যাদবপুর: রিপাবলিক বা অন্য চ্যানেলে যা চলছে তা সাংবাদিকতা নয়

ভাবতে অবাক লাগে, জরুরি অবস্থার সময়ে পশ্চিমবাংলার একাধিক সম্পাদককে জেল খাটতে হয়েছিল সরকারের সামনে মাথা নোয়াননি বলে।

১৯৯০-এর দশকে তখন সারা ভারতের মাঠ মাতাচ্ছেন কৃশানু দে। ধীমান দত্ত সম্পাদিত খেলা পত্রিকায় এক সাক্ষাৎকারে তাঁকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, ভারতীয় ফুটবল আন্তর্জাতিক স্তরে অপ্রাসঙ্গিক হয়ে গেল কেন? কৃশানুর উত্তরটা মোটামুটি এরকম ছিল – সাহিত্য রবীন্দ্রনাথ থেকে সমরেশ বসুতে নেমেছে, ফুটবল চুনী গোস্বামী থেকে কৃশানু দে-তে নামবে না? ফুটবল বিশেষজ্ঞরা বলতে পারেন, এটা কোনো উত্তরই হল না। কৃশানুর খেলার ভক্তরা বলতে পারেন, কৃশানু অযথা বিনয় করছিলেন। তিনি মোটেই খুব নিচু মানের খেলোয়াড় ছিলেন না। সাহিত্যপ্রেমীরা বলতে পারেন, এ অতি বাজে তুলনা। সমরেশ বসু মোটেই এত ওঁচা লেখক নন যে রবীন্দ্রনাথ থেকে নামতে নামতে বাংলা সাহিত্য তাঁর স্তরে এসেছে বলা যাবে। কিন্তু যদি নামগুলো বাদ দিয়ে কৃশানুর বক্তব্যের নির্যাসটুকু নিই, তাহলে দেখা যাবে তিনি বলেছিলেন সব ক্ষেত্রেই বাঙালির অবনমন হচ্ছে। কথাটায় কিন্তু বিন্দুমাত্র ভুল নেই। সেই অবনমনের গতি গত ৩০-৩৫ বছরে আরও বেড়ে গেছে। কৃশানুর মানের বাঙালি ফুটবলার আজ আছে কি? সমরেশ বসুর মানের সাহিত্যিকও বাংলায় আর নেই। তবে বাঙালির সাংবাদিকতা যে উচ্চতা থেকে ধপাস করে পড়েছে, তার তুলনা মেলা ভার। মতি নন্দী থেকে মৌপিয়া নন্দী, গৌরকিশোর ঘোষ থেকে ময়ূখ ঘোষ। যেন এভারেস্ট থেকে সোজা বঙ্গোপসাগরে আছড়ে পড়া।

২০২৪ লোকসভা নির্বাচনের প্রাক্কালে এবং ফলাফল প্রকাশের পরেও সারা দেশে অন্যতম আলোচ্য বিষয় হয়ে উঠেছিল দেশের মূলধারার সংবাদমাধ্যমের, বিশেষত খবরের চ্যানেলগুলোর ভূমিকা। হোয়াটস্যাপ থেকে পাওয়া ভুয়ো খবর সম্প্রচার করা; মন্দির বনাম মসজিদ বয়ান প্রচার করে মুসলমানবিদ্বেষ ছড়ানো; সান্ধ্য প্যানেলে গাঁয়ে মানে না আপনি মোড়ল হিন্দু ও মুসলমান ধর্মীয় নেতাদের ডেকে এনে লড়িয়ে দেওয়া; বিরোধী দলের মুখপাত্র থেকে শুরু করে ছাত্রনেতা, মানবাধিকার কর্মী এবং সরকারের ত্রুটি তুলে ধরা সাংবাদিকদের ধমকানো; যে কোনো আন্দোলনকারীকে দেশদ্রোহী বা মাওবাদী বা খালিস্তানি বলে দেগে দেওয়া, পাকিস্তানের চর বা বিদেশের টাকায় চলেন বলে ঘোষণা করে দেওয়া – এইসব কুকর্ম ধারাবাহিকভাবে চালিয়ে শুধু যে দেশের গোদি মিডিয়া ক্ষমতাসীন বিজেপির প্রচারযন্ত্র হিসাবে কাজ করেছে তা নয়, দেশের সামাজিক পরিবেশ একেবারে বিষিয়ে দিয়েছে। তার ফল আমরা এখনো পেয়ে চলেছি (ভারত ক্রিকেটে ট্রফি জিতলে মধ্যপ্রদেশে সংখ্যালঘু এলাকায় হিংসা ছড়ানো হচ্ছে, উত্তরপ্রদেশে হোলির জন্যে মসজিদ ঢেকে দেওয়া হচ্ছে ত্রিপল দিয়ে), আরও বহুবছর পাব।

পশ্চিমবঙ্গে ২০১৯ লোকসভা এবং ২০২১ বিধানসভা নির্বাচনের সাপেক্ষে বিজেপির ফল অপ্রত্যাশিতভাবে খারাপ হওয়ায় বাংলার সংবাদমাধ্যমের দিকে তখন ততখানি নজর পড়েনি অনেকের। বস্তুত রিপাবলিক টিভি তখন পর্যন্ত মালিক অর্ণব গোস্বামীর পরিবেশনার গাঁক গাঁক শৈলীটুকুই চালু করতে পেরেছিল, ঘৃণার পথে রোজ নতুন মাইলফলক পেরিয়ে যাওয়া তখনো জমিয়ে শুরু করেনি। বলা যেতে পারে প্রদীপ, থুড়ি আগুন, জ্বালাবার আগে কেরোসিন তেল জোগাড় করার পর্ব চলছিল। অন্যদিকে একদা বিজেপির সমর্থনে রাজ্যসভার সাংসদ হওয়া সুভাষ চন্দ্রের জি নেটওয়ার্কের চ্যানেল ২৪ ঘন্টাও তখন আপাত নিরপেক্ষতা বজায় রাখার ব্যাপারে মনোযোগী ছিল। তাছাড়া নির্বাচনের ঠিক আগে সুভাষ চন্দ্রের সঙ্গে বিজেপির মন কষাকষির সংবাদও ভেসে এসেছিল। এবিপি আনন্দও আনন্দবাজার পত্রিকার মতই ধর্মেও থাকত, জিরাফেও থাকত। বাংলা চ্যানেলগুলোর দাঁত নখ বেরোতে শুরু করল ২০২৩ সাল থেকে, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্রের র‍্যাগিংয়ের কারণে মৃত্যুর খবরকে কেন্দ্র করে। তখনই প্রথম দেখা গেল, ওই ঘটনাকে হাতিয়ার করে বাংলার জনপ্রিয় খবরের চ্যানেলগুলোর মুখ হয়ে ওঠা অ্যাংকররা একেবারে অর্ণব, সুধীর চৌধুরী, রুবিকা লিয়াকতদের মত মার্কামারা গোদি মিডিয়ার অ্যাংকরদের ভাষায় ঘৃণা ছড়াতে পারেন।

২০১৬ সালে জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ে কাশ্মীরের স্বাধীনতা চেয়ে স্লোগান দেওয়া হয়েছে – এই ভুয়ো ভিডিও ছড়িয়েছিল কিছু তথাকথিত জাতীয় চ্যানেল (ফরেন্সিক পরীক্ষায় তা প্রমাণিত হয়)। তার ভিত্তিতে দিল্লি পুলিস ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রনেতাদের গ্রেফতার করে এবং গোটা বিশ্ববিদ্যালয়টাকেই জেহাদি সন্ত্রাসবাদীদের আখড়া বলে দেশের সামনে তুলে ধরার প্রক্রিয়া চালু করে গোদি মিডিয়া। সেইসময় টাইমস নাও চ্যানেলে কর্মরত অর্ণব কীভাবে লাইভ শোতে ডেকে উমর খালিদকে অসভ্যের মত ধমকেছিলেন, সেকথা অনেকেরই মনে আছে। ২০২৩ সালে দেখা গেল, মৌপিয়া অর্ণবের ছাত্রী না হলেও একলব্য তো বটেই। তিনিও যাদবপুরের এক ছাত্রনেতাকে ২৪ ঘন্টা চ্যানেলের শোতে ডেকে ধমকালেন এবং পাড়ার মস্তানদের কায়দায় বললেন ‘কে তুমি?’ যেন তিনি নিজে কোনো সম্রাজ্ঞী। রিপাবলিক বাংলার ময়ূখ অবশ্য তখনো তৃণমূল সরকারের বিরোধিতার কারণে এ রাজ্যের বাম কর্মী, সমর্থকদের নয়নের মণি। ওই চ্যানেলের দক্ষিণপন্থী প্রচারকে তখনো অনেকেই ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখছিলেন।

