বাকস্বাধীনতা এখন রীতিমতো কমেডি

পাটনার আন্দোলনে এক যুবক উপস্থিত পুলিশকর্মীকে জিজ্ঞেস করছেন “কাঁদানে গ্যাস, জলকামানের ব্যবস্থা করেছেন?” উত্তরে তিনি না বলায় বলছেন “এ কে ৪৭?” তাতেও না বলায়, যেন ভারি হতাশ হয়ে বলছেন “কিছুরই ব্যবস্থা করেননি?”

দেশ স্বাধীন হতে না হতেই কমিউনিস্টরা স্লোগান তুললেন “ইয়ে আজাদি ঝুঠা হ্যায়”;অর্থাৎ এই স্বাধীনতা মিথ্যা। তাঁদের বক্তব্য— এ কেবল রাজনৈতিক স্বাধীনতা, দেশের গরিব নিপীড়িত মানুষ অর্থনৈতিকভাবে স্বাধীন না হলে সেটা স্বাধীনতাই নয়। কেবল স্লোগান তুললে তো রাজনীতি হয় না,যে কোনো পার্টিকেই তার বার্তা উদ্দিষ্ট মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার একাধিক পথ বের করতে হয়। আজকের রিলের যুগে যেমন, সে যুগেও তেমন গানের মাধ্যমে বার্তা দিলে অনেক সহজে অনেক বেশি মানুষের কাছে পৌঁছত। বিশেষ করে গান একেবারে লেখাপড়া না জানা মানুষের কাছেও বার্তা পৌঁছে দিতে পারে,যা অনেকসময় বক্তৃতা বা প্যামফ্লেট পারে না। তাই অবিভক্ত কমিউনিস্ট পার্টির সাংস্কৃতিক শাখা,ভারতীয় গণনাট্য সঙ্ঘের সদস্যরা ১৯৪৮ সালে গান বাঁধলেন—মাউন্টব্যাটেন মঙ্গলকাব্য। বাংলার প্রাচীন মঙ্গলকাব্যের প্রকরণ মেনে তাতে ভারতের স্বাধীনতাকে তুলে ধরা হল স্রেফ ক্ষমতা হস্তান্তর হিসাবে। “মাউন্টব্যাটন সাহেব ও/তোমার সাধের ব্যাটন/কার হাতে থুইয়া গেলায়ো।” সেই গানে মাউন্টব্যাটেনের স্থলাভিষিক্ত গভর্নর জেনারেল চক্রবর্তী রাজাগোপালাচারী নয়, প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু এবং বল্লভভাই প্যাটেল, মৌলানা আবুল কালাম আজাদের মত মন্ত্রিসভার অন্য সদস্যদের নিয়েও একেবারে নাম করে প্রচণ্ড ব্যঙ্গ করা হয়। সে গান নিষিদ্ধ করেনি ভারত সরকার বা পশ্চিমবঙ্গ সরকার। সেই গান যাতে ছড়াতে না পারে তার ব্যবস্থা করেছিল বলেও জানা যায় না। কমিউনিস্ট পার্টি ওই ১৯৪৮ সালেই নিষিদ্ধ হয়েছিল, কিন্তু সেটা ওই গানের জন্যে নয়।

বছর চল্লিশেক এগিয়ে আসা যাক। ১৯৮৯ লোকসভা নির্বাচনের আগে বিদায়ী প্রধানমন্ত্রী সম্পর্কে বিরোধীরা স্লোগান তোলেন “গলি গলি মে শোর হ্যায়/রাজীব গান্ধী চোর হ্যায়।” কারণ তার কিছুদিন আগেই অভিযোগ উঠেছে— ভারতীয় সেনাবাহিনীর জন্য সুইডেনের অস্ত্র নির্মাণ কোম্পানি বোফর্সের কাছ থেকে অস্ত্র কেনায় প্রায় ১,৪০০ কোটি টাকার দুর্নীতি হয়েছে এবং স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী ঘুষ খেয়েছেন। গোটা নির্বাচন পর্ব এই স্লোগান চলে,আমরা দেখতাম দেয়াল জুড়ে এই স্লোগান লেখা হচ্ছে পাড়ায় পাড়ায়। রাজীব তথা কংগ্রেস আগাগোড়া এই অভিযোগ অস্বীকার করে, কিন্তু নির্বাচনে কংগ্রেস জনসমর্থন হারায়। একদা রাজীবের মন্ত্রিসভার সদস্য বিশ্বনাথ প্রতাপ সিং প্রধানমন্ত্রী হন। কিন্তু একবারের জন্যও রাজীব নিজে বা কংগ্রেস বলেনি যে প্রধানমন্ত্রী চেয়ারটা সাংবিধানিক, তাঁকে চোর বলা মারাত্মক পাপ। অথবা যারা তাঁকে চোর বলছে তারা দেশদ্রোহী, বা তাদের পাকিস্তানে চলে যাওয়া উচিত। ফলে আজ আরও প্রায় ৪০ বছর পরে যখন প্রধানমন্ত্রীকে ঠাট্টার পাত্র বানিয়ে ফেলার জন্যে ছাত্রছাত্রীদের গ্রেফতার করা হচ্ছে; ১৫ বছরের মেয়ের বাড়িতে ঢুকে পড়ে তাকে এবং তার মাকে এমন ভয় দেখানো হচ্ছে যে তাঁরা বাড়ি ছেড়ে দিতে বাধ্য হচ্ছেন; যারা প্রধানমন্ত্রীকে হাসি ঠাট্টা, কার্টুনের বিষয়বস্তু বানিয়ে ফেলেছেন তাঁদের বিরুদ্ধে এফআইআর হচ্ছে এবং উন্মত্ত জনতা তাঁদের বাড়ি পৌঁছে যাচ্ছে, তখন সত্যিই প্রশ্ন করতে ইচ্ছে হয় “ইয়ে আজাদী সচ হ্যায় ইয়া ঝুঠা হ্যায়?”এই স্বাধীনতা সত্য না মিথ্যা?

