গম্ভীর যুগ নয়, শুরু হচ্ছে নতুন ব্র্যান্ড সন্ধান

ভারত সিন্ধুনদের জল আটকে দিয়ে পাকিস্তানকে সত্যিই শুকিয়ে মারতে পারে কিনা সেটা এখনো ঠিক পরিষ্কার হল না। বিশেষজ্ঞরা একরকম বলছেন, সরকার একরকম বলছে। কিন্তু বিরাট কোহলি আর রোহিত শর্মা টেস্ট ক্রিকেট থেকে অবসর নেওয়ায় প্রাক্তন ক্রিকেটার, ধারাভাষ্যকার, সাংবাদিক এবং সাধারণ ক্রিকেটপ্রেমীরা যে পরিমাণ চোখের জল ফেলছেন তা যদি পাকিস্তানের দিকে গড়িয়ে যায় – তাহলে পাকিস্তানিদের আর সিন্ধুর জল নিয়ে দুশ্চিন্তা না করলেও চলবে। বিশেষ করে বিরাটের অবসরের পর দেখা যাচ্ছে কোনো প্রাক্তন বিস্ময়ে হতবাক, কেউ ভারতীয় দলে নেতৃত্বের শূন্যতা নিয়ে চিন্তিত, কেউ আবার বলছেন বিরাট এখনো হেসে খেলে ২-৩ বছর খেলে দিতে পারত। কেউ কেউ বলেছেন রোহিতকে স্রেফ অধিনায়ক হিসাবেই আসন্ন ইংল্যান্ড সফরে দরকার ছিল। তারপর রান পেয়ে গেলে আরও কয়েকটা সিরিজ খেলতে পারত। এসব যাঁরা বলছেন তাঁরা প্রত্যেকে দীর্ঘদিন পেশাদার ক্রিকেট খেলেছেন, জানেন কত ধানে কত চাল হয়। বহুবছর আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কভার করা সাংবাদিকরাও লিখে চলেছেন বিরাটের মধ্যে কত ক্রিকেট বাকি ছিল। এই যখন অবস্থা, তখন পাড়া ক্রিকেটের গণ্ডি না পেরনো ক্রিকেটপ্রেমীরা সোশাল মিডিয়ায় ‘অভি না যাও ছোড় কর/কে দিল অভি ভরা নহি’ ইত্যাদি কাব্যি করলে তাঁদের দোষ দেওয়া চলে না। ব্যাপারটা নভেম্বর-ডিসেম্বরে ঘটলে নির্ঘাত কলকাতা বইমেলায় বিরাটকে নিয়ে কবিতা সংকলন, লিটল ম্যাগাজিনের বিশেষ সংখ্যা ইত্যাদি বেরিয়ে যেত। সেই উপনিবেশের যুগে নাক উঁচু সাহেবরা ঘোষণা করেছিল – জনগণের স্মৃতিশক্তি ভাল নয়। কথাটার বহু প্রমাণ আছে, এখন সোশাল মিডিয়ার যুগে তো স্মৃতি নিজেই স্মৃতি হয়ে গেছে। তাই এই হাহুতাশের মাঝে একটু স্মৃতি তাজা করে নেওয়া যাক। যে দুজনের জন্যে এত কান্নাকাটি, শেষ তিনটে সিরিজে (যার প্রথমটা দুর্বল বাংলাদেশের বিরুদ্ধে, আর পরের দুটোতে ভারত হেরেছে) তাঁদের রানগুলো দেখে নেওয়া যাক।

বিরাট – ৬, ১৭, ৪৭, অপরাজিত ২৯, ০, ৭০, ১, ১৭, ৪, ১, ৫, অপরাজিত ১০০, ৭, ১১, ৩, ব্যাট করেননি, ৩৬, ৫, ১৭, ৬।

রোহিত – ৬, ৫, ২৩, ৮, ২, ৫২, ০, ৮, ১৮, ১১, ৩, ৬, ১০, ব্যাট করেননি, ৩, ৯।

এগুলো দুই তরুণ ক্রিকেটারের রান হলে তাঁদের পৃথিবীর যে কোনো দেশে দল থেকে বাদ দিয়ে বলা হত ‘যাও, প্রথম শ্রেণির ক্রিকেট খেলো গে। ওখানে ঝুড়ি ঝুড়ি রান করো, তখন আবার সুযোগ দেব।’ কিন্তু কোহলির বয়স ৩৬, রোহিতের ৩৮। এ বয়সে আর ফিরে আসা যায় না। যায় না যে, তার প্রমাণ ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের চাপে বহু যুগ পরে রঞ্জি ট্রফি খেলতে গিয়েই দুজনে পেয়ে গিয়েছেন। একজনের স্টাম্প সাধারণ বোলারের আপাত নিরীহ একটা ডেলিভারিতে মাটিতে গড়াগড়ি খেয়েছে।

অন্যজন লেগের দিকে খেলতে গিয়ে ব্যাটের বাইরের কানায় বল লাগিয়ে হাস্যকরভাবে আউট হয়েছেন।

দেশের মাঠে ঘরোয়া ক্রিকেটের পেসারদের খেলতে গিয়েই যাঁদের এই অবস্থা, তাঁরা যে ইংল্যান্ডের গ্রীষ্মে সেখানকার পেসারদের বিরুদ্ধে চোখে অন্ধকার দেখবেন – এটা বোঝার জন্যে সুনীল গাভস্কর বা অনিল কুম্বলের মত বিরাট ক্রিকেটার হতে হয় না, আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কভার করার দীর্ঘ অভিজ্ঞতাও থাকতে হয় না। যখন রোহিত আর বিরাটের বয়স কম ছিল, তখন ইংল্যান্ডে গিয়ে তাঁরা কী করেছেন তা খেয়াল রাখলে আরও পরিষ্কার হয় যে এবার ইংল্যান্ডে গিয়ে দলের উপকারে আসা তাঁদের পক্ষে অসম্ভব ছিল।

রোহিত ইংল্যান্ডের মাটিতে সাতটা টেস্ট খেলেছেন। সেখানে ১৪ ইনিংসে ৫০ পেরিয়েছেন মাত্র দুবার, শতরান মোটে একটা। তাঁর পক্ষে বলার মত কথা একটাই – তিনি ৫২৪ রান করেছেন ৪০.৩০ গড়ে, যা তাঁর গোটা টেস্ট জীবনের গড়ের প্রায় সমান। অর্থাৎ তিনি অন্য দেশের চেয়ে ইংল্যান্ডে বেশি খারাপ খেলেননি। কিন্তু বিরাট?

ইংল্যান্ডে ১৭ খানা টেস্ট খেলে ৩৩ ইনিংসে ১০৯৬ রান। শতরান দুটো, অর্ধশতরান পাঁচটা। বিরাটের টেস্টে গড় যেখানে ৪৬.৮৫, সেখানে ইংল্যান্ডে গড় মাত্র ৩৩.২১। ২০১৪ সালের সফরে তো তাঁর সর্বোচ্চ রান ৩৯, জেমস অ্যান্ডারসন সাক্ষাৎ যম হয়ে উঠেছিলেন বিরাটের জন্য। ২০১৮ সালে অনেক উন্নতি করেন। সিরিজটা শুরুই করেন এজবাস্টনের প্রথম ইনিংসে ১৪৯ দিয়ে, দ্বিতীয় ইনিংসেও ৫১। তৃতীয় টেস্টে ট্রেন্টব্রিজে প্রথম ইনিংসে প্রায় শতরান (৯৭), দ্বিতীয় ইনিংসে ১০৩। পরের দুটো টেস্টেও ধারাবাহিক ছিলেন, শুধু ওভালের শেষ টেস্টের দ্বিতীয় ইনিংসে শূন্য রানে আউট হন। ২০২১-২২ জুড়ে হওয়া পাঁচ টেস্টের সিরিজে কিন্তু আবার ব্যর্থ। মাত্র দুবার ৫০ পেরিয়েছিলেন। ২০২৩ সালের জুনে ওভালে অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনালেও ১৪ আর ৪৯। এই বিরাট আগামী ইংল্যান্ড সফরে থাকবেন না বলে ভারতীয় দলের বিরাট ক্ষতি হবে? সচেতনভাবে একথা দুই ধরনের লোক বলতে পারে – ১) অন্ধ বিরাট ভক্ত, ২) বিরাট নামক ব্র্যান্ড ঘিরে যাদের ব্যবসা।

আমাদের প্রবাদপ্রতিম প্রাক্তন ক্রিকেটাররা, ধারাভাষ্যকাররা এবং সংবাদমাধ্যম দ্বিতীয় দলের সদস্য। বিশ্ব ক্রিকেটে বিরাটের উপর যত টাকা লগ্নি করা রয়েছে তার ধারে কাছে কেউ নেই। ভারতীয় ক্রিকেটে দ্বিতীয় স্থানে রোহিত। এটা বোঝার জন্যে খুব বেশি গবেষণা করতে হবে না। নিজের বাড়ির টিভি বা হাতের মোবাইলের ওটিটি প্ল্যাটফর্মের বিজ্ঞাপনগুলো খেয়াল করলেই টের পাবেন। ভারত-ইংল্যান্ড সিরিজের সম্প্রচার স্বত্ব পেতে যে টাকা খরচ করেছে সম্প্রচার সংস্থা, ওঁরা দুজন না খেললে সে টাকা উঠে আসবে কিনা সন্দেহ। কারণ অধিকাংশ ভারতীয় ক্রিকেট দেখেন না, ক্রিকেটার দেখেন। প্রীতি জিন্টা থেকে শুরু করে পাড়ার পাঁচুদা – অনেককেই বলতে দেখা যাচ্ছে ‘বিরাট না খেললে আর টেস্ট দেখব না’। এ থেকে স্পষ্টই বোঝা যায় – এঁরা কোনোদিনই টেস্ট দেখতেন না, বিরাটকেই দেখতেন। এমনিতে এমন দর্শক চিরকালই ছিল। শচীন তেন্ডুলকর আউট হয়ে গেলে টিভি বন্ধ করে দেওয়া, বাঙালির ক্ষেত্রে সৌরভ আউট হয়ে গেলে টিভি বন্ধ করে দেওয়া – এসব হত। গাভস্করের যুগে রেডিও বন্ধ করে দেওয়ার কাহিনিও আছে। কারণ ভারতীয়দের ব্যক্তিপুজোর অভ্যাস সুপ্রাচীন। আমাদের দেশের প্রাচীনতম দুটো মহাকাব্যই লেখা হয়েছে দুজন ব্যক্তিকে কেন্দ্র করে – রাম আর কৃষ্ণ। তার উপর ক্রিকেট বোধহয় একমাত্র দলগত খেলা, যেখানে মূল লড়াইটা সারাক্ষণ দুজন ব্যক্তির মধ্যে চলে। তার উপর ব্যাটারকে হেলমেট-টেলমেট পরে বেশ যোদ্ধা যোদ্ধা দেখায়। বিরাট, রোহিতের যুগ আবার ‘নিউ ইন্ডিয়া’-র যুগ। মানে অশোক চক্রের চেয়ে সুদর্শন চক্রের জনপ্রিয়তা বেশি। ফলে তাঁদের নিয়ে যে মানুষ বেশি গদগদ হবে এতে আর আশ্চর্য কী? কিন্তু সমস্যা অন্যত্র।

গাভস্কর, শচীনদের আমলের তুলনায় এখন কিন্তু ভারত দল হিসাবে অনেক বেশি পরিপূর্ণ। দুজনের কারোর খেলোয়াড় জীবনেই যশপ্রীত বুমরার মত কেউ ভারতীয় দলে ছিলেন না, যিনি কখনো গতিতে কখনো সুইংয়ে কখনো কাটে ব্যাটারদের পরাস্ত করতে পারেন। কপিলদেব ছিলেন, কিন্তু যোগ্য সঙ্গী পাননি। বুমরা অন্য প্রান্তে মহম্মদ শামিকে পেয়েছেন, বিভিন্ন সময়ে আরও অনেককে পেয়েছেন। শচীনের ক্রিকেটজীবনের দ্বিতীয়ার্ধে রাহুল দ্রাবিড়, সৌরভ গাঙ্গুলি, বীরেন্দ্র সেওয়াগ, ভিভিএস লক্ষ্মণরা এসেছিলেন বটে, কিন্তু বালক বয়সে ভারতীয় ব্যাটিং বলতেই ছিলেন তিনি। ফলে তাঁর অতিমানবিক ভাবমূর্তি তৈরি হওয়ার ক্রিকেটিয় কারণও ছিল। গাভস্করের তো গোটা ক্রিকেটজীবনেই ভারতীয় দল মানে তিনি একা এবং কয়েকজন। সেই কয়েকজনের মধ্যে আবার ৯০% হলেন বেদি-এরাপল্লি প্রসন্ন-ভাগবত চন্দ্রশেখর। ফলে ভারত জিতত কালেভদ্রে। বিরাট, রোহিতদের আমলে কিন্তু দল অনেক বেশি ম্যাচ জেতে। মনোরঞ্জক খেলোয়াড়ও দু-একজন নয়। তবু এরকম ব্যক্তিকেন্দ্রিকতা কেন? কারণ আমাদের মাথা – ক্ষয়ে গেছে ওটা, ব্র্যান্ডে গিলিয়াছে গোটা। তাই ক্রমাগত ব্যর্থ হয়ে চলা, স্পষ্টত ফুরিয়ে যাওয়া ক্রিকেটারকেও দলবদ্ধভাবে ‘যেতে নাহি দিব’ বলা চলছে।

ক্রিকেটভক্তদের অনেকে দেরিতে হলেও উপলব্ধি করেছেন যে ভারতীয় ক্রিকেট দলটা আসলে বিজেপির করতলগত হয়েছে, তারা যেভাবে চালাচ্ছে সেভাবেই চলছে। কিন্তু সেই উপলব্ধি থেকে আশ্চর্য অতিসরলীকৃত ধারণায় পৌঁছে গেছেন। তাঁদের তত্ত্ব হল – প্রাক্তন বিজেপি সাংসদ গৌতম গম্ভীর দলটাকে নিজের মর্জি মত চালাতে চান, এই দুজন থাকলে সুবিধা হচ্ছিল না। তাই ওঁরই চক্রান্তে এঁদের চলে যেতে হল। গম্ভীর যে সুবিধার লোক নন তাতে সন্দেহ নেই, তাঁর হাতে জাতীয় ক্রিকেট দলের রাশ থাকলে যে আরএসএস-বিজেপির খুশি হওয়ার কথা তাও অতীতে লিখেছি। কিন্তু তাতে তো বিরাট, রোহিতের ক্রমাগত ব্যর্থতা মিথ্যে হয়ে যায় না। দলের স্বার্থ বিসর্জন দিয়ে দুজনকে স্রেফ ব্র্যান্ড মূল্যের জন্যে বয়ে চলার অন্যায়টাও ন্যায় হয়ে যায় না। তাছাড়া বিরাট আর রোহিত দলের মধ্যে মোটেই কোনো ধুন্ধুমার ধর্মনিরপেক্ষ লড়াই চালাচ্ছিলেন না, যে সে জন্যে তাঁদের দল থেকে বার করা বিজেপির আশু প্রয়োজন হয়ে উঠবে।

