ভারতীয় ক্রিকেট বয়স ঢেকে ফেলছে বিজ্ঞাপনে

অ্যালাস্টেয়ার কুককে নিশ্চয়ই ভারতীয় ক্রিকেটপ্রেমীদের মনে আছে। টেস্ট ক্রিকেটে বারো হাজারের বেশি রান করা ব্যাটারকে এমনিতেই কোনো ক্রিকেটপ্রেমী ভোলেন না। তার উপর কুক জীবনের প্রথম এবং শেষ টেস্ট খেলেছিলেন ভারতের বিরুদ্ধেই, আর দুটোতেই তিন অঙ্কের রান করেছিলেন। শুধু তা-ই নয়, ২০১১ সালে ভারতের অভিশপ্ত ইংল্যান্ড সফরের সময়ে এজবাস্টন টেস্টে ক্রিকেটজীবনের সর্বোচ্চ স্কোরেও (২৯৪) পৌঁছন। ২০১৮ সালে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকে অবসর নিয়ে ফেলা কুক এখনো দাপটে কাউন্টি ক্রিকেট খেলছেন। এ মরসুমে এসেক্সের এই ওপেনারের গড় এখন ৬০। পাঁচটা ম্যাচেই তিনটে শতরান করে ফেলেছেন এবং দুই দশকব্যাপী প্রথম শ্রেণির ক্রিকেট কেরিয়ারে আগে কখনো যা পারেননি, তা ঘটিয়ে ফেলেছেন গত ম্যাচে। দুই ইনিংসেই শতরান করেছেন।

এদিকে কুক অবসর নেওয়ার পর থেকে ইংল্যান্ডের টেস্ট দলের অবস্থা ক্রমশ খারাপ হয়েছে। জো রুটের কাছে ইংল্যান্ডের কর্মকর্তা, ক্রিকেটপ্রেমী – সকলেরই বিরাট আশা ছিল। কিন্তু ব্যাটার হিসাবে যথেষ্ট সফল হলেও অধিনায়ক হিসাবে রুট একেবারে ব্যর্থ হয়েছেন। গত আঠারোটা টেস্টের মধ্যে মাত্র একটা জিতেছে ইংল্যান্ড। ফলে তিনি পদত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছেন। যে যে কারণে ইংল্যান্ডের এমন হাঁড়ির হাল, তার অন্যতম হল ওপেনারদের ব্যর্থতা। কুক অবসর নেওয়ার পর থেকে অনেককে নির্বাচকরা সুযোগ দিয়েছেন, কিন্তু কেউই ধারাবাহিকতা দেখাতে পারেননি। কুক ইতিমধ্যে স্যার অ্যালাস্টেয়ার কুক হয়ে গেছেন। মানে ক্রিকেট মাঠে তাঁর কীর্তিকে স্বীকৃতি দিয়েছেন স্বয়ং রানী এলিজাবেথ। জাতীয় দলের ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তিত ইংল্যান্ড অ্যান্ড ওয়েলস ক্রিকেট বোর্ড সম্প্রতি খোলনলচে বদলে ফেলেছে। নতুন ডিরেক্টর অফ ক্রিকেট হয়েছেন প্রাক্তন ক্রিকেটার রব কী, নতুন টেস্ট অধিনায়ক বেন স্টোকস আর টেস্ট দলের কোচের দায়িত্বে এসেছেন ব্রেন্ডন ম্যাককালাম। দেশটার নাম ভারত হলে এতদিনে হাউস অফ কমন্সে সব দলের সাংসদরা মিলে রেজলিউশন পাস করাতেন, নতুন অধিনায়ক আর কোচকে কুককে অবসর ভেঙে ফিরে আসতে বলতেই হবে। কুক নিজেও শতমুখে সংবাদমাধ্যমকে বলে বেড়াতেন, তিনি এখনো দারুণ ফিট এবং জীবনের সেরা ফর্মে রয়েছেন।

কিন্তু দেশটার নাম ইংল্যান্ড। কয়েকদিন আগে কুককে এক সাক্ষাৎকারে রব কীর নিয়োগ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল। তিনি বলেছেন, ভালই তো। ইংল্যান্ডের ক্রিকেটের এখন একেবারে নতুন করে শুরু করা উচিত। নিজের সম্পর্কে কোনো কথাই বলেননি। বরং বলেই দিলেন যে পুরনো সবকিছু ভুলে এগোনো উচিত।

স্নেহময় জ্যাঠামশাইরা পরীক্ষায় ফেল করা ভাইপোদের উৎসাহ দেওয়ার জন্যে এরকম বলতেন। তা কুকজেঠুর বয়স কত? সাঁইত্রিশ বছর চার মাস। চলতি আইপিএলে গত ম্যাচটা (তা-ও বিপক্ষের দ্রুততম বোলার লকি ফার্গুসন কোনো অজ্ঞাত কারণে বল করতে এলেন বিরাট আর ফ্যাফ দু প্লেসি সেট হয়ে যাওয়ার পর এবং মাত্র দু ওভার বল করলেন) বাদ দিলে চূড়ান্ত ব্যর্থ (তিনটে ম্যাচে প্রথম বলে আউট; ১৪ ম্যাচে ৩০৯ রান, গড় ২৩.৭৬) বিরাট কোহলির বয়স কত? সাড়ে তেত্রিশ। অর্থাৎ কুক বিরাটের বয়সেই আন্তর্জাতিক ক্রিকেটকে বিদায় জানিয়েছিলেন। তাঁর এখনকার ফর্ম দেখে মনে করা অমূলক নয় যে অবসর না নিলে তিনি এতদিনে শচীন তেন্ডুলকরের টেস্ট ক্রিকেটে মোট রানের রেকর্ড (১৫,৯২১) আর সবচেয়ে বেশি টেস্ট খেলার রেকর্ড (২০০) – দুটোরই কাছাকাছি পৌঁছে যেতেন। অথচ এখন কনিষ্ঠরা পারছে না দেখেও ফিরে আসার নাম করছেন না। বোর্ডও এখন পর্যন্ত তাঁর নাম করেনি। ভক্তরা কেউ কেউ সোশাল মিডিয়ায় কুকের নাম ভাসিয়ে দিয়েছে, কিন্তু প্রাক্তন ক্রিকেটাররাও তা নিয়ে বিশেষ উৎসাহ প্রকাশ করছেন না। এদিকে বিরাটকে ভারতের প্রাক্তন ক্রিকেটার, ধারাভাষ্যকার, সাংবাদিক – অনেকেই একটু বিশ্রাম নেওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন। তিনি নাকি একটানা অনেকদিন খেলে ফেলেছেন, কদিন বিশ্রাম নিলেই হইহই করে রানে ফিরবেন। বিরাটও গ্রুপ লিগের শেষ ম্যাচের আগে আইপিএলের সরাসরি সম্প্রচারকারী সংস্থাকে সাক্ষাৎকারে বললেন তাঁর উপর দিয়ে সত্যিই অনেক ধকল গেছে, তাই বিশ্রাম নিলে ভালই হয়। মজার কথা, বিশ্রাম নেওয়া যে প্রয়োজন সেটা তাঁর আইপিএলের শেষ লগ্নে এসে খেয়াল হল। বিরাট মনে করেন আমাদের প্রাক্তন ডিরেক্টর অফ ক্রিকেট রবি শাস্ত্রীর চেয়ে বড় শুভাকাঙ্ক্ষী তাঁর নেই। তিনি শুধু বিরাটকে বিশ্রাম নেওয়ার পরামর্শ দেননি, বলেছেন বিশ্রামের পর বিরাট আরও ছ বছর খেলতে পারে। অর্থাৎ কুক যে বয়সে ফর্মে থেকেও জ্যাঠামশাইয়ের ভূমিকা উপভোগ করছেন, বিরাট সেই বয়সেও খেলে যাবেন। অথচ বিরাটের ফর্ম কিন্তু এবারের আইপিএলে হঠাৎ উধাও হয়েছে এমন নয়। এই সাইটেই আগে লিখেছি, কোনো ধরনের ক্রিকেটেই তিনি তেমন প্রভাব ফেলতে পারছেন না অনেকগুলো বছর হয়ে গেল।

ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড নতুন করে শুরু করার কাজটা আগেই করেছে, কারণ আইসিসি টুর্নামেন্টে বারবার ব্যর্থতা কাটিয়ে ওঠা দরকার। শাস্ত্রীর জায়গায় এসেছেন রাহুল দ্রাবিড় আর সাদা বলের অধিনায়ক করা হয়েছিল রোহিত শর্মাকে। বিরাট টি টোয়েন্টি ক্রিকেট ছাড়া অন্যগুলোর লাগাম নিজের হাতে রাখতে চেয়েছিলেন, বোর্ড সে গুড়ে বালি দিয়ে পরে টেস্ট ক্রিকেটেও রোহিতকেই নেতা করে দিয়েছে। তা রোহিতের বয়স কত? পঁয়ত্রিশ। টেস্ট ক্রিকেট কোনোদিনই রোহিতের সেরা মঞ্চ ছিল না। ন বছর আগে টেস্ট অভিষেক হলেও এতদিনে মোটে পঁয়তাল্লিশটা টেস্ট খেলেছেন, শতরান মাত্র আটটা। বিদেশে প্রথম শতরান পেলেন গত ইংল্যান্ড সফরে। তিনি আসলে সাদা বলের যম। অথচ গত ওয়ার্ল্ড টি টোয়েন্টিতে বিরাটের পাশাপাশি তিনিও ব্যর্থ হয়েছিলেন, এবার আইপিএলেও মোটেই রানের মধ্যে নেই (১৩ ম্যাচে ২৪৮ রান; গড় ২০.৪৬)। একাধিকবার আইপিএল খেতাব জয়ী মুম্বাই ইন্ডিয়ানস যে এবার পয়েন্ট টেবিলের একেবারে তলায় পড়ে আছে, তার অন্যতম কারণ রোহিতের খারাপ ফর্ম।

এ বছর ফের ওয়ার্ল্ড টি টোয়েন্টি। স্বয়ং অধিনায়ক এরকম ফর্মে থাকলে দলের অবস্থা কী হবে? উপরন্তু দলের সবচেয়ে বড় তারকা বিরাটকে দীর্ঘদিন ধরে টি টোয়েন্টির উপযোগী দেখাচ্ছে না। তিনি ইদানীং এত সাবধানে ব্যাট করছেন (বৃহস্পতিবার গুজরাট টাইটান্সের বিরুদ্ধে ৫৪ বলে ৭৩ রান করার আগে অব্দি স্ট্রাইক রেট ছিল ১১৩.৪৬), যে তিনি বড় রান করলে দলের মোট রান ভাল জায়গায় পৌঁছনো শক্ত। অথচ এই দুই তারকা থাকতে ঋতুরাজ গায়কোয়াড়, রাহুল ত্রিপাঠী, রাহুল টেওটিয়াদের মত বড় শট নিতে পারা ব্যাটারদের দলে জায়গা হবে না।

তবে ভারতীয় ক্রিকেট যে ভারত দেশটার মতই পিছন দিকে এগোতে চাইছে, তার সবচেয়ে বড় উদাহরণ এই দুজন নন। সাঁইত্রিশ বছরের কুক যদি জেঠু হন, আগামী ৭ জুলাই একচল্লিশে পা দিতে চলা মহেন্দ্র সিং ধোনি নিঃসন্দেহে পিতামহ ভীষ্ম। তাঁর যে ইচ্ছামৃত্যু, তা সেই ২০১১ সালেই প্রমাণ হয়ে গেছে। দল পরপর আটটা টেস্ট হারার পরেও ধোনির অধিনায়কত্ব যায়নি, বরং সে প্রস্তাব নির্বাচন কমিটির মিটিংয়ে তোলার পরে মোহিন্দর অমরনাথের নির্বাচকের চাকরি গিয়েছিল। ভারতের একদিনের ক্রিকেটের দলও ধোনিকে বয়ে বেড়িয়েছে বছর চারেক। স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল আর বড় শট নিতে পারেন না, অন্য প্রান্ত থেকে কেউ সে কাজটা করলে তিনি বড়জোর এক-দুই রান নিয়ে স্কোরবোর্ড সচল রাখতে পারেন, যা অনেকসময় জেতার পক্ষে যথেষ্ট নয়। তবু তাঁকে অবসর নিয়ে প্রশ্ন করলে বেজায় রেগে যেতেন। ২০১৬ ওয়ার্ল্ড টি টোয়েন্টি থেকে ভারতের বিদায়ের পর তো নির্লজ্জতার শিখরে উঠেছিলেন। এক অস্ট্রেলিয় সাংবাদিক এই প্রশ্ন করায় তাঁকে সাংবাদিক সম্মেলনের ডায়াসে ডেকে পাশে বসিয়ে জিজ্ঞেস করেছিলেন তিনি ধোনির অবসর দেখতে চান কিনা। তিনি তো আর ভারতীয় নন, যে কোনো আত্মীয় পরিজন থাকবে যে ধোনির জায়গায় খেলতে পারে।

এন শ্রীনিবাসনের থেকে ইচ্ছামৃত্যুর বর পেয়েছিলেন বলেই ধোনি একদিনের ক্রিকেট খেলতে পেরেছেন ২০১৯ বিশ্বকাপ অব্দি। অথচ ২০১৫ বিশ্বকাপের পর থেকে চার, ছয় মারার ক্ষমতা তো বটেই, গড়ও কমে গিয়েছিল। কেরিয়ারের ব্যাটিং গড় যেখানে পঞ্চাশ, সেখানে এই চার বছরের গড় নেমে এসেছিল চুয়াল্লিশে। চারে নেমে খেলতে না পারলে টিভি স্টুডিওতে বসে বিশেষজ্ঞ প্রাক্তন ক্রিকেটাররা বলতেন ধোনিকে পাঁচে খেলানো উচিত। পাঁচে না পারলে বলতেন ছয়ে। অর্থাৎ দল তাঁকে বয়ে বেড়াত। কালে ভদ্রে একটা ম্যাচে উইনিং স্ট্রোক নিলেই ফের সবাই মনে করিয়ে দিত, ধোনি সর্বকালের সেরা ফিনিশার। আর ধোনিকে এসব জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বারবার বলতেন, আগের মত অত ছয় মারেন না তো কী হয়েছে? তিনি তো ফিট আছেন। যেন খেলাটা ক্রিকেট নয়, জিমন্যাস্টিক্স।

আসলে প্রচারযন্ত্র অনুকূল হলে অনেক সমস্যা মিটে যায়। তাই ধোনি নির্বিঘ্নেই খেলে ফেলেন আরও একটা বিশ্বকাপ। কিছু বিশেষজ্ঞ আর অন্ধ ভক্ত আজও বলেন “যদি গাপ্টিলের থ্রোটা উইকেটে না লাগত…”। ভুলে যান যে ধোনি সেদিন পঞ্চাশে পৌঁছতে লাগিয়েছিলেন বাহাত্তরটা বল, মাত্র একটা চার আর একটা ছয় মেরেছিলেন। রবীন্দ্র জাদেজা ৫৯ বলে ৭৭ রান করেছিলেন বলে নিউজিল্যান্ডের জয়ের ব্যবধান আরও বড় হয়নি – এটুকুই সান্ত্বনা। নইলে শেষ ওভারে ধোনির ভেলকি দেখানোর সম্ভাবনা আরও আগেই শেষ হয়ে যেত। রাজনীতিতে প্রচারযন্ত্র অনুকূল হলে নির্বাচনের ফলাফলকে প্রভাবিত করা যায়। কিন্তু খেলার মাঠে পরিণাম বদলানো যায় না।

আরও পড়ুন টুপির আমি টুপির তুমি?

এতদিন পরে হৃদয় খুঁড়ে আবার এসব বেদনা জাগাতে হচ্ছে, কারণ এবারের আইপিএলে ধোনি ওই জাদেজাকেই হাসির পাত্র বানিয়ে ছেড়েছেন। এমনিতে চেন্নাই সুপার কিংসের মালিক শ্রীনিবাসনের কোম্পানি ইন্ডিয়া সিমেন্টসের অন্যতম ডিরেক্টর ধোনি। সুপার কিংস দলটা সে অর্থে তাঁর নিজের সম্পত্তি। যার ব্যাট, যার উইকেট তাকেই খেলতে নেব না – এ জিনিস পাড়া ক্রিকেটেই চলে না, আইপিএলে কী করে চলবে? ফলে ধোনির উইকেটরক্ষায় যতই শিথিলতা আসুক, ব্যাট হাতে ধারাবাহিকতা যতই কমে যাক, এ দলে তিনি যতদিন খেলতে চাইবেন ততদিনই খেলবেন। সমস্যা হল, তিনি কেবল খেলছেন না, খেলতে গিয়ে অন্যদের কোণঠাসা করছেন। আইপিএল শুরু হওয়ার মুখে ঘটা করে ঘোষণা করা হয়েছিল, পিতামহ অধিনায়কের সিংহাসনটি স্নেহভাজন জাদেজার হাতে ছেড়ে দিচ্ছেন। কিন্তু টুর্নামেন্ট শুরু হতেই দেখা গেল ফিল্ডিং সাজানো, বোলিং পরিবর্তন – সবকিছুতেই ধোনির কথাই শেষ কথা। জাদেজা নেহাতই রাবার স্ট্যাম্প। অবশ্য তাতেও সুপার কিংস দলের ছেড়ে দে মা কেঁদে বাঁচি অবস্থা হওয়া আটকায়নি। কিন্তু ব্যাটে, বলে ব্যর্থ জাদেজা নটা খেলার মধ্যে ছটা হারার পর অধিনায়কত্ব ছেড়ে দিতে চাইলেন। ধোনি মুকুট ফিরিয়েও নিলেন, ভবিষ্যতের কথা ভেবে ঋতুরাজ সিংয়ের মত তরুণতর কাউকে দায়িত্ব দিলেন না। তাহলে মরসুমের শুরুতে নেতৃত্ব ছেড়ে দেওয়ারই বা কী প্রয়োজন ছিল? জাদেজাও তো তেত্রিশ পেরিয়েছেন, কচি খোকাটি নন। তাঁর হাতে নেতৃত্ব তুলে দিয়ে কোন মহৎ উদ্দেশ্যসাধনের আশা ছিল? জাদেজা এই মুহূর্তে চোট-আঘাতের কারণে মাঠের বাইরে। এই টানাপোড়েনে তাঁর আত্মবিশ্বাসে চিড় ধরল কিনা তিনি মাঠে না ফেরা পর্যন্ত জানা যাবে না। যদি ধরে থাকে, তাহলে সুপার কিংসের চেয়ে বেশি ক্ষতি কিন্তু ভারতীয় ক্রিকেট দলের।

আসলে বাকি পৃথিবী সামনের দিকে তাকাতে চায়, আর আমরা চাই অতীতের গৌরবে বুঁদ হয়ে থাকতে। এ আমাদের জাতীয় চরিত্র। তাই বয়সের সঙ্গে সঙ্গে যে অতি বড় ক্রিকেটারেরও ক্ষমতা কমে আসে, আজ না কমে থাকলেও পরের বড় টুর্নামেন্টটা আসতে আসতে যে কমে যেতে পারে – এসব কথা না তাঁরা নিজেরা মানেন, না তাঁদের ভক্তকুল মানে। তারকারা আয়নায় মুখ দেখতে পান না, কারণ মুখ ঢেকেছে বিজ্ঞাপনে। ফলে ব্যাটে বলে হচ্ছে না, পা বলের লাইনে যাচ্ছে না, রিফ্লেক্স কমে গেছে, বহু বছর ধরে অতিমাত্রায় জিম করার ফলে টানা দু ঘন্টা ব্যাট করলেই পেশি ক্লান্ত হয়ে পড়ছে – এসব যখন ক্রিকেটার নিজে বুঝতে শুরু করেন, তখনো সবাই মিলে কানের কাছে বলতে থাকে “ও কিছু নয়। কদিন ব্রেক নিলেই সব ঠিক হয়ে যাবে।” এমনটাই এনডর্সমেন্টের যুগে ভারতীয় ক্রিকেটে হয়ে আসছে। যেনতেনপ্রকারেণ চল্লিশ অব্দি খেলে যাওয়ার দৃষ্টান্ত স্থাপন করে গেছেন শচীন। ধোনি ভাবলেন তিনিই বা কম কিসে? হয়ত পঁয়তাল্লিশকে পাখির চোখ করে এগোচ্ছেন। বিরাট ভাবছেন তিনি তো কোনো অংশে ধোনির চেয়ে কম যান না। রোহিত সবে অধিনায়ক হলেন, পঞ্চাশ ওভার আর কুড়ি ওভারের ক্রিকেটে তাঁরও ঝুড়ি ঝুড়ি রান আছে। তিনিই বা চল্লিশ অব্দি খেলার কথা ভাববেন না কেন? “ক্রিকেটের ঈশ্বর” তো শচীন, কুক তো নন। ফলে টেওয়াটিয়া, ত্রিপাঠীদের বেলা মেঘে মেঘেই বাড়বে।

ঋদ্ধিমান সাহার বেলায় দ্রাবিড় ভদ্রভাবে বুঝিয়ে দিয়েছিলেন এই ছেলেখেলা তিনি চলতে দেবেন না। এই ২০২২ সালেও উনবিংশ শতকের সংস্কার আন্দোলনের গন্ধে মাতাল বাঙালি তা নিয়ে বিস্তর গোল করেছিল। এবারের আইপিএলে গুজরাট টাইটান্সের ওপেনার হিসাবে ঋদ্ধিমানের সাফল্যে আবার গুঞ্জন শুরু হয়েছে। ওয়ার্ল্ড টি টোয়েন্টির দল নির্বাচনের সময়ে যদি তরুণদের সুযোগ দেওয়ার নীতি ভুলে গিয়ে তারকাদের প্রাধান্য দেওয়া হয়, তাহলে কিন্তু মানতেই হবে, পোর্টফোলিওতে যথেষ্ট পরিমাণ এনডর্সমেন্ট থাকলে ঋদ্ধিমানের বয়সও ঢেকে যেত।

*সব পরিসংখ্যান ১৯ মে, বৃহস্পতিবারের গুজরাট টাইটান্স বনাম রয়াল চ্যালেঞ্জার্স ব্যাঙ্গালোর ম্যাচ পর্যন্ত

