কুণাল, যাঁর কৌতুক আজ কামড়ায়

‘পরেরবার যদি রাজনৈতিক কৌতুক করি, তাহলে এত ব্যাকফুটে থাকার দরকার নেই। সোজা মোদী, অমিত শাহ, আম্বানি, আদানি – যা প্রাণে চায় বলে দেওয়াই ভাল। কারণ যা-ই করো, গালি তো খেতেই হবে। সুতরাং অল আউট খেলাই ভাল। অত ভাবার দরকার নেই যে লোকে অমুক জোকের যুক্তিটা নিয়ে বলবে…ইন্টারনেটে দুই ধরনের লোক আছে। এক ধরনের লোক শাসক দলের ভক্ত, আরেক ধরনের লোক শাসক দলকে রীতিমত ঘৃণা করে। অতএব…আমাকে অনেকেই বলেছে, এত ফেন্স সিটিং করছ কেন? সুতরাং ঠিক করে নিয়েছি…সেরা কমেডি হয় ক্ষমতার বিরুদ্ধে কথা বললে, তাই না? পাঞ্চ ডাউন করার চেয়ে পাঞ্চ আপ করা ভাল, আর সেটা যদি করতেই হয় তাহলে পাঞ্চটা জোরে মারাই ভাল। সুতরাং এখন যদি আমি রাজনৈতিক কৌতুক করি, তাহলে সেটা অনেক বেশি তীক্ষ্ণ হবে।’

গাম্ভীর্য নির্বোধের মুখোশ। কথাটা অনেককাল আগে বলেছিলেন এক মাস্টারমশাই। মোটেই বিশ্বাস করিনি, কারণ ততদিনে একাধিক জায়গা থেকে জেনেছি যে রাজশেখর বসু অত সরস সব গল্প লিখলেও, খুব গম্ভীর মানুষ ছিলেন। তারাপদ রায়ের সঙ্গে আলাপ ছিল এরকম একজনের মুখ থেকেও একইরকম কথা শুনেছিলাম। কিন্তু মাস্টারমশাই যে নেহাত ভুল বলেননি তার প্রমাণ গত কয়েক দিনে পাওয়া গেছে। ঋজু বিদূষক কুণাল কামরার কমেডি শো যে হলে হয়েছিল, মুম্বইয়ের সেই দ্য হ্যাবিট্যাট -এর মালিক আর কর্মচারীদের জিজ্ঞেস করলে তাঁরা নির্ঘাত বলবেন – হাড়ে হাড়ে টের পাওয়া গেছে। তবে নির্বোধ মানেই কিন্তু নিরীহ নয়। সুকুমার রায়ের রামগরুড়ের ছানাদের হাসতে মানা; একনাথ শিন্ডে, দেবেন্দ্র ফড়নবীশের দলবল আরও এককাঠি সরেস। তারা নিজেরা না হেসেই খুশি নয়, অন্যদেরও হাসতে মানা করে ভাংচুর করে।

অবশ্য এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। হাসাহাসি করলে ফ্যাসিবাদী হওয়া যায় না। তাছাড়া শিবসেনার জন্মই হয়েছিল ঠ্যাঙাড়ে বাহিনি হিসাবে, মুম্বই ও সংলগ্ন শিল্পাঞ্চলে অত্যন্ত শক্তিশালী বামপন্থী ট্রেড ইউনিয়নগুলোকে ভাঙার জন্যে (দুর্জনে বলে কংগ্রেসের উদ্যোগে)। কুণাল কামরার কমেডি শো নিয়ে শিবসেনার গুন্ডামি দেখে অনেকে খেয়াল করিয়ে দিচ্ছেন, শিবসেনার আদিপুরুষ বালাসাহেব ঠাকরে নিজে কার্টুনিস্ট ছিলেন, ইন্দিরা গান্ধীর ব্যঙ্গচিত্রও এঁকেছেন ইত্যাদি। কিন্তু ওসব কথা বলে লাভ নেই। বাল ঠাকরে শিবসেনার নেতা হিসাবে মোটেই কোনো গণতান্ত্রিক ব্যক্তি ছিলেন না। শিবসেনা কীভাবে মুম্বই চালাত সেকথা সে যুগের মুম্বই তথা মহারাষ্ট্রের বাসিন্দারা প্রত্যেকেই জানেন। নয়ের দশকের মুম্বই দাঙ্গায় শিবসেনার ভূমিকাও কোনো গোপন তথ্য নয়। আজ যে সারা ভারতে সুনির্দিষ্ট পরধর্মবিদ্বেষী এবং/অথবা পরজাতিবিদ্বেষী গুন্ডামি চালু করেছে সংঘ পরিবার, তার সূচনা অনেক আগেই বালাসাহেব করে দিয়েছিলেন মহারাষ্ট্রে। মুসলমান তো বটেই, সেইসময় শিবসেনার আক্রমণের বড় লক্ষ্য ছিলেন দক্ষিণ ভারতীয় শ্রমজীবী মানুষজন। ফলে কুণালের শো নিয়ে গুন্ডামি করে এক অর্থে একনাথরা প্রমাণ করে দিলেন যে তাঁরাই বাল ঠাকরের যথার্থ উত্তরাধিকারী, উদ্ধব ঠাকরেরা নন। চলচ্চিত্র পরিচালক হনসল মেহতা ২৪ মার্চ তাঁর এক্স হ্যান্ডেলে এক পোস্টে মনে করিয়ে দিয়েছেন যে আজ থেকে ২৫ বছর আগে তাঁর একখানা ছবির একটামাত্র সংলাপের জন্যে শিবসৈনিকরা তাঁর অফিসে ঢুকে তাণ্ডব চালিয়েছিল। তাঁকে মারধোর করা হয়, মুখে কালি লেপে দেওয়া হয়, তারপর জনা বিশেক রাজনৈতিক নেতা এবং হাজার দশেক লোকের সামনে এক বৃদ্ধার পা ধরে ক্ষমা চাওয়ানো হয়। মুম্বই পুলিস দ্য হ্যাবিট্যাট ভাংচুরে দর্শকের ভূমিকা পালন করেছে, সেদিনও তাই করেছিল। শিবসেনা কেমনভাবে চলত তা বোঝার জন্যে একথাও মনে করা দরকার যে বালাসাহেব ঠাকরের মৃত্যুর পর গোটা মহারাষ্ট্রে প্রায় বনধ করে দেওয়ার সমালোচনা করে সোশাল মিডিয়ায় পোস্ট করার জন্যে শিবসৈনিকরা পালঘরের দুই নিরীহ মেয়ের পিছনে লেগেছিল। তাদের পুলিস গ্রেফতার করে এবং একজনের আত্মীয়ের দোকান ভাংচুর করে শিবসৈনিকরা।

তবুও এবারের ঘটনা আর বাল ঠাকরের আমলের বিবিধ গুন্ডামিতে বিলক্ষণ তফাত আছে। তখন শিবসেনা ছিল রাষ্ট্রকেও তোয়াক্কা না করা অথবা রাষ্ট্রশক্তিকে নিজের ইচ্ছা মত চলতে বাধ্য করা শক্তি। আজ একনাথের শিবসেনা রাষ্ট্রের অংশ। স্রেফ তাঁর চ্যালাদের গুন্ডামিতে ব্যাপারটা থেমে থাকেনি, খোদ বৃহন্মুম্বই মিউনিসিপাল কর্পোরেশনের আধিকারিকরা গিয়ে দ্য হ্যাবিট্যাট ভেঙে এসেছেন। উপরন্তু মহারাষ্ট্রের মুখ্যমন্ত্রী ফড়নবীশ বলেছেন, কুণালকে ক্ষমা চাইতে হবে। তিনি যা খুশি তাই বলতে পারেন না। বাকস্বাধীনতার সীমা আছে ইত্যাদি। বালাসাহেব আইনের পথে যেতেন না, নিজের পথ নিজে কেটে নিতেন। কুণালের বিরুদ্ধে কিন্তু একাধিক এফআইআর ফাইল করা হয়েছে। যারা দ্য হ্যাবিট্যাট ভেঙে দিয়ে এসেছে, তারাই থানায় গিয়ে এফআইআর করেছে কুণালের নামে। অথচ তাদের বিরুদ্ধে কোনো মামলা মোকদ্দমা হওয়ার খবর নেই এখন পর্যন্ত। এখানেই সাধারণ গুন্ডামি আর ফ্যাসিবাদী হিংসার তফাত। এর বিরুদ্ধে শিরদাঁড়া সোজা করে দাঁড়াতে গেলে দুটো জিনিস অবশ্য প্রয়োজনীয় – সাহস আর কৌশল। কুণালের দুটোই আছে। কীরকম? দেখা যাক।

নায়কোচিত সাহস

দ্য হ্যাবিট্যাটের শোয়ের পর থেকে যা যা ঘটেছে তাতে কুণাল নায়ক হয়ে গেছেন – এতে অনেক আরএসএসবিরোধীকেও অসন্তুষ্ট হতে দেখছি। তাঁদের মধ্যে কারোর নায়ক ব্যাপারটাতেই আপত্তি, কারোর আবার আপত্তি কুণাল শোয়ের শেষে ভারতের সংবিধান তুলে ধরে নিজের অধিকারের কথা জানান দিয়েছিলেন বলে। আজ দেশের যা অবস্থা, সুপ্রিম কোর্টের আদেশেরও তোয়াক্কা না করে যেভাবে সংঘবিরোধীদের বাড়িঘর দোকানপাট বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়া চলছে, অপছন্দের লোক হলেই যা ইচ্ছা অভিযোগ দায়ের করে কারাবন্দি করে রাখা চলছে – তাতে কুণালের মত প্রকাশ্যে নাম করে ক্ষমতাসীন লোকেদের নিয়ে যিনি খিল্লি করবেন তিনি তো বহু মানুষের চোখে নায়ক হয়ে যাবেনই। আটকাবেন কী করে? আটকাতে হবেই বা কেন? পৃথিবীর কোন দেশে কোন বিদ্রোহ, কোন বিপ্লব আবার নায়ক ছাড়া হয়েছে? আমাদের স্বাধীনতা আন্দোলনেও তো অনেক নায়ক। সকলে আবার একই মত, একই পথেরও নন। ক্ষুদিরাম বসু নায়ক, মাস্টারদা সূর্য সেন নায়ক, ভগৎ সিং নায়ক, নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু নায়ক; আবার জওহরলাল নেহরু, মৌলানা আবুল কালাম আজাদ, মহাত্মা গান্ধীও নায়ক। শিল্পী সাহিত্যিকদের মধ্যে কাজী নজরুল ইসলাম নায়ক, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় নায়ক, আবার পীতাম্বর দাসও নায়ক। তাঁর নাম আজ প্রায় কারোর মনে নেই, কিন্তু তাঁর রচনা করা ‘একবার বিদায় দে মা ঘুরে আসি’ গানটা রয়ে গেছে। একটা সময় পর্যন্ত অল্লামা ইকবালও আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামের নায়ক ছিলেন। উর্দু, হিন্দি ভাষা নিয়ে অ্যালার্জি না থাকলে ‘সারে জহাঁ সে অচ্ছা’ গানটা আজও যে কোনো দেশপ্রেমিক মানুষের প্রিয় হবে, দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের ‘ধনধান্য পুষ্প ভরা’-র মতই। এঁরাও সকলে এক মতের লোক নন। যিনি আমার লড়াইটাই লড়ছেন কিন্তু একই মতের লোক নন, তাঁর সাহসকে সেলাম জানাতে না পারলে আমারই ক্ষুদ্রতা প্রকাশ পায়। তাঁর নয়।

