সব পথ এসে মিলে গেল শেষে

মেয়ো রোডের মাঝখানে পুব দিকে মুখ করে লাঠি হাতে দাঁড়িয়ে আছেন মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী। গতকাল বিকেলে বাল্মিকী সম্প্রদায়ের একটি মেয়ের ধর্ষণ ও নির্মম হত্যা, খোদ সরকারের দ্বারা প্রমাণ লোপাট এবং ভারতীয় বিচার ব্যবস্থা কর্তৃক সত্যকে ধর্ষণ করার প্রতিবাদে একটা মিছিলে যোগ দিয়েছিলাম। সেই মিছিল শেষ হল গান্ধীজির পাদদেশে। তারপর পথসভা। সেই সভায় দাঁড়িয়ে দেখছিলাম, পিছন দিক থেকে আসা ডুবন্ত সূর্যের আলোয় গান্ধীজির মুখে যেন প্রসন্ন হাসি। কিসের প্রসন্নতা?

এই বাল্মিকী সম্প্রদায়ের মানুষ চলতি কথায় ভাঙ্গি। যুগ যুগ ধরে এঁদের পেশা মানুষের মল মূত্র পরিষ্কার করা। বাংলায় আমরা এই পেশার লোকেদের বলি মেথর। বলা বাহুল্য, ব্রাহ্মণ্যবাদ বা মনুবাদ অনুসারে এঁরা অস্পৃশ্য। দিল্লীতে এঁদের মহল্লায় গান্ধীজি দীর্ঘদিন বসবাস করেছেন। শোনা যায় ঐ এলাকার (যার বর্তমান নাম বাল্মিকী কলোনি) লোকেরা আজও মনে করেন, তাঁদের কাছ থেকে গান্ধীজিকে বিড়লা হাউসে সরিয়ে না নিয়ে গেলে নাথুরাম গডসের ঊর্ধ্বতন চতুর্দশ পুরুষের সাধ্য ছিল না তাঁকে হত্যা করে। এ বিষয়ে বিবেক শুক্লার লেখা Gandhi in Delhi বই থেকে আরো বিস্তারিত জানা যেতে পারে। কিন্তু বর্ণবাদ নিয়ে গান্ধীজির সমালোচনা করার অনেক অবকাশ আছে। তিনি যে মনে করতেন নিম্নবর্ণের লোকেদের জোর করে মন্দিরে ঢোকার চেষ্টা করা অনুচিত, উচ্চবর্ণের লোকেদের প্রায়শ্চিত্ত করবার জন্য সেবা করতে দেওয়া উচিৎ — তা সমর্থনযোগ্য মনে হয় না অনেকেরই। বাবাসাহেব ভীমরাও আম্বেদকর নেহাত ব্যক্তিগত আক্রোশে গান্ধীজির সমালোচনা করতেন না। এমনকি এই যে বাল্মিকী সম্প্রদায়ের লোকেদের সাথে থাকা, তা নিয়েও বিতর্ক আছে।

অরুন্ধতী রায় তাঁর ‘The Doctor and the Saint’ নিবন্ধে লিখছেন “In his history of the Balmiki workers of Delhi, the scholar Vijay Prashad says when Gandhi staged his visits to the Balmiki Colony on Mandir Marg (formerly Reading Road) in 1946, he refused to eat with the community:

‘You can offer me goat’s milk,’ he said, ‘but I will pay for it. If you are keen that I should take food prepared by you, you can come here and cook my food for me’… Balmiki elders recount tales of Gandhi’s hypocrisy, but only with a sense of uneasiness. When a dalit gave Gandhi nuts, he fed them to his goat, saying that he would eat them later, in the goat’s milk. Most of Gandhi’s food, nuts and grains, came from Birla House; he did not take these from dalits. Radical Balmikis took refuge in Ambedkarism which openly confronted Gandhi on these issues.”

