আমার গান: আশ্চর্য ভাবনার মঞ্চায়ন

আটপৌরে জীবনের মধ্যে থেকে বিশ্বসাথে যোগে বিহার করার সাধনাই একসময় বাঙালি মধ্যবিত্তের অভিজ্ঞান ছিল। সেই জীবনযাপনকে মঞ্চায়িত করতে গিয়ে নির্দেশক সুমন সেনগুপ্ত যেভাবে একবিংশ শতাব্দীর হোমো স্যাপিয়েন্সের বিশ্ববীক্ষা এবং জ্ঞানচর্চা নিয়ে প্রশ্ন তুলে দিয়েছেন, সেটাই এই নাটককে বিশিষ্ট করে তোলে।

জন্মান্ধ মেয়েকে জ্যোৎস্নার ধারণা দিতে চেয়েছেন আমাদের ভাষার কবি জয় গোস্বামী। আর জন্মান্ধ ছেলেকে এই মহাবিশ্বের আলো, গান, তারামণ্ডলের রহস্য সন্ধানে প্রবৃত্ত করতে চেয়েছেন পদার্থবিদ্যার শিক্ষক অতীন। কেবল অন্ধ নয়, কোমরের নিচ থেকে পঙ্গু হয়ে যাওয়া একমাত্র ছেলে পলাশকে ঘিরে অতীন আর তাঁর স্ত্রী আরতির যে জীবনসংগ্রাম, ইন্দ্রিয়গত প্রতিবন্ধকতা কাটিয়ে ওঠার জন্য পলাশের যে সংগ্রাম – তা নিয়েই আমার গান নাটক বুনেছে চেতলা কৃষ্টি সংসদ। এই নাটকের নাম আমার আলো বা আমার মুক্তি হলে হয়ত আরও যথাযথ হত, কারণ গান এই নাটকে ধরতাই, নাটকের প্রাণ নয়। অন্তত এই আলোচকের তাই মনে হয়েছে। কিন্তু আসল কথা সেটা নয়। অতীন-আরতি-পলাশের মত সাধারণ পরিবার বাংলার শহরে বা মফস্বলে কোনোদিনই বিরল নয়। আটপৌরে জীবনের মধ্যে থেকে বিশ্বসাথে যোগে বিহার করার সাধনাই একসময় বাঙালি মধ্যবিত্তের অভিজ্ঞান ছিল। সেই জীবনযাপনকে মঞ্চায়িত করতে গিয়ে নির্দেশক সুমন সেনগুপ্ত যেভাবে একবিংশ শতাব্দীর হোমো স্যাপিয়েন্সের বিশ্ববীক্ষা এবং জ্ঞানচর্চা নিয়ে প্রশ্ন তুলে দিয়েছেন, সেটাই এই নাটককে বিশিষ্ট করে তোলে। একবার দেখে মনে হয় – আরও কী যেন ছিল, খেয়াল করলাম না! আরেকবার দেখলে হয়।

পলাশ এমন একজন যুবক যার কৌতূহলের শেষ নেই এবং যে উন্মাদের মত জানতে চায় – আলো কী? যেহেতু সে চক্ষুষ্মান নয়, তাই তার আলোকে জানার একমাত্র উপায় জ্ঞানার্জন। বাবা আর ব্রেইল – এই তার সহায়। আর সহায় বাবার একদা ছাত্র বাবুদা, যে প্রবল তার্কিক, লোকের চোখে পাগল। কখনো সে প্রহেলিকা; আবার কখনো জলবৎ তরলং করে বুঝিয়ে দেয় মহাকর্ষ থেকে শুরু করে অণু, পরমাণুর রহস্য। মানুষকে যেভাবে সর্বদাই ঘিরে থাকে আলো আর অন্ধকার, তেমন করেই পলাশকে ঘিরে থাকে তার বাল্যবন্ধু মুনমুন। মোটের উপর এই কজনকে নিয়েই পলাশের মনোজগৎ। আর যারা আছে, তারা সকলেই বাইরের লোক। অবশ্য আরেকজন ব্যক্তি আছে যাকে দৃষ্টিহীন পলাশই কেবল দেখতে পায়, কিন্তু তার কথা বলে দিলে এই নাটকের রহস্য উদ্ঘাটন করে দেওয়ার অপরাধ ঘটে যাবে।

পলাশের চোখ দিয়ে, অর্থাৎ মন দিয়ে, জগৎটাকে দেখানোর জন্যে মঞ্চসজ্জায় (সুরজিৎ দে) এবং পোশাক-আশাকে (পিয়ালী সামন্ত, রুশতি চৌধুরী) সাদা, কালো আর ধূসরের বাইরে কোনো রং ব্যবহার করা হয়নি। ব্যতিক্রম শুধু পলাশের কল্পনায় তৈরি দিগন্ত, মানুষ বা পাখির মূর্তি। এই কল্পনাশক্তি মুগ্ধ করে। আগাগোড়া হুইলচেয়ারে বসা পলাশের চরিত্র বহুমাত্রিক। সে যেমন জ্ঞানপিপাসু, তেমনি অবুঝ। যত সরল, তত দুর্বোধ্য। সে অনাবিল আনন্দ পেতে পারে, আবার হতাশার চোটে হিংস্রও হয়ে উঠতে পারে। অভিনেতা সায়ন্তন মৈত্র এই পরস্পরবিরোধিতা তুলে ধরতে অনেকটাই সফল, তবে কিছু কিছু মুহূর্তে মনে হয়েছে তিনি অভিব্যক্তির বৈচিত্র্যের অভাবে ভুগছেন। তাঁর হাহাকার আর চরম আনন্দের অভিব্যক্তি প্রায় এক হয়ে গেছে।

ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র পলাশের বাবা এবং পথপ্রদর্শক অতীন। এই চরিত্রের অভিনেতা ময়ূখ দত্তের (নির্দেশনা সহকারীও বটে) বৈজ্ঞানিক আলোচনায় মশগুল হয়ে জটিল তত্ত্ব সহজ করে বুঝিয়ে দেওয়ার সাবলীলতা যতখানি মনোমুগ্ধকর, প্রতিবন্ধী সন্তানের বাবা হিসাবে অসহায়তা ততখানি স্পষ্ট হয় না। মঞ্জিমা চট্টোপাধ্যায় অভিনীত আরতি চরিত্রের পরিসর বড্ড সীমিত মনে হয়। তিনি তো স্বামীর মত ছেলের সঙ্গে জ্ঞানবিজ্ঞানের অভিযানে বেরোতে পারেন না, ফলে তাঁর সঙ্গে রসায়ন নিশ্চয়ই ভিন্নতর; মা হিসাবে তাঁর যন্ত্রণারও কিছু নিজস্বতা থাকার কথা। তা নাটকে তেমনভাবে আলাদা করে দেখা যায় না। পিয়ালী অভিনীত মুনমুনের চরিত্রও যতটা সকলের ভালোবাসা ও আক্রমণের লক্ষ্য, ততটা সোচ্চার নয়। সেদিক থেকে এই নাটকের নারী চরিত্রগুলোকে তুলনায় দুর্বল বললে ভুল হবে না। মঞ্চে সামান্য সময় কাটানো ইন্দ্রাণীও (সৃজনী দে) যেমন একেবারেই প্রান্তিক চরিত্র। জানার ইচ্ছা, জানার জন্যে ক্লেশ স্বীকার করার রোমাঞ্চ উপলব্ধি করা অতীনের বিপরীতে উপরচালাক সাংবাদিকের চরিত্রে সুস্নাত ভট্টাচার্য্যের অভিনয় খুবই বিশ্বাসযোগ্য। খুব বেশি সময় মঞ্চে না থাকলেও যিনি অত্যন্ত প্রভাবশালী অভিনয় করেন তিনি হলেন পলাশের দেখা ব্যক্তির চরিত্রে অরিত্র দে। নাটকের তুঙ্গ মুহূর্তে পলাশের সঙ্গে তাঁর মানসিক দ্বন্দ্বযুদ্ধ রীতিমত রোমাঞ্চকর।

যে অভিনেতার কথা শেষে বলতে হবে, তিনি হলেন বাবুদার চরিত্রে অভিনয় করা অর্ক চক্রবর্তী। চরিত্রটা বেশ বিপজ্জনক। একাধারে যাত্রার বিবেক, ‘কমিক রিলিফ’, বিজ্ঞানের একনিষ্ঠ চিরছাত্র, অতীন-আরতি-পলাশের পরিবারের প্রায় অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। কিন্তু যা সবচেয়ে বিপজ্জনক – সে দর্শককে বারংবার অস্বস্তিতে ফেলে স্বাভাবিকত্ব আর পাগলামির ধারণাকে ওলটপালট করে দিয়ে। অর্কর চরিত্র নাট্যকারের পূর্ণ সহায়তা পেয়েছে। সবচেয়ে হাস্যরস উদ্রেককারী সংলাপগুলো তার, আবার সবচেয়ে ভাবিয়ে তোলার মত সংলাপগুলোও তার। এই মহাবিশ্বকে পলাশের কাছে ভাঙতে ভাঙতে ফার্মিয়ন আর বোসন কণায় এনে ফেলার দায়িত্বও পালন করে বাবুদাই। নাটকটাকে যদি ঘুড়ি হিসাবে ভাবা হয়, তাহলে তার লাটাই অনেকাংশে অর্কর হাতেই থাকে এবং তিনি অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে ঘুড়ির উড়ান নিয়ন্ত্রণ করেন। তাঁর পাগলামি মাত্রা ছাড়ায় না বা লোক হাসানোর চেষ্টা বলে মনে হয় না। আবার অন্য চরিত্রগুলোকে হাস্যাস্পদ করে তুলে নিজে হাসলেও, বিজ্ঞানালোচনার সময়ে গাম্ভীর্যের ঘাটতি হয় না।

আরও পড়ুন অবহেলিত বিজ্ঞান আর কৈশোরকে ভালবেসে এল পক্ষীরাজের ডিম

শুরুতেই বলেছিলাম – গান এই নাটকের ধরতাই। রবীন্দ্রনাথের গান দিয়ে নাটকের ভাবনাকে সংহত করতে চেয়েছেন নির্দেশক। যে গানগুলো ব্যবহৃত হয়েছে সেগুলো যে নাটকের বিষয়বস্তু এবং পরিস্থিতির সঙ্গে জুতসই তা নিয়ে সন্দেহ নেই। সেঁজুতি গুপ্ত, অরিত্র এবং মঞ্জিমার গাওয়াও চমৎকার। কিন্তু গানের ব্যবহার কিঞ্চিৎ কম হলেই ভালো হত মনে হয়। বিশেষত যে গানের দু কলি পলাশ গাইছে মঞ্চের উপর, আলো নিভে যাওয়ার পর সেই গানেরই আরও খানিকটা অংশ অন্য কণ্ঠে বাজছে – এ জিনিস নেহাতই বাহুল্য। বাহুল্যের সমস্যা মঞ্চসজ্জাতেও রয়েছে। পলাশের বিজ্ঞানমগ্নতা বোঝাতে বেশকিছু জিনিস টাঙিয়ে মঞ্চটাকে ছোট করে আনা হয়েছে। তাতে ক্ষতি নেই, কিন্তু দর্শকের দেখতে পাওয়ার মত করে একখানা বাক্সের গায়ে ‘And God Said’ এবং জটিল অঙ্ক লিখে রাখার কি খুব প্রয়োজন ছিল? অত নিচু জায়গায় কোনোকিছুর গায়ে বড় বড় করে লিখে নিশ্চয়ই অতীন অন্ধ ছেলেকে অঙ্ক শেখান না? আজকের বাড়িতে ল্যান্ডলাইনের ভূমিকা যতটুকু দেখানো হয়েছে তাতে ওটাও না থাকলে ক্ষতিবৃদ্ধি হত না।

এ নাটক যেমন ভাললাগার, তেমনই যন্ত্রণার। অতীন এক জায়গায় বলছেনও ‘ব্যথাকে উপভোগ করতে শেখো’। স্বভাবতই এই নাটকে ফিরে ফিরে এসেছেন জীবনানন্দ দাশ। চিরায়ত জ্ঞানের সঙ্গে এ যুগের কেজো জ্ঞানের দ্বন্দ্ব যথার্থ ধরা পড়েছে ব্যক্তির সংলাপে ‘আমাদের এই শতকের/বিজ্ঞান তো সংকলিত জিনিসের ভিড় শুধু— বেড়ে যায় শুধু’ উচ্চারণে। কিন্তু এমন নাটকের সংলাপে মাঝেমাঝে এত পেলবতা কেন? পলাশ নামের ছেলেটাকে বাবা, মা, বন্ধু মিলে বারবার ‘পলাশ ফুল’ বলে ডাকা কেন? আবহসঙ্গীতে ফিরে ফিরে আরামদায়ক ‘মেঘ বলেছে যাব যাব’ সুর বাজানোই বা কেন? রাবীন্দ্রিকতা আসলে বেশ বিপজ্জনক ব্যাপার। মাত্রা ছাড়ালেই অশ্লীল লাগতে শুরু করে।

তবে যতই দোষ ধরা যাক, এই নাটক যে বিষয়কে তুলে ধরেছে তার যে দৃশ্যায়ন সম্ভব – না দেখলে বিশ্বাস করা শক্ত, এবং নাটকের শুরুতে দর্শকের মনে যে উৎকণ্ঠা সৃষ্টি করা হয়েছে, শেষে তার নিরসনের মুহূর্তটা বিশুদ্ধ ম্যাজিক। সেই ম্যাজিকের বড় কৃতিত্ব অবশ্যই আলোর দায়িত্বে থাকা কল্যাণ ঘোষের। তিনি মঞ্চে আলো ফেলার পাশাপাশি দর্শকের দেখতে পাওয়ার মত অন্ধকারও সৃষ্টি করেছেন। নইলে রেশ থেকে যাওয়ার মত ম্যাজিক সৃষ্টি হত না ক্লাইম্যাক্সে।

নাগরিক ডট নেট ওয়েবসাইটে প্রকাশিত

বাংলা বলে কোনো ভাষা নেই, বাঙালি বলে কোনো জাতি নেই?

আজ থেকে বছর তিরিশেক আগেই বাংলা ভাষা কোনটা, বাঙালি কারা – সে বোধ ভদ্রলোক শ্রেণি হারিয়েছে। ফলে আজ যে বাঙালি সাহিত্যিক, অধ্যাপকদের দেখা যাচ্ছে ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়াররা আক্রান্ত না হলে বাংলা ভাষার উপর আক্রমণ হচ্ছে তা বিশ্বাস না করতে, বা বাঙালি প্রবাসী শ্রমিকদের উপর আক্রমণকে বাঙালিদের উপর আক্রমণ বলে না ধরতে – তাতে অবাক হওয়ার কিছু নেই।

ঠিক এক দশক আগের কথা। সদ্য রাজকাহিনী বেরিয়েছে (অবন ঠাকুরের নয়, সৃজিত মুখার্জির)। ইংরিজি জানা বাঙালি ভদ্রলোক, ভদ্রমহিলারা আপ্লুত হয়ে একটা গান শেয়ার করতে লাগলেন সোশাল মিডিয়ায়। কী গান? ওই যে গানটা আমাদের জাতীয় স্তোত্র। কিন্তু এত আপ্লুত হওয়ার কারণ কী? কারণ রবীন্দ্রনাথের লেখা গানটা আসলে অনেক বড়, অত বড় জাতীয় স্তোত্র রাখা যায় না ব্যবহারিক অসুবিধার কারণেই। তাই আমাদের জাতীয় স্তোত্র হিসাবে ব্যবহৃত হয় শুরুর দিকের খানিকটা অংশ। ওই ছবিতে সৃজিতবাবু গোটা গানটাই ব্যবহার করেছিলেন। এই নিয়ে আপ্লুত হওয়া অন্যায় নয়। কিন্তু মুশকিল হল, দেখা গেল যাঁরা শেয়ার করছেন তাঁদের অনেকেই লিখছেন ‘লিসন টু দ্য বেঙ্গলি ভার্শন অফ আওয়ার ন্যাশনাল অ্যান্থেম। ইট’স বিউটিফুল’ – এই জাতীয় কথাবার্তা। সাধারণত সোশাল মিডিয়ায় কারোর কোনো ভুল ধরলে তিনি প্রবল খেপে গিয়ে যিনি ভুল ধরেছেন তাঁকে অপমান করেন। এক্ষেত্রে যেসব বাঙালি মান-অপমানের তোয়াক্কা না করে ওইসব পোস্টে মন্তব্য করেছিলেন বা নিজে পোস্ট করেছিলেন যে গানটা তো বাংলাতেই লিখেছিলেন রবিবাবু, তার আবার বাংলা ভার্শন কী – তাঁদের ‘আঁতেল’, ‘সবজান্তা’ ইত্যাদি বিশেষণ দেওয়া হচ্ছিল। তবে ভারতবর্ষে ইংরিজি জানা মূর্খদের আত্মবিশ্বাস বেশি। তাই সেই মূর্খরা কেউ কেউ আবার যিনি শুধরে দেওয়ার চেষ্টা করছেন তাঁকেই ভুল প্রমাণ করার চেষ্টা করছিল। ব্যাপার দেখে হাসা উচিত না কাঁদা উচিত তা বুঝতে না পারলেও, এটুকু বুঝে গিয়েছিলাম যে বাঙালি সংস্কৃতির ধারক ও বাহক যে ভদ্রলোক শ্রেণি, তাদের ভবিষ্যৎ ঝরঝরে হয়ে গেছে। আজ অমিত মালব্যকে যতই গালাগালি দিন, একথা নিশ্চিত হয়ে বলার উপায় নেই যে তাঁর ওই গণ্ডমূর্খ পোস্টের যুক্তিগুলো কোনো ইংরিজি শিক্ষিত বাঙালি ভদ্রলোকেরই জুগিয়ে দেওয়া নয়।

এই ভদ্রলোক-ভদ্রমহিলাদের অতি পছন্দের একখানা ধর্মীয় সংগঠন আছে, যাকে তাঁরা ধর্মনিরপেক্ষ সংগঠন বলে ভাবতে ভালবাসেন (মানে আমড়াকে আম বলে ভাবতে ভালবাসেন) – রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশন। রাজকাহিনীর গান নিয়ে ভদ্রলোক শ্রেণির রাজবোকামির দেড় দশক আগে ওই সংগঠন পরিচালিত একটা কলেজের পড়ুয়া ছিলাম। আমার সহপাঠী ছিল মঠের ভিতরেই গড়ে ওঠা, সন্ন্যাসীদের দ্বারা পরিচালিত বেদ বিদ্যালয়ে ছোট থেকে লেখাপড়া করে আসা কয়েকজন ছাত্র। তারা জনগণমন গাইত সংস্কৃত উচ্চারণে। আমরা কয়েকজন ছাত্র মিলে একদিন তাদের জিজ্ঞেস করলাম ‘ওরকম উচ্চারণে গাস কেন?’ তারা অত্যন্ত গর্বের সঙ্গে জানাল, ওটা ছোট থেকে শিখেছে। ওটাই শুদ্ধ সংস্কৃত উচ্চারণ। আমরা জিজ্ঞেস করলাম ‘বাংলা গানের উচ্চারণ সংস্কৃতের মত হবে কেন?’ তারা কিছুতেই মানতে রাজি হল না যে গানটা বাংলায় লেখা। নির্ঘাত তারা আজও জাতীয় স্তোত্র গাওয়ার প্রয়োজন হলে ‘শুদ্ধ সংস্কৃত’ উচ্চারণেই গায়। এরা কেউ কিন্তু প্রান্তিক পরিবারের সন্তান নয়, হিন্দিভাষীও নয়। গ্রাম, শহর – দুরকম জায়গার ছেলেই ছিল সেই দলে। সত্যি কথা বলতে, কেবল এরা নয়। আইসিএসই বা সিবিএসই স্কুলে পড়ে আসা বাঙালি সহপাঠীদেরও দেখেছি সংস্কৃত উচ্চারণে জনগণমন গাইতে। অর্থাৎ আজ থেকে বছর তিরিশেক আগেই বাংলা ভাষা কোনটা, বাঙালি কারা – সে বোধ ভদ্রলোক শ্রেণি হারিয়েছে। ফলে আজ যে বাঙালি সাহিত্যিক, অধ্যাপকদের দেখা যাচ্ছে ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়াররা আক্রান্ত না হলে বাংলা ভাষার উপর আক্রমণ হচ্ছে তা বিশ্বাস না করতে, বা বাঙালি প্রবাসী শ্রমিকদের উপর আক্রমণকে বাঙালিদের উপর আক্রমণ বলে না ধরতে – তাতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। এটাই অনিবার্য ছিল।

এখন কথা হচ্ছে, এমনটা হল কেন? বাংলা ভাষা, সংস্কৃতির লাগাম তো চিরকালই এই ভদ্রলোকদের হাতেই থেকেছে। দুই বাংলা ভাগ হওয়ার পরে তো আরওই। বাংলা সিনেমার যত বিখ্যাত অভিনেতা, অভিনেত্রীর নাম মনে করতে পারেন তাদের কজন হিন্দু নিম্নবর্গীয় বা মুসলমান? পাকিস্তান ভেঙে বাংলাদেশ হওয়ার পরে দু-চারজন মুসলমান অভিনেতা, অভিনেত্রী পশ্চিমবঙ্গে অভিনয় করেছেন বটে, কিন্তু মুসলমান চরিত্র কটা এপারের বাংলা সিনেমায়? মুসলমান সমাজের গল্পই বা কটা? পশ্চিমবঙ্গের বাংলা পত্রপত্রিকার সম্পাদক, সাহিত্যিকদের মধ্যে খুঁজতে গেলেও ঘুরে ফিরে সেই প্রাক-স্বাধীনতা যুগের মীর মোশাররফ হোসেন, কাজী নজরুল ইসলাম, জসীমউদ্দিন, সৈয়দ মুজতবা আলী, এস ওয়াজেদ আলী বা একটু পরের সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজের নাম আসবে। কিছু নিবিষ্ট পাঠক হয়ত আবুল বাশার বা আফসার আহমেদের নাম মনে করতে পারবেন। জনপ্রিয় গাইয়ে, বাজিয়েদের মধ্যেও সেই ইংরিজি শিক্ষিত বামুন, কায়েত, বদ্যিরাই বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ। শিক্ষক, অধ্যাপক, ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, উকিল, সাংবাদিক, রাজনীতিবিদ – যেদিকে তাকাবেন সেদিকই তো ভদ্রলোকরা আলো করে আছেন। তাহলে এ অবস্থা হল কেন? স্পষ্টতই পূর্বসুরিরা পতাকা যাদের হাতে দিয়েছেন তাদের বহিবার শকতি দেননি। কিন্তু কেন দেননি, বা দিতে পারেননি?

বামফ্রন্ট সরকার প্রাথমিক স্কুল থেকে ইংরিজি তুলে দেওয়ার জন্যে ভদ্রলোকেরা বেসরকারি ইংরিজি মাধ্যম স্কুলে ছেলেমেয়েদের ভর্তি করতে বাধ্য হন আর তা থেকেই শিক্ষিত বাঙালির সঙ্গে বাংলা ভাষার বিযুক্তি শুরু, কারণ ইংরিজিটা তো শিখতেই হবে। নইলে কাজকর্ম পাওয়া যায় কী করে? ওটাই তো কাজের ভাষা।

এরকম একটা তত্ত্ব প্রায়শই খাড়া করা হয়। এই তত্ত্ব নজর করার মত। শিক্ষা মাতৃভাষাতেই হওয়া উচিত – একথা আমাদের রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, সত্যেন্দ্রনাথ বসু থেকে শুরু করে গোটা দুনিয়ার অনেক বড় বড় পণ্ডিত বলেছেন। আবার বিপক্ষেও যুক্তি আছে। সে বিতর্কে না গিয়ে একথা মেনে নেওয়া যাক যে, কোনো ভাষা কাজের ভাষা হয়ে না থাকলে গুরুত্ব হারায়। বামফ্রন্ট সরকার মাতৃভাষার উপর জোর দিলেও বাংলাকে গোটা রাজ্যের কাজের ভাষা করে তোলার পর্যাপ্ত উদ্যোগ নেয়নি। পাশাপাশি ভারতের মত বহুভাষিক দেশে ইংরিজির গুরুত্ব বিশ্বায়নের সঙ্গে সঙ্গে বেড়েছে এবং ভদ্রলোকরা বাংলা ভাষাকে ক্রমশ ত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছেন – একথা তর্কের খাতিরে নাহয় মেনে নেওয়া গেল। কিন্তু কথা হচ্ছে, বাঙালি ভদ্রলোকদের ছেলেমেয়েরা তো ইংরিজি মাধ্যম স্কুলে পড়ছে বিংশ শতাব্দীর গোড়া থেকেই। যাঁর বই ছেলেমেয়ের হাতে তুলে না দিলে আজও এমনকি অনাবাসী বাঙালিদেরও ‘বাংলার সংস্কৃতি শেখাচ্ছি না’ ভেবে অপরাধবোধ হয়, সেই লীলা মজুমদার নিজেই কনভেন্টের ছাত্রী ছিলেন। তা ইংরিজি মাধ্যম স্কুলে ভর্তি করলেই ছেলেমেয়েকে বাংলা বইপত্তর পড়ানো, বাংলা গান শোনানো, সিনেমা দেখানো, নাটক দেখানো তুলে দিতে হবে – এ নিয়ম কি বামফ্রন্ট সরকারের তৈরি? আগেকার বাঙালির অমন করার দরকার পড়েনি, হঠাৎ বামফ্রন্ট সরকার প্রাথমিক শিক্ষা থেকে ইংরিজি তুলে দিতেই দরকার পড়ল?

সত্যি কথা বলতে, সিপিএম ক্রমশ ভদ্রলোকদের পার্টি হয়ে যাওয়ায় বামফ্রন্টও মেহনতি মানুষের সরকার থেকে ভদ্রলোকদের সরকারেই পরিণত হয়েছিল নয়ের দশকের শেষার্ধে। তাই ভদ্রলোকদের ইংরিজি নিয়ে হাহুতাশের প্রভাবে এই সহস্রাব্দের গোড়ায় কিন্তু প্রাথমিকে ইংরিজি ফিরিয়েও এনেছিল। তারপর কি ভদ্রলোকেরা ছেলেমেয়েদের সরকারি প্রাথমিক স্কুলে ফিরিয়ে এনেছিলেন? মোটেই না। উলটে মাধ্যমিক স্তরেও বেসরকারি স্কুলে ভর্তি করার ঝোঁক বেড়ে গিয়েছিল। এখন নাহয় এসএসসি কেলেঙ্কারি ইত্যাদি যুক্তি দিয়ে বলা যায় সরকারি স্কুলগুলো পড়াশোনার অনুপযুক্ত হয়ে গেছে। বাম আমলে তো প্রতিবছর এসএসসি পরীক্ষা হত, রাজ্যের আনাচে কানাচে গজিয়ে ওঠা ইংরিজি মাধ্যমের স্কুলগুলোর মাস্টারদের চেয়ে অনেক কঠিন প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষা দিয়ে মাস্টারমশাই, দিদিমণিরা সরকারি বাংলা মাধ্যম স্কুলগুলোতে যোগও দিতেন। ত্রুটি থাকলেও স্কুলের পরিকাঠামো নিয়ে, পড়াশোনা নিয়ে তখনকার সরকারের আগ্রহ যে বর্তমান সরকারের চেয়ে বেশি ছিল – তা আজকাল অনেক তৃণমূল কংগ্রেস সমর্থকও স্বীকার করেন। তাহলে?

