যোগাযোগ

ফিরে আসে বৃষ্টির পাখিরা — যে সাহিত্য পাঠককে পড়িয়ে নেয়

কিন্তু শুধু কি একটা রেলনগরীর রোম্যান্টিক ছবি সাজানো এই উপন্যাসে ? আদৌ তা নয় । আছে লোহার ছাঁটের চোরা কারবার, মাফিয়া, তোলাবাজ । ইন্দার বাসস্টপের সন্ধ্যা, যেখানে “রোজ নতুন নতুন দেরি করে ফেলা যাত্রী” দেখা যায়, মেসবাড়ির জানলা দিয়ে দেখতে পাওয়া পরমাসুন্দরী বউটির কথার পর যখন এসব প্রসঙ্গ এসে পড়ে তখন মনে পড়ে টি এস এলিয়টকে, যেখানে অ্যালফ্রেড জে প্রুফ্রক প্রেয়সীকে বলছেন চলো, তোমাতে আমাতে সেইখানে যাই যেখানে সন্ধ্যেটা আকাশে ছড়িয়ে আছে । কার মত ? অপারেশন টেবিলে শোয়ানো অজ্ঞান রুগীটার মত

ছোটবেলায় ‘শুকতারা’, ‘কিশোর ভারতী’ দিয়ে শুরু করে কৈশোরে ‘আনন্দমেলা’ হয়ে শারদ সাহিত্য পড়ার অভ্যেসটা যৌবনে ‘দেশ’, ‘আজকাল’, ‘নন্দন’ পর্যন্ত দিব্যি চলে এসেছিল । কিন্তু পরপর কয়েকবছর থোড় বড়ি খাড়া আর খাড়া বড়ি থোড়ের স্বাদ নিতে হওয়ায় এবং কিছুটা জীবনের চাবুক খেয়ে ওসব পড়ার অভ্যাস ত্যাগ করেছিলাম । গতবছর এক বন্ধুর কথায় জয় গোস্বামী আর শঙ্খ ঘোষের কবিতাদুটো পড়ব বলে শারদীয় দেশ কিনেছিলাম । কিনে দেখলাম ঐ দুজন বাদেও কবিতা বিভাগটা তবু পড়া যায়, গল্প উপন্যাসে পাতা পাঁচেকের বেশি এগোতেই পারছি না । তাই এবছরে আবার বিখ্যাত শারদসংখ্যাগুলোকে ত্যাগ করেছি । তারপর, সাহিত্যিক বন্ধু থাকলে যা হয়, মেদিনীপুর জেলার ‘আমার কাগজ’ পত্রিকায় বেরোনো একটি উপন্যাস পড়ার বড্ড ইচ্ছা হল । পত্রিকাটা না হলেও উপন্যাসটা লেখকের ভালবাসায় আমার ইনবক্সে চলে এল আব্দার করামাত্রই ।
আমরা গত কয়েক দশক ধরে যেসব বাংলা গল্প উপন্যাস জনপ্রিয় পত্রপত্রিকায় পড়তে অভ্যস্ত, যেসব বাংলা ছবি মাল্টিপ্লেক্সে দেখতে অভ্যস্ত তা ভীষণভাবেই নাগরিক । স্থান, কাল, পাত্র, বিষয়, সম্পর্কের টানাপোড়েন — কোনটাই আমার মত মফঃস্বলের গেঁয়ো ভূতকে টানে না । অফিসের সময়টুকু বাদ দিলে আমার যে জীবন, আমার পরিপার্শ্ব, সেসবের গন্ধ কোথাও পাই না ।
কিন্তু ‘ফিরে আসে বৃষ্টির পাখিরা’ নামে এই যে উপন্যাস তার পটভূমি কলকাতা থেকে বেশ দূরে — খড়গপুর, যেখানে আপনি দ্রুতগামী শতাব্দী এক্সপ্রেসে উঠলেও ঘন্টা দেড়েকের আগে পৌঁছবেন না । কেন্দ্রীয় চরিত্র শুভ্র গ্রাম থেকে খড়গপুরে পড়তে আসা নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারের ছেলে । আমার বড় চেনা । এমন কতজনের সঙ্গেই না হোস্টেলজীবন কাটিয়েছি যাদের কাছে কলকাতা তো বটেই, বেলুড়ও শহর ।
কিন্তু সত্যি বলতে কলকাতা বা তার আশেপাশের মফঃস্বলে যারা বেড়ে উঠেছে আমার মত, তারা মফঃস্বল আর তার কাছেদূরের গ্রামকে জানতেই পারে না কখনো । পৃথিবীর সব রং কলকাতায় — এমন একটা বিশ্বাস চেতনে বা অবচেতনে গড়ে ওঠে । এই উপন্যাসে লেখক যখন খড়গপুরের অলিগলি চেনাচ্ছিলেন, গিরি ময়দান স্টেশনের গুলমোহর গাছটার কথা বলছিলেন তখন আমার নবগ্রামের এমন সব পথ আর পুকুরঘাটকে ভালবাসতে ইচ্ছা করছিল যাদের ধারকাছ দিয়ে বহুকাল যাওয়া হয় না ।
কিন্তু শুধু কি একটা রেলনগরীর রোম্যান্টিক ছবি সাজানো এই উপন্যাসে ? আদৌ তা নয় । আছে লোহার ছাঁটের চোরা কারবার, মাফিয়া, তোলাবাজ । ইন্দার বাসস্টপের সন্ধ্যা, যেখানে “রোজ নতুন নতুন দেরি করে ফেলা যাত্রী” দেখা যায়, মেসবাড়ির জানলা দিয়ে দেখতে পাওয়া পরমাসুন্দরী বউটির কথার পর যখন এসব প্রসঙ্গ এসে পড়ে তখন মনে পড়ে টি এস এলিয়টকে, যেখানে অ্যালফ্রেড জে প্রুফ্রক প্রেয়সীকে বলছেন চলো, তোমাতে আমাতে সেইখানে যাই যেখানে সন্ধ্যেটা আকাশে ছড়িয়ে আছে । কার মত ? অপারেশন টেবিলে শোয়ানো অজ্ঞান রুগীটার মত ।
