যোগাযোগ

এই নির্বাচনে দেশ পশ্চাদপসরণ আটকাতে লড়ছে, কিন্তু পশ্চিমবঙ্গ?

মূল্যবৃদ্ধি, কর্মসংস্থানের অভাব, ধনী-দরিদ্রের ব্যবধান বৃদ্ধি, নির্বাচনী বন্ডের মত ইস্যু নিয়ে কথা বললে নিজেরই ফাঁপরে পড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা – একথা বুঝেই কি মমতা শেষ দু-তিন দফার নির্বাচনে পশ্চিমবঙ্গে প্রাসঙ্গিক করে তুললেন ধর্মীয় সংগঠনগুলোকে?

গোপালকৃষ্ণ গোখেলের একটা বাক্যকে সম্বল করে আমরা পশ্চিমবঙ্গের বাঙালিরা প্রায় একশো বছর ধরে রেলা নিয়েই চলেছি – ‘হোয়াট বেঙ্গল থিঙ্কস টুডে, ইন্ডিয়া থিঙ্কস টুমরো’ (বাংলা আজ যা ভাবে, ভারত কাল তা ভাবে)। অথচ কথাটা বহুদিন হল অর্থহীন হয়ে গেছে। একে তো গোখেল যে বাংলার কথা বলেছিলেন, সে বাংলার অর্ধেকটা এখন আলাদা দেশ। তার উপর বাংলার রাজনীতির সর্বভারতীয় রাজনীতিকে প্রভাবিত করার ক্ষমতাও দীর্ঘকাল হল অন্তর্হিত। বাংলার সাংসদদের সমর্থন ছাড়া সরকার পড়ে যাবে – এমন সরকার দিল্লিতে শেষবার হয়েছিল ২০০৪ সালে। বাংলার রাজনীতিতে যোগ্য রাজনীতিবিদের এখন এতই আকাল, যে প্রধান বিরোধী দল তো বটেই, পরপর তিনবার বিপুল সমর্থন নিয়ে ক্ষমতায় আসা শাসক দলকেও নির্বাচনে প্রার্থী বেছে নিতে বারবার বাংলা সিনেমা বা বাংলার ক্রিকেট, ফুটবলের দ্বারস্থ হতে হয়। সব কুড়িয়ে কাচিয়েও ৪২ খানা আসনে বাংলা থেকে প্রার্থী দিয়ে উঠতে পারেনি বাঙালির শাসক দল, কিছু শূন্যস্থান রয়েই গিয়েছিল। সেগুলো পূরণ করতে বিহার থেকে প্রাক্তন বলিউড অভিনেতা, গুজরাট থেকে প্রাক্তন ক্রিকেটার ডেকে আনতে হয়েছে। অথচ ২০২১ বিধানসভা নির্বাচনে এই দলেরই প্রচারের অন্যতম অভিমুখ ছিল – তৃণমূল কংগ্রেসই বাঙালির দল। দেয়ালে দেয়ালে লেখা হয়েছিল স্লোগান – ‘বাংলা নিজের মেয়েকেই চায়’। এখন দেখা যাচ্ছে, কয়েকজন ‘পরের ছেলে’-কে পাশে দাঁড় না করালে নিজের মেয়ের কাজ চলে না।

এ অবস্থাতেও গত এক দশকে বাঙালি বামপন্থী ও উদারপন্থীদের গর্বের শেষ ছিল না কিছু ব্যাপার নিয়ে – এ রাজ্যের রাজনীতি গোবলয়ের মত নয়। এখানে নাকি জাতপাতের রাজনীতি চলে না, হিন্দুত্ব চলে না, ধর্ম নির্বাচনে কোনো ইস্যু হয় না, আরও নানা ভাল ভাল ব্যাপার।

কিন্তু সেই ২০১১ সাল থেকেই দেখা গেছে যে মতুয়ারা বাংলার ভোটে যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ। এখন দেখা যাচ্ছে কুড়মিরাও আলাদা করে গুরুত্বপূর্ণ।

হিন্দুত্বও দিব্যি চলে। নইলে রামনবমী এলেই দাঙ্গা, বকরি ঈদ এসে পড়লেই সোশাল মিডিয়ায় হিন্দু ধর্মনিরপেক্ষদের নিরীহ গবাদি পশুদের জন্যে প্রাণ কেঁদে ওঠা, সর্বোপরি বিধানসভায় ৭৭ খানা আসন পেয়ে হিন্দুত্ববাদী ভারতীয় জনতা পার্টির প্রধান বিরোধী দল হয়ে বসা সম্ভব হত না। ২০২১ সালের ফলাফল দেখে যে সরলমতি ধর্মনিরপেক্ষ বাঙালিরা হিন্দুত্ববাদী শক্তিকে আটকে দিলেন ভেবে প্রবল আত্মপ্রসাদ অনুভব করেছেন, তাঁরা আসলে কল্পনার জগতে বাস করেন। নইলে নির্বাচন কমিশনের ওয়েবসাইটে গিয়ে দেখে নিতে পারতেন – কতগুলো আসনে কয়েকশো, হাজার দুয়েক, হাজার তিনেক – এরকম ব্যবধানে ফয়সালা হয়েছিল। একটা আসনে তো সাত ভোটের ব্যবধানেও ফয়সালা হয়েছিল। প্রকৃতপক্ষে তৃণমূল কংগ্রেসকে জিতিয়েছিল জনকল্যাণমূলক কর্মসূচি আর আতঙ্কিত সংখ্যালঘু মানুষের ভোট। সংখ্যাগুরু বাঙালির দুর্গাপুজোর সময়ে চাগাড় দিয়ে ওঠা ‘ধর্ম যার যার উৎসব সবার’ মার্কা বাছাই করা ধর্মনিরপেক্ষতা নয়।

ধর্মকে যে পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনে ইস্যু করে তোলা যায় তা গত দেড় দশকে নিঃসংশয়ে প্রমাণিত হয়েছে। গত বিধানসভা নির্বাচনে নন্দীগ্রাম কেন্দ্রে মুখ্যমন্ত্রীর বিরুদ্ধে শুভেন্দু অধিকারীর বিষাক্ত প্রচার জয়যুক্ত হওয়ার পর আর বাঙালিদের বড় বড় কথা না বলাই ভাল। বিজেপি আইটি সেলের তৈরি মমতাকে ‘মমতাজ’ নাম দিয়ে নানারকম রসিকতা যেভাবে কট্টর সিপিএম সমর্থকরাও হোয়াটস্যাপ, ফেসবুকে শেয়ার করেন তাতে ধর্মের মদ এক চুমুকও খায় না এমন বাঙালি খুঁজে পাওয়া যে দুষ্কর হয়ে উঠেছে তা অস্বীকার করা মানে নিজেকে ঠকানো।

সুতরাং গুজরাট-রাজস্থান-উত্তরপ্রদেশ-মধ্যপ্রদেশ-বিহার-ঝাড়খণ্ডের নাগরিকদের যে জাতপাত নির্ভরতা, যে রাজনৈতিক সচেতনতার অভাব, যে ধর্মসর্বস্বতায় অভিযুক্ত করে এসেছে সুমিত, প্রমিত বাঙালি; এবারের নির্বাচনে গোটা দেশের মধ্যে পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনেই সেই দোষগুলো সবচেয়ে বেশি দেখা যাচ্ছে। বাকি দেশের সঙ্গে ব্যবধান চোখে পড়ার মত বেশি। কী রাজনৈতিক দলগুলোর প্রচারে, কী মূলধারার সংবাদমাধ্যমগুলোর অবস্থানে, গোটা দেশের প্রবণতার বিপরীতে চলছে বাংলার ভোট।

বাকি দেশের নির্বাচনী প্রচারের দিকে তাকালে সাদা চোখেই দেখা যাচ্ছে, নরেন্দ্র মোদী ২০১৪ আর ২০১৯ সালের মত আলেখ্য নির্মাণ ও নিয়ন্ত্রণ করার খেলায় হেরে গেছেন। মোদী কি গ্যারান্টি নামের ইশতেহার প্রকাশ করে বিকশিত ভারতের প্রতিশ্রুতি দিয়ে শুরুটা ভালই করেছিলেন। কিন্তু অনতিবিলম্বেই – কংগ্রেসের ইশতেহারে সম্পত্তি কেড়ে নেওয়ার কথা আছে, ওটা মুসলিম লিগ মার্কা ইশতেহার, ওরা হিন্দুদের সম্পত্তি শুধু নয় মহিলাদের মঙ্গলসূত্র পর্যন্ত ছিনিয়ে নিয়ে মুসলমানদের দিয়ে দেবে – এইসব আষাঢ়ে গল্প বলতে শুরু করেন। শেষপর্যন্ত নির্বাচনে ফলাফল যা-ই হোক,

এইসব ভুয়ো তথ্য ছড়িয়েও যে মোদী প্রত্যাশিত মাত্রায় ভোট আদায় করতে পারছেন না, তার প্রমাণ হল তিনি আবার মাঝে এক সাক্ষাৎকারে বলে বসেছেন, যে তিনি কখনো সাম্প্রদায়িক প্রচার করেন না। যেদিন করবেন সেদিন জনজীবনে থাকার অধিকার হারাবেন। পরদিন আবার জনসভায় ঘৃণা ছড়ানোর কাজে ফিরে গেছেন। ফলে রাহুল গান্ধী বলতে বাধ্য হয়েছেন, মোদীজি কি গজনী হয়ে গেছেন? কিছুই মনে থাকে না!

কিন্তু এত আক্রমণ সত্ত্বেও কংগ্রেস বা তার জোটসঙ্গী রাষ্ট্রীয় জনতা দল, সমাজবাদী পার্টি, ডিএমকে, জেএমএম, সিপিআই, সিপিএম, লিবারেশন এই সাম্প্রদায়িক কাদা ছোড়াছুড়িতে প্রশ্রয় দেয়নি। তারা কেবলই সংবিধান বাঁচানোর কথা, জাতভিত্তিক আদমশুমারির প্রতিশ্রুতির কথা, বিপুল বেকারত্ব, মূল্যবৃদ্ধি, কৃষকদের দুর্দশার কথা বলে যাচ্ছে। নিজেরা ক্ষমতায় এলে এসবের কী সমাধান করবে তার উত্তরও বেশ বিস্তারিতভাবেই কংগ্রেস ও অন্যান্য বিরোধী দলগুলো দিয়ে চলেছে। উত্তরপ্রদেশে যোগী আদিত্যনাথের রাজত্বে চাকরির পরীক্ষা হলেই প্রশ্ন ফাঁস হয় যায় বলে অভিযোগ, কিন্তু আদিত্যনাথ প্রিয় মোদীজির জন্যে যে বিরোধীদের এই প্রশ্নপত্র আসতে চলেছে তা আগে থেকে জেনে উঠতে পারেননি বোধহয়। ফলে তথাকথিত দারুণ বক্তা মোদীকে এবার নির্বাচনে আক্ষরিক অর্থেই কান্নাকাটি করতে হচ্ছে। মাতৃগর্ভে জন্মাননি, পরমাত্মা থেকে সরাসরি জন্ম হয়েছে – এসব রূপকথার গল্পই তাঁর নির্বাচনী প্রচার হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলে ডিসেম্বর মাসে বিধানসভা নির্বাচনের ফল বেরোবার পর যেসব নির্বাচন-জ্যোতিষী এবং সাংবাদিক ঘোষণা করে দিয়েছিলেন বিজেপি ২০২৪ জিতেই গেছে, তাঁরা এখন সাবধানী সুরে কথা বলছেন।

অন্যদিকে পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনী প্রচারের দিকে তাকিয়ে দেখুন। নীতীশ কুমার কেটে পড়ার পরে ইন্ডিয়া ব্লককে তাসের ঘরের মত মনে হচ্ছিল। কিন্তু অতি গুরুত্বপূর্ণ তিনটে রাজ্যেই শেষপর্যন্ত জমাট জোট হয়েছে – উত্তরপ্রদেশ, বিহার, মহারাষ্ট্র। বিশ্লেষকরা প্রায় সকলেই একমত যে এবারের ভোটের ফল নির্ধারিত হবে পাঁচটা রাজ্যের ফল দিয়ে। উপরিলিখিত তিনটে, কর্ণাটক আর পশ্চিমবঙ্গ। কর্ণাটকে কংগ্রেস সদ্য বিপুল ভোটে বিধানসভা নির্বাচনে জিতে সরকারে এসেছে, তার উপর বিজেপির জোটসঙ্গী জেডিএসের হাসান কেন্দ্রের সাংসদ প্রোজ্জ্বল রেবন্নর পর্যায়ক্রমিক ধর্ষণের কাণ্ড প্রকাশ্যে এসে যাওয়ায় বিজেপি বিপাকে। উত্তরপ্রদেশে সমাজবাদী পার্টির নেতা অখিলেশ যাদব আর রাহুল যেভাবে একসঙ্গে একের পর এক জনসভা করছেন তাতে বিজেপির বিরুদ্ধে যে আন্তরিক লড়াই করছে ইন্ডিয়া ব্লক, তাতে সন্দেহ থাকে না। একই দৃশ্য বিহারেও। সেখানে আরজেডি নেতা তেজস্বী যাদব আর রাহুলের রসায়ন যে দারুণ জমেছে তা বিরাট বিরাট জনসভায় দেখা গেছে। মহারাষ্ট্রেও শেষপর্যন্ত উদ্ধব ঠাকরের শিবসেনা আর শরদ পাওয়ারের এনসিপির সঙ্গে কংগ্রেসের জোট জমাট বেঁধেছে। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গে মমতা বলে দিয়েছিলেন ‘এখানে তৃণমূলই ইন্ডিয়া’।

তেরো বছর ক্ষমতায় থাকা মমতা মনেই করেননি তাঁর বিরুদ্ধে রাজ্যের মানুষের কোনো অংশের কোনো অসন্তোষ থাকতে পারে। টানা এতদিন ক্ষমতায় থাকলে যে প্রতিষ্ঠানবিরোধিতার মনোভাব তৈরি হওয়া স্বাভাবিক তাও তিনি বিশ্বাস করেননি। তাই যখন জোটের কথাবার্তা চলছিল তখনো তিনি এবং তাঁর দলের মুখপাত্ররা কংগ্রেস বিজেপিকে হারাতে কত অযোগ্য, রাহুল কতবার সর্বভারতীয় নেতা হয়ে ওঠার চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়েছেন – এইসব বলে নিজেদের ওজনের ভারে কংগ্রেসকে চাপা দেওয়ার চেষ্টা করছিলেন। বিজেপিশাসিত মণিপুর আর আসাম বাদ দিলে এই রাজ্যের সরকারই রাহুলের ন্যায় যাত্রার সময়ে সবচেয়ে বেশি অসুবিধা সৃষ্টি করেছিল। অমুক জায়গায় রাত্রিবাস করা যাবে না, তমুক জায়গা দিয়ে যাওয়া যাবে না – এসব নানাবিধ বায়নাক্কা ছিল প্রশাসনের। এমনকি ন্যায় যাত্রার পালের হাওয়া কেড়ে নিতে ঠিক ন্যায় যাত্রার এলাকাতেই পদযাত্রা করেছিলেন মমতা স্বয়ং। শেষমেশ একতরফা ৪২ আসনেই প্রার্থী ঘোষণা করে দেওয়া হয় ব্রিগেডের জনগর্জন সভা থেকে। তখনো মমতা রীতিমত খড়্গহস্ত ছিলেন কংগ্রেস বা ইন্ডিয়া ব্লকের প্রতি। যুক্তি ছিল, পশ্চিমবঙ্গে কংগ্রেস আর সিপিএম তৃণমূলের বিরুদ্ধে বিজেপির সঙ্গে যোগসাজশে কাজ করে। তাই তাদের সঙ্গে জোট করা যায় না। উপরন্তু তৃণমূল একাই বিজেপিকে হারিয়ে দিতে পারে, বিধানসভায় হারিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে। কংগ্রেসের কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব এতৎসত্ত্বেও মমতা সম্পর্কে কড়া মন্তব্য করেননি। মমতাকে যা আক্রমণ করার তা করেছেন প্রদেশ কংগ্রেস নেতারা, বিশেষত সভাপতি অধীররঞ্জন চৌধুরী। মমতা সেটাকেই বিজেপির সহায়তা করা বলে গণ্য করেছেন।

এ পর্যন্ত ঠিকই ছিল। এত প্রবীণ এবং পোড়খাওয়া একজন জননেত্রী যদি মনে করেন তিনি একাই একশো, তাতে আপত্তির কিছু নেই। মুশকিল হল প্রচার শুরু হতেই বাকি ভারতে যে কৌশলে বিজেপিকে কোণঠাসা করার চেষ্টা করছে বিরোধীরা, মমতা তার উল্টো পথে হেঁটেছেন। ফলে রাজ্যের রাজনৈতিক বিতর্কের মান ক্রমশ নিম্নগামী হয়েছে। বাকি ভারতের চেয়েও নিম্নগামী।

বিজেপির কৌশলে অবশ্য কিছুমাত্র বদল হয়নি। তাদের ১৮ জন সাংসদ বলার মত কোনো কাজ করেননি, প্রচারে কী আর বলবেন? বিজেপির সেই ২০১৯ সাল থেকে একটাই কাজ – তৃণমূলকে হিন্দুবিরোধী দল হিসাবে প্রমাণ করার চেষ্টা করে যাওয়া। এবারেও তার ব্যতিক্রম হয়নি। এ কাজে এবার তারা ব্যবহার করল সন্দেশখালির ঘটনাবলীকে। মূল অভিযুক্ত যেহেতু শাহজাহান, তাই তাদের কাজটা সহজ হয়ে গিয়েছিল। প্রচার পর্বের প্রথম দিকটা তৃণমূলকে কেবলই আত্মপক্ষ সমর্থন করে যেতে হয়েছে। বিজেপি কর্মী গঙ্গাধর কয়ালের ভিডিও প্রকাশ্যে আসার পর তৃণমূল আক্রমণে যাওয়ার সুযোগ পায়। কে সত্যি বলছে কে মিথ্যে বলছে তা আমরা জানি না। কিন্তু কোনো পক্ষ অবলম্বন না করেও নিশ্চিতভাবে বলা যায়, বিজেপি ফাঁপরে পড়েছে ওই ভিডিও নিয়ে। বিশেষত যখন মহিলারা একের পরে এক মামলা প্রত্যাহার করতে শুরু করলেন, ভিডিও ক্যামেরার সামনে বললেন তাঁদের ভুল বুঝিয়ে সাদা কাগজে সই করিয়ে পুলিসে অভিযোগ করানো হয়েছিল। বসিরহাট কেন্দ্রের প্রার্থী রেখা পাত্র স্বয়ং বলে বসলেন, রাষ্ট্রপতির কাছে ধর্ষিতা বলে যে মেয়েদের নিয়ে যাওয়া হয়েছে তাদের তিনি চেনেন না। শুভেন্দু অধিকারী, যিনি এই চক্রান্তের মাথা বলে তৃণমূল অভিযোগ করেছে, তিনিও কোনো সদুত্তর দিয়ে উঠতে পারেননি। না পারার আক্রোশে সাংবাদিকদের খিস্তি দিতে পেরেছিলেন কেবল।

কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, বামাল সমেত যদি বিজেপির চক্রান্তকারীরা ধরা পড়েই থাকে, তাহলে তারা গ্রেফতার হল না কেন? গঙ্গাধরবাবু মন মজায়ে লুকালেন কোথায়? পুলিস তাঁকে এই জঘন্য চক্রান্তের জন্য গ্রেফতার করেছে বলে তো আমাদের জানা নেই। আমরা সংবাদমাধ্যম থেকে জেনেছিলাম তিনি নাকি পুলিসের কাছে কাদের বিরুদ্ধে কীসব অভিযোগ জানিয়েছিলেন তাঁকে ফাঁসিয়ে দেওয়া হয়েছে বলে। সেই অভিযোগেরই বা কী হল? কদিন সন্দেশখালি নিয়ে প্রচণ্ড হইচই হওয়ার পরে, দুই প্রধান প্রতিপক্ষের সমস্ত নির্বাচনী সভায় সন্দেশখালি নিয়ে বাদানুবাদ হওয়ার পরে দুপক্ষই কি ঠিক করল সন্দেশখালিতে সন্দেশ নাই? কজন মহিলার অভিযোগ সত্যি, কজনের অভিযোগ মিথ্যা, আদৌ কোনোটা সত্যি কিনা – তা তো আমাদের জানা হল না। লাভের লাভ যা হল, তা হচ্ছে রাজ্য সরকারের কাজের খতিয়ান বিজেপি চাইল না, কেন্দ্রীয় সরকারের কাজ বা অকাজ নিয়েও তৃণমূলের প্রচারে কথাবার্তা কমে গেল। নির্বাচনী বন্ড নিয়ে কটা সভায় কথা বলেছেন মমতা বা অভিষেক? কর্মসংস্থানের অভাব নিয়েই বা কবার আক্রমণ করেছেন মোদীকে? মোদী, শাহরাই বা পশ্চিমবঙ্গে প্রচারে এসে গোদাভাবে তৃণমূলকে চোর বলা ছাড়া কী সমালোচনা করেছেন? নির্দিষ্ট করে নিয়োগ দুর্নীতি নিয়েই বা কতটা কথা বলেছেন? মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে তো কোনো পক্ষই পারতপক্ষে কথা বলছে না। সেসব আলোচনা কেবল শোনা যাচ্ছে বাম, কংগ্রেস জোটের প্রার্থীদের মিটিং মিছিলে।

সাংসদের সংখ্যার বিচারে রাজ্যের দুই বৃহত্তম শক্তি কী নিয়ে তর্ক চালাচ্ছে? প্রথমে চলল সন্দেশখালিতে ধর্ষণ হয়েছে নাকি হয়নি। তারপর চলল রাজ্যপালের রিপুকর্ম নিয়ে বাদানুবাদ। সে বাদানুবাদও কোনো গুরুত্বপূর্ণ অভিমুখ নিল না। মুখ্যমন্ত্রী একবার রাজ্যপালের পদত্যাগের দাবি তুললেন, প্রধানমন্ত্রী মুখই খুললেন না, রাজ্যপাল অভিযোগকারিণী মহিলার সম্মান এবং প্রাইভেসির অধিকারের তোয়াক্কা না করে সাংবাদিকদের রাজভবনে ডেকে সিসিটিভি ফুটেজ দেখিয়ে দিলেন। সংবাদমাধ্যমগুলো রাজ্য পুলিসের ‘সূত্র’ উদ্ধৃত করে জানাল, পুলিসের কাছে নাকি বিস্ফোরক তথ্য আছে। এবিপি আনন্দের মত সদ্য গোদি মিডিয়া হয়ে ওঠা টিভি চ্যানেলের বিশেষজ্ঞ ও সঞ্চালকরা আবার, কোন জাদুতে কে জানে, নিঃসন্দেহে বলে গেলেন সবটাই রাজ্যপালের বিরুদ্ধে তৃণমূলের চক্রান্ত। এমতাবস্থায় শ্লীলতাহানিতে অভিযুক্ত রাজ্যপালকে সরে দাঁড়াতে বলার সভ্যতা যে বিজেপির নেই, তা জানতে কারোর বাকি নেই। আর সেই নিয়ে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার সময় ও সদিচ্ছা যে ভোটের মরশুমে তৃণমূলের নেই তাও পরিষ্কার হয়ে গেল।

তাহলে? সন্দেশখালি বা রাজ্যপাল – কোনোটাই নির্বাচনের ইস্যু নয়, তাই তো? কিন্তু দিব্যি ভোটারদের ওই আলোচনাতেই ব্যস্ত রাখা গেল। অতঃপর মুখ্যমন্ত্রী চালু করলেন সেই খেলা, যা মোদীর ভীষণ পছন্দের। মমতা মুর্শিদাবাদের বেলডাঙার ভারত সেবাশ্রম সঙ্ঘের সন্ন্যাসী কার্তিক মহারাজের নাম করে বললেন, ওঁকে সাধু বলেই মনে করেন না। কারণ ওঁর কাছে খবর আছে, ওই সন্ন্যাসী ভোটে তৃণমূলের এজেন্ট বসতে দেন না। মানে পুরোদস্তুর রাজনীতি করেন। একইসঙ্গে ইস্কন আর রামকৃষ্ণ মিশনও নিজেদের ভক্তদের বিজেপিকে ভোট দিতে বলছে বলে মুখ্যমন্ত্রী অভিযোগ করে বসলেন।

হিন্দুপ্রধান ভারতে ইসলামিক ধর্মীয় সংগঠন মানেই সন্ত্রাসবাদীদের আখড়া – এই ধারণা সমস্ত রাষ্ট্রীয় শক্তি, সিনেমা আর সংবাদমাধ্যম মিলে বহু যুগ ধরে জনমানসে গেঁথে দিয়েছে। কিন্তু হিন্দু ধর্মীয় সংগঠনগুলো যে ধোয়া তুলসীপাতা নয়, সেকথা চট করে কেউ বলে না। গেরুয়া সন্ত্রাস নিয়ে এস এম মুশরিফের বইগুলোর কথা এখনো বিশেষ আলোচিত না হলেও রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ বা আরএসএস যে বহুকাল ধরে তলে তলে এদেশের অনেককিছুতে ছড়ি ঘুরিয়েছে তা এখন অনেকের কাছে স্পষ্ট হচ্ছে। এই মুহূর্তে দেশের প্রধানমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, বহু কেন্দ্রীয় মন্ত্রী, উপরাষ্ট্রপতি, বিজেপিশাসিত সমস্ত রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী আরএসএসের শিক্ষায় শিক্ষিত। উপরন্তু কলকাতা হাইকোর্টের বিচারপতি চিত্তরঞ্জন দাশ অবসর নেওয়ার সময়ে বিদায়ী ভাষণে খোশমেজাজে জানিয়েছেন, তিনি বরাবর আরএসএসের সঙ্গে ছিলেন। আরেক বিচারপতি অভিজিৎ গঙ্গোপাধ্যায় তো আজ অবসর নিয়ে কাল বিজেপিতে যোগ দিয়ে নির্বাচনে প্রার্থী হয়ে গেছেন। তাঁর মুখের ভাষা এমন, যে ঠুঁটো জগন্নাথ নির্বাচন কমিশনও চক্ষুলজ্জার খাতিরে মমতার বিরুদ্ধে অশালীন মন্তব্যের কারণে অভিজিৎকে ২৪ ঘন্টা প্রচারে নিরস্ত করেছে।

আরও পড়ুন যারা বিজেপিতে ভিজেছিল

ভারত সেবাশ্রমের কার্তিক মহারাজ মুখ্যমন্ত্রীকে আইনি নোটিস পাঠিয়ে বলেছেন তাঁর বিরুদ্ধে কুৎসা করা হয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী নিশ্চয়ই তার মুখের মত জবাব দেবেন, নতুবা ক্ষমা চাইবেন। কিন্তু কার্তিক মহারাজ যে ওই তল্লাটে রীতিমত রাজনৈতিক বক্তৃতা দিয়ে বেড়ান তার পর্যাপ্ত ভিডিও প্রমাণ রয়েছে। সেসব ভিডিওতে তাঁকে মোটেই সর্বত্যাগী, সংসারে আসক্তিহীন সন্ন্যাসী বলে মনে হয় না। বরং তাঁর শরীরী ভাষা ও মুখের ভাষা মুখ্যমন্ত্রী হয়ে বসা গোরক্ষ মঠের যোগীর বেশি কাছাকাছি।

বিদেশি মুদ্রায় বলীয়ান আন্তর্জাতিক সংগঠন ইস্কন তার ভক্তমণ্ডলীকে বিজেপিকে ভোট দিতে বলছে কিনা সে খবর মুখ্যমন্ত্রীর কাছে থাকতেই পারে। তেমনটা ঘটা আদৌ অসম্ভব নয়। কারণ আরএসএস এক আদ্যন্ত বাঙালিবিদ্বেষী সংগঠন, আর ইস্কনের মধ্যে যে বাঙালিবিদ্বেষ পুরোমাত্রায় আছে তার প্রমাণ একবছর আগেই পাওয়া গিয়েছিল, যখন অমোঘ লীলা দাস বলে ওই সংগঠনের এক সন্ন্যাসী স্বামী বিবেকানন্দকে সিদ্ধপুরুষ বলে মানতে অস্বীকার করেন তিনি আমিষ খেতেন, চুরুট খেতেন বলে। ইস্কন কী ব্যবস্থা নিয়েছিল লোকটির বিরুদ্ধে? কয়েকদিন মুখ বন্ধ করে থাকতে বলা হয়েছিল। ব্যাস!

