ক্ষমতার ঝুঁটি ধরে নেড়ে দেওয়া খবর

সুমন দে, ময়ূখ ঘোষ, মৌপিয়া নন্দীদের যদি দুঃখে কিছু একটা হয়ে যায় তার দায়িত্ব কি জ্ঞানেশবাবু নেবেন?

খুব বড় সাংবাদিকও জীবনে একটা বা দুটো এমন খবর করে উঠতে পারেন যা গোটা দেশকে নাড়িয়ে দেয় এবং সাংবাদিকের মৃত্যুর পরেও আলোচিত হবে। বলা বাহুল্য, গত বুধবার (২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬) তেমন একখানা খবর করে দিয়েছেন দি ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস কাগজের মুম্বই সংস্করণের আবাসিক সম্পাদক ঋতিকা চোপড়া। তাঁর খবরের প্রভাবে এবার গোটা দেশের বড় অংশের মানুষ সেকথা বিশ্বাস করছেন, যেকথা লোকসভার বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধী গতবছর থেকে বলে চলেছেন— ভোট চুরি হচ্ছে, জনাদেশ ভোটে প্রতিফলিত হতে দেওয়া হচ্ছে না এবং এ কাজ করছে খোদ নির্বাচন কমিশন। এত দিন বিজেপি তো বটেই, অন্য বিরোধী দলগুলোও তাঁকে আমল দেয়নি। উদ্ধব ঠাকরের শিবসেনা আমল দিতে শুরু করে মহারাষ্ট্র বিধানসভা নির্বাচনে তাদের অপ্রত্যাশিত খারাপ ফলের পর থেকে। বিহারের অপ্রত্যাশিত ফলের পরে রাষ্ট্রীয় জনতা দলের তেজস্বী যাদব আর লিবারেশনের সাধারণ সম্পাদক দীপঙ্কর ভট্টাচার্য নির্বাচন প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তুলেও কেন কে জানে চুপ করে গিয়েছিলেন! মমতা ব্যানার্জি ও তাঁর দল পশ্চিমবঙ্গের ক্ষমতা হারানোর আগে পর্যন্ত প্রায় বিজেপির সুরেই রাহুলকে তাচ্ছিল্য করত, হারার পর মমতা টের পেলেন যে যথেচ্ছ কারচুপি হয়। তখন এই ফল মানেন না বলে হুঙ্কার দিয়েও চুপ করে গিয়েছিলেন। ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের খবরের পর এঁরা সবাই ফের সোচ্চার। বিজেপির জোটসঙ্গী চিরাগ পাসোয়ানও মুখ খুলেছেন, চন্দ্রবাবু নাইডুর পার্টি, নীতীশ কুমারের দল, এমনকী কর্ণাটকের জেডিএস-ও জবাবদিহি চাইছে। বিজেপি মুখপাত্ররা চ্যানেলে চ্যানেলে নির্বাচন কমিশনের হয়ে জবাবদিহি করতে গিয়ে (কেন এটা তাঁদের দায়িত্ব তা তাঁরাই জানেন) খাবি খাচ্ছেন। রজত শর্মার মত সরকারি পুরস্কারপ্রাপ্ত গোদি সাংবাদিকও জ্ঞানেশ কুমারকে গাল দিচ্ছেন, মন দিচ্ছেন নরেন্দ্র মোদী-অমিত শাহের দিকে যাতে আঙুল না ওঠে তা নিশ্চিত করায়। মূলত কংগ্রেস এবং বামপন্থী দলগুলোর কর্মীরা একেবারে পথে নেমে পড়েছেন, সঙ্গে যোগেন্দ্র যাদবের মত দলহীন মানুষও। শুক্রবার (২৫ সেপ্টেম্বর) দীপঙ্কর, নেহা বোরা, যোগেন্দ্রদের দিল্লি পুলিশ আটকও করেছিল। পাটনায় আন্দোলনকারীদের উপর জলকামান চালিয়েছে। তারপরেও শনিবার দিল্লিতে বিরাট জমায়েত হয়েছে এবং বোধহয় এই প্রথমবার, রাস্তা থেকে আওয়াজ উঠেছে— ইভিএম বাতিল করো, গণতন্ত্র বাঁচাও। হঠাৎ জনপ্রিয় ককরোচ জনতা পার্টির নেতারা যতই জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগকে এক নম্বর দাবি বলুন, অভিজিৎ দিপকে যতই বিরোধীদের ভোট বয়কট করার পরামর্শ দিন, পথে ঘাটে কিন্তু সরাসরি মোদী সরকারের বিরুদ্ধে ক্ষোভের উদ্গীরণ হচ্ছে। সেই ২০১৪ সাল থেকে যাবতীয় সংকটে বুক (মাপটা জানি না) চিতিয়ে নেতৃত্ব দেন যিনি, সেই অমিত শাহ এদিকে স্পিকটি নট, ৫৬ ইঞ্চি ছাতির মোদী কীর্তনে ব্যস্ত।

ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস মূলধারার সংবাদমাধ্যম। তারা এমন একটা খবর করেছে বলেই যে দেশের মূলধারার সংবাদমাধ্যমের প্রবণতা রাতারাতি বদলে গেছে তা কিন্তু নয়। পরিস্থিতি সামলাতে গিয়ে গোদি মিডিয়া এমন ল্যাজে গোবরে, যে “সূত্র বলেছে কমিশনের যাবতীয় সিদ্ধান্ত সর্বসম্মতিক্রমে নেওয়া হয়েছিল”, “সূত্র বলেছে ফর্ম নং ৬ সংক্রান্ত ব্যাপারস্যাপার নির্বাচন কমিশনাররা সকলেই জানতেন”— এই জাতীয় হাস্যকর কথাবার্তা বলে যাচ্ছে। সাংবাদিকতায় নামোল্লেখ না করে সূত্র বলেছে বলা হয় সেসব ক্ষেত্রে, যেখানে সূত্রের দেওয়া তথ্য সূত্রের পক্ষে বিপজ্জনক হতে পারে। অর্থাৎ সূত্র চাইছে না তার নাম প্রকাশিত হোক। কিন্তু এইসব তথ্য যদি নির্বাচন কমিশনাররা বুক ফুলিয়ে না বলতে পারেন, তাহলেই বুঝতে হবে কথাগুলো মিথ্যে। এটুকু বোঝার বুদ্ধি শতকরা একশো জন পাঠক/দর্শকেরই আছে, রাজনৈতিক পছন্দের উপর নির্ভর করে কথাটা কে প্রকাশ্যে স্বীকার করবে আর কে করবে না। ফলে এমন খবর করে একটা সংবাদমাধ্যম নিজেকে ক্ষমতার ভৃত্য প্রতিপন্ন ছাড়া কিছুই করে উঠতে পারে না। এদের আরও হাস্যকর করে দিয়েছে নির্বাচন কমিশন নিজে। বুধবার তড়িঘড়ি প্রকাশ করা প্রেস নোটে এক্সপ্রেসের খবরে প্রকাশিত সব তথ্যই স্বীকার করে নিয়ে বলা হল— তবে সব সিদ্ধান্ত সর্বসম্মত। অর্থাৎ গোদি মিডিয়া আগ বাড়িয়ে যা বলেছিল, কমিশন স্বনামেই সেকথা বলল। গোদি মিডিয়া কুলতিলক অর্ণব গোস্বামী দেখলাম, অভ্যাসবশত রাহুল গান্ধীকে পাপ্পু প্রমাণ করতে গিয়ে রাষ্ট্রীয় জনতা দলের মুখপাত্র কাঞ্চনা যাদবের কাছে এত হ্যাটা হলেন যে মুখ চোখ শুকিয়ে গেল। ইন্ডিয়া টুডে টিভিতে বুধবার রাতেই রাজদীপ সরদেশাইয়ের শো-তে দেখলাম রাজনৈতিক বিশ্লেষক নামধারী যে বিজেপি এজেন্টরা থাকেন, তাঁদের একজন, রজত শেঠি, ঢোঁক গিলে নির্বাচন কমিশনের সবকিছু পরিষ্কার করে বলা উচিত বলছেন।

শনিবারের বারবেলায় তিন নির্বাচন কমিশনার সভা করে যে প্রেস বিজ্ঞপ্তি জারি করেছেন তাতে গোদি মিডিয়া শুধু নয়, রজতের মত বিজেপির এই অঘোষিত মুখপাত্রদের কী হবে ভেবে চিন্তা হচ্ছে। কারণ এই প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে ঋতিকার প্রতিবেদনে যা যা অভিযোগ তোলা হয়েছে সবই মেনে নিয়ে এসআইআর প্রক্রিয়ায় একগুচ্ছ বদল আনার কথা বলা হয়েছে। কী কী বদল তা জানার জন্যে নিশ্চয়ই আপনি এই কলাম পড়েন না, তাই সেগুলো আর উল্লেখ করছি না। কিন্তু মোদ্দাকথা হল, এই বদলগুলো যদি সত্যি সত্যি করা হয় তাহলে এতগুলো রাজ্যে যে বিশেষ নিবিড় সংশোধনী (এসআইআর) হয়ে গেল তার আর কোনো মানেই থাকবে না। যে ভোটাররা বাদ পড়ে গেছেন তালিকা থেকে, তাঁরা সকলেই ফেরত আসবেন। তাহলে এই প্রক্রিয়া কত জরুরি তা নিয়ে এত মাস ধরে যে বক্তৃতাগুলো শত শত রজতরা দিয়ে গেলেন, সেগুলোর কী হবে?

আমাদের ঘরের ছেলেমেয়েদের কথা ভাবলে আরও চিন্তা হচ্ছে। কলকাতার গরমে বারো মাস স্যুট বুট পরে থাকা অ্যাংকররা এত যে ভুয়ো ভোটারের খোঁজ পেলেন, তাঁদের প্রতিবেদকরা বাংলাদেশে পালিয়ে যাওয়া বাড়ির কাজের লোকেদের তালাবন্ধ দরজা দেখালেন— সেইসব লোক যদি ভোটার তালিকায় ফেরত চলে আসেন, কী হবে তখন? সুমন দে, ময়ূখ ঘোষ, মৌপিয়া নন্দীদের যদি দুঃখে কিছু একটা হয়ে যায় তার দায়িত্ব কি জ্ঞানেশবাবু নেবেন? শনিবারের প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে জরুরি ভিত্তিতে বাদ যাওয়া ভোটারদের ফেরানোর প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। তার মানে ঘুরিয়ে মেনে নেওয়া হল যে কয়েক কোটি ভোটারকে অকারণে বাদ দেওয়া হয়েছে। সেক্ষেত্রে বিহার, বাংলা, তামিলনাড়ুর মত রাজ্যে হয়ে যাওয়া নির্বাচনগুলোর কী বৈধতা রইল? ফলগুলোরই বা কী বিশ্বাসযোগ্যতা রইল? এই প্রশ্নটা মনে জাগলেই চোখের সামনে ভেসে উঠছে বিশ্বনাথ চক্রবর্তীর মত রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মুখ। ৪ জুনের পর হাত-পা নেড়ে তাঁরা বাংলার ফলাফলের যেসব ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন, সেগুলোর যে নয়া পয়সা দাম রইল না, সেকথা না বোঝার মত বোকা এঁরা নন। আশা করি এঁদের বাড়িতে আয়না নেই।

গত কয়েকদিনের ঘটনায় অনেকে ভারতের গোল্লায় যাওয়া সাংবাদিকতার পুনরুত্থানের আশা দেখছেন, আমি দেখছি না। এত বছরের প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষতির প্রতিকার মাত্র একটা খবর দিয়ে হয় না। ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসও গত কয়েক বছরে বেশ কিছু ক্ষেত্রে মোদী সরকারের তাঁবেদারি করেছে। এক্ষেত্রেও, যা সংবাদমাধ্যমের কাজ, ঠিক সেটুকুই করা হয়েছে। পরিস্থিতির বিচারে তা একটু বেশি প্রশংসার যোগ্য, কিন্তু প্রাক-২০১৪ ভারতে এর জন্যে প্রতিবেদককে ‘হিরো’ বানানো হত না। তাঁর কাগজকেও সাংবাদিকতার আলোকবর্তিকা বলে তুলে ধরত না কেউ। উপরন্তু, এদেশের সৎ সাংবাদিকতার ধ্বজা বহুদিন হল ছোট সংবাদমাধ্যম, স্বাধীন সাংবাদিকরা তুলে নিয়েছেন। তা করতে গিয়ে জেল খেটেছেন, প্রাণও দিয়েছেন। আজ এক্সপ্রেসের খবরটাকে ‘টার্নিং পয়েন্ট’ বলে নাচানাচি করলে ওই সাংবাদিকদের লড়াইকে অস্বীকার করা হয়। মনে রাখা ভাল, ঋতিকার প্রতিবেদন প্রকাশের দিনই পাঠক-পৃষ্ঠপোষকদের টাকায় চলা মিডিয়া রিপোর্টার্স কালেকটিভ একখানা প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে, যা ভারতের গণতন্ত্রের উপরে কত বড় সার্জিকাল স্ট্রাইক এই এসআইআর, তা বোঝার জন্যে দারুণ গুরুত্বপূর্ণ। খবরটা হল, দিল্লির এসআইআরে নির্বাচন কমিশন ভিআইপি-দের নাম যাতে বাদ না যায় তার জন্যে আলাদা ব্যবস্থা রেখেছে। অর্থাৎ সংবিধানে দেশের সব নাগরিককে যে আইনের চোখে সমান বলা হয়েছে, সরাসরি সেই নীতিরই বিরোধী এই ব্যবস্থা। ভারতীয় গণতন্ত্রের সবচেয়ে বড় গুণ হল— আপনার বাড়ির কাজের মাসির ভোট, আপনার ভোট আর মুকেশ আম্বানির ভোটের দাম সমান। প্রথম নির্বাচন কমিশনার সুকুমার সেনের আমল থেকে আজ পর্যন্ত, অন্তত ভোটার তালিকা তৈরি করার ক্ষেত্রে এর অন্যথা হয়নি। রিপোর্টার্স কালেকটিভের প্রতিবেদন জানাচ্ছে যে, জ্ঞানেশবাবু সেই ব্যবস্থাটারই মূলে কুঠারাঘাত করেছেন। অতএব উদ্বাহু হয়ে ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসকে বা ঋতিকাকে ভারতীয় সাংবাদিকতার উদ্ধারকর্তা অভিধা দেওয়ার কারণ দেখছি না।

আরও পড়ুন নির্বাচনে এবারও খেলা হবে, তবে রান্নাবাটি

আরও একটা কথা না বললেই নয়। দীর্ঘদিন বিভিন্ন কাগজের নিউজরুমের সদস্য ছিলাম বলেই সেদিন প্রতিবেদনটা পড়ে সংশ্লিষ্ট সাংবাদিক সম্পর্কে খোঁজখবর নিতে গিয়ে একটু অবাক হয়েছিলাম। কারণ ইনি মুম্বইয়ে কর্মরত, আর নির্বাচন কমিশন দেশের রাজধানী দিল্লিতে। এমন একখানা খবর মুম্বইতে বসে কোনো সাংবাদিক করে ফেললে প্রতিদ্বন্দ্বীরা তো বটেই, তাঁর নিজের কাগজের দিল্লি ব্যুরোর সহকর্মীদেরও খুশি হওয়ার কথা নয়। বরং দস্তুর হল, দিল্লির প্রতিবেদকদের বস মৃদু ধমক দেবেন “ওখান থেকে স্টোরিটা করল, তোমরা পারলে না?” উপরন্তু এত বড় খবর সাধারণত কোনো একজন সাংবাদিকের কৃতিত্বে কাগজ করতে পারে না। কারণ এর অনেকগুলো দিক আছে, নানা জায়গা থেকে অনেককিছু নিশ্চিত করতে হয়, বেশকিছু কাগজপত্র একেবারে হাতে না এলে এরকম খবর ছেপে দেওয়ার ঝুঁকি নেওয়া যায় না। এত কিছু করতে একাধিক সাংবাদিককে কাজ করতে হয়। তদন্তমূলক সাংবাদিকতা মানেই ‘সবে মিলি করি কাজ’। সেখানে একজনই এত বড় কাজ করে ফেললেন! ভাবতে ভাবতেই সাংবাদিক বন্ধুদের সূত্রে একটা নাম জানতে পারলাম— দামিনী নাথ। ইনি ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের সিনিয়র সাংবাদিক, জাতীয় ব্যুরোর দায়িত্বপূর্ণ পদে আছেন। শুনলাম, তিনিই প্রথম বেশ কিছুদিন আগে এক প্রতিবেদনে লেখেন যে তিন নির্বাচন কমিশনারের মধ্যে মতপার্থক্য দেখা দিয়েছে। তাঁদের মধ্যে দুজন ক্যাবিনেট সেক্রেটারিকে চিঠি লিখেছেন, যা হওয়ার কথা নয়। কারণ নির্বাচন কমিশন স্বশাসিত সংস্থা, কেন্দ্রীয় সরকারের অধীন নয়। সেই প্রতিবেদনের সূত্র ধরেই কেঁচো খুঁড়তে কেউটে বেরিয়ে পড়ার মত নাকি এই খবরটা বেরিয়ে পড়ে। সুতরাং যিনি কেঁচো খুঁড়েছেন, তাঁরও কৃতিত্ব পাওয়া উচিত ছিল। কিন্তু কাগজে কেবল ঋতিকার নাম বেরনোয় তাঁর ছবি তাঁর নাম সোশাল মিডিয়ার পাতায় পাতায়। আমার অভিজ্ঞতা অনুযায়ী, ব্যাপারটা বড় জোর অর্ধেক বিশ্বাস করেছিলাম। কারণ আর সব পেশার মত সাংবাদিকতাতেও রেষারেষি, লবিবাজি ইত্যাদি থাকে। ফলে যারা ঋতিকাকে দেখতে পারে না এবং দামিনীকে পছন্দ করে, তারাও এসব রটাতে পারে। এমনটা নিউজরুমের ভিতরে বারবার ঘটতে দেখেছি। কিন্তু শনিবার দুপুরে দেখলাম ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের সোশাল মিডিয়া হ্যান্ডেল থেকে দামিনীর সঙ্গে দীর্ঘ কথোপকথনের ভিডিও প্রকাশ করা হয়েছে, যেখানে তিনি সাত বছর ধরে নির্বাচন কমিশন কভার করার অভিজ্ঞতা থেকে ঋতিকার প্রতিবেদনের নাড়িনক্ষত্রের সন্ধান দিচ্ছেন।