আধুনিক হওয়ার সাথে কলকাতালগ্ন হওয়ার যে কোন সম্পর্ক নেই সে কথা তো ভুলতেই বসেছিলাম ।
উপন্যাসটা আমার আরো আপন হয়ে ওঠে যখন এমন একজনের প্রসঙ্গ আসে যাকে দেখতে “অনেকটা আত্মগোপন করে থাকা নকশাল” এর মত । লোকটা আসলে সম্পাদক । এমন একজন সম্পাদক যে বড় শহরের বড় কাগজের চাকরি ছেড়ে এসেছে ছোট শহরে তৃণমূল স্তরের সাংবাদিকতা করবে বলে, যে বাতিলযোগ্য লুনা মোপেডে চড়ে খড়গপুর চষে বেড়ায় খবর আর সম্ভাবনাময় সাংবাদিকের খোঁজে । প্রেমের গল্প বলতে বলতে ঔপন্যাসিক আমায় শুনিয়ে দিলেন সেই গল্প — বড় শহরের মত ছোট শহরেও কিভাবে সাংবাদিকতা বদলে গেল খবরের ব্যবসায়, কিভাবে দুর্নীতিই হয়ে উঠল নিয়ম আর সৎ সাংবাদিকতা হয়ে দাঁড়াল বোকামি, কিভাবে বড় কাগজের জেলার পাতা সাড়ে সর্বনাশ করল জেলার সাংবাদিকতার । দেশজুড়ে এই ইতিহাস যে কত কাগজের !
কাদের নিয়ে ‘খবর খড়গপুর’ চালাতেন এই সম্পাদক —- শুভ্রর রণজয়দা ? আশ্চর্য কিছু চরিত্র । একজন আপাদমস্তক কবি, যে শ্মশান থেকে আহরণ করে তার বেশিরভাগ কবিতার লাইন । কেমন সে লাইনগুলো ? “তুমি সড়ক রমণীর আগুনতলে আশ্চর্য, দুর্বল / তুমি হাওয়ার গল্প, জুনের দিকে তীব্র যাওয়া… / তুমি পঠিত হচ্ছ বায়ুহারাদের দেশে, মুখে / হারিয়ে যাচ্ছ নিঃশব্দে ভ্রমিত কোন প্রেমে…”। বাসুদা, এই কবি, শ্মশানে মড়া পোড়াতে আসা একজনেরই প্রেমে পড়ে আর শ্মশানের মাটিতে শুয়েই বলে “জীবন, জীবনই শেষ কথা ।”
আরো ছিল রঘুদা — আশাহত কমিউনিস্ট বাবার আশাবাদী কমিউনিস্ট ছেলে । শহরের খালি দেওয়াল খুঁজে খুঁজে স্লোগান, কবিতার লাইন আর মার্কস, লেনিনের উক্তি লিখে বেড়ায় । সেইসব উক্তি যেগুলো তার পার্টি লোককে বলা বন্ধ করে দিয়েছে । রেলবস্তিতে বসে রঘুদা অবধারিত বিপথগামিতার আগে কিছু শিশুকে আঁকতে শেখায় ।
এছাড়াও ছিল উচ্চাকাঙ্ক্ষী, নির্লজ্জ, অসাধু সৌমাল্যদা । এতই অসাধু যে মৃত বন্ধুর কবিতার খাতা চুরি করে নিজের কবিতায় জুড়ে দিতেও দ্বিধা বোধ করে না ।
ছিল সুপুরুষ, নির্ভীক সাংবাদিক, আমির খসরুভক্ত মাসুদদা, যার সঙ্গে অদ্ভুত এক সম্পর্কের বিপ্রতীপ কোণে দাঁড়াতে হয় শুভ্রকে ।
সবাইকে ছাপিয়ে ছিল কুন্তলা — খাঁচায় বন্দি এক মেয়ে যে আসলে কী চায় সম্ভবত তা-ই ভুলে গিয়েছিল, যেমনটা আমরা অনেকেই যাই । ফলে সে শুভ্রকে দিল দাগা, হয়ত নিজেকেও । কিন্তু তার আগে সে শুভ্রকে উপহার দিয়ে ফেলেছে এক অমর মুহূর্ত ।
শুভ্র। অপাপবিদ্ধ, সুলেখক, স্বপ্নালু শুভ্র । তারও অধঃপতন হয়, হলুদ সাংবাদিকতা তার মনের সমস্ত শ্যামলিমা কেটে সাফ করে দেয় অনবরত । কিন্তু শিকড়টা রয়েই যায় । একটি আত্মহত্যা কিংবা হত্যার পর গিরি ময়দান স্টেশনের বৃষ্টিতে পুনর্জীবন লাভ করে মনুষ্যত্ব । কী করে ? সেটা রহস্য হয়ে থাক ।
আরো অনেক রহস্য, অনেক একান্ত ব্যক্তিগত ভাললাগা অনেকেই খুঁজে পাবেন ‘বৃষ্টির পাখি’ তে । গল্পটা বিষাদে শেষ হয়নি, হয়েছে নতুন আশার সঞ্চারে । কিন্তু আমার মন বিষণ্ন হয়ে গেল এই ভেবে যে বাসুদার মতই খড়গপুরে বা অন্য কোন মফঃস্বল শহরে কি গ্রামে হয়ত কত কবি, কত ঔপন্যাসিক মরে যাচ্ছেন, আমরা কেউ জানতে পারছি না । “উড়ে যাচ্ছে প্রসবকাতর এক শালিখ / ঠোঁটে নিয়ে আমাদের ব্যর্থ মনস্কাম ।”
অন্তত এই উপন্যাসটা যে আমার পড়া হল সেজন্য ঔপন্যাসিক এবং আমার বন্ধু মৃণালকে ধন্যবাদ দিলেও ছোট করা হবে । অরিন্দম দাসের লেখা অমন কবিতার লাইনগুলোই বা পেতাম কোথায় এই উপন্যাসটা না পড়লে ? কবি চলে গেছেন অকালে, নিঃশব্দে । কিন্তু জীবনই যে শেষ কথা তাতে ভুল নেই । নইলে মৃত্যুর দেড় দশক পরে মৃণালের হাত ধরে তাঁর লাইনগুলো আমার কাছে পৌঁছালই বা কী করে আর এভাবে আমাকে নাড়িয়ে দিলই বা কী করে ?