আসলে বাঙালির মান-অপমান বোধ সম্পর্কে কারোরই খুব উচ্চ ধারণা নেই। বাঙালির আদরের সংগঠন রামকৃষ্ণ মিশনেরও নেই। থাকলে সেইসময় তারা অমোঘ লীলাকে বুঝিয়ে দিত শ্রীরামকৃষ্ণের ধর্মাচরণে কেন আমিষ-নিরামিষ ভেদ নেই। শ্রীরামকৃষ্ণ আদতে একজন ধর্মগুরু হলেও সত্যের সন্ধান করেছেন গবেষকের মত। শিষ্যদের মধ্যেও অনুসন্ধিৎসা উস্কে দিতেন, বলতেন ‘সাধুকে দিনে দেখবি, রাতে দেখবি’। অর্থাৎ পরখ করে নিবি, লোকটা সত্যিই সাধু কিনা। ফলে ‘যত মত তত পথ’ কথাটা তিনি স্রেফ বাণী বিতরণ করার জন্যে বলেননি। কলমা পড়ে মুসলমান হয়েছিলেন, খ্রিস্টধর্মও অবলম্বন করে দেখেছিলেন। তিনি খুঁজছিলেন আধ্যাত্মিক সত্য। নিজের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে যেখানে যেখানে তা পাওয়া গেছে, সেই সব পথকেই সত্য বলতে তাঁর কোথাও বাধেনি। ফলে আমিষাশী তন্ত্রসাধক বা নিরামিষাশী বৈষ্ণব – কেউই তাঁর কাছে ব্রাত্য নয়, অহিন্দুও নয়। সেই কারণেই রামকৃষ্ণ মিশনের সন্ন্যাসীদের আমিষ খাওয়ায় বারণ নেই। সিদ্ধপুরুষ কী করে হতে হয় বা আদৌ হওয়া যায় কিনা তা অন্য তর্ক। কিন্তু রামকৃষ্ণের তত্ত্বানুযায়ী, তাঁর কোনো শিষ্যের এই কারণেই আমিষ খেয়েও সিদ্ধপুরুষ হতে বাধা নেই।

মিশন কিন্তু এসব ধর্মালোচনায় যায়নি। কারণ হিন্দু উদারপন্থী – এমনকি বামপন্থী – বাঙালির ন্যাকা আবদার রক্ষা করে ধর্মীয়, অথচ ধর্মনিরপেক্ষ, জগাখিচুড়ি হওয়ার কোনো দায় রামকৃষ্ণ মিশনের নেই। তারা পুরোদস্তুর ধর্মীয় সংগঠন এবং বিশাল আকারের কারণে রীতিমত ব্যবসায়িক সংগঠন বললেও ভুল হয় না। বউবাজারের গয়নার দোকানগুলো যেমন নিজেদের মধ্যে ঝগড়াঝাঁটি করে না, রামকৃষ্ণ মিশনও ইস্কন বা ভারত সেবাশ্রমের সঙ্গে কোনোরকম তর্কে জড়ায় না। উপরন্তু দেশে হিন্দু আধিপত্যবাদী সরকার হলে এরা সকলেই খুশি হয়, কারণ কলাটা মুলোটা পাওয়ার সম্ভাবনা বাড়ে। কেন্দ্রে অটলবিহারী বাজপেয়ীর সরকার থাকার সময়েই সুদৃশ্য বেলুড় মঠ স্টেশন তৈরি করে হাওড়া-বেলুড় মঠ লোকাল ট্রেন চালু হয়েছিল। বিশেষ উৎসবের দিন ছাড়া সে ট্রেনে কাকপক্ষীও চাপত না। অথচ অলাভজনক রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা বিক্রি করে দেওয়ায় উৎসাহী একটা সরকারও ওই লাইন তুলে দেওয়ার কথা ভাবেনি। রামকৃষ্ণ মিশনের সাধুদের মোদীমুগ্ধতাও এমন কিছু ঢাকঢাক গুড়গুড় করার জিনিস নয়। তিনি যখন বেলুড় মঠে এসে রাত্রিযাপন করেছিলেন, সেইসময় তাঁর সঙ্গে দন্তবিকাশ করে সন্ন্যাসীদের সেলফি তোলার বহর আমরা সকলেই দেখেছি। একজন রাজনৈতিক নেতাকে নিয়ে মিশনের সন্ন্যাসীদের এমন নালে ঝোলে অম্বলে হতে দেখলে কী মনে করতেন মিশনের সেইসব প্রতিষ্ঠাতা সন্ন্যাসীরা, যাঁদের জন্যে ভগিনী নিবেদিতাকে মিশনের সংস্রব ত্যাগ করতে হয়েছিল, কারণ তিনি স্বাধীনতা সংগ্রামীদের সক্রিয়ভাবে সাহায্য করছিলেন?

যা-ই মনে করুন, মোদ্দাকথা হল, মমতা পশ্চিমবঙ্গের তিনটে জনপ্রিয় ধর্মীয় সংগঠনের বিরুদ্ধে যে অভিযোগ করেছেন তা মোটেই পাগলের প্রলাপ বলে উড়িয়ে দেওয়ার জিনিস নয়। কিন্তু ঘটনাগুলো তো আজ ঘটতে শুরু করেনি। কার্তিক মহারাজের দাঙ্গায় উস্কানি দেওয়ার কথা যদি সত্যি হয় তাহলে তা বেআইনি কাজ, তাঁর বিরুদ্ধে পুলিসি ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। কিন্তু কোনো সংগঠনের নিজেদের সদস্যদের কোনো বিশেষ দলকে ভোট দিতে বলা তো বেআইনি নয়। তাছাড়া মমতা নিজেই তো রাজ্যে ইমাম ভাতা, পুরোহিত ভাতা চালু করেছেন, সরকারি টাকায় দীঘায় বিরাট মন্দির বানাচ্ছেন। আবার ঈদের নমাজে গিয়ে রাজনৈতিক বক্তৃতাও দিয়েছেন। সেক্ষেত্রে ধর্মীয় সংগঠনগুলো রাজনীতি বিযুক্ত হয়ে থাকবে – এমনটা আশা করা কি যৌক্তিক? তাহলে নির্বাচনে এই কথাগুলো মমতা কেন বললেন? মূল্যবৃদ্ধি, কর্মসংস্থানের অভাব, ধনী-দরিদ্রের ব্যবধান বৃদ্ধি, নির্বাচনী বন্ডের মত ইস্যু নিয়ে কথা বললে নিজেরই ফাঁপরে পড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা – একথা বুঝেই কি মমতা শেষ দু-তিন দফার নির্বাচনে পশ্চিমবঙ্গে প্রাসঙ্গিক করে তুললেন ধর্মীয় সংগঠনগুলোকে? তাহলে গোটা দেশে অনর্গল মিথ্যাভাষণ আর ধর্মীয় মেরুকরণ করে মোদী নির্বাচনটাকে যেভাবে নিজের দিকে টেনে আনতে চাইছেন, সেভাবেই কি মমতাও চাইছেন পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচন হয়ে দাঁড়াক হিন্দু বনাম মুসলমানের? ভারত সেবাশ্রম, ইস্কন ও রামকৃষ্ণ মিশন কর্তৃপক্ষ ইতিমধ্যেই মুখ্যমন্ত্রীর মন্তব্যে অসন্তোষ জ্ঞাপন করেছেন আর বিজেপি নেতারা মহানন্দে প্রচার করে বেড়াচ্ছেন – মমতা সংখ্যালঘু তোষণ করার জন্যে এখন হিন্দু সাধু সন্তদের আক্রমণ করছেন। পশ্চিমবঙ্গকে মনে হচ্ছে নয়ের দশকের উত্তরপ্রদেশ, যেখানে রাজনৈতিক আলেখ্য আবর্তিত হয় অমুক স্বামী, তমুক সরস্বতী, অমুক শঙ্করাচার্যকে ঘিরে।

২০২৪ সালের ঐতিহাসিক সাধারণ নির্বাচনে এই তবে বাঙালির সবচেয়ে বড় অবদান।

নাগরিক ডট নেটে প্রকাশিত

গোট কত বেড়া খেয়ে যাচ্ছে

গাভস্কর যখন খেলতেন তখন সোশাল মিডিয়া ছিল না, গোট কে তা নিয়েও আলোচনাই হত না। সবার উপরে স্যার ডোনাল্ড জর্জ ব্র্যাডম্যান আর স্যার গারফিল্ড সোবার্স। বাকিরা তারপর – এই সহজ ভাবনায় ক্রিকেট দুনিয়া চলত।

সম্প্রতি কিংবদন্তি সুনীল গাভস্করের সঙ্গে বিবাদে জড়িয়ে পড়েছেন মহাতারকা বিরাট কোহলি। সামনেই টি টোয়েন্টি বিশ্বকাপ। বিরাট তার আগে আইপিএলে রয়্যাল চ্যালেঞ্জার্স ব্যাঙ্গালোরের হয়ে প্রচুর রান করছেন (এই লেখার সময়ে ১৩ ইনিংসে ৬৬৮; গড় ৬৬.১০)। ধারাভাষ্যকাররা, যাঁদের অনেকেই বিশ্ব ক্রিকেটে একদা সফল প্রাক্তন ক্রিকেটার, বিরাটের স্ট্রাইক রেটের সমালোচনা করছিলেন। তাই একটি ম্যাচ জিতিয়ে বিরাট তাঁদের বিরুদ্ধে ক্যামেরার সামনে বিবৃতি দেন। বিরাটের দল এবারের আইপিএলের হারতে হারতে প্রায় প্লে অফের ওঠার দৌড় থেকে ছিটকে গেছে। এমতাবস্থায় প্রাক্তন ক্রিকেটাররা বিরাটের মন্থর ব্যাটিং এবং স্পিনারদের মারার অক্ষমতার সমালোচনা করছেন। বিরাট সেই সমালোচনা থেকে কিছু শেখার বদলে সমালোচকদের দিকেই তোপ দেগেছেন। বলে দিয়েছেন, যারা তাঁর পরিস্থিতিতে পড়েনি তাদের পক্ষে বক্সে বসে সমালোচনা করা সহজ। বাইরের লোক যা খুশি ভেবে নিতে পারে। তিনি বাইরের কে কী বলল তাতে কান দেন না। একথায় গাভস্কর বেজায় চটে বলে দিয়েছেন, বাইরের লোকের কথায় যদি কান না-ই দেয় তো কথার উত্তর দিচ্ছে কেন? আমরা যা দেখব তাই তো বলব। আমাদের তো কারোর বিরুদ্ধে কোনো এজেন্ডা নেই। টিভির পর্দায় দেখা গেছে, গাভস্কর যখন একটি ম্যাচ শুরু হওয়ার আগে মাঠে দাঁড়িয়ে মাইক হাতে এসব কথা বলছেন, তখন কাছেই অনুশীলনরত বিরাট কথাগুলো শুনে কটমটিয়ে তাকিয়েছেন।

এমন হতে পারে না যে বিরাট জানেন না গাভস্কর কত বড় ব্যাটার ছিলেন। আর পাঁচজনের কথার দাম না থাক, গাভস্করের কথার অবশ্যই দাম আছে। অন্যান্য বিশেষজ্ঞদের কথারও বিলক্ষণ দাম আছে। নইলে তাঁদের সমালোচনায় বিরাট ক্ষেপে যেতেন না। তাহলে তিনি ওরকম আক্রমণাত্মক মন্তব্য করলেন কেন? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে আমরা যা পাব, তা হল ঔদ্ধত্য। টেস্ট ক্রিকেটে যখন হেলমেট প্রায় ছিলই না, প্রত্যেক আন্তর্জাতিক দলেই এক বা একাধিক ঘন্টায় ৯০ মাইলের বেশি গতিতে বল করা বোলার ছিল, সেইসময় যিনি প্রথম ব্যাটার হিসাবে দশ হাজার রান করেছিলেন বেশ দুর্বল একটা দলে খেলে, তাঁকে আমল না দেওয়ার ঔদ্ধত্য কী করে তৈরি হল? এর উত্তর লুকিয়ে আছে সোশাল মিডিয়া যুগের এক অদ্ভুত প্রবণতার মধ্যে। প্রবণতাটা হল বিভিন্ন যুগের খেলোয়াড়দের মধ্যে তুলনা করে, এক ধরনের কাল্পনিক র‍্যাঙ্কিং তৈরি করে নিজের সময়ের সেরাকে সর্বকালের সেরা প্রতিপন্ন করা। হালে একটি শব্দের জন্ম হয়েছে খেলার জগতে – GOAT, অর্থাৎ ‘গ্রেটেস্ট অফ অল টাইম’। গাভস্কর যখন খেলতেন তখন সোশাল মিডিয়া ছিল না, গোট কে তা নিয়েও আলোচনাই হত না। সবার উপরে স্যার ডোনাল্ড জর্জ ব্র্যাডম্যান আর স্যার গারফিল্ড সোবার্স। বাকিরা তারপর – এই সহজ ভাবনায় ক্রিকেট দুনিয়া চলত। শচীন তেন্ডুলকরের আমল থেকে এনডর্সমেন্টের দুনিয়ায় কে সর্বকালের সেরা তা নিয়ে মশলাদার আলোচনা শুরু হয়। শচীনের বিদায়ের পর কবে যেন মহেন্দ্র সিং ধোনি গোট হয়ে গেলেন, তাঁর বিদায়ের পর বিরাট।

গাভস্করের হয়ে কথা বলার জন্যে সোশাল মিডিয়ায় ট্রোলবাহিনী নেই, বিরাটের জন্যে আছে। তারা বলে দিয়েছে বিরাটই গোট, কেউ অন্য কিছু বললে দল বেঁধে তেড়ে আসে তাকে গাল দিতে। শুধু তাই নয়, প্রাক্তন ক্রিকেটাররাও অনেকদিন ধরে বিরাটকে ভিভিয়ান রিচার্ডস বা শচীনের সমান বা তার চেয়েও মহান ক্রিকেটারের তকমা দিয়ে চলেছেন। ফলে নির্ঘাত বিরাট নিজেও মনে করেন তিনি সর্বকালের সেরা। তাই গাভস্কর, ম্যাথু হেডেনরা এলেবেলে।

এই গোটে যে আজকাল কত বেড়া খেয়ে ফেলছে খেলার জগতে, তার হিসাব নেই। আমরা যে যুগে বাস করি, সেখানে হাতের ফোনটাতেই চাইলে দেখে ফেলা যায় যে কোনো খেলার কিংবদন্তিদের স্মরণীয় এবং সাধারণ খেলাগুলো। বর্তমান প্রজন্ম চাইলেই পেলে বা দিয়েগো মারাদোনার খেলা দেখে ফেলতে পারে। শচীন বা ভিভ তো বটেই, এমনকি ব্র্যাডম্যানের খেলারও এক-আধটা ক্লিপ সোশাল মিডিয়ায় পাওয়া যায়। সেগুলো দেখলে মাঠের তারতম্য, প্রতিপক্ষের গুণমানের তারতম্য নিজের চোখে দেখা যায়। অন্ধ ভক্ত না হলে বোঝাই যায়, এক যুগের সঙ্গে অন্য যুগের খেলোয়াড় তুলনীয় নয়। খেলার মান নির্ভর করে যে যে জিনিসগুলোর উপরে তার প্রায় কোনোটাই এক নেই, থাকার কথাও নয়। দুনিয়ার সবকিছুই তো প্রতি মুহূর্তে বদলাচ্ছে। সেখানে সর্বকালের সেরা দশ বা পাঁচ বা এক মুখরোচক আড্ডার বিষয়বস্তু হতে পারে বড়জোর। এছাড়া কোনোরকম র‍্যাঙ্কিংয়ের কোনো মানে হয় না।

আরও পড়ুন বড় ক্রিকেটারে নয়, বিরাট ব্র্যান্ডে মোহিত জনগণমন

মুশকিল হল, অধিকাংশ ক্রীড়ামোদী সুচিন্তিত মতামতের মানুষ হয়ে গেলে একনিষ্ঠ ভক্তকুল গড়ে উঠবে না। সেটা না হলে জনপ্রিয় খেলোয়াড়রা যে শত শত ব্র্যান্ডের বিজ্ঞাপনে কাজ করেন, সেগুলো চোখ বন্ধ করে কেনার লোক কমে যাবে। তাহলে স্পনসর পাওয়া যাবে না, খেলাধুলো করে কোটি কোটি টাকা কামানোর রাস্তা বন্ধ হয়ে যাবে। এসব হতে দেওয়া যায় না। তাই খেলোয়াড় নিজে, তার সোশাল মিডিয়া টিম, সংবাদমাধ্যম, খেলার সম্প্রচারক, ধারাভাষ্যকাররা – সকলে মিলে কাল্পনিক র‍্যাঙ্কিং গড়ে তোলেন। তাতে সমসাময়িক কাউকে সর্বকালের সেরার মুকুট দিয়ে দেন। যদি কোনো সম ক্ষমতার খেলোয়াড় থাকেন, তাহলে পোয়া বারো। কে সত্যিকারের গোট তা নিয়ে তর্ক বাধিয়ে ব্যাপারটাকে আরও মুখরোচক করে তোলা হয়। ফুটবলে যেমন লিওনেল মেসি বনাম ক্রিস্টিয়ানো রোনাল্ডো। আমিই সেরা – এই কথা ২৪ ঘন্টার মধ্যে ২৬ ঘন্টা শুনতে শুনতে কোনো কোনো খেলোয়াড়ের বিশ্বাস হয়ে যেতে পারে তিনিই সর্বকালের সেরা। তখন তিনি লিওনেল মেসির মত, রামছাগলের সঙ্গে ছবি তোলাতে পারেন বা বিরাটের মত, প্রাক্তন ক্রিকেটারদের ফালতু মনে করতে পারেন।

কোনো খেলোয়াড় নিজেকে সর্বকালের সেরা মনে করলে এমনিতে বিশেষ ক্ষতি ছিল না। কিন্তু তাঁদের ব্যবহারে সেই মনোভাব প্রকাশ হয়ে পড়লে এখন যা হয়, তা হল তাঁদের অন্ধ ভক্তরা প্রাক্তন খেলোয়াড়দের এবং যারা তেমন ভক্ত নয় তাদের গালিগালাজ করার লাইসেন্স পেয়ে যায়। যখন অতীতের খেলা দেখা প্রায় অসম্ভব ছিল, তখন কিন্তু গাভস্করের ভক্তরা বলত না – বিজয় মার্চেন্ট বা সি কে নাইডু ক্রিকেটের কী বোঝে? এমনকি শচীনের দীর্ঘ ক্রিকেটজীবনের প্রথমদিকের ভক্তরাও বলত না গাভস্কর কী বোঝে? বলত না, কারণ গাভস্কর কখনো তেমন ভাবার মত আচরণ করতেন না। বরং আজীবন নিজের আগের প্রজন্মের ক্রিকেটারদের সম্পর্কে শ্রদ্ধা দেখিয়ে এসেছেন। শচীনও গাভস্করের সঙ্গে কথা বলতেন মাথা নিচু করে, কখনো ফর্ম পড়ে গেলে গাভস্করের পরামর্শ নিতেন। অথচ টেস্ট ক্রিকেটে গাভস্করের সব রেকর্ডই তো শচীন ভেঙে দিয়েছেন। এখন কিন্তু বিরাটের ভক্তরা বলেন, গাভস্কর কে? ও কী বোঝে? রোহিত শর্মার ভক্তরা সোশাল মিডিয়ায় মাঝেমধ্যেই বলে যান, রোহিত একদিনের ক্রিকেটে ভারতের গোট ক্রিকেটার। বিরাট দূরের কথা, শচীনও তাঁর ধারে কাছে আসতে পারেন না। এর কারণ আজকের খেলোয়াড়দের আচরণে এক ধরনের ঔদ্ধত্য প্রকাশ পায়। কারোর কম, কারোর বেশি। কথায় কথায় কাল্পনিক, অযৌক্তিক র‍্যাঙ্কিং তৈরি করে সেই ঔদ্ধত্য উস্কে দেওয়া হয়। কারণ ঔদ্ধত্যের ভাল বাজার আছে। আজকাল খেলার মাঠে সভ্যতা, ভদ্রতার চেয়ে ঔদ্ধত্য, অসভ্যতার কাটতি বেশি।

উত্তরবঙ্গ সংবাদে প্রকাশিত

শুধু মোদী নয়, আম্বানি-আদানিদের হাত থেকেও উদ্ধার পাওয়া দরকার

২০১৯ লোকসভা নির্বাচনের আগে ঋজু বিদূষক কুণাল কামরা তাঁর কমেডি রুটিনের একখানা ভিডিও প্রকাশ করেছিলেন। ততদিনে মুকেশ আম্বানি কীভাবে ভারতের অর্থনীতির উপরে একচ্ছত্র আধিপত্য কায়েম করছেন তা পরিষ্কার হয়ে গিয়েছিল, কিন্তু গৌতম আদানির নাম তখনো মুখে মুখে ফেরার পর্যায়ে পৌঁছয়নি। সেই ভিডিওর শুরুতেই কুণাল বলেন ‘আমার আর আম্বানিজির মধ্যে মোদীজি কী করছেন? আমি সোজাসুজি আম্বানিকে কেন ভোট দিতে পারব না? আমাদের আম্বানির সঙ্গে কোনো ঝামেলা আছে? বানাও না পিএম।’ তারপর বলেন ‘আমার সত্যিই মনে হয় কর্পোরেশনগুলোর ভোটে লড়া উচিত। যেমন মুকেশ আম্বানি বনাম রতন টাটা – লড়ো ২০১৯। সত্যিই দারুণ ভোট হবে। ওরা তো একটা বিষয় নিয়েই কথা বলবে – ডেভেলপমেন্ট। বিকাশ। ওরা তো আর কিছু জানেই না। ধরুন রতন টাটা তো আর উত্তরপ্রদেশে গিয়ে ঘর ভর্তি লোকের দিকে তাকিয়ে বলবে না, মন্দির ইয়হি বনেগা।’ বলা বাহুল্য কথাগুলো ঠাট্টা করে বলা, লোক হাসাতে বলা। কিন্তু ইতিহাস সাক্ষী, বিদূষকরা চিরকাল রসিকতা করতে করতে তেতো সত্যও বলে এসেছেন। তা করতে না পারলে বিদূষক হওয়ার মানে হয় না। এ প্রসঙ্গে রবীন্দ্রনাথের বিদূষক গল্প দ্রষ্টব্য। উপরন্তু আমাদের দেশে গত এক দশক ধরে কুণাল, আকাশ ব্যানার্জিরা যে কাজ করছেন তা বিদূষকের সীমায় আটকে নেই। রীতিমত সাংবাদিকতা হয়ে উঠেছে। ঠিক মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে যে কাজ জন অলিভার, হাসান মিনহাজ, ট্রেভর নোয়ারা করে থাকেন। সুতরাং কুণালের রসিকতাতেও খুঁজলে হাসির আড়ালের সত্যগুলো অনায়াসেই পাওয়া যাবে।