তারপর ঘটল আর জি করের ঘটনা। ততদিনে মৌপিয়া ২৪ ঘন্টা থেকে চলে গেছেন কলকাতা টিভিতে, যে কলকাতা টিভি কেন্দ্রীয় এজেন্সির কুনজরে (অর্থাৎ বিজেপির কুনজরে) পড়েছিল ২০২৩ সালেই। ঘন্টার পর ঘন্টা তাদের দফতরে তল্লাশি চালিয়েছিলেন অফিসাররা। আর জি করের ঘটনায় রাজ্য সরকারের ঢাল হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ে মৌপিয়ার চ্যানেল এবং সোশাল মিডিয়া হ্যান্ডেল। তখনই দেখা যায়, তিনি আন্দোলন ব্যাপারটারই তীব্র বিরোধী। গোদি মিডিয়া চ্যানেলগুলোর মতই, সাক্ষ্যপ্রমাণ থাকুক আর না-ই থাকুক, আন্দোলনকারী ডাক্তারদের দুরভিসন্ধি সম্পর্কে নিত্যনতুন অভিযোগ চলতে থাকে। রিপাবলিক বাংলার তখনো দু নৌকায় পা, কারণ একদিকে তৃণমূল সরকারের বিরোধিতা করা কর্তব্য। অন্যদিকে বিজেপি যেই বুঝেছে আর জি কর আন্দোলন থেকে তাদের কোনো লাভ হবে না, হিন্দু-মুসলমান বাইনারির কোনো অবকাশ নেই, অমনি শুভেন্দু অধিকারী আর তৃণমূল নেতাদের সুর মিলে গেছে। ডাক্তাররা কত অসৎ, কেমন মদ গাঁজা খায়, তাদের উপর জনরোষ এসে পড়বে – এসব কথা এসে পড়েছে। এবিপি আনন্দ আবার সেই মামলায় প্রথম থেকে আন্দোলনের পাশে। কারণটা সহজবোধ্য। সরকারবাবুদের কাগজগুলোর মতই তাঁদের খবরের চ্যানেলের গুণগ্রাহীরাও বেশিরভাগ মধ্যবিত্ত, উচ্চবিত্ত। পশ্চিমবঙ্গের ডাক্তাররাও বেশিরভাগই আসেন সেই শ্রেণি থেকে। অতএব ডাক্তাররা দিন কে রাত, রাত কে দিন বললেও সর্বতোভাবে তাঁদের পাশেই থাকতে হত ঘন্টাখানেকের সুমন দে-কে।

আরও পড়ুন নির্বাচনের ফলে হেরে গেছে দেশের অসাধু মিডিয়া

এইসব ছোটখাটো পার্থক্য ঘুচে গেল যাদবপুরে ব্রাত্য বসুর গমন নিয়ে সাম্প্রতিক গোলমালে। যাদবপুরকে মৌপিয়া, ময়ূখ বা সুমন – কারোর চ্যানেলেরই পছন্দ করার কোনো কারণ নেই। রাজ্যে তৃণমূল ক্ষমতায় এসেছে দেড় দশক হতে চলল, কেন্দ্রে বিজেপি জাঁকিয়ে বসেছে এক দশকের বেশি। রাজ্যের বিধানসভায় এরা ছাড়া আর কোনো দল নেই প্রায়। অথচ যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে এখনো উভয়ের কেউই দাঁত ফোটাতে পারেনি। শিক্ষকদের মধ্যে যদি বা সংগঠন আছে, ছাত্রদের মধ্যে তৃণমূল ছাত্র পরিষদ আর অখিল ভারতীয় বিদ্যার্থী পরিষদের উপস্থিতি এখনো সাড়া জাগানোর মত নয়। বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য নিয়োগের ক্ষমতা কার, তা নিয়ে যতই দড়ি টানাটানি করুন মুখ্যমন্ত্রী আর রাজ্যপাল – তাতে যাদবপুরের ছেলেমেয়েদের কিছু এসে যায়নি। এসে যে যায়নি তার প্রমাণ শিক্ষামন্ত্রীর গাড়ি এমনিতে প্রতিদ্বন্দ্বী বিভিন্ন বাম ছাত্র সংগঠনের একত্রে ঘিরে ধরা, গাড়ির সামনে শুয়ে পড়া। সকলেরই দাবি প্রায় এক – ক্যাম্পাসে নির্বাচন করো, গণতন্ত্র ফেরাও। সে দাবির পাশে কেনই বা রিপাবলিক, কলকাতা টিভি, এবিপি আনন্দ দাঁড়াবে? নির্বাচন হলে বেশিরভাগ আসনে জিতবে তো সেই কোনো না কোনো বামপন্থী ছাত্র সংগঠন। তিন চ্যানেলের একটার মালিকও যে বামপন্থীদের পছন্দ করেন না – একথা কে না জানে?

কিন্তু ব্যাপারটা স্রেফ যাদবপুরকে বদনাম দেওয়ায় থেমে থাকলে কথা ছিল। সে তো র‍্যাগিংয়ে ছাত্র মৃত্যুর সময় থেকেই ক্যাম্পাসে পড়ে থাকা মদের বোতল আর ব্যবহৃত কন্ডোম গুনে চলেছে বাংলার সংবাদমাধ্যম। কিন্তু এবারের অভিনবত্ব লাগামছাড়া সাম্প্রদায়িক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রচারে। বিন্দুমাত্র সাক্ষ্যপ্রমাণের তোয়াক্কা না করে যা খুশি অভিযোগ তুলে ঘৃণা ছড়ানোর কাজ করে চলেছে রিপাবলিক বাংলা। যাদবপুর আজমল কাসবের মত উগ্রপন্থী তৈরির কারখানা – এমনও বলা হচ্ছে গলা তুলে। কেন বলছেন ভাই? উত্তরে কিন্তু চিৎকার ছাড়া কিছু পাওয়া যাবে না। এখানে যাদবপুর আসলে উপলক্ষ, আসল লক্ষ্য আতঙ্ক ছড়ানো। কিসের আতঙ্ক? ইসলামিয় সন্ত্রাসবাদের আতঙ্ক। যে ইসলামিয় সন্ত্রাসবাদের কোনো হানা এখন পর্যন্ত পশ্চিমবঙ্গে ঘটেনি, ভারতেও ঘটেনি বহুকাল। এমনকি ২০১৯ সালের পুলওয়ামার ঘটনার তদন্ত নিয়ে প্রবল জাতীয়তাবাদী এবং হিন্দু হৃদয়সম্রাট নরেন্দ্র মোদীর সরকারেরও কোনো তাপ উত্তাপ নেই। সেই কাণ্ডের দোষীরা আজ পর্যন্ত গ্রেফতার হল না। জম্মু ও কাশ্মীর পুলিসের এক শিখ অফিসারকে গ্রেফতার করা হয়েছিল। সেই দাভিন্দর সিং পর্যন্ত ২০২০ সালে জামিন পেয়ে গেছেন, কারণ পুলিস ৯০ দিনের মধ্যে চার্জশিট জমা দিতে পারেনি। এমন উগ্রপন্থার আতঙ্ক আজ ছড়ানো কী উদ্দেশ্যে? হিন্দুদের মধ্যে মুসলমানদের প্রতি ভয় জাগাতে, বাংলার সমাজে ধর্মীয় বিভাজন ঘটাতে। মৌপিয়া মাওবাদীর ভয় দেখানো পর্যন্ত এগিয়েছেন, ময়ূখ আরও এককাঠি সরেস। আসলে দুজনের প্রতি নির্দেশাবলিও বোধহয় কিছুটা ভিন্ন। দুজনেরই অন্তরালের উপরওয়ালার উদ্দেশ্য যাদবপুরের বারোটা বাজানো (কলকাতা পুলিস বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে পুলিস ফাঁড়ি করতে চায় বলে খবরে প্রকাশ। এতে কোনো পাঠকের জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের ক্যাম্পাসে সেনাবাহিনীর ট্যাংক রাখতে চাওয়ার কথা মনে পড়লে নিবন্ধকার দায়ী নন), তবে ময়ূখের উপরওয়ালার তার সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গের মুসলমানদের আরও আরও প্রান্তিক করে দেওয়ার লক্ষ্যও আছে নির্ঘাত। নেহাত সমাপতন নয় যে প্রায় একই সময়ে বিজেপি নেতা শুভেন্দু অধিকারী বলছেন তাঁরা ক্ষমতায় এলে তৃণমূলের মুসলমান বিধায়কদের চ্যাংদোলা করে বিধানসভার বাইরে ছুড়ে ফেলা হবে।