বয়স হচ্ছে

ইতিমধ্যে এক মনোযোগী ছাত্রী হেঁটে যেতে যেতে হঠাৎ পা পিছলে রাস্তার হাঁটুজলে ঝপাং । হাতের খাতা “ভেসে যায় অলকানন্দা জলে”। সে প্রথমে লজ্জিত পরে হর্ষিত । তারস্বরে সঙ্গী ছেলেটাকে ডাকছে ” অ্যাই, কোথায় গেলি ? শিগগির আয় ।” ছেলে অমনি দৌড়ে এসে হাত ধরে তুলতে গেছে । কিন্তু মেয়ের চিৎকৃত নির্দেশ “আগে খাতা আগে খাতা ।” রোগা প্যাংলাটি দেখলাম কোন শালপ্রাংশু মহাভুজ বলীর চেয়ে কোন অংশে কম নয় । একহাতে পৃথুলা সঙ্গিনী আর অন্য হাতে তার হৃদি, থুড়ি খাতা, সে দিব্যি তুলে নিল

বয়সটা যে চল্লিশের দিকে এগোচ্ছে সেটা হাড়ে হাড়ে টের পেলাম গত পরশু বিকেলে । অফিস যাওয়ার পথে কলেজ স্ট্রিট গেছি গোটাদুয়েক বইয়ের খোঁজে । যেতে হবে ন্যাশনাল বুক এজেন্সিতে । আমার পরিষ্কার মনে পড়ল ওটা সূর্য সেন স্ট্রিটে । বীরবিক্রমে পুঁটিরাম পেরিয়ে হাঁটতে হাঁটতে যখন প্রায় রাস্তার শেষ মাথায় পৌঁছে গেছি তখন মনে হল এবার স্মৃতি ব্যর্থ হয়েছে এটা মেনে নেওয়া উচিৎ । নিজের স্মৃতির উপর গর্বটাকে লক্ষ্মী ছেলের মত পিঠের ব্যাগে লুকিয়ে ফেলে এক প্রবীণার কাছে পথনির্দেশ চাইলাম । তিনি জানালেন দোকানটা কফি হাউসের আশেপাশে । প্যারামাউন্টের সামনে দিয়ে যাচ্ছি, তখনও দোকানটার চেহারা কিছুতেই মনে পড়ছে না । অগত্যা একজন নবীন দোকানকর্মীর সাহায্য চাইলাম । তিনি একেবারে কোন্ বাড়িটা তা-ও বলে দিলেন ।
আমি যখন ইউনিভার্সিটি ইনস্টিটিউট হলের সামনে তখন ঝুপ করে নেমে পড়ল বৃষ্টি । ব্যাগ থেকে লটঘটে ছাতাটা বার করে খুলতে খুলতেই একটু ভিজে গেলাম ।
এন বি এ তে ঢুকতে গিয়ে দেখি তার সামনে একগাদা তরুণ তরুণী ভিড় জমিয়েছে । আমার মত তাদের অফিস যাওয়ার তাড়া নেই । তাই বৃষ্টি থেকে বাঁচবার তাগিদও তাদের যৎসামান্য । কোন একটা ছাউনির নীচে দাঁড়ানো যতটা না প্রয়োজনে তার চেয়ে বেশি ঘন হয়ে বৃষ্টি উপভোগ করতে করতে আড্ডা দেওয়ার জন্যে । ঐ ভাবনাহীন প্রাণগুলোকে এড়িয়ে ঢুকে পড়লাম দোকানে । সেখানে মার্কস, এঙ্গেলস, লেনিন, স্তালিন আগলে বসে আছেন কয়েকজন প্রায় বৃদ্ধ ভদ্রলোক যাঁদের চোখ ঢেকে ফেলেছে সিঁড়িতে দাঁড়ানো ছেলেমেয়েগুলো । বৃষ্টি দেখার আর উপায় নেই । আমার প্রবেশে ওঁরা একটু নড়েচড়ে বসেছিলেন কিন্তু আমি এমন একটা বই চেয়ে বসলাম যে হতাশ গলায় ওঁদের একজনকে বলতে হল “ও বই আর পাওয়া যায় না । অনেকদিন হল ।”
যা-ই হোক এক বন্ধুর জন্যে উপহার কেনার ছিল । সে বইটা শেলফের উপরেই রাখা ছিল । সেইটে কিনে বেরিয়ে দেখি বৃষ্টি আরো বেড়েছে, সেইসঙ্গে ছেলেমেয়েদের সংখ্যাও । ভাবছি অনুজ অনির্বাণকে কফি হাউসে আসতে বলি, বহুবার প্রতিশ্রুত আড্ডাটা মারা যাবে । তারপর ভাবলাম এত বৃষ্টিতে আসবেই বা কী করে ? ভাবতে ভাবতে কফি হাউসের দোরগোড়ায় গিয়ে দাঁড়িয়েছি । বাইরের চেহারাটা দেখেই বুঝতে পারছি ভেতরে আমাকে আরো বেমানান, এমনকি হাস্যকর, দেখাবে । তাই বাইরেই কোনমতে গুটিসুটি মেরে দাঁড়িয়ে রইলাম ।
বৃষ্টি কমার নাম নেই । রাস্তা দিয়ে বহু ছেলেমেয়ে ছাতা ছাড়াই দিব্য হেঁটে যাচ্ছে আমার কেজো জীবনকে মুখ ভেঙচিয়ে । কেউ কেউ ভিজতে ভিজতে হঠাৎ বৃষ্টি থেকে বাঁচার ভান করে ফুটপাথে এসে উঠছে । তাদের জায়গা ছাড়তে ছাড়তে আমি ক্রমশ কোণঠাসা । এমন সময়ে দেখি কফি হাউস থেকে একলাফে রাস্তায় নেমে পড়ে একটি মেয়ে তার প্রেমিকটিকে ভিজতে ডাকছে । ছোঁড়া এমন আহাম্মক (অথবা সাইনাসের রুগী) যে হাতের ছাতাখানা দেখিয়ে বলছে “তোর ছাতাটা বার কর না ।” দেখেই আমার মনে হল এ শালা শঙ্খবেলা দ্যাখেনি । শেষ অব্দি অবশ্য মেয়েটিরই জিৎ । সে বিজয়গর্বে গদগদ হয়ে প্রেমিককে বগলদাবা করে সংস্কৃত কলেজ পেরিয়ে উধাও হল ।
এইসব দেখতে দেখতে কখন এক ফুটপাথস্থ বই বিক্রেতার বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছি ! তিনি ঝাঁজিয়ে উঠলেন । আমি দেখলাম এখানে আমার না দাঁড়ানোই শ্রেয় । ময়ূরদের পাড়ায় দাঁড়কাকের দাঁড়িয়ে থাকা সত্যিই অন্যায় । অতএব ঐ বৃষ্টিতেই রাস্তায় নেমে পড়লাম ।
জায়গা খুঁজতে খুঁজতে মনে হল হিন্দু স্কুলের সামনের পাঠ্য বইয়ের দোকানগুলো, যেগুলোকে বরাবর বইপাড়ার সবচেয়ে অপ্রয়োজনীয় দোকান বলে মনে হয় আমার, সেগুলোর ছাউনিই আমার উপযুক্ত আশ্রয় । কারণ সেখানে দেখি পড়াশোনা ছাড়া কিচ্ছু জানে না এমন ছেলেমেয়ে আর তাদের বাবা-মায়েদের ভিড় । আমার মত বা আরেকটু বড় মাপের ভুঁড়ি নিয়ে অনেকেই সেখানে আছে ।
সবে ওখানে দাঁড়িয়ে ছাতাটা বন্ধ করেছি, কোথা থেকে বেগুনী আর নীল শাড়ি পরা দুটো মেয়ে একটা ছাতায় আধাআধি ভিজতে ভিজতে এসে হাজির । একজন আরেকজনকে প্রচন্ড বকছে “তোকে বললাম শাড়ির ঝামেলা করিস না । এখন কী হবে ? হাঁটাও যাচ্ছে না ঠিক করে । কী ভারী হয়েছে শাড়িটা !”
অন্য বেচারির উত্তর “আমি কী করে জানব এরকম বৃষ্টি হবে ? সকাল থেকে রোদই ছিল ।”
এদের ঝগড়া উপভোগ করতে করতেই ভাবছি এত বৃষ্টিতে জল ঠেঙিয়ে অফিস যাব কী করে । হোয়াটস্যাপ গ্রুপে সেই দুশ্চিন্তার কথা লিখেও ফেলেছি । ইতিমধ্যে এক মনোযোগী ছাত্রী হেঁটে যেতে যেতে হঠাৎ পা পিছলে রাস্তার হাঁটুজলে ঝপাং । হাতের খাতা “ভেসে যায় অলকানন্দা জলে”। সে প্রথমে লজ্জিত পরে হর্ষিত । তারস্বরে সঙ্গী ছেলেটাকে ডাকছে ” অ্যাই, কোথায় গেলি ? শিগগির আয় ।” ছেলে অমনি দৌড়ে এসে হাত ধরে তুলতে গেছে । কিন্তু মেয়ের চিৎকৃত নির্দেশ “আগে খাতা আগে খাতা ।” রোগা প্যাংলাটি দেখলাম কোন শালপ্রাংশু মহাভুজ বলীর চেয়ে কোন অংশে কম নয় । একহাতে পৃথুলা সঙ্গিনী আর অন্য হাতে তার হৃদি, থুড়ি খাতা, সে দিব্যি তুলে নিল ।
ততক্ষণে আমার নিজেকে আবার পাতিকাক মনে হচ্ছে । দুঃখে কা কা করে ডেকে উঠতে যাব, অমনি ফোনটা বেজে উঠল । সহকর্মী অর্ণবের ফোন “তুমি আমহার্স্ট স্ট্রিট ক্রসিং এ চলে আসতে পারবে ? আমি ওলাতে আছি । তোমায় তুলে নেব তাহলে ।” আমাকে তখন হেঁটে আন্দামান যেতে বললেও চলে যেতাম, আমহার্স্ট স্ট্রিট তো কোন্ ছার । Damsel না হলেও আমি তখন প্রবল distressed । সহকর্মীটি shining ওলায় আমাকে উদ্ধার করল ।

শিয়রে শমন

বিপদটা আরো বড় কেন জানেন ? সরকারপক্ষ না হয় ডেকে এনেছিল । বিরোধীরা আপত্তি করল না কেন ? কত কারণে কত ওয়াক আউট হয় আইনসভাগুলোতে । এই অনধিকার প্রবেশের প্রতিবাদে হল না কেন ? না হওয়ার মানে হচ্ছে সব দলই ধর্মের কর্তৃত্ব মেনে নিচ্ছে, হিন্দুস্তান তৈরির পথ প্রশস্ত হচ্ছে

