আনন্দময় বর্মণকে বোধহয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এবং তাঁর মন্ত্রিসভার সদস্যরা চেনেন না। চিনে নিতে চাইলে কাজটা কঠিন নয়, কারণ উনি ভারতীয় জনতা পার্টির টিকিটেই নির্বাচিত বিধায়ক।
স্বাধীনতা দিবসের ভাষণে ‘দিমাগী নকশাল’ বলতে প্রধানমন্ত্রী ঠিক কী বুঝিয়েছেন তার ব্যাখ্যা দিতে হয়েছে মন্ত্রিসভার সদস্য কিরেণ রিজিজুকে। নকশাল আন্দোলন কী এবং নকশাল কারা— সে ব্যাপারে যাঁদের সামান্য ধারণা আছে তাঁদের রিজিজুর ব্যাখ্যা শুনে হাসি পাওয়া স্বাভাবিক। তিনি যেসব বৈশিষ্ট্য নির্ধারণ করেছেন তার সঙ্গে নকশাল হওয়ার কোনও আবশ্যিক সম্পর্ক নেই। তার উপর আলাদা করে ‘দিমাগী’ বলতে কী বোঝানো হয়েছে তার ব্যাখ্যাও নেই।
অথচ ভারতের নকশাল আন্দোলন যেখান থেকে শুরু হয়েছিল, সেই নকশালবাড়ি জায়গাটা যে বিধানসভার অধীনে (মাটিগাড়া-নকশালবাড়ি), তা এখন বিজেপিরই দখলে। সেখানকারই বিধায়ক আনন্দময়বাবু। প্রধানমন্ত্রী বা কিরেণবাবু যদি একবারটি তাঁর সঙ্গে কথা বলতেন, তাহলেই হয়ত এমন ঘেঁটে ঘ অবস্থা হত না যাতে প্রধানমন্ত্রীর বক্তৃতার ‘মেড ইজি’ দিতে হয় আরেকজন মন্ত্রীকে; তাতেও এমন সব অদ্ভুত কথা বেরোয় যে সোশাল মিডিয়ায় হাসাহাসি চলে।
অবশ্য এসব গ্রহের কারসাজিও হতে পারে। কারণ ২০১৪ থেকে এই সেদিন পর্যন্ত মোদীজি ও তাঁর দল কাউকে ‘আর্বান নকশাল’, ‘টুকড়ে টুকড়ে গ্যাং’, ‘অ্যান্টি-ন্যাশনাল’, ‘আন্দোলনজীবী’, ‘খালিস্তানি’ ইত্যাদি তকমা দিলে দেশসুদ্ধ লোক তা শিরোধার্য করে সেইসব লোককে দেশের শত্রু হিসাবে মেনে নিত। যারা চিহ্নিত হল তাদের পত্রপাঠ গ্রেফতারি, তাদের নামে এফআইআর দায়ের, বাড়িতে বা অফিসে তল্লাশি চলত। তাদের বন্ধুবান্ধবরাও কিঞ্চিৎ ভীত হয়ে পড়তেন, পাছে সঙ্গদোষে তাঁদেরও একই হাল হয়। কিন্তু কে জানে কোন গ্রহের ষড়যন্ত্রে সেসব চলতে থাকলেও ভয় আউট, ঠাট্টা ইন হয়ে গেছে। দেশের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত আন্দোলনকারী, মানবাধিকার কর্মী, তথ্যের অধিকার আইন নিয়ে মামলা মোকদ্দমা করা লোকজনের (যাদের মধ্যে আবার তরুণ আইনজীবীরাও আছেন) উপর ক্ষিপ্ত হয়ে তাদের আরশোলার সঙ্গে তুলনা করলেন। ও মা! কিছুদিনের মধ্যেই ককরোচ জনতা পার্টি তৈরি হয়ে গেল! তারপর তাদের সঙ্গে গুচ্ছের বামপন্থী ও আম্বেদকরপন্থী ছেলেমেয়ে