টেস্ট ক্রিকেটে রোহিত শর্মা একজন মাঝারি ক্রিকেটারের নাম কিনা, আর বিরাট কোহলি এমনকি নিজের সময়েরও অবিসংবাদী বিশ্বসেরা কিনা, তা অন্য আলোচনার বিষয়। কিন্তু ভারতীয় ক্রিকেটে গম্ভীর যুগ শুরু হতে চলেছে বলে যে হইচই চলছে কদিন ধরে, সে ব্যাপারে কটা কথা বলা দরকার। ভারতীয় দলের সঙ্গে নিয়মিত ঘোরেন যে সাংবাদিকরা, তাঁদের পরস্পরবিরোধী প্রতিবেদনগুলো থেকে যে নির্যাস বেরিয়ে আসে তা হল – গম্ভীর তারকা প্রথা ভাঙতে চান। কিন্তু ভাঙতে চাইলেই তো হল না। ভারতে ক্রিকেট হল কয়েক হাজার কোটি টাকার ব্যবসা। সেই ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে তারকা, মহাতারকা লাগবেই আর ক্রিকেট ব্যবসায়ীরা নিজেদের প্রয়োজনে তা বানিয়েও নেবে। গম্ভীর আটকাতে পারবেন না, আটকাতে চাওয়ার মত বোকাও তিনি নিশ্চয়ই নন। আসলে তিনি দল সংক্রান্ত বড় বড় সিদ্ধান্তগুলো নিজে নিতে চাইছেন। সেটা আধুনিক ক্রিকেটের ইতিহাসে অভূতপূর্ব কিছু নয়। আটের দশকে অস্ট্রেলিয়া দলে বড় বড় সিদ্ধান্তগুলো ববি সিম্পসনই নিতেন, যতদিন না অ্যালান বর্ডার অধিনায়ক হিসাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন। নয়ের দশকে দক্ষিণ আফ্রিকার ক্রিকেটে জুতো সেলাই থেকে চণ্ডীপাঠ করতেন বব উলমার। তাতে দলের ক্ষতি হয়নি, ভালই হয়েছে। উলমারের তো এত প্রভাব ছিল দলের উপর যে, ১৯৯৯ বিশ্বকাপে তিনি ভারতের বিরুদ্ধে ম্যাচে ফিল্ডিংয়ের সময়ে অধিনায়ক হ্যান্সি ক্রোনিয়েকে ইয়ারফোনের মাধ্যমে নির্দেশ দিচ্ছিলেন। আইসিসি নিষেধ করে দেয়

লেখালিখি হচ্ছে – গম্ভীর যুগ এসে পড়ায় ভারতীয় ক্রিকেটের ইতিহাসে এই প্রথম নাকি এমন একটা যুগ আসতে চলেছে যখন কোনো ক্রিকেটারের চেয়ে বেশি প্রভাবশালী হবেন কোচ। একেবারে ভুল তথ্য। ভারতের সফলতম টেস্ট অধিনায়ক হিসাবে এখনো চার নম্বরে থাকা মহম্মদ আজহারউদ্দিনকে প্রবল প্রতাপশালী রাজ সিং দুঙ্গারপুর, কৃষ্ণমাচারি শ্রীকান্তের পর অধিনায়ক করে দিয়েছিলেন দলে কপিলদেব, দিলীপ বেঙ্গসরকর, রবি শাস্ত্রীর মত প্রাক্তন অধিনায়ক এবং তারকা থাকা সত্ত্বেও। আজহার তখন শুভমান গিলের (যিনি অধিনায়ক হবেন বলে শোনা যাচ্ছে) মতই উঠতি তারকা, একদিন ভারত অধিনায়ক হতে পারেন বলে অনেকে ভাবে। কিন্তু অত তাড়াতাড়ি হয়ে যাবেন – একথা আজহার নিজেও ভাবেননি। বোর্ডের ওই সিদ্ধান্ত নেওয়ার উদ্দেশ্যই ছিল এমন একজনকে অধিনায়ক করা, যার নিজের প্রবল প্রতাপ নেই। আজহারের দলের কোচ করে দেওয়া হয়েছিল প্রবাদপ্রতিম বিষাণ সিং বেদিকে, ক্রিকেটার হিসাবে গম্ভীর যাঁর নখের যুগ্যি নন। তারপর প্রবল অশান্তি। ১৯৯০ সালে ইংল্যান্ড সফরে গিয়ে লর্ডস টেস্টে বেদি নাকি আজহারকে বলেছিলেন টস জিতে ব্যাটিং নিতে, কিন্তু আজহার ফিল্ডিং নেন। তারপর গ্রাহাম গুচ একাই ৩৩৩ করেন, ভারত কোনোমতে ফলো অন বাঁচালেও শোচনীয়ভাবে হারে। সিরিজ তো হারেই। তার আগে নিউজিল্যান্ডে ব্যর্থতা, ইংল্যান্ডের পর অস্ট্রেলিয়ায় চূড়ান্ত ব্যর্থতা এবং একটা জেতা একদিনের ম্যাচ হেরে যাওয়া নিয়ে বেদির প্রকাশ্য মন্তব্যে বিতর্ক। বেদির জায়গায় আব্বাস আলি বেগ দায়িত্ব নেওয়ার পরে আজহারের প্রভাব বাড়ে, কিন্তু দল সাফল্যের মুখ দেখেনি। আজহার জিততে শুরু করেন ১৯৯২-৯৩ মরশুমে ঘরের মাঠে ইংল্যান্ড সিরিজ থেকে। তার পিছনেও বড় কারণ কোচ অজিত ওয়াড়েকরের মাথা। ঘূর্ণি পিচ বানিয়ে কুম্বলে-ভেঙ্কটপতি রাজু-রাজেশ চৌহানকে লেলিয়ে দেওয়ার বুদ্ধি তাঁরই ছিল। ১৯৯৬ বিশ্বকাপ সেমিফাইনালে হারের আগে আজহার-ওয়াড়েকর জুটিকে ফিরে তাকাতে হয়নি। সেই দলে ছিলেন অস্তাচলের কপিল, অধিনায়কের সঙ্গে সুসম্পর্ক না থাকলেও তারকা শাস্ত্রী আর ক্রমশ তারকা হয়ে উঠতে থাকা শচীন, বিনোদ কাম্বলি, কুম্বলেরা।

আসন্ন ইংল্যান্ড সফরে গম্ভীর যে দল নিয়ে যাবেন তার চেহারা অনেকটা আজহার-ওয়াড়েকরের প্রথম দলটার মত হতে চলেছে। যে দলে বুমরা আছেন, সে দলে তারকা নেই – একথা বলা আহাম্মকি। গিল যতটা সাড়া জাগিয়ে শুরু করেছিলেন, এখন সেই তুলনায় বিবর্ণ। কিন্তু তাঁর প্রায় গোটা ক্রিকেটজীবন পড়ে আছে ফর্ম ফিরে পাওয়ার জন্যে। তাছাড়াও থাকবেন প্রতিভাবান পন্থ, ৫৮ খানা টেস্ট খেলার পরেও প্রতিশ্রুতিমান কে এল রাহুল, ৮০ খানা টেস্ট খেলে ফেলা রবীন্দ্র জাদেজা। একটা দল খেলতে পারলে জেতার জন্যে এর থেকে বেশি অভিজ্ঞতার প্রয়োজন পড়ে না। এঁদের সঙ্গে যুক্ত হবেন ঘরোয়া ক্রিকেটে দীর্ঘদিন ধরে ভাল খেলে আসা তরুণ সাই সুদর্শন বা ধ্রুব জুড়েলরা। ফলে বিজ্ঞাপনদাতাদেরও একজন বা কয়েকজনকে খুঁজে নিয়ে নতুন ব্র্যান্ড তৈরি করার যথেষ্ট অবকাশ আছে। কেউ একজন সফল হলেই তাকে আকাশে তুলে দেওয়া হবে নিমেষের মধ্যে। দু-এক বছরের মধ্যেই এমন অনেককে পাওয়া যাবে যারা বলবে ‘শুভমানের জন্যেই খেলা দেখি’ বা ‘ঋষভের জন্যেই খেলা দেখি’। সুতরাং নিশ্চিন্ত থাকুন, গম্ভীর যুগ-টুগ নয়। ইংল্যান্ড সফর থেকে শুরু হতে চলেছে ভারতীয় ক্রিকেটের নতুন ব্র্যান্ড সন্ধান। দল ব্যর্থ হলে গম্ভীরও চাকরি খোয়াতে পারেন, ব্র্যান্ড তৈরির কাজ জারি থাকবে।

নাগরিক ডট নেট ওয়েবসাইটে প্রকাশিত

আইপিএল: ১৮ বছর বয়স কী দুঃসহ

ভারতীয় বোর্ডের চোটপাটে আইপিএলের দৈর্ঘ্য বেড়ে চলায় ঘাড় নেড়ে সম্মতি দিয়ে যাচ্ছে আইসিসি। ফলে দুনিয়ার যেখানে যত কুড়ি বিশের লিগ গজাচ্ছে, সবেতেই ঘাড় নাড়তে হচ্ছে।

‘আঠারো বছর বয়স’ নামে একখানা কবিতা লিখেছিলেন তরুণ বয়সেই চলে যাওয়া কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য। তাঁর জীবনের সবটুকুই পরাধীন দেশে কেটেছিল। সেই দেশে ক্ষুদিরাম বসুর মতো ১৮ বছরের ছেলেও ফাঁসি যাওয়ার ঝুঁকি নিতে দ্বিধা করত না। স্বভাবতই সুকান্তর কবিতায় ওই বয়সে পৌঁছোনো মানুষ যে নির্ভয়ে অনেক কিছু ওলট-পালট করার ক্ষমতা রাখে, সেকথা লেখা হয়েছে। কিন্তু আমরা দাঁড়িয়ে আছি স্বাধীনতার ৭৫ বছর অতিক্রম করে যাওয়া দেশে। এখন আর ওই বয়সের ছেলেমেয়েদের কোনও কিছুর জন্য প্রাণ দেওয়ার প্রশ্ন ওঠে না। বরং আজ যারা তাদের বাবা-মা, তাদের অনেকে ওই বয়সে চালু করেছিল ‘বার খেয়ে ক্ষুদিরাম’ কথাটা। অর্থাৎ ক্ষুদিরাম নাকি আদতে বোকা। এমন দেশে আঠারোয় পা দেওয়ার আলাদা তাৎপর্য কী জানি না। তবে ভারতীয় ক্রিকেটের মোচ্ছব আইপিএল আঠারোয় পা দেওয়ায় ক্রিকেট মহলে বিলক্ষণ আলোড়ন তৈরি হয়েছে। সুতরাং আমরা ভেবে দেখি, গত ১৮ বছরে আইপিএল আমাদের কী দিল।

বাঞ্ছিত
১। অলরাউন্ডার: শেন ওয়ার্ন যদি প্রথম আইপিএলেই রবীন্দ্র জাদেজাকে আবিষ্কার না করতেন, বা হার্দিক পান্ডিয়া আইপিএলে নজর কাড়তে না পারতেন, তাহলে কি ভারতীয় দলের নির্বাচকরা তাঁদের নিজ গুণে চিনে নিতেন? সন্দেহ হয়। আইপিএল চালু হওয়ার পর থেকে যেভাবে ক্রমশ তিন ধরনের ক্রিকেটের জাতীয় দল নির্বাচনেই আইপিএলের পারফরমেন্সকে গুরুত্ব দেওয়া বেড়েছে আর রনজি ট্রফি, দলীপ ট্রফি, ইরানি ট্রফি, বিজয় হাজারে ট্রফির গুরুত্ব কমেছে; দেওধর ট্রফি উঠে গিয়েছে, তাতে মনে হয় এঁদের উত্থান এবং ভারতীয় দলে স্থায়ী হওয়ার কৃতিত্ব আইপিএলকে না দিয়ে উপায় নেই।

২। ছেঁড়া কাঁথা থেকে লাখ টাকা: ২০০৮ সালের প্রথম আইপিএল থেকেই বেশ কিছু ক্রিকেটারকে পাওয়া গেছে যাঁরা নিম্নমধ্যবিত্ত বা নিম্নবিত্ত পরিবারে জন্মে অনেক কষ্ট করে ক্রিকেট জগতে প্রবেশ করেছেন, পুরো পরিবারকেও অনেক ত্যাগ স্বীকার করতে হয়েছে। আইপিএলের অর্থ তাঁদের দারিদ্র্য দূর করেছে। ছত্তিশগড়ের কুলদীপ সেন বা উত্তরপ্রদেশের রিঙ্কু সিং ক্রিকেটার হিসাবে হয়তো স্মরণীয় হয়ে থাকবেন না, কিন্তু মানুষ হিসাবে তাঁদের জীবনযাত্রার উন্নতির কৃতিত্ব আইপিএলেরই।

৩। ভারতীয় ফিল্ডিংয়ের দলগত উন্নতি: তরুণদের কাছে ব্যাপারটা তেমন চোখে পড়ার মতো না-ও মনে হতে পারে, কিন্তু আমরা যারা নরেন্দ্র হিরওয়ানি, ভেঙ্কটপতি রাজুদের দেখেছি; মহম্মদ আজহারউদ্দিন, অজয় জাদেজা, মাঝেমধ্যে কপিলদেব বা শচীন তেন্ডুলকর দারুণ ফিল্ডিং করলেও দল হিসাবে ভারতকে অতি সাধারণ ফিল্ডিং করতে দেখেছি, তারা মানতে বাধ্য যে আইপিএল তথা কুড়ি বিশের ক্রিকেটের কল্যাণে ভারতীয়দের ফিল্ডিংয়ের সাধারণ মানই অনেক উঁচুতে উঠেছে।

৪। ভয়হীন তরুণ ভারতীয় ক্রিকেটার: অনেকদিন যাবৎ টেস্ট ক্রিকেট খেলিয়ে দেশগুলোর মধ্যে জাতীয় দলে আগামীদিনে আসতে পারেন বা বাদ পড়ে গেছেন, ফিরতে পারেন– এমন ক্রিকেটারদের নিয়ে ‘এ’ দলের খেলা চালু ছিল। তাতে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে আসার প্রস্তুতি হত। কিন্তু আইপিএলে যেভাবে অন্য দেশের সর্বোচ্চ মানের ক্রিকেটারদের সঙ্গে এবং বিপক্ষে খেলার সুযোগ পায় একেবারে কচিকাঁচারা, সে সুযোগ ওখানে ছিল না। আজ যে যশস্বী জয়সওয়াল, নীতীশ রেড্ডিদের জাতীয় দলে প্রথম ম্যাচেই অকুতোভয় মনে হয়, তার কৃতিত্ব আইপিএলের।

৫। সেরা লোকের থেকে সেরা জিনিস শেখার সুযোগ: জম্মুর ছেলে উমরান মালিক বিদ্যুৎ গতির ইয়র্কারে ব্যাটারের উইকেট ছিটকে দিলেন আর ডাগ আউটে নিজে উইকেট পাওয়ার মতো উল্লাসে ফেটে পড়লেন একদা বিশ্বত্রাস দক্ষিণ আফ্রিকার ডেল স্টেইন– এ দৃশ্য আমরা আইপিএলে দেখেছি। উমরানের গতি অনেক আশা জাগালেও ভারতীয় দলের হয়ে তেমন কিছু করতে পারেননি। খুব বেশি সুযোগও পাননি। কিন্তু স্টেইনের চেয়ে ভালো জোরে বোলিং কোচ তিনি পেতেন কোথায়? আর আইপিএল না থাকলে স্টেইনের ধারেকাছেও পৌঁছানো হত না উমরানের। এমন উদাহরণ অসংখ্য।

