সাংবাদিকরাই এখন ক্রিকেট বোর্ডের ‘চিয়ারলিডার’

এই জাতীয় সাংবাদিকরাই তাই মালিকদের পছন্দের লোক হয়ে উঠলেন, কারণ এঁদের মাধ্যমে ক্রিকেটজগতের সবচেয়ে নামকরা খেলোয়াড় আর সবচেয়ে ক্ষমতাশালী প্রশাসকদের সঙ্গ পাওয়া যায়। ব্যবসায়িক সম্পর্ক স্থাপন করা যায়। কর্পোরেট মিডিয়ায় মালিকের পছন্দের লোক হওয়া মানেই উত্তরোত্তর শ্রীবৃদ্ধি। ফলে ওই সাংবাদিকরাই একতলা বাড়ি থেকে ফট্টি টু পৌঁছলেন, বিখ্যাতও হলেন। পরবর্তী প্রজন্মের সাংবাদিকরা শিখলেন— ওটাই পথ, ব্যাকওয়ার্ড পয়েন্ট আর সিলি পয়েন্টের তফাত না জানলেও ক্ষতি নেই।

নয়ের দশকে অক্ষয় কুমার অভিনীত একখানা হিন্দি ছবিতে একটি মহা চটুল গান ছিল। গানের স্থায়ীতে নায়কের বক্তব্য হল— কোথা থেকে প্রেম শুরু করব বুঝতে পারছি না।
লিখতে বসে আমারও একই অবস্থা হয়েছিল। কারণ অ2অনুস্বর সম্পাদক যে বিষয়টি বেছে দিয়েছেন তা নিয়ে অনেককিছু বলার আছে। আমাকে উদ্ধার করলেন টি টোয়েন্টি বিশ্বকাপের প্রতিবেদন লেখার দায়িত্বপ্রাপ্ত এক সাংবাদিক। তাঁর নামটি উহ্যই থাক, কামটি যখন গর্ব করার মতো নয়। তবে সোশাল মিডিয়ার দৌলতে তাঁর কামটি দুনিয়াসুদ্ধ লোক জেনে ফেলেছে।
২৬ ফেব্রুয়ারির ভারত-জিম্বাবোয়ে ম্যাচের পর সাংবাদিক সম্মেলনে আমাদের আলোচ্য সাংবাদিকটি জিম্বাবোয়ের পক্ষ থেকে আসা ক্রিকেটারটিকে প্রশ্ন করেন— আপনাদের দলের ব্যাটাররা ব্রায়ান বেনেটকে শতরান করার সুযোগ দিল না কেন? ভিডিওতে ক্রিকেটারটির মুখের চেহারা দেখে আপনার স্কুলজীবনের সেইসব বন্ধুদের মনে পড়বে, যারা ইতিহাসের সব প্রশ্নের উত্তর কণ্ঠস্থ করে স্কুলে পৌঁছে আবিষ্কার করত যে সেদিন অঙ্ক পরীক্ষা।

আপনি যদি না জেনে থাকেন যে সাংবাদিক সম্মেলনে কোন ক্রিকেটার এসেছিলেন, তাহলে আপনি হয়তো ভাবছেন—এভাবে লেখার কী আছে? প্রশ্নটা তো সঙ্গত। দল তো এমনিতেও হারত, বেচারা ৯৭ রানে অপরাজিত রয়ে গেল। সতীর্থরা একটু চেষ্টা করলে কি ওর শতরানটা হয়ে যেত না?

আবার আপনি যদি ভারতীয় ক্রিকেট ব্যক্তিসর্বস্ব বলে মনে করেন, তাহলে ভাবছেন— ঠিকই তো করেছে। দলগত খেলায় কে সেঞ্চুরি পেল না পেল তা নিয়ে ভাববে কেন? দয়া করে অত গভীরে ভাবতে যাবেন না। কারণ সাংবাদিক সম্মেলনে যিনি এসেছিলেন তিনিই বেনেট।
তিনি প্রশ্নটা শুনে অবাক হয়ে, কী প্রশ্ন করা হল জিজ্ঞেস করছেন দেখেও, সাংবাদিকটি অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে প্রশ্নটি বুঝিয়ে বলেন। তখন বেনেটকে বলতে হয়— আমিই বেনেট। তাতে হাসির রোল ওঠে এবং লজ্জাজনক ব্যাপারটির মধুরেণ সমাপয়েৎ হয়। এই হল আমাদের দেশে ক্রিকেট সাংবাদিকতার বর্তমান অবস্থা। এমন সব দুর্দান্ত পরিশ্রমী ও প্রতিভাবান লোকেরা কাজটা করছে যে, কার সাংবাদিক সম্মেলনে বসে আছে তা-ই জেনে উঠতে পারছে না।

অবশ্য অ্যালবার্ট আইনস্টাইন সম্পর্কেও কথিত আছে যে তিনি নাকি একবার ট্রেনে উঠে টিকিট হারিয়ে ফেলে যারপরনাই লজ্জিত বোধ করছিলেন, তখন টিকিট চেকার তাঁকে আশ্বস্ত করেন— আমি জানি আপনি ডক্টর আইনস্টাইন। টিকিট নিয়ে ব্যস্ত হবেন না, আপনি যখন বলছেন টিকিট কেটেছিলেন, তখন আমি বিশ্বাস করলাম। কিন্তু আইনস্টাইন আশ্বস্ত হলেন না, কারণ টিকিটটার দরকার চেকারের নয়, তাঁর নিজেরই। কোথায় যাচ্ছেন সেটাই ভুলে বসে আছেন যে।

এটি ঘটনাই হোক আর রটনাই হোক, ব্যবহার করা হয় একথা বোঝাতে যে জিনিয়াসরা এমন সব ভুল করে থাকেন যা সাধারণ মানুষের কাছে হাস্যকর। তা আমাদের সাংবাদিক বন্ধুটি যদি আপেক্ষিকতার তত্ত্ব জাতীয় কিছু আবিষ্কার করে ফেলতে পারেন, তাহলে তাঁকেও জিনিয়াস বলে মেনে নিয়ে প্রমাণস্বরূপ এই ঘটনাটি প্রচার করা যাবেখন। কিন্তু আপাতত এ ঘটনা থেকে একটি জিনিসই প্রমাণিত হচ্ছে— এদেশে ক্রিকেট সাংবাদিকতা করতে এখন ন্যূনতম যোগ্যতারও প্রয়োজন হচ্ছে না।

একথায় অনেক সাংবাদিকই তেলে বেগুনে জ্বলে উঠবেন। ভারত-দক্ষিণ আফ্রিকা ম্যাচের পরে যেমন জ্বলে উঠেছিলেন, তার কারণ আরেকখানা ভিডিও। তাতে দেখা যাচ্ছে, এক সোশাল মিডিয়া ইনফ্লুয়েন্সার ম্যাচের পরে পৌঁছে গেছেন একেবারে মাঠের মাঝখানে, যেখানে কোনো সাংবাদিক যাওয়ার অনুমতি পান না। গিয়ে কী করছেন? ম্যাচের সেরা খেলোয়াড় ডেভিড মিলারকে দাঁড় করিয়ে তাঁর চারপাশে ঘুরে ঘুরে ঠোঁট ফুলিয়ে রাগ দেখাচ্ছেন। ব্যাপারটি পড়তে যত ন্যাকা ন্যাকা লাগছে, আসলে তার চেয়েও বেশি ন্যাকা ছিল।
তবে সে ভিডিও আর দেখতে পাবেন না, কারণ সাংবাদিকদের রাগ এবং কিছু ক্ষিপ্ত ক্রিকেটভক্তের অশ্লীল মন্তব্যের ঠ্যালায় সেই ইনফ্লুয়েন্সার মহিলা ভিডিওটি মুছে দিয়েছেন। তবে তিনি একা নন, আরও কয়েকজন ইনফ্লুয়েন্সার চলতি বিশ্বকাপে এমন গুরুত্ব পাচ্ছেন আয়োজক ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের থেকে, যা নিয়ে সাংবাদিকরা সঙ্গত কারণেই রুষ্ট হয়েছেন।

এই ইনফ্লুয়েন্সারদের ক্রিকেটারদের এত কাছে যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়েছে, স্টেডিয়ামের এমন সব জায়গা থেকে তাঁরা ভিডিও করার সুযোগ পাচ্ছেন যেখানে কোনও ক্রীড়া সাংবাদিক (আলোকচিত্রী এবং ক্যামেরাপার্সনদের ধরে বলছি) যাওয়ার অধিকার পান না। অধিকার পেয়ে যেসব কনটেন্ট এই ইনফ্লুয়েন্সাররা তৈরি করছেন, তাতে ক্রিকেটের ক নেই। বিনোদন আছে, তাও অত্যন্ত মেধাহীন বিনোদন। যে কোনো খেলা থেকে একজন ক্রীড়াপ্রেমী মানুষ যে ধরনের বিনোদন পেতে পারে, সে জিনিস নয়।

কিন্তু ক্রিকেট বোর্ড সাংবাদিকদের চেয়ে এই ইনফ্লুয়েন্সারদের বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে কেন? সে প্রশ্নের উত্তর সৎভাবে খুঁজতে গেলে এদেশের ক্রীড়া সাংবাদিকদের আত্মসমালোচনা করতে হবে। করতে গিয়ে নিজেদের সম্পর্কে এত তেতো সব কথা উঠে আসবে, যে নিমপাতা মিষ্টি মনে হবে।

একটু পিছন থেকে শুরু করা যাক। ললিত মোদী ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগ চালু করার কিছুদিনের মধ্যে যেই বুঝে গেলেন যে এখান থেকে অভূতপূর্ব টাকা রোজগার করার সুযোগ রয়েছে, অমনি নিয়ম করে দিলেন— খেলার দিন খেলার মাঠে কোনে সংবাদমাধ্যম ক্যামেরা নিয়ে ঢুকতে পারবে না। মানে ভিডিও তোলা তো এমনিতেই বারণ, কারণ ভিডিও স্বত্ব সম্প্রচারকারীর দখলে; কাগজে ছাপার জন্য বা টিভির খবরে দেখানোর জন্য স্টিল ছবিও তোলা যাবে না।

তাহলে কী হবে? আইপিএল আয়োজকরা কি নিজেদের খেলার প্রচার কমিয়ে ফেলতে চান? মোটেই তা নয়। নিয়ম করা হল, ছবি নিতে হবে শুধুমাত্র আইপিএলের নিজের ওয়েবসাইট থেকে। ভারতের সংবাদমাধ্যম বিনা প্রতিবাদে এই ব্যবস্থা মেনে নিয়েছিল। নিজেদের মত করে ছবি তুলতে না পারা যে নিজের বাকস্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ— সেকথা মিডিয়ার বাবুদের কারও মাথায় আসেনি। আইপিএলের ছবি আইপিএলের হাত থেকে নেওয়া মানেই হল, যেসব ছবি তারা প্রকাশিত হতে দিতে চায়, কেবল সেসব ছবিই প্রকাশিত হবে। আয়োজকদের পক্ষে অপ্রীতিকর কোনো দৃশ্যের অবতারণা হলে তা সংবাদমাধ্যমের চোখে পড়ার রাস্তা বন্ধ করে দেওয়া হল। সংবাদমাধ্যম সোনামুখ করে এই ব্যবস্থা সেদিন মেনে নিয়েছিল।

যা অপ্রিয় তা প্রকাশ করাই যে আমাদের কাজ এবং খেলার মাঠেও তেমন কিছু ঘটতেই পারে— একথা হয় খেয়াল করেনি, অথবা সংবাদমাধ্যমের মালিক আর উচ্চপদস্থ সাংবাদিকরা ভারতীয় ক্রিকেটের নিয়ন্তাদের সঙ্গে হাত মিলিয়েই এমনটি ঘটিয়েছিলেন। কোন আশঙ্কাটি ঠিক তা আমার পক্ষে বলা সম্ভব নয়, কারণ তখন মূলধারার মিডিয়ায় (বস্তুত তখন ওই একটি ধারাই ছিল) কাজ করলেও অত উচ্চপদস্থ আমি কোনোদিনই ছিলাম না।

