বিবিসিকে বাদ দিয়ে বিশ্বগুরু থাকতে পারবেন মোদী?

বিবিসি যতখানি সম্পাদকীয় স্বাধীনতা ভোগ করে এসেছে চিরকাল, ততখানি আমাদের দূরদর্শন বা অল ইন্ডিয়া রেডিও কোনো দলের সরকারের আমলেই ভোগ করেনি

এই লেখা যখন লিখতে বসেছি, তখন টানা তৃতীয় দিন ব্রিটিশ ব্রডকাস্টিং কর্পোরেশনের দিল্লি ও মুম্বাই অফিস জুড়ে বসে আছেন আয়কর আধিকারিকরা। বিবিসি কর্তৃপক্ষ কর্মচারীদের ইমেল পাঠিয়ে জানিয়েছেন আপাতত যেন দফতরে না এসে বাড়ি থেকেই তাঁরা কাজ চালিয়ে যান। এডিটর্স গিল্ড অফ ইন্ডিয়া, ভারতের সম্পাদকদের একটি অগ্রগণ্য সংগঠন, এবং প্রেস ক্লাব অফ ইন্ডিয়ার মত সাংবাদিকদের সংগঠন একে সংবাদমাধ্যমকে ভয় দেখানোর প্রচেষ্টা হিসাবে দেখছে জানিয়ে প্রথম দিনেই (১৪ ফেব্রুয়ারি) বিবৃতি দিয়েছে। কিন্তু সরকারপক্ষ কিন্তু বলেই যাচ্ছে, এটা বিবিসির দফতরে হানা নয়, সমীক্ষা (সার্ভে) মাত্র। এ এক আইনানুগ নিয়মিত প্রক্রিয়া। আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ আছে বলেই নাকি এই সার্ভে করা হচ্ছে।

বলা বাহুল্য, বিবিসি এ দেশের কোনো আইন ভেঙে থাকলে তদন্তের স্বার্থে তাদের দফতরে সার্ভে করা বা হানা দেওয়া এবং তদন্তে অপরাধ প্রমাণিত হলে শাস্তি দেওয়া ভারত সরকারের আয়কর বিভাগের অধিকার এবং কর্তব্য। কিন্তু মুশকিল হল, এরকম সার্ভে আয়কর বিভাগ এবং এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট গত কয়েক বছরে একাধিকবার দেশের একাধিক সংবাদমাধ্যমের দফতরে চালিয়েছে। অথচ একবারও কোনো সার্ভে বা হানা থেকে কোনো সংবাদমাধ্যমের অপরাধের কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। এডিটর্স গিল্ডের বিবৃতিতেই উল্লেখ করা হয়েছে নিউজক্লিক, নিউজলন্ড্রি, দৈনিক ভাস্কর এবং ভারত সমাচারের দফতরে আয়কর ও ইডি হানার কথা। তার বাইরেও বেশকিছু সংবাদমাধ্যমের দফতরে এমন ঘটনা ঘটেছে। কাশ্মীরের সংবাদমাধ্যম এবং সাংবাদিকদের কাছে তো এসব জলভাত। তাঁরা কথায় কথায় কাগজ বন্ধ করে দেওয়া, নিগ্রহ, ইউএপিএ আইনে কারাবাস – এসবে অভ্যস্ত। এমনকি পশ্চিমবঙ্গের কলকাতা টিভির অফিসেও ডিসেম্বর মাসে ইডি হানা দিয়েছিল। এই সবকটি সংবাদমাধ্যমই আবার কেন্দ্রীয় সরকারকে অসুবিধায় ফেলে এমন প্রতিবেদন বা বিরোধী মতামত প্রকাশ করার জন্য বিখ্যাত (বা সরকারের কাছে কুখ্যাত)। এ যদি নেহাত কাকতালীয় ব্যাপার হয়, তাহলে বলতেই হবে এই কাক আর এই তাল একেবারে রাজযোটক। ফলে বিবিসির দফতরে যা চলছে তিনদিন ধরে, তাকে বাঁকা নজরে না দেখে উপায় নেই।

এডিটর্স গিল্ডের বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০০২ সালের গুজরাটের ঘটনাবলী এবং নরেন্দ্র মোদীর রাজত্বে দেশজুড়ে সংখ্যালঘু মানুষের উপর আক্রমণ নিয়ে বিবিসির দুই পর্বের তথ্যচিত্রের পরেই এই সার্ভে। সে তথ্যচিত্র দেশের মানুষকে দেখতে না দেওয়ার আপ্রাণ চেষ্টা করেছিল এই সরকার। ইউটিউব, ফেসবুক, টুইটারকে দিয়ে ওই তথ্যচিত্রের সমস্ত লিঙ্ক ব্লকও করানো হয়েছিল। ফলে দুয়ে দুয়ে চার করতে কোনো অসুবিধা নেই।

তা বাদেও সরকার যে আসলে বিবিসির উপর ওই তথ্যচিত্রের শোধ তুলছে, আর্থিক অনিয়ম স্রেফ ছুতো – এমন মনে করার কারণ ঘটিয়ে দিচ্ছে নিজেই। কারণ বিবিসি দফতরে হানা নিয়ে এখন পর্যন্ত কোনো ‘সরকারি’ ভাষ্য নেই। একটি আন্তর্জাতিক সংবাদসংস্থার দফতরে এইরকম হানা (আচ্ছা সার্ভেই হল) আন্তর্জাতিক খবরে পরিণত হয়ে গেছে, অথচ আয়কর বিভাগের কোনো শীর্ষস্থানীয় আধিকারিক বা অর্থমন্ত্রকের কোনো সচিব স্তরের আধিকারিক এ নিয়ে কোনো প্রেস বিবৃতি দেননি। অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারামনের দুটি টুইটার হ্যান্ডেলের একটিতেও এ নিয়ে একটি লাইন দেখলাম না। তাহলে প্রথম অনুচ্ছেদে লিখলাম কেন, সরকারপক্ষ বলেই যাচ্ছে…? সেখানেই মজা। ২০০২ সালে গুজরাটে ঠিক কী হয়েছিল, তা নিয়ে সঙ্ঘ পরিবার কখনো এক স্বরে কথা বলে না। একটি অংশ বলে, যা হয়েছিল বেশ হয়েছিল। সন্ত্রাসবাদীদের উচিত শিক্ষা দিয়েছিলেন মোদী। আরেকটি অংশ বলে, খোদ সুপ্রিম কোর্ট রায় দিয়েছে মোদীজির কোনো দোষ ছিল না। এর উপর আর কথা হয় নাকি? সব বিরোধীদের অপপ্রচার।

আরো পড়ুন এই মৃত্যু উপত্যকাই আমার দেশ

বিবিসির দফতরে আয়কর বিভাগের বিচরণ সম্পর্কেও একই পদ্ধতি নেওয়া হয়েছে। এক দল সাংবাদিকের কাছে কিছু তথ্য পাঠিয়ে আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ করা হয়েছে। একদা সরকারবিরোধী বলে পরিচিত, রায় দম্পতির প্রস্থানের পর সরকারি হয়ে ওঠা এনডিটিভির সাংবাদিক সংকেত উপাধ্যায়ই যেমন। তিনি টুইট করে এই অভিযোগের কথা জনসমক্ষে এনেছেন। অথচ এই তথ্যের সূত্র কী জিজ্ঞেস করা হলে তিনি জানিয়েছেন, সরকার প্রেস নোট হিসাবে ওই তথ্যগুলি জানিয়েছে। সরকার মানে কে? প্রেস নোটের উপর লেটারহেড কার ছিল? নিচের স্বাক্ষরটি কার? কোন মন্ত্রক থেকে পাঠানো হয়েছে এই নোট? এসবের কোনো উত্তর এই সাংবাদিকরা দিতে পারেননি। অন্যদিকে বিজেপির মুখপাত্ররা বিভিন্ন টিভি চ্যানেলে প্রতিক্রিয়া দেওয়ার সময়ে বিবিসিকে তেড়ে গাল পাড়ছেন। বিবিসি দুর্নীতিগ্রস্ত, মিথ্যের ঝাঁপি খুলে বসেছে – এরকম নানা অভিযোগ করছেন। ঠিক যে অভিযোগগুলো ‘ইন্ডিয়া: দ্য মোদী কোয়েশ্চেন’ তথ্যচিত্র মুক্তি পাওয়ার পরেও তাঁরা করেছিলেন। এই অভিযোগগুলো সত্যি হতেই পারে। কিন্তু তার সঙ্গে আয়কর বিভাগের কী সম্পর্ক? এর কোনো উত্তর তাঁদের কাছে নেই। অর্থাৎ প্রকারান্তরে মেনে নেওয়া হচ্ছে, আর্থিক অনিয়ম নয়। আপত্তি বিবিসি কী দেখাচ্ছে তা নিয়ে।

স্বাভাবিকভাবেই ভারতের বিরোধী রাজনৈতিক শক্তিগুলি এক সুরে সরকারকে সংবাদমাধ্যমের কণ্ঠরোধের অভিযোগে অভিযুক্ত করছে। কংগ্রেস নেতা জয়রাম রমেশ থেকে শুরু করে সিপিআই (এম-এল) লিবারেশনের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক দীপঙ্কর ভট্টাচার্য পর্যন্ত সকলেই দ্ব্যর্থহীন ভাষায় সরকারের নিন্দা করেছেন। কিন্তু তাতে মোদী সরকারের কী-ই বা এসে যায়? দেশের অধিকাংশ সংবাদমাধ্যম হয় ভক্তিতে নয় ভয়ে সরকারকে প্রশ্ন করা বন্ধ করে দিয়েছে। এনডিটিভির মত দু-একটি নাছোড়বান্দা সংবাদমাধ্যমকে মুকেশ আম্বানি বা গৌতম আদানি কিনে ফেলছেন – চুকে গেল ঝামেলা। কিন্তু বিবিসির বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ তোলা হয়েছে তার কিছু অন্তত প্রমাণ করতে না পারলে অন্য ক্ষতির সম্ভাবনা। আজকের দুনিয়ায় নিজের দেশের সাড়ে বারোটা বাজিয়েও রাষ্ট্রনেতা হিসাবে বিদেশে নাম কুড়ানো অসম্ভব নয়। বিশেষ করে ভারতের মত দেশ, যার বিরাট বাজার বহুজাতিকদের দরকার এবং যে দেশ পরমাণু শক্তিধর – সে দেশের ভিতরে সংখ্যালঘুরা বাঁচল কি মরল, জনা দুয়েক পুঁজিপতি মিলে দেশের সমস্ত সম্পদের দখল নিয়ে নিল কিনা তা নিয়ে অন্য কোনো দেশ মাথা ঘামাতে যায় না। কিন্তু সেসব দেশের সংবাদমাধ্যমের গায়ে হাত পড়লে যা হয়, তা হল গণতান্ত্রিক দেশ হিসাবে পরিচিতির বারোটা বাজে। সে পরিচিতি নিয়ে কমিউনিস্ট চীনের রাষ্ট্রপ্রধান বিশেষ মাথা ঘামান না। শি জিনপিং নিজের দেশের সকলকে নিজের ইচ্ছামত চালাতে পারলে খুশি, বিশ্বগুরু হতে চান না। কিন্তু মোদী তো চান। তাঁকে যদি ব্রিটেন, আমেরিকার সংবাদমাধ্যম ভ্লাদিমির পুতিন আর জিনপিংয়ের সঙ্গে একাসনে বসিয়ে একনায়ক বলে দেগে দেয় – তা কী পছন্দ হবে মোদীজির?

বিবিসি ব্রিটেনের রাজকীয় সনদের মাধ্যমে গঠিত সরকারের একটি মন্ত্রকের অধীন অথচ স্বায়ত্তশাসিত কর্পোরেশন। একে আমাদের প্রসার ভারতীর সঙ্গে গুলিয়ে ফেললে ভুল হবে। বিবিসি যতখানি সম্পাদকীয় স্বাধীনতা ভোগ করে এসেছে চিরকাল, ততখানি আমাদের দূরদর্শন বা অল ইন্ডিয়া রেডিও কোনো দলের সরকারের আমলেই ভোগ করেনি। ফলে ব্রিটেনে কনজারভেটিভ বা লেবার – যার সরকারই থাক, ক্ষমতাসীন প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে মোদী যতই দহরম মহরম করুন, বিবিসি চটলে তারা আরও বেশি করে ভারত সরকার সম্পর্কে বিরূপ প্রচার করবে। বিবিসির দেখাদেখি অন্য বিদেশি সংবাদমাধ্যমও করবে। বিশ্বগুরুর ভাবমূর্তিতে অনবরত আঁচড় পড়তে থাকলে কি খুশি হবেন মোদী? বিবিসি ধোয়া তুলসীপাতা নয়, তবে মনে রাখা ভাল, তারা কিন্তু নিজেদের দেশের ইতিহাসের বিশালকায় রাষ্ট্রনেতা উইনস্টন চার্চিলকেও ছেড়ে কথা বলে না। কথাটা বুঝতেন বলেই ইন্দিরা গান্ধী একসময়ে বিদেশি সংবাদমাধ্যমগুলোর প্রতি খড়্গহস্ত হয়েও পরে তাদের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ আচরণ শুরু করেন।

উত্তরবঙ্গ সংবাদে প্রকাশিত

কতটা পথ পেরোলে পরে ভারত পাওয়া যায়?

আমাদের অনেকেরই সন্দেহ ছিল, আপনি ক্রমঅপসৃয়মান ভারতকে আদৌ খুঁজতে চান কিনা। ভারত জোড়ো যাত্রায় প্রমাণ হল, চান।

মাননীয় রাহুল গান্ধী,

মহাত্মা গান্ধীর শহিদ হওয়ার দিনে ভারত জোড়ো যাত্রার শেষ বিন্দুতে পৌঁছে শ্রীনগরে আপনি যে ভাষণ দিয়েছেন তাতে অন্তত একটি চমৎকার কাজ হয়েছে। যারা বলে ব্যক্তিগত জীবন আর রাজনীতিকে আলাদা আলাদা বাক্সে রাখা উচিত, রাজনৈতিক কারণে ব্যক্তিগত সম্পর্কের অবনতি কাম্য নয়, তারা যে আসলে ব্যক্তিগত জীবনকে রাজনীতি কীভাবে প্রভাবিত করে তা বোঝে না অথবা কোনো উদ্দেশ্যে অন্যদের বুঝতে দিতে চায় না – তা আরও একবার পরিষ্কার হয়ে গেছে।

রাজনৈতিক আলোচনা মানেই তা নৈর্ব্যক্তিক হতে হবে – এই সংস্কার উদারপন্থী ও বাম রাজনীতিতে স্বতঃসিদ্ধ হয়ে দাঁড়িয়েছে। নৈর্ব্যক্তিক, অর্থাৎ আবেগশূন্য। অথচ আবেগ বাদ দিয়ে মানুষ হয় না, মানুষ যা যা করে তার প্রায় কোনোটাই আবেগ বাদ দিয়ে করে না। রাজনীতি তো নয়ই। কিন্তু রাজনীতি তো বটেই, প্রশাসন, বিচারব্যবস্থা, শিক্ষাব্যবস্থা – সবই আবেগশূন্য হওয়াই যে অভিপ্রেত তা আমাদের জনজীবনে বহুকাল হল প্রতিষ্ঠা পেয়ে গেছে। সম্ভবত সেই কারণেই দক্ষিণপন্থীদের পক্ষে সহজ হয়েছে একেবারে উল্টো মেরুতে দাঁড়িয়ে আবেগসর্বস্বতা দিয়ে মানুষের মাথা খেয়ে দেশটার সর্বনাশ করা। আমরা সরকারি অফিসে, হাসপাতালে, স্কুল কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ে আবেগশূন্য ব্যবহার পাই, নেতাদের কাছ থেকে এবং আদালতে আবেগশূন্য ব্যবহার পাই। কারণ গোটা ব্যবস্থাটা অনবরত শিখিয়ে চলেছে, মানুষকে মানুষ হিসাবে ভাবা অন্যায়। তাকে দেখতে হবে নৈর্ব্যক্তিকভাবে। সকলকে ৪৭ফ বা ৬৯ঙ হিসাবে দেখাই নিরপেক্ষতা, ন্যায়বিচার। যে যেখানে ক্ষমতার বিন্যাসে উপরে থাকবে, সে ন্যায় করলেও মায়াদয়াহীনভাবেই করবে – এই আমাদের আজন্মলালিত সংস্কার। উল্টোদিকের মানুষটির সাথে মানুষ হিসাবে নয়, তার প্রাসঙ্গিক তকমার হিসাবে ব্যবহার করাই যেন ন্যায়। এভাবে চললে যা হওয়ার কথা আমাদের দেশে ঠিক তাই হয়েছে। ন্যায় আর হয় না, অধিকাংশ সময় অন্যায়ই হয় সাধারণ মানুষের প্রতি। তাই বোধহয় দক্ষিণপন্থীরা কাজের কথা বাদ দিয়ে কারোর হিন্দু আবেগ, কারোর অসমিয়া আবেগ, কারোর বাঙালি আবেগ, কারোর দলিত আবেগ, কারোর আদিবাসী আবেগে সুড়সুড়ি দিলে ভুল করে মনে হয় “এই তো আমাকে আমি হিসাবে দেখছে।” অতএব সমস্ত মনপ্রাণ তারই দিকে ধাবিত হয়। আপনার শ্রীনগরের বক্তৃতা শুনে মনে হল, আপনি এই কথাটা ধরে ফেলেছেন।

দুই দশকের সাংবাদিক জীবন বাদ দিন, প্রায় সাড়ে তিন দশকের রাজনৈতিক বক্তৃতা শোনার জীবনে মনে করতে পারছি না আর কোনো ভারতীয় রাজনীতিবিদকে কোনো জনসভার প্রতিটি মানুষের সঙ্গে আলাদা করে অথচ একত্রে কথা বলতে দেখেছি। কাশ্মীরের মানুষ এবং সেখানে মোতায়েন আধাসামরিক বাহিনী ও সেনাবাহিনীর জওয়ানদের যে এক পংক্তিতে দাঁড় করানো সম্ভব, একই বাক্যে তাঁদের সকলের যন্ত্রণা ছুঁয়ে ফেলা সম্ভব তা নরেন্দ্র মোদীর ভারতে কেন, রাজীব গান্ধীর ভারতেও আমরা কোনোদিন কল্পনা করতে পারিনি। কারণ সৈনিক বা সাধারণ কাশ্মীরি – এই গোষ্ঠীনামের পিছনের ব্যক্তিগুলির বেদনা বা আনন্দ নিয়ে ভাবার কথা রাজনীতিবিদ দূরে থাক, আমাদেরও মনে আসেনি। আপনি ফোনে নিজের ঠাকুমা এবং বাবার মৃত্যুর খবর পাওয়ার স্মৃতি উল্লেখ করে বললেন, এ যন্ত্রণা মোদী-অমিত শাহ বুঝবেন না। কাশ্মীরের মানুষ বুঝবেন; সিআরপিএফ, বিএসএফ, সেনাবাহিনীর জওয়ানদের আত্মীয়রা বুঝবেন। কারণ তাঁরা এরকম ফোন কল পেয়ে থাকেন। ভারত জোড়ো যাত্রার উদ্দেশ্য এই ফোন কলগুলো আসা বন্ধ করা।

এভাবে বড়জোর শিল্পী, সাহিত্যিকদের কেউ কেউ ভাবতে পেরেছেন। কথাগুলো শুনেই মনে পড়ে গেল আজাজ খান নির্দেশিত হামিদ ছায়াছবিটির কথা। একমাত্র সেখানেই দেখেছিলাম ভারতীয় সেনার হাতে গুম হয়ে যাওয়া বাবার সন্ধানে থাকা আট বছরের ছেলে আর জন্মের পর থেকে সন্তানের মুখ না দেখা জওয়ানের যন্ত্রণাকে পাশাপাশি রাখা হয়েছিল। মোদী-শাহের নিষ্ঠুর পরিহাসে ২০১৯ সালে ওই ছবির নাম ভূমিকায় অভিনয় করা তালহা আর্শাদ রেশিকে নির্দেশক বেশ কিছুদিন জানাতেই পারেননি যে সে দেশের সেরা শিশুশিল্পীর পুরস্কার পেয়েছে। কারণ তখন গোটা কাশ্মীরের যোগাযোগ ব্যবস্থা বন্ধ করে রেখেছিল ভারত সরকার, যা কাশ্মীরের মানুষেরও সরকার।

