন ‘আগে জানলে ভোটে দাঁড় করাতাম না’। কিন্তু তাঁরই অধীন দুটো দফতর একযোগে খুনের ঘটনায় অবহেলা করল, তিনি কিছুই জানলেন না। উপরন্তু আর জি করের কুখ্যাত অধ্যক্ষ সন্দীপ ঘোষের প্রতি সমবেদনা জ্ঞাপন করলেন সর্বসমক্ষে, তারপর পদত্যাগের কয়েক ঘন্টার মধ্যে তাঁকে অন্য হাসপাতালের অধ্যক্ষ করে দিল তাঁরই দফতর। আদালতের ধমক খেয়ে বাধ্যতামূলক ছুটিতে পাঠানো হল। এত কিছু মুখ্যমন্ত্রীর অগোচরে হয়েছে – একথা চরম মমতাভক্তও কি বিশ্বাস করবে? ২২ তারিখই সুপ্রিম কোর্টে আর জি কর মামলার দ্বিতীয় শুনানিতে সিবিআই অভিযোগ করেছে – অপরাধের অকুস্থলের অবস্থার পরিবর্তন করা হয়েছে মামলা তাদের হাতে যাওয়ার আগেই। প্রধান বিচারপতি ডি ওয়াই চন্দ্রচূড় দেখিয়ে দিয়েছেন যে রাজ্য সরকারের জমা দেওয়া টাইমলাইনে অপরাধীকে শাস্তি দিতে তাদের একনিষ্ঠতা নয়, অনীহাই প্রমাণ হয়।

আইনকানুনের কোনো তোয়াক্কা করা হয়নি। আইনজীবী কপিল সিব্বাল এহেন আচরণের ব্যাখ্যা দিতে খাবি খেয়েছেন। তাই বিচারপতি পরবর্তী শুনানিতে কলকাতা পুলিসের একজন দায়িত্বশীল অফিসারকে উপস্থিত থাকতে বলেছেন, যাঁর কাছে এই অসঙ্গতির সন্তোষজনক উত্তর আছে।

এমতাবস্থায় বিরোধীরা স্বাস্থ্যমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর পদত্যাগ দাবি করলে মহাভারত অশুদ্ধ হবে কেন? যাঁরা বনলতা সেনগিরি অন্যায় মনে করেন না তাঁদের জ্ঞাতার্থে বলা যাক, মমতা নিজে বিরোধী নেত্রী থাকার সময়ে একাধিকবার মুখ্যমন্ত্রীর পদত্যাগ দাবি করেছেন।

উপরের ছবির তারিখগুলো দেখলেই বোঝা যাচ্ছে, ২০০৬ সালে বামফ্রন্ট ২৯৪ আসনের মধ্যে ২৩৫ আসন জিতে আসার পরেও ওই দাবি করেছেন। অর্থাৎ তখন কিন্তু বামফ্রন্টের জনপ্রিয়তা নিয়ে অন্তত সংসদীয় পথে প্রশ্ন তোলার কোনো অবকাশ ছিল না। তবু। সত্যি কথা বলতে, অন্যায় কিছু করেননি। গণতন্ত্রে বিরোধী দলের কাজই হল সরকারের পান থেকে চুন খসলে ক্ষেপে ওঠা। কাজটা মমতা চমৎকার পারতেন। বাম দলগুলো আজ পারে না, জাতীয় স্তরে কংগ্রেসও এই সেদিন পর্যন্ত পারত না। মমতার অবশ্য একটা সুবিধা ছিল। ২০১১ সালের আগের সংবাদমাধ্যম এবং নাগরিক সমাজ মমতাকে ‘আন্দোলনের সুবিধা তুলতে দেওয়া হবে না’ বলত না। সরকারের সমালোচনা করে মমতা রাজ্যের বদনাম করছেন – এই জাতীয় কথা সিপিএম নেতাদের মুখে শোনা গেলেও, নাগরিক সমাজের লোকেরা কখনো বলতেন না। ইতিহাস তো সকলেরই থাকে। মমতারও আছে। তিনি তৃণমূল দল খোলার আগে দীর্ঘকাল কংগ্রেসে ছিলেন। কংগ্রেস আমলে পশ্চিমবঙ্গে যেসব অত্যাচার, অনাচার হয়েছে সেগুলোর দায়ও তাঁর ঘাড়ে চাপা উচিত তাহলে। কারণ তিনি কোনোদিন বলেননি যে তিনি সেসবের জন্যে লজ্জিত। উপরন্তু তিনি পশ্চিমবঙ্গের ইতিহাসের সবচেয়ে কুখ্যাত মুখ্যমন্ত্রী সিদ্ধার্থশঙ্কর রায়ের স্নেহভাজনও ছিলেন। এতৎসত্ত্বেও মমতাকে কংগ্রেসের কুকীর্তি মনে করিয়ে দিয়ে চুপ থাকতে বলত না কেউ। কারণ সেটা অপ্রাসঙ্গিক। কে আগে ক্ষমতায় থাকার সময়ে কী করেছিল, তার জন্যে তার পরবর্তী সরকারের বিরুদ্ধে কথা বলার অধিকার নেই, আন্দোলন করার অধিকার নেই – একথা যারা বলে তারা আসলে স্থিতাবস্থার সমর্থক। কোনো দল বা জোট সরকারে থাকাকালীন কুকর্ম করলে তার শাস্তি হিসাবে ভোটাররা তাদের ক্ষমতাচ্যুত করে অন্য কাউকে ক্ষমতায় আনেন। তাদের শাসন অপছন্দ হলে আবার তাদেরও তাড়ান – এভাবেই গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা চলে। ভোটারদের বিশ্বাস অর্জন করতে বিরোধী দলগুলোকে অনবরত লড়াই করে যেতে হয়, সরকার পক্ষের ভুলের ফায়দা তোলার চেষ্টা করতে হয়। এই কাঠামোর বাইরেও একজন বা কয়েকজন নাগরিক অথবা কোনো সংগঠন নির্দিষ্ট দাবি বা দাবিসমূহ নিয়ে আন্দোলন করতেই পারে। কিন্তু কোনো আন্দোলনে অমুককে ঢুকতে দেব না, তমুককে থাকতে দেব না বলাও যে অগণতান্ত্রিক এবং এক ধরনের বামনাই – তা মনুবাদের বিরুদ্ধে আন্দোলন করা ব্যক্তিরাও উপলব্ধি করছেন না।

আরও পড়ুন সব ধর্ষণ সমান নয়

আন্দোলনে একমাত্র তাকেই ঢুকতে দেব না বলা সঙ্গত, যার বিরুদ্ধে আন্দোলন। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গ জুড়ে এই মুহূর্তে নাগরিক সমাজের বিভিন্ন অংশ যে তথাকথিত অরাজনৈতিক আন্দোলনগুলো করছেন, সেগুলো যে কার বিরুদ্ধে তা প্রায়শই বোঝা যাচ্ছে না। অনেক সময় আন্দোলনকারীরা নিজেরাই জোরের সঙ্গে বলছেন – কারোর বিরুদ্ধে নয়। ২২ তারিখ রাত দখল আন্দোলনের আহ্বায়ক বলে পরিচিত রিমঝিম সিনহা ২৫ অগাস্ট (রবিবার) রাতে ফের টর্চ জ্বেলে, বেগুনি পতাকা নিয়ে এক আন্দোলনের ডাক দিয়েছিলেন। সেই ডাক দেওয়ার ভিডিওতেও এই আন্দোলন কার বিরুদ্ধে তা বলা হয়নি, যদিও বলা হয়েছে ‘আজ ২২ অগাস্ট, প্রায় ১২ দিন কেটে গেল, সুবিচার আসেনি। আর জি করের ঘটনার সঙ্গে জড়িত সকলকে গ্রেফতার করাও হয়নি।’ আন্দোলনের এক বিখ্যাত মুখ, অভিনেত্রী সোহিনী সেনগুপ্ত ২৩ অগাস্ট (শুক্রবার) তারিখের আনন্দবাজার পত্রিকায় লিখেছেন ‘একজনকে থামালে হাজার হাজার গলা আরও জোরে চিৎকার করবে’। এই শিরোনাম দেখে ভাবলাম যে থামাচ্ছে তার বিরুদ্ধে শেষমেশ বোধহয় দুকথা লিখেছেন। কিন্তু পড়তে গিয়ে হতাশ হলাম। উনি বরং লিখেছেন ‘আমাদের প্রত্যেকের নিজস্ব রাজনৈতিক বোধ রয়েছে। সেটা দিয়ে, আর নিজেদের সুবুদ্ধি দিয়ে আমরা ‘অ্যাপলিটিক্যাল’ শব্দটি ব্যবহার করছি। এটার মানে কিন্তু এই নয় যে, আমাদের কোনও পক্ষ নিতে হবে। আমাদের কেন কোনও পক্ষ নিতে হবে? আমাদের নিজের কণ্ঠস্বরই আমাদের পক্ষ।’

ন্যায়বিচার চাই বলছি, কিন্তু কার কাছে চাই বলছি না – এর কারণ কী? দুটো কারণ সম্ভব। ১) কার কাছে ন্যায়বিচার চাইছি নিজেও জানি না, ২) জানি, কিন্তু বলতে চাইছি না। কারণ বললেই বোঝা যাবে যে সে ন্যায়বিচার দিচ্ছে না। এই সত্য তাকে বিপদে ফেলবে। কিন্তু আমি কোনো কারণে তাকে বিপদে ফেলতে চাই না।

সমাজের উচ্চকোটির যথেষ্ট লেখাপড়া জানা নারী (এবং পুরুষরা) যেহেতু এই নাগরিক আন্দোলনের মুখ, সেহেতু প্রথম সম্ভাবনাটা বাতিল করে দেওয়াই শ্রেয়। সোহিনী তাঁর লেখার উপর্যুক্ত অংশের পরেই একটা বাচ্চা মেয়ের উল্লেখ করে লিখেছেন সে-ও হাতে মোমবাতি নিয়ে চিৎকার করতে করতে ন্যায়বিচার দাবি করেছে। তারপর মন্তব্য করেছেন ‘সে রাজনীতির কী বোঝে?’ প্রশ্ন হল, সে ন্যায়বিচারেরই বা কী বোঝে? তাকে বড়রা কিছু একটা বুঝিয়েই তো নিয়ে এসেছিলেন প্রতিবাদে? তা আর জি কর কাণ্ড যেভাবে গড়িয়েছে গত কয়েক দিনে, তাতে ওই বাচ্চা মেয়ের বড়রা নিশ্চয়ই বুঝে গেছেন যে যথাসময়ে এফআইআর না করে, মৃতার বাবা-মাকে বিভ্রান্ত করে, এমনকি তড়িঘড়ি মৃতদেহ হাসপাতাল থেকে বার করে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে ন্যায়বিচারের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে এ রাজ্যের সরকারই। কথাটা অনেকে বুঝে গেছেন বলেই শতাব্দী, রিমঝিম, সোহিনীরা ঢোঁক গিললেও ১৪ তারিখ রাতেই এবং তারপর থেকে কোনো কোনো নাগরিক মিছিলেও সরাসরি সরকারবিরোধী স্লোগান শোনা গেছে। তাহলে এবার দ্বিতীয় সম্ভাবনার আলোচনায় আসা যাক।