ললিতবাবু পরে আইপিএল সংক্রান্ত দুর্নীতির মামলায় জড়িয়ে পদচ্যুত হন এবং দেশত্যাগ করেন। ছবি সম্পর্কে ওই নিষেধাজ্ঞাও প্রত্যাহৃত হয়। কিন্তু অধিকার এমন জিনিস যে একবার ছাড়তে শুরু করলে ক্ষমতাবান ক্রমশ একটু একটু করে তা কেড়েই নিতে থাকে।

আইপিএলের মুনাফার ফলে ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড (বিসিসিআই) ফুলে ফেঁপে উঠতে থাকে এবং অর্থের জোরে তার শক্তিও বাড়তে থাকে। ভারতের মাটিতে যে কোনো আন্তর্জাতিক সিরিজের টিভি প্রযোজনা বোর্ড নিজের হাতে তুলে নিল। মানে সম্প্রচার স্বত্ব যে সংস্থার হাতেই যাক, প্রযোজনা করবে বিসিসিআই। মানে দর্শক টিভিতে কী দেখতে পাবেন, কোনটা পাবেন না— সবই চলে গেল বোর্ডের হাতে। যে সংস্থার হাতেই ক্যামেরা থাকুক, তাদের ঘাড়ে কটা মাথা যে এমন কিছু দেখাবে যা বিসিসিআইয়ের বাবুরা লোককে দেখতে দিতে চান না? আপনি বলবেন, ক্রিকেট খেলার সরাসরি সম্প্রচারে এমন কী দেখানোর থাকতে পারে, যা ক্রিকেট বোর্ড লুকোতে চায়? যাঁর বছরের পর বছর মাঠে বসে ক্রিকেট ম্যাচ কভার করার অভিজ্ঞতা নেই, তাঁকে এটা বোঝানো শক্ত।

একটা নিরীহ উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে, আপনি অনুমান করে নিতে পারেন আর কী কী না দেখানো সম্ভব। মহেন্দ্র সিং ধোনি তখনো একদিনের দলের অধিনায়ক, যদিও টেস্ট থেকে অবসর নিয়েছেন। রাঁচিতে একটা একদিনের ম্যাচ কভার করতে গেছি, ম্যাচ চলাকালীন বারবারই বিরাট কোহলি মিড অফ বা মিড অনে দাঁড়িয়ে ফিল্ডিং বদলাচ্ছিলেন, বোলারকে বিভিন্ন নির্দেশ দিচ্ছিলেন। ধোনি দর্শকের ভূমিকায়। প্রেস বক্সেও টিভি চলে, সেখানে কিন্তু একবারও এ দৃশ্য দেখানো হয়নি।

তবে প্রযোজনা বিসিসিআই নিজের হাতে নিয়ে নেওয়ায় আসল ক্ষতি দৃশ্যের দিক থেকে হয়নি, হয়েছে শ্রাব্যের দিক থেকে। মোটামুটি নয়ের দশক থেকে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের এই পরিমাণ সরাসরি সম্প্রচার দেখার সুযোগ হচ্ছে ভারতের ক্রিকেটপ্রেমীদের। যাঁদের স্মৃতি দুর্বল নয়, তাঁরা স্পষ্ট বুঝতে পারছেন ধারাভাষ্য কোথা থেকে কোথায় নেমেছে। আগে প্রাক্তন ক্রিকেটারদের ধারাভাষ্য মন দিয়ে শুনলে খেলাটা সম্পর্কে সত্যিই অনেককিছু শেখা যেত। কারণ রিচি বেনো, সুনীল গাভস্কর, জিওফ্রে বয়কট, ইয়ান চ্যাপেল প্রমুখ ধারাভাষ্যকার তাঁদের বিপুল অভিজ্ঞতা আর জ্ঞানের সদ্ব্যবহার মাঠে যা হচ্ছে তার বিশ্লেষণ করতেন। তার চেয়েও বড় কথা, দল নির্বিশেষে ভালো খেলার প্রশংসা করতেন এবং নিজের দেশের খেলোয়াড়রা খারাপ খেললেও নির্মম সমালোচনা করতেন।

আর এখন? বেনো আর টনি গ্রেগ প্রয়াত। বয়কট স্বাস্থ্যের কারণে এবং চ্যাপেল বয়সের কারণে আর ধারাভাষ্যে নেই। মাইকেল হোল্ডিং সরে যাওয়ার সময়ে বলেছিলেন বটে যে, আর মন চাইছে না; কিন্তু তিনি যেভাবে কমেন্ট্রির মাইক হাতে নিয়ে খেলার বিশ্লেষণের পাশাপাশি ক্রিকেট প্রশাসকদের বিরুদ্ধে খেলোয়াড় জীবনের মতই ভীষণ গতির বাউন্সার হাঁকাতেন, তাতে তাঁর প্রস্থানে কারা খুশি হয়েছে তা বুঝে নেওয়া শক্ত নয়। তবে সবচেয়ে শোচনীয় অবস্থা ভারতীয় ধারাভাষ্যের।

সেকালের সুরেশ সারাইয়া, নরোত্তম পুরীরা অসাধারণ ছিলেন না; প্রবাদপ্রতিম প্রাক্তন ক্রিকেটারও ছিলেন না। কিন্তু কোদালকে কোদাল বলতেন। অনেকদিন পর্যন্ত হর্ষ ভোগলেও তাই। কিন্তু অমিতাভ বচ্চন আর ধোনির টুইটের ঠ্যালায় একবার বিসিসিআইয়ের চুক্তি হারাবার পর থেকে তিনি ভারতীয়দের বেলায় কোদাল দেখলে কেবল চুপ করে থাকেন না, অনেকসময় কোদালকে এরোপ্লেনও বলে দেন। রবি শাস্ত্রী তো চিরকালই প্রশাসকদের চিৎকৃত আনুগত্য দেখিয়েছেন। তার পুরস্কারস্বরূপ ভারতীয় দলের ম্যানেজারি করার দায়িত্ব পেয়েছিলেন। কমেন্ট্রি বক্সে ফেরত এসেও একই কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। কেবল বিরাট বা রোহিত শর্মা নন, শাস্ত্রীর ধারাভাষ্য অনুসারে সূর্যকুমার যাদব, অক্ষর প্যাটেল, হার্দিক পান্ডিয়া, বরুণ চক্রবর্তীরাও একেকজন ‘গ্রেট’।

ভারতীয় দল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বা নামিবিয়াকে হারালেও ঐতিহাসিক জয় হয় আর পরপর সিরিজ হারলেও শাস্ত্রী ও সম্প্রদায় বলে যান— একটা হার একটা বিশ্বসেরা দলকে রাতারাতি খারাপ করে দেয় না। কী করে যে বিশ্বসেরা প্রমাণ হল তা বোঝা মুশকিল, তবে এই আনুগত্যের পুরস্কারস্বরূপ শিগগির মুম্বাইয়ের ওয়াংখেড়ে স্টেডিয়ামের একটি গ্যালারি শাস্ত্রীর নামাঙ্কিত হতে চলেছে।

আকাশ চোপড়া ও অন্যান্য প্রাক্তন ভারতীয় ক্রিকেটার, যাঁরা একইভাবে সমস্ত ভারতীয় ক্রিকেটারকে অন্য গ্রহের জীব বলে প্রচার করতে সদাব্যস্ত এবং বিসিসিআই ও জয় শাহের গুণগান করতে পিছপা নন, তাঁরাও আশা করতে পারেন এরকম কিছু পুরস্কার পাবেন। ভারতে তো আর ক্রিকেট স্টেডিয়ামের অভাব নেই, যতই সেখানে খেলা দেখতে যাওয়া সাধারণ দর্শকের কাছে নরকযন্ত্রণা হোক। এই নুন খাও আর গুণ গাও ব্যবস্থায় মানিয়ে নিতে পারলেন না বলে, সঞ্জয় মঞ্জরেকর বহুদিন হয়ে গেল নিয়মিত ধারাভাষ্য দেওয়ার ডাক পান না। এই সাইট সেই সাইটের বিশেষজ্ঞ হয়ে কাটে। অথচ তাঁর চেয়ে ভাষার উপর অনেক কম দখল থাকা এবং অগভীর বিশ্লেষণ করা বহু প্রাক্তন ক্রিকেটার প্রত্যেক সিরিজে এবং আইপিএলে ধারাভাষ্যকার হিসাবে থাকেন।

ভাবছেন তো, ধারাভাষ্যকারদের কথাবার্তা বিসিসিআই নিয়ন্ত্রণ করার সঙ্গে ক্রিকেট সাংবাদিকতার কী সম্পর্ক? সম্পর্কটা খুবই ঘনিষ্ঠ। প্রথমত, ধারাভাষ্য ব্যাপারটাও ক্রীড়া সাংবাদিকতারই একটা দিক। ওখানেও সত্যি কথাটা বলাই কাজ। সে কাজ আজও ইয়ান বিশপ, ইয়ান স্মিথ, নাসের হুসেন, মাইকেল অ্যাথারটনদের করতে দেখা যায়। তাঁরা ভারতের সমালোচনা করেন বলে আপনি হয়ত রুষ্ট এবং ওঁদের কথায় বর্ণবৈষম্য খুঁজছেন। কিন্তু অ্যাশেজ চলাকালীন ইংল্যান্ডের কী তীব্র সমালোচনা করেছিলেন নাসের আর অ্যাথারটন, সেটা সোশাল মিডিয়ায় খুঁজলেই পেয়ে যাবেন। আমাদের ধারাভাষ্যকাররা কী করেন? শুধু যে নিজেদের ক্রিকেটারদের কোনো দোষ দেখেন না তা নয়, ইদানীং আবার হিন্দুত্ববাদের প্রচারও করেন। কথায় কথায় লাইভ ম্যাচে মা ভবানী, বিষ্ণু, ভোলেনাথ প্রমুখ ভগবানের নাম নেন বিবেক রাজদানরা। উপরন্তু দল নির্বাচনে যত ভুলই হোক, কমেন্ট্রি বক্সে বসে সেটাকে প্রাণপণে ঠিক বলে প্রমাণ করাই তাঁদের কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এই মিথ্যাচারের ফল কিন্তু ভুগছে ভারতীয় ক্রিকেট। বহু যোগ্য ক্রিকেটার জাতীয় দলে সুযোগ পাচ্ছেন না, অযোগ্যরা খেলেই যাচ্ছেন। যদি বলেন খেলায় ফলাফলই শেষ কথা, তাহলে নিজেই বলুন, টেস্ট ক্রিকেটে ভারতীয় দলের সাফল্যের লেখচিত্র উঠছে না নামছে? একদিনের দলও নড়বড় করতে শুরু করেছে। ২০২৩ বিশ্বকাপের ফাইনালে ওঠার পর থেকে ২০২৫ চ্যাম্পিয়নস ট্রফি জিতলেও, দুর্বল শ্রীলঙ্কার কাছে ২৭ বছর পরে সিরিজ হেরেছে। নতুন বছরের শুরুতেই ঘরের মাঠে নিউজিল্যান্ডের কাছেও হারল। টি টোয়েন্টি বিশ্বকাপ পর্যন্ত জয়ের পর জয় এলেও, বিশ্বকাপ শুরু হতেই নড়বড়ে দেখাচ্ছে। দক্ষিণ আফ্রিকা ম্যাচে তো মনে হল দুই দলের মধ্যে এক সমুদ্র ব্যবধান। কিন্তু ধারাভাষ্যে কান দিন। সেই এক কথা শুনবেন— একটা ম্যাচ বা একটা সিরিজ হারলেই বিশ্বসেরা দল খারাপ হয়ে যায় না।
সবচেয়ে চোখে পড়ার মত অধঃপতন হয়েছে গাভস্করের। তিনি এখন ভারতীয় দলের ক্রিকেটারদের চেয়েও বেশি প্রশংসা করেন বিসিসিআইয়ের। এমন ভালো বোর্ড নাকি ক্রিকেটের ইতিহাসে হয়নি। ক্রিকেট দুনিয়ায় যা কিছু ভালো হচ্ছে সবই নাকি বিসিসিআইয়ের দাক্ষিণ্যে, আর যা যা খারাপ হচ্ছে? সেগুলো সবই ইংল্যান্ড আর অস্ট্রেলিয়া যখন ক্রিকেট দুনিয়াকে শাসন করত তখন আরও খারাপ ছিল। অতএব বিসিসিআই যা করছে বেশ করছে।
এবার ভাবুন, যদি কোনো দেশের ক্রিকেট বোর্ড বুঝতে পারে যে টাকার জোরে তারা তাবড় প্রাক্তন ক্রিকেটারদের দিয়ে যা খুশি বলিয়ে নিতে পারে, বলতে না চাইলে মুখ বন্ধ করিয়ে দিতে পারে, তাহলে মাস মাইনেয় বিভিন্ন কাগজে বা টিভি চ্যানেলে অথবা ওয়েবসাইটে কাজ করা সাংবাদিকদের তো এলেবেলে জ্ঞান করবেই। তাদের গলা টিপে ধরবেই। প্রেস ফ্রিডম ইনডেক্সে ভারত যে গত এক-দেড় দশকে ক্রমাগত নিচে নামছে, সেকথা তো এখন সবাই জেনে গেছেন।

