অমিতাভ মুখ খুললেন, তবে শরশয্যায়

এই বাজারে কোনো প্রোডাকশন হাউস মহাভারতের মত বিশাল প্রকল্প হাতে নেবে এমন সম্ভাবনা কম। তবু যদি তেমন কিছু হয়, পিতামহ ভীষ্মের চরিত্রের জন্য অমিতাভ বচ্চনের চেয়ে ভাল কাউকে ভাবা যায় কি?

একসময় খবরের কাগজের বিনোদনের পাতায় নিয়মিত ব্যবধানে খবর বেরোত, বলিউডে বা টলিউডে অমুক নির্দেশক মহাভারত বা মহাভারত অবলম্বনে কোনো বড় বাজেটের ছবি করছেন। তার কটা শেষপর্যন্ত মুক্তি পেয়েছে বা বক্স অফিসে সফল হয়েছে জানি না। তবে ওরকম খবর বেরোলে কদিন প্রকাশিত কাস্টিং নিয়ে সিনেমাভক্তদের মধ্যে বিস্তর আলোচনা চলত। কে কোন চরিত্রে অভিনয় করছে আর কোনটা করলে ভাল হত – এই আলোচনায় দিব্যি সময় কাটত। অতিমারীর সময় থেকেই এ দেশের সিনেমাশিল্প সংকটে। বলিউড রীতিমত বেকায়দায়। এক ওটিটিতে রক্ষা নেই, বয়কট দোসর। তার উপর হিন্দিতে ডাব হয়ে বলিউডকে টেক্কা দিচ্ছে তামিল, মালয়ালম, কন্নড় ভাষার ছবি। এই বাজারে কোনো প্রোডাকশন হাউস মহাভারতের মত বিশাল প্রকল্প হাতে নেবে এমন সম্ভাবনা কম। তবু যদি তেমন কিছু হয়, পিতামহ ভীষ্মের চরিত্রের জন্য অমিতাভ বচ্চনের চেয়ে ভাল কাউকে ভাবা যায় কি? ইংরেজিতে ‘এল্ডার স্টেটসম্যান’ বলে একটা কথা আছে। মহাভারতের আখ্যানে সেই এল্ডার স্টেটসম্যান নিঃসন্দেহে ভীষ্ম। কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে কৌরব পক্ষে যোগ দিলেও পাণ্ডব পক্ষের কাছে তিনি শ্রদ্ধাভাজন তাঁর প্রজ্ঞা, প্রবীণতা এবং বহু বিষয়ে নিরপেক্ষ বিচারক্ষমতার কারণে। অমিতাভ এখন যে বয়সে পৌঁছেছেন, সিনেমার জগতে তাঁর অভিজ্ঞতার যা দৈর্ঘ্য এবং বৈচিত্র্য, ওই জগতের বাইরেও ভারতের সব ক্ষেত্রের সর্বস্তরের মানুষের মধ্যে তাঁর যা গ্রহণযোগ্যতা, তাতে আর কাকে এল্ডার স্টেটসম্যান বলা যায়?

এহেন অমিতাভ ২৮তম কলকাতা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে যে নাতিদীর্ঘ বক্তৃতা দিয়েছেন তা নিয়ে হইহই পড়ে গেছে। হ্যারি পটারের ভক্তরা জানেন, জাদুর দুনিয়ায় ভল্ডেমর্টের নামোচ্চারণ বারণ। আজকের ভারতে তেমনি বাকস্বাধীনতার কথা উচ্চারণ করা বারণ, করলেই ঝামেলা হয়। আজকের ভারতে বিখ্যাত কেউ যদি বলেন বাকস্বাধীনতা আছে, তাহলেই সরকারপক্ষের লোকেরা উদ্দাম নৃত্য শুরু করেন, যাঁরা বলেন নেই তাঁদের এই সুযোগে আরেকবার মিথ্যাবাদী, দেশদ্রোহী ইত্যাদি বলে নেন। ফলে অভিযুক্ত দেশদ্রোহীরা বিখ্যাতকে বলেন “ব্রুটাস, তুমিও”? আর যদি অমিতাভের মত কেউ বলে ফেলেন বাকস্বাধীনতা নেই, তাহলে তো মহাপ্রলয়। সরকারপক্ষ বলেন, এত বড় কথা! বাকস্বাধীনতা নেই? “আমি আছি, গিন্নী আছেন, আছেন আমার নয় ছেলে – /সবাই মিলে কামড়ে দেব মিথ্যে অমন ভয় পেলে।” কিন্তু অমিতাভের মন্তব্যের পরে কিঞ্চিৎ উলটপুরাণ দেখা গেছে। কামড় পরিবার, থুড়ি, সঙ্ঘ পরিবারের ট্রোলবাহিনীর মাথা অমিত মালব্য অমিতাভের প্রশংসা করেই টুইট করেছেন। কারণ মন্তব্যটা কলকাতায় করা হয়েছে, পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপস্থিতিতে। অতএব মালব্যের ব্যাখ্যা, অমিতাভ ‘টাইর‍্যান্ট’ মমতার মুখের সামনে আয়না ধরেছেন। এমন টাইর‍্যান্ট যার রাজত্বে নির্বাচনোত্তর হিংসা হয়।

পশ্চিমবঙ্গের প্রাক-নির্বাচন হিংসা বা নির্বাচনোত্তর হিংসা নিঃসন্দেহে বাকস্বাধীনতার পরিপন্থী, কিন্তু বাকস্বাধীনতা ব্যাপারটার সীমা ওটুকুর মধ্যেই বেঁধে দেওয়ার চালাকি বিজেপির আই টি সেলের প্রধান ছাড়া আর কে-ই বা করবেন? আই টি সেলের আর যে দোষই থাক না কেন, সোশাল মিডিয়ার যুগে কোন জিনিসটা লোকে ভাল ‘খায়’ তা বুঝতে ওদের মত কেউ পারে না। অমিতাভের ভক্তকুল যে এখনো বিজেপির ভক্তকুলের চেয়ে বড়, ফলে এই মন্তব্যের জন্য চিরাচরিত প্রথায় তাঁকে আক্রমণ করলে যে হিতে বিপরীত হতে পারে তা চট করে বুঝে নিয়ে বন্দুকের নল মমতার দিকে ঘুরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছেন মালব্য। সঙ্গে জুড়ে দিয়েছেন অর্ধসত্য প্রচার করার সহজাত ক্ষমতায় তৈরি অরিজিৎ সিংয়ের গান গাওয়ার ভিডিও ক্লিপ। সে ক্লিপে সুকৌশলে কেটে দেওয়া হয়েছে ‘বোঝে না সে বোঝে না’ গানের লাইন দুটো, রয়েছে শুধু ‘রং দে তু মোহে গেরুয়া’। যাতে দেখলেই মনে হয়, মমতার অনুরোধে গান গেয়ে অরিজিৎ বুঝিয়ে দিয়েছেন তিনি গৈরিক বাহিনীর লোক। অরিজিৎ তা হতেই পারেন, হওয়া তাঁর বাকস্বাধীনতা এবং ব্যক্তিস্বাধীনতার অন্তর্গত। কিন্তু ঘটনা হল, ওই চতুর এডিটিং ছাড়া শুধু সেদিনের ঘটনা দিয়ে অরিজিতের সমর্থন প্রমাণ হয় না।

এ শুধু বিজেপি প্রোপাগান্ডা। স্বভাবতই পাল্টা প্রচারে নেমে পড়েছে তৃণমূল কংগ্রেস, নেতৃত্বে সোশাল মিডিয়ার মুক্তিসূর্য মহুয়া মৈত্র। দু পক্ষে যা চলছে তাকে আমরা গেঁয়ো লোকেরা বলি প্যাঁচাল পাড়া। আমাদের রাজনৈতিক বিতর্ক এখন প্যাঁচাল পাড়াই হয়ে দাঁড়িয়েছে। নইলে অমিতাভের বক্তৃতা নিয়ে নিবিষ্ট আলোচনার অবকাশ ছিল। তিনি সিনেমার লোক, সিনেমার কথাই বলেছেন। সিনেমার বহু আগে আমাদের দেশের নাচ, গান, নাটকের মত শিল্পমাধ্যমগুলোর উৎস ছিল ধর্মস্থানগুলো, সেকথা মনে করিয়ে দিয়েছেন। সিনেমা আসার পর পরাধীন ভারতে কীভাবে সেন্সরকে ফাঁকি দিয়ে ইংরেজবিরোধী বক্তব্য ছবিতে ঢুকিয়ে দিতেন শিল্পীরা – সে ইতিহাস টেনে এনেছেন। ১৯৫২ সালের সিনেমাটোগ্রাফ আইনের কথা বলেছেন এবং তারপরেই বলেছেন “মঞ্চে উপবিষ্ট আমার সহকর্মীরা নিশ্চয়ই একমত হবেন যে আজও নাগরিক স্বাধীনতা এবং বাকস্বাধীনতা প্রশ্নের মুখে।” সহকর্মী বলতে সেখানে তখন উপস্থিত বলিউডের শাহরুখ খান, রানী মুখার্জির মত তারকারা। টলিউডের কে নয়?

সাম্প্রতিককালে ধর্মীয় ভাবাবেগের দোহাই দিয়ে কীভাবে একের পর এক ফিল্ম, ওয়েব সিরিজকে আক্রমণ করেছে হিন্দুত্ববাদীরা – সেকথা কারোর অজানা নয়। মাত্র কয়েকদিন হল প্রকাশিত হয়েছে শাহরুখ ও দীপিকা পাড়ুকোনের মুক্তির অপেক্ষায় থাকা পাঠান ছবির বেশরম রঙ্গ গানের ভিডিও। সোয়া তিন মিনিটের ভিডিওতে দীপিকার বিকিনির রং বদলেছে বারবার, কিন্তু কয়েক সেকেন্ডের জন্য তাঁকে কেন গেরুয়া (নাকি কমলা?) বিকিনিতে ইসলাম ধর্মাবলম্বী শাহরুখের বাহুবন্ধনে দেখা গেছে তা নিয়ে তোলপাড় চলছে। এ বছরের গোড়ায় লাল সিং চাড্ডা মুক্তি পাওয়ার আগে থেকেই সোশাল মিডিয়ায় ছবিটাকে বয়কট করার ডাক দেওয়া হয়ে গিয়েছিল।

কারণ আমির খান একবার বলেছিলেন দেশের যা অবস্থা হচ্ছে তাতে স্ত্রী কিরণ রাও একদিন আলোচনা করেছিলেন, দেশ ছেড়ে চলে যাওয়া উচিত কিনা। এরকম অসংখ্য উদাহরণ গত কয়েক বছরের ঘটনাবলী থেকে দেওয়া যায়। পদ্মাবত ছবি নিয়ে কী কাণ্ড হয়েছিল নিশ্চয়ই কেউ ভোলেননি। ছবির শুটিং চলাকালীন সেটে আগুন ধরিয়ে দেওয়া দিয়ে শুরু, দীপিকার নাক কেটে নেওয়ার হুমকি পর্যন্ত দেওয়া হয়েছিল। ছবির নাম প্রথমে ছিল ‘পদ্মাবতী’, রাজপুত বীরদের দৌরাত্ম্যে শেষমেশ নাম বদলে ছবির মুক্তি নিশ্চিত করতে হয়েছিল পরিচালক সঞ্জয় লীলা বনশালীকে। অথচ ছবিটা রীতিমত হিন্দুত্ববাদী। একে প্রচলিত কাহিনিকে ইতিহাস বলে দেখানো হয়েছে, তার উপর আলাউদ্দিন খিলজী যেন নরখাদক। অর্থাৎ এই ছবি জলজ্যান্ত প্রমাণ যে ভারতে বাকস্বাধীনতা এমন বিপন্ন, সকলকে খুশি না করে সিনেমা বানানো যাচ্ছে না। অন্যদিকে কতিপয় প্রযোজক, নির্দেশকের এক বিশেষ ধরনের ছবি সরাসরি সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা পাচ্ছে। এই আবহে অমিতাভ ওই কথাগুলো বলেছেন। মালব্য মোটেই বোকা লোক নন। অমিতাভের কথা প্রসঙ্গে এসব আলোচনা যে অনিবার্য তা তিনি ভালই জানেন। সে আলোচনা গুলিয়ে দিতেই অপ্রাসঙ্গিকভাবে নির্বাচনী হিংসার কথা টেনে এনেছেন।

