রাজ্যের করোনা সামলানো দেখে হাসছে পাশবালিশ

পশ্চিমবঙ্গের প্রশাসন অতিমারির শুরু থেকেই নিঃসন্দেহ যে করোনা সবচেয়ে বেশি ছড়ায় স্কুল, কলেজ আর লোকাল ট্রেন থেকে।

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ছবি ইন্টারনেট থেকে

২০২০ সালের মে মাসে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেছিলেন “করোনাকে পাশবালিশ করে নিন।” অর্থাৎ করোনা থাকবে, করোনাকে নিয়েই চলতে হবে। তখন করোনার প্রথম ঢেউ চলছে, ভ্যাক্সিন আবিষ্কার হয়নি, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (World Health Organisation) থেকে শুরু করে কোনো দেশের কোনো দায়িত্বশীল সংস্থাই করোনার গতিপ্রকৃতি সম্পর্কে বিস্তারিত জানে না। ফলে মুখ্যমন্ত্রীর সেই মন্তব্য অনেককেই বিস্মিত করেছিল, মন্তব্যের সমালোচনা হয়েছিল, বিলক্ষণ হাসিঠাট্টাও হয়েছিল। কেউ কেউ অবশ্য চোখের সামনে গাদা গাদা মানুষকে মরতে দেখেও দৃঢ়প্রত্যয়ী ছিলেন, যে করোনা কোনো রোগই নয়, স্রেফ চক্রান্ত। এঁদের মধ্যে যাঁরা দক্ষিণপন্থী তাঁরা বলতেন চীনের চক্রান্ত, আর বামপন্থীরা বলতেন স্বৈরাচারী শাসকদের গণতন্ত্র ধ্বংস করার চক্রান্ত। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যে অতি বিচক্ষণ বলেই পাশবালিশের পরামর্শ দিয়েছেন, এ কথা সেইসময় জোর গলায় একমাত্র ওঁরাই বলেছিলেন। পরে যখন বিজ্ঞানীরা বললেন অন্য অনেক ভাইরাসের মত করোনাও ক্রমশ শক্তি হারিয়ে ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাসের মত হয়ে যাবে কিন্তু মরবে না, তখন ওঁরা সোল্লাসে বলেছিলেন, হুঁ হুঁ বাওয়া, আমরা তখনই জানতুম। মুখ্যমন্ত্রীকে নিয়ে হাসাহাসি করা? উনি কি না জেনে কথা বলেন?

এখন ২০২২ সালের জানুয়ারি মাস, সারা পৃথিবীতে ভ্যাক্সিন দেওয়া চলছে। এ দেশে কেন্দ্রীয় সরকারের প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী ৩১শে ডিসেম্বর, ২০২১ তারিখের মধ্যে সকলকে বিনামূল্যে ভ্যাক্সিন দেওয়া না হয়ে থাকলেও অনেক মানুষ ভ্যাক্সিন পেয়েছেন। কোনো কোনো দেশে বুস্টার ডোজও দেওয়া হচ্ছে। ইতিমধ্যে করোনার দ্বিতীয় ঢেউ বহু প্রাণ নিয়ে চলে গেছে, ওমিক্রন ভ্যারিয়্যান্টের হাত ধরে তৃতীয় ঢেউ এসে পড়েছে। অনেক দেশে দেখা যাচ্ছে ভাইরাসটা ছড়াচ্ছে আগের চেয়েও দ্রুত, কিন্তু ক্ষতি করার শক্তি আগের চেয়ে কম। আক্রান্তদের মধ্যে হাসপাতালে ভর্তি করতে হচ্ছে এমন মানুষের সংখ্যা কম, মৃত্যুহারও কম। তবে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এখনো সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছে, কারণ তাদের মতে আমাদের হাতে ওমিক্রন সম্পর্কে এখনো যথেষ্ট তথ্য নেই।৩ কিন্তু যা নিশ্চিত, তা হল শিশুদের করোনায় আক্রান্ত হওয়া বা হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার মত অসুস্থ হওয়ার সম্ভাবনা কম। ওমিক্রন বলে নয়, অতিমারির শুরু থেকেই দেখা গেছে খুব কম শিশুকেই কোভিড-১৯ কাবু করতে পারছে। তবু পশ্চিমবঙ্গের শিশুরা স্কুলে যাওয়ার অনুমতি পাচ্ছে না। অর্থাৎ করোনাকে পাশবালিশ করে নেওয়ার ক্ষমতা যাদের সবচেয়ে বেশি, তাদেরই বেরোতে দেওয়া হচ্ছে না। মুখ্যমন্ত্রীর ভাইরোলজি সম্বন্ধে সম্যক জ্ঞান সম্পর্কে যাঁরা দু বছর আগে নিঃসন্দেহ ছিলেন, এখন দেখা যাচ্ছে তাঁরাই স্কুল কেন খোলা হল না, যেটুকু খোলা হয়েছিল সেটুকুও কেন বন্ধ করে দেওয়া হল — তা নিয়ে বিস্তর রাগারাগি করছেন।

বাকি পৃথিবীর গবেষণা যা-ই বলুক, পশ্চিমবঙ্গের প্রশাসন অতিমারির শুরু থেকেই নিঃসন্দেহ যে করোনা সবচেয়ে বেশি ছড়ায় স্কুল, কলেজ আর লোকাল ট্রেন থেকে। লোকাল ট্রেন বন্ধ রেখে বা কমিয়ে দিয়ে রাস্তাঘাটের ভিড় কমানোর ভাবনা কতটা হাস্যকর তা আলাদা করে বলে দিতে হয় না। বরং স্কুল খোলা সম্পর্কে কিছু জরুরি কথা বলা দরকার।

১ নভেম্বর ২০২১ থেকে দিল্লিতে সমস্ত ক্লাসের জন্য ৫০% হাজিরার শর্তে স্কুল খুলে গিয়েছিল, গত কয়েকদিন করোনা আবার বৃদ্ধি পাওয়ায় ফের বন্ধ করা হয়েছে। একই সময়ে কোভিড বিধি মেনে খুলে গিয়েছিল কেরালার স্কুলগুলোও।৫ কর্ণাটকে প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণির ক্লাস শুরু হয়েছিল ২৫ অক্টোবর। সম্প্রতি আক্রান্ত বাড়তে থাকায় অনেক স্কুলে বড়দিনের ছুটি বাড়ানো হয়েছে। মহারাষ্ট্রে হাইস্কুলের ছাত্রছাত্রীদের ক্লাস শুরু হয়েছিল অক্টোবর মাসের গোড়াতেই, প্রাথমিক স্তরের শিশুদের ক্লাস শুরু হয়েছে ডিসেম্বরে।৭ পাশের রাজ্য ঝাড়খন্ডে নবম থেকে দ্বাদশ শ্রেণির ক্লাস চালু হয়ে গিয়েছিল ২ আগস্টেই, দীপাবলির পর থেকে নীচু ক্লাস এবং প্রাথমিক স্কুলগুলোও খুলেছে। বলাই বাহুল্য, প্রয়োজন হলে সব রাজ্যের সরকারই ফের স্কুল বন্ধ করার নির্দেশ দেবেন। কিন্তু লক্ষণীয় ব্যাপার হল, এতগুলো রাজ্যে সমস্ত শ্রেণির ছাত্রছাত্রীদের জন্য স্কুল খুলে দেওয়া সম্ভব হয়েছে, পশ্চিমবঙ্গে বিচক্ষণ মুখ্যমন্ত্রীর উপস্থিতি সত্ত্বেও হয়নি। পশ্চিমবঙ্গে ২০২১ সালের এপ্রিল-মে মাসে বিধানসভা নির্বাচন ছিল। শিক্ষক-শিক্ষিকাদের ভোটকর্মী হতে হবে বলে অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে ভ্যাক্সিন দেওয়া হয়েছিল। যাঁরা সে যাত্রায় ভ্যাক্সিন পাননি, তাঁদেরও সরকার চাইলে সত্বর ভ্যাক্সিন দেওয়ার ব্যবস্থা করতে পারতেন। তারপর স্কুল খোলা যেতে পারত। সেসব করা হয়নি। সুতরাং মনে করা অমূলক নয় যে দিল্লির আপ সরকার, মহারাষ্ট্রের শিবসেনার নেতৃত্বাধীন জোট সরকার, ঝাড়খণ্ডের জেএমএম-কংগ্রেস সরকার, এমনকি কর্ণাটকের বিজেপি সরকারেরও স্কুলশিক্ষা নিয়ে মাথাব্যথা আছে। পশ্চিমবঙ্গের তৃণমূল সরকারের নেই।