রইল সংবিধানের কথা। পৃথিবীর কোনো সংবিধান নিখুঁত নয়, ভারতের সংবিধানও নয়। আবার যে কোনো দেশের সংবিধান খুললেই দেখা যায় অনেক ভাল ভাল কথা লেখা আছে যার প্রয়োগ নেই। কথাটা ভারতের সংবিধানের ক্ষেত্রেও সত্যি। সংবিধান প্রণেতাদের অন্যতম, বাবাসাহেব ভীমরাও আম্বেদকর, নিজেই সংবিধান সভার শেষ অধিবেশনে বলেছিলেন যে সংবিধানে সমতাবিধান করা হল, কিন্তু ভারতের সমাজ রইল অসাম্যে পরিপূর্ণ। এভাবে কতদিন ভারতে গণতন্ত্র টিকবে তা নিয়ে তিনি পরেও বারবার সন্দেহ প্রকাশ করেছেন। কিন্তু ভারতের বহু মানুষ যে এই সংবিধানের দ্বারা নানা মাত্রায় উপকৃত হয়েছে তা অস্বীকার করার উপায় নেই। ঠিক যেমন অনস্বীকার্য যে অনেক মানুষের উপর নিপীড়ন চালানো হয়েছে এবং হচ্ছে এই সংবিধানকে হাতিয়ার করেই। তা বলে যে কোটি কোটি ভারতীয় সংবিধানের উপর আস্থা রাখেন, ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে আজকের লড়াইয়ে সংবিধানকে নিজের অস্ত্র মনে করছেন তাঁদের বিরুদ্ধ পক্ষ বলে মনে করা বা তাঁদের দিকেই বাক্যবাণ ছোড়া এককথায় নির্বুদ্ধিতা। ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে নানা জন নানাভাবে লড়বে, যার যতটুকু ক্ষমতা সে ততটুকুই দিয়েই লড়বে। কেউ লোক হাসিয়ে লড়বে, কেউ গান গেয়ে লড়বে, কেউ লিখে লড়বে, কেউ রাস্তায় মিছিল, মিটিং করে লড়বে, কেউ আইনি লড়াই করবে। এখন ‘এই সংবিধান মানি না’ বলার সময় নয়, কারণ এখন যুদ্ধটা সংবিধানের বিরুদ্ধে নয়। এটুকু বুঝতে খুব অসুবিধা হওয়ার কথা নয়, যদি আপনার সোশাল মিডিয়ার বাইরে একটা সত্যিকারের লড়াই থাকে।

উপযুক্ত কৌশল

কুণালকে মুম্বই থেকে ফোনে হুমকি দিচ্ছে কিছু লোক আর কুণাল তাদের বলছেন ‘আ যা তামিলনাড়ু’ – এমন একটা অডিও ক্লিপ ভাইরাল হয়েছে। অনেক খবরের চ্যানেলেও শোনানো হয়েছে। এটা ভুয়ো বলে এখন পর্যন্ত জানা যায়নি আর ঘটনা হল, মুম্বইয়ের বাসিন্দা কুণাল কয়েক বছর হল তামিলনাড়ুতে থাকতে শুরু করেছেন। ফলে তিনি যে হলে শো করেছিলেন সেখানে ভাংচুর চালাতে পারলেও একনাথের ভক্তরা কুণালকে শারীরিকভাবে আক্রমণ করতে পারেনি। পারলে কী করত তা অনুমান করাও অসম্ভব। স্রেফ হনসলের হাল করে ছেড়ে দিত – একথা আজকের ভারতে নিশ্চিত করে বলা যায় না। মনে রাখতে হবে, বিনা বিচারে উমর খালিদকে বছরের পর বছর আটক করে রাখার আগে তাঁর দিকে গুলি চালানো হয়েছিল। কুণাল মুসলমান নন বলে তেমন সম্ভাবনা নেই – এরকম যাঁরা ভাবেন তাঁরা হয়ত ২০২০ সালে জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের মেয়েদের হোস্টেলে হামলার কথা ভুলে গেছেন। কুণাল অবশ্যই ভোলেননি। উপরন্তু অন্য এক বিদূষক মুনাওয়ার ফারুকীর শো যখন ২০২১ সালে ইন্দোরে বলপূর্বক বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল এবং যে কৌতুক তিনি করেননি তার জন্যে কারারুদ্ধ করা হয়েছিল, তখন যে বিদূষকরা মুনাওয়ারের হয়ে লড়াই লড়েছিলেন, কুণাল তাঁদের একজন। ফলে বুঝতে অসুবিধা হয় না যে কুণাল সচেতনভাবেই এমন এক রাজ্যে চলে গেছেন যে রাজ্যের সরকার সংঘ পরিবারের সঙ্গে আদর্শগত লড়াইয়ে লিপ্ত, অত্যন্ত আক্রমণাত্মক। শুধু তাই নয়, অদূর ভবিষ্যতে এম কে স্ট্যালিনের নেতৃত্বাধীন ডিএমকে ক্ষমতাচ্যুত হলেও বিজেপির তামিলনাড়ুতে ক্ষমতায় আসার কোনো সম্ভাবনা নেই (পশ্চিমবঙ্গে কিন্তু আছে)। তামিলনাড়ুতে সংঘ পরিবারের বিরুদ্ধে সামাজিক-সাংস্কৃতিক প্রতিরোধ এত তীব্র যে সম্প্রতি কেন্দ্রের তিন ভাষা নীতি নিয়ে বিতর্কের আবহে সেখানকার বিজেপি নেত্রী রঞ্জনা নাচিয়ার পার্টি থেকে পদত্যাগ করেছেন

মুম্বইতে দাঁড়িয়ে নাম করে নরেন্দ্র মোদী, অমিত শাহ, ফড়নবীশ, মুকেশ আম্বানি, তাঁর ছেলে, আনন্দ মাহিন্দ্রা, এবং নাম না করে একনাথকে নিয়ে মস্করা করার সাহসের পিছনে যে কুণাল যে রাজ্যে থাকেন তার নিরাপত্তা কাজ করেছে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু ব্যাপারটার মধ্যে কৌশল আছে বলে কুণালের সাহসকে এক বিন্দুও ছোট করা যায় না। কারণ সাম্প্রতিক অতীতে বিজেপিশাসিত রাজ্যে অভিযোগ দায়ের করে অন্য রাজ্যের লোককে গ্রেফতার করার দৃষ্টান্ত বিরল নয়। আসাম পুলিস ২০২০ সাল থেকে তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী সর্বানন্দ সোনোয়ালের নির্দেশে গর্গ চ্যাটার্জিকে গ্রেফতার করতে চাইছিল। কলকাতা পুলিস নাকি সহযোগিতা করছিল না। শেষমেশ ২০২২ সালে গৌহাটি হাইকোর্ট কলকাতার পুলিস কমিশনারকে গর্গবাবুকে গ্রেফতার করার নির্দেশ দেয়, কলকাতা পুলিসকে সে নির্দেশ মানতেই হয়। গুজরাটের বিধায়ক জিগ্নেশ মেওয়ানিকেও আসাম পুলিস গ্রেফতার করে নিয়ে গিয়েছিল। অবশ্যই গুজরাট সরকার বিজেপির হওয়ায় সুবিধা হয়েছিল। কংগ্রেস নেতা পবন খেরাকে তো স্রেফ প্রধানমন্ত্রীকে ‘নরেন্দ্র গৌতমদাস মোদী’ বলার জন্যে দিল্লি বিমানবন্দরে বিমান থেকে নামিয়ে গ্রেফতার করেছিল আসাম পুলিস। তবে সুপ্রিম কোর্টের হস্তক্ষেপে তিনি কয়েক ঘন্টার মধ্যেই জামিন পেয়ে যান।

একথা ঠিক যে কুণালের এখন যেরকম নাম হয়েছে তাতে তাঁকে গ্রেফতার করা হলে প্রশান্ত ভূষণ বা ইন্দিরা জয়সিংয়ের মত দেশের সবচেয়ে নামকরা আইনজীবীরা হয়ত তাঁর হয়ে লড়বেন। তবে মনে রাখতে হবে, কুণাল কিন্তু গর্গ, জিগ্নেশ বা পবনের মত সক্রিয় রাজনীতির লোক নন। তাঁর কাছে গ্রেফতার হওয়া অতখানি জলভাত ব্যাপার না হওয়ারই কথা। আরও বড় কথা হল, কুণাল সুপ্রিম কোর্টকে আগে থেকেই চটিয়ে রেখেছেন। ২০২১ সালে তিনি সুপ্রিম কোর্ট যে দ্রুততায় অর্ণব গোস্বামীর জামিন মঞ্জুর করেছিল, তাকে ব্যঙ্গ করে একগুচ্ছ টুইট করেন। তার জন্যে তাঁর নামে সুপ্রিম কোর্টে মামলা করে কিছু লোক, বিচারপতিরাও আদালত অবমাননার নোটিস পাঠান। কুণাল তার যে জবাব দিয়েছিলেন তাও একই সঙ্গে সাহস ও রসবোধের নিদর্শন। মোদ্দা কথা, তিনি বিচারপতিদের সামনেও মাথা নোয়াননি। শুধু কি তাই? নিজের এক শোয়ে সুপ্রিম কোর্টকে ‘ব্রাহ্মণ-বানিয়া অ্যাফেয়ার’ পর্যন্ত বলে বসে আছেন। এমন লোকের উপর কি আর বিচারপতিরা সদয় হবেন?

কুণালের পরিবর্তন

কুণাল ঋজু বিদূষক হিসাবে কাজ করছেন বছর দশেক হতে চলল। কিন্তু তিনি কি বরাবর এতটা রাজনৈতিক, এত প্রতিবাদী, এতখানি সাহসী ছিলেন? উত্তর হল – না। ২০১৬-১৭ সালে কুণালের যে ভিডিও প্রথম ভাইরাল হয় এবং তাঁর নাম ছড়িয়ে পড়ে, তার নাম ছিল প্যাট্রিয়টিজম অ্যান্ড দ্য গভমেন্ট

এখানে তিনি যেসব কৌতুক করছেন সেগুলোও রাজনৈতিক। তিনি সেইসময় যা যা নিয়ে সর্বত্র আলোচনা হত, যেমন নোটবন্দি, জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয় – সব নিয়েই কথা বলছেন। কিন্তু তাতে আরও নানারকম কৌতুক মিশে আছে। তিনি সমাজের নানা ধরনের লোককে নিয়ে মজা করছেন, সোশাল মিডিয়া ট্রেন্ডগুলো নিয়ে কথা বলছেন, নেটফ্লিক্স নিয়ে মজা করছেন। তখন তাঁর মতে সরকার ছিল ভোডাফোনের মত ‘সার্ভিস প্রোভাইডার’, আর নাগরিক উপভোক্তা। এরপর ২০১৭ সালে তাঁর যে শোয়ের ভিডিও ইউটিউবে আপলোড হয়, সেখানে কুণাল মূলত ট্যাক্সিচালকদের নিয়ে মজা করেন। বিশেষত উবের ড্রাইভারদের নিয়ে। বলেন যে উবের একটা ভাল অ্যাপ কিন্তু ভারতে সেটা কাজ করে না, কারণ এখানকার ড্রাইভাররা ওই অ্যাপের নিয়ম অনুযায়ী চলতে চান না। ২০১৮ সালে দেশ কে বুডঢে ভিডিও। এটাও রাজনৈতিক এবং বিজেপিবিরোধী। কিন্তু ব্যঙ্গের চাঁদমারি বৃদ্ধ দক্ষিণপন্থীরা।

তারপরের ভিডিও আবার অনেকটা অরাজনৈতিক। সেখানে কুণাল মূলত মুম্বই আর ইন্দোর – এই দুই শহরের নানা গোলমালকে ব্যবহার করে হাস্যরস উৎপাদন করেন। এসবের পাশাপাশি চলছিল তাঁর পডকাস্ট শাট আপ ইয়া কুণাল, যেখানে তিনি উমর খালিদ আর কানহাইয়া কুমারের সাক্ষাৎকার নেন। আবার বিজেপি নেতাদেরও সাক্ষাৎকার নেন। কিন্তু এই ২০১৮ সালে কুণালের মধ্যে একটা পরিবর্তন লক্ষ করা যায়। অ্যাবিশ ম্যাথিউ নামে একজন ঋজু বিদূষক আছেন যিনি কুণালের মত অতটা জনপ্রিয় নন। তাঁর ইউটিউব চ্যানেলে তিনি জার্নি অফ আ জোক নামে একখানা পডকাস্ট করেন। সেই পডকাস্টের এক পর্বে কুণাল আসেন সেবছর। সেখানে অ্যাবিশ কুণালের থেকে জানছিলেন প্যাট্রিয়টিজম অ্যান্ড দ্য গভমেন্ট শোয়ের কৌতুকগুলো কীভাবে তৈরি করা হয়েছিল। পর্বের শেষদিকে অ্যাবিশ জিজ্ঞেস করেন, ওই ভিডিওর যে প্রতিক্রিয়া হয়েছে তা থেকে কুণাল কী শিখলেন? উত্তরে কুণাল বলেন ‘পরেরবার যদি রাজনৈতিক কৌতুক করি, তাহলে এত ব্যাকফুটে থাকার দরকার নেই। সোজা মোদী, অমিত শাহ, আম্বানি, আদানি – যা প্রাণে চায় বলে দেওয়াই ভাল। কারণ যা-ই করো, গালি তো খেতেই হবে। সুতরাং অল আউট খেলাই ভাল। অত ভাবার দরকার নেই যে লোকে অমুক জোকের যুক্তিটা নিয়ে বলবে…ইন্টারনেটে দুই ধরনের লোক আছে। এক ধরনের লোক শাসক দলের ভক্ত, আরেক ধরনের লোক শাসক দলকে রীতিমত ঘৃণা করে। অতএব…আমাকে অনেকেই বলেছে, এত ফেন্স সিটিং করছ কেন? সুতরাং ঠিক করে নিয়েছি…সেরা কমেডি হয় ক্ষমতার বিরুদ্ধে কথা বললে, তাই না? পাঞ্চ ডাউন করার চেয়ে পাঞ্চ আপ করা ভাল, আর সেটা যদি করতেই হয় তাহলে পাঞ্চটা জোরে মারাই ভাল। সুতরাং এখন যদি আমি রাজনৈতিক কৌতুক করি, তাহলে সেটা অনেক বেশি তীক্ষ্ণ হবে।’