সাংবাদিকদের গ্রেফতার হওয়া বা খুন হওয়ার খবরেও আজকাল আমরা আর অবাক হই না। অমুক জায়গায় সংবাদমাধ্যমের ঢোকা নিষিদ্ধ করে দেওয়া হয়েছে, তমুক জায়গায় বিশেষ একটি সংবাদমাধ্যমের সাংবাদিকদের ঢোকা বারণ— এসবও আজকাল প্রায়ই আমরা জানতে পারি। কিন্তু ভারত সরকার বা বিভিন্ন রাজ্যের সরকারগুলো এ কাজ নিয়মিত শুরু করার আগেই করেছিল বিসিসিআই। করোনা অতিমারীর সময়ে অকালমৃত আমার একদা সহকর্মী রুচির মিশ্র, নাগপুরের সাংবাদিক হয়েও জীবনের শেষ ৫-৭ বছর বিদর্ভ ক্রিকেট অ্যাসোসিয়েশন স্টেডিয়ামে (যে মাঠে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট ম্যাচ হয়) ঢুকতে পারেননি। কারণ তিনি ওই ক্রিকেট সংস্থার কর্তাদের বিপক্ষে যায়, এমন একটি প্রতিবেদন লিখেছিলেন।
স্বভাবতই, দ্য হিন্দু বা দি ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস-এর মত দু-একটি সংবাদমাধ্যম ছাড়া কোথাও আপনি এ নিয়ে কোনো প্রতিবেদন পড়বেন না যে, বিসিসিআই পৃথিবীর সবচেয়ে ধনী ক্রিকেট বোর্ড হওয়া সত্ত্বেও, অধিকাংশ স্টেডিয়ামে খেলা দেখতে গিয়ে দর্শকরা দুর্গন্ধযুক্ত, নোংরা বাথরুম পান। খাবার জলের সুব্যবস্থাও থাকে না প্রায়শই। কেবল দর্শকদেরই এই অভিজ্ঞতা হয় তা নয়। আমি নিজে ২০১১ ক্রিকেট বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালের প্রতিবেদন লিখতে আমেদাবাদে গিয়ে দেখেছি, প্রেস বক্সের বাথরুমের অবস্থা কোনো মফসসলের রেলস্টেশনের বাথরুমের থেকেও খারাপ।

কিন্তু এসব তখনো লেখা যেত না, এখনো অধিকাংশ জায়গায় যায় না। লিখলেও ছাপা হবে না, বস বলবেন ‘এটা খবর নয়।’ প্রতিবেদক বেশি চাপাচাপি করলে বেঘোরে চাকরিটা খোয়াতে হতে পারে।

ভাবুন। আপনি দর্শক, আপনার জন্যেই ক্রিকেট চলে কিন্তু। আপনি টিকিট কেটে মাঠে যান বলে বোর্ডের আয় হয়। তার থেকেও বহুগুণ বেশি আয় হয় আপনারা টিভিতে বা ওটিটিতে খেলা দেখেন বলে। আপনাদের বিজ্ঞাপনদাতারা নিজের পণ্য বা পরিষেবা চেনাতে চায় বলে বড় বড় কোম্পানি বিজ্ঞাপন দেয়, সে বাবদ টাকা নিয়েই বিসিসিআই আর আইসিসি ধনী হচ্ছে। নিজেদের আইপিএল ছাড়াও, আইসিসির টাকার সিংহভাগ বিসিসিআই নিয়ে নিচ্ছে আপনার ঘাড়ে বন্দুক রেখে ‘আমাদের জন্যেই তো এত টাকা ওঠে’ যুক্তি দিয়ে। অথচ আপনি যে ন্যূনতম পরিষেবা পান না, সেটা খবর নয়। খবর তাহলে কোনটা? গৌতম গম্ভীর কখন কালীঘাটে পুজো দিতে যাবেন।

মোদ্দাকথা, ভারতের ক্রিকেট সাংবাদিকরা এখন বিসিসিআইয়ের ‘চিয়ারলিডার’। কথাটার বাংলা নেই, তবে রবীশ কুমার ভারতের রাজনৈতিক মিডিয়ার একাংশকে চিহ্নিত করেছেন গোদি মিডিয়া বলে। কারণ তারা নরেন্দ্র মোদী সরকারের কোলে বসে শাসক দল যা বলায় তাই বলে। সেভাবে এই ক্রিকেট সাংবাদিকদেরও গোদি মিডিয়া বলা যেতে পারে। এঁরা প্রলয় দেখেও অন্ধ সেজে থাকতে পারেন এবং সোশাল মিডিয়ার যুগে যেহেতু দায়িত্ব প্রতিবেদন লেখা বা শুট করা দিয়ে শেষ হয় না, সেহেতু সোশাল মিডিয়াকে ব্যবহার করে ঠিক সেই কাজই করে থাকেন, যার সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন ‘বাবু যত বলে/পারিষদ দলে/বলে তার শতগুণ।’
ধরুন, মহম্মদ শামি প্রথম শ্রেণি, লিস্ট এ, কুড়ি বিশ— সবরকম ক্রিকেটে ঝুড়ি ঝুড়ি উইকেট নেওয়ার পরেও কেন বাদ? সরফরাজ খান আর কত রান করলে টেস্ট দলে জায়গা পাবেন? বিশেষত যেখানে দল সিরিজের পর সিরিজ হেরেই চলেছে। মুখ্য নির্বাচক অজিত আগরকর এসব প্রশ্নের উত্তর দিয়ে উঠতে পারছেন না, এদিকে এই সাংবাদিকরা একশো যুক্তি দিয়ে যাচ্ছেন। কে এঁদের দায়িত্ব দিল? কেনই বা নির্বাচকদের যে কোনো সিদ্ধান্তের সপক্ষে এঁদের যুক্তি জোগাতেই হবে? উত্তর একটাই। এঁরা বোঝেন না বা ইচ্ছে করেই ভুলে গেছেন যে এঁরা সাংবাদিক, বোর্ডের মুখপাত্র নন। একই কাজ এঁরা অনেকে কোনো নির্দিষ্ট ক্রিকেটারের হয়েও করেন। দুর্জনে বলে মোটেই নিষ্কাম কর্ম নয় এগুলো, তবে প্রমাণাভাবে সে প্রশ্নে যাচ্ছি না।
এখন কথা হল, বিনা পয়সার চিয়ারলিডারদের বিসিসিআই বা ক্রিকেটাররা কেনই বা গুরুত্ব দেবে, সম্মান করবে? প্রযুক্তির প্রভাবে খবরের কাগজ পড়া অনেক কমে গেছে। টিভির খবরের প্রতিও মানুষের আকর্ষণ দ্রুত কমছে। বহু ক্রিকেটপ্রেমীই এখন খেলার পাশাপাশি খেলার খবরও দেখেন হাতের মোবাইলেই। তাঁদের কাছে পৌঁছবার জন্যে সত্যিই তো সাংবাদিকদের চেয়ে অনেক ভালো মাধ্যম ইনস্টাগ্রামার বা ইউটিউবাররা। তাঁদের আচার আচরণ আমাদের চোখে যতই কুরুচিকর মনে হোক।

আরও পড়ুন রাষ্ট্রীয় ক্রিকেট-সেবক সংঘ

ক্রিকেটার ও প্রশাসকদের চিয়ারলিডার হয়ে যাওয়া অবশ্য শুরু করেছিলেন আগের প্রজন্মের সাংবাদিকরা। বিশেষত পশ্চিমবাংলার ক্রিকেট সাংবাদিকরা সাংবাদিকতাকে ‘পেজ থ্রি’ সাংবাদিকতায় পরিণত করার ব্যাপারে পথিকৃৎ। কী কুক্ষণে কবি বিষ্ণু দে একবার লিখে ফেলেছিলেন ‘সংবাদ মূলত কাব্য’। আজ থেকে বছর তিরিশেক আগে, বাংলার কিছু সাংবাদিক কথাটাকে আক্ষরিক অর্থে নিয়ে ফেলে ক্রিকেটের প্রতিবেদনে কাব্যি করা শুরু করে দিলেন। হয়ত খেলাটাকে বোঝা এবং বিশ্লেষণ করতে পারার খামতি ঢাকতেই। যেহেতু ওঁরা জনপ্রিয় কাগজের সাংবাদিক ছিলেন, তাই ওটাই দস্তুর হয়ে দাঁড়াল। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ওসব পড়ে শিখল— ক্রিকেট সাংবাদিকতা মানে হল, মাঠে কী ঘটছে সেটা বাদ দিয়ে ড্রেসিংরুমের অন্দরের কার সঙ্গে কার ঝগড়া হল বা গলাগলি হল, কে রাতের অন্ধকারে কোন নায়িকার সঙ্গে প্রেম করতে বেরোল— এইসব সুললিত গদ্যে লেখা।

এরকম সাংবাদিকতা করার একটা মস্ত সুবিধা আছে। কারও সমালোচনা করতে হয় না, কেউ খুব একটা চটে না। সকলের প্রিয় থাকা যায় এবং ইনি কী বললেন আর উনি কী বললেন, তাই লিখেই দিনের পর দিন চালিয়ে দেওয়া যায়। খেলোয়াড় আর প্রশাসকদের খুশি রাখতে পারলে কাঁড়ি কাঁড়ি সাক্ষাৎকার পাওয়া যায়। তাতে পরিশ্রম আরও কমে যায়। যদ শুনিতং তদ লিখিতং। উচ্চ পদে উঠে গেলে শুনে শুনে লেখার পরিশ্রমটাও করতে হয় না।
একসময় এক প্রথিতযশা ক্রিকেট সাংবাদিকের অধীনে কাজ করতাম, যাঁর কাজ বলতে ছিল রেকর্ডার নিয়ে গিয়ে কোনো একজন নামকরা বর্তমান বা প্রাক্তন ক্রিকেটারের সাক্ষাৎকার নেওয়া। তারপর সেটা নিজে টাইপ করার পরিশ্রমটুকুও করতেন না। কোনো একজন অধীনস্থ সাংবাদিকের হাতে রেকর্ডারটি ধরিয়ে দিতেন। তারপর একদিন গোটা পাতা বা অর্ধেক পাতা জুড়ে সেই হাজার হাজার শব্দের উদ্দেশ্যহীন, অর্থহীন সাক্ষাৎকার প্রকাশিত হত। কার সাক্ষাৎকার নেবেন তার পিছনেও কোন ভাবনাচিন্তা থাকত না। যাকে পেতেন তারই সাক্ষাৎকার নিতেন, খবরের দিক থেকে তাঁর ওই সময়ে কোনো প্রাসঙ্গিকতা থাক আর না-ই থাক।