কী কারণে তৃণমূল সরকারকে বিপদে ফেলতে চাই না? এটাই বাংলার রাজনীতির সেই দ্বিধা, যার কথা এই লেখার প্রথম পর্বে উল্লেখ করেছিলাম। এই রাজ্যে বহু মানুষ আছেন যাঁরা আন্তরিকভাবে বিজেপি-আরএসএসের বিরোধী, আবার এও বোঝেন যে তৃণমূল সরকার বিস্তর অন্যায় করে চলেছে। কিন্তু মনে করেন সিপিএম/বামফ্রন্টকে আর ভোট দেওয়া চলে না (এরকম মনে হওয়ার জন্যে বাম নেতৃত্বের দিশাহীনতা, সাংগঠনিক ব্যর্থতা এবং বিজেপিবিরোধিতায় সিদ্ধান্তহীনতা যথেষ্ট পরিমাণে দায়ী)। অতএব বিজেপিকে আটকাতে তৃণমূলকেই ক্ষমতায় রাখতে হবে।

এই মনোভাবকে প্রশ্ন করার সময় এসে গেছে। নিঃসন্দেহে বিজেপি-আরএসএস যে কোনো রাজ্যের পক্ষেই ধ্বংসাত্মক শক্তি। কিন্তু তৃণমূল যে ধ্বংসাত্মক নয় – একথা কি আর বলা চলে? স্রেফ উল্টোদিকে আরও খারাপ একটা শক্তি আছে – এই যুক্তিতে পার্শ্ববর্তী বাংলাদেশেও শেখ হাসিনার দলের দমনপীড়ন, এমনকি নির্বাচনকে প্রহসনে পরিণত করা মেনে নিয়েও তাঁকেই বহুকাল ধরে সমর্থন করছিলেন প্রগতিশীলরা। কিন্তু মানুষের সহ্যের সীমা থাকে। চৈনিক চক্রান্তই বলুন আর মার্কিন চক্রান্তই বলুন – একটা দল কোনো ভূখণ্ডে বারবার ভোটই হতে দেবে না, সেই ভূখণ্ডের মানুষ তা কতবার কোন কোন যুক্তিতে মেনে নেবেন? পুলিস, অন্যান্য সশস্ত্র বাহিনী এবং শাসক দলের গুন্ডাদের গুলিতে প্রাণ গেলেও মানুষ অন্যদিকে মৌলবাদীরা আছে বলে মুখ বুজে থাকবে – এ জিনিস তো চিরকাল চলে না। স্বীকার্য যে পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভা, লোকসভায় ভোটদানে যে হিংসা, কারচুপি হয় তা এ আমলে নতুন নয়। মমতা ভোটকে হাসিনার মত প্রহসনে পরিণত করেছেন বলা যাবে না। কিন্তু ক্রমশ সেদিকেই এগোচ্ছেন বললে নেহাত ভুল বলা হবে কি?

পরপর দুটো পঞ্চায়েত নির্বাচন কিন্তু প্রহসনেই পরিণত হয়েছে। ২০১৮ সালে পশ্চিমবঙ্গের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি সংখ্যক আসনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছিলেন শাসক দলের প্রার্থীরা। ভোটের দিন রক্তারক্তি দেখতে অভ্যস্ত এই রাজ্যের মানুষও মনোনয়ন পত্র জমা দেওয়ার সময়েই অত মারামারি, মহিলাদের শাড়ি খুলে নেওয়া ইত্যাদি দেখতে অভ্যস্ত ছিলেন না। ২০২৩ পঞ্চায়েত নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয়নি এমন আসনের সংখ্যা নেমে আসে ৯.৫ শতাংশে। কিন্তু তা যত না শাসকের বদান্যতায়, তার চেয়ে বেশি বিরোধীদের লড়াকু মনোভাবের কারণে। মনোনয়ন জমা দেওয়ায় অত্যন্ত কম সময় দিয়ে, জমা দিতে আসা প্রার্থীদের নিরাপত্তা দিতে না পেরে ভোটের আগেই শিরোনামে চলে আসেন রাজ্য নির্বাচন কমিশনার রাজীব সিনহা। তবে আসল খেলা হল ভোট গণনার সময়ে। হিংসা তো হলই, জয়ী প্রার্থীকে আমলারা সার্টিফিকেট দেননি এমন অভিযোগ উঠল। মাঠে ঘাটে ব্যালট ও ব্যালট বাক্স পড়ে থাকতে দেখা গেল, প্রচুর মামলা হল এবং আদালতের নির্দেশে বহু আমলার চাকরি নিয়ে টানাটানি পড়ল।

সিবিআই আর ইডি যে অসংখ্য দুর্নীতির মামলায় তৃণমূলের বিভিন্ন নেতা, মন্ত্রীকে গ্রেফতার ও জিজ্ঞাসাবাদ করেছে সেগুলো থমকে গেছে। ঠিক যেভাবে সারদা ও নারদ মামলার কোনো নিষ্পত্তি হয়নি। তার মানে এই নয় যে তৃণমূল দুর্নীতিমুক্ত। একথা তৃণমূলকে ফ্যাসাদে ফেলতে না চাওয়া মানুষও জানেন। আজ এখানে বাড়ি ভেঙে পড়ছে, কাল ওখানে বাজি তৈরির কারখানায় বিস্ফোরণ হওয়ার পর দেখা যাচ্ছে সেখানে বোমা তৈরি হত, পরশু তৃণমূলের কাউন্সিলররাই প্রকাশ্যে মারামারি করছেন, তার পরদিন কোনো সমাজবিরোধী গ্রেফতার হওয়ায় প্রবীণ বিধায়ক আর সাংসদ (মদন মিত্র, সৌগত রায়) ফোনে খুনের হুমকি পাওয়ার অভিযোগ করছেন – এসব তো এ রাজ্যে চলছিলই। আর জি কর কাণ্ডে দেখা গেল সরকারি হেফাজতে সরকারি কর্মচারীর জান, মালের সুরক্ষাও নেই। সেটা শুধু ধর্ষণ, খুনে প্রমাণিত হয়নি; ১৪ অগাস্ট রাতে হাসপাতালে যে তাণ্ডব চলেছে তাতেও প্রমাণিত হয়েছে। সেদিন ডিউটিতে থাকা নার্সরা জানিয়েছেন, পুলিস তাঁদের নিরাপত্তা দিতে তো ব্যর্থ বটেই, নিজেদের নিরাপত্তার জন্যও তাঁদের কাছেই হাত পেতেছিল। বিজেপি এসে যেতে পারে – স্রেফ এই যুক্তিতে এই চরম নৈরাজ্য দেখেও কি তৃণমূলকে যেনতেনপ্রকারেণ সুরক্ষা দেওয়া চলে? রাজ্যের সব মানুষেরই ভাবার সময় এসেছে।

ভোট তো এখনো অনেক দূরে। ইতিমধ্যে তৃণমূল শুধরেও তো যেতে পারে, যদি টের পায় মানুষ তাদের কর্মকাণ্ডে খুশি নন। কিন্তু প্রাণপণে তাদের অন্যায় ঢাকা দেওয়ার চেষ্টা করলে তো দমনপীড়ন বেড়েই চলবে। ঠিক যা এই মুহূর্তে ঘটছে। ফুটবল মাঠে সমর্থকরা কিছু টিফো দেখাবেন – এই আশঙ্কায় একটা নিরীহ ফুটবল ম্যাচ বাতিল করে দিয়ে আরও বড় প্রতিবাদের রাস্তা খুলে দেওয়া হল। তারপর সেই প্রতিবাদও আটকাতে নিরস্ত্র ফুটবলপ্রেমীদের উপরে লাঠি চালানো হল। এখন স্কুলগুলোকে পর্যন্ত সরকার আদেশ দিচ্ছে – সরকারি অনুষ্ঠান ছাড়া কোনোকিছুতে ছাত্রছাত্রীদের নিয়ে যাওয়া চলবে না।

গণতন্ত্রের চেয়ে একনায়কতন্ত্রের সঙ্গেই যে এই আচরণের মিল বেশি, তা নাগরিক সমাজ স্বীকার না করলে নিজেদের কোনো দলীয় পরিচয় নেই বলে কোন মুখে?

দলহীন প্রতিবাদ সংঘ পরিবারের পক্ষে সুবিধাজনক

সব কথার পরেও রাজনৈতিক দলগুলো সম্পর্কে একটা অরাজনৈতিক আপত্তি উঠবেই। তা হল, দলগুলো নিজেদের রাজনৈতিক স্বার্থ ছাড়া কিছু দেখে না। অতএব প্রতিবাদকে তাদের হাতে চলে যেতে দেওয়া যায় না। এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত হওয়া উচিত কোন রাজনৈতিক দলের স্বার্থ কী তার বিচার করে। যেমন বিজেপি, কংগ্রেস, সিপিএম – সকলেরই রাজনৈতিক স্বার্থ ক্ষমতায় আসা। বিরোধীদের ক্ষমতায় আসতে চাওয়া যে পাপ নয়, একথাটা ২০১১ সালের পর থেকে পশ্চিমবঙ্গের এবং ২০১৪ সালের পর থেকে গোটা দেশের মানুষকে বলে বোঝাতে হয়। সে না হয় হল। কিন্তু এরপরেও বিচার করা দরকার, ক্ষমতায় এলে কে কী করতে পারে? সিপিএম আর কংগ্রেস (একলা বা জোটে) কী করতে পারে তা বোধহয় তারা নিজেরাও ভেবে দেখেনি। সেই কারণেই তাদের ভোট দেওয়ার কথা কেউ ভাবতে পারে না। কিন্তু বিজেপি ক্ষমতায় এলে কী করবে তা নিয়ে বুদ্ধি বিসর্জন না দেওয়া মানুষের সন্দেহের কোনো অবকাশ নেই। নরেন্দ্র মোদী সরকারের কার্যকলাপ দেখে যদি যথেষ্ট শিক্ষা না হয়ে থাকে, তাহলে বিজেপিশাসিত গুজরাট, মণিপুর, ত্রিপুরা, উত্তরপ্রদেশ, হরিয়ানা, মহারাষ্ট্র, আসাম – যে রাজ্য ইচ্ছা হয় দেখে নিন। তাহলেই বিজেপির হাতে প্রতিবাদ চলে যাওয়ার বিপদের সঙ্গে অন্যদের হাতে চলে যাওয়ার ফলের তফাত স্পষ্ট হবে। কিন্তু এসব রাজনৈতিক বিচারে আবার নাগরিক সমাজের লোকেরা যেতে চান না। রাজনৈতিক স্বার্থ তাঁদের কাছে প্রায় অপশব্দ। অনেক মানুষের কাছেই তাই হয়ে দাঁড়ানোর পিছনে রাজনৈতিক দলগুলোর যে কোনো দায় নেই তা নয়। কিন্তু যাঁরা দলগুলোর ঊর্ধ্বে উঠে ন্যায়ের জন্য, রাজ্যের ভালর জন্য দাঁড়িয়েছেন বলে দাবি করেন, তাঁদের কি কোনো স্বার্থ নেই? সেটাও একটু পরখ করে নেওয়া ভাল।

