পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতি: আর জি কর পেরিয়ে

২০১১ সালে পশ্চিমবঙ্গে মমতা ব্যানার্জির সরকার আসার পরে আর ২০১৪ সালে দিল্লিতে নরেন্দ্র মোদীর সরকার আসার পরে ভারতীয় রাজনীতিতে, সমাজে এবং সংবাদমাধ্যমে একটা নতুন কায়দা চালু হয়েছে। প্রশ্ন যা করার বিরোধীদের করা হয়, সরকারকে নয়। অথচ গণতন্ত্র মানে ঠিক উলটো। অন্তত ১৯৪৭ সাল থেকে ভারতে গণতন্ত্র মানে ছিল – প্রশ্ন সরকারকে করা হবে, আন্দোলন হবে সরকারের নীতির বিরুদ্ধে বা কাজের বিরুদ্ধে। সেটা উলটে গেছে। এখন সরকার অপকর্ম করলে সরকার আর সরকারি দলের সুরে সুর মিলিয়ে সংবাদমাধ্যম, এমনকি সাধারণ মানুষও ফিরিস্তি দেন – বিরোধীরা সরকারে থাকার সময়ে কী কী অপকর্ম করেছিল। বিজেপি এবং গোদি মিডিয়ার এই কাজটা করার জন্যে আছে দুটো হাতিয়ার – ‘নেহরু’ আর ‘কংগ্রেস কে ৬০ সাল’। তৃণমূল আর তাদের সোচ্চার ও নিরুচ্চার সমর্থকদের জন্যে আছে ‘বামফ্রন্টের ৩৪ বছর’। আপনি বলতেই পারেন, ‘বাপু, ওই কারণেই তো ওদের সরিয়ে তোমাদের ক্ষমতায় এনেছি। তোমাদের এতদিন হয়ে গেল সরকারে, তাও ওরা কবে কী করেছিল কেন শুনব?’ ওই ফাটা রেকর্ড কিন্তু বেজেই চলবে।

এবারের লোকসভা ভোটে দেশের মানুষ বিজেপির ফাটা রেকর্ড বাজানো অনেকটা বন্ধ করে দিয়েছেন। তার কৃতিত্ব খানিকটা অবশ্যই বিকল্প সংবাদমাধ্যম এবং সাংবাদিকদের। কিন্তু বেশিটাই দেশের বিরোধী দলগুলোর। কোনো সাংবাদিক বা বিকল্প সংবাদমাধ্যম, তাদের যত লক্ষ ফলোয়ারই থাকুক না কেন, যদি ভাবে রাজনৈতিক দলগুলোর কর্মীদের তুলনায় তারা বেশি পরিশ্রম করে বা সাধারণ মানুষ তাদের উপর বেশি নির্ভর করেন, তাহলে সেই সাংবাদিক বা ওয়েবসাইট মাটির সঙ্গে সম্পর্কহীন। রাজনীতির র-ও তারা বোঝে না। তবে তাদের অবদান অন্যূন নয়। ঘটনা হল, বিরোধীদের আন্দোলন করার মত একটা সুস্থ স্বাভাবিক গণতান্ত্রিক ব্যাপারকে ভারতে দশবছর ধরে অস্বাভাবিক, দেশবিরোধী বলে তুলে ধরা হত। ওটাই যে স্বাভাবিক, ওভাবেই যে সরকার বদলায় এবং ওভাবেই যে নরেন্দ্র মোদীও ক্ষমতায় এসেছিলেন, সেকথা মানুষকে ভুলিয়ে দেওয়া হয়েছিল। গত এক-দেড় বছরে মানুষের সেই মনোভাব অনেকটাই কেটেছে। আরএসএস-বিজেপি ও তাদের বশংবদ মিডিয়া, বিরোধীরা আন্দোলন করলেই তাকে নানাভাবে বদনাম করে আর পার পাচ্ছে না। মানুষের মানসিকতার এই পরিবর্তনের কৃতিত্ব অনেকটাই বিকল্প ওয়েবসাইট, স্বাধীন সাংবাদিক, ইউটিউবারদের।

কিন্তু পশ্চিমবঙ্গ এখনো বাকি দেশের চেয়ে পিছিয়ে আছে। এখানে একে বিজেপি ক্ষমতায় নেই, তার উপর এখানেও দিদি মিডিয়া সেই ২০১১ সাল থেকেই আছে। সরকারি বিজ্ঞাপন বন্ধ করে, বন্ধ করার হুমকি দিয়ে বা বিজ্ঞাপন দেওয়ার লোভ দেখিয়ে মমতা ব্যানার্জির সরকার পশ্চিমবঙ্গে দিদি মিডিয়া তৈরি করেছে সচেতনভাবে। উপরি সমস্যা হিসাবে আছেন বাম এবং/অথবা প্রগতিশীল মানুষদের একাংশ। তাঁরা ‘বিজেপি এসে যাবে’, এই যুক্তিতে তৃণমূল সরকারের যাবতীয় অপকর্ম চাপা দেন। বিরোধীরা (বামেদের কথা বলছি, এ রাজ্যে বিজেপি বিরোধীসুলভ কোন কাজটা করে?) গত ১৩ বছরে পর্যাপ্ত পরিমাণে বা তীব্রতায় আন্দোলন করেননি এটা যেমন সত্যি, তেমন এটাও সত্যি যে কোনো বিষয়ে তাঁরা প্রতিবাদ করলেই, মমতা বা তৃণমূল কংগ্রেসের অন্য কোনো নেতা কিছু বলারও আগে খবরের কাগজে বা সোশাল মিডিয়ায় লেখা শুরু হয়ে যায় ‘ওরা আবার কথা বলছে কী? ওরা তো অত সালে অমুকটা করেছিল।’ সংবাদপত্রের উত্তর সম্পাদকীয় লেখক, বিকল্প ওয়েবসাইটগুলোর লেখক এবং জনপ্রিয় ফেসবুকারদের মধ্যে বেশকিছু মানুষ সর্বদা তালিকা নিয়ে তৈরি থাকেন – কবে, কোথায়, কখন তৃণমূল দল বা সরকারের করা কোন অন্যায়টা বামফ্রন্ট সরকারের আমলে সিপিএম বা জোট শরিক অন্য কোনো দল করেছিল। যুক্তি হিসাবে এটা অবশ্যই বনলতা সেনগিরি (whataboutery), যা আজকাল সারা পৃথিবীতে বাম, মধ্য, ডান – সব পক্ষের লোকেরাই করে থাকেন। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সর্বাধিক বিক্রীত বাংলা দৈনিক আনন্দবাজার পত্রিকা ও অন্যান্য মিডিয়ার কয়েক দশকের যত্নে গড়ে তোলা এই নাগরিক বিশ্বাস, যে রাজনীতি অত্যন্ত নোংরা একটা ব্যাপার এবং শুধুমাত্র বদ লোকেরাই রাজনৈতিক দলের সদস্য হয়।

ফলে সরকারের বিরুদ্ধে কোনোরকম আন্দোলনে যুক্ত হতে গেলেই রাজ্যের প্রতিষ্ঠিত বাম দলগুলোকে আন্দোলনকারীরাই বাধা দেন। শিক্ষক নিয়োগে দুর্নীতির বিরুদ্ধে আন্দোলনে এ জিনিস ঘটেছে, সরকারি কর্মচারীদের মহার্ঘ ভাতা বৃদ্ধির দাবিতে আন্দোলনও বামপন্থীদের বাইরে রাখতে গিয়ে দুভাগ হয়ে গিয়েছিল – বামফ্রন্টের সদস্য দলগুলোর সংগঠনের যৌথ মঞ্চ, বাকিদের সংগ্রামী যৌথ মঞ্চ। তারপর কোন মঞ্চ দিল্লিতে বিক্ষোভ দেখাতে গিয়ে হিন্দু মহাসভার আতিথ্য গ্রহণ করল তা নিয়ে ভুল খবরও রটেছিল তৃণমূলের উদ্যোগে। যেহেতু সিপিএমের শিক্ষক সংগঠন নিখিল বঙ্গ শিক্ষক সমিতির নাম ওই পেশার বাইরের মানুষের কাছে বেশি পরিচিত এবং আন্দোলনের বাইরে থাকা অনেক শিক্ষকও খবর রাখতেন না আন্দোলনের কতগুলো ভাগ হয়েছে, সেহেতু অনেকে সাক্ষ্যপ্রমাণ না দেখেই ধরে নিয়েছিলেন কাজটা সিপিএমের সংগঠনের নেতৃত্বে থাকা অংশেরই। তৃণমূল নেতা কুণাল ঘোষও সুযোগ বুঝে সোশাল মিডিয়ায় রাম-বাম-কং আঁতাত প্রমাণিত হল বলে ধুয়ো তুলেছিলেন। অথচ ঘটনা ছিল উলটো

সবচেয়ে বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে যে বিরোধীরা, তাদের এইভাবে যে কোনো আন্দোলন থেকে দূরে রাখার এই কৌশল কংগ্রেস সম্পর্কে সেই ২০১৪ সাল থেকে সারা দেশে প্রয়োগ করে যাচ্ছিল বিজেপি। তাদের দ্বারা শাসিত কোনো রাজ্যে ধর্ষণ নিয়ে অসন্তোষ তৈরি হলেই বিজেপি নেতারা এবং গোদি মিডিয়া মনে করিয়ে দিত – নির্ভয়া কাণ্ড হয়েছে কংগ্রেস আমলে। অতএব কংগ্রেসের ও নিয়ে কোনো কথা বলার অধিকার নেই। নরেন্দ্র মোদী সরকারের কোনো অগণতান্ত্রিক কাজ নিয়ে প্রতিবাদ করলেই ইন্দিরা গান্ধীর জরুরি অবস্থা মনে করিয়ে দেওয়া হত। ধর্মনিরপেক্ষতা নিয়ে কথা বললেই শাহ বানো মামলার নাম করা হত। দেশের সাধারণ মানুষও এই একপেশে ধারণায় বিশ্বাস করছিলেন, যে কংগ্রেসের ৬০ বছরের শাসনে দেশে একটাও ভাল কাজ হয়নি। উপরন্তু বিজেপি এমন কিছুই করছে না, যা কংগ্রেস আগে করেনি। পশ্চিমবঙ্গের মতই কোথাও কোনো আন্দোলন দানা বাঁধলেই সংগঠকরা আগেভাগে বলে দিতেন ‘আমাদের এখানে কোনো রাজনৈতিক দল নেই। আমরা আন্দোলনের রাজনীতিকরণ চাই না।’ ফলে কংগ্রেসও হয়ে পড়েছিল রক্ষণাত্মক। যখন সারা দেশে এনআরসি-সিএএবিরোধী আন্দোলন চলছে, তখন এআইসিসি অফিসে বসে সাংবাদিক সম্মেলন করা ছাড়া ওই আন্দোলনে কোনো ভূমিকা নিতে ভয় পেয়েছে। সংগঠনকে কাজে লাগায়নি। কখনো দিল্লিতে অনুষ্ঠিত কোনো আন্দোলনে কংগ্রেসের কেউ গিয়ে হাজির হলেই সমবেত গোদি মিডিয়া এবং বিজেপি সেই আন্দোলনকে ‘রাজনৈতিক সুবিধাবাদ’ বলে দেগে দিয়েছে। এমনকি আন্দোলনকারীরাও আপত্তি করেছেন। ২০১৫ সালে যন্তর মন্তরে প্রাক্তন সেনাকর্মীদের আন্দোলনে রাহুল হাজির হওয়ায় তাঁকে আন্দোলনকারীরাই চলে যেতে বলেন।

