গম্ভীর যুগ নয়, শুরু হচ্ছে নতুন ব্র্যান্ড সন্ধান

ভারত সিন্ধুনদের জল আটকে দিয়ে পাকিস্তানকে সত্যিই শুকিয়ে মারতে পারে কিনা সেটা এখনো ঠিক পরিষ্কার হল না। বিশেষজ্ঞরা একরকম বলছেন, সরকার একরকম বলছে। কিন্তু বিরাট কোহলি আর রোহিত শর্মা টেস্ট ক্রিকেট থেকে অবসর নেওয়ায় প্রাক্তন ক্রিকেটার, ধারাভাষ্যকার, সাংবাদিক এবং সাধারণ ক্রিকেটপ্রেমীরা যে পরিমাণ চোখের জল ফেলছেন তা যদি পাকিস্তানের দিকে গড়িয়ে যায় – তাহলে পাকিস্তানিদের আর সিন্ধুর জল নিয়ে দুশ্চিন্তা না করলেও চলবে। বিশেষ করে বিরাটের অবসরের পর দেখা যাচ্ছে কোনো প্রাক্তন বিস্ময়ে হতবাক, কেউ ভারতীয় দলে নেতৃত্বের শূন্যতা নিয়ে চিন্তিত, কেউ আবার বলছেন বিরাট এখনো হেসে খেলে ২-৩ বছর খেলে দিতে পারত। কেউ কেউ বলেছেন রোহিতকে স্রেফ অধিনায়ক হিসাবেই আসন্ন ইংল্যান্ড সফরে দরকার ছিল। তারপর রান পেয়ে গেলে আরও কয়েকটা সিরিজ খেলতে পারত। এসব যাঁরা বলছেন তাঁরা প্রত্যেকে দীর্ঘদিন পেশাদার ক্রিকেট খেলেছেন, জানেন কত ধানে কত চাল হয়। বহুবছর আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কভার করা সাংবাদিকরাও লিখে চলেছেন বিরাটের মধ্যে কত ক্রিকেট বাকি ছিল। এই যখন অবস্থা, তখন পাড়া ক্রিকেটের গণ্ডি না পেরনো ক্রিকেটপ্রেমীরা সোশাল মিডিয়ায় ‘অভি না যাও ছোড় কর/কে দিল অভি ভরা নহি’ ইত্যাদি কাব্যি করলে তাঁদের দোষ দেওয়া চলে না। ব্যাপারটা নভেম্বর-ডিসেম্বরে ঘটলে নির্ঘাত কলকাতা বইমেলায় বিরাটকে নিয়ে কবিতা সংকলন, লিটল ম্যাগাজিনের বিশেষ সংখ্যা ইত্যাদি বেরিয়ে যেত। সেই উপনিবেশের যুগে নাক উঁচু সাহেবরা ঘোষণা করেছিল – জনগণের স্মৃতিশক্তি ভাল নয়। কথাটার বহু প্রমাণ আছে, এখন সোশাল মিডিয়ার যুগে তো স্মৃতি নিজেই স্মৃতি হয়ে গেছে। তাই এই হাহুতাশের মাঝে একটু স্মৃতি তাজা করে নেওয়া যাক। যে দুজনের জন্যে এত কান্নাকাটি, শেষ তিনটে সিরিজে (যার প্রথমটা দুর্বল বাংলাদেশের বিরুদ্ধে, আর পরের দুটোতে ভারত হেরেছে) তাঁদের রানগুলো দেখে নেওয়া যাক।

বিরাট – ৬, ১৭, ৪৭, অপরাজিত ২৯, ০, ৭০, ১, ১৭, ৪, ১, ৫, অপরাজিত ১০০, ৭, ১১, ৩, ব্যাট করেননি, ৩৬, ৫, ১৭, ৬।

রোহিত – ৬, ৫, ২৩, ৮, ২, ৫২, ০, ৮, ১৮, ১১, ৩, ৬, ১০, ব্যাট করেননি, ৩, ৯।

এগুলো দুই তরুণ ক্রিকেটারের রান হলে তাঁদের পৃথিবীর যে কোনো দেশে দল থেকে বাদ দিয়ে বলা হত ‘যাও, প্রথম শ্রেণির ক্রিকেট খেলো গে। ওখানে ঝুড়ি ঝুড়ি রান করো, তখন আবার সুযোগ দেব।’ কিন্তু কোহলির বয়স ৩৬, রোহিতের ৩৮। এ বয়সে আর ফিরে আসা যায় না। যায় না যে, তার প্রমাণ ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের চাপে বহু যুগ পরে রঞ্জি ট্রফি খেলতে গিয়েই দুজনে পেয়ে গিয়েছেন। একজনের স্টাম্প সাধারণ বোলারের আপাত নিরীহ একটা ডেলিভারিতে মাটিতে গড়াগড়ি খেয়েছে।

অন্যজন লেগের দিকে খেলতে গিয়ে ব্যাটের বাইরের কানায় বল লাগিয়ে হাস্যকরভাবে আউট হয়েছেন।

দেশের মাঠে ঘরোয়া ক্রিকেটের পেসারদের খেলতে গিয়েই যাঁদের এই অবস্থা, তাঁরা যে ইংল্যান্ডের গ্রীষ্মে সেখানকার পেসারদের বিরুদ্ধে চোখে অন্ধকার দেখবেন – এটা বোঝার জন্যে সুনীল গাভস্কর বা অনিল কুম্বলের মত বিরাট ক্রিকেটার হতে হয় না, আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কভার করার দীর্ঘ অভিজ্ঞতাও থাকতে হয় না। যখন রোহিত আর বিরাটের বয়স কম ছিল, তখন ইংল্যান্ডে গিয়ে তাঁরা কী করেছেন তা খেয়াল রাখলে আরও পরিষ্কার হয় যে এবার ইংল্যান্ডে গিয়ে দলের উপকারে আসা তাঁদের পক্ষে অসম্ভব ছিল।

রোহিত ইংল্যান্ডের মাটিতে সাতটা টেস্ট খেলেছেন। সেখানে ১৪ ইনিংসে ৫০ পেরিয়েছেন মাত্র দুবার, শতরান মোটে একটা। তাঁর পক্ষে বলার মত কথা একটাই – তিনি ৫২৪ রান করেছেন ৪০.৩০ গড়ে, যা তাঁর গোটা টেস্ট জীবনের গড়ের প্রায় সমান। অর্থাৎ তিনি অন্য দেশের চেয়ে ইংল্যান্ডে বেশি খারাপ খেলেননি। কিন্তু বিরাট?

ইংল্যান্ডে ১৭ খানা টেস্ট খেলে ৩৩ ইনিংসে ১০৯৬ রান। শতরান দুটো, অর্ধশতরান পাঁচটা। বিরাটের টেস্টে গড় যেখানে ৪৬.৮৫, সেখানে ইংল্যান্ডে গড় মাত্র ৩৩.২১। ২০১৪ সালের সফরে তো তাঁর সর্বোচ্চ রান ৩৯, জেমস অ্যান্ডারসন সাক্ষাৎ যম হয়ে উঠেছিলেন বিরাটের জন্য। ২০১৮ সালে অনেক উন্নতি করেন। সিরিজটা শুরুই করেন এজবাস্টনের প্রথম ইনিংসে ১৪৯ দিয়ে, দ্বিতীয় ইনিংসেও ৫১। তৃতীয় টেস্টে ট্রেন্টব্রিজে প্রথম ইনিংসে প্রায় শতরান (৯৭), দ্বিতীয় ইনিংসে ১০৩। পরের দুটো টেস্টেও ধারাবাহিক ছিলেন, শুধু ওভালের শেষ টেস্টের দ্বিতীয় ইনিংসে শূন্য রানে আউট হন। ২০২১-২২ জুড়ে হওয়া পাঁচ টেস্টের সিরিজে কিন্তু আবার ব্যর্থ। মাত্র দুবার ৫০ পেরিয়েছিলেন। ২০২৩ সালের জুনে ওভালে অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনালেও ১৪ আর ৪৯। এই বিরাট আগামী ইংল্যান্ড সফরে থাকবেন না বলে ভারতীয় দলের বিরাট ক্ষতি হবে? সচেতনভাবে একথা দুই ধরনের লোক বলতে পারে – ১) অন্ধ বিরাট ভক্ত, ২) বিরাট নামক ব্র্যান্ড ঘিরে যাদের ব্যবসা।

আমাদের প্রবাদপ্রতিম প্রাক্তন ক্রিকেটাররা, ধারাভাষ্যকাররা এবং সংবাদমাধ্যম দ্বিতীয় দলের সদস্য। বিশ্ব ক্রিকেটে বিরাটের উপর যত টাকা লগ্নি করা রয়েছে তার ধারে কাছে কেউ নেই। ভারতীয় ক্রিকেটে দ্বিতীয় স্থানে রোহিত। এটা বোঝার জন্যে খুব বেশি গবেষণা করতে হবে না। নিজের বাড়ির টিভি বা হাতের মোবাইলের ওটিটি প্ল্যাটফর্মের বিজ্ঞাপনগুলো খেয়াল করলেই টের পাবেন। ভারত-ইংল্যান্ড সিরিজের সম্প্রচার স্বত্ব পেতে যে টাকা খরচ করেছে সম্প্রচার সংস্থা, ওঁরা দুজন না খেললে সে টাকা উঠে আসবে কিনা সন্দেহ। কারণ অধিকাংশ ভারতীয় ক্রিকেট দেখেন না, ক্রিকেটার দেখেন। প্রীতি জিন্টা থেকে শুরু করে পাড়ার পাঁচুদা – অনেককেই বলতে দেখা যাচ্ছে ‘বিরাট না খেললে আর টেস্ট দেখব না’। এ থেকে স্পষ্টই বোঝা যায় – এঁরা কোনোদিনই টেস্ট দেখতেন না, বিরাটকেই দেখতেন। এমনিতে এমন দর্শক চিরকালই ছিল। শচীন তেন্ডুলকর আউট হয়ে গেলে টিভি বন্ধ করে দেওয়া, বাঙালির ক্ষেত্রে সৌরভ আউট হয়ে গেলে টিভি বন্ধ করে দেওয়া – এসব হত। গাভস্করের যুগে রেডিও বন্ধ করে দেওয়ার কাহিনিও আছে। কারণ ভারতীয়দের ব্যক্তিপুজোর অভ্যাস সুপ্রাচীন। আমাদের দেশের প্রাচীনতম দুটো মহাকাব্যই লেখা হয়েছে দুজন ব্যক্তিকে কেন্দ্র করে – রাম আর কৃষ্ণ। তার উপর ক্রিকেট বোধহয় একমাত্র দলগত খেলা, যেখানে মূল লড়াইটা সারাক্ষণ দুজন ব্যক্তির মধ্যে চলে। তার উপর ব্যাটারকে হেলমেট-টেলমেট পরে বেশ যোদ্ধা যোদ্ধা দেখায়। বিরাট, রোহিতের যুগ আবার ‘নিউ ইন্ডিয়া’-র যুগ। মানে অশোক চক্রের চেয়ে সুদর্শন চক্রের জনপ্রিয়তা বেশি। ফলে তাঁদের নিয়ে যে মানুষ বেশি গদগদ হবে এতে আর আশ্চর্য কী? কিন্তু সমস্যা অন্যত্র।

