অপারেশন সিঁদুর যে যে কারণে ভাল লাগল

গত কয়েকদিনে যা বুঝলাম, মোদিজি যতই স্লোগান দিন ‘বেটি বচাও, বেটি পঢ়াও’, এদেশের প্রগতিশীলরাও সিঁদুরকেই মেয়েদের সবচেয়ে দামি সম্পত্তি বলে মনে করেন।

২০২৫ সালের ৭ মে তারিখটা এ-জীবনে আর ভুলতে পারব বলে মনে হয় না। সকালে ঘুম থেকে উঠেই খবর পেলাম— বিশ্ব যখন নিদ্রামগন গগন অন্ধকার, তখন পহলগামে পাক-মদতপুষ্ট সন্ত্রাসবাদীদের হাতে মৃত ২৬ জনের হয়ে শোধ তুলে নিয়েছে ভারতীয় বায়ুসেনা। পাড়ার দোকানে, মোড়ের মাথায় জোর আলোচনা— পাকিস্তানকে টের পাইয়ে দেওয়া গেছে। যে-সব দোকানে খদ্দের কম হলেও আমদানি বেশি, সেখানে দেয়ালে লাগানো টিভিতে পাড়া কাঁপিয়ে চিৎকার করছেন বিভিন্ন চ্যানেলের অ্যাঙ্কররা। শুনে মনে হল, তাঁরাই প্রাণের ঝুঁকি নিয়ে বোম ফেলে এসেছেন সীমান্তের ওপারে। বায়ুসেনার অফিসাররা নন। ভালো লাগল সকাল সকাল, মনে হল— আমিও পারি। আমরা যারা জীবনে কিছুই পারি না, ফ্ল্যাট কেনার পর ২-৩ বছর কেটে গেলেও প্রোমোটার লিফট লাগাচ্ছে না দেখে ক্রেতা সুরক্ষা আদালতে মামলা ঠুকতেও ভয় পাই, তাদের আত্মবিশ্বাস তুঙ্গে তুলে দিতে পারেন একমাত্র টিভি চ্যানেলের সাংবাদিকরা।

তবে এখানেই শেষ নয়। দিনটা আরও স্মরণীয় হয়ে গেল বেলা দশটার পরে, যখন নতুন দিল্লিতে ভারত সরকারের পক্ষ থেকে সরকারিভাবে সংবাদমাধ্যমকে জানানো হল ঠিক কী ঘটানো হয়েছে এবং কীভাবে। চারপাশে খুশির পরিবেশ তৈরি হলে নিজেরও ভাল লাগে। দেখলাম ব্রিফিং শেষ না হতেই আমার আত্মীয়, প্রতিবেশী, বন্ধু— সকলেই দারুণ খুশিয়াল হয়ে উঠেছে। না, সরকারের সমর্থকদের কথা বলছি না। যারা সরকারবিরোধী তাদের কথাই বলছি। যারা ধর্মনিরপেক্ষ তাদের খুশির কারণ মূলত দুটো। বিদেশসচিব বিক্রম মিশ্রি এ-কথা বলেননি যে পহলগামে হিন্দুদের আলাদা করে মারা হয়েছে। তার উপর তিনি বলেছেন যে সন্ত্রাসবাদীদের অনেক লক্ষ্যের মধ্যে একটা ছিল জম্মু ও কাশ্মীরে এবং বাকি ভারতে সাম্প্রদায়িক অশান্তি সৃষ্টি করা।

তবে! এই যে ধর্মনিরপেক্ষ বন্ধুদের সেদিন থেকে সেকু বলে গাল দেওয়া হচ্ছিল, এখন হল তো? ভারত সরকার নিজেই বলল তো, যে ধর্মনিরপেক্ষ লোকেদের কোনও দোষ নেই, বরং মানুষে মানুষে ধর্মের ভিত্তিতে ভেদাভেদ করা সন্ত্রাসবাদীদের কাজ? এত বড় সরকারি সিলমোহর ভারতের ধর্মনিরপেক্ষ মানুষ সেই ২০১৪ সাল থেকে পাননি। আহ্লাদ হবে না? পরিষেবা বেসরকারি হলে ভালো হবে জানি, কিন্তু স্বীকৃতিটা যে সরকারি না হলে আমাদের চলে না। তা পেয়ে গিয়ে আমারও গর্বে বুকটা ফুলে উঠল। ময়ূখ ঘোষ যা-ই বলুন, এতদ্বারা আমরা সেকুরাই জিতে গেলাম শেষমেশ। নরেন্দ্র মোদির মতো লোকের সরকার পর্যন্ত মানতে বাধ্য হল— ধর্মনিরপেক্ষতাই আমাদের সবচেয়ে বড় শক্তি। নেহাত সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের মতো প্রতিভা নিয়ে জন্মাইনি, নইলে গেয়েই উঠতাম ‘কী মিষ্টি, দেখো মিষ্টি/কী মিষ্টি এ সকাল’।

ওটুকু মিষ্টিতেই গোটা দিনটা কেটে যেতে পারত। কিন্তু আমাদের ধর্মনিরপেক্ষ পাতে রসগোল্লার পরে কালাকাঁদের ব্যবস্থাও করে রেখেছিল সরকার। বিক্রমবাবুর দুইদিকে বসিয়ে দেওয়া হয়েছিল দুই মহিলা সেনা অফিসারকে— ব্যোমিকা সিং আর সোফিয়া কুরেশি। একজন হিন্দু, একজন মুসলমান। আহা! কী বুদ্ধিই না করেছেন বিদেশমন্ত্রী জয়শঙ্করবাবু। পাকিস্তানের লক্ষ্য ছিল ভারতীয় হিন্দু আর ভারতীয় মুসলমানের মধ্যে বিভাজন তৈরি করা। কিন্তু জয়শঙ্করবাবু কি সোজা লোক? জেএনইউয়ের প্রাক্তনী বলে কথা। না হয় মন্ত্রী-টন্ত্রী হবেন বলে বিজেপিতে ভিড়েছেন। তা বলে কি আর অ্যালমা মাটারকে ভারতমাতার চেয়ে কম গুরুত্ব দেন? বিশ্বগুরুর মন্ত্রিসভায় ঢোকার অনেক আগেই বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে বাঙালি সেকু, মাকু বন্ধুদের মুখে নির্ঘাত কবিগুরুর কবিতা শুনেছিলেন। তাই তো প্রেস ব্রিফিংয়ে একেবারে ‘ভারততীর্থ’ দেখিয়ে দিলেন পাকিস্তানকে। ওঃ! মাস্টারস্ট্রোক। বিজেপি সমর্থকদের চেয়েও জোরে জোরে সমস্বরে আমার ধর্মনিরপেক্ষ বন্ধুরাই বলতে শুরু করলেন।