মুখ্যমন্ত্রী যে করোনাকে পাশবালিশ করে ফেলতে বলেছিলেন, সেটা কিন্তু স্রেফ কথার কথা নয়। অন্তত পশ্চিমবঙ্গে নয়। অনেক ক্ষেত্রেই করোনাকে বুকে জড়িয়েই এগোনো হয়েছে, যেমন নির্বাচন। ২০২০ সালের মার্চের পর থেকে স্কুল, কলেজ একটানা বন্ধ থেকেছে; এই কয়েক মাসের জন্য খুলে আবার বন্ধ হয়ে গেল। রাজ্যের সবচেয়ে বড় দুটো পরীক্ষা — মাধ্যমিক আর উচ্চমাধ্যমিক— বাতিল হয়ে গেছে। কিন্তু নির্বাচন হয়েছে যথাসময়ে, ভরপুর প্রচার সমেত। কেবল বিধানসভা নয়, সামান্য দেরিতে হলেও কলকাতা কর্পোরেশনের নির্বাচন হয়েছে। রাজ্যের বাকি কর্পোরেশন এবং ছোট পৌরসভাগুলোর নির্বাচনও পাশবালিশ নিয়ে খেলতে খেলতেই হয়ে যাবে নিঃসন্দেহে। বড়দিন, নতুন বছর উদযাপন করতে যারা পার্ক স্ট্রিটে ভিড় জমিয়েছিল, তাদের পাশবালিশের অধিকারকেও সরকার সম্মান দিয়েছেন। গঙ্গাসাগরের তীর্থযাত্রীদেরও পাশবালিশের অধিকার সুরক্ষিত।

স্কুল, কলেজ ফের বন্ধ করে দেওয়ায় যে ক্ষতি তার তবু কিছুটা পরিমাপ হয়েছে। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম, সমাজসেবী সংস্থার কল্যাণে এবং কিছুটা সোশাল মিডিয়ার দৌলতে আমরা জানতে পেরেছি বিশেষত গ্রামাঞ্চলে স্কুলশিক্ষার কী অপরিসীম ক্ষতি এর মধ্যেই হয়ে গিয়েছে। ক্লাসে ফার্স্ট হয় যে মেয়ে, তার বিয়ে হয়ে গেছে — এমন খবরও আমাদের অজানা নেই। কিন্তু যে ক্ষতির কোনো পরিমাপ হয়নি, হয়ত হবেও না, তা হল মাসের পর মাস লোকাল ট্রেন বন্ধ করে রাখার ক্ষতি। কেবল শহর ঘেঁষা মফস্বল নয়, দূর গ্রামেরও বিপুল সংখ্যক মানুষকে রুটিরুজির জন্য নিত্য কলকাতায় আসতে হয়। সেই আসা যাওয়ার প্রধান মাধ্যম হল হাওড়া, শিয়ালদা থেকে ছাড়া লোকাল ট্রেন। শুধু যাত্রীদের কথা বললেও সবটা বলা হয় না। এই লোকাল ট্রেনে হকারি করে দিন গুজরান হয় বহু মানুষের। লোকাল ট্রেন বন্ধ রাখা মানে তাঁদের জীবিকারও সর্বনাশ করা। মার্চ ২০২০ থেকে অক্টোবর ২০২১ পর্যন্ত কতজন লোকাল ট্রেনের হকার আত্মহত্যা করেছেন তার কোনো পরিসংখ্যান কখনো পাওয়া যাবে কিনা সন্দেহ। আর অনাহারে মৃত্যু বলে তো এ দেশে, এ রাজ্যে কিছু হয় না আজকাল। রাত দশটা অব্দি লোকাল ট্রেন চললে আশা করি হকাররা সপরিবারে অন্তত অর্ধাহারের উপযোগী রোজগার করতে পারবেন।

তা এসবের প্রতিকার কী? প্রতিকার নেই। কারণ কোনো সরকার যখন পাশবালিশের বেশি ভেবে উঠতে পারে না, তখন খাদ্য বস্ত্র বাসস্থান শিক্ষা স্বাস্থ্যের কথা বলার দায়িত্ব নিতে হয় বিরোধীদের। অধিকার কী তা যখন মানুষ ভুলে যায়, গণতন্ত্রে তা মনে করিয়ে দেওয়ার, অধিকার আদায়ের আন্দোলন করার দায়িত্ব বিরোধীদের। কিন্তু এ রাজ্যের বিরোধীরাও নিজ নিজ পাশবালিশ নিয়ে ব্যস্ত। প্রধান বিরোধী দল বিজেপির পাশবালিশ হল হিন্দুত্ব। স্কুল, কলেজ, লোকাল ট্রেন নিয়ে তাদের মাথাব্যথা নেই। উপস্থিত লোকলস্করও নেই, কারণ অনেকেই এসেছিল তবু আসে নাই। নির্বাচনের পর তৃণমূলে ফিরে গেছে। আর যে বিরোধীরা বিধানসভায় আসনের নিরিখে শূন্য হলেও এখনো কিছুটা লোকবলের অধিকারী, তাদের পাশবালিশ হল সোশাল মিডিয়া। ফেসবুক, টুইটার খুললেই সিপিএম নেতা, কর্মীদের পোস্ট দেখে জানা যাচ্ছে (১) স্কুল, কলেজ বন্ধ রাখা হীরক রাজার পাঠশালা বন্ধ করে দেওয়ার সমতুল্য এবং একই উদ্দেশ্যে করা; (২) পশ্চিমবঙ্গের গোটা গোটা প্রজন্ম নষ্ট হয়ে যাচ্ছে এর ফলে; (৩) লোকাল ট্রেন কমালে আরও বেশি ভিড় হবে, তাতে বরং সংক্রমণ ছড়ানোর সম্ভাবনা বাড়বে। আরও নানা কথা যা সকলেরই জানা আছে। বিকল্প বামেরাও ফেসবুক বিদীর্ণ করে এসব বলছেন, সঙ্গে থাকছে করোনা কীভাবে গণতন্ত্রের সর্বনাশ করেছে তার উল্লেখ।