যে দেশে প্রকাশ্যে কিছু বলতে গেলে বা লিখতে গেলে শতবার ভাবতে হয়— বাড়িতে পুলিশ অথবা গুন্ডাবাহিনী আসবে কিনা, সে দেশে বাকস্বাধীনতা যে ঘোর বিপদে তা নিয়ে সন্দেহের অবকাশ নেই। তবু যে আমাদের ৮০তম স্বাধীনতা দিবসে দাঁড়িয়ে নিজেদের শেষ বিচারে স্বাধীন দেশের নাগরিক বলেই মনে হচ্ছে, তার কৃতিত্ব কিন্তু সরকার বা আদালতের নয়। কৃতিত্ব দেশের নাগরিকদের। যাবতীয় হুমকি,পুলিশের পেরেক বসানো লাঠি, এ কে ৪৭, জলকামান,কাঁদানে গ্যাস,বুলডোজার সহ্য ও অগ্রাহ্য করে এদেশের সবুজ, অবুঝ,কাঁচা নাগরিকরা দেখিয়ে দিয়েছেন— বাঁধন যত শক্ত হবে তত বাঁধন টুটিয়ে দেওয়ার সাহস তাঁদের আছে। নিজেদের মর্ত্যে আগত ভগবান মনে করা যে নেতাদের চিরাচরিত প্রতিবাদের ভাষা দিয়ে মাটিতে নামিয়ে আনা যাচ্ছিল না, তাঁদের দম ফাটানো হাসি দিয়ে ফুৎকারে উড়িয়ে দিয়েছেন নাগরিকরা। প্রধানমন্ত্রী নিজের ৫৬ ইঞ্চির ছাতি নিয়ে গর্ব করেছিলেন, এখন সেই ৫৬ ইঞ্চিকেই ব্যুমেরাং করে তাঁর দিকে ছুড়ে দিয়েছে তরুণ প্রজন্ম। কী করে বাঁচবেন তার আঘাত থেকে? ভাবতে গিয়ে রাতে না ঘুম হচ্ছে প্রধানমন্ত্রীর, না তাঁর কোটি কোটি টাকা মাইনের জনসংযোগের দায়িত্বে থাকা মানুষজনের। এক্স আর মেটাকে বলে সব অপছন্দের ভিডিও মোছানোর ব্যবস্থা করছে সরকার। নরেন্দ্র মোদী সরকারের এক মন্ত্রী নীতিন গড়করি তো সোজা আদালতে চলে গেছেন তাঁর সম্পর্কে পোস্ট মোছানোর জন্যে। কিন্তু কত মোছা হবে? যা ছড়িয়ে গেছে তা তো ছড়িয়েই গেছে,মানুষের মন থেকে মুছে দেওয়ার তো কোনো উপায় নেই। তার উপর সোশাল মিডিয়া এমন এক গ্যাঁড়াকল যে যত পোস্ট মোছা হয়, তত নতুন পোস্ট এসে পড়ে। এই যৌবন জলতরঙ্গ রুধিবে কে? ক্ষমতাশালীর ভাবমূর্তি ধূলিসাৎ,প্রেস্টিজে গ্যামাক্সিন।

এখন দেশের প্রধান বিরোধী দল কংগ্রেসও সংসদ চত্বরেই প্রধানমন্ত্রীকে বাঁদর বলছে,তাঁর যাকে তাকে জড়িয়ে ধরার অভ্যাস নিয়ে ঠাট্টা করছেন লোকসভার বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধী।