আরও পড়ুন গোট কত বেড়া খেয়ে যাচ্ছে

অবাঞ্ছিত
১। যা বদলায় সেটাই নিয়ম: কম সময়ের খেলা হিসাবেই যে কুড়ি ওভারের খেলার উৎপত্তি, তাতে অনন্তকাল ধরে ফিল্ডিং সাজিয়ে, ওভার রেটের তোয়াক্কা না করেও বহুবার কোনও শাস্তি হয়নি মহাতারকা অধিনায়কদের। কে এই সুবিধা পেয়েছেন আর কে পাননি তা নিয়ে অনলাইনে বিস্তর চুলোচুলি চলে এঁদের ভক্তদের মধ্যে। আইপিএল কর্তৃপক্ষ অবশ্য সে অশান্তি মিটিয়ে ফেলেছেন। আগে তবু তিনটে ম্যাচে নির্ধারিত সময়ে ওভার শেষ করতে না পারলে অধিনায়ককে একটা ম্যাচে সাসপেন্ড করা হত। এবার থেকে আর সে ঝক্কি থাকছে না। কেবল ‘ডিমেরিট পয়েন্ট’ দেওয়া হবে। অমন অনেক পয়েন্ট জমলে তবে সাসপেনশনের প্রশ্ন। নতুন করে নিলাম হবে, ছয়জনের বেশি ক্রিকেটারকে ধরে রাখা যাবে না, আবার অতজনকে রাখার খরচ বিস্তর, ওদিকে মহেন্দ্র সিং ধোনি চেন্নাই সুপার কিংস ছেড়ে নড়বেন না। অতএব নিয়ম বদলে ধোনিকে কোনওদিন দেশের হয়ে না খেলা ক্রিকেটারদের মতো ‘আনক্যাপড’ হওয়ার, মানে শিং ভেঙে বাছুরের দলে ঢোকার, সুযোগ করে দেওয়া হল।

২। মহাতারকাদের মুখ বাঁচানোর সুযোগ: ধরুন, আপনি অনেকদিন হল টেস্টে সুবিধা করতে পারছেন না। বল বেশি লাফালে বা সুইং হলে অথবা স্পিন হলেই আপনাকে সর্বকালের সেরা তো দূরের কথা, নিজের কালের মাঝারিও মনে হচ্ছে না। কুছ পরোয়া নেই। আইপিএল মাস দুয়েকের লম্বা প্রতিযোগিতা। রান আপনি পাবেনই। অমনি সকলে ভুলে যাবে টেস্টে কতকাল রান করেননি, ড্যাং ড্যাং করে পরের সিরিজেও খেলতে নামবেন।

৩। ঘরোয়া ক্রিকেটের সাড়ে সর্বনাশ: দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়েও বন্ধ হয়নি ভারতের ঘরোয়া ক্রিকেটের সবচেয়ে বড় প্রতিযোগিতা রনজি ট্রফি। কিন্তু করোনা অতিমারির সময়ে বন্ধ হয়ে রইল। কেবল ঘরোয়া ক্রিকেট খেলে সংসার চলে যে ক্রিকেটারদের, তাঁদের আক্ষরিক অর্থে হাঁড়ির হাল হল। কিন্তু উপায় কী? ওতে খরচ আর আইপিএলে আয়। তাই ক্রিকেট বোর্ড ব্যস্ত ছিল আইপিএলের আয়োজন করতে।

৪। সব ক্রিকেটের ঊর্ধ্বে: ক্রিকেট ১১ জনের খেলা, কিন্তু আইপিএল ১২ জনের খেলা। এগারোজনের মধ্যে যথেষ্ট ধুন্ধুমার ব্যাটার ঢোকানো যাচ্ছে না? আচ্ছা, ব্যাটিংয়ের সময়ে একজন বোলারকে বসিয়ে ‘ইমপ্যাক্ট প্লেয়ার’ হিসাবে আরেকজন ব্যাটারকে ঢুকিয়ে নেবেন। বোলার কম পড়ছে? অসুবিধা নেই। ফিল্ডিং করার সময়ে ব্যাটারদের একজনকে বসিয়ে আরেকজন বোলারকে খেলাবেন।

৫। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের অন্তর্জলিযাত্রা: নিজের দেশে আসন্ন মরশুমে এবারের বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনালে ওঠা দক্ষিণ আফ্রিকা একটাও টেস্ট খেলবে না, খেলবে শুধু পাঁচখানা টি টোয়েন্টি। ভারতীয় বোর্ডের চোটপাটে আইপিএলের দৈর্ঘ্য বেড়ে চলায় ঘাড় নেড়ে সম্মতি দিয়ে যাচ্ছে আইসিসি। ফলে দুনিয়ার যেখানে যত কুড়ি বিশের লিগ গজাচ্ছে, সবেতেই ঘাড় নাড়তে হচ্ছে। ক্রিকেট দুনিয়ার বড়, মেজো, সেজো ভাই ভারত, অস্ট্রেলিয়া, ইংল্যান্ড আবার ঠিক করেছে টেস্ট নিজেদের মধ্যেই খেলবে, অন্য দেশগুলোর সঙ্গে ক্ষমাঘেন্না করে একটা-দুটো। এদিকে, আইসিসির আয়ের বেশিরভাগটাও ওরাই নেয়। ফলে বাকি বোর্ডগুলোর অবস্থা সঙ্গিন। তারাও টিকে থাকতে কুড়ি বিশের লিগ আয়োজনেই মন দিচ্ছে। খেলোয়াড়রাও ৩০-৩২ বছরে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকে অবসর নিয়ে ফেলছেন। পাঁচদিন নয়, এমনকি ৬-৭ ঘণ্টাও নয়, ঘণ্টা চারেক খেলেই যদি মেলা রোজগার করা যায় তো কে বেশি খাটতে যাবে? এরপর হয়তো ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেট হবে সারাবছর আর মাস দুয়েক আন্তর্জাতিক। খেলাটা ক্রিকেট থাকবে না ডাংগুলি হয়ে যাবে– সেটা অন্য আলোচনার বিষয়।

উত্তরবঙ্গ সংবাদে প্রকাশিত

জয় শাহের দুয়ারে হাস্যকর ট্রফি প্রকল্প

ফাইনালের মঞ্চে পুরস্কার দেওয়ার সময় আয়োজক দেশ পাকিস্তানের কাউকে দেখা গেল না কর্তাদের মধ্যে। বিশ্বের কোথাও কোনও টুর্নামেন্টে এ দৃশ্য দেখেছেন?

নহবত বসেছিল, গায়ে গোলাপ জল ছেটানোর জন্যে লোক তৈরি ছিল, হেঁশেলের দিক থেকে ভেসে আসছিল বেগুনির সুগন্ধ, বরকে অভ্যর্থনা করার জন্যে কনে কর্তা জমাটি পোশাক পরে তৈরি, কিন্তু শেষপর্যন্ত বর এসে পৌঁছল না। ফলে সব আয়োজন ভেস্তে গেল। কনে কর্তা ব্যাজার মুখ করে অতিথিদের কোনোমতে নমস্কার করে খাইয়ে দাইয়ে বাড়ি পাঠিয়ে কর্তব্য সমাধা করলেন।

এই ছিল ২০২৩ বিশ্বকাপ ফাইনালের পরের অবস্থা। ভারত জিতে গেলে গোটা দলকে নিয়ে কী বিপুল নির্বাচনী প্রচারাভিযান চালাত বিজেপি, সে পরিকল্পনা কোথাও কোথাও প্রকাশিত হয়েছিল। কংগ্রেস মুখপাত্র সুপ্রিয়া শ্রীনেত দাবি করেছিলেন, রাজস্থানের এক বিজেপি নেতা তাঁকে বলেছিলেন যে বিজেপির সমস্ত হোর্ডিংয়ে বিশ্বকাপ হাতে মোদীর ছবি দেওয়ার ব্যবস্থা তৈরি ছিল। কিন্তু সে গুড়ে বালি ছড়িয়ে দিয়েছিল প্যাট কামিন্সের বাহিনি। ২০২৪ সালের ওয়ার্ল্ড টি টোয়েন্টি অবশ্য রোহিত শর্মারা জিতেছিলেন, কিন্তু ততদিনে লোকসভা নির্বাচন মিটে গেছে। ক্রমশ বিরাট হয়ে ওঠা নরেন্দ্র মোদীকে কেটে ছেঁটে দেশের অন্য নেতাদের মাপে এনে দিয়েছেন ভোটাররা। তখন আর হইচই করে কী লাভ?

সেই শোক বুঝি এতদিনে দূর হল। বিশ্বকাপ ফাইনালের পরে মোদীর পিছনে যেরকম বেচারা ভঙ্গিতে হাঁটছিলেন তৎকালীন বিসিসিআই যুগ্ম সচিব জয় শাহ, তাতে মনে হচ্ছিল বাবার বন্ধু নরেনজেঠু প্রচণ্ড ধমকেছেন ‘একটা কাজ যদি তোকে দিয়ে হয়!’ কিন্তু তাঁর নামও জয় শাহ। তিনি পরাজয় মেনে নিয়ে চুপ করে বসে থাকার লোক নন। ইতিমধ্যে আইসিসির শীর্ষপদ দখল করে জেঠুকে এবার তিনি যে উপহার দিলেন তা একেবারে নিখুঁত।

নিজে মাঠে নেমে তো খেলতে পারেন না, কিন্তু রোহিতদের সর্বোচ্চ সুযোগসুবিধা দেওয়ার ব্যবস্থা করে দিয়েছেন। ১৯৩৪ সালের ফুটবল বিশ্বকাপ ইতালিকে জেতানোর জন্যে বেনিতো মুসোলিনি কী করেছিলেন বা ১৯৭৮ সালের বিশ্বকাপ আর্জেন্টিনাকে জেতাতে সে দেশের জুন্টা সরকার কত কলকাঠি নেড়েছিল তা আজ খুব গোপন তথ্য নয়। কিন্তু সেই দুই বিশ্বকাপেও ইতালি আর আর্জেন্টিনা সে আরাম পায়নি যা এবারে রোহিতরা পেলেন।

আইসিসি চেয়ারম্যান হিসেবে ভারতের জয়ে মাঠে তাঁর উচ্ছ্বাস প্রকাশও অত্যন্ত দৃষ্টিকটু, হাসির খোরাক। ডালমিয়া, শ্রীনিবাসন, শশাঙ্ক মনোহররা অতীতে এই পদে থেকেছেন, এমন বালখিল্যসুলভ আচরণ করেননি কোনওদিন। আরও অবাক কাণ্ড, ফাইনালের মঞ্চে পুরস্কার দেওয়ার সময় আয়োজক দেশ পাকিস্তানের কাউকে দেখা গেল না কর্তাদের মধ্যে। বিশ্বের কোথাও কোনও টুর্নামেন্টে এ দৃশ্য দেখেছেন? শোয়েব আখতারের ক্ষোভ প্রকাশ স্বাভাবিক। বৈষম্য তো আরও আছে!

প্রতিযোগিতার অন্য সব দল খেলল পাকিস্তানের একাধিক মাঠে ঘুরে ঘুরে, ভারতীয় দল একেবারে অন্য দেশের একটা শহরেই পায়ের উপর পা তুলে বসে রইল। অন্য দলগুলোকে পাকিস্তান থেকে উড়ে আসতে হল, আবার ফিরে যেতে হল। এই কাণ্ড করতে গিয়ে সবচেয়ে বিরক্তিকর অবস্থা হল দক্ষিণ আফ্রিকার। ভারত কোন সেমিফাইনালে উঠবে তা জানা না থাকায় অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে তাদেরও দুবাই যেতে হল সেমিফাইনালের আগে। তারপর যখন বোঝা গেল ভারতের সঙ্গে অস্ট্রেলিয়ারই সেমিফাইনাল হবে, তখন ফেরত আসতে হল পাকিস্তানে। বিশ্রাম নেওয়ার বিশেষ সময় না পেয়েই নিউজিল্যান্ডের বিরুদ্ধে সেমিফাইনাল। সেই সেমিফাইনালে হারলেও, ৬৭ বলে অপরাজিত ১০০ রান করা ডেভিড মিলার বিরক্তি প্রকাশ করেই ফেললেন

আরও পড়ুন জয় জয় জয় জয় হে

ভারত অন্যায় সুবিধা পেয়েছে – একথা বলার সাহস ক্রিকেট দুনিয়ায় কারোর হয় না। যেমন বিশ্ব রাজনীতিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে ধমকানোর সাহস এই সেদিন পর্যন্ত কারোর হত না। কারণটা একই – সোজা কথায় টাকার গরম। আমরা আইসিসিকে সবচেয়ে বেশি ব্যবসা দিই, অতএব আইসিসির আয়ের বেশিরভাগটা আমরাই নেব – এই গা জোয়ারি যুক্তিতে ভারত, অস্ট্রেলিয়া আর ইংল্যান্ড দীর্ঘদিন হল বাকি ক্রিকেট দুনিয়াকে শুকিয়ে মারছে।

এরা যেটুকু উচ্ছিষ্ট ছুড়ে দেয় বাকিদের প্রতি, তা নিয়েই তাদের চলতে হয়। তাই কোনো বোর্ড মুখ খোলে না। বোর্ডের বারণ আছে বলে ক্রিকেটাররাও কিছু বলেন না। কিন্তু পাকিস্তানে চলল চ্যাম্পিয়নস ট্রফি আর ভারত খেলল দুবাই ট্রফি – এটা বোধহয় সহ্যের সীমা ছাড়িয়ে গেছে। তাই বোর্ডগুলো কিছু না বললেও অনেক বিদেশি সাংবাদিক ও প্রাক্তন ক্রিকেটার এবার এ নিয়ে প্রশ্ন তুলে ফেলেছেন, মিলারও মুখ খুলেছেন। সুবোধ বালক ভারতীয় মিডিয়া আর ধারাভাষ্যকাররা অবশ্য মানছেন না। তাঁরা দিল্লির প্রাক্তন বিজেপি বিধায়ক, অধুনা ভারতীয় দলের কোচ গৌতম গম্ভীরের সঙ্গে একমত। কিন্তু মহম্মদ শামি সোজা সরল লোক, তিনি মেনে নিয়েছেন যে সব ম্যাচ একই মাঠে খেলায় ভারত বিশেষ সুবিধা পেয়েছে।

বস্তুত, ক্রিকেটের অ আ ক খ জানলে এবং অন্ধ ভক্ত না হলে যে কেউ মানবেন যে সব ম্যাচ এক মাঠে খেললে সুবিধা হয়। কারণ ক্রিকেট অন্য যে কোনো খেলার চেয়ে অনেক বেশি নির্ভর করে আবহাওয়া এবং পিচের উপরে। চার স্পিনার খেলানোর জন্যে বিস্তর হাততালি কুড়োচ্ছেন গম্ভীর, রোহিত আর প্রধান নির্বাচক অজিত আগরকর। এই সিদ্ধান্ত তাঁরা নিতে পেরেছেন কারণ জানতেন, একই মাঠে ভারত সব ম্যাচ খেলবে আর সে মাঠের পিচ হবে স্পিন সহায়ক। অন্য সব দলকে কিন্তু একাধিক মাঠের পিচের কথা ভেবে দল গড়তে হয়েছিল।

একথা বললেই যা বলা হচ্ছে, তা হল – আর কী উপায় ছিল? ভারত তো পাকিস্তানে খেলতে যেতে পারত না। কারণটা রাজনৈতিক, অর্থাৎ ভারত সরকারের বারণ। কথাটা ঠিক। কিন্তু সেক্ষেত্রে ভারতের গ্রুপের সবকটা খেলাই সংযুক্ত আরব আমিরশাহীতে করা যেতে পারত, দুবাই আর শারজা মিলিয়ে। তাহলে অন্তত গ্রুপের অন্য দলগুলোও একই ধরনের পিচে একাধিক ম্যাচ খেলার সুযোগ পেত।

পাকিস্তানে খেলতে না যাওয়ার রাজনৈতিক কারণটাকেও প্রশ্ন করা দরকার। ২০০৮ সালের সন্ত্রাসবাদী হানার কথা তুলে আর কত যুগ দুই দেশের ক্রিকেটিয় সম্পর্ক অস্বাভাবিক করে রাখা হবে? মোদীর আচমকা নওয়াজ শরীফের নাতনির বিয়েতে খেতে যাওয়া, পাঠানকোটের সন্ত্রাসবাদী হানার তদন্ত করতে পাক গোয়েন্দা বিভাগকে ভারতের সেনা ছাউনিতে ঢুকতে দেওয়া – এসব তো ২০০৮ সালের অনেক পরে ঘটেছে। এমনকি গতবছর ফেব্রুয়ারি মাসে ডেভিস কাপে ভারতের টেনিস দল ইসলামাবাদে গিয়ে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে খেলে এসেছে। কেবল ক্রিকেট দল পাকিস্তানে গেলেই মহাভারত অশুদ্ধ হবে?

