আমার মায়ের দিদিমা ছিলেন ধর্মপ্রাণ হিন্দু বিধবা, নিয়মকানুন সবই পালন করতেন। কিন্তু কেউ মারা গেলে ঘটা করে শ্রাদ্ধশান্তি করা নাকি পছন্দ করতেন না। আমাদের পরিচিত মহলে প্রায়ই দেখা যেত, কোনো বৃদ্ধ বা বৃদ্ধা নিজের ছেলেমেয়ের কাছে চূড়ান্ত অবহেলার শিকার হলেন। কিন্তু তিনি মারা যেতেই তারা দুশো লোক খাইয়ে শ্রাদ্ধ করছে, দানধ্যান করছে, খাবারের তালিকায় রাখা হয়েছে মৃত মানুষটার প্রিয় খাবারদাবার। তখনই আমার মা স্মরণ করতেন ‘দিদিমা বলত, থাকতে দিলে না ভাতকাপড়, মরলে পরে দানসাগর।’ গত রবিবার (২৪ অগাস্ট) চেতেশ্বর পূজারা অবসর নেওয়ার সিদ্ধান্ত ঘোষণা করার পর থেকে প্রাক্তন ক্রিকেটার, পূজারার সহখেলোয়াড়, সাংবাদিক, ধারাভাষ্যকার এবং ক্রিকেটভক্তদের প্রতিক্রিয়া দেখে ঠিক ওই কথাটাই মনে পড়ছে।
এ প্রসঙ্গে ঠিক দশ বছর আগে, ২০১৫ সালের ২৮ অগাস্ট, কলম্বোয় শুরু হওয়া ভারত বনাম শ্রীলঙ্কা সিরিজের তৃতীয় টেস্টের কথা স্মরণ করা দরকার। সেই সিরিজের প্রথম দুটো টেস্টে পূজারাকে খেলানো হয়নি, কারণ প্রবল প্রতিভাবান রোহিত শর্মাকে টেস্ট দলে যেনতেনপ্রকারেণ থিতু করার চেষ্টা চলছিল। জীবনের প্রথম দুটো টেস্টে পরপর শতরান করার পর থেকে পাঁচ-ছয় নম্বরে ব্যাট করে তিনি আর সুবিধা করতে পারছিলেন না। শ্রীলঙ্কার মাটি ভারতীয় ব্যাটারদের পক্ষে কোনোদিনই দুর্জয় ঘাঁটি নয়, আর ততদিনে শ্রীলঙ্কার বোলিংও অনেকটা নিরামিষ। তাই রান করার দেদার সুযোগ পাওয়া যাবে ভেবে তিন নম্বরে খেলানো হয়েছিল রোহিতকে। গলে প্রথম টেস্টে তিনি করেন যথাক্রমে ৯ ও ৪; ভারত হারে। দ্বিতীয় টেস্টে রোহিতকে আগলাতে ফেরত পাঠানো হয় পাঁচ নম্বরে, তিনে আসেন অজিঙ্ক রাহানে। রোহিত করেন ৭৯ ও ৩৪। অজিঙ্ক প্রথম ইনিংসে ব্যর্থ হলেও, দ্বিতীয় ইনিংসে শতরান করেন। তার উপর ভারত জিতে যায়। ফলে তৃতীয় টেস্টেও পূজারার খেলার সম্ভাবনা ছিল না, যদিও তার আগের অস্ট্রেলিয়া সফরে অ্যাডিলেডে ৭৩ ও ২১ (রোহিত ৪৩ ও ৬) আর ব্রিসবেনে ১৮ ও ৪৩ (রোহিত ৩২ ও ০) করে এসেছিলেন। কিন্তু দ্বিতীয় টেস্ট চলাকালীনই প্রারম্ভিক ব্যাটার মুরলী বিজয়ের হ্যামস্ট্রিংয়ের চোট মাথাচাড়া দিল। আরেক প্রারম্ভিক ব্যাটার শিখর ধাওয়ানেরও চোট ছিল। তাহলে কে এল রাহুলের সঙ্গে ইনিংস শুরু করবেন কে? যুক্তি বলে – রোহিত, কারণ তাঁরই তো দলে জায়গা পাকা করা দরকার। তাছাড়া তিনি এই সিরিজেই আগে তিন নম্বরে ব্যাটও করেছিলেন। ক্রিকেট মহলের চিরকালীন যুক্তি হল – যে