এই প্রশ্নের উত্তর দিতে গেলে আসলে বাঙালি ভদ্রলোকের অভদ্রতা প্রকাশ হয়ে পড়বে। বহু ভদ্রলোকের কাছেই আপত্তিকর ছিল বাম আমলে মুটে, মজুর, রিকশাওয়ালা, বাড়ির কাজের লোক, মুচি, মেথরের ছেলেমেয়েদের তাদের ছেলেমেয়েদের সঙ্গে একই স্কুলে ঢুকে পড়া। আরও বেশি গায়ে লাগত যখন তারা কেউ নিজের ছেলেমেয়ের চেয়ে পরীক্ষায় বেশি নম্বর পেয়ে যেত। পরীক্ষার ফল বেরোবার পর আমাদের অনেককেই বকুনি খেতে হয়েছে ‘তোর লজ্জা করে না? অমুকের বাড়িতে কোনোদিন কেউ স্কুলের গণ্ডি পেরোয়নি, আর ও অঙ্কে ৮৫ পেয়ে গেল। তুই মাস্টারের ছেলে হয়ে ৫৫? ছিঃ!’ মাস্টারের ছেলে বড় হয়ে মাস্টার; ডাক্তারের ছেলেমেয়ে তো বটেই, ছেলের বউ আর জামাইও ডাক্তার; উকিলের ছেলেমেয়ে উকিল; মুদির ছেলে মুদি, তার মেয়ে অন্য ছোট ব্যবসায়ীর গৃহবধূ; রিকশাওয়ালার ছেলে সবজিওয়ালা – এই সামাজিক স্থিতাবস্থায়, গোবলয়ের লোক বলে বাঙালি ভদ্রলোক যাদের দিকে তাকিয়ে নাক সিঁটকোয়, তাদের মত নিজেরাও অভ্যস্ত ছিল। সেই স্থিতাবস্থা ঘেঁটে যাওয়ার সামান্য সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল বাম আমলে। ওটুকুই ভদ্রলোকদের পক্ষে শিশুর আত্মার উপর নরকের দুঃস্বপ্নের মত হয়ে দাঁড়িয়েছিল। এই দুঃস্বপ্ন থেকে মুক্তি পাওয়ার পথ তারা খুঁজে পায় অনেক টাকা মাইনের বেসরকারি স্কুলে। নয়ের দশক থেকে মনমোহনী অর্থনীতির জোরে বাঙালি ভদ্রলোকের জীবনে আমূল পরিবর্তন এসে যায়। তাদের হাতে এসে গেল খরচ করার মত অতিরিক্ত টাকা। ফলে ছোটলোকের ছেলেপুলের সঙ্গে এক স্কুলে পড়ানোর আর দরকার রইল না। পাঠিয়ে দাও ফেলো কড়ি মাখো তেল স্কুলে। এমনকি বামফ্রন্ট সরকারের বদান্যতায় উচ্চমধ্যবিত্ত হয়ে ওঠা সরকারি স্কুলের মাস্টারমশাই, দিদিমণিরাও নিজেদের ছেলেমেয়েকে ইংরিজি মাধ্যম স্কুলে পাঠানো শুরু করেন তখনই। সংখ্যাটা অবশ্যই এখন অনেক বেড়েছে, তার পিছনে বর্তমান সরকারের শিক্ষাজগৎ নিয়ে ছেলেখেলার অবদান কম নয়। কিন্তু আসল কথা হল, ‘ইংরিজি শিখতে হবে বলে ইংরিজি মাধ্যম স্কুলে পড়াচ্ছি’ – এটা স্রেফ অজুহাত। দুর্বল অজুহাত। সেটা বুঝতে পেরেই যুক্তি জোরদার হবে মনে করে নয়ের দশকে অনেক বাবা-মা বলতেন ‘ইংরিজি বলা শিখতে হবে। নইলে কম্পিটিশনে দাঁড়াতে পারবে না। তাই ইংলিশ মিডিয়ামে দিয়েছি।’ এও ভারি মজার কথা। স্কুলটা কি তাহলে ‘স্পোকেন ইংলিশ’ শেখার জায়গা? ওটা জানলেই চাকরিবাকরি পাওয়া যায়? চোস্ত ইংরিজি বলতে পারলেই অঙ্ক, বিজ্ঞান, ভূগোল, ইতিহাস – সব শেখা হয়ে যাবে? অধিকাংশ বাঙালি ভদ্রলোক কিন্তু তেমনই মনে করে আজও। কথা বললেই টের পাওয়া যায়। তবে আজকাল একটা নতুন ব্যাপার ঘটেছে। ইংরেজ আমলে বাঙালি ভদ্রলোকের জীবনের লক্ষ্য ছিল যতটা সম্ভব ইংরেজ হওয়া, স্বাধীনতার পর থেকে – অনাবাসী ভারতীয় হওয়া। আজকের বাঙালি ভদ্রলোকের জীবনে একটা নতুন লক্ষ্য যোগ হয়েছে – মাড়োয়ারি বা গুজরাটি হওয়া। তাই ছেলেপুলেকে ইংরিজি মাধ্যমে পড়িয়ে ইংরিজি বলা শিখিয়েই সে খুশি নয়, দ্বিতীয় ভাষা হিসাবে হিন্দিও গুঁজে দিচ্ছে। সুতরাং বাংলা মাঠের বাইরে। গল্পের বই পড়ার এবং পড়ানোর চল বাঙালি ভদ্রলোক বাড়ি থেকে উঠে গেছে বহুকাল, এখন আবার বাবা-মায়েরা খেয়াল রাখেন, ছেলেমেয়ে যেন বাংলা সিরিয়াল বা সিনেমা দেখে না ফেলে।

এমতাবস্থায় বাংলা ভাষা-সংস্কৃতি কী, কোনটা তার অঙ্গ আর কোনটা নয় – তা নিয়ে স্পষ্ট ধারণা থাকবে কোন চুলোয়? সংজ্ঞাগুলো ঠিক করে দিয়েছি আমরা ভদ্রলোকরা। আমাদের সংজ্ঞায়িত বাংলা ভাষা-সংস্কৃতিকে আমরাই বাংলার বাইরে বাংলা বলে পরিচিত হতে দিইনি, ওগুলোকে আমাদের সংস্কৃতির বৃত্তে জায়গাই দিইনি। কলকাতা ও সংলগ্ন এলাকার ভাষায় লেখা গান আমাদের ‘আধুনিক গান’। বাঙাল ভাষার গানকে তখনই বাংলা গান বলে মেনেছি যখন শচীন দেববর্মণের মত রাজপুত্র গেয়েছেন। গ্রামের মানুষের নিজের গানকে লোকগীতি বলে আলাদা বাক্সে রেখেছি। পনিটেল বাঁধা শহুরে ভদ্রলোকরা গিটার বাজিয়ে ব্যান্ড বানিয়ে গাইলে তবেই সে গানের জায়গা হয়েছে প্রেসিডেন্সি, লেডি ব্র্যাবোর্ন বা যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস মোচ্ছবে। আচ্ছা তাও নাহয় মেনে নেওয়া গেল। কিন্তু নিজেরা যাকে বাংলা ভাষা, বাঙালি সংস্কৃতি বলে দেগে দিয়েছি তাকে সমাজের নিচের তলায় ছড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টাও কি করেছি? ফিল্ম সোসাইটি বানিয়ে ঋত্বিক ঘটকের উদ্বাস্তুদের নিয়ে তৈরি ছবি দেখেছি আর প্রবন্ধ লিখেছি। পরবর্তীকালে বাংলাদেশ থেকে চলে আসা উদ্বাস্তু, যারা এখানে এসে পেটের দায়ে আমাদের বাড়িতে বাসন মাজে বা ঘর ঝাঁট দেয় – তাদের দেখানোর তো চেষ্টা করিনি। সত্যজিৎ রায় বিশ্ববন্দিত পরিচালক বলে জাঁক করেছি, কিন্তু পথের পাঁচালী-র হরিহর রায়ের পরিবারের মত হতদরিদ্র বাঙালিকে ওই ছবি দেখানোর কোনো প্রয়াস তো আমাদের ছিল না। কারণ আমরা নিশ্চিত ছিলাম – ওরা ওসব বুঝবে না। ওদের জন্যে বেদের মেয়ে জ্যোৎস্না-ই ঠিক আছে। ঘটনা হল, যার দুবেলা পেট ভরে ভাত জোটে না, তারও মনের খিদে থাকে এবং সে খোরাক খুঁজে নেয়। বাংলার গরিব মানুষ, নিম্নবর্গীয় মানুষও তাই করেছে। আমাদের তৈরি সংস্কৃতি যখন তাদের পোষায়নি তখন তারা হিন্দি সিনেমা, হিন্দি গানে মজেছে। অধুনা ইউটিউব শর্টস আর ইনস্টা রিলসে। আমাদের অ্যাকাডেমি, আমাদের নন্দন নিয়ে আমরাই বুঁদ ছিলাম। ও জিনিস আজ কেউ বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দিলেই বা ওদের কী? এদিকে আমরা, বিশ্বায়িত ভদ্রলোকরাও, হিন্দি ভাষা-সংস্কৃতির দিকে ঝুঁকেছি। ইংরিজি তো ছিলই। ফলে এখন হঠাৎ আবিষ্কার করছি – হিন্দি-হিন্দু-হিন্দুস্তান তত্ত্বের প্রবক্তারা বলে দিচ্ছে বাংলা বলে আসলে কোনো ভাষা নেই, আর সেটাকেই ঠিক বলছেন বাংলা ভাষায় বইপত্তর লিখে নাম করে ফেলা লেখকরা।

নবজাগরণই বলি আর সমাজ সংস্কার আন্দোলনই বলি, উনিশ শতকে সেই প্রক্রিয়ার মধ্যে দিয়ে আলোর সন্ধান যে বাঙালি ভদ্রলোক পেয়েছিল তা অনস্বীকার্য। কিন্তু আলো বাড়াতে গেলে আলো ছড়াতে হয়। ভদ্রলোকরা কী করেছে? প্রদীপ নিজের ঘরেই রেখে দিয়েছে, হাতে নিয়ে যাদের ঘরে আলো নেই তাদের কাছে যায়নি, তারা আমাদের প্রদীপ থেকে নিজেদের প্রদীপ জ্বালিয়ে নিতে পারেনি। এখন আমাদের প্রদীপের আয়ু ফুরিয়ে এসেছে, তাই চারপাশ অন্ধকারে ডুবে যেতে বসেছে। আসলে আমাদের বাংলা ভাষা চর্চা, সংস্কৃতি চর্চা বা যে কোনো চর্চাই বহুকাল হল প্রদর্শনীতে পরিণত হয়েছে। ওর মধ্যে ঘাম ঝরানোর কোনো ব্যাপার নেই, তাই ও থেকে আমাদের কোনো অর্জনও নেই। কেন এমন হল? ভাবতে গেলে জ্যোতি ভট্টাচার্য ‘কালচার’ ও ‘সংস্কৃতি’ প্রবন্ধে যে গোলমালের কথা বলেছেন সেটাই মনে পড়ে যাচ্ছে। একবার পড়ে দেখা যাক

ইংরেজি ভাষা থেকে ‘কালচার’ শব্দটার আমরা বাংলা পরিভাষা করেছি ‘সংস্কৃতি’। ঠিক পরিভাষা কী হওয়া উচিত – ‘সংস্কৃতি’ না ‘কৃষ্টি’, তা নিয়ে বিসংবাদ হয়েছে এককালে। রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, ‘কৃষ্টি’ শব্দটা বাংলা ভাষায় কুশ্রী অপজনন। ‘তাসের দেশ’ নাটকে শব্দটা নিয়ে কৌতুকও করেছিলেন রবীন্দ্রনাথ। তারপরে ‘কৃষ্টি’ শব্দটা ক্রমে লোপ পেয়েছে, ‘সংস্কৃতি’-ই ব্যবহারসিদ্ধ লোকগ্রাহ্য শব্দ হয়ে উঠেছে।

ইংরেজরা ‘কালচার’ শব্দটা নিয়েছিল লাটিন ভাষা থেকে। লাটিন ভাষায় শব্দটার প্রধান অর্থ ছিল কৃষিকর্ম, ‘এগ্রিকালচার’ শব্দের মধ্যে সেই প্রধান অর্থ বাহিত হচ্ছে। এই কারণেই বাংলায় কেউ কেউ ‘কৃষ্টি’ বলতে চেয়েছিলেন, কর্ষণের সঙ্গে তার সম্পর্ক। কৃষিকর্মে কর্ষিত ক্ষেত্রে বীজ বপন করে নতুন শস্য উৎপাদন করা হয়…চিকিৎসাবিজ্ঞানে রোগজীবাণুর প্রতিষেধক জীবাণু ‘কালচার’ করে তৈরি করা হয়; রক্তে রোগজীবাণু বা ক্ষতিকর কোনো পদার্থ থাকলে অণুবীক্ষণে তা দেখতে হলে অনেক সময় রক্তবিন্দুর ‘কালচার’ করে তাকে বর্ধিত করতে হয়। মোট কথা ‘কালচার’ শব্দটার মধ্যে কর্ষণ বা অনুশীলনের দ্বারা নতুন বস্তু অথবা নতুন গুণ সৃষ্টি ইঙ্গিত রয়েছে, এর ঝোঁক উৎপাদনমুখী। কোনো না কোনো রকম বৃদ্ধি এর ফল।

আমাদের ‘সংস্কৃতি’ শব্দটির শব্দার্থগত ঝোঁক কিন্তু এরকম নয়। এর প্রধান অর্থ রূঢ় অবস্থা থেকে মার্জিত অবস্থায় আনয়ন, স্থূল অবস্থা থেকে বাহুল্যবর্জিত করে সূক্ষ্ম অবস্থায় আনয়ন। নতুন বস্তু সৃষ্টি, নতুন গুণ উৎপাদন, বা সংখ্যাবৃদ্ধি এর অভীপ্সিত লক্ষ্য নয়, যা আছে তাকেই একটা পরিশীলিত সংযত সুসমঞ্জস সুকুমার রূপদান এর লক্ষ্য। ‘সংস্কৃতি’ শব্দটির এই প্রধান ঝোঁক আমাদের আজকের পরিস্থিতিতে খানিকটা বাধাস্বরূপ হয়ে উঠছে – এরকম আশঙ্কা করছি।

পঞ্চাশ বছরেরও বেশি আগে লেখা এই কথাগুলো আজ আবার ভাবাচ্ছে। কারণ সংস্কৃতি শব্দের প্রধান ঝোঁক এখন আর খানিকটা বাধা নয়, গভীর কুয়োর দেওয়াল হয়ে গেছে দেখা যাচ্ছে। সেই কুয়োর ব্যাং হয়ে গেছি আমরা ভদ্রলোকরা; বাইরে রয়ে গেছে বাঙালি মুসলমান, বাঙালি নিম্নবর্গীয় হিন্দু এবং সাধারণভাবে, গরিব বাঙালি। কৃষ্টি শব্দটায় রবীন্দ্রনাথ প্রবল আপত্তি করেছিলেন বটে, তবে ভদ্রলোকদের কূপমণ্ডূকতা ধরে ফেলতে তাঁরও ভুল হয়নি। বঙ্গভঙ্গ রদের আন্দোলনে প্রথমে নেতৃত্ব দিয়েও তাই সরে গিয়েছিলেন। কারণ ফাঁকিবাজিটা ধরে ফেলেছিলেন। পরেও তাঁর লেখাপত্রে ভদ্রলোকি চালাকির আবরণ উন্মোচন করেছেন বারবার। ‘হিন্দু-মুসলমান’ প্রবন্ধে যেমন লিখেছেন

অল্পবয়সে যখন প্রথম জমিদারি সেরেস্তা দেখতে গিয়েছিলুম তখন দেখলুম, আমাদের ব্রাহ্মণ ম্যানেজার যে তক্তপোষে গদিতে বসে দরবার করেন সেখানে এক ধারে জাজিম তোলা, সেই জায়গাটা মুসলমান প্রজাদের বসবার জন্যে; আর জাজিমের উপর বসে হিন্দু প্রজারা। এইটে দেখে আমার ধিক্কার জন্মেছিল। অথচ এই ম্যানেজার আধুনিক দেশাত্মবোধী দলের। ইংরেজরাজের দরবারে ভারতীয়ের অসম্মান নিয়ে কটুভাষাব্যবহার তিনি উপভোগ করে থাকেন, তবু স্বদেশীয়কে ভদ্রোচিত সম্মান দেবার বেলা এত কৃপণ। এই কৃপণতা সমাজে ও কর্মক্ষেত্রে অনেকদূর পর্যন্ত প্রবেশ করেছে; অবশেষে এমন হয়েছে যেখানে হিন্দু সেখানে মুসলমানের দ্বার সংকীর্ণ, যেখানে মুসলমান সেখানে হিন্দুর বাধা বিস্তর।

এই ম্যানেজারই বাঙালি ভদ্রলোকের সংস্কৃতি আর কৃষ্টির তফাতের প্রমাণ। এঁর দেশাত্মবোধ হল প্রদর্শনী। ওটার নির্দিষ্ট মঞ্চ আছে, সেখানে নিজের পরিশীলিত দেশাত্মবোধ প্রমাণ করতে ওটা কাজে লাগে। কিন্তু নিজের জীবনে মেনে চলার, মুসলমানও যে তাঁর সমান ভারতীয় তা স্বীকার করার এবং অনুশীলন করার দায় নেই। এমন চরিত্রই এখন হাজারে হাজারে আমাদের চারপাশে ঘুরে বেড়াচ্ছে। রবীন্দ্রনাথ এই প্রবন্ধ লিখেছিলেন স্বাধীনতার আগে। স্বাধীনোত্তর ভারতে আবার সারা দেশের উদারপন্থী এবং বাঙালি ভদ্রলোকদের নিজেকে সংস্কৃতিবান প্রমাণ করতে ধর্মনিরপেক্ষ হওয়া আবশ্যিক হয়ে দাঁড়িয়েছিল। এখন দেশের রাজনীতি বদলে যাওয়ায়, পরিবেশ বদলে যাওয়ায় ওটা আর আবশ্যিক নয়। তাই এই ম্যানেজারবাবুর মনের কথা তিলোত্তমা মজুমদার, পবিত্র সরকারদের মুখে উঠে এসেছে, যার মর্মার্থ হল – ভদ্রলোকরাই বাঙালি। মুসলমানরা বাঙালি নয়। ভদ্রলোকদের উপর আক্রমণ হলে তবেই বলা চলে বাংলা ভাষার উপর আক্রমণ হয়েছে, মুসলমানদের উপর আক্রমণ বাংলা ভাষার উপর আক্রমণ নয়।

এ হল বাঙালি ভদ্রলোকের অন্তত দুশো বছর ধরে আপন মনের মাধুরী মিশায়ে তৈরি সত্য। এর সঙ্গে বাস্তবের কোনো সম্পর্ক নেই। এই তিলোত্তমা, এই পবিত্র, এই সঙ্গীতা বন্দ্যোপাধ্যায়রাই একুশে ফেব্রুয়ারি এসে পড়লে গদগদ উত্তর-সম্পাদকীয় প্রবন্ধ লেখেন বাংলা ভাষা নিয়ে। কিন্তু এখন বোঝা যাচ্ছে, ওগুলো সব প্রদর্শনী। আজকাল যাকে বাংলায় বলে ‘পারফরম্যান্স’। মনের কথা হল – একুশের ভাষা শহিদরা কেউ বাঙালি নয়, তারা ভদ্রলোকদের বাংলা ভাষার জন্যে প্রাণ দিয়েছিল মাত্র। ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধেও এঁরা বিস্তর লেখালিখি, বলাবলি করে চলেছেন সেই ২০১৪ সাল থেকে। কিন্তু স্পষ্টতই ওসবও পারফরম্যান্স। নইলে বিশাল বিশাল গেটওয়ালা আবাসনে থাকা এবং শীতাতপনিয়ন্ত্রিত গাড়িতে চড়া লেখক, বুদ্ধিজীবীরা কী করে বলেন যে এই বাংলায় হঠাৎ চতুর্দিকে প্রচুর নতুন লোক দেখতে পাচ্ছেন, যাদের সঙ্গে বাঙালিদের কোনো সংস্কৃতিগত মিল নেই? কোনো পরিসংখ্যানই এই সত্য প্রতিষ্ঠা করে না। এ যে নাজিদের আতঙ্ক সৃষ্টির ধ্রুপদী কৌশল, তা না জানার মত কম লেখাপড়া এঁদের নয়। উপরন্তু, যদি তর্কের খাতিরে ধরেও নেওয়া যায় চারপাশটা বাংলাদেশি এবং রোহিঙ্গায় ভরে গেছে, তাহলেই বা তাদের সঙ্গে এই ভদ্রমহিলা, ভদ্রলোকদের সংস্কৃতিগত মিলের অভাব হয় কী করে? অনেক বেশি অমিল তো হওয়ার কথা কলকাতা ও শহরতলিতে দ্রুত বেড়ে চলা বহুতলগুলোর বাসিন্দা হয়ে আসা হিন্দিভাষীদের সঙ্গে, যাদের অনেকেই আমিষের গন্ধ পেলে নাক কোঁচকায়। তাদেরই রাজ্যে কাজ করতে যাওয়া পশ্চিমবঙ্গের হিন্দু ও মুসলমান প্রবাসী শ্রমিকদের বাংলাদেশি দেগে দিয়ে কোনো আইনকানুনের তোয়াক্কা না করে, বৈধ কাগজপত্রকে পাত্তা না দিয়ে মারধোর করা হচ্ছে, পে লোডার দিয়ে বাংলাদেশে ছুড়ে ফেলা হচ্ছে।

এই তথাকথিত বুদ্ধিজীবীরা অবশ্য রোগ নন, রোগাক্রান্তের নমুনা। এই রোগে আমাদের আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধব অনেকেই আক্রান্ত। আমাদের যে কোনো একজনকে দেখলেই বোঝা যায়, বাঙালি ভদ্রলোকের কূপমণ্ডূকতা এবং নীতিহীনতা ঐতিহাসিক হলেও, গত অর্ধ দশকে বিশেষ অবনমন হয়েছে। ১৯৪৭ সালে পশ্চিমবঙ্গের ভদ্রলোকদের সংখ্যাগরিষ্ঠের মানসিকতা এরকম থাকলে বাঙালরা উদ্বাস্তু হয়ে এদেশে এসে হয় অনাগরিক বেগার শ্রমিকে পরিণত হত, বা ভিক্ষা করতে করতে অনাহারে মারা যেত। সেক্ষেত্রে ১৯৭১ সালেও পশ্চিমবঙ্গের বাঙালিরা ভারত সরকারকে বাংলাদেশের পাশে দাঁড়াতে যুদ্ধে নামার প্ররোচনা দিত না (অশোক মিত্র লিখিত আপিলা-চাপিলা দ্রষ্টব্য), সাধারণ মানুষের মধ্যে মুক্তিযুদ্ধের প্রতি আবেগ তৈরি হত না, বাঙালরা আরও এক দফা উদ্বাস্তু হওয়ার ধাক্কা সামলে এদেশে থিতু হতে পারত না।

মজার কথা, এখন ভদ্রলোকদের যে অংশের বাংলাদেশি অনুপ্রবেশের চিন্তায় রাতে ঘুম হচ্ছে না, তাদের অনেকে দ্বিতীয়, তৃতীয় বা চতুর্থ প্রজন্মের বাঙাল। এরা বুঝতে পারছে না, বা রিপাবলিক টিভি দেখে দেখে এত অন্ধ হয়ে গেছে যে বুঝতে চাইছে না, যে ভাষাকে বাংলাদেশি ভাষা বলে আজ চালাচ্ছে বিজেপি, সেই ভাষা অনেকাংশে তাদের মা-দিদিমার ভাষা। ওই ভাষাকে অস্বীকার করলেও ওই পরিচিতি যাওয়ার নয়। আগামীদিনে এ কার্ড ও কার্ড সে কার্ড – কোনো কার্ড দিয়েই নিজের নাগরিকত্ব প্রমাণ করে ওঠা যাবে না। কারণ কোনটা নাগরিকত্বের প্রমাণ সেটা ঠিক করে রাষ্ট্র। আর ভারত রাষ্ট্রের এই মুহূর্তে প্রকল্প হল বাঙালিদের অনাগরিক প্রমাণ করা।

ভদ্রলোকের ছেলেমেয়েদের স্মৃতিশক্তি তাজা করে দেওয়ার জন্যে বলি, সেই বামফ্রন্ট আমল থেকে – যখন তৃণমূল কংগ্রেস নেত্রী মমতা ব্যানার্জি প্রথম অভিযোগ তোলেন যে বাংলাদেশ থেকে লোক ঢুকিয়ে ভোটে জেতে বামেরা – বঙ্গ বিজেপির বক্তব্য ছিল, বাংলাদেশ থেকে আসা হিন্দুদের শরণার্থী ধরে নিয়ে আশ্রয় দিতে হবে এবং মুসলমানদের অনুপ্রবেশকারী ধরে নিয়ে শাস্তি দিতে হবে, ফেরত পাঠাতে হবে। অধুনা সোশাল মিডিয়ার বাইরে অপ্রাসঙ্গিক হয়ে যাওয়া তথাগত রায় যখন বঙ্গ বিজেপির সভাপতি ছিলেন, তখন তিনি একাধিক টিভি বিতর্কে বসে একথা বলেছেন। নরেন্দ্র মোদী সরকার যে নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন (সিএএ) পাশ করে ২০১৯ সালে, তার মর্মবস্তুও এটাই। সে কারণেই এ রাজ্যের হিন্দুদের, বিশেষত ভদ্রলোকদের, ওই আইন খুব পছন্দ হয়েছিল। মতুয়াদের মত বাংলাদেশ থেকে অত্যাচারিত হয়ে চলে আসা নিম্নবর্গীয় জনগোষ্ঠীর মানুষও ওই আইন পাশ হওয়ায় উল্লসিত হয়েছিলেন। কিন্তু একটা প্রশ্নের উত্তর না বিজেপি দিতে চায়, না সম্প্রতি বিজেপি সমর্থক হয়ে ওঠা পশ্চিমবঙ্গবাসী তৃতীয়-চতুর্থ প্রজন্মের বাঙাল ভদ্রলোকরা। প্রশ্নটা হল, শরণার্থীদের আশ্রয় দেওয়া এবং নাগরিকত্ব দেওয়ার মত মানবিক প্রকল্পের ‘কাট-অফ ডেট’ থাকবে কেন? সিএএ অনুযায়ী নাগরিকত্ব পাওয়ার ‘কাট-অফ ডেট’ হল ৩১ ডিসেম্বর ২০১৪। এর মানে কী? ওই তারিখের পরে কি বাংলাদেশে হিন্দু নির্যাতন বন্ধ হয়ে গেছে? নাকি ওর পরে যে হিন্দুরা নির্যাতিত হচ্ছে তারা মায়ের ভোগে যাক – এটাই হিন্দু দরদি বিজেপি এবং ভারতের নাগরিকত্ব এতদিনে অধিকারে পরিণত হয়ে গেছে বলে মনে করা বাঙাল ভদ্রলোকদের মনের কথা? এ প্রশ্ন করলেই বিজেপি নেতা তরুণজ্যোতি তিওয়ারি থেকে শুরু করে বাঙাল ভাষা বলতে না পারা সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার বাঙাল, সকলেই এক সুরে ঝাঁঝিয়ে ওঠে ‘যে আসবে তাকেই থাকতে দিতে হবে? দেশটা ধর্মশালা নাকি?’