সংবাদমাধ্যম এরকমই। অতএব সাংবাদিকদের মধ্যে নায়ক খোঁজার চেষ্টা না করাই ভালো। বরং রবি নায়ারের নামটা জেনে রাখুন। ইনি গুজরাটের সাংবাদিক। গৌতম আদানির ব্যবসায়িক কার্যকলাপ নিয়ে প্রতিবেদন লিখেছিলেন বলে আদানি এন্টারপ্রাইজেস তাঁর বিরুদ্ধে মানহানির ফৌজদারি মামলা ঠোকে ২০২১ সালে। সেই মামলায় তাঁকে গত ১৭ সেপ্টেম্বর গ্রেফতার করা হয় এক জামিন অযোগ্য গ্রেফতারি পরোয়ানায়। গুজরাট হাইকোর্টে, তারপর সুপ্রিম কোর্টে, আবেদন করেও জামিন পাওয়া যাচ্ছিল না। শেষমেশ বৃহস্পতিবার (২৪ সেপ্টেম্বর) জামিন পেয়েছেন। ধর্ষণের সাজাপ্রাপ্ত গুরমীত রাম রহিম কতবার বাইরে আসেন খেয়াল করেছেন তো?

শেষ পাতে

মনে পড়ল, আমার অন্যতম প্রিয় কলামনিস্ট খুশবন্ত সিং হিন্দুস্তান টাইমস কাগজে তাঁর কলাম শেষ করতেন একখানা চুটকি দিয়ে। গম্ভীর বিষয় নিয়ে একগাদা কথা লেখার পরে এভাবে শেষ করা খুবই যুক্তিযুক্ত বলে আমার মনে হয়। তাই এবার থেকে এই কলামও মজার কোনো ঘটনা দিয়ে শেষ করব। আজ বলি ‘সূত্র’ নিয়ে একটা মজার ব্যাপার।

এক সাংবাদিক একটা আন্তর্জাতিক ক্রিকেট ম্যাচের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে প্রতিবেদন লিখেছিলেন। অত্যন্ত পরিশ্রমী প্রতিবেদন— পুলিশ কমিশনার থেকে শুরু করে কনস্টেবল পর্যন্ত সকলের উদ্ধৃতি ছিল। এমনকী শেষে ছিল “পুলিশ কুকুরটির ঘনিষ্ঠ এক সূত্র জানিয়েছে…”

a2onuswor.com ওয়েবসাইটে প্রকাশিত

গণতন্ত্রের কঙ্কাল দেখিয়ে দিলেন জিতু মুন্ডা

যে ‘গণতন্ত্রের উৎসব’ সম্পর্কে আমাদের প্রত্যাশা নামতে এইখানে এসে ঠেকেছে— এ থেকেই প্রমাণ হয় যে ভারতীয় গণতন্ত্রের চামড়া, মাংস, মজ্জা সব খুবলে খাওয়া হয়ে গেছে। পড়ে আছে কঙ্কাল।

নির্বাচনের ভরা মরশুমে একথা বললে নিশ্চয়ই মহাপাপ হবে যে গণতন্ত্র মানে কেবল ভোট দেওয়া, ভোট নেওয়া আর সরকার গঠন নয়। কিন্তু আমরা অনেকেই অনেক পাপ জানতে বা অজান্তে রোজ করে চলেছি। সুতরাং এ পাপও করেই ফেলা যাক। পশ্চিমবঙ্গে এবারে যেভাবে ভোট হচ্ছে, তার সঙ্গে নাজি জার্মানির নির্বাচনের মিল খুঁজতে খুব বেশি কষ্ট করতে হবে না, অমিল বোধহয় একটাই— এখনো কোনো বুথে ভোটারের পাশে দাঁড়িয়ে সশস্ত্র বাহিনীর লোককে কাকে ভোট দেওয়া হচ্ছে নজর রেখেছে বলে খবর নেই। আশা করা যাক, দ্বিতীয় দফার শেষেও অন্তত এইটুকু সান্ত্বনা থাকবে যে তেমনটা হয়নি। এই যে ‘গণতন্ত্রের উৎসব’ সম্পর্কে আমাদের প্রত্যাশা নামতে এইখানে এসে ঠেকেছে— এ থেকেই প্রমাণ হয় যে ভারতীয় গণতন্ত্রের চামড়া, মাংস, মজ্জা সব খুবলে খাওয়া হয়ে গেছে। পড়ে আছে কঙ্কাল।

ব্যাপারটা একেবারে সাদা চোখে দেখতে পাওয়ার ব্যবস্থা করে দেওয়ার জন্যে ধন্যবাদ প্রাপ্য আমাদের প্রতিবেশী রাজ্য ওড়িশার কেওনঝার জেলার বাসিন্দা জিতু মুন্ডার। ‘আমরা পৃথিবীর বৃহত্তম গণতন্ত্র, আমরা পৃথিবীর চতুর্থ বৃহত্তম অর্থনীতি’ বলে গোরিলা গোষ্ঠীর দলনেতার মত বুক বাজানো আমাদের অভ্যাসে দাঁড়িয়ে গেছে। কিন্তু জিতুকে মাত্র হাজার বিশেক টাকা ব্যাংক থেকে তোলার জন্যে যা করতে হয়েছে, তাতে প্রমাণ হয় যে পৃথিবীর যে কোনো গোরিলা সমাজ আজকের ভারতের চেয়ে সভ্য। গোরিলা সমাজে প্রয়াত বোনের কষ্টার্জিত ফলমূল অধিকার করতে বোনের কঙ্কাল মাটি খুঁড়ে তুলে এনে অপেক্ষাকৃত বেশি ক্ষমতাশালী গোরিলার সামনে যে রাখতে হত না— একথা ডায়ান ফসির মত কোনো বিশেষজ্ঞকে জিজ্ঞেস না করেই হলফ করে বলা যায়। জিতুর বোন গবাদি পশু বিক্রি করে ওই কটা টাকা পেয়েছিলেন, তারপর তাঁর মৃত্যু হয়। হতদরিদ্র জিতুকে বারবার ব্যাংকে গিয়ে শুনতে হয়েছে— মৃত্যুর প্রমাণ চাই, অর্থাৎ কাগজ চাই। জিতুর পক্ষে ‘কাগজ দেখাব না’ বলার বিলাসিতা করা সম্ভব নয়, এদিকে তাঁর কাগজও অমিল। জিতুর মত আদিবাসী, প্রান্তিক মানুষের কাছে অনেক কাগজই থাকে না। আগামীদিনে ওড়িশায় এসআইআর হলে হয়ত জিতুকে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার বাইরে ছুড়ে ফেলা হবে, যেভাবে পশ্চিমবঙ্গের ৬৬ লাখ মানুষকে ফেলা হয়েছে (অধিকাংশের কাগজ থাকা সত্ত্বেও)। এমনই রক্তমাংসহীন হিংস্র একটা ব্যবস্থা আমাদের দেশে গণতন্ত্রের নামে চলছে।

অনেকেই বলবেন, ব্যাংকের সঙ্গে গণতন্ত্রের সম্পর্ক কী? কারণ শুরুতেই বললাম, গণতন্ত্র মানে কেবল ভোট— একথা বিশ্বাস করা আমাদের বদভ্যাসে দাঁড়িয়ে গেছে। নিজের টাকা বা প্রয়াত নিকটাত্মীয়ের ব্যাংকে গচ্ছিত টাকা তোলা যে একজন মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার— তা আমাদের মনেই হয় না। যে কোনোদিন যে কোনো ব্যাংকে গেলেই কোনো না কোনো মানুষকে দেখা যায় মৃত আত্মীয়ের টাকাপয়সার ব্যাপারে এসেছেন। ব্যাংক থেকে কিছু কাগজপত্রের তালিকা দিয়ে দেওয়া হয় ভাবলেশহীন মুখে। তার মধ্যে অবশ্যই থাকে KYC, যা জীবিত অবস্থায় ওই গ্রাহক নির্ঘাত ৯৯ বার জমা দিয়েছেন। ডিজিটাল ইন্ডিয়াতেও কেন ব্যাংকের একজন গ্রাহককে বারবার KYC জমা দিতে হবে— এ প্রশ্ন করা হলে নিম্নতম ব্যাংককর্মী থেকে জেনারেল ম্যানেজার পর্যন্ত সকলেই হাত উলটে উত্তর দেন— নিয়ম। এমন নির্বোধ নিয়ম আছে কেন, বাতিল হচ্ছে না কেন— এসব প্রশ্ন আমরা করি না। নিয়ম যে দৈবনির্দেশিত নয়, মানুষের তৈরি, তাতে গোলমাল থাকতে পারে এবং তা পরিবর্তনযোগ্য— সেকথা আমরা ভুলে গেছি। যেমন আমরা মাঝেমধ্যে কাগজে পড়ি বা হাতের মোবাইলে দেখতে পাই, অমুক জায়গায় তমুক লোক আধার কার্ডের বায়োমেট্রিক্স মেলেনি বলে সরকারি প্রকল্পের টাকা পাচ্ছেন না। তারপর আমরা স্ক্রোল করে অন্যকিছুতে চলে যাই। ২০১৮ সালে আমাদের আরেক প্রতিবেশী রাজ্য ঝাড়খণ্ডের পাকুড় জেলার লুখি মুর্মু অনাহারে মারা গিয়েছিলেন ২৩ জানুয়ারি, কারণ অক্টোবর মাস থেকে বায়োমেট্রিক্স মিলছিল না বলে রেশন তুলতে পারেননি। ওই রেশন ছিল তাঁর বেঁচে থাকার চাবিকাঠি। এসব দেখে আমরা আধার কার্ড সম্পর্কে কোনো প্রশ্ন তুলি না। অথচ সুপ্রিম কোর্ট ২০১৬ সালেই রায় দিয়েছে যে সরকারি প্রকল্পে আধার কার্ড ব্যবহার করা যেতে পারে, কিন্তু বাধ্যতামূলক করা যাবে না।

এগুলো আমাদের গণতান্ত্রিক আলোচনার বিষয় নয়। কারণ আমাদের বায়োমেট্রিক্স মেলা না মেলা নিয়ে ভাবতে হয় কেবল মোবাইলের নতুন সিম কার্ড দরকার হলে। দোকানের মালিক বা কর্মচারীদের নিজেদের দায় সিম বিক্রি করা, তাই তারা বেজায় ভদ্রতা করে। আধার না মিললে ‘ভোটার কার্ড আর প্যান কার্ড দিয়ে হয়ে যাবে স্যার’। জিতুর বা লুখির কাছে হয়ত জরুরি কাগজ নেই, বিকল্প কাগজও নেই। কিন্তু তাঁদের জন্যে কেউ অন্য রাস্তার খোঁজ করবে না। কারণ তাঁদের ক্রয়ক্ষমতা নেই, তাই কানাকড়ি দাম নেই। না দোকানে, না ব্যাংকে, না নির্বাচন কমিশনের কাছে। কারণ আমাদের ব্যবস্থায় মানুষের দাম (পড়ুন বৈধতা, শুনতে গণতান্ত্রিক হবে) মানুষ দিয়ে নয়, কাগজ দিয়ে। কোন কাগজ? সেটা আবার ব্যাংক বা রাষ্ট্র ইচ্ছামত বদলে ফেলতে পারে রোজ। পশ্চিমবঙ্গের এসআইআরে ঠিক তাই হয়েছে, এখনো হয়ে চলেছে। ভোটার তালিকায় উঠে যাওয়া নামও এখন ট্রাইব্যুনালের আদেশে বাদ হয়ে যাচ্ছে।

এদিকে এসআইআরে বাদ যাওয়া বিচারাধীন ভোটারদের মধ্যে যাঁদের বিচার হয়েছে, তাঁদের প্রায় ৯৯% বৈধ ভোটার বলে গণ্য হয়েছেন। মানে তাঁদের অবৈধ ঘোষণা করার কোনো কারণই ছিল না। অর্থাৎ গণতন্ত্রের লাগাম আর জনগণের হাতে নেই। এখনো কেউ কেউ ভোট দিতে পারছেন, এই যা। মানে ওই কঙ্কালটাই এখনো অবশিষ্ট আছে। তারও উপকারিতা আছে, দেখালে একটু-আধটু অধিকার পাওয়া যায়। জিতু যেমন ব্যাংকের দরজার সামনে বোনের কঙ্কালটাকে শুইয়ে দেওয়ায় হঠাৎ ব্যাংক সদয় হয়ে গেছে, তাদের KYC-র প্রয়োজনও রাতারাতি মিটে গেছে। জিতুর হাতে বোনের গচ্ছিত টাকা তো তুলে দেওয়া হয়েছেই, সঙ্গে সাহায্য বাবদ আরও টাকা দেওয়া হয়েছে। আহা! দয়ার শরীর বাবুদের!