এই সংকট তো কেবল কাশ্মীরের মানুষের নয়। দেশের যেখানেই রাষ্ট্র অতিমাত্রায় শক্তিধর হয়ে উঠেছে, নাগরিকের সঙ্গে রাষ্ট্রীয় স্বার্থের সংঘাত রাষ্ট্রের সহ্যের সীমা অতিক্রম করেছে, সেখানেই এই সংকট স্বাধীনতার পর থেকে বারবার ঘটেছে, আজও ঘটে চলেছে। ঠিক যেমন রাষ্ট্রের হাতে ধর্ষিত হওয়া অথবা ধর্ষিত হয়ে রাষ্ট্রশক্তির কাছ থেকে নৈর্ব্যক্তিক (একজন ধর্ষিতার পক্ষে যা অমানবিকের নামান্তর) ব্যবহার পাওয়া এ দেশের মেয়েদের অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। অথচ কোনো নেতাকে কখনো জনসভায় বলতে শুনিনি – “আপনারা হয়ত দেখেছেন আমি যখন হাঁটছিলাম, বেশকিছু মহিলা কাঁদছিলেন। জানেন ওঁরা কেন কাঁদছিলেন? কয়েকজন আমার সাথে দেখা করে আবেগপ্রবণ হয়ে পড়ে কাঁদছিলেন ঠিকই, কিন্তু এমন অনেকেও ছিলেন যাঁরা কাঁদছিলেন ধর্ষণের শিকার হয়েছেন বলে। কেউ কেউ বলছিলেন ওঁদের যৌন হয়রানি হয়েছে, কয়েকজনের আত্মীয়ই কাণ্ডটা ঘটিয়েছে। শুনে আমি যখন বলতাম, আমি পুলিসকে বলি তাহলে? ওঁরা বলতেন, রাহুলজি, পুলিসকে বলবেন না। আমরা আপনাকে বলতে চেয়েছিলাম, কিন্তু পুলিসকে বলবেন না। বললে আমাদের আরও ক্ষতি হবে। এই হল আমাদের দেশের বাস্তব।”

এ দেশ কত মহান তা নিয়ে কেবল সংঘ পরিবার তো নয়, আমাদের সকলেরই গর্বের শেষ নেই। সেই গর্বের আখ্যানে এই বাস্তব খাপ খায় না বলে আমরা এড়িয়ে যাই, রাজনৈতিক নেতারা তো এড়িয়ে যান বটেই। যে দলের যেখানে সরকার আছে সেখানে সে দলের নেতারা আরও বেশি করে এড়িয়ে যান, কারণ তাঁরা মনে মনে একে সমস্যা বলে জানলেও স্রেফ আইনশৃঙ্খলার সমস্যা বলেই ভাবেন। ফলে এসব কথা তুললে নিজের দলের সরকারের ঘাড়ে দোষ এসে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করেন। তার উপর পুলিসকে বললে সমস্যা বাড়বে – এ তো সরাসরি রাষ্ট্রবিরোধী কথা। সংসদীয় ব্যবস্থায় বিরোধী দলও তো রাষ্ট্রব্যবস্থার অঙ্গ। ব্যবস্থার মধ্যে থেকে তার বিরুদ্ধে কথা বলা চলে কখনো? অথচ আপনি বললেন। এখনো ভারতের বেশ বড় বড় তিনটে রাজ্যে আপনার দলের সরকার, অর্থাৎ সেখানকার পুলিস আপনার দলেরই হাতে। তার উপর আপনি, আপনার মা এবং বোন সারাক্ষণ রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার ঘেরাটোপে থাকেন। তবু যে আপনি এসব কথা বললেন, এ কথা চট করে ভোলা যাবে না। যেখানে দাঁড়িয়ে কথাগুলো বললেন, সেখান থেকে কুনান পোশপোরা ঠিক কত কিলোমিটার দূরে তা জানি না। তবে এটুকু বুঝতে পারি, আপনার কথাগুলো কেবল ওই কাণ্ডের ধর্ষিতাদের নয়, স্পর্শ করবে মণিপুরের সেই মহিলাদেরও, যাঁরা ২০০৪ সালে একদা উলঙ্গ হয়ে দাঁড়িয়ে পড়েছিলেন ইম্ফলের রাস্তায়, সঙ্গে ছিল ফেস্টুন। তাতে লাল অক্ষরে লেখা ছিল – INDIAN ARMY RAPE US। কথাগুলো নিশ্চয়ই ছুঁয়ে ফেলবে ছত্তিসগড়ের সোনি সোরিকে, বেঁচে থাকলে ছুঁয়ে ফেলত অর্চনা গুহকেও। সংবাদমাধ্যম যাকে নির্ভয়া নাম দিয়েছিল সেই মেয়েটিকে তো বটেই। এইসব কুকীর্তির সময়ে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় ছিল আপনার দলই। তবু আপনি এসব কথা বলেছেন বলে, বা সেইজন্যেই আরও বেশি করে আপনি ধন্যবাদার্হ, রাহুল। মানহারা মানবীর দ্বারে এসে দাঁড়ানোর সাহস খুব কম পুরুষের হয়। তাকে মানবী হওয়ার সম্মানটুকু দেওয়ার ক্ষমতাও অনেক শাসকেরই হয় না, নিজে মহিলা হলেও। আমি যে রাজ্যের বাসিন্দা সে রাজ্যের মহিলা মুখ্যমন্ত্রীই তো ধর্ষণ হলেই হয় ধর্ষিতার চরিত্র নিয়ে প্রশ্ন তোলেন, নয় প্রতিবাদী মহিলাদের দিকে আঙুল উঁচিয়ে তেড়ে যান, নতুবা ছেলেটি ও মেয়েটির মধ্যে প্রেম ছিল কিনা তার খোঁজ করেন। ভারতের রাজনীতিবিদদের থেকে এমন ব্যবহার পেয়েই ভারতীয় মেয়েরা অভ্যস্ত।

আরও পড়ুন রাহুলে না, বাবুলে হ্যাঁ: তৃণমূলের প্রকৃত এজেন্ডা নিয়ে কিছু প্রশ্ন

আপনার বক্তৃতায় আপনি আরও অনেক কথা বলেছেন যেগুলো ভাল কথা, প্রয়োজনীয় কথা, বহুবার বলা কথা। তবু আবার বলা প্রয়োজন, কারণ কেউ বলছে না। যেমন আপনি ‘গঙ্গা-যমুনী তহজীব’-এর কথা, অর্থাৎ হিন্দু-মুসলমানের যৌথ সভ্যতার কথা বলেছেন। কন্যাকুমারী থেকে কাশ্মীর পর্যন্ত আপনার যাত্রার তুলনায় এনেছেন কাশ্মীর থেকে এলাহাবাদে নেহরু পরিবারের যাত্রার প্রসঙ্গ। সাংস্কৃতিকভাবে কাশ্মীর থেকে কন্যাকুমারী কেমন একই সূত্রে গাঁথা তা দেখাতে ব্যক্তিগত ইতিহাসের এই ব্যবহার যে একজন পাকা বক্তার লক্ষণ। কিন্তু যা আপনার গোটা বক্তৃতায় সারাক্ষণ ছেয়ে থেকেছে তা হল সংবেদনশীলতা। আরও সহজ করে বললে, কেন্দ্র থেকে প্রান্তের মানুষকে ছোঁয়ার ইচ্ছা। আপনি যেমন ধর্ষিত মহিলাদের কথা বলেছেন, তেমনই বলেছেন দুটি হতদরিদ্র ছেলের কথা, যাদের গায়ে জামা পর্যন্ত ছিল না, দেহ ছিল ধূলিমলিন। বলেছেন তাদের দেখেই মনে হয়েছিল উত্তর ভারতের শীতেও শুধু টি-শার্ট পরেই কাটিয়ে দেবেন। সমালোচকের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেখলে কথাগুলো বানানো মনে হওয়া অস্বাভাবিক নয়। আপনার বক্তৃতার দিনেই নাগরিক ডট নেটে মনীষা ব্যানার্জি লিখেছেন “কথিত আছে চম্পারণে কস্তুরবা দেখেছিলেন, একটি ঝুপড়িতে দুই মহিলার মাত্র একটি কাপড়। একসঙ্গে দুজনে বাইরে বেরোতে পারেন না। এই কাহিনি গান্ধীকে কটিবস্ত্র ধারণে বাধ্য করে…”। ফলে সন্দেহ করা অমূলক নয়, যে এই কাহিনি আপনার জানা এবং আসলে তা থেকেই টি-শার্ট পরার সিদ্ধান্ত। যদি তাও হয়, তবু আজকের ভারতে একজন রাজনীতিবিদ সচেতনভাবে গান্ধীকে অনুকরণ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন এবং গান্ধীর এমন একটি কাজ অনুকরণ করছেন যা করতে গেলে নিজেকে শারীরিক কষ্ট ভোগ করতে হয় – এ বড় কম কথা নয়। আমরা তো শুনে এসেছি আপনি ‘শাহজাদা’। আপনি নিজেও এই ভাষণে বলেছেন আজন্ম কোনো না কোনো সরকারি বাড়িতে থেকেছেন। শুধু সমালোচকের চোখ দিয়ে দেখলেও সেই লোকের এই ভূমিকার প্রশংসা না করে উপায় নেই। ঘৃণার ব্যাপারীদের কথা অবশ্য আলাদা।

ধূলিমলিন ছেলেদুটির কথা বলতে গিয়ে আপনি ফের তুলে এনেছেন আমাদের পালিশ করা ভারতবর্ষের কদাকার দিকটি। আপনারই এক সঙ্গী যে আপনাকে বলেছিলেন ওদের সাথে গলাগলি করা উচিত হয়নি, ওরা নোংরা – সেকথা বলে দিয়েছেন সর্বসমক্ষে। জানিয়েছেন, আপনার উত্তর ছিল “ওরা আমার এবং আপনার থেকে পরিষ্কার।” আবার বলি, একথা বানানো হওয়া অসম্ভব নয়। কিন্তু বানানো হলেও দোষের নয়। প্রথমত, একজন নেতা জনসভায় না ভেবেচিন্তে যা খুশি বলবেনই বা কেন? দ্বিতীয়ত, অস্পৃশ্যতা আজও আমাদের দেশে ইতিহাস হয়ে যায়নি। যাঁরা ভুক্তভোগী তাঁদের একথা যেভাবে ছোঁবে, আমার মত উচ্চবর্গীয় সাংবাদিককে সেভাবে স্পর্শ করবে না বলাই বাহুল্য। কয়েক হাজার বছর ধরে কোণঠাসা হয়ে থাকা সেইসব মানুষ ভারত জুড়ে গত আট বছরে আরও কোণঠাসা হয়েছেন, যতই একজন দলিতের পর একজন আদিবাসী রাষ্ট্রপতি হয়ে থাকুন। যেসব গালাগালি স্বাধীন ভারতে অন্তত তাঁরা পিছন ফিরলে ছুঁড়ে দেওয়া হত, আজকাল প্রকাশ্যেই দেওয়া হয়। তাঁরা জানলেন, নিদেনপক্ষে একজন নেতা আছেন ভারতীয় রাজনীতিতে, যিনি ওই ভাবনার, ওই ব্যবহারের বিরুদ্ধে।

আজকের ভারত যেমন হয়েছে, তাতে সারাক্ষণ কথাবার্তা চলে নাগরিকত্ব নিয়ে। অনেকদিন পরে কাউকে ভারতীয়ত্ব নিয়ে আলোচনা করতে শুনলাম। ছোটবেলায় ইতিহাস বইতে পড়া “বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্য” কথাটাকে আজ বাজে কাগজের ঝুড়িতে ফেলে দেওয়া হয়েছে। সেই ঐক্য কীভাবে ভারতের সর্বত্র বিচিত্র ভাষায় বিশিষ্ট ব্যক্তিদের চিন্তায় ধরা পড়েছে আপনি সেকথা বলেছেন। গুজরাটের গান্ধী, আসামের শঙ্করদেব, কর্ণাটকের বাসবেশ্বর বা বাসবান্না, কেরালার নারায়ণ গুরু, মহারাষ্ট্রের জ্যোতিবা ফুলে – এঁদের সকলকেই আপনি ভারতীয়ত্বের নির্মাতা বলেছেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নামটা শুনতে না পেয়ে রাগ করব ভাবছিলাম। কারণ এমনকি জওহরলাল নেহরুও তাঁর ডিসকভারি অফ ইন্ডিয়া গ্রন্থে ভারতীয়ত্বের নির্মাণে তাঁর অবদান গুরুত্বপূর্ণ বলে মতপ্রকাশ করেছেন, গান্ধীর সঙ্গে তাঁকে একাসনে বসিয়েছেন (“Tagore and Gandhi have undoubtedly been the two outstanding and dominating figures of India in the first half of the twentieth century… Tagore and Gandhi bring us to our present age.”)। সেই রবীন্দ্রনাথের নাম করলেন না দেখে সত্যিই রাগ করতে যাচ্ছিলাম। তারপর খেয়াল হল, রবীন্দ্রনাথের নাম তো বহু নেতার মুখে শুনেছি। এমনকি মোদীও শালগ্রাম শিলার মত করে তাঁর নাম নিয়ে নেন, অসহ্য উচ্চারণে তাঁর কবিতার পংক্তি আউড়ে বাঙালিদের মোহিত করার চেষ্টা করেন ভোটের মুখে। কিন্তু নারায়ণ গুরু আর ফুলের মত দুজন বর্ণবাদবিরোধী মানুষের নাম ভারতের কোনো উচ্চবর্গীয় শীর্ষস্থানীয় নেতার মুখে কোনোদিন শুনেছি কি? এমনকি আপনার পূর্বপুরুষ নেহরুর উপর্যুক্ত বইটিতেও বর্ণাশ্রম শুরুতে ভাল উদ্দেশ্যেই চালু করা হয়েছিল, পরে মন্দ হয়ে যায় – এই জাতীয় মতামত প্রকাশ করা হয়েছে। গান্ধীও অস্পৃশ্যতার বিরুদ্ধে ছিলেন, বর্ণাশ্রমের বিরুদ্ধে নয়।

উপরন্তু আমরা যারা বিন্ধ্য পর্বতের এপাশে বাস করি এবং তামিল, তেলুগু, কন্নড়, মালয়ালির তফাত করতে পারি না; ওদিককার লোক হলেই দক্ষিণ ভারতীয় বলে দিয়ে নিশ্চিন্ত হই, তাদের অনেকের কাছে তো নামদুটোই নতুন। সে নাম আপনি করলেন ভারতের একেবারে উত্তর প্রান্তে দাঁড়িয়ে। এমনটি না করলে “দিবে আর নিবে, মিলাবে মিলিবে” স্বপ্ন সত্যি হবে কী করে? স্বাধীনতার পর ৭৫ বছর পেরিয়ে গেলেও এই আদানপ্রদান তো ঘটেনি, তাই তো সবার পরশে পবিত্র করা তীর্থনীরে মঙ্গলঘট ভরা হয়নি। আপনি কি পারবেন সেই ঘট ভরতে?

সে বড় কঠিন কাজ, সম্ভবত অনেক শতাব্দীর মনীষীর কাজ। আজকের ভারতে যখন সকলেই আড়চোখে সকলকে দেখে, তখন এ কাজ আরও শক্ত। সত্যি কথা বলতে কি, আপনি সে কাজের যোগ্য লোক কিনা তার পরীক্ষা আপনি ক্ষমতায় না পৌঁছলে শুরুই হবে না। আপনি যতই বলুন, ভারত জোড়ো যাত্রা কংগ্রেসের জন্য করেননি, কংগ্রেসকে বাদ দিয়েও আপনি যা করতে চান তা করতে পারবেন না। আর সেই দলে আজও গুরুত্বপূর্ণ নেতা হিসাবে আছেন কমলনাথের মত লোক, যিনি এই সেদিন অযোধ্যায় বাবরি মসজিদের জায়গায় রামমন্দির নির্মাণে কৃতিত্বের ভাগীদার হতে চেয়েছেন। যোগ করেছেন, আসল কৃতিত্ব আপনার বাবা রাজীব গান্ধীর, কারণ ১৯৮৫ সালে তিনিই বাবরির তালা খুলিয়ে দিয়েছিলেন। এছাড়াও আছেন শশী থারুর, যিনি কে জানে কোন অধিকারে কদিন আগে ঘোষণা করে দিলেন, ভারতের মুসলমানরা পর্যন্ত আর গুজরাট ২০০২ নিয়ে ভাবতে চান না

এঁদের নিয়ে কী করে ভারত জুড়বেন সে প্রশ্নের উত্তর খোঁজার ভার আপনার। নেহরু যে গণতন্ত্রের কথা বলতেন সেই গণতন্ত্রের রীতি মেনে আপনার উপর সাগ্রহ কিন্তু সন্দিগ্ধ নজর রাখব আমরা, যারা এখনো প্রশ্ন তোলা এবং সমালোচনা করা সংবাদমাধ্যমের কাজ বলে মনে করি। কিন্তু একথা অনস্বীকার্য যে ভারতের আজ এমন এক নেতা দরকার যাঁর ছাপ্পান্ন ইঞ্চি ছাতি না হলেও বুকের ভিতরে কিছুটা পাথর আছে। যে কোনো ভারতবাসী ধ্বনি দিলে প্রতিধ্বনি পাবে। আপনার শ্রীনগরের বক্তৃতা শোনার পর মনে না করে পারছি না, আপনি তেমনই একজন।

ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা এবং স্মৃতিকে উপযুক্ত স্থান দিতে হবে। কিন্তু সেখানেই থেমে থাকলে কেউ এগোতে পারে না। কেবল রাজনীতি নয়, সাংবাদিকতাতেও তার ঊর্ধ্বে উঠতে হয়, তবেই সত্যের সন্ধান পাওয়া যায়। আমাদের হারিয়ে যাওয়া বা কখনো খুঁজে না পাওয়া ভারতের সন্ধানও সেভাবেই পাওয়া যাবে সম্ভবত। দূরদর্শনে যখন নেহরুর ডিসকভারি অফ ইন্ডিয়া অবলম্বনে শ্যাম বেনেগালের ভারত এক খোঁজ ধারাবাহিক শুরু হয়, তখন আমার বয়স ছয়। আপনার বোধহয় ১৮। তখন না হলেও, এখন নিশ্চয়ই খেয়াল করেছেন যে সুপণ্ডিত নেহরু বইয়ের নামে দাবি করেছেন তিনি ভারতকে ‘আবিষ্কার’ করেছেন। অন্যদিকে বেনেগাল ওই বইয়ের মধ্যে দিয়ে ভারত দেশটাকে খুঁজে বেড়িয়েছেন। এতদিন আমাদের অনেকেরই সন্দেহ ছিল, আপনি ক্রমঅপসৃয়মান ভারতকে আদৌ খুঁজতে চান কিনা। ভারত জোড়ো যাত্রায় প্রমাণ হল, চান। আশা করি এ খোঁজ শ্রীনগরে শেষ হয়নি, শুরু হল।

ধন্যবাদান্তে

জনৈক সাংবাদিক।

নাগরিক ডট নেটে প্রকাশিত

কী ঢাকছে সরকারি চোলি? কেনই বা ঢাকছে?

আজ বিবিসির তথ্যচিত্র মুছে দেওয়া হচ্ছে, কাল ২০০২ সালে গুজরাটে আদৌ কোনো দাঙ্গা হয়েছিল বলে পোস্ট করলেই তা মুছে দেওয়া হবে। আহসান জাফরি খুন হননি – ওটি ভুয়ো খবর। বিলকিস ধর্ষিত হননি – ওটিও ভুয়ো খবর।

চোলি কে পিছে কেয়া হ্যায়
চোলি কে পিছে?
চুনরী কে নীচে কেয়া হ্যায়
চুনরী কে নীচে?