২০২০-২১ সালের কৃষক আন্দোলনের সময়ে পাঞ্জাবে কংগ্রেস সরকার থাকা সত্ত্বেও দিল্লির আন্দোলনে কংগ্রেসের কোনো ভূমিকা ছিল না বললেই চলে। পাঞ্জাবের মুখ্যমন্ত্রী ক্যাপ্টেন অমরিন্দর সিং (পরে কংগ্রেস ছেড়ে নিজের দল খোলেন, এখন আবার বিজেপিতে যোগ দিয়েছেন) আন্দোলনকে মৌখিক সমর্থন জানিয়েছিলেন কেবল। কংগ্রেসের এই নিজের মধ্যে গুটিয়ে থাকা বিজেপিকে ভয়ানক হয়ে উঠতে সাহায্য করেছে। কংগ্রেস শেষমেশ এই সংকোচ কাটিয়ে ওঠে রাহুলের ভারত জোড়ো যাত্রার মধ্যে দিয়ে।

পশ্চিমবঙ্গে সিপিএম তথা বাম দলগুলোর সংকোচ আজও কাটেনি। তার অন্যতম কারণ, তাঁরা কংগ্রেসের মত কোনো নতুন বয়ান খাড়া করতে পারেননি। যে শিল্পায়ন হয়নি তার জন্য এবং ব্যর্থ মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের জন্য অশ্রুপাত করা ছাড়া তাঁদের বক্তব্য বলতে তৃণমূলের দোষগুলো দেখিয়ে দেওয়া। সিপিএম সদস্য, সমর্থকরা এখনো ‘গর্বের ৩৪’ নিয়ে বিভোর। এখনো নিজেরাই মেনে নিতে পারেননি যে ৩৪ বছরের সবটাই গর্বের হলে সংখ্যাটা উনচল্লিশে পৌঁছত, চৌত্রিশে থেমে যেত না। ফলে এখনো তাঁদের আমল নিয়ে বনলতা সেনগিরি করে সিপিএম নেতাকর্মীদের স্তব্ধ করে দেওয়া যায়। কোনো আন্দোলনের নেতৃত্ব হাতে তুলে নেওয়ার সাহস তাঁরা করে উঠতে পারেন না, পতাকাহীন মিছিলের ডাক দেন। বড়জোর ছাত্র সংগঠন বা যুব সংগঠনের নামে মিছিল, জমায়েত ইত্যাদি করা হয়। এই সংকোচের ফলে পশ্চিমবঙ্গে এক অদ্ভুত রাজনীতি রমরমিয়ে চলছে।

তৃণমূল সরকারের আমলে সরকারি হাসপাতালের ভিতরে সরকারি ডাক্তার ধর্ষিত হয়ে খুন হলেন। ইতিমধ্যেই পরিষ্কার যে প্রথম থেকে ঘটনাটা চেপে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে হাসপাতাল ও পুলিসের তরফ থেকে। স্বাস্থ্য আর স্বরাষ্ট্র – দুটো দফতরই স্বয়ং মুখ্যমন্ত্রীর হাতে। খুনের ঘটনা ৯ অগাস্ট সকালে প্রকাশ্যে আসার পর থেকেই হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ও পুলিসের কাজে, অর্থাৎ সরকারি কাজে, এত অসঙ্গতি যে কলকাতা হাইকোর্টে তো বটেই, সুপ্রিম কোর্টে পর্যন্ত ‘হ্যাঁ স্যার, ভুল হয়ে গেছে স্যার’-এর বাইরে যেতে পারেননি রাজ্য সরকারের কৌঁসুলি।

তবু এখনো তৃণমূল তো বটেই, পশ্চিমবঙ্গের নাগরিক সমাজের একটা অংশও এই আলোচনায় বানতলা, ধানতলা টেনে আনছেন। রাত দখল আন্দোলনের অন্যতম নেত্রী বলে পরিচিত শতাব্দী দাশ গত বুধবারের আনন্দবাজার পত্রিকায় ‘অ-দলীয়, প্রবল রাজনৈতিক’ শীর্ষক প্রবন্ধে লিখেছেন ‘সাধারণ মানুষই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, তাঁদের কাঁধে চেপে কাউকে রাজনৈতিক আখের গোছাতে দেবেন না তাঁরা। বর্তমান শাসনহীনতার বিরুদ্ধে সংগঠিত মিছিল থেকেই হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে, মনুবাদী পিতৃতান্ত্রিক বিজেপিকে এই আন্দোলনের সুবিধা তুলতে দেওয়া হবে না। মনে করিয়ে দেওয়া হয়েছে সিপিএম যুগের বানতলা আর তৃণমূলের কামদুনি, একই সঙ্গে।’ পড়ে গুলিয়ে গেল – আন্দোলনের দাবিটা কী? অনেকের হাতে পোস্টার ছিল এবং মুখে স্লোগান ছিল ‘We want justice’, অর্থাৎ ‘আমরা ন্যায়বিচার চাই’। কার জন্য ন্যায়বিচার? আর জি করে মৃত মেয়েটার জন্যে ন্যায়বিচার, নাকি কামদুনির ধর্ষিতার জন্য ন্যায়বিচার, নাকি বানতলার ধর্ষিতার জন্য ন্যায়বিচার, নাকি এদের সকলের জন্য ন্যায়বিচার? মুশকিল হল, বানতলা আর কামদুনি – দুটো মামলারই নিষ্পত্তি হয়ে গেছে আগেই। ন্যায়বিচার হয়েছে কিনা তা ভিন্ন প্রশ্ন, কিন্তু আর জি করের ঘটনার পরে ওইসব ঘটনার জন্যে আন্দোলন করার তো মানে নেই। বিশেষত বানতলার ন্যায়বিচার তৃণমূল সরকারের কাছে তো চাওয়া যেতে পারে না। চাইলে বামফ্রন্ট সরকারের কাছে চাইতে হয়। যে সরকারের এখন আর অস্তিত্বই নেই, তার বিরুদ্ধে আন্দোলন মোদীর ভারত আর দিদির পশ্চিমবঙ্গেই শুধু সম্ভব। অবশ্য শতাব্দী বা সমমনস্করা বলতেই পারেন, ওই বাক্যগুলোর অর্থ তা নয়। অর্থ হল – এসব অনাচার সিপিএমও আগে করেছে, তৃণমূলও করেছে। অতএব তাদের এই আন্দোলনে প্রবেশ নিষেধ। পশ্চিমবঙ্গের নাগরিক সমাজের অরাজনৈতিক নেতারা এরকমই বলেন সাধারণত। কিন্তু একথা বললে আন্দোলনের লক্ষ্য আরও অস্পষ্ট হবে।

রাজনৈতিক দলগুলোর প্রবেশ না হয় আটকানো গেল, তাদের সহযোগিতা অগ্রাহ্য করা গেল কি? কামদুনির তৃণমূল সরকার রাত দখলের আন্দোলনের বিরোধিতা করেনি। বরং তাদের দখলে থাকা অটো, টোটো ইউনিয়ন বেশি রাতেও যানবাহন সচল রেখে সাহায্য করেছে। বানতলার সিপিএমের শ্রমিক সংগঠন সিটুর দখলে থাকা অ্যাপ ক্যাব চালকদের ইউনিয়নও সহযোগিতা করেছে। তার উপর আন্দোলনকারীরা নিজেরাই মনুবাদী পিতৃতান্ত্রিক বিজেপি সরকারের অধীনে থাকা মেট্রো রেলকে ইমেল করে অনুরোধ জানিয়েছিলেন মেট্রো চালু রাখতে। মেট্রো রেল সে দাবি পূরণ করেছে। এসব না হলে ১৪ তারিখ রাতে কলকাতায় অমন জমায়েত হত কি? হয়েছে ভাল কথা। কিন্তু মেয়েদের রাত দখল কি সফল হয়েছে? প্রশ্নটা তুলতে হচ্ছে, কারণ কদিন পরেই রাজ্য সরকার মহিলাদের রাতে সুরক্ষিত রাখতে যেসব ব্যবস্থা ঘোষণা করেছে, তার অন্যতম হল – মহিলাদের নাইট ডিউটি কম দেওয়া, সম্ভব হলে না দেওয়া। অর্থাৎ রাতের যেটুকু দখল মেয়েদের হাতে এখন আছে, সরকার নিজের অক্ষমতা ঢাকতে সেটুকুও কেড়ে নিতে চায়। তাহলে ‘শাসনহীনতার বিরুদ্ধে সংগঠিত মিছিল’ থেকে দেওয়া হুঁশিয়ারিটা যথেষ্ট জোরদার ছিল কিনা – এই প্রশ্নটা ওঠা উচিত নয় কি?

ঘটনা হল, তথাকথিত নাগরিক আন্দোলনের হুঁশিয়ারি এর চেয়ে বেশি জোরদার হয় না। সেকথা সরকারও জানে। সেই কারণেই কোনো রাজনৈতিক দলের সভা, সমাবেশ, মিছিল হলে যত পুলিস মজুত করা হয় তা এই ধরনের আন্দোলনের জন্য করা হয় না। ২০ অগাস্ট মোহনবাগান-ইস্টবেঙ্গল ম্যাচ বাতিলের পর সমর্থকরা যে প্রতিবাদী জমায়েতের ডাক দিয়েছিলেন, সেটাও অ-দলীয় কিন্তু রাজনৈতিক জমায়েত। অথচ তার প্রতি সরকারের অবিশ্বাস অনেক বেশি ছিল। তাই জমায়েতের ঘোষিত জায়গা (যুবভারতী ক্রীড়াঙ্গন) পর্যন্ত কাউকে যেতেই দেওয়া হয়নি। উপরন্তু কেবল পুলিস নয়, ইস্টার্ন মেট্রোপলিটান বাইপাসে র‍্যাফ পর্যন্ত নামানো হয়। লাঠিও চালানো হয়।

যা-ই হোক, ১৪ অগাস্টের কর্মসূচি অন্তত একটা ব্যাপারে সফল। সরকার ভেবেছিল ওইদিন ওই প্রতিবাদ হতে দিলে পরদিন থেকে প্রতিবাদ থিতিয়ে যাবে। কিন্তু তা ঘটেনি। ফলে এখন দেখা যাচ্ছে সরকার বলছে, সাধারণ মানুষের আন্দোলনে বিরোধীরা ঢুকে পড়ে সরকারের বিরুদ্ধে চক্রান্ত করছে। মৃতার জন্যে ন্যায়বিচার আদায় করা নয়, এর উদ্দেশ্য সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করা। যেহেতু বিজেপি নেতা শুভেন্দু অধিকারী, পরে বামেরাও, মমতার পদত্যাগের দাবি তুলেছেন, সেহেতু একথা আরও বেশি করে বলা হচ্ছে। এতে তৃণমূল আপত্তি করতেই পারে, শঙ্কিতও হতে পারে। কিন্তু তৃণমূলের স্বার্থ যাঁদের স্বার্থ নয়, তাঁরা আপত্তি করবেন কেন? অথচ করছেন। এখানেই পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতির জটিলতা, দ্বিধা।