উভয় পক্ষই যা বলছেন সঠিক বলছেন, কিন্তু মুশকিল হল সোশাল মিডিয়ায় ওসব লেখার জন্যে তো আমাদের মত অক্ষম নিষ্কর্মারা রয়েছে। বিরোধী রাজনীতির লোকেদের তো এগুলো নিয়ে রাস্তায় নামার কথা। কোথায় আইন অমান্য? কোথায় স্কুল খোলার দাবিতে নবান্ন অভিযান? কোথায় লোকাল ট্রেন যেমন চলছিল তেমন রাখার দাবি নিয়ে রাস্তায় বসে পড়া? সুজনবাবু, সেলিমবাবু, সূর্যবাবুরা মমতা ব্যানার্জির ভূমিকার নিন্দা করে এন্তার লাইক কুড়োচ্ছেন। দীপঙ্করবাবু সর্বভারতীয় নেতা, ফলে ওঁর নীরবতা নিয়ে অভিযোগ করা চলে না। উনি পশ্চিমবঙ্গ নিয়ে টুইট করার মধ্যেও যাননি গত কয়েক দিনে। নেতারা যে পথে চলেন, স্বাভাবিকভাবে কর্মীরাও সে পথেই চলবেন। ফলে সোশাল মিডিয়ায় সরকারের অগণতান্ত্রিকতা নিয়ে লেখালিখির পাশাপাশি বড়দিনে যারা ফুর্তি করতে বেরিয়েছিল তাদের নির্বুদ্ধিতা, ভোগবাদ ইত্যাদিকে আক্রমণ করা চলছে। যেন ক্ষমতা প্রয়োগ করে ফুর্তি স্থগিত করে দেওয়া সরকারের দায়িত্ব ছিল না, যেন সাধারণ মানুষ এতই অবাধ্য যে এ বছর সরকার পার্ক স্ট্রিটে সমস্ত উদযাপন বন্ধ রাখতে নির্দেশ দিলেও বৈপ্লবিক কায়দায় সান্টা ক্লসের টুপি পরে ঝাঁপিয়ে পড়ত। আরও মজার কথা, বিপ্লবীরা সেইসব দিন আনি দিন খাই লোকেদের কথা ভুলেই গেছেন, যাঁরা বছরের এই সময়টায় মানুষ ফুর্তি করতে বেরোয় বলে দুটো পয়সা রোজগার করতে পারেন।

রাজ্যের এই দুর্দশা দেখে কারোর হয়ত চোখে জল আসতে পারে, তবে হাসছে পাশবালিশ।

তথ্যসূত্র

১। https://bangla.hindustantimes.com/

২। https://timesofindia.indiatimes.com/world/rest-of-world/why-an-omicron-wave-may-not-be-as-severe-as-delta/articleshow/88498802.cms

৩। https://fortune.com/2021/12/30/omicron-less-dangerous-covid-too-soon-to-know-who-warns/

৪। https://www.livemint.com/news/india/all-schools-in-delhi-to-reopen-from-today-covid-19-guidelines-and-other-details-11635725583788.html

৫। https://timesofindia.indiatimes.com/home/education/news/kerala-schools-reopen-after-long-covid-19-break/articleshow/87463018.cms

৬। https://timesofindia.indiatimes.com/home/education/news/after-18-months-schools-reopen-across-maharashtra-for-physical-classes/articleshow/86745389.cms

৭। https://indianexpress.com/article/cities/pune/maharashtra-offline-classes-for-primary-schools-students-to-resume-december-1-7641081/

৮। https://www.indiatoday.in/education-today/news/story/jharkhand-schools-reopen-from-today-for-classes-9-to-12-1835746-2021-08-02

৯। https://www.news18.com/news/education-career/jharkhand-schools-to-open-and-close-at-8-am-and-noon-respectively-4557812.html

https://nagorik.net এ প্রকাশিত

লিয়েন্ডার মনে রাখতে পারেন জয়পাল সিং মুন্ডাকে

পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী অন্তত একটি নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি রক্ষা করেছেন। বলেছিলেন, খেলা হবে। তা সারাক্ষণই খেলা হচ্ছে। কেবল রাজনীতিবিদ নয়, সত্যিকারের খেলোয়াড়দেরও টেনে আনা হচ্ছে এই খেলায়। বাংলার ক্রিকেট দলের দুই প্রাক্তন অধিনায়ক লক্ষ্মীরতন শুক্লা আর মনোজ তিওয়ারি আগেই তৃণমূল কংগ্রেসের ঘর আলো করে ছিলেন। লক্ষ্মী মন্ত্রী হয়েছেন, মনোজ বিধায়ক। প্রবীণ ফুটবলার প্রসূন ব্যানার্জি সাংসদ হয়েছেন, অপেক্ষাকৃত নবীন দীপেন্দু বিশ্বাসও তৃণমূলের টিকিটে বিধায়ক হয়েছেন। পরে দলে থেকে কাজ করতে না পেরে বিজেপিতে চলে গেছেন। কোনোদিন হয়ত, প্রয়াত অশোক মিত্রের ভাষায়, সন্ধের কনে দেখা আলোয় ফিরেও আসবেন। কিন্তু গতকাল মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যা করেছেন, তার তুল্য ঘটনা খুব বেশি নেই। অলিম্পিকে ব্যক্তিগত ইভেন্টে পদক জেতা ভারতীয়ের সংখ্যা হাতে গোনা। ওই কৃতিত্ব প্রথম যিনি অর্জন করেছিলেন, সেই লিয়েন্ডার পেজকে মমতা নিজের পার্টিতে নিয়ে এসেছেন

লন্ডন অলিম্পিকে বোঞ্জ পদক জয়ী কুস্তিগির যোগেশ্বর দত্ত বিজেপিতে যোগ দিয়েছেন। বেজিং অলিম্পিকে ব্রোঞ্জজয়ী বক্সার বিজেন্দর সিং আবার কংগ্রেসে। এথেন্স অলিম্পিকে শুটিংয়ে রুপো জেতা রাজ্যবর্ধন সিং রাঠোর শুধু বিজেপিতে যোগ দিয়েছেন নয়, কেন্দ্রীয় মন্ত্রী পর্যন্ত হয়েছেন। কিন্তু এঁরা কেউই কংগ্রেস আর বিজেপির বাইরে যাননি। লিয়েন্ডারকে মমতা একটি আঞ্চলিক দলে নিয়ে এলেন।

এলেন তো, কিন্তু করবেন কী? কেবল অলিম্পিয়ান নয়, ভারতের ফুটবল, ক্রিকেট দলের বহু তারকাই রাজনীতিতে যোগ দিয়েছেন; মন্ত্রী, সাংসদ, বিধায়ক হয়েছেন। শচীন তেণ্ডুলকরের মত কেউ কেউ কোনো দলে যোগ না দিলেও রাজ্যসভার মনোনীত সদস্য হয়েছেন। কিন্তু করেছেন কী? দেশের মানুষের কী উপকার হয়েছে তাঁদের রাজনীতির ময়দানে আসায়? প্রাক্তন ক্রিকেটারদের রাজনীতিতে অবদান তো মনে করাই মুশকিল। মনসুর আলি খান পতৌদি খোদ ইন্দিরা গান্ধীর বিরুদ্ধে প্রার্থী হয়ে পরাজিত হয়েছিলেন। কুড়ি বছর পরে ইন্দিরার পার্টির টিকিটে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেও সুবিধা হয়নি। কীর্তি আজাদ, চেতন চৌহান রাজনীতিতে যোগ দিয়ে দিল্লির ক্রিকেটের রাজনীতিবিদদের উদরস্থ হওয়া পর্যন্ত বাঁচাতে পারেননি। মহম্মদ আজহারউদ্দিন সাংসদ হিসাবে স্মরণীয় কিছু করেছিলেন এমন দাবি নিজেও করবেন না। হালের নভজ্যোৎ সিং সিধু এখনো বেশি জনপ্রিয় ইন্ডিয়ান লাফটার চ্যালেঞ্জের বিচারক হিসাবে।