২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনের জন্যে ‘নো ভোট টু বিজেপি’ বলে এক প্রচারাভিযানে নেমেছিল বাংলার নাগরিক সমাজ। বাম কর্মী, সমর্থকরা রুষ্ট হয়েছিলেন। তাঁরা মনে করেছিলেন, এটা ঘুরিয়ে নাক দেখানোর মত করে তৃণমূলকে ভোট দিতে বলা। এই প্রচারাভিযানে যুক্ত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে তৃণমূলের থেকে টাকাপয়সা নেওয়ার ভিত্তিহীন অভিযোগও তুলেছিলেন। তবে পরে বালিগঞ্জ বিধানসভা কেন্দ্রের উপনির্বাচনে এবং ২০২৪ সালে দক্ষিণ কলকাতা লোকসভা কেন্দ্রে ওই প্রচারাভিযানের অন্যতম মুখ সায়রা শাহ হালিমকে সিপিএম প্রার্থী করে। কিন্তু ঘটনা হল, ওই প্রচারাভিযানের উদ্যোগীদের একজন – সামিরুল ইসলাম – পরে তৃণমূলের হয়ে রাজ্যসভায় চলে গেছেন।

‘নো ভোট টু বিজেপি’-কে জনপ্রিয় করতে জরুরি ভূমিকা নিয়েছিল একখানা মিউজিক ভিডিও। সেখানে দেখা গিয়েছিল বাংলা থিয়েটার ও সিনেমা জগতের একগুচ্ছ তারকাকে। সেখানে যেমন সব্যসাচী চক্রবর্তী, চন্দন সেন, রাহুল অরুণোদয় বন্দ্যোপাধ্যায়ের মত মার্কামারা সিপিএম ছিলেন; তেমন ছিলেন দলহীন পরমব্রত চট্টোপাধ্যায়। তিনি সেইসময় বিজেপির বিরুদ্ধে কাগজে লেখালিখিও করেছিলেন। ২০২১ নির্বাচনের কিছুদিন পরেই দেখা গেল, তিনি দেউচা পাঁচামিতে কয়লাখনি হওয়া নিয়ে স্থানীয় মানুষের সঙ্গে সরকারের সমন্বয় সাধনের জন্য তৈরি এক রাজ্য সরকারি কমিটির প্রধান নিযুক্ত হয়েছেন। তিনি কয়লার কী জানেন, খনির কী জানেন, আদিবাসীদেরই বা কী জানেন – তা কি নিজেও জানেন? ২০২৩ সালে এসে এক সাক্ষাৎকারে পরমব্রত জানান যে তিনি ওই কমিটি থেকে পদত্যাগ করেছেন, ‘সেপ্টেম্বর বা অক্টোবরে।’ কারণ তাঁকে যে কাজ দেওয়া হয়েছিল সে কাজ নাকি শেষ হয়ে গেছে। কী কাজ, সে কাজ করতে গিয়ে কী পাওয়া গেল – এই ধরনের কমিটি সম্পর্কে এসব প্রশ্ন ভারতবর্ষে কোনোদিনই কেউ তোলে না। কিন্তু ব্যক্তিগতভাবে অন্তত দুজনকে চিনি, যাঁরা ‘নো ভোট টু বিজেপি’-র লোকেদের তৃণমূল সরকারের থেকে এরকম সুবিধা গ্রহণ করা দেখে বিতৃষ্ণায় ২০২৪ নির্বাচনের আগে আর এই ধরনের কোনো উদ্যোগে জড়িত হতে চাননি। নিশ্চিতভাবে এমন মানুষ আরও আছেন। সম্ভবত সে কারণেই এবারে আর ওই ক্যাম্পেনকে অন্তত ওই নামে দেখা যায়নি। কথা হল, দলের ঊর্ধ্বে দণ্ডায়মানরা যদি এমনভাবে ব্যক্তিস্বার্থ চরিতার্থ করেন, তাহলে দলগুলোর দোষ কী? তারা তো তবু কোনো একটা সমষ্টির স্বার্থ চরিতার্থ করতে চায়।

দলগুলোর সততা নেই, বিশেষত কাজে আর কথায় মিল নেই, তাই তাদের বিশ্বাস করা যায় না – এই বয়ান বাংলার নাগরিক সমাজে খুব জনপ্রিয়। কথাটা যে পুরোপুরি মিথ্যে তাও নয়। দলগুলোও সেকথা জানে। গত কয়েক বছরে বামেদের দলের পতাকা বাদ দিয়ে মিছিল, মিটিংয়ের ডাক দেওয়ার অভ্যাস হয়ত তারই স্বীকৃতি। সিপিএমের লোকেদের সংগঠিত মিছিল, রাজ্য সম্পাদক মহম্মদ সেলিম স্বয়ং হাঁটছেন, অথচ বলা হচ্ছে নাগরিক মিছিল – এমন অসংখ্য দৃষ্টান্ত আছে। এমন ব্যানারবিহীন দলীয় অভিযানের সাম্প্রতিকতম উদ্যোগ অবশ্য দক্ষিণপন্থীদের – মঙ্গলবারের নবান্ন অভিযান, যার ডাক দিয়েছিল ‘বাংলার ছাত্রসমাজ’। সে এমন ছাত্রসমাজ যে তাতে সহজেই যুক্ত হয়ে যান ব্যারাকপুরের অর্জুন সিং, সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করে নেন লম্বা সাদা দাড়িওলা এক সাধু। কিন্তু অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে রাজনৈতিক দলগুলোকে অস্বীকার করে বিশ্ব ছাড়ায়ে উঠতে চান যে বিদ্রোহীরা, তাঁদের সততার উদাহরণগুলোও যে নিদারুণ।

যেমন ধরুন দামিনী বেণী বসু। কয়েক মাস আগেই তাঁর একটা লেখা নিয়ে হইচই পড়ে গিয়েছিল। টিনের তলোয়ার নাটকে ধর্ষণে অভিযুক্ত অভিনেতা সুদীপ্ত চট্টোপাধ্যায়কে অভিনয়ের সুযোগ দেওয়ার প্রতিবাদ করে নির্দেশক সুমন মুখোপাধ্যায়কে সোশাল মিডিয়ায় খোলা চিঠি লিখেছিলেন দামিনী। তা নিয়ে একটা ওয়েবসাইটে খবর হয়, পরে সে খবর সরিয়ে দেওয়া হয়। দামিনী দাবি করেন যে সুমনের অঙ্গুলিহেলনেই ওই লেখা সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। এর প্রতিবাদে অন্য এক সাইটে লেখেন। সে লেখায় অন্য অনেক কথার সঙ্গে দামিনী লেখেন, বাংলা থিয়েটারে ‘রেপ-কালচার’ চালু আছে। সুমন দামিনীর সেই লেখার লিখিত উত্তরও দেন। বলা বাহুল্য, দামিনী মিথ্যা অভিযোগ করেছিলেন এমন প্রমাণ যখন নেই, তখন বেশ করেছিলেন। কিন্তু মুশকিল হয়েছে ওই কথায় আর কাজে মিল নিয়ে। গত সপ্তাহে কলকাতার এক বিলাসবহুল হোটেলে বিতরণ করা হয়েছে দেবী অ্যাওয়ার্ডস ২০২৪। অতীতে এই পুরস্কার যাঁরা প্রত্যাখ্যান করেছেন তাঁদের মধ্যে আছেন তামিলনাড়ুর দলিত কবি সুকীর্তা রানি। গতবছর ফেব্রুয়ারি মাসে এই পুরস্কার প্রত্যাখ্যান করার কারণ হিসাবে তিনি ফেসবুকে লেখেন ‘আমি সবে গতকাল জানতে পেরেছি যে এই অনুষ্ঠানের প্রধান স্পনসর হল আদানি গ্রুপ। আমি এমন কোনো সংগঠনের হাত থেকে বা এমন কোনো অনুষ্ঠানে পুরস্কার নিয়ে খুশি হব না, যা আদানির আর্থিক সাহায্যপ্রাপ্ত। কারণ সেটা আমি যে রাজনীতির কথা বলি বা যে আদর্শে বিশ্বাস করি তার পরিপন্থী। তাই আমি এই পুরস্কার গ্রহণ করব না।’

লিঙ্গ রাজনীতি, আদর্শ ইত্যাদি সম্পর্কে দামিনীকে অত্যন্ত সচেতন একজন শিল্পী হিসাবেই আমরা চিনেছি। এবছর ওই পুরস্কারপ্রাপ্ত ১৩ জন মহিলার মধ্যে একজন সেই দামিনী। তাঁর হাতে পুরস্কার তুলে দিয়েছেন কে? বিজেপি নেত্রী স্মৃতি ইরানি। বিজেপি ভারতের একমাত্র রাজনৈতিক দল যাদের নেতারা ধর্ষকের সমর্থনে মিছিল করে; যাদের সরকার ধর্ষণে শাস্তিপ্রাপ্তদের কেবল ক্ষমা করে দেয় না, মালা পরিয়ে, মিষ্টি খাইয়ে বরণ করে নেয়; রাতের অন্ধকারে পুলিস পাঠিয়ে ধর্ষিতার পরিবারকে আটকে রেখে দেহ ছিনিয়ে নিয়ে পুড়িয়ে দেয়। সেই দলের নেত্রীর হাত থেকে হাসিমুখে পুরস্কার নিয়েই দামিনী ক্ষান্ত দেননি। আর জি কর কাণ্ড নিয়েও দুকথা বলে দিয়েছেন সুললিত ইংরিজিতে। হরিবংশ রাই বচ্চন রচিত ‘অগ্নিপথ’ কবিতার লাইন আউড়ে যৌন অপরাধের বিরুদ্ধে লড়ার শপথ-টপথ নিয়েছেন, সেই শপথে গলা মেলানোর জন্য মাইকটা স্মৃতির দিকে এগিয়েও দিয়েছেন।

পুরস্কৃতদের মধ্যে ছিলেন টালিগঞ্জের অভিনেত্রী শুভশ্রী গাঙ্গুলিও। তিনিও পুরস্কার গ্রহণ করে বলেন ‘আমি সম্মানিত এবং কৃতজ্ঞ। কিন্তু সেই কথাতেই ফিরে আসতে হচ্ছে। খুশি নই। আমরা সবাই ভেঙে পড়েছি। আজকে এই পুরস্কার পেয়ে আমি নিশ্চয়ই খুশি, কিন্তু আনন্দ করতে পারছি না।’ শুভশ্রীকে এই পুরস্কার নেওয়ার কয়েকদিন পরে আর জি কর কাণ্ডে ন্যায়বিচার চেয়ে সিনেমা পাড়ার শিল্পীদের মিছিলেও হাঁটতে দেখা গেছে।

একই অঙ্গে এত রূপ দেখে সন্দেহ হয় – এঁদের প্রতিবাদ, আন্দোলনের পিছনেও আসলে নিজের যশলোভ। ওটা নিশ্চিত করতেই কখনো ক্ষমতাসীন তৃণমূলের দোষ নিয়ে চুপ করে থাকা, কখনো বিজেপি নেত্রীর হাত থেকে পুরস্কার নিয়ে যৌন অপরাধের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের ডাক দেওয়া। রাজনৈতিক নেতাদের সম্পর্কে খুব চালু কথা – তাঁরা জনতাকে ভুলিয়ে নিজেদের স্বার্থসিদ্ধি করেন। ১৪ তারিখ রাতে যে মহিলারা রাত দখলের ডাক পেয়ে পথে বেরিয়েছিলেন বা এখন শিল্পীদের মিছিল দেখে উদ্বুদ্ধ হচ্ছেন, তাঁদেরও কি তথাকথিত নাগরিক সমাজের এই নেতৃস্থানীয়রা ভোলাচ্ছেন না? নেতাদের নিদেনপক্ষে ভোট চাইতে আসতে হয়, তাই খানিকটা দায়বদ্ধতা থাকে। নাগরিক সমাজের নেতাদের তো সে চিন্তাও নেই। একটা রাজ্যসভার আসন অথবা সরকারি কমিটির সদস্যপদ, নিদেন কাগজে লেখা বা নাম বেরনো, খবরের চ্যানেলের প্যানেলে গিয়ে বসার ব্যবস্থা করতে পারলেই কাজ হাসিল। তার চেয়ে মহত্তর কোনো ন্যায়বিচার কি সত্যিই তাঁরা চান?