একনায়কতন্ত্রের সঙ্গে মিল বাড়ছে পশ্চিমবঙ্গের

লক্ষণীয় যে ২০১১ সালের পর থেকে পশ্চিমবঙ্গে একাধিক ভয়ানক ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে এবং পার্ক স্ট্রিট থেকে হাঁসখালি – প্রায় কোথাও মুখ্যমন্ত্রী ধর্ষিতাকে নিয়ে কুমন্তব্য করে ব্যাপারটাকে লঘু করে দিতে ছাড়েননি। তবু বিরোধীরা তাঁর পদত্যাগ দাবি করেনি। তুলনায় এবারে মুখ্যমন্ত্রী অনেক সংযত। প্রথমদিনই বলে দিয়েছিলেন যে মৃতার বাবা-মা চাইলে সিবিআই তদন্তে তাঁর আপত্তি নেই। তাহলে এবার বিরোধীরা পদত্যাগ চাইছেন কেন? কারণটা সহজবোধ্য। মুখ্যমন্ত্রীর কাজের চেয়ে তো আর কথার গুরুত্ব বেশি নয়। এবারের ঘটনায় যুক্ত দুটো দফতরই মুখ্যমন্ত্রীর নিজের হাতে এবং তারা নিজেদের কাজে বিস্তর গাফিলতি করেছে তা ঘটনার দিন থেকেই বোঝা যাচ্ছিল। পরবর্তীকালে হাইকোর্ট এবং সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিরাও সেই মতই ব্যক্ত করেছেন। এ রাজ্যে এমনিতে তৃণমূলের রাজনৈতিক বিরোধীরা ছাড়া প্রায় সকলেই যে কোনো দুর্নীতি, আইনশৃঙ্খলার অবনতির ঘটনায় বলেন – দোষীরা তৃণমূলের লোক হলেও মুখ্যমন্ত্রীর দোষ নেই। সাধারণ ভোটাররাও সাধারণত তাই মনে করেন। হাজারো কেলেঙ্কারি সত্ত্বেও একের পর এক নির্বাচনে তৃণমূলের জয়ের বড় কারণ মমতার এই ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা। রাজ্যের সবচেয়ে গরিব মানুষ, যিনি হয়ত স্থানীয় তৃণমূল নেতাদের দৌরাত্ম্যে অতিষ্ঠ, তাঁরও বিশ্বাস ‘দিদির পার্টির ছেলেগুলো বদমাইশ। দিদি কী করবে?’ কিন্তু আর জি করের ঘটনায় এরকম বলার কোনো উপায় নেই।

শিক্ষা দুর্নীতিতে সব দোষই শিক্ষামন্ত্রী পার্থ চ্যাটার্জি এবং আমলাদের উপর চাপিয়ে দেওয়া গিয়েছিল। গরু পাচার, কয়লা পাচার ইত্যাদি মামলায় তো অভিযুক্ত বা গ্রেফতার হওয়া ব্যক্তিদের সঙ্গে মুখ্যমন্ত্রীর সংযোগ আবিষ্কার করার প্রশ্নই নেই। অনুব্রত মণ্ডল তৃণমূল নেতা বলেই যে মমতা তাঁর থেকে টাকা পান – এমন কথা ইডিও বলেনি। সারদা কেলেঙ্কারিতে দু-একবার মুখ্যমন্ত্রীর নাম এলেও তা গুজবের বেশি এগোয়নি। নারদ কেলেঙ্কারির অভিযুক্তদের সম্পর্কেও মমতা বলতে পেরেছিলেন ‘আগে জানলে ভোটে দাঁড় করাতাম না’। কিন্তু তাঁরই অধীন দুটো দফতর একযোগে খুনের ঘটনায় অবহেলা করল, তিনি কিছুই জানলেন না। উপরন্তু আর জি করের কুখ্যাত অধ্যক্ষ সন্দীপ ঘোষের প্রতি সমবেদনা জ্ঞাপন করলেন সর্বসমক্ষে, তারপর পদত্যাগের কয়েক ঘন্টার মধ্যে তাঁকে অন্য হাসপাতালের অধ্যক্ষ করে দিল তাঁরই দফতর। আদালতের ধমক খেয়ে বাধ্যতামূলক ছুটিতে পাঠানো হল। এত কিছু মুখ্যমন্ত্রীর অগোচরে হয়েছে – একথা চরম মমতাভক্তও কি বিশ্বাস করবে? ২২ তারিখই সুপ্রিম কোর্টে আর জি কর মামলার দ্বিতীয় শুনানিতে সিবিআই অভিযোগ করেছে – অপরাধের অকুস্থলের অবস্থার পরিবর্তন করা হয়েছে মামলা তাদের হাতে যাওয়ার আগেই। প্রধান বিচারপতি ডি ওয়াই চন্দ্রচূড় দেখিয়ে দিয়েছেন যে রাজ্য সরকারের জমা দেওয়া টাইমলাইনে অপরাধীকে শাস্তি দিতে তাদের একনিষ্ঠতা নয়, অনীহাই প্রমাণ হয়।

আইনকানুনের কোনো তোয়াক্কা করা হয়নি। আইনজীবী কপিল সিব্বাল এহেন আচরণের ব্যাখ্যা দিতে খাবি খেয়েছেন। তাই বিচারপতি পরবর্তী শুনানিতে কলকাতা পুলিসের একজন দায়িত্বশীল অফিসারকে উপস্থিত থাকতে বলেছেন, যাঁর কাছে এই অসঙ্গতির সন্তোষজনক উত্তর আছে।

এমতাবস্থায় বিরোধীরা স্বাস্থ্যমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর পদত্যাগ দাবি করলে মহাভারত অশুদ্ধ হবে কেন? যাঁরা বনলতা সেনগিরি অন্যায় মনে করেন না তাঁদের জ্ঞাতার্থে বলা যাক, মমতা নিজে বিরোধী নেত্রী থাকার সময়ে একাধিকবার মুখ্যমন্ত্রীর পদত্যাগ দাবি করেছেন।

উপরের ছবির তারিখগুলো দেখলেই বোঝা যাচ্ছে, ২০০৬ সালে বামফ্রন্ট ২৯৪ আসনের মধ্যে ২৩৫ আসন জিতে আসার পরেও ওই দাবি করেছেন। অর্থাৎ তখন কিন্তু বামফ্রন্টের জনপ্রিয়তা নিয়ে অন্তত সংসদীয় পথে প্রশ্ন তোলার কোনো অবকাশ ছিল না। তবু। সত্যি কথা বলতে, অন্যায় কিছু করেননি। গণতন্ত্রে বিরোধী দলের কাজই হল সরকারের পান থেকে চুন খসলে ক্ষেপে ওঠা। কাজটা মমতা চমৎকার পারতেন। বাম দলগুলো আজ পারে না, জাতীয় স্তরে কংগ্রেসও এই সেদিন পর্যন্ত পারত না। মমতার অবশ্য একটা সুবিধা ছিল। ২০১১ সালের আগের সংবাদমাধ্যম এবং নাগরিক সমাজ মমতাকে ‘আন্দোলনের সুবিধা তুলতে দেওয়া হবে না’ বলত না। সরকারের সমালোচনা করে মমতা রাজ্যের বদনাম করছেন – এই জাতীয় কথা সিপিএম নেতাদের মুখে শোনা গেলেও, নাগরিক সমাজের লোকেরা কখনো বলতেন না। ইতিহাস তো সকলেরই থাকে। মমতারও আছে। তিনি তৃণমূল দল খোলার আগে দীর্ঘকাল কংগ্রেসে ছিলেন। কংগ্রেস আমলে পশ্চিমবঙ্গে যেসব অত্যাচার, অনাচার হয়েছে সেগুলোর দায়ও তাঁর ঘাড়ে চাপা উচিত তাহলে। কারণ তিনি কোনোদিন বলেননি যে তিনি সেসবের জন্যে লজ্জিত। উপরন্তু তিনি পশ্চিমবঙ্গের ইতিহাসের সবচেয়ে কুখ্যাত মুখ্যমন্ত্রী সিদ্ধার্থশঙ্কর রায়ের স্নেহভাজনও ছিলেন। এতৎসত্ত্বেও মমতাকে কংগ্রেসের কুকীর্তি মনে করিয়ে দিয়ে চুপ থাকতে বলত না কেউ। কারণ সেটা অপ্রাসঙ্গিক। কে আগে ক্ষমতায় থাকার সময়ে কী করেছিল, তার জন্যে তার পরবর্তী সরকারের বিরুদ্ধে কথা বলার অধিকার নেই, আন্দোলন করার অধিকার নেই – একথা যারা বলে তারা আসলে স্থিতাবস্থার সমর্থক। কোনো দল বা জোট সরকারে থাকাকালীন কুকর্ম করলে তার শাস্তি হিসাবে ভোটাররা তাদের ক্ষমতাচ্যুত করে অন্য কাউকে ক্ষমতায় আনেন। তাদের শাসন অপছন্দ হলে আবার তাদেরও তাড়ান – এভাবেই গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা চলে। ভোটারদের বিশ্বাস অর্জন করতে বিরোধী দলগুলোকে অনবরত লড়াই করে যেতে হয়, সরকার পক্ষের ভুলের ফায়দা তোলার চেষ্টা করতে হয়। এই কাঠামোর বাইরেও একজন বা কয়েকজন নাগরিক অথবা কোনো সংগঠন নির্দিষ্ট দাবি বা দাবিসমূহ নিয়ে আন্দোলন করতেই পারে। কিন্তু কোনো আন্দোলনে অমুককে ঢুকতে দেব না, তমুককে থাকতে দেব না বলাও যে অগণতান্ত্রিক এবং এক ধরনের বামনাই – তা মনুবাদের বিরুদ্ধে আন্দোলন করা ব্যক্তিরাও উপলব্ধি করছেন না।

আরও পড়ুন সব ধর্ষণ সমান নয়

আন্দোলনে একমাত্র তাকেই ঢুকতে দেব না বলা সঙ্গত, যার বিরুদ্ধে আন্দোলন। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গ জুড়ে এই মুহূর্তে নাগরিক সমাজের বিভিন্ন অংশ যে তথাকথিত অরাজনৈতিক আন্দোলনগুলো করছেন, সেগুলো যে কার বিরুদ্ধে তা প্রায়শই বোঝা যাচ্ছে না। অনেক সময় আন্দোলনকারীরা নিজেরাই জোরের সঙ্গে বলছেন – কারোর বিরুদ্ধে নয়। ২২ তারিখ রাত দখল আন্দোলনের আহ্বায়ক বলে পরিচিত রিমঝিম সিনহা ২৫ অগাস্ট (রবিবার) রাতে ফের টর্চ জ্বেলে, বেগুনি পতাকা নিয়ে এক আন্দোলনের ডাক দিয়েছিলেন। সেই ডাক দেওয়ার ভিডিওতেও এই আন্দোলন কার বিরুদ্ধে তা বলা হয়নি, যদিও বলা হয়েছে ‘আজ ২২ অগাস্ট, প্রায় ১২ দিন কেটে গেল, সুবিচার আসেনি। আর জি করের ঘটনার সঙ্গে জড়িত সকলকে গ্রেফতার করাও হয়নি।’ আন্দোলনের এক বিখ্যাত মুখ, অভিনেত্রী সোহিনী সেনগুপ্ত ২৩ অগাস্ট (শুক্রবার) তারিখের আনন্দবাজার পত্রিকায় লিখেছেন ‘একজনকে থামালে হাজার হাজার গলা আরও জোরে চিৎকার করবে’। এই শিরোনাম দেখে ভাবলাম যে থামাচ্ছে তার বিরুদ্ধে শেষমেশ বোধহয় দুকথা লিখেছেন। কিন্তু পড়তে গিয়ে হতাশ হলাম। উনি বরং লিখেছেন ‘আমাদের প্রত্যেকের নিজস্ব রাজনৈতিক বোধ রয়েছে। সেটা দিয়ে, আর নিজেদের সুবুদ্ধি দিয়ে আমরা ‘অ্যাপলিটিক্যাল’ শব্দটি ব্যবহার করছি। এটার মানে কিন্তু এই নয় যে, আমাদের কোনও পক্ষ নিতে হবে। আমাদের কেন কোনও পক্ষ নিতে হবে? আমাদের নিজের কণ্ঠস্বরই আমাদের পক্ষ।’

ন্যায়বিচার চাই বলছি, কিন্তু কার কাছে চাই বলছি না – এর কারণ কী? দুটো কারণ সম্ভব। ১) কার কাছে ন্যায়বিচার চাইছি নিজেও জানি না, ২) জানি, কিন্তু বলতে চাইছি না। কারণ বললেই বোঝা যাবে যে সে ন্যায়বিচার দিচ্ছে না। এই সত্য তাকে বিপদে ফেলবে। কিন্তু আমি কোনো কারণে তাকে বিপদে ফেলতে চাই না।

