গোট কত বেড়া খেয়ে যাচ্ছে

গাভস্কর যখন খেলতেন তখন সোশাল মিডিয়া ছিল না, গোট কে তা নিয়েও আলোচনাই হত না। সবার উপরে স্যার ডোনাল্ড জর্জ ব্র্যাডম্যান আর স্যার গারফিল্ড সোবার্স। বাকিরা তারপর – এই সহজ ভাবনায় ক্রিকেট দুনিয়া চলত।

সম্প্রতি কিংবদন্তি সুনীল গাভস্করের সঙ্গে বিবাদে জড়িয়ে পড়েছেন মহাতারকা বিরাট কোহলি। সামনেই টি টোয়েন্টি বিশ্বকাপ। বিরাট তার আগে আইপিএলে রয়্যাল চ্যালেঞ্জার্স ব্যাঙ্গালোরের হয়ে প্রচুর রান করছেন (এই লেখার সময়ে ১৩ ইনিংসে ৬৬৮; গড় ৬৬.১০)। ধারাভাষ্যকাররা, যাঁদের অনেকেই বিশ্ব ক্রিকেটে একদা সফল প্রাক্তন ক্রিকেটার, বিরাটের স্ট্রাইক রেটের সমালোচনা করছিলেন। তাই একটি ম্যাচ জিতিয়ে বিরাট তাঁদের বিরুদ্ধে ক্যামেরার সামনে বিবৃতি দেন। বিরাটের দল এবারের আইপিএলের হারতে হারতে প্রায় প্লে অফের ওঠার দৌড় থেকে ছিটকে গেছে। এমতাবস্থায় প্রাক্তন ক্রিকেটাররা বিরাটের মন্থর ব্যাটিং এবং স্পিনারদের মারার অক্ষমতার সমালোচনা করছেন। বিরাট সেই সমালোচনা থেকে কিছু শেখার বদলে সমালোচকদের দিকেই তোপ দেগেছেন। বলে দিয়েছেন, যারা তাঁর পরিস্থিতিতে পড়েনি তাদের পক্ষে বক্সে বসে সমালোচনা করা সহজ। বাইরের লোক যা খুশি ভেবে নিতে পারে। তিনি বাইরের কে কী বলল তাতে কান দেন না। একথায় গাভস্কর বেজায় চটে বলে দিয়েছেন, বাইরের লোকের কথায় যদি কান না-ই দেয় তো কথার উত্তর দিচ্ছে কেন? আমরা যা দেখব তাই তো বলব। আমাদের তো কারোর বিরুদ্ধে কোনো এজেন্ডা নেই। টিভির পর্দায় দেখা গেছে, গাভস্কর যখন একটি ম্যাচ শুরু হওয়ার আগে মাঠে দাঁড়িয়ে মাইক হাতে এসব কথা বলছেন, তখন কাছেই অনুশীলনরত বিরাট কথাগুলো শুনে কটমটিয়ে তাকিয়েছেন।

এমন হতে পারে না যে বিরাট জানেন না গাভস্কর কত বড় ব্যাটার ছিলেন। আর পাঁচজনের কথার দাম না থাক, গাভস্করের কথার অবশ্যই দাম আছে। অন্যান্য বিশেষজ্ঞদের কথারও বিলক্ষণ দাম আছে। নইলে তাঁদের সমালোচনায় বিরাট ক্ষেপে যেতেন না। তাহলে তিনি ওরকম আক্রমণাত্মক মন্তব্য করলেন কেন? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে আমরা যা পাব, তা হল ঔদ্ধত্য। টেস্ট ক্রিকেটে যখন হেলমেট প্রায় ছিলই না, প্রত্যেক আন্তর্জাতিক দলেই এক বা একাধিক ঘন্টায় ৯০ মাইলের বেশি গতিতে বল করা বোলার ছিল, সেইসময় যিনি প্রথম ব্যাটার হিসাবে দশ হাজার রান করেছিলেন বেশ দুর্বল একটা দলে খেলে, তাঁকে আমল না দেওয়ার ঔদ্ধত্য কী করে তৈরি হল? এর উত্তর লুকিয়ে আছে সোশাল মিডিয়া যুগের এক অদ্ভুত প্রবণতার মধ্যে। প্রবণতাটা হল বিভিন্ন যুগের খেলোয়াড়দের মধ্যে তুলনা করে, এক ধরনের কাল্পনিক র‍্যাঙ্কিং তৈরি করে নিজের সময়ের সেরাকে সর্বকালের সেরা প্রতিপন্ন করা। হালে একটি শব্দের জন্ম হয়েছে খেলার জগতে – GOAT, অর্থাৎ ‘গ্রেটেস্ট অফ অল টাইম’। গাভস্কর যখন খেলতেন তখন সোশাল মিডিয়া ছিল না, গোট কে তা নিয়েও আলোচনাই হত না। সবার উপরে স্যার ডোনাল্ড জর্জ ব্র্যাডম্যান আর স্যার গারফিল্ড সোবার্স। বাকিরা তারপর – এই সহজ ভাবনায় ক্রিকেট দুনিয়া চলত। শচীন তেন্ডুলকরের আমল থেকে এনডর্সমেন্টের দুনিয়ায় কে সর্বকালের সেরা তা নিয়ে মশলাদার আলোচনা শুরু হয়। শচীনের বিদায়ের পর কবে যেন মহেন্দ্র সিং ধোনি গোট হয়ে গেলেন, তাঁর বিদায়ের পর বিরাট।

গাভস্করের হয়ে কথা বলার জন্যে সোশাল মিডিয়ায় ট্রোলবাহিনী নেই, বিরাটের জন্যে আছে। তারা বলে দিয়েছে বিরাটই গোট, কেউ অন্য কিছু বললে দল বেঁধে তেড়ে আসে তাকে গাল দিতে। শুধু তাই নয়, প্রাক্তন ক্রিকেটাররাও অনেকদিন ধরে বিরাটকে ভিভিয়ান রিচার্ডস বা শচীনের সমান বা তার চেয়েও মহান ক্রিকেটারের তকমা দিয়ে চলেছেন। ফলে নির্ঘাত বিরাট নিজেও মনে করেন তিনি সর্বকালের সেরা। তাই গাভস্কর, ম্যাথু হেডেনরা এলেবেলে।

এই গোটে যে আজকাল কত বেড়া খেয়ে ফেলছে খেলার জগতে, তার হিসাব নেই। আমরা যে যুগে বাস করি, সেখানে হাতের ফোনটাতেই চাইলে দেখে ফেলা যায় যে কোনো খেলার কিংবদন্তিদের স্মরণীয় এবং সাধারণ খেলাগুলো। বর্তমান প্রজন্ম চাইলেই পেলে বা দিয়েগো মারাদোনার খেলা দেখে ফেলতে পারে। শচীন বা ভিভ তো বটেই, এমনকি ব্র্যাডম্যানের খেলারও এক-আধটা ক্লিপ সোশাল মিডিয়ায় পাওয়া যায়। সেগুলো দেখলে মাঠের তারতম্য, প্রতিপক্ষের গুণমানের তারতম্য নিজের চোখে দেখা যায়। অন্ধ ভক্ত না হলে বোঝাই যায়, এক যুগের সঙ্গে অন্য যুগের খেলোয়াড় তুলনীয় নয়। খেলার মান নির্ভর করে যে যে জিনিসগুলোর উপরে তার প্রায় কোনোটাই এক নেই, থাকার কথাও নয়। দুনিয়ার সবকিছুই তো প্রতি মুহূর্তে বদলাচ্ছে। সেখানে সর্বকালের সেরা দশ বা পাঁচ বা এক মুখরোচক আড্ডার বিষয়বস্তু হতে পারে বড়জোর। এছাড়া কোনোরকম র‍্যাঙ্কিংয়ের কোনো মানে হয় না।

আরও পড়ুন বড় ক্রিকেটারে নয়, বিরাট ব্র্যান্ডে মোহিত জনগণমন

মুশকিল হল, অধিকাংশ ক্রীড়ামোদী সুচিন্তিত মতামতের মানুষ হয়ে গেলে একনিষ্ঠ ভক্তকুল গড়ে উঠবে না। সেটা না হলে জনপ্রিয় খেলোয়াড়রা যে শত শত ব্র্যান্ডের বিজ্ঞাপনে কাজ করেন, সেগুলো চোখ বন্ধ করে কেনার লোক কমে যাবে। তাহলে স্পনসর পাওয়া যাবে না, খেলাধুলো করে কোটি কোটি টাকা কামানোর রাস্তা বন্ধ হয়ে যাবে। এসব হতে দেওয়া যায় না। তাই খেলোয়াড় নিজে, তার সোশাল মিডিয়া টিম, সংবাদমাধ্যম, খেলার সম্প্রচারক, ধারাভাষ্যকাররা – সকলে মিলে কাল্পনিক র‍্যাঙ্কিং গড়ে তোলেন। তাতে সমসাময়িক কাউকে সর্বকালের সেরার মুকুট দিয়ে দেন। যদি কোনো সম ক্ষমতার খেলোয়াড় থাকেন, তাহলে পোয়া বারো। কে সত্যিকারের গোট তা নিয়ে তর্ক বাধিয়ে ব্যাপারটাকে আরও মুখরোচক করে তোলা হয়। ফুটবলে যেমন লিওনেল মেসি বনাম ক্রিস্টিয়ানো রোনাল্ডো। আমিই সেরা – এই কথা ২৪ ঘন্টার মধ্যে ২৬ ঘন্টা শুনতে শুনতে কোনো কোনো খেলোয়াড়ের বিশ্বাস হয়ে যেতে পারে তিনিই সর্বকালের সেরা। তখন তিনি লিওনেল মেসির মত, রামছাগলের সঙ্গে ছবি তোলাতে পারেন বা বিরাটের মত, প্রাক্তন ক্রিকেটারদের ফালতু মনে করতে পারেন।

কোনো খেলোয়াড় নিজেকে সর্বকালের সেরা মনে করলে এমনিতে বিশেষ ক্ষতি ছিল না। কিন্তু তাঁদের ব্যবহারে সেই মনোভাব প্রকাশ হয়ে পড়লে এখন যা হয়, তা হল তাঁদের অন্ধ ভক্তরা প্রাক্তন খেলোয়াড়দের এবং যারা তেমন ভক্ত নয় তাদের গালিগালাজ করার লাইসেন্স পেয়ে যায়। যখন অতীতের খেলা দেখা প্রায় অসম্ভব ছিল, তখন কিন্তু গাভস্করের ভক্তরা বলত না – বিজয় মার্চেন্ট বা সি কে নাইডু ক্রিকেটের কী বোঝে? এমনকি শচীনের দীর্ঘ ক্রিকেটজীবনের প্রথমদিকের ভক্তরাও বলত না গাভস্কর কী বোঝে? বলত না, কারণ গাভস্কর কখনো তেমন ভাবার মত আচরণ করতেন না। বরং আজীবন নিজের আগের প্রজন্মের ক্রিকেটারদের সম্পর্কে শ্রদ্ধা দেখিয়ে এসেছেন। শচীনও গাভস্করের সঙ্গে কথা বলতেন মাথা নিচু করে, কখনো ফর্ম পড়ে গেলে গাভস্করের পরামর্শ নিতেন। অথচ টেস্ট ক্রিকেটে গাভস্করের সব রেকর্ডই তো শচীন ভেঙে দিয়েছেন। এখন কিন্তু বিরাটের ভক্তরা বলেন, গাভস্কর কে? ও কী বোঝে? রোহিত শর্মার ভক্তরা সোশাল মিডিয়ায় মাঝেমধ্যেই বলে যান, রোহিত একদিনের ক্রিকেটে ভারতের গোট ক্রিকেটার। বিরাট দূরের কথা, শচীনও তাঁর ধারে কাছে আসতে পারেন না। এর কারণ আজকের খেলোয়াড়দের আচরণে এক ধরনের ঔদ্ধত্য প্রকাশ পায়। কারোর কম, কারোর বেশি। কথায় কথায় কাল্পনিক, অযৌক্তিক র‍্যাঙ্কিং তৈরি করে সেই ঔদ্ধত্য উস্কে দেওয়া হয়। কারণ ঔদ্ধত্যের ভাল বাজার আছে। আজকাল খেলার মাঠে সভ্যতা, ভদ্রতার চেয়ে ঔদ্ধত্য, অসভ্যতার কাটতি বেশি।

উত্তরবঙ্গ সংবাদে প্রকাশিত

একনায়কতন্ত্রের ছায়া ঘনাইছে সংসদ ভবনে

একথা পরিষ্কার যে সংসদ কক্ষে নিজের জায়গা বজায় রাখতে হলে বিরোধীদের স্পিকটি নট হয়ে বসে থাকতে হবে। প্রশ্ন করেছ কি মরেছ।

গতবছর ১৮ ডিসেম্বর ছিল বিশ্বকাপ ফুটবলের ফাইনাল। ফাইনালের আগে এবং পরে ভারতের বহু জায়গায় ভারতীয়রা আর্জেন্তিনীয় হয়ে গিয়েছিলেন। নেহাত আর্জেন্টিনা মুসলমান-প্রধান দেশ নয়। নইলে যে হারে আর্জেন্টিনার পতাকা ঝোলানো হয়েছিল পাড়ায় পাড়ায়, কেবল পশ্চিমবঙ্গেই কয়েক হাজার লোকের নামে দেশদ্রোহের মামলা রুজু হয়ে যেত। এখনো সোশাল মিডিয়া খুললে দেখা যাচ্ছে শত শত ভারতীয় একবছর আগের সুখস্মৃতি রোমন্থন করছেন। এবছর ১৮ ডিসেম্বরে বোঝা গেল, ভারত আর আর্জেন্টিনার মিল কেবল ফুটবলপ্রীতিতে নয়।

সবে আর্জেন্টিনায় ক্ষমতায় এসেছে দক্ষিণপন্থী রাষ্ট্রপতি হাভিয়ের মিলেইয়ের লিবার্টি অ্যাডভান্সেজ পার্টির নেতৃত্বাধীন জোট। এসেই দেশের মুদ্রার মূল্য অর্ধেক করে ফেলেছে এবং তা নিয়ে প্রতিবাদ হবে বুঝে নিরাপত্তা বিষয়ক মন্ত্রী প্যাট্রিশিয়া বুলরিখ বলে দিয়েছেন, যেসব সংগঠন বা ব্যক্তি প্রতিবাদে অংশগ্রহণ করবে তাদের ডিজিটাল বা সাধারণ উপায়ে চিহ্নিত করা হবে। তারপর প্রতিবাদ আটকাতে যে নিরাপত্তা বাহিনী ব্যবহার করা হবে তার খরচ প্রতিবাদীদের থেকেই আদায় করা হবে। আরও যোগ করেছেন, আমরা বহুবছর সম্পূর্ণ অরাজকতার মধ্যে কাটিয়েছি। এসব খতম করার সময় এসেছে। আন্দোলন, প্রতিবাদকে ‘এক্সটর্শন’ আখ্যা দিয়ে বলেছেন, রাস্তাঘাটে প্রতিবাদ প্রতিরোধে নাগরিকরা অনেক ভুগেছেন। আর চলবে না। কাণ্ড দেখে বামপন্থী সাংসদ মিরিয়াম ব্রেগমান সোশাল মিডিয়ায় পোস্ট করেছিলেন, বুলরিখ যা ঘোষণা করেছেন তা একেবারে অসাংবিধানিক। প্রতিবাদের অধিকার সব অধিকারের মধ্যে প্রথম অধিকার। তাতে ক্ষমতাসীন জোটের নেতা হোসে লুইস এসপার্ত সটান জবাব দিয়েছেন – হয় কারাগার, নয় বুলেট।

উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী আদিত্যনাথ বা মধ্যপ্রদেশের শিবরাজ চৌহান কি দিল্লি মিউনিসিপাল কর্পোরেশনের বুলডোজার চালানো, প্রতিবাদীর সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করার আইন প্রণয়নের সঙ্গে আর্জেন্টিনার সরকারের কার্যকলাপের আন্তরিক মিল। তবে মিলেই সবে ক্ষমতায় এলেন, জাঁকিয়ে বসতে সময় লাগবে। নরেন্দ্র মোদীর সরকার দুটো মেয়াদ পূর্ণ করতে চলল, তৃতীয় মেয়াদের সম্ভাবনাও উজ্জ্বল দেখাচ্ছে। ফলে তাঁর সরকারের দমননীতি আরও বেপরোয়া হওয়াই স্বাভাবিক। দেশে বেকারত্বের হার ইংরেজ আমলের হারে পৌঁছে গেছে, জিডিপির হিসাব সন্দেহজনক, ছোট ও মাঝারি ব্যবসাগুলো ধুঁকছে, অনাহারের আন্তর্জাতিক সূচকে ভারত নেমেই চলেছে – এসব তথ্য প্রায় সমস্ত মূলধারার সংবাদমাধ্যম পকেটে থাকা সত্ত্বেও চেপে রাখা যাচ্ছে না। বিদেশনীতি বেশ নড়বড়ে দেখাচ্ছে, দক্ষিণ ভারতে যে রাজ্যে বিজেপি সবচেয়ে শক্তিশালী সেখানে বড় হার হল কিছুদিন আগে। এইসব কারণে সম্ভবত মোদী-অমিত শাহরা মাঝে কিছুটা অনিশ্চয়তায় ভুগছিলেন। কিন্তু রাজস্থান, মধ্যপ্রদেশ, ছত্তিসগড়ে বিরাট জয়ে তাঁরা বুঝে ফেলেছেন যে ভারতের প্রাণকেন্দ্র এখনো হাতের মুঠোয়। ফলে কংগ্রেসমুক্ত ভারতের স্লোগান বদলে ফেলা হয়েছে বিরোধীমুক্ত সংসদের অনুচ্চারিত নির্দেশে। তাই আর্জেন্টিনার বিশ্বকাপ জয়ের বর্ষপূর্তির দিনে ইতিহাস সৃষ্টি করে শতাধিক সাংসদকে সাসপেন্ড করে দেওয়া হয়েছে পুরো শীতকালীন অধিবেশন থেকে। কে জানত রোহিত শর্মার ক্রিকেট বিশ্বকাপের স্ট্রাইক রেট টপকে যাবেন দুই বৃদ্ধ – ওম বিড়লা আর জগদীপ ধনখড়! শচীন তেন্ডুলকর সম্পর্কে অভিযোগ ছিল, তিনি নব্বইয়ের ঘরে ঢুকে মন্থর হয়ে যান। সম্প্রতি বিরাট কোহলির বিরুদ্ধেও সেরকম অভিযোগ উঠছে। কিন্তু ওম আর জগদীপ ১৮ তারিখ পর্যন্ত ৯২ জন সাংসদকে সাসপেন্ড করে গতি কমাননি। পরদিনই সোজা ১৪১-এ পৌঁছে গেছেন। প্রধানমন্ত্রীর ভারত অধিনায়কের হাতে বিশ্বকাপ তুলে দেওয়া এবং তা নিয়ে দেশব্যাপী বর্ণাঢ্য প্রচারের অভিলাষ তাঁরই নামাঙ্কিত মাঠে মারা গিয়েছিল, যার অন্যতম কারণ কোহলিদের মন্থর ব্যাটিং। একেবারে সুদে আসলে পুষিয়ে দিচ্ছেন সংসদের দুই কক্ষের কর্ণধার।

কেউ রেগে উঠে বলতেই পারেন, এটা কি ঠাট্টা তামাশার বিষয়? মুশকিল হল, যেভাবে এতজন বিরোধী দলের সাংসদকে সাসপেন্ড করে দেওয়া হয়েছে তাতে সংসদ জায়গাটাই তো তামাশায় পরিণত হয়েছে। সাসপেন্ড হওয়া সাংসদদের অপরাধ কী? কড়া নিরাপত্তা বেষ্টনী পেরিয়ে কী করে চারজন সটান সংসদের ভিতরে ঢুকে পড়ল, তা নিয়ে প্রধানমন্ত্রী আর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বিবৃতি দাবি করা। দুজনেই সংসদের বাইরে এ নিয়ে কথা বলেছেন, সংবাদমাধ্যমে বলেছেন। কিন্তু কিছুতেই সংসদের ভিতরে বলবেন না। কেন বলবেন না? কোনো প্রশ্ন নয়।

সেই রাহুল গান্ধীকে তড়িঘড়ি লোকসভা থেকে সাসপেন্ড করার সময়েই অনেকে সন্দেহ প্রকাশ করেছিলেন যে সরকারের অপছন্দের প্রশ্ন করলে সংসদে টিকতে দেওয়া হবে না। মহুয়া মৈত্রকে সাসপেন্ড করার পদ্ধতি সন্দেহকে বিশ্বাসে পরিণত করল। অবশেষে সরকারের গোঁয়ার্তুমির প্রতিবাদ করার জন্যে ১৪১ জনকে সাসপেন্ড করার পরে আর অন্যরকম ভাবার অবকাশ নেই। একথা পরিষ্কার যে সংসদ কক্ষে নিজের জায়গা বজায় রাখতে হলে বিরোধীদের স্পিকটি নট হয়ে বসে থাকতে হবে। প্রশ্ন করেছ কি মরেছ।

সাসপেনশনের যে কারণ দেখানো হচ্ছে তা যে নেহাতই লোকদেখানো তা বলার অপেক্ষা রাখে না। গৌতম আদানির মালিকানাধীন একটি চ্যানেলে দেখছিলাম বিজেপি মুখপাত্র শাজিয়া ইলমি আর বিজেপিপন্থী সাংবাদিক স্মিতা প্রকাশ বলছেন – সংসদ ভদ্র বিতর্কের জায়গা। বিরোধীদের তাতে আগ্রহ নেই, বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করছিলেন। তাই তাঁদের সাসপেন্ড করেছেন লোকসভার স্পিকার আর রাজ্যসভার চেয়ারম্যান। বহুজন সমাজ পার্টির সাংসদ দানিশ আলিকে ছাপার অযোগ্য গালাগালি দেওয়া বিজেপি সাংসদ রমেশ বিধুরীও তাহলে ভদ্র বিতর্কে লিপ্ত ছিলেন বলে ধরে নিতে হবে। আরেক বিজেপি সাংসদ প্রতাপ সিমহা, যাঁর সই করা পাস নিয়ে সেদিন সংসদ ভবনে ঢুকে পড়েছিলেন চার বিক্ষুব্ধ তরুণ, তিনিও স্পিকারকে ‘ওঁদের সম্বন্ধে কিছু জানি না’ বলেই পার পেয়ে গেলেন। বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির দায় নিতে হল না। অর্থাৎ নিয়ম বিজেপি সাংসদদের জন্যে একরকম, বিরোধী দলের সাংসদদের জন্যে অন্যরকম।

সে ব্যাপারে অবশ্য বিজেপি নেতাদের বিশেষ রাখঢাক নেই। অরুণ জেটলি সংসদের কাজে বাধা দেওয়াকেও সংসদীয় ব্যবস্থার অঙ্গ বলেছিলেন। ২০০১ সালে সংসদ ভবনে সন্ত্রাসবাদী হানার পরে তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লালকৃষ্ণ আদবানি স্বতঃপ্রণোদিতভাবে বিবৃতি দিয়েছিলেন, প্রধানমন্ত্রী অটলবিহারী বাজপেয়ীও বিবৃতি দিয়েছিলেন। এসব বলেও বিজেপি মুখপাত্রদের দমানো যাচ্ছে না। তাঁরা অবলীলাক্রমে বলে দিচ্ছেন, ওসব কবেকার কথা। এখন দিন বদলে গেছে, আজ আর ওসব চলবে না। যা নেহাতই চক্ষুলজ্জার খাতিরে বলছেন না, তা হল গণতন্ত্র-ফন্ত্র আর চলবে না। সে কারণেই তো ইংরেজ আমলের ফৌজদারি দণ্ডবিধির আধুনিকীকরণের নামে নিয়ে আসা হয়েছে এমন আইন যা পুলিসকে দেবে আরও একচ্ছত্র ক্ষমতা। সরকারের আস্তিনে আছে নতুন টেলিযোগাযোগ সংক্রান্ত বিল, যা আইনে পরিণত হলে কোনো ব্যক্তির বা কোনো এলাকার টেলিযোগাযোগ সরকার সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করে দিতে পারবে নিজের বিবেচনা অনুযায়ী। আরও আছে পোস্টাল পরিষেবা সংক্রান্ত আইন, যা মোতাবেক পোস্ট অফিস যে কোনো পার্সেল খুলে ফেলতে পারবে। দরকার বুঝলে তা প্রাপকের কাছে না-ও পাঠাতে পারে।

আরও পড়ুন এক যে ছিল সংসদ 

একনায়কতন্ত্রের ছায়া ঘনিয়ে এল। এদিকে বিরোধীরা তাঁদের অর্ধেকের বেশি সাংসদ সাসপেন্ড হয়ে যাওয়ার পরেও লক্ষ্মী হয়ে সংসদের সিঁড়িতেই ধরনা দিচ্ছেন। কে কটা আসনে লড়বেন তা নিয়ে ইন্ডিয়া জোটের বৈঠকে আলোচনা হচ্ছে, মমতা ব্যানার্জি রাহুল গান্ধীকে পাশ কাটিয়ে জোটের প্রধানমন্ত্রী পদপ্রার্থী হিসাবে মল্লিকার্জুন খড়্গের নাম করছেন। এ রাজ্যের বামেরা আরও এককাঠি সরেস। তাঁরা মীনাক্ষী মুখার্জিকে ইনসাফ যাত্রা নামক কী একটা কর্মসূচিতে নামিয়ে দিয়ে দিবাস্বপ্ন দেখছেন তৃণমূলকে ক্ষমতাচ্যুত করবেন। অথচ বিজেপি ২০২৪ নির্বাচন জিতে গেলে পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যটা থাকবে কিনা, তার বিধানসভার গঠন কী হবে তার ঠিক নেই।

সুতরাং ভারতীয় গণতন্ত্র বাঁচবে কিনা, এ প্রশ্ন করলে একটাই উত্তর দেওয়া চলে – সবই রামের ইচ্ছে।

উত্তরবঙ্গ সংবাদে প্রকাশিত

আবার ফাইনালে হার, ফাটানো যাক দু-একটা বুদ্বুদ এবার

ভারতীয় ক্রিকেটের গোটা বাস্তুতন্ত্র দাঁড়িয়ে আছে সত্যকে অস্বীকার করে। বিশ্বকাপ ফাইনালে হারের পর একাধিক ক্রিকেট ওয়েবসাইট এবং পরিসংখ্যানবিদ সোশাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে দিয়েছেন একটা পরিসংখ্যান – ভারত গত তিনটে বিশ্বকাপে মাত্র চারটে ম্যাচ হেরেছে। এমন অনর্থক পরিসংখ্যান দিয়ে ব্যর্থতা ঢাকার চেষ্টা পৃথিবীর অন্য কোনো দেশে বা এদেশের অন্য কোনো খেলায় হয় না।

সপ্তাহের অর্ধেক কেটে গেল, বিশ্বকাপ ফাইনালে হারের শোকপালন এখনো শেষ হল না। সুড়ঙ্গে আটকে পড়া শ্রমিকদের খোঁজ নিয়েছেন কিনা জানি না, তবে ফাইনালের পর পরাজিত ভারতীয় দলের সদস্যদের পিঠ চাপড়ে দিতে প্রধানমন্ত্রী স্বয়ং সাজঘরে গেছেন। দলের প্রত্যেককে আলাদা করে সান্ত্বনা দিয়েছেন, মহম্মদ শামির মাথাটাকে নিজেদের কাঁধে ঠেসে ধরেছেন, তারপর স্লো মোশনে আবেগাকুল আবহসঙ্গীত সহকারে বেরিয়ে এসেছেন – এই ভিডিও মুক্তি পেয়েছে। অতএব এই শোক পর্ব নির্ঘাত দীর্ঘায়িত হবে। আগে মানুষ শোকে নিস্তব্ধ হয়ে যেত, আজকাল আক্রমণাত্মক হয়ে যায়। শোকের জন্যে যাকে দায়ী করে তার মেয়ে, বউকে ধর্ষণের হুমকি দেয়। অন্তত সেইটা আশা করা যায় আজ সন্ধে থেকে বন্ধ হয়ে যাবে, কারণ অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে কুড়ি বিশের সিরিজ শুরু হয়ে যাচ্ছে। সূর্যকুমার যাদবের নেতৃত্বাধীন দল যদি অস্ট্রেলিয়াকে হারিয়ে দিতে পারে তাহলে তো কথাই নেই। গলার শির ফুলিয়ে সেই কথা বলা যাবে যা এখন বিনীতভাবে বলা হচ্ছে – আমাদের দলটাই সেরা, ওই দিনটা খারাপ গেছিল আর কি। মোদ্দাকথা, কেন আরও একবার একটা আইসিসি ট্রফি জিততে ব্যর্থ হলাম তার কোনো ক্রিকেটিয় বিশ্লেষণ হবে না।

কে-ই বা সেটা চায়? ভারতের কোনো প্রাক্তন ক্রিকেটার কোনো ত্রুটি তুলে ধরেছেন? গত কয়েকদিন বাংলা কাগজ-টাগজ ঘেঁটেও কোথাও রবিবারের হারের কোনো বিশ্লেষণ চোখে পড়ল না। কার চোখে কত জল কেবলই তা মাপা চলছে। সব সংবাদমাধ্যম ‘খলনায়ক’ খুঁজতে শুরু করেনি এটা যতখানি স্বস্তিদায়ক, ততটাই অস্বস্তির কারোর কোনো ক্রিকেটিয় ব্যাখ্যায় না যাওয়া। দল জেতে ক্রিকেটারদের মুনশিয়ানায় আর হারে কপালের দোষে – এই যদি ক্রিকেটভক্ত, বিশেষজ্ঞ, সাংবাদিক এবং টিম ম্যানেজমেন্টের মিলিত সিদ্ধান্ত হয় তাহলে দশ বছর কেন; বিশ বছরেও ট্রফির খরা কাটা শক্ত।

চ্যাম্পিয়নস ট্রফি, ওয়ার্ল্ড টি টোয়েন্টি, বিশ্বকাপ – একটা করে প্রতিযোগিতার কোনো একটা স্তরে ভারতীয় দল মুখ থুবড়ে পড়ে আর ভারতের তাবড় প্রাক্তন ক্রিকেটার, ধারাভাষ্যকার আর সাংবাদিকরা মূলত দুটো কথা ঘুরিয়ে ফিরিয়ে বলতে থাকেন – ১) একটা খারাপ দিন একটা ভাল দলকে রাতারাতি খারাপ করে দেয় না, ২) ভাগ্য খারাপ, তাই খারাপ দিনটা ফাইনালেই এল। কী আর করা যাবে?

সব দেশেই খেলা সম্পর্কে সাধারণ দর্শকের মতামত গঠনে প্রধান ভূমিকা নেন বিশেষজ্ঞ আর সাংবাদিকরা। তাঁরাই দিনের পর দিন এসব বলে চললে ক্রিকেটভক্তদের দোষ দেওয়া যায় না। সবাই তো আর দেখতে পান না অস্ট্রেলিয়া, ইংল্যান্ড বা নিউজিল্যান্ডের প্রাক্তনরা নিজেদের দল হারলে (এমনকি জিতলেও) কীরকম চুলচেরা বিশ্লেষণ করেন, ছোট ছোট ত্রুটিকেও রেয়াত করেন না ধারাভাষ্যে। ভারতের বিশেষজ্ঞ ও সাংবাদিককুল বিসিসিআই প্রযোজিত টিভি সম্প্রচারের আমলে, কর্তাদের চটালে মাঠে ঢোকার অনুমোদন না পাওয়ার যুগে দেশসুদ্ধু লোককে শিখিয়ে দিয়েছেন যে জিতলে সমালোচনা করা হল ছিদ্রান্বেষণ আর হারলে সমালোচনা করতে নেই। দলের পাশে দাঁড়াতে হয়। মুশকিল হল, বারবার ব্যর্থতার ফলে ব্যাপারটা বাংলা ছবির পাশে দাঁড়ানোর মত কঠিন হয়ে যাচ্ছে। পরপর দশটা ম্যাচ জেতার পরে একটা ম্যাচ হেরেছে বলে একথা একটু বেশি কটু শোনাতে পারে। কিন্তু আসলে তো একটা ম্যাচ নয়, ২০১৩ সালের চ্যাম্পিয়নস ট্রফির পর থেকে কোনো আইসিসি টুর্নামেন্ট জিততে পারেনি ভারত। দ্বিপাক্ষিক সিরিজের বাইরে জয় বলতে ২০২৩ এশিয়া কাপ। কিন্তু ক্রিকেট বহির্ভূত কারণে (ক্রিকেটিয় কারণ বাদই দিলাম) পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা, বাংলাদেশের যা অবস্থা তাতে ওটাও না জিতলে আর দল রাখার মানে কী?