আসলে কুণাল ঠাট্টা করে যা বলেছিলেন তা পৃথিবী জুড়ে উদারনৈতিক গণতন্ত্রের ভালমন্দ নিয়ে যে আলোচনা চলছে তারই অঙ্গ। কোনো দেশের নির্বাচনী গণতন্ত্রই কোনোদিন অতিধনীদের প্রভাবমুক্ত ছিল না। কিন্তু একবিংশ শতাব্দীতে এসে প্রায় সব দেশের গণতন্ত্রপ্রেমী মানুষের মনেই এই সন্দেহ দেখা দিয়েছে, যে অতিধনীরাই হয়ত গণতন্ত্রের রাশ হাতে তুলে নিয়েছে। প্রকাশ্য রাষ্ট্রীয় নজরদারি ব্যবস্থা, সোশাল মিডিয়া আর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে জনমত প্রভাবিত করার উপায় এবং রাজনৈতিক দলগুলোকে বিপুল টাকা দেওয়ার ক্ষমতা মিলিয়ে বড় বড় কর্পোরেশনগুলোই কোথায় কে সরকার গড়বে আর কে সরকার চালাবে তা নিয়ন্ত্রণ করছে কিনা – এ নিয়ে সারা পৃথিবীতেই কথা হচ্ছে। কুণাল যে কাল্পনিক নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বিতার কথা বলেছিলেন তা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে তার আগেই অর্ধেক বাস্তবে পরিণত হয়েছে। কারণ ডোনাল্ড ট্রাম্প আম্বানির মতই একজন ধনকুবের। রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে দাঁড়িয়ে পড়ার আগে পর্যন্ত তাঁকে কোনোভাবেই রাজনীতিবিদদের সারিতে বসানো যেত না। আমাদের দেশে ব্যাপারটা অতদূর না গেলেও সরকারি নীতি নির্ধারণে যে কর্পোরেট শক্তি বড় ভূমিকা নিচ্ছে তার একাধিক প্রমাণ তো আমাদের চোখের সামনেই রয়েছে। যাদের সন্দেহ ছিল তারাও দেখে ফেলেছে নির্বাচনী বন্ডে কোথা থেকে কে কত টাকা পেয়েছে। কর্পোরেট স্বার্থে আইন বদলে আদিবাসীদের জমির অধিকার কেড়ে নেওয়া, কাশ্মীরে কেন্দ্রীয় শাসন কায়েম করার মত বহু ঘটনা ঘটেছে। কতগুলো বন্দর, বিমানবন্দর আদানির হাতে গেছে; আম্বানি কীভাবে খুচরো ব্যবসা থেকে শুরু করে খনিজ তেল – দেশের সমস্ত ব্যবসায় জাল বিছিয়েছেন তা-ও অনেকেরই জানা। ফলে কিছুদিন আগে অবধি ক্রোনি পুঁজিবাদ কথাটা যার শোনা ছিল না, সেও জেনে গেছে।

কোনো সন্দেহ নেই, এদেশে ক্রোনি পুঁজিবাদকে রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু করে তোলায় সবচেয়ে বেশি অবদান যাঁর, তাঁর নাম রাহুল গান্ধী। সপ্তদশ লোকসভায় বামপন্থী দলগুলোর সাংসদ ছিলেন হাতে গোনা কয়েকজন, সংসদের বাইরেও তাঁদের ক্ষমতা অত্যন্ত সীমিত। এমন অবস্থায় পুঁজিবাদ বা ক্রোনি পুঁজিবাদ নিয়ে দিনরাত আওয়াজ তোলার মত কেউ ছিলেন না। সংসদের ভিতরে তো নয়ই। রাহুলই প্রথমে সংসদের বাইরে নাম করে আম্বানি, আদানি দেশের সম্পদ কীভাবে লুটেপুটে খাচ্ছেন তা বলা শুরু করলেন। তারপর সংসদের ভিতরে আদানি আর নরেন্দ্র মোদীর একত্র ছবি এনলার্জ করে দেশের সামনে তুলে ধরলেন। মোদীর প্রাণভোমরা যে সত্যিই আরএসএস নয়, কর্পোরেটের হাতে – তা প্রমাণ হয়ে যায় কিছুদিন পরেই রাহুলকে সংসদ থেকে সাসপেন্ড করার ঘটনায়। রাহুল আদালত ঘুরে সংসদে ফিরে আসার পরেও আম্বানি, আদানিকে আক্রমণ করা ছাড়েননি। তবু এবারের নির্বাচনে ইতিহাস গড়লেন কিন্তু সেই মোদী। ক্রোনি পুঁজিবাদ নিয়ে সারা পৃথিবীতে যতই আলোচনা হোক, এত বড় গণতান্ত্রিক দেশের নির্বাচনে দুজন পুঁজিপতির নাম নির্বাচনী প্রচারে সর্বত্র আলোচিত হচ্ছে – এমন ঘটনা বিরল।

মিথ্যা বলা, সত্যকে বিকৃত করে উপস্থাপন করা এবারের নির্বাচনে জলভাত করে ফেলেছেন প্রধানমন্ত্রী। নির্বাচন শুরু হওয়ার পর থেকে কংগ্রেসের ইশতেহার সম্পর্কে বানিয়ে বানিয়ে নানা কথা বলে চলেছেন সাম্প্রদায়িক বিভাজন তৈরি করতে। অনেকেই বলছিলেন নিজের দলের ইশতেহার সম্পর্কে একটিও বাক্য খরচ না করে কেবলই কংগ্রেসের ইশতেহার সম্পর্কে অপপ্রচার আসলে প্রধানমন্ত্রীর উদ্বেগের প্রকাশ। তিনি সংসদের ভিতরে দাঁড়িয়ে প্রবল আত্মবিশ্বাসে ৪০০ আসন পার করার কথা বলেছিলেন। কিন্তু ভোটের ময়দানে যে প্রবণতার খোঁজ তিনি পাচ্ছেন তা ৫৬ ইঞ্চি বুকে ভরসা জোগাচ্ছে না। তাই সেই লালকৃষ্ণ আদবানির আমল থেকে বিজেপির যে পরীক্ষিত জয়ের ফর্মুলা, তাতেই ফিরে গেছেন – মুসলমানের ভয় দেখিয়ে হিন্দুদের ভোট কুড়াও।

এর না হয় তবু একটা ব্যাখ্যা হয়। কিন্তু তৃতীয় দফার ভোটের পরে তেলেঙ্গানার ওয়ারাঙ্গলে বক্তৃতা দিতে গিয়ে যে কথা মোদী বললেন, তার পিছনে যুক্তি কী? পাঁচ বছর ধরে কংগ্রেসের শাহজাদা সকাল থেকে মালা জপার মত আম্বানি, আদানির নাম বলতেন। ভোট ঘোষণা হতেই কেন এদের নাম বলা বন্ধ হয়ে গেল? নির্ঘাত আম্বানি, আদানির কাছ থেকে টেম্পো করে বস্তা বস্তা মাল কংগ্রেসের কাছে গেছে? শাহজাদা জবাব দিন – এই তাঁর বক্তব্য। রাজনীতিতে তো বটেই, নির্বাচনী প্রচারেও প্রত্যেকটা শব্দ মেপে খরচ করাই নিয়ম। তার উপর দশ বছর ধরে শুনে আসছি মোদী ভারতের সর্বকালের সেরা প্রধানমন্ত্রী। তিনি কি না ভেবেচিন্তে কিছু বলতে পারেন? তাহলে হঠাৎ নিজের সবচেয়ে বড় বন্ধুদের এভাবে বিরোধী দলকে গোপনে টাকা দেওয়ায় অভিযুক্ত করতে গেলেন কেন? অতীতে সংসদে রাহুল তথা বিরোধীরা আদানির সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে তাঁকে বারবার আক্রমণ করা সত্ত্বেও তিনি তো মুখ খোলেননি। তাহলে ভোটের ভরা বাজারে কেন এমন করলেন? ওই বক্তৃতার পরে বেশ কয়েকদিন কেটে গেছে। পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে, ওই কথায় বিজেপির সদস্য সমর্থকদের মধ্যে কোনো নতুন উদ্দীপনার সঞ্চার তো হয়নি বটেই, উল্টে রাহুলের ভিডিও জবাব ভাইরাল হয়ে গেছে। সমস্ত মূলধারার সংবাদমাধ্যমেও মোদীর কথার সঙ্গে সমান গুরুত্বে সেই জবাব সম্প্রচারিত হয়েছে এবং রাহুলের জবাবে রক্ষণাত্মক হওয়ার বিন্দুমাত্র প্রচেষ্টা নেই। বরং তিনি পালটা আক্রমণের রাস্তায় গিয়ে ফের ক্রোনি পুঁজিবাদ চালানোয় অভিযুক্ত করেছেন মোদী সরকারকে। বলেছেন, মোদী সরকার ২২ জন অতিধনী তৈরি করেছে, আমরা কয়েক কোটি লাখপতি বানাব। শুক্রবার উত্তরপ্রদেশে এক সভায় আরও এক ধাপ এগিয়ে বলেছেন, যখন কেউ ভয় পেয়ে যায় তখন আপন লোকেদের ডাকাডাকি করতে থাকে। মোদী হারের ভয় পেয়েছেন। তাই আম্বানি, আদানির নাম করছেন যাতে তাঁরা ওঁকে বাঁচান।

আমরা রাহুলের এসব কথায় বিশ্বাস করব না। কারণ নির্বাচনী প্রচারে গরম গরম কথা বলতেই হয়, বিশেষ করে বিরোধী পক্ষের নেতা হলে। আমরা খানিকক্ষণের জন্য একথাও ভুলে যাই, যে মোদী এক্ষেত্রেও মিথ্যাভাষণ করেছেন। রাহুল মোটেই ভোটের প্রচারে আম্বানি, আদানির নাম বলা বন্ধ করে দেননি। দি ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের এই প্রতিবেদনে পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে, নির্বাচন ঘোষণা হওয়ার পর থেকে রাহুল সাতবার সাতটা বক্তৃতায় ওই দুজনের নাম করেছেন।

আমরা বরং তর্কের খাতিরে ধরে নিই, মোদী সত্যি কথাই বলছেন। আমরা ধরে নিচ্ছি টেম্পোয় করে টাকা পাঠানোর কথাটা লোকের বুঝতে সুবিধা হবে বলে মোদী বলেছেন। মোদ্দাকথা হল, আম্বানি আর আদানি কংগ্রেসকে টাকা দিচ্ছেন এই নির্বাচনে। যদি একথা সত্যি হয়, তাও কিন্তু বিজেপির পক্ষে দুঃসংবাদ। কর্পোরেটবান্ধব মোদী সরকারের মাথার উপর থেকে যদি ভারতের সবচেয়ে ধনী দুই ব্যবসায়ীর হাত সরে গিয়ে থাকে তাহলে মোদীর সমূহ বিপদ। কারণ তাহলে বুঝতে হবে, তাঁরা হাওয়া খারাপ বুঝে পরবর্তী সরকারে নির্ণায়ক শক্তি হবে যারা, তাদের তুষ্ট করবেন ঠিক করেছেন। বস্তুত, অনেকেই খেয়াল করেছেন যে মোদীর এই বক্তব্য ধামাচাপা দেওয়ার জন্যে আদানির মালিকানাধীন চ্যানেল এনডিটিভি সেদিন মাতামাতি করছিল স্যাম পিত্রোদার মন্তব্য নিয়ে, যে মন্তব্যের সঙ্গে কংগ্রেস একমত নয় বলে পত্রপাঠ জানায়। তারপর পিত্রোদাকে কংগ্রেসের বৈদেশিক শাখার কর্তার পদ ছাড়তেও বাধ্য করা হয় সেইদিনই। কিন্তু পরদিন এনডিটিভি যা করেছে তা আরও কৌতূহলোদ্দীপক। সন্দেশখালির বিজেপি নেতা গঙ্গাধর কয়ালের গোপন ক্যামেরার সামনে শুভেন্দু অধিকারীর নির্দেশে ধর্ষণের মিথ্যা অভিযোগ দায়ের করানোর চক্রান্ত যেদিন ফাঁস হল, সেদিন থেকে সমস্ত গোদি মিডিয়ার মত এনডিটিভিও খবরটা যথাসম্ভব চেপে গিয়েছিল। কিন্তু বুধবার মোদীর ওই বক্তৃতার পরে বৃহস্পতিবার যখন রেখা পাত্রের ভিডিও প্রকাশ্যে এল, সে খবর এনডিটিভি দেখিয়েছে যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়ে।

এ কিন্তু মোদীর পক্ষে অশনি সংকেত। আদানি আর আম্বানি মিলে ভারতের মূলধারার সংবাদমাধ্যমের অনেকখানি দখল করে আছেন। ক্রোনি পুঁজিবাদ ভারতের সংবাদমাধ্যমেও মোদীর আমলে কাজ করেছে পুরোদমে। নিজের চা বিক্রেতার অতীত থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রির মত বহু নড়বড়ে সত্যের উপরে মোদীর যে বিশালকায় ভাবমূর্তি নির্মিত হয়েছে তা সম্ভব হত না এতগুলো সংবাদমাধ্যমের শতকরা একশো ভাগ সমর্থন না থাকলে। সেই সমর্থন যদি সরতে শুরু করে, ওই ভাবমূর্তি ভেঙে পড়তে বিশেষ সময় লাগবে না। এখন সোশাল মিডিয়ার যুগ, সবকিছু ঘটে বড্ড তাড়াতাড়ি। নির্বাচন কমিশনের বদান্যতায় এক দীর্ঘ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এখনো চারটে দফা বাকি, প্রথম তিন দফায় বিজেপি দারুণ ফল করবে এমনটা মোদীর ভাবভঙ্গি দেখে মনে হচ্ছে না। সে ভরসা থাকলে তাঁকে মরিয়া হয়ে আম্বানি, আদানির নাম করে রাহুলকে আক্রমণ করতে হত না। এমতাবস্থায় টিভি কভারেজ কমে গেলে মোদী যাবেন কোথায়? বিশেষত জি নেটওয়ার্কের মালিক এবং মোদীর একদা ঘনিষ্ঠ সুভাষ চন্দ্র যখন আগে থেকেই চটে আছেন ফের রাজ্যসভার টিকিট না পেয়ে। তিনি ওয়ার্ল্ড প্রেস ফ্রিডম ডে উপলক্ষে বলে বসেছেন যে ভারতে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা মোটেই ভাল জায়গায় নেই। তার চেয়েও বড় কথা, গোদি মিডিয়ার অন্যতম মুখ দীপক চৌরাসিয়াকে জি নিউজ ছাড়তে বাধ্য করা হয়েছে। সুধীর চৌধুরীর মত লোকও হঠাৎই মোদীর বক্তৃতার মিথ্যা দর্শকদের সামনে উদ্ঘাটন করতে শুরু করেছেন। এ সময় আম্বানি, আদানিকে কেউ চটায়?

আরও পড়ুন এনডিটিভি বিসর্জন: শোক নিষ্প্রয়োজন, উল্লাস অন্যায়

এই যে ভারতের মত এত বড় দেশের নির্বাচনে অন্যতম ইস্যু হয়ে উঠেছেন দুজন পুঁজিপতি – এটাই প্রমাণ করে একবিংশ শতাব্দীর গণতন্ত্র পুঁজিপতিদের উপরে কতখানি নির্ভরশীল। বিজেপি মুখপাত্ররা অনেকে প্রধানমন্ত্রীর সেদিনের বক্তৃতার পক্ষে দাঁড়াতে গিয়ে বলছেন – ঠিকই বলছেন – যে রাহুল উঠতে বসতে আম্বানি-আদানির চোদ্দ পুরুষ উদ্ধার করেন, সেই রাহুলের দলের মুখ্যমন্ত্রীরাই ওই দুজনের শিল্প নিজের রাজ্যে টেনে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন। এই দ্বিচারিতা কেন? কথা হল, পুঁজিবাদ নয়া উদারবাদী অর্থনীতির সাহায্যে এই শতকে গণতন্ত্রের ঘাড়ে এমনই চেপে বসেছে যে এই দ্বিচারিতা না করে কোনো সরকারে থাকা দলের উপায় নেই। সরকারি সম্পত্তি, সরকারি শিল্পগুলোর বারোটা বাজিয়ে দেওয়া শুরু হয়েছিল ১৯৯১ সাল থেকেই। সেই প্রকল্পের দ্রুততা বাড়িয়ে মোদী সরকার প্রায় সমস্ত রাষ্ট্রীয় সম্পত্তিই তুলে দিয়েছে কর্পোরেটের হাতে। এখন যে সরকার জনকল্যাণমুখী হতে চায়, তার নিজের টাকা রোজগারের পথ এত সংকীর্ণ হয়েছে যে পুঁজিপতিদের উপরে নির্ভর করা ছাড়া উপায় নেই। অথচ তারা তা হতে দেবে না। কারণ রাষ্ট্র নাগরিকে পরিষেবা দিতে সক্ষম হলে কর্পোরেটের থেকে পরিষেবা কিনবে কে? সরকারি হাসপাতাল ঝকঝকে তকতকে হলে, ভাল চিকিৎসা শস্তায় করে দিলে বেসরকারি হাসপাতালে কে যাবে?

সুতরাং রাহুলের আসল পরীক্ষা শুরু হবে সরকারে আসতে পারলে। এখন মোদীকে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়ে কয়েক কোটি লাখপতি তৈরি করার কথা বলা সোজা। কিন্তু মোদীর চেয়ারে বসার সুযোগ পাওয়া গেলে দলের ইশতেহারে যে গুচ্ছ গুচ্ছ জনকল্যাণমুখী প্রকল্পের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে তা পূরণ করতে গেলে আম্বানি, আদানিদের সঙ্গে সরাসরি সংঘাতে যেতে হবে। চোখ বুজে বলে দেওয়া যায়, বিরোধিতা হবে তাঁর নিজের দলের ভিতর থেকেও। সেসব সামলে কি ইশতেহারের প্রতিশ্রুতি পূরণ করা সম্ভব হবে? পারলে তা গোটা পৃথিবীতে উদাহরণ হয়ে থাকবে। কারণ ক্রোনি পুঁজিবাদের হাত থেকে উদ্ধারের পথ এখন সব দেশেই খোঁজা হচ্ছে। উদারনৈতিক গণতন্ত্রের পিঠ দেয়ালে ঠেকে গেছে। ঋজু বিদূষক কুণাল তাঁর সাম্প্রতিক এক ভিডিওতে মোদীর বদলে কে – এই প্রশ্নের যে উত্তর দিয়েছেন, তা এখন অনেক দেশেরই দুর্দশাগ্রস্ত মানুষের মনের কথা – ‘খালি চেয়ারও চলবে’।

পিপলস রিপোর্টারে প্রকাশিত

রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে ৪২ বছর

অনেকসময় দার্জিলিঙে হঠাৎ মেঘ সরে গিয়ে কাঞ্চনজঙ্ঘা যেভাবে নিজেকে উদ্ঘাটন করে, সেভাবে কোনো ঘটনায় আচমকা জলের মত পরিষ্কার হয়ে যায় রবীন্দ্রনাথের একেকটা লাইন।

মা মারা গেছেন খুব বেশিদিন হয়নি। তবু এবছর মায়ের মৃত্যুদিনটা ভুলে গিয়েছিলাম। বেলার দিকে বোন ফোন করে মনে না করালে মনে পড়ত না। আসলে ওই দিনটার চেয়ে মাকে অনেক বেশি মনে পড়ে প্রতিবছর পঁচিশে বৈশাখে। আমার মায়ের বেশ বেলা করেই ঘুম থেকে ওঠার অভ্যাস ছিল, কিন্তু বছরে ওই একটা দিন ঘুম থেকে উঠে পড়তেন খুব ভোরে। দূরদর্শনে জোড়াসাঁকো আর রবীন্দ্র সদনের কবিপ্রণাম দেখবেন বলে। বাড়িতে টিভি এসেছিল আটের দশকের শেষ দিকে। তখন থেকেই এই রুটিন চলছিল। মা যথারীতি ঈশ্বরে বিশ্বাসী, একসময় বাড়িতে ঠাকুরের আসন পেতে পুজোও করতেন। কিন্তু মহালয়ার দিন ভোর ভোর উঠতেই হবে, উঠে বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের চণ্ডীপাঠ শুনতেই হবে – ‘মহিষাসুরমর্দিনী’ নিয়ে এত গদগদ ছিলেন না। কোনোবার উঠতেন, কোনোবার উঠতেন না। কিন্তু পঁচিশে বৈশাখে ছাড়াছাড়ি নেই। খুব ইচ্ছা ছিল, একবার জোড়াসাঁকো বা রবীন্দ্র সদনের অনুষ্ঠানে গিয়ে ওখানে বসে গোটাটা দেখবেন। আমার কাছে আবদার ছিল, যখন বড় হয়ে চাকরি করব, তখন যেন নিয়ে যাই। আমি চাকরি পাওয়ার পরেও মা ১৬ বছর বেঁচেছিলেন। তখন আর মুখ ফুটে বলেননি, আমারও খেয়াল হয়নি। মুনীর নিয়াজি যথার্থই লিখেছেন “হমেশা দের কর দেতা হুঁ ম্যায়…” (সর্বদা দেরি করে ফেলি আমি)।

মা মারা গিয়েছিলেন শীতের শেষ দিকে। সেবার পঁচিশে বৈশাখে আমার ভোর ভোর ঘুম ভেঙে গেল, যদিও আমার বরাবর বেলা করে ঘুম থেকে ওঠা অভ্যাস। মা কবিপ্রণাম দেখতে উঠে পড়তেন, আমি বিছানা ছাড়তাম না। ঘুমটা পাতলা হয়ে গেলে গান, আবৃত্তি, ভাষ্যপাঠের আওয়াজ কানে ভেসে আসত। মা মারা যাওয়ার বছরের রবীন্দ্র জয়ন্তীতে তেমন আওয়াজ কানে আসতেই ধড়মড়িয়ে উঠে বসেছিলাম। কিন্তু উঠে বসতেই সে আওয়াজ মিলিয়ে গেল। না, কোথাও তো টিভি চলছে না! না আমাদের ফ্ল্যাটে, না পাশের বাড়িটায়, যেখান থেকে মেগা সিরিয়ালের সংলাপ বা ইউটিউবে চালানো হিন্দি সিনেমার গান ভেসে আসে প্রায়শই। বুঝলাম, স্বপ্ন দেখছিলাম। স্বপ্ন তো আসলে ইচ্ছাপূরণ – সিগমুন্ড ফ্রয়েড কবেই বলে গেছেন।

আমার একেবারে ছোটবেলায় বাড়িতে টিভি ছিল না, কেনার সামর্থ্য ছিল না বলে। এক নিকটাত্মীয় রঙিন টিভি কেনার সময়ে সাদাকালো টিভিটা যখন আমাদের দিয়ে দেন, তখন আমার বয়স ছয় কি সাত। তার আগে পর্যন্ত আমাদের বাড়িতে বিনোদন বলতে ছিল বই আর আমার অদেখা ঠাকুর্দার রেকর্ড প্লেয়ার। আমার হাতেখড়ির আগে থেকে টিভি আসার সময় পর্যন্ত সন্ধেবেলা আমার প্রিয় বিনোদন ছিল মায়ের মুখে সঞ্চয়িতার কোনো কবিতা পাঠ শোনা, বা মায়ের গলায় রবীন্দ্রসঙ্গীত। গীতবিতানটা খুলে রাখতেন পাশে, কিন্তু কোনোদিন দেখতে হয়েছে বলে মনে পড়ে না। শুনে শুনে বেশকিছু কবিতা আর গানের প্রতি আমার পক্ষপাত জন্মেছিল। বারবার সেগুলোই শুনতে চাইতাম।

যেমন পলাতকা কাব্যগ্রন্থের ‘নিষ্কৃতি’ কবিতাটা। কুলীন এবং নিষ্ঠুর বাপের মেয়ে মঞ্জুলিকার কষ্টের কথা পড়তে পড়তে মায়ের চোখ দিয়ে জল গড়াত, আমার চোখ দিয়েও। পথের পাঁচালী পড়েছি অনেক পরে। অপরের দুঃখে কষ্ট পাওয়ার শুরু মঞ্জুলিকার জন্যে কাঁদতে কাঁদতেই।

মায়ের নিজের বেশি প্রিয় ছিল “ডাক্তারে যা বলে বলুক নাকো,/রাখো রাখো খুলে রাখো,/শিয়রের ওই জানলা দুটো, – গায়ে লাগুক হাওয়া।/ওষুধ? আমার ফুরিয়ে গেছে ওষুধ খাওয়া।” বড় হয়ে সকৌতুকে লক্ষ করেছি, বাবার সঙ্গে ঝগড়া-টগড়া হলে এই কবিতাটা বেশি পড়তেন। মনোমালিন্য ২৪ ঘন্টার বেশি স্থায়ী হলে আবার পড়তেন ‘সাধারণ মেয়ে’।

লোডশেডিং তখন নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার ছিল, আর লোডশেডিং হয়ে গেলে হ্যারিকেন বা মোমবাতির আলোয় শুয়ে শুয়ে কবিতা পড়া যায় না। সেরকম পরিস্থিতিতে মা গান ধরতেন। আমার প্রায় ৪২ বছরের জীবনে আর কোনো অগায়কের এতগুলো রবীন্দ্রসঙ্গীত সুর সমেত মুখস্থ আছে বলে দেখিনি। অক্ষর পরিচয় হওয়ার আগেই রবীন্দ্রসঙ্গীত যে অন্য গানের চেয়ে আলাদা – এটা বুঝতে শিখেছিলাম মায়ের গান শুনে। কথাগুলোর মানে বোঝার বয়স তখন হয়নি, কিন্তু বারবার শুনে প্রায় মুখস্থ হয়ে গিয়েছিল মায়ের প্রিয় গানগুলো – “তোমার অসীমে প্রাণমন লয়ে”, “আমি রূপে তোমায় ভোলাব না”, “আমার সকল নিয়ে বসে আছি”, “সুখের মাঝে তোমায় দেখেছি”।

সুচিত্রা মিত্র আর কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায়ের লং প্লেয়িং রেকর্ড বেশ কয়েকটা ছিল আমাদের। বাগবাজারে মায়ের বড়মাসির বাড়ি যাওয়া হলেই ফেরার সময়ে মেট্রোরেলের জন্যে খুঁড়ে ফেলা এবড়োখেবড়ো রাস্তা অগ্রাহ্য করে, লাইন দিয়ে যে রেকর্ডের দোকানগুলো ছিল মা সেখানে খোঁজ করতেন নতুন কী এসেছে। ঋতু গুহ আর পূর্বা দামের নাম জানতে পারি তখনই। তবে অনেক খোঁজাখুঁজির পরেও ঋতুর গলায় “তোমার  সোনার থালায় সাজাব আজ” খুঁজে পাননি মা। যে রেকর্ডটা কিনে এনেছিলেন তার দুটো গান কে জানে কী কারণে আমার খুব প্রিয় হয়ে গিয়েছিল – “এরা  পরকে আপন করে, আপনারে পর”, “পেয়েছি ছুটি বিদায় দেহ ভাই”। সেই থেকে আজ পর্যন্ত আমার কাছে বুদ্ধদেব গুহ ঋতু গুহর স্বামী। আর কিছু নন।

বাবার অতখানি রাবীন্দ্রিক হওয়ার সময় ছিল না। বছর বিশেক বয়সে মার্কসবাদী কমিউনিস্ট পার্টির সদস্যপদ পেয়েছিলেন। মৃত্যুর আড়াই মাস আগে শয্যাশায়ী হয়ে যাওয়া পর্যন্ত দিনের বেশিরভাগ সময়টা পার্টির কাজেই কাটাতেন। তার উপর আমার শৈশবে প্রশাসনিক দায়িত্বেও ছিলেন। তবু একবার বিবাহবার্ষিকীতে মাকে উপহার দিলেন একটা এলপি রেকর্ড, যার এক পিঠে কণিকা, অন্য পিঠে দেবব্রত বিশ্বাস। সুচিত্রার গান বাবার তত পছন্দ ছিল না। রেকর্ডে দেবব্রতর গলায় সম্ভবত প্রথম গানটাই ছিল ‘আকাশ ভরা সূর্য তারা’। তখন আমার বয়স সাত বা আট। শুনেই মনে হল, এ কী আশ্চর্য গান রে বাবা! এমন কথা হয় গানের! এমন গলা হয় মানুষের! সেই বিস্ময় আমার আজও কাটেনি।

পার্টি সংগঠন, প্রশাসন, পরিবার সামলেও বাবা যে সুযোগটা পারতপক্ষে ছাড়তেন না সেটা হল অপেশাদার যাত্রায়, নাটকে অভিনয় করার সুযোগ। বাবা আর তাঁর বন্ধুরা কয়েকজন মিলে যাত্রা ক্লাব খুলেছিলেন, বছরে অন্তত একটা যাত্রা হত। আজকাল যাকে ‘টল, ডার্ক অ্যান্ড হ্যানসাম’ চেহারা বলে, তেমন চেহারা থাকার সুবাদে বাবা বেশ কয়েকবার নায়কের ভূমিকায় অভিনয় করেছেন। কিন্তু চেহারা নয়, যাত্রায় অভিনয় করতে গেলে যা অপরিহার্য, তা হল শক্তিশালী কণ্ঠস্বর। সেরিবেল্লা ডিজেনারেশন নামে এক আরোগ্যহীন রোগে গলাটা নষ্ট হয়ে যাওয়ার আগে বাবার দারুণ একখানা কণ্ঠস্বরও ছিল। সেই সুবাদে বাবা চমৎকার কবিতা আবৃত্তিও করতেন। বহুকাল চর্চা না থাকলেও অনর্গল আবৃত্তি করতে পারতেন নজরুলের ‘আমার কৈফিয়ত’। বাড়িটা গমগম করত। রবীন্দ্রনাথের কবিতার মধ্যে বাবা বারবার আবৃত্তি করতেন ‘ছেলেটা’ আর ‘বাঁশি’। বাবার অনেকটা সময় বাড়িতে থাকা আমাদের দুই ভাইবোনের কাছে অনেকদিন পর্যন্ত ছিল লটারি পাওয়ার মত ব্যাপার। তেমন দিনে মনমেজাজ বিশেষ রকমের ভাল থাকলে বাবা সঞ্চয়িতা টেনে নিয়ে উদাত্ত কণ্ঠে পড়তেন “যদি  পরজন্মে পাই রে হতে/ব্রজের রাখাল বালক/তবে  নিবিয়ে দেব নিজের ঘরে/সুসভ্যতার আলোক।” মা পড়তেন ‘পুরাতন ভৃত্য’ বা ‘দুই বিঘা জমি’। বাবা মাঝে মাঝে গেয়েও উঠতেন। সবই দেবব্রতর গলায় শোনা গান – ‘আমি যখন তাঁর দুয়ারে ভিক্ষা নিতে যাই’, ‘তোরা যে যা বলিস ভাই’, ‘যেতে যেতে একলা পথে/নিবেছে মোর বাতি,’ ‘যে রাতে মোর দুয়ারগুলি’।

একসময় রেকর্ড প্লেয়ারটার দিন ফুরোল। গানহীন দীর্ঘ কয়েকটা বছরের পরে বাড়িতে এল ফিলিপসের ক্যাসেট প্লেয়ার, যাকে আমরা বলতাম টেপ রেকর্ডার। তখন উঁচু ক্লাসে পড়ি। এক ছুটির দিনে মা ঠিক করলেন, আমাদের চারজনের গলা টেপে ধরে রাখা হবে। ব্ল্যাঙ্ক ক্যাসেট ছিল না, কিন্তু যখন ঝোঁক চেপেছে তখন করতেই হবে কাজটা। উনিশ বছর বয়সী এ আর রহমানের সৃষ্টি রোজা-র সাউন্ড ট্র‍্যাকের খানিকটা ধ্বংস করে রেকর্ড করা হল – বাবার গলায় ‘বিষ্টি পড়ে টাপুর টুপুর’, মায়ের গলায় “সন্ন্যাসী উপগুপ্ত/মথুরাপুরীর প্রাচীরের তলে/একদা ছিলেন সুপ্ত – ”। ধরে রাখা হয়েছিল, কিন্তু সংরক্ষণ করা হয়নি। ক্যাসেটের যুগ চলে গেছে, ওই কণ্ঠস্বরগুলো আমাদের সন্তানদের শোনার জন্যে এ যুগের উপযোগী ফর্ম্যাটে রাখা হয়নি। আমার মায়ের আরেকটা প্রিয় গান “যা  হারিয়ে যায় তা আগলে বসে/রইব কত আর?”

গত সহস্রাব্দের শেষে প্রাপ্তবয়স্ক হলাম। জন্মদিনে বাবা-মা বরাবরই বই দিতেন, জামাকাপড় বা খেলনা নয়। আঠারোতম জন্মদিনের আগেরদিন দেখি মা রিকশা করে এসে বাড়ির সামনে নামলেন আর রিকশাকাকু একটা ইয়াব্বড় প্যাকিং বাক্স ঘরে নামিয়ে দিয়ে গেলেন। কী আছে তাতে? সেবারের জন্মদিনের উপহার – বিশ্বভারতী প্রকাশিত রবীন্দ্র রচনাবলীর প্রথম ১৫ খণ্ড। বারো তারিখের আগে মাইনে হত না বাবার। সাত-আট তারিখে অত দামি জিনিস বাড়িতে এসে পড়ায় দেখলাম বাবার ভুরু সামান্য কুঁচকে গেছে। দাম শুনে চোখ কপালে। তখনই বোধহয় ১৭০০-১৮০০ টাকা দাম ছিল। কিন্তু একটু পরেই বাবার রাগ পড়ে গেল। বললেন “যাকগে, এ জিনিস তো জীবনে একবারই কেনা। আমরা যখন থাকব না তখনো ওর কাজে লাগবে এরকম একটা জিনিস দেওয়া গেল।” পরবর্তী এক বছরে সমস্ত কবিতা পড়ে ফেলেছিলাম। তারপর ক্রমশ গল্প, উপন্যাস, নাটক। প্রবন্ধগুলো পড়তে ভারি আলস্য লাগত। সে আলস্য কাটাতে কাটাতে বাবা, মা দুজনেই বিদায় নিলেন; আমার চশমাটা বাইফোকাল হয়ে গেল। রাশিয়ার চিঠি, কালান্তর, শান্তিনিকেতন, মহাত্মা গান্ধী, ইতিহাস, ভারতবর্ষ – এসব পড়তে পড়তে এতদিন যে জিনিস যে চোখে দেখে এসেছি তা বদলে যায় আর মনে পড়ে বাবার মন্তব্য “আমরা যখন থাকব না তখনো ওর কাজে লাগবে এরকম একটা জিনিস দেওয়া গেল।”

বাবার যখন শেষ সময় – মানে অসুখটা জেনে গেছি, বাবাও টের পেয়ে গেছে, চোখে আর ভাল দেখতে পাচ্ছে না, গলা দিয়ে স্বর বেরনো একেবারেই বন্ধ হয়ে গেছে, তখনো শ্রবণেন্দ্রিয় ঠিক ছিল। একদিন সন্ধেবেলা কোনো কারণে আমি, মা, বোন বাবাকে ঘিরে বসে একসঙ্গে গাইছিলাম “আগুনের পরশমণি ছোঁয়াও প্রাণে।” “ব্যথা মোর/উঠবে জ্বলে/ঊর্ধ্ব-পানে” পংক্তিতে এসে এক অদ্ভুত অনুভূতি হল। মনে হল, জীবনটা যদি সিনেমা হত তাহলে এই শটটার পরের শটে দেখা যেত – বিছানাটা খালি, বাবা নেই। সাউন্ড ট্র্যাকে গানটা চলতে থাকত। রবীন্দ্রনাথের আর সব থেমে গেলেও গান কখনো থামে না, জীবন মরণের সীমানা ছাড়ায়ে চলতেই থাকে। সেই হাতেখড়ির আগের যুগে রান্নাঘরে আটা মাখতে মাখতে গাওয়ার মাঝে মা বলেছিলেন “জীবনের সব পরিস্থিতির জন্যেই দেখবি রবীন্দ্রনাথের একটা না একটা গান আছে।” তখন মনে হয়েছিল, এই কয়েকবছর আগেও মনে হত, মা রবীন্দ্রভক্ত বলে বাড়িয়ে বলেছেন। কিন্তু বয়স যত বাড়ছে, ততই কথাটা বিশ্বাস না করে উপায় থাকছে না। বরং এখন মনে হয় মা একটু রক্ষণশীল হয়েই কথাটা বলেছিলেন। কেবল রবীন্দ্রনাথের গান নয়, বোধহয় রবীন্দ্রনাথের কাব্যের ক্ষেত্রেও কথাটা সত্যি। কোভিড হাসপাতাল থেকে যখন মায়ের মৃতদেহ নিয়ে বাড়ি আসছিলাম, রাস্তা খুঁড়ে পৌরসভা কোনো কাজ করছিল বলে সোজা পথে না এসে ঘুরপথে আসতে হয়েছিল। তখন মা রবীন্দ্রনাথের যে কবিতা আমাকে একেবারে ছোটবেলায় আবৃত্তি করতে শিখিয়েছিলেন, তার প্রথম কয়েক লাইন মনে পড়ছিল “মনে করো যেন বিদেশ ঘুরে/মাকে নিয়ে যাচ্ছি অনেক দূরে।”

অনেককাল হল, শ্মশানে গেলেই আমার কানে বাজতে থাকে দেবব্রতর গলায় “আছে দুঃখ, আছে মৃত্যু, বিরহদহন লাগে/তবুও শান্তি, তবু আনন্দ, তবু অনন্ত জাগে।” সদ্যমৃত কোনো কাছের মানুষকে দাহ করতে শ্মশানে গিয়ে দ্বিতীয় লাইনটা অবিশ্বাস্য, অবাস্তব মনে হওয়াই স্বাভাবিক। কিন্তু আমার দিব্যি বিশ্বাসযোগ্য মনে হয়। কারণ যে বছর বাবা মারা গেলেন, সেবছরই আমার মেয়ে জন্মাল। যে বছর মা মারা গেলেন, সে বছরই আমার ভাগ্নী জন্মাল। কোনো সন্দেহ নেই – “নাহি ক্ষয়, নাহি শেষ,  নাহি নাহি দৈন্যলেশ।”

মাস দেড়েক পরেই বিয়াল্লিশে পা দেব। জীবনের কাছে এখনো যা যা প্রত্যাশা আছে তার অন্যতম হল রবীন্দ্রনাথের যেসব লাইনের অর্থ আজও বুঝিনি সেগুলোর মর্মোদ্ধার। বুঝে গেছি, সবসময় বুঝতে চেষ্টা করলেই বোঝা যায় না। অনেকসময় দার্জিলিঙে হঠাৎ মেঘ সরে গিয়ে কাঞ্চনজঙ্ঘা যেভাবে নিজেকে উদ্ঘাটন করে, সেভাবে কোনো ঘটনায় আচমকা জলের মত পরিষ্কার হয়ে যায় রবীন্দ্রনাথের একেকটা লাইন। নইলে ভেনেজুয়েলার জগদ্বিখ্যাত নেতা উগো শাভেজ, জাপানের সাংবাদিক জুনিচি কোদামা আর তার স্ত্রী রিয়েকো আসাতোর সঙ্গে ভারতের এক নগণ্য মফস্বলের ছাপোষা প্রতীক যে বিশ্বসাথে যোগে যুক্ত – তা কখনো আমার বুঝে ওঠা হত না।

মহিলা ভোটাররা কি এখনো ততটা মানুষ নন পশ্চিমবঙ্গে?

ভারত জুড়ে মহিলা ভোটারদের গুরুত্ব ক্রমশ বাড়ছে। লোকসভা নির্বাচনের সঙ্গেই বিধানসভা নির্বাচন আছে অন্ধ্রপ্রদেশে। প্রায় সব বিশ্লেষক বলছেন, ওই রাজ্যে কে ক্ষমতায় আসবে তা নির্ধারিত হবে মহিলাদের হাতে। পশ্চিমবঙ্গেও যে মহিলাদের ভোট অতি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়িয়েছে, তা জানতে কারোর বাকি নেই। নির্বাচন কমিশনের তথ্য বলছে, পশ্চিমবঙ্গে এখন ৩.৭৩ কোটি মহিলা ভোটার। পুরুষদের চেয়ে মাত্র ১২ লক্ষ কম। ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে আমাদের রাজ্যে পুরুষদের চেয়ে বেশি মহিলা ভোট দিয়েছিলেন। বলা হয়, তৃণমূল কংগ্রেসের বারবার ভোটে জেতার অন্যতম কারণ মমতা ব্যানার্জির মহিলা ভোটব্যাঙ্ক। সেই ভোটব্যাঙ্ককে আরও জোরদার করতেই নাকি লক্ষ্মীর ভাণ্ডার প্রকল্পের কথা ভাবা হয়েছিল। সাধারণ বুদ্ধি বলে, এমন একটা রাজ্যে ভোটের সময়ে মহিলাদের গুরুত্ব সব দলের কাছেই আকাশছোঁয়া হবে। নির্বাচনী প্রচার ভরে থাকবে মহিলাদের দাবিদাওয়া নিয়ে। কিন্তু দুঃখের বিষয়, ভারত এমন একটা দেশ যে দেশে সাধারণ বুদ্ধি বিশেষ কাজে লাগে না। এখানে সারাক্ষণই অসাধারণ ব্যাপারস্যাপার ঘটতে থাকে। এখন যেমন পশ্চিমবঙ্গে আলোচনার কেন্দ্রে মহিলারাই, কিন্তু রাজনৈতিক দলগুলো তাঁদের ভোট পাওয়ার জন্যে ‘এই করব, সেই দেব, তাই বানিয়ে দেব’ বলছে বলে নয়। বরং দুই প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী দল মহিলাদের সম্মানকে দড়ি টানাটানির বিষয়বস্তু করে তুলেছে বলে।

আমরা যখন কলেজে পড়ি, তখন গরীবের সম্মান নামের এক বাংলা ছবির পোস্টার লেগেছিল আমাদের হোস্টেলের পাড়ার বেশকিছু দেওয়ালে। তা দেখে আমার এক বন্ধু বলেছিল, ‘এ থেকেই বোঝা যায় যে দেশে গরিবের কোনো সম্মান নেই।’ পশ্চিমবঙ্গে এই মুহূর্তে বহু আলোচিত মহিলাদের সম্মান সম্পর্কে একই কথা প্রযোজ্য। তৃণমূল কংগ্রেস আর বিজেপি – দুপক্ষ থেকেই যত ফিল্মি সংলাপ ছোড়া হচ্ছে, তত পরিষ্কার হচ্ছে আসলে মহিলাদের সম্মান নয়, তাঁদের ভোটই অভীষ্ট লক্ষ্য। সন্দেশখালিতে আসলে কোনো ধর্ষণ হয়নি, বিজেপি মহিলাদের দিয়ে মিথ্যা অভিযোগ দায়ের করিয়েছে – এই মর্মে বিজেপিরই অঞ্চল সভাপতি গঙ্গাধর কয়ালের ভিডিও ভাইরাল হওয়ার পর সোমবার এক সভায় মুখ্যমন্ত্রী বলেছেন ‘মেয়েদের কাছে টাকার চেয়ে শাড়ির আঁচল অনেক গুরুত্বপূর্ণ, সম্মান গুরুত্বপূর্ণ। বেশি চক্রান্ত করো না। সব কিছু পরিকল্পনা (করে) করেছে।’ পালটা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ বলেছেন ‘মমতা দিদি আপনার লজ্জা হওয়া উচিত। আপনি মহিলা মুখ্যমন্ত্রী, আপনার নাকের ডগায় হাজার হাজার বোনের উপর অত্যাচার, ধর্ষণ হয়েছে। কিন্তু আমি আজ বলতে চাই, সন্দেশখালিতে যে অত্যাচার করেছে, সে যদি পাতালেও লুকিয়ে থাকে… মমতা দিদি তাঁদের পাতালে লুকিয়ে রাখলেও সেখান থেকে খুঁজে বের করে জেলে ঢোকাব।’

শাহের বক্তব্যের পুরোটাই ফেনা, অতএব তা নিয়ে আলোচনা নিষ্প্রয়োজন। মুখ্যমন্ত্রীর নাটকীয় প্রথম বাক্য বাদ দিয়ে বাকিটা বিচার করা যাক। তাঁর বক্তব্য সত্যি হওয়া মোটেই অসম্ভব নয়। নাগরিক ডট নেট যেহেতু বিজেপি নেতার ভাইরাল ভিডিও সম্পর্কে তদন্ত করেনি, করার উপযুক্তও নয়, সেহেতু ওতে প্রযুক্তিগত কারিকুরি আছে কিনা তা আমরা বলতে পারি না। কিন্তু যেভাবে ভিডিও প্রকাশ্যে আসার কিছুক্ষণের মধ্যেই এক খবরের চ্যানেলে গঙ্গাধর স্বীকার করেছিলেন – ছবিতে যাকে দেখা যাচ্ছে সেই ব্যক্তি উনিই এবং ওই কথোপকথন সত্যিই হয়েছিল, তাতে পরবর্তীকালে স্পষ্টতই দলের নির্দেশে তিনি যে ভিডিও বিবৃতি দিয়েছেন তাকে বিশ্বাস করা শক্ত হয়ে পড়ে।

তিনি এখানে কোনোমতে আত্মপক্ষ সমর্থনে এটুকুই বলতে পেরেছেন যে তাঁকে দিয়ে কথাগুলো বলানো হয়েছিল। কীভাবে? প্রলোভন দেখিয়ে, নাকি ভয় দেখিয়ে? সে ব্যাপারেও কিছু বলেননি তখন। এমনকি পরে বিবৃতি বদলে ফেলেও তা বলেননি, বলেছেন এতে যান্ত্রিক কারচুপি আছে। অর্থাৎ দুটো বিবৃতি পরস্পরবিরোধী। গঙ্গাধরের কথা অনুযায়ী যে ব্যক্তি এসবের পরিকল্পনা করেছিলেন, সেই শুভেন্দু অধিকারীও এই ভিডিও অসত্য – এ কথার অকাট্য প্রমাণ এখন পর্যন্ত দিতে পারেননি। যাঁরা ধর্ষণের অভিযোগে আন্দোলন শুরু করেছিলেন তাঁদের অন্যতম এবং বসিরহাট লোকসভা কেন্দ্রের বিজেপি প্রার্থী রেখা পাত্র তবু টিভি ক্যামেরার সামনে বলেছেন, গঙ্গাধরকে ভয় দেখিয়ে তৃণমূল এসব করে থাকতে পারে। কিন্তু সে তো তাঁর বিশ্বাস। এখন কথা হল, মুখ্যমন্ত্রী যদি মনে করেন এই ভিডিও বিজেপির ষড়যন্ত্রের অকাট্য প্রমাণ, তাহলে নির্বাচনী প্রচারে তাদের বদমাইশি ধরিয়ে দেওয়ার পাশাপাশি ফৌজদারি মামলা দায়ের করা হচ্ছে না কেন? ধর্ষণের মিথ্যা অভিযোগ দায়ের করিয়ে একটা এলাকায় অশান্তি সৃষ্টি করা, সাম্প্রদায়িক বিভাজনের চেষ্টা করা – এগুলো তো মারাত্মক অপরাধ। কেউ এই অপরাধ করেছেন জানলে স্রেফ বাদানুবাদে থেমে থাকবে কেন একটা রাজ্যের সরকার? কেনই বা যে মহিলারা ধর্ষণের অভিযোগ দায়ের করেছেন, পুলিস তাঁরা কী বলছেন তা জানার চেষ্টা করবে না? একথা তো সত্যি, যে আইনত গঙ্গাধর সত্যি বলে থাকলেও প্রমাণ হয় না সব সাজানো। একজন অভিযোগকারী মহিলা কী বলছেন সেটাই বিচার্য।

এখানেই সন্দেহ হয়, সন্দেশখালিতে সত্যিই মহিলারা ধর্ষিত হয়েছেন কি হননি তা নিয়ে মুখ্যমন্ত্রীর ততটা মাথাব্যথা নেই। তিনি শুধু রাজ্যের মহিলা ভোটারদের কাছে একথা প্রমাণ করতে চান যে বিজেপি এতই হীন একটা দল, যে মহিলাদের মানসম্মানের তোয়াক্কা করে না। রাজনৈতিক ফায়দার জন্যে তাঁদের দিয়ে ধর্ষণের মিথ্যা অভিযোগ করাতেও পিছপা হয় না। রাজ্যের আরেকটা ঘটনাতেও এই একই সন্দেহ হয় মুখ্যমন্ত্রীর উদ্দেশ্য সম্পর্কে। সেটাও চমকে দেওয়ার মত ঘটনা।

রাজ্যপাল সিভি আনন্দ বোসের বিরুদ্ধে শ্লীলতাহানির অভিযোগ এনেছেন রাজভবনের এক অস্থায়ী কর্মচারী। হেয়ার স্ট্রিট থানায় এফআইআর করেছেন। এই খবর প্রকাশ হওয়ার পর থেকে রাজ্যপাল এমন একটা কাজও করেননি যাতে তিনি যে নির্দোষ তা প্রমাণ করার আন্তরিকতা বোঝা যায়। তিনি কেবল রাজভবনে পুলিসের আর মন্ত্রী চন্দ্রিমা ভট্টাচার্যের প্রবেশ নিষেধ করেছেন। বিবৃতি দিয়ে বলেছেন এটা রাজনৈতিক চক্রান্ত। এমন নয় যে অতীতে কখনো কোনো রাজ্যের রাজ্যপালের বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ ওঠেনি। কিন্তু তাঁদের প্রতিক্রিয়া আনন্দ বোসের মত হয়নি।

২০০৯ সালে অন্ধ্রপ্রদেশের রাজ্যপাল পদ ছাড়তে হয়েছিল নারায়ণ দত্ত তিওয়ারিকে। কারণ রাজভবনে তাঁর যৌন কীর্তিকলাপের টেপ প্রকাশ্যে এসেছিল এবং বিরোধীরা সমস্বরে তাঁর পদত্যাগ দাবি করেছিল। সিপিএম নেত্রী বৃন্দা কারাত রাষ্ট্রপতি প্রতিভা পাতিলকে চিঠি লিখে জানিয়েছিলেন, যদি তিওয়ারি পদত্যাগ করতে রাজি না হন তাহলে তাঁকে বরখাস্ত করা উচিত। অভিযোগ ওঠার পরে আনন্দ বোসের মত বুক ফুলিয়ে চলা তিওয়ারির পক্ষে সম্ভব হয়নি। অনস্বীকার্য যে অভিযোগ উঠেছে মানেই বোস অপরাধী তা নয়। অপরাধ প্রমাণিত হতে হয়। কিন্তু সে তো তদন্তসাপেক্ষ, আর রাজ্যপাল পদের সাংবিধানিক রক্ষাকবচ থাকায় বোসের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা দায়ের করে তদন্ত শুরু করাও সম্ভব নয়। কিন্তু নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করতে পদত্যাগ করার নামটি নেই; উল্টে রাজভবনের কর্মীদেরও এ বিষয়ে শমন অগ্রাহ্য করার নির্দেশ দেওয়া, পুলিসকে সিসিটিভি ফুটেজ না দেওয়ার আদেশ করার মত ঔদ্ধত্য রাজ্যপালের আসে কোথা থেকে?