আজ্ঞে না, পুলওয়ামা ভুলিনি। সে ঘটনা যারা ঘটিয়েছিল তাদের শাস্তি হয়েছে? কোনো জোরদার তদন্ত হয়েছে? দাভিন্দর সিং বলে এক ভারতীয় পুলিস অফিসারকে গ্রেফতার করা হয়েছিল। তিনিও জামিন পেয়ে গেছেন ২০২০ সালে। তাহলে ক্রিকেট দলের ঘাড়ে বন্দুক রেখে জাতীয়তাবাদের নাটক করা কেন? আর সত্যিই যদি পাকিস্তান অচ্ছুত হয়, তাহলে প্রত্যেক আইসিসি প্রতিযোগিতায় ভারত আর পাকিস্তানকে এক গ্রুপে রাখাই বা কেন?

ধরা যাক, রাখা হয় না। ওটা এমনিই হয়ে যায়। তাহলেই বা ভারতীয় দল ম্যাচটা খেলে কেন? বোর্ড তো বলতে পারে – পাকিস্তানের সঙ্গে আমরা খেলব না, ওই ম্যাচের পয়েন্ট পাকিস্তানকে দিয়ে দেওয়া হোক। কেন বলে না? টিভি সম্প্রচার থেকে যে বিপুল টাকা আয় হয় তার নেশা তাহলে জাতীয়তাবাদের চেয়েও বেশি তো?

উত্তরগুলো অস্বস্তিকর। ফলে যিনি ভিন্নমত হবেন, তিনি সহজ রাস্তাটা নেবেন। বলবেন – এসব বলে ভারতের জয়কে ছোট করবেন না। ওরা পাকিস্তানে খেললেও জিতত। দুবাইতেও জিততে তো হয়েছে। আজ্ঞে হ্যাঁ, সেকথা ঠিক। তবে কথা হচ্ছে, আমাদের দেশের নির্বাচনগুলোতে যেসব দল রিগিং করে, অনেক ক্ষেত্রে রিগিং না করলেও তারাই জিতত। তাহলে কি ‘আহা! কী সুন্দর রিগিং করে!’ বলে হাততালি দিতে হবে?

উত্তরবঙ্গ সংবাদে প্রকাশিত

ভারতীয় ক্রিকেটের জন্য আরও আঘাত অপেক্ষা করছে

একজন-দুজন নয়, গোটা ক্লাসই ফেল। এরপরেও রোহিত বুক ফুলিয়ে বললেন, কাটাছেঁড়া করার দরকার নেই।

মনে করুন আপনি একটা ক্লাসের ক্লাস টিচার। আপনার ক্লাসের সবকটা ছাত্রছাত্রী বার্ষিক পরীক্ষায় ফেল করেছে। হেডমাস্টার আপনার কাছে কৈফিয়ত চাইলেন। আপনি বললেন “এ নিয়ে এত ভাবার কিছু নেই। এতবছর তো সবাই পাস করেছে। একদিন তো এই রেকর্ড ভাঙতই, না হয় এবছরই ভাঙল।” কী ফল হবে? স্কুল বেসরকারি হলে চাকরিটি যাবে। সরকারি স্কুলে তা হবে না, কিন্তু বিলক্ষণ গালমন্দ হজম করতে হবে। ঘটনা হল, নিউজিল্যান্ডের কাছে একটা টেস্ট বাকি থাকতেই সিরিজ হেরে যাওয়ার পরে ভারত অধিনায়ক রোহিত শর্মা প্রায় এই কথাগুলোই বলেছেন।

বলেছেন, এত কাটাছেঁড়া করার কী আছে? বারো বছর পরে একটা সিরিজ (ঘরের মাঠে) তো দল হারতেই পারে। যা চেপে গেছেন, তা হল দল সমানে সমানে লড়াই করে হারেনি, ল্যাজেগোবরে হয়েছে। প্রথম টেস্টের প্রথম দিনে ভিজে আবহাওয়ায় বল সুইং করতেই রোহিত বাহিনী ৪৬ রানে অল আউট হয়ে গিয়েছিল। দ্বিতীয় ইনিংসে ঋষভ পন্থ আর সরফরাজ খান দুর্দান্ত ব্যাটিং করায় ইনিংস হার বেঁচেছে। পুনের দ্বিতীয় টেস্টের প্রথম ইনিংসে স্পিনারদের পিচেও দেড়শো রানেই জারিজুরি শেষ। দ্বিতীয় ইনিংসেও যশস্বী জয়সোয়াল ছাড়া সব ব্যাটার ব্যর্থ। নিচের দিকে রবীন্দ্র জাদেজা কিছু রান না করলে আবার দুশোর নিচে ইনিংস গুটিয়ে যেত। শুধু কি তাই? প্রথম টেস্টে জোরে বোলিং সহায়ক পিচকে বুঝতে ভুল করে তিন স্পিনারে খেলা হল। ফলে আবহাওয়া যেমনই থাকুক, টস জিতে ব্যাটিং নেওয়া ছাড়া উপায় রইল না। ওদিকে এখনই যাঁকে কপিলদেবের চেয়েও ভাল বলা শুরু হয়ে গেছে, সেই যশপ্রীত বুমরা ওই পিচে বিশেষ কিছু করতে পারলেন না। আরেক ‘গোট’ (গ্রেটেস্ট অফ অল টাইম) রবিচন্দ্রন অশ্বিনকেও নির্বিষ দেখাল। জাদেজা আর কুলদীপ যাদব তিনটে করে উইকেট নিলেন বটে, কিন্তু নিউজিল্যান্ড চারশো রান তুলে ফেলল। দ্বিতীয় টেস্টেও ভারতের আটশোর বেশি উইকেট নিয়ে ফেলা ‘রবি-অ্যাশ’ জুটি ব্যর্থ। এক ব্যাগ অভিজ্ঞতা নিয়ে, ওয়াশিংটন সুন্দর আর মিচেল স্যান্টনারের বোলিং দেখেও, তাঁরা বুঝেই উঠতে পারলেন না যে এই পিচে আস্তে বল করতে হবে। জোরে জোরে বল করে লাভ নেই। বুমরা এখানেও রিভার্স সুইং-টুইং করাতে পারলেন না। মানে একজন-দুজন নয়, গোটা ক্লাসই ফেল। এরপরেও রোহিত বুক ফুলিয়ে বললেন, কাটাছেঁড়া করার দরকার নেই।

আসলে রোহিত জানেন, তিনি যে ক্রিকেট বোর্ডের কর্মচারী তারা টাকা দিয়ে কিনে রেখেছে যাদের কাটাছেঁড়া করা কাজ তাদের এক বড় অংশকে। প্রাক্তন ক্রিকেটার, ধারাভাষ্যকার আর সাংবাদিকদের কথা বলছি। আরেকটা অংশ ভয়েই চুপ করে থাকবে। কারণ সত্যি কথা বলে/লিখে ফেললে ক্রিকেট বোর্ড ধারাভাষ্যের চুক্তি থেকে বাদ দিয়ে দেবে বা আর মাঠে ঢুকতে দেবে না। হাতে না মেরে ভাতে মারা যাকে বলে আর কি। রোহিত নির্ভুল আন্দাজ করেছেন। একই দিনে পাকিস্তানে, অর্থাৎ বিদেশের মাঠে, ইংল্যান্ডের হারের পর নাসের হুসেন, মাইকেল আথারটনরা চুলচেরা সমালোচনা করছেন বেন স্টোকসের দলের। অন্যদিকে সুনীল গাভস্কর, রবি শাস্ত্রী, সঞ্জয় মঞ্জরেকর, অনিল কুম্বলেরা ‘আহা! ওরা তো খারাপ খেলোয়াড় নয়। খেলায় হার জিত তো আছেই। ঘরের মাঠে টানা ১২ বছর, ১৮ খানা সিরিজ জিতেছে। সেটা তো মনে রাখতে হবে’ – এই জাতীয় কথাবার্তা বলছেন। বেশ, ওঁদের কথাও থাক। অত বড় ক্রিকেটারদের তো উড়িয়ে দেওয়া যায় না। এই ১২ বছর অপরাজিত থাকার রেকর্ডটা নিয়েই বরং কাটাছেঁড়া করা যাক।

ভারত কি কোনোদিন ঘরের মাঠে দুর্বল দল ছিল, বা মাঝেমধ্যেই এর তার কাছে সিরিজ হারত? সোজা উত্তর – না। এই শতাব্দীর ইতিহাসে ২০১২ সালে অ্যালাস্টেয়ার কুকের ইংল্যান্ডের আগে ভারত শেষ সিরিজে হেরেছিল আরও আট বছর আগে, অ্যাডাম গিলক্রিস্ট-রিকি পন্টিংয়ের অস্ট্রেলিয়ার কাছে। অর্থাৎ আড়াই দশকে মোটে চারটে সিরিজ হার। তার আগের সিরিজ হার ছিল ২০০০ সালে, হ্যানসি ক্রোনিয়ের দক্ষিণ আফ্রিকার বিরুদ্ধে। আর গত শতকের ইতিহাস?

অস্ট্রেলিয়া হল টেস্ট ক্রিকেটের ইতিহাসে সবচেয়ে সফল দল। সেই অস্ট্রেলিয়া ২০০৪-০৫ মরশুমের ওই জয়ের আগে ভারতে শেষ জিতেছিল ১৯৬৯-৭০ সালে। ইংল্যান্ডের ভারতের মাঠে কুকের দলের আগে শেষ সিরিজ জয় ছিল ১৯৮৪-৮৫ মরশুমে। ওয়েস্ট ইন্ডিজ এ দেশে এসে শেষবার সিরিজ জিতেছে ১৯৮৩-৮৪ মরশুমে। শ্রীলঙ্কা আজ পর্যন্ত জেতেনি, নিউজিল্যান্ড যে আগে কখনো জেতেনি তা তো এখন সকলেই জানেন। তারা শেষবার এ দেশে একটা টেস্ট ম্যাচই জিতেছিল সেই ১৯৮৮ সালে, তাও ১৯৬৯ সালের পর প্রথমবার। এমনকি পাকিস্তান, যাদের সঙ্গে আমাদের আবহাওয়া এবং পিচের চরিত্র সবচেয়ে বেশি মেলে, তারাও ১৯৫২-৫৩ থেকে ২০০৭-০৮ পর্যন্ত ভারত সফরে এসে সিরিজ জিততে পেরেছিল মাত্র একবার – ১৯৮৬-৮৭ মরশুমে। সুতরাং ভারত চিরকালই নিজের দেশে বাঘ। কোহলি, রোহিতরা নতুন কিছু করেননি। বস্তুত, সব দলই নিজের দেশে বাঘ। তাই যে কোনো টেস্ট দলেরই উৎকর্ষ বিচার করা হয় বিদেশে তারা কেমন তাই দিয়ে। অজিত ওয়াড়েকরের ভারতীয় দল শ্রদ্ধেয়, কারণ ১৯৭১ সালে তারা ওয়েস্ট ইন্ডিজ এবং ইংল্যান্ডে সিরিজ জিতেছিল। সৌরভ গাঙ্গুলির দল ভারতের ক্রিকেট ইতিহাসে চিরকাল উঁচু জায়গায় থাকবে, কারণ তারা নিয়মিত বিদেশে টেস্ট ম্যাচ জেতা শুরু করেছিল। গত এক দশকে কোহলির নেতৃত্বাধীন ভারতীয় দলের কলার তোলার মত সাফল্যও দুবার অস্ট্রেলিয়ায় সিরিজ জেতা। দেশের মাঠে একের পর এক দলকে দুরমুশ করা নয়।

আরও পড়ুন জয় জয় জয় জয় হে

এর সঙ্গে আরেকটা কথা না বললেই নয়, যা এক পডকাস্টে বলে বিস্তর ট্রোলড হয়েছিলেন হর্ষ ভোগলে। কথাটা হল, গত ১০-১২ বছরে টেস্ট ক্রিকেট সম্ভবত খেলাটার ইতিহাসে সবচেয়ে কম প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ছিল। ২০১১ বিশ্বকাপের পর থেকে ধাপে ধাপে অবসর নিলেন শ্রীলঙ্কা ক্রিকেটের মহীরুহরা। ছোট্ট দেশে চট করে সর্বোচ্চ মানের ক্রিকেটার পাওয়া শক্ত, ফলে দলটা একেবারে দুর্বল হয়ে গিয়েছিল। রাজনৈতিক কারণে ভারত পাকিস্তানের বিরুদ্ধে খেলেনি। মাঝেমধ্যে এক-আধটা অঘটন ছাড়া ওয়েস্ট ইন্ডিজও অতি দুর্বল হয়ে পড়েছে এইসময়। ওখানে বাস্কেটবল, বেসবলের দিকেই বেশি ধাবিত হচ্ছে তরুণ প্রজন্ম। দক্ষিণ আফ্রিকার ক্রিকেট বিপদে পড়েছিল কালো মানুষদের জন্য সংরক্ষণ নীতির প্রভাবে বহু ক্রিকেটার দেশত্যাগ করায়। অর্থাৎ ভাল মানের আন্তর্জাতিক দল ছিল ভারতকে নিয়ে বড়জোর চারটে। সুতরাং ১২ বছর দেশে হারিনি – এই নিয়ে উদ্বাহু না হয়ে বরং মনে রাখা ভাল, এই যুগেও কিন্তু আমরা দক্ষিণ আফ্রিকাকে ও দেশে হারাতে পারিনি, ইংল্যান্ডে সিরিজ জিততে পারিনি, নিউজিল্যান্ডেও নয়। এমনকি বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের শুধু ফাইনালটা ইংল্যান্ডে হতেই পরপর দুবার হেরে বসেছি।