একবিংশ শতকে পৃথিবীর বহু দেশেই অবশ্য এরকম দলবিহীন নাগরিক সমাজের আন্দোলন দেখা যাচ্ছে। অনেকে এই প্রবণতা নিয়ে খুব উৎসাহিত। তাঁরা বলেন এটাই নতুন যুগের রাজনীতি। যুগে যুগে রাজনীতি যে বদলায় সেকথা তো ঠিকই। তবে এখন পর্যন্ত এ ধরনের রাজনীতি কিন্তু কোথাও প্রগতিশীলদের জয়যুক্ত করেনি। ‘অক্যুপাই ওয়াল স্ট্রিট’ কিছু অর্জন করতে পারেনি। তাহরীর স্কোয়ার থেকে শুরু হওয়া আরব বসন্তও কোনো নতুন ভোর নিয়ে আসেনি। বাংলাদেশে কদিন আগে হওয়া বিদ্রোহের পরিণামও যে প্রগতিশীল হবে তা এখনই বলা যাচ্ছে না। সেদেশের বামপন্থী, প্রগতিশীল শক্তির বেশকিছু অপছন্দের ঘটনাও ঘটছে মুহাম্মদ ইউনুসের সরকারের আমলে। উপরন্তু আমাদের দেশে দলবিহীন, পতাকাবিহীন ‘ইন্ডিয়া আগেনস্ট করাপশন’ এবং নির্ভয়া কাণ্ডের পরবর্তী আন্দোলনের পরিণাম হয়েছে ভয়াবহ। হিন্দুত্ববাদীদের ক্ষমতায় আনতে বড় ভূমিকা পালন করেছিল ওই দুটো আন্দোলন। কারণ বোধহয় এই, যে যেখানে কোনো পতাকা নেই সেখানে সংঘ পরিবারের লোকেরা সামাজিক সংগঠন করার দীর্ঘ অভিজ্ঞতা ব্যবহার করে খুব সহজেই সেঁধিয়ে যেতে পারে। সুতরাং রাজনৈতিক দলগুলোকে বাইরে রেখে নাগরিক সমাজের স্বয়ংক্রিয় আন্দোলনকে জয় বলে ভেবে নেওয়া বিপজ্জনক। এতে বেয়াদপ শাসককে শিক্ষা দেওয়া হচ্ছে কিনা তা যেমন ভাবার, তেমনই বিজেপিকে আটকানো হচ্ছে মনে করে বিজেপির রাস্তাই পরিষ্কার করা হচ্ছে কিনা তাও ভেবে দেখা দরকার।

২০১৪ সালে মোদী সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকে এই প্রথম কোনো অ-বিজেপি রাজ্য সরকারের বিরুদ্ধে এত বড় গণআন্দোলন হচ্ছে। কেন পশ্চিমবঙ্গেই এমন হল? যে প্রতিবাদীরা একাধারে ফ্যাসিবিরোধী এবং তৃণমূলের কোনো দোষ দেখতে পান না, তাঁরা কি ভেবে দেখবেন?

নাগরিক ডট নেটে প্রকাশিত

অরাজনীতির হাত থেকে কবে স্বাধীন হবে পশ্চিমবঙ্গের মানুষ?

আমরা ছোট থেকেই শিখে এসেছি – রাজনীতি খুব খারাপ জিনিস। পশ্চিমবঙ্গের যাবতীয় দুরবস্থার মূলে হল রাজনীতি। আমাদের বড়রা আনন্দবাজার পত্রিকা পড়ে দিনরাত এই আলোচনাই করতেন

স্বাধীনতা দিবসে খুব ভোরবেলা ঘুম ভেঙে গেল। মাইকে দেশাত্মবোধক গান ভেসে এসে নয়, একটা স্বপ্ন দেখে।

দেখলাম সেলুলার জেলের সামনে দাঁড়িয়ে নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর আর বাঘাযতীন কীসব আলোচনা করছেন। পাশেই একটা লম্বা বাঁশে ভারতের পতাকা ফুল-টুল দিয়ে বাঁধা রয়েছে, ওঁরা কেউ তুলবেন বোধহয়। মাইকে ঝাঁ ঝাঁ করে ‘কদম কদম বঢ়ায়ে যা’ বাজছে আর আজাদ হিন্দ ফৌজ সাবধান পজিশনে দাঁড়িয়ে আছে। আমি একখানা রেকর্ডার বাগিয়ে ধরে এগিয়ে গেছি, তিনজনের বক্তব্য রেকর্ড করব বলে। কিন্তু তার আগেই নেতাজি হাত নেড়ে কাকে একটা ডাকলেন। দেখি – ক্ষুদিরাম বসু। তিন বয়োজ্যেষ্ঠ মিলে তাঁকেই এগিয়ে দিলেন পতাকা তুলতে। দেখে আমার বুকের ছাতি তো ৫৬ ইঞ্চি হবার জোগাড়। নেতাদের কোট চাইতে ভুলেই গেছি। ক্ষুদিরাম পতাকা তুললেন, একগাদা গাঁদা ফুল ঝরে পড়ল আর গোটা আজাদ হিন্দ ফৌজ ‘জয় হিন্দ’ বলে স্যালুট করল। আমিও উৎসাহের চোটে ‘জয় হিন্দ’ বলে সেলাম ঠুকে ফেলেছি। অমনি কানের কাছে কে যেন বলে উঠল ‘এ কী! এখানে স্লোগান দিচ্ছেন! ছিঃ! এটা একটা জাতীয় অনুষ্ঠান। দয়া করে এটাকে পলিটিসাইজ করবেন না।’ তাকিয়ে দেখি হাফপ্যান্ট পরা সুমন দে। আমি বলতে যাচ্ছিলাম, স্বাধীনতা সংগ্রাম ব্যাপারটাই তো রাজনৈতিক। তাহলে স্বাধীনতা দিবস অরাজনৈতিক হয় কী করে? সেখানে স্লোগান দেওয়া যাবে না-ই বা কেন? কিন্তু তার আগেই রবীন্দ্রনাথ সুমনবাবুর পিঠে মারলেন এক রদ্দা। অঙ্ক না পারলে আমাদের স্কুলের জহরবাবু যেরকম মারতেন, একেবারে সেইরকম। সুমনবাবু করুণ মুখে পিঠে হাত বুলোতে বুলোতে বললেন ‘কেস দেবেন না, প্লিজ’। অমনি আমার ঘুমটা ভেঙে গেল।

এরকম জগাখিচুড়ি স্বপ্ন কেন দেখলাম ভাবতে ভাবতে মনে হল, আমি যে প্রজন্মের লোক তাতে স্বাধীনতা দিবসে এই স্বপ্ন দেখাই স্বাভাবিক। কারণ আমরা ছোট থেকেই শিখে এসেছি – রাজনীতি খুব খারাপ জিনিস। পশ্চিমবঙ্গের যাবতীয় দুরবস্থার মূলে হল রাজনীতি। আমাদের বড়রা আনন্দবাজার পত্রিকা পড়ে দিনরাত যা আলোচনা করতেন তার মোটামুটি নির্যাস হল –

১) পশ্চিমবঙ্গে কোনো কাজ হয় না, কারণ বনধ হয়।
২) পশ্চিমবঙ্গে শিল্প হয় না, কারণ শ্রমিকরা রাজনীতি করে।
৩) পশ্চিমবঙ্গের স্কুলে লেখাপড়া হয় না, কারণ মাস্টাররা রাজনীতি করে।
৪) পশ্চিমবঙ্গের কলেজে ছাত্রছাত্রীরা পড়াশোনা করে না, কারণ রাজনীতি করে।

ফলে ২০১১ সালে যখন বামফ্রন্ট সরকার বিদায় নিল, তখন আমাদের প্রজন্মের অনেকেই স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছিল। আমাদের বড়দের কারো কারো মুখ দেখে মনে হয়েছিল, বাকি জীবনটা বাম শাসনে কাটাতে হবে না বলে দারুণ শান্তি পেয়েছেন। তখন চারপাশে সবাই বলত যে এবার থেকে পশ্চিমবঙ্গে শিল্প হবে, স্কুলে লেখাপড়া হবে, কলেজে ছাত্রছাত্রীরা মন দিয়ে পড়াশোনা করবে, হাসপাতালে চিকিৎসা হবে, ‘চলবে না, চলবে না’ আর চলবে না। এবার থেকে সব চলবে। কারণ রাজনীতি আর চলবে না। রাজনীতি না চললে যে খুব খারাপ হবে, সেকথা তখন বামপন্থী কয়েকজন ক্ষীণ কণ্ঠে বলেছিলেন। কিন্তু সদ্য যে হেরে গেছে তার কথায় কে কান দেয়? তার উপর একটানা ৩৪ বছর শাসন করে যারা হারে, তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগের লম্বা তালিকা থাকে। সেসব থেকে মুখ তুলতে কে চায়? তখন প্রায় সকলেই নিঃসন্দেহ, যে রাজ্যটা একেবারে শেষ হয়ে গেছে। তার জন্যে দায়ী বাম শাসন, কিন্তু কারণ রাজনীতি।

হা হুতাশ ছিল শুধু একজনের জন্য – বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য। কারণ তিনি বামপন্থী সরকারের মুখ্যমন্ত্রী হলেও বুঝেছিলেন যে সবকিছুতে রাজনীতি করা ঠিক নয়। যেমন উন্নয়ন নিয়ে রাজনীতি করা ভীষণ অন্যায়। তাই তিনি রাজনীতির ঊর্ধ্বে উঠে রাজ্যের ছেলেমেয়েদের ভালর জন্যে বাংলায় শিল্প আনতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তাঁর পার্টিই তাঁকে পিছন থেকে ছুরি মারল। তাই তিনি হেরে গেলেন। নেহাত তিনি অসম্ভব ভদ্রলোক, তাই মুখ ফুটে বলেননি ‘ব্রুটাস, তুমিও?’ তাঁর হয়ে আনন্দবাজার আর অন্যান্য সংবাদমাধ্যমগুলোই বলে দিয়েছিল। বিধানচন্দ্র রায় যদি বাংলার রূপকার হন, বুদ্ধদেব তাহলে বাংলার অরাজনীতির জন্মদাতা। তিনি মনে করতেন উন্নয়ন অরাজনৈতিক, তাই পার্টির কৃষক সংগঠনকে না জানিয়ে সিঙ্গুরের জমির প্রতিশ্রুতি দিয়ে দেন রতন টাটাকে। তিনি মনে করতেন শিল্প অরাজনৈতিক, তাই সটান বলে দেন – তাঁর দুর্ভাগ্য যে তিনি এমন একটা পার্টি করেন যারা বনধ ডাকে। বোধহয় তিনি মনে করতেন রাজনীতিও অরাজনৈতিক হলেই ভাল হয়। সেই কারণেই অন্য বামপন্থী দলের কর্মীদের পিছনে পুলিস লাগানো, ইউএপিএ আইনে গ্রেফতার করা ইত্যাদি তাঁর আমলে বেড়ে গিয়েছিল। এসবে অবশ্য আমাদের, মানে ভদ্রলোকদের, কোনো আপত্তি ছিল না। কারণ ওই যে – রাজনীতি খুব খারাপ জিনিস। তখন বিস্তর লেখালিখি হয়েছিল, এখনো বলাবলি হয় – মানুষটা তো ভাল, কিন্তু পার্টিটাই যে খারাপ। মানে কোনোভাবে যদি তৃণমূল কংগ্রেসের সরকারের মুখ্যমন্ত্রী হতে পারতেন বুদ্ধবাবু, তাহলে ভদ্রলোক-ভদ্রমহিলারা সবচেয়ে খুশি হতেন।