আমাদের তখন সবে গোঁফের রেখা উঠছে। সন্ধেবেলা দূরদর্শনের ‘সুপারহিট মুকাবলা’ অনুষ্ঠানে খলনায়ক ছবির এই গান পরপর কয়েক সপ্তাহ বেজেছিল এবং আমাদের উদ্বেল করেছিল। তখনো বাঙালি ছেলেমেয়েরা ভূমিষ্ঠ হয়েই হিন্দিতে পণ্ডিত হয়ে যেত না, ইংরেজি মাধ্যমের ছাত্রছাত্রীদের বাবা-মায়েরাও দলে দলে হিন্দিকে তাদের দ্বিতীয় ভাষা করে তুলতে উদগ্রীব হতেন না। ফলে চোলি আর চুনরী শব্দদুটির অর্থ জানতে আমাদের কিঞ্চিৎ সময় লেগেছিল। জানার পর আমাদের রোমাঞ্চ কোন মাত্রায় পৌঁছেছিল তা আজকের স্মার্টফোন প্রজন্ম কল্পনা করতে পারবে না। কিছুদিন পরে সে রোমাঞ্চে জল ঢেলে দিতে কেউ বা কারা আদালতে মামলা ঠুকে দিল। গানটি শ্লীল না অশ্লীল তা নিয়ে প্রবল তর্কাতর্কি লেগে গেল, কিছুদিন পরে দেখা গেল জনপ্রিয়তায় একসময় এক নম্বরে উঠে যাওয়া ওই গান আর ‘সুপারহিট মুকাবলা’ অনুষ্ঠানে বাজানো হচ্ছে না। ইলা অরুণের গাওয়া ওই চারটি লাইন মোটেই অশালীন নয় – এই যুক্তির পক্ষে যারা, তাদের হাতিয়ার ছিল অলকা ইয়াগনিকের গাওয়া পরের কয়েক লাইন

চোলি মে দিল হ্যায় মেরা
চুনরী মে দিল হ্যায় মেরা
ইয়ে দিল ম্যায় দুঙ্গি মেরে ইয়ার কো, পেয়ার কো।

অকাট্য যুক্তি। ছবিতে দেখা যেত এক নাচাগানার আসরে নীনা গুপ্তা গানের প্রথম চার লাইনের প্রশ্নটি তুলছেন, আর লাস্যময়ী মাধুরী দীক্ষিত স্পষ্ট উত্তর দিয়ে দিচ্ছেন। অতএব অন্য কিছু ভাবার তো কোনো কারণ নেই। যতদূর মনে পড়ে আদালতে গানটির অশ্লীলতা প্রমাণ হয়নি, তাই প্রায় একই যুগের খুদ্দার ছবির অন্য একটি গান ‘সেক্সি সেক্সি সেক্সি মুঝে লোগ বোলে’-র মত আদালতের নির্দেশে গানের কথা বদল করে নতুন করে প্রকাশ করতে হয়নি। কিন্তু ঘটনা হল, চোলির পিছনে আর চুনরীর নিচে যা আছে তা নিয়ে আমাদের রোমাঞ্চে জল ঢালা সম্ভব হয়নি। আমরা যে যার মত করে বুঝে নিয়েছিলাম কী আছে – দিল না অন্য কিছু।

২০০২ সালে গুজরাটে গোধরায় ট্রেনে অগ্নিকাণ্ডের পর কী ঘটেছিল, তাতে নরেন্দ্র মোদীর কতখানি দায় ছিল, আদৌ ছিল কি ছিল না – এ প্রশ্ন উঠলেই আমার ওই গানটির কথাই মনে পড়ে। হৃদয় তো অনেক গভীরে গেলে পাওয়া যায়। বয়ঃসন্ধির ছেলেপুলেদের অতদূর যাওয়ার ধৈর্য থাকে না। আমরা, ইংরেজিতে যাকে বলে ‘স্কিন ডিপ’, ওই গানের সে অর্থটুকু ভেবেই আহ্লাদিত হতাম। দূরবর্তী কোনো মাইক থেকে গানটি ভেসে এলে বন্ধুবান্ধবদের মধ্যে চোখ মারামারি চলত, ঠোঁটে থাকত দুষ্টু হাসি। তা বলে কি আমাদের মধ্যে একটিও সুবোধ বালক ছিল না? তারা আমাদের অসভ্য উল্লাস দেখে যারপরনাই বিরক্ত হত। দু-একজন খাঁটি সাত্ত্বিক মানসিকতায় আমাদের বোঝানোর চেষ্টা করত, আমরা গানটির একেবারে ভুল অর্থ ভেবে নিচ্ছি। একই গানের কথার যে একাধিক অর্থ হওয়া সম্ভব সে শিক্ষা আমরা তখনই পাই – রবীন্দ্রসঙ্গীতের গভীরতা বা ভারতচন্দ্রের ব্যাজস্তুতিকে স্পর্শ করার আগেই।

বিলিতি কবিতার রোম্যান্টিক যুগের কবিরা মনে করতেন মানুষ অমৃতের সন্তান। জন্মের পরেও বেশ কিছুদিন সে নিষ্পাপ থাকে, তারপর অভিজ্ঞতার মধ্যে দিয়ে তার মধ্যে পাপ প্রবেশ করে, পবিত্রতা বিদায় নেয়। কবি উইলিয়াম ব্লেক Songs of Innocence আর Songs of Experience নামে দুটি পরিপূরক কবিতার বই লিখে ফেলেছিলেন, আর উইলিয়াম ওয়ার্ডসওয়ার্থ লিখেছিলেন এ জগৎ হল কারাগার। একটি ছেলে যত বড় হয় তত তার চতুর্দিকে ঘনিয়ে আসে সে কারাগারের গরাদ (“Shades of the prison-house begin to close/Upon the growing Boy”)। ২০০২ সালের মত ঘটনা যখন ঘটে তখন মানুষ অমৃতের সন্তান না মৃত্যুর সওদাগর তা নিয়ে ঘোর সন্দেহ দেখা দেয়। তবে এখন পিছন ফিরে মনে হয় মাধুরীর চোলি যেমন আমাদের নিষ্পাপ নাবালকত্ব থেকে অভিজ্ঞ সাবালকত্বে পৌঁছে দিয়েছিল, তেমনই গুজরাট ২০০২ ভারতের হিন্দুত্ববাদী রাজনীতিকে রাম জন্মভূমি নিয়ে গণহিস্টিরিয়া তৈরি করা আর মসজিদ ভাঙার রাজনীতির নাবালকত্ব থেকে শাসনযন্ত্রকে ব্যবহার করে অভীষ্ট লক্ষ্যপূরণের সাবালকত্বে পৌঁছে দিয়েছিল।

দেশের সর্বোচ্চ আদালত একাধিক মামলায় রায় দিয়েছে – কয়েক হাজার মানুষের মৃত্যু, ধর্ষণ, বাস্তুচ্যুতির পিছনে কোনো বৃহত্তর অপরাধমূলক চক্রান্ত ছিল না। তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী মোদীরও কোনো প্রত্যক্ষ দায় ছিল না। এর উপরে আর কথা কী? কে না জানে, ভারতের বিচারব্যবস্থার মত নিখুঁত ও নিরপেক্ষ ব্যবস্থা পৃথিবীর কোথাও নেই? সেই কারণেই তো বিচারপতি নিয়োগের কলেজিয়াম ব্যবস্থাকে বাতিল করার দাবিতে উঠেপড়ে লেগেছে মোদী সরকার। তাদের অভিযোগ – ব্যবস্থাটি অগণতান্ত্রিক। আইনমন্ত্রী কিরেন রিজিজু আর সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি ধনঞ্জয় যশবন্ত চন্দ্রচূড় প্রায় বাগযুদ্ধে জড়িয়ে পড়ছেন প্রতিদিন। কী কাণ্ড! যে ব্যবস্থা মোদীর বিরুদ্ধে যাবতীয় রাজনৈতিক চক্রান্ত নস্যাৎ করে তাঁকে পদ্মফুলের মত নিষ্পাপ প্রমাণ করেছে, সেই ব্যবস্থাকে কিনা তাঁর সরকারই মনে করে অগণতান্ত্রিক!

এমন সময়, হাঁউ মাউ খাঁউ, গণহত্যার গন্ধ পাঁউ বলে এসে পড়ল বিবিসির তথ্যচিত্র ইন্ডিয়া: দ্য মোদী কোয়েশ্চেন। নতুন করে উঠে পড়ল চোলির পিছনে কী আছে সেই প্রশ্ন। এইবেলা পরিষ্কার করে দেওয়া যাক, উদাহরণ হিসাবে শুধুমাত্র বিপরীতকামী পুরুষদের মধ্যে চালু থাকা নারীদেহ সম্পর্কে একটি রগরগে আলোচনাকে কেন টেনে এনেছি। কারণটি খুব সোজা। ওই যে বললাম, আমরা যে যার মত করে বুঝে নিয়েছিলাম? লক্ষ করলে দেখা যাবে, গুজরাটে ঠিক কী হয়েছিল বিজেপির ভোটাররাও ঠিক একইভাবে যে যার মত করে বুঝে নিয়েছে। ওই যে বললাম, গানটি ভেসে এলেই আমাদের মধ্যে চোখ মারামারি চলত? ঠিক একই ব্যাপার বিজেপি ও তার ভোটারদের মধ্যে চলে। বিবিসির তথ্যচিত্রে যা যা দেখানো হয়েছে তার কিছুই কিন্তু নতুন নয়। নতুন খবর বলতে এটুকুই, যে ব্রিটিশ সরকার এক নিজস্ব তদন্ত চালিয়েছিল, যার সিদ্ধান্ত হল মোদী স্বয়ং দায়ী। যে সমস্ত প্রমাণ, যেসব সাক্ষীকে এই তথ্যচিত্রের দর্শকরা দেখছেন তাঁদের কথা ভারতের বহু ছোটবড় সংবাদমাধ্যমে গত দুই দশকে প্রকাশিত হয়েছে। রাকেশ শর্মার তথ্যচিত্র ফাইনাল সলিউশন দেখলে বিবিসির তথ্যচিত্রের চেয়েও বেশি ঠান্ডা স্রোত নামবে শিরদাঁড়া বেয়ে। সেই তথ্যচিত্রটি যখন ইউটিউবে প্রথম আপলোড করা হয়, তখন সরকারের হাতে তা ব্লক করিয়ে দেওয়ার ক্ষমতা ছিল না। কিন্তু দলে দলে লোক বারবার রিপোর্ট করে ‘কমিউনিটি স্ট্যান্ডার্ড’-কে অজুহাত হিসাবে ব্যবহার করে সাময়িকভাবে ব্লক করিয়ে দিয়েছিল।

ফলে বারবার প্রশ্ন উঠেছে। উঠলেই প্রত্যেকবার বিজেপি নেতা ও সমর্থকদের থেকে দুরকম উত্তর পাওয়া যায়। এক দল বলে, সব বানানো গল্প। সুপ্রিম কোর্ট ক্লিনচিট দিয়েছে। আরেক দল বলে, যা করেছে বেশ করেছে। মুসলমানদের বেশি বাড়তে দেওয়া উচিত নয়। অমিত শাহ স্বয়ং যেমন সংবাদসংস্থা এএনআইকে বলেছিলেন, মোদীজির বিরুদ্ধে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য প্রণোদিত অভিযোগ করা হয়েছিল। সুপ্রিম কোর্টের রায়ের পর সেই অভিযোগকারীদের ক্ষমা চাওয়া উচিত। আবার সম্প্রতি হিমাচল প্রদেশে নির্বাচনী প্রচারে বলেছেন, ২০০২ সালে মোদীজি যারা হিংসা ছড়ায় তাদের উচিত শিক্ষা দিয়েছিলেন। ফলে গুজরাটে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। যার যা পছন্দ সে তাই বুঝে নেবে।

আমরাও ঠিক এমনই করতাম। এক দল মাধুরীর হৃদয় নিয়ে ভাবত, আরেক দল মাংসপিণ্ড নিয়ে। এমন চোলিকেন্দ্রিক পৌরুষই যে গুজরাট ২০০২-এর অভিজ্ঞান তা আর কেউ না জানলেও বিলকিস বানো বিলক্ষণ জানেন।

ভারত সরকার ইউটিউবে বিবিসির তথ্যচিত্রের যত লিঙ্ক আছে সব ব্লক করে দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে। বিবিসির তথ্যচিত্রের লিঙ্ক শেয়ার করায় বেশকিছু টুইটও মুছে দিতে বলেছে। যদি বলি এই সাবালক জীবনের চেয়ে সেই নাবালক জীবন ভাল ছিল, তাহলে স্রেফ স্মৃতিমেদুর হয়ে পড়ছি বলা যাবে কি? তখন ভারত রাষ্ট্র স্রেফ যৌনতাকেই অশ্লীল বলে বিবেচনা করত, ঢেকেঢুকে রেখে, গানের কথা বদলে দিয়ে বা কোনো ফিল্মের গোটা দু-চার চুম্বন দৃশ্য বাদ দিয়েই নিজের ক্ষমতা জানান দিত। তাও কেউ আদালতে দৌড়লে তবে। এখন তথ্যপ্রযুক্তি আইন সংশোধন করে নিজের অপছন্দের কিছু দেখলেই তাকে অসত্য বলে দেগে দিয়ে ইন্টারনেট থেকে সরিয়ে দিতে পারে। ঠিক সেই কাজটিই করা হয়েছে এক্ষেত্রে। কদিন আগেই, গত মঙ্গলবার, তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রকের ওয়েবসাইটে আপলোড হওয়া সংশোধনীর এক খসড়ায় দেখা যাচ্ছে, ভবিষ্যতে সরকারের প্রেস ইনফরমেশন ব্যুরো যে খবরকে ভুয়ো খবর বলে ঘোষণা করবে সে খবর কোনো সোশাল মিডিয়ায় শেয়ার করা যাবে না। শেয়ার হলে তার দায়িত্ব বর্তাবে সোশাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মটির উপর।

অর্থাৎ আজ বিবিসির তথ্যচিত্র মুছে দেওয়া হচ্ছে, কাল ২০০২ সালে গুজরাটে আদৌ কোনো দাঙ্গা হয়েছিল বলে পোস্ট করলেই তা মুছে দেওয়া হবে। আহসান জাফরি খুন হননি – ওটি ভুয়ো খবর। বিলকিস ধর্ষিত হননি – ওটিও ভুয়ো খবর। প্রেস ইনফরমেশন ব্যুরো হয়ত এমনই বলবে। তা সরকার বা সরকারি সংস্থাগুলি বলতেই পারে। কিন্তু যত বলবে ততই চোলির পিছনে কী আছে সে প্রশ্ন জোরালো হবে। সরকারের এখনো চোলি কেন প্রয়োজন – সে প্রশ্নও উঠবে নির্ঘাত। কারণ গুজরাট দাঙ্গায় অভিযুক্ত, এমনকি শাস্তিপ্রাপ্তরাও তো এখন মুক্ত। ওয়ার্ডসওয়ার্থের কাব্যের সত্যতা প্রমাণ করে গারদ ঘনিয়ে এসেছে কেবল উমর খালিদ, শার্জিল ইমামদের মত নাবালকদের উপর – যারা গালভর্তি দাড়ি গজিয়ে যাওয়ার পরেও মানুষকে মৃত্যুর সওদাগর ভাবার সাবালকত্বে উত্তীর্ণ হতে পারেনি।

আরও পড়ুন অসংসদীয় শব্দ: মুখ বুজে বাঁচা অভ্যাস করতে হবে

সামান্য আশাবাদী অবশ্য হওয়া যায় একথা ভেবে, যে সরকারের এখনো খানিক লজ্জাশরম আছে বলেই চোলির প্রয়োজন পড়ছে। তবে ইন্টারনেটের যুগে চোলি যথাস্থানে রাখা লৌহকঠিন সরকারের পক্ষেও কষ্টসাধ্য। শীত বড়জোর আর এক মাস। তারপর বসন্ত সমীরণে ভোরের দিকে হাওড়ার ফেরিঘাট থেকে যদি বাগবাজার অভিমুখে নৌকাবিহারে বেরিয়ে পড়েন, তাহলে দেখতে পাবেন ভাগীরথীর পাড়ে প্রাতঃকৃত্য করতে বসেছেন অনেকে। তাঁরা বসেন নদীর দিকে পিছন ফিরে। তাতে সুবিধা হল, আপনি তাঁদের উলঙ্গ অবস্থায় দেখতে পেলেও তাঁরা আপনাকে দেখতে পান না। ফলে ভেবে নেওয়া সহজ হয় যে আপনিও তাঁদের দেখতে পাচ্ছেন না। ইন্টারনেটে একটি দেশের মধ্যে তথ্য ও তথ্যচিত্র ব্লক করা এমনই ব্যাপার। অবশ্য আত্মপ্রতারণা ছাড়া একনায়কত্ব বাঁচে কেমন করে?

পুনশ্চ: বিবিসির তথ্যচিত্রের নামে পার্ট ওয়ান কথাটি রয়েছে। কঙ্গনা রানাওয়াতের হিট ছবির সংলাপের ভাষায় “অভি তো হমে ঔর জলীল হোনা হ্যায়।”

নাগরিক ডট নেটে প্রকাশিত

অমর্ত্য সেন, ক্লিকটোপ আর মাদাম তুসো

অমর্ত্যকে গালি দেওয়ার কাজটাও কেবল বাঙালিরাই করছেন। বিজেপির মধ্যেও কেবল তথাগত, দিলীপ ঘোষরাই। প্রধানমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কোনো প্রতিক্রিয়া নেই।

আনন্দবাজার পত্রিকা স্মরণীয় শিরোনাম দেওয়ার জন্য বিখ্যাত। এই তো সেদিন পেলের প্রয়াণে শিরোনাম হল ‘আমার সম্রাট স্বপ্নে থাক’। শঙ্খ ঘোষের ‘বাবরের প্রার্থনা’ পড়া থাকলে পাঠকের কাছে এই শিরোনামের রস কিঞ্চিৎ ঘনীভূত হবে সন্দেহ নেই, কিন্তু না থাকলেও রসে তিনি পুরোপুরি বঞ্চিত হবেন না। খবরের কাগজে এই ধরনের শিরোনামকেই সেরা বলে ধরা হয়ে এসেছে চিরকাল। অমর্ত্য সেন যখন নোবেল পুরস্কার পেলেন, তখন আমার মত যাদের সবে গোঁফদাড়ি গজিয়েছিল, তাদের নির্ঘাত এই মধ্যবয়সে এসেও মনে আছে সেই অবিস্মরণীয় শিরোনাম – ‘মর্তের সেরা পুরস্কার বাংলার অমর্ত্যর’। তখন ইন্টারনেট থাকলেও সোশাল মিডিয়া ছিল না, সংবাদমাধ্যমের ঘাড়ে ক্লিক আদায় করার চাপ ছিল না, ক্লিকটোপের প্রয়োজন ছিল না। এখন আছে। অনিবার্যভাবে ওয়েব মাধ্যমের এই কৌশল অন্য মাধ্যমগুলোতেও ঢুকে পড়েছে। অনেক ক্ষেত্রে খবরের কাগজের সাংবাদিকদের কাজের মূল্যায়নও মালিকরা করছেন কোন প্রতিবেদনে ওয়েবে কতগুলো হিট হল তা দিয়ে। কোনো কোনো কাগজ অনলাইন সংস্করণের জন্য আলাদা কর্মীবাহিনী না রেখে এক মাইনেয় দুটো কাজই করিয়ে নিচ্ছে সাংবাদিকদের দিয়ে। ফলে খবরের কাগজের শিরোনামেও সত্যনিষ্ঠা, বিশ্লেষণী ক্ষমতা, বুদ্ধির দীপ্তি, ভাষার নৈপুণ্য গুরুত্ব হারাচ্ছে, প্রাধান্য পাচ্ছে শিরোনামে “অশ্বত্থামা হত” বলে চোখ টেনে নিয়ে প্রতিবেদনে বেশ পরের দিকে “ইতি গজ” বলার প্রবণতা। সেই ধারাতেই দিন তিনেক আগে আনন্দবাজার পত্রিকায় প্রকাশিত এক প্রতিবেদন নিয়ে শীতের বাংলা কদিন উত্তপ্ত। তার শিরোনাম – মমতা প্রধানমন্ত্রী হওয়ার যোগ্য, বলেই দিলেন নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ ‘ভারতরত্ন’ অমর্ত্য সেন।

এই শিরোনামে চোখ পড়া মাত্রই মনে হওয়া স্বাভাবিক যে অমর্ত্য মমতা ব্যানার্জিকে একটা শংসাপত্র দিয়েছেন। এমনকি যে পাঠক মমতার অনুরাগী এবং/অথবা তৃণমূল কংগ্রেসের সমর্থক, তাঁর পক্ষে এমন ভেবে নেওয়াও অসম্ভব নয় যে সম্ভাব্য প্রধানমন্ত্রীদের মধ্যে অমর্ত্য মমতাকেই যোগ্যতম বলেছেন। কারণ অমর্ত্যের বিজেপিবিরোধিতা সর্বজনবিদিত; তিনি তো আর নরেন্দ্র মোদীকে যোগ্যতম বলবেন না। এই ধারণা আরও দৃঢ় হবে মমতার প্রতিক্রিয়া জানলে। তিনি বলেছেন “অমর্ত্য সেন বিশ্ববরেণ্য পণ্ডিত, আমাদের অন্যতম গর্ব। তাঁর পর্যবেক্ষণ আমাদের পথ দেখায়। তাঁর উপদেশ আমাদের কাছে আদেশ। দেশের বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে তাঁর পর্যবেক্ষণ ও মূল্যায়ন নিশ্চয় সবাইকে গুরুত্ব দিয়ে ভাবতে হবে।” যেন অমর্ত্য তাঁকে প্রধানমন্ত্রী হওয়ার উপদেশ দিয়েছেন।

অথচ আনন্দবাজারের প্রতিবেদনটা পড়তে গেলে একেবারে অন্য সত্যের সন্ধান পাওয়া যাচ্ছে। আসলে সংবাদসংস্থা প্রেস ট্রাস্ট অফ ইন্ডিয়া (পিটিআই)-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে দেশের সামগ্রিক পরিস্থিতি নিয়ে অমর্ত্য অনেক কথাবার্তা বলেছেন। সাক্ষাৎকারটা ছিল ইংরেজিতে। দেশকে নেতৃত্ব দেওয়ার ব্যাপারে মমতার ক্ষমতা সম্পর্কে অমর্ত্যের নিজের ব্যবহৃত শব্দগুলো হল, “It’s not that she does not have the ability to do it. She clearly has the ability. On the other hand, it’s yet not established that Mamata can pull the forces of public dismay against the BJP in an integrated way to make it possible for her to have the leadership to put an end to the fractionalisation in India.”