এখন কথা হচ্ছে, এই আজকের বাঙালদের পূর্বপুরুষরা যখন ভিটেমাটি চাটি হয়ে এপারে চলে এসেছিলেন অধুনা বাংলাদেশ থেকে, তখন কি দেশটা ধর্মশালা ছিল? তখনকার শাসকরা মনে করেছিলেন – ছিল। ভাগ্যিস করেছিলেন, তাই আজকের বাঙাল ভদ্রলোকরা কলার তুলে এই প্রশ্ন করতে পারছেন। ওঁরা অবশ্য বলবেন ‘তখনকার পরিস্থিতি আর এখনকার পরিস্থিতি কি এক নাকি? ১৯৪৭ সালে তো একটা দেশকে আনতাবড়ি কেটে ভাগ করা হয়েছিল। আমাদের পূর্বপুরুষদের এই ভাগটার উপরে ততখানিই অধিকার, যতখানি আগে থেকেই এ ভাগে থাকা লোকেদের।’ ১৯৭১ সালে কিন্তু দেশভাগ-টাগ হয়নি। তখনো বাংলাদেশ থেকে আসা উদ্বাস্তুদের এ দেশের নাগরিকত্ব দেওয়া হয়েছিল। সেকথা মনে রাখলেও মানতেই হবে, যুক্তিটা সঠিক। কিন্তু মুশকিল হল, একবার যদি বিভাজনে হাততালি দেওয়া শুরু করেন, তখন দেখবেন অনেক চেপে রাখা বিভাজন বেরিয়ে পড়ছে। বাঙালরা এপারে চলে আসায় মোটেই পশ্চিমবঙ্গীয়রা (চলতি কথায় যাদের এদেশি বা ঘটি বলা হয়) সকলে খুব আপ্লুত হয়নি। ‘বাংলাদেশ থেকে লোক ঢুকছে পিলপিল করে, রোহিঙ্গায় চারপাশ ভরে গেছে’ – এই প্রোপাগান্ডায় আপনি যত ধুয়ো দিচ্ছেন, তত সেদিনের উদ্বাস্তুদের প্রতি বিদ্বেষ চেপে রাখা পশ্চিমবঙ্গীয়দের স্মৃতি তাজা হয়ে উঠছে। পশ্চিমবঙ্গে গত কয়েক বছরে আরএসএস-বিজেপির শক্তি বাড়ার পাশাপাশি ইস্টবেঙ্গল আর মোহনবাগান সমর্থকদের মধ্যে অনলাইন পা টানাটানির ভাষা যেভাবে বদলেছে, তা খেয়াল করলেই ব্যাপারটা স্পষ্ট হয়। অতএব বাঙাল ভদ্রলোক-ভদ্রমহিলাদের বোঝা উচিত যে তারা হিন্দিভাষীদের ‘রোহিঙ্গা’, ‘বাংলাদেশি’ বলে চিৎকারে যোগ দিয়ে নিজেদের ডিটেনশন ক্যাম্পের রাস্তা বানাচ্ছে।

বাড়াবাড়ি মনে হল কথাটা? আসামে এনআরসি-র সময়েও দেখেছিলাম সেখানকার বাঙাল ভদ্রলোকরা অনেকে বলছে ‘যে আসবে তাকেই থাকতে দিতে হবে? দেশটা ধর্মশালা নাকি?’ ঠিক এই কথাটাই যে হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে বাঙালিদের সম্পর্কে জাতিবিদ্বেষী অসমিয়াদের বক্তব্য, সেকথা তাদের খেয়াল ছিল না। খেয়াল হল, যখন এনআরসি থেকে বাদ পড়ে যাওয়া ১৯ লক্ষ মানুষের মধ্যে সাড়ে ১২ লক্ষ হিন্দু বেরোল এবং তার মধ্যে তারাও পড়ে গেল। নেলি গণহত্যার ইতিহাসও ওই ভদ্রলোকরা ভুলে থাকতে চেয়েছিল, কারণ ওতে যারা মরেছিল তারা মুসলমান। এখন আসামের বিভিন্ন ডিটেনশন সেন্টারে কারা দিন কাটাচ্ছে সেটা পশ্চিমবঙ্গে চতুর্দিকে রোহিঙ্গা দেখতে পাওয়া বাঙাল ভদ্রলোকরা একটু দেখে নিতে পারেন। পশ্চিমবঙ্গে এনআরসি করার পরিকল্পনা এখনো সরকারের নেই, কিন্তু এসআইআরের পরিকল্পনা বিলক্ষণ আছে। সেটাও একটা তালিকা, তারও থাকবে ‘কাট-অফ ডেট’। এসব ভদ্রলোকরা ভালই জানেন, কিন্তু কুয়োর ব্যাং তো কুয়োর বাইরের জগতের কথা জানতে পারলেও মানতে চায় না। যেমন নির্বাচন কমিশনের বানানো আরেকটা তালিকা – ভোটার তালিকা – কেমন হয় আজকাল সেকথা রাহুল গান্ধী চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিলেও ভদ্রলোকরা চোখ বন্ধ করে থাকতে পারে।

১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গবিরোধী আন্দোলনের সময়কার ভদ্রলোকদের ফাঁকিবাজিকে রবীন্দ্রনাথ চিহ্নিত করেছিলেন, নিন্দাও করেছিলেন। তবু মানতে হবে, সেই ভদ্রলোকদের অন্য সময়ে না হলেও বিপদের সময়ে বাঙালি মুসলমানদের সঙ্গে জোট বাঁধার বুদ্ধি ছিল। এখনকার ভদ্রলোক শ্রেণির মস্তিষ্ক এত উর্বর যে বিপদের সময়ে আরও বেশি করে নিজেদের আলাদা করে নিচ্ছে। বিপন্ন বাঙালির পাশে দাঁড়ানোর বদলে ‘আমি স্নান বলি, ও গোসল বলে। অতএব ও বাঙালি না, আমি বাঙালি’ – এসব বোকা বোকা কথা বলে নিজের কুয়োটা আরও গভীর করে খুঁড়ছে। যে হিন্দি আধিপত্যবাদী হিন্দুরা কোনোদিনই বাঙালিকে আপন বলে মনে করেনি এবং করবে না, তারা নিজেদের মনোভাব স্পষ্ট ভাষায় বুঝিয়ে দিলেও ভদ্রলোক, ভদ্রমহিলারা বুক ফুলিয়ে প্রতিপন্ন করতে চাইছে – বাঙালি বলে কোনো জাতি নেই। আছে দুটো আলাদা জাতি – বাঙালি হিন্দু আর বাংলাদেশি। বাংলা বলেও কোনো ভাষা নেই। আছে দুটো আলাদা ভাষা – হিন্দুর বাংলা আর বাংলাদেশি বাংলা। এই ঐতিহাসিক মূর্খামি যে দৃশ্যের সম্ভাবনা বাড়িয়ে তুলছে তা এইরকম – ভদ্রলোকরা বাঙালি বলে মার খাচ্ছে হিন্দিভাষীদের হাতে, আর এখন যে বাঙালিদের মার খাওয়া চলছে, যাদের বাঙালি বলে স্বীকার করতেই রাজি নয় ভদ্রলোকরা, তারা দূর থেকে বলছে ‘ওমা! আপনি ভদ্রলোক? আমি ভেবেছিলাম বাঙালি।’

নাগরিক ডট নেট ওয়েবসাইটে প্রকাশিত

অবহেলিত বিজ্ঞান আর কৈশোরকে ভালবেসে এল পক্ষীরাজের ডিম

আধুনিক বাঙালি বিজ্ঞানী হতে চায় না, কেউ কেউ হয়ে যায়। তাই আমাদের গল্পে, উপন্যাসে, সিনেমায় বিষয় হিসাবে বিজ্ঞান বা বিজ্ঞানী বিরল।

আকাশের লক্ষ লক্ষ তারার মধ্যে একটা হল সূর্য। সেই সূর্যের আটটা গ্রহ, তার একটা হল পৃথিবী। সেই পৃথিবীর একটা ছোট্ট জায়গা হল আকাশগঞ্জ। সেখানকার একটা স্কুলের একটা পরীক্ষায় যদি আমি ফেল করি, তাহলে কি আমি বিজ্ঞানী হতে পারব না? সৌকর্য ঘোষালের পক্ষীরাজের ডিম ছবির কেন্দ্রীয় চরিত্র শ্রীমান ঘোতন ওরফে সার্থক (মহাব্রত বসু) তারায় ভরা আকাশের দিকে তাকিয়ে আপন মনে এই প্রশ্ন তোলে মাধ্যমিকের টেস্টে, বিজ্ঞান পড়তে গেলে যা না জানলে একেবারেই চলে না, সেই অঙ্কে শূন্য পাওয়ার পরে।

নিজের অস্তিত্বকে এভাবে প্রশ্ন করতে একমাত্র মানুষই পারে – একথা একাধিকবার নানাভাবে লিখেছেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। আর এই মহাবিশ্বের সাপেক্ষে মানুষের ক্ষুদ্রতার কথা লিখেছেন বিশ্বখ্যাত মার্কিন জ্যোতির্বিজ্ঞানী কার্ল সেগান। তাঁর একখানা বিখ্যাত বইয়ের নাম পেল ব্লু ডট: এ ভিশন অফ দ্য হিউম্যান ফিউচার ইন স্পেস। সেই বইয়ের এক জায়গায় তিনি যা লিখেছেন তার বাংলা তরজমা করলে এরকম দাঁড়ায় ‘ওই বিন্দুটাকে আবার দেখুন। ওটাই এই জায়গাটা। আমাদের বাড়ি। ওটাই আমরা। ওর মধ্যেই আপনি যাদের ভালবাসেন, যাদের চেনেন, যাদের কথা কোনোদিন শুনেছেন, যত মানুষ কোনোদিন ছিল, জীবন কাটিয়েছিল, তারা সকলে আছে…পৃথিবীটা এক বিরাট ব্রহ্মাণ্ডের মধ্যে একটা ছোট্ট মঞ্চ।’ সেগানের জন্মের সাত বছর আগে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখেছিলেন ‘আকাশভরা সূর্য-তারা, বিশ্বভরা প্রাণ,/তাহারি মাঝখানে আমি পেয়েছি মোর স্থান…’। এই লাইনগুলো রবীন্দ্রনাথের কলম থেকে আসা খুবই স্বাভাবিক। কারণ তাঁর বিশেষ বন্ধু ছিলেন জগদীশচন্দ্র বসু আর স্নেহভাজন ছিলেন আরেক বিশ্ববিশ্রুত বাঙালি বিজ্ঞানী সত্যেন্দ্রনাথ বসু। ছোটদের বিজ্ঞানের প্রাথমিক পাঠ দিতে বিশ্বপরিচয় বইখানা লিখে সত্যেন্দ্রনাথকেই উৎসর্গ করেছিলেন রবীন্দ্রনাথ। কিন্তু কী আশ্চর্য! বাঙালির ‘কালচার’ চর্চায় কোনোদিন বিজ্ঞানীদের জায়গা হল না! আমাদের সাংস্কৃতিক মহীরুহ কারা জিজ্ঞেস করলে কোনো বাঙালিকে আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়, জগদীশচন্দ্র, সত্যেন্দ্রনাথ বা মেঘনাদ সাহার নাম করতে শোনা যায় না। বোধহয় তাই, বাঙালি বাবা-মায়েরা বহুকাল ধরে ছেলেমেয়েদের ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার করতে চাইলেও বিজ্ঞানী হয়ে উঠতে উৎসাহ দেন না। আধুনিক বাঙালি বিজ্ঞানী হতে চায় না, কেউ কেউ হয়ে যায়। তাই আমাদের গল্পে, উপন্যাসে, সিনেমায় বিষয় হিসাবে বিজ্ঞান বা বিজ্ঞানী বিরল; যদি না সেটা কল্পবিজ্ঞান হয়। সৌকর্য কিন্তু এমন এক ছবি তৈরি করেছেন যার কেন্দ্রে আছে বিজ্ঞান, বিজ্ঞানে আগ্রহ, বিজ্ঞান গবেষণা, এক কিশোরের বিজ্ঞানী হওয়ার স্বপ্ন।

বিশ্বপরিচয়ে সত্যেন্দ্রনাথের উদ্দেশে রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন ‘মানুষ একমাত্র জীব যে আপনার সহজ বোধকেই সন্দেহ করেছে, প্রতিবাদ করেছে, হার মানাতে পারলেই খুশি হয়েছে। মানুষ সহজশক্তির সীমানা ছাড়াবার সাধনায় দূরকে করেছে নিকট, অদৃশ্যকে করেছে প্রত্যক্ষ, দুর্বোধকে দিয়েছে ভাষা। প্রকাশলোকের অন্তরে আছে যে অপ্রকাশলোক, মানুষ সেই গহনে প্রবেশ করে বিশ্বব্যাপারের মূলরহস্য কেবলই অবারিত করছে। যে সাধনায় এটা সম্ভব হয়েছে তার সুযোগ ও শক্তি পৃথিবীর অধিকাংশ মানুষেরই নেই। অথচ যারা এই সাধনার শক্তি ও দান থেকে একেবারেই বঞ্চিত হল তারা আধুনিক যুগের প্রত্যন্তদেশে একঘরে হয়ে রইল।’ যেন ঘোতনের কথাই লিখেছেন!

শুধু যে ঘোতন বিজ্ঞানী হওয়ার স্বপ্ন দেখে তা নয়, তার অঙ্কের মাস্টারমশাই বটব্যালও (অনির্বাণ ভট্টাচার্য) মনেপ্রাণে বিজ্ঞানী, তাঁর বাবাও ছিলেন বিজ্ঞানী। বিজ্ঞান গবেষণা করতে বিদেশ যাওয়ার অভিলাষ পূরণ হয়নি, তবু বটব্যাল স্যার বিজ্ঞান-পাগল। আকাশগঞ্জ হাইস্কুলের ছাত্রদের ঘর্ষণ ব্যাপারটা হাতেনাতে বোঝাতে বারান্দায় মোবিল ঢেলে দেন, তার উপর পিছলে পড়েন একের পর এক মাস্টারমশাই। শেষমেশ হেডস্যারও। ফলে বটব্যাল স্যারকে চাকরিটি খোয়াতে হয়। স্যারের ঘরে বড় বড় দুটো ছবিতে আছেন জগদীশচন্দ্র; আর অ্যালবার্ট আইনস্টাইন, যিনি আলো যে সবসময় সরলরেখায় চলে না তা প্রমাণ করতে বড় ভূমিকা নিয়েছিলেন। এখানেই শেষ নয়, যেভাবে সৌমিক হালদারের মায়াবী ক্যামেরায় ক্লোজ আপে ধরা পড়ে সামান্য ফড়িংও, তাতে মনে পড়ে আরেক বাঙালি বিজ্ঞানী গোপালচন্দ্র ভট্টাচার্যকে। ছোটদের বোধগম্য করে কীটপতঙ্গদের নিয়েও বাংলায় বই লেখার যত্ন ছিল যাঁর। ছোটদের ভাল লাগার জন্যে একটা ছবিতে যা যা দরকার, সেসব মশলা দিয়েও এমন বিজ্ঞানকেন্দ্রিক ছবি তৈরি করার জন্যে নির্দেশক সৌকর্যের প্রশংসা প্রাপ্য। সন্দীপ রায়ের বিস্মরণযোগ্য প্রফেসর শঙ্কুকে (ধৃতিমান চট্টোপাধ্যায়) বাদ দিলে বাংলা ছবির পর্দায় শেষ মনে রেখে দেওয়ার মত বিজ্ঞানী চরিত্র পাতালঘর (২০০৩) ছবির অঘোর সেন (সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়) আর ভূতনাথ (জয় সেনগুপ্ত)। কিন্তু সেই ছবিতে বিজ্ঞানের সঙ্গে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ছিল ভূত ও রূপকথা, যেমনটা শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের যে কোনো কাহিনিতে থাকে। এখানে কিন্তু পক্ষীরাজের রূপকথাকে বিজ্ঞানমনস্কতার দিকে ঠেলে দেয় চিত্রনাট্য।

সৌকর্যের ২০১৮ সালের ছবি রেনবো জেলি যাঁরা দেখেছেন (স্বতঃপ্রণোদিত অবাঞ্ছিত পরামর্শ দিচ্ছি – না দেখে থাকলে দেখে নিন), তাঁদের অতি পরিচিত ঘোতন আর তার বন্ধু পপিন্স (অনুমেঘা ব্যানার্জি)। এই ছবিতে তারা আর শিশু নেই, কিশোর-কিশোরী। তার সঙ্গে তাল রেখে সম্পর্কের রসায়নেও বয়ঃসন্ধিসুলভ পরিবর্তন এসেছে, যা ছবিতে অন্য এক রস যোগ করেছে। রেনবো জেলির পরে সৌকর্যের গতবছর মুক্তি পাওয়া ভূতপরী (২০২৪) ছবিতে মজা, ভূত, রূপকথার সঙ্গে মিশেছিল অনিবার্য বিষাদ। এই ছবিতে তার চেয়ে মৃদু অথচ গভীর বিষাদ আছে। সে কারণেই ছবি শেষ হওয়ার পরেও বেশ খানিকক্ষণ রেশ থেকে যায়। দুই খুদে অভিনেতাই চমৎকার কাজ করেছে। ‘মার্জিনাল আই কিউ’ থাকলেই যে মানুষের কৌতূহলের অভাব হয় না, আগ্রহের অভাব হয় না, অনুভূতির অভাব হয় না, তা মহাব্রতর অভিনয়ে দারুণভাবে ফুটে উঠেছে। রেনবো জেলির পর এই ছবি দেখলে মনে হয় মহাব্রতর সহজাত অভিনয় ক্ষমতা আছে। পপিন্সের সঙ্গে একান্ত দৃশ্যগুলোতে তার শরীরী ভাষায়, গলার স্বরে যে আকুতি ফুটে ওঠে তা এখনো বয়ঃসন্ধির স্মৃতি আছে যাঁদের, তাঁরা তারিয়ে তারিয়ে উপভোগ করতে পারবেন। অনুমেঘার সংলাপ বলার ধরনে রেনবো জেলিতে খানিকটা কবিতা আবৃত্তির ঢং ছিল, যার ক্ষতিপূরণ হয়ে গিয়েছিল শৈশবের মিষ্টতায়। এই ছবিতে তার অভিনয়ে প্রয়োজনীয় পরিণতি দেখা গেছে। জগদীশচন্দ্রের বন্ধুর লেখা লাগসই গানটা গাওয়ার সময়ে বোঝা গেছে, অনুমেঘার গানের গলাটাও বেশ।

মজাদার সংলাপ আর সুরেলা গান এই ছবির জোরের জায়গা। বিশেষত সৌকর্যের কথায় এবং নবারুণ বোসের সুরে ‘অঙ্কে জিরো, কিসের হিরো, খ্যাপা স্যারের বিশেষ গেরো’ গানখানা যেমন ছবির গল্প আর মেজাজের সঙ্গে দারুণ খাপ খায়, তেমনি একবার শুনলে চট করে ভুলতে পারাও শক্ত। অবশ্য ওই গানে একটা চালু বাঙালি ভ্রান্তি ঢুকে পড়েছে। ম্যাজিকের সঙ্গে কিন্তু ম্যাজিক রিয়ালিজমের কোনো সম্পর্ক নেই। ‘ম্যাজিক রিয়ালিজম’ ব্যাপারটা আসলে কী তা গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজের নোবেল প্রাপ্তি বক্তৃতা পড়লে পরিষ্কার বোঝা যায়।

গানখানা চমৎকার গেয়েছেন অনির্বাণ ভট্টাচার্য, কিন্তু হতাশ করেছে তাঁর অভিনয়। অনির্বাণকে নিজের বয়সের থেকে অনেক বেশি বয়সী একখানা চরিত্র দেওয়া হয়েছিল। তা বিশ্বাসযোগ্য করে তুলতে তিনি একটা বিশেষ কণ্ঠস্বর, কতকগুলো মুদ্রাদোষের সাহায্য নিয়েছেন। তাতে হাস্যরসের উৎপাদন হয়েছে বটে, কিন্তু উৎপাদনের চেষ্টা বড় বেশি করে ধরা পড়েছে। বরং যেসব দৃশ্যে তিনি বাবার স্মৃতিতে, প্রয়াত বন্ধুর স্মৃতিতে বিষণ্ণ – সেখানে অভিনেতা অনির্বাণকে চেনা গেছে। অতি অভিনয়ে দুষ্ট আরেক বিশিষ্ট অভিনেতা, পঞ্চায়েত প্রধানের চরিত্রে, দেবেশ রায়চৌধুরীও। প্যাংলার চরিত্রে শ্যামল চক্রবর্তী আর বিল্টুর চরিত্রে অনুজয় চট্টোপাধ্যায়ের মত দুজন চমৎকার অভিনেতার বিশেষ কিছু করার ছিল না।

আরো পড়ুন ছবিটা

এইখানেই এসে পড়ে চিত্রনাট্যের দুর্বলতার প্রশ্ন। এই দুজন যেমন অনেকখানি অব্যবহৃত রয়ে গেছেন, তেমনি বটব্যাল স্যারের বিজ্ঞান-পাগলামিও আরও স্পষ্ট হওয়া দরকার ছিল বলে মনে হয়। বটব্যাল স্যারের অল্পবয়সের যে চেহারা দেখানো হয়েছে তার সঙ্গে বেশি বয়সের চেহারা আর হাবভাবের তফাতও চোখে লাগার মত। হয়ত দুজন আলাদা অভিনেতাকে ব্যবহার করলে ব্যাপারটা তত বিসদৃশ লাগত না। এছাড়া যে জিনিসটা এই ছবিতে বেখাপ্পা লাগে তা হল পঞ্চায়েত প্রধানের পিছনের দেওয়ালের ছবিগুলো। এমন কোনো রাজনৈতিক নেতা কি এদেশে আছেন যিনি পাশাপাশি টাঙিয়ে রাখেন লেনিন, জোসেফ স্তালিন, জওহরলাল নেহরু আর নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর ছবি?

তবে এসব ত্রুটিকে ছাপিয়ে গেছে এই ছবির আদর্শগত দিক। আকাশগঞ্জে কোনো উঁচু নিচু ভেদ নেই। বিজ্ঞানীর বাড়ির চাকর প্যাংলা অঙ্কে যথেষ্ট দড়। সে-ই ঘোতনের পরীক্ষা নিয়ে নিতে পারে। গ্রামের স্কুলে পাশ করতে গলদঘর্ম ঘোতনের গোটা দুনিয়ায় সবচেয়ে বড় বন্ধু হল কলকাতার স্কুলে ক্লাসে ফার্স্ট হওয়া পপিন্স। বটব্যাল স্যার তো বটেই, হেডস্যার গুণধর বাগচী (সুব্রত সেনগুপ্ত) পর্যন্ত পরীক্ষায় সর্বোচ্চ নম্বর পাওয়াই জীবন সার্থক হওয়ার একমাত্র নিদর্শন বলে মনে করেন না। দুর্নীতিগ্রস্ত, আত্মরতিপ্রবণ পঞ্চায়েত প্রধানের মাথায় বন্দুক ধরার সুযোগ পেয়ে তাঁরা কী দাবি করেন? স্কুলে লাইব্রেরি আর ল্যাবরেটরি বানিয়ে দিতে হবে। সবচেয়ে বড় কথা, অনুভূতিপ্রবণ মন না থাকলে ডিগ্রি, বুদ্ধি, পরীক্ষার নম্বর যে বৃথা – এই কথাটা এই ছবির কোষে কোষে।

এসব দেখলে মনে পড়ে, আকাশগঞ্জ আমাদের আশপাশেই ছিল। আমাদেরই অবহেলায় হারিয়ে গেছে। সৌকর্য কল্পনাশক্তির জোরে তাকে ভারি সহজ, সুন্দর করে আবার আমাদের চোখের সামনে তুলে ধরেছেন। আমাদের ছেলেমেয়েদের সেই আকাশগঞ্জ দেখানোর সুযোগ না ছাড়াই ভাল। অন্তত তাদের স্বপ্নে আকাশগঞ্জ ঢুকে পড়ুক। তারপর কে বলতে পারে? ভোরের স্বপ্ন, মিথ্যে না-ও তো হতে পারে।

নাগরিক ডট নেট ওয়েবসাইটে প্রকাশিত

অ্যাংকর-বাক্যই এ-যুগের বেদবাক্য

 একদিন রাতে আমি স্বপ্ন দেখিনু—
“চেয়ে দেখো” “চেয়ে দেখো” বলে যেন বিনু।
চেয়ে দেখি, ঠোকাঠুকি বরগা-কড়িতে,
কলিকাতা চলিয়াছে নড়িতে নড়িতে।
ইঁটে-গড়া গণ্ডার বাড়িগুলো সোজা
চলিয়াছে, দুদ্দাড় জানালা দরোজা।
রাস্তা চলেছে যত অজগর সাপ,
পিঠে তার ট্রামগাড়ি পড়ে ধুপধাপ্।

আমি মনে মনে ভাবি, চিন্তা তো নাই,
কলিকাতা যাক নাকো সোজা বোম্বাই।
দিল্লী লাহোরে যাক, যাক না আগরা—
মাথায় পাগড়ি দেব পায়েতে নাগরা।

সহজ পাঠ দ্বিতীয় ভাগ প্রকাশিত হওয়ার সময়ে ভাগ্যিস স্মার্টফোন, সোশাল মিডিয়া, দিনরাতের টিভি চ্যানেল, আর তাদের চিল্লানোসরাস অ্যাংকর— এসব কিছুই ছিল না। নইলে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যদি ফেসবুকে উপরের পংক্তিগুলো লিখে ফেলতেন, তাহলে কী কেলেঙ্কারিটাই না হত! নোবেল পুরস্কারজয়ী কবি বলে কথা। কয়েক মিনিটের মধ্যেই ভাইরাল হয়ে যেত এবং ভারতের বাংলা, ইংরেজি ও হিন্দি টিভি চ্যানেলগুলো ‘ব্রেকিং নিউজ’ হিসেবে দেখাত—

মাঝরাতে উধাও কলকাতা,
প্রত্যুত্তরে করাচি ভ্যানিশ করল ভারতীয় নৌসেনা।

কোনও চ্যানেলে হয়তো পর্দায় ভেসে উঠত—

‘কলকাতাকে রাতের অন্ধকারে লাহোরে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা পাকিস্তানের’,
‘ভারতীয় মিসাইলের আক্রমণে দিল্লিতেই অভিযান শেষ

রাতে কবিতাটি পোস্ট করে রবীন্দ্রনাথ যতক্ষণে সকালে ঘুম থেকে উঠতেন, ততক্ষণে দেখতেন কলকাতা যে কলকাতাতেই আছে, সে-কথা আর কেউ বিশ্বাস করছে না। এমনকি কলকাতা হারানোয় কেউ শোকপ্রকাশও করছে না। চারপাশে লাহোর, করাচি দখলের উল্লাস দেখতে দেখতে শান্তিনিকেতনে বসে তাঁরও হয়তো দুপুরের দিকে সন্দেহ হত— ‘কলকাতা সত্যি সত্যি কলকাতাতেই আছে তো?’ স্নেহভাজন কাজী নজরুল ইসলামকে হয়তো ফোন করতেন উদ্বিগ্ন হয়ে, তারপর তাঁর মুখ থেকে কলকাতা যথাস্থানে আছে শুনে হাঁফ ছেড়ে বাঁচতেন। ততক্ষণে তাঁর কাছে প্রতিক্রিয়া চেয়ে পৌঁছে যেত বিশিষ্ট নিউজ অ্যাংকরদের জুম কল। বিশ্বকবি প্রাণপণ চেষ্টা করতেন বোঝাতে যে ওটা তাঁর কল্পনা, কলকাতা যেখানে থাকার সেখানেই আছে। একচুলও নড়েনি, নড়া সম্ভবও নয়। একখানা আস্ত শহর যাবে কোথায়? কিন্তু বিশিষ্ট অ্যাংকররা এত সহজে ছেড়ে দেওয়ার পাত্র নন। রবীন্দ্রনাথের কাছে কলকাতা অবিচল থাকার প্রমাণ চাওয়া হত নিশ্চয়ই। তিনি হয়তো বলতেন, একটু আগে নজরুলের সঙ্গে কথা হয়েছে, তিনি জানিয়েছেন যে দুশ্চিন্তার কোনও কারণ ঘটেনি। বলামাত্রই ঝাঁপিয়ে পড়তেন জাতীয়তাবাদী অ্যাংকর, ‘আর কতদিন কুসুম কুসুম কবিদের কথায় ভুলে নিজের অস্তিত্ব যে বিপন্ন সেটা গোপন করবেন? এসব সেকুলারিজমের দিন শেষ। এত সেকুলার হওয়ার ইচ্ছে হলে পাকিস্তানে চলে যান।’ সালটা ১৯৩০, ফলে রবীন্দ্রনাথ হয়তো বেচারাথেরিয়ামের মতো মুখ করে ভাবতেন— সেটা আবার কোন দেশ রে বাবা!

