সঙ্ঘারামের রক্তকরবী: রাবীন্দ্রিক অথচ সমসাময়িক

বাংলার শিল্পীদের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের সংলাপ জারি আছে, একই সময়ে দু-দুটো নাট্যদল রক্তকরবী মঞ্চস্থ করছে, আর আপনি দেখতে না গিয়েই সবটা জেনে ফেলবেন?

এই মুহূর্তে আফ্রিকার বেশ কিছু দেশে ইবোলা মহামারী চলছে। কঙ্গোয় সেই মহামারীর কেন্দ্রবিন্দু হল প্রবল দারিদ্র্যে ধ্বস্ত শহর মংবোয়ালু। কী আছে সেই শহরে? আছে সোনার খনি, গোটা এলাকার অর্থনীতি সেই খনির উপর নির্ভরশীল। আর সেই খনিতে কাজ করেন প্রচুর প্রবাসী শ্রমিক। অর্থাৎ মাটির নিচে সোনা, অথচ মাটির উপরের মানুষগুলো, সেই সোনা যারা খুঁড়ে বের করে সেই মানুষগুলো, হদ্দ গরিব। প্রয়াত পল ফার্মারের মত চিকিৎসক তথা নৃতত্ত্ববিদ লিখেছেন যে আফ্রিকার কঙ্গো, সিয়েরা লিওনের মত দেশের মানুষকে যুগের পর যুগ সোনা বা হীরের লোভে যেভাবে শোষণ করা হয়েছে, ওখানে বারবার মহামারী দেখা দেওয়ার তা অন্যতম কারণ। সুতরাং ২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে যদি কারও সন্দেহ হয়, রক্তকরবী নাটকের যক্ষপুরী সম্পূর্ণ কাল্পনিক, তাহলে তাকে মংবোয়ালুর খোঁজ দেওয়াই যথেষ্ট। সেখানে গেলেই দেখা পাওয়া যাবে এই নাটকের ফাগুলাল, চন্দ্রা, কিশোর, বিশু পাগল, গোকুলদের। নন্দিনী আর রঞ্জনের দেখা পাওয়া যাবে কি? সম্ভবত না, কারণ সোনা আর হীরের ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে ইলন মাস্ক, জেফ বেজোসের মত সর্দারদের হারাতে নন্দিনী আর রঞ্জনের সন্ধানই মানুষের সন্ধান। এই সন্ধান আছে বলেই রক্তকরবী ‘সত্যমূলক’ হলেও নাটক, ইতিহাস নয়। তবে কেবল মংবোয়ালু তো যক্ষপুরী নয়, রক্তকরবী নাটক প্রকাশের শতবর্ষ পরে আজ গোটা দুনিয়াটাই যক্ষপুরী। সেই সত্য তুলে ধরতে ক্যান্টিন আর্ট স্পেসের পর, হাতিবাগান সঙ্ঘারামের সত্যনিষ্ঠ প্রযোজনাও দেখার সুযোগ হল সম্প্রতি।

রক্তকরবী নাটকের উপস্থাপনায় মঞ্চসজ্জা বরাবরই খুব আলোচিত বিষয়। প্রদীপ কুমার পাত্র আর মদন মিস্ত্রি এখানে যে যক্ষপুরী বানিয়ে তুলেছেন তা ধ্রুপদী রবীন্দ্রনাটকের মেজাজ বজায় রেখেই আজকের দুনিয়াকে স্পষ্ট করে তুলেছে। মঞ্চের দুই প্রান্তে রাস্তার আলোর স্তম্ভে ক্লোজ সার্কিট টিভির শ্যেনদৃষ্টি এবং রাজার বন্ধ দরজার ঠিক উপরেও তার উপস্থিতি জর্জ অরওয়েলের 1984 উপন্যাসকে মনে পড়িয়ে দেয়। আমরা সবাই যে এক ডিসটোপিয়ায় বসবাস করছি, আজকের পৃথিবীর ব্যবসায়ীরা এবং রাষ্ট্র যে নজরদারি চালায় নাগরিকদের উপর, সেই আধুনিক সত্য অনায়াসে রাবীন্দ্রিক হয়ে ওঠে যখন বিশু (তথাগত চৌধুরী) ওই ক্যামেরার দিকেই আঙুল তুলে ফাগুলালকে (কল্লোল দে) বলে “তোদের আদর পড়ে যেখানে সর্দারের দৃষ্টি পড়ে সেখানেই, সোনাব্যাঙ যতই মকমক শব্দে কোলাব্যাঙের অভ্যর্থনা করে, সেটা কানে গিয়ে পৌঁছয় বোড়াসাপের।” পরিচালকের কল্পনার সঙ্গে মঞ্চ পরিকল্পনা ও নির্মাণের এই সুর মেলানো অপূর্ব। পাশাপাশি এই মঞ্চ পুঁজিবাদের ধারাবাহিকতাকেও ধারণ করেছে। বড় বড় দাঁতওয়ালা চাকা দেখে মনে পড়ে যায় চার্লি চ্যাপলিনের মডার্ন টাইমস ছবির সেই দৈত্যাকৃতি চাকাগুলোকে। রাজার রহস্যময়তার অনেকটাও মঞ্চসজ্জার কৃতিত্ব। যে অর্ধস্বচ্ছ দরজার ওপার থেকে রাজা (অনুরণ সেনগুপ্ত) কথা বলে, তাতে পড়া রাজার ছায়া তার ভয়ঙ্করতা এবং অসহায়তাকে দর্শকের সামনে অতিকায় করে তোলে।

দীপ্তেশ মুখার্জি আর অভিরূপ দে-র অবদানে এই নাটকে শব্দ ও সঙ্গীত যে আবহ নির্মাণ করেছে তা-ও স্বতন্ত্র উল্লেখের দাবি রাখে। শুরুতেই তালবাদ্য সহযোগে এবং মধুরিমা গোস্বামীর অঙ্গবিন্যাসে সোনা খনন দর্শকের মনোযোগ আকর্ষণ করে নেয়।

অভিনয়ের আলোচনায় আসতে দেরি করলাম, কারণ রবীন্দ্রনাথ যে ভাষায় এই নাটক রচনা করেছেন, তার বিমূর্ততাকে মূর্ত করে তোলায় মঞ্চ, শব্দ, সঙ্গীতের ভূমিকা অতি গুরুত্বপূর্ণ। ওখানে প্রয়াস ব্যর্থ হলে মনোযোগী রবীন্দ্রপাঠক দর্শক ছাড়া আর কাউকে স্রেফ অভিনয় দিয়ে ছুঁয়ে ফেলা এই নাটকে বেশ কঠিন। অভিনয়ের আলোচনা শুরু করা যাক নন্দিনীকে দিয়েই।

নন্দিনী আসলে কে? যক্ষপুরীর কড়া নিয়মে এই মস্ত বেনিয়মটি হাজির হল কোথা থেকে? রবীন্দ্রনাথের নিজের ব্যাখ্যায় “জেলেদের জালে দৈবাৎ মাঝে-মাঝে অখাদ্যজাতের জলচর জীব আটকা পড়ে। তাদের দ্বারা পেটভরা বা ট্যাঁকভরার কাজ তো হয়ই না, মাঝের থেকে তারা জাল ছিঁড়ে দিয়ে যায়। এই নাট্যের ঘটনাজালের মধ্যে নন্দিনী নামক একটি কন্যা তেমনিভাবে এসে পড়েছে।” নাটকের শেষদিকে আমরা যক্ষপুরীর মত হিংস্র খনি এলাকায় নন্দিনীর গ্রামের কথা শুনতে পাই, সে গ্রামের মানুষের কথাও পাই। সে খেতের কথা বলে, ফসলের কথা বলে, ফুল তার অঙ্গে, রং তার মনে। এই চরিত্রে ঈস্পীতা ঘোষ যতবার মঞ্চে আসেন, মঞ্চ জুড়ে থাকা অন্ধকার ও অবসাদে আলোর সঞ্চার হয়। এর কৃতিত্ব শ্রমিকদের গাঢ় নীল পোশাক, মঞ্চের দখল নিয়ে রাখা কালো রঙের বিপরীতে ঈস্পীতার সবুজ শাড়ি, হলুদ ব্লাউজ আর লাল ফুলের যতখানি (রূপসজ্জা: সঞ্জয় পাল), ততখানিই তাঁর অভিনয়ের। তিনি লঘু পায়ে চলে ফিরে বেড়ান, সে চলা নাচ নয় অথচ ছন্দময়। ঘোর লাগিয়ে দেওয়ার মত রূপ না থাকলে নন্দিনীর চরিত্রে বিশ্বাসযোগ্য হয়ে ওঠা শক্ত, কিন্তু সে রূপ সম্পূর্ণ হয় অভিনয় ক্ষমতা দিয়ে। বস্তুত, ঘন্টা দুয়েকের বিরতিহীন নাটকের মধ্যেই দুজন নন্দিনীকে দেখা যায়। এক নন্দিনী আনন্দকে, বিদ্রোহকে এমনভাবে ছড়িয়ে দিতে পারে পুরুষের মধ্যে যে গোকুল (অর্ক চক্রবর্তী) বা চন্দ্রা (মধুরিমা) তাকে বিপদ বলে মনে করে। আরেক নন্দিনীকে দেখা যায় একেবারে শেষদিকে, যে দিশেহারা। আনন্দের বদলে শঙ্কাই তার অভিজ্ঞান। এই দুই নন্দিনীর চরিত্রেই ঈস্পীতা চমৎকার। তবে গান গাওয়ার সময়ে তাঁকে কিছুটা দুর্বল লাগে।

বিশু পাগল রক্তকরবী নাটকের কতখানি, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। এক নারীর হাতে আকাশের চাঁদ এনে দিতে সে যক্ষপুরীতে এসেছিল। তারপর তাকে চরবৃত্তি করতে লাগিয়ে দিয়েছিল সর্দাররা। কিন্তু সে কাজ বিশুর দ্বারা হয়নি। তাই তার অবস্থা আর পাঁচজন শ্রমিকের চেয়েও খারাপ। অথচ সে যাদের বিরুদ্ধে চরবৃত্তি করতে এসেছিল তারাই তাকে ভালোবাসে। সর্দারদের লোক থেকে শ্রমিকদের লোক হয়ে যাওয়ায় বিশুর স্ত্রীও তাকে ত্যাগ করেছে। এতখানি নিঃস্বতা সত্ত্বেও যক্ষপুরীতে বিশু একমাত্র লোক, যার গান নন্দিনীকেও মুগ্ধ করে। এই তিক্ততাহীন বিশুর চরিত্রকে তথাগত (যিনি এই নাটকের নির্দেশকও) প্রায় দার্শনিক উচ্চতা দান করেছেন। তাঁর দরাজ গানের গলা বিষণ্ণ সংলাপ উচ্চারণের সময়েও এক ধরনের নিরাসক্তির আভাস দেয়। যেন এমন একজন মানুষ, যে চোখের জলের জোয়ারেও ভোলে না যে ডাঙা আছে। তথাগতর বিশু একইসঙ্গে প্রেমিক ও সন্ন্যাসী।

মাত্র কয়েকদিন আগেই ক্যান্টিন আর্ট স্পেসের রক্তকরবী প্রযোজনায় আজকের বাংলা নাট্যমঞ্চের আরেক প্রতিভাবান অভিনেতা বুদ্ধদেব দাসের অভিনয় দেখার সুযোগ হয়েছে। দুজন ভালো অভিনেতা একই চরিত্রের কেমন দুরকম ব্যাখ্যা করেন তা এত অল্প সময়ের ব্যবধানে দেখার বিরল সুযোগ এই মুহূর্তে এই বাংলার দর্শকের হাতের মুঠোয়। বুদ্ধদেবের বিশুর সর্বাঙ্গে লেগে থাকে বিষাদ, তথাগতর মুখে লেগেই থাকে অনির্বচনীয় হাসি। যেন তিনি জানেন, জীবনের রণ রক্ত সফলতা সত্য, তবু শেষ সত্য নয়। রাজা একবার জিজ্ঞেস করে, নন্দিনীর সঙ্গে ও কে? “রঞ্জনের জুড়ি নাকি?” তার উত্তরে বিশু বলে “না রাজা, আমি রঞ্জনের ও-পিঠ, যে পিঠে আলো পড়ে না— আমি অমাবস্যা।” এই সংলাপ যখন বুদ্ধদেব বলেন, তখন ঝরে পড়ে রঞ্জন হতে না পারার হতাশা। আর তথাগত যখন বলেন, তখন মনে হয়— তিনি রঞ্জন নন এবং রঞ্জন হতে চান না। তিনি নিজের অবস্থানে খুশি। বড় বিস্ময় লাগে এই দুই অভিনেতাকে দেখে। আমাদের তো আজ বিশেষ কিছুই নেই। তবু একজন তথাগত আর একজন বুদ্ধদেব আছেন!

রাজার চরিত্রে অনুরণও চমকপ্রদ। এই চরিত্রের অভিনেতার হাতে যে কণ্ঠস্বর ছাড়া বিশেষ কোনো আয়ুধ নেই তা তো সবাই জানেন, কিন্তু এখানে অনুরণকে একটা বাড়তি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছেন নির্দেশক— গলার পাশাপাশি ছায়া দিয়েও অভিনয় করতে হয়েছে। অর্থাৎ এখানে রাজাকে একেবারে দেখা যায় না তা নয়, সারাক্ষণই রাজার ছায়া দেখা যায়। সুরজ বিশ্বাস ও ধনপতি মণ্ডলের আলোকসম্পাতে এ এক অদ্ভুত কাণ্ড। অনুরণ যে দক্ষতায় নিজের ছায়ার উচ্চতা বাড়িয়ে কমিয়ে এবং কণ্ঠস্বরের নিপুণ ব্যবহারে রাজার বিরাট ভাবমূর্তি তৈরি করেন, তা ভেঙে পড়ে শেষ পর্বে তাঁর অন্তরাল থেকে বেরিয়ে আসায়। তখন অনুরণের সত্যিকারের দৈহিক উচ্চতা যে বৈপরীত্য তৈরি করে তার সঙ্গে মানানসই তাঁর বিধ্বস্ত, প্রতারিত অথচ হার না মানা মানুষের অভিনয়।

আরও পড়ুন রক্তকরবী: প্রযোজনা আন্তর্জাতিক, কিন্তু বাংলা কি?

ফাগুলালের চরিত্রে কল্লোল আর তার স্ত্রী চন্দ্রার চরিত্রে মধুরিমা সাক্ষাৎ শ্রমিক ও তার গিন্নী। ঠিক যেমন জীবন থেকে উঠে আসা অধ্যাপক মনে হয় অনন্য শঙ্কর দেবভূতিকে। অন্যান্য ছোট কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে দীপজ্যোতি মণ্ডল (কিশোর), অর্ক, জয়ন্ত মিত্র (সর্দার), অভিজিৎ নাগ (গোঁসাই) যথাযথ। অভিরূপের গিটার এবং নীলার্ঘ্য দত্তর ব্যাঞ্জো এই নাটকে কতখানি গুরুত্বপূর্ণ তা বুঝিয়ে বলতে গেলে কবীর সুমন দিয়ে কীভাবে রবীন্দ্রনাথকে ছুঁয়ে ফেলেছেন নির্দেশক, সেকথাটা বলে দিতে হবে। কিন্তু সে রহস্য উদ্ঘাটন করব কেন? বাঙালির এই দুঃসময়েও বাংলার শিল্পীদের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের সংলাপ জারি আছে, একই সময়ে দু-দুটো নাট্যদল রক্তকরবী মঞ্চস্থ করছে, আর আপনি দেখতে না গিয়েই সবটা জেনে ফেলবেন? এমন অন্যায়ে প্রশ্রয় দেব না।

ক্যান্টিন আর্ট স্পেসের প্রযোজনার উপসংহার নিয়ে আমার আপত্তির কথা লিখেছিলাম। হাতিবাগান সঙ্ঘারামের নাটকের উপসংহার অতখানি পার্টিজান নয়, ‘পৌষ তোদের ডাক দিয়েছে’-র সঙ্গে শ্রুতিমধুর মিশ্রণ ঘটানো হয়েছে ‘হেই সামালো ধান হো’-র। কিন্তু শ্রুতিমধুর হলেও এই সৃজনান্তর নাটকের বার্তাকে একটা অস্বস্তিকর জায়গায় নিয়ে গেছে বলে মনে হয়। নাটকটাকে আগাগোড়া সমকালীন করে তোলা হয়েছে, কিন্তু শেষে তেভাগা আন্দোলনের সময়কার এই গানের আবাহন থেকে কি এই সিদ্ধান্ত করব যে যক্ষপুরী থেকে পরিত্রাণের পথ হিসাবে কৃষিপ্রধান সভ্যতাকেই দেখলেন তথাগত ও তাঁর দল? সে সমাধান রবীন্দ্রনাথের সময়ে বাস্তবোচিত হলেও, আজকের দিনে কিন্তু একেবারেই কল্পকথা। রবীন্দ্রনাথ যখন এই নাটক লেখেন তখন তাঁর বন্ধু মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী গ্রামভিত্তিক রাষ্ট্রের ধারণা দিচ্ছিলেন। সেই ধারণা স্বাধীন ভারতে পরিত্যক্ত হয়, গান্ধীরই শিষ্য জওহরলাল নেহরুর পৌরোহিত্যে আমাদের অর্থনীতির ভিত হয়ে দাঁড়ায় ভারি শিল্প ও বাঁধ। সেখান থেকে বহু যুগ পার করে আমরা এখন বিশ্বব্যাপী গিগ অর্থনীতি এবং প্রযুক্তিভিত্তিক সামন্ততন্ত্রের (techno-feudalism) কবলে। এ যুগের সোনার খনির শ্রমিকদের নিস্তারের পথ কৃষিকাজে নেই। বিশ্বজুড়ে জমির সংকট, জমি থাকলেও জলের সংকট। সেই সংকট আরও বাড়াচ্ছে বেজোস, মাস্ক, স্যাম অল্টম্যানদের ইয়া বড় সব ডেটা সেন্টার। এখন ধানের নামে হাত মুষ্টিবদ্ধ করে কোনো লাভ হবে কি?

এ প্রশ্নের উত্তর খোঁজার দায় কেবল নাট্যকর্মীদের উপর চাপিয়ে দিলে অবশ্য অন্যায় হবে। তাঁরা শিল্পী, তাঁদের মূল কাজ সত্য তুলে ধরা এবং স্বপ্ন দেখানো। সে কাজ এই নাটকে শতকরা একশো ভাগ সততায় করা হয়েছে। তবে শিল্পীদের কাজেও তো আমরা ভবিষ্যতের ইশারা খুঁজি; বিশেষ করে সেইসব শিল্পীদের কাজে, যাঁরা শতবর্ষ আগের শিল্পকে নিজের সময়ের মাটিতে দাঁড় করানোর স্পর্ধা দেখান।

রক্তকরবী: প্রযোজনা আন্তর্জাতিক, কিন্তু বাংলা কি?

এমনই তাঁর অভিনয়ের জাদু যে মনে হয়, রবীন্দ্রনাথ যেন বিশু পাগলের চরিত্র লিখেছিলেন বুদ্ধদেব দাস অভিনয় করবেন বলেই।

ভারতীয় নাট্যজগতের প্রবাদপ্রতিম নট ও নাট্যকার গিরীশ কারনাড প্রায় দেড় দশক আগে একবার বাঙালির প্রবল বিরাগভাজন হয়েছিলেন। কারণ তিনি বলেছিলেন— রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর মহান কবি, কিন্তু দ্বিতীয় সারির এবং মাঝারি মানের নাট্যকার। তাঁর নাটকের গরিব চরিত্রগুলো ‘কার্ডবোর্ড ক্যারেক্টার্স’। নাট্যকার হিসাবে তিনি বাদল সরকার, মোহন রাকেশ এবং বিজয় তেন্ডুলকরকে রবীন্দ্রনাথের থেকে বেশি নম্বর দিয়েছিলেন। হিন্দুদের ৩৩ কোটি ঠাকুর, বাঙালির তখন ছিল ৩৩ কোটি ১। ফলে কারনাডের এই মতামতে প্রবল রুষ্ট হয়েছিলেন সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় থেকে শুরু করে শ্রমিক নেতা গুরুদাস দাশগুপ্ত পর্যন্ত সকলেই। গিরীশের সমালোচনার কোনো চর্চিত উত্তর দেওয়া হয়েছিল— এমন দৃষ্টান্ত এই লেখা লিখতে বসে খুঁজে পাচ্ছি না। গিরীশের সমালোচনার উত্তরে বাংলার কোনো নাট্যদল রবীন্দ্রনাথের কোনো নাটক মঞ্চস্থ করে শৈল্পিক প্রতিবাদ করেছিল কিনা, তাও জানতে পারছি না। স্মৃতি থেকে যতটুকু উদ্ধার করতে পারছি, তাতে শেয়ালের কুমির ছানা দেখানোর মত করে বহুরূপীর রক্তকরবী প্রযোজনার কথাই তুলে ধরা হয়েছিল বিভিন্ন মহল থেকে। তবে এই মুহূর্তে বাংলার মঞ্চে অন্তত দুটো দল রক্তকরবী অভিনয় করছে— হাতিবাগান সঙ্ঘারাম ও ক্যান্টিন আর্ট স্পেস। দ্বিতীয় দলটার অভিনয় সম্প্রতি দেখার সুযোগ হল। তারা রবীন্দ্রনাথের এই বহু আলোচিত নাটককে যেভাবে সমসাময়িক করে তুলেছে, তাতে কারনাড জীবিত থাকলে হয়ত নিজের মন্তব্য পুনর্বিবেচনা করতে বাধ্য হতেন। রবীন্দ্রনাথের নাটক যে এমন এক বিমূর্ততাকে ছুঁয়ে আছে, যা দিয়ে একশো বছর পরের মূর্ততাকেও ধরে ফেলা যায়— তা এই প্রযোজনায় দিনের আলোর মত পরিষ্কার। একথা সত্যি যে সোনার খনির শ্রমিকরা বলে না ‘বনের মধ্যে পাখি ছুটি পেলে উড়তে পায়, খাঁচার মধ্যে তাকে ছুটি দিলে মাথা ঠুকে মরে।’ এই দার্শনিকতা যদি তাদের মনে কাজ করেও, তা এইভাবে প্রকাশ করার মত ভাষাজ্ঞান তাদের থাকে না। কিন্তু কথাটা এতদূর সত্য যে তা ১৯২৫ সালে যতখানি সত্য ছিল, ২০২৬ সালেও সমান সত্য। হয়ত আজ আরও বেশি সত্য। কারণ এখন আর কেবল খনি শ্রমিক নয়, কর্পোরেট মজুরদের জীবনেও সত্য। শঙ্খ ঘোষ লিখেছিলেন— সত্য বলা ছাড়া কবিতার কোনো কাজ নেই। সেকথা তো যে কোনো শিল্পমাধ্যমের জন্যেই সত্যি।

রবীন্দ্রনাথের নাটকে আজকের সত্যানুসন্ধানে ক্যান্টিন আর্ট স্পেস যা যা করেছে তার মধ্যে সবচেয়ে অভিনব হল মঞ্চসজ্জা। দর্শকাসনকে চারদিক থেকে ঘিরে তৈরি হয়েছে মঞ্চ, যা স্বাভাবিকভাবেই দর্শকাসনের চেয়ে উঁচুতে। ফলে নাটকের শুরুতেই যখন ফাগুলাল (ঋদ্ধিবেশ ভট্টাচার্য) বলে, আপনারা খনি এলাকায় এসে পড়েছেন, তখন তা কথার কথা থাকে না। খনির মধ্যে বসে থাকার অনুভূতি হয়। নাট্যকার রচিত মূল সংলাপ ব্যবহার করেই অন্য ঘটনাবলী, শব্দ, দৃশ্য আমদানি করে প্রযোজনার কাছাকাছি সময় দেখানো সাম্প্রতিককালে বাংলায় উইলিয়াম শেক্সপিয়রের নাটকের প্রযোজনায় জলভাত। স্বপ্নসন্ধানীর হ্যামলেট-এ যেমন চলে আসে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যাওয়ার প্রসঙ্গ, ম্যাকবেথ-এ এসে পড়ে গাজা। কিন্তু রবীন্দ্রনাথের সৃষ্টিকে এভাবে একেবারে আজকের মাটিতে নামিয়ে আনার প্রচেষ্টা সুলভ নয়। এই প্রচেষ্টার আরও বেশি প্রশংসা প্রাপ্য এইজন্যে যে ব্যাপারটা স্রেফ জয়রাজ ভট্টাচার্যের করা সিনোগ্রাফি আর অভিনেতাদের পোশাক-আশাকে থেমে থাকেনি। ফাগুলাল এখানে হিন্দিভাষী শ্রমিক, সে আর তার বউ চন্দ্রা (দেবপ্রিয়া অধিকারী) দেহাতি ভাষাতেও বাক্যালাপ করে। সর্দার (বিপ্লব বন্দ্যোপাধ্যায়) এখানে গলফ খেলে অবসর যাপন করা কর্পোরেট এক্সিকিউটিভ, অধ্যাপক (অনসূয়া রাকা) সংবেদনশীল হলেও মধ্যবিত্ত অভ্যাসের বাইরে যেতে না পারা মহিলা বুদ্ধিজীবী। এইসব উচ্চশ্রেণির মানুষের মুখের ভাষায় মিশে থাকে যথেচ্ছ ইংরিজি। তবে নাটকের মূল বয়ানের বিনির্মাণের সেরা দৃষ্টান্ত শ্রমিকদের নম্বরে চিহ্নিত ইউনিফর্ম, যেখানে বিশু পাগলের নম্বর হল 69NG (রবীন্দ্রনাথের কলমে যা ৬৯ঙ), অর্থাৎ কিনা NOT GOOD। নন্দিনীর মত প্রতিষ্ঠানবিরোধী, প্রচলিত ব্যবস্থার গোড়া ধরে টান দেওয়া চরিত্রের মুখে ইংরিজি সংলাপ— বিশেষত একেবারে শেষদিকে ‘brutal capitalism’— অবশ্য বাহুল্য মনে হয়।

যেমন বাহুল্য মনে হয় কমিউনিস্ট ইন্টারন্যাশনাল গেয়ে নাটকের সমাপ্তি। রবীন্দ্রনাথ কোনো ভান করেননি। রক্তকরবীর ভূমিকায় ‘নাট্যপরিচয়’-এ পরিষ্কার লিখে দিয়েছেন ‘এই নাটক সত্যমূলক’। সুতরাং তাঁর আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু যে ধনতন্ত্র আর দেখাচ্ছেন শ্রমিকদের জীবন, তা নিয়ে কোনো সংশয়ের অবকাশ কোনোদিনই ছিল না। নাটকের শেষে যে ভাঙনের জয়গান, তা যে শ্রমিক অভ্যুত্থানই— তাও চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেওয়ার প্রয়োজন পড়ে না। তারপরেও কমিউনিস্ট ইন্টারন্যাশনালের মত পার্টিজান উপাদান ব্যবহার করলে বাম রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত বা তার প্রতি অনুরক্ত দর্শকরা আলাদা তৃপ্তি পেতে পারেন, কিন্তু আজকের দিনে এই নাটককে বৃহত্তর দর্শকসমাজের কাছে পৌঁছে দেওয়া জরুরি। সে কাজে ব্যাঘাত ঘটা অসম্ভব নয়। অবশ্য এই নাটকের দর্শক হিসাবে কাদের চান বা কাদের চান না, সে সিদ্ধান্ত নেওয়ার স্বাধীনতা যাঁরা এই নাটক করছেন তাঁদেরই।

একথা বলা এই জন্যে যে এই প্রযোজনার মধ্যে বৃত্ত বড় করে ফেলার সম্ভাবনা আছে। কারণ এখানে যত্ন করে দৃশ্য নির্মাণ করা হয়েছে এবং অভিনেতারা প্রায় সবাই নিজেদের ক্ষমতার পূর্ণ সদ্ব্যবহার করেছেন। ফলে কোথা দিয়ে দু ঘন্টা কেটে যায় টের পাওয়া যায় না। এই নাটকে প্রাণ আছে।