ইনস্ক্রিপ্টে প্রকাশিত

ক্রিকেটের লুপ্তপ্রায় সৌন্দর্যের নাম উমরান

ক্রিকেটের মরশুম বদলে গেছে। আগে ক্রিকেট মরশুমের সূচনা বলতে বোঝাত অঘ্রাণ মাস। যখন সন্ধে না নামতেই শিশির পড়তে শুরু করে, গা শিরশির করে ভোরের দিকে। আর মরশুমের শেষ, যখন মাঘের শীত বাঘের গায়। মাঝের মাসগুলোতে ইডেন উদ্যানে বসত টেস্ট বা একদিনের ক্রিকেটের আসর। প্রবীণ ক্রিকেটপ্রেমীরা এখনও শোনান ভাগবত চন্দ্রশেখরের ম্যাচ জেতানো স্পেলের কথা বা সোনালি চুলের টনি গ্রেগকে প্রথম দেখার অভিজ্ঞতা। আমাদের প্রজন্মের কাছে অমূল্য স্মৃতি নয়ের দশকের মাঝামাঝি হিরো কাপের সেমিফাইনাল, ওই দশকের গোড়ায় দুর্বার গতির অ্যালান ডোনাল্ড আর অফসাইডের চিনের প্রাচীর জন্টি রোডসকে প্রথম দেখার অভিজ্ঞতা। মরশুম দীর্ঘায়িত হয়েছে অনেকদিন হল। ২০০১ সালে যেদিন অস্ট্রেলিয়ার সর্বনাশ সম্পূর্ণ হল হরভজনের হ্যাটট্রিক আর রাহুল দ্রাবিড়-ভিভিএস লক্ষ্মণের যুগলবন্দিতে, সেদিন চৈত্র মাস। অবশ্য গত শতাব্দীতেই জৈষ্ঠ্যের প্রখর তপন তাপে পাকিস্তানকে হারিয়ে ইডেন থেকে ইন্ডিপেন্ডেন্স কাপ জিতে নিয়ে গেছে অর্জুনা রণতুঙ্গার শ্রীলঙ্কা। ঠান্ডা পানীয়ের কোম্পানি টুর্নামেন্টের টাইটেল স্পনসর হলে যা হয়! এরপর আরও দুটো দশক কেটে গেছে। এখন খেলা হয় সারা বছর, আর ক্রিকেট ক্যালেন্ডারের সবচেয়ে বড় উৎসব হয়ে দাঁড়িয়েছে বিজ্ঞাপনদাতাদের প্রিমিয়ার লিগ– আইপিএল। তাই এবারও কাঠফাটা গরমে ইডেনে বসবে ক্রিকেটের আসর– আইপিএল প্লে অফ।

শুধু মরশুম নয়, খেলাটাও বদলে গেছে বিস্তর, আবিশ্ব। সারা বছর ক্রিকেটের যুগে বিশ্রামের সময় নেই, গতি আসবে কোথা থেকে? অতএব, এখন চাহিদা আস্তে বল করতে পারা জোরে বোলারের। স্লোয়ার, চেঞ্জ অফ পেস ইত্যাদি বাহারি নামের মন্থরতা আবিষ্কৃত হয়েছে। স্পিন শিল্পে শান দিয়ে আরও ধারালো হয়ে ওঠারও সময় নেই। তাই চাহিদা জোরে বল করতে পারা স্পিনারের, যার বল সাধারণত সোজা যাবে, ঘুরলেই রহস্য তৈরি হবে। শুধু কি তাই? এখন ক্রিকেট খেললে গ্লেন ম্যাকগ্রা, কোর্টনি ওয়ালশ-রা বিশেষ পাত্তা পেতেন না। কারণ তাঁরা ব্যাট করতে পারতেন না একেবারেই। এখন প্যাট কামিন্সের মতো বোলারেরও ব্যাট হাতে ম্যাচ জেতানোর ক্ষমতা থাকা দরকার। সুনীল নারিনকেও ইনিংসের শুরুতে বা মিডল অর্ডারে চার-ছক্কা হাঁকাতে জানতে হয়। অর্থাৎ, অসামান্য বোলার বা ব্যাটারের চেয়ে মাঝারি মানের অলরাউন্ডার বেশি প্রার্থনীয়।

ফলে ক্রিকেটের আদি অকৃত্রিম সম্পদ– কাঁপুনি ধরিয়ে দেওয়া ফাস্ট বোলার, যে কোনও পরিবেশে বল দু’দিকে সুইং করানোর ক্ষমতাসম্পন্ন মিডিয়াম ফাস্ট বোলার, খাঁটি লেগ স্পিন বা অফ স্পিনের রহস্যে ব্যাটারদের নাজেহাল করে দেওয়া স্পিনার, নিখুঁত ডিফেন্সসম্পন্ন এবং ছবির মত কভার ড্রাইভ মারতে পারা ব্যাটাররা ডোডোপাখি হয়ে যাচ্ছেন। কেবল কুড়ি বিশের ক্রিকেটে নয়, পঞ্চাশ ওভারের ক্রিকেটে বা টেস্টেও তাঁদের পক্ষে দলে টিকে থাকা শক্ত হচ্ছে। বরং এইসব গুণ থাকা দোষ হয়ে দাঁড়াচ্ছে অনেকের ক্ষেত্রে। ভুবনেশ্বর কুমারের মতো সুইং শিল্পীর যেমন টেস্ট কেরিয়ার বলে কিছু হলই না। কারণ প্রাক্তন ক্রিকেটার, ধারাভাষ্যকার, সাংবাদিক– সকলে সিদ্ধান্ত করে ফেললেন, এ সুইং সহায়ক পিচ ছাড়া সুবিধা করতে পারবে না। অথচ স্রেফ লম্বা, বেশি বাউন্স আদায় করতে পারেন– এই যুক্তিতে হাতে গোনা কয়েকটা বলার মতো পারফরম্যান্স নিয়েই একশো টেস্ট খেলে ফেললেন ইশান্ত শর্মা (জোরে বোলারদের মধ্যে একশোর বেশি টেস্ট খেলার পরেও উইকেট পিছু ৩২-এর বেশি গড় ইশান্ত ছাড়া কেবল জাক কালিসের, কিন্তু তিনি ব্যাট হাতে তেরো হাজার রানও করেছেন)। ব্যাট করতে পারেন বলে রবীন্দ্র জাদেজা টেস্টেও রবিচন্দ্রন অশ্বিনের মতো প্রবল শক্তিধর এবং মেধাবী বোলারের জায়গা দখল করে রাখতে পেরেছেন ম্যাচের পর ম্যাচ।

অর্থাৎ, ছোট ছোট মাঠে ঘণ্টায় ১৩০-১৪০ কিলোমিটার গতির বল আর দড়কচা ‘মিস্ট্রি’ স্পিনারদের বিরুদ্ধে পেশিবহুল ব্যাটারদের চার, ছক্কার বন্যা– এই হল আজকের ক্রিকেটোৎসব। যে দলের ব্যাটাররা ব্যর্থ হবেন, তাঁরা হারবেন। সেদিন প্রতিপক্ষের বোলারদের মনে হবে অসাধারণ, পরের দিনই হয়তো অতি সাধারণ দেখাবে। এই মরশুমে যাকে মনে হচ্ছে জিনিয়াস, পরের মরশুমেই সে ভিড়ে হারিয়ে যাবে। নামটা স্বপ্নিল অসনোদকর, পল ভালথাটি, মনপ্রীত গোনি, বরুণ চক্রবর্তী– যা খুশি হতে পারে। এমনকী, রতিতেও ক্লান্তি আসে, আর এই জিনিস দিনের পর দিন দেখতে হলে ক্লান্তি আসবে না? লাইভ সম্প্রচারের জাঁকজমক যাই-ই প্রমাণ করার চেষ্টা করুক, আইপিএল দেখতে দেখতেও দর্শকের ক্লান্তি আসে। সম্প্রচারকারী, বিজ্ঞাপনদাতা এবং আইপিএল কর্তৃপক্ষ সে কথা বিলক্ষণ জানে। তাই এবারের আইপিএলে প্রত্যেক ম্যাচে যত্ন করে দেখানো হচ্ছে, ম্যাচের দ্রুততম বলটা কে করল। সেই বোলারের জন্য এক লক্ষ টাকা পুরস্কারও থাকছে। বারবার কে পাচ্ছেন সেই পুরস্কার? ক্যারিবিয়ান দ্বীপপুঞ্জের কেউ নন, কোনো অস্ট্রেলিয়ানও নন, এমনকী নিউজিল্যান্ডের লকি ফার্গুসনও নন। পরপর ছ’টা ম্যাচে এই পুরস্কার পেয়েছেন সানরাইজার্স হায়দরাবাদের উমরান মালিক।

আগেই বলেছি, বিশ্ব ক্রিকেটে এখন যথার্থ ফাস্ট বোলার, অর্থাৎ ধারাবাহিকভাবে যে কোনো পিচে গড়ে ৯০ মাইলের (প্রায় ১৪৫ কিলোমিটার) বেশি গতিতে বল করতে পারেন এরকম বোলার বিরল। নিজেদের সেরা দিনে যশপ্রীত বুমরা আর মহম্মদ শামি পৌঁছে যান ওই গতিতে। মাঝে মাঝে নতুন বলে মিচেল স্টার্ক আর কামিন্সও পারেন। উমরান কিন্তু নিয়মিত ওই গতিতে বল করছেন, ১৫০ কিলোমিটারের গণ্ডিও পেরিয়ে যাচ্ছেন প্রায়ই। উমরানের মন্থরতম বলটাও ঘণ্টায় ১৪০ কিলোমিটারের আশপাশে থাকে। মুম্বইয়ের প্রবল গরমে এত জোরে বল করছেন কী করে? বিস্মিত হর্ষ ভোগলের এই প্রশ্নের উত্তরে উমরান বলেছেন, আমাদের জম্মুতে তো প্রচণ্ড গরমেও খেলি। ওতে কষ্ট হয় না, বরং মজা লাগে। কিন্তু গতিই শেষ কথা নয়। নইলে ব্রেট লি আর শন টেটের তফাত থাকত না। বলের লাইন, লেংথ ঠিক না থাকলে গতিময় বোলিংয়ে কোনও লাভ হয় না। উমরানের সেখানেও ভুল নেই। নেই বলেই রবিবার (১৭ এপ্রিল) পাঞ্জাব কিংসের বিরুদ্ধে শেষ ওভারে একটাও রান না দিয়ে তুলে নিতে পেরেছেন তিন-তিনটে উইকেট, টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটের ইতিহাসে প্রথমবার। ওই ম্যাচের চার উইকেট নিয়ে আইপিএলে ছ’টা ম্যাচ খেলে ন’টা উইকেট নেওয়া হয়ে গেল।

কিন্তু উমরানের আসল প্রভাব পরিসংখ্যানে ধরা পড়েনি। সত্যিকারের ফাস্ট বোলিং যা করে তার সবটা কখনওই স্কোরবোর্ডে ধরা পড়ে না। ২০১৩-‘১৪ অ্যাশেজ সিরিজে অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে মিচেল জনসন ইংল্যান্ডের কী অবস্থা করেছিলেন, তা কেবল পাঁচ টেস্টে ৩৭টা উইকেট নেওয়ার তথ্য থেকে বোঝা যাবে না। ওই বোলিং দেখলে তবেই বোঝা যায়, ইংল্যান্ডের ব্যাটাররা কেমন মরার আগেই মরে বসে থাকতেন জনসনাতঙ্কে। কেভিন পিটারসেনের মতো বড় ব্যাটার কেমন ছেলেমানুষের মতো আক্রমণাত্মক খেলতে গিয়ে বোল্ড হয়েছেন, না দেখলে বিশ্বাস করা যায় না। ক্লাইভ লয়েডের পেস চতুষ্টয়ের কোনও স্পেল দেখুন ইউটিউবে, জেফ থমসনের বোলিং দেখুন, বা কার্টলি অ্যামব্রোসের অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে এক রান দিয়ে সাত উইকেট তুলে নেওয়া দেখুন। ইডেন উদ্যানে তখনও অখ্যাত শোয়েব আখতারের পরপর দু’বলে রাহুল আর শচীন তেণ্ডুলকরকে আউট করা ফিরে দেখুন। পয়লা বৈশাখ সন্ধ্যায় উমরান কলকাতা নাইট রাইডার্স অধিনায়ক শ্রেয়স আয়ারকে বোল্ড করার পর ছেলেমানুষের মতো উল্লাস করছিলেন যিনি, সেই ডেল স্টেইনের বোলিংয়ের ভিডিও দেখুন। বুঝতে পারবেন ভয়ংকর সুন্দর কাকে বলে। এমন সৌন্দর্যের প্রতি মানুষের আকর্ষণ চিরন্তন, আর এই নেশা ধরানো সৌন্দর্যেরই মালিক উমরান।

আরও পড়ুন বেলা ফুরোতে আর বসে রইলেন না শেন ওয়ার্ন

তিনি আইপিএলের চার, ছক্কায় ঝলমলে সন্ধেবেলায় ব্যাটারদের প্রাগৈতিহাসিক জঙ্গলে প্রাণ হাতে করে বাঁচা তৃণভোজীদের স্তরে নামিয়ে আনতে পারেন। কেকেআর ম্যাচে শ্রেয়স আর আন্দ্রে রাসেলের বিরুদ্ধে তাঁর বোলিং যে কোনও ক্রিকেট-রসিকের চোখে লেগে থাকবে। শ্রেয়স বারবার লেগের দিকে সরে গিয়ে উমরানকে খেলার চেষ্টা করছিলেন। অফসাইডে সীমানার কাছাকাছি একাধিক ফিল্ডার থাকা সত্ত্বেও এই কৌশল কেন, তা ধারাভাষ্যকাররা বুঝে উঠতে পারছিলেন না। সম্ভবত, বোর্ডের সঙ্গে চুক্তিই তাঁদের বুঝতে দিচ্ছিল না। কারণ পাড়ার মাঠে টেনিস বলে ক্রিকেট খেলার অভিজ্ঞতা থাকলেও বোঝা যায় ওটা কৌশল ছিল না, ছিল আত্মরক্ষার তাগিদ। একনাগাড়ে সামান্য শর্টপিচ বল করে ব্যাটারকে ওভাবে কুঁকড়ে দিয়ে, তারপর ইয়র্কারে বোল্ড করে দিতে আমরা দেখেছি ওয়াকার ইউনিসকে। রোমাঞ্চিত হয়েছি। এই রোমাঞ্চ গত দশ বছরে বিশ্ব ক্রিকেট থেকে প্রায় উধাও হয়ে গেছে। এখনও আন্তর্জাতিক ক্রিকেট না খেলা উমরান সেই রোমাঞ্চ ফিরিয়ে দিচ্ছেন আইপিএলের মঞ্চে।

ওই গতি দর্শককে রোমাঞ্চিত করে, ক্রিকেট দেখার সাবেকি আনন্দ ফিরিয়ে আনে। কিন্তু খেলাটার জন্য কী করে? মাঝারিয়ানাকে উলঙ্গ করে দেয়, খুব ভাল ক্রিকেটার আর মহান ক্রিকেটারের তফাত গড়ে দেয়। পৃথিবীজুড়ে চার, ছয় মেরে বেড়িয়ে ভূয়সী প্রশংসা পাওয়া রাসেল যেমন শুক্রবার ওই একটি ওভারে টের পেয়ে গেলেন তিনি ভিভ রিচার্ডস তো দূরের কথা, গর্ডন গ্রিনিজেরও যোগ্য উত্তরসূরি নন। ব্যাটে-বলে করতেই বিস্তর ঝামেলায় পড়লেন, একটা বাউন্সারে তো মাথা বাঁচাতে একেবারে শুয়ে পড়তে হল। উমরান হাসলেন।

কুড়ি বিশের ক্রিকেটের মুশকিল হলো, উমরানের সৌন্দর্য তারিয়ে তারিয়ে উপভোগ করার উপায় নেই। মাত্র চব্বিশটা বল, তার ওপর সীমানা এত ছোট করা আছে যে চোখ বুজে ব্যাট ছোঁয়াতে পারলেও এক-আধটা ছয় হয়ে যায়। এখন অবধি মাত্র তিনটে প্রথম শ্রেণির ম্যাচ খেলা উমরান দিনে ১৫-২০ ওভার বল করলেও এই গতি বজায় থাকবে কি না, তা ভবিষ্যৎ বলবে। উমরানের আগুনে সৌন্দর্য আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে প্রতিপক্ষ ব্যাটারদের দগ্ধ করবে কি না, সে আলোচনাও এখন থাক। আপাতত জম্মুর ছেলের শ্বাসরোধকারী সৌন্দর্য চেটেপুটে উপভোগ করে নিন। যৌবন আর গতি, দুটোই হারিয়ে যায়। বিশেষত জম্মু, কাশ্মীরের যৌবন আগলে বসে থাকা যায় না।

ঋণ: সাহেবদের থেকে শেখা খেলা দেখার অভিজ্ঞতাকে বাংলা ক্যালেন্ডার অনুযায়ী সাজিয়ে নেওয়ার চেষ্টা অধ্যাপক অভীক মজুমদারের এক সাম্প্রতিক উত্তর-সম্পাদকীয় প্রবন্ধের প্ররোচনায়। দেখা গেল তাতে ভাষাটা বেশি কাব্যিক হল। উমরানের ক্রিকেট কাব্যময়।

ইনস্ক্রিপ্টে প্রকাশিত

ঝুলন সেরা বাঙালি ক্রিকেটার? মোটেই না

ভারতীয় ফুটবলের ইতিহাস বাংলাকে বাদ দিয়ে লেখা অসম্ভব। কিন্তু গত শতাব্দীর শেষ পর্যন্তও ভারতীয় ক্রিকেটের ইতিহাস বাংলাকে বাদ দিয়ে অনায়াসে লেখা যেত। রেকর্ড বইয়ে সর্বোচ্চ রানের ওপেনিং জুটির তালিকার একেবারে শীর্ষে পঙ্কজ রায়ের নাম ছিল ঠিকই, কিন্তু রেকর্ড বই ইতিহাস নয়। একবিংশ শতাব্দীতে ভারতের ক্রিকেট ইতিহাসে বাংলার পাকাপাকি জায়গা তৈরি করেছেন দুজন। একজন অবসর নেওয়ার দেড় দশক পরেও সারাক্ষণ সংবাদের শিরোনামে, বাঙালির নয়নের মণি। অর্থাৎ সৌরভ গাঙ্গুলি। অন্যজন কে, বাজি রেখে বলতে পারি, আপনি ভুরু কুঁচকে ভাবছেন।

এই শতাব্দীর প্রথম কয়েক বছরে ফিক্সিং কেলেঙ্কারির বিপর্যয় কাটিয়ে অধিনায়ক হিসাবে সৌরভ যখন ভারতীয় ক্রিকেটের ইতিহাস বদলে দিচ্ছিলেন, সেই সময়েই ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে চেন্নাইতে একটি একদিনের ম্যাচে ভারতের হয়ে খেলতে শুরু করেন ঝুলন গোস্বামী। সে বছরই টেস্ট অভিষেক। ঝুলনের শুরুটা সৌরভের মত সাড়া জাগানো হয়নি। প্রথম টেস্টে এই ডানহাতি জোরে বোলার কোনো উইকেট পাননি। কিন্তু গত কুড়ি বছর ধরে ভারতের মহিলা দলের প্রায় সমস্ত স্মরণীয় জয়ে ঝুলনের উল্লেখযোগ্য অবদান ছিল। ২০০৬ সালে ভারতীয় মহিলারা ইংল্যান্ডের মাটিতে প্রথম টেস্ট সিরিজ জেতেন। প্রথম টেস্টে লেস্টারে নৈশপ্রহরী হিসাবে ঝুলন ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ অর্ধশতরান করেন। আর টনটনের দ্বিতীয় টেস্টে তিনি একাই একশো। প্রথম ইনিংসে ৩৩ রানে পাঁচ উইকেট, দ্বিতীয় ইনিংসে ৪৫ রানে পাঁচ উইকেট। একদিনের ক্রিকেটে ঝুলন প্রকৃতপক্ষে একজন কিংবদন্তি। চলতি বিশ্বকাপে তিনি মহিলাদের বিশ্বকাপের ইতিহাসে সর্বোচ্চ উইকেট শিকারী হলেন, তারপরেই মেয়েদের একদিনের ক্রিকেটের ইতিহাসে প্রথম বোলার হিসাবে ২৫০ উইকেটের মালিক হলেন।

যাঁরা মেয়েদের ক্রিকেটের খবর রাখেন তাঁরা জানেন, ভারতের মহিলাদের দলে এই মুহূর্তে দুজন আছেন যাঁরা সর্বকালের সেরাদের মধ্যে পড়েন। কীর্তির দিক থেকে অধিনায়ক মিতালী রাজ যদি মেয়েদের ক্রিকেটের শচীন তেন্ডুলকর হন, ঝুলন অবশ্যই কপিলদেব। দুটো দশক জুড়ে ভারতীয় বোলিংকে নেতৃত্ব দেওয়া কত শক্ত, তা কপিলদেবের চেয়ে ভাল কে-ই বা জানে? ঝুলনের নামটা মাথায় আসেনি বলে জিভ কাটছেন নাকি? কাটবেন না, কারণ দোষ আপনার নয়। শুধু যে মহিলাদের ক্রিকেট টিভিতে অনেক কম দেখানো হয় আর কাগজে অনেক কম লেখা হয় তা-ই নয়, কপিলদেব ১৬ বছরে খেলেছেন ১৩১টা টেস্ট আর ২২৫টা একদিনের ম্যাচ। ঝুলন কুড়ি বছরে ২০১ খানা একদিনের ম্যাচ (২২ মার্চ, ২০২২ তারিখে ভারত বনাম বাংলাদেশ ম্যাচ পর্যন্ত) খেললেও টেস্ট খেলেছেন মাত্র বারোটা। একদিনের ম্যাচের সংখ্যাটাও আসলে কপিলের সাথে তুলনীয় নয়, কারণ কপিলের কেরিয়ারের বেশ খানিকটা সময়ে একদিনের ক্রিকেট ছিল লম্বা টেস্ট সিরিজের শেষ পাতে মিষ্টির মত। কিন্তু ঝুলনের দু বছর আগে অভিষেক হওয়া জাহির খান বারো বছরেই দুশো একদিনের ম্যাচ খেলে ফেলেছিলেন।