আরও পড়ুন ভোটচুরির অভিযোগ আমাদের এনে ফেলেছে এক সন্ধিক্ষণে

আমরা অনেকে অবশ্য এটুকু গণতন্ত্রেই খুশি। আমাদের আধ কোটি সহনাগরিক বিনা দোষে ভোট দিতে পারলেন না, তাতে কী হয়েছে? রিগিং হলেও তো কত লোক ভোট দিতে পারে না। আমি ভোট দিতে পারছি মানেই গণতন্ত্র সজীব। আমাদের ফ্ল্যাটের বাইরে পর্যন্ত পা রাখতে হচ্ছে না, হাউজিংয়েই বুথ হয়েছে। এমন গণতন্ত্র কোথাও খুঁজে পাবে নাকো তুমি। রাজ্যটা কাশ্মীর এবং সব নিয়মকানুনের বাইরে চলে যাওয়া মণিপুরের চেয়েও বেশি সশস্ত্র বাহিনীতে ভরে গেল দেখে আমরা আরও নিশ্চিত হচ্ছি যে দেশে গণতন্ত্র বেঁচে আছে। ফরসা টুকটুকে, সুবেশী, হিন্দিভাষী পুলিশ অফিসার আঙুল উঁচিয়ে গ্রামে ঢুকে লোককে শাসাচ্ছেন দেখে আমাদের দারুণ লাগছে। কারণ আমরা হিন্দি সিনেমায় নায়ককে ওরকমভাবে খলনায়ক ও তার দলবলকে শাসাতে দেখেছি। মিডিয়া আবার বলছে, লোকটা ‘এনকাউন্টার স্পেশালিস্ট’। সোনায় সোহাগা। যে অফিসাররা এনকাউন্টার করে তাদের মত বাহাদুর যে আর হয় না, সে তো আমরা সেই অব তক ছপ্পন থেকেই জানি। মিডিয়া লোকটার নাম দিয়েছে সিঙ্ঘম। ওই ছবিটা আরও সাম্প্রতিক, ফলে আমাদের আরও ভালো মনে আছে। অতএব আমরা আহ্লাদে আটখানা। যে লোক আইন আদালতের তোয়াক্কা না করে সোজা ঠুকে দেয়, তার হাতেই যে আমাদের গণতন্ত্র সবচেয়ে নিরাপদ— এতে আর সন্দেহ কী? বিশেষত যার পরিবার পরিজনকে শাসাচ্ছে, সে নিজেই যখন অনেকের মতে অপরাধী। উত্তরপ্রদেশের মত, জাহাঙ্গীরের বাড়ির উপরেই বুলডোজার চালিয়ে দিলে আমরা আরও নিশ্চিত হতে পারতাম যে আমাদের গণতন্ত্রের এই রক্ষীটি জবরদস্ত। ডান, বাম নির্বিশেষে আমাদের এই যে ভাবনা— এটাই প্রমাণ করে যে গণতন্ত্রের কঙ্কালকে জ্যান্ত জিনিস বলে ভুল করছি। জিতু একেবারে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিলেন।

কঙ্কালপুজোর শুভেচ্ছা।

নাগরিক ডট নেট ওয়েবসাইটে প্রকাশিত

এসআইআর মওকায় অনুপ্রবেশ নিয়ে কিছু কথা

যার ওই তথাকথিত যোগ্যতা নেই, টাকা বা পরিচিতিও নেই, তারও কিন্তু উন্নততর জীবনের অভিলাষ আছে। সেই জীবনকে ধাওয়া করার মানবিক অধিকারও আছে। কথাটা যেমন ভারত থেকে যে আমেরিকায় যেতে চায় তার বেলায় সত্যি, তেমন যে বাংলাদেশ থেকে ভারতে আসতে চায়, তার বেলাতেও সত্যি। এই লোকগুলো তাহলে কী করে? বেআইনি পথে বাংলাদেশ থেকে ভারতে ঢোকে, বা ভারত থেকে আমেরিকায় যায়। রাষ্ট্রের ভাষায় বললে— অনুপ্রবেশ করে।

সম্প্রতি নাগরিক ডট নেটের পডকাস্টে এসে সিপিএম নেতা সৃজন ভট্টাচার্য বলেছেন ‘অনুপ্রবেশ শুধু ধর্মীয় কারণে ঘটে না।’ সবিস্তারে বলেছেন— সারা পৃথিবীতেই মানুষ নিজের দেশ থেকে উন্নততর অর্থনীতির দেশে যাওয়ার চেষ্টা করে, ফলে এটা সারা পৃথিবীর সমস্যা। এই কথাগুলো রিল হিসাবে ছড়িয়ে পড়তেই এক শ্রেণির মানুষ রেগে কাঁই হয়েছেন। সেই মওকায় আরও চাট্টি কথা বলে নেওয়ার ধান্দায় এই লেখার অবতারণা।

সৃজন যা বলেছেন তাকে তথ্য হিসাবে অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই। ওই ভিডিওর নিচে ছাপার অযোগ্য ভাষায় যাঁরা মন্তব্য করে যাচ্ছেন, তাঁরা নিজেরাই অনেকে অন্য দেশে বসে আছেন বিভিন্ন পেশার সঙ্গে যুক্ত হয়ে। অমৃতকালের ভারত বা তার আগের ভারত পেশাগতভাবে বা জীবনযাত্রার অন্য মাপকাঠিতে তাঁদের খুব পছন্দের জায়গা হলে নিশ্চয়ই বিদেশে গিয়ে বসবাস করতেন না। সোশাল মিডিয়ায় বামপন্থী বা উদারপন্থী চিন্তাভাবনাকে আক্রমণ করা যাঁদের দৈনন্দিন কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছে গত এক যুগে (পারিশ্রমিকে বা বিনা পারিশ্রমিকে), তাঁদের বড় অংশ তথ্যপ্রযুক্তি ক্ষেত্রের ইঞ্জিনিয়ার এবং ওই পেশার বহু মানুষের গত দুই-আড়াই দশক ধরেই জীবনের লক্ষ্য— কোম্পানির কাজে প্রথম বিশ্বের দেশগুলোতে যাওয়া, তারপর সেই কাজটাকেই স্থায়ী করে নিয়ে, অথবা অন্য কোনো কোম্পানির চাকরি নিয়ে, সেদেশেই থিতু হওয়া। অনেকে তো এক দেশ থেকে আরেক দেশে ভেসেও বেড়ান। দেশে ফেরার কোনো আশু পরিকল্পনা নেই, সুদূর ভবিষ্যতেও নেই। অথচ মানুষ উন্নত অর্থনীতির দেশে চলে যেতে চায় শুনলেই এঁরা তেলে বেগুনে জ্বলে ওঠেন। অবশ্য ওঁরা বলবেন ‘সেটা অভিবাসন, অনুপ্রবেশ নয়।’ সে প্রসঙ্গে আসব, ফাঁকি দেব না।

বলতে দ্বিধা নেই, বছর দশ-পনেরো আগেও, যারা পড়াশোনা করতে বা স্বল্পমেয়াদি কাজের সূত্রে আমাদের দেশ থেকে বিদেশে গিয়ে সেখানকার স্থায়ী বাসিন্দা হয়ে যায়, তাদের খুব ভালো চোখে দেখতাম না। প্রথম বিশ্বের দেশগুলোকে ২০০ বছর ধরে অন্য কোনো দেশ শোষণ করেনি, বরং ভারতের মত দেশগুলোকে শুষেই ওরা ধনী হয়েছে। সুতরাং এদেশের চেয়ে ওসব দেশের জীবনযাত্রা, কাজের সুযোগ ইত্যাদি উন্নত হওয়ারই কথা। সেসবের জন্যে এদেশের গরিব, মধ্যবিত্ত মানুষের ভর্তুকির টাকায় লেখাপড়া শেখা (সরকারি ভর্তুকির জন্যেই এদেশে লেখাপড়ার খরচ কম ছিল বছর পনেরো আগে পর্যন্তও। সরকারের টাকা মানে সাধারণ মানুষের করের টাকা, আর কর মানে কেবল আয়কর নয়) যেসব ছেলেমেয়ে বিদেশেই থেকে যেত, তাদের সম্বন্ধে ‘পলাতক’ শব্দটাই আমি ব্যবহার করতাম। এখন আর করি না, কারণ একাধিক কারণে আমার মত বদলেছে।

প্রথমত, স্বাধীনতার ৮০ বছর হতে চলল, এখনো আমরা দেশটাকে এমন করে তুলতে পারিনি, যেখানে সাদামাটা মানুষও জীবনের ন্যূনতম প্রয়োজনগুলো সুস্থভাবে সোজা পথে মিটিয়ে শান্তিতে বসবাস করতে পারে। উচ্চাকাঙ্ক্ষী হলে তো কথাই নেই। ফলে ইতিহাসের নিয়ম মেনে মানুষ উন্নততর জীবনযাত্রার দিকে দৌড়বেই। এমনকি আদিম মানুষও তাই করত, নইলে মানুষ নামক প্রাণীটি কখনো আফ্রিকা মহাদেশ ছেড়ে বেরোত না (যাঁরা জীববিজ্ঞান ও ইতিহাস মানেন না, তাঁরা এই লেখা পড়া এখানেই বন্ধ করে দিন)।

দ্বিতীয়ত, ভারতের বেশকিছু সম্প্রদায়ের জন্যে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে দেশের অবস্থা শেষ দেড় দশকে এমন করে ফেলা হয়েছে যে সেই সম্প্রদায়ের যে কোনো মানুষই সুযোগ থাকলে দেশ ছেড়ে চলে যেতে চাইবে। তাদের উপরেও রাগ করা চলে না।

তৃতীয়ত, দেশ আর রাষ্ট্র এক জিনিস নয়। আমরা দুটোকে সমার্থক শব্দ বলে ভাবি, কিন্তু আসলে তা নয়। রাষ্ট্র প্রশাসনিক ব্যাপার, দেশ মূলত মনোভূমি। ফলে ভারত রাষ্ট্রের ভূগোল আছে, সরকার আছে। ভারত দেশটার ভূগোল নেই, ইতিহাস আছে। সরকার নেই, সংস্কৃতি আছে। কেউ বুকে করে সেই সংস্কৃতি পৃথিবীর যে কোনো প্রান্তে নিয়ে গিয়ে বাস করতে পারে। সেই কারণেই গ্রীন কার্ড পেয়ে যাওয়া লোকও আমেরিকায় ভারতীয় ক্রিকেট দলের ম্যাচ হলে নীল জার্সি পরে গলা ফাটাতে পারে। মার্কিন রাষ্ট্রের নাগরিকের দায়িত্ব পালন করেও পারে। তার উপর ভারত এমন মজার দেশ যে ভারতীয় সংস্কৃতি মানে আসলে সাড়ে বত্রিশ ভাজা ‘একটি বিরাট হিয়া’। হিয়া মানে মন। সুতরাং ভারতীয় হিয়া যে পৃথিবীর যেখানে নিয়ে যেতে পেরেছে, সেখানেই ভারত আছে বললে ভুল হয় না। যার মনটা ভারতীয়, সে-ই ভারতীয়। তার ধর্ম যা-ই হোক, মুখের ভাষা যা-ই হোক, পেশা যা-ই হোক, বড়লোকই হোক আর গরিবই হোক। ভারতে থাকুক আর না-ই থাকুক। একথা মাথায় ঢোকার পরে আর অনাবাসী ভারতীয়দের উপর রাগ করি না। কিন্তু এইসব প্রিয় কথা বলতে গেলেই কিছু অপ্রিয় কথা এসে পড়ে, যেগুলো বর্তমান আলোচনায় প্রাসঙ্গিক।

উন্নততর জীবনের সন্ধানে যাওয়া আসলে সব মানুষের জন্মগত অধিকার, অথচ দুনিয়ার কোনো রাষ্ট্র সেকথা স্বীকার করে না। তাই এক দেশ থেকে আরেক দেশে ভাগ্যান্বেষণে যেতে হলে নিজের এবং যে রাষ্ট্রে যেতে চান, দুপক্ষেরই সম্মতি আদায় করতে হয়। মানে পাসপোর্ট, ভিসা, ওয়ার্ক পারমিট, পরে নাগরিকত্ব ইত্যাদি। ওগুলো পেতে কী লাগে? আপনি বলবেন যোগ্যতা, আসলে লাগে টাকা এবং/অথবা পরিচিতি। ভেবে দেখুন, নিজেই বুঝতে পারবেন। GRE, CIEFL, TOEFL না কীসব আছে আপনাদের? সেগুলো পাশ না করে কি কেউ বিদেশ যাচ্ছে না, নাকি গিয়ে বাসিন্দা হয়ে যাচ্ছে না? আপনি যাকে যোগ্যতা বলছেন, সেটা কীসের যোগ্যতা? আপনাকে অন্য দেশে ঢোকার অনুমতি আদায় করে দেবে সেদেশের কেউ (আপনি যেখানে পড়তে বা পড়াতে যাচ্ছেন সেই শিক্ষা প্রতিষ্ঠান অথবা আপনি যে কোম্পানির চাকুরে) – এই ব্যবস্থা করার যোগ্যতা।

এখন কথা হল, যার ওই তথাকথিত যোগ্যতা নেই, টাকা বা পরিচিতিও নেই, তারও কিন্তু উন্নততর জীবনের অভিলাষ আছে। সেই জীবনকে ধাওয়া করার মানবিক অধিকারও আছে। কথাটা যেমন ভারত থেকে যে আমেরিকায় যেতে চায় তার বেলায় সত্যি, তেমন যে বাংলাদেশ থেকে ভারতে আসতে চায়, তার বেলাতেও সত্যি। এই লোকগুলো তাহলে কী করে? বেআইনি পথে বাংলাদেশ থেকে ভারতে ঢোকে, বা ভারত থেকে আমেরিকায় যায়। রাষ্ট্রের ভাষায় বললে— অনুপ্রবেশ করে। এ তো গেল আরও ভালো জীবনের আকাঙ্ক্ষায় দেশ বদলানোর কথা। এছাড়া স্রেফ প্রাণে বাঁচতেও মানুষ এক রাষ্ট্র থেকে আরেক রাষ্ট্রে যায়। তাদের উদ্বাস্তু বলাই দস্তুর, কিন্তু যখনই কোনো রাষ্ট্রের মনে হয় ‘ব্যাটারা বড্ড বেশি সংখ্যায় আসছে’, তখনই লাঠিসোটা গুলি বন্দুক বের করে তাদের তাড়াতে লেগে পড়ে। তখন আর উদ্বাস্তু বলে না, বলে অনুপ্রবেশকারী।

কোনটা অনুপ্রবেশ আর কোনটা নয়, সেটা ঠিক করে রাষ্ট্র। আর সংজ্ঞাটা সে যেদিন ইচ্ছে যখন ইচ্ছে বদলে ফেলতে পারে। উদ্বাস্তুদের কথা বাদ দিন। আপনি হয়ত রাতে ঘুমোলেন নাগরিক হিসাবে, সকালে উঠে দেখলেন অনুপ্রবেশকারী হয়ে গেছেন। এই কথাটা কমাস আগে বললেও অনাবাসী বন্ধুরা নির্ঘাত হেসে উড়িয়ে দিতেন, এখন আর পারবেন না। ডোনাল্ড ট্রাম্পের মুখটা একবার মনে করে দেখুন। কদিন আগেই হাড়ে ঠকঠকানি ধরিয়ে দিয়েছিলেন না? স্বীকার না করলেও, অনেকের হাড় এখনো ঠকঠক করেই চলেছে। তা সত্ত্বেও কিন্তু ‘পশ্চিমবঙ্গে বড্ড বেশি বাংলাদেশি আর রোহিঙ্গা ঢুকে পড়েছে’ বলে রাতে ঘুম না হওয়া বাঙালি বাবা-মায়েরা ছেলেমেয়েকে কী করে বিদেশে পাঠানো যায় তার খোঁজখবর জারি রেখেছেন। ‘আমার ছেলে স্টেটসে থাকে’ বলে বিয়েবাড়িতে দূর সম্পর্কের আত্মীয় এবং নতুন পরিচিতের কাছে রেলা নেওয়াও জারি আছে। কয়েক মাস আগে এক বিয়েবাড়িতে তেমন এক আত্মীয়ের সঙ্গে আমার কথা হচ্ছিল। তাঁর ছেলেও ‘স্টেটসে থাকে’, তার উপর বউমা আমেরিকান। স্বভাবতই ভদ্রমহিলা মাটির দু ইঞ্চি উপর দিয়ে হাঁটেন। বউমা আমিষ খান না, কারণ তিনি ‘অ্যানিমাল ক্রুয়েলটি’-র বিরুদ্ধে। সমাজবিজ্ঞান নিয়ে লেখাপড়া করে এখন কী একটা এনজিও-তে ‘আন্ডার-প্রিভিলেজড’ মানুষের জন্য কাজ করেন। গর্বিত শাশুড়ি এসব শোনাচ্ছিলেন আমাদের। বাঙালিসুলভ বোকামিতে জিজ্ঞেস করে ফেলেছিলাম ‘আপনার ছেলে-বউমা কি তাহলে ডেমোক্র্যাট?’ উত্তর এল ‘সেরকম কিছু না, যার যেটা ভালো সেটা বলে। আমার বউমা যেমন বলে, ট্রাম্প ইজ দ্য বেস্ট প্রেসিডেন্ট।’ এই কথোপকথনের আগেই H1B ভিসা নিয়ে ট্রাম্পের বিষোদ্গার শুরু হয়ে গেছে। আমার মনে তার চেয়েও দগদগে ঘা তৈরি করেছে ভারতীয়দের হাতে-পায়ে শেকল বেঁধে বিমানে তুলে আমেরিকা থেকে বের করে দেওয়ার দৃশ্য।