আরও পড়ুন ভারতীয় দলের জার্সি এখন বিজেপির সম্পত্তি

স্রেফ হিসাব রাখার স্বার্থে বাইচুং ভুটিয়া, পারগত সিংয়ের মত অনেকের নাম করা যায়। পদাধিকারী হওয়া যদি রাজনীতিতে সাফল্য বলে ধরা হয় তাহলে অবশ্য প্রাক্তন খেলোয়াড়দের অনেকেই সফল। হয়ত সেই সাফল্যই তাঁদের লক্ষ্য ছিল। তাই কোনো ছোট দলে নয়, হয় কংগ্রেসে বা বিজেপিতে যোগ দিয়েছিলেন। বড় দলের টিকিটে জেতার সম্ভাবনা বেশি, জিতলে মন্ত্রী হওয়ার সুযোগও আসতে পারে। সেই যুক্তিতে লিয়েন্ডার বঙ্গ তৃণমূলে যোগ দিলে না হয় বোঝা যেত। গোয়া বিধানসভায় তৃণমূলের টিকিটে জিতে কি মন্ত্রী হওয়া যাবে? ভবিষ্যৎ বলবে।

খেলা থেকে রাজনীতিতে গিয়ে কোনো দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য নিয়ে অধিকারের জন্য সংগ্রাম করেছেন, এমন লোকের কথা ভাবতে গেলে আজও কিন্তু একজনের কথাই মনে আসে — আদিবাসী মহাসভার প্রতিষ্ঠাতা জয়পাল সিং মুন্ডা। ১৯০৩ সালে তৎকালীন বিহারের খুঁটি জেলায় জন্মানো এই আদিবাসী নেতা ১৯২৮ অলিম্পিকে সোনা জয়ী ভারতীয় দলকে লিগ স্তরে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন, যদিও নকআউট ম্যাচগুলোতে খেলেননি। রাজনীতিতে যোগ দিয়ে স্বাধীনতার আগে থেকে তিনি আদিবাসীদের জন্য পৃথক রাজ্যের দাবি জানিয়ে গেছেন। সে দাবি পূর্ণ হয়েছে তাঁর মৃত্যুরও তিন দশক পরে। ভারতের সংবিধান সভার সদস্য হিসাবে এক স্মরণীয় বক্তৃতায় তিনি বলেছিলেন, আমার মত মানুষদের পুরো ইতিহাসটাই হল অনাদিবাসীদের দ্বারা অবিরাম শোষিত ও স্থানচ্যুত হওয়ার ইতিহাস। মাঝে মাঝে কিছু বিদ্রোহ আর বিশৃঙ্খলার ইতিহাস। তবু আমি পণ্ডিত জওহরলাল নেহরুর কথায় বিশ্বাস রাখছি। আপনাদের সবার এই কথায় বিশ্বাস রাখছি, যে আমরা স্বাধীন ভারতে একটা নতুন অধ্যায় শুরু করব, যেখানে সবার জন্য সমান সুযোগ থাকবে, আর কেউ অবহেলিত হবে না।

উত্তরবঙ্গ সংবাদে প্রকাশিত

দলে দলে দলবদলের খেলায় বাঙালি এখন দিব্যি দড়

পেপ বার্সেলোনার একগুচ্ছ খেলোয়াড়কে বায়ার্ন মিউনিখ বা ম্যাঞ্চেস্টার সিটিতে আনতে পারেননি। মুকুল দলে দলে বিজেপি নেতা, কর্মীকে তৃণমূলে আনছেন। আস্ত জেলা কমিটি তুলে আনছেন।

টিভিতে ইউরো দেখছেন? হিংসা হচ্ছে না? প্রায় সব মাঠেই দর্শক আছে। অথচ এ দেশে আমরা ভয়ে ভয়ে বাজার যাচ্ছি, ট্রেন চলছে না বলে বিস্তর কাঠখড় পুড়িয়ে কাজে যেতে হচ্ছে, তিতিবিরক্ত মানুষ স্পেশাল ট্রেন আটকে দিচ্ছেন, ছেলেমেয়েরা স্কুল কলেজ যাওয়া ভুলে গেছে, বড় বড় পরীক্ষা বাতিল, খেলাধুলোর তো প্রশ্নই নেই। ফাঁকা মাঠে ইন্ডিয়ান সুপার লিগ আর অর্ধেক ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগ ছাড়া ভারতে দেখার মত খেলা হয়নি সেই গত বছরের মার্চ থেকে। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের খেলাপাগল লোকেদের খেলা দেখার তেষ্টা যে কমেনি, বরং বেড়েছে — সেকথা রাজ্যের নেতৃবৃন্দ বিলক্ষণ জানেন। অতএব নির্বাচনে স্লোগান হল “খেলা হবে”। ঘ্রাণেন অর্ধভোজনম কথাটা যদি সত্যি হয়, তাহলে শ্রবণেন সোয়া ভোজনম তো বটে। সোয়াই বা কেন? এক জনসভায় তো মুখ্যমন্ত্রী হুইল চেয়ার থেকে দর্শকদের দিকে একটা সত্যিকারের ফুটবলই ছুঁড়লেন। হাড্ডাহাড্ডি খেলার মাঠে দর্শকদের প্রাণ যাওয়ার ইতিহাস সারা পৃথিবীতেই আছে। ইডেনে মোহনবাগান-ইস্টবেঙ্গল ম্যাচ দেখতে গিয়ে ১৬ জনের মৃত্যুর কথা এ রাজ্যের কে না জানে? এবারের নির্বাচনও ছিল মরণপণ লড়াই, অতএব বেশকিছু প্রাণ গেল।

তবে মাঠের খেলার সাথে রাজনীতির খেলার বড় তফাত হল মাঠের খেলার শুরু আছে, শেষ আছে। শেষ হলে জয়ী দলের অধিনায়ক কেন উইলিয়ামসন পরাজিত অধিনায়ক বিরাট কোহলির কাঁধে মাথা রাখতে পারেন, কোহলি ঠেলে সরিয়ে দেন না। আইসিসির কাছে অকারণ নালিশ ঠুকে ট্রফি ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টাও করেন না। কিন্তু রাজনীতির খেলার সূচনা, উপসংহারের ঠিক নেই। অনেকে ভাবেন কেবল নির্বাচনটুকু খেলা। “খেলা হবে” স্লোগান যাঁর মাথা থেকে বেরিয়েছিল, তিনিও হয়ত তাই ভেবেছিলেন। কিন্তু নির্বাচনের ফল বেরোনো মাত্রই পরাজিত বিজেপি বুঝিয়ে দিল, বিধানসভা নির্বাচনটা বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপ ফাইনালের মত ‘ওয়ান-অফ’ খেলা নয়, লম্বা সিরিজ।