এসব ব্যাপার মমতা ব্যানার্জি ভালই বুঝতেন। তাঁকে তো আর এমনি এমনি বড় নেত্রী বলা হয় না। তিনি বুদ্ধবাবুর মত বই-টই লেখা শুরু করলেন। তা দিয়ে ভদ্রলোকদের খুব একটা সন্তুষ্ট করতে পারেননি, কিন্তু একে একে সব জায়গা থেকে রাজনীতি তুলে দিয়ে যারপরনাই প্রিয় হয়েছেন। পশ্চিমবঙ্গে ২০১১ সালের পর থেকে আর কোনো সফল বনধ হয় না। কারণ যে নেত্রী নিজে বিরোধী থাকার সময়ে নিজেই ঘনঘন বনধ ডাকতেন, তিনি মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পরে আর বনধ ডাকেন না। কোনো বিরোধী দল বনধ ডাকলে সরকারি কর্মচারীদের আগের রাতে অফিসে থেকে যেতে হয়, নইলে যে করেই হোক অফিসে পৌঁছতে হয়। ‘ব্রেক অফ সার্ভিস’ ইত্যাদি হুমকি থাকে। বামফ্রন্ট আমলে হাতে মাথা কাটা কো-অর্ডিনেশন কমিটির বিপ্লবী নেতারা কোথায় গেলেন? বিপন্ন সরকারি কর্মচারীরা অনেকসময় বুঝে পান না। বাস ইউনিয়ন, ট্যাক্সি ইউনিয়ন, অটো ইউনিয়ন, টোটো ইউনিয়ন – সবই যেহেতু বাম আমলের মতই শাসক দলের দখলে সেহেতু বনধ ব্যর্থই হয়। কিন্তু কাজ হয় কি? শনি, রবিবারকে কোনো ছুটির দিনের সঙ্গে একদিন বেশি ছুটি দিয়ে যোগ করে দেওয়া, পুজোর অনুদানের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে পুজোর ছুটি বৃদ্ধি – এসব তো হয়েই চলেছে। অবশ্য অরাজনৈতিক কারণে কাজ বন্ধ থাকলে পশ্চিমবঙ্গে কেউ আপত্তি করে না। যত দোষ, রাজনীতি ঘোষ।

পশ্চিমবঙ্গের শ্রমিকরাও আর রাজনীতি করেন না। বাম আমলের প্রবল প্রতাপান্বিত সিটু নিষ্প্রভ। শাসক দলের শ্রমিক সংগঠন শ্রমিকদের অধিকারের জন্যে কী করে কেউ জানে না। কিন্তু বাংলায় শিল্প এসেছে কি? বাংলায় শিল্পপতিরা বছর বছর আসতেন বর্ণাঢ্য শিল্প সম্মেলনে। বাংলায় সৌরভ গাঙ্গুলির মত নতুন শিল্পপতির জন্মও দেখা গেছে তৃণমূল শাসনে। কিন্তু শিল্প কোথায়? শিল্পপতির দেখা পেলেও শিল্পের দেখা না পেয়ে বোধহয় স্বয়ং মুখ্যমন্ত্রীও হতাশ হয়ে পড়েছেন। তাই এবছর আর বিশ্ব বঙ্গ বাণিজ্য সম্মেলন হচ্ছে না।

পশ্চিমবঙ্গের স্কুল নিয়ে বলতে শুরু করলে তো এ লেখা আর শেষ হবে না। বাম আমলের নিখিলবঙ্গ শিক্ষক সমিতির চেয়ে ঢের বেশি দাপট নিয়ে স্কুলে স্কুলে রয়েছে শুধুমাত্র তৃণমূলের শিক্ষক সংগঠন শিক্ষা সেল। বহু স্কুলে প্রধান শিক্ষক নেই, বছরের পর বছর কাজ চলছে ‘টিচার ইন চার্জ’ দিয়ে। বলা বাহুল্য তাঁরা কারা। তাঁদের অনেকের সঙ্গেই শিক্ষকদের গোলমাল গড়াচ্ছে আদালত পর্যন্ত। রাজনীতি নেই, সংগঠন নেই। তাই একা একাই লড়তে হচ্ছে শিক্ষকদের। অবশ্য সে তো সামান্য ব্যাপার। তার চেয়ে অনেক বড় কথা হল, কোনো স্কুলে ছাত্রছাত্রী আছে অথচ মাস্টার নেই। কোথাও আবার মাস্টার আছে অথচ ছাত্রছাত্রী নেই। কেন নেই? সে কেলেঙ্কারি কে না জানে! কিন্তু তা নিয়ে আজ অবধি বিরোধীরা কোনো বড় রাজনৈতিক আন্দোলন করতে পারলেন না। চাকরিপ্রার্থীরা অবশ্য রাজনীতি দূরে রাখার চেষ্টা করে গেছেন আপ্রাণ। মাঝরাত্তিরে পুলিস মহিলা আন্দোলনকারীদের পর্যন্ত টেনে হিঁচড়ে রাস্তা থেকে তুলে নিয়ে গেলেও তাঁরা বলেছেন ‘আমরা কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত নই’। কারণ ওই যে – রাজনীতি খুব খারাপ জিনিস। সে না হয় হল, কিন্তু স্কুলে লেখাপড়া হচ্ছে কি? স্কুলগুলো তো বন্ধ হতে বসেছে। রমরমা বেড়েছে বেসরকারি শীতাতপনিয়ন্ত্রিত স্কুলের। তাতে অবশ্য ভদ্রলোকদের অসুবিধা নেই। ছেলেমেয়েকে ওসব স্কুলে পড়ানোর রেস্ত তাঁদের আছে। তাছাড়া ওইসব স্কুলের একটা বড় গুণ হল – রাজনীতি নেই।

আমাদের বাবা-মায়েদের স্বপ্ন পূরণ করে মমতা কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়েও রাজনীতি বন্ধ করে দিয়েছেন। যাদবপুর বা প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয়ের মত দু-একটা ব্যতিক্রম বাদ দিলে সর্বত্র জাঁকিয়ে বসেছে একমেবাদ্বিতীয়ম তৃণমূল ছাত্র পরিষদ। মাঝে আবার কলেজে ভর্তি হতে গেলে তাদের মোটা টাকা উৎকোচ দিতে হচ্ছিল। নিজে বকাঝকা করেও তা বন্ধ করতে না পেরে কলেজে ভর্তির ব্যবস্থা অনলাইন করে ফেলেছে মমতা সরকার। ছাত্র ইউনিয়নের নির্বাচন বন্ধ সেই ২০১৭ সাল থেকে। আগে নাকি ছাত্রছাত্রীরা রাজনীতি করত বলে কলেজে লেখাপড়া হত না। এখন ছেলেমেয়েরা আর কলেজমুখো হতেই চাইছে না। নামকরা কলেজেও আসন খালি পড়ে থাকছে। কারণ ছাত্রছাত্রীরা জানে, জাতীয় শিক্ষানীতি আর রাজ্য শিক্ষানীতি (এবং দুর্নীতি) মিলিয়ে যা অবস্থা তাতে কলেজে পড়ে ভাত জোটানোর ব্যবস্থা হবে কিনা তার ঠিক নেই। এ রাজ্যে তো স্কুল, কলেজে শিক্ষক নিয়োগও প্রায় বন্ধ। এমএ/এমএসসি, এমনকি পিএইচডি করা ছেলেমেয়েরা সরকারি চাকরিপ্রাপ্ত শিক্ষাকর্মীদের চেয়েও কম বেতনে পড়াতে বাধ্য হচ্ছে আংশিক সময়ের অধ্যাপক হিসাবে অথবা দেদার অনুমোদন দিয়ে রাখা বেসরকারি নড়বড়ে কলেজে। অর্থাৎ কলেজ থেকে রাজনীতি তাড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে শিক্ষাকেও তাড়ানো হয়েছে।

মানে রাজ্যের সবকিছু অরাজনৈতিক হয়ে একটাও উপকার হয়েছে বলা যাবে না। তবু কিন্তু বাঙালির অরাজনীতি প্রেম অম্লান। সংসদে দাঁড়িয়ে যখন নরেন্দ্র মোদী বা অমিত শাহ যে কোনো বিষয়ে ফাঁপরে পড়লেই বলেন ‘বিরোধীরা রাজনীতি করছে’, আমাদের হাসি পায় না, রাগও হয় না। তৃণমূল কংগ্রেস নেতারা ওরকম বললেও আমাদের এখনো মনে হয় – ঠিকই বলছে। যে কোনো আন্দোলনকে বদনাম করার, নাগরিকদের চোখে হেয় করার একই উপায় বিজেপি ও তৃণমূল অবলম্বন করে – ‘দাবি ন্যায্য। কিন্তু বিরোধীরা এ নিয়ে রাজনীতি করছেন।’ যেন রাজনীতি করা এদেশে নিষিদ্ধ। একমাত্র ক্ষমতাসীন পক্ষই যে রাজনীতি অপছন্দ করে তা আমরা খেয়ালই করি না। ক্ষমতাসীনদের সুরে সুর মিলিয়ে আমরা রাজনীতি চাই না, অথচ গণতন্ত্র চাই। মানে স্নান করব, কিন্তু চুল ভেজাব না। অরাজনীতির সাধনা যে আমাদের প্রকৃতপক্ষে হিংস্র একদলীয় শাসনের দিকে নিয়ে গেছে, তা আমরা বুঝেও বুঝতে চাই না। জাতীয় স্তরে কী চলছে সে তো সবাই জানে। অন্য রাজ্যের বহু মানুষ এই অরাজনীতির ফাঁকি ধরে ফেলেছেন। তাই বিজেপিকে ছেঁটে দিয়েছেন ২০২৪ লোকসভা নির্বাচনে। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের অবস্থা কী?