সেসব উল্লেখ করে জিজ্ঞেস করলাম— এসব কাণ্ড করে ট্রাম্প কী করে মার্কিন বউমার চোখে সেরা রাষ্ট্রপতি হন? বাঙাল (নিজেই বললেন) শাশুড়ি উত্তর দিলেন ‘না, ওরা তো বেআইনিভাবে আমেরিকায় গেছিল। ওরা তো অনুপ্রবেশকারী। ওরা আমেরিকায় গেছে স্রেফ টাকা রোজগার করতে। ওদের তো বের করে দিতেই হবে’। উত্তরে বলেই ফেললাম, আপনার ছেলেও তো টাকা করতেই গেছে। ভদ্রমহিলার উত্তর ‘আমার ছেলে তো পাসপোর্ট, ভিসা করিয়ে গেছে।’ অর্থাৎ ঘুরে ফিরে ব্যাপারটা দাঁড়াল ওই— রাষ্ট্রের দেওয়া কাগজ যাকে অভিবাসী বলে সে-ই অভিবাসী, অন্যরা অনুপ্রবেশকারী। এই কাগজ জোগাড় করা কিন্তু যোগ্যতার ব্যাপার নয়, নেহাতই রাষ্ট্রের দয়া। এ দয়া যদি ১৯৪৭ সালের পরে ভারত রাষ্ট্র না দেখাত, তাহলে আজ যে বাঙালরা এবিপি আনন্দ ইত্যাদি চ্যানেলে দেখানো হাজার হাজার লোকের বাংলাদেশে পালানোর ভুয়ো ভিডিও দেখে উল্লসিত, এসআইআরে বাদ পড়া লোকেরা ঢিট হয়েছে ভেবে নাচছেন, তাঁদের বাপ-মায়েরা কিন্তু অনুপ্রবেশকারী হয়ে যেতেন।

তবে একটা কথা মানতেই হবে। ট্রাম্প, তাঁর উপরাষ্ট্রপতি জে ডি ভান্স, যতই অভিবাসীদের বাড়ির মেয়ে বিয়ে করে ভণ্ডামি করুন, নরেন্দ্র মোদীর বিজেপির কিন্তু অন্য দেশ থেকে আসা লোকেদের ব্যাপারে চিন্তাভাবনা অনেক পরিষ্কার। তথাগত রায় যখন রাজ্য সভাপতি ছিলেন, সেই জুরাসিক যুগ থেকে বঙ্গ বিজেপি বলে আসছে— বাংলাদেশ থেকে আসা মুসলমানরা অনুপ্রবেশকারী, হিন্দুরা শরণার্থী। কেন্দ্রে একক শক্তিতে ক্ষমতায় আসার পরে তারা নাগরিকত্ব আইনের যে সংশোধন করেছে, তাতেও এই ভাবনাকেই স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। এতক্ষণ ধরে যা যা বলেছি, সবকিছুর বিপরীতে পুরনো ও নতুন বাঙালরা সেই আইনকে তুলে ধরতে পারেন। কিন্তু ডেভিল (ডিমের নয়, বিজেপির প্রতি বিশ্বস্ত হতে চাইলে আমিষ-চিন্তা মাথা থেকে তাড়ান) যে ডিটেলে। এসআইআর থেকে বাদ দেওয়ার সময়ে কই হিন্দুদের রেখে দেওয়া হল না তো! এখন যে নিত্য হিন্দু বীর অমিত শাহ এসআইআর থেকে বাদ পড়া মানুষকে দেশছাড়া করার হুমকি দিচ্ছেন, তাতেও তো বলছেন না যে হিন্দুদের রেখে দেওয়া হবে? অনুপ্রবেশকারী আর শরণার্থী বলে দুটো গোষ্ঠীর কথা তো বলছেন না? একটা শব্দই তো ব্যবহার করছেন— ‘ঘুসপ্যায়েট’।

আরো পড়ুন রামদাসী, লালদাসের ধর্ম এবং রামমন্দির

আসামের ডিটেনশন ক্যাম্পেও কিন্তু কেবল মুসলমানদের ঢোকানো হয়নি। উলটে একাধিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ওই রাজ্যের ডিটেনশন ক্যাম্পে আটক বেশিরভাগ মানুষ হিন্দু বাঙালি।

সংঘ পরিবারের সোশাল মিডিয়া যোদ্ধারা যে নেহাত পুতুলখেলায় লিপ্ত নন, সংঘের মনের কথাই যে তাঁদের মুখ দিয়ে বেরোয়— একথা যদি জানা থাকে, তাহলে বুঝতে অসুবিধা হওয়ার কথা নয় যে এক্ষেত্রেও অমিত শাহরা অত্যন্ত সৎ। কারণ ওঁদের আই টি সেলের লোকেরা ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বাসিন্দা হিন্দুদের জন্যে কেঁদে ভাসালেও তাদের এদেশে আশ্রয় নেওয়ার প্রসঙ্গ উঠলেই বলে ‘দেশটা কি ধর্মশালা নাকি?’ অর্থাৎ এঁদের হিন্দু বাঙালির প্রতি প্রীতি আসলে, গোদা বাংলায় যাকে বলে, মায়ের চেয়ে মাসির দরদ বেশি। মানে আহা উহু করব, কিন্তু দায়িত্ব নেব না। তাহলে আহা উহু করাই বা কেন, ভেবে দেখেছেন কি? কারণটা খুব সহজ। যাতে ওদেশের সংখ্যালঘুর প্রতি অত্যাচারকে এদেশের সংখ্যালঘুর অত্যাচারের পক্ষে যুক্তি হিসাবে তুলে ধরা যায়। মানে শুঁড়ির সাক্ষী যেমন মাতাল, সংঘ পরিবারের সাক্ষী জামাত। মুশকিল হল, বাংলাদেশের মানুষ জামাতকে হারিয়ে ভূত করে দিলেন; পশ্চিমবঙ্গের মানুষের হিন্দুত্বের নেশা কিন্তু কাটছে না। আই টি সেল নিরুপায় হয়ে আঁকড়ে ধরেছে পশ্চিমবঙ্গের সীমান্তবর্তী আসনগুলোতে জামাতের জয়কে, তাই দিয়ে হোয়াটস্যাপ গ্রুপগুলোর মাধ্যমে ‘পশ্চিমবঙ্গ বিপন্ন, বাংলাদেশ হয়ে যাবে’ বলে ভয় দেখানো হচ্ছে। বাঙালি সে প্রোপাগান্ডা এখনো গিলছে। কারণ মুসলমানদের প্রতি অকারণ ভয় থেকে তৈরি হওয়া ঘৃণা এতদিনে ঘাড়ে এমন চেপে বসেছে যে সৃজন যখন বলছেন ‘রাষ্ট্র কোনোদিনই খুব ভালো জিনিস নয়’, তখন এঁরা মনে করছেন— পশ্চিমবঙ্গকে বাংলাদেশ বানানোর চক্রান্ত করছে। ফলে যে হিন্দুর নিজের নাম এসআইআরে বাদ পড়েনি, তিনি আর যাঁর নাম বাদ পড়েছে তাঁকে নিয়েও চিন্তিত নন। রাষ্ট্রের প্রতি এমন অচলা ভক্তি তৈরি হয়েছে যে ভেবে নিচ্ছেন— এমনি এমনি তো আর বাদ দেয়নি, ওরা হিন্দু হলেও নির্ঘাত বাংলাদেশ থেকে এসেছে।

এখন বুঝবেন না, যখন বুঝবেন তখন অনেক দেরি হয়ে যাবে জেনেও একবার বলে রাখা যাক— রাষ্ট্র, বিশেষ করে আধুনিক জাতিরাষ্ট্র, নেহাতই সেদিনের ছেলে। বয়স আড়াইশো-তিনশো বছরের বেশি নয় এবং জিনিসটা মানুষের তৈরি। যদি ভগবান বলে কেউ থেকেও থাকেন, তিনি রাষ্ট্রগুলোর সীমানা এঁকে দিয়ে পৃথিবীর রাজনৈতিক ম্যাপটা তৈরি করেননি। স্রেফ গত একশো বছরেই কতগুলো রাষ্ট্র তৈরি হয়েছে আর ভেঙে গেছে গুগল করে দেখে নিলেই চলবে, সৃজনকে বা এই নিবন্ধকারকে বিশ্বাস করার দরকার নেই।

সুতরাং মানুষের তৈরি রাষ্ট্র, নাগরিকদের সিদ্ধান্তে তৈরি রাষ্ট্র যখন নিজের মর্জি মত নির্ধারণ করে— এ নাগরিক আর ও নাগরিক নয়, তখন প্রতিবাদ করাই বুদ্ধিমানের কাজ। কারণ এ জিনিস একবার শুরু হলে থামবার নয়। কাল মর্জি বদলালে রাষ্ট্র নাগরিক হওয়ার মাপকাঠি বদলে দেবে। আজকের মাপকাঠিতে আপনি নাগরিক, সেদিনের মাপকাঠিতে বাদ পড়ে যেতে পারেন। কী করবেন তখন? আপনারাই তো বলেন— মুসলমানদের ভারতে থাকার দরকার নেই, তাদের যাওয়ার জন্যে নাকি ৫৭ খানা দেশ আছে। আপনাদের এই একটাই দেশ।

নাগরিক ডট নেট ওয়েবসাইটে প্রকাশিত

নির্বাচনে এবারও খেলা হবে, তবে রান্নাবাটি

আমরা যেমন বিহারের খবর রাখি না, তেমন ওড়িশার খবরও রাখি না। ফলে আমরা অনেকেই জানি না, সেখানে গত বিধানসভা নির্বাচনের ভোটগণনায় কী কাণ্ড হয়েছে।

এই লেখা যখন লিখছি, তখন পর্যন্ত আমার এলাকায় বিজেপি প্রার্থীর কোনো প্রচার চোখে পড়েনি। অথচ সিপিএম প্রার্থী অলিতে গলিতে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। প্রায় বাড়ি বাড়ি যাচ্ছেন, কোনো কোনো ফ্ল্যাটেও উঠে পড়ছেন। রাস্তায় বেরোলেই কোথাও না কোথাও তাঁর অথবা সিপিএমের অন্য কর্মীদের মিছিল, মিটিং চোখে পড়ছে। তৃণমূল প্রার্থীকেও হাত জোড় করে হাসি হাসি মুখ নিয়ে ঘুরে বেড়াতে দেখা গেছে। দেয়াল লিখনেও সিপিএম আর তৃণমূলের উপস্থিতিই চোখে পড়ছে, বিজেপি নেই। বিজেপি যে আছে তার প্রমাণ হিসাবে কোনো কোনো পাড়ায় তিনকোণা গেরুয়া পতাকা শোভা পাচ্ছে, তবে সেগুলো লাগানো হয়েছিল রামনবমী উপলক্ষে। হনুমানপুজোর দিনও এলাকায় গত কয়েক বছরে তৈরি হওয়া, হিন্দিভাষীপ্রধান ফ্ল্যাটগুলোর সামনে রাম, সীতা, হনুমানের কাট আউটের পাশে ওই পতাকাগুলো দেখা গেছে। কোনো কোনো বাইকচালককে ওই গেরুয়া পতাকা লাগিয়ে ঘুরতে দেখা যাচ্ছে, কিন্তু নির্বাচনী প্রচার বলতে যা বোঝায় তাতে বিজেপির বিশেষ উৎসাহ আছে বলে মনে হচ্ছে না। একাধিক কেন্দ্রের অধিবাসী পরিচিতদের সঙ্গে কথা বলে একইরকম তথ্য পাচ্ছি। এদিক ওদিক দু-একজন প্রার্থীর মাছ হাতে প্রচার করা বা প্রাক্তন এনএসজি কমান্ডোর সেই পোশাক পরে প্রচারে বেরিয়ে পড়ার মত ঘটনা বাদ দিলে, সংবাদমাধ্যম বা সোশাল মিডিয়াতেও কেন্দ্রের শাসক দলের প্রচারের প্রাবল্য নেই।

প্রশ্ন হল, এমন কেন হচ্ছে? বিজেপি কেবল ভারতের নয়, তাদের কথা অনুযায়ী, পৃথিবীর বৃহত্তম রাজনৈতিক দল। নির্বাচনী বন্ডের কল্যাণে এবং আরও নানা কারণে তাদের টাকাপয়সারও অভাব নেই যে খরচের কথা ভেবে প্রচারে রাশ টানতে হবে। তাহলে এই কার্পণ্য কেন? দীর্ঘদিন ধরে যাঁরা নির্বাচন দেখে আসছেন, তাঁদের কাছে এর সহজ ব্যাখ্যা হল— বিজেপির সংগঠন নেই। অতএব সিদ্ধান্ত হল— ভোট পাবে না। দুঃখের বিষয়, এই ব্যাখ্যা প্রাক-২০১৯ নির্বাচনগুলোর জন্যে নির্ভুল। কিন্তু সেবার থেকে দেখা গেছে— এ রাজ্যে বিজেপির সংগঠন নেই, ভোট আছে। বামপন্থীদের আবার নয় নয় করেও খানিকটা সংগঠন আছে, কিন্তু ভোট নেই। ২০১৯ লোকসভা নির্বাচন, ২০২১ বিধানসভা নির্বাচন এবং ২০২৪ লোকসভা নির্বাচন— প্রত্যেকবার ফল বেরোবার পর এই ব্যাপারটাই উপলব্ধি করা গেছে। এর কারণ বামের ভোট রামে চলে যাওয়া, নাকি তৃণমূল-বিজেপি সেটিং—সে আলোচনা এবারকার মত মুলতুবি থাক। কারণ পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার এবারের নির্বাচন অভূতপূর্ব। অথচ কথাটা বামপন্থীরা এবং তৃণমূল যেন বুঝেও বুঝতে চাইছে না। ফলে তাদের প্রচারকে রান্নাবাটি খেলা ছাড়া আর কিছু ভাবা যাচ্ছে না। শয়ে শয়ে লোক সঙ্গে নিয়ে, পার্টির পতাকায় এলাকা ছয়লাপ করে, ক্ষমতায় এলে পশ্চিমবঙ্গের ভোল পালটে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া বা গত ১৫ বছরের উন্নয়নের পাঁচালী শোনানোর যে কোনো মানে হচ্ছে না, সেকথা সাধারণ ভোটারদের কথাবার্তায় কান পাতলে দিব্যি টের পাওয়া যাচ্ছে। কিন্তু রাজনৈতিক দলগুলো যেন কানে গুঁজেছে তুলো আর পিঠে বেঁধেছে কুলো।

১) ৬ এপ্রিল রাতে নির্বাচন কমিশন দয়া করে বিচারাধীন থাকা ভোটারদের মধ্যে কাদের ভাগ্যে ভোটদানের শিকে ছিঁড়ল আর কাদের ছিঁড়ল না— তার সর্বশেষ তালিকা প্রকাশ করেছে। রাজ্যসুদ্ধ লাখ লাখ লোক উৎকণ্ঠায় জীবন কাটাচ্ছিলেন, সেই উৎকণ্ঠা সহ্য করতে না পেরে রিষড়ার মিনতি সেন আত্মহত্যা করেছেন বলেও অভিযোগ উঠেছে। সোশাল মিডিয়া খুললে আরও বহু মানুষের কথা জানা যাচ্ছে, যাঁরা গত কয়েক দিনে এই দুর্ভাবনায় অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। শেষমেশ জানা গেছে, ৬০ লাখের বেশি ভোটারের মধ্যে প্রায় ২৭ লাখ বাদ।

২) আগেই বাদ পড়েছিলেন ৫৮ লাখ, এবার আরও ২৭ লাখ। আগের ৫৮ লাখের মধ্যে অবশ্য কিছু মৃত ভোটার ছিল, তবে ডিসেম্বরের খসড়া তালিকা থেকেই জীবিতকে মৃত বানিয়ে দেওয়ার ঘটনাও ছিল। অনেক প্রগতিশীলও যা কীসব রাজনৈতিক অঙ্ক কষে মানতে চাইছিলেন না, তাও প্রমাণ হয়ে গেছে শেষ তালিকা বেরোবার পরে— মুসলমানদের বাদ পড়ার হার তাঁদের ভোটার তালিকায় উপস্থিতির হারের চেয়ে বেশি। অল্ট নিউজ এই তথ্য টেনে বের করেছিল কলকাতার দুটো বিধানসভা কেন্দ্রের বিশেষ নিবিড় সংশোধনী পরবর্তী ভোটার তালিকা থেকে, সবর ইনস্টিটিউট এই তথ্য বের করেছে বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারীর দুই কেন্দ্রের অন্যতম, নন্দীগ্রামের, তালিকা বিশ্লেষণ করে। উপরে দেওয়া নির্বাচন কমিশনের নিজের তালিকাতেও দেখা যাচ্ছে— মুর্শিদাবাদ, উত্তর ২৪ পরগণা, মালদার মত যে জেলাগুলোতে মুসলমান সম্প্রদায়ের মানুষ অন্যান্য জেলার তুলনায় বেশি, সেখানেই বাদ পড়া মানুষের সংখ্যা বেশি। তাছাড়া যাঁরা বাদ পড়েছেন, তাঁদের মধ্যে মহিলা, নিম্নবর্গীয় হিন্দু, আদিবাসীদের উপস্থিতি প্রধান। অর্থাৎ যাঁদের বিজেপিকে ভোট দেওয়ার সম্ভাবনা শূন্য থেকে শুরু, তাঁদের ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়ার ব্যবস্থারই ভালো নাম এসআইআর। বাংলাদেশের হিন্দুদের জন্যে এত প্রাণ কাঁদে বিজেপি নেতাদের, অথচ সেখান থেকে তাড়া খেয়ে চলে আসা মতুয়াদের উপরেও কোপ পড়েছে। আমরা ছাপ্পা ভোট দেখেছি, বুথ দখল দেখেছি, ‘সায়েন্টিফিক রিগিং’ শুনেছি, ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিনে কারচুপির অভিযোগও শুনতে পাই। গণনার সময়ে ব্যালট খেয়ে নেওয়া, ধানখেতে বা নালায় ফেলে দেওয়ার দৃশ্যও নতুন নয়। কিন্তু সেসবই ভোটদানের দিন বা ভোটদানের পরের ব্যাপার। ভোটগ্রহণের আগেই নির্বাচন জিতে নেওয়ার এমন ভবিষ্যনিধি প্রকল্প আমরা দেখিনি।