হাসবেন না। ব্যাপারটা মোটেই হাস্যকর নয়। ১৯৭১ সালের পর ফের ভারত-পাকিস্তানের পূরোদস্তুর যুদ্ধ লাগার উপক্রম হয়েছিল এ-মাসের গোড়ায়। সেই বাজারে দেশের টিভি চ্যানেলগুলো যে কাণ্ড করেছে, তাতে পরিষ্কার বোঝা গেছে— যুদ্ধ করার উৎসাহ ভারতীয় সেনাবাহিনীর চেয়েও তাদের বেশি এবং সে অভিলাষ চরিতার্থ করতে তারা আক্ষরিক অর্থেই দিনকে রাত আর রাতকে দিন করতে প্রস্তুত।

আরও পড়ুন এবার মোদীর পথের চেয়েও কঠিন গোদি মিডিয়ার পথ

একদিন রাতে ভিডিও গেমের দৃশ্য, লস এঞ্জেলসে বিমান ভেঙে পড়ার দৃশ্য, ইজরায়েলের চার বছরের পুরনো ভিডিও ইত্যাদি দেখিয়ে ভারতীয় টিভি চ্যানেলগুলো প্রায় গোটা পাকিস্তানই ভারতের দখলে চলে এসেছে বলে জানিয়েছিল। পরদিন কিছু চ্যানেল ভালমানুষ সেজে ভুয়ো খবর ছড়ানোর বিরুদ্ধে বাণী দিয়েছিল বটে, কিন্তু এমন চ্যানেলও আছে যারা ওসবেরও তোয়াক্কা করেনি। করতে যাবেই বা কেন? কেন্দ্রীয় শাসক দলই তো নিজেদের সোশাল মিডিয়া হ্যান্ডেল থেকে পোস্ট করে জানিয়েছে, পাকিস্তানের সঙ্গে লড়াই করতে গেলে দেশের সরকার বা সেনাবাহিনীকে নিয়ে তো বটেই, মিডিয়ার এসব কীর্তি নিয়েও হাসাহাসি করা চলবে না। কারণ অনেক খবরের মধ্যে দু-চারটে ভুল খবর দেখিয়ে দিলে এমন কিছু দোষ হয় না, কিন্তু ভুল খবরকে ভুল খবর বললে দেশের মনোবল নষ্ট হয়। যুদ্ধ মানে হল ‘ন্যারেটিভ ওয়ার’। ভুয়ো খবর চিহ্নিত করা মানে সেই যুদ্ধে নিজের দেশকে হারিয়ে দেওয়া।

ভারতীয় সংবাদমাধ্যমের ছড়ানো ভুয়ো খবরের পক্ষে দাঁড়িয়ে বুক চিতিয়ে লড়ে যাওয়া এই ভিডিওতে ভাষণ দিয়েছেন কে? টাইমস নাও নবভারতের কনসাল্টিং এডিটর সুশান্ত সিনহা। বুঝতেই পারছেন, তিনি কত বড় সাংবাদিক। অতএব, মোটেই হাসাহাসি করবেন না। নইলে কখনও দেখবেন, সরকারের সমালোচনা করার জন্য নয়, মোদিজি বা শাহজিকে নিয়ে রসিকতা করার জন্যও নয়, মিডিয়াকে নিয়ে হাসাহাসি করার জন্য অশোকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক আলি খান মাহমুদাবাদের মতো আপনিও গ্রেপ্তার হয়ে যাবেন।

অ্যাঁ, কী বললেন? উনি মুসলমান না হলে ওই পোস্টের জন্য গ্রেপ্তার হতেন না? আজ্ঞে, ঠিক ধরেছেন। কথাটা উমর খালিদের বেলায় সত্যি, গুলফিশা ফতিমার ক্ষেত্রে সত্যি, যে রিপোর্ট লেখাই হয়নি তার জন্য গ্রেপ্তার হওয়া সাংবাদিক সিদ্দিক কাপ্পানের ক্ষেত্রেও সত্যি, আরও অনেকের ক্ষেত্রেই সত্যি।

কিন্তু মাথায় রাখবেন, গুজরাতের ৯২ বছরের পুরনো জনপ্রিয় সংবাদপত্র ‘গুজরাত সমাচার’-এর দুই মালিকের অন্যতম, ৭৩ বছর বয়সী বাহুবলী শাহকে এ সপ্তাহেই গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তিনি মুসলমান নন। তাঁকে গ্রেপ্তার করেছে এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট, তবে কী অভিযোগে তা এখনও বলা হয়নি। তবে কাগজটির সরকারবিরোধী হিসেবে নাম বা বদনাম আছে। তাছাড়া, এ-ও মনে রাখবেন— ইদানীং উত্তরপ্রদেশের নেহা সিং রাঠোর, মাদ্রী কাকোটির মতো হিন্দু মহিলাদের বিরুদ্ধেও হাসিঠাট্টার জন্য এফআইআর দায়ের করা হচ্ছে।

সুতরাং, মোটেই হাসাহাসি করবেন না আমাদের লড়াকু টিভি চ্যানেল আর তাদের মহামহিম অ্যাংকরদের নিয়ে। এঁদের হাত কত লম্বা, জানেন তো? মৃত লোকও এঁদের আওতার বাইরে নন। কাশ্মিরের পুঞ্চে সীমান্তের ওপার থেকে আসা গোলায় নিহত মৌলানা মহম্মদ ইকবালকে এই মহান সাংবাদিকরা সন্ত্রাসবাদী বলে দেগে দিয়েছিলেন। অর্থাৎ, পুঞ্চ পুলিশের চেয়েও এঁরা বেশি জানেন। ভারতীয় সেনাবাহিনীর চেয়ে তো বটেই। পাকিস্তানের কিরানা হিলসে পরমাণু বোমার কেন্দ্রেও নাকি ভারতের বিমান বোম ফেলেছে বলে তাঁরা জানিয়েছিলেন। এদিকে সরকারি ব্রিফিংয়ে তা নিয়ে প্রশ্ন করা হলে, এয়ার মার্শাল একে ভারতী প্রশ্নকর্তা সাংবাদিককে বলেন, ‘আপনাকে ধন্যবাদ ওখানে পাকিস্তানের পরমাণু বোমা আছে এ-কথা আমাদের জানানোর জন্যে। আমরা কখনও বলিনি যে আমরা কিরানা হিলসে বোম ফেলেছি।

তাহলে বুঝলেন তো, সাংবাদিকদের চটালে মরেও শান্তি পাবেন না, মরার পরেও সন্ত্রাসবাদী হয়ে যেতে পারেন! বিশ্বকবিই যখন বলে গেছেন, ‘সেই সত্য যা রচিবে তুমি’, তখন নিউজ চ্যানেল আর তাদের জাতীয়তাবাদী অ্যাংকরদের নিয়ে খবরদার হাসাহাসি করবেন না। ভুয়ো খবর বলে যে কিছু হয়, তা ভুলে যান।

চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম ওয়েবসাইটে প্রকাশিত

অপারেশন সিঁদুর যে যে কারণে ভাল লাগল

গত কয়েকদিনে যা বুঝলাম, মোদিজি যতই স্লোগান দিন ‘বেটি বচাও, বেটি পঢ়াও’, এদেশের প্রগতিশীলরাও সিঁদুরকেই মেয়েদের সবচেয়ে দামি সম্পত্তি বলে মনে করেন।

২০২৫ সালের ৭ মে তারিখটা এ-জীবনে আর ভুলতে পারব বলে মনে হয় না। সকালে ঘুম থেকে উঠেই খবর পেলাম— বিশ্ব যখন নিদ্রামগন গগন অন্ধকার, তখন পহলগামে পাক-মদতপুষ্ট সন্ত্রাসবাদীদের হাতে মৃত ২৬ জনের হয়ে শোধ তুলে নিয়েছে ভারতীয় বায়ুসেনা। পাড়ার দোকানে, মোড়ের মাথায় জোর আলোচনা— পাকিস্তানকে টের পাইয়ে দেওয়া গেছে। যে-সব দোকানে খদ্দের কম হলেও আমদানি বেশি, সেখানে দেয়ালে লাগানো টিভিতে পাড়া কাঁপিয়ে চিৎকার করছেন বিভিন্ন চ্যানেলের অ্যাঙ্কররা। শুনে মনে হল, তাঁরাই প্রাণের ঝুঁকি নিয়ে বোম ফেলে এসেছেন সীমান্তের ওপারে। বায়ুসেনার অফিসাররা নন। ভালো লাগল সকাল সকাল, মনে হল— আমিও পারি। আমরা যারা জীবনে কিছুই পারি না, ফ্ল্যাট কেনার পর ২-৩ বছর কেটে গেলেও প্রোমোটার লিফট লাগাচ্ছে না দেখে ক্রেতা সুরক্ষা আদালতে মামলা ঠুকতেও ভয় পাই, তাদের আত্মবিশ্বাস তুঙ্গে তুলে দিতে পারেন একমাত্র টিভি চ্যানেলের সাংবাদিকরা।

তবে এখানেই শেষ নয়। দিনটা আরও স্মরণীয় হয়ে গেল বেলা দশটার পরে, যখন নতুন দিল্লিতে ভারত সরকারের পক্ষ থেকে সরকারিভাবে সংবাদমাধ্যমকে জানানো হল ঠিক কী ঘটানো হয়েছে এবং কীভাবে। চারপাশে খুশির পরিবেশ তৈরি হলে নিজেরও ভাল লাগে। দেখলাম ব্রিফিং শেষ না হতেই আমার আত্মীয়, প্রতিবেশী, বন্ধু— সকলেই দারুণ খুশিয়াল হয়ে উঠেছে। না, সরকারের সমর্থকদের কথা বলছি না। যারা সরকারবিরোধী তাদের কথাই বলছি। যারা ধর্মনিরপেক্ষ তাদের খুশির কারণ মূলত দুটো। বিদেশসচিব বিক্রম মিশ্রি এ-কথা বলেননি যে পহলগামে হিন্দুদের আলাদা করে মারা হয়েছে। তার উপর তিনি বলেছেন যে সন্ত্রাসবাদীদের অনেক লক্ষ্যের মধ্যে একটা ছিল জম্মু ও কাশ্মীরে এবং বাকি ভারতে সাম্প্রদায়িক অশান্তি সৃষ্টি করা।

তবে! এই যে ধর্মনিরপেক্ষ বন্ধুদের সেদিন থেকে সেকু বলে গাল দেওয়া হচ্ছিল, এখন হল তো? ভারত সরকার নিজেই বলল তো, যে ধর্মনিরপেক্ষ লোকেদের কোনও দোষ নেই, বরং মানুষে মানুষে ধর্মের ভিত্তিতে ভেদাভেদ করা সন্ত্রাসবাদীদের কাজ? এত বড় সরকারি সিলমোহর ভারতের ধর্মনিরপেক্ষ মানুষ সেই ২০১৪ সাল থেকে পাননি। আহ্লাদ হবে না? পরিষেবা বেসরকারি হলে ভালো হবে জানি, কিন্তু স্বীকৃতিটা যে সরকারি না হলে আমাদের চলে না। তা পেয়ে গিয়ে আমারও গর্বে বুকটা ফুলে উঠল। ময়ূখ ঘোষ যা-ই বলুন, এতদ্বারা আমরা সেকুরাই জিতে গেলাম শেষমেশ। নরেন্দ্র মোদির মতো লোকের সরকার পর্যন্ত মানতে বাধ্য হল— ধর্মনিরপেক্ষতাই আমাদের সবচেয়ে বড় শক্তি। নেহাত সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের মতো প্রতিভা নিয়ে জন্মাইনি, নইলে গেয়েই উঠতাম ‘কী মিষ্টি, দেখো মিষ্টি/কী মিষ্টি এ সকাল’।

ওটুকু মিষ্টিতেই গোটা দিনটা কেটে যেতে পারত। কিন্তু আমাদের ধর্মনিরপেক্ষ পাতে রসগোল্লার পরে কালাকাঁদের ব্যবস্থাও করে রেখেছিল সরকার। বিক্রমবাবুর দুইদিকে বসিয়ে দেওয়া হয়েছিল দুই মহিলা সেনা অফিসারকে— ব্যোমিকা সিং আর সোফিয়া কুরেশি। একজন হিন্দু, একজন মুসলমান। আহা! কী বুদ্ধিই না করেছেন বিদেশমন্ত্রী জয়শঙ্করবাবু। পাকিস্তানের লক্ষ্য ছিল ভারতীয় হিন্দু আর ভারতীয় মুসলমানের মধ্যে বিভাজন তৈরি করা। কিন্তু জয়শঙ্করবাবু কি সোজা লোক? জেএনইউয়ের প্রাক্তনী বলে কথা। না হয় মন্ত্রী-টন্ত্রী হবেন বলে বিজেপিতে ভিড়েছেন। তা বলে কি আর অ্যালমা মাটারকে ভারতমাতার চেয়ে কম গুরুত্ব দেন? বিশ্বগুরুর মন্ত্রিসভায় ঢোকার অনেক আগেই বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে বাঙালি সেকু, মাকু বন্ধুদের মুখে নির্ঘাত কবিগুরুর কবিতা শুনেছিলেন। তাই তো প্রেস ব্রিফিংয়ে একেবারে ‘ভারততীর্থ’ দেখিয়ে দিলেন পাকিস্তানকে। ওঃ! মাস্টারস্ট্রোক। বিজেপি সমর্থকদের চেয়েও জোরে জোরে সমস্বরে আমার ধর্মনিরপেক্ষ বন্ধুরাই বলতে শুরু করলেন।

এখানেই শেষ নয়। আনন্দ আরও বেড়ে গেল নারীবাদী বন্ধুদের আনন্দ দেখে। এরকম একটা গুরুতর সন্ত্রাসবাদী আক্রমণের জবাব দেওয়ার অপারেশনের নাম দেওয়া হয়েছে ‘অপারেশন সিঁদুর’। মানে যে মহিলাদের সিঁদুর সেদিন সন্ত্রাসবাদীরা মুছে দিয়েছে তাদের সরকার সম্মান জানাল। তাও আবার দায়সারাভাবে নয়, প্রত্যাঘাতের ব্রিফিংয়ে দুই মহিলা অফিসারকে পাঠিয়ে। এমন ‘সিম্বলিজম’ অতুলনীয়। পাকিস্তান পারবে এরকম? পারবে যে না, তা নিয়ে দেখলাম বিজেপিবিরোধী নারীবাদী আর বিজেপি সমর্থকরা একমত। দুই পক্ষেরই বক্তব্য মোটামুটি এক— পাকিস্তানের মেয়েরা বোরখায় বন্দি, এদিকে আমাদের মেয়েরা যুদ্ধে যাচ্ছে শুধু নয়, নেতৃত্বও দিচ্ছে। মোদি সরকার যতই খারাপ হোক, এই ব্যাপারটা হেব্বি দিয়েছে।

আনন্দে ভাসতে ভাসতেই দেখলাম একে একে ভারতের সংসদীয় মার্কসবাদী দলগুলোর বিবৃতিও এসে পড়েছে। সকলেই সেনাবাহিনীকে বাহবা দিয়েছে। লিবারেশন ছাড়া কেউ যুদ্ধ যেন না হয় সে চেষ্টা করতে হবে— এ-কথা বলেনি। পাকিস্তান সরকারকে অনেক পরামর্শ-টরামর্শ দিয়েছে সন্ত্রাসবাদীদের ঘাঁটি ভেঙে দেওয়া, দোষীদের ভারতের হাতে তুলে দেওয়া ইত্যাদি সম্পর্কে। কিন্তু ভারত সরকারের কাছে পহলগামের ঘটনার তদন্তের কী হল— সে প্রশ্ন তোলেনি। কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খড়্গে কদিন আগেই অভিযোগ করেছিলেন যে, প্রধানমন্ত্রীর কাছে আগে থেকেই খবর ছিল যে কাশ্মীরে পর্যটকদের উপর হামলা হতে পারে। সেই কারণেই নাকি তিনি কাশ্মীর সফর বাতিল করেন। তাহলে নিরস্ত্র মানুষগুলোর প্রাণ বাঁচানো গেল না কেন? সে-প্রশ্নের জবাবও কোনও মার্কসবাদী দলের বিবৃতিতে চাওয়া হয়নি। এমনকি এতজন নিরপরাধ, নিরস্ত্র ভারতীয়ের মৃত্যুর ঘটনা নিয়ে যে দুটো সর্বদলীয় বৈঠক হল তার একটাতেও প্রধানমন্ত্রী উপস্থিত থাকলেন না কেন— সে-প্রশ্নও মাত্র দ্বিতীয় বৈঠকের পরে তোলা হয়েছে। সিপিআই দলের বিবৃতিতে তবু দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা প্রশমিত করার দাবি জানানো হয়েছে, সিপিএমের বিবৃতিতে কেবলই ভারত সরকারের জন্যে হাততালি আর পাকিস্তানের উপর চাপ বজায় রাখার পরামর্শ। দ্বিতীয় বৈঠকে সিপিএম সাংসদ জন ব্রিটাসের বক্তব্যে তবু খানিকটা সরকারের কাছে জবাবদিহি চাওয়ার প্রবণতা দেখা গেছে।

দেখে শুনে বুঝলাম, আমার মার্কসবাদী বন্ধুরাও খুবই আনন্দ পেয়েছে। অ্যাদ্দিন জানতাম তারা উল্লসিত হলে ‘লাল সেলাম’ বলে। এবার দেখলাম ‘জয় হিন্দ’ চালু হয়েছে। ‘ভারত মাতা কি জয়’ নেই দেখে অবাক হলাম। কারণ অনেকে বলেই দিয়েছে— রাজনৈতিকভাবে বিজেপির সঙ্গে মতপার্থক্য থাকতে পারে, কিন্তু দেশের সুরক্ষার প্রশ্নে সবাই এক। সিঁদুরকৌটোর ছবিওলা পোস্টারও অনেক কমরেড সগর্বে শেয়ার করেছেন।

সত্যি বলছি, বামে-ডানে এমন ঐক্য জন্মে দেখিনি। স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাস পড়েছিলাম হোয়াটস্যাপ ইউনিভার্সিটির দ্বারোদ্ঘাটনের অনেককাল আগে। তাতেও এমন ঐক্যের গল্প পাইনি। তাই খুব আনন্দ হল। এই যে সবকিছুতে রাজনীতি করার অভ্যাসের ঊর্ধ্বে উঠে সকলে এক হতে পেরেছে— এই তো আমাদের শক্তি। এইজন্যেই তো আমরা সভেরেন সোশালিস্ট সেকুলার ডেমোক্র্যাটিক, আরও কী কী সব, রিপাবলিক।

আরও পড়ুন হিন্দুরাষ্ট্রের হিন্দু নাগরিকের পিঠ বাঁচানোর চিঠি

তবে এসব হল ছোটখাটো আনন্দের কারণ। বেশি আনন্দ পেয়েছি অপারেশন সিঁদুরের সুদূরপ্রসারী ফলগুলো টের পেয়ে। যেমন ধরুন, সোফিয়া ব্রিফিংয়ে এসে বসার পর থেকে ভারতে মুসলমানদের বাড়িঘরের উপর দিয়ে বুলডোজার চালানো বন্ধ হয়ে গেছে। মুসলমান ডেলিভারি বয়ের কাছ থেকে খাবার না নেওয়ার বদভ্যাস সকলে ত্যাগ করেছে। মুসলমান মানেই সন্ত্রাসবাদী— এ-কথা তো আর ভুলেও কেউ উচ্চারণ করছে না। ব্যোমিকা আর সোফিয়াকে দেখামাত্র দেশের যেখানে যত ক্লিনিক বেআইনিভাবে ভ্রূণের লিঙ্গ পরীক্ষা করে কন্যাভ্রূণ হত্যা করত, সবকটার ব্যবসা লাটে উঠেছে। এপিজে আব্দুল কালামের পর আবার এতদিনে সোফিয়ার দেখা পেয়ে হিন্দুত্ববাদীদের বিশ্বাস হয়েছে যে মুসলমানরা ভারি দেশপ্রেমিক।

অপারেশন সিঁদুর যখন এত ভালো ভালো ব্যাপার একসঙ্গে ঘটিয়ে ফেলেছে, তখন অনুমান করছি মুনমুন সেনের শেষ হয়ে যাওয়া কেরিয়ারও নতুন করে শুরু করিয়ে দেবে। হয়ত ব্যবধান ছবির একখানা দেশপ্রেমিক হিন্দি রিমেক তৈরি হবে। আশা ভোঁসলের বয়সটা বড্ড বেশি হয়ে গেছে, তাই বৃদ্ধা মুনমুনের ঠোঁটে কণ্ঠদান করবেন শ্রেয়া ঘোষাল। সঙ্ঘ পরিবারের ঘনিষ্ঠ ভিক্টর ব্যানার্জিকে হয়তো শহিদ-টহিদ হিসাবে দেখানো হবে। তাঁর ছবির দিকে তাকিয়ে মুনমুন সেই ‘কত না ভাগ্যে আমার এ জীবন ধন্য হল/সিঁথির এই একটু সিঁদুরে সবকিছু বদলে গেল’-র হিন্দিটা ধরবেন। হয়তো গীতিকার হবেন প্রসূন জোশি আর সুর দিয়ে দেবেন এআর রহমান। তাহলেই বেশ ধর্মনিরপেক্ষ হয়ে যাবে ব্যাপারটা। গত কয়েকদিনে যা বুঝলাম, মোদিজি যতই স্লোগান দিন ‘বেটি বচাও, বেটি পঢ়াও’, এদেশের প্রগতিশীলরাও সিঁদুরকেই মেয়েদের সবচেয়ে দামি সম্পত্তি বলে মনে করেন। আজকের বাজারে ছবিটা চলবেও ভালো, প্রযোজক পেতেও অসুবিধা হবে না। কারণ ‘অপারেশন সিঁদুর’ ট্রেডমার্কের জন্যে একাধিক আবেদন জমা পড়ে গেছে। আবেদনকারীদের মধ্যে রিলায়েন্স গ্রুপও ছিল, তবে মুকেশ আম্বানি লোক ভালো। তিনি আবেদন প্রত্যাহার করে নিয়েছেন, বলেছেন কোনও অপোগণ্ড নিচুতলার কর্মচারী নাকি ভুল করে আবেদনটা করে ফেলেছিল তা সে যা-ই হোক, ট্রেডমার্ক কেউ নিক আর না-ই নিক, নামটার বিক্রয়যোগ্যতা তো প্রমাণ হয়ে গেল। এরপর ছবির প্রযোজক পেতে কি আর অসুবিধা হবে? আমরা ধর্মনিরপেক্ষ, বামপন্থী, প্রগতিশীল লোকেরা দল বেঁধে দেখতে যাব। কারণ ওই যে— রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকতেই পারে, কিন্তু দেশের প্রশ্নে আমরা সকলে এককাট্টা।

অর্থাৎ আগামীদিনে ভারতের আনন্দযজ্ঞে সবার নিমন্ত্রণ। তবে এই যজ্ঞে পুঞ্চে যে ১৫ জন ভারতীয়কে পাকিস্তান বোম ফেলে মেরেছে আর যে ৪৩ জনকে আহত করেছে বলে খবর, তাদের পরিবার-পরিজন যোগ দেবে কিনা ঠিক বুঝতে পারছি না। অবশ্য কাশ্মীর আমাদের বলেই যে কাশ্মীরিদেরও আমাদের লোক বলে ধরতে হবে এমন মাথার দিব্যি কেউ দেয়নি। কাশ্মীরিরা যেহেতু ঘরপোড়া গরু, তারা সিঁদুরে মেঘ দেখলে ডরাতে পারে। আমরা আনন্দ করব না কেন?

চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম ওয়েবসাইটে প্রকাশিত

বাংলা মাধ্যম স্কুলের পর বাংলা সিনেমা উঠে যাওয়ার পালা?