এমন নয় যে কংগ্রেস যতদিন সরকারে ছিল ততদিন ভারত বাকস্বাধীনতার স্বর্গ ছিল আর বিজেপি ক্ষমতায় আসতেই নরক হয়ে গেছে। রাহুলের ঠাকুমা ইন্দিরার আমলেই ভারতে জরুরি অবস্থা ঘোষিত হয়। তখন খবরের কাগজের অফিসে সরকারি অফিসার এসে বসে থাকতেন কোথায় কী ছাপা হচ্ছে না হচ্ছে দেখতে। বাবু দেখে মাথা দোলাবেন, তবে ছাপা হবে। তার প্রতিবাদে সেইসময় কোনো কাগজ সম্পাদকীয় স্তম্ভ খালি রেখেছিল, কেউ বা কাটা চিহ্ন ছেপে দিয়েছিল। অবাধ্য সাংবাদিকদের ব্যাপক গ্রেফতারি তো ছিলই,অবাধ্য হওয়ায় কিশোরকুমারের গান বাজানো বন্ধ করে দিয়েছিল অল ইন্ডিয়া রেডিও। এমনকী ইন্দিরার সঙ্গে নায়িকার চরিত্রের মিল আছে— এই অলিখিত অভিযোগে নিষিদ্ধ করে দেওয়া হয়েছিল সুচিত্রা সেন ও সঞ্জীবকুমার অভিনীত, গুলজারের ছবি আন্ধী। খোদ পশ্চিমবঙ্গে প্রয়াত সুব্রত মুখোপাধ্যায়ের উদ্যোগে রবীন্দ্রনাথের ‘চিত্ত যেথা ভয়শূন্য’ নিষিদ্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। মৃত্যুর আগে পর্যন্তও তা নিয়ে তাঁর কোনো আক্ষেপ ছিল না।

বাকস্বাধীনতায় সরকারি হস্তক্ষেপের আরও অজস্র দৃষ্টান্ত আছে স্বাধীন ভারতে। রাজীবের প্রধানমন্ত্রিত্বেই সলমন রুশদির স্যাটানিক ভার্সেস নিষিদ্ধ করে দেওয়া হয়েছিল মুসলমান মৌলবাদীদের চাপে। পশ্চিমবঙ্গে বামফ্রন্ট আমলে তসলিমা নাসরিনের দ্বিখণ্ডিত নিষিদ্ধ করার ইতিহাস আছে,মৌলবাদীদের সামান্য গণ্ডগোলের ভয়ে তসলিমাকে কলকাতা থেকে বিদেয় করে দেওয়ার ইতিহাসও আছে। একবার তো কলকাতা ফিল্মোৎসবে আসা একখানা ছবিতে (টরাস) লেনিনকে যেভাবে দেখানো হয়েছে তা রাজ্য সরকারের পছন্দ হয়নি বলে চলতে দেওয়া হয়নি— এমন অভিযোগও উঠেছিল। ফলে শিল্প,সাহিত্যের বাকস্বাধীনতা রক্ষায় ভারতের কোনো রাজনৈতিক শক্তির ভূমিকাই ধারাবাহিকভাবে ভালো নয়। কিন্তু গত এক যুগে মোদী সরকারের আমলে বা ডবল ইঞ্জিন সরকারগুলোর শাসনে যা হয়েছে তার মধ্যে বিলক্ষণ নতুনত্ব আছে।

এর আগে বিভিন্ন মতকে বিভিন্ন সময়ে দমন করার চেষ্টা হয়েছে; কিন্তু সিনেমা, সাহিত্য, নাটক, শিল্পকলা, এমনকী ইতিহাস রচনাতেও একটাই বয়ান সর্বত্র সবার উপরে চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা হয়নি। উপরন্তু, ইন্দিরার ঘোষিত জরুরি অবস্থার বছর দুয়েক (১৯৭৫-৭৭) বাদ দিলে, যাবতীয় সংবাদমাধ্যমের গলা টিপে ধরে তাকে দিয়ে সরকারি বয়ান বলিয়ে নেওয়ার চেষ্টা হিমাচল থেকে কন্যাকুমারী পর্যন্ত বিরল। মোদী সরকারের আমলে কিন্তু সব মিডিয়ার এক রা,জরুরি অবস্থার ঘোষণা ছাড়াই। যে কারণে গোদি মিডিয়া কথাটার উদ্ভব হয়েছে। ভারত জুড়ে এত সাংবাদিকের গ্রেফতার ও হত্যার খতিয়ানও কোনো রাজ্যে পাওয়া যাবে না। স্বভাবতই আন্তর্জাতিক প্রেস ফ্রিডম ইনডেক্সে আমাদের দেশের অবস্থা দেখে বাস কন্ডাক্টরদের মত বলতে হয় “পেছন দিকে এগিয়ে যান।”