মুক্তকণ্ঠে অমিতাভের প্রশংসা করা যেত দেশের আজকের অবস্থায় এই কথাগুলো বলার জন্য, কারণ তাঁর কথার দাম যে সকলের চেয়ে বেশি তাতে সন্দেহ নেই। কিন্তু কিছু অসুবিধা আছে। বিজেপির প্রোপাগান্ডার জবাবে পশ্চিমবঙ্গের শাসক দল যা যা বলছে ‘তাতে ঠাকুরঘরে কে রে, আমি তো কলা খাইনি’ মনোভাব স্পষ্ট। মুক্তিসূর্য মহুয়াও অমিতাভকে বাংলার জামাই-টামাই বলে আলোচনার গভীরে না গিয়ে তুই বেড়াল না মুই বেড়াল স্তরেই থাকার চেষ্টা করেছেন। কারণ সিনেমার কৈলাস পর্বতের বাসিন্দা অমিতাভ খবর না রাখলেও মহুয়া বিলক্ষণ জানেন রাজনৈতিক বিরোধীদের উপর আক্রমণ বাদ দিলেও পশ্চিমবঙ্গে বাকস্বাধীনতা কী দারুণ স্বাস্থ্যের অধিকারী। ফ্যাসিবাদের সাত-সতেরো লক্ষণ তাঁর কণ্ঠস্থ, তাই তিনি জানেন ভবিষ্যতের ভূত বলে একটা বাংলা ছবি সেন্ট্রাল বোর্ড অফ ফিল্ম সার্টিফিকেশনের ছাড়পত্র পাওয়ার পরেও পশ্চিমবঙ্গের অধিকাংশ হলে দেখানো হচ্ছিল না। নির্মাতাদের সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত দৌড়তে হয়েছিল।

সেই ছবির পরিচালক অনীক দত্ত তার আগের কলকাতা চলচ্চিত্রোৎসবে চতুর্দিকে বাংলা ছবির দিকপালদের ছবির বদলে মুখ্যমন্ত্রীর ছবি থাকার নিন্দা করেছিলেন।

অমিতাভের প্রশংসা করা যাচ্ছে না ঠিক এই কারণেই। তিনি জরুরি কথা বলেছেন, কিন্তু কায়দাটা ধরি মাছ না ছুঁই পানি। কারোর নাম না করে কিছু ভাল ভাল কথা বলা যে যুগপৎ শিরোনামে আসা নিশ্চিত করা আর বিপদসীমার বাইরে থাকার কৌশল তা তাঁর মত শোম্যান ভাল করেই জানে। উপরন্তু পিতামহ ভীষ্মের সঙ্গে তাঁর সাদৃশ্য প্রবীণতা আর অভিজ্ঞতাতেই শেষ নয়। আমরা জানি দ্রৌপদীর বস্ত্রহরণের সময়ে ভীষ্ম টুঁ শব্দটি করেননি। না, একটু ভুল হল। দ্রৌপদী নিজের সম্মানরক্ষার শেষ চেষ্টা হিসাবে প্রশ্ন করেন, পাশা খেলায় যুধিষ্ঠির কি নিজের আগে পাঞ্চালীকে বাজি রেখে হেরেছিলেন, নাকি পরে? যদি নিজেকে আগে বাজি রেখে হেরে থাকেন তাহলে তো দ্রৌপদীর উপর অধিকার আগেই হারিয়েছেন। সুতরাং পাঞ্চালী বিজিত নন। এ প্রশ্নের উত্তরে ভীষ্ম বলেছিলেন এসব কূটতর্কের বিষয়। এ দিয়ে মীমাংসা হতে পারে না। তাছাড়া যুধিষ্ঠির নিজেই তো ধর্মপুত্তুর। তাঁর মত করে ধর্ম আর কে বোঝে? অমিতাভও কিন্তু গত কয়েক বছরে দেশে যা যা ঘটেছে তা নিয়ে কখনো মুখ খোলেননি। যে বলিউডের তিনি বেতাজ বাদশা, তার উপর একের পর এক আক্রমণেও নিশ্চুপ ছিলেন। সুশান্ত সিং রাজপুতের মৃত্যুর পর গোটা বলিউডকে মাদকাসক্ত বলে প্রমাণ করার চেষ্টা হয়েছে বিজেপির তরফে, অমিতাভ-পত্নী জয়া রাজ্যসভায় তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছেন, অমিতাভ কিন্তু মুখ খোলেননি। আজ হঠাৎ চৈতন্যোদয় কী কারণে তা বোঝা শক্ত।

অবশ্য কবি বলেছেন “প্রভাত কি রাত্রির অবসানে।/যখনি চিত্ত জেগেছে, শুনেছ বাণী,/তখনি এসেছে প্রভাত।” অমিতাভের চিত্ত যদি শেষমেশ জেগে থাকে তাতে ক্ষতি নেই। তবে যুগে যুগে অবতারের রূপ বদলানোর মত কংগ্রেস আমলে যিনি কংগ্রেসি, উত্তরপ্রদেশে মুলায়ম সিং যাদবের রমরমার কালে অমর সিংয়ের মিত্রতায় যিনি সপরিবারে সমাজবাদী, যিনি কুছ দিন তো গুজারো গুজরাত মেঁ ক্যাম্পেনে দেশের বারোটা জায়গায় ছড়িয়ে থাকা জ্যোতির্লিঙ্গকেই দেশের একতার প্রতীক বলতে আপত্তি করেন না, তাঁর চিত্ত হঠাৎ আলোর ঝলকানি লেগে ঝলমল করছে এ কথা সহজে বিশ্বাস হতে চায় না, এই আর কি।

আরও পড়ুন ক্রিকেটার তুমি কার?

মঞ্চে অন্য যাঁরা ছিলেন তাঁদের উপস্থিতিও যে বিশ্বাস উৎপাদনে সহায়ক নয় তা বলাই বাহুল্য। মুখ্যমন্ত্রী বা কলকাতার মহানাগরিকের কথা বাদই দিলাম। অমিতাভ যখন বক্তৃতা দিচ্ছেন, ঠিক পিছনেই দেখতে পেলাম পণ্ডিত অজয় চক্রবর্তীর মুখ। অমিত শাহের মত প্রবল গণতান্ত্রিক মানুষ কলকাতায় এসে যাঁর আতিথ্য গ্রহণ করেন, সঙ্গীতের ব্যাপারে বিশুদ্ধবাদী, প্রচারবিমুখ সেই অজয়বাবু সিনেমার উৎসবে কী করছিলেন কে জানে! এঁদের মধ্যে দাঁড়িয়ে বাকস্বাধীনতার জন্য হা হুতাশ করেছেন অমিতাভ। অবশ্য শরশয্যাই তো ভীষ্মের নিয়তি।

নাগরিক ডট নেটে প্রকাশিত

সিপিএম পথে ফিরেছে, কিন্তু ব্যালটে ফিরবে কি?

আইএসএফের সঙ্গে সিপিএম তথা বামফ্রন্টের এখন ঠিক কী সম্পর্ক? কংগ্রেসের সঙ্গে কি আবার জোট করা হবে?

খবরে প্রকাশ, সিপিএম নেত্রী মীনাক্ষী মুখার্জি শিলিগুড়িতে এক সভায় বলেছেন, শিলিগুড়ি পৌর নিগম বামেদের হাতছাড়া হয়েছে সবে কয়েক মাস। কিন্তু এর মধ্যেই তা দুর্বৃত্তদের হাতে চলে গেছে। সিপিএম তথা বাম আমলে পশ্চিমবঙ্গের সমস্ত প্রশাসনিক কার্যকলাপ বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের ধুতি পাঞ্জাবির মত শ্বেতশুভ্র ছিল, কোথাও দুর্নীতির লেশমাত্র ছিল না – এমনটা নিশ্চয়ই নয়। কিন্তু কোনো সন্দেহ নেই, দুর্নীতির যে পরিমাণ এবং দুর্নীতি করে বুক ফুলিয়ে ঘুরে বেড়ানোর যে নির্লজ্জা এ রাজ্যে দেখা যাচ্ছে তা একান্তই তৃণমূল কংগ্রেসের দান। তার মধ্যে কংগ্রেসের উত্তরাধিকার খুঁজতে যাওয়াও বৃথা। আবু বরকত আলি গনিখান চৌধুরীরা সেকালের জমিদারদের কায়দায় রাজনীতি করতেন, অধীর চৌধুরীর মত লোকেরা তার সঙ্গে মিশিয়েছিলেন পেশিশক্তির ব্যবহার। কিন্তু সেখানেও পরিমাণ মত দুষ্টের দমন শিষ্টের পালন করে রবিন হুড মার্কা ভাবমূর্তি তৈরি করার প্রয়াস থাকত। বাম আমলেও রাজনৈতিক মদতপুষ্ট সমাজবিরোধীরা অন্তত নিজের এলাকায় গরীবের মেয়ের বিয়ে দেওয়া, অমুক বড়লোককে ‘চমকে’ দিয়ে তমুক গরীবকে একটু স্বস্তি দেওয়া – এসব করত।

কিন্তু মাত্র এগারো বছরের শাসনেই দেখা যাচ্ছে তৃণমূলের শীর্ষনেতাদের ফ্ল্যাট থেকে নগদ কোটি কোটি টাকা উদ্ধার হচ্ছে, তদন্ত এগোলে অগাধ গোপন সম্পত্তির হদিশ পাওয়া যাচ্ছে। অনুব্রত মন্ডলের মত বাহুবলীরা নিজেরাই নেতা হয়ে উঠেছে। পশ্চিমবঙ্গের বাইরে তো বটেই, এমনকি দেশের বাইরেও নেতাদের সম্পত্তি রয়েছে বলে জানা যাচ্ছে। এতৎসত্ত্বেও স্বয়ং মমতা ব্যানার্জি প্রকাশ্যে অনুব্রতর মত নেতার পাশে দাঁড়াচ্ছেন, ববি হাকিম বাঘ বেরিয়ে এলেই শেয়ালরা পালাবে ইত্যাদি আক্রমণাত্মক কথাবার্তা বলছেন। সাধারণ মানুষ টিভির পর্দায় পাহাড়প্রমাণ টাকা দেখে ফেলায় কদিন নিচু হয়ে থাকা শাসকের গলা আবার সপ্তমে চড়েছে। সুতরাং সাধারণ মানুষ যদি ভেবে নেন, শীর্ষ নেতৃত্বের আশীর্বাদেই এত দুর্নীতি চলছে রাজ্যে, তাহলে দোষ দেওয়া যাবে না। উপরন্তু মহারাষ্ট্র বা তামিলনাড়ুর মত পশ্চিমবঙ্গের চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী অর্থনীতির রাজ্যে দুর্নীতি সাধারণ মানুষের যতটা চোখে লাগে, কর্মসংস্থানের হাহাকার পড়ে যাওয়া পশ্চিমবঙ্গে শাসক দলের নেতাদের বিপুল সম্পত্তি এবং তা নিয়ে বিন্দুমাত্র অপরাধবোধের অভাব অনেক বেশি গায়ে লাগাই স্বাভাবিক।

ফলে মীনাক্ষীর কথা বেশকিছু শ্রোতাকে স্পর্শ করতে পারলে অবাক হওয়ার কিছু নেই। সম্ভবত পারছেও। সেই কারণেই ইদানীং সিপিএমের মিছিল, মিটিংয়ে আবার ভিড় হতে দেখা যাচ্ছে। স্রেফ কৌতূহলী জনতার ভিড় নয়, মধ্যবয়স্ক বা পাকা চুলের মানুষের ভিড় নয় – তরুণ তরুণীদের ভিড়। স্কুল নিয়োগে দুর্নীতির বিরুদ্ধে আন্দোলন চলছে বছর দশেক হতে চলল, কিন্তু গত এক বছরে যে তীব্রতা এসেছে আন্দোলনে – তাও আগে দেখা যায়নি। এর পিছনেও যে সিপিএমের সক্রিয়তা বৃদ্ধি অন্যতম কারণ, তা এই আন্দোলনকে নিয়মিত নজরে রাখা সাংবাদিকরা সকলেই জানেন। মীনাক্ষী, ইন্দ্রজিৎ ঘোষ, কলতান দাশগুপ্তের মত সিপিএমের ছাত্র, যুব সংগঠনের নেতারা যে এই আন্দোলন নিয়ে পথে নেমে পড়েছেন, কম্পাস ঠিক করতে সাহায্য করছেন তা তো কারোর কাছেই অবিদিত নেই। যে রাত্রে করুণাময়ী থেকে আন্দোলনকারীদের বলপূর্বক তুলে দেওয়া হল কলকাতা হাইকোর্টের নির্দেশকে সাক্ষী গোপাল করে, সে রাত্রেও এঁরা পৌঁছে গিয়েছিলেন উচ্ছেদ আটকাতে। চাকরিপ্রার্থীদের আন্দোলন সম্পর্কে সিপিএমের হাবভাব বদল চোখে পড়ার মত। পূর্বতন রাজ্য সম্পাদক সূর্যকান্ত মিশ্রের আমলে এই আন্দোলন চলছিল নিজের মত করে। কলকাতার মাঝখানে গান্ধীমূর্তির পাদদেশে চাকরিপ্রার্থীরা যখন অনশন করছিলেন, তখন পথচারীরা পর্যন্ত উঁকি মেরে দেখতেন না এরা কারা, কেন এখানে বসে আছে। সিপিএম বলত তারা আন্দোলনটাকে হাইজ্যাক করতে চায় না বলে ওর মধ্যে প্রবেশ করছে না, কিন্তু আন্দোলনকারীদের পাশে আছে। পাশে থাকা মানে কোনোদিন বিমান বসু, কোনোদিন অন্য কোনো নেতার মেয়ো রোড গমনের ফেসবুক লাইভ। মহম্মদ সেলিম রাজ্য সম্পাদক হওয়ার পর থেকে স্বয়ং বেশ কয়েকবার আন্দোলনকারীদের কাছে গেছেন, এই ইস্যু নিয়ে পার্টির পতাকা নিয়ে অথবা নাগরিক মিছিলের নাম দিয়ে একাধিক কর্মসূচি পালন হয়েছে। বিচারপতি অভিজিৎ গঙ্গোপাধ্যায়ের কড়া রায় তৃণমূল সরকারকে বিপদে ফেলেছে আদালতের ভিতরে। কিন্তু আদালতের লড়াইকে রাস্তায় নিয়ে আসার কৃতিত্ব অবশ্যই সিপিএমের।