এখানেই শেষ নয়। আনন্দ আরও বেড়ে গেল নারীবাদী বন্ধুদের আনন্দ দেখে। এরকম একটা গুরুতর সন্ত্রাসবাদী আক্রমণের জবাব দেওয়ার অপারেশনের নাম দেওয়া হয়েছে ‘অপারেশন সিঁদুর’। মানে যে মহিলাদের সিঁদুর সেদিন সন্ত্রাসবাদীরা মুছে দিয়েছে তাদের সরকার সম্মান জানাল। তাও আবার দায়সারাভাবে নয়, প্রত্যাঘাতের ব্রিফিংয়ে দুই মহিলা অফিসারকে পাঠিয়ে। এমন ‘সিম্বলিজম’ অতুলনীয়। পাকিস্তান পারবে এরকম? পারবে যে না, তা নিয়ে দেখলাম বিজেপিবিরোধী নারীবাদী আর বিজেপি সমর্থকরা একমত। দুই পক্ষেরই বক্তব্য মোটামুটি এক— পাকিস্তানের মেয়েরা বোরখায় বন্দি, এদিকে আমাদের মেয়েরা যুদ্ধে যাচ্ছে শুধু নয়, নেতৃত্বও দিচ্ছে। মোদি সরকার যতই খারাপ হোক, এই ব্যাপারটা হেব্বি দিয়েছে।

আনন্দে ভাসতে ভাসতেই দেখলাম একে একে ভারতের সংসদীয় মার্কসবাদী দলগুলোর বিবৃতিও এসে পড়েছে। সকলেই সেনাবাহিনীকে বাহবা দিয়েছে। লিবারেশন ছাড়া কেউ যুদ্ধ যেন না হয় সে চেষ্টা করতে হবে— এ-কথা বলেনি। পাকিস্তান সরকারকে অনেক পরামর্শ-টরামর্শ দিয়েছে সন্ত্রাসবাদীদের ঘাঁটি ভেঙে দেওয়া, দোষীদের ভারতের হাতে তুলে দেওয়া ইত্যাদি সম্পর্কে। কিন্তু ভারত সরকারের কাছে পহলগামের ঘটনার তদন্তের কী হল— সে প্রশ্ন তোলেনি। কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খড়্গে কদিন আগেই অভিযোগ করেছিলেন যে, প্রধানমন্ত্রীর কাছে আগে থেকেই খবর ছিল যে কাশ্মীরে পর্যটকদের উপর হামলা হতে পারে। সেই কারণেই নাকি তিনি কাশ্মীর সফর বাতিল করেন। তাহলে নিরস্ত্র মানুষগুলোর প্রাণ বাঁচানো গেল না কেন? সে-প্রশ্নের জবাবও কোনও মার্কসবাদী দলের বিবৃতিতে চাওয়া হয়নি। এমনকি এতজন নিরপরাধ, নিরস্ত্র ভারতীয়ের মৃত্যুর ঘটনা নিয়ে যে দুটো সর্বদলীয় বৈঠক হল তার একটাতেও প্রধানমন্ত্রী উপস্থিত থাকলেন না কেন— সে-প্রশ্নও মাত্র দ্বিতীয় বৈঠকের পরে তোলা হয়েছে। সিপিআই দলের বিবৃতিতে তবু দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা প্রশমিত করার দাবি জানানো হয়েছে, সিপিএমের বিবৃতিতে কেবলই ভারত সরকারের জন্যে হাততালি আর পাকিস্তানের উপর চাপ বজায় রাখার পরামর্শ। দ্বিতীয় বৈঠকে সিপিএম সাংসদ জন ব্রিটাসের বক্তব্যে তবু খানিকটা সরকারের কাছে জবাবদিহি চাওয়ার প্রবণতা দেখা গেছে।

দেখে শুনে বুঝলাম, আমার মার্কসবাদী বন্ধুরাও খুবই আনন্দ পেয়েছে। অ্যাদ্দিন জানতাম তারা উল্লসিত হলে ‘লাল সেলাম’ বলে। এবার দেখলাম ‘জয় হিন্দ’ চালু হয়েছে। ‘ভারত মাতা কি জয়’ নেই দেখে অবাক হলাম। কারণ অনেকে বলেই দিয়েছে— রাজনৈতিকভাবে বিজেপির সঙ্গে মতপার্থক্য থাকতে পারে, কিন্তু দেশের সুরক্ষার প্রশ্নে সবাই এক। সিঁদুরকৌটোর ছবিওলা পোস্টারও অনেক কমরেড সগর্বে শেয়ার করেছেন।

সত্যি বলছি, বামে-ডানে এমন ঐক্য জন্মে দেখিনি। স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাস পড়েছিলাম হোয়াটস্যাপ ইউনিভার্সিটির দ্বারোদ্ঘাটনের অনেককাল আগে। তাতেও এমন ঐক্যের গল্প পাইনি। তাই খুব আনন্দ হল। এই যে সবকিছুতে রাজনীতি করার অভ্যাসের ঊর্ধ্বে উঠে সকলে এক হতে পেরেছে— এই তো আমাদের শক্তি। এইজন্যেই তো আমরা সভেরেন সোশালিস্ট সেকুলার ডেমোক্র্যাটিক, আরও কী কী সব, রিপাবলিক।

আরও পড়ুন হিন্দুরাষ্ট্রের হিন্দু নাগরিকের পিঠ বাঁচানোর চিঠি

তবে এসব হল ছোটখাটো আনন্দের কারণ। বেশি আনন্দ পেয়েছি অপারেশন সিঁদুরের সুদূরপ্রসারী ফলগুলো টের পেয়ে। যেমন ধরুন, সোফিয়া ব্রিফিংয়ে এসে বসার পর থেকে ভারতে মুসলমানদের বাড়িঘরের উপর দিয়ে বুলডোজার চালানো বন্ধ হয়ে গেছে। মুসলমান ডেলিভারি বয়ের কাছ থেকে খাবার না নেওয়ার বদভ্যাস সকলে ত্যাগ করেছে। মুসলমান মানেই সন্ত্রাসবাদী— এ-কথা তো আর ভুলেও কেউ উচ্চারণ করছে না। ব্যোমিকা আর সোফিয়াকে দেখামাত্র দেশের যেখানে যত ক্লিনিক বেআইনিভাবে ভ্রূণের লিঙ্গ পরীক্ষা করে কন্যাভ্রূণ হত্যা করত, সবকটার ব্যবসা লাটে উঠেছে। এপিজে আব্দুল কালামের পর আবার এতদিনে সোফিয়ার দেখা পেয়ে হিন্দুত্ববাদীদের বিশ্বাস হয়েছে যে মুসলমানরা ভারি দেশপ্রেমিক।