গাভস্কর, শচীনদের আমলের তুলনায় এখন কিন্তু ভারত দল হিসাবে অনেক বেশি পরিপূর্ণ। দুজনের কারোর খেলোয়াড় জীবনেই যশপ্রীত বুমরার মত কেউ ভারতীয় দলে ছিলেন না, যিনি কখনো গতিতে কখনো সুইংয়ে কখনো কাটে ব্যাটারদের পরাস্ত করতে পারেন। কপিলদেব ছিলেন, কিন্তু যোগ্য সঙ্গী পাননি। বুমরা অন্য প্রান্তে মহম্মদ শামিকে পেয়েছেন, বিভিন্ন সময়ে আরও অনেককে পেয়েছেন। শচীনের ক্রিকেটজীবনের দ্বিতীয়ার্ধে রাহুল দ্রাবিড়, সৌরভ গাঙ্গুলি, বীরেন্দ্র সেওয়াগ, ভিভিএস লক্ষ্মণরা এসেছিলেন বটে, কিন্তু বালক বয়সে ভারতীয় ব্যাটিং বলতেই ছিলেন তিনি। ফলে তাঁর অতিমানবিক ভাবমূর্তি তৈরি হওয়ার ক্রিকেটিয় কারণও ছিল। গাভস্করের তো গোটা ক্রিকেটজীবনেই ভারতীয় দল মানে তিনি একা এবং কয়েকজন। সেই কয়েকজনের মধ্যে আবার ৯০% হলেন বেদি-এরাপল্লি প্রসন্ন-ভাগবত চন্দ্রশেখর। ফলে ভারত জিতত কালেভদ্রে। বিরাট, রোহিতদের আমলে কিন্তু দল অনেক বেশি ম্যাচ জেতে। মনোরঞ্জক খেলোয়াড়ও দু-একজন নয়। তবু এরকম ব্যক্তিকেন্দ্রিকতা কেন? কারণ আমাদের মাথা – ক্ষয়ে গেছে ওটা, ব্র্যান্ডে গিলিয়াছে গোটা। তাই ক্রমাগত ব্যর্থ হয়ে চলা, স্পষ্টত ফুরিয়ে যাওয়া ক্রিকেটারকেও দলবদ্ধভাবে ‘যেতে নাহি দিব’ বলা চলছে।

ক্রিকেটভক্তদের অনেকে দেরিতে হলেও উপলব্ধি করেছেন যে ভারতীয় ক্রিকেট দলটা আসলে বিজেপির করতলগত হয়েছে, তারা যেভাবে চালাচ্ছে সেভাবেই চলছে। কিন্তু সেই উপলব্ধি থেকে আশ্চর্য অতিসরলীকৃত ধারণায় পৌঁছে গেছেন। তাঁদের তত্ত্ব হল – প্রাক্তন বিজেপি সাংসদ গৌতম গম্ভীর দলটাকে নিজের মর্জি মত চালাতে চান, এই দুজন থাকলে সুবিধা হচ্ছিল না। তাই ওঁরই চক্রান্তে এঁদের চলে যেতে হল। গম্ভীর যে সুবিধার লোক নন তাতে সন্দেহ নেই, তাঁর হাতে জাতীয় ক্রিকেট দলের রাশ থাকলে যে আরএসএস-বিজেপির খুশি হওয়ার কথা তাও অতীতে লিখেছি। কিন্তু তাতে তো বিরাট, রোহিতের ক্রমাগত ব্যর্থতা মিথ্যে হয়ে যায় না। দলের স্বার্থ বিসর্জন দিয়ে দুজনকে স্রেফ ব্র্যান্ড মূল্যের জন্যে বয়ে চলার অন্যায়টাও ন্যায় হয়ে যায় না। তাছাড়া বিরাট আর রোহিত দলের মধ্যে মোটেই কোনো ধুন্ধুমার ধর্মনিরপেক্ষ লড়াই চালাচ্ছিলেন না, যে সে জন্যে তাঁদের দল থেকে বার করা বিজেপির আশু প্রয়োজন হয়ে উঠবে।

টেস্ট ক্রিকেটে রোহিত শর্মা একজন মাঝারি ক্রিকেটারের নাম কিনা, আর বিরাট কোহলি এমনকি নিজের সময়েরও অবিসংবাদী বিশ্বসেরা কিনা, তা অন্য আলোচনার বিষয়। কিন্তু ভারতীয় ক্রিকেটে গম্ভীর যুগ শুরু হতে চলেছে বলে যে হইচই চলছে কদিন ধরে, সে ব্যাপারে কটা কথা বলা দরকার। ভারতীয় দলের সঙ্গে নিয়মিত ঘোরেন যে সাংবাদিকরা, তাঁদের পরস্পরবিরোধী প্রতিবেদনগুলো থেকে যে নির্যাস বেরিয়ে আসে তা হল – গম্ভীর তারকা প্রথা ভাঙতে চান। কিন্তু ভাঙতে চাইলেই তো হল না। ভারতে ক্রিকেট হল কয়েক হাজার কোটি টাকার ব্যবসা। সেই ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে তারকা, মহাতারকা লাগবেই আর ক্রিকেট ব্যবসায়ীরা নিজেদের প্রয়োজনে তা বানিয়েও নেবে। গম্ভীর আটকাতে পারবেন না, আটকাতে চাওয়ার মত বোকাও তিনি নিশ্চয়ই নন। আসলে তিনি দল সংক্রান্ত বড় বড় সিদ্ধান্তগুলো নিজে নিতে চাইছেন। সেটা আধুনিক ক্রিকেটের ইতিহাসে অভূতপূর্ব কিছু নয়। আটের দশকে অস্ট্রেলিয়া দলে বড় বড় সিদ্ধান্তগুলো ববি সিম্পসনই নিতেন, যতদিন না অ্যালান বর্ডার অধিনায়ক হিসাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন। নয়ের দশকে দক্ষিণ আফ্রিকার ক্রিকেটে জুতো সেলাই থেকে চণ্ডীপাঠ করতেন বব উলমার। তাতে দলের ক্ষতি হয়নি, ভালই হয়েছে। উলমারের তো এত প্রভাব ছিল দলের উপর যে, ১৯৯৯ বিশ্বকাপে তিনি ভারতের বিরুদ্ধে ম্যাচে ফিল্ডিংয়ের সময়ে অধিনায়ক হ্যান্সি ক্রোনিয়েকে ইয়ারফোনের মাধ্যমে নির্দেশ দিচ্ছিলেন। আইসিসি নিষেধ করে দেয়

লেখালিখি হচ্ছে – গম্ভীর যুগ এসে পড়ায় ভারতীয় ক্রিকেটের ইতিহাসে এই প্রথম নাকি এমন একটা যুগ আসতে চলেছে যখন কোনো ক্রিকেটারের চেয়ে বেশি প্রভাবশালী হবেন কোচ। একেবারে ভুল তথ্য। ভারতের সফলতম টেস্ট অধিনায়ক হিসাবে এখনো চার নম্বরে থাকা মহম্মদ আজহারউদ্দিনকে প্রবল প্রতাপশালী রাজ সিং দুঙ্গারপুর, কৃষ্ণমাচারি শ্রীকান্তের পর অধিনায়ক করে দিয়েছিলেন দলে কপিলদেব, দিলীপ বেঙ্গসরকর, রবি শাস্ত্রীর মত প্রাক্তন অধিনায়ক এবং তারকা থাকা সত্ত্বেও। আজহার তখন শুভমান গিলের (যিনি অধিনায়ক হবেন বলে শোনা যাচ্ছে) মতই উঠতি তারকা, একদিন ভারত অধিনায়ক হতে পারেন বলে অনেকে ভাবে। কিন্তু অত তাড়াতাড়ি হয়ে যাবেন – একথা আজহার নিজেও ভাবেননি। বোর্ডের ওই সিদ্ধান্ত নেওয়ার উদ্দেশ্যই ছিল এমন একজনকে অধিনায়ক করা, যার নিজের প্রবল প্রতাপ নেই। আজহারের দলের কোচ করে দেওয়া হয়েছিল প্রবাদপ্রতিম বিষাণ সিং বেদিকে, ক্রিকেটার হিসাবে গম্ভীর যাঁর নখের যুগ্যি নন। তারপর প্রবল অশান্তি। ১৯৯০ সালে ইংল্যান্ড সফরে গিয়ে লর্ডস টেস্টে বেদি নাকি আজহারকে বলেছিলেন টস জিতে ব্যাটিং নিতে, কিন্তু আজহার ফিল্ডিং নেন। তারপর গ্রাহাম গুচ একাই ৩৩৩ করেন, ভারত কোনোমতে ফলো অন বাঁচালেও শোচনীয়ভাবে হারে। সিরিজ তো হারেই। তার আগে নিউজিল্যান্ডে ব্যর্থতা, ইংল্যান্ডের পর অস্ট্রেলিয়ায় চূড়ান্ত ব্যর্থতা এবং একটা জেতা একদিনের ম্যাচ হেরে যাওয়া নিয়ে বেদির প্রকাশ্য মন্তব্যে বিতর্ক। বেদির জায়গায় আব্বাস আলি বেগ দায়িত্ব নেওয়ার পরে আজহারের প্রভাব বাড়ে, কিন্তু দল সাফল্যের মুখ দেখেনি। আজহার জিততে শুরু করেন ১৯৯২-৯৩ মরশুমে ঘরের মাঠে ইংল্যান্ড সিরিজ থেকে। তার পিছনেও বড় কারণ কোচ অজিত ওয়াড়েকরের মাথা। ঘূর্ণি পিচ বানিয়ে কুম্বলে-ভেঙ্কটপতি রাজু-রাজেশ চৌহানকে লেলিয়ে দেওয়ার বুদ্ধি তাঁরই ছিল। ১৯৯৬ বিশ্বকাপ সেমিফাইনালে হারের আগে আজহার-ওয়াড়েকর জুটিকে ফিরে তাকাতে হয়নি। সেই দলে ছিলেন অস্তাচলের কপিল, অধিনায়কের সঙ্গে সুসম্পর্ক না থাকলেও তারকা শাস্ত্রী আর ক্রমশ তারকা হয়ে উঠতে থাকা শচীন, বিনোদ কাম্বলি, কুম্বলেরা।

আসন্ন ইংল্যান্ড সফরে গম্ভীর যে দল নিয়ে যাবেন তার চেহারা অনেকটা আজহার-ওয়াড়েকরের প্রথম দলটার মত হতে চলেছে। যে দলে বুমরা আছেন, সে দলে তারকা নেই – একথা বলা আহাম্মকি। গিল যতটা সাড়া জাগিয়ে শুরু করেছিলেন, এখন সেই তুলনায় বিবর্ণ। কিন্তু তাঁর প্রায় গোটা ক্রিকেটজীবন পড়ে আছে ফর্ম ফিরে পাওয়ার জন্যে। তাছাড়াও থাকবেন প্রতিভাবান পন্থ, ৫৮ খানা টেস্ট খেলার পরেও প্রতিশ্রুতিমান কে এল রাহুল, ৮০ খানা টেস্ট খেলে ফেলা রবীন্দ্র জাদেজা। একটা দল খেলতে পারলে জেতার জন্যে এর থেকে বেশি অভিজ্ঞতার প্রয়োজন পড়ে না। এঁদের সঙ্গে যুক্ত হবেন ঘরোয়া ক্রিকেটে দীর্ঘদিন ধরে ভাল খেলে আসা তরুণ সাই সুদর্শন বা ধ্রুব জুড়েলরা। ফলে বিজ্ঞাপনদাতাদেরও একজন বা কয়েকজনকে খুঁজে নিয়ে নতুন ব্র্যান্ড তৈরি করার যথেষ্ট অবকাশ আছে। কেউ একজন সফল হলেই তাকে আকাশে তুলে দেওয়া হবে নিমেষের মধ্যে। দু-এক বছরের মধ্যেই এমন অনেককে পাওয়া যাবে যারা বলবে ‘শুভমানের জন্যেই খেলা দেখি’ বা ‘ঋষভের জন্যেই খেলা দেখি’। সুতরাং নিশ্চিন্ত থাকুন, গম্ভীর যুগ-টুগ নয়। ইংল্যান্ড সফর থেকে শুরু হতে চলেছে ভারতীয় ক্রিকেটের নতুন ব্র্যান্ড সন্ধান। দল ব্যর্থ হলে গম্ভীরও চাকরি খোয়াতে পারেন, ব্র্যান্ড তৈরির কাজ জারি থাকবে।

নাগরিক ডট নেট ওয়েবসাইটে প্রকাশিত

স্বর্গহারা মাঝারিয়ানার দেবদূত: অশ্বিন, জাদেজা

ভারত টেস্ট ক্রিকেট খেলছে ১৯৩২ সাল থেকে, আর ভারতের মাটিতে প্রথম টেস্ট খেলা হয় ১৯৩৩ সালে। একানব্বই বছরের ইতিহাসে প্রথমবার তিন বা তার বেশি ম্যাচসম্পন্ন সিরিজের সবকটা ম্যাচ হেরে যাওয়ায় যাঁরা এখন মুহ্যমান, তাঁদের মাঝারিয়ানা এবং অশ্বিন, জাদেজার প্রসঙ্গে নিয়ে যাওয়ার আগে কয়েকটা কথা একটু বলে নেওয়া দরকার।