রক্তকরবী পড়া আছে বা দেখা আছে এমন সকলেই জানেন যে এই নাটকের প্রাণ হল নন্দিনী, বিশু, আর নেপথ্য থেকে রাজা। এই প্রযোজনায় বিশুর চরিত্রে বুদ্ধদেব দাস একজন জিনস পরা আধুনিক যুবক, যিনি খালি গলায় যেমন ‘চোখের জলের লাগল জোয়ার’ গেয়ে ওঠেন, তেমন গিটার বাজিয়ে ‘জামাইকা ফেয়ারওয়েল’ গেয়ে যক্ষপুরীতে আসার আগের জীবনের বেদনাবিধুর স্মৃতিচারণও করেন। তাঁর গুপ্তচর হয়ে যক্ষপুরীর শ্রমিকদের মধ্যে প্রবেশ করার স্বীকারোক্তিতে নমকহারাম (১৯৭৩) ছবির রাজেশ খান্নাকে মনে পড়ে। এতৎসত্ত্বেও এমনই তাঁর অভিনয়ের জাদু যে মনে হয়, রবীন্দ্রনাথ যেন বিশু পাগলের চরিত্র লিখেছিলেন বুদ্ধদেব অভিনয় করবেন বলেই। বুদ্ধদেবের অভিনয় প্রতিভা বাংলা নাটকের দর্শকদের মধ্যে বেশ কিছুদিন হল সমাদৃত। কিন্তু বিশুর চরিত্রে এই অভিনয়ে এত পরত যে অভিনেতা থেকে চরিত্রকে আলাদা করাই শক্ত হয়ে যায়। যে অহংবোধ এবং বেদনা মিশিয়ে তিনি বলেন ‘তোর সেই কিছু-না-দেওয়া আমি ললাটে পরে চলে যাব। অল্প-কিছু দেওয়ার দামে আমার গান বিক্রি করব না’, আর যে রাজনৈতিক প্রজ্ঞায় বলেন ‘চুপ করাটাকে যে শুনতে পায়, তাতে আপদ আরো বাড়ে’, তাতে আশ্চর্য বিশ্বাস ফুটে ওঠে। মনে হয় না, বুদ্ধদেব অন্যের লেখা সংলাপ বলছেন। অভিনেতা কীভাবে নিজের শরীরকে ব্যবহার করলেন, শ্বাসকষ্টের অভিনয় কতটা নিখুঁত হল— এসব তথ্য নেহাত অপ্রাসঙ্গিক মনে হয়। কারণ ওগুলো যে অভিনয় সেকথা ততক্ষণে ভুলে গেছি। আশ মেটে না বুদ্ধদেবের গলায় গিটারের ঝংকার সমেত ‘তোমায় গান শোনাব’ দু-এক লাইন শুনে, বরং খালি গলায় আরও খানিকটা শোনা গেলে হয়ত প্রাণের আরাম হত।

সেই তুলনায় নন্দিনীর চরিত্রে শ্রাবন্তী ভট্টাচার্য প্রথম দিকে কিছুতেই যেন সপ্তমে পৌঁছতে পারেন না। নন্দিনীর মাদকতা অন্য চরিত্রগুলোর সংলাপ থেকেই বুঝে নিতে হয়। বরং নাটকের পরের দিকে যখন নন্দিনী ক্রমশ রণরঙ্গিনী হয়ে ওঠে, তখন শ্রাবন্তীর দেহভঙ্গিমা অনেক বেশি সাবলীল লাগে। রঞ্জনের মৃত্যুতে তাঁর শোকের বিদ্রোহের উন্মাদনায় পরিণত হওয়া বেশি স্পর্শ করে।

দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্যি, খুব বেশি দর্শক এখনো তথাগত চৌধুরীকে চেনেন না। ব্যাপারটা যে দুর্ভাগ্যজনক তা নিয়ে এই নাটক দেখলে আর সন্দেহ থাকবে না। রাজা চরিত্রে তাঁর অভিনয়ের প্রায় একমাত্র সম্বল কণ্ঠস্বর। রবীন্দ্রনাথ তেমনই ধার্য করেছেন। ফলে বহুরূপীর সেই বিখ্যাত প্রযোজনায় এই কঠিন কাজটা করতেন শম্ভু মিত্র স্বয়ং। তথাগত সম্বলকে আয়ুধে পরিণত করেছেন। ক্ষমতার দম্ভ, ক্ষমতার হাতে নিজেই বন্দি হয়ে যাওয়ার এবং তা থেকে বেরিয়ে আসতে না পারার অসহায়তা, নন্দিনীর প্রতি অদম্য আকর্ষণ এবং তার ক্ষুদ্র সহজতার কাছে নিজের বিশালতার পরাজয় তথাগতর কণ্ঠে নদীর জোয়ার ভাঁটার মত খেলতে থাকে। রক্তকরবীর রাজাই সম্ভবত সবচেয়ে রাবীন্দ্রিক। মানবতাবাদী রবীন্দ্রনাথ যক্ষপুরীর একনায়ককে আঁকলেন, অথচ তাকেও ভালোবাসার স্পর্শ থেকে বঞ্চিত করতে পারলেন না। সোনার খনির অন্ধকার থেকে নন্দিনীর আলো দিয়ে তাকেও বের করে নিয়ে এলেন। সে নিজের ধ্বজা নিজেই ভেঙে নিজের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করতে চলল। শোষকের প্রতি এত মমতা কোনো বিদ্রোহ দেখায় না, দেখায়নি। হয়ত কারনাড এই চরিত্রচিত্রণকেই মাঝারিয়ানা বলতেন। কিন্তু রাজার চরিত্রটা এমন যে নন্দিনীর মত আমাদেরও তার প্রতি মায়া পড়ে যায়। পড়বে না, যদি রাজা চরিত্রের অভিনেতা তাঁর চরিত্রের স্ববিরোধী বৈশিষ্ট্যগুলোর কোনো একটায় বেশি জোর দিয়ে ফেলেন। এই টাল সামলাতে পারাই সম্ভবত ওই চরিত্রের অভিনেতার কাজটা কঠিন করে তোলে। সে কাজ চমৎকার করেছেন তথাগত। তিনি তাঁর বদ্ধ ঘরের বিশালতা ছেড়ে যখন দর্শকের চোখের সামনে বেরিয়ে আসেন, তখন ছোট হয়ে যান না। প্রিয় হয়ে ওঠেন।

আরও পড়ুন মহাভারত ২: আজকের মহাকাব্য

ফাগুলালের চরিত্রে ঋদ্ধিবেশের অভিনয় অত্যন্ত স্বতঃস্ফূর্ত, কিন্তু চন্দ্রার চরিত্রে দেবপ্রিয়া অধিকারী চমকপ্রদ। তাঁর হাত নাড়া, মুখ ঝামটা দেওয়া, দেহাতি উচ্চারণ একেবারে পশ্চিমবঙ্গের শ্রমিক মহল্লার হিন্দিভাষী গিন্নীদের মত। বাংলা সংলাপ না থাকলে বিশ্বাস করা শক্ত হত যে চন্দ্রা চরিত্রের অভিনেত্রী বাঙালি। এই প্রযোজনায় রবীন্দ্রনাথের বয়ানের বিনির্মাণে অন্যতম বড় ঝুঁকি নেওয়া হয়েছে অধ্যাপকের চরিত্রকে নারী করে দিয়ে। ব্যাপারটা যে উতরে গেছে তার কৃতিত্ব অনসূয়ার। তিনি অধ্যাপক চরিত্রের পৌরুষ দূর করে তাতে দিব্যি নারীত্ব আরোপ করতে পেরেছেন। নন্দিনীর প্রতি এক ধরনের সমকামী আকর্ষণের আভাস নন্দিনীর চৌম্বক শক্তি বোঝাতেও সহায়ক হয়েছে। শোষণ হচ্ছে মেনে নিয়ে ক্ষমতাকে না চটানোর মধ্যবিত্ত অভ্যাসও অনসূয়া সাবলীলভাবে তুলে ধরেছেন। আর যিনি স্বল্প উপস্থিতিতেও প্রভাব ফেলেন, তিনি হলেন সর্দার চরিত্রে বিপ্লব বন্দ্যোপাধ্যায়। কর্পোরেট শয়তান হয়ে উঠতে তাঁকে উচ্চকিত অভিনয় করতে হয়নি, হাঁটাচলায় মাপা আভিজাত্যের পালিশ দিয়েই কাজ সেরে ফেলেছেন। তাঁর ক্রূরতা তাঁর শীতলতায়।

সবকিছুর পরে একটা ব্যাপারেই মন খুঁতখুঁত করে। এই প্রযোজনার আন্তর্জাতিক মানে ওঠার সাধ্য আছে, সংলাপে একাধিক ভাষার ব্যবহার এবং দর্শকদের হাতে দেওয়া কাগজখানায় কেবল ইংরিজির ব্যবহার থেকে মনে হয়— সাধও আছে। কিন্তু সেদিকে মন দিতে গিয়ে বাংলা কম পড়ে গেল কি? রবীন্দ্রনাথের কিন্তু আন্তর্জাতিক হওয়ার জন্যে কম বাঙালি হওয়ার দরকার পড়েনি। নাজি অধিকৃত ওয়ারশ ঘেটোতে নিশ্চিত মৃত্যুর সামনে দাঁড়িয়ে থাকা শিশুদের ডাকঘর নাটক করার কথা তো আমরা জানি।

নাগরিক ডট নেট ওয়েবসাইটে প্রকাশিত

সাংবাদিকরাই এখন ক্রিকেট বোর্ডের ‘চিয়ারলিডার’

এই জাতীয় সাংবাদিকরাই তাই মালিকদের পছন্দের লোক হয়ে উঠলেন, কারণ এঁদের মাধ্যমে ক্রিকেটজগতের সবচেয়ে নামকরা খেলোয়াড় আর সবচেয়ে ক্ষমতাশালী প্রশাসকদের সঙ্গ পাওয়া যায়। ব্যবসায়িক সম্পর্ক স্থাপন করা যায়। কর্পোরেট মিডিয়ায় মালিকের পছন্দের লোক হওয়া মানেই উত্তরোত্তর শ্রীবৃদ্ধি। ফলে ওই সাংবাদিকরাই একতলা বাড়ি থেকে ফট্টি টু পৌঁছলেন, বিখ্যাতও হলেন। পরবর্তী প্রজন্মের সাংবাদিকরা শিখলেন— ওটাই পথ, ব্যাকওয়ার্ড পয়েন্ট আর সিলি পয়েন্টের তফাত না জানলেও ক্ষতি নেই।

নয়ের দশকে অক্ষয় কুমার অভিনীত একখানা হিন্দি ছবিতে একটি মহা চটুল গান ছিল। গানের স্থায়ীতে নায়কের বক্তব্য হল— কোথা থেকে প্রেম শুরু করব বুঝতে পারছি না।
লিখতে বসে আমারও একই অবস্থা হয়েছিল। কারণ অ2অনুস্বর সম্পাদক যে বিষয়টি বেছে দিয়েছেন তা নিয়ে অনেককিছু বলার আছে। আমাকে উদ্ধার করলেন টি টোয়েন্টি বিশ্বকাপের প্রতিবেদন লেখার দায়িত্বপ্রাপ্ত এক সাংবাদিক। তাঁর নামটি উহ্যই থাক, কামটি যখন গর্ব করার মতো নয়। তবে সোশাল মিডিয়ার দৌলতে তাঁর কামটি দুনিয়াসুদ্ধ লোক জেনে ফেলেছে।
২৬ ফেব্রুয়ারির ভারত-জিম্বাবোয়ে ম্যাচের পর সাংবাদিক সম্মেলনে আমাদের আলোচ্য সাংবাদিকটি জিম্বাবোয়ের পক্ষ থেকে আসা ক্রিকেটারটিকে প্রশ্ন করেন— আপনাদের দলের ব্যাটাররা ব্রায়ান বেনেটকে শতরান করার সুযোগ দিল না কেন? ভিডিওতে ক্রিকেটারটির মুখের চেহারা দেখে আপনার স্কুলজীবনের সেইসব বন্ধুদের মনে পড়বে, যারা ইতিহাসের সব প্রশ্নের উত্তর কণ্ঠস্থ করে স্কুলে পৌঁছে আবিষ্কার করত যে সেদিন অঙ্ক পরীক্ষা।

আপনি যদি না জেনে থাকেন যে সাংবাদিক সম্মেলনে কোন ক্রিকেটার এসেছিলেন, তাহলে আপনি হয়তো ভাবছেন—এভাবে লেখার কী আছে? প্রশ্নটা তো সঙ্গত। দল তো এমনিতেও হারত, বেচারা ৯৭ রানে অপরাজিত রয়ে গেল। সতীর্থরা একটু চেষ্টা করলে কি ওর শতরানটা হয়ে যেত না?

আবার আপনি যদি ভারতীয় ক্রিকেট ব্যক্তিসর্বস্ব বলে মনে করেন, তাহলে ভাবছেন— ঠিকই তো করেছে। দলগত খেলায় কে সেঞ্চুরি পেল না পেল তা নিয়ে ভাববে কেন? দয়া করে অত গভীরে ভাবতে যাবেন না। কারণ সাংবাদিক সম্মেলনে যিনি এসেছিলেন তিনিই বেনেট।
তিনি প্রশ্নটা শুনে অবাক হয়ে, কী প্রশ্ন করা হল জিজ্ঞেস করছেন দেখেও, সাংবাদিকটি অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে প্রশ্নটি বুঝিয়ে বলেন। তখন বেনেটকে বলতে হয়— আমিই বেনেট। তাতে হাসির রোল ওঠে এবং লজ্জাজনক ব্যাপারটির মধুরেণ সমাপয়েৎ হয়। এই হল আমাদের দেশে ক্রিকেট সাংবাদিকতার বর্তমান অবস্থা। এমন সব দুর্দান্ত পরিশ্রমী ও প্রতিভাবান লোকেরা কাজটা করছে যে, কার সাংবাদিক সম্মেলনে বসে আছে তা-ই জেনে উঠতে পারছে না।

অবশ্য অ্যালবার্ট আইনস্টাইন সম্পর্কেও কথিত আছে যে তিনি নাকি একবার ট্রেনে উঠে টিকিট হারিয়ে ফেলে যারপরনাই লজ্জিত বোধ করছিলেন, তখন টিকিট চেকার তাঁকে আশ্বস্ত করেন— আমি জানি আপনি ডক্টর আইনস্টাইন। টিকিট নিয়ে ব্যস্ত হবেন না, আপনি যখন বলছেন টিকিট কেটেছিলেন, তখন আমি বিশ্বাস করলাম। কিন্তু আইনস্টাইন আশ্বস্ত হলেন না, কারণ টিকিটটার দরকার চেকারের নয়, তাঁর নিজেরই। কোথায় যাচ্ছেন সেটাই ভুলে বসে আছেন যে।

এটি ঘটনাই হোক আর রটনাই হোক, ব্যবহার করা হয় একথা বোঝাতে যে জিনিয়াসরা এমন সব ভুল করে থাকেন যা সাধারণ মানুষের কাছে হাস্যকর। তা আমাদের সাংবাদিক বন্ধুটি যদি আপেক্ষিকতার তত্ত্ব জাতীয় কিছু আবিষ্কার করে ফেলতে পারেন, তাহলে তাঁকেও জিনিয়াস বলে মেনে নিয়ে প্রমাণস্বরূপ এই ঘটনাটি প্রচার করা যাবেখন। কিন্তু আপাতত এ ঘটনা থেকে একটি জিনিসই প্রমাণিত হচ্ছে— এদেশে ক্রিকেট সাংবাদিকতা করতে এখন ন্যূনতম যোগ্যতারও প্রয়োজন হচ্ছে না।

একথায় অনেক সাংবাদিকই তেলে বেগুনে জ্বলে উঠবেন। ভারত-দক্ষিণ আফ্রিকা ম্যাচের পরে যেমন জ্বলে উঠেছিলেন, তার কারণ আরেকখানা ভিডিও। তাতে দেখা যাচ্ছে, এক সোশাল মিডিয়া ইনফ্লুয়েন্সার ম্যাচের পরে পৌঁছে গেছেন একেবারে মাঠের মাঝখানে, যেখানে কোনো সাংবাদিক যাওয়ার অনুমতি পান না। গিয়ে কী করছেন? ম্যাচের সেরা খেলোয়াড় ডেভিড মিলারকে দাঁড় করিয়ে তাঁর চারপাশে ঘুরে ঘুরে ঠোঁট ফুলিয়ে রাগ দেখাচ্ছেন। ব্যাপারটি পড়তে যত ন্যাকা ন্যাকা লাগছে, আসলে তার চেয়েও বেশি ন্যাকা ছিল।
তবে সে ভিডিও আর দেখতে পাবেন না, কারণ সাংবাদিকদের রাগ এবং কিছু ক্ষিপ্ত ক্রিকেটভক্তের অশ্লীল মন্তব্যের ঠ্যালায় সেই ইনফ্লুয়েন্সার মহিলা ভিডিওটি মুছে দিয়েছেন। তবে তিনি একা নন, আরও কয়েকজন ইনফ্লুয়েন্সার চলতি বিশ্বকাপে এমন গুরুত্ব পাচ্ছেন আয়োজক ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের থেকে, যা নিয়ে সাংবাদিকরা সঙ্গত কারণেই রুষ্ট হয়েছেন।

এই ইনফ্লুয়েন্সারদের ক্রিকেটারদের এত কাছে যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়েছে, স্টেডিয়ামের এমন সব জায়গা থেকে তাঁরা ভিডিও করার সুযোগ পাচ্ছেন যেখানে কোনও ক্রীড়া সাংবাদিক (আলোকচিত্রী এবং ক্যামেরাপার্সনদের ধরে বলছি) যাওয়ার অধিকার পান না। অধিকার পেয়ে যেসব কনটেন্ট এই ইনফ্লুয়েন্সাররা তৈরি করছেন, তাতে ক্রিকেটের ক নেই। বিনোদন আছে, তাও অত্যন্ত মেধাহীন বিনোদন। যে কোনো খেলা থেকে একজন ক্রীড়াপ্রেমী মানুষ যে ধরনের বিনোদন পেতে পারে, সে জিনিস নয়।

কিন্তু ক্রিকেট বোর্ড সাংবাদিকদের চেয়ে এই ইনফ্লুয়েন্সারদের বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে কেন? সে প্রশ্নের উত্তর সৎভাবে খুঁজতে গেলে এদেশের ক্রীড়া সাংবাদিকদের আত্মসমালোচনা করতে হবে। করতে গিয়ে নিজেদের সম্পর্কে এত তেতো সব কথা উঠে আসবে, যে নিমপাতা মিষ্টি মনে হবে।

একটু পিছন থেকে শুরু করা যাক। ললিত মোদী ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগ চালু করার কিছুদিনের মধ্যে যেই বুঝে গেলেন যে এখান থেকে অভূতপূর্ব টাকা রোজগার করার সুযোগ রয়েছে, অমনি নিয়ম করে দিলেন— খেলার দিন খেলার মাঠে কোনে সংবাদমাধ্যম ক্যামেরা নিয়ে ঢুকতে পারবে না। মানে ভিডিও তোলা তো এমনিতেই বারণ, কারণ ভিডিও স্বত্ব সম্প্রচারকারীর দখলে; কাগজে ছাপার জন্য বা টিভির খবরে দেখানোর জন্য স্টিল ছবিও তোলা যাবে না।

তাহলে কী হবে? আইপিএল আয়োজকরা কি নিজেদের খেলার প্রচার কমিয়ে ফেলতে চান? মোটেই তা নয়। নিয়ম করা হল, ছবি নিতে হবে শুধুমাত্র আইপিএলের নিজের ওয়েবসাইট থেকে। ভারতের সংবাদমাধ্যম বিনা প্রতিবাদে এই ব্যবস্থা মেনে নিয়েছিল। নিজেদের মত করে ছবি তুলতে না পারা যে নিজের বাকস্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ— সেকথা মিডিয়ার বাবুদের কারও মাথায় আসেনি। আইপিএলের ছবি আইপিএলের হাত থেকে নেওয়া মানেই হল, যেসব ছবি তারা প্রকাশিত হতে দিতে চায়, কেবল সেসব ছবিই প্রকাশিত হবে। আয়োজকদের পক্ষে অপ্রীতিকর কোনো দৃশ্যের অবতারণা হলে তা সংবাদমাধ্যমের চোখে পড়ার রাস্তা বন্ধ করে দেওয়া হল। সংবাদমাধ্যম সোনামুখ করে এই ব্যবস্থা সেদিন মেনে নিয়েছিল।

যা অপ্রিয় তা প্রকাশ করাই যে আমাদের কাজ এবং খেলার মাঠেও তেমন কিছু ঘটতেই পারে— একথা হয় খেয়াল করেনি, অথবা সংবাদমাধ্যমের মালিক আর উচ্চপদস্থ সাংবাদিকরা ভারতীয় ক্রিকেটের নিয়ন্তাদের সঙ্গে হাত মিলিয়েই এমনটি ঘটিয়েছিলেন। কোন আশঙ্কাটি ঠিক তা আমার পক্ষে বলা সম্ভব নয়, কারণ তখন মূলধারার মিডিয়ায় (বস্তুত তখন ওই একটি ধারাই ছিল) কাজ করলেও অত উচ্চপদস্থ আমি কোনোদিনই ছিলাম না।

ললিতবাবু পরে আইপিএল সংক্রান্ত দুর্নীতির মামলায় জড়িয়ে পদচ্যুত হন এবং দেশত্যাগ করেন। ছবি সম্পর্কে ওই নিষেধাজ্ঞাও প্রত্যাহৃত হয়। কিন্তু অধিকার এমন জিনিস যে একবার ছাড়তে শুরু করলে ক্ষমতাবান ক্রমশ একটু একটু করে তা কেড়েই নিতে থাকে।

আইপিএলের মুনাফার ফলে ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড (বিসিসিআই) ফুলে ফেঁপে উঠতে থাকে এবং অর্থের জোরে তার শক্তিও বাড়তে থাকে। ভারতের মাটিতে যে কোনো আন্তর্জাতিক সিরিজের টিভি প্রযোজনা বোর্ড নিজের হাতে তুলে নিল। মানে সম্প্রচার স্বত্ব যে সংস্থার হাতেই যাক, প্রযোজনা করবে বিসিসিআই। মানে দর্শক টিভিতে কী দেখতে পাবেন, কোনটা পাবেন না— সবই চলে গেল বোর্ডের হাতে। যে সংস্থার হাতেই ক্যামেরা থাকুক, তাদের ঘাড়ে কটা মাথা যে এমন কিছু দেখাবে যা বিসিসিআইয়ের বাবুরা লোককে দেখতে দিতে চান না? আপনি বলবেন, ক্রিকেট খেলার সরাসরি সম্প্রচারে এমন কী দেখানোর থাকতে পারে, যা ক্রিকেট বোর্ড লুকোতে চায়? যাঁর বছরের পর বছর মাঠে বসে ক্রিকেট ম্যাচ কভার করার অভিজ্ঞতা নেই, তাঁকে এটা বোঝানো শক্ত।

একটা নিরীহ উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে, আপনি অনুমান করে নিতে পারেন আর কী কী না দেখানো সম্ভব। মহেন্দ্র সিং ধোনি তখনো একদিনের দলের অধিনায়ক, যদিও টেস্ট থেকে অবসর নিয়েছেন। রাঁচিতে একটা একদিনের ম্যাচ কভার করতে গেছি, ম্যাচ চলাকালীন বারবারই বিরাট কোহলি মিড অফ বা মিড অনে দাঁড়িয়ে ফিল্ডিং বদলাচ্ছিলেন, বোলারকে বিভিন্ন নির্দেশ দিচ্ছিলেন। ধোনি দর্শকের ভূমিকায়। প্রেস বক্সেও টিভি চলে, সেখানে কিন্তু একবারও এ দৃশ্য দেখানো হয়নি।

তবে প্রযোজনা বিসিসিআই নিজের হাতে নিয়ে নেওয়ায় আসল ক্ষতি দৃশ্যের দিক থেকে হয়নি, হয়েছে শ্রাব্যের দিক থেকে। মোটামুটি নয়ের দশক থেকে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের এই পরিমাণ সরাসরি সম্প্রচার দেখার সুযোগ হচ্ছে ভারতের ক্রিকেটপ্রেমীদের। যাঁদের স্মৃতি দুর্বল নয়, তাঁরা স্পষ্ট বুঝতে পারছেন ধারাভাষ্য কোথা থেকে কোথায় নেমেছে। আগে প্রাক্তন ক্রিকেটারদের ধারাভাষ্য মন দিয়ে শুনলে খেলাটা সম্পর্কে সত্যিই অনেককিছু শেখা যেত। কারণ রিচি বেনো, সুনীল গাভস্কর, জিওফ্রে বয়কট, ইয়ান চ্যাপেল প্রমুখ ধারাভাষ্যকার তাঁদের বিপুল অভিজ্ঞতা আর জ্ঞানের সদ্ব্যবহার মাঠে যা হচ্ছে তার বিশ্লেষণ করতেন। তার চেয়েও বড় কথা, দল নির্বিশেষে ভালো খেলার প্রশংসা করতেন এবং নিজের দেশের খেলোয়াড়রা খারাপ খেললেও নির্মম সমালোচনা করতেন।

আর এখন? বেনো আর টনি গ্রেগ প্রয়াত। বয়কট স্বাস্থ্যের কারণে এবং চ্যাপেল বয়সের কারণে আর ধারাভাষ্যে নেই। মাইকেল হোল্ডিং সরে যাওয়ার সময়ে বলেছিলেন বটে যে, আর মন চাইছে না; কিন্তু তিনি যেভাবে কমেন্ট্রির মাইক হাতে নিয়ে খেলার বিশ্লেষণের পাশাপাশি ক্রিকেট প্রশাসকদের বিরুদ্ধে খেলোয়াড় জীবনের মতই ভীষণ গতির বাউন্সার হাঁকাতেন, তাতে তাঁর প্রস্থানে কারা খুশি হয়েছে তা বুঝে নেওয়া শক্ত নয়। তবে সবচেয়ে শোচনীয় অবস্থা ভারতীয় ধারাভাষ্যের।

সেকালের সুরেশ সারাইয়া, নরোত্তম পুরীরা অসাধারণ ছিলেন না; প্রবাদপ্রতিম প্রাক্তন ক্রিকেটারও ছিলেন না। কিন্তু কোদালকে কোদাল বলতেন। অনেকদিন পর্যন্ত হর্ষ ভোগলেও তাই। কিন্তু অমিতাভ বচ্চন আর ধোনির টুইটের ঠ্যালায় একবার বিসিসিআইয়ের চুক্তি হারাবার পর থেকে তিনি ভারতীয়দের বেলায় কোদাল দেখলে কেবল চুপ করে থাকেন না, অনেকসময় কোদালকে এরোপ্লেনও বলে দেন। রবি শাস্ত্রী তো চিরকালই প্রশাসকদের চিৎকৃত আনুগত্য দেখিয়েছেন। তার পুরস্কারস্বরূপ ভারতীয় দলের ম্যানেজারি করার দায়িত্ব পেয়েছিলেন। কমেন্ট্রি বক্সে ফেরত এসেও একই কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। কেবল বিরাট বা রোহিত শর্মা নন, শাস্ত্রীর ধারাভাষ্য অনুসারে সূর্যকুমার যাদব, অক্ষর প্যাটেল, হার্দিক পান্ডিয়া, বরুণ চক্রবর্তীরাও একেকজন ‘গ্রেট’।

ভারতীয় দল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বা নামিবিয়াকে হারালেও ঐতিহাসিক জয় হয় আর পরপর সিরিজ হারলেও শাস্ত্রী ও সম্প্রদায় বলে যান— একটা হার একটা বিশ্বসেরা দলকে রাতারাতি খারাপ করে দেয় না। কী করে যে বিশ্বসেরা প্রমাণ হল তা বোঝা মুশকিল, তবে এই আনুগত্যের পুরস্কারস্বরূপ শিগগির মুম্বাইয়ের ওয়াংখেড়ে স্টেডিয়ামের একটি গ্যালারি শাস্ত্রীর নামাঙ্কিত হতে চলেছে।

আকাশ চোপড়া ও অন্যান্য প্রাক্তন ভারতীয় ক্রিকেটার, যাঁরা একইভাবে সমস্ত ভারতীয় ক্রিকেটারকে অন্য গ্রহের জীব বলে প্রচার করতে সদাব্যস্ত এবং বিসিসিআই ও জয় শাহের গুণগান করতে পিছপা নন, তাঁরাও আশা করতে পারেন এরকম কিছু পুরস্কার পাবেন। ভারতে তো আর ক্রিকেট স্টেডিয়ামের অভাব নেই, যতই সেখানে খেলা দেখতে যাওয়া সাধারণ দর্শকের কাছে নরকযন্ত্রণা হোক। এই নুন খাও আর গুণ গাও ব্যবস্থায় মানিয়ে নিতে পারলেন না বলে, সঞ্জয় মঞ্জরেকর বহুদিন হয়ে গেল নিয়মিত ধারাভাষ্য দেওয়ার ডাক পান না। এই সাইট সেই সাইটের বিশেষজ্ঞ হয়ে কাটে। অথচ তাঁর চেয়ে ভাষার উপর অনেক কম দখল থাকা এবং অগভীর বিশ্লেষণ করা বহু প্রাক্তন ক্রিকেটার প্রত্যেক সিরিজে এবং আইপিএলে ধারাভাষ্যকার হিসাবে থাকেন।