নয়ের দশক থেকে কলকাতার বড় বড় সংবাদমাধ্যম যে শহুরে দরকচা মারা ছবিগুলোকে বাংলা ছবির পুনরুত্থান বলে দাগিয়ে দিল, সেগুলো বস্তুত বিভিন্ন মেজ সেজ ফেস্টিভালে পুরস্কার জেতা ছাড়া বাংলা ছবির হোমেও লাগেনি যজ্ঞেও লাগেনি।

এখনো বছরে যে দু-চারটে দিন পশ্চিমবঙ্গের বাঙালির নিজস্ব সংস্কৃতির জন্য গর্ববোধ হয় এবং সেটাকে বাঁচানো প্রয়োজন বলে মনে হয়, আজ তার মধ্যে এক দিন। আজ বাংলা সিনেমার আন্তর্জাতিকভাবে সবচেয়ে উদযাপিত পরিচালক সত্যজিৎ রায়ের জন্মদিন। মুর্শিদাবাদোত্তর, পহলগামোত্তর বাঙালি ভদ্রলোক-ভদ্রমহিলার সহসা নিজের হিন্দু সত্তা আবিষ্কার এবং দিঘার উপকূলে তাঁদের আদরের রামমোহন-বিদ্যাসাগর-রবীন্দ্রনাথ-নজরুলের প্রগতিশীলতা জগন্নাথদেবের পায়ে সঁপে দেওয়ার পর বলতে হবে, কপাল জোরে এই দিনটা পাওয়া গেছে। কেবল আজকের দিনেই বাংলা সিনেমা সম্পর্কে কখানা কথা লিখলে কেউ কেউ হয়ত গুরুত্ব দিয়ে পড়বেন। আগামীকালই আর তা হবে না। কারণ বিষয় হিসাবে কাশ্মীর-মুসলমান-পাকিস্তানের সহজ সমীকরণ বা কার বাড়িতে দিঘার মন্দিরের প্রসাদ পৌঁছল আর কোথায় পৌঁছল না, তা বাংলা সিনেমার হাল হকিকতের চেয়ে অনেক বেশি মুখরোচক।

সাংবাদিকতার সাবেকি নিয়ম মেনে সাম্প্রতিকতম ঘটনাটার উল্লেখ করেই আলোচনা শুরু করা যাক। গত বুধবার (৩০ এপ্রিল) বাংলা ছবির ছজন পরিচালক – অনির্বাণ ভট্টাচার্য, ইন্দ্রনীল রায়চৌধুরী, কিংশুক দে, পরমব্রত চট্টোপাধ্যায়, বিদুলা ভট্টাচার্য, সুদেষ্ণা রায় – একখানা মিনিট পনেরোর ভিডিও বার্তা প্রকাশ করেছেন। সে বার্তা টালিগঞ্জের কলাকুশলীদের প্রতি। ভিডিওতে বলা হয়েছে যে টালিগঞ্জ পাড়ার ফেডারেশন – যার সভাপতি পশ্চিমবঙ্গ সরকারের মন্ত্রী অরূপ বিশ্বাসের ভাই স্বরূপ বিশ্বাস – এবং এই পরিচালকরা, এখন বিবদমান। যাঁরা বাংলা কাগজগুলোর বিনোদনের পাতায় নিয়মিত চোখ বোলান, তাঁদের কাছে এটা খবর নয়। কিন্তু পরিচালকরা বলছেন – কলাকুশলীদের ফেডারেশনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে যে পরিচালকরা কলাকুশলীদের বিপক্ষে। এই ভিডিও নির্মাণের উদ্দেশ্য – সেই ‘ভুল’ ধারণা দূর করা।

ভিডিওটা না দেখে থাকলেও, এই পর্যন্ত পড়েই বুঝতে অসুবিধা হওয়ার কথা নয় যে গণ্ডগোল এতদূর গড়িয়েছে, এ রাজ্যের সমস্ত বিবাদেরই নিষ্পত্তি করে দেওয়ার ক্ষমতা ধরেন যিনি, তাঁর উপরেও ভরসা রাখতে পারেনি কোনো পক্ষই। টালিগঞ্জ মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জির বাসস্থান থেকে বেশি দূরে নয়। তার উপর ফেডারেশন সভাপতি তাঁরই মন্ত্রিসভার সদস্যের ভাই। তা সত্ত্বেও তাঁরা দিদির হস্তক্ষেপে পরিচালকদের সঙ্গে বিবাদ মিটিয়ে নেননি। নিলে পরিচালকরা এই অভিযোগ করতেন না। আবার পরিচালকরাও মুখ্যমন্ত্রীর ছত্রছায়ায় গেলেই নিজেদের অভাব অভিযোগ দূর হবে – এ বিশ্বাস রাখতে পারেননি। ফলে ভিডিও করে ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির ভিতরের বিবাদ প্রকাশ্যে এনে ফেলেছেন। পুরো ভিডিও দেখলে মালুম হয় – বাধ্য হয়েছেন।

কেন হল এরকম?

সংবাদমাধ্যমে আগে প্রকাশিত হয়েছে, এই ভিডিওতেও পরিচালকরা জানিয়েছেন যে তাঁরা মুখ্যমন্ত্রীর কাছে যাননি তা নয়। মুখ্যমন্ত্রী তাঁদের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন যে তিনি একটি কমিটি তৈরি করে দেবেন, যে কমিটি সব পক্ষের কথাবার্তা শুনে বিবাদ মেটানোর ব্যবস্থা করবে। কিন্তু সেই কমিটি গঠন করতে গেলে যে সরকারি বিজ্ঞপ্তি জারি করতে হয়, সেটাই পরবর্তী তিন মাসে হয়নি। পরিচালকরা তারপরেও এক মাস অপেক্ষা করেন। সরকার নট নড়নচড়ন। পরিচালকদের একাধিক ইমেলেরও জবাব দেওয়া হয়নি। অতঃপর তাঁরা সাংবাদিক সম্মেলন করে ফেডারেশনের কীর্তিকলাপ সম্পর্কে সর্বসমক্ষে অভিযোগ করেন। এই তাঁদের মহাপাপ। পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন প্রান্তে বিভিন্ন পেশার মানুষ জানেন, কর্মস্থলে যা অত্যাচার অবিচার হয় সেসব নিয়ে প্রকাশ্যে কথা না বলাই দস্তুর। সমাধান চাইলে যাঁরা অত্যাচার অবিচার করলেন তাঁদের কাছেই হাতজোড় করে দাঁড়ানো নিয়ম। তাঁরা সদয় না হলে খুব বড় অপরাধেও পুলিস এফআইআর নিতে চায় না। সেখানে এই পরিচালকরা একেবারে সাংবাদিক সম্মেলন করে বসলেন! ঘাড়ে কটা মাথা! ভিডিওতে পরিচালকদের অভিযোগ – এরপর থেকেই শুরু হয় সেই সাংবাদিক সম্মেলনে উপস্থিত পরিচালকদের কাজ করতে না দেওয়ার ব্যবস্থা। ওঁদের শুটিংয়ে কলাকুশলীদের কাজ করতে বারণ করা হয়। তার ফলেই নাকি তাঁরা (এই ছজন সমেত মোট ১৫ জন পরিচালক) আদালতের দ্বারস্থ হয়েছেন।

যে বাংলায় পুলিসে যাওয়াই সাধারণ মানুষের পক্ষে স্থানে স্থানে মহাপাতক, সেখানে একেবারে কলকাতা হাইকোর্টে ফেডারেশনের সর্বময় কর্তার বিরুদ্ধে মানহানির মামলা করে বসেছেন এঁরা। সে মামলার ইতিমধ্যেই দুটি শুনানি হয়েছে, সে খবর সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিতও হয়েছে। বিচারপতি অমৃতা সিনহা যে নির্দেশগুলো দিয়েছেন তাতে পরিচালকদের হাত শক্ত হয়েছে। তিনি স্পষ্ট বলেছেন, পরিচালকদের কাজে ফেডারেশন কোনো হস্তক্ষেপ করতে পারবে না। এমনকি যে ইউনিক কার্ড ফেডারেশনের তুরুপের তাস, যা না থাকলে সিনেমাপাড়ায় কাউকে কাজ করতে দেয় না তারা, সেই কার্ডকেও মূল্যহীন বলেছেন বিচারক। কিন্তু হলে হবে কী? আদালত নির্দেশ দিলেই মানব – এত সুবোধ বালকদের রাজ্য পশ্চিমবঙ্গ নয়। ওই নির্দেশের পরেও সুদেষ্ণা রায়ের ছবির শুটিং শুরু করতে গিয়ে ঠিক তাই ঘটেছে, যা রাহুল মুখার্জির ছবির শুটিং নিয়ে গতবছর জুলাই মাসে ঘটায় টলিপাড়ার সমস্ত কাজ বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। অর্থাৎ শুটিং সূচি ঘোষণা হওয়ার পরেও একজন কুশীলবও কাজ করতে আসেননি।

সেই থেকে অচলাবস্থা চলছে টালিগঞ্জে। মুখ্যমন্ত্রী হয় মেটাননি, অথবা ধরে নিতে হবে, তাঁর নির্দেশকেও অগ্রাহ্য করার মত শক্তি টলিপাড়ার দণ্ডমুণ্ডের কর্তা স্বরূপবাবুর আছে। আদালতের নির্দেশের পরেও সুদেষ্ণার ছবির কাজ বাতিল হয়ে যাওয়ায় আদালত অবমাননা হয়েছে কিনা, হয়ে থাকলে স্বরূপবাবু বা অন্য কেউ শাস্তির পাত্র কিনা, নাকি গোটা ঘটনায় তাঁর কোনো ভূমিকাই নেই – তার বিচার আদালতে হবে। কিন্তু সাড়ে ১৫ মিনিটের ভিডিওতে পরিচালকরা অভিযোগ করেছেন যে ফেডারেশনের ভয়েই কুশীলবরা নির্দিষ্ট কিছু পরিচালকের ছবিতে কাজ করতে আসছেন না। একথা সত্যি না মিথ্যা তা বলা মুশকিল, তবে হাইকোর্ট যে এই অভিযোগকে সত্যি বলেই গণ্য করেছে তার ইঙ্গিত বিচারপতির নির্দেশে রয়েছে। স্বরূপবাবু অবশ্য প্রকাশ্যে খুবই ভদ্রলোক। যতবার সংবাদমাধ্যম তাঁর কাছে এই গণ্ডগোল নিয়ে কিছু জানতে চায়, তিনি হয় বলেন আদালতে বিচারাধীন বিষয়ে কোনো মন্তব্য করবেন না, নতুবা বলেন এসব তাঁর ফেডারেশনের বিরুদ্ধে চক্রান্ত। যেমনটা বুধবারের ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পরে বলেছেন

পশ্চিমবঙ্গে এখন বিরাট বিরাট ঘটনা ঘটছে। শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মীদের নিয়োগ দুর্নীতির ফলে এক লপ্তে ২৬,০০০ মানুষের চাকরি গেছে। এদিকে মুর্শিদাবাদের দাঙ্গা এবং পহলগামের সন্ত্রাসবাদী হামলার পর সাম্প্রদায়িকতার সমস্যাও বাংলার বাসিন্দাদের এ রাজ্যে এবং ভিনরাজ্যে নানাভাবে বিপদে ফেলছে। সরকারি টাকায় মন্দির তৈরি এবং তার উদ্বোধন উপলক্ষে ঘুরপথে আমিষ খাওয়াদাওয়া বন্ধ করার চেষ্টার মত অভূতপূর্ব ঘটনাও ঘটে গেছে। এতকিছুর মধ্যে বাংলা সিনেমার জগতে কী হচ্ছে না হচ্ছে তা নিয়ে দীর্ঘ লেখা ফেঁদে বসার কী দরকার? প্রশ্নটা সঙ্গত এবং উত্তরটা জরুরি।

যা যা ঘটছে সবই রাজনৈতিক এবং সিনেমাপাড়ায় যা ঘটছে তাও মোটেই অরাজনৈতিক নয়। একেবারে গোদা অর্থে রাজনৈতিক তো বটেই, কারণ পরিচালকদের অভিযোগের তির শাসক দলের নেতা স্বরূপবাবুর দিকে। কিন্তু কেবল দলীয় রাজনীতির কথা ভাবলে চলবে না। জুলাই মাস থেকে এ পর্যন্ত ঘটনা পরম্পরা লক্ষ করলে বোঝা যায় যে টালিগঞ্জের এই ‘বিদ্রোহী’ পরিচালকরা যে অভিযোগ করছেন, তার সঙ্গে আর জি কর কাণ্ডের পর রাজ্যের বিভিন্ন মেডিকাল কলেজের ডাক্তাররা যে অভিযোগ করেছিলেন তার কোনো মৌলিক তফাত নেই। দুই ক্ষেত্রেই মূল অভিযোগ হল – হুমকি সংস্কৃতি চলছে। চোখ রাঙিয়ে, ভয় দেখিয়ে এক পক্ষ তাদের যা ইচ্ছে তাই করিয়ে নিতে চাইছে। প্রতিবাদ করলে কাজ করতে দেওয়া হচ্ছে না। ঠিক যেভাবে সেকালে গ্রামদেশে মোড়লের বিরুদ্ধাচরণ করলে ধোপা নাপিত বন্ধ করিয়ে দেওয়া হত।

আমি, আপনি কোন ছার; রুপোলি পর্দার লোকেরা, তারকারা, এরকম ভয়ের পরিবেশে কাজ করতে হচ্ছে বলে অভিযোগ করছেন। ব্যাপারটা এই রাজ্যের শুভাকাঙ্ক্ষী সকলকে ভাবিয়ে তোলার মত। শাসক দলের অনুগতরা টালিগঞ্জ পাড়ায় কলাকুশলী হিসাবে কাজ পায়, ছবিতে কাজ করতে যত লোক লাগা উচিত চাপ দিয়ে তার চেয়ে বেশি লোককে কাজ পাইয়ে দেওয়া হয় – এসব অভিযোগ যে তৃণমূল সরকারের আমলেই প্রথম উঠছে এমন নয়। কিন্তু কথা হল, স্বাস্থ্যবান মানুষের খানিকটা রক্ত মশা খেলে বিশেষ ক্ষতি হয় না। কিন্তু যে রক্তাল্পতায় ভুগছে তাকেও যদি রোজ একপাল মশা ছেঁকে ধরে, তাহলে অল্পদিনেই মৃত্যু অবশ্যম্ভাবী। ইন্ডাস্ট্রি হিসাবে বাংলা ছবি এখন সেই স্তরে পৌঁছে গেছে, অথচ ফেডারেশনের প্রতাপ কমছে না। ফলে কাজ আরও কমে যাচ্ছে। ২০২৪ সালে মাত্র ৩৬ খানা ছবি তৈরি হয়েছে, যা নাকি গত ১৫ বছরে সর্বনিম্ন। ফেডারেশনের উদ্ভট সব নিয়মের ঠ্যালায় (পড়ুন দাবির ঠ্যালায়, কারণ আইনত কোনো নিয়ম বানানোর অধিকার ফেডারেশনের নেই) বাংলা ছবির প্রযোজকের সংখ্যা কমছে, বাইরের কোনো ফিল্ম ইউনিটও আর পারতপক্ষে কলকাতায় শুটিং করতে আসছে না। বাংলা ছবির অভিনেতারা কাজের অভাবে কেউ মুম্বাই পাড়ি দিচ্ছেন, কেউ ইউটিউব চ্যানেল খুলে টক শো চালাচ্ছেন, কেউ অন্য ব্যবসাপত্র খোলার কথা ভাবছেন। বেশকিছু উল্লেখযোগ্য ছবির পরিচালক ইন্দ্রাশিস আচার্য, কেবল সিনেমা করে জীবিকা নির্বাহ করা শক্ত হয়ে দাঁড়াচ্ছে – একথা স্পষ্টাস্পষ্টি বলে গতবছর কর্পোরেট চাকরিতে যোগ দিয়েছেন। কিন্তু অভিনেতা, পরিচালকদের হাতে না হয় এসব বিকল্প রয়েছে। যাঁরা মেক আপ করেন, আলোর কাজ করেন, জুনিয়র আর্টিস্ট হিসাবে কাজ করেন অথবা স্রেফ সেটে ফাইফরমাশ খাটেন – তাঁদের তো আর নেই। এমন চললে তাঁরা যাবেন কোথায়? ফেডারেশন নিজেদের যাদের লোক বলে দাবি করছে, তাঁদেরই তো আক্ষরিক অর্থে পথে বসতে হবে। সান্ত্বনা হিসাবে তখন বড়জোর বলা যাবে ‘মনখারাপ করবেন না। আপনাদের আগে ডাক্তার আর শিক্ষকরাও পথে বসেছেন।’

গুন্ডামিই আইন হয়ে দাঁড়াবে, তার সঙ্গে আপোস করে স্রেফ নিজেরটুকু নিয়ে ভেবে তথাকথিত ‘ফার্স্ট বয়’-রা ছবি বানাবেন, বিশেষ ক্ষমতাশালী নায়কের ছবি নিয়ে বিপুল সোশাল মিডিয়া প্রচার চলবে – মাঝরাতে অমুক জায়গায় শো হাউসফুল, তমুক ছবি ব্লকবাস্টার। আর যাঁরা ইন্ডাস্ট্রির দমবন্ধ করা বর্তমান ও ভয়াবহ ভবিষ্যৎ ভেবে প্রতিবাদ করবেন তাঁদের একঘরে করা হবে। ফলে ইন্ডাস্ট্রিতে ক্রমশ কাজ কমবে। এভাবে ধুঁকতে ধুঁকতে একটা ভাষার ছবি কতদিন বেঁচে থাকতে পারে? এমনিতেই দুনিয়া জুড়ে সিনেমাশিল্পের এক ধরনের সংকট চলছে। হলিউড বা বলিউডও তার বাইরে নয়। তার উপর টলিউডের মত ছোট বাজারসম্পন্ন, আগে থেকেই দুর্বল হয়ে থাকা ইন্ডাস্ট্রিতে যদি সিনেমার বাইরের লোকেদের গা জোয়ারিই শেষ কথা হয়ে দাঁড়ায়, তাহলে বাংলা ছবি বাঁচবে কী করে?

বাঙালিদের মধ্যে এমন সিনেমাবোদ্ধার অভাব নেই, যাঁরা নাকটা আকাশের দিকে তুলে বলবেন ‘বাংলা ছবি না বাঁচলেই বা কী? যা সব ছবি বানায়…’। একথার উত্তর দেওয়ার আগে কতকগুলো তেতো কথা বলা দরকার।

প্রথমত, ফেডারেশন বনাম পরিচালকদের দ্বন্দ্ব টলিউডের যে কঙ্কালসার চেহারা তুলে ধরেছে তা দিয়ে শৈল্পিক দিক থেকে ভাল ছবি হওয়া অসম্ভব বললেই চলে। প্রয়াত অশোক মিত্রের কথা ধার করে বলতে হয়, অভাবের সংসারে ‘তেইশ বছরের আপাত-উঠতি শরীরেও, স্তন আর স্তন থাকে না, দুদিনেই তা হেলে প’ড়ে মাই হয়ে যায়।’ আজকাল বাংলা পূর্ণদৈর্ঘ্যের ছায়াছবির শুটিং হয় ১৪-১৫ দিনে। এতেই মাস্টারপিস বানাতে গেলে নির্দেশক, চিত্রগ্রাহক, সঙ্গীত পরিচালক, অভিনেতা – সকলকেই জিনিয়াস হতে হবে। একসঙ্গে এত জিনিয়াস কোনো দেশে কোনোকালেই সুলভ ছিল না।

আরও পড়ুন সিনেমার হাত ধরে ভারতীয়দের বিশ্বজয় চলছে বহুকাল ধরে 

দ্বিতীয়ত, যে তিন বাঙালি পরিচালককে জিনিয়াস গণ্য করে আজকাল আমরা বুক ফোলাই, তাঁদের কর্মজীবনে মোটেই সমস্ত ছবি হল ভরে দেখতে যায়নি বাঙালি দর্শক। গেলে ঋত্বিক ঘটক হতাশায় ক্রমশ বেশি বেশি করে মদে ডুবে যেতেন না, অকালে মারাও যেতেন না হয়ত। তাঁর মৃত্যুর পরেও কলকাতা এমন কিছু উদ্বেল হয়নি। সত্যজিৎই বাণিজ্যিক সাফল্যের মুখ দেখেছেন অনেকটা। তাও তাঁর সবচেয়ে শৈল্পিক কাজগুলোর চেয়ে বেশি জনপ্রিয় হয়েছে গুগাবাবা, হীরক রাজার দেশে আর ফেলুদার ছবিগুলো। মৃণাল সেনের ছবি তো খুব জনপ্রিয় হওয়ার কথাও নয়। তাঁর বক্তব্য আলাদা, শৈলীও আলাদা। বাংলা ছবিকে বাঁচিয়ে রেখেছিল আসলে সিনেমাবোদ্ধাদের হেলাশ্রদ্ধার পাত্র হয়ে থাকা ছবিগুলো। সেসব ছবি বানাতেন তপন সিংহ, অজয় কর, দীনেন গুপ্ত, অরবিন্দ মুখোপাধ্যায়, তরুণ মজুমদার, প্রভাত রায়, অঞ্জন চৌধুরী প্রমুখ। নিখাদ প্রেমের ছবি বা মজার ছবি, আটপৌরে সাংসারিক জটিলতার ছবি, সাধারণ মানুষের রোজকার সমস্যার ছবি – এসব দেখতে দর্শক হল ভরাত বলে শিল্পী ও কলাকুশলীদের সংসার চলত, প্রযোজকদের ঘরে টাকা আসত। তাই তাঁরা হিট হবে না ধরে নিয়েই সত্যজিৎ বা মৃণালের মত শিল্পীদের ছবিতে টাকা ঢালতে পারতেন। নয়ের দশক থেকে কলকাতার বড় বড় সংবাদমাধ্যম যে শহুরে দরকচা মারা ছবিগুলোকে বাংলা ছবির পুনরুত্থান বলে দাগিয়ে দিল, সেগুলো বস্তুত বিভিন্ন মেজ সেজ ফেস্টিভালে পুরস্কার জেতা ছাড়া বাংলা ছবির হোমেও লাগেনি যজ্ঞেও লাগেনি। এক পর্দার সিনেমা হলগুলো উঠে যাওয়ার আগে থেকেই ওইসব ছবি গ্রাম আর শহরের দর্শকের মধ্যে কাঁটাতার বসিয়ে দিয়েছে। মাল্টিপ্লেক্স এসে সর্বনাশ সম্পূর্ণ করেছে। বিপুল সংখ্যক দর্শক বাংলা ছবির হাতছাড়া হয়ে গেছেন অত টাকার টিকিট কাটার ক্ষমতা নেই বলে আর গ্রামেগঞ্জে সিনেমা হল প্রায় নেই বলে। যাঁরা আছেন, তাঁদের পক্ষে হাতে ইয়াব্বড় পপকর্নের বালতি নিয়ে বাংলা ছবি কেন, কোনো ছবির পাশেই দাঁড়ানো কঠিন। মনোযোগ স্বভাবতই ৪০০ টাকার পপকর্ন নষ্ট না হওয়ার দিকেই রাখতে হবে।

এবার বলা যাক, বাংলা ছবি না বাঁচলে কী হবে। শুধু শিল্পী আর কলাকুশলীদের রুজি রোজগার বন্ধ হবে তা নয়। পৃথিবীর বিশিষ্ট সংস্কৃতিবান জাতিগুলোর অন্যতম হিসাবে বাঙালির যে পরিচিতি, তা অনেকটাই মুছে যাবে। আজ গোটা ভারতকে এক ধর্ম, এক ভাষা, এক সংস্কৃতির দেশ করে তোলার যে আপ্রাণ লড়াই চালাচ্ছে সংঘ পরিবার, তাতে সেটা হবে তাদের গুরুত্বপূর্ণ জিত। আপনি আজ সত্যজিতের অস্কার আর ঋত্বিকের মৃত্যুর এতবছর পরে তাঁকে নিয়ে মার্টিন স্করসেসির মুগ্ধতার কথা শতমুখে বলে সম্মান পান বাংলা সিনেমা বলে একটা কিছুর অস্তিত্ব আছে বলে। না থাকলে যাকেই বলতে যাবেন, সে বলবে ‘হ্যাঁ হ্যাঁ, তোমাদের একসময় নাকি সবই ছিল। এখন কী আছে বলো?’ বাংলা মাধ্যম স্কুলগুলোকে উঠে যাওয়ার দ্বারপ্রান্তে এনে দাঁড় করিয়েছে পশ্চিমবঙ্গ সরকার। এর সঙ্গে বাংলা সিনেমাশিল্পটা তুলে দিতে পারলে সোনায় সোহাগা। পাড়ায় পাড়ায় রবীন্দ্র জয়ন্তী কমে এসেছে অনেকদিন হল, আজ থেকে ৫০ বছর পরে সত্যজিতের জন্মদিন পালন করার লোকও পাওয়া যাবে না।

ব্যাপারটা কিন্তু গভীরভাবে রাজনৈতিক। আপনি মাছি তাড়ানোর ভঙ্গিতে বলতেই পারেন ‘পরমব্রত চাটুজ্জে তো সরকারের দেউচা-পাঁচামির কমিটিতে ঢুকেছিল। এখন বুঝুক ঠ্যালা’, অথবা ‘অনির্বাণ ভটচায্যি তো আর জি করের বেলায় চুপ ছিল। এখন কেন?’, কিম্বা ‘সুদেষ্ণা রায় তো সরকারের কীসব কমিশনের মেম্বার। এদের পাত্তা না দেওয়াই উচিত।’ কিন্তু আপনি যত উদাসীন থাকবেন, আপনার ভাষা-সংস্কৃতির বারোটা বাজানোর জন্যে যে বড় রাজনীতিটা চলছে তার পথ তত পরিষ্কার হবে।

নাগরিক ডট নেট ওয়েবসাইটে প্রকাশিত

মায়ানগর: যুগান্তরের ছবি, আমাদের ছবি

সিনেমা হলে ঢুকে হিয়া টুপটাপ, জিয়া নস্ট্যাল হলেই হাততালি দিই। পরিচালক আদিত্যবিক্রম সেনগুপ্ত মায়ানগর ছবিতে করেছেন ঠিক উল্টোটা। শেষ বছর বিশেকে কলকাতা যেভাবে গোল্লায় গেছে তার স্মৃতি নিখুঁত নির্মমতায় পর্দায় তুলে এনেছেন।