এর নাম নাকি সাংবাদিকতা। এ জিনিস দিনের পর দিন চালিয়ে যেতে গেলে একটি ব্যাপারই খেয়াল রাখতে হয়— ক্ষমতাশালীদের খুশি রাখা। সে কাজটা আমার সেই বস এবং তাঁর সমসাময়িক বাংলা কাগজের ক্রীড়া সম্পাদকরা, খুব মন দিয়েই করতেন। আমার বসটি তো একবার ক্রিকেট অ্যাসোসিয়েশন অফ বেঙ্গলের নির্বাচনের আগেরদিন জগমোহন ডালমিয়া গোষ্ঠীর ইশতেহারই কাগজে ছাপিয়ে দিয়েছিলেন। সেসব পাপের ফলই এখন ফলছে। এসব হল খোলা বাজার অর্থনীতি ভারতে চালু হওয়ার পরের সাংবাদিকতার নিদর্শন। তখন সারা ভারতের সংবাদমাধ্যম সবে জনকল্যাণের লক্ষ্যে কাজ করার খোলস ছাড়তে শুরু করেছে, সংবাদমাধ্যমের মালিকরা টাকা করার নতুন নতুন রাস্তা খুঁজছেন।

এই জাতীয় সাংবাদিকরাই তাই মালিকদের পছন্দের লোক হয়ে উঠলেন, কারণ এঁদের মাধ্যমে ক্রিকেটজগতের সবচেয়ে নামকরা খেলোয়াড় আর সবচেয়ে ক্ষমতাশালী প্রশাসকদের সঙ্গ পাওয়া যায়। ব্যবসায়িক সম্পর্ক স্থাপন করা যায়। কর্পোরেট মিডিয়ায় মালিকের পছন্দের লোক হওয়া মানেই উত্তরোত্তর শ্রীবৃদ্ধি। ফলে ওই সাংবাদিকরাই একতলা বাড়ি থেকে ফট্টি টু পৌঁছলেন, বিখ্যাতও হলেন। পরবর্তী প্রজন্মের সাংবাদিকরা শিখলেন— ওটাই পথ, ব্যাকওয়ার্ড পয়েন্ট আর সিলি পয়েন্টের তফাত না জানলেও ক্ষতি নেই।

সব মিলিয়ে ভারতীয় ক্রিকেটে তৈরি হয়ে গেল এমন এক বাস্তুতন্ত্র, যেখানে কেউ কারও ভুল ধরে না। আমিও ভালো, তুমিও ভালো। কিন্তু সবার চাইতে ভালো পাঁউরুটি আর লাভের গুড়। ইতিমধ্যে এসে পড়েছে হিন্দুত্ববাদ, উগ্র জাতীয়তাবাদ। প্রথমে সরকারের গোদি মিডিয়া এই বয়ানটি দাঁড় করাল যে, সরকার মানেই দেশ। এখন বিসিসিআইয়ের গোদি মিডিয়া এই বয়ান প্রতিষ্ঠা করিয়েছে যে, জাতীয় ক্রিকেট দল মানেই দেশ। ফলে এখন ‘অ্যান্টি-ন্যাশনাল’ তকমা পেতে আর সরকারের সমালোচনা করতে হয় না, ক্রিকেট দলের সমালোচনা করাই যথেষ্ট। সমালোচনা করতে না হলে বিশ্লেষণ করতে হয় না, বিশ্লেষণ করতে না হলে পরিশ্রম করতে হয় না, মেধার দরকার হয় না। অতএব ক্রিকেট সাংবাদিকরা ক্রমশ ডোডোপাখি হয়ে যাবেন, দাপিয়ে বেড়াবেন ইনফ্লুয়েন্সাররা।

১৯৯৪ সালের ডিসেম্বরে মহম্মদ আজহারউদ্দিনের ভারত মোহালির সবুজ পিচে ওয়েস্ট ইন্ডিজের কাছে শোচনীয়ভাবে তৃতীয় টেস্টে হেরে যাওয়ার পর মতি নন্দী লিখেছিলেন ‘বিনোদ কাম্বলির ব্যাটিং বাহাদুরি সবই দেশি মন্থর বাউন্সহীন পিচে। পাথরের ওপর মাটি ফেলে তৈরি মোহালির শক্ত নিখুঁত নতুন পিচের বাউন্স এবং ওয়ালশের বলে নাক ফেটে যাওয়া প্রভাকরের রক্তাক্ত মুখ দেখার পর ভারতীয় ব্যাটিংয়ের অবস্থাটা ধরা পড়ল স্কোর বোর্ডে— এক কথায় সেটি হল ভয়।’ সমালোচনার তীক্ষ্ণতায় এর ধারেকাছে পৌঁছতে পারে এমন কোনো লেখা ভারত দেশের মাটিতে নিউজিল্যান্ডের কাছে রসগোল্লা পাওয়ার পরে আপনার প্রিয় সাংবাদিকরা কেউ লিখেছেন কি? মতিবাবু আজ এমন লিখলে সোশাল মিডিয়ায় তাঁর মা-মাসিকে ধর্ষণের হুমকি দিতেন তথাকথিত ক্রিকেটপ্রেমীরাই। অন্য সাংবাদিকরাও পোস্ট করতেন, এসব লেখা অন্যায়। একটা ম্যাচে ব্যর্থ হলেই বিশ্বসেরা দল খারাপ হয়ে যায় না।
অতএব ব্রায়ান বেনেটকে না চিনে সাংবাদিক সম্মেলনে বসাই যুগোপযোগী।

অ2অনুস্বর ডট কম ওয়েবসাইটে প্রকাশিত

খেলোয়াড় মেয়েদের জয় হোক

মেয়েদের দলের সাফল্যের চেয়ে ব্যর্থতাকে বড় করে দেখানোর যে প্রবণতা এতদিন দেখা গেছে, তার ব্যাখ্যা নারীবিদ্বেষ ছাড়া অন্য কিছু দিয়ে হয় না।

‘খেলোয়াড় মেয়ে’ কথাটা প্রথম কার মুখে শুনেছিলাম মনে করতে পারছি না, কিন্তু কয়েকশোবার শুনেছি। কোনও মেয়েকে খারাপ মেয়ে বলে দেগে দিতে এই শব্দবন্ধ বেশ জনপ্রিয়। রবিবার মাঝরাতে যখন নাদিন দে ক্লার্কের ব্যাট থেকে বেরোনো উড়ন্ত বলটাকে টেনে নামিয়ে দু-হাত ছড়িয়ে উড়ান শুরু করলেন হরমনপ্রীত কৌর আর তাঁকে ধরতে দৌড়লেন স্মৃতি মান্ধনা, শেফালি বর্মা, জেমিমা রডরিগস, দীপ্তি শর্মা, অমনজ্যোত কৌর, রিচা ঘোষ, রাধা যাদব, শ্রী চরনি, ক্রান্তি গৌড়, রেণুকা সিং ঠাকুররা— ঠিক তখন, এ-যুগের সেরা ধারাভাষ্যকার ইয়ান বিশপ বলে উঠলেন ‘এই মুহূর্ত কয়েক প্রজন্মের উত্তরাধিকার তৈরি করল।’ আমার ভাবতে ইচ্ছে হল, সেই উত্তরাধিকারের জোরে খেলোয়াড় মেয়ে কথাটা আর গালাগালি থাকবে না। চারপাশ দেখে আমরা যতই হতাশ হই প্রায়শ, দুনিয়া যে বদলায় তাতে তো সন্দেহ নেই। একসময় ভালোঘরের মেয়েরা অভিনয় করে না— এই সংস্কার তো ছিল আমাদের সমাজে। সত্যিই ‘ভালো’-ঘরের মেয়েদের অভিনয় করতে দেওয়াও হত না। সেই পরিস্থিতি তো বদলেছে। মেয়ে অভিনেত্রী হলে, বিখ্যাত হলে তাকে নিয়ে তো আজ গর্ব করেন বাবা-মা, পাড়া-প্রতিবেশীরা। তেমন এমন ভবিষ্যৎও নিশ্চয়ই আসবে, এই ভারতেই আসবে, যখন একটা মেয়ের যৌন বিশুদ্ধতাই তাকে বিচার করার সবচেয়ে বড় মাপকাঠি হয়ে থাকবে না।

বাইরে আমরা যে যা-ই বলি, মেয়েরা বিশ্বখেতাব জিতেছে বলে যতই তাদের প্রশংসায় ভরিয়ে দিই এখন, সামগ্রিকভাবে কিন্তু আজও ওটাই মাপকাঠি। মান্ধাতার আমলের কথা বলছি না। মাত্র এক দশক আগে, রিও অলিম্পিকের সময়ে, এক সর্বভারতীয় ইংরেজি কাগজে কাজ করতাম। সেদিন নিউজ এজেন্সি একটা খবর পাঠিয়েছিল গেমস ভিলেজে কন্ডোমের চাহিদা সম্পর্কে। সন্ধেবেলার এডিট মিটিংয়ে অবাক হয়ে খেয়াল করলাম, উচ্চশিক্ষিত সাংবাদিকরা জানতেনই না যে গেমস ভিলেজে অ্যাথলিটদের মধ্যে যৌন সম্পর্ক হয়। কিন্তু ব্যাপারটা বিস্ময়ে সীমাবদ্ধ থাকলেও কথা ছিল। সবচেয়ে বয়োজ্যেষ্ঠ মহিলা সাংবাদিক বলে বসলেন ‘তাহলে বাপু মেয়েদের খেলতে না দেওয়াই ভালো।’ অর্থাৎ মেয়েদের ‘সতীত্ব’ বজায় রাখাই আসল। ওটা করতে না পারলে হাজার সাফল্যেও কিছু এসে যায় না। আশা করা যাক, হরমনপ্রীতদের বিশ্বজয়ের পরে অন্তত উচ্চশিক্ষিত বাবা-মায়েরা ওই সাংবাদিকের মতো ভাবা বন্ধ করবেন।

‘অনার কিলিং’-খ্যাত হরিয়ানার মেয়ে শেফালি, হিমাচল প্রদেশের ঠাকুর পরিবারের মেয়ে রেণুকা, মুম্বাইয়ের ধার্মিক খ্রিস্টান জেমিমা বা আমাদের শিলিগুড়ির রিচা— প্রায় সকলেরই ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যাচ্ছে, তাদের ক্রিকেট শুরু ছেলেদের সঙ্গে খেলতে গিয়ে। কিংবদন্তি ঝুলন গোস্বামীর শুরুটাও একইভাবে হয়েছিল চাকদায়। কারণ মাঠের দখল ছেলেদের হাতে। খেলোয়াড় জীবন তৈরি করতে হলে এ-দেশে আগে ছেলেদের সমকক্ষ হতে হয়, তাদের হারিয়ে দেখাতে হয়। ঠিক যেমন দঙ্গল (২০১৬) ছবিতে আমরা দেখেছিলাম— মহাবীর সিং ফোগতকে মেয়েদের এমনভাবে তৈরি করতে হয়েছিল যাতে তারা কুস্তিতে ছেলেদের হারাতে পারে। অস্ট্রেলিয়া, ইংল্যান্ডের মতো দেশের মেয়েদের পেশাদার খেলোয়াড় হতে হলে এমন অসম লড়াই দিয়ে শুরু করতে হয় না। ফলে রবিবারের জয় এ-দেশের নারীবাদীদের দায়িত্ব বাড়িয়ে দিল। রাতদখলের মতো মাঠদখলের আন্দোলনও তাঁদের করতে হবে। প্রাক্তন বোর্ড সভাপতি এন শ্রীনিবাসনের সোশাল মিডিয়ায় ভাইরাল পুরনো মন্তব্য থেকে নিশ্চয়ই সকলে জেনে গেছেন ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড যাঁরা চালান, তাঁরা মেয়েদের ক্রিকেটকে কী নজরে দেখেন। বর্তমান বোর্ডকর্তারাও খুব অন্যরকম ভাবেন এমন মনে করার কারণ নেই। ফাইনালের দিন মাঠে সপরিবার জয় শাহের উপস্থিতি দেখে ঠকবেন না।