খেলা হবে আর আনুষঙ্গিক উত্তেজনাগুলো থাকবে না তা কি হয়? সৌরভোত্তর বাঙালি না হয় ক্রিকেটের দিকে বেশি ঝুঁকেছে, কিন্তু তার সেরা খেলা এখনও ফুটবল। নইলে ইস্টবেঙ্গলকে আই এস এল খেলানোর জন্য মুখ্যমন্ত্রী মাঠে নামেন? ফুটবলের অন্যতম আকর্ষণ হল ‘ট্রান্সফার মার্কেট’। এই বিলিতি কথাটা হালের আমদানি। গত শতকের আশি-নব্বইয়ের দশক অব্দি যখন টিভির চ্যানেল ঘোরালেই ইউরোপের লিগ দেখা যেত না; সেইসময় আমরা বলতাম ‘দলবদল’। দিবারাত্র খবরের চ্যানেল ছিল না, ডিজিটাল মাধ্যম ছিল না, কিন্তু সকালের কাগজ তেতে থাকত দলবদলের খবরে। আজ পড়লাম কৃশানু-বিকাশ মোহনবাগানে যাচ্ছেন, কালই ছবি বেরোল “ইস্টবেঙ্গলের গোপন আস্তানায় আড্ডার আসরে অভিন্ন জুটি”। সঙ্গে হয়ত পল্টু দাসের উক্তি “ওরা ঘরের ছেলে, আমাদের ছেড়ে কোথায় যাবে?” মহমেডান ছাড়ছেন চিমা? সুদীপ চ্যাটার্জি কি দল বদলাবেন? কার অফার নিয়ে ভাবছেন শিশির ঘোষ? বিজয়ন-সত্যেন কি সত্যিই কেরালা পুলিস ছেড়ে মোহনবাগানে আসছেন? এইসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে খুঁজতে মাঠে বল পড়ার আগেই ফুটবল মরসুম শুরু হয়ে যেত। একসময় রীতিমত অপহরণের অভিযোগে জেরবার হয়ে আই এফ এ চালু করল টোকেন ব্যবস্থা। টোকেন যার, ফুটবলার তার। তখন আবার এক ক্লাবকে টোকেন দিয়ে ফেলে পুলিসে ডায়রি করা শুরু হল টোকেন হারিয়ে গেছে বা কেড়ে নেওয়া হয়েছে বলে।

আই এস এল যুগের তরুণ বাঙালির কাছে এসব গল্পকথা মনে হবে। কলকাতা লিগকে দুয়োরানি করে দিয়েছিল যে আই-লিগ, তাও তো এখন সবার পিছে সবার নীচে। কিন্তু মাঝবয়সী বা বার্ধক্যে উপনীত ফুটবলপ্রেমীরা নিশ্চয়ই গত কয়েক মাস স্মৃতিমেদুরতায় ভুগছেন। ভোটের মরসুমে ফিরে এসেছে তিরিশ-চল্লিশ বছর আগের উত্তেজনা। প্রত্যেকবার অমিত শাহ উড়ে আসার কয়েকদিন আগে থেকে চ্যানেলে, কাগজে, ফেসবুকে আলোচনা চলেছে কোন কোন তৃণমূল নেতা বিজেপিতে যাচ্ছেন, কোন কোন সাংসদ ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রাখছেন, কোন সিপিএম কাউন্সিলর কোন দিনের সভায় বিজেপিতে যোগ দেবেন। সন্দেহ নেই বিজেপির রিক্রুটারদের কাছে সে আমলের টুটু বসু, পল্টু দাস, মহম্মদ ওমররা নস্যি। তৃণমূল মন্ত্রিসভার সদস্য শুভেন্দু অধিকারী থেকে প্রবীণ সিপিএম নেতা অশোক ভট্টাচার্যের ডান হাত শঙ্কর ঘোষ পর্যন্ত কাকে না বঁড়শিতে গেঁথেছেন? তৃণমূলও হাত গুটিয়ে বসে ছিল না, তবে দলে টানা লোকেদের ধারে এবং ভারে তারা পিছিয়ে ছিল। সৌমিত্র খাঁয়ের ঘর ভাঙা ছাড়া আর তেমন সাফল্য কোথায়? তাছাড়া কৃশানু এক দলে, বিকাশ অন্য দলে থাকলে লাভ কী?

ফুটবলের দলবদল শেষ হয়ে যেত মরসুম শুরু হওয়ার আগেই। ‘মিড-সিজন ট্রান্সফার উইন্ডো’ ব্যাপারটা ইউরোপ থেকে শেখা হল অনেক পরে। কিন্তু সে তো উইন্ডো, মানে জানলা। নির্বাচনের পরে যা খুলে গেছে তা সিংহদুয়ার। ধীরেন দে, জ্যোতিষ গুহ পর্যন্ত ফেল পড়ে যাবেন মুকুল রায়ের সামনে। বাংলা সংবাদমাধ্যমে তাঁকে চাণক্য বলা হচ্ছে ইদানীং, অচিরেই মোরিনহো বা গুয়ার্দিওলার সাথে তুলনা করতে হবে। যদিও তাঁদেরও এমন চৌম্বকশক্তি নেই। পেপ বার্সেলোনার একগুচ্ছ খেলোয়াড়কে বায়ার্ন মিউনিখ বা ম্যাঞ্চেস্টার সিটিতে আনতে পারেননি। মুকুল দলে দলে বিজেপি নেতা, কর্মীকে তৃণমূলে আনছেন। আস্ত জেলা কমিটি তুলে আনছেন। খেলার আরও রোমহর্ষক হয়ে উঠছে। মুকুলবাবু বিধানসভার পাবলিক অ্যাকাউন্টস কমিটির চেয়ারম্যান হতে চলেছেন। বিরোধীরা আপত্তি করেছিলেন, ও পদটায় বিরোধী দলের বিধায়ককে বসানোই তো দস্তুর। কারণ শাসক দলে থাকা বিধায়ক সরকারি হিসাবপত্র পরীক্ষা করলে যে গলতি মাপ করে দেবেন না, তার নিশ্চয়তা নেই। জবাবে মুখ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন মুকুলবাবু তো বিজেপিরই বিধায়ক, তৃণমূল তাঁকে সমর্থন করবে কেবল।

পিকে ব্যানার্জি আর অমল দত্ত যখন যথাক্রমে ইস্টবেঙ্গল আর মোহনবাগানের কোচ ছিলেন, তখন উত্তেজনার পারদ চড়েই থাকত। ডায়মন্ড ম্যাচের আগে সে কি প্রবল বাদানুবাদ! একবার ভাবুন তো, যদি পিকে একইসঙ্গে দুই দলেরই কোচ হতেন? সাইডলাইনের এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্ত দৌড়ে বেড়াতেন, বাইচুংকে নির্দেশ দিতেন “অপেক্ষা করলে হবে না, বল কাড়তে হবে।” তারপর বাইচুং গোল করতেই বাসুদেব মণ্ডলকে বকতেন “হচ্ছেটা কী? তুই থাকতে বাইচুং সাপ্লাই পাচ্ছে কেন?” মুকুল রায় খেলাটাকে সেই উচ্চতায় নিয়ে গেছেন। অর্জুন শ্রীকৃষ্ণের বিশ্বরূপ দর্শন করেছিলেন, বাঙালি মুকুলবাবুর বিশ্বরূপ দেখছে। এদিকেও তিনি, ওদিকেও তিনি।