আসলে ভারতীয় ক্রিকেটের গোটা বাস্তুতন্ত্র দাঁড়িয়ে আছে সত্যকে অস্বীকার করে। বিশ্বকাপ ফাইনালে হারের পর একাধিক ক্রিকেট ওয়েবসাইট এবং পরিসংখ্যানবিদ সোশাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে দিয়েছেন একটা পরিসংখ্যান – ভারত গত তিনটে বিশ্বকাপে মাত্র চারটে ম্যাচ হেরেছে। এমন অনর্থক পরিসংখ্যান দিয়ে ব্যর্থতা ঢাকার চেষ্টা পৃথিবীর অন্য কোনো দেশে বা এদেশের অন্য কোনো খেলায় হয় না। প্রাথমিক স্তরের ম্যাচের সংখ্যা নক আউট পর্যায়ের চেয়ে কম তো হবেই। প্রাথমিক স্তরের বেশিরভাগ ম্যাচ না জিতলে নক আউটে ওঠা যায় না। সেমিফাইনাল তো দুটোই হয়, ফাইনাল একটা। জগতে যতদিন পাটিগণিত আছে, ততদিন এমনটাই হবে। পিভি সিন্ধু কোনো প্রতিযোগিতার সেমিফাইনালে বা ফাইনালে হারলে তাঁর পক্ষ নিয়ে কেউ বলে না, অধিকাংশ ম্যাচই তো জিতেছিল। অতএব চ্যাম্পিয়ন না হলেও ও-ই সেরা খেলোয়াড়। ফুটবল বিশ্বকাপের ফাইনালে পরাজিত দলের সমর্থকরা ঝরঝরিয়ে কাঁদেন, অনেকে ক্ষিপ্তও হয়ে ওঠেন। কিন্তু তাঁরা বা তাঁদের দেশের প্রাক্তন ফুটবলাররা কখনো বলেন না, অধিকাংশ ম্যাচ জিতেছি। অতএব চ্যাম্পিয়ন না হলেও আমরাই সেরা দল। কিন্তু ভারতীয় ক্রিকেটে এই জাতীয় নির্বুদ্ধিতার প্রদর্শনী দশ বছর ধরে প্রত্যেক প্রতিযোগিতার পরেই হয়ে থাকে। মায়াবাদের দেশ ভারতবর্ষে কেউ একথা স্বীকার করতে রাজি নন, যে নক আউটে বারবার হার অঘটন হতে পারে না। নিজেদের মধ্যে গলদ আছে, সে গলদ খুঁজে বার করতে হবে এবং সংশোধন করতে হবে। আসলে স্বীকার করতে গেলেই একগাদা অপ্রিয় সত্যের মুখোমুখি দাঁড়াতে হবে, অনেক সযত্নলালিত বুদ্বুদ দুম ফটাস হয়ে যাবে। তাতে এই যে কয়েক হাজার কোটি টাকার ক্রিকেট বাণিজ্য, তার সঙ্গে যুক্ত বিবিধ কায়েমি স্বার্থে ঘা লাগবে।

সেই বুদ্বুদগুলোর আলোচনায় যাওয়ার আগে বলে নেওয়া যাক, ক্রিকেট বাস্তুতন্ত্রের কেউ কেউ কখনো কখনো স্বীকার করেন যে বারবার আইসিসি টুর্নামেন্টে ব্যর্থ হওয়া একটা দীর্ঘমেয়াদি সমস্যা। কিন্তু তাঁরাও ব্যাপারটাকে স্রেফ মানসিক বলে আখ্যা দেন। যদি সেটাই ঠিক হয়, তাহলে খেলোয়াড়দের মানসিক সমস্যা দূর করার যেসব অত্যাধুনিক ব্যবস্থা আজকের চিকিৎসাবিজ্ঞানে আছে, বিশ্বের সবচেয়ে ধনী ক্রিকেট বোর্ডকে সেগুলো ব্যবহার করতে আটকাচ্ছে কে? নাকি সেসব করেও ফল একই থেকে যাচ্ছে? এসব প্রশ্ন ক্রিকেট বাস্তুতন্ত্রের লোকেরা তোলেন না।

এবার বুদ্বুদগুলোর দিকে তাকানো যাক।

১. বেশিরভাগ ম্যাচে জয়

এবারের মত বিশ্বকাপে পরপর দশটা ম্যাচ ভারত কখনো জেতেনি, তার চেয়েও বড় কথা এমন দাপটে জেতেনি। সেই কারণে এই দলের বাহবা প্রাপ্য, কিন্তু সেই সুবাদে ২০১৫ আর ২০১৯ সালের ভারতীয় দলগুলোকেও স্রেফ বেশিরভাগ ম্যাচ জেতার জন্য একইরকম ভাল বলে প্রমাণ করতে চাইলে কিছু অপ্রিয় প্রসঙ্গ না তুলে উপায় থাকে না।

২০০৭ সালে ভারত ভীষণ সহজ গ্রুপে ছিল (অন্য দলগুলো বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কা এবং বারমুডা)। তা সত্ত্বেও গ্রুপ স্তর থেকেই বিদায় নেয়। ভারত যেহেতু সবচেয়ে জনপ্রিয় দল, তাই তারা বিদায় নিলে মাঠ ভরে না। তার চেয়েও বড় কথা টিভি রেটিংয়ের বারোটা বেজে যায়। বিজ্ঞাপনদাতাদের বিপুল লোকসান হয়। আইসিসি সেবার বিপুল আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হয়। ফলে ভবিষ্যতে ভারতের দ্রুত বিদায়ের সম্ভাবনা নির্মূল করতেই হত। তাই ২০১১ বিশ্বকাপে ফরম্যাটই বদলে ফেলা হয়। ১৯৯৯ সাল থেকে চালু হয়েছিল গ্রুপ লিগের পর সুপার সিক্স (২০০৭ সালে সুপার এইট) স্তর, তারপর সেমিফাইনাল, ফাইনাল। ২০১১ সালে ফিরে যাওয়া হল ১৯৯৬ সালের ফরম্যাটে। প্রথমে থাকল গ্রুপ স্তর (সাত দলের), তারপর কোয়ার্টার ফাইনাল, সেমিফাইনাল, ফাইনাল। অর্থাৎ একটা দল (পড়ুন ভারত) কমপক্ষে ছটা ম্যাচ খেলবেই গ্রুপ স্তরে, ফাইনাল পর্যন্ত গেলে নটা। ২০১৫ সালে ভারত ছিল পুল বি-তে। সেখানে বাকি ছটা দলের মধ্যে তিনটের নাম আয়ারল্যান্ড, জিম্বাবোয়ে আর সংযুক্ত আরব আমীরশাহী। বাকি তিনটে দলের মধ্যে ছিল ক্ষয়িষ্ণু ওয়েস্ট ইন্ডিজ। এই পুলের সব ম্যাচ জিতে কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠার জন্যেও আলাদা হাততালি প্রাপ্য? কোয়ার্টার ফাইনালে আবার প্রতিপক্ষ ছিল বাংলাদেশ। সেমিফাইনালে কঠিন প্রতিপক্ষের সামনে পড়ামাত্রই মহেন্দ্র সিং ধোনির দল দুরমুশ হয়ে যায়। অস্ট্রেলিয়া জেতে ৯৫ রানে।

পরের বিশ্বকাপে ফের ফরম্যাট বদলে ফেলা হয়, অনিশ্চয়তা আরও কমিয়ে আনা হয়। বিশ্বকাপ ফুটবল জিততে হলে চার-চারটে নক আউট ম্যাচ জিততে হয়। কিন্তু ২০১৯ থেকে ক্রিকেট বিশ্বকাপ জিততে হলে মোটে দুটো – সেমিফাইনাল আর ফাইনাল। ২০০৭ সালের ১৬ দলের বিশ্বকাপকে ছোট করতে করতে করে দেওয়া হল দশ দলের। সবাই সবার বিরুদ্ধে খেলবে, অর্থাৎ কমপক্ষে নটা ম্যাচ খেলা নিশ্চিত হল। প্রথম চারে থাকলেই সোজা সেমিফাইনাল, সেখান থেকে দুটো ম্যাচ জিতলেই কেল্লা ফতে। এই ব্যবস্থায় ভারত আর নিউজিল্যান্ডের লিগের ম্যাচ বৃষ্টিতে ভেস্তে যায়, ইংল্যান্ড বেশ সহজেই ভারতকে পরাস্ত করে। সেমিফাইনালে নিউজিল্যান্ড ভারতকে হারিয়ে দেয়।

আগের লেখাতেই লিখেছি, কীভাবে ত্রিদেব শুকিয়ে মারছে বাকি ক্রিকেট দুনিয়াকে। যাঁদের সত্যিই শুধু ক্রিকেটার নয়, ক্রিকেটের প্রতিও ভালবাসা আছে এবং দশ বছরেরও বেশি আগের ক্রিকেট সম্পর্কে জানা আছে, তাঁরা নিশ্চয়ই মানবেন যে ২০১১ সালের পর থেকে ওয়েস্ট ইন্ডিজ, শ্রীলঙ্কা, দক্ষিণ আফ্রিকা, পাকিস্তান যেখানে পৌঁছেছে তাতে বিশ্ব ক্রিকেটে প্রতিদ্বন্দ্বিতা সীমাবদ্ধ হয়ে গেছে তিন-চারটে দলের মধ্যে। এবারের বিশ্বকাপে দক্ষিণ আফ্রিকা ঘুরে দাঁড়ানোর লক্ষণ দেখাল, কিন্তু ২০১৯ সালে তাদের অবস্থা ছিল টালমাটাল। ফলে আসলে বিশ্বকাপের দাবিদার ছিল ভারত, অস্ট্রেলিয়া, ইংল্যান্ড আর নিউজিল্যান্ড। ভারত একমাত্র অস্ট্রেলিয়াকে হারাতে পেরেছিল। বাকি দুই দলের কাছেই হারে। ২০১৭ চ্যাম্পিয়নস ট্রফিতে গ্রুপের খেলায় হারতে হয়েছিল শ্রীলঙ্কার কাছে আর ফাইনালে শোচনীয় হার হয়েছিল পাকিস্তানের কাছে। ওয়ার্ল্ড টি টোয়েন্টির আলোচনায় যাওয়া অর্থহীন, কারণ সেখানে ২০০৭ সালে খেতাব জয় বাদ দিলে ভারতের অবস্থা আরও করুণ।

সুতরাং বেশিরভাগ ম্যাচে জেতার তথ্যকে গলার মালা করে লাভ নেই। সমস্যাটাও মোটেই স্রেফ মানসিক নয়, দক্ষতাজনিত।

২. দক্ষতার দিক থেকে বিশ্বসেরা

বিশ্বসেরার শিরোপা যে নেই তা তো বলাই বাহুল্য, কিন্তু দক্ষতার দিক থেকে বিশ্বসেরা – এই ধারণাও দাঁড়িয়ে আছে নরম মাটির উপরে। ক্রিকেটে কোনোদিনই দক্ষতা মানে কেবল ব্যাটিং, বোলিং, ফিল্ডিং করার পারদর্শিতা নয়। সঠিক পরিকল্পনার দক্ষতা সমান গুরুত্বপূর্ণ। আজকের ভিডিও অ্যানালিসিস ইত্যাদি অতি উন্নত প্রযুক্তির যুগে সঠিক পরিকল্পনার গুরুত্ব ও ক্ষমতা আরও বেড়ে গেছে। ভারতীয় দল কি সেইখানে অন্য দলগুলোর সমতুল্য? স্মৃতিতে এখনো টাটকা এবারের বিশ্বকাপ ফাইনাল দিয়েই দেখা যাক।

ফাইনালে

ম্যাচের প্রথম বল থেকেই পরিষ্কার হয় যে অস্ট্রেলিয়া একবার ভারতের সঙ্গে খেলা হয়ে যাওয়ার পর দ্বিতীয়বার খেলতে এসেছে অনুপুঙ্খ পরিকল্পনা নিয়ে। প্রত্যেক ভারতীয় ব্যাটারের জন্যে ছিল আলাদা আলাদা পরিকল্পনা।

রোহিত শর্মা প্রত্যেক ম্যাচে ঝোড়ো সূচনা করেছেন, তাঁর বেশিরভাগ চার ছয় হয়েছে অফ সাইডে পয়েন্টের পর থেকে মিড অফ পর্যন্ত এলাকা দিয়ে আর লেগ সাইডে স্কোয়্যার লেগ দিয়ে। অস্ট্রেলিয়া ঠিক ওই দুই জায়গায় সীমানার ধারে ফিল্ডার রেখে বল করা শুরু করে। তার উপর আগের ম্যাচগুলো ভারত যেসব মাঠে খেলেছে তার তুলনায় নরেন্দ্র মোদী স্টেডিয়ামের মাঠ বড়। অন্য ম্যাচে যেসব শটে চার বা ছয় হচ্ছিল, সেগুলোতে এক-দুই রান হতে শুরু করল। ফলে প্রথম দু-এক ওভার রোহিতকে কিছুটা হতাশ করে। তিনি অবশ্য একটু পরেই এই পরিকল্পনাকে পরাস্ত করে মারতে শুরু করেন। তখন আসে দ্বিতীয় পরিকল্পনা। পাওয়ার প্লে শেষ না হতেই গ্লেন ম্যাক্সওয়েলকে দিয়ে স্পিন করানো, যাতে জোরে বোলারের গতি রোহিতকে বড় শট নিতে সাহায্য না করে। তাঁকে যেন অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ করতে হয়, ভুল করার সম্ভাবনা বাড়ে। ম্যাক্সওয়েল প্রথমে মার খেলেও শেষপর্যন্ত এই পরিকল্পনায় ফল হয়, রোহিত বড় শট নিতে গিয়ে আউট হয়ে যান।

শুভমান গিলের মূল শক্তি পয়েন্ট থেকে কভার পর্যন্ত অঞ্চল দিয়ে সামনের পায়ে ড্রাইভ করে বাউন্ডারি পাওয়া আর সামান্য খাটো লেংথের বলে একটুখানি হাত খোলার জায়গা পেলেই স্কোয়্যার কাট করা। তাঁকে কাট করার কোনো সুযোগই দেওয়া হল না এবং অফ সাইডে ফিল্ডারের ভিড় জমিয়ে দেওয়া হল। গিল নিজেও জানেন তাঁর ড্রাইভ কখনো কখনো কিছুটা পথ হাওয়ায় যাত্রা করে, তার উপর সেদিনের পিচটা ছিল মন্থর। ফলে তেমন হওয়ার সম্ভাবনা আরও বেশি। সেই ভাবনায় বিব্রত রাখতে শর্ট কভার দাঁড় করিয়ে দেওয়া হল মুখের সামনে। গিল রান করার জায়গা খুঁজে না পেয়ে হাঁসফাঁস করলেন, তারপর অফের বল জোর করে লেগে ঘুরিয়ে মারতে গিয়ে মিড অনে ক্যাচ দিয়ে আউট হলেন।

বিরাট কোহলিকে চটপট আউট করতে হলে ক্রিজে এসেই তিনি যে খুচরো রান নিতে শুরু করেন তা আটকাতে হয়। লখনৌতে পিচ ছিল আমেদাবাদের মতই মন্থর। সেখানে ইংল্যান্ড কভারে, মিড উইকেট, মিড অফ, মিড অনে লোক দাঁড় করিয়ে সফলভাবে আট বল কোনো রান করতে দেয়নি। নবম বলে তিনি ধৈর্য হারিয়ে জোরে ড্রাইভ করতে গিয়ে মিড অফে ক্যাচ দিয়ে আউট হন। অস্ট্রেলিয়াও তাঁকে মোটামুটি চুপ রাখছিল, কিন্তু মিচেল স্টার্ক একটা ওভারে নো বল করার পর খেই হারিয়ে ফেললেন। কোহলি পরপর তিনটে চার মেরে দিলেন। পরিকল্পনা ব্যর্থ হল। তবু অস্ট্রেলিয়া কোনো সময়েই তাঁকে শট নেওয়ার জন্যে বেশি জায়গা দেয়নি, হাফভলি প্রায় পাননি। যে পিচে বল ব্যাটে আসছে না, সেখানে কোহলির পছন্দের খেলা – বলের গতিকে ব্যবহার করে ফিল্ডারদের ফাঁকে বল ঠেলে দিয়ে দৌড়ে রান নেওয়া – বেশ শক্ত। অস্ট্রেলিয়া অধিনায়ক প্যাট কামিন্স সমেত সব জোরে বোলারই স্লোয়ারের উপর জোর দিচ্ছিলেন। মোটেই দরকার অনুযায়ী রান হচ্ছিল না। উলটো দিকে কে এল রাহুল তো সেদিন বিশ্বকাপের মন্থরতম অর্ধশতরান করেছেন। ফলে কোহলির উপর চাপ বাড়ছিল। যতই মনে হোক তিনি নিশ্চিত শতরানের দিকে এগোচ্ছিলেন আর কপাল দোষে কামিন্সের বলটা ব্যাটে লেগে উইকেটে পড়ল, আসলে কোহলি কখনোই স্বচ্ছন্দ ছিলেন না। ওই পিচে বারবার স্কোয়্যারে বল ঠেলে রান নিতে থাকলে গায়ের দিকে আসা খাটো লেংথের বলে ওভাবে প্লেড অন হওয়া মোটেই অপ্রত্যাশিত নয়।

রাহুলের জন্যে কোনো পরিকল্পনার প্রয়োজন পড়েনি হয়ত। তিনি বেশ কিছুদিন হল একদিনের ক্রিকেট তো বটেই, কুড়ি বিশের ক্রিকেটেও এমনভাবে ব্যাট করেন যা দেখে মনে পড়ে কবীর সুমনের গান “ও গানওলা, আরেকটা গান গাও। আমার আর কোথাও যাবার নেই, কিচ্ছু করার নেই।” সেমিফাইনালে যেরকম নির্ভেজাল পাটা উইকেট পাওয়া গিয়েছিল এবং দেরিতে ব্যাট করতে নামার সুযোগ পেয়েছিলেন, একমাত্র সেরকম ক্ষেত্রেই রাহুলকে চার ছয় মারতে ইচ্ছুক দেখা যায়। অন্যথায় তিনি ওরকম মন্থর ব্যাটিংই করেন, তারপর হয় স্টার্কের বলটার মত একটা দারুণ বলে আউট হয়ে যান, নয়ত উপায়ান্তর নেই দেখে মারতে গিয়ে আউট হন।

মধ্যে ছিলেন শ্রেয়স আয়ার। তাঁর জন্যেও স্পষ্ট পরিকল্পনা ছিল। সাংবাদিক সম্মেলনে শর্ট বল নিয়ে প্রশ্ন করলে তিনি যতই রাগ করুন আর শ্রীলঙ্কা বা নিউজিল্যান্ডের বোলারদের বিরুদ্ধে যতই শতরান হাঁকান; কামিন্স, স্টার্ক, জশ হেজলউডের মত দীর্ঘদেহী জোরে বোলারদের বিরুদ্ধে তিনি যে সামনের পায়ে আসতে ইতস্তত করেন তা সাদা চোখেই দেখা যায়। অস্ট্রেলিয়া অধিনায়ক তাঁকে গুড লেংথে বল করলেন, তিনি সামনের পায়ে না এসে দোনামোনা করে খেলে খোঁচা দিয়ে ফেললেন।

সূর্যকুমার যাদবের শক্তি হল বোলারদের গতিকে কাজে লাগিয়ে মাঠের দুরূহ কোণে বল পাঠানো। আমেদাবাদের পিচে সে কাজটা এমনিতেই শক্ত ছিল। তার উপর অস্ট্রেলিয়া তাঁকে কোনো গতিই দেয়নি। যে বলে আউট হলেন সেটাও ছিল হেজলউডের মন্থর গতির খাটো লেংথের বল।

রবীন্দ্র জাদেজা টেস্টে ব্যাট হাতে দিব্যি ধারাবাহিক, একদিনের ক্রিকেটে মোটেই তা নন। তবু কেন তাঁকে সূর্যকুমারের আগে পাঠানো হয়েছিল তা রোহিত আর রাহুল দ্রাবিড়ই জানেন। কিন্তু তিনিও অলরাউন্ডারসুলভ কিছু করে উঠতে পারেননি। অনেকগুলো বল খেলে মোটে নয় রান করে অসহায়ের মত আউট হন।

এত পরিকল্পনার বিপরীতে ভারতের পরিকল্পনা কীরকম ছিল?

দুনিয়াসুদ্ধ লোক জানে ডানহাতি জোরে বোলার রাউন্ড দ্য উইকেট বল করলে ডেভিড ওয়ার্নার অস্বস্তি বোধ করেন। ইংল্যান্ডের স্টুয়ার্ট ব্রড সব ধরনের ক্রিকেটেই তাঁকে ওইভাবে বল করে বহুবার আউট করেছেন। অথচ মহম্মদ শামি শুরু করলেন যথারীতি ওভার দ্য উইকেট এবং চার হল। ওয়ার্নার ভাগ্যিস আত্মঘাতী শট খেলে আউট হয়ে গেলেন।

ট্রেভিস হেডের অস্বস্তি যে শরীর লক্ষ করে ধেয়ে আসা খাটো লেংথের বলে, তাও সুবিদিত। কিন্তু শামি আর যশপ্রীত বুমরা – দুজনেই তাঁকে অফস্টাম্পের বাইরে বল দিয়ে গেলেন, তিনিও বলের লেংথ অনুযায়ী কখনো সামনের পায়ে কখনো পিছনের পায়ে কভার, মিড অফ দিয়ে রান করে গেলেন। যতক্ষণে মহম্মদ সিরাজ তাঁকে শরীর লক্ষ করে বল করা শুরু করলেন ততক্ষণে ট্রেভিস হেড ক্রিজে জমে গেছেন।

মারনাস লাবুশেন আরেকটু হলে অস্ট্রেলিয়ার বিশ্বকাপ দলে সুযোগই পেতেন না। কারণ তিনি বড় শট নিতে পারেন না বললেই হয়। তাই তাঁর কাজ একটা দিক ধরে থাকা, খুচরো রান নিয়ে স্কোরবোর্ড সচল রাখা। এটাও গোপন তথ্য নয়। খুচরো রান নিতে না পারলেই যে লাবুশেন হাঁকপাক করেন, বিশেষ করে স্পিনারের বিরুদ্ধে আক্রমণাত্মক শট নিতে গিয়ে বিপদে পড়েন তা চেন্নাইয়ের ভারত-অস্ট্রেলিয়া ম্যাচেও দেখা গিয়েছিল। অথচ ফাইনালে তিনি ব্যাট করতে আসার পরে তাঁর উপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করার কোনো চেষ্টা হয়েছিল কি? এক প্রান্ত থেকে স্পিনার এনে মুখের সামনে ফিল্ডার দাঁড় করিয়েও অন্যরকম চেষ্টা করা যেত।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে যে দল পরিকল্পনার দক্ষতায় প্রতিপক্ষের থেকে এতখানি পিছিয়ে থাকে, তাকে দক্ষতায় বিশ্বসেরা কী করে বলা যায়?

. এক দিনের ভুল

কেউ বলতেই পারেন, একটা ম্যাচ হারলেই এত কিছুকে ভুল বলে দেগে দেওয়া অন্যায়। ওই পরিকল্পনা নিয়েই তো টানা দশটা ম্যাচ জিতেছে। ঘটনা হল, ফাইনাল আর দশটা ম্যাচের মতই আরেকটা ম্যাচ – একথা মাইকের সামনে বলতে ভাল, শুনতে আরও ভাল। কিন্তু কোনো ভাল দল ওই কথা বিশ্বাস করে বসে থাকে না। ফাইনালে তো বটেই, যে কোনো নক আউট ম্যাচেই সকলে বেশি তৈরি হয়ে আসে। অস্ট্রেলিয়াই তার জলজ্যান্ত প্রমাণ। আর গত দশ বছর ধরে দেখা যাচ্ছে, ভারত আলাদা প্রস্তুতি নেয় না। সেই কারণেই বারবার অপ্রস্তুত হয়।

এই প্রস্তুতিহীনতা অবশ্য কেবল নক আউটের ব্যাপার নয়, এই বিশ্বকাপের ব্যাপারও নয়। মহেন্দ্র সিং ধোনির আমল থেকেই স্টেজে মেরে দেওয়ার প্রবণতা আর কিছু গোঁড়ামি ভারতীয় দলের মজ্জাগত হয়ে গেছে। সেগুলো কী কী কারণে নক আউটের আগে ভারতকে অসুবিধায় ফেলে না তা যাঁরা এতদূর পড়ে ফেলেছেন তাঁরা বুঝে ফেলেছেন। এবার প্রবণতাগুলো কী তা দেখে নেওয়া যাক:

বিশ্বকাপের দল তৈরি করতে হয় চার বছর ধরে। কিন্তু ২০১৫ বিশ্বকাপের পরের চার বছরেও ভারতীয় টিম ম্যানেজমেন্ট একজন চার নম্বর ব্যাটার ঠিক করতে পারেনি। ২০১৮ সালে অধিনায়ক কোহলি বলে দিয়েছিলেন, আম্বাতি রায়ুডুই হবেন বিশ্বকাপের চার নম্বর। শেষমেশ যখন বিশ্বকাপের দল ঘোষণা হল তখন দেখা গেল রায়ুডু আদৌ দলে নেই। বিজয়শঙ্কর বলে একজন হঠাৎ টিম ম্যানেজমেন্টের ভরসাস্থল হয়ে উঠেছিলেন। কেন তা আজও বোঝা যায়নি। প্রায় খেলা ছেড়ে দেওয়া দীনেশ কার্তিকও বিশ্বকাপ খেলতে চলে গেলেন, রায়ুডু বাদ। দলের অত গুরুত্বপূর্ণ একটা জায়গা নিয়ে অমন ফাজলামি করে কোনো দল কোনোদিন বিশ্বকাপ জেতেনি। পরের চার বছরেও বিস্তর কাটা জোড়ার পরে শ্রেয়সে মনস্থির করতে পারল টিম ম্যানেজমেন্ট, কিন্তু হার্দিক পান্ডিয়া ছাড়া অলরাউন্ডার পাওয়া গেল না। তাঁর বদলে কাজ চালাতে পারেন ভেবে যাঁকে নেওয়া হয়েছিল, সেই শার্দূল ঠাকুরকে বল হাতে দিয়ে নিশ্চিন্ত থাকা যায় না। ব্যাটেও তিনি বিশেষ সুবিধা করতে পারেন না। সেই যে অস্ট্রেলিয়ায় একটা টেস্টে রান করে দিয়েছিলেন, সেই ভরসাতেই আজও তাঁকে অলরাউন্ডার বলে চালানো হচ্ছে। এ সমস্যার একটা সহজ সমাধান হতে পারত, যদি ভারতের ব্যাটাররা কেউ কেউ কাজ চালানোর মত বোলিং করতে পারতেন। এই বিশ্বকাপে যেখানে উইকেটে বল ঘুরেছে, অস্ট্রেলিয়ার হয়ে কাজ চালানোর চেয়ে বেশি কাজই করেছেন গ্লেন ম্যাক্সওয়েল আর হেড। নিউজিল্যান্ডেরও ছিলেন গ্লেন ফিলিপস, ড্যারিল মিচেল, মিচেল স্যান্টনার, রচিন রবীন্দ্ররা। দক্ষিণ আফ্রিকার এইডেন মারক্রামের অফস্পিনও মন্দ নয়। কিন্তু রোহিতের হাতে ঠিক পাঁচজন বোলার। তাঁদের একজন মার খেয়ে গেলে সমূহ বিপদ। ওই পাঁচজন এতটাই ভাল বল করেছেন ফাইনাল পর্যন্ত, যে এই ফাঁকটা ধরা পড়েনি। কিন্তু একদিনের ক্রিকেটে এ ফাঁক বড় ফাঁকি। এ নিয়েই বিশ্বকাপ জিতে গেলে সেও এক ইতিহাস হত। ফাইনালে হেড আর লাবুশেন জমে যেতেই ফাঁকি ধরা পড়ে গেল, অধিনায়ক নিরুপায়।

আরও পড়ুন ভারতীয় ক্রিকেট মানে ফলাফল নিরপেক্ষ ব্যবসা

আমাদের ব্যাটাররা বল করতে পারেন না কেন? বোলারদের ব্যাটের হাতেরই বা কেন উন্নতি হচ্ছে না? এসব প্রশ্ন করলেই মহাতারকাদের মহা ইগোর কথা উঠে আসবে। রোহিত নিজে দীর্ঘকাল কাজ চালানোর মত অফস্পিন বল করতেন, অনেকদিন হল ছেড়ে দিয়েছেন। কোহলিও মিডিয়াম পেস বল করতেন, তিনিও ছেড়ে দিয়েছেন। কেন ছাড়লেন? দলের প্রয়োজন থাকতেও কেন আবার শুরু করেননি? দেবা ন জানন্তি। এঁদের কি এমন কোনো চোট আছে যা বল করলে বেড়ে যেতে পারে? তেমন কোনো খবর নেই কিন্তু।

শচীন তেন্ডুলকরের (ম্যাচ ৪৭০, বল ৮০৫৪, ওভার পিছু রান ৫.১০, উইকেট ১৫৪, সেরা বোলিং ৫/৩২) টেনিস এলবো হয়েছিল, একসময় কোমরে বেল্ট পরে ব্যাট করতে নামতে হয়েছিল, তারপর সেই চোট মাস ছয়েকের জন্যে মাঠের বাইরে পাঠিয়ে দিয়েছিল। তার আগে পরে বল করেছেন, ম্যাচ জিতিয়েছেন। বীরেন্দ্র সেওয়াগও (ম্যাচ ২৫১, বল ৪৩৯২, ওভার পিছু রান ৫.২৬, উইকেট ৯৬, সেরা বোলিং ৪/৬) চোটমুক্ত ছিলেন না, কিন্তু বল করতেন। সৌরভ গাঙ্গুলির (ম্যাচ ৩১১, বল ৪৫৬১, ওভার পিছু রান ৫.০৬, উইকেট ১০০, সেরা বোলিং ৫/১৬) ফিটনেস তো হাস্যকৌতুকের বিষয় ছিল। অথচ বল করে একাধিক স্মরণীয় জয় এনে দিয়েছেন।

সুরেশ রায়না (ম্যাচ ২২৬, বল ২১২৬, ওভার পিছু রান ৫.১১, উইকেট ৩৬, সেরা বোলিং ৩/৩৪) এঁদের মত অত উঁচু দরের ব্যাটার ছিলেন না, কিন্তু মিডল অর্ডারে ভরসা দিয়েছেন একসময়। দরকারে অফস্পিনটাও করে দিতেন।

এদিকে আজকের মহাতারকা ব্যাটারদের কেবল ফিটনেস নিয়েই কয়েকশো প্রবন্ধ লেখা হয়েছে, রোজ লক্ষ লক্ষ গদগদ পোস্ট হয় সোশাল মিডিয়ায়। কিন্তু ওঁরা বল করতে পারেন না। কেদার যাদব বলে একজন ছিলেন। মারকুটে ব্যাট আর খুব নিচ থেকে বল ছেড়ে অফস্পিন করতেন, মারা সোজা ছিল না। বিরাটের সঙ্গে শতরান করে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে একটা স্মরণীয় ম্যাচ জিতিয়েছিলেন। তিনি হঠাৎ কোনো অজ্ঞাত কারণে নির্বাচক ও টিম ম্যানেজমেন্টের বিষনজরে পড়ে বাদ চলে যান ২০২০ সালে।

২০১৪ সালের ইংল্যান্ড সফরে দেখা গিয়েছিল ভুবনেশ্বর কুমারের ব্যাটের হাত রীতিমত ভাল। ট্রেন্টব্রিজ টেস্টের দুই ইনিংসেই অর্ধশতরান করেছিলেন। আবার ২০১৭ সালে পাল্লেকেলেতে যখন শ্রীলঙ্কার বিরুদ্ধে ১৩১ রানে সাত উইকেট পড়ে যায়, তখন অপরাজিত ৫৩ রান করে মহেন্দ্র সিং ধোনির সঙ্গে জুটিতে ১০০ রান তুলে ম্যাচ জিতিয়েছিলেন। মাঝে বেশ কিছুদিন একদিনের দলের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ ছিলেন ভুবনেশ্বর। অথচ তাঁকে গড়েপিটে অলরাউন্ডার করে তুলতে পারেননি সর্বকালের সেরা ভারতীয় দল তৈরি করার কৃতিত্ব যিনি দিনরাত দাবি করেন, সেই রবি শাস্ত্রী, আর তাঁর আদরের দুই অধিনায়ক ধোনি, কোহলি।

এখনকার বোলারদের মধ্যে শামি আর বুমরা দুজনেই যে ব্যাটিং উপভোগ করেন তা টেস্ট ক্রিকেটে স্পষ্ট দেখা যায়। শামি দিব্যি কয়েকটা বড় শট নিয়ে ফেলতে পারেন। বুমরা আরও এক ধাপ এগিয়ে। স্টুয়ার্ট ব্রডকে ঠেঙিয়ে টেস্টে এক ওভারে সবচেয়ে বেশি রান দেওয়ার রেকর্ড করিয়ে নিয়েছেন তিনি।

এঁদের ব্যাটের হাতটা যত্ন করে আরেকটু ভাল করে দেওয়ার কাজটুকুও যদি না পারেন, তাহলে রাহুল দ্রাবিড় আর ব্যাটিং কোচ বিক্রম রাঠোর করেনটা কী? রোহিত, কোহলিকে তো আর হাতে ধরে ব্যাটিং শেখাতে হয় না।

আসলে এসব করতে গেলে নমনীয়তা দরকার। কিন্তু ভারতীয় দলের একদিনের ক্রিকেটের ব্যাটিং আর গোঁড়ামি সমার্থক। বেশিরভাগ পাঠক রে রে করে তেড়ে আসবেন জেনেও না বলে উপায় নেই, শচীন আর সেওয়াগের প্রস্থানের পর থেকে ভারত একদিনের ক্রিকেটে যে ব্যাটিংটা করছিল এতকাল, সেটা গত শতাব্দীর ব্যাটিং। রোহিত আর শিখর ধাওয়ান যেভাবে ইনিংস শুরু করতেন – একজন মারতেন, আরেকজন ধরে ধরে খেলতেন – সেটা করা হত ১৯৯৬ বিশ্বকাপের আগে পর্যন্ত। সনৎ জয়সূর্য আর রমেশ কালুভিথরনা সেই ধারা বদলে দেন। শচীন-সৌরভ, সৌরভ-সেওয়াগ, শচীন-সেওয়াগ মান্ধাতার আমলের ছকে ফেরত যাননি। ২০০০ চ্যাম্পিয়নস ট্রফির ফাইনালে ওঠা, ২০০২ ন্যাটওয়েস্ট ট্রফি জয়, ২০০৩ বিশ্বকাপের ফাইনালে ওঠা, ২০১১ বিশ্বকাপ জয় – এসবের পিছনে ভারতের ওপেনিং জুটির উল্লেখযোগ্য ভূমিকা ছিল।

এদিকে বিশ্বজয়ী অধিনায়ক ধোনি নিজে ‘ফিনিশার’, বিশ্বাস করতেন যে কোনো জায়গা থেকে ম্যাচ জিতিয়ে দেবেন। সম্ভবত সে কারণেই ২০১২ সালে শচীন আর ২০১৩ সালে সেওয়াগের প্রস্থানের পর উইকেট হাতে রেখে খেলার নীতি তিনি চালু করেন। রোহিতের যতদিন বয়স ছিল, ধৈর্য আর রিফ্লেক্স দুটোই ভাল ছিল, ততদিন লম্বা ইনিংস খেলে পরের দিকে স্ট্রাইক রেটের ঘাটতি পুষিয়ে দিতেন। কোহলির তখন স্বাভাবিক খেলাতেই অতি দ্রুত রান হত। ওই ক্ষমতাই তাঁকে রান তাড়া করার রাজায় পরিণত করেছিল। তার প্রমাণ ২০১২ সালে হোবার্টে শ্রীলঙ্কার বিরুদ্ধে, ২০১৩ সালে জয়পুরে অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে বা ২০১৭ সালে পুনেতে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে খেলা ইনিংসে রয়েছে। ধোনিও সত্যিই শেষ লগ্নে যে কোনো রান তুলে দিতে পারতেন। কিন্তু ২০১৪ সালের পর থেকে ধোনির বড় শট নেওয়ার ক্ষমতা ক্রমশ কমে আসে। তাঁর মত রিফ্লেক্স-নির্ভর, চোখ আর হাতের সমন্বয়ের উপর নির্ভরশীল ব্যাটারের ক্ষেত্রে ওই বয়সে সেটা হওয়া স্বাভাবিক। কিন্তু তিনি ততদিনে ভারতীয় ক্রিকেটের সর্বশক্তিমান তারকা। বেড়ালের গলায় ঘন্টা বাঁধবে কে? মহিন্দর অমরনাথ ২০১১ সালের শেষদিকে টেস্ট ক্রিকেটে বাঁধতে চেয়েছিলেন, ধোনির গডফাদার এন শ্রীনিবাসন তাঁকে হেলিকপ্টার শট মেরে গ্যালারিতে পাঠিয়ে দেন।

যা-ই হোক, ঘটনা হল দুই প্রান্ত থেকে দুটো নতুন বল আর আগাগোড়া পাওয়ার প্লের যুগে বেশি ঝুঁকি নিয়ে অনেক বেশি রান করাটাই ব্যাটিং। ইংল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড সে খেলাই খেলছে গত এক দশক। তারাই জিতেছে বিশ্বকাপ, ভারত ২০১৩ চ্যাম্পিয়নস ট্রফি জেতার পর থেকে জিতেছে শুধু কিছু অর্থহীন দ্বিপাক্ষিক সিরিজ। ধোনির বয়স যত বেড়েছে তিনি সত্যকে অস্বীকার করে সেই পুরনো খেলাই খেলে গেছেন এবং যে ম্যাচেই অন্য কেউ বড় শট নিতে পারেনি, সেখানে ধোনি শেষ অবধি ক্রিজে থেকেও ‘ফিনিশ’ করতে পারেননি। ওই চক্করে ২০১৯ বিশ্বকাপটাই ফিনিশ করে দিয়ে গেছেন। ধোনিভক্তরা আজও বীরবিক্রমে বলেন, মার্টিন গাপ্টিলের ওই থ্রোটা উইকেটে না লাগলেই নাকি…। অথচ ওই বিশ্বকাপেই ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে ধোনি শেষ ওভার পর্যন্ত ক্রিজে ছিলেন (৩১ বলে অপরাজিত ৪২), ভারত দুই কি পাঁচ রানেও নয়, ৩১ রানে হেরেছিল। ওই ম্যাচের স্কোরকার্ডের দিকে তাকালেই দুই দলের ব্যাটিং ভাবনার তফাতটা দিনের আলোর মত পরিষ্কার হয়ে যায় এবং ওই ভাবনাই যে তফাত গড়ে দিচ্ছে তাও স্পষ্ট বোঝা যায়।

২০১৯ সালের পর থেকে কোহলি, রোহিতেরও বয়স বাড়ছে। পাওয়ার প্লের নিয়ম বদলাচ্ছে, আরও বেশি রান উঠছে। রোহিত তো ধোনির আমলে ইনিংস শুরু করার সময় থেকে বরাবরই প্রথমে রক্ষণ, পরে আক্রমণ নীতিতে খেলে এসেছেন। সেভাবেই তিনবার দ্বিশতরান করেছেন। তিনি বদলাবেন কেন? এদিকে কোহলিরও ক্ষমতা কমছে। যত কমছে তিনি তত সাবধানী হচ্ছেন। আজকের একদিনের ক্রিকেটে ঝুঁকি না নিলে কোহলির দরের ব্যাটার রোজ অর্ধশতরান করতে পারেন। তাও মাঝে তিন-চার বছর তাঁর সব ধরনের ক্রিকেটেই সময় খারাপ যাচ্ছিল। পঁচিশ ইনিংস পরে একদিনের ক্রিকেটে শতরান এল গত বছর ডিসেম্বরে চট্টগ্রামে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে। মনে রাখা ভাল, সিরিজটা ভারত আগেই হেরে গিয়েছিল। কোহলির শতরানটা আসে সিরিজ হেরে যাওয়ার পরের ম্যাচে। অতঃপর কোহলি ছন্দে ফিরেছেন, বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহকও হলেন। কিন্তু দেখা গেল তিনি ধোনিসুলভ সাবধানী ব্যাটিং করছেন। ধোনির চেয়ে কোহলি অনেক উঁচু দরের ব্যাটার, তাছাড়া নামেনও অনেক আগে। তাই রান করছেন বেশি, কিন্তু দ্রুত রান তোলার দায়িত্ব অন্য কাউকে নিতে হচ্ছে। ফাইনালে সে দায়িত্ব রাহুল পালন করতে পারেননি। পরিসংখ্যান বলছে, ফাইনালে প্রথম দশ ওভারের পরে ভারত মাত্র চারটে চার মেরেছে। ২০০৫ সালের পর পুরুষদের একদিনের ম্যাচে এটা দ্বিতীয় সর্বনিম্ন। এই ব্যাটিং কোনো ম্যাচ জেতাতে পারে না, বিশ্বকাপ ফাইনালে জেতা তো অসম্ভব। এমন ইনিংসে মহাতারকা পঞ্চাশ, একশো যা-ই করুন; কী এসে যায়?

