ক্রিকেটের ধারাভাষ্যকাররা প্রায়ই বলেন – ক্রিকেট হল মিলিমিটারের খেলা। মানে কয়েক মিলিমিটার এদিক-ওদিক হলে নট আউটটা আউট হয়ে যেতে পারে, ছয়টা চার হয়ে যেতে পারে, ফলে জয়টা পরাজয়ে বদলে যেতে পারে। ব্রাত্য বসু আর তাঁর গাড়ির চালক বোধহয় ক্রিকেট দেখেন না। পশ্চিমবঙ্গের লেখাপড়া, নাটক, সিনেমা – এত কিছু সামলে কি আর সময় পাওয়া যায়? নইলে ইন্দ্রানুজ রায়ের গায়ে উঠে পড়ার কয়েক মিলিমিটার আগেই গাড়ির ব্রেক কষে ফেলতেন। তাহলেই কোনো সমস্যা থাকত না। কোনো চ্যানেল তাদের সাংবাদিককে পাঠিয়ে দিত ক্যাম্পাসে পড়ে থাকা মদের বোতল আর কন্ডোম গুনতে, কোনো চ্যানেল অতীতে ছড়িয়ে লাট করা কোনো প্রাক্তন উপাচার্যকে ডেকে এনে বোঝাত যাদবপুরে কোনো ‘ডিসিপ্লিন’ নেই এবং ‘ডিসিপ্লিন’ প্রতিষ্ঠা করতে গেলে কী করতে হবে। কোনো তথাকথিত স্বাধীন সাংবাদিক নিশ্চিন্তে তাঁর ইউটিউব চ্যানেলে বলে দিতে পারতেন ব্যাপারটা স্রেফ শিক্ষাক্ষেত্রে নৈরাজ্য তৈরি করার জন্যে সিপিএমের চক্রান্ত, কে কে বামপন্থী ছাত্র সংগঠনগুলোকে পৃথিবীর কোথা থেকে কত টাকা চাঁদা দিয়েছে তার এক্সেল শীট বানিয়ে ‘বিগ এক্সপোজে’ বলে প্রকাশ করতে পারতেন। আর জি কর আন্দোলনে যেসব বামপন্থীরা কর্পোরেট হাসপাতালের চক্রান্ত, স্বাস্থ্যসাথী প্রকল্প বানচাল করার ষড়যন্ত্র, বিজেপিকে ক্ষমতায় আনার পরিকল্পনা দেখতে পাচ্ছিলেন তাঁরাও নিশ্চিন্তে শিক্ষার বেসরকারিকরণের চক্রান্ত, কন্যাশ্রী প্রকল্প বানচাল করার ষড়যন্ত্র, ২০২৬ সালে বিজেপিকে ক্ষমতায় আনার পরিকল্পনা নিয়ে সোশাল মিডিয়ায় লম্ফঝম্প করতে পারতেন। নিজেদের ছাত্রজীবনে মুখে চোখে বিপ্লবের স্বপ্ন মেখে যথেষ্ট অশান্ত ছাত্র আন্দোলন করে, এখন পুলিসের সত্যবাদিতায় এবং শিক্ষামন্ত্রীর সম্ভ্রম রক্ষায় দারুণ বিশ্বাসী হয়ে যাওয়া অনাবাসী ফেসবুক ইনফ্লুয়েন্সার সদগুরুরাও দীর্ঘ পোস্ট লিখতে পারতেন – যাদবপুরের চ্যাংড়ারা ছাত্র সংসদের নির্বাচন ইত্যাদি দাবি করে ক্যাম্পাসে যে ফ্যাসিবাদ প্রবেশের রাস্তা খুলে দিচ্ছে – এই মর্মে। এমনকি সাংস্কৃতিক কর্মী ব্রাত্যবাবুর নাটক, সিনেমার বন্ধুরাও টিভি ক্যামেরাকে বড় মুখ করে বলতে পারতেন ‘কোনো রাজনীতির মধ্যে না গিয়ে বলছি – একজন শিক্ষিত, রুচিবান মানুষ, যিনি আবার মাস্টারমশাইও, তাঁর উপরে এই আক্রমণ নিন্দাযোগ্য।’ এই জাতীয় কিছু। সব বানচাল করে দিল ওই মিলিমিটার।
একটা জলজ্যান্ত ছেলের উপর দিয়ে গাড়ি চালিয়ে দেওয়া হয়েছে। সেই দৃশ্য ভাইরাল হয়ে গেছে, অস্বীকার করা যাবে না। ফলে অরূপ বিশ্বাস বা দেবাংশু ভট্টাচার্যের মত সরাসরি তৃণমূল কংগ্রেস করেন না যাঁরা, তাঁদের এখন ঢোঁক গিলে মানবিকতা দেখাতেই হচ্ছে। নইলে ভবিষ্যতে নিরপেক্ষতা (সংবাদমাধ্যমের), ফ্যাসিবাদবিরোধিতা (বামপন্থী ও উদারপন্থীদের) ইত্যাদি ভাল ভাল জিনিস করি বলে দাবি করা যাবে না। না, মানে করতে কে আর আটকাত? কিন্তু নিজেদেরই একটু বিবেকে লাগত বোধহয়। তাই ওঁদের এই মহানুভবতা। বোধহয় অনেকের মহানুভবতার কারণ এটাও যে ইন্দ্রানুজ রাজ্যের কোনো বিরোধী রাজনৈতিক দলের ছাত্র সংগঠনের সদস্য নয়। সেটা হলে সংবাদমাধ্যম তো বটেই, বিকল্প বামেরাও অনেকে শিক্ষামন্ত্রীকে ঘিরে ধরা, তাঁর গাড়ির কাচ ভাঙা ইত্যাদির নিন্দা করতেন এবং একে ওই বিরোধী রাজনৈতিক দলটার ক্ষমতা দখলের ঘৃণ্য চেষ্টা বলে সাংবাদিক সম্মেলন করতেন। যেমনটা আর জি কর আন্দোলনের শেষ পর্বে আমরা দেখেছি।