আরও পড়ুন রাহুলে না, বাবুলে হ্যাঁ: তৃণমূলের প্রকৃত এজেন্ডা নিয়ে কিছু প্রশ্ন

যে সময়ের কথা বলে লেখা শুরু করেছিলাম, সে সময় বাঙালির গুমোর ছিল, আর যা-ই হোক, ফুটবলে আমরা ভারতসেরা, কলকাতা হল ভারতীয় ফুটবলের মক্কা। সে গর্ব গোয়ায় গুঁড়িয়ে গেছে অনেককাল আগে। আরেক অহঙ্কার ছিল বাংলার রাজনীতি। এখানে মারামারি, খুনোখুনি হয়। কিন্তু আয়ারাম গয়ারাম সংস্কৃতি নেই, ওসব গোবলয়ের ব্যাপার। আজকের ট্রান্সফার মার্কেটে সে গর্বও ধূলিসাৎ।

অবশ্য রাজনীতি খেলা হয়ে দাঁড়ালে এসব হবেই। যে কোন ঘটনাই প্রথমবার ঘটলে চোখ কপালে ওঠে, দ্বিতীয়বার আর কেউ উচ্চবাচ্য করে না। ফলে খেলা যত এগোবে, নেতাদের যাওয়া আসা বাঙালিরও গা-সওয়া হয়ে যাবে। রবি শাস্ত্রী ধারাভাষ্য দেওয়ার সময় উত্তেজক ম্যাচের শেষে বলতেন, আসলে জয়ী হল খেলাটা। এ ক্ষেত্রেও যে খেলাটাই জিতবে তাতে সন্দেহ নেই। কারণ হারবে, হারছে সাধারণ নাগরিক।

উত্তরবঙ্গ সংবাদে প্রকাশিত

সোশাল মিডিয়ায় চোখ ধাঁধিয়েই বামেদের সর্বনাশ

ইদানীংকালে বামপন্থী কর্মীদের মধ্যে, বিশেষত তরুণদের মধ্যে, এক অদ্ভুত প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। তাঁরা মনে করেন সোশাল মিডিয়াকে নিয়ন্ত্রণ করা ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ।

এই স্তম্ভে আমার প্রথম লেখা ছিল সিপিএমের প্রচারে ব্যবহৃত টুম্পাসোনা প্যারডি নিয়ে। সেই ভিডিও সোশাল মিডিয়ায় ব্যাপক জনপ্রিয় হয়েছিল, ইউটিউবে কয়েক কোটি হিট হয়। কারো কারো অপছন্দ হলেও, শেয়ার, লাইক এবং ইউটিউব হিটের সংখ্যাই প্রমাণ করে বহু মানুষ সেই ভিডিও পছন্দ করেছিলেন। সেই ভিডিও তখন একাধিক কাগজে খবর হয়ে দাঁড়িয়েছিল। সিপিএম নেতারা দাবি করেছিলেন যুবসমাজের ভাষায়, সাধারণ মানুষের ভাষায় কথা বলার ক্ষেত্রে তাঁদের যে ঘাটতি, ওই ভিডিও তা পূরণ করার প্রচেষ্টা। সোশাল মিডিয়ায় সাফল্য প্রমাণ করে তাঁরা সফল। অর্থাৎ বিজ্ঞাপন সংস্থা যেভাবে বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে ক্রেতার কাছে পৌঁছতে চায়, বামপন্থীরাও সেইভাবে বার্তা পৌঁছে দিতে চেয়েছিলেন ভোটারদের কাছে। বিজ্ঞাপন সংস্থাগুলো নিজেদের ক্যাম্পেনের সাফল্য মাপে আর্থিক বর্ষের শেষে বিজ্ঞাপিত পণ্য বা পরিষেবার বিক্রির পরিসংখ্যান দেখে। সেই যুক্তি মানলে বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফল যেহেতু দেখাচ্ছে বামেদের হাত খালি, সেহেতু টুম্পাসোনাও যে ফ্লপ তা এবার মেনে নেওয়া দরকার। যে যুবসমাজকে ওঁরা ধরতে পেরেছেন বলে ভাবছিলেন, তাঁদের কত শতাংশ ভোট দিয়েছেন তা বিস্তারিত ফলাফল এলে তবেই বোঝা যাবে। কিন্তু রাজ্যের অধিকাংশ মানুষ যে তাঁদের প্রত্যাখ্যান করেছেন তা পরিষ্কার। এবার তাহলে ভাবার সময়, কোথায় ভুল হল? তীব্র বামবিরোধী মানুষও ভাবেননি যে স্বাধীন ভারতে বাংলার বিধানসভা নির্বাচনের সবচেয়ে খারাপ ফল বামেরা এবার করবে।

চুলচেরা বিশ্লেষণ করতে হলে অপেক্ষা করতে হবে সম্পূর্ণ ফলাফল হাতে নিয়ে পর্যালোচনা পর্যন্ত। কিন্তু প্রাথমিকভাবে যা বোঝা যাচ্ছে, তা হল জনগণের ভাবনা চিন্তার সাথে বামপন্থীদের চিন্তাভাবনার দুস্তর ফারাক। ইদানীংকালে বামপন্থী কর্মীদের মধ্যে, বিশেষত তরুণদের মধ্যে, এক অদ্ভুত প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। তাঁরা মনে করেন সোশাল মিডিয়াকে নিয়ন্ত্রণ করা ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ। টুম্পাসোনা নিয়ে আপ্লুত হওয়াও তারই প্রকাশ। সন্দেহ নেই যে সমস্ত আলোচনায় উঠে আসে বিজেপি কিভাবে হাজার হাজার হোয়াটস্যাপ গ্রুপকে ব্যবহার করে ভুয়ো খবর এবং নিজেদের বার্তা ঘরে ঘরে ছড়িয়ে দিয়ে ২০১৪ থেকে নির্বাচন জিতে চলেছে। কিভাবে টুইটারের হ্যাশট্যাগ যুদ্ধ চালিয়ে তাদের বহু শাখাবিশিষ্ট প্রোপাগান্ডা মেশিনারি ভোটারের মস্তিষ্কের দখল নেয়। এসবের বিরুদ্ধে লড়তে হবে ঠিক কথা, কিন্তু মানুষের সাথে নিবিড় যোগাযোগের যে কোন বিকল্প নেই, সেকথা বললে আজকালকার অনেক সিপিএম কর্মী বেশ রেগেই যান। “ওসব করে আজকাল আর জেতা যায় না” — এটা তাঁদের অনেকের প্রিয় বাক্যবন্ধ।