এখানে দ্বিমেরু ভোট হওয়ায় বিজেপির আসন অনেক কমে গেলেও, ভোট কিন্তু বিশেষ কমছে না। উপরন্তু শুধু যে পঞ্চায়েত নির্বাচন ব্যাপারটা পরপর দুবার প্রহসনে পরিণত হল তা নয়, আর সব কলেজের মত মেডিকাল কলেজগুলোতেও প্রায় মাফিয়া হয়ে উঠেছে শাসক দলের ছাত্র সংগঠন। তৃণমূল কংগ্রেস সংলগ্ন ডাক্তার-অধ্যাপকদের একাংশের প্রশ্রয়ে আর জি কর মেডিকাল কলেজ ও হাসপাতাল যে নরককুণ্ড হয়ে উঠেছে তা এখন নিজ মুখে স্বীকার করছেন তৃণমূলেরই নেতা শান্তনু সেন। অবশ্য ওই হাসপাতালের স্নাতকোত্তর স্তরের ছাত্রীর নৃশংস ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ড না ঘটলে এবং নিজের মেয়ে ওই কলেজেরই ছাত্রী না হলে শান্তনু মুখ খুলতেন কিনা সন্দেহ।

আর জি করে অন্য ইউনিয়ন করতে গেলে ছাত্রছাত্রীদের কী হাল করা হয় তা কিন্তু আগেও এই ওয়েবসাইটেই প্রকাশিত হয়েছে। এবারের হত্যাকাণ্ডের মত আরও কত কাণ্ড অন্য মেডিকাল কলেজগুলোতে হওয়ার অপেক্ষায় আছে আমরা জানি না। অথচ আমরা সকলেই বুঝি, এমন আরও ঘটনা অনিবার্য। তবু শাসককে প্রশ্ন করার থেকে বাঙালি ভদ্রজনের কাছে এখনো বেশি গুরুত্বপূর্ণ অরাজনৈতিক থাকা। তাই এবারের স্বাধীনতা দিবস শুরু হল মধ্যরাতে মহিলাদের ডাকা যে আন্দোলন দিয়ে, সেই আন্দোলনের হোতারা বারবার ঘোষণা করে গেলেন – এটা অরাজনৈতিক আন্দোলন। বিখ্যাত অভিনেত্রী সোহিনী সেনগুপ্ত টিভি স্টুডিওতে বসে ধর্ষণ আটকাতে গেলে সমাজের, শিক্ষাব্যবস্থার কী কী সংস্কার করা দরকার সেসব বলার পাশাপাশি জোর দিয়ে বললেন – সরকারি রোষানলে তাঁকে কখনো পড়তে হয়নি। তাই সরকারের বিরুদ্ধে তাঁর কোনো রাগ নেই। এই আন্দোলন মহিলাদের নিরাপত্তা বিষয়ক। তাই কেউ যদি কোনো রাজনৈতিক পতাকা নিয়ে আসে, তাহলে তাকে ‘rudely’ বারণ করা হবে। অরাজনৈতিক সঞ্চালক সুমন দে বা স্টুডিওতে উপস্থিত রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিরাও তাঁকে প্রশ্ন করলেন না, এ রাজ্যের মহিলাদের নিরাপত্তা দেওয়ার দায়িত্ব কার? ভগবানের? তাহলে সরকারের দায়িত্ব কী? সোহিনীকে সরকারি রোষানলে পড়তে হয়নি বলেই যদি সরকারের বিরুদ্ধে তাঁর কোনো বক্তব্য না থাকে, তাহলে আর পাঁচজনের সঙ্গে আন্দোলনে নামার প্রয়োজন কী? আন্দোলনের কেন্দ্রে কি তাঁর স্বার্থ, নাকি যে মেয়েটি নৃশংসভাবে খুন হয়েছে তার স্বার্থ? বিখ্যাতরা এইরকম গা বাঁচানো অবস্থান নিয়ে দিব্যি চলতে পারেন, কারণ সরকারকে যদি বা সংবাদমাধ্যম ক্কচিৎ কদাচিৎ প্রশ্নের মুখে ফেলে, বিখ্যাতদের ফেলে না। তাই পরমব্রত চট্টোপাধ্যায়ও মাঝরাতে অ্যাকাডেমি অফ ফাইন আর্টসের সামনে দাঁড়িয়ে অবলীলাক্রমে বলে যেতে পারেন – কলকাতা দেশের অন্যান্য শহরের থেকে মহিলাদের নিরাপত্তায় এখনো অনেক এগিয়ে। তাই তো এরকম ঘটনা বেশি আঘাত দেয়। তাই তো তাঁরা পথে নেমেছেন। এটা এ দল বনাম ও দলের বিষয় নয় ইত্যাদি।

যে ঘটনার প্রতিবাদে মহিলারা রাস্তায় নেমেছিলেন বুধবার রাতে, সেটা ঘটেছে সরকারি হাসপাতালে। সরকার চালাচ্ছে একটা দল, সেই দলেরই অধীনে রয়েছে পুলিস। সেই পুলিসের বিরুদ্ধেই তথ্যপ্রমাণ লোপাটের অভিযোগ উঠেছে। সরকারি দলের নেতা এক ডাক্তারই মেডিকাল কলেজটা চালান, তিনিই কটু মন্তব্য করেছিলেন মৃতার বিরুদ্ধে। সেই মন্তব্যের প্রতিবাদেই রাতের দখল নেওয়ার ডাক। তাঁরই বিরুদ্ধে উঠেছে মারাত্মক সব অভিযোগ। সুতরাং পরমব্রত ঠিকই বলেছেন। এটা এ দল বনাম ও দলের বিষয় তো নয়ই। এটা একটাই দল বনাম মৃতার পরিবারকে ন্যায়বিচার পাইয়ে দেওয়ার বিষয়। অথচ তিনি ওই দলটার নামে কিছু বলবেন না। কারণ ওই যে – রাজনীতি খুব খারাপ জিনিস।

আনন্দের কথা, অরাজনীতির ধ্বজাধারীদের ডাকে যে হাজার হাজার অখ্যাত মহিলা (এবং পুরুষ) বুধবার রাতে পথে নেমে এসেছিলেন পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন জায়গায় এবং দেশের বিভিন্ন শহরে, তাঁরা এসব ন্যাকামি বোঝেন না। তাঁরা দ্ব্যর্থহীন ভাষায় আর জি কর হাসপাতালের মৃতা ছাত্রীর জন্যে ন্যায়বিচার চেয়ে স্লোগান তুলেছেন। অনেকে টিভি ক্যামেরার সামনে সরাসরি বলেছেন, যাকে গ্রেফতার করা হয়েছে সে সাক্ষীগোপাল। আসল অপরাধীদের ধরতে হবে এবং শাস্তি দিতে হবে। সরকারের কাছ থেকে সরাসরি জবাবদিহি চেয়েছেন তাঁরা। এসব দৃশ্য কালীঘাটের বাড়িতে বসে টিভিতে দেখে মমতা হয়ত অবাক হয়েছেন। অভিমানও করে থাকতে পারেন। তাঁর সরকার এই ‘বেনজির অরাজনৈতিক আন্দোলনের’ (এবিপি আনন্দের ভাষায়) সঙ্গে যে সহযোগিতা করেছে, তার এই প্রতিদান হয়ত তিনি আশা করেননি।

আন্দোলনের হোতারা এতে খুশি হলেন না রেগে গেলেন, তা-ই বা কে জানে! তাঁরা তো ব্যাপারটা অরাজনৈতিক রাখতেই চেয়েছিলেন। তাঁদের তো লক্ষ্য ছিল রাতের দখল নেওয়া, সরকারের বিরোধিতা করা তো নয়। অরাজনৈতিক বলে যে কিছু হয় না তা হয়ত তাঁরা ভুলে গিয়েছিলেন। ফলে রাশ আর হাতে থাকেনি, রাস্তায় নেমে আসা মানুষ সরকারের বিরুদ্ধে পুঞ্জীভূত ক্ষোভ উগরে দিয়েছে। আসলে দুনিয়ায় অরাজনৈতিক বলে যে কিছু হয় না, এটা যেমন ভোলা চলে না, তেমনি একথা ভুললেও চলে না যে জনতা সকলকে চমকে দিতে পারে। বুধবার রাতেও দিয়েছে। নইলে যে কাগজ একদা লিখত ‘যে দেশে ব্রিগেড নাই সেখানে কি গণতন্ত্র নাই?’, তারই টিভি চ্যানেলকে বুধবার লিখতে হত না ‘বিবেকের ডাকে বাংলা জুড়ে ব্রিগেড’। অবশ্য এর মানে হয়ত এটাও হতে পারে, যে ব্রিগেডেও আপত্তি নেই। যদি সেটা অরাজনৈতিক ব্রিগেড হয়।

আরও পড়ুন এই নির্বাচনে দেশ পশ্চাদপসরণ আটকাতে লড়ছে, কিন্তু পশ্চিমবঙ্গ?

মুশকিল হল, অরাজনৈতিক আন্দোলন একবিংশ শতাব্দীতে সারা বিশ্বে বেশ কেতাদুরস্ত হয়ে দাঁড়ালেও কোনো পরিবর্তন ঘটাতে পারেনি, যতক্ষণ না প্রবলভাবে রাজনৈতিক হয়ে উঠেছে। বাংলাদেশে সম্প্রতি যা ঘটেছে তা থেকেও একথাই প্রমাণ হয়। তবে পরিবর্তন ঘটাক আর না-ই ঘটাক, পশ্চিমবঙ্গের ভদ্রমহিলারা যে পথে নেমে আন্দোলন করার প্রয়োজন স্বীকার করেছেন – এটা নিঃসন্দেহে ভাল লক্ষণ। রাত তো দখল হল। আশা করি এরপর থেকে কলকাতার রাস্তায় দিনে মিছিল, জমায়েত বা অবরোধ দেখলে তাঁরা আর বিরক্ত হবেন না। ব্রিগেডে বা একুশে জুলাইয়ের মিটিংয়ে গ্রাম, মফস্বল থেকে আসা মানুষকে দেখে নাক সিঁটকে বলবেন না ‘চিড়িয়াখানা, ভিক্টোরিয়া বেড়াতে এসেছে।’ যার গায়ে লাঠি এসে পড়ে, তার জন্যে রাস্তাই যে একমাত্র রাস্তা – এটুকু মেট্রো, নিজের গাড়ি বা অ্যাপ ক্যাবে চেপে রাত দখল করতে আসা মহিলারা বুঝলেই অরাজনীতির বিরুদ্ধে স্বাধীনতা সংগ্রাম বেশ খানিকটা এগোবে। আর না বুঝলে?

বুধবার রাতেই কে বা কারা আর জি কর হাসপাতালে ঢুকে পড়ে তাণ্ডব চালিয়েছে, এমার্জেন্সি ডিপার্টমেন্টে ভাংচুর করেছে। আন্দোলনরত একমাত্র রাজনৈতিক শক্তি ভারতের গণতান্ত্রিক যুব ফেডারেশন ওই চত্বরে যেখানে অবস্থান বিক্ষোভ করছিল সেই জায়গাটা ভেঙে দেওয়া হয়েছে। তৃণমূল কংগ্রেসের দু নম্বর নেতা অভিষেক ব্যানার্জি জানিয়ে দিয়েছেন, ডাক্তারদের আন্দোলন ন্যায্য। তাঁদের নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। এসব যারা করেছে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

মানে নির্ঘাত স্বাধীনতা দিবস থেকেই ধর্ষণ, খুনের ঘটনার চেয়ে বড় করে তোলা হবে সরকারি হাসপাতালে হামলার ঘটনাকে। অন্যদিকে শনিবার থেকে মমতার দলই পথে নামবে মৃতাকে ন্যায়বিচার পাইয়ে দেওয়ার দাবিতে। অর্থাৎ যাঁর অধীন হাসপাতাল প্রশাসন ঘটনা ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করল, প্রমাণ লোপাট করতে হাসপাতালে ভাঙাভাঙি শুরু করে দিয়েছিল, সেই প্রশাসনের মাথাকে যিনি অন্য হাসপাতালে পুনর্বাসন দিয়েছিলেন – সেই স্বাস্থ্যমন্ত্রী ও পুলিসমন্ত্রীই এবার আন্দোলনকারী সাজবেন। বুধবার রাতের আন্দোলনের হোতাদের যুক্তি মানলে এতে কোনো অসঙ্গতি নেই। কারণ ব্যাপারটার মধ্যে রাজনীতি টেনে আনা অনুচিত। ব্যাপারটা নারী অধিকার সংক্রান্ত। মুখ্যমন্ত্রী নিজে নারী। অতএব।