প্রথমত, ভারতের জয়ে প্রকাশ্যে উল্লাস করা তাঁর বর্তমান পদের সঙ্গে মোটেই মানানসই নয়। কারণ তিনি এখন আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিলের চেয়ারম্যান, ভারতের বোর্ডের কেউ নন, যদিও বকলমে তিনিই সর্বেসর্বা। খেলাটার প্রতি গভীরে প্রোথিত অশ্রদ্ধা না থাকলে এবং নিজের পদমর্যাদা বুঝতে সম্পূর্ণ অক্ষম না হলে ওই পদের লোক অমন আচরণ করে না। অতীতে যে ভারতীয়রা আইসিসির সর্বোচ্চ পদ অলঙ্কৃত করেছেন (যেমন জগমোহন ডালমিয়া, শরদ পাওয়ার, শশাঙ্ক মনোহর) তাঁরা এই আদেখলেপনা করতেন না। দ্বিতীয়ত, জয়ের অনুগত ভারতীয় ক্রিকেট সাংবাদিকরা এখন কদিন বিস্তর প্রোপাগান্ডা চালাবেন, জয় মেয়েদের ক্রিকেটের জন্যে কত কিছু করেছেন তার ফিরিস্তি দিয়ে। ওতেও ভুলবেন না। তথ্যের আড়ালে লুকিয়ে ফেলা তথ্য জানতে এইটা পড়ে নিতে পারেন।

সত্যিই যদি বোর্ডের মেয়েদের ক্রিকেটের প্রতি দরদ থাকত, তাহলে টুর্নামেন্টের সেরা ক্রিকেটার দীপ্তি শর্মাকে মুখ ফুটে বলতে হত না— আরও বেশি ম্যাচ খেলার ব্যবস্থা হলে ভালো হয়। মনে রাখবেন, কিংবদন্তি ঝুলন গোস্বামী দুই দশকের আন্তর্জাতিক ক্রিকেটজীবনে খেলতে পেরেছিলেন মাত্র এক ডজন টেস্ট আর ২০৪ খানা একদিনের ম্যাচ। অথচ ভারতের হয়ে বছর বারো খেলেই ৯২ খানা টেস্ট আর ২০০ একদিনের ম্যাচ খেলেছিলেন জাহির খান। বিরাট কোহলি ১৩-১৪ বছরের আন্তর্জাতিক ক্রিকেট জীবনেই ১২৩ খানা টেস্ট আর তিনশোর বেশি একদিনের ম্যাচ খেলে ফেলেছেন। আজকের বিশ্বজয়ী দলের সহ-অধিনায়িকা স্মৃতি ২০১৩ সালে অভিষেকের পর থেকে খেলেছেন ১১৭ খানা একদিনের ম্যাচ আর ২০১৪ সালে টেস্ট অভিষেকের পর মাত্র সাতখানা টেস্ট। ওদিকে একই সময়ে অভিষেক হওয়া মহম্মদ শামি খেলে ফেলেছেন ৬৪ খানা টেস্ট আর ১০৮ খানা একদিনের ম্যাচ। ইচ্ছাকৃতভাবে মেয়েদের বিশ্বকাপকে যথেষ্ট গুরুত্ব না দিয়ে ছোট ছোট শহরে ম্যাচ দেওয়া, মুম্বাইয়ের তিনটে ক্রিকেট স্টেডিয়ামের মধ্যে সবচেয়ে ঐতিহ্যহীন এবং শহরের প্রান্তে থাকা স্টেডিয়ামকে সেমিফাইনাল ও ফাইনালের জন্যে বেছে নেওয়া আর বিশ্বকাপসুলভ প্রচারের ব্যবস্থা না করা তো আছেই। বোঝাই যায়, অ্যালিসা হিলির অস্ট্রেলিয়া, ন্যাট শিভার-ব্রান্টের ইংল্যান্ড বা লরা উলভার্টের দক্ষিণ আফ্রিকা খেলছিল প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে। হরমনপ্রীতের ভারত খেলছিল প্রতিপক্ষ এবং নিজেদের বোর্ডের বিরুদ্ধে। এখন দলকে এককালীন ৫১ কোটি টাকা পুরস্কার দিয়ে নারীদরদি সাজবে বোর্ড।

আরও পড়ুন আলতো ফ্লিক: ক্রিকেট নিয়ে ব্যতিক্রমী বই

অবশ্য কেবল বোর্ডই যে হরমনপ্রীতদের বিরুদ্ধে ছিল তা নয়। মেয়েদের দল এত বছরে যতবার হেরেছে, ততবার মেয়েদের দ্বারা যে ক্রিকেট হয় না, মেয়েদের দলের পিছনে টাকা খরচ করা যে অপচয়— সে-কথা আজ উদ্বাহু নৃত্য করা সাধারণ দর্শকরা তো বটেই, ক্রীড়া সাংবাদিকরাও বলে গেছেন সোশাল মিডিয়ায়। খবরের কাগজে বা টিভি চ্যানেলে যৎসামান্য জায়গা বরাদ্দ হয়েছে মেয়েদের ক্রিকেটের জন্য। এ-কথা ঠিকই যে খেলায় সাফল্য না এলে সাধারণ মানুষের আগ্রহ বাড়ে না, সংবাদমাধ্যমেও বেশি জায়গা দেওয়ার কোনও যুক্তি নেই। এখন চূড়ান্ত সাফল্য এসেছে, স্বভাবতই সব মহলের আগ্রহ বাড়বে। কিন্তু মেয়েদের দলের সাফল্যের চেয়ে ব্যর্থতাকে বড় করে দেখানোর যে প্রবণতা এতদিন দেখা গেছে, তার ব্যাখ্যা নারীবিদ্বেষ ছাড়া অন্য কিছু দিয়ে হয় না। ভারতের মেয়েরা এর আগেও দু-দুবার একদিনের ক্রিকেটের বিশ্বকাপ ফাইনালে পৌঁছেছিল। দুবারই হেরে যাওয়া মাত্রই লেখালিখি হয়েছে— এদের দিয়ে কিস্যু হবে না। এদের জন্যে এত করা হয়, তবু…। কত যে করা হয় তার সংক্ষিপ্ত বিবরণ উপরেই দিয়েছি। এদিকে ছেলেদের দল পৃথিবীর সবচেয়ে ধনী ক্রিকেট বোর্ডের বিরাট মুনাফার যাবতীয় সুবিধা পেয়ে থাকে। অথচ গত ১২ বছরে অসংখ্য সুযোগেও বিশ্বখেতাব মাত্র একটা, তাও কুড়ি-বিশের ক্রিকেটে। বরং গত দুবছরে একদিনের ম্যাচ আর টেস্ট ক্রিকেটে হারের সংখ্যা ক্রমশ বাড়ছে। কিন্তু ওই দলের ন্যূনতম সাফল্যকেও বিরাট করে দেখাতে উঠে পড়ে লাগে বোর্ড আর তার গোদি মিডিয়া। হারা সিরিজের গুরুত্বহীন ম্যাচে রোহিত শর্মা বা বিরাট শতরান করলে সেই ইনিংসকেই কাব্যিক করে তুলতে ঝাঁপিয়ে পড়েন প্রাক্তন ক্রিকেটার, সাংবাদিক আর সোশাল মিডিয়া ইনফ্লুয়েন্সাররা। অথচ ভেবে দেখুন, কতবার আপনি পড়েছেন যে, বর্তমানে মেয়েদের ক্রিকেটে বিশ্বের অন্যতম সেরা ব্যাটার হলেন স্মৃতি, আর সবচেয়ে ধারাবাহিক অলরাউন্ডারদের একজন দীপ্তি?

যা-ই হোক, হয়তো আমি পুরুষ বলেই এসব নিয়ে ভাবছি। স্মৃতি, দীপ্তি, রিচারা যেভাবে বেড়ে উঠেছেন তাতে ওঁরা জানেন যে এরকমই হওয়ার কথা ছিল, এরকমই হবে। কদিন পরেই যদি তাঁদের কারও উপরে মেয়ে বলে কোনও আক্রমণ চলে (যেমনটা বিশ্বকাপ চলাকালীন দুই অস্ট্রেলিয়া ক্রিকেটারের উপরে চলেছে), তখন আজ মাথায় তুলে নাচা ‘পাবলিক’ এবং ‘মিডিয়া’ পাশে দাঁড়াবে না। নিজের সম্মান বজায় রাখতে না পারার দোষ নিজের— এই জাতীয় কিছু বলে দেবেন কৈলাস বিজয়বর্গীয়ের মতো কোনও নেতা। বিশ্বকাপটা যে মধ্যরাতে জেতা হয়েছিল, সে-কথা ভুলে গিয়ে কোনও মহিলা মুখ্যমন্ত্রী বলে দিতে পারেন— অত রাতে বাইরে যাওয়া উচিত হয়নি। সাংবাদিকরা গসিপের খোঁজ করবেন, কেউ হয়তো লিখে দেবেন— বিশ্বকাপ জিতে ধরা কে সরা জ্ঞান করতে শুরু করেছিল এরা। তাই এই ঘটনা ঘটেছে। এরা মহা খেলোয়াড় মেয়ে।

সে যা-ই হোক, হরমনদের দৌলতে অনেকদিন পরে আস্ত একখানা প্রতিযোগিতা দেখা গেল, যেখানে প্রতিপক্ষকে আউট করে মুখের সামনে গিয়ে অসভ্যের মতো চিৎকার করলেন না ভারতীয় ক্রিকেটাররা। আউট হলে অসন্তোষ প্রকাশ করলেন না, আম্পায়ারদের সিদ্ধান্ত নিয়ে আক্রমণাত্মক বিবৃতি দিলেন না পৃথিবীর সবচেয়ে পয়সাওয়ালা বোর্ডের খেলোয়াড় হওয়ার রেলায়। নীল জার্সির গা বেয়ে উপচে পড়ল না উগ্র জাতীয়তাবাদ, গ্যালারির হিংস্র চেহারাও দেখা গেল না।

খেলোয়াড় মেয়েদের জয় হোক।

চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম ওয়েবসাইটে প্রকাশিত

জয় শাহের দুয়ারে হাস্যকর ট্রফি প্রকল্প

ফাইনালের মঞ্চে পুরস্কার দেওয়ার সময় আয়োজক দেশ পাকিস্তানের কাউকে দেখা গেল না কর্তাদের মধ্যে। বিশ্বের কোথাও কোনও টুর্নামেন্টে এ দৃশ্য দেখেছেন?