অপারেশন সিঁদুর যখন এত ভালো ভালো ব্যাপার একসঙ্গে ঘটিয়ে ফেলেছে, তখন অনুমান করছি মুনমুন সেনের শেষ হয়ে যাওয়া কেরিয়ারও নতুন করে শুরু করিয়ে দেবে। হয়ত ব্যবধান ছবির একখানা দেশপ্রেমিক হিন্দি রিমেক তৈরি হবে। আশা ভোঁসলের বয়সটা বড্ড বেশি হয়ে গেছে, তাই বৃদ্ধা মুনমুনের ঠোঁটে কণ্ঠদান করবেন শ্রেয়া ঘোষাল। সঙ্ঘ পরিবারের ঘনিষ্ঠ ভিক্টর ব্যানার্জিকে হয়তো শহিদ-টহিদ হিসাবে দেখানো হবে। তাঁর ছবির দিকে তাকিয়ে মুনমুন সেই ‘কত না ভাগ্যে আমার এ জীবন ধন্য হল/সিঁথির এই একটু সিঁদুরে সবকিছু বদলে গেল’-র হিন্দিটা ধরবেন। হয়তো গীতিকার হবেন প্রসূন জোশি আর সুর দিয়ে দেবেন এআর রহমান। তাহলেই বেশ ধর্মনিরপেক্ষ হয়ে যাবে ব্যাপারটা। গত কয়েকদিনে যা বুঝলাম, মোদিজি যতই স্লোগান দিন ‘বেটি বচাও, বেটি পঢ়াও’, এদেশের প্রগতিশীলরাও সিঁদুরকেই মেয়েদের সবচেয়ে দামি সম্পত্তি বলে মনে করেন। আজকের বাজারে ছবিটা চলবেও ভালো, প্রযোজক পেতেও অসুবিধা হবে না। কারণ ‘অপারেশন সিঁদুর’ ট্রেডমার্কের জন্যে একাধিক আবেদন জমা পড়ে গেছে। আবেদনকারীদের মধ্যে রিলায়েন্স গ্রুপও ছিল, তবে মুকেশ আম্বানি লোক ভালো। তিনি আবেদন প্রত্যাহার করে নিয়েছেন, বলেছেন কোনও অপোগণ্ড নিচুতলার কর্মচারী নাকি ভুল করে আবেদনটা করে ফেলেছিল তা সে যা-ই হোক, ট্রেডমার্ক কেউ নিক আর না-ই নিক, নামটার বিক্রয়যোগ্যতা তো প্রমাণ হয়ে গেল। এরপর ছবির প্রযোজক পেতে কি আর অসুবিধা হবে? আমরা ধর্মনিরপেক্ষ, বামপন্থী, প্রগতিশীল লোকেরা দল বেঁধে দেখতে যাব। কারণ ওই যে— রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকতেই পারে, কিন্তু দেশের প্রশ্নে আমরা সকলে এককাট্টা।

অর্থাৎ আগামীদিনে ভারতের আনন্দযজ্ঞে সবার নিমন্ত্রণ। তবে এই যজ্ঞে পুঞ্চে যে ১৫ জন ভারতীয়কে পাকিস্তান বোম ফেলে মেরেছে আর যে ৪৩ জনকে আহত করেছে বলে খবর, তাদের পরিবার-পরিজন যোগ দেবে কিনা ঠিক বুঝতে পারছি না। অবশ্য কাশ্মীর আমাদের বলেই যে কাশ্মীরিদেরও আমাদের লোক বলে ধরতে হবে এমন মাথার দিব্যি কেউ দেয়নি। কাশ্মীরিরা যেহেতু ঘরপোড়া গরু, তারা সিঁদুরে মেঘ দেখলে ডরাতে পারে। আমরা আনন্দ করব না কেন?

চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম ওয়েবসাইটে প্রকাশিত

কুণাল, যাঁর কৌতুক আজ কামড়ায়

‘পরেরবার যদি রাজনৈতিক কৌতুক করি, তাহলে এত ব্যাকফুটে থাকার দরকার নেই। সোজা মোদী, অমিত শাহ, আম্বানি, আদানি – যা প্রাণে চায় বলে দেওয়াই ভাল। কারণ যা-ই করো, গালি তো খেতেই হবে। সুতরাং অল আউট খেলাই ভাল। অত ভাবার দরকার নেই যে লোকে অমুক জোকের যুক্তিটা নিয়ে বলবে…ইন্টারনেটে দুই ধরনের লোক আছে। এক ধরনের লোক শাসক দলের ভক্ত, আরেক ধরনের লোক শাসক দলকে রীতিমত ঘৃণা করে। অতএব…আমাকে অনেকেই বলেছে, এত ফেন্স সিটিং করছ কেন? সুতরাং ঠিক করে নিয়েছি…সেরা কমেডি হয় ক্ষমতার বিরুদ্ধে কথা বললে, তাই না? পাঞ্চ ডাউন করার চেয়ে পাঞ্চ আপ করা ভাল, আর সেটা যদি করতেই হয় তাহলে পাঞ্চটা জোরে মারাই ভাল। সুতরাং এখন যদি আমি রাজনৈতিক কৌতুক করি, তাহলে সেটা অনেক বেশি তীক্ষ্ণ হবে।’

গাম্ভীর্য নির্বোধের মুখোশ। কথাটা অনেককাল আগে বলেছিলেন এক মাস্টারমশাই। মোটেই বিশ্বাস করিনি, কারণ ততদিনে একাধিক জায়গা থেকে জেনেছি যে রাজশেখর বসু অত সরস সব গল্প লিখলেও, খুব গম্ভীর মানুষ ছিলেন। তারাপদ রায়ের সঙ্গে আলাপ ছিল এরকম একজনের মুখ থেকেও একইরকম কথা শুনেছিলাম। কিন্তু মাস্টারমশাই যে নেহাত ভুল বলেননি তার প্রমাণ গত কয়েক দিনে পাওয়া গেছে। ঋজু বিদূষক কুণাল কামরার কমেডি শো যে হলে হয়েছিল, মুম্বইয়ের সেই দ্য হ্যাবিট্যাট -এর মালিক আর কর্মচারীদের জিজ্ঞেস করলে তাঁরা নির্ঘাত বলবেন – হাড়ে হাড়ে টের পাওয়া গেছে। তবে নির্বোধ মানেই কিন্তু নিরীহ নয়। সুকুমার রায়ের রামগরুড়ের ছানাদের হাসতে মানা; একনাথ শিন্ডে, দেবেন্দ্র ফড়নবীশের দলবল আরও এককাঠি সরেস। তারা নিজেরা না হেসেই খুশি নয়, অন্যদেরও হাসতে মানা করে ভাংচুর করে।