সমাজের উচ্চকোটির যথেষ্ট লেখাপড়া জানা নারী (এবং পুরুষরা) যেহেতু এই নাগরিক আন্দোলনের মুখ, সেহেতু প্রথম সম্ভাবনাটা বাতিল করে দেওয়াই শ্রেয়। সোহিনী তাঁর লেখার উপর্যুক্ত অংশের পরেই একটা বাচ্চা মেয়ের উল্লেখ করে লিখেছেন সে-ও হাতে মোমবাতি নিয়ে চিৎকার করতে করতে ন্যায়বিচার দাবি করেছে। তারপর মন্তব্য করেছেন ‘সে রাজনীতির কী বোঝে?’ প্রশ্ন হল, সে ন্যায়বিচারেরই বা কী বোঝে? তাকে বড়রা কিছু একটা বুঝিয়েই তো নিয়ে এসেছিলেন প্রতিবাদে? তা আর জি কর কাণ্ড যেভাবে গড়িয়েছে গত কয়েক দিনে, তাতে ওই বাচ্চা মেয়ের বড়রা নিশ্চয়ই বুঝে গেছেন যে যথাসময়ে এফআইআর না করে, মৃতার বাবা-মাকে বিভ্রান্ত করে, এমনকি তড়িঘড়ি মৃতদেহ হাসপাতাল থেকে বার করে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে ন্যায়বিচারের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে এ রাজ্যের সরকারই। কথাটা অনেকে বুঝে গেছেন বলেই শতাব্দী, রিমঝিম, সোহিনীরা ঢোঁক গিললেও ১৪ তারিখ রাতেই এবং তারপর থেকে কোনো কোনো নাগরিক মিছিলেও সরাসরি সরকারবিরোধী স্লোগান শোনা গেছে। তাহলে এবার দ্বিতীয় সম্ভাবনার আলোচনায় আসা যাক।

কী কারণে তৃণমূল সরকারকে বিপদে ফেলতে চাই না? এটাই বাংলার রাজনীতির সেই দ্বিধা, যার কথা এই লেখার প্রথম পর্বে উল্লেখ করেছিলাম। এই রাজ্যে বহু মানুষ আছেন যাঁরা আন্তরিকভাবে বিজেপি-আরএসএসের বিরোধী, আবার এও বোঝেন যে তৃণমূল সরকার বিস্তর অন্যায় করে চলেছে। কিন্তু মনে করেন সিপিএম/বামফ্রন্টকে আর ভোট দেওয়া চলে না (এরকম মনে হওয়ার জন্যে বাম নেতৃত্বের দিশাহীনতা, সাংগঠনিক ব্যর্থতা এবং বিজেপিবিরোধিতায় সিদ্ধান্তহীনতা যথেষ্ট পরিমাণে দায়ী)। অতএব বিজেপিকে আটকাতে তৃণমূলকেই ক্ষমতায় রাখতে হবে।

এই মনোভাবকে প্রশ্ন করার সময় এসে গেছে। নিঃসন্দেহে বিজেপি-আরএসএস যে কোনো রাজ্যের পক্ষেই ধ্বংসাত্মক শক্তি। কিন্তু তৃণমূল যে ধ্বংসাত্মক নয় – একথা কি আর বলা চলে? স্রেফ উল্টোদিকে আরও খারাপ একটা শক্তি আছে – এই যুক্তিতে পার্শ্ববর্তী বাংলাদেশেও শেখ হাসিনার দলের দমনপীড়ন, এমনকি নির্বাচনকে প্রহসনে পরিণত করা মেনে নিয়েও তাঁকেই বহুকাল ধরে সমর্থন করছিলেন প্রগতিশীলরা। কিন্তু মানুষের সহ্যের সীমা থাকে। চৈনিক চক্রান্তই বলুন আর মার্কিন চক্রান্তই বলুন – একটা দল কোনো ভূখণ্ডে বারবার ভোটই হতে দেবে না, সেই ভূখণ্ডের মানুষ তা কতবার কোন কোন যুক্তিতে মেনে নেবেন? পুলিস, অন্যান্য সশস্ত্র বাহিনী এবং শাসক দলের গুন্ডাদের গুলিতে প্রাণ গেলেও মানুষ অন্যদিকে মৌলবাদীরা আছে বলে মুখ বুজে থাকবে – এ জিনিস তো চিরকাল চলে না। স্বীকার্য যে পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভা, লোকসভায় ভোটদানে যে হিংসা, কারচুপি হয় তা এ আমলে নতুন নয়। মমতা ভোটকে হাসিনার মত প্রহসনে পরিণত করেছেন বলা যাবে না। কিন্তু ক্রমশ সেদিকেই এগোচ্ছেন বললে নেহাত ভুল বলা হবে কি?

পরপর দুটো পঞ্চায়েত নির্বাচন কিন্তু প্রহসনেই পরিণত হয়েছে। ২০১৮ সালে পশ্চিমবঙ্গের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি সংখ্যক আসনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছিলেন শাসক দলের প্রার্থীরা। ভোটের দিন রক্তারক্তি দেখতে অভ্যস্ত এই রাজ্যের মানুষও মনোনয়ন পত্র জমা দেওয়ার সময়েই অত মারামারি, মহিলাদের শাড়ি খুলে নেওয়া ইত্যাদি দেখতে অভ্যস্ত ছিলেন না। ২০২৩ পঞ্চায়েত নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয়নি এমন আসনের সংখ্যা নেমে আসে ৯.৫ শতাংশে। কিন্তু তা যত না শাসকের বদান্যতায়, তার চেয়ে বেশি বিরোধীদের লড়াকু মনোভাবের কারণে। মনোনয়ন জমা দেওয়ায় অত্যন্ত কম সময় দিয়ে, জমা দিতে আসা প্রার্থীদের নিরাপত্তা দিতে না পেরে ভোটের আগেই শিরোনামে চলে আসেন রাজ্য নির্বাচন কমিশনার রাজীব সিনহা। তবে আসল খেলা হল ভোট গণনার সময়ে। হিংসা তো হলই, জয়ী প্রার্থীকে আমলারা সার্টিফিকেট দেননি এমন অভিযোগ উঠল। মাঠে ঘাটে ব্যালট ও ব্যালট বাক্স পড়ে থাকতে দেখা গেল, প্রচুর মামলা হল এবং আদালতের নির্দেশে বহু আমলার চাকরি নিয়ে টানাটানি পড়ল।

সিবিআই আর ইডি যে অসংখ্য দুর্নীতির মামলায় তৃণমূলের বিভিন্ন নেতা, মন্ত্রীকে গ্রেফতার ও জিজ্ঞাসাবাদ করেছে সেগুলো থমকে গেছে। ঠিক যেভাবে সারদা ও নারদ মামলার কোনো নিষ্পত্তি হয়নি। তার মানে এই নয় যে তৃণমূল দুর্নীতিমুক্ত। একথা তৃণমূলকে ফ্যাসাদে ফেলতে না চাওয়া মানুষও জানেন। আজ এখানে বাড়ি ভেঙে পড়ছে, কাল ওখানে বাজি তৈরির কারখানায় বিস্ফোরণ হওয়ার পর দেখা যাচ্ছে সেখানে বোমা তৈরি হত, পরশু তৃণমূলের কাউন্সিলররাই প্রকাশ্যে মারামারি করছেন, তার পরদিন কোনো সমাজবিরোধী গ্রেফতার হওয়ায় প্রবীণ বিধায়ক আর সাংসদ (মদন মিত্র, সৌগত রায়) ফোনে খুনের হুমকি পাওয়ার অভিযোগ করছেন – এসব তো এ রাজ্যে চলছিলই। আর জি কর কাণ্ডে দেখা গেল সরকারি হেফাজতে সরকারি কর্মচারীর জান, মালের সুরক্ষাও নেই। সেটা শুধু ধর্ষণ, খুনে প্রমাণিত হয়নি; ১৪ অগাস্ট রাতে হাসপাতালে যে তাণ্ডব চলেছে তাতেও প্রমাণিত হয়েছে। সেদিন ডিউটিতে থাকা নার্সরা জানিয়েছেন, পুলিস তাঁদের নিরাপত্তা দিতে তো ব্যর্থ বটেই, নিজেদের নিরাপত্তার জন্যও তাঁদের কাছেই হাত পেতেছিল। বিজেপি এসে যেতে পারে – স্রেফ এই যুক্তিতে এই চরম নৈরাজ্য দেখেও কি তৃণমূলকে যেনতেনপ্রকারেণ সুরক্ষা দেওয়া চলে? রাজ্যের সব মানুষেরই ভাবার সময় এসেছে।

ভোট তো এখনো অনেক দূরে। ইতিমধ্যে তৃণমূল শুধরেও তো যেতে পারে, যদি টের পায় মানুষ তাদের কর্মকাণ্ডে খুশি নন। কিন্তু প্রাণপণে তাদের অন্যায় ঢাকা দেওয়ার চেষ্টা করলে তো দমনপীড়ন বেড়েই চলবে। ঠিক যা এই মুহূর্তে ঘটছে। ফুটবল মাঠে সমর্থকরা কিছু টিফো দেখাবেন – এই আশঙ্কায় একটা নিরীহ ফুটবল ম্যাচ বাতিল করে দিয়ে আরও বড় প্রতিবাদের রাস্তা খুলে দেওয়া হল। তারপর সেই প্রতিবাদও আটকাতে নিরস্ত্র ফুটবলপ্রেমীদের উপরে লাঠি চালানো হল। এখন স্কুলগুলোকে পর্যন্ত সরকার আদেশ দিচ্ছে – সরকারি অনুষ্ঠান ছাড়া কোনোকিছুতে ছাত্রছাত্রীদের নিয়ে যাওয়া চলবে না।

গণতন্ত্রের চেয়ে একনায়কতন্ত্রের সঙ্গেই যে এই আচরণের মিল বেশি, তা নাগরিক সমাজ স্বীকার না করলে নিজেদের কোনো দলীয় পরিচয় নেই বলে কোন মুখে?

দলহীন প্রতিবাদ সংঘ পরিবারের পক্ষে সুবিধাজনক

সব কথার পরেও রাজনৈতিক দলগুলো সম্পর্কে একটা অরাজনৈতিক আপত্তি উঠবেই। তা হল, দলগুলো নিজেদের রাজনৈতিক স্বার্থ ছাড়া কিছু দেখে না। অতএব প্রতিবাদকে তাদের হাতে চলে যেতে দেওয়া যায় না। এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত হওয়া উচিত কোন রাজনৈতিক দলের স্বার্থ কী তার বিচার করে। যেমন বিজেপি, কংগ্রেস, সিপিএম – সকলেরই রাজনৈতিক স্বার্থ ক্ষমতায় আসা। বিরোধীদের ক্ষমতায় আসতে চাওয়া যে পাপ নয়, একথাটা ২০১১ সালের পর থেকে পশ্চিমবঙ্গের এবং ২০১৪ সালের পর থেকে গোটা দেশের মানুষকে বলে বোঝাতে হয়। সে না হয় হল। কিন্তু এরপরেও বিচার করা দরকার, ক্ষমতায় এলে কে কী করতে পারে? সিপিএম আর কংগ্রেস (একলা বা জোটে) কী করতে পারে তা বোধহয় তারা নিজেরাও ভেবে দেখেনি। সেই কারণেই তাদের ভোট দেওয়ার কথা কেউ ভাবতে পারে না। কিন্তু বিজেপি ক্ষমতায় এলে কী করবে তা নিয়ে বুদ্ধি বিসর্জন না দেওয়া মানুষের সন্দেহের কোনো অবকাশ নেই। নরেন্দ্র মোদী সরকারের কার্যকলাপ দেখে যদি যথেষ্ট শিক্ষা না হয়ে থাকে, তাহলে বিজেপিশাসিত গুজরাট, মণিপুর, ত্রিপুরা, উত্তরপ্রদেশ, হরিয়ানা, মহারাষ্ট্র, আসাম – যে রাজ্য ইচ্ছা হয় দেখে নিন। তাহলেই বিজেপির হাতে প্রতিবাদ চলে যাওয়ার বিপদের সঙ্গে অন্যদের হাতে চলে যাওয়ার ফলের তফাত স্পষ্ট হবে। কিন্তু এসব রাজনৈতিক বিচারে আবার নাগরিক সমাজের লোকেরা যেতে চান না। রাজনৈতিক স্বার্থ তাঁদের কাছে প্রায় অপশব্দ। অনেক মানুষের কাছেই তাই হয়ে দাঁড়ানোর পিছনে রাজনৈতিক দলগুলোর যে কোনো দায় নেই তা নয়। কিন্তু যাঁরা দলগুলোর ঊর্ধ্বে উঠে ন্যায়ের জন্য, রাজ্যের ভালর জন্য দাঁড়িয়েছেন বলে দাবি করেন, তাঁদের কি কোনো স্বার্থ নেই? সেটাও একটু পরখ করে নেওয়া ভাল।