এই ability শব্দটার বাংলা তর্জমা ক্ষমতা এবং যোগ্যতা – দুইই হতে পারে। অমর্ত্য যদি qualification শব্দটা ব্যবহার করতেন তাহলে তিনি যে যোগ্যতাই বুঝিয়েছেন তা নিয়ে সন্দেহের অবকাশ থাকত না। কিন্তু তর্কের খাতিরে যদি ধরে নেওয়া যায় তিনি যোগ্যতাই বুঝিয়েছেন, তাহলেও পরের শব্দগুলো অমর্ত্যের অনাস্থার ইঙ্গিত। নিজের মত করে তর্জমা না করে বরং আনন্দবাজারের প্রতিবেদন থেকেই গোটা উক্তিটা তুলে দেওয়া যাক – “এমন নয় যে তাঁর এটা করার ক্ষমতা নেই। এটা খুব স্পষ্ট, তাঁর সেই ক্ষমতা রয়েছে। কিন্তু অন্য দিকে, এটা এখনও প্রতিষ্ঠিত নয় যে, মমতা বিজেপির বিরুদ্ধে জনগণের হতাশার জায়গাগুলোকে এক ছাতার তলায় এনে ভারতে বিভেদের রাজনীতির অবসান ঘটাতে নেতৃত্ব দেবেন।”

কিমাশ্চর্যম তৎপরম! শিরোনামের ‘যোগ্য’ প্রতিবেদনে এসে ‘ক্ষমতা’ হয়ে গেল! অর্থাৎ মমতার যোগ্যতা হল অশ্বত্থামা। সে যে মৃত সে খবর শিরোনামে দিয়ে অনলাইনে ক্লিক এবং অফলাইনে জোর আলোচনা নিশ্চিত করার পর প্রতিবেদনে ক্ষমতার কথা বলা হল, পাঠককে নিচু স্বরে জানিয়ে দেওয়া হল, যে মারা গেছে সে দ্রোণাচার্যের পুত্র নয়, একটা হাতি মাত্র। এ যে সম্পাদকমণ্ডলীর সচেতন সিদ্ধান্ত তাতে সন্দেহ নেই, কারণ অমর্ত্য ability শব্দটা কোন অর্থে ব্যবহার করেছেন তা নিয়ে অত বড় কাগজের সম্পাদকমণ্ডলী তো দূরের কথা, কোনো সাধারণ পাঠকেরও সন্দেহ থাকবে না প্রসঙ্গ জানা থাকলে। সোশাল মিডিয়ার যুগে অপ্রাসঙ্গিকভাবে মহাপুরুষদের উদ্ধৃত করা অতিমারীতে পরিণত হয়েছে অনেকদিন হল। এই কৌশলে কেউ প্রমাণ করতে চান রবীন্দ্রনাথ বা আম্বেদকর মুসলমান, খ্রিস্টানদের মোটেই সুবিধের লোক মনে করতেন না। কেউ আবার স্বামী বিবেকানন্দকে বামপন্থী প্রমাণ করার চেষ্টা করেন। সেই কুঅভ্যাসকে প্রশ্রয় না দিয়ে আমরা বরং আনন্দবাজারের তর্জমা থেকেই দেখে নিই অমর্ত্য কী প্রসঙ্গে আমাদের মুখ্যমন্ত্রী সম্পর্কে ওই মন্তব্য করেছেন। তিনি বলেছেন “আমার মনে হচ্ছে, একাধিক আঞ্চলিক দল আগামী দিনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে চলেছে। আমার মনে হয়, ডিএমকে একটি গুরুত্বপূর্ণ দল। তৃণমূলও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সমাজবাদী পার্টির ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। কিন্তু আমি জানি না, এই মুহূর্তে তারা কী অবস্থায় রয়েছে।”

স্পষ্টতই অমর্ত্যের মাথায় রয়েছে তামিলনাড়ু, পশ্চিমবঙ্গ এবং উত্তরপ্রদেশের বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফল এবং তার সাপেক্ষে লোকসভায় ডিএমকে, তৃণমূল কংগ্রেস ও সমাজবাদী পার্টি লোকসভায় কত আসন পেতে পারে সেই হিসাব। এই রাজ্যগুলোর সর্বশেষ বিধানসভা নির্বাচনে ওই তিন দলের প্রাপ্ত আসন যোগ করলে দাঁড়ায় ৪৮৫ (তৃণমূল ২১৫ + ডিএমকে ১৫৯ + সমাজবাদী পার্টি ১১১)। এই তিন রাজ্যে মোট লোকসভা আসনের সংখ্যা ১৬১ (পশ্চিমবঙ্গ ৪২ + তামিলনাড়ু ৩৯ + উত্তরপ্রদেশ ৮০)। সাধারণত একটা লোকসভা আসনের মধ্যে থাকে সাতটা বিধানসভা আসন। আন্দাজ পাওয়ার জন্য তৃণমূল, ডিএমকে, সমাজবাদী পার্টির ৪৮৫ আসনকে সাত দিয়ে ভাগ করলে দাঁড়ায় প্রায় ৭০। এই সাক্ষাৎকারে অমর্ত্য আগেই বলেছেন ২০২৪ নির্বাচন বিজেপি একচ্ছত্র আধিপত্য নিয়ে জিতে যাবে বলে তিনি মনে করেন না। তিনি সঠিক প্রমাণিত হলে বিজেপির আসন সংখ্যা এখনকার চেয়ে কমে যাবে, ত্রিশঙ্কু লোকসভা হওয়াও অসম্ভব নয়। বলা বাহুল্য, সেক্ষেত্রে ৭০টা আসন অমূল্য। সেই কারণেই আঞ্চলিক দলগুলোর কথা বলা।

কিন্তু বিধানসভা আর লোকসভা নির্বাচন যে এক নয় সেকথা অমর্ত্য বিলক্ষণ জানেন। উপরন্তু লোকসভা নির্বাচন আসতে আসতে এই রাজ্যগুলোর ভোটারদের এই দলগুলো সম্পর্কে মতও বদলাতে পারে নানা কারণে, হয়ত ইতিমধ্যে বদলেও গেছে। সেসব মাথায় রেখেই তিনি যোগ করেছেন “কিন্তু আমি জানি না, এই মুহূর্তে তারা কী অবস্থায় রয়েছে।” এতৎসত্ত্বেও ক্লিকটোপ ফেলতে এবং নিঃসন্দেহে সম্পাদকীয় নীতির কারণে শিরোনামে এসে গেল, অমর্ত্য বলেছেন মমতা প্রধানমন্ত্রী হওয়ার যোগ্য। অন্যান্য সংবাদমাধ্যমও পত্রপাঠ এই নিয়ে হইচই শুরু করে দিল।

এ পর্যন্ত তবু ঠিক ছিল। সংবাদমাধ্যম এমনটাই করে থাকে, করা তাদের ব্যবসায়িক স্বাধীনতা। হয়ত বাকস্বাধীনতাও। আমাদের বাকস্বাধীনতা হল এমন আচরণের সমালোচনা করা। মুশকিল হল, ব্যাপার সেখানে থেমে থাকেনি। বামপন্থী এবং দক্ষিণপন্থী বাঙালিরা ৮৯ বছরের লোকটাকে গালাগাল দিতে নেমে পড়েছেন। তথাগত রায়ের মত দক্ষিণপন্থী, যাঁরা প্রায়শই বলে থাকেন অমর্ত্য অর্থনীতি কিস্যু জানেন না (অর্থাৎ প্রযুক্তিবিদ তথাগত অর্থনীতি জানেন), তাঁরা ওঁকে নিজের বিষয়ের বাইরে কথা বলতে নিষেধ করছেন। এদিকে তৃণমূল শাসনে তিতিবিরক্ত অনেক বামপন্থী অমর্ত্যকে ‘চটিচাটা’ তকমা দিচ্ছেন। ঠিক যেভাবে বিজেপির সমালোচনা করলেই অমর্ত্যকে তাদের ট্রোলবাহিনী কংগ্রেসের ধামাধরা বলে অভিহিত করে। নোবেলজয়ী হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক, যাঁর এ দেশে কোনোদিন পা না রাখলেও চলে, তাঁর যে কারোর ধামা ধরার বা চটি চাটার প্রয়োজন নেই তা এদের বোঝাবে কে?

আরও পড়ুন রেউড়ি সংস্কৃতি: যে গল্পে ডান-বাম গুলিয়ে গিয়েছে

সিপিএম নেতা সুজন চক্রবর্তী কিন্তু মমতার ক্ষমতা সম্পর্কে অমর্ত্যের সঙ্গে সহমত পোষণ করেছেন। তারপর নিজের রাজনৈতিক অবস্থান থেকে বলেছেন, বিজেপিবিরোধী শক্তিগুলিকে এক করা দূরের কথা, মমতা বরং তাদের মধ্যে বিভাজন তৈরি করতে চেষ্টা করবেন।

#EISAMAY “অমর্ত্য সেন সঠিক সংশয় প্রকাশ করছেন যে বিজেপি বিরোধী শক্তিগুলিকে কি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় একজোট করতে পারবেন? আমরা বলছি একজোট করার বদলে বিজেপি বিরোধী শক্তিগুলি যাতে একজোট না হতে পারে তৃণমূল তার চেষ্টা করছে” মন্তব্য সুজন চক্রবর্তীর ⁦@SUJAN_SPEAK⁩ #CPIM #TMC #BJP PIC.TWITTER.COM/IJZIID5DZY— prasenjit bera (@prasenjitberaES) January 14, 2023

কিন্তু তাতে কী? কমিউনিস্ট পার্টিগুলোর বিখ্যাত (বা কুখ্যাত) গণতান্ত্রিক কেন্দ্রিকতার মুখে ছাই দিয়ে সোশাল মিডিয়ার যুগে সব বাম দলেই কমবেশি ‘গো অ্যাজ ইউ লাইক’ চালু হয়ে গেছে। সেই প্রথা মেনে সিপিএম কর্মী, সমর্থকরা বিভিন্ন মাত্রায় অমর্ত্যের বিরুদ্ধে বিষোদ্গার করেই চলেছেন। তাঁদের সবচেয়ে ভদ্র অংশ বলছে, বুড়ো বয়সে ভীমরতি ধরেছে। কেউ কেউ আবার গভীর পর্যবেক্ষণের পর মন্তব্য করছে অমর্ত্য নাকি বেশ কিছুদিন হল মমতার ধামা ধরেছেন। কারোর বক্তব্য, এসব শান্তিনিকেতনে নিজের জমি, বাড়ি বাঁচাতে হার্ভার্ডের অধ্যাপকের মরিয়া চেষ্টা। বিজেপি সমর্থক বাঙালিরাও মোটামুটি এইসব অভিযোগই তুলছে বৃদ্ধের বিরুদ্ধে। অমর্ত্য সেনের চোদ্দ পুরুষের ভাগ্য যে মেম বিয়ে করেছেন বলে নোবেল পেয়েছেন – এই পুরনো অভিযোগটা এখনো ট্রাঙ্ক থেকে বের করে মাঘের রোদে মেলে দেওয়া হয়নি।

পরিতাপের বিষয়, যদিও পিটিআইকে দেওয়া সাক্ষাৎকার নিয়ে সারা দেশের সংবাদমাধ্যমে লেখালিখি হয়েছে এবং প্রায় একই সময়ে দ্য ওয়ার ওয়েবসাইটের সাংবাদিক করণ থাপারকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে অমর্ত্য বিজেপি তথা সঙ্ঘ পরিবারকে আরও বিশদে এবং কঠোরতম ভাষায় তুলোধোনা করেছেন, তা নিয়ে বাংলার সংবাদমাধ্যম বা সোশাল মিডিয়ায় প্রায় কোনো আলোচনা নেই।

অমর্ত্যকে গালি দেওয়ার কাজটাও কেবল বাঙালিরাই করছেন। বিজেপির মধ্যেও কেবল তথাগত, দিলীপ ঘোষরাই। প্রধানমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কোনো প্রতিক্রিয়া নেই। এমনকি বিজেপিবিরোধী বিদ্বানদের গাল না পাড়লে যাঁর ভাত হজম হয় না, সেই অমিত মালব্য পর্যন্ত এখন পর্যন্ত একটা টুইট করেননি। অথচ শেষ জীবিত পৃথিবীবিখ্যাত বাঙালিকে বামপন্থী ও দক্ষিণপন্থী বাঙালিরা স্রেফ অপছন্দের রাজনৈতিক নেতা সম্পর্কে একটি মন্তব্যের কারণে যা খুশি তাই বলে চলেছেন।

বাঙালি মেধার এহেন অবনমন কৌতুককর। আনন্দবাজার ক্লিকটোপ ফেলেছে এবং সে টোপ গেলা মানুষের সংখ্যাধিক্য প্রমাণ করছে, শিরোনাম পেরিয়ে প্রতিবেদন অবধি যাওয়া লোকেরা আজকাল ব্যতিক্রম। আরও মজার কথা হল, ওই কাগজটাকে যাঁরা বাজারি কাগজ বলে হেলা শ্রদ্ধা করেন চিরকাল, সেই বামপন্থীরাও এই টোপ কম গেলেননি। অর্থাৎ প্রকাশ্যে বাজারি বলে গাল দিলেও পড়ার বেলায় ওই কাগজটাই পড়েন। শুধু তাই নয়, সম্ভবত কেবল ওটাই পড়েন। নইলে অন্য একাধিক জায়গায় প্রকাশিত ওই সাক্ষাৎকারের প্রতিবেদন থেকেই জেনে ফেলতে পারতেন, অমর্ত্য মমতাকে কোনো শংসাপত্র দেননি।

অমর্ত্য সেন ভগবান নন। দুনিয়ার সব ব্যাপারে তিনি যা বলবেন তাই মেনে নিতে হবে এমন কোনো কথা নেই। বস্তুত সমাজবিজ্ঞানে ঠিক আর ভুলের সীমারেখা স্থির নয়, ফলে অত বড় পণ্ডিতের বক্তব্যকে একজন কলেজপড়ুয়াও চ্যালেঞ্জ জানাতেই পারে। কিন্তু যা খুশি বলা আর ভিন্নমত পোষণ করা এক জিনিস নয়। বামফ্রন্ট আমলে বেশ কয়েকবার অমর্ত্য সেন পশ্চিমবঙ্গ সরকারের সমালোচনা করেছিলেন, সরকার একমত হয়নি। একবার তো অমর্ত্যকে ভুল প্রমাণ করতে গণশক্তির পাতায় কলম ধরেছিলেন তৎকালীন অর্থমন্ত্রী অসীম দাশগুপ্ত।

আজকের পশ্চিমবঙ্গে অবশ্য এসব কথা স্মরণ করিয়ে লাভ নেই। ডান, বাম নির্বিশেষে মাদাম তুসো মার্কা মৃণাল সেনে মজে থাকা বাঙালি ভিন্নমত হতে গেলে যে লিখতে হয়, নিদেনপক্ষে প্রতিপক্ষের বক্তব্য পুরোটা পড়তে হয় – সেকথা কেন বিশ্বাস করতে যাবে?

নাগরিক ডট নেটে প্রকাশিত

জাতীয় সঙ্গীত এবং নেশন: ইরান যা ভাবায়

নেশন যে একটা বানিয়ে তোলা ধারণা – রবীন্দ্রনাথের এই মতের চমৎকার প্রমাণ পাওয়া যায় ভারত বনাম বাংলাদেশ খেলা হলে। একই কবির একই ভাষায় লেখা দুটো গান গায় দুই আলাদা নেশনের মানুষ।

জাতীয় সঙ্গীত না গাওয়ার কী কী ফল হতে পারে? ইসলামিক আইনে চালিত, এই মুহূর্তে গনগনে বিদ্রোহের আগুনে ঝলসাতে থাকা মধ্যপ্রাচ্যের দেশ ইরানে কী হতে পারে জানি না, তবে সাংবিধানিকভাবে এখনো ধর্মনিরপেক্ষ এবং তথাকথিত আধুনিক আইনকানুন মেনে চলা দেশ ভারতে কী হতে পারে তার বেশকিছু দৃষ্টান্ত আছে।

২০১৮ সালের দুর্গাপুজোর সপ্তমীর দিন নিজেদের দেশের সবচেয়ে সংস্কৃতিবান এবং প্রগতিশীল জনগোষ্ঠী বলে দাবি করা কলকাতার বাসিন্দারা স্টার থিয়েটারে ন জন দর্শকের দিকে তেড়ে যান সিনেমা শুরু হওয়ার আগে ‘জনগণমন’ চলার সময়ে উঠে দাঁড়িয়ে গান না করার অপরাধে। অথচ সে বছরের জানুয়ারিতেই সুপ্রিম কোর্টের তৎকালীন প্রধান বিচারপতি দীপক মিশ্রের নেতৃত্বাধীন বেঞ্চ ২০১৬ সালে সুপ্রিম কোর্টেরই জারি করা সিনেমা হলে জাতীয় স্তোত্র বাজানো বাধ্যতামূলক করার আদেশ বাতিল করে দিয়ে বলেছিল, “The interim order passed on November 30, 2016 is modified that playing of national anthem prior to screening of a film is not mandatory or directory”। কিন্তু দেশের অবস্থা তখনই এমন, যে ওই আদেশ পুরোপুরি বাতিল করার সাহস সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিদেরও হয়নি। বর্তমান প্রধান বিচারপতি চন্দ্রচূড় সে সময়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন বটে “should we wear our patriotism on our sleeves”? কিন্তু আদালত এ প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে স্কোয়্যার পাস দিয়েছিল কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভাকে।

সুপ্রিম কোর্টের ওই রায়ের পর ৯ জানুয়ারি দ্য টাইমস অফ ইন্ডিয়া কলকাতার বিভিন্ন সিনেমা হলের মালিকদের মতামত প্রকাশ করেছিল এক প্রতিবেদনে। সেই প্রতিবেদন পড়লে বোঝা যায়, ভারতের জাতীয় সঙ্গীতের রচয়িতা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জাতিরাষ্ট্র এবং জাতীয়তাবাদ সম্পর্কে যে মনোভাবই থেকে থাকুক, কলকাতার হলমালিকরা ব্যবসার মত জাতীয়তাবাদের প্রতিযোগিতাতেও হারতে রাজি নন।

প্রিয়া সিনেমার মালিক অরিজিৎ দত্ত বলেছিলেন “সুপ্রিম কোর্টের এই আদেশে আমার এখানে কোনো তফাত হবে না। আমি জাতীয় সঙ্গীতের বদলে বন্দে মাতরম বাজাব। আশা করব দর্শকরা উঠে দাঁড়াবেন। তবে আমি কাউকে জোর করব না।” মিনার, বিজলী, ছবিঘরের মালিক সুরঞ্জন পাল বলেছিলেন “সুপ্রিম কোর্টের নতুন অর্ডার জাতীয় স্তোত্র বাজানো বাধ্যতামূলক নয় বললেও আমি বাজাতেই থাকব। আমি এ-ও আশা করব যে গান চলার সময়ে দর্শকরা উঠে দাঁড়াবেন।” নবীনার মালিক নবীন চৌখানি আবার একটা নতুন কথা বলেছিলেন। “আগের অর্ডারটা বৈষম্যমূলক ছিল। কেবল সিনেমা হলগুলোকে জাতীয় স্তোত্র বাজানোর জন্যে বেছে নেওয়া হল কেন? রেস্তোরাঁ, খেলার মাঠ – এসব জায়গায় তো বাজাতে বলা হয়নি।”