২০২৩-২০২৭ আইপিএলের সম্প্রচার স্বত্ব বেচার জন্য যখন দরপত্র আহ্বান করা হয়েছিল, তখন ঘোষণা করা হয়েছিল ২০২৪ সালে আইপিএলে খেলা হবে ৭৪ খানা ম্যাচ, ২০২৫ ও ২০২৬ আইপিএলে ৮৪ এবং ২০২৭ আইপিএলে ৯৪। তবে এবছর সেপ্টেম্বর মাসে ক্রিকইনফো ওয়েবসাইট এক প্রতিবেদনে জানায় – ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড (বিসিসিআই) ২০২৫ আইপিএলে ম্যাচের সংখ্যা না বাড়ানোই ভাল বলে মনে করছে, কারণ ভারত বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনালে ওঠার মত জায়গায় আছে। আর ফাইনাল হবে মে-জুন নাগাদ। সুতরাং আইপিএল বেশি লম্বা হলে ভারতীয় দলের ক্রিকেটারদের চাপ বেড়ে যাবে। এখনো আইপিএলের সূচি ঘোষণা হয়নি, ইতিমধ্যে ভারতের বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপ ফাইনালে ওঠার সম্ভাবনা বড়সড় ধাক্কা খেয়েছে। অস্ট্রেলিয়ায় নিদেনপক্ষে চারটে টেস্ট জিততে না পারলে অন্য দলগুলোর জেতা-হারার উপর নির্ভর করতে হবে। সুতরাং অস্ট্রেলিয়া সফরে ভারতীয় দলের ব্যর্থতা বিসিসিআইয়ের কাছে পূর্ব ঘোষণা অনুযায়ী ৮৪ ম্যাচের আইপিএল করার সুবর্ণ সুযোগ এনে দিতে পারে। বেশি ম্যাচ খেলা মানে খেলোয়াড়দের জন্যেও বেশি টাকা।

গন্ধটা খুব সন্দেহজনক লাগছে? কিছু করার নেই। এটাই আজকের ক্রিকেটের বাস্তবতা। ভারতের সংবাদমাধ্যমের বেশিরভাগটাই বিসিসিআইয়ের অনুগত বলে এসব নিয়ে বিশেষ লেখালিখি হয় না, কিন্তু ইংল্যান্ডের দ্য ডেইলি টেলিগ্রাফ কাগজের সাংবাদিক টিম উইগমোর সম্প্রতি এক বিশেষ প্রতিবেদন লিখেছেন। শিরোনাম ‘হাউ ক্রিকেট এট ইটসেলফ’, অর্থাৎ ক্রিকেট কীভাবে নিজেকে খেয়ে ফেলল। সেই লম্বা প্রতিবেদনে টিম দেখিয়েছেন যে সারা পৃথিবীতে এখন এত বিপুল সংখ্যক ফ্র্যাঞ্চাইজ লিগ হচ্ছে যে প্রকৃতপক্ষে ৫০০ দিনের ক্রিকেট খেলা হচ্ছে ৩৬৫ দিনে। একই ক্রিকেটার সাত-আটটা লিগে খেলছেন, অনেকসময় একই সপ্তাহে তিনটে আলাদা আলাদা লিগে খেলছেন। ফলে এক লিগে খেলতে খেলতে অনেকেই চাইছেন যেন তাঁর দল হেরে যায়, যাতে তিনি অন্য একটা লিগে গিয়ে যোগ দিতে পারেন। কারণ তাতে রোজগার বাড়বে। অনেক লিগে আবার লগ্নি ব্যাপারটা এত গোলমেলে যে অনেক দলের মালিক নিজের দলের বিরুদ্ধেই বাজি ধরেন বেটিং সাইটে। আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিল এবং বিভিন্ন দেশের ক্রিকেট নিয়ামক সংস্থাগুলো ঢালাও এইসব লিগকে অনুমোদন দিয়ে যাচ্ছে আগাপাশতলা না ভেবে। ফলে এমন লিগও আছে যেগুলোতে দল গঠন করা হচ্ছে, খেলোয়াড়দের নেওয়া হচ্ছে টিভি সম্প্রচার স্বত্ব থেকে টাকা আসবে আশা করে। তারপর টাকা না আসায় একটা বলও খেলা হওয়ার আগেই লিগ বাতিল হয়ে যাচ্ছে। অনেক জায়গায় আবার খেলোয়াড়রা টাকা পাচ্ছেন না বলে মাঠে পৌঁছে খেলতে নামতে চাইছেন না। ব্রেন্ডন ম্যাককালাম, আন্দ্রে রাসেলের মত লোকেরও এই অভিজ্ঞতা হয়েছে।

এসব খবর দিয়ে এই ইঙ্গিত করছি না যে ভারতীয় দল ইচ্ছা করে নিউজিল্যান্ডের কাছে গোহারা হেরেছে বা অস্ট্রেলিয়ায় ইচ্ছে করে হারবে। যাঁরা ক্রিকেট খেলা ন্যূনতম মনোযোগ দিয়ে দেখেন এবং অন্তত কিছুটা বোঝেন, তাঁদেরও বুঝিয়ে বলার দরকার নেই যে এই ভারতীয় দলের ইচ্ছে করে হারার যোগ্যতা নেই। তবু খবরগুলো দিলাম এইজন্যে যে ৩-০ হওয়ার পর থেকে উদ্ধারের উপায় হিসাবে কোনো কোনো প্রাক্তন ক্রিকেটার, সাংবাদিক এবং বহু ক্রিকেটপ্রেমী আইপিএলকে এই দুরবস্থার একমাত্র কারণ বলে ঠাওরাচ্ছেন এবং আইপিএল বন্ধ করা বা আইপিএলকে কম গুরুত্ব দেওয়ার নিদান দিচ্ছেন। প্রথম দুই অনুচ্ছেদ পড়লে দুটো জিনিস বুঝতে পারা উচিত – ১) ওসব দিবাস্বপ্ন দেখে লাভ নেই, ২) কেবল আইপিএলের ঘাড়ে দোষ চাপালে চলবে না, কারণ ফ্র্যাঞ্চাইজ লিগ নিয়ে বাড়াবাড়ি গোটা ক্রিকেট দুনিয়ায় হচ্ছে এবং তার ফলে একা ভারতীয় দল ভুগছে না।

ভারত-নিউজিল্যান্ড সিরিজের পাশাপাশিই চলছিল পাকিস্তান-ইংল্যান্ড সিরিজ। ভারতে এসে নিউজিল্যান্ডের ৩-০ জয়কে বলা হচ্ছে টেস্ট ক্রিকেটের ইতিহাসের অন্যতম বড় অঘটন, কিন্তু পাকিস্তানের সিরিজটাতে যা হয়েছে তাও কম চমকপ্রদ নয়। পাকিস্তান গত কয়েকবছর ধরে হাইওয়ের মত পিচ বানিয়ে যাচ্ছিল। ইংল্যান্ডের এর আগের পাকিস্তান সফরে সেইসব পিচে ম্যাককালাম-বেন স্টোকসের মস্তিষ্কপ্রসূত ব্যাজবল দারুণ কাজ দিয়েছিল। ইংল্যান্ডের ব্যাটাররা এত দ্রুত এত রান তুলছিলেন যে সেই রানের চাপেই পাকিস্তানের ব্যাটিং ধসে পড়ছিল। ফলে ইংল্যান্ড সিরিজ জিতে ফিরেছিল। এবারেও প্রথম টেস্টে সেই একইরকম পিচ তৈরি করা হয়েছিল মুলতানে। সেখানে পাকিস্তানের ৫৫৬ রানের জবাবে ইংল্যান্ড সাত উইকেটে ৮২৩ রান করে, মারকুটে হ্যারি ব্রুক একাই ৩১৭। ওই রানের চাপে দ্বিতীয় ইনিংসে পাকিস্তান মাত্র ৫৪.৫ ওভারে ২২০ রানে গুটিয়ে যায়।

তারপর পাকিস্তানের ক্রিকেট বোর্ড কী করল? নির্বাচক কমিটি বদলে দিল। আকিব জাভেদের নেতৃত্বাধীন নতুন নির্বাচক কমিটি দায়িত্ব নিয়েই দলের খোলনলচে বদলে ফেলল। দলের এক নম্বর ব্যাটিং তারকা বাবর আজমকে বিশ্রামে পাঠিয়ে দিল; বোলিং তারকা শাহীন আফ্রিদি, নাসিম শাহদেরও বসিয়ে দেওয়া হল। দলে এলেন ত্রিশোর্ধ্ব দুই স্পিনার নোমান আলি আর সাজিদ খান। আরও অদ্ভুত সিদ্ধান্ত – দ্বিতীয় টেস্টও মুলতানের একই পিচে খেলা। শেষপর্যন্ত সবকটা সিদ্ধান্তই কিন্তু খেটে গেল। টানা দুটো টেস্ট হওয়া পিচে বল ঘুরল বনবনিয়ে আর ইংল্যান্ডের কুড়িটা উইকেটই তুলে নিলেন সাজিদ আর নোমান। দ্বিতীয় ইনিংসে তো ওই দুজন ছাড়া কাউকে বলই করতে হল না। দেখা গেল ইংল্যান্ডের ব্যাটাররা পাটা উইকেটে যত রানই করুন, বল ঘুরলেই চোখে সর্ষেফুল দেখছেন। রাওয়ালপিণ্ডির তৃতীয় টেস্টেও একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি। এখানে সাজিদ-নোমান প্রথম ইনিংসে নিলেন নটা উইকেট, দ্বিতীয় ইনিংসে দশটাই।

ক্রিকেট দুনিয়ায় এখন সবচেয়ে ধনী তিনটে ক্রিকেট বোর্ডের দুটো হল আমাদের বিসিসিআই আর স্টোকসদের ইংল্যান্ড অ্যান্ড ওয়েলস ক্রিকেট বোর্ড (ইসিবি)। কোন দুটো বোর্ড ফ্র্যাঞ্চাইজ লিগ নিয়ে সবচেয়ে বেশি বাড়াবাড়ি করে? এই দুটো দেশই। ভারতীয় ক্রিকেটে বিপণন থেকে দল নির্বাচন – সবকিছু আইপিএলকেন্দ্রিক হয়ে গেছে। ইংল্যান্ডে আবার শুধু কুড়ি বিশের লিগ ‘টি টোয়েন্টি ব্লাস্ট’ নয়, ১০০ বলের খেলা ‘দ্য হান্ড্রেড’ বলেও একটা প্রতিযোগিতা চালু হয়েছে। পাঁচ বলের ওভার, বাহারি রংদার জামা, সাদা বল, ছোট মাঠ, একইসঙ্গে ছেলেদের আর মেয়েদের লিগ – সে এক মোচ্ছব। এত কাণ্ড করতে গিয়ে কাউন্টি ক্রিকেটের মরশুম বদলাতে হয়েছে, অর্থাৎ প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটের গুরুত্ব কমেছে। এদিকে টেস্ট দল পড়েছে গাড্ডায়। জো রুটের আমলে দুর্বল ওয়েস্ট ইন্ডিজে গিয়েও সিরিজ হারার পরে দায়িত্ব দেওয়া হয় স্টোকস-ম্যাককালামকে। তাঁরা ব্যাজবল চালু করে দেশের মাঠে নিউজিল্যান্ড আর ভারতের বিরুদ্ধে বেশ কিছুটা সাফল্য পেয়েছিলেন, পাকিস্তানে এসে সিরিজ জিতেছিলেন। কিন্তু অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে অ্যাশেজের ফলাফলের বিশেষ তারতম্য হয়নি, এবছরের গোড়ার দিকে ভারতে এসে সিরিজ হেরেছেন, এখন ছন্নছাড়া পাকিস্তানের কাছেও হারলেন। উপরন্তু ২০২১ সালে বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপ চালু হওয়ার পর থেকে দুবার ফাইনাল হয়েছে, একবারও ইংল্যান্ড ফাইনালে উঠতে পারেনি। ভারত সফরে আর সদ্যসমাপ্ত পাকিস্তান সফরে – দুবারই দেখা গেছে যে রুটকে বাদ দিলে ইংল্যান্ডের ব্যাটাররা স্পিন একেবারেই খেলতে পারছেন না। এক-আধটা ইনিংসে অলিভার পোপ বা বেন ডাকেট রান করে ফেলছেন। কিন্তু সেগুলো ব্যতিক্রম। সুতরাং স্পিন খেলতে না পারার দোষে শুধু রোহিত শর্মারা দুষ্ট নন। কুড়ি বিশের খেলা যে সব দলের ব্যাটারদেরই স্পিন খেলার দক্ষতার বারোটা বাজাচ্ছে তাতে সন্দেহ নেই। কেভিন পিটারসেন সেকথা স্পষ্ট বলেও দিয়েছেন