২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনের জন্যে ‘নো ভোট টু বিজেপি’ বলে এক প্রচারাভিযানে নেমেছিল বাংলার নাগরিক সমাজ। বাম কর্মী, সমর্থকরা রুষ্ট হয়েছিলেন। তাঁরা মনে করেছিলেন, এটা ঘুরিয়ে নাক দেখানোর মত করে তৃণমূলকে ভোট দিতে বলা। এই প্রচারাভিযানে যুক্ত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে তৃণমূলের থেকে টাকাপয়সা নেওয়ার ভিত্তিহীন অভিযোগও তুলেছিলেন। তবে পরে বালিগঞ্জ বিধানসভা কেন্দ্রের উপনির্বাচনে এবং ২০২৪ সালে দক্ষিণ কলকাতা লোকসভা কেন্দ্রে ওই প্রচারাভিযানের অন্যতম মুখ সায়রা শাহ হালিমকে সিপিএম প্রার্থী করে। কিন্তু ঘটনা হল, ওই প্রচারাভিযানের উদ্যোগীদের একজন – সামিরুল ইসলাম – পরে তৃণমূলের হয়ে রাজ্যসভায় চলে গেছেন।

‘নো ভোট টু বিজেপি’-কে জনপ্রিয় করতে জরুরি ভূমিকা নিয়েছিল একখানা মিউজিক ভিডিও। সেখানে দেখা গিয়েছিল বাংলা থিয়েটার ও সিনেমা জগতের একগুচ্ছ তারকাকে। সেখানে যেমন সব্যসাচী চক্রবর্তী, চন্দন সেন, রাহুল অরুণোদয় বন্দ্যোপাধ্যায়ের মত মার্কামারা সিপিএম ছিলেন; তেমন ছিলেন দলহীন পরমব্রত চট্টোপাধ্যায়। তিনি সেইসময় বিজেপির বিরুদ্ধে কাগজে লেখালিখিও করেছিলেন। ২০২১ নির্বাচনের কিছুদিন পরেই দেখা গেল, তিনি দেউচা পাঁচামিতে কয়লাখনি হওয়া নিয়ে স্থানীয় মানুষের সঙ্গে সরকারের সমন্বয় সাধনের জন্য তৈরি এক রাজ্য সরকারি কমিটির প্রধান নিযুক্ত হয়েছেন। তিনি কয়লার কী জানেন, খনির কী জানেন, আদিবাসীদেরই বা কী জানেন – তা কি নিজেও জানেন? ২০২৩ সালে এসে এক সাক্ষাৎকারে পরমব্রত জানান যে তিনি ওই কমিটি থেকে পদত্যাগ করেছেন, ‘সেপ্টেম্বর বা অক্টোবরে।’ কারণ তাঁকে যে কাজ দেওয়া হয়েছিল সে কাজ নাকি শেষ হয়ে গেছে। কী কাজ, সে কাজ করতে গিয়ে কী পাওয়া গেল – এই ধরনের কমিটি সম্পর্কে এসব প্রশ্ন ভারতবর্ষে কোনোদিনই কেউ তোলে না। কিন্তু ব্যক্তিগতভাবে অন্তত দুজনকে চিনি, যাঁরা ‘নো ভোট টু বিজেপি’-র লোকেদের তৃণমূল সরকারের থেকে এরকম সুবিধা গ্রহণ করা দেখে বিতৃষ্ণায় ২০২৪ নির্বাচনের আগে আর এই ধরনের কোনো উদ্যোগে জড়িত হতে চাননি। নিশ্চিতভাবে এমন মানুষ আরও আছেন। সম্ভবত সে কারণেই এবারে আর ওই ক্যাম্পেনকে অন্তত ওই নামে দেখা যায়নি। কথা হল, দলের ঊর্ধ্বে দণ্ডায়মানরা যদি এমনভাবে ব্যক্তিস্বার্থ চরিতার্থ করেন, তাহলে দলগুলোর দোষ কী? তারা তো তবু কোনো একটা সমষ্টির স্বার্থ চরিতার্থ করতে চায়।

দলগুলোর সততা নেই, বিশেষত কাজে আর কথায় মিল নেই, তাই তাদের বিশ্বাস করা যায় না – এই বয়ান বাংলার নাগরিক সমাজে খুব জনপ্রিয়। কথাটা যে পুরোপুরি মিথ্যে তাও নয়। দলগুলোও সেকথা জানে। গত কয়েক বছরে বামেদের দলের পতাকা বাদ দিয়ে মিছিল, মিটিংয়ের ডাক দেওয়ার অভ্যাস হয়ত তারই স্বীকৃতি। সিপিএমের লোকেদের সংগঠিত মিছিল, রাজ্য সম্পাদক মহম্মদ সেলিম স্বয়ং হাঁটছেন, অথচ বলা হচ্ছে নাগরিক মিছিল – এমন অসংখ্য দৃষ্টান্ত আছে। এমন ব্যানারবিহীন দলীয় অভিযানের সাম্প্রতিকতম উদ্যোগ অবশ্য দক্ষিণপন্থীদের – মঙ্গলবারের নবান্ন অভিযান, যার ডাক দিয়েছিল ‘বাংলার ছাত্রসমাজ’। সে এমন ছাত্রসমাজ যে তাতে সহজেই যুক্ত হয়ে যান ব্যারাকপুরের অর্জুন সিং, সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করে নেন লম্বা সাদা দাড়িওলা এক সাধু। কিন্তু অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে রাজনৈতিক দলগুলোকে অস্বীকার করে বিশ্ব ছাড়ায়ে উঠতে চান যে বিদ্রোহীরা, তাঁদের সততার উদাহরণগুলোও যে নিদারুণ।

যেমন ধরুন দামিনী বেণী বসু। কয়েক মাস আগেই তাঁর একটা লেখা নিয়ে হইচই পড়ে গিয়েছিল। টিনের তলোয়ার নাটকে ধর্ষণে অভিযুক্ত অভিনেতা সুদীপ্ত চট্টোপাধ্যায়কে অভিনয়ের সুযোগ দেওয়ার প্রতিবাদ করে নির্দেশক সুমন মুখোপাধ্যায়কে সোশাল মিডিয়ায় খোলা চিঠি লিখেছিলেন দামিনী। তা নিয়ে একটা ওয়েবসাইটে খবর হয়, পরে সে খবর সরিয়ে দেওয়া হয়। দামিনী দাবি করেন যে সুমনের অঙ্গুলিহেলনেই ওই লেখা সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। এর প্রতিবাদে অন্য এক সাইটে লেখেন। সে লেখায় অন্য অনেক কথার সঙ্গে দামিনী লেখেন, বাংলা থিয়েটারে ‘রেপ-কালচার’ চালু আছে। সুমন দামিনীর সেই লেখার লিখিত উত্তরও দেন। বলা বাহুল্য, দামিনী মিথ্যা অভিযোগ করেছিলেন এমন প্রমাণ যখন নেই, তখন বেশ করেছিলেন। কিন্তু মুশকিল হয়েছে ওই কথায় আর কাজে মিল নিয়ে। গত সপ্তাহে কলকাতার এক বিলাসবহুল হোটেলে বিতরণ করা হয়েছে দেবী অ্যাওয়ার্ডস ২০২৪। অতীতে এই পুরস্কার যাঁরা প্রত্যাখ্যান করেছেন তাঁদের মধ্যে আছেন তামিলনাড়ুর দলিত কবি সুকীর্তা রানি। গতবছর ফেব্রুয়ারি মাসে এই পুরস্কার প্রত্যাখ্যান করার কারণ হিসাবে তিনি ফেসবুকে লেখেন ‘আমি সবে গতকাল জানতে পেরেছি যে এই অনুষ্ঠানের প্রধান স্পনসর হল আদানি গ্রুপ। আমি এমন কোনো সংগঠনের হাত থেকে বা এমন কোনো অনুষ্ঠানে পুরস্কার নিয়ে খুশি হব না, যা আদানির আর্থিক সাহায্যপ্রাপ্ত। কারণ সেটা আমি যে রাজনীতির কথা বলি বা যে আদর্শে বিশ্বাস করি তার পরিপন্থী। তাই আমি এই পুরস্কার গ্রহণ করব না।’

লিঙ্গ রাজনীতি, আদর্শ ইত্যাদি সম্পর্কে দামিনীকে অত্যন্ত সচেতন একজন শিল্পী হিসাবেই আমরা চিনেছি। এবছর ওই পুরস্কারপ্রাপ্ত ১৩ জন মহিলার মধ্যে একজন সেই দামিনী। তাঁর হাতে পুরস্কার তুলে দিয়েছেন কে? বিজেপি নেত্রী স্মৃতি ইরানি। বিজেপি ভারতের একমাত্র রাজনৈতিক দল যাদের নেতারা ধর্ষকের সমর্থনে মিছিল করে; যাদের সরকার ধর্ষণে শাস্তিপ্রাপ্তদের কেবল ক্ষমা করে দেয় না, মালা পরিয়ে, মিষ্টি খাইয়ে বরণ করে নেয়; রাতের অন্ধকারে পুলিস পাঠিয়ে ধর্ষিতার পরিবারকে আটকে রেখে দেহ ছিনিয়ে নিয়ে পুড়িয়ে দেয়। সেই দলের নেত্রীর হাত থেকে হাসিমুখে পুরস্কার নিয়েই দামিনী ক্ষান্ত দেননি। আর জি কর কাণ্ড নিয়েও দুকথা বলে দিয়েছেন সুললিত ইংরিজিতে। হরিবংশ রাই বচ্চন রচিত ‘অগ্নিপথ’ কবিতার লাইন আউড়ে যৌন অপরাধের বিরুদ্ধে লড়ার শপথ-টপথ নিয়েছেন, সেই শপথে গলা মেলানোর জন্য মাইকটা স্মৃতির দিকে এগিয়েও দিয়েছেন।

পুরস্কৃতদের মধ্যে ছিলেন টালিগঞ্জের অভিনেত্রী শুভশ্রী গাঙ্গুলিও। তিনিও পুরস্কার গ্রহণ করে বলেন ‘আমি সম্মানিত এবং কৃতজ্ঞ। কিন্তু সেই কথাতেই ফিরে আসতে হচ্ছে। খুশি নই। আমরা সবাই ভেঙে পড়েছি। আজকে এই পুরস্কার পেয়ে আমি নিশ্চয়ই খুশি, কিন্তু আনন্দ করতে পারছি না।’ শুভশ্রীকে এই পুরস্কার নেওয়ার কয়েকদিন পরে আর জি কর কাণ্ডে ন্যায়বিচার চেয়ে সিনেমা পাড়ার শিল্পীদের মিছিলেও হাঁটতে দেখা গেছে।

একই অঙ্গে এত রূপ দেখে সন্দেহ হয় – এঁদের প্রতিবাদ, আন্দোলনের পিছনেও আসলে নিজের যশলোভ। ওটা নিশ্চিত করতেই কখনো ক্ষমতাসীন তৃণমূলের দোষ নিয়ে চুপ করে থাকা, কখনো বিজেপি নেত্রীর হাত থেকে পুরস্কার নিয়ে যৌন অপরাধের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের ডাক দেওয়া। রাজনৈতিক নেতাদের সম্পর্কে খুব চালু কথা – তাঁরা জনতাকে ভুলিয়ে নিজেদের স্বার্থসিদ্ধি করেন। ১৪ তারিখ রাতে যে মহিলারা রাত দখলের ডাক পেয়ে পথে বেরিয়েছিলেন বা এখন শিল্পীদের মিছিল দেখে উদ্বুদ্ধ হচ্ছেন, তাঁদেরও কি তথাকথিত নাগরিক সমাজের এই নেতৃস্থানীয়রা ভোলাচ্ছেন না? নেতাদের নিদেনপক্ষে ভোট চাইতে আসতে হয়, তাই খানিকটা দায়বদ্ধতা থাকে। নাগরিক সমাজের নেতাদের তো সে চিন্তাও নেই। একটা রাজ্যসভার আসন অথবা সরকারি কমিটির সদস্যপদ, নিদেন কাগজে লেখা বা নাম বেরনো, খবরের চ্যানেলের প্যানেলে গিয়ে বসার ব্যবস্থা করতে পারলেই কাজ হাসিল। তার চেয়ে মহত্তর কোনো ন্যায়বিচার কি সত্যিই তাঁরা চান?