বাংলাদেশকে দুদিনে হারিয়েছি বলে পেশি ফোলানোর ফল এই সিরিজে দেখা যাচ্ছে। এখনো ভুল কারণে নাচানাচি চালু রাখলে অদূর ভবিষ্যতে আরও আঘাত পেতে হবে। অবশ্য সেটা প্রায় অনিবার্য। কারণ এই সিরিজ ৩-০ হারলে, এমনকি আসন্ন অস্ট্রেলিয়া সফরে ৫-০ হারলেও, কিছু বদলানোর আশা কম। কারণ ২০১১-১২ মরশুমে পরপর আটটা টেস্ট হারার পরেও মহেন্দ্র সিং ধোনির অধিনায়কত্ব যায়নি, শচীনকে অবসর নিতে বাধ্য করা হয়নি। ফলাফলকে সেদিনই গুরুত্বহীন করে দেওয়া হয়েছে ভারতীয় ক্রিকেটে।

উত্তরবঙ্গ সংবাদ কাগজে প্রকাশিত

এ যুগে তৃতীয় নয়নও জিরো

এখন চণ্ডীগড়ের মেয়র নির্বাচনেও বৈধ পথে জেতার উপায় না থাকলে বিরোধীদের ব্যালট নষ্ট করিয়ে দেওয়া হয় স্বয়ং নির্বাচনী অফিসারকে দিয়ে। এ যুগে তৃতীয় নয়নের উপরেও আস্থা না থাকাই স্বাভাবিক।

ডিসিশন রিভিউ সিস্টেম বা ডিআরএসের যুগে আম্পায়ারদের ডিকি বার্ড, ডেভিড শেপার্ড বা সাইমন টফেলের মত পরম শ্রদ্ধেয় হয়ে ওঠার সুযোগ কমে গেছে। পড়ে আছে কুখ্যাত হওয়ার সুযোগ। কারণ আজকাল রান আউট বা স্টাম্প আউটের ক্ষেত্রে খুব সহজ সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রেও মাঠের আম্পায়াররা নিজে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ঝুঁকি নেন না, ঠান্ডা ঘরে বসা টিভি আম্পায়ারের হাতেই ব্যাপারটা ছেড়ে দেন। শ্যেনদৃষ্টির একাধিক ক্যামেরা আর অত্যাধুনিক প্রযুক্তির কারণে মাঠে দাঁড়িয়ে আম্পায়ারিংয়ের মত পরিশ্রমসাধ্য কাজ এখন আগের চেয়েও বেশি প্রশংসাহীন। সঠিক সিদ্ধান্তের জন্যে বড় একটা কেউ প্রশংসা করবে না, কিন্তু ভুল সিদ্ধান্ত নিলে সমালোচনার বন্যা বয়ে যাবে ধারাভাষ্যকারদের বক্স থেকে সোশাল মিডিয়া পর্যন্ত। কারণ দুনিয়া সুদ্ধ লোক কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই স্বচক্ষে, স্বকর্ণে জেনে ফেলবে যে সিদ্ধান্তটা ভুল ছিল। যদি ক্ষতিগ্রস্ত দল রিভিউ করে আর টিভি আম্পায়ার সিদ্ধান্ত বদলে দেন, তাহলে তো কথাই নেই। এমনটা এক ম্যাচে একাধিকবার ঘটে গেলেই বলাবলি, লেখালিখি শুরু হয়ে যাবে – এই আম্পায়ারটা ফালতু। ক্রিকেট লাভজনক ব্যবসা হয়ে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে আম্পায়ারদের পারিশ্রমিক অনেক বেড়েছে। আজকের নীতিন মেননরা যা পারিশ্রমিক পান তা প্রয়াত বার্ড কোনোদিন পাননি। কিন্তু সেকথা তো ক্রিকেটারদের ক্ষেত্রেও সত্যি। বিরাট কোহলি যা রোজগার করেন তা কি সুনীল গাভস্কর তাঁর খেলোয়াড় জীবনে স্বপ্নেও ভাবতে পারতেন? দুঃখের বিষয়, ক্রিকেটারদের পারিশ্রমিক বাড়ার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে সম্মান কমেনি, যা হয়েছে আম্পায়ারদের ক্ষেত্রে। আগে কুখ্যাত আম্পায়াররা ছিলেন ব্যতিক্রম এবং কুখ্যাতির কারণ কখনোই ভুল সিদ্ধান্ত হত না। হত আম্পায়ারের পক্ষে মানানসই নয় এমন কোনো আচরণ। তৃতীয় আম্পায়ার (অধুনা টিভি আম্পায়ার বলাই দস্তুর) এসে যাওয়ার পরে মাঠের আম্পায়াররা পান থেকে চুন খসলেই খলনায়ক হয়ে যান।

ইউটিউবের কিছু চ্যানেল বা সোশাল মিডিয়া এক্সের কিছু হ্যান্ডেলের পুরনো খেলার পোস্ট দেখলে পরিষ্কার বোঝা যায়, আজকাল মাঠের আম্পায়াররা কিন্তু আগের চেয়ে অনেক কম ভুল করেন। তৃতীয় আম্পায়ার চালু হওয়ার আগের যুগে, এমনকি তারপরেও এমন অনেক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে যা দেখলে চক্ষু ছানাবড়া হয়ে যাবে। যে দেশে খেলা হত সেই দেশের আম্পায়াররা যেসব সিদ্ধান্ত নিতেন তা অনেক ক্ষেত্রেই পক্ষপাতদুষ্ট বলে মনে হত, এখন সেসব ভিডিও ফিরে দেখলে আর সন্দেহ থাকে না। শ্রীলঙ্কার আম্পায়াররা ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে একটা সিরিজে তেমন সিদ্ধান্তের বন্যা বইয়ে দিয়েছিলেন। সনৎ জয়সূর্যের লেগ স্টাম্পের অনেক বাইরে পিচ পড়া বলে অ্যালেক স্টুয়ার্টকে এলবিডব্লিউ দেওয়া হয়েছে, তিনি আক্ষরিক অর্থে হাঁ হয়ে গেছেন। নিউজিল্যান্ড বনাম ইংল্যান্ডের একটা ম্যাচে আবার বোলার, উইকেটরক্ষক কেউ কোনো আবেদন না করা সত্ত্বেও আম্পায়ার ব্যাটারকে আউট দিয়ে দিয়েছিলেন। বল যদিও ব্যাটের ধারে কাছে আসেনি। ভারত বনাম শ্রীলঙ্কার একটা একদিনের ম্যাচে তো আম্পায়ার চমৎকার কাণ্ড করেছিলেন। অজয় জাদেজা অফ স্টাম্পের বাইরের বলে ব্যাট চালালেন এবং ফস্কালেন। কেউ কোনো আবেদন করার আগেই আম্পায়ার ডান হাতের তর্জনী আকাশে তুলে দিলেন। তা দেখে শ্রীলঙ্কার ক্রিকেটাররা উল্লাস আরম্ভ করতে যেতেই তিনি আঙুল নামিয়ে নিজের টুপিটা ধরে ফেললেন। অর্থাৎ নট আউট, উনি টুপি ধরার জন্যেই আঙুল তুলেছিলেন। এমন সব কাণ্ড ঘটত বলেই আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ক্রমশ টেস্ট ম্যাচে দুই আম্পায়ারই নিরপেক্ষ দেশের হবেন, একদিনের ম্যাচে মাত্র একজন আয়োজক দেশের হবেন – এইসব নিয়ম চালু করতে হয়েছিল। প্রযুক্তির উন্নতির সুযোগ নিয়ে তৃতীয় আম্পায়ার রাখার সিদ্ধান্ত কিন্তু হয়েছিল মাঠের আম্পায়ারদের সৎ ভুলগুলো শোধরানোর জন্যেই। তাই ১৯৯২-৯৩ মরশুমে ভারত বনাম দক্ষিণ আফ্রিকা সিরিজে যখন প্রথমবার তৃতীয় আম্পায়ার কাজ শুরু করেন, তখন তাঁকে অনেক ছোট গণ্ডির মধ্যে কাজ করতে হত।

এখনকার মত যে কোনো সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রেই তাঁর মত চাওয়া যেত না। খেলোয়াড়রা তৃতীয় আম্পায়ারের কাছে আবেদন জানাতেও পারতেন না। ব্যাপারটা সম্পূর্ণ মাঠের আম্পায়ারদের আয়ত্তে ছিল।

সেই যুগে বা তারও আগে ক্রিকেট খেলায় যখন আদৌ তৃতীয় আম্পায়ার ছিল না, তখন কিন্তু খেলোয়াড়দের কাছে আম্পায়ারদের সম্মান ছিল আকাশছোঁয়া। ১৯৮৭ সালে পাকিস্তানের আম্পায়ার শাকুর রানা যেমন পায়ে পা দিয়ে ঝগড়া করেছিলেন ইংল্যান্ড অধিনায়ক মাইক গ্যাটিংয়ের সঙ্গে, অথবা প্রবল নাক উঁচু (এবং সম্ভবত বর্ণবিদ্বেষী) ড্যারেল হেয়ার যেভাবে বেমক্কা পাকিস্তানকে বল বিকৃতিতে অভিযুক্ত করেছিলেন ২০০৬ সালে, তেমনটা না ঘটলে খেলোয়াড়রা আম্পায়ারদের ডাহা ভুল সিদ্ধান্তও মেনে নিতেন। সাময়িক উত্তেজনার বশে কখনো বাড়াবাড়ি করা হয়ে গেলেও দলের অন্যরা সামলে নিতেন। যেমন গাভস্করের মত ঠান্ডা মাথার লোকও ১৯৮১ সালে মেলবোর্ন টেস্টে এলবিডব্লিউ হওয়ার পর রেগে গিয়ে পার্টনার চেতন চৌহানকে মাঠ থেকে বার করে আনতে চেয়েছিলেন। কিন্তু সীমানা পেরোবার আগেই ভারতীয় দলের ম্যানেজার শাহীদ দুরানি আর বাপু নাদকার্নি গাভস্করকে শান্ত করে চেতনকে ফেরত পাঠান। গাভস্কর অবশ্য পরে বলেছেন তিনি ভুল আউট দেওয়ার জন্যে আম্পায়ার রেক্স হোয়াইটহেডের উপর ততটা রাগ করেননি। চেতনকে নিয়ে একেবারে খেলা থেকেই দল প্রত্যাহার করে নিতে চেয়েছিলেন ডেনিস লিলির কটূক্তি সহ্য করতে না পেরে। আউটের সিদ্ধান্তটা কিন্তু সত্যিই ভুল ছিল। সিডনি মর্নিং হেরাল্ড কাগজে লেখা হয়েছিল, বল পায়ে লাগার আগে ব্যাটের লাগার শব্দ গাছের গুঁড়িতে কুড়ুল মারার মত জোরে শোনা গিয়েছিল। রানা বনাম গ্যাটিং কাণ্ডেও ইংল্যান্ডের ক্রিকেট বোর্ড গ্যাটিংকে ক্ষমা চাইতে বাধ্য করেছিল, পাকিস্তানে ইংল্যান্ডের রাষ্ট্রদূত নিজে মধ‍্যস্থতা করেছিলেন ঝামেলা মেটাতে। এমনকি গোটা দল দেশে ফিরে যেতে চাইলেও ইংল্যান্ডের বোর্ড প্রত্যেক ক্রিকেটারকে ১০০০ পাউন্ড করে ‘হার্ডশিপ অ্যালাউয়েন্স’ দিয়ে সফর শেষ করিয়েছিল। গ্যাটিং পরে বলেছেন, তিনিও বাড়াবাড়ি করে ফেলেছিলেন।

এর সঙ্গে তুলনা করুন আজকের আম্পায়ারদের সঙ্গে ক্রিকেটারদের ব্যবহার। মাঠের আম্পায়ারদের নিজেদেরই আগেকার আত্মবিশ্বাস নেই, তাঁরা প্রযুক্তি হাতে থাকতে ভুল প্রমাণিত হওয়ার ঝুঁকি যে নেন না তা তো আগেই বলেছি। উপরন্তু ক্রিকেটাররাও আর তাঁদের ততখানি শ্রদ্ধার আসনে রাখেননি। বিশেষত মহাতারকারা তো টিভি আম্পায়ারকেও আমল দেন না। স্মরণ করুন ২০২২ সালের জানুয়ারি মাসে ভারত বনাম দক্ষিণ আফ্রিকার কেপ টাউন টেস্টের কথা। তৃতীয় দিন দক্ষিণ আফ্রিকার তৎকালীন অধিনায়ক ডীন এলগারের বিরুদ্ধে এলবিডব্লিউয়ের আবেদন নাকচ করে দেন টিভি আম্পায়ার। কারণ হক আই দেখায় ওটা নট আউট। তার জন্যে রুষ্ট ভারত অধিনায়ক কোহলি, তাঁর পারিষদ কে এল রাহুল এবং রবিচন্দ্রন অশ্বিন স্টাম্প মাইক্রোফোন ব্যবহার করে কেবল আয়োজক দেশের নাগরিক টিভি আম্পায়ার নয়, সম্প্রচারকারী সংস্থা এবং গোটা দেশটার মানুষ সম্পর্কেই কটূক্তি করেন। সবাই মিলে নাকি ভারতীয় দলের বিরুদ্ধে একজোট হয়ে নেমেছিল।

আরও পড়ুন এরপর কি মাঠে কুস্তি লড়বেন বিরাট কোহলিরা?