ভারতীয় পুরুষদের ক্রিকেটের মহীরুহ যাঁরা, তাঁদের ঝুলিতে একটা জিনিস আছে যা বাংলার গৌরব সৌরভের ঝুলিতে নেই। ২০০৩ সালের ২৩ মার্চ রিকি পন্টিংয়ের অপরাজেয় অস্ট্রেলিয়া সৌরভের হাতে বিশ্বকাপ ওঠার সমস্ত সম্ভাবনা দুরমুশ করে চতুর্থবার বিশ্বকাপ জিতেছিল। কিন্তু কপিলদেব বিশ্বকাপ জিতেছেন, সুনীল গাভস্করও সেই দলে ছিলেন। বিশ্বসেরার মেডেল গলায় ঝুলিয়েছে শচীন তেন্ডুলকর আর মহেন্দ্র সিং ধোনিও। ব্যক্তিগত কৃতিত্বে ঝলমলে কেরিয়ারে ঝুলন আর মিতালীর ও জিনিসটার স্বাদ এখনো পাওয়া হয়নি। পেতে গেলে চলতি বিশ্বকাপে দুজনকেই নিজেদের সেরা ফর্মের কাছাকাছি থাকতে হবে। প্রথম চারটে ম্যাচে নীরব থাকার পর পঞ্চম ম্যাচে মিতালীর ব্যাট কথা বললেও পার্থক্য গড়ে দিতে পারেনি। বাংলাদেশ ম্যাচে দল জিতে গেলেও মিতালী আবার ব্যর্থ। ঝুলন মন্দ খেলছিলেন না, কিন্তু অস্ট্রেলিয়া ম্যাচে একেবারেই ফ্লপ, সহজ বাংলাদেশ ম্যাচে ছিলেন স্বমহিমায়। গতবার ফাইনালে উঠেও ইংল্যান্ডের কাছে হারতে হয়েছিল। বাকি রইল দক্ষিণ আফ্রিকা ম্যাচ। সেটা জিততে পারলে এখনো ভারতের সেমিফাইনালে পৌঁছবার সম্ভাবনা আছে। যদি শেষপর্যন্ত স্মৃতি মান্ধনা, পূজা বস্ত্রকর, শেফালি বর্মার মত তরুণদের সাথে মিতালী, ঝুলন, হরমনপ্রীতদের সুর মিলে যায় তাহলে ৩ এপ্রিল ক্রাইস্টচার্চে প্রথম বাঙালি হিসাবে ঝুলন ছুঁয়ে ফেলবেন ক্রিকেট বিশ্বকাপ। সঙ্গে থাকবেন শিলিগুড়ির রিচা ঘোষ।

চিন্তা করবেন না। এখন পর্যন্ত ধারাবাহিকতা দেখাতে না পারা ভারতীয় দলের চ্যাম্পিয়ন হওয়ার মত ঘটনা ঘটে গেলেও ঝুলনকে আমরা কেউ সেরা বাঙালি ক্রিকেটার বলার ধৃষ্টতা দেখাব না। মহিলাদের ক্রিকেট নিয়ে আমাদের আগ্রহ থাক আর না-ই থাক, শিগগির জেনে যাব যে মেয়েদের ক্রিকেটের বোলারদের গড় গতি ছেলেদের চেয়ে কম। আরও নানা তথ্য থেকে প্রমাণ করা খুব কঠিন হবে না যে মেয়েদের বিশ্বকাপ জয় আর ছেলেদের বিশ্বকাপ জয় এক নয়। সেরেনা উইলিয়ামসকে ও দেশে কেউ রাফায়েল নাদাল, রজার ফেডেরার বা নোভাক জোকোভিচের চেয়ে কম বড় খেলোয়াড় ভাবে না। তা বলে আমাদেরও যে ওভাবে ভাবতে হবে এমন মাথার দিব্যি কেউ দেয়নি।

আরও পড়ুন কালোর জন্যে কাঁদা, অথচ সাদা মনে কাদা

তাছাড়া সৌরভের বায়োপিক হওয়ার আগেই যে বলিউড ঝুলনের বায়োপিক বানিয়ে ফেলছে, সে কি কম স্বীকৃতি? তাতে আবার ঝুলনের চরিত্রে অভিনয় করছেন ছেলেদের ক্রিকেট দলের অধিনায়কের অভিনেত্রী স্ত্রী। এর চেয়ে বেশি কী-ই বা চাওয়ার থাকতে পারে ঝুলনের মত একজন শীর্ষস্থানীয় ক্রিকেটারের? ঢ্যাঙা, কালো মেয়ে মাঠে উইকেট তুলতে পারে, রান করতে পারে। কিন্তু পয়সা দিয়ে টিকিট কেটে যখন তার জীবন নিয়ে তৈরি সিনেমা দেখতে যাব, তখন পর্দায় একটা টুকটুকে মেয়ে না থাকলে চলবে কেন? আমরা মণিপুরি মেরি কমকে পর্দায় দেখি পাঞ্জাবি অভিনেত্রীর অবয়বে, বাংলার ঝুলনকেও সেভাবেই দেখব। দেখে পপকর্ন খেতে খেতে হাততালিও দেব। দেশের ক্রিকেট বোর্ডই যখন মহিলা ক্রিকেটারদের পারিশ্রমিক পুরুষদের ধারেকাছে হওয়া উচিত বলে মনে করে না, দলটার নিয়মিত খেলতে পাওয়া উচিত বলেও মনে করে না, তখন আমরা সাধারণ ক্রিকেটপ্রেমীরা সব সমান করে ভাবতে যাব কেন? আমাদের কালো মেয়ের পায়ের তলায় আলোর নাচন দেখার জন্য কেন ছটফট করব?

ইনস্ক্রিপ্টে প্রকাশিত

বেলা ফুরোতে আর বসে রইলেন না শেন ওয়ার্ন

আইপিএল আজকের তরুণ ক্রিকেট দর্শকদের কাছে জলভাত। কিন্তু আমাদের মত যারা পরিণত বয়সে আইপিএল শুরু হতে দেখেছে ২০০৮ সালে, তাদের বড় বিস্ময় লেগেছিল। আমার সেই বিস্ময় বেড়ে গিয়েছিল শেন ওয়ার্ন সম্পর্কে একটা কথা শুনে।

সদ্য আন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকে অবসর নেওয়া ওয়ার্ন সেবার আইপিএলের সবচেয়ে শস্তা দল জয়পুরের রাজস্থান রয়্যালসের একাধারে অধিনায়ক ও কোচ। নিলামের পর দলগুলোর যা চেহারা হয়েছিল, তাতে অনেকেরই ধারণা ছিল হইহই করে চ্যাম্পিয়ন হবে হায়দরাবাদের তারকাখচিত ডেকান চার্জার্স। আর জয়পুরের দলটার জায়গা হবে শেষের দিকে। ডেকান চার্জার্সের মালিক হায়দরাবাদের মহা বিত্তবান রেড্ডিরা। তাঁরা আবার ওই শহরের সবচেয়ে জনপ্রিয় ইংরেজি কাগজ ডেকান ক্রনিকলেরও মালিক। সেই কাগজের প্রতিনিধি হিসাবে মুম্বাইতে একটা আইপিএল ম্যাচ কভার করতে গিয়ে এক সর্বভারতীয় কাগজের সাংবাদিকের সাথে আলাপ হল। তার মুখেই শুনলাম রাজস্থান রয়্যালসের প্রায় অখ্যাত স্বপ্নিল অসনোদকর, রবীন্দ্র জাদেজা, ইউসুফ পাঠানদের সাথে ওয়ার্নের দারুণ ঘনিষ্ঠতা। ভারতের ঘরোয়া ক্রিকেটের এইসব চারাগাছের জন্য নাকি ওয়ার্ন বটবৃক্ষ হয়ে উঠেছেন। আমি এবং আমার কাগজের অগ্রজ সাংবাদিক কথাটা প্রথমে বিশ্বাস করিনি। কারণ অস্ট্রেলিয়ান ক্রিকেটারদের উন্নাসিকতা জগদ্বিখ্যাত। শোনা যায় কেউ কেউ প্রবল বর্ণবিদ্বেষীও। যেহেতু ডেকান চার্জার্সে সেবার চাঁদের হাট, আমরা নিজেরাও দেখেছি, টিম ফ্লাইটে ভারতীয় ক্রিকেটাররা একসঙ্গে বসেন। অ্যাডাম গিলক্রিস্ট, অ্যান্ড্রু সাইমন্ডস, হার্শেল গিবসরা নিজেদের মধ্যেই আড্ডা মারেন। আর ওয়ার্নের মত মহাতারকা অসনোদকরদের পাত্তা দেবেন, এ-ও কি সম্ভব? কিন্তু সেই সাংবাদিক বন্ধুর বিস্তারিত বিবরণ শুনে অবিশ্বাস করার উপায় রইল না।

সে বলল, প্রথম দিকে দলের ভারতীয় ক্রিকেটাররা ওয়ার্নের সাথে কথা বলতেই ভয় পেত। একে তিনি অত বড় ক্রিকেটার, তার উপর ইউসুফরা ইংরেজি বলায় একেবারেই সড়গড় নন। সাপোর্ট স্টাফের কারোর থেকে এই সমস্যার কথা জানতে পেরে ওয়ার্ন সকলকে বলেন, যে ভাষায় তোমরা স্বচ্ছন্দ সেই ভাষাতেই আমার সাথে কথা বলবে। আমি তোমাদের দেশে কাজ করতে এসেছি, আমার দায়িত্ব বুঝে নেওয়া।

শেন ওয়ার্ন বড় ক্রিকেটার বরাবরই মানতাম, কারণ গণ্ডমূর্খ না হলে মানতে সবাই বাধ্য। তাঁর প্রতি যে বিরূপতা ছিল, তা বিদায় নিল সেইদিন।

কেন ছিল বিরূপতা?

আসলে আমাদের কৈশোর ও প্রথম যৌবন কেটেছে ওয়ার্নের বোলিং দেখতে দেখতে। বলা ভাল, শচীন বনাম ওয়ার্ন দ্বৈরথ দেখতে দেখতে। আমাদের খেলা দেখতে শেখায় দল নির্বিশেষে নৈপুণ্যকে কুর্নিশ জানানোর পাঠ খুব বেশি ছিল না। আজকের কদর্য পার্টিজানশিপের সূচনা সে আমলেই হয়েছিল। আসলে আমাদের জন্যে কোনো মতি নন্দী লিখতেন না, প্রাঞ্জল বিশ্লেষণে বাঙালি পাঠককে বুঝিয়ে দিতেন না শচীন, সিধুরা অনায়াস দক্ষতায় তাঁকে মাঠের বাইরে পাঠালেও ওয়ার্ন একজন ক্ষণজন্মা শিল্পী। আমাদের সময়ে ইডেন উদ্যান থেকে রেডিওতে ভেসে আসত না ক্রিকেটরসিক অজয় বসুর কণ্ঠ। আমাদের টিভির ইডেন তখন কাগজের ভাষাতেও গার্ডেন্স হয়ে গেছে। ক্রিকেটের রোম্যান্স অনুভব করতে আমরা শিখলাম কই? ওয়ার্নের বলে শচীনের তিনরকম সুইপ, ক্রিজ ছেড়ে কোণাকুণি বেরিয়ে এসে ওয়াইড লং অন দিয়ে ছয় মারায় আমরা হাততালি দিয়েছি মূলত ভারতীয় ব্যাটার অস্ট্রেলিয় বোলারের বলে চার আর ছয় মেরেছে বলে। আমাদের মধ্যে যারা ইংরেজিতে দড় ছিল না, তারা পিটার রোবাকও পড়তে পারেনি। ওয়ার্ন কত বড় শিল্পী তা বোঝা দূরে থাক, শচীন কত বড় শিল্পী তা-ও তারা তখন বড় একটা বুঝতে পারেনি। তাছাড়া আমাদের সময়টা সুনীল গাভাসকর, গুন্ডাপ্পা বিশ্বনাথদের যুগ নয়। বিপক্ষ দলের প্রিয় ক্রিকেটারের নামে বিশ্বসেরা ব্যাটার নিজের ছেলের নাম দেবেন, সে সংস্কৃতি তখন ক্রমশ লুপ্ত হচ্ছে; আগ্রাসন শব্দটা চালু হয়ে গেছে। কখন ব্যাটার একটা মনোরম লেট কাট মারবে বা স্পিনারের একটা বল ব্যাটারকে হাস্যকরভাবে পরাস্ত করবে, আর উইকেট পড়ুক না পড়ুক ওই বলটাই মনে রেখে দেবে দর্শক — সেসব দিন তখন চলে গেছে। আমরা দীর্ঘকাল খেলায় জয়, পরাজয়ের পরেও যে কিছু থাকে তা অনুভব করিনি। অস্ট্রেলিয়া যখন ১৯৯৭-৯৮ মরসুমে ভারত সফরে এল, ওয়ার্ন নিজের খাবার হিসাবে সেদ্ধ বিনের টিন নিয়ে এসেছেন দেশ থেকে — এই খবর পড়ে আমরা যারপরনাই উত্তেজিত হয়েছি। আমাদের উত্তেজিত করা হয়েছে। কাগজে লেখা হয়েছে এটা ভারতের অপমান, শচীন আমাদের সবার হয়ে এর প্রতিশোধ নেবেন। তাই সে মরসুমে যেখানে অস্ট্রেলিয়াকে পেয়েছেন, ক্ষমতার শীর্ষে থাকা শচীন সেখানেই ওয়ার্নসুদ্ধু অজিদের একেবারে দুরমুশ করে দেওয়ায় আমরা কিছুটা অতিরিক্ত আনন্দ পেয়েছি।

কিন্তু আমাদের একটা জিনিস ছিল যা পূর্বসুরীরা পাননি। সেটা হল কেবল টিভি। তাই আমরা ভারতীয় ব্যাটিংয়ের হাতে ওয়ার্নের নাকানি চোবানি খাওয়া (১৪ টেস্টে ৪৩ উইকেট; গড় ৪৭.১৮, ৫ উইকেট মাত্র একবার) যেমন দেখেছি, তেমনি পৃথিবীর যে কোনো মাঠে, যে কোনো ধরনের পিচে অন্য দেশগুলোর মাথা ঘুরিয়ে দেওয়া দেখার সৌভাগ্যও হয়েছে। ১৯৯২ সালে সিডনিতে ভারতের বিরুদ্ধে যখন ওয়ার্নের অভিষেক হল, তখনো আমাদের এখানে ঘরে ঘরে কেবল টিভি ছিল না। সোনালি চুলের একটা ২২ বছরের ছেলেকে বেধড়ক মারছেন রবি শাস্ত্রী আর শচীন — এই দৃশ্য আমরা কেবল রাতের খাবার খেতে খেতে দূরদর্শনের হাইলাইটসে দেখেছি। পরের বছর মাইক গ্যাটিংকে বোকা বানানো ‘শতাব্দীর সেরা বল’-ও লাইভ দেখেছিল খুব অল্পসংখ্যক ভারতীয়।

কিন্তু পুরনো সুরার মত স্বাদু, অবসরের দিকে এগিয়ে চলা ওয়ার্নের ২০০৫ সালে এজবাস্টনে অ্যান্ড্রু স্ট্রসকে জোকারে পরিণত করা বলটা আমরা অনেকেই লাইভ দেখেছি।

ভাগ্যিস দেখেছি! উসেন বোল্টের দৌড়, মাইকেল ফেল্পসের সাঁতার, রজার ফেডেরারের টেনিস দেখার মত যে কটা জিনিস যখন ঘটেছে তখনই দেখেছি বলে আমাদের মধ্যে যারা আশি-নব্বই বছর বাঁচবে তারা শেষ বয়সে গর্ব করতে পারবে, তার একটা হল ওয়ার্নের বোলিং।

তাঁর কিন্তু আব্দুল কাদিরের মত রহস্যময় গুগলি ছিল না। কিন্তু যে বলের পর বল একই জায়গায় ফেলতে পারে এবং একই জায়গা থেকে লেগ ব্রেক কখনো বেশি, কখনো কম ঘোরাতে পারে — তার গুগলিটা তেমন জোরদার না হলেই বা কী? কেবল বল ঘোরানোর পরিমাণের হেরফের করে যে ওয়ার্ন একটা দলের গোটা ব্যাটিং ধসিয়ে দিতে পারতেন, তা সবচেয়ে বেশি টের পেয়েছে অস্ট্রেলিয়ার চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ইংল্যান্ড। কখনো অফস্টাম্পের অনেক বাইরের বল নিশ্চিন্তে প্যাডে নিতে গিয়ে পায়ের পিছন দিয়ে বোল্ড হয়েছেন স্ট্রস, তো কখনো বল বেশি ঘুরবে ভেবে ব্যাট বাড়িয়ে দিয়ে মাটিতে পড়ে দ্রুত গতিতে সোজা চলে আসা ফ্লিপারে এল বি ডব্লিউ হয়েছেন ইয়ান বেল। ভারত ছাড়া অন্য দলের বিরুদ্ধে ওয়ার্ন ডানহাতি ব্যাটারকে ওভার দ্য উইকেট বল করলেই তাঁকে মনে হত সাক্ষাৎ নিয়তি। যখন ইচ্ছা একটা বল ভাসিয়ে দেবেন লেগ স্লিপের দিকে, অত দূরে যাচ্ছে দেখে ব্যাটার নিশ্চিন্তে ছেড়ে দেওয়ার কথা ভাববেন অথবা চার মারার মোক্ষম সুযোগ ভেবে সুইপ করতে যাবেন। আর অমনি বলটা মাটিতে পড়ে বিদ্যুৎ গতিতে উল্টো দিকে ঘুরে স্টাম্প ভেঙে দেবে। এভাবে বোকা বনেছেন মাইকেল আর্থারটনের মত দুঁদে ব্যাটারও। ভারতীয়দের মধ্যে সম্ভবত একমাত্র এমএসকে প্রসাদকেই এরকম অপ্রস্তুতে পড়তে হয়েছিল।

আবার রাউন্ড দ্য উইকেট বল করা ওয়ার্নের বিরুদ্ধে অতি সাবধানী হতে গিয়ে হাসির পাত্র হয়ে পড়েছিলেন নিউজিল্যান্ডের ক্রেগ ম্যাকমিলান।

আমাদের কেবল টিভি ছিল, এখন ইউটিউবও আছে। যতবার খুশি এইসব মুহূর্ত দেখা যায়। অনেকে যেমন বড়ে গুলাম আলি খাঁ সাহেবের গান বারবার শোনে; ফিরে ফিরে দেখে সত্যজিৎ, ঋত্বিক, মৃণাল বা কুরোসাওয়ার ছবি।

কিন্তু ওয়ার্ন আবার ওতেও শেষ হন না। বাউন্ডারির বাইরেও তিনি একজন বেহিসাবী শিল্পী। জীবন ভোগ করবার, নিজেকে অপচয় করবার বিপুল ক্ষুধা তাঁর। এ ব্যাপারে ওয়ার্নের তুলনা চলতে পারে একমাত্র দিয়েগো মারাদোনার সাথে। ওয়ার্ন ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে যত উইকেট নিয়েছেন, ব্রিটিশ ট্যাবলয়েডগুলোকে মুখরোচক খবর আর ছবি জুগিয়েছেন বোধহয় তার চেয়েও বেশি। কখনো একাধিক যৌনকর্মীর সাথে যৌন অ্যাডভেঞ্চার, কখনো এলিজাবেথ হার্লির সাথে প্রেম। কখনো বুকিকে দিয়ে দেন পিচ সম্পর্কে তথ্য, কখনো নিষিদ্ধ ডাইইউরেটিক নিয়ে বিশ্বকাপ খেলার সুযোগ হারান। তিনি উপস্থিত থাকলে পাদপ্রদীপের আলো তাঁকে ছেড়ে থাকতে পারত না। আবার সেই আলোয় এক ঝাঁক অর্বাচীনকে আলোকিত করে তারকাখচিত আইপিএল জিতে নিয়েছিলেন ওয়ার্ন। মতি নন্দীর হয়ত সে ঘটনা দেখলে মনে পড়ত বুড়ো আর্চি ম্যাকলারেনের এক দল অপেশাদারকে নিয়ে ওয়ারউইক আর্মস্ট্রংয়ের সর্বগ্রাসী দলকে হারিয়ে দেওয়ার কথা। মহাকাব্য তো নয়ই, এ যুগ এমনকি খণ্ডকাব্যের যুগও থাকছে না। এখন ফেসবুক কবিতার যুগ, তাই টি টোয়েন্টিতেই কাব্যিকতা খুঁজতে হয় আমাদের। এ যুগে ওয়ার্ন বেমানান। তাঁর ধারাভাষ্য তাই অনেকেরই মনঃপূত হয়নি, রিচি বেনোর মত যত বড় ক্রিকেটার তত বড় ধারাভাষ্যকার হয়ে উঠতে যে ওয়ার্ন পারবেন না তা বেশ বোঝা যাচ্ছিল। তবে তাতে শিল্পী ওয়ার্নের দাম কমে না।

লেগস্পিন এমনিতেই বড় কঠিন শিল্প। বলা হয়, জন্মগত প্রতিভা না থাকলে ও জিনিসটা হয় না। ওয়ার্নের প্রজন্মে অত্যাশ্চর্যভাবে বিশ্ব ক্রিকেটে ছিলেন তিনজন সর্বোচ্চ মানের স্পিনার — ভারতের অনিল কুম্বলে, পাকিস্তানের মুস্তাক আহমেদ আর অস্ট্রেলিয়ার ওয়ার্ন। এঁদের অবসরের পরে পাকিস্তানের ইয়াসির শাহ ছাড়া আর তেমন লেগস্পিনার উঠে আসেননি। আসলে চটজলদি ক্রিকেটের রমরমার যুগে ওয়ার্নের মত বিপুল প্রতিভা না থাকলে লেগস্পিন করে টিকে থাকাই মুশকিল। এখন ফ্লাইট দিলে, লেগ ব্রেকের পর লেগ ব্রেক করে গেলে ছোট্ট মাঠে ব্যাটারের কাজ সহজ হয়ে যাবে। ওয়ার্ন পারতেন ওসব করেও একদিনের ক্রিকেটে হ্যাটট্রিক করতে, বিশ্বকাপে (১৯৯৯) সর্বোচ্চ উইকেট শিকারি হতে। টি টোয়েন্টিতেও ৭৩ ম্যাচে ওভার পিছু আটের কম রান দিয়ে সত্তরটা উইকেট নিয়েছিলেন। অ্যাডাম জাম্পা, আদিল রশিদরা পারবেন না। আর টি টোয়েন্টিতে ভাল করতে না পারলে আজকাল টেস্ট খেলার সুযোগও পাওয়া শক্ত। এখন বন্যেরা বনে সুন্দর, লেগস্পিন ইউটিউবে। ওয়ার্নকে আর ক্রিকেটের দরকার ছিল না বোধহয়।