আরও পড়ুন কুণাল, যাঁর কৌতুক আজ কামড়ায়

তবে মানুষ এত অদ্ভুত জীব, ভারত এমন আশ্চর্য দেশ যে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে ফেললেও কোথাও কোনো বিদ্রোহ মাথাচাড়া দেবে না— এমনটা বেশিদিন হয় না। যেমন রাজনীতিতে হয় না, তেমনি বাকস্বাধীনতার ক্ষেত্রেও হয় না। এখন যে ঠাট্টার স্রোতে স্বয়ং মোদী টালমাটাল এবং রাহুল যাকে রাজনীতির ভাষা করে তুলছেন,সেটা কিন্তু শুরু করেছিলেন ঋজু বিদূষকরা। সাম্প্রতিক জেন জি আন্দোলনের এক ভাইরাল ভিডিওতে দেখা গেছে,পাটনার আন্দোলনে এক যুবক উপস্থিত পুলিশকর্মীকে জিজ্ঞেস করছেন “কাঁদানে গ্যাস, জলকামানের ব্যবস্থা করেছেন?” উত্তরে তিনি না বলায় বলছেন “এ কে ৪৭?” তাতেও না বলায়, যেন ভারি হতাশ হয়ে বলছেন “কিছুরই ব্যবস্থা করেননি?” ক্ষমতাকে এইভাবে খেলো করে দেওয়ার পথ কিন্তু দেখিয়েছেন ঋজু বিদূষকরা। কুণাল কামরার ২০১৯ সালের এক ভিডিওতে দেখা যায়,তিনি বলছেন— প্রত্যেকবার রামনবমীতে নেতারা তলোয়ার হাতে এসে বলেন, মন্দির ইয়হি বনায়েঙ্গে। তলোয়ার দেখেই মুড খারাপ হয়ে যায়। এত ট্যাক্স দিই, তাও এই ব্যাকডেটেড ওয়েপন! রকেট লঞ্চার-টঞ্চার আনুন, যাতে পাবলিকেরও আস্থা থাকে যে নেতা ঠিকঠাক এগোচ্ছেন। প্রায় এই ভাষাই উঠে এসেছে পাটনার ওই যুবকের মুখে।

এই হাস্যরস যে বিরোধী রাজনীতিবিদদের সমান বিপজ্জনক তা বুঝতে পেরে এই বিদূষকদের উপর বহুদিন ধরেই খড়্গহস্ত ডবল ইঞ্জিন সরকারগুলো। কুণাল, মুনাওয়ার ফারুকি সমেত অনেকের বিরুদ্ধে বারবার মামলা মোকদ্দমা হয়েছে; উন্মত্ত জনতার আক্রমণ হয়েছে; তাঁদের শো করার অপরাধে হল ভেঙে দেওয়া হয়েছে। সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মুনাওয়ারকে তো কারাবাস পর্যন্ত করতে হয়েছে। এমনকী এসব নিয়েও ঠাট্টা করেছেন বরুণ গ্রোভার,যাঁকে কুণালরা ওঁদের গুরু বলে মানেন। বরুণ তাঁর ‘নাথিং মেকস সেন্স’ শীর্ষক শোয়ের শুরুতেই বলেন— এমন হতে পারে যে কিছুদিন পরে আপনাদের পুলিশ স্টেশন থেকে ডাক এল। ভয় পাবেন না,শুধু তিনটে প্রশ্নের উত্তর মনে রাখবেন। প্রথমত, শো কোথায় দেখেছেন? বলবেন,অ্যান্টিলায়। দ্বিতীয়ত,কমেডিয়ান কে ছিল?বলবেন,সময় রায়না। তৃতীয়ত,জোক কাকে নিয়ে ছিল?বলবেন,রাহুল গান্ধী।

তাহলে ভারতে এখন বাকস্বাধীনতার অবস্থা কি ভালো, না খারাপ? উত্তরটাও বরুণের কথাতেই দেওয়া যাক।

“ভারতে এখন কমেডি করা খুব শক্ত কাজ, কারণ কমেডির সরাসরি প্রতিযোগিতা বাস্তবের সঙ্গে।”

সত্যি কথা। নইলে সরকার বদলের পর অ্যাকাডেমি অফ ফাইন আর্টসের টিকিট কাউন্টারের রং গেরুয়া করে দিল কর্তৃপক্ষ, আজ এক দল শিল্পী গিয়ে সাদা করে দিলেন, আবার কাল আরেক দল শিল্পী এসে গেরুয়া রং করলেন লাল রং নিয়ে আপত্তি জানিয়ে— এ কি সম্ভব?

a2onuswor.com ওয়েবসাইটে প্রকাশিত

তসলিমার জয়ধ্বনি: রাজনীতি ভুলে সংস্কৃতি চর্চা স্থগিত রাখলে হয় না?

ভয় পেলে চুপ করে থাকা যায়। ক্ষমতার পক্ষ নিয়ে, সংখ্যাগুরুর পক্ষ নিয়ে ইনিয়েবিনিয়ে বা সোচ্চারে বলাবলি, লেখালিখি করার দরকার হয় না। তাদের মঞ্চে যাওয়ারও দরকার হয় না। সে কাজ যাঁরা করছেন এবং করাকে যাঁরা সমর্থন করছেন, তাঁরা ওটা না করলে মোটেই খাওয়া-পরা বন্ধ হবে না। খুব বেশি হলে যা হবে তা হল, পুজোর ছুটিতে প্যারিস বা মায়ামি বেড়াতে যাওয়ার সঙ্গতি থাকবে না, মন্দারমণি দিয়ে কাজ সারতে হবে।

কারও কাছে কিছু দাবি করা চলবে না। নেতাদের কাছ থেকে তাদের কাজের কৈফিয়ত দাবি করা চলবে না। ফুটবলারদের কাছ থেকে অন্য ফুটবলারদের অপমানে প্রতিবাদ দাবি করা চলবে না। দেশের যুবসমাজের উন্মাদনা এবং পকেটের পয়সায় যারা কোটিপতি, সেই খেলোয়াড় বা অভিনেতাদের কাছ থেকে ওই যুবসমাজের উপর দমনপীড়ন নেমে এলে তার বিরোধিতা দাবি করা চলবে না। সংবাদমাধ্যমের কাছে সত্যনিষ্ঠা দাবি করা চলবে না। এমনকী সাহিত্যিকরা বিবেকবান হবেন, যিনি ধর্মীয় মৌলবাদের ও সংখ্যাগুরুবাদের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ার কারণে দেশছাড়া, তিনি অন্য দেশের মৌলবাদ ও সংখ্যাগুরুবাদের সঙ্গে আপস করবেন না— এ দাবিও করা চলবে না। এমনটাই আমাদের সময়ের দাবি।