অবশ্য এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। হাসাহাসি করলে ফ্যাসিবাদী হওয়া যায় না। তাছাড়া শিবসেনার জন্মই হয়েছিল ঠ্যাঙাড়ে বাহিনি হিসাবে, মুম্বই ও সংলগ্ন শিল্পাঞ্চলে অত্যন্ত শক্তিশালী বামপন্থী ট্রেড ইউনিয়নগুলোকে ভাঙার জন্যে (দুর্জনে বলে কংগ্রেসের উদ্যোগে)। কুণাল কামরার কমেডি শো নিয়ে শিবসেনার গুন্ডামি দেখে অনেকে খেয়াল করিয়ে দিচ্ছেন, শিবসেনার আদিপুরুষ বালাসাহেব ঠাকরে নিজে কার্টুনিস্ট ছিলেন, ইন্দিরা গান্ধীর ব্যঙ্গচিত্রও এঁকেছেন ইত্যাদি। কিন্তু ওসব কথা বলে লাভ নেই। বাল ঠাকরে শিবসেনার নেতা হিসাবে মোটেই কোনো গণতান্ত্রিক ব্যক্তি ছিলেন না। শিবসেনা কীভাবে মুম্বই চালাত সেকথা সে যুগের মুম্বই তথা মহারাষ্ট্রের বাসিন্দারা প্রত্যেকেই জানেন। নয়ের দশকের মুম্বই দাঙ্গায় শিবসেনার ভূমিকাও কোনো গোপন তথ্য নয়। আজ যে সারা ভারতে সুনির্দিষ্ট পরধর্মবিদ্বেষী এবং/অথবা পরজাতিবিদ্বেষী গুন্ডামি চালু করেছে সংঘ পরিবার, তার সূচনা অনেক আগেই বালাসাহেব করে দিয়েছিলেন মহারাষ্ট্রে। মুসলমান তো বটেই, সেইসময় শিবসেনার আক্রমণের বড় লক্ষ্য ছিলেন দক্ষিণ ভারতীয় শ্রমজীবী মানুষজন। ফলে কুণালের শো নিয়ে গুন্ডামি করে এক অর্থে একনাথরা প্রমাণ করে দিলেন যে তাঁরাই বাল ঠাকরের যথার্থ উত্তরাধিকারী, উদ্ধব ঠাকরেরা নন। চলচ্চিত্র পরিচালক হনসল মেহতা ২৪ মার্চ তাঁর এক্স হ্যান্ডেলে এক পোস্টে মনে করিয়ে দিয়েছেন যে আজ থেকে ২৫ বছর আগে তাঁর একখানা ছবির একটামাত্র সংলাপের জন্যে শিবসৈনিকরা তাঁর অফিসে ঢুকে তাণ্ডব চালিয়েছিল। তাঁকে মারধোর করা হয়, মুখে কালি লেপে দেওয়া হয়, তারপর জনা বিশেক রাজনৈতিক নেতা এবং হাজার দশেক লোকের সামনে এক বৃদ্ধার পা ধরে ক্ষমা চাওয়ানো হয়। মুম্বই পুলিস দ্য হ্যাবিট্যাট ভাংচুরে দর্শকের ভূমিকা পালন করেছে, সেদিনও তাই করেছিল। শিবসেনা কেমনভাবে চলত তা বোঝার জন্যে একথাও মনে করা দরকার যে বালাসাহেব ঠাকরের মৃত্যুর পর গোটা মহারাষ্ট্রে প্রায় বনধ করে দেওয়ার সমালোচনা করে সোশাল মিডিয়ায় পোস্ট করার জন্যে শিবসৈনিকরা পালঘরের দুই নিরীহ মেয়ের পিছনে লেগেছিল। তাদের পুলিস গ্রেফতার করে এবং একজনের আত্মীয়ের দোকান ভাংচুর করে শিবসৈনিকরা।

তবুও এবারের ঘটনা আর বাল ঠাকরের আমলের বিবিধ গুন্ডামিতে বিলক্ষণ তফাত আছে। তখন শিবসেনা ছিল রাষ্ট্রকেও তোয়াক্কা না করা অথবা রাষ্ট্রশক্তিকে নিজের ইচ্ছা মত চলতে বাধ্য করা শক্তি। আজ একনাথের শিবসেনা রাষ্ট্রের অংশ। স্রেফ তাঁর চ্যালাদের গুন্ডামিতে ব্যাপারটা থেমে থাকেনি, খোদ বৃহন্মুম্বই মিউনিসিপাল কর্পোরেশনের আধিকারিকরা গিয়ে দ্য হ্যাবিট্যাট ভেঙে এসেছেন। উপরন্তু মহারাষ্ট্রের মুখ্যমন্ত্রী ফড়নবীশ বলেছেন, কুণালকে ক্ষমা চাইতে হবে। তিনি যা খুশি তাই বলতে পারেন না। বাকস্বাধীনতার সীমা আছে ইত্যাদি। বালাসাহেব আইনের পথে যেতেন না, নিজের পথ নিজে কেটে নিতেন। কুণালের বিরুদ্ধে কিন্তু একাধিক এফআইআর ফাইল করা হয়েছে। যারা দ্য হ্যাবিট্যাট ভেঙে দিয়ে এসেছে, তারাই থানায় গিয়ে এফআইআর করেছে কুণালের নামে। অথচ তাদের বিরুদ্ধে কোনো মামলা মোকদ্দমা হওয়ার খবর নেই এখন পর্যন্ত। এখানেই সাধারণ গুন্ডামি আর ফ্যাসিবাদী হিংসার তফাত। এর বিরুদ্ধে শিরদাঁড়া সোজা করে দাঁড়াতে গেলে দুটো জিনিস অবশ্য প্রয়োজনীয় – সাহস আর কৌশল। কুণালের দুটোই আছে। কীরকম? দেখা যাক।

নায়কোচিত সাহস

দ্য হ্যাবিট্যাটের শোয়ের পর থেকে যা যা ঘটেছে তাতে কুণাল নায়ক হয়ে গেছেন – এতে অনেক আরএসএসবিরোধীকেও অসন্তুষ্ট হতে দেখছি। তাঁদের মধ্যে কারোর নায়ক ব্যাপারটাতেই আপত্তি, কারোর আবার আপত্তি কুণাল শোয়ের শেষে ভারতের সংবিধান তুলে ধরে নিজের অধিকারের কথা জানান দিয়েছিলেন বলে। আজ দেশের যা অবস্থা, সুপ্রিম কোর্টের আদেশেরও তোয়াক্কা না করে যেভাবে সংঘবিরোধীদের বাড়িঘর দোকানপাট বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়া চলছে, অপছন্দের লোক হলেই যা ইচ্ছা অভিযোগ দায়ের করে কারাবন্দি করে রাখা চলছে – তাতে কুণালের মত প্রকাশ্যে নাম করে ক্ষমতাসীন লোকেদের নিয়ে যিনি খিল্লি করবেন তিনি তো বহু মানুষের চোখে নায়ক হয়ে যাবেনই। আটকাবেন কী করে? আটকাতে হবেই বা কেন? পৃথিবীর কোন দেশে কোন বিদ্রোহ, কোন বিপ্লব আবার নায়ক ছাড়া হয়েছে? আমাদের স্বাধীনতা আন্দোলনেও তো অনেক নায়ক। সকলে আবার একই মত, একই পথেরও নন। ক্ষুদিরাম বসু নায়ক, মাস্টারদা সূর্য সেন নায়ক, ভগৎ সিং নায়ক, নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু নায়ক; আবার জওহরলাল নেহরু, মৌলানা আবুল কালাম আজাদ, মহাত্মা গান্ধীও নায়ক। শিল্পী সাহিত্যিকদের মধ্যে কাজী নজরুল ইসলাম নায়ক, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় নায়ক, আবার পীতাম্বর দাসও নায়ক। তাঁর নাম আজ প্রায় কারোর মনে নেই, কিন্তু তাঁর রচনা করা ‘একবার বিদায় দে মা ঘুরে আসি’ গানটা রয়ে গেছে। একটা সময় পর্যন্ত অল্লামা ইকবালও আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামের নায়ক ছিলেন। উর্দু, হিন্দি ভাষা নিয়ে অ্যালার্জি না থাকলে ‘সারে জহাঁ সে অচ্ছা’ গানটা আজও যে কোনো দেশপ্রেমিক মানুষের প্রিয় হবে, দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের ‘ধনধান্য পুষ্প ভরা’-র মতই। এঁরাও সকলে এক মতের লোক নন। যিনি আমার লড়াইটাই লড়ছেন কিন্তু একই মতের লোক নন, তাঁর সাহসকে সেলাম জানাতে না পারলে আমারই ক্ষুদ্রতা প্রকাশ পায়। তাঁর নয়।