আরও পড়ুন বৃদ্ধতন্ত্র নয়, সিপিএমের সমস্যা মধ্যবিত্ততন্ত্র

আপত্তি উঠবে, যে তরুণ সিপিএম কর্মীরা কি গত বছরের লকডাউনের সময় থেকে শুরু করে উম্পুনের বিপর্যয় হয়ে এখনকার দ্বিতীয় কোরোনা ঢেউয়ে একেবারে নীচের তলার মানুষের পাশে থাকেননি? নিঃসন্দেহে থেকেছেন। তৃণমূল বা বিজেপির উপস্থিতি বরং সেখানে নগণ্য। এই মুহূর্তেও দলমত নির্বিশেষে বহু মানুষ অক্সিজেন সিলিন্ডার, অ্যাম্বুলেন্স বা হাসপাতালের বেডের দরকারে রেড ভলান্টিয়ার্সের খোঁজ করছেন। গ্রীন ভলান্টিয়ার্স বা স্যাফ্রন ভলান্টিয়ার্স বলে কিছুর অস্তিত্ব কারোর জানা নেই। কিন্তু সিপিএম নেতৃত্বের ভাবা প্রয়োজন, কর্মীদের এই অক্লান্ত পরিশ্রমের ফসল ভোট বাক্সে উঠছে না কেন? স্পষ্টতই মানুষ কোন ইস্যুকে ভোটের ইস্যু বলে মনে করেন, তা বুঝতে তাঁদের ভুল হচ্ছে। তাঁরা মনে করছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকারের বিরুদ্ধে ভোটারদের মধ্যে ব্যাপক অসন্তোষ আছে। অথচ দেখা গেল ভোটারদের কাছে প্রধান ইস্যু ছিল বিজেপি শাসনের ভয়। কর্মসংস্থান, পরিকাঠামো, দুর্নীতি — যেগুলো বামেদের ইশতেহার এবং নির্বাচনী প্রচারের কেন্দ্রে ছিল — তার চেয়ে ভোটারদের বেশি জরুরি মনে হয়েছে বিজেপি জিতলে এনআরসি, সিএএ-র বিপদের কথা। হয়ত এসএসসি পরীক্ষা দিয়ে চাকরি না পাওয়ার চেয়েও তরুণ ভোটারদের বড় বিপদ মনে হয়েছে অ্যান্টি রোমিও স্কোয়াডের হুমকিকে। সোশাল মিডিয়ার বিজেপির সাথে টক্কর দেওয়া বামেরা এসব বুঝতেই পারেননি, তাই মাটিতে দাঁড়িয়ে না পেরেছেন তৃণমূল কংগ্রেসের সাথে টক্কর দিতে, না পেরেছেন বিজেপির প্রতিপক্ষ হিসাবে বিশ্বাসযোগ্য হয়ে উঠতে।

উত্তরবঙ্গ সংবাদে প্রকাশিত

তরুণ কৃষক নেতা, শ্রমিক নেতারা কোথায়?

সিপিএমের মত দল যে পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভায় ২ থেকে বামফ্রন্টের অন্য দল সমেত শত মুখে বলার মত ২৩৫-এ পৌঁছেছিল, তার পিছনে কিন্তু ছিলেন জ্যোতি বসুর মত শ্রমিক নেতা এবং হরেকৃষ্ণ কোঙার, বিনয় চৌধুরীদের মত কৃষক নেতারা।

যৌবন রাজনীতির কাছে কী চায়? ক্ষমতা? নাম? যশ? অর্থ?

প্রশ্নগুলোর উত্তর বেশ কঠিন। সাধারণ বুদ্ধি বলে নিতান্ত সাধু সন্ন্যাসী না হলে এই জিনিসগুলো পাওয়ার ইচ্ছা সকলেরই থাকে। যত বেশি থাকলে তাকে লোভ বলা যায়, তত বেশি না থাকলেও, থাকে। অথচ যৌবন এসবের জন্যই রাজনীতিতে আসে, এ কথা যদি সত্যি হত, তাহলে পৃথিবী জুড়ে ইতিহাসের সমস্ত যুগেই সরকারবিরোধী, বা ব্যাপকার্থে প্রতিষ্ঠানবিরোধী রাজনীতিতে, যুবক-যুবতীদের বিরাট সংখ্যায় অংশগ্রহণ করতে দেখা যেত না। কারণ ও রাজনীতিতে পাওয়ার চেয়ে খোওয়ানোর সম্ভাবনা বেশি। ক্ষুদিরাম বসু, ভগৎ সিং-এর নাম তবু ইতিহাসে থেকে গেছে; বিভিন্ন দেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম এবং গণঅভ্যুত্থানের ইতিহাসে কত যুবক-যুবতী প্রাণ হারিয়েছে, পঙ্গু হয়ে গেছে, কারাবাস করেছে তার কোন হিসাব কোনদিন করা সম্ভব হবে না। তবুও যে কোন আন্দোলনে তাদের ঝাঁপিয়ে পড়া থামে না। এবং ব্যতিক্রমহীনভাবে যে কোন দেশেই বেশ কিছু ছেলেমেয়েকে আকর্ষণ করে বামপন্থী রাজনীতি। এ দেশে এ রাজ্যেও তাই। ষাট-সত্তরের দশকে অসংখ্য মার্কসবাদে আকৃষ্ট যুবক-যুবতী নকশাল আন্দোলনের প্রভাবে বা প্রকোপে খুন হয়েছে, বন্দী হয়েছে, লাঞ্ছিত হয়েছে, পঙ্গু হয়েছে। তারপরেও বিভিন্ন মতের বামপন্থী দলগুলোর প্রতি ঐ বয়সের ছেলেমেয়েদের আকর্ষণ রয়ে গিয়েছিল। কিন্তু নব্বইয়ের দশক থেকে এই দলগুলোর নেতৃত্বে তারুণ্যের অভাব দেখা দিল। সে অভাব সবচেয়ে বেশি করে চোখে পড়ত দেশের বৃহত্তম বাম দল সিপিএমের দিকে তাকালে। ইদানীং প্রবাহ বদলের লক্ষণ দেখা যাচ্ছে।

পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনের জন্য অধিকাংশ বামপন্থী প্রার্থীর নাম ঘোষিত হয়েছে। তরুণ মুখের ভিড়, ছাত্র যুব ফ্রন্টের প্রাধান্য। মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি এবং দোর্দণ্ডপ্রতাপ শুভেন্দু অধিকারীর মত ওজনদার প্রার্থীদের বিরুদ্ধে নন্দীগ্রাম আসনে দাঁড়াচ্ছেন ভারতের গণতান্ত্রিক যুব ফেডারেশনের নেত্রী মীনাক্ষি মুখোপাধ্যায়। সিঙ্গুরের মত প্রতীকি আসনে ভারতের ছাত্র ফেডারেশনের রাজ্য সম্পাদক সৃজন ভট্টাচার্য। এ ছাড়াও জহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র রাজনীতির জন্য প্রসিদ্ধ ঐশী ঘোষ আর দীপ্সিতা ধরও প্রার্থী তালিকায়। বৃদ্ধতন্ত্র বলে ব্যঙ্গ করা হয় যে দলগুলোকে, সেই দলের প্রার্থীদের মধ্যে এত নতুন এবং তরুণ মুখের ভিড় প্রমাণ করে ব্যঙ্গের অন্তর্নিহিত ইতিবাচক সমালোচনা বামেরা গ্রহণ করেছেন। পার্টির মস্তিষ্কে নতুন রক্ত সঞ্চালন করা যে দরকারি এবং সেই প্রক্রিয়া শুরু করা যে আশু প্রয়োজন, তা শেষ পর্যন্ত মেনে নিয়েছেন। গোটা ২০২০ জুড়ে বাম দলগুলো রাজ্য রাজনীতির আলোচনায় যতটা জায়গা অধিকার করে ছিল, এ বছরের প্রথম দু মাসেই যে তার চেয়ে বেশি প্রভাব বিস্তার করেছে, তার পিছনেও অল্পবয়সীরাই। ১১ই ফেব্রুয়ারি ছাত্র-যুবদের নবান্ন অভিযান দিয়েই বামেরা নতুন করে সবার কাছে নিজেদের উপস্থিতি জানান দিল। অনেকদিন পরে বাংলা টিভি চ্যানেলগুলোতে তৃণমূল-বিজেপি তরজার বাইরে কোন রাজনৈতিক খবর দেখা গেল। মইদুল ইসলাম মিদ্যার মৃত্যু নিয়ে সরকারকে আক্রমণ করার কাজেও এসএফআই, ডিওয়াইএফআইয়ের ছেলেমেয়েদেরই পুরোভাগে দেখা গেছে। তারপর ২৮শে ফেব্রুয়ারি ব্রিগেডের জনসভাতেও তরুণদের অভূতপূর্ব গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

তরুণ নেতৃত্ব তৈরি করার এই চেষ্টা কতটা দীর্ঘমেয়াদি সিদ্ধান্ত আর কতটা ভোটারদের মন পাওয়ার চেষ্টা তা সময় বলবে, কিন্তু এই প্রচেষ্টার অন্য একটা দিক আছে যা নিয়ে বামপন্থী সদস্য সমর্থকদের বড় একটা কথাবার্তা বলতে শোনা যায় না। ছাত্র, যুব ফ্রন্টের নেতাদের প্রবীণ নেতৃত্ব গুরুত্ব দিচ্ছেন, বিভিন্ন আন্দোলনে সামনের সারিতে তারা থাকছে দেখে একেবারে পাড়া স্তরের কর্মী, সমর্থক, সাধারণ ভোটার যে বেশ খুশি তা স্পষ্ট দেখা যায়। যিনি কোনদিন বামেদের ভোট দেননি, হয়ত ভবিষ্যতেও দেবেন না, তিনিও বলেন “যাক, নতুনদের জায়গা দিয়েছে। এক মুখ দেখতে দেখতে মানুষ ক্লান্ত।” হয়ত ঠিকই বলেন, কিন্তু যে প্রশ্নটা কেউ করে না, তা হল তরুণ নেতা মানে কী?

অন্যান্য দলে তরুণ নেতা বলতে বোঝানো হয় অল্পবয়সী, উচ্চশিক্ষিত, প্রায়শই সুদর্শন, সুবক্তা নেতাদের। কংগ্রেসের মত প্রাচীন এবং অভিজাতবংশীয় নেতায় পরিপূর্ণ দলে যেমন শচীন পাইলট, জ্যোতিরাদিত্য সিন্ধিয়া, মিলিন্দ দেওরাদের বোঝানো হত কিছুদিন আগেও। বিজেপিতে এখন তরুণ নেতা বলতে বোঝায় চমৎকার ইংরেজিতে বিষাক্ত বিদ্বেষপূর্ণ বক্তৃতা দেওয়ার ক্ষমতাসম্পন্ন বছর তিরিশেকের সাংসদ তেজস্বী সূর্যকে। বিহারে এখন তরুণ নেতা তেজস্বী যাদব। বছর দশেক আগে উত্তরপ্রদেশে ছিলেন অখিলেশ। ভারতের কমিউনিস্ট পার্টিগুলোতেও যেন ক্রমশ তরুণ নেতার মধ্যে ঐ গুণগুলোই খোঁজা হচ্ছে — বয়সে তরুণ কিনা, উচ্চশিক্ষিত কিনা, ছবিতে ভাল দেখায় কিনা আর ভাল কথা বলতে পারে কিনা। বলা বাহুল্য, এসব গুণ দোষের নয়। কিন্তু কমিউনিস্ট পার্টির এর সঙ্গে আরো একটা জিনিসের খোঁজ করার কথা, তা হল শ্রেণী। তিনি কোন শ্রেণী থেকে আসছেন তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ কোন শ্রেণীর মধ্যে কাজ করেন। যৌবন কোন শ্রেণী নয়, ছাত্র কোন শ্রেণী নয়।

তরুণ বামপন্থী মুখ বললেই কোন নামগুলো আমাদের মনে আসে? কানহাইয়া, ঐশী, দীপ্সিতা, সৃজন, শতরূপ; কয়েক বছর আগে পর্যন্ত ঋতব্রত। মানে ঘুরে ফিরে জহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়, প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয়, আশুতোষ কলেজের মত নামকরা প্রতিষ্ঠানের ছাত্রনেতারা। এমন ছেলেমেয়েদের রাজনীতিতে আসা নিঃসন্দেহে দেশের জন্য ভাল খবর, কিন্তু কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্ব জুড়েও কেবল এরাই থাকলে সমাজের নিপীড়িত শ্রেণী কোথায় প্রতিনিধিত্ব পাবে? তরুণ কৃষক নেতা হতে পারেন না? একশো দিন পেরিয়ে যাওয়া দিল্লী সীমান্তের কৃষক আন্দোলনে এত যে তরুণ মুখ দেখছি? এ রাজ্যেরই লোক হান্নান মোল্লার নেতৃত্ব দেওয়ার ক্ষমতা সারা দেশ জানতে পারল তিনি প্রবীণ বয়সে সারা ভারত কিষাণ সভার সাধারণ সম্পাদক হয়ে তিনি অন্য রাজ্যে চলে যাওয়ার পর। অথচ এ রাজ্যে কৃষক সভার আন্দোলন টের পাওয়া যায় না দীর্ঘকাল। তরুণ কৃষক নেতা পাওয়া যাবে কোথা থেকে?

আরও পড়ুন বৃদ্ধতন্ত্র নয়, সিপিএমের সমস্যা মধ্যবিত্ততন্ত্র

এক সিপিএম কর্মী বন্ধুর সাথে কথা হচ্ছিল কয়েক মাস আগে। সে বলছিল “উত্তরবঙ্গের চা বাগানে আমাদের শক্তি বেশ কিছুটা বেড়েছে গত পাঁচ বছরে। কৃতিত্ব যার, সেই ছেলেটা বছরে অন্তত ৩০০ দিন চা বাগানের শ্রমিকদের মধ্যেই পড়ে থাকে। বাংলা, হিন্দি, উর্দু, নেপালি — সব ভাষায় গড়গড় করে কথা বলতে পারে। শ্রমিকদের ঘরের লোক হয়ে গেছে। তাকে কেউ চেনে না, কারণ তার ফেসবুক লাইভ করার সময় নেই।” শুনে সন্দেহ জাগল, তবে কি তরুণ শ্রমিক নেতাও আছে, আমরা অভ্যাসের দাস বলে তাদের চিনি না? সে বিলাসিতা আমাদের মানায়, কমিউনিস্ট পার্টিকে মানায় কিনা সন্দেহ। শ্রমিক, কৃষকের প্রতিনিধি ছাড়া কী করে সংযোগ সম্ভব গরীব মানুষের সাথে? সেই সংযোগ ছিন্ন হয়েই তো ক্ষমতা হারানোর দশ বছরের মধ্যে ভোট শতাংশ এক অঙ্কে নেমে আসার বিপত্তি আর নির্বাচনের মুখে অনন্যোপায় জোটসঙ্গীর খোঁজ।

সিপিএমের মত দল যে পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভায় ২ থেকে বামফ্রন্টের অন্য দল সমেত শত মুখে বলার মত ২৩৫-এ পৌঁছেছিল, তার পিছনে কিন্তু ছিলেন জ্যোতি বসুর মত শ্রমিক নেতা এবং হরেকৃষ্ণ কোঙার, বিনয় চৌধুরীদের মত কৃষক নেতারা।

উত্তরবঙ্গ সংবাদে প্রকাশিত