তৃতীয় আম্পায়ারের সিদ্ধান্তে প্রথম রান আউট হওয়া শচীন তেন্ডুলকর আর এখনকার কোহলির মাঝে যিনি ভারতীয় ক্রিকেটের এক নম্বর তারকা ছিলেন, সেই মহেন্দ্র সিং ধোনি আরও এককাঠি সরেস। ২০১৯ সালের আইপিএলে ধোনির চেন্নাই সুপার কিংসের বিরুদ্ধে রাজস্থান রয়্যালসের একটা ম্যাচে বোলারের প্রান্তের আম্পায়ার বেন স্টোকসের ফুল টসে নো-বল ডাকলেও লেগ আম্পায়ার সেই সিদ্ধান্ত খারিজ করে দেন। ধোনি, যিনি তার আগেই আউট হয়ে গেছিলেন, একেবারে পাড়ার টোক্কা ক্রিকেট প্রতিযোগিতার মত সটান মাঠে ঢুকে পড়েন সেই সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ করতে। আম্পায়ারদের নেহাতই বেচারা দেখিয়েছিল তাঁর সামনে। অবশ্য তাঁরা নিজেদের সিদ্ধান্ত বদল করেননি।

এই দুটো ঘটনাই এই লেখার পাকা চুলের পাঠকদের যৌবনে সর্বোচ্চ স্তরের ক্রিকেটে অকল্পনীয় ছিল। অথচ তখন ভুল সিদ্ধান্তের সংখ্যা নিঃসন্দেহে বেশি ছিল, খেলোয়াড়দের আবেগ কিছুমাত্র কম ছিল না। তৃতীয় আম্পায়ার এসে পড়ার পরেও যে কত হাস্যকর ঘটনা ঘটিয়েছেন মাঠের আম্পায়াররা, তার ইয়ত্তা নেই। তবু তা নিয়ে খেলোয়াড়, বিশেষজ্ঞ, সাংবাদিক, দর্শক কাউকেই অত্যধিক উত্তেজিত হতে দেখা যেত না সচরাচর। ইডেন উদ্যানে ১৯৯৩ সালের হিরো কাপ ফাইনালের কথা নিশ্চয়ই অনেকের মনে আছে। ওয়েস্ট ইন্ডিজের রোল্যান্ড হোল্ডার অনিল কুম্বলের বলে বোল্ড হয়ে যান। অথচ সেটা দুই আম্পায়ারের কেউ খেয়াল করেননি। এমনকি ভারতের উইকেটরক্ষক বিজয় যাদবও খেয়াল করেননি। বলটা থার্ডম্যানে চলে যাওয়ায় দুই ব্যাটার যখন রান নেওয়ার তাল করছেন, তখন ফিল্ডার মনোজ প্রভাকর বল কুড়িয়ে নিয়ে প্রশ্ন করেন – বেল পড়ে গেল কী করে? শেষমেশ টিভি আম্পায়ার শেখর চৌধুরী জানান – আসলে বোল্ড হয়েছেন হোল্ডার। ১৯৯৯ সালের অ্যাডিলেড টেস্টে শচীন তেন্ডুলকরকে অস্ট্রেলিয় আম্পায়ার ড্যারিল হার্পার কাঁধে লাগা বলে এলবিডব্লিউ দিয়েছিলেন। তা নিয়ে বিস্তর বিতর্কও হয়েছিল। কিন্তু শচীন আম্পায়ারকে দুকথা শোনাতে যাননি। তিনি এবং সৌরভ গাঙ্গুলি একসময় নিয়মিত আম্পায়ারের ভুলে আউট হতেন। ১৯৯৯ সালেই পাকিস্তানের বিরুদ্ধে অবিস্মরণীয় চেন্নাই টেস্টের দ্বিতীয় ইনিংসে সৌরভকে দুবার ড্রপ পড়া বলে ক্যাচ আউট দেওয়া হয়। বোলিং প্রান্তের আম্পায়ার স্টিভ ডান আর লেগ আম্পায়ার (যিনি সৌরভ বাঁ হাতি হওয়ায় তখন অফে দাঁড়িয়েছিলেন) ভি কে রামস্বামী তৃতীয় আম্পায়ারের সাহায্য নেওয়ার কথা আদৌ ভাবেননি! একে সেটা ছিল ভারত বনাম পাকিস্তান টেস্ট, তার উপর লেগ আম্পায়ার ছিলেন ভারতীয়, ভারত শচীনের অসামান্য শতরান সত্ত্বেও ম্যাচটা একটুর জন্যে হেরে যায়। তবুও আম্পায়ারদের ভুল নিয়ে ভারতীয় ক্রিকেটাররা খুব বেশি বাক্য ব্যয় করেননি। প্রাক্তনরা সমালোচনা করেছিলেন, কিন্তু তার চেয়ে অনেক বেশি কথা খরচ করা হয়েছিল শচীনের এবং পাকিস্তান দলের প্রশংসায়। চিপক স্টেডিয়ামের দর্শকরা পাকিস্তান দলকে উঠে দাঁড়িয়ে অভিবাদন জানিয়েছিলেন। আম্পায়ারদের একটা ভুল নিয়ে নষ্ট করার মত সময় সাংবাদিকদেরও ছিল না।

শেষ করা যাক ২০০৭-০৮ মরশুমে ভারত বনাম অস্ট্রেলিয়ার সিডনি টেস্ট দিয়ে। একটা ম্যাচে অতগুলো ভুল সিদ্ধান্ত বিরল। মাঠের দুই আম্পায়ার মার্ক বেনসন আর স্টিভ বাকনর তো বটেই, এমনকি তৃতীয় আম্পায়ার ব্রুস অক্সেনফোর্ডও গাদা গাদা ভুল করেন। মাইকেল হাসি আর অ্যান্ড্রু সাইমন্ডস একাধিকবার আউট ছিলেন, দেওয়া হয়নি। সবচেয়ে ন্যক্কারজনক ঘটনা ঘটে শেষদিন। মাইকেল ক্লার্ক সৌরভের ব্যাট থেকে বেরনো বল মাটিতে পড়ে যাওয়ার পরে ধরে ক্যাচের আবেদন করেন। আম্পায়াররা তৃতীয় আম্পায়ারের সাহায্য না নিয়ে অস্ট্রেলিয় অধিনায়ক রিকি পন্টিংয়ের কথায় সৌরভকে আউট দিয়ে দেন। ধারাভাষ্যের দায়িত্বে থাকা প্রাক্তন ক্রিকেটাররা সঙ্গত কারণেই কঠোর সমালোচনা করেন আম্পায়ারদের এবং অস্ট্রেলিয় ক্রিকেটারদের। ভারত অধিনায়ক অনিল কুম্বলে সাংবাদিক সম্মেলনে এসে বলেন, এই ম্যাচে কেবল একটা দলই ক্রিকেটের সহবত অনুযায়ী খেলছিল। কিন্তু মাঠের মধ্যে একজন ভারতীয় ক্রিকেটারও আম্পায়ারদের সঙ্গে অসদাচরণ করেননি।

আসলে ক্রিকেটাররা তো আকাশ থেকে পড়েন না, সমাজ থেকেই উঠে আসেন। তখনকার ভারতীয় সমাজে জয়ের দাম ছিল, কিন্তু যে কোনো মূল্যে জিততে হবে – এই মনোভাব সর্বব্যাপী ছিল না। এখন চণ্ডীগড়ের মেয়র নির্বাচনেও বৈধ পথে জেতার উপায় না থাকলে বিরোধীদের ব্যালট নষ্ট করিয়ে দেওয়া হয় স্বয়ং নির্বাচনী অফিসারকে দিয়ে। এ যুগে তৃতীয় নয়নের উপরেও আস্থা না থাকাই স্বাভাবিক।

সংবাদ প্রতিদিনের রোববার পত্রিকায় প্রকাশিত

কেন আমি আইপিএল নাস্তিক?

প্রতিবছর ঘটা করে নিলাম হয়, বাবুরা দাসী বাঁদি কেনার মত পছন্দের ক্রিকেটার কেনেন। খেলার সময়েও কেবল খেলা হয় না। গ্যালারিতে এবং আফটার পার্টিতে বলিউড সুন্দরীরা আসেন, মাঠের ধারে চিয়ারলিডার নাম দিয়ে স্বল্পবাস মেম নাচানো হয়।

সদ্য দ্বিতীয়বার বাবা হওয়া বিরাট কোহলি মাঠে নামার জন্যে মুখিয়ে আছেন। মহেন্দ্র সিং ধোনির নাকি ব্র্যাড পিট অভিনীত বেঞ্জামিন বাটনের মত বয়স বাড়ার বদলে কমছে। হার্দিক পান্ডিয়ার কাছে মুম্বই ইন্ডিয়ান্সের অধিনায়কত্ব হারানোয় রোহিত শর্মা কি রেগে আছেন, নাকি হালকা বোধ করছেন?

খবরের কাগজের খেলার পাতা থেকে সোশ্যাল মিডিয়া– সর্বত্র ক্রিকেটপ্রেমীরা এখন এসব নিয়েই আলোচনা করছেন। কারণ শীত চলে যেতেই এসে পড়েছে ভারতীয় ক্রিকেটের বৃহত্তম রিয়েলিটি শো। পেশাগত বাধ্যবাধকতা সরে যাওয়ার পর থেকে আইপিএল দেখি টিভির চ্যানেল ঘোরাতে ঘোরাতে কখনও চোখে পড়ে গেলে দু-এক ওভার। উপরন্তু কাগজে, টিভিতে বা হাতের মোবাইলে শিরোনাম পেরিয়ে আইপিএলের খবরেও ঢুকি না। প্রশ্ন হচ্ছে, ক্রিকেটপ্রেমিক হয়েও আইপিএল দেখতে যাই না কেন? যুক্তিগুলো সাজানো যাক।

ক্রিকেটের কাঠিন্য নেইআছে আমোদ 

২০০৮ সালের প্রথম আইপিএলের সময়ে যে কাগজের ক্রীড়া সাংবাদিক ছিলাম, সেই কাগজের মালিক আইপিএলের একটি ফ্র্যাঞ্চাইজিরও মালিক ছিলেন। প্রথম খেলার দিনই মাঠে গিয়ে দেখি– অবাক কাণ্ড! বাউন্ডারির দড়ির বাইরে যতটা জায়গা পড়ে, তা একত্র করলে আরেকটা ছোটখাটো মাঠ হয়ে যায়। খেলা শুরু হতেই দেখা গেল, রোহিত শর্মা স্পিনারের বল চামচের মত করে পিছন দিকে তুলে দিলেও মাত্র একবার ড্রপ খেয়ে মাঠের বাইরে চলে যাচ্ছে। আমাদের উপর কিন্তু কাগজের কর্তাদের কড়া নির্দেশ ছিল, বাউন্ডারি যে ছোট করে দেওয়া হয়েছে সেকথা কোনও কারণেই লেখা যাবে না।

গত দেড় দশকে অবশ্য এসব লুকোচুরি আর নেই। এখন সবাই জানে, ৫০ ওভারের খেলাতেও বাউন্ডারি ছোট করে ফেলা হয় চার-ছয়ের সংখ্যা বাড়াতে। স্বীকার্য যে, আজকাল এমন বড় বড় ছয় মারা হয় যে বল গিয়ে পড়ে গ্যালারিতে। তার কারণ ব্যাটগুলোর গঠন এবং ওজন, বাউন্ডারির দৈর্ঘ্য নয়। কিন্তু একইসঙ্গে লক্ষ করে দেখবেন, সীমানার ধারে রোমাঞ্চকর ক্যাচের সংখ্যা কত বেড়ে গিয়েছে। পৃথিবীর যে কোনও দেশে কুড়ি ওভারের লিগ চললেই প্রায় প্রতিদিন কোনও না কোনও ভিডিও ভাইরাল হয়, যেখানে একজন ফিল্ডার অপূর্ব কায়দায় শূন্যে শরীর ছুড়ে দিয়ে বা অন্য একজন ফিল্ডারের সাহায্যে সীমানার বাইরে থেকে ফিরে ক্যাচ নিচ্ছেন। এমনটা সম্ভব হয় সীমানার বাইরে অনেকখানি জায়গা থাকে বলেই।

ইউটিউবে প্রাক-আইপিএল যুগের সাদা বলের ক্রিকেটই দেখুন– সীমানার পরে মাঠ শেষ। সেখানে এসব করতে গেলে ভারতীয় স্টেডিয়ামগুলোর গ্রিলে ধাক্কা খেতে হত। আরও লক্ষ করুন, বাউন্ডারি ছোট করে দেওয়ায় রানিং বিটুইন দ্য উইকেটসে কত কম শক্তি খরচ হচ্ছে ব্যাটারের। তিন রান প্রায় হয়ই না, কারণ ফিল্ডারের বল তাড়া করে চার আটকে বল ফেরত পাঠানোর অবকাশ কম। তার আগেই বল সীমানা পেরিয়ে যাবে।

সাধারণভাবে পরিশ্রমের দিক থেকে দেখলেও যে আইপিএল বা টি২০ ক্রিকেট একজন ক্রিকেটারের পক্ষে তুলনায় আরামদায়ক তা নিশ্চয়ই আলাদা করে বলে দেওয়ার দরকার নেই। বোলারকে চার ওভারের বেশি বল করতে হয় না, একজন ব্যাটার প্রথম থেকে শেষপর্যন্ত খেলে শতরান করলেও বড়জোর ৬০-৭০ বল খেলবেন। টেস্ট ক্রিকেটের কথা বাদ দিন, ৪২ বছর বয়সে পঞ্চাশ ওভারের খেলা খেলতে হলেও টের পাওয়া যেত ধোনির বয়স কমছে না বাড়ছে। জেমস অ্যান্ডারসন একজনই হয়, তিনিও বেছে বেছে ম্যাচ খেলেন।

বড়লোকের বেড়ালের বিয়ে

সদ্য প্রকাশিত এক সমীক্ষায় পাওয়া গিয়েছে, ভারতের উপরতলার ১% লোকের হাতে দেশের ২২.৬% আয় আর ৪০% সম্পদ রয়েছে। তা এমন এক দেশে বাবুরা বেড়ালের বিয়ে দেবেন না মোচ্ছব করে? প্রতিবছর ঘটা করে নিলাম হয়, বাবুরা দাসী বাঁদি কেনার মত পছন্দের ক্রিকেটার কেনেন। খেলার সময়েও কেবল খেলা হয় না। গ্যালারিতে এবং আফটার পার্টিতে বলিউড সুন্দরীরা আসেন, মাঠের ধারে চিয়ারলিডার নাম দিয়ে স্বল্পবাস মেম নাচানো হয়। কোন কোন বছর কোন ক্রিকেটার কোন চিয়ারলিডারের সঙ্গে কী ধরনের যৌনতায় লিপ্ত হয়েছিলেন তা নিয়ে রসালো কাহিনীও প্রকাশিত হয় সংবাদমাধ্যমে।

একবার যেমন প্রাক্তন দক্ষিণ আফ্রিকা অধিনায়ক গ্রেম স্মিথের কীর্তিকলাপ মুখরোচক হয়েছিল, আরেকবার ক্রিস গেল আর শেরলিন চোপড়ার নাচানাচি কলকাতার কাগজের প্রথম পাতায় জায়গা করে নিয়েছিল। আজ থেকে ঠিক এক যুগ আগে পুনে ওয়ারিয়র্স দলের ক্রিকেটাররা রেভ পার্টিতে গিয়ে মাদকদ্রব্য নিয়ে ক্যাচ কট কটও হয়েছিলেন। নেহাত তাঁরা শাহরুখ খানের ছেলে নন, তাই বেশি হয়রানি হয়নি।

কবি বলেছেন, শীত এসে পড়লে বসন্ত খুব পিছিয়ে থাকতে পারে না। তেমনই ফুর্তির উপাদান হিসাবে মদ, মেয়েমানুষ এসে পড়লে জুয়াও পিছিয়ে থাকে না। তবে ভারতের সরকার, সাংবাদিক, ভাষ্যকার, সর্বোপরি ক্রিকেটপ্রেমী জনতা অত্যন্ত ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে চলেন। তাই ম্যাচ ফিক্সিংয়ের ঘটনা ধরা পড়ে গেলে শান্তাকুমারণ শ্রীসান্ত, অজিত চান্ডিলার মত কয়েকজনকে শাস্তি দিয়ে মিটিয়ে ফেলা হয়। চেন্নাই সুপার কিংস দল সাসপেন্ড হয়ে যায় তাদের মালিকদের অন্যতম গুরুনাথ মেইয়াপ্পন অবৈধ বাজি ধরায় যুক্ত ছিলেন বলে, অথচ তৎকালীন অধিনায়ক ধোনি নাকি কিছুই জানতেন না। এক ফ্রেমে একাধিক ছবি থাকলেও তিনি নাকি এন শ্রীনিবাসনের জামাইকে আদৌ চিনতেন না। অথচ ধোনি নিজে শ্রীনিবাসনের স্নেহভাজন, তাঁর কোম্পানির ভাইস প্রেসিডেন্টও নিযুক্ত হয়েছিলেন।

আইপিএলের উদ্গাতা ললিত মোদি বিস্তর আর্থিক কেলেঙ্কারি করেছেন বলে অভিযোগ ওঠে ২০১০ সালে। নিজের লোকদের কম পয়সায় ফ্র্যাঞ্চাইজির মালিকানা পাইয়ে দেওয়া, আইপিএলের মিডিয়া স্বত্ব বিক্রির টাকা থেকে কাটমানি নেওয়া, বিদেশে গোপন অ্যাকাউন্টে টাকা সরানো– কী ছিল না তার মধ্যে? প্যান্ডোরার বাক্স খুলেছিলেন ললিত নিজেই। যখন তিনি অভিযোগ করেন যে, তৎকালীন মন্ত্রী শশী থারুর নিজের প্রভাব খাটিয়ে সুনন্দা পুষ্করকে কোচি টাস্কার্স ফ্র্যাঞ্চাইজি কিনিয়ে দিয়েছেন। তা থেকে আরও নানা অভিযোগ উঠেছিল– আইপিএলের সব ফ্র্যাঞ্চাইজিতেই নাকি বেনামে অনেকের টাকা খাটে। অন্য কোনও দেশে হয়তো এত কাণ্ডের পর এই লিগ চিরতরে বন্ধ হয়ে যেত। কিন্তু যারা দেশ চালায়, তাদের মোচ্ছব থামায় কার সাধ্যি? ‘দ্য শো মাস্ট গো অন’।

ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগসত্যি?