৩) ধরা যাক, আপনি নিরীহ লোক। আপনাকে মেরে ধরে এলাকার গুন্ডারা সর্বস্ব কেড়ে নিল। আপনি পুলিশের কাছে গেলেন, বাকি যা দু-চার পয়সা ছিল সেগুলোও তারা কেড়ে নিল, আপনি পথে বসলেন। এমতাবস্থায় আমাদের দেশের মানুষ কোনো একটা উপায় বের করতে পারলে যায় আদালতের কাছে। এক্ষেত্রেও তাই হয়েছিল। তা আমাদের সর্বোচ্চ আদালতের বিচারপতিদের এমন দয়ার শরীর যে তাঁরা বলেছেন যাদের নাম জজসাহেবদের বিচারেও বাদ গেছে, তাঁরাও ফের আবেদন করতে পারবেন। তবে তাঁদের আবেদনের নিষ্পত্তি হোক আর না-ই হোক, ভোট ভোটের সময়েই হতে হবে। যাঁরা এবার ভোট দিতে পারছেন না, তাঁরা নাহয় পরেরবার দেবেন। পৃথিবীর সব গণতান্ত্রিক দেশে ভোট হয় ভোটারের স্বার্থে। এখন ধর্মাবতাররা যা সিদ্ধান্ত নিলেন তাতে বোঝা গেল, পশ্চিমবঙ্গে ভোট হবে ভোটের স্বার্থে। ভোটার হলেন ফাউ। ভোটার জনপ্রতিনিধি নির্বাচন করবেন না, নির্বাচন কমিশন ভোটার নির্বাচন করবে। তারা না পারলে বিচারপতিরা করবেন। যেভাবে পারবেন সেভাবে করবেন, যখন ইচ্ছে হবে তখন করবেন। ভোটার অধিকার হারালে প্রতিবাদ করতেও পারবেন না। করলে পাইক, বরকন্দাজ ডাকা হবে, হাজতবাস হবে, ভোটার সন্ত্রাসবাদী কিনা তাও খতিয়ে দেখা হবে। ডিগ্রিধারী উচ্চবর্গীয় সাংবাদিকরা স্টুডিওতে বসে বিচারকদের জন্যে চোখের জল ফেলবেন আর প্রতিবাদী ভোটারদের ভীষণ বকে দেবেন।

৪) সন্ত্রাসবাদের কবলে থাকা কাশ্মীর বা বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনে দীর্ণ আট-নয়ের দশকের পাঞ্জাব বা উত্তর-পূর্বাঞ্চলের রাজ্যগুলো ছাড়া কোথাও কখনো নির্বাচনে এত বাইরে থেকে আনা সশস্ত্র বাহিনী ব্যবহৃত হয়েছে কিনা সন্দেহ। অনেকদিন যাবৎ একটা কথা চালু হয়েছে— ভোট নাকি গণতন্ত্রের উৎসব। এবারে দেখে মনে হচ্ছে যুদ্ধ। সে যুদ্ধে আসার জন্যে রওনা দেওয়ার আগে কেন্দ্রীয় বাহিনীর জওয়ানরা আবার অযোধ্যার রামমন্দিরে মাথা ঠুকে আসছেন। মানে যুদ্ধকে পশ্চিমবঙ্গের ভোটারদের চোখে একেবারে ধর্মযুদ্ধে পরিণত করার চেষ্টা। কীরকম নিরপেক্ষ ভোটদান নিশ্চিত করতে আসছে কেন্দ্রীয় বাহিনী, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।

৫) মানুষের ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়ার জন্যই যে এসআইআর, সেটা অবশ্য বাঙালি বুদ্ধিমানরা বিহারের এসআইআরের দিকে চোখ রাখলে প্রথমেই টের পেতেন। কিন্তু পাননি। যা-ই হোক, বিহারে ও জিনিস আগে করা হয়েছে বলেই বাংলায় যা হল তাকে অভূতপূর্ব বলা চলে না। তবে ভাববেন না, এসআইআরেই কমিশনের গাফিলতি শেষ হয়। আমরা যেমন বিহারের খবর রাখি না, তেমন ওড়িশার খবরও রাখি না। ফলে আমরা অনেকেই জানি না, সেখানে গত বিধানসভা নির্বাচনের ভোটগণনায় কী কাণ্ড হয়েছে। ফ্রন্টলাইন পত্রিকার এক প্রতিবেদন অনুযায়ী বহু বুথে যত ভোট পড়েছে (যার হিসাব থাকে ফর্ম ১৭সি-তে) আর যত ভোট গোনা হয়েছে (যার হিসাব থাকে ফর্ম ২০-তে) তা মেলেনি। বিজু জনতা দল ২০২৪ সালের ডিসেম্বর মাসে তাদের প্রেস নোটে জানায়— ১৪৭ খানা বিধানসভা কেন্দ্রের ৫৮ খানা বুথে পড়া ভোট আর গোনা ভোটের তফাত এক থেকে ৯০৮ পর্যন্ত পৌঁছেছে। দুটো চোখ কপালে তোলা উদাহরণ দিয়ে চক্করটি বোঝানো যাক। ফুলবনী কেন্দ্রের ৫৭ নম্বর বুথে ভোট পড়েছে ৬৮২, কিন্তু ফর্ম নং ২০ বলছে একটা ভোটও গোনা হয়নি। তালসারার ১৬৫ ও ২১৯ নম্বর বুথে মোট ১,৪৪৪ জন ভোট দিয়েছেন বলছে ফর্ম নং ১৭সি। অথচ ফর্ম নং ২০ বলছে ও দুটোরও কোনো ভোট গোনা হয়নি। উলটো উদাহরণও আছে। পদমপুরের ১৪ খানা বুথ মিলিয়ে নাকি ভোট পড়েছে ৮২, গোনা হয়েছে ৯,৩০৪। এসব নিয়ে বিজু জনতা দল দুবার নির্বাচন কমিশনে অভিযোগ জানিয়েছে, তথ্যের অধিকার আইনেও আবেদন জানিয়েছে। কেউ পাত্তা দেয়নি।

৬) কলকবজা কী আছে না আছে না জেনেও যেমন আমরা ট্রেনে বাসে চড়ি, সেভাবেই জনপ্রতিনিধিত্ব আইনে কী আছে বা অমুক নম্বর ফর্ম আর তমুক নম্বর ফর্ম দিয়ে কী হয় না জেনেও সেই ১৯৫২ সাল থেকে ভারতের মানুষ ভোট দিয়ে আসছিল। এবারে জ্ঞানেশ কুমারের দৌরাত্ম্যে আমরা কিছু কিছু কল বা গ্যাঁড়াকল সম্পর্কে জানতে বাধ্য হয়েছি। সেরকম দুটো গ্যাঁড়াকল হল ফর্ম নং ৬ আর ৭। এমনিতে ফর্ম নং ৬ খুবই নিরীহ জিনিস। ওটা দিয়ে ভোটার হওয়ার আবেদন করতে হয়। কিন্তু বিহারের অভিজ্ঞতা থেকে এবং পশ্চিমবঙ্গেও গত কয়েকদিনের অভিজ্ঞতায় আমরা জেনে গেছি যে, ওটা ব্যবহার করে ভিনরাজ্যের লোককে রাতারাতি ভোটার তালিকায় ঢোকানোর কাজ করা হয় বলে প্রচুর অভিযোগ আছে। সে কাজ করতে গিয়ে কিছু লোক হাতেনাতে ধরা পড়েছে বলে দাবি করেছে তৃণমূল কংগ্রেস, কিন্তু সব যে ধরা সম্ভব হবে না তা বলাই বাহুল্য। ফর্ম নং ৭-এর ব্যবহার আরও চমৎকার। ও দিয়ে কমিশনে অভিযোগ জানানো যায়— অমুক বৈধ ভোটার নয়, ওকে বাদ দিন। সেটাকে ব্যবহার করে মুসলমানদের বাদ দেওয়ার চেষ্টা করা হবে— একথা কিছুদিন আগে সগর্বে জানিয়েছিলেন আসামের বিজেপি মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মা। এসব সম্ভব হয় না নির্বাচন কমিশন ওই ফর্মগুলোর আবেদনকারীদের ব্যাপারে নিয়মমাফিক যাচাই করলে। কিন্তু তা কি করা হয়? হলে আসামের বিএলও সুমনা চৌধুরী, ফর্ম নং ৭-এর উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ব্যবহার ক্যামেরার সামনে ফাঁস করে দেওয়ার জন্যে, চাকরি থেকে সাসপেন্ড হলেন কেন? পশ্চিমবঙ্গেও গুচ্ছ গুচ্ছ ফর্ম নং ৭ নিয়ে ধরা পড়ার অভিযোগ উঠেছে বিজেপির কর্মীদের বিরুদ্ধে।

৭) নির্বাচন কমিশনের এতরকম কীর্তিকলাপ দেখে ভারতের প্রায় সব বিরোধী দল তার উপর আস্থা হারিয়েছে। ফলে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশকে অপসারণের প্রস্তাব এনেছিলেন বিভিন্ন দলের ১৯৩ জন সাংসদ। লোকসভার স্পিকার এবং রাজ্যসভার চেয়ারম্যান সেই প্রস্তাব নিয়ে আলোচনাই হতে দেননি। কোনো কারণও দেখাননি।

এই সাত কাণ্ড রামায়ণ জানার পরে, বিজেপি যে অমিত শাহ আর নরেন্দ্র মোদীর জনসভা ছাড়া প্রচারে বিশেষ মন দিচ্ছে না, তাতে অবাক হওয়ার কিছু থাকে কি? অন্যদিকে পশ্চিমবঙ্গের বিজেপিবিরোধী দলগুলো যে প্রাণপণ প্রচার করে চলেছে, তাকে শিশুদের আপন মনে রান্নাবাটি খেলা ছাড়া অন্য কিছু বলা চলে কি? ভোটারদের অধিকারের কথা নির্বাচন কমিশন ভাবেনি, সুপ্রিম কোর্ট ভাবেনি— একথা ঠিক। কিন্তু তৃণমূল কংগ্রেস, কংগ্রেস বা বামপন্থীরা যে ভাবছেন, তারই বা প্রমাণ কোথায়? কোনো পক্ষই প্রথম থেকে একবারও বলেনি যে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র মানে হল, জনগণের বেছে নেওয়া তন্ত্র। এ তো তন্ত্র জনগণ বেছে নিচ্ছে। এ অধিকার রাষ্ট্রের নেই, অতএব এই প্রক্রিয়া বাতিল করতে হবে। কেবল পশ্চিমবঙ্গের দলগুলো বলেনি তা নয়, যে ১২ খানা রাজ্যে এসআইআর হল, কোথাও কোনো দলই বলেনি। সবাই মেনে নিল যে এটা সাংবিধানিক প্রক্রিয়া। অথচ সংবিধানে এমন কোনো প্রক্রিয়ার কথা আছে— একথা আজ পর্যন্ত সুপ্রিম কোর্টও বলে উঠতে পারল না। জনপ্রতিনিধিত্ব আইনেও আছে নিবিড় সংশোধনের কথা, যা ভারতে এর আগেও বহুবার হয়েছে, পশ্চিমবঙ্গে শেষ হয়েছিল ২০০২ সালে। তার জন্যে ভোটারকে ফর্ম পূরণ করতে হয় না, নিজের নাগরিক হওয়ার প্রমাণ দিতে হয় না, বাপ-মা নাগরিক ছিলেন কিনা তাও দেখাতে হয় না। নির্বাচন কমিশনই নিজের উদ্যোগে নিজের ভুল সংশোধন করে। বিশেষ নিবিড় সংশোধন বলে যে আদৌ কিছু নেই, তা নাগরিক ডট নেটের পডকাস্টে এসে পরিষ্কার বলে গিয়েছেন নির্বাচন কমিশনের প্রাক্তন সিইও জহর সরকার।

বিহারে এই প্রক্রিয়ার শুরু থেকেই বোঝা গিয়েছিল মতলবখানা কী। অথচ রাষ্ট্রীয় জনতা দল, কংগ্রেস এবং বামপন্থীরা সেই প্রক্রিয়া মেনে নিয়েই নির্বাচনে লড়লেন। বোধহয় ভেবেছিলেন এত মানুষ নীতীশ কুমারের সরকারের উপর খাপ্পা যে যত ভোটারই বাদ যাক, ঠিক জিতে যাবেন। তা যখন হল না এবং অপ্রত্যাশিত বড় ব্যবধানে হার হল, তখন বিস্তর গণ্ডগোল আছে বলে অভিযোগ জানিয়েও দু-একবার মৃদু প্রতিবাদ করে বাধ্য ছেলেমেয়েদের মত তাঁরা বিধানসভায় গিয়ে বসে পড়লেন। কোথাও কোনো আন্দোলন, অবরোধ কিছু দেখা গেল না। যে রাহুল গান্ধী ভোট চুরি ধরে ফেলেছেন বলে কর্ণাটক ও মহারাষ্ট্র নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে এ বোমা সে বোমা ফাটানো সাংবাদিক সম্মেলন করেছিলেন, তিনিও চুপসে গেলেন। সেই যে চুপ করেছেন, পশ্চিমবঙ্গে কোটিখানেক মানুষের ভোটাধিকার হরণ নিয়ে আজ পর্যন্ত এক লাইন সোশাল মিডিয়া পোস্টও করে উঠতে পারেননি। তাহলে তো ধরে নিতে হবে, কর্ণাটক আর মহারাষ্ট্রের ভোট চুরি নিয়ে তাঁর ভাবনা আছে, কারণ সেখানে তাঁর দল জেতার অবস্থায় থাকে। পশ্চিমবঙ্গে খুব ভালো ফল করলেও যেহেতু কংগ্রেস গোটা পাঁচেকের বেশি আসন জিতবে না, সেহেতু এ রাজ্যের লোক বাঁচুক, মরুক বা ডিটেনশন ক্যাম্পে যাক, তাঁর কিছু এসে যায় না। মহব্বতের দোকান দেখা যাচ্ছে খুবই ছোট।

তৃণমূল কংগ্রেস যে মতলবটা প্রথমে ধরতে পারেনি তা পরিষ্কার। ভেবেছিল তাদের সাংগঠনিক জোর দিয়ে ভোটার বাদ দেওয়া সামলে নেবে। তাই মোড়ে মোড়ে ভোটার সহায়তা কেন্দ্র খুলে বসে এসআইআরে সাহায্য করেছে। সিপিএমের পলিট বুরো যতই প্রথম থেকে এই প্রক্রিয়ার বিরোধিতা করুক, বঙ্গীয় নেতা ও কর্মীরা ভেবেছিলেন এতে তৃণমূলের ভুয়ো ভোটার বাদ যাবে। তাই তাঁরাও মহা উৎসাহে এই কর্মযজ্ঞের আগুনে ঘি ঢেলেছিলেন, ‘লজিকাল ডিসক্রিপেন্সি’ ঢুকে পড়ার পর থেকে ঢোঁক গিলে প্রতিবাদ করছেন। এখনো ভাঙবেন তবু মচকাবেন না, বলে যাচ্ছেন ওই জিনিসটা না থাকলেই ভালো এসআইআর হত। অথচ বিহারে ওটা না থেকেও প্রান্তিক মানুষের ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়ার কাজটা হয়েছিল।

যা-ই হোক, ভুল মানুষমাত্রেই করে, ফলে মানুষের তৈরি রাজনৈতিক দলও করতেই পারে। কিন্তু ভুল বুঝতে পারার পর, ‘বাদ পড়ে যাওয়া ভোটারদের তালিকায় না ঢোকানো পর্যন্ত ভোট করা চলবে না এবং করলে সে ভোটে অংশগ্রহণ করব না’, একথা তৃণমূল, বামেরা বা কংগ্রেস বলতে পারছে না কেন? সাধারণ বুদ্ধিতে এর উত্তর হল— মমতা ভাবছেন, এসব সত্ত্বেও কোনো মতে জিতে গেলে ক্ষমতায় টিকে যাব। আর বাম, কংগ্রেস শূন্যের গেরো কাটিয়ে গোটা কয়েক বিধায়ক বাগানোর সুযোগ ছাড়তে চায় না। কিন্তু কথা হল, অক্টোপাসের মত যে ফাঁদ পাতা হয়েছে, তাতে ওই আশায় থেকে আর পাঁচটা ভোটের মত প্রচার চালিয়ে যাওয়ার কি কোনো মানে আছে? জিতলেও তো গণতন্ত্রের শবদেহের উপর নৃত্য করেই জেতা হবে।

ছোটবেলায় রান্নাবাটি খেলার সময়ে আমরা ধুলোকেই ভাত হিসাবে প্লেটে নিতাম বটে, তবে মুখ পর্যন্ত তুলে নামিয়ে রাখতাম। খেতাম না কিন্তু।

নাগরিক ডট নেট ওয়েবসাইটে প্রকাশিত

বাংলা বলে কোনো ভাষা নেই, বাঙালি বলে কোনো জাতি নেই?

