রূপবতী

শাহ বানোর নাম জানে না এমন কোন লিখতে পড়তে জানা ভারতীয় বোধহয় আর অবশিষ্ট নেই। যারা জানত না তারাও কয়েকমাস আগে তিন তালাক এবং অভিন্ন দেওয়ানী বিধি নিয়ে বিজেপির কিং কং সুলভ বুক চাপড়ানোর সূত্রে জেনে গেছে শাহ বানো কে। ঐ ভদ্রমহিলার নামটা ভারতীয় দক্ষিণপন্থী রাজনীতিবিদ, বুদ্ধিজীবী এবং সাধারণ মুসলমানবিদ্বেষীরা চট করে ভুলবে না কারণ মুসলমানরা যে এখনো “আধুনিক হয়নি”, তারা যে “এখনো মধ্যযুগে পড়ে আছে” সেটার এমন হাতেগরম প্রমাণ পাওয়া যায় না তো চট করে। কিন্তু বলুন “রূপ কানোয়ার”, অনেকেই বলবে “সেটা আবার কে?” যারা ফেসবুকে জহরলাল নেহরু আর বিজয়লক্ষ্মী পন্ডিতের ছবি শেয়ার করে জহরলালকে দুশ্চরিত্র প্রমাণ করে তারা তো বটেই। রূপ কানোয়ার একটা বছর আঠেরোর মেয়ে। ১৯৮৭ সালের ৪ঠা সেপ্টেম্বর তার চব্বিশ বছর বয়সী স্বামীর চিতায় সে সতী হয়।

হ্যাঁ, ঠিকই পড়ছেন। সতী হয়, অর্থাৎ স্বামীর সঙ্গে সহমরণে যায়। এই সেই প্রথা যা রদ করার জন্যে রামমোহন রায় (“এমনকিছু ভাল লোক ছিলেন না। হিন্দুধর্মের অনেক ক্ষতি করেছেন” — আনুমানিক ১৯৯৯ সালে জনপ্রিয় এবং তথাকথিত আধুনিক এক হিন্দু ধর্মীয় সংগঠনের সন্ন্যাসীর মন্তব্য) আজ থেকে প্রায় দুশো বছর আগে এখান থেকে লন্ডন পর্যন্ত দৌড়াদৌড়ি করেছিলেন এবং তার ফলে ১৮২৯ এ লর্ড বেন্টিঙ্কের আমলে আমাদের ঔপনিবেশিক শাসকেরা এই জঘন্য প্রথাকে বেআইনি ঘোষণা করে। কিন্তু বুঝতেই পারছেন, ১৯৮৭ তেও কেউ সতী হচ্ছে মানে ১৫৮ বছরেও হিন্দুরা সকলে আধুনিক হয়ে উঠতে পারেনি। দেশের আইন যা বলে বলুক, ধর্মীয় ভাবাবেগের উপরে কোনকিছুর স্থান তাদের কাছে নেই। ঐ সময়কার প্রতিবেদন বলছে, কয়েকশো লোকের সামনে রূপ কানোয়ার সতী হয়। সে স্বেচ্ছায় সতী হয়নি (হলে সেটাও আত্মহত্যা বলে আইনত অপরাধ), তাকে জোর করা হয়েছিল বলে অভিযোগ থাকায় পুলিশি তদন্ত ইত্যাদি হয়। যথারীতি কিছু প্রমাণ করা যায়নি। কয়েকশো লোককে কে চটাতে যাবে? শেষমেশ সতী হতে প্ররোচনা দেওয়ার অভিযোগে কয়েকজনের বিরুদ্ধে আইনি কার্যকলাপ চালু হয়। কিন্তু তারাও ২০০৪ সালে প্রমাণের অভাবে বেকসুর খালাস পায়। পদ্মাবতী ছবিটা কেন মুক্তি পাওয়া উচিৎ নয়, তার পক্ষে একটাই যুক্তি দেওয়া হচ্ছে — “Rajput pride”। সেটা কী জিনিস বুঝতে হলে রূপ কানোয়ারের ঘটনাটা খুব প্রাসঙ্গিক। ঐ যে এক গাঁ লোক মিলে একটা মেয়েকে মৃত স্বামীর সঙ্গে জ্যান্ত পোড়ানো (বা পুড়তে দেওয়া), তার মৃত্যুর পর তাকে ভগবান বানিয়ে ফেলা, যেখানে পোড়ানো হয়েছে সেই জায়গাটাকে তীর্থক্ষেত্র করে তোলা — ওটাই রাজপুতদের গর্বের জিনিস।