রইল সংবিধানের কথা। পৃথিবীর কোনো সংবিধান নিখুঁত নয়, ভারতের সংবিধানও নয়। আবার যে কোনো দেশের সংবিধান খুললেই দেখা যায় অনেক ভাল ভাল কথা লেখা আছে যার প্রয়োগ নেই। কথাটা ভারতের সংবিধানের ক্ষেত্রেও সত্যি। সংবিধান প্রণেতাদের অন্যতম, বাবাসাহেব ভীমরাও আম্বেদকর, নিজেই সংবিধান সভার শেষ অধিবেশনে বলেছিলেন যে সংবিধানে সমতাবিধান করা হল, কিন্তু ভারতের সমাজ রইল অসাম্যে পরিপূর্ণ। এভাবে কতদিন ভারতে গণতন্ত্র টিকবে তা নিয়ে তিনি পরেও বারবার সন্দেহ প্রকাশ করেছেন। কিন্তু ভারতের বহু মানুষ যে এই সংবিধানের দ্বারা নানা মাত্রায় উপকৃত হয়েছে তা অস্বীকার করার উপায় নেই। ঠিক যেমন অনস্বীকার্য যে অনেক মানুষের উপর নিপীড়ন চালানো হয়েছে এবং হচ্ছে এই সংবিধানকে হাতিয়ার করেই। তা বলে যে কোটি কোটি ভারতীয় সংবিধানের উপর আস্থা রাখেন, ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে আজকের লড়াইয়ে সংবিধানকে নিজের অস্ত্র মনে করছেন তাঁদের বিরুদ্ধ পক্ষ বলে মনে করা বা তাঁদের দিকেই বাক্যবাণ ছোড়া এককথায় নির্বুদ্ধিতা। ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে নানা জন নানাভাবে লড়বে, যার যতটুকু ক্ষমতা সে ততটুকুই দিয়েই লড়বে। কেউ লোক হাসিয়ে লড়বে, কেউ গান গেয়ে লড়বে, কেউ লিখে লড়বে, কেউ রাস্তায় মিছিল, মিটিং করে লড়বে, কেউ আইনি লড়াই করবে। এখন ‘এই সংবিধান মানি না’ বলার সময় নয়, কারণ এখন যুদ্ধটা সংবিধানের বিরুদ্ধে নয়। এটুকু বুঝতে খুব অসুবিধা হওয়ার কথা নয়, যদি আপনার সোশাল মিডিয়ার বাইরে একটা সত্যিকারের লড়াই থাকে।

উপযুক্ত কৌশল

কুণালকে মুম্বই থেকে ফোনে হুমকি দিচ্ছে কিছু লোক আর কুণাল তাদের বলছেন ‘আ যা তামিলনাড়ু’ – এমন একটা অডিও ক্লিপ ভাইরাল হয়েছে। অনেক খবরের চ্যানেলেও শোনানো হয়েছে। এটা ভুয়ো বলে এখন পর্যন্ত জানা যায়নি আর ঘটনা হল, মুম্বইয়ের বাসিন্দা কুণাল কয়েক বছর হল তামিলনাড়ুতে থাকতে শুরু করেছেন। ফলে তিনি যে হলে শো করেছিলেন সেখানে ভাংচুর চালাতে পারলেও একনাথের ভক্তরা কুণালকে শারীরিকভাবে আক্রমণ করতে পারেনি। পারলে কী করত তা অনুমান করাও অসম্ভব। স্রেফ হনসলের হাল করে ছেড়ে দিত – একথা আজকের ভারতে নিশ্চিত করে বলা যায় না। মনে রাখতে হবে, বিনা বিচারে উমর খালিদকে বছরের পর বছর আটক করে রাখার আগে তাঁর দিকে গুলি চালানো হয়েছিল। কুণাল মুসলমান নন বলে তেমন সম্ভাবনা নেই – এরকম যাঁরা ভাবেন তাঁরা হয়ত ২০২০ সালে জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের মেয়েদের হোস্টেলে হামলার কথা ভুলে গেছেন। কুণাল অবশ্যই ভোলেননি। উপরন্তু অন্য এক বিদূষক মুনাওয়ার ফারুকীর শো যখন ২০২১ সালে ইন্দোরে বলপূর্বক বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল এবং যে কৌতুক তিনি করেননি তার জন্যে কারারুদ্ধ করা হয়েছিল, তখন যে বিদূষকরা মুনাওয়ারের হয়ে লড়াই লড়েছিলেন, কুণাল তাঁদের একজন। ফলে বুঝতে অসুবিধা হয় না যে কুণাল সচেতনভাবেই এমন এক রাজ্যে চলে গেছেন যে রাজ্যের সরকার সংঘ পরিবারের সঙ্গে আদর্শগত লড়াইয়ে লিপ্ত, অত্যন্ত আক্রমণাত্মক। শুধু তাই নয়, অদূর ভবিষ্যতে এম কে স্ট্যালিনের নেতৃত্বাধীন ডিএমকে ক্ষমতাচ্যুত হলেও বিজেপির তামিলনাড়ুতে ক্ষমতায় আসার কোনো সম্ভাবনা নেই (পশ্চিমবঙ্গে কিন্তু আছে)। তামিলনাড়ুতে সংঘ পরিবারের বিরুদ্ধে সামাজিক-সাংস্কৃতিক প্রতিরোধ এত তীব্র যে সম্প্রতি কেন্দ্রের তিন ভাষা নীতি নিয়ে বিতর্কের আবহে সেখানকার বিজেপি নেত্রী রঞ্জনা নাচিয়ার পার্টি থেকে পদত্যাগ করেছেন