কিন্তু রাজ্যের পরিস্থিতির সাপেক্ষে যে প্রশ্ন এখন গুরুত্বপূর্ণ, তা হল পথে ঘাটে সিপিএমের প্রতি সমর্থন ফেরত এলেও, ব্যালট বাক্সে আসবে কি? কোনো সন্দেহ নেই, কলকাতার ধর্মতলায় সারা রাজ্যের ছাত্র, যুবদের একত্র করে শক্তি প্রদর্শন আর ভোট আদায় এক জিনিস নয়। ২০২৪ এখনো ঢের দেরি, সামনেই পঞ্চায়েত নির্বাচন। সে নির্বাচনে চাকরিপ্রার্থীদের আন্দোলন কতটা প্রভাব ফেলবে বলা মুশকিল। হয়ত বেশি প্রভাবশালী হবে সিপিএমের হেল্পলাইন, যেখানে মানুষ ফোন করে স্থানীয় দুর্নীতির কথা বলতে পারেন। সিপিএম নেতাদের দাবি দারুণ সাড়া পাওয়া যাচ্ছে। এছাড়া রাজ্যের প্রত্যেক পঞ্চায়েত এলাকায় গোটা নভেম্বর মাস জুড়ে পদযাত্রা এবং ডেপুটেশনের কর্মসূচিও নেওয়া হয়েছে, যা শুভেন্দু-অভিষেক কাদা ছোড়াছুড়ি এবং রাজ্যজুড়ে তৃণমূলের গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব পেরিয়ে কলকাতার সংবাদমাধ্যমে এখনো জায়গা করে নিতে পারেনি।

রাস্তাঘাটে সাধারণ মানুষের সঙ্গে কথা বললে স্পষ্ট টের পাওয়া যাচ্ছে, তৃণমূলের স্থানীয় প্রশাসন এবং রাজ্য নেতাদের বিরুদ্ধে যথেষ্ট ক্ষোভ জমেছে। কিন্তু তেমন ক্ষোভ ২০২১ বিধানসভা নির্বাচনের আগেও ছিল। সে নির্বাচন অনেকটা সাম্প্রদায়িক রাজনীতি সম্পর্কে গণভোটে পরিণত হওয়ায় এবং দুয়ারে সরকার আর লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের কল্যাণে তৃণমূল শেষপর্যন্ত হইহই করে জিতেছিল। কিন্তু পঞ্চায়েত ভোট অন্য ব্যাপার। ইতিমধ্যে দুয়ারে সরকার নিয়েও দুর্নীতি হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠছে। তৃণমূলেরই একাধিক গোষ্ঠীকে কারা কী পেল, কারা পেল না তা নিয়ে প্রকাশ্যে ঝগড়া করতে দেখা যাচ্ছে। বিজেপি এখন পর্যন্ত নিষ্প্রভ। এই পরিস্থিতির সুযোগ নিতে কি পারবে সিপিএম?

এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে উঠে আসবে আরেকটি জরুরি প্রশ্ন। বামফ্রন্ট, তুমি আজিও আছ কি? কারণ সিপিএম যখন মধ্যগগনে, তখনো বহু জায়গায় তাদের চেয়ে ফরোয়ার্ড ব্লক, আরএসপির মত ফ্রন্টের অন্য দলগুলোরই আধিপত্য বেশি ছিল। তা নিয়ে নিজেদের মধ্যে খুনোখুনি যেমন হয়েছে, তেমনি নির্বাচনের সময়ে এই সমীকরণ বামফ্রন্টের হাত শক্তও করেছে। মুর্শিদাবাদে কী অবস্থা আরএসপির? কোচবিহারে উদয়ন গুহর প্রস্থানের পর কেমন আছে ফরোয়ার্ড ব্লক? প্রবাদপ্রতিম চিত্ত বসুর পার্টির উত্তর ২৪ পরগণাতেই বা কী হাল? বিধানসভা নির্বাচনের সময়ে যে সংযুক্ত মোর্চা তৈরি হয়েছিল তাতে ছিল কংগ্রেস আর ইন্ডিয়ান সেকুলার ফ্রন্টও। পশ্চিমবঙ্গের গ্রামীণ মুসলমান এবং হিন্দু নিম্নবর্গীয় মানুষের হাত ধরার জন্যই নাকি শেষোক্ত দলটিকে নেওয়া হয়েছিল। তাদের সঙ্গেই বা সিপিএম তথা বামফ্রন্টের এখন ঠিক কী সম্পর্ক? কংগ্রেসের সঙ্গে কি আবার জোট করা হবে?

আরও পড়ুন সেলিব্রিটি কাল্ট দরদী সিপিএমকে খোলা চিঠি

এইসব প্রশ্নেই লুকিয়ে আছে বামেরা এ রাজ্যে ঘুরে দাঁড়াতে পারবে কিনা তার উত্তর। কারণ এ রাজ্যে যেভাবে ভোট হয়, তাতে সবকিছু ঠিকঠাক করেও নির্বাচনের দিন খড়্গ হাতে দাঁড়িয়ে থাকা উন্নয়নের মোকাবিলা করতে না পারলে ভোটে জেতা যায় না। গোটা রাজ্যে একা তার মোকাবিলা করার মত সংগঠন সিপিএমের এখন নেই, আগামী কয়েক মাসের মধ্যে হবেও না।

উত্তরবঙ্গ সংবাদে প্রকাশিত

সরকারি শিক্ষাব্যবস্থা তুলে দেওয়াই কি উদ্দেশ্য?

পশ্চিমবঙ্গের কাগজ, টিভি চ্যানেলের মালিক, সম্পাদক, উত্তর সম্পাদকীয় লেখক, বিশেষজ্ঞ ও বিখ্যাতদের ছেলেপুলেরা প্রায় কেউই সরকারি স্কুলে পড়ে না। ফলে দিব্যি ওসব স্কুলের রোগবালাইকে অগ্রাহ্য করে থাকা গিয়েছিল।

ঘটনাচক্রে আমার পিতৃকুল, মাতৃকুলের অধিকাংশ আত্মীয় পেশায় শিক্ষক। তাঁরা অনেকেই আজ প্রয়াত। রাজনৈতিকভাবে সরকারি, বিরোধী, দুয়ের মাঝামাঝি— নানারকম দলের সদস্য, সমর্থক হলেও গত শতকের নয়ের দশকের শেষদিকে দেখতাম সকলেই একটি ব্যাপারে একমত— পশ্চিমবঙ্গের সরকারি ও সরকারপোষিত স্কুলগুলো ক্রমশ উঠে যাবে। কারণ ওই স্কুলগুলো ভরে থাকত মধ্যবিত্ত বাড়ির ছেলেমেয়েতে, যাদের বাবা-মায়েরা ক্রমশ তাদের বেসরকারি ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে সরিয়ে নিচ্ছিলেন। আমার শিক্ষক আত্মীয়রা বলতেন এই প্রবণতা বাড়তে বাড়তে একসময় সরকারি ও সরকারপোষিত স্কুলগুলোতে পড়ে থাকবে কেবল তারা, যাদের বাবা-মায়েরা বেসরকারি স্কুলের খরচ পোষাতে পারবেন না। তাদের পড়াশোনা হল কি হল না তা নিয়ে শিক্ষকদেরও বিশেষ মাথাব্যথা থাকবে না, সরকারও দায়সারা স্কুল চালাবে। তখন কথাগুলো বিশ্বাস করিনি, কিন্তু আজ পশ্চিমবঙ্গের স্কুলশিক্ষার অবস্থা দেখে সেই আত্মীয়দের বিশ্লেষণ ক্ষমতা এবং ভবিষ্যৎ দর্শনের পারদর্শিতা স্বীকার না করে উপায় নেই।

আমাদের ছাত্রাবস্থাতেই সরকারি প্রাথমিক স্কুলগুলো ধুঁকতে শুরু করেছিল। তার জন্যে দায়ী করা হয় বামফ্রন্ট সরকারের প্রাথমিক স্তর থেকে ইংরেজি তুলে দেওয়ার সিদ্ধান্তকে। কিন্তু এই শতকে কী কারণে মধ্যবিত্ত বাবা-মায়েরা সরকারি মাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিক স্কুলগুলোকে ত্যাগ করলেন তা অত সহজে ব্যাখ্যা করা সম্ভব নয়। একটা কারণ অবশ্যই কোন মাধ্যমে পড়ানো হচ্ছে তা নিয়ে বাঙালির অত্যধিক মাথাব্যথা। শিক্ষার গুণমান নিয়ে মাথা না ঘামিয়ে অনেক বাবা-মাই ছেলেমেয়ের ইংরেজিতে গড়গড়িয়ে কথা বলতে পারা নিশ্চিত করতে চান। অর্থাৎ স্কুল তাঁদের কাছে প্রকৃতপক্ষে সারাদিনব্যাপী স্পোকেন ইংলিশ ক্লাস। সঙ্গে অন্য বিষয়গুলো পড়িয়ে দিলেই হল। ফলে সাধ্যাতীত এবং বুদ্ধিতে যার ব্যাখ্যা নেই এমন মাইনে দিয়েও বেসরকারি স্কুলেই তাঁরা ছেলেমেয়েকে পাঠান। সে ধরনের অনেক স্কুলেরই শিক্ষকদের যোগ্যতা প্রশ্নাতীত নয়, ফলে অনেকসময় ওই অভিভাবকরাই পড়াশোনার মান নিয়ে একান্ত আলোচনায় সন্দেহ প্রকাশ করেন। অথচ পশ্চিমবঙ্গের সরকারি ও সরকারপোষিত স্কুলগুলোতে যাঁরা পড়ান, তাঁরা অন্তত ১৯৯৭-৯৮ সাল থেকে একটা প্রতিযোগিতামূলক লিখিত পরীক্ষা এবং ইন্টারভিউতে নিজেদের যোগ্যতার প্রমাণ দিয়ে নিযুক্ত হচ্ছিলেন। তা সত্ত্বেও মধ্যবিত্তের বেসরকারি স্কুলে ছোটার পিছনে কি ‘বেসরকারি হলে পরিষেবা ভাল হবে’ কুসংস্কার? নাকি বাজার অর্থনীতির ‘যা পয়সা দিয়ে কিনতে হয় না তা ভাল নয়’ আদর্শে আস্থা? উত্তর যা-ই হোক, মধ্যবিত্ত ছেলেমেয়েরা সরে যাওয়ায় স্কুলের প্রতি শিক্ষকদের এবং সরকারের আগ্রহ যে কমে গেছে তাতে সন্দেহ নেই। কিছুদিন আগেই তো বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে একগুচ্ছ স্কুল। বহু জায়গায় স্কুল চালু রাখতে শিক্ষকরা এলাকার বাড়ি বাড়ি গিয়ে ছাত্রছাত্রী ধরে আনছেন।

শিক্ষকসমাজ অবশ্যই কোনও মনোলিথ নয়। পশ্চিমবঙ্গের সব শিক্ষক একইরকম ভাবেন বা সকলেই ফাঁকিবাজ, বসে বসে মাইনে পান— এমন একটা মত ইদানীং রীতিমত জনপ্রিয় হয়েছে। সে মতে সায় দিচ্ছি না। কারণ ফাঁকিবাজ সব পেশাতেই ছিল, আছে এবং থাকবে। তা বলে একটা গোটা পেশার সকলেই অলস, অনিচ্ছুক কর্মী হয়ে যান না। কিন্তু যা বলার, তা হল স্কুলের পঠনপাঠন নিয়ে শিক্ষকদের নিরুৎসাহ করার সবরকম চেষ্টা সরকারি তরফে করা হয়েছে। মন দিয়ে পড়াতে চান এমন অনেক শিক্ষকই সখেদে বলেন, সিলেবাস শেষ করানো অতিমারির আগেও রীতিমত কঠিন ছিল। কারণ তাঁদের অনেকখানি সময় চলে যায় বিভিন্ন সরকারি প্রকল্পের জন্য ছেলেমেয়েদের তথ্যাবলি সংগ্রহ ও নথিবদ্ধ করতে, জিনিসপত্র বিলি করতে। স্কুলগুলো প্রায় রেশন দোকানের চেহারা নেয়, ক্লাস কাটছাঁট করতে হয়। তার উপর বর্তমান সরকারের আমলে পশ্চিমবঙ্গে সরকারি ছুটি কত বেড়েছে তা নিয়েও আলাদা গবেষণা হতে পারে। পুজোর ছুটি ফুরোতেই চায় না, গরমের ছুটি প্রায়শই নির্ধারিত দিনের আগেই শুরু হয়ে যায়, তারপর বাড়িয়ে দেওয়া হয়। আগে ছুটির তালিকার বেশিরভাগটা ঠিক করতেন স্কুল কর্তৃপক্ষ, এখন চলে অঘোষিত এক-রাজ্য-এক-ছুটি নীতি। ফলে দক্ষিণবঙ্গ গরমে পুড়লে শীতল উত্তরবঙ্গেও স্কুল বন্ধ থাকে। কোনও স্কুল কর্তৃপক্ষ স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে সরকারি ছুটি অগ্রাহ্য করে পঠনপাঠন চালু রাখতে চাইলে শাস্তির হুমকি দেওয়া হয়। এর উপর আছে শূন্য পদের বিপদ। বহু স্কুলে অশিক্ষক কর্মীদের পদ ফাঁকা পড়ে আছে। সে কাজও শিক্ষকদেরই করতে হয়। এতসব করে আর কতটুকু পড়ানো সম্ভব?