তিন নম্বরে ব্যাট করতে পারে, সে প্রয়োজনে ইনিংস শুরু করবে। এই যুক্তিতে রাহুল দ্রাবিড় পর্যন্ত একাধিকবার ইনিংস শুরু করেছেন। কিন্তু ওসব যুক্তি রোহিতের মত প্রতিভাবানদের জন্য নয়। তিনি সেই পাঁচ নম্বরেই খেললেন, পূজারাকে বলা হল – ওঠ ছুঁড়ি তোর বিয়ে। ওপেন করতে হবে। পূজারা এলেন, দেখলেন এবং নিজস্ব ভঙ্গিমায় জয় করলেন। সাড়ে সাত ঘন্টার বেশি ব্যাট করে অপরাজিত ১৪৫। ভারত করেছিল মোটে ৩১২, বাকি ব্যাটাররা সবাই ব্যর্থ, দ্বিতীয় সর্বোচ্চ স্কোর লেগস্পিনার অমিত মিশ্রের ৫৯। দ্বিতীয় ইনিংসে শূন্য রানে আউট হলেও, পূজারার ওই শতরানের জন্যই ভারত প্রথম ইনিংসে শতাধিক রানে এগিয়ে যায় এবং ম্যাচ ও সিরিজ জেতে।
এরপর কী হওয়ার কথা? ভূয়সী প্রশংসা এবং দলে জায়গা পাকা হয়ে যাওয়া। কিন্তু পূজারার বেলায় তা হয়নি। বাকিদের কথা ছেড়ে দিন, স্বয়ং সুনীল গাভস্কর ধারাভাষ্য দিতে দিতে কী বলেছিলেন মনে করিয়ে দিই। পূজারা যখন অর্ধশতরান করেন ওই ইনিংসে, তখন সঞ্জয় মঞ্জরেকর গাভস্করকে জিজ্ঞেস করেন যে, পূজারা কি এবার দলে পাকা হলেন? উত্তরে গাভস্কর বলেন, ওই দলে টিকতে থাকতে গেলে নাকি শ দেড়েক রান করতে হবে। গোটা দেশের ক্রিকেট বাস্তুতন্ত্র পূজারাকে এভাবেই দেখে এসেছে বরাবর। সেই কারণেই আজ তাদের পূজারার বিদায়ে চোখের জল ফেলা দেখে ‘ন্যাকা’ বলতে ইচ্ছে করছে। পূজারার ওই ইনিংসের কয়েক দিনের মধ্যেই মুকুল কেশবন কলকাতা থেকে প্রকাশিত দ্য টেলিগ্রাফ কাগজে একখানা উত্তর-সম্পাদকীয় প্রবন্ধ লেখেন। তাতে গাভস্করকে ওই মন্তব্যের জন্য তীব্র আক্রমণ করেন। মুকুল প্রশ্ন তোলেন ‘What team of titans was this? And what bastion of Bradmans was Pujara trying to breach?’ গোদা বাংলায় – কী এমন ভগবানদের দল এই ভারতীয় দলটা? কোন ব্র্যাডম্যানদের দুর্গে ঢোকার চেষ্টা করছিলেন পূজারা? মুকুলের এই তীক্ষ্ণতা অত্যন্ত যৌক্তিক, কারণ ওই ইনিংস খেলতে খেলতে পূজারার গড় ৫০ পেরিয়ে যায়। সেইসময় রোহিত আর রাহানে তো বটেই, বিরাট কোহলির গড়ও পঞ্চাশের নিচে ছিল।
ভারতীয় ক্রিকেটের সমস্যা হল, ওই কথাগুলো কোনো ক্রীড়া সাংবাদিক লেখেননি। মুকুলের মত কলাম লেখক, যাঁরা আরও নানা বিষয়ে লেখেন, এইসব গোলমাল চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিতে তাঁদেরই কলম ধরতে হয়। ক্রীড়া সাংবাদিকরা কখনো যে সংবাদমাধ্যমে চাকরি করেন তার স্বার্থে, কখনো বা নিজের কায়েমি স্বার্থে, যা সত্য তা বলেন