বেলা ফুরোতেই তিনি চলে গেলেন। অন্য অনেক ব্যাপারে ওয়ার্ন একেবারেই অস্ট্রেলিয়সুলভ ছিলেন না, কিন্তু ঠিক সময়ে চলে যাওয়ার ব্যাপারে খাঁটি অস্ট্রেলিয়। তাঁর শেষ টেস্ট সিরিজ ছিল ২০০৬-০৭ অ্যাশেজ। আর্মস্ট্রংয়ের সেই দলের পর অস্ট্রেলিয়া প্রথমবার ৫-০ অ্যাশেজ জিতল। সেটা সম্ভব হত না অ্যাডিলেডে দ্বিতীয় টেস্টের পঞ্চম দিন সকালে ওয়ার্ন ইংল্যান্ডের কোমর ভেঙে না দিলে।

নাগরিক ডট নেট-এ প্রকাশিত

ঋদ্ধিমান কাণ্ডে মুখোশ ছিঁড়ে বেরিয়ে এসেছে কুৎসিত মুখ

ফেব্রুয়ারি মাসের তৃতীয় সপ্তাহ শুরু হলেই বাঙালির জাত্যভিমান চড়চড়িয়ে বাড়তে থাকে। এমন একটা সময়ে সর্বশেষ বাঙালি টেস্ট ক্রিকেটার ঋদ্ধিমান সাহাকে (বাংলা থেকে নির্বাচিত সর্বশেষ টেস্ট ক্রিকেটার অবশ্য উত্তরপ্রদেশ থেকে এসে কলকাতার বাসিন্দা হয়ে যাওয়া মহম্মদ শামি) ভারতীয় দল থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। সরকারিভাবে শ্রীলঙ্কার বিরুদ্ধে সিরিজের জন্য দল ঘোষণা ১৯ ফেব্রুয়ারি হয়ে থাকলেও সংবাদমাধ্যমে আগেই প্রকাশিত হয়েছিল, ভারতীয় দলের কোচ রাহুল দ্রাবিড় নাকি ঋদ্ধিমানকে বলে দিয়েছেন, তাঁকে দলে নেওয়া হবে না। প্রধান নির্বাচক চেতন শর্মা দল ঘোষণা করার পর থেকে ঋদ্ধিমান বেশ কয়েকটা সংবাদমাধ্যমের সাথে কথা বলেছেন। সর্বত্রই পরিষ্কার যে সত্যিই তাঁকে দ্রাবিড় সেরকমই বলেছিলেন। শুধু তা-ই নয়, চেতনও ফোনে বলেছিলেন এরপর থেকে আর ঋদ্ধিমানের কথা ভাবা হবে না। একে ঋদ্ধিমান ধনী ক্রিকেট প্রশাসক বাবার আদরের ছোট ছেলে নন, মধ্যবিত্ত পরিবার থেকে আসা প্রথম প্রজন্মের আন্তর্জাতিক ক্রিকেটার; তার উপর তিনি কলকাতার ছেলে নন, শিলিগুড়ি থেকে কলকাতায় এসেছিলেন। সেই কারণেই বোধহয় বাঙালির আবেগের এখনো তেমন বিস্ফোরণ ঘটেনি। তার আবেগ উস্কে দেয় কলকাতার যে খবরের কাগজ আর টিভি চ্যানেলগুলো, তারাও এখনো ঈষদুষ্ণ; টগবগিয়ে ফুটছে না। এর পাশে সৌরভ গাঙ্গুলির খেলোয়াড় জীবন মনে পড়লে অবাক লাগে।

জীবনের প্রথম দুটো টেস্টে শতরান করার পরে বাংলা কাগজগুলো স্রেফ সৌরভের প্রশংসা করে থামত না। তাঁকে যে কোনো মুহূর্তে বাদ দেওয়া হতে পারে, এমন আশঙ্কা সঙ্গে জুড়ে দেওয়া হত। ওয়েস্ট ইন্ডিজে সৌরভ একটা টেস্টে বাদ পড়লেন। বাংলা কাগজে টেস্ট ম্যাচের রিপোর্টের থেকেও বেশি জল্পনা কল্পনা হল ভারতীয় দলে কতজন ব্রুটাস আছে তা নিয়ে। অধিনায়ক শচীন যে সৌরভকে মোটেই পছন্দ করেন না, তিনি ছেলেবেলার বন্ধু বিনোদ কাম্বলির জন্যে সৌরভকে বলি দিচ্ছেন — এসব কথা আমরা তখন গোগ্রাসে গিলতাম। আশ্চর্যের ব্যাপার, সৌরভকেই অধিনায়ক শচীন টাইটান কাপে নিজের ওপেনিং পার্টনার করে নিলেন। সেই জুটি একদিনের ক্রিকেট ইতিহাসের অন্যতম সেরা জুটি হয়ে উঠল। ২০০২ সালে অধিনায়ক সৌরভই সেই জুটি কিছুদিনের জন্য ভেঙে দিয়েছিলেন। আর কাম্বলি? তাঁর কেরিয়ার বেশি লম্বা হয়নি। তিনি বহু বছর পরে এক সংবাদমাধ্যমকে দুঃখ করে বলেছিলেন, শচীন আমার ছোটবেলার বন্ধু অথচ আমাকে একটু সাহায্য করল না। করলে আমার কেরিয়ারটা অন্যরকম হতে পারত। অধিনায়ক হিসাবে শচীন যে ঠিক লোকের উপরেই ভরসা করেছিলেন, সৌরভের কেরিয়ারই তার প্রমাণ।

গ্রেগ চ্যাপেলের আমলে তো চ্যাপেল আর দ্রাবিড় হয়ে উঠেছিলেন বাঙালির জাতীয় শত্রু। ভারতের সর্বকালের অন্যতম সেরা ব্যাটারটি যে কত বড় বদমাইশ, সে কথা গজাল দিয়ে বাঙালির মাথায় গুঁজে দিয়েছিল কলকাতার সংবাদমাধ্যম। তার ফল পাওয়া গিয়েছিল হাতে নাতে। সেইসময় ইডেন উদ্যানে দক্ষিণ আফ্রিকার বিরুদ্ধে একটা একদিনের ম্যাচে গোটা স্টেডিয়াম সমর্থন করেছিল গ্রেম স্মিথের দলকে। ভারতীয় অধিনায়ক বোল্ড হতে দর্শকরা উল্লাসে ফেটে পড়েছিলেন। তখন ভারতের বিপক্ষ দলকে সমর্থন করলে গ্রেফতার করার রেওয়াজ ছিল না। দিনগুলি মোর সোনার খাঁচায় রইল না।

২০১৮ সালে অস্ত্রোপচারের জন্যে ভারতীয় টেস্ট দলের এক নম্বর উইকেটরক্ষক ঋদ্ধিমানকে সরে দাঁড়াতে হয়েছিল, তাঁর জায়গা নিয়েছিলেন ঋষভ পন্থ। ঋদ্ধিমান যে সেইসময় ভারতের সেরা উইকেটরক্ষক তা নিয়ে কোথাও কোনো বিতর্ক ছিল না, বরং তিনিই বিশ্বসেরা কিনা তা নিয়ে আলোচনা হত। সৈয়দ কিরমানি থেকে অ্যাডাম গিলক্রিস্ট — কিংবদন্তি উইকেটরক্ষকরা সকলেই তাঁর প্রশংসায় পঞ্চমুখ ছিলেন। অথচ ঋদ্ধিমান ফিট হয়ে যাওয়ার পর তৎকালীন অধিনায়ক বিরাট কোহলি আর কোচ রবি শাস্ত্রী কিন্তু তাঁকে তাঁর জায়গা ফিরিয়ে দেননি। ঋষভ ঋদ্ধিমানের অনুপস্থিতিতে ইংল্যান্ডে শতরান করেছিলেন সত্যি, একবার এক ইনিংসে পাঁচটা ক্যাচ নিয়েছিলেন তা-ও সত্যি। কিন্তু তাঁর কিপিং যে মোটেই টেস্ট ক্রিকেটের মানের নয়, তা সাদা চোখেও ধরা পড়ত। বিশেষ করে স্পিনাররা বল করলে একেকসময় ব্যাপারটা হাস্যকর হয়ে দাঁড়াত। তবু ক্রমশ ঋদ্ধি হয়ে গেলেন টিম ম্যানেজমেন্টের দ্বিতীয় পছন্দ, ঋষভ বারবার ব্যর্থ না হলে অথবা আহত না হলে ঋদ্ধির জন্য প্রথম একাদশের দরজা বন্ধ হয়ে গেল। তাতে সময়ে সময়ে বোলারদের উপর নিদারুণ অবিচার হচ্ছে দেখে নতুন সূত্র তৈরি করা হল, বিদেশে কিপিং করবেন ঋষভ আর দেশে ঋদ্ধি। সবসময়ে সেটাও অবশ্য মানা হয়নি। আশ্চর্যের কথা, পড়তি ফর্মের সৌরভকে বাদ দেওয়া হয়েছিল বলে যে সাংবাদিকরা প্রায় ধর্মযুদ্ধে নেমে পড়েছিলেন, তাঁরা ফর্মে থাকা ঋদ্ধিমানের প্রতি অবিচার নিয়ে বিশেষ শব্দ খরচ করেননি।

ঋষভের ফর্ম মুখ বন্ধ করে রেখেছিল — এই যুক্তি কিন্তু খাটবে না। কারণ প্রমাণিত যোগ্যতার সিনিয়র খেলোয়াড়ের অনুপস্থিতিতে দারুণ খেলেও তিনি ফিরে আসায় জায়গা ছেড়ে দিতে হয়েছে জুনিয়রকে — এমন ঘটনা কোহলি-শাস্ত্রী জমানায় একাধিকবার ঘটেছে। বোলারদের ক্ষেত্রে তো আকছার এমনটা হয়েই থাকে। কিন্তু সবচেয়ে স্মরণীয় ঘটনা ব্যাটার করুণ নায়ারের। ২০১৬ সালে চোটের জন্য অজিঙ্ক রাহানে দলের বাইরে থাকায় খেলতে নেমে করুণ ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে শতরান নয়, দ্বিশতরান নয়, ত্রিশতরান করেছিলেন। পরের টেস্টে কিন্তু রাহানে নিজের জায়গা ফেরত পান। করুণ তারপর আর মাত্র তিনটে সুযোগ পেয়েছিলেন। রাহানেকে জায়গা ফিরিয়ে দেওয়া প্রসঙ্গে তখন অধিনায়ক কোহলি বলেছিলেন, একটা পারফরম্যান্স অন্য একজন খেলোয়াড়ের কয়েক বছরের পরিশ্রমের মূল্য চুকিয়ে দিতে পারে না। আজ রাহানের ফর্ম নেই, দল থেকে বাদ পড়েছেন বলে অনেকেই কোহলির এই মন্তব্য পড়ে নাক সিঁটকাবেন। কিন্তু সেদিন রাহানের গড় ছিল প্রায় পঞ্চাশ। সুতরাং কোহলি ভুল কিছু বলেননি। তবে দু বছরের মধ্যেই ঋষভের নড়বড়ে কিপিং আর একটা শতরান যে কী করে ঋদ্ধিমানের চার বছরের মসৃণ কিপিং আর তিনটে শতরানের চেয়ে বেশি মূল্যবান হয়ে গেল, সে এক রহস্য।

আরও বড় রহস্য হল ব্যোমকেশে আপ্লুত কলকাতা শহরের সংবাদমাধ্যমের এই রহস্য উন্মোচনে উৎসাহের অভাব। সৌরভকে বাদ দিয়ে গ্রেগ চ্যাপেল দুর্গার অসুর হয়ে গিয়েছিলেন। সে সময় ফেলুদার ছবি করার সত্ব সন্দীপ রায় ছেড়ে দিলে, আর রিমেক হুজুগ থাকলে, নির্ঘাত মন্দার বোসের নাম রাহুল দ্রাবিড় করে দেওয়া হত। এ যুগে কিন্তু কলকাতার সংবাদমাধ্যমে কোহলি বন্দনায় ছেদ পড়েনি। তাঁর ট্যাটু থেকে হেলথ ড্রিঙ্ক, প্রেম-অপ্রেম সবই বাঙালিকে ষোড়শোপচারে খাওয়ানো হয়েছে। এমনও নয় যে বাংলার গৌরব সৌরভ ক্রিকেট বোর্ডের প্রধান বলেই ঋদ্ধির ব্যাপারটা মানিয়ে নেওয়া হয়েছে। কারণ সৌরভ বোর্ড সভাপতি হয়েছেন ২০১৯ সালে; ঋদ্ধিমানকে যখন দু নম্বর করে দেওয়া হল, তখন বোর্ড বলে প্রায় কিছুই ছিল না। সুপ্রিম কোর্ট নিযুক্ত অ্যাড হক কমিটির মাথা হিসাবে বোর্ড চালাচ্ছিলেন বিনোদ রাই। তিনি কম্পট্রোলার অ্যান্ড অডিটর জেনারেল থাকাকালীন মনমোহন সিং সরকারের প্রতি যতটা কড়া ছিলেন, ঠিক ততটাই শিথিল ছিলেন কোহলি-শাস্ত্রীর টিম ম্যানেজমেন্টের প্রতি।

আসলে ভারতীয় ক্রিকেট কোনোদিনই পুরোপুরি ক্রিকেটিয় যুক্তি মেনে চলে না, আর ভারতীয় সাংবাদিকতা বহুদিন হল সাংবাদিকতার যুক্তি মেনে চলে না। ক্রিকেট সাংবাদিকতা তো নয়ই। এ দেশের ক্রিকেট সাংবাদিকতার মহীরুহরা সেই সৌরভ, শচীনদের সময় থেকেই খেলাটিকে ভুলে বাণীতে মনোনিবেশ করেছেন। সৌরভের নয়নাভিরাম কভার ড্রাইভের বিশ্লেষণে নয়, তাঁদের ওস্তাদি ছিল সৌরভ অমুক জায়গা থেকে তমুক জায়গায় যেতে যেতে গাড়িতে কী বললেন তার স্টেনোগ্রাফি করায়। ক্রিকেট সাংবাদিকতাকে সফলভাবে গসিপ সাংবাদিকতায় পরিণত করা হয়েছে গত শতকের শেষ থেকেই।

এখন মুশকিল হল, চেতেশ্বর পূজারা, রাহানে, ঋদ্ধিমানের মত লোকেরা ক্রিকেট খেলতে শিখেছেন। আক্রমণাত্মক ইংরেজি বলতে শেখেননি; বলিউডি নায়িকার সাথে প্রেম করতে পারেননি; মাঠে নেমে স্রেফ ক্যাচ ধরে, স্টাম্পিং করে আর রান করে চলে আসা যে কর্তব্য নয় তা-ও বোঝেননি। ফলে তাঁদের গ্ল্যামার নেই। যার গ্ল্যামার নেই তার খেলা সম্পর্কে লেখার ক্ষমতা আমাদের সাংবাদিকরা হারিয়েছেন, পাঠকের অভ্যাসও নষ্ট করে দিয়েছেন। এখন ঋদ্ধিমান বাদ পড়েছেন বলে আপনি যতই সহানুভূতি দেখান, বিরাট কী খেলেন, টুরের মাঝের বিরতিতে অনুষ্কাকে নিয়ে কোথায় গেলেন — এসব লিখলে আপনি হামলে পড়ে পড়বেন। ঋদ্ধিমান কোন অনুশীলনের জোরে যশপ্রীত বুমরার ঘন্টায় নব্বই মাইল গতিতে ধেয়ে আসা প্রচণ্ড সুইং হওয়া বলও অক্লেশে তালুবন্দি করেন তা নিয়ে লিখলে আপনার পানসে লাগবে। সৌরভ কেবল বাঙালি নন, তাঁর গ্ল্যামার ছিল। কালোকোলো বেঁটেখাটো রোগাসোগা ঋদ্ধির সেটা নেই। আছে বিরাটের, আছে রবি শাস্ত্রীর। তাঁরা ফোন ধরা বন্ধ করে দিলে আমাদের সাংবাদিকরা চোখে অন্ধকার দেখবেন। এখন সোশাল মিডিয়ার যুগ; বাংলা কাগজে, সাইটে বা চ্যানেলে বিরাটের সমালোচনা করে রিপোর্টার নিশ্চিন্তে তাঁর সাথে হেঁ হেঁ করতে যাবেন, সে গুড়ে বালি। ঠিক বিরাটের কানে পৌঁছে যাবে, অমুক জায়গায় তমুক কথা লেখা হয়েছে। আর সহিষ্ণুতায় এই প্রজন্মের তারকারা একেবারে শজারুপ্রতিম। ওসব ঝামেলায় কে পড়তে যাবে বাপু? কী জানি তা দিয়ে তো আর সাংবাদিকতা হয় না এ যুগে, হয় কাকে চিনি তা দিয়ে। বিরাট, রবিকে চিনলেই লাভ। ঋদ্ধিমানকে তো যে টিভিতে খেলা দেখে সে-ও চেনে।

অর্থাৎ যে গ্ল্যামারাস, ক্ষমতাশালী — তার সাতখুন মাফ।

কিন্তু জনরুচিকে সবসময়, সব বিষয়ে ইচ্ছে মতো চালনা করতে স্বয়ং নরেন্দ্র মোদী পারেন না; ক্রিকেট মাঠের উডওয়ার্ড, বার্নস্টাইনরা তো কোন ছার। তাই এই মুহূর্তে ঋদ্ধিমানের বাদ পড়া নিয়ে কিঞ্চিৎ লেখালিখি করতেই হচ্ছে। হাজার হোক, বাঙালি ক্রিকেটার বংশে বাতি দিতে উনিই তো ছিলেন। তাঁকে বাদ দেওয়ায় জাতির ভাবাবেগ বিলক্ষণ ক্ষতিগ্রস্ত। আমাদের ক্রিকেট সাংবাদিকরা বাজার বোঝেন। ঋদ্ধিমানের চোখের জল বিকোবে ভাল। অতএব দ্রাবিড়কে খলনায়ক বানানোর প্রকল্প আবার চালু হয়েছে। যখন ঋদ্ধিমানের হয়ে কলম ধরা উচিত ছিল তখন এঁরা নিদ্রামগন ছিলেন, এখন গগন অন্ধকার করে প্রমাণ করতে নেমেছেন, আটত্রিশে পা দিতে চলা ঋদ্ধিমানকে বাদ দেওয়া ঘোরতর অন্যায়।

সদ্য ভাষা শহিদ দিবস গেল বলে ঋদ্ধিকে শহিদ ঠাওরাতে যতই মন চাক, ক্রিকেটিয় যুক্তি কিন্তু অন্য কথা বলে। ঋষভের ব্যাটিং গড় এখন প্রায় চল্লিশ, ঋদ্ধিমানের তিরিশও নয়। উপরন্তু গত বছরের অস্ট্রেলিয়া সফরে ব্রিসবেনে যে ম্যাচ জেতানো ইনিংস খেলেছেন ঋষভ, মানতেই হবে সে ইনিংস খেলা ঋদ্ধিমানের পক্ষে সম্ভব নয়। ঋষভের কিপিংয়েও উন্নতি হয়েছে সম্প্রতি। তার কারণ হয়ত ঋদ্ধি স্বয়ং। দ্রাবিড়কে খলনায়ক বানানোর জন্য এক সাংবাদিক সম্প্রতি রবি শাস্ত্রীর ইয়াব্বড় সাক্ষাৎকার নিয়েছেন। ঋদ্ধিকে এক নম্বর থেকে দু’নম্বর করে দেওয়া কোচ সেখানে তাঁকে প্রশংসায় ভরিয়ে দিয়েছেন। বলেছেন এমন টিমম্যান দেখা যায় না। নিজে খেলতে পাবে না জেনেও হাতে ধরে ঋষভকে শিখিয়েছে। তাকে এভাবে বিদায় করা অনুচিত।

আরও পড়ুন নিশীথিনী-সম

অর্থাৎ টেস্ট ক্রিকেটে কী করে কিপিং করতে হয় একজন জানত না। তা সত্ত্বেও তাকে খেলানো হয়েছে এবং তাকে খেলতে শেখানোর দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল তাকে, যে খেলতে জানত। এখন কুম্ভীরাশ্রু বিসর্জন করা হচ্ছে। দ্রাবিড়কে মগনলাল মেঘরাজ বানাতে হবে বলে এক বাঙালি সাংবাদিক এই অশ্রু বিসর্জনের পরিসরটি তৈরি করে দিলেন।

সাংবাদিকদের দোষত্রুটি নিয়ে এত কথা লেখার কি কোনো দরকার আছে? সত্যিই দ্বিধায় ছিলাম। দ্বিধা কাটিয়ে দিল ঋদ্ধিমানের একটি টুইট। ১৯ তারিখ সকালে এক টুইটে ঋদ্ধিমান জানালেন, এতক্ষণ যাঁদের নিন্দা করছি তেমনই এক “শ্রদ্ধেয়” সাংবাদিক সাক্ষাৎকার চেয়েছিলেন। তিনি পাত্তা দেননি বলে সাংবাদিকটি গ্যাংস্টারের কায়দায় হুমকি দিয়েছেন, ফল ভাল হবে না। এই সাক্ষাৎকার-সর্বস্ব সাংবাদিকরা সাংবাদিকতার যতটা ক্ষতি করেন, ততটাই ক্ষতি করেন ক্রিকেটারদের এবং ক্রিকেটের। এঁরাই অফসাইডের রাজা সৌরভকে বোঝাতেন, যে অত সহজে বাউন্ডারি মারতে পারে তার রানিং বিটুইন দ্য উইকেটসে উন্নতি না করলেও চলে। এঁরাই সৌরভের টেকনিকের ত্রুটি নিয়ে আলোচনা করা ধারাভাষ্যকারদের বাঙালিবিরোধী প্রতিপন্ন করতেন। ফলে সৌরভের শর্ট বল খেলার দুর্বলতা রয়েই গেল, নইলে তাঁর মতো প্রতিভাবানের টেস্ট ক্রিকেটে মাত্র হাজার সাতেক রান আর ৪২ গড় নিয়ে কেরিয়ার শেষ করার কথা নয়। ফলে এই সাংবাদিকদের কুপ্রভাব নিয়ে যতদূর সম্ভব লেখা দরকার বইকি। আগে কেউ ঋদ্ধিমানের মত চ্যাট ফাঁস করে দিয়ে এঁদের কাঠগড়ায় তোলেনি। হয়ত সোশাল মিডিয়া ছিল না বলে তা করা সম্ভবও ছিল না। এখন শোনা যাচ্ছে, বোর্ড নাকি ঘটনার তদন্ত করবে।

সে তদন্তে অবশ্য সংশ্লিষ্ট সাংবাদিকটির শাস্তির সম্ভাবনা কম, উল্টে ঋদ্ধিমান না শাস্তি পেয়ে যান। কারণ সাংবাদিকরা কেবল নিজেদের অযোগ্যতা ঢাকতেই শীর্ষস্থানীয় ক্রিকেটার, কোচ, কর্তাদের চাটুকারিতা করেন তেমন নয়। ওঁরা চাটুকারিতা যথেষ্ট পছন্দ করেন এবং ব্যক্তিগত ও গোষ্ঠীগত নানা এজেন্ডা চরিতার্থ করতে এই সাংবাদিকদের ব্যবহার করে থাকেন। ফলে এই সাংবাদিকদের একেকজন প্রবল ক্ষমতাধর হয়ে ওঠেন। নইলে একজন আন্তর্জাতিক ক্রিকেটারকে এমন হুমকি দেওয়ার ক্ষমতা হবে কী করে?