আজকের কুণালের দিকে সেদিনের কুণালের যাত্রা শুরু তখন থেকে। ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনের আগে তাঁর যে ভিডিও আপলোড হয় সেখানে কুণাল এসে দাঁড়ান একখানা কালো টি শার্ট পরে, যার উপর বড় বড় অক্ষরে লেখা WAH MODIJI WAH। মঞ্চে এসেই তিনি দর্শকদের জিজ্ঞেস করেন ‘আমার আর আম্বানিজির মধ্যে মোদীজি কী করছেন? আমি সোজা আম্বানিকে কেন ভোট দিতে পারি না?’ হাসাহাসির মধ্যে দিয়ে কুণাল একবিংশ শতকের বিশ্ব রাজনীতির এক নিদারুণ সত্য উদ্ঘাটন করে ফেলেন – আজকের রাজনীতিকে চালায় আসলে বড় বড় কর্পোরেশনগুলো। তখনো কিন্তু মোদীর সঙ্গে আম্বানি, গৌতম আদানির সম্পর্ক নিয়ে রাহুল গান্ধী সরব হননি। ডোনাল্ড ট্রাম্পের হয়ে ইলন মাস্কের লম্ফঝম্প কোনোদিন দেখতে হবে – একথাও কেউ কল্পনা করেনি। অথচ কুণাল বলেন ‘আমার মনে হয় কর্পোরেশনগুলোরই ভোটে লড়া উচিত। রতন টাটা বনাম মুকেশ আম্বানি। লড়ো ২০১৯।’ এই কৌতুককে এগিয়ে নিতে নিতেও কুণাল আমাদের এক বুনিয়াদি বিতর্কের দিকে নিয়ে যান। সেটা হল – উন্নয়ন বা বিকাশ মানে কী?

নয়া উদারনীতিবাদ আমাদের এমন মাথা খেয়েছে, এটা যে বিতর্কের বিষয় তা এদেশের মার্কসবাদের নামে শপথ নেওয়া অনেক পার্টিও এই সহস্রাব্দে ভুলেই গেছে। লক্ষ করুন, যে কুণাল আগে সরকারকে ভোডাফোনের মত একটা কোম্পানি বলেই আখ্যা দিতেন, তিনি বছর তিনেক পরেই কর্পোরেশনগুলোর মুখোশ খুলছেন হাসাতে হাসাতে। পরের পাঁচ বছরে কুণাল কী কী করলেন? একদা উবের ড্রাইভারদের আচরণ নিয়ে কৌতুক করা মানুষটি গিগ শ্রমিকদের নিয়ে তৈরি গানের ভিডিও শেয়ার করলেন নিজের ইউটিউব চ্যানেলে। দেশের গোদি মিডিয়ার মুকুটহীন সম্রাট এবং জাতীয়তাবাদের ধ্বজাধারী সাংবাদিক অর্ণবের যে নিজের স্টুডিওর স্বাচ্ছন্দ্যের বাইরে এলে গলা দিয়ে আওয়াজ বেরোয় না তা ফাঁস করে দিলেন বিস্তর ঝামেলার ঝুঁকি নিয়েও। উমর, শার্জিল ইমামের মত রাজনৈতিক বন্দিদের মুক্তির দাবিতে সভায় বক্তৃতা দিলেন। হাস্যকৌতুকের ভিডিওগুলোতেও কৃষক আন্দোলনের প্রতি সহমর্মিতা দেখালেন, পডকাস্টে পি সাইনাথের মত লোককে ডেকে আনলেন। ২০২৪ লোকসভা নির্বাচনের সময়ে পুরোদস্তুর সাংবাদিকসুলভ অধ্যবসায়ে পর্বের পর পর্বে সরকারের রিপোর্ট কার্ড বার করলেন। অতঃপর এই সাম্প্রতিকতম ভিডিও, যা মহারাষ্ট্রের বিধানসভা নির্বাচনে বিরোধীদের ভরাডুবির পর সারা দেশে ঝুলে পড়া অনেক কাঁধকে মাথা তোলার সাহস দিল।

এই ভিডিওতে কুণাল যাদের আক্রমণ করেছেন তারা বুদ্ধিমানের মত, অতি ক্ষুদ্র এক ব্যক্তি, যার নামও নেওয়া হয়নি, তাকে অপমান করা হয়েছে অভিযোগ করে হল্লা করছে। সেই হল্লায় বিরোধী পক্ষের অনেকেও ভুলছেন। তাঁরা খেয়াল করছেন না, ভারতের কোনো রাজনৈতিক নেতা এখনো যা বলেননি কুণাল প্রথমবার সেটাই বলে দিয়েছেন এই ভিডিওতে। দেশের কমিউনিস্টরা পর্যন্ত যখন ফ্যাসিবাদী শাসন চলছে না নয়া ফ্যাসিবাদী – তা নিয়ে তাত্ত্বিক তর্কে মেতে আছেন, তখন এই বিদূষক শাহরুখ খান অভিনীত বাদশা ছবির টাইটেল সংটার প্যারডি বানিয়ে মোদীকে ‘তানাশাহ’ (একনায়ক) বলে দিয়েছেন। ওঁদের লেগেছে তো আসলে ওইখানে। আজকের দিনে গণতান্ত্রিক ভড়ংটা বজায় রাখতে সব একনায়কই চায়। রচপ তায়িপ এর্দোগান, ভ্লাদিমির পুতিনও সর্বক্ষণ প্রমাণ করার চেষ্টা করেন যে তাঁদের দেশে গণতন্ত্র চলছে। মোদীও ব্যতিক্রম নন। সেখানে একজন লোক হাসানোর লোক যদি সরাসরি একনায়ক শব্দটা উচ্চারণ করে ফেলে, তা হজম করা শক্ত। হাসিকে ভয় পায় না এমন কোনো একনায়ক হয় না। কারণ মানুষের উপর তাদের নিয়ন্ত্রণ বজায় থাকে ভয়ের কারণে, আর হাসি একনায়ককে খিল্লির পাত্র করে ফেলে। তাতে ভয় কেটে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। কোনো বিরোধী নেতার মুখ থেকে এই শব্দ বেরোলে খুব বেশি লোক পাত্তা না-ও দিতে পারে। কারণ একে তো অনেকে রাজনৈতিক বক্তৃতা শোনে না, তার উপর বিরোধীরা তো ক্ষমতাসীনের নামে দু-চারটে খারাপ কথা বলবেই। কিন্তু যে লোক হাসায় তার কথা স্রেফ রাগ করার জন্যেও অনেকে শোনে। ফলে কুণালের এই ভিডিও এক মূর্তিমান বিপদ। বিজেপি আই টি সেল ইতিমধ্যেই নেমে পড়েছে কুণালের পিছনে ডীপ স্টেটের ভূমিকা আছে, মার্কসবাদীদের টাকায় কুণাল চলেন – এইসব বলে পরিস্থিতি সামলাতে। মহারাষ্ট্র পুলিস কুণালের মুম্বইয়ের বাড়িতে গিয়ে, তিনি কাদের থেকে টাকাপয়সা পেয়েছেন তা নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করার জন্য তাঁর বাবা-মায়ের কাছে শমনও দিয়ে এসেছে। মজা হল, যত এসব করা হচ্ছে তত কুণালের কৌতুকগুলোর শক্তি বেড়ে যাচ্ছে। কারণ কুণাল বহুদিন আগে থেকে নিজেই হাসি হাসি মুখে বলে থাকেন ‘কমিউনিস্ট পার্টি অফ ইন্ডিয়া নে বহত প্যায়সে দিয়ে হ্যাঁয় মেরে কো’।

একটা কথা না বলে এ আলোচনা শেষ করতে পারছি না।

ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে নিজেদের অগ্রণী সৈনিক ভাবার এক অকারণ অভ্যাস বাঙালিদের আছে। সংঘ পরিবারের গোটা ভারতের উপর হিন্দি চাপিয়ে দেওয়ার আবহে এখন আরও বেশি করে পশ্চিমবঙ্গে বেশকিছু বাংলাবাদীর উদ্ভব হয়েছে। তাঁদের অনেকে অনাবাসী ভারতীয় হয়ে বাঙালি জাতীয়তাবাদের স্বপ্ন বিক্রি করেন সোশাল মিডিয়ায়, অবিভক্ত বাংলা আলাদা রাষ্ট্র হলে কী হত না হত তা নিয়ে বাষ্পাকুল হয়ে পড়েন। অনেকে আবার পশ্চিমবঙ্গে থেকেই নিজের ছেলেমেয়েকে ইংরিজি মাধ্যম স্কুলে দ্বিতীয় ভাষা হিসাবে হিন্দি পড়িয়ে বাংলার সংস্কৃতি বাঁচাতে ব্যাকুল। কুণালের মত হিন্দিভাষীদের কাজের প্রশংসা করলেই তাঁরা ভীষণ রেগে যান। কিন্তু কী করা যাবে? বাংলায় একজনও যে আজ পর্যন্ত হিন্দিভাষী রবীশ কুমার বা কুণালের মত ঋজু হয়ে দাঁড়াতে পারলেন না ফ্যাসিবাদের সামনে। না কোনো সাংবাদিক, না কোনো ঋজু বিদূষক, না কোনো গায়ক, না কোনো কবি। সারা ভারতে জনপ্রিয় হওয়ার কথা বলছি না। তার জন্যে অবশ্যই কুণালরা হিন্দি, ইংরিজি ব্যবহার করার সুবিধা পান। কিন্তু বাংলা ভাষায় বাঙালিদের আলোড়িত করার মত আমির আজিজ সুলভ গনগনে একখানা কবিতা কোন কবি লিখেছেন মোদী সরকারের দশ বছরে? স্লোগান হয়ে ওঠা কবিতার আবশ্যিক গুণ নয়। কিন্তু বরুণ গ্রোভার রচিত ‘হম কাগজ নহি দিখায়েঙ্গে’ যেভাবে সারা দেশে স্লোগান হয়ে উঠেছিল, তেমন একখানা কবিতাই বা কে লিখেছেন বাংলায়? বাংলা ভাষার কোন সাংবাদিক (এমনকি বিকল্প মাধ্যমেরও) রবীশের মত লাগাতার লিখে যাচ্ছেন/বলে যাচ্ছেন কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে?

আরও পড়ুন হাসছি মোরা হাসছি দেখো: বীর দাসের বীরত্বে দুই ভারতের পর্দা ফাঁস

কেন্দ্রের সরকারের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর কথা বলছি, রাজ্য সরকারের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে বলছি না। কাজটা তো খুব কঠিন হওয়ার কথা নয়, কারণ কুণালের তামিলনাড়ুর মত পশ্চিমবঙ্গও তো বিজেপিবিরোধী দলের (অন্তত তাদের বয়ান অনুযায়ী) শাসনে থাকা রাজ্য। কুণালের পিছনে যদি স্ট্যালিনের বরাভয় থেকে থাকে, এখান থেকে তাঁর মত কেউ উঠে দাঁড়ালে তাঁর পিছনেও নিশ্চয়ই মমতা ব্যানার্জির বরাভয় থাকবে। তাহলে ভয় কিসের?

আসলে বোধহয় স্বীকার করে নেওয়া ভাল, আমাদের সে মুরোদ নেই। আমরা মুখেন (এবং ফেসবুকেন) মারিতং জগৎ। আমাদের রাজ্য সরকারও তাই। নইলে যে ডিলিমিটেশন হলে আমাদের সাড়ে সর্বনাশ, তার বিরুদ্ধে অবিজেপি মুখ্যমন্ত্রীদের বৈঠক ডাকলেন স্ট্যালিন, তাতে গেলেনই না আমাদের রাজ্য সরকারের কোনো প্রতিনিধি!