বামুন চিনি পৈতে প্রমাণ, বাঙালি চিনি কেমনে? নস্ট্যালজিয়া দিয়ে। ওই জিনিসটারই বিক্রয়যোগ্যতা বাঙালি সমাজে এখনো নিশ্চিত। তাই বাংলায় দুজন এখনো বিক্রি হন – রবীন্দ্রনাথ আর সত্যজিৎ রায়। ওটা আছে বলেই শতবর্ষ এসে পড়লে বিক্রি হন মৃণাল সেন, ঋত্বিক ঘটকও। নস্ট্যালজিয়ার তোড়ে রবীন্দ্রনাথের লেখা বিশেষ কেউ পড়ে না, অথচ সিগনালে তাঁর গান বাজে। ছোটরা সত্যজিতের গুগাবাবা দেখতে শেখে না, বড়রা ফেলুদাকে নিয়ে বছরের পর বছর ছেলেমানুষি চালিয়ে যায়, ভুলেও কেউ দেবী (১৯৬০) বা সীমাবদ্ধ (১৯৭১) দেখে না। তবে সত্যজিতের মেলায় হারিয়ে যাওয়া নাতিকে নায়ক বানিয়ে ছবি করলে হাউজ ফুল হয়। লোকে পথের পাঁচালী (১৯৫৫)-র বিখ্যাত দৃশ্যের হুবহু নকল দেখে আহা, উহু করে। মৃণালের রাজনীতি যতই বাতিল হয়ে যাক কলকাতা শহরে, ছবিগুলো যতই বিস্মৃত হোক, তাঁর বায়োপিকের বাহুল্য হয় বাংলা সিনেমায়। খারিজ (১৯৮২) কেউ দেখে না, কিন্তু তার সিকুয়েল তৈরি হয়। ঋত্বিকের ছবি কলকাতা শহরে দেখানোর অনুমতি বাতিল হয়, কিন্তু তাঁর নাম করে এবং না করে একাধিক বায়োপিক বানানো হয়, তাঁর নামে মেট্রো স্টেশন হয়। এসব নস্ট্যালজিয়া ছাড়া আর কী? এমনিতে স্মৃতি খুবই কাজের জিনিস, নইলে সাহিত্যিক মিলান কুন্দেরা লিখতেন না ‘ক্ষমতার বিরুদ্ধে মানুষের সংগ্রাম হল বিস্মৃতির বিরুদ্ধে স্মৃতির সংগ্রাম।’ কিন্তু কলকাতা তথা বাংলায় আমরা সমস্ত অস্বস্তিকর স্মৃতি থেকে মুখ ফিরিয়ে ন্যাকা স্মৃতিমেদুরতায় ডুবে আছি। তাই সিনেমা হলে ঢুকে হিয়া টুপটাপ, জিয়া নস্ট্যাল হলেই হাততালি দিই। পরিচালক আদিত্যবিক্রম সেনগুপ্ত মায়ানগর ছবিতে করেছেন ঠিক উল্টোটা। শেষ বছর বিশেকে কলকাতা যেভাবে গোল্লায় গেছে তার স্মৃতি নিখুঁত নির্মমতায় পর্দায় তুলে এনেছেন।

কেন এমন হয়ে গেল কলকাতা? দেখতে দেখতে পপকর্ন খাওয়া যায় এমন স্মৃতিমেদুরতা বজায় রাখতে হলে সিনেমায় দোষটা চাপিয়ে দিতে হয় কোনো অনির্দেশ্য শক্তির ঘাড়ে। ক্ষমতাশালীদের দিকে আঙুল তোলা তো নৈব নৈব চ, এমনকি নিজেদের দিকেও আঙুল তোলা চলে না। অথচ আদিত্যবিক্রম দেখিয়েছেন – লোভের গুড় ছড়িয়ে দিয়েছে ক্ষমতাশালীরা আর তা চেটেপুটে নিতে পিঁপড়ের মত এগিয়ে গেছে অভিনেত্রী হয়ে ওঠার স্বপ্ন মুছে যাওয়া গৃহবধূ এলার (শ্রীলেখা মিত্র) মত মানুষ। এই কালপর্বে বড় ফ্ল্যাট, নতুন বাইক, অনেক টাকা, বিদেশযাত্রার স্বপ্নে বিভোর করে দেওয়া হয়েছে রোজগারের অন্য পথ খুঁজে না পাওয়া রাজা (সায়ক রায়), পিংকিদের (রিকিতা নন্দিনী শিমু)। তারপর সর্বস্বান্ত করে দেওয়া হয়েছে। এই লোভের গুড়ের কল্পতরু বেয়ে শিখরে পৌঁছবার প্রতিযোগিতায় যারা নামেনি তাদের প্রায় সমাজচ্যুত করেছে কলকাতা। মাস্টারির চাকরি জোটাতে না পারা শিশির (সত্রাজিৎ সরকার), যে প্রাঞ্জল করে ছেলেমেয়েদের বুঝিয়ে দিতে পারে পদার্থবিদ্যার গূঢ় তত্ত্ব, তাকে প্রায়ান্ধকার পুরনো বাড়িতে গৃহশিক্ষক হয়েই থেকে যেতে হয়েছে। নিজের বউয়ের কাছেও বাতিল হয়ে গেছে সে। ভীতু হলেও প্রোমোটারদের হাতে বন্ধ থিয়েটার হল তুলে না দেওয়ার মরণপণ সংকল্প নিয়ে একা একা মদ খেতে খেতে অবসাদে ডুবে গেছে বুবুদা (ব্রাত্য বসু)। ওরা ডাইনোসর, ওদের সরিয়ে দিয়ে আধুনিক হয়ে উঠেছে কলকাতা।

আদিত্যবিক্রম দেখালেন বলে খেয়াল হল, আমাদের চোখের সামনে কী দারুণ এক মায়ানগর নির্মাণ সম্পূর্ণ হয়েছে! এখানে নগদে রোজগার করলে ব্যাংক ঋণ দেয় না। অথচ গরিব, নিম্নবিত্ত মানুষের বহু কষ্টে সঞ্চিত কোটি কোটি টাকা নগদে আত্মসাৎ করে ধনী হয়ে যায় প্রদীপ্ত পাল (অনির্বাণ চক্রবর্তী)। কলকাতার ইন্দ্রপ্রস্থের মত এক মায়ানগর হয়ে ওঠার ইতিহাস আদিত্যবিক্রম ধরে রেখেছেন গোখান তিরয়াকির ক্যামেরায়। এই ইন্দ্রপ্রস্থে স্ফটিকের ফাঁকিতে উপরে ওঠাকেই সুখ ভেবে একেবারে একলা হয়ে যায় এলা। তারপর দুর্যোধনের পুষ্পশোভিত সরোবরকে শুকনো ডাঙা ভেবে ঝপাং করে পড়ে যাওয়ার মত আছড়ে পড়তে হয় সহায়সম্বলহীন মাটিতে। এই মায়ানগর রাজাকেও ফকির বানিয়ে ছাড়ে। এ মায়ানগর এমন এক সিন্ডিকেট যেখানে সৎ থাকতে চেয়েও পারে না ইঞ্জিনিয়ার ভাস্কর (অরিন্দম ঘোষ)। এ শহরে একমাত্র ডেঙ্গুর মশা তাড়ানোর ধোঁয়াই রচনা করতে পারে স্বপ্নের মায়াজাল।

এবং রবীন্দ্রনাথ। তিনিও বিকৃত ও বিক্রীত হন এই মায়ানগরে। মোটের উপর নরম শব্দ এবং নৈঃশব্দ্যে নির্মিত মিংকো এগার্সম্যানের সাউন্ডট্র্যাকে কান ঝালাপালা করে দেয় শুধুমাত্র রবীন্দ্রনাথের গান। আজকের বাঙালির দুই শালগ্রাম শিলার আসলে কী অবস্থা করেছে কলকাতা, তা এতদিনে কোনো বাংলা ছবি দেখিয়ে দিল। আদিত্যবিক্রম রবীন্দ্রনাথের রক্তাক্ত হয়ে যাওয়া দেখিয়েছেন কোনো রাখঢাক না রেখে, আর সত্যজিতের অবস্থা দেখাতে চেয়েছেন কিনা নিশ্চিত হওয়া যায় না। কিন্তু এলা যখন ফ্ল্যাট পাওয়ার লোভে প্রদীপ্তর হোটেলের ঘরে পৌঁছে যায়, তখন কিছুতেই অগ্রাহ্য করা যায় না এই অনুভূতি, যে জন অরণ্য (১৯৭৬) ছবির সেই দৃশ্যই আবার দেখছি, যেখানে নিজের কাজ হাসিল করতে বন্ধুর বোনকে ক্লায়েন্টের ঘরের দরজায় পৌঁছে দেয় বিবেকের দংশনে ছিন্নভিন্ন সোমনাথ। তফাত বলতে, আজকের কলকাতায় অভাব নয়, এলার কম্পাস ঠিক করে লোভ। তাই তার কোনো ‘মিডলম্যান’ প্রয়োজন হয় না।

বিলাস যাদের প্রয়োজনে পরিণত হয়েছে আর প্রয়োজনটুকুও যাদের বিলাসে পরিণত হয়েছে, তাদের কাছে জলজ্যান্ত একটা শহরের মায়ানগর হয়ে যাওয়ার ইতিহাস তুলে ধরেছেন পরিচালক। বাংলা ছবি অরাজনৈতিক হয়ে গেছে বলে আমাদের অনেকেরই আক্ষেপ। অদূর ভবিষ্যতে সে আক্ষেপ দূর হওয়ার সম্ভাবনা নেই। কারণ এই ছবি করতেও বিদেশি প্রযোজক, বিদেশি কলাকুশলীদের সাহায্য নিতে হয়েছে পরিচালককে। তবে তার সদ্ব্যবহার করে তিনি বানিয়ে ফেলেছেন গত দেড় দশকের সবচেয়ে স্পষ্ট রাজনৈতিক ছবি। ফলে এই তথ্য অবাক করে না যে ২০২১ সালে মুক্তি পাওয়া এই ছবির পটভূমিকা যে কলকাতা শহর, সেখানকার সিনেমা হলেই ছবিটা এসে পৌঁছল চার বছর পরে।

তবে ছবির রাজনীতি ব্যর্থ হয়ে যেত, একজন দর্শকের কাছেও নিজের বার্তা পৌঁছে দিতে পারতেন না পরিচালক, যদি তাঁর প্রয়াস শিল্পোত্তীর্ণ না হত। আশ্চর্য সব দৃশ্যের জন্ম দিয়েছেন আদিত্য বিক্রম। ডেঙ্গু তাড়ানোর ধোঁয়াকে সিনেমার চিরাচরিত স্বপ্নদৃশ্যের কায়দায় ব্যবহার করার কথা আগেই বলেছি। তার চেয়েও বেশি অবাক করে পরিবারের কনিষ্ঠতমের মৃত্যুতে বিষণ্ণ পোষা কুকুর, প্রেমের ফুর্তির বাঁশির সঙ্গে সুর মিলিয়ে জ্বলে ওঠা নকল তাজমহলের আলো। শেষ দৃশ্যের ম্যাজিক গোপন থাক। যাঁরা এই পরিচালকের প্রথম ছবি আসা যাওয়ার মাঝে (২০১৪) দেখেছেন তাঁরা জানেন, আদ্যন্ত বাস্তবে পা রেখে দাঁড়িয়ে থেকে হঠাৎ কল্পনার রাজ্যে চলে গিয়ে কী অসামান্য ম্যাজিক দেখাতে পারেন আদিত্য বিক্রম। রবীন্দ্রনাথের কথাও তোলা থাক যাঁরা এখনো ছবিটা দেখেননি তাঁদের জন্য। না, ট্রেলারে দেখানো শটগুলোর কথা হচ্ছে না। এটা সেই জাতের বাংলা ছবি নয় যার ট্রেলার দেখাই যথেষ্ট।

আরও পড়ুন মানিকবাবুর মেঘ: অনন্য রোম্যান্টিক ছবি

তা বলে কোনো দুর্ধর্ষ চমক আশা করবেন না। পরিচালক নিচু তারে বেঁধেছেন দৃশ্যগুলোকে, আর সেই সুরেই সুর মিলিয়ে কাজ করেছেন ক্যামেরার সামনের শিল্পীরা। এই ছবির চমক বলতে ওই নিচু তারের উঁচু মানের অভিনয়ই। শ্রীলেখা আশ্চর্য দক্ষতায় একইসঙ্গে লাস্যময়ী এবং ঘরোয়া; কৌশলী এবং অগোছালো; কুটিল এবং বোকা। বস্তুত একই চরিত্রে দুজন মেয়ের অভিনয় করেছেন তিনি। এমন এক মেয়ে যাকে অপাপবিদ্ধ কিশোরী থেকে উচ্চাকাঙ্ক্ষী চতুর মহিলা করে তুলেছে জীবন। যার লোভ ষোল আনা, কিন্তু কল্পতরুর মালিক প্রদীপ্তর মত নির্দ্বিধায় অন্য মানুষের ক্ষতির বিনিময়ে লাভবান হতে যার বাধে।

এলার স্বামী শিশিরের চরিত্রে সত্রাজিৎকে পুরুষ দর্শকের মাঝে মাঝে মনে হবে ভেড়ুয়া। কী নির্লিপ্তভাবে বিয়ে করা বউয়ের দিকে প্রায় না তাকিয়ে কাটিয়ে দেয় লোকটা! নিজের ব্যর্থতা মেনে নেওয়া একজন মানুষের অভিনয়ে সত্রাজিৎ আবেগ চেপে রাখেন আশ্চর্য দক্ষতায়, অথচ রসবোধ একটুও চিড় খায় না। তা ছাত্রকে কুকুরের ভয় দেখানোতেই হোক, আর সেই কুকুরের সামনে পড়ে গিয়ে সন্ত্রস্ত রাজাকে ‘আমি কী করব? ও আমার কথা শোনে না’ বলাতেই হোক। কণ্ঠস্বরের ওঠানামা ছাড়াই সত্রাজিৎ এমন একজন মানুষকে দেখিয়ে দেন যার মমত্ববোধ আছে পুরোমাত্রায়, স্ত্রীর প্রতি প্রেমও আছে যথেষ্ট। কিন্তু সেসব সে প্রকাশ করে না, কারণ জানে তাতে লাভ নেই। শ্রীলেখা শেষমেশ গৃহত্যাগ করার পরে সত্রাজিতের চোখ ভরে আসে, তবু তিনি কাঁদেন না। আবার ঝড়জলের রাতে মত্ত স্ত্রী হঠাৎ ফিরে এলেও আবেগে বিহ্বল হয়ে পড়েন না।

ব্রাত্য বসু এতটাই বুবুদা হয়ে গেছেন যে সন্দেহ জাগে, তিনি আদৌ অভিনয় করছেন কিনা। তাঁর চেয়ারে বসতে গিয়ে মাঝপথে থমকে যাওয়া, জবুথবু বসার ভঙ্গি, দরদরিয়ে ঘেমে চলা, একই কথা বারবার ঘুরিয়ে ফিরিয়ে জিজ্ঞেস করা শারীরিক ও মানসিক অস্থিরতার প্রমাণ দেয়। তাঁর সারা শরীরে আতঙ্ক জেগে থাকে সারাক্ষণ। অথচ অঙ্গপ্রত্যঙ্গ ও মস্তিষ্কের উপর নিয়ন্ত্রণ হারালেও, মুখে ‘বাড়ি বেচে দেব’ বললেও নিজের জায়গা ছেড়ে না যাওয়ার আকুতি পরিষ্কার ফুটে ওঠে।

মানুষ মাত্রেই বহুমাত্রিক। তেমন এক আপাত ভালমানুষ, বহুমাত্রিক চরিত্রে যথাযথ অভিনয় করেছেন অরিন্দম।

সায়ক তাঁর উচ্চাকাঙ্ক্ষায়, অক্ষম রাগে, ভয়ে কুঁকড়ে যাওয়ায় এবং অব্যক্ত হতাশায় আমাদের সকলের পরিচিত নিম্নবিত্ত পরিবারের চিট ফান্ড এজেন্টদের একজন হয়ে উঠেছেন। রিকিতাও তাঁর চরিত্রে যথাযথ। অতি স্বল্প সুযোগেও চিট ফান্ডের সর্বদা মিষ্টি কথা বলা চালু কর্মকর্তা হিসাবে জ্যান্ত হয়ে উঠেছেন লোকনাথ দে।

গত কয়েক বছরে কলকাতার যেসব মানুষকে আমরা দেখি না, দেখতে চাই না, তাদের সিনেমার পর্দায় তুলে এনেছে অন্তত তিনটে ছবি – মায়ার জঞ্জাল (২০২০), ঝিল্লি (২০২১) আর মানিকবাবুর মেঘ (২০২১)। আদিত্যবিক্রম মায়ানগর ছবিতে ধরে রেখেছেন আমাদের দেখা লোকেদের বদলে যাওয়া, আমাদের চেনা শহরের হাওয়ায় মিলিয়ে যাওয়া। তা করতে গিয়ে তিনি ক্যামেরাবন্দি করে ফেলেছেন গোটা রাজ্যটার যুগান্তর। তিনি যে সচেতনভাবেই ঘটনা আর কল্পনা মিশিয়ে দিচ্ছেন, গুলিয়ে দিচ্ছেন, তা পরিষ্কার হয় যখন একটা শটে এক বাড়ির ছাদে মোবাইলে কথোপকথনে ব্যস্ত রাজার পিছনে দেখা যায় পোস্তার ভেঙে পড়া ফ্লাইওভারের অবশিষ্টাংশ; আর এক রডের মাথায় হাওয়ায় দোলে অধুনা দেশের সকলের পরিচিত তিনকোণা পতাকা। উপরন্তু কল্পতরুর মালিক প্রদীপ্ত হাওয়া খারাপ দেখে বিমানবন্দরের দিকে রওনা দেন, গন্তব্য কাশ্মীর। এ রাজ্যের যেসব মানুষের স্মৃতি দুর্বল নয়, তাঁদের স্থান মাহাত্ম্য বলে বোঝাতে হবে না।

এই ছবিতে যে কালপর্ব দেখানো হয়েছে, সেই পর্ব আমাদের প্রজন্মের প্রথম যৌবন। ফলত, বৃদ্ধ যুগের গলিত শবের পাশে প্রাণকল্লোলে নবযুগ আসার যে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল সেইসময়, তা যে নেহাতই ফাঁকা বুলি ছিল তা আমরা এতদিনে বুঝে গেছি। কিন্তু সেই উপলব্ধি সবিস্তারে বাংলা ছবিতে বড় পর্দায় এতদিন দেখা যায়নি। সে অর্থে আদিত্যবিক্রমের এই ছবি আমাদের প্রজন্মের বয়ান। এটা আমাদের ছবি। তাই সত্যজিতের মহানগর (১৯৬৩)-এর অকারণ আশাবাদী সমাপ্তি আদিত্যবিক্রমের মায়ানগরে সম্ভব হয় না। তাঁকে ম্যাজিকের আশ্রয় নিতে হয়।

নাগরিক ডট নেট ওয়েবসাইটে প্রকাশিত

অথৈ: যত্নে নির্মিত ভারতের ট্র্যাজেডি

অথৈ ভদ্রলোকের ছবি নয়। ভদ্রলোকেরা ভদ্রলোকের খেলার নাম করে যা যা অক্রিকেটিয় আচরণ করে, সেগুলোকে উলঙ্গ করে ফেলার ছবি। এ ছবির নায়ক একজন ‘ছোটলোক’, অথৈ লোধা, যার গোটা সম্প্রদায় স্বাধীনতার পরেও বেশ কিছুদিন দেশের আইনের চোখে অপরাধপ্রবণ জাত ছিল। আর খলনায়ক একজন ভদ্রলোক। যে সে ভদ্রলোক নয়, একেবারে কুলীন বামুন – অনগ্র চট্টোপাধ্যায়। সে আবার বিদেশে এক পা দিয়ে ফেলা ডাক্তার। এদের জন্যই আনন্দবাজার পত্রিকার রবিবারের পাতায় ‘পাত্রী চাই’ বিজ্ঞাপন দিয়ে লেখা হয় – ব্রাহ্মণবংশীয়, প্রকৃত সুন্দরী মেয়ে চাই। পশ্চিমবঙ্গের সংস্কৃতি জগৎ বরাবর এদেরই নিয়ন্ত্রণে। সিনেমা হলগুলোর মালিকদের মধ্যেও লোধাদের সংখ্যা যে শূন্য তা চোখ বুজে বলে দেওয়া যায় (আজকাল তো আবার সিনেমা হল ঢুকে গেছে অতি ধনী, প্রায়শই অবাঙালি উচ্চবর্গীয় মালিকদের মলের পেটে)। তাই ছবিটাও আমাদের দেখতে হয় ভদ্রলোকের চোখ দিয়েই। অনগ্র স্বয়ং এই আখ্যানের সূত্রধার। সে ছোট থেকেই বাড়িতে আশ্রিত সমবয়স্ক অথৈকে ঈর্ষা করেছে, অথচ সবকিছুতেই তার কাছে হেরেছে। খালি পায়ের ফুটবলে তাকে কাটিয়ে ভূপতিত করে গোল করেছে অথৈ। ফলে অনগ্র ওরফে গোগোর প্রিয় খেলা ক্রিকেট। সে ভদ্রলোকের খেলা ক্রিকেটের আদবকায়দা অনুসরণ করে অথৈকে চূড়ান্ত খেলাটায় হারিয়ে দিতে নেমেছে — দিয়াকে অথৈয়ের কাছ থেকে ছিনিয়ে নেওয়ার খেলা।

বহুতলবাসী, শহুরে, অরাজনৈতিক বাংলা ছায়াছবির একঘেয়ে জগতে বহুকাল পরে অথৈ একখানা আদ্যন্ত গ্রামীণ এবং রাজনৈতিক ছবি। চিত্রনাট্যকার ও পরিচালক অর্ণ আর সৃজনশীল পরিচালক অনির্বাণ সে রাজনীতি শুরু করেছেন একেবারে শিল্পী ও কলাকুশলীদের নাম দেখানো থেকে। এ ছবির টাইটেল কার্ডে কারোর নামের সঙ্গে পদবি লেখা নেই। প্রয়োজনে অমুকদা, তমুকদি আছেন। দুজন কৌশিক থাকায় একজন কৌশিকদা আছেন আর একজন কৌশিকবাবু আছেন। অর্ণর চিত্রনাট্য অতীতের বহু শেক্সপিয়রাশ্রয়ী ছবির মত তাঁর আখ্যানকে অবলম্বন করেছে বটে, কিন্তু নিজের রাজনীতির প্রতি বিশ্বস্ততার কারণে ওথেলো ছাড়িয়ে বহুদূর চলে গেছে। বাংলায় জাতপাত নেই – ভদ্রলোকদের এই নিশ্চিন্ত, আত্মপ্রতারক ধারণার গোড়া ধরে টানতে গেলে ঈর্ষা দেখানো দরকার ছিল। যে ঈর্ষায় ভদ্রলোকেরা অথৈয়ের মত সংরক্ষণপ্রাপ্ত ছাত্রদের বলে – সোনার চাঁদ, সোনার টুকরো। যৌন ঈর্ষার চেয়ে বড় ঈর্ষা নেই। তাই শেক্সপিয়রের নাটকে ইয়াগোর চক্রান্তের মূলে ছিল ক্যাসিওর প্রতি ঈর্ষা, কারণ ওথেলো তার বদলে ক্যাসিওর পদোন্নতি ঘটিয়েছে। অর্ণর চিত্রনাট্যে গোগোর ঈর্ষা কিন্তু অথৈকেই, এবং তা চরমে পৌঁছেছে নিজের কামনার বস্তু দিয়া অথৈকে ভালবেসে তার সঙ্গিনী হয়ে যাওয়ায়।

গোগোর চরিত্রের দিকনির্ণয় করে তার যৌন হতাশা। অথৈ জানে গোগো তার প্রাণের বন্ধু। দুজনের অনেক মিল। দুজনে একই পুরুষের অভিভাবকত্বে একই বাড়িতে বড় হয়েছে। একই স্কুলে, একই মেডিকাল কলেজে পড়েছে। কিন্তু অথৈয়ের শয্যায় থাকে দিয়া, গোগোর শয্যাসঙ্গিনী অকালমৃতা মায়ের ছবি। দুজনেই মায়ের মৃত্যুর দৃশ্য স্বপ্নে দেখে ঘেমে নেয়ে জেগে ওঠে। কিন্তু অথৈকে শান্ত করে বিছানায় ফিরিয়ে আনার জন্য আছে দিয়া, গোগোর আছে শুধু অয়দিপাউস এষণা। মিলির সঙ্গে ভিনসুরার এক ভাঙা বাড়িতে সঙ্গমে তার শরীর সাময়িক সুখ পায়, তার মন শান্তি পায় না।

ভিনসুরা কোথায়? যাঁরা ভাবেন বাংলায় আছে ‘ছায়াসুনিবিড় শান্তির নীড়    ছোটো ছোটো গ্রামগুলি’, তাঁরা ভিনসুরাকে খুঁজে পাবেন না। কিন্তু যাঁরা গজদন্তমিনারে থাকেন না, তাঁরা জানেন ভিনসুরা যে কোনো শহরের মতই পাপবিদ্ধ। সেখানে সুন্দরী মেয়ের বাথরুমে উঁকি মারার চেষ্টা করে গ্রামের গাঁটকাটা, কোনো মেয়ের ফেলে যাওয়া ওড়না নিয়ে হস্তমৈথুন করে পাঁড় মাতাল, বোকা রসিকতায় একদল মেয়ের মন জয় করার চেষ্টা করে সুদর্শন যুবক, সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে দায়সারা রবীন্দ্রসঙ্গীত গাওয়া হয় এবং তাতে মন ওঠে না গ্রামের অল্পবয়সীদের। ছেলেরা তো বটেই, গ্রামের মেয়েরাও চটুল আইটেম নাম্বারে মত্ত হয়ে নাচে।

বাঙালি দর্শকের সিনেমা দেখার চোখ কান হয় আবর্জনা, নয় ওপরচালাক ছবি দেখে দেখে এত ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে যে সাধারণ দর্শক শুধু নয়, পেশাদার সিনেমা আলোচকরাও আইটেম নাম্বারে কেবল নর্তকীর শরীরটুকুই দেখতে পান। গানের কথাগুলো খেয়ালই করেন না। তাই এই ছবির আলোচনায় এক জনপ্রিয় বাংলা দৈনিকে লেখা হয়েছে, আইটেম নাম্বারটা নাকি অপ্রয়োজনীয় এবং হাস্যকর। কী সেই গানের কথাগুলো?