একবিংশ শতকে পৃথিবীর বহু দেশেই অবশ্য এরকম দলবিহীন নাগরিক সমাজের আন্দোলন দেখা যাচ্ছে। অনেকে এই প্রবণতা নিয়ে খুব উৎসাহিত। তাঁরা বলেন এটাই নতুন যুগের রাজনীতি। যুগে যুগে রাজনীতি যে বদলায় সেকথা তো ঠিকই। তবে এখন পর্যন্ত এ ধরনের রাজনীতি কিন্তু কোথাও প্রগতিশীলদের জয়যুক্ত করেনি। ‘অক্যুপাই ওয়াল স্ট্রিট’ কিছু অর্জন করতে পারেনি। তাহরীর স্কোয়ার থেকে শুরু হওয়া আরব বসন্তও কোনো নতুন ভোর নিয়ে আসেনি। বাংলাদেশে কদিন আগে হওয়া বিদ্রোহের পরিণামও যে প্রগতিশীল হবে তা এখনই বলা যাচ্ছে না। সেদেশের বামপন্থী, প্রগতিশীল শক্তির বেশকিছু অপছন্দের ঘটনাও ঘটছে মুহাম্মদ ইউনুসের সরকারের আমলে। উপরন্তু আমাদের দেশে দলবিহীন, পতাকাবিহীন ‘ইন্ডিয়া আগেনস্ট করাপশন’ এবং নির্ভয়া কাণ্ডের পরবর্তী আন্দোলনের পরিণাম হয়েছে ভয়াবহ। হিন্দুত্ববাদীদের ক্ষমতায় আনতে বড় ভূমিকা পালন করেছিল ওই দুটো আন্দোলন। কারণ বোধহয় এই, যে যেখানে কোনো পতাকা নেই সেখানে সংঘ পরিবারের লোকেরা সামাজিক সংগঠন করার দীর্ঘ অভিজ্ঞতা ব্যবহার করে খুব সহজেই সেঁধিয়ে যেতে পারে। সুতরাং রাজনৈতিক দলগুলোকে বাইরে রেখে নাগরিক সমাজের স্বয়ংক্রিয় আন্দোলনকে জয় বলে ভেবে নেওয়া বিপজ্জনক। এতে বেয়াদপ শাসককে শিক্ষা দেওয়া হচ্ছে কিনা তা যেমন ভাবার, তেমনই বিজেপিকে আটকানো হচ্ছে মনে করে বিজেপির রাস্তাই পরিষ্কার করা হচ্ছে কিনা তাও ভেবে দেখা দরকার।

২০১৪ সালে মোদী সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকে এই প্রথম কোনো অ-বিজেপি রাজ্য সরকারের বিরুদ্ধে এত বড় গণআন্দোলন হচ্ছে। কেন পশ্চিমবঙ্গেই এমন হল? যে প্রতিবাদীরা একাধারে ফ্যাসিবিরোধী এবং তৃণমূলের কোনো দোষ দেখতে পান না, তাঁরা কি ভেবে দেখবেন?

নাগরিক ডট নেটে প্রকাশিত

অরাজনীতির হাত থেকে কবে স্বাধীন হবে পশ্চিমবঙ্গের মানুষ?

আমরা ছোট থেকেই শিখে এসেছি – রাজনীতি খুব খারাপ জিনিস। পশ্চিমবঙ্গের যাবতীয় দুরবস্থার মূলে হল রাজনীতি। আমাদের বড়রা আনন্দবাজার পত্রিকা পড়ে দিনরাত এই আলোচনাই করতেন

স্বাধীনতা দিবসে খুব ভোরবেলা ঘুম ভেঙে গেল। মাইকে দেশাত্মবোধক গান ভেসে এসে নয়, একটা স্বপ্ন দেখে।

দেখলাম সেলুলার জেলের সামনে দাঁড়িয়ে নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর আর বাঘাযতীন কীসব আলোচনা করছেন। পাশেই একটা লম্বা বাঁশে ভারতের পতাকা ফুল-টুল দিয়ে বাঁধা রয়েছে, ওঁরা কেউ তুলবেন বোধহয়। মাইকে ঝাঁ ঝাঁ করে ‘কদম কদম বঢ়ায়ে যা’ বাজছে আর আজাদ হিন্দ ফৌজ সাবধান পজিশনে দাঁড়িয়ে আছে। আমি একখানা রেকর্ডার বাগিয়ে ধরে এগিয়ে গেছি, তিনজনের বক্তব্য রেকর্ড করব বলে। কিন্তু তার আগেই নেতাজি হাত নেড়ে কাকে একটা ডাকলেন। দেখি – ক্ষুদিরাম বসু। তিন বয়োজ্যেষ্ঠ মিলে তাঁকেই এগিয়ে দিলেন পতাকা তুলতে। দেখে আমার বুকের ছাতি তো ৫৬ ইঞ্চি হবার জোগাড়। নেতাদের কোট চাইতে ভুলেই গেছি। ক্ষুদিরাম পতাকা তুললেন, একগাদা গাঁদা ফুল ঝরে পড়ল আর গোটা আজাদ হিন্দ ফৌজ ‘জয় হিন্দ’ বলে স্যালুট করল। আমিও উৎসাহের চোটে ‘জয় হিন্দ’ বলে সেলাম ঠুকে ফেলেছি। অমনি কানের কাছে কে যেন বলে উঠল ‘এ কী! এখানে স্লোগান দিচ্ছেন! ছিঃ! এটা একটা জাতীয় অনুষ্ঠান। দয়া করে এটাকে পলিটিসাইজ করবেন না।’ তাকিয়ে দেখি হাফপ্যান্ট পরা সুমন দে। আমি বলতে যাচ্ছিলাম, স্বাধীনতা সংগ্রাম ব্যাপারটাই তো রাজনৈতিক। তাহলে স্বাধীনতা দিবস অরাজনৈতিক হয় কী করে? সেখানে স্লোগান দেওয়া যাবে না-ই বা কেন? কিন্তু তার আগেই রবীন্দ্রনাথ সুমনবাবুর পিঠে মারলেন এক রদ্দা। অঙ্ক না পারলে আমাদের স্কুলের জহরবাবু যেরকম মারতেন, একেবারে সেইরকম। সুমনবাবু করুণ মুখে পিঠে হাত বুলোতে বুলোতে বললেন ‘কেস দেবেন না, প্লিজ’। অমনি আমার ঘুমটা ভেঙে গেল।

এরকম জগাখিচুড়ি স্বপ্ন কেন দেখলাম ভাবতে ভাবতে মনে হল, আমি যে প্রজন্মের লোক তাতে স্বাধীনতা দিবসে এই স্বপ্ন দেখাই স্বাভাবিক। কারণ আমরা ছোট থেকেই শিখে এসেছি – রাজনীতি খুব খারাপ জিনিস। পশ্চিমবঙ্গের যাবতীয় দুরবস্থার মূলে হল রাজনীতি। আমাদের বড়রা আনন্দবাজার পত্রিকা পড়ে দিনরাত যা আলোচনা করতেন তার মোটামুটি নির্যাস হল –

১) পশ্চিমবঙ্গে কোনো কাজ হয় না, কারণ বনধ হয়।
২) পশ্চিমবঙ্গে শিল্প হয় না, কারণ শ্রমিকরা রাজনীতি করে।
৩) পশ্চিমবঙ্গের স্কুলে লেখাপড়া হয় না, কারণ মাস্টাররা রাজনীতি করে।
৪) পশ্চিমবঙ্গের কলেজে ছাত্রছাত্রীরা পড়াশোনা করে না, কারণ রাজনীতি করে।

ফলে ২০১১ সালে যখন বামফ্রন্ট সরকার বিদায় নিল, তখন আমাদের প্রজন্মের অনেকেই স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছিল। আমাদের বড়দের কারো কারো মুখ দেখে মনে হয়েছিল, বাকি জীবনটা বাম শাসনে কাটাতে হবে না বলে দারুণ শান্তি পেয়েছেন। তখন চারপাশে সবাই বলত যে এবার থেকে পশ্চিমবঙ্গে শিল্প হবে, স্কুলে লেখাপড়া হবে, কলেজে ছাত্রছাত্রীরা মন দিয়ে পড়াশোনা করবে, হাসপাতালে চিকিৎসা হবে, ‘চলবে না, চলবে না’ আর চলবে না। এবার থেকে সব চলবে। কারণ রাজনীতি আর চলবে না। রাজনীতি না চললে যে খুব খারাপ হবে, সেকথা তখন বামপন্থী কয়েকজন ক্ষীণ কণ্ঠে বলেছিলেন। কিন্তু সদ্য যে হেরে গেছে তার কথায় কে কান দেয়? তার উপর একটানা ৩৪ বছর শাসন করে যারা হারে, তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগের লম্বা তালিকা থাকে। সেসব থেকে মুখ তুলতে কে চায়? তখন প্রায় সকলেই নিঃসন্দেহ, যে রাজ্যটা একেবারে শেষ হয়ে গেছে। তার জন্যে দায়ী বাম শাসন, কিন্তু কারণ রাজনীতি।

হা হুতাশ ছিল শুধু একজনের জন্য – বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য। কারণ তিনি বামপন্থী সরকারের মুখ্যমন্ত্রী হলেও বুঝেছিলেন যে সবকিছুতে রাজনীতি করা ঠিক নয়। যেমন উন্নয়ন নিয়ে রাজনীতি করা ভীষণ অন্যায়। তাই তিনি রাজনীতির ঊর্ধ্বে উঠে রাজ্যের ছেলেমেয়েদের ভালর জন্যে বাংলায় শিল্প আনতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তাঁর পার্টিই তাঁকে পিছন থেকে ছুরি মারল। তাই তিনি হেরে গেলেন। নেহাত তিনি অসম্ভব ভদ্রলোক, তাই মুখ ফুটে বলেননি ‘ব্রুটাস, তুমিও?’ তাঁর হয়ে আনন্দবাজার আর অন্যান্য সংবাদমাধ্যমগুলোই বলে দিয়েছিল। বিধানচন্দ্র রায় যদি বাংলার রূপকার হন, বুদ্ধদেব তাহলে বাংলার অরাজনীতির জন্মদাতা। তিনি মনে করতেন উন্নয়ন অরাজনৈতিক, তাই পার্টির কৃষক সংগঠনকে না জানিয়ে সিঙ্গুরের জমির প্রতিশ্রুতি দিয়ে দেন রতন টাটাকে। তিনি মনে করতেন শিল্প অরাজনৈতিক, তাই সটান বলে দেন – তাঁর দুর্ভাগ্য যে তিনি এমন একটা পার্টি করেন যারা বনধ ডাকে। বোধহয় তিনি মনে করতেন রাজনীতিও অরাজনৈতিক হলেই ভাল হয়। সেই কারণেই অন্য বামপন্থী দলের কর্মীদের পিছনে পুলিস লাগানো, ইউএপিএ আইনে গ্রেফতার করা ইত্যাদি তাঁর আমলে বেড়ে গিয়েছিল। এসবে অবশ্য আমাদের, মানে ভদ্রলোকদের, কোনো আপত্তি ছিল না। কারণ ওই যে – রাজনীতি খুব খারাপ জিনিস। তখন বিস্তর লেখালিখি হয়েছিল, এখনো বলাবলি হয় – মানুষটা তো ভাল, কিন্তু পার্টিটাই যে খারাপ। মানে কোনোভাবে যদি তৃণমূল কংগ্রেসের সরকারের মুখ্যমন্ত্রী হতে পারতেন বুদ্ধবাবু, তাহলে ভদ্রলোক-ভদ্রমহিলারা সবচেয়ে খুশি হতেন।