এতৎসত্ত্বেও নিম্নবর্ণের অনেক মানুষের মনেই গান্ধীজির জন্য জায়গা আছে। তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ ভারতের বর্তমান মনুবাদী, ফ্যাসিবাদী শাসকের গান্ধীজিকে আক্রমণ না করা। গান্ধীজির একনিষ্ঠ সহচর জওহরলাল নেহরুকে নোংরা ব্যক্তিগত আক্রমণ করতে তারা ছাড়ে না। কিন্তু গান্ধীজিকে আক্রমণ করার বদলে বরং দেখানোর চেষ্টা করে যে তারা গান্ধীর পথেই চলেছে। তার কারণ “মুসলমান ভোটব্যাঙ্ক” কে ঘৃণা করলেও “দলিত ভোটব্যাঙ্ক” তাদের বিশেষ প্রয়োজন। পাছে গান্ধীজিকে গালাগালি করলে সেই ভোটে ভাঙন ধরে! তাই গডসের মূর্তি আর গান্ধীর মূর্তি — দুয়েই মালা দেওয়া হয়।

গান্ধীর সমালোচনা করার আরো অনেক জায়গা আছে। তিনি নিজেই যখন বলেছেন “আমার জীবনই আমার বাণী”, তখন জীবন আর বাণী — দুটোতেই নানা অসঙ্গতি দেখানো সম্ভব। দক্ষিণ আফ্রিকায় থাকাকালীন তিনি যে গড়পড়তা ভারতীয়দের মতই আফ্রিকানদের ভারতীয়দের চেয়ে নিকৃষ্ট মনে করতেন তার প্রমাণ তাঁর লেখাপত্র, বক্তৃতাতেই আছে।

রাজনীতিতে ধর্মের প্রবেশ কি বিষময় হতে পারে তা আমরা আজ হাড়ে হাড়ে বুঝতে পারছি। সে কাজটাও যে গান্ধীর হাত দিয়েই হয়েছে — এমন সমালোচনা বাম ও দক্ষিণ, উভয় দিক থেকেই হয়েছে। বক্তব্যগুলো উড়িয়ে দেওয়ার মত নয়। তাঁর হিন্দ স্বরাজ যে স্বপ্নের রাষ্ট্রের কথা বলে, তার সাথে ধর্মীয় ভাবনা ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে। যদিও হিন্দুত্ববাদের গুরু বিনায়ক দামোদর সাভারকরের সেরকম রাষ্ট্র মোটেই পছন্দ হয়নি, ফলে এখনকার হিন্দুত্ববাদীদের গান্ধীজির পথেই চলার দাবী যে বিশুদ্ধ গঞ্জিকা তা বলার অপেক্ষা রাখে না।

গান্ধীজি যে অহিংসার কথা বলতেন, যাকে তিনি দর্শনে পরিণত করেছিলেন তার সাথেও পুরোপুরি একমত হওয়া শক্ত। পৃথিবীর সর্বত্র বাস্তবতা হল বলপ্রয়োগ না করলে কোন কোন কাজ একেবারেই করা সম্ভব হয় না, অনেক ক্ষেত্রে বলপ্রয়োগ না করলে দুর্বলের উপর সবলের অত্যাচারকে প্রশ্রয়ই দেওয়া হয়। কিন্তু গতকাল বিকেলে গান্ধীজির পায়ের নীচে দাঁড়িয়ে ভাবছিলাম, রাজনৈতিক কৌশল হিসাবে অহিংস আন্দোলন সম্ভবত তাঁর সময়ের চেয়ে আজ বেশি সুবিধাজনক হয়ে উঠেছে।