সত্যিকারের বিশ্লেষণ করলে স্বীকার করতে হবে, ফাইনালে ভারতকে হারিয়েছে মিডল অর্ডার ব্যাটিং। বোলিং নয়। বস্তুত, গত চার-পাঁচ বছরে ভারতীয় বোলাররা টেস্টে এবং একদিনের ক্রিকেটে এত বেশি হারা ম্যাচ জিতিয়ে দিয়েছেন যে ব্যাটারদের এরকম মন্থর ব্যাটিং, সার্বিক ব্যর্থতা – সবই ঢেকে গেছে বারবার। এবারের ইংল্যান্ড ম্যাচও অমন হইহই করে জেতার কথা নয় ওই কটা রান নিয়ে। কিন্তু ঐন্দ্রজালিক জুটি শামি-বুমরা ফর্মে থাকলে সবই সম্ভব। তার উপর আছেন মহম্মদ সিরাজ আর রহস্যময় কুলদীপ যাদব, যাঁর কোনটা গুগলি আর কোনটা সাধারণ লেগ ব্রেক তা বুঝতে ফাইনালে ট্রেভিস হেড আর মারনাস লাবুশেনের আগে পর্যন্ত সব দলের ব্যাটাররা হিমশিম খেলেন। এঁদের সঙ্গে রবীন্দ্র জাদেজা। কিন্তু এঁরা কোনোদিন ব্যর্থ হবেন না এমন দাবি করা চলে না। তাই হাতে রান থাকা দরকার। কথাটা আর কেউ না বুঝুক, অধিনায়ক রোহিত বুঝেছিলেন। তাই বিশ্বকাপে এসে নিজের ব্যাটিং বদলে ফেললেন। কিন্তু দলের সবচেয়ে বড় তারকাকে বদলানোর সাধ্য তাঁরও নেই। কোহলি ঠিক তিনটে শতরান সমেত ৭৬৫ রান করলেন। কিন্তু এবারের বিশ্বকাপের প্রথম দশজন রান সংগ্রাহকের মধ্যে একমাত্র তাঁর আর রাহুলের স্ট্রাইক রেটই একশোর নিচে

অস্ট্রেলিয়াকে ফাইনালে জেতাল হেড আর লাবুশেনের চতুর্থ উইকেট জুটি, ভারতকে হারাল কোহলি আর রাহুলের শম্বুক গতির চতুর্থ উইকেট জুটি। অথচ ভারত এমন আজব দেশ, তারকা সাংবাদিক থেকে ফেসবুক পণ্ডিত – সকলে এখনো প্রশ্ন করে যাচ্ছেন, রোহিত কেন ওই শটটা খেলতে গেল? ফাইনালে কেউ ওরকম খেলে? সাক্ষ্যপ্রমাণ বলছে ফাইনালে রোহিত ওই ব্যাটিং না করলে অস্ট্রেলিয়ার লক্ষ্যটা আরও কম হত, ম্যাচটা আরও আগে শেষ হত।

তারকা থেকে ক্রিকেটপ্রেমী – গোটা বাস্তুতন্ত্রের গোঁড়ামি না কাটলে ভারতীয় ক্রিকেট, দেশটার মতই, পিছন দিকে এগোতে থাকবে।

নাগরিক ডট নেটে প্রকাশিত

ভবিষ্যৎ ঝরঝরে হল কি এই বিশ্বকাপে?

গতবছর অস্ট্রেলিয়ায় চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে তিন ম্যাচের সিরিজেও গ্যালারিতে মাছি তাড়ানোর লোক ছিল না ঠিক ওয়ার্ল্ড টি টোয়েন্টির পরেই। এই বিশ্বকাপে দেখা গেল ভারতেও ভারত না খেললে মাঠ ভরানো দুষ্কর।

পৃথিবীর যে কোনো দলগত খেলায় বিশ্বকাপ হয় চার বছর অন্তর। দর্শকরা ওই এক-দেড় মাসের অপেক্ষায় থাকেন, খেলোয়াড়রাও আজীবন স্বপ্ন দেখেন – বিশ্বকাপে খেলব, দেশকে জেতাব, ক্রীড়াপ্রেমীদের চোখের মণি হব। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের বয়স প্রায় দেড়শো বছর হলেও বিশ্বকাপটা অন্য অনেক খেলার চেয়ে নবীন। বিশ্বকাপ ফুটবল সাত বছর পরেই শতবর্ষে পড়বে, অথচ বিশ্বকাপ ক্রিকেটের বয়স এখনো পঞ্চাশ হয়নি। ইতিমধ্যেই তার রমরমা কমে এল। চার বছর পরে বিশ্বকাপ হলে যে প্রতীক্ষা আর প্রত্যাশা বিশ্বকাপকে বিরাট করে তোলে তা বেশ খানিকটা লঘু করে ফেলেছে ক্রিকেটের নিয়ামক সংস্থা, আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিল, নিজেই। ২০০৭ সালে শুরু হওয়া ওয়ার্ল্ড টি টোয়েন্টি হয় এক বছর অন্তর এবং দুটো পঞ্চাশ ওভারের বিশ্বকাপের মাঝের বছরগুলোতে। ফলে সব দলকে একই প্রতিযোগিতায় খেলতে দেখার যে অভিনবত্ব তা কমে গেছে। খেলোয়াড়দের নায়ক হওয়ার সুযোগও বেড়েছে।

আমরা যারা পঞ্চাশ ওভারের ক্রিকেট ভালবাসি, তারা বুঝতে পারি যে টেস্ট ক্রিকেটের ধাঁচে এই খেলাতেও দেয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়ার পর ফিরে আসা যায়। এই ধিকিধিকি জ্বলতে জ্বলতে শেষে ফেটে পড়ার রোমাঞ্চ টি টোয়েন্টি ক্রিকেটে নেই। সেরা টি টোয়েন্টি ইনিংসও গ্লেন ম্যাক্সওয়েলের আফগানিস্তানের বিরুদ্ধে করা দ্বিশতরানের মত মহাকাব্যিক হওয়া সম্ভব নয়, কারণ মহাকাব্য হয়ে ওঠার সময়টাই নেই ওখানে। কিন্তু অস্বীকার করার উপায় নেই যে সারা পৃথিবীতে জনপ্রিয়তায় একদিনের ক্রিকেট অনেক পিছিয়ে পড়েছে। তার কোনো সুরাহা এই বিশ্বকাপ করতে পারল বলে মনে হয় না।

একদিনের ক্রিকেট বা তার বিশ্বকাপ চালু হয়েছিল টেস্ট ক্রিকেট সম্পর্কে শীতল হয়ে পড়া দর্শকদের মাঠে ফেরানোর প্রয়োজনে। টি টোয়েন্টি আর তার বিশ্বকাপের জন্ম কিন্তু একদিনের ক্রিকেটে অনীহা এসে যাওয়া দর্শককে মাঠে ফেরাতে হয়নি। ২০০৭ সাল নাগাদ সারা পৃথিবীর দর্শক মোটেই একদিনের ক্রিকেট থেকে মুখ ফিরিয়ে নেননি। সেই সমস্যা ছিল মূলত ইংল্যান্ডে, যেখানে ক্রিকেটের প্রতিদ্বন্দ্বী প্রিমিয়ার লিগ ফুটবল। বস্তুত সে বছর দক্ষিণ আফ্রিকায় ওয়ার্ল্ড টি টোয়েন্টি অনুষ্ঠিত হওয়ার আগে কুড়ি ওভারের ক্রিকেট জিনিসটা ঠিক কী, তা অনেক ক্রিকেট খেলিয়ে দেশেরই খুব একটা জানা ছিল না। পৃথিবীর সবচেয়ে ধনী ক্রিকেট বোর্ড, বোর্ড অফ কন্ট্রোল ফর ক্রিকেট ইন ইন্ডিয়া, টি টোয়েন্টি সম্পর্কে প্রথম দিকে রীতিমত অনাগ্রহী ছিল। ব্যবসায়িক সম্ভাবনার দিকটা তাদের চোখে পড়ে মহেন্দ্র সিং ধোনির দল প্রথম ওয়ার্ল্ড টি টোয়েন্টি খেতাব জিতে ফেলার পর। সেটাই কাল হল একদিনের ক্রিকেটের। ২০০৭-০৮ সালে বিসিসিআই প্রথমে ইন্ডিয়ান ক্রিকেট লিগে খেলার অপরাধে এক দল ভারতীয় ক্রিকেটারকে নির্বাসন দেয় (সেই তালিকায় অন্যতম পরিচিত নাম হল আম্বাতি রায়ুডু), পরে নিজেরাই ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগ খুলে বসে। ২০১১ সালে ভারত একদিনের ক্রিকেটের বিশ্বকাপও জিতে ফেলে। সে বছর অক্টোবরে চালু হয় একদিনের ক্রিকেটে দু প্রান্ত থেকে দুটো বলে খেলার নিয়ম, টি টোয়েন্টির দেখাদেখি বাউন্ডারির দড়ি ক্রমশ ঢুকে আসতে শুরু করে মাঠের ভিতর। ব্যাট, বলের লড়াই একতরফা করে দিয়ে ছোটে রানের ফুলঝুরি আর একদিনের ক্রিকেট ক্রমশ একঘেয়ে হয়ে উঠতে থাকে।

আরও পড়ুন বিশ্বকাপে কী হবে ভুলে যান, আইপিএল দেখুন

সেই ধারায় কোনো পরিবর্তন এল কি এই বিশ্বকাপে? যে কোনো খেলায় বিশ্বকাপের কাছে সবসময় ক্রীড়াপ্রেমীদের প্রত্যাশা থাকে নতুন কিছুর – নতুন তারকা, নতুন কৌশল, খেলার দর্শনের কোনো নতুন দিক, ভবিষ্যতের নতুন দিশা। তেমন কিছু কি পাওয়া গেল? যা যা নতুন দেখা গেল সেগুলো কি খুব আশাব্যঞ্জক?

ইংল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকায় যে একদিনের ক্রিকেট দেখতে মাঠে লোক হয় না, সে খবর অনেকদিন হল ঠোঙা হয়ে গেছে। গতবছর অস্ট্রেলিয়ায় চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে তিন ম্যাচের সিরিজেও গ্যালারিতে মাছি তাড়ানোর লোক ছিল না ঠিক ওয়ার্ল্ড টি টোয়েন্টির পরেই। এই বিশ্বকাপে দেখা গেল ভারতেও ভারত না খেললে মাঠ ভরানো দুষ্কর। চেন্নাই, বেঙ্গালুরুর মত দু-একটা কেন্দ্র ছাড়া ভারত নেই অথচ গ্যালারি ভর্তি – এ দৃশ্য প্রায় দেখাই যায়নি। পৃথিবীর বৃহত্তম স্টেডিয়াম বলে ঢাকঢোল পিটিয়ে উদ্বোধিত আমেদাবাদের নরেন্দ্র মোদী স্টেডিয়ামই উদ্বোধনী ম্যাচে ছিল শুনশান। একই দৃশ্য ধরমশালার মত জায়গাতেও দেখা গেছে। আরও গণ্ডগোলের ব্যাপার হল, গ্যালারি শূন্য থাকলেও যে সাইট থেকে টিকিট বিক্রি করা হয়েছে সেই সাইট দেখিয়েছে প্রায় সব টিকিট বিক্রি হয়ে গেছে। এ কি ভুল, নাকি কেলেঙ্কারি? ভারতে অবশ্য কেলেঙ্কারির যুগ অতীত। অমিত শাহ, জয় শাহদের আমলে কোনো কেলেঙ্কারি হয় না।

আরেকটা নতুন জিনিসও দেখা গেল এবার বিশ্বকাপে। উদ্বোধনী অনুষ্ঠান বলে কিছু হয় না, হয় আয়োজকদের পছন্দের ম্যাচে নাচগান। এবারে সেই ম্যাচ ছিল ১৭ অক্টোবর আমেদাবাদে অনুষ্ঠিত ভারত বনাম পাকিস্তান ম্যাচ। সে ম্যাচের নাচগান আবার এমন স্বর্গীয় জিনিস যে টিভিতে তার সরাসরি সম্প্রচার হয় না, কেবল মাঠে যাওয়া দর্শকরা দেখতে পান। ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড আরও দুটো জিনিস পরিষ্কার করে দিয়েছে। প্রথমত, খেলা উপলক্ষ, মোচ্ছবই লক্ষ্য। দ্বিতীয়ত, বিশ্বকাপ মানে সব দলের সমান গুরুত্ব নয়। আয়োজক দেশ অন্যদের দয়া করে যতটা আপ্যায়ন করবে, তাতেই মানিয়ে নিতে হবে।

প্রথমটার প্রমাণ খেলার মাঝেই মাঠ অন্ধকার করে লেজার শো। ব্যাপারটা দর্শকদের জন্যে যতই আমোদের হোক, খেলোয়াড়দের জন্যে যে অসুবিধাজনক সেকথা ম্যাক্সওয়েল বলেও দিলেন দিল্লিতে নেদারল্যান্ডসে বনাম অস্ট্রেলিয়া ম্যাচের পর। কিন্তু কেউ কান দিল না। লেজার শো চলছে, চলবে। নির্ঘাত ফাইনালেও হবে।

অবশ্য এখানেই চলে আসছে দ্বিতীয় ব্যাপারটা। ভারত ফাইনালে উঠেছে যখন, তখন মাঠের দর্শকদের জন্য আরেক দফা এক্সক্লুসিভ নাচগান, লেজার শো ইত্যাদি হবে হয়ত। কিন্তু রোহিত শর্মারা ফাইনালে না উঠলে কী হত? মানে আয়োজক ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড কি সব দলের ম্যাচ নিয়ে সমান উৎসাহী ছিল এই বিশ্বকাপে? বিশ্বকাপ আয়োজনের দায়িত্ব পেলে যে কোনো দেশকে নিয়ামক সংস্থার সঙ্গে একটা চুক্তি স্বাক্ষর করতে হয়, ভারতীয় বোর্ডও করেছিল। সেই চুক্তি অনুযায়ী কেবল বিভিন্ন দেশের দল নয়, সে দেশের সাংবাদিক এবং ক্রীড়াপ্রেমীদের সহজে ভিসা দেওয়া, খেলার টিকিটের ব্যবস্থা ইত্যাদি করতে হয়। এই বিশ্বকাপে দেখা গেল ভারতীয় বোর্ড সেসবের তোয়াক্কা করেনি। ফলে বহু দেশের ক্রিকেটপ্রেমীরা আসতেই পারেননি। কর্তারা, প্রাক্তন ক্রিকেটাররা এবং দিশি ক্রিকেটভক্তরা অবশ্য উল্লসিত গ্যালারিতে নীল সমুদ্র তৈরি হচ্ছে বলে। বাড়তি উল্লাসের কারণ, পাকিস্তানের অতি অল্প সংখ্যক সাংবাদিককে ভিসা দেওয়া হয়েছিল। অনেক সমর্থক এবং সাংবাদিক এসে পৌঁছন ভারত-পাকিস্তান ম্যাচ হয়ে যাওয়ার পরে। পাকিস্তানিদের অপছন্দ হওয়ায় এই ব্যবস্থায় অনেকেই খুশি। মুশকিল হল, আগামী বিশ্বকাপগুলোতে কোনো আয়োজক দেশের যদি ভারতীয়দের অপছন্দ হয়, তখন এরকম ব্যবহারের প্রতিবাদ করলে তারা পাত্তা দেবে না।

নিজের দেশের ক্রিকেটারদের মত অন্য দেশের ক্রিকেটারদের ভাল খেলাতেও আনন্দ পাওয়া এবং বাহবা দেওয়ার সংস্কৃতি সংকুচিত হয়ে ভারতীয় দর্শকদের মধ্যে যে একচোখা উগ্রতা এসে পড়েছে তারও একাধিক নিদর্শন এবারের বিশ্বকাপে দেখা গেছে। ভারতীয় ব্যাটার চার, ছয় মারলে গ্যালারি উত্তাল আর বিপক্ষের ব্যাটার মারলে পিন পতনের স্তব্ধতা অনেকদিনই নিয়ম হয়ে গেছে। কিন্তু বাংলাদেশের মত দুর্বল দলের সমর্থকের প্রতিও গ্যালারিতে আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠার দৃশ্য নতুন। এতেও অসুবিধা একটাই। এই দৃষ্টান্ত অন্যেরা অনুসরণ করলে কী হবে? ভবিষ্যতের বিশ্বকাপগুলো কি খুব আনন্দের হবে সেক্ষেত্রে?

উত্তরবঙ্গ সংবাদে প্রকাশিত

ভারতের দাপুটে বিশ্বকাপ: কিছু কাঁটা রহিয়া গেল

ক্রিকেট এমন এক আফিম, যে রাজনীতির বামপন্থী এবং উদারপন্থীরাও এসব বিষয়কে গুরুত্ব দিতে রাজি নন। ন্যায়-অন্যায়ের বিচার যে ফলে নয়, প্রক্রিয়ায় – সেকথা অন্তত ক্রিকেটের ক্ষেত্রে তাঁরা মানতে রাজি নন।

আজ পর্যন্ত অলিম্পিকে সবচেয়ে বেশি পদক জিতেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। গড়ের দিক থেকে আবার সবচেয়ে ভাল ফল পূর্বতন সোভিয়েত ইউনিয়নের। দ্রুত এই তালিকায় উপরে উঠছে চীন। প্রত্যেক অলিম্পিকের পরেই পদক তালিকায় চোখ বুলোলে প্রথম চার-পাঁচটা স্থানে যে দেশগুলোর নাম দেখা যায় সেগুলো অর্থনীতিতেও বিশ্বের অগ্রসর দেশগুলোর মধ্যে পড়ে। ফুটবল বিশ্বকাপের প্রায় একশো বছরের ইতিহাসও অনুরূপ। সবচেয়ে ধনী মহাদেশ ইউরোপের পাঁচটা দেশ মিলে বিশ্বকাপ জিতে ফেলেছে ১২ বার (পশ্চিম জার্মানি/জার্মানি ৪, ইতালি ৪, ফ্রান্স ২, ইংল্যান্ড ১, স্পেন ১)। অসামান্য প্রতিভাধর খেলোয়াড়দের উপস্থিতি সত্ত্বেও গরিব লাতিন আমেরিকার তিনটে দেশ বিশ্বকাপ জিতেছে সব মিলিয়ে দশবার (ব্রাজিল ৫, আর্জেন্টিনা ৩, উরুগুয়ে ২)। এশিয়া আর আফ্রিকার কোনো দেশ আজ অবধি বিশ্বকাপ জিততে পারেনি, অদূর ভবিষ্যতেও পারবে এমন সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে না।

আগামীকাল বিশ্বকাপ ক্রিকেটের ফাইনাল। তার আগে এসব কথা বলা এইজন্যে যে উপরের ঘটনাগুলোর পিছনে সফলতর ধনী দেশগুলোর কোনো চক্রান্ত নেই, সমস্ত খেলোয়াড়কে দিয়ে মাদক সেবন করানো নেই, রেফারি বা জাজদের ঘুষ খাওয়ানো নেই। যা আছে তা হল টাকার জোর। যে কোনো খেলার সর্বোচ্চ স্তরের প্রতিযোগিতায় ধারাবাহিকভাবে সফল হতে গেলে একটা দেশকে বিপুল অর্থ খরচ করতে হয়। ২০১৬ অলিম্পিকের পর অভিনব বিন্দ্রা হিন্দুস্তান টাইমস কাগজে এক কলামে লিখেছিলেন, “দেশ হিসাবে আমাদের ঠিক করতে হবে আমরা এমন একটা স্তরে পৌঁছতে চাই কিনা যেখানে পদক তালিকায় প্রথম পাঁচে শেষ করতে পারি। সেটা আমাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ কিনা, মানসম্মানের প্রশ্ন কিনা… আমরা উন্নয়নশীল দেশ, আমাদের দেশে দারিদ্র্য আছে। সুতরাং আমাদের ঠিক করতে হবে অলিম্পিককে আমরা তার চেয়েও বেশি অগ্রাধিকার দেব কিনা। কিন্তু যদি আমরা চাই আমাদের অ্যাথলিটরা জিতুক, তাহলে দীর্ঘমেয়াদি লগ্নি করা দরকার। ব্যাপারটা জটিল।” বলা বাহুল্য, দলগত খেলায় ব্যাপারটা আরও বেশি জটিল। গত দুই দশক ধরে ভারতীয় ক্রিকেট অর্থের দিক থেকে সমস্ত ক্রিকেট খেলিয়ে দেশের মধ্যে সবচেয়ে ভাল জায়গায়। এর প্রতিফলন খেলার মাঠে পড়তে বাধ্য। তাই চলতি বিশ্বকাপে ভারতীয় ক্রিকেট দলের আধিপত্যকে ব্যাখ্যা করতে কোনো ষড়যন্ত্রের তত্ত্ব খাড়া করা নেহাতই হাস্যকর। বরং এই বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যবহার করার সুযোগ থাকা সত্ত্বেও ভারত যে ২০১৩ চ্যাম্পিয়নস ট্রফির পরে আর কোনো বিশ্বমানের প্রতিযোগিতায় জয়ী হতে পারেনি তা নিতান্তই লজ্জাজনক। আর কোনো ক্রিকেট খেলিয়ে দেশের এত বড় প্রতিভার মানবজমিন নেই, সেই জমিনে গজানো প্রতিভাকে সার জল দিয়ে বড় করার সামর্থ্য নেই। তা সত্ত্বেও যদি এ দেশ থেকে মহম্মদ শামি, যশপ্রীত বুমরা, রোহিত শর্মা, বিরাট কোহলি, শুভমান গিলরা উঠে না আসেন তাহলে কোন দেশ থেকে আসবেন?

ক্রিকেট দুনিয়ায় আর্থিকভাবে দু নম্বর এবং তিন নম্বর স্থানে আছে যথাক্রমে অস্ট্রেলিয়া এবং ইংল্যান্ড। লক্ষ করুন, ফাইনালে ভারতের প্রতিপক্ষ অস্ট্রেলিয়াই। ইংল্যান্ডও হয়ত শেষ চারে থাকত, যদি ২০ ওভার আর ৫০ ওভারের খেলায় তফাত করতে ভুলে না যেত, কিছু অনিচ্ছুক বুড়িয়ে যাওয়া ক্রিকেটারকে দলে না রাখত আর তাদের উদ্ধত ক্রিকেট বোর্ড টালবাহানার পর কেন্দ্রীয়ভাবে চুক্তিবদ্ধ করার জন্যে ক্রিকেটারদের এমন এক তালিকা প্রকাশ না করত, যা প্রায় কাউকে খুশি করেনি। যাঁরা আইপিএল নিলামের বাইরেও ক্রিকেটের অর্থনীতির খবর রাখেন তাঁরা জানেন যে গত এক দশকে অন্য দেশগুলোর সঙ্গে নিজেদের আর্থিক ব্যবধান অস্বাভাবিক বাড়িয়ে তুলে ক্রিকেট দুনিয়াকে ক্রমশ প্রতিদ্বন্দ্বিতাহীন করে তুলেছে এই ‘বিগ থ্রি’ – ভারত, অস্ট্রেলিয়া, ইংল্যান্ড। শ্রীলঙ্কা, পাকিস্তান, দক্ষিণ আফ্রিকা, সর্বোপরি ওয়েস্ট ইন্ডিজের মত একদা শক্তিশালী দলগুলোর অনেক পিছিয়ে পড়ার পিছনে এর ভূমিকা কম নয়। ত্রিদেবের এই প্রতাপে বছর বিশেক আগে জিম্বাবোয়ে, কেনিয়ার মত যে দেশগুলো দ্রুত উঠে আসছিল তারাও ক্রিকেট মানচিত্রের বাইরে ছিটকে পড়েছে। অল্প কিছুদিন আগে টেস্ট স্ট্যাটাস পাওয়া আফগানিস্তান, আয়ারল্যান্ডের সঙ্গেও কেউ দ্বিপাক্ষিক সিরিজ খেলে না। ফিফা যেখানে ব্যবসা বাড়ানোর জন্যে বিশ্বকাপের মূলপর্বে দেশের সংখ্যা ক্রমশ বাড়াচ্ছে, সেখানে আইসিসি ২০১১ আর ২০১৫ সালের ১৪ দলের বিশ্বকাপকে গত বিশ্বকাপ থেকেই নামিয়ে এনেছে দশ দলের বিশ্বকাপে। শুধুমাত্র ব্যবসা বাড়াতে দলের সংখ্যা বাড়ানো ভাল নয় – এ যুক্তি দেওয়া যেতেই পারে। কিন্তু কমানো হল কার ভালর জন্যে? তাছাড়া ত্রিদেবের সকলের উপর ছড়ি ঘোরানোর পিছনে ব্যবসা ছাড়া আর কোন মহৎ উদ্দেশ্য কাজ করছে? ‘বিগ থ্রি মডেল’ কীভাবে ক্রিকেট দুনিয়ার সংকোচন ঘটাচ্ছে, অনেক দেশকে শুকিয়ে মারছে তা নিয়ে গত একবছর বারবার লিখেছি। বিস্তারিত পাবেন এই লেখায়

শ্রীলঙ্কা, পাকিস্তান, দক্ষিণ আফ্রিকা, বাংলাদেশের ক্রিকেট বোর্ডগুলো আইসিসির আয় বন্টনের এই অসাম্য থেকে বাঁচতে যে রাস্তা বার করেছে তা হল আইপিএলের আদলে কুড়ি বিশের লিগ আয়োজন করা। যে দেশের ভারতের মত আইপিএলের বাইরেও অনেকগুলো প্রথম শ্রেণির দল নেই, ঘরোয়া পঞ্চাশ ওভারের খেলার পরিকাঠামো তেমন নয়, সে দেশে এর অনিবার্য পরিণতি কী, তা এবারের বিশ্বকাপে দেখা গেছে। এমন বোলার পাওয়া দুষ্কর যারা দশ ওভার ভাল বল করতে পারে। আরও শক্ত এমন ব্যাটার পাওয়া যার গোটা ১৫ বলে চার, ছয় মারতে না পারলেই নিজেকে ব্যর্থ মনে হয় না। আইপিএলের মত রোজগার অন্য দেশের ফ্র্যাঞ্চাইজ লিগগুলো থেকে হয় না। ফলে ওই দেশগুলোর ক্রিকেটাররা সারা পৃথিবী ঘুরে একাধিক লিগে খেলে বেড়ান। এত খেললে গড়ে ঘন্টায় ৯০ মাইলের বেশি গতিতে বল করার বোলার পাওয়া যাবে না, আজকাল যায়ও না। তাছাড়া কুড়ি বিশের আদলে ৫০ ওভারের ক্রিকেটে যেভাবে মাঠ ছোট করে আনা হয়েছে তাতে অত জোরে বল করে লাভই বা কী? ব্যাটের কানায় লাগলেও ছয় হয়ে যাবে। ব্যাটারদেরও ইনিংস গড়ে তোলার ধৈর্য থাকছে না। সুইং বা স্পিন সামলানোর ক্ষমতাও দিন দিন কমে যাচ্ছে। কুড়ি ওভারের খেলায় বোলাররা তো সারাক্ষণ রান আটকাতে বৈচিত্র্য আনতে ব্যস্ত। তাই ক্রস সিম, নাকল বল, স্লোয়ার ইত্যাদি চেষ্টা করে যাচ্ছেন। শামি বা বুমরার মত সিম সোজা রেখে খাঁটি সুইং বা সিম করানোর ক্ষমতা থাকছে না। চলতি বিশ্বকাপ দেখিয়ে দিল, সাদা বলের ক্রিকেটে প্রথম দু-এক ওভারের মধ্যে উইকেট নেওয়ার জন্যে প্রসিদ্ধ শাহীনশাহ আফ্রিদিও নতুন বল সুইং করানোর ক্ষমতা হারিয়ে ফেলতে পারেন। ট্রেন্ট বোল্টেরও প্রায় একই সমস্যা হল। সারাবছর কুড়ি বিশের ক্রিকেট খেলে হঠাৎ অভ্যাস বদলে ফেলা যায় না। এতকিছু সত্ত্বেও এই বিশ্বকাপে নিউজিল্যান্ড, দক্ষিণ আফ্রিকার সেমিফাইনালে লড়ে যাওয়া এটুকুই প্রমাণ করে যে ক্রিকেটে মহান অনিশ্চয়তা কিছুটা অবশিষ্ট আছে।