কারণ? সকলেরই নাকি রুটিরুজির প্রশ্ন আছে, অস্তিত্বের প্রশ্ন আছে। যেন ইতিহাসের একমাত্র এই কালখণ্ডেই সত্যি কথা বলতে হলে, প্রতিবাদ করতে হলে মানুষকে নিজের রোজগার, নিজের অস্তিত্বের ঝুঁকি নিতে হচ্ছে। যেন অতীতে সর্বদেশে সর্বকালে প্রতিবাদ করা ভারি আরামের কাজ ছিল। দমনপীড়নে বিশ্বাসী সরকার বা মৌলবাদীরা প্রতিবাদীদের চাকরি দিত, চাকুরে হলে মাইনে বাড়িয়ে দিত, বোনাস দিত, মাঝেমধ্যে পুরস্কারও দিত। একে-৪৭ হাতে নিয়ে ভিন্ন মতের মানুষের বাড়ির বাইরে নিজেরাই পাহারা দিত, বলত “আমি আপনার বিরোধী হতে পারি, কিন্তু আপনার কথা বলার অধিকার আমি নিজের জীবন দিয়েও রক্ষা করব।”

মজা হল, রুটিরুজির যুক্তি যাঁরা দিচ্ছেন তাঁরা কেউ ‘দিন আনি দিন খাই’ শ্রেণির মানুষ নন। সরকারি দমন বা সংখ্যাগুরুবাদী গুন্ডাদের হাতে মারধর, হয়রানির ভয় সকলের আছে (এই লেখকেরও আছে)। নাট্যকর্মী থেকে শুরু করে ১৫ বছরের বাচ্চা মেয়েকে পর্যন্ত যেভাবে সদলবলে আক্রমণ করা হচ্ছে, তাতে ভয় পেলে কাউকে দোষ দেওয়াও যায় না। কিন্তু ভয় পেলে চুপ করে থাকা যায়। ক্ষমতার পক্ষ নিয়ে, সংখ্যাগুরুর পক্ষ নিয়ে ইনিয়েবিনিয়ে বা সোচ্চারে বলাবলি, লেখালিখি করার দরকার হয় না। তাদের মঞ্চে যাওয়ারও দরকার হয় না। সে কাজ যাঁরা করছেন এবং করাকে যাঁরা সমর্থন করছেন, তাঁরা ওটা না করলে মোটেই খাওয়া-পরা বন্ধ হবে না। খুব বেশি হলে যা হবে তা হল, পুজোর ছুটিতে প্যারিস বা মায়ামি বেড়াতে যাওয়ার সঙ্গতি থাকবে না, মন্দারমণি দিয়ে কাজ সারতে হবে। পশ্চিমবঙ্গের বাঙালি লেখকদের রবীন্দ্র পুরস্কার, বঙ্কিম পুরস্কার, বাংলা আকাদেমি পুরস্কার, সাহিত্য আকাদেমি পুরস্কারের দরজা বন্ধ হয়ে যাবে। তেতো সত্য হল— ভোগবাদ আর ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদে আমরা এমন গলা পর্যন্ত ডুবে গেছি যে ওসব ছাড়াও যে বাঁচা যায় তা আমাদের পাড়ার ছাপোষা গোঁসাই থেকে শুরু করে নামকরা কবি গোঁসাই পর্যন্ত কেউ কল্পনাও করতে পারে না। কিন্তু সকলের বাড়িতেই আয়না আছে। যিনি যত বিখ্যাত, তাঁর আয়না তত বড়। তার সামনে দাঁড়ালে নিজের এই চেহারা দেখে আমাদের সকলেরই লজ্জা করে। সেই লজ্জা ঢাকতে পাতার পোশাক হল “রুটিরুজি”। এ রাজ্যের বাংলা ভাষার লেখকরা ভালো করেই জানেন (এখন সোশাল মিডিয়ার দৌলতে অনেক পাঠকও জেনে ফেলেছেন) যে বাংলায় সাহিত্য রচনা করে রুটিরুজির ব্যবস্থা হয় না। লেখকদের প্রায় সকলেরই অন্য পেশা আছে, যাঁদের নেই তাঁরা অন্য পেশার খোঁজে আছেন। শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের পসার বিখ্যাত, তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় বইয়ের রয়্যালটি দিয়ে গাড়ি কিনেছিলেন শোনা যায়। গজেন্দ্রকুমার মিত্র আরেকজনের সঙ্গে মিলে আস্ত প্রকাশনা সংস্থা খুলে ফেলেছিলেন। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, বুদ্ধদেব গুহ, শংকরও বহুবিক্রীত ছিলেন। কিন্তু সেসব দিন চলে গেছে। আজকের সবচেয়ে জনপ্রিয় লেখকের বইও পাঁচশো বা হাজার কপি বিক্রি হয় বলে তাঁদের প্রকাশকদের দাবি করতে দেখা যায় না। সেই কারণে কি পুরস্কারই কি রুটিরুজি হয়ে দাঁড়িয়েছে? যাঁদের ব্যাপারটা তাই, তাঁরা মনের সুখে তসলিমা থেকে সন্তোষী মা— যাকে খুশি বন্দনা করুন, আপত্তি নেই। যাঁদের তেমন স্বার্থ নেই, তাঁরাও নিজ নিজ প্রিয় সাহিত্যিকের পাশে দাঁড়ানোর জন্যে যদি এমন করতে চান তো করুন। কিন্তু একে বাকস্বাধীনতার পক্ষে দাঁড়ানো বলে তত্ত্বায়ন করা চলছে। তাই কিছু কথা না বলে থাকা যাচ্ছে না।