কিন্তু মুশকিল হল, এসব বলে রোহিতরা পার পেতে পারেন না। কারণ প্রথমত, স্টোকসরা খেলছিলেন বিদেশে, রোহিতরা দেশে। টেস্ট ক্রিকেটের প্রায় দেড়শো বছরের ইতিহাসে মাত্র দশবার কোনো দল নিজের দেশে তিন বা তার বেশি টেস্টের সিরিজের সবকটা ম্যাচে হেরেছে। দ্বিতীয়ত, স্টোকসদের জন্ম বেদি-প্রসন্ন-চন্দ্রশেখর-ভেঙ্কটরাঘবন, অনিল কুম্বলে, হরভজন সিংদের দেশে নয়। তৃতীয়ত, কিথ ফ্লেচার, অ্যালাস্টেয়ার কুক, পিটারসেন, রুটের মত কয়েকজনকে বাদ দিলে কোনোদিনই ইংল্যান্ডের ব্যাটাররা স্পিন খেলতে দারুণ পারদর্শী ছিলেন না।

ভারতীয়দের ইতিহাস ঠিক উল্টো। আমাদের দলকে যে ‘দেশে বাঘ বিদেশে বেড়াল’ বলা হত তার বড় কারণ – আমাদের নেহাত মাঝারি মানের ব্যাটাররা জোরে বলে চোখ বুজে ফেললেও স্পিনারদের ছিঁড়ে খেতেন। সেই কারণেই সর্বকালের সেরা লেগস্পিনার শেন ওয়ার্ন ভারতের বিরুদ্ধে এক ইনিংসে পাঁচ উইকেট নিয়েছেন ১৪ টেস্টে মাত্র একবার। তিনি যখন ১৯৯৮ সালে ভারতে প্রথম টেস্ট খেলতে আসেন, তখন শচীন তেন্ডুলকর ব্যাট করতে নামার আগেই ওয়ার্নকে মেরে আধমরা করে রাখতেন নভজ্যোৎ সিং সিধু। ইনি কিন্তু ভারতের সর্বকালের সেরা ১৫ জন ব্যাটারের তালিকাতেও থাকবেন না। মুথাইয়া মুরলীধরনের ভারতের বিরুদ্ধে সাফল্য ওয়ার্নের চেয়ে বেশি, কিন্তু তারও বেশিরভাগটা শ্রীলঙ্কায়। ভারতে এসে তিনি এক ইনিংসে দুবারের বেশি পাঁচ উইকেট নিতে পারেননি। দুজনেরই ভারতের বিরুদ্ধে গড় সামগ্রিক গড়ের চেয়ে অনেক বেশি।

ইংল্যান্ড থেকে সেই প্রাচীনকালের জিম লেকার আর ছয়, সাতের দশকের ডেরেক আন্ডারউড ছাড়া বিশ্বমানের স্পিনারই বা এসেছে কজন? ২০১২-১৩ মরশুমে তারা ভারতে এসে সিরিজ জিতেছিল যে দুজনের জন্যে, তাঁদের মধ্যে গ্রেম সোয়ান তো বেশিদিন খেললেনই না। আর মন্টি পানেসার সম্পর্কে ওয়ার্ন একবার বলেছিলেন – ও পঞ্চাশটা টেস্ট খেলেনি, একই টেস্ট পঞ্চাশবার খেলেছে। সাম্প্রতিক ভারত সফর আর পাকিস্তান সফরে প্রমাণ হয়ে গেছে যে এখনো ইংল্যান্ডের ব্যাটাররা তেমন দরের স্পিনারদের বিরুদ্ধে অনুশীলনের সুযোগ পান না। জ্যাক লিচের সীমাবদ্ধতা অসীম, শোয়েব বশির আর রেহান আহমেদ ভবিষ্যতে কেমন হবেন তা ভবিষ্যৎ বলবে – কিন্তু এখনো ৩৮ বছরের নোমান আর ৩১ বছরের সাজিদের সমকক্ষ নন। এই সমস্যা তো রোহিত, বিরাট কোহলি, শুভমান গিলদের নেই। তাঁরা এখন ঠাসা আন্তর্জাতিক ক্যালেন্ডারের ঠ্যালায় না হয় ঘরোয়া ক্রিকেট খেলার সময় করতে পারেন না, উঠে এসেছিলেন তো ঘরোয়া ক্রিকেট খেলেই। সেখানে তো একগাদা ভাল মানের স্পিনারকে খেলতে হয়েছিল। যদি ধরে নিই এই ব্যাপারটা সাইকেল চালাতে শেখার মত নয়, ছোট থেকে শিখে আসা জিনিসও খেলোয়াড়রা ভুলে যান, তাহলেও ভারতীয় দলে এই মুহূর্তে এমন অন্তত দুজন স্পিনার আছেন যাঁদের একজনকে সারাক্ষণই আমাদের প্রাক্তন ক্রিকেটার এবং সাংবাদিকরা ভারতের সর্বকালের সেরা বলেন – রবিচন্দ্রন অশ্বিন। অন্যজন বিশ্বের সর্বকালের সেরা অলরাউন্ডারদের একজন, এমন দাবিও নিউজিল্যান্ড সিরিজের আগে পর্যন্ত শোনা গেছে – রবীন্দ্র জাদেজা। তা আমাদের ব্যাটাররা তো নেটে এঁদের বোলিংয়ে ব্যাট করেন। তা সত্ত্বেও এই ধেড়ে বয়সে ঘরোয়া ক্রিকেট খেলেন না বলেই বিরাট, রোহিতরা স্পিনারদের বিরুদ্ধে রান করতে পারেননি, আর রঞ্জি ট্রফিতে ফেরত গেলেই আবার তরতরিয়ে রান করতে শুরু করবেন? বিশ্বাস করা শক্ত।

আসল কথা হল, ভারতের টেস্ট দলের সদস্যদের মাঝারিয়ানা ধরা পড়ে গিয়েছে। বোর্ডের বিপুল অর্থবলে চালিত সর্বব্যাপী প্রচারযন্ত্র যে সত্য চাপা দিয়ে রেখেছিল, টেস্ট ক্রিকেটের ইতিহাসে সবচেয়ে কম প্রতিযোগিতামূলক ১২-১৩ বছর যে সত্যকে চেপে রাখা সম্ভব করেছিল, পরিশ্রমী নিউজিল্যান্ড দল সেই সত্যকে একেবারে উলঙ্গ করে দিয়েছে। তাই এখন রেখে ঢেকে সমালোচনা করে পরিত্রাণ পাওয়ার চেষ্টা করছে এ দেশের ক্রিকেট বাস্তুতন্ত্র।

ক্রিকেটভক্তরা এখনই তেড়ে আসবেন – ‘১২ বছরে দেশের মাঠে পরপর ১৮ খানা সিরিজ জিতেছে যে দল, তারা মাঝারি? এই রেকর্ড আর কোনো দলের নেই তা জানেন?’ আজ্ঞে জানি। কথাটা একদম সত্যি। ঠিক যেমন ‘অশ্বত্থামা হত’ কথাটাও সত্যি। এক্ষেত্রে ‘ইতি গজ’-র হাতিটা একটা বড়সড় দাঁতাল। তার একটা দাঁত হল অতীতের ভারতীয় দলগুলোর ঘরের মাঠের রেকর্ড, যা নিয়ে কদিন আগেই এইখানে বিস্তারিত লিখেছি। সে দাঁতের কথা জেনেও কেউ কেউ নিশ্চয়ই বলবেন – আগের দলগুলো যতই জিতুক, বিরাট আর রোহিতের দলের মত পরপর ১৮ খানা তো জেতেনি। ঠিক। কেন এই রেকর্ডটা হয়েছে তা বোঝা যাবে অন্য দাঁতটার কথা বললে।

বিরাট-রবি শাস্ত্রী জমানার আগেও ভারতে ঘূর্ণি পিচই হত বটে, কিন্তু বল প্রথম দিন মধ্যাহ্নভোজনের বিরতির আগে থেকেই ঘুরছে – এমনটা কমই দেখা যেত। বল তাক লাগিয়ে দেওয়ার মত ঘুরত তৃতীয় দিন থেকে। তার আগে পর্যন্ত স্পিনারদের ঘাম ঝরাতে হত। মূলত গতি আর লাইন, লেংথের বৈচিত্র্যের উপর নির্ভর করে উইকেট নিতে হত। বেদি-প্রসন্ন-চন্দ্রশেখর থেকে আরম্ভ করে কুম্বলে-হরভজন ওরকম পিচেই বল করেছেন এবং ম্যাচ জিতিয়েছেন বছরের পর বছর। এই কথাটা অবশ্য পরিসংখ্যান দিয়ে প্রমাণ করার উপায় নেই, কারণ এর কোনো পরিসংখ্যান হয় না। যাঁরা সেই যুগ থেকে খেলা দেখছেন তাঁরা হয় একবাক্যে একমত হবেন, নয় একেবারেই মানবেন না। তরুণরা তো মানতেই চাইবেন না, কারণ কুড়ি বিশ প্রজন্মের ইউটিউব থাকলেও ধৈর্য নেই। কিন্তু অন্য একটা ব্যাপার আছে যার প্রমাণ দেওয়া যায়।

বিরাট-শাস্ত্রী জমানার আগে পর্যন্ত কিন্তু প্রত্যেক সিরিজেই এমন এক-আধটা মাঠে খেলা দেওয়া হত যেখানকার পিচ, আবহাওয়া মিলিয়ে সফরকারী দলেরও কিছুটা সাহায্য পাওয়ার আশা থাকত। যেমন কলকাতার ইডেন উদ্যানে অনেক সময়েই বিপক্ষের জোরে বোলাররা গঙ্গার হাওয়াকে কাজে লাগাতে পারতেন, পিচেও অনেক সময় বেশ ঘাস থাকত। ইতিহাস বলছে ইডেনে অস্ট্রেলিয়া আর ইংল্যান্ড জিতেছে দুবার করে। ওয়েস্ট ইন্ডিজ জিতেছে তিনবার আর পাকিস্তান, দক্ষিণ আফ্রিকাও একবার করে জিতেছে। সেই ইডেনে ভারত শেষ তিনটে টেস্ট খেলেছে যথাক্রমে নিউজিল্যান্ড, শ্রীলঙ্কা আর বাংলাদেশের বিরুদ্ধে। শেষ ম্যাচটা ছিল সেই ২০১৯ সালে। অস্ট্রেলিয়ার মত দলের বিরুদ্ধে ২০০১ সালের সেই অবিস্মরণীয় টেস্টের পর থেকে আর খেলাই হয়নি ইডেনে।

এমন আরেকটা মাঠ ছিল মোহালির পিসিএ স্টেডিয়াম। ওই মাঠে সফরকারী দলগুলো জিততে না পারলেও অন্তত ড্র করতে পারত। কোর্টনি ওয়ালশের ওয়েস্ট ইন্ডিজ তো ১৯৯৪ সালে গোটা সফরে কিছু জিততে না পারলেও ওখানে শেষ টেস্টে ভারতকে হারিয়েছিল। ওই মাঠে ইংল্যান্ড ড্র করেছে একবার, নিউজিল্যান্ড দুবার, পাকিস্তান একবার, শ্রীলঙ্কা একবার। সে মাঠেও গত ১১ বছরে খেলা হয়েছে মাত্র চারটে টেস্ট।