ওসব সমস্যা ভারতের ক্রিকেটারদের নেই। তাঁরা ভারতীয় দলের হয়ে খেলে আর আইপিএল খেলেই যা রোজগার করেন তার সঙ্গে ওয়েস্ট ইন্ডিজ, পাকিস্তান বা দক্ষিণ আফ্রিকার একজন গড় আন্তর্জাতিক ক্রিকেটারের রোজগারের তুলনা চলে না। তাঁদের দেশে দেশে খেলে বেড়াতে হয় না। তার চেয়েও বড় কথা, আইপিএলের ব্র্যান্ড মূল্য বজায় রাখতে বিসিসিআই তাঁদের অন্য লিগে খেলার অনুমতিও দেয় না। ফলে বুমরা, শামি বা মহম্মদ সিরাজ, কুলদীপ যাদবরা ক্রিকেটের সাবেকি দক্ষতাগুলোয় শান দেওয়ার সুযোগ পান। গত একবছর চোটের কারণে না খেলা বুমরার পক্ষে শাপে বর হয়ে দাঁড়িয়েছে। শরীর বিশ্রাম পেয়েছে। শামি আবার ভারতীয় কুড়ি বিশের দলে নিয়মিত নন, একদিনের ম্যাচ আর টেস্ট ম্যাচের সংখ্যা ক্রমশ কমছে। সেটাও এক্ষেত্রে সুবিধা। আর ব্যাটাররা? কোহলি, রোহিত, রাহুলরা গতবছর পর্যন্ত বলের চেয়ে বেশি রান করার দর্শনকে পাত্তাই দেননি। তাই বারবার দল ব্যর্থ হয়েছে। পাত্তা না দেওয়ার আত্মবিশ্বাস দিয়েছে আয়ের নিশ্চয়তা। ভারতীয় বোর্ডের অর্থকরী কেন্দ্রীয় চুক্তি আর আইপিএল – দুটোই। এই নিরাপত্তা প্রয়োজনের তুলনায় একটু বেশিই হয়ে যাওয়ায় তাঁরা কুড়ি বিশ বা ৫০ ওভার, কোনো ধরনের খেলাতেই আদৌ ঝুঁকি নিতে রাজি হচ্ছিলেন না। তারই ফল গত দেড়-দুই বছরের হারগুলো। বিশ্বকাপেও সেই ধারা চালু রাখলে ফলাফল অন্যরকম হত না, বোলাররা যতই অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠুন। কারণ ভারতীয় বোলিং কয়েকটা খারাপ দিন বাদ দিলে টেস্ট আর একদিনের ম্যাচে বেশ কয়েকবছর ধরেই অসাধারণ। বিশ্বকাপের কিছুদিন আগে থেকে তিন নিরাপদ ব্যাটারের মধ্যে একজন, রোহিত শর্মা, ঠিক করলেন আক্ষরিক অর্থে সামনে দাঁড়িয়ে নেতৃত্ব দেবেন। আগের কয়েকটা সিরিজে এ জিনিস অনুশীলন করেছেন, অবশেষে বিশ্বকাপে সাফল্য পেতে শুরু করলেন। ফলে বাকিদের নিজেকে কমবেশি না বদলে উপায় রইল না। অর্থাৎ ওই বোলিংয়ের সঙ্গে যুক্ত হল আক্রমণাত্মক ব্যাটিং। তার উপর ঘরের মাঠের চেনা পরিবেশ, চেনা পিচের সুবিধা তো আছেই। এতসব মিলিয়ে অন্য দলগুলোর সঙ্গে এই দুস্তর ব্যবধান তৈরি হয়েছে। ফাইনালে অস্ট্রেলিয়া জিতে গেলেও এগুলো মিথ্যে হয়ে যায় না। এর জন্যে আলাদা করে সমস্ত ম্যাচ ‘ফিক্স’ করার প্রয়োজন পড়ে না। এই দলের যা শক্তি, তাতে পিচ বদল করাও নিষ্প্রয়োজন। এদেশের যে কোনো পিচেই এই দল জিততে পারত। অন্য দেশে বিশ্বকাপ হলে অন্য কথা ছিল।

সুতরাং ভারত আগামীকাল বিশ্বকাপ জিতলে তিনটে খেতাবের মধ্যে নিঃসন্দেহে সবচেয়ে দাপুটে জয় হবে এটা। কিন্তু সকলের জন্যে সবচেয়ে আনন্দের জয় বলা যাবে কি? বিশ্বকাপ উপলক্ষ, বিজেপি সরকারের মহিমা প্রচার এবং শাসক দলের রাজনৈতিক প্রকল্প অনুযায়ী সবকিছু চালানোই যে লক্ষ্য তা সেই ৫ অক্টোবর থেকেই পরিষ্কার। উদ্বোধনী অনুষ্ঠান হল না, এদিকে ভারত-পাকিস্তান ম্যাচে বলিউডি শিল্পীদের ডেকে এনে ধুমধাম হল। আগামীকাল আবার ম্যাচের আগে মোচ্ছব, মাঝে মোচ্ছব, পরে মোচ্ছব। শুধু তাই নয়, দেশের সেনাবাহিনীকেও নামিয়ে দেওয়া হচ্ছে খেলার আঙিনায় শক্তি প্রদর্শন করতে। প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিতিতে বিমানবাহিনী খেল দেখাবে।

মজার কথা, আইসিসির এসব আপত্তি নেই। দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ছেলে ভারতের বোর্ডের সর্বেসর্বা হয়ে বসেছেন, সর্বজনবিদিত যে এই ঘটনায় স্বয়ং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর অবদান ছিল। তাতেও আইসিসির আপত্তি নেই। অথচ বিশ্বকাপ চলতে চলতেই শ্রীলঙ্কার বোর্ডকে সাসপেন্ড করা হল সরকারি হস্তক্ষেপের কারণে। যারা স্রেফ ভারতের সাফল্য নিয়ে গদগদ হতে রাজি নয়, ভারতীয় বোর্ডের কার্যকলাপ নিয়ে এখনো প্রশ্ন তুলছে, তাদের ঠিক বিজেপি সরকারের কায়দাতেই ভারতবিরোধী বলে দেগে দেওয়ার সংস্কৃতি দেশের ক্রিকেটমহলে চালু করে দেওয়া হয়েছে। দেশের রাজনৈতিক সাংবাদিকতার মত ক্রিকেট সাংবাদিকতাও গোদি মিডিয়ার দখলে। প্রথিতযশা সাংবাদিকরা বস্তুত বোর্ড এবং/অথবা বিখ্যাত ক্রিকেটারদের জনসংযোগ আধিকারিকে পরিণত হয়েছেন। তাই ভারতের খুব অল্প সংবাদমাধ্যমেই যথাযোগ্য গুরুত্বে প্রকাশিত হয়েছে এই খবর, যে শ্রীলঙ্কার বিশ্বকাপ জয়ী প্রাক্তন অধিনায়ক অর্জুনা রণতুঙ্গা এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, শ্রীলঙ্কার ক্রিকেটের দুর্দশার জন্যে দায়ী বিসিসিআই সচিব জয় শাহ। তাঁর অঙ্গুলিহেলনেই নাকি শ্রীলঙ্কার ক্রিকেট চলে।

অভিযোগটা সত্যি হোক আর মিথ্যেই হোক, ভারতের, বিশেষত বাংলার, নামকরা ক্রিকেট সাংবাদিকদের স্রেফ চেপে যাওয়ার কারণ কী? দেশদ্রোহী বলে চিহ্নিত হয়ে যাওয়া, নাকি বোর্ডের আনুকূল্য বন্ধ হয়ে যাওয়া? ধরে নেওয়াই যেত, রণতুঙ্গা বিশ্বকাপে দেশের ভরাডুবি দেখে হতাশায় প্রলাপ বকেছেন। শ্রীলঙ্কার বিদায়ের পর তাদের এক সাংসদ যেমন বলেছিলেন, ব্যাটিং কোচ মাহেলা জয়বর্ধনে নাকি বিসিসিআইয়ের প্রভাবে ভারতের বিরুদ্ধে ম্যাচে শ্রীলঙ্কার অধিনায়ককে বলেছিলেন টসে জিতে ফিল্ডিং নিতে। মুশকিল হল, শ্রীলঙ্কার সরকার রণতুঙ্গার মন্তব্যের জন্যে বিসিসিআই সচিবের কাছে ক্ষমা চেয়েছে একেবারে সংসদের অধিবেশনে। উপরন্তু পর্যটন মন্ত্রী বলেছেন, স্বয়ং রাষ্ট্রপতি নাকি শাহকে ফোন করে দুঃখপ্রকাশ করেছেন। যদি ভারতীয় বোর্ডের এত প্রভাব থাকে একেবারে শ্রীলঙ্কা সরকারের উপর, তাহলে ক্রিকেট বোর্ডের উপর নিয়ন্ত্রণ থাকা আর কী এমন ব্যাপার? বোর্ড প্রভাব না খাটালেও ফল একই হত, আর প্রভাব খাটায়নি – এ দুটো কিন্তু এক নয়। অটো ফন বিসমার্কের সেই বিখ্যাত উক্তি মনে পড়ে যায় – রাজনীতিতে কোনোকিছু বিশ্বাস করবে না, যতক্ষণ না সেটা অস্বীকার করা হচ্ছে। কিন্তু ক্রিকেট এমন এক আফিম, যে রাজনীতির বামপন্থী এবং উদারপন্থীরাও এসব বিষয়কে গুরুত্ব দিতে রাজি নন। ন্যায়-অন্যায়ের বিচার যে ফলে নয়, প্রক্রিয়ায় – সেকথা অন্তত ক্রিকেটের ক্ষেত্রে তাঁরা মানতে রাজি নন।

ভারত বনাম নিউজিল্যান্ড সেমিফাইনালের পিচ বদলানোর অভিযোগকেও নস্যাৎ করেছেন ভারতের সাংবাদিককুল, প্রাক্তন ক্রিকেটার এবং ক্রিকেটভক্তরা। ইংল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়ার কিছু সংবাদমাধ্যমের বক্তব্য, আইসিসি থেকে বিশ্বকাপের পিচগুলোর সার্বিক দায়িত্বপ্রাপ্ত অ্যান্ডি অ্যাটকিনসন তাদের ইমেলে জানিয়েছেন, তাঁর অজ্ঞাতসারে সেমিফাইনালে যে পিচে খেলা হওয়ার কথা ছিল তা বদলে দেওয়া হয়। একই ইমেলে অ্যাটকিনসন এই আশঙ্কাও প্রকাশ করেন যে ফাইনালের জন্য তিনি যে পিচ পছন্দ করেছেন তাও ভারতীয় দলের সুবিধার্থে বদলে দেওয়া হতে পারে। এ নিয়ে হইচই পড়ে যাওয়ায় আইসিসি সেমিফাইনাল চলাকালীন একটা বিবৃতি দেয়। সেই বিবৃতিতে কিন্তু বলা হয়নি যে পিচ বদলানোর অভিযোগ মিথ্যা। শুধু বলা হয়েছে, এমনটা করা হয়েই থাকে এবং অ্যাটকিনসনকে জানানো হয়েছিল (“was apprised of the change”)। এই বয়ান যদি সঠিক হয়, তাহলে হয় অ্যাটকিনসন মিথ্যা বলেছেন অথবা তাঁকে জানানো হয়েছিল পিচ বদলে ফেলার পরে। সত্যানুসন্ধান করতে হলে কোনটা ঘটেছে তা অ্যাটকিনসনের কাছে জানতে চাওয়া উচিত ছিল। ভারতের সংবাদমাধ্যম এবং প্রাক্তন ক্রিকেটাররা কিন্তু সেসবের মধ্যে যাননি। তাঁরা আইসিসির বিবৃতিকে তুলে ধরে রায় দিয়ে দিলেন, এসব ভারতের কাছে হেরে যাওয়া লোকেদের মড়াকান্না। যাহা সরকারি বিবৃতি তাহাই সত্য – ওয়ার্ল্ড প্রেস ফ্রিডম ইনডেক্সে তলানিতে পড়ে থাকা দেশে এটাই যে নিয়ম তা অবশ্য বলাই বাহুল্য। আরও মজার কথা, সেমিফাইনালে প্রচুর রান হওয়ার ঘটনাকে যুক্তি হিসাবে তুলে ধরা বলা হল – এই তো। নতুন পিচ নয় বলে আপত্তি করার কী ছিল? পিচটা তো মোটেই মন্থর ছিল না। অর্থাৎ নিয়ম মানা হল কি হল না, তা আলোচ্য নয়। আলোচ্য হল ফলাফলটা কী? কোনো সাংবাদিক বা প্রাক্তন ক্রিকেটার কিন্তু আইসিসির নিয়মাবলী তুলে দেখাননি যে অ্যাটকিনসনকে জানিয়েই কাজ করতে হবে এমন কোনো নিয়ম নেই। অ্যাটকিনসন রাবার স্ট্যাম্প মাত্র। উলটে নানারকম অক্রিকেটিয় যুক্তি উঠে এসেছে।

কেউ বলেছেন ভারত যে এতদিনে ইংরেজদের প্রভুত্ব নাশ করে ক্রিকেটে শেষ কথা হয়ে উঠেছে এটা অনেকের সহ্য হচ্ছে না, তাই ভারতকে ছোট করতে এসব বাজে কথা বলা। ইংল্যান্ডের ভারতীয় বংশোদ্ভূত প্রাক্তন ক্রিকেটার মার্ক রামপ্রকাশ একথা বলে আবার লিখেছেন, দিল্লির প্রবল বায়ুদূষণ নিয়ে যারা কথা বলছে তারাও নাকি এই উদ্দেশ্যেই ওসব বলছে। এ তো গেল ঋষি সুনকসুলভ ভারতপ্রেমের দৃষ্টান্ত। সুনীল গাভস্করের মত শতকরা একশো ভাগ ভারতীয় আরও এক ধাপ এগিয়ে বলেছেন, ভারতকে এদের দরকার কারণ ভারতের সঙ্গে খেললে অনেক টাকা রোজগার হয়। অথচ এরা ভারতের দিকেই আঙুল তোলে। মানে এরা চায় ভারতকে নিজেদের সুবিধার্থে ব্যবহার করতে, কিন্তু ভারত নিজের সুবিধা দেখলেই এদের অসুবিধা। আরও বলেছেন, পিচ যদি বদলানো হয়েই থাকে তো আইসিসিকে জানিয়েই হয়েছে। লুকিয়ে চুরিয়ে হয়নি। আইসিসির দায়িত্বপ্রাপ্ত লোকটার যদি কিছু বলার সাহস না থাকে, তাহলে আইসিসিকে ধরো। বিসিসিআইয়ের দিকে আঙুল তুলো না। সংবাদসংস্থা পিটিআই গতকাল একটি নামহীন বিসিসিআই সূত্রকে উদ্ধৃত করে খবর দিয়েছিল, অ্যাটকিনসনের কাজ নাকি শেষ। তিনি দেশে ফিরে গেছেন। অথচ আজ তাঁকে আমেদাবাদে পিচ পরিদর্শন করতে দেখা গেছে।

বৃদ্ধ কিংবদন্তির এই প্রবল জাতীয়তাবাদ খুবই প্রশংসনীয় হত, যদি হাস্যকর না হত। হাস্যকর এই কারণে, যে বিসিসিআই বাকি দেশগুলোর উপর ছড়ি ঘোরাচ্ছে ওই ইংল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে হাত মিলিয়েই। তাদের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে নয়। ঠিক কথাই যে তাদের ভারতকে দরকার, কিন্তু ভারতও ঘুরে ফিরে তাদের সঙ্গেই খেলে। অন্যদের সঙ্গে খেলতে চায় না। কারণ এদের সঙ্গে খেললেই টিভি সম্প্রচার থেকে সবচেয়ে বেশি টাকা আসে।

আরও পড়ুন ভারতীয় ক্রিকেট: জাহান্নামের আগুনে পুষ্পের হাসি

অর্থাৎ অন্যায় ঢাকতে জাতীয়তাবাদ টেনে আনা, লোক খেপাতে পাশ্চাত্যের দেশগুলোর বিরুদ্ধে গরম গরম কথা বলা আর ব্যবসায়িক স্বার্থে সেই দেশগুলোর সঙ্গেই হাত মেলানো, পাকিস্তানকে দিনরাত খলনায়ক বলে দাগানো আর টাকা উঠবে বলে তাদের বিরুদ্ধে খেলা নিয়েই উদ্বাহু নৃত্য করা এবং সেই উন্মাদনাকে ব্যবহার করে ঘৃণা ছড়ানো – ভারতের শাসক দলের রাজনীতির সব বৈশিষ্ট্যই ভারতীয় ক্রিকেট শরীরে ধারণ করে ফেলেছে এই বিশ্বকাপে। কাল হবে ফাইনাল। জিতলে জবরদস্ত নির্বাচনী প্রচার। ব্রাজিলের রাষ্ট্রপতি জেয়ার বলসোনারো যেভাবে নির্বাচনে ব্রাজিল ফুটবল দলকে নিজের কাজে লাগিয়েছিলেন, নরেন্দ্র মোদীও সেভাবে ভারতীয় ক্রিকেট দলকে ব্যবহার করা শুরু করবেন নিজের নামাঙ্কিত স্টেডিয়াম থেকেই। নেইমাররা বলসোনারোর পাশে দাঁড়িয়েছিলেন, বিরাটরা তো সেই ২০১৪ সাল থেকেই দাঁড়াচ্ছেন। এবার না হয় নির্বাচনী প্রচারের মঞ্চেই দাঁড়াবেন। উপরি হিসাবে থাকবেন গাভস্কর, শচীন তেন্ডুলকররা। বারাণসী ক্রিকেট স্টেডিয়ামের শিলান্যাসে চার মারাঠি ব্রাহ্মণ প্রাক্তন ভারত অধিনায়ক (গাভস্কর, দিলীপ ভেঙসরকর, রবি শাস্ত্রী, তেন্ডুলকর) যেতে পারেন, ভোটের প্রচারে নামতে আর আপত্তি কী?

হারলে কী হবে? যত দোষ শামি, সিরাজদের হবে নিশ্চয়ই।

নাগরিক ডট নেটে প্রকাশিত

দায়সারা বিশ্বকাপ, শেষ বিশ্বকাপ?

কর্তারা যে ৫০ ওভারের খেলাটাকে বিদায় করতে পারলেই বাঁচেন তা সবচেয়ে স্পষ্ট করে বলেছেন হ্যাম্পশায়ার কাউন্টির প্রাক্তন অধিনায়ক এবং সদ্য পৃথিবীর প্রাচীনতম ক্রিকেট ক্লাব এমসিসির সভাপতি হওয়া মার্ক নিকোলাস।

১৯৮৭ সালে যখন প্রথমবার এদেশে ক্রিকেট বিশ্বকাপ হয় তখন দুনিয়াটাই অন্যরকম ছিল। তাই সেকথা থাক, বরং ১৯৯৬ সালের কথা ভাবা যাক। আজ ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড জাতীয় পুরুষ ক্রিকেট দলের খেলা আর আইপিএলের সম্প্রচার স্বত্ব বিক্রি করে যে টাকার হিমালয়ে চড়েছে তা টেথিস সাগরের মত উঁচু হতে শুরু করেছিল ওই সময় থেকেই। প্রয়াত জগমোহন ডালমিয়া বুঝতে পেরেছিলেন ভারতের ক্রিকেটপাগল জনতার বাজার কত লোভনীয় বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর কাছে। সেই বাজারে তাদের প্রবেশাধিকার দিয়ে এত টাকা কামাতে পারে ভারতীয় বোর্ড, যে গোটা ক্রিকেট দুনিয়া শাসন করা যাবে। ইংল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়ার চোখরাঙানি সহ্য করার বদলে তাদেরই চোখ রাঙানো যাবে। তবে ডালমিয়া ছিলেন খাঁটি ব্যবসায়ী। কামানোর জন্য খরচ করতে তাঁর আপত্তি ছিল না। বিশেষত টাকা যখন বোর্ডের, নিজের পকেটের নয়। ফলে ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা মিলিয়ে হওয়া সেবারের বিশ্বকাপে জাঁকজমকের খামতি ছিল না। সেই বিশ্বকাপ থেকে বিস্তর আয় হয়েছিল এবং তার অনেকটা ডালমিয়া পকেটে পুরেছেন – এমন অভিযোগ পরে উঠেছিল। সেসব মামলা মোকদ্দমার জেরেই একসময় তাঁকে বোর্ডছাড়া হতে হয়, পরে আবার ফিরেও আসেন। কিন্তু বিশ্বকাপের আয়োজন যে জবরদস্ত হয়েছিল তা কেউ অস্বীকার করে না। ইডেন উদ্যানে বহু অর্থ খরচ করে বিরাট উদ্বোধনী অনুষ্ঠান হয়েছিল, গঙ্গার হাওয়া এসে অদৃষ্টপূর্ব লেজার শোকে অভূতপূর্ব বিপর্যয়ে পরিণত করেছিল। ভারত সেমিফাইনালে শোচনীয়ভাবে শ্রীলঙ্কার কাছে হেরে যাওয়ার পরে লেখালিখি হয়েছিল, উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের জন্য তৈরি মঞ্চটাই নাকি যত নষ্টের গোড়া। ওটা তৈরি করতে গিয়েই নাকি পিচের বারোটা বেজে গিয়েছিল, ফলে সেমিফাইনালের দিন অরবিন্দ ডি সিলভা আর মুথাইয়া মুরলীধরন এক জাতের বোলার হয়ে গিয়েছিলেন। ২০১১ সালে ভারত, বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কায় হওয়া বিশ্বকাপেও জাঁকজমক কম ছিল না। সেবার ঢাকার বঙ্গবন্ধু ন্যাশনাল স্টেডিয়ামে বর্ণাঢ্য উদ্বোধনী অনুষ্ঠান হয়েছিল। তদ্দিনে ভারত হিমালয়ে উঠে পড়েছে, বোর্ডের টাকার অভাব নেই। ফলে বাকি বিশ্বকাপটাও হয়েছিল বিশ্বকাপের মত। আর এবার?

আজ গতবারের দুই ফাইনালিস্ট ইংল্যান্ড আর নিউজিল্যান্ড বিশ্বকাপ শুরু করবে। কিন্তু তার আগে কোনো উদ্বোধনী অনুষ্ঠান হবে না, কারণ ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড খুবই মিতব্যয়ী। চোখধাঁধানো উদ্বোধনী অনুষ্ঠান করে শুধু আইপিএল শুরুর দিনে। ১৯৯৬ সালে বোর্ড সভাপতি ছিলেন শিল্পপতি ডালমিয়া, এখন শিল্পপতি জয় শাহ। ও না! ভুল হল। বোর্ড সভাপতি ১৯৮৩ বিশ্বকাপ জয়ী ভারতীয় দলের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য রজার বিনি, জয় হলেন সচিব। আসলে বিনিকে দেখা যায় কম, শোনা যায় আরও কম। তাই খেয়াল থাকে না। মানে তাঁর অবস্থা রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মুর মত। তিনি সাংবিধানিক প্রধান বটে, সবেতেই তাঁর স্বাক্ষর লাগে বটে, কিন্তু নতুন সংসদ ভবন উদ্বোধনে তাঁকে ডাকাই হয় না। রাজদণ্ড হাতে দাঁড়িয়ে থাকেন মোদীজি। ক্রিকেট বোর্ডের সর্বেসর্বাও এখন শাহজি, বিনিজি অন্তঃপুরবাসী। যাঁর নাম জয় আর পদবি শাহ, তিনি সর্বেসর্বা হবেন না তো হবে কে? সে যতই তিনি এশিয়ান গেমসে মহিলাদের ক্রিকেটে স্মৃতি মান্ধনা একাই সোনা জিতেছেন মনে করুন না কেন।

কথা হল, জগমোহনের বিশ্বকাপ আয়োজন করা নিয়ে যা উৎসাহ ছিল, জয়ের তার অর্ধেকও দেখা যাচ্ছে না। তাই এবারের বিশ্বকাপের সূচি ঘোষণা হয়েছে মাত্র ১০০ দিন আগে, যেখানে পৃথিবীর যে কোনো খেলায় বিশ্বকাপের সূচি ঘোষণা হয়ে যায় বছরখানেক আগে। আগামী বছর জুন মাসে ওয়েস্ট ইন্ডিজ ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে অনুষ্ঠেয় ওয়ার্ল্ড টি টোয়েন্টির সূচি যেমন প্রকাশিত হয়েছে গত মাসে। কারণ বিভিন্ন দেশের মানুষকে খেলা দেখতে একটা নির্দিষ্ট সময়ে একটা দেশে পৌঁছতে হবে। যাতায়াতের ব্যবস্থা করতে হবে, থাকার ব্যবস্থা করতে হবে। সেসব প্রস্তুতি নেওয়ার জন্য যত কম সময় পাওয়া যাবে খরচ বেড়ে যাবে ততই। অব্যবস্থা দেখা দেবে, যে দেশে খেলা সেই দেশে বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি তৈরি হবে। কিন্তু ওসব ভাবনা রাজা বাদশাহরা কবেই বা করলেন? তাঁরা চলেন নিজের নিয়মে, বাকি সকলকে মানিয়ে নিতে হয়। বিশ্বকাপ এমনিতে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিলের প্রতিযোগিতা, ফলে সূচি ঘোষণা করার কথা তাদের। কিন্তু আয়োজক দেশকেই ঠিক করতে হয় সূচিটা। একথাও কারোর জানতে বাকি নেই যে ফুটবল দুনিয়াকে ফিফা যেভাবে নিয়ন্ত্রণ করে, আইসিসির মুরোদ নেই তা করার। ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের অর্থবল এত বেশি যে আইসিসি এখন ঠুঁটো জগন্নাথ। অনতি অতীতে আইসিসির ফিউচার টুরস প্রোগ্রামে (অর্থাৎ পরবর্তী কয়েক বছরের আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের নির্ধারিত সূচিতে) আইপিএলের জন্য যে আরও বেশি ফাঁক রাখা হবে তা ঘোষণা করে দিয়েছেন শাহজিই, আইসিসি নয়। তা নিয়ে আইসিসি ট্যাঁ ফোঁ করতে পারেনি। ফলে এত দেরিতে বিশ্বকাপের সূচি ঘোষণার দায় আইসিসির ঘাড়ে চাপানো চলে না।

তবে অস্বাভাবিক দেরিতে সূচি ঘোষণাতেই অব্যবস্থার শেষ নয়, বরং সূচনা। কয়েক দিনের মধ্যেই দেখা গেল বিভিন্ন আয়োজক রাজ্য সংস্থা তাদের স্টেডিয়ামে যেদিন ম্যাচ দেওয়া হয়েছে সেদিন আয়োজন সম্ভব নয় বলছে। খোদ কলকাতাতেই যেমন কালীপুজোর দিন ইংল্যান্ড বনাম পাকিস্তান ম্যাচ রাখা হয়েছিল। ক্রিকেট ম্যাচ আয়োজনের অভিজ্ঞতা না থাকা মানুষও বোঝেন যে সেদিন ম্যাচ আয়োজন করা অসম্ভব, কিন্তু দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর পুত্র বোঝেন না। ক্রীড়াসূচি তৈরি করার সময়ে যে যেখানে খেলা সেখানকার আয়োজকদের সঙ্গে আলোচনা করতে হয়, সম্ভবত তাও তিনি বোঝেন না। নইলে ক্রিকেট অ্যাসোসিয়েশন অফ বেঙ্গলের আয়োজকরা নিশ্চয়ই এত বোকা নন যে কালীপুজোর দিন ম্যাচ করতে রাজি হবেন? জয় শাহীর মজা হল, হিন্দুত্ববাদী দলের নেতা অমিত শাহের পুত্র সর্বেসর্বা হলেও বিশ্বকাপের সূচি বানানোর সময়ে বোর্ডের খেয়ালই ছিল না যে ১৫ অক্টোবর নবরাত্রি উৎসবের সূচনা, সেদিন আমেদাবাদ শহরে ভারত বনাম পাকিস্তান ম্যাচ করা সম্ভব নয়। এহেন প্রশাসনিক নৈপুণ্যের কারণে অনেক দেরিতে সূচি ঘোষণা করার পরেও সব মিলিয়ে গোটা দশেক ম্যাচের দিনক্ষণ বদল করতে হয়েছে।

এখানেই শেষ নয়। বিশ্বকাপের টিকিট বিক্রি নিয়ে যা চলছে তা প্রাক-২০১৪ ভারতে সম্ভবত তদন্তযোগ্য কেলেঙ্কারি বলে গণ্য হত এবং সমস্ত খবরের কাগজ, টিভি চ্যানেলে দিনরাত এ নিয়েই তর্কাতর্কি চলত। একে তো টিকিটের আকাশছোঁয়া দাম, তার উপর বিশ্বকাপের টিকিট অনলাইনে কিনতে গিয়ে অনেকেই তাজ্জব বনে গেছেন। ঘন্টা চারেক ‘কিউ’-তে পড়ে থেকেও টিকিট পাননি অনেকে। আইসিসি এখন পর্যন্ত বলেনি কত টিকিট বিক্রি হওয়ার কথা ছিল আর কত টিকিট বিক্রি হয়েছে। বিক্রির দায়িত্বে থাকা বুকমাইশো সোশাল মিডিয়ায় জানিয়েছে, তাদের হাতে নাকি সীমিত সংখ্যক টিকিটই আছে। এত টিকিট গেল কোথায়? এসব নিয়ে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে যত লেখালিখি হয়েছে, ভারতের সংবাদমাধ্যমে তত হয়নি। ইংরেজি ভাষার সংবাদমাধ্যমে তবু খানিকটা হয়েছে, বাংলার কথা না বলাই ভাল। একদিকে টিকিটের আকাল, অন্যদিকে একাধিক সংবাদমাধ্যম জানাচ্ছে, আজকে উদ্বোধনী ম্যাচে নরেন্দ্র মোদী স্টেডিয়ামে নাকি ৪০,০০০ মহিলাকে দর্শক হিসাবে নিয়ে আসার ব্যবস্থা করেছে গুজরাট বিজেপি। আমেদাবাদের ওয়ার্ডে ওয়ার্ডে হোয়াটস্যাপে আমন্ত্রণ পাঠিয়ে নাকি এই ব্যবস্থা করা হয়েছে। তাহলে কি বিশ্বকাপের টিকিট পেতে গেলে বিজেপির সদস্য বা সমর্থক হতে হবে? সেকথা যদি ঠিক না-ও হয়, এই বিশ্বকাপে হক যে অন্য সব রাজ্যের চেয়ে গুজরাটের বেশি, তাতে কিন্তু সন্দেহ নেই। ভারতে এর আগে অনুষ্ঠিত তিনটে বিশ্বকাপে মুম্বাইয়ের ওয়াংখেড়ে স্টেডিয়াম, কলকাতার ইডেন উদ্যান, দিল্লির ফিরোজ শাহ কোটলা বা চেন্নাইয়ের চিদম্বরম স্টেডিয়ামের মত ঐতিহ্যশালী মাঠের যে সৌভাগ্য হয়নি সেই সৌভাগ্যই এবার হয়েছে নরেন্দ্র মোদী স্টেডিয়ামের। বিশ্বকাপের উদ্বোধনী ম্যাচ ওখানে, ফাইনাল ওখানে, আবার ক্রিকেটবিশ্বের সকলের চোখ থাকে যে ম্যাচের দিকে – সেই ভারত বনাম পাকিস্তান ম্যাচও ওই মাঠেই।

কেন ঘটছে এসব? জলের মত সরল করে বুঝিয়ে দিয়েছেন বহুদিনের ক্রীড়া সাংবাদিক শারদা উগ্রা, সম্প্রতি দ্য ক্যারাভ্যান পত্রিকায় প্রকাশিত তাঁর দীর্ঘ প্রতিবেদনে, যার শিরোনাম Shah’s playground: BJP’s Control of Cricket in India। সেই প্রতিবেদনে বোর্ডের কর্মকর্তাদের উদ্ধৃত করে জানিয়েছেন, অমিতপুত্র বোর্ড চালান একেবারেই একনায়কত্বের ঢঙে। মিনমিনে বিনির সময় থেকে নয়, সৌরভ গাঙ্গুলি বোর্ড সভাপতি থাকার সময় থেকেই। অনেকসময় তিনি বোর্ডের অন্যদের সৌরভের ফোন ধরতে বারণ করতেন। যদি সৌরভ বলতেন অমুক ম্যাচটা ওইদিন হতে হবে, অবধারিতভাবে অন্য কোনোদিন ধার্য করা হত। জয়ের সঙ্গে হাত মিলিয়ে সুপ্রিম কোর্টকে কাঁচকলা দেখিয়ে নিজের সভাপতি পদের মেয়াদ বাড়িয়ে নেওয়া সৌরভ এসব মেনে নিয়েই পদ আঁকড়ে পড়েছিলেন। বোঝা শক্ত নয়, কেন বিশ্বকাপ আয়োজনে এত ডামাডোল। যাঁর কোনো প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা নেই, তিনি যদি একনায়কের কায়দায় এত বড় প্রতিযোগিতার আয়োজন করেন তাহলে এর চেয়ে উন্নত আর কী হওয়া সম্ভব?