নহবত বসেছিল, গায়ে গোলাপ জল ছেটানোর জন্যে লোক তৈরি ছিল, হেঁশেলের দিক থেকে ভেসে আসছিল বেগুনির সুগন্ধ, বরকে অভ্যর্থনা করার জন্যে কনে কর্তা জমাটি পোশাক পরে তৈরি, কিন্তু শেষপর্যন্ত বর এসে পৌঁছল না। ফলে সব আয়োজন ভেস্তে গেল। কনে কর্তা ব্যাজার মুখ করে অতিথিদের কোনোমতে নমস্কার করে খাইয়ে দাইয়ে বাড়ি পাঠিয়ে কর্তব্য সমাধা করলেন।

এই ছিল ২০২৩ বিশ্বকাপ ফাইনালের পরের অবস্থা। ভারত জিতে গেলে গোটা দলকে নিয়ে কী বিপুল নির্বাচনী প্রচারাভিযান চালাত বিজেপি, সে পরিকল্পনা কোথাও কোথাও প্রকাশিত হয়েছিল। কংগ্রেস মুখপাত্র সুপ্রিয়া শ্রীনেত দাবি করেছিলেন, রাজস্থানের এক বিজেপি নেতা তাঁকে বলেছিলেন যে বিজেপির সমস্ত হোর্ডিংয়ে বিশ্বকাপ হাতে মোদীর ছবি দেওয়ার ব্যবস্থা তৈরি ছিল। কিন্তু সে গুড়ে বালি ছড়িয়ে দিয়েছিল প্যাট কামিন্সের বাহিনি। ২০২৪ সালের ওয়ার্ল্ড টি টোয়েন্টি অবশ্য রোহিত শর্মারা জিতেছিলেন, কিন্তু ততদিনে লোকসভা নির্বাচন মিটে গেছে। ক্রমশ বিরাট হয়ে ওঠা নরেন্দ্র মোদীকে কেটে ছেঁটে দেশের অন্য নেতাদের মাপে এনে দিয়েছেন ভোটাররা। তখন আর হইচই করে কী লাভ?

সেই শোক বুঝি এতদিনে দূর হল। বিশ্বকাপ ফাইনালের পরে মোদীর পিছনে যেরকম বেচারা ভঙ্গিতে হাঁটছিলেন তৎকালীন বিসিসিআই যুগ্ম সচিব জয় শাহ, তাতে মনে হচ্ছিল বাবার বন্ধু নরেনজেঠু প্রচণ্ড ধমকেছেন ‘একটা কাজ যদি তোকে দিয়ে হয়!’ কিন্তু তাঁর নামও জয় শাহ। তিনি পরাজয় মেনে নিয়ে চুপ করে বসে থাকার লোক নন। ইতিমধ্যে আইসিসির শীর্ষপদ দখল করে জেঠুকে এবার তিনি যে উপহার দিলেন তা একেবারে নিখুঁত।

নিজে মাঠে নেমে তো খেলতে পারেন না, কিন্তু রোহিতদের সর্বোচ্চ সুযোগসুবিধা দেওয়ার ব্যবস্থা করে দিয়েছেন। ১৯৩৪ সালের ফুটবল বিশ্বকাপ ইতালিকে জেতানোর জন্যে বেনিতো মুসোলিনি কী করেছিলেন বা ১৯৭৮ সালের বিশ্বকাপ আর্জেন্টিনাকে জেতাতে সে দেশের জুন্টা সরকার কত কলকাঠি নেড়েছিল তা আজ খুব গোপন তথ্য নয়। কিন্তু সেই দুই বিশ্বকাপেও ইতালি আর আর্জেন্টিনা সে আরাম পায়নি যা এবারে রোহিতরা পেলেন।

আইসিসি চেয়ারম্যান হিসেবে ভারতের জয়ে মাঠে তাঁর উচ্ছ্বাস প্রকাশও অত্যন্ত দৃষ্টিকটু, হাসির খোরাক। ডালমিয়া, শ্রীনিবাসন, শশাঙ্ক মনোহররা অতীতে এই পদে থেকেছেন, এমন বালখিল্যসুলভ আচরণ করেননি কোনওদিন। আরও অবাক কাণ্ড, ফাইনালের মঞ্চে পুরস্কার দেওয়ার সময় আয়োজক দেশ পাকিস্তানের কাউকে দেখা গেল না কর্তাদের মধ্যে। বিশ্বের কোথাও কোনও টুর্নামেন্টে এ দৃশ্য দেখেছেন? শোয়েব আখতারের ক্ষোভ প্রকাশ স্বাভাবিক। বৈষম্য তো আরও আছে!

প্রতিযোগিতার অন্য সব দল খেলল পাকিস্তানের একাধিক মাঠে ঘুরে ঘুরে, ভারতীয় দল একেবারে অন্য দেশের একটা শহরেই পায়ের উপর পা তুলে বসে রইল। অন্য দলগুলোকে পাকিস্তান থেকে উড়ে আসতে হল, আবার ফিরে যেতে হল। এই কাণ্ড করতে গিয়ে সবচেয়ে বিরক্তিকর অবস্থা হল দক্ষিণ আফ্রিকার। ভারত কোন সেমিফাইনালে উঠবে তা জানা না থাকায় অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে তাদেরও দুবাই যেতে হল সেমিফাইনালের আগে। তারপর যখন বোঝা গেল ভারতের সঙ্গে অস্ট্রেলিয়ারই সেমিফাইনাল হবে, তখন ফেরত আসতে হল পাকিস্তানে। বিশ্রাম নেওয়ার বিশেষ সময় না পেয়েই নিউজিল্যান্ডের বিরুদ্ধে সেমিফাইনাল। সেই সেমিফাইনালে হারলেও, ৬৭ বলে অপরাজিত ১০০ রান করা ডেভিড মিলার বিরক্তি প্রকাশ করেই ফেললেন

আরও পড়ুন জয় জয় জয় জয় হে

ভারত অন্যায় সুবিধা পেয়েছে – একথা বলার সাহস ক্রিকেট দুনিয়ায় কারোর হয় না। যেমন বিশ্ব রাজনীতিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে ধমকানোর সাহস এই সেদিন পর্যন্ত কারোর হত না। কারণটা একই – সোজা কথায় টাকার গরম। আমরা আইসিসিকে সবচেয়ে বেশি ব্যবসা দিই, অতএব আইসিসির আয়ের বেশিরভাগটা আমরাই নেব – এই গা জোয়ারি যুক্তিতে ভারত, অস্ট্রেলিয়া আর ইংল্যান্ড দীর্ঘদিন হল বাকি ক্রিকেট দুনিয়াকে শুকিয়ে মারছে।

এরা যেটুকু উচ্ছিষ্ট ছুড়ে দেয় বাকিদের প্রতি, তা নিয়েই তাদের চলতে হয়। তাই কোনো বোর্ড মুখ খোলে না। বোর্ডের বারণ আছে বলে ক্রিকেটাররাও কিছু বলেন না। কিন্তু পাকিস্তানে চলল চ্যাম্পিয়নস ট্রফি আর ভারত খেলল দুবাই ট্রফি – এটা বোধহয় সহ্যের সীমা ছাড়িয়ে গেছে। তাই বোর্ডগুলো কিছু না বললেও অনেক বিদেশি সাংবাদিক ও প্রাক্তন ক্রিকেটার এবার এ নিয়ে প্রশ্ন তুলে ফেলেছেন, মিলারও মুখ খুলেছেন। সুবোধ বালক ভারতীয় মিডিয়া আর ধারাভাষ্যকাররা অবশ্য মানছেন না। তাঁরা দিল্লির প্রাক্তন বিজেপি বিধায়ক, অধুনা ভারতীয় দলের কোচ গৌতম গম্ভীরের সঙ্গে একমত। কিন্তু মহম্মদ শামি সোজা সরল লোক, তিনি মেনে নিয়েছেন যে সব ম্যাচ একই মাঠে খেলায় ভারত বিশেষ সুবিধা পেয়েছে।

বস্তুত, ক্রিকেটের অ আ ক খ জানলে এবং অন্ধ ভক্ত না হলে যে কেউ মানবেন যে সব ম্যাচ এক মাঠে খেললে সুবিধা হয়। কারণ ক্রিকেট অন্য যে কোনো খেলার চেয়ে অনেক বেশি নির্ভর করে আবহাওয়া এবং পিচের উপরে। চার স্পিনার খেলানোর জন্যে বিস্তর হাততালি কুড়োচ্ছেন গম্ভীর, রোহিত আর প্রধান নির্বাচক অজিত আগরকর। এই সিদ্ধান্ত তাঁরা নিতে পেরেছেন কারণ জানতেন, একই মাঠে ভারত সব ম্যাচ খেলবে আর সে মাঠের পিচ হবে স্পিন সহায়ক। অন্য সব দলকে কিন্তু একাধিক মাঠের পিচের কথা ভেবে দল গড়তে হয়েছিল।

একথা বললেই যা বলা হচ্ছে, তা হল – আর কী উপায় ছিল? ভারত তো পাকিস্তানে খেলতে যেতে পারত না। কারণটা রাজনৈতিক, অর্থাৎ ভারত সরকারের বারণ। কথাটা ঠিক। কিন্তু সেক্ষেত্রে ভারতের গ্রুপের সবকটা খেলাই সংযুক্ত আরব আমিরশাহীতে করা যেতে পারত, দুবাই আর শারজা মিলিয়ে। তাহলে অন্তত গ্রুপের অন্য দলগুলোও একই ধরনের পিচে একাধিক ম্যাচ খেলার সুযোগ পেত।

পাকিস্তানে খেলতে না যাওয়ার রাজনৈতিক কারণটাকেও প্রশ্ন করা দরকার। ২০০৮ সালের সন্ত্রাসবাদী হানার কথা তুলে আর কত যুগ দুই দেশের ক্রিকেটিয় সম্পর্ক অস্বাভাবিক করে রাখা হবে? মোদীর আচমকা নওয়াজ শরীফের নাতনির বিয়েতে খেতে যাওয়া, পাঠানকোটের সন্ত্রাসবাদী হানার তদন্ত করতে পাক গোয়েন্দা বিভাগকে ভারতের সেনা ছাউনিতে ঢুকতে দেওয়া – এসব তো ২০০৮ সালের অনেক পরে ঘটেছে। এমনকি গতবছর ফেব্রুয়ারি মাসে ডেভিস কাপে ভারতের টেনিস দল ইসলামাবাদে গিয়ে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে খেলে এসেছে। কেবল ক্রিকেট দল পাকিস্তানে গেলেই মহাভারত অশুদ্ধ হবে?

আজ্ঞে না, পুলওয়ামা ভুলিনি। সে ঘটনা যারা ঘটিয়েছিল তাদের শাস্তি হয়েছে? কোনো জোরদার তদন্ত হয়েছে? দাভিন্দর সিং বলে এক ভারতীয় পুলিস অফিসারকে গ্রেফতার করা হয়েছিল। তিনিও জামিন পেয়ে গেছেন ২০২০ সালে। তাহলে ক্রিকেট দলের ঘাড়ে বন্দুক রেখে জাতীয়তাবাদের নাটক করা কেন? আর সত্যিই যদি পাকিস্তান অচ্ছুত হয়, তাহলে প্রত্যেক আইসিসি প্রতিযোগিতায় ভারত আর পাকিস্তানকে এক গ্রুপে রাখাই বা কেন?

ধরা যাক, রাখা হয় না। ওটা এমনিই হয়ে যায়। তাহলেই বা ভারতীয় দল ম্যাচটা খেলে কেন? বোর্ড তো বলতে পারে – পাকিস্তানের সঙ্গে আমরা খেলব না, ওই ম্যাচের পয়েন্ট পাকিস্তানকে দিয়ে দেওয়া হোক। কেন বলে না? টিভি সম্প্রচার থেকে যে বিপুল টাকা আয় হয় তার নেশা তাহলে জাতীয়তাবাদের চেয়েও বেশি তো?

উত্তরগুলো অস্বস্তিকর। ফলে যিনি ভিন্নমত হবেন, তিনি সহজ রাস্তাটা নেবেন। বলবেন – এসব বলে ভারতের জয়কে ছোট করবেন না। ওরা পাকিস্তানে খেললেও জিতত। দুবাইতেও জিততে তো হয়েছে। আজ্ঞে হ্যাঁ, সেকথা ঠিক। তবে কথা হচ্ছে, আমাদের দেশের নির্বাচনগুলোতে যেসব দল রিগিং করে, অনেক ক্ষেত্রে রিগিং না করলেও তারাই জিতত। তাহলে কি ‘আহা! কী সুন্দর রিগিং করে!’ বলে হাততালি দিতে হবে?