অর্থাৎ দিনের যে কোনো সময়ে যে কোনো উদ্দেশ্যে আপনি যেখানেই যান না কেন, রাষ্ট্রের ইচ্ছা হলেই আপনাকে সাবধান পজিশনে দাঁড় করিয়ে জাতীয় স্তোত্র বাজিয়ে দেওয়া হবে আর আপনাকেও সুবোধ বালক/বালিকা হয়ে গাইতে হবে। এই ব্যবস্থায় বিশেষ কারোর আপত্তি নেই। শুধু তাই নয়, কেউ ভিন্নমত হলে তাকেও মেরে ধরে দাঁড় করিয়ে গাওয়ানোর উদ্যোগ নেবে লোকে।

চেন্নাই, বেঙ্গালুরুতেও সেসময় সিনেমা হলে এ নিয়ে বিস্তর গোলমাল, হাতাহাতি হয়েছিল, গৌহাটিতে হুইলচেয়ারে বসা এক শারীরিক প্রতিবন্ধী মানুষকেও জাতীয়তাবাদী দর্শকরা উঠে না দাঁড়ানোর জন্য গালাগালি করেছিলেন। উল্লেখ্য, জাতীয় সঙ্গীত বা জাতীয় পতাকার অবমাননা আইনত অপরাধ বলে গণ্য হলেও আইনে কোথাও বলা নেই উঠে না দাঁড়ানো মানে অবমাননা করা। যা-ই হোক, আজও রমরমিয়ে সিনেমা হলে জাতীয় স্তোত্র বেজে চলেছে, অধিকাংশ নাগরিক উঠে দাঁড়িয়ে গান গেয়েও থাকেন। ইদানীং অবশ্য যারা উঠে দাঁড়ায় না তাদের দিকে তেড়ে যাওয়ার ঘটনা তত শোনা যায় না। অনেকে ওসব ঝামেলা এড়াতে গান বেজে যাওয়ার পরে হলে ঢোকেন। তার মানে ঝামেলা যে হতে পারে সে আতঙ্ক সফলভাবে সকলের মনে ঢুকিয়ে দেওয়া গেছে। সিনেমা হলে জাতীয়তাবাদ প্রদর্শন কর্তব্য বলে স্বীকৃত হয়েছে। সে কর্তব্য পালন না করলে গারদে পুরে দেওয়ার আইন এখনো পাস হয়নি বটে, কিন্তু প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী কদিন আগে বলে দিয়েছেন, শুধু বন্দুকধারী নয়, কলমধারী নকশালদেরও সমূলে উৎপাটিত করতে হবে। তেমন কিছুদিন পরে বলতেই পারেন, শুধু রাজনীতি করা অ্যান্টি-ন্যাশনাল নয়, জাতীয় স্তোত্র না গাওয়া অ্যান্টি-ন্যাশনালদেরও গ্রেপ্তার করতে হবে। কে না জানে, প্রধানমন্ত্রী যে সে লোক নন? তিনি বিষ্ণুর একাদশ অবতার। অতএব তাঁর কথাই আইন। তিনি বললেই জাতীয় স্তোত্র গাইতে যারা উঠে দাঁড়ায় না তাদের হাজতবাস করানোর জন্য সিনেমা হলে কাতারে কাতারে পুলিস মোতায়েন হয়ে যাবে নিশ্চয়ই।

তবু না মেনে উপায় নেই, আমাদের প্রধানমন্ত্রীর আয়াতোল্লা খোমেইনি হয়ে উঠতে বাকি আছে। অনুসিদ্ধান্ত – ভারতের ইরান হয়ে উঠতে বাকি আছে। তাই ভাবছিলাম, ভারতেই যদি সাধারণ নাগরিক সিনেমা হলে জাতীয় স্তোত্র না গাইলে এত কাণ্ড হতে পারে, তাহলে কাতারের বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে ম্যাচের আগে ইরানের যে ফুটবলাররা জাতীয় সঙ্গীত গাইলেন না, তাঁদের কী অবস্থা হবে। ম্যাচের পর সাংবাদিক সম্মেলনে ইরান অধিনায়ক এহসান হজসফি দ্ব্যর্থহীন ভাষায় জানিয়ে দিয়েছেন কেন তাঁরা জাতীয় সঙ্গীত গাননি। জানিয়েছেন দেশে যা চলছে তা যে ভাল হচ্ছে না তা অস্বীকার করার কোনো অবকাশ নেই এবং তাঁর দল দেশের মানুষের পাশেই আছে। তাদের জন্যেই ভাল খেলার চেষ্টা, গোল করার চেষ্টা।

⚡️ BREAKING: #IRAN FOOTBALL TEAM CAPTAIN DEFIES REGIME, BACKS PROTESTS: “WE HAVE TO ACCEPT THAT CONDITIONS IN OUR COUNTRY ARE NOT RIGHT & OUR PEOPLE ARE NOT HAPPY. THEY SHOULD KNOW THAT WE ARE WITH THEM. AND WE SUPPORT THEM. AND WE SYMPATHIZE WITH THEM REGARDING THE CONDITIONS.” PIC.TWITTER.COM/SX4KENXITZ— Hillel Neuer (@HillelNeuer) November 21, 2022

কী চলছে তাঁর দেশে? কারোর জানতে বাকি নেই। ১৬ সেপ্টেম্বর মাহসা আমীনী রাষ্ট্রের হাতে খুন হওয়ার পর থেকে ইরানের মহিলাদের হিজাববিরোধী আন্দোলনের তীব্রতা বহুগুণ বেড়ে গেছে। তাঁরা প্রকাশ্যে আসছেন ইসলামিক রাষ্ট্রের হিজাব, বোরখা পরার আইন অমান্য করে। পুড়িয়ে দিচ্ছেন সেসব, চুল কেটে ফেলছেন। মিছিলে মিছিলে ছয়লাপ গোটা দেশ। পাল্লা দিয়ে চলছে সরকারি দমননীতি – মারধোর, হত্যা, পুলিসি হেফাজতে যৌন নির্যাতন। ইরানের পুরুষদের একটা বড় অংশ যে এই আন্দোলনের পাশে এসে গেছেন তার প্রমাণ পাওয়া গেল বিশ্বকাপের মঞ্চে ফুটবল দলের প্রতিবাদে।

পৃথিবীর কোথাও কোনো নারী আন্দোলনের পাশে এভাবে পুরুষদের জাতীয় দলের খেলোয়াড়রা দাঁড়িয়েছেন কিনা জানি না, নারীবাদ নিয়ে যাঁরা চর্চা করেন তাঁরা বলতে পারবেন। কিন্তু হজসফি ও তাঁর দল একইসঙ্গে অন্য একটা প্রশ্ন তুলে দিয়েছেন যা আজকের পৃথিবীতে, ভারতে তো বটেই, প্রাসঙ্গিক। ভারতের জাতীয় স্তোত্রের রচয়িতা রবীন্দ্রনাথ নেশন (বাংলাতেও এই শব্দই লিখেছেন) ব্যাপারটাকেই ভাল চোখে দেখতেন না। স্বাধীন দেশে কী করলে নেশনের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন করা হয় তার কিছু মানদণ্ড আমরা ঠিক করেছি, সব দেশই করে থাকে। তার অন্যতম জাতীয় সঙ্গীত। ইরানের ফুটবলাররা জাতীয় সঙ্গীত গাইলেন না, বললেন দেশের মানুষের পাশে দাঁড়াতেই এই সিদ্ধান্ত। অর্থাৎ দেশ মানে মানুষ, কতকগুলো প্রতীক নয়। তাহলে কি প্রতীকের প্রয়োজন শুধু দেশের উপর নেশনের আধিপত্য বজায় রাখতে?

১৯৩২ সালের এপ্রিল মাসে রবীন্দ্রনাথ ইরানে যান শাসক রেজা শাহ পহলভির আমন্ত্রণে। কিন্তু তাঁর সঙ্গে ইরানের সম্পর্ক হজসফিদের জানার কথা নয়। তবু তাঁদের আচরণে যেন উঠে এসেছে নেশন সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথেরই অনাস্থা।

আরও পড়ুন ‘ন্যাশনাল আর্কাইভের অবলুপ্তি দেশটাকে শপিং মল বানানোর চক্রান্ত’

১৯১৬ সালের মে মাস থেকে ১৯১৭ সালের এপ্রিল – এই সময়ের মধ্যে জাপান ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে রবীন্দ্রনাথ বক্তৃতা দেন। যেসব কথাবার্তা তিনি বলেন তা জাতীয়তাবাদীদের (বা নেশনবাদীদের) সেদিনও পছন্দ হয়নি, আজও হয় না। যেমন জাপান সম্পর্কে তিনি বলেন “জাপানে দেখেছি গোটা দেশের মানুষ স্বেচ্ছায় নিজেদের মস্তিষ্ক এবং স্বাধীনতা সরকারের হাতে খর্ব হতে দিয়েছে। আর সরকার নানারকম শিক্ষার ব্যবস্থার দ্বারা মানুষের চিন্তাকে নিয়ন্ত্রণ করছে, তাদের অনুভূতি নির্মাণ করছে, মানুষের মধ্যে আধ্যাত্মিক হয়ে ওঠার সম্ভাবনা দেখা দিলে সন্দেহপ্রবণ হয়ে পড়ে নজরদারি চালাচ্ছে। এক সংকীর্ণ পথ দিয়ে সত্যের দিকে নয়, মানুষকে সেই দিকে চালিত করছে যেদিকে নিয়ে গেলে মানুষকে একেবারে ভেঙে গড়ে নিজের ইচ্ছানুযায়ী এক সমসত্ত্ব জড়পিণ্ডে পরিণত করা যাবে। মানুষ এই সর্বগ্রাসী মানসিক দাসত্ব সানন্দে এবং সগর্বে মেনে নেয় কারণ তাদের মধ্যে নেশন নামক ক্ষমতার যন্ত্রে পরিণত হওয়ার উত্তেজক অভিলাষ কাজ করে…”। [ভাষান্তর আমার]

(I have seen in Japan the voluntary submission of the whole people to the trimming of their minds and clipping of their freedom by their government, which through various educational agencies regulates their thoughts, manufactures their feelings, becomes suspiciously watchful when they show signs of inclining toward the spiritual, leading them through a narrow path not toward what is true but what is necessary for the complete welding of them into one unform mass according to its own recipe. The people accept this all-pervading mental slavery with cheerfulness and pride because of their nervous desire to turn themselves into a machine of power, called the Nation…)

পড়লে মনে হয় প্রথম বিশ্বযুদ্ধের মধ্যে দাঁড়িয়েই রবীন্দ্রনাথ ইসলামিক বিপ্লব পরবর্তী ইরানের মত নেশন বা একবিংশ শতাব্দীর বিরাট ডিসটোপিয়াসুলভ নেশনগুলোর চেহারা দেখতে পাচ্ছিলেন, যা তাঁর অন্তত দেড় দশক পরে ইউরোপের টোটালিটেরিয়ান রাষ্ট্রগুলোকে দেখে কল্পনা করবেন অলডাস হাক্সলি (Brave New World; প্রকাশকাল ১৯৩২), তিন দশক পরে জর্জ অরওয়েল (1984; প্রকাশকাল ১৯৪৯)।

নেশন যে একটা বানিয়ে তোলা ধারণা – রবীন্দ্রনাথের এই মতের চমৎকার প্রমাণ পাওয়া যায় ভারত বনাম বাংলাদেশ খেলা হলে। একই কবির একই ভাষায় লেখা দুটো গান গায় দুই আলাদা নেশনের মানুষ। রবীন্দ্রনাথকে এ জিনিস দেখতে হয়নি। ১৯১৬-১৭ সালের সেই বক্তৃতামালায় ভারত সম্পর্কে তিনি বলেছিলেন “যদিও শৈশবকাল থেকে আমাকে শেখানো হয়েছিল যে নেশনকে পুজো করা প্রায় ঈশ্বরকে এবং মানবতাকে শ্রদ্ধা করার চেয়েও ভাল, আমার মনে হয় আমি সেই শিক্ষার প্রভাব কাটিয়ে উঠেছি। আমার বিশ্বাস আমার দেশের মানুষ তাঁদের সত্যিকারের ভারত লাভ করতে পারবেন সেই শিক্ষার বিরুদ্ধে লড়াই করলে, যা শেখায় একটা দেশ মানবতার আদর্শের চেয়ে বড়।”

(Even though from childhood I had been taught that idolatry of the Nation is almost better than reverence for God and humanity, I believe I have outgrown that teaching, and it is my conviction that my countrymen will truly gain their India by fighting against the education which teaches them that a country is greater than the ideals of humanity.) [ভাষান্তর আমার]

রবীন্দ্রনাথ যে লড়াই করতে বলেছিলেন আমরা তাতে ব্যর্থ হওয়ার ফলেই দেশভাগ হয়, উপরন্তু খণ্ডিত ভারতবর্ষ আজও ভাগ হয়ে চলেছে। ইরানের ফুটবল দল নেশন নির্ধারিত প্রতীককে অস্বীকার করে দেশের মানুষের পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেছেন, ভারতীয় ক্রীড়াবিদরা যত দিন যাচ্ছে তত নেশনের বশংবদ হয়ে পড়ছেন। আগে সাতে পাঁচে থাকতেন না, ইদানীং সবার আগে রাষ্ট্রের পক্ষ নিতে ঝাঁপিয়ে পড়েন সোশাল মিডিয়ায়। এসব বললেই একটা কথা বলা হয় – আমাদের দেশের খেলোয়াড়দের থেকে ওসব আশা করা উচিত নয়, কারণ আমাদের সমাজ ইউরোপ বা আমেরিকার মত গণতান্ত্রিক নয়। আমাদের খেলোয়াড়রা রাজনৈতিক প্রতিবাদ করলে নাকি নানাবিধ চাপের মুখে পড়বেন। ইরানের ফুটবলারদের দেখার পর এ কথায় আর কান দেওয়ার প্রয়োজন নেই বোধহয়। কারণ আমরা তো ইরানের চেয়ে বেশি গণতান্ত্রিক দেশ বলেই নিজেদের দাবি করে থাকি। তাহলে তাদের ফুটবলাররা এবং তাঁদের পরিজন যে সংকটের কল্পনায় ম্রিয়মান না হয়ে এমন প্রতিবাদ করেছেন তার চেয়ে বড় কোন বিপদে আমাদের খেলোয়াড়রা পড়তে পারেন স্বাধীনতার অমৃত মহোৎসবে?

পুনশ্চ: বিশ্বকাপ জ্বরে আমাদের অনেকেরই হয়ত চোখ এড়িয়ে গেছে একটা খবর। বিজেপির আইনজীবী নেতা অশ্বিনী উপাধ্যায় দিল্লি হাইকোর্টে জনস্বার্থ মামলা করে দাবি করেছেন ‘জনগণমন’ আর ‘বন্দে মাতরম’-কে সমান মর্যাদা দিতে হবে। তার উত্তরে কেন্দ্রীয় সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রক জানিয়েছে, দুটো গান একই স্তরের এবং দেশের প্রত্যেক নাগরিকের দুটোকেই সমান শ্রদ্ধা জানানো উচিত। উপাধ্যায় নিজের পিটিশনে দাবি জানিয়েছেন, কেন্দ্রীয় সরকার এবং রাজ্য সরকারগুলোকে সমস্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে দুটো গানই প্রত্যেক কাজের দিনে বাজানো নিশ্চিত করতে হবে।

দেশ যত দুর্বল হয় নেশনকে তত শক্তিশালী করার দরকার হয়। যে গানে নেশন কম জনগণমন বেশি, সে গান ঠেকায় পড়ে সহ্য করে নিতে হয়। কিন্তু আধিপত্যবাদী রাষ্ট্রের কাছে অবশ্যই সেই গান বেশি শ্রেয়, যেখানে মাতৃমূর্তির সাহায্যে জনমনে অভিন্ন নেশন প্রতিভাত হয়। 

নাগরিক ডট নেটে প্রকাশিত

রেউড়ি সংস্কৃতি: যে গল্পে ডান-বাম গুলিয়ে গিয়েছে

১৯৯১ পরবর্তী যুগে দিনরাত মন্ত্রের মত কানের কাছে বলে বলে যে কয়েকটি কথা আমাদের মর্মে প্রবেশ করিয়ে দেওয়া হয়েছে তার অন্যতম হল, কোনও পরিষেবা বা পণ্য বাজার থেকে পয়সা দিয়ে না কিনে পাচ্ছে মানেই সেটা দান।

আমি কোন পথে যে চলি, কোন কথা যে বলি
তোমায় সামনে পেয়েও খুঁজে বেড়াই মনের চোরা গলি।

এই প্রকল্প বারবার বিরোধীদের ফাঁপরে ফেলতে সমর্থ হয়। এমন গতিতে এমন এক লেংথে পিচ পড়ে মোদি সরকারের সিদ্ধান্তগুলো, যাতে ব্যাকফুটে যাব না ফ্রন্টফুটে খেলব ঠিক করতে করতেই বিরোধীদের ব্যাট-প্যাডের ফাঁক দিয়ে বল গলে গিয়ে উইকেট ভেঙে দেয়। এই মুহূর্তে যেমন কল্যাণমূলক রাষ্ট্রের যে শেষ চিহ্নটুকু ভারত রাষ্ট্রের মধ্যে রয়েছে, সেটুকুও মুছে ফেলতে সাঁড়াশি আক্রমণ শুরু হয়েছে।

প্রাক্তন বিজেপি মুখপাত্র অশ্বিনী উপাধ্যায় সুপ্রিম কোর্টে জনস্বার্থ মামলা দায়ের করেছেন নির্বাচনী প্রচারে যেসব রাজনৈতিক দল ভোটারদের আকর্ষণ করতে “freebies” দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেয়, তাদের নির্বাচনী প্রতীক ফ্রিজ করে দেওয়া এবং রেজিস্ট্রেশন বাতিল করার দাবিতে। পিটিশনার বলেছেন “irrational freebies” অর্থাৎ মুফতে অযৌক্তিক সুযোগসুবিধা বিলোবার আগে তার অর্থনৈতিক প্রভাব আলোচনা করতে হবে। এই মামলার শুনানিতে ১১ আগস্ট মহামান্য প্রধান বিচারপতি এন ভি রামান্না বলে বসলেন, অর্থনীতির ক্ষতি আর মানুষের কল্যাণের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা দরকার। অবশ্য তিনি যোগ করেছেন “আমি রেজিস্ট্রেশন বাতিল করার দিকটা দেখতে চাই না। সেটা অগণতান্ত্রিক। হাজার হোক, ভারত তো একটা গণতন্ত্র।” তার আগেই ৩ আগস্ট বিচারকরা বলেছিলেন, ব্যাপারটা গুরুতর। অতএব নীতি আয়োগ, অর্থ কমিশন, আইন কমিশন, রিজার্ভ ব্যাঙ্ক এবং শাসক ও বিরোধী দলগুলোর প্রতিনিধিদের নিয়ে একটা কমিটি তৈরি হোক মুফতের সুযোগসুবিধার নানা দিক নিয়ে আলোচনা করতে। ১৭ আগস্ট ছিল এ যাবৎ এই মামলার শেষ শুনানি, আগামী সপ্তাহে ফের শুনানি হওয়ার কথা। মজার ব্যাপার, ১১ তারিখ প্রধান বিচারপতি নিজেই সন্দেহ প্রকাশ করেছিলেন, এ বিষয়ে আদালতের হস্তক্ষেপ করার কতটুকু অধিকার আছে তা নিয়ে। অথচ সেই যুক্তিতে পিটিশন বাতিল করে দেননি।

এই মামলার শুনানিতে দেশের সলিসিটর জেনারেল তুষার মেহতার কিছু মন্তব্য একবার দেখে নেওয়া যাক। “এই ফ্রিবি কালচারটাকে এখন শিল্পের পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে আর নির্বাচন এখন এই নিয়ে লড়া হয়। ফ্রিবিগুলোকে যদি জনকল্যাণ বলে ধরা হয়, তাহলে বিপর্যয় ঘটবে। এটাই যদি নর্ম হয়ে দাঁড়ায়, তাহলে মাননীয় বিচারকরা নর্মগুলো ঠিক করে দিন। আইনসভা যতক্ষণ না কিছু করছে, মাননীয় বিচারকরা কিছু নর্ম ঠিক করে দিতেই পারেন।”