আরও পড়ুন ক্রিকেট জেনেশুনে বিশ করেছে পান

যোগ্যতার অভাবের পাশাপাশি সদিচ্ছার অভাবটাও অবশ্য উড়িয়ে দেওয়ার নয়। ১৯৯৬ সালে একদিনের ক্রিকেটের রমরমা ছিল, এখন বিশ্বজুড়েই ৫০ ওভারের খেলা অবাঞ্ছিত। ১৯৭০-এর দশকে একদিনের ক্রিকেটের দরকার হয়েছিল টেস্টের একঘেয়েমি কাটিয়ে মাঠে দর্শক ফেরাতে। সেই চেষ্টা সফল হয়। পরে খেলায় আরও বিনোদন আনতে কেরি প্যাকার চালু করেন রঙিন জামা, সাদা বলে দিনরাতের একদিনের ম্যাচ। প্রথম দিকে তিনি বিদ্রোহী তকমা পেলেও শেষপর্যন্ত কর্তারা বোঝেন এতে বিপুল মুনাফার সম্ভাবনা। প্যাকারের ক্রিকেটই হয়ে দাঁড়ায় মান্য একদিনের ক্রিকেট। এখন আর সে দিন নেই। বিশ্বজুড়ে বাড়ছে ফ্র্যাঞ্চাইজ ক্রিকেট। ক্রিকেটের কর্তাব্যক্তিরা তাকে যথেচ্ছ বাড়তেও দিচ্ছেন, কারণ ওতেই পকেট ভরে যাচ্ছে। যদি একদিনের ক্রিকেটের প্রতি মমতা থাকত, তাহলে ফ্র্যাঞ্চাইজ লিগগুলোতে লাগাম দিতেন। টি টোয়েন্টির মত একদিনের ক্রিকেটেও দুই প্রান্ত থেকে দুটো বলে খেলা চালু করে, মাঠের সীমানা দৃষ্টিকটুভাবে ছোট করে এনে, ইনিংসের সবকটা ওভারকেই ফিল্ডিং সাজানোর নানাবিধ নিষেধের আওতায় নিয়ে এসে ব্যাট-বলের লড়াইকে দুদলের ব্যাটারদের চার, ছয় মারার প্রতিযোগিতায় পরিণত করতেন না। ফল যা হওয়ার তাই হয়েছে। কথায় কথায় সাড়ে তিনশো-চারশো রান হচ্ছে, দ্বিশতরান হচ্ছে মুহুর্মুহু। পুরুষদের একদিনের ক্রিকেটে ২০১০ সালে শচীন তেন্ডুলকার প্রথম দ্বিশতরান করার পর থেকে গত ১৩ বছরে আরও নখানা দ্বিশতরান হয়ে গেছে, একা রোহিত শর্মার ঝুলিতেই তিনখানা। অথচ একদিনের ক্রিকেটের প্রতি দর্শকদের আগ্রহ কমে গেছে পৃথিবীর সর্বত্র। ঘন্টা তিনেক লাগাতার চার-ছক্কা দেখতে ভাল লাগে, ছ-সাত ঘন্টা ধরে ও জিনিস দেখা সাধারণত ক্লান্তিকর। শেষের দিকের ওভারগুলোতে পুরনো বলে রিভার্স সুইং করিয়ে ব্যাটারদের কাজ কঠিন করে দেওয়া বোলারদের পক্ষে দুঃসাধ্য হয়ে গেছে। স্পিনারদেরও চকচকে নতুন বলে চার, ছয় না খাওয়ার দিকেই মনোযোগ দিতে হচ্ছে। ওয়াসিম আক্রাম, শেন ওয়ার্নরা এখন খেললে কোনো তফাত গড়ে দিতে পারতেন কিনা বলা মুশকিল।

খেলোয়াড়রাও ইদানীং ৫০ ওভারের ক্রিকেট খেলার আগ্রহ হারিয়ে ফেলছেন। অনেক কম পরিশ্রমে অনেক বেশি টাকা রোজগার করা যাচ্ছে কুড়ি বিশের ক্রিকেট খেলে। ফলে ওটাকেই তাঁরা অগ্রাধিকার দিচ্ছেন। টেস্ট ক্রিকেট আর ফ্র্যাঞ্চাইজ ক্রিকেট খেলে শরীরেও আর এত তাগদ থাকছে না যে একদিনের ক্রিকেট খেলবেন। গত বিশ্বকাপের সেরা ক্রিকেটার বেন স্টোকস তো গতবছর একদিনের ক্রিকেট থেকে অবসরই নিয়ে ফেলেছিলেন। ইংল্যান্ডের ক্রিকেটকর্তারা অনেক বলে কয়ে তাঁকে শুধুমাত্র ২০২৩ বিশ্বকাপ খেলতে রাজি করিয়েছেন। বিশ্বকাপের পর কী হবে কেউ জানে না। নিউজিল্যান্ডের সেরা বোলার ট্রেন্ট বোল্টও নিজের দেশের বোর্ডের কেন্দ্রীয় চুক্তি থেকে অব্যাহতি নিয়েছেন। অর্থাৎ দেশের হয়ে খেলার আগ্রহ কমে গেছে, ফ্র্যাঞ্চাইজ ক্রিকেটের দিকে ঝুঁকছেন। ভারতের সাদা বলের অধিনায়ক রোহিত শর্মা আর বিরাট কোহলিও সাম্প্রতিককালে একদিনের ম্যাচের সিরিজে একটা ম্যাচ খেলেন তো দুটো ম্যাচে বিশ্রাম নেন। বিশ্বকাপের আগে শেষ দুটো সিরিজ ছিল এশিয়া কাপ আর অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে দ্বিপাক্ষিক সিরিজ। তারও সব ম্যাচ খেললেন না।

কর্তারা যে ৫০ ওভারের খেলাটাকে বিদায় করতে পারলেই বাঁচেন তা সবচেয়ে স্পষ্ট করে বলেছেন হ্যাম্পশায়ার কাউন্টির প্রাক্তন অধিনায়ক এবং সদ্য পৃথিবীর প্রাচীনতম ক্রিকেট ক্লাব এমসিসির সভাপতি হওয়া মার্ক নিকোলাস। ইএসপিএন ক্রিকইনফো ওয়েবসাইটকে তিনি বলেছেন, একদিনের ক্রিকেট আগামীদিনে বিশ্বকাপের বাইরে আর হওয়ার মানে হয় না। এমসিসি এখন আর ক্রিকেটের নিয়ামক সংস্থা নয়, কিন্তু ইংল্যান্ডের ক্রিকেটে এখনো তাদের মতামতের বিস্তর গুরুত্ব আছে আর ইংল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়ার বোর্ডগুলোই জয় শাহের বোর্ডের পরে সবচেয়ে ধনী বোর্ড। বস্তুত তারা ভারতীয় বোর্ডের নন্দী, ভৃঙ্গী। অনেকের ধারণা ভারতই ৫০ ওভারের খেলাটাকে ধরে রেখেছে এবং এবারের বিশ্বকাপটা জমজমাট হলে খেলাটা বেঁচে যাবে। এককথায়, ভারতই পারে বাঁচাতে। পারে হয়ত, কিন্তু বিশ্বকাপ আয়োজনে যে অযত্ন প্রকট তাতে বাঁচানোর ইচ্ছা আছে বলে তো মনে হয় না। আগামী কয়েক মরসুমে আইপিএলকে আরও লম্বা করার যে পরিকল্পনা চূড়ান্ত করে ফেলা হয়েছে সেটাও একদিনের ক্রিকেটের প্রতি ভালবাসার লক্ষণ নয়। অতএব ২০২৭ সালে আর ৫০ ওভারের বিশ্বকাপ না হলে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না। ভবিষ্যৎ সম্পর্কে এতখানি অনিশ্চয়তা নিয়ে সম্ভবত কোনো খেলার বিশ্বকাপ শুরু হয়নি এর আগে।

নাগরিক ডট নেটে প্রকাশিত

টেস্ট পরীক্ষায় আবার ফেল: একটি পূর্ণাঙ্গ প্রহসন

এই সময়কালে টেস্ট দল পরপর দুবার অস্ট্রেলিয়ায় সিরিজ জেতা ছাড়া বিদেশের কোথাও সিরিজ জেতেনি। বিদেশে খেলা হলেই রোহিত, চেতেশ্বর পূজারা, কোহলি, অজিঙ্ক রাহানে ধ্যাড়াবেন আর কখনো ঋষভ পন্থ, কখনো জাদেজা, কখনো শার্দূল, কখনো ওয়াশিংটন সুন্দর রান করে মুখরক্ষা করবেন – এটাই নিয়ম হয়ে দাঁড়িয়েছে।

প্রথম অঙ্ক: সব ব্যাটাকে ছেড়ে টস ব্যাটাকে ধর

ভারত কেন ওভালে হারল? টসে জিতে রোহিত শর্মা অস্ট্রেলিয়াকে ব্যাট করতে ডাকলেন বলে। ধারাভাষ্যকার অথবা খবরের কাগজে কলাম লেখা বিশেষজ্ঞ প্রাক্তন ক্রিকেটার, ক্রিকেট সাংবাদিক এবং জনতা – সকলে মিলে এই উত্তরটা তৈরি করে ফেলেছিলেন বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের প্রথম দিনের খেলা শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই। কারণ অস্ট্রেলিয়া দিনের শেষে তিন উইকেটে ৩২৭ রানে পৌঁছে গিয়েছিল। রানের অযোধ্যা পাহাড় যে পরদিন হিমালয়ে পরিণত হবে তার স্পষ্ট ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছিল। তবু তো শেষমেশ অস্ট্রেলিয়া এভারেস্টে উঠতে পারেনি, কারাকোরামে পৌঁছেই থেমে গিয়েছিল। অতএব স্রেফ প্রথম দিনের আবহাওয়া দেখেই কেন ফিল্ডিং নেবে – এ সমালোচনা করা ভারি সহজ হয়ে গেল। কেউ আসল কথাটাই বললেন না। টস করতে যাওয়ার সময়ে তো অধিনায়ককে হাতে যে ১১ জন খেলবেন তাদের তালিকাটা নিয়ে যেতে হয়। সেখানে বাঘা বাঘা চারজন জোরে বোলারের নাম লেখা হয়ে গেছে। তারপর টস জিতে আর ব্যাটিং নেওয়া যায় নাকি? যদি ইংল্যান্ডের মাঠে প্রথম দিনের তাজা পিচে বল করার সুযোগই না নেব, তাহলে আর চারজন জোরে বোলারকে নিলাম কেন? সে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলার পর টস জিতে ব্যাটিং নেওয়ার মত আহাম্মকি আর আছে নাকি?

এমন নয় যে এই কথাটা একমাত্র আমিই বুঝেছি আর সুনীল গাভস্কর, রবি শাস্ত্রী, আকাশ চোপড়া প্রমুখ তাবড় প্রাক্তন ক্রিকেটার ধরতে পারেননি। কিন্তু তাঁরা সেকথা বলেননি। তাঁরা বলেছেন বটে, যে পৌনে পাঁচশো উইকেট নিয়ে ফেলা রবিচন্দ্রন অশ্বিনকে খেলানো উচিত ছিল। কিন্তু কেন বিদেশের মাঠে একের পর এক টেস্টে একমাত্র স্পিনার হিসাবে তাঁর বদলে দলে থাকেন রবীন্দ্র জাদেজা – তার যুক্তিগ্রাহ্য ব্যাখ্যা দিতেও তাঁরা আপ্রাণ চেষ্টা করে গেছেন। ব্যাখ্যাটা হল, জাদেজার ব্যাটিং অশ্বিনের চেয়ে ভাল। অথচ ব্যাপারটা কিন্তু মোটেই প্রশ্নাতীত নয়।

এই ম্যাচে জাদেজা প্রথম ইনিংসে ৪৮ রান করেছেন, যা না করলে ভারতের হারের ব্যবধানটা আরও বড় হত। দ্বিতীয় ইনিংসে স্কট বোল্যান্ডের সামনে দু বলের বেশি টিকতেই পারেননি। স্কোরারদের কাজ না বাড়িয়ে বিদায় নিয়েছেন। কিন্তু তার জন্যে তাঁকে উড়িয়ে দেব না। কোনো খেলোয়াড়ই সব ম্যাচে সফল হন না। ঘটনা হল অশ্বিন আর জাদেজার গোটা কেরিয়ারের ব্যাটিং পাশাপাশি রাখলে পরিষ্কার দেখা যায় অলরাউন্ডার হিসাবে অশ্বিন মোটেই খুব পিছিয়ে নেই। এখন পর্যন্ত ৬৫ টেস্টে ২৬৮ উইকেটের সঙ্গে জাদেজার রান ২৭০৬, গড় ৩৫.৬০, ১৮ অর্ধশতরানে সঙ্গে শতরান তিনটে। অশ্বিন ৯২ টেস্টে ৪৭৪ উইকেট নেওয়ার পাশাপাশি ২৬.৯৭ গড়ে ৩১২৯ রানও করে ফেলেছেন। তেরোটা অর্ধশতরানের পাশাপাশি পাঁচ-পাঁচটা শতরানও আছে তাঁর। এর উপর আছে ২০২১ সালের জানুয়ারি মাসে সিডনিতে সারাদিন ব্যাট করে ম্যাচ বাঁচানো ৩৯, যার দাম একটা দ্বিশতরানের চেয়েও বেশি। অতি বড় জাদেজাভক্তও ম্যাচের উপর ওর চেয়ে বেশি প্রভাব ফেলেছে এমন কোনো ইনিংসের কথা বলতে পারবেন না।

তাছাড়া জাদেজা দেশের মাঠের ঘূর্ণি পিচে যতখানি প্রভাবশালী বোলার, বিদেশে ততটাই নির্বিষ। তিনি ওভালে বিষাণ সিং বেদীকে টপকে টেস্ট ক্রিকেটে সর্বোচ্চ উইকেট শিকারী বাঁহাতি স্পিনার হয়ে গেছেন বটে, কিন্তু ২৬৮ উইকেটের মধ্যে ১৯৪ খানা উইকেটই এসেছে দেশের মাটিতে (৪০ টেস্টে), উইকেট পিছু মাত্র ২০.৪৫ রান খরচ করে। কিন্তু বিদেশে গেলেই জাদেজা অন্য বোলার। পঁচিশটা টেস্ট খেলে পেয়েছেন মাত্র ৭৪ খানা উইকেট। একেকটার জন্যে খরচ হয়েছে ৩৪.৩২ রান। ওভাল টেস্টেও দেখা গেল প্রথম ইনিংসে তিনি কোনো প্রভাবই ফেলতে পারলেন না। দ্বিতীয় ইনিংসে যখন বল রীতিমত ঘুরছে এবং লাফাচ্ছে তখন তিনটে উইকেট পেলেন বটে, কিন্তু স্টিভ স্মিথ আর ট্রেভিস হেডের দ্রুত রান তোলার তাড়া না থাকলে এবং ক্যামেরন গ্রীন স্কুল ক্রিকেটারের মত করে ডিফেন্স না করলে সেগুলো জুটত না। মহেন্দ্র সিং ধোনি অধিনায়ক থাকাকালীন একবার ইংল্যান্ডেই একটা টেস্টে জাদেজার স্পিন এতটাই পানসে হয়ে গিয়েছিল যে ধোনি উইকেট থেকে পিছিয়ে দাঁড়িয়ে তাঁকে দিয়ে মিডিয়াম পেস বোলিং করিয়েছিলেন। তবু একমাত্র স্পিনার হিসাবে জাদেজাই খেলবেন, অশ্বিন নয়। তাঁরও বিদেশের রেকর্ড (৩৭ ম্যাচে ১৩৭ উইকেট, গড় ৩১.৪৫) দেশের তুলনায় সাধারণ, কিন্তু গত কয়েকটা বিদেশে সফরে অনেকখানি উন্নতি দেখা গিয়েছিল। বিশেষ করে অস্ট্রেলিয়া সফরে এ যুগের সম্ভবত সেরা টেস্ট ব্যাটার স্মিথকে তিনি বোতলবন্দি করে ফেলেছিলেন।

এই অশ্বিনের চেয়ে শার্দূল ঠাকুর আর উমেশ যাদবকেও বেশি প্রয়োজনীয় মনে করা হয়েছে। উমেশ সেই ২০১১ সাল থেকে টেস্ট খেলছেন। সাতান্নটা টেস্ট খেলার পরেও তাঁর বোলিংয়ে অভিজ্ঞতার কোনো ছাপ দেখা যায় না। আজও গড় তিরিশের নিচে নামল না, ওভার পিছু সাড়ে তিনের বেশি রানও দিয়ে ফেলেন। কোনো ওভারে একটাও চার মারার বল না দিলে ধারাভাষ্যকাররা আপ্লুত হয়ে পড়েন। কিন্তু তিনি নাকি দারুণ রিভার্স সুইং করান – এরকম একটা যুক্তি ওভালে তাঁর নির্বাচনের সপক্ষে দেওয়ার চেষ্টা করছিলেন শাস্ত্রীরা। ইংল্যান্ডের আবহাওয়ার কারণে সাধারণত বল এমনিই সারাদিন সুইং করে। সেখানে যে রিভার্স সুইং বিশেষজ্ঞের বিশেষ দরকার পড়বে না, তা কি ওই বোদ্ধারা জানেন না? আর দরকার পড়লেই বা। উমেশ তো ওয়াকার ইউনিসের মাপের বোলার নন। শার্দূলেরও না আছে গতি, না বিরাট সুইং। যতই নটা টেস্টে ২৯ খানা উইকেট পেয়ে থাকুন, দারুণ বোলিং সহায়ক পরিবেশ না পেলে তিনি নেহাত সাধারণ। ব্যাটেও এমন কিছু ধারাবাহিক নন, গড় মোটে ২০.৩৩। ত্রিশোর্ধ্ব এই ক্রিকেটারদের কাছ থেকে যে নতুন কিছু পাওয়ার থাকতে পারে না, সেকথা রোহিত আর সারাক্ষণ মনোযোগী ছাত্রের মত খাতায় নোট নেওয়া রাহুল দ্রাবিড় বোঝেন না কেন?

বোঝেন না যে সেকথা কিন্তু গাভস্কররা বলেন না। তাঁরা বরং টিম ম্যানেজমেন্টের সিদ্ধান্তগুলোর সপক্ষে যুক্তি খাড়া করার চেষ্টা করেন। কারণ নুন খেলে গুণ গাইতেই হয়। নইলে নুন খাওয়া ছাড়তে হয়। ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড শুধু পৃথিবীর সবচেয়ে ধনী বোর্ডই নয়, একমাত্র বোর্ড যারা জাতীয় দল এবং আইপিএলের সম্প্রচারের সুতোও নিজেদের হাতে রাখে। ধারাভাষ্যকাররা তার হাতের পুতুল। অপছন্দের কথা বলেছ কি চুক্তি বাতিল। অতএব বোর্ড যা করে সব ভাল, টিম ম্যানেজমেন্টও সবসময় ভালই করে, তবে মাঝেমধ্যে দু-একটা ভুল হয়ে যায় আর কি। যেমন টস জিতে ফিল্ডিং নিতে গিয়ে ব্যাটিং নেওয়া হয়ে যায়। তা বলে কি আর অচল ক্রিকেটার দলে নেওয়া হয়? মোটেই তা বলা যায় না।

দ্বিতীয় অঙ্ক: ভাঙব তবু মচকাব না

যাঁরা মন দিয়ে ওভাল টেস্ট দেখেছেন এবং পঞ্চম দিন সকাল সকাল ভারত হেরে যাওয়ার পরেও ভগ্ন হৃদয়ে অস্ট্রেলিয়ার ট্রফি হাতে নেওয়া পর্যন্ত সম্প্রচার দেখেছেন তাঁরা নিশ্চয়ই দুটো কথা ভাবছেন। প্রথমত, ডুবিয়েছে ভারতীয় দলের ক্রিকেটাররা। খামোকা প্রাক্তন ক্রিকেটারদের সমালোচনা করা কেন? দ্বিতীয়ত, অন্য সময়ে যা-ই করুন, ওভাল টেস্টের পরে তো আমাদের প্রাক্তনরা যারপরনাই সমালোচনা করেছেন। গাভস্কর তো এত রেগে গিয়েছিলেন যে স্টার স্পোর্টসের অ্যাঙ্কর ভদ্রমহিলাকে দেখে মনে হচ্ছিল পালাতে পারলে বাঁচেন। দ্রাবিড়ের দুই পুরনো বন্ধু সৌরভ গাঙ্গুলি আর হরভজন সিংও তাঁকে বিস্তর চোখা চোখা প্রশ্নে বিদ্ধ করেছেন। তাহলে এঁদের সমালোচনা করা কেন?

ঠিক কথা। প্রথম প্রশ্নের উত্তরে আসতে একটু সময় লাগবে। আগে দ্বিতীয় প্রশ্নের উত্তর দিয়ে নিই। ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের চুক্তি যতই মহার্ঘ হোক, চোখের চামড়া তো কিনতে পারে না। ফলে ২০৯ রানে টেস্ট হারার পরে মিষ্টি কথা বলা কী করে সম্ভব? তাছাড়া হাজার হোক, গাভস্কর, সৌরভদের ক্রিকেট দুনিয়ায় তাঁদের খেলোয়াড় জীবনের অর্জনগুলোর জন্য বিশেষ সম্মান আছে। সে সম্মান তাঁরা বিসর্জন দেন কী করে? তাঁরা তো আর রাহুল কাঁওয়াল বা অর্ণব গোস্বামী নন যে বিজেপির গোহারা হারকে লাইভ টিভিতে ‘সম্মানজনক হার’ বলে চালানোর চেষ্টা করবেন অন্য দেশের লোকে কী ভাবল সেসবের তোয়াক্কা না করে। ক্রিকেটার গাভস্করের নামে গান বাঁধা হয়েছিল ওয়েস্ট ইন্ডিজে, অধিনায়ক সৌরভকে এখনো সমীহ করে সারা বিশ্বের ক্রিকেটমহল। সেগুলোর মূল্য ক্রিকেট বোর্ডের মহাত্মা গান্ধীর ছবিওয়ালা কাগজ এখনো পুরোপুরি ভুলিয়ে দিতে পারেনি। তার উপর ধৈর্যচ্যুতির সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না। বিদেশের মাঠে ভারত এই প্রথম হারল না, এর চেয়ে লজ্জাজনকভাবেও হেরেছে। কিন্তু একটা সাধারণ পিচে পাঁচদিন সবদিক থেকে পর্যুদস্ত হয়ে সেই সৌরভের আমল থেকে কতবার হেরেছে তা হাতে গুণে বলা যাবে। ভারতীয় ক্রিকেটে তাঁর সবচেয়ে বড় অবদানই হল বিদেশে জিততে শেখানো। গাভস্করও বিদেশে বহু যুদ্ধের নায়ক। ওই ওভালেই তাঁর মহাকাব্যিক ২২১ রান আছে চতুর্থ ইনিংসে। সেদিন চারশোর বেশি রান তাড়া করে ভারত আরেকটু হলে জিতেই যাচ্ছিল। ফলে এই হার তাঁদের হজম না হওয়াই স্বাভাবিক। কিন্তু…

এই কিন্তুর মধ্যেই আছে দ্বিতীয় উত্তর। রাগত প্রাক্তনরা কী বলেছেন তা কি খেয়াল করেছেন? বিরাট কোহলির আউট সম্পর্কে মতামত চাইলে ক্রুদ্ধ গাভস্কর বলেছেন, ওকেই জিজ্ঞেস করুন চতুর্থ-পঞ্চম স্টাম্পের বল কেন তাড়া করতে গেছিল। সৌরভ দ্রাবিড়কে প্রশ্ন করেছেন, প্রথমে ব্যাট করার কী যুক্তি ছিল? তিনি আরও উল্লেখ করেছেন যে ভারতের প্রথম পাঁচ ব্যাটার দীর্ঘদিন হল রান করতে পারছেন না। ব্যাটিংয়ে কি রদবদলের দরকার নেই? হরভজন জিজ্ঞেস করেন, ভারতীয় দলের মহাতারকারা বিদেশের পিচে কেন রান করতে পারেন না? বোলাররাই বা সুবিধা করতে পারেন না কেন?

প্রশ্নগুলো চোখা বটে, কিন্তু বেশি চোখা লাগছে এই কারণে যে ভারতের প্রাক্তনদের মুখ থেকে বর্তমান ক্রিকেটারদের স্তুতি শুনতেই আমরা অভ্যস্ত হয়ে গেছি। ব্যর্থ হলে সমালোচনা করা, প্রশ্ন করাই যে তাঁদের কাজ – একথা আমরা ভুলেই গিয়েছিলাম। এমনটা কিন্তু অন্য দেশে হয় না। ২০২১-২৩ টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের গোড়ার দিকে ইংল্যান্ড জঘন্য খেলছিল। অধিনায়ক জো রুট ছাড়া প্রায় কেউই রান করতে পারছিলেন না, বোলারদের অবস্থাও ছিল তথৈবচ। রুটের অধিনায়কত্বও প্রত্যাশা পূরণ করতে পারছিল না। এমনকি দুর্বল ওয়েস্ট ইন্ডিজের কাছেও শোচনীয় পরাজয় ঘটে ইংল্যান্ডের। সেইসময় নাসের হুসেন, মার্ক বুচারের মত প্রাক্তনরা কিন্তু টিম ম্যানেজমেন্টকে ছেড়ে কথা বলেননি। তাঁর ধারাভাষ্য দিতে গিয়ে পরিষ্কার বলতেন রুটকে দিয়ে আর অধিনায়কত্ব হবে না। রুট শেষপর্যন্ত দায়িত্ব ছেড়ে দেন, ব্যর্থতার দায় মাথায় নিয়ে পদত্যাগ করেন ইংল্যান্ড অ্যান্ড ওয়েলস ক্রিকেট বোর্ডের পক্ষ থেকে জাতীয় দল এবং আরও অনেককিছুর দায়িত্বে থাকা অ্যান্ড্রু স্ট্রস। তাঁর জায়গায় আসেন রবার্ট কী। তারপর টেস্ট দলের কোচ ক্রিস সিলভারউডকে সরিয়ে নিয়ে আসা হয় ব্রেন্ডন ম্যাককালামকে, অধিনায়ক হন বেন স্টোকস। দলেও বেশকিছু রদবদল করা হয়। তারপর থেকে ইংল্যান্ড যে ক্রিকেট খেলছে তাতে শুধু যে তারা অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠেছে তাই নয়, তারা টেস্ট ক্রিকেটকে নতুন যুগে নিয়ে যাচ্ছে কিনা সেটাই এখন আলোচনার বিষয়। ম্যাককালামের আদরের নাম ব্যাজ। সেই থেকে তাদের খেলার ধরনের নামকরণ হয়েছে ব্যাজবল।

অথচ আমাদের প্রবাদপ্রতিম প্রাক্তনদের দেখুন। পৃথিবীর সেরা মানের পারিশ্রমিক, অনুশীলনের সুযোগসুবিধা ইত্যাদি পেয়েও সেই ২০১৩ সালের চ্যাম্পিয়নস ট্রফির পর থেকে আর কোনো আইসিসি ট্রফি জেতেনি ভারত। উপরন্তু এই সময়কালে টেস্ট দল পরপর দুবার অস্ট্রেলিয়ায় সিরিজ জেতা ছাড়া বিদেশের কোথাও সিরিজ জেতেনি। বিদেশে খেলা হলেই রোহিত, চেতেশ্বর পূজারা, কোহলি, অজিঙ্ক রাহানে ধ্যাড়াবেন আর কখনো ঋষভ পন্থ, কখনো জাদেজা, কখনো শার্দূল, কখনো ওয়াশিংটন সুন্দর রান করে মুখরক্ষা করবেন – এটাই নিয়ম হয়ে দাঁড়িয়েছে। দশ বছর ধরে এই ঘটনা বারবার ঘটে চললেও এখনো গাভস্কর, সৌরভরা নাম করে বলতে পারছেন না অমুককে বাদ দেওয়া উচিত। ২০১৩ সালে যখন ভারত বহুকাল পরে ঘরের মাঠে ইংল্যান্ডের কাছে সিরিজ হারল, তখন জিওফ্রে বয়কট আর কপিলদেব কিন্তু রাখঢাক না রেখেই বলেছিলেন, শচীন তেন্ডুলকর উন্নতি করতে না পারলে অবসর নিন। আজ বিরাটের নাম মুখে আনতে পারছেন না আমাদের প্রাক্তনরা, বহু ভারতীয় গিন্নী যেমন কর্তার নাম মুখে আনেন না। অথচ একা কোহলিই যে কতখানি ডুবিয়ে দিচ্ছেন ভারতকে, তার স্পষ্ট পরিসংখ্যান তুলে ধরেছেন ক্রিকেট অ্যানালিটিক্স সংস্থা ক্রিকভিজের সিনিয়র ব্রডকাস্ট অ্যানালিস্ট সোহম সরখেল। নিচের এই টুইটসূত্রে চোখ রাখলেই দেখতে পাবেন, সদ্য শেষ হওয়া টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপে অন্য ব্যাটারদের ব্যর্থতা সত্ত্বেও ভারতের চার নম্বর ব্যাটার বাদে সব জায়গার ব্যাটাররাই বিপক্ষের ব্যাটারদের চেয়ে গড়ে ভাল রান করেছেন। কিন্তু একা কোহলির ব্যর্থতাই এত বিরাট যে তা অন্য সবার কাজে জল ঢেলে দিয়েছে। ২০২০ সালে তাঁর গড় ছিল ১৯, ২০২১ সালে ২৮ আর ২০২২ সালে ২৬। এ বছর এখন পর্যন্ত ৪৫, কিন্তু তার কারণ আমেদাবাদের ঢ্যাবঢেবে পিচে ১৮৬। ওই ইনিংস বাদে চলতি বছরেও তাঁর গড় ২৫।

তৃতীয় অঙ্ক: মানুষের তৃতীয় হাত

জিততে পারুন আর না-ই পারুন, ভারতীয় দলের ক্রিকেটার বা কোচের মুখে সবসময় খই ফোটে। এ জিনিসটা শিখিয়ে যাওয়ার কৃতিত্ব অবশ্যই ধোনি আর শাস্ত্রীর। ধোনি ইংরেজি অভিধান থেকে একটি চমৎকার শব্দ চয়ন করেছিলেন – প্রোসেস। হেরে গেলেই বলতেন, আমরা হারজিত নিয়ে চিন্তিত নই। প্রোসেস ‘ফলো’ করা হয়েছে কিনা সেটাই বড় কথা। সেটা করা হলে ‘রেজাল্ট’ ঠিক এসে যাবে। কথাগুলো চমৎকার। বেশ একটা মহাত্মা গান্ধীসুলভ প্রশান্তি রয়েছে কথাগুলোর মধ্যে। কিন্তু মুশকিল হচ্ছে, ধোনি বাবা হয়ে গেলেন, চুল পেকে গেল, ভারতীয় দল থেকে অবসর নিয়ে ফেললেন, ‘রেজাল্ট’ তো আজও এসে পৌঁছল না। তাঁর উত্তরসূরী কোহলি আর ভারতীয় দলের তৎকালীন কোচ শাস্ত্রী প্রোসেসের সঙ্গে যোগ করেছিলেন আরেকটি শব্দ – ইনটেন্ট। বারবার সাংবাদিক সম্মেলনে এসে দুজনেই বলতেন, ইনটেন্টই হচ্ছে আসল। ওটা যার আছে তার উপর টিম ম্যানেজমেন্টের ভরসা আছে। ইনটেন্ট দেখিয়ে হারলে কোনো দুঃখ নেই। এই ইনটেন্ট নেই বলে পূজারা যখন ধারাবাহিক ছিলেন তখনো বারবার বাদ পড়তে হয়েছে, ফর্মে থাকা রাহানেকে বসিয়ে রেখে নড়বড়ে রোহিতকে টেস্ট খেলানো হয়েছে দক্ষিণ আফ্রিকায়।

এইবার দ্বিতীয় অঙ্কে উত্থাপিত প্রথম প্রশ্নের জবাবটা দিয়ে ফেলা যাক। ভারতীয় ক্রিকেট দলের ব্যর্থতায় প্রাক্তনদের সমালোচনা করছি কেন?

এই যে ইনটেন্ট নামক ধাষ্টামো, এর টেস্ট ক্রিকেটে কোনো মানেই হয় না জেনেও আমাদের প্রাক্তনরা কিন্তু সেসময় অধিনায়ক কোহলি আর কোচ শাস্ত্রীকে প্রশংসায় ভরিয়ে দিয়েছিলেন, দুহাত তুলে সমর্থন করেছিলেন। ২০১৫ সালের শ্রীলঙ্কা সফরে প্রথম দুটো টেস্টে পূজারাকে বসিয়ে রাখা হয়, কারণ তার আগের অস্ট্রেলিয়া সিরিজে তাঁর মধ্যে ইনটেন্ট দেখা যায়নি। তৃতীয় টেস্টে দুই ওপেনারের অভাব ঘটায় অগত্যা তাঁকে খেলানো হয় এবং তিনি ১৪৫ রানে অপরাজিত থাকেন। বস্তুত, দ্বিতীয় ইনিংসে শূন্য রানে আউট হলেও, কম রানের সেই ম্যাচে ওই ইনিংসই তফাত গড়ে দেয় এবং ভারত জেতে। পূজারা প্রথম ইনিংসে যখন পঞ্চাশ পেরোন, তখন ধারাভাষ্যকার সঞ্জয় মঞ্জরেকর গাভস্করকে জিজ্ঞেস করেন পূজারা কি দলে নিজের জায়গা পাকা করতে পারলেন, নাকি শতরান করলে জায়গা পাকা হবে? সানি উত্তর দেন, এই দলে যা প্রতিভার ছড়াছড়ি তাতে আলোচনায় থাকতে গেলে পূজারাকে দেড়শোর বেশি করতে হবে। বিরক্ত কলামনিস্ট মুকুল কেশবন দ্য টেলিগ্রাফ-এ লেখেন “A century and a half…what team of Titans was this, what bastion of Bradmans was Pujara trying to breach?” সেই ইনটেন্টের ভূত যে পূজারাকে আজও তাড়া করে বেড়াচ্ছে, তার প্রমাণ ওভালের দ্বিতীয় ইনিংসে তাঁর চরিত্রবিরোধী এবং খেলার পরিস্থিতি অনুযায়ী সম্পূর্ণ অপ্রয়োজনীয় শট খেলতে গিয়ে আউট হওয়া। ক্রিজে জমে যাওয়া রোহিতের হঠাৎ নাথান লায়নের সোজা বলকে সুইপ করতে গিয়ে এলবিডব্লিউ হওয়া বা কোহলির কয়েকটা ডট বল হতেই বহুদূরের বল তাড়া করে স্লিপে ক্যাচ দিয়ে ফিরে যাওয়ার পিছনেও ইনটেন্টের ভূমিকা নিশ্চয়ই আছে।

ভারতীয় ক্রিকেটের একেবারে ভাবনার জায়গায় এই দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতিগুলো যখন করা হয়েছে, তখন হাততালি দিয়েছেন এই বিশেষজ্ঞ প্রাক্তনরা। কোহলির জিম-পাগল হওয়া এবং গোটা দলকে জিম-পাগল করে তোলাকে প্রশংসায় ভরিয়ে দিয়েছেন আমাদের প্রাক্তনরা, হর্ষ ভোগলেরা এবং প্রাতঃস্মরণীয় ক্রিকেট সাংবাদিকরা। অথচ মাইকেল হোল্ডিং, ওয়াসিম আক্রাম, কপিলদেবের মত নমস্য জোরে বোলাররা চিরকাল বলে এসেছেন, ক্রিকেটার মানে কুস্তিগীর নয়। তাদের পেশি ওরকম হওয়ার দরকার নেই। তাদের শরীর তৈরি করতে সেরা প্র্যাকটিস হল নেট প্র্যাকটিস। বিশেষ করে জোরে বোলারদের উচিত যত বেশি সম্ভব বোলিং করা। বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে এঁরা বারবার বলেছেন, এমনকি অফ সিজনেও কয়েকশো ওভার বল করতেন নেটে। সেভাবেই চোট-আঘাত মুক্ত অবস্থায় টানা প্রায় দুই দশক ভারতের হয়ে খেলে গেছেন কপিল। অথচ এখন আমাদের জিম করা ক্রিকেটারদের এমন অবস্থা যে ব্যাটাররাই অনেকে টানা দুটো সিরিজ খেলে উঠতে পারেন না। আর বোলাররা? যশপ্রীত বুমরা সেই যে আহত হয়েছেন, কিছুতেই মাঠে ফিরতে পারছেন না। বিশ্বকাপে খেলতে পারবেন কিনা কেউ নিশ্চিত করে বলতে পারছে না। প্রসিদ্ধ কৃষ্ণ, নভদীপ সাইনি – যাঁকেই ভবিষ্যৎ বলে ভাবা হয়, কিছুদিন পরেই দেখা যায় তিনি আহত। অতএব ঘুরে ফিরে বুড়িয়ে যাওয়া উমেশ আর মাঝারি মানের শার্দূলকেই খেলাতে হয়। অর্থাৎ গোলমালটা প্রথম একাদশ নির্বাচন থেকে শুরু হয়নি। দেশের কয়েকশো খেলোয়াড়ের মধ্যে থেকে ১৪-১৫ জন বেছে নেওয়ার সময়েই গোড়ায় গলদ হয়ে গেছে।

