বাংলা বলে কোনো ভাষা নেই, বাঙালি বলে কোনো জাতি নেই?

আজ থেকে বছর তিরিশেক আগেই বাংলা ভাষা কোনটা, বাঙালি কারা – সে বোধ ভদ্রলোক শ্রেণি হারিয়েছে। ফলে আজ যে বাঙালি সাহিত্যিক, অধ্যাপকদের দেখা যাচ্ছে ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়াররা আক্রান্ত না হলে বাংলা ভাষার উপর আক্রমণ হচ্ছে তা বিশ্বাস না করতে, বা বাঙালি প্রবাসী শ্রমিকদের উপর আক্রমণকে বাঙালিদের উপর আক্রমণ বলে না ধরতে – তাতে অবাক হওয়ার কিছু নেই।

ঠিক এক দশক আগের কথা। সদ্য রাজকাহিনী বেরিয়েছে (অবন ঠাকুরের নয়, সৃজিত মুখার্জির)। ইংরিজি জানা বাঙালি ভদ্রলোক, ভদ্রমহিলারা আপ্লুত হয়ে একটা গান শেয়ার করতে লাগলেন সোশাল মিডিয়ায়। কী গান? ওই যে গানটা আমাদের জাতীয় স্তোত্র। কিন্তু এত আপ্লুত হওয়ার কারণ কী? কারণ রবীন্দ্রনাথের লেখা গানটা আসলে অনেক বড়, অত বড় জাতীয় স্তোত্র রাখা যায় না ব্যবহারিক অসুবিধার কারণেই। তাই আমাদের জাতীয় স্তোত্র হিসাবে ব্যবহৃত হয় শুরুর দিকের খানিকটা অংশ। ওই ছবিতে সৃজিতবাবু গোটা গানটাই ব্যবহার করেছিলেন। এই নিয়ে আপ্লুত হওয়া অন্যায় নয়। কিন্তু মুশকিল হল, দেখা গেল যাঁরা শেয়ার করছেন তাঁদের অনেকেই লিখছেন ‘লিসন টু দ্য বেঙ্গলি ভার্শন অফ আওয়ার ন্যাশনাল অ্যান্থেম। ইট’স বিউটিফুল’ – এই জাতীয় কথাবার্তা। সাধারণত সোশাল মিডিয়ায় কারোর কোনো ভুল ধরলে তিনি প্রবল খেপে গিয়ে যিনি ভুল ধরেছেন তাঁকে অপমান করেন। এক্ষেত্রে যেসব বাঙালি মান-অপমানের তোয়াক্কা না করে ওইসব পোস্টে মন্তব্য করেছিলেন বা নিজে পোস্ট করেছিলেন যে গানটা তো বাংলাতেই লিখেছিলেন রবিবাবু, তার আবার বাংলা ভার্শন কী – তাঁদের ‘আঁতেল’, ‘সবজান্তা’ ইত্যাদি বিশেষণ দেওয়া হচ্ছিল। তবে ভারতবর্ষে ইংরিজি জানা মূর্খদের আত্মবিশ্বাস বেশি। তাই সেই মূর্খরা কেউ কেউ আবার যিনি শুধরে দেওয়ার চেষ্টা করছেন তাঁকেই ভুল প্রমাণ করার চেষ্টা করছিল। ব্যাপার দেখে হাসা উচিত না কাঁদা উচিত তা বুঝতে না পারলেও, এটুকু বুঝে গিয়েছিলাম যে বাঙালি সংস্কৃতির ধারক ও বাহক যে ভদ্রলোক শ্রেণি, তাদের ভবিষ্যৎ ঝরঝরে হয়ে গেছে। আজ অমিত মালব্যকে যতই গালাগালি দিন, একথা নিশ্চিত হয়ে বলার উপায় নেই যে তাঁর ওই গণ্ডমূর্খ পোস্টের যুক্তিগুলো কোনো ইংরিজি শিক্ষিত বাঙালি ভদ্রলোকেরই জুগিয়ে দেওয়া নয়।

এই ভদ্রলোক-ভদ্রমহিলাদের অতি পছন্দের একখানা ধর্মীয় সংগঠন আছে, যাকে তাঁরা ধর্মনিরপেক্ষ সংগঠন বলে ভাবতে ভালবাসেন (মানে আমড়াকে আম বলে ভাবতে ভালবাসেন) – রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশন। রাজকাহিনীর গান নিয়ে ভদ্রলোক শ্রেণির রাজবোকামির দেড় দশক আগে ওই সংগঠন পরিচালিত একটা কলেজের পড়ুয়া ছিলাম। আমার সহপাঠী ছিল মঠের ভিতরেই গড়ে ওঠা, সন্ন্যাসীদের দ্বারা পরিচালিত বেদ বিদ্যালয়ে ছোট থেকে লেখাপড়া করে আসা কয়েকজন ছাত্র। তারা জনগণমন গাইত সংস্কৃত উচ্চারণে। আমরা কয়েকজন ছাত্র মিলে একদিন তাদের জিজ্ঞেস করলাম ‘ওরকম উচ্চারণে গাস কেন?’ তারা অত্যন্ত গর্বের সঙ্গে জানাল, ওটা ছোট থেকে শিখেছে। ওটাই শুদ্ধ সংস্কৃত উচ্চারণ। আমরা জিজ্ঞেস করলাম ‘বাংলা গানের উচ্চারণ সংস্কৃতের মত হবে কেন?’ তারা কিছুতেই মানতে রাজি হল না যে গানটা বাংলায় লেখা। নির্ঘাত তারা আজও জাতীয় স্তোত্র গাওয়ার প্রয়োজন হলে ‘শুদ্ধ সংস্কৃত’ উচ্চারণেই গায়। এরা কেউ কিন্তু প্রান্তিক পরিবারের সন্তান নয়, হিন্দিভাষীও নয়। গ্রাম, শহর – দুরকম জায়গার ছেলেই ছিল সেই দলে। সত্যি কথা বলতে, কেবল এরা নয়। আইসিএসই বা সিবিএসই স্কুলে পড়ে আসা বাঙালি সহপাঠীদেরও দেখেছি সংস্কৃত উচ্চারণে জনগণমন গাইতে। অর্থাৎ আজ থেকে বছর তিরিশেক আগেই বাংলা ভাষা কোনটা, বাঙালি কারা – সে বোধ ভদ্রলোক শ্রেণি হারিয়েছে। ফলে আজ যে বাঙালি সাহিত্যিক, অধ্যাপকদের দেখা যাচ্ছে ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়াররা আক্রান্ত না হলে বাংলা ভাষার উপর আক্রমণ হচ্ছে তা বিশ্বাস না করতে, বা বাঙালি প্রবাসী শ্রমিকদের উপর আক্রমণকে বাঙালিদের উপর আক্রমণ বলে না ধরতে – তাতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। এটাই অনিবার্য ছিল।

এখন কথা হচ্ছে, এমনটা হল কেন? বাংলা ভাষা, সংস্কৃতির লাগাম তো চিরকালই এই ভদ্রলোকদের হাতেই থেকেছে। দুই বাংলা ভাগ হওয়ার পরে তো আরওই। বাংলা সিনেমার যত বিখ্যাত অভিনেতা, অভিনেত্রীর নাম মনে করতে পারেন তাদের কজন হিন্দু নিম্নবর্গীয় বা মুসলমান? পাকিস্তান ভেঙে বাংলাদেশ হওয়ার পরে দু-চারজন মুসলমান অভিনেতা, অভিনেত্রী পশ্চিমবঙ্গে অভিনয় করেছেন বটে, কিন্তু মুসলমান চরিত্র কটা এপারের বাংলা সিনেমায়? মুসলমান সমাজের গল্পই বা কটা? পশ্চিমবঙ্গের বাংলা পত্রপত্রিকার সম্পাদক, সাহিত্যিকদের মধ্যে খুঁজতে গেলেও ঘুরে ফিরে সেই প্রাক-স্বাধীনতা যুগের মীর মোশাররফ হোসেন, কাজী নজরুল ইসলাম, জসীমউদ্দিন, সৈয়দ মুজতবা আলী, এস ওয়াজেদ আলী বা একটু পরের সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজের নাম আসবে। কিছু নিবিষ্ট পাঠক হয়ত আবুল বাশার বা আফসার আহমেদের নাম মনে করতে পারবেন। জনপ্রিয় গাইয়ে, বাজিয়েদের মধ্যেও সেই ইংরিজি শিক্ষিত বামুন, কায়েত, বদ্যিরাই বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ। শিক্ষক, অধ্যাপক, ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, উকিল, সাংবাদিক, রাজনীতিবিদ – যেদিকে তাকাবেন সেদিকই তো ভদ্রলোকরা আলো করে আছেন। তাহলে এ অবস্থা হল কেন? স্পষ্টতই পূর্বসুরিরা পতাকা যাদের হাতে দিয়েছেন তাদের বহিবার শকতি দেননি। কিন্তু কেন দেননি, বা দিতে পারেননি?

বামফ্রন্ট সরকার প্রাথমিক স্কুল থেকে ইংরিজি তুলে দেওয়ার জন্যে ভদ্রলোকেরা বেসরকারি ইংরিজি মাধ্যম স্কুলে ছেলেমেয়েদের ভর্তি করতে বাধ্য হন আর তা থেকেই শিক্ষিত বাঙালির সঙ্গে বাংলা ভাষার বিযুক্তি শুরু, কারণ ইংরিজিটা তো শিখতেই হবে। নইলে কাজকর্ম পাওয়া যায় কী করে? ওটাই তো কাজের ভাষা।

এরকম একটা তত্ত্ব প্রায়শই খাড়া করা হয়। এই তত্ত্ব নজর করার মত। শিক্ষা মাতৃভাষাতেই হওয়া উচিত – একথা আমাদের রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, সত্যেন্দ্রনাথ বসু থেকে শুরু করে গোটা দুনিয়ার অনেক বড় বড় পণ্ডিত বলেছেন। আবার বিপক্ষেও যুক্তি আছে। সে বিতর্কে না গিয়ে একথা মেনে নেওয়া যাক যে, কোনো ভাষা কাজের ভাষা হয়ে না থাকলে গুরুত্ব হারায়। বামফ্রন্ট সরকার মাতৃভাষার উপর জোর দিলেও বাংলাকে গোটা রাজ্যের কাজের ভাষা করে তোলার পর্যাপ্ত উদ্যোগ নেয়নি। পাশাপাশি ভারতের মত বহুভাষিক দেশে ইংরিজির গুরুত্ব বিশ্বায়নের সঙ্গে সঙ্গে বেড়েছে এবং ভদ্রলোকরা বাংলা ভাষাকে ক্রমশ ত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছেন – একথা তর্কের খাতিরে নাহয় মেনে নেওয়া গেল। কিন্তু কথা হচ্ছে, বাঙালি ভদ্রলোকদের ছেলেমেয়েরা তো ইংরিজি মাধ্যম স্কুলে পড়ছে বিংশ শতাব্দীর গোড়া থেকেই। যাঁর বই ছেলেমেয়ের হাতে তুলে না দিলে আজও এমনকি অনাবাসী বাঙালিদেরও ‘বাংলার সংস্কৃতি শেখাচ্ছি না’ ভেবে অপরাধবোধ হয়, সেই লীলা মজুমদার নিজেই কনভেন্টের ছাত্রী ছিলেন। তা ইংরিজি মাধ্যম স্কুলে ভর্তি করলেই ছেলেমেয়েকে বাংলা বইপত্তর পড়ানো, বাংলা গান শোনানো, সিনেমা দেখানো, নাটক দেখানো তুলে দিতে হবে – এ নিয়ম কি বামফ্রন্ট সরকারের তৈরি? আগেকার বাঙালির অমন করার দরকার পড়েনি, হঠাৎ বামফ্রন্ট সরকার প্রাথমিক শিক্ষা থেকে ইংরিজি তুলে দিতেই দরকার পড়ল?