না। জনপ্রিয় ক্রিকেটারদের সমালোচনা করেন না। যেসব ক্রিকেটার পরিশ্রমী কিন্তু গ্ল্যামারবিহীন কারণ সাদা বলের ক্রিকেটে সাফল্য নেই, পকেটে মোটা টাকার আইপিএল চুক্তি নেই, তাঁদের কয়েকটা ব্যর্থতাতেই ‘একে দিয়ে হবে না’ জাতীয় কথাবার্তা চালু করে দেন। পঞ্চাশ করলে বলেন একশো করতে হবে, একশো করলে বলেন দেড়শো করতে হবে, দেড়শো করলে বলেন ধারাবাহিক হতে হবে। যেন বাকিরা ভীষণ ধারাবাহিক। এই যে বিদায়ী প্রজন্মকে এখন ঘটা করে সোনার প্রজন্ম বলা হচ্ছে, তাদের একেকজনের ব্যাটিং গড় দেখুন – বিরাট (৪৬.৮৫), পূজারা (৪৩.৬০), রোহিত (৪০.৫৭), রাহানে (৩৮.৪৬)। সেরা ব্যাটারটির গড় প্রায় ৪৭। পঞ্চাশের উপরে দূরের কথা, ধারেকাছেও কেউ নেই। এই যদি সোনার প্রজন্ম হয়, তাহলে বলতে হবে সোনাও যা পেতলও তাই।
আসলে গত শতকের শেষ থেকেই যত দিন যাচ্ছে, ভারতে ক্রিকেট ব্যবসা হিসাবে তত ফুলে ফেঁপে উঠছে। ব্যবসা যত বড় হচ্ছে, তত খেলার যে অনিশ্চয়তা, খেলোয়াড়দের সাফল্য-ব্যর্থতার যে স্বাভাবিক উত্থান পতন – তা মেনে নেওয়া লগ্নিকারীদের পক্ষে অসম্ভব হয়ে দাঁড়াচ্ছে। ফলে দিনকে রাত, রাতকে দিন করতেই হবে। যে খেলোয়াড়কে দেখতে শুনতে ভাল, কুড়ি বিশের ক্রিকেটে বা একদিনের ক্রিকেটে (ক্রমশ এটার প্রভাবও কমে যাচ্ছে) সাফল্য আছে – তার তেলা মাথাতেই তেল দিতে হবে। সোজা কথায়, যে খেলোয়াড়কে ব্র্যান্ডে পরিণত করে তার হাত দিয়ে কাঁড়ি কাঁড়ি পণ্যের বিজ্ঞাপন করানো যায়, তার সাফল্যই সাফল্য এবং সে সামান্য সফল হলেও সেটাকে বেলুনের মত ফুলিয়ে বিরাট করে দেখাতে হবে। কেবল টেস্ট খেলা শান্তশিষ্ট ক্রিকেটার ব্র্যান্ড হিসাবে বিকোবে না। অতএব সে খেলার জোরে ব্র্যান্ডের সমকক্ষ হয়ে উঠতে পারে দেখলেই সাবধান হও। তার সাফল্যকে কমিয়ে দেখাও, ব্যর্থতাকে বাড়িয়ে দেখাও।
বিজ্ঞাপনদাতা নিয়ন্ত্রিত এই ব্যবস্থাই ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড, প্রাক্তন ক্রিকেটার, ক্রিকেট সাংবাদিক, বিশ্লেষক, ধারাভাষ্যকার – সকলকে চালায়। নিজের অজান্তে চালিত হন দর্শকরাও। ফলে পূজারা যখন খেলতেন, তখন অসম্ভব নায়কোচিত কিছু না করলে ক্রিকেটপ্রেমীরাও বিরক্তই হতেন তাঁর উপর। এখন সোশাল মিডিয়ায় যতজন পূজারাকে পুরনো যৌথ পরিবারের অল্প আয়ের বড়দার মত দেখছেন বা ‘দাঁত থাকতে দাঁতের মর্ম বোঝা যায় না’ কথাটা দিয়ে শ্রদ্ধাজ্ঞাপন করছেন, তাঁরাও অনেকে পূজারা দুটো ম্যাচে ব্যর্থ হলেই বলেছেন – এটাকে বাদ দেয় না কেন?