ব্যাটার বেছে নেওয়ায় গলদ তো আরও গভীর। কারণ টপ অর্ডার এবং মিডল অর্ডারের নিষ্কর্মাদের সরানো যাবে না। পূজারা, রাহানেদের তবু বাদ দেওয়া গেছে। তাঁদের কাউন্টি ক্রিকেটে বা ঘরোয়া ক্রিকেটে রান করে ফিরতে হয়েছে। কিন্তু রোহিত আর কোহলির আছে বিপুল বিজ্ঞাপনী সমর্থন। অর্থাৎ তাঁদের উপর কোটি কোটি টাকা লগ্নি করে রেখেছে বহু কোম্পানি। তার মধ্যে আছে ঘুরিয়ে নাক দেখিয়ে জুয়া খেলার কোম্পানিগুলোও। তাদের কেউ কেউ এমনকি জাতীয় দলের শার্ট স্পনসর, অমুক স্পনসর তমুক স্পনসর। তাদের আর্থিক ক্ষতি হয় এমন কাজ মোটেই করা চলে না। অতএব রান করতে না পারলেও শালগ্রাম শিলার মত এদের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ তারকাদের দলে রাখতেই হবে। রঞ্জি ট্রফিতে ঝুড়ি ঝুড়ি রান করা সরফরাজ খানরা যদ্দিন আইপিএলে রানের বন্যা বইয়ে শাঁসালো স্পনসর জোগাড় করতে না পারছেন তদ্দিন বাড়ির টিভিতে টেস্ট ম্যাচ দেখা ছাড়া কিছুই করতে পারবেন না। এর ফলে দলের যে ক্রিকেটিয় ক্ষতি, তা পূরণ করতেই টেস্ট দল নির্বাচনের সময়ে বোলারদের বেলাতেও দেখা হয় ভাল ব্যাট করতে পারে কিনা, উইকেটরক্ষক বাছার সময়েও তাই।

অগ্রাধিকারের এই উলটপুরাণ এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে ওভাল টেস্টে কে এল রাহুলকে উইকেটরক্ষক হিসাবে খেলানোর নিদান দিয়ে ফেলেছিলেন বহু বোর্ড ঘনিষ্ঠ ক্রিকেট সাংবাদিক। রাহুল ফিট থাকলে বোধহয় সেটাই ঘটত। যদিও সকলেই জানেন ইংল্যান্ডে উইকেটরক্ষা ভীষণ শক্ত কাজ কারণ বল ব্যাটারকে অতিক্রম করার পরেও সুইং করে অনেকসময়, পিচে অসমান বাউন্সও থাকতে পারে। সেখানে পাঁচদিনের খেলায় রাহুলের মত ঠেকনা দেওয়া উইকেটরক্ষক খেলানো আর খাদের ধারে দাঁড়িয়ে সেলফি তোলা একই কথা। ওভালে কোনা শ্রীকর ভরত প্রশংসনীয় উইকেটরক্ষা করেছেন। তারপরেও সোশাল মিডিয়ায় “ওকে দিয়ে হবে না” লিখে চলেছেন বহু বোদ্ধা সাংবাদিক। পন্থ থাকলে আলাদা কথা ছিল। তিনি অনুপস্থিত থাকা সত্ত্বেও বেচারা ভরত শান্তিতে খেলতে পারবেন না। ঋদ্ধিমান সাহাকে যখন দ্রাবিড় ডেকে বলে দিয়েছিলেন, তাঁর বয়স হয়েছে বলে আর টেস্ট দলে না নেওয়ার কথা ঠিক করেছে টিম ম্যানেজমেন্ট, তখন মনে হয়েছিল অস্ট্রেলিয়ার মত নতুন খেলোয়াড় তুলে আনার প্রগতিশীল পথে এগোচ্ছে ভারতীয় দল। এখন বোঝা যাচ্ছে, ওসব কিছু নয়। ঋদ্ধিমানের দরকার ছিল অমুক ডট কমের একটা এনডর্সমেন্ট চুক্তি। তাহলেই বয়সটা বাড়তি না হয়ে কমতি হয়ে যেত।

দল নির্বাচনে এইসব শর্তাবলী প্রযোজ্য বলেই বোধহয় বোর্ড পাঁচজনের নির্বাচন সমিতিতে চারজনকে রেখে, অস্থায়ী চেয়ারম্যান রেখে দিব্যি চালিয়ে যাচ্ছে সেই ২০২০ সাল থেকে। তাঁদের আর গুরুত্ব কী? রাজ সিং দুঙ্গারপুরের মত বৈপ্লবিক সিদ্ধান্ত নিয়ে কোনো সাড়ে ষোলো বছরের ছেলেকে দলে ঢুকিয়ে দেওয়া বা যাঁকে ভবিষ্যতের অধিনায়ক বলে কেউ ভাবছেই না, তাকে গিয়ে “মিয়াঁ, ক্যাপ্টেন বনো গে?” বলার অধিকারই আজকের নির্বাচকদের নেই। তাঁরা স্রেফ দক্ষ বাজিকরের হাতের পুতুল।

সমস্ত ক্রিকেট ব্যবস্থাটাই যে অব্যবস্থায় পরিণত হয়েছে সেকথা বলার কাজ তো বিশেষজ্ঞ, ধারাভাষ্যকার, সাংবাদিকদেরই। যিনি যত বড় নাম, তাঁর দায়িত্ব তত বেশি। অথচ সকলেই সুকুমার রায়ের ছড়ার মত “এই দুনিয়ার সকল ভাল, আসল ভাল নকল ভাল” বলে চালিয়ে যাচ্ছেন এক দশক যাবৎ। কারণ কেউ ধারাভাষ্য দেওয়ার চুক্তির লোভ সামলাতে পারছেন না, কারোর চাকরি বোর্ডের জো হুজুরি না করলে চলে যাবে। যেমন স্মৃতি ইরানিকে প্রশ্ন করায় এক সাংবাদিকের চাকরি গেছে বলে অভিযোগ উঠেছে। সাংবাদিকরা না হয় চাকরি বাঁচাতে ব্যস্ত, কিন্তু ভারতের হয়ে খেলা এবং এত বছর মোটা মাইনের ধারাভাষ্যের কাজ করা বিশেষজ্ঞরা এখনো জো হুজুরি করে যাবেন আর দুকথা শুনবেন না তা কি হয়?

আজ ভারতীয় ক্রিকেটে যে হারজিতের যে কোনো মূল্য নেই, রোহিত-কোহলিরা যে বারবার ব্যর্থতার পরেও কলার তুলে ‘গ্রেট’ অভিধা নিয়ে ঘুরে বেড়াতে পারেন এবং প্রত্যেকটা হারের পর নতুন নতুন অজুহাত খাড়া করতে পারেন তার জন্যে তো ভারতীয় ক্রিকেটের গোটা বাস্তুতন্ত্র দায়ী। এমন বাস্তুতন্ত্র তৈরি করায় সক্রিয় ভূমিকা নিয়েছেন প্রাক্তনরা। ওভালের পরাজয়ের পরেও একগুচ্ছ অজুহাত খাড়া করেছেন অধিনায়ক রোহিত। টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনাল আইপিএল ফাইনালের পরে কেন হবে? জুনের বদলে মার্চে কেন হবে না? হলেই তো প্রস্তুতি নেওয়ার যথেষ্ট সময় পাওয়া যেত। এত বড় প্রতিযোগিতার ফাইনাল তিন ম্যাচের হওয়া উচিত – এমন দাবিও করেছেন। হেরোদের ঘ্যানঘ্যান শুনতে কারই বা ভাল লাগে? অস্ট্রেলিয়া অধিনায়ক প্যাট কামিন্স তাই বিদ্রুপ করেছেন “পঞ্চাশটা ম্যাচের সিরিজ হচ্ছে আদর্শ। কিন্তু অলিম্পিকে সোনার মেডেল জেতার জন্যে একটাই রেস হয়। এএফএল, এনআরএল সিরিজগুলোরও ফাইনাল থাকে। একেই খেলা বলে।”

চতুর্থ অঙ্ক: সাধের লাউ

পৃথিবীর সমস্ত খেলার নিয়ামক সংস্থার মধ্যে সবচেয়ে দুর্বল সংস্থার নাম আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিল, অর্থাৎ আইসিসি। তাদের টিকি বাঁধা আছে ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের কাছে, কারণ তারাই সবচেয়ে বেশি টাকার জোগান দেয় আইসিসিকে। বিনিময়ে সবচেয়ে বেশি লাভের গুড়ও নেয়। ফলে ভারতীয় বোর্ড চাইলে টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপ ফাইনালও তিন ম্যাচের হতেই পারে, ইংল্যান্ডের বদলে আমেদাবাদের নরেন্দ্র মোদী স্টেডিয়ামে হতে পারে। সেখানে এমন পিচ বানিয়ে দেওয়া হবে যে আমি-আপনি গিয়ে বল করলেও এক হাত ঘুরবে। কিন্তু কথা হল, ভারতীয় বোর্ড কি অতটা মাথা ঘামাবে?

তার সোনার ডিম পাড়া হাঁস হল আইপিএল। সেই আইপিএলের সম্প্রচার স্বত্ব থেকে এত টাকা আয় হয় যে আগামী দিনে প্রতিযোগিতাটাকে টেনে আরও লম্বা করা হচ্ছে। আইসিসি তাতে মাথা নেড়ে সায়ও দিয়ে ফেলেছে। আইপিএল সম্পর্কে আমাদের সমস্ত বর্তমান ও প্রাক্তন ক্রিকেটার, ধারাভাষ্যকার এবং প্রাতঃস্মরণীয় সাংবাদিকরা উচ্ছ্বসিত। তাঁদের কথাবার্তায়, লেখাপত্রে মনে হয় মানবজাতি এই প্রথম একটি জিনিস আবিষ্কার করতে পেরেছে যার কোনো নেতিবাচক দিক নেই। সমালোচনা করার মত একখানা বৈশিষ্ট্যও নেই। অথচ ওভাল টেস্টে হারের পর হঠাৎ সকলের মনে পড়েছে, যে আইপিএলটা না থাকলে এই ফাইনালের জন্যে যথেষ্ট প্রস্তুতির সময় পাওয়া যেত।

আরও পড়ুন আন্তর্জাতিক ক্রিকেটকে মরে প্রমাণ করতে হবে সে মরেনি

অনেকে বলছেন এই হারের পর নাকি দ্রাবিড়ের চাকরি নিয়ে টানাটানি হতে পারে। হয়ত সেটা আন্দাজ করে মরিয়া হয়ে অথবা চাকরিটা যাবেই ধরে নিয়ে তিনি বলেছেন ক্রীড়াসূচি নিয়ে তিনি কখনোই খুশি হতে পারেন না। ফাইনালের দিন কুড়ি আগে যদি ইংল্যান্ডে পৌঁছনো যেত আর দু-তিনটে সাইড ম্যাচ পাওয়া যেত, তাহলে চমৎকার প্রস্তুতি হত। শুনলে মনে হয় ইনি রিপ ভ্যান দ্রাবিড়। নিজের খেলোয়াড় জীবন শেষ হওয়ার পর ঘুমিয়ে পড়েছিলেন, এইমাত্র জেগে উঠেছেন। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের যা ঠাসা ক্রীড়াসূচি তাতে সাইড ম্যাচ ব্যাপারটা তো বন্ধ হয়ে গেছে বহুদিন। বিশেষ করে ভারতীয় দলের অফ সিজন বলে কিছু নেই দ্রাবিড় যখন ক্রিকেটার তখন থেকেই। তিনি যখন অবসর নেন আইপিএল তখনো চারাগাছ। এখন সে বটবৃক্ষ, দুর্জনে বলছে ছদ্মবেশী সেপ্টোপাস। তার খিদে ক্রমশ বাড়ছে, বিশ্বের অন্যত্র তার বীজ থেকে আরও নানা মাংসাশী লিগের জন্ম হচ্ছে যারা ক্রমশ আন্তর্জাতিক ক্রিকেটকে গিলে নেবে। এমন দিনে ভারত অধিনায়ক চাইছেন তিন ম্যাচের ফাইনাল, কোচ সাইড ম্যাচের কথা বলছেন। এসব কি প্রয়োজনের চেয়ে অনেক বেশি টাকা রোজগার করার অপরাধবোধের প্রকাশ, নাকি আমাদের দেশের পরিচালকদের মত বৈদিক যুগে ফিরে যাওয়ার সাধ?

গত ইংল্যান্ড সফরে ভারতীয় দলের কোচ থাকা অবস্থায় যে শাস্ত্রী কোভিড পরিস্থিতির মধ্যে সিরিজটা ভালয় ভালয় শেষ করার চেয়ে নিজের বইয়ের প্রকাশ অনুষ্ঠানকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছিলেন, তিনি আবার জ্ঞান দিয়েছেন, আইপিএল বাদ দিয়ে টেস্টের জন্যে প্রস্তুতি নেওয়ার কাজটা খেলোয়াড়দের নিজ দায়িত্বেই করা উচিত। যোগ করেছেন, ভারতীয় বোর্ডের ফ্র্যাঞ্চাইজদের সঙ্গে চুক্তিতে একটা শর্ত রাখা উচিত যাতে খেলোয়াড়রা ভবিষ্যতে এত বড় ম্যাচের জন্যে এরকম সুযোগ পায়। এত উত্তম প্রশাসনিক পরিকল্পনা তিনি জাতীয় দলের সঙ্গে যুক্ত থাকার সময়ে কোথায় ছিল কে জানে? তিনি দায়িত্বে থাকতেই ভারত প্রথমবার বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনালে ওঠে। তখন এমন কোনো প্রয়াস তিনি করেননি, হার থেকে শিক্ষা নিয়ে এমন কোনো পরামর্শই বোর্ডকে দিয়ে যাননি। এখন অসংখ্য ভাল ভাল ধারণা তাঁর মাথায় গিজগিজ করছে।

পঞ্চম অঙ্ক: যত গোল্লায় যায় তত আনন্দ

ক্রিকেট এখন আগে অত্যন্ত লাভজনক ব্যবসা, পরে খেলা। সে ব্যবসার সবচেয়ে কম চাহিদার মালটির নাম টেস্ট ক্রিকেট। অতএব আপনি আরও একটা আইসিসি টুর্নামেন্টে ভারত জিততে পারল না বলে যতই দুঃখ পান, জানবেন কর্তারা বা ক্রিকেটাররা আপনার দুঃখের ভাগী নয়। ভারতীয় ক্রিকেটারদের দুঃখে প্রাণ যাচ্ছে এমন মনে করার কারণ নেই, অস্ট্রেলিয়ার ক্রিকেটাররাও টেস্ট ক্রিকেটের জন্য জীবন দিতে প্রস্তুত বলে ভাববেন না। প্রমাণ চান? ওভাল টেস্টের একটা মিনিটও ইংল্যান্ডের বিখ্যাত বা কুখ্যাত খামখেয়ালি আবহাওয়ার জন্যে নষ্ট হয়নি। অথচ পাঁচদিন মিলিয়ে মোট ৪৪ ওভার কম খেলা হয়েছে। অর্থাৎ কোনো দলেরই দিনে যতগুলো ওভার বল করা সম্ভব ততগুলো সম্পূর্ণ করার গরজ ছিল না।

সুতরাং যদি পাঁচদিনের খেলার প্রতি ভালবাসা থেকে থাকে, তাহলে বয়স্ক ঠাকুমার ফোকলা হাসি যেভাবে লোকে শেষ কয়েকদিন প্রাণভরে দেখে নেয়, সেইভাবে উপভোগ করে নিন। এ খেলা বাঁচুক তা কর্তারা চান না, সম্ভবত খেলোয়াড়রাও নয়। নইলে নিউজিল্যান্ডের ট্রেন্ট বোল্ট, ইংল্যান্ডের জেসন রয়রা স্বেচ্ছায় দেশের বোর্ডের কেন্দ্রীয় চুক্তি থেকে বেরিয়ে আসতেন না ফ্র্যাঞ্চাইজ লিগ খেলবেন বলে। কর্তারা ফ্র্যাঞ্চাইজ লিগ খোলায় লাগাম দিতেন, টেস্ট ক্রিকেটকে আকর্ষণীয় করে তুলতে গোলাপি বলের দিন-রাতের টেস্ট আয়োজন ক্রমশ বাড়াতেন। হচ্ছে ঠিক উল্টো – বোল্টরা দলে ভারি হচ্ছেন। শোনা যাচ্ছে দক্ষিণ আফ্রিকা, সংযুক্ত আরব আমিরশাহী, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পর এবার সৌদি আরবেও বিপুল অর্থকরী ফ্র্যাঞ্চাইজ লিগ চালু হবে। আর দিন-রাতের টেস্টের কেউ নামোচ্চারণ করছে না।

নাগরিক ডট নেট ওয়েবসাইটে প্রকাশিত

দল হারলেও গুহার চিচিং বনধ হতে দেবে না ক্রিকেট বোর্ড

এঁদের সময় শেষ। সেকথা এঁদের ভক্তরা মানবেন না, তার চেয়েও বড় কথা ক্রিকেট বোর্ড মানবে না। কারণ এই তারকাদের পিছনে টাকার থলি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে একগুচ্ছ স্পনসর।

রবিচন্দ্রন অশ্বিন খেললেই কি ভারত ওভালের বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপ ফাইনাল জিতে যেত? যশপ্রীত বুমরা যদি ফিট থাকতেন এবং খেলতেন, তাহলে কি ভারত জিতে যেত? ঋষভ পন্থ যদি প্রচণ্ড গতিতে গাড়ি চালাতে গিয়ে অন্যের এবং নিজের জীবন বিপন্ন করে শয্যাশায়ী না হতেন, তাহলে কি শেষ ইনিংসে ৪৪৪ রান তাড়া করার বিশ্বরেকর্ড করে জিতিয়ে দিতেন? এগুলোর কোনো ঠিক বা ভুল উত্তর হয় না, কারণ কী হলে কী হত কেউ বলতে পারে না। তবে তথ্য বলছে, ২০২১ টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনালে এই তিনজনই খেলেছিলেন। তবু ভারত হেরেছিল। শুধু তাই নয়, বিভিন্ন সময়ে এই তিনজনের উল্লেখযোগ্য অবদান সত্ত্বেও ভারত সেই ২০১৩ সালের চ্যাম্পিয়নস ট্রফির পরে আর কোনো আইসিসি টুর্নামেন্টেই খেতাব জেতেনি। শুধু টেস্ট ক্রিকেটের কথাই যদি বলি, গত দশ বছরে দুবার অস্ট্রেলিয়ায় সিরিজ জেতা ছাড়া ভারতের আর কোনো বলার মত সাফল্য নেই। দেশের মাঠে দাপটে যে কোনো দলকে হারিয়ে দেওয়ার রেকর্ড ভারতের টেস্ট ইতিহাসে নতুন কিছু নয়। কিন্তু অতীতে একাধিক ভারতীয় দল ইংল্যান্ডে টেস্ট সিরিজ জিতেছে, নিউজিল্যান্ডে জিতেছে। এর একটাও রবি শাস্ত্রী-বিরাট কোহলি, রাহুল দ্রাবিড়-কোহলি বা দ্রাবিড়-রোহিত শর্মার দ্বারা হয়ে ওঠেনি। এমনকি গত দক্ষিণ আফ্রিকা সফরে ভাঙাচোরা, নতুন মুখদের নিয়ে তৈরি দলটার কাছেও হেরে এসেছে এই দল। সুতরাং এই একটা ম্যাচে অমুক, অমুক আর অমুক থাকলেই ভারত জিতে যেত কিনা সে প্রশ্ন না তুলে বরং অন্য কয়েকটা প্রশ্নের উত্তর জানা আছে কিনা দেখুন।

১) কোন টেস্ট খেলিয়ে দেশের নির্বাচন সমিতিতে যতজন নির্বাচক থাকার কথা ততজন নেই
২) কোন টেস্ট খেলিয়ে দেশের নির্বাচন সমিতিতে প্রধান নির্বাচক বলে কেউ নেই?
৩) কোন টেস্ট খেলিয়ে দেশের জাতীয় দল নির্বাচনের পর কোনো সাংবাদিক সম্মেলন হয় না?

জানেন কি, এই তিনটে প্রশ্নেরই উত্তর ভারত? যে কোনো খেলার আন্তর্জাতিক স্তরটাকে যাঁরা পেশাদার এবং সর্বোচ্চ গুরুত্বের ব্যাপার বলে মনে করেন, তাঁরা নিশ্চয়ই বুঝবেন যে দিনের পর দিন এই ফাজলামি চালিয়ে গিয়ে বিশ্ব খেতাব কেন, কোনো সিরিজই জেতার আশা করা উচিত নয়।

ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের বর্তমান সংবিধান অনুযায়ী পাঁচজন নির্বাচক থাকার কথা। কিন্তু আছেন চারজন – শিবসুন্দর দাস, সুব্রত ব্যানার্জি, সলিল আঙ্কোলা আর শ্রীধরণ শরথ। এ বছর জানুয়ারি মাসে পাঁচ সদস্যের নির্বাচক কমিটিই ঘোষণা করা হয়েছিল, তার একজন চেয়ারম্যানও ছিলেন – চেতন শর্মা। কিন্তু পরের মাসেই তাঁকে পদত্যাগ করতে হয় একটা স্টিং অপারেশনে নির্বাচন সংক্রান্ত কিছু তথ্য ফাঁস করে দেওয়ার ফলে। তারপর চার মাস কেটে গেছে। ভারত দেশের মাঠে অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ টেস্ট ও একদিনের সিরিজ খেলল। প্রথম দুটো টেস্টের দল নির্বাচনের সময়ে চেতন ছিলেন। তারপর থেকে দল নির্বাচন করেছেন ওই ভাঙাচোরা নির্বাচন সমিতি এবং তার অন্তর্বর্তীকালীন চেয়ারম্যান শিবসুন্দর। মনে রাখা ভাল, এ বছর অক্টোবর-নভেম্বরে ভারতে একদিনের ক্রিকেটের বিশ্বকাপ। ফলে অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে একদিনের সিরিজটা যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ ছিল। তার দল নির্বাচনও করে ওই ভাঙা নির্বাচন কমিটি। বলা বাহুল্য, টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপ ফাইনালের দল নির্বাচনের সময়েও পঞ্চম নির্বাচককে নিয়োগ করার কথা ভাবেনি বিশ্বের সবচেয়ে ধনী ক্রিকেট বোর্ড। এভাবে বোধহয় পয়সা বাঁচানো হচ্ছে। বোর্ড সভাপতি জয় শাহের ক্রিকেটবুদ্ধি নিয়ে প্রশ্ন তোলা যেতে পারে, গত কয়েক বছরে তাঁর সম্পত্তি যেভাবে কয়েক হাজার গুণ বেড়েছে তাতে তাঁর ব্যবসাবুদ্ধি নিয়ে তো আর প্রশ্ন তোলা চলে না।

মজার কথা, নির্বাচন সমিতি নিয়ে এই ধাষ্টামোর সূচনা কিন্তু চেতনের পদত্যাগ থেকে শুরু হয়নি। গত নভেম্বরে কুড়ি বিশের বিশ্বকাপ থেকে ভারত বিদায় নেওয়ার পর এর আগের নির্বাচন সমিতিকে ঘটা করে বরখাস্ত করে বোর্ড। সেই নির্বাচন সমিতিতেও চারজন সদস্যই ছিলেন, এবং কী আশ্চর্য! তখনো চেয়ারম্যান ছিলেন চেতনই। অর্থাৎ যে ব্যর্থতার দায় ঘাড়ে চাপিয়ে অন্য তিন নির্বাচক সুনীল যোশী, দেবাশিস মোহান্তি আর হরবিন্দর সিংকে বিদায় করে দেওয়া হল; সেই ব্যর্থতার কাণ্ডারী চেতনকে আবার নির্বাচন সমিতির চেয়ারম্যান করে নিয়ে আসা হয়েছিল।

সুতরাং বোঝা যাচ্ছে, ক্রিকেট বোর্ড দল নির্বাচনকে তেমন জরুরি ব্যাপার বলে মনে করে না। সেটা দল ঘোষণার ভঙ্গিতেও পরিষ্কার। ভারতীয় ক্রিকেটে দস্তুর ছিল প্রধান নির্বাচক সংবাদমাধ্যমের সামনে এসে দল ঘোষণা করেন। ক্রিকেটজীবনে অতি সাধারণ এমএসকে প্রসাদ, প্রশাসক হিসাবে বিশালকায় রাজ সিং দুঙ্গারপুর বা ক্রিকেটার হিসাবেও যথেষ্ট সফল দিলীপ ভেংসরকার – কেউ প্রধান নির্বাচক হয়ে এর অন্যথা করেননি। কিন্তু সেসব বন্ধ হয়ে গেছে জয় বোর্ড সভাপতি হওয়ার পর থেকে। এখন দিনের কোনো একটা সময়ে বোর্ড প্রেস বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে খেলোয়াড় তালিকা জানিয়ে দেয়। তারপর কে বাদ পড়লেন আর কাকে বিশ্রাম দেওয়া হল তা নিয়ে গুজব পল্লবিত হয়।

সবচেয়ে শোচনীয় ব্যাপার হল, ঘরোয়া ক্রিকেটে দিনের পর দিন ভাল খেলেও যে তরুণ ক্রিকেটাররা দলে সুযোগ পান না, তাঁদের কেন নেওয়া হল না তার জন্য জবাবদিহি করা হয় না। ভারতীয় ব্যাটিংয়ের টপ অর্ডার ফর্মে নেই কোভিড অতিমারীর আগে থেকে। কালে ভদ্রে এক-আধটা অর্ধশতরান বা শতরান করে উদ্ধার করেন। অধিকাংশ ইনিংসে শেষদিকে পন্থ, রবীন্দ্র জাদেজা বা শার্দূল ঠাকুর সম্মানজনক স্কোরে পৌঁছে দেন দলকে। সেই কারণেই বোলার হিসাবে বিদেশের মাঠে কল্কে না পেলেও ওঁদেরই খেলানো হয় সেরা বোলার অশ্বিনকে বসিয়ে রেখে। যেদিন জাদেজা, শার্দূলরাও পেরে ওঠেন না, সেদিন মধ্যাহ্নভোজনের আগেই খেলা শেষ হয়ে যায়, যেমন রবিবার ওভালে হল। অথবা দল খটখটে রোদের দিনেও ৩৬ অল আউট হয়ে যায়, যেমনটা ঘটেছিল ২০২০ সালের ১৯ ডিসেম্বর অ্যাডিলেডে।

এভাবে সিরিজ বা বড় ম্যাচ জেতা সম্ভব নয় বলেই ভারত অধিকাংশ ক্ষেত্রে জেতে না। অথচ ঘুরে ফিরে সেই রোহিত, সেই চেতেশ্বর পূজারা, সেই অজিঙ্ক রাহানে, সেই কোহলি খেলেই চলেছেন। এদিকে মুম্বাইয়ের ২৫ বছরের ছেলে সরফরাজ খান ৩৭ প্রথম শ্রেণির ম্যাচে সাড়ে তিন হাজার রান করে বসে আছেন প্রায় ৮০ গড়ে। তিনি কেন সুযোগ পান না জবাব দেওয়ার কেউ নেই। বাংলা দলের অভিমন্যু ঈশ্বরন (৮৭ ম্যাচে ৬৫৫৬ রান, গড় প্রায় ৪৮) পরপর বেশ কয়েকটা রঞ্জি ট্রফিতে ধারাবাহিকভাবে রান করে যাচ্ছেন। তাঁরও মেঘে মেঘেই বেলা বাড়ছে। এরকম আরও নাম আছে।

আরও পড়ুন ভারতীয় ক্রিকেট বয়স ঢেকে ফেলছে বিজ্ঞাপনে

বাদ গিয়ে ফেরত আসা রাহানে ওভালে দুই ইনিংসেই ভারতের সেরা ব্যাটার ছিলেন, দ্বিতীয় ইনিংসে রোহিত আর কোহলিও বেশ ভাল ব্যাট করলেন। কিন্তু দেখা গেল, তাঁদের যথেষ্ট ভাল ফর্মও আর দলের জন্য যথেষ্ট নয়। ভারত দুশোর বেশি রানে হারল। ক্রিকেট জগতে একথার একটাই মানে হয়। এঁদের সময় শেষ। সেকথা এঁদের ভক্তরা মানবেন না, তার চেয়েও বড় কথা ক্রিকেট বোর্ড মানবে না। কারণ এই তারকাদের পিছনে টাকার থলি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে একগুচ্ছ স্পনসর। খেলা সরাসরি সম্প্রচারকারীদের প্রাণ তাদের হাতে, আর সম্প্রচারই হল বোর্ডের ধনরত্নে ভরা গুহা। হারজিতের কথা ভেবে কি আর ও গুহার চিচিং বনধ হতে দেওয়া যায়? যায় না বলেই বয়সের যুক্তিতে ঋদ্ধিমান সাহাকে রাহুল দ্রাবিড় বলে দিতে পেরেছিলেন, এবার তুমি এসো। কিন্তু কোহলিদের বয়স চোখে দেখতে পান না।

উত্তরবঙ্গ সংবাদে প্রকাশিত

বিশ্বকাপে কী হবে ভুলে যান, আইপিএল দেখুন

রবীশ কুমার মোদীর দোষ দেখতে পায় না এমন মিডিয়ার নাম দিয়েছেন গোদি মিডিয়া, অর্থাৎ মোদীর কোলে চড়ে বসে থাকা মিডিয়া। জানি না ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের কোলে চড়ে বসে থাকা মিডিয়ার কী নাম হওয়া উচিত।

‘ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড’ কথাটা কয়েক বছর আগে পর্যন্তও ভারতীয় অর্থনীতির আলোচনায় খুব ব্যবহার করা হত। কোনো বাঙালি অর্থনীতিবিদ এর বাংলা করেছেন কিনা জানি না। তবে এর মোটামুটি মানে হল, জনসংখ্যার এক বড় অংশ বয়সে নবীন হওয়ার সুবিধা। এখন আমাদের যতই ভাঁড়ে মা ভবানী হোক, নরেন্দ্র মোদী যখন ক্ষমতায় আসেন তখন সকলেই বলতেন ভারতীয়দের একটা বড় অংশ যেহেতু এখন কর্মক্ষম অবস্থায় আছেন সেহেতু এদের কর্মসংস্থান জুগিয়ে দিলেই দেশ ফুলে ফলে ভরে উঠবে। তা সে ডিভিডেন্ড গত ৮-১০ বছরে কতটা পাওয়া গেল তা নিয়ে এখন বিস্তর সন্দেহ দেখা দিয়েছে। নতুন চাকরি হওয়ার বদলে আমাদের দেশে বেকারত্ব ৪৫ বছরে সর্বোচ্চ হয়ে দাঁড়িয়েছে একথা ২০১৯ সালে কেন্দ্রীয় সরকারের শ্রমমন্ত্রকই বলেছিল। ছোট ব্যবসার অবস্থা কী তা পাড়ার দোকানে কথা বললেই টের পাওয়া যায়। ভারতীয় ক্রিকেট দলের অবস্থাও কেমন যেন আমাদের অর্থনীতির মতই হয়ে দাঁড়াচ্ছে। তরুণ প্রতিভার অভাব নেই একথা আমরা সেই মহেন্দ্র সিং ধোনির আমল থেকে শুনে আসছি। যেটুকু সুযোগ দেওয়া হয়েছে তাতে সেই প্রতিভারা যে নেহাত খারাপ ফল দিয়েছে তা-ও নয়, অথচ ঘুরে ফিরে একই মুখ খেলে চলেছে জাতীয় দলের জার্সি গায়ে এবং একের পর এক বিশ্বকাপে ডোবানোর পর এখন দ্বিপাক্ষিক সিরিজেও ডোবাচ্ছে।

অর্থনীতির ফাঁক ঢাকতে জিডিপির মানদণ্ডই বদলে দেওয়া হয়েছিল প্রয়াত অরুণ জেটলি অর্থমন্ত্রী থাকার সময়ে। অনেক বিরোধী দল এবং অর্থনীতিবিদ সেই পদক্ষেপের সমালোচনা করেছিলেন। কিন্তু ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড এমন এক চমৎকার বাস্তুতন্ত্র তৈরি করতে সফল হয়েছে টাকার জোরে, যেখানে কোনো সমালোচক নেই। উল্টে যাদের সমালোচক হওয়ার কথা, সেই সংবাদমাধ্যম এবং প্রাক্তন ক্রিকেটাররা বোর্ডকে সাফল্যের মানদণ্ডগুলো বদলে ফেলতে সর্বতোভাবে সাহায্য করেন। ২০১৩ সালের চ্যাম্পিয়নস ট্রফির পর থেকে আর কোনো আইসিসি টুর্নামেন্ট জেতেনি ভারত। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে সেমিফাইনালও পেরোতে পারেনি (২০১৪ ওয়ার্ল্ড টি টোয়েন্টি, ২০১৭ চ্যাম্পিয়নস ট্রফি, ২০২১ বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপ ফাইনাল ব্যতিক্রম। শেষেরটায় অবশ্য সেমিফাইনাল বলে কিছু ছিল না)। ২০২১ ওয়ার্ল্ড টি টোয়েন্টিতে তো সেমিফাইনালেরও আগে ঘরে ফেরার বিমান ধরতে হয়েছিল। অথচ কাগজে, টিভিতে, খেলা চলাকালীন ধারাভাষ্যে সারাক্ষণ প্রচার করা হয় আমাদের দল বিশ্বসেরা। সেখানেই থেমে না থেকে বলা হয় এই দল ভারতের সর্বকালের সেরা। কেন? না আমরা প্রচুর দ্বিপাক্ষিক সিরিজ জিতি। প্রায় প্রতি বছর কোনো না কোনো আইসিসি টুর্নামেন্ট থাকার কারণে গত এক দশকে দ্বিপাক্ষিক সিরিজগুলোর গুরুত্ব যে প্রায় শূন্যে নেমে এসেছে, সেকথা কেউ লেখেন না বা বলেন না। টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপ চালু হওয়ার পরে পাঁচদিনের ক্রিকেটেও দ্বিপাক্ষিক সিরিজের গুরুত্ব তো আসলে টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনালে ওঠা গেল কিনা, খেতাব জেতা গেল কিনা – তাতে। এসব বলা হয় না।