এখানে একটা কথা বলা জরুরি। রিপাবলিক বাংলা কিন্তু আজ হঠাৎ মুসলমানবিদ্বেষ ছড়ানোর কাজ শুরু করেনি, প্রথম থেকেই এ কাজ করে আসছে। বাংলাদেশের জুলাই বিপ্লবের পর থেকে লাগাতার বাংলাদেশি হিন্দুদের প্রতি দরদ দেখানোর ভান করে তীব্র বিদ্বেষমূলক, গালগল্পপ্রবণ শো চালিয়ে গেছে ময়ূখ ও তার চ্যানেল। মূল রিপাবলিক চ্যানেলটির বেত্তান্ত যাঁরা জানেন তাঁদের অবশ্য আগেই বোঝা উচিত ছিল যে এরা সাংবাদিকতা করতে আসেনি, আরএসএস-বিজেপির এজেন্ডা অনুযায়ী সমাজে বিভাজন তৈরি করাই এদের আসল কাজ। জেগে ঘুমোলে অবশ্য কিছুই জানা যায় না, বোঝা যায় না। পশ্চিমবঙ্গে ঘোষিত ফ্যাসিবাদবিরোধী, হিন্দুত্ববাদবিরোধী যে রাজনৈতিক দলগুলো আছে – তৃণমূল কংগ্রেস, কংগ্রেস এবং বাম দলগুলো – তারা এতদিন জেগেই ঘুমোচ্ছিল বোধহয়। তাই ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বর মাসে ইন্ডিয়া জোট যখন সিদ্ধান্ত নিল যে হিন্দি, ইংরিজি চ্যানেল মিলিয়ে ১৪ জন অ্যাংকরের অনুষ্ঠান তারা বয়কট করবে, তখন এই সবকটা দল ওই জোটে থাকা সত্ত্বেও পশ্চিমবঙ্গে এমন কিছু করা হবে কিনা তা নিয়ে প্রায় কোনো আলোচনাই হয়নি। তাহলে প্রশ্ন হল, ‘আজি এ প্রভাতে রবির কর/কেমনে পশিল প্রাণের ’পর’? প্রশ্নটা বিশেষত বামপন্থীদের জন্যে। তৃণমূলের মুখপাত্রদের রিপাবলিক বাংলার সাম্প্রদায়িকতা নিয়ে আপত্তি থাকার কথা নয়। ময়ূখ বা রিপাবলিক বাংলার অন্য কোনো সাংবাদিক মুসলমানদের সম্পর্কে চাট্টি উস্কানিমূলক কথা বললে তা নিয়ে চ্যানেলে বসে চেঁচামেচি করে তাঁদের বরং সংখ্যালঘুদের রক্ষাকর্তা হওয়ার ভান করতে সুবিধা হবে। আর কংগ্রেসের তো কে নেতা, কে নয় তাই বোঝা শক্ত। অবস্থা এমনই যে রাহুল গান্ধীকে গুজরাটে গিয়ে বলতে হয় – কংগ্রেসে বিজেপির লোক আছে, তাদের তিনি বার করে দেবেন। ফলে কে কোথায় যাবেন না যাবেন সে ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেবে কে?

কিন্তু বামপন্থীরা, অন্তত তাঁদের ঘোষণা অনুযায়ী, বিজেপির সঙ্গে প্রতিযোগিতামূলক সাম্প্রদায়িকতা করতে নামেননি। আবার কংগ্রেসের মত নেতৃত্বহীনতার সমস্যাও থাকার কথা নয়, কারণ তাঁদের তো ‘রেজিমেন্টেড’ দল। তাহলে? ময়ূখ সরাসরি এ রাজ্যের বামপন্থীদের আক্রমণ করল বলে ঘুম ভাঙল, নাকি রাজ্য সম্পাদক মহম্মদ সেলিমের ধর্মীয় পরিচয় নিয়ে নোংরামি করার পরে ঘুম ভাঙল? যে কারণেই ভেঙে থাক, কবি বলেছেন, প্রভাত কেবল রাত্রির অবসানে নয়। যখনই চিত্ত জাগে তখনই প্রভাত হয়। কিন্তু প্রভাত কি আদৌ হয়েছে? এতকিছুর পরেও তো রিপাবলিক বাংলা চ্যানেলের শোতে বাম প্রতিনিধিরা হাজির হচ্ছেন। যাদবপুর কাণ্ডে রিপাবলিক বাংলার কার্যকলাপে আরও পরিষ্কার হয়ে গেছে যে তারা সাংবাদিকতা করে না। ক্যাম্পাসে ঢুকে তাদের প্রতিবেদকদের উদ্দাম অসভ্যতার (ভিডিও প্রমাণ বর্তমান) ফলে ছাত্রছাত্রীরা তাদের বিরুদ্ধে এফআইআর করেছে যাদবপুর থানায়। ছাত্রছাত্রীদের কাছে ‘দালাল’ আখ্যা পাওয়া প্রতিবেদকরা ক্যামেরার সামনে লাইন দিয়ে দাঁড়িয়ে সগর্বে দাবি করেছেন তাঁরা দালালই। দেশের মানুষের দালাল। অপছন্দের সাংবাদিকদের কোনো রাজনৈতিক সংগঠনের সদস্যরা দালাল আখ্যা দিচ্ছেন – এটা নতুন কিছু নয়। কিন্তু সত্যিকারের সংবাদমাধ্যম সে আখ্যাকে পাত্তা দেয় না, ‘আমরা অমুক আমরা তমুক’ বলে বড়াইও করে না। কারণ সাংবাদিকতার প্রাথমিক পাঠের মধ্যে যেটা পড়ে, সেটা হল – সাংবাদিক নিজে সংবাদ নয়। দেখা যাচ্ছে সেই প্রাথমিক পাঠটাই রিপাবলিক বাংলা মানে না। এরপরেও এদের সংবাদমাধ্যম হিসাবে গণ্য করার কোনো মানে নেই।

পশ্চিমবঙ্গের ফ্যাসিবিরোধী রাজনৈতিক দল, অরাজনৈতিক সংগঠন এবং ব্যক্তিরা প্রায় সবাই ‘গোয়েবেলস’ আর ‘রেডিও রোয়ান্ডা’ কথা দুটো ব্যবহার করে থাকেন। প্রথমটা অ্যাডলফ হিটলারের ঘনিষ্ঠ, নাজি প্রোপাগান্ডার দায়িত্বে থাকা কুখ্যাত ব্যক্তিটির নাম। দ্বিতীয়টা গত শতকের নয়ের দশকে আফ্রিকার রোয়ান্ডার গৃহযুদ্ধে হুটু হত্যার মিথ্যা খবর প্রচার করে, লোক খেপিয়ে টুটসিদের গণহত্যার পথ প্রস্তুত করা রেডিও স্টেশনের নাম। আমাদের ফ্যাসিবিরোধীরা সঠিকভাবেই বলে থাকেন যে এদেশের গোদি মিডিয়া গোয়েবেলসের কায়দায় মিথ্যা প্রচার করে এবং রেডিও রোয়ান্ডার কায়দায় পরজাতিবিদ্বেষ ছড়িয়ে গণহত্যার দিকে ঠেলে দিচ্ছে দেশের মুসলমানদের। কিন্তু মুশকিল হল, সে কাজে তাঁরা যে মদত দিয়ে ফেলছেন – এটা মানতে রাজি নন। আগে না হলেও, সম্প্রতি বাম দলগুলোর অনেক কর্মী, সমর্থক বলতে শুরু করেছেন যে রিপাবলিক বাংলায় পার্টি প্রতিনিধিদের আর না যাওয়াই উচিত। তাতে প্রতিযুক্তি দেওয়া হয় ‘ওই প্ল্যাটফর্মটা ব্যবহার করা দরকার। ছেড়ে দেওয়া উচিত না’। এই প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করনেওয়ালারা বোধহয় সেইসময় রোয়ান্ডায় থাকলে রেডিও রোয়ান্ডাতেও যেতেন – প্ল্যাটফর্মটা ব্যবহার করতে।

করে কী লাভ হচ্ছে? কোনো পরিমাপযোগ্য লাভ কোনো বাম দলের নেতা বা মুখপাত্র দেখাতে পারবেন না। কী ক্ষতি হচ্ছে তা বরং পরিষ্কার। বহু বাম সমর্থকের বাড়িতে গেলে দেখতে পাওয়া যায়, দিনরাত রিপাবলিক বাংলা এবং রিপাবলিক টিভি চলে। কেন চলে? কারণ বাম নেতারা ওই চ্যানেলগুলোতে যান বলে সমর্থকরা মনে করেন ওরা নিশ্চয়ই ঠিক জিনিস দেখায়, ঠিক কথা বলে। অর্থাৎ তাঁদের মনোজগতে রিপাবলিক নেটওয়ার্ক বৈধতা পেয়ে গেছে। এতে রিপাবলিকের সুবিধা হল, সারাদিন চেতনে ও অবচেতনে তাদের ঘৃণাভাষণ ও ভুয়ো খবর বাম সমর্থক পরিবারগুলোকে গেলাতে পারছে। ফলে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে সন্ত্রাসবাদী তৈরি হয় বললেও তারা বিশ্বাস করবে, শিগগির পশ্চিমবঙ্গে মুসলমানরা সংখ্যায় হিন্দুদের ছাড়িয়ে যাবে আর হিন্দুদের ফের দেশভাগের সময়কার মত জান মাল নিয়ে উদ্বাস্তু হতে হবে বললেও তারা বিশ্বাস করবে। সিপিএমের মিছিল, মিটিংয়ে লোক হয় অথচ ভোট কেন পড়ে না – এই প্রশ্নের এও এক উত্তর। বাম নেতারা অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসে মনে করেন, তাঁরা রিপাবলিকের প্ল্যাটফর্মকে ব্যবহার করছেন। আসলে রিপাবলিক তাঁদের ব্যবহার করছে। তার প্রমাণ নির্বাচনের পর নির্বাচনে বামেদের ভোট রামে চলে যাওয়া।