ঋদ্ধিমানের মত নিবেদিতপ্রাণ ক্রিকেটারের দল থেকে বাদ পড়লে মনখারাপ হওয়া স্বাভাবিক। কিন্তু ঘটনার উত্তাপ কেটে গেলে তিনি নিশ্চয়ই বুঝতে পারবেন, এই বয়সে রিজার্ভ কিপার করে না রেখে তাঁকে সোজাসাপ্টা ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কথা জানিয়ে দিয়ে দ্রাবিড় যথার্থ কাজই করেছেন। ২০ তারিখ ইডেনে ভারত বনাম ওয়েস্ট ইন্ডিজ ম্যাচের পর সাংবাদিক সম্মেলনে দ্রাবিড় পরিষ্কার বলেছেন, তিনি চাননি ঋদ্ধিমানের মত একজন সংবাদমাধ্যম থেকে বাদ পড়ার খবরটা জানুন।৩ বরং সিনিয়র ক্রিকেটারকে আলাদা করে “তোমাকে আর নিতে পারছি না” বলার সৌজন্য ভারতীয় ক্রিকেটের ইতিহাসে খুব কম টিম ম্যানেজমেন্ট এবং নির্বাচন কমিটি দেখিয়েছে। ঋদ্ধি অভিমান করে বলছেন “আমাকে ঘুরিয়ে অবসর নিতে বলা হয়েছে”। তাঁর অভিমানে যে সাংবাদিকদের মাঠের বাইরের মশলাই রান্নার একমাত্র উপকরণ, তারা ছাড়া আর কারো লাভ হচ্ছে না। ভারতীয় ক্রিকেটের দুর্ভাগ্য,সচিন তেন্ডুলকরকে গোটা দুয়েক রেকর্ড ভাঙার জন্য ২০১১ বিশ্বকাপের পরেও খেলতে দেওয়া হয়েছিল। আর মহেন্দ্র সিং ধোনিকে বয়ে বেড়াতে হয়েছিল তিনি প্রবল প্রতাপশালী ক্রিকেট কর্তার কোম্পানির লোক বলে। নইলে ৩৭-৩৮ বছর বয়সের লোকের জায়গা সর্বোচ্চ স্তরের ক্রিকেটে অবশিষ্ট নেই।

আইপিএল সর্বোচ্চ স্তরের ক্রিকেট নয়।

ইনস্ক্রিপ্টে প্রকাশিত

IPL auction: Where privilege holds court

Suhana and Aryan Khan look so like their father that even somebody who has stopped following showbiz and news, shall know they are Shah Rukh Khan’s children the moment he/she sees them. But this Saturday afternoon, while watching the Indian Premier League (IPL) auction I was wondering who the other girl beside them was at the Kolkata Knight Riders table. Wonder does not last in the age of social media. Within a few minutes, I came to know that she is Juhi Chawla’s daughter Jhanvi. The revelation came through a Twitter thread where people were arguing over dynasty. Some were scandalised that Jhanvi, Suhana and Aryan were judging the ability of some hard-working professionals whilst being present at the auction just by privilege of birth. The other lot argued, it was not their fault that they were born to rich and famous parents. Some went to the extent of saying: their parents worked hard, yours didn’t. Deal with it.

I found the conversation more comical than caustic because it reminded me what Rahul Gandhi, India’s most hated dynast, had said in Parliament just ten days ago. “There are two Indias — one for the rich, one for the poor — and the gap between the two was widening,” he had said. “Today, the earnings of 84 percent of Indians have dwindled, pushing them towards poverty.” I couldn’t help laughing. The IPL auction was making people from this 84 percent argue for and against the privilege of the 16 per cent.

We came to know in 2019 that India’s unemployment rate is at a 45-year-old high. The pandemic has only worsened the situation. If Gautama Buddha were alive today and the mother of a jobless youth went to him asking for her son’s/daughter’s job, Buddha would have asked her to bring a handful of mustard from a home where joblessness or pay cuts have not hit. The lady’s only hope would be the hotel where the IPL auction was held. Even during this distress, 204 cricketers found themselves worth Rs. 550 crore.

I am not going to put you off by talking about migrant labourers. I don’t need to. Because even Indian cricketers outside the IPL fold are part of the 84 per cent. If you look around, you will find enough reports about domestic cricketers deep in debt running their family in absence of first-class cricket. But IPL, supposedly, is the fountain that feeds the stream of domestic cricket. That fountain kept flowing during the pandemic, even shifting countries in the midst of waves of crisis. Which all means that the Ranji Trophy not taking place should matter little financially to cricketers, groundsmen, umpires, scorers et al. But it did. The Board, busy keeping the fountain alive, did not care about the stream. Compensation (and a much-needed hike) was announced only in September 2021. One can clearly see the two Indias here. IPL’s India deals in hundreds of crores, the rest of Indian cricket has to suffer an agonising wait for a few lakhs.

Read Troll comes full circle for Kohli and how

Like the debate over dynasty, the point about hard work and talent will obviously rear its beautiful head here. Some will definitely say, “Those who have enough talent and work hard play IPL.” Of course, T20 is the best form of cricket to judge talent and hard work. Don’t let banal commentators and star cricketers doing lip service tell you otherwise. This is not the era where cricketers will be happy receiving Rs one lakh each from a Lata Mangeshkar-led fundraiser, after winning the World Cup. It is the age of Chris Gayle and Kieron Pollard, who are comfortable not playing for their country as they can make a killing playing in T20 leagues all over the world. It is also the age of Liam Livingstone and Tim David, who may never stake a claim to cricketing immortality but are treasured more than World Cup-winning Eoin Morgan and the Bradmanesque Steve Smith. Talent and hard work are so key to IPL success that Paul Valthaty, Manvinder Bisla became footnotes soon after big success; Pravin Tambe succeeded at an age when life insurance policies mature, with a physique Virat Kohli still has nightmares about. There is also the story of hat-trick man Ajit Chandila, who like many others, shone only in IPL. But we shall not talk about these forgottens lest it opens a can of worms.

After every IPL auction, we invariably read some rags to riches stories. A player who has played only tennis ball cricket, someone who was not a professional cricketer even six months back or somebody who has never been selected for any first-class side. In short, you do not necessarily need to come through the dusty ranks of the domestic system to get into the IPL. It wholly depends on your marketability and ability (specifically in short format). A modern day, glorified slave market, the IPL auction is. Then you land on the biggest stage possible and rake in the moolah. Through a system that reduces a rigorous discipline into a TRP-driven melodrama. The other, and more problematic aspect of IPL is that nobody is sure of the logic with which and IPL auction plays out.

Obviously, it would be wrong to grudge young men of this poor, jobless country the chance to get rich. But we tend to forget, rags to riches stories hold charm only because there are more rags than riches. Today India has more billionaires than ever, along with unprecedented unemployment. Talent needs opportunity, to announce its presence and work, to work hard. Both are in short supply for us — the 84 per cent. Celebrating the pomp of IPL and arguing about the privilege of its elite is actually a nice way to laugh at ourselves. The joke actually is on us.

Originally published on newsclick

বড় ক্রিকেটারে নয়, বিরাট ব্র্যান্ডে মোহিত জনগণমন

ব্র্যান্ড বুদ্ধ। কথাটা এই শতকের শুরুতে পশ্চিমবঙ্গে বেশ জনপ্রিয় হয়েছিল। এতটাই জনপ্রিয় যে বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের নিজের দলের সদস্যরা, যাঁদের তাত্ত্বিক ভাবে ব্র্যান্ডিং ব্যাপারটা নিয়েই প্রবল আপত্তি থাকার কথা, তাঁরাও বেশ সন্তোষ প্রকাশ করতেন। যদি ধরে নেওয়া যায় তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী সত্যিই একটি ব্র্যান্ড, তাহলে মানতেই হবে সে ব্র্যান্ড রীতিমত জনপ্রিয় হয়েছিল। শতকের প্রথম দশকের দুটো নির্বাচনেই বুদ্ধদেবের নেতৃত্বাধীন দল তথা জোট হই হই করে জিতেছিল। ব্র্যান্ড বুদ্ধের চেয়ে অনেক বেশি আলোচিত এবং সফল ব্র্যান্ড মোদি। মানতেই হবে ব্র্যান্ড নির্মাণের মুন্সিয়ানাও সেখানে অনেক বেশি। কারণ একজন লেখাপড়া জানা ভদ্রলোককে নির্ভরযোগ্য প্রশাসক হিসাবে তুলে ধরার চেয়ে গোটা রাজ্যে গণহত্যা চলার সময়ে ক্ষমতাসীন নেতাকে গোটা দেশ চালানোর পক্ষে বিকল্পহীন প্রশাসক হিসাবে তুলে ধরা বহুগুণ কঠিন। ব্র্যান্ড নির্মাণ মানেই হল যা না থাকলেও ক্ষতিবৃদ্ধি হয় না তাকেই অপরিহার্য বলে প্রতিষ্ঠা করা, যার বিকল্প আছে তাকে নির্বিকল্প হিসাবে ঘোষণা করা। তাই কেবল ভালো বললে চলে না, তুলনায় যেতে হয়। আর সকলের চেয়ে ভালো, এ পর্যন্ত যা যা দেখেছেন, সবার চেয়ে ভাল — এইসব বলতে হয়। তাই নরেন্দ্র মোদি কোনো শিশুর দিকে তাকিয়ে হাসলেই ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী, যিনি কোনো শিশুর দিকে তাকিয়ে হাসলেন — এই জাতীয় প্রচারের প্রয়োজন পড়ে।

রাজনীতিবিদের ব্র্যান্ড নির্মাণ করার চেয়ে খেলোয়াড়দের ব্র্যান্ড নির্মাণ করা সহজ। কারণ তাঁরা কাজের অঙ্গ হিসাবেই সাধারণ মানুষের নিরিখে অবিশ্বাস্য কাণ্ডকারখানা করে থাকেন। অভিনেতারাও করেন বটে, কিন্তু তা অবশ্যই পূর্বনির্ধারিত; চিত্রনাট্য এবং প্রযুক্তির সহায়তায় করা। আজকের দিনের দর্শকরা জানেন কোনটা ক্যামেরার কারসাজি, কোথায় আসল নায়ক হল ভিএফএক্স। কিন্তু বিরাট কোহলির দিকে যখন বাউন্সার ধেয়ে আসে, তখন তিনি পুল করতে পারলে তবেই বল মাঠের বাইরে যাবে। ওখানে ফাঁকি চলে না। তাই তাঁর বিশ্বাসযোগ্যতা এমনিতেই বেশি। কিন্তু ওতে সন্তুষ্ট হলে অপ্রতিদ্বন্দ্বী ব্র্যান্ড নির্মাণ সম্ভব নয়।

গাড়ির টায়ার থেকে টিএমটি বার, পেশাগত শিক্ষার সাইট থেকে পটেটো চিপসের বিকল্প স্ন্যাকস যাঁকে দিয়ে বিক্রি করাতে হবে — তিনি যে কেবল দারুণ খেলোয়াড় নন, অন্য সকলের চেয়ে, এমনকি আগে যাঁরা ক্রিকেট খেলেছেন তাঁদের সকলের চেয়ে ভাল; নিদেনপক্ষে সর্বকালের সেরাদের মতই ভাল, তা প্রতিষ্ঠা না করলে চলে না। এই কারণেই সারা পৃথিবীর খেলাধুলোয় বর্তমানের তারকাদের সর্বকালের সেরার আসনে বসানোর হুড়োহুড়ি।

অতীতে কোনো খেলোয়াড় সর্বকালের সেরাদের মধ্যে পড়েন কিনা সে আলোচনা শুরু হতো তাঁর কেরিয়ারের শেষ প্রান্তে বা কেরিয়ার শেষ হলে। কিন্তু শচীন তেন্ডুলকর যখন মধ্যগগনে, তখনই এই মর্মে বিপুল প্রচার শুরু হয়ে গিয়েছিল। কারণ তখন বিপুল টাকার চুক্তি নিয়ে ওয়ার্ল্ড টেল এসে পড়েছে ভারতীয় ক্রিকেটে, শচীনকে ধনী করার দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিয়েছেন মার্ক মাসকারেনহাস। অশীতিপর ডন ব্র্যাডম্যান এক সাক্ষাৎকারে বলে ফেলেছেন, ‘এই ছেলেটাকে দেখে আমার নিজের কথা মনে পড়ে।’ ব্যাস! আর যায় কোথায়? সর্বকালের সেরা হিসাবে শচীনের এমন জোরদার ব্র্যান্ডিং হল, কাগজে এমন লেখালিখি, টিভিতে এমন বিজ্ঞাপন যে আমরা যারা সুনীল গাভস্করের খেলা দেখিনি; কপিলদেব, ইয়ান বোথাম, ভিভ রিচার্ডসদের তাঁদের সেরা সময়ে দেখিনি; তারা নিঃসন্দেহ হয়ে উঠলাম — সবার উপরে শচীন সত্য, তাহার উপরে নাই। সর্বকালের সেরার মুকুটের জন্য শচীনের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসাবে আমরা বড়জোর ব্রায়ান লারাকে মানতে রাজি ছিলাম, কোনো প্রাক্তনকে মোটেই নয়।

ব্র্যান্ডিংয়ের সেই ট্র্যাডিশন আজও সমান তালে চলছে। শচীন অবসর নিয়েছেন বলে তো আর ব্যবসা থেমে থাকতে পারে না, অতএব পরবর্তী GOAT (গ্রেটেস্ট অফ অল টাইম — এই অভিধাটি সোশাল মিডিয়ার যুগে নতুন আমদানি, শচীনের সময়ে চালু হয়নি) হয়ে গেলেন মহেন্দ্র সিং ধোনি। তাঁর কেরিয়ার শেষের দিকে যেতেই বিরাট। প্রত্যেক প্রজন্মেই আগের গোটের নৈপুণ্যকে অতিক্রম করে এসে যাচ্ছেন নতুন গোট। মানবিক দক্ষতার এত দ্রুত বিবর্তন হয় জানলে হয়ত চার্লস ডারউইন ওরিজিন অফ স্পিসিজ নিজে হাতে পুড়িয়ে দিতেন।

গোট প্রচার ভোট প্রচারের মতই শক্তিশালী। শচীনের আমলে কেবল সাংবাদিককুল আর বিজ্ঞাপন ছিল প্রচারযন্ত্র। এখন যুক্ত হয়েছে সোশাল মিডিয়া। কেবল প্রচার নয়, ভিন্নমতের প্রতিকারও সেখানে হয়ে থাকে। ট্যুইটারে একবার বলে দেখুন, বিরাট নিঃসন্দেহে বড় ব্যাটার। কিন্তু সর্বকালের সেরা বলার সময় হয়েছে কি? পঙ্গপালের মত ধেয়ে আসবেন বিরাটভক্তরা। আক্রমণ শুরু হবে আপনি যে ক্রিকেটের ‘ক’ বোঝেন না সেই ঘোষণা দিয়ে। ক্রমশ আপনি যে মোগ্যাম্বোসুলভ খলনায়ক তা বলা হবে। তারপর প্রমাণ করা হবে আপনি দেশদ্রোহী; নামটা মুসলমান হলে সোজা পাকিস্তানি। গালিগালাজ ইত্যাদি তো আছেই। বলা যেতেই পারত যে এসবের সাথে খেলার বা খেলোয়াড়ের কোনো সম্পর্ক নেই। ক্রীড়ানুরাগীরা কালে কালে এরকম জঙ্গিপনা করে আসছেন, সোশাল মিডিয়া আসায় পাড়ার রকের জঙ্গিপনা জনপরিসর পেয়ে গেছে মাত্র। দুঃখের বিষয়, তা বলা যাবে না। কারণ দু’টি।

প্রথমত, এমন আক্রমণ কেবল রাম শ্যাম যদু মধুরা করে না। সাংবাদিক, ধারাভাষ্যকার, ভেরিফায়েড হ্যান্ডেলওলা উচ্চপদস্থ সরকারি অফিসার, ডাক্তার, উকিল — কেউই বাদ যান না। দ্বিতীয়ত, বিরাট নিজেও একাধিকবার ট্রোলদের মত আচরণ করেছেন।

ভারতের শাসক দলের মত ভারতের ক্রিকেট দলও সমালোচনা মোটেই বরদাস্ত করে না সেই ধোনির আমল থেকেই। বিশ্বের সবচেয়ে ধনী ক্রিকেট বোর্ড বিসিসিআই মাইনে দিয়ে ধারাভাষ্যকার রাখে। দল হারুক আর জিতুক, ভারতীয় ক্রিকেটারদের সমালোচনা করেছ কি মরেছ। ব্যাপারটা হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছিলেন হর্ষ ভোগলে। অমিতাভ বচ্চনের টুইট রিটুইট করে ভোগলের ধারাভাষ্য নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছিলেন তৎকালীন ভারত অধিনায়ক ধোনি। তারপরই ভোগলের কন্ট্র্যাক্ট চলে যায়। বিরাট ক্রিকেটের মেধাবী এবং মনোযোগী ছাত্র; তিনি বড়দের দেখে যা শিখেছেন তা তাঁদের চেয়ে ঢের বেশি জোর দিয়ে করেন। ২০১৫ ক্রিকেট বিশ্বকাপ চলাকালীন অনুশীলনের সময়ে তিনি এক ভারতীয় সাংবাদিককে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করেন, কারণ তাঁর ধারণা হয়েছিল ওই সাংবাদিক বিরাট আর অনুষ্কা শর্মার সম্পর্ক নিয়ে আপত্তিকর কথাবার্তা লিখেছেন। পরে যখন জানা যায় সেই নিবন্ধ অন্য এক সাংবাদিকের লেখা, তখন বিরাট ক্ষমা চান। অর্থাৎ ভুল লোককে গালিগালাজ করা হয়েছে বলে ক্ষমা চান। এই ঘটনায় টিম ডিরেক্টর রবি শাস্ত্রী বলেছিলেন, তিনি বিরাটকে বুঝিয়েছেন যে ভবিষ্যৎ ভারত অধিনায়কের এরকম ব্যবহার সাজে না। যদিও বিরাট তখন ভারতের টেস্ট অধিনায়ক হয়ে গিয়েছেন।

২০১৮ সালে বিরাটের কোপে পড়েন এক ক্রিকেটপ্রেমীও। দোষের মধ্যে, তিনি বলেছিলেন ভারতের চেয়ে অন্য দেশের ব্যাটারদের খেলা দেখতে তাঁর বেশি ভালো লাগে। বিরাট তাঁকে সটান বলে দেন, তাহলে অন্য দেশে গিয়েই থাকা উচিত। দেশের শাসক দল বিজেপি ও তার ট্রোলরা তখন অনলাইন এবং অফলাইন — সর্বত্র সরকারবিরোধী কথা বললেই পাকিস্তানে চলে যাওয়ার পরামর্শ দিচ্ছে। অবশ্য এরকম প্রতিধ্বনিতে অবাক হওয়ার কিছু ছিল না। কারণ ২০১৬ সালের ৮ নভেম্বর প্রধানমন্ত্রী আচমকা নোটবন্দির ঘোষণা করার সাতদিন পরে সাংবাদিক সম্মেলনে বিরাট বলেছিলেন, ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাসে ওটা তাঁর দেখা সেরা সিদ্ধান্ত।  বিরাট ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাস কতখানি জানেন সে প্রশ্ন তোলা নিষ্প্রয়োজন, কারণ যিনি গোট তিনি তো কেবল খেলার গোট নন, তিনি সর্বজ্ঞ।

ব্র্যান্ডিংয়ের এমনই মহিমা, যে সাংবাদিক সম্মেলনে অপছন্দের প্রশ্ন শুনলেই রেগে যাওয়ার ধারাবাহিক ইতিহাস, কাগজে কী বেরোল তা নিয়ে সাংবাদিককে আক্রমণ করা এবং বিতর্কিত সরকারি সিদ্ধান্তকে সাত তাড়াতাড়ি সমর্থন করার ইতিহাস থাকা সত্ত্বেও বিরাটের অধিনায়কত্ব নিয়ে সাম্প্রতিক টানাপোড়েনে বড় অংশের বিজেপিবিরোধী মানুষ নিঃসন্দেহ, যে বিরাটকে সরিয়ে দেওয়া আসলে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত। মহম্মদ শামির পক্ষ নিয়ে কথা বলেছিলেন বলে অমিত শাহের নির্দেশে তাঁর পুত্র জয় শাহ ও বশংবদ সৌরভ গাঙ্গুলি মিলে বিরাটকে একদিনের নেতৃত্ব থেকে সরিয়ে দিয়েছেন, আর টেস্টের নেতৃত্ব ছেড়ে দিতে বাধ্য করেছেন।