ভাবছেন তো, ধারাভাষ্যকারদের কথাবার্তা বিসিসিআই নিয়ন্ত্রণ করার সঙ্গে ক্রিকেট সাংবাদিকতার কী সম্পর্ক? সম্পর্কটা খুবই ঘনিষ্ঠ। প্রথমত, ধারাভাষ্য ব্যাপারটাও ক্রীড়া সাংবাদিকতারই একটা দিক। ওখানেও সত্যি কথাটা বলাই কাজ। সে কাজ আজও ইয়ান বিশপ, ইয়ান স্মিথ, নাসের হুসেন, মাইকেল অ্যাথারটনদের করতে দেখা যায়। তাঁরা ভারতের সমালোচনা করেন বলে আপনি হয়ত রুষ্ট এবং ওঁদের কথায় বর্ণবৈষম্য খুঁজছেন। কিন্তু অ্যাশেজ চলাকালীন ইংল্যান্ডের কী তীব্র সমালোচনা করেছিলেন নাসের আর অ্যাথারটন, সেটা সোশাল মিডিয়ায় খুঁজলেই পেয়ে যাবেন। আমাদের ধারাভাষ্যকাররা কী করেন? শুধু যে নিজেদের ক্রিকেটারদের কোনো দোষ দেখেন না তা নয়, ইদানীং আবার হিন্দুত্ববাদের প্রচারও করেন। কথায় কথায় লাইভ ম্যাচে মা ভবানী, বিষ্ণু, ভোলেনাথ প্রমুখ ভগবানের নাম নেন বিবেক রাজদানরা। উপরন্তু দল নির্বাচনে যত ভুলই হোক, কমেন্ট্রি বক্সে বসে সেটাকে প্রাণপণে ঠিক বলে প্রমাণ করাই তাঁদের কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এই মিথ্যাচারের ফল কিন্তু ভুগছে ভারতীয় ক্রিকেট। বহু যোগ্য ক্রিকেটার জাতীয় দলে সুযোগ পাচ্ছেন না, অযোগ্যরা খেলেই যাচ্ছেন। যদি বলেন খেলায় ফলাফলই শেষ কথা, তাহলে নিজেই বলুন, টেস্ট ক্রিকেটে ভারতীয় দলের সাফল্যের লেখচিত্র উঠছে না নামছে? একদিনের দলও নড়বড় করতে শুরু করেছে। ২০২৩ বিশ্বকাপের ফাইনালে ওঠার পর থেকে ২০২৫ চ্যাম্পিয়নস ট্রফি জিতলেও, দুর্বল শ্রীলঙ্কার কাছে ২৭ বছর পরে সিরিজ হেরেছে। নতুন বছরের শুরুতেই ঘরের মাঠে নিউজিল্যান্ডের কাছেও হারল। টি টোয়েন্টি বিশ্বকাপ পর্যন্ত জয়ের পর জয় এলেও, বিশ্বকাপ শুরু হতেই নড়বড়ে দেখাচ্ছে। দক্ষিণ আফ্রিকা ম্যাচে তো মনে হল দুই দলের মধ্যে এক সমুদ্র ব্যবধান। কিন্তু ধারাভাষ্যে কান দিন। সেই এক কথা শুনবেন— একটা ম্যাচ বা একটা সিরিজ হারলেই বিশ্বসেরা দল খারাপ হয়ে যায় না।
সবচেয়ে চোখে পড়ার মত অধঃপতন হয়েছে গাভস্করের। তিনি এখন ভারতীয় দলের ক্রিকেটারদের চেয়েও বেশি প্রশংসা করেন বিসিসিআইয়ের। এমন ভালো বোর্ড নাকি ক্রিকেটের ইতিহাসে হয়নি। ক্রিকেট দুনিয়ায় যা কিছু ভালো হচ্ছে সবই নাকি বিসিসিআইয়ের দাক্ষিণ্যে, আর যা যা খারাপ হচ্ছে? সেগুলো সবই ইংল্যান্ড আর অস্ট্রেলিয়া যখন ক্রিকেট দুনিয়াকে শাসন করত তখন আরও খারাপ ছিল। অতএব বিসিসিআই যা করছে বেশ করছে।
এবার ভাবুন, যদি কোনো দেশের ক্রিকেট বোর্ড বুঝতে পারে যে টাকার জোরে তারা তাবড় প্রাক্তন ক্রিকেটারদের দিয়ে যা খুশি বলিয়ে নিতে পারে, বলতে না চাইলে মুখ বন্ধ করিয়ে দিতে পারে, তাহলে মাস মাইনেয় বিভিন্ন কাগজে বা টিভি চ্যানেলে অথবা ওয়েবসাইটে কাজ করা সাংবাদিকদের তো এলেবেলে জ্ঞান করবেই। তাদের গলা টিপে ধরবেই। প্রেস ফ্রিডম ইনডেক্সে ভারত যে গত এক-দেড় দশকে ক্রমাগত নিচে নামছে, সেকথা তো এখন সবাই জেনে গেছেন।

সাংবাদিকদের গ্রেফতার হওয়া বা খুন হওয়ার খবরেও আজকাল আমরা আর অবাক হই না। অমুক জায়গায় সংবাদমাধ্যমের ঢোকা নিষিদ্ধ করে দেওয়া হয়েছে, তমুক জায়গায় বিশেষ একটি সংবাদমাধ্যমের সাংবাদিকদের ঢোকা বারণ— এসবও আজকাল প্রায়ই আমরা জানতে পারি। কিন্তু ভারত সরকার বা বিভিন্ন রাজ্যের সরকারগুলো এ কাজ নিয়মিত শুরু করার আগেই করেছিল বিসিসিআই। করোনা অতিমারীর সময়ে অকালমৃত আমার একদা সহকর্মী রুচির মিশ্র, নাগপুরের সাংবাদিক হয়েও জীবনের শেষ ৫-৭ বছর বিদর্ভ ক্রিকেট অ্যাসোসিয়েশন স্টেডিয়ামে (যে মাঠে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট ম্যাচ হয়) ঢুকতে পারেননি। কারণ তিনি ওই ক্রিকেট সংস্থার কর্তাদের বিপক্ষে যায়, এমন একটি প্রতিবেদন লিখেছিলেন।
স্বভাবতই, দ্য হিন্দু বা দি ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস-এর মত দু-একটি সংবাদমাধ্যম ছাড়া কোথাও আপনি এ নিয়ে কোনো প্রতিবেদন পড়বেন না যে, বিসিসিআই পৃথিবীর সবচেয়ে ধনী ক্রিকেট বোর্ড হওয়া সত্ত্বেও, অধিকাংশ স্টেডিয়ামে খেলা দেখতে গিয়ে দর্শকরা দুর্গন্ধযুক্ত, নোংরা বাথরুম পান। খাবার জলের সুব্যবস্থাও থাকে না প্রায়শই। কেবল দর্শকদেরই এই অভিজ্ঞতা হয় তা নয়। আমি নিজে ২০১১ ক্রিকেট বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালের প্রতিবেদন লিখতে আমেদাবাদে গিয়ে দেখেছি, প্রেস বক্সের বাথরুমের অবস্থা কোনো মফসসলের রেলস্টেশনের বাথরুমের থেকেও খারাপ।

কিন্তু এসব তখনো লেখা যেত না, এখনো অধিকাংশ জায়গায় যায় না। লিখলেও ছাপা হবে না, বস বলবেন ‘এটা খবর নয়।’ প্রতিবেদক বেশি চাপাচাপি করলে বেঘোরে চাকরিটা খোয়াতে হতে পারে।

ভাবুন। আপনি দর্শক, আপনার জন্যেই ক্রিকেট চলে কিন্তু। আপনি টিকিট কেটে মাঠে যান বলে বোর্ডের আয় হয়। তার থেকেও বহুগুণ বেশি আয় হয় আপনারা টিভিতে বা ওটিটিতে খেলা দেখেন বলে। আপনাদের বিজ্ঞাপনদাতারা নিজের পণ্য বা পরিষেবা চেনাতে চায় বলে বড় বড় কোম্পানি বিজ্ঞাপন দেয়, সে বাবদ টাকা নিয়েই বিসিসিআই আর আইসিসি ধনী হচ্ছে। নিজেদের আইপিএল ছাড়াও, আইসিসির টাকার সিংহভাগ বিসিসিআই নিয়ে নিচ্ছে আপনার ঘাড়ে বন্দুক রেখে ‘আমাদের জন্যেই তো এত টাকা ওঠে’ যুক্তি দিয়ে। অথচ আপনি যে ন্যূনতম পরিষেবা পান না, সেটা খবর নয়। খবর তাহলে কোনটা? গৌতম গম্ভীর কখন কালীঘাটে পুজো দিতে যাবেন।

মোদ্দাকথা, ভারতের ক্রিকেট সাংবাদিকরা এখন বিসিসিআইয়ের ‘চিয়ারলিডার’। কথাটার বাংলা নেই, তবে রবীশ কুমার ভারতের রাজনৈতিক মিডিয়ার একাংশকে চিহ্নিত করেছেন গোদি মিডিয়া বলে। কারণ তারা নরেন্দ্র মোদী সরকারের কোলে বসে শাসক দল যা বলায় তাই বলে। সেভাবে এই ক্রিকেট সাংবাদিকদেরও গোদি মিডিয়া বলা যেতে পারে। এঁরা প্রলয় দেখেও অন্ধ সেজে থাকতে পারেন এবং সোশাল মিডিয়ার যুগে যেহেতু দায়িত্ব প্রতিবেদন লেখা বা শুট করা দিয়ে শেষ হয় না, সেহেতু সোশাল মিডিয়াকে ব্যবহার করে ঠিক সেই কাজই করে থাকেন, যার সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন ‘বাবু যত বলে/পারিষদ দলে/বলে তার শতগুণ।’
ধরুন, মহম্মদ শামি প্রথম শ্রেণি, লিস্ট এ, কুড়ি বিশ— সবরকম ক্রিকেটে ঝুড়ি ঝুড়ি উইকেট নেওয়ার পরেও কেন বাদ? সরফরাজ খান আর কত রান করলে টেস্ট দলে জায়গা পাবেন? বিশেষত যেখানে দল সিরিজের পর সিরিজ হেরেই চলেছে। মুখ্য নির্বাচক অজিত আগরকর এসব প্রশ্নের উত্তর দিয়ে উঠতে পারছেন না, এদিকে এই সাংবাদিকরা একশো যুক্তি দিয়ে যাচ্ছেন। কে এঁদের দায়িত্ব দিল? কেনই বা নির্বাচকদের যে কোনো সিদ্ধান্তের সপক্ষে এঁদের যুক্তি জোগাতেই হবে? উত্তর একটাই। এঁরা বোঝেন না বা ইচ্ছে করেই ভুলে গেছেন যে এঁরা সাংবাদিক, বোর্ডের মুখপাত্র নন। একই কাজ এঁরা অনেকে কোনো নির্দিষ্ট ক্রিকেটারের হয়েও করেন। দুর্জনে বলে মোটেই নিষ্কাম কর্ম নয় এগুলো, তবে প্রমাণাভাবে সে প্রশ্নে যাচ্ছি না।
এখন কথা হল, বিনা পয়সার চিয়ারলিডারদের বিসিসিআই বা ক্রিকেটাররা কেনই বা গুরুত্ব দেবে, সম্মান করবে? প্রযুক্তির প্রভাবে খবরের কাগজ পড়া অনেক কমে গেছে। টিভির খবরের প্রতিও মানুষের আকর্ষণ দ্রুত কমছে। বহু ক্রিকেটপ্রেমীই এখন খেলার পাশাপাশি খেলার খবরও দেখেন হাতের মোবাইলেই। তাঁদের কাছে পৌঁছবার জন্যে সত্যিই তো সাংবাদিকদের চেয়ে অনেক ভালো মাধ্যম ইনস্টাগ্রামার বা ইউটিউবাররা। তাঁদের আচার আচরণ আমাদের চোখে যতই কুরুচিকর মনে হোক।

আরও পড়ুন রাষ্ট্রীয় ক্রিকেট-সেবক সংঘ

ক্রিকেটার ও প্রশাসকদের চিয়ারলিডার হয়ে যাওয়া অবশ্য শুরু করেছিলেন আগের প্রজন্মের সাংবাদিকরা। বিশেষত পশ্চিমবাংলার ক্রিকেট সাংবাদিকরা সাংবাদিকতাকে ‘পেজ থ্রি’ সাংবাদিকতায় পরিণত করার ব্যাপারে পথিকৃৎ। কী কুক্ষণে কবি বিষ্ণু দে একবার লিখে ফেলেছিলেন ‘সংবাদ মূলত কাব্য’। আজ থেকে বছর তিরিশেক আগে, বাংলার কিছু সাংবাদিক কথাটাকে আক্ষরিক অর্থে নিয়ে ফেলে ক্রিকেটের প্রতিবেদনে কাব্যি করা শুরু করে দিলেন। হয়ত খেলাটাকে বোঝা এবং বিশ্লেষণ করতে পারার খামতি ঢাকতেই। যেহেতু ওঁরা জনপ্রিয় কাগজের সাংবাদিক ছিলেন, তাই ওটাই দস্তুর হয়ে দাঁড়াল। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ওসব পড়ে শিখল— ক্রিকেট সাংবাদিকতা মানে হল, মাঠে কী ঘটছে সেটা বাদ দিয়ে ড্রেসিংরুমের অন্দরের কার সঙ্গে কার ঝগড়া হল বা গলাগলি হল, কে রাতের অন্ধকারে কোন নায়িকার সঙ্গে প্রেম করতে বেরোল— এইসব সুললিত গদ্যে লেখা।

এরকম সাংবাদিকতা করার একটা মস্ত সুবিধা আছে। কারও সমালোচনা করতে হয় না, কেউ খুব একটা চটে না। সকলের প্রিয় থাকা যায় এবং ইনি কী বললেন আর উনি কী বললেন, তাই লিখেই দিনের পর দিন চালিয়ে দেওয়া যায়। খেলোয়াড় আর প্রশাসকদের খুশি রাখতে পারলে কাঁড়ি কাঁড়ি সাক্ষাৎকার পাওয়া যায়। তাতে পরিশ্রম আরও কমে যায়। যদ শুনিতং তদ লিখিতং। উচ্চ পদে উঠে গেলে শুনে শুনে লেখার পরিশ্রমটাও করতে হয় না।
একসময় এক প্রথিতযশা ক্রিকেট সাংবাদিকের অধীনে কাজ করতাম, যাঁর কাজ বলতে ছিল রেকর্ডার নিয়ে গিয়ে কোনো একজন নামকরা বর্তমান বা প্রাক্তন ক্রিকেটারের সাক্ষাৎকার নেওয়া। তারপর সেটা নিজে টাইপ করার পরিশ্রমটুকুও করতেন না। কোনো একজন অধীনস্থ সাংবাদিকের হাতে রেকর্ডারটি ধরিয়ে দিতেন। তারপর একদিন গোটা পাতা বা অর্ধেক পাতা জুড়ে সেই হাজার হাজার শব্দের উদ্দেশ্যহীন, অর্থহীন সাক্ষাৎকার প্রকাশিত হত। কার সাক্ষাৎকার নেবেন তার পিছনেও কোন ভাবনাচিন্তা থাকত না। যাকে পেতেন তারই সাক্ষাৎকার নিতেন, খবরের দিক থেকে তাঁর ওই সময়ে কোনো প্রাসঙ্গিকতা থাক আর না-ই থাক।

এর নাম নাকি সাংবাদিকতা। এ জিনিস দিনের পর দিন চালিয়ে যেতে গেলে একটি ব্যাপারই খেয়াল রাখতে হয়— ক্ষমতাশালীদের খুশি রাখা। সে কাজটা আমার সেই বস এবং তাঁর সমসাময়িক বাংলা কাগজের ক্রীড়া সম্পাদকরা, খুব মন দিয়েই করতেন। আমার বসটি তো একবার ক্রিকেট অ্যাসোসিয়েশন অফ বেঙ্গলের নির্বাচনের আগেরদিন জগমোহন ডালমিয়া গোষ্ঠীর ইশতেহারই কাগজে ছাপিয়ে দিয়েছিলেন। সেসব পাপের ফলই এখন ফলছে। এসব হল খোলা বাজার অর্থনীতি ভারতে চালু হওয়ার পরের সাংবাদিকতার নিদর্শন। তখন সারা ভারতের সংবাদমাধ্যম সবে জনকল্যাণের লক্ষ্যে কাজ করার খোলস ছাড়তে শুরু করেছে, সংবাদমাধ্যমের মালিকরা টাকা করার নতুন নতুন রাস্তা খুঁজছেন।

এই জাতীয় সাংবাদিকরাই তাই মালিকদের পছন্দের লোক হয়ে উঠলেন, কারণ এঁদের মাধ্যমে ক্রিকেটজগতের সবচেয়ে নামকরা খেলোয়াড় আর সবচেয়ে ক্ষমতাশালী প্রশাসকদের সঙ্গ পাওয়া যায়। ব্যবসায়িক সম্পর্ক স্থাপন করা যায়। কর্পোরেট মিডিয়ায় মালিকের পছন্দের লোক হওয়া মানেই উত্তরোত্তর শ্রীবৃদ্ধি। ফলে ওই সাংবাদিকরাই একতলা বাড়ি থেকে ফট্টি টু পৌঁছলেন, বিখ্যাতও হলেন। পরবর্তী প্রজন্মের সাংবাদিকরা শিখলেন— ওটাই পথ, ব্যাকওয়ার্ড পয়েন্ট আর সিলি পয়েন্টের তফাত না জানলেও ক্ষতি নেই।

সব মিলিয়ে ভারতীয় ক্রিকেটে তৈরি হয়ে গেল এমন এক বাস্তুতন্ত্র, যেখানে কেউ কারও ভুল ধরে না। আমিও ভালো, তুমিও ভালো। কিন্তু সবার চাইতে ভালো পাঁউরুটি আর লাভের গুড়। ইতিমধ্যে এসে পড়েছে হিন্দুত্ববাদ, উগ্র জাতীয়তাবাদ। প্রথমে সরকারের গোদি মিডিয়া এই বয়ানটি দাঁড় করাল যে, সরকার মানেই দেশ। এখন বিসিসিআইয়ের গোদি মিডিয়া এই বয়ান প্রতিষ্ঠা করিয়েছে যে, জাতীয় ক্রিকেট দল মানেই দেশ। ফলে এখন ‘অ্যান্টি-ন্যাশনাল’ তকমা পেতে আর সরকারের সমালোচনা করতে হয় না, ক্রিকেট দলের সমালোচনা করাই যথেষ্ট। সমালোচনা করতে না হলে বিশ্লেষণ করতে হয় না, বিশ্লেষণ করতে না হলে পরিশ্রম করতে হয় না, মেধার দরকার হয় না। অতএব ক্রিকেট সাংবাদিকরা ক্রমশ ডোডোপাখি হয়ে যাবেন, দাপিয়ে বেড়াবেন ইনফ্লুয়েন্সাররা।

১৯৯৪ সালের ডিসেম্বরে মহম্মদ আজহারউদ্দিনের ভারত মোহালির সবুজ পিচে ওয়েস্ট ইন্ডিজের কাছে শোচনীয়ভাবে তৃতীয় টেস্টে হেরে যাওয়ার পর মতি নন্দী লিখেছিলেন ‘বিনোদ কাম্বলির ব্যাটিং বাহাদুরি সবই দেশি মন্থর বাউন্সহীন পিচে। পাথরের ওপর মাটি ফেলে তৈরি মোহালির শক্ত নিখুঁত নতুন পিচের বাউন্স এবং ওয়ালশের বলে নাক ফেটে যাওয়া প্রভাকরের রক্তাক্ত মুখ দেখার পর ভারতীয় ব্যাটিংয়ের অবস্থাটা ধরা পড়ল স্কোর বোর্ডে— এক কথায় সেটি হল ভয়।’ সমালোচনার তীক্ষ্ণতায় এর ধারেকাছে পৌঁছতে পারে এমন কোনো লেখা ভারত দেশের মাটিতে নিউজিল্যান্ডের কাছে রসগোল্লা পাওয়ার পরে আপনার প্রিয় সাংবাদিকরা কেউ লিখেছেন কি? মতিবাবু আজ এমন লিখলে সোশাল মিডিয়ায় তাঁর মা-মাসিকে ধর্ষণের হুমকি দিতেন তথাকথিত ক্রিকেটপ্রেমীরাই। অন্য সাংবাদিকরাও পোস্ট করতেন, এসব লেখা অন্যায়। একটা ম্যাচে ব্যর্থ হলেই বিশ্বসেরা দল খারাপ হয়ে যায় না।
অতএব ব্রায়ান বেনেটকে না চিনে সাংবাদিক সম্মেলনে বসাই যুগোপযোগী।

অ2অনুস্বর ডট কম ওয়েবসাইটে প্রকাশিত

আমার গান: আশ্চর্য ভাবনার মঞ্চায়ন

আটপৌরে জীবনের মধ্যে থেকে বিশ্বসাথে যোগে বিহার করার সাধনাই একসময় বাঙালি মধ্যবিত্তের অভিজ্ঞান ছিল। সেই জীবনযাপনকে মঞ্চায়িত করতে গিয়ে নির্দেশক সুমন সেনগুপ্ত যেভাবে একবিংশ শতাব্দীর হোমো স্যাপিয়েন্সের বিশ্ববীক্ষা এবং জ্ঞানচর্চা নিয়ে প্রশ্ন তুলে দিয়েছেন, সেটাই এই নাটককে বিশিষ্ট করে তোলে।

জন্মান্ধ মেয়েকে জ্যোৎস্নার ধারণা দিতে চেয়েছেন আমাদের ভাষার কবি জয় গোস্বামী। আর জন্মান্ধ ছেলেকে এই মহাবিশ্বের আলো, গান, তারামণ্ডলের রহস্য সন্ধানে প্রবৃত্ত করতে চেয়েছেন পদার্থবিদ্যার শিক্ষক অতীন। কেবল অন্ধ নয়, কোমরের নিচ থেকে পঙ্গু হয়ে যাওয়া একমাত্র ছেলে পলাশকে ঘিরে অতীন আর তাঁর স্ত্রী আরতির যে জীবনসংগ্রাম, ইন্দ্রিয়গত প্রতিবন্ধকতা কাটিয়ে ওঠার জন্য পলাশের যে সংগ্রাম – তা নিয়েই আমার গান নাটক বুনেছে চেতলা কৃষ্টি সংসদ। এই নাটকের নাম আমার আলো বা আমার মুক্তি হলে হয়ত আরও যথাযথ হত, কারণ গান এই নাটকে ধরতাই, নাটকের প্রাণ নয়। অন্তত এই আলোচকের তাই মনে হয়েছে। কিন্তু আসল কথা সেটা নয়। অতীন-আরতি-পলাশের মত সাধারণ পরিবার বাংলার শহরে বা মফস্বলে কোনোদিনই বিরল নয়। আটপৌরে জীবনের মধ্যে থেকে বিশ্বসাথে যোগে বিহার করার সাধনাই একসময় বাঙালি মধ্যবিত্তের অভিজ্ঞান ছিল। সেই জীবনযাপনকে মঞ্চায়িত করতে গিয়ে নির্দেশক সুমন সেনগুপ্ত যেভাবে একবিংশ শতাব্দীর হোমো স্যাপিয়েন্সের বিশ্ববীক্ষা এবং জ্ঞানচর্চা নিয়ে প্রশ্ন তুলে দিয়েছেন, সেটাই এই নাটককে বিশিষ্ট করে তোলে। একবার দেখে মনে হয় – আরও কী যেন ছিল, খেয়াল করলাম না! আরেকবার দেখলে হয়।

পলাশ এমন একজন যুবক যার কৌতূহলের শেষ নেই এবং যে উন্মাদের মত জানতে চায় – আলো কী? যেহেতু সে চক্ষুষ্মান নয়, তাই তার আলোকে জানার একমাত্র উপায় জ্ঞানার্জন। বাবা আর ব্রেইল – এই তার সহায়। আর সহায় বাবার একদা ছাত্র বাবুদা, যে প্রবল তার্কিক, লোকের চোখে পাগল। কখনো সে প্রহেলিকা; আবার কখনো জলবৎ তরলং করে বুঝিয়ে দেয় মহাকর্ষ থেকে শুরু করে অণু, পরমাণুর রহস্য। মানুষকে যেভাবে সর্বদাই ঘিরে থাকে আলো আর অন্ধকার, তেমন করেই পলাশকে ঘিরে থাকে তার বাল্যবন্ধু মুনমুন। মোটের উপর এই কজনকে নিয়েই পলাশের মনোজগৎ। আর যারা আছে, তারা সকলেই বাইরের লোক। অবশ্য আরেকজন ব্যক্তি আছে যাকে দৃষ্টিহীন পলাশই কেবল দেখতে পায়, কিন্তু তার কথা বলে দিলে এই নাটকের রহস্য উদ্ঘাটন করে দেওয়ার অপরাধ ঘটে যাবে।

পলাশের চোখ দিয়ে, অর্থাৎ মন দিয়ে, জগৎটাকে দেখানোর জন্যে মঞ্চসজ্জায় (সুরজিৎ দে) এবং পোশাক-আশাকে (পিয়ালী সামন্ত, রুশতি চৌধুরী) সাদা, কালো আর ধূসরের বাইরে কোনো রং ব্যবহার করা হয়নি। ব্যতিক্রম শুধু পলাশের কল্পনায় তৈরি দিগন্ত, মানুষ বা পাখির মূর্তি। এই কল্পনাশক্তি মুগ্ধ করে। আগাগোড়া হুইলচেয়ারে বসা পলাশের চরিত্র বহুমাত্রিক। সে যেমন জ্ঞানপিপাসু, তেমনি অবুঝ। যত সরল, তত দুর্বোধ্য। সে অনাবিল আনন্দ পেতে পারে, আবার হতাশার চোটে হিংস্রও হয়ে উঠতে পারে। অভিনেতা সায়ন্তন মৈত্র এই পরস্পরবিরোধিতা তুলে ধরতে অনেকটাই সফল, তবে কিছু কিছু মুহূর্তে মনে হয়েছে তিনি অভিব্যক্তির বৈচিত্র্যের অভাবে ভুগছেন। তাঁর হাহাকার আর চরম আনন্দের অভিব্যক্তি প্রায় এক হয়ে গেছে।

ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র পলাশের বাবা এবং পথপ্রদর্শক অতীন। এই চরিত্রের অভিনেতা ময়ূখ দত্তের (নির্দেশনা সহকারীও বটে) বৈজ্ঞানিক আলোচনায় মশগুল হয়ে জটিল তত্ত্ব সহজ করে বুঝিয়ে দেওয়ার সাবলীলতা যতখানি মনোমুগ্ধকর, প্রতিবন্ধী সন্তানের বাবা হিসাবে অসহায়তা ততখানি স্পষ্ট হয় না। মঞ্জিমা চট্টোপাধ্যায় অভিনীত আরতি চরিত্রের পরিসর বড্ড সীমিত মনে হয়। তিনি তো স্বামীর মত ছেলের সঙ্গে জ্ঞানবিজ্ঞানের অভিযানে বেরোতে পারেন না, ফলে তাঁর সঙ্গে রসায়ন নিশ্চয়ই ভিন্নতর; মা হিসাবে তাঁর যন্ত্রণারও কিছু নিজস্বতা থাকার কথা। তা নাটকে তেমনভাবে আলাদা করে দেখা যায় না। পিয়ালী অভিনীত মুনমুনের চরিত্রও যতটা সকলের ভালোবাসা ও আক্রমণের লক্ষ্য, ততটা সোচ্চার নয়। সেদিক থেকে এই নাটকের নারী চরিত্রগুলোকে তুলনায় দুর্বল বললে ভুল হবে না। মঞ্চে সামান্য সময় কাটানো ইন্দ্রাণীও (সৃজনী দে) যেমন একেবারেই প্রান্তিক চরিত্র। জানার ইচ্ছা, জানার জন্যে ক্লেশ স্বীকার করার রোমাঞ্চ উপলব্ধি করা অতীনের বিপরীতে উপরচালাক সাংবাদিকের চরিত্রে সুস্নাত ভট্টাচার্য্যের অভিনয় খুবই বিশ্বাসযোগ্য। খুব বেশি সময় মঞ্চে না থাকলেও যিনি অত্যন্ত প্রভাবশালী অভিনয় করেন তিনি হলেন পলাশের দেখা ব্যক্তির চরিত্রে অরিত্র দে। নাটকের তুঙ্গ মুহূর্তে পলাশের সঙ্গে তাঁর মানসিক দ্বন্দ্বযুদ্ধ রীতিমত রোমাঞ্চকর।