দেখুন, সত্যি কথা সোজা করে বলাই ভাল। গণতন্ত্র-ফন্ত্র কে চায়? বিশেষ করে শিক্ষাঙ্গনে গণতন্ত্র তো বাবা-মায়েরা মোটেই চান না। ছেলেমেয়ে কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে যাবে লেখাপড়া করতে। ওটা রাজনীতি করার জায়গা নাকি? বাবা-মায়েরা বিলক্ষণ জানেন যে যাদবপুরে লেখাপড়া হয় না। ওখানে কেবল ছেলেরা গাঁজা খায়, মেয়েরা ছেলেদের সঙ্গে বসে হাফপ্যান্ট পরে সিগারেট খায়। কিন্তু সেসবও মেনে নেওয়া যেত যুগের ধর্ম হিসাবে। এসবের থেকেও বড় অপরাধ যেটা করে যাদবপুরের ছেলেমেয়েরা, সেটা হল রাজনীতি করে। তাও আবার মূলত বামপন্থী রাজনীতি। এই রাজনীতির ছোঁয়াচ বাঁচাতে অর্থনৈতিকভাবে সক্ষম বাবা-মায়েরা পাঁচতারা হোটেলের মত যেসব বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় হয়েছে ছেলেমেয়েদের সেখানে পাঠাতেই বেশি স্বচ্ছন্দ বোধ করেন। যাদবপুর, প্রেসিডেন্সির মত দু-একটা জায়গা বাদে পশ্চিমবঙ্গের কোনো কলেজে যে ২০১৭ সাল থেকে ছাত্র সংসদের নির্বাচন হয় না তাতে বাবা-মায়েরা তো বটেই, অনেক ছাত্রছাত্রীও খুশি। ভোট দেব পঞ্চায়েত, পৌরসভা, বিধানসভা, লোকসভার জন্যে। পড়াশোনার জায়গায় আবার ভোট কিসের? এইসব করতে গিয়েই তো বাম আমলে পশ্চিমবঙ্গে লেখাপড়া হত না, তাই না? এদিকে ২০১১ সাল থেকে কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্রমশ ছাত্র রাজনীতি তুলে দিয়ে কীরকম দুর্দান্ত পড়াশোনা হচ্ছে তা সমস্ত ছাত্রছাত্রী এবং অভিভাবক জানেন। আরও নিদারুণভাবে জানেন মাস্টারমশাই, দিদিমণিরা। বছরের পর বছর নির্বাচন না হওয়া মানে যে একনায়কতন্ত্র – সেকথা তাঁরা দেশের রাজনীতি সম্পর্কে মানতে রাজি। পশ্চিমবঙ্গের ভোটে হিংসা, রিগিং ইত্যাদি নিয়েও অসন্তুষ্ট হন। কিন্তু কলেজ ক্যাম্পাসে তাঁরা রাজনীতি চান না, ভোট-ফোট চান না। কেন? জিজ্ঞেস করলেই উত্তর পাওয়া যাবে ‘ওতে লেখাপড়ার ক্ষতি হয়। অশান্তি হয়।’ প্রথম যুক্তিটা সত্যি হলে যাদবপুর বছরের পর বছর ইউজিসি, ন্যাক, বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মূল্যায়নে কী করে দেশের সেরা প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে থাকে, সে প্রশ্নের উত্তর কিন্তু কারোর কাছে নেই। দ্বিতীয় যুক্তিটা ঠিক হলে অন্য শান্তিপূর্ণ কলেজগুলোতে ছাত্রসংখ্যা কমছে কেন, যাদের নাম খাতায় আছে তারাও ক্লাস করতে আসে না কেন, এসব প্রশ্নও কেউ নিজেকে করে না। ছাত্র রাজনীতির প্রায় পঞ্চত্বপ্রাপ্তি হওয়া পশ্চিমবঙ্গে যাদবপুরের মত জায়গাতেও খাতা না দেখেই নম্বর দিয়ে দেওয়া হচ্ছে, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে ১২০ জনের খাতা হারিয়ে যাচ্ছে কেন?