এ-ও বলা হয় না, যে সাদা বলের ক্রিকেটে ভারত আসলে গত শতাব্দীর ক্রিকেট খেলে চলেছে ২০১১ বিশ্বকাপের পর থেকেই। রোহিত শর্মা আর শিখর ধাওয়ান, পরে রোহিত আর কে এল রাহুল যেভাবে ইনিংস শুরু করতেন সেভাবে একদিনের ক্রিকেট খেলা হত প্রাক-জয়সূর্য-কালুভিথর্না যুগে। ২০১১ বিশ্বকাপে শচীন তেন্ডুলকর আর বীরেন্দ্র সেওয়াগ যেভাবে ভারতের ইনিংস শুরু করতেন সেটা মনে থাকলেও কথাটা বুঝতে অসুবিধা হয় না। তাঁদের অবসরের পরে তো একদিনের ক্রিকেটটা আরও বদলেছে। দু প্রান্ত থেকে দুটো বল দিয়ে খেলা শুরু হয়েছে। ফলে স্পিনারদের প্রভাব কমেছে, রিভার্স সুইং প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। কারণ বল পুরনো না হলে ও দুটো হওয়া শক্ত। সঙ্গে আছে পাওয়ার প্লে, অর্থাৎ সারাক্ষণ বোলাররা নানারকম বিধিনিষেধের মধ্যে বল করছেন। ফলে রান করার কাজটা আগের চেয়ে অনেক সহজ হয়ে গেছে। সেই কারণে ইনিংসের শুরুতে আরও বেশি রান করার রাস্তা নিয়েছে ইংল্যান্ডের মত দল, যারা সব ধরনের ক্রিকেটে গত এক-দেড় দশকে আইসিসি টুর্নামেন্টগুলোতে সবচেয়ে বেশি সফল। অন্যদিকে মন্থরভাবে শুরু করব, উইকেট হাতে রেখে পরে মারব – এই নীতি অবলম্বন করে আমাদের বিরাট কোহলি আর রোহিত শর্মা ঝুড়ি ঝুড়ি শতরান আর দ্বিশতরান করেছেন দ্বিপাক্ষিক সিরিজগুলোতে। গড় দেখলে চোখ কপালে উঠে যাবে, কিন্তু আসল জায়গায় চাপের ম্যাচে বারবার ব্যর্থ এবং দলও হেরেছে। রোহিত তবু ২০১৯ বিশ্বকাপে অসাধারণ ধারাবাহিকতা দেখিয়েছিলেন (৯ ম্যাচে ৬৪৮ রান, গড় ৮১; শতরান ৫), বিরাট তো বিশ্বকাপে অন্য মানুষ হয়ে যান। তিনটে বিশ্বকাপ খেলে এখন অবধি মোটে দুটো শতরান। তার কোনোটাই নক আউট ম্যাচে নয়, একটা আবার ২০১১ সালে দুর্বল বাংলাদেশের বিরুদ্ধে। কেরিয়ারে গড় ৫৭.৩২, অথচ বিশ্বকাপে গড় ৪৬.৮১।

রবীশ কুমার মোদীর দোষ দেখতে পায় না এমন মিডিয়ার নাম দিয়েছেন গোদি মিডিয়া, অর্থাৎ মোদীর কোলে চড়ে বসে থাকা মিডিয়া। জানি না ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের কোলে চড়ে বসে থাকা মিডিয়ার কী নাম হওয়া উচিত। গোদি মিডিয়ায় কর্মরত অনেক সাংবাদিক যেমন বিবেক দংশনে ভোগেন, ভারতীয় ক্রিকেট কভার করা অনেক সাংবাদিকেরও একই অবস্থা। ২০০৭ সালের বিশ্বকাপে শচীন তেন্ডুলকর চরম ব্যর্থ হওয়ার পরে এবং ভারত প্রথম রাউন্ডে বিদায় নেওয়ার পরে অত বড় ক্রিকেটারেরও চরম সমালোচনা হয়েছিল। এক সর্বভারতীয় ইংরেজি কাগজে শিরোনাম হয়েছিল ENDULKAR। অথচ কোহলি বছর চারেক হয়ে গেল দলের হোমেও লাগেন না, যজ্ঞেও লাগেন না। কারোর সাধ্যি নেই সেকথা লেখে। বরং এতকাল পরে সাদা বলের ক্রিকেটে দুটো অর্থহীন ম্যাচে (১. এশিয়া কাপ থেকে বিদায় নিশ্চিত হয়ে যাওয়ার পর আফগানিস্তানের বিরুদ্ধে, ২. বাংলাদেশের সঙ্গে একদিনের সিরিজ হেরে যাওয়ার পর তৃতীয় একদিনের ম্যাচে) শতরান করার পর রাজার প্রত্যাবর্তন ইত্যাদি লিখতে হয়েছে। আমেদাবাদ টেস্টে ঢ্যাবঢেবে পিচে শতরান করে তাঁর টেস্টের রান খরাও সবে কেটেছে। গত কয়েক বছরে গড় নামতে নামতে ৪৮.৯৩ হয়ে গেছে। অথচ কথায় কথায় তাঁকে সর্বকালের সেরাদের সঙ্গে এক পঙক্তিতে বসিয়ে দেওয়া কিন্তু থামেনি। যাঁদের সঙ্গে তাঁর নামোচ্চারণ করা হচ্ছে তাঁদের সকলের গড় পঞ্চাশের বেশি।

বলতে পারেন, এসব কথা লিখতে চাইলেই লেখা যায়? কেউ কি বারণ করেছে? তা করেনি বটে, তবে লিখে ফেললে সাংবাদিকের চাকরিটি নট হয়ে যেতে পারে। বিশ্বাস না হলে হর্ষ ভোগলেকে জিজ্ঞেস করে দেখতে পারেন। তিনি কারোর সমালোচনাও করেননি। মহেন্দ্র সিং ধোনি অধিনায়ক থাকার সময়ে টুইটারে অমিতাভ বচ্চনের একটি অন্যায় সমালোচনা, যা আবার ধোনি সমর্থন জানিয়ে রিটুইট করেছিলেন, তার প্রতিবাদে ভদ্র ভাষায় জানিয়েছিলেন, সারাক্ষণ ভারতীয় ক্রিকেটারদের প্রশংসা করা একজন ধারাভাষ্যকারের কাজ নয়। সেবার ধারাভাষ্যকারদের সঙ্গে চুক্তি পুনর্নবীকরণের সময় এলে দেখা যায় হর্ষ বাদ পড়েছেন। রবীন্দ্র জাদেজাকে “বিটস অ্যান্ড পিসেজ ক্রিকেটার” বলার অপরাধে একই অবস্থা হয়েছিল সঞ্জয় মঞ্জরেকরের। তা অত নামকরা লোকেদেরই যদি ওই অবস্থা হয় তাহলে খবরের কাগজ, নিউজ এজেন্সি বা ওয়েবসাইটের একজন নগণ্য সাংবাদিকের কী অবস্থা হতে পারে ভেবে দেখুন। হর্ষ আর সঞ্জয় তবু কিছুদিন পরে, কে জানে কোন শর্তে, আবার বোর্ডের তালিকায় ফিরতে পেরেছেন। সাংবাদিকের তো একটি ফোনে চাকরি চলে যাবে এবং তারকাদের চটিয়ে চাকরি গেলে আর কোথাও চাকরি হবে না।

যাঁরা জানেন না তাঁদের জন্য বলে রাখা যাক, ভারতের মাটিতে যত ক্রিকেট ম্যাচ হয় তার টিভি সম্প্রচারের প্রযোজক ভারতীয় বোর্ড। খেলা আপনি স্টার নেটওয়ার্কেই দেখুন আর সোনিতেই দেখুন। ফলে ধারাভাষ্যকাররা অধিকাংশই বোর্ডের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ, সম্প্রচারকারীর সঙ্গে নয়। যাঁরা সম্প্রচারকারীর সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ তাঁরাও জানেন বোর্ডের অপছন্দের কথা বললে সম্প্রচারকারীও বিদায় করে দেবে, বোর্ডের সঙ্গে বিবাদ করে ব্যবসা গুবলেট করার ঝুঁকি নেবে না। এখানকার সম্প্রচার স্বত্ব পরম প্রার্থিত বস্তু। এই ব্যবস্থা ক্রিকেটবিশ্বের আর কোনো দেশে চালু নেই। সব দেশেই ক্রিকেট বোর্ড আলাদা, সম্প্রচারকারী এবং তার ধারাভাষ্যকাররা স্বাধীন। ফলে ইংল্যান্ডের খেলায় আপনি নাসের হুসেনকে জো রুট বা বেন স্টোকসের সমালোচনা করতে শুনবেন, কিন্তু ভারতীয় ব্যাটিং গোটা সিরিজে জঘন্যভাবে ব্যর্থ হওয়ার পরেও বুধবার (২২ মার্চ ২০২৩) অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে তৃতীয় একদিনের ম্যাচে দীনেশ কার্তিক বলেছেন এই সিরিজে ব্যাটারদের পারফরম্যান্স “প্রিটি অ্যাভারেজ”। প্রথম ম্যাচে ভারতের প্রথম চার উইকেট পড়ে গিয়েছিল ৩৯ রানে, মাত্র ১০.২ ওভারে। পঞ্চম উইকেট পড়ে যায় ৮৩ রানে, তখন মাত্র ১৯.২ ওভার খেলা হয়েছে। দ্বিতীয় ম্যাচে তো গোটা দল আউট হয়ে যায় ১১৭ রানে, ২৬ ওভারের মধ্যে। শেষ ম্যাচে যথেষ্ট ভাল শুরু করার পরেও শেষ সাত উইকেট পড়ে গেছে ১০২ রানে। এই ব্যাটিং যদি “প্রিটি অ্যাভারেজ” হয় তাহলে অক্সফোর্ড, কেমব্রিজ, ওয়েবস্টার – সমস্ত প্রামাণ্য ইংরেজি অভিধানের সম্পাদকমণ্ডলীকে সত্বর জানানো দরকার যে ‘অ্যাভারেজ’ শব্দটার মানে বদলে গেছে। অবশ্য কার্তিক তো শিশু, প্রবাদপ্রতিম সুনীল গাভস্করকেও সারাক্ষণ অত্যুক্তি করে যেতে হয়। একবার আইপিএল চলাকালীন মুখ ফুটে বলেছিলেন, লকডাউনের সময়ে কোহলি যথেষ্ট অনুশীলন করতে পাননি। হালকা মেজাজে যোগ করেছিলেন, একটা ভিডিওতে দেখলাম অনুষ্কার সঙ্গে খেলছিল। ওই অনুশীলনে কোনো লাভ হবে না। অমনি এক রাগত ইন্সটাগ্রাম পোস্ট করে ট্রোলবাহিনী লেলিয়ে দিয়েছিলেন শ্রীমতি কোহলি

এসব কথা বলছি কারণ ঘরের মাঠে বিশ্বকাপের মাত্র মাস ছয়েক আগে অস্ট্রেলিয়ার কাছে সিরিজ হারের যথার্থ মূল্যায়ন করতে গেলে ভারতীয় ক্রিকেটের এই গোটা বাস্তুতন্ত্রকে বোঝা দরকার। টাকা এবং ট্রোলবাহিনীর জোরে ক্রিকেট বোর্ড ও ক্রিকেটাররা সমস্ত সমালোচকের মুখ বন্ধ করে দিতে পারেন, একগাদা হোম সিরিজের আয়োজন করতে পারেন যাতে আমাদের ক্রিকেটারদের রেকর্ডগুলো ফুলে ফেঁপে ওঠে। কিন্তু রোহিত, কোহলি, রাহুল, রবীন্দ্র জাদেজাদের বয়স তো কমাতে পারেন না। প্রাকৃতিক নিয়মেই তাঁদের রিফ্লেক্স কমছে, লম্বা ইনিংস খেলার শারীরিক ক্ষমতা এবং মানসিক দক্ষতাও কমছে। ফলে আগে অন্তত দ্বিপাক্ষিক সিরিজে যে কৌশলে খেলে দলকে জয় এনে দিতে পারছিলেন, তা আর পেরে উঠছেন না। বুধবার যেমন ‘চেজমাস্টার’ বিরাট তাঁর চিরাচরিত রান তাড়া করার কায়দায় শুরু করেও শেষপর্যন্ত টানতে পারলেন না। রাহুল যে দ্রুত রান করতে পারেন না তা আর কতবার প্রমাণিত হলে কোচ রাহুল দ্রাবিড়, অধিনায়ক রোহিত এবং নির্বাচকরা তাঁকে অপরিহার্য ভাবা বন্ধ করবেন তাঁরাই জানেন। রাহুল এই সিরিজের প্রথম ম্যাচে অপরাজিত ৭৫ রান করে দলকে জিতিয়ে দেওয়ায় আকাশ বাতাস বিদীর্ণ করে শোনা গিয়েছিল তিনি নাকি সমালোচনার জবাব দিয়েছেন। কিন্তু ঘটনা হল সে ম্যাচে জিততে হলে মাত্র ১৮৯ রান করতে হত, কোনো তাড়া ছিল না। ফলে রাহুল আপন মনে ব্যাট করার সুযোগ পেয়েছিলেন। বুধবারের খেলায় লক্ষ্য ছিল ২৭০, তবুও তিনি বিরাটের মত ১-২ রান নিয়ে স্কোরবোর্ড সচল রাখার তাগিদ দেখাননি। বত্রিশ রান করতে নিয়ে নিলেন ৫০ বল। এইভাবে নিজেই নিজের উপর চাপ বাড়াতে বাড়াতে একসময় হঠাৎ ‘পিটিয়ে ঠান্ডা করে দেব’ ভঙ্গিতে ব্যাট করতে গিয়ে আউট হয়ে গেলেন। এহেন রাহুলকে আবার টিম ম্যানেজমেন্ট ঋষভ পন্থের অনুপস্থিতিতে বিশ্বকাপের পাকাপাকি উইকেটরক্ষক হিসাবেও ভাবছে। এখন উপায়?

এখানেই এসে পড়ে ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড জলে যাওয়ার প্রশ্ন। হাতের কাছেই আছেন ঈশান কিষণ। যিনি এই সিরিজে অধিনায়ক রোহিত খেলেননি বলে মোটে একটা ম্যাচে খেলার সুযোগ পেলেন। তিনি এখন অবধি ১৪ একদিনের ম্যাচে ৪২.৫০ গড়ে রান করেছেন, একমাত্র শতরানটা আবার ২১০। অথচ তাঁকে মিডল অর্ডারে ভাবা যাচ্ছে না। ঈশানের বয়স তবু ২৪, তাঁর থেকে ডিভিডেন্ড পাওয়ার এখনো সময় আছে। এই সিরিজে দলের বাইরে ছিলেন আরেকজন উইকেটরক্ষক ব্যাটার, যিনি এখন অবধি ১১ একদিনের ম্যাচে সুযোগ পেয়ে ৬৬ গড়ে রান করেছেন, স্ট্রাইক রেটও একশোর বেশি। অথচ কিছুতেই তাঁকে টানা সুযোগ দেওয়া হচ্ছে না। সেই সঞ্জু স্যামসনের বয়সে দেখতে দেখতে ২৯ হতে চলল। হয়ত এই বিশ্বকাপের দলেও তাঁকে রাখা হবে না। কারণ সাত বছর এবং একটা বিশ্বকাপ খেলে ফেলার পরেও যে ৩১ বছর বয়সীর ব্যাটিং অর্ডারই পাকা করা যাচ্ছে না, সেই রাহুল দলকে নতুন কিছু দিতে পারেন বলে বিশ্বাস করে টিম ম্যানেজমেন্ট।

পঁয়ত্রিশ হতে চলা বিরাট কোনোদিনই স্পিনের বিরুদ্ধে দারুণ ব্যাটার ছিলেন না। বছর তিনেক হল মাঝের ওভারগুলোতে কিছুতেই স্পিনারদের মেরে উঠতে পারেন না, মারতে গেলেই আউট হয়ে যান। ঠিক যেমন বুধবার হলেন। অথচ উপমহাদেশে বিশ্বকাপ, মাঝের ওভারগুলোতে স্পিনাররাই বেশি বল করবেন। বিশ্বকাপের আগেই ছত্রিশে পা দেবেন অধিনায়ক রোহিত। এই দলে একমাত্র তিনিই ক্রিজ ছেড়ে বেরিয়ে স্পিনারদের মারতে পারেন। কিন্তু তাঁর ধারাবাহিকতাও ক্রমশ কমছে। ইদানীং বল ঘুরলে বেশ অসুবিধায় পড়ছেন, অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে টেস্ট সিরিজে প্রকট হয়েছে সমস্যাটা। এদিকে বল সুইং করলে তাঁকে চিরকালই কিঞ্চিৎ দিশাহারা দেখায়। সেই কারণেই টেস্ট ক্রিকেটে বিরাটের অর্ধেক সাফল্যও পাননি। এঁরা আমাদের ব্যাটিংয়ের স্তম্ভ।

অবশ্য শুধু ব্যাটিং নিয়ে দুশ্চিন্তা করলে দুশ্চিন্তার প্রতি অবিচার করা হবে। মনে রাখা ভাল, আমরা ডিসেম্বরে বাংলাদেশের কাছে সিরিজ হেরেছি আর মার্চে অস্ট্রেলিয়ার কাছে সিরিজ হারলাম স্রেফ ব্যাটিং ব্যর্থতার কারণে নয়। মাঝে যে সিরিজে শ্রীলঙ্কাকে ৩-০ হারিয়েছি সেখানেও প্রথম ম্যাচে তারা ৩৭৩ রানের জবাবে ৩০৬ তুলে ফেলেছিল। অধিনায়ক দাসুন শানাকা ৮৮ বলে ১০৮ রান করে অপরাজিত ছিলেন। অস্ট্রেলিয়া সিরিজের দ্বিতীয় ম্যাচে সুইং সহায়ক পরিবেশে ভারতের ব্যাটিং শুয়ে পড়লেও অস্ট্রেলিয়ার ১২১ রান তুলতে লেগেছে মাত্র ১১ ওভার, একটাও উইকেট খোয়াতে হয়নি। সবচেয়ে সিনিয়র বোলার মহম্মদ শামির মধ্যেও ধারাবাহিকতার অভাব স্পষ্ট। আমাদের বিরাট ভরসা যশপ্রীত বুমরা বিশ্বকাপে খেলতে পারবেন কিনা এখনো অনিশ্চিত, সাদা বলের ক্রিকেটে দীর্ঘদিন নির্ভরতা দেওয়া ভুবনেশ্বর কুমারও সাম্প্রতিক টি টোয়েন্টি ব্যর্থতার পর দলের বাইরে। অস্ট্রেলিয়া সিরিজের নির্বাচিত দলের দিকে তাকালে কতকগুলো আশ্চর্য ব্যাপার লক্ষ করা যাবে।

এই দলে ছিলেন না ২৪ বছরের অর্শদীপ সিং, যিনি টি টোয়েন্টিতে ইতিমধ্যেই যথেষ্ট পরিণতির পরিচয় দিয়েছেন এবং মাত্র তিনটে একদিনের ম্যাচ খেলার সুযোগ পেয়েছেন। অথচ ছিলেন ৩১ বছরের জয়দেব উনড়কত, যিনি দেশের জার্সিতে শেষ একদিনের ম্যাচ খেলেছেন ২০১৩ সালে। আমাদের সবেধন নীলমণি জোরে বোলার অলরাউন্ডার হার্দিক পান্ডিয়া সম্পূর্ণ ফিট এবং ব্যাটে, বলে চমৎকার খেললেন। তা সত্ত্বেও দলে ছিলেন মোটামুটি একই কাজের লোক শার্দূল ঠাকুর। তাঁর বয়স ৩১। প্রথম ম্যাচে দুজনেই একসঙ্গে খেলেও ফেললেন। শার্দূলকে মাত্র দু ওভার বল করতে দেওয়া হল আর ব্যাট করার কথা ছিল আট নম্বরে। তার দরকার পড়েনি। দ্বিতীয় ম্যাচে শার্দূলের জায়গায় এসে পড়লেন অক্ষর প্যাটেল, ভারত একসঙ্গে তিনজন বাঁহাতি স্পিনারকে খেলাল। এদিকে দেখা গেল পিচ জোরে বোলারদের উপযোগী। মিচেল স্টার্ক একাই পাঁচ উইকেট নিলেন, বাকিগুলো শন অ্যাবট আর নাথান এলিস। এসব দৃশ্য বেঞ্চে বসে দেখলেন ২৩ বছরের উমরান মালিক। তিনি আজকের ক্রিকেটে বিরল সেই প্রজাতির বোলার, যাঁর গড় গতি ঘন্টায় ১৪৫ কিলোমিটার বা ৯০ মাইলের বেশি। বিশাখাপত্তনমে তিন ওভারে ২৫ রান দেওয়া অক্ষরই চেন্নাইয়ের সিরিজ নির্ধারক ম্যাচেও খেললেন। দুটো উইকেট নিলেও আট ওভারে ৫৭ রান দিলেন আর বিশেষজ্ঞ ব্যাটার সূর্যকুমার যাদব তো বটেই, হার্দিকেরও আগে ব্যাট করতে এসে চার বলে দু রান করে রান আউট হয়ে গেলেন। তিন স্পিনারই খেলাতে হলে হাতে কিন্তু অফস্পিনার ওয়াশিংটন সুন্দরও ছিলেন। তাঁর আর অক্ষরের মধ্যে কে বেশি ভাল ব্যাট করেন তা তর্কসাপেক্ষ। লেগস্পিনার যজুবেন্দ্র চহলও ছিলেন, যিনি কিছুদিন আগেও ছিলেন টিম ম্যানেজমেন্টের নয়নমণি। হঠাৎ ২০২১ ওয়ার্ল্ড টি টোয়েন্টি থেকে অকর্মণ্য প্রমাণিত হয়েছেন। সেবার দলেই ছিলেন না, পরের বছর অস্ট্রেলিয়ায় নিয়ে গিয়েও খেলানো হল না।

বুধবার চেন্নাইতে দেখা গেল ভারতের তিন স্পিনারের মধ্যে কুলদীপ যাদব ছাড়া বাকিরা অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটারদের উপর তেমন প্রভাব ফেলতে পারলেন না। অক্ষর মার খেলেন, জাদেজা উইকেট নিতে পারলেন না। কিন্তু অস্ট্রেলিয়ার অ্যাডাম জাম্পা আর অ্যাশটন অ্যাগারই আসলে ম্যাচটা জিতে নিলেন। তাঁদের দুজনের কুড়ি ওভারে মাত্র ৮৬ রান উঠল, চলে গেল ছটা উইকেট। ভারতের মাটিতে এমন ভেলকি দেখাতে স্বয়ং শেন ওয়ার্নও পারেননি। মানে এই সিরিজ হার চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল, ভারতীয় ব্যাটাররা বল সুইং করলেও হাবুডুবু খান, স্পিন করলেও হাবুডুবু খান। মানতেই হবে দ্বিতীয়টা নতুন লাগছে। বিশেষত ভারতের এই দলকে যেহেতু সেই রবি শাস্ত্রী-কোহলির আমল থেকে সর্বকালের সেরা দল বলে দাবি করা হচ্ছে। শাস্ত্রী টিম ডিরেক্টর থাকার সময়ে স্বয়ং এই দাবি করেছিলেন, তারপর যথারীতি ভারতের সংবাদমাধ্যম বারবার লিখে এবং বলে ব্যাপারটা সকলকে বিশ্বাস করাতে উদ্যোগী হয়েছে। অথচ দেশের মাঠে ভারতকে হারানো চিরকালই শক্ত। স্টিভ ওয়র বিশ্বরেকর্ডধারী দলও পারেনি। কোহলি, রোহিতরা ইংল্যান্ড বা নিউজিল্যান্ডে সিরিজ জেতেননি, যার একাধিক নজির ভারতীয় ক্রিকেটে আছে। এমনকি তাদের ক্রিকেট ইতিহাসের সবচেয়ে দুর্বল দক্ষিণ আফ্রিকা দলের কাছেও হেরে এসেছে। বস্তুত দুবার অস্ট্রেলিয়ায় সিরিজ জেতা ছাড়া বর্তমান প্রজন্ম এমন কিছুই করেনি যা ভারতীয় ক্রিকেটের ইতিহাসে অভূতপূর্ব। তাও টেস্ট ক্রিকেটে। সাদা বলের ক্রিকেটে বলার মত একটা সাফল্যও গত দশ বছরে আসেনি। বরং ভিতরে ভিতরে যেসব বিপ্লব ঘটে গিয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছিল, সেগুলোর টিকি পর্যন্ত দেখতে পাওয়া যাচ্ছে না।

আমাদের নাকি অফুরন্ত জোরে বোলারের জোগান তৈরি হয়েছে। কোথায় তাঁরা? এক বুমরার অনুপস্থিতিতেই এত ছন্নছাড়া দেখাচ্ছে কেন বোলিংকে? টেস্টে এখনো কেন খেলিয়ে যাওয়া হচ্ছে ৩৬ বছর বয়সী অত্যন্ত মাঝারি মানের বোলার উমেশ যাদবকে? যা অবস্থা তাতে আইপিএলে ভাল বল করলে হয়ত ভুবনেশ্বরকেও বিশ্বকাপের জন্য ফিরিয়ে আনতে হবে। তাঁরও তো বয়স ৩৩। মাঝে মাঝে উদয় হন খলীল আহমেদ, নভদীপ সাইনি, দীপক চহর, প্রসিদ্ধ কৃষ্ণর মত তরুণ বোলাররা। প্রাক্তন ক্রিকেটাররা উজ্জ্বল ভবিষ্যতের লক্ষণ দেখেন তাঁদের মধ্যে এবং আমাদের দেখান। তারপর সেই বোলাররা বাদ পড়েন বা চোট পান, আর ফেরেন না। কোন কৃষ্ণগহ্বরে তলিয়ে যান?

এত চোটই বা হয় কেন? শুধু তো বোলার নয়, ব্যাটাররাও দেখা যাচ্ছে বসে বসেই চোট পেয়ে যান। যে শ্রেয়স আয়ার একদিনের ক্রিকেটে মিডল অর্ডারকে ভরসা দেবেন ভাবা হচ্ছিল, হঠাৎ আমেদাবাদ টেস্টে তিনি চোটের কারণে ব্যাট করতে নামলেন না। এখন জানা যাচ্ছে সে নাকি এমন চোট যে আইপিএল খেলাও অনিশ্চিত। এর আগে এমন অদ্ভুত চোট রাহুল পেয়েছেন, রোহিত পেয়েছেন। এর কারণ কি অতিরিক্ত ক্রিকেট? যদি তাই হয় তাহলে সুরাহা কী? বুধবারের হারের পর অধিনায়ক রোহিত সাঁইবাবাসুলভ দার্শনিকতায় বলে দিয়েছেন, খেলোয়াড়দের চোট সমস্যা তৈরি করছে ঠিকই, কিন্তু আইপিএল ফ্র্যাঞ্চাইজগুলোই সব ক্রিকেটারের মালিক। তারাই ঠিক করবে কে কতগুলো ম্যাচ খেলবে না খেলবে।

আরও পড়ুন ভারতীয় ক্রিকেট: জাহান্নামের আগুনে পুষ্পের হাসি

তাহলে দেখা যাচ্ছে ভারতীয় ক্রিকেটের তরুণ প্রতিভারা ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড থেকে ক্রমশ ডেমোগ্রাফিক লায়াবিলিটিতে পরিণত হচ্ছেন। যে সূর্যকুমার যাদব গত দুবছর টি টোয়েন্টিতে চোখ ধাঁধানো ব্যাটিং করে একদিনের দলে জায়গা করে নিয়েছেন এবং যাঁকে দুটো ম্যাচে প্রথম বলে আউট হয়েছেন বলেই তৃতীয় ম্যাচে সাত নম্বরে ঠেলে দেওয়া হল, তিনিও কিন্তু দীর্ঘদিন ঘরোয়া ক্রিকেটে রান করে যাওয়া সত্ত্বেও প্রথম সুযোগ পেয়েছেন ৩১ বছর বয়সে। কারণ তারকাদের বাদ দেওয়া বা ব্যাটিং অর্ডার বদলানো প্রায় অসম্ভব। অথচ অস্ট্রেলিয়াকে দেখুন। মিচেল মার্শ ওপেন করতে এসে ধুন্ধুমার ব্যাটিং করছেন, তাই ডেভিড ওয়ার্নারের মত সিনিয়রকেও মিডল অর্ডারে খেলতে হল। বুমরা আর আয়ার ছিলেন না বলে অস্ট্রেলিয়ার এই জয়কে তুচ্ছ করাও বোকামি হবে। কারণ বুমরা অনেকদিন ধরেই নেই, আমরা তাঁর বিকল্প তৈরি করতে পারিনি। আর আয়ারের অনুপস্থিতিই যদি ঢাকতে না পারেন তাহলে আর রোহিত, বিরাটরা, রাহুলরা কিসের বড় ব্যাটার? বরং অস্ট্রেলিয়ার দলে ছিলেন না তাদের অন্যতম সেরা দুই পেসার – অধিনায়ক প্যাট কামিন্স (মায়ের মৃত্যুর ফলে) আর জশ হেজলউড (চোটের কারণে)। মিচেল স্টার্কের সঙ্গে মিডিয়াম পেসার মার্কাস স্তোইনিস আর অজিদের দ্বিতীয় সারির শন অ্যাবটকে সামলাতেই হিমসিম খেল তথাকথিত বিশ্বসেরা ভারতীয় ব্যাটিং। তাও তো অপরিণত ব্যাটিং করে প্রথম ম্যাচটা ভারতকে প্রায় উপহার দিয়েছিলেন অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটাররা, নইলে কী হত কে জানে?

আজকাল কোনো বিষয়েই দীর্ঘমেয়াদি চিন্তা করার চল নেই। কিন্তু বিশ্বকাপের বছর বলেই হয়ত এসব নিয়ে অনেক ক্রিকেটভক্ত একটু চিন্তিত। তবে দেশের ক্রিকেটকর্তারা মোটেই চিন্তিত নন। একটা দেশের ক্রিকেট চালাতে গেলে ন্যূনতম যে কাঠামোগুলো দরকার হয় সেগুলোকে ঠিক রাখার প্রয়োজনও তাঁরা বোধ করেন না। নইলে নির্বাচন কমিটি নিয়ে এই ধাষ্টামো চলত নাকি?

২০২২ ওয়ার্ল্ড টি টোয়েন্টির ব্যর্থতার জন্য চেতন শর্মার নেতৃত্বাধীন নির্বাচন কমিটিকে গত নভেম্বরে বরখাস্ত করা হল ঘটা করে। তারপর দুমাস কারা নির্বাচক ছিলেন কেউ জানে না। জানুয়ারি মাসে নতুন নির্বাচন কমিটি হল, যার নেতৃত্বে সেই চেতনই। একমাস পরেই আরেক নাটক। এক টিভি চ্যানেলের স্টিং অপারেশনে চেতনকে বিরাটের নেতৃত্ব কেড়ে নেওয়া নিয়ে কিছু ভিতরের খবর ফাঁস করতে দেখা গেল। অতঃপর ঘোষণা করা হল তিনি নাকি বোর্ড সভাপতি জয় শাহের কাছে স্বেচ্ছায় পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছেন। তা না হয় দিলেন, কিন্তু তাঁর স্থলাভিষিক্ত হলেন কে? কেউ না। বহুকাল হল নির্বাচন কমিটির প্রধান সশরীরে দল ঘোষণা করেন না, কাকে নেওয়া হল, কাকে নেওয়া হল না তা নিয়ে কোনো প্রশ্নোত্তরের সুযোগ থাকে না। এরপর হয়ত নির্বাচন কমিটিই থাকবে না। দরকারই বা কী? ক্রিকেটারদের মালিক যখন ফ্র্যাঞ্চাইজগুলো, জাতীয় দল নির্বাচনটাও তারাই করে দিতে পারে তো। দেশের ব্যাঙ্ক, বিমা, বন্দর, বিমানবন্দর – সবই যখন গুটি কয়েক লোকের মালিকানায় চলে যাচ্ছে, ক্রিকেট দলটাও তাই যাক না। এমনিতেও যে দল দেশ চালায় সেই দলই তো ক্রিকেট বোর্ড চালাচ্ছে। ক্রিকেটাররা জাতীয় দলের জার্সি গায়ে সেই দলের নির্বাচনী পোস্টারে মুখও দেখাচ্ছেন। তাহলে এক যাত্রায় আর পৃথক ফল হবে কেন? বিশ্বকাপ ভুলে যান। আগামী শুক্রবার থেকে আইপিএল দেখুন মনের সুখে।

ইনস্ক্রিপ্টে প্রকাশিত

ভারতীয় ক্রিকেট: জাহান্নামের আগুনে পুষ্পের হাসি

কেবল টি টোয়েন্টি নয়। রোহিত, শিখর ধাওয়ান, কোহলিরা একদিনের ক্রিকেটে যে ব্যাটিংটা করেন সেটাও প্রায় প্রাক-জয়সূর্য-কালু যুগের ব্যাটিং।

হে (ক্রিকেট) অতীত, তুমি হৃদয়ে আমার…

রোহিত শর্মা, বিরাট কোহলিরা সোশাল মিডিয়া প্রজন্মের ক্রিকেটার। তাঁরা খুব ইতিহাসের তোয়াক্কা করবেন এমন ভাবা অন্যায়। কিন্তু ভারতীয় দলের কোচ রাহুল দ্রাবিড়ের খেলোয়াড় জীবন থেকেই একটা ব্যাপারে দারুণ সুনাম। তিনি নাকি নিজের প্রজন্মের ক্রিকেটারদের মধ্যে সবচেয়ে পড়ুয়া। যে কোনো সফরে তিনি কিছু না কিছু পড়েন। সেসব বইয়ের একটা বড় অংশ জুড়ে থাকে ক্রিকেটের ইতিহাস। বিভিন্ন ক্রিকেট সাংবাদিক একাধিকবার এসব কথা লিখেছেন, তাই বিশ্বাস না করার কোনো কারণ নেই। উপরন্তু দ্রাবিড় যে সুবক্তা তা আমরা সকলেই জানি। শুধু ইংরেজিটা চমৎকার বলেন তা নয়, বক্তব্যও থাকে জোরালো। দ্রাবিড়ের ২০১১ সালের ‘স্যার ডোনাল্ড ব্র্যাডম্যান ওরেশন’ এত উৎকৃষ্ট ছিল যে তা নিয়ে বিস্তর লেখালিখি হয়েছিল। যে লোক বই পড়ে না তার পক্ষে অত সুন্দর কথা বলা সম্ভব নয়।

এহেন পড়ুয়া এবং ক্রিকেট ইতিহাস সচেতন দ্রাবিড় কি জানেন না যে অস্ট্রেলিয়া যেমন গ্লেন ম্যাকগ্রা, ডেনিস লিলি, জেফ থমসন, ব্রেট লি-র দেশ তেমনই রিচি বেনো আর শেন ওয়ার্নেরও দেশ? বল ঘোরাতে জানেন এমন লেগস্পিনাররা বরাবরই অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে সফল হন, কারণ সে দেশের পিচের অতিরিক্ত বাউন্স তাঁদের ঘূর্ণিকে আরও বিষাক্ত করে তোলে। এই মুহূর্তে পায়ে গুলি খেয়ে হুইলচেয়ারে বন্দি ইমরান খান জানেন, ১৯৯২ সালে পাকিস্তানের বিশ্বকাপ জয়ে কত বড় ভূমিকা ছিল লেগস্পিনার মুস্তাক আহমেদের। নটা ম্যাচে ১৬ খানা উইকেট নিয়েছিলেন ১৯.৪৩ গড়ে, ওভার পিছু রান দিয়েছিলেন চারেরও কম। সেরা বোলিং করেছিলেন একেবারে ফাইনালে। মেলবোর্নের বিশাল মাঠে ইংল্যান্ড অধিনায়ক গ্রাহাম গুচ আর অলরাউন্ডার ডারমট রিভ মুস্তাককে মারতে গিয়ে আউটফিল্ডে ক্যাচ তুলে আউট হন। গ্রেম হিক ঠকে যান মুস্তাকের গুগলিতে।

লেগস্পিনারদের কথা বলে আলোচনা শুরু করলাম কেন? ওয়ার্ল্ড টি টোয়েন্টি ফাইনালে ১৯৯২ সালের মতই আবার পাকিস্তান আর ইংল্যান্ড মুখোমুখি বলে? না। ভাগবত চন্দ্রশেখর আর অনিল কুম্বলের দেশ ভারত একজন পরীক্ষিত ও সফল লেগস্পিনারকে ডাগআউটেই বসিয়ে রেখে প্রতিযোগিতা থেকে বিদায় নিল বলে। যজুবেন্দ্র চহলের অস্ট্রেলিয়া সফর বেঞ্চে বসে শেষ হয়ে যাওয়াই ভারতের এবারের অভিযানের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা। কারণ ভারতীয় টিম ম্যানেজমেন্ট যে আগাগোড়া ভুল পরিকল্পনা নিয়ে বিশ্ব খেতাব জিততে গিয়েছিল, তার এর চেয়ে বড় প্রমাণ নেই। মাঠে নেমে যেসব ভুলভ্রান্তি হয়েছে সেসবের আলোচনা তো হবেই। কিন্তু পরিকল্পনাতেই ভুল থাকলে মাঠে নেমে আর ঠিক কাজটা করা হবে কী করে?