কবি বলেছেন নামে কী আসে যায়? আইপিএলের বেলায় সেকথা মনে রাখা খুব জরুরি। এ এমনই ভারতীয় লিগ যে, ২০০৯ সালে সাধারণ নির্বাচনের সময়ে ম্যাচের আয়োজন করা যাবে না বলে দক্ষিণ আফ্রিকায় খেলা হয়েছিল। পরেও সংযুক্ত আরব আমিরশাহিতে খেলা হয়েছে। অতএব দরকার পড়লে উত্তর মেরুতে বা চাঁদেও খেলা যেতে পারে। কিন্তু খেলা হওয়া চাই, কারণ সম্প্রচার স্বত্ব বেচে পকেট ভারী হচ্ছে ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের। সেটাই লক্ষ্য, ক্রিকেট উপলক্ষ্য।

বোর্ড ধনী হলে তা কি ভারতীয় ক্রিকেটের লাভ নয়? এর উত্তর দেওয়া বেজায় শক্ত। ভারতীয় ক্রিকেটারদের, এমনকি ঘরোয়া ক্রিকেটারদেরও যে আইপিএল যুগে পারিশ্রমিক অনেক বেড়েছে তা অনস্বীকার্য। কিন্তু মুশকিল হল, কর্তা এবং ক্রিকেটারদের লক্ষ্য, মোক্ষ সবই হয়ে গিয়েছে আইপিএল। অতিমারির সময়ে আইপিএলটা যেন হতে পারে তার সযত্ন ব্যবস্থা করেছিল সৌরভ গাঙ্গুলির নেতৃত্বাধীন বোর্ড। অথচ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়েও চালু ছিল যে রনজি ট্রফি, তা চালু রাখার উদ্যোগ নেয়নি। ঘরোয়া ক্রিকেটারদের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার ব্যবস্থাও হয় অনেক পরে।

আরো পড়ুন ভারতীয় ক্রিকেট মানে ফলাফল নিরপেক্ষ ব্যবসা

দেওধর ট্রফি, চ্যালেঞ্জার ট্রফির মত গুরুত্বপূর্ণ ঘরোয়া প্রতিযোগিতা প্রায় তুলে দেওয়া হয়েছে। শুধু টি২০ নয়, পঞ্চাশ ওভারের জাতীয় দল বা টেস্ট দল বাছার সময়েও যে আইপিএলের পারফরমেন্সকেই গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে তা এখন সুনীল গাভাসকারের মত শান্তশিষ্ট লোকও বলতে শুরু করেছেন। কেএল রাহুলের মত প্রতিষ্ঠিত তারকা তো বটেই, ঈশান কিষান বা শ্রেয়স আয়ারের মত তরুণ তুর্কিরাও এখন আইপিএল ছাড়া অন্য কিছুকে পাত্তা দিচ্ছেন না। কেউ মানসিক সমস্যার দোহাই দিয়ে আইপিএলের আগের টেস্ট সিরিজ থেকেও পালাচ্ছেন, কেউ চোট আছে বলে রনজি না খেলে বসে থাকছেন।

তাহলে আইপিএল থেকে ভারতীয় ক্রিকেট টাকা ছাড়া পেল কী? মনে রাখা ভাল, পৃথিবীর সেরা টি ২০ লিগের আয়োজক হওয়া নিয়ে গুমর থাকলেও ভারত সেই ২০০৭ সালের পরে আর ওয়ার্ল্ড টি২০ও জেতেনি। এই লিগ কেন দেখব? হাতে নষ্ট করার মত সময় থাকলে না হয় কোনও ওয়েব সিরিজ দেখা যাবে।

উত্তরবঙ্গ সংবাদে প্রকাশিত

ধৈর্যের টেস্টে আমরা সবাই ফেল

মহাতারকারা সব গুণের অতীত। তাই নিজেদের ত্রুটি স্বীকার না করে সব ব্যাটাকে ছেড়ে বেঁড়ে ব্যাটাকে, অর্থাৎ পিচকে, ধরা হয়।

কেপটাউনে বুধবার দক্ষিণ আফ্রিকা ৫৫ রানে অল আউট হল সকালে, বিকেলে ভারতের আধ ডজন উইকেট পড়ে গেল কোনো রান না করেই। বৃহস্পতি বাদ দিয়ে শুক্রবারেই সিডনিতে এক ডজন উইকেট পড়ে গেল ৭৮ রানে। প্রথমে অস্ট্রেলিয়ার পাঁচটা উইকেট পড়ল দশ রানে, তারপর পাকিস্তানের সাতজন আউট ৬৮ রানে। কেপটাউন টেস্ট বৃহস্পতিবারেই চুকে গেল, টেস্ট ক্রিকেটের প্রায় দেড়শো বছরের ইতিহাসে সংক্ষিপ্ততম ম্যাচ হল। সিডনি টেস্টও পাঁচদিন গড়াল না, শনিবারেই শেষ হয়ে গেল। গত কয়েক বছরে বহু ম্যাচ পাঁচদিন গড়ায়নি। মোটেই তার সবকটা অতি দ্রুত বা একেবারে ধুলো ওড়া পিচে খেলা হয়নি। ইংল্যান্ডের ক্রিকেট বোর্ড টেস্ট ক্রিকেটকে পাঁচদিনের বদলে চারদিনের খেলা করে দিতে পারলে খুশি হয়। গতবছর জুন মাসে আয়ারল্যান্ডের বিরুদ্ধে একটা চারদিনের টেস্ট খেলেও ফেলেছে।

মোদ্দাকথা, পাঁচদিনের ক্রিকেট আর পোষাচ্ছে না। কর্তাদের পোষাচ্ছে না কারণ এখনকার ক্রিকেটকর্তারা খেলা বেচে টাকা করতে চান না। টাকা করার জন্যে খেলাতে চান। আর টাকা আসে টি টোয়েন্টি ক্রিকেট থেকে, ফ্র্যাঞ্চাইজ লিগ থেকে। তাই ক্রিকেটারদের ক্লান্তি, চোট আঘাত ইত্যাদির তোয়াক্কা না করে দেদার টি টোয়েন্টি লিগ চালু করা হচ্ছে। চুলোয় যাক একদিনের ক্রিকেট, টেস্ট ক্রিকেট। ক্রিকেটাররাই বা ঘন্টা পাঁচেক খেলে কোটিপতি হওয়া গেলে পাঁচদিনের রগড়ানি সহ্য করতে যাবেন কেন? অনেকেই তাই নানা কারণে একদিনের ক্রিকেট, পাঁচদিনের ক্রিকেটকে বিদায় জানাচ্ছেন। বাকিদেরও টেস্ট খেলার প্রয়োজনীয় গুণগুলো হারিয়ে যাচ্ছে। বোলাররা পিচের একটা জায়গায় ওভারের পর ওভার বল ফেলতে গলদঘর্ম, কয়েক ওভার উইকেট না পড়লেই অধিনায়করাও অধৈর্য হয়ে বোলিং পরিবর্তন করে ফেলেন। আরও শোচনীয় অবস্থা ব্যাটারদের। সারাক্ষণ মাথায় স্ট্রাইক রেটের পোকা নড়ে। বোলার যখন দারুণ বোলিং করছে তখন কয়েকটা ওভার মেডেন দেওয়ার ধৈর্য নেই, বল ছাড়তে ভুলে যাচ্ছেন। কারণ চার, ছয় মারতে না পারলে মনে হয় ব্যাটিং বৃথা। কয়েকটা বলে রান না করার পর একটা ড্রাইভ করার মত বল দেখলেই চোখ চকচক করে ওঠে। সুইং, বাউন্স, স্পিন ইত্যাদির বিচার না করে ব্যাট চলে যায় বলের পানে। ফলে ১৫৩/৪ থেকে ১৫৩ রানেই অল আউট হয়ে যেতে পারে একটা দল।

আরও পড়ুন ক্রিকেট জেনেশুনে বিশ করেছে পান

কিন্তু মহাতারকারা সব গুণের অতীত। তাই নিজেদের ত্রুটি স্বীকার না করে সব ব্যাটাকে ছেড়ে বেঁড়ে ব্যাটাকে, অর্থাৎ পিচকে, ধরা হয়। ভারত অধিনায়ক জাঁক করে বলতে পারেন, এরকম পিচ হলে কিন্তু আমাদের দেশের পিচ নিয়েও অভিযোগ করা চলবে না।

অবশ্য এ জন্যে কেবল ক্রিকেটারদের সমালোচনা করা অনুচিত। ঠান্ডা মাথায় গলদ বিচার করে শুধরে নেওয়ার ব্যবস্থা করার ধৈর্য কারই বা আছে আজকাল? বিচারক কথায় কথায় চাকরি থেকে বরখাস্তের আদেশ দেন, শিক্ষক পাঠ্য বই পড়ানোর রাস্তায় না গিয়ে সহায়িকার সন্ধান দিয়ে দেন, সাংবাদিক সত্যাসত্য বিচার না করে হোয়াটস্যাপে ফরোয়ার্ড হওয়া বার্তাকেই খবর বলে চালিয়ে দেন, লেখকের কবিতা বা গল্প কি উপন্যাস লিখে কাটাছেঁড়া করে তাকে আরও ভাল করার ধৈর্য নেই। সঙ্গে সঙ্গে ফেসবুকে পোস্ট করে লাইক পাওয়া চাই, তারপর আগামী বইমেলাতেই বই আকারে প্রকাশ করা চাই। জীবনানন্দ দাশ যেমন লিখেছেন আর কি “সকলকে ফাঁকি দিয়ে স্বর্গে পৌঁছুবে/সকলের আগে সকলেই তাই।”

উত্তরবঙ্গ সংবাদে প্রকাশিত

এরপর কি মাঠে কুস্তি লড়বেন বিরাট কোহলিরা?

কেপটাউন টেস্টের তৃতীয় দিনে বিরাট কোহলি। ছবি টুইটার থেকে

যন্ত্রের যন্ত্রণা কথাটা নতুন নয়। কিন্তু যন্ত্র মানুষের সঙ্গে মিলে ষড়যন্ত্র করে — এ অভিযোগ নিঃসন্দেহে নতুন। সাই ফাইয়ের ভক্তরা অবশ্য বলবেন ভবিষ্যতে যন্ত্রেরা মন্ত্রণা করে মানুষের ভিটেমাটি চাটি করবে। আশঙ্কাটা হেসে উড়িয়ে দেওয়ার মত নয়, কিন্তু তখনো মানুষ আর যন্ত্র একে অপরের বিরুদ্ধে লড়বে বলেই তো মনে করা হয়। যন্ত্র আমার সাথে ষড় করে আপনাকে বিপদে ফেলবে — এমনটা এখনো কোনো হলিউডি চিত্রনাট্যকারের মাথায় আসেনি। তবে ভারতীয় ক্রিকেটাররা যে সে লোক নন। তাঁরা আমার আপনার চেয়ে কিঞ্চিৎ উচ্চস্তরের জীব বইকি। তাই গতকাল কেপটাউনের তৃতীয় টেস্টে ডিসিশন রিভিউ সিস্টেম দক্ষিণ আফ্রিকার অধিনায়ক ডীন এলগারকে এল বি ডব্লিউ হওয়ার হাত থেকে বাঁচিয়ে দিল দেখে সরোষে ভারত অধিনায়ক বিরাট কোহলি, তাঁর সহকারী কে এল রাহুল, আর বর্ষীয়ান ক্রিকেটার রবিচন্দ্রন অশ্বিন প্রযুক্তির, সম্প্রচারকারীর এবং দক্ষিণ আফ্রিকা দেশটার শাপ শাপান্ত করেছেন।

সুকুমার রায় লিখেছিলেন “ছায়ার সাথে কুস্তি করে গাত্রে হল ব্যথা।” এ যে “আজগুবি নয়, আজগুবি নয়, সত্যিকারের কথা —” বিরাটদের কাণ্ড না দেখলে বিশ্বাস করা শক্ত হত। উইকেটের সামনে গিয়ে স্টাম্প মাইক্রোফোনের উপর ঝুঁকে পড়ে মাঠে অনুপস্থিত লোকেদের গাল দেওয়া যত না ক্রিকেটারসুলভ তার চেয়ে বেশি জনি লিভারসুলভ। হাস্যকর দিকটা বাদ দিলে, এই আচরণ হল অসভ্যতা। এক দশক আগেও একে অসভ্যতাই বলা হত, ইদানীং সভ্যতার সংজ্ঞা বিস্তর বদলেছে। তাই ভারতের ক্রিকেটার, প্রাক্তন ক্রিকেটার, ধারাভাষ্যকার, সাংবাদিক প্রমুখ কাল থেকে নানারকম নরম ব্যাখ্যা দিচ্ছেন:

ক) “আসলে ওরা প্রাণ দিয়ে খেলে তো, এত বাজে সিদ্ধান্ত হলে কি আর মাথার ঠিক রাখা যায়?”