কারণ গোটা বাস্তুতন্ত্র আমাদের মাথায় ঢুকিয়েছে, বাদ দিতে হলে আগে পূজারাকেই বাদ দেওয়া উচিত, যেহেতু তাঁর ‘ইনটেন্ট’ নেই। কথাটা ভারতীয় ক্রিকেটে চালু করেছিলেন সাদা বলের ক্রিকেটে আমাদের দুটো বিশ্বকাপ জেতানো অধিনায়ক মহেন্দ্র সিং ধোনি, পরে ওটাকে মুদ্রাদোষে পরিণত করেন বিরাট আর তাঁর দাদাভাই রবি শাস্ত্রী। রান করলে কি করলে না, হারলে না জিতলে – সেসব বড় কথা নয়। বড় কথা হল ‘ইনটেন্ট’ আছে কিনা। একথা যে কতবার অধিনায়ক থাকার সময়ে বিরাট আর কোচ হিসাবে শাস্ত্রী বলেছেন তার ইয়ত্তা নেই। লক্ষ করলে দেখা যাবে, হারলেই ওই শব্দটা বেশি ব্যবহার করতেন তাঁরা। কারণ ওরকম গালভরা কথা বললে হারের কারণ নিয়ে কথা বলা এড়িয়ে যাওয়া যায়, টিম ম্যানেজমেন্টের দোষত্রুটি ঢেকে ফেলা যায়। আর ধারাভাষ্যকার হয়ে যাওয়া প্রাক্তন ক্রিকেটাররা তো বহুকাল হল ‘রাজা যত বলে পারিষদ দলে বলে তার শতগুণ’ নীতি নিয়েছেন, যেহেতু ভারতে ক্রিকেট সম্প্রচারের দায়িত্ব পুরোপুরি বিসিসিআইয়ের হাতে এবং তাদের অলিখিত শর্ত হল – ভারতীয় দলের বা কোনো ক্রিকেটারের সমালোচনা করা যাবে না। টিম ম্যানেজমেন্ট যা বলবে তা-ই শিরোধার্য। তাই তাঁরাও দিনরাত ‘ইনটেন্ট’ নিয়ে হাত-পা নেড়ে বাণী দিয়ে গেছেন। তার উপর আছে সোশাল মিডিয়া এবং বিরাট, রোহিতদের মত তারকাদের জনসংযোগ মেশিনারি। ফলে পূজারা আরও কোণঠাসা হয়েছেন। এতকিছু সামলে তিনি যে শতাধিক টেস্ট খেলে গেলেন, কেবল তার জন্যেই একখানা প্রণাম প্রাপ্য।
সোজা কথাটা সোজা করেই বলা দরকার। বিরাট, রোহিত, রাহানে, পূজারাদের ব্যাটিং প্রজন্ম মোটেই সোনার ছিল না, ছিল মাঝারি মানের। তাঁদের সময়ে ভারতের বোলিং অতীতের বহু বোলিং আক্রমণের চেয়ে বৈচিত্র্যময় এবং উন্নত হওয়ায় বেশকিছু স্মরণীয় জয় পেয়েছে দল। আবেগ বাদ দিয়ে দেখলে এটুকুই সত্যি। যে ব্যাটিং লাইন আপে একজনের গড়ও পঞ্চাশের উপরে নয়, সে ব্যাটিং নিজের সময়ের বিশ্বসেরাও নয়। ভারতীয় দলের খেলা বেচার জন্যে ওভাবে ব্র্যান্ডিং করা দরকার ছিল, তাই করা হয়েছে। ভারতীয় ব্যাটিংয়ের সোনার প্রজন্ম ছিল শচীন তেন্ডুলকর (৫৩.৭৮), রাহুল দ্রাবিড় (৫২.৩১), বীরেন্দ্র সেওয়াগ (৪৯.৩৪), ভিভিএস লক্ষ্মণ (৪৫.