যে অভিনেতার কথা শেষে বলতে হবে, তিনি হলেন বাবুদার চরিত্রে অভিনয় করা অর্ক চক্রবর্তী। চরিত্রটা বেশ বিপজ্জনক। একাধারে যাত্রার বিবেক, ‘কমিক রিলিফ’, বিজ্ঞানের একনিষ্ঠ চিরছাত্র, অতীন-আরতি-পলাশের পরিবারের প্রায় অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। কিন্তু যা সবচেয়ে বিপজ্জনক – সে দর্শককে বারংবার অস্বস্তিতে ফেলে স্বাভাবিকত্ব আর পাগলামির ধারণাকে ওলটপালট করে দিয়ে। অর্কর চরিত্র নাট্যকারের পূর্ণ সহায়তা পেয়েছে। সবচেয়ে হাস্যরস উদ্রেককারী সংলাপগুলো তার, আবার সবচেয়ে ভাবিয়ে তোলার মত সংলাপগুলোও তার। এই মহাবিশ্বকে পলাশের কাছে ভাঙতে ভাঙতে ফার্মিয়ন আর বোসন কণায় এনে ফেলার দায়িত্বও পালন করে বাবুদাই। নাটকটাকে যদি ঘুড়ি হিসাবে ভাবা হয়, তাহলে তার লাটাই অনেকাংশে অর্কর হাতেই থাকে এবং তিনি অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে ঘুড়ির উড়ান নিয়ন্ত্রণ করেন। তাঁর পাগলামি মাত্রা ছাড়ায় না বা লোক হাসানোর চেষ্টা বলে মনে হয় না। আবার অন্য চরিত্রগুলোকে হাস্যাস্পদ করে তুলে নিজে হাসলেও, বিজ্ঞানালোচনার সময়ে গাম্ভীর্যের ঘাটতি হয় না।

আরও পড়ুন অবহেলিত বিজ্ঞান আর কৈশোরকে ভালবেসে এল পক্ষীরাজের ডিম

শুরুতেই বলেছিলাম – গান এই নাটকের ধরতাই। রবীন্দ্রনাথের গান দিয়ে নাটকের ভাবনাকে সংহত করতে চেয়েছেন নির্দেশক। যে গানগুলো ব্যবহৃত হয়েছে সেগুলো যে নাটকের বিষয়বস্তু এবং পরিস্থিতির সঙ্গে জুতসই তা নিয়ে সন্দেহ নেই। সেঁজুতি গুপ্ত, অরিত্র এবং মঞ্জিমার গাওয়াও চমৎকার। কিন্তু গানের ব্যবহার কিঞ্চিৎ কম হলেই ভালো হত মনে হয়। বিশেষত যে গানের দু কলি পলাশ গাইছে মঞ্চের উপর, আলো নিভে যাওয়ার পর সেই গানেরই আরও খানিকটা অংশ অন্য কণ্ঠে বাজছে – এ জিনিস নেহাতই বাহুল্য। বাহুল্যের সমস্যা মঞ্চসজ্জাতেও রয়েছে। পলাশের বিজ্ঞানমগ্নতা বোঝাতে বেশকিছু জিনিস টাঙিয়ে মঞ্চটাকে ছোট করে আনা হয়েছে। তাতে ক্ষতি নেই, কিন্তু দর্শকের দেখতে পাওয়ার মত করে একখানা বাক্সের গায়ে ‘And God Said’ এবং জটিল অঙ্ক লিখে রাখার কি খুব প্রয়োজন ছিল? অত নিচু জায়গায় কোনোকিছুর গায়ে বড় বড় করে লিখে নিশ্চয়ই অতীন অন্ধ ছেলেকে অঙ্ক শেখান না? আজকের বাড়িতে ল্যান্ডলাইনের ভূমিকা যতটুকু দেখানো হয়েছে তাতে ওটাও না থাকলে ক্ষতিবৃদ্ধি হত না।

এ নাটক যেমন ভাললাগার, তেমনই যন্ত্রণার। অতীন এক জায়গায় বলছেনও ‘ব্যথাকে উপভোগ করতে শেখো’। স্বভাবতই এই নাটকে ফিরে ফিরে এসেছেন জীবনানন্দ দাশ। চিরায়ত জ্ঞানের সঙ্গে এ যুগের কেজো জ্ঞানের দ্বন্দ্ব যথার্থ ধরা পড়েছে ব্যক্তির সংলাপে ‘আমাদের এই শতকের/বিজ্ঞান তো সংকলিত জিনিসের ভিড় শুধু— বেড়ে যায় শুধু’ উচ্চারণে। কিন্তু এমন নাটকের সংলাপে মাঝেমাঝে এত পেলবতা কেন? পলাশ নামের ছেলেটাকে বাবা, মা, বন্ধু মিলে বারবার ‘পলাশ ফুল’ বলে ডাকা কেন? আবহসঙ্গীতে ফিরে ফিরে আরামদায়ক ‘মেঘ বলেছে যাব যাব’ সুর বাজানোই বা কেন? রাবীন্দ্রিকতা আসলে বেশ বিপজ্জনক ব্যাপার। মাত্রা ছাড়ালেই অশ্লীল লাগতে শুরু করে।

তবে যতই দোষ ধরা যাক, এই নাটক যে বিষয়কে তুলে ধরেছে তার যে দৃশ্যায়ন সম্ভব – না দেখলে বিশ্বাস করা শক্ত, এবং নাটকের শুরুতে দর্শকের মনে যে উৎকণ্ঠা সৃষ্টি করা হয়েছে, শেষে তার নিরসনের মুহূর্তটা বিশুদ্ধ ম্যাজিক। সেই ম্যাজিকের বড় কৃতিত্ব অবশ্যই আলোর দায়িত্বে থাকা কল্যাণ ঘোষের। তিনি মঞ্চে আলো ফেলার পাশাপাশি দর্শকের দেখতে পাওয়ার মত অন্ধকারও সৃষ্টি করেছেন। নইলে রেশ থেকে যাওয়ার মত ম্যাজিক সৃষ্টি হত না ক্লাইম্যাক্সে।

নাগরিক ডট নেট ওয়েবসাইটে প্রকাশিত

বাংলা বলে কোনো ভাষা নেই, বাঙালি বলে কোনো জাতি নেই?

আজ থেকে বছর তিরিশেক আগেই বাংলা ভাষা কোনটা, বাঙালি কারা – সে বোধ ভদ্রলোক শ্রেণি হারিয়েছে। ফলে আজ যে বাঙালি সাহিত্যিক, অধ্যাপকদের দেখা যাচ্ছে ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়াররা আক্রান্ত না হলে বাংলা ভাষার উপর আক্রমণ হচ্ছে তা বিশ্বাস না করতে, বা বাঙালি প্রবাসী শ্রমিকদের উপর আক্রমণকে বাঙালিদের উপর আক্রমণ বলে না ধরতে – তাতে অবাক হওয়ার কিছু নেই।

ঠিক এক দশক আগের কথা। সদ্য রাজকাহিনী বেরিয়েছে (অবন ঠাকুরের নয়, সৃজিত মুখার্জির)। ইংরিজি জানা বাঙালি ভদ্রলোক, ভদ্রমহিলারা আপ্লুত হয়ে একটা গান শেয়ার করতে লাগলেন সোশাল মিডিয়ায়। কী গান? ওই যে গানটা আমাদের জাতীয় স্তোত্র। কিন্তু এত আপ্লুত হওয়ার কারণ কী? কারণ রবীন্দ্রনাথের লেখা গানটা আসলে অনেক বড়, অত বড় জাতীয় স্তোত্র রাখা যায় না ব্যবহারিক অসুবিধার কারণেই। তাই আমাদের জাতীয় স্তোত্র হিসাবে ব্যবহৃত হয় শুরুর দিকের খানিকটা অংশ। ওই ছবিতে সৃজিতবাবু গোটা গানটাই ব্যবহার করেছিলেন। এই নিয়ে আপ্লুত হওয়া অন্যায় নয়। কিন্তু মুশকিল হল, দেখা গেল যাঁরা শেয়ার করছেন তাঁদের অনেকেই লিখছেন ‘লিসন টু দ্য বেঙ্গলি ভার্শন অফ আওয়ার ন্যাশনাল অ্যান্থেম। ইট’স বিউটিফুল’ – এই জাতীয় কথাবার্তা। সাধারণত সোশাল মিডিয়ায় কারোর কোনো ভুল ধরলে তিনি প্রবল খেপে গিয়ে যিনি ভুল ধরেছেন তাঁকে অপমান করেন। এক্ষেত্রে যেসব বাঙালি মান-অপমানের তোয়াক্কা না করে ওইসব পোস্টে মন্তব্য করেছিলেন বা নিজে পোস্ট করেছিলেন যে গানটা তো বাংলাতেই লিখেছিলেন রবিবাবু, তার আবার বাংলা ভার্শন কী – তাঁদের ‘আঁতেল’, ‘সবজান্তা’ ইত্যাদি বিশেষণ দেওয়া হচ্ছিল। তবে ভারতবর্ষে ইংরিজি জানা মূর্খদের আত্মবিশ্বাস বেশি। তাই সেই মূর্খরা কেউ কেউ আবার যিনি শুধরে দেওয়ার চেষ্টা করছেন তাঁকেই ভুল প্রমাণ করার চেষ্টা করছিল। ব্যাপার দেখে হাসা উচিত না কাঁদা উচিত তা বুঝতে না পারলেও, এটুকু বুঝে গিয়েছিলাম যে বাঙালি সংস্কৃতির ধারক ও বাহক যে ভদ্রলোক শ্রেণি, তাদের ভবিষ্যৎ ঝরঝরে হয়ে গেছে। আজ অমিত মালব্যকে যতই গালাগালি দিন, একথা নিশ্চিত হয়ে বলার উপায় নেই যে তাঁর ওই গণ্ডমূর্খ পোস্টের যুক্তিগুলো কোনো ইংরিজি শিক্ষিত বাঙালি ভদ্রলোকেরই জুগিয়ে দেওয়া নয়।

এই ভদ্রলোক-ভদ্রমহিলাদের অতি পছন্দের একখানা ধর্মীয় সংগঠন আছে, যাকে তাঁরা ধর্মনিরপেক্ষ সংগঠন বলে ভাবতে ভালবাসেন (মানে আমড়াকে আম বলে ভাবতে ভালবাসেন) – রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশন। রাজকাহিনীর গান নিয়ে ভদ্রলোক শ্রেণির রাজবোকামির দেড় দশক আগে ওই সংগঠন পরিচালিত একটা কলেজের পড়ুয়া ছিলাম। আমার সহপাঠী ছিল মঠের ভিতরেই গড়ে ওঠা, সন্ন্যাসীদের দ্বারা পরিচালিত বেদ বিদ্যালয়ে ছোট থেকে লেখাপড়া করে আসা কয়েকজন ছাত্র। তারা জনগণমন গাইত সংস্কৃত উচ্চারণে। আমরা কয়েকজন ছাত্র মিলে একদিন তাদের জিজ্ঞেস করলাম ‘ওরকম উচ্চারণে গাস কেন?’ তারা অত্যন্ত গর্বের সঙ্গে জানাল, ওটা ছোট থেকে শিখেছে। ওটাই শুদ্ধ সংস্কৃত উচ্চারণ। আমরা জিজ্ঞেস করলাম ‘বাংলা গানের উচ্চারণ সংস্কৃতের মত হবে কেন?’ তারা কিছুতেই মানতে রাজি হল না যে গানটা বাংলায় লেখা। নির্ঘাত তারা আজও জাতীয় স্তোত্র গাওয়ার প্রয়োজন হলে ‘শুদ্ধ সংস্কৃত’ উচ্চারণেই গায়। এরা কেউ কিন্তু প্রান্তিক পরিবারের সন্তান নয়, হিন্দিভাষীও নয়। গ্রাম, শহর – দুরকম জায়গার ছেলেই ছিল সেই দলে। সত্যি কথা বলতে, কেবল এরা নয়। আইসিএসই বা সিবিএসই স্কুলে পড়ে আসা বাঙালি সহপাঠীদেরও দেখেছি সংস্কৃত উচ্চারণে জনগণমন গাইতে। অর্থাৎ আজ থেকে বছর তিরিশেক আগেই বাংলা ভাষা কোনটা, বাঙালি কারা – সে বোধ ভদ্রলোক শ্রেণি হারিয়েছে। ফলে আজ যে বাঙালি সাহিত্যিক, অধ্যাপকদের দেখা যাচ্ছে ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়াররা আক্রান্ত না হলে বাংলা ভাষার উপর আক্রমণ হচ্ছে তা বিশ্বাস না করতে, বা বাঙালি প্রবাসী শ্রমিকদের উপর আক্রমণকে বাঙালিদের উপর আক্রমণ বলে না ধরতে – তাতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। এটাই অনিবার্য ছিল।

এখন কথা হচ্ছে, এমনটা হল কেন? বাংলা ভাষা, সংস্কৃতির লাগাম তো চিরকালই এই ভদ্রলোকদের হাতেই থেকেছে। দুই বাংলা ভাগ হওয়ার পরে তো আরওই। বাংলা সিনেমার যত বিখ্যাত অভিনেতা, অভিনেত্রীর নাম মনে করতে পারেন তাদের কজন হিন্দু নিম্নবর্গীয় বা মুসলমান? পাকিস্তান ভেঙে বাংলাদেশ হওয়ার পরে দু-চারজন মুসলমান অভিনেতা, অভিনেত্রী পশ্চিমবঙ্গে অভিনয় করেছেন বটে, কিন্তু মুসলমান চরিত্র কটা এপারের বাংলা সিনেমায়? মুসলমান সমাজের গল্পই বা কটা? পশ্চিমবঙ্গের বাংলা পত্রপত্রিকার সম্পাদক, সাহিত্যিকদের মধ্যে খুঁজতে গেলেও ঘুরে ফিরে সেই প্রাক-স্বাধীনতা যুগের মীর মোশাররফ হোসেন, কাজী নজরুল ইসলাম, জসীমউদ্দিন, সৈয়দ মুজতবা আলী, এস ওয়াজেদ আলী বা একটু পরের সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজের নাম আসবে। কিছু নিবিষ্ট পাঠক হয়ত আবুল বাশার বা আফসার আহমেদের নাম মনে করতে পারবেন। জনপ্রিয় গাইয়ে, বাজিয়েদের মধ্যেও সেই ইংরিজি শিক্ষিত বামুন, কায়েত, বদ্যিরাই বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ। শিক্ষক, অধ্যাপক, ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, উকিল, সাংবাদিক, রাজনীতিবিদ – যেদিকে তাকাবেন সেদিকই তো ভদ্রলোকরা আলো করে আছেন। তাহলে এ অবস্থা হল কেন? স্পষ্টতই পূর্বসুরিরা পতাকা যাদের হাতে দিয়েছেন তাদের বহিবার শকতি দেননি। কিন্তু কেন দেননি, বা দিতে পারেননি?

বামফ্রন্ট সরকার প্রাথমিক স্কুল থেকে ইংরিজি তুলে দেওয়ার জন্যে ভদ্রলোকেরা বেসরকারি ইংরিজি মাধ্যম স্কুলে ছেলেমেয়েদের ভর্তি করতে বাধ্য হন আর তা থেকেই শিক্ষিত বাঙালির সঙ্গে বাংলা ভাষার বিযুক্তি শুরু, কারণ ইংরিজিটা তো শিখতেই হবে। নইলে কাজকর্ম পাওয়া যায় কী করে? ওটাই তো কাজের ভাষা।

এরকম একটা তত্ত্ব প্রায়শই খাড়া করা হয়। এই তত্ত্ব নজর করার মত। শিক্ষা মাতৃভাষাতেই হওয়া উচিত – একথা আমাদের রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, সত্যেন্দ্রনাথ বসু থেকে শুরু করে গোটা দুনিয়ার অনেক বড় বড় পণ্ডিত বলেছেন। আবার বিপক্ষেও যুক্তি আছে। সে বিতর্কে না গিয়ে একথা মেনে নেওয়া যাক যে, কোনো ভাষা কাজের ভাষা হয়ে না থাকলে গুরুত্ব হারায়। বামফ্রন্ট সরকার মাতৃভাষার উপর জোর দিলেও বাংলাকে গোটা রাজ্যের কাজের ভাষা করে তোলার পর্যাপ্ত উদ্যোগ নেয়নি। পাশাপাশি ভারতের মত বহুভাষিক দেশে ইংরিজির গুরুত্ব বিশ্বায়নের সঙ্গে সঙ্গে বেড়েছে এবং ভদ্রলোকরা বাংলা ভাষাকে ক্রমশ ত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছেন – একথা তর্কের খাতিরে নাহয় মেনে নেওয়া গেল। কিন্তু কথা হচ্ছে, বাঙালি ভদ্রলোকদের ছেলেমেয়েরা তো ইংরিজি মাধ্যম স্কুলে পড়ছে বিংশ শতাব্দীর গোড়া থেকেই। যাঁর বই ছেলেমেয়ের হাতে তুলে না দিলে আজও এমনকি অনাবাসী বাঙালিদেরও ‘বাংলার সংস্কৃতি শেখাচ্ছি না’ ভেবে অপরাধবোধ হয়, সেই লীলা মজুমদার নিজেই কনভেন্টের ছাত্রী ছিলেন। তা ইংরিজি মাধ্যম স্কুলে ভর্তি করলেই ছেলেমেয়েকে বাংলা বইপত্তর পড়ানো, বাংলা গান শোনানো, সিনেমা দেখানো, নাটক দেখানো তুলে দিতে হবে – এ নিয়ম কি বামফ্রন্ট সরকারের তৈরি? আগেকার বাঙালির অমন করার দরকার পড়েনি, হঠাৎ বামফ্রন্ট সরকার প্রাথমিক শিক্ষা থেকে ইংরিজি তুলে দিতেই দরকার পড়ল?

সত্যি কথা বলতে, সিপিএম ক্রমশ ভদ্রলোকদের পার্টি হয়ে যাওয়ায় বামফ্রন্টও মেহনতি মানুষের সরকার থেকে ভদ্রলোকদের সরকারেই পরিণত হয়েছিল নয়ের দশকের শেষার্ধে। তাই ভদ্রলোকদের ইংরিজি নিয়ে হাহুতাশের প্রভাবে এই সহস্রাব্দের গোড়ায় কিন্তু প্রাথমিকে ইংরিজি ফিরিয়েও এনেছিল। তারপর কি ভদ্রলোকেরা ছেলেমেয়েদের সরকারি প্রাথমিক স্কুলে ফিরিয়ে এনেছিলেন? মোটেই না। উলটে মাধ্যমিক স্তরেও বেসরকারি স্কুলে ভর্তি করার ঝোঁক বেড়ে গিয়েছিল। এখন নাহয় এসএসসি কেলেঙ্কারি ইত্যাদি যুক্তি দিয়ে বলা যায় সরকারি স্কুলগুলো পড়াশোনার অনুপযুক্ত হয়ে গেছে। বাম আমলে তো প্রতিবছর এসএসসি পরীক্ষা হত, রাজ্যের আনাচে কানাচে গজিয়ে ওঠা ইংরিজি মাধ্যমের স্কুলগুলোর মাস্টারদের চেয়ে অনেক কঠিন প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষা দিয়ে মাস্টারমশাই, দিদিমণিরা সরকারি বাংলা মাধ্যম স্কুলগুলোতে যোগও দিতেন। ত্রুটি থাকলেও স্কুলের পরিকাঠামো নিয়ে, পড়াশোনা নিয়ে তখনকার সরকারের আগ্রহ যে বর্তমান সরকারের চেয়ে বেশি ছিল – তা আজকাল অনেক তৃণমূল কংগ্রেস সমর্থকও স্বীকার করেন। তাহলে?

এই প্রশ্নের উত্তর দিতে গেলে আসলে বাঙালি ভদ্রলোকের অভদ্রতা প্রকাশ হয়ে পড়বে। বহু ভদ্রলোকের কাছেই আপত্তিকর ছিল বাম আমলে মুটে, মজুর, রিকশাওয়ালা, বাড়ির কাজের লোক, মুচি, মেথরের ছেলেমেয়েদের তাদের ছেলেমেয়েদের সঙ্গে একই স্কুলে ঢুকে পড়া। আরও বেশি গায়ে লাগত যখন তারা কেউ নিজের ছেলেমেয়ের চেয়ে পরীক্ষায় বেশি নম্বর পেয়ে যেত। পরীক্ষার ফল বেরোবার পর আমাদের অনেককেই বকুনি খেতে হয়েছে ‘তোর লজ্জা করে না? অমুকের বাড়িতে কোনোদিন কেউ স্কুলের গণ্ডি পেরোয়নি, আর ও অঙ্কে ৮৫ পেয়ে গেল। তুই মাস্টারের ছেলে হয়ে ৫৫? ছিঃ!’ মাস্টারের ছেলে বড় হয়ে মাস্টার; ডাক্তারের ছেলেমেয়ে তো বটেই, ছেলের বউ আর জামাইও ডাক্তার; উকিলের ছেলেমেয়ে উকিল; মুদির ছেলে মুদি, তার মেয়ে অন্য ছোট ব্যবসায়ীর গৃহবধূ; রিকশাওয়ালার ছেলে সবজিওয়ালা – এই সামাজিক স্থিতাবস্থায়, গোবলয়ের লোক বলে বাঙালি ভদ্রলোক যাদের দিকে তাকিয়ে নাক সিঁটকোয়, তাদের মত নিজেরাও অভ্যস্ত ছিল। সেই স্থিতাবস্থা ঘেঁটে যাওয়ার সামান্য সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল বাম আমলে। ওটুকুই ভদ্রলোকদের পক্ষে শিশুর আত্মার উপর নরকের দুঃস্বপ্নের মত হয়ে দাঁড়িয়েছিল। এই দুঃস্বপ্ন থেকে মুক্তি পাওয়ার পথ তারা খুঁজে পায় অনেক টাকা মাইনের বেসরকারি স্কুলে। নয়ের দশক থেকে মনমোহনী অর্থনীতির জোরে বাঙালি ভদ্রলোকের জীবনে আমূল পরিবর্তন এসে যায়। তাদের হাতে এসে গেল খরচ করার মত অতিরিক্ত টাকা। ফলে ছোটলোকের ছেলেপুলের সঙ্গে এক স্কুলে পড়ানোর আর দরকার রইল না। পাঠিয়ে দাও ফেলো কড়ি মাখো তেল স্কুলে। এমনকি বামফ্রন্ট সরকারের বদান্যতায় উচ্চমধ্যবিত্ত হয়ে ওঠা সরকারি স্কুলের মাস্টারমশাই, দিদিমণিরাও নিজেদের ছেলেমেয়েকে ইংরিজি মাধ্যম স্কুলে পাঠানো শুরু করেন তখনই। সংখ্যাটা অবশ্যই এখন অনেক বেড়েছে, তার পিছনে বর্তমান সরকারের শিক্ষাজগৎ নিয়ে ছেলেখেলার অবদান কম নয়। কিন্তু আসল কথা হল, ‘ইংরিজি শিখতে হবে বলে ইংরিজি মাধ্যম স্কুলে পড়াচ্ছি’ – এটা স্রেফ অজুহাত। দুর্বল অজুহাত। সেটা বুঝতে পেরেই যুক্তি জোরদার হবে মনে করে নয়ের দশকে অনেক বাবা-মা বলতেন ‘ইংরিজি বলা শিখতে হবে। নইলে কম্পিটিশনে দাঁড়াতে পারবে না। তাই ইংলিশ মিডিয়ামে দিয়েছি।’ এও ভারি মজার কথা। স্কুলটা কি তাহলে ‘স্পোকেন ইংলিশ’ শেখার জায়গা? ওটা জানলেই চাকরিবাকরি পাওয়া যায়? চোস্ত ইংরিজি বলতে পারলেই অঙ্ক, বিজ্ঞান, ভূগোল, ইতিহাস – সব শেখা হয়ে যাবে? অধিকাংশ বাঙালি ভদ্রলোক কিন্তু তেমনই মনে করে আজও। কথা বললেই টের পাওয়া যায়। তবে আজকাল একটা নতুন ব্যাপার ঘটেছে। ইংরেজ আমলে বাঙালি ভদ্রলোকের জীবনের লক্ষ্য ছিল যতটা সম্ভব ইংরেজ হওয়া, স্বাধীনতার পর থেকে – অনাবাসী ভারতীয় হওয়া। আজকের বাঙালি ভদ্রলোকের জীবনে একটা নতুন লক্ষ্য যোগ হয়েছে – মাড়োয়ারি বা গুজরাটি হওয়া। তাই ছেলেপুলেকে ইংরিজি মাধ্যমে পড়িয়ে ইংরিজি বলা শিখিয়েই সে খুশি নয়, দ্বিতীয় ভাষা হিসাবে হিন্দিও গুঁজে দিচ্ছে। সুতরাং বাংলা মাঠের বাইরে। গল্পের বই পড়ার এবং পড়ানোর চল বাঙালি ভদ্রলোক বাড়ি থেকে উঠে গেছে বহুকাল, এখন আবার বাবা-মায়েরা খেয়াল রাখেন, ছেলেমেয়ে যেন বাংলা সিরিয়াল বা সিনেমা দেখে না ফেলে।

এমতাবস্থায় বাংলা ভাষা-সংস্কৃতি কী, কোনটা তার অঙ্গ আর কোনটা নয় – তা নিয়ে স্পষ্ট ধারণা থাকবে কোন চুলোয়? সংজ্ঞাগুলো ঠিক করে দিয়েছি আমরা ভদ্রলোকরা। আমাদের সংজ্ঞায়িত বাংলা ভাষা-সংস্কৃতিকে আমরাই বাংলার বাইরে বাংলা বলে পরিচিত হতে দিইনি, ওগুলোকে আমাদের সংস্কৃতির বৃত্তে জায়গাই দিইনি। কলকাতা ও সংলগ্ন এলাকার ভাষায় লেখা গান আমাদের ‘আধুনিক গান’। বাঙাল ভাষার গানকে তখনই বাংলা গান বলে মেনেছি যখন শচীন দেববর্মণের মত রাজপুত্র গেয়েছেন। গ্রামের মানুষের নিজের গানকে লোকগীতি বলে আলাদা বাক্সে রেখেছি। পনিটেল বাঁধা শহুরে ভদ্রলোকরা গিটার বাজিয়ে ব্যান্ড বানিয়ে গাইলে তবেই সে গানের জায়গা হয়েছে প্রেসিডেন্সি, লেডি ব্র্যাবোর্ন বা যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস মোচ্ছবে। আচ্ছা তাও নাহয় মেনে নেওয়া গেল। কিন্তু নিজেরা যাকে বাংলা ভাষা, বাঙালি সংস্কৃতি বলে দেগে দিয়েছি তাকে সমাজের নিচের তলায় ছড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টাও কি করেছি? ফিল্ম সোসাইটি বানিয়ে ঋত্বিক ঘটকের উদ্বাস্তুদের নিয়ে তৈরি ছবি দেখেছি আর প্রবন্ধ লিখেছি। পরবর্তীকালে বাংলাদেশ থেকে চলে আসা উদ্বাস্তু, যারা এখানে এসে পেটের দায়ে আমাদের বাড়িতে বাসন মাজে বা ঘর ঝাঁট দেয় – তাদের দেখানোর তো চেষ্টা করিনি। সত্যজিৎ রায় বিশ্ববন্দিত পরিচালক বলে জাঁক করেছি, কিন্তু পথের পাঁচালী-র হরিহর রায়ের পরিবারের মত হতদরিদ্র বাঙালিকে ওই ছবি দেখানোর কোনো প্রয়াস তো আমাদের ছিল না। কারণ আমরা নিশ্চিত ছিলাম – ওরা ওসব বুঝবে না। ওদের জন্যে বেদের মেয়ে জ্যোৎস্না-ই ঠিক আছে। ঘটনা হল, যার দুবেলা পেট ভরে ভাত জোটে না, তারও মনের খিদে থাকে এবং সে খোরাক খুঁজে নেয়। বাংলার গরিব মানুষ, নিম্নবর্গীয় মানুষও তাই করেছে। আমাদের তৈরি সংস্কৃতি যখন তাদের পোষায়নি তখন তারা হিন্দি সিনেমা, হিন্দি গানে মজেছে। অধুনা ইউটিউব শর্টস আর ইনস্টা রিলসে। আমাদের অ্যাকাডেমি, আমাদের নন্দন নিয়ে আমরাই বুঁদ ছিলাম। ও জিনিস আজ কেউ বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দিলেই বা ওদের কী? এদিকে আমরা, বিশ্বায়িত ভদ্রলোকরাও, হিন্দি ভাষা-সংস্কৃতির দিকে ঝুঁকেছি। ইংরিজি তো ছিলই। ফলে এখন হঠাৎ আবিষ্কার করছি – হিন্দি-হিন্দু-হিন্দুস্তান তত্ত্বের প্রবক্তারা বলে দিচ্ছে বাংলা বলে আসলে কোনো ভাষা নেই, আর সেটাকেই ঠিক বলছেন বাংলা ভাষায় বইপত্তর লিখে নাম করে ফেলা লেখকরা।