দীর্ঘ চেষ্টায় গোটা রাজ্যের মাথায় ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছে যে ছাত্রছাত্রীরা রাজনীতি করলে লেখাপড়া হয় না আর শ্রমিকরা রাজনীতি করলে শিল্প হয় না। ২০১১ সালের পর থেকে সরকারি প্রচেষ্টায় দুটোই প্রায় তুলে দেওয়া হয়েছে সফলভাবে। অথচ না লেখাপড়া হচ্ছে, না শিল্প হচ্ছে। এসব বললে উত্তর আসবে, অত সালে অমুক কলেজে ছাত্র ইউনিয়নের নির্বাচনে হিংসায় অমুকের প্রাণ গিয়েছিল, তমুকের চোখ নষ্ট হয়েছিল। তমুক কলেজে এসএফআই বাম আমলে তোলাবাজি করেছিল, তৃণমূল নতুন কিছু করছে না। ঠিক কথা। একথাও ঠিক যে বহু কারখানায় বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠনের নেতারা (শ্রমিক ইউনিয়ন কেবল সিপিএম বা অন্য বামপন্থী দলের নেই; কংগ্রেস, তৃণমূল, এমনকি আরএসএসেরও আছে। এটা আবার এ যুগের সবজান্তারা জানেন না) মালিকপক্ষের সঙ্গে তলে তলে আপোস করে শ্রমিকদের বারোটা বাজিয়েছেন। কিন্তু তার জন্যে ইউনিয়ন, রাজনীতি, গণতন্ত্র সব তুলে দেওয়া উচিত – এই প্রত্যয় তৈরি হলে মাথায় ব্যথা হওয়া মাত্রই ব্যথার ওষুধ না খেয়ে বা দীর্ঘকালীন মাথাব্যথার কারণ সন্ধানে ডাক্তারের কাছে না গিয়ে পত্রপাঠ মাথাটা কেটে ফেলা উচিত। তাতে অচিরেই পশ্চিমবঙ্গ স্কন্ধকাটাদের রাজ্যে পরিণত হবে। ইতিমধ্যেই দু-কান কাটাদের রাজ্যে পরিণত হয়েছে। তাই চার্জশিটে যার নাম লেখা আছে সে বুক ফুলিয়ে সভায় বলতে পারে – ওটা কার নাম, নির্দিষ্ট করে বলুক। টিভি স্টুডিওর সান্ধ্য আলোচনায় গভীর জল্পনা কল্পনা চলে – নামটা কার।
এমন রাজ্যে সরকার যে নিতান্ত কোণঠাসা না হলে কোনো আন্দোলনকে গ্রাহ্য করবে না, কোনো দাবিকেই পাত্তা দেবে না তাতে আশ্চর্যের কিছু নেই। আর জি কর আন্দোলন যখন তুঙ্গে, তখন জুনিয়র ডাক্তাররা মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকে কলেজগুলোতে ছাত্র সংসদের নির্বাচন করানোর দাবি করেছিলেন। সরকারপক্ষ থেকে অমনি প্রচার করা শুরু হয় ‘এই দেখুন, এরা আসলে ক্ষমতা চায়’। সেই প্রচার অনেকের পছন্দও হয়ে যায়। মানে গণতান্ত্রিক দেশে নির্বাচন চাওয়া মহা অপরাধ। তর্কের খাতিরে যদি ধরে নেওয়া যায় তারা ক্ষমতা চায় বলেই নির্বাচন চেয়েছিল, সেটাই বা অপরাধ হবে কেন? নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতা হস্তান্তর তো গণতন্ত্রের লক্ষণ। গায়ের জোরে ক্ষমতা দখল করতে তো চায়নি। অথচ বহু বিপ্লবীও সেইসময় সরকারি দলের এই অন্যায় প্রচারের প্রতিবাদ করেননি। ব্রাত্যবাবুর গাড়ির বেপরোয়া মেজাজ তখনই তৈরি হয়েছে। এমনিতেই আমাদের দেশে গণতন্ত্র সংকুচিত হতে হতে এমন জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছে যে শাসক দলগুলোর যে কোনো অন্যায় নিয়ে প্রশ্ন তুললেই তারা বলে দেয়, কাজটা করার পরেও তারাই জিতেছে। অতএব মানুষের তাদের উপর আস্থা আছে। সুতরাং ওটা অন্যায় নয়। তার উপর লেখাপড়া জানা নাগরিকরা যদি নিজেরাই নানা ভাষায় বলতে শুরু করেন যে কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদ, স্কুলের ম্যানেজিং কমিটি বা টিচার্স কাউন্সিল, সমবায় সংস্থা ইত্যাদি ছোট ছোট পরিসরেও নির্বাচন চাওয়াই অপরাধ – তাহলে তো সোনায় সোহাগা।
অর্থাৎ ছাত্রের উপর দিয়ে শিক্ষামন্ত্রীর গাড়ি চালিয়ে দেওয়ার ঔদ্ধত্য শাসককে আমরাই উপহার দিয়েছি বললে বিশেষ ভুল হয় না। বিরোধী দলগুলো অবশ্যই দায়হীন নয়। বিধানসভার বিরোধী দল বিজেপির স্বর যে যাদবপুর বা ছাত্র রাজনীতির প্রসঙ্গ উঠলে তৃণমূলের সঙ্গে মিশে যায় তা অতীতেও দেখা গেছে, গতকাল থেকেও দেখা যাচ্ছে। এটা কাকতালীয় নয়। জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের মত যেসব প্রতিষ্ঠানের ছাত্রছাত্রীরা আজও মূলত বামপন্থী সেইসব প্রতিষ্ঠানকে তৃণমূল কংগ্রেসের মত বিজেপিও শত্রুই মনে করে এবং সেগুলোর সাড়ে বারোটা বাজাতে চেষ্টার ত্রুটি রাখে না। মতপার্থক্য যা নিয়ে হয় সেটা হল যারা বাবুল সুপ্রিয়র মাথায় চাঁটি মেরেছে বা ব্রাত্যবাবুকে আঘাত করেছে তাদের কী বলা হবে তাই নিয়ে। নকশাল, নাকি আর্বান নকশাল, নাকি দেশদ্রোহী, নাকি পাকিস্তানি ইত্যাদি প্রভৃতি। অমন মতপার্থক্য তৃণমূলের নিজের ভিতরেও তো হয়। কাল থেকে যেমন কোনো তৃণমূল নেতা বলছেন এটা সিপিএমের বদমাইশি, কেউ বলছে অতিবামদের গুন্ডামি ইত্যাদি প্রভৃতি। বিধানসভা, লোকসভায় বারবার শূন্য পেলেও যাদের হাতে নাকি এই রাজ্যের প্রগতিশীলতার ঐতিহ্য রক্ষা করার দায়িত্ব, সেই সিপিএম বা বামফ্রন্টের দলগুলোর আবার অন্য সমস্যা। বিভিন্ন ক্যাম্পাসে তাদের ছাত্রনেতারা যতটা লড়াকু, বিশেষত অন্য বামেদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে, ক্যাম্পাসের বাইরে পার্টির ততটা লড়াই দেখা যায় না। তার উপর ইদানীং আবার সিপিএম নেতারা ডিপার্টমেন্টাল স্টোর সিস্টেম চালু করেছেন। ব্রিগেডের ডাক দেয় যুব সংগঠন বা খেতমজুরদের সংগঠন। যাদবপুরে ছাত্রের উপর দিয়ে মন্ত্রীর গাড়ি চলে গেছে বলে ছাত্র ধর্মঘটের ডাক দিয়েছে ছাত্র সংগঠন। স্কুলশিক্ষার অব্যবস্থা নিয়ে আন্দোলন করতে হলে সে আন্দোলন হয় শিক্ষক