উত্তরবঙ্গ সংবাদে প্রকাশিত

দায়সারা বিশ্বকাপ, শেষ বিশ্বকাপ?

কর্তারা যে ৫০ ওভারের খেলাটাকে বিদায় করতে পারলেই বাঁচেন তা সবচেয়ে স্পষ্ট করে বলেছেন হ্যাম্পশায়ার কাউন্টির প্রাক্তন অধিনায়ক এবং সদ্য পৃথিবীর প্রাচীনতম ক্রিকেট ক্লাব এমসিসির সভাপতি হওয়া মার্ক নিকোলাস।

১৯৮৭ সালে যখন প্রথমবার এদেশে ক্রিকেট বিশ্বকাপ হয় তখন দুনিয়াটাই অন্যরকম ছিল। তাই সেকথা থাক, বরং ১৯৯৬ সালের কথা ভাবা যাক। আজ ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড জাতীয় পুরুষ ক্রিকেট দলের খেলা আর আইপিএলের সম্প্রচার স্বত্ব বিক্রি করে যে টাকার হিমালয়ে চড়েছে তা টেথিস সাগরের মত উঁচু হতে শুরু করেছিল ওই সময় থেকেই। প্রয়াত জগমোহন ডালমিয়া বুঝতে পেরেছিলেন ভারতের ক্রিকেটপাগল জনতার বাজার কত লোভনীয় বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর কাছে। সেই বাজারে তাদের প্রবেশাধিকার দিয়ে এত টাকা কামাতে পারে ভারতীয় বোর্ড, যে গোটা ক্রিকেট দুনিয়া শাসন করা যাবে। ইংল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়ার চোখরাঙানি সহ্য করার বদলে তাদেরই চোখ রাঙানো যাবে। তবে ডালমিয়া ছিলেন খাঁটি ব্যবসায়ী। কামানোর জন্য খরচ করতে তাঁর আপত্তি ছিল না। বিশেষত টাকা যখন বোর্ডের, নিজের পকেটের নয়। ফলে ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা মিলিয়ে হওয়া সেবারের বিশ্বকাপে জাঁকজমকের খামতি ছিল না। সেই বিশ্বকাপ থেকে বিস্তর আয় হয়েছিল এবং তার অনেকটা ডালমিয়া পকেটে পুরেছেন – এমন অভিযোগ পরে উঠেছিল। সেসব মামলা মোকদ্দমার জেরেই একসময় তাঁকে বোর্ডছাড়া হতে হয়, পরে আবার ফিরেও আসেন। কিন্তু বিশ্বকাপের আয়োজন যে জবরদস্ত হয়েছিল তা কেউ অস্বীকার করে না। ইডেন উদ্যানে বহু অর্থ খরচ করে বিরাট উদ্বোধনী অনুষ্ঠান হয়েছিল, গঙ্গার হাওয়া এসে অদৃষ্টপূর্ব লেজার শোকে অভূতপূর্ব বিপর্যয়ে পরিণত করেছিল। ভারত সেমিফাইনালে শোচনীয়ভাবে শ্রীলঙ্কার কাছে হেরে যাওয়ার পরে লেখালিখি হয়েছিল, উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের জন্য তৈরি মঞ্চটাই নাকি যত নষ্টের গোড়া। ওটা তৈরি করতে গিয়েই নাকি পিচের বারোটা বেজে গিয়েছিল, ফলে সেমিফাইনালের দিন অরবিন্দ ডি সিলভা আর মুথাইয়া মুরলীধরন এক জাতের বোলার হয়ে গিয়েছিলেন। ২০১১ সালে ভারত, বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কায় হওয়া বিশ্বকাপেও জাঁকজমক কম ছিল না। সেবার ঢাকার বঙ্গবন্ধু ন্যাশনাল স্টেডিয়ামে বর্ণাঢ্য উদ্বোধনী অনুষ্ঠান হয়েছিল। তদ্দিনে ভারত হিমালয়ে উঠে পড়েছে, বোর্ডের টাকার অভাব নেই। ফলে বাকি বিশ্বকাপটাও হয়েছিল বিশ্বকাপের মত। আর এবার?

আজ গতবারের দুই ফাইনালিস্ট ইংল্যান্ড আর নিউজিল্যান্ড বিশ্বকাপ শুরু করবে। কিন্তু তার আগে কোনো উদ্বোধনী অনুষ্ঠান হবে না, কারণ ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড খুবই মিতব্যয়ী। চোখধাঁধানো উদ্বোধনী অনুষ্ঠান করে শুধু আইপিএল শুরুর দিনে। ১৯৯৬ সালে বোর্ড সভাপতি ছিলেন শিল্পপতি ডালমিয়া, এখন শিল্পপতি জয় শাহ। ও না! ভুল হল। বোর্ড সভাপতি ১৯৮৩ বিশ্বকাপ জয়ী ভারতীয় দলের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য রজার বিনি, জয় হলেন সচিব। আসলে বিনিকে দেখা যায় কম, শোনা যায় আরও কম। তাই খেয়াল থাকে না। মানে তাঁর অবস্থা রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মুর মত। তিনি সাংবিধানিক প্রধান বটে, সবেতেই তাঁর স্বাক্ষর লাগে বটে, কিন্তু নতুন সংসদ ভবন উদ্বোধনে তাঁকে ডাকাই হয় না। রাজদণ্ড হাতে দাঁড়িয়ে থাকেন মোদীজি। ক্রিকেট বোর্ডের সর্বেসর্বাও এখন শাহজি, বিনিজি অন্তঃপুরবাসী। যাঁর নাম জয় আর পদবি শাহ, তিনি সর্বেসর্বা হবেন না তো হবে কে? সে যতই তিনি এশিয়ান গেমসে মহিলাদের ক্রিকেটে স্মৃতি মান্ধনা একাই সোনা জিতেছেন মনে করুন না কেন।

কথা হল, জগমোহনের বিশ্বকাপ আয়োজন করা নিয়ে যা উৎসাহ ছিল, জয়ের তার অর্ধেকও দেখা যাচ্ছে না। তাই এবারের বিশ্বকাপের সূচি ঘোষণা হয়েছে মাত্র ১০০ দিন আগে, যেখানে পৃথিবীর যে কোনো খেলায় বিশ্বকাপের সূচি ঘোষণা হয়ে যায় বছরখানেক আগে। আগামী বছর জুন মাসে ওয়েস্ট ইন্ডিজ ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে অনুষ্ঠেয় ওয়ার্ল্ড টি টোয়েন্টির সূচি যেমন প্রকাশিত হয়েছে গত মাসে। কারণ বিভিন্ন দেশের মানুষকে খেলা দেখতে একটা নির্দিষ্ট সময়ে একটা দেশে পৌঁছতে হবে। যাতায়াতের ব্যবস্থা করতে হবে, থাকার ব্যবস্থা করতে হবে। সেসব প্রস্তুতি নেওয়ার জন্য যত কম সময় পাওয়া যাবে খরচ বেড়ে যাবে ততই। অব্যবস্থা দেখা দেবে, যে দেশে খেলা সেই দেশে বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি তৈরি হবে। কিন্তু ওসব ভাবনা রাজা বাদশাহরা কবেই বা করলেন? তাঁরা চলেন নিজের নিয়মে, বাকি সকলকে মানিয়ে নিতে হয়। বিশ্বকাপ এমনিতে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিলের প্রতিযোগিতা, ফলে সূচি ঘোষণা করার কথা তাদের। কিন্তু আয়োজক দেশকেই ঠিক করতে হয় সূচিটা। একথাও কারোর জানতে বাকি নেই যে ফুটবল দুনিয়াকে ফিফা যেভাবে নিয়ন্ত্রণ করে, আইসিসির মুরোদ নেই তা করার। ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের অর্থবল এত বেশি যে আইসিসি এখন ঠুঁটো জগন্নাথ। অনতি অতীতে আইসিসির ফিউচার টুরস প্রোগ্রামে (অর্থাৎ পরবর্তী কয়েক বছরের আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের নির্ধারিত সূচিতে) আইপিএলের জন্য যে আরও বেশি ফাঁক রাখা হবে তা ঘোষণা করে দিয়েছেন শাহজিই, আইসিসি নয়। তা নিয়ে আইসিসি ট্যাঁ ফোঁ করতে পারেনি। ফলে এত দেরিতে বিশ্বকাপের সূচি ঘোষণার দায় আইসিসির ঘাড়ে চাপানো চলে না।

তবে অস্বাভাবিক দেরিতে সূচি ঘোষণাতেই অব্যবস্থার শেষ নয়, বরং সূচনা। কয়েক দিনের মধ্যেই দেখা গেল বিভিন্ন আয়োজক রাজ্য সংস্থা তাদের স্টেডিয়ামে যেদিন ম্যাচ দেওয়া হয়েছে সেদিন আয়োজন সম্ভব নয় বলছে। খোদ কলকাতাতেই যেমন কালীপুজোর দিন ইংল্যান্ড বনাম পাকিস্তান ম্যাচ রাখা হয়েছিল। ক্রিকেট ম্যাচ আয়োজনের অভিজ্ঞতা না থাকা মানুষও বোঝেন যে সেদিন ম্যাচ আয়োজন করা অসম্ভব, কিন্তু দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর পুত্র বোঝেন না। ক্রীড়াসূচি তৈরি করার সময়ে যে যেখানে খেলা সেখানকার আয়োজকদের সঙ্গে আলোচনা করতে হয়, সম্ভবত তাও তিনি বোঝেন না। নইলে ক্রিকেট অ্যাসোসিয়েশন অফ বেঙ্গলের আয়োজকরা নিশ্চয়ই এত বোকা নন যে কালীপুজোর দিন ম্যাচ করতে রাজি হবেন? জয় শাহীর মজা হল, হিন্দুত্ববাদী দলের নেতা অমিত শাহের পুত্র সর্বেসর্বা হলেও বিশ্বকাপের সূচি বানানোর সময়ে বোর্ডের খেয়ালই ছিল না যে ১৫ অক্টোবর নবরাত্রি উৎসবের সূচনা, সেদিন আমেদাবাদ শহরে ভারত বনাম পাকিস্তান ম্যাচ করা সম্ভব নয়। এহেন প্রশাসনিক নৈপুণ্যের কারণে অনেক দেরিতে সূচি ঘোষণা করার পরেও সব মিলিয়ে গোটা দশেক ম্যাচের দিনক্ষণ বদল করতে হয়েছে।