আজকের দুনিয়ায় ভারতের মত সুবৃহৎ রাষ্ট্র, যার বিপুল পুলিশ বাহিনী এবং সুবিশাল সেনাবাহিনী আছে, তার বিরুদ্ধে লড়াইয়ে কালকের মিছিলের শ খানেক লোক আণুবীক্ষণিক তো বটেই, কয়েক লক্ষ লোকের মিছিলও তেমন বড় কিছু নয়। এত লোকের হাতে অস্ত্র থাকলেও তেমন কিছু এসে যায় না। যদি তা না হত, তাহলে বাইরে থেকে অস্ত্রের যোগান থাকা সত্ত্বেও এভাবে কাশ্মীরের জিভ কেটে নেওয়া সম্ভব হত না। আসলে প্রতিবাদীর হাতে অস্ত্র থাকলে তাদের বিরুদ্ধে জনমত তৈরি করতে, নিজের পীড়নের সপক্ষে মত তৈরি করতে আজকের দুনিয়ায় রাষ্ট্রের আরো সুবিধা হয়। সেই কারণেই প্রতিবাদীদের দলমত নির্বিশেষে জেহাদি বা আর্বান নকশাল বলে দেগে দেওয়া। অথচ কয়েক হাজার নিরস্ত্র প্রতিবাদীকে সন্ত্রাসবাদী বলে মিথ্যা অভিযোগে হাজতে পোরা গেলেও, লোকচক্ষে সন্ত্রাসবাদী বলে প্রমাণ করা বড় শক্ত। তার জন্য বশংবদ সংবাদমাধ্যম লাগে, মাইনে করা আই টি সেল লাগে। সে প্রোপাগান্ডাই বা কতদিন বিশ্বাসযোগ্য থাকে সেটা দেখার। এই দোনলা প্রোপাগান্ডার বয়স কিন্তু এখনো বছর দশেক হয়নি। একটা দেশের ইতিহাসে দশ বছর কতটুকুই বা সময়? তাই আজ বহু মানুষ কানহাইয়া কুমার, উমর খালিদ বা শার্জিল ইমামকে কতিপয় আত্মবিক্রীত নিউজ অ্যাঙ্করের কথায় টুকড়ে টুকড়ে গ্যাং বলে বিশ্বাস করছেন বলেই যে চিরকাল করবেন — এমনটা নাও হতে পারে। প্রোপাগান্ডা সততই স্বল্পায়ু।

কিন্তু এসবের ফলে যা হয়েছে তা হল আদর্শের দিক থেকে গান্ধীজির শত যোজন দূরে থাকা উমর থেকে শুরু করে কংগ্রেসী রাহুল গান্ধী পর্যন্ত সকলেই তাঁদের বক্তৃতায় একই সুরে বলছেন, আমরা এই শাসককে জমি ছাড়ব না, আমরা সর্বশক্তি দিয়ে লড়াই করব। কিন্তু শান্তিপূর্ণভাবে, সংবিধান মেনে। অর্থাৎ সকলেই গান্ধীগিরি শিরোধার্য করেছেন। গান্ধীর প্রসন্নতা বোধহয় এই কারণে।

ভারতের সংবিধান হিন্দুত্ববাদের রমরমায় অধুনা অনেকের কাছেই একটি ঘৃণিত নথিপত্র। বিশেষত বর্ণহিন্দুরা, যাঁরা হাথরাসের ঘটনাকে স্রেফ ধর্ষণ হিসাবে দেখতে পছন্দ করেন, মেয়েটির দলিত হওয়ার কোন আলাদা গুরুত্ব নেই ভাবতেই স্বচ্ছন্দ বোধ করেন, তাঁদের অনেকেরই সংবিধানটা অপছন্দ। কারণ “আম্বেদকর এস সি, এস টি র দিকে ঝোল টেনে দেশটার সর্বনাশ করে দিয়ে গেছে।” গান্ধীজির হত্যাকারীরা যখন তেমন শক্তিশালী ছিল না, তখনই এঁরা শিখেছেন সংবিধানটা একা আম্বেদকরই লিখে ফেলেছিলেন এবং গায়ের জোরে বামুন, কায়েতদের বঞ্চিত করে গেছেন। সংবিধান সভা বলে কোন কিছুর সম্বন্ধে যে অধিকাংশ মানুষ জানেন না, সংবিধানের প্রত্যেকটি অনুচ্ছেদের দায়িত্ব যতটা আম্বেদকরের ততটাই শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জির — এ কথা যে বেশিরভাগ নাগরিক বোঝেন না, তার জন্য মধ্যপন্থী বা বামপন্থীরা কম দায়ী নন। কিন্তু মজার কথা, ঘোর দক্ষিণপন্থার আক্রমণে যখন সংবিধান নিয়ে এই প্রথম সচেতন কাটা ছেঁড়া হচ্ছে, তখন গান্ধীর কৌশল সব বিরোধীরই কৌশল হয়ে উঠছে। আর যে নথিকে তাঁরা হাতিয়ার করছেন সেটা গান্ধীর সবচেয়ে বড় সমালোচক আম্বেদকরের সাথে সমার্থক। এ বছরের জানুয়ারি মাসে সি এ এ – এন আর সি – এন পি আর বিরোধী মিছিল মিটিঙেও তো আমরা দেখেছি সেই অভূতপূর্ব দৃশ্য — পাশাপাশি গান্ধী আর আম্বেদকরের ছবি। গান্ধী মূর্তির প্রসন্নতা হয়ত সে কারণেও।