এই বিতর্কে দুটো জিনিস বিশেষভাবে লক্ষ করার মত। প্রথমত, ফ্রিবি বলতে স্পষ্টতই বোঝানো হচ্ছে সরকার সাধারণ মানুষকে যেসব সুযোগসুবিধা দেয় সেগুলোকে। কারণ প্রধান বিচারপতি বলেছেন অর্থনীতির ক্ষতি (“economy losing money”) আর মানুষের কল্যাণ (“welfare of the people”)— দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য রাখা দরকার। অর্থাৎ বলেই দেওয়া হল অর্থনীতির কাজ মানুষের কল্যাণ করা নয়। দ্বিতীয়ত, কেন্দ্রীয় সরকারের প্রতিনিধি তুষার ইঙ্গিত দিয়েছেন আইনসভা ফ্রিবি সম্পর্কে কিছু করবে। অর্থাৎ কোনও আইন প্রণয়ন করবে। সে করতেই পারে। লোকসভায় যে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা আছে বিজেপির, তাকে ব্যবহার করে এবং রাজ্যসভায় বিল পাশ করাতে অসুবিধা হলে বিরোধী সাংসদদের সাসপেন্ড করে দিয়ে যে কোনও আইনই কেন্দ্রীয় সরকার করে ফেলতে পারে। কিন্তু দেখা যাচ্ছে সরকারের সে পর্যন্তও তর সইছে না। তুষার চাইছেন তার আগেই আদালত কিছু নিয়মকানুন ঘোষণা করুক।

এই জনস্বার্থ মামলা এত গুরুত্বপূর্ণ কেন? কারণ এই মামলা দায়ের হওয়ার কিছুদিন আগেই, গত মাসের শেষদিকে, উত্তরপ্রদেশে বুন্দেলখণ্ড এক্সপ্রেসওয়ে উদ্বোধন করতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেছিলেন, দেশে “রেউড়ি কালচার” চালু হয়েছে। রেউড়ি, অর্থাৎ মিষ্টি, বিতরণ করে ভোট কিনে নেওয়ার চেষ্টা হচ্ছে। দেশের পক্ষে এই সংস্কৃতি খুব বিপজ্জনক। দেশের মানুষকে, বিশেষ করে যুবসমাজকে, এই কালচার সম্পর্কে সতর্ক থাকতে হবে। রেউড়ি কালচারের লোকেরা এক্সপ্রেসওয়ে, বিমানবন্দর বা ডিফেন্স করিডোর বানাতে পারবে না।

রেউড়ি মন্তব্যের পিছনের ছকটা খুব পরিষ্কার। প্রধানমন্ত্রীর উন্নয়নের সংজ্ঞা ঘোর নব্য-উদারবাদী। কর্মসংস্থান, শিক্ষা, স্বাস্থ্য— এসবের উন্নতি হল কি হল না তা নিয়ে তাঁর বিন্দুমাত্র মাথাব্যথা নেই। উন্নয়ন বলতে তিনি বোঝেন এক্সপ্রেসওয়ে, বিমানবন্দর, ডিফেন্স করিডোর। নব্য উদারবাদী অর্থনীতিতে ভর্তুকি যেমন একটি অশ্লীল শব্দ, তেমনই ভারতের বিভিন্ন রাজ্যের সরকারগুলো গরিব নাগরিকদের জন্য যেসব আর্থিক সাহায্যের ব্যবস্থা করেছে বা বিভিন্ন পরিষেবার মূল্যে বিশেষ ছাড় দিয়ে থাকে— সেগুলোও ক্ষতিকর, অবান্তর। তাই ওগুলোকে রেউড়ি বলা। মতাদর্শগতভাবেই মোদি সরকার ওসবের বিরোধী। সেটা বুঝতে অবশ্য কারও বাকি নেই। ২০১৪ সালের পর থেকে মহাত্মা গান্ধি ন্যাশনাল রুরাল এমপ্লয়মেন্ট গ্যারান্টি স্কিমকে যেরকম হেলাছেদ্দা করা হয়েছে সেদিকে নজর রাখলেই বোঝা যায়। নতুন কথাটা হল, এবার অন্য দলগুলোর সরকার ও পথে হাঁটতে না চাইলে আইন করে, পারলে আদালতের নির্দেশকে শিখণ্ডী করে তাদের শায়েস্তা করা হবে। এক দেশ, এক অর্থনীতি কায়েম করতে চাইছে মোদি সরকার। সে দেশে রেউড়ি জাতীয় প্রকল্পের কোনো স্থান নেই।

তাৎক্ষণিক রাজনৈতিক কারণটাও সহজবোধ্য। সাম্প্রতিককালে যে কটা রাজ্যের নির্বাচনে বিজেপিকে হারতে হয়েছে, তার প্রায় প্রত্যেকটাতেই তাদের পথ আটকে দাঁড়িয়েছে এই কল্যাণমূলক প্রকল্পগুলো, যা রেউড়ি – প্রধানমন্ত্রীর ভাষায়। আরএসএস-বিজেপির নব্য-উদারবাদী অর্থনৈতিক নীতি আর ধর্মীয় মেরুকরণের রাজনীতি মুখ থুবড়ে পড়েছে দিল্লি আর পাঞ্জাবে আম আদমি পার্টির সস্তায় বিদ্যুৎ, চাষিদের ঋণ মকুবের প্রতিশ্রুতি, স্বাস্থ্য ও শিক্ষায় ভর্তুকি এবং সরকারের সক্রিয়তায় সরকারি স্কুল ও মহল্লা ক্লিনিকের উন্নতির সামনে। পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনে তৃণমূলের জয়ের জন্য প্রায় সব বিশ্লেষকই কৃতিত্ব দিয়েছেন লক্ষ্মীর ভাণ্ডার, দুয়ারে সরকারের মত পদক্ষেপকে। কন্যাশ্রীর মত প্রকল্প তো আগে থেকেই চলছিল। স্তালিনের দল দ্রাবিড় মুন্নেত্রা কজঘমও ক্ষমতায় এলে যে গৃহবধূদের রেশন কার্ড আছে তাঁদের মাসে ১০০০ টাকা করে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। সুতরাং নির্বাচনের ময়দানেও এই একটা বাধা বিজেপি কিছুতেই টপকাতে পারছে না। ফলে বিরোধীদের হাতে পড়ে থাকা এই শেষ অস্ত্রটা কেড়ে না নিলেই নয়। তাই এই আক্রমণ।

এবার শুরুতেই যে দ্বিধার কথা বলেছিলাম, সেই আলোচনায় আসি। বিজেপি সামাজিক এবং অর্থনৈতিক, দুদিক থেকেই যে একটি দক্ষিণপন্থী দল তাতে সন্দেহ নেই। সেই কারণেই কয়েক লক্ষ কোটি টাকার কর্পোরেট কর মকুব করে দেওয়া তাদের মতে ফ্রিবি নয়। কিন্তু কর্মসংস্থানহীন বা দরিদ্র মহিলাদের হাতে সরকার মাসে মাসে নগদ টাকা দিলে অর্থনীতির ক্ষতি হয়ে যাবে, বিপর্যয় সৃষ্টি হবে বলে তাদের চিন্তা। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের বাম দলগুলো, বিধানসভায় শূন্য হলেও যাদের রাস্তাঘাটে প্রধান বিরোধী হিসাবে দেখা যাচ্ছে, তারা প্রায় মোদির সুরেই গত দশ বছর ধরে তৃণমূল সরকারের জনকল্যাণমূলক প্রকল্পগুলো সম্পর্কে কথা বলে আসছে কেন? সিপিএমের যে কোনও স্তরের সদস্য এবং সমর্থকরা কন্যাশ্রী, সবুজ সাথী, লক্ষ্মীর ভাণ্ডার ইত্যাদি প্রকল্প সম্পর্কে “খয়রাতি”, “দয়ার দান”, “টাকা দিয়ে মানুষের মুখ বন্ধ রাখছে”, “মানুষকে দয়ার পাত্র করে দিয়েছে” ইত্যাদি বাক্যবন্ধ ব্যবহার করেন। মানুষ বসে বসে টাকা পেতে ভালবাসে, তাই তৃণমূলকে ভোট দিয়ে যাচ্ছে— এতদূরও বলা হয়। গরিব মানুষ রাজনীতি বোঝেন না, ভিক্ষা পেলেই খুশি— এই জাতীয় অপমানকর মন্তব্যও প্রকাশ্যেই করা হয়। স্রেফ সোশাল মিডিয়ার বিপ্লবীরা নন, শতরূপ ঘোষের মত সংবাদমাধ্যমে দলের প্রতিনিধি হিসাবে নিয়মিত মুখ দেখানো নেতারাও সামান্য পালিশ করা ভাষায় এসব বলে থাকেন।

স্বভাবতই সাধারণ সম্পাদক সীতারাম ইয়েচুরির টুইট ছাড়া রেউড়ি বিতর্কে সিপিএমের কোনও সুসংহত বক্তব্য পাওয়া যাচ্ছে না। দুর্গাপুজোর জন্য ক্লাবগুলোকে টাকা দেওয়া আর লক্ষ্মীর ভাণ্ডারে টাকা দেওয়াকে তাঁরা এক করে দেখেন কিনা— তা নিয়ে কোনও স্পষ্ট আলোচনা সিপিএম নেতারা করেন কি? অথচ এই আলোচনা জরুরি। এ রাজ্যে জনমত বলতে যে শ্রেণির মানুষের বক্তব্যকে বোঝানো হয় সাধারণত, সেই শ্রেণির মধ্যে জনকল্যাণমূলক প্রকল্পগুলোকে দানখয়রাতি বলে ভাবার মানসিকতা কিন্তু সুদূরপ্রসারী। ভদ্রলোক শ্রেণির যেসব ভোটার তৃণমূলকে ভোট দেন, তাঁরাও “এই শ্রী, ওই শ্রী” না থাকলেই খুশি হতেন। সরকারি কর্মচারীদের ডিএ দিতে রাজ্য সরকারের যে অনীহা তার বিপরীতে ওই প্রকল্পগুলোকে রেখে আলোচনা করতে বাঙালি মধ্যবিত্ত, উচ্চবিত্তরা বিলক্ষণ ভালবাসেন। তৃণমূলের নেতা, মন্ত্রীদের দুর্নীতি ফাঁস হলে “এই টাকাগুলো দিয়ে ডিএ দেওয়া যেত না?”— এ প্রশ্ন শোনা যায়। কিন্তু কাউকে বলতে শোনা যায় না “এই টাকা দিয়ে লক্ষ্মীর ভাণ্ডারে এক হাজার টাকা করে দেওয়া যায় না?” অথচ এঁরা এমনিতে ভাল করেই জানেন পাঁচশো টাকায় আজকাল কিছুই হয় না। আসলে মনে করা হয়, ডিএ পাওয়া অধিকার কিন্তু লক্ষ্মীর ভাণ্ডার দয়ার দান।

এর কারণ ১৯৯১ পরবর্তী যুগে দিনরাত মন্ত্রের মত কানের কাছে বলে বলে যে কয়েকটি কথা আমাদের মর্মে প্রবেশ করিয়ে দেওয়া হয়েছে তার অন্যতম হল, কোনও পরিষেবা বা পণ্য বাজার থেকে পয়সা দিয়ে না কিনে পাচ্ছে মানেই সেটা দান। সরকার দিচ্ছে মানেই দান করছে। আরেকটি কথা হল, চাকুরিজীবীরা করদাতা, গরিব শ্রমজীবী মানুষ করদাতা নয়। তারা করদাতাদের টাকায় বেঁচে থাকা পরজীবী।

এই দুটিই যে সর্বৈব মিথ্যা, তা বোঝানোর সবচেয়ে বড় দায়িত্ব ছিল বামপন্থীদের। কিন্তু সে দায়িত্ব তাঁরা মোটেই পালন করেননি, এখনও করেন না। ভর্তুকি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য পণ্য— একথা বলে নব্য-উদারনীতিবাদ। অন্যদিকে, যে কোনও ধরনের বামপন্থার খাতায় এগুলো অধিকার। এটুকু বুঝতে এবং বোঝাতে বামপন্থীদের অসুবিধা হওয়ার কথা নয়। কিন্তু দেখা যাচ্ছে বঙ্গ সিপিএমের এই অ আ ক খ প্রবলভাবে গুলিয়ে গেছে। ফলে বামফ্রন্টের ৩৪ বছরের সাফল্যের তালিকা দিতে গিয়ে তাঁরা দিব্যি নানা কল্যাণমূলক প্রকল্পের কথা বলেন। স্কুলের মেয়েদের সাইকেল দেওয়া যে তাঁদের আমলেই চালু হয়ে গিয়েছিল— সেকথাও বলেন। নিজেরা গরিব মানুষের জন্য কম টাকায় খাওয়ার ব্যবস্থা করতে কমিউনিটি ক্যান্টিনও চালান। কিন্তু সরকারি প্রকল্পগুলোকে বলেন দানখয়রাতি।

আমি যেমন করদাতা, আমার বাড়ির পরিচারিকাও করদাতা। তফাত হল আমি আয়কর দিই, তিনি দেন না। কারণ করের আওতায় আসার মত আয় তাঁর নেই। কিন্তু তিনি নিজের আয়ের টাকায় যা যা কেনেন সবেতেই কর দেন। আগের প্রত্যক্ষ করের যুগেও দিতেন, এখন পণ্য ও পরিষেবা করের (GST) যুগেও দেন। সুতরাং লক্ষ্মীর ভাণ্ডার থেকে যে টাকা পান বা দু টাকা কিলো চালে যে ভর্তুকি পান তাতে তাঁরও অবদান আছে, তিনি পরজীবী নন। ব্যতিক্রম বাদ দিলে এই কথাগুলো সিপিএমের সদস্য, সমর্থকরা নিজেরাই বোঝেন না বা বুঝতে অস্বীকার করেন। অন্যদের আর বোঝাবেন কী করে?

পশ্চিমবঙ্গে বাম দল বলতে অবশ্য শুধু সিপিএম বা বামফ্রন্টের দলগুলোকে বোঝায় না। কিন্তু বিকল্প বামেদের সংগঠন, অন্তত চাক্ষুষ প্রমাণে, আরও সীমিত। কিন্তু তাঁরাও যে রেউড়ি বিতর্কে খুব সোচ্চার এমন নয়। দশ বছর ধরে রাস্তায় নামার মত একাধিক ইস্যু থাকা সত্ত্বেও পথে না নামা সিপিএম অবশেষে পার্থ চ্যাটার্জি, অনুব্রত মণ্ডলের গ্রেফতারির পর বিরোধীসুলভ সক্রিয়তা দেখাচ্ছে। আর বিকল্প বামেরা সক্রিয়তা দেখাচ্ছেন ইডি-সিবিআই যেহেতু বিজেপি সরকারের হাতে, সেহেতু তৃণমূল নেতাদের বিপুল দুর্নীতি নিয়ে কেন পথে নামা উচিত নয় সেই তর্কে। উন্নয়ন মানে কী বা কী হওয়া উচিত— সে আলোচনাতেও মাঝেমধ্যে দেখা যায় ভারতীয় বামপন্থীদের। যে কারণে বেশিরভাগ বামপন্থী দলের কাছেই আজও পরিবেশ কোনও রাজনৈতিক ইস্যু নয়। নব্য-উদারবাদীদের মতই তাঁরা ভাবেন পরিবেশের সামান্য ক্ষতি করে যদি শিল্প হয়, কর্মসংস্থান হয় তাহলে তেমন ক্ষতি নেই। পৃথিবীর অন্য অনেক দেশের নানা গাঢ়ত্বের লালেরা কিন্তু এ পথে হাঁটছেন না। অর্থাৎ পথ সামনে রয়েছে, কিন্তু উত্তমকুমার অভিনীত অবিনাশের মতই আমাদের বামপন্থীরাও নিজেদের চোরাগলিতে দিশেহারা।

বামেরা কী করছেন, কী বলছেন, তা কেন গুরুত্বপূর্ণ? এই জন্যে, যে দুর্নীতিগ্রস্ত সরকার চিরকাল থাকবে না। কেন্দ্রীয় সরকারের গা জোয়ারিতেই হোক বা নাগরিকদের ভোটে, প্রাকৃতিক নিয়মেই এই সরকার একদিন চলে যাবে। তখন যে দলের সরকারই আসুক, সরকারি নীতি সম্পর্কে সাধারণ মানুষের মনে দক্ষিণপন্থী ভাবনার যে আসন তৈরি হয়েছে তা ভাঙতে না পারলে ভবিষ্যতেও মানবিক সরকার দেখতে পাব না আমরা। এই ভাঙার দাবি কাদের কাছে করা যায়? বিজেপির কাছে তো নয়। রামচন্দ্র গুহ নিজেকে বলেন “ল্যাপ্সড মার্ক্সিস্ট”। আমারও এক বয়োজ্যেষ্ঠ ল্যাপ্সড মার্ক্সিস্ট বন্ধু আছেন। তিনি সর্বদাই বলেন, বামপন্থীদের থেকে কিছু আশা করা উচিত নয়। কিন্তু বামেদের বাদ দিলে যদি পড়ে থাকে বিজেপি, তাহলে আর উপায় কী? আশা করা বেঁচে থাকার জন্য জরুরি একটা কাজ। সে কাজ তো ছাড়া যায় না।

চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম ওয়েবসাইটে প্রকাশিত

অসংসদীয় শব্দ: মুখ বুজে বাঁচা অভ্যাস করতে হবে

“কথা বোলো না কেউ শব্দ কোরো না 
ভগবান নিদ্রা গিয়েছেন 
গোলযোগ সইতে পারেন না।”

মনোজ মিত্রের নরক গুলজার নাটকের এই গান গত শতকের একটা অংশে রীতিমত জনপ্রিয় ছিল। আমাদের এঁদো মফস্বলে কলকাতার গ্রুপ থিয়েটার দেখার অভ্যাস খুব বেশি লোকের ছিল না। তৎসত্ত্বেও নব্বইয়ের দশকে অন্তত দুবার শখের অভিনেতাদের পাড়ার মঞ্চে এই নাটক করতে দেখেছি আর নারদের চরিত্রে যে-ই থাকুক, তার গলায় সুর থাক বা না থাক, এ গান গাওয়া মাত্রই দর্শকদের মজে যেতে দেখেছি। পিতামহ ব্রহ্মা টেনে ঘুমোচ্ছেন, দেবর্ষি নারদ নেচে নেচে এই গান গাইছেন – এই হল দৃশ্য। নাটকটি আগাগোড়া সরস। এখানে ব্রহ্মা একজন মানুষকে পুনর্জন্ম দেওয়ার জন্য ঘুষ নিতে যান, চিত্রগুপ্ত দেখে ফেলে আর্তনাদ করে ওঠে “উৎকোচ”। ব্রহ্মা ট্যাঁকে টাকা গুঁজতে গুঁজতে বলেন “মেলা ফাজলামি কোরো না। উৎকোচ ছাড়া আমাদের ইনকামটা কী, অ্যাঁ? আমরা কি খাটি, না এগ্রিকালচার করি, না মেশিন বানাই? অতবড় স্বর্গপুরীর এস্ট্যাবলিশমেন্ট কস্ট আসবে কোত্থেকে, অ্যাঁ?” তাছাড়া এই নাটকে একজন বাবাজি আছেন, যিনি ব্রহ্মার কৃপায় কল্পতরু থলি পাওয়া মাত্রই রম্ভাকে চেয়ে বসেন। কিন্তু থলিতে হাত ঢোকালে হাতে উঠে আসে একটি মর্তমান কলা।