এই সহজ কথাটা স্বীকার করতে বাম নেতাদের ভীষণ অসুবিধা। তাঁদের জঙ্গি অনলাইন সমর্থকরাও এসব বললে বলেন – এটা মিডিয়ার যুগ। মিডিয়াকে ব্যবহার করতেই হবে। এখানে বলার কথা দুটো। প্রথমত, উট আর উটপাখি যেমন এক নয়, বক আর বকফুল যেমন এক নয়, রিপাবলিকও তেমন মিডিয়া নয়। দ্বিতীয়ত, মিডিয়া সম্পর্কে নিজেদের অগ্রজদের সাবধানবাণীই আজকের বাম নেতা কর্মীরা বিস্মৃত হয়েছেন। একাধিক লোকের স্মৃতিচারণে পাওয়া যায় যে জ্যোতি বসু আর প্রমোদ দাশগুপ্ত দুজনেই কমরেডদের বলতেন ‘আনন্দবাজার আমাদের কোনো কাজের প্রশংসা করলেই সাবধান হবেন। আরেকবার ভেবে দেখবেন কাজটা ঠিক হচ্ছে কিনা।’ তাও তো ওঁদের সময়ে কোনো সংবাদমাধ্যম রিপাবলিকের স্তরে নামেনি। তবু একথা তাঁরা কেন বলতেন? কারণটা খুব স্পষ্ট। মিডিয়া হাউস মানেই হল বৃহৎ পুঁজি। তার স্বার্থ সবসময় বামপন্থী দলগুলোর স্বার্থের পরিপন্থী, তারা যে শ্রেণির প্রতিনিধিত্ব করতে চায় – তার পরিপন্থী। সুতরাং তাদের প্ল্যাটফর্মে তারা বামপন্থীদের ততটুকুই প্রচার দেবে যতটুকুতে তাদের স্বার্থ বিঘ্নিত না হয়। অতএব তাদের নিন্দাই প্রত্যাশিত, প্রশংসা সন্দেহজনক।

একথা বললে সিপিএমের এখনকার লোকেরা বলেন ‘এখন যুগ বদলে গেছে। ওসব ওঁদের যুগে চলত, এখন চলে না।’ কথা হচ্ছে, যুগ তো সর্বদাই বদলায়। কিন্তু জ্যোতিবাবুদের সময় থেকে আজ পর্যন্ত মিডিয়ার কী ধরনের বদল হয়েছে? বৃহৎ পুঁজির বদলে এখনকার মিডিয়া কি ছোট পুঁজির হাতে চলে গেছে? ফলে তাদের স্বার্থের সঙ্গে বামপন্থীদের স্বার্থের সংঘাত আগের চেয়ে কমে গেছে? মোটেই তা নয়। বরং এখন মূলধারার মিডিয়া আরও বড় পুঁজির অধীন হয়েছে। দেশের অধিকাংশ মিডিয়া হাউস নামে, বেনামে হয় মুকেশ আম্বানি নয় গৌতম আদানির হাতে চলে গেছে। অর্ণব যখন রিপাবলিক টিভি চালু করেন, তখন তাঁকে পুঁজি জুগিয়েছিলেন আবার এক বিজেপি সাংসদ অস্ত্র ব্যবসায়ী – এ তথ্যও সবার জানা। সেই নেটওয়ার্কের চ্যানেলে না গেলে চলবে না বা গেলে বামপন্থীদের লাভ হবে – এহেন চিন্তার ব্যাখ্যা কী?

সন্তোষজনক ব্যাখ্যা যে নেই তা ১ মার্চের পর থেকে এ রাজ্যের বাম নেতা কর্মীরা বিলক্ষণ বুঝতে পারছেন। তাই ময়ূখের উপর অভিমান করতে শুরু করেছেন। কলেজজীবনে ময়ূখ ভারতের ছাত্র ফেডারেশন করতেন বলে শোনা যায়। সাংবাদিকতার পেশায় যাওয়ার পরেও সেই গন্ধ তাঁর গায়ে বেশ কিছুদিন লেগেছিল। সেই সময়কার সোশাল মিডিয়া পোস্ট দেখেই বিশেষত সিপিএম সমর্থকরা তাঁর প্রেমে পড়েছিলেন। এখন সেইসব পোস্ট শেয়ার করে বাক্যবাণ নিক্ষেপ করা হচ্ছে – তাহলে কি তখন ময়ূখ নিজেই দেশদ্রোহী ছিল, ইত্যাদি। সিপিএম নেতা সৃজন ভট্টাচার্যের একখানা ভিডিও দেখলাম। সেটা ১৩ মার্চ যাদবপুর ক্যাম্পাসে রিপাবলিকের বীরপুঙ্গবদের চরম অসভ্যতার আগে শুট করা। সেখানে সৃজন ময়ূখের বক্তব্যের সমস্ত গোলমাল সুন্দর তুলে ধরলেন, কিন্তু তারপর বললেন ‘ও ছোটবেলায় এরকম ছিল না’। মুশকিল হল, ছোটবেলায় তো হিটলারও নাজি ছিল না। তাতে কী এসে যায়? সমস্যাটা তো আসলে ব্যক্তি ময়ূখ বা ব্যক্তি মৌপিয়া নন। কোন সাংবাদিক কীভাবে কাজ করবেন, কোন বিষয়ে কোন পক্ষ নেবেন তা ঠিক হয় তাঁর কোম্পানির (পড়ুন মালিকের) স্বার্থ অনুযায়ী। এটুকু বোঝার মত রাজনৈতিক পরিপক্কতা কি বঙ্গ সিপিএমের নেতাদের নেই?

আরেকটা জিনিস হয়ত সৃজনের মত তরুণ নেতাদের পক্ষে বোঝা সম্ভব নয়, কারণ তাঁরা সে আমলে ছোট ছিলেন। কিন্তু প্রবীণ সেলিম বা সুজন চক্রবর্তীদের না জানার কথা নয়। তা হল বামফ্রন্ট আমলে কলেজে রাম, শ্যাম, যদু, মধু সবাই এসএফআই ছিল। অফিসে যেমন সবাই কো-অর্ডিনেশন কমিটি, স্কুলে এবিটিএ আর কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ে ওয়েবকুটা। ওতে কিছু প্রমাণ হয় না। অমন সর্বাঙ্গীণ আনুগত্য তৈরি করার বিপদই হল – সরকার বদলালেই লোকগুলো বদলে যায়। যেভাবে পাড়ায় পাড়ায় অটো স্ট্যান্ডের লাল পতাকাগুলো ঘাসফুলে বদলে গিয়েছিল ২০১১ সালে। মানুষের আসল রং বোঝা যায় দিন বদলালে। ময়ূখের রং এখন দেখা যাচ্ছে।

একটা সংবাদমাধ্যমে যতজন সাংবাদিক কাজ করেন তাঁরা সকলে নীতি নির্ধারক নন। অন্য যে কোনো পেশার মত সেখানেও অধিকাংশই স্রেফ হুকুম তামিল করেন। ফলে সংবাদমাধ্যমের কুকর্মের জন্য সাংবাদিককে সবসময় দায়ী করা যায় না। কিন্তু ময়ূখ, মৌপিয়া, সুমনরা যে স্তরে পৌঁছে গেছেন তাতে আর তাঁদের পদাতিক সৈনিক বলে ছাড় দেওয়া যায় না। ওই স্তরের সাংবাদিকরা সরাসরি নির্দেশ নেন মালিকের থেকে, অনেকসময় কোম্পানিতে তাঁদের শেয়ারও থাকে। মালিকরা জেনে বুঝেই এমন লোককে ওই জায়গায় তোলেন যে বিনা বাক্যব্যয়ে এমন কাজ করতে পারবে যা বিন্দুমাত্র বিবেক থাকলে পারা যায় না। ফলে ময়ূখ-মেদুরতা এবং প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করার ভাবনা ছেড়ে পশ্চিমবঙ্গের ধর্মীয় মেরুকরণে নেমে পড়া মিডিয়াকে বয়কট করার সময় এসে গেছে। বিভিন্ন দলের নেতারা ওসব চ্যানেলে গিয়ে বৈধতা না দিলেই সমর্থকদের চোখেও ওদের বিশ্বাসযোগ্যতা কমবে। তার প্রতিফলন ভোটবাক্সে পড়বে কিনা জানি না, ক্রমশ বারুদের স্তূপ হয়ে ওঠা সমাজে অবশ্যই পড়বে। রবীশ কুমার এমনি এমনি বলেন না – টিভিতে খবর দেখা বন্ধ করুন।

পুনশ্চ: রিপাবলিক টিভি আর কলকাতার টিভির দুই তারকার চেয়ে ভদ্র আচরণ করেন। তাহলেও এবিপি আনন্দের সুমনের কথাবার্তা কোন দিকে গড়ায় সেদিকে সতর্ক দৃষ্টি রাখা দরকার আমাদের সকলের। মনে রাখা ভাল, তিনি পুঁচকে দল ইন্ডিয়ান সেকুলার ফ্রন্টের আব্বাস সিদ্দিকীকে বলতে পারেন ‘আব্বাস, আপনি বিজেপির ভোট কাটুয়া।’ কিন্তু অমিত শাহের সাক্ষাৎকার নেওয়ার সময়ে জিজ্ঞেস করে উঠতে পারেন না – তৃণমূল থেকে বিজেপিতে আর বিজেপি থেকে তৃণমূলে অবাধ যাতায়াত চলে কী করে? উপরন্তু, বাংলাদেশের বিদ্রোহকে হাতিয়ার করে সাম্প্রদায়িক হাওয়া তোলার চেষ্টা সুমনের শো থেকেও কম হয়নি। আর সাম্প্রতিক যাদবপুর কাণ্ডে তিনি আপ্রাণ চেষ্টা করছিলেন প্রমাণ করতে যে ইন্দ্রানুজ রায়ের উপর দিয়ে মন্ত্রীর গাড়ি চলে যাওয়ার ছবিটা ভুয়ো। প্রমাণ হিসাবে কী যুক্তি দিচ্ছিলেন? না ছবিটা গণশক্তি ছাড়া কোথাও বেরোয়নি। এই যুক্তিতে দুনিয়ার সব সংবাদমাধ্যমের সব এক্সক্লুসিভই ভুয়ো। কারণ সেই খবর অন্য কোথাও বেরোয় না।