তাহলে আজকাল খেলা দেওয়া হয় কোথায়? এরও গোটা দুয়েক উদাহরণ দেওয়া যাক।

২০১৭ সালে প্রথম টেস্ট ম্যাচ হওয়া পুনের এমসিএ স্টেডিয়ামে সাত বছরের মধ্যে তিনটে ম্যাচ হয়ে গেল এবং তিনটেই ঘূর্ণি পিচে। রান উঠল কম। ২০১৭ সালের প্রথম খেলাটায় আমাদের রবি-অ্যাশ জুটিকে টপকে গিয়েছিলেন অস্ট্রেলিয়ায় স্টিভেন ও’কিফ আর নাথান লায়ন। ২০১৯ সালে দুর্বল স্পিন আক্রমণের দক্ষিণ আফ্রিকার সঙ্গে অবশ্য ভারত ছশোর বেশি রান করেছিল, দক্ষিণ আফ্রিকা ফলো অন করে হেরেছিল। এবারেও টেস্টে অনিয়মিত মিচেল স্যান্টনার ম্যাচে ১৩ খানা উইকেট তুলে নিলেন, আমাদের সর্বকালের সেরা দুই স্পিনারকে টেক্কা দিলেন। ভাগ্যে ওয়াশিংটন সুন্দর ছিলেন, নইলে অবস্থা আরও শোচনীয় হত।

আমেদাবাদের সর্দার প্যাটেল স্টেডিয়াম ভেঙেচুরে নতুন করে নরেন্দ্র মোদী স্টেডিয়ামে পরিণত করা হল, সেখানে প্রথম টেস্ট হল ২০২১ সালে। একেবারে পরপর দুটো টেস্ট। প্রথমটা শেষ হল দুদিনে, দ্বিতীয়টা তিনদিনে। প্রথম টেস্টে দুদলের কেউ দেড়শো পেরোতে পারেনি, ইংল্যান্ড দ্বিতীয় ইনিংসে ৮১ রানে অল আউট। এরকম পিচ কুম্বলেরা গোটা জীবনে পাননি। মাত্র দুবছর বয়সী ওই স্টেডিয়ামে তিন নম্বর টেস্টও খেলা হয়ে গেছে গতবছর। আগের দুই টেস্টে পিচ নিয়ে বড্ড বাড়াবাড়ি করা হয়ে গেছে ভেবেই বোধহয় একেবারে ঢ্যাবঢেবে পিচ বানানো হয়েছিল অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে। আড়াই খানা ইনিংস খেলা হয়েছিল, চারজন শতরান করেছিলেন। তাছাড়া ট্রেভিস হেড ৯০, অক্ষর প্যাটেল ৭৯।

তালিকা আরও লম্বা করা যায়, কিন্তু যাঁর বোঝার তিনি এতেই বুঝে নেবেন পরপর ১৮ খানা সিরিজ জেতার মাস্তানি আসলে কোথায়। অশ্বিন আর জাদেজার মাঝারিয়ানা আরও পরিষ্কার হয় দেশের মাঠের সঙ্গে বিদেশের মাঠে তাঁদের পরিসংখ্যান মিলিয়ে দেখলে। অশ্বিনের ৫৩৬ খানা উইকেটের মাত্র ১৪৯টা এসেছে বিদেশে, গড় ৩০.৪০। উনচল্লিশটা টেস্টে এক ইনিংসে পাঁচ উইকেট নিয়েছেন আটবার। এই পরিসংখ্যান খারাপ নয়, মাঝারি। দেশের মাঠে ৬৫ খানা টেস্ট খেলে নিয়েছেন ৩৮৩ খানা উইকেট, গড় ২১.৫৭, এক ইনিংসে পাঁচ উইকেট নিয়েছেন ২৯ বার। মানে দুজন অশ্বিন একেবারে দুজন আলাদা বোলার।

জাদেজার পরিসংখ্যান দেখবেন? উনি ভারতের মাটিতে ৪৯ টেস্টে ২৩৮ উইকেট নিয়েছেন মাত্র ২০.৭১ গড়ে, এক ইনিংসে পাঁচ উইকেট ১৩ বার। কিন্তু বিদেশে? ২৬ খানা টেস্ট খেলে মোটে ৭৬ খানা উইকেট, গড় ৩২.৭৮। এক ইনিংসে পাঁচ উইকেট মোটে দুবার। হিন্দি সিনেমা হলে দেখানো হত দেশে খেলেন জাদেজা, আর বিদেশে ভিলেন তাঁকে তালা বন্ধ ঘরে রেখে তাঁরই মত দেখতে অন্য একজনকে খেলতে নামায়। একথা ঠিকই যে প্রায় সব বোলারই নিজের দেশে বেশি ভাল বল করেন। কিন্তু সর্বকালের সেরার তকমাধারীদের পরিসংখ্যানে দেশে আর বিদেশে এত তফাত ঘটে না। আমাদের দেশের সবচেয়ে সফল স্পিনারদেরই দেখুন না:

এই পরিসংখ্যানগুলো দেখলেই পরিষ্কার হয়, অশ্বিন-জাদেজার চেয়ে অনেক বড় স্পিনার ছিলেন অজিত ওয়াড়েকরের স্পিন ত্রয়ী। কারণ তাঁদের দেশে আর বিদেশে উইকেট সংখ্যা আর এক ইনিংসে পাঁচ উইকেট নেওয়ার ঘটনা প্রায় সমান। সেই কারণেই তাঁরা ওয়েস্ট ইন্ডিজ, ইংল্যান্ডেও সিরিজ জেতাতে পেরেছিলেন। কুম্বলে, হরভজন বিদেশে ওঁদের মত ভাল না হলেও নেহাত ফেলনা ছিলেন না। বিদেশে অন্তত দুটো টেস্ট ম্যাচের কথা উল্লেখ করা যায় যেখানে এঁরা দুজনে ম্যাচ জিতিয়েছিলেন – ১) ২০০৬ সালে কিংস্টনে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিরুদ্ধে প্রথম ইনিংসে হরভজন পাঁচ উইকেট নেন আর দ্বিতীয় ইনিংসে কুম্বলে ছয় উইকেট নিয়ে ৪৯ রানে ম্যাচ জেতান। ২) ২০০২ সালে লিডসের ইনিংস জয়ে তাঁদের অবদান আরও উল্লেখযোগ্য, কারণ ভিজে আবহাওয়ায় পিচটা ছিল জোরে বোলারদের জন্য আদর্শ। সেখানে কুম্বলে-হরভজন বিপক্ষের কুড়িটা উইকেটের ১১ খানা তুলে নেন। অশ্বিন আর জাদেজা কিন্তু এমন দুজন বোলার যাঁদের উপমহাদেশের বাইরে একসঙ্গে খেলানোর কথা ভারত অধিনায়করাই ভেবে উঠতে পারেন না। অধিকাংশ ক্ষেত্রে যে অশ্বিনকে বসিয়ে রাখা হয় তার কারণ কিন্তু বোলিং নয়। সম্ভবত তার কারণ কোহলি-শাস্ত্রীর মত দ্রাবিড়-রোহিতেরও ধারণা ছিল, জাদেজা অশ্বিনের চেয়ে ব্যাট ভাল করেন।

আরও পড়ুন এ যুগে তৃতীয় নয়নও জিরো

নিউজিল্যান্ড সিরিজে ব্যাটাররা চূড়ান্ত ব্যর্থ, অথচ অশ্বিন আর জাদেজার মাঝারিয়ানা নিয়ে এত বড় লেখা কেন লিখলাম? তার কারণ টেস্ট জিততে গেলে কুড়িটা উইকেট নিতে হয় এবং ভারতের মাটিতে জিততে গেলে স্পিনারদের সাফল্য অপরিহার্য। ব্যাটারদের ব্যর্থতায় মুহ্যমান হয়ে আলোচকরা অশ্বিন-জাদেজার ব্যর্থতাকে তত গুরুত্ব দিচ্ছেন না। ‘একটা সিরিজে হতেই পারে’ বলে উড়িয়ে দিচ্ছেন। লেখার এই পর্বে এ জন্যেই দেখানো দরকার ছিল যে এই ব্যর্থতা একটা সিরিজের ব্যাপার নয়। এতদিন এক বানানো স্বর্গের দেবদূত করে রাখা হয়েছিল ওঁদের। তাই এই পতন অনিবার্য ছিল। অতীতেও একাধিকবার ওঁদের মাঝারিয়ানা দেখিয়ে দিয়ে গেছেন অন্য দেশের স্পিনাররা। কিন্তু ভারত শেষপর্যন্ত সিরিজ জিতে গেছে বলে চোখে পড়েনি। ভারতে এসে বেদি, প্রসন্ন, চন্দ্রশেখর, কুম্বলে, হরভজনের থেকে বেশি উইকেট নিয়ে চলে যাওয়ার ক্ষমতা হয়নি ওয়ার্ন বা মুরলীদেরও। অথচ অশ্বিন-জাদেজার চেয়ে বেশ কয়েকবার বেশি উইকেট নিয়েছেন সোয়ান-পানেসার, ও’কিফ-লায়ন, লায়ন-ম্যাট কুনেমান-টড মার্ফি, টম হার্টলি-বশির স্যান্টনার, আজাজ প্যাটেল, গ্লেন ফিলিপসরা।

রবি-অ্যাশের এই ব্যর্থতা ঢাকতে এখন নতুন কায়দা চালু করেছেন ভারতীয় বিশেষজ্ঞরা। বলা এবং লেখা হচ্ছে, যত দোষ টিম ম্যানেজমেন্টের। বেশি ঘূর্ণি উইকেট বানালে মুড়ি মিছরি এক দর হয়ে যায়। ফলে রবি-অ্যাশের মুনশিয়ানার আর দাম থাকে না। কিমাশ্চর্যমতৎপরম! ওঁরা যদি এত বড় স্পিনার হন যে যেখানে বল তেমন ঘোরে না সেখানেও কেরামতি দেখাতে পারেন, তাহলে যেখানে বল বেশি ঘোরে সেখানে তো ওঁদের ধারেকাছে অন্যদের আসতে পারার কথা নয়। কোনো ব্যাটার সম্পর্কে কখনো শুনেছেন যে ব্যাটিং সহায়ক পিচে অন্যরা বেশি রান করে দেয়, কিন্তু শক্ত পিচে সে-ই সেরা? তাছাড়া রবি-অ্যাশ বরাবর কম ঘূর্ণির পিচেই এত উইকেট নিয়ে এসেছেন – সাক্ষ্যপ্রমাণ তো তা বলছে না। আর বিদেশে, যেখানে বল বিশেষ ঘোরে না, সেখানে তো ওঁদের একসঙ্গে খেলানোই যায় না।

আজ এ পর্যন্তই। ভারতীয় দলের তারকা ব্যাটাররাও যে মাঝারিয়ানার বানানো স্বর্গের দেবদূত, কেবল স্পিন খেলতে না পারা যে ৩-০ ফলাফলের কারণ নয়, সেসব কথা সবিস্তারে না লিখলে এই লেখা সম্পূর্ণ হবে না। সে কাজ পরের পর্বের জন্য তোলা রইল।

সমস্ত পরিসংখ্যান ক্রিকইনফো থেকে

নাগরিক ডট নেট ওয়েবসাইটে প্রকাশিত

সবাই চুপ করে থাকবে, মানিয়ে নিন শামি

পাকিস্তান ম্যাচে হিন্দুরা খারাপ পারফরম্যান্স করলে সন্দেহ করার কিছু নেই, মুসলমানকে সন্দেহ করতে হবে — এই মানসিকতার বিরুদ্ধে কুম্বলে, শচীনরা একটাও কথা বলেননি।

ঘটনা ১

রাজস্থানের বাসিন্দা নাফিসা আত্তারি গত মঙ্গলবার তাঁর চাকরি থেকে বরখাস্ত হয়েছেন, বুধবার গ্রেপ্তার হয়েছেন। কারণ তিনি সোশাল মিডিয়ায় রবিবারের ভারত-পাকিস্তান ম্যাচে পাকিস্তান জিতে যাওয়ার পর আনন্দ প্রকাশ করেছিলেন।