সত্যি কথা বলতে, সিপিএম ক্রমশ ভদ্রলোকদের পার্টি হয়ে যাওয়ায় বামফ্রন্টও মেহনতি মানুষের সরকার থেকে ভদ্রলোকদের সরকারেই পরিণত হয়েছিল নয়ের দশকের শেষার্ধে। তাই ভদ্রলোকদের ইংরিজি নিয়ে হাহুতাশের প্রভাবে এই সহস্রাব্দের গোড়ায় কিন্তু প্রাথমিকে ইংরিজি ফিরিয়েও এনেছিল। তারপর কি ভদ্রলোকেরা ছেলেমেয়েদের সরকারি প্রাথমিক স্কুলে ফিরিয়ে এনেছিলেন? মোটেই না। উলটে মাধ্যমিক স্তরেও বেসরকারি স্কুলে ভর্তি করার ঝোঁক বেড়ে গিয়েছিল। এখন নাহয় এসএসসি কেলেঙ্কারি ইত্যাদি যুক্তি দিয়ে বলা যায় সরকারি স্কুলগুলো পড়াশোনার অনুপযুক্ত হয়ে গেছে। বাম আমলে তো প্রতিবছর এসএসসি পরীক্ষা হত, রাজ্যের আনাচে কানাচে গজিয়ে ওঠা ইংরিজি মাধ্যমের স্কুলগুলোর মাস্টারদের চেয়ে অনেক কঠিন প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষা দিয়ে মাস্টারমশাই, দিদিমণিরা সরকারি বাংলা মাধ্যম স্কুলগুলোতে যোগও দিতেন। ত্রুটি থাকলেও স্কুলের পরিকাঠামো নিয়ে, পড়াশোনা নিয়ে তখনকার সরকারের আগ্রহ যে বর্তমান সরকারের চেয়ে বেশি ছিল – তা আজকাল অনেক তৃণমূল কংগ্রেস সমর্থকও স্বীকার করেন। তাহলে?

এই প্রশ্নের উত্তর দিতে গেলে আসলে বাঙালি ভদ্রলোকের অভদ্রতা প্রকাশ হয়ে পড়বে। বহু ভদ্রলোকের কাছেই আপত্তিকর ছিল বাম আমলে মুটে, মজুর, রিকশাওয়ালা, বাড়ির কাজের লোক, মুচি, মেথরের ছেলেমেয়েদের তাদের ছেলেমেয়েদের সঙ্গে একই স্কুলে ঢুকে পড়া। আরও বেশি গায়ে লাগত যখন তারা কেউ নিজের ছেলেমেয়ের চেয়ে পরীক্ষায় বেশি নম্বর পেয়ে যেত। পরীক্ষার ফল বেরোবার পর আমাদের অনেককেই বকুনি খেতে হয়েছে ‘তোর লজ্জা করে না? অমুকের বাড়িতে কোনোদিন কেউ স্কুলের গণ্ডি পেরোয়নি, আর ও অঙ্কে ৮৫ পেয়ে গেল। তুই মাস্টারের ছেলে হয়ে ৫৫? ছিঃ!’ মাস্টারের ছেলে বড় হয়ে মাস্টার; ডাক্তারের ছেলেমেয়ে তো বটেই, ছেলের বউ আর জামাইও ডাক্তার; উকিলের ছেলেমেয়ে উকিল; মুদির ছেলে মুদি, তার মেয়ে অন্য ছোট ব্যবসায়ীর গৃহবধূ; রিকশাওয়ালার ছেলে সবজিওয়ালা – এই সামাজিক স্থিতাবস্থায়, গোবলয়ের লোক বলে বাঙালি ভদ্রলোক যাদের দিকে তাকিয়ে নাক সিঁটকোয়, তাদের মত নিজেরাও অভ্যস্ত ছিল। সেই স্থিতাবস্থা ঘেঁটে যাওয়ার সামান্য সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল বাম আমলে। ওটুকুই ভদ্রলোকদের পক্ষে শিশুর আত্মার উপর নরকের দুঃস্বপ্নের মত হয়ে দাঁড়িয়েছিল। এই দুঃস্বপ্ন থেকে মুক্তি পাওয়ার পথ তারা খুঁজে পায় অনেক টাকা মাইনের বেসরকারি স্কুলে। নয়ের দশক থেকে মনমোহনী অর্থনীতির জোরে বাঙালি ভদ্রলোকের জীবনে আমূল পরিবর্তন এসে যায়। তাদের হাতে এসে গেল খরচ করার মত অতিরিক্ত টাকা। ফলে ছোটলোকের ছেলেপুলের সঙ্গে এক স্কুলে পড়ানোর আর দরকার রইল না। পাঠিয়ে দাও ফেলো কড়ি মাখো তেল স্কুলে। এমনকি বামফ্রন্ট সরকারের বদান্যতায় উচ্চমধ্যবিত্ত হয়ে ওঠা সরকারি স্কুলের মাস্টারমশাই, দিদিমণিরাও নিজেদের ছেলেমেয়েকে ইংরিজি মাধ্যম স্কুলে পাঠানো শুরু করেন তখনই। সংখ্যাটা অবশ্যই এখন অনেক বেড়েছে, তার পিছনে বর্তমান সরকারের শিক্ষাজগৎ নিয়ে ছেলেখেলার অবদান কম নয়। কিন্তু আসল কথা হল, ‘ইংরিজি শিখতে হবে বলে ইংরিজি মাধ্যম স্কুলে পড়াচ্ছি’ – এটা স্রেফ অজুহাত। দুর্বল অজুহাত। সেটা বুঝতে পেরেই যুক্তি জোরদার হবে মনে করে নয়ের দশকে অনেক বাবা-মা বলতেন ‘ইংরিজি বলা শিখতে হবে। নইলে কম্পিটিশনে দাঁড়াতে পারবে না। তাই ইংলিশ মিডিয়ামে দিয়েছি।’ এও ভারি মজার কথা। স্কুলটা কি তাহলে ‘স্পোকেন ইংলিশ’ শেখার জায়গা? ওটা জানলেই চাকরিবাকরি পাওয়া যায়? চোস্ত ইংরিজি বলতে পারলেই অঙ্ক, বিজ্ঞান, ভূগোল, ইতিহাস – সব শেখা হয়ে যাবে? অধিকাংশ বাঙালি ভদ্রলোক কিন্তু তেমনই মনে করে আজও। কথা বললেই টের পাওয়া যায়। তবে আজকাল একটা নতুন ব্যাপার ঘটেছে। ইংরেজ আমলে বাঙালি ভদ্রলোকের জীবনের লক্ষ্য ছিল যতটা সম্ভব ইংরেজ হওয়া, স্বাধীনতার পর থেকে – অনাবাসী ভারতীয় হওয়া। আজকের বাঙালি ভদ্রলোকের জীবনে একটা নতুন লক্ষ্য যোগ হয়েছে – মাড়োয়ারি বা গুজরাটি হওয়া। তাই ছেলেপুলেকে ইংরিজি মাধ্যমে পড়িয়ে ইংরিজি বলা শিখিয়েই সে খুশি নয়, দ্বিতীয় ভাষা হিসাবে হিন্দিও গুঁজে দিচ্ছে। সুতরাং বাংলা মাঠের বাইরে। গল্পের বই পড়ার এবং পড়ানোর চল বাঙালি ভদ্রলোক বাড়ি থেকে উঠে গেছে বহুকাল, এখন আবার বাবা-মায়েরা খেয়াল রাখেন, ছেলেমেয়ে যেন বাংলা সিরিয়াল বা সিনেমা দেখে না ফেলে।