মুম্বইতে দাঁড়িয়ে নাম করে নরেন্দ্র মোদী, অমিত শাহ, ফড়নবীশ, মুকেশ আম্বানি, তাঁর ছেলে, আনন্দ মাহিন্দ্রা, এবং নাম না করে একনাথকে নিয়ে মস্করা করার সাহসের পিছনে যে কুণাল যে রাজ্যে থাকেন তার নিরাপত্তা কাজ করেছে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু ব্যাপারটার মধ্যে কৌশল আছে বলে কুণালের সাহসকে এক বিন্দুও ছোট করা যায় না। কারণ সাম্প্রতিক অতীতে বিজেপিশাসিত রাজ্যে অভিযোগ দায়ের করে অন্য রাজ্যের লোককে গ্রেফতার করার দৃষ্টান্ত বিরল নয়। আসাম পুলিস ২০২০ সাল থেকে তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী সর্বানন্দ সোনোয়ালের নির্দেশে গর্গ চ্যাটার্জিকে গ্রেফতার করতে চাইছিল। কলকাতা পুলিস নাকি সহযোগিতা করছিল না। শেষমেশ ২০২২ সালে গৌহাটি হাইকোর্ট কলকাতার পুলিস কমিশনারকে গর্গবাবুকে গ্রেফতার করার নির্দেশ দেয়, কলকাতা পুলিসকে সে নির্দেশ মানতেই হয়। গুজরাটের বিধায়ক জিগ্নেশ মেওয়ানিকেও আসাম পুলিস গ্রেফতার করে নিয়ে গিয়েছিল। অবশ্যই গুজরাট সরকার বিজেপির হওয়ায় সুবিধা হয়েছিল। কংগ্রেস নেতা পবন খেরাকে তো স্রেফ প্রধানমন্ত্রীকে ‘নরেন্দ্র গৌতমদাস মোদী’ বলার জন্যে দিল্লি বিমানবন্দরে বিমান থেকে নামিয়ে গ্রেফতার করেছিল আসাম পুলিস। তবে সুপ্রিম কোর্টের হস্তক্ষেপে তিনি কয়েক ঘন্টার মধ্যেই জামিন পেয়ে যান।

একথা ঠিক যে কুণালের এখন যেরকম নাম হয়েছে তাতে তাঁকে গ্রেফতার করা হলে প্রশান্ত ভূষণ বা ইন্দিরা জয়সিংয়ের মত দেশের সবচেয়ে নামকরা আইনজীবীরা হয়ত তাঁর হয়ে লড়বেন। তবে মনে রাখতে হবে, কুণাল কিন্তু গর্গ, জিগ্নেশ বা পবনের মত সক্রিয় রাজনীতির লোক নন। তাঁর কাছে গ্রেফতার হওয়া অতখানি জলভাত ব্যাপার না হওয়ারই কথা। আরও বড় কথা হল, কুণাল সুপ্রিম কোর্টকে আগে থেকেই চটিয়ে রেখেছেন। ২০২১ সালে তিনি সুপ্রিম কোর্ট যে দ্রুততায় অর্ণব গোস্বামীর জামিন মঞ্জুর করেছিল, তাকে ব্যঙ্গ করে একগুচ্ছ টুইট করেন। তার জন্যে তাঁর নামে সুপ্রিম কোর্টে মামলা করে কিছু লোক, বিচারপতিরাও আদালত অবমাননার নোটিস পাঠান। কুণাল তার যে জবাব দিয়েছিলেন তাও একই সঙ্গে সাহস ও রসবোধের নিদর্শন। মোদ্দা কথা, তিনি বিচারপতিদের সামনেও মাথা নোয়াননি। শুধু কি তাই? নিজের এক শোয়ে সুপ্রিম কোর্টকে ‘ব্রাহ্মণ-বানিয়া অ্যাফেয়ার’ পর্যন্ত বলে বসে আছেন। এমন লোকের উপর কি আর বিচারপতিরা সদয় হবেন?

কুণালের পরিবর্তন

কুণাল ঋজু বিদূষক হিসাবে কাজ করছেন বছর দশেক হতে চলল। কিন্তু তিনি কি বরাবর এতটা রাজনৈতিক, এত প্রতিবাদী, এতখানি সাহসী ছিলেন? উত্তর হল – না। ২০১৬-১৭ সালে কুণালের যে ভিডিও প্রথম ভাইরাল হয় এবং তাঁর নাম ছড়িয়ে পড়ে, তার নাম ছিল প্যাট্রিয়টিজম অ্যান্ড দ্য গভমেন্ট

এখানে তিনি যেসব কৌতুক করছেন সেগুলোও রাজনৈতিক। তিনি সেইসময় যা যা নিয়ে সর্বত্র আলোচনা হত, যেমন নোটবন্দি, জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয় – সব নিয়েই কথা বলছেন। কিন্তু তাতে আরও নানারকম কৌতুক মিশে আছে। তিনি সমাজের নানা ধরনের লোককে নিয়ে মজা করছেন, সোশাল মিডিয়া ট্রেন্ডগুলো নিয়ে কথা বলছেন, নেটফ্লিক্স নিয়ে মজা করছেন। তখন তাঁর মতে সরকার ছিল ভোডাফোনের মত ‘সার্ভিস প্রোভাইডার’, আর নাগরিক উপভোক্তা। এরপর ২০১৭ সালে তাঁর যে শোয়ের ভিডিও ইউটিউবে আপলোড হয়, সেখানে কুণাল মূলত ট্যাক্সিচালকদের নিয়ে মজা করেন। বিশেষত উবের ড্রাইভারদের নিয়ে। বলেন যে উবের একটা ভাল অ্যাপ কিন্তু ভারতে সেটা কাজ করে না, কারণ এখানকার ড্রাইভাররা ওই অ্যাপের নিয়ম অনুযায়ী চলতে চান না। ২০১৮ সালে দেশ কে বুডঢে ভিডিও। এটাও রাজনৈতিক এবং বিজেপিবিরোধী। কিন্তু ব্যঙ্গের চাঁদমারি বৃদ্ধ দক্ষিণপন্থীরা।