আজ থেকে বছর তিরিশেক আগেই বাংলা ভাষা কোনটা, বাঙালি কারা – সে বোধ ভদ্রলোক শ্রেণি হারিয়েছে। ফলে আজ যে বাঙালি সাহিত্যিক, অধ্যাপকদের দেখা যাচ্ছে ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়াররা আক্রান্ত না হলে বাংলা ভাষার উপর আক্রমণ হচ্ছে তা বিশ্বাস না করতে, বা বাঙালি প্রবাসী শ্রমিকদের উপর আক্রমণকে বাঙালিদের উপর আক্রমণ বলে না ধরতে – তাতে অবাক হওয়ার কিছু নেই।

ঠিক এক দশক আগের কথা। সদ্য রাজকাহিনী বেরিয়েছে (অবন ঠাকুরের নয়, সৃজিত মুখার্জির)। ইংরিজি জানা বাঙালি ভদ্রলোক, ভদ্রমহিলারা আপ্লুত হয়ে একটা গান শেয়ার করতে লাগলেন সোশাল মিডিয়ায়। কী গান? ওই যে গানটা আমাদের জাতীয় স্তোত্র। কিন্তু এত আপ্লুত হওয়ার কারণ কী? কারণ রবীন্দ্রনাথের লেখা গানটা আসলে অনেক বড়, অত বড় জাতীয় স্তোত্র রাখা যায় না ব্যবহারিক অসুবিধার কারণেই। তাই আমাদের জাতীয় স্তোত্র হিসাবে ব্যবহৃত হয় শুরুর দিকের খানিকটা অংশ। ওই ছবিতে সৃজিতবাবু গোটা গানটাই ব্যবহার করেছিলেন। এই নিয়ে আপ্লুত হওয়া অন্যায় নয়। কিন্তু মুশকিল হল, দেখা গেল যাঁরা শেয়ার করছেন তাঁদের অনেকেই লিখছেন ‘লিসন টু দ্য বেঙ্গলি ভার্শন অফ আওয়ার ন্যাশনাল অ্যান্থেম। ইট’স বিউটিফুল’ – এই জাতীয় কথাবার্তা। সাধারণত সোশাল মিডিয়ায় কারোর কোনো ভুল ধরলে তিনি প্রবল খেপে গিয়ে যিনি ভুল ধরেছেন তাঁকে অপমান করেন। এক্ষেত্রে যেসব বাঙালি মান-অপমানের তোয়াক্কা না করে ওইসব পোস্টে মন্তব্য করেছিলেন বা নিজে পোস্ট করেছিলেন যে গানটা তো বাংলাতেই লিখেছিলেন রবিবাবু, তার আবার বাংলা ভার্শন কী – তাঁদের ‘আঁতেল’, ‘সবজান্তা’ ইত্যাদি বিশেষণ দেওয়া হচ্ছিল। তবে ভারতবর্ষে ইংরিজি জানা মূর্খদের আত্মবিশ্বাস বেশি। তাই সেই মূর্খরা কেউ কেউ আবার যিনি শুধরে দেওয়ার চেষ্টা করছেন তাঁকেই ভুল প্রমাণ করার চেষ্টা করছিল। ব্যাপার দেখে হাসা উচিত না কাঁদা উচিত তা বুঝতে না পারলেও, এটুকু বুঝে গিয়েছিলাম যে বাঙালি সংস্কৃতির ধারক ও বাহক যে ভদ্রলোক শ্রেণি, তাদের ভবিষ্যৎ ঝরঝরে হয়ে গেছে। আজ অমিত মালব্যকে যতই গালাগালি দিন, একথা নিশ্চিত হয়ে বলার উপায় নেই যে তাঁর ওই গণ্ডমূর্খ পোস্টের যুক্তিগুলো কোনো ইংরিজি শিক্ষিত বাঙালি ভদ্রলোকেরই জুগিয়ে দেওয়া নয়।

এই ভদ্রলোক-ভদ্রমহিলাদের অতি পছন্দের একখানা ধর্মীয় সংগঠন আছে, যাকে তাঁরা ধর্মনিরপেক্ষ সংগঠন বলে ভাবতে ভালবাসেন (মানে আমড়াকে আম বলে ভাবতে ভালবাসেন) – রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশন। রাজকাহিনীর গান নিয়ে ভদ্রলোক শ্রেণির রাজবোকামির দেড় দশক আগে ওই সংগঠন পরিচালিত একটা কলেজের পড়ুয়া ছিলাম। আমার সহপাঠী ছিল মঠের ভিতরেই গড়ে ওঠা, সন্ন্যাসীদের দ্বারা পরিচালিত বেদ বিদ্যালয়ে ছোট থেকে লেখাপড়া করে আসা কয়েকজন ছাত্র। তারা জনগণমন গাইত সংস্কৃত উচ্চারণে। আমরা কয়েকজন ছাত্র মিলে একদিন তাদের জিজ্ঞেস করলাম ‘ওরকম উচ্চারণে গাস কেন?’ তারা অত্যন্ত গর্বের সঙ্গে জানাল, ওটা ছোট থেকে শিখেছে। ওটাই শুদ্ধ সংস্কৃত উচ্চারণ। আমরা জিজ্ঞেস করলাম ‘বাংলা গানের উচ্চারণ সংস্কৃতের মত হবে কেন?’ তারা কিছুতেই মানতে রাজি হল না যে গানটা বাংলায় লেখা। নির্ঘাত তারা আজও জাতীয় স্তোত্র গাওয়ার প্রয়োজন হলে ‘শুদ্ধ সংস্কৃত’ উচ্চারণেই গায়। এরা কেউ কিন্তু প্রান্তিক পরিবারের সন্তান নয়, হিন্দিভাষীও নয়। গ্রাম, শহর – দুরকম জায়গার ছেলেই ছিল সেই দলে। সত্যি কথা বলতে, কেবল এরা নয়। আইসিএসই বা সিবিএসই স্কুলে পড়ে আসা বাঙালি সহপাঠীদেরও দেখেছি সংস্কৃত উচ্চারণে জনগণমন গাইতে। অর্থাৎ আজ থেকে বছর তিরিশেক আগেই বাংলা ভাষা কোনটা, বাঙালি কারা – সে বোধ ভদ্রলোক শ্রেণি হারিয়েছে। ফলে আজ যে বাঙালি সাহিত্যিক, অধ্যাপকদের দেখা যাচ্ছে ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়াররা আক্রান্ত না হলে বাংলা ভাষার উপর আক্রমণ হচ্ছে তা বিশ্বাস না করতে, বা বাঙালি প্রবাসী শ্রমিকদের উপর আক্রমণকে বাঙালিদের উপর আক্রমণ বলে না ধরতে – তাতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। এটাই অনিবার্য ছিল।

এখন কথা হচ্ছে, এমনটা হল কেন? বাংলা ভাষা, সংস্কৃতির লাগাম তো চিরকালই এই ভদ্রলোকদের হাতেই থেকেছে। দুই বাংলা ভাগ হওয়ার পরে তো আরওই। বাংলা সিনেমার যত বিখ্যাত অভিনেতা, অভিনেত্রীর নাম মনে করতে পারেন তাদের কজন হিন্দু নিম্নবর্গীয় বা মুসলমান? পাকিস্তান ভেঙে বাংলাদেশ হওয়ার পরে দু-চারজন মুসলমান অভিনেতা, অভিনেত্রী পশ্চিমবঙ্গে অভিনয় করেছেন বটে, কিন্তু মুসলমান চরিত্র কটা এপারের বাংলা সিনেমায়? মুসলমান সমাজের গল্পই বা কটা? পশ্চিমবঙ্গের বাংলা পত্রপত্রিকার সম্পাদক, সাহিত্যিকদের মধ্যে খুঁজতে গেলেও ঘুরে ফিরে সেই প্রাক-স্বাধীনতা যুগের মীর মোশাররফ হোসেন, কাজী নজরুল ইসলাম, জসীমউদ্দিন, সৈয়দ মুজতবা আলী, এস ওয়াজেদ আলী বা একটু পরের সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজের নাম আসবে। কিছু নিবিষ্ট পাঠক হয়ত আবুল বাশার বা আফসার আহমেদের নাম মনে করতে পারবেন। জনপ্রিয় গাইয়ে, বাজিয়েদের মধ্যেও সেই ইংরিজি শিক্ষিত বামুন, কায়েত, বদ্যিরাই বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ। শিক্ষক, অধ্যাপক, ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, উকিল, সাংবাদিক, রাজনীতিবিদ – যেদিকে তাকাবেন সেদিকই তো ভদ্রলোকরা আলো করে আছেন। তাহলে এ অবস্থা হল কেন? স্পষ্টতই পূর্বসুরিরা পতাকা যাদের হাতে দিয়েছেন তাদের বহিবার শকতি দেননি। কিন্তু কেন দেননি, বা দিতে পারেননি?

বামফ্রন্ট সরকার প্রাথমিক স্কুল থেকে ইংরিজি তুলে দেওয়ার জন্যে ভদ্রলোকেরা বেসরকারি ইংরিজি মাধ্যম স্কুলে ছেলেমেয়েদের ভর্তি করতে বাধ্য হন আর তা থেকেই শিক্ষিত বাঙালির সঙ্গে বাংলা ভাষার বিযুক্তি শুরু, কারণ ইংরিজিটা তো শিখতেই হবে। নইলে কাজকর্ম পাওয়া যায় কী করে? ওটাই তো কাজের ভাষা।

এরকম একটা তত্ত্ব প্রায়শই খাড়া করা হয়। এই তত্ত্ব নজর করার মত। শিক্ষা মাতৃভাষাতেই হওয়া উচিত – একথা আমাদের রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, সত্যেন্দ্রনাথ বসু থেকে শুরু করে গোটা দুনিয়ার অনেক বড় বড় পণ্ডিত বলেছেন। আবার বিপক্ষেও যুক্তি আছে। সে বিতর্কে না গিয়ে একথা মেনে নেওয়া যাক যে, কোনো ভাষা কাজের ভাষা হয়ে না থাকলে গুরুত্ব হারায়। বামফ্রন্ট সরকার মাতৃভাষার উপর জোর দিলেও বাংলাকে গোটা রাজ্যের কাজের ভাষা করে তোলার পর্যাপ্ত উদ্যোগ নেয়নি। পাশাপাশি ভারতের মত বহুভাষিক দেশে ইংরিজির গুরুত্ব বিশ্বায়নের সঙ্গে সঙ্গে বেড়েছে এবং ভদ্রলোকরা বাংলা ভাষাকে ক্রমশ ত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছেন – একথা তর্কের খাতিরে নাহয় মেনে নেওয়া গেল। কিন্তু কথা হচ্ছে, বাঙালি ভদ্রলোকদের ছেলেমেয়েরা তো ইংরিজি মাধ্যম স্কুলে পড়ছে বিংশ শতাব্দীর গোড়া থেকেই। যাঁর বই ছেলেমেয়ের হাতে তুলে না দিলে আজও এমনকি অনাবাসী বাঙালিদেরও ‘বাংলার সংস্কৃতি শেখাচ্ছি না’ ভেবে অপরাধবোধ হয়, সেই লীলা মজুমদার নিজেই কনভেন্টের ছাত্রী ছিলেন। তা ইংরিজি মাধ্যম স্কুলে ভর্তি করলেই ছেলেমেয়েকে বাংলা বইপত্তর পড়ানো, বাংলা গান শোনানো, সিনেমা দেখানো, নাটক দেখানো তুলে দিতে হবে – এ নিয়ম কি বামফ্রন্ট সরকারের তৈরি? আগেকার বাঙালির অমন করার দরকার পড়েনি, হঠাৎ বামফ্রন্ট সরকার প্রাথমিক শিক্ষা থেকে ইংরিজি তুলে দিতেই দরকার পড়ল?

সত্যি কথা বলতে, সিপিএম ক্রমশ ভদ্রলোকদের পার্টি হয়ে যাওয়ায় বামফ্রন্টও মেহনতি মানুষের সরকার থেকে ভদ্রলোকদের সরকারেই পরিণত হয়েছিল নয়ের দশকের শেষার্ধে। তাই ভদ্রলোকদের ইংরিজি নিয়ে হাহুতাশের প্রভাবে এই সহস্রাব্দের গোড়ায় কিন্তু প্রাথমিকে ইংরিজি ফিরিয়েও এনেছিল। তারপর কি ভদ্রলোকেরা ছেলেমেয়েদের সরকারি প্রাথমিক স্কুলে ফিরিয়ে এনেছিলেন? মোটেই না। উলটে মাধ্যমিক স্তরেও বেসরকারি স্কুলে ভর্তি করার ঝোঁক বেড়ে গিয়েছিল। এখন নাহয় এসএসসি কেলেঙ্কারি ইত্যাদি যুক্তি দিয়ে বলা যায় সরকারি স্কুলগুলো পড়াশোনার অনুপযুক্ত হয়ে গেছে। বাম আমলে তো প্রতিবছর এসএসসি পরীক্ষা হত, রাজ্যের আনাচে কানাচে গজিয়ে ওঠা ইংরিজি মাধ্যমের স্কুলগুলোর মাস্টারদের চেয়ে অনেক কঠিন প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষা দিয়ে মাস্টারমশাই, দিদিমণিরা সরকারি বাংলা মাধ্যম স্কুলগুলোতে যোগও দিতেন। ত্রুটি থাকলেও স্কুলের পরিকাঠামো নিয়ে, পড়াশোনা নিয়ে তখনকার সরকারের আগ্রহ যে বর্তমান সরকারের চেয়ে বেশি ছিল – তা আজকাল অনেক তৃণমূল কংগ্রেস সমর্থকও স্বীকার করেন। তাহলে?