এমতাবস্থায় বাংলা ভাষা-সংস্কৃতি কী, কোনটা তার অঙ্গ আর কোনটা নয় – তা নিয়ে স্পষ্ট ধারণা থাকবে কোন চুলোয়? সংজ্ঞাগুলো ঠিক করে দিয়েছি আমরা ভদ্রলোকরা। আমাদের সংজ্ঞায়িত বাংলা ভাষা-সংস্কৃতিকে আমরাই বাংলার বাইরে বাংলা বলে পরিচিত হতে দিইনি, ওগুলোকে আমাদের সংস্কৃতির বৃত্তে জায়গাই দিইনি। কলকাতা ও সংলগ্ন এলাকার ভাষায় লেখা গান আমাদের ‘আধুনিক গান’। বাঙাল ভাষার গানকে তখনই বাংলা গান বলে মেনেছি যখন শচীন দেববর্মণের মত রাজপুত্র গেয়েছেন। গ্রামের মানুষের নিজের গানকে লোকগীতি বলে আলাদা বাক্সে রেখেছি। পনিটেল বাঁধা শহুরে ভদ্রলোকরা গিটার বাজিয়ে ব্যান্ড বানিয়ে গাইলে তবেই সে গানের জায়গা হয়েছে প্রেসিডেন্সি, লেডি ব্র্যাবোর্ন বা যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস মোচ্ছবে। আচ্ছা তাও নাহয় মেনে নেওয়া গেল। কিন্তু নিজেরা যাকে বাংলা ভাষা, বাঙালি সংস্কৃতি বলে দেগে দিয়েছি তাকে সমাজের নিচের তলায় ছড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টাও কি করেছি? ফিল্ম সোসাইটি বানিয়ে ঋত্বিক ঘটকের উদ্বাস্তুদের নিয়ে তৈরি ছবি দেখেছি আর প্রবন্ধ লিখেছি। পরবর্তীকালে বাংলাদেশ থেকে চলে আসা উদ্বাস্তু, যারা এখানে এসে পেটের দায়ে আমাদের বাড়িতে বাসন মাজে বা ঘর ঝাঁট দেয় – তাদের দেখানোর তো চেষ্টা করিনি। সত্যজিৎ রায় বিশ্ববন্দিত পরিচালক বলে জাঁক করেছি, কিন্তু পথের পাঁচালী-র হরিহর রায়ের পরিবারের মত হতদরিদ্র বাঙালিকে ওই ছবি দেখানোর কোনো প্রয়াস তো আমাদের ছিল না। কারণ আমরা নিশ্চিত ছিলাম – ওরা ওসব বুঝবে না। ওদের জন্যে বেদের মেয়ে জ্যোৎস্না-ই ঠিক আছে। ঘটনা হল, যার দুবেলা পেট ভরে ভাত জোটে না, তারও মনের খিদে থাকে এবং সে খোরাক খুঁজে নেয়। বাংলার গরিব মানুষ, নিম্নবর্গীয় মানুষও তাই করেছে। আমাদের তৈরি সংস্কৃতি যখন তাদের পোষায়নি তখন তারা হিন্দি সিনেমা, হিন্দি গানে মজেছে। অধুনা ইউটিউব শর্টস আর ইনস্টা রিলসে। আমাদের অ্যাকাডেমি, আমাদের নন্দন নিয়ে আমরাই বুঁদ ছিলাম। ও জিনিস আজ কেউ বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দিলেই বা ওদের কী? এদিকে আমরা, বিশ্বায়িত ভদ্রলোকরাও, হিন্দি ভাষা-সংস্কৃতির দিকে ঝুঁকেছি। ইংরিজি তো ছিলই। ফলে এখন হঠাৎ আবিষ্কার করছি – হিন্দি-হিন্দু-হিন্দুস্তান তত্ত্বের প্রবক্তারা বলে দিচ্ছে বাংলা বলে আসলে কোনো ভাষা নেই, আর সেটাকেই ঠিক বলছেন বাংলা ভাষায় বইপত্তর লিখে নাম করে ফেলা লেখকরা।

নবজাগরণই বলি আর সমাজ সংস্কার আন্দোলনই বলি, উনিশ শতকে সেই প্রক্রিয়ার মধ্যে দিয়ে আলোর সন্ধান যে বাঙালি ভদ্রলোক পেয়েছিল তা অনস্বীকার্য। কিন্তু আলো বাড়াতে গেলে আলো ছড়াতে হয়। ভদ্রলোকরা কী করেছে? প্রদীপ নিজের ঘরেই রেখে দিয়েছে, হাতে নিয়ে যাদের ঘরে আলো নেই তাদের কাছে যায়নি, তারা আমাদের প্রদীপ থেকে নিজেদের প্রদীপ জ্বালিয়ে নিতে পারেনি। এখন আমাদের প্রদীপের আয়ু ফুরিয়ে এসেছে, তাই চারপাশ অন্ধকারে ডুবে যেতে বসেছে। আসলে আমাদের বাংলা ভাষা চর্চা, সংস্কৃতি চর্চা বা যে কোনো চর্চাই বহুকাল হল প্রদর্শনীতে পরিণত হয়েছে। ওর মধ্যে ঘাম ঝরানোর কোনো ব্যাপার নেই, তাই ও থেকে আমাদের কোনো অর্জনও নেই। কেন এমন হল? ভাবতে গেলে জ্যোতি ভট্টাচার্য ‘কালচার’ ও ‘সংস্কৃতি’ প্রবন্ধে যে গোলমালের কথা বলেছেন সেটাই মনে পড়ে যাচ্ছে। একবার পড়ে দেখা যাক

ইংরেজি ভাষা থেকে ‘কালচার’ শব্দটার আমরা বাংলা পরিভাষা করেছি ‘সংস্কৃতি’। ঠিক পরিভাষা কী হওয়া উচিত – ‘সংস্কৃতি’ না ‘কৃষ্টি’, তা নিয়ে বিসংবাদ হয়েছে এককালে। রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, ‘কৃষ্টি’ শব্দটা বাংলা ভাষায় কুশ্রী অপজনন। ‘তাসের দেশ’ নাটকে শব্দটা নিয়ে কৌতুকও করেছিলেন রবীন্দ্রনাথ। তারপরে ‘কৃষ্টি’ শব্দটা ক্রমে লোপ পেয়েছে, ‘সংস্কৃতি’-ই ব্যবহারসিদ্ধ লোকগ্রাহ্য শব্দ হয়ে উঠেছে।

ইংরেজরা ‘কালচার’ শব্দটা নিয়েছিল লাটিন ভাষা থেকে। লাটিন ভাষায় শব্দটার প্রধান অর্থ ছিল কৃষিকর্ম, ‘এগ্রিকালচার’ শব্দের মধ্যে সেই প্রধান অর্থ বাহিত হচ্ছে। এই কারণেই বাংলায় কেউ কেউ ‘কৃষ্টি’ বলতে চেয়েছিলেন, কর্ষণের সঙ্গে তার সম্পর্ক। কৃষিকর্মে কর্ষিত ক্ষেত্রে বীজ বপন করে নতুন শস্য উৎপাদন করা হয়…চিকিৎসাবিজ্ঞানে রোগজীবাণুর প্রতিষেধক জীবাণু ‘কালচার’ করে তৈরি করা হয়; রক্তে রোগজীবাণু বা ক্ষতিকর কোনো পদার্থ থাকলে অণুবীক্ষণে তা দেখতে হলে অনেক সময় রক্তবিন্দুর ‘কালচার’ করে তাকে বর্ধিত করতে হয়। মোট কথা ‘কালচার’ শব্দটার মধ্যে কর্ষণ বা অনুশীলনের দ্বারা নতুন বস্তু অথবা নতুন গুণ সৃষ্টি ইঙ্গিত রয়েছে, এর ঝোঁক উৎপাদনমুখী। কোনো না কোনো রকম বৃদ্ধি এর ফল।

আমাদের ‘সংস্কৃতি’ শব্দটির শব্দার্থগত ঝোঁক কিন্তু এরকম নয়। এর প্রধান অর্থ রূঢ় অবস্থা থেকে মার্জিত অবস্থায় আনয়ন, স্থূল অবস্থা থেকে বাহুল্যবর্জিত করে সূক্ষ্ম অবস্থায় আনয়ন। নতুন বস্তু সৃষ্টি, নতুন গুণ উৎপাদন, বা সংখ্যাবৃদ্ধি এর অভীপ্সিত লক্ষ্য নয়, যা আছে তাকেই একটা পরিশীলিত সংযত সুসমঞ্জস সুকুমার রূপদান এর লক্ষ্য। ‘সংস্কৃতি’ শব্দটির এই প্রধান ঝোঁক আমাদের আজকের পরিস্থিতিতে খানিকটা বাধাস্বরূপ হয়ে উঠছে – এরকম আশঙ্কা করছি।

পঞ্চাশ বছরেরও বেশি আগে লেখা এই কথাগুলো আজ আবার ভাবাচ্ছে। কারণ সংস্কৃতি শব্দের প্রধান ঝোঁক এখন আর খানিকটা বাধা নয়, গভীর কুয়োর দেওয়াল হয়ে গেছে দেখা যাচ্ছে। সেই কুয়োর ব্যাং হয়ে গেছি আমরা ভদ্রলোকরা; বাইরে রয়ে গেছে বাঙালি মুসলমান, বাঙালি নিম্নবর্গীয় হিন্দু এবং সাধারণভাবে, গরিব বাঙালি। কৃষ্টি শব্দটায় রবীন্দ্রনাথ প্রবল আপত্তি করেছিলেন বটে, তবে ভদ্রলোকদের কূপমণ্ডূকতা ধরে ফেলতে তাঁরও ভুল হয়নি। বঙ্গভঙ্গ রদের আন্দোলনে প্রথমে নেতৃত্ব দিয়েও তাই সরে গিয়েছিলেন। কারণ ফাঁকিবাজিটা ধরে ফেলেছিলেন। পরেও তাঁর লেখাপত্রে ভদ্রলোকি চালাকির আবরণ উন্মোচন করেছেন বারবার। ‘হিন্দু-মুসলমান’ প্রবন্ধে যেমন লিখেছেন

অল্পবয়সে যখন প্রথম জমিদারি সেরেস্তা দেখতে গিয়েছিলুম তখন দেখলুম, আমাদের ব্রাহ্মণ ম্যানেজার যে তক্তপোষে গদিতে বসে দরবার করেন সেখানে এক ধারে জাজিম তোলা, সেই জায়গাটা মুসলমান প্রজাদের বসবার জন্যে; আর জাজিমের উপর বসে হিন্দু প্রজারা। এইটে দেখে আমার ধিক্কার জন্মেছিল। অথচ এই ম্যানেজার আধুনিক দেশাত্মবোধী দলের। ইংরেজরাজের দরবারে ভারতীয়ের অসম্মান নিয়ে কটুভাষাব্যবহার তিনি উপভোগ করে থাকেন, তবু স্বদেশীয়কে ভদ্রোচিত সম্মান দেবার বেলা এত কৃপণ। এই কৃপণতা সমাজে ও কর্মক্ষেত্রে অনেকদূর পর্যন্ত প্রবেশ করেছে; অবশেষে এমন হয়েছে যেখানে হিন্দু সেখানে মুসলমানের দ্বার সংকীর্ণ, যেখানে মুসলমান সেখানে হিন্দুর বাধা বিস্তর।