ইতিহাস বোধহয় এভাবেই গড়ে পিটে নেয়। মেয়ো রোডের গান্ধী মূর্তির কাছে অনেকগুলো রাস্তা এসে মিশেছে। সংখ্যায় অল্প হলেও কাল সেখানে এসে মিশেছিলেন নানা পথের বামপন্থীরা — যোগেন্দ্র যাদবের মত ঘোষিত গান্ধীবাদী সমাজবাদের দল স্বরাজ ইন্ডিয়ার মানুষজন; সি পি আই (এম) থেকে নির্বাসিত প্রসেনজিৎ বসুর মত লোক; কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের টগবগে বামপন্থী ছেলেমেয়েরা, যারা নানা দলের বা হয়ত শুধুই ক্যাম্পাস লেফট; আমার মত রাজনীতি না করা বামপন্থীরা। আরো অনেকে আসেননি, কিন্তু আসতে বাধা নেই। সচেতনে বা অবচেতনে গান্ধীজির পথে এমন অনেকেই এসে পড়ছেন, যাঁদের সাথে তাঁর আদায় কাঁচকলায় সম্পর্ক ছিল। সকলে মিলিত হলে যদি দেশের ভাল হয় তাতে গান্ধী, আম্বেদকর, নেহরু, শ্রীপাদ অমৃত ডাঙ্গে বা জ্যোতি বসু — কেউই আপত্তি করতেন বলে মনে হয় না। গান্ধীজিকে যিনি মহাত্মা বলেছিলেন, সেই রবীন্দ্রনাথ (অমিতাভ চৌধুরীর মতে উনিই প্রথম বলেননি) থাকলে আশা করতেন “ঘৃণা করি দূরে আছে যারা আজও / বন্ধ নাশিবে — তারাও আসিবে দাঁড়াবে ঘিরে।”

প্রজাতন্ত্রসাধনা

কী শিখেছ স্কুলে আজ
বলো দেখি বাছা?

শিখেছি স্বাধীন সব মানুষ ধরায়
স্কুলেতে তো আমাদের তেমনই পড়ায়।

What did you learn in school today
Dear little boy of mine?

I learnt that everybody’s free
That’s what the teachers said to me.
—Tom Paxton

তখন ক্লাস ফাইভে পড়ি। স্কুলে বেশ নামডাক হয়েছে বক্তা হিসাবে। অতএব মাস্টারমশাইদের একজন বললেন প্রজাতন্ত্র দিবসের অনুষ্ঠানে বক্তৃতা দিতে হবে ছাত্রদের পক্ষ থেকে। বক্তৃতা তৈরি করে সহকারী প্রধান শিক্ষক পূর্ণচন্দ্র মণ্ডলকে শুনিয়ে আসতে হবে আগেই। পূর্ণবাবুকে শোনাতে যেতেই তিনি মৃদু হেসে পিঠে হাত বুলিয়ে বললেন “আর যা-ই বল বাবা, ইয়ে আজাদি ঝুটা হ্যায় বলে দিস না। তুই তো আবার কমিউনিস্ট লোকের ছেলে…”

তখন অবশ্য আমার আজাদিকে মোটেই ঝুটো মনে হত না, আর বাবা আমাকে শিখিয়ে পড়িয়েও দিতেন না। সুতরাং ২৬শে জানুয়ারি হেড স্যারের ঘরের সামনে বসানো মাইকে যে ভাল ভাল কথাগুলো বললাম সেগুলো বিশ্বাস করেই বললাম। মাস্টারমশাইরা বিস্তর পিঠ চাপড়ে দিলেন, বন্ধুরা কেউ কেউ চোখ গোল গোল করে বলল “কী করে তুই এরকম বলতে পারিস!” আমি মহা খুশি। আহা! আমার স্বাধীনতা, আমার প্রজাতন্ত্র।