ভারতের মত দেশে ক্রিকেট বোঝে না এরকম লোকের সংখ্যা খুবই কম। ফলে অগণিত ক্রিকেটবোদ্ধাদের মধ্যে কেউ বলে বসতেই পারেন, ১৯৯২ সালের বস্তাপচা ৫০ ওভারের ক্রিকেটের ধারণা দিয়ে আজকের টি টোয়েন্টি ক্রিকেটকে ব্যাখ্যা করতে যাওয়া বোকামি। আচ্ছা, ইতিহাস চুলোয় যাক। এবারে ওয়ার্ল্ড টি টোয়েন্টিতে লেগস্পিনাররা কী করেছেন সেটাই না হয় দেখা যাক।

সুপার ১২ স্তর থেকে ফাইনালের আগে পর্যন্ত মোট নজন লেগস্পিনার খেলেছেন (ইংল্যান্ডের দুজন; আফগানিস্তান, অস্ট্রেলিয়া, আয়ারল্যান্ড, নিউজিল্যান্ড, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা, জিম্বাবোয়ের একজন করে)। এঁরা মোট ১৩১ ওভার বল করে তুলে নিয়েছেন ৪১টা উইকেট। উইকেট পিছু খরচ করতে হয়েছে মাত্র ২২.২৯ রান, ওভার পিছু রান দিয়েছেন সাতেরও কম। একজনও লেগস্পিনারকে খেলায়নি ভারত, দক্ষিণ আফ্রিকা, নেদারল্যান্ডস আর বাংলাদেশ – ঠিক যে চারটে দেশ সেমিফাইনালে পৌঁছতে পারেনি।

যা শত্রু পরে পরে

এই আলোচনা শুরুতেই সেরে নেওয়ার আরেকটা কারণ হল, ভারত অধিনায়ক রোহিত শর্মা সেমিফাইনালে গোহারা হারার পর সটান দোষ চাপিয়ে দিয়েছেন বোলারদের ঘাড়ে। স্বয়ং অধিনায়ক সমেত ব্যাটাররা কী করেছেন সে প্রশ্নে যাওয়ার আগে তাই বলে নেওয়া দরকার যে ঠিকঠাক বোলারদের খেলানোই হয়নি। অস্ট্রেলিয়ায় খেলা হলেই সমস্ত আলোচনা জোরে বোলারদের নিয়ে হয়ে থাকে। কারণ সবাই জানে সে দেশের পিচ অন্য দেশের তুলনায় গতিময় হয়, বাউন্স বেশি থাকে। কিন্তু সত্যি কথা বলতে অস্ট্রেলিয়ায় জিততে হলে দলে ভাল স্পিনার থাকা একইরকম জরুরি, বিশেষ করে সীমিত ওভারের খেলায়। কারণ পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ক্রিকেটমাঠগুলো অস্ট্রেলিয়াতেই। যাঁরা নিয়মিত টি টোয়েন্টি ক্রিকেট দেখে অভ্যস্ত তাঁরা জানেন, এই ফরম্যাটে সর্বত্রই বাউন্ডারি ছোট করে ফেলা হয়। ফলে দৌড়ে তিন রান নেওয়ার ঘটনা প্রায় দেখাই যায় না ভারত বা সংযুক্ত আরব আমীরশাহীর মাঠে। কিন্তু অস্ট্রেলিয়ার মাঠগুলো এতটাই বড় যে বাউন্ডারি কমিয়ে আনার পরেও এবারের ওয়ার্ল্ড টি টোয়েন্টিতে প্রচুর তিন রান হতে দেখা গেছে। ভারতের সঙ্গে সেমিফাইনালে মহম্মদ শামির অবিমৃশ্যকারিতায় জস বাটলার একবার দৌড়ে চার রান পর্যন্ত নিয়ে ফেলেছেন। তা এত বড় বড় মাঠে স্পিনারকে চার, ছয় মারতে গেলে আউট হওয়ার সম্ভাবনা বাড়ে। তাই টি টোয়েন্টি যুগের আগেও যে দলে ভাল স্পিনার আছে তারা অস্ট্রেলিয়ায় ভাল ফল করেছে।

১৯৯২ সালে কেবল পাকিস্তানের মুস্তাক নয়, নিউজিল্যান্ডের অফস্পিনার দীপক প্যাটেলও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিলেন এই কারণে। স্পিনার যে বোলিং ওপেন করতে পারে তার আগে কেউ কখনো ভাবেনি। প্রয়াত মার্টিন ক্রোয়ের ওই চাল প্রতিপক্ষকে কিংকর্তব্যবিমূঢ় করে দিয়েছিল। প্যাটেল বেশি উইকেট নিতে পারেননি, কিন্তু ওভার পিছু রান দিয়েছিলেন ৩.১০। আরও আগে ১৯৮৫ সালে ভারত যখন অস্ট্রেলিয়ায় বেনসন অ্যান্ড হেজেস কাপ জেতে, সেই জয়েরও অন্যতম স্থপতি ছিলেন লেগস্পিনার লক্ষ্মণ শিবরামকৃষ্ণণ।

অথচ এবার চহলের বদলে খেলে গেলেন অক্ষর প্যাটেল। যিনি উচ্চতার কারণে পিচ থেকে বাউন্স আদায় করতে পারেন বটে, কিন্তু বল ঘোরাতে হলে তাঁর দরকার স্লো টার্নার। অস্ট্রেলিয়ায় অমন পিচ পাওয়া যায় না, বরং সমান বাউন্সের পিচ হওয়ায় অক্ষরের মত বোলারকে মনের সুখে প্রহারেণ ধনঞ্জয় করা যায়। হয়েছেও তাই। অক্ষর প্রায় ৪০ গড়ে পাঁচ ম্যাচে মোটে তিনটে উইকেট নিয়েছেন, ওভার পিছু সাড়ে আটের বেশি রান দিয়েছেন। কিন্তু বোলিং আক্রমণের একমাত্র সমস্যা তিনি নন। দীর্ঘদিন সাদা বলের ক্রিকেটে টিম ম্যানেজমেন্টের অপছন্দের বোলার হয়ে থাকার পর রোহিত-দ্রাবিড়ের আমলে অশ্বিন হঠাৎই প্রিয় হয়ে উঠেছেন। কিন্তু তিনি প্রায় কোনো ম্যাচেই কোনো প্রভাব ফেলতে পারেননি। অথচ পিচে স্পিনারদের জন্য যথেষ্ট সাহায্য ছিল। সেমিফাইনালের অ্যাডিলেডে তো ছিলই। চহলের চেয়ে অক্ষরের ব্যাটিং ক্ষমতা বেশি, তাই তাঁকে খেলানোই সমীচীন – এমন একটা যুক্তি টিম ম্যানেজমেন্টের পক্ষ থেকে ভাসিয়ে দেওয়া হয়েছিল। অথচ দেখা গেল প্রায়ই তাঁর আগে ব্যাট করতে নামছেন অশ্বিন। তাহলে আর চহল খেললে কী ক্ষতি ছিল?

পেস বোলিং বিভাগে আবার গোড়ায় গলদ। তড়িঘড়ি আহত যশপ্রীত বুমরাকে ফেরানোর চেষ্টা হয়েছিল, সে চেষ্টা সফল হয়নি। শামি অতীতে টি টোয়েন্টিতে ভাল করেননি, তা সত্ত্বেও তাঁকেই বুমরার জায়গায় নেওয়া হল। সুপার ১২-তে তবু ঠিকঠাক চলছিল, সেমিফাইনালে যখন তাঁরই বোলিং আক্রমণকে নেতৃত্ব দেওয়ার কথা, তখনই শামি ব্যর্থ হলেন। তরুণ অর্শদীপ (১০ উইকেট, ওভার পিছু ৭.৮০ রান) আর অভিজ্ঞ ভুবনেশ্বর কুমার (মাত্র চার উইকেট, কিন্তু ওভার পিছু ৬.১৬) গোটা প্রতিযোগিতায় নেহাত খারাপ বল করেননি। কিন্তু সমস্যা হল তাঁরা একইরকম গতির সুইং বোলার। যেদিন বল তত সুইং করে না, সেদিন দু প্রান্ত থেকে দুজনকে খেলতে হলে ব্যাটারদের কাজ অনেক সহজ হয়ে যায়। শামির গতি এঁদের চেয়ে বেশি, কিন্তু সুইং না হলেও ব্যাটারকে ঘামিয়ে তোলার মত নয়; যা পাকিস্তানের হ্যারিস রউফ, ইংল্যান্ডের মার্ক উড বা দক্ষিণ আফ্রিকার অ্যানরিখ নর্খ্যে পারেন। ফলে ভারতের বোলিং হয়ে গেল বৈচিত্র্যহীন। ভারতের দ্রুততম বোলার হয়ে গেলেন অলরাউন্ডার হার্দিক পান্ডিয়া, যিনি আবার বিশেষ ফর্মে ছিলেন না। আসলে বিশেষ করে বুমরা অনুপস্থিত বলেই দরকার ছিল একজন এক্সপ্রেস গতির পেসার। কিন্তু ঘন্টায় ১৫০ কিলোমিটারের বেশি গতিতে বল করতে পারা উমরান মালিক বা মহসীন খানকে তো স্কোয়াডেই রাখা হয়নি।

শশী তারকায় তপনে

নির্বাচক এবং টিম ম্যানেজমেন্টের পরিকল্পনার অভাব বোলারদের ঘাড়ে চাপিয়ে রোহিত আসলে যাদের আড়াল করেছেন, এবার তাদের আলোচনায় আসা যাক। ক্রিকেটের যে ফরম্যাটে মাত্র ১২০টা বল খেলার জন্য হাতে দশখানা উইকেট থাকে, সেখানে বোলারদের ভূমিকা যে স্রেফ সহায়কের – একথা বোঝার জন্য ক্রিকেট বোদ্ধা হওয়ার দরকার পড়ে না। টি টোয়েন্টি জেতানোর দায়িত্ব সর্বদা মূলত ব্যাটারদের কাঁধে। যে দলের ব্যাটিং লাইন আপ বাংলাদেশ, জিম্বাবোয়ে, নেদারল্যান্ডসের মত দলের সঙ্গেও ২০০ রান করতে পারে না; পার্থের সবচেয়ে গতিময় পিচে ১৪০ পর্যন্তও পৌঁছতে পারে না – সেই দলের অধিনায়ক যখন স্রেফ সেমিফাইনাল ম্যাচটা দশ উইকেটে হারার জন্য বোলারদের দিকে আঙুল তোলেন তখন হেসে ফেলা ছাড়া উপায় থাকে না।

অধিনায়ক নিজে ছটা ম্যাচে মাত্র ১১৬ রান করেছেন, গড় ১৯.৩৩। তাঁর নির্ভরযোগ্য ওপেনিং পার্টনার কে এল রাহুলের গড় ২১.৩৩। দুটো অর্ধশতরান করেছেন জিম্বাবোয়ে আর বাংলাদেশের বিরুদ্ধে। তাসকিন আহমেদকে খেলতে গিয়েই তাঁর গলদঘর্ম অবস্থা। কিন্তু সবচেয়ে বড় কথা, রোহিত আর রাহুলের স্ট্রাইক রেট যথাক্রমে ১০৬.৪২ আর ১২০.৭৫। এই দুই বীরপুঙ্গবের কল্যাণে ওপেনিং জুটির ওভার পিছু রান করার দিক থেকে ভারত সুপার ১২-তে খেলা দলগুলোর মধ্যে সবার নিচে, সবার পিছে (৪.৯৮, অর্থাৎ ১০৬ বল খেলে ৮৮ রান)।

যোগ্যতার্জন পর্ব পেরিয়ে সুপার ১২-তে উঠতে পারেনি যারা, তাদের মধ্যেও একমাত্র নামিবিয়া এক্ষেত্রে ভারতের চেয়ে পিছিয়ে (৪.৪৪)।

এবার সবচেয়ে অপ্রিয় প্রসঙ্গে আসা যাক – বিরাট কোহলি। তিনি প্রতিযোগিতা শেষ করেছেন ব্র্যাডম্যানোচিত ৯৮.৬৬ গড়ে, স্ট্রাইক রেট ১৩৬.৪০। অতএব কোহলির ভক্তরা এবং তিনি যে শুধু ভারতের নয় পৃথিবীর সর্বকালের সেরা ব্যাটার তা প্রমাণ করতে ব্যস্ত বিশেষজ্ঞরা, বলে চলেছেন – আর কী করবে লোকটা? ঘটনা হল সূর্যকুমার যাদব গোটা প্রতিযোগিতায় অবিশ্বাস্য স্ট্রাইক রেটে (১৮৯.৬৮) ব্যাট না করলে এবং সেমিফাইনালে হার্দিক একই কাজ (১৯০.৯০) না করলে কোহলির ওই অর্ধশতরানগুলো সত্ত্বেও ভারত সম্ভবত আরও আগেই প্রতিযোগিতা থেকে বিদায় নিত। কারণ মোট রান জেতার মত হত না। একমাত্র ব্যতিক্রম পাকিস্তান ম্যাচ। সত্যিই ওই হারা ম্যাচটা কোহলি একা হাতে জিতিয়েছেন। একথাও সত্যি যে শেষ দু ওভারে কোনোদিন ভুলতে না পারার মত দুটো ছক্কা মারার প্রতিভা এই মুহূর্তে বিশ্বের আর কোনো ব্যাটারের নেই। কিন্তু প্রথম ওভারে ব্যাট করতে নেমে ১৬০ রান তুলতে তাঁকে শেষ ওভার অবধি খেলতে হয়েছে এবং শেষ ওভারেও ম্যাচের লাগাম নিজের হাতে রাখতে পারেননি। শেষ বল খেলে উইনিং স্ট্রোক নিতে হয়েছে টেল এন্ডার অশ্বিনকে। সেদিন যা ঘটেছিল তা এককথায় কামাল। কিন্তু কামাল একবারই ঘটে। কামাল ভুল প্রণালীকে সঠিক বলে প্রমাণ করে না। শেষ দু ওভারে গোটা তিরিশেক রান বারবার তোলা যায় না। সুতরাং ‘আগে ধরে খেলব, পরে মেরে পুষিয়ে দেব’ নীতি অচল। ইংল্যান্ড ম্যাচই তা প্রমাণ করে দিয়েছে। পঞ্চাশ করতে ৪০ বল খরচ করে ফেলার পর কোহলি ১৮তম ওভারে আউট হয়ে গেলেন, দলের রান তখন মাত্র ১৩৬।

কোহলির এই নীতির সপক্ষে যুক্তি হল – ওপেনাররা ডুবিয়েছে, তিনে নেমে খেলাটা ধরতে হবে না? নইলে তো ইনিংস আগেই শেষ হয়ে যেত। পাটীগণিত কিন্তু এই ধরাধরি সমর্থন করে না। হিসাবটা একেবারে সোজা। টি টোয়েন্টিতে একটা দলের জন্য বরাদ্দ ১২০টা বল, হাতে দশটা উইকেট। মানে উইকেট পিছু মাত্র ১২টা বল। একজন ব্যাটার ওর চেয়ে বেশি বল না খেললে কিচ্ছু এসে যায় না, বরং সেক্ষেত্রে পরের ব্যাটার বেশি সুযোগ পেয়ে যাবেন রান করতে। সুতরাং বারোটা বলে যত বেশি সম্ভব রান করার চেষ্টা করা উচিত, তার চেয়ে বেশি বল খেললে আরও বেশি রান করার চেষ্টা করা দরকার। তা না করে ১৩৬.৪০ স্ট্রাইক রেটে পুরো ইনিংস ব্যাট করা মানে পরের ব্যাটারদের কাজ কঠিন করে দেওয়া, হাতে থাকা উইকেটের অপচয়। মনে রাখা ভাল, এই প্রতিযোগিতায় পাওয়ার প্লে-তে ওভার পিছু রান করায় শেষ থেকে দ্বিতীয় হয়েছে ভারত (৫.৯৭; প্রথম স্থানে নেদারল্যান্ডস)।

পাওয়ার প্লে-তে অত কম রান করে টি টোয়েন্টি খেতাব জেতা যায় না। এতে কোহলির দায় কিন্তু কম নয়। কারণ তিনি প্রায়শই পাওয়ার প্লে চলাকালীনই ব্যাট করতে নেমেছেন। টি টোয়েন্টি একেবারেই স্ট্রাইক রেটের খেলা। কোহলির কেরিয়ার স্ট্রাইক রেট ১৩৭.৯৬। মোট রান আর গড়ে যত উপরেই থাকুন, এতে তিনি পৃথিবীর প্রথম ৭০ জনের মধ্যেও নেই। নিজে অধিনায়ক থাকার সময়ে কোহলি টেস্ট ম্যাচের ব্যাটিং নিয়ে বলতে গিয়েও ‘ইনটেন্ট’ শব্দটা বারবার ব্যবহার করতেন। অর্থাৎ পিচ যেমনই হোক, পরিস্থিতি যা-ই হোক, প্রতিপক্ষের বোলিং সবল না দুর্বল সেসব দেখা চলবে না। সারাক্ষণ রান করার চেষ্টা করে যেতে হবে, মন্থর গতিতে রান করা মানেই নাকি নিজের দলের উপর চাপ তৈরি করা। কথাটা অবশ্য চালু করেছিলেন মহেন্দ্র সিং ধোনি। এই ইনটেন্টের অভাবেই তো অজিঙ্ক রাহানের সাদা বলের কেরিয়ার বলে কিছু হল না। চেতেশ্বর পূজারাকে বহুবার শতরান করেও শুনতে হয়েছে তাঁর ইনটেন্টের অভাব আছে। আশ্চর্যের কথা, ক্রিকেটের সবচেয়ে ছোট ফরম্যাটে কোহলির নিজের ইনটেন্টের দেখা পাওয়া যায় না। সুনীল গাভস্কর, গুন্ডাপ্পা বিশ্বনাথ, শচীন তেন্ডুলকর, মহম্মদ আজহারউদ্দিন, ভিভিএস লক্ষ্মণের দেশের কোহলি অ্যাডাম জাম্পা, লিয়াম লিভিংস্টোন, আদিল রশিদের মত স্পিনারকেও পিটিয়ে উঠতে পারেন না।

ঘটনা হল, এসব দোষ এবারের ওয়ার্ল্ড টি টোয়েন্টিতে প্রথম জানা গেল এমন নয়। গত বছর সংযুক্ত আরব আমীরশাহীর ওয়ার্ল্ড টি টোয়েন্টিতে এইসব দোষেই ভারত সেমিফাইনালেও পৌঁছতে পারেনি। এ বছর এশিয়া কাপেও এইসব কারণেই আফগানিস্তান ছাড়া কারোর সঙ্গেই পরাক্রম দেখানো সম্ভব হয়নি। তা সত্ত্বেও কেন এই তারকাদের বাদ দেওয়া যায় না, কীভাবে ভারতীয় ক্রিকেটের নির্বাচন প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করে আইপিএল – সেসব নিয়ে এই ওয়েবসাইটেই আগে লিখেছি, পুনরাবৃত্তি নিষ্প্রয়োজন। বরং অন্য কয়েকটা প্রশ্ন নিয়ে নাড়াচাড়া করা যাক।

কচি তারা, কথা ফোটে নাই

২০১৩ সালের চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফির পরে ভারত আর কোনো খেতাব জেতেনি। আজ দ্রাবিড়-রোহিতের ব্যর্থতায় শাস্ত্রী-কোহলির যে ভক্তরা উল্লসিত, তাঁরাও নিশ্চয়ই এ তথ্য ভুলে যাননি। সর্বগ্রাসী মিডিয়া হাইপ আর মনভোলানো বিজ্ঞাপনী চাকচিক্য এতদিন সব ধামাচাপা দিয়ে রেখেছিল, ইংল্যান্ড একেবারে দশ উইকেটে জিতল বলেই সম্ভবত আর সামলাতে পারা যাচ্ছে না। বহু চাটুকারেরও মুখ খুলে গেছে। তবু এই চূড়ান্ত পণ্যায়নের যুগে যেহেতু ক্রিকেট তারকাদের একেকজনের উপর কোটি কোটি টাকা লগ্নি হয়ে আছে, সেহেতু এঁদের ঢাল হয়ে এখনো কিছু সংবাদমাধ্যম, ক্রিকেট লেখক এবং অতশত না বোঝা নিষ্পাপ ভক্ত দাঁড়িয়ে পড়েছেন। তাঁরা ভাঙবেন তবু মচকাবেন না। নরেন্দ্র মোদীর সরকারের একটা ব্যর্থতাও অস্বীকার করতে না পেরে যেমন এক শ্রেণির মানুষ বলেন “ইফ নট মোদী, দেন হু”, তেমনি এঁরাও বলতে শুরু করেছেন, এদের বাদ দিলে খেলবে কারা?

ঘটনা হল, এই মুহূর্তে ভারতীয় ক্রিকেটে এর চেয়ে অবান্তর প্রশ্ন নেই। মুম্বাইয়ের পৃথ্বী শ দেশের হয়ে এখন পর্যন্ত একটাই টি টোয়েন্টি খেলেছেন এবং কোনো রান করতে পারেননি। কিন্তু আইপিএল এবং ঘরোয়া টি টোয়েন্টিতে ৯২ ম্যাচে তিনি করে ফেলেছেন ২৪০১ রান; স্ট্রাইক রেট ১৫১.৬৭; সর্বোচ্চ ১৩৪। ওই ১৩৪ রান তিনি করেছেন মাত্র ৬১ বলে, গত মাসে আসামের বিরুদ্ধে সৈয়দ মুস্তাক আলি ট্রফিতে। ওই প্রতিযোগিতাটি হল ভারতের ঘরোয়া টি টোয়েন্টি প্রতিযোগিতা। তাহলে আইপিএল কী? এ প্রশ্ন উত্থাপন করিয়া লজ্জা দিবেন না।

ভারতীয় দলের তারকারা ইদানীং যত খেলেন তার সমান বা হয়ত তার চেয়েও বেশি বিশ্রাম নেন। সেই সুবাদে ঝাড়খণ্ডের উইকেটকিপার ব্যাটার ঈশান কিষণকে তো অনেকেই চিনে গেছেন। ভারতের হয়ে যে কটা টি টোয়েন্টি আর একদিনের ম্যাচ তিনি এখন অব্দি খেলেছেন তাতে ধোনির মত অভাবনীয় কিছু না করলেও প্রমাণ হয়েছে তাঁর আরও সুযোগ প্রাপ্য। স্রেফ ওপেনিং ব্যাটার হিসাবেও তিনি খেলেছেন এবং খেলতে পারেন।

কিন্তু কাব্যে সবচেয়ে উপেক্ষিত কেরালার সঞ্জু স্যামসন। তিনি যে সিরিজে দলে সুযোগ পান সেখানে একটা-দুটো ম্যাচে খেলেন, সেখানে সফল বা ব্যর্থ যা-ই হোন, পরের সিরিজে বাদ পড়ে যান। আবার হয়ত তার পরের সিরিজে ফেরত আসেন। তারকাদের ট্র্যাফিক জ্যামে মাথা গলাতে পারেন না আর কি। এ পর্যন্ত ভারতের হয়ে ১৬টা টি টোয়েন্টিতে ১৩৫.১৫ স্ট্রাইক রেটে ২৯৬ রান করেছেন। উইকেটের পিছনে সাতটা ক্যাচ নিয়েছেন, দুটো স্টাম্পিং করেছেন। সঞ্জুর বয়স ইতিমধ্যেই ২৮, ঈশান ২৪, পৃথ্বী ২৩। এছাড়াও আছেন শ্রেয়স আয়ার, শুভমান গিলরা। আছেন আইপিএলে সাফল্য পাওয়া ঋতুরাজ গায়কোয়াড় (২৫), রাহুল ত্রিপাঠী (৩১), ফিনিশার হিসাবে একাধিকবার চমকে দেওয়া রাহুল টেওয়াটিয়া (২৯)। ইংল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ডের মত বহু দেশ টি টোয়েন্টিতে এমন অনেককে খেলায় যাঁরা অন্য কোনো ফরম্যাটে সুযোগ পান না। ভারতও চাইলে তেমন করতেই পারে। টি টোয়েন্টি অন্যরকম, তার চাহিদাও অন্যরকম।

মাঝখানে নদী ওই

উপরের নামগুলো গত কয়েক মাসে তারকাদের অনুপস্থিতিতে যেটুকু সুযোগ পাওয়া গেছে তার সদ্ব্যবহার করা ক্রিকেটারদের। কিন্তু ওয়ার্ল্ড টি টোয়েন্টি থেকে শুকনো মুখে ফেরা দলের মধ্যেই এমন দুজন আছেন যাঁরা উপর্যুপরি ব্যর্থ হওয়া তারকাদের জায়গা নিতে পারেন। একজন ঋষভ পন্থ। টেস্ট ক্রিকেটে মাত্র ৩১ ম্যাচের কেরিয়ারেই যেসব ইনিংস তিনি খেলে ফেলেছেন তাতে তাঁর প্রতিভাকে সন্দেহ করার আর উপায় নেই। কিন্তু তার সঙ্গে মানানসই সাফল্য সাদা বলের কেরিয়ারে এখনো দেখা যায়নি। তার অনেকখানি দায় শাস্ত্রী-কোহলি এবং দ্রাবিড়-রোহিতের। পাঁচ বছর হয়ে গেল, ব্যাটিং অর্ডারে ঋষভের জায়গা কোথায় তা এখনো স্থির হল না। অথচ সাদা চোখেই দেখা যায়, তাঁর মত আক্রমণাত্মক ব্যাটার যত বেশি বল খেলার সুযোগ পায় দলের পক্ষে তত ভাল। ইংল্যান্ডে একটা ম্যাচে ওপেনার হিসাবে খেলিয়েই সে পরীক্ষায় দাঁড়ি টেনে দিলেন দ্রাবিড়-রোহিত; আগের কোচ, অধিনায়ক তো সে চেষ্টাও করেননি। ভাবলে শিউরে উঠতে হয়, শচীন একদিনের ক্রিকেটে কত নম্বরে ব্যাট করবেন তা নিয়ে অজিত ওয়াড়েকর-আজহার ১৯৯৪ সালে অকল্যান্ডের সেই ইনিংসের পরেও এমন টালবাহানা করলে কী হত।

অন্যজন দীপক হুড়া। বরোদার এই ২৭ বছর বয়সী ব্যাটার ভারতের হয়ে ১৩টা টি টোয়েন্টিতে ১৫৩.৪০ স্ট্রাইক রেটে শ তিনেক রান করে ফেলেছেন। জুন মাসে আয়ারল্যান্ডের বিরুদ্ধে তিন নম্বরে ব্যাট করতে নেমে মাত্র ৫৭ বলে ১০৪ করেছেন। তবু তাঁর জায়গা পাকা নয়, কারণ ওই ট্র্যাফিক জ্যাম। ওয়ার্ল্ড টি টোয়েন্টিতে মাত্র একটা ম্যাচ খেলতে পেলেন পার্থে সবচেয়ে কঠিন উইকেটে।

বলে রাখা ভাল, কেবল টি টোয়েন্টি নয়। রোহিত, শিখর ধাওয়ান, কোহলিরা একদিনের ক্রিকেটে যে ব্যাটিংটা করেন সেটাও প্রায় প্রাক-জয়সূর্য-কালু যুগের ব্যাটিং। বিশেষত ২০১৫ সালের বিশ্বকাপের পর থেকে ও ব্যাটিং সব দল বাতিল করে দিয়েছে। সে কারণেই ভারত ৫০ ওভারের ক্রিকেটেও ঝুড়ি ঝুড়ি দ্বিপাক্ষিক সিরিজ জিতেছে গত ন বছরে, কিন্তু বড় প্রতিযোগিতা এলেই ব্যর্থ। কারণ কোনো বড় দল, বিশেষ করে নক আউট স্তরের ম্যাচে, শেষের দিকের ওভারে এত লুজ বল ফেলে না বা ফিল্ডিংয়ে এত ভুলভ্রান্তি করে না যে পাওয়ার প্লে-তে কম রান করার ক্ষতি পুষিয়ে দেওয়া যাবে। বরং সে সময় আসার আগেই আউট হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা প্রবল। ২০১৯ বিশ্বকাপ সেমিফাইনালে যেমন নতুন বলেই রোহিত, রাহুল, কোহলি আউট হয়ে গিয়েছিলেন। ফলে শুধু খেলোয়াড় পরিবর্তন নয়, পরিকল্পনায় আমূল পরিবর্তন না আনলে সামনের বছর ঘরের মাঠে ৫০ ওভারের বিশ্বকাপেও একইরকম বিপর্যয় ঘটবে।

আরও পড়ুন বিরাট, রোহিত, রাহুলদের সত্য রচনা চলছে চলবে

একই প্রণালী বারবার প্রয়োগ করে যদি ভারতীয় বোর্ড ভিন্ন ফলের আশা করে তাহলে বলতে হয় জেতা হারায় তাদের কিছু এসে যায় না। তেমনটা হওয়া অস্বাভাবিক নয়, কারণ আইপিএল আর ভারতীয় ক্রিকেট দলের ম্যাচের সম্প্রচার সত্ত্ব থেকে এত বিপুল অর্থ আয় হয় যে দলের জয় পরাজয়ে কেবল ক্রিকেটপ্রেমীদেরই উত্তেজিত হওয়া সাজে। বোর্ডকর্তারা অ্যাকাউন্ট ব্যালান্স দেখে নিয়ে সুখে নিদ্রা যেতে পারেন।

এতক্ষণে অরিন্দম…

কারা যেন ভারতের টি টোয়েন্টি ক্রিকেট দলের ভবিষ্যৎ নিয়ে বিষম চিন্তিত হয়ে দ্রাবিড়কে প্রশ্ন করে ফেলেছিল, ভারতীয় ক্রিকেটারদের কি অন্য দেশের টি টোয়েন্টি লিগে খেলতে দেওয়া উচিত? ইংল্যান্ডের ক্রিকেটাররা তো অনেকেই অস্ট্রেলিয়ার বিগ ব্যাশ লিগে খেলেন। হয়ত তারই সুবিধা পেয়ে গেলেন। দ্রাবিড়, ভারতের সর্বকালের সেরা টেস্ট ক্রিকেটারদের একজন, মহা উদ্বিগ্ন হয়ে বলেছেন, সে তো ভারি মুশকিলের ব্যাপার হবে। অন্য দেশের লিগগুলোর সময়ে আমাদের ঘরোয়া ক্রিকেট চলে যে! ভারতীয়রা ওখানে খেলতে গেলে আমাদের রঞ্জি ট্রফিটা উঠে যাবে যে! শুনে মাইকেল মধুসূদন মনে পড়ে: “এতক্ষণে” –অরিন্দম কহিলা বিষাদে / “জানিনা কেমনে আসি লক্ষণ পশিল/রক্ষঃপুরে!…”

ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড আর্থিক পেশির জোরে যখন আইপিএলের জন্য আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিলের ফিউচার টুরস প্রোগ্রামে জায়গা খালি করিয়েছে তখন আর পাঁচজন অনুগত প্রাক্তন ক্রিকেটারের মতই দ্রাবিড় চুপচাপ ছিলেন। ইতিমধ্যে বোর্ড আইপিএলে আরও দুটো দল যোগ করেছে, সম্প্রচার সত্ত্বের দাম যত বাড়ানো হচ্ছে তত টাকা পাওয়া যাচ্ছে দেখে আগামী কয়েক বছরে ম্যাচের সংখ্যাও বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে। এখন সারা পৃথিবীতে একের পর এক ফ্র্যাঞ্চাইজ লিগ গজাচ্ছে। সেসব দেশের ক্রিকেট বোর্ড নিজেদের খেলোয়াড়দের এতকাল আইপিএলের জন্য ছেড়ে এসেছে, আন্তর্জাতিক ক্রিকেট বন্ধ রেখে আইপিএল চলবে – এ ব্যবস্থাও মেনে নিয়েছে। এখন যদি বিস্মিত দ্রাবিড় বলেন – হায়, তাত, উচিত কি তব/একাজ – তাতে তো চিড়ে ভিজবে না। উচিত-অনুচিতের সীমা তো ক্রিকেট কবেই পেরিয়ে এসেছে।

ইনস্ক্রিপ্ট-এ প্রকাশিত