৯৭), সৌরভ গাঙ্গুলিদের (৪২.১৭) প্রজন্ম। ক্রিকেটের যে কোনো যুগে যে কোনো দলে প্রথম দুজন থাকলেই অধিনায়ক বলবেন – আর যে ইচ্ছে খেলুক, চিন্তা নেই। তার সঙ্গে আবার শুরুতে মারকুটে সেওয়াগ, নিচের দিকে বিপদের দিনে ঠিক খেলে দেওয়া সৌরভ আর লক্ষ্মণ। অথচ পূজারাদের প্রজন্মের দিকে তাকালে দেখা যাবে – সৌরভ, লক্ষ্মণ যেসব সীমাবদ্ধতার কারণে আরও বড় ব্যাটার হতে পারেননি, ঠিক সেগুলোই বিরাট-রোহিত-রাহানে-পূজারাদের ছিল। এঁরা কেউ সব দেশে প্রায় সমান সফল নন। নিউজিল্যান্ডের মাটিতে চারজনেই মোটের উপর ব্যর্থ, ইংল্যান্ডের রেকর্ডও সুবিধাজনক নয়। পূজারার রেকর্ড তো বেশ খারাপ (মাত্র একটা শতরান, গড় ২৯), বিরাটের রেকর্ড তত খারাপ দেখায় না ২০১৮ সালের সফরের সৌজন্যে। একমাত্র অস্ট্রেলিয়ায় এঁরা খুব সফল, যেমন সফল ছিলেন লক্ষ্মণ।
ফলে এই যে পূজারা অবসর নেওয়ার পরে তাঁকে অতিমানবিক চেহারা দেওয়া হচ্ছে, কাব্যি উপচে পড়ছে – এর কোনো যুক্তি নেই। এটা করা হচ্ছে, কারণ এই মুহূর্তে পূজারাকে নিয়ে গদগদ হয়ে কিছু লিখলেই প্রচুর ক্লিক, হিট, লাইক পাওয়া যাচ্ছে। অর্থাৎ পূজারা এখন ‘ট্রেন্ডিং’। এই চক্করে টেস্ট ক্রিকেটের সর্বোচ্চ রান সংগ্রহকারীদের তালিকায় পাঁচ নম্বরে থাকা রাহুলের (১৩,২৮৮) সমগোত্রীয় বলা হচ্ছে পূজারাকে (৭,১৯৫)। এতে পূজারার গৌরব বাড়ে না, দৈত্যাকৃতি রাহুলকে বনসাই করার অপচেষ্টা হয়। পূজারা সম্প্রতি ভারত-ইংল্যান্ড সিরিজে ধারাভাষ্য দিলেন। তাতে দেখা গেল শাস্ত্রীসুলভ চড়া গলায় আবেগমথিত কথাবার্তা বলার লোক তিনি নন, বরং অল্প কথায় গভীর বিশ্লেষণই তাঁর শক্তি। সুতরাং মনে হয়, তিনিও জানেন যে রাহুলের সঙ্গে তাঁর একটাই মিল – দুজনেই তিন নম্বরে ব্যাট করেছেন দীর্ঘ সময়। বাকি সব অতিকথন।
এতক্ষণে নব্য পূজারাভক্তরা নির্ঘাত আস্তিন গোটাচ্ছেন, বলছেন ‘পূজারা খতরে মে হ্যায়’। দাঁড়ান, অত চটবেন না। পূজারা একেবারে কিছুই নন – একথা বলছি না। টেস্ট ক্রিকেটে সাত হাজার রান করাও কম কথা নয়। কিন্তু মুশকিল হল, গা জোয়ারি তুলনা এবং অতিকথনে ওই সাত হাজার রানের দাম কমে যায়। পূজারাকে তাঁর সমসাময়িক ভারতীয় ব্যাটারদের সঙ্গে তুলনা করলেই সঠিক গুরুত্ব মালুম হয়।