আরও পড়ুন সকলেই চুপ করে থাকবে, শামিকে মানিয়ে নিতে হবে

বিরাটের কথা উঠলেই যে দেশের বেশিরভাগ মানুষের যুক্তিবোধ ঘুমিয়ে পড়ে, সবটাই আবেগ দিয়ে নিয়ন্ত্রিত হয় — এখানেই ব্র্যান্ড নির্মাতাদের সাফল্য। নানা মহল থেকে আভাস পাওয়া যাচ্ছে যে প্রধানমন্ত্রী মোদির ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা এখন আর আগের জায়গায় নেই। কিন্তু সর্বোচ্চ জনপ্রিয়তার সময়েও তিনি এভাবে ডান, বাম, মধ্যপন্থীদের এক করে ফেলতে পারেননি। রাজনীতিতে এবং সমাজে যেসব প্রবণতার চরম নিন্দা করে থাকেন মোদিবিরোধীরা, সেগুলোই বিরাটের মধ্যে দেখা গেলে সকলে জাতীয়তাবাদী হয়ে পড়েন। প্রযুক্তির সিদ্ধান্ত পছন্দ হয়নি বলে অধিনায়ক সদলবলে হাস্যকর অসভ্যতা করলেও কেউ বলেন না, বিদেশের মাঠে অধিনায়ক প্রকৃতপক্ষে আমাদের রাষ্ট্রদূত। তিনি এই আচরণ করতে পারেন না, এর জন্যে শাস্তি হওয়া উচিত। উল্টে উঠে আসে বনলতা সেনগিরির যুক্তি (যাকে ইংরেজিতে বলা হয় হোয়াট্যাবাউটারি) — এরকম যখন সাহেবরা করত তখন কোথায় ছিলেন? এখন আমাদের জোর হয়েছে, তাই বিরাট করছে। বেশ করছে। রাজনীতিবিদদের গুন্ডাসুলভ কথাবার্তার যাঁরা অহরহ নিন্দা করেন, তাঁরাও বিরাটের নেতৃত্বাধীন দলের খেলার মাঠে অকারণ চিৎকার, খেলার পরেও সাংবাদিক সম্মেলনে এসে আক্রমণাত্মক ভাষায় কথা বলাকে আগ্রাসনের যুক্তিতে সমর্থন করেন। বিজেপি কথিত যে ‘নিউ ইন্ডিয়া’ অনেকের প্রবল অপছন্দ, সেই ভারতের বৈশিষ্ট্যগুলোই বিরাটের শরীরী ভাষায় দেখে একই লোকেদের যে উল্লাস– সেটাই ব্র্যান্ডিংয়ের জয়পতাকা।

সরকারি দল, তাদের সাঙ্গোপাঙ্গ এবং সহায়ক সংবাদমাধ্যম যখন বলে তারা ক্ষমতায় আসার আগে ভারতে কোনো উন্নয়ন হয়নি, বিদেশে ভারতের কোনো সম্মান ছিল না, ভারতীয়রা ভীতু বলে পরিচিত ছিল; তখন প্রতিবাদ করার লোক পাওয়া যায়। অথচ শাস্ত্রী, বিরাট এবং তাঁদের ভগবান বানিয়ে তোলা সংবাদমাধ্যম গত কয়েক বছর ধরে প্রচার করে যাচ্ছেন ভারতীয় ক্রিকেট দল আগে আক্রমণাত্মক ছিল না, লড়ে যাওয়ার ক্ষমতা ছিল না, ক্রিকেটাররা মুখের মত জবাব দিতে পারতেন না ইত্যাদি। এই প্রোপাগান্ডা হাঁ করে গিলছেন প্রায় সবাই। ইতিহাস বিকৃত করা অথবা অস্বীকার করার যে ধারা এ দেশে চালু হয়েছে, সেই ধারারই অংশ এসব। যেন ১৯৭৬ সালে পোর্ট অফ স্পেনে নেহাত মিনমিন করে মোহিন্দর অমরনাথ, গুন্ডাপ্পা বিশ্বনাথ, সুনীল গাভস্কররা ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিরুদ্ধে চতুর্থ ইনিংসে ৪০৬ রান তুলে জয় ছিনিয়ে নিতে পেরেছিলেন। যেন স্টিভ ওয়র বিশ্বজয়ী অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ২০০৩-০৪ মরসুমে সমানে সমানে লড়েনি ভারতীয় দল। যেন ১৯৮৩ বিশ্বকাপে জিম্বাবোয়ের বিরুদ্ধে ১৭ রানে পাঁচ উইকেট পড়ে যাওয়ার পর কপিলদেব অপরাজিত ১৭৫ করতে পেরেছিলেন লড়ে যাওয়ার ক্ষমতা ছাড়াই। ১৯৮১ সালে আগের টেস্টেই বাউন্সারে আহত হয়ে হাসপাতালে চলে যাওয়া সন্দীপ পাতিলের অ্যাডিলেড টেস্টে ডেনিস লিলি, রডনি হগ, প্যাসকোকে বাইশটা চার আর একটা ছয় মেরে ১৭৪ রান করাও বোধহয় সম্ভব হয়েছিল আক্রমণাত্মক না হয়েই।

একটা প্রযুক্তিগত সিদ্ধান্ত বিপক্ষে যাওয়ায় বিরাট নেশাগ্রস্তের মত স্টাম্প মাইক্রোফোনে টিভি সম্প্রচারকারীকে ধমকেছেন, সহ অধিনায়ক কে এল রাহুল গোটা দক্ষিণ আফ্রিকা দেশটাকেই অভিযুক্ত করেছেন। কিন্তু ম্যাচের পর বিরাট ঘটনার ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে কয়েকটা অর্থহীন কথা বলেছেন। “মাঠের ভিতরে ঠিক কী ঘটছিল বাইরের লোকেরা তো জানে না, আমরা জানি। আমি এখন বলব না যে আমরা বাড়াবাড়ি করে ফেলেছি। কারণ তখন যদি আমরা চার্জড আপ হয়ে গোটা তিনেক উইকেট নিয়ে নিতাম তাহলেই খেলাটা ঘুরে যেত।” মনে করুন ২০০৭-০৮ মরসুমে সিডনি টেস্টের কথা। অস্ট্রেলিয় তৃতীয় আম্পায়ারের একের পর এক ভুল সিদ্ধান্তে ভারত কোণঠাসা হয়, তারপর শেষ দিনে স্রেফ রিকি পন্টিংয়ের মিথ্যাচারে বিশ্বাস করে আম্পায়াররা সৌরভকে ড্রপ পড়া বলে আউট দেন, দল হেরে যায়। ভারত অধিনায়ক অনিল কুম্বলে মাঠের ভিতরে ছেলেমানুষের মত হাত-পা ছোঁড়েননি, চিৎকার করেননি। কিন্তু খেলার পর দ্ব্যর্থহীন ভাষায় বলেছিলেন “এখানে একটা দলই ক্রিকেটের স্পিরিট অনুযায়ী খেলছিল।” এসব লড়াকু মনোভাব নয়, আগ্রাসন নয়, সাহসিকতা নয় — এমনটাই শিখে গেছি আমরা।

বিরাটের নেতৃত্বে নতুন কী ঘটেছে আসলে? ভারতীয় দল অনেক বেশি জয়ের মুখ দেখেছে। অস্ট্রেলিয়ায় প্রথমবার, দ্বিতীয়বার টেস্ট সিরিজ জিতেছে। কিন্তু সেই জয় আকাশ থেকে পড়েনি। বিরাটের দলের এই স্মরণীয় জয়গুলো এসেছে ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতায়। সৌরভের আমলে শুরু হয়েছিল বিদেশে নিয়মিত টেস্ট ম্যাচ জেতা। জয়ের সংখ্যা বাড়ে ধোনির আমলে, বিরাটের আমলে আরম্ভ হয়েছে সিরিজ জয়। তার কৃতিত্ব অনেকটাই জোরে বোলারদের, নেতা হিসাবে অবশ্যই বিরাটেরও। উপরন্তু জয়ের ইতিহাস থাকা সত্ত্বেও বিরাটের আমলে ভারত ইংল্যান্ডে সিরিজ জেতেনি, নিউজিল্যান্ডেও নয়। টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপ জেতা হয়নি, দক্ষিণ আফ্রিকাতেও দু’বারের চেষ্টায় প্রথমবার সিরিজ জিতে নতুন ইতিহাস তৈরি করা যায়নি। কিন্তু বিরাট বন্দনা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে এসব কথা বলতে গিয়েও ঠারেঠোরে জওহরলাল নেহরুকে ছোট করার ঢঙে আগের অধিনায়কদের এক হাত নেওয়া হয়। বলা হয় বিরাটের আগে কোনো অধিনায়ক নাকি জোরে বোলারদের এত গুরুত্ব দেননি। ঘটনা হল, আগে কোনো অধিনায়ক একসাথে এতজন ভাল জোরে বোলার পাননি। ভারতীয় ক্রিকেটে একসময় বিষাণ সিং বেদিকে বোলিং ওপেন করতে হয়েছে, এমনকী দু-একবার গাভস্করকেও। কারণ বিশ্বমানের জোরে বোলার কেউ ছিলেন না। সে পরিবর্তনও এসেছে ধারাবাহিকভাবেই।

প্রথমে এসেছেন কপিলদেব। তাঁর কেরিয়ারের শেষ প্রান্তে জাভাগাল শ্রীনাথ, পিছু পিছু ভেঙ্কটেশ প্রসাদ। পরবর্তীকালে জাহির খান, আশিস নেহরারা। ২০০৩ বিশ্বকাপের ফাইনালে পৌঁছনো হত না পেস ত্রয়ীকে ছাড়া। সে ত্রয়ী তৈরিই হত না অধিনায়ক সৌরভ প্রায় অবসর নিয়ে ফেলা শ্রীনাথকে খেলতে রাজি না করালে। সৌরভের সময়েই সাড়া জাগিয়ে এসেছিলেন ইরফান পাঠান, যাঁর অলরাউন্ডার হতে গিয়ে নষ্ট হয়ে যাওয়া ভারতীয় ক্রিকেটের দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি। রাহুল দ্রাবিড় অধিনায়ক থাকার সময়ে ওয়েস্ট ইন্ডিজ সফরে ভারতের হয়ে অল্প কিছুদিন রীতিমত গতিময় বোলিং করেছিলেন মুনাফ প্যাটেল আর বিক্রম রাজবীর সিং। প্রথম জন ক্রমশ গতি কমিয়ে ফেলেন, দ্বিতীয় জন আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে টিকে থাকতে পারেননি। রাহুলের আমলেই উঠে এসেছিলেন শান্তাকুমারণ শ্রীশান্ত, রুদ্রপ্রতাপ সিংরা। ইতিমধ্যে ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের আর্থিক সঙ্গতি বেড়েছে, জোরে বোলারদের প্রতি যত্ন বেড়েছে, ঘরোয়া ক্রিকেটে জোরে বোলিং সহায়ক পিচ তৈরিও শুরু হয়েছে। যশপ্রীত বুমরা, মহম্মদ শামিদের রাত্রির বৃন্ত থেকে ফুটন্ত সকাল ছিঁড়ে আনার মত করে বিরাট নিয়ে আসেননি। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের চাপে ঘরোয়া ক্রিকেট খেলার সুযোগ না পাওয়া একজন অধিনায়কের পক্ষে তা সম্ভবও নয়।

এসব গোপনীয় তথ্য নয়, কিন্তু এখন কারো মনেই পড়ে না। কারণ আমাদের মুখ ঢেকেছে বিজ্ঞাপনে, আর বিজ্ঞাপন ঢেকেছে বিরাটের মুখে। তাই একদিনের ক্রিকেটের দল একের পর এক বিশ্ব স্তরের টুর্নামেন্টে ব্যর্থ হোক, বিরাটকে সরানো চলবে না। তিনি বিবৃতি দেবেন “টেস্ট আর একদিনের দলের নেতৃত্ব দিতে তৈরি থাকার জন্য টি টোয়েন্টির নেতৃত্ব ছেড়ে দিচ্ছি।” তবু আমাদের মনে হবে না, ভদ্রলোক অধিনায়কত্বকে জমিদারি মনে করছেন। তিনি গোট, তাঁর সাত খুন মাফ।

বস্তুত, ব্র্যান্ডিংয়ের ফাঁদ থেকে বেরোতে পারলে দেখতে পেতাম, বিরাট (৯৯ টেস্টে ৭৯৬২ রান, গড় ৫০.৩৯, শতরান ২৭) টেস্ট ক্রিকেটে দারুণ এবং নিজের সময়ের সেরা ব্যাটারদের অন্যতম। কিন্তু গোট তো নয়ই, তাঁকে সর্বকালের সেরাদের একজন বলার সময়ও আসেনি। তাঁর সমসাময়িকদের মধ্যে স্টিভ স্মিথ (৮২ টেস্টে ৭৭৮৪ রান, গড় ৫৯.৮৪, শতরান ২৭), কেন উইলিয়ামসন (৮৬ টেস্টে ৭২৭২ রান, গড় ৫৩.৪৭, শতরান ২৪) বরং তাঁর চেয়ে বেশি ধারাবাহিক। কেবল রানের দিক থেকে টেস্টের ইতিহাসে সর্বকালের সেরা দশে ঢুকতে হলেও বিরাটকে এখনো জনা কুড়ি খেলোয়াড়কে টপকাতে হবে। শুধু ভারতীয়দের মধ্যেও তিনি আপাতত ছয় নম্বরে। দলের জন্য যা আরও চিন্তার, তা হল গত কয়েক বছরে তাঁর পারফরম্যান্স গ্রাফ ক্রমশ নামছে। ২০১৯ সালের নভেম্বরে শেষ শতরানের পর থেকে হিসাব করলে তাঁর গড় ২৮.১৪।

আন্তর্জাতিক টি টোয়েন্টি ক্রিকেটে তিনি এই মুহূর্তে রানের দিক থেকে দু’নম্বরে, গড়ে এক নম্বর (৯৫ ম্যাচে ৩২২৭ রান, গড় ৫২.০৪), অধিনায়কত্বের রেকর্ডও ভাল। একদিনের ক্রিকেটের অধিনায়কত্বের রেকর্ডও নিঃসন্দেহে ঈর্ষণীয়, কিন্তু দুঃখের বিষয় সাদা বলের ক্রিকেটে দ্বিপাক্ষিক সিরিজ জয়ের বিশেষ মূল্য নেই আজকের ক্রিকেটে। কারণ টি টোয়েন্টি যুগে দলগুলোর দ্বিপাক্ষিক ওয়ান ডে ম্যাচ খেলার আগ্রহ ক্রমশ কমছে। চার বছর অন্তর ৫০ ওভারের বিশ্বকাপের সঙ্গে এখন যুক্ত হয়েছে এক বছর অন্তর টি টোয়েন্টি বিশ্বকাপ। অর্থাৎ একটি দল পাঁচ বছরে চারটি বিশ্বকাপ খেলছে। সুতরাং দ্বিপাক্ষিক সিরিজগুলো বিশ্বকাপের প্রস্তুতি মাত্র। লক্ষ করে দেখুন, অস্ট্রেলিয়ার যে দল সদ্য ওয়ার্ল্ড টি-টোয়েন্টি জিতল, সেই দলের সঙ্গে কিছুদিনে আগেই যে দল বাংলাদেশের বিরুদ্ধে টি-টোয়েন্টি সিরিজ হেরেছিল তার বিস্তর তফাত। সুতরাং বিশ্বকাপে বা চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফিতে রান করতে না পারলে বা ট্রফি জিততে না পারলে অন্য সময়ের ফলাফলের বিশেষ গুরুত্ব থাকে না। টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে এখন প্রধান হয়ে দাঁড়িয়েছে আইপিএলের মত ফ্যাঞ্চাইজ ক্রিকেট। সেখানে ব্যাটে প্রচুর রান থাকলেও নেতা বিরাট কিন্তু চূড়ান্ত ব্যর্থ। রয়াল চ্যালেঞ্জার্স ব্যাঙ্গালোরের নেতা হিসাবে তাঁর প্রাপ্তি শূন্য।

যে ক্রিকেটে বিরাট সত্যিই সর্বকালের সেরাদের আসনের দাবিদার, তা হল একদিনের ক্রিকেট (২৫৫ ম্যাচে ১২২২০ রান, গড় ৫৯.০৩, শতরান ৪৩)। এখানে তাঁর সমসাময়িকরা কেউ ধারে কাছে নেই। শচীনের ৪৯ শতরানের রেকর্ডের থেকে মাত্র ছয় ধাপ দূরে আছেন বিরাট। গড়ের দিক থেকে তিনি আপাতত তিন নম্বরে, কিন্তু সামনের দু’জন খেলেছেন মাত্র গোটা তিরিশেক ম্যাচ। দুশোর বেশি ম্যাচ খেলেছেন এমন ক্রিকেটারদের মধ্যে তাঁর ব্যাটিং গড়ই সর্বোচ্চ। কিন্তু মুশকিল হল, ৫০ ওভারের খেলায় যাঁরা সর্বকালের সেরা হিসাবে সর্বজনস্বীকৃত, অর্থাৎ ভিভ রিচার্ডস, শচীন, রিকি পন্টিং, সনৎ জয়সূর্য, কুমার সঙ্গকারা বা ধোনি — তাঁদের বিশ্বকাপের পারফরম্যান্সের পাশে বিরাট ফ্যাকাশে (২৬ ম্যাচে ১০৩০ রান, গড় ৪৬.৮১, শতরান ২)। অথচ খেলে ফেলেছেন তিনটে বিশ্বকাপ। বিশেষত নক আউট স্তরে তাঁকে একবারও স্বমহিমায় দেখা যায়নি। বিশ্বকাপে রান এবং শতরানের দিক থেকে সবার উপরে থাকা শচীন তো বটেই, তিলকরত্নে দিলশান (২৭ ম্যাচে ১১১২ রান, গড় ৫২.৯৫, শতরান ৪), হার্শেল গিবসের (২৫ ম্যাচে ১০৬৭ রান, গড় ৫৬.১৫, শতরান ২) মত ক্রিকেটারদেরও বিরাটের চেয়ে বেশি স্মরণীয় পারফরম্যান্স রয়েছে। ফর্ম থাকলে আগামী বছর ঘরের মাঠের বিশ্বকাপে হয়ত তিনি এই অভাব পুষিয়ে দেবেন।

একথা ঠিক যে পরিসংখ্যান দিয়ে সব কিছু প্রমাণ হয় না। কারণ পরিসংখ্যানে ধরা থাকে না পিচের অবস্থা, ম্যাচের পরিস্থিতি বা খেলোয়াড়ের শারীরিক অসুবিধা। ধুম জ্বর গায়ে বা বাউন্সারে মাথা ফেটে যাওয়ার পর করা ৩০ রানের মূল্য পরিস্থিতির বিচারে শতরানের চেয়েও বেশি হয় অনেকসময়। ব্যাটিংয়ের ল্যাজকে সঙ্গে নিয়ে আহত ভিভিএস লক্ষ্মণের অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে টেস্ট জেতানো ইনিংসের মূল্য সংখ্যায় মাপা যায় কখনো? গত বছর রবিচন্দ্রন অশ্বিন আর হনুমা বিহারীর অস্ট্রেলিয়ায় টেস্ট বাঁচানো জুটির ওজনও ওই ম্যাচের স্কোরকার্ড দেখে উপলব্ধি করা যাবে না। সবচেয়ে বড় কথা, ব্যাটিং কতটা ভাল তা প্রতিপক্ষের বোলিংয়ের মান না জেনে বিচার করা মূর্খামি। কারণ ক্রিকেট খেলায় একমাত্র বোলিংটাই ক্রিয়া; ব্যাটিং আর ফিল্ডিং হল প্রতিক্রিয়া।

কিন্তু পরিসংখ্যান বাদ দিয়ে আলোচনা করলে বিরাটকে আর তত বিরাট মনে হবে না হয়তো। কারণ তখন বলতেই হবে, তাঁর কেরিয়ারের বড় অংশে সারা পৃথিবীতে এমন জোরে বোলার বিরল, যিনি যে কোনো পিচে যে কোনো আবহাওয়ায় দিনের যে কোনো সময়ে ঘন্টায় নব্বই মাইল বা তার বেশি গতিতে বল করতে পারেন। বড়জোর অস্ট্রেলিয়ার মিচেল জনসন আর দক্ষিণ আফ্রিকার ডেল স্টেইন, মর্নি মর্কেলের কথা ভাবা যেতে পারে। নব্বই আর শূন্য দশকে কার্টলি অ্যামব্রোস, কোর্টনি ওয়ালশ, প্যাট্রিক প্যাটারসন, অ্যালান ডোনাল্ড, শোয়েব আখতার, ব্রেট লি, শেন বন্ডরা ছিলেন। সত্তর ও আশির দশকে ছিলেন ওয়েস্ট ইন্ডিজের ভয় ধরানো পেস চতুর্ভুজ, অস্ট্রেলিয়ার লিলি-থমসন, নিউজিল্যান্ডের রিচার্ড হেডলি, ইংল্যান্ডের বব উইলিস, পাকিস্তানের আক্রাম-ইউনিস। আরও বলতে হবে, তত গতিময় না হলেও এখন মিচেল স্টার্ক, জশ হেজলউড, জেমস অ্যান্ডারসন, স্টুয়ার্ট ব্রড, টিম সাউদিদের মত সুইং ও সিম করাতে পারা বোলাররা আছেন। কিন্তু বিশ্বমানের স্পিনার বলতে শুধু নাথান লায়ন। আজাজ প্যাটেল যতই এক ইনিংসে দশ উইকেট নিন, নিউজিল্যান্ড স্পিন সহায়ক উইকেট নয় বলে পরের ম্যাচেই তাঁকে খেলায়নি। আর ছিলেন ইয়াসির শাহ, কিন্তু রাজনৈতিক কারণে বিরাটের তাঁর বিরুদ্ধে খেলা হয়নি। অত্যন্ত মাঝারি মানের অ্যাডাম জাম্পা বা আদিল রশিদের বিরুদ্ধে কিন্তু বিরাটকে স্বচ্ছন্দ দেখায় না।