জুটে গেল। দিল্লির যন্তর মন্তর থেকে শুরু হয়ে তারা গোটা উত্তর ভারতে ওড়াউড়ি শুরু করে দিল; বিভিন্ন রাজ্যের পুলিশ ‘হিট’ দিতে দিতে নাজেহাল, কিছুতেই কিছু হয় না। অমিত শাহের চাণক্যসুলভ বুদ্ধি পর্যন্ত ফেল। আরশোলা মারতে গিয়ে এমন হল যে তিনি নিজেই সংসদে ঢোকা ছেড়ে দিতে বাধ্য হলেন। প্রধানমন্ত্রী বাংকারে আশ্রয় নিয়েছিলেন কিনা কে জানে! যা-ই হোক, আরশোলাদের ইনস্টাগ্রামে ক্ষমা করে দিয়ে তিনি লালকেল্লা থেকে দেশের মানুষকে ‘দিমাগী নকশাল’ সম্পর্কে সাবধান করলেন। এবারে দেখা গেল মোটেই কেউ ঘাবড়াচ্ছে না। সোশাল মিডিয়ায় দিমাগী নকশাল পার্টিও তৈরি হয়ে গেছে। কেউ আর ভয় তো পাচ্ছেই না, এমনকী ব্যাপারটা এমন ‘কুল’ হয়ে দাঁড়িয়েছে যে নকশাল (মাওবাদী) সংগঠনগুলোর বিরুদ্ধে অপারেশন গ্রীন হান্ট চালু করে অমিত শাহকে অপারেশন কাগারের পথ দেখিয়েছিলেন যে পি চিদম্বরম, তিনিও নিজেকে দিমাগী নকশাল বলে দাবি করে বসেছেন। বল মা তারা দাঁড়াই কোথা!
প্রধানমন্ত্রী বলেছিলেন, নকশালরা শেষ হয়ে গেছে। কিন্তু দিমাগী নকশালরা এখনও আছে। তাদের থেকেই সাবধান হতে হবে। একথা শুনে আমার মত ছাপোষা নাগরিকদের কিছুটা আশ্বস্ত লাগে। নকশালরা নিজেরাও গুনে বলতে পারবে না তাদের কতরকমের প্রকারভেদ আছে, তার মধ্যে কারা অবশিষ্ট আছে আর কারা অপারেশন কাগারের ফলে অবলুপ্ত। কিন্তু মোদীজি যখন বলছেন আর কেউ নেই, তখন নিশ্চিত নেই।
আরও পড়ুন ওয়ারেন হেস্টিংস যা শেখালেন
সেই ২০১৬ সালে নোটবন্দির পর থেকে শুনে আসছি, নকশালরা শেষ হয়ে গেছে। কথাটা এতবার বলা হয়েছে যে এবার গুনে দেখতে হবে এ পর্যন্ত কতবার নকশালরা শেষ হয়েছে। যা-ই হোক, আরও একবার শেষ হলে ক্ষতি কী? শাস্ত্রে বলেছে অধিকন্তু ন দোষায়। তাই স্বাধীনতা দিবসের বক্তৃতা শুনে আশায় বুক বেঁধেছিলাম। কিন্তু দিমাগী নকশাল আবার কোথা থেকে এল রে বাপু! দিমাগ মানে তো মগজ। তাহলে দিমাগী নকশাল মানে হল মগুজে নকশাল। এটা কি কাগুজে বাঘের মত ব্যাপার? তা বাপু বাঘশুমারির সময়ে আলাদা করে কাগুজে বাঘও গোনা হয় বলে তো শুনিনি। কাগুজে বাঘ আসল বাঘের সমান বিপজ্জনক, এমনও শুনিনি। তাহলে নকশালরা আর না থাকলে মগুজে নকশালদের নিয়ে এত চিন্তা কীসের? তাছাড়া কোন মানুষটারই বা মগজ নেই? যারা প্রধানমন্ত্রীর দলের লোক তারা কি বিনা মগজেই এত বড় দেশ চালাচ্ছে?