ক্রিকেট খেলায় ব্লাইন্ড স্পট বলে একটা ব্যাপার আছে, যেখানে বল পড়লে ব্যাটসম্যানের প্রতিক্রিয়ার বিকল্প অত্যন্ত সীমিত। বলটাকে আক্রমণ করা প্রায় অসম্ভব। অধিকাংশ ব্যাটসম্যানের ক্ষেত্রে সেটা লেগ স্টাম্পের বাইরের এলাকা। তাই আইন অনুযায়ী সেখানে পিচ পড়া বলে লেগ বিফোর উইকেট আউট দেওয়া যায় না। ভারতীয় প্রজাতন্ত্রের ব্লাইন্ড স্পটগুলো সম্পর্কে তখনো কিছুই জানতাম না।

দেশমাতৃকা কী বিলক্ষণ জানতাম। কিন্তু মণিপুরের মায়েদের কথা জানতাম না। আমার সেই অপাপবিদ্ধ প্রজাতন্ত্র দিবসের বছর দশেক পরে তাঁরা উলঙ্গ হয়ে রাজপথে দাঁড়াবেন, হাতের ব্যানারে বড় বড় অক্ষরে লেখা থাকবে “INDIAN ARMY RAPE US”। ততদিনে ইরম শর্মিলার অনশনের চার বছর অতিক্রান্ত।

মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্মে বিলাসিতা যেমন জানি না তখনো, তেমনি খিদে কাকে বলে তা-ও সম্যক জানি না। রোজ রাতে যারা জল খেয়ে ঘুমোয় তারাও যে প্রজাতন্ত্রের ব্লাইন্ড স্পট সে কথাও আমার বোঝা হয়নি।

আমার কাছে জম্মু-কাশ্মীর মানে তখন শর্মিলা ঠাকুর আর শাম্মি কাপুর। AFSPA যে কত বড় chutzpah সেকথা জানারও প্রশ্নই ছিল না সেই প্রজাতন্ত্র দিবসে।

যতদূর মনে পড়ে, আদিবাসীদের জীবন আর জল জঙ্গল থেকে উৎখাত হয়ে যাওয়া আটকাতে যুগ যুগ ধরে তাদের অনন্ত লড়াই যে ১৯৫০ সালের ২৬শে জানুয়ারিতেও থামতে পারেনি সে কথাও তখন জানা ছিল না আমার।

বয়স আন্দাজে সে হয়ত আশ্চর্য নয়, যা আশ্চর্য তা হল আমি জানতাম সংবিধান প্রণেতা হলেন বাবাসাহেব ভীমরাও আম্বেদকর। যেন ঐ একটি লোক একা একা দক্ষিণের জানলা খুলে বসে বসন্তের মৃদুমন্দ বাতাসে আপন মনের মাধুরী মিশায়ে লিখে ফেলেছিলেন কয়েকশো পাতার একখানা নিয়মাবলী, যা পুঙখানুপুঙখ অনুসরণ করে এত বড় দেশটা চলবে। সুতরাং সংবিধানটা ভাল হলে সব কৃতিত্ব আম্বেদকরের, মন্দ হলেও ঐ একজনকে গালাগাল দিলেই যথেষ্ট। সংবিধান সভা ব্যাপারটার কোন অস্তিত্ব আমার চেতনায় বহুকাল ছিল না। এমনকি ক্লাস নাইন টেন পর্যন্ত পাঠ্য ইতিহাস বইতেও সেটা নামমাত্র।