বাংলার কালচার্ড বাবু-বিবি আজও যাঁকে নিয়ে “আহা! সত্যিকারের ভদ্রলোক ছিলেন” বলে হাহুতাশ করে, সেই বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য নিজের দলের তথা ভারতবর্ষের বামপন্থী আন্দোলনের যে দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি করেছিলেন মুখ্যমন্ত্রী থাকার সময়ে, তা সিপিএমের কর্মী-সমর্থকরা কেউ কেউ আজকাল জনান্তিকে স্বীকার করেন। পার্টি স্বীকার করে না, হয়তো কোনওদিন করবেও না। তাতে অবশ্য ইতিহাস বদলাবে না। বুদ্ধদেব সরকারের যেসব ভুলভাল সিদ্ধান্ত নরেন্দ্র মোদি, শুভেন্দু অধিকারীদের অক্সিজেন জুগিয়েছে তার অন্যতম হল কলকাতা থেকে তসলিমা নাসরিনকে বিদায় নিতে বাধ্য করা। হাতে ২৩৫ জন বিধায়ক আর তিরিশের বেশি সাংসদ থাকা সত্ত্বেও, দিন দুয়েকের কলকাতাকেন্দ্রিক অশান্তিতে যদি কোনও সরকারের মনে হয়ে থাকে যে একজন সাহিত্যিককে নিরাপত্তা দিতে তারা অপারগ এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সামলে উঠতে পারবে না, তাহলে সেই সরকার অযোগ্য। জ্যোতি বসুর আমলে ভারতজুড়ে শিখ গণহত্যার সময়ে এ রাজ্যে কেউ ট্যাঁ ফোঁ করতে পারেনি, বাবরি মসজিদ ভাঙা-পরবর্তী দাঙ্গাও পশ্চিমবঙ্গে লাগামছাড়া হতে পারেনি। সেখানে বুদ্ধবাবুরা একজন সাহিত্যিকের বিরুদ্ধে কিছু সংগঠিত অশান্তিতে ঘাবড়ে গেলেন এবং তাঁকে রাজ্যছাড়া করলেন। ফলে হিন্দুত্ববাদীরা দ্বিবিধ সুবিধা পেয়ে গেল। প্রথমত, পশ্চিমবঙ্গের গোটা মুসলমান সমাজ ভীষণ অসহিষ্ণু— এ-কথা প্রচার করার পরিসর তৈরি হয়ে গেল। দ্বিতীয়ত, বামপন্থীরা সংখ্যালঘু তোষণ করে, মুসলমান মৌলবাদীদের প্রশ্রয় দেয়— এ-কথা বলার জন্যেও চিরকালীন দৃষ্টান্ত হাতে এসে গেল। তসলিমা যে স্বমহিমায় তার আগে বহুবছর কলকাতায় ছিলেন, সেই সত্য সম্পূর্ণ অর্থহীন হয়ে গেল। আজ দেখা যাচ্ছে অনেকের সে-কথা মনেই নেই। না থাকা দোষেরও নয়। এক বালতি দুধে এক ফোঁটা চোনা ফেলে দেওয়ার পর কাটা দুধ আগে ভালো ছিল বলে বিক্রি করতে গেলে কেউ কিনবে না। যে সময়ে দিল্লি, মুম্বইতে শিবসেনার হুমকিতে ভারত-পাকিস্তান টেস্ট ম্যাচ হতে পারত না সেইসময় এই কলকাতাতেই যে ম্যাচ হয়েছে, বা এই বামফ্রন্ট সরকারই যে কাশীতে শুটিং করতে না পারা চলচ্চিত্র পরিচালক দীপা মেহতাকে কলকাতায় শুটিং করলে নিরাপত্তার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল— সেই সত্য তসলিমার বিতাড়নে নতুন অর্থ পরিগ্রহ করে। হিন্দুত্ববাদীদের পক্ষে বলা সহজ হয়ে যায় যে ওগুলো ধর্মনিরপেক্ষতার লক্ষণ নয়। কমিউনিস্টরা আসলে হিন্দুবিরোধী, তাই ওগুলো করেছিল। বাকস্বাধীনতার পক্ষে বলে করেনি।