উত্তরটা খুব শক্ত নয়। তিওয়ারির বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠার সময়ে কেন্দ্রে ছিল কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন ইউপিএ সরকার। কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভার পরামর্শে রাজ্যপাল নিয়োগ করেন রাষ্ট্রপতি। তিওয়ারি অবশ্যই বুঝেছিলেন যে কেন্দ্রের সরকার তাঁর পদ বাঁচানোর চেষ্টা করবে না। তাই মানে মানে কেটে পড়েন। বোস নির্ঘাত জানেন, এই অভিযোগের কারণে নরেন্দ্র মোদীর নেতৃত্বাধীন সরকারের পরামর্শে রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মু তাঁকে সরে যেতে বলবেন না। শুধু বোস কেন, আপনি-আমিও জানি যে যৌন অপরাধের অভিযোগ বিজেপির কাছে কোনো অভিযোগের মধ্যেই পড়ে না। তাদের সরকার বিলকিস বানোর ধর্ষক বলে শাস্তিপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের ক্ষমা করে দেয়, জেল থেকে বেরোবার পর মালা পরিয়ে বরণ করে। ওই দলের নেতা আট বছরের মেয়ে আসিফাকে ধর্ষণ করে খুন করায় অভিযুক্তদের সমর্থনে মিছিল করে। পদক জয়ী অলিম্পিয়ানরা রাস্তায় বসে আন্দোলন করলেও ব্রিজভূষণ শরণ সিং গ্রেফতার হন না। ঝামেলা খুব বেড়ে যাওয়ায় তাঁকে কুস্তি ফেডারেশনের সর্বোচ্চ পদ থেকে সরিয়ে তাঁরই ডানহাতকে ওই পদে বসানোর ব্যবস্থা করে দেওয়া হয় আর নির্বাচনের টিকিটটা তাঁকে না দিয়ে তাঁর ছেলেকে দেওয়া হয়। উত্তরপ্রদেশের হাথরাসের মেয়েটার কী হাল করা হয়েছিল তাও আমরা জানি। সোমবার উত্তরবঙ্গ সংবাদ কাগজের প্রথম পাতায় এক প্রতিবেদনে রূপায়ণ ভট্টাচার্য জানিয়েছেন, তার পরিবারকে আজও নজরবন্দি করে রাখা হয়েছে আর ধর্ষকরা বহাল তবিয়তে ঘুরে বেড়াচ্ছে। কর্ণাটকে তো বিজেপির নেতাই অভিযোগ করেছেন, প্রোজ্জ্বল রেবন্ন নামক নরকের কীটটি সম্পর্কে তিনি আগেই নেতৃত্বকে জানিয়েছিলেন এবং জেডিএসের সঙ্গে জোটে থাকা উচিত হচ্ছে না বলেছিলেন। কেউ কান দেয়নি। সবচেয়ে বড় কথা, যে প্রধানমন্ত্রী এক বছরে একবারও মণিপুরে যাওয়ার প্রয়োজন বোধ করেননি, কুকি মহিলাদের উলঙ্গ করে হাঁটানোর নিন্দা করতে সময় নেন আড়াই মাস, তিনি সামান্য শ্লীলতাহানির অভিযোগেই একজন রাজ্যপালকে সরতে বলবেন? যাঃ!

প্রমাণ হয়ে গেছে, বোসের অনুমান নির্ভুল। প্রধানমন্ত্রী ওই অভিযোগ ওঠার পরে পরেই পশ্চিমবঙ্গে এসে ভোটের প্রচার করে গেছেন, রাজভবনের আতিথ্য গ্রহণ করেছেন। কিন্তু সেখানকার কর্মচারীর অভিযোগ নিয়ে উচ্চবাচ্য করেননি। মানে সন্দেশখালির প্রধান অভিযুক্তের নাম শাহজাহান না হলে বা সে বিজেপির সদস্য হলে সিবিআই তদন্তের কথা হয়ত উঠত না। গঙ্গাধর সত্যি বলছেন না মিথ্যে, তা নিয়েও মাথা ঘামানোর দরকার হত না। কিন্তু এখন নির্বাচনের মরসুম, সন্দেশখালিতে বিজেপির ‘দোনো হাথ মে লাড্ডু’ হয়ে গেছে। একে হিন্দু বনাম মুসলমান বয়ান তৈরি করা গেছে (গোদি মিডিয়ার সহায়তায় দিব্যি চেপে যাওয়া গেছে যে শাহজাহানের দুই প্রধান স্যাঙাতই হিন্দু), তার উপর ভোটের বাজারে পশ্চিমবঙ্গের মহিলা ভোটারদের সামনে তৃণমূলকে নারীবিরোধী প্রমাণ করার সুযোগ পাওয়া গেছে। সত্যিই নারীর সম্মান মূল্যবান মনে করলে আনন্দ বোসকে আপাতত পদ ছেড়ে দিতে বলা হত।

কিন্তু এ তো বিজেপির সন্দেহাতীত ব্যবহার। এই ঘটনাতেও মুখ্যমন্ত্রীর উদ্দেশ্য নিয়ে সন্দেহ আছে বলছি কেন? তার কারণ মুখ্যমন্ত্রী প্রচারে এই কাণ্ড নিয়ে বলতে গিয়ে বলেছেন, এরকম আরও অনেক ঘটনা সম্পর্কে তিনি আগেই জানতেন। প্রশ্ন হল, জানলে আগেই কেন্দ্রীয় সরকারকে জানিয়ে এই রাজ্যপালকে সরানোর ব্যবস্থা করেননি কেন? তাহলে কি তিনি নির্বাচনের অপেক্ষায় ছিলেন? রাজভবনের কর্মচারী মহিলার অভিযোগকে কি তিনি স্রেফ বিজেপিকে মহিলাবিরোধী এবং নিজের দলকে মহিলাবান্ধব প্রমাণ করার কাজে লাগাচ্ছেন? অর্থাৎ সন্দেহ হয়, এখানেও উদ্দেশ্য সেই মহিলাদের ভোট, মহিলাদের সম্মানরক্ষা নয়।

আলোচনাটা এখানেই শেষ করে দিলে বিজেপি-তৃণমূল বাইনারিকে উৎসাহ দেওয়া হয়ে যাবে হয়ত। যারা রাজ্যের তৃতীয় শক্তি এবং এই নির্বাচনে আরও শক্তিশালী তৃতীয় শক্তি হয়ে ওঠার চেষ্টা চালাচ্ছে তাদের ভূমিকা সম্পর্কেও কিছু বলা দরকার।

বামফ্রন্টের বড় শরিক সিপিএম, আর কংগ্রেস, দুই দলের নির্বাচনী ইশতেহারেই মহিলাদের সম্পর্কে প্রচুর পরিকল্পনার কথা আছে। সিপিএমের ইশতেহারে ‘women’ শব্দটা আছে ৪৯ বার, কংগ্রেসের ইশতেহারে ৪০ বার। দুই দলেরই ক্ষমতায় এলে মহিলাদের জন্যে অনেক ভাল ভাল পরিকল্পনা আছে, যা পশ্চিমবঙ্গের মহিলাদেরও যে কাজে লাগবে তা বলাই বাহুল্য। সিপিএম এবারে মহিলা ভোটারদের গুরুত্ব দিয়ে আলাদা করে সাংবাদিক সম্মেলনও করেছে। কিন্তু এখানে আমরা যে দুটো ঘটনা নিয়ে আলোচনা করছি, সেগুলো সম্পর্কে দুই দলেরই অবস্থান অস্পষ্ট বা আপত্তিকর।

সন্দেশখালির শাহজাহানবিরোধী আন্দোলনে সিপিএম তথা সিপিএম-কংগ্রেস জোটের বসিরহাট কেন্দ্রের প্রার্থী নিরাপদ সর্দার উল্লেখযোগ্য ভূমিকা নিয়েছিলেন। পুলিস তাঁকে গ্রেফতারও করেছিল। মীনাক্ষী মুখার্জি সমেত অন্যান্য বাম নেতৃত্বকে সন্দেশখালি যেতে বাধাও দেওয়া হয়েছিল। বিজেপির মত কেবল হিন্দু মহিলা ধর্ষিত হয়েছেন এমন দাবি না করে থাকলেও মহিলাদের উপর নির্যাতন নিয়ে সিপিএমও সরব ছিল। কংগ্রেস ওই এলাকায় প্রায় অস্তিত্বহীন। কিন্তু তারাও ওই আন্দোলনের পক্ষে দাঁড়িয়েছিল। এখন গঙ্গাধরকে নিয়ে কী করা হবে সেটা দুই দলের নেতৃত্ব কি বুঝে উঠতে পারছেন না?

প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি এবং বহরমপুর কেন্দ্রের প্রার্থী অধীররঞ্জন চৌধুরী ভিডিওর প্রতিক্রিয়ায় ঘুরে ফিরে মমতাকেই দায়ী করেছেন। কেন তা বোঝা শক্ত। সিপিএমের রাজ্য সম্পাদক তথা মুর্শিদাবাদ কেন্দ্রের প্রার্থী মহম্মদ সেলিম বলেছেন রাজ্যের যেখানে যা কুকর্ম হয় সবেতেই হয় তৃণমূল, নয় বিজেপি অথবা দুই দলই যুক্ত থাকে। বিজেপি নিজের সুবিধা করতে গিয়ে তৃণমূলের দুঃশাসনের সুবিধা করে দিয়েছে গত দশ বছরে। এ কথারই বা মানে কী? গঙ্গাধরের কথায় সিপিএম বিশ্বাস করছে, নাকি ওটা তৃণমূলের চক্রান্ত বলেই ধরছে? সত্যিই ধর্ষণ হয়নি, নাকি হয়েছিল? স্থানীয় সিপিএম জানে না সত্যিটা কী? কিছুই পরিষ্কার হল না। বর্ষীয়ান সিপিএম নেতা এবং দমদম কেন্দ্রের কংগ্রেস সমর্থিত প্রার্থী সুজন চক্রবর্তী যা বলেছেন তা আরও অদ্ভুত।

সেলিমের বক্তব্য শুনলে মনে হয়, তিনি জিমন্যাস্টের মত ব্যালান্স বিমের উপরে রয়েছেন। একটু এদিক ওদিক হলেই পড়ে যাবেন, প্রতিযোগিতার বাইরে চলে যাবেন। আইন এবং সহবত বলে, তদন্ত ছাড়াই কোনো মহিলার লাঞ্ছনার অভিযোগ উড়িয়ে দেওয়া উচিত নয়। তার উপর রাজ্যের প্রায় অর্ধেক ভোটার মহিলা। তাই সেলিম ধর্ষণের অভিযোগগুলোকে এখনই মিথ্যে বলতে পারছেন না। ওদিকে গঙ্গাধরের ভিডিওটাও যে উড়িয়ে দেওয়া যায় না তা না বোঝার লোক তিনি নন। এর উপর আছে তৃণমূল ও বিজেপি, দুপক্ষই খারাপ – এই অবস্থান বজায় রাখার দায়িত্ব। সুজন যা বলেছেন তাতে আবার মনে হয় তিনি সেলিমের সঙ্গে একমত নন। তিনি নিশ্চিত জানেন যে গঙ্গাধরের ভিডিও ভুয়ো। একই পার্টির দুজন নেতা যদি এরকম প্রায় পরস্পরবিরোধী বিবৃতি দেন, তাহলে পার্টির মত কোনটা তা বোঝা দায় হয়ে পড়ে। যদি স্রেফ ভোট বৈতরণী পার হওয়াই উদ্দেশ্য হয়, তাহলেও এমন গোলমেলে অবস্থান কোনো দলের পক্ষে স্বাস্থ্যকর নয়।

তবে এ নিয়ে তবু বাম-কংগ্রেস কোনো একটা অবস্থান নিয়েছে। রাজভবনের কাণ্ডে তাদের অবস্থান কী তা এখন পর্যন্ত অজানা। একমাত্র বিমান বসু ‘অন রেকর্ড’ মতামত দিয়েছেন, যদি একে কোনো মতামত বলা যায় – ‘রাজ্যপালের ঘটনা দুর্ভাগ্যজনক। সবটা না জেনে এখনই কোনো মন্তব্য করব না।’ অধীর চৌধুরীর রাজ্যপালকে আক্রমণ না করা তবু মেনে নেওয়া যায়। হাজার হোক তিনি কংগ্রেস নেতা। কেন্দ্রে কংগ্রেসের সরকার থাকার সময়ে রাজ্যপালদের দিয়ে কী কী করানো হয়েছে তা হয়ত তাঁর মনে আছে। তাই তিনি রাজ্যপালের খুব একটা দোষ ধরেন না। কিন্তু সিপিএম নেতাদের রাজ্যপালের প্রতি এত সম্ভ্রম কৌতূহলোদ্দীপক।

আরও পড়ুন শুধু কুস্তির পদক নয়, দেবতার গ্রাসে আজ সবার সন্তান

ক্ষমতা চলে যাওয়ার পর থেকেই বঙ্গ সিপিএমের নেতারা রাজ্যপালদের সম্পর্কে খুব সাবধানী হয়ে উঠেছেন। বরাবর কিন্তু এমন ছিল না। সিপিএম দল একসময় রাজ্যপাল পদটারই অবলুপ্তি দাবি করত। এবারের ইশতেহারেও লেখা রয়েছে ‘It [CPI(M)] stands for a Governor to be chosen out of a panel of three eminent persons proposed by the chief minister…’। অর্থাৎ সিপিএম চায়, রাজ্যপাল বেছে নিক মুখ্যমন্ত্রী দ্বারা প্রস্তাবিত তিন বিশিষ্ট ব্যক্তির এক প্যানেল। কেরালার রাজ্যপালের সঙ্গে গত কয়েকমাস ধরে ধুন্ধুমার চলছে সে রাজ্যের সিপিএম নেতৃত্বাধীন সরকারের। পার্টির ছাত্র সংগঠন রাজ্যপালের বিরুদ্ধে একের পর এক কর্মসূচি গ্রহণ করে চলেছে। অথচ এ রাজ্যের সিপিএম নেতারা সেই জগদীপ ধনখড়ের আমল থেকেই রাজ্য সরকার আর রাজ্যপালের সংঘাত হলে দুপক্ষই খারাপ – একথা বলতে ভীষণ ব্যস্ত হয়ে পড়েন। জ্যোতি বসু আর তাঁর প্রথম অর্থমন্ত্রী অশোক মিত্র কিন্তু দ্ব্যর্থহীন ভাষায় কেন্দ্র-রাজ্য সংঘাতে রাজ্যের পক্ষ নিতেন। বিরোধীশাসিত রাজ্যগুলোকে একজোট করে কেন্দ্র-রাজ্য সম্পর্কের পুনর্বিন্যাসের জন্য তাঁরা দীর্ঘদিন পরিশ্রম করেছেন। সারকারিয়া কমিশন অনেকটা সেই পরিশ্রমের ফসল। মোদী সরকারের আমলে যে রাজ্যপাল আর কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের লেফটেন্যান্ট গভর্নররা সাংবিধানিক অধিকারের সীমা লঙ্ঘন করেছেন বারবার, সেকথা কিন্তু সিপিএমের নির্বাচনী ইশতেহারে পর্যন্ত লেখা হয়েছে। অথচ মমতা সরকারের সঙ্গে যতবার ধনখড়ের সংঘাত হয়েছে, সিপিএম নেতারা ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন দোষ যে দুজনেরই তা প্রমাণ করতে। বোস আসার পরেও প্রথম দিকে ব্যাপারটা বদলায়নি, ইদানীং অবশ্য কিছু ব্যতিক্রম দেখা যাচ্ছে। বোস যখন গতবছর রাজনৈতিক হিংসায় আক্রান্তদের বাড়ি বাড়ি ঘুরে বেড়াচ্ছিলেন, তখন সেলিম বলেছিলেন, এটা রাজ্যপালের কাজ নয়। রাজ্যপাল শাহের নির্দেশে বিজেপি নেতা হওয়ার চেষ্টা করছেন। রাজ্যের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে দুর্নীতি এবং হিংসা চলছে অভিযোগ করে বোস বিচারবিভাগীয় তদন্তের নির্দেশ দেন গতমাসে। কংগ্রেস, সিপিএম, তৃণমূল একযোগে বলে – রাজ্যপালের এ কাজ করার এক্তিয়ার নেই।

সেসব না হয় সাংবিধানিক অধিকারের ব্যাপার। বোসের বিরুদ্ধে শ্লীলতাহানির অভিযোগ নিয়ে মতামত দেওয়া তো তুলনায় সহজ। যে সহবতের কারণে সেলিম সন্দেশখালির মহিলাদের অভিযোগ উড়িয়ে দিতে পারছেন না, সেই সহবত অনুযায়ীই বলতে পারার কথা যে রাজ্যপালের উচিত সরে গিয়ে তদন্তের পথ করে দেওয়া। তিনি দোষী না নির্দোষ তা পরে দেখা যাবে। রাজ্যের প্রায় ৫০% মহিলা ভোটারের কথা ভেবেও বাম, কংগ্রেস নেতারা এইটুকু বলে উঠতে পারছেন না।

নাগরিক ডট নেটে প্রকাশিত

Better late than never collection of late-blooming Indian haikus

Vandana Parashar writes: peace memorial/I walk a mile/in father’s shoes

One of the most difficult jobs in this world is to define poetry. One of my enduring memories of institutional reading of literature is a professor asking our class “What is poetry”, taking 15-20 answers and then declaring “All of you are partially right and partially wrong”. Because, he explained, poetry is like one’s own mother. One can say a thousand things if he/she is asked to describe her. Yet something shall remain left out. Naturally, it is not easy to define a sub-genre of poetry, especially if it is an imported form.

However, Kynpham Sing Nongkynrih, one of the editors of Late-Blooming Cherries, has made a painstaking effort in his note to give the reader a rough idea about what haiku poetry is. It could be irrelevant to someone with academic involvement with poetry but is particularly useful for a general reader like me. As he quotes British critic Chris Baldick to say haiku ‘is a form of Japanese lyric verse that encapsulates a single impression of a natural object or scene, within a particular season’, I begin to think this is not as foreign as I thought. Learning about the connection of haiku to Zen Buddhism brings it closer to my Indian sensibility. This is the country of ‘doha’ (couplets containing spiritual truth) after all. However, hardly any haiku contained in this collection is spiritual. Then again, the form most poets have adopted – two lines building up to a crescendo – reminds me of Urdu ghazals which consist of multiple ‘sher’ that are complete in themselves, having a clinching last line.

Also read Meet Pakistani director who used Rabindrasangeet

Once the editors have peeled off the foreignness of these haikus, the poetry not only reads familiar but starts to inspire the emotions it means to. It is said that poetry resides between the lines. The greater the poet, the more he says through the unwritten words. It seems that job is all the more important in haiku because Kynpham Sing’s note explains, haiku’s “suggestive quality is chiefly owing to the presence of imagery, which the haiku cannot do without.” Therefore, in this form, the poet has to draw as powerful an image as he can with as few words as possible. The poets in this collection have excelled in doing that. There are beautiful images to be found as well as haunting ones, like the following by Arvinder Kaur:

Courtroom

How white the shirt

of the rapist

……………………………………..

or by Anju Kishore:

Bombed homes –

talks go round and round

the table

……………………………………………

These are images drawn with words that stay with you. Reading a woman writing the first three lines is a highly Indian experience today. At the same time, the universality is unmistakable. Anju’s lines bring to mind the scenes beamed to our mobile phones and TV sets from Gaza every moment. This is not forced but spontaneous contemporaneity that touches the universal.

On the other hand, some poets in this collection have written highly personal lines that talk to the reader individually. Priya Narayanan, for example, writes:

Empty sky –

how heavy this jar

filled with your ashes.

……………………………………………

Death and loneliness are also running through the veins of editor Rimi Nath’s haikus.

Crowd at a graveyard –

the world is

a burial ground

steam from a kettle:

the soul

leaving the body

………………………………………

The most startling one says:

success –

a lone tree

standing

…………………………………..

Her co-editor Kynpham Sing is more outgoing and seems to take a lighter view of the world around him.

Stupas of Sanchi –

a monk under a tree, lost

in a mobile phone

………………………………………..

Sometimes his sense of humour turns black

city’s cluttered drains

even unwanted infants

are thrown in

…………………………………..

Kynpham Sing has a way with words which allows him to even express despair with humour

region’s backwardness

Explained by a road sign:

‘slow men at work’

………………………………………..

But like a true poet, nature’s beauty does not escape him despite all this. He has been able to conserve the wonder of a child inside himself:

Creepy caterpillar,

when did you become

these flying colours?

……………………………………….

The same quality can be found in Vandana Parashar, who writes:

unexpected showers

every puddle sets free

the child in me

……………………………………….

This despite death and other troubles dotting her writing

peace memorial

I walk a mile

in father’s shoes

…………………………………….

how many more

clouds will pass before it rains

-miscarriage

……………………………………..

Troubles of the real world perhaps find the best expression in the words of Brijesh Raj:

fissured fields

watering the crop

with his tears

………………………………………

family reunion

the widest smile

the counsellor’s

………………………………………..

And in A Thiagarajan’s haiku:

new actors –

Gandhi is shot

again

Kala Ramesh has taken the experiment with the form a step farther and written one-liners like: did Ganga dream of being the city’s sewage?

But if it comes to pouring one’s bleeding heart out, Teji Sethi is the best of the lot. See for yourself:

gunshots

I know nothing

of lullabies

………………………………………

as it goes

with the wind, this cherry petal

so shall I

…………………………………

his last trip

on the waters of the Ganges

a floating urn

………………………………..

amavasya

my scars eclipsed

for a night

The success of this collection is in bringing all the nine tastes – nava rasa, as they are called in Indian aesthetics – together in this beautifully illustrated collection of haiku poetry. Mugdha’s cover gives it the look it deserves.

Late-Blooming Cherries: Haiku poetry from India
Edited by: Kynpham Sing Nongkynrih and Rimi Nath
Publisher: Harper Collins
Price: Rs. 399

Originally published on meghalayamonitor.com

সত্যজিৎ রায়কে পূজার ছলে ভুলে থাকা চলে না

অদূর ভবিষ্যতে এদেশে মহাত্মা গান্ধী, জওহরলাল নেহরু, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সঙ্গে সত্যজিৎও গণশত্রু বলে চিহ্নিত হবেন হয়ত।

চার্লস চ্যাপলিনকে কি সত্যিই অ্যাডলফ হিটলারের মত দেখতে ছিল? একেবারেই না। আসলে চ্যাপলিন দাড়িগোঁফহীন অত্যন্ত সুপুরুষ একজন লোক। বাংলায় যাকে বলে রমণীমোহন, উচ্চতার ব্যাপারটা বাদ দিলে তিনি তাই। বেশিরভাগ ছবিতেই অবশ্য ঐ মাছি গোঁফটাসুদ্ধই চ্যাপলিনকে দেখা যায়; কিন্তু সে চেহারাও চোখের ভাষায়, চুলের ছাঁটে, বেশভূষায় টোমেনিয়ার একনায়ক অ্যাডেনয়েড হিঙ্কেলের থেকে বহুযোজন দূরে। বলাই বাহুল্য যে চ্যাপলিন ইচ্ছে করেই হিঙ্কেলকে হিটলারের আদল দিয়েছিলেন। কিন্তু হিটলার কি হিঙ্কেলের মত হাস্যকর একজন লোক ছিল? তা তো নয়। বেলুন নিয়ে খেলা করার মত ছেলেমানুষি তার ছিল না, পর্দা বেয়ে ওঠার মত জোকারসুলভ কাজও সে করত বলে তার ঘনিষ্ঠ কারোর স্মৃতিচারণায় পাওয়া যায় না। তাহলে চ্যাপলিন কেন এরকম হাস্যকর করে দেখালেন ইতিহাসের সবচেয়ে বড় খুনেটাকে?

দ্য গ্রেট ডিক্টেটর ছবির ৪০ বছর পর মুক্তি পায় হীরক রাজার দেশে। আরেক একনায়কের গল্প। হীরক রাজার চরিত্রে উৎপল দত্তকে মনে করে দেখুন। বিশাল চেহারা, লম্বা গোঁফ, মোটা গলা – বেশ ভয় ধরানো চেহারা। হিঙ্কেলের ঠিক উলটো। কিন্তু মুখের ভাষাটা? প্রথমত সে কথা বলে ছড়া কেটে। যা শুনে হাসি পেতে বাধ্য। দ্বিতীয়ত, উৎপল দত্ত পরে বলেছিলেন, শুটিংয়ের সময়ে সত্যজিৎ রায় তাঁকে বলেন ‘হীরক রাজার সংলাপগুলো গ্রাম্য উচ্চারণে বলো। যারা পড়াশোনা বিশেষ জানে না, তাদের মত। লোকটাকে দর্শকের কাছে হাস্যাস্পদ করে দাও।’

চল্লিশ বছরের ব্যবধানে দুই একনায়ককে পর্দায় দেখাতে গিয়ে দুই জিনিয়াসই দেখালেন হাস্যকর করে, অর্থাৎ ভয়ানক লোকেদের সম্পর্কে ভয় ভেঙে দিলেন। দুই স্রষ্টা একটা ব্যাপারে একমত – একনায়করা সবচেয়ে অপছন্দ করে তাদের নিয়ে হাসাহাসি, কারণ আমাদের ভয়ই তাদের শক্তি। হাসাহাসিতে ভয় কেটে যায়।

চ্যাপলিন বা সত্যজিতের সময়ে ইন্টারনেট ছিল না, মিম ছিল না। ব্যঙ্গ ছিল, শ্লেষ ছিল, একনায়ক ছিল। চ্যাপলিনের সময়ে হিটলার, সত্যজিতের সময়ে ইন্দিরা গান্ধী। ১৯৪০ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ সবে শুরু হয়েছে, হিটলারের কুকীর্তির সবটা তখনো জার্মানির বাইরের মানুষ জানেন না। কিন্তু দ্রষ্টা চ্যাপলিন ফ্যাসিবাদের বিপদ বুঝেছেন, তাকে নিয়ে প্রবল ঠাট্টা করছেন, বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে মানুষকে অন্য ভবিষ্যতের কথা বলছেন। ১৯৮০ সালে সত্যজিৎ যখন হীরক রাজার দেশে আমাদের নিয়ে গেলেন তখন ইন্দিরা গান্ধী ক্ষমতায় ফেরত এসেছেন। ততদিনে বিশ্ববন্দিত পরিচালক ছোটদের দেখার মত রূপকথার এমন এক গল্প নিয়ে এলেন পর্দায়, যাকে উৎপল পরে বলবেন জরুরি অবস্থার বিরুদ্ধে সত্যজিতের প্রতিবাদ। শুধু কি তাই করেছেন সত্যজিৎ? নাকি যে স্রষ্টারা দ্রষ্টা হন, তাঁদের মতই ভবিষ্যতের একনায়কদেরও একহাত নিয়েছেন, ভবিষ্যতের প্রতিবাদীদের ভাষা জুগিয়েছেন?