আর বেশি লিখব না, কারণ বৃদ্ধ বয়সে মনোজ মিত্রকে হাজতবাস করানো আমার উদ্দেশ্য নয়। কথা হল বিশ-পঁচিশ বছর আগে একশো শতাংশ হিন্দু (নব্বই শতাংশ উচ্চবর্ণ) অভিনেতাদের দ্বারা অভিনীত এই নাটক দেখেছি, আর একশো শতাংশ হিন্দু দর্শককুলকে নাটক দেখে হেসে গড়াগড়ি খেতে দেখেছি। কিন্তু বিস্তর ধস্তাধস্তির পর মহম্মদ জুবের আজ দিল্লি পুলিসের দায়ের করা মামলাতেও জামিন না পেলে এবং জজসাহেব তাঁর রায়ে বাকস্বাধীনতা যে সাংবিধানিক অধিকার সেটি ষোড়শোপচারে মনে করিয়ে না দিলে সাহস করে এই লেখা লিখতে বসতাম না। কারণ কী লেখা যাবে, কোনটা বলা যাবে সে ব্যাপারে আজকাল আর সংবিধান চূড়ান্ত নয়, সরকারের বকলমে পুলিস চূড়ান্ত। পুলিসের অধিকারের সীমাও বেড়ে গেছে অনেক। একদা পুলিসের হাত এত ছোট ছিল, যে আশিতে আসিও না ছবিতে ভানু বন্দ্যোপাধ্যায় জলে নেমে পড়ে বলেছিলেন তাঁকে আর ধরা যাবে না, কারণ তিনি তখন জলপুলিসের আন্ডারে। আর এ যুগে আসাম পুলিসের হাত গুজরাট পর্যন্ত লম্বা, পশ্চিমবঙ্গ পুলিসের হাত গোয়া পর্যন্ত পৌঁছে যায়। দেশটা যে প্রেতপুরীতে পরিণত হয়েছে, এই বোধহয় তার সর্বোত্তম প্রমাণ। কারণ ছোটবেলায় জ্যাঠা-জেঠিদের মুখে কলকাতায় মেসে থেকে চাকরি করা এক গ্রাম্য ভদ্রলোকের গল্প শুনেছিলাম। তিনি বহুকাল পরে বাড়ি গিয়ে খেতে বসেছেন, ডালের সাথে মেখে খাবেন বলে দুটি পাতিলেবুর আবদার করেছেন। করেই দেখেন বউয়ের হাতদুটো ইয়া লম্বা হয়ে নিজের বাড়ির সীমানা পেরিয়ে পাশের বাড়ির গাছ থেকে লেবু পেড়ে নিয়ে এল। আসলে ওলাউঠার মহামারীতে গ্রাম সাফ হয়ে গিয়েছিল। ঘৃণার মহামারীতে আমাদের দেশ সাফ হয়ে গেছে। গল্পের ভদ্রলোক শহরে পালিয়ে বেঁচেছিলেন, আমরা কোথায় পালিয়ে বাঁচব জানি না। ভারত জোড়া ফাঁদ পেতেছ, কেমনে দিই ফাঁকি? আধেক ধরা পড়েছি গো, আধেক আছে বাকি।

আমরা ভারতীয়, আমরা মেনে নিতে জানি। যা যা বলা বারণ, লেখা বারণ সেগুলো মেনে নিয়ে চলব বলেই ঠিক করেছিলাম। কিন্তু দেখলাম অবাক কাণ্ড! কেবল আমরা মানিয়ে নিলে চলবে না, হাজার ভণ্ডামি ও নোংরামি সত্ত্বেও যে সংসদের দিকে আমরা তাকিয়ে থাকি তার সদস্যদের জন্যেও তালিকা তৈরি হয়েছে। ভগবান, থুড়ি সরকার, যাতে নিশ্চিন্তে নিদ্রা যেতে পারেন, কেউ গোল করতে না পারে তার নিশ্ছিদ্র ব্যবস্থা করতে কোন কোন শব্দ উচ্চারণ করা যাবে না, অর্থাৎ কোনগুলো অসংসদীয়, তার নতুন ফর্দ প্রকাশিত হয়েছে সংসদের মৌসুমি অধিবেশনের প্রাক্কালে। সেখানেই শেষ নয়, আরও বলা হয়েছে, সংসদ চত্বরে কোনো “ডেমনস্ট্রেশন”, ধর্না, ধর্মঘট করা যাবে না। এমনকি অনশন বা কোনো ধর্মীয় অনুষ্ঠানও করা যাবে না। অর্থাৎ সমস্ত শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদই গণতন্ত্রের মন্দিরে বারণ। এ হল সেই মন্দির, যেখানে প্রথমবার প্রবেশ করার সময়ে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ঘটা করে সিঁড়িতে মাথা ঠেকিয়ে প্রণাম করেছিলেন। ধর্মীয় অনুষ্ঠান করা যাবে না – এই দারুণ ধর্মনিরপেক্ষ আদেশের কারণ অবশ্য দুর্বোধ্য। কারণ মাত্র কয়েকদিন আগে নতুন সংসদ ভবনে দন্তবিকশিত সিংহের মূর্তি স্থাপন করার সময়ে প্রধানমন্ত্রী নিজে পুজো-আচ্চা করেছেন। তাহলে বক্তব্যটি কি এই, যে পুরনো মন্দিরে পুজো চলবে না, নতুন মন্দিরে চলবে? গণতন্ত্রের মন্দিরে শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ নিষিদ্ধ করার অর্থই বা কী? তাহলে কি শান্তিভঙ্গ করে যেসব প্রতিবাদ প্রণালী, সেগুলোর পথ পরিষ্কার করা হচ্ছে? মোদীজির বন্ধু ডোনাল্ড ট্রাম্প মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রপতি পদ থেকে অপসারিত হওয়ার পর ক্যাপিটল হিলে যেরকম প্রতিবাদ দেখে সারা বিশ্ব শিউরে উঠেছিল, তেমন প্রতিবাদ ছাড়া কি এ দেশে আর কোনো প্রতিবাদ করতে দেওয়া হবে না? করলেই বুলডোজার চালানো হবে? প্রতিবাদের চেহারা অবশ্য বিচিত্র। পার্শ্ববর্তী শ্রীলঙ্কায় আরেক ধরনের প্রতিবাদ হচ্ছে। প্রতিবাদের ধরনধারণ, সীমানা নির্দিষ্ট করে দেওয়া আজ পর্যন্ত কোনো দেশের কোনো শাসকের পক্ষে সম্ভব হয়নি। অবশ্য মোদীজি বালক বয়সে খালি হাতে কুমিরের মুখ থেকে ক্রিকেট বল এবং কুমিরছানা নিয়ে এসেছেন। তাঁর অসাধ্য কী?

মোদীজির সরকার কী কী পারে তা আমরা এতদিনে জেনে ফেলেছি, বিরোধীরা কী পারেন তা দেখা এখনো বাকি আছে। অসংসদীয় শব্দের তালিকার সংযোজনগুলো সেই সুযোগ এনে দিয়েছে। দু-একজন বিরোধী সাংসদ বলছেন বটে, তাঁরা নির্দেশ অগ্রাহ্য করে ওই শব্দগুলো সংসদে ব্যবহার করবেন, কিন্তু সেই ২০১৪ সাল থেকে তাঁরা যেরকম লক্ষ্মীসোনা হয়ে আছেন, তাতে না আঁচালে বিশ্বাস করা যাচ্ছে না। পালানিয়প্পম চিদম্বরমের মত দু-একজন প্রবীণ সাংসদ তো ইতিমধ্যেই টুইট করে দেখিয়েছেন, ভাষার উপর দখল থাকলেই যে শব্দগুলোকে অসংসদীয় বলে ঘোষণা করা হয়েছে সেগুলো বাদ দিয়েও সরকারের সমালোচনা করা সম্ভব। সোশাল মিডিয়ায় মস্করাও চালু হয়েছে, শশী থারুরের মত জ্যান্ত থিসরাস থাকতে আর কিসের চিন্তা? এমন সুবোধ বিরোধী থাকতে আমাদের আর কিসের চিন্তা? ইন্টারনেট জোক আর মিম সংস্কৃতি এমন গভীরে পৌঁছেছে যে সাংসদরাও গভীরে ভাবছেন না। তাঁরা বোধহয় ভেবে দেখছেন না, যে কোনো শব্দ অসংসদীয় বলে ঘোষিত হল মানে জোর করে সে শব্দ উচ্চারণ করলেও সংসদের কার্যবিবরণীতে তা নথিবদ্ধ করা হবে না। অর্থাৎ এমন ব্যবস্থা করা হয়েছে যাতে আজ থেকে পঞ্চাশ বছর পরে অন্তত সংসদের কার্যবিবরণী থেকে কোনো ইতিহাস লেখক জানতে পারবেন না যে ভারতে ‘স্নুপগেট’ বলে কিছু ঘটেছিল, কেউ ‘ডিক্টেটোরিয়াল’ ছিল বা সরকারের বিরুদ্ধে ‘তানাশাহি’-র অভিযোগ ছিল। মনোমত ইতিহাস লেখার যে ব্যবস্থা ভারতে চলছে, এ-ও যে তারই অঙ্গ, সেকথা বিরোধী দলের কেউ বুঝছেন কি? শুধু ইতিমধ্যেই লিখিত ইতিহাস বিকৃত করা নয়, এই অসংসদীয় শব্দের তালিকা যে ভবিষ্যতে যে ইতিহাস লেখা হবে তা-ও বিকৃত করার প্রচেষ্টা, তা বিরোধীরা কেউ ভেবে দেখেছেন বলে তো মনে হচ্ছে না।

আরও পড়ুন পশ্চিমবঙ্গে নির্বাচন প্রহসনে পরিণত হলে ক্ষতি নেই বিজেপির

এত সহজে ইতিহাস থেকে সত্য মুছে ফেলা যায় কিনা সে বিতর্ক নেহাতই বিদ্যায়তনিক। তা নিয়ে মাথা না ঘামিয়ে বিরোধী দলের রাজনীতিবিদদের অধিকার হরণ শুরু হওয়া মাত্রই সর্বশক্তি দিয়ে প্রতিবাদ করা উচিত। কিন্তু আমাদের বিরোধীরা তেমন করেন না। তাঁদের মধ্যে বিদ্যাসাগর কথিত গোপালরাই দলে ভারি। মাঝেমধ্যে রাহুল গান্ধী রাখাল হয়ে ওঠেন বটে, কিন্তু কদিন না যেতেই ইউরোপে দম নিতে চলে যান। সুললিত ইংরেজি বলতে পারা থারুর বা মহুয়া মৈত্র, ডেরেক ও’ব্রায়েনরাই আজকের সংসদীয় বিরোধিতার মুখ। তাঁরা ইন্দ্রজিৎ গুপ্ত বা সোমনাথ চ্যাটার্জির মত জাঁদরেল নন, সেকালের মমতা ব্যানার্জির মত ওয়েলে নেমে গিয়ে স্পিকারের মুখে কাগজ ছুড়ে মারার মত মেঠো রাজনীতিও তাঁদের আসে না। তেমন কাজ করলেও দল যে তাঁদের পাশে দাঁড়াবেই, তার নিশ্চয়তা নেই। এমন বিরোধী পেলে যে কোনো শাসকেরই পোয়া বারো হয়। তারা কাকে রাষ্ট্রপতি পদপ্রার্থী করবে তা নিয়ে অযথা মাথা ঘামায়, শেষ লগ্নে মাথা চুলকে বলে, আগে বললে তো ওনাদের প্রার্থীকেই সমর্থন করতাম। এদিকে সরকার নিশ্চিন্তে একের পর এক অধিকার হরণ করে চলে।

অতএব আমরা, সাধারণ ভারতীয়রা, আধেক ধরা পড়ে বাকি আধেকের আশঙ্কাতেই থাকি। ভ্লাদিমির পুতিনের রাশিয়া বা রচপ তৈয়প এর্দোগানের তুরস্কে মানুষ যেমন মুখ বুজে বাঁচে, তেমনভাবে বাঁচা আমাদের শিগগির অভ্যাস করে নিতে হবে। তবে অসংসদীয় শব্দের তালিকার মত হাজতে পোরার যোগ্য শব্দেরও একটা প্রকাশ্য তালিকা থাকলে আমাদের সুবিধা হয়।

https://nagorik.net এ প্রকাশিত

ফাদার স্ট্যান স্বামী: একটি শোকহীন মৃত্যু

স্ট্যান স্বামীর জামিনের আবেদন করার লোক কম ছিল না। বারবার আবেদন করা হয়েছে, বারবার শুনানি হয়েছে আর রাষ্ট্র আপ্রাণ চেষ্টা করেছে তিনি যেন জামিন না পান।

৬ জুলাই ছিল দলাই লামার ৮৬তম জন্মদিন। সেই উপলক্ষে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এই তিব্বতি ধর্মগুরুকে ফোন করে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন। মোদী যা করেন, সবই ইতিহাসে প্রথমবার ঘটে। দলাই লামাকে জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানানোর ব্যাপারেও নাকি তিনিই প্রথম। সে প্রথম বা চতুর্দশ যা-ই হোন, ব্যাপারটা আপত্তিকর নয়। ভারতবর্ষ সাধুসন্তদের দেশ, ধর্মভীরু মানুষের দেশ। আমাদের প্রধানমন্ত্রী ধর্মগুরুকে জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানাবেন — এ আর বেশি কথা কী? তাছাড়া দলাই লামা কেবল ধর্মগুরু নন, বহু বছর ধরে ভারতেরই বাসিন্দা এবং চীনা আগ্রাসনের বিরুদ্ধে তিব্বতি জনগণের অধিকার রক্ষার লড়াইয়ের নেতা। ভারতের মত গণতান্ত্রিক দেশের প্রধানমন্ত্রী তো তাঁর পাশেই থাকবেন। অধিকার রক্ষার লড়াই পৃথিবীর সর্বত্র, সব সরকারের আমলেই কেউ না কেউ করে চলে। তেমনই আরেকটা লড়াইয়ের সৈনিক ছিলেন স্ট্যান স্বামী — আরেকজন ধর্মযাজক। দলাই লামার চেয়ে বছর দুয়েকের ছোট এই মানুষটা দলাইয়ের জন্মদিনের আগের দিনই মারা গেলেন। ধর্মভীরু এবং মানুষের অধিকারের লড়াইয়ে সহমর্মী প্রধানমন্ত্রী শোক প্রকাশ করে টুইট করেননি।

যে মানুষটা রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে অভিযুক্ত; এমনকি সুধা ভরদ্বাজ, গৌতম নভলাখা, ভারভারা রাও, সোমা সেন, জি এন সাইবাবা, আনন্দ তেলতুম্বড়ে, হ্যানি বাবুদের সাথে মিলে নাকি প্রধানমন্ত্রীকে হত্যার ছক কষছিলেন, তাঁর মৃত্যুতে সেই প্রধানমন্ত্রীই শোক প্রকাশ করবেন! অন্যায় আবদার, তাই না? কিন্তু স্ট্যান স্বামীর বিরুদ্ধে যে অভিযোগ রয়েছে, দলাই লামার বিরুদ্ধে চীনা সরকারের অভিযোগ যে তার চেয়েও সাংঘাতিক। তিনি কেবল রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত তা নয়, রীতিমত নেতা। সেই কারণেই ১৯৫৯ সালে চীনা বাহিনীর সাথে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের পর তাঁকে ছদ্মবেশ ধারণ করে ভারতে পালিয়ে এসে আশ্রয় নিতে হয়েছিল। তখনকার প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু থেকে শুরু করে মোদীর পূর্বসুরী মনমোহন সিং পর্যন্ত সব দলের সব প্রধানমন্ত্রী দলাই লামাকে আশ্রয় দেওয়ার সিদ্ধান্তকে সমর্থন জানিয়েছেন। বিরোধী দলগুলোও এ নিয়ে কখনো সরকারকে আক্রমণ করেনি। এতে চীনের সাথে কূটনৈতিক সম্পর্কের ক্ষতি হলেও নীতি বদলানো হয়নি, কারণ ভারত সরকার তিব্বতের মানুষের অধিকারকে গুরুত্ব দিতে চেয়েছে। ভাবা যেত মোদী সেই ধারাই অনুসরণ করছেন, যদি নিজের দেশের আন্দোলনকারীদের প্রতি তাঁর সরকার সংবেদনশীল হত। অন্য অনেককিছুর মত বিচারাধীন অবস্থায় বৃদ্ধ ধর্মযাজকের মৃত্যুও বোধহয় মোদীর আমলেই প্রথম হল।

এমনিতে ভারতে বিনা বিচারে পুলিশ বা বিচারবিভাগীয় হেফাজতে বছরের পর বছর আটকে থাকা নতুন কিছু নয়। নানা সমীক্ষায় দেখা যায় দলিত, আদিবাসী, ধর্মীয় সংখ্যালঘু মানুষের কপালে এই দুর্ভোগ সহজেই জোটে। ট্যাঁকের জোর না থাকলে বা লোকলস্কর না থাকলে মাত্র কয়েকশো টাকা চুরি করা বাচ্চা ছেলেকেও বিনা বিচারে বহু বছর কারাবাস করতে হয়। মৃত্যুও অস্বাভাবিক নয়। এমনই এক মৃত্যুর ঘটনায় মঙ্গলবার সারাদিন উত্তপ্ত ছিল বর্ধমান জেলার বরাকর। কিন্তু স্ট্যান স্বামীর জামিনের আবেদন করার লোক কম ছিল না। বারবার আবেদন করা হয়েছে, বারবার শুনানি হয়েছে আর রাষ্ট্র আপ্রাণ চেষ্টা করেছে তিনি যেন জামিন না পান। কেবল জামিন নয়, পার্কিনসন্স অসুখে ভোগা এই মানুষটা যাতে জল খাওয়ার জন্য একটা স্ট্র পর্যন্ত না পান তার জন্য প্রাণপণ আইনি লড়াই করেছে মোদী সরকার। দেশদ্রোহীদের এমনটাই হওয়া উচিত — এই মত অনেকেরই। মুশকিল হল, ফাদারের দেশদ্রোহের এক বিন্দু প্রমাণ দিতে পারেনি তদন্তকারী সংস্থা। দিল্লি দাঙ্গার জন্য এই একই আইনে অভিযুক্ত উমর খালিদের মত স্ট্যান, ভারভারা, গৌতম, সুধা, সোমাদের বিরুদ্ধেও এখন পর্যন্ত কোন প্রমাণ নেই। প্রমাণ বলতে যা জমা দেওয়া হয়েছে, তা বড়জোর কিছু বইপত্র বা লিফলেট।

ফাদার স্ট্যান সম্বন্ধে যা জানা যায়নি, তা বাদ দিয়ে যা জানা আছে সেগুলো আলোচনা করে দেখা যাক তিনি কেমন ভয়ঙ্কর লোক ছিলেন। তিনি এমন ঘোর সন্ত্রাসবাদী যে মাওবাদী সন্দেহে গ্রেপ্তার হওয়া আদিবাসীদের পরিবার পরিজনের হাতে অস্ত্র তুলে না দিয়ে ন্যায়বিচারের দাবিতে জনস্বার্থ মামলা করতেন। সংবিধানের পঞ্চম তফসিল অনুযায়ী কেন আদিবাসী এলাকায় ট্রাইব অ্যাডভাইসরি কাউন্সিল গড়া হয়নি, সে প্রশ্ন তুলতেন। খনিজ পদার্থের জন্য বা শিল্প গড়তে আদিবাসীদের জল-জঙ্গল-জমির অধিকার কেড়ে নেওয়ার বিরুদ্ধে বোমা, বন্দুক, গুলিবিহীন আন্দোলন করতেন।

আরও পড়ুন বাধ্যতামূলক মহানতার একাকিত্বে ইমাম রশিদি

আসলে প্রমাণের দরকার নেই, আটক করে রাখার ইচ্ছাই যথেষ্ট। Unlawful Activities (Prevention) Act বা ইউএপিএ এমন এক আইন, যে আইনে জামিন হল ব্যতিক্রম, অভিযুক্তকে আটক করে রাখাই নিয়ম। অন্য সব আইনের সাথে এই আইনের এখানেই তফাত। মনে রাখা ভাল, ১৯৬৭ সালে চালু হওয়া এই আইনকে ২০০৪ সালে ইউপিএ সরকার সংশোধনী এনে আরো কঠোর করে তোলে। বিপুল অপব্যবহারের অভিযোগে Prevention of Terrorism Act বা পোটা বাতিল করতে হওয়ায়, সেই আইনের বহু আপত্তিকর ধারা এই সংশোধনীর মাধ্যমে ইউএপিএ-তে ঢুকিয়ে দেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী পি চিদম্বরম। কোন দল প্রতিবাদে মুখর হয়নি। চার্জশিট ছাড়াই গ্রেপ্তারির ব্যবস্থা, জামিন পাওয়ার বিষয়ে নানা শর্ত আরোপ করা এবং “সন্ত্রাসবাদী কার্যকলাপ”-এর অস্পষ্ট সংজ্ঞার আওতা বৃদ্ধি — সবই ইউপিএ আমলেই করা হয়েছিল, ২০০৮ ও ২০১২ সালে আরো দুটো সংশোধনীর মাধ্যমে। বিজেপি সরকার ২০১৯ সালের সংশোধনীর মাধ্যমে ব্যক্তিকে সন্ত্রাসবাদী হিসাবে দেগে দেওয়ার ব্যবস্থা করে, আগে কেবল কোনো সংগঠনকে সন্ত্রাসবাদী গণ্য করা যেত। রাজ্যসভায় বাম দলগুলো, তৃণমূল কংগ্রেস, ডিএমকে, এমডিএমকে, আরজেডি এবং এআইএমআইএমের মত কয়েকটা ছোট পার্টি ছাড়া সেই সংশোধনীর বিরুদ্ধে কেউ ভোট দেয়নি। লোকসভায় এআইএমআইএম, বিএসপি, আইইউএমএল, ন্যাশনাল কনফারেন্স এবং এইউডিএফ দলের মোট আটজন সাংসদ সংশোধনীর বিরুদ্ধে ভোট দেন। কংগ্রেস ভোটাভুটির সময় ওয়াক আউট করলেও রাজ্যসভায় পক্ষে ভোট দিয়েছিল।