এই ম্যানেজারই বাঙালি ভদ্রলোকের সংস্কৃতি আর কৃষ্টির তফাতের প্রমাণ। এঁর দেশাত্মবোধ হল প্রদর্শনী। ওটার নির্দিষ্ট মঞ্চ আছে, সেখানে নিজের পরিশীলিত দেশাত্মবোধ প্রমাণ করতে ওটা কাজে লাগে। কিন্তু নিজের জীবনে মেনে চলার, মুসলমানও যে তাঁর সমান ভারতীয় তা স্বীকার করার এবং অনুশীলন করার দায় নেই। এমন চরিত্রই এখন হাজারে হাজারে আমাদের চারপাশে ঘুরে বেড়াচ্ছে। রবীন্দ্রনাথ এই প্রবন্ধ লিখেছিলেন স্বাধীনতার আগে। স্বাধীনোত্তর ভারতে আবার সারা দেশের উদারপন্থী এবং বাঙালি ভদ্রলোকদের নিজেকে সংস্কৃতিবান প্রমাণ করতে ধর্মনিরপেক্ষ হওয়া আবশ্যিক হয়ে দাঁড়িয়েছিল। এখন দেশের রাজনীতি বদলে যাওয়ায়, পরিবেশ বদলে যাওয়ায় ওটা আর আবশ্যিক নয়। তাই এই ম্যানেজারবাবুর মনের কথা তিলোত্তমা মজুমদার, পবিত্র সরকারদের মুখে উঠে এসেছে, যার মর্মার্থ হল – ভদ্রলোকরাই বাঙালি। মুসলমানরা বাঙালি নয়। ভদ্রলোকদের উপর আক্রমণ হলে তবেই বলা চলে বাংলা ভাষার উপর আক্রমণ হয়েছে, মুসলমানদের উপর আক্রমণ বাংলা ভাষার উপর আক্রমণ নয়।

এ হল বাঙালি ভদ্রলোকের অন্তত দুশো বছর ধরে আপন মনের মাধুরী মিশায়ে তৈরি সত্য। এর সঙ্গে বাস্তবের কোনো সম্পর্ক নেই। এই তিলোত্তমা, এই পবিত্র, এই সঙ্গীতা বন্দ্যোপাধ্যায়রাই একুশে ফেব্রুয়ারি এসে পড়লে গদগদ উত্তর-সম্পাদকীয় প্রবন্ধ লেখেন বাংলা ভাষা নিয়ে। কিন্তু এখন বোঝা যাচ্ছে, ওগুলো সব প্রদর্শনী। আজকাল যাকে বাংলায় বলে ‘পারফরম্যান্স’। মনের কথা হল – একুশের ভাষা শহিদরা কেউ বাঙালি নয়, তারা ভদ্রলোকদের বাংলা ভাষার জন্যে প্রাণ দিয়েছিল মাত্র। ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধেও এঁরা বিস্তর লেখালিখি, বলাবলি করে চলেছেন সেই ২০১৪ সাল থেকে। কিন্তু স্পষ্টতই ওসবও পারফরম্যান্স। নইলে বিশাল বিশাল গেটওয়ালা আবাসনে থাকা এবং শীতাতপনিয়ন্ত্রিত গাড়িতে চড়া লেখক, বুদ্ধিজীবীরা কী করে বলেন যে এই বাংলায় হঠাৎ চতুর্দিকে প্রচুর নতুন লোক দেখতে পাচ্ছেন, যাদের সঙ্গে বাঙালিদের কোনো সংস্কৃতিগত মিল নেই? কোনো পরিসংখ্যানই এই সত্য প্রতিষ্ঠা করে না। এ যে নাজিদের আতঙ্ক সৃষ্টির ধ্রুপদী কৌশল, তা না জানার মত কম লেখাপড়া এঁদের নয়। উপরন্তু, যদি তর্কের খাতিরে ধরেও নেওয়া যায় চারপাশটা বাংলাদেশি এবং রোহিঙ্গায় ভরে গেছে, তাহলেই বা তাদের সঙ্গে এই ভদ্রমহিলা, ভদ্রলোকদের সংস্কৃতিগত মিলের অভাব হয় কী করে? অনেক বেশি অমিল তো হওয়ার কথা কলকাতা ও শহরতলিতে দ্রুত বেড়ে চলা বহুতলগুলোর বাসিন্দা হয়ে আসা হিন্দিভাষীদের সঙ্গে, যাদের অনেকেই আমিষের গন্ধ পেলে নাক কোঁচকায়। তাদেরই রাজ্যে কাজ করতে যাওয়া পশ্চিমবঙ্গের হিন্দু ও মুসলমান প্রবাসী শ্রমিকদের বাংলাদেশি দেগে দিয়ে কোনো আইনকানুনের তোয়াক্কা না করে, বৈধ কাগজপত্রকে পাত্তা না দিয়ে মারধোর করা হচ্ছে, পে লোডার দিয়ে বাংলাদেশে ছুড়ে ফেলা হচ্ছে।

এই তথাকথিত বুদ্ধিজীবীরা অবশ্য রোগ নন, রোগাক্রান্তের নমুনা। এই রোগে আমাদের আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধব অনেকেই আক্রান্ত। আমাদের যে কোনো একজনকে দেখলেই বোঝা যায়, বাঙালি ভদ্রলোকের কূপমণ্ডূকতা এবং নীতিহীনতা ঐতিহাসিক হলেও, গত অর্ধ দশকে বিশেষ অবনমন হয়েছে। ১৯৪৭ সালে পশ্চিমবঙ্গের ভদ্রলোকদের সংখ্যাগরিষ্ঠের মানসিকতা এরকম থাকলে বাঙালরা উদ্বাস্তু হয়ে এদেশে এসে হয় অনাগরিক বেগার শ্রমিকে পরিণত হত, বা ভিক্ষা করতে করতে অনাহারে মারা যেত। সেক্ষেত্রে ১৯৭১ সালেও পশ্চিমবঙ্গের বাঙালিরা ভারত সরকারকে বাংলাদেশের পাশে দাঁড়াতে যুদ্ধে নামার প্ররোচনা দিত না (অশোক মিত্র লিখিত আপিলা-চাপিলা দ্রষ্টব্য), সাধারণ মানুষের মধ্যে মুক্তিযুদ্ধের প্রতি আবেগ তৈরি হত না, বাঙালরা আরও এক দফা উদ্বাস্তু হওয়ার ধাক্কা সামলে এদেশে থিতু হতে পারত না।

মজার কথা, এখন ভদ্রলোকদের যে অংশের বাংলাদেশি অনুপ্রবেশের চিন্তায় রাতে ঘুম হচ্ছে না, তাদের অনেকে দ্বিতীয়, তৃতীয় বা চতুর্থ প্রজন্মের বাঙাল। এরা বুঝতে পারছে না, বা রিপাবলিক টিভি দেখে দেখে এত অন্ধ হয়ে গেছে যে বুঝতে চাইছে না, যে ভাষাকে বাংলাদেশি ভাষা বলে আজ চালাচ্ছে বিজেপি, সেই ভাষা অনেকাংশে তাদের মা-দিদিমার ভাষা। ওই ভাষাকে অস্বীকার করলেও ওই পরিচিতি যাওয়ার নয়। আগামীদিনে এ কার্ড ও কার্ড সে কার্ড – কোনো কার্ড দিয়েই নিজের নাগরিকত্ব প্রমাণ করে ওঠা যাবে না। কারণ কোনটা নাগরিকত্বের প্রমাণ সেটা ঠিক করে রাষ্ট্র। আর ভারত রাষ্ট্রের এই মুহূর্তে প্রকল্প হল বাঙালিদের অনাগরিক প্রমাণ করা।

ভদ্রলোকের ছেলেমেয়েদের স্মৃতিশক্তি তাজা করে দেওয়ার জন্যে বলি, সেই বামফ্রন্ট আমল থেকে – যখন তৃণমূল কংগ্রেস নেত্রী মমতা ব্যানার্জি প্রথম অভিযোগ তোলেন যে বাংলাদেশ থেকে লোক ঢুকিয়ে ভোটে জেতে বামেরা – বঙ্গ বিজেপির বক্তব্য ছিল, বাংলাদেশ থেকে আসা হিন্দুদের শরণার্থী ধরে নিয়ে আশ্রয় দিতে হবে এবং মুসলমানদের অনুপ্রবেশকারী ধরে নিয়ে শাস্তি দিতে হবে, ফেরত পাঠাতে হবে। অধুনা সোশাল মিডিয়ার বাইরে অপ্রাসঙ্গিক হয়ে যাওয়া তথাগত রায় যখন বঙ্গ বিজেপির সভাপতি ছিলেন, তখন তিনি একাধিক টিভি বিতর্কে বসে একথা বলেছেন। নরেন্দ্র মোদী সরকার যে নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন (সিএএ) পাশ করে ২০১৯ সালে, তার মর্মবস্তুও এটাই। সে কারণেই এ রাজ্যের হিন্দুদের, বিশেষত ভদ্রলোকদের, ওই আইন খুব পছন্দ হয়েছিল। মতুয়াদের মত বাংলাদেশ থেকে অত্যাচারিত হয়ে চলে আসা নিম্নবর্গীয় জনগোষ্ঠীর মানুষও ওই আইন পাশ হওয়ায় উল্লসিত হয়েছিলেন। কিন্তু একটা প্রশ্নের উত্তর না বিজেপি দিতে চায়, না সম্প্রতি বিজেপি সমর্থক হয়ে ওঠা পশ্চিমবঙ্গবাসী তৃতীয়-চতুর্থ প্রজন্মের বাঙাল ভদ্রলোকরা। প্রশ্নটা হল, শরণার্থীদের আশ্রয় দেওয়া এবং নাগরিকত্ব দেওয়ার মত মানবিক প্রকল্পের ‘কাট-অফ ডেট’ থাকবে কেন? সিএএ অনুযায়ী নাগরিকত্ব পাওয়ার ‘কাট-অফ ডেট’ হল ৩১ ডিসেম্বর ২০১৪। এর মানে কী? ওই তারিখের পরে কি বাংলাদেশে হিন্দু নির্যাতন বন্ধ হয়ে গেছে? নাকি ওর পরে যে হিন্দুরা নির্যাতিত হচ্ছে তারা মায়ের ভোগে যাক – এটাই হিন্দু দরদি বিজেপি এবং ভারতের নাগরিকত্ব এতদিনে অধিকারে পরিণত হয়ে গেছে বলে মনে করা বাঙাল ভদ্রলোকদের মনের কথা? এ প্রশ্ন করলেই বিজেপি নেতা তরুণজ্যোতি তিওয়ারি থেকে শুরু করে বাঙাল ভাষা বলতে না পারা সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার বাঙাল, সকলেই এক সুরে ঝাঁঝিয়ে ওঠে ‘যে আসবে তাকেই থাকতে দিতে হবে? দেশটা ধর্মশালা নাকি?’