গত কয়েক দিন ধরে মূলত তাঁর একখানা ইনিংস নিয়েই যাবতীয় ভজন পূজন চলছে। সোশাল মিডিয়া থেকে খবরের কাগজ – সর্বত্র চোখে পড়ছে তাঁর হেলমেট পরিহিত, বাউন্সার এড়াতে ঈষৎ ঝুঁকে পড়া ছবি। সে ছবিতে চিহ্নিত করা – শরীরের কোথায় কোথায় বল লেগেছিল, তবু তিনি আউট হননি। অর্থাৎ সেই ২০২১ সালের ১৫-১৯ জানুয়ারির গাব্বা টেস্টের কথা হচ্ছে। ওই ইনিংস অবশ্যই অবিস্মরণীয়। সোয়া পাঁচ ঘন্টা ব্যাট করে, গায়ে ডজনখানেক আঘাত সহ্য করে অমূল্য ৫৬ রান করেছিলেন চতুর্থ ইনিংসে ৩২৮ রান তাড়া করতে নেমে। কিন্তু ভাগ্যিস শুভমান গিল (৯১) আর ঋষভ পন্থ (অপরাজিত ৮৯) ছিলেন। টেস্টটা ড্র হয়ে গেলে বা ভারত হেরে গেলে পূজারার ব্যথার পূজা ব্যর্থ হত, আজ কেউ ওই ইনিংসের কথা বলত না। কারণ ভারতীয় ক্রিকেট বাস্তুতন্ত্র, আমি-আপনিও যার অঙ্গ, এই ধরনের ইনিংসকে তার গুণমানের জন্য পাত্তা দেয় না।
বিশ্বাস হচ্ছে না? তাহলে বলুন দেখি হনুমা বিহারী এখন কোথায়? ঠিক তার আগের টেস্টেই আহত অবস্থায়, অসহ্য যন্ত্রণা নিয়ে হেরে যাওয়া ম্যাচ প্রায় তিন ঘন্টা ব্যাট করে বাঁচিয়ে দিয়েছিলেন বিহারী। নইলে ব্রিসবেনে সিরিজ জেতার সুযোগ পাওয়াই জেতা যেত না। অথচ ওই ম্যাচের পর মাত্র চারটে টেস্টে খেলানো হয়েছিল বিহারীকে। সেগুলোতে যে একেবারে রান করতে পারেননি তাও নয়। অথচ তিনি আজ বিস্মৃত। আসন্ন রঞ্জি ট্রফিতে ত্রিপুরার হয়ে খেলবেন ঠিক করেছেন, অর্থাৎ বুঝে গেছেন যে আর জাতীয় দলে ফেরা হবে না। সিডনির সেই ইনিংসে ব্যথায় নড়তে পারছিলেন না বিহারীর সঙ্গী অশ্বিনও। তবুও দু ঘন্টার বেশি ব্যাট করে গেছেন, অস্ট্রেলিয়ার পূর্ণ শক্তির বোলিং আক্রমণ তাঁকে আউট করতে পারেনি। তারপরেও টিম ম্যানেজমেন্টের বিশ্বাস হয়নি যে অশ্বিনের ব্যাটিং শক্তি রবীন্দ্র জাদেজার চেয়ে খারাপ নয়। অশ্বিনকে বিদেশের মাঠে সেই বাইরেই বসে থাকতে হয়েছে। সম্প্রতি নিজের পডকাস্টে রাহুলের প্রশ্নের উত্তরে স্পষ্টাস্পষ্টি অশ্বিন বলেও দিয়েছেন যে ব্যাপারটা অসহ্য হয়ে দাঁড়াচ্ছিল বলেই তিনি অবসর নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেন। এই হল ভারতীয় ক্রিকেট। এখানে পূজারার ওই ইনিংস মনে রাখা হত ম্যাচ না জিতলে?