ওরে তুই ভালোর দলে নাম লিখিয়ে
কী-ই বা পেলি বল
কে করল কদর তোর ভালোকে
(সবাই) পাল্টে নিল দল

(ওরে) আর কতকাল থাকবি বোকা
ভালোর ঘরে শুধুই ধোঁকা
(এসব) ভালোর পোকা পায়ে মাড়িয়ে
দ্বন্দ্ব ভুলে যা

মন্দ হয়ে যা রে
বাবু মন্দ হয়ে যা

ওরে তুই মন্দ হয়ে মজা পাবি
অন্ধকারে ঘর সাজাবি
থাকবি আলোর থেকে দূরে
সাঁতার দিবি রাত পুকুরে

দেখলি অনেক ভালোবেসে
শূন্য পেলি দিনের শেষে
(এবার) যুগের তালে মোহের বিষে
অন্ধ হয়ে যা

মন্দ হয়ে যা রে
বাবু মন্দ হয়ে যা।

সেই অ্যারিস্টটলের আমল থেকে ট্র্যাজেডি কী, ট্র্যাজিক নায়ককে কেন ট্র্যাজেডির সম্মুখীন হতে হয় তা নিয়ে বিস্তর আলোচনা হয়েছে। পণ্ডিতরা বলেছেন ট্র্যাজিক নায়কের চরিত্রে এমন একটা উপাদান (tragic flaw) থাকে যা তাকে অনিবার্যভাবে ট্র্যাজেডির দিকে ঠেলে দেয়। সেই উপাদানের নাম দেওয়া হয়েছে – হ্যামার্শিয়া (Hamartia)। উদাহরণস্বরূপ, ম্যাকবেথের বেলায় সেই উপাদান উচ্চাকাঙ্ক্ষা, হ্যামলেটের বেলায় সিদ্ধান্তহীনতা, ওথেলোর বেলায় সন্দেহ বা ঈর্ষা। কিন্তু আধুনিক সমালোচকদের মতে হ্যামার্শিয়া কোনো চারিত্রিক উপাদান নয়, আসলে ওটা সিদ্ধান্ত নেওয়ার ভ্রান্তি (error of judgment)। অথৈয়ের ভ্রান্তিটা তাহলে কী?

সে ভিনসুরাকে, সেখানকার মানুষকে বড় বেশি ভালবাসে, সেই ভালবাসায় অন্ধ হয়ে তাদের ভাল করতে চায়। সে সগর্বে বলে ‘এটা আমার ভিনসুরা’। সে ভিনসুরার সকলকে নিজের মত মনে করে। মুকুলকে (ক্যাসিও), গোগোকে (ইয়াগো), এমনকি দিয়াকেও (ডেসডিমোনা)। কিন্তু তারা মোটেই অথৈয়ের মত নয়। একথা উপলব্ধি না করাই অথৈয়ের ট্র্যাজেডির কারণ। সে যদি মুকুলের এক রাতের মাতলামি ক্ষমা করে দিতে পারত, যদি গোগো তার সঙ্গে এক নোংরা খেলা খেলছে সন্দেহ করেও তাকে বিশ্বাস করে না বসত, যদি দিয়ার মুকুলের প্রতি স্নেহ বুঝতে পারত – তাহলে তার পরিণতি ট্র্যাজিক হত না। কিন্তু আসলে যে ভিনসুরা তার নয়, ভিনসুরার সবাই তার মত নয় – একথা বোঝার ব্যর্থতাই অথৈকে ট্র্যাজিক নায়কে পরিণত করে। ভদ্রলোকেদের ভিনসুরায় অথৈকে একা করে দেয় তার জাতি পরিচয়। সেই পরিচয়জনিত অতীতের বিষময় স্মৃতি, তা থেকে জন্ম নেওয়া হীনমন্যতাই দিয়ার প্রতি আর মুকুলের প্রতি তার সন্দেহকে পুষ্ট করে। অথচ ওই অতীতকে সে ভুলতে পারে না, কারণ সে সগর্বে বলে, অতীতটাই তার পুঁজি।

প্রিয় ভিনসুরার সঙ্গে তার এই অমিল ফুটিয়ে তুলতে যথার্থ ভূমিকা নিয়েছে ওই আইটেম নাম্বার। সকলের উদ্দাম নৃত্য দেখে অথৈ যখন দিয়াকে নিয়ে স্থানত্যাগ করে, তখন পর্দা জুড়ে লেগে থাকে বিষাদ। হাঁ করে আইটেম নাম্বারের আইটেমের দিকে তাকিয়ে থাকলে অবশ্য তা চোখ এড়িয়ে যাবে।

হয়ত নির্দেশক ও চিত্রনাট্যকার হিসাবে অর্ণর এটা প্রথম ছবি বলে এবং সৃজনশীল পরিচালক হিসাবে সঙ্গে অনির্বাণ ছিলেন বলে এ ছবিতে সাবধানী হওয়ার কোনো ব্যাপার নেই, পরীক্ষা নিরীক্ষার কোনো খামতি নেই। কোনটা সফল হয়েছে, কোনটা ব্যর্থ – তা নিয়ে তর্ক চলতে পারে। কিন্তু বাংলা ছবির বাঁধা ছকের একেবারে বাইরে চলে গিয়ে যে এ ছবি বানানো হয়েছে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। এতখানি পরীক্ষামূলক হওয়া সম্ভব হত না সৌমিকের অসাধারণ ক্যামেরার কাজ এবং সংলাপের সম্পাদনা ছাড়া। অর্ণ (অথৈ) আর অনির্বাণের (গোগো) অভিনয় দক্ষতার সবটুকু সৌমিকের ক্যামেরা চেটেপুটে নিয়েছে অসাধারণ সব ক্লোজ আপে, আলো আর অন্ধকারের বৈচিত্র্যে, রঙিন আলোর শিহরণ জাগানো ব্যবহারে। অবিস্মরণীয় দৃশ্য তৈরি হয়েছে, যখন দিয়ার (সোহিনী) প্রতি অথৈয়ের বিশ্বাস একেবারে ভেঙে পড়ে। তারই সঙ্গে ভেঙে পড়ে ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল, আকাদেমি অফ ফাইন আর্টস, শহিদ মিনার – স্মৃতির শহরের, ভদ্রলোকদের তৈরি প্রেমের শহরের একেকটা স্তম্ভ।

আরও পড়ুন মায়ার জঞ্জাল: যে কলকাতা দেখতে পাই না, দেখতে চাই না

আজকের বাংলা ছবির পক্ষে বিরল যত্ন রয়েছে এই ছবির শব্দ ব্যবহারেও। সুগত, দেবাশিস, প্রসূন, অনিন্দিতরা সচরাচর কানে আসে না নেপথ্যের যেসব শব্দ, সেগুলোকেও দর্শকের কানে পৌঁছে দিয়েছেন এবং আখ্যান তার মধ্যে দিয়েও কথা বলেছে। দূরাগত মাইকের বা চলমান পথিকের গুনগুন গানও কানে এসেছে।

এবার অভিনয়ের কথায় আসা যাক। এই চিত্রনাট্য অতি উচ্চমানের অভিনয় দাবি করেছিল। সাধারণ অভিনয় দিয়ে ভিনসুরার লোধা ডাক্তার অথৈয়ের দুনিয়ার ভাঙনকে জলবায়ু পরিবর্তন বা গাজার গণহত্যার সঙ্গে যুক্ত করার কোনো উপায় ছিল না। এই অসাধ্য সাধন করেছেন অর্ণ। গত কয়েক বছরে কলকাতার থিয়েটার জগতে যে তরুণ অভিনেতারা সবচেয়ে বেশি চোখে পড়েছেন, অর্ণ তাঁদের অন্যতম। কিন্তু বড় পর্দায় এত গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে তাঁকে আগে দেখা যায়নি। এই অভিনয় কেবল চোখে পড়ার মত নয়, মনে থেকে যাওয়ার মত। অনির্বাণের সঙ্গে মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধের মুহূর্তগুলোই হোক বা সোহিনীর সঙ্গে প্রেম-অপ্রেমের অতি দ্রুত যাতায়াতের মুহূর্ত – অর্ণর মাথার চুল থেকে পায়ের নখ পর্যন্ত সবকিছু কথা বলেছে। একজন সৎ, হৃদয়বান মানুষ থেকে পশুত্বে ক্রমাবতরণ তিনি নিজের মুখে এঁকেছেন সফলভাবে।

শেক্সপিয়রের ডেসডিমোনা আর বিশাল ভরদ্বাজের ডলি – দুজনের চেয়েই বেশি স্বাবলম্বী ও স্বাধীনচেতা এই ছবির দিয়া। তাকে নায়ক তুলে আনেনি, সে স্বেচ্ছায় নিজের পরিবার ও কেরিয়ার বিসর্জন দিয়ে অথৈয়ের সঙ্গে গণ্ডগ্রামে এসে ঘর বেঁধেছে। এই চরিত্রে সোহিনীর নারীবাদ কখনো শাপমোচন (১৯৫৫) ছবির সুচিত্রা সেনের মত নীরব আত্মবিশ্বাসী, আবার কখনো হলিউডি নায়িকাদের মত সোচ্চার। সোহিনী পর্দায় পাগলের মত প্রেম করেছেন, আবার যার জন্যে সর্বস্ব ত্যাগ করে আসা, তাকে ঠিক সময়ে ঘা মেরে বাঁচানোর চেষ্টাতেও তিনি সপাট। গলা তুলে বলেন, আসলে তো অথৈয়ের প্রশ্ন এটা নয় যে দিয়া মুকুলকে ভালবাসে কিনা। আসল প্রশ্ন হল সে মুকুলের সঙ্গে শুয়েছে কিনা। সোহিনীকে কিছুটা নিষ্প্রভ দেখিয়েছে ক্লাইম্যাক্সে, যখন চলে যাওয়া প্রেমের দিন স্মরণ করে দিয়া গাইছে ‘জীবন মরণের সীমানা ছাড়ায়ে’।

এই নিষ্প্রভতার কিছুটা দায় অবশ্য চিত্রনাট্যকারকেও নিতে হবে। কারণ ওই গান যে অথৈ আর দিয়ার ব্যক্তিগত গান ছিল, তা একবারও দুজনে মিলে গোটাটা না গাওয়ায় খুব ছাপ ফেলেনি। ফলে শেষে ওই গানের অভিঘাত তেমন তীব্র হয় না। চিত্রনাট্যের এই খামতির সঙ্গে একটা বাহুল্যের উল্লেখও করতে হয়। স্টিফেন মোফাত নির্মিত বিবিসির শার্লক ওয়েব সিরিজের পর থেকে অনেক সিরিজ এবং ছবিতেই দেখা যায়, ফ্ল্যাশব্যাক দেখানোর সময়ে বর্তমানের চরিত্র সেখানে উপস্থিত। অথৈ ছবিতেও এই কৌশল ব্যবহার করা হয়েছে অথৈ আর গোগোর ছোটবেলা দেখাতে। কিন্তু ততক্ষণে গোগোর বর্ণনায় এবং অন্যান্য দৃশ্যের কারণে দর্শকের পক্ষে আর বোঝা শক্ত নয় যে ছোট ছেলে দুটো কে, কাদের শৈশব দেখানো হচ্ছে। সুতরাং সেখানে আর প্রাপ্তবয়স্ক গোগোকে না দেখালেও চলত।

‘জীবন মরণের সীমানা ছাড়ায়ে’ একবার শোনা গেছে অনির্বাণের গলায়, অথৈয়ের সংবর্ধনা সভায়। অনির্বাণ যে সুরেলা কণ্ঠের অধিকারী তা এতদিনে বাংলা সিনেমা ও নাটকের দর্শকরা জেনে গেছেন। সেই অনির্বাণের ছবির প্রয়োজনে ঈষৎ বেসুরো করে গাওয়া মুনশিয়ানার পরিচায়ক। মঞ্চসফল অথৈ নাটকে অনির্বাণ প্রায় সারাক্ষণ মঞ্চে থাকতেন, ছবিতেও বেশিরভাগ সময়েই পর্দায় তিনি উপস্থিত। এতখানি পরিশ্রম তাঁর অভিনয়ে একবারও ছায়া ফেলেনি। ফুর্তিবাজ অথচ কুটিল, দিলখোলা অথচ নির্দয় গোগো হিসাবে তিনি সারাক্ষণই ফুরফুরে মেজাজ বজায় রাখতে সফল। বস্তুত তাঁর সূক্ষ্ম নির্দয়তা এত প্রবল যে মাঝে মাঝে হেমেন গুপ্তের ৪২ ছবির বিকাশ রায়ের কথা মনে পড়ে যায়। বাংলা ছবি নিয়ে সেই উন্মাদনার যুগ অতিক্রান্ত। নইলে বিকাশ রায়কে দেখে লোকে যেমন ঢিল ছুড়ত শোনা যায়, তেমন অনির্বাণের দিকেও হয়ত উড়ে যেত কিছু চটি জুতো। মোটামুটি ফাঁকা প্রেক্ষাগৃহেও তাঁর দিকে বর্ষিত দু-একটা অভিশাপ কানে এল। এই চরিত্রের অভিনেতার জন্যে তা স্বর্ণপদকের সামিল। এই বহুস্তরীয় চরিত্রের জটিলতা বিচার করলে এটা কি এ পর্যন্ত সিনেমায় অনির্বাণের সেরা অভিনয়? তাঁর ভক্তরা ভেবে দেখতে পারেন।

মুকুলের চরিত্রে অর্পণ, মিলির চরিত্রে মিমি, পিঙ্কির চরিত্রে দিতিপ্রিয়া, রাধুর চরিত্রে সুমিত, মন্টুর চরিত্রে মিলন যথাযথ। গোগোর বাবার চরিত্রে প্রবীণ অভিনেতা কৌশিককে অবশ্য কিছুটা দ্বিধান্বিত মনে হয়। যেন ঠিক বুঝে উঠতে পারেননি তাঁর কতটা কী করা উচিত।

শেক্সপিয়রের ওথেলো নাটক কীভাবে শেষ হয় সকলেই জানেন, তাই এখানে স্পয়লার দেওয়ার ভয় নেই। অথৈও শেষ হয় একাধিক মৃত্যুতে। কিন্তু অনিবার্য মৃত্যুগুলোকে যে ক্যানভাসে এঁকেছে অর্ণর চিত্রনাট্য, তাতে যেন পড়া যায় অদৃশ্য কালিতে লেখা

যারে তুমি নীচে ফেল সে তোমারে বাঁধিবে যে নীচে
পশ্চাতে রেখেছ যারে সে তোমারে পশ্চাতে টানিছে।

ছোটলোক অথৈয়ের ট্র্যাজিক পরিণতি সত্ত্বেও ভদ্রলোক গোগোর চক্রান্ত তাই ব্যর্থ হয়ে যায়। ট্র্যাজেডির মারে বেশ খানিকক্ষণ চেয়ার ছেড়ে ওঠা যায় না।

বাংলা সিনেমার পক্ষে অবশ্য এ ছবি ট্র্যাজেডি নয়, বরং রীতিমত আশাব্যঞ্জক। অর্ণ স্রেফ এমন একখানা চিত্রনাট্যের জন্যেই প্রশংসা পেতে পারতেন। সঙ্গে নির্দেশনার দায়িত্ব পালন করেছেন, আবার উঁচু দরের অভিনয়ও করেছেন। অনির্বাণও নির্দেশনার কাজে হাত লাগানোর পাশাপাশি ছবির গান লিখেছেন, এত বড় এবং গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে অনায়াস দক্ষতায় অভিনয় করেছেন। একই প্রজন্মে এমন দু-দুজন শিল্পী যে ইন্ডাস্ট্রির সিনেমায় আছেন, সেই ইন্ডাস্ট্রি সম্পর্কে একেবারে আশা ছেড়ে দেওয়া অনুচিত।

এ ছবির পাশে দাঁড়াতে হবে না, স্বচ্ছন্দে সামনে বসা যায়।

নাগরিক ডট নেটে প্রকাশিত

রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে ৪২ বছর

অনেকসময় দার্জিলিঙে হঠাৎ মেঘ সরে গিয়ে কাঞ্চনজঙ্ঘা যেভাবে নিজেকে উদ্ঘাটন করে, সেভাবে কোনো ঘটনায় আচমকা জলের মত পরিষ্কার হয়ে যায় রবীন্দ্রনাথের একেকটা লাইন।

মা মারা গেছেন খুব বেশিদিন হয়নি। তবু এবছর মায়ের মৃত্যুদিনটা ভুলে গিয়েছিলাম। বেলার দিকে বোন ফোন করে মনে না করালে মনে পড়ত না। আসলে ওই দিনটার চেয়ে মাকে অনেক বেশি মনে পড়ে প্রতিবছর পঁচিশে বৈশাখে। আমার মায়ের বেশ বেলা করেই ঘুম থেকে ওঠার অভ্যাস ছিল, কিন্তু বছরে ওই একটা দিন ঘুম থেকে উঠে পড়তেন খুব ভোরে। দূরদর্শনে জোড়াসাঁকো আর রবীন্দ্র সদনের কবিপ্রণাম দেখবেন বলে। বাড়িতে টিভি এসেছিল আটের দশকের শেষ দিকে। তখন থেকেই এই রুটিন চলছিল। মা যথারীতি ঈশ্বরে বিশ্বাসী, একসময় বাড়িতে ঠাকুরের আসন পেতে পুজোও করতেন। কিন্তু মহালয়ার দিন ভোর ভোর উঠতেই হবে, উঠে বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের চণ্ডীপাঠ শুনতেই হবে – ‘মহিষাসুরমর্দিনী’ নিয়ে এত গদগদ ছিলেন না। কোনোবার উঠতেন, কোনোবার উঠতেন না। কিন্তু পঁচিশে বৈশাখে ছাড়াছাড়ি নেই। খুব ইচ্ছা ছিল, একবার জোড়াসাঁকো বা রবীন্দ্র সদনের অনুষ্ঠানে গিয়ে ওখানে বসে গোটাটা দেখবেন। আমার কাছে আবদার ছিল, যখন বড় হয়ে চাকরি করব, তখন যেন নিয়ে যাই। আমি চাকরি পাওয়ার পরেও মা ১৬ বছর বেঁচেছিলেন। তখন আর মুখ ফুটে বলেননি, আমারও খেয়াল হয়নি। মুনীর নিয়াজি যথার্থই লিখেছেন “হমেশা দের কর দেতা হুঁ ম্যায়…” (সর্বদা দেরি করে ফেলি আমি)।

মা মারা গিয়েছিলেন শীতের শেষ দিকে। সেবার পঁচিশে বৈশাখে আমার ভোর ভোর ঘুম ভেঙে গেল, যদিও আমার বরাবর বেলা করে ঘুম থেকে ওঠা অভ্যাস। মা কবিপ্রণাম দেখতে উঠে পড়তেন, আমি বিছানা ছাড়তাম না। ঘুমটা পাতলা হয়ে গেলে গান, আবৃত্তি, ভাষ্যপাঠের আওয়াজ কানে ভেসে আসত। মা মারা যাওয়ার বছরের রবীন্দ্র জয়ন্তীতে তেমন আওয়াজ কানে আসতেই ধড়মড়িয়ে উঠে বসেছিলাম। কিন্তু উঠে বসতেই সে আওয়াজ মিলিয়ে গেল। না, কোথাও তো টিভি চলছে না! না আমাদের ফ্ল্যাটে, না পাশের বাড়িটায়, যেখান থেকে মেগা সিরিয়ালের সংলাপ বা ইউটিউবে চালানো হিন্দি সিনেমার গান ভেসে আসে প্রায়শই। বুঝলাম, স্বপ্ন দেখছিলাম। স্বপ্ন তো আসলে ইচ্ছাপূরণ – সিগমুন্ড ফ্রয়েড কবেই বলে গেছেন।

আমার একেবারে ছোটবেলায় বাড়িতে টিভি ছিল না, কেনার সামর্থ্য ছিল না বলে। এক নিকটাত্মীয় রঙিন টিভি কেনার সময়ে সাদাকালো টিভিটা যখন আমাদের দিয়ে দেন, তখন আমার বয়স ছয় কি সাত। তার আগে পর্যন্ত আমাদের বাড়িতে বিনোদন বলতে ছিল বই আর আমার অদেখা ঠাকুর্দার রেকর্ড প্লেয়ার। আমার হাতেখড়ির আগে থেকে টিভি আসার সময় পর্যন্ত সন্ধেবেলা আমার প্রিয় বিনোদন ছিল মায়ের মুখে সঞ্চয়িতার কোনো কবিতা পাঠ শোনা, বা মায়ের গলায় রবীন্দ্রসঙ্গীত। গীতবিতানটা খুলে রাখতেন পাশে, কিন্তু কোনোদিন দেখতে হয়েছে বলে মনে পড়ে না। শুনে শুনে বেশকিছু কবিতা আর গানের প্রতি আমার পক্ষপাত জন্মেছিল। বারবার সেগুলোই শুনতে চাইতাম।

যেমন পলাতকা কাব্যগ্রন্থের ‘নিষ্কৃতি’ কবিতাটা। কুলীন এবং নিষ্ঠুর বাপের মেয়ে মঞ্জুলিকার কষ্টের কথা পড়তে পড়তে মায়ের চোখ দিয়ে জল গড়াত, আমার চোখ দিয়েও। পথের পাঁচালী পড়েছি অনেক পরে। অপরের দুঃখে কষ্ট পাওয়ার শুরু মঞ্জুলিকার জন্যে কাঁদতে কাঁদতেই।

মায়ের নিজের বেশি প্রিয় ছিল “ডাক্তারে যা বলে বলুক নাকো,/রাখো রাখো খুলে রাখো,/শিয়রের ওই জানলা দুটো, – গায়ে লাগুক হাওয়া।/ওষুধ? আমার ফুরিয়ে গেছে ওষুধ খাওয়া।” বড় হয়ে সকৌতুকে লক্ষ করেছি, বাবার সঙ্গে ঝগড়া-টগড়া হলে এই কবিতাটা বেশি পড়তেন। মনোমালিন্য ২৪ ঘন্টার বেশি স্থায়ী হলে আবার পড়তেন ‘সাধারণ মেয়ে’।

লোডশেডিং তখন নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার ছিল, আর লোডশেডিং হয়ে গেলে হ্যারিকেন বা মোমবাতির আলোয় শুয়ে শুয়ে কবিতা পড়া যায় না। সেরকম পরিস্থিতিতে মা গান ধরতেন। আমার প্রায় ৪২ বছরের জীবনে আর কোনো অগায়কের এতগুলো রবীন্দ্রসঙ্গীত সুর সমেত মুখস্থ আছে বলে দেখিনি। অক্ষর পরিচয় হওয়ার আগেই রবীন্দ্রসঙ্গীত যে অন্য গানের চেয়ে আলাদা – এটা বুঝতে শিখেছিলাম মায়ের গান শুনে। কথাগুলোর মানে বোঝার বয়স তখন হয়নি, কিন্তু বারবার শুনে প্রায় মুখস্থ হয়ে গিয়েছিল মায়ের প্রিয় গানগুলো – “তোমার অসীমে প্রাণমন লয়ে”, “আমি রূপে তোমায় ভোলাব না”, “আমার সকল নিয়ে বসে আছি”, “সুখের মাঝে তোমায় দেখেছি”

সুচিত্রা মিত্র আর কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায়ের লং প্লেয়িং রেকর্ড বেশ কয়েকটা ছিল আমাদের। বাগবাজারে মায়ের বড়মাসির বাড়ি যাওয়া হলেই ফেরার সময়ে মেট্রোরেলের জন্যে খুঁড়ে ফেলা এবড়োখেবড়ো রাস্তা অগ্রাহ্য করে, লাইন দিয়ে যে রেকর্ডের দোকানগুলো ছিল মা সেখানে খোঁজ করতেন নতুন কী এসেছে। ঋতু গুহ আর পূর্বা দামের নাম জানতে পারি তখনই। তবে অনেক খোঁজাখুঁজির পরেও ঋতুর গলায় “তোমার  সোনার থালায় সাজাব আজ” খুঁজে পাননি মা। যে রেকর্ডটা কিনে এনেছিলেন তার দুটো গান কে জানে কী কারণে আমার খুব প্রিয় হয়ে গিয়েছিল – “এরা  পরকে আপন করে, আপনারে পর”, “পেয়েছি ছুটি বিদায় দেহ ভাই”। সেই থেকে আজ পর্যন্ত আমার কাছে বুদ্ধদেব গুহ ঋতু গুহর স্বামী। আর কিছু নন।

বাবার অতখানি রাবীন্দ্রিক হওয়ার সময় ছিল না। বছর বিশেক বয়সে মার্কসবাদী কমিউনিস্ট পার্টির সদস্যপদ পেয়েছিলেন। মৃত্যুর আড়াই মাস আগে শয্যাশায়ী হয়ে যাওয়া পর্যন্ত দিনের বেশিরভাগ সময়টা পার্টির কাজেই কাটাতেন। তার উপর আমার শৈশবে প্রশাসনিক দায়িত্বেও ছিলেন। তবু একবার বিবাহবার্ষিকীতে মাকে উপহার দিলেন একটা এলপি রেকর্ড, যার এক পিঠে কণিকা, অন্য পিঠে দেবব্রত বিশ্বাস। সুচিত্রার গান বাবার তত পছন্দ ছিল না। রেকর্ডে দেবব্রতর গলায় সম্ভবত প্রথম গানটাই ছিল ‘আকাশ ভরা সূর্য তারা’। তখন আমার বয়স সাত বা আট। শুনেই মনে হল, এ কী আশ্চর্য গান রে বাবা! এমন কথা হয় গানের! এমন গলা হয় মানুষের! সেই বিস্ময় আমার আজও কাটেনি।

পার্টি সংগঠন, প্রশাসন, পরিবার সামলেও বাবা যে সুযোগটা পারতপক্ষে ছাড়তেন না সেটা হল অপেশাদার যাত্রায়, নাটকে অভিনয় করার সুযোগ। বাবা আর তাঁর বন্ধুরা কয়েকজন মিলে যাত্রা ক্লাব খুলেছিলেন, বছরে অন্তত একটা যাত্রা হত। আজকাল যাকে ‘টল, ডার্ক অ্যান্ড হ্যানসাম’ চেহারা বলে, তেমন চেহারা থাকার সুবাদে বাবা বেশ কয়েকবার নায়কের ভূমিকায় অভিনয় করেছেন। কিন্তু চেহারা নয়, যাত্রায় অভিনয় করতে গেলে যা অপরিহার্য, তা হল শক্তিশালী কণ্ঠস্বর। সেরিবেল্লা ডিজেনারেশন নামে এক আরোগ্যহীন রোগে গলাটা নষ্ট হয়ে যাওয়ার আগে বাবার দারুণ একখানা কণ্ঠস্বরও ছিল। সেই সুবাদে বাবা চমৎকার কবিতা আবৃত্তিও করতেন। বহুকাল চর্চা না থাকলেও অনর্গল আবৃত্তি করতে পারতেন নজরুলের ‘আমার কৈফিয়ত’। বাড়িটা গমগম করত। রবীন্দ্রনাথের কবিতার মধ্যে বাবা বারবার আবৃত্তি করতেন ‘ছেলেটা’ আর ‘বাঁশি’। বাবার অনেকটা সময় বাড়িতে থাকা আমাদের দুই ভাইবোনের কাছে অনেকদিন পর্যন্ত ছিল লটারি পাওয়ার মত ব্যাপার। তেমন দিনে মনমেজাজ বিশেষ রকমের ভাল থাকলে বাবা সঞ্চয়িতা টেনে নিয়ে উদাত্ত কণ্ঠে পড়তেন “যদি  পরজন্মে পাই রে হতে/ব্রজের রাখাল বালক/তবে  নিবিয়ে দেব নিজের ঘরে/সুসভ্যতার আলোক।” মা পড়তেন ‘পুরাতন ভৃত্য’ বা ‘দুই বিঘা জমি’। বাবা মাঝে মাঝে গেয়েও উঠতেন। সবই দেবব্রতর গলায় শোনা গান – ‘আমি যখন তাঁর দুয়ারে ভিক্ষা নিতে যাই’, ‘তোরা যে যা বলিস ভাই’, ‘যেতে যেতে একলা পথে/নিবেছে মোর বাতি,’ ‘যে রাতে মোর দুয়ারগুলি’।

একসময় রেকর্ড প্লেয়ারটার দিন ফুরোল। গানহীন দীর্ঘ কয়েকটা বছরের পরে বাড়িতে এল ফিলিপসের ক্যাসেট প্লেয়ার, যাকে আমরা বলতাম টেপ রেকর্ডার। তখন উঁচু ক্লাসে পড়ি। এক ছুটির দিনে মা ঠিক করলেন, আমাদের চারজনের গলা টেপে ধরে রাখা হবে। ব্ল্যাঙ্ক ক্যাসেট ছিল না, কিন্তু যখন ঝোঁক চেপেছে তখন করতেই হবে কাজটা। উনিশ বছর বয়সী এ আর রহমানের সৃষ্টি রোজা-র সাউন্ড ট্র‍্যাকের খানিকটা ধ্বংস করে রেকর্ড করা হল – বাবার গলায় ‘বিষ্টি পড়ে টাপুর টুপুর’, মায়ের গলায় “সন্ন্যাসী উপগুপ্ত/মথুরাপুরীর প্রাচীরের তলে/একদা ছিলেন সুপ্ত – ”। ধরে রাখা হয়েছিল, কিন্তু সংরক্ষণ করা হয়নি। ক্যাসেটের যুগ চলে গেছে, ওই কণ্ঠস্বরগুলো আমাদের সন্তানদের শোনার জন্যে এ যুগের উপযোগী ফর্ম্যাটে রাখা হয়নি। আমার মায়ের আরেকটা প্রিয় গান “যা  হারিয়ে যায় তা আগলে বসে/রইব কত আর?”