অতএব আমাদের হয়ে লড়বেও অন্যরাই। আমরা কেবল পায়ের উপর পা তুলে তাদের দোষ ধরে যাব, কেন তারা যথেষ্ট বিপ্লবী নয় তা লিখে সোশাল মিডিয়া ভরাব। যেমন এখন কুণাল সম্পর্কে ভরাচ্ছি।

নাগরিক ডট নেট ওয়েবসাইটে প্রকাশিত

হিন্দিভাষী ইউটিউবার যা করলেন, বাঙালিরা যা করলেন না

হিন্দি বলয়ের রাজ্যগুলোর গ্রামে-মফস্সলে ছড়িয়ে আছেন আরও অনেকে, যাঁদের ফলোয়ার রবীশ, ধ্রুব, আকাশ, কুণাল, সমদীশদের চেয়ে অনেক কম। তাঁদের কারও একটা ইউটিউব চ্যানেল আছে, কারও স্রেফ একটা ফেসবুক পেজ। কিন্তু গ্রামের যে সামান্য লেখাপড়া জানা বা নিরক্ষর মানুষের কাছে ইংরেজি ভাষায় কাজ করা প্রগতিশীলরা পৌঁছতে পারেন না, তাঁদের মধ্যে বিষ ঢোকা আটকাতে বা বিষ ঝাড়তে অতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা এই অখ্যাত মানুষগুলোর।

বেঙ্গালুরু নিবাসী আমার এক বন্ধুপত্নীর অভিজ্ঞতা বলি। সে একটি বাচ্চাদের স্কুলের দিদিমণি। বছর ছয়েকের এক ছাত্রীকে তার একটু বেশি মিষ্টি লাগে, মেয়েটিরও দিদিমণিকে বেশ পছন্দ। একই রুটের বাসে তাদের বাড়ি ফেরা। ফলে দু’জনের মধ্যে স্কুলের বাইরেও কথাবার্তা হয়। সেই মেয়েটি হঠাৎ একদিন দিদিমণিকে অনুরোধ করে বসল– ‘আমার একটা ইউটিউব চ্যানেল আছে। আপনি প্লিজ সাবস্ক্রাইব করুন।’ হতচকিত দিদিমণি পরে করবেন বলে এড়িয়ে গিয়েছিলেন, কিন্তু পরদিন আবার মেয়েটি ধরল, তার পরদিন আবার। কতবার না বলা যায়? একটা ছোট মেয়েকে প্রত্যাখ্যান করতে খারাপও লাগে। কিন্তু শেষমেশ বিরক্তি জিতে গেল। দিদিমণি বলতে বাধ্য হলেন– ‘আমাকে এই অনুরোধ কোরো না।’

এমন অভিজ্ঞতা আজকাল পশ্চিমবঙ্গেও অনেকের হয়। ইউটিউব ঘাঁটলেও দেখা যায়, সারা পৃথিবীর দুধের শিশু থেকে লোলচর্ম বৃদ্ধ পর্যন্ত সকলেরই নিজস্ব ইউটিউব চ্যানেল আছে। যার চ্যানেলে যা আপলোড করা হয়, তা যতই অপ্রয়োজনীয় হোক, দেখার লোকও আছে। ব্যাপারটা স্রেফ অপ্রয়োজনীয়তায় আটকে থাকলে সমস্যা ছিল না। কিন্তু ইউটিউব এমন এক মাধ্যম হয়ে দাঁড়িয়েছে, যা দিয়ে ফেসবুক বা টুইটারের মতোই ঘৃণা ছড়ানোর কাজও করা হচ্ছে। সাংবাদিক কুণাল পুরোহিত আস্ত একখানা বই লিখেছেন, কীভাবে কিছু ইউটিউব চ্যানেল মুসলমানবিদ্বেষে পরিপূর্ণ গানের ভিডিও তৈরি করে প্রত্যন্ত এলাকাতেও অসংখ্য মানুষকে প্রতিদিন আরও হিংস্র করে তুলছে, তা নিয়ে। বইয়ের নাম ‘H-POP: THE SECRETIVE WORLD OF HINDUTVA POP STARS’। এ জিনিসটা কেবল ভারতেই হচ্ছে এমন নয়। সব দেশেই ইউটিউব ঘৃণা ছড়ানোর চমৎকার অস্ত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু সেটাই শেষ কথা নয়।

২০১৬ সালে যখন ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রথমবার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে দাঁড়িয়েছিলেন, তখন দেখা গিয়েছিল যে ইউটিউব সমেত সোশাল মিডিয়া তাঁর প্রচারে বড় অস্ত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষত ফেসবুকের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছিল, তারা বর্ণবিদ্বেষ এবং কুৎসা তো আটকাচ্ছেই না; উল্টে‌ ওসব ছড়াতে সাহায্য করছে। ফেসবুকের মালিক মেটা আর ইউটিউবের মালিক গুগল– দুই কোম্পানির বিরুদ্ধেই এই অভিযোগ আছে; যেমন আছে আড়ি পাতার অভিযোগ, ব্যবহারকারীদের অজান্তে তাদের তথ্য বিক্রি করে মুনাফা করার অভিযোগ। এসব প্রায় সবাই জানে। তবু বহু মানুষ ইউটিউবকে ব্যবহার করেই কিছু বৃহত্তর ভালো কাজ করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।

সারা পৃথিবীতেই নির্বাচনী গণতন্ত্রের সংকট চলছে, বড় বড় দেশগুলোর শাসকদের মধ্যে স্বৈরতান্ত্রিক প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। তাঁরা সংবাদমাধ্যমের কণ্ঠরোধ করছেন, ভারতের মতো দেশে সংবাদমাধ্যমগুলোও মুনাফার লোভে সরকারের মুখপত্রে পরিণত হচ্ছে। দিনরাত মিথ্যাচার এবং ঘৃণাভাষণের এই ঢেউয়ে সাধারণ মানুষের কাছে সত্য তুলে ধরার কাজে ঋজু বিদূষক এবং স্বাধীন সাংবাদিকরা ব্যবহার করছেন ইউটিউবকে। বস্তুত বিদূষক আর সাংবাদিকের সীমানা মুছে যাচ্ছে। ট্রাম্পের আমলে তাঁর অন্যতম শত্রু হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন জন অলিভার, হাসান মিনহাজ, ট্রেভর নোয়ার মতো বিদূষকরা। তাঁদের শো প্রায় নিউজ বুলেটিনই। লোক হাসাতেও তাঁরা খবরকেই ব্যবহার করেন। ২০২৪ সাধারণ নির্বাচনে ভারতেও ঠিক তাই ঘটতে দেখা গেল।

সত্যি কথা বলতে, এবারের নির্বাচনে ধ্রুব রাঠি, রবীশ কুমার, আকাশ ব্যানার্জি, কুণাল কামরারা তাঁদের চ্যানেলের মাধ্যমে যে কাজ করলেন, তা মার্কিন দেশের ইউটিউবারদের থেকে ঢের বেশি কঠিন ছিল। কারণ ও দেশে ট্রাম্পের আমলে আদালত, নির্বাচন কমিশন, সেনাবাহিনী এবং মূলধারার সংবাদমাধ্যম রামলালার সামনে মোদির সাষ্টাঙ্গ প্রণামের মতো ট্রাম্পের সামনে শুয়ে পড়েনি। ট্রাম্পকে পদে পদে প্রতিরোধের সম্মুখীন হতে হয়েছিল। ফলে বাকস্বাধীনতা এ দেশের মতো অতখানি বিপদে পড়েনি, বিদূষক বা সাংবাদিকদের পদে পদে গ্রেফতার হওয়ার ভয়ে থাকতে হয়নি। কিন্তু এদেশে কুণালের বিরুদ্ধে একাধিক মামলা হয়েছে, একাধিক বিদূষকের শো বাতিল করতে হয়েছে ক্ষমতাসীন দলের সমর্থক গুন্ডাদের আক্রমণে, নিত্য তাঁদের হুমকি সহ্য করতে হয়েছে। মুনাওয়ার ফারুকির মতো ঋজু বিদূষক গ্রেফতারও হয়েছেন। কাশ্মীর থেকে কন্যাকুমারিকা পর্যন্ত মোট কতজন সাংবাদিক গ্রেফতার হয়েছেন, খুন হয়েছেন তার তালিকা করতে বসলে রামায়ণে কুলোবে না, মহাভারত হয়ে যাবে। সিদ্দিক কাপ্পানের মতো কেউ কেউ যে প্রতিবেদন লেখাই হয়নি, তার জন্যও গ্রেফতার হয়েছেন। সাতবছর আগে খুন হওয়া গৌরী লঙ্কেশের হত্যাকারীরা আজও অধরা। রবীশের মতো সাংবাদিকদের চুপ করিয়ে দেওয়ার জন্য আস্ত চ্যানেল কিনে নিয়েছে সরকারবান্ধব পুঁজিপতিরা।

এতৎসত্ত্বেও রবীশ কেবল তাঁর চ্যানেলের গ্রাহকদের টাকায়, সামান্য সংস্থান আর ছোট্ট একটা দল নিয়ে যে সাংবাদিকতার নিদর্শন রাখলেন, তা ঐতিহাসিক। কুণাল আর আকাশ তো নির্বাচনের আগে পুরোদস্তুর সাংবাদিক হয়ে গেলেন। কুণাল দশবছর ধরে মোদি সরকার কী কী করেছে আর করেনি, তা নিয়ে রিপোর্ট কার্ড সিরিজ করলেন। পর্বগুলোর শেষে তিনি মনে করাতেন– যেভাবে দেশ চালানো হয়েছে তাতে প্রধানমন্ত্রী হিসাবে মোদির জায়গায় খালি চেয়ার রাখলেও চলবে। নতুন টেলিকম আইনে কীভাবে বিকল্প সংবাদমাধ্যম, ইউটিউবার, ইনস্টাগ্রামারদেরও কণ্ঠরোধের ব্যবস্থা করা হয়েছে, তা নিয়ে আকাশের ভিডিও ভাইরাল হয়েছিল। সেই ভাইরাল ভিডিওতে তিনি ভিপিএন (ভার্চুয়াল প্রাইভেট নেটওয়ার্ক) সম্পর্কেও দর্শকদের সচেতন করেন। তারপর ধ্রুবর প্রচণ্ড ভাইরাল ভিডিও সম্পর্কে তাঁর সাক্ষাৎকার নেন, যথার্থ সাংবাদিকের মতোই তাঁকে ব্যাখ্যা করতে বলেন– কেন তিনি বলছেন ভারত একনায়কতন্ত্রের দিকে এগোচ্ছে। আর ধ্রুব যা করেছেন, তা নিয়ে তো আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমেও আলাদা করে চর্চা হচ্ছে। বিপুল জনপ্রিয় ইউটিউবার তো অনেকেই আছেন, কিন্তু দেশের বিপদ দেখে নিজের নিশ্চিন্ত কোণ ছেড়ে বেরিয়ে এসে সরাসরি ক্ষমতাকে আক্রমণ করার ঝুঁকি কি সকলে নেয়?