এই প্রশ্নের উত্তর দিতে গেলে আসলে বাঙালি ভদ্রলোকের অভদ্রতা প্রকাশ হয়ে পড়বে। বহু ভদ্রলোকের কাছেই আপত্তিকর ছিল বাম আমলে মুটে, মজুর, রিকশাওয়ালা, বাড়ির কাজের লোক, মুচি, মেথরের ছেলেমেয়েদের তাদের ছেলেমেয়েদের সঙ্গে একই স্কুলে ঢুকে পড়া। আরও বেশি গায়ে লাগত যখন তারা কেউ নিজের ছেলেমেয়ের চেয়ে পরীক্ষায় বেশি নম্বর পেয়ে যেত। পরীক্ষার ফল বেরোবার পর আমাদের অনেককেই বকুনি খেতে হয়েছে ‘তোর লজ্জা করে না? অমুকের বাড়িতে কোনোদিন কেউ স্কুলের গণ্ডি পেরোয়নি, আর ও অঙ্কে ৮৫ পেয়ে গেল। তুই মাস্টারের ছেলে হয়ে ৫৫? ছিঃ!’ মাস্টারের ছেলে বড় হয়ে মাস্টার; ডাক্তারের ছেলেমেয়ে তো বটেই, ছেলের বউ আর জামাইও ডাক্তার; উকিলের ছেলেমেয়ে উকিল; মুদির ছেলে মুদি, তার মেয়ে অন্য ছোট ব্যবসায়ীর গৃহবধূ; রিকশাওয়ালার ছেলে সবজিওয়ালা – এই সামাজিক স্থিতাবস্থায়, গোবলয়ের লোক বলে বাঙালি ভদ্রলোক যাদের দিকে তাকিয়ে নাক সিঁটকোয়, তাদের মত নিজেরাও অভ্যস্ত ছিল। সেই স্থিতাবস্থা ঘেঁটে যাওয়ার সামান্য সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল বাম আমলে। ওটুকুই ভদ্রলোকদের পক্ষে শিশুর আত্মার উপর নরকের দুঃস্বপ্নের মত হয়ে দাঁড়িয়েছিল। এই দুঃস্বপ্ন থেকে মুক্তি পাওয়ার পথ তারা খুঁজে পায় অনেক টাকা মাইনের বেসরকারি স্কুলে। নয়ের দশক থেকে মনমোহনী অর্থনীতির জোরে বাঙালি ভদ্রলোকের জীবনে আমূল পরিবর্তন এসে যায়। তাদের হাতে এসে গেল খরচ করার মত অতিরিক্ত টাকা। ফলে ছোটলোকের ছেলেপুলের সঙ্গে এক স্কুলে পড়ানোর আর দরকার রইল না। পাঠিয়ে দাও ফেলো কড়ি মাখো তেল স্কুলে। এমনকি বামফ্রন্ট সরকারের বদান্যতায় উচ্চমধ্যবিত্ত হয়ে ওঠা সরকারি স্কুলের মাস্টারমশাই, দিদিমণিরাও নিজেদের ছেলেমেয়েকে ইংরিজি মাধ্যম স্কুলে পাঠানো শুরু করেন তখনই। সংখ্যাটা অবশ্যই এখন অনেক বেড়েছে, তার পিছনে বর্তমান সরকারের শিক্ষাজগৎ নিয়ে ছেলেখেলার অবদান কম নয়। কিন্তু আসল কথা হল, ‘ইংরিজি শিখতে হবে বলে ইংরিজি মাধ্যম স্কুলে পড়াচ্ছি’ – এটা স্রেফ অজুহাত। দুর্বল অজুহাত। সেটা বুঝতে পেরেই যুক্তি জোরদার হবে মনে করে নয়ের দশকে অনেক বাবা-মা বলতেন ‘ইংরিজি বলা শিখতে হবে। নইলে কম্পিটিশনে দাঁড়াতে পারবে না। তাই ইংলিশ মিডিয়ামে দিয়েছি।’ এও ভারি মজার কথা। স্কুলটা কি তাহলে ‘স্পোকেন ইংলিশ’ শেখার জায়গা? ওটা জানলেই চাকরিবাকরি পাওয়া যায়? চোস্ত ইংরিজি বলতে পারলেই অঙ্ক, বিজ্ঞান, ভূগোল, ইতিহাস – সব শেখা হয়ে যাবে? অধিকাংশ বাঙালি ভদ্রলোক কিন্তু তেমনই মনে করে আজও। কথা বললেই টের পাওয়া যায়। তবে আজকাল একটা নতুন ব্যাপার ঘটেছে। ইংরেজ আমলে বাঙালি ভদ্রলোকের জীবনের লক্ষ্য ছিল যতটা সম্ভব ইংরেজ হওয়া, স্বাধীনতার পর থেকে – অনাবাসী ভারতীয় হওয়া। আজকের বাঙালি ভদ্রলোকের জীবনে একটা নতুন লক্ষ্য যোগ হয়েছে – মাড়োয়ারি বা গুজরাটি হওয়া। তাই ছেলেপুলেকে ইংরিজি মাধ্যমে পড়িয়ে ইংরিজি বলা শিখিয়েই সে খুশি নয়, দ্বিতীয় ভাষা হিসাবে হিন্দিও গুঁজে দিচ্ছে। সুতরাং বাংলা মাঠের বাইরে। গল্পের বই পড়ার এবং পড়ানোর চল বাঙালি ভদ্রলোক বাড়ি থেকে উঠে গেছে বহুকাল, এখন আবার বাবা-মায়েরা খেয়াল রাখেন, ছেলেমেয়ে যেন বাংলা সিরিয়াল বা সিনেমা দেখে না ফেলে।

এমতাবস্থায় বাংলা ভাষা-সংস্কৃতি কী, কোনটা তার অঙ্গ আর কোনটা নয় – তা নিয়ে স্পষ্ট ধারণা থাকবে কোন চুলোয়? সংজ্ঞাগুলো ঠিক করে দিয়েছি আমরা ভদ্রলোকরা। আমাদের সংজ্ঞায়িত বাংলা ভাষা-সংস্কৃতিকে আমরাই বাংলার বাইরে বাংলা বলে পরিচিত হতে দিইনি, ওগুলোকে আমাদের সংস্কৃতির বৃত্তে জায়গাই দিইনি। কলকাতা ও সংলগ্ন এলাকার ভাষায় লেখা গান আমাদের ‘আধুনিক গান’। বাঙাল ভাষার গানকে তখনই বাংলা গান বলে মেনেছি যখন শচীন দেববর্মণের মত রাজপুত্র গেয়েছেন। গ্রামের মানুষের নিজের গানকে লোকগীতি বলে আলাদা বাক্সে রেখেছি। পনিটেল বাঁধা শহুরে ভদ্রলোকরা গিটার বাজিয়ে ব্যান্ড বানিয়ে গাইলে তবেই সে গানের জায়গা হয়েছে প্রেসিডেন্সি, লেডি ব্র্যাবোর্ন বা যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস মোচ্ছবে। আচ্ছা তাও নাহয় মেনে নেওয়া গেল। কিন্তু নিজেরা যাকে বাংলা ভাষা, বাঙালি সংস্কৃতি বলে দেগে দিয়েছি তাকে সমাজের নিচের তলায় ছড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টাও কি করেছি? ফিল্ম সোসাইটি বানিয়ে ঋত্বিক ঘটকের উদ্বাস্তুদের নিয়ে তৈরি ছবি দেখেছি আর প্রবন্ধ লিখেছি। পরবর্তীকালে বাংলাদেশ থেকে চলে আসা উদ্বাস্তু, যারা এখানে এসে পেটের দায়ে আমাদের বাড়িতে বাসন মাজে বা ঘর ঝাঁট দেয় – তাদের দেখানোর তো চেষ্টা করিনি। সত্যজিৎ রায় বিশ্ববন্দিত পরিচালক বলে জাঁক করেছি, কিন্তু পথের পাঁচালী-র হরিহর রায়ের পরিবারের মত হতদরিদ্র বাঙালিকে ওই ছবি দেখানোর কোনো প্রয়াস তো আমাদের ছিল না। কারণ আমরা নিশ্চিত ছিলাম – ওরা ওসব বুঝবে না। ওদের জন্যে বেদের মেয়ে জ্যোৎস্না-ই ঠিক আছে। ঘটনা হল, যার দুবেলা পেট ভরে ভাত জোটে না, তারও মনের খিদে থাকে এবং সে খোরাক খুঁজে নেয়। বাংলার গরিব মানুষ, নিম্নবর্গীয় মানুষও তাই করেছে। আমাদের তৈরি সংস্কৃতি যখন তাদের পোষায়নি তখন তারা হিন্দি সিনেমা, হিন্দি গানে মজেছে। অধুনা ইউটিউব শর্টস আর ইনস্টা রিলসে। আমাদের অ্যাকাডেমি, আমাদের নন্দন নিয়ে আমরাই বুঁদ ছিলাম। ও জিনিস আজ কেউ বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দিলেই বা ওদের কী? এদিকে আমরা, বিশ্বায়িত ভদ্রলোকরাও, হিন্দি ভাষা-সংস্কৃতির দিকে ঝুঁকেছি। ইংরিজি তো ছিলই। ফলে এখন হঠাৎ আবিষ্কার করছি – হিন্দি-হিন্দু-হিন্দুস্তান তত্ত্বের প্রবক্তারা বলে দিচ্ছে বাংলা বলে আসলে কোনো ভাষা নেই, আর সেটাকেই ঠিক বলছেন বাংলা ভাষায় বইপত্তর লিখে নাম করে ফেলা লেখকরা।

নবজাগরণই বলি আর সমাজ সংস্কার আন্দোলনই বলি, উনিশ শতকে সেই প্রক্রিয়ার মধ্যে দিয়ে আলোর সন্ধান যে বাঙালি ভদ্রলোক পেয়েছিল তা অনস্বীকার্য। কিন্তু আলো বাড়াতে গেলে আলো ছড়াতে হয়। ভদ্রলোকরা কী করেছে? প্রদীপ নিজের ঘরেই রেখে দিয়েছে, হাতে নিয়ে যাদের ঘরে আলো নেই তাদের কাছে যায়নি, তারা আমাদের প্রদীপ থেকে নিজেদের প্রদীপ জ্বালিয়ে নিতে পারেনি। এখন আমাদের প্রদীপের আয়ু ফুরিয়ে এসেছে, তাই চারপাশ অন্ধকারে ডুবে যেতে বসেছে। আসলে আমাদের বাংলা ভাষা চর্চা, সংস্কৃতি চর্চা বা যে কোনো চর্চাই বহুকাল হল প্রদর্শনীতে পরিণত হয়েছে। ওর মধ্যে ঘাম ঝরানোর কোনো ব্যাপার নেই, তাই ও থেকে আমাদের কোনো অর্জনও নেই। কেন এমন হল? ভাবতে গেলে জ্যোতি ভট্টাচার্য ‘কালচার’ ও ‘সংস্কৃতি’ প্রবন্ধে যে গোলমালের কথা বলেছেন সেটাই মনে পড়ে যাচ্ছে। একবার পড়ে দেখা যাক

ইংরেজি ভাষা থেকে ‘কালচার’ শব্দটার আমরা বাংলা পরিভাষা করেছি ‘সংস্কৃতি’। ঠিক পরিভাষা কী হওয়া উচিত – ‘সংস্কৃতি’ না ‘কৃষ্টি’, তা নিয়ে বিসংবাদ হয়েছে এককালে। রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, ‘কৃষ্টি’ শব্দটা বাংলা ভাষায় কুশ্রী অপজনন। ‘তাসের দেশ’ নাটকে শব্দটা নিয়ে কৌতুকও করেছিলেন রবীন্দ্রনাথ। তারপরে ‘কৃষ্টি’ শব্দটা ক্রমে লোপ পেয়েছে, ‘সংস্কৃতি’-ই ব্যবহারসিদ্ধ লোকগ্রাহ্য শব্দ হয়ে উঠেছে।

…

ইংরেজরা ‘কালচার’ শব্দটা নিয়েছিল লাটিন ভাষা থেকে। লাটিন ভাষায় শব্দটার প্রধান অর্থ ছিল কৃষিকর্ম, ‘এগ্রিকালচার’ শব্দের মধ্যে সেই প্রধান অর্থ বাহিত হচ্ছে। এই কারণেই বাংলায় কেউ কেউ ‘কৃষ্টি’ বলতে চেয়েছিলেন, কর্ষণের সঙ্গে তার সম্পর্ক। কৃষিকর্মে কর্ষিত ক্ষেত্রে বীজ বপন করে নতুন শস্য উৎপাদন করা হয়…চিকিৎসাবিজ্ঞানে রোগজীবাণুর প্রতিষেধক জীবাণু ‘কালচার’ করে তৈরি করা হয়; রক্তে রোগজীবাণু বা ক্ষতিকর কোনো পদার্থ থাকলে অণুবীক্ষণে তা দেখতে হলে অনেক সময় রক্তবিন্দুর ‘কালচার’ করে তাকে বর্ধিত করতে হয়। মোট কথা ‘কালচার’ শব্দটার মধ্যে কর্ষণ বা অনুশীলনের দ্বারা নতুন বস্তু অথবা নতুন গুণ সৃষ্টি ইঙ্গিত রয়েছে, এর ঝোঁক উৎপাদনমুখী। কোনো না কোনো রকম বৃদ্ধি এর ফল।

আমাদের ‘সংস্কৃতি’ শব্দটির শব্দার্থগত ঝোঁক কিন্তু এরকম নয়। এর প্রধান অর্থ রূঢ় অবস্থা থেকে মার্জিত অবস্থায় আনয়ন, স্থূল অবস্থা থেকে বাহুল্যবর্জিত করে সূক্ষ্ম অবস্থায় আনয়ন। নতুন বস্তু সৃষ্টি, নতুন গুণ উৎপাদন, বা সংখ্যাবৃদ্ধি এর অভীপ্সিত লক্ষ্য নয়, যা আছে তাকেই একটা পরিশীলিত সংযত সুসমঞ্জস সুকুমার রূপদান এর লক্ষ্য। ‘সংস্কৃতি’ শব্দটির এই প্রধান ঝোঁক আমাদের আজকের পরিস্থিতিতে খানিকটা বাধাস্বরূপ হয়ে উঠছে – এরকম আশঙ্কা করছি।

পঞ্চাশ বছরেরও বেশি আগে লেখা এই কথাগুলো আজ আবার ভাবাচ্ছে। কারণ সংস্কৃতি শব্দের প্রধান ঝোঁক এখন আর খানিকটা বাধা নয়, গভীর কুয়োর দেওয়াল হয়ে গেছে দেখা যাচ্ছে। সেই কুয়োর ব্যাং হয়ে গেছি আমরা ভদ্রলোকরা; বাইরে রয়ে গেছে বাঙালি মুসলমান, বাঙালি নিম্নবর্গীয় হিন্দু এবং সাধারণভাবে, গরিব বাঙালি। কৃষ্টি শব্দটায় রবীন্দ্রনাথ প্রবল আপত্তি করেছিলেন বটে, তবে ভদ্রলোকদের কূপমণ্ডূকতা ধরে ফেলতে তাঁরও ভুল হয়নি। বঙ্গভঙ্গ রদের আন্দোলনে প্রথমে নেতৃত্ব দিয়েও তাই সরে গিয়েছিলেন। কারণ ফাঁকিবাজিটা ধরে ফেলেছিলেন। পরেও তাঁর লেখাপত্রে ভদ্রলোকি চালাকির আবরণ উন্মোচন করেছেন বারবার। ‘হিন্দু-মুসলমান’ প্রবন্ধে যেমন লিখেছেন

অল্পবয়সে যখন প্রথম জমিদারি সেরেস্তা দেখতে গিয়েছিলুম তখন দেখলুম, আমাদের ব্রাহ্মণ ম্যানেজার যে তক্তপোষে গদিতে বসে দরবার করেন সেখানে এক ধারে জাজিম তোলা, সেই জায়গাটা মুসলমান প্রজাদের বসবার জন্যে; আর জাজিমের উপর বসে হিন্দু প্রজারা। এইটে দেখে আমার ধিক্কার জন্মেছিল। অথচ এই ম্যানেজার আধুনিক দেশাত্মবোধী দলের। ইংরেজরাজের দরবারে ভারতীয়ের অসম্মান নিয়ে কটুভাষাব্যবহার তিনি উপভোগ করে থাকেন, তবু স্বদেশীয়কে ভদ্রোচিত সম্মান দেবার বেলা এত কৃপণ। এই কৃপণতা সমাজে ও কর্মক্ষেত্রে অনেকদূর পর্যন্ত প্রবেশ করেছে; অবশেষে এমন হয়েছে যেখানে হিন্দু সেখানে মুসলমানের দ্বার সংকীর্ণ, যেখানে মুসলমান সেখানে হিন্দুর বাধা বিস্তর।

এই ম্যানেজারই বাঙালি ভদ্রলোকের সংস্কৃতি আর কৃষ্টির তফাতের প্রমাণ। এঁর দেশাত্মবোধ হল প্রদর্শনী। ওটার নির্দিষ্ট মঞ্চ আছে, সেখানে নিজের পরিশীলিত দেশাত্মবোধ প্রমাণ করতে ওটা কাজে লাগে। কিন্তু নিজের জীবনে মেনে চলার, মুসলমানও যে তাঁর সমান ভারতীয় তা স্বীকার করার এবং অনুশীলন করার দায় নেই। এমন চরিত্রই এখন হাজারে হাজারে আমাদের চারপাশে ঘুরে বেড়াচ্ছে। রবীন্দ্রনাথ এই প্রবন্ধ লিখেছিলেন স্বাধীনতার আগে। স্বাধীনোত্তর ভারতে আবার সারা দেশের উদারপন্থী এবং বাঙালি ভদ্রলোকদের নিজেকে সংস্কৃতিবান প্রমাণ করতে ধর্মনিরপেক্ষ হওয়া আবশ্যিক হয়ে দাঁড়িয়েছিল। এখন দেশের রাজনীতি বদলে যাওয়ায়, পরিবেশ বদলে যাওয়ায় ওটা আর আবশ্যিক নয়। তাই এই ম্যানেজারবাবুর মনের কথা তিলোত্তমা মজুমদার, পবিত্র সরকারদের মুখে উঠে এসেছে, যার মর্মার্থ হল – ভদ্রলোকরাই বাঙালি। মুসলমানরা বাঙালি নয়। ভদ্রলোকদের উপর আক্রমণ হলে তবেই বলা চলে বাংলা ভাষার উপর আক্রমণ হয়েছে, মুসলমানদের উপর আক্রমণ বাংলা ভাষার উপর আক্রমণ নয়।