নবজাগরণই বলি আর সমাজ সংস্কার আন্দোলনই বলি, উনিশ শতকে সেই প্রক্রিয়ার মধ্যে দিয়ে আলোর সন্ধান যে বাঙালি ভদ্রলোক পেয়েছিল তা অনস্বীকার্য। কিন্তু আলো বাড়াতে গেলে আলো ছড়াতে হয়। ভদ্রলোকরা কী করেছে? প্রদীপ নিজের ঘরেই রেখে দিয়েছে, হাতে নিয়ে যাদের ঘরে আলো নেই তাদের কাছে যায়নি, তারা আমাদের প্রদীপ থেকে নিজেদের প্রদীপ জ্বালিয়ে নিতে পারেনি। এখন আমাদের প্রদীপের আয়ু ফুরিয়ে এসেছে, তাই চারপাশ অন্ধকারে ডুবে যেতে বসেছে। আসলে আমাদের বাংলা ভাষা চর্চা, সংস্কৃতি চর্চা বা যে কোনো চর্চাই বহুকাল হল প্রদর্শনীতে পরিণত হয়েছে। ওর মধ্যে ঘাম ঝরানোর কোনো ব্যাপার নেই, তাই ও থেকে আমাদের কোনো অর্জনও নেই। কেন এমন হল? ভাবতে গেলে জ্যোতি ভট্টাচার্য ‘কালচার’ ও ‘সংস্কৃতি’ প্রবন্ধে যে গোলমালের কথা বলেছেন সেটাই মনে পড়ে যাচ্ছে। একবার পড়ে দেখা যাক

ইংরেজি ভাষা থেকে ‘কালচার’ শব্দটার আমরা বাংলা পরিভাষা করেছি ‘সংস্কৃতি’। ঠিক পরিভাষা কী হওয়া উচিত – ‘সংস্কৃতি’ না ‘কৃষ্টি’, তা নিয়ে বিসংবাদ হয়েছে এককালে। রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, ‘কৃষ্টি’ শব্দটা বাংলা ভাষায় কুশ্রী অপজনন। ‘তাসের দেশ’ নাটকে শব্দটা নিয়ে কৌতুকও করেছিলেন রবীন্দ্রনাথ। তারপরে ‘কৃষ্টি’ শব্দটা ক্রমে লোপ পেয়েছে, ‘সংস্কৃতি’-ই ব্যবহারসিদ্ধ লোকগ্রাহ্য শব্দ হয়ে উঠেছে।

ইংরেজরা ‘কালচার’ শব্দটা নিয়েছিল লাটিন ভাষা থেকে। লাটিন ভাষায় শব্দটার প্রধান অর্থ ছিল কৃষিকর্ম, ‘এগ্রিকালচার’ শব্দের মধ্যে সেই প্রধান অর্থ বাহিত হচ্ছে। এই কারণেই বাংলায় কেউ কেউ ‘কৃষ্টি’ বলতে চেয়েছিলেন, কর্ষণের সঙ্গে তার সম্পর্ক। কৃষিকর্মে কর্ষিত ক্ষেত্রে বীজ বপন করে নতুন শস্য উৎপাদন করা হয়…চিকিৎসাবিজ্ঞানে রোগজীবাণুর প্রতিষেধক জীবাণু ‘কালচার’ করে তৈরি করা হয়; রক্তে রোগজীবাণু বা ক্ষতিকর কোনো পদার্থ থাকলে অণুবীক্ষণে তা দেখতে হলে অনেক সময় রক্তবিন্দুর ‘কালচার’ করে তাকে বর্ধিত করতে হয়। মোট কথা ‘কালচার’ শব্দটার মধ্যে কর্ষণ বা অনুশীলনের দ্বারা নতুন বস্তু অথবা নতুন গুণ সৃষ্টি ইঙ্গিত রয়েছে, এর ঝোঁক উৎপাদনমুখী। কোনো না কোনো রকম বৃদ্ধি এর ফল।

আমাদের ‘সংস্কৃতি’ শব্দটির শব্দার্থগত ঝোঁক কিন্তু এরকম নয়। এর প্রধান অর্থ রূঢ় অবস্থা থেকে মার্জিত অবস্থায় আনয়ন, স্থূল অবস্থা থেকে বাহুল্যবর্জিত করে সূক্ষ্ম অবস্থায় আনয়ন। নতুন বস্তু সৃষ্টি, নতুন গুণ উৎপাদন, বা সংখ্যাবৃদ্ধি এর অভীপ্সিত লক্ষ্য নয়, যা আছে তাকেই একটা পরিশীলিত সংযত সুসমঞ্জস সুকুমার রূপদান এর লক্ষ্য। ‘সংস্কৃতি’ শব্দটির এই প্রধান ঝোঁক আমাদের আজকের পরিস্থিতিতে খানিকটা বাধাস্বরূপ হয়ে উঠছে – এরকম আশঙ্কা করছি।

পঞ্চাশ বছরেরও বেশি আগে লেখা এই কথাগুলো আজ আবার ভাবাচ্ছে। কারণ সংস্কৃতি শব্দের প্রধান ঝোঁক এখন আর খানিকটা বাধা নয়, গভীর কুয়োর দেওয়াল হয়ে গেছে দেখা যাচ্ছে। সেই কুয়োর ব্যাং হয়ে গেছি আমরা ভদ্রলোকরা; বাইরে রয়ে গেছে বাঙালি মুসলমান, বাঙালি নিম্নবর্গীয় হিন্দু এবং সাধারণভাবে, গরিব বাঙালি। কৃষ্টি শব্দটায় রবীন্দ্রনাথ প্রবল আপত্তি করেছিলেন বটে, তবে ভদ্রলোকদের কূপমণ্ডূকতা ধরে ফেলতে তাঁরও ভুল হয়নি। বঙ্গভঙ্গ রদের আন্দোলনে প্রথমে নেতৃত্ব দিয়েও তাই সরে গিয়েছিলেন। কারণ ফাঁকিবাজিটা ধরে ফেলেছিলেন। পরেও তাঁর লেখাপত্রে ভদ্রলোকি চালাকির আবরণ উন্মোচন করেছেন বারবার। ‘হিন্দু-মুসলমান’ প্রবন্ধে যেমন লিখেছেন

অল্পবয়সে যখন প্রথম জমিদারি সেরেস্তা দেখতে গিয়েছিলুম তখন দেখলুম, আমাদের ব্রাহ্মণ ম্যানেজার যে তক্তপোষে গদিতে বসে দরবার করেন সেখানে এক ধারে জাজিম তোলা, সেই জায়গাটা মুসলমান প্রজাদের বসবার জন্যে; আর জাজিমের উপর বসে হিন্দু প্রজারা। এইটে দেখে আমার ধিক্কার জন্মেছিল। অথচ এই ম্যানেজার আধুনিক দেশাত্মবোধী দলের। ইংরেজরাজের দরবারে ভারতীয়ের অসম্মান নিয়ে কটুভাষাব্যবহার তিনি উপভোগ করে থাকেন, তবু স্বদেশীয়কে ভদ্রোচিত সম্মান দেবার বেলা এত কৃপণ। এই কৃপণতা সমাজে ও কর্মক্ষেত্রে অনেকদূর পর্যন্ত প্রবেশ করেছে; অবশেষে এমন হয়েছে যেখানে হিন্দু সেখানে মুসলমানের দ্বার সংকীর্ণ, যেখানে মুসলমান সেখানে হিন্দুর বাধা বিস্তর।

এই ম্যানেজারই বাঙালি ভদ্রলোকের সংস্কৃতি আর কৃষ্টির তফাতের প্রমাণ। এঁর দেশাত্মবোধ হল প্রদর্শনী। ওটার নির্দিষ্ট মঞ্চ আছে, সেখানে নিজের পরিশীলিত দেশাত্মবোধ প্রমাণ করতে ওটা কাজে লাগে। কিন্তু নিজের জীবনে মেনে চলার, মুসলমানও যে তাঁর সমান ভারতীয় তা স্বীকার করার এবং অনুশীলন করার দায় নেই। এমন চরিত্রই এখন হাজারে হাজারে আমাদের চারপাশে ঘুরে বেড়াচ্ছে। রবীন্দ্রনাথ এই প্রবন্ধ লিখেছিলেন স্বাধীনতার আগে। স্বাধীনোত্তর ভারতে আবার সারা দেশের উদারপন্থী এবং বাঙালি ভদ্রলোকদের নিজেকে সংস্কৃতিবান প্রমাণ করতে ধর্মনিরপেক্ষ হওয়া আবশ্যিক হয়ে দাঁড়িয়েছিল। এখন দেশের রাজনীতি বদলে যাওয়ায়, পরিবেশ বদলে যাওয়ায় ওটা আর আবশ্যিক নয়। তাই এই ম্যানেজারবাবুর মনের কথা তিলোত্তমা মজুমদার, পবিত্র সরকারদের মুখে উঠে এসেছে, যার মর্মার্থ হল – ভদ্রলোকরাই বাঙালি। মুসলমানরা বাঙালি নয়। ভদ্রলোকদের উপর আক্রমণ হলে তবেই বলা চলে বাংলা ভাষার উপর আক্রমণ হয়েছে, মুসলমানদের উপর আক্রমণ বাংলা ভাষার উপর আক্রমণ নয়।

এ হল বাঙালি ভদ্রলোকের অন্তত দুশো বছর ধরে আপন মনের মাধুরী মিশায়ে তৈরি সত্য। এর সঙ্গে বাস্তবের কোনো সম্পর্ক নেই। এই তিলোত্তমা, এই পবিত্র, এই সঙ্গীতা বন্দ্যোপাধ্যায়রাই একুশে ফেব্রুয়ারি এসে পড়লে গদগদ উত্তর-সম্পাদকীয় প্রবন্ধ লেখেন বাংলা ভাষা নিয়ে। কিন্তু এখন বোঝা যাচ্ছে, ওগুলো সব প্রদর্শনী। আজকাল যাকে বাংলায় বলে ‘পারফরম্যান্স’। মনের কথা হল – একুশের ভাষা শহিদরা কেউ বাঙালি নয়, তারা ভদ্রলোকদের বাংলা ভাষার জন্যে প্রাণ দিয়েছিল মাত্র। ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধেও এঁরা বিস্তর লেখালিখি, বলাবলি করে চলেছেন সেই ২০১৪ সাল থেকে। কিন্তু স্পষ্টতই ওসবও পারফরম্যান্স। নইলে বিশাল বিশাল গেটওয়ালা আবাসনে থাকা এবং শীতাতপনিয়ন্ত্রিত গাড়িতে চড়া লেখক, বুদ্ধিজীবীরা কী করে বলেন যে এই বাংলায় হঠাৎ চতুর্দিকে প্রচুর নতুন লোক দেখতে পাচ্ছেন, যাদের সঙ্গে বাঙালিদের কোনো সংস্কৃতিগত মিল নেই? কোনো পরিসংখ্যানই এই সত্য প্রতিষ্ঠা করে না। এ যে নাজিদের আতঙ্ক সৃষ্টির ধ্রুপদী কৌশল, তা না জানার মত কম লেখাপড়া এঁদের নয়। উপরন্তু, যদি তর্কের খাতিরে ধরেও নেওয়া যায় চারপাশটা বাংলাদেশি এবং রোহিঙ্গায় ভরে গেছে, তাহলেই বা তাদের সঙ্গে এই ভদ্রমহিলা, ভদ্রলোকদের সংস্কৃতিগত মিলের অভাব হয় কী করে? অনেক বেশি অমিল তো হওয়ার কথা কলকাতা ও শহরতলিতে দ্রুত বেড়ে চলা বহুতলগুলোর বাসিন্দা হয়ে আসা হিন্দিভাষীদের সঙ্গে, যাদের অনেকেই আমিষের গন্ধ পেলে নাক কোঁচকায়। তাদেরই রাজ্যে কাজ করতে যাওয়া পশ্চিমবঙ্গের হিন্দু ও মুসলমান প্রবাসী শ্রমিকদের বাংলাদেশি দেগে দিয়ে কোনো আইনকানুনের তোয়াক্কা না করে, বৈধ কাগজপত্রকে পাত্তা না দিয়ে মারধোর করা হচ্ছে, পে লোডার দিয়ে বাংলাদেশে ছুড়ে ফেলা হচ্ছে।

এই তথাকথিত বুদ্ধিজীবীরা অবশ্য রোগ নন, রোগাক্রান্তের নমুনা। এই রোগে আমাদের আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধব অনেকেই আক্রান্ত। আমাদের যে কোনো একজনকে দেখলেই বোঝা যায়, বাঙালি ভদ্রলোকের কূপমণ্ডূকতা এবং নীতিহীনতা ঐতিহাসিক হলেও, গত অর্ধ দশকে বিশেষ অবনমন হয়েছে। ১৯৪৭ সালে পশ্চিমবঙ্গের ভদ্রলোকদের সংখ্যাগরিষ্ঠের মানসিকতা এরকম থাকলে বাঙালরা উদ্বাস্তু হয়ে এদেশে এসে হয় অনাগরিক বেগার শ্রমিকে পরিণত হত, বা ভিক্ষা করতে করতে অনাহারে মারা যেত। সেক্ষেত্রে ১৯৭১ সালেও পশ্চিমবঙ্গের বাঙালিরা ভারত সরকারকে বাংলাদেশের পাশে দাঁড়াতে যুদ্ধে নামার প্ররোচনা দিত না (অশোক মিত্র লিখিত আপিলা-চাপিলা দ্রষ্টব্য), সাধারণ মানুষের মধ্যে মুক্তিযুদ্ধের প্রতি আবেগ তৈরি হত না, বাঙালরা আরও এক দফা উদ্বাস্তু হওয়ার ধাক্কা সামলে এদেশে থিতু হতে পারত না।

মজার কথা, এখন ভদ্রলোকদের যে অংশের বাংলাদেশি অনুপ্রবেশের চিন্তায় রাতে ঘুম হচ্ছে না, তাদের অনেকে দ্বিতীয়, তৃতীয় বা চতুর্থ প্রজন্মের বাঙাল। এরা বুঝতে পারছে না, বা রিপাবলিক টিভি দেখে দেখে এত অন্ধ হয়ে গেছে যে বুঝতে চাইছে না, যে ভাষাকে বাংলাদেশি ভাষা বলে আজ চালাচ্ছে বিজেপি, সেই ভাষা অনেকাংশে তাদের মা-দিদিমার ভাষা। ওই ভাষাকে অস্বীকার করলেও ওই পরিচিতি যাওয়ার নয়। আগামীদিনে এ কার্ড ও কার্ড সে কার্ড – কোনো কার্ড দিয়েই নিজের নাগরিকত্ব প্রমাণ করে ওঠা যাবে না। কারণ কোনটা নাগরিকত্বের প্রমাণ সেটা ঠিক করে রাষ্ট্র। আর ভারত রাষ্ট্রের এই মুহূর্তে প্রকল্প হল বাঙালিদের অনাগরিক প্রমাণ করা।

ভদ্রলোকের ছেলেমেয়েদের স্মৃতিশক্তি তাজা করে দেওয়ার জন্যে বলি, সেই বামফ্রন্ট আমল থেকে – যখন তৃণমূল কংগ্রেস নেত্রী মমতা ব্যানার্জি প্রথম অভিযোগ তোলেন যে বাংলাদেশ থেকে লোক ঢুকিয়ে ভোটে জেতে বামেরা – বঙ্গ বিজেপির বক্তব্য ছিল, বাংলাদেশ থেকে আসা হিন্দুদের শরণার্থী ধরে নিয়ে আশ্রয় দিতে হবে এবং মুসলমানদের অনুপ্রবেশকারী ধরে নিয়ে শাস্তি দিতে হবে, ফেরত পাঠাতে হবে। অধুনা সোশাল মিডিয়ার বাইরে অপ্রাসঙ্গিক হয়ে যাওয়া তথাগত রায় যখন বঙ্গ বিজেপির সভাপতি ছিলেন, তখন তিনি একাধিক টিভি বিতর্কে বসে একথা বলেছেন। নরেন্দ্র মোদী সরকার যে নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন (সিএএ) পাশ করে ২০১৯ সালে, তার মর্মবস্তুও এটাই। সে কারণেই এ রাজ্যের হিন্দুদের, বিশেষত ভদ্রলোকদের, ওই আইন খুব পছন্দ হয়েছিল। মতুয়াদের মত বাংলাদেশ থেকে অত্যাচারিত হয়ে চলে আসা নিম্নবর্গীয় জনগোষ্ঠীর মানুষও ওই আইন পাশ হওয়ায় উল্লসিত হয়েছিলেন। কিন্তু একটা প্রশ্নের উত্তর না বিজেপি দিতে চায়, না সম্প্রতি বিজেপি সমর্থক হয়ে ওঠা পশ্চিমবঙ্গবাসী তৃতীয়-চতুর্থ প্রজন্মের বাঙাল ভদ্রলোকরা। প্রশ্নটা হল, শরণার্থীদের আশ্রয় দেওয়া এবং নাগরিকত্ব দেওয়ার মত মানবিক প্রকল্পের ‘কাট-অফ ডেট’ থাকবে কেন? সিএএ অনুযায়ী নাগরিকত্ব পাওয়ার ‘কাট-অফ ডেট’ হল ৩১ ডিসেম্বর ২০১৪। এর মানে কী? ওই তারিখের পরে কি বাংলাদেশে হিন্দু নির্যাতন বন্ধ হয়ে গেছে? নাকি ওর পরে যে হিন্দুরা নির্যাতিত হচ্ছে তারা মায়ের ভোগে যাক – এটাই হিন্দু দরদি বিজেপি এবং ভারতের নাগরিকত্ব এতদিনে অধিকারে পরিণত হয়ে গেছে বলে মনে করা বাঙাল ভদ্রলোকদের মনের কথা? এ প্রশ্ন করলেই বিজেপি নেতা তরুণজ্যোতি তিওয়ারি থেকে শুরু করে বাঙাল ভাষা বলতে না পারা সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার বাঙাল, সকলেই এক সুরে ঝাঁঝিয়ে ওঠে ‘যে আসবে তাকেই থাকতে দিতে হবে? দেশটা ধর্মশালা নাকি?’

এখন কথা হচ্ছে, এই আজকের বাঙালদের পূর্বপুরুষরা যখন ভিটেমাটি চাটি হয়ে এপারে চলে এসেছিলেন অধুনা বাংলাদেশ থেকে, তখন কি দেশটা ধর্মশালা ছিল? তখনকার শাসকরা মনে করেছিলেন – ছিল। ভাগ্যিস করেছিলেন, তাই আজকের বাঙাল ভদ্রলোকরা কলার তুলে এই প্রশ্ন করতে পারছেন। ওঁরা অবশ্য বলবেন ‘তখনকার পরিস্থিতি আর এখনকার পরিস্থিতি কি এক নাকি? ১৯৪৭ সালে তো একটা দেশকে আনতাবড়ি কেটে ভাগ করা হয়েছিল। আমাদের পূর্বপুরুষদের এই ভাগটার উপরে ততখানিই অধিকার, যতখানি আগে থেকেই এ ভাগে থাকা লোকেদের।’ ১৯৭১ সালে কিন্তু দেশভাগ-টাগ হয়নি। তখনো বাংলাদেশ থেকে আসা উদ্বাস্তুদের এ দেশের নাগরিকত্ব দেওয়া হয়েছিল। সেকথা মনে রাখলেও মানতেই হবে, যুক্তিটা সঠিক। কিন্তু মুশকিল হল, একবার যদি বিভাজনে হাততালি দেওয়া শুরু করেন, তখন দেখবেন অনেক চেপে রাখা বিভাজন বেরিয়ে পড়ছে। বাঙালরা এপারে চলে আসায় মোটেই পশ্চিমবঙ্গীয়রা (চলতি কথায় যাদের এদেশি বা ঘটি বলা হয়) সকলে খুব আপ্লুত হয়নি। ‘বাংলাদেশ থেকে লোক ঢুকছে পিলপিল করে, রোহিঙ্গায় চারপাশ ভরে গেছে’ – এই প্রোপাগান্ডায় আপনি যত ধুয়ো দিচ্ছেন, তত সেদিনের উদ্বাস্তুদের প্রতি বিদ্বেষ চেপে রাখা পশ্চিমবঙ্গীয়দের স্মৃতি তাজা হয়ে উঠছে। পশ্চিমবঙ্গে গত কয়েক বছরে আরএসএস-বিজেপির শক্তি বাড়ার পাশাপাশি ইস্টবেঙ্গল আর মোহনবাগান সমর্থকদের মধ্যে অনলাইন পা টানাটানির ভাষা যেভাবে বদলেছে, তা খেয়াল করলেই ব্যাপারটা স্পষ্ট হয়। অতএব বাঙাল ভদ্রলোক-ভদ্রমহিলাদের বোঝা উচিত যে তারা হিন্দিভাষীদের ‘রোহিঙ্গা’, ‘বাংলাদেশি’ বলে চিৎকারে যোগ দিয়ে নিজেদের ডিটেনশন ক্যাম্পের রাস্তা বানাচ্ছে।

বাড়াবাড়ি মনে হল কথাটা? আসামে এনআরসি-র সময়েও দেখেছিলাম সেখানকার বাঙাল ভদ্রলোকরা অনেকে বলছে ‘যে আসবে তাকেই থাকতে দিতে হবে? দেশটা ধর্মশালা নাকি?’ ঠিক এই কথাটাই যে হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে বাঙালিদের সম্পর্কে জাতিবিদ্বেষী অসমিয়াদের বক্তব্য, সেকথা তাদের খেয়াল ছিল না। খেয়াল হল, যখন এনআরসি থেকে বাদ পড়ে যাওয়া ১৯ লক্ষ মানুষের মধ্যে সাড়ে ১২ লক্ষ হিন্দু বেরোল এবং তার মধ্যে তারাও পড়ে গেল। নেলি গণহত্যার ইতিহাসও ওই ভদ্রলোকরা ভুলে থাকতে চেয়েছিল, কারণ ওতে যারা মরেছিল তারা মুসলমান। এখন আসামের বিভিন্ন ডিটেনশন সেন্টারে কারা দিন কাটাচ্ছে সেটা পশ্চিমবঙ্গে চতুর্দিকে রোহিঙ্গা দেখতে পাওয়া বাঙাল ভদ্রলোকরা একটু দেখে নিতে পারেন। পশ্চিমবঙ্গে এনআরসি করার পরিকল্পনা এখনো সরকারের নেই, কিন্তু এসআইআরের পরিকল্পনা বিলক্ষণ আছে। সেটাও একটা তালিকা, তারও থাকবে ‘কাট-অফ ডেট’। এসব ভদ্রলোকরা ভালই জানেন, কিন্তু কুয়োর ব্যাং তো কুয়োর বাইরের জগতের কথা জানতে পারলেও মানতে চায় না। যেমন নির্বাচন কমিশনের বানানো আরেকটা তালিকা – ভোটার তালিকা – কেমন হয় আজকাল সেকথা রাহুল গান্ধী চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিলেও ভদ্রলোকরা চোখ বন্ধ করে থাকতে পারে।

১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গবিরোধী আন্দোলনের সময়কার ভদ্রলোকদের ফাঁকিবাজিকে রবীন্দ্রনাথ চিহ্নিত করেছিলেন, নিন্দাও করেছিলেন। তবু মানতে হবে, সেই ভদ্রলোকদের অন্য সময়ে না হলেও বিপদের সময়ে বাঙালি মুসলমানদের সঙ্গে জোট বাঁধার বুদ্ধি ছিল। এখনকার ভদ্রলোক শ্রেণির মস্তিষ্ক এত উর্বর যে বিপদের সময়ে আরও বেশি করে নিজেদের আলাদা করে নিচ্ছে। বিপন্ন বাঙালির পাশে দাঁড়ানোর বদলে ‘আমি স্নান বলি, ও গোসল বলে। অতএব ও বাঙালি না, আমি বাঙালি’ – এসব বোকা বোকা কথা বলে নিজের কুয়োটা আরও গভীর করে খুঁড়ছে। যে হিন্দি আধিপত্যবাদী হিন্দুরা কোনোদিনই বাঙালিকে আপন বলে মনে করেনি এবং করবে না, তারা নিজেদের মনোভাব স্পষ্ট ভাষায় বুঝিয়ে দিলেও ভদ্রলোক, ভদ্রমহিলারা বুক ফুলিয়ে প্রতিপন্ন করতে চাইছে – বাঙালি বলে কোনো জাতি নেই। আছে দুটো আলাদা জাতি – বাঙালি হিন্দু আর বাংলাদেশি। বাংলা বলেও কোনো ভাষা নেই। আছে দুটো আলাদা ভাষা – হিন্দুর বাংলা আর বাংলাদেশি বাংলা। এই ঐতিহাসিক মূর্খামি যে দৃশ্যের সম্ভাবনা বাড়িয়ে তুলছে তা এইরকম – ভদ্রলোকরা বাঙালি বলে মার খাচ্ছে হিন্দিভাষীদের হাতে, আর এখন যে বাঙালিদের মার খাওয়া চলছে, যাদের বাঙালি বলে স্বীকার করতেই রাজি নয় ভদ্রলোকরা, তারা দূর থেকে বলছে ‘ওমা! আপনি ভদ্রলোক? আমি ভেবেছিলাম বাঙালি।’

নাগরিক ডট নেট ওয়েবসাইটে প্রকাশিত

অবহেলিত বিজ্ঞান আর কৈশোরকে ভালবেসে এল পক্ষীরাজের ডিম

আধুনিক বাঙালি বিজ্ঞানী হতে চায় না, কেউ কেউ হয়ে যায়। তাই আমাদের গল্পে, উপন্যাসে, সিনেমায় বিষয় হিসাবে বিজ্ঞান বা বিজ্ঞানী বিরল।

আকাশের লক্ষ লক্ষ তারার মধ্যে একটা হল সূর্য। সেই সূর্যের আটটা গ্রহ, তার একটা হল পৃথিবী। সেই পৃথিবীর একটা ছোট্ট জায়গা হল আকাশগঞ্জ। সেখানকার একটা স্কুলের একটা পরীক্ষায় যদি আমি ফেল করি, তাহলে কি আমি বিজ্ঞানী হতে পারব না? সৌকর্য ঘোষালের পক্ষীরাজের ডিম ছবির কেন্দ্রীয় চরিত্র শ্রীমান ঘোতন ওরফে সার্থক (মহাব্রত বসু) তারায় ভরা আকাশের দিকে তাকিয়ে আপন মনে এই প্রশ্ন তোলে মাধ্যমিকের টেস্টে, বিজ্ঞান পড়তে গেলে যা না জানলে একেবারেই চলে না, সেই অঙ্কে শূন্য পাওয়ার পরে।

নিজের অস্তিত্বকে এভাবে প্রশ্ন করতে একমাত্র মানুষই পারে – একথা একাধিকবার নানাভাবে লিখেছেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। আর এই মহাবিশ্বের সাপেক্ষে মানুষের ক্ষুদ্রতার কথা লিখেছেন বিশ্বখ্যাত মার্কিন জ্যোতির্বিজ্ঞানী কার্ল সেগান। তাঁর একখানা বিখ্যাত বইয়ের নাম পেল ব্লু ডট: এ ভিশন অফ দ্য হিউম্যান ফিউচার ইন স্পেস। সেই বইয়ের এক জায়গায় তিনি যা লিখেছেন তার বাংলা তরজমা করলে এরকম দাঁড়ায় ‘ওই বিন্দুটাকে আবার দেখুন। ওটাই এই জায়গাটা। আমাদের বাড়ি। ওটাই আমরা। ওর মধ্যেই আপনি যাদের ভালবাসেন, যাদের চেনেন, যাদের কথা কোনোদিন শুনেছেন, যত মানুষ কোনোদিন ছিল, জীবন কাটিয়েছিল, তারা সকলে আছে…পৃথিবীটা এক বিরাট ব্রহ্মাণ্ডের মধ্যে একটা ছোট্ট মঞ্চ।’ সেগানের জন্মের সাত বছর আগে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখেছিলেন ‘আকাশভরা সূর্য-তারা, বিশ্বভরা প্রাণ,/তাহারি মাঝখানে আমি পেয়েছি মোর স্থান…’। এই লাইনগুলো রবীন্দ্রনাথের কলম থেকে আসা খুবই স্বাভাবিক। কারণ তাঁর বিশেষ বন্ধু ছিলেন জগদীশচন্দ্র বসু আর স্নেহভাজন ছিলেন আরেক বিশ্ববিশ্রুত বাঙালি বিজ্ঞানী সত্যেন্দ্রনাথ বসু। ছোটদের বিজ্ঞানের প্রাথমিক পাঠ দিতে বিশ্বপরিচয় বইখানা লিখে সত্যেন্দ্রনাথকেই উৎসর্গ করেছিলেন রবীন্দ্রনাথ। কিন্তু কী আশ্চর্য! বাঙালির ‘কালচার’ চর্চায় কোনোদিন বিজ্ঞানীদের জায়গা হল না! আমাদের সাংস্কৃতিক মহীরুহ কারা জিজ্ঞেস করলে কোনো বাঙালিকে আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়, জগদীশচন্দ্র, সত্যেন্দ্রনাথ বা মেঘনাদ সাহার নাম করতে শোনা যায় না। বোধহয় তাই, বাঙালি বাবা-মায়েরা বহুকাল ধরে ছেলেমেয়েদের ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার করতে চাইলেও বিজ্ঞানী হয়ে উঠতে উৎসাহ দেন না। আধুনিক বাঙালি বিজ্ঞানী হতে চায় না, কেউ কেউ হয়ে যায়। তাই আমাদের গল্পে, উপন্যাসে, সিনেমায় বিষয় হিসাবে বিজ্ঞান বা বিজ্ঞানী বিরল; যদি না সেটা কল্পবিজ্ঞান হয়। সৌকর্য কিন্তু এমন এক ছবি তৈরি করেছেন যার কেন্দ্রে আছে বিজ্ঞান, বিজ্ঞানে আগ্রহ, বিজ্ঞান গবেষণা, এক কিশোরের বিজ্ঞানী হওয়ার স্বপ্ন।

বিশ্বপরিচয়ে সত্যেন্দ্রনাথের উদ্দেশে রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন ‘মানুষ একমাত্র জীব যে আপনার সহজ বোধকেই সন্দেহ করেছে, প্রতিবাদ করেছে, হার মানাতে পারলেই খুশি হয়েছে। মানুষ সহজশক্তির সীমানা ছাড়াবার সাধনায় দূরকে করেছে নিকট, অদৃশ্যকে করেছে প্রত্যক্ষ, দুর্বোধকে দিয়েছে ভাষা। প্রকাশলোকের অন্তরে আছে যে অপ্রকাশলোক, মানুষ সেই গহনে প্রবেশ করে বিশ্বব্যাপারের মূলরহস্য কেবলই অবারিত করছে। যে সাধনায় এটা সম্ভব হয়েছে তার সুযোগ ও শক্তি পৃথিবীর অধিকাংশ মানুষেরই নেই। অথচ যারা এই সাধনার শক্তি ও দান থেকে একেবারেই বঞ্চিত হল তারা আধুনিক যুগের প্রত্যন্তদেশে একঘরে হয়ে রইল।’ যেন ঘোতনের কথাই লিখেছেন!