এখনও তিরিশে পা না দেওয়া ধ্রুব যদিও জার্মানিতে থাকেন, তিনি ভারতের নাগরিক। তাঁর পরিবার পরিজনও এখানে আছেন। সেক্ষেত্রে এতখানি ঝুঁকি নিয়ে সরাসরি মোদির বিরুদ্ধে রীতিমতো প্রচারাভিযান চালানো কম সাহসের কাজ নয়। ধ্রুব এমনিতে তেমন বৈপ্লবিক চিন্তাধারার লোক নন, অতীতে অনেক ব্যাপারেই তিনি বিজেপিকে সমর্থন করে ভিডিও বানিয়েছেন। সংবিধানের ৩৭০ নং অনুচ্ছেদ বাতিল করাও তিনি সমর্থন করেছিলেন। কিন্তু এই নির্বাচনে তাঁর অবদান ভোলার নয়।

পাঞ্জাবি যুবক সমদীশ ভাটিয়া ইউটিউবার হিসাবে প্রথম জনপ্রিয় হন ২০২০-’২১ সালে দিল্লি শহরকে ঘিরে কৃষক আন্দোলনের সময়ে। আন্দোলনকারীদের ভিতরে চলে গিয়ে তাঁদের কথা তিনি তুলে আনতেন। মাঝে কিছুদিন সিনেমা জগতের বিখ্যাতদের লম্বা লম্বা সাক্ষাৎকার নিচ্ছিলেন, যার জন্য তাঁর শো-তে এসে নির্দেশক দিবাকর ব্যানার্জি ঈষৎ ক্ষোভও প্রকাশ করেন। এবার নির্বাচনের মুখে সমদীশ আবার স্টুডিও ছেড়ে ক্যামেরা নিয়ে বেরিয়ে পড়েন ভারত খুঁজতে। কখনও সে ভারত দিল্লি শহরের একেবারে মাঝখানে, অথচ মানুষ সেখানে জঞ্জালের মধ্যে বেঁচে আছে। কখনও সে ভারত বিহারের এক গ্রাম, যেখানে হরিজনরা এখনও হ্যান্ড পাম্পে হাত দিলে হাঙ্গামা বেধে যায়।

এমন আরও অনেকে আছেন। হিন্দি বলয়ের রাজ্যগুলোর গ্রামে-মফস্সলে ছড়িয়ে আছেন আরও অনেকে, যাঁদের ফলোয়ার রবীশ, ধ্রুব, আকাশ, কুণাল, সমদীশদের চেয়ে অনেক কম। তাঁদের কারও একটা ইউটিউব চ্যানেল আছে, কারও স্রেফ একটা ফেসবুক পেজ। কিন্তু গ্রামের যে সামান্য লেখাপড়া জানা বা নিরক্ষর মানুষের কাছে ইংরেজি ভাষায় কাজ করা প্রগতিশীলরা পৌঁছতে পারেন না, তাঁদের মধ্যে বিষ ঢোকা আটকাতে বা বিষ ঝাড়তে অতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা এই অখ্যাত মানুষগুলোর। তাঁদের অনেকের ইউটিউবার বা সাংবাদিক তকমা নেই। কেউ কেউ দিন গুজরান করেন আসলে দিল্লি, মুম্বইয়ের বড় সংবাদমাধ্যমকে খবর সরবরাহ করার বিনিময়ে অতি সামান্য টাকা পেয়ে। সেই টাকায় সংসার চালিয়ে, তা থেকেই খরচ করে এসব করেন কোন তাগিদে, তা আমাদের মতো আলোকপ্রাপ্ত বাঙালিদের পক্ষে বোঝা প্রায় অসম্ভব।

আরও পড়ুন এনডিটিভি বিসর্জন: শোক নিষ্প্রয়োজন, উল্লাস অন্যায়

পশ্চিমবঙ্গে কি ইউটিউবার নেই? কয়েক হাজার ইউটিউবার আছেন। তবে তাঁদের অধিকাংশ হাসি-মশকরায় ব্যস্ত। কেউ ক্রমশ ছোট হয়ে আসা টালিগঞ্জ ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির কেষ্টবিষ্টুদের সাক্ষাৎকার নিয়ে ফলোয়ার বাড়ান, রোজগার করেন। বাংলার যে প্রবীণ সাংবাদিকরা ইউটিউব চ্যানেল চালান তাঁদের মধ্যেও রবীশের মতো মেরুদণ্ড এবং অধ্যবসায় বিরল। তবু সাংবাদিকদের মধ্যে আছেন দু’-একজন, কিন্তু বিশুদ্ধ ইউটিউবারদের কথা না বলাই ভালো। ফলে বাঙালির ইউটিউব চ্যানেল মানে সাধারণত রান্নার চ্যানেল বা বেড়ানোর জায়গার সুলুকসন্ধান দেওয়ার চ্যানেল। নয়তো সংস্কৃতির ঢাক তেরে কেটে তাক তাক। বাঙালি তো শিল্পী হয়েই জন্মায়। ফলে গান, নাচ, আবৃত্তিতে ইউটিউব ভরিয়ে দেয় বুকের দুধ খাওয়ার বয়সটা পার হলেই। এছাড়া যা আছে তা স্রেফ আবর্জনা। হয় অর্থহীন, নয় ঘৃণা ছড়ানোর প্রয়াস।

এমনিতেই ভারতের বিরাট অংশের মানুষের ভাষা হিন্দি। তাঁদের প্রভাবিত করতে না পারলে যে ভালো বা মন্দ কোনও কাজই এদেশে করা সম্ভব নয়, তা বলা বাহুল্য। কিন্তু সেকথা এদেশের আলোকপ্রাপ্তদের সচরাচর মনে থাকে না। অথচ গণতন্ত্র বাঁচানোর জন্যে যে শহর থেকে, সংবাদমাধ্যম থেকে সবচেয়ে দূরে থাকা মানুষটার কাছেও সত্য পৌঁছে দিতে হবে, সব ভাষার মানুষের কাছে পৌঁছতে হবে– তা রবীশ, ধ্রুবরা বুঝতে পেরেছিলেন। ফলে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে হিন্দি বাদে অন্য ভাষাতেও নিজেদের ভিডিও প্রকাশ করেছেন। আবার যে হিন্দিতে সংবাদমাধ্যমের কথাবার্তা চালানো হয়, সেই হিন্দি সকলের বোধগম্য নয় বুঝে রবীশ আলাদা করে ভোজপুরী ভাষাতেও ভিডিও প্রকাশ করেছেন।

এই সুদূরপ্রসারী চিন্তা, এই যত্ন বাংলায় কোথায়? বাঙালিরা কেবল রবীশদের বাংলা ভিডিও দেখে হিন্দি আগ্রাসনের তত্ত্ব কপচাতে পারে। নিজেরা নিজের ভাষাকে বুকনি ছাড়া আর কিছু দিতে রাজি নয়।

রোববার ডট ইন ওয়েবসাইটে প্রকাশিত

শুধু মোদী নয়, আম্বানি-আদানিদের হাত থেকেও উদ্ধার পাওয়া দরকার

২০১৯ লোকসভা নির্বাচনের আগে ঋজু বিদূষক কুণাল কামরা তাঁর কমেডি রুটিনের একখানা ভিডিও প্রকাশ করেছিলেন। ততদিনে মুকেশ আম্বানি কীভাবে ভারতের অর্থনীতির উপরে একচ্ছত্র আধিপত্য কায়েম করছেন তা পরিষ্কার হয়ে গিয়েছিল, কিন্তু গৌতম আদানির নাম তখনো মুখে মুখে ফেরার পর্যায়ে পৌঁছয়নি। সেই ভিডিওর শুরুতেই কুণাল বলেন ‘আমার আর আম্বানিজির মধ্যে মোদীজি কী করছেন? আমি সোজাসুজি আম্বানিকে কেন ভোট দিতে পারব না? আমাদের আম্বানির সঙ্গে কোনো ঝামেলা আছে? বানাও না পিএম।’ তারপর বলেন ‘আমার সত্যিই মনে হয় কর্পোরেশনগুলোর ভোটে লড়া উচিত। যেমন মুকেশ আম্বানি বনাম রতন টাটা – লড়ো ২০১৯। সত্যিই দারুণ ভোট হবে। ওরা তো একটা বিষয় নিয়েই কথা বলবে – ডেভেলপমেন্ট। বিকাশ। ওরা তো আর কিছু জানেই না। ধরুন রতন টাটা তো আর উত্তরপ্রদেশে গিয়ে ঘর ভর্তি লোকের দিকে তাকিয়ে বলবে না, মন্দির ইয়হি বনেগা।’ বলা বাহুল্য কথাগুলো ঠাট্টা করে বলা, লোক হাসাতে বলা। কিন্তু ইতিহাস সাক্ষী, বিদূষকরা চিরকাল রসিকতা করতে করতে তেতো সত্যও বলে এসেছেন। তা করতে না পারলে বিদূষক হওয়ার মানে হয় না। এ প্রসঙ্গে রবীন্দ্রনাথের বিদূষক গল্প দ্রষ্টব্য। উপরন্তু আমাদের দেশে গত এক দশক ধরে কুণাল, আকাশ ব্যানার্জিরা যে কাজ করছেন তা বিদূষকের সীমায় আটকে নেই। রীতিমত সাংবাদিকতা হয়ে উঠেছে। ঠিক মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে যে কাজ জন অলিভার, হাসান মিনহাজ, ট্রেভর নোয়ারা করে থাকেন। সুতরাং কুণালের রসিকতাতেও খুঁজলে হাসির আড়ালের সত্যগুলো অনায়াসেই পাওয়া যাবে।

আসলে কুণাল ঠাট্টা করে যা বলেছিলেন তা পৃথিবী জুড়ে উদারনৈতিক গণতন্ত্রের ভালমন্দ নিয়ে যে আলোচনা চলছে তারই অঙ্গ। কোনো দেশের নির্বাচনী গণতন্ত্রই কোনোদিন অতিধনীদের প্রভাবমুক্ত ছিল না। কিন্তু একবিংশ শতাব্দীতে এসে প্রায় সব দেশের গণতন্ত্রপ্রেমী মানুষের মনেই এই সন্দেহ দেখা দিয়েছে, যে অতিধনীরাই হয়ত গণতন্ত্রের রাশ হাতে তুলে নিয়েছে। প্রকাশ্য রাষ্ট্রীয় নজরদারি ব্যবস্থা, সোশাল মিডিয়া আর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে জনমত প্রভাবিত করার উপায় এবং রাজনৈতিক দলগুলোকে বিপুল টাকা দেওয়ার ক্ষমতা মিলিয়ে বড় বড় কর্পোরেশনগুলোই কোথায় কে সরকার গড়বে আর কে সরকার চালাবে তা নিয়ন্ত্রণ করছে কিনা – এ নিয়ে সারা পৃথিবীতেই কথা হচ্ছে। কুণাল যে কাল্পনিক নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বিতার কথা বলেছিলেন তা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে তার আগেই অর্ধেক বাস্তবে পরিণত হয়েছে। কারণ ডোনাল্ড ট্রাম্প আম্বানির মতই একজন ধনকুবের। রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে দাঁড়িয়ে পড়ার আগে পর্যন্ত তাঁকে কোনোভাবেই রাজনীতিবিদদের সারিতে বসানো যেত না। আমাদের দেশে ব্যাপারটা অতদূর না গেলেও সরকারি নীতি নির্ধারণে যে কর্পোরেট শক্তি বড় ভূমিকা নিচ্ছে তার একাধিক প্রমাণ তো আমাদের চোখের সামনেই রয়েছে। যাদের সন্দেহ ছিল তারাও দেখে ফেলেছে নির্বাচনী বন্ডে কোথা থেকে কে কত টাকা পেয়েছে। কর্পোরেট স্বার্থে আইন বদলে আদিবাসীদের জমির অধিকার কেড়ে নেওয়া, কাশ্মীরে কেন্দ্রীয় শাসন কায়েম করার মত বহু ঘটনা ঘটেছে। কতগুলো বন্দর, বিমানবন্দর আদানির হাতে গেছে; আম্বানি কীভাবে খুচরো ব্যবসা থেকে শুরু করে খনিজ তেল – দেশের সমস্ত ব্যবসায় জাল বিছিয়েছেন তা-ও অনেকেরই জানা। ফলে কিছুদিন আগে অবধি ক্রোনি পুঁজিবাদ কথাটা যার শোনা ছিল না, সেও জেনে গেছে।

কোনো সন্দেহ নেই, এদেশে ক্রোনি পুঁজিবাদকে রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু করে তোলায় সবচেয়ে বেশি অবদান যাঁর, তাঁর নাম রাহুল গান্ধী। সপ্তদশ লোকসভায় বামপন্থী দলগুলোর সাংসদ ছিলেন হাতে গোনা কয়েকজন, সংসদের বাইরেও তাঁদের ক্ষমতা অত্যন্ত সীমিত। এমন অবস্থায় পুঁজিবাদ বা ক্রোনি পুঁজিবাদ নিয়ে দিনরাত আওয়াজ তোলার মত কেউ ছিলেন না। সংসদের ভিতরে তো নয়ই। রাহুলই প্রথমে সংসদের বাইরে নাম করে আম্বানি, আদানি দেশের সম্পদ কীভাবে লুটেপুটে খাচ্ছেন তা বলা শুরু করলেন। তারপর সংসদের ভিতরে আদানি আর নরেন্দ্র মোদীর একত্র ছবি এনলার্জ করে দেশের সামনে তুলে ধরলেন। মোদীর প্রাণভোমরা যে সত্যিই আরএসএস নয়, কর্পোরেটের হাতে – তা প্রমাণ হয়ে যায় কিছুদিন পরেই রাহুলকে সংসদ থেকে সাসপেন্ড করার ঘটনায়। রাহুল আদালত ঘুরে সংসদে ফিরে আসার পরেও আম্বানি, আদানিকে আক্রমণ করা ছাড়েননি। তবু এবারের নির্বাচনে ইতিহাস গড়লেন কিন্তু সেই মোদী। ক্রোনি পুঁজিবাদ নিয়ে সারা পৃথিবীতে যতই আলোচনা হোক, এত বড় গণতান্ত্রিক দেশের নির্বাচনে দুজন পুঁজিপতির নাম নির্বাচনী প্রচারে সর্বত্র আলোচিত হচ্ছে – এমন ঘটনা বিরল।