এসব অভিভাবকদেরও বিলক্ষণ চোখে পড়ে। ছেলেমেয়েকে সরকারি স্কুলমুখো না করার পিছনে এসব কারণও কাজ করে এবং সেজন্য তাঁদের দোষ দেওয়া চলে না। উপর্যুক্ত বিপত্তিগুলোর চেয়েও শিক্ষকদের কাজকর্মে বেশি প্রভাব ফেলছে শিক্ষকের অভাব। যেসব স্কুলে এখনও ছাত্রছাত্রীর অভাব নেই, সেখানেও শিক্ষকের অভাব প্রকট। স্কুলে শিক্ষক নিয়োগের যে স্বচ্ছ ও নিয়মিত ব্যবস্থা তৃণমূল সরকার উত্তরাধিকারসূত্রে পেয়েছিল তাকে লাটে তুলে দেওয়ার ফলে বহু স্কুলে পর্যাপ্ত শিক্ষক নেই। উপরন্তু ইচ্ছামত বদলির ব্যবস্থায় কোথাও একই বিষয়ের শিক্ষক প্রয়োজনের তুলনায় বেশি, অথচ অন্য কোনও বিষয়ের একজন শিক্ষকও নেই।

অর্থাৎ শুধু যে রাস্তায় বসে থাকা (এবং মধ্যরাতে চ্যাংদোলা করে তুলে নিয়ে যাওয়া) হবু শিক্ষকরাই অবিচারের শিকার, তা নয়। যাঁরা স্কুলে পড়াচ্ছেন তাঁরাও ভাল নেই। সবচেয়ে বড় ক্ষতি হচ্ছে সেইসব ছাত্রছাত্রীদের, যাদের বাবা-মা শীতাতপনিয়ন্ত্রিত স্কুলের মাইনে জোগাতে পারেন না। অতিমারির সময়ে সরকার স্কুল খোলার নামই করছিল না, যেনতেনপ্রকারেণ বন্ধ রাখছিল দেখে অনেকেই আশঙ্কা করছিলেন স্কুলগুলোকে লাটে তুলে দেওয়াই উদ্দেশ্য। সে কাজে অতিমারিকে ব্যবহার করা হচ্ছে। তাঁদের আশঙ্কা যথার্থ। কিন্তু আশ্চর্যের কথা, নিয়োগের পরীক্ষা নিয়ে বেলাগাম দুর্নীতি এবং চালু চাকরির পরীক্ষাটাকে অকেজো করে দেওয়া যে কেবল কর্মসংস্থান সংক্রান্ত ইস্যু নয়, সরকারি শিক্ষাব্যবস্থা লাটে তুলে দেওয়ার পরিকল্পনারও অংশ সেকথা গত এগারো বছরে কারও মনে হয়নি। সেই ২০১৩ সালেই যখন শিক্ষামন্ত্রী ব্রাত্য বসু পরিষ্কার বলেছিলেন, এসএসসি কি দুর্গাপুজো যে প্রতি বছর করতে হবে? একথা যে স্কুলশিক্ষার উপরে কুঠারাঘাত সেকথা রাজ্য সরকারের রাজনৈতিক বিরোধীরা ছাড়া কেউ তখন বলেননি। পরবর্তীকালে যখন তদানীন্তন শিক্ষামন্ত্রী পার্থ চট্টোপাধ্যায় ঘোষণা করলেন এসএসসি, টেট ইত্যাদি পরীক্ষার মেধাতালিকা প্রকাশ করা হবে না, পাশ করলে প্রার্থীর কাছে এসএমএস যাবে কেবল, তখনও রাজ্যের লেখাপড়া জানা মানুষ কোনও উচ্চবাচ্য করেননি। একটি প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষা হবে সরকারি উদ্যোগে অথচ তার মেধাতালিকা প্রকাশ করা হবে না— এ যে দুর্নীতির পথ প্রস্তুত করা, তা তখন কোন সাংবাদিক লিখেছিলেন? কোন শিক্ষাবিদ একটি উত্তর-সম্পাদকীয় প্রবন্ধ লিখেছিলেন? আজকের দুর্নীতির নিন্দা করতে গিয়ে অনেকেই বাম আমলের নিয়োগ দুর্নীতি টেনে আনছেন। এতে হয়ত নিরপেক্ষতা প্রমাণ হয়, কিন্তু অস্বীকার করা হয় যে এসএসসি, টেট দুর্নীতির সঙ্গে প্রাক-এসএসসি যুগে টাকা দিয়ে চাকরি পাওয়ার তুলনা বস্তুত আলুর সঙ্গে আপেলের তুলনা। কারণ সেখানে স্থানীয় স্তরে দুর্নীতি হত, যা বন্ধ করতে সরকার কেন্দ্রীয় পরীক্ষাব্যবস্থা চালু করেছিল। এখানে সরকার সচেতনভাবে একটি চালু ব্যবস্থা ধাপে ধাপে তুলে দিয়েছে যাতে কেন্দ্রীয়ভাবে দুর্নীতি করা সম্ভব হয়। যাঁরা বলেন পাঁচ টাকার দুর্নীতিও দুর্নীতি আর পাঁচ কোটি টাকার দুর্নীতিও দুর্নীতি, তাঁদের দেখলে সশরীরে ঈশ্বর দর্শনের মত অনুভূতি হতে পারে। কিন্তু তাতে একথা অপ্রমাণ হয় না যে তাঁরা যে কোনও কারণেই হোক স্থিতাবস্থার সমর্থক। পরিস্থিতির চাপে বর্তমান সরকারকে খানিকটা গাল দিচ্ছেন মাত্র। হয়ত কিছুটা বিবেকের দায়ে, কিছুটা নইলে লোকে খারাপ বলবে বলে।

আরও পড়ুন শিক্ষক দিবসের প্রশ্ন: শিক্ষকদের বাঁচাবে কে?

তৃণমূল সরকারের বরাবরের সমর্থক কেউ কেউ যেমন রাতের অন্ধকারে মহিলাসুদ্ধ আন্দোলনকারীদের পুলিসের রাস্তা থেকে সরিয়ে দেওয়ার দৃশ্যে আর স্থির থাকতে পারেননি। বলেছেন বলপ্রয়োগ কাম্য নয়, আলোচনার ভিত্তিতে সমস্যা মিটিয়ে ফেলা হোক। এসব বিবৃতি দিলে হয়ত বিবেকের ডাকে সাড়া দেওয়া হয় বা সাধারণ মানুষের কাছে নিজের ভাবমূর্তি কিছুটা উজ্জ্বল করা যায়। কিন্তু এগুলির বক্তব্য দুর্বোধ্য। ভাবখানা এমন যেন সরকার বাহাদুর এ দুর্নীতিতে যুক্তই নন। তৃতীয় পক্ষ টাকা নিয়ে চাকরি দিয়ে যোগ্য প্রার্থীদের বঞ্চিত করেছে। এখন সরকার এদের অভিভাবকের আসনে বসে বুঝিয়েসুঝিয়ে মিটিয়ে দিলেই সব মিটে যায়। যেন সরকার মেধাতালিকা প্রকাশ না করার সিদ্ধান্ত নেয়নি, প্রাক্তন শিক্ষামন্ত্রী এই মামলায় হাজতবাস করছেন না, যেন আদালত কান ধরার আগে সরকার নিজেই দোষীদের খুঁজে খুঁজে শাস্তি দেওয়া শুরু করেছিল।

হিন্দিভাষীরা বলে থাকেন “দাল মে কুছ কালা নেহি হ্যায়, পুরা দাল হি কালা হ্যায়।” পশ্চিমবঙ্গের নিয়োগ দুর্নীতির ব্যাপারটাও যে তাই তা এখনও অনেকেই বুঝতে পারছেন না বা বুঝতে চাইছেন না। কারণ এই সত্য তাঁদের রাজনৈতিক বয়ানের সঙ্গে খাপ খাচ্ছে না। কিন্তু চুপ করে থাকতেও পারছেন না, কারণ যে ছেলেমেয়েগুলোকে লাঞ্ছিত হতে দেখা গেছে তারা মোটের উপর নিজের শ্রেণির। এরা মইদুল ইসলাম মিদ্যার মত বিরোধী দলের মিছিলে আসা বা আনিস খানের মত দলীয় রাজনীতির বাইরে দাঁড়িয়ে প্রশাসনের বিরুদ্ধে লড়ে যাওয়া গেঁয়ো মুসলমান নয় যে তাদের মৃত্যুতে চোখ ফিরিয়ে থাকা যাবে। পশ্চিমবঙ্গের কাগজ, টিভি চ্যানেলের মালিক, সম্পাদক, উত্তর সম্পাদকীয় লেখক, বিশেষজ্ঞ ও বিখ্যাতদের ছেলেপুলেরা প্রায় কেউই সরকারি স্কুলে পড়ে না। ফলে দিব্যি ওসব স্কুলের রোগবালাইকে অগ্রাহ্য করে থাকা গিয়েছিল। কিন্তু এখন যারা মার খাচ্ছে তাদের মুখের ভাষা শুনে, বেশভূষা দেখে পরের ছেলে পরমানন্দ, যত গোল্লায় যায় তত আনন্দ ভেবে আর থাকা যাচ্ছে না। এতদিনে সত্যিই গা শিরশির করছে— এরপর কোনও ইস্যুতে যদি আমাদের ছেলেমেয়েগুলোর সঙ্গেই সরকার এরকম ব্যবহার করে! এতদিন যারা মার খেয়েছে, নানাভাবে অত্যাচারিত হয়েছে তাদের অবস্থা এবং অবস্থানকে নানা যুক্তিতে আমল না দেওয়া এই মানুষদের জন্যই বোধহয় কবি লিখেছিলেন “যাদের করেছ অপমান/অপমানে হতে হবে তাহাদের সবার সমান।”

চাকরিপ্রার্থীদের আন্দোলন হয়ত শেষ অবধি ছত্রভঙ্গ হয়ে যাবে সরকারি প্রতাপে বা কৌশলে, হয়ত সব যেমন চলছিল তেমনই চলবে। কিন্তু তারা অন্তত সাতে পাঁচে না থাকা বাঙালির হাড়ে ঠকঠকানি ধরানোর কাজটুকু করতে পেরেছে বলে ধন্যবাদার্হ।

চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম ওয়েবসাইটে প্রকাশিত

মুখ্যমন্ত্রীর আরএসএস: বিশ্বাসে মিলায় বস্তু

পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী কেবল গুণী মানুষ নন, তাঁর প্রতিভা বহুমুখী। তিনি সাহিত্য রচনা করেন, ছবি আঁকেন, গান লেখেন। তার উপর রাজ্যের প্রশাসন চালাতে হয়। একজন মানুষকে এত কাজ করতে হলে কাগজ পড়ার সময়ের অভাব ঘটা খুবই স্বাভাবিক। নিশ্চয়ই প্রতিদিন কাগজ পড়ার সময় মুখ্যমন্ত্রী পান না। পেলে চোখে পড়ত কলকাতা থেকে প্রকাশিত দ্য টেলিগ্রাফ কাগজের একটা খবর, যার শিরোনাম ‘RSS yet to clear air on bombing claim affidavit’। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কংগ্রেসের মিডিয়া বিভাগের প্রধান পবন খেরা রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের (আরএসএস) এক প্রাক্তন প্রচারকের মহারাষ্ট্রের নানদেড় জেলা ও সেশনস আদালতে জমা দেওয়া হলফনামা প্রকাশ্যে এনেছেন। সেই হলফনামায় যশবন্ত শিন্ডে নামক ওই লোকটি দাবি করেছে, সংঘ পরিবারের সদস্য সংগঠনগুলো দেশের বিভিন্ন জায়গায় বোমা বিস্ফোরণ ঘটিয়ে সংবাদমাধ্যমের একাংশ এবং পুলিস প্রশাসনের সহযোগিতায় তার দোষ মুসলমান সম্প্রদায়ের ঘাড়ে চাপিয়েছে। ফলে ২০১৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে বিজেপি লাভবান হয়েছে।