গা ঘিনঘিন করছে? কেন ভাই? এরা তো মুসলমান নয়, হোক না মধ্যযুগীয়। রাজপুতরা নাকি বরাবর বীরের জাত। এমন বীর যে তাদের মেয়েদের শেখানো হত শত্রু আক্রমণ করলে নিজের যৌন শুদ্ধতা বাঁচাতে আগুনে ঝাঁপ দেবে, তবু যেন শত্রুর হাতে পড়ো না। এর আবার গালভরা নাম আছে — জহরব্রত। আলাউদ্দিন খিলজি যখন রাজপুতানা আক্রমণ করেন তখন নাকি রানী পদ্মাবতী (আমাদের অবনীন্দ্রনাথের রাজকাহিনীর পদ্মিনী) এই জহরব্রতই পালন করেন।
এটা ইতিহাস না নেহাত গপ্প সে বিতর্কে যাবই না। নাহয় ইতিহাসই হল। কিন্তু এই ২০১৭ সালে দাঁড়িয়ে একজন মহিলার যৌন শুদ্ধতা তার জীবনের চেয়েও মূল্যবান, অতএব যিনি নিজের মানরক্ষায় প্রাণত্যাগ করেছেন তিনি দেবী — এই চিন্তাভাবনা যাদের, তাদের তো আধুনিক মানুষ বলা চলতে পারে না। তাহলে স্বীকার করতে হয় যে হিন্দুদেরও অনেকেই এখনো মধ্যযুগে পড়ে আছে।
একদল বিজ্ঞ লোক বলবে “১৯৮৭র একটা ঘটনা দিয়ে ২০১৭র রাজপুতদের বদনাম করছে। যত্তসব।” সেইসব বিজ্ঞদের জ্ঞাতার্থে বলি ২০১১র জনগণনা অনুযায়ী রাজস্থানে প্রতি হাজার জন পুরুষপিছু মাত্র ৯২৮ জন মেয়ে। জাতীয় অনুপাতের চেয়েও রাজপুত বীরপুঙ্গবদের রাজস্থান অনেক পিছিয়ে। শূন্য থেকে ছয় বছরের শিশুদের মধ্যে হিসাব করলে সংখ্যাটা আরো ভয়াবহ — ৮৮৮। বোঝাই যাচ্ছে রাজপুতরা তাদের মেয়েদের নিয়ে কি দারুণ গর্বিত। আমাদের মেয়েরা শত্রুর এঁটো হয় না — এইটাই ওঁদের একমাত্র গর্বের জায়গা আর কি। স্বভাবতই পদ্মাবতী সিনেমার পর্দায় নাচলে গাইলে ওঁদের গর্বে আঘাত লাগবে বইকি। সিনেমা যে বাস্তব নয় সেসব বুঝিয়ে লাভ কী? যেদেশে গুরমীত রাম রহিম সিং এর সুপারহিরো ফিল্ম হিট হয় সেদেশে ও যুক্তি শুনবে কে?
এসব বলার মানে এই নয় যে রাজপুত মানেই নরাধম। সত্যি বলতে কি, শুধু রাজপুত নয়, এদেশের সর্বত্রই উচ্চবর্ণের লোকেরা নানারকম অমানুষিক আচার হাজার বছর ধরে চালিয়ে এসেছে। এই বাংলায় যেমন কুলীন ব্রাক্ষ্মণরা বিয়ে করাটাকেই একটা পেশায় পরিণত করে ফেলেছিল। বাঁড়ুজ্জে বংশে যখন জন্মেছি তখন খুঁজলে নিশ্চয় আমার কোন পূর্বপুরুষকেও পাওয়া যাবে যে এরকম বিকৃত ব্যবসায় লিপ্ত ছিল। তা বলে আমি, একবিংশ শতকের মানুষ, আমি কি সেসবকে সমর্থন করব? কুলীন বামুনদের নিয়ে কেউ ছবি করলে কি বাংলার চাটুজ্জে, বাঁড়ুজ্জে, মুখুজ্জে মিলে সিনেমা হল ভাঙচুর করতে নামবে না পরিচালকের মাথা কাটতে চাইবে?