ঘটনা ২

কাশ্মীরের শ্রীনগরের শের-এ-কাশ্মীর ইনস্টিটিউট অফ মেডিকাল সাইন্সেস আর গভমেন্ট মেডিকাল কলেজের ছাত্রছাত্রী, ওয়ার্ডেন ও ম্যানেজমেন্টের লোকেদের বিরুদ্ধে কুখ্যাত ইউএপিএ আইনে মামলা দায়ের করেছে পুলিস। অভিযোগ পাকিস্তানের জয়ে উল্লাস করা, বাজি পোড়ানো ইত্যাদি। অভিযুক্তদের চিহ্নিত করা হয়নি, তবে পুলিস বিষয়টি খতিয়ে দেখছে। ক্যাম্পাসে গিয়ে জিজ্ঞাসাবাদও করা হয়েছে।

ঘটনা ৩

রবিবার ভারত-পাক ম্যাচের পর একটি দক্ষিণপন্থী ফেসবুক পেজ থেকে পোস্ট করা হয় যে মুসলমান পাড়ায় পাকিস্তান জেতার পর বাজি পোড়ানো হয়েছে। পুলিস তদন্ত করে দেখে যে ওই পাড়ায় সেদিন বিয়ে ছিল এবং বাজি আসলে সেখানেই পোড়ানো হচ্ছিল। যারা ফেসবুক পোস্টটি করেছিল, তারা দোষ স্বীকার করে লিখিতভাবে ক্ষমা প্রার্থনা করেছে। পুলিস তাদের প্রত্যেককে দিয়ে ২৫ হাজার টাকার বন্ড জমা করিয়েছে।

ঘটনা ৪

উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ বৃহস্পতিবার ঘোষণা করেছেন পাকিস্তানের জয় যারা উদযাপন করেছে তাদের বিরুদ্ধে সিডিশন ল, অর্থাৎ দেশদ্রোহবিরোধী আইন প্রয়োগ করা হবে। আগ্রাতে কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে ইতিমধ্যেই ।

সব ঘটনা উল্লেখ করা গেল না, নিশ্চিতভাবেই অনেক ঘটনা বাদ পড়ে গেল। পাঠকরা নিজেদের জানা ঘটনা এই তালিকায় জুড়ে নিতে পারবেন। এমন ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তালিকা তৈরি করা সম্ভব হলে তা কুড়ি বিশের বিশ্বকাপে ভারতীয় দলের একমাত্র মুসলমান ক্রিকেটার মহম্মদ শামির কাছে পাঠানো যেতে পারে। তাতে তাঁর মানসিক যন্ত্রণার কিছু উপশম হলেও হতে পারে। কারণ এই ঘটনাগুলো জানলে তিনি বুঝতে পারবেন, পাকিস্তানের কাছে ভারত হেরে যাওয়ার পর থেকে তাঁকে যা সহ্য করতে হয়েছে তা ভারতের সাধারণ মুসলমানদের দুর্গতির তুলনায় কিছুই নয়। তাঁকে নাহক অনলাইন গালাগালি সহ্য করতে হয়েছে, জামিন অযোগ্য ধারায় পুলিশ কেস তো আর হয়নি। চাকরিও খোয়াতে হয়নি। বিশ্বাসঘাতকতার অভিযোগ উঠেছে মাত্র, সে অভিযোগের ভিত্তিতে অন্তত গ্রেপ্তার করা হয়নি। শামির নিয়োগকর্তা যে ক্রিকেট বোর্ড, সে বোর্ডের সেক্রেটারি যখন খোদ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর পুত্র, তখন দেশে ফিরলেও যে শামিকে ৩.৫ ওভারে ৪৩ রান দেওয়ার জন্য গ্রেপ্তার করা হবে না তা নিশ্চিত করে বলা যায়। সে নিশ্চয়তা এ মুহূর্তে ভারতের অধিকাংশ ইসলাম ধর্মাবলম্বীর নেই।

ফুটবলপ্রেমীরা জানেন ১৯৬৯ সালে একটা ফুটবল ম্যাচের জন্য হন্ডুরাস আর এল সালভাদোরের মধ্যে যুদ্ধ হয়েছিল। মানে খেলার জন্য যুদ্ধ হওয়ার ইতিহাস আছে। কিন্তু ভারত-পাক ক্রিকেট ম্যাচ হল যুদ্ধের জন্য খেলা — গত পাঁচ দিনের ঘটনাবলী তা প্রমাণ করে দিয়েছে। পাকিস্তানের গণতন্ত্র নিয়ে অতি বড় পাকিস্তানিও গলা তুলে কথা বলতে সঙ্কোচ বোধ করেন। আর ভারত এখন এত মহান গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র, যে ক্রিকেট ম্যাচে অন্য দেশের দলকে সমর্থন করলে চাকরি হারাতে হয়, গ্রেপ্তার হতে হয়, এমনকি দেশের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করার অভিযোগেও অভিযুক্ত হতে হয়। কিন্তু সে কথা বললে অর্ধেক বলা হয়। কোনো ভারতীয় অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড, ওয়েস্ট ইন্ডিজ, এমনকি ইংল্যান্ডকেও সমর্থন করতে পারেন। জেলে যেতে হবে না। যত দোষ পাকিস্তানকে সমর্থন করলেই। কেবল অন্ধ ক্রিকেটভক্তরা নয়, ক্রিকেটাররা পর্যন্ত তা-ই মনে করেন। প্রাক্তন ক্রিকেটার গৌতম গম্ভীর রবিবারই টুইট করেছিলেন, যারা ভারতের জয়ে বাজি পোড়াচ্ছে তারা ভারতীয় হতে পারে না। তিনি অবশ্য এখন বিজেপি সাংসদ, তাই এমন মন্তব্য তাঁর থেকে অপ্রত্যাশিত নয়, কিন্তু বীরেন্দ্র সেওয়াগও তীর্যক টুইট করতে ছাড়েননি। তাঁর বক্তব্য দীপাবলিতে ভারতের বেশকিছু এলাকায় বাজি নিষিদ্ধ করা হয়েছে, অথচ পাকিস্তান জেতার পরে লোকে বাজি পোড়াচ্ছে। তারা বোধহয় ক্রিকেটের জয় উদযাপন করছে। তাহলে দীপাবলিতেই বা বাজি পোড়ালে দোষ কী? এই ভণ্ডামির কী প্রয়োজন? সব জ্ঞান দীপাবলির বেলাতেই কেন? সীমান্তের ওপারের ওঁরাও কিছু কম যান না। এক মন্ত্রী বলেছেন এই জয় ইসলামের জয়। প্রাক্তন ক্রিকেটার ওয়াকার ইউনিস লাইভ টিভিতে বলেছেন, রিজওয়ানের ব্যাটিংয়ের চেয়েও তৃপ্তিদায়ক ব্যাপার হল হিন্দুদের মধ্যে গিয়ে নমাজ পড়া। অর্থাৎ এতগুলো লোক তক্কে তক্কে ছিল যুদ্ধ করবে বলে — ধর্মযুদ্ধ।

আরও পড়ুন এটা যুদ্ধ নয়, ক্রিকেট; ওঁরা গ্ল্যাডিয়েটর নন, ক্রিকেটার

কিন্তু এতেও সবটা বলা হল না। কারণ পাকিস্তানে এখন পর্যন্ত বিরাট কোহলি চার-ছয় মারার সময়ে উল্লাস করার জন্য কাউকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে খবর নেই। ওয়াকারকেও তাঁর মন্তব্যের জন্য দুঃখপ্রকাশ করে টুইট করতে হয়েছে । কিন্তু সেওয়াগ, গম্ভীররা ওসবের ধারে কাছে যাননি। কারণ পাকিস্তানি মন্ত্রী, প্রাক্তন ক্রিকেটাররা যেমন শত্রুপক্ষকে আক্রমণ করেছেন, এঁরা মনে করেন এঁরাও তেমনই শত্রুপক্ষকে আক্রমণ করেছেন। কে সেই শত্রু? উত্তরটা খুব সোজা। কানে বাজির আওয়াজ এলেই যাদের সম্বন্ধে মনে হয় নির্ঘাত ওরাই পোড়াচ্ছে এবং পাকিস্তান জিতেছে বলেই পোড়াচ্ছে, তারাই শত্রু, তারাই দেশদ্রোহী। অর্থাৎ আপনি ভারতীয় হয়ে পাকিস্তানকে সমর্থন করেও বেঁচে যেতে পারেন, যদি মুসলমান না হন।

নেহাত গা জোয়ারি মন্তব্য করা হল? মুসলমানদের দিকে ঝোল টেনে কথা বলা হল মনে হচ্ছে? মহম্মদ শামিকে রাম, শ্যাম, যদু, মধুর ‘গদ্দার’ ইত্যাদি বলা দেখেই সে সন্দেহ দূর হয়ে যাওয়ার কথা। যদি তারপরেও সন্দেহ থাকে, তাহলে শামির সমর্থনে ভারতীয় প্রাক্তন ক্রিকেটারদের টুইটগুলো লক্ষ করবেন। গম্ভীর, সেওয়াগ তো বটেই; অনিল কুম্বলে, ভারতীয় ক্রিকেটের মৌনীবাবা শচীন তেন্ডুলকর — সকলেই শামি যে নির্দোষ সেই মর্মে টুইট করেছেন। সকলেরই বক্তব্য মোটামুটি এক। শামি চ্যাম্পিয়ন বোলার; খেলার মাঠে একটা খারাপ দিন যে কোনো খেলোয়াড়ের যেতে পারে; শামি, আমরা তোমাকে ভালবাসি, ইত্যাদি। একজনও কিন্তু বলেননি, শামি ভারতের হয়ে ক্রিকেট খেলে, আমরাও ভারতের হয়ে খেলেছি। ওকে সন্দেহ করা আর আমাদের সন্দেহ করা একই কথা। যারা তা করে তাদের মত ফ্যান আমাদের দরকার নেই। ইংল্যান্ডের ফুটবল দলের অধিনায়ক হ্যারি কেন কিন্তু পেনাল্টি শুট আউটে গোল করতে ব্যর্থ কৃষ্ণাঙ্গ ফুটবলারদের সমর্থনে ঠিক এই কথাই বলেছিলেন। শচীনরা বলেননি, কারণ ওঁরা খুব ভাল করে জানেন শামি মুসলমান বলেই সে সন্দেহের পাত্র। উইকেট না পেলেও, মার খেলেও যশপ্রীত বুমরা, ভুবনেশ্বর কুমার, রবীন্দ্র জাদেজা সন্দেহের পাত্র নয়। পাকিস্তান ম্যাচে হিন্দুরা খারাপ পারফরম্যান্স করলে সন্দেহ করার কিছু নেই, মুসলমানকে সন্দেহ করতে হবে — এই মানসিকতার বিরুদ্ধে কুম্বলে, শচীনরা একটাও কথা বলেননি। তাঁরা তবু মুখ খুলেছেন, অধিনায়ক ডাকাবুকো কোহলির থেকে পাওয়া গেছে বিরাট নীরবতা। সমালোচকদের বিরুদ্ধে কথার ফুলঝুরি ছোটানো কোচ রবি শাস্ত্রীরও মুখে কুলুপ। এমনকি টিমের বড়দা (মেন্টরের বাংলা প্রতিশব্দ পরামর্শদাতা। ধোনির জন্য সেটা বড্ড ম্যাড়মেড়ে নয়?) মহেন্দ্র সিং ধোনিও চুপ।

কেনই বা চুপ থাকবেন না? ওঁরাও তো আমার, আপনার মত কাগজ পড়েন, টিভি দেখেন, সোশাল মিডিয়া ঘাঁটেন। ফলে ওঁরা দেশের অবস্থা সম্পর্কে যথেষ্ট ওয়াকিবহাল। ওঁরা হয়ত জানেন গুজরাটের আনন্দ (আমুল খ্যাত) শহরের মঙ্গলবারের ঘটনা। সেখানে একটি নতুন হোটেল, রেস্তোরাঁ ও ব্যাঙ্কোয়েট হলের উদ্বোধন আটকাতে বিরাট জনতা হাজির হয় গত পরশু। তারা গঙ্গাজল দিয়ে এলাকা শুদ্ধিকরণের প্রয়াস করেছে। স্লোগান দিয়েছে, ভারতে থাকতে হলে জয় শ্রীরাম বলতে হবে। হিন্দু এলাকায় মুসলমান মালিকের হোটেল থাকবে, এ অনাচার তারা মানতে রাজি নয়। খবরে প্রকাশ, হোটেলটির তিন মালিকের একজন হিন্দু। কিন্তু তা যথেষ্ট নয়।

ধোনি ঝাড়খন্ডের মানুষ, দিব্যি বাংলা বলতে পারেন। রাঁচিতে তাঁর ঘনিষ্ঠ লোকজনদের মধ্যেও বাঙালি আছেন। তাঁর প্রতিভা প্রথম চিনেছিলেন কেশব ব্যানার্জি নামের এক বাঙালি মাস্টারমশাই। ফলে ধোনি হয়ত ত্রিপুরার খবরও রাখেন। হয়ত ভাল করেই জানেন, ওই রাজ্যে কীভাবে মুসলমান খ্যাদানো চলছে কদিন ধরে আর পশ্চিমবঙ্গের বাঙালি মালিকানায় চলা সংবাদমাধ্যম চোখ বুজে আছে। এই পরিবেশের মধ্যে ধোনির কী দায় পড়েছে মুসলমান সতীর্থের হয়ে মুখ খোলার?