বরাবরই ইউএপিএ-কে আরো শক্তিশালী করার পক্ষে সন্ত্রাসবাদের জুজু দেখানো হয়েছে, কিন্তু কার্যক্ষেত্রে এই আইন প্রয়োগ করা হয়েছে সরকারবিরোধী মানুষের উপর। পশ্চিমবঙ্গে বাম আমলে এই আইনে রাজনৈতিক কর্মী, সমাজকর্মীদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তৃণমূল সরকারের আমলেও সেই ট্র্যাডিশন সমানে চলেছে। তবে যেহেতু এ দেশে বিজেপি বিরোধী শুভবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি, তাই এই আইনে গ্রেপ্তার হওয়া মানুষের সংখ্যা এখন কয়েকশোতে পৌঁছেছে।

আসলে ফাদার স্ট্যান স্বামীর মৃত্যু আমাদের সকলকেই আয়নার সামনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। শুধু রাজনৈতিক দলগুলো নয়, আমরা সাধারণ নাগরিকরাও সন্ত্রাসবাদের নাম করলেই যে কোন সরকারি দমনপীড়নকে বৈধ বলে মেনে নিয়ে থাকি। তাই এমন সব একুশে আইন দেখে ক্ষেপে ওঠার বদলে খুশি হই। আমাদের মধ্যে অনেকে নিশ্চয়ই স্ট্যান স্বামীর মৃত্যুতেও “বেশ হয়েছে” মনে করছে। কারণ আমাদের সাধু সন্তদের প্রতি ভক্তির সীমা বাবা রামদেব অব্দি। কোন ফাদারের কাজকর্মের কারণে তাঁর প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়ার যুগ আমরা পেরিয়ে এসেছি। এক্ষেত্রে কিন্তু মানুষটাকে শ্রদ্ধা করার প্রয়োজন নেই। এটুকু বোঝা দরকার যে কোন কারণে সরকারের (এমনকি স্রেফ পুলিশের) চক্ষুশূল হলেই বিনা প্রমাণে এইভাবে আমাকে, আপনাকেও দিনের পর দিন কারাগারে ফেলে রাখা সম্ভব। গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় এমনকি জল খাওয়ার পথে বাধা সৃষ্টি করে তিলে তিলে মেরে ফেলা সম্ভব। আইন মেনেই।

উত্তরবঙ্গ সংবাদে প্রকাশিত

বিবি বিদায় নিলেও বদলাবে না ইজরায়েল

বিবি লঙ্কা প্রতিষ্ঠা করে গেছেন, এখন সেখানে যে যাবে সে-ই হবে রাবণ।

“… সরে যাওয়ার পর তাঁর উত্তরাধিকার বলতে আরও সুরক্ষিত একটা দেশ থাকবে না, থাকবে একটা গভীরভাবে বিভাজিত সমাজ, যা দেওয়ালের আড়ালে বাস করে।” কথাগুলো লিখেছিলেন একজন প্রধানমন্ত্রীর জীবনীকার, ২০১৮ সালে প্রকাশিত জীবনীতে। দেশটা নানা ভাষা নানা মতের দেশ ভারত নয়। নেতার নাম নরেন্দ্র মোদী নয়। দেশটার নাম ইজরায়েল, নেতার নাম বেনইয়ামিন নেতানিয়াহু, বইটার নাম বিবি, লেখক ইজরায়েলি সাংবাদিক আনশেল ফেফার। একটানা বারো বছর, সব মিলিয়ে ১৫ বছর, ক্ষমতায় থাকার পর আমাদের প্রধানমন্ত্রীর প্রিয় বন্ধু বিবি সম্প্রতি পদচ্যুত হলেন।

বিবির বন্ধু, শত্রু উভয়েই বলেন পদ আঁকড়ে থাকায় তাঁর জুড়ি নেই। বহুদিন থেকেই গদি টলোমলো। দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে, ২০১৯ সালে প্রথম ক্ষমতাসীন ইজরায়েলি নেতা হিসাবে ফৌজদারি মামলায় অভিযুক্ত হয়েছেন। অভিযোগ তিনি কোটিপতিদের কাছ থেকে দামি উপহার নিয়েছেন, তার বদলে সংবাদমাধ্যম ও টেলিকম কোম্পানির মালিকদের অন্যায় সুযোগ সুবিধা দিয়েছেন। বিবির বন্ধুর দেশে এসব কোনও অভিযোগই নয়। যারা অভিযোগ করছে তাদের পাপ্পু, দেশদ্রোহী, আর্বান নকশাল ইত্যাদি বলে দিলেই ঝামেলা চুকে যায়। কিন্তু ইজরায়েলে তা হবার জো নেই। অতিমারীর মধ্যেও বিরাট মিছিল হয়েছে বিবিকে সরানোর দাবিতে। কিন্তু বিবির অমিত শাহ না থাকলেও কৌশল আছে। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা বলছেন কৌশলের জোরেই তিনি বিরোধীদের দ্বিধাবিভক্ত করে রেখে এতদিন ক্ষমতায় টিকে গেলেন। শেষমেশ তাঁরই প্রাক্তন চিফ অফ স্টাফ, প্যালেস্তাইন সম্বন্ধে তাঁরই মত গোঁড়া মানসিকতার নাফতালি বেনেত্তে থেকে শুরু করে আরব ইসলামিস্ট পর্যন্ত সকলে হাত মিলিয়ে নেতানিয়াহুকে পদচ্যুত করতে পারলেন।

যা যা অভিযোগ আছে তাতে বছর দশেক কারাবাসের সম্ভাবনা প্রবল। কিন্তু বিবি সফলভাবে ইজরায়েলকে প্রবলভাবে যুযুধান দেশে পরিণত করেছেন। তিনি যখন ক্ষমতায় আসেন তখন প্যালেস্তাইন সমস্যার শান্তিপূর্ণ সমাধানের যেটুকু সম্ভাবনা ছিল, এখন আর তা-ও নেই বলে মনে করা হচ্ছে। পিটিয়ে সবকিছুই ঠান্ডা করে দেওয়া যায় — এই মানসিকতা দেশের রাজনীতিতে প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে। উত্তরসূরী বেনেত্তের সাথে নেতানিয়াহুর মতাদর্শগত তফাত নেই। অর্থাৎ বিবি লঙ্কা প্রতিষ্ঠা করে গেছেন, এখন সেখানে যে যাবে সে-ই হবে রাবণ।

আরও পড়ুন বিবিসিকে বাদ দিয়ে বিশ্বগুরু থাকতে পারবেন মোদী?

ইজরায়েল অবশ্য রাষ্ট্র হিসাবে বিবির আগে থেকেই আধিপত্যবাদী। তবে বিবির মত বুক ফুলিয়ে আধিপত্যবাদকে আদর্শ হিসাবে খাড়া করতে সকলে পারে না। ১০ই জুলাই ১৯৯৬ তারিখে মার্কিন কংগ্রেসে প্রথম বক্তৃতাতেই তিনি বলেছিলেন হিব্রু ধর্মশাস্ত্রে লেখা আছে, ঈশ্বর তাঁর ভক্তদের শক্তি দেবেন এবং শান্তি দিয়ে আশীর্বাদ করবেন। অতএব শক্তি থেকেই যে শান্তি আসে — এটাই সত্য। গোদা বাংলায় বললে, সবই ব্যাদে আছে এবং ব্যাদে যা আছে তা-ই শেষ সত্য। বোঝা শক্ত নয়, কেন বিবি আর মোদী সাহেবের গলাগলি হয়েছিল। কেনই বা স্বাধীনতার পর থেকে সব সরকারের অনুসৃত বিদেশনীতি থেকে সরে এসে ইজরায়েলের দিকে ঝুঁকে পড়ল মোদী সরকার, কেন ভারতের আন্দোলনকারীদের মোবাইল ফোনে পেগ্যাসাসের মত ইজরায়েলি সফটওয়্যারের উঁকি ঝুঁকি শুরু হল।

মোদীর মতাদর্শগত শিক্ষা রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘের হাতে আর সেই সঙ্ঘের গুরু গোলওয়ালকর ছিলেন নাজি ভক্ত। ‘উই, অর আওয়ার নেশনহুড ডিফাইনড’ বইতে ইহুদী নিধনের জন্য তিনি জার্মানির ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। তা সত্ত্বেও মোদী কী করে ইজরায়েলের সাথে গা মাখামাখি করেন, তা নিয়ে বিজেপি-বিরোধীদের প্রায়ই বিস্ময় প্রকাশ বা কটাক্ষ করতে দেখা যায়। তাঁরা আসলে এখনও হলোকস্টের যুগে পড়ে আছেন, মোদী আর বিবি এগিয়ে গেছেন। দুজনেই জানেন এ যুগে আর এক লপ্তে গণহত্যা করে ‘শত্রু’ জনগোষ্ঠীকে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়া সম্ভব নয়। শক্তি প্রদর্শন করে ক্রমশ প্রান্তিক করে দেওয়াই পথ। সে কাজ করতে পারলে কে ক্ষমতায়, তাতে কিছু এসে যায় না। ভারতকে ইজরায়েলের মত লঙ্কায় পরিণত করতে বিবির সাহায্য প্রয়োজন ছিল। মোদীর পরে যে দলের যিনিই আসুন, তিনি যেন বেনেত্তির মতই ধারাবাহিকতা রক্ষা করেন তা নিশ্চিত করতে হবে তো।

উত্তরবঙ্গ সংবাদে প্রকাশিত

এক যে ছিল সংসদ

বিনা বিতর্কে পছন্দের কাজগুলো হয়ে যাক – এটা এদেশে কে না চায়? যে কোনো বড় শহরের জনবহুল মোড়ে দাঁড়িয়ে যাদের ভদ্রলোক-ভদ্রমহিলা বলে মনে হয় তাদের জিজ্ঞেস করে দেখুন। কতজন যে বলবে “গণতন্ত্রের সীমা থাকা উচিৎ”, “মিলিটারি রুল হচ্ছে বেস্ট”!

সে এক সংসদ ছিল। প্রধানমন্ত্রীর আসনে বসতেন জহরলাল নেহরু বলে একজন। সাহিত্যিক ই এম ফর্স্টারের ধারণা ছিল, ফরাসী দার্শনিক ভলতেয়ারের যদি পুনর্জন্ম হয় আর তিনি বিশ্ব পরিস্থিতি নিয়ে একটা চিঠি লিখবেন ঠিক করেন, তাহলে একমাত্র যে রাষ্ট্রনেতা সেটা পাওয়ার যোগ্য, তিনি নেহরু। আর বিরোধী দলনেতার আসনে বসতেন অসামান্য বাগ্মী এবং পণ্ডিত, অবিভক্ত কমিউনিস্ট পার্টির নেতা হীরেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়। একটু দূরেই ছিলেন হিন্দু মহাসভার শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়। তিনিও কম বড় বক্তা নন। একবার শ্যামাপ্রসাদ বক্তৃতা দিচ্ছেন, নেহরু উঠে বললেন “What nonsense are you talking?” শ্যামাপ্রসাদ জবাব দিলেন “There’s no monopoly of yours in talking nonsense, sir.”

ঘটনাটা শুনেছিলাম হাওড়ার এক সময়কার সিপিএম সাংসদ প্রয়াত সুশান্ত চক্রবর্তীর মুখে। তিনি আরও একটা সংসদীয় বিতর্কের গল্প শুনিয়েছিলেন। সেটা ওরকম মান্ধাতার আমলের ঘটনা নয়, আমাদের সময়ের অনেক কাছাকাছি। কংগ্রেস নেতা এ আর আন্তুলের বিরুদ্ধে সিমেন্ট নিয়ে দুর্নীতির অভিযোগ। তা নিয়ে বিরোধীরা সংসদে জোর চেপে ধরেছেন সরকারকে। বিতর্কে এক মন্ত্রী দীর্ঘ বক্তৃতা দিলেন, তারপর বিশ্বনাথ প্রতাপ সিং বলতে উঠেছেন। শুরুতেই বললেন “The minister spoke at length, trying to cement his argument. But failed.”

এই গল্পগুলো শুনি ২০০০ সাল নাগাদ। তখন ক্লাস টুয়েলভে পড়ি, রাষ্ট্রবিজ্ঞানের তরুণ মাস্টারমশাই বিশ্বনাথ চক্রবর্তী ঠিক করলেন আমাদের দিয়ে মক পার্লামেন্ট করাবেন। যেদিন অনুষ্ঠানটা হল সেদিন অতিথি হিসাবে এসে সুশান্তবাবু শুনিয়েছিলেন গল্পগুলো। ওগুলো অবশ্য লোকসভা, রাজ্যসভার অধিবেশনের সরাসরি টিভি সম্প্রচার শুরু হওয়ার আগের ঘটনা। আমি যে প্রজন্মের লোক, তারাই প্রথম টিভিতে ওসব দেখতে পায়। তখনো কিন্তু সংসদের বিতর্কগুলোর একটা ন্যূনতম মান ছিল।

আমরা ট্রেজারি বেঞ্চে অটলবিহারী বাজপেয়ীর কথার চেয়ে লম্বা বিরামযুক্ত বক্তৃতা শুনেছি, সাথে তাঁর স্বরচিত কবিতা। যেগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি মনে আছে আস্থাভোটে জয়যুক্ত হওয়ার আগে বলা “কর্তব্য পথ পর / ইয়ে ভি সহি, উয়ো ভি সহি।” আমরা লালকৃষ্ণ আদবানির সংস্কৃতাশ্রয়ী হিন্দি বক্তৃতা শুনেছি, বিরোধী আসন থেকে জলদগম্ভীর সোমনাথ চ্যাটার্জিকে শুনেছি, পূর্ণ সাংমাকে মনে আছে, ভোজপুরী হিন্দি আর টুকরো রসিকতায় গুরু বিষয়কে লঘু করে বলতে পারার ক্ষমতাসম্পন্ন লালুপ্রসাদকেও মনে আছে। আরও পরে সরকারপক্ষের পি চিদম্বরম, কপিল সিবাল আর বিরোধীপক্ষের অরুণ জেটলি, সুষমা স্বরাজ, সীতারাম ইয়েচুরির বক্তব্যও কান পেতে শোনার মত ছিল। তার চেয়েও বড় কথা ওয়াক আউট, বিলের প্রিন্ট আউট ছেঁড়া, ওয়েলে নেমে স্লোগান দেওয়া — এসব সত্ত্বেও খুব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোতে বিতর্ক হত। তাতে সব পক্ষের প্রধান নেতারা অংশগ্রহণও করতেন। বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রী বক্তৃতা দেবেন না, এটা কল্পনাতীত ছিল।

তারপর আচ্ছে দিন এল। কার জানি না, তবে সংসদীয় গণতন্ত্রের যে নয় তা বেশ বোঝা যাচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী প্রথম দিন সংসদ ভবনে ঢোকার সময় সিঁড়িতে মাথা ঠেকিয়ে প্রণাম করেছিলেন, বলেছিলেন “এটাই তো আমার মন্দির।” এবং তারপর থেকেই ক্রমশ সংসদের অধিবেশন বসার দিন কমেছে, মন্দিরের প্রধান সেবায়েতের উপস্থিতিও কমেছে। অনেক দেশদ্রোহী বলে উনি সংসদ এড়িয়ে যান কারণ মেঠো বক্তৃতায় হাত-পা নেড়ে, চোখের জল ফেলে উতরে গেলেও সংসদে জোরালো বক্তৃতা দেওয়া ওঁর কম্ম নয়। তবে আমি একথা বিশ্বাস করি না। এটা নেহাতই কুৎসা। আসলে ভদ্রলোক দিনে মোটে চার ঘন্টা ঘুমোন তো। আমার ধারণা সেই চার ঘন্টা হল দুপুর বারোটা থেকে চারটে। তা ঐ সময়টা কি সংসদে বসে নষ্ট করা যায়? ওটুকু না ঘুমোলে মানুষটা অসুস্থ হয়ে পড়বে না?

কিন্তু দেশদ্রোহীরা তো এসব শুনবে না, তারা উল্টোপাল্টা বলবেই। সেটা বন্ধ করতে সরকার ভাল বুদ্ধি বার করেছেন – কোনো বিতর্ক হওয়ারই দরকার নেই সংসদে। এই প্রবণতা শুরু থেকেই অল্প অল্প দেখা যাচ্ছিল। বিমুদ্রাকরণের মত বড় বিষয় নিয়েও বিরোধীরা চেঁচামেচি করার পর সরকার আলোচনায় রাজি হয়েছিল। তাও চেয়েছিল যেন সংক্ষিপ্ত আলোচনা হয়, ভোটাভুটির ব্যাপার না থাকে। এবং যেভাবেই আলোচনা হোক না কেন, প্রধানমন্ত্রী কিন্তু বক্তব্য রাখবেন না।

এবারে আরেক কাঠি সরেস। একটা লোক দেশের এত টাকা মেরে দিয়ে পালিয়ে গেল যে এখনো ঠিক বোঝা যাচ্ছে না কত টাকা, অথচ সরকারের মনেই হল না এটা নিয়ে সংসদে আলোচনার প্রয়োজন আছে। বিরোধীরা আলোচনার দাবীতে বিস্তর চেঁচামেচি করছেন (বেশ করছেন), এখন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানাচ্ছেন সরকার সবকিছু নিয়ে আলোচনায় রাজি। কিন্তু একথা বলছেন কবে? না বিনা বিতর্কে অর্থ বিল পাশ হয়ে যাওয়ার পরে। যা যা ছিল তাতে তার মধ্যে রাজনৈতিক দলগুলোর বিদেশের টাকায় পুষ্ট হওয়াকে আইনসম্মত করে নেওয়াও আছে। এতবড় কান্ড হয়ে গেল কোনো বিতর্ক ছাড়াই। সরকারের যেন কোনো দায় নেই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এনে সংসদ সচল করার। ফ্লোর ম্যানেজমেন্ট কথাটার যেন কোনো অস্তিত্বই নেই।

আসলে বিনা বিতর্কে পছন্দের কাজগুলো হয়ে যাক – এটা এদেশে কে না চায়? যে কোনো বড় শহরের জনবহুল মোড়ে দাঁড়িয়ে যাদের ভদ্রলোক-ভদ্রমহিলা বলে মনে হয় তাদের জিজ্ঞেস করে দেখুন। কতজন যে বলবে “গণতন্ত্রের সীমা থাকা উচিত”, “মিলিটারি রুল হচ্ছে বেস্ট”!

আরও পড়ুন কী ঢাকছে সরকারি চোলি? কেনই বা ঢাকছে?

যাঁরা মনে করেন কথাগুলো ঠিকই, তাঁদের জন্যে একটা ঐতিহাসিক ঘটনা বলে শেষ করি। ঘটনাটার সাথে আমাদের দেশের কোন ঘটনার মিল আছে কিনা আপনারাই ভেবে দেখুন।

ঘটনাটা ঘটে ২১ মার্চ, ১৯৩৩ তারিখে। সেদিন নাজি পার্টির নেতা হিটলার পটসডাম গ্যারিসন চার্চের বাইরে তদানীন্তন জার্মান রাষ্ট্রপতি পল ফান হিন্ডেনবার্গকে হাঁটু মুড়ে অভিবাদন জানায় এবং করমর্দন করে। উপলক্ষটা ছিল নব নির্বাচিত রাইখস্ট্যাগের (জার্মান সংসদ আর কি) প্রথম অধিবেশন। যেহেতু হিন্ডেনবার্গ রাষ্ট্রপ্রধান আর দিনটা হল রাইখস্ট্যাগের অধিবেশন শুরুর দিন, তাই অনেকে মনে করেছিল হিটলার জার্মান সংবিধান ইত্যাদির প্রতি নিজের আনুগত্য প্রকাশ করল। এর পরের বারো বছর প্রমাণ করেছে তাদের ভাবনাটা সঠিক ছিল কিনা।