মিথ্যা বলা, সত্যকে বিকৃত করে উপস্থাপন করা এবারের নির্বাচনে জলভাত করে ফেলেছেন প্রধানমন্ত্রী। নির্বাচন শুরু হওয়ার পর থেকে কংগ্রেসের ইশতেহার সম্পর্কে বানিয়ে বানিয়ে নানা কথা বলে চলেছেন সাম্প্রদায়িক বিভাজন তৈরি করতে। অনেকেই বলছিলেন নিজের দলের ইশতেহার সম্পর্কে একটিও বাক্য খরচ না করে কেবলই কংগ্রেসের ইশতেহার সম্পর্কে অপপ্রচার আসলে প্রধানমন্ত্রীর উদ্বেগের প্রকাশ। তিনি সংসদের ভিতরে দাঁড়িয়ে প্রবল আত্মবিশ্বাসে ৪০০ আসন পার করার কথা বলেছিলেন। কিন্তু ভোটের ময়দানে যে প্রবণতার খোঁজ তিনি পাচ্ছেন তা ৫৬ ইঞ্চি বুকে ভরসা জোগাচ্ছে না। তাই সেই লালকৃষ্ণ আদবানির আমল থেকে বিজেপির যে পরীক্ষিত জয়ের ফর্মুলা, তাতেই ফিরে গেছেন – মুসলমানের ভয় দেখিয়ে হিন্দুদের ভোট কুড়াও।

এর না হয় তবু একটা ব্যাখ্যা হয়। কিন্তু তৃতীয় দফার ভোটের পরে তেলেঙ্গানার ওয়ারাঙ্গলে বক্তৃতা দিতে গিয়ে যে কথা মোদী বললেন, তার পিছনে যুক্তি কী? পাঁচ বছর ধরে কংগ্রেসের শাহজাদা সকাল থেকে মালা জপার মত আম্বানি, আদানির নাম বলতেন। ভোট ঘোষণা হতেই কেন এদের নাম বলা বন্ধ হয়ে গেল? নির্ঘাত আম্বানি, আদানির কাছ থেকে টেম্পো করে বস্তা বস্তা মাল কংগ্রেসের কাছে গেছে? শাহজাদা জবাব দিন – এই তাঁর বক্তব্য। রাজনীতিতে তো বটেই, নির্বাচনী প্রচারেও প্রত্যেকটা শব্দ মেপে খরচ করাই নিয়ম। তার উপর দশ বছর ধরে শুনে আসছি মোদী ভারতের সর্বকালের সেরা প্রধানমন্ত্রী। তিনি কি না ভেবেচিন্তে কিছু বলতে পারেন? তাহলে হঠাৎ নিজের সবচেয়ে বড় বন্ধুদের এভাবে বিরোধী দলকে গোপনে টাকা দেওয়ায় অভিযুক্ত করতে গেলেন কেন? অতীতে সংসদে রাহুল তথা বিরোধীরা আদানির সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে তাঁকে বারবার আক্রমণ করা সত্ত্বেও তিনি তো মুখ খোলেননি। তাহলে ভোটের ভরা বাজারে কেন এমন করলেন? ওই বক্তৃতার পরে বেশ কয়েকদিন কেটে গেছে। পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে, ওই কথায় বিজেপির সদস্য সমর্থকদের মধ্যে কোনো নতুন উদ্দীপনার সঞ্চার তো হয়নি বটেই, উল্টে রাহুলের ভিডিও জবাব ভাইরাল হয়ে গেছে। সমস্ত মূলধারার সংবাদমাধ্যমেও মোদীর কথার সঙ্গে সমান গুরুত্বে সেই জবাব সম্প্রচারিত হয়েছে এবং রাহুলের জবাবে রক্ষণাত্মক হওয়ার বিন্দুমাত্র প্রচেষ্টা নেই। বরং তিনি পালটা আক্রমণের রাস্তায় গিয়ে ফের ক্রোনি পুঁজিবাদ চালানোয় অভিযুক্ত করেছেন মোদী সরকারকে। বলেছেন, মোদী সরকার ২২ জন অতিধনী তৈরি করেছে, আমরা কয়েক কোটি লাখপতি বানাব। শুক্রবার উত্তরপ্রদেশে এক সভায় আরও এক ধাপ এগিয়ে বলেছেন, যখন কেউ ভয় পেয়ে যায় তখন আপন লোকেদের ডাকাডাকি করতে থাকে। মোদী হারের ভয় পেয়েছেন। তাই আম্বানি, আদানির নাম করছেন যাতে তাঁরা ওঁকে বাঁচান।

আমরা রাহুলের এসব কথায় বিশ্বাস করব না। কারণ নির্বাচনী প্রচারে গরম গরম কথা বলতেই হয়, বিশেষ করে বিরোধী পক্ষের নেতা হলে। আমরা খানিকক্ষণের জন্য একথাও ভুলে যাই, যে মোদী এক্ষেত্রেও মিথ্যাভাষণ করেছেন। রাহুল মোটেই ভোটের প্রচারে আম্বানি, আদানির নাম বলা বন্ধ করে দেননি। দি ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের এই প্রতিবেদনে পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে, নির্বাচন ঘোষণা হওয়ার পর থেকে রাহুল সাতবার সাতটা বক্তৃতায় ওই দুজনের নাম করেছেন।

আমরা বরং তর্কের খাতিরে ধরে নিই, মোদী সত্যি কথাই বলছেন। আমরা ধরে নিচ্ছি টেম্পোয় করে টাকা পাঠানোর কথাটা লোকের বুঝতে সুবিধা হবে বলে মোদী বলেছেন। মোদ্দাকথা হল, আম্বানি আর আদানি কংগ্রেসকে টাকা দিচ্ছেন এই নির্বাচনে। যদি একথা সত্যি হয়, তাও কিন্তু বিজেপির পক্ষে দুঃসংবাদ। কর্পোরেটবান্ধব মোদী সরকারের মাথার উপর থেকে যদি ভারতের সবচেয়ে ধনী দুই ব্যবসায়ীর হাত সরে গিয়ে থাকে তাহলে মোদীর সমূহ বিপদ। কারণ তাহলে বুঝতে হবে, তাঁরা হাওয়া খারাপ বুঝে পরবর্তী সরকারে নির্ণায়ক শক্তি হবে যারা, তাদের তুষ্ট করবেন ঠিক করেছেন। বস্তুত, অনেকেই খেয়াল করেছেন যে মোদীর এই বক্তব্য ধামাচাপা দেওয়ার জন্যে আদানির মালিকানাধীন চ্যানেল এনডিটিভি সেদিন মাতামাতি করছিল স্যাম পিত্রোদার মন্তব্য নিয়ে, যে মন্তব্যের সঙ্গে কংগ্রেস একমত নয় বলে পত্রপাঠ জানায়। তারপর পিত্রোদাকে কংগ্রেসের বৈদেশিক শাখার কর্তার পদ ছাড়তেও বাধ্য করা হয় সেইদিনই। কিন্তু পরদিন এনডিটিভি যা করেছে তা আরও কৌতূহলোদ্দীপক। সন্দেশখালির বিজেপি নেতা গঙ্গাধর কয়ালের গোপন ক্যামেরার সামনে শুভেন্দু অধিকারীর নির্দেশে ধর্ষণের মিথ্যা অভিযোগ দায়ের করানোর চক্রান্ত যেদিন ফাঁস হল, সেদিন থেকে সমস্ত গোদি মিডিয়ার মত এনডিটিভিও খবরটা যথাসম্ভব চেপে গিয়েছিল। কিন্তু বুধবার মোদীর ওই বক্তৃতার পরে বৃহস্পতিবার যখন রেখা পাত্রের ভিডিও প্রকাশ্যে এল, সে খবর এনডিটিভি দেখিয়েছে যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়ে।

এ কিন্তু মোদীর পক্ষে অশনি সংকেত। আদানি আর আম্বানি মিলে ভারতের মূলধারার সংবাদমাধ্যমের অনেকখানি দখল করে আছেন। ক্রোনি পুঁজিবাদ ভারতের সংবাদমাধ্যমেও মোদীর আমলে কাজ করেছে পুরোদমে। নিজের চা বিক্রেতার অতীত থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রির মত বহু নড়বড়ে সত্যের উপরে মোদীর যে বিশালকায় ভাবমূর্তি নির্মিত হয়েছে তা সম্ভব হত না এতগুলো সংবাদমাধ্যমের শতকরা একশো ভাগ সমর্থন না থাকলে। সেই সমর্থন যদি সরতে শুরু করে, ওই ভাবমূর্তি ভেঙে পড়তে বিশেষ সময় লাগবে না। এখন সোশাল মিডিয়ার যুগ, সবকিছু ঘটে বড্ড তাড়াতাড়ি। নির্বাচন কমিশনের বদান্যতায় এক দীর্ঘ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এখনো চারটে দফা বাকি, প্রথম তিন দফায় বিজেপি দারুণ ফল করবে এমনটা মোদীর ভাবভঙ্গি দেখে মনে হচ্ছে না। সে ভরসা থাকলে তাঁকে মরিয়া হয়ে আম্বানি, আদানির নাম করে রাহুলকে আক্রমণ করতে হত না। এমতাবস্থায় টিভি কভারেজ কমে গেলে মোদী যাবেন কোথায়? বিশেষত জি নেটওয়ার্কের মালিক এবং মোদীর একদা ঘনিষ্ঠ সুভাষ চন্দ্র যখন আগে থেকেই চটে আছেন ফের রাজ্যসভার টিকিট না পেয়ে। তিনি ওয়ার্ল্ড প্রেস ফ্রিডম ডে উপলক্ষে বলে বসেছেন যে ভারতে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা মোটেই ভাল জায়গায় নেই। তার চেয়েও বড় কথা, গোদি মিডিয়ার অন্যতম মুখ দীপক চৌরাসিয়াকে জি নিউজ ছাড়তে বাধ্য করা হয়েছে। সুধীর চৌধুরীর মত লোকও হঠাৎই মোদীর বক্তৃতার মিথ্যা দর্শকদের সামনে উদ্ঘাটন করতে শুরু করেছেন। এ সময় আম্বানি, আদানিকে কেউ চটায়?

আরও পড়ুন এনডিটিভি বিসর্জন: শোক নিষ্প্রয়োজন, উল্লাস অন্যায়

এই যে ভারতের মত এত বড় দেশের নির্বাচনে অন্যতম ইস্যু হয়ে উঠেছেন দুজন পুঁজিপতি – এটাই প্রমাণ করে একবিংশ শতাব্দীর গণতন্ত্র পুঁজিপতিদের উপরে কতখানি নির্ভরশীল। বিজেপি মুখপাত্ররা অনেকে প্রধানমন্ত্রীর সেদিনের বক্তৃতার পক্ষে দাঁড়াতে গিয়ে বলছেন – ঠিকই বলছেন – যে রাহুল উঠতে বসতে আম্বানি-আদানির চোদ্দ পুরুষ উদ্ধার করেন, সেই রাহুলের দলের মুখ্যমন্ত্রীরাই ওই দুজনের শিল্প নিজের রাজ্যে টেনে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন। এই দ্বিচারিতা কেন? কথা হল, পুঁজিবাদ নয়া উদারবাদী অর্থনীতির সাহায্যে এই শতকে গণতন্ত্রের ঘাড়ে এমনই চেপে বসেছে যে এই দ্বিচারিতা না করে কোনো সরকারে থাকা দলের উপায় নেই। সরকারি সম্পত্তি, সরকারি শিল্পগুলোর বারোটা বাজিয়ে দেওয়া শুরু হয়েছিল ১৯৯১ সাল থেকেই। সেই প্রকল্পের দ্রুততা বাড়িয়ে মোদী সরকার প্রায় সমস্ত রাষ্ট্রীয় সম্পত্তিই তুলে দিয়েছে কর্পোরেটের হাতে। এখন যে সরকার জনকল্যাণমুখী হতে চায়, তার নিজের টাকা রোজগারের পথ এত সংকীর্ণ হয়েছে যে পুঁজিপতিদের উপরে নির্ভর করা ছাড়া উপায় নেই। অথচ তারা তা হতে দেবে না। কারণ রাষ্ট্র নাগরিকে পরিষেবা দিতে সক্ষম হলে কর্পোরেটের থেকে পরিষেবা কিনবে কে? সরকারি হাসপাতাল ঝকঝকে তকতকে হলে, ভাল চিকিৎসা শস্তায় করে দিলে বেসরকারি হাসপাতালে কে যাবে?