খবরটা মুখ্যমন্ত্রীর চোখ এড়িয়ে গিয়ে থাকতেই পারে, কারণ এ নিয়ে কোনো চ্যানেলে কোনো বিতর্কসভা বসেনি। কলকাতার অন্যান্য তথাকথিত উদার খবরের কাগজগুলোতেও আতসকাচ দিয়ে খুঁজে দেখতে হবে এই খবর। তাছাড়া কংগ্রেস তো বানিয়েও বলতে পারে। কারণ তারা তৃণমূল কংগ্রেসকে বিজেপির প্রধান বিরোধী হয়ে উঠতে দিতে চায় না। কিন্তু মুখ্যমন্ত্রীর শক্তিশালী সোশাল মিডিয়া টিম আছে। টুইটারে তাঁর সাত মিলিয়ন ফলোয়ার, ফেসবুকে ৪.৯ মিলিয়ন। সেই সোশাল মিডিয়া টিমের সাহায্য নিলেই মুখ্যমন্ত্রী জানতে পারবেন যে ওই মর্মে হলফনামা সত্যিই ফাইল করা হয়েছে। চাইলে স্বয়ং যশবন্তের মুখ থেকেই হলফনামায় লিখিত অভিযোগগুলো সংক্ষেপে শুনে নিতেও পারবেন। মারাঠি যশবন্তের ভিডিও ইংরেজি সাবটাইটেল সমেত সোশাল মিডিয়ায় ঘুরে বেড়াচ্ছে।

যশবন্তের হলফনামার কথা প্রকাশ্যে এল বৃহস্পতিবার, কলকাতার কাগজের প্রথম পাতায় সে খবর বেরোল শুক্রবার সকালে। সেদিনই সাংবাদিক সম্মেলনে মুখ্যমন্ত্রী বললেন “আরএসএস এত খারাপ ছিল না, এবং এত খারাপ বলে আমি বিশ্বাস করি না।” মুখ্যমন্ত্রী নিশ্চয়ই খবরটা জানতে পারেননি বলেই ওরকম বলেছেন। স্বীকার্য যে যশবন্তের কথাগুলো অভিযোগ মাত্র। কিন্তু যে সংগঠনের একদা প্রচারকরা এই মুহূর্তে দেশের রাষ্ট্রপতি, উপরাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী এবং বহু রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী – তার বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ যে মারাত্মক, সে কথা না বোঝার মত রাজনীতিবিদ মমতা ব্যানার্জি নন। তাছাড়া তিনদিন হয়ে গেল, এখন পর্যন্ত আরএসএস যশবন্তকে মিথ্যাবাদী বলে কোনো বিবৃতি দেয়নি। অবশ্য জবাবদিহি না চাইলে বিবৃতি দেওয়ার প্রশ্ন ওঠে না। ২০০৬ সালের নানদেড় বিস্ফোরণ কাণ্ডে সরকারি সাক্ষী (অ্যাপ্রুভার) হতে চেয়ে আবেদন করেছিল যশবন্ত। আদালত সবেমাত্র সেই আবেদন গ্রহণ করেছে, আরএসএসকে জবাবদিহি করতে তো ডাকেনি। সাংবাদিকদেরই বা ঘাড়ে কটা মাথা, যে এ নিয়ে মোহন ভাগবতকে প্রশ্ন করবে? অতএব আরএসএসের বয়ে গেছে তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ মিথ্যা বলে ঘোষণা করতে। কথায় আছে, বিশ্বাসে মিলায় বস্তু, তর্কে বহুদূর। মুখ্যমন্ত্রী তো বিশ্বাসই করেন না আরএসএস খারাপ। ফলে যতক্ষণ তারা নিজেরা না বলছে “হ্যাঁ, আমরা খারাপ”, মুখ্যমন্ত্রী নিশ্চিন্ত। কিন্তু খটকা অন্যত্র।

“এত খারাপ ছিল না”। এত খারাপ মানে কত খারাপ? তার মানে মুখ্যমন্ত্রী জানেন যে আরএসএস একটু একটু খারাপ? সেই পরিমাণটা কি তাঁর পক্ষে সুবিধাজনক? খারাপ ছিল না মানেই বা কী? আগে যতটুকু খারাপ ছিল তাতে তাঁর আপত্তি ছিল না, এখন বেশি খারাপ হয়ে গেছে – এ কথাই কি বলতে চেয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী? তাঁর কাছে কোনটা ভাল, কোনটা খারাপ তা অবশ্য আমাদের জানা নেই। মহাত্মা গান্ধীকে হত্যা করা কি খারাপ? সে হত্যায় আরএসএস যোগ প্রত্যক্ষভাবে প্রমাণ হয়নি বটে, তবে সেই ঘটনার পরে ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লিখেছিলেন, আরএসএস নেতাদের ভাষণগুলো যে বিষ ছড়িয়েছে তারই পরিণতি গান্ধীহত্যা। তাই ভারত সরকার আরএসএসকে নিষিদ্ধ করে। কে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ছিলেন তখন? সর্দার বল্লভভাই প্যাটেল। জওহরলাল নেহরুর বদলে যিনি প্রধানমন্ত্রী হলে ভারত সোনার দেশ হত বলে আরএসএস এখন দিনরাত ঘোষণা করে। মুখ্যমন্ত্রী নানা কাজে ব্যস্ত থাকেন, তাই ধরে নিচ্ছি অতকাল আগের ব্যাপার তাঁর মনে নেই। তাই তার ভালমন্দ ভেবে দেখেননি। তবে যেহেতু তিনি একজন সাংবিধানিক পদাধিকারী এবং নিজেকে ধর্মনিরপেক্ষ বলে দাবি করেন, সেহেতু ধরে নিতে দোষ নেই যে যশবন্ত শিন্ডে তার হলফনামায় যে ধরনের কার্যকলাপের কথা লিখেছে সেগুলো আমাদের মুখ্যমন্ত্রীর চোখে খারাপই। কারণ কাজগুলো বেআইনি এবং সাম্প্রদায়িক।

এখন কথা হল, যশবন্ত যে অভিযোগ করেছে আরএসএসের বিরুদ্ধে, সে অভিযোগও কিন্তু এই প্রথম উঠল তা নয়। মুখ্যমন্ত্রী কাগজ পড়ারই সময় পান না যখন, বই পড়ার সুযোগ না পাওয়ারই কথা। তবে তাঁর তো পড়ুয়া পারিষদের অভাব নেই। তাঁরা কেউ কেউ নির্ঘাত মহারাষ্ট্র পুলিসের প্রাক্তন ইন্সপেক্টর জেনারেল এস এম মুশরিফের লেখাপত্র পড়েছেন। তাঁর লেখা আরএসএস: দেশ কা সবসে বড়া আতঙ্কবাদী সংগঠন বইতে ২০০৭ থেকে ২০০৯ পর্যন্ত মোট ১৮টা বোমা বিস্ফোরণে আরএসএস, অভিনব ভারত, জয় বন্দেমাতরম, বজরং দল এবং সনাতন সংস্থা – এই পাঁচটা হিন্দুত্ববাদী সংগঠনকে দায়ী করা হয়েছে। মুখ্যমন্ত্রীর পার্ষদরা কেন যে এসব কথা তাঁকে জানাননি! জানলে নিশ্চয়ই আরএসএস খারাপ “ছিল না” – একথা মুখ্যমন্ত্রী অতটা আত্মবিশ্বাসী হয়ে বলতেন না। অবশ্য মুশরিফ যা লিখেছেন তার সমস্তই তো স্রেফ অভিযোগ। মালেগাঁও বিস্ফোরণের প্রধান অভিযুক্ত সাধ্বী প্রজ্ঞা যেভাবে ছাড়া পেয়ে সাংসদ হয়ে গেছেন, তাতে ওসব অভিযোগকে আর আমল দেওয়া চলে কিনা সে প্রশ্ন উঠতেই পারে। তবে আরএসএসের উপর অত্যন্ত জোরালো বিশ্বাস না থাকলে এসব জেনে সংঘ পরিবারের সদস্য নয় এমন এক রাজনৈতিক দলের সর্বময় নেত্রীর কিছুটা সন্দিহান হওয়ার কথা। কিন্তু বাংলার মুখ্যমন্ত্রী নিজের বিশ্বাসে অটল।

রাজনীতিতে দুজন ব্যক্তি, দুটো সংগঠন বা একজন ব্যক্তির সঙ্গে একটা সংগঠনের সম্পর্ক চোখ বন্ধ করে ভরসা করার মত পর্যায়ে পৌঁছনো চাট্টিখানি কথা নয়। বিপদের সময়ে পাশে দাঁড়ানোর ইতিহাস না থাকলে তেমনটা হওয়া শক্ত। সেদিক থেকে মমতার আরএসএসের প্রতি এই বিশ্বাস বুঝতে অসুবিধা হয় না। আজকের মুখ্যমন্ত্রী গত শতকের শেষ দশকে যখন ভারতের প্রাচীনতম রাজনৈতিক দল থেকে বেরিয়ে আসেন, তখন এককালের স্বয়ংসেবক অটলবিহারী বাজপেয়ী আর লালকৃষ্ণ আদবানির স্নেহ না পেলে মমতার পক্ষে আস্ত একখানা রাজনৈতিক দল গড়ে তোলা সম্ভব হত কি? হলেও সদ্যোজাত দলটাই মধ্যগগনে থাকা সিপিএম তথা বামফ্রন্টের বিরোধী হয়ে ওঠার ক্ষমতা রাখে – এ বিশ্বাস কংগ্রেসের ভোটার তথা কর্মীদের মধ্যে প্রতিষ্ঠা করা যেত কি? মাত্র আটজন সাংসদ যে দলের, সেই দলের নেত্রীকে রেল মন্ত্রকের দায়িত্ব দিয়ে পশ্চিমবঙ্গের ভোটারদের প্রভাবিত করার মহার্ঘ সুযোগ দিয়েছিল বিজেপি। শুধু কি তাই? তেহেলকা কাণ্ড প্রকাশিত হওয়ার পরেই সততার প্রতীক মমতা দুর্নীতির বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে এনডিএ ত্যাগ করেন। তা সত্ত্বেও ২০০৩ সালে তাঁকে দপ্তরহীন মন্ত্রী করে ফিরিয়ে নেওয়া হয়। আরএসএস আর বিজেপি আলাদা – এই তত্ত্বে এখনো বিশ্বাস করেন যাঁরা, তাঁদের কথা আলাদা। বাকিরা নিশ্চয়ই মানবেন, এভাবে পাশে থাকার পরেও যদি মমতা আরএসএসকে বিশ্বাস না করতেন তাহলে ভারি অন্যায় হত।

আসলে মমতার আরএসএসে বিশ্বাস ততটা অসুবিধাজনক নয়। তাঁর বারংবার আরএসএস প্রীতি ঘোষণা সত্ত্বেও দেশসুদ্ধ ধর্মনিরপেক্ষ শিবিরের কেষ্টবিষ্টুদের মমতায় বিশ্বাস বরং বৃহত্তর বিপদের কারণ। গত বছর বিধানসভা নির্বাচনে যখন বিজেপির ক্ষমতায় আসা আটকানোই মূল এজেন্ডা হয়ে দাঁড়াল, তখন বামপন্থীদের মধ্যে লেগে গেল প্রবল ঝগড়া। সিপিএম নেতৃত্বাধীন বাম দলগুলো বলতে শুরু করল বিজেপি আর তৃণমূল অভিন্ন, তাই তৃণমূলকে ভোট দেওয়া আর বিজেপিকে ভোট দেওয়া একই কথা। উঠে এল একটা নতুন শব্দ – বিজেমূল। অন্যদিকে নকশালপন্থীরা বলতে লাগল, যেখানে যে প্রার্থী বিজেপির বিরুদ্ধে সবচেয়ে শক্তিশালী তাকে ভোট দিতে। বিজেমূল তত্ত্বের প্রমাণ হিসাবে সিপিএম “দলে থেকে কাজ করতে পারছি না” বলে লাইন দিয়ে তৃণমূল থেকে বিজেপিতে চলে যাওয়া শীর্ষস্থানীয় নেতা, মন্ত্রীদের দেখাতে লাগল। আর যত না তৃণমূল, তার চেয়েও বেশি করে নকশালরা তার জবাবে তালিকা দিতে থাকল, কোন ব্লক স্তরের সিপিএম নেতা বিজেপিতে গেছে, কোন জেলা স্তরের নেত্রী বিজেপিতে যোগ দিলেন। অর্থাৎ দুপক্ষের কেউই তৃণমূল কংগ্রেসের রাজনীতি কী, ধর্মনিরপেক্ষতার প্রশ্নে তাদের বিশ্বাসযোগ্যতা থাকলে কেন আছে বা না থাকলে কেন নেই – সে আলোচনায় গেল না। অথচ ঠিক তখনই ইন্ডিয়া টুডে কনক্লেভে বসে লাইভ অনুষ্ঠানে মুখ্যমন্ত্রী বলছেন “আমি সংঘ পরিবারের বিরুদ্ধে লড়ছি না। ওরা তো নির্বাচনে লড়ে না। ওরা বিজেপিকে সমর্থন করে। আমি লড়ছি বিজেপির সঙ্গে।” এই নেত্রীর দল জয়যুক্ত হল, একমাত্র বিরোধী দল হিসাবে উঠে এল বিজেপি। অর্থাৎ ঘোষিতভাবে আরএসএসের বন্ধু দুটো দলের হাতে চলে গেল বাংলার আইনসভা। অথচ পশ্চিমবঙ্গের ধর্মনিরপেক্ষ বুদ্ধিমানরা উল্লসিত হয়ে ঘোষণা করলেন, বাংলার ধর্মনিরপেক্ষ ঐতিহ্য জিতে গেল। রামমোহন, বিদ্যাসাগর, রবীন্দ্রনাথ জিতে গেলেন, ইত্যাদি।