এখানেই শেষ নয়। বিশ্বকাপের টিকিট বিক্রি নিয়ে যা চলছে তা প্রাক-২০১৪ ভারতে সম্ভবত তদন্তযোগ্য কেলেঙ্কারি বলে গণ্য হত এবং সমস্ত খবরের কাগজ, টিভি চ্যানেলে দিনরাত এ নিয়েই তর্কাতর্কি চলত। একে তো টিকিটের আকাশছোঁয়া দাম, তার উপর বিশ্বকাপের টিকিট অনলাইনে কিনতে গিয়ে অনেকেই তাজ্জব বনে গেছেন। ঘন্টা চারেক ‘কিউ’-তে পড়ে থেকেও টিকিট পাননি অনেকে। আইসিসি এখন পর্যন্ত বলেনি কত টিকিট বিক্রি হওয়ার কথা ছিল আর কত টিকিট বিক্রি হয়েছে। বিক্রির দায়িত্বে থাকা বুকমাইশো সোশাল মিডিয়ায় জানিয়েছে, তাদের হাতে নাকি সীমিত সংখ্যক টিকিটই আছে। এত টিকিট গেল কোথায়? এসব নিয়ে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে যত লেখালিখি হয়েছে, ভারতের সংবাদমাধ্যমে তত হয়নি। ইংরেজি ভাষার সংবাদমাধ্যমে তবু খানিকটা হয়েছে, বাংলার কথা না বলাই ভাল। একদিকে টিকিটের আকাল, অন্যদিকে একাধিক সংবাদমাধ্যম জানাচ্ছে, আজকে উদ্বোধনী ম্যাচে নরেন্দ্র মোদী স্টেডিয়ামে নাকি ৪০,০০০ মহিলাকে দর্শক হিসাবে নিয়ে আসার ব্যবস্থা করেছে গুজরাট বিজেপি। আমেদাবাদের ওয়ার্ডে ওয়ার্ডে হোয়াটস্যাপে আমন্ত্রণ পাঠিয়ে নাকি এই ব্যবস্থা করা হয়েছে। তাহলে কি বিশ্বকাপের টিকিট পেতে গেলে বিজেপির সদস্য বা সমর্থক হতে হবে? সেকথা যদি ঠিক না-ও হয়, এই বিশ্বকাপে হক যে অন্য সব রাজ্যের চেয়ে গুজরাটের বেশি, তাতে কিন্তু সন্দেহ নেই। ভারতে এর আগে অনুষ্ঠিত তিনটে বিশ্বকাপে মুম্বাইয়ের ওয়াংখেড়ে স্টেডিয়াম, কলকাতার ইডেন উদ্যান, দিল্লির ফিরোজ শাহ কোটলা বা চেন্নাইয়ের চিদম্বরম স্টেডিয়ামের মত ঐতিহ্যশালী মাঠের যে সৌভাগ্য হয়নি সেই সৌভাগ্যই এবার হয়েছে নরেন্দ্র মোদী স্টেডিয়ামের। বিশ্বকাপের উদ্বোধনী ম্যাচ ওখানে, ফাইনাল ওখানে, আবার ক্রিকেটবিশ্বের সকলের চোখ থাকে যে ম্যাচের দিকে – সেই ভারত বনাম পাকিস্তান ম্যাচও ওই মাঠেই।

কেন ঘটছে এসব? জলের মত সরল করে বুঝিয়ে দিয়েছেন বহুদিনের ক্রীড়া সাংবাদিক শারদা উগ্রা, সম্প্রতি দ্য ক্যারাভ্যান পত্রিকায় প্রকাশিত তাঁর দীর্ঘ প্রতিবেদনে, যার শিরোনাম Shah’s playground: BJP’s Control of Cricket in India। সেই প্রতিবেদনে বোর্ডের কর্মকর্তাদের উদ্ধৃত করে জানিয়েছেন, অমিতপুত্র বোর্ড চালান একেবারেই একনায়কত্বের ঢঙে। মিনমিনে বিনির সময় থেকে নয়, সৌরভ গাঙ্গুলি বোর্ড সভাপতি থাকার সময় থেকেই। অনেকসময় তিনি বোর্ডের অন্যদের সৌরভের ফোন ধরতে বারণ করতেন। যদি সৌরভ বলতেন অমুক ম্যাচটা ওইদিন হতে হবে, অবধারিতভাবে অন্য কোনোদিন ধার্য করা হত। জয়ের সঙ্গে হাত মিলিয়ে সুপ্রিম কোর্টকে কাঁচকলা দেখিয়ে নিজের সভাপতি পদের মেয়াদ বাড়িয়ে নেওয়া সৌরভ এসব মেনে নিয়েই পদ আঁকড়ে পড়েছিলেন। বোঝা শক্ত নয়, কেন বিশ্বকাপ আয়োজনে এত ডামাডোল। যাঁর কোনো প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা নেই, তিনি যদি একনায়কের কায়দায় এত বড় প্রতিযোগিতার আয়োজন করেন তাহলে এর চেয়ে উন্নত আর কী হওয়া সম্ভব?

আরও পড়ুন ক্রিকেট জেনেশুনে বিশ করেছে পান

যোগ্যতার অভাবের পাশাপাশি সদিচ্ছার অভাবটাও অবশ্য উড়িয়ে দেওয়ার নয়। ১৯৯৬ সালে একদিনের ক্রিকেটের রমরমা ছিল, এখন বিশ্বজুড়েই ৫০ ওভারের খেলা অবাঞ্ছিত। ১৯৭০-এর দশকে একদিনের ক্রিকেটের দরকার হয়েছিল টেস্টের একঘেয়েমি কাটিয়ে মাঠে দর্শক ফেরাতে। সেই চেষ্টা সফল হয়। পরে খেলায় আরও বিনোদন আনতে কেরি প্যাকার চালু করেন রঙিন জামা, সাদা বলে দিনরাতের একদিনের ম্যাচ। প্রথম দিকে তিনি বিদ্রোহী তকমা পেলেও শেষপর্যন্ত কর্তারা বোঝেন এতে বিপুল মুনাফার সম্ভাবনা। প্যাকারের ক্রিকেটই হয়ে দাঁড়ায় মান্য একদিনের ক্রিকেট। এখন আর সে দিন নেই। বিশ্বজুড়ে বাড়ছে ফ্র্যাঞ্চাইজ ক্রিকেট। ক্রিকেটের কর্তাব্যক্তিরা তাকে যথেচ্ছ বাড়তেও দিচ্ছেন, কারণ ওতেই পকেট ভরে যাচ্ছে। যদি একদিনের ক্রিকেটের প্রতি মমতা থাকত, তাহলে ফ্র্যাঞ্চাইজ লিগগুলোতে লাগাম দিতেন। টি টোয়েন্টির মত একদিনের ক্রিকেটেও দুই প্রান্ত থেকে দুটো বলে খেলা চালু করে, মাঠের সীমানা দৃষ্টিকটুভাবে ছোট করে এনে, ইনিংসের সবকটা ওভারকেই ফিল্ডিং সাজানোর নানাবিধ নিষেধের আওতায় নিয়ে এসে ব্যাট-বলের লড়াইকে দুদলের ব্যাটারদের চার, ছয় মারার প্রতিযোগিতায় পরিণত করতেন না। ফল যা হওয়ার তাই হয়েছে। কথায় কথায় সাড়ে তিনশো-চারশো রান হচ্ছে, দ্বিশতরান হচ্ছে মুহুর্মুহু। পুরুষদের একদিনের ক্রিকেটে ২০১০ সালে শচীন তেন্ডুলকার প্রথম দ্বিশতরান করার পর থেকে গত ১৩ বছরে আরও নখানা দ্বিশতরান হয়ে গেছে, একা রোহিত শর্মার ঝুলিতেই তিনখানা। অথচ একদিনের ক্রিকেটের প্রতি দর্শকদের আগ্রহ কমে গেছে পৃথিবীর সর্বত্র। ঘন্টা তিনেক লাগাতার চার-ছক্কা দেখতে ভাল লাগে, ছ-সাত ঘন্টা ধরে ও জিনিস দেখা সাধারণত ক্লান্তিকর। শেষের দিকের ওভারগুলোতে পুরনো বলে রিভার্স সুইং করিয়ে ব্যাটারদের কাজ কঠিন করে দেওয়া বোলারদের পক্ষে দুঃসাধ্য হয়ে গেছে। স্পিনারদেরও চকচকে নতুন বলে চার, ছয় না খাওয়ার দিকেই মনোযোগ দিতে হচ্ছে। ওয়াসিম আক্রাম, শেন ওয়ার্নরা এখন খেললে কোনো তফাত গড়ে দিতে পারতেন কিনা বলা মুশকিল।

খেলোয়াড়রাও ইদানীং ৫০ ওভারের ক্রিকেট খেলার আগ্রহ হারিয়ে ফেলছেন। অনেক কম পরিশ্রমে অনেক বেশি টাকা রোজগার করা যাচ্ছে কুড়ি বিশের ক্রিকেট খেলে। ফলে ওটাকেই তাঁরা অগ্রাধিকার দিচ্ছেন। টেস্ট ক্রিকেট আর ফ্র্যাঞ্চাইজ ক্রিকেট খেলে শরীরেও আর এত তাগদ থাকছে না যে একদিনের ক্রিকেট খেলবেন। গত বিশ্বকাপের সেরা ক্রিকেটার বেন স্টোকস তো গতবছর একদিনের ক্রিকেট থেকে অবসরই নিয়ে ফেলেছিলেন। ইংল্যান্ডের ক্রিকেটকর্তারা অনেক বলে কয়ে তাঁকে শুধুমাত্র ২০২৩ বিশ্বকাপ খেলতে রাজি করিয়েছেন। বিশ্বকাপের পর কী হবে কেউ জানে না। নিউজিল্যান্ডের সেরা বোলার ট্রেন্ট বোল্টও নিজের দেশের বোর্ডের কেন্দ্রীয় চুক্তি থেকে অব্যাহতি নিয়েছেন। অর্থাৎ দেশের হয়ে খেলার আগ্রহ কমে গেছে, ফ্র্যাঞ্চাইজ ক্রিকেটের দিকে ঝুঁকছেন। ভারতের সাদা বলের অধিনায়ক রোহিত শর্মা আর বিরাট কোহলিও সাম্প্রতিককালে একদিনের ম্যাচের সিরিজে একটা ম্যাচ খেলেন তো দুটো ম্যাচে বিশ্রাম নেন। বিশ্বকাপের আগে শেষ দুটো সিরিজ ছিল এশিয়া কাপ আর অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে দ্বিপাক্ষিক সিরিজ। তারও সব ম্যাচ খেললেন না।

কর্তারা যে ৫০ ওভারের খেলাটাকে বিদায় করতে পারলেই বাঁচেন তা সবচেয়ে স্পষ্ট করে বলেছেন হ্যাম্পশায়ার কাউন্টির প্রাক্তন অধিনায়ক এবং সদ্য পৃথিবীর প্রাচীনতম ক্রিকেট ক্লাব এমসিসির সভাপতি হওয়া মার্ক নিকোলাস। ইএসপিএন ক্রিকইনফো ওয়েবসাইটকে তিনি বলেছেন, একদিনের ক্রিকেট আগামীদিনে বিশ্বকাপের বাইরে আর হওয়ার মানে হয় না। এমসিসি এখন আর ক্রিকেটের নিয়ামক সংস্থা নয়, কিন্তু ইংল্যান্ডের ক্রিকেটে এখনো তাদের মতামতের বিস্তর গুরুত্ব আছে আর ইংল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়ার বোর্ডগুলোই জয় শাহের বোর্ডের পরে সবচেয়ে ধনী বোর্ড। বস্তুত তারা ভারতীয় বোর্ডের নন্দী, ভৃঙ্গী। অনেকের ধারণা ভারতই ৫০ ওভারের খেলাটাকে ধরে রেখেছে এবং এবারের বিশ্বকাপটা জমজমাট হলে খেলাটা বেঁচে যাবে। এককথায়, ভারতই পারে বাঁচাতে। পারে হয়ত, কিন্তু বিশ্বকাপ আয়োজনে যে অযত্ন প্রকট তাতে বাঁচানোর ইচ্ছা আছে বলে তো মনে হয় না। আগামী কয়েক মরসুমে আইপিএলকে আরও লম্বা করার যে পরিকল্পনা চূড়ান্ত করে ফেলা হয়েছে সেটাও একদিনের ক্রিকেটের প্রতি ভালবাসার লক্ষণ নয়। অতএব ২০২৭ সালে আর ৫০ ওভারের বিশ্বকাপ না হলে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না। ভবিষ্যৎ সম্পর্কে এতখানি অনিশ্চয়তা নিয়ে সম্ভবত কোনো খেলার বিশ্বকাপ শুরু হয়নি এর আগে।

নাগরিক ডট নেটে প্রকাশিত