এখন কথা হচ্ছে, এই আজকের বাঙালদের পূর্বপুরুষরা যখন ভিটেমাটি চাটি হয়ে এপারে চলে এসেছিলেন অধুনা বাংলাদেশ থেকে, তখন কি দেশটা ধর্মশালা ছিল? তখনকার শাসকরা মনে করেছিলেন – ছিল। ভাগ্যিস করেছিলেন, তাই আজকের বাঙাল ভদ্রলোকরা কলার তুলে এই প্রশ্ন করতে পারছেন। ওঁরা অবশ্য বলবেন ‘তখনকার পরিস্থিতি আর এখনকার পরিস্থিতি কি এক নাকি? ১৯৪৭ সালে তো একটা দেশকে আনতাবড়ি কেটে ভাগ করা হয়েছিল। আমাদের পূর্বপুরুষদের এই ভাগটার উপরে ততখানিই অধিকার, যতখানি আগে থেকেই এ ভাগে থাকা লোকেদের।’ ১৯৭১ সালে কিন্তু দেশভাগ-টাগ হয়নি। তখনো বাংলাদেশ থেকে আসা উদ্বাস্তুদের এ দেশের নাগরিকত্ব দেওয়া হয়েছিল। সেকথা মনে রাখলেও মানতেই হবে, যুক্তিটা সঠিক। কিন্তু মুশকিল হল, একবার যদি বিভাজনে হাততালি দেওয়া শুরু করেন, তখন দেখবেন অনেক চেপে রাখা বিভাজন বেরিয়ে পড়ছে। বাঙালরা এপারে চলে আসায় মোটেই পশ্চিমবঙ্গীয়রা (চলতি কথায় যাদের এদেশি বা ঘটি বলা হয়) সকলে খুব আপ্লুত হয়নি। ‘বাংলাদেশ থেকে লোক ঢুকছে পিলপিল করে, রোহিঙ্গায় চারপাশ ভরে গেছে’ – এই প্রোপাগান্ডায় আপনি যত ধুয়ো দিচ্ছেন, তত সেদিনের উদ্বাস্তুদের প্রতি বিদ্বেষ চেপে রাখা পশ্চিমবঙ্গীয়দের স্মৃতি তাজা হয়ে উঠছে। পশ্চিমবঙ্গে গত কয়েক বছরে আরএসএস-বিজেপির শক্তি বাড়ার পাশাপাশি ইস্টবেঙ্গল আর মোহনবাগান সমর্থকদের মধ্যে অনলাইন পা টানাটানির ভাষা যেভাবে বদলেছে, তা খেয়াল করলেই ব্যাপারটা স্পষ্ট হয়। অতএব বাঙাল ভদ্রলোক-ভদ্রমহিলাদের বোঝা উচিত যে তারা হিন্দিভাষীদের ‘রোহিঙ্গা’, ‘বাংলাদেশি’ বলে চিৎকারে যোগ দিয়ে নিজেদের ডিটেনশন ক্যাম্পের রাস্তা বানাচ্ছে।

বাড়াবাড়ি মনে হল কথাটা? আসামে এনআরসি-র সময়েও দেখেছিলাম সেখানকার বাঙাল ভদ্রলোকরা অনেকে বলছে ‘যে আসবে তাকেই থাকতে দিতে হবে? দেশটা ধর্মশালা নাকি?’ ঠিক এই কথাটাই যে হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে বাঙালিদের সম্পর্কে জাতিবিদ্বেষী অসমিয়াদের বক্তব্য, সেকথা তাদের খেয়াল ছিল না। খেয়াল হল, যখন এনআরসি থেকে বাদ পড়ে যাওয়া ১৯ লক্ষ মানুষের মধ্যে সাড়ে ১২ লক্ষ হিন্দু বেরোল এবং তার মধ্যে তারাও পড়ে গেল। নেলি গণহত্যার ইতিহাসও ওই ভদ্রলোকরা ভুলে থাকতে চেয়েছিল, কারণ ওতে যারা মরেছিল তারা মুসলমান। এখন আসামের বিভিন্ন ডিটেনশন সেন্টারে কারা দিন কাটাচ্ছে সেটা পশ্চিমবঙ্গে চতুর্দিকে রোহিঙ্গা দেখতে পাওয়া বাঙাল ভদ্রলোকরা একটু দেখে নিতে পারেন। পশ্চিমবঙ্গে এনআরসি করার পরিকল্পনা এখনো সরকারের নেই, কিন্তু এসআইআরের পরিকল্পনা বিলক্ষণ আছে। সেটাও একটা তালিকা, তারও থাকবে ‘কাট-অফ ডেট’। এসব ভদ্রলোকরা ভালই জানেন, কিন্তু কুয়োর ব্যাং তো কুয়োর বাইরের জগতের কথা জানতে পারলেও মানতে চায় না। যেমন নির্বাচন কমিশনের বানানো আরেকটা তালিকা – ভোটার তালিকা – কেমন হয় আজকাল সেকথা রাহুল গান্ধী চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিলেও ভদ্রলোকরা চোখ বন্ধ করে থাকতে পারে।

১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গবিরোধী আন্দোলনের সময়কার ভদ্রলোকদের ফাঁকিবাজিকে রবীন্দ্রনাথ চিহ্নিত করেছিলেন, নিন্দাও করেছিলেন। তবু মানতে হবে, সেই ভদ্রলোকদের অন্য সময়ে না হলেও বিপদের সময়ে বাঙালি মুসলমানদের সঙ্গে জোট বাঁধার বুদ্ধি ছিল। এখনকার ভদ্রলোক শ্রেণির মস্তিষ্ক এত উর্বর যে বিপদের সময়ে আরও বেশি করে নিজেদের আলাদা করে নিচ্ছে। বিপন্ন বাঙালির পাশে দাঁড়ানোর বদলে ‘আমি স্নান বলি, ও গোসল বলে। অতএব ও বাঙালি না, আমি বাঙালি’ – এসব বোকা বোকা কথা বলে নিজের কুয়োটা আরও গভীর করে খুঁড়ছে। যে হিন্দি আধিপত্যবাদী হিন্দুরা কোনোদিনই বাঙালিকে আপন বলে মনে করেনি এবং করবে না, তারা নিজেদের মনোভাব স্পষ্ট ভাষায় বুঝিয়ে দিলেও ভদ্রলোক, ভদ্রমহিলারা বুক ফুলিয়ে প্রতিপন্ন করতে চাইছে – বাঙালি বলে কোনো জাতি নেই। আছে দুটো আলাদা জাতি – বাঙালি হিন্দু আর বাংলাদেশি। বাংলা বলেও কোনো ভাষা নেই। আছে দুটো আলাদা ভাষা – হিন্দুর বাংলা আর বাংলাদেশি বাংলা। এই ঐতিহাসিক মূর্খামি যে দৃশ্যের সম্ভাবনা বাড়িয়ে তুলছে তা এইরকম – ভদ্রলোকরা বাঙালি বলে মার খাচ্ছে হিন্দিভাষীদের হাতে, আর এখন যে বাঙালিদের মার খাওয়া চলছে, যাদের বাঙালি বলে স্বীকার করতেই রাজি নয় ভদ্রলোকরা, তারা দূর থেকে বলছে ‘ওমা! আপনি ভদ্রলোক? আমি ভেবেছিলাম বাঙালি।’

নাগরিক ডট নেট ওয়েবসাইটে প্রকাশিত

যাদবপুর: রিপাবলিক বা অন্য চ্যানেলে যা চলছে তা সাংবাদিকতা নয়

ভাবতে অবাক লাগে, জরুরি অবস্থার সময়ে পশ্চিমবাংলার একাধিক সম্পাদককে জেল খাটতে হয়েছিল সরকারের সামনে মাথা নোয়াননি বলে।

১৯৯০-এর দশকে তখন সারা ভারতের মাঠ মাতাচ্ছেন কৃশানু দে। ধীমান দত্ত সম্পাদিত খেলা পত্রিকায় এক সাক্ষাৎকারে তাঁকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, ভারতীয় ফুটবল আন্তর্জাতিক স্তরে অপ্রাসঙ্গিক হয়ে গেল কেন? কৃশানুর উত্তরটা মোটামুটি এরকম ছিল – সাহিত্য রবীন্দ্রনাথ থেকে সমরেশ বসুতে নেমেছে, ফুটবল চুনী গোস্বামী থেকে কৃশানু দে-তে নামবে না? ফুটবল বিশেষজ্ঞরা বলতে পারেন, এটা কোনো উত্তরই হল না। কৃশানুর খেলার ভক্তরা বলতে পারেন, কৃশানু অযথা বিনয় করছিলেন। তিনি মোটেই খুব নিচু মানের খেলোয়াড় ছিলেন না। সাহিত্যপ্রেমীরা বলতে পারেন, এ অতি বাজে তুলনা। সমরেশ বসু মোটেই এত ওঁচা লেখক নন যে রবীন্দ্রনাথ থেকে নামতে নামতে বাংলা সাহিত্য তাঁর স্তরে এসেছে বলা যাবে। কিন্তু যদি নামগুলো বাদ দিয়ে কৃশানুর বক্তব্যের নির্যাসটুকু নিই, তাহলে দেখা যাবে তিনি বলেছিলেন সব ক্ষেত্রেই বাঙালির অবনমন হচ্ছে। কথাটায় কিন্তু বিন্দুমাত্র ভুল নেই। সেই অবনমনের গতি গত ৩০-৩৫ বছরে আরও বেড়ে গেছে। কৃশানুর মানের বাঙালি ফুটবলার আজ আছে কি? সমরেশ বসুর মানের সাহিত্যিকও বাংলায় আর নেই। তবে বাঙালির সাংবাদিকতা যে উচ্চতা থেকে ধপাস করে পড়েছে, তার তুলনা মেলা ভার। মতি নন্দী থেকে মৌপিয়া নন্দী, গৌরকিশোর ঘোষ থেকে ময়ূখ ঘোষ। যেন এভারেস্ট থেকে সোজা বঙ্গোপসাগরে আছড়ে পড়া।