শুধু যে ঘোতন বিজ্ঞানী হওয়ার স্বপ্ন দেখে তা নয়, তার অঙ্কের মাস্টারমশাই বটব্যালও (অনির্বাণ ভট্টাচার্য) মনেপ্রাণে বিজ্ঞানী, তাঁর বাবাও ছিলেন বিজ্ঞানী। বিজ্ঞান গবেষণা করতে বিদেশ যাওয়ার অভিলাষ পূরণ হয়নি, তবু বটব্যাল স্যার বিজ্ঞান-পাগল। আকাশগঞ্জ হাইস্কুলের ছাত্রদের ঘর্ষণ ব্যাপারটা হাতেনাতে বোঝাতে বারান্দায় মোবিল ঢেলে দেন, তার উপর পিছলে পড়েন একের পর এক মাস্টারমশাই। শেষমেশ হেডস্যারও। ফলে বটব্যাল স্যারকে চাকরিটি খোয়াতে হয়। স্যারের ঘরে বড় বড় দুটো ছবিতে আছেন জগদীশচন্দ্র; আর অ্যালবার্ট আইনস্টাইন, যিনি আলো যে সবসময় সরলরেখায় চলে না তা প্রমাণ করতে বড় ভূমিকা নিয়েছিলেন। এখানেই শেষ নয়, যেভাবে সৌমিক হালদারের মায়াবী ক্যামেরায় ক্লোজ আপে ধরা পড়ে সামান্য ফড়িংও, তাতে মনে পড়ে আরেক বাঙালি বিজ্ঞানী গোপালচন্দ্র ভট্টাচার্যকে। ছোটদের বোধগম্য করে কীটপতঙ্গদের নিয়েও বাংলায় বই লেখার যত্ন ছিল যাঁর। ছোটদের ভাল লাগার জন্যে একটা ছবিতে যা যা দরকার, সেসব মশলা দিয়েও এমন বিজ্ঞানকেন্দ্রিক ছবি তৈরি করার জন্যে নির্দেশক সৌকর্যের প্রশংসা প্রাপ্য। সন্দীপ রায়ের বিস্মরণযোগ্য প্রফেসর শঙ্কুকে (ধৃতিমান চট্টোপাধ্যায়) বাদ দিলে বাংলা ছবির পর্দায় শেষ মনে রেখে দেওয়ার মত বিজ্ঞানী চরিত্র পাতালঘর (২০০৩) ছবির অঘোর সেন (সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়) আর ভূতনাথ (জয় সেনগুপ্ত)। কিন্তু সেই ছবিতে বিজ্ঞানের সঙ্গে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ছিল ভূত ও রূপকথা, যেমনটা শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের যে কোনো কাহিনিতে থাকে। এখানে কিন্তু পক্ষীরাজের রূপকথাকে বিজ্ঞানমনস্কতার দিকে ঠেলে দেয় চিত্রনাট্য।

সৌকর্যের ২০১৮ সালের ছবি রেনবো জেলি যাঁরা দেখেছেন (স্বতঃপ্রণোদিত অবাঞ্ছিত পরামর্শ দিচ্ছি – না দেখে থাকলে দেখে নিন), তাঁদের অতি পরিচিত ঘোতন আর তার বন্ধু পপিন্স (অনুমেঘা ব্যানার্জি)। এই ছবিতে তারা আর শিশু নেই, কিশোর-কিশোরী। তার সঙ্গে তাল রেখে সম্পর্কের রসায়নেও বয়ঃসন্ধিসুলভ পরিবর্তন এসেছে, যা ছবিতে অন্য এক রস যোগ করেছে। রেনবো জেলির পরে সৌকর্যের গতবছর মুক্তি পাওয়া ভূতপরী (২০২৪) ছবিতে মজা, ভূত, রূপকথার সঙ্গে মিশেছিল অনিবার্য বিষাদ। এই ছবিতে তার চেয়ে মৃদু অথচ গভীর বিষাদ আছে। সে কারণেই ছবি শেষ হওয়ার পরেও বেশ খানিকক্ষণ রেশ থেকে যায়। দুই খুদে অভিনেতাই চমৎকার কাজ করেছে। ‘মার্জিনাল আই কিউ’ থাকলেই যে মানুষের কৌতূহলের অভাব হয় না, আগ্রহের অভাব হয় না, অনুভূতির অভাব হয় না, তা মহাব্রতর অভিনয়ে দারুণভাবে ফুটে উঠেছে। রেনবো জেলির পর এই ছবি দেখলে মনে হয় মহাব্রতর সহজাত অভিনয় ক্ষমতা আছে। পপিন্সের সঙ্গে একান্ত দৃশ্যগুলোতে তার শরীরী ভাষায়, গলার স্বরে যে আকুতি ফুটে ওঠে তা এখনো বয়ঃসন্ধির স্মৃতি আছে যাঁদের, তাঁরা তারিয়ে তারিয়ে উপভোগ করতে পারবেন। অনুমেঘার সংলাপ বলার ধরনে রেনবো জেলিতে খানিকটা কবিতা আবৃত্তির ঢং ছিল, যার ক্ষতিপূরণ হয়ে গিয়েছিল শৈশবের মিষ্টতায়। এই ছবিতে তার অভিনয়ে প্রয়োজনীয় পরিণতি দেখা গেছে। জগদীশচন্দ্রের বন্ধুর লেখা লাগসই গানটা গাওয়ার সময়ে বোঝা গেছে, অনুমেঘার গানের গলাটাও বেশ।

মজাদার সংলাপ আর সুরেলা গান এই ছবির জোরের জায়গা। বিশেষত সৌকর্যের কথায় এবং নবারুণ বোসের সুরে ‘অঙ্কে জিরো, কিসের হিরো, খ্যাপা স্যারের বিশেষ গেরো’ গানখানা যেমন ছবির গল্প আর মেজাজের সঙ্গে দারুণ খাপ খায়, তেমনি একবার শুনলে চট করে ভুলতে পারাও শক্ত। অবশ্য ওই গানে একটা চালু বাঙালি ভ্রান্তি ঢুকে পড়েছে। ম্যাজিকের সঙ্গে কিন্তু ম্যাজিক রিয়ালিজমের কোনো সম্পর্ক নেই। ‘ম্যাজিক রিয়ালিজম’ ব্যাপারটা আসলে কী তা গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজের নোবেল প্রাপ্তি বক্তৃতা পড়লে পরিষ্কার বোঝা যায়।

গানখানা চমৎকার গেয়েছেন অনির্বাণ ভট্টাচার্য, কিন্তু হতাশ করেছে তাঁর অভিনয়। অনির্বাণকে নিজের বয়সের থেকে অনেক বেশি বয়সী একখানা চরিত্র দেওয়া হয়েছিল। তা বিশ্বাসযোগ্য করে তুলতে তিনি একটা বিশেষ কণ্ঠস্বর, কতকগুলো মুদ্রাদোষের সাহায্য নিয়েছেন। তাতে হাস্যরসের উৎপাদন হয়েছে বটে, কিন্তু উৎপাদনের চেষ্টা বড় বেশি করে ধরা পড়েছে। বরং যেসব দৃশ্যে তিনি বাবার স্মৃতিতে, প্রয়াত বন্ধুর স্মৃতিতে বিষণ্ণ – সেখানে অভিনেতা অনির্বাণকে চেনা গেছে। অতি অভিনয়ে দুষ্ট আরেক বিশিষ্ট অভিনেতা, পঞ্চায়েত প্রধানের চরিত্রে, দেবেশ রায়চৌধুরীও। প্যাংলার চরিত্রে শ্যামল চক্রবর্তী আর বিল্টুর চরিত্রে অনুজয় চট্টোপাধ্যায়ের মত দুজন চমৎকার অভিনেতার বিশেষ কিছু করার ছিল না।

আরো পড়ুন ছবিটা

এইখানেই এসে পড়ে চিত্রনাট্যের দুর্বলতার প্রশ্ন। এই দুজন যেমন অনেকখানি অব্যবহৃত রয়ে গেছেন, তেমনি বটব্যাল স্যারের বিজ্ঞান-পাগলামিও আরও স্পষ্ট হওয়া দরকার ছিল বলে মনে হয়। বটব্যাল স্যারের অল্পবয়সের যে চেহারা দেখানো হয়েছে তার সঙ্গে বেশি বয়সের চেহারা আর হাবভাবের তফাতও চোখে লাগার মত। হয়ত দুজন আলাদা অভিনেতাকে ব্যবহার করলে ব্যাপারটা তত বিসদৃশ লাগত না। এছাড়া যে জিনিসটা এই ছবিতে বেখাপ্পা লাগে তা হল পঞ্চায়েত প্রধানের পিছনের দেওয়ালের ছবিগুলো। এমন কোনো রাজনৈতিক নেতা কি এদেশে আছেন যিনি পাশাপাশি টাঙিয়ে রাখেন লেনিন, জোসেফ স্তালিন, জওহরলাল নেহরু আর নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর ছবি?

তবে এসব ত্রুটিকে ছাপিয়ে গেছে এই ছবির আদর্শগত দিক। আকাশগঞ্জে কোনো উঁচু নিচু ভেদ নেই। বিজ্ঞানীর বাড়ির চাকর প্যাংলা অঙ্কে যথেষ্ট দড়। সে-ই ঘোতনের পরীক্ষা নিয়ে নিতে পারে। গ্রামের স্কুলে পাশ করতে গলদঘর্ম ঘোতনের গোটা দুনিয়ায় সবচেয়ে বড় বন্ধু হল কলকাতার স্কুলে ক্লাসে ফার্স্ট হওয়া পপিন্স। বটব্যাল স্যার তো বটেই, হেডস্যার গুণধর বাগচী (সুব্রত সেনগুপ্ত) পর্যন্ত পরীক্ষায় সর্বোচ্চ নম্বর পাওয়াই জীবন সার্থক হওয়ার একমাত্র নিদর্শন বলে মনে করেন না। দুর্নীতিগ্রস্ত, আত্মরতিপ্রবণ পঞ্চায়েত প্রধানের মাথায় বন্দুক ধরার সুযোগ পেয়ে তাঁরা কী দাবি করেন? স্কুলে লাইব্রেরি আর ল্যাবরেটরি বানিয়ে দিতে হবে। সবচেয়ে বড় কথা, অনুভূতিপ্রবণ মন না থাকলে ডিগ্রি, বুদ্ধি, পরীক্ষার নম্বর যে বৃথা – এই কথাটা এই ছবির কোষে কোষে।

এসব দেখলে মনে পড়ে, আকাশগঞ্জ আমাদের আশপাশেই ছিল। আমাদেরই অবহেলায় হারিয়ে গেছে। সৌকর্য কল্পনাশক্তির জোরে তাকে ভারি সহজ, সুন্দর করে আবার আমাদের চোখের সামনে তুলে ধরেছেন। আমাদের ছেলেমেয়েদের সেই আকাশগঞ্জ দেখানোর সুযোগ না ছাড়াই ভাল। অন্তত তাদের স্বপ্নে আকাশগঞ্জ ঢুকে পড়ুক। তারপর কে বলতে পারে? ভোরের স্বপ্ন, মিথ্যে না-ও তো হতে পারে।

নাগরিক ডট নেট ওয়েবসাইটে প্রকাশিত

অ্যাংকর-বাক্যই এ-যুগের বেদবাক্য

 একদিন রাতে আমি স্বপ্ন দেখিনু—
“চেয়ে দেখো” “চেয়ে দেখো” বলে যেন বিনু।
চেয়ে দেখি, ঠোকাঠুকি বরগা-কড়িতে,
কলিকাতা চলিয়াছে নড়িতে নড়িতে।
ইঁটে-গড়া গণ্ডার বাড়িগুলো সোজা
চলিয়াছে, দুদ্দাড় জানালা দরোজা।
রাস্তা চলেছে যত অজগর সাপ,
পিঠে তার ট্রামগাড়ি পড়ে ধুপধাপ্।

আমি মনে মনে ভাবি, চিন্তা তো নাই,
কলিকাতা যাক নাকো সোজা বোম্বাই।
দিল্লী লাহোরে যাক, যাক না আগরা—
মাথায় পাগড়ি দেব পায়েতে নাগরা।

সহজ পাঠ দ্বিতীয় ভাগ প্রকাশিত হওয়ার সময়ে ভাগ্যিস স্মার্টফোন, সোশাল মিডিয়া, দিনরাতের টিভি চ্যানেল, আর তাদের চিল্লানোসরাস অ্যাংকর— এসব কিছুই ছিল না। নইলে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যদি ফেসবুকে উপরের পংক্তিগুলো লিখে ফেলতেন, তাহলে কী কেলেঙ্কারিটাই না হত! নোবেল পুরস্কারজয়ী কবি বলে কথা। কয়েক মিনিটের মধ্যেই ভাইরাল হয়ে যেত এবং ভারতের বাংলা, ইংরেজি ও হিন্দি টিভি চ্যানেলগুলো ‘ব্রেকিং নিউজ’ হিসেবে দেখাত—

মাঝরাতে উধাও কলকাতা,
প্রত্যুত্তরে করাচি ভ্যানিশ করল ভারতীয় নৌসেনা।

কোনও চ্যানেলে হয়তো পর্দায় ভেসে উঠত—

‘কলকাতাকে রাতের অন্ধকারে লাহোরে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা পাকিস্তানের’,
‘ভারতীয় মিসাইলের আক্রমণে দিল্লিতেই অভিযান শেষ

রাতে কবিতাটি পোস্ট করে রবীন্দ্রনাথ যতক্ষণে সকালে ঘুম থেকে উঠতেন, ততক্ষণে দেখতেন কলকাতা যে কলকাতাতেই আছে, সে-কথা আর কেউ বিশ্বাস করছে না। এমনকি কলকাতা হারানোয় কেউ শোকপ্রকাশও করছে না। চারপাশে লাহোর, করাচি দখলের উল্লাস দেখতে দেখতে শান্তিনিকেতনে বসে তাঁরও হয়তো দুপুরের দিকে সন্দেহ হত— ‘কলকাতা সত্যি সত্যি কলকাতাতেই আছে তো?’ স্নেহভাজন কাজী নজরুল ইসলামকে হয়তো ফোন করতেন উদ্বিগ্ন হয়ে, তারপর তাঁর মুখ থেকে কলকাতা যথাস্থানে আছে শুনে হাঁফ ছেড়ে বাঁচতেন। ততক্ষণে তাঁর কাছে প্রতিক্রিয়া চেয়ে পৌঁছে যেত বিশিষ্ট নিউজ অ্যাংকরদের জুম কল। বিশ্বকবি প্রাণপণ চেষ্টা করতেন বোঝাতে যে ওটা তাঁর কল্পনা, কলকাতা যেখানে থাকার সেখানেই আছে। একচুলও নড়েনি, নড়া সম্ভবও নয়। একখানা আস্ত শহর যাবে কোথায়? কিন্তু বিশিষ্ট অ্যাংকররা এত সহজে ছেড়ে দেওয়ার পাত্র নন। রবীন্দ্রনাথের কাছে কলকাতা অবিচল থাকার প্রমাণ চাওয়া হত নিশ্চয়ই। তিনি হয়তো বলতেন, একটু আগে নজরুলের সঙ্গে কথা হয়েছে, তিনি জানিয়েছেন যে দুশ্চিন্তার কোনও কারণ ঘটেনি। বলামাত্রই ঝাঁপিয়ে পড়তেন জাতীয়তাবাদী অ্যাংকর, ‘আর কতদিন কুসুম কুসুম কবিদের কথায় ভুলে নিজের অস্তিত্ব যে বিপন্ন সেটা গোপন করবেন? এসব সেকুলারিজমের দিন শেষ। এত সেকুলার হওয়ার ইচ্ছে হলে পাকিস্তানে চলে যান।’ সালটা ১৯৩০, ফলে রবীন্দ্রনাথ হয়তো বেচারাথেরিয়ামের মতো মুখ করে ভাবতেন— সেটা আবার কোন দেশ রে বাবা!

হাসবেন না। ব্যাপারটা মোটেই হাস্যকর নয়। ১৯৭১ সালের পর ফের ভারত-পাকিস্তানের পূরোদস্তুর যুদ্ধ লাগার উপক্রম হয়েছিল এ-মাসের গোড়ায়। সেই বাজারে দেশের টিভি চ্যানেলগুলো যে কাণ্ড করেছে, তাতে পরিষ্কার বোঝা গেছে— যুদ্ধ করার উৎসাহ ভারতীয় সেনাবাহিনীর চেয়েও তাদের বেশি এবং সে অভিলাষ চরিতার্থ করতে তারা আক্ষরিক অর্থেই দিনকে রাত আর রাতকে দিন করতে প্রস্তুত।

আরও পড়ুন এবার মোদীর পথের চেয়েও কঠিন গোদি মিডিয়ার পথ

একদিন রাতে ভিডিও গেমের দৃশ্য, লস এঞ্জেলসে বিমান ভেঙে পড়ার দৃশ্য, ইজরায়েলের চার বছরের পুরনো ভিডিও ইত্যাদি দেখিয়ে ভারতীয় টিভি চ্যানেলগুলো প্রায় গোটা পাকিস্তানই ভারতের দখলে চলে এসেছে বলে জানিয়েছিল। পরদিন কিছু চ্যানেল ভালমানুষ সেজে ভুয়ো খবর ছড়ানোর বিরুদ্ধে বাণী দিয়েছিল বটে, কিন্তু এমন চ্যানেলও আছে যারা ওসবেরও তোয়াক্কা করেনি। করতে যাবেই বা কেন? কেন্দ্রীয় শাসক দলই তো নিজেদের সোশাল মিডিয়া হ্যান্ডেল থেকে পোস্ট করে জানিয়েছে, পাকিস্তানের সঙ্গে লড়াই করতে গেলে দেশের সরকার বা সেনাবাহিনীকে নিয়ে তো বটেই, মিডিয়ার এসব কীর্তি নিয়েও হাসাহাসি করা চলবে না। কারণ অনেক খবরের মধ্যে দু-চারটে ভুল খবর দেখিয়ে দিলে এমন কিছু দোষ হয় না, কিন্তু ভুল খবরকে ভুল খবর বললে দেশের মনোবল নষ্ট হয়। যুদ্ধ মানে হল ‘ন্যারেটিভ ওয়ার’। ভুয়ো খবর চিহ্নিত করা মানে সেই যুদ্ধে নিজের দেশকে হারিয়ে দেওয়া।

ভারতীয় সংবাদমাধ্যমের ছড়ানো ভুয়ো খবরের পক্ষে দাঁড়িয়ে বুক চিতিয়ে লড়ে যাওয়া এই ভিডিওতে ভাষণ দিয়েছেন কে? টাইমস নাও নবভারতের কনসাল্টিং এডিটর সুশান্ত সিনহা। বুঝতেই পারছেন, তিনি কত বড় সাংবাদিক। অতএব, মোটেই হাসাহাসি করবেন না। নইলে কখনও দেখবেন, সরকারের সমালোচনা করার জন্য নয়, মোদিজি বা শাহজিকে নিয়ে রসিকতা করার জন্যও নয়, মিডিয়াকে নিয়ে হাসাহাসি করার জন্য অশোকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক আলি খান মাহমুদাবাদের মতো আপনিও গ্রেপ্তার হয়ে যাবেন।

অ্যাঁ, কী বললেন? উনি মুসলমান না হলে ওই পোস্টের জন্য গ্রেপ্তার হতেন না? আজ্ঞে, ঠিক ধরেছেন। কথাটা উমর খালিদের বেলায় সত্যি, গুলফিশা ফতিমার ক্ষেত্রে সত্যি, যে রিপোর্ট লেখাই হয়নি তার জন্য গ্রেপ্তার হওয়া সাংবাদিক সিদ্দিক কাপ্পানের ক্ষেত্রেও সত্যি, আরও অনেকের ক্ষেত্রেই সত্যি।

কিন্তু মাথায় রাখবেন, গুজরাতের ৯২ বছরের পুরনো জনপ্রিয় সংবাদপত্র ‘গুজরাত সমাচার’-এর দুই মালিকের অন্যতম, ৭৩ বছর বয়সী বাহুবলী শাহকে এ সপ্তাহেই গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তিনি মুসলমান নন। তাঁকে গ্রেপ্তার করেছে এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট, তবে কী অভিযোগে তা এখনও বলা হয়নি। তবে কাগজটির সরকারবিরোধী হিসেবে নাম বা বদনাম আছে। তাছাড়া, এ-ও মনে রাখবেন— ইদানীং উত্তরপ্রদেশের নেহা সিং রাঠোর, মাদ্রী কাকোটির মতো হিন্দু মহিলাদের বিরুদ্ধেও হাসিঠাট্টার জন্য এফআইআর দায়ের করা হচ্ছে।

সুতরাং, মোটেই হাসাহাসি করবেন না আমাদের লড়াকু টিভি চ্যানেল আর তাদের মহামহিম অ্যাংকরদের নিয়ে। এঁদের হাত কত লম্বা, জানেন তো? মৃত লোকও এঁদের আওতার বাইরে নন। কাশ্মিরের পুঞ্চে সীমান্তের ওপার থেকে আসা গোলায় নিহত মৌলানা মহম্মদ ইকবালকে এই মহান সাংবাদিকরা সন্ত্রাসবাদী বলে দেগে দিয়েছিলেন। অর্থাৎ, পুঞ্চ পুলিশের চেয়েও এঁরা বেশি জানেন। ভারতীয় সেনাবাহিনীর চেয়ে তো বটেই। পাকিস্তানের কিরানা হিলসে পরমাণু বোমার কেন্দ্রেও নাকি ভারতের বিমান বোম ফেলেছে বলে তাঁরা জানিয়েছিলেন। এদিকে সরকারি ব্রিফিংয়ে তা নিয়ে প্রশ্ন করা হলে, এয়ার মার্শাল একে ভারতী প্রশ্নকর্তা সাংবাদিককে বলেন, ‘আপনাকে ধন্যবাদ ওখানে পাকিস্তানের পরমাণু বোমা আছে এ-কথা আমাদের জানানোর জন্যে। আমরা কখনও বলিনি যে আমরা কিরানা হিলসে বোম ফেলেছি।

তাহলে বুঝলেন তো, সাংবাদিকদের চটালে মরেও শান্তি পাবেন না, মরার পরেও সন্ত্রাসবাদী হয়ে যেতে পারেন! বিশ্বকবিই যখন বলে গেছেন, ‘সেই সত্য যা রচিবে তুমি’, তখন নিউজ চ্যানেল আর তাদের জাতীয়তাবাদী অ্যাংকরদের নিয়ে খবরদার হাসাহাসি করবেন না। ভুয়ো খবর বলে যে কিছু হয়, তা ভুলে যান।

চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম ওয়েবসাইটে প্রকাশিত

অপারেশন সিঁদুর যে যে কারণে ভাল লাগল

গত কয়েকদিনে যা বুঝলাম, মোদিজি যতই স্লোগান দিন ‘বেটি বচাও, বেটি পঢ়াও’, এদেশের প্রগতিশীলরাও সিঁদুরকেই মেয়েদের সবচেয়ে দামি সম্পত্তি বলে মনে করেন।

২০২৫ সালের ৭ মে তারিখটা এ-জীবনে আর ভুলতে পারব বলে মনে হয় না। সকালে ঘুম থেকে উঠেই খবর পেলাম— বিশ্ব যখন নিদ্রামগন গগন অন্ধকার, তখন পহলগামে পাক-মদতপুষ্ট সন্ত্রাসবাদীদের হাতে মৃত ২৬ জনের হয়ে শোধ তুলে নিয়েছে ভারতীয় বায়ুসেনা। পাড়ার দোকানে, মোড়ের মাথায় জোর আলোচনা— পাকিস্তানকে টের পাইয়ে দেওয়া গেছে। যে-সব দোকানে খদ্দের কম হলেও আমদানি বেশি, সেখানে দেয়ালে লাগানো টিভিতে পাড়া কাঁপিয়ে চিৎকার করছেন বিভিন্ন চ্যানেলের অ্যাঙ্কররা। শুনে মনে হল, তাঁরাই প্রাণের ঝুঁকি নিয়ে বোম ফেলে এসেছেন সীমান্তের ওপারে। বায়ুসেনার অফিসাররা নন। ভালো লাগল সকাল সকাল, মনে হল— আমিও পারি। আমরা যারা জীবনে কিছুই পারি না, ফ্ল্যাট কেনার পর ২-৩ বছর কেটে গেলেও প্রোমোটার লিফট লাগাচ্ছে না দেখে ক্রেতা সুরক্ষা আদালতে মামলা ঠুকতেও ভয় পাই, তাদের আত্মবিশ্বাস তুঙ্গে তুলে দিতে পারেন একমাত্র টিভি চ্যানেলের সাংবাদিকরা।

তবে এখানেই শেষ নয়। দিনটা আরও স্মরণীয় হয়ে গেল বেলা দশটার পরে, যখন নতুন দিল্লিতে ভারত সরকারের পক্ষ থেকে সরকারিভাবে সংবাদমাধ্যমকে জানানো হল ঠিক কী ঘটানো হয়েছে এবং কীভাবে। চারপাশে খুশির পরিবেশ তৈরি হলে নিজেরও ভাল লাগে। দেখলাম ব্রিফিং শেষ না হতেই আমার আত্মীয়, প্রতিবেশী, বন্ধু— সকলেই দারুণ খুশিয়াল হয়ে উঠেছে। না, সরকারের সমর্থকদের কথা বলছি না। যারা সরকারবিরোধী তাদের কথাই বলছি। যারা ধর্মনিরপেক্ষ তাদের খুশির কারণ মূলত দুটো। বিদেশসচিব বিক্রম মিশ্রি এ-কথা বলেননি যে পহলগামে হিন্দুদের আলাদা করে মারা হয়েছে। তার উপর তিনি বলেছেন যে সন্ত্রাসবাদীদের অনেক লক্ষ্যের মধ্যে একটা ছিল জম্মু ও কাশ্মীরে এবং বাকি ভারতে সাম্প্রদায়িক অশান্তি সৃষ্টি করা।

তবে! এই যে ধর্মনিরপেক্ষ বন্ধুদের সেদিন থেকে সেকু বলে গাল দেওয়া হচ্ছিল, এখন হল তো? ভারত সরকার নিজেই বলল তো, যে ধর্মনিরপেক্ষ লোকেদের কোনও দোষ নেই, বরং মানুষে মানুষে ধর্মের ভিত্তিতে ভেদাভেদ করা সন্ত্রাসবাদীদের কাজ? এত বড় সরকারি সিলমোহর ভারতের ধর্মনিরপেক্ষ মানুষ সেই ২০১৪ সাল থেকে পাননি। আহ্লাদ হবে না? পরিষেবা বেসরকারি হলে ভালো হবে জানি, কিন্তু স্বীকৃতিটা যে সরকারি না হলে আমাদের চলে না। তা পেয়ে গিয়ে আমারও গর্বে বুকটা ফুলে উঠল। ময়ূখ ঘোষ যা-ই বলুন, এতদ্বারা আমরা সেকুরাই জিতে গেলাম শেষমেশ। নরেন্দ্র মোদির মতো লোকের সরকার পর্যন্ত মানতে বাধ্য হল— ধর্মনিরপেক্ষতাই আমাদের সবচেয়ে বড় শক্তি। নেহাত সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের মতো প্রতিভা নিয়ে জন্মাইনি, নইলে গেয়েই উঠতাম ‘কী মিষ্টি, দেখো মিষ্টি/কী মিষ্টি এ সকাল’।