১৫ই আগস্ট ১৯৪৭ এর পর থেকে বরাবরই ভারতে দারিদ্র্য ছিল, দুর্নীতি ছিল, অশিক্ষা ছিল, জাতের নামে বজ্জাতি ছিল, ধর্মান্ধতা এবং তজ্জনিত হিংসা ছিল । তবু যে ভারত পাকিস্তানের মত সর্বৈব ব্যর্থ এবং সন্ত্রাসবাদীচালিত রাষ্ট্রে পরিণত হয়নি তার বড় কারণ — আমরা সেনাবাহিনীকে ব্যারাকের বাইরে এবং ধর্মগুরুদের ধর্মস্থানের বাইরে আসতে দিইনি । এক কথায় আমাদের সরকার, প্রশাসন কারোর গুরুর কথায় চলেনি, কোন সেনাপ্রধানের কথাতেও চলেনি ।
কিন্তু উচ্চাকাঙ্ক্ষা যাবে কোথায় ? সেই স্বাধীন হওয়ার সময় থেকে এক শ্রেণীর ভারতীয়ের উচ্চাকাঙ্ক্ষা “ওরা পাকিস্তান বানিয়েছে, আমরা হিন্দুস্তান বানাব । উন্নত, ভাল দেশ হওয়ার দরকার নেই । পাকিস্তানের উল্টোপিঠ বানানো চাই ।” এই দাবি হতভাগা মহাত্মা গান্ধী আর তার চ্যালাচামুন্ডারা বানচাল করে দিয়েছিল । সেই রাগে ব্যাটাকে সাবড়ে দিয়েও লাভ হয়নি । গান্ধীর পয়লা নম্বর চ্যালা নেহরু আর পয়লা নম্বর বিরোধী আম্বেদকর তো বটেই এমনকি দেশের অন্য পার্টিগুলোও হিন্দুস্তানের দাবিকে পাত্তাই দেয়নি । শেষ অব্দি তাই এরা নিজেরাই একটা পার্টি বানিয়ে নেমে পড়ল । তা অনেকবছর ঘষটানোর পরে বছরদুয়েক হল বেশ হাত পা ছড়িয়ে গ্যাঁট হয়ে এরা সরকারে বসতে পেরেছে আর বসেই শুরু হয়ে গেছে হিন্দুস্তান নির্মাণ । তারই এযাবৎ সবচেয়ে বড় ব্যবস্থা হল নাগা সাধুকে বিধানসভায় বাণী দেওয়ার সুযোগ দেওয়া ।
জ্ঞানের সাগর বাবা সেখানে বলেছেন ধর্ম আর রাজনীতি হল স্বামী স্ত্রীর মত । তাই স্ত্রীকে স্বামীর কথা শুনে চলতেই হবে । নারীবাদীরা সঙ্গত কারণেই রুষ্ট ।তাঁদের আপত্তি বাবার নগ্নতা এবং যে রূপকটা ব্যবহার করেছেন সেটা নিয়ে । কিন্তু সেসবের চেয়ে ঢের বেশি বিপজ্জনক বাবা যা বলেছেন তার নিহিতার্থ । “রাজনীতিকে ধর্মের কথা শুনে চলতেই হবে ।” অর্থাৎ সংবিধান ভুলে যান । ভারতকে বিজেপি বাবার সম্পত্তি করবার দিকে এগোচ্ছে । আইনসভায় একজন ধর্মগুরুর বক্তৃতা দেওয়ার কোন অধিকারই যেখানে নেই সেখানে একজন এসে বক্তৃতা তো দিলই আবার নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের বলে দিয়ে গেল “এখন থেকে আমরা যা বলব তাই শুনে চলতে হবে ।” জল যে আমাদের গলা অব্দি উঠে এসেছে বুঝতে পারছেন কি ? এরপরে দাবিদাওয়া নিয়ে এমপি এমএলএ নয়, হরিসভায় ছুটতে হবে । গণতন্ত্রের বস্ত্রহরণ শুরু হয়েছে । বাবার নগ্নতা আসলে প্রতীকি ।
বিপদটা আরো বড় কেন জানেন ? সরকারপক্ষ না হয় ডেকে এনেছিল । বিরোধীরা আপত্তি করল না কেন ? কত কারণে কত ওয়াক আউট হয় আইনসভাগুলোতে । এই অনধিকার প্রবেশের প্রতিবাদে হল না কেন ? না হওয়ার মানে হচ্ছে সব দলই ধর্মের কর্তৃত্ব মেনে নিচ্ছে, হিন্দুস্তান তৈরির পথ প্রশস্ত হচ্ছে ।
আপনি নির্ঘাৎ বলবেন “জৈনরা একটি সংখ্যালঘু সম্প্রদায় । তাদের গুরুকে ডেকে আনা একটি ধর্মনিরপেক্ষ পদক্ষেপ । এতে হিন্দুত্ববাদীদের চক্রান্ত দেখা অন্যায় এবং হাস্যকর ।” যদি বলেন তাহলে আপনি হয় গোবেচারা নয় হাড়েবজ্জাত কারণ জৈনরা সংখ্যায় কম হলেও প্রচন্ড প্রভাবশালী । আপনি চোখ বুজে এক মিনিটে ভারতের যে কজন ধনী লোকের নাম মনে করতে পারবেন তাদের অধিকাংশ জৈন । আর জৈন সম্প্রদায়ের গুজরাতি, মারোয়াড়ি ব্যবসায়ীরা ঐতিহাসিকভাবে বিজেপির সবচেয়ে বড় ভরসাস্থল । মমতা হাওয়ার মধ্যেও বড়বাজারে বিজেপি কত ভোট পেয়েছিল খোঁজ নিয়ে দেখুন না । জৈন বলতেই যদি আপনি মহাবীর প্রতিষ্ঠিত সেই ব্রাক্ষ্মণ্যবাদবিরোধী ধর্মের কথা এখনো ভাবেন তাহলে আপনি ঘুমোচ্ছেন । শিগগির জাগুন ।
এত কথার পরে বলবেন না “ভারত হিন্দুস্তান হয়ে গেলে ক্ষতি কী ?” উত্তরে ধর্মনিরপেক্ষতা কেন প্রয়োজন তা নিয়ে অনেক কথা বলা যায় । আমি সেসব বলব না । শুধু অনুরোধ করব একবার গুগল করে ১৯৭০-৮০র ইরান, লেবানন, আফগানিস্তান এইসব দেশের ছবি (আলোকচিত্র) দেখুন । তারপর এখনকার ছবিগুলো দেখুন ।

নিভৃতে যতনে

ধরা পড়ে গিয়ে প্রচন্ড ঘাবড়ে গেছি তখন । ভাবছি বাবা কি জানতে পেরে গেছে এক সহপাঠিনীর সম্পর্কে আমার দুর্বলতা ? আমি তো আমার দুই ঘনিষ্ঠতম বন্ধু ছাড়া কাউকে বলিনি ! এমনকি মেয়েটাকেও কিছু বলিনি । বলার সাহসই নেই । সে আমার চেয়ে লেখাপড়ায় অনেক ভাল, কি সুন্দরী কি সুন্দরী !