আরও মজার কথা, নির্বাচনে গোল্লা পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই সিপিএমও পরিত্যাগ করল বিজেমূল তত্ত্ব। আরও এক ধাপ এগিয়ে এ বছর রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে দেশের একমাত্র যে নেতা সর্বদা নাম করে আরএসএসকে আক্রমণ করেন, সেই রাহুল গান্ধীর দল কংগ্রেস থেকে শুরু করে সিপিএম, লিবারেশন সমেত সমস্ত বাম দল সমর্থন করে বসল মমতার পছন্দের প্রার্থীকে। সে আরেক যশবন্ত – বিজেপি থেকে তৃণমূলে এসেছেন। এ থেকে যা প্রমাণিত হয় তা হল, মমতার মত আরএসএস-বান্ধব নয় যে রাজনৈতিক শক্তিগুলো, তারাও ব্যাপারটাকে নির্বাচনী লড়াইয়ের বেশি কিছু ভাবে না।

আরএসএসের কাছে ভারতকে হিন্দুরাষ্ট্র করে তোলা মতাদর্শগত মরণপণ লড়াই। সে লক্ষ্যে পৌঁছতে তারা সাংবিধানিক, অসাংবিধানিক – সবরকম পথই নিতে রাজি। প্রয়োজনে আদবানির মত আগুনে নেতাকে বঞ্চিত করে বাজপেয়ীর মত নরমপন্থীকে প্রধানমন্ত্রী করতে রাজি ছিল। জমি শক্ত হওয়ার পর নরেন্দ্র মোদীর মত কড়া হিন্দুত্ববাদীকে নেতা করেছে, ভবিষ্যতে তাঁকেও আস্তাকুঁড়ে নিক্ষেপ করে আরও গোঁড়া আদিত্যনাথকে সর্বোচ্চ নেতার আসনে বসাতে পারে। বিরোধীরা ওই বিস্তারে ভেবেই উঠতে পারেনি এখনো। এমনকি তথাকথিত কমিউনিস্ট দলগুলোও কেবল স্ট্র্যাটেজি সন্ধানে ব্যস্ত। কোথায় কাকে সমর্থন করলে বা কার সাথে নির্বাচনী জোট গড়লে বিজেপির ক্ষমতায় আসা আটকানো যাবে – এটুকুই তাদের চিন্তার গণ্ডি। সে কারণেই বিজেমূল শব্দটা নির্বাচনের আগে ভেসে ওঠে, পরাজয়ের পর মিলিয়ে যায়। যদি সিপিএমের পক্ষ থেকে সংঘমূল কথাটা বলা হত এবং শূন্য হয়ে যাওয়ার পরেও বলে যাওয়া হত, তাহলে জনমানসে সত্যি সত্যি প্রশ্নচিহ্ন তৈরি হতে পারত। হিন্দুরাষ্ট্র কী, তা হওয়া আটকানো কেন দরকার, আটকানোর ক্ষেত্রে মমতাকে সত্যিই প্রয়োজন, নাকি তিনি হিন্দুত্বের ট্রোজান ঘোড়া – শতকরা ৮০-৯০ জন মানুষ এই মুহূর্তে এসব নিয়ে ভাবছেন না (সোশাল মিডিয়া দেখে যা-ই মনে হোক)। সংঘ পরিবারকে সরাসরি রাজনৈতিক ভাষণে, কর্মসূচিতে আক্রমণ করা হলে ভাবতে বাধ্য হতেন।

বিহারে বিজেপিকে ক্ষমতাচ্যুত করার সুযোগ আসা মাত্রই সমস্ত বাম দল একজোট হয়ে নীতীশকুমারকে সমর্থন করেছে। কেবল লিবারেশন নয়, সিপিএমও। সে জোটে কংগ্রেসও আছে। অথচ নীতীশও মমতার মতই বিজেপির সঙ্গে ঘর করেছেন। শুধু তা-ই নয়, মমতার বিজেপির সাথে শেষ জোট ছিল ২০০৬ সালে। নীতীশ কিন্তু ২০১৬ বিধানসভা ভোটে রাষ্ট্রীয় জনতা দলের সঙ্গে লড়ে জিতেও বিশ্বাসঘাতকতা করে বিজেপির কাছে ফিরে গিয়েছিলেন। কেন নীতীশ আরএসএস-বিরোধী বাম দল এবং কংগ্রেসের কাছে গ্রহণযোগ্য আর কেন মমতা নন, তা নিয়ে কোনো আলোচনাই শুনলাম না আমরা। আলোচনাটা হল না সম্ভবত এইজন্যে, যে বামেরা বা কংগ্রেস নিজেরাই ওসব নিয়ে ভাবে না। বিজেপিকে ক্ষমতা থেকে দূরে রাখতে পারলেই খুশি, শেষমেশ আরএসএসের প্রকল্পই সফল হয়ে যাবে কিনা তা ভেবে দেখার প্রয়োজন বোধ করে না। অথবা ‘যখন হবে তখন দেখা যাবে’ নীতি নিয়ে চলছে।

আসলে কিন্তু মমতায় আর নীতীশে তফাত বড় কম নয়। নীতীশ সুযোগসন্ধানী, ক্ষমতালোভী রাজনীতিবিদ। তারই অনিবার্য ফল হিসাবে ভূতপূর্ব জনতা দলের সঙ্গে, একদা সতীর্থ লালুপ্রসাদের সাথে তাঁর বিচ্ছেদ হয়েছিল। কিন্তু তাঁর রাজনীতির সূতিকাগার হল সমাজবাদী রাজনীতি, নিম্নবর্গীয় মানুষের রাজনীতি। সে কারণেই নীতীশ কখনো বিজেপিকে পুরোপুরি বিশ্বাস করতে পারেননি, বিজেপিও পারেনি। নীতীশ কখনো মমতার মত সোচ্চার আরএসএস বন্দনাও করেননি। কারণ আরএসএস হল ব্রাহ্মণদের দ্বারা পরিচালিত, হিন্দু সমাজের উপর ব্রাহ্মণ আধিপত্য বজায় রাখার জন্য গঠিত সংস্থা। নীতীশের দলের নিম্নবর্গীয় সদস্য, সমর্থকদের সঙ্গে আরএসএসের আড়চোখে দেখার সম্পর্কটুকুই হওয়া সম্ভব। তার বেশি নয়।

অন্যদিকে মমতা ব্রাহ্মণকন্যা। তাঁকে দুর্গা বলে সম্বোধন করতে আরএসএসের কোথাও বাধে না। মমতার রাজনীতির ইতিহাস অন্য দিক থেকেও নীতীশের সঙ্গে মেলে না। বস্তুত যুগপৎ কংগ্রেস বিরোধিতা এবং কমিউনিস্ট বিরোধিতার ইতিহাস সম্ভবত মমতা ছাড়া ভারতের কোনো আঞ্চলিক দলের নেই। তামিলনাড়ুর দ্রাবিড় রাজনীতির ভিত্তিতে তৈরি দলগুলোর স্বভাবতই প্যাথোলজিকাল বাম বিরোধিতা নেই, কিন্তু ঐতিহাসিকভাবে কংগ্রেস বিরোধিতা ছিল। তেলুগু দেশম, তেলেঙ্গানা রাষ্ট্র সমিতি, জগন্মোহন রেড্ডির দল বা ওড়িশার বিজু জনতা দলের জন্ম তৃণমূলের মতই কংগ্রেস ভেঙে। কিন্তু তাদেরও বামেদের সাথে ধুন্ধুমার সংঘাতের ইতিহাস নেই। তাদের এলাকায় বামেদের দুর্বলতা তার কারণ হতে পারে, কিন্তু এ কি নেহাত সমাপতন যে বিন্ধ্য পর্বতের উত্তর দিকে আরএসএস বাদ দিলে তৃণমূলই একমাত্র রাজনৈতিক শক্তি, কমিউনিস্ট এবং কংগ্রেস, দু পক্ষই যাদের ঘোষিত শত্রু? লক্ষণীয়, ২০১১ বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূল আর কংগ্রেসের জোট গড়তে দারুণ উদ্যোগী ভূমিকা নিয়েছিলেন প্রণব মুখার্জি। তাঁর জীবনের শেষ প্রান্তে এসে দেখা গেল, তিনি আরএসএসের বিশেষ শ্রদ্ধাভাজন। সেই জোট বামফ্রন্টকে হারাতে পেরেছিল বটে, কিন্তু পশ্চিমবঙ্গে কংগ্রেসের ভাঙনের গতিও বাড়িয়ে দিয়েছিল।

তাহলে আরএসএসের সাথে সম্পর্ক মমতাকে কী কী দিয়েছে তা বোঝা গেল। এবার আরএসএস কী কী পেয়েছে সে আলোচনায় আসা যাক? রাজনীতিতে তো কেউ “আমি   নিশিদিন তোমায় ভালোবাসি,/ তুমি   অবসরমত বাসিয়ো” গায় না। আরএসএস যা যা পেয়েছে সবকটাই অমূল্য।

১) আরএসএসের দুই ঘোষিত শত্রু মুসলমান আর কমিউনিস্ট। তৃণমূলের উদ্যোগে কমিউনিস্টরা প্রথমে তাদের সবচেয়ে বড় ঘাঁটি থেকে ক্ষমতাচ্যুত, পরে ছত্রভঙ্গ হয়েছে। তার জন্যে আরএসএসের আগমার্কা কোম্পানি বিজেপিকে বিন্দুমাত্র কসরত করতে হয়নি। মুসলমানরা আগে প্রান্তিক ছিলেন, তৃণমূল আমলে বাংলার হিন্দুদের শত্রু হিসাবে চিহ্নিত হয়ে গেছেন। মমতা প্রথমবার ক্ষমতায় এসে ইমাম ভাতা চালু করলেন, বিজেপি প্রায় বিনা আয়াসেই হিন্দুদের বোঝাতে সক্ষম হল, মুসলমানরা মমতার দুধেল গাই। পরে মমতা নিজেই অনবধানবশত (নাকি সচেতনভাবেই?) সেকথা বললেনও। এখন পরিস্থিতি এমন, যে বাম আমলে মুসলমানরা বিভিন্ন এলাকায় বাড়ি ভাড়া পেতেন না, এখন খোদ সল্টলেকে হোটেলের ঘর ভাড়া পান না।

২) মুসলমান তোষণ হচ্ছে – এই প্রোপাগান্ডা হিন্দুদের একটা বড় অংশের বদ্ধমূল ধারণায় পরিণত হয়েছে তৃণমূল শাসনের ১১ বছরে। ইতিমধ্যে বেলাগাম হিন্দু তোষণ চলছে। বিজেপি আজগুবি অনলাইন প্রচার শুরু করল “পশ্চিমবঙ্গে দুর্গাপুজো করতে দেওয়া হয় না”, তৃণমূল সরকার দুর্গাপুজোগুলোকে নগদ অনুদান দিতে শুরু করল। আরএসএস শুরু করল রামনবমীতে অস্ত্র মিছিল, তৃণমূল আরম্ভ করল বজরংবলী পুজো। সুপ্রিম কোর্টের রায়ে অযোধ্যায় রামমন্দির তৈরির পথ খুলে গেল, আরএসএসের প্রতিশ্রুতি পূরণ হল। এদিকে দিদি দীঘায় জগন্নাথ মন্দির নির্মাণের পরিকল্পনা নিলেন। রাজ্যে বিজেপির সরকার থাকলেও এভাবে হিন্দুত্বকে রাজনীতির এজেন্ডায় নিয়ে আসতে পারত কিনা সন্দেহ।