গত সহস্রাব্দের শেষে প্রাপ্তবয়স্ক হলাম। জন্মদিনে বাবা-মা বরাবরই বই দিতেন, জামাকাপড় বা খেলনা নয়। আঠারোতম জন্মদিনের আগেরদিন দেখি মা রিকশা করে এসে বাড়ির সামনে নামলেন আর রিকশাকাকু একটা ইয়াব্বড় প্যাকিং বাক্স ঘরে নামিয়ে দিয়ে গেলেন। কী আছে তাতে? সেবারের জন্মদিনের উপহার – বিশ্বভারতী প্রকাশিত রবীন্দ্র রচনাবলীর প্রথম ১৫ খণ্ড। বারো তারিখের আগে মাইনে হত না বাবার। সাত-আট তারিখে অত দামি জিনিস বাড়িতে এসে পড়ায় দেখলাম বাবার ভুরু সামান্য কুঁচকে গেছে। দাম শুনে চোখ কপালে। তখনই বোধহয় ১৭০০-১৮০০ টাকা দাম ছিল। কিন্তু একটু পরেই বাবার রাগ পড়ে গেল। বললেন “যাকগে, এ জিনিস তো জীবনে একবারই কেনা। আমরা যখন থাকব না তখনো ওর কাজে লাগবে এরকম একটা জিনিস দেওয়া গেল।” পরবর্তী এক বছরে সমস্ত কবিতা পড়ে ফেলেছিলাম। তারপর ক্রমশ গল্প, উপন্যাস, নাটক। প্রবন্ধগুলো পড়তে ভারি আলস্য লাগত। সে আলস্য কাটাতে কাটাতে বাবা, মা দুজনেই বিদায় নিলেন; আমার চশমাটা বাইফোকাল হয়ে গেল। রাশিয়ার চিঠি, কালান্তর, শান্তিনিকেতন, মহাত্মা গান্ধী, ইতিহাস, ভারতবর্ষ – এসব পড়তে পড়তে এতদিন যে জিনিস যে চোখে দেখে এসেছি তা বদলে যায় আর মনে পড়ে বাবার মন্তব্য “আমরা যখন থাকব না তখনো ওর কাজে লাগবে এরকম একটা জিনিস দেওয়া গেল।”

বাবার যখন শেষ সময় – মানে অসুখটা জেনে গেছি, বাবাও টের পেয়ে গেছে, চোখে আর ভাল দেখতে পাচ্ছে না, গলা দিয়ে স্বর বেরনো একেবারেই বন্ধ হয়ে গেছে, তখনো শ্রবণেন্দ্রিয় ঠিক ছিল। একদিন সন্ধেবেলা কোনো কারণে আমি, মা, বোন বাবাকে ঘিরে বসে একসঙ্গে গাইছিলাম “আগুনের পরশমণি ছোঁয়াও প্রাণে।” “ব্যথা মোর/উঠবে জ্বলে/ঊর্ধ্ব-পানে” পংক্তিতে এসে এক অদ্ভুত অনুভূতি হল। মনে হল, জীবনটা যদি সিনেমা হত তাহলে এই শটটার পরের শটে দেখা যেত – বিছানাটা খালি, বাবা নেই। সাউন্ড ট্র্যাকে গানটা চলতে থাকত। রবীন্দ্রনাথের আর সব থেমে গেলেও গান কখনো থামে না, জীবন মরণের সীমানা ছাড়ায়ে চলতেই থাকে। সেই হাতেখড়ির আগের যুগে রান্নাঘরে আটা মাখতে মাখতে গাওয়ার মাঝে মা বলেছিলেন “জীবনের সব পরিস্থিতির জন্যেই দেখবি রবীন্দ্রনাথের একটা না একটা গান আছে।” তখন মনে হয়েছিল, এই কয়েকবছর আগেও মনে হত, মা রবীন্দ্রভক্ত বলে বাড়িয়ে বলেছেন। কিন্তু বয়স যত বাড়ছে, ততই কথাটা বিশ্বাস না করে উপায় থাকছে না। বরং এখন মনে হয় মা একটু রক্ষণশীল হয়েই কথাটা বলেছিলেন। কেবল রবীন্দ্রনাথের গান নয়, বোধহয় রবীন্দ্রনাথের কাব্যের ক্ষেত্রেও কথাটা সত্যি। কোভিড হাসপাতাল থেকে যখন মায়ের মৃতদেহ নিয়ে বাড়ি আসছিলাম, রাস্তা খুঁড়ে পৌরসভা কোনো কাজ করছিল বলে সোজা পথে না এসে ঘুরপথে আসতে হয়েছিল। তখন মা রবীন্দ্রনাথের যে কবিতা আমাকে একেবারে ছোটবেলায় আবৃত্তি করতে শিখিয়েছিলেন, তার প্রথম কয়েক লাইন মনে পড়ছিল “মনে করো যেন বিদেশ ঘুরে/মাকে নিয়ে যাচ্ছি অনেক দূরে।”

অনেককাল হল, শ্মশানে গেলেই আমার কানে বাজতে থাকে দেবব্রতর গলায় “আছে দুঃখ, আছে মৃত্যু, বিরহদহন লাগে/তবুও শান্তি, তবু আনন্দ, তবু অনন্ত জাগে।” সদ্যমৃত কোনো কাছের মানুষকে দাহ করতে শ্মশানে গিয়ে দ্বিতীয় লাইনটা অবিশ্বাস্য, অবাস্তব মনে হওয়াই স্বাভাবিক। কিন্তু আমার দিব্যি বিশ্বাসযোগ্য মনে হয়। কারণ যে বছর বাবা মারা গেলেন, সেবছরই আমার মেয়ে জন্মাল। যে বছর মা মারা গেলেন, সে বছরই আমার ভাগ্নী জন্মাল। কোনো সন্দেহ নেই – “নাহি ক্ষয়, নাহি শেষ,  নাহি নাহি দৈন্যলেশ।”

মাস দেড়েক পরেই বিয়াল্লিশে পা দেব। জীবনের কাছে এখনো যা যা প্রত্যাশা আছে তার অন্যতম হল রবীন্দ্রনাথের যেসব লাইনের অর্থ আজও বুঝিনি সেগুলোর মর্মোদ্ধার। বুঝে গেছি, সবসময় বুঝতে চেষ্টা করলেই বোঝা যায় না। অনেকসময় দার্জিলিঙে হঠাৎ মেঘ সরে গিয়ে কাঞ্চনজঙ্ঘা যেভাবে নিজেকে উদ্ঘাটন করে, সেভাবে কোনো ঘটনায় আচমকা জলের মত পরিষ্কার হয়ে যায় রবীন্দ্রনাথের একেকটা লাইন। নইলে ভেনেজুয়েলার জগদ্বিখ্যাত নেতা উগো শাভেজ, জাপানের সাংবাদিক জুনিচি কোদামা আর তার স্ত্রী রিয়েকো আসাতোর সঙ্গে ভারতের এক নগণ্য মফস্বলের ছাপোষা প্রতীক যে বিশ্বসাথে যোগে যুক্ত – তা কখনো আমার বুঝে ওঠা হত না।

সত্যজিৎ রায়কে পূজার ছলে ভুলে থাকা চলে না

অদূর ভবিষ্যতে এদেশে মহাত্মা গান্ধী, জওহরলাল নেহরু, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সঙ্গে সত্যজিৎও গণশত্রু বলে চিহ্নিত হবেন হয়ত।

চার্লস চ্যাপলিনকে কি সত্যিই অ্যাডলফ হিটলারের মত দেখতে ছিল? একেবারেই না। আসলে চ্যাপলিন দাড়িগোঁফহীন অত্যন্ত সুপুরুষ একজন লোক। বাংলায় যাকে বলে রমণীমোহন, উচ্চতার ব্যাপারটা বাদ দিলে তিনি তাই। বেশিরভাগ ছবিতেই অবশ্য ঐ মাছি গোঁফটাসুদ্ধই চ্যাপলিনকে দেখা যায়; কিন্তু সে চেহারাও চোখের ভাষায়, চুলের ছাঁটে, বেশভূষায় টোমেনিয়ার একনায়ক অ্যাডেনয়েড হিঙ্কেলের থেকে বহুযোজন দূরে। বলাই বাহুল্য যে চ্যাপলিন ইচ্ছে করেই হিঙ্কেলকে হিটলারের আদল দিয়েছিলেন। কিন্তু হিটলার কি হিঙ্কেলের মত হাস্যকর একজন লোক ছিল? তা তো নয়। বেলুন নিয়ে খেলা করার মত ছেলেমানুষি তার ছিল না, পর্দা বেয়ে ওঠার মত জোকারসুলভ কাজও সে করত বলে তার ঘনিষ্ঠ কারোর স্মৃতিচারণায় পাওয়া যায় না। তাহলে চ্যাপলিন কেন এরকম হাস্যকর করে দেখালেন ইতিহাসের সবচেয়ে বড় খুনেটাকে?

দ্য গ্রেট ডিক্টেটর ছবির ৪০ বছর পর মুক্তি পায় হীরক রাজার দেশে। আরেক একনায়কের গল্প। হীরক রাজার চরিত্রে উৎপল দত্তকে মনে করে দেখুন। বিশাল চেহারা, লম্বা গোঁফ, মোটা গলা – বেশ ভয় ধরানো চেহারা। হিঙ্কেলের ঠিক উলটো। কিন্তু মুখের ভাষাটা? প্রথমত সে কথা বলে ছড়া কেটে। যা শুনে হাসি পেতে বাধ্য। দ্বিতীয়ত, উৎপল দত্ত পরে বলেছিলেন, শুটিংয়ের সময়ে সত্যজিৎ রায় তাঁকে বলেন ‘হীরক রাজার সংলাপগুলো গ্রাম্য উচ্চারণে বলো। যারা পড়াশোনা বিশেষ জানে না, তাদের মত। লোকটাকে দর্শকের কাছে হাস্যাস্পদ করে দাও।’

চল্লিশ বছরের ব্যবধানে দুই একনায়ককে পর্দায় দেখাতে গিয়ে দুই জিনিয়াসই দেখালেন হাস্যকর করে, অর্থাৎ ভয়ানক লোকেদের সম্পর্কে ভয় ভেঙে দিলেন। দুই স্রষ্টা একটা ব্যাপারে একমত – একনায়করা সবচেয়ে অপছন্দ করে তাদের নিয়ে হাসাহাসি, কারণ আমাদের ভয়ই তাদের শক্তি। হাসাহাসিতে ভয় কেটে যায়।

চ্যাপলিন বা সত্যজিতের সময়ে ইন্টারনেট ছিল না, মিম ছিল না। ব্যঙ্গ ছিল, শ্লেষ ছিল, একনায়ক ছিল। চ্যাপলিনের সময়ে হিটলার, সত্যজিতের সময়ে ইন্দিরা গান্ধী। ১৯৪০ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ সবে শুরু হয়েছে, হিটলারের কুকীর্তির সবটা তখনো জার্মানির বাইরের মানুষ জানেন না। কিন্তু দ্রষ্টা চ্যাপলিন ফ্যাসিবাদের বিপদ বুঝেছেন, তাকে নিয়ে প্রবল ঠাট্টা করছেন, বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে মানুষকে অন্য ভবিষ্যতের কথা বলছেন। ১৯৮০ সালে সত্যজিৎ যখন হীরক রাজার দেশে আমাদের নিয়ে গেলেন তখন ইন্দিরা গান্ধী ক্ষমতায় ফেরত এসেছেন। ততদিনে বিশ্ববন্দিত পরিচালক ছোটদের দেখার মত রূপকথার এমন এক গল্প নিয়ে এলেন পর্দায়, যাকে উৎপল পরে বলবেন জরুরি অবস্থার বিরুদ্ধে সত্যজিতের প্রতিবাদ। শুধু কি তাই করেছেন সত্যজিৎ? নাকি যে স্রষ্টারা দ্রষ্টা হন, তাঁদের মতই ভবিষ্যতের একনায়কদেরও একহাত নিয়েছেন, ভবিষ্যতের প্রতিবাদীদের ভাষা জুগিয়েছেন?

গত কয়েক বছরে সোশাল মিডিয়ায় যতবার মমতা ব্যানার্জিকে হীরক রানী আর নরেন্দ্র মোদীকে হীরক রাজা বলা হয়েছে, হীরক রাজার সঙ্গে তার সভাসদদের কথোপকথনের অনুকরণে যত পোস্ট তৈরি হয়েছে – তা প্রমাণ করে সত্যজিৎ এখনো আমাদের প্রতিবাদের ভাষা। মৃত্যুর তিন দশক পরেও তাঁর কাজ আমরা ফিরে দেখব কেন? অভ্যাসবশত? না। সত্যজিৎ শুধু অভ্যাসে পরিণত হওয়ার মত শিল্পী নন, তার চেয়ে অনেক বড়। তিনি দারুণভাবে সমকালীন, তাই চিরকালীন। যেমনটা বলেছেন উৎপল, এই বক্তৃতায়

One has a sneaking suspicion that all this talk of Renaissance ideas may well be a ruse to remove from sight the living contemporaneity of Ray’s ideas and relegate him to a museum of ancient statuary which has ceased to bother us now. This suspicion is strengthened when we consider a film like Ray’s Hirak Rajar Deshe (Kingdom of Diamonds, 1980) which was his response to Mrs Gandhi’s Emergency decree. This film in the guise of a fairytale is a blast against all forms of dictatorship which believes in thought-control, prison for the workers, arrests and deportations but which all the while is preparing its own ultimate destruction.

Renaissance is an inadequate term for Ray. He was a moment in the conscience of man.

এই বক্তৃতার উপলক্ষ ছিল সাহিত্য আকাদেমি, সঙ্গীতনাটক আকাদেমি আর ললিতকলা আকাদেমির যৌথ প্রচেষ্টায় আয়োজিত এক সেমিনার। সত্যজিৎ মারা যাওয়ার ১৩ দিন পরে। মৃত্যুর পর সমস্ত সরকারি মহল থেকে – দূরদর্শনে, রেডিওতে, এমনকি এই সেমিনারে বিলি করা কাগজেও তাঁকে উল্লেখ করা হচ্ছিল “representative of Indian Renaissance” বলে। সেই তকমার বিরুদ্ধে এখানে গর্জে উঠেছেন উৎপল। বলছেন এটা আসলে প্রতিবাদীর প্রতিবাদী চরিত্র ভুলিয়ে দেওয়ার সরকারি চক্রান্ত। ভারতীয় রেনেসাঁ আবার কী জিনিস? খায় না মাথায় দেয়? ঐতিহাসিকরা যেটার কথা বলতেন তা হল বাংলার রেনেসাঁ – হেনরি লুই ভিভিয়ান ডিরোজিও আর তাঁর ছাত্রদের দিয়ে যার শুরু আর রবীন্দ্রনাথে যার পূর্ণতা। কিন্তু সেটাও রেনেসাঁ বলতে যা বোঝায়, সেই স্তরে পৌঁছয়নি। সমাজের সামন্ততান্ত্রিক কাঠামো ভেঙে নতুন সমাজ গড়া হয়নি। তাই পরবর্তীকালের ঐতিহাসিকরা এর নাম দিয়েছেন বাংলার সংস্কার আন্দোলন। কিন্তু সত্যজিৎ শুধু সেই সংস্কারের সন্তান নন, তিনি তার চেয়ে অনেক বেশি।

তাহলে? আজ সত্যজিতের জন্মদিনে আমরা, আত্মবিস্মৃত বাঙালিরা, তাঁকে স্মরণ করব কি শুধু মোদী, মমতার বিরুদ্ধে তিনি আমাদের মিম বানানোর সুযোগ দিয়েছেন বলে? আজকে আমাদের সামনে, গোটা ভারতের সামনে, গোটা পৃথিবীর সামনে কি দুটো মাত্র বিপদ – মোদী আর মমতা? তা তো নয়। গোটা পৃথিবী জুড়েই এখন একনায়কত্বের উত্থানের যুগ। ভারতে ধর্মীয় ফ্যাসিবাদী নরেন্দ্র মোদীর চেহারায়, ইজরায়েলে হানাদারি বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর চেহারায়, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে কর্পোরেট মুঘল ডোনাল্ড ট্রাম্পের চেহারায়, রাশিয়ায় যুদ্ধবাজ জাতীয়তাবাদী ভ্লাদিমির পুতিনের চেহারায়, তুরস্কে রচপ তায়িপ এর্দোগানের চেহারায়। এই লড়াইয়ে আমাদের ভাষা যোগাতে পারেন কি সত্যজিৎ?

যতবার হীরক রাজার দেশে দেখি ততবার মনে হয় সারাজীবনে এমন বৈপ্লবিক ছবি সত্যজিৎ আর বোধহয় বানাননি। বিজ্ঞানের উপর আক্রমণের প্রতিবাদে খোদ মার্কিন মুলুকে বিজ্ঞানীরা মিছিল করেছিলেন ট্রাম্প রাষ্ট্রপতি থাকার সময়ে। এদেশেও বিজ্ঞানীরা এবং বিজ্ঞানচর্চা আক্রমণের মুখে পড়েছে প্রবলভাবেই, যতই চন্দ্রযান আর মঙ্গলযান পাঠানো হোক মহাকাশে। আমাদের দেশে একের পর এক বিশ্ববিদ্যালয়ে অপবিজ্ঞানের চর্চা চালু করা হচ্ছে। মোদীরাজের প্রথম দিকে বিজ্ঞান কংগ্রেসে আলোচনা হত প্রাচীন ভারতের পরমাণু বোমা নিয়ে, ক্রমশ বিজ্ঞান কংগ্রেস বন্ধই করে দেওয়া হল। এখন রামলালার কপালে সূর্যতিলক এঁকে দেওয়াই বিজ্ঞানের বিরাট অর্জন বলে প্রচার করা হচ্ছে। এক বাবাজি করোনার ওষুধ, ক্যান্সারের ওষুধ – সবই আবিষ্কার করে ফেলেছেন, এমন অবৈজ্ঞানিক দাবি করে কোটিপতি হয়ে যান সরকারি মদতে।

এদিকে পিএইচডি স্কলারদের ভাতা অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে, প্রতিবাদের ঘাঁটি জহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ে এক ধাক্কায় আটশোর কাছাকাছি পিএইচডি আসন লোপ করে দেওয়ার ঘটনাও বাসি হয়ে গেছে। কারণ ‘এরা যত বেশি পড়ে, তত বেশি জানে, তত কম মানে।’ বন্ধ হয়ে যাচ্ছে উদয়ন পণ্ডিতের পাঠশালা। দিনের পর দিন কারারুদ্ধ থাকছেন জিএন সাইবাবার মত অধ্যাপক আর উমর খালিদের মত ছাত্ররা। বুঝিয়ে বলার প্রয়োজন নেই যে অতিকায় সর্দার বল্লভভাই প্যাটেলের মূর্তি আসলে কার মূর্তি। আমাদের গোটা দেশটাই এখন মূর্তির মাঠ।

কিন্তু হীরক রাজার দেশে আটকে থাকলে ভুল করবেন। ১৯৫৫ সালের পথের পাঁচালী থেকে ১৯৯১ সালের আগন্তুক পর্যন্ত ওই একটিমাত্র ছবিই সত্যজিৎ করে গেছেন যা এই দুঃসময়ে আমাদের সম্বল – তা নয়। মনে রাখবেন, সত্যজিৎ সেই পরিচালক যাঁর প্রথম ছবি দেখে এক রাষ্ট্রপতি তাঁকে জিজ্ঞেস করেছিলেন পর্দায় এত দারিদ্র্য দেখালে বিশ্বের কাছে দেশের অসম্মান হবে না? সত্যজিতের সপাট প্রতিপ্রশ্ন ছিল ‘দেশে এত দারিদ্র্য আছে সেটা সহ্য করা যদি আপনার পক্ষে অন্যায় না হয়, আমার পক্ষে সেই দারিদ্র্য দেখানো অন্যায় হবে কেন?’ একের পর এক দক্ষিণপন্থী প্রোপাগান্ডা ছবির যুগে, ইন্টারনেট ট্রোলদের প্রশ্নের মুখে এমন শিল্পীই তো আমাদের ধ্রুবতারা।

আরও পড়ুন টলমলে ট্রিবিউটে ফেলুদার গোয়েন্দাগিরি গুবলেট

তিনি মারা যান ১৯৯২ সালের এপ্রিল মাসে আর ধর্মান্ধ রাজনীতি এদেশে সবচেয়ে বড় সাফল্য পায় ডিসেম্বরে – বাবরি মসজিদ ভেঙে। তার ঠিক ৩২ বছর পরে, আজ, ধর্মান্ধতা এদেশে ফ্যাশনে পরিণত। বাবারা জাঁকিয়ে বসেছেন, দিনকে রাত রাতকে দিন করছেন, গোমূত্র দিয়ে ক্যান্সার সারানোর নিদান দিচ্ছেন, মুখ্যমন্ত্রীও হয়ে বসছেন। লেখাপড়া না জানা, গাঁইয়া, গরীব মানুষ নয়; এই বাবাদের ভক্ত এবং শক্তি সম্ভ্রান্ত, বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রিপ্রাপ্ত ক্ষমতাশালীরা। মনে পড়ে না বিরিঞ্চিবাবার ভক্তদের? কিন্তু এহেন মহাপুরুষরা শেষ কথা বলেন না। যদি ভরসা হারিয়ে ফেলে থাকেন, একবার দেখুন, বারবার দেখুন কাপুরুষ ও মহাপুরুষ (১৯৬৫)। যমুনাবক্ষে মোচ্ছব করে নদীর বারোটা বাজান এক বাবা আর তাঁর কাছে উপঢৌকন হিসাবে সরকারি আশীর্বাদ নিয়ে পৌঁছন রাষ্ট্রনেতা, দেশের শ্রেষ্ঠ ধনীরা। আমার-আপনার নিরাপত্তার জন্য তৈরি সেনাবাহিনীকে ব্যবহার করা হয় ব্যক্তিগত ভৃত্যবাহিনী হিসাবে। মনে হয় না, আমাদের যদি একজন ফেলুদা থাকত, যে বাবাকে গারদে পাঠিয়ে, ধনী ভক্তকে দেয়ালে পিঠ দিয়ে দাঁড় করিয়ে সার্কাসের খেল দেখাত, তবে বেশ হত?

আমরা কি হঠাৎ পৌঁছেছি এই অন্ধকার সময়ে? এক হ্যাঁচকা টানে সংঘ পরিবার আমাদের প্রগতিশীল সমাজকে উল্টোদিকে টেনে নিয়ে গেছে? না। ধর্মান্ধতার বিরুদ্ধে, কুসংস্কারের বিরুদ্ধে আমাদের লড়াইয়ে ফাঁকি ছিল বরাবর। ছিল বলেই ১৯৮৭ সালেও রূপ কানোয়ার সতী হয়, শাস্তি হয় না একজনেরও। ছিল বলেই শাহ বানো সুবিচার পাননি, এত বছর পরেও তিন তালাককে হাতিয়ার করে মুসলমান বিদ্বেষ ছড়িয়ে চলেছে হীরক রাজার লোকেরা। ধর্মের হাতে মেয়েদের এহেন লাঞ্ছনার কালে, অ্যান্টি-রোমিও স্কোয়াডের নামে, লাভ জিহাদের নামে মেয়েদের অধিকারকে অস্বীকার করার দিনে মনে না পড়ে উপায় নেই সত্যজিতের ১৯৬০ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ছবি দেবী। সেখানে জমিদার বাড়ির তরুণী বউ দয়াময়ীকে কালীভক্ত শ্বশুরের অন্ধবিশ্বাসের ভারে দেবী হয়ে উঠতে হচ্ছে, যার পরিণতি তার সাজানো জীবন তছনছ হয়ে যাওয়ায়।

বারবার উৎপলের যে বক্তৃতার উল্লেখ করছি, এই অন্ধকারে সত্যজিৎকে খুঁজতে গিয়ে যে বক্তৃতা আমাদের জোরালো টর্চ হতে পারে, সেখানে দেবী সম্পর্কে উৎপল বলছেন

“A proper tribute to Ray would have been… to make arrangements for Devi to be shown all over the country at cheaper rates. Devi is a revolutionary film in the Indian context. It challenges religion as it has been understood in the depths of the Indian countryside for hundreds of years. It is a direct attack on the black magic that is passed off as divinity in this country. Instead of the vulgarized Ramayana and Mahabharata, the Indian TV could have telecast Devi again and again; then perhaps today we would not have to discuss the outrages of the monkey brigade in Ayodhya.”

বুঝতেই পারছেন হীরক রাজার কত বড় শত্রু আমাদের সত্যজিৎ। অদূর ভবিষ্যতে এদেশে মহাত্মা গান্ধী, জওহরলাল নেহরু, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সঙ্গে সত্যজিৎও গণশত্রু বলে চিহ্নিত হবেন হয়ত। এমন একজন গণশত্রুকে আমরা এখন গোয়েন্দায় বেঁধে রাখলে তা হবে রবীন্দ্রনাথের সেই গানটার মত – তোমার পূজার ছলে তোমায় ভুলেই থাকি।

নাগরিক ডট নেটে প্রকাশিত