২০২৪ লোকসভা নির্বাচনের প্রাক্কালে এবং ফলাফল প্রকাশের পরেও সারা দেশে অন্যতম আলোচ্য বিষয় হয়ে উঠেছিল দেশের মূলধারার সংবাদমাধ্যমের, বিশেষত খবরের চ্যানেলগুলোর ভূমিকা। হোয়াটস্যাপ থেকে পাওয়া ভুয়ো খবর সম্প্রচার করা; মন্দির বনাম মসজিদ বয়ান প্রচার করে মুসলমানবিদ্বেষ ছড়ানো; সান্ধ্য প্যানেলে গাঁয়ে মানে না আপনি মোড়ল হিন্দু ও মুসলমান ধর্মীয় নেতাদের ডেকে এনে লড়িয়ে দেওয়া; বিরোধী দলের মুখপাত্র থেকে শুরু করে ছাত্রনেতা, মানবাধিকার কর্মী এবং সরকারের ত্রুটি তুলে ধরা সাংবাদিকদের ধমকানো; যে কোনো আন্দোলনকারীকে দেশদ্রোহী বা মাওবাদী বা খালিস্তানি বলে দেগে দেওয়া, পাকিস্তানের চর বা বিদেশের টাকায় চলেন বলে ঘোষণা করে দেওয়া – এইসব কুকর্ম ধারাবাহিকভাবে চালিয়ে শুধু যে দেশের গোদি মিডিয়া ক্ষমতাসীন বিজেপির প্রচারযন্ত্র হিসাবে কাজ করেছে তা নয়, দেশের সামাজিক পরিবেশ একেবারে বিষিয়ে দিয়েছে। তার ফল আমরা এখনো পেয়ে চলেছি (ভারত ক্রিকেটে ট্রফি জিতলে মধ্যপ্রদেশে সংখ্যালঘু এলাকায় হিংসা ছড়ানো হচ্ছে, উত্তরপ্রদেশে হোলির জন্যে মসজিদ ঢেকে দেওয়া হচ্ছে ত্রিপল দিয়ে), আরও বহুবছর পাব।

পশ্চিমবঙ্গে ২০১৯ লোকসভা এবং ২০২১ বিধানসভা নির্বাচনের সাপেক্ষে বিজেপির ফল অপ্রত্যাশিতভাবে খারাপ হওয়ায় বাংলার সংবাদমাধ্যমের দিকে তখন ততখানি নজর পড়েনি অনেকের। বস্তুত রিপাবলিক টিভি তখন পর্যন্ত মালিক অর্ণব গোস্বামীর পরিবেশনার গাঁক গাঁক শৈলীটুকুই চালু করতে পেরেছিল, ঘৃণার পথে রোজ নতুন মাইলফলক পেরিয়ে যাওয়া তখনো জমিয়ে শুরু করেনি। বলা যেতে পারে প্রদীপ, থুড়ি আগুন, জ্বালাবার আগে কেরোসিন তেল জোগাড় করার পর্ব চলছিল। অন্যদিকে একদা বিজেপির সমর্থনে রাজ্যসভার সাংসদ হওয়া সুভাষ চন্দ্রের জি নেটওয়ার্কের চ্যানেল ২৪ ঘন্টাও তখন আপাত নিরপেক্ষতা বজায় রাখার ব্যাপারে মনোযোগী ছিল। তাছাড়া নির্বাচনের ঠিক আগে সুভাষ চন্দ্রের সঙ্গে বিজেপির মন কষাকষির সংবাদও ভেসে এসেছিল। এবিপি আনন্দও আনন্দবাজার পত্রিকার মতই ধর্মেও থাকত, জিরাফেও থাকত। বাংলা চ্যানেলগুলোর দাঁত নখ বেরোতে শুরু করল ২০২৩ সাল থেকে, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্রের র‍্যাগিংয়ের কারণে মৃত্যুর খবরকে কেন্দ্র করে। তখনই প্রথম দেখা গেল, ওই ঘটনাকে হাতিয়ার করে বাংলার জনপ্রিয় খবরের চ্যানেলগুলোর মুখ হয়ে ওঠা অ্যাংকররা একেবারে অর্ণব, সুধীর চৌধুরী, রুবিকা লিয়াকতদের মত মার্কামারা গোদি মিডিয়ার অ্যাংকরদের ভাষায় ঘৃণা ছড়াতে পারেন।

২০১৬ সালে জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ে কাশ্মীরের স্বাধীনতা চেয়ে স্লোগান দেওয়া হয়েছে – এই ভুয়ো ভিডিও ছড়িয়েছিল কিছু তথাকথিত জাতীয় চ্যানেল (ফরেন্সিক পরীক্ষায় তা প্রমাণিত হয়)। তার ভিত্তিতে দিল্লি পুলিস ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রনেতাদের গ্রেফতার করে এবং গোটা বিশ্ববিদ্যালয়টাকেই জেহাদি সন্ত্রাসবাদীদের আখড়া বলে দেশের সামনে তুলে ধরার প্রক্রিয়া চালু করে গোদি মিডিয়া। সেইসময় টাইমস নাও চ্যানেলে কর্মরত অর্ণব কীভাবে লাইভ শোতে ডেকে উমর খালিদকে অসভ্যের মত ধমকেছিলেন, সেকথা অনেকেরই মনে আছে। ২০২৩ সালে দেখা গেল, মৌপিয়া অর্ণবের ছাত্রী না হলেও একলব্য তো বটেই। তিনিও যাদবপুরের এক ছাত্রনেতাকে ২৪ ঘন্টা চ্যানেলের শোতে ডেকে ধমকালেন এবং পাড়ার মস্তানদের কায়দায় বললেন ‘কে তুমি?’ যেন তিনি নিজে কোনো সম্রাজ্ঞী। রিপাবলিক বাংলার ময়ূখ অবশ্য তখনো তৃণমূল সরকারের বিরোধিতার কারণে এ রাজ্যের বাম কর্মী, সমর্থকদের নয়নের মণি। ওই চ্যানেলের দক্ষিণপন্থী প্রচারকে তখনো অনেকেই ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখছিলেন।

তারপর ঘটল আর জি করের ঘটনা। ততদিনে মৌপিয়া ২৪ ঘন্টা থেকে চলে গেছেন কলকাতা টিভিতে, যে কলকাতা টিভি কেন্দ্রীয় এজেন্সির কুনজরে (অর্থাৎ বিজেপির কুনজরে) পড়েছিল ২০২৩ সালেই। ঘন্টার পর ঘন্টা তাদের দফতরে তল্লাশি চালিয়েছিলেন অফিসাররা। আর জি করের ঘটনায় রাজ্য সরকারের ঢাল হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ে মৌপিয়ার চ্যানেল এবং সোশাল মিডিয়া হ্যান্ডেল। তখনই দেখা যায়, তিনি আন্দোলন ব্যাপারটারই তীব্র বিরোধী। গোদি মিডিয়া চ্যানেলগুলোর মতই, সাক্ষ্যপ্রমাণ থাকুক আর না-ই থাকুক, আন্দোলনকারী ডাক্তারদের দুরভিসন্ধি সম্পর্কে নিত্যনতুন অভিযোগ চলতে থাকে। রিপাবলিক বাংলার তখনো দু নৌকায় পা, কারণ একদিকে তৃণমূল সরকারের বিরোধিতা করা কর্তব্য। অন্যদিকে বিজেপি যেই বুঝেছে আর জি কর আন্দোলন থেকে তাদের কোনো লাভ হবে না, হিন্দু-মুসলমান বাইনারির কোনো অবকাশ নেই, অমনি শুভেন্দু অধিকারী আর তৃণমূল নেতাদের সুর মিলে গেছে। ডাক্তাররা কত অসৎ, কেমন মদ গাঁজা খায়, তাদের উপর জনরোষ এসে পড়বে – এসব কথা এসে পড়েছে। এবিপি আনন্দ আবার সেই মামলায় প্রথম থেকে আন্দোলনের পাশে। কারণটা সহজবোধ্য। সরকারবাবুদের কাগজগুলোর মতই তাঁদের খবরের চ্যানেলের গুণগ্রাহীরাও বেশিরভাগ মধ্যবিত্ত, উচ্চবিত্ত। পশ্চিমবঙ্গের ডাক্তাররাও বেশিরভাগই আসেন সেই শ্রেণি থেকে। অতএব ডাক্তাররা দিন কে রাত, রাত কে দিন বললেও সর্বতোভাবে তাঁদের পাশেই থাকতে হত ঘন্টাখানেকের সুমন দে-কে।

আরও পড়ুন নির্বাচনের ফলে হেরে গেছে দেশের অসাধু মিডিয়া

এইসব ছোটখাটো পার্থক্য ঘুচে গেল যাদবপুরে ব্রাত্য বসুর গমন নিয়ে সাম্প্রতিক গোলমালে। যাদবপুরকে মৌপিয়া, ময়ূখ বা সুমন – কারোর চ্যানেলেরই পছন্দ করার কোনো কারণ নেই। রাজ্যে তৃণমূল ক্ষমতায় এসেছে দেড় দশক হতে চলল, কেন্দ্রে বিজেপি জাঁকিয়ে বসেছে এক দশকের বেশি। রাজ্যের বিধানসভায় এরা ছাড়া আর কোনো দল নেই প্রায়। অথচ যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে এখনো উভয়ের কেউই দাঁত ফোটাতে পারেনি। শিক্ষকদের মধ্যে যদি বা সংগঠন আছে, ছাত্রদের মধ্যে তৃণমূল ছাত্র পরিষদ আর অখিল ভারতীয় বিদ্যার্থী পরিষদের উপস্থিতি এখনো সাড়া জাগানোর মত নয়। বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য নিয়োগের ক্ষমতা কার, তা নিয়ে যতই দড়ি টানাটানি করুন মুখ্যমন্ত্রী আর রাজ্যপাল – তাতে যাদবপুরের ছেলেমেয়েদের কিছু এসে যায়নি। এসে যে যায়নি তার প্রমাণ শিক্ষামন্ত্রীর গাড়ি এমনিতে প্রতিদ্বন্দ্বী বিভিন্ন বাম ছাত্র সংগঠনের একত্রে ঘিরে ধরা, গাড়ির সামনে শুয়ে পড়া। সকলেরই দাবি প্রায় এক – ক্যাম্পাসে নির্বাচন করো, গণতন্ত্র ফেরাও। সে দাবির পাশে কেনই বা রিপাবলিক, কলকাতা টিভি, এবিপি আনন্দ দাঁড়াবে? নির্বাচন হলে বেশিরভাগ আসনে জিতবে তো সেই কোনো না কোনো বামপন্থী ছাত্র সংগঠন। তিন চ্যানেলের একটার মালিকও যে বামপন্থীদের পছন্দ করেন না – একথা কে না জানে?