এত ঘটনা না জানলেও আইপিএল খেলা তারকা ক্রিকেটাররা বিলক্ষণ জানেন, এক গ্রাম মাদক উদ্ধার না হওয়া সত্ত্বেও শাহরুখ খানের ছেলেকে তিন সপ্তাহ কারাবাস করতে হল। ইতিমধ্যে তদন্তকারী অফিসারের বিরুদ্ধে নানা কেলেঙ্কারির অভিযোগ উঠে এসেছে। যে দেশে অর্ণব গোস্বামীর জামিনের জন্য মধ্যরাতে আদালত বসতে পারে, সে দেশে আদালতের সময়ই হয় না মাসের পর মাস, বছরের পর বছর উমর খালিদের জামিনের আবেদন শোনার। শার্জিল ইমাম যে কথা বলেননি তার জন্য, সিদ্দিক কাপ্পান যে প্রতিবেদন লেখেননি তার জন্য, মুনাওয়ার ফারুকি যে কৌতুক করেননি তার জন্য এবং আরিয়ান খান যে মাদক নেননি তার জন্য — কারাবাস করতে পারেন। একজন আদানির বন্দরে কয়েক হাজার গ্রামের মাদক পাওয়া গেলেও তেমন হেলদোল হয় না আইনের রক্ষকদের, একজন খানকে রেভ পার্টিতে পাওয়া গেলেই সে কেবল মাদকাসক্ত নয়, মাদক ব্যবসায়ী হয়ে যায় সারা দেশের চোখে — এ কথা আমাদের মত ক্রিকেট তারকারাও জানেন। তাই তাঁরা চুপ করেই থাকবেন।

শামি, আপনি মানিয়ে নিন। আপনার চেয়ে অনেক দূরে, অনেক নীচে থাকা ভারতীয় মুসলমানরা প্রতিনিয়ত যেমন মানিয়ে নিচ্ছেন।

নাগরিক ডট নেটে প্রকাশিত

ওয়াসিম জাফর: ক্রিকেটের গৌরবহীন একা

ওয়াসিমের দীর্ঘ কেরিয়ারের টিমমেটদের অধিকাংশের নীরবতা দেখিয়ে দিচ্ছে, তাঁদের কাছে ওঁর শেষ পরিচয় একজন ভিন্নধর্মী মানুষের।

ওয়াসিম জাফর কিন্তু মুনাওয়ার ফারুকি নন। তিনি হিন্দু দেবদেবী বা অমিত শাহ – নরেন্দ্র মোদীকে নিয়ে মস্করা করতে পারেন এমন কোন সম্ভাবনা নেই। করেছেন এমন কোন ইউটিউব ভিডিও-ও নেই। কারণ ওটা ওয়াসিমের পেশা নয়। তাঁর পেশা ক্রিকেট। তিনি প্রাক্তন ক্রিকেটার, অবসর নেওয়ার পর উত্তরাখণ্ড রঞ্জি দলের হেড কোচের চাকরি করছিলেন। পদত্যাগ করেছেন, কারণ তাঁর মতে ক্রিকেট অ্যাসোসিয়েশন অফ উত্তরাখণ্ডের (সিএইউ) কর্তারা তাঁর কাজে অন্যায় হস্তক্ষেপ করছিলেন, নিজেদের পছন্দের ক্রিকেটারদের যোগ্যতা না থাকা সত্ত্বেও দলে নিচ্ছিলেন। ব্যাপারটা এ দেশের খেলার জগতের চিরপরিচিত ঘটনাগুলোর একটা হয়েই থেকে যেত, যদি না টিম ম্যানেজার নবনীত মিশ্র ওয়াসিমের বিরুদ্ধে সাম্প্রদায়িকতার অভিযোগ আনতেন।

ওয়াসিমের পদত্যাগের পর এক হিন্দি কাগজের কাছে তাঁর নামে বিষোদগার করতে গিয়ে নবনীত বলেন হেড কোচ নাকি দল নির্বাচন করছিলেন ধর্মের ভিত্তিতে। অর্থাৎ মুসলমান হলে দলে সুযোগ পাওয়ার ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছিল। আরো গুরুতর অভিযোগ, টিম হাডলে (পরস্পরের কাঁধে হাত রেখে গোল হয়ে দাঁড়িয়ে আলোচনা করার সেই যে প্রথা জন রাইট আর সৌরভ গাঙ্গুলি ২০০৩ বিশ্বকাপে ভারতীয় ক্রিকেটে চালু করেছিলেন) “রামভক্ত হনুমান কি জয়” বলতে বারণ করেছিলেন। শুধু কি তাই? বায়ো বাবল ভেঙে এক মৌলবীকে নিয়ে এসেছিলেন সাজঘরে। শিশুর আত্মার উপর এমন নরকের দুঃস্বপ্ন চাপিয়ে দেওয়ার পরে কি আর…?

আর কী? ওয়াসিমের প্রত্যুত্তর এই প্রশ্নটাই। বলেছেন তিনি যদি সত্যিই সাম্প্রদায়িক হয়ে থাকেন, তাহলে আগেই তাড়িয়ে দেওয়া হয়নি কেন? উপরন্তু বলেছেন সাম্প্রদায়িক হলে তিনি হিন্দু জয় বিস্তাকে অধিনায়ক করতে চাইতেন না। কর্তারাই বরং তাঁর কথা না মেনে ইসলাম ধর্মাবলম্বী ইকবাল আবদুল্লাকে অধিনায়ক করেন। ওয়াসিম উল্লেখ করেছেন কোন কোন মুসলমান ক্রিকেটারকে তিনি ভাল খেলতে না পারার কারণে প্রথম একাদশ থেকে বাদ দিয়েছেন। এ-ও বলেছেন যে দলের কাউকে হনুমানের বা রামের জয়ধ্বনি দিতে তিনি শোনেননি। বরং শিখদের প্রিয় একটি জয়ধ্বনি দেওয়া হচ্ছিল। তিনি তার বদলে “গো উত্তরাখণ্ড” বা “লেট’স ডু ইট উত্তরাখণ্ড” কিংবা “কাম অন উত্তরাখণ্ড” বলতে পরামর্শ দেন। কারণ দলটা কোন সম্প্রদায়ের হয়ে খেলছে না, খেলছে রাজ্যের হয়ে। সাম্প্রদায়িক মানসিকতার লোক হলে তো দলকে দিয়ে “আল্লা হো আকবর” বলাতেন। মৌলবীকেও তিনি সাজঘরে আনেননি, এনেছিলেন ইকবাল — ওয়াসিমের বক্তব্য এই।

ওয়াসিমের প্রশ্নগুলোর উত্তর দিয়ে এখনো সিএইউ কর্তারা তাঁকে মিথ্যাবাদী প্রমাণ করে উঠতে পারেননি। ইতিমধ্যে ইকবাল বলেছেন তিনিই মৌলবীকে জুম্মার নমাজের জন্য নিয়ে এসেছিলেন বটে, তবে ওয়াসিমের কাছ থেকে অনুমতি পাননি। তিনি বরং টিম ম্যানেজারকে জিজ্ঞেস করতে বলেছিলেন। হেড কোচের বিরুদ্ধে সাম্প্রদায়িকতার অভিযোগ আনা নবনীত স্বয়ং মৌলবী সাহেবকে নিয়ে আসার অনুমতি দেন। বারণ করলে তাঁকে আনা হত না। সত্যি কথা বলতে, ইকবালের ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্টে মৌলবী সাহেবের সাথে ক্রিকেটারদের যে ছবি রয়েছে তার ত্রিসীমানায় ওয়াসিম নেই। এই প্রবন্ধ লেখার সময় পরিস্থিতি এই, যে সিএইউ সচিব মহিম বর্মা (ওয়াসিম পদত্যাগপত্রে মূলত এই ভদ্রলোকের বিরুদ্ধেই হস্তক্ষেপের অভিযোগ এনেছেন) প্রেস বিজ্ঞপ্তি দিয়ে জানিয়েছেন বায়ো বাবল লঙ্ঘন করা সম্বন্ধে ম্যানেজারের থেকে ব্যাখ্যা চাওয়া হয়েছে। সেই বিজ্ঞপ্তিতে ওয়াসিমের কিন্তু নামগন্ধ নেই।

এতখানি এসে নিশ্চয়ই ভাবছেন, এর মধ্যে মুনাওয়ার ফারুকির কথা উঠছে কেন? উঠছে এই জন্য যে শেষ বিচারে মুনাওয়ারের দোষ যা, ওয়াসিমের দোষও তাই। মুসলমান পরিচিতি। ওয়াসিম তবু ভাগ্যবান। স্রেফ বদনামের ভাগী হতে হয়েছে, দক্ষিণপন্থী প্রোপাগান্ডা ওয়েবসাইট তার চরিত্রানুসারে ঘটনা আর রটনার তফাত না করে ট্রোলবাহিনীকে লেলিয়ে দিয়েছে। মুনাওয়ারের মত নির্দিষ্ট অভিযোগ না থাকা সত্ত্বেও মাস খানেক হাজতবাস তো করতে হয়নি।

যদি মনে হয় তুলনাটা অহেতুক, তাহলে লক্ষ করুন ক্রিকেট প্রশাসকদের বিরুদ্ধে ওয়াসিমের পদত্যাগপত্রে লেখা অভিযোগগুলো নস্যাৎ করতে কী কী বলা হয়েছে। বলা যেতেই পারত ওয়াসিম অযোগ্য, ওঁর কোচিং-এ দল কিছুই জেতেনি, তাই উনি কর্তাদের ঘাড়ে দোষ চাপিয়ে পালিয়ে গেছেন। অথবা বলা যেতে পারত খেলোয়াড়রা ওয়াসিমকে পছন্দ করছিল না, তাই উনি পালিয়ে বাঁচলেন। কোচের চলে যাওয়ার সন্তোষজনক ব্যাখ্যা দিতে এইসব কথাই ভারতের বিভিন্ন খেলার কর্মকর্তারা চিরকাল বলে থাকেন। মোহনবাগান, ইস্টবেঙ্গলের সমর্থকদের তো এসব শুনে শুনে কান পচে গেছে। উত্তরাখণ্ডের কর্তারা তেমন বললেন না কিন্তু। বললেন এমন কিছু কথা, যা একমাত্র মুসলমানদের সম্বন্ধে বললেই মানুষকে ক্ষেপিয়ে তোলা যায় এবং সব প্রশ্ন ভুলিয়ে দেওয়া যায়। ভেবে দেখুন, যদি উত্তরাখণ্ডের হেড কোচের নাম ওয়াসিম জাফর না হয়ে অসীম জৈন হত, তার সম্বন্ধে যদি বলা হত, “বেছে বেছে হিন্দু ক্রিকেটারদের খেলায়”, “টিম হাডলে আল্লা হো আকবর বলতে বারণ করেছিল”, “বায়ো বাবল লঙ্ঘন করে সাজঘরে স্থানীয় মন্দিরের পুরোহিতকে ডেকে এনে প্রার্থনা করেছে” — তাহলে সবাই বলতেন না, ঠিকই করেছে? যারা “হিন্দু খতরে মে হ্যায়” বলে, শুধু তারা নয়, বাকিরাও কি মনে করতেন না বিনা দোষে লোকটার পিছনে লাগা হচ্ছে?