গত কয়েক বছরে সোশাল মিডিয়ায় যতবার মমতা ব্যানার্জিকে হীরক রানী আর নরেন্দ্র মোদীকে হীরক রাজা বলা হয়েছে, হীরক রাজার সঙ্গে তার সভাসদদের কথোপকথনের অনুকরণে যত পোস্ট তৈরি হয়েছে – তা প্রমাণ করে সত্যজিৎ এখনো আমাদের প্রতিবাদের ভাষা। মৃত্যুর তিন দশক পরেও তাঁর কাজ আমরা ফিরে দেখব কেন? অভ্যাসবশত? না। সত্যজিৎ শুধু অভ্যাসে পরিণত হওয়ার মত শিল্পী নন, তার চেয়ে অনেক বড়। তিনি দারুণভাবে সমকালীন, তাই চিরকালীন। যেমনটা বলেছেন উৎপল, এই বক্তৃতায়

One has a sneaking suspicion that all this talk of Renaissance ideas may well be a ruse to remove from sight the living contemporaneity of Ray’s ideas and relegate him to a museum of ancient statuary which has ceased to bother us now. This suspicion is strengthened when we consider a film like Ray’s Hirak Rajar Deshe (Kingdom of Diamonds, 1980) which was his response to Mrs Gandhi’s Emergency decree. This film in the guise of a fairytale is a blast against all forms of dictatorship which believes in thought-control, prison for the workers, arrests and deportations but which all the while is preparing its own ultimate destruction.

Renaissance is an inadequate term for Ray. He was a moment in the conscience of man.

এই বক্তৃতার উপলক্ষ ছিল সাহিত্য আকাদেমি, সঙ্গীতনাটক আকাদেমি আর ললিতকলা আকাদেমির যৌথ প্রচেষ্টায় আয়োজিত এক সেমিনার। সত্যজিৎ মারা যাওয়ার ১৩ দিন পরে। মৃত্যুর পর সমস্ত সরকারি মহল থেকে – দূরদর্শনে, রেডিওতে, এমনকি এই সেমিনারে বিলি করা কাগজেও তাঁকে উল্লেখ করা হচ্ছিল “representative of Indian Renaissance” বলে। সেই তকমার বিরুদ্ধে এখানে গর্জে উঠেছেন উৎপল। বলছেন এটা আসলে প্রতিবাদীর প্রতিবাদী চরিত্র ভুলিয়ে দেওয়ার সরকারি চক্রান্ত। ভারতীয় রেনেসাঁ আবার কী জিনিস? খায় না মাথায় দেয়? ঐতিহাসিকরা যেটার কথা বলতেন তা হল বাংলার রেনেসাঁ – হেনরি লুই ভিভিয়ান ডিরোজিও আর তাঁর ছাত্রদের দিয়ে যার শুরু আর রবীন্দ্রনাথে যার পূর্ণতা। কিন্তু সেটাও রেনেসাঁ বলতে যা বোঝায়, সেই স্তরে পৌঁছয়নি। সমাজের সামন্ততান্ত্রিক কাঠামো ভেঙে নতুন সমাজ গড়া হয়নি। তাই পরবর্তীকালের ঐতিহাসিকরা এর নাম দিয়েছেন বাংলার সংস্কার আন্দোলন। কিন্তু সত্যজিৎ শুধু সেই সংস্কারের সন্তান নন, তিনি তার চেয়ে অনেক বেশি।

তাহলে? আজ সত্যজিতের জন্মদিনে আমরা, আত্মবিস্মৃত বাঙালিরা, তাঁকে স্মরণ করব কি শুধু মোদী, মমতার বিরুদ্ধে তিনি আমাদের মিম বানানোর সুযোগ দিয়েছেন বলে? আজকে আমাদের সামনে, গোটা ভারতের সামনে, গোটা পৃথিবীর সামনে কি দুটো মাত্র বিপদ – মোদী আর মমতা? তা তো নয়। গোটা পৃথিবী জুড়েই এখন একনায়কত্বের উত্থানের যুগ। ভারতে ধর্মীয় ফ্যাসিবাদী নরেন্দ্র মোদীর চেহারায়, ইজরায়েলে হানাদারি বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর চেহারায়, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে কর্পোরেট মুঘল ডোনাল্ড ট্রাম্পের চেহারায়, রাশিয়ায় যুদ্ধবাজ জাতীয়তাবাদী ভ্লাদিমির পুতিনের চেহারায়, তুরস্কে রচপ তায়িপ এর্দোগানের চেহারায়। এই লড়াইয়ে আমাদের ভাষা যোগাতে পারেন কি সত্যজিৎ?

যতবার হীরক রাজার দেশে দেখি ততবার মনে হয় সারাজীবনে এমন বৈপ্লবিক ছবি সত্যজিৎ আর বোধহয় বানাননি। বিজ্ঞানের উপর আক্রমণের প্রতিবাদে খোদ মার্কিন মুলুকে বিজ্ঞানীরা মিছিল করেছিলেন ট্রাম্প রাষ্ট্রপতি থাকার সময়ে। এদেশেও বিজ্ঞানীরা এবং বিজ্ঞানচর্চা আক্রমণের মুখে পড়েছে প্রবলভাবেই, যতই চন্দ্রযান আর মঙ্গলযান পাঠানো হোক মহাকাশে। আমাদের দেশে একের পর এক বিশ্ববিদ্যালয়ে অপবিজ্ঞানের চর্চা চালু করা হচ্ছে। মোদীরাজের প্রথম দিকে বিজ্ঞান কংগ্রেসে আলোচনা হত প্রাচীন ভারতের পরমাণু বোমা নিয়ে, ক্রমশ বিজ্ঞান কংগ্রেস বন্ধই করে দেওয়া হল। এখন রামলালার কপালে সূর্যতিলক এঁকে দেওয়াই বিজ্ঞানের বিরাট অর্জন বলে প্রচার করা হচ্ছে। এক বাবাজি করোনার ওষুধ, ক্যান্সারের ওষুধ – সবই আবিষ্কার করে ফেলেছেন, এমন অবৈজ্ঞানিক দাবি করে কোটিপতি হয়ে যান সরকারি মদতে।

এদিকে পিএইচডি স্কলারদের ভাতা অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে, প্রতিবাদের ঘাঁটি জহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ে এক ধাক্কায় আটশোর কাছাকাছি পিএইচডি আসন লোপ করে দেওয়ার ঘটনাও বাসি হয়ে গেছে। কারণ ‘এরা যত বেশি পড়ে, তত বেশি জানে, তত কম মানে।’ বন্ধ হয়ে যাচ্ছে উদয়ন পণ্ডিতের পাঠশালা। দিনের পর দিন কারারুদ্ধ থাকছেন জিএন সাইবাবার মত অধ্যাপক আর উমর খালিদের মত ছাত্ররা। বুঝিয়ে বলার প্রয়োজন নেই যে অতিকায় সর্দার বল্লভভাই প্যাটেলের মূর্তি আসলে কার মূর্তি। আমাদের গোটা দেশটাই এখন মূর্তির মাঠ।

কিন্তু হীরক রাজার দেশে আটকে থাকলে ভুল করবেন। ১৯৫৫ সালের পথের পাঁচালী থেকে ১৯৯১ সালের আগন্তুক পর্যন্ত ওই একটিমাত্র ছবিই সত্যজিৎ করে গেছেন যা এই দুঃসময়ে আমাদের সম্বল – তা নয়। মনে রাখবেন, সত্যজিৎ সেই পরিচালক যাঁর প্রথম ছবি দেখে এক রাষ্ট্রপতি তাঁকে জিজ্ঞেস করেছিলেন পর্দায় এত দারিদ্র্য দেখালে বিশ্বের কাছে দেশের অসম্মান হবে না? সত্যজিতের সপাট প্রতিপ্রশ্ন ছিল ‘দেশে এত দারিদ্র্য আছে সেটা সহ্য করা যদি আপনার পক্ষে অন্যায় না হয়, আমার পক্ষে সেই দারিদ্র্য দেখানো অন্যায় হবে কেন?’ একের পর এক দক্ষিণপন্থী প্রোপাগান্ডা ছবির যুগে, ইন্টারনেট ট্রোলদের প্রশ্নের মুখে এমন শিল্পীই তো আমাদের ধ্রুবতারা।

আরও পড়ুন টলমলে ট্রিবিউটে ফেলুদার গোয়েন্দাগিরি গুবলেট

তিনি মারা যান ১৯৯২ সালের এপ্রিল মাসে আর ধর্মান্ধ রাজনীতি এদেশে সবচেয়ে বড় সাফল্য পায় ডিসেম্বরে – বাবরি মসজিদ ভেঙে। তার ঠিক ৩২ বছর পরে, আজ, ধর্মান্ধতা এদেশে ফ্যাশনে পরিণত। বাবারা জাঁকিয়ে বসেছেন, দিনকে রাত রাতকে দিন করছেন, গোমূত্র দিয়ে ক্যান্সার সারানোর নিদান দিচ্ছেন, মুখ্যমন্ত্রীও হয়ে বসছেন। লেখাপড়া না জানা, গাঁইয়া, গরীব মানুষ নয়; এই বাবাদের ভক্ত এবং শক্তি সম্ভ্রান্ত, বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রিপ্রাপ্ত ক্ষমতাশালীরা। মনে পড়ে না বিরিঞ্চিবাবার ভক্তদের? কিন্তু এহেন মহাপুরুষরা শেষ কথা বলেন না। যদি ভরসা হারিয়ে ফেলে থাকেন, একবার দেখুন, বারবার দেখুন কাপুরুষ ও মহাপুরুষ (১৯৬৫)। যমুনাবক্ষে মোচ্ছব করে নদীর বারোটা বাজান এক বাবা আর তাঁর কাছে উপঢৌকন হিসাবে সরকারি আশীর্বাদ নিয়ে পৌঁছন রাষ্ট্রনেতা, দেশের শ্রেষ্ঠ ধনীরা। আমার-আপনার নিরাপত্তার জন্য তৈরি সেনাবাহিনীকে ব্যবহার করা হয় ব্যক্তিগত ভৃত্যবাহিনী হিসাবে। মনে হয় না, আমাদের যদি একজন ফেলুদা থাকত, যে বাবাকে গারদে পাঠিয়ে, ধনী ভক্তকে দেয়ালে পিঠ দিয়ে দাঁড় করিয়ে সার্কাসের খেল দেখাত, তবে বেশ হত?

আমরা কি হঠাৎ পৌঁছেছি এই অন্ধকার সময়ে? এক হ্যাঁচকা টানে সংঘ পরিবার আমাদের প্রগতিশীল সমাজকে উল্টোদিকে টেনে নিয়ে গেছে? না। ধর্মান্ধতার বিরুদ্ধে, কুসংস্কারের বিরুদ্ধে আমাদের লড়াইয়ে ফাঁকি ছিল বরাবর। ছিল বলেই ১৯৮৭ সালেও রূপ কানোয়ার সতী হয়, শাস্তি হয় না একজনেরও। ছিল বলেই শাহ বানো সুবিচার পাননি, এত বছর পরেও তিন তালাককে হাতিয়ার করে মুসলমান বিদ্বেষ ছড়িয়ে চলেছে হীরক রাজার লোকেরা। ধর্মের হাতে মেয়েদের এহেন লাঞ্ছনার কালে, অ্যান্টি-রোমিও স্কোয়াডের নামে, লাভ জিহাদের নামে মেয়েদের অধিকারকে অস্বীকার করার দিনে মনে না পড়ে উপায় নেই সত্যজিতের ১৯৬০ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ছবি দেবী। সেখানে জমিদার বাড়ির তরুণী বউ দয়াময়ীকে কালীভক্ত শ্বশুরের অন্ধবিশ্বাসের ভারে দেবী হয়ে উঠতে হচ্ছে, যার পরিণতি তার সাজানো জীবন তছনছ হয়ে যাওয়ায়।

বারবার উৎপলের যে বক্তৃতার উল্লেখ করছি, এই অন্ধকারে সত্যজিৎকে খুঁজতে গিয়ে যে বক্তৃতা আমাদের জোরালো টর্চ হতে পারে, সেখানে দেবী সম্পর্কে উৎপল বলছেন

“A proper tribute to Ray would have been… to make arrangements for Devi to be shown all over the country at cheaper rates. Devi is a revolutionary film in the Indian context. It challenges religion as it has been understood in the depths of the Indian countryside for hundreds of years. It is a direct attack on the black magic that is passed off as divinity in this country. Instead of the vulgarized Ramayana and Mahabharata, the Indian TV could have telecast Devi again and again; then perhaps today we would not have to discuss the outrages of the monkey brigade in Ayodhya.”

বুঝতেই পারছেন হীরক রাজার কত বড় শত্রু আমাদের সত্যজিৎ। অদূর ভবিষ্যতে এদেশে মহাত্মা গান্ধী, জওহরলাল নেহরু, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সঙ্গে সত্যজিৎও গণশত্রু বলে চিহ্নিত হবেন হয়ত। এমন একজন গণশত্রুকে আমরা এখন গোয়েন্দায় বেঁধে রাখলে তা হবে রবীন্দ্রনাথের সেই গানটার মত – তোমার পূজার ছলে তোমায় ভুলেই থাকি।

নাগরিক ডট নেটে প্রকাশিত

এসএসসি কেলেঙ্কারি: বনলতা সেন, রবীন্দ্রসঙ্গীত আর পরের ছেলে

রাম পরীক্ষায় পাস করে চাকরি পেয়েছে জানলে শ্যাম এসএসসির উপর হামলা করতে যাবে কেন? ১৯৯৮ সাল থেকে তো তেমন কিছু ঘটেনি।

ছোটবেলায় এক নিকটাত্মীয়কে দেখতাম ‘গনি খান’ বলতে অজ্ঞান। তখনো আবু বরকত আলি গনি খান চৌধুরী কংগ্রেসের কত বড় নেতা, কোথাকার নেতা, কী তাঁর দোষ বা গুণ – সেসব জানার বয়স আমার হয়নি। এটুকু জানতাম যে তিনি কংগ্রেস নেতা এবং কংগ্রেস আমাদের শত্রু। কারণ কংগ্রেস আমলে আমার বাবাকে অন্য পার্টি করার অপরাধে জেল খাটতে হয়েছে, পরিবারের অন্যদের উপরেও দমনপীড়ন চলেছে। ফলে ওই আত্মীয়ের গনি-মুগ্ধতা দেখে রাগে ফুলতাম। একদিন আমার মা বোঝালেন ‘আরে রাগ করিস কেন? গনি খানের জন্যে চাকরি পেয়েছেন উনি। নুন খাবেন আর গুণ গাবেন না?’ বড় হয়ে জেনেছি, গনি খান রেলমন্ত্রী থাকার সময়ে অনেক বঙ্গসন্তানকেই রেলে চাকরি দিয়েছিলেন এবং সেজন্যে বহু পরিবার আজীবন তাঁকে ভগবানের মত ভক্তি করত। তাঁর ভাইপো ঈশা খান যদি মালদা দক্ষিণ কেন্দ্রে জেতেন, তাতেও ওই কাজের কিছুটা অবদান থাকবে। সেই বঙ্গসন্তানরা সকলেই কি যোগ্য ছিল? আমার আত্মীয় কি যোগ্য ছিলেন? জানি না। তখন যোগ্যতার মাপকাঠি কী ছিল, আদৌ কিছু ছিল কিনা – তাও জানি না। মোদ্দাকথা গনি খান যে বিস্তর লোককে ক্ষমতা প্রয়োগ করে চাকরি পাইয়ে দিয়েছিলেন তা একটি সর্বজনবিদিত গোপনীয় তথ্য। শুনেছি কলকাতার শিয়ালদা অঞ্চলেও বহু পরিবার আছে যারা একসময় সোমেন মিত্র বলতে অজ্ঞান ছিল অনেকটা একই কারণে। বামফ্রন্ট আমলেও পার্টি-ঘনিষ্ঠ বলেই যে অনেকে চাকরি পেয়েছে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। তার উদাহরণও আমার পরিচিতদের মধ্যে আছে। তারা সকলে যে অযোগ্য তা নয়, কিন্তু পার্টি-ঘনিষ্ঠ হওয়ায় তারা যে অগ্রাধিকার পেয়েছিল তাতে ভুল নেই। কিন্তু ওসবের সঙ্গে এখন যে নিয়োগ দুর্নীতির রায় নিয়ে পশ্চিমবঙ্গ উত্তাল, সেই দুর্নীতির কোনো তুলনা চলে না।

কেন চলে না সে ব্যাখ্যায় আসব, তার আগে বলে নিই প্রথম অনুচ্ছেদেই কংগ্রেস আমল, বাম আমলের পিছন দরজা দিয়ে নিয়োগের কথা কেন বললাম। বনলতা সেনগিরি (‘এতদিন কোথায় ছিলেন?’) যে কোনো আলোচনাকে লাইনচ্যুত করে। ওই বিড়ালটি প্রথম রাত্রে মেরে রাখার জন্যেই বললাম। বিচারপতিদের কলমের এক আঁচড়ে পঁচিশ হাজারের বেশি স্কুলশিক্ষক ও শিক্ষাকর্মীর চাকরি চলে গেল যে দুর্নীতির জেরে, তার সঙ্গে অতীতে কোনো আমলে শাসকের ঘনিষ্ঠ হওয়ার সুবাদে পাওয়া চাকরির তুলনা চলে না প্রথমত এই কারণে, যে সেখানে শাসক চাকরি বিক্রির ব্যবসা ফেঁদে বসেনি। এখন অবধি যতটুকু আদালতে প্রমাণিত এবং সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত, তাতেই দেখা যাচ্ছে তৃণমূল কংগ্রেস নেতারা স্কুলের চাকরি কেনাবেচার রাজ্যজোড়া বাজার খুলে বসেছিলেন। ও জিনিস এ রাজ্যে অভূতপূর্ব। মধ্যপ্রদেশের ব্যাপম কেলেঙ্কারির সঙ্গে হয়ত তুলনা চলতে পারে।

দ্বিতীয়ত, মাপকাঠির প্রশ্ন। পশ্চিমবঙ্গে বহুকাল ধরে কলেজে শিক্ষক নিয়োগের জন্য কলেজ সার্ভিস কমিশনের পরীক্ষা চালু থাকলেও স্কুলশিক্ষক নিয়োগের কোনো মাপকাঠি ছিল না। স্কুলগুলো শূন্য পদ থাকলে নিজেরাই বিজ্ঞাপন দিত, ইন্টারভিউ নিত, নিয়োগ করত। এই ব্যবস্থারই সুযোগে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপে নিয়োগ চলত। সে রাস্তা বন্ধ করতেই স্কুল সার্ভিস কমিশন চালু করা হয়েছিল। কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগের জন্য সর্বভারতীয় নেট (National Eligibility Test) বা রাজ্যস্তরের স্লেট (State Level Eligibility Test) পরীক্ষার মত ১৯৯৭ সালে আইন করে পশ্চিমবঙ্গে চালু হয় স্কুল সার্ভিস কমিশনের পরীক্ষা (প্রথম পরীক্ষা ১৯৯৮ সালে)। অর্থাৎ রাজ্যের সব সরকারপোষিত স্কুলে শিক্ষক এবং শিক্ষাকর্মী নিয়োগের জন্য একটিই পরীক্ষা। লিখিত পরীক্ষা এবং কমিশনের বিশেষজ্ঞদের কাছে ইন্টারভিউতে পাস করলেই স্কুলের চাকরির পাকাপাকি ব্যবস্থা।

বাম আমলের শেষ দেড় দশকে পশ্চিমবঙ্গের উচ্চশিক্ষিত ছেলেমেয়েরা জানত, এ রাজ্যে তাদের জন্যে আর কিছু না থাক, একটা সরকারি চাকরি আছেই – স্কুলের চাকরি। ১৯৯৮-২০১০ – এক যুগ এই পরীক্ষা হয়েছে, মেধা তালিকা প্রকাশিত হয়েছে, নিয়োগ হয়েছে। যোগ্যতার যে মাপকাঠি এসএসসি ঠিক করেছিল সেটাই সঠিক কিনা, যারা এই পরীক্ষায় পাস করতে পারেনি তারাই যে অযোগ্য তার প্রমাণ কী – এসব সূক্ষ্ম তর্ক করাই যায়। কিন্তু ওই বছরগুলোতে অমুককে টপকে তমুক চাকরি পেয়ে গেল কী করে, অমুক তমুকের থেকে কম নম্বর পেয়েছে তাও আগে চাকরি পেল কী করে – এইসব অভিযোগ নিয়ে থানা পুলিস মামলা মোকদ্দমা হয়নি। অন্যায়ভাবে বাদ পড়ার অভিযোগ করে কাউকে রাজপথে বসে থাকতে হয়নি একদিনও। রাজ্যের শিক্ষামন্ত্রী ব্রাত্য বসু অবশ্য গতবছর মার্চে বলেছিলেন যে সিএজি রিপোর্টে উল্লেখ আছে, বাম আমলেও ৪৬,০০০ নিয়োগে অনিয়ম ছিল। তাঁদের সরকার ভদ্রতাবশত সেই অভিযোগের ভিত্তিতে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। তবে যেভাবে তৃণমূল সরকারের নিয়োগ দুর্নীতি নিয়ে রাজনীতি করছে বিরোধীরা, তাতে এইবার মুখ্যমন্ত্রীকে জানানো হবে। তিনি যা বলবেন তাই হবে। ব্রাত্যবাবু কি আজও জানাননি, নাকি মুখ্যমন্ত্রী এখনো চিরশত্রু বামেদের সঙ্গে ভদ্রতা করছেন? জানি না। সেইসময় ব্রাত্যবাবু বলেছিলেন ১৯৯৭ থেকে পশ্চিমবঙ্গে স্কুলে যত নিয়োগ হয়েছে তা নিয়ে শ্বেতপত্রও প্রকাশ করবে রাজ্য সরকার। সেই শ্বেতপত্রই বা কোথায় গেল?

এমনি ক’রেই যায় যদি দিন যাক না
যা-ই হোক, এসএসসি পরীক্ষা চালু রেখেই কীভাবে চাকরি বিক্রির বাজার খোলা যায়, সে বুদ্ধি সম্ভবত তৃণমূল সরকারের আমলে কেউ জোগাড় করে উঠতে পারেনি। তাই ব্যবস্থাটাকেই ধসিয়ে দেওয়া হল ক্রমশ। ২০১৩-১৪ থেকেই নানা অভিযোগ উঠতে শুরু করে, ২০১৬ থেকে অভিযোগের বন্যা। এখন যে ছেলেমেয়েরা কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করে তাদের সঙ্গে কথা বললে জানা যায় যে শিক্ষক হওয়ার প্রত্যাশা তারা অনেকেই ত্যাগ করেছে। এসএসসি পরীক্ষা আর কখনো সুষ্ঠুভাবে হয়ে স্কুলে তাদের চাকরি হবে বলে তারা মনে করে না। এই হতাশা নেহাত যুক্তিহীন বলা যাবে না। কারণ আজকাল নিজের ঘরে আগুন লাগার আগে পর্যন্ত কেউ কোথাও আগুন লেগেছে দেখলে গা করে না, আর স্কুলে নিয়োগের সংকট শেষ বিচারে খুব বেশি সংখ্যক পশ্চিমবঙ্গবাসীর সংকট নয়। যাদের চাকরি গেল তাদের সংকট, যারা এসএসসি পরীক্ষা দিয়েছিল তাদের সংকট, হয়ত যারা দেবে ভেবেছিল তাদের মানসিক হতাশার কারণ। আর সংকট স্কুল চালাতে নাকের জলে চোখের জলে হওয়া শিক্ষক-শিক্ষিকাদের, যাঁরা আদালতের সাম্প্রতিকতম রায়ের পরে আরও বিপদে পড়ে গেলেন। কারণ ইতিমধ্যেই বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন থেকে আমরা জেনে গেছি যে অনেক স্কুলে আর কোনো স্থায়ী শিক্ষকই থাকবেন না ২০১৬ সালে এসএসসি পাস করা ব্যক্তিরা বরখাস্ত হওয়ার পর। অনেক স্কুলে কোনো কোনো বিষয় আর পড়ানো যাবে না শিক্ষক নেই বলে। বিচারপতি দেবাংশু বসাক আর বিচারপতি মহম্মদ শব্বর রশীদি এই রায় দেওয়ার অনেক আগে থেকেই তো জানা যাচ্ছিল, কোথাও মাসিক তিন-চার হাজার টাকা বেতনে আংশিক সময়ের শিক্ষক চাইছে স্কুল, কোথাও আবার স্থানীয় মানুষের কাছে আবেদন জানানো হচ্ছে – যদি কোনো সহৃদয় ব্যক্তি এসে অমুক বিষয়টা বিনামূল্যে পড়িয়ে দিয়ে যান তো ভাল হয়। স্কুলে ওই বিষয়ের শিক্ষক নেই, অথচ ছাত্রছাত্রী আছে।

কিন্তু এসব স্কুলশিক্ষার সঙ্গে জড়িত মানুষের সমস্যা। যাঁরা পড়ান তাঁদের সমস্যা, যারা পড়ে তাদের আর তাদের বাবা-মায়েদের সমস্যা। এ নিয়ে নিয়মিত সান্ধ্য টিভি বিতর্ক হয় না। আজকাল তো এতরকম সমীক্ষা হয়। কেউ যদি সমীক্ষা করে, কলকাতার সম্পাদকদের কতজনের ছেলেমেয়ে সরকারপোষিত স্কুলে পড়ে আর যাঁরা স্টুডিওতে এসে গলা ফাটান তাঁদের কতজনের সন্তান ওসব স্কুলে পড়ে – তাহলেই বোঝা যাবে কেন সান্ধ্য বিতর্ক হয় না। এবারে নির্বাচন পর্বের মধ্যে এতগুলো লোকের চাকরি গেছে তাই, নইলে রাজ্যের মূলধারার সংবাদমাধ্যম কতদূর পাত্তা দিত সন্দেহ আছে। কলকাতা নাকি প্রতিবাদের শহর। সেখানে কয়েকশো ছেলেমেয়ে হাজার দিনের বেশি রাস্তায় বসে আছে (সকলে চাকরির দাবি করেও নয়, অনেকে যোগ্যতা প্রমাণের সুযোগ দাবি করে), অথচ সরকারি স্কুলশিক্ষায় কিছু এসে যায় না এমন কজন মানুষ একবার গিয়ে দাঁড়িয়েছেন সেখানে? টিভি ক্যামেরাও পৌঁছয় কখনো সরকার বা বিরোধী পক্ষের কোনো নেতার কথায়, কি আদালতের খোঁচায় এই ইস্যু উঠে এলে তবেই। এমনকি এই ১১০০ দিন পেরিয়ে যাওয়া আন্দোলনের পাশে দাঁড়ানোর কথা চাকরি পেয়ে যাওয়া শিক্ষক-শিক্ষিকাদেরও কোনোদিন মনে পড়েনি। তাঁরা বিভিন্ন শিক্ষক সংগঠনের উদ্যোগে কলকাতার বিভিন্ন জায়গায় গিয়ে বসলেন কখন? যখন রাজ্য সরকার মহার্ঘ ভাতার দাবি উড়িয়ে দিল। তার আগে চাকরিপ্রার্থীদের হয়ে একটাও মিছিল করেছেন এসএসসির যুগে চাকরি পাওয়া নবীন বা তার আগের যুগে চাকরি পাওয়া প্রবীণ শিক্ষকরা? একদিনও আন্দোলনের সঙ্গে সহমর্মিতা জানাতে গিয়ে বসেছেন পথে?