সুতরাং রাহুলের আসল পরীক্ষা শুরু হবে সরকারে আসতে পারলে। এখন মোদীকে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়ে কয়েক কোটি লাখপতি তৈরি করার কথা বলা সোজা। কিন্তু মোদীর চেয়ারে বসার সুযোগ পাওয়া গেলে দলের ইশতেহারে যে গুচ্ছ গুচ্ছ জনকল্যাণমুখী প্রকল্পের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে তা পূরণ করতে গেলে আম্বানি, আদানিদের সঙ্গে সরাসরি সংঘাতে যেতে হবে। চোখ বুজে বলে দেওয়া যায়, বিরোধিতা হবে তাঁর নিজের দলের ভিতর থেকেও। সেসব সামলে কি ইশতেহারের প্রতিশ্রুতি পূরণ করা সম্ভব হবে? পারলে তা গোটা পৃথিবীতে উদাহরণ হয়ে থাকবে। কারণ ক্রোনি পুঁজিবাদের হাত থেকে উদ্ধারের পথ এখন সব দেশেই খোঁজা হচ্ছে। উদারনৈতিক গণতন্ত্রের পিঠ দেয়ালে ঠেকে গেছে। ঋজু বিদূষক কুণাল তাঁর সাম্প্রতিক এক ভিডিওতে মোদীর বদলে কে – এই প্রশ্নের যে উত্তর দিয়েছেন, তা এখন অনেক দেশেরই দুর্দশাগ্রস্ত মানুষের মনের কথা – ‘খালি চেয়ারও চলবে’

পিপলস রিপোর্টারে প্রকাশিত

হাসছি মোরা হাসছি দেখো: বীর দাসের বীরত্বে দুই ভারতের পর্দা ফাঁস

দুটো ভারতের কথাই বিদূষক বীর দাস মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কেনেডি সেন্টারে দাঁড়িয়ে হলভর্তি দর্শকের সামনে বলেছেন। বস্তুত, তিনি কোনো রসিকতা করেননি। কোনো চুটকি বলেননি। কেবল ভারতে ঘটে যাওয়া কতকগুলো ঘটনা পরপর আউড়ে গেছেন। তাতেই এক ভারত এফআইআর করে ফেলেছে, অন্য ভারত উঠে দাঁড়িয়ে হাততালি দিচ্ছে।

কিসে আমাদের হাসি পায়? এ প্রশ্নের উত্তরের মধ্যেই লুকিয়ে আছে আমরা কারা — সে প্রশ্নের উত্তর। হাসি যে এভাবে মানুষ চেনায় তা ২০১৪ পরবর্তী ‘স্বাধীন’ ভারতে বাস না করলে বোধহয় বোঝা হত না। এখন হোয়াটস্যাপ, ফেসবুক, টুইটারে অনবরত হাসির উপাদান আসে। চাইলেই এমন ব্যবস্থা করা সম্ভব যাতে সারাদিন মোবাইলে কেবল চুটকিই আসতে থাকবে। কদিন পরে গুগল যখন বুঝবে আপনি হাসবেন বলেই বাঁচেন, তখন আপনাকে খবর হিসাবেও নানারকম চুটকি, মিম আর হাস্যকর ভিডিও পাঠাতে থাকবে।
 

আমরা সবাই হাসছি, গোটা দেশ হাসছে। সবাই, সবকিছুই হাসির পাত্র। একজন নিরস্ত্র লোককে গুলি করে মেরে ফেলেছে পুলিস, এক উল্লসিত মানুষ লাফিয়ে উঠে তার বুকে লাথি মারছে। তেমন হোয়াটস্যাপ গ্রুপে থাকলে এ নিয়েও একাধিক চুটকি পড়তে পারবেন। একটা মিছিলের লোকেদের পিছন থেকে এসে পিষে দিয়ে চলে গেছে একটা গাড়ি। পিষে যাওয়া লোকগুলোকে নিয়েও কৌতুক করা সম্ভব। তাছাড়া মহিলারা কত বোকা তা নিয়ে, একইসঙ্গে তারা পুরুষদের কেমন দাঁতের উপর রাখে তা নিয়েও অজস্র কৌতুক বিতরণ হয় আজকাল। মুসলমানদের রক্ষণশীলতা, পুরুষদের দাড়ি আর মহিলাদের বোরখা নিয়েও দারুণ বুদ্ধিমান এবং প্রবল শিক্ষিত লোকেরা মাথা খাটিয়ে হাজার হাজার জোক ও মিম তৈরি করছেন। আজকাল হাসির প্রয়োজনীয়তা এত প্রবল, যে নাচগানের অনুষ্ঠানেও লোক না হাসালে টিআরপি পাওয়া যায় না। আর হাসাতে হলে যে জাতিবিদ্বেষপূর্ণ বিদ্রুপ করতেই হবে তা স্বতঃসিদ্ধ। কদিন আগেই নাচের অনুষ্ঠানের এক সঞ্চালক গৌহাটির এক শিশুশিল্পীকে দর্শকদের সামনে হাজির করেছেন “চাইনিজ”, “মোমো”, “চিং চং” বলে। এসব দেখেও আমাদের হাসি পায়। রসিকতাটাকে জাতিবিদ্বেষপূর্ণ বললে আরও বেশি হাসি পায়। কারণ জাতিবিদ্বেষও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা বলে ভাবতে আমরা অভ্যস্ত, যতক্ষণ না বিদ্বেষটা আমাদের জাতির প্রতি ধেয়ে আসে।

কিসে আমাদের হাসি পায় না? এর উত্তরও বলে দেবে আমরা কারা। পেট্রোল, ডিজেলের লাগামছাড়া দাম নিয়ে রসিকতা করলে আমাদের হাসি পায় না। প্রধানমন্ত্রীকে নিয়ে রসিকতা করলে আমাদের হাসি পায় না। দেবদেবীদের নিয়ে, পৌরাণিক চরিত্রদের নিয়ে রসিকতা করলেও আমাদের হাসি পায় না। দেশের দোষত্রুটি, দুর্নীতি নিয়ে রসিকতা করলে আমাদের হাসি পায় না। শুধু হাসি পায় না তা-ই নয়, ওসব নিয়ে রসিকতা করলে আমরা বেজায় চটে যাই। চটে গিয়ে মতপ্রকাশের স্বাধীনতার কথা আর মনে থাকে না। তখুনি আমরা তেড়ে গাল পাড়ি, রসিকতা করা বিদূষক বা কার্টুনিস্টকে পাকিস্তানে চলে যেতে বলি। আমাদের মধ্যে যারা উদ্যোগী, তারা এফআইআর পর্যন্ত করি। কিন্তু এই আমরাই সব নই। আমাদের আরেক দল আছে।

এই আমাদেরও হাসি পায়। আমরা মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে হাসাহাসি করি। ভারত ১৯৪৭ সালে নয়, ২০১৪ সালে স্বাধীন হয়েছে শুনে হাসাহাসি করি। যারা এসব বলে তাদের মধ্যে স্বাধীনতা সংগ্রামীর সংখ্যা যে শূন্য, তা নিয়ে হাসাহাসি করি। প্রধানমন্ত্রীর দাড়ি আর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ভুঁড়ি নিয়ে রসিকতায় হাসি। আমরা লক্ষ্মণের শক্তিশেল পড়ে হাসি, যানে ভি দো ইয়ারোঁ ছবির শেষ দৃশ্য দেখে হেসে গড়িয়ে পড়ি। আর কিসে আমাদের হাসি পায়? প্রধানমন্ত্রী সমেত দেশের সবচেয়ে দায়িত্বপূর্ণ লোকেদের কার্যকলাপ এবং অবলীলাক্রমে দিনকে রাত, রাতকে দিন করার ক্ষমতা দেখে হাসি পায়। পেঁয়াজের দাম এত বাড়ছে কেন জিজ্ঞেস করলে অর্থমন্ত্রী যখন বলেন “আমি পেঁয়াজ খাই না”, তখন আমাদের হাসি পায়। চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য আলেকজান্ডারকে না হওয়া যুদ্ধে হারিয়েছিলেন শুনে আমাদের হাসি পায়। গুজরাটে পথের ধারে আমিষ খাবার বিক্রি করতে দেওয়া হবে না শুনেও হাসি পায়, কারণ আমরা নিরুপায়। আমরা কেবল হাসতে পারি, আর কিছুই করতে পারি না। মানুষ তো কেবল মজা পেয়ে হাসে না, চরম দুর্দশাতেও হাসে। আমাদের এখন সেই অবস্থা। দেশের প্রধান নিরাপত্তা উপদেষ্টা যখন বলেন নাগরিক সমাজের সাথেও লড়তে হবে, তখনো আমাদের হাসি পায়। কিন্তু ভয়ে হেসে উঠতে পারি না। যখন দেশের সেনাবাহিনীর প্রধান গণপিটুনিকে বৈধ ঘোষণা করেন, তখনো হাসতে পারলে আমরা খুশি হতাম। কিন্তু সাহস হয় না, কারণ আমাদের গায়ে ‘দেশদ্রোহী’ ছাপ দিনরাত পড়ে। ‘সন্ত্রাসবাদী’ ছাপ পড়তে কতক্ষণ?

এই দুই আমরা — ভারতের বাসিন্দা। দুটো ভারত। এই দুটো ভারতের কথাই বিদূষক বীর দাস মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কেনেডি সেন্টারে দাঁড়িয়ে হলভর্তি দর্শকের সামনে বলেছেন। বস্তুত, তিনি কোনো রসিকতা করেননি। কোনো চুটকি বলেননি। কেবল ভারতে ঘটে যাওয়া কতকগুলো ঘটনা পরপর আউড়ে গেছেন। তাতেই এক ভারত এফআইআর করে ফেলেছে, অন্য ভারত উঠে দাঁড়িয়ে হাততালি দিচ্ছে। কারণ বীর দাস যে কথাগুলো সহজ ভাষায় বলেছেন, সেগুলো দেশের কোনো বিরোধী নেতা এখন পর্যন্ত বলেননি। প্রথিতযশা সাংবাদিকদের অধিকাংশ হয় মিথ্যে বলার শিল্পে দড় হয়ে উঠেছেন, নয় নিরপেক্ষতার অজুহাতকে ঢাল করে ফেলেছেন। এখনো সত্য খোঁজার, সত্য লেখার, সত্য দেখানোর সাহস যাঁদের আছে তাঁরা সিদ্দিক কাপ্পানের মত কারাগারে পচছেন। অবিনাশ ঝায়ের মত খুন হচ্ছেন। সমৃদ্ধি সকুনিয়া আর স্বর্ণা ঝায়ের মত আটক হচ্ছেন।

হয়ত বীরও কোনোদিন আটক হবেন অথবা তাঁর পেশার বারোটা বাজিয়ে দেওয়া হবে, যেমনটা মুনাওয়ার ফারুকির ক্ষেত্রে করা হল। হয়ত বীর, কুণাল কামরা, বরুণ গ্রোভাররা মুসলমান নন বলেই কিছুটা বেশি সুযোগ পাচ্ছেন। কিন্তু সেই সুযোগের সদ্ব্যবহার করে বীর বুঝিয়ে দিলেন তিনি কোন ভারতের সঙ্গে আছেন। তিনি সার্থকনামা।