তখন সবে খিস্তি শিখছি । রোজ বিকেলে আর কেউ না থাকলেও আমরা দুজন মিলেই ক্রিকেট খেলতাম । একদিন শুনি বন্ধুটি উইকেট পুঁততে পুঁততে গুনগুন করে গাইছে “হাসপাতালের বেডে টি বি রোগীর সাথে খেলা করে শুয়োরের বাচ্চা । তবু রেডিওটা টিভিটার সাথে সুর ধরে সারে জাঁহা সে আচ্ছা” । আমি এরকম আজব গান জম্মে শুনিনি । গানে খিস্তি ! ভাল লাগল বললে ভুল হবে তবে নতুন লাগল নিঃসন্দেহে । রাতে খেতে বসে বললাম “জানো এরকম নাকি একটা গান বেরিয়েছে ।” মা শুনেই ছ্যা ছ্যা করে উঠল । বাবা বলল “আমিও কোথায় একটা শুনলাম ! মাইকে বাজছিল । এসব হুজুগের গান । দুদিন খুব চলবে । তারপর আর খুঁজে পাওয়া যাবে না ।” আমার কৌতূহল কমল না ।
স্কুলে অনেক সহপাঠী দেখলাম গায়কের খুব ভক্ত । একজন আমাকে ক্যাসেটের নাম (অ্যালবাম বলতে তখন শুধু ছবি সাঁটার বই-ই জানতাম), অন্যান্য গানগুলো সম্পর্কে তো বললই, নচিকেতার অতীত বর্তমান সম্বন্ধেও বেশ কিছু জ্ঞান দিয়ে দিল । আমার ভীষণ ইচ্ছে করছে গানগুলো শুনতে । কী করে যে শুনি ! তার কিছুদিন আগেই কয়েকটা গানহীন বছর কাটানোর পর বাবার বকেয়া মহার্ঘ ভাতার কিছুটা দিয়ে ফিলিপসের টু ইন ওয়ান কেনা হয়েছে । বাড়িতে নিয়ে এসে চালানো উচিৎ হবে না বুঝতে পারছি । ভাবছি বন্ধুটার বাড়ি একদিন যাওয়া যায় কিনা ।
হঠাৎ একদিন বাবা বলল “দ্যাখ তো বড়দার কাছে নচিকেতার ক্যাসেট আছে কিনা ?”
আমার অবসরপ্রাপ্ত বড়দাজেঠু গান আর বইয়ের পোকা । বোধহয় সেইজন্যেই মনটা আশ্চর্যরকমের জোয়ান । জগন্ময় মিত্রও শোনে আবার সুমন, নচিকেতাও শোনে । দৌড়ে নিয়ে এলাম । বাবার ভাবান্তরের কারণ জানার চেয়ে গানগুলো শোনার আগ্রহ ছিল অনেক বেশি । তারপর একঘন্টা ধরে দু পিঠের গানগুলো বাপ ছেলে মিলে শুনলাম । মা তিতিবিরক্ত । বাবাকে বলল “তুমিও বসে বসে এইসব গান শুনছ ?”
বাবা বলল “শুনতেই হবে । সময়ের ধ্বনি । কান না পাতলে যে সময়টাকে চেনা যাবে না । আমাদের যুব ফেডারেশনের শঙ্কর খুব জোর দিয়ে আজকে বলল ‘আপনি শুনে দেখুন, হাবুলদা । আপনার যদি খারাপ লাগে আমি নিজে শোনা ছেড়ে দেব ।’ তাই ভাবলাম শুনে দেখি । ভাল গান । হতাশায় ভরপুর । এত হতাশ যে খিস্তি দিচ্ছে । বেশ করছে । খিস্তি দেওয়ার মত হলে দেবে না ? ছেলেপুলেদের চাকরি নেই বাকরি নেই । খিস্তি দেবে না তো কি ? কিন্তু গলায় সুর আছে, গানে প্রাণ আছে ।”
“সে তো সুমনের গানও সময়ের গান । ওর তো খিস্তি দিতে লাগে না ?” মা বলল ।
“ওর গান সুন্দর করে সত্যি কথা বলে তাই ভাল । এর গান কর্কশ করে সত্যি কথা বলে তাই ভাল । দুটোই ভাল ।”
মা নাক সিঁটকে বলল “কিন্তু এ গান বেশিদিনের নয় । সুমনের গান থাকবে ।”
“হতে পারে । কিন্তু সে বিচার ইতিহাস করবে । আমি কে ?”
তারপরেই বাবা আমায় জিজ্ঞেস করল কোন্ গানটা সবচেয়ে ভাল লাগল । সত্যি কথাটা লজ্জায় বলতে পারলাম না । বললাম “শুধু বিষ শুধু বিষ দাও ।” বাবা বলল “বাজে কথা বলিস না । তোর সবচেয়ে ভাল লেগেছে “লাল ফিতে সাদা মোজা । আমি তোর বাপ রে ।”
ধরা পড়ে গিয়ে প্রচন্ড ঘাবড়ে গেছি তখন । ভাবছি বাবা কি জানতে পেরে গেছে এক সহপাঠিনীর সম্পর্কে আমার দুর্বলতা ? আমি তো আমার দুই ঘনিষ্ঠতম বন্ধু ছাড়া কাউকে বলিনি ! এমনকি মেয়েটাকেও কিছু বলিনি । বলার সাহসই নেই । সে আমার চেয়ে লেখাপড়ায় অনেক ভাল, কি সুন্দরী কি সুন্দরী ! ওরকম একটা মেয়ের যে আমাকে পছন্দ হতেই পারে না তা নিয়ে আমার কোন সন্দেহ নেই । তাছাড়া ও কাউকে বলে দিলে আমার বাবার মানসম্মান থাকবে না । বাবা আমায় বকবে কি মারবে সে তো পরের কথা । ফলে কায়দা করে তার নাম না লিখে কিছু বোগাস কবিতা লেখা ছাড়া আর কিছুই তো আমি করিনি ! তাও বাবা বুঝে গেল !
এইসব সাত-পাঁচ ভাবছি, তখনই বাবা বলল “এই বয়সে সব কথা বাড়ি এসে আমাদের বলবি । বন্ধুর মত । মাকে হোক বা আমাকে হোক । তাহলে আমরা তোকে অনেক বিপদ থেকে বাঁচাতে পারব । তবে একটা কথা আমাদেরও বলবি না । নীলাঞ্জনার কথা । তাকেও বলবি না । শুধু নিজের মনে তার সাথে কথা বলবি । এই বয়সে প্রেমে পড়লে স্বভাব ভাল থাকে যদি প্রেম ‘করা’ ব্যাপারটা মাথায় না ঢোকে । ভালবাসার চেয়ে ভাল জিনিস তো নেই । প্রথমবার এটা হলে নিজের মধ্যে প্রাণভরে অনুভব করতে হয় । বিশেষ করে প্রথম প্রেমের অনুভূতি আর ফেরত পাওয়া যায় না । এটা বলাবলি করতে গিয়ে নষ্ট করে ফেলিস না । ভালবাসাটা তোর । সে ভালবাসে কি না বাসে তাতে কী এসে গেল ?”
আজকে মনে হচ্ছে বাবা হওয়ার একটা বড় শিক্ষা আমার বাবা আমাকে সেদিনই দিয়েছে।

রজত জয়ন্তী — গাঁটে গাঁটে

বলছি এই ২৫ বছরে কোন্ কোন্ শিল্পে আমরা খুব এগোলুম আর প্রচুর চাকরি দিতে পারলুম? কত কারখানা বন্ধ হয়েছে সে হিসাবটা আমার কাছে নেই বলে আমি দুঃখিত। আসলে আমি বরাবর অঙ্কে কাঁচা। বড় বড় সংখ্যা দেখলেই ভিরমি খাই। তবে ঐ নাম করা শিল্প আমাদের যা ছিল, পাবলিকের সম্পত্তি, তার মধ্যে এইচ এম টি লাটে, চিত্তরঞ্জন খাবি খাচ্ছে। বি এস এন এল তথৈবচ ওদিকে তাদেরই টাওয়ার ব্যবহার করে ভোডাফোন, এয়ারটেল লালে লাল। থ্রি জি বলে টু জি দিয়ে আমাদের দিব্যি টুপি পরাচ্ছে, মধ্যে মধ্যে আবার কর ফাঁকিও দিচ্ছে। আদালত জরিমানা করলে “এরম করলে খেলব না” বলে ঠোঁট ফোলাচ্ছে আর সরকার সব মিটমাট করে নিচ্ছে