২০১১ সালের অক্টোবর মাসে ক্রিকেটের নিয়ামক সংস্থা আইসিসি ৫০ ওভারের খেলা দু প্রান্ত থেকে দুটি আলাদা বলে খেলা হবে — এই নিয়ম চালু করে। আগে একটি বলেই গোটা ইনিংস খেলার নিয়ম ছিল। সাধারণত ৩৫-৪০ ওভার নাগাদ সেই বলের সাদা রং নষ্ট হয়ে গিয়ে ব্যাটারদের দেখতে অসুবিধা হত, বল নরম হয়ে যাওয়ায় মারতে অসুবিধায় পড়তে হত, অনেকসময় বলের আকৃতিও যেত বিগড়ে। তেমন হলে আম্পায়াররা বল বদলাতে পারবেন, কিন্তু সেই বল আনকোরা নতুন হবে না, হবে একটু পুরনো বল। আগে হয়ে যাওয়া খেলাগুলোর মাঠ থেকে সংগ্রহ করে আনা অনেকগুলো বলের মধ্যে থেকে আম্পায়াররা বল বেছে নেবেন — এই ছিল নিয়ম। দুটো বলে খেলা শুরু হওয়ায় রিভার্স সুইং প্রায় বন্ধ, কারণ বল তেমন পুরনো হচ্ছে না। একই কারণে স্পিনারদের পক্ষে বল ঘোরানোও বেশি শক্ত হয়ে গেছে। টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটের প্রভাবে বাউন্ডারিও যে ছোট করে ফেলা হয়েছে, সচেতন টিভি দর্শকও তা বুঝতে পারেন। স্বভাবতই ব্যাটিং আগের চেয়ে সহজ হয়েছে। শতরানের সংখ্যা বেড়েছে, আগে ব্যাট করলে তিনশো রান করে নিশ্চিন্ত থাকার দিন শেষ।

১৯৭০ সালের ৫ জানুয়ারি খেলা হয়েছিল প্রথম একদিনের ক্রিকেট ম্যাচ, আর প্রথম দ্বিশতরান এসেছিল ১৬ ডিসেম্বর ১৯৯৭ সালে অস্ট্রেলিয়ার মহিলা ক্রিকেটার বেলিন্দা ক্লার্কের ব্যাট থেকে। পুরুষদের ক্রিকেটে দ্বিশতরান এসেছে আরও ১৩ বছর পরে শচীনের ব্যাট থেকে। অথচ ২০১১ থেকে গত ১১ বছরে বীরেন্দ্র সেওয়াগ, ক্রিস গেল, মার্টিন গাপ্টিল, ফখর জমান — সকলেই দ্বিশতরান করেছেন। একা রোহিত শর্মাই তিনটে দ্বিশতরানের মালিক। একদিনের ক্রিকেটে যাঁদের গড় পঞ্চাশের বেশি, তাঁদের মধ্যে মাইকেল বিভান আর নেদারল্যান্ডসের রায়ান টেন দুশখাতাকে বাদ দিলে সকলেরই কেরিয়ারের বেশিরভাগ সময় কেটেছে ২০১১ সালের অক্টোবরের পরে।

বলা বাহুল্য, এসব পরিবর্তন বিরাটের সুবিধা হবে বলে কেউ করে দেয়নি। তিনি যে নিয়মে খেলার সুযোগ পেয়েছেন, তার মধ্যে নিজের সেরা পারফরম্যান্স দিয়েছেন। কিন্তু সর্বকালের সেরাদের পাশে বসাতে হলে বা একেবারে গোট বলতে হলে এমন তুল্যমূল্য আলোচনা যে করতেই হয়। আসলে ওসব ব্র্যান্ডিংয়ের কারসাজি। আশা করা যায় ভক্তরা না বুঝলেও বিরাট নিজে সে কথা বোঝেন, ফলে মেসিসুলভ মূঢ়তায় কোনো লম্বকর্ণের সঙ্গে ক্যামেরার সামনে দাঁড়াবেন না। এখনো যে অনেক কিছু অর্জন করা বাকি আছে, তা বুঝলে তিনি আরও বড় ক্রিকেটার হতে পারবেন। ভারতীয় দলও আরও অনেক বেশি জয়ের মুখ দেখবে। ইতিহাস পারফরম্যান্স বোঝে। মন কি বাত বোঝে না, স্টাম্প মাইক কি বাতও বোঝে না।

ইনস্ক্রিপ্টে প্রকাশিত

এরপর কি মাঠে কুস্তি লড়বেন বিরাট কোহলিরা?

কেপটাউন টেস্টের তৃতীয় দিনে বিরাট কোহলি। ছবি টুইটার থেকে

যন্ত্রের যন্ত্রণা কথাটা নতুন নয়। কিন্তু যন্ত্র মানুষের সঙ্গে মিলে ষড়যন্ত্র করে — এ অভিযোগ নিঃসন্দেহে নতুন। সাই ফাইয়ের ভক্তরা অবশ্য বলবেন ভবিষ্যতে যন্ত্রেরা মন্ত্রণা করে মানুষের ভিটেমাটি চাটি করবে। আশঙ্কাটা হেসে উড়িয়ে দেওয়ার মত নয়, কিন্তু তখনো মানুষ আর যন্ত্র একে অপরের বিরুদ্ধে লড়বে বলেই তো মনে করা হয়। যন্ত্র আমার সাথে ষড় করে আপনাকে বিপদে ফেলবে — এমনটা এখনো কোনো হলিউডি চিত্রনাট্যকারের মাথায় আসেনি। তবে ভারতীয় ক্রিকেটাররা যে সে লোক নন। তাঁরা আমার আপনার চেয়ে কিঞ্চিৎ উচ্চস্তরের জীব বইকি। তাই গতকাল কেপটাউনের তৃতীয় টেস্টে ডিসিশন রিভিউ সিস্টেম দক্ষিণ আফ্রিকার অধিনায়ক ডীন এলগারকে এল বি ডব্লিউ হওয়ার হাত থেকে বাঁচিয়ে দিল দেখে সরোষে ভারত অধিনায়ক বিরাট কোহলি, তাঁর সহকারী কে এল রাহুল, আর বর্ষীয়ান ক্রিকেটার রবিচন্দ্রন অশ্বিন প্রযুক্তির, সম্প্রচারকারীর এবং দক্ষিণ আফ্রিকা দেশটার শাপ শাপান্ত করেছেন।

সুকুমার রায় লিখেছিলেন “ছায়ার সাথে কুস্তি করে গাত্রে হল ব্যথা।” এ যে “আজগুবি নয়, আজগুবি নয়, সত্যিকারের কথা —” বিরাটদের কাণ্ড না দেখলে বিশ্বাস করা শক্ত হত। উইকেটের সামনে গিয়ে স্টাম্প মাইক্রোফোনের উপর ঝুঁকে পড়ে মাঠে অনুপস্থিত লোকেদের গাল দেওয়া যত না ক্রিকেটারসুলভ তার চেয়ে বেশি জনি লিভারসুলভ। হাস্যকর দিকটা বাদ দিলে, এই আচরণ হল অসভ্যতা। এক দশক আগেও একে অসভ্যতাই বলা হত, ইদানীং সভ্যতার সংজ্ঞা বিস্তর বদলেছে। তাই ভারতের ক্রিকেটার, প্রাক্তন ক্রিকেটার, ধারাভাষ্যকার, সাংবাদিক প্রমুখ কাল থেকে নানারকম নরম ব্যাখ্যা দিচ্ছেন:

ক) “আসলে ওরা প্রাণ দিয়ে খেলে তো, এত বাজে সিদ্ধান্ত হলে কি আর মাথার ঠিক রাখা যায়?”

খ) “ক্রিকেটাররাও তো মানুষ। উত্তেজনার মুহূর্তে আবেগ এসে পড়া স্বাভাবিক।”

গ) “ঝোঁকের মাথায় করে ফেলেছে।”

আরও নানারকম ব্যাখ্যা সোশাল মিডিয়ায় দেখা গেছে, তালিকা দীর্ঘতর করা নিষ্প্রয়োজন। ধারাভাষ্যের জগতে ভারতের প্রবীণতম প্রতিনিধি সুনীল গাভস্কর। তিনি ভাল করেই জানেন, টেস্টে ১০,১২২ রান যতই ক্রিকেটের ইতিহাসে তাঁর আসন পাকা করে থাকুক, সেটা ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের কমেন্ট্রি চুক্তির গ্যারান্টি নয়। তাই গতকাল খেলার পর মার্ক নিকোলাস আর শন পোলকের সাথে বিতর্কিত মুহূর্তগুলো নিয়ে আলোচনা করার সময়ে তিনি কেবল এলগার আউট ছিলেন কিনা, তা নিয়েই কথা বলে গেলেন। ভারতীয় ক্রিকেটারদের অন্যায় আচরণ সম্বন্ধে ভাল বা মন্দ একটি শব্দও উচ্চারণ করলেন না। হাতে গোনা কয়েকজন সত্যি কথাটা বলার সাহস করেছেন, যেমন বাংলার ক্রিকেটার এবং একদা অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপ দলে বিরাটের সতীর্থ শ্রীবৎস গোস্বামী। তাঁকে যে পরিমাণ ট্রোলিংয়ের স্বীকার হতে হয়েছে, তা প্রমাণ করে ‘নতুন’ ভারতে অভদ্রতা পূজনীয়, ভদ্রতা বর্জনীয়।

কোনো সুস্থ দেশে গতকালের ঘটনার আলোচনায় এলগার আউট ছিলেন কি ছিলেন না তা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে না। কারণ সে দেশের অধিকাংশ মানুষ মানবেন, ক্রিকেটে আউট থাকা সত্ত্বেও আউট না হওয়া, আর আউট না হওয়া সত্ত্বেও আউট হয়ে যাওয়া চলতেই থাকে। সে জন্যে মন খারাপ হতে পারে, মাথা গরম হতে পারে। কিন্তু গোটা দেশটা আমাদের দলের বিরুদ্ধে লড়ছে, মেজাজ হারিয়ে এরকম মন্তব্য করার অধিকার কোনো আন্তর্জাতিক ক্রিকেটারের নেই। কিন্তু আজকের ভারতকে নিঃসংশয়ে সুস্থ দেশ বলা চলে না। দেশপ্রেমিকরাই বলে থাকেন, এখানকার যুবসমাজ নাকি এতটাই অসুস্থ, যে পিতৃমাতৃহীন হওয়ার শোকে তারা মুসলমান মহিলাদের কাল্পনিক নিলাম করার অনলাইন অ্যাপ তৈরি করে। আলোচনা যখন এমন একটা দেশে দাঁড়িয়ে হচ্ছে, তখন বিরাটদের আচরণ যে অন্যায় তা প্রমাণ করার জন্যে এলগার আউট ছিলেন কিনা সে আলোচনায় না গিয়ে উপায় নেই।

ক্রিকেট খেলায় যতরকম আউটের সিদ্ধান্ত হয়, তার মধ্যে চিরকালই সবচেয়ে বিতর্কিত লেগ বিফোর উইকেট বা এল বি ডব্লিউ। কারণ অন্য সব আউটের ক্ষেত্রেই যা ঘটেছে তার ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত হয়। কিন্তু এল বি ডব্লিউয়ের ক্ষেত্রে আম্পায়ার সিদ্ধান্ত নেন কী হতে পারত। বল যখন ব্যাটারের পায়ে লাগল তখন যদি পা-টা সেখানে না থাকত, তাহলে কি বলটা উইকেটে গিয়ে লাগতে পারত? যদি আম্পায়ারের সিদ্ধান্ত হ্যাঁ হয়, তাহলে তিনি তর্জনী তুলে ব্যাটারের মৃত্যুঘন্টা বাজিয়ে দেন। নাহলে ব্যাটার বেঁচে যান। যখন লাইভ টিভি ছিল না তখনকার কত আউট যে আসলে আউট ছিল না, আর কত নট আউট আসলে আউট ছিল, আমরা কখনো জানতে পারব না। ডিসিশন রিভিউ সিস্টেমের বয়স মাত্র ১৪ বছর (চালু হওয়ার সময়ে নাম ছিল আম্পায়ার ডিসিশন রিভিউ সিস্টেম)। ফলে লাইভ টিভি চালু হওয়ার পরেও দীর্ঘকাল এল বি ডব্লিউ বোলিং প্রান্তের আম্পায়ারের বিবেচনার উপরেই সম্পূর্ণ নির্ভরশীল ছিল। ইদানীং ইউটিউব আর টুইটারের কল্যাণে সেই সময়কার বহু আউট নিয়েই হাসাহাসি চলে, কারণ দেখা যায় বহু ব্যাটার কোনো যুক্তিতেই আউট ছিলেন না, আম্পায়ার আউট দিয়েছেন। অনেকে আবার বল ব্যাটে খেলেও এল বি ডব্লিউ আউট হয়েছেন। প্রযুক্তির প্রভূত উন্নতিতে বিপুল পরিমাণ টিভি দর্শকের চোখে আম্পায়ারের ভুল (ইচ্ছাকৃত বা অনিচ্ছাকৃত) নগ্নভাবে ধরা পড়ার কারণেই ইন্টারন্যাশনাল ক্রিকেট কাউন্সিল (আই সি সি) প্রথমে রান আউট ইত্যাদির জন্য তৃতীয় আম্পায়ার, পরে ডি আর এস চালু করতে বাধ্য হয়েছিল। ডি আর এসের আগেই এসেছে নিরপেক্ষ আম্পায়ার নিয়োগের নিয়ম। নব্বইয়ের দশকেও অনেকদিন যে দেশে খেলা হত, সে দেশেরই দুই আম্পায়ার খেলা পরিচালনা করতেন। কিন্তু বিশেষত এল বি ডব্লিউ আউটের ক্ষেত্রেই সন্দেহ জোরদার হয়ে উঠেছিল, যে আম্পায়াররা নিজের দেশের ব্যাটারদের ইচ্ছা করে আউট দেন না, আর প্রতিপক্ষের ব্যাটারদের আউট না হলেও আউট করে দেন। সেই কারণেই প্রথমে চালু হয় টেস্ট ক্রিকেটে দুজন, একদিনের ক্রিকেটে একজন নিরপেক্ষ দেশের আম্পায়ার নিয়োগ। পরে আসে ডি আর এস। অর্থাৎ এল বি ডব্লিউয়ের সিদ্ধান্তকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হতে না দেওয়া ডি আর এস প্রবর্তনের অন্যতম উদ্দেশ্য।

তাই ডি আর এস যতগুলো প্রযুক্তি ব্যবহার করে, তার অন্যতম হল হকআই। এল বি ডব্লিউয়ের আবেদন হলে এখন আম্পায়ার প্রথমে দ্যাখেন নো-বল ছিল কিনা, কারণ নো-বলে রান আউট ছাড়া অন্য আউট হয় না। তারপর দ্যাখেন বলটা লেগ স্টাম্পের বাইরে পিচ পড়েছিল কিনা। তেমনটা হয়ে থাকলে আইন অনুযায়ী তখনই আবেদন বাতিল হয়ে যায়। সেখানেও সব ঠিকঠাক থাকলে স্নিকোমিটার বা হটস্পট দিয়ে দ্যাখেন বল পায়ে লাগার আগে ব্যাটে লেগেছিল কিনা। কারণ আগে ব্যাটে লাগলে আর লেগ বিফোর উইকেটের প্রশ্ন ওঠে না। সব শেষে আসে বল ট্র্যাকিং, অর্থাৎ পা ওখানে না থাকলে বলটা উইকেটে গিয়ে লাগত কিনা। বল ট্র্যাকিং প্রযুক্তি বলের সিম, স্পিনের সঙ্গে সঙ্গে পিচের বাউন্সও বিচার করে। ভারত বা শ্রীলঙ্কার পিচে বল যে মাটিতে পড়ার পর কম লাফায়, অস্ট্রেলিয়া বা দক্ষিণ আফ্রিকায় বেশি — বল ট্র্যাকিংকে তা শেখানো আছে। ডীন এলগারের বেলায় যে দেখানো হয়েছে বল উইকেটের উপর দিয়ে চলে যেত, তা এই কারণেই ঘটেছে। এমন নয় যে বল ট্র্যাকিং অভ্রান্ত। এই সিরিজেরই প্রথম টেস্টে মায়াঙ্ক আগরওয়ালের বিরুদ্ধে আবেদন রিভিউ করতে গিয়ে দেখিয়েছিল বল উইকেটে লাগছে, অথচ প্রায় সকলেরই মনে হয়েছিল পেস বোলারের ওই বল বেশি বাউন্সের কারণে উইকেটে লাগত না। প্রযুক্তিটা সঠিক কিনা, আরও ভাল হতে পারে কিনা — তা নিয়ে তর্ক চলতে পারে। কিন্তু হক আই একটি নিরপেক্ষ সংস্থা। ভারতে যখন কোনো সিরিজ হয় তখনো এই প্রযুক্তি তারাই সরবরাহ করে, সম্প্রচারকারী সংস্থার কোনো হাত থাকে না। অতএব দক্ষিণ আফ্রিকার টিভি সম্প্রচারকারী সুপারস্পোর্টের বিরুদ্ধে বিরাট আর অশ্বিনের বিষোদ্গার একেবারেই অকারণ।

কে এল রাহুলের অভিযোগ আরও অন্যায়। স্টাম্প মাইকে শোনা গেছে তিনি বলছেন গোটা দক্ষিণ আফ্রিকা ভারতীয় দলের এগারোজনের বিরুদ্ধে লড়ছে। অথচ বোলিং প্রান্তের যে আম্পায়ার এলগারকে আউট দিয়েছিলেন, সেই মারায় ইরাসমাস দক্ষিণ আফ্রিকারই মানুষ। ১৯৯৪ সালে তৈরি হওয়া নিরপেক্ষ আম্পায়ারের নিয়ম কোভিড-১৯ অতিমারি চালু হওয়ার পর থেকে স্থগিত রয়েছে। আপাতত সমস্ত সিরিজেই যে দেশে খেলা হচ্ছে সে দেশের আম্পায়াররাই দায়িত্ব পালন করছেন। স্টাম্প মাইকে শোনা গেছে, টিভি আম্পায়ার এলগারকে আউট ছিলেন না বলার পর ইরাসমাস বলছেন “এ হতে পারে না।” আর আজ বাদে কাল যিনি ভারতের স্থায়ী অধিনায়ক হবেন, তিনি কিনা বলছেন গোটা দক্ষিণ আফ্রিকা ভারতীয় দলের বিরুদ্ধে মাঠে নেমে পড়েছে।

আসল সমস্যা বিরাট, রাহুল বা অশ্বিনের ঔদ্ধত্য নয়। সমস্যা ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের অর্থবলে (গোদা বাংলায় টাকার গরমে) আইসিসিকে ঠুঁটো জগন্নাথ করে রাখা। বিরাটরা জেনে গেছেন তাঁরা পৃথিবীর সবচেয়ে ধনী ক্রিকেট বোর্ডের কর্মচারী, তাই সব নিয়মকানুনের ঊর্ধ্বে। মাঠে গালিগালাজ করলে একসময় জরিমানা-টরিমানা হত, এখন ওগুলোকে আবেগের বহিঃপ্রকাশ বলে ধরা হয়। কারণ ভারতীয় ক্রিকেটারদের জরিমানা দিতে বলার ক্ষমতা আইসিসির নেই। ফলে গালিগালাজ মাঠের মধ্যেও সীমাবদ্ধ থাকে না। পরে সাংবাদিক সম্মেলনে এসে রাহুলের মত আপাত ভদ্র ক্রিকেটার গ্যাং ওয়ারের ভাষায় বলেন “আমাদের একজনকে ঘাঁটালে আমরা এগারোজন মিলে ঝাঁপিয়ে পড়ব।”

অভিজ্ঞ সাংবাদিক থেকে শুরু করে রকে বসা ক্রিকেট পণ্ডিত, ব্যক্তিগত জীবনে যথেষ্ট ভদ্র বিশ্লেষক থেকে শুরু করে পাড়ার বৌদি পর্যন্ত সকলের কাছেই এর সপক্ষে যুক্তি মজুত। প্রথমত, এটা আগ্রাসন, এটা ছাড়া জেতা যায় না। দ্বিতীয়ত, অস্ট্রেলিয়া, ইংল্যান্ডের যখন ক্ষমতা ছিল তখন ওরা এসব অনেক করেছে। এখন আমাদের ক্ষমতা আছে তাই করছি। বেশ করছি।

প্রথম যুক্তিটার মানে হল ক্লাইভ লয়েডের ওয়েস্ট ইন্ডিজ বা অর্জুন রণতুঙ্গার শ্রীলঙ্কা কোনোদিন কিচ্ছু জেতেনি। অজিত ওয়াড়েকর বা সৌরভ গাঙ্গুলির ভারতীয় দলের কথা ছেড়েই দিন। দেশে যেমন নরেন্দ্র মোদী সরকার আসার আগে কোনো উন্নয়ন হয়নি, তেমনি বিরাট কোহলি আর রবি শাস্ত্রী দায়িত্ব নেওয়ার আগে ভারতীয় ক্রিকেট দলও কখনো কিছু জেতেনি।

দ্বিতীয় যুক্তিটা আরও চমৎকার। বনলতা সেনগিরি (“এতদিন কোথায় ছিলেন?”) বাদ দিলেও যা পড়ে থাকে তা হল, আমরা অস্ট্রেলিয়া, ইংল্যান্ডের উপর প্রতিশোধ নিচ্ছি তাদের সঙ্গেই হাত মিলিয়ে। কারণ ক্রিকেটের খবর রাখলে আপনি নিশ্চয়ই জানেন, এই তিনটে দেশের ক্রিকেট বোর্ড এখন ‘বিগ থ্রি’। হাত মিলিয়ে আইসিসির রাজস্বের সিংহভাগ দখলে রেখে সংগঠনটিকে ঠুঁটো জগন্নাথ করে রেখেছে। এরা নিজেদের মধ্যেই খেলে বেশি, অন্যদের সাথে খেলে কম। তাই নিউজিল্যান্ড বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়ন হলেও ভারত তাদের সাথে দুটো টেস্টের বেশি খেলে না, ইংল্যান্ড নড়বড়ে দল হলেও তাদের বিরুদ্ধে খেলে পাঁচ টেস্টের সিরিজ।