কল্পনা করতেও কষ্ট হচ্ছে, তাই না? এর কারণ কিন্তু এই নয় যে বাঙালি ব্রাক্ষ্মণরা সব দেবতুল্য, রাজস্থানের কর্ণি সেনার রাজপুতদের মত নয়। কারণটা ইতিহাস। বিশদে বলার জায়গা এবং সময় যেহেতু নেই তাই সংক্ষেপে একথা বললে অত্যুক্তি হবে না যে কারণটা রামমোহন আর বিদ্যাসাগর। শশী থারুর বলে এক নিপুণ বক্তা এবং ধুরন্ধর ভদ্রলোক বলেছেন রাজপুত ঐতিহ্য ভারতীয় ঐতিহ্যের অপরিহার্য অঙ্গ। অতএব তাদের ঐতিহ্যের অপমান না হয় সেদিকে সকলের নজর দেওয়া উচিৎ। রামমোহন আর বিদ্যাসাগর এইসব ঐতিহ্যের স্বরূপ থারুরের চেয়ে অনেক ভাল জানতেন। তাই ওসবের তোয়াক্কা না করে বিধর্মী, বিজাতীয় শাসকের কাছে সতীদাহ, বহুবিবাহের ঐতিহ্যের বারোটা পাঁচ বাজিয়ে দেওয়ার জন্যে তদবির করতে একদম দ্বিধা করেননি। সেসময়কার বামুন, কায়েতরা আজকের কর্ণি সেনার মতই আচরণ করেছিল। পার্থক্যের মধ্যে ইংরেজ সরকার বসুন্ধরা রাজে সিন্ধিয়ার মত “ইশ! ওরা কি দুষ্টু!” বলে হাত গুটিয়ে বসে থাকেনি। অসভ্য ঐতিহ্যগুলোকে বেআইনি করে ছেড়েছিল।
আরেকটা সুবিধা তখন ছিল। সেসময় অতিচালাক, স্বার্থান্বেষী, ঘুষখোর বুদ্ধিজীবী আর সাংবাদিক ছিল না যারা সরকারের মদতপ্রাপ্ত সন্ত্রাসবাদীগুলোকে ন্যাকামি করে “fringe element” বলবে। এরা আছে বলেই আইনের শাসনের উপরে কোন গোষ্ঠীর ভাবাবেগের এই অবাধ দৌরাত্ম্য নির্ঝঞ্ঝাটে সম্ভব হচ্ছে। শাসক দলের নেতা লাইভ টিভিতে বসে আইএসের ঢঙে খুনের হুমকি দিচ্ছে, নায়িকার অঙ্গহানির হুমকি দিয়ে ড্যাংড্যাং করে ঘুরে বেড়াচ্ছে লোকে, সরকার কিছুই করতে পারছে না। বিজেপির মুখ্যমন্ত্রীদের এই এক মজা। তাঁরা সবাই ভীষণ পরিশ্রমী, উপযুক্ত এবং জনপ্রিয় কিন্তু সঙ্কটের সময়ে তাঁরা কেউই কিছু করে উঠতে পারেন না। যেমন ২০০২ এ মোদী পারেননি আরকি। সব মিলিয়ে দীপিকা পাড়ুকোনের নাক আস্ত থাকলেও দেশ হিসাবে ভারতের নাক কাটা গেছে। নিজেদের সভ্য বলে দাবী করার অধিকার আমরা ক্রমশ হারাচ্ছি।
দুঃখের বিষয় এই যে এমন একটা ছবি নিয়ে এই কান্ড হচ্ছে যেখানে আধুনিক ভারতে একেবারেই অনুকরণীয় নয় এমন এক চরিত্রকে গৌরবান্বিত করা হয়েছে। সঞ্জয় লীলা বনশালী তো সমাজসচেতন বাস্তবধর্মী ছবি বানানোর বান্দা নন। তিনি কেবল মনোরম দৃশ্যপট তৈরি করেন। দেবদাসের নিদারুণ ট্রাজেডিও তাঁর হাতে পড়ে রাঙা টুকটুক করে। এমন পরিচালকের এই দুর্গতির কোন মানে হয়! তাছাড়া এরপরেও তো তিনি একবারও বলছেন না এস দুর্গা আর ন্যুড ছবির সঙ্গে যে অন্যায় হয়েছে তাও কম আঘাত নয়। এতদিন কল্পজগতে বাস করেছেন বেশ করেছেন। এখন যখন নাচগানওলা ফর্মুলা ছবি বানাতে গিয়েও গোষ্ঠীর এবং রাষ্ট্রের গুন্ডামি সহ্য করতে হচ্ছে তখন অন্তত বেপরোয়া হয়ে উঠুন না। দেখান না একটা অন্য কল্পজগত। বানান না রূপ কানোয়ারকে নিয়ে একটা ছবি, যেখানে স্বামীর চিতা থেকে লাফিয়ে নেমে পড়ে অমিতাভ বচ্চনের মত একাই শ্বশুর, দেওর আর তাদের গুন্ডাবাহিনীকে নিকেশ করবেন দীপিকা। তারপর নীচু জাত বা মুসলমান বলে যে প্রেমিকের সাথে বিয়ে দেননি বাবা-মা, সেই রণবীরকে বাইকের পেছনে চাপিয়ে চলে যাবেন অনেক দূরে, “Rajput pride” কে কাঁচকলা দেখিয়ে।
পুনশ্চ: আমার ধারণা এই লেখাটায় বেশকিছু লোক মন্তব্য করবে যে এর মধ্যে হিন্দু, মুসলমানকে টেনে আনা নোংরা রাজনীতি বা মূর্খামি। রাজপুত ভাবাবেগে আঘাত লাগায় রাজস্থানের মুসলমানরাও আহত। এর প্রমাণ হিসাবে বলা হবে যে আজমের শরীফও পদ্মাবতীর মুক্তির বিরোধিতা করেছে। উত্তরে বলি, আজমের শরীফের ঘাড়ে কটা মাথা যে বিরোধিতা না করে? যে রাজপুতদের মুখ্যমন্ত্রীই ছুঁতে পারেন না তাদের বিরোধিতা করবে সংখ্যালঘুরা?
Advertisements