তাহলে সমস্যা কি কিছু মানুষের মগজে যা আছে তা নিয়ে? তবে তো ভারি মুশকিল। শুনেছি মার্কিন দেশে অ্যালবার্ট আইনস্টাইনের মগজ নানা ভাগে ভাগ করে রীতিমত সংরক্ষণ করে রাখা হয়েছে, কারণ এক জীবনে অত বিরাট বিরাট কাজ করে যাওয়া লোক মানুষের ইতিহাসে বিরল। কিন্তু সে তো তাঁর আশ্চর্য মেধার প্রকাশ দেখে তাঁর মৃত্যুর পর করা হয়েছে। জ্যান্ত লোকের মগজ দেখতে পান নাকি আমাদের প্রধানমন্ত্রী! তাঁর কাছে কি সুকুমার রায় বর্ণিত ফুটোস্কোপ রয়েছে? অবশ্য মোদীজি পারেন না এমন জিনিস নেই। সেই কোন ছেলেবেলায় কুমিরের মুখ থেকে খেলার বল উদ্ধার করে এনেছিলেন। এই তো সেদিন সশরীরে উপস্থিত না হয়েও কয়েক ঘন্টার জন্যে রুশ-ইউক্রেন যুদ্ধ থামিয়ে দিয়েছিলেন। তাঁর পক্ষে জ্যান্ত মানুষের মগজে কী আছে তা জানা আর এমন কী ব্যাপার?
কিন্তু যদি জানেনই যে যা আছে তা দেশের পক্ষে ক্ষতিকর, তাহলে এতদিন কোনো ব্যবস্থা নেননি কেন? তিনিই তো আমাদের দণ্ডমুণ্ডের কর্তা। পেট্রল পাম্প থেকে ভ্যাকসিন সার্টিফিকেট (সুনীল শেঠির ঠাকুরঘরেও)— তিনি সর্বত্রগামী। কেবল দেশের শত্রুদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার বেলাতেই সব দায়িত্ব আমাদের ঘাড়ে এসে পড়বে নাকি? করোনা ভাইরাস আটকানোর মত মগুজে নকশালদের আটকানোর জন্যেও এবার থালা বাজানোর হোমটাস্ক দেবেন আমাদের, নাকি মোমবাতি জ্বালানোর? নাকি কোথাও লাইন-টাইন দিতে হবে আবার? গত বারো বছরে এই একটা শিল্পেই তো নিয়মিত কর্মসংস্থান হয়েছে। টাকা তুলতে লাইন, অমুকের সঙ্গে তমুকের লিংক করাতে লাইন, এসআইআরে নাম তুলতে লাইন, ট্রাইব্যুনালে লাইনে দাঁড়ানোর পর এবার কি মগুজে নকশাল নই প্রমাণ করতে লাইনে দাঁড় করানো হবে আবালবৃদ্ধবণিতাকে?
নাকি সমস্যা মগজ থাকলেই? তাই যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় বা জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের মত মগজের চর্চা করার জায়গাগুলোতে রাত বিরেতে হামলা হবে? সে সরকার মাইবাপ, যদি তাই চান তো তাই হবে। ঠেকাবে কে? কিন্তু যাদবপুর বা জেএনইউ-কে মেরে ধরে গলগোটিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের স্তরে নামিয়ে আনলেই কি মগজের সমস্যা মিটবে? মগজ যে সকলেরই আছে, আর সেটা থাকে মুণ্ডুতে। তা মুণ্ডু গেলে খাবটা কী? অবশ্য গ্যাসের দাম, জিনিসপত্রের দাম যেভাবে বাড়ছে তাতে খাওয়ার খরচ অনেক। হিতৈষী সরকার হয়ত খরচ বাঁচিয়ে দিতে চাইছেন। এটাই মাস্টারস্ট্রোক।
a2onuswor.com ওয়েবসাইটে প্রকাশিত