ভাবতে অবাক লাগে, জরুরি অবস্থার সময়ে পশ্চিমবাংলার একাধিক সম্পাদককে জেল খাটতে হয়েছিল সরকারের সামনে মাথা নোয়াননি বলে। সেই গৌরকিশোর ঘোষ, বরুণ সেনগুপ্তরা জীবিত নেই। কিন্তু তাঁদের শিষ্যরা অনেকে আছেন। সেই শিষ্যদের আজও অনেক সাংবাদিক আদর্শ বলে মনে করেন, বহু পাঠক/দর্শক তাঁদের মতামতকে গুরুত্ব দেন। সেই অনির্বাণ চট্টোপাধ্যায়, জয়ন্ত ঘোষাল, অশোক দাশগুপ্তরা এখনো হয় কাগজে নয় সোশাল মিডিয়ায় যথেষ্ট সক্রিয়। এই ‘গ্র্যান্ড ওল্ড ম্যান’-রা কেউ কি সোচ্চারে বলেছেন, বাংলার টিভি চ্যানেলগুলো যা করছে তা সাংবাদিকতা নয়? কারোর জানা থাকলে খবর দেবেন।

নাগরিক ডট নেট ওয়েবসাইটে প্রকাশিত

গৌরী লঙ্কেশ এখন অবান্তর স্মৃতি

যেহেতু সাংবাদিকরা আকাশ থেকে পড়েন না, আর সকলের মত তাঁরাও একটা আর্থসামাজিক ব্যবস্থা এবং রাষ্ট্রব্যবস্থার উৎপাদন, সেহেতু গৌরীর খুনে অভিযুক্তদের সাম্প্রতিক জামিন এবং মালা পরিয়ে বরণের দৃশ্যও আমাকে অবাক করেনি। মুচকি হেসে স্ক্রোল করে অন্য খবরে চলে যেতে আমার অসুবিধা হয়নি।

“বাট গৌরী লঙ্কেশ ওয়াজ নট আ জার্নালিস্ট। শি ওয়াজ অ্যান অ্যাক্টিভিস্ট।”

৬ সেপ্টেম্বর ২০১৭। বক্তা পঞ্চাশের বেশি সংস্করণবিশিষ্ট একটি ভারতীয় ইংরিজি কাগজের একাধিক সংস্করণের একজন সম্পাদক। ঠিক তার আগের দিন গৌরী নিজের বাড়ির সামনে গুলিতে ঝাঁঝরা হয়ে গেছেন। কথাগুলো ভদ্রলোক বলছিলেন একঝাঁক অতি তরুণ সাংবাদিককে, যারা সদ্য কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণ্ডি পেরিয়ে সাংবাদিকতায় পা রেখেছে। স্বাধীনতার ৭০ বছর পরে কলকাতার যে শীতাতপনিয়ন্ত্রিত অফিসে দাঁড়িয়ে নিজের পদের সুযোগ নিয়ে উনি কথাগুলো বলছিলেন, পরাধীন দেশে নীলকর সাহেবদের বিরুদ্ধে লিখে লিখে মরে যাওয়া হিন্দু প্যাট্রিয়ট কাগজের সম্পাদক হরিশ্চন্দ্র মুখোপাধ্যায়ের নামাঙ্কিত রাস্তাটা সেখান থেকে কিলোমিটার দেড়েক। এমনকি যে অফিসে দাঁড়িয়ে তিনি কথা বলছিলেন, সেই অফিসের সামনের রাস্তার নামকরণ হয়েছিল সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের নামে। হরিশ তবু সরকারি কর্মচারী ছিলেন, দলীয় রাজনীতি করতেন না। সুরেন বাঁড়ুজ্জে রীতিমত কংগ্রেস সভাপতি ছিলেন। সেইসঙ্গে দ্য বেঙ্গলি নামের কাগজ সম্পাদনা করতেন। সম্ভবত তিনিই প্রথম ভারতীয় সাংবাদিক, যাঁকে কাগজের একটি লেখার জন্যে কারাদণ্ডে দণ্ডিত হতে হয়। আরও পিছিয়ে গেলে এই কলকাতাতেই রামমোহন রায় বলে একজন সাংবাদিকের নাম পাওয়া যাবে। রামমোহনের কলমের জোরে ইংরেজ আমলের সুপ্রিম কোর্টকেও গেঁয়ো রায়তের চাবুক খেয়ে মৃত্যুর ঘটনায় জেলা জজের কৈফিয়ত তলব করতে হয়েছিল। সেই শহরে বসে একজন শীর্ষস্থানীয় সম্পাদক গৌরীর মৃত্যুর পরদিনই বলতে পেরেছিলেন যে গৌরী সাংবাদিক ছিলেন না, কারণ তিনি অ্যাক্টিভিস্ট ছিলেন।

দৃশ্যটা দেখেছিলাম এবং কথাগুলো শুনেছিলাম ফুটখানেক দূর থেকে। চুপ করে থাকতে হয়েছিল, কারণ ওই যে বললাম – আমি তখন কর্পোরেট ক্রীতদাস। ক্রীতদাসের প্রতিবাদ করার অধিকার থাকে না, সাহসও থাকে না। তবে আমাদের পায়ের তলার জমি যে সরছে সেটা সেদিনই পরিষ্কার হয়ে গিয়েছিল আমার কাছে। যে দেশে একজন সাংবাদিক খুন হলে অন্য সাংবাদিকরা বলে – ও সাংবাদিক নয় কারণ ও অ্যাক্টিভিস্ট, সে দেশে কোনো সাংবাদিকের জীবনেরই যে দাম থাকবে না অদূর ভবিষ্যতে, চাকরি থাকা দূর অস্ত, তা বুঝতে আমার অসুবিধা হয়নি। আমার অনুমান নির্ভুল প্রমাণ করে বছর তিনেকের মধ্যেই অতিমারীর অজুহাতে ভারতের মিডিয়ায় ব্যাপক সাংবাদিক ছাঁটাই শুরু হয়। যেহেতু সাংবাদিকরা আকাশ থেকে পড়েন না, আর সকলের মত তাঁরাও একটা আর্থসামাজিক ব্যবস্থা এবং রাষ্ট্রব্যবস্থার উৎপাদন, সেহেতু গৌরীর খুনে অভিযুক্তদের সাম্প্রতিক জামিন এবং মালা পরিয়ে বরণের দৃশ্যও আমাকে অবাক করেনি। মুচকি হেসে স্ক্রোল করে অন্য খবরে চলে যেতে আমার অসুবিধা হয়নি। কারণ সাংবাদিক হত্যা আর সাংবাদিক ছাঁটাইয়ের উদ্দেশ্য একই – ক্ষমতাশালীর সমালোচনা বন্ধ করা, ক্ষমতার দিকে আঙুল তোলা বন্ধ করা, ক্ষমতাহীনের কণ্ঠ সকলের কানে পৌঁছবার ব্যবস্থা নষ্ট করা।

আরও পড়ুন তালিবান শাসন: ঘর হতে শুধু দুই পা ফেলিয়া

লজ্জাজনক হলেও স্বীকার না করে উপায় নেই, যে খুন হওয়ার আগে পর্যন্ত গৌরী আমার কাছে খুব পরিচিত ছিলেন না। দু-একবার নাম শুনেছিলাম। কিন্তু দ্য টাইমস অফ ইন্ডিয়া, সানডে পত্রিকা, ইনাড়ু টিভি চ্যানেলের মত বড় বড় কর্পোরেট সংবাদমাধ্যমে দেড় দশক কাজ করলেও গৌরীকে আমরা যেসব কাজের জন্য আজও মনে রেখেছি সেসব তিনি করেছেন মাতৃভাষা কন্নড়ে, মূলত তাঁর বাবা পলিয়া লঙ্কেশের মৃত্যুর পর তাঁরই প্রতিষ্ঠিত কাগজ লঙ্কেশ পত্রিকে (পরবর্তীকালে গৌরী লঙ্কেশ পত্রিকে)-র দায়িত্ব নিয়ে। আমরা বাঙালিরা আমেরিকায় কী হচ্ছে খবর রাখি, ইউরোপের সাংবাদিকতার হাল হকিকতও জানি। কিন্তু বিভিন্ন ভারতীয় ভাষার সাংবাদিকদের খবর জানি না। বড়জোর হিন্দি ভাষার রবীশ কুমারদের আমরা চিনি। তাও তাঁরা কর্পোরেট টিভি চ্যানেলে তারকা হয়ে উঠেছিলেন বলে। গৌরীর মত বিভিন্ন ভারতীয় ভাষার সংবাদমাধ্যমে যাঁরা মরণপণ সাংবাদিকতা করেন তাঁদের খবর আমরা পাই কোথায়? হয়ত চাই না বলেই পাই না। তাই আমাদের নিজেদের বিকল্প সাংবাদিকতা হয়ে দাঁড়ায় শিকড়হীন, কোনো কোনো ক্ষেত্রে সুবিধাবাদীও। লিটল ম্যাগাজিনের দীর্ঘ ঐতিহ্য থাকলেও বাংলায় বিকল্প সংবাদমাধ্যম সম্ভবত তৈরিই হত না মূলধারার সংবাদমাধ্যমে সাংবাদিকতার পরিসর ক্রমশ সংকীর্ণ হয়ে না গেলে। অন্যদের দোষ দেব না, আমারও তো দিব্যি চলে যাচ্ছিল দেড় দশক কর্পোরেট ক্রীতদাস হয়ে মাসান্তে মোটা মাইনে পকেটস্থ করে। গৌরীর হত্যা নাড়া দিলেও, নড়াতে তো পারেনি। বিকল্প হওয়ার জ্বালা যে অনেক। যা পাওয়া যায় তার চেয়ে ছাড়তে হয় অনেক বেশি।