অরাজনীতির হাত থেকে স্বাধীন হতে না পারলে মানুষকে বোকা বানানোর এই চেষ্টা পশ্চিমবঙ্গে চলতেই থাকবে। আশা করা যাক, বুধবার রাতের পর বাঙালি ভদ্রমহিলারা আর বোকা বনবেন না।

নাগরিক ডট নেটে প্রকাশিত

খাড়া বড়ি থোড় বললেই উড়ে যাবে না নতুন ফেলুদা ছবি

সন্তোষ দত্তের জন্মশতবর্ষে যে ফেলুদা ছবি মুক্তি পাবে তাতে যদি জটায়ুর অভিনয়টা ভাল হয় তাহলে তাঁকে যথার্থ শ্রদ্ধা জানানো হবে।

বুঝে দেখ জটায়ুর কলমের জোর
ঘুরে গেছে রহস্য কাহিনীর মোড়
থোড় বড়ি খাড়া
লিখে তাড়াতাড়া
এইবারে লিখেছেন খাড়া বড়ি থোড়।

ফেলু মিত্তিরের ভক্তরা জানেন, এই পাঁচ লাইনের রচয়িতা প্রদোষচন্দ্র মিত্র স্বয়ং। হত্যাপুরী গল্পের শুরুতেই ফেলুদা রচিত এই লিমেরিক তোপসে পাঠকের কাছে হাজির করেছে। সন্দীপ রায়ের হত্যাপুরী ছবির বর্ণনাতেও এই ছড়া দিব্যি খেটে যায়। তবে ফেলুদাকে নিয়ে নতুন কিছু করা হয়েছে এমন প্রত্যাশা নিয়ে কে-ই বা সিনেমা হলে যাচ্ছে? শীতের ছুটির মধ্যে কোনো একটা দিন সপরিবারে খানিকটা স্মৃতিমেদুর সময় কাটানো – ফেলুদার ছবি দেখতে যাওয়ার এই তো আসল উদ্দেশ্য। সুতরাং সে ছবি অভিনব না হয়ে যত পরিচিত হয় ততই ভাল। তাছাড়া ফেলুদার ছবির সব দর্শকই গল্পগুলো পড়ে ফেলেছে – একথা বুকে হাত দিয়ে বলা ক্রমশ কঠিন হয়ে দাঁড়াচ্ছে। এখনকার স্কুল-কলেজের ছেলেমেয়েদের অনেকেরই ফেলুদার কথা বাবা-মায়ের মুখে শোনা। তারা বই পড়ে কম, বাংলা পড়ে আরও কম। ফলে ছবিগুলো এমনিতেই তাদের কাছে অভিনব। আমরা চল্লিশোর্ধ্বরা কনুইটা সিটের হাতলে ঠেকিয়ে হাতটা থুতনিতে রেখে যতই ভুরু কুঁচকে বিচার করি সন্দীপ সত্যজিতের ফেলুদাকে পর্দায় আনতে গিয়ে কোথায় কতটুকু সরলেন বা সরলেন না, সরলে সেটা রসোত্তীর্ণ হল কিনা; তরুণতর দর্শকদের অনেকের কাছেই কেবল গল্পটা নয়, ফেলু-তোপসে-জটায়ুর গোটা জগৎটাই নতুন। যতবার ফেলুদা চলচ্চিত্রায়িত হচ্ছে, ততবার তাদের নতুন অভিজ্ঞতা হচ্ছে। বাঙালির সাংস্কৃতিক শিকড় যতখানি আলগা হয়ে গেছে, তাতে স্রেফ আর্কাইভ করে রাখার কথা ভেবে যদি সত্তর ছুঁই ছুঁই সন্দীপ এখনো পুরনো ফর্মুলাতেই ফেলুদা ছবি বানিয়ে যান তাহলে তাঁকে দোষ দেওয়া চলে না।

ছবির বিচার করতে গিয়ে এসব কথাও ভাবতে হচ্ছে – এটা নিশ্চয়ই দুর্ভাগ্যজনক। কিন্তু বাংলা ছবি, শুধু ছবিই বা কেন, বাংলার সংস্কৃতিই যে কপাল চাপড়ানোর মত অবস্থায় পৌঁছেছে তা নিয়ে তো আর ঢাকঢাক গুড়গুড় করার কিছু নেই। বাংলা ছবির দুরবস্থা যে নেহাত নিন্দুকের কল্পনা নয় তার ব্যবসায়িক ও শৈল্পিক – দু ধরনের প্রমাণই উপস্থিত। ২০২২ সালে গোটা চারেক ছবি প্রেক্ষাগৃহে লোক টানতে পেরেছে, যার মধ্যে একটা আবার বাংলাদেশের ছবি। এতেই প্রযোজক থেকে শুরু করে দর্শক অব্দি সকলেই আহ্লাদে আটখানা – এই হল ব্যবসায়িক প্রমাণ। আর শৈল্পিক প্রমাণ তো প্রায় এক দশক ধরে গোয়েন্দা ছবির প্রাবল্যেই পাওয়া যাচ্ছে।

এমন নয় যে পৃথিবীর আর কোনো ভাষায় জনপ্রিয় গোয়েন্দা গল্প নিয়ে কাঁড়ি কাঁড়ি ছবি বা সিরিজ হয় না। বাঙালিরা যে ভাষার সিনেমা, সিরিজের সঙ্গে সবচেয়ে বেশি পরিচিত সেই ইংরেজি ভাষাতেই শার্লক হোমস, আর্কুল পয়রো, মিস মার্পল প্রমুখ গোয়েন্দাকে নিয়ে গুচ্ছ গুচ্ছ বড় পর্দার ছবি, টিভি সিরিজ হয়েছে; ওটিটির যুগে ওয়েব সিরিজও হয়ে চলেছে। কিন্তু প্রায় সমস্ত প্রযোজনাতেই নতুন কিছু করার প্রয়াস দেখা যায়, কখনো কখনো তার ফলে বিবিসির শার্লক সিরিজের মত চমকপ্রদ কিছুও তৈরি হয়।

সন্দীপ সত্যজিতের ছেলে হওয়ার সুযোগ নিয়ে নিজে ফেলুদার হাতে মোবাইল ফোন ধরিয়ে দিয়ে গল্পগুলোকে আজকের দিনে নিয়ে আসা ছাড়া কোনোরকম সৃজনশীলতা দেখাচ্ছেন না, ওদিকে কপিরাইট ধরে রেখে অন্য কাউকে আরও সৃজনশীল হওয়ার সুযোগও দিচ্ছেন না বলে আমরা – ফেলুদা পড়ে বড় হওয়া প্রজন্ম – অনুযোগ করতাম গত দশকে। সন্দীপ সে গুড়ে বালি দিয়েছেন অনেকদিন হল। তাঁর হাঁটুর বয়সী পরিচালকরা ফেলুদাকে নিয়ে ওয়েব সিরিজ করছেন। কিন্তু তাতেই বা ফেলুদা নব নব রূপে প্রাণে আসতে পারছে কই? তরুণ পরিচালকদের উদ্ভাবনী শক্তির নমুনা দেখে তো উল্লসিত হওয়া যাচ্ছে না।

বাংলাদেশের দর্শকদের জন্য শেয়াল দেবতা রহস্য আর ঘুরঘুটিয়ার ঘটনা নিয়ে ওয়েব সিরিজ করেছিলেন পরমব্রত চট্টোপাধ্যায়। শেষমেশ সেখানে কলকাতার ঢাকা হয়ে যাওয়া আর তোপসের লেখা বইয়ের বদলে ব্লগে প্রকাশিত হওয়া ছাড়া কোনো যুগান্তকারী পরিবর্তন দেখা যায়নি। ও জিনিসটিও স্টিভেন মফাট আর মার্ক গ্যাটিস শার্লক সিরিজে আগেই করে ফেলেছেন এবং সেখানে আর্থার কোনান ডয়েলের আখ্যানকে তাঁরা যতদূর নিয়ে গেছেন ততখানি পরীক্ষামূলক হওয়ার সাহস পরমব্রত দেখিয়ে উঠতে পারেননি। উপরন্তু স্বয়ং ফেলুদার ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়ে প্রবল আত্মবিশ্বাসে ঘুরঘুটিয়ার ঘটনার ক্লাইম্যাক্সে রবীন্দ্রনাথের সবচেয়ে পরিচিত দুটো লাইন আওড়াতে গিয়ে গুবলেট করেছেন। শেয়াল দেবতা রহস্যে ফেলুদার একটি সাংবাদিক প্রেমিকা প্রায় জুটিয়ে ফেলেছিলেন (শারলিন ফারজানা), শেষ অব্দি বোধহয় সন্দেশ পড়া প্রাচীন পাঠক-পাঠিকারা রেগে যাবেন ভেবে পিছিয়ে যান।

পরমব্রত তবু নতুন কিছু করার চেষ্টা করেছিলেন, বাংলা ছবির রিমেক সম্রাট সৃজিত মুখোপাধ্যায় তো ফেলুদাকে নিয়ে পিরিয়ড পিস বানাতে গিয়ে ১৯৮০-র দশকের দমদম বিমানবন্দরে ইনক্রেডিবল ইন্ডিয়া ক্যাম্পেনের পোস্টার সেঁটে ফেলেছেন। মুক্তি পেতে চলেছে অরিন্দম শীল নির্দেশিত আরও একটা ফেলুদা ওয়েব সিরিজ। সেখানে আবার গ্যাংটকে এ জাতীয় গন্ডগোল দেখা না গেলেই হয়। পরিচালক অবশ্য এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন এখানে ফেলুদা আধুনিক – স্মার্টফোন, স্মার্টওয়াচ ব্যবহার করেন। তবে সেটাই প্রধান আকর্ষণ হয়ে থাকলে খাড়া বড়ি থোড়ই ভবিতব্য।

সন্দীপের হত্যাপুরীকে এই পরিস্থিতি মনে রেখে বিচার করা ভাল।

তিনি প্রথম যখন বড় পর্দার জন্যে ফেলুদার ছবি তৈরি করতে শুরু করেন তখন যে ব্যাপারটা সবচেয়ে বেশি হতাশ করত তা হল কে অপরাধী তা গোড়াতেই দেখিয়ে দেওয়া। সত্যজিৎ নিজে সোনার কেল্লা আর জয়বাবা ফেলুনাথ – দুটো ক্ষেত্রেই তা করেছিলেন। কিন্তু গল্পের তুলনায় সে দুটো প্রায় আমূল পরিবর্তিত চিত্রনাট্য। ফলে বইয়ের ‘হু ডান ইট’ পর্দায় থ্রিলারে পরিণত হয়ে অন্যরকম উত্তেজনা সৃষ্টি করেছে। সন্দীপ আবার আমূল পরিবর্তন করতে চান না কখনোই, ফলে ছবির অবস্থা হত ন যযৌ ন তস্থৌ। হত্যাপুরীতে সে দ্বিধা নেই। চিত্রনাট্য মোটের উপর গল্পকেই অনুসরণ করেছে, ‘হু ডান ইট’ উৎকণ্ঠা বজায় রাখা হয়েছে। শুরুতে যে ফেলুদা আবিষ্কারক দর্শক প্রজন্মের কথা বলছিলাম, তাদের এই চিত্রনাট্য আকর্ষণ করবে। গল্প থেকে চোখে পড়ার মত পরিবর্তন বলতে জটায়ুর ড্রাইভার হরিপদবাবুকে বাদ দেওয়া। তাতে অবশ্য কোনো ক্ষতি হয়নি।