খ) “ক্রিকেটাররাও তো মানুষ। উত্তেজনার মুহূর্তে আবেগ এসে পড়া স্বাভাবিক।”

গ) “ঝোঁকের মাথায় করে ফেলেছে।”

আরও নানারকম ব্যাখ্যা সোশাল মিডিয়ায় দেখা গেছে, তালিকা দীর্ঘতর করা নিষ্প্রয়োজন। ধারাভাষ্যের জগতে ভারতের প্রবীণতম প্রতিনিধি সুনীল গাভস্কর। তিনি ভাল করেই জানেন, টেস্টে ১০,১২২ রান যতই ক্রিকেটের ইতিহাসে তাঁর আসন পাকা করে থাকুক, সেটা ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের কমেন্ট্রি চুক্তির গ্যারান্টি নয়। তাই গতকাল খেলার পর মার্ক নিকোলাস আর শন পোলকের সাথে বিতর্কিত মুহূর্তগুলো নিয়ে আলোচনা করার সময়ে তিনি কেবল এলগার আউট ছিলেন কিনা, তা নিয়েই কথা বলে গেলেন। ভারতীয় ক্রিকেটারদের অন্যায় আচরণ সম্বন্ধে ভাল বা মন্দ একটি শব্দও উচ্চারণ করলেন না। হাতে গোনা কয়েকজন সত্যি কথাটা বলার সাহস করেছেন, যেমন বাংলার ক্রিকেটার এবং একদা অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপ দলে বিরাটের সতীর্থ শ্রীবৎস গোস্বামী। তাঁকে যে পরিমাণ ট্রোলিংয়ের স্বীকার হতে হয়েছে, তা প্রমাণ করে ‘নতুন’ ভারতে অভদ্রতা পূজনীয়, ভদ্রতা বর্জনীয়।

কোনো সুস্থ দেশে গতকালের ঘটনার আলোচনায় এলগার আউট ছিলেন কি ছিলেন না তা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে না। কারণ সে দেশের অধিকাংশ মানুষ মানবেন, ক্রিকেটে আউট থাকা সত্ত্বেও আউট না হওয়া, আর আউট না হওয়া সত্ত্বেও আউট হয়ে যাওয়া চলতেই থাকে। সে জন্যে মন খারাপ হতে পারে, মাথা গরম হতে পারে। কিন্তু গোটা দেশটা আমাদের দলের বিরুদ্ধে লড়ছে, মেজাজ হারিয়ে এরকম মন্তব্য করার অধিকার কোনো আন্তর্জাতিক ক্রিকেটারের নেই। কিন্তু আজকের ভারতকে নিঃসংশয়ে সুস্থ দেশ বলা চলে না। দেশপ্রেমিকরাই বলে থাকেন, এখানকার যুবসমাজ নাকি এতটাই অসুস্থ, যে পিতৃমাতৃহীন হওয়ার শোকে তারা মুসলমান মহিলাদের কাল্পনিক নিলাম করার অনলাইন অ্যাপ তৈরি করে। আলোচনা যখন এমন একটা দেশে দাঁড়িয়ে হচ্ছে, তখন বিরাটদের আচরণ যে অন্যায় তা প্রমাণ করার জন্যে এলগার আউট ছিলেন কিনা সে আলোচনায় না গিয়ে উপায় নেই।

ক্রিকেট খেলায় যতরকম আউটের সিদ্ধান্ত হয়, তার মধ্যে চিরকালই সবচেয়ে বিতর্কিত লেগ বিফোর উইকেট বা এল বি ডব্লিউ। কারণ অন্য সব আউটের ক্ষেত্রেই যা ঘটেছে তার ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত হয়। কিন্তু এল বি ডব্লিউয়ের ক্ষেত্রে আম্পায়ার সিদ্ধান্ত নেন কী হতে পারত। বল যখন ব্যাটারের পায়ে লাগল তখন যদি পা-টা সেখানে না থাকত, তাহলে কি বলটা উইকেটে গিয়ে লাগতে পারত? যদি আম্পায়ারের সিদ্ধান্ত হ্যাঁ হয়, তাহলে তিনি তর্জনী তুলে ব্যাটারের মৃত্যুঘন্টা বাজিয়ে দেন। নাহলে ব্যাটার বেঁচে যান। যখন লাইভ টিভি ছিল না তখনকার কত আউট যে আসলে আউট ছিল না, আর কত নট আউট আসলে আউট ছিল, আমরা কখনো জানতে পারব না। ডিসিশন রিভিউ সিস্টেমের বয়স মাত্র ১৪ বছর (চালু হওয়ার সময়ে নাম ছিল আম্পায়ার ডিসিশন রিভিউ সিস্টেম)। ফলে লাইভ টিভি চালু হওয়ার পরেও দীর্ঘকাল এল বি ডব্লিউ বোলিং প্রান্তের আম্পায়ারের বিবেচনার উপরেই সম্পূর্ণ নির্ভরশীল ছিল। ইদানীং ইউটিউব আর টুইটারের কল্যাণে সেই সময়কার বহু আউট নিয়েই হাসাহাসি চলে, কারণ দেখা যায় বহু ব্যাটার কোনো যুক্তিতেই আউট ছিলেন না, আম্পায়ার আউট দিয়েছেন। অনেকে আবার বল ব্যাটে খেলেও এল বি ডব্লিউ আউট হয়েছেন। প্রযুক্তির প্রভূত উন্নতিতে বিপুল পরিমাণ টিভি দর্শকের চোখে আম্পায়ারের ভুল (ইচ্ছাকৃত বা অনিচ্ছাকৃত) নগ্নভাবে ধরা পড়ার কারণেই ইন্টারন্যাশনাল ক্রিকেট কাউন্সিল (আই সি সি) প্রথমে রান আউট ইত্যাদির জন্য তৃতীয় আম্পায়ার, পরে ডি আর এস চালু করতে বাধ্য হয়েছিল। ডি আর এসের আগেই এসেছে নিরপেক্ষ আম্পায়ার নিয়োগের নিয়ম। নব্বইয়ের দশকেও অনেকদিন যে দেশে খেলা হত, সে দেশেরই দুই আম্পায়ার খেলা পরিচালনা করতেন। কিন্তু বিশেষত এল বি ডব্লিউ আউটের ক্ষেত্রেই সন্দেহ জোরদার হয়ে উঠেছিল, যে আম্পায়াররা নিজের দেশের ব্যাটারদের ইচ্ছা করে আউট দেন না, আর প্রতিপক্ষের ব্যাটারদের আউট না হলেও আউট করে দেন। সেই কারণেই প্রথমে চালু হয় টেস্ট ক্রিকেটে দুজন, একদিনের ক্রিকেটে একজন নিরপেক্ষ দেশের আম্পায়ার নিয়োগ। পরে আসে ডি আর এস। অর্থাৎ এল বি ডব্লিউয়ের সিদ্ধান্তকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হতে না দেওয়া ডি আর এস প্রবর্তনের অন্যতম উদ্দেশ্য।

তাই ডি আর এস যতগুলো প্রযুক্তি ব্যবহার করে, তার অন্যতম হল হকআই। এল বি ডব্লিউয়ের আবেদন হলে এখন আম্পায়ার প্রথমে দ্যাখেন নো-বল ছিল কিনা, কারণ নো-বলে রান আউট ছাড়া অন্য আউট হয় না। তারপর দ্যাখেন বলটা লেগ স্টাম্পের বাইরে পিচ পড়েছিল কিনা। তেমনটা হয়ে থাকলে আইন অনুযায়ী তখনই আবেদন বাতিল হয়ে যায়। সেখানেও সব ঠিকঠাক থাকলে স্নিকোমিটার বা হটস্পট দিয়ে দ্যাখেন বল পায়ে লাগার আগে ব্যাটে লেগেছিল কিনা। কারণ আগে ব্যাটে লাগলে আর লেগ বিফোর উইকেটের প্রশ্ন ওঠে না। সব শেষে আসে বল ট্র্যাকিং, অর্থাৎ পা ওখানে না থাকলে বলটা উইকেটে গিয়ে লাগত কিনা। বল ট্র্যাকিং প্রযুক্তি বলের সিম, স্পিনের সঙ্গে সঙ্গে পিচের বাউন্সও বিচার করে। ভারত বা শ্রীলঙ্কার পিচে বল যে মাটিতে পড়ার পর কম লাফায়, অস্ট্রেলিয়া বা দক্ষিণ আফ্রিকায় বেশি — বল ট্র্যাকিংকে তা শেখানো আছে। ডীন এলগারের বেলায় যে দেখানো হয়েছে বল উইকেটের উপর দিয়ে চলে যেত, তা এই কারণেই ঘটেছে। এমন নয় যে বল ট্র্যাকিং অভ্রান্ত। এই সিরিজেরই প্রথম টেস্টে মায়াঙ্ক আগরওয়ালের বিরুদ্ধে আবেদন রিভিউ করতে গিয়ে দেখিয়েছিল বল উইকেটে লাগছে, অথচ প্রায় সকলেরই মনে হয়েছিল পেস বোলারের ওই বল বেশি বাউন্সের কারণে উইকেটে লাগত না। প্রযুক্তিটা সঠিক কিনা, আরও ভাল হতে পারে কিনা — তা নিয়ে তর্ক চলতে পারে। কিন্তু হক আই একটি নিরপেক্ষ সংস্থা। ভারতে যখন কোনো সিরিজ হয় তখনো এই প্রযুক্তি তারাই সরবরাহ করে, সম্প্রচারকারী সংস্থার কোনো হাত থাকে না। অতএব দক্ষিণ আফ্রিকার টিভি সম্প্রচারকারী সুপারস্পোর্টের বিরুদ্ধে বিরাট আর অশ্বিনের বিষোদ্গার একেবারেই অকারণ।

কে এল রাহুলের অভিযোগ আরও অন্যায়। স্টাম্প মাইকে শোনা গেছে তিনি বলছেন গোটা দক্ষিণ আফ্রিকা ভারতীয় দলের এগারোজনের বিরুদ্ধে লড়ছে। অথচ বোলিং প্রান্তের যে আম্পায়ার এলগারকে আউট দিয়েছিলেন, সেই মারায় ইরাসমাস দক্ষিণ আফ্রিকারই মানুষ। ১৯৯৪ সালে তৈরি হওয়া নিরপেক্ষ আম্পায়ারের নিয়ম কোভিড-১৯ অতিমারি চালু হওয়ার পর থেকে স্থগিত রয়েছে। আপাতত সমস্ত সিরিজেই যে দেশে খেলা হচ্ছে সে দেশের আম্পায়াররাই দায়িত্ব পালন করছেন। স্টাম্প মাইকে শোনা গেছে, টিভি আম্পায়ার এলগারকে আউট ছিলেন না বলার পর ইরাসমাস বলছেন “এ হতে পারে না।” আর আজ বাদে কাল যিনি ভারতের স্থায়ী অধিনায়ক হবেন, তিনি কিনা বলছেন গোটা দক্ষিণ আফ্রিকা ভারতীয় দলের বিরুদ্ধে মাঠে নেমে পড়েছে।

আসল সমস্যা বিরাট, রাহুল বা অশ্বিনের ঔদ্ধত্য নয়। সমস্যা ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের অর্থবলে (গোদা বাংলায় টাকার গরমে) আইসিসিকে ঠুঁটো জগন্নাথ করে রাখা। বিরাটরা জেনে গেছেন তাঁরা পৃথিবীর সবচেয়ে ধনী ক্রিকেট বোর্ডের কর্মচারী, তাই সব নিয়মকানুনের ঊর্ধ্বে। মাঠে গালিগালাজ করলে একসময় জরিমানা-টরিমানা হত, এখন ওগুলোকে আবেগের বহিঃপ্রকাশ বলে ধরা হয়। কারণ ভারতীয় ক্রিকেটারদের জরিমানা দিতে বলার ক্ষমতা আইসিসির নেই। ফলে গালিগালাজ মাঠের মধ্যেও সীমাবদ্ধ থাকে না। পরে সাংবাদিক সম্মেলনে এসে রাহুলের মত আপাত ভদ্র ক্রিকেটার গ্যাং ওয়ারের ভাষায় বলেন “আমাদের একজনকে ঘাঁটালে আমরা এগারোজন মিলে ঝাঁপিয়ে পড়ব।”

অভিজ্ঞ সাংবাদিক থেকে শুরু করে রকে বসা ক্রিকেট পণ্ডিত, ব্যক্তিগত জীবনে যথেষ্ট ভদ্র বিশ্লেষক থেকে শুরু করে পাড়ার বৌদি পর্যন্ত সকলের কাছেই এর সপক্ষে যুক্তি মজুত। প্রথমত, এটা আগ্রাসন, এটা ছাড়া জেতা যায় না। দ্বিতীয়ত, অস্ট্রেলিয়া, ইংল্যান্ডের যখন ক্ষমতা ছিল তখন ওরা এসব অনেক করেছে। এখন আমাদের ক্ষমতা আছে তাই করছি। বেশ করছি।

প্রথম যুক্তিটার মানে হল ক্লাইভ লয়েডের ওয়েস্ট ইন্ডিজ বা অর্জুন রণতুঙ্গার শ্রীলঙ্কা কোনোদিন কিচ্ছু জেতেনি। অজিত ওয়াড়েকর বা সৌরভ গাঙ্গুলির ভারতীয় দলের কথা ছেড়েই দিন। দেশে যেমন নরেন্দ্র মোদী সরকার আসার আগে কোনো উন্নয়ন হয়নি, তেমনি বিরাট কোহলি আর রবি শাস্ত্রী দায়িত্ব নেওয়ার আগে ভারতীয় ক্রিকেট দলও কখনো কিছু জেতেনি।

দ্বিতীয় যুক্তিটা আরও চমৎকার। বনলতা সেনগিরি (“এতদিন কোথায় ছিলেন?”) বাদ দিলেও যা পড়ে থাকে তা হল, আমরা অস্ট্রেলিয়া, ইংল্যান্ডের উপর প্রতিশোধ নিচ্ছি তাদের সঙ্গেই হাত মিলিয়ে। কারণ ক্রিকেটের খবর রাখলে আপনি নিশ্চয়ই জানেন, এই তিনটে দেশের ক্রিকেট বোর্ড এখন ‘বিগ থ্রি’। হাত মিলিয়ে আইসিসির রাজস্বের সিংহভাগ দখলে রেখে সংগঠনটিকে ঠুঁটো জগন্নাথ করে রেখেছে। এরা নিজেদের মধ্যেই খেলে বেশি, অন্যদের সাথে খেলে কম। তাই নিউজিল্যান্ড বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়ন হলেও ভারত তাদের সাথে দুটো টেস্টের বেশি খেলে না, ইংল্যান্ড নড়বড়ে দল হলেও তাদের বিরুদ্ধে খেলে পাঁচ টেস্টের সিরিজ।

বলতেই পারেন, জোর যার মুলুক তার। এভাবেই তো দুনিয়া চলছে। এতে আপত্তি করার কী আছে? ঠিক কথা। সমস্যা একটাই। এরপর আপনার ছেলেকে ক্রিকেট কোচিং সেন্টারে পাঠানোর পাশাপাশি কুস্তি বা বক্সিংও শেখাতে হতে পারে। কারণ মাঠে মাথা গরম হলেই যা ইচ্ছে তাই বলা যখন নিয়ম হয়ে যাচ্ছে, তখন কদিন পরে যা ইচ্ছে তাই করাও নিয়ম হয়ে দাঁড়াতে পারে। ১৯৯০-৯১ দলীপ ট্রফির ফাইনালে রশিদ প্যাটেল আর রমন লাম্বার উইকেট আর ব্যাট নিয়ে মারামারি হয়ত আজকের বাবা-মায়েদের কারো কারো মনে আছে। সেদিন ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড দুজনকে যথাক্রমে ১৩ মাস আর দশ মাসের জন্য নির্বাসন দিয়েছিল। এখন অবশ্য তেমন হওয়ার সম্ভাবনা কম। “ক্রিকেট কোনোদিনই ভদ্রলোকের খেলা ছিল না”, “এমন তো আগেও হয়েছে” ইত্যাদি যুক্তি আজকাল সবসময় তৈরি থাকে।

তথ্যসূত্র

১। https://cricketaddictor.com/india-tour-of-south-africa-2021/watch-virat-kohli-ravi-ashwin-kl-rahul-take-a-dig-at-broadcasters-after-dean-elgar-survives-due-to-drs-gaffe/

২। https://twitter.com/thefield_in/status/1481666634138136577?t=LjROQTTUwJIbCvy3p2M3Ew&s=03

৩। https://twitter.com/shreevats1/status/1481648590389149696?s=20

৪। https://www.hindustantimes.com/cricket/if-you-go-after-one-of-us-all-xi-will-come-right-back-rahul-england-s-sledging-against-bumrah-shami-101629168592536.html

৫। https://en.100mbsports.com/on-this-day-ugly-spat-between-rashid-patel-and-raman-lamba-breaks-out/

https://nagorik.net এ প্রকাশিত