আসলে গৌরীর মৃত্যু কেবল তাদেরই নড়াতে পেরেছে, গৌরী যাদের জন্য নিজের কলমকে হাতিয়ারের মত ব্যবহার করেছিলেন। নইলে নিজের বাড়ির সামনে খুন হওয়ার সাতবছর পরেও, কারা সম্ভাব্য খুনি তার মোটামুটি হদিশ থাকা সত্ত্বেও গৌরীর হত্যাকারীরা শাস্তি পাবে না কেন? মনে রাখা ভাল, গৌরী হিন্দুত্ববাদীদের দীর্ঘদিনের শত্রু হলেও তাঁকে যখন খুন করা হয় তখন কর্ণাটকে ছিল সিদ্দারামাইয়ার নেতৃত্বাধীন কংগ্রেস সরকার। সেই সরকারের পুলিসও অপরাধীদের শাস্তি দেওয়ার কাজে তেমন এগোয়নি। ইতিমধ্যে একাধিকবার সরকার বদল হয়ে গতবছর গৌরীর রাজ্যে আবার ক্ষমতায় এসেছে কংগ্রেস, আবার মুখ্যমন্ত্রী হয়েছেন সিদ্দারামাইয়া। বহু রাজনৈতিক বিশ্লেষকের মতে কংগ্রেসের কর্ণাটক জয়ের অন্যতম কারণ রাহুল গান্ধীর ভারত জোড়ো যাত্রা এবং হিন্দুত্ববাদের বিরুদ্ধে সোচ্চার অবস্থান। তবু কিন্তু হিন্দুত্ববাদের আমৃত্যু প্রতিপক্ষ গৌরীর হত্যার অভিযোগে গ্রেফতার হওয়া ১৭ জনের মধ্যে ১১ জন ইতিমধ্যেই জামিনে মুক্ত। রাহুলের মহব্বতের দোকানে গৌরীর জন্যে কি তবে কিছুই নেই? যেমন চারবছর ধরে বিনা বিচারে আটক সেই উমর খালিদের জন্য তাঁর দোকানে নেই একটা শব্দও, যাঁকে গৌরী নিজের ছেলে বলতেন?

আসলে বোবার যেমন শত্রু নেই, তেমনি যথার্থ সাংবাদিকের শত্রুর অভাব নেই। গৌরীরও ছিল না। কর্ণাটকের আজকের উপমুখ্যমন্ত্রী ডি কে শিবকুমারের বিরুদ্ধেও গৌরী একসময় লেখালিখি করেছিলেন। এমনকি সিদ্দারামাইয়া সরকারের টিপু সুলতান জয়ন্তী পালন করার সিদ্ধান্তকেও তিনি ভাল চোখে দেখেননি। তিনি ওই সিদ্ধান্তকে ‘নরম সাম্প্রদায়িকতা’ আখ্যা দিয়েছিলেন। এমন একজনের হত্যাকারীরা শাস্তি পেল কি পেল না, তা নিয়ে কেনই বা মাথা ঘামাতে যাবে কোনো দল বা তার নেতৃত্ব? যে ভারতে প্রয়োজনীয় অর্ণব গোস্বামী, নাভিকা কুমার, মৌপিয়া নন্দীর মত সরকারি তোতাপাখিরা; সেখানে গৌরী যে অপ্রয়োজনীয় তা বলাই বাহুল্য।

গৌরীর মৃত্যুর পর তাঁর আমৃত্যু বন্ধু এবং প্রাক্তন স্বামী সাংবাদিক চিদানন্দ রাজঘাট্টা এক দীর্ঘ ফেসবুক পোস্ট করেছিলেন, যা একান্ত ব্যক্তিগত অথচ গৌরী লঙ্কেশের শত্রু কারা এবং কেন – তা বোঝার সবচেয়ে ভাল উপায়। সেই পোস্ট পড়ে হয়ত বাঙালি বদভ্যাসেই আমার মনে পড়েছিল শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের সেইসব লাইন ‘অবান্তর স্মৃতির ভিতর আছে/তোমার মুখ অশ্রু-ঝলোমলো/লিখিও, উহা ফিরৎ চাহো কিনা?’ আজ সাতবছর পরে মনে হচ্ছে, ব্যাপারটা আর কাব্যে আটকে নেই। গৌরী এই দেশের কাছে ব্যবহারিকভাবেও অবান্তর স্মৃতিই হয়ে গেছেন।

রোববার.ইন ওয়েবসাইটে প্রকাশিত

সাংবাদিকদের অকালমৃত্যু যা যা শেখায়

আমার দ্বিতীয় চাকরিতে যিনি আমার বস ছিলেন, তিনি এক বিরল প্রজাতির ভদ্রলোক। একটুর জন্যে সতীশ হতে হতে বেঁচে গিয়েছিলেন।

লোকসভা নির্বাচনের বাজারে একটা মৃত্যু প্রায় সকলের নজর এড়িয়ে গেছে, কারণ বাংলা সংবাদমাধ্যমে তা নিয়ে এক লাইনও লেখা হয়নি। মূলধারার সংবাদমাধ্যমে অবশ্য সেই মৃত্যু নিয়ে লেখালিখি হওয়ার সম্ভাবনাও ছিল না। নিজের অপরাধ সকলেই ধামাচাপা দেয়। মূলধারার বাইরে আছি বলেই আমার লেখার সুযোগ ছিল। কিন্তু নির্বাচন সংক্রান্ত লেখালিখিতে মেতে গিয়ে আমিও সেই বর্ষীয়ান সাংবাদিকের মৃত্যুকে অগ্রাহ্য করার দোষে দুষ্ট হয়েছি। এই লেখা বস্তুত পাপস্খালনের চেষ্টা।

ভদ্রলোকের নাম সতীশ নন্দগাঁওকর। তিনি সর্বভারতীয় এবং স্বনামধন্য খবরের কাগজ হিন্দুস্তান টাইমস-এর মুম্বাই সংস্করণের মুম্বাই-থানে ব্যুরোর প্রধান ছিলেন। যাঁরা খবরের কাগজের কার্যপদ্ধতি সম্পর্কে ওয়াকিবহাল, তাঁরা জানেন যে পদটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই ধরনের পদগুলোতে সাধারণত থাকেন অত্যন্ত অভিজ্ঞ রিপোর্টাররা। তাঁদের অধীনে কাজ করেন অন্যরা। এই ব্যুরো প্রধানদের কাজের সময় বলে কিছু থাকে না, থাকা সম্ভব নয়। হয়ত অফিস থেকে বাড়ি চলে গেলেন রাত নটায়, কিন্তু দুটোর সময়ে ফোন আসতে পারে যে অমুক জায়গায় তমুক ঘটনা ঘটেছে। তখন নিজে না গেলেও, তাঁরই দায়িত্ব অন্য কোনো রিপোর্টারকে জানিয়ে খবরটা যেন পরদিন কাগজে বেরোয় তা নিশ্চিত করা। অফিসে নাইট ডিউটিতে থাকেন যে রিপোর্টার, তিনিও কোনো সিদ্ধান্ত নিতে অপারগ হলে যত রাতই হোক ব্যুরো প্রধানকে ঘুম থেকে তোলেন। এটাই দস্তুর। আবার কোনো খবর হাতছাড়া হয়ে গেলে, বা ভুল খবর বেরিয়ে গেলে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে জবাবদিহির দায়িত্বও প্রথমে ব্যুরো প্রধানের। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে অত বড় কাগজের ব্যুরো প্রধানরা নিজেরাও নামকরা সাংবাদিক হন। ফলে কাগজের উপর রাজনৈতিক/অরাজনৈতিক যেসব চাপ আসে বাইরে থেকে, তার অনেকটাও তাঁদেরই সামলাতে হয়। তার উপর রিপোর্টাররা অনেক ক্ষেত্রে অপাঠ্য, দুর্বোধ্য কপি লেখেন। সেই কপিকে বোধ্য করে তুলে তবে সম্পাদনার ডেস্কে পাঠানোও ব্যুরো প্রধানের দায়িত্ব।

এইরকম প্রচণ্ড চাপের একটা কাজ করতেন সতীশ। সঙ্গে আরও বেশকিছু অতিরিক্ত কাজ তাঁকে করতে হত। তিনি গত ২৮ ফেব্রুয়ারি মুম্বাইয়ে অফিসের কাছেই এক ওষুধের দোকানে ব্যথার ওষুধ কিনতে গিয়ে হৃদরোগে আক্রান্ত হন। নিকটবর্তী হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলে চিকিৎসকরা বলেন সতীশ মারা গেছেন। এমন মৃত্যু নেহাত বিরল নয়। আমার আপনার অনেক পরিচিতই এরকম হঠাৎ হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান আজকাল। তাহলে সতীশকে নিয়ে লিখছি কেন? কারণ তাঁর মৃত্যুর পর কিছু অভূতপূর্ব ঘটনা ঘটেছে।