এসব ব্যাপার মমতা ব্যানার্জি ভালই বুঝতেন। তাঁকে তো আর এমনি এমনি বড় নেত্রী বলা হয় না। তিনি বুদ্ধবাবুর মত বই-টই লেখা শুরু করলেন। তা দিয়ে ভদ্রলোকদের খুব একটা সন্তুষ্ট করতে পারেননি, কিন্তু একে একে সব জায়গা থেকে রাজনীতি তুলে দিয়ে যারপরনাই প্রিয় হয়েছেন। পশ্চিমবঙ্গে ২০১১ সালের পর থেকে আর কোনো সফল বনধ হয় না। কারণ যে নেত্রী নিজে বিরোধী থাকার সময়ে নিজেই ঘনঘন বনধ ডাকতেন, তিনি মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পরে আর বনধ ডাকেন না। কোনো বিরোধী দল বনধ ডাকলে সরকারি কর্মচারীদের আগের রাতে অফিসে থেকে যেতে হয়, নইলে যে করেই হোক অফিসে পৌঁছতে হয়। ‘ব্রেক অফ সার্ভিস’ ইত্যাদি হুমকি থাকে। বামফ্রন্ট আমলে হাতে মাথা কাটা কো-অর্ডিনেশন কমিটির বিপ্লবী নেতারা কোথায় গেলেন? বিপন্ন সরকারি কর্মচারীরা অনেকসময় বুঝে পান না। বাস ইউনিয়ন, ট্যাক্সি ইউনিয়ন, অটো ইউনিয়ন, টোটো ইউনিয়ন – সবই যেহেতু বাম আমলের মতই শাসক দলের দখলে সেহেতু বনধ ব্যর্থই হয়। কিন্তু কাজ হয় কি? শনি, রবিবারকে কোনো ছুটির দিনের সঙ্গে একদিন বেশি ছুটি দিয়ে যোগ করে দেওয়া, পুজোর অনুদানের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে পুজোর ছুটি বৃদ্ধি – এসব তো হয়েই চলেছে। অবশ্য অরাজনৈতিক কারণে কাজ বন্ধ থাকলে পশ্চিমবঙ্গে কেউ আপত্তি করে না। যত দোষ, রাজনীতি ঘোষ।

পশ্চিমবঙ্গের শ্রমিকরাও আর রাজনীতি করেন না। বাম আমলের প্রবল প্রতাপান্বিত সিটু নিষ্প্রভ। শাসক দলের শ্রমিক সংগঠন শ্রমিকদের অধিকারের জন্যে কী করে কেউ জানে না। কিন্তু বাংলায় শিল্প এসেছে কি? বাংলায় শিল্পপতিরা বছর বছর আসতেন বর্ণাঢ্য শিল্প সম্মেলনে। বাংলায় সৌরভ গাঙ্গুলির মত নতুন শিল্পপতির জন্মও দেখা গেছে তৃণমূল শাসনে। কিন্তু শিল্প কোথায়? শিল্পপতির দেখা পেলেও শিল্পের দেখা না পেয়ে বোধহয় স্বয়ং মুখ্যমন্ত্রীও হতাশ হয়ে পড়েছেন। তাই এবছর আর বিশ্ব বঙ্গ বাণিজ্য সম্মেলন হচ্ছে না।

পশ্চিমবঙ্গের স্কুল নিয়ে বলতে শুরু করলে তো এ লেখা আর শেষ হবে না। বাম আমলের নিখিলবঙ্গ শিক্ষক সমিতির চেয়ে ঢের বেশি দাপট নিয়ে স্কুলে স্কুলে রয়েছে শুধুমাত্র তৃণমূলের শিক্ষক সংগঠন শিক্ষা সেল। বহু স্কুলে প্রধান শিক্ষক নেই, বছরের পর বছর কাজ চলছে ‘টিচার ইন চার্জ’ দিয়ে। বলা বাহুল্য তাঁরা কারা। তাঁদের অনেকের সঙ্গেই শিক্ষকদের গোলমাল গড়াচ্ছে আদালত পর্যন্ত। রাজনীতি নেই, সংগঠন নেই। তাই একা একাই লড়তে হচ্ছে শিক্ষকদের। অবশ্য সে তো সামান্য ব্যাপার। তার চেয়ে অনেক বড় কথা হল, কোনো স্কুলে ছাত্রছাত্রী আছে অথচ মাস্টার নেই। কোথাও আবার মাস্টার আছে অথচ ছাত্রছাত্রী নেই। কেন নেই? সে কেলেঙ্কারি কে না জানে! কিন্তু তা নিয়ে আজ অবধি বিরোধীরা কোনো বড় রাজনৈতিক আন্দোলন করতে পারলেন না। চাকরিপ্রার্থীরা অবশ্য রাজনীতি দূরে রাখার চেষ্টা করে গেছেন আপ্রাণ। মাঝরাত্তিরে পুলিস মহিলা আন্দোলনকারীদের পর্যন্ত টেনে হিঁচড়ে রাস্তা থেকে তুলে নিয়ে গেলেও তাঁরা বলেছেন ‘আমরা কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত নই’। কারণ ওই যে – রাজনীতি খুব খারাপ জিনিস। সে না হয় হল, কিন্তু স্কুলে লেখাপড়া হচ্ছে কি? স্কুলগুলো তো বন্ধ হতে বসেছে। রমরমা বেড়েছে বেসরকারি শীতাতপনিয়ন্ত্রিত স্কুলের। তাতে অবশ্য ভদ্রলোকদের অসুবিধা নেই। ছেলেমেয়েকে ওসব স্কুলে পড়ানোর রেস্ত তাঁদের আছে। তাছাড়া ওইসব স্কুলের একটা বড় গুণ হল – রাজনীতি নেই।

আমাদের বাবা-মায়েদের স্বপ্ন পূরণ করে মমতা কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়েও রাজনীতি বন্ধ করে দিয়েছেন। যাদবপুর বা প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয়ের মত দু-একটা ব্যতিক্রম বাদ দিলে সর্বত্র জাঁকিয়ে বসেছে একমেবাদ্বিতীয়ম তৃণমূল ছাত্র পরিষদ। মাঝে আবার কলেজে ভর্তি হতে গেলে তাদের মোটা টাকা উৎকোচ দিতে হচ্ছিল। নিজে বকাঝকা করেও তা বন্ধ করতে না পেরে কলেজে ভর্তির ব্যবস্থা অনলাইন করে ফেলেছে মমতা সরকার। ছাত্র ইউনিয়নের নির্বাচন বন্ধ সেই ২০১৭ সাল থেকে। আগে নাকি ছাত্রছাত্রীরা রাজনীতি করত বলে কলেজে লেখাপড়া হত না। এখন ছেলেমেয়েরা আর কলেজমুখো হতেই চাইছে না। নামকরা কলেজেও আসন খালি পড়ে থাকছে। কারণ ছাত্রছাত্রীরা জানে, জাতীয় শিক্ষানীতি আর রাজ্য শিক্ষানীতি (এবং দুর্নীতি) মিলিয়ে যা অবস্থা তাতে কলেজে পড়ে ভাত জোটানোর ব্যবস্থা হবে কিনা তার ঠিক নেই। এ রাজ্যে তো স্কুল, কলেজে শিক্ষক নিয়োগও প্রায় বন্ধ। এমএ/এমএসসি, এমনকি পিএইচডি করা ছেলেমেয়েরা সরকারি চাকরিপ্রাপ্ত শিক্ষাকর্মীদের চেয়েও কম বেতনে পড়াতে বাধ্য হচ্ছে আংশিক সময়ের অধ্যাপক হিসাবে অথবা দেদার অনুমোদন দিয়ে রাখা বেসরকারি নড়বড়ে কলেজে। অর্থাৎ কলেজ থেকে রাজনীতি তাড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে শিক্ষাকেও তাড়ানো হয়েছে।

মানে রাজ্যের সবকিছু অরাজনৈতিক হয়ে একটাও উপকার হয়েছে বলা যাবে না। তবু কিন্তু বাঙালির অরাজনীতি প্রেম অম্লান। সংসদে দাঁড়িয়ে যখন নরেন্দ্র মোদী বা অমিত শাহ যে কোনো বিষয়ে ফাঁপরে পড়লেই বলেন ‘বিরোধীরা রাজনীতি করছে’, আমাদের হাসি পায় না, রাগও হয় না। তৃণমূল কংগ্রেস নেতারা ওরকম বললেও আমাদের এখনো মনে হয় – ঠিকই বলছে। যে কোনো আন্দোলনকে বদনাম করার, নাগরিকদের চোখে হেয় করার একই উপায় বিজেপি ও তৃণমূল অবলম্বন করে – ‘দাবি ন্যায্য। কিন্তু বিরোধীরা এ নিয়ে রাজনীতি করছেন।’ যেন রাজনীতি করা এদেশে নিষিদ্ধ। একমাত্র ক্ষমতাসীন পক্ষই যে রাজনীতি অপছন্দ করে তা আমরা খেয়ালই করি না। ক্ষমতাসীনদের সুরে সুর মিলিয়ে আমরা রাজনীতি চাই না, অথচ গণতন্ত্র চাই। মানে স্নান করব, কিন্তু চুল ভেজাব না। অরাজনীতির সাধনা যে আমাদের প্রকৃতপক্ষে হিংস্র একদলীয় শাসনের দিকে নিয়ে গেছে, তা আমরা বুঝেও বুঝতে চাই না। জাতীয় স্তরে কী চলছে সে তো সবাই জানে। অন্য রাজ্যের বহু মানুষ এই অরাজনীতির ফাঁকি ধরে ফেলেছেন। তাই বিজেপিকে ছেঁটে দিয়েছেন ২০২৪ লোকসভা নির্বাচনে। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের অবস্থা কী?