২০১৯ সালে যখন ধর্মতলায় প্রায় একমাস ধরে অনশন করেছিলেন চাকরিপ্রার্থীরা, তখন একদিন অফিস যাওয়ার পথে গিয়েছিলাম সেখানে। সেদিনও প্রবল গরম আর অদূরে ইডেন উদ্যানে আইপিএলের প্রথম খেলা। কাতারে কাতারে মানুষ ইডেনমুখো। তার মধ্যে ভরদুপুরে মুখ অন্ধকার করে শহরের একেবারে মধ্যিখানে বসেছিল কতকগুলো ছেলেমেয়ে। কখনো বিমান বসু গেছেন বলে টিভি ক্যামেরা গেছে, কখনো কোনো বিজেপি নেতা গেছেন বলে গেছে। সেবার ব্যাপারটা একটু বিপজ্জনক দিকে চলে যাওয়ায় (আসলে বোধহয় সেটাও নির্বাচনের বছর হওয়ায়) শেষমেশ মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি নিজে গিয়ে চাকরি হবে আশ্বাস দিয়ে অনশন ভাঙিয়েছিলেন। চাকরি হয়নি। কিন্তু সেকথা কে মনে রেখেছিল এতদিন? যে কোনো আন্দোলন অবশ্য এ রাজ্যে এমন প্রতিক্রিয়াই পায়। ছন্দা সাহা, রেবতী রাউত, তাপস বর – এই মানুষগুলোর কারোর মনে আছে আজ? করুণাময়ী মোড় থেকে অত্যন্ত নির্দয়ভাবে যখন রাস্তা দিয়ে টেনে হিঁচড়ে আন্দোলনকারীদের নিয়ে গেছে পুলিস, তখন মনে করতে বাধ্য হয়েছেন অনেকে। কারণ টিভিতে দেখা গেছে, কাগজে ছবি বেরিয়েছে। ব্যাস ওটুকুই।

এখন হাজার পঁচিশেক মানুষের চাকরি গেছে শুনে প্রায় অর্ধশতক আগের বেকারত্বের হারে পৌঁছে যাওয়া দেশের কিছু মানুষ আশ্চর্য রকম খুশি। কেন খুশি জানি না। এদের অনেককেই তো বেকারত্ব নিয়ে অন্য সময়ে চিন্তিত দেখি। ওই যে অটোর পিছনে লেখা থাকে ‘দ্যাখ কেমন লাগে’ – তেমন কোনো ধর্ষকাম মানসিকতা ছাড়া এর কোনো ব্যাখ্যা নেই বলেই মনে হয়। অবশ্য যে মানুষ পাশের বাড়িতে আগুন লেগেছে দেখে বালতি ভরে জল নিয়ে দৌড়ে যাওয়া দূরে থাক, হায় হায় বলে আর্তনাদও করে না, সে যে ধর্ষকাম তাতে আর সন্দেহ কী? এ যুগে ক্ষেত্রবিশেষে আমরা সবাই ধর্ষকাম। সুতরাং আমাদের তৈরি রাষ্ট্র যে ধর্ষকাম হবে তা বলাই বাহুল্য। আদালত বারবার চাইলেও নিয়ামক সংস্থা কারা পাস করেছিল আর কারা টাকা দিয়ে চাকরি পেয়েছে তা ঝাড়াই বাছাই করার জন্যে প্রয়োজনীয় ওএমআর শিট জমা দেয় না। সরকার ওএমআর শিট তিনবছর রেখে দেওয়ার নিয়ম বদলে একবছর করে দেয়, তারপর বিপদ বুঝে বলে – এবার থেকে দশবছর রাখা থাকবে। আর আদালত ঝাড়াই বাছাই করা যাচ্ছে না বলে সকলেরই চাকরি খায়।

এমনিতে যে ভারতীয় আদালতে কোনো মামলার নিষ্পত্তি হওয়ার গতি সবচেয়ে বেশি, সেটা হল হিন্দি সিনেমার আদালত – আড়াই থেকে তিন ঘন্টায় পুলিস তদন্ত শেষ করে আদালতে রিপোর্ট দাখিল করে, বিচারপতি সাক্ষী সাবুদ যাচাই করে রায় দিয়ে দেন। এদেশের অন্য সব আদালতই রাবীন্দ্রিক – এমনি ক’রেই যায় যদি দিন যাক না। কিন্তু এই মামলায় দেখা গেল আদালত রীতিমত ‘ফাস্ট ট্র্যাক’। গত ৯ নভেম্বর সুপ্রিম কোর্ট নিয়োগ সংক্রান্ত সব মামলার একত্রে বিচার করার জন্য কলকাতা হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতিকে বিশেষ বেঞ্চ গঠন করতে অনুরোধ করেছিল। তৎকালীন বিচারপতি অভিজিৎ গঙ্গোপাধ্যায়ের রায়ে যাদের চাকরি গিয়েছিল তাদের বরখাস্ত করার নির্দেশও ছমাসের জন্য রদ করে দিয়েছিল, যাতে ইতিমধ্যে বিশেষ বেঞ্চ বিচারের কাজ শেষ করতে পারে। পাঁচ মাস ২১ দিনের মাথায় রায় ঘোষণা করে দিলেন মহামান্য বিচারপতিরা। এমন নির্দিষ্ট তারিখ মেনে দেশে খুন, ধর্ষণ, সন্ত্রাসবাদী হামলার অভিযোগের বিচারও যদি হত! বোঝা যাচ্ছে আদালতের তাড়া ছিল। এত তাড়া ছিল যে তিনবার বৈধ চাকুরেদের তালিকা দিতে বলা সত্ত্বেও যখন স্কুল সার্ভিস কমিশন দিল না, তখন তার চেয়ারম্যানকে গ্রেফতার করানো বা বরখাস্ত করার সময় পেল না আদালত। গোটা কেলেঙ্কারিতে ক্যাবিনেটের দায় আছে বোঝা সত্ত্বেও যিনি এ রাজ্যের শিক্ষামন্ত্রী তাঁকেও তখনই ধরতে বলা হল না সিবিআইকে। ঘুষ দেওয়া-নেওয়ার মামলায় ঘুষ কে বা কারা নিয়েছে তার খোঁজ পরে হবে, আগে বরখাস্ত হল যারা ঘুষ দিয়েছে তারা। সঙ্গে যারা ঘুষ দেয়নি বলে আদালতেরও বিশ্বাস, তারাও।

পরের ছেলে পরমানন্দ
বিচারকদের তাড়া থাকতেই পারে। কার রাজ্যপাল হওয়ার তাড়া, কার সাংসদ হওয়ার তাড়া তা আমাদের মত সাধারণ মানুষের পক্ষে বোঝা সম্ভব নয়। আমরা আইন-টাইনও তত বুঝি না। কিন্তু আশ্চর্য লাগে যখন দেখি ঘুষ নেওয়ার চেয়েও বড় অপরাধ হয়ে দাঁড়াচ্ছে ঘুষ দেওয়া। আমাদের উদাসীনতা বা ধর্ষকাম মানসিকতা স্বীকার করে নিয়ে মনে করিয়ে দিই, আমরা এমন এক রাজ্যে বাস করি যেখানে কয়েক বছর আগে যথেষ্ট নম্বর পেয়েও কলেজে ভর্তি হতে গেলে শাসক দলের ছাত্র সংসদকে মোটা টাকা ঘুষ দিতে হচ্ছিল। সেই রাজ্যে ঘুষ দিয়ে চাকরি পাওয়াকে ঠিক কতখানি অপরাধ বলে গণ্য করা উচিত, সেই নৈতিক প্রশ্নের উত্তর আমি নিজেকে দিয়ে উঠতে পারছি না। আইনে সবকিছু মোটা হরফে লেখা আছে, নীতি ব্যাপারটা তো অত সোজা নয়। পশ্চিমবঙ্গে বসে সন্দেহ করা আদৌ অন্যায় নয় যে যাঁরা টাকা দিয়ে চাকরি পেয়েছেন তাঁদের মধ্যেও এমন প্রার্থী আছেন, যিনি সসম্মানে পরীক্ষায় পাস করেছিলেন। কিন্তু অমুক দাদা বা তমুক দিদি হয়ত ডেকে বলেছিলেন, অমুক পরিমাণ টাকা না দিলে নিয়োগপত্র দেওয়া হবে না।

এমন কোনো মতলব না থাকলে পার্থ চ্যাটার্জি শিক্ষামন্ত্রী থাকাকালীন প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার মেধা তালিকা প্রকাশ না করে এসএমএসে যোগ্য প্রার্থীদের জানানো হবে বলেছিলেন কেন? পাবলিক পরীক্ষায় কে কে পাস করেছে সে তথ্য প্রাইভেট হবে কেন? এ তো নির্বাচনী বন্ডের মত হয়ে গেল – কে টাকা দিল, কাকে টাকা দিল তা তৃতীয় ব্যক্তি যেন জানতে না পারে। শুধু যে টাকা পেল সে জানবে আর যে দিল সে জানবে। এক্ষেত্রেও যে চাকরি পেল শুধু সে-ই জানল আর যে চাকরি দিল সে জানল। নির্বাচনী বন্ডে ওই ব্যবস্থা করার পক্ষে তবু একটা অজুহাত ছিল। কোন দলকে কে চাঁদা দিচ্ছে জানলে অন্য দল দাতার উপর হামলা করতে পারে। কিন্তু রাম পরীক্ষায় পাস করে চাকরি পেয়েছে জানলে শ্যাম এসএসসির উপর হামলা করতে যাবে কেন? ১৯৯৮ সাল থেকে তো তেমন কিছু ঘটেনি। বরং বহু চাকরিপ্রার্থীই একবার পাস করতে না পেরে আবার পরীক্ষা দিয়েছেন, দ্বিতীয় বা তৃতীয় বারে উত্তীর্ণ হয়ে চাকরি পেয়েছেন। আর এখন হাজার জোরাজুরিতেও কমিশন জানিয়ে উঠতে পারছে না যে কারা উত্তীর্ণ হয়েছিলেন? এ তো বড় রঙ্গ যাদু।

এই কারণেই না ভেবে উপায় নেই যে আদালতকে যোগ্য-অযোগ্য আলাদা করতে সাহায্য না করার কারণ আসলে অনুত্তীর্ণরা। কমিশনের বর্তমান চেয়ারম্যান সিদ্ধার্থ মজুমদার জোর দিয়ে বলছেন চাকরি যাওয়া ২৫,৭৫৩ জনের মধ্যে মাত্র ৫,২৫০ জন অযোগ্য। অথচ ‘(বাকিরা যে প্রত্যেকে যোগ্য) সেই বিষয়ে নিশ্চিত নই। পুরোপুরি শংসাপত্র দিতে পারব না।’ কেন পারবেন না? ওএমআর শিট নেই বলে? কেন নেই? ঠিক ২০১৬ সালেই নিয়ম বদলে ওএমআর শিট তিন বছরের বদলে এক বছর রাখলেই চলবে এই নিয়ম করা হয়েছিল বলে? সেই নিয়ম কি করাই হয়েছিল ওএমআর শিট পুড়িয়ে দেওয়া হবে বলে? পুড়িয়ে দেওয়ার তাড়াহুড়ো কি আজকের মত পরিস্থিতির কথা ভেবে করা হয়েছিল? যদি আদালতকে ২০,৫০৩ জন যোগ্য প্রার্থীর নাম জানিয়ে দেওয়া হত তাহলে তাঁদের চাকরি যেত না। যেত কেবল বাকিদের। তখন ওই হাজার পাঁচেক মানুষ সদলবলে যাঁদের হাতে টাকা দিয়েছেন তাঁদের কাছে টাকা ফেরত চাইতেন এবং ব্যাপারটা একেবারে অহিংস থাকত, এমন সম্ভাবনা কম। অর্থাৎ আদালতের রায়ে এই দূরদৃষ্টিসম্পন্ন অপরাধের কারবারীদের পিঠ আক্ষরিক অর্থে বেঁচে গেল। এখন মুখ্যমন্ত্রী, তাঁর ভাইপো, শিক্ষামন্ত্রী, এসএসসি চেয়ারম্যান – সকলেই সুপ্রিম কোর্ট দেখিয়ে বলতে পারছেন, এই তো আবেদন করেছি। কোনো চিন্তা নেই।

ঘটনা হল, আবেদন করলেও চিন্তার যথেষ্ট কারণ আছে। হাইকোর্টের এই বিশেষ বেঞ্চ গঠিতই হয়েছিল সুপ্রিম কোর্টের অনুরোধে (পড়ুন নির্দেশে)। সেই বেঞ্চের রায় কি একেবারে উল্টে দেবেন সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিরা? বড়জোর তমলুকের বিজেপি প্রার্থী, থুড়ি প্রাক্তন বিচারপতি, অভিজিৎ গঙ্গোপাধ্যায়ের রায়ের যেমন প্রয়োগ আটকে দেওয়া হয়েছিল কিছুদিনের জন্যে, তেমন কিছু হতে পারে। নির্বাচন পর্ব শেষ হওয়ার আগেই তা হলে তৃণমূলের লাভ, না হলে বিজেপির। যাঁদের চাকরি গেল তাঁদের অবস্থা উনিশ-বিশ হবে আর যাঁরা রাস্তায় বসে আছেন তাঁদের দুর্দশারও কোনো সুরাহা হবে না। ইতিমধ্যে যারা ঘুষ নিয়েছিল তারা হয়ত বাঙ্কার-টাঙ্কার বানাবে অথবা য পলায়তি স জীবতি উপদেশ শিরোধার্য করবে।

আর আমরা? কদিন পরেই যোগ্য, অযোগ্য, যোগ্যতা প্রমাণের সুযোগ না পাওয়া – সকলের কথাই ভুলে যাব। তারপর হয়ত একদিন সুপ্রিম কোর্টের রায় বেরোবে। তাতে যদি রায় উল্টে যায় তাহলে যাঁদের চাকরি বেঁচে গেল তাঁদের এবং তাঁদের পরিবার পরিজনের কাছে তৃণমূল স্বচ্ছ দল হয়ে যাবে; যদি হাইকোর্টের রায় বহাল থাকে তাঁরা সুদ্ধ সকলের কাছে তৃণমূল চোর বলে প্রমাণিত হবে। বাংলার লক্ষ স্কুল নিরাশায়, আলোহীনতায় ডুবে নিস্তব্ধ নিস্তেল হয়ে গেলে তৃণমূলের কী, বিজেপির কী, আদালতের কী আর আমাদেরই বা কী? আমাদের ছেলেমেয়েরা তো আর ওসব স্কুলে পড়ে না। ওগুলো না হয় কদিন পরে উঠে যাবে বা বেসরকারি হয়ে যাবে। সকলেই জানে – বেসরকারি হলে পরিষেবা ভাল হবে।

অতএব ও নিয়ে ভেবে লাভ নেই। নির্বাচনে কে জিতল সেটাই আসল কথা।

পিপলস রিপোর্টারে প্রকাশিত

এ যুগে তৃতীয় নয়নও জিরো

এখন চণ্ডীগড়ের মেয়র নির্বাচনেও বৈধ পথে জেতার উপায় না থাকলে বিরোধীদের ব্যালট নষ্ট করিয়ে দেওয়া হয় স্বয়ং নির্বাচনী অফিসারকে দিয়ে। এ যুগে তৃতীয় নয়নের উপরেও আস্থা না থাকাই স্বাভাবিক।

ডিসিশন রিভিউ সিস্টেম বা ডিআরএসের যুগে আম্পায়ারদের ডিকি বার্ড, ডেভিড শেপার্ড বা সাইমন টফেলের মত পরম শ্রদ্ধেয় হয়ে ওঠার সুযোগ কমে গেছে। পড়ে আছে কুখ্যাত হওয়ার সুযোগ। কারণ আজকাল রান আউট বা স্টাম্প আউটের ক্ষেত্রে খুব সহজ সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রেও মাঠের আম্পায়াররা নিজে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ঝুঁকি নেন না, ঠান্ডা ঘরে বসা টিভি আম্পায়ারের হাতেই ব্যাপারটা ছেড়ে দেন। শ্যেনদৃষ্টির একাধিক ক্যামেরা আর অত্যাধুনিক প্রযুক্তির কারণে মাঠে দাঁড়িয়ে আম্পায়ারিংয়ের মত পরিশ্রমসাধ্য কাজ এখন আগের চেয়েও বেশি প্রশংসাহীন। সঠিক সিদ্ধান্তের জন্যে বড় একটা কেউ প্রশংসা করবে না, কিন্তু ভুল সিদ্ধান্ত নিলে সমালোচনার বন্যা বয়ে যাবে ধারাভাষ্যকারদের বক্স থেকে সোশাল মিডিয়া পর্যন্ত। কারণ দুনিয়া সুদ্ধ লোক কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই স্বচক্ষে, স্বকর্ণে জেনে ফেলবে যে সিদ্ধান্তটা ভুল ছিল। যদি ক্ষতিগ্রস্ত দল রিভিউ করে আর টিভি আম্পায়ার সিদ্ধান্ত বদলে দেন, তাহলে তো কথাই নেই। এমনটা এক ম্যাচে একাধিকবার ঘটে গেলেই বলাবলি, লেখালিখি শুরু হয়ে যাবে – এই আম্পায়ারটা ফালতু। ক্রিকেট লাভজনক ব্যবসা হয়ে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে আম্পায়ারদের পারিশ্রমিক অনেক বেড়েছে। আজকের নীতিন মেননরা যা পারিশ্রমিক পান তা প্রয়াত বার্ড কোনোদিন পাননি। কিন্তু সেকথা তো ক্রিকেটারদের ক্ষেত্রেও সত্যি। বিরাট কোহলি যা রোজগার করেন তা কি সুনীল গাভস্কর তাঁর খেলোয়াড় জীবনে স্বপ্নেও ভাবতে পারতেন? দুঃখের বিষয়, ক্রিকেটারদের পারিশ্রমিক বাড়ার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে সম্মান কমেনি, যা হয়েছে আম্পায়ারদের ক্ষেত্রে। আগে কুখ্যাত আম্পায়াররা ছিলেন ব্যতিক্রম এবং কুখ্যাতির কারণ কখনোই ভুল সিদ্ধান্ত হত না। হত আম্পায়ারের পক্ষে মানানসই নয় এমন কোনো আচরণ। তৃতীয় আম্পায়ার (অধুনা টিভি আম্পায়ার বলাই দস্তুর) এসে যাওয়ার পরে মাঠের আম্পায়াররা পান থেকে চুন খসলেই খলনায়ক হয়ে যান।

ইউটিউবের কিছু চ্যানেল বা সোশাল মিডিয়া এক্সের কিছু হ্যান্ডেলের পুরনো খেলার পোস্ট দেখলে পরিষ্কার বোঝা যায়, আজকাল মাঠের আম্পায়াররা কিন্তু আগের চেয়ে অনেক কম ভুল করেন। তৃতীয় আম্পায়ার চালু হওয়ার আগের যুগে, এমনকি তারপরেও এমন অনেক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে যা দেখলে চক্ষু ছানাবড়া হয়ে যাবে। যে দেশে খেলা হত সেই দেশের আম্পায়াররা যেসব সিদ্ধান্ত নিতেন তা অনেক ক্ষেত্রেই পক্ষপাতদুষ্ট বলে মনে হত, এখন সেসব ভিডিও ফিরে দেখলে আর সন্দেহ থাকে না। শ্রীলঙ্কার আম্পায়াররা ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে একটা সিরিজে তেমন সিদ্ধান্তের বন্যা বইয়ে দিয়েছিলেন। সনৎ জয়সূর্যের লেগ স্টাম্পের অনেক বাইরে পিচ পড়া বলে অ্যালেক স্টুয়ার্টকে এলবিডব্লিউ দেওয়া হয়েছে, তিনি আক্ষরিক অর্থে হাঁ হয়ে গেছেন। নিউজিল্যান্ড বনাম ইংল্যান্ডের একটা ম্যাচে আবার বোলার, উইকেটরক্ষক কেউ কোনো আবেদন না করা সত্ত্বেও আম্পায়ার ব্যাটারকে আউট দিয়ে দিয়েছিলেন। বল যদিও ব্যাটের ধারে কাছে আসেনি। ভারত বনাম শ্রীলঙ্কার একটা একদিনের ম্যাচে তো আম্পায়ার চমৎকার কাণ্ড করেছিলেন। অজয় জাদেজা অফ স্টাম্পের বাইরের বলে ব্যাট চালালেন এবং ফস্কালেন। কেউ কোনো আবেদন করার আগেই আম্পায়ার ডান হাতের তর্জনী আকাশে তুলে দিলেন। তা দেখে শ্রীলঙ্কার ক্রিকেটাররা উল্লাস আরম্ভ করতে যেতেই তিনি আঙুল নামিয়ে নিজের টুপিটা ধরে ফেললেন। অর্থাৎ নট আউট, উনি টুপি ধরার জন্যেই আঙুল তুলেছিলেন। এমন সব কাণ্ড ঘটত বলেই আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ক্রমশ টেস্ট ম্যাচে দুই আম্পায়ারই নিরপেক্ষ দেশের হবেন, একদিনের ম্যাচে মাত্র একজন আয়োজক দেশের হবেন – এইসব নিয়ম চালু করতে হয়েছিল। প্রযুক্তির উন্নতির সুযোগ নিয়ে তৃতীয় আম্পায়ার রাখার সিদ্ধান্ত কিন্তু হয়েছিল মাঠের আম্পায়ারদের সৎ ভুলগুলো শোধরানোর জন্যেই। তাই ১৯৯২-৯৩ মরশুমে ভারত বনাম দক্ষিণ আফ্রিকা সিরিজে যখন প্রথমবার তৃতীয় আম্পায়ার কাজ শুরু করেন, তখন তাঁকে অনেক ছোট গণ্ডির মধ্যে কাজ করতে হত।

এখনকার মত যে কোনো সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রেই তাঁর মত চাওয়া যেত না। খেলোয়াড়রা তৃতীয় আম্পায়ারের কাছে আবেদন জানাতেও পারতেন না। ব্যাপারটা সম্পূর্ণ মাঠের আম্পায়ারদের আয়ত্তে ছিল।

সেই যুগে বা তারও আগে ক্রিকেট খেলায় যখন আদৌ তৃতীয় আম্পায়ার ছিল না, তখন কিন্তু খেলোয়াড়দের কাছে আম্পায়ারদের সম্মান ছিল আকাশছোঁয়া। ১৯৮৭ সালে পাকিস্তানের আম্পায়ার শাকুর রানা যেমন পায়ে পা দিয়ে ঝগড়া করেছিলেন ইংল্যান্ড অধিনায়ক মাইক গ্যাটিংয়ের সঙ্গে, অথবা প্রবল নাক উঁচু (এবং সম্ভবত বর্ণবিদ্বেষী) ড্যারেল হেয়ার যেভাবে বেমক্কা পাকিস্তানকে বল বিকৃতিতে অভিযুক্ত করেছিলেন ২০০৬ সালে, তেমনটা না ঘটলে খেলোয়াড়রা আম্পায়ারদের ডাহা ভুল সিদ্ধান্তও মেনে নিতেন। সাময়িক উত্তেজনার বশে কখনো বাড়াবাড়ি করা হয়ে গেলেও দলের অন্যরা সামলে নিতেন। যেমন গাভস্করের মত ঠান্ডা মাথার লোকও ১৯৮১ সালে মেলবোর্ন টেস্টে এলবিডব্লিউ হওয়ার পর রেগে গিয়ে পার্টনার চেতন চৌহানকে মাঠ থেকে বার করে আনতে চেয়েছিলেন। কিন্তু সীমানা পেরোবার আগেই ভারতীয় দলের ম্যানেজার শাহীদ দুরানি আর বাপু নাদকার্নি গাভস্করকে শান্ত করে চেতনকে ফেরত পাঠান। গাভস্কর অবশ্য পরে বলেছেন তিনি ভুল আউট দেওয়ার জন্যে আম্পায়ার রেক্স হোয়াইটহেডের উপর ততটা রাগ করেননি। চেতনকে নিয়ে একেবারে খেলা থেকেই দল প্রত্যাহার করে নিতে চেয়েছিলেন ডেনিস লিলির কটূক্তি সহ্য করতে না পেরে। আউটের সিদ্ধান্তটা কিন্তু সত্যিই ভুল ছিল। সিডনি মর্নিং হেরাল্ড কাগজে লেখা হয়েছিল, বল পায়ে লাগার আগে ব্যাটের লাগার শব্দ গাছের গুঁড়িতে কুড়ুল মারার মত জোরে শোনা গিয়েছিল। রানা বনাম গ্যাটিং কাণ্ডেও ইংল্যান্ডের ক্রিকেট বোর্ড গ্যাটিংকে ক্ষমা চাইতে বাধ্য করেছিল, পাকিস্তানে ইংল্যান্ডের রাষ্ট্রদূত নিজে মধ‍্যস্থতা করেছিলেন ঝামেলা মেটাতে। এমনকি গোটা দল দেশে ফিরে যেতে চাইলেও ইংল্যান্ডের বোর্ড প্রত্যেক ক্রিকেটারকে ১০০০ পাউন্ড করে ‘হার্ডশিপ অ্যালাউয়েন্স’ দিয়ে সফর শেষ করিয়েছিল। গ্যাটিং পরে বলেছেন, তিনিও বাড়াবাড়ি করে ফেলেছিলেন।

এর সঙ্গে তুলনা করুন আজকের আম্পায়ারদের সঙ্গে ক্রিকেটারদের ব্যবহার। মাঠের আম্পায়ারদের নিজেদেরই আগেকার আত্মবিশ্বাস নেই, তাঁরা প্রযুক্তি হাতে থাকতে ভুল প্রমাণিত হওয়ার ঝুঁকি যে নেন না তা তো আগেই বলেছি। উপরন্তু ক্রিকেটাররাও আর তাঁদের ততখানি শ্রদ্ধার আসনে রাখেননি। বিশেষত মহাতারকারা তো টিভি আম্পায়ারকেও আমল দেন না। স্মরণ করুন ২০২২ সালের জানুয়ারি মাসে ভারত বনাম দক্ষিণ আফ্রিকার কেপ টাউন টেস্টের কথা। তৃতীয় দিন দক্ষিণ আফ্রিকার তৎকালীন অধিনায়ক ডীন এলগারের বিরুদ্ধে এলবিডব্লিউয়ের আবেদন নাকচ করে দেন টিভি আম্পায়ার। কারণ হক আই দেখায় ওটা নট আউট। তার জন্যে রুষ্ট ভারত অধিনায়ক কোহলি, তাঁর পারিষদ কে এল রাহুল এবং রবিচন্দ্রন অশ্বিন স্টাম্প মাইক্রোফোন ব্যবহার করে কেবল আয়োজক দেশের নাগরিক টিভি আম্পায়ার নয়, সম্প্রচারকারী সংস্থা এবং গোটা দেশটার মানুষ সম্পর্কেই কটূক্তি করেন। সবাই মিলে নাকি ভারতীয় দলের বিরুদ্ধে একজোট হয়ে নেমেছিল।

আরও পড়ুন এরপর কি মাঠে কুস্তি লড়বেন বিরাট কোহলিরা?