সংগঠনের ব্যানারে। পার্টির নাম, পার্টির পতাকা দেখা যায় কেবল সম্মেলনে আর সাংবাদিক সম্মেলনে। পার্টির ‘নতুন মুখ’, ‘তরুণ মুখ’ বলে খ্যাত নেতৃবৃন্দকে কলকাতায় বিভিন্ন ছায়াছবির প্রিমিয়ারে আর টিভি স্টুডিওতে রোজ দেখা যায়। কিন্তু মীনাক্ষী মুখার্জি বাদ দিলে কাউকে প্রত্যন্ত এলাকার আন্দোলনে নিয়মিত দেখা যায় না। ক্ষমতাসীন তৃণমূলে এত জটিলতা নেই। একটাই বুলডোজার, সব জায়গায় চালানো হয়।
পশ্চিমবঙ্গে এর বাইরেও তৃণমূলবিরোধী দল আছে। কয়েকটা কোণে কংগ্রেস আছে, যাদের কথা বলাই বাহুল্য। তাছাড়া কিছু বাম দল আছে। ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে যখন বামফ্রন্ট শূন্য হয়ে গেল, তখন এক ওয়েব ম্যাগাজিনে লিখেছিলাম, তাঁদের অনেককালের অভিযোগ, সিপিএম বামপন্থার বদনাম করছে। একটিবার সুযোগ পেলেই তাঁরা দেখিয়ে দিতে পারেন আসল বামপন্থা কী, কিন্তু সিপিএম তাঁদের জায়গা ছাড়ে না। এবার সিপিএম শূন্য হয়ে গেল, সামনে ফ্যাসিবাদের বিপদ। এইবার তাঁরা সিপিএমের জায়গাটা নিন, দেখিয়ে দিন। কিন্তু ২০২৬ আসতে চলল, তাঁরা জায়গা ভরাট করতে পারলেন না। এখনো বলছেন যা ঘটছে সবই সিপিএমের দায়িত্ব। সে দায়িত্ব পালনে সিপিএম যে ব্যর্থ তা নিয়ে সন্দেহের অবকাশ নেই। কিন্তু ওটুকু বলে ওঁরা সন্তুষ্ট নন। আবার সিপিএমের উপর অভিমান করাও চাই। ‘বিজেপিকে ফ্যাসিবাদী না বলে নয়া ফ্যাসিবাদী বললি কেন? এরম কল্লে খেলব না।’ আবার সিপিএমও বলে ‘তোরা মমতাকে লেসার ইভিল বলেছিলিস না? এখন কেন?’ মানে রবীন্দ্রনাথের কাছে কথাঞ্জলি পুটে ক্ষমা চেয়ে নিয়ে ব্যাপারটাকে এরকমভাবে বলা যায় যে ‘বাম ভাবে আমি দেব/বিকল্প ভাবে আমি/নিউট্রাল ভাবে আমি দেব/হাসে ফ্যাসিনামী।’
আরও পড়ুন আন্দোলন, ন্যায়বিচার, পুজো: একটি অরোম্যান্টিক বয়ান
পশ্চিমে গুজরাট থেকে শুরু হয়ে বিজেপির বিজয়রথ পূর্বে ওড়িশা পর্যন্ত এসে পড়েছে। পশ্চিমবঙ্গে ঢুকতে পারেনি বলে আমরা অনেকেই আহ্লাদিত। সেই ২০২১ সাল থেকেই ফ্যাসিবাদকে হারিয়ে দিয়ে বেশ একটা বিপ্লবী অনুভূতি হচ্ছে। এদিকে সেবার নির্বাচন পর্ব মিটতেই তৃণমূল থেকে বিজেপিতে চলে যাওয়া নেতারা গুটিগুটি ফিরে এসেছেন, ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে লড়াকু নেত্রী মমতা ব্যানার্জি ফিরিয়েও নিয়েছেন। আসানসোল দাঙ্গায় উস্কানি দেওয়া বাবুলবাবু তো তৃণমূলে এসে মন্ত্রীও হয়ে গেছেন। মুকুল রায় বিজেপিতে আছেন, না তৃণমূলে – সে আবার এক রহস্য। রাজ্যের রাজনৈতিক বিতর্কও উন্নয়ন থেকে ধর্মে সরে