বলতেই পারেন, জোর যার মুলুক তার। এভাবেই তো দুনিয়া চলছে। এতে আপত্তি করার কী আছে? ঠিক কথা। সমস্যা একটাই। এরপর আপনার ছেলেকে ক্রিকেট কোচিং সেন্টারে পাঠানোর পাশাপাশি কুস্তি বা বক্সিংও শেখাতে হতে পারে। কারণ মাঠে মাথা গরম হলেই যা ইচ্ছে তাই বলা যখন নিয়ম হয়ে যাচ্ছে, তখন কদিন পরে যা ইচ্ছে তাই করাও নিয়ম হয়ে দাঁড়াতে পারে। ১৯৯০-৯১ দলীপ ট্রফির ফাইনালে রশিদ প্যাটেল আর রমন লাম্বার উইকেট আর ব্যাট নিয়ে মারামারি হয়ত আজকের বাবা-মায়েদের কারো কারো মনে আছে। সেদিন ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড দুজনকে যথাক্রমে ১৩ মাস আর দশ মাসের জন্য নির্বাসন দিয়েছিল। এখন অবশ্য তেমন হওয়ার সম্ভাবনা কম। “ক্রিকেট কোনোদিনই ভদ্রলোকের খেলা ছিল না”, “এমন তো আগেও হয়েছে” ইত্যাদি যুক্তি আজকাল সবসময় তৈরি থাকে।

তথ্যসূত্র

১। https://cricketaddictor.com/india-tour-of-south-africa-2021/watch-virat-kohli-ravi-ashwin-kl-rahul-take-a-dig-at-broadcasters-after-dean-elgar-survives-due-to-drs-gaffe/

২। https://twitter.com/thefield_in/status/1481666634138136577?t=LjROQTTUwJIbCvy3p2M3Ew&s=03

৩। https://twitter.com/shreevats1/status/1481648590389149696?s=20

৪। https://www.hindustantimes.com/cricket/if-you-go-after-one-of-us-all-xi-will-come-right-back-rahul-england-s-sledging-against-bumrah-shami-101629168592536.html

৫। https://en.100mbsports.com/on-this-day-ugly-spat-between-rashid-patel-and-raman-lamba-breaks-out/

https://nagorik.net এ প্রকাশিত

বিরাট অপসারণ: দুই পুরনো বন্ধুর অস্ট্রেলিয় সিদ্ধান্ত

রবি শাস্ত্রী আর বিরাট একদিনের ক্রিকেটের দলের জন্য এত বছরেও একজন চার নম্বর খুঁজে পাননি; কুলদীপ যাদব, যজুবেন্দ্র চহলকে তাঁদের আজ মনে হয়েছে দারুণ প্রতিভা, কাল ভেবেছেন আবর্জনা।

এই মুহূর্তে ভারতীয় ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়ার চেয়ে বেশ খানিকটা এগিয়ে। ভারত আপাতত টেস্টে এক নম্বর দল, টি টোয়েন্টিতে দু নম্বর। একমাত্র একদিনের ক্রিকেটে অস্ট্রেলিয়া তিন, ভারত চার। এবারের টি টোয়েন্টি বিশ্বকাপ ছাড়া অস্ট্রেলিয়ার ঝুলিতে তেমন বড় সাফল্য নেই অনেকদিন হল। নিজের দেশে পরপর দুবার ভারতের কাছে টেস্ট সিরিজ হেরেছে। বল ট্যাম্পারিং, অশ্লীল এস এম এসে জর্জরিত। সুতরাং বলাই যায়, অস্ট্রেলিয়ার সে রাম নেই। কিন্তু সে অযোধ্যাও নেই বললে ভুল হবে। ব্যক্তির চেয়ে দল বড় — তাদের ক্রিকেট সংস্কৃতি বদলায়নি। ওটাই দীর্ঘমেয়াদি দলগত সাফল্যের চাবিকাঠি। ওভাবেই পরপর তিনটে বিশ্বকাপ জেতা দল গড়ে ওঠে।

ভারতীয় ক্রিকেটে এ সংস্কৃতি কোনোদিন ছিল না। এখানে শচীন তেন্ডুলকরের অবসর বর্ণময় করে তুলতে আলাদা সিরিজের আয়োজন হয়। এই তারকাকেন্দ্রিক সংস্কৃতিকে জোর ধাক্কা দিয়েছিলেন অস্ট্রেলিয় গ্রেগ চ্যাপেল। যে দুজন ঘটনার কেন্দ্রে ছিলেন, তাঁদের একজন এখন ভারতীয় দলের কোচ। অন্যজন বোর্ড সভাপতি। সেই রাহুল দ্রাবিড় আর সৌরভ গাঙ্গুলির যুগলবন্দিতে বিরাট কোহলির দুটো মুকুট গেছে, পড়ে আছে একটা

মনে রাখা ভাল, সৌরভ অধিনায়ক হওয়ার আগে টিম ইন্ডিয়া কথাটার প্রচলন হয়নি। সবাই জানত দিল্লি লবি, মুম্বাই লবি ইত্যাদির কথা। প্রতিভাবান ক্রিকেটাররা ‘টিম’ হয়ে উঠতেন না, যা বিদেশে মুখ থুবড়ে পড়ার বড় কারণ ছিল। সে ঐতিহ্য ভেঙে নতুন উত্তরাধিকার তৈরি করেছিলেন সৌরভই। ফলে সে কালের বঙ্গ মিডিয়া সৌরভের অধিনায়কত্ব চলে যাওয়ায় রাহুলকে যতই মিচকে শয়তান বা বিশ্বাসঘাতক প্রতিপন্ন করে থাক, সৌরভ বিলক্ষণ বুঝতেন দলের স্বার্থ সবার উপরে। আর সে স্বার্থ রাহুলের হাতে নিরাপদ। না বুঝলে ওই ঘটনার পরেও এত বছর দুজনের বন্ধুত্ব অম্লান থাকত না। বোর্ড সভাপতি হয়ে সৌরভ রাহুলকে প্রথমে ‘এ’ দলের দায়িত্বে, পরে সিনিয়র দলের দায়িত্বে আনতেন না।

র‍্যাঙ্কিং যা-ই বলুক, সাদা বলের ক্রিকেটে একগুচ্ছ দ্বিপাক্ষিক সিরিজ জিতে একের পর এক আইসিসি প্রতিযোগিতায় যে দল ব্যর্থ, সে দলের নেতৃত্ব বদলের প্রয়োজন অনস্বীকার্য। সৌরভ, রাহুলদের সময় হলে হয়ত সেমিফাইনাল, ফাইনালে উঠলেই প্রশংসা করা যেত। গত এক দশকে সাফল্যের যে খতিয়ান মহেন্দ্র সিং ধোনি, বিরাট, রোহিত নিজেরাই তৈরি করেছেন — তাতে এখন আর সেমিফাইনালে উঠলেই হাততালি দাবি করা চলে না।

রবি শাস্ত্রী আর বিরাট একদিনের ক্রিকেটের দলের জন্য এত বছরেও একজন চার নম্বর খুঁজে পাননি; কুলদীপ যাদব, যজুবেন্দ্র চহলকে তাঁদের আজ মনে হয়েছে দারুণ প্রতিভা, কাল ভেবেছেন আবর্জনা। এরকম অনেক উদাহরণ দিয়ে প্রমাণ করা যায়, কেন সাদা বলের ক্রিকেটে তাঁদের উত্তরাধিকার বলতে পড়ে থাকবে অশ্বডিম্ব। সে আলোচনা বড় পরিসরের জন্য তোলা থাক।

আপাতত যা বলার, তা হল সামনে দাঁড়িয়ে নেতৃত্ব দিয়ে ১৯৯৯ বিশ্বকাপ জেতানো অধিনায়ক স্টিভ ওয়কেও অস্ট্রেলিয়া ২০০৩ বিশ্বকাপের দলে রাখেনি। কারণ তিনি মন্থর হয়ে যাচ্ছিলেন, ব্যাটে রান ছিল না। আমাদের বিরাট আন্তর্জাতিক ম্যাচে শেষ শতরান করেছেন ২৩ নভেম্বর ২০১৯,  কলকাতায়। একদিনের ক্রিকেটে শেষ শতরান ১৪ আগস্ট ২০১৯, পোর্ট অফ স্পেনে। তাঁর সামগ্রিক গড় যেখানে প্রায় ষাট, সেখানে ওই শতরানের পর থেকে গড় ৪৩.২৬। অধিনায়কত্ব থাক, উনি বরং ব্যাটিংয়ে মন দিয়ে শচীনের শতরানের রেকর্ড ভাঙুন। মাত্র সাত পা দূরে আছেন।

আরও পড়ুন বিরাট, রোহিত, রাহুলদের সত্য রচনা চলছে চলবে

বিরাটভক্তদের অভিমান হচ্ছে, এই কড়া সিদ্ধান্তটা নিদেন পক্ষে সাংবাদিক সম্মেলন ডেকে ঘোষণা করা হল না বলে। অন্যায় অভিমান নয়, তবে কিনা বিরাট নিজেও সাংবাদিক সম্মেলনের বিশেষ ভক্ত নন। অপ্রিয় প্রশ্ন এলে কেমন রেগে যান, ইন্টারনেট ঘাঁটলেই দেখতে পাবেন। তাঁকে সরানোর সিদ্ধান্ত সাংবাদিক সম্মেলনে ঘোষণা করলে অপ্রিয় প্রশ্নই বেশি আসত নির্ঘাত। প্রধান নির্বাচক চেতন শর্মার বয়স হয়েছে। তাঁর সুস্থ শরীরকে ব্যস্ত করার ঝুঁকি অ্যাঞ্জিওপ্লাস্টি হওয়া বোর্ড সভাপতি না নিয়ে ভালই করেছেন।

উত্তরবঙ্গ সংবাদে প্রকাশিত

ভারতীয় ক্রিকেট মানে ফলাফল নিরপেক্ষ ব্যবসা

জয় যা প্রকাশ করে তার চেয়ে বেশি লুকিয়ে ফেলে, পরাজয় যা ধামাচাপা রয়েছে সেদিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করে। টি টুয়েন্টি বিশ্বকাপ থেকে ভারতের সত্বর বিদায়ে মুহ্যমান ক্রিকেটপ্রেমীরা এভাবে ভেবে দেখতে পারেন। বিশ্বের সেরা টি টুয়েন্টি প্রতিযোগিতার আয়োজন করে বলে যে দেশ দাবি করে থাকে, ২০০৭ সালের পর থেকে তাদের একবারও চ্যাম্পিয়ন হতে না পারা এবং ২০১৪ সালের পর আর ফাইনালের মুখ না দেখার পিছনে গভীরতর অসুখ খুঁজে দেখার এই তো সুযোগ। কোভিড যুগের আন্তর্জাতিক ক্রিকেট দলগুলোর মত বুদ্বুদের মধ্যে বাঁচার ইচ্ছা প্রবল না হলে এ-ও ভেবে দেখা দরকার, সমস্যা কি কেবল দল নির্বাচন আর রণকৌশলে, নাকি গোটা ক্রিকেট কাঠামোটাই একদা জনপ্রিয় টুথপেস্টের বিজ্ঞাপনে দেখানো অসুস্থ মাড়ির মত “ভাল দেখায় বাইরে, পচে গেছে ভিতরে?”

এসব হিং টিং ছট প্রশ্ন যদি মাথার মধ্যে কামড়াতে শুরু করে, তাহলে বিশেষত বাঙালি ক্রিকেটপ্রেমী বিপদে পড়বেন। কারণ সৎভাবে এগুলোর উত্তর খুঁজতে গিয়ে প্রথমেই উঠে আসবে এক বঙ্গসন্তানের অনাচারের কথা। দেড়-দুশো বছর আগে মাইকেল মধুসূদন লিখেছিলেন “হে বঙ্গ, ভাণ্ডারে বিবিধ রতন”। সেসব দিন চলে গেছে, এখন ভাঁড়ে মা ভবানী। সৌরভ গাঙ্গুলিই যে আমাদের সর্বশেষ রত্ন, তা কলকাতার কাগজ ও টিভি চ্যানেলের চিৎকৃত প্রচারে গত শতাব্দীর শেষ দিক থেকেই আমরা মেনে নিয়েছি। তিনি শতরান করলে বাঙালি আবার জগৎসভায় শ্রেষ্ঠ, বাদ পড়লে কেন্দ্রের বঞ্চনা। স্টিভ ওয়কে ইডেন টেস্টে টসের জন্য অপেক্ষা করিয়ে রাখা আমাদের কাছে বিদ্যাসাগরের সাহেবের টেবিলে খড়ম পরিহিত পা তুলে বসার চেয়ে কম নয়। সে যুগে আমরা আরেকটু হলেই লর্ডসের ব্যালকনিতে জামা খুলে মাথার উপর বনবন করে ঘোরানোর কীর্তিকে শিকাগো ধর্মমহাসভায় স্বামী বিবেকানন্দের বক্তৃতার পাশে বসিয়ে দিতাম। এহেন তেজস্বী বাঙালি আইকন কিনা ক্রিকেট বোর্ড সভাপতি হওয়ার জন্য সমর্থন নিলেন এন শ্রীনিবাসনের। কে শ্রীনিবাসন? যাঁর অনাচার ভারতীয় ক্রিকেটে চূড়ান্ত অচলাবস্থার সূচনা করে। এমন অচলাবস্থা, যে সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে বোর্ডের সংবিধানই নতুন করে লিখতে হয়েছিল। বোর্ডের দায়িত্ব দীর্ঘদিন ন্যস্ত ছিল সর্বোচ্চ আদালত নিযুক্ত অ্যাড-হক কমিটির হাতে। সেই অ্যাড-হক কমিটির প্রধান বিনোদ রাই, সব জেনেও, সৌরভের হাতে দায়িত্ব তুলে দিয়ে বিদায় নেওয়ার সময়ে বলেছিলেন, সৌরভের চেয়ে যোগ্যতর কোনো ব্যক্তি নেই এই পদের জন্য।

যোগ্যতম হলেও, নতুন সংবিধান অনুযায়ী এই ২০২১ সালের নভেম্বর মাস পর্যন্ত সৌরভের বোর্ড প্রেসিডেন্ট পদে থাকারই কথা নয়। ২০১৯ সালের অক্টোবরে ওই চেয়ারে বসার আগেই ক্রিকেটে অ্যাসোসিয়েশন অফ বেঙ্গলের কর্তা হিসাবে তিনি দু দফায় পাঁচ বছরের বেশি কাটিয়ে ফেলেছিলেন। তাই বোর্ড প্রেসিডেন্ট হিসাবে তাঁর মেয়াদ ছিল ন মাস। ছ বছর পদাধিকারী থাকার পর তিন বছরের কুলিং অফ পিরিয়ড, যখন সৌরভ কেবল বোর্ড নয়, বোর্ডের অধীন কোনো রাজ্য ক্রিকেট সংস্থার পদাধিকারীও থাকতে পারেন না। কিন্তু ভ্লাদিমির পুতিনের মত সৌরভও বোধহয় মনে করেন দেশোদ্ধারের পথে আইনকে বাধা হতে দেওয়া চলে না। তাই তাঁর নেতৃত্বাধীন বোর্ড সুপ্রিম কোর্টে সংশোধিত সংবিধান পুনরায় সংশোধনের আর্জি জানিয়ে বসল। অতঃপর “তারিখ পে তারিখ”।

তা-ও না হয় মানা গেল, কিন্তু যোগ্যতমের আমলে কেমন উদ্বর্তন হল ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের? যে ঘরোয়া ক্রিকেটের শক্তিবৃদ্ধির জন্যই শাস্ত্রী-কোহলির দল গত কয়েক বছরে বিশ্ব ক্রিকেট শাসন করতে পেরেছে বলে শোনা যায়, সেই ঘরোয়া ক্রিকেটারদের অতিমারীর আমলে হাঁড়ির হাল। ২০২০ সালের মে-জুন নাগাদ প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, অনেকেরই বোর্ডের কাছে এক নয়, দুই নয়, তিন বছরের টাকা পাওনা। আম্পায়ার, স্কোরার, কিউরেটার প্রমুখ খেলা চালানোর জন্য অপরিহার্য ব্যক্তিদেরও একই অবস্থা। সবে এ বছর সেপ্টেম্বরে বোর্ড বর্ধিত ফি এবং ক্ষতিপূরণ ঘোষণা করেছে। দেশের প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটের প্রধানতম প্রতিযোগিতা রঞ্জি ট্রফি, যা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়েও বন্ধ থাকেনি, আদৌ খেলা হয়নি ২০২০-২১ মরসুমে। বোর্ডের বক্তব্য ছিল, দু মাসের বায়ো বাবল তৈরি করে সংক্ষিপ্ত রঞ্জি ট্রফি আয়োজনও অসম্ভব। তার চেয়ে সাদা বলের প্রতিযোগিতার আয়োজন করা ভাল। প্রেসিডেন্ট সৌরভ আর তাঁর যোগ্য সহকারী জয় শাহ কিন্তু ইতিমধ্যে আপ্রাণ চেষ্টায় আইপিএল সম্পূর্ণ করেছেন। ভারতীয় ক্রিকেটের সাথে যুক্ত কর্মকর্তা, সাংবাদিক, ভাষ্যকার — সকলেই আইপিএলকে বুক দিয়ে আগলে রাখেন। কারণ ওতেই নাকি বোর্ডের সংসার চলে, ওটি না বাঁচলে ঘরোয়া ক্রিকেট বাঁচবে না। অথচ কার্যক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে আইপিএল ফুলে ফেঁপে উঠছে, ঘরোয়া ক্রিকেটকে সতীনের সন্তানের মত দয়ার দানে বেঁচে থাকতে হচ্ছে।

ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড অধুনা পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী বোর্ড; ইংল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়াকেও পিছনে ফেলে দিয়েছে বলে ইদানীং এক ধরনের জাতীয়তাবাদী গর্বও প্রচারিত হয়। কিন্তু সে গর্বে মহিলাদের কোনো ভাগ নেই। কন্যাসন্তানের পিতা সৌরভের আমলে অস্ট্রেলিয়ার মহিলাদের বিগ ব্যাশের আদলে মহিলাদের আইপিএল কিন্তু চালু হল না। অথচ ভারতের মহিলারা গত বছর ফেব্রুয়ারি মাসে অস্ট্রেলিয়ায় টি টুয়েন্টি বিশ্বকাপের ফাইনালে উঠেছিলেন। তবু, যে আইপিএল নাকি সর্বরোগহর বড়ি, মহিলাদের জন্য তার ব্যবস্থা করার সুযোগ হয় না পৃথিবীর সবচেয়ে ক্ষমতাশালী বোর্ডের।

সব মিলিয়ে বলা চলে, গোড়া কেটে আগায় জল দেওয়া চলছে। আইনকানুনকে কাঁচকলা দেখানো বাহাদুরিতে পরিণত, কনফ্লিক্ট অফ ইন্টারেস্ট বদ রসিকতায়। বোর্ড প্রেসিডেন্ট স্বয়ং এমন এক বাণিজ্যিক সংস্থার বিজ্ঞাপনে মুখ দেখান, যারা জাতীয় দলের শার্ট স্পনসরের প্রতিদ্বন্দ্বী। আবার প্রেসিডেন্ট যুক্ত, এমন সংস্থা আইপিএলের ফ্র্যাঞ্চাইজ কিনে ফেলে। স্পষ্টতই সৌরভ শ্রীনিবাসনের পথেই হাঁটছেন। ইন্ডিয়া সিমেন্টসের দোর্দণ্ডপ্রতাপ ওই মালিক একইসঙ্গে বোর্ড প্রেসিডেন্ট এবং চেন্নাই সুপার কিংসের মালিক ছিলেন। দলের অধিনায়ক মহেন্দ্র সিং ধোনিকে ইন্ডিয়া সিমেন্টসের ভাইস-প্রেসিডেন্টও করেছিলেন। সৌরভ সে তুলনায় আর এমন কী করেছেন?

আরও পড়ুন বোর্ডের ঘরে যে ধন আছে, ক্রিকেটের ঘরে সে ধন আছে?

নিয়ম ভাঙা ক্ষমতা প্রদর্শনের উপায় হয়ে দাঁড়ালে ভাল কাজও বাঁকা পথে করতে ভাল লাগে। ঠিক সেভাবেই ভারতীয় দলের কোচ হিসাবে নিয়োগ করা হল রাহুল দ্রাবিড়কে। আইনে যেমন বলা আছে সেভাবে ক্রিকেট অ্যাডভাইসরি কমিটি (সদস্য মদনলাল, রুদ্রপ্রতাপ সিং ও সুলক্ষণা নায়েক) বসিয়ে প্রার্থীদের সাক্ষাৎকার নিয়ে কোচ নির্বাচন করলেও দ্রাবিড় যোগ্যতম প্রার্থী হিসাবে নির্বাচিত হতেই পারতেন। কিন্তু তাতে গুণময় বাগচীর মত পেশি ফোলানো যায় না। তাই প্রথমে খবর ছড়িয়ে দেওয়া হল, দ্রাবিড় কোচ হতে পারেন। ফলত আর কেউ প্রার্থী হলেন না। অতঃপর ঘোষণা করা হল, আর কোনো প্রার্থী নেই, অতএব দ্রাবিড়ই কোচ হলেন। জনপ্রিয় প্রার্থীকে রিগিং করে জিতিয়ে দিলে তাঁর যোগ্যতাকে কতটা সম্মান দেওয়া হয় তা অশোক ভট্টাচার্যের একদা ঘনিষ্ঠ, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আশীর্বাদধন্য এবং অমিত শাহের পুত্রবন্ধু সৌরভ জানেন আশা করা যায়।

অবশ্য এত কথা তাঁর না ভাবলেও চলবে। কারণ ভারতীয় ক্রিকেট এমন এক উচ্চতায় পৌঁছেছে, যেখানে জাতীয় দলের ব্যর্থতাতেও কিছু এসে যায় না। কদিন পরেই আইপিএলের খেলোয়াড় নিলাম হবে। আপামর ক্রিকেটভক্ত, সাংবাদিক, বিশ্লেষক টাকার অঙ্ক নিয়ে আলোচনা করবেন। তারপর আসবে বসন্ত — আইপিএলের আরও একটি মরসুম। দখিনা হাওয়ায় ভেসে যাবে আরও একটি আইসিসি টুর্নামেন্ট থেকে শূন্য হাতে ফেরার দুঃখ। ক্রিকেট খেলার ফলাফল নিরপেক্ষ ব্যবসায় পরিণত হতে আর বেশি দেরি নেই।

উত্তরবঙ্গ সংবাদে প্রকাশিত