৩) ভারতের একেক রাজ্যের একেকটা বিশিষ্ট গুণ আছে, যা সেই রাজ্যের মানুষের মূলধন। গুজরাটের যেমন ব্যবসা, পাঞ্জাবের কৃষিকাজ। বাংলার ছিল লেখাপড়া, গানবাজনা, সাহিত্য, সিনেমা ইত্যাদি। অন্য রাজ্যের লোকেরা যাকে কটাক্ষ করে এককথায় বলে কালচার। এই কালচার আরএসএসের হিন্দুত্বের একেবারে বিপরীত মেরুর জিনিস। তৃণমূল আমলে সবচেয়ে নির্বিঘ্নে সাড়ে সর্বনাশ ঘটানো গেছে এই কালচারের। বাংলার ছেলেমেয়েরা ফড়ফড় করে ইংরেজি বলতে না পারলেও দেশে বিদেশে গবেষক, অধ্যাপক হিসাবে তাদের দাম ছিল। এখনো সর্বভারতীয় বিজ্ঞান পুরস্কারগুলোর প্রাপকদের তালিকা মাঝে মাঝে সেকথা জানান দেয়। সে দাম ধুলোয় মিশিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা হয়েছে স্কুল, কলেজের চাকরি বিক্রি করে লেখাপড়া লাটে তুলে দিয়ে। নায়ক, নায়িকা, গায়ক, গায়িকারা কাতারে কাতারে বিধায়ক আর সাংসদ হয়ে গেছেন। লেখকরা ব্যস্ত পুষ্পাঞ্জলি দিতে আর চরণামৃত পান করতে। সিনেমার কথা না বলাই ভাল। শৈল্পিক উৎকর্ষ বাদ দিন, পারিশ্রমিকের হাল এত খারাপ যে কলকাতার শিল্পীরা স্রেফ বাংলা ছবিতে, ওয়েব সিরিজে কাজ করে টিকে থাকতে পারবেন কিনা সন্দেহ। মন্ত্রীর বান্ধবীর ফ্ল্যাট থেকে টাকার পাহাড় উদ্ধার হওয়ার ছবি দেখে প্রথম সারির অভিনেতা অনির্বাণ ভট্টাচার্য হা-হুতাশ করছেন, ওই পরিমাণ টাকার অর্ধেক পেলেও বাংলা ছবিগুলো অনেক ভাল করে করা যেত।

কিন্তু এসব গোল্লায় যাওয়ার চেয়েও বড় ক্ষতি হয়েছে। লেখাপড়া, গানবাজনা, সাহিত্য, সিনেমা মিলিয়ে যে বাঙালি মনন ছিল সেটাই নষ্ট হয়ে গেছে। আসল ক্ষতি সেটা। বাঙালি হিন্দু ভদ্রলোকের অন্তত একটা ভান ছিল, যে সে ভারতের অন্য অনেক রাজ্যের লোকেদের মত ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ি করে না। দুর্গাপুজো এলে কদিন পাগলামি করে; নিজের বাড়িতে লক্ষ্মীপুজো, সরস্বতীপুজো, সত্যনারায়ণের সিন্নি চলে। কিন্তু বাইরে সে একজন ধর্মনিরপেক্ষ মানুষ। এখন সেসব গেছে। নতুন ফ্ল্যাটবাড়ি হলে তার গায়ে খোদাই করা হচ্ছে গণেশের মুখ, শিবলিঙ্গ বা স্বস্তিকা। কলিং বেলে বেজে উঠছে “ওঁ ভূর্ভুবঃ স্বঃ”। অক্ষয় তৃতীয়ায় এখনো গণেশপুজো এবং হালখাতা হয় এমন দোকান খুঁজে পাওয়া দায়, অথচ গণেশ চতুর্থী এক দশকের মধ্যে ঘরে ঘরে পৌঁছে গেছে। শিগগির পশ্চিমবঙ্গ সরকারের অনন্ত ছুটির তালিকায় যোগ হবে নির্ঘাত। অল্পবয়সী বাঙালি কথা বলছে হিন্দি মিশিয়ে, ছোটরা স্কুলে দ্বিতীয় ভাষা হিসাবে শিখছে হিন্দি। বঙ্গভঙ্গের নাম করতেই লর্ড কার্জনের ঘুম কেড়ে নেওয়া বাঙালি নিজে নিজেই প্রায় উত্তর ভারতীয় হিন্দু হয়ে গেল তৃণমূল আমলে। এই সাংস্কৃতিক অনুপ্রবেশ তামিলনাড়ুতে কিছুতেই হয়ে উঠছে না আরএসএসের দ্বারা। কেরালায় মার খেতে হচ্ছে, এমনকি নিজেদের হাতে থাকা কর্ণাটকেও করতে গিয়ে অনবরত সংঘাত হচ্ছে। বাংলায় কিন্তু ওসবের দরকারই হচ্ছে না। বিনা রক্তপাতে বাঙালি বাঙালিয়ানা বিসর্জন দিচ্ছে।

আরও পড়ুন শাহেনশাহ ও ফ্যাসিবিরোধী ইশতেহার

এর বেশি আর কী চাইতে পারত আরএসএস? মমতা হিন্দুরাষ্ট্রের জন্য রুক্ষ, পাথুরে বাংলার মাটিতে হাল চালিয়ে নরম তুলতুলে করে দিয়েছেন। বীজ বপনও সারা। ফসল তোলার কাজটা শুধু বাকি।

রেউড়ি সংস্কৃতি: যে গল্পে ডান-বাম গুলিয়ে গিয়েছে

১৯৯১ পরবর্তী যুগে দিনরাত মন্ত্রের মত কানের কাছে বলে বলে যে কয়েকটি কথা আমাদের মর্মে প্রবেশ করিয়ে দেওয়া হয়েছে তার অন্যতম হল, কোনও পরিষেবা বা পণ্য বাজার থেকে পয়সা দিয়ে না কিনে পাচ্ছে মানেই সেটা দান।

আমি কোন পথে যে চলি, কোন কথা যে বলি
তোমায় সামনে পেয়েও খুঁজে বেড়াই মনের চোরা গলি।

এই প্রকল্প বারবার বিরোধীদের ফাঁপরে ফেলতে সমর্থ হয়। এমন গতিতে এমন এক লেংথে পিচ পড়ে মোদি সরকারের সিদ্ধান্তগুলো, যাতে ব্যাকফুটে যাব না ফ্রন্টফুটে খেলব ঠিক করতে করতেই বিরোধীদের ব্যাট-প্যাডের ফাঁক দিয়ে বল গলে গিয়ে উইকেট ভেঙে দেয়। এই মুহূর্তে যেমন কল্যাণমূলক রাষ্ট্রের যে শেষ চিহ্নটুকু ভারত রাষ্ট্রের মধ্যে রয়েছে, সেটুকুও মুছে ফেলতে সাঁড়াশি আক্রমণ শুরু হয়েছে।

প্রাক্তন বিজেপি মুখপাত্র অশ্বিনী উপাধ্যায় সুপ্রিম কোর্টে জনস্বার্থ মামলা দায়ের করেছেন নির্বাচনী প্রচারে যেসব রাজনৈতিক দল ভোটারদের আকর্ষণ করতে “freebies” দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেয়, তাদের নির্বাচনী প্রতীক ফ্রিজ করে দেওয়া এবং রেজিস্ট্রেশন বাতিল করার দাবিতে। পিটিশনার বলেছেন “irrational freebies” অর্থাৎ মুফতে অযৌক্তিক সুযোগসুবিধা বিলোবার আগে তার অর্থনৈতিক প্রভাব আলোচনা করতে হবে। এই মামলার শুনানিতে ১১ আগস্ট মহামান্য প্রধান বিচারপতি এন ভি রামান্না বলে বসলেন, অর্থনীতির ক্ষতি আর মানুষের কল্যাণের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা দরকার। অবশ্য তিনি যোগ করেছেন “আমি রেজিস্ট্রেশন বাতিল করার দিকটা দেখতে চাই না। সেটা অগণতান্ত্রিক। হাজার হোক, ভারত তো একটা গণতন্ত্র।” তার আগেই ৩ আগস্ট বিচারকরা বলেছিলেন, ব্যাপারটা গুরুতর। অতএব নীতি আয়োগ, অর্থ কমিশন, আইন কমিশন, রিজার্ভ ব্যাঙ্ক এবং শাসক ও বিরোধী দলগুলোর প্রতিনিধিদের নিয়ে একটা কমিটি তৈরি হোক মুফতের সুযোগসুবিধার নানা দিক নিয়ে আলোচনা করতে। ১৭ আগস্ট ছিল এ যাবৎ এই মামলার শেষ শুনানি, আগামী সপ্তাহে ফের শুনানি হওয়ার কথা। মজার ব্যাপার, ১১ তারিখ প্রধান বিচারপতি নিজেই সন্দেহ প্রকাশ করেছিলেন, এ বিষয়ে আদালতের হস্তক্ষেপ করার কতটুকু অধিকার আছে তা নিয়ে। অথচ সেই যুক্তিতে পিটিশন বাতিল করে দেননি।

এই মামলার শুনানিতে দেশের সলিসিটর জেনারেল তুষার মেহতার কিছু মন্তব্য একবার দেখে নেওয়া যাক। “এই ফ্রিবি কালচারটাকে এখন শিল্পের পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে আর নির্বাচন এখন এই নিয়ে লড়া হয়। ফ্রিবিগুলোকে যদি জনকল্যাণ বলে ধরা হয়, তাহলে বিপর্যয় ঘটবে। এটাই যদি নর্ম হয়ে দাঁড়ায়, তাহলে মাননীয় বিচারকরা নর্মগুলো ঠিক করে দিন। আইনসভা যতক্ষণ না কিছু করছে, মাননীয় বিচারকরা কিছু নর্ম ঠিক করে দিতেই পারেন।”

এই বিতর্কে দুটো জিনিস বিশেষভাবে লক্ষ করার মত। প্রথমত, ফ্রিবি বলতে স্পষ্টতই বোঝানো হচ্ছে সরকার সাধারণ মানুষকে যেসব সুযোগসুবিধা দেয় সেগুলোকে। কারণ প্রধান বিচারপতি বলেছেন অর্থনীতির ক্ষতি (“economy losing money”) আর মানুষের কল্যাণ (“welfare of the people”)— দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য রাখা দরকার। অর্থাৎ বলেই দেওয়া হল অর্থনীতির কাজ মানুষের কল্যাণ করা নয়। দ্বিতীয়ত, কেন্দ্রীয় সরকারের প্রতিনিধি তুষার ইঙ্গিত দিয়েছেন আইনসভা ফ্রিবি সম্পর্কে কিছু করবে। অর্থাৎ কোনও আইন প্রণয়ন করবে। সে করতেই পারে। লোকসভায় যে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা আছে বিজেপির, তাকে ব্যবহার করে এবং রাজ্যসভায় বিল পাশ করাতে অসুবিধা হলে বিরোধী সাংসদদের সাসপেন্ড করে দিয়ে যে কোনও আইনই কেন্দ্রীয় সরকার করে ফেলতে পারে। কিন্তু দেখা যাচ্ছে সরকারের সে পর্যন্তও তর সইছে না। তুষার চাইছেন তার আগেই আদালত কিছু নিয়মকানুন ঘোষণা করুক।

এই জনস্বার্থ মামলা এত গুরুত্বপূর্ণ কেন? কারণ এই মামলা দায়ের হওয়ার কিছুদিন আগেই, গত মাসের শেষদিকে, উত্তরপ্রদেশে বুন্দেলখণ্ড এক্সপ্রেসওয়ে উদ্বোধন করতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেছিলেন, দেশে “রেউড়ি কালচার” চালু হয়েছে। রেউড়ি, অর্থাৎ মিষ্টি, বিতরণ করে ভোট কিনে নেওয়ার চেষ্টা হচ্ছে। দেশের পক্ষে এই সংস্কৃতি খুব বিপজ্জনক। দেশের মানুষকে, বিশেষ করে যুবসমাজকে, এই কালচার সম্পর্কে সতর্ক থাকতে হবে। রেউড়ি কালচারের লোকেরা এক্সপ্রেসওয়ে, বিমানবন্দর বা ডিফেন্স করিডোর বানাতে পারবে না।

রেউড়ি মন্তব্যের পিছনের ছকটা খুব পরিষ্কার। প্রধানমন্ত্রীর উন্নয়নের সংজ্ঞা ঘোর নব্য-উদারবাদী। কর্মসংস্থান, শিক্ষা, স্বাস্থ্য— এসবের উন্নতি হল কি হল না তা নিয়ে তাঁর বিন্দুমাত্র মাথাব্যথা নেই। উন্নয়ন বলতে তিনি বোঝেন এক্সপ্রেসওয়ে, বিমানবন্দর, ডিফেন্স করিডোর। নব্য উদারবাদী অর্থনীতিতে ভর্তুকি যেমন একটি অশ্লীল শব্দ, তেমনই ভারতের বিভিন্ন রাজ্যের সরকারগুলো গরিব নাগরিকদের জন্য যেসব আর্থিক সাহায্যের ব্যবস্থা করেছে বা বিভিন্ন পরিষেবার মূল্যে বিশেষ ছাড় দিয়ে থাকে— সেগুলোও ক্ষতিকর, অবান্তর। তাই ওগুলোকে রেউড়ি বলা। মতাদর্শগতভাবেই মোদি সরকার ওসবের বিরোধী। সেটা বুঝতে অবশ্য কারও বাকি নেই। ২০১৪ সালের পর থেকে মহাত্মা গান্ধি ন্যাশনাল রুরাল এমপ্লয়মেন্ট গ্যারান্টি স্কিমকে যেরকম হেলাছেদ্দা করা হয়েছে সেদিকে নজর রাখলেই বোঝা যায়। নতুন কথাটা হল, এবার অন্য দলগুলোর সরকার ও পথে হাঁটতে না চাইলে আইন করে, পারলে আদালতের নির্দেশকে শিখণ্ডী করে তাদের শায়েস্তা করা হবে। এক দেশ, এক অর্থনীতি কায়েম করতে চাইছে মোদি সরকার। সে দেশে রেউড়ি জাতীয় প্রকল্পের কোনো স্থান নেই।