এ ছবির সেরা অভিনেতা দুজন – সাহেব চ্যাটার্জী আর শুভাশিষ মুখোপাধ্যায়। সুপুরুষ সাহেবের শিশুর মত সরল হাসি বিলাস মজুমদারকে দারুণ বিশ্বাসযোগ্য করে তুলেছে। হারবার্টের চরিত্রে অভিনয় করা শুভাশিস যে লক্ষ্মণ ভট্টাচার্যের চরিত্র ঘুমিয়ে ঘুমিয়েও করে ফেলতে পারেন তা বলার অপেক্ষা রাখে না। পরাণ বন্দ্যোপাধ্যায় (দুর্গাগতি সেন) সম্ভবত অভিনয় জীবনের এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছেন যেখানে খেলার মাঠে যাকে ‘প্লেয়িং ফ্রম মেমরি’ বলে, তা করলেও দেখার মত হবে। ঠিক ফ্রাঙ্কো বারেসি যেভাবে ১৯৯৪ বিশ্বকাপ ফাইনালে ওটুকু করেই সেরা সময়ের রোমারিও, বেবেতোকে আটকে দিয়েছিলেন।

কিন্তু যে কোনো ফেলুদা ছবির আসল আকর্ষণ তো ওই তিনজন – গোয়েন্দা, তাঁর খুড়তুতো ভাই আর রহস্য রোমাঞ্চ ঔপন্যাসিক লালমোহন গাঙ্গুলী। তাঁদের অভিনয়ে গোলমাল হলে দারুণ চিত্রনাট্য, অসামান্য সিনেমাটোগ্রাফি – কোনোকিছুই ছবিকে বাঁচাতে পারে না। যে কোনো গোয়েন্দা গল্পের চলচ্চিত্রায়ণেই অবশ্য তাই। বেনেডিক্ট কামবারবাচ আর মার্টিন ফ্রিম্যান যথাক্রমে শার্লক হোমস আর ডাক্তার ওয়াটসনের চরিত্রে মারকাটারি অভিনয় না করলে বিবিসির শার্লক সিরিজ তাক লাগানো ভাবনা, চিত্রনাট্য, প্রযুক্তির ব্যবহার সত্ত্বেও মুখ থুবড়ে পড়তই। হত্যাপুরী ছবিতে তিন কেন্দ্রীয় চরিত্রের অভিনেতাদের সন্দীপ এই প্রথম ব্যবহার করলেন। বস্তুত, ছবিটা যেমনই হয়ে থাক, সন্দীপের প্রশংসা প্রাপ্য এই ২০২২ সালে দাঁড়িয়ে প্রবল প্রতাপশালী প্রযোজকের সঙ্গে কাস্টিং নিয়ে আপোস করেননি বলে। একই প্রযোজকের ব্যানারে অন্য পরিচালক যে কাস্ট নিয়ে কাজ করেছেন তাঁকেও সেই কাস্ট নিয়েই কাজ করতে হবে – এই অন্যায় আবদার মানবেন না বলে সন্দীপ প্রযোজকই বদলে ফেলেছেন। ছবিটা হতে পারত অনেক আগেই, কিন্তু পিছিয়ে গেছে। এখন কথা হল, তাঁর এই লড়াইকে যথাযোগ্য মর্যাদা দিতে পারলেন কি তাঁর পছন্দের অভিনেতারা?

ফেলুদার কথায় শেষে আসব, কারণ ওটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র। তোপসেকে দিয়ে শুরু করা যাক। সন্দেহ নেই, সেই সোনার কেল্লার সিদ্ধার্থ চ্যাটার্জির পরে এই প্রথম একজন তোপসেকে দেখে কচি ছেলে বলে মনে হয়েছে। সন্দীপ রায়ের টেলিফিল্মগুলোতে এবং সিনেমায় শাশ্বত চট্টোপাধ্যায় আর পরমব্রত যখন ওই চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন, তাঁদের মোটেই বছর পনেরোর ছেলে মনে হয়নি। বরং পরমব্রত নির্দেশিত ওয়েব সিরিজে ঋদ্ধি সেনকে কিছুটা বইয়ের তোপসে মনে হয়েছিল। হয়ত আগের ছবিগুলোতে সন্দীপ তোপসেকে একটু বড় ছেলে হিসাবেই দেখাতে চেয়েছিলেন। হত্যাপুরীতে আয়ুশ দাসকে কিন্তু সদ্য দাড়িগোঁফ ওঠা তোপসেই মনে হচ্ছে। কিন্তু মুশকিল অন্যত্র। সংলাপ বলায় তাঁর নিজেকে কচিতর করে তোলার চেষ্টা ভীষণ চোখে লাগে। উপরন্তু মেগাসিরিয়ালের অভিনেতাদের মত উত্তেজনা প্রকাশ করতে গেলে তিনি চোখ বড় বড় করে কথা বলেন। বড় পর্দায় স্বভাবতই সে চোখ আরও বড় বড় লাগে।

আরও পড়ুন টলমলে ট্রিবিউটে ফেলুদার গোয়েন্দাগিরি গুবলেট

সন্দীপ রায় নিজে বলেছেন শিগগির আরও ফেলুদা ছবি করবেন, অন্য পরিচালকরাও ময়দানে নেমে পড়েছেন। ফলে আশা করা যায় ২০২৫ সালেও কোনো না কোনো ফেলুদা ছবি মুক্তি পাবে। বছরটা গুরুত্বপূর্ণ, কারণ সেবার সন্তোষ দত্ত একশোয় পড়বেন। বাষট্টি বছরের জীবনে যতগুলো ছবিতে কাজ করেছেন কোনোটাতেই একেবারে ফেলে দেওয়ার মত অভিনয় করেননি। তবু বেশিরভাগ দর্শক তাঁকে মনে রেখেছেন জটায়ু হিসাবে। তাঁর জন্মশতবর্ষে যে ফেলুদা ছবি মুক্তি পাবে তাতে যদি জটায়ুর অভিনয়টা ভাল হয় তাহলে তাঁকে যথার্থ শ্রদ্ধা জানানো হবে। কিন্তু লক্ষণ ভাল নয়। ওই চরিত্রের অভিনয় সন্তোষ দত্তের মৃত্যুর পর থেকে যেন ক্রমশ খারাপের দিকে যাচ্ছে। রবি ঘোষ আর অনুপকুমার তবু একরকম ছিলেন, অকালমৃত্যু না হলে হয়ত আরও ভাল করতেন। বিভু ভট্টাচার্যের আমল থেকে শুরু হয়েছে লালমোহনবাবুকে কমিক রিলিফে পরিণত করা। সন্দীপ সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, জটায়ু ভাঁড় নন, বন্ধু। এই কথাটা যে কোনো ফেলুদারসিকই বোঝেন, কিন্তু কোনো অজ্ঞাত কারণে ওই চরিত্রের অভিনেতারা সন্তোষ দত্তের প্রয়াণের পর সাড়ে তিন দশকেও বুঝে উঠতে পারলেন না। সৃজিতের দার্জিলিং জমজমাট সিরিজে অনির্বাণ চক্রবর্তী তো প্রায় গোপাল ভাঁড় হয়ে দাঁড়িয়েছেন। সে না হয় অন্য পরিচালকের ছবি, কিন্তু সন্দীপের নিজের ছবির জটায়ুরা কেন নিজেদের ভাঁড় মনে করছেন? হত্যাপুরীর জটায়ু অভিজিৎ গুহ নিজেও একজন পরিচালক, অথচ তিনিও এ দোষ কাটিয়ে উঠতে পারেননি। সারাক্ষণই অতি-অভিনয় করে গেছেন। হোটেলের ঘরের একটা দৃশ্যে তো মনে হয়েছে তিনি ফেলুদাকেও ছাপিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন।

যে অভিনেতার কাস্টিং নিয়ে অনেকের মনেই সন্দেহ ছিল, সেই ইন্দ্রনীল সেনগুপ্তই কিন্তু সবচেয়ে জমাট অভিনয় করেছেন। সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় আর সব্যসাচী চক্রবর্তীর বাচনভঙ্গি আর উচ্চারণ ফেলুদাকে এমন খাঁটি বাঙালি চেহারা দিয়েছে যে প্রবাসী ইন্দ্রনীলের ঈষৎ টানওলা বাংলা অভ্যস্ত কানে কোথাও কোথাও একটু অস্বস্তি তৈরি করে, কিন্তু তাঁর অতীতের অভিনয় দেখা থাকলে বোঝা যায় সেখানেও অনেকটা উন্নতি করেছেন। তাছাড়া কেবল বাচনভঙ্গীই তো অভিনয় নয়। হাঁটাচলায়, স্থৈর্যে, সাহসে ইন্দ্রনীল ফেলুদা হয়ে উঠতে সমর্থ হয়েছেন। তিনি আবীর চ্যাটার্জির মত সংলাপসর্বস্ব ফেলুদা নন, টোটা রায়চৌধুরীর মত বচ্চনপ্রতিম ফেলুদাও নন। ইন্দ্রনীলকে সত্যিই মগজাস্ত্র-নির্ভর গোয়েন্দা বলে মনে হয়েছে। জটায়ুকে হ্যাটা করার প্রবণতা, যা সব্যসাচী পরবর্তী ফেলুদাদের অভিজ্ঞান হয়ে উঠেছিল, তাও ইন্দ্রনীলের মধ্যে নেই।

সম্প্রতি বাংলা ছবি, ওয়েব সিরিজে গোয়েন্দার ছড়াছড়ি। রোগা ভূত, মোটা ভূত, বাবা ভূত, ছানা ভূতের মত নানারকমের গোয়েন্দায় ভরে গেছে দ্বিগ্বিদিক। অথচ রহস্যের তেমন বৈচিত্র্য নেই। সোনাদা একের পর এক ছবিতে গুপ্তধনই উদ্ধার করে চলেছেন, একেনবাবুর জটায়ুসুলভ হিন্দি বলা আর বাংলা প্রবাদ ব্যবহারে ভুল করায় বৈচিত্র্য থাকলেও ঘুরে ফিরে সেই খুনের রহস্যের কিনারা করছেন। তার মধ্যে সন্দীপ ফেলুদার এমন একটা গল্প বেছে নিয়ে ছবি করেছেন যেখানে সোনাদানা নয়, অপরাধের লক্ষ্য প্রাচীন পুঁথি। খুনোখুনি যা হয়েছে সেগুলোও পুঁথির কারণেই। এ জন্যেও বোধ করি তাঁর ধন্যবাদ প্রাপ্য। পুঁথিকে ধন মনে করার বাঙালি সংস্কৃতি লুপ্তপ্রায়। দুর্গাগতি আর সিধুজ্যাঠার মত মানুষ, পাহাড়প্রমাণ টাকা যাঁদের কিনতে পারে না – তাঁরাও মিসিং লিঙ্কে পরিণত হয়েছেন। হত্যাপুরী নিদেনপক্ষে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য প্রমাণ রেখে দিল যে এমন মানুষও একদা এই পশ্চিমবঙ্গে ছেল।

নাগরিক ডট নেটে প্রকাশিত