উপরন্তু চারপাশ দেখে মনে হচ্ছে, যেন ওই ইনিংস আর ওই সিরিজ ছাড়া আর বলার মত কিছু কোনোদিন করেননি পূজারা। অথচ এই লেখা শুরুই করা গেছে এমন একটা ইনিংসের কথা দিয়ে, যেখানে দলের ছাই ফেলতে ভাঙা কুলো পূজারা জেতার মঞ্চ তৈরি করে দিয়েছিলেন। ইংল্যান্ডের মাটিতে পূজারার একমাত্র শতরানটাও কিন্তু প্রতিকূল পরিস্থিতিতে ব্যাটিং বিপর্যয়ের মধ্যে একা কুম্ভ হয়ে লড়ার দৃষ্টান্ত। ২০১৮ সালে সাদাম্পটনে সেই ইনিংসে ভারতের তাবড় ব্যাটাররা অনিয়মিত স্পিনার মঈন আলিকে পাঁচ উইকেট দিয়ে বসেন। মাত্র ৮৪.৫ ওভারে ২৭৩ রানে অল আউট হয়ে যায় দল, পূজারা অপরাজিত ১৩২। তাঁর পরে সর্বোচ্চ রান ছিল অধিনায়ক বিরাটের – ৪৬। ম্যাচটা অবশ্য দল হেরেছিল।
পূজারার আরও বড় কীর্তি কী?
অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে তাঁর রান এবং শতরান বিরাটের চেয়ে কম হলেও, গড় প্রায় সমান (বিরাট ৪৬.৭২; পূজারা ৪৭.২৮)। কিন্তু সেটা বড় কথা নয়। কে কত বড় খেলোয়াড় তা নিয়ে আলোচনা করতে গেলে ভাবতেই হয় কার খেলা ম্যাচের ফলাফলকে কতখানি প্রভাবিত করেছে। আজকাল ‘ইমপ্যাক্ট প্লেয়ার’ কথাটাও খুব চালু। তা অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে পূজারা কিন্তু বিরাটের চেয়েও বড় ইমপ্যাক্ট প্লেয়ার। বিরাটের অস্ট্রেলিয়ায় সেরা সিরিজ ছিল ২০১৪-১৫ মরশুমে। সেবার তিনি চারটে টেস্টে চারখানা শতরান করেন। সেই সিরিজ ভারত হেরেছিল। ২০১৮-১৯ মরশুমে ভারত যখন জিতল, বিরাটের গড় ছিল ৪০.২৮। পার্থে যে ম্যাচে শতরান করেন, সে ম্যাচে ভারত প্রায় দেড়শো রানে হেরে যায়। সেই সিরিজে রানের পাহাড় গড়েছিলেন পূজারা। চার ম্যাচে ৫২১ রান (গড় ৭৪.৪২; শতরান ৩, অর্ধশতরান ১)। শেষ টেস্টে সিডনিতে শুরুতেই ভারত অস্ট্রেলিয়ার ঘাড়ে ৬২২ রানের গন্ধমাদন চাপিয়ে দিতে পেরেছিল পূজারার ম্যারাথন ১৯৩ রানের সৌজন্যে (সঙ্গে ঋষভের স্বভাবসিদ্ধ অপরাজিত ১৫৯)। সেই ইনিংসটা নিয়েও বিশেষ কথা হচ্ছে না।
আরও পড়ুন শীর্ষে উঠেও গলি-ক্রিকেট না ভোলা অশ্বিন