তাৎক্ষণিক রাজনৈতিক কারণটাও সহজবোধ্য। সাম্প্রতিককালে যে কটা রাজ্যের নির্বাচনে বিজেপিকে হারতে হয়েছে, তার প্রায় প্রত্যেকটাতেই তাদের পথ আটকে দাঁড়িয়েছে এই কল্যাণমূলক প্রকল্পগুলো, যা রেউড়ি – প্রধানমন্ত্রীর ভাষায়। আরএসএস-বিজেপির নব্য-উদারবাদী অর্থনৈতিক নীতি আর ধর্মীয় মেরুকরণের রাজনীতি মুখ থুবড়ে পড়েছে দিল্লি আর পাঞ্জাবে আম আদমি পার্টির সস্তায় বিদ্যুৎ, চাষিদের ঋণ মকুবের প্রতিশ্রুতি, স্বাস্থ্য ও শিক্ষায় ভর্তুকি এবং সরকারের সক্রিয়তায় সরকারি স্কুল ও মহল্লা ক্লিনিকের উন্নতির সামনে। পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনে তৃণমূলের জয়ের জন্য প্রায় সব বিশ্লেষকই কৃতিত্ব দিয়েছেন লক্ষ্মীর ভাণ্ডার, দুয়ারে সরকারের মত পদক্ষেপকে। কন্যাশ্রীর মত প্রকল্প তো আগে থেকেই চলছিল। স্তালিনের দল দ্রাবিড় মুন্নেত্রা কজঘমও ক্ষমতায় এলে যে গৃহবধূদের রেশন কার্ড আছে তাঁদের মাসে ১০০০ টাকা করে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। সুতরাং নির্বাচনের ময়দানেও এই একটা বাধা বিজেপি কিছুতেই টপকাতে পারছে না। ফলে বিরোধীদের হাতে পড়ে থাকা এই শেষ অস্ত্রটা কেড়ে না নিলেই নয়। তাই এই আক্রমণ।

এবার শুরুতেই যে দ্বিধার কথা বলেছিলাম, সেই আলোচনায় আসি। বিজেপি সামাজিক এবং অর্থনৈতিক, দুদিক থেকেই যে একটি দক্ষিণপন্থী দল তাতে সন্দেহ নেই। সেই কারণেই কয়েক লক্ষ কোটি টাকার কর্পোরেট কর মকুব করে দেওয়া তাদের মতে ফ্রিবি নয়। কিন্তু কর্মসংস্থানহীন বা দরিদ্র মহিলাদের হাতে সরকার মাসে মাসে নগদ টাকা দিলে অর্থনীতির ক্ষতি হয়ে যাবে, বিপর্যয় সৃষ্টি হবে বলে তাদের চিন্তা। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের বাম দলগুলো, বিধানসভায় শূন্য হলেও যাদের রাস্তাঘাটে প্রধান বিরোধী হিসাবে দেখা যাচ্ছে, তারা প্রায় মোদির সুরেই গত দশ বছর ধরে তৃণমূল সরকারের জনকল্যাণমূলক প্রকল্পগুলো সম্পর্কে কথা বলে আসছে কেন? সিপিএমের যে কোনও স্তরের সদস্য এবং সমর্থকরা কন্যাশ্রী, সবুজ সাথী, লক্ষ্মীর ভাণ্ডার ইত্যাদি প্রকল্প সম্পর্কে “খয়রাতি”, “দয়ার দান”, “টাকা দিয়ে মানুষের মুখ বন্ধ রাখছে”, “মানুষকে দয়ার পাত্র করে দিয়েছে” ইত্যাদি বাক্যবন্ধ ব্যবহার করেন। মানুষ বসে বসে টাকা পেতে ভালবাসে, তাই তৃণমূলকে ভোট দিয়ে যাচ্ছে— এতদূরও বলা হয়। গরিব মানুষ রাজনীতি বোঝেন না, ভিক্ষা পেলেই খুশি— এই জাতীয় অপমানকর মন্তব্যও প্রকাশ্যেই করা হয়। স্রেফ সোশাল মিডিয়ার বিপ্লবীরা নন, শতরূপ ঘোষের মত সংবাদমাধ্যমে দলের প্রতিনিধি হিসাবে নিয়মিত মুখ দেখানো নেতারাও সামান্য পালিশ করা ভাষায় এসব বলে থাকেন।

স্বভাবতই সাধারণ সম্পাদক সীতারাম ইয়েচুরির টুইট ছাড়া রেউড়ি বিতর্কে সিপিএমের কোনও সুসংহত বক্তব্য পাওয়া যাচ্ছে না। দুর্গাপুজোর জন্য ক্লাবগুলোকে টাকা দেওয়া আর লক্ষ্মীর ভাণ্ডারে টাকা দেওয়াকে তাঁরা এক করে দেখেন কিনা— তা নিয়ে কোনও স্পষ্ট আলোচনা সিপিএম নেতারা করেন কি? অথচ এই আলোচনা জরুরি। এ রাজ্যে জনমত বলতে যে শ্রেণির মানুষের বক্তব্যকে বোঝানো হয় সাধারণত, সেই শ্রেণির মধ্যে জনকল্যাণমূলক প্রকল্পগুলোকে দানখয়রাতি বলে ভাবার মানসিকতা কিন্তু সুদূরপ্রসারী। ভদ্রলোক শ্রেণির যেসব ভোটার তৃণমূলকে ভোট দেন, তাঁরাও “এই শ্রী, ওই শ্রী” না থাকলেই খুশি হতেন। সরকারি কর্মচারীদের ডিএ দিতে রাজ্য সরকারের যে অনীহা তার বিপরীতে ওই প্রকল্পগুলোকে রেখে আলোচনা করতে বাঙালি মধ্যবিত্ত, উচ্চবিত্তরা বিলক্ষণ ভালবাসেন। তৃণমূলের নেতা, মন্ত্রীদের দুর্নীতি ফাঁস হলে “এই টাকাগুলো দিয়ে ডিএ দেওয়া যেত না?”— এ প্রশ্ন শোনা যায়। কিন্তু কাউকে বলতে শোনা যায় না “এই টাকা দিয়ে লক্ষ্মীর ভাণ্ডারে এক হাজার টাকা করে দেওয়া যায় না?” অথচ এঁরা এমনিতে ভাল করেই জানেন পাঁচশো টাকায় আজকাল কিছুই হয় না। আসলে মনে করা হয়, ডিএ পাওয়া অধিকার কিন্তু লক্ষ্মীর ভাণ্ডার দয়ার দান।

এর কারণ ১৯৯১ পরবর্তী যুগে দিনরাত মন্ত্রের মত কানের কাছে বলে বলে যে কয়েকটি কথা আমাদের মর্মে প্রবেশ করিয়ে দেওয়া হয়েছে তার অন্যতম হল, কোনও পরিষেবা বা পণ্য বাজার থেকে পয়সা দিয়ে না কিনে পাচ্ছে মানেই সেটা দান। সরকার দিচ্ছে মানেই দান করছে। আরেকটি কথা হল, চাকুরিজীবীরা করদাতা, গরিব শ্রমজীবী মানুষ করদাতা নয়। তারা করদাতাদের টাকায় বেঁচে থাকা পরজীবী।

এই দুটিই যে সর্বৈব মিথ্যা, তা বোঝানোর সবচেয়ে বড় দায়িত্ব ছিল বামপন্থীদের। কিন্তু সে দায়িত্ব তাঁরা মোটেই পালন করেননি, এখনও করেন না। ভর্তুকি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য পণ্য— একথা বলে নব্য-উদারনীতিবাদ। অন্যদিকে, যে কোনও ধরনের বামপন্থার খাতায় এগুলো অধিকার। এটুকু বুঝতে এবং বোঝাতে বামপন্থীদের অসুবিধা হওয়ার কথা নয়। কিন্তু দেখা যাচ্ছে বঙ্গ সিপিএমের এই অ আ ক খ প্রবলভাবে গুলিয়ে গেছে। ফলে বামফ্রন্টের ৩৪ বছরের সাফল্যের তালিকা দিতে গিয়ে তাঁরা দিব্যি নানা কল্যাণমূলক প্রকল্পের কথা বলেন। স্কুলের মেয়েদের সাইকেল দেওয়া যে তাঁদের আমলেই চালু হয়ে গিয়েছিল— সেকথাও বলেন। নিজেরা গরিব মানুষের জন্য কম টাকায় খাওয়ার ব্যবস্থা করতে কমিউনিটি ক্যান্টিনও চালান। কিন্তু সরকারি প্রকল্পগুলোকে বলেন দানখয়রাতি।

আমি যেমন করদাতা, আমার বাড়ির পরিচারিকাও করদাতা। তফাত হল আমি আয়কর দিই, তিনি দেন না। কারণ করের আওতায় আসার মত আয় তাঁর নেই। কিন্তু তিনি নিজের আয়ের টাকায় যা যা কেনেন সবেতেই কর দেন। আগের প্রত্যক্ষ করের যুগেও দিতেন, এখন পণ্য ও পরিষেবা করের (GST) যুগেও দেন। সুতরাং লক্ষ্মীর ভাণ্ডার থেকে যে টাকা পান বা দু টাকা কিলো চালে যে ভর্তুকি পান তাতে তাঁরও অবদান আছে, তিনি পরজীবী নন। ব্যতিক্রম বাদ দিলে এই কথাগুলো সিপিএমের সদস্য, সমর্থকরা নিজেরাই বোঝেন না বা বুঝতে অস্বীকার করেন। অন্যদের আর বোঝাবেন কী করে?

পশ্চিমবঙ্গে বাম দল বলতে অবশ্য শুধু সিপিএম বা বামফ্রন্টের দলগুলোকে বোঝায় না। কিন্তু বিকল্প বামেদের সংগঠন, অন্তত চাক্ষুষ প্রমাণে, আরও সীমিত। কিন্তু তাঁরাও যে রেউড়ি বিতর্কে খুব সোচ্চার এমন নয়। দশ বছর ধরে রাস্তায় নামার মত একাধিক ইস্যু থাকা সত্ত্বেও পথে না নামা সিপিএম অবশেষে পার্থ চ্যাটার্জি, অনুব্রত মণ্ডলের গ্রেফতারির পর বিরোধীসুলভ সক্রিয়তা দেখাচ্ছে। আর বিকল্প বামেরা সক্রিয়তা দেখাচ্ছেন ইডি-সিবিআই যেহেতু বিজেপি সরকারের হাতে, সেহেতু তৃণমূল নেতাদের বিপুল দুর্নীতি নিয়ে কেন পথে নামা উচিত নয় সেই তর্কে। উন্নয়ন মানে কী বা কী হওয়া উচিত— সে আলোচনাতেও মাঝেমধ্যে দেখা যায় ভারতীয় বামপন্থীদের। যে কারণে বেশিরভাগ বামপন্থী দলের কাছেই আজও পরিবেশ কোনও রাজনৈতিক ইস্যু নয়। নব্য-উদারবাদীদের মতই তাঁরা ভাবেন পরিবেশের সামান্য ক্ষতি করে যদি শিল্প হয়, কর্মসংস্থান হয় তাহলে তেমন ক্ষতি নেই। পৃথিবীর অন্য অনেক দেশের নানা গাঢ়ত্বের লালেরা কিন্তু এ পথে হাঁটছেন না। অর্থাৎ পথ সামনে রয়েছে, কিন্তু উত্তমকুমার অভিনীত অবিনাশের মতই আমাদের বামপন্থীরাও নিজেদের চোরাগলিতে দিশেহারা।

বামেরা কী করছেন, কী বলছেন, তা কেন গুরুত্বপূর্ণ? এই জন্যে, যে দুর্নীতিগ্রস্ত সরকার চিরকাল থাকবে না। কেন্দ্রীয় সরকারের গা জোয়ারিতেই হোক বা নাগরিকদের ভোটে, প্রাকৃতিক নিয়মেই এই সরকার একদিন চলে যাবে। তখন যে দলের সরকারই আসুক, সরকারি নীতি সম্পর্কে সাধারণ মানুষের মনে দক্ষিণপন্থী ভাবনার যে আসন তৈরি হয়েছে তা ভাঙতে না পারলে ভবিষ্যতেও মানবিক সরকার দেখতে পাব না আমরা। এই ভাঙার দাবি কাদের কাছে করা যায়? বিজেপির কাছে তো নয়। রামচন্দ্র গুহ নিজেকে বলেন “ল্যাপ্সড মার্ক্সিস্ট”। আমারও এক বয়োজ্যেষ্ঠ ল্যাপ্সড মার্ক্সিস্ট বন্ধু আছেন। তিনি সর্বদাই বলেন, বামপন্থীদের থেকে কিছু আশা করা উচিত নয়। কিন্তু বামেদের বাদ দিলে যদি পড়ে থাকে বিজেপি, তাহলে আর উপায় কী? আশা করা বেঁচে থাকার জন্য জরুরি একটা কাজ। সে কাজ তো ছাড়া যায় না।

চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম ওয়েবসাইটে প্রকাশিত

%d bloggers like this: