এটা যুদ্ধ নয়, ক্রিকেট; ওঁরা গ্ল্যাডিয়েটর নন, ক্রিকেটার

বিশ্বকাপ, চ্যাম্পিয়নস ট্রফি, এশিয়া কাপের সময়ে কি জওয়ানরা লড়েন না? তা যদি হয় তাহলে তো আরও বেশি করে ভারত-পাক ক্রিকেট ম্যাচ হওয়া উচিত।

ম্যাচে তখন টানটান উত্তেজনা। টিভির পর্দায় দেখা গেল ওভারের মাঝখানে দীর্ঘদেহী হার্দিকের খর্বকায় রিজওয়ানকে পিছন থেকে জড়িয়ে ধরার দৃশ্য। চমকে যাওয়ার পর রিজওয়ানও ভালবেসে টেনে নিলেন হার্দিকের হাত। ম্যাচের আগের কদিন টুইটারে ভাইরাল হয়েছিল একটা ভিডিও। চোটের কারণে এশিয়া কাপ ক্রিকেট থেকে ছিটকে যাওয়া শাহীন আফ্রিদি মনমরা হয়ে প্র্যাকটিসের মাঠের ধারে বসেছিলেন। বিরাট কোহলিকে আসতে দেখে উঠে দাঁড়ালেন। বিরাট জিজ্ঞেস করলেন পা কেমন আছে। আফ্রিদি বললেন, আমরা আপনার জন্য প্রার্থনা করছি, যেন আপনার ফর্ম ফিরে আসে।

এই আবহে খেলা হল রবিবারের ভারত-পাক ক্রিকেট ম্যাচ। এর আগের ম্যাচ হয়েছিল ২৪ অক্টোবর ২০২১, ওয়ার্ল্ড টি টোয়েন্টি উপলক্ষে। সে ম্যাচ দাপটে জিতেছিল পাকিস্তান। এবারে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হল। শেষপর্যন্ত তফাত গড়ে দিলেন পান্ড্য, ভারত জিতল। কিন্তু কোনো ম্যাচেই কোনো অবাঞ্ছিত উত্তাপ তৈরি হয়নি। বরং সাম্প্রতিককালে ভারত বনাম ইংল্যান্ড খেলা হলে ম্যাচের আগে, পরে এবং মাঝে বেশ কিছু অপ্রীতিকর পরিস্থিতি তৈরি হতে দেখা গেছে। চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী দুই প্রতিবেশীর খেলা বরং ঠিক সেভাবেই হল যেভাবে হওয়া উচিত – ব্যাট বলের লড়াইতে কেউ কাউকে এক ইঞ্চি জমি ছাড়ল না, কিন্তু মুখের হাসিটি বজায় রইল। শুধু তা-ই নয়, পাক ব্যাটার ফখর জমান আউটের আবেদন না হলেও বল ব্যাটে লেগেছে বুঝতে পেরে নিজেই হেঁটে বেরিয়ে গেলেন। তবু কিন্তু এই দুই দলের মধ্যে সিরিজ খেলা হবে না।

আরও পড়ুন টুপির আমি টুপির তুমি?

শেষ ভারত-পাকিস্তান টেস্ট খেলা হয়েছিল ২০০৭ সালে আর শেষ একদিনের ম্যাচ ২০১৯ সালের বিশ্বকাপে। দীর্ঘকাল হল ভারত বহুদলীয় প্রতিযোগিতার বাইরে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে খেলে না। আবার আইসিসি টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপ বহুদলীয় হওয়া সত্ত্বেও সেখানে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে খেলে না। কেন খেলে না? কারণ স্ট্যান্ড-আপ কমেডিয়ান কুণাল কামরার ভাষায় “জওয়ান সীমা পে লড় রহে হ্যাঁয়”। তাহলে বিশ্বকাপ, চ্যাম্পিয়নস ট্রফি, এশিয়া কাপের সময়ে কি জওয়ানরা লড়েন না? শান্ত হয়ে বসে টিভিতে খেলা দেখেন? তা যদি হয় তাহলে তো আরও বেশি করে ভারত-পাক ক্রিকেট ম্যাচ হওয়া উচিত। প্রক্সি ওয়ারে সীমান্তের এপারে ওপারে নিয়মিত যে জওয়ানদের প্রাণ যায়, সেগুলো বেঁচে যাবে। আসল কথা, নিয়মিত খেলা হলে প্রত্যেকটা ম্যাচ নিয়ে যুদ্ধ যুদ্ধ পরিবেশ তৈরি করা আর সম্ভব হবে না। মাঠে ক্রিকেটারদের হাসিঠাট্টা, স্বাভাবিক ব্যবহার দেখতে দেখতে এপারের দেড়শো কোটি আর ওপারের কোটি পঁচিশেক মানুষ যদি বিশ্বাস করতে শুরু করে, প্রতিবেশী দেশের মানুষ মানেই ইবলিশের বাচ্চা বা রক্তপিপাসু জেহাদি সন্ত্রাসবাদী নয়, তাহলে সমূহ বিপদ দুই দেশের শাসকদেরই। তখন দেশের বেকারত্ব, দেশের মুদ্রাস্ফীতি, দেশের সাম্প্রদায়িকতা ইত্যাদি নিয়ে জবাবদিহি করতে হবে। সে বিপদ এড়াতে কালেভদ্রে ম্যাচ হবে, পিচে পপিং ক্রিজ চিহ্নিত করতে টানা লাইনটাকে নিয়ন্ত্রণরেখার সাথে তুলনা করে সম্প্রচারকারী সংস্থা বিজ্ঞাপন দেবে আর প্রগলভ রবি শাস্ত্রীর কণ্ঠে শোনানো হবে – এটা স্টেডিয়াম নয়, কলিসিয়াম। ওরা ক্রিকেটার নয়, গ্ল্যাডিয়েটর। ভারত-পাকিস্তান ম্যাচ মানেই খেলার মাঠ লড়াইয়ের মাঠ হয়ে উঠবে।

উত্তরবঙ্গ সংবাদে প্রকাশিত

ফিফা থেকে নির্বাসন মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা মাত্র

এমন কি হতে পারে যে ফিফা সর্বভারতীয় ফুটবল ফেডারেশনকে (এআইএফএফ) নির্বাসন দেওয়ায় কোনো ভারতীয় খুশি হয়েছে? খেলোয়াড় বা ফুটবলপ্রেমীদের খুশি হওয়ার তো প্রশ্নই ওঠে না। ক্লাবকর্তারাই বা খুশি হবেন কী কারণে? এমনিতেই তো ইন্ডিয়ান সুপার লিগের বাইরের ক্লাবগুলো ধুঁকছে। তার উপর ফিফার নির্বাসন মানে ফিফা থেকে এশিয়ান ফুটবল কনফেডারেশন (এএফসি) মারফত যা টাকাকড়ি এআইএফএফের কাছে আসত তা-ও বন্ধ থাকবে। ফলে ছিটেফোঁটা যা চুঁইয়ে পড়ত ক্লাবগুলোর দিকে, সে পথও বন্ধ হয়ে যাবে। স্পনসরদেরও খুশি হওয়ার কারণ নেই। স্পনসর মানে মোটের উপর আইএসএলের স্পনসরদের কথাই ধরতে হবে, কারণ তার বাইরে ভারতীয় ফুটবলে আগ্রহী স্পনসর পাওয়া বেশ কঠিন। নিষেধাজ্ঞার ফলে ভারতের আর সব ফুটবল প্রতিযোগিতার মত আইএসএলও হয়ে গেল ফিফার অনুমোদনহীন লিগ। অর্থাৎ আগামী জানুয়ারির ট্রান্সফার উইন্ডোতে নতুন করে বিদেশি ফুটবলার আর নেওয়া যাবে না। বিদেশিরাই যে আইএসএলের জাঁকজমকের অর্ধেক, তাতে সন্দেহ নেই। তাহলে এই নির্বাসনে খুশি হতে পারে কে?

আপাতদৃষ্টিতে মনে হয় কেউ না। কিন্তু ভারত হল রামায়ণ-মহাভারতের দেশ। এখানে গল্পের মধ্যে গল্প, তার মধ্যে গল্প, সে গল্পের মধ্যেও আরেকখানা গল্প থাকে। এখানে আপাতদৃষ্টির ধোঁকা খাওয়াই স্বাভাবিক। সুতরাং হতেই পারে যে একদল ফুটবল প্রশাসক এই নির্বাসনে খুশিই হয়েছেন। দেশের ফুটবল এতে গোল্লায় গেলেও তাঁদের কিছু যায় আসে না। ভারতীয় ফুটবল ফেডারেশনকে পৈতৃক জমিদারি বানিয়ে ফেলেছিলেন তাঁরা, সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে সেই জমিদারি হাতছাড়া হয়েছে মাত্র কয়েক মাস আগে। তখনই তাঁরা হুমকি দিয়েছিলেন, আদালত দেশের ফুটবল প্রশাসনে হস্তক্ষেপ করলে ফিফা এ দেশের ফেডারেশনকে ব্যান করে দিতে পারে। সেই হুমকি ফলে যাওয়ায় আজ তাঁরা বাঁকা হাসতেই পারেন, মনে মনে বলতেই পারেন “দ্যাখ কেমন লাগে।” এই তাঁরা কারা? রহস্য করবার দরকার নেই, কারণ দেশের আপামর ফুটবলপ্রেমী জানেন প্রফুল প্যাটেল আর তাঁর সাঙ্গোপাঙ্গরাই আইনত মেয়াদ ফুরিয়ে যাওয়ার পরেও এআইএফএফ এক্সিকিউটিভ কমিটি আলো করে বসেছিলেন। সুপ্রিম কোর্টের গুঁতোয় আসনচ্যুত হওয়ার পর এবার যদি তিনি প্রফুল্ল অন্তরে এস্রাজ বাজান তাহলে অবাক হওয়ার কিছু নেই।

আদালতের নির্দেশে ভারতীয় ফুটবল ফেডারেশনের সভাপতি পদ হারালেও প্রফুল কিন্তু এখনো ফিফায় ভারতের প্রতিনিধি। ফলে কোনো কোনো মহল থেকে এমন আশঙ্কাও প্রকাশ করা হচ্ছে, যে ফিফার সিদ্ধান্তে তাঁর হাত আছে। কিন্তু ঘটনা হল, এর জন্য প্রফুলকে খুব একটা দায়ী করা চলে না। ফিফা আন্তর্জাতিক অলিম্পিক কমিটির (আইওসি) সনদে স্বাক্ষরকারী। সেই সনদ অনুযায়ী বিশ্বের কোনো দেশের কোনো খেলার জাতীয় ফেডারেশনে সরকার বা কোনো তৃতীয় পক্ষ হস্তক্ষেপ করলে সেই ফেডারেশনের অনুমোদন বাতিল করা হয়। সুতরাং যে মুহূর্তে ভারতের সুপ্রিম কোর্ট কমিটি অফ অ্যাডমিনিস্ট্রেটর্স (সিওএ) গঠন করে ফেডারেশনের দায়িত্ব তাদের হাতে দিয়েছে, সেই মুহূর্তেই নির্বাসনের সম্ভাবনা তৈরি হয়ে গিয়েছিল।

১৬ অগাস্ট সিওএ যে বিবৃতি দিয়েছে, তাতে বলা হয়েছে ফিফার সিদ্ধান্ত তাদের অবাক করেছে। কারণ সর্বোচ্চ আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী, ভারত সরকারের জাতীয় ক্রীড়া বিধি মেনে নতুন এক্সিকিউটিভ কমিটি গঠনের জন্য নির্বাচনের কাজ দ্রুত এগোচ্ছিল এবং এই প্রক্রিয়া নিয়ে অনবরত ফিফা, এএফসি সহ সব পক্ষের সঙ্গে আলাপ আলোচনা চলছিল। উপরন্তু, ২৫ জুলাই ফিফা-এএফসি এআইএফএফের অ্যাক্টিং সেক্রেটারি জেনারেলকে যে চিঠি দিয়েছিল প্রস্তাবিত স্ট্যাটিউট সম্পর্কে, সেই চিঠির সুপারিশ মেনে স্ট্যাটিউটে বদলও করা হয়েছে। কিন্তু ২৫ জুলাইয়ের চিঠিটি পড়লে সিওএ-র যুক্তি অসার বলে মনে হবে। কারণ ওই চিঠিতে প্রস্তাবিত স্ট্যাটিউট সম্পর্কে ফিফা-এএফসি কিছু আপত্তি প্রকাশ করেছিল। সেই আপত্তিগুলোতে বিশেষ আমল দেওয়া হয়নি, কোনো মতে পাশ কাটিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। ১৫ অগাস্ট সাসপেনশনের চিঠিতে ফিফা সেকথাই উল্লেখ করেছে।

তবে এই নির্বাসন দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার সম্ভাবনা কম। ফিফা কাউন্সিল নির্বাসনের সিদ্ধান্ত জানানোর পাশাপাশিই বলেছে, ভারত সরকারের ক্রীড়া ও যুবকল্যাণ দপ্তরের সঙ্গে তারা যোগাযোগ রাখছে এবং আশাবাদী যে সমস্যা মিটে যাবে। আসলে এই সিদ্ধান্তের তাৎক্ষণিক ফলগুলোর অন্যতম হল অক্টোবর মাসে এ দেশে যে মেয়েদের অনূর্ধ্ব-১৭ ফুটবল বিশ্বকাপ হওয়ার কথা, তা বাতিল হয়ে যাওয়া। সেটা হলে এ দেশের মেয়েদের ক্ষতি, ফিফাও তেমনটা চায় না। এমনকি ভারত সরকারও চায় না। সবেমাত্র স্বাধীনতা দিবসের ভাষণে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী নারী অধিকার নিয়ে একগাদা ভাল ভাল কথা বলেছেন, এখনই মহিলাদের বিশ্বকাপ ভারত থেকে সরে গেলে তাঁর ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে বলেই হয়ত সরকারপক্ষের বিশ্বাস। নইলে সলিসিটর জেনারেল তুষার মেহতা স্বয়ং সুপ্রিম কোর্টের কাছে জরুরি ভিত্তিতে ১৭ তারিখই এ বিষয়ে শুনানির আর্জি জানাবেন কেন? সকাল সকাল শুনানি হওয়ার কথা এবং সর্বোচ্চ আদালত যদি সিওএকে ফিফার কথামত কাজ করার নির্দেশ দেন, তাহলে ভারতের নির্বাসন উঠে যেতে সপ্তাহ খানেকের বেশি লাগবে না।

কিন্তু নির্বাসন ক্ষণস্থায়ী বা দীর্ঘস্থায়ী – যা-ই হোক না কেন, দেশের ফুটবল এ অবস্থায় পৌঁছল কেন তা নিয়ে কিন্তু আলোচনা করতেই হবে। সুপ্রিম কোর্ট তো স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে ফুটবল প্রশাসনে নাক গলায়নি। দিল্লির আইনজীবী রাহুল মেহরাকে আদালতের দ্বারস্থ হতে হয়েছিল কেন? সেসবের বিস্তারিত আলোচনা এখানে পাবেন।

প্রফুল প্যাটেল শুধু অগণতান্ত্রিক উপায়ে ফেডারেশনের মাথায় বসেছিলেন তা নয়, তাঁর আমলে কুকীর্তির তালিকা বেশ লম্বা। তাঁর আমলেই ফেডারেশনকে কার্যত ঠুঁটো জগন্নাথে পরিণত করে দেশের ফুটবলের দণ্ডমুণ্ডের কর্তায় পরিণত হয়েছে একটি ফ্র্যাঞ্চাইজ লিগ, যার দৃষ্টান্ত পৃথিবীর কোনো দেশের ফুটবল ইতিহাসে পাওয়া যাবে না। আজ যে ফুটবলপ্রেমীরা গেল গেল রব তুলছেন, তাঁদের স্বীকার করে নেওয়ার সময় এসেছে, যে ফিফার সিদ্ধান্ত আসলে মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা। এমন নয় যে ভারতীয় ফুটবল দারুণ স্বাস্থ্যের অধিকারী ছিল, হঠাৎ বিনা মেঘে বজ্রপাত হয়ে প্রাণহানি হয়েছে। মোহনবাগান আর ইস্টবেঙ্গল আইএসএল খেলছে – বাংলার ফুটবলপ্রেমীরা এতেই খুশি হয়েছেন। দেশের আর কোথায় ফুটবল খেলাটার কী হল না হল তা নিয়ে তাঁরা মাথা ঘামাতে রাজি হননি। তাঁরা খেয়ালই করেননি কলকাতা লিগটা পর্যন্ত ছেলেখেলায় পরিণত হয়েছে। কখন হয়, কেমন করে হয় তার কোনো ঠিক নেই। দুই বড় ক্লাব নিজেদের মর্জি অনুসারে খেলে অথবা খেলে না। বছর ১০-১৫ আগে কলকাতায় তিন প্রধান ছাড়াও কিছু ক্লাব দেখা যেত যারা চমকে দেওয়ার মত ফুটবল খেলত। একসময় জাতীয় লিগে খেলা টালিগঞ্জ অগ্রগামী গেল কোথায়? নতুন দল গড়ে মোহনবাগান, ইস্টবেঙ্গলের সাথে সমানে সমানে লড়ে যাওয়া ইউনাইটেড এসসি তো আইএসএল থেকে শত হস্ত দূরে। এমনকি মহমেডান স্পোর্টিংও অনেকখানি পিছিয়ে পড়েছে।

একই চিত্র জাতীয় স্তরে। মাহিন্দ্রা কোম্পানি দল তুলে দিয়েছে অনেকদিন হল। জেসিটির নাম আর শোনা যায় এখন? সবই আইএসএলের দোষে হয়েছে তা নয়, কিন্তু আইএসএল সব সংকটের শীর্ষবিন্দু। মুমূর্ষু ভারতীয় ফুটবলের চিকিৎসা করার বদলে প্রফুলের আমলে স্যালাইন, অক্সিজেন খুলে নিয়ে শেষ করে দেওয়ার ব্যবস্থা হয়েছে আইএসএলের মাধ্যমে। গত দুই দশকে জাতীয় দলের সেরা খেলোয়াড়দের ধাত্রীভূমি উত্তর-পূর্বাঞ্চলের ছোট ছোট ক্লাবগুলো। শিলং লাজং, আইজল এফসির মত ক্লাবের বহু বছরের পরিশ্রমকে পাত্তা না দিয়ে তাদের করে দেওয়া হয়েছে দ্বিতীয় শ্রেণির (অর্থাৎ আই লিগের) নাগরিক। আর স্রেফ বিত্তের জোরে প্রথম সারির নাগরিক হয়েছে ইতিহাসবিহীন নর্থ ইস্ট ইউনাইটেড এফসি। ডেম্পো বা সালগাঁওকারের মত দল পড়ে রইল, গোয়া ফুটবলের ধারক ও বাহক হয়ে গেল এফসি গোয়া। বিজয়ন, সত্যেন, আনচেরি, পাপ্পাচানদের কেরল পুলিস কোথায় মিলিয়ে গেছে। টাইটেনিয়াম ক্লাবের কথা কজনেরই বা মনে আছে? সারা ভারত চিনছে কেরালা ব্লাস্টার্সকে।

আরও পড়ুন বড়লোকের খেলা

যে মোহনবাগান, ইস্টবেঙ্গলকে ফুটবল জগতের কেন্দ্রবিন্দু মনে করেন বাংলার ফুটবল পাগলরা, তাদের অবস্থাও তো কহতব্য নয়। প্রতি মরসুমের শুরুতেই মনে হয় এই বুঝি ইস্টবেঙ্গল দলটা উঠে গেল। তখন মুখ্যমন্ত্রী হস্তক্ষেপ করেন আর একটি জোড়াতালি দেওয়া ব্যবস্থা হয়। আর মোহনবাগান? তাদের নাম আদৌ মোহনবাগান কিনা তা নিয়েই সন্দেহ দেখা দেয় মাঝেমধ্যে। আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার প্রস্তুতি হিসাবে কলকাতা লিগ খেলে না দলটি, তারপর সেই প্রতিযোগিতায় হজম করে আসে আধ ডজন গোল।

এভাবে ভারতীয় ফুটবল কোনদিকে যাচ্ছিল? সুনীল ছেত্রী গোল করায় লায়োনেল মেসি আর ক্রিস্টিয়ানো রোনাল্ডোর সঙ্গে পাল্লা দেন বটে, কিন্তু জাতীয় দলের ফলাফলে বিশেষ তারতম্য হয়নি। বাইচুং ভুটিয়া থেকে সুনীল হয়ে জেজে লালপেখলুয়া – জাতীয় দল ফিফা র‍্যাঙ্কিংয়ে সেই একশোর আশপাশে ঘোরাফেরা করছে (২৩ জুন ২০২২ তারিখে সর্বশেষ আপডেটের সময়ে ১০৪)।

এই নির্বাসনে আশু ক্ষতি হল বরং মেয়েদের ফুটবলের। আমরা অনেকেই খবর রাখি না, মেয়েদের ফুটবলে ভারত অনেক এগিয়ে (৫ অগাস্ট ২০২২ তারিখে সর্বশেষ আপডেটের সময়ে র‍্যাঙ্কিং ৫৮)। সেই ফুটবল নিয়েও চরম ছেলেখেলা চলেছে প্রফুলের আমলে। শুধু যে অতি অযত্নে ইন্ডিয়ান উইমেন্স লিগ চালানো হয় তা-ই নয়, এ বছরের গোড়ায় দেশে এশিয়ান কাপের আয়োজন করতে গিয়ে চরম কেলেঙ্কারি হয়েছে। প্রতিযোগিতা চলাকালীন ভারতীয় দলের ১২ জন কোভিডাক্রান্ত হওয়ার মেয়েদের আর সেই প্রতিযোগিতায় খেলাই হয়নি। অথচ তার জন্যে কে দায়ী তা নিয়ে ফেডারেশন মাথা ঘামায়নি, আজ অবধি কারোর শাস্তিও হয়নি। ভারতের ফুটবল মহল, সংবাদমাধ্যম – সকলেই এত সচেতন যে ওসব হওয়ার আশাও বোধহয় কেউ করেনি। শুধু কি তাই? অনূর্ধ্ব-১৭ মহিলাদের জাতীয় দলের সহকারী প্রশিক্ষক অ্যালেক্স অ্যামব্রোসের বিরুদ্ধে যৌন হয়রানির অভিযোগ পর্যন্ত উঠেছে। সিওএ পত্রপাঠ তাঁকে বরখাস্ত করেছে। প্রফুলের আমল হলে কী হত কে জানে?

স্বভাবতই ফেডারেশনের নির্বাসনের খবরে যেরকম চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়েছে, কোমর ভেঙে যাওয়া ভারতীয় ফুটবলকে উঠে দাঁড়াতে গেলে কী করতে হবে তা নিয়ে সেরকম আলোচনা হবে না ধরে নেওয়া যায়। কারণ কোনো উপায়ে আইএসএল যথাসময়ে অনুষ্ঠিত হওয়া নিশ্চিত করা গেলেই কোমর যে আদৌ ভাঙেনি তা বিশ্বাস করে নেবেন ফুটবলপ্রেমীরাও।

নাগরিক ডট নেট-এ প্রকাশিত

বঙ্গবিভূষণ পুরস্কার কি এমনি এমনি খায়?

পুরস্কার কেন মূল্যবান? সকলে পায় না বলে। সারা পৃথিবীতে এত বৈজ্ঞানিক গবেষণা হচ্ছে, এত সাহিত্য সৃষ্টি হচ্ছে, এত সমাজসেবা হচ্ছে রোজ, অথচ ছশো কোটি মানুষের মধ্যে সবমিলিয়ে জনা দশেক প্রতি বছর নোবেল পুরস্কার পান। তাই ওই পুরস্কার প্রাপকদের সব দেশেই আলাদা সম্মান। একসময় পাড়ার পুজোর ধুনুচি নৃত্য প্রতিযোগিতায় ছোটদের উৎসাহিত করার জন্য সব অংশগ্রহণকারীকেই সান্ত্বনা পুরস্কার হিসাবে থালা, বাটি, চামচ ইত্যাদি দেওয়া হত। তাছাড়া আর কোনো পুরস্কারই রাম শ্যাম যদু মধু – সকলকেই দেওয়ার নজির নেই। আদৌ পুরস্কার বলে কিছু থাকা উচিত কিনা তা নিয়ে বিতর্কের অবকাশ আছে। কোনো দেশের বা রাজ্যের সরকারের আদৌ কাউকে পুরস্কার দেওয়া উচিত কিনা তা নিয়েও বিলক্ষণ তর্ক হতে পারে। ভারতের সংবিধান বলে আইনের চোখে, রাষ্ট্রের চোখে সব নাগরিকই সমান। সেক্ষেত্রে সরকারের বিশেষ বিশেষ নাগরিককে পুরস্কার দেওয়া উচিত কিনা তা-ও তর্কাতীত নয়।

এতৎসত্ত্বেও আমাদের দেশে স্বাধীনতার পর থেকেই নানারকম সরকারি পুরস্কার চালু আছে। প্রায় প্রতি বছরই প্রাপকদের তালিকা কোনো না কোনো দিক থেকে সমালোচিত হয় এটা যেমন সত্য, তেমনি প্রাপকদের সামাজিক সম্মান যে বৃদ্ধি পায় তা-ও অস্বীকার করার উপায় নেই। মুশকিল হল সাম্প্রতিককালে পুরস্কারগুলো যেন বড় বেশি সহজলভ্য হয়ে গেছে, ফলে মূল্য হারাচ্ছে। কেন্দ্রীয় সরকার পদ্মভূষণ, পদ্মবিভূষণ ইত্যাদি দিয়ে থাকেন। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পর গরীব পশ্চিমবঙ্গ সরকার চালু করেছিলেন বঙ্গবিভূষণ। সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়, সুচিত্রা সেন, মহাশ্বেতা দেবীর মত প্রবাদপ্রতিম মানুষ তা পেয়েছেন। এ বছর হঠাৎ ব্যক্তির পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানকেও পুরস্কৃত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন পশ্চিমবঙ্গ সরকার। কোন প্রতিষ্ঠান? না কলকাতার তিন ঐতিহ্যশালী ফুটবল ক্লাব – মোহনবাগান, ইস্টবেঙ্গল আর মহমেডান স্পোর্টিং

আরও পড়ুন আকাদেমি সমাচার: সাহিত্য পুরস্কার যার যার, তিরস্কার সবার

এমনিতে ভাল কাজের জন্য কোনো প্রতিষ্ঠানকে পুরস্কৃত করায় দোষ নেই। কিন্তু যে পুরস্কার নোবেল জয়ী অমর্ত্য সেন (তিনি অবশ্য নেবেন না জানিয়েছেন) আর অভিজিৎ বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায়কে দেওয়া হচ্ছে, সে জিনিস যে কোন যুক্তিতে তিনটি ফুটবল ক্লাবকে দেওয়া যেতে পারে তা দুর্বোধ্য। অর্থনীতিতে অমর্ত্য আর অভিজিৎ বিনায়কের কাজ গোটা বিশ্বে আলোচিত। অন্যদিকে কলকাতার তিন ক্লাবের কর্মকর্তারা নিজেদের অবিমৃশ্যকারিতায়, অপদার্থতায় একসময় যে শহরকে ভারতীয় ফুটবলের মক্কা বলা হত তাকে প্রায় ধাপার মাঠে পরিণত করেছেন। অমর্ত্য, অভিজিৎ আর তাঁদের অবদান যদি একই পুরস্কারের যোগ্য হয়, তাহলে সে পুরস্কারের আর মূল্য থাকল কী? শতাব্দী-প্রাচীন মোহনবাগান, ইস্টবেঙ্গল আর এককালে ভারত দাপিয়ে বেড়ানো মহমেডান স্পোর্টিংকে এই পুরস্কার প্রদান যদি তাদের অতীত গৌরবের কথা ভেবে দেওয়া হয়ে থাকে, তাহলে অবশ্য নস্ট্যালজিয়া-কাতর বাঙালির যোগ্য কাজই হয়। কিন্তু সেক্ষেত্রে প্রশ্ন ওঠে, এদের অবদান বুঝতে রাজ্য সরকারের এত সময় লাগল কেন? মোহনবাগানের এটিকের মুখাপেক্ষী হওয়া আর ইস্টবেঙ্গলের এই আছি এই নেই অবস্থা না হলে কি তাদের অবদান ঠাওর হচ্ছিল না?

অবশ্য যে রাজ্যে মুখ্যমন্ত্রীকে পুরস্কৃত করার জন্যে রাতারাতি নতুন সাহিত্য পুরস্কার চালু হয়ে যায়, সেখানে প্রদানের অর্থ, গুরুত্ব – এসব নিয়ে আলোচনা করা বাতুলতা।

উত্তরবঙ্গ সংবাদে প্রকাশিত

আন্তর্জাতিক ক্রিকেটকে মরে প্রমাণ করতে হবে সে মরেনি

যদি ২০১১ বিশ্বকাপ ফাইনালের সেরা খেলোয়াড় মহেন্দ্র সিং ধোনি ২০১৫ বিশ্বকাপের বছর খানেক আগে ঘোষণা করতেন তিনি আর একদিনের ক্রিকেট খেলবেন না, কেমন হত ব্যাপারটা? তখন ধোনির বয়স সবে ৩৩ বছর। চোট আঘাতে বেশ কিছুদিন মাঠের বাইরে থাকতে হয়েছিল এমন নয়, উইকেটরক্ষায় শিথিলতা দেখা যাচ্ছিল বা ব্যাটে রান ছিল না তা-ও নয়। সে অবস্থায় ক্রিকেটের অন্যতম বক্স অফিস ধোনি একদিনের ক্রিকেট থেকে অবসর নিলে অবশ্যই হইচই পড়ে যেত। কিন্তু এমন কিছু তখন ঘটেনি। সাদা বলের ক্রিকেটের সর্বকালের সেরাদের একজন ধোনি শুধু ২০১৫ বিশ্বকাপ নয়, ২০১৯ সালের বিশ্বকাপও খেলেছেন। কিন্তু ধোনি তখন ৫০ ওভারের ক্রিকেট থেকে অবসর নিয়ে ফেললে যতটা অবাক কাণ্ড হত, অতি সম্প্রতি তার চেয়েও অবাক কাণ্ড ঘটে গেছে। যে কোনো ধরনের ক্রিকেটে বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় অলরাউন্ডারদের একজন এবং ২০১৯ বিশ্বকাপ ফাইনালের সেরা খেলোয়াড় বেন স্টোকস একদিনের ক্রিকেট থেকে অবসর নেওয়ার সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেছেন। ১৯ জুলাই (মঙ্গলবার) দক্ষিণ আফ্রিকার বিরুদ্ধে ইংল্যান্ডের প্রথম একদিনের আন্তর্জাতিকই ছিল তাঁর খেলোয়াড় জীবনের শেষ একদিনের ম্যাচ।

ধোনি অবসর নিলে যা হত, স্টোকসের অবসর তার চেয়েও বেশি আশ্চর্যের কারণ স্টোকসের বয়স এখন ৩১। ব্যাটিংয়ের ক্ষেত্রে বলা হয়, এই বয়সে এসে একজন ব্যাটার আরও পরিণত হয়ে ওঠেন। আর স্টোকস তাঁর বোলিং বাদ দিয়ে শুধু ব্যাটার হিসাবেই ইংল্যান্ড দলে জায়গা পেতে পারেন তিন ধরনের ক্রিকেটেই। অতীতে বয়স বাড়লে, শরীরের ধকল নেওয়ার ক্ষমতা কমে গেলে অনেক অলরাউন্ডারই বোলিং করা ছেড়ে দিয়েছেন। ১৯৯৯ বিশ্বকাপে স্টিভ ওয় ব্যাট হাতেই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিলেন। সুপার সিক্সের শেষ ম্যাচে দক্ষিণ আফ্রিকার বিরুদ্ধে তাঁর অপরাজিত ১২০ রান ছাড়া অস্ট্রেলিয়ার শেষ অব্দি ফাইনালে পৌঁছত না। টাই হয়ে যাওয়া সেমিফাইনালেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ অর্ধশতরান করেছিলেন। স্টোকসও যে আগামী বছর ভারতীয় উপমহাদেশের বিশ্বকাপে ব্যাট হাতে পার্থক্য গড়ে দিতে পারতেন না তা বলা যায় না। কিন্তু তিনি সে বিকল্পের দিকে গেলেন না। এমন একজন ক্রিকেটার, যিনি নিঃসন্দেহে একদিনের ক্রিকেটের একজন গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড় এবং যাঁর খেলা সারা বিশ্বের ক্রিকেটপ্রেমীদের বিলক্ষণ আনন্দ দেয়, তিনি কেন এত তাড়াতাড়ি অবসর নিয়ে নিলেন?

ভবিষ্যতে যখন ক্রিকেটের ইতিহাস লেখা হবে, তখন ২০২২ সালের জুলাই মাসের তৃতীয় সপ্তাহ নিয়ে একটা আলাদা অধ্যায় লিখতে হবে। এই এক সপ্তাহে এমন তিনটে ঘটনা ঘটে গেছে যা আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের যুগ বদলে যাওয়ার সূচক। একটা অবশ্যই স্টোকসের মত একজন সক্রিয়, জনপ্রিয় এবং অল্পবয়সী ক্রিকেটারের একদিনের ক্রিকেট থেকে অবসর নেওয়া। কিন্তু ক্রিকেট দলগত খেলা। সেদিক থেকে আরও বড় ঘটনা স্টোকসের অবসরের ঠিক পাঁচদিন আগে দক্ষিণ আফ্রিকার ক্রিকেট বোর্ডের একটা সিদ্ধান্ত। ২০২৩ সালের জানুয়ারি মাসে অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে দক্ষিণ আফ্রিকার একটা একদিনের ম্যাচের সিরিজ খেলার কথা ছিল। কিন্তু ১৩ জুলাই ক্রিকেট সাউথ আফ্রিকা ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়াকে জানায় যে তারা ওই সিরিজ খেলতে অপারগ, কারণ ওই সময়ে তারা নিজেদের দেশে যে নতুন টি টোয়েন্টি ফ্র্যাঞ্চাইজ লিগ চালু করছে তার খেলা চলবে। সেই লিগ সামলে জাতীয় দলকে অস্ট্রেলিয়ায় পাঠানো সম্ভব নয়। আর বাকি বছরের ব্যস্ত ক্রীড়াসূচি থেকে আর কোনো সময় বার করাও সম্ভব নয়।

টি টোয়েন্টি ফ্র্যাঞ্চাইজ লিগের গুরুত্ব কতটা বেড়ে গেছে আর একদিনের আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের গুরুত্ব কতটা কমে গেছে তা এই ঘটনা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল। কারণ দক্ষিণ আফ্রিকার এই সিদ্ধান্তে তাদের আগামী বছরের বিশ্বকাপ খেলার উপরে প্রশ্নচিহ্ন তৈরি হল। আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিলের নিয়মানুযায়ী, এখন একদিনের আন্তর্জাতিক ম্যাচগুলো আইসিসি ক্রিকেট ওয়ার্ল্ড কাপ সুপার লিগের অংশ। ঠিক যেমন টেস্ট ম্যাচগুলো বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের অংশ। তফাত বলতে সুপার লিগের পয়েন্ট দিয়ে একদিনের ক্রিকেটের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন নির্ধারিত হয় না, ঠিক হয় কোন কোন দল সরাসরি বিশ্বকাপে খেলবে। ওই পয়েন্ট টেবিলের প্রথম আটটা দল (ভারত বাদে সাতটা, কারণ ভারত আয়োজক দেশ) ২০২৩ বিশ্বকাপে সরাসরি খেলার যোগ্যতা অর্জন করবে, বাকিদের পাঁচটা অ্যাসোশিয়েট দেশের সঙ্গে যোগ্যতা অর্জনকারী প্রতিযোগিতায় খেলতে হবে। সেখান থেকে মাত্র দুটো দেশ বিশ্বকাপে খেলার যোগ্যতা অর্জন করবে। ওই পয়েন্ট টেবিলে দক্ষিণ আফ্রিকা এই মুহূর্তে এগারো নম্বরে আছে। জানুয়ারি মাসের অস্ট্রেলিয়া সিরিজ বাদ যাওয়ায় মে মাসে ওই টেবিল চূড়ান্ত হওয়ার আগে দক্ষিণ আফ্রিকা আর মাত্র দুটো সিরিজ খেলার সুযোগ পাবে – ইংল্যান্ড আর ভারতের বিরুদ্ধে। সেই দুটো সিরিজ জিতে প্রথম পাঁচে উঠে আসা মোটেই সহজ নয়। যোগ্যতা অর্জনকারী প্রতিযোগিতাও নেহাত সহজ হবে না, কারণ সেখানে প্রতিদ্বন্দ্বী হিসাবে থাকতে পারে শ্রীলঙ্কা, আয়ারল্যান্ডের মত দলগুলো। এককথায়, দক্ষিণ আফ্রিকা বিশ্বকাপ খেলার সুযোগও ছেড়ে দিতে রাজি হয়ে গেল ফ্র্যাঞ্চাইজ টি টোয়েন্টি লিগ আয়োজন করার জন্য।

আইসিসির পূর্ণ সদস্য কোনো দেশের ক্রিকেট বোর্ডের এই মনোভাব ইঙ্গিত দিচ্ছে, পঞ্চাশ ওভারের ক্রিকেট হল অতীত। কুড়ি ওভারের ক্রিকেটই ভবিষ্যৎ। যুগপৎ এই ইঙ্গিতও পাওয়া যাচ্ছে, যে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের চেয়ে ফ্র্যাঞ্চাইজ ক্রিকেট বেশি গুরুত্বপূর্ণ। অন্তত একটা ক্রিকেট বোর্ড সেরকমই মনে করছে। ১৩ তারিখ ক্রিকেট সাউথ আফ্রিকা এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার ঠিক এক সপ্তাহ পরে ঘটেছে তৃতীয় ঘটনা। দক্ষিণ আফ্রিকার বোর্ড যে টি টোয়েন্টি লিগের জন্য অস্ট্রেলিয়া সফর বাতিল করেছে, সেই লিগের ফ্র্যাঞ্চাইজগুলোর নিলাম ছিল ২০ তারিখ। সেখানে ছটা ফ্র্যাঞ্চাইজের সবকটাই কিনে নিয়েছেন আইপিএলের বিভিন্ন ফ্র্যাঞ্চাইজের মালিকরা। মুম্বাই ইন্ডিয়ানস, চেন্নাই সুপার কিংস, দিল্লি ক্যাপিটালস, লখনৌ সুপার জায়ান্টস, সানরাইজার্স হায়দরাবাদ এবং রাজস্থান রয়্যালসের মালিকরাই এখন দক্ষিণ আফ্রিকার ওই লিগের ভাগ্যনিয়ন্তা। বহুদিন আগে থেকেই ক্যারিবিয়ান প্রিমিয়ার লিগ এবং আমেরিকার লিগে দল আছে কলকাতা নাইট রাইডার্সের মালিকদের, মুম্বাই ইন্ডিয়ানসের মালিকরা সংযুক্ত আরব আমিরশাহীর লিখে একটা দলের মালিক। ক্যারিবিয়ান লিগে পাঞ্জাব কিংস আর রাজস্থান রয়্যালসের মালিকদেরও দল রয়েছে। কিন্তু এর আগে কোনো লিগের সম্পূর্ণ দখল আইপিএল ফ্র্যাঞ্চাইজের মালিকদের হাতে আসেনি। তাদের ইচ্ছাতেই ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড এ পর্যন্ত পৃথিবীর অন্য কোনো দেশের ফ্র্যাঞ্চাইজ লিগে ভারতীয় ক্রিকেটারদের খেলার অনুমতি দেয়নি। এখন কথা হল, অন্য দেশের লিগের দলগুলোও যখন আইপিএলের ফ্র্যাঞ্চাইজ মালিকদেরই দখলে, তখন তাঁরা বিরাট কোহলি, রোহিত শর্মা, ঋষভ পন্থ, হার্দিক পাণ্ড্যার মত জনপ্রিয় ক্রিকেটারদের চাইবেন না কেন? চাইলে ভারতীয় বোর্ড কতদিন না বলতে পারবে? যদি না পারে, তখন ক্রিকেটাররা আর কত ক্রিকেট খেলবেন?

ক্রিকেটের মরসুম বলে আর কিছু নেই বহুকাল হল। বিশেষ করে ভারত, ইংল্যান্ড আর অস্ট্রেলিয়া যে পরিমাণ ক্রিকেটে খেলে তাতে ক্রিকেটারদের চোট, আঘাত লেগেই আছে। জেমস অ্যান্ডারসন, স্টুয়ার্ট ব্রড, চেতেশ্বর পুজারার মত যাঁরা শুধু টেস্ট খেলেন একমাত্র তাঁদেরই দেখা যায় চোট আঘাত কম। বিশেষ করে জোরে বোলাররা দুটো সিরিজ খেলেন তো চারটে সিরিজ মাঠের বাইরে থাকেন। ভারতীয় ক্রিকেটারদের চোট, আঘাত এবং ক্লান্তি তো এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে চলতি বছরের সাত মাস পূর্ণ হওয়ার আগেই সাতজন ভারত অধিনায়ক (বিরাট, রোহিত, কে এল রাহুল, হার্দিক, ঋষভ পন্থ, যশপ্রীত বুমরা, শিখর ধাওয়ান) দেখে ফেলব আমরা। স্টোকসও কিন্তু ক্রীড়াসূচিকে দোষ দিয়েছেন। তিনি বিবৃতিতে জানিয়েছেন, তিন ধরনের ক্রিকেটেই দলকে একশো শতাংশ দেওয়া তাঁর পক্ষে সম্ভব হচ্ছে না। তাই পঞ্চাশ ওভারের ক্রিকেট থেকে অবসর নিচ্ছেন।

ঘটনা হল, এভাবে চললে আরও অনেককেই তিরিশের আশেপাশে অবসর নিয়ে ফেলতে দেখা যাবে। একেকজন একেক ধরনের ক্রিকেট ছেড়ে দেবেন, কিন্তু নিশ্চিতভাবে বলা যায়, কেউই টি টোয়েন্টি ক্রিকেট ছাড়বেন না। দেশের হয়ে না খেললেও ফ্র্যাঞ্চাইজ ক্রিকেট খেলবেনই। ওয়েস্ট ইন্ডিজের মত যেসব দেশে ক্রিকেটের অবস্থা সঙ্গীন, ক্রিকেট বোর্ড তেমন টাকাপয়সা দিতে পারে না, সেখানকার ক্রিকেটাররা গত এক দশক ধরেই দেশের হয়ে খেলার তোয়াক্কা না করে সারা পৃথিবীর ফ্র্যাঞ্চাইজ লিগ খেলে বেড়িয়েছেন। কারণ ওখানে অনেক টাকা রোজগার করার সুযোগ রয়েছে। এই সুযোগ আরও বাড়ছে এবং বাড়বে। দক্ষিণ আফ্রিকার নতুন লিগে উৎসাহের কারণও আর্থিক। তাদের ক্রিকেটও ধুঁকছে। কিন্তু শুধু ওই একটা লিগ চালু হচ্ছে তা তো নয়, এ বছর থেকে আইপিএল আট দলের বদলে দশ দলের লিগ হয়ে গেছে। সম্প্রচার সত্ত্ব বিক্রি করে যে বিপুল পরিমাণ টাকা ভারতীয় বোর্ড আয় করছে, তাতে অদূর ভবিষ্যতে আরও দল যোগ করে আইপিএলকে আরও লম্বা করতে চাইলেও অবাক হওয়ার কিছু নেই। এদিকে আইসিসির কেন্দ্রীয় ক্রীড়াসূচি, যার পোশাকি নাম ফিউচার টুরস প্রোগ্রাম, তাতে আইপিএলের জন্য আলাদা করে আড়াই মাস সময় ছেড়ে রাখা হবে বলে একরকম সিদ্ধান্ত হয়ে গেছে। অস্ট্রেলিয়ার বিগ ব্যাশ লিগ এবং ইংল্যান্ডের একশো বলের লিগ দ্য হান্ড্রেড – সেসবের জন্যেও আলাদা করে সময় ধার্য করা হবে। শীর্ষস্থানীয় ক্রিকেটাররা এত লিগ ক্রিকেট খেলে আর দেশের হয়ে খেলবেন কখন? কেনই বা খেলবেন? ভারত, অস্ট্রেলিয়া, ইংল্যান্ডের মত যেসব দেশের বোর্ড সফল ফ্র্যাঞ্চাইজ লিগের রোজগার থেকে জাতীয় দলের ক্রিকেটারদের ভাল পারিশ্রমিক দিতে পারবে, তারা না হয় তবু পারবে। পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা, ওয়েস্ট ইন্ডিজ, নিউজিল্যান্ড – এরা কী করবে? এমনকি অস্ট্রেলিয়া, ইংল্যান্ডও খাবি খেতে পারে। এই সাইটেই আগে লিখেছি, এক অস্ট্রেলিয় সাংবাদিক আগামী মরসুমে আইপিএলে ক্রিকেটারদের পারিশ্রমিক এমন জায়গায় পৌঁছতে পারে যা ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়া অধিনায়ক প্যাট কামিন্সকে যা পারিশ্রমিক দেয় তার চেয়ে পাঁচ গুণ বেশি।

কিন্তু ক্রিকেটাররা নয়, আন্তর্জাতিক ক্রিকেটকে বিপদে ফেলছে বোর্ডগুলো এবং আইসিসির লোভ। এই শতাব্দীর প্রথম দশকেও পঞ্চাশ ওভারের ক্রিকেটে বেশ জনপ্রিয় ছিল ত্রিদেশীয়, চতুর্দেশীয় প্রতিযোগিতা; যদিও তার টান ক্রমশ কমে আসছিল। টি টোয়েন্টি যুগে আইসিসি ওই ধরনের প্রতিযোগিতা একেবারেই বন্ধ করে দিল, যাতে শুধুমাত্র আইসিসি আয়োজিত প্রতিযোগিতাগুলোই বহুদলীয় হয়। কেন? সম্প্রচারের লাভের গুড় যাতে কম না পড়ে। অথচ আইসিসি কিন্তু একই যুক্তিতে ওয়ার্ল্ড টি টোয়েন্টি ছাড়া কোনো বহুদলীয় টি টোয়েন্টি প্রতিযোগিতা হবে না বলেনি। একের পর এক ফ্র্যাঞ্চাইজ লিগ চালু হয়েছে। আসলে আইসিসির বলার উপায় ছিল না। কারণ সবচেয়ে প্রভাবশালী সদস্য ভারতই সবচেয়ে বড় লিগটা চালায়।

সুতরাং কুড়ি ওভারের ক্রিকেট তথা ফ্র্যাঞ্চাইজ ক্রিকেটের জনপ্রিয়তা ক্রমশ বাড়তে থাকল। ২০১১ বিশ্বকাপের পর পঞ্চাশ ওভারের খেলায় নতুন নিয়ম হল, দুই প্রান্ত থেকে দুটো বলে খেলা হবে। টি টোয়েন্টির মতই ছোট করে আনা হল বাউন্ডারি, তার উপর সারাক্ষণই পাওয়ার প্লে। ফলে পঞ্চাশ ওভারের খেলার নাটকীয়তার বারোটা বাজল। রিভার্স সুইং বন্ধ, স্পিনারদের ভূমিকা নগণ্য। কারণ বল পুরনো হয় না বলে ঘুরতে চায় না, ইনিংসের শেষ প্রান্তে বল নরম হয়ে গিয়ে আর মারা শক্ত হয় না। ফলে খেলাটা হয়ে দাঁড়াল টি টোয়েন্টিরই বড় সংস্করণ। সে জিনিস আলাদা করে দেখতে কার ভাল লাগে? এ নিয়ে শচীন তেন্ডুলকরের মত লোক আপত্তি করেছেন, আইসিসি কান দেয়নি। এখন একদিনের ক্রিকেট ভালবাসেন এমন অনেকে চাইছেন আইসিসি খেলাটাকে বাঁচানোর উদ্যোগ নিক। স্বয়ং ভারত অধিনায়ক রোহিত কদিন আগে মনে করিয়ে দিয়েছেন ত্রিদেশীয় সিরিজগুলোর কথা, বলেছেন ওগুলো আবার চালু করলে হয়ত খেলার সংখ্যা কমানো যাবে, ক্রিকেটারদের চাপ কমবে।

কিন্তু ক্রিকেটারদের চাপ কমাতে চাইছে কে? কেরি প্যাকারও ব্যবসায়ী ছিলেন। তিনি যখন ওয়ার্ল্ড সিরিজ চালু করে রঙিন জামা, সাদা বলের ক্রিকেটের রাস্তায় হাঁটেন, স্বার্থটা একেবারেই ব্যবসায়িক ছিল। কিন্তু তিনি ক্রিকেটকে ব্যবহার করে টাকা রোজগার করতে চেয়েছিলেন, আজকের ক্রিকেটকর্তারা টাকা রোজগার করার জন্যে ক্রিকেটকে ব্যবহার করতে চান। কথায় বলে, মানুষের প্রয়োজনের শেষ আছে, লোভের শেষ নেই। মুনাফার লোভ তো অসীম। একবিংশ শতকে যে কোনো বড় ব্যবসার আর্থিক বছরের লক্ষ্য ঠিক হয় আগের বছরের মুনাফা অনুসারে। এ বছর আরও বেশি মুনাফাই লক্ষ্য। অতএব ক্রিকেটের ব্যবসায় ফ্র্যাঞ্চাইজ লিগগুলোকে দৈর্ঘ্যে প্রস্থে বাড়িয়ে চলাই লক্ষ্য। তাতে শুধু একদিনের ক্রিকেট নয়, সব ধরনের আন্তর্জাতিক ক্রিকেটই গোল্লায় গেলে ক্ষতি নেই। বরং গোল্লায় না পাঠালেই নয়।

আরও পড়ুন IPL auction: Where privilege holds court

তার জন্য জনমত তৈরি করার কাজ আরম্ভ হয়ে গেছে পুরোদমে। ভারতীয় দলের কোচ হিসাবে সাফল্যের মুখ দেখে ক্রিকেটজগতে বিলক্ষণ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছেন রবি শাস্ত্রী। তিনি সম্প্রতি এজবাস্টন টেস্ট চলাকালীন সম্প্রচার সংস্থার স্টুডিওতে বসে বলেছিলেন, ক্রিকেটের ফুটবলের মতই ক্লাবভিত্তিক হয়ে ওঠা উচিত। ইংল্যান্ডের দ্য টেলিগ্রাফ কাগজের পডকাস্টে বুধবার ফের একথা বলেছেন। যোগ করেছেন, বিশেষ করে টি টোয়েন্টিতে দ্বিপাক্ষিক ক্রিকেট কমিয়ে ফেলা উচিত। শুধু বিশ্বকাপের সময়ে, আইসিসি টুর্নামেন্টগুলোর সময়ে জাতীয় দলগুলোর মধ্যে ক্রিকেট হওয়া উচিত। বাকি সময়টা দেশে দেশে ফ্র্যাঞ্চাইজ ক্রিকেট চলুক। তারপর, যেন টেস্ট ক্রিকেট বলে একটা বস্তু আছে সেকথা মনে পড়ায়, বলেছেন এমনটা করলে উপরের ছটা দেশের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক টেস্ট খেলার জন্যে বেশি সময় পাওয়া যাবে। টেস্ট ক্রিকেটকে দুটো স্তরে ভাগ করে দেওয়া দরকার। নইলে দশ বছর পরে টেস্ট ক্রিকেট বাঁচবে না। গোটা পডকাস্টের মধ্যে থেকে এই যে এক মিনিট তুলে টুইট করা হয়েছে, তাতেই কতগুলো চমকপ্রদ কথা!

পূর্ণ আত্মবিশ্বাসে আপেলের সঙ্গে কমলালেবুর তুলনা করার সাহস বোধহয় একমাত্র শাস্ত্রীরই আছে। তিনি এমন একটা খেলার সঙ্গে ক্রিকেটের তুলনা করেছেন যে খেলার একটাই ফরম্যাট – নব্বই মিনিট। সেই খেলার পথে হেঁটে নাকি টি টোয়েন্টি, টেস্ট, একদিনের ক্রিকেট – সবই বাঁচবে। উপরন্তু তিনি বলছেন দেশে দেশে ফ্র্যাঞ্চাইজ লিগগুলোকে উৎসাহ দেওয়া উচিত, তাহলে নাকি টেস্ট খেলার সময় পাওয়া যাবে। বছরে মাসের সংখ্যা না বাড়ালে যে দুটো একইসঙ্গে কী করে সম্ভব তা তিনিই জানেন। সব দেশে সফল ফ্র্যাঞ্চাইজ লিগ নেই। পাকিস্তানের মত দেশে থাকলেও রাজনৈতিক কারণে ক্রিকেট বিশ্বে পাকিস্তান পিছিয়ে, তাই পাকিস্তান সুপার লিগের অদূর ভবিষ্যতে আর্থিকভাবে আইপিএল বা বিগ ব্যাশের সমকক্ষ হয়ে ওঠার সম্ভাবনা কম। তাহলে ওই দেশগুলোতে ক্রিকেট বাঁচবে কী করে? ভারত, অস্ট্রেলিয়া, ইংল্যান্ডের দয়ায়? সে দয়ার বহর তো যথেষ্ট দেখা গেছে। আইসিসির রাজস্বের বেশিরভাগটা তাদেরই দিতে হবে, কারণ তারাই সবচেয়ে বেশি টাকা এনে দেয় – এই যুক্তিতেই তো তারা চলে। নিজেদের মধ্যে ছাড়া অন্য দেশগুলোর সাথে এক সিরিজে দুটোর বেশি টেস্টও তারা খেলতে চায় না।

আসলে শাস্ত্রী যা বলেছেন তা আইসিসি তথা বিসিসিআই কর্তাদের মনের কথা। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের যে ভবিষ্যৎ তিনি নির্দেশ করেছেন তা আরও সংকীর্ণ। ফলে মুনাফার ভাগীদার আরও কম, মুনাফার ভাগ বেশি। মুশকিল হল, ফুটবল খেলা হয় পৃথিবীর প্রায় সব দেশে, ক্লাবও অসংখ্য। ক্রিকেট এখনো গোটা পনেরো দেশের খেলা। কর্তারা যে পথে যেতে চাইছেন তাতে ওই পনেরোও কমতে কমতে পাঁচে এসে ঠেকতে পারে। আরও ভাল করে ভেবে দেখলে বোঝা যায়, যে দেশে ক্রিকেটের জনপ্রিয়তা সবচেয়ে বেশি, সেই ভারতেও আসলে খেলাটা নয়, খেলোয়াড়রা জনপ্রিয়। মাঠে, টিভির সামনে এবং মোবাইলের পর্দায় ভিড় হয় আন্তর্জাতিক তারকাদের টানে। আইপিএলের রমরমাও তাঁদের তারকাচূর্ণেই। ওটা বাদ গেলে কী হয়? ঘরোয়া ফুটবলের অবহেলিত প্রতিযোগিতা সন্তোষ ট্রফির ফাইনালে মাঠ ভরে যায়, অনলাইন স্ট্রিমিং দ্যাখে কয়েক লক্ষ লোক। কিন্তু রঞ্জি ট্রফি ফাইনালের স্কোরের খবরও রাখে না বিশেষ কেউ। সুতরাং আন্তর্জাতিক ক্রিকেট দুয়োরানী হয়ে গেলে ফ্র্যাঞ্চাইজ লিগ নিয়ে মাতামাতি থিতিয়ে যেতে বেশি সময় না-ও লাগতে পারে।

তবে ভবিষ্যৎ চিন্তা করার বদভ্যাস ক্রিকেটকর্তাদের নেই। শোনা যাচ্ছে অন্য দেশের লিগে দল কিনেছেন যাঁরা, তাঁদের চাপে আসন্ন সাধারণ সভায় বিসিসিআই নাকি ভারতীয় ক্রিকেটারদের বিদেশের লিগে খেলার অনুমতি দিয়ে দিতে পারে। হয়ত এখনই শীর্ষস্থানীয়দের ছাড়া হবে না, সরাসরি বোর্ডের সাথে চুক্তিবদ্ধ নন এমন ক্রিকেটারদের ছাড়া হবে। তা যদি ঘটে তাহলে ইতিমধ্যেই অবহেলিত ঘরোয়া ক্রিকেট আরও রক্তশূন্য হয়ে যাবে। বিপুল অর্থের হাতছানি উপেক্ষা করে কে পড়ে থাকবে জনশূন্য স্টেডিয়ামে চারদিন, পাঁচদিনের ক্রিকেট খেলার জন্য? তারপর শাস্ত্রীদের ফ্র্যাঞ্চাইজ লিগের বাড়বাড়ন্তে টেস্ট ক্রিকেট তথা আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের দীর্ঘজীবন প্রাপ্তির ফ্যান্টাসি কী করে পূরণ হবে কে জানে!

ইনস্ক্রিপ্টে প্রকাশিত

ইংল্যান্ডের নতুন ক্রিকেট ভারতীয়দের যা শেখাল

১৯৯৬ বিশ্বকাপে একদিনের ক্রিকেটের ব্যাটিংয়ে সনৎ জয়সূর্য আর রমেশ কালুভিথরনার জুটি বিপ্লব ঘটিয়ে দেওয়ার কিছুদিন পরের কথা। একটা ম্যাচে শ্রীলঙ্কার কাছে দুরমুশ হওয়ার পর ভারত অধিনায়ক শচীন তেন্ডুলকরকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, আগে ব্যাট করে কত রান করলে এই শ্রীলঙ্কাকে হারানো যাবে বলে মনে হয়? শচীন অসহায়ের মত উত্তর দিয়েছিলেন, বোধহয় এক হাজার। গত মঙ্গলবার এজবাস্টনে পুরস্কার বিতরণের সময়ে যশপ্রীত বুমরার মুখ দেখে মনে হচ্ছিল, মার্ক বুচার যদি জিজ্ঞেস করতেন চতুর্থ ইনিংসে কত রানের লক্ষ্যমাত্রা দিলে ইংল্যান্ডকে হারানো যাবে বলে মনে হয়, তাহলে বুমরা শচীনের উত্তরটাই দিতেন। টেস্ট ম্যাচের চতুর্থ ইনিংসে যদি কোনো দল ৩৭৮ রান মাত্র তিন উইকেট হারিয়ে তুলে পঞ্চম দিন মধ্যাহ্নভোজের বিরতির আগেই খেলা শেষ করে দেয়, তাহলে হেরে যাওয়া দলের অধিনায়ক এছাড়া আর কী-ই বা বলতে পারেন? এজবাস্টনে যা ঘটেছে তা আরও বেশি চমকপ্রদ, আরও সুদূরপ্রসারী এই জন্যে যে টেস্টের ইতিহাসে এই প্রথমবার কোনো দল পরপর চারটে ম্যাচ চতুর্থ ইনিংসে আড়াইশোর বেশি রান তুলে জিতল। এই রানগুলো যে গতিতে তোলা হয়েছে সেটাও টেস্ট ক্রিকেটে চট করে হয় না। ইংল্যান্ডের ক্রিকেট সাংবাদিক, সমর্থকরা আদর করে এই ধারার ব্যাটিংয়ের নাম দিয়েছেন ‘ব্যাজবল’ – দলের কোচ ব্রেন্ডন ম্যাককালামের ডাকনাম ব্যাজ, সেই কারণে। ঘটনাটা যেহেতু একবার মাত্র ঘটেনি, পরপর চারবার ঘটে গেল, সুতরাং মানতেই হবে ব্যাজবল একটা নতুন ধারা। ব্যাজবল টেস্ট ক্রিকেটের প্রচলিত ব্যাটিংয়ের বিরুদ্ধে এক বিদ্রোহ। যতক্ষণ ইংল্যান্ডের বাইরে নানারকম পরিবেশে, নানারকম পিচে এ জিনিস করা হচ্ছে ততক্ষণ একে বিপ্লব বলা চলবে না ঠিকই। কিন্তু প্রয়াসটা যে বৈপ্লবিক তা অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই।

এই সহজ কথাটা মেনে নিতে কিন্তু ভারতীয়দের প্রচণ্ড অসুবিধা হচ্ছে। এজবাস্টন টেস্টের আগে থেকেই ইংল্যান্ড যা করছে তা যে নতুন কিছু নয়, তা ঠারেঠোরে ভারতের প্রাক্তন ক্রিকেটার থেকে সাধারণ দর্শক – সকলেই বলছিলেন। জোর গলায় ব্যাজবল নিয়ে ঠাট্টা ইয়ার্কি শুরু হয়ে যায় ঋষভ পন্থ ভারতের ক্রিকেট ইতিহাসের অন্যতম স্মরণীয় ইনিংসে খেলে ফেলতেই। ইংল্যান্ড ব্যাটিং প্রথম ইনিংসে ব্যর্থ হওয়ায় তাচ্ছিল্যের মাত্রা বেড়ে যায়। জনি বেয়ারস্টোর একা কুম্ভের মত শতরানকে ধর্তব্যের মধ্যেই আনা হয়নি। বিশেষজ্ঞদের দেখাদেখি ক্রিকেটভক্তদের মধ্যেও সিরিজ সম্প্রচারকারী টিভি চ্যানেলের বিজ্ঞাপন মাফিক ইংল্যান্ডকে ধোলাই দেওয়া হচ্ছে বলে উল্লাস চলছিল। চতুর্থ দিন দুপুরে ভারত যখন ৩৭৮ রানের লক্ষ্যমাত্রা খাড়া করে অল আউট হয়ে গেল, তখন আমরা কত অসাধারণ দল, আমাদের সাথে প্রথম সাক্ষাতেই ব্যাজবল কেমন অশ্বডিম্ব প্রসব করল – এসব উচ্চমার্গীয় আলোচনা চলছিল। কিন্তু বার্মিংহামে সন্ধে নামার আগেই গলা নামিয়ে ফেলতে হল সকলকে। বেয়ারস্টো আর ইংল্যান্ড অধিনায়ক বেন স্টোকস ফর্মে থাকলে তবেই ব্যাজবল খেলা সম্ভব – এমনটা ভেবে নিশ্চিন্ত ছিলেন যে বিশেষজ্ঞরা, তাঁরা দেখলেন ইংল্যান্ডের দুই নড়বড়ে ওপেনারই দারুণ আত্মবিশ্বাসে আক্রমণাত্মক ব্যাট করলেন। জ্যাক ক্রলি কিছুটা সাবেকি ওপেনারদের ঢঙে খেললেও অ্যালেক্স লিজ শামি, বুমরা, সিরাজ – সকলকেই আক্রমণ করলেন। বাঁহাতি ব্যাটারের অফস্টাম্পের বাইরে তৈরি হওয়া পিচের ক্ষত কাজে লাগিয়ে রবীন্দ্র জাদেজা ভেলকি দেখাবেন বলে আশা ছিল। লিজ প্রথম ওভার থেকেই তাঁকে আক্রমণ করে সে আশায় জল ঢেলে দিলেন। সব মিলিয়ে ওভার পিছু পাঁচ রান করে নিয়ে ইংল্যান্ড একশো পেরিয়ে গেল। এরপর অস্থায়ী অধিনায়ক বুমরা দ্রুত দুটো উইকেট তুলে নিয়ে কিছুটা আশা দেখিয়েছিলেন। কিন্তু অতঃপর যা ঘটল, তাকে ক্রিকেটের সাহেবি পরিভাষায় কী বলে সে কথা থাক, গোদা বাংলায় বলে দুরমুশ করা। ক্ষণেকের জন্য বুদ্ধিভ্রংশ হয়ে জো রুট লিজের রান আউটের কারণ হয়ে না দাঁড়ালে হয়ত ভারতের হারের ব্যবধানটা আরও হতভম্ব করার মত হত। যা-ই হোক, শেষপর্যন্ত রুট আর বেয়ারস্টো যথাক্রমে ৮২.০৮ আর ৭৮.৬২ স্ট্রাইক রেটে ৩৪টা চার আর দুটো ছয় মেরে কার্য সমাধা করেছেন।

ভারতীয় পণ্ডিতরা ভাঙবেন তবু মচকাবেন না। ম্যাচের পর স্টুডিওতে বসে সঞ্জয় মঞ্জরেকর মাথা নেড়ে বললেন এই ব্যাটিংটা ব্যাজবল নয়, এটা হল “সেন্সিবল ব্যাটিং”। মানে মোগলসরাইয়ের নাম দীনদয়াল উপাধ্যায় নগর, টালিগঞ্জের নাম উত্তমকুমার। সঞ্জয় একা নন। ম্যাচটা শেষ হয়েছে বেশ কয়েকদিন কেটে গেল; অজিত আগরকর, বীরেন্দর সেওয়াগ, ওয়াসিম জাফররা এখনো অক্লান্ত পরিশ্রম করে যাচ্ছেন এটা প্রমাণ করতে যে ইংল্যান্ড নতুন কিছু আবিষ্কার করেনি। আপাতত যে তত্ত্বটি খাড়া করা হয়েছে, তা হল এমন ব্যাটিং তো ঋষভ পন্থই করে। এ আর নতুন কী? অনেকে ভিভ রিচার্ডস, সেওয়াগ, জয়সূর্য, অ্যাডাম গিলক্রিস্টেরও নাম করেছেন। পণ্ডিতদের (এবং ভারতীয় ক্রিকেট দলের ভক্তদের) বোঝানো দুঃসাধ্য যে কোনো একজন ব্যাটারের টেস্টে একদিনের ক্রিকেটের মেজাজে ব্যাটিং ব্যাজবল নয়, নতুন কিছুও নয়। স্বয়ং ডন ব্র্যাডম্যানই তো একবার একদিনে ৩০০ রান করেছিলেন (১১ জুলাই ১৯৩০)। কিন্তু একটা আস্ত টেস্ট দলের ব্যাটিং কৌশল হয়ে দাঁড়িয়েছে অন্য কিছু না ভেবে রান তাড়া করে যাওয়া, এক থেকে এগারো নম্বর, সবাই সেই নীতি মেনে ব্যাট করছে – এমনটা টেস্টের ইতিহাসে হয়নি। জো রুটের মত কপিবুক ব্যাটার নিয়মিত স্পিনারদের সুইচ হিট মারছেন, জোরে বোলারদের ব্যাট উল্টে স্লিপের মাথার উপর দিয়ে মাঠের বাইরে পাঠাচ্ছেন। অর্থাৎ দলের পরিচালকরা এটাই চাইছেন। স্টোকস এজবাস্টনে টস জিতে বলেছিলেন, তাঁর দল রান তাড়া করার ব্যাপারে আত্মবিশ্বাসী। টেস্ট ম্যাচে টসে জিতে ফিল্ডিং নেওয়া হবে না প্রথমে ব্যাট করা হবে, তা ঠিক হচ্ছে পিচ বা আবহাওয়ার চরিত্র দেখে নয়, রান তাড়া করার পারদর্শিতা মাথায় রেখে – এ জিনিস অভূতপূর্ব। শুধু টেস্ট খেলা নয়, খেলাটাকে নিয়ে আলোচনা করার মানদণ্ডটাই তো বদলে দিল ইংল্যান্ড। ব্যাজবল বলুন বা অন্য কিছু বলুন, নামে কী আসে যায়? ব্যাজবলকে যে নামেই ডাকা হোক, তার সুগন্ধ কমে না। মুশকিল হল, আমরা ভারতীয়রা আর খেলার সুগন্ধ পাই না, সেটা সামরিক লড়াইসুলভ প্রতিহিংসার পূতিগন্ধে চাপা পড়ে যায়। আমাদের দলকে প্রত্যেক খেলায় জিততে হবে, আম্পায়ারের প্রত্যেকটা সিদ্ধান্ত আমাদের পক্ষে যেতে হবে। অন্যথা হলে আমাদের খেলোয়াড়রা দাঁত নখ বের করে ফেলেন, আমরাও গ্যালারিতে বা টিভির/মোবাইলের সামনে বসে ব্যাপারটা জাতীয় সংকট হিসাবে ধরে নিয়ে ফুঁসতে থাকি। প্রতিপক্ষের ভাল বোলিং বা ব্যাটিং দেখে মুগ্ধ হওয়ার ক্ষমতাই যখন হারিয়ে গেছে, তাদের দলগত উদ্ভাবনী ক্ষমতা দেখে তারিফ করার ক্ষমতা আর থাকবে কী করে?

তবে প্রাক্তন ক্রিকেটাররা কী বললেন; বিশ্লেষক, সাংবাদিকরা কী টুইট করলেন আর তার প্রভাবে সাধারণ ক্রিকেটভক্তদের কী প্রতিক্রিয়া হল তা নিয়ে আলোচনার দরকার হত না, যদি না প্রতিপক্ষের অভিনবত্বকে গুরুত্ব না দেওয়ার প্রবণতা খোদ ভারতীয় ক্রিকেট দলের মধ্যেই দেখা যেত। এজবাস্টনে ভারত যেভাবে খেলেছে, তাতে মনে করা অমূলক নয় যে বুমরা আর কোচ রাহুল দ্রাবিড়ও ব্যাজবল ব্যাপারটাকে স্রেফ ইংরেজ মিডিয়ার অতিকথন বলেই ধরে নিয়েছিলেন। তাই তার জন্যে আলাদা করে কোনো পরিকল্পনা করেননি। নইলে হু হু করে রান হয়ে যাচ্ছে দেখেও রানের গতি কমানোর জন্যে চতুর্থ দিন রক্ষ্মণাত্মক ফিল্ডিং সাজানো, রক্ষণাত্মক বোলিং করা হল না কেন? তাহলে কি ধরে নেওয়া হয়েছিল, কোনোভাবে কয়েকটা উইকেট ফেলতে পারলেই ইংল্যান্ড ম্যাচ বাঁচানোর কথা ভাববে, যেমনটা টেস্ট ক্রিকেটে চিরকাল হয়ে এসেছে? দ্বিতীয় ইনিংসে ভারতের ব্যাটিং দেখেও মনে হয়নি, তারা এমন একটা দলের জন্য লক্ষ্য স্থির করছে যারা পরপর তিনটে টেস্টে ঝড়ের গতিতে আড়াইশোর বেশি রান তাড়া করে জিতেছে। চেতেশ্বর পুজারা ছাড়া আর কেউ যত বেশি সময় সম্ভব ব্যাট করে ইংল্যান্ডের রান তোলার সময় কমিয়ে ফেলার কথা ভেবেছেন, এমন লক্ষণ দেখা যায়নি। ঋষভ যে সময়ে যে শট খেলার সিদ্ধান্ত নিয়ে আউট হলেন, তাতেও মনে হয় তাঁর ধারণা হয়েছিল যথেষ্ট রান উঠে গেছে। এরপর দ্রুত যা পাওয়া তা-ই বোনাস। এমনিতে ৩৭৮ রান যথেষ্ট বলে মনে হওয়া দোষের নয়। কিন্তু ভিডিও অ্যানালিস্ট, পরিসংখ্যানবিদ ইত্যাদি বাহিনী সঙ্গে নিয়ে ঘুরে বেড়ানো বিশ্বের সবচেয়ে ধনী ক্রিকেট দল নিউজিল্যান্ড সিরিজের কথা জেনেও এত নিশ্চিন্ত থাকতে পারল?

অল্প সময়ের ব্যবধানে তিনটে টেস্টে (দক্ষিণ আফ্রিকায় শেষ দুটো টেস্ট আর এজবাস্টন) চতুর্থ ইনিংসে বোলাররা চরম ব্যর্থ হওয়ার পর যে ভারতীয় বোলিংকে এতদিন পাইকারি হারে সর্বকালের সেরা তকমা দেওয়া হচ্ছিল, তাকে নিয়েও প্রশ্ন তুলছেন অনেকে। আসলে অন্ধ হলে যে প্রলয় বন্ধ থাকে না, সে কথাটা অন্য সব ক্ষেত্রের মত ক্রিকেটেও আমরা অনেকদিন হল ভুলে থাকা অভ্যাস করেছি। তার ফল দেখে এখন মাথা চুলকোতে হচ্ছে। বোলারদের আর দোষ কী? ইংল্যান্ডের মত ফর্মে থাকা, জয়ের ছন্দে থাকা ব্যাটিংয়ের বিরুদ্ধে যদি আপনি তিনজন বোলার আর দুজন আধা অলরাউন্ডার নিয়ে খেলতে নামেন, তাহলে এমন ফল হওয়া তো অস্বাভাবিক নয়। বিশেষ করে যখন পিচ ম্যাচের শেষ দুদিনে বোলারদের যতটা সাহায্য করার কথা ততটা করল না।

তিনজন খাঁটি পেসারের সঙ্গে রবিচন্দ্রন অশ্বিনের মত একজন খাঁটি স্পিনারকে খেলানো হয়নি, খেলেছেন শার্দূল ঠাকুর আর রবীন্দ্র জাদেজা। এই একই কৌশল বিরাট কোহলি আর রবি শাস্ত্রীও নিয়েছিলেন ম্যাচের পর ম্যাচ। তা নিয়ে বিস্তর বিতর্ক হয়েছিল, কিন্তু দেখা যাচ্ছে রোহিত শর্মা (এ ম্যাচে বুমরা)-দ্রাবিড় জুটিও একই কৌশল নিচ্ছে। জাদেজাকে আধা অলরাউন্ডার বললে অনেকে যারপরনাই রাগ করেন, কিন্তু সত্যিটা হল দেশের মাঠে তিনি একজন ম্যাচ জেতানো স্পিনার। কিন্তু বিদেশে ক্রিকেট খেলার সময়ে তিনি একজন শক্তিশালী ব্যাটার, যিনি সামান্য হাত ঘোরাতে পারেন। গত ৪-৫ বছরে বিদেশের মাঠে ভারতের সবচেয়ে ধারাবাহিক ব্যাটার হলেন ঋষভ আর জাদেজা। ভারতের তিন, চার আর পাঁচ নম্বর সেই ২০১৮-১৯ সালের অস্ট্রেলিয়া সফরের পর থেকেই নড়বড়ে। পুজারা, বিরাট আর অজিঙ্ক রাহানে যতগুলো ইনিংসে একসাথে সফল হয়েছেন তার চেয়ে বেশি ইনিংসে ব্যর্থ হয়েছেন। উদ্ধার করেছেন নীচের সারির ব্যাটাররা। কখনো ঋষভ, কখনো বোলারদের সঙ্গে নিয়ে জাদেজা। অতএব উপরের তিনজনের ব্যর্থতা ঢাকতে তাঁর ব্যাটটা দরকার, তাতে বোলিং শক্তিতে যতই ঘাটতি হোক। একই কারণে বল হাতে তেমন সাফল্য না পেলেও হার্দিক পাণ্ড্যাকে এগারোটা টেস্ট খেলানো হয়েছিল। চোটের কারণে হার্দিক সরে যাওয়ার পর আনা হয়েছে শার্দূলকে। হার্দিকের তবু কিছুটা গতি ছিল, শার্দূলের তা-ও নেই। পিচ থেকে একেবারে সাহায্য না পেলে, প্রধান বোলাররা প্রথম দিককার উইকেটগুলো না নিতে পারলে শার্দূলের পক্ষে সফল হওয়া কঠিন। মূলত বুমরা আর শামি দীর্ঘকাল দারুণ ফর্মে থাকায় এইসব ফাঁকফোকর ধরা পড়েনি। তাঁরা এখন প্রাকৃতিক নিয়মেই ফর্ম হারাচ্ছেন, আর ফাঁকগুলো বিরাট হাঁ হয়ে দাঁড়াচ্ছে।

রাহানেকে অনেক ব্যর্থতার পরে বাদ দেওয়া হয়েছে, কিন্তু পুজারা আর বিরাট এখনো খেলে যাচ্ছেন। পুজারার কোনো ব্র্যান্ড ভ্যালু নেই, তিনি সাদা বলের ক্রিকেটে জায়গা করে নিতে পারেননি, আইপিএলও খেলেন না। তাই তাঁর যোগ্যতা নিয়ে তবু প্রশ্ন তোলা চলে। তিনি প্রথম একাদশ থেকে বেশ কয়েকবার বাদ গেছেন। উপর্যুপরি ব্যর্থতার পর ঘরের মাঠে শ্রীলঙ্কা সিরিজেও বাদ পড়েছিলেন, কাউন্টি ক্রিকেটে ঝুড়ি ঝুড়ি রান করে ফেরত আসতে হয়েছে। কিন্তু বিরাট হলেন অনির্বচনীয় গুণের আধার। ২০১৮-১৯ মরসুমের অস্ট্রেলিয়া সফরের পর থেকে বিরাট বা পুজারা কেউই ধারাবাহিকভাবে রান করেননি। নভেম্বর ২০১৯ থেকে দুজনের পারফরম্যান্স পাল্লা দিয়ে খারাপ হয়েছে। প্রথম জনের গড় ২৯.৬৪, দ্বিতীয় জনের ২৮.৩১। কিন্তু দলে বিরাটের জায়গা নিয়ে কোনো প্রশ্ন করা চলবে না। সকলেই জানে, তিনি যে কোনো দিন আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে তাঁর ৭১তম শতরানটি করে রানে ফিরবেন। ততদিন জাদেজা, শার্দূলরা তাঁর রানগুলো করে দেবেন না কেন?

আরও পড়ুন বড় ক্রিকেটারে নয়, বিরাট ব্র্যান্ডে মোহিত জনগণমন

শাস্ত্রী-কোহলির দেখানো এই পথেই রাহুল-রোহিত হাঁটছেন যখন, তখন এই পথে আলো জ্বেলে এ পথেই ভারতীয় ক্রিকেটের ক্রমমুক্তি হবে নিশ্চয়ই। বছরের গোড়ায় যখন নতুন লোকেদের হাতে ভারতীয় ক্রিকেট দলের দায়িত্ব তুলে দেওয়া হল, তারপর সাঁইত্রিশ পেরনো ঋদ্ধিমান সাহাকে দ্রাবিড় জানিয়ে দিলেন তাঁর কথা আর ভাবা হবে না, তখন মনে হয়েছিল ভারতীয় ক্রিকেট সত্যিই বদলাচ্ছে। কিন্তু এখন আবার সবাই চলতি হাওয়ার পন্থী। অফ ফর্মে থাকা বিরাট, সদ্য কোভিডের জন্য টেস্ট না খেলা অধিনায়ক রোহিত প্রমুখ বিশ্রাম নেবেন। তাই ওয়েস্ট ইন্ডিজে একদিনের ম্যাচে ভারতের অধিনায়কত্ব পাচ্ছেন সাঁইত্রিশের দিকে এগোনো শিখর ধাওয়ান।

ইনস্ক্রিপ্টে প্রকাশিত

বোর্ডের ঘরে যে ধন আছে, ক্রিকেটের ঘরে সে ধন আছে?

রাজা বাদশারা বিশেষ আনন্দের দিনে দাঁড়িপাল্লার এক দিকে বসতেন আর অন্যদিকে চাপানো হত সোনাদানা। হুজুরের ওজনের সমান সম্পদ গরীবগুরবোদের মধ্যে বিলিয়ে দেওয়া হত। সবকিছুকেই কতটা ধন পাওয়া যাবে তার সাপেক্ষে মাপার সেই কি শুরু? কে জানে! তবে আমরা এমন এক সময়ে বাস করছি যখন সাফল্য-ব্যর্থতা তো বটেই, উৎকর্ষ-অপকর্ষ, উচিত-অনুচিতও টাকা দিয়েই মাপা হয়। তাই খেলার খবরেও ঢুকে পড়ে টাকার হিসাব; খেলোয়াড়দের রান, উইকেট, ক্যাচের চেয়েও বড় আলোচনার বিষয় হয়ে ওঠে ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগের নিলামে তাঁদের দর। স্বভাবতই ক্রিকেট দলের সাফল্য দিয়ে ক্রিকেট বোর্ডের সাফল্য মাপার দিনও শেষ, দলের ব্যর্থতায় বোর্ডের কাছে জবাবদিহি চাওয়ার যুগও গত হয়েছে। ভারতীয় ক্রিকেট দলের মতই ক্রিকেট বোর্ডও আমাদের নয়নের মণি, কারণ বোর্ড সফল। তাই আমরা প্রশ্ন তুলি না, বোর্ড সভাপতি সৌরভ গাঙ্গুলি আর সচিব জয় শাহের মেয়াদ উত্তীর্ণ হয়ে যাওয়ার পরেও তাঁরা কেন চেয়ার ছাড়ছেন না। কেন তুলব? বোর্ড তো সফল। বহু বছর হল ক্রিকেট দুনিয়ার সবচেয়ে ধনী বোর্ডের নাম বোর্ড অফ কন্ট্রোল ফর ক্রিকেট ইন ইন্ডিয়া। এর চেয়ে বড় সাফল্য আর কী আছে? যদি কোনোদিন দেখা যায় ভারতীয় বোর্ডের আর্থিক ক্ষতি হচ্ছে, আয়ের দিক থেকে এক নম্বর জায়গাটা অন্য কোনো দেশের হাতে চলে গেছে, তখন কাঠগড়ায় তোলা হবে সৌরভ-জয়কে।

তা সম্প্রতি ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড আরও একটা বড়সড় সাফল্য পেয়েছে। এ যুগের বিচারে বিখ্যাত সৌরভ-শচীন জুটির সব সাফল্যের দাম এর চেয়ে কম। কারণ তাঁরা গোটা কয়েক ম্যাচ জিতিয়েছেন ভারতকে, কিছু গুরুত্বপূর্ণ সিরিজ এবং টুর্নামেন্ট জিতিয়েছেন। সেসবের স্মারক মুম্বাইয়ের ওয়াংখেড়ে স্টেডিয়ামে বোর্ডের সদর দপ্তরে গেলে দেখা যায়। কিন্তু সৌরভ-জয় জুটি বোর্ডকে সদ্য এনে দিয়েছে ৪৮,৩৯০ কোটি টাকা। এ একেবারে নগদ লাভ। এ জিনিস কেবল ব্যাঙ্কে গেলে দেখা যায় তা নয়, এর উপস্থিতি প্রতি মুহূর্তে টের পাওয়া যায়। পাঁচ বছরের জন্য আইপিএলের সম্প্রচার স্বত্ব বেচে এই রোজগার হয়েছে। প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই মহামতি জয় শাহ সংবাদসংস্থা পিটিআইকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেছেন, আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিলের পরের ফিউচার টুরস প্রোগ্রামে, অর্থাৎ কোন দেশ কবে কার বিরুদ্ধে কোথায় খেলবে তার যে বিস্তারিত সূচি তৈরি হয় তাতে, আলাদা করে আইপিএলের জন্য আলাদা করে আড়াই মাস সময় দেওয়া থাকবে। মানে সেইসময় পৃথিবীর কোথাও কোনো আন্তর্জাতিক ক্রিকেট খেলা হবে না, যাতে সব দেশের শীর্ষস্থানীয় ক্রিকেটাররা শুধু আইপিএল খেলতে পারেন। লক্ষ করুন, এই ঘোষণা করে দিলেন বিসিসিআইয়ের সচিব, আইসিসির কোনো কর্মকর্তা নয়। জয় বলেছেন এ নিয়ে আইসিসি এবং বিভিন্ন ক্রিকেট বোর্ডের সঙ্গে আলোচনা হয়ে গেছে। তা হতেই পারে। কিন্তু ফিউচার টুরস প্রোগ্রাম তো তৈরি করে আইসিসি। তাহলে কোন এক্তিয়ারে জয় এই ঘোষণা করতে পারেন? উত্তর ওই ৪৮,৩৯০ কোটি। এই মূল্যে সম্প্রচার সত্ত্ব বিক্রি হওয়ায় ম্যাচ পিছু সম্প্রচার মূল্যের বিচারে আইপিএল সারা বিশ্বে জনপ্রিয় ইংল্যান্ডের প্রিমিয়ার লিগ ফুটবলের চেয়েও এগিয়ে গেল।

স্রেফ অর্থের জোরে যেমন সম্মিলিত জাতিপুঞ্জ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বশংবদ, আইসিসি তেমন ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের অনুগত। বিশ্ব রাজনীতিতে তবু অবাধ্য চীন আছে, দুর্বিনীত রাশিয়া আছে। ফলে নিজের স্বার্থরক্ষায় যা খুশি করতে পারলেও পৃথিবীর সর্বত্র সর্বদা আমেরিকার কথাই শেষ কথা হয়ে দাঁড়ায় না। কিন্তু ক্রিকেট দুনিয়ায় ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের প্রতিস্পর্ধী কোনো শক্তি নেই। যে কটা দেশ দীর্ঘদিন ধরে ক্রিকেট খেলে, যাদের দেশে ক্রিকেটের উল্লেখযোগ্য বাজার আছে, তাদের মধ্যে ভারত সবচেয়ে জনবহুল এবং ক্রিকেটের জন্য পাগল দেশ। ফলে এখানকার বাজার সবচেয়ে বড়। বিশ্বায়নের আগে, ভারতীয় অর্থনীতির উদারীকরণের আগের যুগে যে বোর্ডগুলো ক্রিকেটের উপর ছড়ি ঘোরাত, সেই ইংল্যান্ড আর অস্ট্রেলিয়ার একাধিপত্যের জবাব দিচ্ছে বিসিসিআই – এমন একটা কথা ভেবে অনেকে উত্তর-ঔপনিবেশিক আনন্দ পান। বিসিসিআইয়ের যে কোনো অন্যায়কে এই যুক্তিতে ভারতের ক্রিকেটবোদ্ধারা বৈধ বলে ঘোষণা করে থাকেন বলেই সাধারণ ক্রিকেটপ্রেমীর মনে অমন ধারণা তৈরি হয়। কিন্তু ঘটনা হল, বিসিসিআই মোটেই কোনো বৈপ্লবিক কায়দায় আইসিসির উপর আধিপত্য কায়েম করেনি। ইংল্যান্ড অ্যান্ড ওয়েলস ক্রিকেট বোর্ড (ইসিবি) আর ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়ার (সিএ) সাথে সমঝোতা করেই এই ছড়ি ঘোরানো চলছে।

২০১৪ সালে এন শ্রীনিবাসন আইসিসি চেয়ারম্যান থাকার সময়ে রীতিমত আইন করে তৈরি হয় আইসিসির নতুন রাজস্ব বন্টন পদ্ধতি, যাকে সাধারণত ‘বিগ থ্রি মডেল’ বলা হয়ে থাকে। এই মডেল অনুযায়ী ২০১৫-২০২৩ সালে আইসিসির আয় থেকে ৪৪০ মিলিয়ন ডলার পেতে পারত বিসিসিআই, প্রায় ১৫০ মিলিয়ন ডলার পেত ইসিবি আর প্রায় ১৩২ মিলিয়ন ডলার পেত সিএ। যা পড়ে থাকত তা বাকিদের মধ্যে নানা পরিমাণে ভাগ হত। কিন্তু পরে শ্রীনিবাসনের স্থলাভিষিক্ত হন আরেক ভারতীয় – শশাঙ্ক মনোহর। তিনি নিজে ভারতীয় হয়েও তেলা মাথায় তেল দেওয়া বিগ থ্রি মডেলের বিরোধিতা করেন এবং শেষপর্যন্ত ২০১৭ সালে বিগ থ্রি মডেল বাতিল করে ১৪-১ ভোটে পাস হয় নতুন মডেল। সেখানে আইসিসির রাজস্ব থেকে ভারতীয় বোর্ডের প্রাপ্য হয় ২৯৩ মিলিয়ন ডলার, ইংল্যান্ডের বোর্ডের ১৪৩ মিলিয়ন ডলার, বাকি সাত (অস্ট্রেলিয়া, শ্রীলঙ্কা, পাকিস্তান, দক্ষিণ আফ্রিকা, ওয়েস্ট ইন্ডিজ, নিউজিল্যান্ড, বাংলাদেশ) পূর্ণ সদস্য বোর্ডের ১৩২ মিলিয়ন ডলার করে আর জিম্বাবোয়ের প্রাপ্য হয় ৯৪ মিলিয়ন ডলার। বিসিসিআই এই নতুন ব্যবস্থায় যারপরনাই রুষ্ট হয়; ইংল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়ার ক্রিকেট বোর্ডও খুশি হয়নি। বিগ থ্রি মডেলের পক্ষে তাদের সোজাসাপ্টা যুক্তি – আমরা সবচেয়ে বেশি টাকা এনে দিই, অতএব আমরাই সবচেয়ে বেশি টাকা নেব। এমন নির্ভেজাল বৈষম্যবাদী যুক্তি প্রকাশ্যে বলতে জেফ বেজোস বা ইলন মাস্কের মত ধনকুবেরও লজ্জা পেতেন। মনে করুন, কোনো পরিবারে দশ ভাই। যে তিন ভাই সবচেয়ে বেশি রোজগার করে, তারা যদি খেতে বসে বলে খাবারের বেশিরভাগ অংশ তাদের দিয়ে দিতে হবে – তাহলে যেমন হয় আর কি। ব্যাপারটা যে শুধু দৃষ্টিকটু তা নয়। এই ব্যবস্থা চলতে দিলে যা হবে, তা হল ওই তিন ভাই ক্রমশ মোটা হবে আর বাকিরা অপুষ্টিতে ভুগবে, হয়ত শুকিয়ে মরবে।

পুঁজিবাদ এমনিতে তেলা মাথায় তেল দেওয়ারই ব্যবস্থা; মানুষের সাধ্যমত অবদান গ্রহণ করে তার প্রয়োজন মত ফিরিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা নয়। কিন্তু পুঁজিবাদকেও বাঁচতে হলে খেয়াল রাখতে হয়, যেন শোষণ করার উপযুক্ত শোষিত থাকে। রিজার্ভ ব্যাঙ্কের ভূতপূর্ব গভর্নর এবং পুঁজিবাদী অর্থনীতিবিদ রঘুরাম রাজন ও লুইগি জিঙ্গেলসের একটা বইয়ের নামই হল সেভিং ক্যাপিটালিজম ফ্রম দ্য ক্যাপিটালিস্টস ক্রিকেটের বাজার তো এমনিতেই ছোট, কারণ নিয়মিত আন্তর্জাতিক ক্রিকেট খেলে ডজনখানেক দেশ। মনোপলি কায়েম করতে গিয়ে ছোট ছোট দেশগুলোকে শুকিয়ে মারলে যে ব্যবসার ভাল হবে না – তা বুঝতে অসুবিধা হওয়ার কথা নয়।

কিন্তু একে নব্য উদারবাদী অর্থনীতির যুগ, তার উপর বিসিসিআই হল সর্বশক্তিমান। তাই গোঁসাঘরে মিলিত হয়ে তিন ক্রিকেট বোর্ড নতুন ফিকির বার করল। আইসিসি তো বন্টন করে আইসিসি আয়োজিত প্রতিযোগিতাগুলোর রাজস্ব, কিন্তু আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের বেশিটাই তো দ্বিপাক্ষিক সিরিজ। সেই সিরিজের আয় পুরোটাই ভাগ হয় দুই দেশের ক্রিকেট বোর্ডের মধ্যে। তাই এই তিন দেশ নিজেদের মধ্যে ঘুরে ফিরে বেশি খেলা আরম্ভ করল। আইসিসির ফিউচার টুরস প্রোগ্রামকে ফেলে দেওয়া যায় না। কারণ প্রথমত, তা করলে আইসিসি ভেঙে বেরিয়ে আসতে হয়। ব্যবসার মুনাফা বাড়ানো উদ্দেশ্য, বিদ্রোহ করা তো নয়। দ্বিতীয়ত, ২০১৯ থেকে চালু হয়েছে টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপ। সবার সাথে সবাইকে খেলতে হবে (যদিও রাজনৈতিক কারণে ভারত-পাকিস্তান সিরিজ হয় না), পয়েন্টের প্রশ্ন আছে। তাই ত্রিদেব করলেন কী, নিজেদের মধ্যে চার-পাঁচ টেস্টের সিরিজ খেলা শুরু করলেন। ওদিকে নিউজিল্যান্ডের মত ভাল দলের সঙ্গে ভারত দুটো টেস্টের বেশি খেলে না। দক্ষিণ আফ্রিকার সঙ্গে কটা ম্যাচ খেলা হবে; একই সফরে একদিনের ম্যাচ, টি টোয়েন্টি খেলা হবে কিনা তা নিয়ে দরাদরি চলে। ওই যে বলেছি, খেলার উৎকর্ষ বিচার্য নয়। বিচার্য হল কোন সিরিজ বেচে বেশি টাকা আসবে। এই কারণেই অস্ট্রেলিয়ায় করোনা পরিস্থিতি যখন বেশ খারাপ, তখনো ভারতের অস্ট্রেলিয়া সফর দিব্যি চালু ছিল। অথচ করোনার কারণেই অস্ট্রেলিয়া ২০২০ সালে দক্ষিণ আফ্রিকার সাথে তিন টেস্টের সিরিজ বাতিল করে দিয়েছিল।

বিসিসিআই আইসিসিকে ঠুঁটো জগন্নাথ করে ফেলতে পেরেছে এবং ইসিবি আর সিএকে লেজুড় বানিয়ে ফেলতে পেরেছে। এর একমাত্র কারণ টাকা। আর সেই টাকার সবচেয়ে বড় উৎস হল আইপিএল। এই প্রতিযোগিতা কতটা এগিয়ে দেয় বিসিসিআইকে? উদাহরণ হিসাবে এই ৪৮,৩৯০ কোটি টাকাকেই ব্যবহার করা যাক। আগেই বলেছি, ২০১৭ সালের এপ্রিল মাসে পাস হওয়া আইসিসির নতুন রাজস্ব বন্টন মডেল অনুযায়ী আট বছরের জন্য বিসিসিআইয়ের প্রাপ্য ২৯৩ মিলিয়ন ডলার। মানে আজকের বিনিময় মূল্যে প্রায় ২,২৯৫ কোটি টাকা। যখন এই সিদ্ধান্ত হয় তখন ডলারের সাপেক্ষে টাকার দাম আরও বেশি ছিল, ফলে বিসিসিআইয়ের প্রাপ্য ছিল আরও কম। এই টাকা পাওয়া যায় কিস্তিতে। আগামী দিনে শেষ কিস্তি পাওয়ার সময়ে টাকার দাম পড়তে থাকলে হয়ত আরেকটু বেশি পাওয়া যাবে। কিন্তু শেষপর্যন্ত যা-ই পাওয়া যাক, স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে শুধু আইপিএলের পাঁচ বছরের সম্প্রচার স্বত্ব বিক্রি করেই বিসিসিআই তার ২৩-২৪ গুণ বেশি টাকা আয় করতে পারে। এর আগের বছরগুলোর (২০১৫-২২) স্বত্ব বিক্রি করে বোর্ড পেয়েছিল ১৬,৩৪৭.৫০ কোটি টাকা। আইসিসির দেয় টাকা তো তার কাছেও নস্যি। সুতরাং বিসিসিআইয়ের যদি আর কোনো আয়ের উৎস না-ও থাকে, কেবল আইপিএলই ক্রিকেট জগতে আধিপত্য বজায় রাখার জন্য যথেষ্ট।

এই আধিপত্য খাটিয়ে যা যা করা হচ্ছে তা নিয়ে ক্রিকেট বিশ্বে নানারকম আপত্তি উঠছে, দুশ্চিন্তা প্রকাশ করা হচ্ছে। ইংল্যান্ড আর অস্ট্রেলিয়া আজব দেশ। সেখানকার প্রাক্তন ক্রিকেটাররা, বড় বড় সংবাদমাধ্যমের সাংবাদিকরা নিজেদের ক্রিকেট বোর্ডের দোষ ধরেন। ফলে বিসিসিআইয়ের সাথে হাত মিলিয়ে তারা বিলক্ষণ লাভ করছে জেনেও তাঁরা অস্বস্তিকর প্রশ্ন তোলেন। অস্ট্রেলিয়ার ‘দি এজ’ পত্রিকার ক্রিকেট লিখিয়ে ড্যানিয়েল ব্রেটিগ যেমন লিখেছেন, আইপিএলের আয় আকাশ ছোঁয়ার ফলে টেস্ট ক্রিকেট ক্রমশ মাইনর লিগে পরিণত হতে পারে। তাঁর আশঙ্কা যে অমূলক নয় তার ইঙ্গিত জয়ের সাক্ষাৎকারে রয়েছে।

এমনিতেই আইসিসির উপর প্রভাব খাটিয়ে বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের প্রথম মরসুমে (২০১৯-২১) এক অত্যাশ্চর্য পয়েন্ট সিস্টেম চালু করা হয়েছিল। সব ম্যাচের পয়েন্ট মূল্য সমান ছিল না, কিন্তু সব সিরিজের পয়েন্ট মূল্য সমান ছিল। কারণটা সহজবোধ্য – ত্রিদেব তো নিজেদের মধ্যে যতগুলো টেস্ট খেলবেন, অন্যদের সাথে ততগুলো খেলবেন না। ফলে পাঁচ টেস্টের অ্যাশেজ সিরিজেও সব ম্যাচ জিতলে পাওয়া যাচ্ছিল ১২০ (২৪x৫) পয়েন্ট, আবার ভারত-নিউজিল্যান্ডের দুই টেস্টের সিরিজেও সব ম্যাচ জিতলে সেই ১২০ (৬০x২)। এত বায়নাক্কা বজায় রেখেও অবশ্য খেতাবটা জিততে পারেনি তিন প্রধানের কেউ। বর্তমান মরসুমে এই বায়না আর মানা হয়নি, কিন্তু জয়ের বয়ান অনুযায়ী, আগামী দিনে বছরে আড়াই মাস আইপিএলকে ছেড়ে দেওয়া হবে বলে ঠিক হয়েছে। এদিকে পাকিস্তান, ওয়েস্ট ইন্ডিজ, অস্ট্রেলিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকাতেও এখন ফ্যাঞ্চাইজ লিগ চালু হয়েছে। ইংল্যান্ডে চালু হয়েছে ১০০ বলের খেলার ফ্যাঞ্চাইজ লিগ – দ্য হান্ড্রেড। সেগুলো অত টাকার খনি নয় বলে আইসিসির আনুকূল্য পাবে না, কিন্তু উপার্জনের প্রয়োজনে বেশকিছু আন্তর্জাতিক ক্রিকেটার সেগুলোতেও খেলেন এবং খেলবেন। নয় নয় করে সারা বিশ্বে কেবল ফ্র্যাঞ্চাইজ লিগই খেলে বেড়ানো ক্রিকেটারের সংখ্যা এখন কম নয়। তাঁদের দর ক্রমশ বাড়ছে, ফলে আরও বেশি সংখ্যক ক্রিকেটার যে আগামী দিনে ওই পথ বেছে নেবেন তাতে সন্দেহ নেই, শীর্ষস্থানীয়রা তো থাকবেনই। তাহলে জাতীয় দলের হয়ে ক্রিকেট খেলবেন কোন ক্রিকেটাররা এবং কখন?

এদিকে বিসিসিআই ছাড়া অন্য বোর্ডগুলোর পক্ষে ক্রিকেটারদের পারিশ্রমিক সেভাবে বাড়ানো কিন্তু সম্ভব হচ্ছে না। ব্রেটিগ লিখেছেন, আইপিএলের সম্প্রচার স্বত্ব থেকে আয় করা অর্থের ২৫ শতাংশও যদি আইপিএল ফ্র্যাঞ্চাইজগুলোর স্যালারি ক্যাপ বাড়াতে ব্যবহার করা হয়, তাহলেই আন্তর্জাতিক ক্রিকেট হয়ে দাঁড়াবে “ফাইন্যানশিয়াল আফটারথট”। অর্থাৎ “ওটা সময় পেলে খেলা যাবে এখন”। কারণ আইপিএলের সম্প্রচার স্বত্ব যখন ১৬,৩৪৭.৫০ কোটি টাকায় বিক্রি হয়েছিল, তখন তার ১৪ শতাংশ ছিল স্যালারি ক্যাপ। আগামী নিলামে সেই অনুপাত বজায় রাখলেই স্যালারি ক্যাপ হয়ে যাবে এখনকার তিন গুণ। তখন কেমন পারিশ্রমিক হবে শীর্ষস্থানীয় ক্রিকেটারদের? ব্রেটিগ প্যাট কামিন্সের উদাহরণ দিয়েছেন। কামিন্স এখন ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়ার থেকে পান মরসুম পিছু ২ মিলিয়ন ডলার, যা আইপিএলে খেলার জন্য সর্বোচ্চ যা পাওয়া যায় তার তুল্য। নতুন সম্প্রচার স্বত্বের পরিমাণ অনুসারে পারিশ্রমিক বাড়লে আইপিএলের সবচেয়ে দামি ক্রিকেটারের পারিশ্রমিক কিন্তু ১০ মিলিয়ন ডলারেও পৌঁছে যেতে পারে।

এখানেই শেষ নয়। যে প্রিমিয়ার লিগকে আইপিএল ছাপিয়ে গেছে বলে এত হইচই, সেই লিগের সম্প্রচার স্বত্বের অর্ধেকেরও বেশি খেলোয়াড়দের পারিশ্রমিক হিসাবে দেওয়া হয়। আইপিএল যদি সেই মডেল অনুসরণ করে তাহলে ক্রিকেটারদের পারিশ্রমিক কত হবে ভাবুন। তখন পাঁচদিনের ক্রিকেট খেলার উৎসাহ কজনের থাকবে? অন্য ফর্ম্যাটেই বা দেশের জার্সি গায়ে খেলার কতটুকু গুরুত্ব থাকবে? স্রেফ আইপিএল ফ্যাঞ্চাইজগুলোর চোখে পড়ার মঞ্চ হয়ে উঠবে কি আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের ময়দান?

কেউ বলতেই পারেন, তেমন হলে ক্ষতিটা কোথায়? আন্তর্জাতিক ফুটবল তো কবে থেকেই ওভাবে চলছে। বিশ্বকাপ, কোপা আমেরিকা, আফ্রিকান নেশনস কাপ থেকে ইউরোপের বড় বড় ক্লাবগুলো ফুটবলার পছন্দ করে। তারপর তারা ইউরোপের লিগগুলোতে খেলতে এসে আকাশছোঁয়া পারিশ্রমিক পান। দেশের হয়ে খেলার জন্যে তাঁদের পাওয়া যাচ্ছে না – এমন অভিযোগে মাঝেমধ্যে বিবাদ বিসম্বাদও হয়। তাই সেসবের জন্য বিশ্ব নিয়ামক সংস্থা ফিফাকে আলাদা নিয়মও তৈরি করতে হয়েছে। না হয় আইসিসিও তেমন কিছু করবে। ক্রিকেটারদের রোজগার বাড়লে ক্ষতি কী? ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের রোজগার বাড়লে, প্রভাব প্রতিপত্তি বাড়লেই বা অসুবিধা কোথায়?

ঠিক কথা। খেলা তো আসলে ব্যবসা। যে ফর্ম্যাট বেশি বিক্রি হবে সে ফর্ম্যাটই টিকে থাকবে। ফলে টেস্ট ক্রিকেটের জন্য চোখের জল ফেলে লাভ নেই। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের বদলে ফ্র্যাঞ্চাইজ ক্রিকেটই আসল খেলা হয়ে দাঁড়ালেও কালের গতি হিসাবেই মেনে নিতে হবে। কিন্তু মুশকিল হল, ইউরোপের ফুটবল মাঠে খেলা দেখতে যাওয়ার অভিজ্ঞতা আর ভারতের ক্রিকেট মাঠে খেলা দেখতে যাওয়ার অভিজ্ঞতায় এখনো আকাশ-পাতাল তফাত। বিশ্বের ধনী ফুটবল ক্লাবগুলো অর্জিত অর্থের বেশ খানিকটা ব্যয় করে দর্শক স্বাচ্ছন্দ্য নিশ্চিত করতে। অথচ ভারতের বহু ক্রিকেট মাঠে সাধারণ দর্শকদের জন্য অপেক্ষা করে থাকে পূতিগন্ধময় বাথরুম। কোথাও তিনতলায় খেলা দেখতে বসলে পানীয় জলের জন্য নামতে হয় একতলায়।

ইউরোপে নিয়মানুযায়ী ক্লাবগুলোর নিজস্ব অ্যাকাডেমি থাকে, সেখানে শিশু বয়স থেকে ফুটবলার তৈরি করা হয়। আইপিএলে ওসব তো নেই বটেই, শুরু হওয়ার সময়ে ‘ক্যাচমেন্ট এরিয়া’-র ক্রিকেটের উন্নতিকল্পে ফ্র্যাঞ্চাইজগুলো কীসব করবে শোনা গিয়েছিল। এখন ক্যাচমেন্ট এরিয়া ব্যাপারটারই আর নামগন্ধ নেই। কলকাতা নাইট রাইডার্সে বাংলার ক্রিকেটার দূরবীন দিয়ে খুঁজতে হয়, গুজরাট টাইটান্সে খুঁজতে হয় গুজরাটের খেলোয়াড়। উপরন্তু ফুটবলে উন্নত দেশে আন্তর্জাতিক মানের স্টেডিয়ামগুলোর মালিক ক্লাবগুলোই। সেই পরিকাঠামো আন্তর্জাতিক ফুটবলের জন্য ব্যবহৃত হয়। ক্রিকেটে কিন্তু ব্যাপারটা উল্টো। দেশের ক্রিকেট বোর্ডের অর্থে তৈরি পরিকাঠামোই ব্যবহার করছে ফ্র্যাঞ্চাইজগুলো। মানে খেলাটার থেকে তারা নিচ্ছে সবকিছু, কী ফিরিয়ে দিচ্ছে তার হদিশ নেই।

আর বিশ্বের সবচেয়ে বিত্তশালী ক্রিকেট বোর্ডের কথা যত কম বলা যায় তত ভাল। আইপিএলের বিন্দুমাত্র সমালোচনা করলেই বিসিসিআই ও তার অনুগত প্রাক্তন ক্রিকেটার, বিশেষজ্ঞ, সাংবাদিকরা বলতে শুরু করেন ঘরোয়া ক্রিকেটের উন্নতি হয়েছে আইপিএল থেকে আসা অর্থের জন্যই। ক্রিকেটারদের পারিশ্রমিক, প্রাক্তনদের পেনশন বেড়েছে সে কথা সত্যি। কিন্তু সেগুলো তো যে কোনো পেশাতেই নির্দিষ্ট সময় অন্তর বাড়ার কথা। গত দুই দশকে দেশে যে হারে মূল্যবৃদ্ধি হয়েছে, সে অনুপাতে কিন্তু ওই টাকার অঙ্কগুলো বাড়েনি। আর ওটুকুই তো একটা খেলার উন্নতির সব নয়। বাকি চেহারাটা কেমন?

আরও পড়ুন বড়লোকের খেলা

কোভিড পর্বে বোর্ড প্রবল উৎসাহে আইপিএল আয়োজন করেছে (প্রয়োজন পড়লে বিদেশে), জাতীয় দলের বিদেশ সফরের ব্যবস্থা করেছে। অথচ রঞ্জি ট্রফি খেলা ক্রিকেটারদের টাকা দেওয়ার কথা ভুলেই গিয়েছিল। আম্পায়ার, স্কোরার, মাঠ পরিচর্যার দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিরাও বিস্মৃত হয়েছিলেন। মুম্বাই আর মধ্যপ্রদেশের মধ্যে এবারের রঞ্জি ট্রফি ফাইনালে ডিসিশন রিভিউ সিস্টেমের ব্যবস্থা নেই, কারণ খরচে কুলোবে না। উত্তরাখণ্ডের রঞ্জি দলের ক্রিকেটারদের দুর্দশার কথা জানলে অবশ্য মনে হবে এসব কিছুই নয়। এ মাসের গোড়ায় সাংবাদিক জেমি অল্টারের প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে, ওই ক্রিকেটাররা এক বছর ধরে পারিশ্রমিক পাচ্ছেন দিনে মাত্র ১০০ টাকা। সে টাকাও মাসের পর মাস বকেয়া থাকে। অধিনায়ক জয় বিস্তা বিসিসিআইকে ২০২০-২১ ও ২০২১-২২ মরসুমের বকেয়ার ব্যাপারে চিঠি লিখে কোনো জবাব পাননি।

মেয়েদের ক্রিকেট বিসিসিআই কীভাবে চালাচ্ছে তা নিয়ে লিখতে বসলে আরও হাজার দুয়েক শব্দ লিখতে হবে। এটুকু বলা যাক, যে চলতি ভারত-শ্রীলঙ্কা সিরিজ ভারতে বসে টিভিতে সরাসরি দেখা যাচ্ছে না। বহু টালবাহানার পর আগামী বছর অবশ্য মেয়েদের আইপিএল শুরু হবে বলে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে।

অর্থাৎ বিসিসিআই নিঃসন্দেহে একটি সফল কোম্পানি, কিন্তু সে সাফল্যে ক্রিকেটের কী লাভ হচ্ছে তা ঠিক বোঝা যাচ্ছে না। একসময় সারা পৃথিবীতে অর্থনীতির আলোচনায় ‘ট্রিকল ডাউন’ কথাটা বেশ জনপ্রিয় ছিল। বলা হত সচ্ছলতা চুঁইয়ে পড়বে নীচের দিকে, তাতেই নীচের তলার মানুষের হাল ফিরবে। বাস্তবে তা কতটা ঘটে তা নিয়ে অর্থনীতিবিদরা তর্ক করবেন, কিন্তু অন্তত ভারতীয় ক্রিকেটে বিসিসিআইয়ের সচ্ছলতা চুঁইয়ে পড়তে দেখা যাচ্ছে না। টেস্ট ক্রিকেটের জন্য চোখের জল না হয় না-ই ফেললাম, আন্তর্জাতিক ক্রিকেট চুলোয় যাওয়াও না হয় মেনে নিলাম। কিন্তু বিসিসিআইয়ের সমান ওজনের সমৃদ্ধি যে দেশীয় ক্রিকেটে দেখা যাচ্ছে না।

ইনস্ক্রিপ্টে প্রকাশিত

ভারতীয় ক্রিকেট বয়স ঢেকে ফেলছে বিজ্ঞাপনে

অ্যালাস্টেয়ার কুককে নিশ্চয়ই ভারতীয় ক্রিকেটপ্রেমীদের মনে আছে। টেস্ট ক্রিকেটে বারো হাজারের বেশি রান করা ব্যাটারকে এমনিতেই কোনো ক্রিকেটপ্রেমী ভোলেন না। তার উপর কুক জীবনের প্রথম এবং শেষ টেস্ট খেলেছিলেন ভারতের বিরুদ্ধেই, আর দুটোতেই তিন অঙ্কের রান করেছিলেন। শুধু তা-ই নয়, ২০১১ সালে ভারতের অভিশপ্ত ইংল্যান্ড সফরের সময়ে এজবাস্টন টেস্টে ক্রিকেটজীবনের সর্বোচ্চ স্কোরেও (২৯৪) পৌঁছন। ২০১৮ সালে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকে অবসর নিয়ে ফেলা কুক এখনো দাপটে কাউন্টি ক্রিকেট খেলছেন। এ মরসুমে এসেক্সের এই ওপেনারের গড় এখন ৬০। পাঁচটা ম্যাচেই তিনটে শতরান করে ফেলেছেন এবং দুই দশকব্যাপী প্রথম শ্রেণির ক্রিকেট কেরিয়ারে আগে কখনো যা পারেননি, তা ঘটিয়ে ফেলেছেন গত ম্যাচে। দুই ইনিংসেই শতরান করেছেন।

এদিকে কুক অবসর নেওয়ার পর থেকে ইংল্যান্ডের টেস্ট দলের অবস্থা ক্রমশ খারাপ হয়েছে। জো রুটের কাছে ইংল্যান্ডের কর্মকর্তা, ক্রিকেটপ্রেমী – সকলেরই বিরাট আশা ছিল। কিন্তু ব্যাটার হিসাবে যথেষ্ট সফল হলেও অধিনায়ক হিসাবে রুট একেবারে ব্যর্থ হয়েছেন। গত আঠারোটা টেস্টের মধ্যে মাত্র একটা জিতেছে ইংল্যান্ড। ফলে তিনি পদত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছেন। যে যে কারণে ইংল্যান্ডের এমন হাঁড়ির হাল, তার অন্যতম হল ওপেনারদের ব্যর্থতা। কুক অবসর নেওয়ার পর থেকে অনেককে নির্বাচকরা সুযোগ দিয়েছেন, কিন্তু কেউই ধারাবাহিকতা দেখাতে পারেননি। কুক ইতিমধ্যে স্যার অ্যালাস্টেয়ার কুক হয়ে গেছেন। মানে ক্রিকেট মাঠে তাঁর কীর্তিকে স্বীকৃতি দিয়েছেন স্বয়ং রানী এলিজাবেথ। জাতীয় দলের ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তিত ইংল্যান্ড অ্যান্ড ওয়েলস ক্রিকেট বোর্ড সম্প্রতি খোলনলচে বদলে ফেলেছে। নতুন ডিরেক্টর অফ ক্রিকেট হয়েছেন প্রাক্তন ক্রিকেটার রব কী, নতুন টেস্ট অধিনায়ক বেন স্টোকস আর টেস্ট দলের কোচের দায়িত্বে এসেছেন ব্রেন্ডন ম্যাককালাম। দেশটার নাম ভারত হলে এতদিনে হাউস অফ কমন্সে সব দলের সাংসদরা মিলে রেজলিউশন পাস করাতেন, নতুন অধিনায়ক আর কোচকে কুককে অবসর ভেঙে ফিরে আসতে বলতেই হবে। কুক নিজেও শতমুখে সংবাদমাধ্যমকে বলে বেড়াতেন, তিনি এখনো দারুণ ফিট এবং জীবনের সেরা ফর্মে রয়েছেন।

কিন্তু দেশটার নাম ইংল্যান্ড। কয়েকদিন আগে কুককে এক সাক্ষাৎকারে রব কীর নিয়োগ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল। তিনি বলেছেন, ভালই তো। ইংল্যান্ডের ক্রিকেটের এখন একেবারে নতুন করে শুরু করা উচিত। নিজের সম্পর্কে কোনো কথাই বলেননি। বরং বলেই দিলেন যে পুরনো সবকিছু ভুলে এগোনো উচিত।

স্নেহময় জ্যাঠামশাইরা পরীক্ষায় ফেল করা ভাইপোদের উৎসাহ দেওয়ার জন্যে এরকম বলতেন। তা কুকজেঠুর বয়স কত? সাঁইত্রিশ বছর চার মাস। চলতি আইপিএলে গত ম্যাচটা (তা-ও বিপক্ষের দ্রুততম বোলার লকি ফার্গুসন কোনো অজ্ঞাত কারণে বল করতে এলেন বিরাট আর ফ্যাফ দু প্লেসি সেট হয়ে যাওয়ার পর এবং মাত্র দু ওভার বল করলেন) বাদ দিলে চূড়ান্ত ব্যর্থ (তিনটে ম্যাচে প্রথম বলে আউট; ১৪ ম্যাচে ৩০৯ রান, গড় ২৩.৭৬) বিরাট কোহলির বয়স কত? সাড়ে তেত্রিশ। অর্থাৎ কুক বিরাটের বয়সেই আন্তর্জাতিক ক্রিকেটকে বিদায় জানিয়েছিলেন। তাঁর এখনকার ফর্ম দেখে মনে করা অমূলক নয় যে অবসর না নিলে তিনি এতদিনে শচীন তেন্ডুলকরের টেস্ট ক্রিকেটে মোট রানের রেকর্ড (১৫,৯২১) আর সবচেয়ে বেশি টেস্ট খেলার রেকর্ড (২০০) – দুটোরই কাছাকাছি পৌঁছে যেতেন। অথচ এখন কনিষ্ঠরা পারছে না দেখেও ফিরে আসার নাম করছেন না। বোর্ডও এখন পর্যন্ত তাঁর নাম করেনি। ভক্তরা কেউ কেউ সোশাল মিডিয়ায় কুকের নাম ভাসিয়ে দিয়েছে, কিন্তু প্রাক্তন ক্রিকেটাররাও তা নিয়ে বিশেষ উৎসাহ প্রকাশ করছেন না। এদিকে বিরাটকে ভারতের প্রাক্তন ক্রিকেটার, ধারাভাষ্যকার, সাংবাদিক – অনেকেই একটু বিশ্রাম নেওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন। তিনি নাকি একটানা অনেকদিন খেলে ফেলেছেন, কদিন বিশ্রাম নিলেই হইহই করে রানে ফিরবেন। বিরাটও গ্রুপ লিগের শেষ ম্যাচের আগে আইপিএলের সরাসরি সম্প্রচারকারী সংস্থাকে সাক্ষাৎকারে বললেন তাঁর উপর দিয়ে সত্যিই অনেক ধকল গেছে, তাই বিশ্রাম নিলে ভালই হয়। মজার কথা, বিশ্রাম নেওয়া যে প্রয়োজন সেটা তাঁর আইপিএলের শেষ লগ্নে এসে খেয়াল হল। বিরাট মনে করেন আমাদের প্রাক্তন ডিরেক্টর অফ ক্রিকেট রবি শাস্ত্রীর চেয়ে বড় শুভাকাঙ্ক্ষী তাঁর নেই। তিনি শুধু বিরাটকে বিশ্রাম নেওয়ার পরামর্শ দেননি, বলেছেন বিশ্রামের পর বিরাট আরও ছ বছর খেলতে পারে। অর্থাৎ কুক যে বয়সে ফর্মে থেকেও জ্যাঠামশাইয়ের ভূমিকা উপভোগ করছেন, বিরাট সেই বয়সেও খেলে যাবেন। অথচ বিরাটের ফর্ম কিন্তু এবারের আইপিএলে হঠাৎ উধাও হয়েছে এমন নয়। এই সাইটেই আগে লিখেছি, কোনো ধরনের ক্রিকেটেই তিনি তেমন প্রভাব ফেলতে পারছেন না অনেকগুলো বছর হয়ে গেল।

ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড নতুন করে শুরু করার কাজটা আগেই করেছে, কারণ আইসিসি টুর্নামেন্টে বারবার ব্যর্থতা কাটিয়ে ওঠা দরকার। শাস্ত্রীর জায়গায় এসেছেন রাহুল দ্রাবিড় আর সাদা বলের অধিনায়ক করা হয়েছিল রোহিত শর্মাকে। বিরাট টি টোয়েন্টি ক্রিকেট ছাড়া অন্যগুলোর লাগাম নিজের হাতে রাখতে চেয়েছিলেন, বোর্ড সে গুড়ে বালি দিয়ে পরে টেস্ট ক্রিকেটেও রোহিতকেই নেতা করে দিয়েছে। তা রোহিতের বয়স কত? পঁয়ত্রিশ। টেস্ট ক্রিকেট কোনোদিনই রোহিতের সেরা মঞ্চ ছিল না। ন বছর আগে টেস্ট অভিষেক হলেও এতদিনে মোটে পঁয়তাল্লিশটা টেস্ট খেলেছেন, শতরান মাত্র আটটা। বিদেশে প্রথম শতরান পেলেন গত ইংল্যান্ড সফরে। তিনি আসলে সাদা বলের যম। অথচ গত ওয়ার্ল্ড টি টোয়েন্টিতে বিরাটের পাশাপাশি তিনিও ব্যর্থ হয়েছিলেন, এবার আইপিএলেও মোটেই রানের মধ্যে নেই (১৩ ম্যাচে ২৪৮ রান; গড় ২০.৪৬)। একাধিকবার আইপিএল খেতাব জয়ী মুম্বাই ইন্ডিয়ানস যে এবার পয়েন্ট টেবিলের একেবারে তলায় পড়ে আছে, তার অন্যতম কারণ রোহিতের খারাপ ফর্ম।

এ বছর ফের ওয়ার্ল্ড টি টোয়েন্টি। স্বয়ং অধিনায়ক এরকম ফর্মে থাকলে দলের অবস্থা কী হবে? উপরন্তু দলের সবচেয়ে বড় তারকা বিরাটকে দীর্ঘদিন ধরে টি টোয়েন্টির উপযোগী দেখাচ্ছে না। তিনি ইদানীং এত সাবধানে ব্যাট করছেন (বৃহস্পতিবার গুজরাট টাইটান্সের বিরুদ্ধে ৫৪ বলে ৭৩ রান করার আগে অব্দি স্ট্রাইক রেট ছিল ১১৩.৪৬), যে তিনি বড় রান করলে দলের মোট রান ভাল জায়গায় পৌঁছনো শক্ত। অথচ এই দুই তারকা থাকতে ঋতুরাজ গায়কোয়াড়, রাহুল ত্রিপাঠী, রাহুল টেওটিয়াদের মত বড় শট নিতে পারা ব্যাটারদের দলে জায়গা হবে না।

তবে ভারতীয় ক্রিকেট যে ভারত দেশটার মতই পিছন দিকে এগোতে চাইছে, তার সবচেয়ে বড় উদাহরণ এই দুজন নন। সাঁইত্রিশ বছরের কুক যদি জেঠু হন, আগামী ৭ জুলাই একচল্লিশে পা দিতে চলা মহেন্দ্র সিং ধোনি নিঃসন্দেহে পিতামহ ভীষ্ম। তাঁর যে ইচ্ছামৃত্যু, তা সেই ২০১১ সালেই প্রমাণ হয়ে গেছে। দল পরপর আটটা টেস্ট হারার পরেও ধোনির অধিনায়কত্ব যায়নি, বরং সে প্রস্তাব নির্বাচন কমিটির মিটিংয়ে তোলার পরে মোহিন্দর অমরনাথের নির্বাচকের চাকরি গিয়েছিল। ভারতের একদিনের ক্রিকেটের দলও ধোনিকে বয়ে বেড়িয়েছে বছর চারেক। স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল আর বড় শট নিতে পারেন না, অন্য প্রান্ত থেকে কেউ সে কাজটা করলে তিনি বড়জোর এক-দুই রান নিয়ে স্কোরবোর্ড সচল রাখতে পারেন, যা অনেকসময় জেতার পক্ষে যথেষ্ট নয়। তবু তাঁকে অবসর নিয়ে প্রশ্ন করলে বেজায় রেগে যেতেন। ২০১৬ ওয়ার্ল্ড টি টোয়েন্টি থেকে ভারতের বিদায়ের পর তো নির্লজ্জতার শিখরে উঠেছিলেন। এক অস্ট্রেলিয় সাংবাদিক এই প্রশ্ন করায় তাঁকে সাংবাদিক সম্মেলনের ডায়াসে ডেকে পাশে বসিয়ে জিজ্ঞেস করেছিলেন তিনি ধোনির অবসর দেখতে চান কিনা। তিনি তো আর ভারতীয় নন, যে কোনো আত্মীয় পরিজন থাকবে যে ধোনির জায়গায় খেলতে পারে।

এন শ্রীনিবাসনের থেকে ইচ্ছামৃত্যুর বর পেয়েছিলেন বলেই ধোনি একদিনের ক্রিকেট খেলতে পেরেছেন ২০১৯ বিশ্বকাপ অব্দি। অথচ ২০১৫ বিশ্বকাপের পর থেকে চার, ছয় মারার ক্ষমতা তো বটেই, গড়ও কমে গিয়েছিল। কেরিয়ারের ব্যাটিং গড় যেখানে পঞ্চাশ, সেখানে এই চার বছরের গড় নেমে এসেছিল চুয়াল্লিশে। চারে নেমে খেলতে না পারলে টিভি স্টুডিওতে বসে বিশেষজ্ঞ প্রাক্তন ক্রিকেটাররা বলতেন ধোনিকে পাঁচে খেলানো উচিত। পাঁচে না পারলে বলতেন ছয়ে। অর্থাৎ দল তাঁকে বয়ে বেড়াত। কালে ভদ্রে একটা ম্যাচে উইনিং স্ট্রোক নিলেই ফের সবাই মনে করিয়ে দিত, ধোনি সর্বকালের সেরা ফিনিশার। আর ধোনিকে এসব জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বারবার বলতেন, আগের মত অত ছয় মারেন না তো কী হয়েছে? তিনি তো ফিট আছেন। যেন খেলাটা ক্রিকেট নয়, জিমন্যাস্টিক্স।

আসলে প্রচারযন্ত্র অনুকূল হলে অনেক সমস্যা মিটে যায়। তাই ধোনি নির্বিঘ্নেই খেলে ফেলেন আরও একটা বিশ্বকাপ। কিছু বিশেষজ্ঞ আর অন্ধ ভক্ত আজও বলেন “যদি গাপ্টিলের থ্রোটা উইকেটে না লাগত…”। ভুলে যান যে ধোনি সেদিন পঞ্চাশে পৌঁছতে লাগিয়েছিলেন বাহাত্তরটা বল, মাত্র একটা চার আর একটা ছয় মেরেছিলেন। রবীন্দ্র জাদেজা ৫৯ বলে ৭৭ রান করেছিলেন বলে নিউজিল্যান্ডের জয়ের ব্যবধান আরও বড় হয়নি – এটুকুই সান্ত্বনা। নইলে শেষ ওভারে ধোনির ভেলকি দেখানোর সম্ভাবনা আরও আগেই শেষ হয়ে যেত। রাজনীতিতে প্রচারযন্ত্র অনুকূল হলে নির্বাচনের ফলাফলকে প্রভাবিত করা যায়। কিন্তু খেলার মাঠে পরিণাম বদলানো যায় না।

আরও পড়ুন টুপির আমি টুপির তুমি?

এতদিন পরে হৃদয় খুঁড়ে আবার এসব বেদনা জাগাতে হচ্ছে, কারণ এবারের আইপিএলে ধোনি ওই জাদেজাকেই হাসির পাত্র বানিয়ে ছেড়েছেন। এমনিতে চেন্নাই সুপার কিংসের মালিক শ্রীনিবাসনের কোম্পানি ইন্ডিয়া সিমেন্টসের অন্যতম ডিরেক্টর ধোনি। সুপার কিংস দলটা সে অর্থে তাঁর নিজের সম্পত্তি। যার ব্যাট, যার উইকেট তাকেই খেলতে নেব না – এ জিনিস পাড়া ক্রিকেটেই চলে না, আইপিএলে কী করে চলবে? ফলে ধোনির উইকেটরক্ষায় যতই শিথিলতা আসুক, ব্যাট হাতে ধারাবাহিকতা যতই কমে যাক, এ দলে তিনি যতদিন খেলতে চাইবেন ততদিনই খেলবেন। সমস্যা হল, তিনি কেবল খেলছেন না, খেলতে গিয়ে অন্যদের কোণঠাসা করছেন। আইপিএল শুরু হওয়ার মুখে ঘটা করে ঘোষণা করা হয়েছিল, পিতামহ অধিনায়কের সিংহাসনটি স্নেহভাজন জাদেজার হাতে ছেড়ে দিচ্ছেন। কিন্তু টুর্নামেন্ট শুরু হতেই দেখা গেল ফিল্ডিং সাজানো, বোলিং পরিবর্তন – সবকিছুতেই ধোনির কথাই শেষ কথা। জাদেজা নেহাতই রাবার স্ট্যাম্প। অবশ্য তাতেও সুপার কিংস দলের ছেড়ে দে মা কেঁদে বাঁচি অবস্থা হওয়া আটকায়নি। কিন্তু ব্যাটে, বলে ব্যর্থ জাদেজা নটা খেলার মধ্যে ছটা হারার পর অধিনায়কত্ব ছেড়ে দিতে চাইলেন। ধোনি মুকুট ফিরিয়েও নিলেন, ভবিষ্যতের কথা ভেবে ঋতুরাজ সিংয়ের মত তরুণতর কাউকে দায়িত্ব দিলেন না। তাহলে মরসুমের শুরুতে নেতৃত্ব ছেড়ে দেওয়ারই বা কী প্রয়োজন ছিল? জাদেজাও তো তেত্রিশ পেরিয়েছেন, কচি খোকাটি নন। তাঁর হাতে নেতৃত্ব তুলে দিয়ে কোন মহৎ উদ্দেশ্যসাধনের আশা ছিল? জাদেজা এই মুহূর্তে চোট-আঘাতের কারণে মাঠের বাইরে। এই টানাপোড়েনে তাঁর আত্মবিশ্বাসে চিড় ধরল কিনা তিনি মাঠে না ফেরা পর্যন্ত জানা যাবে না। যদি ধরে থাকে, তাহলে সুপার কিংসের চেয়ে বেশি ক্ষতি কিন্তু ভারতীয় ক্রিকেট দলের।

আসলে বাকি পৃথিবী সামনের দিকে তাকাতে চায়, আর আমরা চাই অতীতের গৌরবে বুঁদ হয়ে থাকতে। এ আমাদের জাতীয় চরিত্র। তাই বয়সের সঙ্গে সঙ্গে যে অতি বড় ক্রিকেটারেরও ক্ষমতা কমে আসে, আজ না কমে থাকলেও পরের বড় টুর্নামেন্টটা আসতে আসতে যে কমে যেতে পারে – এসব কথা না তাঁরা নিজেরা মানেন, না তাঁদের ভক্তকুল মানে। তারকারা আয়নায় মুখ দেখতে পান না, কারণ মুখ ঢেকেছে বিজ্ঞাপনে। ফলে ব্যাটে বলে হচ্ছে না, পা বলের লাইনে যাচ্ছে না, রিফ্লেক্স কমে গেছে, বহু বছর ধরে অতিমাত্রায় জিম করার ফলে টানা দু ঘন্টা ব্যাট করলেই পেশি ক্লান্ত হয়ে পড়ছে – এসব যখন ক্রিকেটার নিজে বুঝতে শুরু করেন, তখনো সবাই মিলে কানের কাছে বলতে থাকে “ও কিছু নয়। কদিন ব্রেক নিলেই সব ঠিক হয়ে যাবে।” এমনটাই এনডর্সমেন্টের যুগে ভারতীয় ক্রিকেটে হয়ে আসছে। যেনতেনপ্রকারেণ চল্লিশ অব্দি খেলে যাওয়ার দৃষ্টান্ত স্থাপন করে গেছেন শচীন। ধোনি ভাবলেন তিনিই বা কম কিসে? হয়ত পঁয়তাল্লিশকে পাখির চোখ করে এগোচ্ছেন। বিরাট ভাবছেন তিনি তো কোনো অংশে ধোনির চেয়ে কম যান না। রোহিত সবে অধিনায়ক হলেন, পঞ্চাশ ওভার আর কুড়ি ওভারের ক্রিকেটে তাঁরও ঝুড়ি ঝুড়ি রান আছে। তিনিই বা চল্লিশ অব্দি খেলার কথা ভাববেন না কেন? “ক্রিকেটের ঈশ্বর” তো শচীন, কুক তো নন। ফলে টেওয়াটিয়া, ত্রিপাঠীদের বেলা মেঘে মেঘেই বাড়বে।

ঋদ্ধিমান সাহার বেলায় দ্রাবিড় ভদ্রভাবে বুঝিয়ে দিয়েছিলেন এই ছেলেখেলা তিনি চলতে দেবেন না। এই ২০২২ সালেও উনবিংশ শতকের সংস্কার আন্দোলনের গন্ধে মাতাল বাঙালি তা নিয়ে বিস্তর গোল করেছিল। এবারের আইপিএলে গুজরাট টাইটান্সের ওপেনার হিসাবে ঋদ্ধিমানের সাফল্যে আবার গুঞ্জন শুরু হয়েছে। ওয়ার্ল্ড টি টোয়েন্টির দল নির্বাচনের সময়ে যদি তরুণদের সুযোগ দেওয়ার নীতি ভুলে গিয়ে তারকাদের প্রাধান্য দেওয়া হয়, তাহলে কিন্তু মানতেই হবে, পোর্টফোলিওতে যথেষ্ট পরিমাণ এনডর্সমেন্ট থাকলে ঋদ্ধিমানের বয়সও ঢেকে যেত।

*সব পরিসংখ্যান ১৯ মে, বৃহস্পতিবারের গুজরাট টাইটান্স বনাম রয়াল চ্যালেঞ্জার্স ব্যাঙ্গালোর ম্যাচ পর্যন্ত

ইনস্ক্রিপ্টে প্রকাশিত

ক্রিকেটের লুপ্তপ্রায় সৌন্দর্যের নাম উমরান

ক্রিকেটের মরশুম বদলে গেছে। আগে ক্রিকেট মরশুমের সূচনা বলতে বোঝাত অঘ্রাণ মাস। যখন সন্ধে না নামতেই শিশির পড়তে শুরু করে, গা শিরশির করে ভোরের দিকে। আর মরশুমের শেষ, যখন মাঘের শীত বাঘের গায়। মাঝের মাসগুলোতে ইডেন উদ্যানে বসত টেস্ট বা একদিনের ক্রিকেটের আসর। প্রবীণ ক্রিকেটপ্রেমীরা এখনও শোনান ভাগবত চন্দ্রশেখরের ম্যাচ জেতানো স্পেলের কথা বা সোনালি চুলের টনি গ্রেগকে প্রথম দেখার অভিজ্ঞতা। আমাদের প্রজন্মের কাছে অমূল্য স্মৃতি নয়ের দশকের মাঝামাঝি হিরো কাপের সেমিফাইনাল, ওই দশকের গোড়ায় দুর্বার গতির অ্যালান ডোনাল্ড আর অফসাইডের চিনের প্রাচীর জন্টি রোডসকে প্রথম দেখার অভিজ্ঞতা। মরশুম দীর্ঘায়িত হয়েছে অনেকদিন হল। ২০০১ সালে যেদিন অস্ট্রেলিয়ার সর্বনাশ সম্পূর্ণ হল হরভজনের হ্যাটট্রিক আর রাহুল দ্রাবিড়-ভিভিএস লক্ষ্মণের যুগলবন্দিতে, সেদিন চৈত্র মাস। অবশ্য গত শতাব্দীতেই জৈষ্ঠ্যের প্রখর তপন তাপে পাকিস্তানকে হারিয়ে ইডেন থেকে ইন্ডিপেন্ডেন্স কাপ জিতে নিয়ে গেছে অর্জুনা রণতুঙ্গার শ্রীলঙ্কা। ঠান্ডা পানীয়ের কোম্পানি টুর্নামেন্টের টাইটেল স্পনসর হলে যা হয়! এরপর আরও দুটো দশক কেটে গেছে। এখন খেলা হয় সারা বছর, আর ক্রিকেট ক্যালেন্ডারের সবচেয়ে বড় উৎসব হয়ে দাঁড়িয়েছে বিজ্ঞাপনদাতাদের প্রিমিয়ার লিগ– আইপিএল। তাই এবারও কাঠফাটা গরমে ইডেনে বসবে ক্রিকেটের আসর– আইপিএল প্লে অফ।

শুধু মরশুম নয়, খেলাটাও বদলে গেছে বিস্তর, আবিশ্ব। সারা বছর ক্রিকেটের যুগে বিশ্রামের সময় নেই, গতি আসবে কোথা থেকে? অতএব, এখন চাহিদা আস্তে বল করতে পারা জোরে বোলারের। স্লোয়ার, চেঞ্জ অফ পেস ইত্যাদি বাহারি নামের মন্থরতা আবিষ্কৃত হয়েছে। স্পিন শিল্পে শান দিয়ে আরও ধারালো হয়ে ওঠারও সময় নেই। তাই চাহিদা জোরে বল করতে পারা স্পিনারের, যার বল সাধারণত সোজা যাবে, ঘুরলেই রহস্য তৈরি হবে। শুধু কি তাই? এখন ক্রিকেট খেললে গ্লেন ম্যাকগ্রা, কোর্টনি ওয়ালশ-রা বিশেষ পাত্তা পেতেন না। কারণ তাঁরা ব্যাট করতে পারতেন না একেবারেই। এখন প্যাট কামিন্সের মতো বোলারেরও ব্যাট হাতে ম্যাচ জেতানোর ক্ষমতা থাকা দরকার। সুনীল নারিনকেও ইনিংসের শুরুতে বা মিডল অর্ডারে চার-ছক্কা হাঁকাতে জানতে হয়। অর্থাৎ, অসামান্য বোলার বা ব্যাটারের চেয়ে মাঝারি মানের অলরাউন্ডার বেশি প্রার্থনীয়।

ফলে ক্রিকেটের আদি অকৃত্রিম সম্পদ– কাঁপুনি ধরিয়ে দেওয়া ফাস্ট বোলার, যে কোনও পরিবেশে বল দু’দিকে সুইং করানোর ক্ষমতাসম্পন্ন মিডিয়াম ফাস্ট বোলার, খাঁটি লেগ স্পিন বা অফ স্পিনের রহস্যে ব্যাটারদের নাজেহাল করে দেওয়া স্পিনার, নিখুঁত ডিফেন্সসম্পন্ন এবং ছবির মত কভার ড্রাইভ মারতে পারা ব্যাটাররা ডোডোপাখি হয়ে যাচ্ছেন। কেবল কুড়ি বিশের ক্রিকেটে নয়, পঞ্চাশ ওভারের ক্রিকেটে বা টেস্টেও তাঁদের পক্ষে দলে টিকে থাকা শক্ত হচ্ছে। বরং এইসব গুণ থাকা দোষ হয়ে দাঁড়াচ্ছে অনেকের ক্ষেত্রে। ভুবনেশ্বর কুমারের মতো সুইং শিল্পীর যেমন টেস্ট কেরিয়ার বলে কিছু হলই না। কারণ প্রাক্তন ক্রিকেটার, ধারাভাষ্যকার, সাংবাদিক– সকলে সিদ্ধান্ত করে ফেললেন, এ সুইং সহায়ক পিচ ছাড়া সুবিধা করতে পারবে না। অথচ স্রেফ লম্বা, বেশি বাউন্স আদায় করতে পারেন– এই যুক্তিতে হাতে গোনা কয়েকটা বলার মতো পারফরম্যান্স নিয়েই একশো টেস্ট খেলে ফেললেন ইশান্ত শর্মা (জোরে বোলারদের মধ্যে একশোর বেশি টেস্ট খেলার পরেও উইকেট পিছু ৩২-এর বেশি গড় ইশান্ত ছাড়া কেবল জাক কালিসের, কিন্তু তিনি ব্যাট হাতে তেরো হাজার রানও করেছেন)। ব্যাট করতে পারেন বলে রবীন্দ্র জাদেজা টেস্টেও রবিচন্দ্রন অশ্বিনের মতো প্রবল শক্তিধর এবং মেধাবী বোলারের জায়গা দখল করে রাখতে পেরেছেন ম্যাচের পর ম্যাচ।

অর্থাৎ, ছোট ছোট মাঠে ঘণ্টায় ১৩০-১৪০ কিলোমিটার গতির বল আর দড়কচা ‘মিস্ট্রি’ স্পিনারদের বিরুদ্ধে পেশিবহুল ব্যাটারদের চার, ছক্কার বন্যা– এই হল আজকের ক্রিকেটোৎসব। যে দলের ব্যাটাররা ব্যর্থ হবেন, তাঁরা হারবেন। সেদিন প্রতিপক্ষের বোলারদের মনে হবে অসাধারণ, পরের দিনই হয়তো অতি সাধারণ দেখাবে। এই মরশুমে যাকে মনে হচ্ছে জিনিয়াস, পরের মরশুমেই সে ভিড়ে হারিয়ে যাবে। নামটা স্বপ্নিল অসনোদকর, পল ভালথাটি, মনপ্রীত গোনি, বরুণ চক্রবর্তী– যা খুশি হতে পারে। এমনকী, রতিতেও ক্লান্তি আসে, আর এই জিনিস দিনের পর দিন দেখতে হলে ক্লান্তি আসবে না? লাইভ সম্প্রচারের জাঁকজমক যাই-ই প্রমাণ করার চেষ্টা করুক, আইপিএল দেখতে দেখতেও দর্শকের ক্লান্তি আসে। সম্প্রচারকারী, বিজ্ঞাপনদাতা এবং আইপিএল কর্তৃপক্ষ সে কথা বিলক্ষণ জানে। তাই এবারের আইপিএলে প্রত্যেক ম্যাচে যত্ন করে দেখানো হচ্ছে, ম্যাচের দ্রুততম বলটা কে করল। সেই বোলারের জন্য এক লক্ষ টাকা পুরস্কারও থাকছে। বারবার কে পাচ্ছেন সেই পুরস্কার? ক্যারিবিয়ান দ্বীপপুঞ্জের কেউ নন, কোনো অস্ট্রেলিয়ানও নন, এমনকী নিউজিল্যান্ডের লকি ফার্গুসনও নন। পরপর ছ’টা ম্যাচে এই পুরস্কার পেয়েছেন সানরাইজার্স হায়দরাবাদের উমরান মালিক।

আগেই বলেছি, বিশ্ব ক্রিকেটে এখন যথার্থ ফাস্ট বোলার, অর্থাৎ ধারাবাহিকভাবে যে কোনো পিচে গড়ে ৯০ মাইলের (প্রায় ১৪৫ কিলোমিটার) বেশি গতিতে বল করতে পারেন এরকম বোলার বিরল। নিজেদের সেরা দিনে যশপ্রীত বুমরা আর মহম্মদ শামি পৌঁছে যান ওই গতিতে। মাঝে মাঝে নতুন বলে মিচেল স্টার্ক আর কামিন্সও পারেন। উমরান কিন্তু নিয়মিত ওই গতিতে বল করছেন, ১৫০ কিলোমিটারের গণ্ডিও পেরিয়ে যাচ্ছেন প্রায়ই। উমরানের মন্থরতম বলটাও ঘণ্টায় ১৪০ কিলোমিটারের আশপাশে থাকে। মুম্বইয়ের প্রবল গরমে এত জোরে বল করছেন কী করে? বিস্মিত হর্ষ ভোগলের এই প্রশ্নের উত্তরে উমরান বলেছেন, আমাদের জম্মুতে তো প্রচণ্ড গরমেও খেলি। ওতে কষ্ট হয় না, বরং মজা লাগে। কিন্তু গতিই শেষ কথা নয়। নইলে ব্রেট লি আর শন টেটের তফাত থাকত না। বলের লাইন, লেংথ ঠিক না থাকলে গতিময় বোলিংয়ে কোনও লাভ হয় না। উমরানের সেখানেও ভুল নেই। নেই বলেই রবিবার (১৭ এপ্রিল) পাঞ্জাব কিংসের বিরুদ্ধে শেষ ওভারে একটাও রান না দিয়ে তুলে নিতে পেরেছেন তিন-তিনটে উইকেট, টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটের ইতিহাসে প্রথমবার। ওই ম্যাচের চার উইকেট নিয়ে আইপিএলে ছ’টা ম্যাচ খেলে ন’টা উইকেট নেওয়া হয়ে গেল।

কিন্তু উমরানের আসল প্রভাব পরিসংখ্যানে ধরা পড়েনি। সত্যিকারের ফাস্ট বোলিং যা করে তার সবটা কখনওই স্কোরবোর্ডে ধরা পড়ে না। ২০১৩-‘১৪ অ্যাশেজ সিরিজে অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে মিচেল জনসন ইংল্যান্ডের কী অবস্থা করেছিলেন, তা কেবল পাঁচ টেস্টে ৩৭টা উইকেট নেওয়ার তথ্য থেকে বোঝা যাবে না। ওই বোলিং দেখলে তবেই বোঝা যায়, ইংল্যান্ডের ব্যাটাররা কেমন মরার আগেই মরে বসে থাকতেন জনসনাতঙ্কে। কেভিন পিটারসেনের মতো বড় ব্যাটার কেমন ছেলেমানুষের মতো আক্রমণাত্মক খেলতে গিয়ে বোল্ড হয়েছেন, না দেখলে বিশ্বাস করা যায় না। ক্লাইভ লয়েডের পেস চতুষ্টয়ের কোনও স্পেল দেখুন ইউটিউবে, জেফ থমসনের বোলিং দেখুন, বা কার্টলি অ্যামব্রোসের অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে এক রান দিয়ে সাত উইকেট তুলে নেওয়া দেখুন। ইডেন উদ্যানে তখনও অখ্যাত শোয়েব আখতারের পরপর দু’বলে রাহুল আর শচীন তেণ্ডুলকরকে আউট করা ফিরে দেখুন। পয়লা বৈশাখ সন্ধ্যায় উমরান কলকাতা নাইট রাইডার্স অধিনায়ক শ্রেয়স আয়ারকে বোল্ড করার পর ছেলেমানুষের মতো উল্লাস করছিলেন যিনি, সেই ডেল স্টেইনের বোলিংয়ের ভিডিও দেখুন। বুঝতে পারবেন ভয়ংকর সুন্দর কাকে বলে। এমন সৌন্দর্যের প্রতি মানুষের আকর্ষণ চিরন্তন, আর এই নেশা ধরানো সৌন্দর্যেরই মালিক উমরান।

আরও পড়ুন বেলা ফুরোতে আর বসে রইলেন না শেন ওয়ার্ন

তিনি আইপিএলের চার, ছক্কায় ঝলমলে সন্ধেবেলায় ব্যাটারদের প্রাগৈতিহাসিক জঙ্গলে প্রাণ হাতে করে বাঁচা তৃণভোজীদের স্তরে নামিয়ে আনতে পারেন। কেকেআর ম্যাচে শ্রেয়স আর আন্দ্রে রাসেলের বিরুদ্ধে তাঁর বোলিং যে কোনও ক্রিকেট-রসিকের চোখে লেগে থাকবে। শ্রেয়স বারবার লেগের দিকে সরে গিয়ে উমরানকে খেলার চেষ্টা করছিলেন। অফসাইডে সীমানার কাছাকাছি একাধিক ফিল্ডার থাকা সত্ত্বেও এই কৌশল কেন, তা ধারাভাষ্যকাররা বুঝে উঠতে পারছিলেন না। সম্ভবত, বোর্ডের সঙ্গে চুক্তিই তাঁদের বুঝতে দিচ্ছিল না। কারণ পাড়ার মাঠে টেনিস বলে ক্রিকেট খেলার অভিজ্ঞতা থাকলেও বোঝা যায় ওটা কৌশল ছিল না, ছিল আত্মরক্ষার তাগিদ। একনাগাড়ে সামান্য শর্টপিচ বল করে ব্যাটারকে ওভাবে কুঁকড়ে দিয়ে, তারপর ইয়র্কারে বোল্ড করে দিতে আমরা দেখেছি ওয়াকার ইউনিসকে। রোমাঞ্চিত হয়েছি। এই রোমাঞ্চ গত দশ বছরে বিশ্ব ক্রিকেট থেকে প্রায় উধাও হয়ে গেছে। এখনও আন্তর্জাতিক ক্রিকেট না খেলা উমরান সেই রোমাঞ্চ ফিরিয়ে দিচ্ছেন আইপিএলের মঞ্চে।

ওই গতি দর্শককে রোমাঞ্চিত করে, ক্রিকেট দেখার সাবেকি আনন্দ ফিরিয়ে আনে। কিন্তু খেলাটার জন্য কী করে? মাঝারিয়ানাকে উলঙ্গ করে দেয়, খুব ভাল ক্রিকেটার আর মহান ক্রিকেটারের তফাত গড়ে দেয়। পৃথিবীজুড়ে চার, ছয় মেরে বেড়িয়ে ভূয়সী প্রশংসা পাওয়া রাসেল যেমন শুক্রবার ওই একটি ওভারে টের পেয়ে গেলেন তিনি ভিভ রিচার্ডস তো দূরের কথা, গর্ডন গ্রিনিজেরও যোগ্য উত্তরসূরি নন। ব্যাটে-বলে করতেই বিস্তর ঝামেলায় পড়লেন, একটা বাউন্সারে তো মাথা বাঁচাতে একেবারে শুয়ে পড়তে হল। উমরান হাসলেন।

কুড়ি বিশের ক্রিকেটের মুশকিল হলো, উমরানের সৌন্দর্য তারিয়ে তারিয়ে উপভোগ করার উপায় নেই। মাত্র চব্বিশটা বল, তার ওপর সীমানা এত ছোট করা আছে যে চোখ বুজে ব্যাট ছোঁয়াতে পারলেও এক-আধটা ছয় হয়ে যায়। এখন অবধি মাত্র তিনটে প্রথম শ্রেণির ম্যাচ খেলা উমরান দিনে ১৫-২০ ওভার বল করলেও এই গতি বজায় থাকবে কি না, তা ভবিষ্যৎ বলবে। উমরানের আগুনে সৌন্দর্য আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে প্রতিপক্ষ ব্যাটারদের দগ্ধ করবে কি না, সে আলোচনাও এখন থাক। আপাতত জম্মুর ছেলের শ্বাসরোধকারী সৌন্দর্য চেটেপুটে উপভোগ করে নিন। যৌবন আর গতি, দুটোই হারিয়ে যায়। বিশেষত জম্মু, কাশ্মীরের যৌবন আগলে বসে থাকা যায় না।

ঋণ: সাহেবদের থেকে শেখা খেলা দেখার অভিজ্ঞতাকে বাংলা ক্যালেন্ডার অনুযায়ী সাজিয়ে নেওয়ার চেষ্টা অধ্যাপক অভীক মজুমদারের এক সাম্প্রতিক উত্তর-সম্পাদকীয় প্রবন্ধের প্ররোচনায়। দেখা গেল তাতে ভাষাটা বেশি কাব্যিক হল। উমরানের ক্রিকেট কাব্যময়।

ইনস্ক্রিপ্টে প্রকাশিত

ঝুলন সেরা বাঙালি ক্রিকেটার? মোটেই না

ভারতীয় ফুটবলের ইতিহাস বাংলাকে বাদ দিয়ে লেখা অসম্ভব। কিন্তু গত শতাব্দীর শেষ পর্যন্তও ভারতীয় ক্রিকেটের ইতিহাস বাংলাকে বাদ দিয়ে অনায়াসে লেখা যেত। রেকর্ড বইয়ে সর্বোচ্চ রানের ওপেনিং জুটির তালিকার একেবারে শীর্ষে পঙ্কজ রায়ের নাম ছিল ঠিকই, কিন্তু রেকর্ড বই ইতিহাস নয়। একবিংশ শতাব্দীতে ভারতের ক্রিকেট ইতিহাসে বাংলার পাকাপাকি জায়গা তৈরি করেছেন দুজন। একজন অবসর নেওয়ার দেড় দশক পরেও সারাক্ষণ সংবাদের শিরোনামে, বাঙালির নয়নের মণি। অর্থাৎ সৌরভ গাঙ্গুলি। অন্যজন কে, বাজি রেখে বলতে পারি, আপনি ভুরু কুঁচকে ভাবছেন।

এই শতাব্দীর প্রথম কয়েক বছরে ফিক্সিং কেলেঙ্কারির বিপর্যয় কাটিয়ে অধিনায়ক হিসাবে সৌরভ যখন ভারতীয় ক্রিকেটের ইতিহাস বদলে দিচ্ছিলেন, সেই সময়েই ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে চেন্নাইতে একটি একদিনের ম্যাচে ভারতের হয়ে খেলতে শুরু করেন ঝুলন গোস্বামী। সে বছরই টেস্ট অভিষেক। ঝুলনের শুরুটা সৌরভের মত সাড়া জাগানো হয়নি। প্রথম টেস্টে এই ডানহাতি জোরে বোলার কোনো উইকেট পাননি। কিন্তু গত কুড়ি বছর ধরে ভারতের মহিলা দলের প্রায় সমস্ত স্মরণীয় জয়ে ঝুলনের উল্লেখযোগ্য অবদান ছিল। ২০০৬ সালে ভারতীয় মহিলারা ইংল্যান্ডের মাটিতে প্রথম টেস্ট সিরিজ জেতেন। প্রথম টেস্টে লেস্টারে নৈশপ্রহরী হিসাবে ঝুলন ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ অর্ধশতরান করেন। আর টনটনের দ্বিতীয় টেস্টে তিনি একাই একশো। প্রথম ইনিংসে ৩৩ রানে পাঁচ উইকেট, দ্বিতীয় ইনিংসে ৪৫ রানে পাঁচ উইকেট। একদিনের ক্রিকেটে ঝুলন প্রকৃতপক্ষে একজন কিংবদন্তি। চলতি বিশ্বকাপে তিনি মহিলাদের বিশ্বকাপের ইতিহাসে সর্বোচ্চ উইকেট শিকারী হলেন, তারপরেই মেয়েদের একদিনের ক্রিকেটের ইতিহাসে প্রথম বোলার হিসাবে ২৫০ উইকেটের মালিক হলেন।

যাঁরা মেয়েদের ক্রিকেটের খবর রাখেন তাঁরা জানেন, ভারতের মহিলাদের দলে এই মুহূর্তে দুজন আছেন যাঁরা সর্বকালের সেরাদের মধ্যে পড়েন। কীর্তির দিক থেকে অধিনায়ক মিতালী রাজ যদি মেয়েদের ক্রিকেটের শচীন তেন্ডুলকর হন, ঝুলন অবশ্যই কপিলদেব। দুটো দশক জুড়ে ভারতীয় বোলিংকে নেতৃত্ব দেওয়া কত শক্ত, তা কপিলদেবের চেয়ে ভাল কে-ই বা জানে? ঝুলনের নামটা মাথায় আসেনি বলে জিভ কাটছেন নাকি? কাটবেন না, কারণ দোষ আপনার নয়। শুধু যে মহিলাদের ক্রিকেট টিভিতে অনেক কম দেখানো হয় আর কাগজে অনেক কম লেখা হয় তা-ই নয়, কপিলদেব ১৬ বছরে খেলেছেন ১৩১টা টেস্ট আর ২২৫টা একদিনের ম্যাচ। ঝুলন কুড়ি বছরে ২০১ খানা একদিনের ম্যাচ (২২ মার্চ, ২০২২ তারিখে ভারত বনাম বাংলাদেশ ম্যাচ পর্যন্ত) খেললেও টেস্ট খেলেছেন মাত্র বারোটা। একদিনের ম্যাচের সংখ্যাটাও আসলে কপিলের সাথে তুলনীয় নয়, কারণ কপিলের কেরিয়ারের বেশ খানিকটা সময়ে একদিনের ক্রিকেট ছিল লম্বা টেস্ট সিরিজের শেষ পাতে মিষ্টির মত। কিন্তু ঝুলনের দু বছর আগে অভিষেক হওয়া জাহির খান বারো বছরেই দুশো একদিনের ম্যাচ খেলে ফেলেছিলেন।

ভারতীয় পুরুষদের ক্রিকেটের মহীরুহ যাঁরা, তাঁদের ঝুলিতে একটা জিনিস আছে যা বাংলার গৌরব সৌরভের ঝুলিতে নেই। ২০০৩ সালের ২৩ মার্চ রিকি পন্টিংয়ের অপরাজেয় অস্ট্রেলিয়া সৌরভের হাতে বিশ্বকাপ ওঠার সমস্ত সম্ভাবনা দুরমুশ করে চতুর্থবার বিশ্বকাপ জিতেছিল। কিন্তু কপিলদেব বিশ্বকাপ জিতেছেন, সুনীল গাভস্করও সেই দলে ছিলেন। বিশ্বসেরার মেডেল গলায় ঝুলিয়েছে শচীন তেন্ডুলকর আর মহেন্দ্র সিং ধোনিও। ব্যক্তিগত কৃতিত্বে ঝলমলে কেরিয়ারে ঝুলন আর মিতালীর ও জিনিসটার স্বাদ এখনো পাওয়া হয়নি। পেতে গেলে চলতি বিশ্বকাপে দুজনকেই নিজেদের সেরা ফর্মের কাছাকাছি থাকতে হবে। প্রথম চারটে ম্যাচে নীরব থাকার পর পঞ্চম ম্যাচে মিতালীর ব্যাট কথা বললেও পার্থক্য গড়ে দিতে পারেনি। বাংলাদেশ ম্যাচে দল জিতে গেলেও মিতালী আবার ব্যর্থ। ঝুলন মন্দ খেলছিলেন না, কিন্তু অস্ট্রেলিয়া ম্যাচে একেবারেই ফ্লপ, সহজ বাংলাদেশ ম্যাচে ছিলেন স্বমহিমায়। গতবার ফাইনালে উঠেও ইংল্যান্ডের কাছে হারতে হয়েছিল। বাকি রইল দক্ষিণ আফ্রিকা ম্যাচ। সেটা জিততে পারলে এখনো ভারতের সেমিফাইনালে পৌঁছবার সম্ভাবনা আছে। যদি শেষপর্যন্ত স্মৃতি মান্ধনা, পূজা বস্ত্রকর, শেফালি বর্মার মত তরুণদের সাথে মিতালী, ঝুলন, হরমনপ্রীতদের সুর মিলে যায় তাহলে ৩ এপ্রিল ক্রাইস্টচার্চে প্রথম বাঙালি হিসাবে ঝুলন ছুঁয়ে ফেলবেন ক্রিকেট বিশ্বকাপ। সঙ্গে থাকবেন শিলিগুড়ির রিচা ঘোষ।

চিন্তা করবেন না। এখন পর্যন্ত ধারাবাহিকতা দেখাতে না পারা ভারতীয় দলের চ্যাম্পিয়ন হওয়ার মত ঘটনা ঘটে গেলেও ঝুলনকে আমরা কেউ সেরা বাঙালি ক্রিকেটার বলার ধৃষ্টতা দেখাব না। মহিলাদের ক্রিকেট নিয়ে আমাদের আগ্রহ থাক আর না-ই থাক, শিগগির জেনে যাব যে মেয়েদের ক্রিকেটের বোলারদের গড় গতি ছেলেদের চেয়ে কম। আরও নানা তথ্য থেকে প্রমাণ করা খুব কঠিন হবে না যে মেয়েদের বিশ্বকাপ জয় আর ছেলেদের বিশ্বকাপ জয় এক নয়। সেরেনা উইলিয়ামসকে ও দেশে কেউ রাফায়েল নাদাল, রজার ফেডেরার বা নোভাক জোকোভিচের চেয়ে কম বড় খেলোয়াড় ভাবে না। তা বলে আমাদেরও যে ওভাবে ভাবতে হবে এমন মাথার দিব্যি কেউ দেয়নি।

আরও পড়ুন কালোর জন্যে কাঁদা, অথচ সাদা মনে কাদা

তাছাড়া সৌরভের বায়োপিক হওয়ার আগেই যে বলিউড ঝুলনের বায়োপিক বানিয়ে ফেলছে, সে কি কম স্বীকৃতি? তাতে আবার ঝুলনের চরিত্রে অভিনয় করছেন ছেলেদের ক্রিকেট দলের অধিনায়কের অভিনেত্রী স্ত্রী। এর চেয়ে বেশি কী-ই বা চাওয়ার থাকতে পারে ঝুলনের মত একজন শীর্ষস্থানীয় ক্রিকেটারের? ঢ্যাঙা, কালো মেয়ে মাঠে উইকেট তুলতে পারে, রান করতে পারে। কিন্তু পয়সা দিয়ে টিকিট কেটে যখন তার জীবন নিয়ে তৈরি সিনেমা দেখতে যাব, তখন পর্দায় একটা টুকটুকে মেয়ে না থাকলে চলবে কেন? আমরা মণিপুরি মেরি কমকে পর্দায় দেখি পাঞ্জাবি অভিনেত্রীর অবয়বে, বাংলার ঝুলনকেও সেভাবেই দেখব। দেখে পপকর্ন খেতে খেতে হাততালিও দেব। দেশের ক্রিকেট বোর্ডই যখন মহিলা ক্রিকেটারদের পারিশ্রমিক পুরুষদের ধারেকাছে হওয়া উচিত বলে মনে করে না, দলটার নিয়মিত খেলতে পাওয়া উচিত বলেও মনে করে না, তখন আমরা সাধারণ ক্রিকেটপ্রেমীরা সব সমান করে ভাবতে যাব কেন? আমাদের কালো মেয়ের পায়ের তলায় আলোর নাচন দেখার জন্য কেন ছটফট করব?

ইনস্ক্রিপ্টে প্রকাশিত

বেলা ফুরোতে আর বসে রইলেন না শেন ওয়ার্ন

আইপিএল আজকের তরুণ ক্রিকেট দর্শকদের কাছে জলভাত। কিন্তু আমাদের মত যারা পরিণত বয়সে আইপিএল শুরু হতে দেখেছে ২০০৮ সালে, তাদের বড় বিস্ময় লেগেছিল। আমার সেই বিস্ময় বেড়ে গিয়েছিল শেন ওয়ার্ন সম্পর্কে একটা কথা শুনে।

সদ্য আন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকে অবসর নেওয়া ওয়ার্ন সেবার আইপিএলের সবচেয়ে শস্তা দল জয়পুরের রাজস্থান রয়্যালসের একাধারে অধিনায়ক ও কোচ। নিলামের পর দলগুলোর যা চেহারা হয়েছিল, তাতে অনেকেরই ধারণা ছিল হইহই করে চ্যাম্পিয়ন হবে হায়দরাবাদের তারকাখচিত ডেকান চার্জার্স। আর জয়পুরের দলটার জায়গা হবে শেষের দিকে। ডেকান চার্জার্সের মালিক হায়দরাবাদের মহা বিত্তবান রেড্ডিরা। তাঁরা আবার ওই শহরের সবচেয়ে জনপ্রিয় ইংরেজি কাগজ ডেকান ক্রনিকলেরও মালিক। সেই কাগজের প্রতিনিধি হিসাবে মুম্বাইতে একটা আইপিএল ম্যাচ কভার করতে গিয়ে এক সর্বভারতীয় কাগজের সাংবাদিকের সাথে আলাপ হল। তার মুখেই শুনলাম রাজস্থান রয়্যালসের প্রায় অখ্যাত স্বপ্নিল অসনোদকর, রবীন্দ্র জাদেজা, ইউসুফ পাঠানদের সাথে ওয়ার্নের দারুণ ঘনিষ্ঠতা। ভারতের ঘরোয়া ক্রিকেটের এইসব চারাগাছের জন্য নাকি ওয়ার্ন বটবৃক্ষ হয়ে উঠেছেন। আমি এবং আমার কাগজের অগ্রজ সাংবাদিক কথাটা প্রথমে বিশ্বাস করিনি। কারণ অস্ট্রেলিয়ান ক্রিকেটারদের উন্নাসিকতা জগদ্বিখ্যাত। শোনা যায় কেউ কেউ প্রবল বর্ণবিদ্বেষীও। যেহেতু ডেকান চার্জার্সে সেবার চাঁদের হাট, আমরা নিজেরাও দেখেছি, টিম ফ্লাইটে ভারতীয় ক্রিকেটাররা একসঙ্গে বসেন। অ্যাডাম গিলক্রিস্ট, অ্যান্ড্রু সাইমন্ডস, হার্শেল গিবসরা নিজেদের মধ্যেই আড্ডা মারেন। আর ওয়ার্নের মত মহাতারকা অসনোদকরদের পাত্তা দেবেন, এ-ও কি সম্ভব? কিন্তু সেই সাংবাদিক বন্ধুর বিস্তারিত বিবরণ শুনে অবিশ্বাস করার উপায় রইল না।

সে বলল, প্রথম দিকে দলের ভারতীয় ক্রিকেটাররা ওয়ার্নের সাথে কথা বলতেই ভয় পেত। একে তিনি অত বড় ক্রিকেটার, তার উপর ইউসুফরা ইংরেজি বলায় একেবারেই সড়গড় নন। সাপোর্ট স্টাফের কারোর থেকে এই সমস্যার কথা জানতে পেরে ওয়ার্ন সকলকে বলেন, যে ভাষায় তোমরা স্বচ্ছন্দ সেই ভাষাতেই আমার সাথে কথা বলবে। আমি তোমাদের দেশে কাজ করতে এসেছি, আমার দায়িত্ব বুঝে নেওয়া।

শেন ওয়ার্ন বড় ক্রিকেটার বরাবরই মানতাম, কারণ গণ্ডমূর্খ না হলে মানতে সবাই বাধ্য। তাঁর প্রতি যে বিরূপতা ছিল, তা বিদায় নিল সেইদিন।

কেন ছিল বিরূপতা?

আসলে আমাদের কৈশোর ও প্রথম যৌবন কেটেছে ওয়ার্নের বোলিং দেখতে দেখতে। বলা ভাল, শচীন বনাম ওয়ার্ন দ্বৈরথ দেখতে দেখতে। আমাদের খেলা দেখতে শেখায় দল নির্বিশেষে নৈপুণ্যকে কুর্নিশ জানানোর পাঠ খুব বেশি ছিল না। আজকের কদর্য পার্টিজানশিপের সূচনা সে আমলেই হয়েছিল। আসলে আমাদের জন্যে কোনো মতি নন্দী লিখতেন না, প্রাঞ্জল বিশ্লেষণে বাঙালি পাঠককে বুঝিয়ে দিতেন না শচীন, সিধুরা অনায়াস দক্ষতায় তাঁকে মাঠের বাইরে পাঠালেও ওয়ার্ন একজন ক্ষণজন্মা শিল্পী। আমাদের সময়ে ইডেন উদ্যান থেকে রেডিওতে ভেসে আসত না ক্রিকেটরসিক অজয় বসুর কণ্ঠ। আমাদের টিভির ইডেন তখন কাগজের ভাষাতেও গার্ডেন্স হয়ে গেছে। ক্রিকেটের রোম্যান্স অনুভব করতে আমরা শিখলাম কই? ওয়ার্নের বলে শচীনের তিনরকম সুইপ, ক্রিজ ছেড়ে কোণাকুণি বেরিয়ে এসে ওয়াইড লং অন দিয়ে ছয় মারায় আমরা হাততালি দিয়েছি মূলত ভারতীয় ব্যাটার অস্ট্রেলিয় বোলারের বলে চার আর ছয় মেরেছে বলে। আমাদের মধ্যে যারা ইংরেজিতে দড় ছিল না, তারা পিটার রোবাকও পড়তে পারেনি। ওয়ার্ন কত বড় শিল্পী তা বোঝা দূরে থাক, শচীন কত বড় শিল্পী তা-ও তারা তখন বড় একটা বুঝতে পারেনি। তাছাড়া আমাদের সময়টা সুনীল গাভাসকর, গুন্ডাপ্পা বিশ্বনাথদের যুগ নয়। বিপক্ষ দলের প্রিয় ক্রিকেটারের নামে বিশ্বসেরা ব্যাটার নিজের ছেলের নাম দেবেন, সে সংস্কৃতি তখন ক্রমশ লুপ্ত হচ্ছে; আগ্রাসন শব্দটা চালু হয়ে গেছে। কখন ব্যাটার একটা মনোরম লেট কাট মারবে বা স্পিনারের একটা বল ব্যাটারকে হাস্যকরভাবে পরাস্ত করবে, আর উইকেট পড়ুক না পড়ুক ওই বলটাই মনে রেখে দেবে দর্শক — সেসব দিন তখন চলে গেছে। আমরা দীর্ঘকাল খেলায় জয়, পরাজয়ের পরেও যে কিছু থাকে তা অনুভব করিনি। অস্ট্রেলিয়া যখন ১৯৯৭-৯৮ মরসুমে ভারত সফরে এল, ওয়ার্ন নিজের খাবার হিসাবে সেদ্ধ বিনের টিন নিয়ে এসেছেন দেশ থেকে — এই খবর পড়ে আমরা যারপরনাই উত্তেজিত হয়েছি। আমাদের উত্তেজিত করা হয়েছে। কাগজে লেখা হয়েছে এটা ভারতের অপমান, শচীন আমাদের সবার হয়ে এর প্রতিশোধ নেবেন। তাই সে মরসুমে যেখানে অস্ট্রেলিয়াকে পেয়েছেন, ক্ষমতার শীর্ষে থাকা শচীন সেখানেই ওয়ার্নসুদ্ধু অজিদের একেবারে দুরমুশ করে দেওয়ায় আমরা কিছুটা অতিরিক্ত আনন্দ পেয়েছি।

কিন্তু আমাদের একটা জিনিস ছিল যা পূর্বসুরীরা পাননি। সেটা হল কেবল টিভি। তাই আমরা ভারতীয় ব্যাটিংয়ের হাতে ওয়ার্নের নাকানি চোবানি খাওয়া (১৪ টেস্টে ৪৩ উইকেট; গড় ৪৭.১৮, ৫ উইকেট মাত্র একবার) যেমন দেখেছি, তেমনি পৃথিবীর যে কোনো মাঠে, যে কোনো ধরনের পিচে অন্য দেশগুলোর মাথা ঘুরিয়ে দেওয়া দেখার সৌভাগ্যও হয়েছে। ১৯৯২ সালে সিডনিতে ভারতের বিরুদ্ধে যখন ওয়ার্নের অভিষেক হল, তখনো আমাদের এখানে ঘরে ঘরে কেবল টিভি ছিল না। সোনালি চুলের একটা ২২ বছরের ছেলেকে বেধড়ক মারছেন রবি শাস্ত্রী আর শচীন — এই দৃশ্য আমরা কেবল রাতের খাবার খেতে খেতে দূরদর্শনের হাইলাইটসে দেখেছি। পরের বছর মাইক গ্যাটিংকে বোকা বানানো ‘শতাব্দীর সেরা বল’-ও লাইভ দেখেছিল খুব অল্পসংখ্যক ভারতীয়।

কিন্তু পুরনো সুরার মত স্বাদু, অবসরের দিকে এগিয়ে চলা ওয়ার্নের ২০০৫ সালে এজবাস্টনে অ্যান্ড্রু স্ট্রসকে জোকারে পরিণত করা বলটা আমরা অনেকেই লাইভ দেখেছি।

ভাগ্যিস দেখেছি! উসেন বোল্টের দৌড়, মাইকেল ফেল্পসের সাঁতার, রজার ফেডেরারের টেনিস দেখার মত যে কটা জিনিস যখন ঘটেছে তখনই দেখেছি বলে আমাদের মধ্যে যারা আশি-নব্বই বছর বাঁচবে তারা শেষ বয়সে গর্ব করতে পারবে, তার একটা হল ওয়ার্নের বোলিং।

তাঁর কিন্তু আব্দুল কাদিরের মত রহস্যময় গুগলি ছিল না। কিন্তু যে বলের পর বল একই জায়গায় ফেলতে পারে এবং একই জায়গা থেকে লেগ ব্রেক কখনো বেশি, কখনো কম ঘোরাতে পারে — তার গুগলিটা তেমন জোরদার না হলেই বা কী? কেবল বল ঘোরানোর পরিমাণের হেরফের করে যে ওয়ার্ন একটা দলের গোটা ব্যাটিং ধসিয়ে দিতে পারতেন, তা সবচেয়ে বেশি টের পেয়েছে অস্ট্রেলিয়ার চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ইংল্যান্ড। কখনো অফস্টাম্পের অনেক বাইরের বল নিশ্চিন্তে প্যাডে নিতে গিয়ে পায়ের পিছন দিয়ে বোল্ড হয়েছেন স্ট্রস, তো কখনো বল বেশি ঘুরবে ভেবে ব্যাট বাড়িয়ে দিয়ে মাটিতে পড়ে দ্রুত গতিতে সোজা চলে আসা ফ্লিপারে এল বি ডব্লিউ হয়েছেন ইয়ান বেল। ভারত ছাড়া অন্য দলের বিরুদ্ধে ওয়ার্ন ডানহাতি ব্যাটারকে ওভার দ্য উইকেট বল করলেই তাঁকে মনে হত সাক্ষাৎ নিয়তি। যখন ইচ্ছা একটা বল ভাসিয়ে দেবেন লেগ স্লিপের দিকে, অত দূরে যাচ্ছে দেখে ব্যাটার নিশ্চিন্তে ছেড়ে দেওয়ার কথা ভাববেন অথবা চার মারার মোক্ষম সুযোগ ভেবে সুইপ করতে যাবেন। আর অমনি বলটা মাটিতে পড়ে বিদ্যুৎ গতিতে উল্টো দিকে ঘুরে স্টাম্প ভেঙে দেবে। এভাবে বোকা বনেছেন মাইকেল আর্থারটনের মত দুঁদে ব্যাটারও। ভারতীয়দের মধ্যে সম্ভবত একমাত্র এমএসকে প্রসাদকেই এরকম অপ্রস্তুতে পড়তে হয়েছিল।

আবার রাউন্ড দ্য উইকেট বল করা ওয়ার্নের বিরুদ্ধে অতি সাবধানী হতে গিয়ে হাসির পাত্র হয়ে পড়েছিলেন নিউজিল্যান্ডের ক্রেগ ম্যাকমিলান।

আমাদের কেবল টিভি ছিল, এখন ইউটিউবও আছে। যতবার খুশি এইসব মুহূর্ত দেখা যায়। অনেকে যেমন বড়ে গুলাম আলি খাঁ সাহেবের গান বারবার শোনে; ফিরে ফিরে দেখে সত্যজিৎ, ঋত্বিক, মৃণাল বা কুরোসাওয়ার ছবি।

কিন্তু ওয়ার্ন আবার ওতেও শেষ হন না। বাউন্ডারির বাইরেও তিনি একজন বেহিসাবী শিল্পী। জীবন ভোগ করবার, নিজেকে অপচয় করবার বিপুল ক্ষুধা তাঁর। এ ব্যাপারে ওয়ার্নের তুলনা চলতে পারে একমাত্র দিয়েগো মারাদোনার সাথে। ওয়ার্ন ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে যত উইকেট নিয়েছেন, ব্রিটিশ ট্যাবলয়েডগুলোকে মুখরোচক খবর আর ছবি জুগিয়েছেন বোধহয় তার চেয়েও বেশি। কখনো একাধিক যৌনকর্মীর সাথে যৌন অ্যাডভেঞ্চার, কখনো এলিজাবেথ হার্লির সাথে প্রেম। কখনো বুকিকে দিয়ে দেন পিচ সম্পর্কে তথ্য, কখনো নিষিদ্ধ ডাইইউরেটিক নিয়ে বিশ্বকাপ খেলার সুযোগ হারান। তিনি উপস্থিত থাকলে পাদপ্রদীপের আলো তাঁকে ছেড়ে থাকতে পারত না। আবার সেই আলোয় এক ঝাঁক অর্বাচীনকে আলোকিত করে তারকাখচিত আইপিএল জিতে নিয়েছিলেন ওয়ার্ন। মতি নন্দীর হয়ত সে ঘটনা দেখলে মনে পড়ত বুড়ো আর্চি ম্যাকলারেনের এক দল অপেশাদারকে নিয়ে ওয়ারউইক আর্মস্ট্রংয়ের সর্বগ্রাসী দলকে হারিয়ে দেওয়ার কথা। মহাকাব্য তো নয়ই, এ যুগ এমনকি খণ্ডকাব্যের যুগও থাকছে না। এখন ফেসবুক কবিতার যুগ, তাই টি টোয়েন্টিতেই কাব্যিকতা খুঁজতে হয় আমাদের। এ যুগে ওয়ার্ন বেমানান। তাঁর ধারাভাষ্য তাই অনেকেরই মনঃপূত হয়নি, রিচি বেনোর মত যত বড় ক্রিকেটার তত বড় ধারাভাষ্যকার হয়ে উঠতে যে ওয়ার্ন পারবেন না তা বেশ বোঝা যাচ্ছিল। তবে তাতে শিল্পী ওয়ার্নের দাম কমে না।

লেগস্পিন এমনিতেই বড় কঠিন শিল্প। বলা হয়, জন্মগত প্রতিভা না থাকলে ও জিনিসটা হয় না। ওয়ার্নের প্রজন্মে অত্যাশ্চর্যভাবে বিশ্ব ক্রিকেটে ছিলেন তিনজন সর্বোচ্চ মানের স্পিনার — ভারতের অনিল কুম্বলে, পাকিস্তানের মুস্তাক আহমেদ আর অস্ট্রেলিয়ার ওয়ার্ন। এঁদের অবসরের পরে পাকিস্তানের ইয়াসির শাহ ছাড়া আর তেমন লেগস্পিনার উঠে আসেননি। আসলে চটজলদি ক্রিকেটের রমরমার যুগে ওয়ার্নের মত বিপুল প্রতিভা না থাকলে লেগস্পিন করে টিকে থাকাই মুশকিল। এখন ফ্লাইট দিলে, লেগ ব্রেকের পর লেগ ব্রেক করে গেলে ছোট্ট মাঠে ব্যাটারের কাজ সহজ হয়ে যাবে। ওয়ার্ন পারতেন ওসব করেও একদিনের ক্রিকেটে হ্যাটট্রিক করতে, বিশ্বকাপে (১৯৯৯) সর্বোচ্চ উইকেট শিকারি হতে। টি টোয়েন্টিতেও ৭৩ ম্যাচে ওভার পিছু আটের কম রান দিয়ে সত্তরটা উইকেট নিয়েছিলেন। অ্যাডাম জাম্পা, আদিল রশিদরা পারবেন না। আর টি টোয়েন্টিতে ভাল করতে না পারলে আজকাল টেস্ট খেলার সুযোগও পাওয়া শক্ত। এখন বন্যেরা বনে সুন্দর, লেগস্পিন ইউটিউবে। ওয়ার্নকে আর ক্রিকেটের দরকার ছিল না বোধহয়।

বেলা ফুরোতেই তিনি চলে গেলেন। অন্য অনেক ব্যাপারে ওয়ার্ন একেবারেই অস্ট্রেলিয়সুলভ ছিলেন না, কিন্তু ঠিক সময়ে চলে যাওয়ার ব্যাপারে খাঁটি অস্ট্রেলিয়। তাঁর শেষ টেস্ট সিরিজ ছিল ২০০৬-০৭ অ্যাশেজ। আর্মস্ট্রংয়ের সেই দলের পর অস্ট্রেলিয়া প্রথমবার ৫-০ অ্যাশেজ জিতল। সেটা সম্ভব হত না অ্যাডিলেডে দ্বিতীয় টেস্টের পঞ্চম দিন সকালে ওয়ার্ন ইংল্যান্ডের কোমর ভেঙে না দিলে।

নাগরিক ডট নেট-এ প্রকাশিত