কিন্তু ব্যাপারটা স্রেফ যাদবপুরকে বদনাম দেওয়ায় থেমে থাকলে কথা ছিল। সে তো র‍্যাগিংয়ে ছাত্র মৃত্যুর সময় থেকেই ক্যাম্পাসে পড়ে থাকা মদের বোতল আর ব্যবহৃত কন্ডোম গুনে চলেছে বাংলার সংবাদমাধ্যম। কিন্তু এবারের অভিনবত্ব লাগামছাড়া সাম্প্রদায়িক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রচারে। বিন্দুমাত্র সাক্ষ্যপ্রমাণের তোয়াক্কা না করে যা খুশি অভিযোগ তুলে ঘৃণা ছড়ানোর কাজ করে চলেছে রিপাবলিক বাংলা। যাদবপুর আজমল কাসবের মত উগ্রপন্থী তৈরির কারখানা – এমনও বলা হচ্ছে গলা তুলে। কেন বলছেন ভাই? উত্তরে কিন্তু চিৎকার ছাড়া কিছু পাওয়া যাবে না। এখানে যাদবপুর আসলে উপলক্ষ, আসল লক্ষ্য আতঙ্ক ছড়ানো। কিসের আতঙ্ক? ইসলামিয় সন্ত্রাসবাদের আতঙ্ক। যে ইসলামিয় সন্ত্রাসবাদের কোনো হানা এখন পর্যন্ত পশ্চিমবঙ্গে ঘটেনি, ভারতেও ঘটেনি বহুকাল। এমনকি ২০১৯ সালের পুলওয়ামার ঘটনার তদন্ত নিয়ে প্রবল জাতীয়তাবাদী এবং হিন্দু হৃদয়সম্রাট নরেন্দ্র মোদীর সরকারেরও কোনো তাপ উত্তাপ নেই। সেই কাণ্ডের দোষীরা আজ পর্যন্ত গ্রেফতার হল না। জম্মু ও কাশ্মীর পুলিসের এক শিখ অফিসারকে গ্রেফতার করা হয়েছিল। সেই দাভিন্দর সিং পর্যন্ত ২০২০ সালে জামিন পেয়ে গেছেন, কারণ পুলিস ৯০ দিনের মধ্যে চার্জশিট জমা দিতে পারেনি। এমন উগ্রপন্থার আতঙ্ক আজ ছড়ানো কী উদ্দেশ্যে? হিন্দুদের মধ্যে মুসলমানদের প্রতি ভয় জাগাতে, বাংলার সমাজে ধর্মীয় বিভাজন ঘটাতে। মৌপিয়া মাওবাদীর ভয় দেখানো পর্যন্ত এগিয়েছেন, ময়ূখ আরও এককাঠি সরেস। আসলে দুজনের প্রতি নির্দেশাবলিও বোধহয় কিছুটা ভিন্ন। দুজনেরই অন্তরালের উপরওয়ালার উদ্দেশ্য যাদবপুরের বারোটা বাজানো (কলকাতা পুলিস বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে পুলিস ফাঁড়ি করতে চায় বলে খবরে প্রকাশ। এতে কোনো পাঠকের জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের ক্যাম্পাসে সেনাবাহিনীর ট্যাংক রাখতে চাওয়ার কথা মনে পড়লে নিবন্ধকার দায়ী নন), তবে ময়ূখের উপরওয়ালার তার সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গের মুসলমানদের আরও আরও প্রান্তিক করে দেওয়ার লক্ষ্যও আছে নির্ঘাত। নেহাত সমাপতন নয় যে প্রায় একই সময়ে বিজেপি নেতা শুভেন্দু অধিকারী বলছেন তাঁরা ক্ষমতায় এলে তৃণমূলের মুসলমান বিধায়কদের চ্যাংদোলা করে বিধানসভার বাইরে ছুড়ে ফেলা হবে।

এখানে একটা কথা বলা জরুরি। রিপাবলিক বাংলা কিন্তু আজ হঠাৎ মুসলমানবিদ্বেষ ছড়ানোর কাজ শুরু করেনি, প্রথম থেকেই এ কাজ করে আসছে। বাংলাদেশের জুলাই বিপ্লবের পর থেকে লাগাতার বাংলাদেশি হিন্দুদের প্রতি দরদ দেখানোর ভান করে তীব্র বিদ্বেষমূলক, গালগল্পপ্রবণ শো চালিয়ে গেছে ময়ূখ ও তার চ্যানেল। মূল রিপাবলিক চ্যানেলটির বেত্তান্ত যাঁরা জানেন তাঁদের অবশ্য আগেই বোঝা উচিত ছিল যে এরা সাংবাদিকতা করতে আসেনি, আরএসএস-বিজেপির এজেন্ডা অনুযায়ী সমাজে বিভাজন তৈরি করাই এদের আসল কাজ। জেগে ঘুমোলে অবশ্য কিছুই জানা যায় না, বোঝা যায় না। পশ্চিমবঙ্গে ঘোষিত ফ্যাসিবাদবিরোধী, হিন্দুত্ববাদবিরোধী যে রাজনৈতিক দলগুলো আছে – তৃণমূল কংগ্রেস, কংগ্রেস এবং বাম দলগুলো – তারা এতদিন জেগেই ঘুমোচ্ছিল বোধহয়। তাই ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বর মাসে ইন্ডিয়া জোট যখন সিদ্ধান্ত নিল যে হিন্দি, ইংরিজি চ্যানেল মিলিয়ে ১৪ জন অ্যাংকরের অনুষ্ঠান তারা বয়কট করবে, তখন এই সবকটা দল ওই জোটে থাকা সত্ত্বেও পশ্চিমবঙ্গে এমন কিছু করা হবে কিনা তা নিয়ে প্রায় কোনো আলোচনাই হয়নি। তাহলে প্রশ্ন হল, ‘আজি এ প্রভাতে রবির কর/কেমনে পশিল প্রাণের ’পর’? প্রশ্নটা বিশেষত বামপন্থীদের জন্যে। তৃণমূলের মুখপাত্রদের রিপাবলিক বাংলার সাম্প্রদায়িকতা নিয়ে আপত্তি থাকার কথা নয়। ময়ূখ বা রিপাবলিক বাংলার অন্য কোনো সাংবাদিক মুসলমানদের সম্পর্কে চাট্টি উস্কানিমূলক কথা বললে তা নিয়ে চ্যানেলে বসে চেঁচামেচি করে তাঁদের বরং সংখ্যালঘুদের রক্ষাকর্তা হওয়ার ভান করতে সুবিধা হবে। আর কংগ্রেসের তো কে নেতা, কে নয় তাই বোঝা শক্ত। অবস্থা এমনই যে রাহুল গান্ধীকে গুজরাটে গিয়ে বলতে হয় – কংগ্রেসে বিজেপির লোক আছে, তাদের তিনি বার করে দেবেন। ফলে কে কোথায় যাবেন না যাবেন সে ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেবে কে?

কিন্তু বামপন্থীরা, অন্তত তাঁদের ঘোষণা অনুযায়ী, বিজেপির সঙ্গে প্রতিযোগিতামূলক সাম্প্রদায়িকতা করতে নামেননি। আবার কংগ্রেসের মত নেতৃত্বহীনতার সমস্যাও থাকার কথা নয়, কারণ তাঁদের তো ‘রেজিমেন্টেড’ দল। তাহলে? ময়ূখ সরাসরি এ রাজ্যের বামপন্থীদের আক্রমণ করল বলে ঘুম ভাঙল, নাকি রাজ্য সম্পাদক মহম্মদ সেলিমের ধর্মীয় পরিচয় নিয়ে নোংরামি করার পরে ঘুম ভাঙল? যে কারণেই ভেঙে থাক, কবি বলেছেন, প্রভাত কেবল রাত্রির অবসানে নয়। যখনই চিত্ত জাগে তখনই প্রভাত হয়। কিন্তু প্রভাত কি আদৌ হয়েছে? এতকিছুর পরেও তো রিপাবলিক বাংলা চ্যানেলের শোতে বাম প্রতিনিধিরা হাজির হচ্ছেন। যাদবপুর কাণ্ডে রিপাবলিক বাংলার কার্যকলাপে আরও পরিষ্কার হয়ে গেছে যে তারা সাংবাদিকতা করে না। ক্যাম্পাসে ঢুকে তাদের প্রতিবেদকদের উদ্দাম অসভ্যতার (ভিডিও প্রমাণ বর্তমান) ফলে ছাত্রছাত্রীরা তাদের বিরুদ্ধে এফআইআর করেছে যাদবপুর থানায়। ছাত্রছাত্রীদের কাছে ‘দালাল’ আখ্যা পাওয়া প্রতিবেদকরা ক্যামেরার সামনে লাইন দিয়ে দাঁড়িয়ে সগর্বে দাবি করেছেন তাঁরা দালালই। দেশের মানুষের দালাল। অপছন্দের সাংবাদিকদের কোনো রাজনৈতিক সংগঠনের সদস্যরা দালাল আখ্যা দিচ্ছেন – এটা নতুন কিছু নয়। কিন্তু সত্যিকারের সংবাদমাধ্যম সে আখ্যাকে পাত্তা দেয় না, ‘আমরা অমুক আমরা তমুক’ বলে বড়াইও করে না। কারণ সাংবাদিকতার প্রাথমিক পাঠের মধ্যে যেটা পড়ে, সেটা হল – সাংবাদিক নিজে সংবাদ নয়। দেখা যাচ্ছে সেই প্রাথমিক পাঠটাই রিপাবলিক বাংলা মানে না। এরপরেও এদের সংবাদমাধ্যম হিসাবে গণ্য করার কোনো মানে নেই।

পশ্চিমবঙ্গের ফ্যাসিবিরোধী রাজনৈতিক দল, অরাজনৈতিক সংগঠন এবং ব্যক্তিরা প্রায় সবাই ‘গোয়েবেলস’ আর ‘রেডিও রোয়ান্ডা’ কথা দুটো ব্যবহার করে থাকেন। প্রথমটা অ্যাডলফ হিটলারের ঘনিষ্ঠ, নাজি প্রোপাগান্ডার দায়িত্বে থাকা কুখ্যাত ব্যক্তিটির নাম। দ্বিতীয়টা গত শতকের নয়ের দশকে আফ্রিকার রোয়ান্ডার গৃহযুদ্ধে হুটু হত্যার মিথ্যা খবর প্রচার করে, লোক খেপিয়ে টুটসিদের গণহত্যার পথ প্রস্তুত করা রেডিও স্টেশনের নাম। আমাদের ফ্যাসিবিরোধীরা সঠিকভাবেই বলে থাকেন যে এদেশের গোদি মিডিয়া গোয়েবেলসের কায়দায় মিথ্যা প্রচার করে এবং রেডিও রোয়ান্ডার কায়দায় পরজাতিবিদ্বেষ ছড়িয়ে গণহত্যার দিকে ঠেলে দিচ্ছে দেশের মুসলমানদের। কিন্তু মুশকিল হল, সে কাজে তাঁরা যে মদত দিয়ে ফেলছেন – এটা মানতে রাজি নন। আগে না হলেও, সম্প্রতি বাম দলগুলোর অনেক কর্মী, সমর্থক বলতে শুরু করেছেন যে রিপাবলিক বাংলায় পার্টি প্রতিনিধিদের আর না যাওয়াই উচিত। তাতে প্রতিযুক্তি দেওয়া হয় ‘ওই প্ল্যাটফর্মটা ব্যবহার করা দরকার। ছেড়ে দেওয়া উচিত না’। এই প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করনেওয়ালারা বোধহয় সেইসময় রোয়ান্ডায় থাকলে রেডিও রোয়ান্ডাতেও যেতেন – প্ল্যাটফর্মটা ব্যবহার করতে।