আম্বেদকর সম্পর্কেই বা কী জানতাম? একটা চশমা পরা টাক মাথা গোল মুখো লোক, যিনি সংবিধান প্রণেতা। ব্যাস! এটুকুই। ইতিহাস বইতে গান্ধীজির জন্যে অনেকগুলো পাতা বরাদ্দ। নেতাজীর জন্যেও কম নয়। নেহরু ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী, স্বাধীনতা সংগ্রামী — তাও পড়েছি। মৌলানা আবুল কালাম আজাদও স্বাধীনতা সংগ্রামী, সুপণ্ডিত, কংগ্রেস সভাপতি ইত্যাদি। হয়ত বাম শাসিত রাজ্য বলেই স্কুলপাঠ্য ইতিহাসে মাস্টারদা সূর্য সেন বা ভগৎ সিংও তখন ব্রাত্য ছিলেন না। এমনকি মহারাষ্ট্রের চাপেকর ভ্রাতৃদ্বয়ের সশস্ত্র আন্দোলন প্রসঙ্গে বিনায়ক দামোদর সাভারকরও ছিলেন (গভর্নর জেনারেলকে অজস্র মার্সি পিটিশন লেখা এবং মুক্তি পাওয়ার পর ভোল পাল্টে ফেলার ইতিহাস ছিল না অবশ্য)। আম্বেদকর সম্বন্ধে কিন্তু ঐ এক লাইন।

বর্ণবাদের বিরুদ্ধে তাঁর আজীবন সংগ্রামের কথা পড়তে পাইনি আমরা। গান্ধীর সাথে তাঁর পুনা চুক্তি স্বাধীনতা সংগ্রামের একটি মাইল ফলক বলে লেখা হয়েছিল। কিন্তু চুক্তিটা কী এবং কেন সেসব আমাদের জানা হয়নি। সাবালক হতে হতে আমরা জেনেছি নেহরুর লেখা বিখ্যাত বইয়ের নাম ‘The Discovery of India’, গান্ধীর আত্মকথা ‘My experiments with truth’। কিন্তু আম্বেদকর যে সংবিধান ছাড়া জীবনে আর কিছু লিখেছেন তার কোন লক্ষণ দেখিনি আমরা। ‘Annihilation of caste’ নামক অদ্বিতীয় বইটা (আদপে বক্তৃতা) পড়তে আমার সাঁইত্রিশ বছর বয়স হয়ে গেল।

অবশ্য আম্বেদকর সম্বন্ধে আরেকটা জিনিস স্কুল ছাড়ার পরে পরেই জেনে ফেলেছিলাম আমরা। “লোকটা কাস্টের ভিত্তিতে রিজার্ভেশন করে দেশের বারোটা বাজিয়ে দিয়েছে।“ অর্থাৎ ঐ সিদ্ধান্তটার দায়ও একা ঐ লোকটার ঘাড়েই চাপে। আমার বাবা বলতেন “সব ব্যাটাকে ছেড়ে বেঁড়ে ব্যাটাকে ধর”। এও সেই ব্যাপার। কাস্ট কোথা থেকে এল, কেন এল, কত হাজার বছর ধরে তার অন্যায় সুবিধা কে ভোগ করল, কারা এখনো ভোগ করছে — সেসব কিছুই জানা হল না। সংবিধান সভা কী, তার সদস্য কারা ছিলেন, কিভাবে সেখানে প্রত্যেকটি বিষয় নিয়ে আলোচনা করে গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে সংবিধান প্রণয়ন হয়েছে — তাও জানার দরকার পড়ল না। ফলে কাস্ট তৈরি করার দোষ মনুর ঘাড়ে চাপল না, চাপল আম্বেদকরের ঘাড়ে।

কত কী যে জানা হয়নি! পাঠ্য যে কত কিছু অপাঠ্য করে রেখেছিল! প্রজাতন্ত্রেও যে কত দেওয়াল তুলে রেখেছি আমরা! হিন্দুরা সর্বক্ষণ আলোচনা করে যে মুসলমানরা ঘেটো বানিয়ে বাস করে, ওদের আরো খোলামেলা হওয়া উচিৎ। অথচ হিন্দু বন্ধুরা মিলে একসাথে জমি কিনে কো-অপারেটিভ আবাসন তৈরি করার পরিকল্পনা করে মুসলমান বন্ধুর সামনেই, তাকে কখনো বলে না “তুইও আমাদের সাথে ফ্ল্যাট কেন।” মহানগরগুলোতেও নিরামিষাশীদের হাউজিঙে আমিষাশীর জায়গা হয় না।