ওটুকু মিষ্টিতেই গোটা দিনটা কেটে যেতে পারত। কিন্তু আমাদের ধর্মনিরপেক্ষ পাতে রসগোল্লার পরে কালাকাঁদের ব্যবস্থাও করে রেখেছিল সরকার। বিক্রমবাবুর দুইদিকে বসিয়ে দেওয়া হয়েছিল দুই মহিলা সেনা অফিসারকে— ব্যোমিকা সিং আর সোফিয়া কুরেশি। একজন হিন্দু, একজন মুসলমান। আহা! কী বুদ্ধিই না করেছেন বিদেশমন্ত্রী জয়শঙ্করবাবু। পাকিস্তানের লক্ষ্য ছিল ভারতীয় হিন্দু আর ভারতীয় মুসলমানের মধ্যে বিভাজন তৈরি করা। কিন্তু জয়শঙ্করবাবু কি সোজা লোক? জেএনইউয়ের প্রাক্তনী বলে কথা। না হয় মন্ত্রী-টন্ত্রী হবেন বলে বিজেপিতে ভিড়েছেন। তা বলে কি আর অ্যালমা মাটারকে ভারতমাতার চেয়ে কম গুরুত্ব দেন? বিশ্বগুরুর মন্ত্রিসভায় ঢোকার অনেক আগেই বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে বাঙালি সেকু, মাকু বন্ধুদের মুখে নির্ঘাত কবিগুরুর কবিতা শুনেছিলেন। তাই তো প্রেস ব্রিফিংয়ে একেবারে ‘ভারততীর্থ’ দেখিয়ে দিলেন পাকিস্তানকে। ওঃ! মাস্টারস্ট্রোক। বিজেপি সমর্থকদের চেয়েও জোরে জোরে সমস্বরে আমার ধর্মনিরপেক্ষ বন্ধুরাই বলতে শুরু করলেন।

এখানেই শেষ নয়। আনন্দ আরও বেড়ে গেল নারীবাদী বন্ধুদের আনন্দ দেখে। এরকম একটা গুরুতর সন্ত্রাসবাদী আক্রমণের জবাব দেওয়ার অপারেশনের নাম দেওয়া হয়েছে ‘অপারেশন সিঁদুর’। মানে যে মহিলাদের সিঁদুর সেদিন সন্ত্রাসবাদীরা মুছে দিয়েছে তাদের সরকার সম্মান জানাল। তাও আবার দায়সারাভাবে নয়, প্রত্যাঘাতের ব্রিফিংয়ে দুই মহিলা অফিসারকে পাঠিয়ে। এমন ‘সিম্বলিজম’ অতুলনীয়। পাকিস্তান পারবে এরকম? পারবে যে না, তা নিয়ে দেখলাম বিজেপিবিরোধী নারীবাদী আর বিজেপি সমর্থকরা একমত। দুই পক্ষেরই বক্তব্য মোটামুটি এক— পাকিস্তানের মেয়েরা বোরখায় বন্দি, এদিকে আমাদের মেয়েরা যুদ্ধে যাচ্ছে শুধু নয়, নেতৃত্বও দিচ্ছে। মোদি সরকার যতই খারাপ হোক, এই ব্যাপারটা হেব্বি দিয়েছে।

আনন্দে ভাসতে ভাসতেই দেখলাম একে একে ভারতের সংসদীয় মার্কসবাদী দলগুলোর বিবৃতিও এসে পড়েছে। সকলেই সেনাবাহিনীকে বাহবা দিয়েছে। লিবারেশন ছাড়া কেউ যুদ্ধ যেন না হয় সে চেষ্টা করতে হবে— এ-কথা বলেনি। পাকিস্তান সরকারকে অনেক পরামর্শ-টরামর্শ দিয়েছে সন্ত্রাসবাদীদের ঘাঁটি ভেঙে দেওয়া, দোষীদের ভারতের হাতে তুলে দেওয়া ইত্যাদি সম্পর্কে। কিন্তু ভারত সরকারের কাছে পহলগামের ঘটনার তদন্তের কী হল— সে প্রশ্ন তোলেনি। কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খড়্গে কদিন আগেই অভিযোগ করেছিলেন যে, প্রধানমন্ত্রীর কাছে আগে থেকেই খবর ছিল যে কাশ্মীরে পর্যটকদের উপর হামলা হতে পারে। সেই কারণেই নাকি তিনি কাশ্মীর সফর বাতিল করেন। তাহলে নিরস্ত্র মানুষগুলোর প্রাণ বাঁচানো গেল না কেন? সে-প্রশ্নের জবাবও কোনও মার্কসবাদী দলের বিবৃতিতে চাওয়া হয়নি। এমনকি এতজন নিরপরাধ, নিরস্ত্র ভারতীয়ের মৃত্যুর ঘটনা নিয়ে যে দুটো সর্বদলীয় বৈঠক হল তার একটাতেও প্রধানমন্ত্রী উপস্থিত থাকলেন না কেন— সে-প্রশ্নও মাত্র দ্বিতীয় বৈঠকের পরে তোলা হয়েছে। সিপিআই দলের বিবৃতিতে তবু দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা প্রশমিত করার দাবি জানানো হয়েছে, সিপিএমের বিবৃতিতে কেবলই ভারত সরকারের জন্যে হাততালি আর পাকিস্তানের উপর চাপ বজায় রাখার পরামর্শ। দ্বিতীয় বৈঠকে সিপিএম সাংসদ জন ব্রিটাসের বক্তব্যে তবু খানিকটা সরকারের কাছে জবাবদিহি চাওয়ার প্রবণতা দেখা গেছে।

দেখে শুনে বুঝলাম, আমার মার্কসবাদী বন্ধুরাও খুবই আনন্দ পেয়েছে। অ্যাদ্দিন জানতাম তারা উল্লসিত হলে ‘লাল সেলাম’ বলে। এবার দেখলাম ‘জয় হিন্দ’ চালু হয়েছে। ‘ভারত মাতা কি জয়’ নেই দেখে অবাক হলাম। কারণ অনেকে বলেই দিয়েছে— রাজনৈতিকভাবে বিজেপির সঙ্গে মতপার্থক্য থাকতে পারে, কিন্তু দেশের সুরক্ষার প্রশ্নে সবাই এক। সিঁদুরকৌটোর ছবিওলা পোস্টারও অনেক কমরেড সগর্বে শেয়ার করেছেন।

সত্যি বলছি, বামে-ডানে এমন ঐক্য জন্মে দেখিনি। স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাস পড়েছিলাম হোয়াটস্যাপ ইউনিভার্সিটির দ্বারোদ্ঘাটনের অনেককাল আগে। তাতেও এমন ঐক্যের গল্প পাইনি। তাই খুব আনন্দ হল। এই যে সবকিছুতে রাজনীতি করার অভ্যাসের ঊর্ধ্বে উঠে সকলে এক হতে পেরেছে— এই তো আমাদের শক্তি। এইজন্যেই তো আমরা সভেরেন সোশালিস্ট সেকুলার ডেমোক্র্যাটিক, আরও কী কী সব, রিপাবলিক।

আরও পড়ুন হিন্দুরাষ্ট্রের হিন্দু নাগরিকের পিঠ বাঁচানোর চিঠি

তবে এসব হল ছোটখাটো আনন্দের কারণ। বেশি আনন্দ পেয়েছি অপারেশন সিঁদুরের সুদূরপ্রসারী ফলগুলো টের পেয়ে। যেমন ধরুন, সোফিয়া ব্রিফিংয়ে এসে বসার পর থেকে ভারতে মুসলমানদের বাড়িঘরের উপর দিয়ে বুলডোজার চালানো বন্ধ হয়ে গেছে। মুসলমান ডেলিভারি বয়ের কাছ থেকে খাবার না নেওয়ার বদভ্যাস সকলে ত্যাগ করেছে। মুসলমান মানেই সন্ত্রাসবাদী— এ-কথা তো আর ভুলেও কেউ উচ্চারণ করছে না। ব্যোমিকা আর সোফিয়াকে দেখামাত্র দেশের যেখানে যত ক্লিনিক বেআইনিভাবে ভ্রূণের লিঙ্গ পরীক্ষা করে কন্যাভ্রূণ হত্যা করত, সবকটার ব্যবসা লাটে উঠেছে। এপিজে আব্দুল কালামের পর আবার এতদিনে সোফিয়ার দেখা পেয়ে হিন্দুত্ববাদীদের বিশ্বাস হয়েছে যে মুসলমানরা ভারি দেশপ্রেমিক।

অপারেশন সিঁদুর যখন এত ভালো ভালো ব্যাপার একসঙ্গে ঘটিয়ে ফেলেছে, তখন অনুমান করছি মুনমুন সেনের শেষ হয়ে যাওয়া কেরিয়ারও নতুন করে শুরু করিয়ে দেবে। হয়ত ব্যবধান ছবির একখানা দেশপ্রেমিক হিন্দি রিমেক তৈরি হবে। আশা ভোঁসলের বয়সটা বড্ড বেশি হয়ে গেছে, তাই বৃদ্ধা মুনমুনের ঠোঁটে কণ্ঠদান করবেন শ্রেয়া ঘোষাল। সঙ্ঘ পরিবারের ঘনিষ্ঠ ভিক্টর ব্যানার্জিকে হয়তো শহিদ-টহিদ হিসাবে দেখানো হবে। তাঁর ছবির দিকে তাকিয়ে মুনমুন সেই ‘কত না ভাগ্যে আমার এ জীবন ধন্য হল/সিঁথির এই একটু সিঁদুরে সবকিছু বদলে গেল’-র হিন্দিটা ধরবেন। হয়তো গীতিকার হবেন প্রসূন জোশি আর সুর দিয়ে দেবেন এআর রহমান। তাহলেই বেশ ধর্মনিরপেক্ষ হয়ে যাবে ব্যাপারটা। গত কয়েকদিনে যা বুঝলাম, মোদিজি যতই স্লোগান দিন ‘বেটি বচাও, বেটি পঢ়াও’, এদেশের প্রগতিশীলরাও সিঁদুরকেই মেয়েদের সবচেয়ে দামি সম্পত্তি বলে মনে করেন। আজকের বাজারে ছবিটা চলবেও ভালো, প্রযোজক পেতেও অসুবিধা হবে না। কারণ ‘অপারেশন সিঁদুর’ ট্রেডমার্কের জন্যে একাধিক আবেদন জমা পড়ে গেছে। আবেদনকারীদের মধ্যে রিলায়েন্স গ্রুপও ছিল, তবে মুকেশ আম্বানি লোক ভালো। তিনি আবেদন প্রত্যাহার করে নিয়েছেন, বলেছেন কোনও অপোগণ্ড নিচুতলার কর্মচারী নাকি ভুল করে আবেদনটা করে ফেলেছিল তা সে যা-ই হোক, ট্রেডমার্ক কেউ নিক আর না-ই নিক, নামটার বিক্রয়যোগ্যতা তো প্রমাণ হয়ে গেল। এরপর ছবির প্রযোজক পেতে কি আর অসুবিধা হবে? আমরা ধর্মনিরপেক্ষ, বামপন্থী, প্রগতিশীল লোকেরা দল বেঁধে দেখতে যাব। কারণ ওই যে— রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকতেই পারে, কিন্তু দেশের প্রশ্নে আমরা সকলে এককাট্টা।

অর্থাৎ আগামীদিনে ভারতের আনন্দযজ্ঞে সবার নিমন্ত্রণ। তবে এই যজ্ঞে পুঞ্চে যে ১৫ জন ভারতীয়কে পাকিস্তান বোম ফেলে মেরেছে আর যে ৪৩ জনকে আহত করেছে বলে খবর, তাদের পরিবার-পরিজন যোগ দেবে কিনা ঠিক বুঝতে পারছি না। অবশ্য কাশ্মীর আমাদের বলেই যে কাশ্মীরিদেরও আমাদের লোক বলে ধরতে হবে এমন মাথার দিব্যি কেউ দেয়নি। কাশ্মীরিরা যেহেতু ঘরপোড়া গরু, তারা সিঁদুরে মেঘ দেখলে ডরাতে পারে। আমরা আনন্দ করব না কেন?

চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম ওয়েবসাইটে প্রকাশিত

বাংলা মাধ্যম স্কুলের পর বাংলা সিনেমা উঠে যাওয়ার পালা?

নয়ের দশক থেকে কলকাতার বড় বড় সংবাদমাধ্যম যে শহুরে দরকচা মারা ছবিগুলোকে বাংলা ছবির পুনরুত্থান বলে দাগিয়ে দিল, সেগুলো বস্তুত বিভিন্ন মেজ সেজ ফেস্টিভালে পুরস্কার জেতা ছাড়া বাংলা ছবির হোমেও লাগেনি যজ্ঞেও লাগেনি।

এখনো বছরে যে দু-চারটে দিন পশ্চিমবঙ্গের বাঙালির নিজস্ব সংস্কৃতির জন্য গর্ববোধ হয় এবং সেটাকে বাঁচানো প্রয়োজন বলে মনে হয়, আজ তার মধ্যে এক দিন। আজ বাংলা সিনেমার আন্তর্জাতিকভাবে সবচেয়ে উদযাপিত পরিচালক সত্যজিৎ রায়ের জন্মদিন। মুর্শিদাবাদোত্তর, পহলগামোত্তর বাঙালি ভদ্রলোক-ভদ্রমহিলার সহসা নিজের হিন্দু সত্তা আবিষ্কার এবং দিঘার উপকূলে তাঁদের আদরের রামমোহন-বিদ্যাসাগর-রবীন্দ্রনাথ-নজরুলের প্রগতিশীলতা জগন্নাথদেবের পায়ে সঁপে দেওয়ার পর বলতে হবে, কপাল জোরে এই দিনটা পাওয়া গেছে। কেবল আজকের দিনেই বাংলা সিনেমা সম্পর্কে কখানা কথা লিখলে কেউ কেউ হয়ত গুরুত্ব দিয়ে পড়বেন। আগামীকালই আর তা হবে না। কারণ বিষয় হিসাবে কাশ্মীর-মুসলমান-পাকিস্তানের সহজ সমীকরণ বা কার বাড়িতে দিঘার মন্দিরের প্রসাদ পৌঁছল আর কোথায় পৌঁছল না, তা বাংলা সিনেমার হাল হকিকতের চেয়ে অনেক বেশি মুখরোচক।

সাংবাদিকতার সাবেকি নিয়ম মেনে সাম্প্রতিকতম ঘটনাটার উল্লেখ করেই আলোচনা শুরু করা যাক। গত বুধবার (৩০ এপ্রিল) বাংলা ছবির ছজন পরিচালক – অনির্বাণ ভট্টাচার্য, ইন্দ্রনীল রায়চৌধুরী, কিংশুক দে, পরমব্রত চট্টোপাধ্যায়, বিদুলা ভট্টাচার্য, সুদেষ্ণা রায় – একখানা মিনিট পনেরোর ভিডিও বার্তা প্রকাশ করেছেন। সে বার্তা টালিগঞ্জের কলাকুশলীদের প্রতি। ভিডিওতে বলা হয়েছে যে টালিগঞ্জ পাড়ার ফেডারেশন – যার সভাপতি পশ্চিমবঙ্গ সরকারের মন্ত্রী অরূপ বিশ্বাসের ভাই স্বরূপ বিশ্বাস – এবং এই পরিচালকরা, এখন বিবদমান। যাঁরা বাংলা কাগজগুলোর বিনোদনের পাতায় নিয়মিত চোখ বোলান, তাঁদের কাছে এটা খবর নয়। কিন্তু পরিচালকরা বলছেন – কলাকুশলীদের ফেডারেশনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে যে পরিচালকরা কলাকুশলীদের বিপক্ষে। এই ভিডিও নির্মাণের উদ্দেশ্য – সেই ‘ভুল’ ধারণা দূর করা।

ভিডিওটা না দেখে থাকলেও, এই পর্যন্ত পড়েই বুঝতে অসুবিধা হওয়ার কথা নয় যে গণ্ডগোল এতদূর গড়িয়েছে, এ রাজ্যের সমস্ত বিবাদেরই নিষ্পত্তি করে দেওয়ার ক্ষমতা ধরেন যিনি, তাঁর উপরেও ভরসা রাখতে পারেনি কোনো পক্ষই। টালিগঞ্জ মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জির বাসস্থান থেকে বেশি দূরে নয়। তার উপর ফেডারেশন সভাপতি তাঁরই মন্ত্রিসভার সদস্যের ভাই। তা সত্ত্বেও তাঁরা দিদির হস্তক্ষেপে পরিচালকদের সঙ্গে বিবাদ মিটিয়ে নেননি। নিলে পরিচালকরা এই অভিযোগ করতেন না। আবার পরিচালকরাও মুখ্যমন্ত্রীর ছত্রছায়ায় গেলেই নিজেদের অভাব অভিযোগ দূর হবে – এ বিশ্বাস রাখতে পারেননি। ফলে ভিডিও করে ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির ভিতরের বিবাদ প্রকাশ্যে এনে ফেলেছেন। পুরো ভিডিও দেখলে মালুম হয় – বাধ্য হয়েছেন।

কেন হল এরকম?

সংবাদমাধ্যমে আগে প্রকাশিত হয়েছে, এই ভিডিওতেও পরিচালকরা জানিয়েছেন যে তাঁরা মুখ্যমন্ত্রীর কাছে যাননি তা নয়। মুখ্যমন্ত্রী তাঁদের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন যে তিনি একটি কমিটি তৈরি করে দেবেন, যে কমিটি সব পক্ষের কথাবার্তা শুনে বিবাদ মেটানোর ব্যবস্থা করবে। কিন্তু সেই কমিটি গঠন করতে গেলে যে সরকারি বিজ্ঞপ্তি জারি করতে হয়, সেটাই পরবর্তী তিন মাসে হয়নি। পরিচালকরা তারপরেও এক মাস অপেক্ষা করেন। সরকার নট নড়নচড়ন। পরিচালকদের একাধিক ইমেলেরও জবাব দেওয়া হয়নি। অতঃপর তাঁরা সাংবাদিক সম্মেলন করে ফেডারেশনের কীর্তিকলাপ সম্পর্কে সর্বসমক্ষে অভিযোগ করেন। এই তাঁদের মহাপাপ। পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন প্রান্তে বিভিন্ন পেশার মানুষ জানেন, কর্মস্থলে যা অত্যাচার অবিচার হয় সেসব নিয়ে প্রকাশ্যে কথা না বলাই দস্তুর। সমাধান চাইলে যাঁরা অত্যাচার অবিচার করলেন তাঁদের কাছেই হাতজোড় করে দাঁড়ানো নিয়ম। তাঁরা সদয় না হলে খুব বড় অপরাধেও পুলিস এফআইআর নিতে চায় না। সেখানে এই পরিচালকরা একেবারে সাংবাদিক সম্মেলন করে বসলেন! ঘাড়ে কটা মাথা! ভিডিওতে পরিচালকদের অভিযোগ – এরপর থেকেই শুরু হয় সেই সাংবাদিক সম্মেলনে উপস্থিত পরিচালকদের কাজ করতে না দেওয়ার ব্যবস্থা। ওঁদের শুটিংয়ে কলাকুশলীদের কাজ করতে বারণ করা হয়। তার ফলেই নাকি তাঁরা (এই ছজন সমেত মোট ১৫ জন পরিচালক) আদালতের দ্বারস্থ হয়েছেন।

যে বাংলায় পুলিসে যাওয়াই সাধারণ মানুষের পক্ষে স্থানে স্থানে মহাপাতক, সেখানে একেবারে কলকাতা হাইকোর্টে ফেডারেশনের সর্বময় কর্তার বিরুদ্ধে মানহানির মামলা করে বসেছেন এঁরা। সে মামলার ইতিমধ্যেই দুটি শুনানি হয়েছে, সে খবর সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিতও হয়েছে। বিচারপতি অমৃতা সিনহা যে নির্দেশগুলো দিয়েছেন তাতে পরিচালকদের হাত শক্ত হয়েছে। তিনি স্পষ্ট বলেছেন, পরিচালকদের কাজে ফেডারেশন কোনো হস্তক্ষেপ করতে পারবে না। এমনকি যে ইউনিক কার্ড ফেডারেশনের তুরুপের তাস, যা না থাকলে সিনেমাপাড়ায় কাউকে কাজ করতে দেয় না তারা, সেই কার্ডকেও মূল্যহীন বলেছেন বিচারক। কিন্তু হলে হবে কী? আদালত নির্দেশ দিলেই মানব – এত সুবোধ বালকদের রাজ্য পশ্চিমবঙ্গ নয়। ওই নির্দেশের পরেও সুদেষ্ণা রায়ের ছবির শুটিং শুরু করতে গিয়ে ঠিক তাই ঘটেছে, যা রাহুল মুখার্জির ছবির শুটিং নিয়ে গতবছর জুলাই মাসে ঘটায় টলিপাড়ার সমস্ত কাজ বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। অর্থাৎ শুটিং সূচি ঘোষণা হওয়ার পরেও একজন কুশীলবও কাজ করতে আসেননি।

সেই থেকে অচলাবস্থা চলছে টালিগঞ্জে। মুখ্যমন্ত্রী হয় মেটাননি, অথবা ধরে নিতে হবে, তাঁর নির্দেশকেও অগ্রাহ্য করার মত শক্তি টলিপাড়ার দণ্ডমুণ্ডের কর্তা স্বরূপবাবুর আছে। আদালতের নির্দেশের পরেও সুদেষ্ণার ছবির কাজ বাতিল হয়ে যাওয়ায় আদালত অবমাননা হয়েছে কিনা, হয়ে থাকলে স্বরূপবাবু বা অন্য কেউ শাস্তির পাত্র কিনা, নাকি গোটা ঘটনায় তাঁর কোনো ভূমিকাই নেই – তার বিচার আদালতে হবে। কিন্তু সাড়ে ১৫ মিনিটের ভিডিওতে পরিচালকরা অভিযোগ করেছেন যে ফেডারেশনের ভয়েই কুশীলবরা নির্দিষ্ট কিছু পরিচালকের ছবিতে কাজ করতে আসছেন না। একথা সত্যি না মিথ্যা তা বলা মুশকিল, তবে হাইকোর্ট যে এই অভিযোগকে সত্যি বলেই গণ্য করেছে তার ইঙ্গিত বিচারপতির নির্দেশে রয়েছে। স্বরূপবাবু অবশ্য প্রকাশ্যে খুবই ভদ্রলোক। যতবার সংবাদমাধ্যম তাঁর কাছে এই গণ্ডগোল নিয়ে কিছু জানতে চায়, তিনি হয় বলেন আদালতে বিচারাধীন বিষয়ে কোনো মন্তব্য করবেন না, নতুবা বলেন এসব তাঁর ফেডারেশনের বিরুদ্ধে চক্রান্ত। যেমনটা বুধবারের ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পরে বলেছেন

পশ্চিমবঙ্গে এখন বিরাট বিরাট ঘটনা ঘটছে। শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মীদের নিয়োগ দুর্নীতির ফলে এক লপ্তে ২৬,০০০ মানুষের চাকরি গেছে। এদিকে মুর্শিদাবাদের দাঙ্গা এবং পহলগামের সন্ত্রাসবাদী হামলার পর সাম্প্রদায়িকতার সমস্যাও বাংলার বাসিন্দাদের এ রাজ্যে এবং ভিনরাজ্যে নানাভাবে বিপদে ফেলছে। সরকারি টাকায় মন্দির তৈরি এবং তার উদ্বোধন উপলক্ষে ঘুরপথে আমিষ খাওয়াদাওয়া বন্ধ করার চেষ্টার মত অভূতপূর্ব ঘটনাও ঘটে গেছে। এতকিছুর মধ্যে বাংলা সিনেমার জগতে কী হচ্ছে না হচ্ছে তা নিয়ে দীর্ঘ লেখা ফেঁদে বসার কী দরকার? প্রশ্নটা সঙ্গত এবং উত্তরটা জরুরি।

যা যা ঘটছে সবই রাজনৈতিক এবং সিনেমাপাড়ায় যা ঘটছে তাও মোটেই অরাজনৈতিক নয়। একেবারে গোদা অর্থে রাজনৈতিক তো বটেই, কারণ পরিচালকদের অভিযোগের তির শাসক দলের নেতা স্বরূপবাবুর দিকে। কিন্তু কেবল দলীয় রাজনীতির কথা ভাবলে চলবে না। জুলাই মাস থেকে এ পর্যন্ত ঘটনা পরম্পরা লক্ষ করলে বোঝা যায় যে টালিগঞ্জের এই ‘বিদ্রোহী’ পরিচালকরা যে অভিযোগ করছেন, তার সঙ্গে আর জি কর কাণ্ডের পর রাজ্যের বিভিন্ন মেডিকাল কলেজের ডাক্তাররা যে অভিযোগ করেছিলেন তার কোনো মৌলিক তফাত নেই। দুই ক্ষেত্রেই মূল অভিযোগ হল – হুমকি সংস্কৃতি চলছে। চোখ রাঙিয়ে, ভয় দেখিয়ে এক পক্ষ তাদের যা ইচ্ছে তাই করিয়ে নিতে চাইছে। প্রতিবাদ করলে কাজ করতে দেওয়া হচ্ছে না। ঠিক যেভাবে সেকালে গ্রামদেশে মোড়লের বিরুদ্ধাচরণ করলে ধোপা নাপিত বন্ধ করিয়ে দেওয়া হত।

আমি, আপনি কোন ছার; রুপোলি পর্দার লোকেরা, তারকারা, এরকম ভয়ের পরিবেশে কাজ করতে হচ্ছে বলে অভিযোগ করছেন। ব্যাপারটা এই রাজ্যের শুভাকাঙ্ক্ষী সকলকে ভাবিয়ে তোলার মত। শাসক দলের অনুগতরা টালিগঞ্জ পাড়ায় কলাকুশলী হিসাবে কাজ পায়, ছবিতে কাজ করতে যত লোক লাগা উচিত চাপ দিয়ে তার চেয়ে বেশি লোককে কাজ পাইয়ে দেওয়া হয় – এসব অভিযোগ যে তৃণমূল সরকারের আমলেই প্রথম উঠছে এমন নয়। কিন্তু কথা হল, স্বাস্থ্যবান মানুষের খানিকটা রক্ত মশা খেলে বিশেষ ক্ষতি হয় না। কিন্তু যে রক্তাল্পতায় ভুগছে তাকেও যদি রোজ একপাল মশা ছেঁকে ধরে, তাহলে অল্পদিনেই মৃত্যু অবশ্যম্ভাবী। ইন্ডাস্ট্রি হিসাবে বাংলা ছবি এখন সেই স্তরে পৌঁছে গেছে, অথচ ফেডারেশনের প্রতাপ কমছে না। ফলে কাজ আরও কমে যাচ্ছে। ২০২৪ সালে মাত্র ৩৬ খানা ছবি তৈরি হয়েছে, যা নাকি গত ১৫ বছরে সর্বনিম্ন। ফেডারেশনের উদ্ভট সব নিয়মের ঠ্যালায় (পড়ুন দাবির ঠ্যালায়, কারণ আইনত কোনো নিয়ম বানানোর অধিকার ফেডারেশনের নেই) বাংলা ছবির প্রযোজকের সংখ্যা কমছে, বাইরের কোনো ফিল্ম ইউনিটও আর পারতপক্ষে কলকাতায় শুটিং করতে আসছে না। বাংলা ছবির অভিনেতারা কাজের অভাবে কেউ মুম্বাই পাড়ি দিচ্ছেন, কেউ ইউটিউব চ্যানেল খুলে টক শো চালাচ্ছেন, কেউ অন্য ব্যবসাপত্র খোলার কথা ভাবছেন। বেশকিছু উল্লেখযোগ্য ছবির পরিচালক ইন্দ্রাশিস আচার্য, কেবল সিনেমা করে জীবিকা নির্বাহ করা শক্ত হয়ে দাঁড়াচ্ছে – একথা স্পষ্টাস্পষ্টি বলে গতবছর কর্পোরেট চাকরিতে যোগ দিয়েছেন। কিন্তু অভিনেতা, পরিচালকদের হাতে না হয় এসব বিকল্প রয়েছে। যাঁরা মেক আপ করেন, আলোর কাজ করেন, জুনিয়র আর্টিস্ট হিসাবে কাজ করেন অথবা স্রেফ সেটে ফাইফরমাশ খাটেন – তাঁদের তো আর নেই। এমন চললে তাঁরা যাবেন কোথায়? ফেডারেশন নিজেদের যাদের লোক বলে দাবি করছে, তাঁদেরই তো আক্ষরিক অর্থে পথে বসতে হবে। সান্ত্বনা হিসাবে তখন বড়জোর বলা যাবে ‘মনখারাপ করবেন না। আপনাদের আগে ডাক্তার আর শিক্ষকরাও পথে বসেছেন।’

গুন্ডামিই আইন হয়ে দাঁড়াবে, তার সঙ্গে আপোস করে স্রেফ নিজেরটুকু নিয়ে ভেবে তথাকথিত ‘ফার্স্ট বয়’-রা ছবি বানাবেন, বিশেষ ক্ষমতাশালী নায়কের ছবি নিয়ে বিপুল সোশাল মিডিয়া প্রচার চলবে – মাঝরাতে অমুক জায়গায় শো হাউসফুল, তমুক ছবি ব্লকবাস্টার। আর যাঁরা ইন্ডাস্ট্রির দমবন্ধ করা বর্তমান ও ভয়াবহ ভবিষ্যৎ ভেবে প্রতিবাদ করবেন তাঁদের একঘরে করা হবে। ফলে ইন্ডাস্ট্রিতে ক্রমশ কাজ কমবে। এভাবে ধুঁকতে ধুঁকতে একটা ভাষার ছবি কতদিন বেঁচে থাকতে পারে? এমনিতেই দুনিয়া জুড়ে সিনেমাশিল্পের এক ধরনের সংকট চলছে। হলিউড বা বলিউডও তার বাইরে নয়। তার উপর টলিউডের মত ছোট বাজারসম্পন্ন, আগে থেকেই দুর্বল হয়ে থাকা ইন্ডাস্ট্রিতে যদি সিনেমার বাইরের লোকেদের গা জোয়ারিই শেষ কথা হয়ে দাঁড়ায়, তাহলে বাংলা ছবি বাঁচবে কী করে?