গেছে। অযোধ্যার রামমন্দিরের পালটা দীঘায় জগন্নাথের মন্দির হয়েছে সরকারি টাকায়। দুর্গাপুজোয় সরকারি সাহায্য তো ছিলই, কাশীর অনুকরণে কলকাতায় গঙ্গার ঘাটে সন্ধ্যারতিও চালু হয়ে গেছে। কোথাও নির্বাচন হলে অশান্তি শুধু নয়, দেখা যাচ্ছে নির্বাচন চাইলেও অশান্তি হয়। দেশের সবচেয়ে বড় সিনেমা শিল্প বলিউডকে দখল করে ফেলেছে বিজেপি, একের পর এক হিন্দুত্ব প্রোপাগান্ডা ছবি চলছে। অথচ তৃণমূল সাংসদ, বিধায়কে ভর্তি টলিউডে কিন্তু তার পালটা প্রোপাগান্ডা ছবি হচ্ছে না। বরং প্রবল মুসলমানবিদ্বেষী বয়ানে ছবি হয়েছে, তাতে যাদবপুরের তৎকালীন তৃণমূল সাংসদ অভিনয় করেছেন। গোয়েন্দা ব্যোমকেশকে ত্রিশূলধারী শিব সাজানো ছবি হয়েছে ঘাটালের তৃণমূল সাংসদের প্রযোজনায়, শ্রেষ্ঠাংশেও তিনি। উপরন্তু ইতিমধ্যেই রুগ্ন শিল্প হয়ে যাওয়া আঞ্চলিক ভাষার এই ইন্ডাস্ট্রির অবস্থা আরও কাহিল হচ্ছে তৃণমূল নেতাদের প্রতাপে। টেকনিশিয়ানদের গিল্ড আর নির্দেশকদের দ্বন্দ্বে গতবছর জুলাই মাসে একবার বেশ কয়েকদিন শুটিং বন্ধ ছিল। তারপর অক্টোবর মাসে ২৩৩ জন পরিচালক তৃণমূলের টলিপাড়ার নেতা স্বরূপ বিশ্বাসের বিরুদ্ধে মানহানির মামলা করেন। সম্ভবত তারই প্রতিক্রিয়ায় টেকনিশিয়ানদের গিল্ড কয়েকজন পরিচালকের ছবির কাজে বাগড়া দেয়। ফলে গতমাসে পরিচালকরা কর্মবিরতি পালন শুরু করেছিলেন, তবে তাঁদের একতার অভাবে ব্যাপারটা দাঁড়ায়নি। সমস্যা কিন্তু রয়েই গেছে।
এ রাজ্যে অনেকে তো মানেন ভারতে ফ্যাসিবাদ এসে গেছে এবং ফ্যাসিবাদী বলেই আরএসএসের বিরুদ্ধে লড়াইটা আসলে সাংস্কৃতিক লড়াই। তাঁদের অনেকেই আবার বলেন তৃণমূল ফ্যাসিবাদী নয়, কারণ খুব খারাপ শক্তি হলেও তাদের কোনো আদর্শ নেই। আদর্শ না থেকেই যদি ফ্যাসিবাদ যে যে লক্ষ্য পৌঁছতে চায় সেই সেই লক্ষ্যে পৌঁছে যায় কোনো দল, তাহলেও কি সে ফ্যাসিবাদী হয় না?
কে জানে বাপু! বাঙালি তাত্ত্বিক জাতি। স্বৈরাচারী না ফ্যাসিবাদী; ফ্যাসিবাদী না নয়া ফ্যাসিবাদী? এসব তাত্ত্বিক লড়াই আমরা সারাদিন করে যেতে পারি। করছিও তাই। কাজের কাজ তো কিছু করছি না। অবশ্য করতে যাবই বা কেন? আমাদের তো অরাজনৈতিক, নিরপেক্ষ থাকতে হবে। কলকাতা থেকে প্রকাশিত বাঙালির গর্বের প্রগতিশীল খবরের কাগজ দ্য টেলিগ্রাফ-এর মত, যারা আজ যাদবপুরের খবরের শিরোনামে লিখেছে ‘Bratya, student hurt in JU clash’। ভাবুন! যার হাতে কাচ ঢুকেছে সে-ও ‘hurt’, যে গাড়ির তলায় পড়েছে, মারা যেতে পারত, সে-ও ‘hurt’। তুলনাহীন নিরপেক্ষতা।
নাগরিক ডট নেট ওয়েবসাইটে প্রকাশিত