গত ১৩ মার্চ মুম্বাই প্রেস ক্লাবে সতীশের স্মরণসভায় তাঁর স্ত্রী অঞ্জলি অম্বেকর বলেন, ‘সাংবাদিক না হলে সতীশ একটা সুন্দর জীবন কাটাতে পারত।’ কথাটা নেহাত একজন অকালমৃতের স্ত্রীর বিলাপ বলে উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। কারণ তিনি হিন্দুস্তান টাইমসের মুম্বাই সংস্করণের রেসিডেন্ট এডিটর মীনা বাঘেলের বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন এডিটর্স গিল্ড অফ ইন্ডিয়া, প্রেস কাউন্সিল এবং মুম্বাই প্রেস ক্লাবে। তাঁর অভিযোগ, মীনা অনবরত অন্য সাংবাদিকদের সামনে সতীশকে অপমান করতেন, যা তাঁর মত সংবেদনশীল মানুষকে প্রবল আঘাত করত। মারা যাওয়ার খানিকক্ষণ আগে, শীতাতপনিয়ন্ত্রিত ঘরে বসে কুলকুল করে ঘামতে ঘামতে সতীশ বলেছিলেন যে তিনি পরদিনই পদত্যাগ করবেন। কারণ সেদিনও খানিক আগেই মীনা একই আচরণ করেছিলেন এবং এই আচরণ দীর্ঘদিন ধরে চলছিল। অঞ্জলির অভিযোগের ভিত্তিতে মুম্বাই প্রেস ক্লাব প্রাথমিক তদন্ত চালিয়ে রিপোর্ট তৈরি করেছে। তাতে বলা হয়েছে, যদিও সতীশের মৃত্যু আর মীনার ব্যবহারের মধ্যে কোনো সরাসরি সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করা যায়নি, তবু একথা সত্যি যে মীনা তাঁকে প্রচণ্ড মানসিক চাপে রাখতেন এবং নিয়মিত অপমান করতেন। এসব ‘কার্ডিয়াক এপিসোড’-এর কারণ হয়ে থাকতেই পারে।

এডিটর্স গিল্ডও এক বিবৃতিতে হিন্দুস্তান টাইমস কর্তৃপক্ষকে এই মৃত্যুর যথাযথ ও স্বচ্ছ তদন্ত করতে অনুরোধ করেছে। এর বেশি কিছু করার ক্ষমতা প্রেস ক্লাব বা গিল্ডের আইনত নেই, কারণ এগুলো সাংবাদিকদের সংগঠন মাত্র। ট্রেড ইউনিয়ন পর্যন্ত নয়। সত্যি কথা বলতে, ভারতের কর্পোরেট সংবাদমাধ্যমে বছর তিরিশেক হল সাংবাদিকদের ট্রেড ইউনিয়ন করা বন্ধ হয়ে গেছে। নয়ের দশকে উদারীকরণের সময়ে সংবাদমাধ্যমগুলো কর্মচারীদের চাকরিগুলোকে চুক্তিভিত্তিক করে ফেলার চেষ্টা শুরু করে। সংবাদমাধ্যমে যাঁরা শ্রমজীবী, অর্থাৎ ছাপার মেশিন চালানোর কাজ করেন বা অফিসগুলোতে পিওনের কাজ ইত্যাদি করতেন, তাঁদের মধ্যে এর বিরুদ্ধে কিছুটা প্রতিরোধ তৈরি হয়েছিল। তাই তাঁদের চুক্তিভিত্তিক কর্মচারী করে ফেলা সহজ হয়নি, অনেকে পুরনো ওয়েজ বোর্ডের অধীনেই রয়ে গিয়েছিলেন। তাঁদের যখন তখন তাড়ানো যায় না; যেমন ইচ্ছে ইনক্রিমেন্ট না দেওয়া বা মাইনে কমিয়ে দেওয়াও যায় না। অর্থাৎ নানা ঝামেলা পোয়াতে হয় মালিককে। অত টাকা দিতে পারব না, ব্যবসার অবস্থা ভাল না – এসব ওজর নিয়ে কোটিপতি কাগজগুলোর মালিকরা বিভিন্ন সময়ে আদালতে পর্যন্ত গেছেন ওই ধরনের কর্মচারীদের বিরুদ্ধে। কর্মচারীরাও গেছেন। অধিকাংশ ক্ষেত্রে কর্মচারীদেরই জয় হয়েছে।

কিন্তু যাঁরা নিজেদের বুদ্ধিজীবী মনে করেন, সেই সাংবাদিকরা, পাকা চাকরি থেকে চুক্তিভিত্তিক চাকরিতে চলে যেতে বিশেষ আপত্তি করেননি। কারণ তাঁদের সামনে মহার্ঘ প্যাকেজের গাজর ঝোলানো হয়েছিল। ফলে সাংবাদিকদের মধ্যে থেকে ইউনিয়ন তুলে দিতে মালিকদের বিশেষ কসরত করতে হয়নি। কিন্তু কেবল শ্রমজীবীদের মধ্যে ইউনিয়ন থাকতে থাকতে ক্রমশ দুর্বল হয়ে পড়ে; মালিকরা যে দুর্বল করে দিতে সক্রিয় ছিল তা বলাই বাহুল্য। যত পুরনো কর্মী অবসর নিয়েছেন, তত চুক্তিভিত্তিক কর্মী বেড়েছে, ইউনিয়ন ততই সাইন বোর্ডে পরিণত হয়েছে। সেই ৩০-৩৫ বছর আগে শুরু হওয়া প্রক্রিয়ার ফল এই, যে আজ সতীশরা কারণে-অকারণে গালমন্দ সহ্য করে কাজ করতে বাধ্য হন। পরিণামে জীবনটা পর্যন্ত চলে যায় অনেক সময়।

শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত হিন্দুস্তান টাইমস সতীশের বস মীনার বিরুদ্ধে কোনো তদন্ত করছে না। করলেও সতীশের মৃত্যুতে তাঁকে দায়ী করার মত কোনো প্রমাণ যে পাওয়া যাবে না তা বলাই বাহুল্য। আত্মহত্যায় প্ররোচনার অভিযোগই আদালতে প্রমাণ করা যথেষ্ট দুরূহ, আর এ তো ডাক্তারি পরিভাষায় স্বাভাবিক মৃত্যু। কিন্তু গত কয়েক বছরে সাংবাদিকদের মধ্যে ৫০-৬০ বছর বয়সে মৃত্যু কীভাবে বেড়েছে তার যদি কোনো সমীক্ষা করা যায়, তাহলে যে চোখ কপালে তোলার মত একটা সংখ্যা পাওয়া যাবে তা নিয়ে আমার কোনো সন্দেহ নেই। কেন সন্দেহ নেই?

কারণ যে পরিস্থিতিতে পড়ে সতীশের হৃদপিণ্ড কাজ বন্ধ করে দিয়েছে, তেমন পরিস্থিতিতে খবরের কাগজের দেড় দশকের কর্মজীবনে আমি নিজেও পড়েছি, অগ্রজ সহকর্মীদেরও পড়তে দেখেছি। হয়ত বয়স কম ছিল বলে আমার শরীর লড়ে গেছে। কিন্তু অগ্রজদের চল্লিশ না পেরোতেই নানারকম ছোট বড় রোগে আক্রান্ত হতে দেখেছি। সাংবাদিকদের মধ্যে ডায়বেটিস, হাইপার টেনশন, হৃদরোগ আজকাল জলভাত। আমার শেষ চাকরির এক অনুজ হঠাৎ একদিন রাতে সিলিং ফ্যান থেকে ঝুলে পড়েছিল। অন্য বিভাগের কর্মী হওয়ায় তার সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা ছিল না আমার। কিন্তু তার মৃত্যুর পরে তারই বিভাগের সাংবাদিকদের থেকে জেনেছিলাম, ওই ঝুলে পড়া মোটেই আকস্মিক নয়। তার কাজের সময় উদ্ভট হওয়ায় বৈবাহিক জীবনে অশান্তি চলছিল বেশ কিছুদিন ধরে। সে তার সুরাহা করার জন্যে বসের কাছে সামান্য পেশাদারি সাহায্য চেয়েছিল – কাজের সময়টা যদি অন্তত কিছুদিনের জন্য বদল করা যায়। তাকে প্রতিশ্রুতি দিয়েও সে বদল করা হয়নি। স্ত্রীর সঙ্গে অশান্তিও মেটেনি। ছেলেটি খুব বলিয়ে কইয়ে ছিল না। যাওয়ার সময়ে সুইসাইড নোট লেখার নাটকীয়তাটুকুও করেনি। এই মৃত্যুর দায়িত্ব কে নেবে? কেউ না। বেচারির তো অভিযোগ করারও কেউ ছিল না।