এই পর্যন্ত মানতে অসুবিধা আজকের সাহিত্যিক, শিল্পী, বাকস্বাধীনতাপ্রেমী নাগরিকদের প্রায় কারও নেই দেখা যাচ্ছে। কিন্তু এসব বুঝেও কী করে যে তসলিমার এতদিন পরে কলকাতায় আগমনকে বাকস্বাধীনতার জয় বলে অভিনন্দিত করা যাচ্ছে তা বোঝা দায়। তাঁকে ফিরিয়ে এনেছে কারা এবং কী উদ্দেশ্যে, তা নিয়ে সংশয়ের অবকাশ কী করে থাকছে? যে-ই আনুক, যে উদ্দেশ্যেই আনুক— এটা আপাতদৃষ্টিতে ভারি উদার যুক্তি মনে হলেও, আসলে হাস্যকর। যাদের অধীনে থাকা সাহিত্য আকাদেমি এমএম কলবুর্গির মতো লেখকের হত্যার কোনও নিন্দা করেনি, যারা অপছন্দের কথা লেখার জন্যে (সিদ্দিক কাপ্পানের ক্ষেত্রে, স্রেফ লিখতে পারে ভেবেই) সারা দেশে বহু সাংবাদিককে গ্রেপ্তার করে কঠোরতম আইনে মামলা ঠুকে দিনের পর দিন কারাবন্দি করে রাখে, যারা তাদের অপছন্দের কথা সোশাল মিডিয়ায় পোস্ট করার জন্যে নিত্য লেখক, শিল্পীদের বিরুদ্ধে এফআইআর দায়ের করছে, এমনকি দলবদ্ধভাবে বাড়ি গিয়ে ভয়ও দেখাচ্ছে, তারাই আজ পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতায়। সেই দল তসলিমাকে কলকাতায় ফিরিয়ে নিয়ে এসেছে বাকস্বাধীনতায় বিশ্বাস করে বলে, রাজনৈতিক অ্যাজেন্ডার স্বার্থে নয়— এ-কথায় কেন বিশ্বাস করতে হবে? বা উদ্দেশ্য সেটা হলেও ব্যাপারটা ভালো— এ-কথারই বা মানে কী? তাহলে আগামীকাল তালিবানরা যদি অরুন্ধতী রায়কে কাবুলে ডেকে সংবর্ধনা দেয়, আমরা তালিবানদের প্রশংসা করব? বলব, উদ্দেশ্য যা-ই হোক, ব্যাপারটা ভালো?

তা-ই করব হয়তো, কারণ আমাদের সাহিত্যিক, শিল্পীরা তো সেরকমই। তাঁরা একেবারে আজকের জয় গোস্বামীর মতই, ক্ষমতাসীনের বিরুদ্ধে মুখ খোলেন সে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর। অন্তত ২০১১ সালের পর থেকে তাই। ২০১৫ সালে যখন সারা ভারতের শিল্পী, সাহিত্যিকরা কেন্দ্রীয় সরকারের কাছ থেকে পাওয়া পুরস্কার ফিরিয়ে দিচ্ছিলেন তথাকথিত গোরক্ষকদের হাতে গণপিটুনিতে হত্যা; কলবুর্গি, নরেন্দ্র দাভোলকরের মতো মানুষের হত্যা এবং তা নিয়ে সাহিত্য আকাদেমির মতো সংস্থাগুলোর নীরবতার প্রতিবাদে, তখন এই বাংলা থেকে কেবল মন্দাক্রান্তা সেন পুরস্কার ফিরিয়ে দিয়েছিলেন। আর জ্ঞানপীঠ পুরস্কার নিতে গিয়ে নিজের প্রতিবাদ জ্ঞাপন করেছিলেন প্রয়াত শঙ্খ ঘোষ। আজ তসলিমার নামে জয়ধ্বনি করা, আনন্দবাজারের প্রথম পাতায় তাঁর গুণগান করা জয় গোস্বামীই বা কোথায় ছিলেন আর বাকিরাই বা কটা মিটিং, মিছিল করেছিলেন? আচ্ছা, জাতীয় স্তরের ব্যাপারস্যাপার থাক। তসলিমাকে ফেরানোর দাবিতেই বা কটা মিটিং, মিছিল হয়েছিল তৃণমূল কংগ্রেস সরকারের আমলে? জয়-সহ কত গুণীজনই তো মমতা ব্যানার্জির ঘনিষ্ঠ ছিলেন, তখন উদ্যোগ নেননি কেন? আজ জয় বলছেন, আরও অনেকেই বলছেন, তাঁরা নাকি চুপ করে থাকতে বাধ্য হয়েছিলেন হুমকি সংস্কৃতির কারণে। তাহলে সোজা মেনে নিলেই তো হয়— আমরা ভীতু, তাই মুখ খুলতে পারব না। আবার তত্ত্বায়নের দরকার কী? কালের নিয়মে যখন বিজেপি সরকার চলে যাবে, তখন আবার বাকস্বাধীনতার ধ্বজাধারী শিল্পী, সাহিত্যিক, সাহিত্যপ্রেমীরা বলবেন না তো “আমাদের দিয়ে জোর করে তসলিমা বন্দনা করানো হয়েছিল?”