ভারতে অর্থনৈতিক উদারীকরণের রজত জয়ন্তী পালনে জোর কদমে নেমে পড়েছে কংগ্রেস। কিন্তু এখানেও তাদের টেক্কা দিল বিজেপি। মনমোহনকে যতই গালাগাল দিক না কেন, তাঁরই দেখানো পথে এগিয়ে ভারতের প্রতিরক্ষা, ওষুধপত্র, খুচরো ব্যবসা সবকিছুতে জমিয়ে ব্যবসা করার জন্য দরজা হাট করে খুলে দিল নরেন্দ্র মোদীর সরকার আর প্রধানমন্ত্রী সদর্পে ঘোষণা করলেন ভারত এখন পৃথিবীর সবচেয়ে মুক্ত অর্থনীতি। উদারীকরণের এর চেয়ে বড় উদযাপন আর কী হতে পারে?
চমৎকার পদক্ষেপ। যে মুষ্টিমেয় সংবাদমাধ্যম সাম্প্রদায়িক রাজনীতির জন্য, প্রতিশোধমূলক রাজনীতির জন্য সরকারকে প্রশ্নের মুখে ফেলছিল তারা একবাক্যে স্বীকার করল এতদিনে একটা কাজের মত কাজ হয়েছে। উদারপন্থী বুদ্ধিজীবীরাও ভারত এবার জগৎসভায় শ্রেষ্ঠ আসন লবেই এটা বলতে বাধ্য হলেন। এখানে মনে রাখতে হবে উন্নত পুঁজিবাদী দেশে বুদ্ধিজীবী হলেন ধনী বিক্রেতারা। মার্কিন দেশে বিল গেটস, স্টিভ জোবস হলে এদেশে মুকেশ আম্বানি, নারায়ণমূর্তি, ফিকি, অ্যাসোচেম ইত্যাদিরা। তবে সবচেয়ে বড় লাভ হল লেখাপড়া শেখা মধ্যবিত্ত, যারা আচ্ছে দিনের গাজরটা খুড়োর কলে ঝোলানো দেখে খচে বোম হয়েছিল, তারা মহা খুশি। তারা এক ধাক্কায় গ্যাসের ভর্তুকির দুঃখ ভুলে গেছে, ডাল, টমেটোর দামও ভুলে গেছে। কারণ তারা জানে বিদেশী পুঁজি আসা মানেই হচ্ছে কাঁড়ি কাঁড়ি চাকরি আর ভুরিভুরি মাইনে। গত সপ্তাহে মলে যে স্টোরটার ব্র্যান্ডেড শার্টটা দূর থেকে দেখে চলে আসতে হয়েছে সেটাই এবার নাগালে চলে আসবে। জয় নরসিমার জয়, জয় মনমোহনের জয়, জয় মোদীর জয়, জয় জেটলির জয়।
এই বাজারে কয়েকটা প্রশ্ন করতে চাই। মানে আমি বামপন্থী লোক তো। বামপন্থীদের কাজই হল বাজে বকা। সেইটুকুই করতে চাইছি আর কি। সকলে ক্ষমা ঘেন্না করে নেবেন আর কারো কাছে উত্তর থাকলে দিয়ে দেবেন। প্রতিপ্রশ্ন করলে অ্যান্টি ন্যাশনালও বলতে পারেন।
বলছি এই ২৫ বছরে কোন্ কোন্ শিল্পে আমরা খুব এগোলুম আর প্রচুর চাকরি দিতে পারলুম? কত কারখানা বন্ধ হয়েছে সে হিসাবটা আমার কাছে নেই বলে আমি দুঃখিত। আসলে আমি বরাবর অঙ্কে কাঁচা। বড় বড় সংখ্যা দেখলেই ভিরমি খাই। তবে ঐ নাম করা শিল্প আমাদের যা ছিল, পাবলিকের সম্পত্তি, তার মধ্যে এইচ এম টি লাটে, চিত্তরঞ্জন খাবি খাচ্ছে। বি এস এন এল তথৈবচ ওদিকে তাদেরই টাওয়ার ব্যবহার করে ভোডাফোন, এয়ারটেল লালে লাল। থ্রি জি বলে টু জি দিয়ে আমাদের দিব্যি টুপি পরাচ্ছে, মধ্যে মধ্যে আবার কর ফাঁকিও দিচ্ছে। আদালত জরিমানা করলে “এরম করলে খেলব না” বলে ঠোঁট ফোলাচ্ছে আর সরকার সব মিটমাট করে নিচ্ছে। বিভিন্ন শিল্পে কত লোকের চাকরি গেছে সে প্রশ্ন তুলছি না। ওসব নির্ঘাৎ অযোগ্য লোক ছিল তাই চাকরি গেছে। পুঁজিবাদে যোগ্যতমের উদ্বর্তন হবে এটাই তো স্বাভাবিক। তাই কত লোকের চাকরি হয়েছে জানতে চাইছি। বেকার টেকার আর নেই তো? মানে চারদিকে তো তথ্যপ্রযুক্তি ছাড়া আর প্রযুক্তি দেখি না। যে পড়েছিল খনি প্রযুক্তি সে-ও দেখি সফটওয়্যারে আর যে ছিল কম্পিউটার সায়েন্সের ভাল ছাত্র সে-ও সফটওয়্যারে। তারও আবার বেশিরভাগ কাজই বিদেশি কোম্পানির কাজ এদেশে বসে হচ্ছে। কোনদিন এই কাজগুলো আসা বন্ধ হলে যে কী হবে! কোথায় থাকবে যোগ্যতমের উদ্বর্তনের তত্ত্ব!
ও হ্যাঁ। আরেকরকম শিল্পেও চাকরি হচ্ছে বটে — কর্তাশিল্প। এম বি এ পাশ করে বিভিন্ন কোম্পানির কর্তা হওয়ার শিল্প। এছাড়াও আছে কথাশিল্প। সারারাত জেগে লোকের গালমন্দ শুনে মাস গেলে হাজার দশ-পনেরো টাকা আয় করা, যা দিয়ে আজকের বাজারে আড়াই জনের সংসার চালানোও শক্ত। এরও অনেকটাই বিদেশের কাজ।
তাহলে পঁচিশ বছর ধরে দেশের কোন্ উন্নতিটা হল? এত শিল্পোন্নত দেশ হল আমাদের যে এখন মনমোহনের সুযোগ্য ছাত্র নরেন্দ্রকে বলতে হচ্ছে #MakeInIndia? মানে আসলে কিস্যু হয়নি এখানে? তাহলে ব্যবস্থাটা ব্যর্থ তো?
উহুঁ। তা নয়। ব্যবস্থাটা কংগ্রেস ঠিক করে চালাতে পারেনি। কাছাটা পুরো না খুললে কি আর বিশ্ব বাজারে সাঁতার কাটা যায় বাপু? এই সবে আমাদের মিত্র দিলেন খুলে। এবারেই দেশটা পুরো ফ্রেঞ্চ রিভিয়েরা হয়ে যাবে। আর পঁচিশটা বছর ধৈর্য ধরুন।
আচ্ছা কাছা আমাদের আগেই যারা খুলেছিল তারা এখন কেমন আছে? দক্ষিণ আমেরিকার দেশগুলো খুলেছিল। এই সহস্রাব্দের গোড়াতেই রক্তাক্ত অবস্থায় জল থেকে উঠে আসে। উদারীকরণের পিরানহা শুধু হাড়গুলো বাকি রেখেছিল। তারা বামদিকে হাঁটতে শুরু করে। অধুনা সঙ্কট সত্ত্বেও উদারীকরণের রাস্তায় তারা এখুনি ফিরছে না। গ্রীসের অবস্থা আমরা কিছুদিন আগেই দেখেছি। এতই করুণ যে “আর পারছি না, চলে যাব” বলে চিৎকার করেও শেষ অব্দি “দু বেলা দু মুঠো দিস” বলে ফের নির্যাতন মেনে নিয়েছে।
আর যে দেশ প্রথমে নিজে বিবস্ত্র হয়ে জলে নেমে অন্যদের ডেকেছিল খোদ সেই দেশে বেকারত্ব বেড়ে চলেছে। অনেকে দেউলিয়া হয়ে গেছে।
তা হোক গে। মনমোহন আর মোদীর দেখানো পথই আমাদের পথ। পুঁজিবাদেরও যে রকমফের হতে পারে তা আমরা শুনব কেন? এলোমেলো করে দে মা, লুটেপুটে খাই। আম্বানি, আদানি খাবে খাক না। চুঁইয়ে এসে যেটুকু পড়বে তাতেই আমাদের যথেষ্টর চেয়ে অনেক বেশি হবে। গরীব, নিম্ন মধ্যবিত্তের যা হয় হোক। দেশে আর গরীব যদি না-ই থাকে সেটা কি খারাপ? বামপন্থীদের খালি “গরীব গরীব” করে চেল্লানো স্বভাব। আসলে গরীব না থাকলে আমাদের পাত্তা দেবে কে? যত্তোসব।

পুনশ্চ: অবাম বন্ধুরা আশা করি স্বীকার করবেন আমার মত হদ্দ বোকা বামপন্থীরা এখন এদেশে অনুল্লেখ্য। বামপন্থী রাজনৈতিক দলগুলো কিন্তু সবেতে বাগড়া দেওয়ার বদনাম ঘোচানোর আপ্রাণ চেষ্টা করছে। সবচেয়ে বড় বামপন্থী দলটাকেই দেখুন না। এসব আলোচনায় তারা নেই। আন্দোলনে নামার হুমকি-টুমকিও দিচ্ছে না। তাদের বৃহত্তম সমস্যা এখন কংগ্রেসের সঙ্গে প্রেম করব না ঝগড়া করব। তাই নিয়ে তিনদিন ধরে মিটিং করছে, কেউ এই প্রেম অবৈধ বললে তাকে বার করে দিচ্ছে। এক কথায় (ফ্যাতাড়ুদের ভাষায়) “ছিঁড়ছে”। ভারতবর্ষের মত এত বড় মাঠে ফাঁকায় গোল দেওয়ার সুযোগ বহুজাতিকগুলো পূর্ব ইউরোপে সমাজতন্ত্রের পতনের সময়ও পায়নি।