তৃতীয় আম্পায়ারের সিদ্ধান্তে প্রথম রান আউট হওয়া শচীন তেন্ডুলকর আর এখনকার কোহলির মাঝে যিনি ভারতীয় ক্রিকেটের এক নম্বর তারকা ছিলেন, সেই মহেন্দ্র সিং ধোনি আরও এককাঠি সরেস। ২০১৯ সালের আইপিএলে ধোনির চেন্নাই সুপার কিংসের বিরুদ্ধে রাজস্থান রয়্যালসের একটা ম্যাচে বোলারের প্রান্তের আম্পায়ার বেন স্টোকসের ফুল টসে নো-বল ডাকলেও লেগ আম্পায়ার সেই সিদ্ধান্ত খারিজ করে দেন। ধোনি, যিনি তার আগেই আউট হয়ে গেছিলেন, একেবারে পাড়ার টোক্কা ক্রিকেট প্রতিযোগিতার মত সটান মাঠে ঢুকে পড়েন সেই সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ করতে। আম্পায়ারদের নেহাতই বেচারা দেখিয়েছিল তাঁর সামনে। অবশ্য তাঁরা নিজেদের সিদ্ধান্ত বদল করেননি।

এই দুটো ঘটনাই এই লেখার পাকা চুলের পাঠকদের যৌবনে সর্বোচ্চ স্তরের ক্রিকেটে অকল্পনীয় ছিল। অথচ তখন ভুল সিদ্ধান্তের সংখ্যা নিঃসন্দেহে বেশি ছিল, খেলোয়াড়দের আবেগ কিছুমাত্র কম ছিল না। তৃতীয় আম্পায়ার এসে পড়ার পরেও যে কত হাস্যকর ঘটনা ঘটিয়েছেন মাঠের আম্পায়াররা, তার ইয়ত্তা নেই। তবু তা নিয়ে খেলোয়াড়, বিশেষজ্ঞ, সাংবাদিক, দর্শক কাউকেই অত্যধিক উত্তেজিত হতে দেখা যেত না সচরাচর। ইডেন উদ্যানে ১৯৯৩ সালের হিরো কাপ ফাইনালের কথা নিশ্চয়ই অনেকের মনে আছে। ওয়েস্ট ইন্ডিজের রোল্যান্ড হোল্ডার অনিল কুম্বলের বলে বোল্ড হয়ে যান। অথচ সেটা দুই আম্পায়ারের কেউ খেয়াল করেননি। এমনকি ভারতের উইকেটরক্ষক বিজয় যাদবও খেয়াল করেননি। বলটা থার্ডম্যানে চলে যাওয়ায় দুই ব্যাটার যখন রান নেওয়ার তাল করছেন, তখন ফিল্ডার মনোজ প্রভাকর বল কুড়িয়ে নিয়ে প্রশ্ন করেন – বেল পড়ে গেল কী করে? শেষমেশ টিভি আম্পায়ার শেখর চৌধুরী জানান – আসলে বোল্ড হয়েছেন হোল্ডার। ১৯৯৯ সালের অ্যাডিলেড টেস্টে শচীন তেন্ডুলকরকে অস্ট্রেলিয় আম্পায়ার ড্যারিল হার্পার কাঁধে লাগা বলে এলবিডব্লিউ দিয়েছিলেন। তা নিয়ে বিস্তর বিতর্কও হয়েছিল। কিন্তু শচীন আম্পায়ারকে দুকথা শোনাতে যাননি। তিনি এবং সৌরভ গাঙ্গুলি একসময় নিয়মিত আম্পায়ারের ভুলে আউট হতেন। ১৯৯৯ সালেই পাকিস্তানের বিরুদ্ধে অবিস্মরণীয় চেন্নাই টেস্টের দ্বিতীয় ইনিংসে সৌরভকে দুবার ড্রপ পড়া বলে ক্যাচ আউট দেওয়া হয়। বোলিং প্রান্তের আম্পায়ার স্টিভ ডান আর লেগ আম্পায়ার (যিনি সৌরভ বাঁ হাতি হওয়ায় তখন অফে দাঁড়িয়েছিলেন) ভি কে রামস্বামী তৃতীয় আম্পায়ারের সাহায্য নেওয়ার কথা আদৌ ভাবেননি! একে সেটা ছিল ভারত বনাম পাকিস্তান টেস্ট, তার উপর লেগ আম্পায়ার ছিলেন ভারতীয়, ভারত শচীনের অসামান্য শতরান সত্ত্বেও ম্যাচটা একটুর জন্যে হেরে যায়। তবুও আম্পায়ারদের ভুল নিয়ে ভারতীয় ক্রিকেটাররা খুব বেশি বাক্য ব্যয় করেননি। প্রাক্তনরা সমালোচনা করেছিলেন, কিন্তু তার চেয়ে অনেক বেশি কথা খরচ করা হয়েছিল শচীনের এবং পাকিস্তান দলের প্রশংসায়। চিপক স্টেডিয়ামের দর্শকরা পাকিস্তান দলকে উঠে দাঁড়িয়ে অভিবাদন জানিয়েছিলেন। আম্পায়ারদের একটা ভুল নিয়ে নষ্ট করার মত সময় সাংবাদিকদেরও ছিল না।

শেষ করা যাক ২০০৭-০৮ মরশুমে ভারত বনাম অস্ট্রেলিয়ার সিডনি টেস্ট দিয়ে। একটা ম্যাচে অতগুলো ভুল সিদ্ধান্ত বিরল। মাঠের দুই আম্পায়ার মার্ক বেনসন আর স্টিভ বাকনর তো বটেই, এমনকি তৃতীয় আম্পায়ার ব্রুস অক্সেনফোর্ডও গাদা গাদা ভুল করেন। মাইকেল হাসি আর অ্যান্ড্রু সাইমন্ডস একাধিকবার আউট ছিলেন, দেওয়া হয়নি। সবচেয়ে ন্যক্কারজনক ঘটনা ঘটে শেষদিন। মাইকেল ক্লার্ক সৌরভের ব্যাট থেকে বেরনো বল মাটিতে পড়ে যাওয়ার পরে ধরে ক্যাচের আবেদন করেন। আম্পায়াররা তৃতীয় আম্পায়ারের সাহায্য না নিয়ে অস্ট্রেলিয় অধিনায়ক রিকি পন্টিংয়ের কথায় সৌরভকে আউট দিয়ে দেন। ধারাভাষ্যের দায়িত্বে থাকা প্রাক্তন ক্রিকেটাররা সঙ্গত কারণেই কঠোর সমালোচনা করেন আম্পায়ারদের এবং অস্ট্রেলিয় ক্রিকেটারদের। ভারত অধিনায়ক অনিল কুম্বলে সাংবাদিক সম্মেলনে এসে বলেন, এই ম্যাচে কেবল একটা দলই ক্রিকেটের সহবত অনুযায়ী খেলছিল। কিন্তু মাঠের মধ্যে একজন ভারতীয় ক্রিকেটারও আম্পায়ারদের সঙ্গে অসদাচরণ করেননি।

আসলে ক্রিকেটাররা তো আকাশ থেকে পড়েন না, সমাজ থেকেই উঠে আসেন। তখনকার ভারতীয় সমাজে জয়ের দাম ছিল, কিন্তু যে কোনো মূল্যে জিততে হবে – এই মনোভাব সর্বব্যাপী ছিল না। এখন চণ্ডীগড়ের মেয়র নির্বাচনেও বৈধ পথে জেতার উপায় না থাকলে বিরোধীদের ব্যালট নষ্ট করিয়ে দেওয়া হয় স্বয়ং নির্বাচনী অফিসারকে দিয়ে। এ যুগে তৃতীয় নয়নের উপরেও আস্থা না থাকাই স্বাভাবিক।

সংবাদ প্রতিদিনের রোববার পত্রিকায় প্রকাশিত

গিলি গিলি গে: মোদী ম্যাজিক বলতে যা বোঝায়

মোদী ম্যাজিক কথাটা তো সেই ২০১৪ সাল থেকে শুনে আসছেন। কিন্তু ভেবে দেখেছেন কি, ম্যাজিকটা ঠিক কী? এমনিতে বাঙালি পি সি সরকারের জাত। হাত-পা বেঁধে গালা দিয়ে সিল করা প্যাকিং বাক্সে পুরে সমুদ্রে ফেলে দিলেও সাঁতরে পাড়ে এসে ওঠা, লোকের চোখে সামনে আস্ত ট্রেন বা তাজমহল ভ্যানিশ করে দেওয়াই যে ম্যাজিকের সর্বোচ্চ স্তর তা আমরা ছোটবেলা থেকে জানি। ফলে জাত জাদুকর চিনতে আমাদের ভুল হয় না। পি সি সরকার জুনিয়র যে দলের প্রার্থী হয়েছিলেন একদা, সেই দলের সর্বকালের সবচেয়ে জনপ্রিয় নেতা নরেন্দ্র মোদীর ম্যাজিকগুলো এইবেলা চিনে নেওয়া আমাদের কর্তব্য। কারণ প্রথম দু দফা ভোটদানের পরে অনেক বিশ্লেষক বলছেন ২০১৪ আর ২০১৯ সালের মত মোদী ম্যাজিক নাকি হচ্ছে না। এঁদের বাড়া ভাতে ছাই দিয়ে ৪ জুন মোদী চারশো পার করে ফেলতেই পারেন। তখন এঁরা কী বলবেন? আমরা বরং একটু এগিয়ে থাকার চেষ্টা করি। ইন্দ্রজাল কেমন করে হয় তা তো শুধু জাদুকর জানেন। আমাদের সাধ্য কী বুঝে ফেলি? আমরা কেবল জাদুকর মঞ্চের উপরে যা যা করেন সেগুলো চিহ্নিত করতে পারি। সেটাই করা যাক।

ছিল নির্বাচন কমিশন, হল ঠুঁটো জগন্নাথ

এবারের ভোটে সোজা পথে জেতা সহজ হবে না আন্দাজ করে সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে প্রধান নির্বাচন কমিশনার বেছে নেওয়ার কমিটিতে দেশের প্রধান বিচারপতির বদলে একজন ক্যাবিনেট মন্ত্রীকে রাখার আইন পাস করা হয়েছে। তারপর সেই আইন অনুযায়ী এমন লোকেদের বেছে নেওয়া হয়েছে যাঁরা মোদীর গত রবিবারের ঘৃণাভাষণ নিয়ে মন্তব্য করতেও ভয় পান। সতেরো হাজার নাগরিক স্বাক্ষরিত চিঠি বা মোদীর মন্তব্য নিয়ে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের সমালোচনাও নির্বাচন কমিশনের মুখ খোলাতে পারেনি। এর জন্যে নির্বাচন কমিশনারদের আবার রামভক্ত বলে বসবেন না। তাঁরা কুম্ভকর্ণের ভক্ত। তবে চক্ষুলজ্জা বলে তো একটা জিনিস আছে। তাই তাঁরা নিরপেক্ষতা দেখাতে রাহুল গান্ধী আর মোদী – দুজনের বক্তব্যেই আপত্তি জানিয়ে দুই ব্যক্তিকে নয়, তাঁদের পার্টিকে নোটিস পাঠিয়েছেন। অভূতপূর্ব ঘটনা, অর্থাৎ ম্যাজিক।

প্রার্থী ভ্যানিশ

যে কোনো বড় ঐন্দ্রজালিকের মত মোদীর ঝুলিতে আরও অনেক তাস আছে। তাঁর খাসতালুক গুজরাটের সুরাটে যাতে এই গরমে ভোটারদের ভোট দিতে বেরোতে না হয় তার ব্যবস্থা করে ফেলেছে দল। কংগ্রেস প্রার্থী নীলেশ কুম্ভানির প্রস্তাবকদের সই নিয়ে সন্দেহ আছে বলে অভিযোগ করেছিল বিজেপি। রিটার্নিং অফিসার সৌরভ পাড়হি সেই অভিযোগে সায় দেন। বলেন প্রস্তাবকরা নাকি হলফনামা জমা দিয়ে জানিয়েছেন যে ওগুলো তাঁদের সই নয়। কংগ্রেস অভিযোগ করেছে সেই প্রস্তাবকদের অপহরণ করা হয়েছিল, যাতে প্রার্থী তাঁদের সশরীরে রিটার্নিং অফিসারের সামনে হাজির করতে না পারেন। ঘটনা এইটুকু হলেও না হয় কথা ছিল। কিন্তু কংগ্রেসের বিকল্প প্রার্থী সুরেশ পাড়সালার মনোনয়নও বাতিল করে দেওয়া হয়েছে। শুধু কি তাই? সুরাট কেন্দ্রের নির্দল প্রার্থীরাও কোনো অজ্ঞাত কারণে মনোনয়ন প্রত্যাহার করেছেন। ফলে বিজেপি প্রার্থী মুকেশ দালাল ইতিমধ্যেই হাসি হাসি মুখে রিটার্নিং অফিসারের হাত থেকে জয়ীর শংসাপত্র নিয়ে ছবি তুলে ফেলেছেন। এদিকে কুম্ভানি নিজেও সোমবারের পর উধাও। কংগ্রেসের কেউ কেউ মনে করছেন উনি কয়েকদিনের মধ্যেই বিজেপিতে যোগ দেবেন। গুজরাট প্রদেশ কংগ্রেস কমিটি তাঁকে ছ বছরের জন্য দল থেকে বহিষ্কারও করেছে বিজেপির সঙ্গে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত থাকার অভিযোগ করে।

এর আগেই আমেদাবাদ পূর্ব আসনের কংগ্রেস প্রার্থী রোহন গুপ্তা নাম ঘোষণা হয়ে যাওয়ার পর বাবার অসুস্থতার দোহাই দিয়ে ভোটে দাঁড়াবেন না বলেন, তারপর দলত্যাগ করেন। আগামী কয়েক দফার নির্বাচনে আরও কত আসনে এরকম ঘটবে কে বলতে পারে?

এক পার্টি থেকে দুই, দুই থেকে চার

কংগ্রেস মোদীর ঘৃণাভাষণ এবং সুরাটের ঘটনার প্রতিবাদ করে নির্বাচন কমিশনে লম্বা চিঠি দিয়ে এসেছে। কিন্তু নির্বাচন কমিশন কী করবে? অনেক আগেই মহারাষ্ট্রের দুই শক্তিশালী দল শিবসেনা আর এনসিপিকে ভেঙে দিয়েছে মোদীর বিকাশ। তারপর বিজেপির সঙ্গে চলে যাওয়া অংশকেই আসল দল তকমা দিয়ে তাদেরই দলীয় প্রতীক ব্যবহারের ক্ষমতা দিয়েছে নির্বাচন কমিশন। মোদী সাত্ত্বিক মানুষ, মদ্যপান করেন না। তাই দীপ জ্বেলে যাই ছবির অনিল চ্যাটার্জির মত জলের বোতল হাতে নিয়ে গাইতেই পারেন ‘এমন বন্ধু আর কে আছে?’

লোকাল ট্রেনে দশ টাকায় দশখানা কলম বিক্রি করা হকারদের দেখেছেন তো? তাঁরা একটা করে কলম বার করেন আর এমন বিশদে তার গুণাবলী বর্ণনা করেন যে মনে হয় এটাই শেষ কলম। তারপর বলেন ‘এখানেই শেষ নয়…’। মোদীর চারশো পারের ম্যাজিকও সেইরকম।

যেমন সিপিএম অভিযোগ করেছে, ত্রিপুরা পশ্চিম কেন্দ্রের সরকারি নথিই বলছে কোথাও কোথাও ১০০ শতাংশের বেশি ভোট পড়েছে।

নমো যন্ত্র, নমো যন্ত্র, নমো যন্ত্র…

এখানেই শেষ নয়। আছে ইভিএম। মোদীভক্তদের কথা আলাদা। তার বাইরে যাঁরা কাল অবধিও ইভিএমে কারচুপি আছে শুনলেই বিরোধীদের ছিঁচকাঁদুনে বলতেন, তাঁরাও এখন ব্যাপারটাকে নেহাত ষড়যন্ত্রের তত্ত্ব বলে উড়িয়ে দিতে পারছেন না। কারণ নির্বাচন কমিশন ইভিএম নিয়ে প্রশ্ন উঠলেই যা করে, তাকে বাংলায় বহুকাল ধরে বলা হয় ‘ঠাকুরঘরে কে রে? আমি তো কলা খাইনি’।

নির্বাচনী বন্ড নিয়ে যাঁরা মামলা করেছিলেন তাঁদের অন্যতম, অ্যাসোসিয়েশন ফর ডেমোক্র্যাটিক রাইটস (এডিআর), এবং আরও অনেকে মিলে সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হয়েছিলেন ইভিএম নিয়ে। ইভিএম বাতিল করার দাবি করা হয়নি। দাবি ছিল ইভিএমের ভোট যে ভোটারের মতই প্রতিফলিত করছে তা নিশ্চিত করতে সমস্ত ভোটার ভেরিফায়েবল পেপার অডিট ট্রেল (ভিভিপ্যাট) স্লিপ গোনা হোক। নির্বাচন কমিশন সেটুকুও এড়াতে মরিয়া। ভিভিপ্যাট গোনার জন্যে নয়, গুনতে গেলে পাঁচদিন লেগে যাবে ইত্যাদি অদ্ভুত যুক্তি দেওয়া হয়েছিল কমিশনের পক্ষ থেকে। কোনো প্রযুক্তিগত গোলমাল যে নেই তাও কেবল মুখের কথায় বিশ্বাস করতে হবে – এরকমই দাবি নির্বাচন কমিশনের। শুনানি চলাকালীনই কেরালার কসরগোড় থেকে খবর আসে যে মক পোলে বিজেপির প্রতীকে একটা করে অতিরিক্ত ভোট চলে যাচ্ছে কিছু ইভিএমে। বিচারপতি সঞ্জীব খান্না ও বিচারপতি দীপঙ্কর দত্তের বেঞ্চ কমিশনকে খতিয়ে দেখতে বলে। কমিশন বলে দেয় খবরটাই নাকি মিথ্যে।

আরও পড়ুন এক যে ছিল সংসদ

মজার কথা, নির্বাচন কমিশনের যে চার বিশেষজ্ঞের দল আছে ইভিএম-ভিভিপ্যাট ব্যবস্থা সুরক্ষিত আছে কিনা তা দেখার জন্য, তার সদস্যরা নিজেরাই ভিভিপ্যাট নির্মাণ করেছেন। দ্য নিউজ মিনিট ওয়েবসাইটের এই তাক লাগানো প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে গত সোমবার। মানে আপনার বানানো মেশিন যে ঠিক কাজ করছে তার সার্টিফিকেট দিচ্ছেন আপনিই। এরকম একটা ব্যবস্থায় চলছে গোটা দেশের লোকসভা ও বিধানসভা নির্বাচন। কখনো কোনো বাইরের লোককে পরীক্ষা করে দেখতে দেওয়া হয়নি এই ব্যবস্থায় কোনো গলদ আছে কিনা। কিন্তু শেষমেশ বিচারপতিরা রায় দিয়েছেন, সমস্ত ভিভিপ্যাট স্লিপ গোনার কোনো দরকার নেই। তবে যে কম্পিউটার থেকে ইভিএমে পার্টিগুলোর প্রতীক ঢোকানো হয়, সেগুলোকেও ইভিএম আর ভিভিপ্যাট মেশিনের সঙ্গে ফল ঘোষণার ৪৫ দিন পর পর্যন্ত সংরক্ষণ করতে হবে। পরাজিত প্রার্থীরা ৫% ইভিএম যাচাই করতে চাইতে পারবেন স্বখরচায়।

বিচারপতি খান্না আর বিচারপতি দত্ত এই রায় দিতে গিয়ে বলেছেন, সবসময় অন্ধভাবে নির্বাচন প্রক্রিয়াকে অবিশ্বাস করলে অপ্রীতিকর সন্দেহ তৈরি হতে পারে। শ্রীরামকৃষ্ণ বলেছিলেন, যতদিন বাঁচি ততদিন শিখি। এতদিন জানতাম বিশ্বাস অন্ধ হয়। বিচারপতিদ্বয় আমাদের শেখালেন, অবিশ্বাসও অন্ধ হয়।

ট্রেন ভ্যানিশ

এখানেও শেষ নয়। অভিযোগ উঠেছে যে আসামের প্রবাসী শ্রমিকরা (যাঁদের বড় অংশ মুসলমান) যাতে ভোট দিতে আসতে না পারেন, সেই উদ্দেশ্যে আসামগামী ছটা ট্রেন বাতিল করা হয়েছে।

জাদুকর মোদী যখন ঝুলি থেকে এত পায়রা, খরগোশ ইত্যাদি বার করতে পারেন তখন তাঁর চারশো পার করা কি নিশ্চিত?

মোটেই না। গত কয়েক বছর ধরে যেভাবে বিরোধী মতের রাজনীতিবিদ, সমাজকর্মী, ছাত্রনেতা এবং সাংবাদিকদের কারারুদ্ধ করা হচ্ছে; গত কয়েক মাসে যেভাবে বিরোধী দলের মুখ্যমন্ত্রীদেরও জেলে পোরা হয়েছে; গত কয়েক দিন ধরে মোদী যেভাবে কংগ্রেসকেও মাওবাদী বলে দেগে দিচ্ছেন তাঁর বক্তৃতায় এবং তাঁর ডান হাত শাহ যেভাবে বলেছেন এবার ক্ষমতায় এলে দুবছরের মধ্যে ভারতে মাওবাদ শেষ করে দেওয়া হবে, তার সঙ্গে অনেকটা মিলে যায় ১৯৩৩ সালে জার্মানির ফেডারেল ইলেকশনের আগে নাজি সরকারের কার্যকলাপ। অত কাণ্ড করেও কিন্তু তারা সেবার নির্বাচনে একা সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়নি। জার্মান ন্যাশনাল পিপলস পার্টির (ডিএনভিপি) মদত দরকার হয়েছিল। সেই দলকে অনতিবিলম্বেই গিলে নেয় অ্যাডলফ হিটলারের দল এবং প্রতিষ্ঠিত হয় একনায়কতান্ত্রিক শাসন। মোদীর দলেরও জোটসঙ্গী আছে। ২০১৯ সালের চেয়ে কম, কারণ অনেকেই বিপদের আশঙ্কা করে কেটে পড়েছে। তবু আছে। তার বাইরেও আছে কিছু দল, যাদের দুর্নীতির সুযোগ নিয়ে ভ্যানিশ করার জন্যে মোদীর হাতে আছে আয়কর বিভাগ, ইডি, সিবিআই। গত সোমবারই যেমন কলকাতা হাইকোর্টের এসএসসি মামলার রায়ে সিবিআই তদন্তের আওতায় চলে এসেছে মমতা ব্যানার্জির পুরো ক্যাবিনেট। অর্থাৎ এই রায়ে আর কিছু হোক না হোক, অন্তত লোকসভা ত্রিশঙ্কু হলে মোদীর তৃণমূলের সমর্থন আদায় করার ব্যবস্থা হয়ে রইল।

১৯৩৩ সালের পর জার্মানিতে আর বহুদলীয় নির্বাচন হয়নি দেড় দশক। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে নাজি জার্মানির শোচনীয় পরাজয় না হলে আরও কতদিন হত না তা বলা কঠিন। সুতরাং যে ভারতীয় ভোট দেওয়ার অধিকারকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন, তিনি যে দলেরই সমর্থক হোন, এই নির্বাচনে তাঁর একটাই কাজ – আর পাঁচটা দলের সমর্থন নিয়েও মোদীর ক্ষমতায় ফিরতে না পারা নিশ্চিত করা। ম্যাজিক মঞ্চেই ভাল। কারণ সে ম্যাজিকে যারা ভ্যানিশ হয় তাদের জাদুকর আবার ফিরিয়ে আনেন। নাজিরা যাদের ভ্যানিশ করে দিয়েছিল তারা কিন্তু আর ফেরেনি। তাদের মধ্যে কেবল কমিউনিস্ট, সোশালিস্ট আর নাজিবিরোধী, ইহুদি আর সমকামীরা ছিল না।

নাগরিক ডট নেটে প্রকাশিত