বেহুলা লখিন্দরের বাসরে একটা মাত্র ছিদ্র ছিল। সেখান দিয়েই প্রবেশ করেছিল কালনাগিনী। আমাদের প্রজাতন্ত্রের বাসরে শুরু থেকেই অজস্র ছিদ্র। সেসব ছিদ্র দিয়ে ঢুকে পড়েছে ধর্মীয় ফ্যাসিবাদের শত সহস্র সাপ। ছিদ্রগুলো আম্বেদকর গোড়াতেই দেখতে পেয়েছিলেন। তাই সংবিধান সভায় তাঁর শেষ বক্তৃতায় ভারতে গণতন্ত্র টিকবে কিনা তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন। টিকিয়ে রাখতে হলে তিনটি পদক্ষেপ জরুরী বলে উল্লেখ করেছিলেন। তৃতীয়টি নিয়ে গড়িমসি আমাদের আজকের দুর্দিন ঘনিয়ে তুলেছে বলে মনে হয়:

তৃতীয় যে কাজটা আমাদের করতেই হবে তা হল রাজনৈতিক গণতন্ত্র হয়ে সন্তুষ্ট থাকলে চলবে না। আমাদের রাজনৈতিক গণতন্ত্রকে সামাজিক গণতন্ত্রে পরিণত করতে হবে। রাজনৈতিক গণতন্ত্র স্থায়ী হতে পারে না যদি তার ভিত সামাজিক গণতন্ত্র দিয়ে তৈরি না হয়। সামাজিক গণতন্ত্র মানে কী? মানে এমন এক জীবনচর্যা, যা স্বাধীনতা, সাম্য ও মৈত্রীকে জীবনধারণের মূল নীতি বলে মনে করে। এই তিনটে নীতিকে আলাদা করে দেখলে চলবে না। এদের একত্রে ভাবতে হবে কারণ কোন একটা অনুসরণ না করা হলেই গণতন্ত্রের উদ্দেশ্য ব্যর্থ হয়…। ২৬শে জানুয়ারি ১৯৫০ আমরা এক স্ববিরোধী জীবন শুরু করতে চলেছি। রাজনৈতিক জীবনে সাম্য থাকবে, অর্থনৈতিক আর সামাজিক জীবনে থাকবে অসাম্য…। কতদিন আমরা এই স্ববিরোধ চালিয়ে যাব? কতদিন সমাজে, অর্থনীতিতে মানুষকে সাম্য থেকে বঞ্চিত করব? যদি বেশিদিন তা করি তাহলে তা আমাদের রাজনৈতিক গণতন্ত্রের ধ্বংসের কারণ হয়ে উঠবে।

আম্বেদকরের ভবিষ্যদ্বাণী মিলে যাওয়ার মুখে। ব্লাইন্ড স্পটগুলো চওড়া হতে হতে ব্ল্যাকহোলে পরিণত। সবচেয়ে বড়টার নাম কাশ্মীর, পিছু পিছু উত্তরপ্রদেশ।

আশার কথা এই যে সংবিধানের প্রস্তাবনায় যাদের “We, the people of India” বলা হয়েছে তারা এই প্রথম বিপুল সংখ্যায় সংবিধান কী এবং কেন, প্রজাতন্ত্র ব্যাপারটাই বা কী — এসব জিজ্ঞেস করছে। যারা এই সংবিধানের বিনাশ চায় তারাও এমন তেড়ে গাল দেয়নি আগে। তার ফলে সংবিধান সম্বন্ধে আগ্রহ বাড়ছে। হাজার হাজার সাধারণ মানুষ একত্রে রাস্তাঘাটে দাঁড়িয়ে সংবিধানের প্রস্তাবনা পড়ছেন, সংবিধান বাঁচাতে হবে বলে মিছিল করছেন — এমন প্রজাতন্ত্র আমরা আগে দেখিনি।

স্কুলপাঠ্য ইতিহাসে জায়গা না পাওয়া আম্বেদকর এখন মিছিলে। জামা মসজিদের সিঁড়িতে দলিত নেতা চন্দ্রশেখর আজাদ রাবণের হাতে, ধর্মতলার ধরনায় বর্ণহিন্দু ছাত্রীর হাতে। এমন প্রজাতন্ত্র দিবস আমাদের ইতিহাসে সম্ভবত আগে আসেনি। রাস্তায় অতন্দ্র মায়েরা বলছেন “বালাই ষাট”।

*ভাষান্তর আমার