প্রতিবাদের অধিকার

আপনি সমর্থন করেন না এমন একটা বিষয় নিয়ে আন্দোলন হলেই আপনি বলবেন “আমার টাকায় এসব করা চলবে না। যে পাতে খাচ্ছ, সে পাতেই হাগছ” ইত্যাদি। তাহলে তো মশাই যে পাড়ার লোক সরকারী দলের প্রার্থীকে জেতায় না সে পাড়ায় রাস্তা না বানানোটাই সঠিক রাজনীতি। আপনি মমতার রাজ্যে থেকে বি জে পি, সি পি এম, কংগ্রেস এদের ভোট দেবেন আর দিদির ভাইয়েরা আপনার জন্য ক্যাটরিনার গালের মত রাস্তা বানিয়ে দেবে! আপনিও তো যে পাতে খাচ্ছেন সে পাতেই হাগছেন

JNUSU President Kanhaiya Kumar at JNU

হোক কলরব আন্দোলনের সময় দেখেছি, এখন আবার দেখছি যে আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে একটা যুক্তি দেওয়া হয় — আয়করদাতাদের টাকায় যেহেতু তারা ভর্তুকিপ্রাপ্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়ছে অতএব তাদের প্রতিবাদ-টতিবাদ করার অধিকার নেই। এগুলো করা মানে আয়করদাতার টাকা নষ্ট করা। এই যুক্তি যুগপৎ বোকার যুক্তি এবং গা-জোয়ারি যুক্তি।
কেন এটা বোকার যুক্তি সেটা আগে বলি।

ভারতবর্ষে কয়েক কোটি আয়করদাতা। তারা সকলে প্রায় কোন বিষয়েই একমত নয়। হওয়ার দরকারও নেই। তাহলে কি করে ধরে নেওয়া হয় যে সব আয়করদাতাই মনে করে ছাত্রছাত্রীদের কোন বিষয়ে প্রতিবাদ করা উচিৎ নয় বা আদৌ রাজনীতি করা উচিৎ নয়? যিনি এরকম ভাবেন তিনি ভাবুন কিন্তু আমার আয় বা ভাবনার মালিকানা আমি আপনাকে দিইনি। উপরন্তু যারা আন্দোলন করছে তাদের বাবা-মায়েরাও অনেকে আয়করদাতা। দেশগঠনে তাঁদের আয় কিছু কম পরিমাণে ব্যবহার হয় না। যাদবপুরের যেসব মাস্টারমশাই, দিদিমণি ছাত্রদের সমর্থন করেছিলেন এবং জে এন ইউ এর যাঁরা আন্দোলনের পাশে দাঁড়িয়েছেন তাঁরাও শুধু আয়করদাতার টাকায় মাইনে পান তা নয়, নিজেরাও আয়কর দেন। প্রাক্তন ছাত্রছাত্রী, যাঁরা এদেশে থাকেন, তাঁরাও আয়করদাতা। স্পষ্টত, যে কোন ছাত্র আন্দোলনই বহু আয়করদাতার স্নেহধন্য।

এবার আপনি বলবেন, তাহলে যেসব আয়করদাতা আন্দোলনকারীরা তাদের টাকা নষ্ট করছে মনে করে তাদের মতামত কি মূল্যহীন? একেবারেই না। এখানেই আসছে গা-জোয়ারির প্রশ্নটা। আপনি সমর্থন করেন না এমন একটা বিষয় নিয়ে আন্দোলন হলেই আপনি বলবেন “আমার টাকায় এসব করা চলবে না। যে পাতে খাচ্ছ, সে পাতেই হাগছ” ইত্যাদি। তাহলে তো মশাই যে পাড়ার লোক সরকারী দলের প্রার্থীকে জেতায় না সে পাড়ায় রাস্তা না বানানোটাই সঠিক রাজনীতি। আপনি মমতার রাজ্যে থেকে বি জে পি, সি পি এম, কংগ্রেস এদের ভোট দেবেন আর দিদির ভাইয়েরা আপনার জন্য ক্যাটরিনার গালের মত রাস্তা বানিয়ে দেবে! আপনিও তো যে পাতে খাচ্ছেন সে পাতেই হাগছেন। আমি বামপন্থী। তা বলে আমি একথা বলতে পারি না যে আমি আয়কর দিই বলে বিশ্ববিদ্যালয়ে শুধু এস এফ আই আর এ আই এস এফ কে রাজনীতি করতে দিতে হবে। ছাত্র পরিষদ, টি এম সি পি, এ বি ভি পি সকলেরই অধিকার আছে। আমি এদের অপছন্দ করি বলেই এরা আন্দোলন করলে বলতে পারি না “আমার টাকায় এসব করা চলবে না। যে পাতে খাচ্ছ, সে পাতেই হাগছ”।

যদি বলি তাহলে আমি গুন্ডা। স্বাধীন দেশের নাগরিক-ফাগরিক কিস্যু নই। যে অন্যের স্বাধীনতা মানে না তার নিজের স্বাধীনতাও বাঁচে না।

পুনশ্চ — বিদেশবাসী প্রাক্তনীদের কথা এখানে বললাম না। কারণ তাঁদের মধ্যে যাঁরা ম্যাডিসন স্কোয়ার গার্ডেনে যান তাঁরা অত্যন্ত দেশভক্ত। নিশ্চয় এসব দেশদ্রোহী আন্দোলন কোন যুক্তিতেই সমর্থন করেন না। আর যাঁরা ঐসব অনুষ্ঠানে যান না তাঁরা তো একেবারে দেশদ্রোহী। তাঁরা কি ভাবেন সেই নিয়ে আলোচনা করলে যদি পুলিশে ধরে!

ভালবাসা কারে কয়

বেশ ছোটবেলাতেই আমার একটা বদভ্যাস হয়েছিল — প্রেমে পড়ার। জার্মান কবি শিলার একটা মজার কথা বলেছিলেন “মানুষ প্রেমে পড়ে বলে কবিতা লেখে না। কবিতা লেখে বলে প্রেমে পড়ে।” হয়ত সেভাবেও এই বদভ্যাসটা হয়ে থাকতে পারে।
যখন বিএ ফার্স্ট ইয়ারে পড়ি তখন দীর্ঘদিনের পরিচিত এক প্রাক্তন সহপাঠিনীর প্রেমে হাবুডুবু খাচ্ছি। সে বেচারি কিন্তু এর বিন্দু বিসর্গ জানে না। এক বন্ধুর থেকে ফোন নম্বর নিয়ে তার বাড়িতে ফোন করি। করে চুপ করে থাকি যতক্ষণ না সে হ্যালো হ্যালো বলতে বিরক্ত হয়ে ফোন ছেড়ে দেয়। অন্য কেউ ফোন ধরলে কেটে দিয়ে আবার করি। সেবার সরস্বতী পুজোর সময়ে রোখ চাপল এবার “প্রপোজ” করবই। কোনবার ঐ ছুটিতে বাড়ি আসতাম না। সেই উপলক্ষ্যে এলাম। এক বন্ধুর সেই মেয়েটির বাড়িতে প্রসাদ খাওয়ার নেমন্তন্ন ছিল। তার সহায়তায় আমারও নেমন্তন্ন হল। গেলাম। কখনো তাকে শাড়ি পরে দেখিনি। এমনিতেই আমি ক্যাবলা, আরো কেবলে গেলাম। প্রগল্ভ আমি সেদিন এতটাই চুপচাপ ছিলাম যে সে বলতে বাধ্য হল “তুই তো আজ কথাই বলছিস না।”
পরদিন বিকেলে হোস্টেলে ফেরত যাওয়া। রিকশায় ওঠার সময়ে বাবার হাতে একটা চিঠি দিয়ে বললাম আমি চলে গেলে ওটা পড়তে। বাবা অবাক। চিঠির প্রথম লাইনটা ছিল “বাবা, মনে হচ্ছে প্রেমে পড়েছি।” তারপর সেই মেয়েটির নামধাম ইত্যাদি।
হোস্টেলে ফেরার হপ্তাখানেক পরে বাবার চিঠি এল। তার সব কথা এখানে প্রাসঙ্গিক নয় কিন্তু বাবা লিখেছিল “Love is not just an emotion. It is a height to be achieved.” সেই উচ্চতায় উঠতে পেরেছি কিনা জানি না তবে চেষ্টা করে গেছি। আর শর্টকাট হিসাবে কখনো ভ্যালেন্টাইনস ডে কার্ড, ভেলভেটের হৃদপিন্ড, দামী চকোলেট — এসবের সাহায্য নিইনি। তাতেও কিন্তু আমাকে প্রেমিক হিসাবে অনেকেই অবিশ্বাস করেনি। যার সাথে গত ন’বছরের অভিন্ন জীবন, সে-ও করেনি।
আজকাল ভাবনা হয় আমার মেয়ের যখন প্রেমে পড়ার বয়স হবে তখন সে-ও বহুজাতিক গোলকধাঁধায় হারিয়ে গিয়ে প্রেমকে উপহারের মূল্যে আর উদ্ঘাটনের প্রাবল্যে মাপতে শিখবে না তো?