সদ্য সমাপ্ত অস্ট্রেলিয়া সফরেই কয়েকজন ভারতীয় ক্রিকেটার বায়ো বাবল ভেঙে রেস্তোরাঁয় খেতে গিয়ে এক ভক্তের ক্যামেরাবন্দী হয়েছিলেন এবং, ভক্তটির বয়ান অনুযায়ী, তাঁকে আলিঙ্গন করেছিলেন। সেকথা প্রকাশ্যে আসার পর এ দেশের আপামর ক্রিকেটপ্রেমী এবং ক্রিকেট সাংবাদিক ভক্তটিকেই আক্রমণ করেন। ক্রিকেটাররা নাকি অবোধ শিশু। উপরন্তু তাঁরা বৃষ্টি এসে যাওয়ায় নিরুপায় হয়ে রেস্তোরাঁয় ঢুকেছিলেন। ক্রিকেট বোর্ডও ক্রিকেটারদেরই পাশে দাঁড়ায়। বলে বাবলটি তো তেমনি আছে, কমেনি এক রত্তি। আজ হঠাৎ মৌলবী সাজঘরে আসায় সকলের খেয়াল হয়েছে সবার উপরে বাবল সত্য, তাহার উপরে নাই।

ঘটনাটায় ওয়াসিমের যোগ তো এখন অব্দি প্রমাণিতই নয়। তাঁর অন্য কথাগুলো ভেবে দেখুন। ক্রিকেটজীবনের শেষ দিক থেকে তিনি লম্বা দাড়ি রাখেন বলে তাঁকে দেখে আপনার আসাদুদ্দিন ওয়েসির কথা মনে পড়তেই পারে, পাকিস্তানি বলতেও ইচ্ছা করতে পারে, কিন্তু তিনি টিম হাডলে যে যুক্তিতে শিখ ধর্মের জয়ধ্বনিরও বিরোধিতা করেছেন, সেটাই প্রকৃত ধর্মনিরপেক্ষতা নয় কি? খেলছি উত্তরাখণ্ডের হয়ে, তাই উত্তরাখণ্ডের নামে ধ্বনি দাও, কোন ধর্মের নামে দিও না। এর চেয়ে যুক্তিযুক্ত পরামর্শ কিছু আছে? ভারত কি পাকিস্তানের মত এক ধর্মের দেশ যে এখানে কোন একটা ধর্মের জয়ধ্বনিকে দলের জয়ধ্বনি করে দেওয়া হবে, আর অন্য ধর্মের খেলোয়াড়দেরও তা মেনে চলতে হবে? উঠতে বসতে ইসলামের একেশ্বরবাদকে বলব গোঁড়ামি আর হিন্দুদের বহুত্ববাদকে বলব উদারতা, তারপর সামাজিক জীবনে নিজের ঈশ্বরকেই চাপিয়ে দেব?

সত্যি কথাটা সহজ করেই বলা যাক। এ দেশে এই মুহূর্তে একজন মুসলমানের মুসলমান হওয়াই সবচেয়ে বড় সমস্যা। তিনি মুনাওয়ারের মত দাড়ি গোঁফ কামানো হালফ্যাশানের তরুণ হলেও সমস্যা, ওয়াসিমের মত লম্বা দাড়ি রাখা, ইকবালের মত মৌলবী ডেকে জুম্মার নামাজ পড়া মুসলমান হলেও সমস্যা। একজন লোক হাসিয়ে আয় করছে, যেভাবে হাসাচ্ছে তা আমার পছন্দ নয়। আমি না শুনলেই পারি। কিন্তু তাতে আমি থামব কেন? মুসলমান পরিচিতিটাকে হাতিয়ার করি। তাহলেই তার মুখ বন্ধ করে দেওয়া যাবে। উপরি জেলের ঘানিও টানানো যাবে। একজন দেশের হয়ে দিব্যি ক্রিকেট খেলেছে, প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে সকলের চেয়ে বেশি রান করেছে, এখন কোচিং করাচ্ছে, আবার আমার দোষও ধরছে। সেটা আমার পছন্দ নয়। কী করা যায়? খুব সোজা। মুসলমান পরিচিতিটাকে হাতিয়ার করি। তাহলেই তার মুখ বন্ধ করে দেওয়া যাবে।

এই দেশ কোনদিনই নিখুঁত ছিল না, স্বাধীন হওয়ার সময় থেকেই সহস্র স্ববিরোধিতা। সংবিধান সব নাগরিককে সমান চোখে দেখেছে, অথচ সমাজ সকলকে সমান মনে করে না। এই বৈপরীত্য সম্পর্কে স্বয়ং ভীমরাও আম্বেদকর সচেতন ছিলেন। সংবিধান সভার শেষ বক্তৃতায় তিনি সেকথা উল্লেখও করেছেন। এই বৈপরীত্য দূর করার দায়িত্ব যাঁদের হাতে ন্যস্ত ছিল, তাঁরা দায়িত্ব পালন করেননি। ফলে ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রের থানায় কালীপুজো হয়েছে, আমরা শিখেছি এটা সাম্প্রদায়িক নয়, কারণ অন্য ধর্মের লোকেরা তো আপত্তি করেনি। স্কুলে সরস্বতীপুজো হয়েছে, আমরা জেনেছি এটাও সাম্প্রদায়িকতা নয়। কই অন্য ধর্মের ছাত্রছাত্রী বা তাদের বাবা-মায়েরা তো আপত্তি করেনি? ময়দানে ফুটবল মরসুম শুরু হয়েছে বারপুজো দিয়ে, আমরা সাম্প্রদায়িকতা দেখিনি। আই পি এল ফ্র্যাঞ্চাইজ ক্রমাগত হারের দোষ কাটাতে স্টেডিয়ামে পুজো করেছে, তাতেও কেউ সাম্প্রদায়িকতা দেখেনি। ২০১৫-১৬ মরসুমে দিল্লীর রঞ্জি দলকে দিয়ে প্রতিদিন খেলার আগে সূর্য নমস্কার করাতেন কোচ বিজয় দাহিয়া আর অধিনায়ক গৌতম গম্ভীর। যুক্তি ছিল “A team that prays together stays together.” । তখনো কারোর মনে হয়নি ব্যাপারটা সাম্প্রদায়িক।

আসলে বরাবর আমাদের ধর্মনিরপেক্ষতার সংজ্ঞা এবং মানদণ্ড ঠিক করেছে সংখ্যাগুরু। আজ অবস্থার এমন অবনতি হয়েছে যে দেশের যে জায়গাটায় ধর্ম বা জাতপাতের পরিচিতি কোন ইস্যু ছিল না বলে আমরা জানতাম, সেই খেলার মাঠেও তফাত করা শুরু হয়েছে।

যদি কেবল কর্মকর্তারাই এমনটা করতেন, তাহলে তবু কথা ছিল। কারণ ভারতের খেলাধুলো চালান আসলে রাজনীতির ব্যাপারীরা। আর এই মুহূর্তে যাদের পাল্লা ভারী, তাদের তো মানুষে মানুষে ভেদ করাটাই রাজনীতি। আমরা অন্তত এই ভেবে সান্ত্বনা পেতাম যে আমাদের খেলোয়াড়রা এভাবে ভাবেন না। তাঁদের কাছে সহখেলোয়াড়ের একটাই পরিচয় — খেলোয়াড়। কিন্তু এখন আর তেমনটা ভাবা যাচ্ছে না। এই লেখা শেষ করা পর্যন্ত অনিল কুম্বলে ছাড়া এ দেশের প্রবাদপ্রতিম ক্রিকেটারদের একজনও ওয়াসিমের পক্ষ নিয়ে একটি শব্দও খরচ করেননি। প্রাক্তনদের মধ্যে দোদ্দা গণেশ, অমল মজুমদার, ইরফান পাঠান আর বর্তমান ক্রিকেটারদের মধ্যে মনোজ তিওয়ারির মত দু একজন ছাড়া সবাই চুপ। ইকবাল আবদুল্লা, বা ওয়াসিমের বিদর্ভের হয়ে খেলার সময়কার টিমমেট ফয়েজ ফজলের সহমর্মিতায় কী-ই বা এসে যায়? ওয়াসিমের দীর্ঘ কেরিয়ারের টিমমেটদের অধিকাংশের নীরবতা দেখিয়ে দিচ্ছে, তাঁদের কাছে ওঁর শেষ পরিচয় একজন ভিন্নধর্মী মানুষের।

মনে রাখা দরকার, ওয়াসিম জাফর যে সে ক্রিকেটার নন। বেশিরভাগ ম্যাচ খেলেছেন ভারতীয় ক্রিকেটের কুলীন দল মুম্বাইয়ের হয়ে। শুধু যে প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে তাঁর তর্কাতীত সাফল্য তা নয়, ভারতের হয়ে ৩১টা টেস্ট ম্যাচে প্রায় ৩৫ গড়ে হাজার দুয়েক রান করেছেন। মাত্র চারজন ভারতীয় ওপেনার ওয়েস্ট ইন্ডিজের মাটিতে দ্বিশতরান করতে পেরেছেন। ওয়াসিম তাঁদের একজন। অন্যরা সুনীল গাভস্কর, দিলীপ সরদেশাই আর নভজ্যোৎ সিং সিধু। এ হেন ক্রিকেটারকে তাঁর ধর্মীয় পরিচয়ের জন্য কোণঠাসা করা হচ্ছে, আর চুপ করে আছেন মুম্বাইয়ের সব মহীরুহ। তাঁদের একজন, অজিঙ্ক রাহানে, এখন ভারতীয় টেস্ট দলের সহ-অধিনায়ক। চেন্নাইতে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে টেস্ট শুরুর আগের দিন সাংবাদিক সম্মেলনে তাঁকে প্রশ্ন করা হয়েছিল এই নিয়ে। রাহানে বলেছেন তিনি ব্যাপারটা ঠিক জানেন না। এই রাহানেই সপ্তাহখানেক আগে কৃষক আন্দোলন সম্বন্ধে যথেষ্ট জানতেন। দেশকে এক থাকার বার্তা দিয়েছিলেন আরো অনেক ক্রিকেটারের সঙ্গে মিলে। এঁরা সবাই এখন স্পিকটি নট। রোহিত শর্মা চুপ, গাভস্করেরও সাড়াশব্দ নেই।

এবং শচীন তেন্ডুলকর। আজও ইউটিউবে দেখা যায় নব্বইয়ের দশকে তৈরি একটা ভিডিও ক্যাম্পেন। সারা দেশে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ফিরিয়ে আনার আবেদন করতে গিয়ে শচীন সেখানে বলছেন “When we play for India, we’re a team. It doesn’t matter if you’re a Hindu or a Muslim on the field. Don’t let it matter off the field.” সেই ভিডিওতে অমিতাভ ও অভিষেক বচ্চন, অপর্ণা সেন, অনুপম খের, শাবানা আজমির মত অভিনেতা-অভিনেত্রীদের সাথে শচীনও যে অভিনয়ই করছিলেন তা কে জানত?

নগর পুড়লে দেবালয় এড়ায় না। সুতরাং ধর্মীয় বিভাজন মাঠে নেমে পড়ায় অবাক হওয়ার কিছু নেই। তবে কষ্ট হয় মহম্মদ সিরাজের মত যাঁরা একসাথে পিতা আর পিতৃভূমির জন্য কাঁদেন, তাঁদের জন্য। ভারতীয় ক্রিকেট ঐ অশ্রুর যোগ্য থাকবে তো?

নাগরিক ডট নেট ওয়েবসাইটে প্রকাশিত