বাঙালিদের মধ্যে এমন সিনেমাবোদ্ধার অভাব নেই, যাঁরা নাকটা আকাশের দিকে তুলে বলবেন ‘বাংলা ছবি না বাঁচলেই বা কী? যা সব ছবি বানায়…’। একথার উত্তর দেওয়ার আগে কতকগুলো তেতো কথা বলা দরকার।

প্রথমত, ফেডারেশন বনাম পরিচালকদের দ্বন্দ্ব টলিউডের যে কঙ্কালসার চেহারা তুলে ধরেছে তা দিয়ে শৈল্পিক দিক থেকে ভাল ছবি হওয়া অসম্ভব বললেই চলে। প্রয়াত অশোক মিত্রের কথা ধার করে বলতে হয়, অভাবের সংসারে ‘তেইশ বছরের আপাত-উঠতি শরীরেও, স্তন আর স্তন থাকে না, দুদিনেই তা হেলে প’ড়ে মাই হয়ে যায়।’ আজকাল বাংলা পূর্ণদৈর্ঘ্যের ছায়াছবির শুটিং হয় ১৪-১৫ দিনে। এতেই মাস্টারপিস বানাতে গেলে নির্দেশক, চিত্রগ্রাহক, সঙ্গীত পরিচালক, অভিনেতা – সকলকেই জিনিয়াস হতে হবে। একসঙ্গে এত জিনিয়াস কোনো দেশে কোনোকালেই সুলভ ছিল না।

আরও পড়ুন সিনেমার হাত ধরে ভারতীয়দের বিশ্বজয় চলছে বহুকাল ধরে 

দ্বিতীয়ত, যে তিন বাঙালি পরিচালককে জিনিয়াস গণ্য করে আজকাল আমরা বুক ফোলাই, তাঁদের কর্মজীবনে মোটেই সমস্ত ছবি হল ভরে দেখতে যায়নি বাঙালি দর্শক। গেলে ঋত্বিক ঘটক হতাশায় ক্রমশ বেশি বেশি করে মদে ডুবে যেতেন না, অকালে মারাও যেতেন না হয়ত। তাঁর মৃত্যুর পরেও কলকাতা এমন কিছু উদ্বেল হয়নি। সত্যজিৎই বাণিজ্যিক সাফল্যের মুখ দেখেছেন অনেকটা। তাও তাঁর সবচেয়ে শৈল্পিক কাজগুলোর চেয়ে বেশি জনপ্রিয় হয়েছে গুগাবাবা, হীরক রাজার দেশে আর ফেলুদার ছবিগুলো। মৃণাল সেনের ছবি তো খুব জনপ্রিয় হওয়ার কথাও নয়। তাঁর বক্তব্য আলাদা, শৈলীও আলাদা। বাংলা ছবিকে বাঁচিয়ে রেখেছিল আসলে সিনেমাবোদ্ধাদের হেলাশ্রদ্ধার পাত্র হয়ে থাকা ছবিগুলো। সেসব ছবি বানাতেন তপন সিংহ, অজয় কর, দীনেন গুপ্ত, অরবিন্দ মুখোপাধ্যায়, তরুণ মজুমদার, প্রভাত রায়, অঞ্জন চৌধুরী প্রমুখ। নিখাদ প্রেমের ছবি বা মজার ছবি, আটপৌরে সাংসারিক জটিলতার ছবি, সাধারণ মানুষের রোজকার সমস্যার ছবি – এসব দেখতে দর্শক হল ভরাত বলে শিল্পী ও কলাকুশলীদের সংসার চলত, প্রযোজকদের ঘরে টাকা আসত। তাই তাঁরা হিট হবে না ধরে নিয়েই সত্যজিৎ বা মৃণালের মত শিল্পীদের ছবিতে টাকা ঢালতে পারতেন। নয়ের দশক থেকে কলকাতার বড় বড় সংবাদমাধ্যম যে শহুরে দরকচা মারা ছবিগুলোকে বাংলা ছবির পুনরুত্থান বলে দাগিয়ে দিল, সেগুলো বস্তুত বিভিন্ন মেজ সেজ ফেস্টিভালে পুরস্কার জেতা ছাড়া বাংলা ছবির হোমেও লাগেনি যজ্ঞেও লাগেনি। এক পর্দার সিনেমা হলগুলো উঠে যাওয়ার আগে থেকেই ওইসব ছবি গ্রাম আর শহরের দর্শকের মধ্যে কাঁটাতার বসিয়ে দিয়েছে। মাল্টিপ্লেক্স এসে সর্বনাশ সম্পূর্ণ করেছে। বিপুল সংখ্যক দর্শক বাংলা ছবির হাতছাড়া হয়ে গেছেন অত টাকার টিকিট কাটার ক্ষমতা নেই বলে আর গ্রামেগঞ্জে সিনেমা হল প্রায় নেই বলে। যাঁরা আছেন, তাঁদের পক্ষে হাতে ইয়াব্বড় পপকর্নের বালতি নিয়ে বাংলা ছবি কেন, কোনো ছবির পাশেই দাঁড়ানো কঠিন। মনোযোগ স্বভাবতই ৪০০ টাকার পপকর্ন নষ্ট না হওয়ার দিকেই রাখতে হবে।

এবার বলা যাক, বাংলা ছবি না বাঁচলে কী হবে। শুধু শিল্পী আর কলাকুশলীদের রুজি রোজগার বন্ধ হবে তা নয়। পৃথিবীর বিশিষ্ট সংস্কৃতিবান জাতিগুলোর অন্যতম হিসাবে বাঙালির যে পরিচিতি, তা অনেকটাই মুছে যাবে। আজ গোটা ভারতকে এক ধর্ম, এক ভাষা, এক সংস্কৃতির দেশ করে তোলার যে আপ্রাণ লড়াই চালাচ্ছে সংঘ পরিবার, তাতে সেটা হবে তাদের গুরুত্বপূর্ণ জিত। আপনি আজ সত্যজিতের অস্কার আর ঋত্বিকের মৃত্যুর এতবছর পরে তাঁকে নিয়ে মার্টিন স্করসেসির মুগ্ধতার কথা শতমুখে বলে সম্মান পান বাংলা সিনেমা বলে একটা কিছুর অস্তিত্ব আছে বলে। না থাকলে যাকেই বলতে যাবেন, সে বলবে ‘হ্যাঁ হ্যাঁ, তোমাদের একসময় নাকি সবই ছিল। এখন কী আছে বলো?’ বাংলা মাধ্যম স্কুলগুলোকে উঠে যাওয়ার দ্বারপ্রান্তে এনে দাঁড় করিয়েছে পশ্চিমবঙ্গ সরকার। এর সঙ্গে বাংলা সিনেমাশিল্পটা তুলে দিতে পারলে সোনায় সোহাগা। পাড়ায় পাড়ায় রবীন্দ্র জয়ন্তী কমে এসেছে অনেকদিন হল, আজ থেকে ৫০ বছর পরে সত্যজিতের জন্মদিন পালন করার লোকও পাওয়া যাবে না।

ব্যাপারটা কিন্তু গভীরভাবে রাজনৈতিক। আপনি মাছি তাড়ানোর ভঙ্গিতে বলতেই পারেন ‘পরমব্রত চাটুজ্জে তো সরকারের দেউচা-পাঁচামির কমিটিতে ঢুকেছিল। এখন বুঝুক ঠ্যালা’, অথবা ‘অনির্বাণ ভটচায্যি তো আর জি করের বেলায় চুপ ছিল। এখন কেন?’, কিম্বা ‘সুদেষ্ণা রায় তো সরকারের কীসব কমিশনের মেম্বার। এদের পাত্তা না দেওয়াই উচিত।’ কিন্তু আপনি যত উদাসীন থাকবেন, আপনার ভাষা-সংস্কৃতির বারোটা বাজানোর জন্যে যে বড় রাজনীতিটা চলছে তার পথ তত পরিষ্কার হবে।

নাগরিক ডট নেট ওয়েবসাইটে প্রকাশিত

মায়ানগর: যুগান্তরের ছবি, আমাদের ছবি

সিনেমা হলে ঢুকে হিয়া টুপটাপ, জিয়া নস্ট্যাল হলেই হাততালি দিই। পরিচালক আদিত্যবিক্রম সেনগুপ্ত মায়ানগর ছবিতে করেছেন ঠিক উল্টোটা। শেষ বছর বিশেকে কলকাতা যেভাবে গোল্লায় গেছে তার স্মৃতি নিখুঁত নির্মমতায় পর্দায় তুলে এনেছেন।

বামুন চিনি পৈতে প্রমাণ, বাঙালি চিনি কেমনে? নস্ট্যালজিয়া দিয়ে। ওই জিনিসটারই বিক্রয়যোগ্যতা বাঙালি সমাজে এখনো নিশ্চিত। তাই বাংলায় দুজন এখনো বিক্রি হন – রবীন্দ্রনাথ আর সত্যজিৎ রায়। ওটা আছে বলেই শতবর্ষ এসে পড়লে বিক্রি হন মৃণাল সেন, ঋত্বিক ঘটকও। নস্ট্যালজিয়ার তোড়ে রবীন্দ্রনাথের লেখা বিশেষ কেউ পড়ে না, অথচ সিগনালে তাঁর গান বাজে। ছোটরা সত্যজিতের গুগাবাবা দেখতে শেখে না, বড়রা ফেলুদাকে নিয়ে বছরের পর বছর ছেলেমানুষি চালিয়ে যায়, ভুলেও কেউ দেবী (১৯৬০) বা সীমাবদ্ধ (১৯৭১) দেখে না। তবে সত্যজিতের মেলায় হারিয়ে যাওয়া নাতিকে নায়ক বানিয়ে ছবি করলে হাউজ ফুল হয়। লোকে পথের পাঁচালী (১৯৫৫)-র বিখ্যাত দৃশ্যের হুবহু নকল দেখে আহা, উহু করে। মৃণালের রাজনীতি যতই বাতিল হয়ে যাক কলকাতা শহরে, ছবিগুলো যতই বিস্মৃত হোক, তাঁর বায়োপিকের বাহুল্য হয় বাংলা সিনেমায়। খারিজ (১৯৮২) কেউ দেখে না, কিন্তু তার সিকুয়েল তৈরি হয়। ঋত্বিকের ছবি কলকাতা শহরে দেখানোর অনুমতি বাতিল হয়, কিন্তু তাঁর নাম করে এবং না করে একাধিক বায়োপিক বানানো হয়, তাঁর নামে মেট্রো স্টেশন হয়। এসব নস্ট্যালজিয়া ছাড়া আর কী? এমনিতে স্মৃতি খুবই কাজের জিনিস, নইলে সাহিত্যিক মিলান কুন্দেরা লিখতেন না ‘ক্ষমতার বিরুদ্ধে মানুষের সংগ্রাম হল বিস্মৃতির বিরুদ্ধে স্মৃতির সংগ্রাম।’ কিন্তু কলকাতা তথা বাংলায় আমরা সমস্ত অস্বস্তিকর স্মৃতি থেকে মুখ ফিরিয়ে ন্যাকা স্মৃতিমেদুরতায় ডুবে আছি। তাই সিনেমা হলে ঢুকে হিয়া টুপটাপ, জিয়া নস্ট্যাল হলেই হাততালি দিই। পরিচালক আদিত্যবিক্রম সেনগুপ্ত মায়ানগর ছবিতে করেছেন ঠিক উল্টোটা। শেষ বছর বিশেকে কলকাতা যেভাবে গোল্লায় গেছে তার স্মৃতি নিখুঁত নির্মমতায় পর্দায় তুলে এনেছেন।

কেন এমন হয়ে গেল কলকাতা? দেখতে দেখতে পপকর্ন খাওয়া যায় এমন স্মৃতিমেদুরতা বজায় রাখতে হলে সিনেমায় দোষটা চাপিয়ে দিতে হয় কোনো অনির্দেশ্য শক্তির ঘাড়ে। ক্ষমতাশালীদের দিকে আঙুল তোলা তো নৈব নৈব চ, এমনকি নিজেদের দিকেও আঙুল তোলা চলে না। অথচ আদিত্যবিক্রম দেখিয়েছেন – লোভের গুড় ছড়িয়ে দিয়েছে ক্ষমতাশালীরা আর তা চেটেপুটে নিতে পিঁপড়ের মত এগিয়ে গেছে অভিনেত্রী হয়ে ওঠার স্বপ্ন মুছে যাওয়া গৃহবধূ এলার (শ্রীলেখা মিত্র) মত মানুষ। এই কালপর্বে বড় ফ্ল্যাট, নতুন বাইক, অনেক টাকা, বিদেশযাত্রার স্বপ্নে বিভোর করে দেওয়া হয়েছে রোজগারের অন্য পথ খুঁজে না পাওয়া রাজা (সায়ক রায়), পিংকিদের (রিকিতা নন্দিনী শিমু)। তারপর সর্বস্বান্ত করে দেওয়া হয়েছে। এই লোভের গুড়ের কল্পতরু বেয়ে শিখরে পৌঁছবার প্রতিযোগিতায় যারা নামেনি তাদের প্রায় সমাজচ্যুত করেছে কলকাতা। মাস্টারির চাকরি জোটাতে না পারা শিশির (সত্রাজিৎ সরকার), যে প্রাঞ্জল করে ছেলেমেয়েদের বুঝিয়ে দিতে পারে পদার্থবিদ্যার গূঢ় তত্ত্ব, তাকে প্রায়ান্ধকার পুরনো বাড়িতে গৃহশিক্ষক হয়েই থেকে যেতে হয়েছে। নিজের বউয়ের কাছেও বাতিল হয়ে গেছে সে। ভীতু হলেও প্রোমোটারদের হাতে বন্ধ থিয়েটার হল তুলে না দেওয়ার মরণপণ সংকল্প নিয়ে একা একা মদ খেতে খেতে অবসাদে ডুবে গেছে বুবুদা (ব্রাত্য বসু)। ওরা ডাইনোসর, ওদের সরিয়ে দিয়ে আধুনিক হয়ে উঠেছে কলকাতা।

আদিত্যবিক্রম দেখালেন বলে খেয়াল হল, আমাদের চোখের সামনে কী দারুণ এক মায়ানগর নির্মাণ সম্পূর্ণ হয়েছে! এখানে নগদে রোজগার করলে ব্যাংক ঋণ দেয় না। অথচ গরিব, নিম্নবিত্ত মানুষের বহু কষ্টে সঞ্চিত কোটি কোটি টাকা নগদে আত্মসাৎ করে ধনী হয়ে যায় প্রদীপ্ত পাল (অনির্বাণ চক্রবর্তী)। কলকাতার ইন্দ্রপ্রস্থের মত এক মায়ানগর হয়ে ওঠার ইতিহাস আদিত্যবিক্রম ধরে রেখেছেন গোখান তিরয়াকির ক্যামেরায়। এই ইন্দ্রপ্রস্থে স্ফটিকের ফাঁকিতে উপরে ওঠাকেই সুখ ভেবে একেবারে একলা হয়ে যায় এলা। তারপর দুর্যোধনের পুষ্পশোভিত সরোবরকে শুকনো ডাঙা ভেবে ঝপাং করে পড়ে যাওয়ার মত আছড়ে পড়তে হয় সহায়সম্বলহীন মাটিতে। এই মায়ানগর রাজাকেও ফকির বানিয়ে ছাড়ে। এ মায়ানগর এমন এক সিন্ডিকেট যেখানে সৎ থাকতে চেয়েও পারে না ইঞ্জিনিয়ার ভাস্কর (অরিন্দম ঘোষ)। এ শহরে একমাত্র ডেঙ্গুর মশা তাড়ানোর ধোঁয়াই রচনা করতে পারে স্বপ্নের মায়াজাল।

এবং রবীন্দ্রনাথ। তিনিও বিকৃত ও বিক্রীত হন এই মায়ানগরে। মোটের উপর নরম শব্দ এবং নৈঃশব্দ্যে নির্মিত মিংকো এগার্সম্যানের সাউন্ডট্র্যাকে কান ঝালাপালা করে দেয় শুধুমাত্র রবীন্দ্রনাথের গান। আজকের বাঙালির দুই শালগ্রাম শিলার আসলে কী অবস্থা করেছে কলকাতা, তা এতদিনে কোনো বাংলা ছবি দেখিয়ে দিল। আদিত্যবিক্রম রবীন্দ্রনাথের রক্তাক্ত হয়ে যাওয়া দেখিয়েছেন কোনো রাখঢাক না রেখে, আর সত্যজিতের অবস্থা দেখাতে চেয়েছেন কিনা নিশ্চিত হওয়া যায় না। কিন্তু এলা যখন ফ্ল্যাট পাওয়ার লোভে প্রদীপ্তর হোটেলের ঘরে পৌঁছে যায়, তখন কিছুতেই অগ্রাহ্য করা যায় না এই অনুভূতি, যে জন অরণ্য (১৯৭৬) ছবির সেই দৃশ্যই আবার দেখছি, যেখানে নিজের কাজ হাসিল করতে বন্ধুর বোনকে ক্লায়েন্টের ঘরের দরজায় পৌঁছে দেয় বিবেকের দংশনে ছিন্নভিন্ন সোমনাথ। তফাত বলতে, আজকের কলকাতায় অভাব নয়, এলার কম্পাস ঠিক করে লোভ। তাই তার কোনো ‘মিডলম্যান’ প্রয়োজন হয় না।

বিলাস যাদের প্রয়োজনে পরিণত হয়েছে আর প্রয়োজনটুকুও যাদের বিলাসে পরিণত হয়েছে, তাদের কাছে জলজ্যান্ত একটা শহরের মায়ানগর হয়ে যাওয়ার ইতিহাস তুলে ধরেছেন পরিচালক। বাংলা ছবি অরাজনৈতিক হয়ে গেছে বলে আমাদের অনেকেরই আক্ষেপ। অদূর ভবিষ্যতে সে আক্ষেপ দূর হওয়ার সম্ভাবনা নেই। কারণ এই ছবি করতেও বিদেশি প্রযোজক, বিদেশি কলাকুশলীদের সাহায্য নিতে হয়েছে পরিচালককে। তবে তার সদ্ব্যবহার করে তিনি বানিয়ে ফেলেছেন গত দেড় দশকের সবচেয়ে স্পষ্ট রাজনৈতিক ছবি। ফলে এই তথ্য অবাক করে না যে ২০২১ সালে মুক্তি পাওয়া এই ছবির পটভূমিকা যে কলকাতা শহর, সেখানকার সিনেমা হলেই ছবিটা এসে পৌঁছল চার বছর পরে।

তবে ছবির রাজনীতি ব্যর্থ হয়ে যেত, একজন দর্শকের কাছেও নিজের বার্তা পৌঁছে দিতে পারতেন না পরিচালক, যদি তাঁর প্রয়াস শিল্পোত্তীর্ণ না হত। আশ্চর্য সব দৃশ্যের জন্ম দিয়েছেন আদিত্য বিক্রম। ডেঙ্গু তাড়ানোর ধোঁয়াকে সিনেমার চিরাচরিত স্বপ্নদৃশ্যের কায়দায় ব্যবহার করার কথা আগেই বলেছি। তার চেয়েও বেশি অবাক করে পরিবারের কনিষ্ঠতমের মৃত্যুতে বিষণ্ণ পোষা কুকুর, প্রেমের ফুর্তির বাঁশির সঙ্গে সুর মিলিয়ে জ্বলে ওঠা নকল তাজমহলের আলো। শেষ দৃশ্যের ম্যাজিক গোপন থাক। যাঁরা এই পরিচালকের প্রথম ছবি আসা যাওয়ার মাঝে (২০১৪) দেখেছেন তাঁরা জানেন, আদ্যন্ত বাস্তবে পা রেখে দাঁড়িয়ে থেকে হঠাৎ কল্পনার রাজ্যে চলে গিয়ে কী অসামান্য ম্যাজিক দেখাতে পারেন আদিত্য বিক্রম। রবীন্দ্রনাথের কথাও তোলা থাক যাঁরা এখনো ছবিটা দেখেননি তাঁদের জন্য। না, ট্রেলারে দেখানো শটগুলোর কথা হচ্ছে না। এটা সেই জাতের বাংলা ছবি নয় যার ট্রেলার দেখাই যথেষ্ট।

আরও পড়ুন মানিকবাবুর মেঘ: অনন্য রোম্যান্টিক ছবি

তা বলে কোনো দুর্ধর্ষ চমক আশা করবেন না। পরিচালক নিচু তারে বেঁধেছেন দৃশ্যগুলোকে, আর সেই সুরেই সুর মিলিয়ে কাজ করেছেন ক্যামেরার সামনের শিল্পীরা। এই ছবির চমক বলতে ওই নিচু তারের উঁচু মানের অভিনয়ই। শ্রীলেখা আশ্চর্য দক্ষতায় একইসঙ্গে লাস্যময়ী এবং ঘরোয়া; কৌশলী এবং অগোছালো; কুটিল এবং বোকা। বস্তুত একই চরিত্রে দুজন মেয়ের অভিনয় করেছেন তিনি। এমন এক মেয়ে যাকে অপাপবিদ্ধ কিশোরী থেকে উচ্চাকাঙ্ক্ষী চতুর মহিলা করে তুলেছে জীবন। যার লোভ ষোল আনা, কিন্তু কল্পতরুর মালিক প্রদীপ্তর মত নির্দ্বিধায় অন্য মানুষের ক্ষতির বিনিময়ে লাভবান হতে যার বাধে।

এলার স্বামী শিশিরের চরিত্রে সত্রাজিৎকে পুরুষ দর্শকের মাঝে মাঝে মনে হবে ভেড়ুয়া। কী নির্লিপ্তভাবে বিয়ে করা বউয়ের দিকে প্রায় না তাকিয়ে কাটিয়ে দেয় লোকটা! নিজের ব্যর্থতা মেনে নেওয়া একজন মানুষের অভিনয়ে সত্রাজিৎ আবেগ চেপে রাখেন আশ্চর্য দক্ষতায়, অথচ রসবোধ একটুও চিড় খায় না। তা ছাত্রকে কুকুরের ভয় দেখানোতেই হোক, আর সেই কুকুরের সামনে পড়ে গিয়ে সন্ত্রস্ত রাজাকে ‘আমি কী করব? ও আমার কথা শোনে না’ বলাতেই হোক। কণ্ঠস্বরের ওঠানামা ছাড়াই সত্রাজিৎ এমন একজন মানুষকে দেখিয়ে দেন যার মমত্ববোধ আছে পুরোমাত্রায়, স্ত্রীর প্রতি প্রেমও আছে যথেষ্ট। কিন্তু সেসব সে প্রকাশ করে না, কারণ জানে তাতে লাভ নেই। শ্রীলেখা শেষমেশ গৃহত্যাগ করার পরে সত্রাজিতের চোখ ভরে আসে, তবু তিনি কাঁদেন না। আবার ঝড়জলের রাতে মত্ত স্ত্রী হঠাৎ ফিরে এলেও আবেগে বিহ্বল হয়ে পড়েন না।

ব্রাত্য বসু এতটাই বুবুদা হয়ে গেছেন যে সন্দেহ জাগে, তিনি আদৌ অভিনয় করছেন কিনা। তাঁর চেয়ারে বসতে গিয়ে মাঝপথে থমকে যাওয়া, জবুথবু বসার ভঙ্গি, দরদরিয়ে ঘেমে চলা, একই কথা বারবার ঘুরিয়ে ফিরিয়ে জিজ্ঞেস করা শারীরিক ও মানসিক অস্থিরতার প্রমাণ দেয়। তাঁর সারা শরীরে আতঙ্ক জেগে থাকে সারাক্ষণ। অথচ অঙ্গপ্রত্যঙ্গ ও মস্তিষ্কের উপর নিয়ন্ত্রণ হারালেও, মুখে ‘বাড়ি বেচে দেব’ বললেও নিজের জায়গা ছেড়ে না যাওয়ার আকুতি পরিষ্কার ফুটে ওঠে।

মানুষ মাত্রেই বহুমাত্রিক। তেমন এক আপাত ভালমানুষ, বহুমাত্রিক চরিত্রে যথাযথ অভিনয় করেছেন অরিন্দম।

সায়ক তাঁর উচ্চাকাঙ্ক্ষায়, অক্ষম রাগে, ভয়ে কুঁকড়ে যাওয়ায় এবং অব্যক্ত হতাশায় আমাদের সকলের পরিচিত নিম্নবিত্ত পরিবারের চিট ফান্ড এজেন্টদের একজন হয়ে উঠেছেন। রিকিতাও তাঁর চরিত্রে যথাযথ। অতি স্বল্প সুযোগেও চিট ফান্ডের সর্বদা মিষ্টি কথা বলা চালু কর্মকর্তা হিসাবে জ্যান্ত হয়ে উঠেছেন লোকনাথ দে।

গত কয়েক বছরে কলকাতার যেসব মানুষকে আমরা দেখি না, দেখতে চাই না, তাদের সিনেমার পর্দায় তুলে এনেছে অন্তত তিনটে ছবি – মায়ার জঞ্জাল (২০২০), ঝিল্লি (২০২১) আর মানিকবাবুর মেঘ (২০২১)। আদিত্যবিক্রম মায়ানগর ছবিতে ধরে রেখেছেন আমাদের দেখা লোকেদের বদলে যাওয়া, আমাদের চেনা শহরের হাওয়ায় মিলিয়ে যাওয়া। তা করতে গিয়ে তিনি ক্যামেরাবন্দি করে ফেলেছেন গোটা রাজ্যটার যুগান্তর। তিনি যে সচেতনভাবেই ঘটনা আর কল্পনা মিশিয়ে দিচ্ছেন, গুলিয়ে দিচ্ছেন, তা পরিষ্কার হয় যখন একটা শটে এক বাড়ির ছাদে মোবাইলে কথোপকথনে ব্যস্ত রাজার পিছনে দেখা যায় পোস্তার ভেঙে পড়া ফ্লাইওভারের অবশিষ্টাংশ; আর এক রডের মাথায় হাওয়ায় দোলে অধুনা দেশের সকলের পরিচিত তিনকোণা পতাকা। উপরন্তু কল্পতরুর মালিক প্রদীপ্ত হাওয়া খারাপ দেখে বিমানবন্দরের দিকে রওনা দেন, গন্তব্য কাশ্মীর। এ রাজ্যের যেসব মানুষের স্মৃতি দুর্বল নয়, তাঁদের স্থান মাহাত্ম্য বলে বোঝাতে হবে না।

এই ছবিতে যে কালপর্ব দেখানো হয়েছে, সেই পর্ব আমাদের প্রজন্মের প্রথম যৌবন। ফলত, বৃদ্ধ যুগের গলিত শবের পাশে প্রাণকল্লোলে নবযুগ আসার যে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল সেইসময়, তা যে নেহাতই ফাঁকা বুলি ছিল তা আমরা এতদিনে বুঝে গেছি। কিন্তু সেই উপলব্ধি সবিস্তারে বাংলা ছবিতে বড় পর্দায় এতদিন দেখা যায়নি। সে অর্থে আদিত্যবিক্রমের এই ছবি আমাদের প্রজন্মের বয়ান। এটা আমাদের ছবি। তাই সত্যজিতের মহানগর (১৯৬৩)-এর অকারণ আশাবাদী সমাপ্তি আদিত্যবিক্রমের মায়ানগরে সম্ভব হয় না। তাঁকে ম্যাজিকের আশ্রয় নিতে হয়।

নাগরিক ডট নেট ওয়েবসাইটে প্রকাশিত