গায়কের মৃত্যু

subirsen

গায়কের মৃত্যু হয় কখন? যখন অনুগত সুরও অবাধ্য হয়ে ওঠে? যখন নিজের যশে আকন্ঠ মত্ত তিনি নতুন সুরের সন্ধান ছেড়ে দেন? নাকি সুর ছেড়ে গেলেও নাছোড়বান্দা গায়ক যখন অভ্যেসের দাস হয়ে দীর্ঘকাল গেয়ে যাওয়ার পর শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন, তখন? এসব প্রশ্নের উত্তর যার কাছে যা-ই হোক, “সুর আর গান থেমে গেলে সবাই আমাকে ভুলে যাবে” — এই আশঙ্কা থেকে কোন গায়ক কখনো মুক্ত হতে পারেন না। রূঢ় সত্যটা হল কোন কোন গায়কের মৃত্যু হয় না। বাকিরা নিতান্ত মর। সুবীর সেন হয়ত অমর গায়কদের দলে পড়বেন না। জীবদ্দশাতেই সংখ্যাগরিষ্ঠ তরুণ শ্রোতার কাছে তিনি রিমেক গানের ক্যাসেটের ফোল্ডারে লেখা নামমাত্রে পরিণত। তবু স্মৃতি বলে একটা জিনিস আছে, নস্ট্যালজিয়া বলে একটা গলার কাছে আটকে থাকা জিনিস আজও আছে। আর সেসব জিনিস গানকে যেভাবে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে রাখে, আর কিছুকে তেমন নয়। মায়ের গলায় প্রথম শোনা কোন গান, ছেলেমানুষী প্রেমের দিনগুলোয় ভাল লাগা কোন গান কি কখনো হারিয়ে যায় স্মৃতি থেকে? সে যতই সাধারণ গায়কের গাওয়া গান হোক না কেন।
মনে পড়ছে এক বন্ধুর মুখে শোনা গল্প। তার বাবা -মায়ের প্রেমের বিয়ে। আমার বন্ধু এবং তার বোন স্কুলের উঁচু ক্লাসের ছাত্রছাত্রী যখন, তখনও দাম্পত্যকলহে বিশেষ সুবিধে না করে উঠতে পারলেই ওদের বাবা গেয়ে উঠতেন “এত সুর আর এত গান…” আর ওর মা গলে জল হয়ে যেতেন। কারণ ওঁদের প্রেমের প্রদোষে, যখন ভদ্রলোক সাহস করে মনের কথা ভদ্রমহিলাকে বলে উঠতে পারছিলেন না, তখন ঐ গানটি গেয়েই বাজিমাত করেছিলেন।
কালের নিয়মে আমার বন্ধুর বাবা-মা একদিন আর থাকবেন না। কিন্তু বন্ধুটি সুবীর সেনকে কখনো ভুলবে না। যখন ওঁরা থাকবেন না তখন সুবীর সেন আরও বেশি করে থাকবেন আমার বন্ধুর সাথে। সীমাবদ্ধ হলেও এ এমন অমরত্ব যা থেকে কোন গায়ককে বঞ্চিত করার সাধ্য পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ সঙ্গীত সমালোচকেরও নেই।

প্যারিসের শিক্ষা

যদি ভুল করে সন্ত্রাসবাদের উৎপত্তি নিয়ে কথা বলেও ফেলেন তো “these murderers are being funded from the middle east” অব্দি বলে থেমে যাবেন। সৌদি আরবের নাম করতে যাবেন না। ওদের নাম করলেই আবার আমেরিকার নাম চলে আসবে। মনে রাখবেন ও দেশে অনেক ভারতীয় যায় এবং আরও অনেকে যেতে চায়। অতএব ঐ দেশটা ধোয়া তুলসীপাতা

প্যারিসে নারকীয় সন্ত্রাসবাদী হানার পর ৪৮ ঘন্টা অতিক্রান্ত। ইতিমধ্যে অনেক কিছু শিখলাম। দেখুন তো ঠিক শিখেছি কি না ।
১) হিন্দুরা ভারতীয় বা বাংলাদেশি বা পাকিস্তানী। খ্রিস্টানরা ফরাসী, ইংরেজ, ওলন্দাজ, চীনা, জাপানী ইত্যাদি। কিন্তু মুসলমানরা সবাই মুসলমান। অতএব তাদেরই দায়িত্ব ইসলামিক স্টেটকে নিকেশ করা। বসিরহাটের ভাতডালখেকো মুসলমান যদি বলে “মশাই আমি ছা পোষা বাঙালি। জীবনে কলকাতা ছাড়া অন্য শহর দেখিনি। আমি ইরাক, সিরিয়ায় কি হচ্ছে তার কি করব?” সঙ্গে সঙ্গে গলা নামিয়ে পাশের অমুসলমান লোকটাকে বলতে হয় “দেখেছেন কিরকম সেয়ানা! মুসলমান আবার বাঙালি”। তারপর ফেসবুকে লিখতে হবে “this tendency to live in denial is the bane of Islam” ইত্যাদি।

২) হিন্দুরা হিন্দু মৌলবাদীদের বিরুদ্ধে মুখ খুললে কিন্তু বুঝতে হয় রাজনৈতিক উদ্দেশ্য আছে বা পয়সা খেয়েছে। তাছাড়া কি এমন হয়েছে যে “হিন্দু মৌলবাদ” বলে চেঁচাতে হবে? আগে আই এসের মত লন্ডন, প্যারিসে শ’দুয়েক লোক মারুক। তখন দেখা যাবে।

৩) মুসলমানদের চেয়ে হিন্দু এবং খ্রিস্টানরা ইসলাম ধর্ম নিয়ে অনেক বেশি পড়াশোনা করে। কোরানের কোন্ অনুচ্ছেদে বা কোন্ হাদিশে লোকের মুন্ডু কাটতে বলা আছে তা বেশিরভাগ অমুসলমানেরই ক্লিকস্থ।

৪) ইসলামিক সন্ত্রাসবাদের উৎস কোথায়, তার মদতদাতা কারা — এইসব আলোচনায় যাওয়া যাবে না। কারণ এইসব আলোচনা করা মানেই আপনি জেহাদি অথবা সিপিএম। নিদেনপক্ষে কংগ্রেস। আগামী বছর ভোটে দাঁড়াচ্ছেন; তাই এখন থেকে সংখ্যালঘু ভোট যোগাড়ে লেগেছেন।

৫) যদি ভুল করে সন্ত্রাসবাদের উৎপত্তি নিয়ে কথা বলেও ফেলেন তো “these murderers are being funded from the middle east” অব্দি বলে থেমে যাবেন। সৌদি আরবের নাম করতে যাবেন না। ওদের নাম করলেই আবার আমেরিকার নাম চলে আসবে। মনে রাখবেন ও দেশে অনেক ভারতীয় যায় এবং আরও অনেকে যেতে চায়। অতএব ঐ দেশটা ধোয়া তুলসীপাতা। ওদের এসব নোংরা অপবাদ দেওয়া বামপন্থীদের চক্রান্ত। ভুলে যাবেন না, যদিও কোনদিন কেন্দ্রে ক্ষমতায় আসেনি, তবু ভারতবর্ষের আজকের অবস্থার জন্যে ওরাই দায়ী। পৃথিবীর যেখানেই ওরা ক্ষমতায় ছিল সেখানেই মানবাধিকার বলে আর কিছু রাখেনি। তেমনই একটা দেশ আফগানিস্তান। সেদেশকে মুক্ত করতে আমেরিকার অবদান ভুলে গেলে চলবে না। তারাই তালিবানদের সাহায্যে ….
এই রে! না না আমি কিছু বলিনি। নমস্কার নমস্কার।