এ হল বাঙালি ভদ্রলোকের অন্তত দুশো বছর ধরে আপন মনের মাধুরী মিশায়ে তৈরি সত্য। এর সঙ্গে বাস্তবের কোনো সম্পর্ক নেই। এই তিলোত্তমা, এই পবিত্র, এই সঙ্গীতা বন্দ্যোপাধ্যায়রাই একুশে ফেব্রুয়ারি এসে পড়লে গদগদ উত্তর-সম্পাদকীয় প্রবন্ধ লেখেন বাংলা ভাষা নিয়ে। কিন্তু এখন বোঝা যাচ্ছে, ওগুলো সব প্রদর্শনী। আজকাল যাকে বাংলায় বলে ‘পারফরম্যান্স’। মনের কথা হল – একুশের ভাষা শহিদরা কেউ বাঙালি নয়, তারা ভদ্রলোকদের বাংলা ভাষার জন্যে প্রাণ দিয়েছিল মাত্র। ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধেও এঁরা বিস্তর লেখালিখি, বলাবলি করে চলেছেন সেই ২০১৪ সাল থেকে। কিন্তু স্পষ্টতই ওসবও পারফরম্যান্স। নইলে বিশাল বিশাল গেটওয়ালা আবাসনে থাকা এবং শীতাতপনিয়ন্ত্রিত গাড়িতে চড়া লেখক, বুদ্ধিজীবীরা কী করে বলেন যে এই বাংলায় হঠাৎ চতুর্দিকে প্রচুর নতুন লোক দেখতে পাচ্ছেন, যাদের সঙ্গে বাঙালিদের কোনো সংস্কৃতিগত মিল নেই? কোনো পরিসংখ্যানই এই সত্য প্রতিষ্ঠা করে না। এ যে নাজিদের আতঙ্ক সৃষ্টির ধ্রুপদী কৌশল, তা না জানার মত কম লেখাপড়া এঁদের নয়। উপরন্তু, যদি তর্কের খাতিরে ধরেও নেওয়া যায় চারপাশটা বাংলাদেশি এবং রোহিঙ্গায় ভরে গেছে, তাহলেই বা তাদের সঙ্গে এই ভদ্রমহিলা, ভদ্রলোকদের সংস্কৃতিগত মিলের অভাব হয় কী করে? অনেক বেশি অমিল তো হওয়ার কথা কলকাতা ও শহরতলিতে দ্রুত বেড়ে চলা বহুতলগুলোর বাসিন্দা হয়ে আসা হিন্দিভাষীদের সঙ্গে, যাদের অনেকেই আমিষের গন্ধ পেলে নাক কোঁচকায়। তাদেরই রাজ্যে কাজ করতে যাওয়া পশ্চিমবঙ্গের হিন্দু ও মুসলমান প্রবাসী শ্রমিকদের বাংলাদেশি দেগে দিয়ে কোনো আইনকানুনের তোয়াক্কা না করে, বৈধ কাগজপত্রকে পাত্তা না দিয়ে মারধোর করা হচ্ছে, পে লোডার দিয়ে বাংলাদেশে ছুড়ে ফেলা হচ্ছে।

এই তথাকথিত বুদ্ধিজীবীরা অবশ্য রোগ নন, রোগাক্রান্তের নমুনা। এই রোগে আমাদের আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধব অনেকেই আক্রান্ত। আমাদের যে কোনো একজনকে দেখলেই বোঝা যায়, বাঙালি ভদ্রলোকের কূপমণ্ডূকতা এবং নীতিহীনতা ঐতিহাসিক হলেও, গত অর্ধ দশকে বিশেষ অবনমন হয়েছে। ১৯৪৭ সালে পশ্চিমবঙ্গের ভদ্রলোকদের সংখ্যাগরিষ্ঠের মানসিকতা এরকম থাকলে বাঙালরা উদ্বাস্তু হয়ে এদেশে এসে হয় অনাগরিক বেগার শ্রমিকে পরিণত হত, বা ভিক্ষা করতে করতে অনাহারে মারা যেত। সেক্ষেত্রে ১৯৭১ সালেও পশ্চিমবঙ্গের বাঙালিরা ভারত সরকারকে বাংলাদেশের পাশে দাঁড়াতে যুদ্ধে নামার প্ররোচনা দিত না (অশোক মিত্র লিখিত আপিলা-চাপিলা দ্রষ্টব্য), সাধারণ মানুষের মধ্যে মুক্তিযুদ্ধের প্রতি আবেগ তৈরি হত না, বাঙালরা আরও এক দফা উদ্বাস্তু হওয়ার ধাক্কা সামলে এদেশে থিতু হতে পারত না।

মজার কথা, এখন ভদ্রলোকদের যে অংশের বাংলাদেশি অনুপ্রবেশের চিন্তায় রাতে ঘুম হচ্ছে না, তাদের অনেকে দ্বিতীয়, তৃতীয় বা চতুর্থ প্রজন্মের বাঙাল। এরা বুঝতে পারছে না, বা রিপাবলিক টিভি দেখে দেখে এত অন্ধ হয়ে গেছে যে বুঝতে চাইছে না, যে ভাষাকে বাংলাদেশি ভাষা বলে আজ চালাচ্ছে বিজেপি, সেই ভাষা অনেকাংশে তাদের মা-দিদিমার ভাষা। ওই ভাষাকে অস্বীকার করলেও ওই পরিচিতি যাওয়ার নয়। আগামীদিনে এ কার্ড ও কার্ড সে কার্ড – কোনো কার্ড দিয়েই নিজের নাগরিকত্ব প্রমাণ করে ওঠা যাবে না। কারণ কোনটা নাগরিকত্বের প্রমাণ সেটা ঠিক করে রাষ্ট্র। আর ভারত রাষ্ট্রের এই মুহূর্তে প্রকল্প হল বাঙালিদের অনাগরিক প্রমাণ করা।

ভদ্রলোকের ছেলেমেয়েদের স্মৃতিশক্তি তাজা করে দেওয়ার জন্যে বলি, সেই বামফ্রন্ট আমল থেকে – যখন তৃণমূল কংগ্রেস নেত্রী মমতা ব্যানার্জি প্রথম অভিযোগ তোলেন যে বাংলাদেশ থেকে লোক ঢুকিয়ে ভোটে জেতে বামেরা – বঙ্গ বিজেপির বক্তব্য ছিল, বাংলাদেশ থেকে আসা হিন্দুদের শরণার্থী ধরে নিয়ে আশ্রয় দিতে হবে এবং মুসলমানদের অনুপ্রবেশকারী ধরে নিয়ে শাস্তি দিতে হবে, ফেরত পাঠাতে হবে। অধুনা সোশাল মিডিয়ার বাইরে অপ্রাসঙ্গিক হয়ে যাওয়া তথাগত রায় যখন বঙ্গ বিজেপির সভাপতি ছিলেন, তখন তিনি একাধিক টিভি বিতর্কে বসে একথা বলেছেন। নরেন্দ্র মোদী সরকার যে নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন (সিএএ) পাশ করে ২০১৯ সালে, তার মর্মবস্তুও এটাই। সে কারণেই এ রাজ্যের হিন্দুদের, বিশেষত ভদ্রলোকদের, ওই আইন খুব পছন্দ হয়েছিল। মতুয়াদের মত বাংলাদেশ থেকে অত্যাচারিত হয়ে চলে আসা নিম্নবর্গীয় জনগোষ্ঠীর মানুষও ওই আইন পাশ হওয়ায় উল্লসিত হয়েছিলেন। কিন্তু একটা প্রশ্নের উত্তর না বিজেপি দিতে চায়, না সম্প্রতি বিজেপি সমর্থক হয়ে ওঠা পশ্চিমবঙ্গবাসী তৃতীয়-চতুর্থ প্রজন্মের বাঙাল ভদ্রলোকরা। প্রশ্নটা হল, শরণার্থীদের আশ্রয় দেওয়া এবং নাগরিকত্ব দেওয়ার মত মানবিক প্রকল্পের ‘কাট-অফ ডেট’ থাকবে কেন? সিএএ অনুযায়ী নাগরিকত্ব পাওয়ার ‘কাট-অফ ডেট’ হল ৩১ ডিসেম্বর ২০১৪। এর মানে কী? ওই তারিখের পরে কি বাংলাদেশে হিন্দু নির্যাতন বন্ধ হয়ে গেছে? নাকি ওর পরে যে হিন্দুরা নির্যাতিত হচ্ছে তারা মায়ের ভোগে যাক – এটাই হিন্দু দরদি বিজেপি এবং ভারতের নাগরিকত্ব এতদিনে অধিকারে পরিণত হয়ে গেছে বলে মনে করা বাঙাল ভদ্রলোকদের মনের কথা? এ প্রশ্ন করলেই বিজেপি নেতা তরুণজ্যোতি তিওয়ারি থেকে শুরু করে বাঙাল ভাষা বলতে না পারা সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার বাঙাল, সকলেই এক সুরে ঝাঁঝিয়ে ওঠে ‘যে আসবে তাকেই থাকতে দিতে হবে? দেশটা ধর্মশালা নাকি?’

এখন কথা হচ্ছে, এই আজকের বাঙালদের পূর্বপুরুষরা যখন ভিটেমাটি চাটি হয়ে এপারে চলে এসেছিলেন অধুনা বাংলাদেশ থেকে, তখন কি দেশটা ধর্মশালা ছিল? তখনকার শাসকরা মনে করেছিলেন – ছিল। ভাগ্যিস করেছিলেন, তাই আজকের বাঙাল ভদ্রলোকরা কলার তুলে এই প্রশ্ন করতে পারছেন। ওঁরা অবশ্য বলবেন ‘তখনকার পরিস্থিতি আর এখনকার পরিস্থিতি কি এক নাকি? ১৯৪৭ সালে তো একটা দেশকে আনতাবড়ি কেটে ভাগ করা হয়েছিল। আমাদের পূর্বপুরুষদের এই ভাগটার উপরে ততখানিই অধিকার, যতখানি আগে থেকেই এ ভাগে থাকা লোকেদের।’ ১৯৭১ সালে কিন্তু দেশভাগ-টাগ হয়নি। তখনো বাংলাদেশ থেকে আসা উদ্বাস্তুদের এ দেশের নাগরিকত্ব দেওয়া হয়েছিল। সেকথা মনে রাখলেও মানতেই হবে, যুক্তিটা সঠিক। কিন্তু মুশকিল হল, একবার যদি বিভাজনে হাততালি দেওয়া শুরু করেন, তখন দেখবেন অনেক চেপে রাখা বিভাজন বেরিয়ে পড়ছে। বাঙালরা এপারে চলে আসায় মোটেই পশ্চিমবঙ্গীয়রা (চলতি কথায় যাদের এদেশি বা ঘটি বলা হয়) সকলে খুব আপ্লুত হয়নি। ‘বাংলাদেশ থেকে লোক ঢুকছে পিলপিল করে, রোহিঙ্গায় চারপাশ ভরে গেছে’ – এই প্রোপাগান্ডায় আপনি যত ধুয়ো দিচ্ছেন, তত সেদিনের উদ্বাস্তুদের প্রতি বিদ্বেষ চেপে রাখা পশ্চিমবঙ্গীয়দের স্মৃতি তাজা হয়ে উঠছে। পশ্চিমবঙ্গে গত কয়েক বছরে আরএসএস-বিজেপির শক্তি বাড়ার পাশাপাশি ইস্টবেঙ্গল আর মোহনবাগান সমর্থকদের মধ্যে অনলাইন পা টানাটানির ভাষা যেভাবে বদলেছে, তা খেয়াল করলেই ব্যাপারটা স্পষ্ট হয়। অতএব বাঙাল ভদ্রলোক-ভদ্রমহিলাদের বোঝা উচিত যে তারা হিন্দিভাষীদের ‘রোহিঙ্গা’, ‘বাংলাদেশি’ বলে চিৎকারে যোগ দিয়ে নিজেদের ডিটেনশন ক্যাম্পের রাস্তা বানাচ্ছে।

বাড়াবাড়ি মনে হল কথাটা? আসামে এনআরসি-র সময়েও দেখেছিলাম সেখানকার বাঙাল ভদ্রলোকরা অনেকে বলছে ‘যে আসবে তাকেই থাকতে দিতে হবে? দেশটা ধর্মশালা নাকি?’ ঠিক এই কথাটাই যে হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে বাঙালিদের সম্পর্কে জাতিবিদ্বেষী অসমিয়াদের বক্তব্য, সেকথা তাদের খেয়াল ছিল না। খেয়াল হল, যখন এনআরসি থেকে বাদ পড়ে যাওয়া ১৯ লক্ষ মানুষের মধ্যে সাড়ে ১২ লক্ষ হিন্দু বেরোল এবং তার মধ্যে তারাও পড়ে গেল। নেলি গণহত্যার ইতিহাসও ওই ভদ্রলোকরা ভুলে থাকতে চেয়েছিল, কারণ ওতে যারা মরেছিল তারা মুসলমান। এখন আসামের বিভিন্ন ডিটেনশন সেন্টারে কারা দিন কাটাচ্ছে সেটা পশ্চিমবঙ্গে চতুর্দিকে রোহিঙ্গা দেখতে পাওয়া বাঙাল ভদ্রলোকরা একটু দেখে নিতে পারেন। পশ্চিমবঙ্গে এনআরসি করার পরিকল্পনা এখনো সরকারের নেই, কিন্তু এসআইআরের পরিকল্পনা বিলক্ষণ আছে। সেটাও একটা তালিকা, তারও থাকবে ‘কাট-অফ ডেট’। এসব ভদ্রলোকরা ভালই জানেন, কিন্তু কুয়োর ব্যাং তো কুয়োর বাইরের জগতের কথা জানতে পারলেও মানতে চায় না। যেমন নির্বাচন কমিশনের বানানো আরেকটা তালিকা – ভোটার তালিকা – কেমন হয় আজকাল সেকথা রাহুল গান্ধী চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিলেও ভদ্রলোকরা চোখ বন্ধ করে থাকতে পারে।

১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গবিরোধী আন্দোলনের সময়কার ভদ্রলোকদের ফাঁকিবাজিকে রবীন্দ্রনাথ চিহ্নিত করেছিলেন, নিন্দাও করেছিলেন। তবু মানতে হবে, সেই ভদ্রলোকদের অন্য সময়ে না হলেও বিপদের সময়ে বাঙালি মুসলমানদের সঙ্গে জোট বাঁধার বুদ্ধি ছিল। এখনকার ভদ্রলোক শ্রেণির মস্তিষ্ক এত উর্বর যে বিপদের সময়ে আরও বেশি করে নিজেদের আলাদা করে নিচ্ছে। বিপন্ন বাঙালির পাশে দাঁড়ানোর বদলে ‘আমি স্নান বলি, ও গোসল বলে। অতএব ও বাঙালি না, আমি বাঙালি’ – এসব বোকা বোকা কথা বলে নিজের কুয়োটা আরও গভীর করে খুঁড়ছে। যে হিন্দি আধিপত্যবাদী হিন্দুরা কোনোদিনই বাঙালিকে আপন বলে মনে করেনি এবং করবে না, তারা নিজেদের মনোভাব স্পষ্ট ভাষায় বুঝিয়ে দিলেও ভদ্রলোক, ভদ্রমহিলারা বুক ফুলিয়ে প্রতিপন্ন করতে চাইছে – বাঙালি বলে কোনো জাতি নেই। আছে দুটো আলাদা জাতি – বাঙালি হিন্দু আর বাংলাদেশি। বাংলা বলেও কোনো ভাষা নেই। আছে দুটো আলাদা ভাষা – হিন্দুর বাংলা আর বাংলাদেশি বাংলা। এই ঐতিহাসিক মূর্খামি যে দৃশ্যের সম্ভাবনা বাড়িয়ে তুলছে তা এইরকম – ভদ্রলোকরা বাঙালি বলে মার খাচ্ছে হিন্দিভাষীদের হাতে, আর এখন যে বাঙালিদের মার খাওয়া চলছে, যাদের বাঙালি বলে স্বীকার করতেই রাজি নয় ভদ্রলোকরা, তারা দূর থেকে বলছে ‘ওমা! আপনি ভদ্রলোক? আমি ভেবেছিলাম বাঙালি।’

নাগরিক ডট নেট ওয়েবসাইটে প্রকাশিত