২০২০-২১ মরশুমে যখন ভারত দ্বিতীয়বার সিরিজ জেতে, তখন বিরাট প্রথম টেস্টের পরে আর খেলেননি। অ্যাডিলেডের দিন-রাতের সেই ম্যাচে প্রথম ইনিংসে ৭৪ রান করেছিলেন, দ্বিতীয় ইনিংসে ৩৬ অল আউটের লজ্জার মধ্যে ৪। এই সিরিজে পূজারার রান দেখলে মনে হবে সাধারণ (চার টেস্টে ২৭১; গড় ৩৩.৮৭; অর্ধশতরান ৩)। কিন্তু অস্ট্রেলিয়াকে তিনি পরাস্ত করেছিলেন ঘন্টার পর ঘন্টা ব্যাট করে। গোটা সিরিজে ব্যাট করেছিলেন ১,৩৬৬ মিনিট, অর্থাৎ ২২ ঘন্টার বেশি। সেবারে খুব বেশি রান ওঠেনি, ভারতের হয়ে সবচেয়ে বেশি রান করেছিলেন ঋষভ – পূজারার থেকে মাত্র তিন রান বেশি। শতরান করেছিলেন একমাত্র রাহানে। কিন্তু ভারতের জেতার পিছনে পূজারার ৯২৮ বল খেলার ভূমিকা যে কতখানি, তা এবারের অস্ট্রেলিয়া সফরের মুখে স্পষ্ট করে দিয়েছেন স্বয়ং জশ হেজলউড। তিনি বলেছেন – পূজারা না থাকায় অনেকটা নিশ্চিন্ত লাগছে।
সুতরাং তথাকথিত সোনার প্রজন্মের সবচেয়ে বড় সাফল্য – অস্ট্রেলিয়ায় পরপর দুবার টেস্ট সিরিজ জয় – মহানায়ক বিরাট কুমার বা রোহিত কুমারের জন্যে আসেনি, এসেছে ‘ইনটেন্ট’ না থাকা পূজারার জন্যে। তবু তাঁর টেস্ট কেরিয়ার শেষ হয়েছে ওই দুজনের আগেই। কারণ তাঁর উপর কোটি কোটি টাকা লগ্নি করা ছিল না বিজ্ঞাপনদাতাদের। ফর্ম পড়ে যাওয়ার কারণ তাঁকে বাদ দেওয়া যায়, ব্র্যান্ডদের বাদ দেওয়ার আগে নানা নাটক করতে হয়। রোহিত সম্পর্কে রটাতে হয় নিজেই নিজেকে দল থেকে সরিয়ে নিয়েছে। বিরাট অবসর নিয়ে ফেলার পরেও ফিরে আসার গুজব ছড়ানো চলতে থাকে। ২০২৩ সালের জুন মাসে শেষবার টেস্ট খেলার পরে পূজারা সাসেক্সের হয়ে কাউন্টি ক্রিকেট খেলেছেন এবং হাজার দুয়েক রান করেছেন। কিন্তু তিনি টেস্ট দলে ফিরবেন – এমন গুজব ছড়ায়নি। বিরাট টেস্ট থেকে অবসর নিয়ে নেওয়ার পরেও ভারতের এবারের ইংল্যান্ড সফরের আগে বেশকিছু সংবাদমাধ্যম বলতে শুরু করেছিল – বিরাট নাকি কাউন্টি ক্রিকেট খেলবেন। তরুণ ভারতীয় দল লম্বা সিরিজে বিপদে পড়ে গেলে নাকি তিনি এসে উদ্ধার করবেন। বিরাট কাউন্টি খেলেননি, ভারতের তরুণ ব্যাটিংয়ের উদ্ধারকর্তার প্রয়োজনও হয়নি।
পূজারাকে নিয়ে অমন গুজব ছড়ানোর সুযোগও ছিল না, কারণ তিনি কমেন্ট্রি বক্সে হাজির ছিলেন। মুশকিল হল, তাঁর ব্যাটিংয়ের মতই ধারাভাষ্যও শান্তশিষ্ট, যুক্তিনিষ্ঠ। বৃদ্ধ গাভস্করও যে যুগে অতিরিক্ত উত্তেজনা দেখাচ্ছেন কমেন্ট্রি বক্সে, যুক্তির তোয়াক্কা না করে উগ্র জাতীয়তাবাদী হয়ে উঠছেন সামান্যতম কারণে, সেখানে পূজারার ধারাভাষ্য কি চলতে দেওয়া হবে? নাকি তাঁকে এখানেও ঘাড়ধাক্কা খেতে হবে? এই আশঙ্কা থেকেই মনে হয়, পূজারার ব্যথার পূজা এখনো শেষ হয়নি।
নাগরিক ডট নেট ওয়েবসাইটে প্রকাশিত