তারপরের ভিডিও আবার অনেকটা অরাজনৈতিক। সেখানে কুণাল মূলত মুম্বই আর ইন্দোর – এই দুই শহরের নানা গোলমালকে ব্যবহার করে হাস্যরস উৎপাদন করেন। এসবের পাশাপাশি চলছিল তাঁর পডকাস্ট শাট আপ ইয়া কুণাল, যেখানে তিনি উমর খালিদ আর কানহাইয়া কুমারের সাক্ষাৎকার নেন। আবার বিজেপি নেতাদেরও সাক্ষাৎকার নেন। কিন্তু এই ২০১৮ সালে কুণালের মধ্যে একটা পরিবর্তন লক্ষ করা যায়। অ্যাবিশ ম্যাথিউ নামে একজন ঋজু বিদূষক আছেন যিনি কুণালের মত অতটা জনপ্রিয় নন। তাঁর ইউটিউব চ্যানেলে তিনি জার্নি অফ আ জোক নামে একখানা পডকাস্ট করেন। সেই পডকাস্টের এক পর্বে কুণাল আসেন সেবছর। সেখানে অ্যাবিশ কুণালের থেকে জানছিলেন প্যাট্রিয়টিজম অ্যান্ড দ্য গভমেন্ট শোয়ের কৌতুকগুলো কীভাবে তৈরি করা হয়েছিল। পর্বের শেষদিকে অ্যাবিশ জিজ্ঞেস করেন, ওই ভিডিওর যে প্রতিক্রিয়া হয়েছে তা থেকে কুণাল কী শিখলেন? উত্তরে কুণাল বলেন ‘পরেরবার যদি রাজনৈতিক কৌতুক করি, তাহলে এত ব্যাকফুটে থাকার দরকার নেই। সোজা মোদী, অমিত শাহ, আম্বানি, আদানি – যা প্রাণে চায় বলে দেওয়াই ভাল। কারণ যা-ই করো, গালি তো খেতেই হবে। সুতরাং অল আউট খেলাই ভাল। অত ভাবার দরকার নেই যে লোকে অমুক জোকের যুক্তিটা নিয়ে বলবে…ইন্টারনেটে দুই ধরনের লোক আছে। এক ধরনের লোক শাসক দলের ভক্ত, আরেক ধরনের লোক শাসক দলকে রীতিমত ঘৃণা করে। অতএব…আমাকে অনেকেই বলেছে, এত ফেন্স সিটিং করছ কেন? সুতরাং ঠিক করে নিয়েছি…সেরা কমেডি হয় ক্ষমতার বিরুদ্ধে কথা বললে, তাই না? পাঞ্চ ডাউন করার চেয়ে পাঞ্চ আপ করা ভাল, আর সেটা যদি করতেই হয় তাহলে পাঞ্চটা জোরে মারাই ভাল। সুতরাং এখন যদি আমি রাজনৈতিক কৌতুক করি, তাহলে সেটা অনেক বেশি তীক্ষ্ণ হবে।’

আজকের কুণালের দিকে সেদিনের কুণালের যাত্রা শুরু তখন থেকে। ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনের আগে তাঁর যে ভিডিও আপলোড হয় সেখানে কুণাল এসে দাঁড়ান একখানা কালো টি শার্ট পরে, যার উপর বড় বড় অক্ষরে লেখা WAH MODIJI WAH। মঞ্চে এসেই তিনি দর্শকদের জিজ্ঞেস করেন ‘আমার আর আম্বানিজির মধ্যে মোদীজি কী করছেন? আমি সোজা আম্বানিকে কেন ভোট দিতে পারি না?’ হাসাহাসির মধ্যে দিয়ে কুণাল একবিংশ শতকের বিশ্ব রাজনীতির এক নিদারুণ সত্য উদ্ঘাটন করে ফেলেন – আজকের রাজনীতিকে চালায় আসলে বড় বড় কর্পোরেশনগুলো। তখনো কিন্তু মোদীর সঙ্গে আম্বানি, গৌতম আদানির সম্পর্ক নিয়ে রাহুল গান্ধী সরব হননি। ডোনাল্ড ট্রাম্পের হয়ে ইলন মাস্কের লম্ফঝম্প কোনোদিন দেখতে হবে – একথাও কেউ কল্পনা করেনি। অথচ কুণাল বলেন ‘আমার মনে হয় কর্পোরেশনগুলোরই ভোটে লড়া উচিত। রতন টাটা বনাম মুকেশ আম্বানি। লড়ো ২০১৯।’ এই কৌতুককে এগিয়ে নিতে নিতেও কুণাল আমাদের এক বুনিয়াদি বিতর্কের দিকে নিয়ে যান। সেটা হল – উন্নয়ন বা বিকাশ মানে কী?

নয়া উদারনীতিবাদ আমাদের এমন মাথা খেয়েছে, এটা যে বিতর্কের বিষয় তা এদেশের মার্কসবাদের নামে শপথ নেওয়া অনেক পার্টিও এই সহস্রাব্দে ভুলেই গেছে। লক্ষ করুন, যে কুণাল আগে সরকারকে ভোডাফোনের মত একটা কোম্পানি বলেই আখ্যা দিতেন, তিনি বছর তিনেক পরেই কর্পোরেশনগুলোর মুখোশ খুলছেন হাসাতে হাসাতে। পরের পাঁচ বছরে কুণাল কী কী করলেন? একদা উবের ড্রাইভারদের আচরণ নিয়ে কৌতুক করা মানুষটি গিগ শ্রমিকদের নিয়ে তৈরি গানের ভিডিও শেয়ার করলেন নিজের ইউটিউব চ্যানেলে। দেশের গোদি মিডিয়ার মুকুটহীন সম্রাট এবং জাতীয়তাবাদের ধ্বজাধারী সাংবাদিক অর্ণবের যে নিজের স্টুডিওর স্বাচ্ছন্দ্যের বাইরে এলে গলা দিয়ে আওয়াজ বেরোয় না তা ফাঁস করে দিলেন বিস্তর ঝামেলার ঝুঁকি নিয়েও। উমর, শার্জিল ইমামের মত রাজনৈতিক বন্দিদের মুক্তির দাবিতে সভায় বক্তৃতা দিলেন। হাস্যকৌতুকের ভিডিওগুলোতেও কৃষক আন্দোলনের প্রতি সহমর্মিতা দেখালেন, পডকাস্টে পি সাইনাথের মত লোককে ডেকে আনলেন। ২০২৪ লোকসভা নির্বাচনের সময়ে পুরোদস্তুর সাংবাদিকসুলভ অধ্যবসায়ে পর্বের পর পর্বে সরকারের রিপোর্ট কার্ড বার করলেন। অতঃপর এই সাম্প্রতিকতম ভিডিও, যা মহারাষ্ট্রের বিধানসভা নির্বাচনে বিরোধীদের ভরাডুবির পর সারা দেশে ঝুলে পড়া অনেক কাঁধকে মাথা তোলার সাহস দিল।