আমার দ্বিতীয় চাকরিতে যিনি আমার বস ছিলেন, তিনি এক বিরল প্রজাতির ভদ্রলোক। একটুর জন্যে সতীশ হতে হতে বেঁচে গিয়েছিলেন। আমি ওই কাগজের খেলার পাতায় যোগ দিয়েই শুনি, ক্রীড়া সম্পাদকের কয়েকদিন আগেই গুরুতর স্ট্রোক হয়েছে। তাই তিনি হাসপাতালে ভর্তি। মাস দেড়েক পরে যখন কাজে যোগ দিলেন, দেখলাম নিপাট ভালমানুষ এবং অফিসে অসম্ভব জনপ্রিয়। শুধু কাগজের সম্পাদক ভদ্রমহিলা, যিনি অত্যন্ত দক্ষ সহ-সম্পাদককেও ভরা নিউজরুমে হাঁটুর বয়সী ছেলেমেয়েদের সামনে অপদস্থ করতে ছাড়েন না, তিনিই আমাদের ক্রীড়া সম্পাদকের উপর খড়্গহস্ত। কোনো নির্দিষ্ট কারণ ছাড়াই। তাঁর সব কাজেই উনি ভুল ধরেন। মজার কথা, কাজ বলতে যা বোঝায় তা ওই ভদ্রমহিলাকে একদিনও করতে দেখিনি। আমি যে আট মাস ওই কাগজে ছিলাম, তার মধ্যে একদিনও সম্পাদক এক লাইন লেখেননি কাগজে। সম্পাদকীয় পর্যন্ত লিখতেন না। সারাদিন বসে বসে এর তার উপর চেঁচানো আর কয়েকটা পাতায় চোখ বোলানো ছাড়া তাঁর কাজ বলতে ছিল ম্যাড়মেড়ে ইংরিজিতে একে তাকে অপ্রয়োজনীয় ইমেল পাঠানো। কোনোদিন প্রথম পাতায় একটা শিরোনাম পর্যন্ত দিতে দেখিনি। অথচ তিনিই ওই কাগজের দণ্ডমুণ্ডের কর্তা। সদ্য মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে আসা আমার বসকে দেখতাম – সম্পাদকের চিৎকার শুরু হলেই হাত কাঁপছে। এর অনিবার্য ফল যা, একদিন ঠিক তাই ঘটল। সকালবেলা খবর পেলাম, আমাদের ক্রীড়া সম্পাদকের আবার হার্ট অ্যাটাক হয়েছে। তিনি ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিটে ভর্তি। আমি আর আমার এক সহকর্মী হাসপাতালে দেখতে গিয়ে ক্রীড়া সম্পাদকের স্ত্রীর মুখে যা শুনেছিলাম, তার সঙ্গে সতীশের স্ত্রীর বয়ানের শিউরে ওঠার মত মিল। সুখের কথা, তিনি কিছুদিন পরেই অবসর নেন। হয়ত সে কারণেই এখনো সুস্থ শরীরে জীবিত।

আরও পড়ুন টুইটার, বাইজু’স আঁধারে ছাঁটাই সম্পর্কে কয়েকটি কথা

এসব কথা লিখছি কেন? সব কর্পোরেট চাকুরেরই তো অল্পবিস্তর একইরকম অভিজ্ঞতা হয়। তাই তো আজকাল কাউকে জিজ্ঞেস করলে শোনা যায় না যে সে নিজের চাকরিতে সুখী। তাহলে সাংবাদিকরাই বা ব্যতিক্রম হবেন কেন? তাঁদের নিয়ে আলাদা করে লেখার কী আছে? সঙ্গত প্রশ্ন। আসলে ভারতের মূলধারার সাংবাদিকতা যে অতল খাদের মধ্যে পড়েছে গত এক দশকে, তাকে বুঝতে গেলে সাংবাদিকরা কোন অবস্থার মধ্যে কাজ করেন তা জানা দরকার। নইলে অন্ধের হস্তিদর্শন হয়।

শিক্ষকতার ব্যাপারে অনেকে বলে থাকেন, প্রচণ্ড মারধর করে সেইসব শিক্ষকরাই, যারা ভাল করে পড়াতে পারে না। সাংবাদিকতার ব্যাপারেও বললে ভুল হবে না যে অধস্তনদের উপর নিত্য চোটপাট চালানো, গালিগালাজ, অপমান করা অযোগ্য সাংবাদিকের লক্ষণ। ওই আচরণের পিছনে নিজের যোগ্যতার অভাবজনিত নিরাপত্তাহীনতার বড় ভূমিকা থাকে। বেশি যোগ্যতাসম্পন্ন কেউ তাকে অতিক্রম করে যাবে – এই উৎকণ্ঠা থেকে অধস্তনদের আত্মবিশ্বাস নষ্ট করে দেওয়ার প্রচেষ্টা থাকে। এর অজস্র উদাহরণ আছে। কিন্তু নাম করলে আইনি ঝামেলায় পড়তে হবে। কে না জানে, রাজনৈতিক নেতাদের পরেই সবচেয়ে লম্বা হাত বড় মিডিয়ার বড় সাংবাদিকদের? তাঁরা ক্ষমতাকে প্রশ্ন করতে না পারুন, কোটিপতি মালিকের মদতে এবং রাজনৈতিক ক্ষমতাবানদের সঙ্গে দহরমের সুবাদে ক্ষমতাহীনকে মাটিতে মিশিয়ে দিতে সিদ্ধহস্ত। দুঃখের বিষয়, নয়ের দশক থেকে মিডিয়ার দখল সম্পাদকদের হাত থেকে সরাসরি মালিকদের হাতে চলে যাওয়ায় এই ধরনের অযোগ্য অথচ বশংবদ সাংবাদিকদেরই তাঁরা উঁচু পদগুলোতে বসিয়েছেন। কারণ যোগ্য সাংবাদিক মালিককেও প্রশ্ন করবেন, মালিকের ব্যবসায়িক উদ্দেশ্য পালন করতে অস্বীকার করতেও পারেন। এরই ফলশ্রুতিতে সতীশের মত দশা হচ্ছে বহু সাংবাদিকের। তার চেয়েও বেশি সাংবাদিকের চাকরি যাচ্ছে করোনা অতিমারী বা কোম্পানির আর্থিক ক্ষতির অজুহাতে। ফলে মিডিয়া ভরে যাচ্ছে অশিক্ষিত, অর্ধশিক্ষিত সাংবাদিকে। তারাই হয়ে উঠছে সংবাদমাধ্যমগুলোর নীতি নির্ধারক। রবীশ কুমাররা সরে যাচ্ছেন ইউটিউবে, টিভি চ্যানেলে জাঁকিয়ে বসছেন অর্ণব গোস্বামীরা। নাম করা চ্যানেলে হোয়াটস্যাপে ফরোয়ার্ড হওয়া ভুয়ো খবর ঘটা করে প্রচারিত হচ্ছে। কোথাও সাম্প্রদায়িকতার বিষ ছড়াচ্ছেন অঞ্জনা ওম কাশ্যপ, কোথাও বিতর্ক আয়োজনের ভান করে এক পক্ষকে মৌপিয়া নন্দী ধমকাচ্ছেন ‘কে তুমি?’

এসবে তিতিবিরক্ত মানুষ ইদানীং ঝুঁকছেন বিকল্প সংবাদমাধ্যমের দিকে। তবে ভাবলে ভুল হবে যে এসব বালাই সেখানে একেবারেই নেই। তেমনটা হওয়া সম্ভবও নয়। কারণ বিকল্প সংবাদমাধ্যম আকাশ থেকে পড়েনি। যাঁরা এই মঞ্চগুলো গড়ে তুলেছেন বা তুলছেন, তাঁদের হাতেখড়ি হয়েছিল মূলধারাতেই। সকলেই যে আদর্শের কারণে অন্য পথে এসেছেন এমন নয়। অনেকে সেখানে যোগ্যতা প্রমাণ করতে না পেরেও বিকল্প পথে এসেছেন। তাঁরা হতে চান মূলধারার মহীরুহদের মতই। আসলে তাঁরাই এদের আদর্শ। অধস্তনদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার না করলে, যিনি টাকা জোগাচ্ছেন তাঁর পায়ে তৈলমর্দন না করলে, ক্ষমতাবানদের দাদা দিদি বানাতে না পারলে বড় সাংবাদিক হওয়া যায় না – এ ধারণা বিকল্প মাধ্যমের অনেকের মধ্যেও বদ্ধমূল। এই মনোভাবের ফল কাজে পড়তে বাধ্য। মূলধারার সংবাদমাধ্যমের কাজে পড়েছে, বিকল্প মাধ্যমেও অবশ্যই পড়বে। সত্যি কথা বলতে, এ দেশের বিকল্প সংবাদমাধ্যম এখনো বিকল্প ব্যবসায়িক মডেল হিসাবে সম্পূর্ণ বিকশিত হয়নি। অর্থাৎ মূলধারায় কাজ করে যতখানি রোজগার করা যায়, বিকল্পে এখনো যায় না। যশও এখনো মূলধারায় বেশি। বিকল্পে একই পরিমাণ যশলাভে পরিশ্রম অনেক বেশি। কোনোদিন ওগুলো মূলধারার সমান হয়ে গেলে বিকল্প মাধ্যমের সাংবাদিকদের আদর্শবাদের যথার্থ পরীক্ষা হবে। আমরা অনেকেই তো আসলে সুযোগের অভাবে চরিত্রবান।

ডুলুং পত্রিকার আষাঢ়-শ্রাবণ ১৪৩১ সংখ্যায় প্রকাশিত