আরো পড়ুন বাংলার কূপমণ্ডূক হাসি

আমাদের বাংলায় হবে সেই ছেলে কবে? এখানে আপাতত পদ্মলোচন নামের কানা ছেলেদের ছড়াছড়ি। কেবল অরাজনৈতিক, মোটা দাগের যৌন রসিকতার উদযাপন চলছে। যে দেশের সাংবাদিকরা বিকিয়ে যায় সে দেশ নিশ্চয়ই দুর্ভাগা, কিন্তু যে জাতির বিদূষকরা সুবিধাবাদী — তাদের দুর্দশা আরও বেশি। বাঙালি এখন সেই জাতি। ইন্টারনেট ঘাঁটলেই হিন্দি বলয়ের অনেকের ভিডিও দেখা যায়, যাঁরা বীর বা কুণালদের মত বিখ্যাত না হলেও যোগী আদিত্যনাথের মত ভয়ঙ্কর লোককে নিয়েও রসিকতা করতে ভয় পান না। বাংলায় তেমন কেউ কই? ভাবলে অবাক লাগে, এই ভাষারই একজন কবি লিখেছিলেন সেই পংক্তিগুলো, যা বীরকে ভুল প্রমাণ করতে উঠে পড়ে লাগা ভারতীয়দের মনের ভাব প্রকাশ করেছে নিখুঁতভাবে

অভয় দিচ্ছি, শুনছ না যে? ধরব নাকি ঠ্যাং দুটা?
বসলে তোমার মুণ্ডু চেপে বুঝবে তখন কাণ্ডটা!
আমি আছি, গিন্নি আছেন, আছেন আমার নয় ছেলে —
সবাই মিলে কামড়ে দেব মিথ্যে অমন ভয় পেলে।

নাগরিক ডট নেট ওয়েবসাইটে প্রকাশিত

বাংলার কূপমণ্ডূক হাসি

বাঙালি বিদূষকদের সেই মেধা নেই, সেই সাহস নেই — যা থাকলে ভাঁড় মোসাহেব হয়ে থাকেন না, বিদূষক হয়ে ওঠেন।

দুটো বিপরীতার্থক শব্দ নিয়ে বাঙালির দুই আইকন বিস্তর ভাবনা চিন্তা করেছেন। রবীন্দ্রনাথ “বিশ্বনাগরিক” শব্দটা আমাদের দিয়েছেন, আর সত্যজিৎ রায় তাঁর সারাজীবনের কাজে সিধু জ্যাঠা, প্রফেসর শঙ্কুর মত বিশ্বনাগরিককে আঁকার পর শেষ ছবি ‘আগন্তুক’-এ পর্যটক মনমোহনের মাধ্যমে “কূপমণ্ডূক” হতে বারণ করেছেন। বাঙালি নিজেকে বিশ্বনাগরিক বলে পরিচয় দিতে বিলক্ষণ ভালবাসে। কিন্তু দুঃখের বিষয় যত দিন যাচ্ছে, তার মধ্যে কূপমণ্ডূকতার লক্ষণগুলোই প্রকট হতে দেখা যাচ্ছে। বাঙালির সংস্কৃতি নিয়েও গর্বের শেষ নেই। সংস্কৃতি প্রায় নির্বাচনী ইস্যু হয়ে দাঁড়িয়েছে, অনেকের ধারণা কালচার শব্দটা বাংলাই। সেই কালচারেই আপাদমস্তক কূপমণ্ডূকতা দেখা যাচ্ছে। গোপালকৃষ্ণ গোখেল দেড়শো বছর আগে বলেছিলেন আজ বাংলা যা ভাবে, কাল ভারত তাই ভাবে। তা নিয়ে আমরা আজও গর্ব করি। অথচ এখন শিল্প, সাহিত্য, সিনেমা — সবেতেই ভারত আজ যা ভাবছে, বাংলা আগামী পরশুও ভেবে উঠতে পারবে বলে ভরসা হচ্ছে না।

গুরুগম্ভীর ব্যাপার বাদ দিয়ে হাসি তামাশা নিয়েই আলোচনা করা যাক। হাতে হাতে স্মার্টফোন আর শস্তা ইন্টারনেটের কারণে এখন অ্যামাজন, নেটফ্লিক্সের মত ওটিটি প্ল্যাটফর্ম আর ইউটিউবের রমরমা। এসবে বিনোদন বলতে শুধু সিনেমা আর ওয়েব সিরিজ বোঝায় না, স্ট্যান্ড আপ কমেডিও বোঝায়। মানে একজন শিল্পী মাইক হাতে লোক হাসান। ব্যাপারটা কিছুটা বক্তৃতা, কিছুটা অভিনয়। কিন্তু উদ্দেশ্য লোক হাসানো। সারা পৃথিবীতেই ব্যাপারটা এখন দারুণ জনপ্রিয়। তবে এই স্ট্যান্ড আপ কমেডিয়ানরা শুধু লোক হাসানোয় থেমে নেই। সারা পৃথিবীতে গত কয়েক বছরে গণতন্ত্রের সঙ্কটে এঁরা প্রতিবাদী স্বর। এই বিদূষকদের পিচকিরি থেকে ছুটে আসা রসিকতার রঙে ডোনাল্ড ট্রাম্প, ভ্লাদিমির পুতিন, জেয়ার বলসোনারো, নরেন্দ্র মোদী, অ্যাঞ্জেলা মেরকেল, জাস্টিন ট্রুডো — সকলের কাপড় চোপড় নষ্ট হচ্ছে। ট্রেভর নোয়া, হাসান মিনহাজরা রীতিমত তারকা হয়ে উঠেছেন অল্প সময়েই। ব্রিটিশ কমেডিয়ান জন অলিভার হাসানোর শিল্পকে অন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছেন। তাঁর শো লাস্ট উইক টুনাইট রীতিমত খবরের বুলেটিন। শুধু পরিবেশনের আঙ্গিকে নয়, বিষয় নির্বাচন আর গবেষণার গভীরতাতেও। সারা পৃথিবীর শাসক, ক্ষমতাশালী, অতি ধনীরা তাঁর রসিক বুলেটিনের চাঁদমারি।

ইউরোপ, আমেরিকার বিদূষকদের সুবিধা এই, যে তাঁদের বিরুদ্ধে গণ আক্রমণ বা রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস হয়নি এখনো। ভারতে হয়েছে, হচ্ছে। কুণাল কামরা শো করতে গিয়ে বাধা পেয়েছেন একাধিক জায়গায়, অনলাইন হুমকি তো পেয়েই থাকেন। আরেক বিদূষক বরুণ গ্রোভার তো একটা শোতে হাসতে হাসতে বলেছিলেন “আমাকে অনেকে জিজ্ঞেস করে ‘এত যে হুমকি পান, ভয় করে না?’ আমি বলি আমার আগে তো কামরার নম্বর আছে। ওর ভাল মন্দ কিছু একটা হয়ে যাক, তারপর ভয় পাব।” এসবের ফলে যা হয়েছে, তা হল ভারতে বিদূষকরা হয়ে দাঁড়িয়েছেন প্রতিবাদের মুখ। ক্ষমতা যত টুঁটি টিপে ধরছে, এঁরা তত বেপরোয়া হচ্ছেন। কুণালের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টকে অবমাননার অভিযোগ আনা হয়, তিনি ক্ষমা চাইতে অস্বীকার করেন। তার কয়েক মাস আগেই জনপ্রিয় দক্ষিণপন্থী সংবাদ পরিবেশককে তাঁরই কায়দায় প্রশ্ন করার “অপরাধে” কুণালের বিমানে চড়ার অধিকার কেড়ে নেওয়া হয় ছ মাসের জন্য। তবে সবকিছু ছাপিয়ে গেছে মুনাওয়ার ফারুকির উপর আক্রমণ। শোতে ঢুকে পড়ে তিনি কী বলতে পারেন (বলেননি কিন্তু), তা ধরে নিয়ে গ্রেপ্তারি এবং দিনের পর দিন বিনা জামিনে হাজতবাস করানো হয়েছে দিনের পর দিন। স্বাধীন ভারতে দলীয় রাজনীতির বাইরে থাকা কোন মানুষের সাথে রাষ্ট্রের এরকম ব্যবহার বিরল। কুণাল মুনাওয়ারের পাশে দাঁড়িয়েছেন, আইনি লড়াইয়ে সবরকম সাহায্য করেছেন।

দেশ বিদেশের বিদূষকরা যখন এরকম ধুন্ধুমার কাণ্ড করে বেড়াচ্ছেন, তখন বাংলার বিদূষকদের দেখুন। বিভিন্ন বাংলা চ্যানেলে লাফটার চ্যালেঞ্জ মার্কা একাধিক অনুষ্ঠান দেখা যায়। তার উপর আছে ফেসবুক, ইউটিউব চ্যানেল। এতজন হাস্যরস উৎপাদন করছেন অথচ কারোর রসিকতা কোন নেতা নেত্রী আমলা ব্যবসায়ীর গায়ে লাগছে না। কারণ লোক হাসাতে বাঙালি বিদূষকরা কেবল বেঁটে লোককে বেঁটে, মোটা লোককে মোটা বলছেন আর অতি স্থূল, নারীবিদ্বেষী যৌন রসিকতা করছেন। নিজস্ব কুয়োয় নিরাপদ হাসি চলছে। অথচ এমন নয় যে বাংলার রাজনীতি বৈকাল হ্রদের মত নির্মল আর ডেড সি-র মত শান্ত। গত এক-দেড় দশকে জানা গেছে এখানে একজন রাজনীতিবিদ আছেন, যিনি প্রতিপক্ষকে খুনের হুমকি দেন কারণ তাঁর মস্তিষ্কে ঠিকমত অক্সিজেন যায় না। আরেকজন আছেন, যিনি সাংবাদিকের পশ্চাদ্দেশে পিন ফোটাতে চান। আরো একজন আছেন, যিনি গরুর দুধ থেকে নিষ্কাশন করতে পারেন। অতি সম্প্রতি আবার এক দম্পতিকে পাওয়া গেছে, যাঁদের বৈবাহিক জীবনের সবকিছুই রাজনীতির স্বার্থে প্রকাশ্য। তার উপর আছে দলবদলান্তে ভোল বদল। এক কথায় বাংলার জমি এখন হাসি তামাশার পক্ষে অতি উর্বর। কুণাল কামরার ভাষায় বলতে গেলে “কাঁহা মিলেগা ইতনা কনটেন্ট?” এমনও বলা যায় না যে সাধারণ দর্শক এসব নিয়ে হাসি তামাশা পছন্দ করেন না। হোয়াটস্যাপ, ফেসবুকে তাঁরা বাংলার রাজনীতি নিয়ে অনর্গল রসিকতা করছেন, রসিকতা শেয়ার করছেন। আসলে বাঙালি বিদূষকদের সেই মেধা নেই, সেই সাহস নেই — যা থাকলে ভাঁড় মোসাহেব হয়ে থাকেন না, বিদূষক হয়ে ওঠেন।

আরও পড়ুন হাসছি মোরা হাসছি দেখো: বীর দাসের বীরত্বে দুই ভারতের পর্দা ফাঁস

হাস্যরস উৎপাদনে বাঙালির এই কূপমণ্ডূকতা দ্বিগুণ দুঃখজনক, কারণ উনবিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধে হুতোম প্যাঁচার নকশার প্রবল শ্লেষ থেকে শুরু করে শরচ্চন্দ্র পণ্ডিত, সুকুমার রায়, রাজশেখর বসু হয়ে সদ্য শতবর্ষ পার করা ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়, জহর রায়, রবি ঘোষ যে হাস্যরসের পরম্পরা প্রতিষ্ঠা করেছেন বাঙালির সাহিত্যে, সিনেমায়, মঞ্চে দাঁড়িয়ে হাস্যকৌতুক বলায় — তা কখনো সমকালীন সমাজ, রাজনীতিকে পাশ কাটিয়ে যায়নি। উদাহরণের তালিকা দীর্ঘ না করে শুধু এইটুকু বলা থাক, ভানুবাবুর ‘নবরামায়ণ’ যদি এ যুগে অ্যামাজন বা নেটফ্লিক্সের জন্য তৈরি করা হত, তাহলে ক্ষমতাসীনরা প্রবল তাণ্ডব করতেন। হয়ত ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি থেকে নির্বাসনের ব্যবস্থাও করে দেওয়া হত। উনি অবশ্য পিছু হটতেন বলে মনে হয় না। সে যুগে বামপন্থী সংগঠন করার জন্য টালিগঞ্জে কাজ না পেয়ে ডোন্ট কেয়ার মনোভাব নিয়ে যাত্রা করতে চলে গিয়েছিলেন। এ যুগে হয়ত বলতেন “তগো ইন্ডাস্ট্রি নিয়া তোরা থাক। আমাগো ইউটিউব চ্যানেলে আমি ড্যাং ড্যাং কইরা অভিনয় করুম।”

উত্তরবঙ্গে সংবাদে প্রকাশিত