এই ভিডিওতে কুণাল যাদের আক্রমণ করেছেন তারা বুদ্ধিমানের মত, অতি ক্ষুদ্র এক ব্যক্তি, যার নামও নেওয়া হয়নি, তাকে অপমান করা হয়েছে অভিযোগ করে হল্লা করছে। সেই হল্লায় বিরোধী পক্ষের অনেকেও ভুলছেন। তাঁরা খেয়াল করছেন না, ভারতের কোনো রাজনৈতিক নেতা এখনো যা বলেননি কুণাল প্রথমবার সেটাই বলে দিয়েছেন এই ভিডিওতে। দেশের কমিউনিস্টরা পর্যন্ত যখন ফ্যাসিবাদী শাসন চলছে না নয়া ফ্যাসিবাদী – তা নিয়ে তাত্ত্বিক তর্কে মেতে আছেন, তখন এই বিদূষক শাহরুখ খান অভিনীত বাদশা ছবির টাইটেল সংটার প্যারডি বানিয়ে মোদীকে ‘তানাশাহ’ (একনায়ক) বলে দিয়েছেন। ওঁদের লেগেছে তো আসলে ওইখানে। আজকের দিনে গণতান্ত্রিক ভড়ংটা বজায় রাখতে সব একনায়কই চায়। রচপ তায়িপ এর্দোগান, ভ্লাদিমির পুতিনও সর্বক্ষণ প্রমাণ করার চেষ্টা করেন যে তাঁদের দেশে গণতন্ত্র চলছে। মোদীও ব্যতিক্রম নন। সেখানে একজন লোক হাসানোর লোক যদি সরাসরি একনায়ক শব্দটা উচ্চারণ করে ফেলে, তা হজম করা শক্ত। হাসিকে ভয় পায় না এমন কোনো একনায়ক হয় না। কারণ মানুষের উপর তাদের নিয়ন্ত্রণ বজায় থাকে ভয়ের কারণে, আর হাসি একনায়ককে খিল্লির পাত্র করে ফেলে। তাতে ভয় কেটে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। কোনো বিরোধী নেতার মুখ থেকে এই শব্দ বেরোলে খুব বেশি লোক পাত্তা না-ও দিতে পারে। কারণ একে তো অনেকে রাজনৈতিক বক্তৃতা শোনে না, তার উপর বিরোধীরা তো ক্ষমতাসীনের নামে দু-চারটে খারাপ কথা বলবেই। কিন্তু যে লোক হাসায় তার কথা স্রেফ রাগ করার জন্যেও অনেকে শোনে। ফলে কুণালের এই ভিডিও এক মূর্তিমান বিপদ। বিজেপি আই টি সেল ইতিমধ্যেই নেমে পড়েছে কুণালের পিছনে ডীপ স্টেটের ভূমিকা আছে, মার্কসবাদীদের টাকায় কুণাল চলেন – এইসব বলে পরিস্থিতি সামলাতে। মহারাষ্ট্র পুলিস কুণালের মুম্বইয়ের বাড়িতে গিয়ে, তিনি কাদের থেকে টাকাপয়সা পেয়েছেন তা নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করার জন্য তাঁর বাবা-মায়ের কাছে শমনও দিয়ে এসেছে। মজা হল, যত এসব করা হচ্ছে তত কুণালের কৌতুকগুলোর শক্তি বেড়ে যাচ্ছে। কারণ কুণাল বহুদিন আগে থেকে নিজেই হাসি হাসি মুখে বলে থাকেন ‘কমিউনিস্ট পার্টি অফ ইন্ডিয়া নে বহত প্যায়সে দিয়ে হ্যাঁয় মেরে কো’।

একটা কথা না বলে এ আলোচনা শেষ করতে পারছি না।

ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে নিজেদের অগ্রণী সৈনিক ভাবার এক অকারণ অভ্যাস বাঙালিদের আছে। সংঘ পরিবারের গোটা ভারতের উপর হিন্দি চাপিয়ে দেওয়ার আবহে এখন আরও বেশি করে পশ্চিমবঙ্গে বেশকিছু বাংলাবাদীর উদ্ভব হয়েছে। তাঁদের অনেকে অনাবাসী ভারতীয় হয়ে বাঙালি জাতীয়তাবাদের স্বপ্ন বিক্রি করেন সোশাল মিডিয়ায়, অবিভক্ত বাংলা আলাদা রাষ্ট্র হলে কী হত না হত তা নিয়ে বাষ্পাকুল হয়ে পড়েন। অনেকে আবার পশ্চিমবঙ্গে থেকেই নিজের ছেলেমেয়েকে ইংরিজি মাধ্যম স্কুলে দ্বিতীয় ভাষা হিসাবে হিন্দি পড়িয়ে বাংলার সংস্কৃতি বাঁচাতে ব্যাকুল। কুণালের মত হিন্দিভাষীদের কাজের প্রশংসা করলেই তাঁরা ভীষণ রেগে যান। কিন্তু কী করা যাবে? বাংলায় একজনও যে আজ পর্যন্ত হিন্দিভাষী রবীশ কুমার বা কুণালের মত ঋজু হয়ে দাঁড়াতে পারলেন না ফ্যাসিবাদের সামনে। না কোনো সাংবাদিক, না কোনো ঋজু বিদূষক, না কোনো গায়ক, না কোনো কবি। সারা ভারতে জনপ্রিয় হওয়ার কথা বলছি না। তার জন্যে অবশ্যই কুণালরা হিন্দি, ইংরিজি ব্যবহার করার সুবিধা পান। কিন্তু বাংলা ভাষায় বাঙালিদের আলোড়িত করার মত আমির আজিজ সুলভ গনগনে একখানা কবিতা কোন কবি লিখেছেন মোদী সরকারের দশ বছরে? স্লোগান হয়ে ওঠা কবিতার আবশ্যিক গুণ নয়। কিন্তু বরুণ গ্রোভার রচিত ‘হম কাগজ নহি দিখায়েঙ্গে’ যেভাবে সারা দেশে স্লোগান হয়ে উঠেছিল, তেমন একখানা কবিতাই বা কে লিখেছেন বাংলায়? বাংলা ভাষার কোন সাংবাদিক (এমনকি বিকল্প মাধ্যমেরও) রবীশের মত লাগাতার লিখে যাচ্ছেন/বলে যাচ্ছেন কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে?

আরও পড়ুন হাসছি মোরা হাসছি দেখো: বীর দাসের বীরত্বে দুই ভারতের পর্দা ফাঁস

কেন্দ্রের সরকারের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর কথা বলছি, রাজ্য সরকারের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে বলছি না। কাজটা তো খুব কঠিন হওয়ার কথা নয়, কারণ কুণালের তামিলনাড়ুর মত পশ্চিমবঙ্গও তো বিজেপিবিরোধী দলের (অন্তত তাদের বয়ান অনুযায়ী) শাসনে থাকা রাজ্য। কুণালের পিছনে যদি স্ট্যালিনের বরাভয় থেকে থাকে, এখান থেকে তাঁর মত কেউ উঠে দাঁড়ালে তাঁর পিছনেও নিশ্চয়ই মমতা ব্যানার্জির বরাভয় থাকবে। তাহলে ভয় কিসের?

আসলে বোধহয় স্বীকার করে নেওয়া ভাল, আমাদের সে মুরোদ নেই। আমরা মুখেন (এবং ফেসবুকেন) মারিতং জগৎ। আমাদের রাজ্য সরকারও তাই। নইলে যে ডিলিমিটেশন হলে আমাদের সাড়ে সর্বনাশ, তার বিরুদ্ধে অবিজেপি মুখ্যমন্ত্রীদের বৈঠক ডাকলেন স্ট্যালিন, তাতে গেলেনই না আমাদের রাজ্য সরকারের কোনো প্রতিনিধি!

অতএব আমাদের হয়ে লড়বেও অন্যরাই। আমরা কেবল পায়ের উপর পা তুলে তাদের দোষ ধরে যাব, কেন তারা যথেষ্ট বিপ্লবী নয় তা লিখে সোশাল মিডিয়া ভরাব। যেমন এখন কুণাল সম্পর্কে ভরাচ্ছি।

নাগরিক ডট নেট ওয়েবসাইটে প্রকাশিত