তসলিমা কলকাতায় আসার পর থেকে অভ্যর্থনা আর শেষ হচ্ছে না। সম্ভবত রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নোবেল পুরস্কার নিয়ে দেশে ফেরার পরে বা স্বামী বিবেকানন্দ শিকাগো বক্তৃতা দিয়ে ফেরার পরেও এই শহরে এরকম লাগাতার অভ্যর্থনার ব্যবস্থা হয়নি। জয়কে দুয়ো দিয়ে যারা মঞ্চ থেকে নামিয়ে দিয়েছে তারা যদি ভেবে থাকে বিরাট কাজ করেছে, তাহলে তারা নেহাতই বোকা। পরদিন পড়তে হয় নইলে পিছিয়ে পড়তে হয় যে কাগজ, তার প্রথম পাতার তসলিমামুখী কলামটা কিন্তু জয়ই লিখেছেন। একদা যে শহরে ছিলেন সে শহরে ফিরে এসেছেন বলে নামকরা পত্রিকার প্রচ্ছদকাহিনি হয়েছে কোনও কবির কবিতা— এমনটাই বা আমাদের অকাব্যিক যুগে কতবার কোন শহরে ঘটেছে? তসলিমার বেলায় কলকাতায় ঘটল। কলকাতার সংবাদমাধ্যমগুলোর অন্যতম খবর হয়ে গেছেন তসলিমা। তিনি স্রেফ কলকাতায় পা রাখতেই ধন্য হল ধন্য হল আমাদের বাঙালি জীবন। সমস্তটাই বাংলার মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত ভালোবাসা, সংবাদমাধ্যমের স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিক্রিয়া— এই যদি বিশ্বাস করতে হয়, তাহলে মা দুর্গা সত্যি, মহিষাসুর সত্যি, ক্যাপ্টেন স্পার্ক সত্যি।

আরও পড়ুন মঈন সম্পর্কে কুৎসিত বিদ্রূপে সন্দেহ জাগে, তসলিমা কি হিন্দুত্বের ট্রোজান ঘোড়া? 

এবার কেউ চোখ রাঙিয়েই বলতেই পারেন “তবে রে, এসব সত্যি না হলে সত্যিটা কী?” সবিনয়ে বলব, আজ্ঞে সত্যিটা হল তসলিমা এই বাংলায় একে একটি বিক্রয়যোগ্য ব্র্যান্ড, তার উপর ডবল ইঞ্জিন সরকার পশ্চিমবঙ্গকে যে ছাঁচে ঢালতে চায় তার পক্ষেও নিখুঁত। কারণ তিনি কেবল মুসলমান মৌলবাদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী চরিত্র নন। একবার টুইটারে ইংল্যান্ডের মুসলমান ক্রিকেটার মঈন আলি লম্বা দাড়ি রাখেন বলে তিনিও সন্ত্রাসবাদী হতে পারেন বলে রসিকতা করেছিলেন খাঁটি হিন্দুত্ববাদী কায়দায়। ইংল্যান্ডের খ্রিস্টান ক্রিকেটাররা দল বেঁধে প্রতিবাদ করায় বুঝতে পারেন বাড়াবাড়ি হয়ে গেছে। তখন টুইটটি মুছে দিয়ে দাবি করেন ওটা নাকি সারকাজম ছিল। বলা বাহুল্য, সে-কথা সত্যি হলে টুইট মুছে দেওয়ার দরকার ছিল না। যা-ই হোক, লম্বা দাড়ি মানেই মৌলবাদী, হিজাব বা বোরখা পরে মানেই মৌলবাদের শিকার— এগুলো আমার মতো পশ্চিমবঙ্গীয় ভদ্রলোকের খুব পছন্দের স্টিরিওটাইপ। অতএব তসলিমাকে দিয়ে সেইসব বয়ান বাঙালি সমাজে চারিয়ে দেওয়া সহজ হতে পারে, যেগুলো বাকি ভারত আস্তাকুঁড়ে ফেলে দিচ্ছে ক্রমশ। সাম্প্রতিক ‘জেন জি’ আন্দোলন তার প্রমাণ।

সুতরাং তসলিমার আগমন, জয়ের গমন— সবই রাজনৈতিক। আমরা যে খুবই কালচারাল জাতি তা দুনিয়াসুদ্ধ লোক জানে। নইলে বিপুল উৎসাহে ঠিক অন্য সংস্কৃতি দ্বারা আক্রান্ত হওয়ার যুগেই রামমোহন, বিদ্যাসাগর, রবীন্দ্রনাথের মতো আইকনদের ক্যানসেল কালচারে ফেলে দিই? তাই করতে করতে এখন এমন হাল হয়েছে যে নেতাজি সুভাষচন্দ্র পড়েছেন জুতোর তলায়, আর তসলিমা চড়েছেন মাথায়। রাজনীতির ঊর্ধ্বে উঠে সাংস্কৃতিক হওয়ার চেষ্টা অন্তত এবারটা না করলেই নয়?

চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম ওয়েবসাইটে প্রকাশিত