এখানে দ্বিমেরু ভোট হওয়ায় বিজেপির আসন অনেক কমে গেলেও, ভোট কিন্তু বিশেষ কমছে না। উপরন্তু শুধু যে পঞ্চায়েত নির্বাচন ব্যাপারটা পরপর দুবার প্রহসনে পরিণত হল তা নয়, আর সব কলেজের মত মেডিকাল কলেজগুলোতেও প্রায় মাফিয়া হয়ে উঠেছে শাসক দলের ছাত্র সংগঠন। তৃণমূল কংগ্রেস সংলগ্ন ডাক্তার-অধ্যাপকদের একাংশের প্রশ্রয়ে আর জি কর মেডিকাল কলেজ ও হাসপাতাল যে নরককুণ্ড হয়ে উঠেছে তা এখন নিজ মুখে স্বীকার করছেন তৃণমূলেরই নেতা শান্তনু সেন। অবশ্য ওই হাসপাতালের স্নাতকোত্তর স্তরের ছাত্রীর নৃশংস ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ড না ঘটলে এবং নিজের মেয়ে ওই কলেজেরই ছাত্রী না হলে শান্তনু মুখ খুলতেন কিনা সন্দেহ।

আর জি করে অন্য ইউনিয়ন করতে গেলে ছাত্রছাত্রীদের কী হাল করা হয় তা কিন্তু আগেও এই ওয়েবসাইটেই প্রকাশিত হয়েছে। এবারের হত্যাকাণ্ডের মত আরও কত কাণ্ড অন্য মেডিকাল কলেজগুলোতে হওয়ার অপেক্ষায় আছে আমরা জানি না। অথচ আমরা সকলেই বুঝি, এমন আরও ঘটনা অনিবার্য। তবু শাসককে প্রশ্ন করার থেকে বাঙালি ভদ্রজনের কাছে এখনো বেশি গুরুত্বপূর্ণ অরাজনৈতিক থাকা। তাই এবারের স্বাধীনতা দিবস শুরু হল মধ্যরাতে মহিলাদের ডাকা যে আন্দোলন দিয়ে, সেই আন্দোলনের হোতারা বারবার ঘোষণা করে গেলেন – এটা অরাজনৈতিক আন্দোলন। বিখ্যাত অভিনেত্রী সোহিনী সেনগুপ্ত টিভি স্টুডিওতে বসে ধর্ষণ আটকাতে গেলে সমাজের, শিক্ষাব্যবস্থার কী কী সংস্কার করা দরকার সেসব বলার পাশাপাশি জোর দিয়ে বললেন – সরকারি রোষানলে তাঁকে কখনো পড়তে হয়নি। তাই সরকারের বিরুদ্ধে তাঁর কোনো রাগ নেই। এই আন্দোলন মহিলাদের নিরাপত্তা বিষয়ক। তাই কেউ যদি কোনো রাজনৈতিক পতাকা নিয়ে আসে, তাহলে তাকে ‘rudely’ বারণ করা হবে। অরাজনৈতিক সঞ্চালক সুমন দে বা স্টুডিওতে উপস্থিত রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিরাও তাঁকে প্রশ্ন করলেন না, এ রাজ্যের মহিলাদের নিরাপত্তা দেওয়ার দায়িত্ব কার? ভগবানের? তাহলে সরকারের দায়িত্ব কী? সোহিনীকে সরকারি রোষানলে পড়তে হয়নি বলেই যদি সরকারের বিরুদ্ধে তাঁর কোনো বক্তব্য না থাকে, তাহলে আর পাঁচজনের সঙ্গে আন্দোলনে নামার প্রয়োজন কী? আন্দোলনের কেন্দ্রে কি তাঁর স্বার্থ, নাকি যে মেয়েটি নৃশংসভাবে খুন হয়েছে তার স্বার্থ? বিখ্যাতরা এইরকম গা বাঁচানো অবস্থান নিয়ে দিব্যি চলতে পারেন, কারণ সরকারকে যদি বা সংবাদমাধ্যম ক্কচিৎ কদাচিৎ প্রশ্নের মুখে ফেলে, বিখ্যাতদের ফেলে না। তাই পরমব্রত চট্টোপাধ্যায়ও মাঝরাতে অ্যাকাডেমি অফ ফাইন আর্টসের সামনে দাঁড়িয়ে অবলীলাক্রমে বলে যেতে পারেন – কলকাতা দেশের অন্যান্য শহরের থেকে মহিলাদের নিরাপত্তায় এখনো অনেক এগিয়ে। তাই তো এরকম ঘটনা বেশি আঘাত দেয়। তাই তো তাঁরা পথে নেমেছেন। এটা এ দল বনাম ও দলের বিষয় নয় ইত্যাদি।

যে ঘটনার প্রতিবাদে মহিলারা রাস্তায় নেমেছিলেন বুধবার রাতে, সেটা ঘটেছে সরকারি হাসপাতালে। সরকার চালাচ্ছে একটা দল, সেই দলেরই অধীনে রয়েছে পুলিস। সেই পুলিসের বিরুদ্ধেই তথ্যপ্রমাণ লোপাটের অভিযোগ উঠেছে। সরকারি দলের নেতা এক ডাক্তারই মেডিকাল কলেজটা চালান, তিনিই কটু মন্তব্য করেছিলেন মৃতার বিরুদ্ধে। সেই মন্তব্যের প্রতিবাদেই রাতের দখল নেওয়ার ডাক। তাঁরই বিরুদ্ধে উঠেছে মারাত্মক সব অভিযোগ। সুতরাং পরমব্রত ঠিকই বলেছেন। এটা এ দল বনাম ও দলের বিষয় তো নয়ই। এটা একটাই দল বনাম মৃতার পরিবারকে ন্যায়বিচার পাইয়ে দেওয়ার বিষয়। অথচ তিনি ওই দলটার নামে কিছু বলবেন না। কারণ ওই যে – রাজনীতি খুব খারাপ জিনিস।

আনন্দের কথা, অরাজনীতির ধ্বজাধারীদের ডাকে যে হাজার হাজার অখ্যাত মহিলা (এবং পুরুষ) বুধবার রাতে পথে নেমে এসেছিলেন পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন জায়গায় এবং দেশের বিভিন্ন শহরে, তাঁরা এসব ন্যাকামি বোঝেন না। তাঁরা দ্ব্যর্থহীন ভাষায় আর জি কর হাসপাতালের মৃতা ছাত্রীর জন্যে ন্যায়বিচার চেয়ে স্লোগান তুলেছেন। অনেকে টিভি ক্যামেরার সামনে সরাসরি বলেছেন, যাকে গ্রেফতার করা হয়েছে সে সাক্ষীগোপাল। আসল অপরাধীদের ধরতে হবে এবং শাস্তি দিতে হবে। সরকারের কাছ থেকে সরাসরি জবাবদিহি চেয়েছেন তাঁরা। এসব দৃশ্য কালীঘাটের বাড়িতে বসে টিভিতে দেখে মমতা হয়ত অবাক হয়েছেন। অভিমানও করে থাকতে পারেন। তাঁর সরকার এই ‘বেনজির অরাজনৈতিক আন্দোলনের’ (এবিপি আনন্দের ভাষায়) সঙ্গে যে সহযোগিতা করেছে, তার এই প্রতিদান হয়ত তিনি আশা করেননি।

আন্দোলনের হোতারা এতে খুশি হলেন না রেগে গেলেন, তা-ই বা কে জানে! তাঁরা তো ব্যাপারটা অরাজনৈতিক রাখতেই চেয়েছিলেন। তাঁদের তো লক্ষ্য ছিল রাতের দখল নেওয়া, সরকারের বিরোধিতা করা তো নয়। অরাজনৈতিক বলে যে কিছু হয় না তা হয়ত তাঁরা ভুলে গিয়েছিলেন। ফলে রাশ আর হাতে থাকেনি, রাস্তায় নেমে আসা মানুষ সরকারের বিরুদ্ধে পুঞ্জীভূত ক্ষোভ উগরে দিয়েছে। আসলে দুনিয়ায় অরাজনৈতিক বলে যে কিছু হয় না, এটা যেমন ভোলা চলে না, তেমনি একথা ভুললেও চলে না যে জনতা সকলকে চমকে দিতে পারে। বুধবার রাতেও দিয়েছে। নইলে যে কাগজ একদা লিখত ‘যে দেশে ব্রিগেড নাই সেখানে কি গণতন্ত্র নাই?’, তারই টিভি চ্যানেলকে বুধবার লিখতে হত না ‘বিবেকের ডাকে বাংলা জুড়ে ব্রিগেড’। অবশ্য এর মানে হয়ত এটাও হতে পারে, যে ব্রিগেডেও আপত্তি নেই। যদি সেটা অরাজনৈতিক ব্রিগেড হয়।

আরও পড়ুন এই নির্বাচনে দেশ পশ্চাদপসরণ আটকাতে লড়ছে, কিন্তু পশ্চিমবঙ্গ?

মুশকিল হল, অরাজনৈতিক আন্দোলন একবিংশ শতাব্দীতে সারা বিশ্বে বেশ কেতাদুরস্ত হয়ে দাঁড়ালেও কোনো পরিবর্তন ঘটাতে পারেনি, যতক্ষণ না প্রবলভাবে রাজনৈতিক হয়ে উঠেছে। বাংলাদেশে সম্প্রতি যা ঘটেছে তা থেকেও একথাই প্রমাণ হয়। তবে পরিবর্তন ঘটাক আর না-ই ঘটাক, পশ্চিমবঙ্গের ভদ্রমহিলারা যে পথে নেমে আন্দোলন করার প্রয়োজন স্বীকার করেছেন – এটা নিঃসন্দেহে ভাল লক্ষণ। রাত তো দখল হল। আশা করি এরপর থেকে কলকাতার রাস্তায় দিনে মিছিল, জমায়েত বা অবরোধ দেখলে তাঁরা আর বিরক্ত হবেন না। ব্রিগেডে বা একুশে জুলাইয়ের মিটিংয়ে গ্রাম, মফস্বল থেকে আসা মানুষকে দেখে নাক সিঁটকে বলবেন না ‘চিড়িয়াখানা, ভিক্টোরিয়া বেড়াতে এসেছে।’ যার গায়ে লাঠি এসে পড়ে, তার জন্যে রাস্তাই যে একমাত্র রাস্তা – এটুকু মেট্রো, নিজের গাড়ি বা অ্যাপ ক্যাবে চেপে রাত দখল করতে আসা মহিলারা বুঝলেই অরাজনীতির বিরুদ্ধে স্বাধীনতা সংগ্রাম বেশ খানিকটা এগোবে। আর না বুঝলে?

বুধবার রাতেই কে বা কারা আর জি কর হাসপাতালে ঢুকে পড়ে তাণ্ডব চালিয়েছে, এমার্জেন্সি ডিপার্টমেন্টে ভাংচুর করেছে। আন্দোলনরত একমাত্র রাজনৈতিক শক্তি ভারতের গণতান্ত্রিক যুব ফেডারেশন ওই চত্বরে যেখানে অবস্থান বিক্ষোভ করছিল সেই জায়গাটা ভেঙে দেওয়া হয়েছে। তৃণমূল কংগ্রেসের দু নম্বর নেতা অভিষেক ব্যানার্জি জানিয়ে দিয়েছেন, ডাক্তারদের আন্দোলন ন্যায্য। তাঁদের নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। এসব যারা করেছে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

মানে নির্ঘাত স্বাধীনতা দিবস থেকেই ধর্ষণ, খুনের ঘটনার চেয়ে বড় করে তোলা হবে সরকারি হাসপাতালে হামলার ঘটনাকে। অন্যদিকে শনিবার থেকে মমতার দলই পথে নামবে মৃতাকে ন্যায়বিচার পাইয়ে দেওয়ার দাবিতে। অর্থাৎ যাঁর অধীন হাসপাতাল প্রশাসন ঘটনা ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করল, প্রমাণ লোপাট করতে হাসপাতালে ভাঙাভাঙি শুরু করে দিয়েছিল, সেই প্রশাসনের মাথাকে যিনি অন্য হাসপাতালে পুনর্বাসন দিয়েছিলেন – সেই স্বাস্থ্যমন্ত্রী ও পুলিসমন্ত্রীই এবার আন্দোলনকারী সাজবেন। বুধবার রাতের আন্দোলনের হোতাদের যুক্তি মানলে এতে কোনো অসঙ্গতি নেই। কারণ ব্যাপারটার মধ্যে রাজনীতি টেনে আনা অনুচিত। ব্যাপারটা নারী অধিকার সংক্রান্ত। মুখ্যমন্ত্রী নিজে নারী। অতএব।

অরাজনীতির হাত থেকে স্বাধীন হতে না পারলে মানুষকে বোকা বানানোর এই চেষ্টা পশ্চিমবঙ্গে চলতেই থাকবে। আশা করা যাক, বুধবার রাতের পর বাঙালি ভদ্রমহিলারা আর বোকা বনবেন না।

নাগরিক ডট নেটে প্রকাশিত