করে কী লাভ হচ্ছে? কোনো পরিমাপযোগ্য লাভ কোনো বাম দলের নেতা বা মুখপাত্র দেখাতে পারবেন না। কী ক্ষতি হচ্ছে তা বরং পরিষ্কার। বহু বাম সমর্থকের বাড়িতে গেলে দেখতে পাওয়া যায়, দিনরাত রিপাবলিক বাংলা এবং রিপাবলিক টিভি চলে। কেন চলে? কারণ বাম নেতারা ওই চ্যানেলগুলোতে যান বলে সমর্থকরা মনে করেন ওরা নিশ্চয়ই ঠিক জিনিস দেখায়, ঠিক কথা বলে। অর্থাৎ তাঁদের মনোজগতে রিপাবলিক নেটওয়ার্ক বৈধতা পেয়ে গেছে। এতে রিপাবলিকের সুবিধা হল, সারাদিন চেতনে ও অবচেতনে তাদের ঘৃণাভাষণ ও ভুয়ো খবর বাম সমর্থক পরিবারগুলোকে গেলাতে পারছে। ফলে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে সন্ত্রাসবাদী তৈরি হয় বললেও তারা বিশ্বাস করবে, শিগগির পশ্চিমবঙ্গে মুসলমানরা সংখ্যায় হিন্দুদের ছাড়িয়ে যাবে আর হিন্দুদের ফের দেশভাগের সময়কার মত জান মাল নিয়ে উদ্বাস্তু হতে হবে বললেও তারা বিশ্বাস করবে। সিপিএমের মিছিল, মিটিংয়ে লোক হয় অথচ ভোট কেন পড়ে না – এই প্রশ্নের এও এক উত্তর। বাম নেতারা অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসে মনে করেন, তাঁরা রিপাবলিকের প্ল্যাটফর্মকে ব্যবহার করছেন। আসলে রিপাবলিক তাঁদের ব্যবহার করছে। তার প্রমাণ নির্বাচনের পর নির্বাচনে বামেদের ভোট রামে চলে যাওয়া।

এই সহজ কথাটা স্বীকার করতে বাম নেতাদের ভীষণ অসুবিধা। তাঁদের জঙ্গি অনলাইন সমর্থকরাও এসব বললে বলেন – এটা মিডিয়ার যুগ। মিডিয়াকে ব্যবহার করতেই হবে। এখানে বলার কথা দুটো। প্রথমত, উট আর উটপাখি যেমন এক নয়, বক আর বকফুল যেমন এক নয়, রিপাবলিকও তেমন মিডিয়া নয়। দ্বিতীয়ত, মিডিয়া সম্পর্কে নিজেদের অগ্রজদের সাবধানবাণীই আজকের বাম নেতা কর্মীরা বিস্মৃত হয়েছেন। একাধিক লোকের স্মৃতিচারণে পাওয়া যায় যে জ্যোতি বসু আর প্রমোদ দাশগুপ্ত দুজনেই কমরেডদের বলতেন ‘আনন্দবাজার আমাদের কোনো কাজের প্রশংসা করলেই সাবধান হবেন। আরেকবার ভেবে দেখবেন কাজটা ঠিক হচ্ছে কিনা।’ তাও তো ওঁদের সময়ে কোনো সংবাদমাধ্যম রিপাবলিকের স্তরে নামেনি। তবু একথা তাঁরা কেন বলতেন? কারণটা খুব স্পষ্ট। মিডিয়া হাউস মানেই হল বৃহৎ পুঁজি। তার স্বার্থ সবসময় বামপন্থী দলগুলোর স্বার্থের পরিপন্থী, তারা যে শ্রেণির প্রতিনিধিত্ব করতে চায় – তার পরিপন্থী। সুতরাং তাদের প্ল্যাটফর্মে তারা বামপন্থীদের ততটুকুই প্রচার দেবে যতটুকুতে তাদের স্বার্থ বিঘ্নিত না হয়। অতএব তাদের নিন্দাই প্রত্যাশিত, প্রশংসা সন্দেহজনক।

একথা বললে সিপিএমের এখনকার লোকেরা বলেন ‘এখন যুগ বদলে গেছে। ওসব ওঁদের যুগে চলত, এখন চলে না।’ কথা হচ্ছে, যুগ তো সর্বদাই বদলায়। কিন্তু জ্যোতিবাবুদের সময় থেকে আজ পর্যন্ত মিডিয়ার কী ধরনের বদল হয়েছে? বৃহৎ পুঁজির বদলে এখনকার মিডিয়া কি ছোট পুঁজির হাতে চলে গেছে? ফলে তাদের স্বার্থের সঙ্গে বামপন্থীদের স্বার্থের সংঘাত আগের চেয়ে কমে গেছে? মোটেই তা নয়। বরং এখন মূলধারার মিডিয়া আরও বড় পুঁজির অধীন হয়েছে। দেশের অধিকাংশ মিডিয়া হাউস নামে, বেনামে হয় মুকেশ আম্বানি নয় গৌতম আদানির হাতে চলে গেছে। অর্ণব যখন রিপাবলিক টিভি চালু করেন, তখন তাঁকে পুঁজি জুগিয়েছিলেন আবার এক বিজেপি সাংসদ অস্ত্র ব্যবসায়ী – এ তথ্যও সবার জানা। সেই নেটওয়ার্কের চ্যানেলে না গেলে চলবে না বা গেলে বামপন্থীদের লাভ হবে – এহেন চিন্তার ব্যাখ্যা কী?

সন্তোষজনক ব্যাখ্যা যে নেই তা ১ মার্চের পর থেকে এ রাজ্যের বাম নেতা কর্মীরা বিলক্ষণ বুঝতে পারছেন। তাই ময়ূখের উপর অভিমান করতে শুরু করেছেন। কলেজজীবনে ময়ূখ ভারতের ছাত্র ফেডারেশন করতেন বলে শোনা যায়। সাংবাদিকতার পেশায় যাওয়ার পরেও সেই গন্ধ তাঁর গায়ে বেশ কিছুদিন লেগেছিল। সেই সময়কার সোশাল মিডিয়া পোস্ট দেখেই বিশেষত সিপিএম সমর্থকরা তাঁর প্রেমে পড়েছিলেন। এখন সেইসব পোস্ট শেয়ার করে বাক্যবাণ নিক্ষেপ করা হচ্ছে – তাহলে কি তখন ময়ূখ নিজেই দেশদ্রোহী ছিল, ইত্যাদি। সিপিএম নেতা সৃজন ভট্টাচার্যের একখানা ভিডিও দেখলাম। সেটা ১৩ মার্চ যাদবপুর ক্যাম্পাসে রিপাবলিকের বীরপুঙ্গবদের চরম অসভ্যতার আগে শুট করা। সেখানে সৃজন ময়ূখের বক্তব্যের সমস্ত গোলমাল সুন্দর তুলে ধরলেন, কিন্তু তারপর বললেন ‘ও ছোটবেলায় এরকম ছিল না’। মুশকিল হল, ছোটবেলায় তো হিটলারও নাজি ছিল না। তাতে কী এসে যায়? সমস্যাটা তো আসলে ব্যক্তি ময়ূখ বা ব্যক্তি মৌপিয়া নন। কোন সাংবাদিক কীভাবে কাজ করবেন, কোন বিষয়ে কোন পক্ষ নেবেন তা ঠিক হয় তাঁর কোম্পানির (পড়ুন মালিকের) স্বার্থ অনুযায়ী। এটুকু বোঝার মত রাজনৈতিক পরিপক্কতা কি বঙ্গ সিপিএমের নেতাদের নেই?

আরেকটা জিনিস হয়ত সৃজনের মত তরুণ নেতাদের পক্ষে বোঝা সম্ভব নয়, কারণ তাঁরা সে আমলে ছোট ছিলেন। কিন্তু প্রবীণ সেলিম বা সুজন চক্রবর্তীদের না জানার কথা নয়। তা হল বামফ্রন্ট আমলে কলেজে রাম, শ্যাম, যদু, মধু সবাই এসএফআই ছিল। অফিসে যেমন সবাই কো-অর্ডিনেশন কমিটি, স্কুলে এবিটিএ আর কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ে ওয়েবকুটা। ওতে কিছু প্রমাণ হয় না। অমন সর্বাঙ্গীণ আনুগত্য তৈরি করার বিপদই হল – সরকার বদলালেই লোকগুলো বদলে যায়। যেভাবে পাড়ায় পাড়ায় অটো স্ট্যান্ডের লাল পতাকাগুলো ঘাসফুলে বদলে গিয়েছিল ২০১১ সালে। মানুষের আসল রং বোঝা যায় দিন বদলালে। ময়ূখের রং এখন দেখা যাচ্ছে।

একটা সংবাদমাধ্যমে যতজন সাংবাদিক কাজ করেন তাঁরা সকলে নীতি নির্ধারক নন। অন্য যে কোনো পেশার মত সেখানেও অধিকাংশই স্রেফ হুকুম তামিল করেন। ফলে সংবাদমাধ্যমের কুকর্মের জন্য সাংবাদিককে সবসময় দায়ী করা যায় না। কিন্তু ময়ূখ, মৌপিয়া, সুমনরা যে স্তরে পৌঁছে গেছেন তাতে আর তাঁদের পদাতিক সৈনিক বলে ছাড় দেওয়া যায় না। ওই স্তরের সাংবাদিকরা সরাসরি নির্দেশ নেন মালিকের থেকে, অনেকসময় কোম্পানিতে তাঁদের শেয়ারও থাকে। মালিকরা জেনে বুঝেই এমন লোককে ওই জায়গায় তোলেন যে বিনা বাক্যব্যয়ে এমন কাজ করতে পারবে যা বিন্দুমাত্র বিবেক থাকলে পারা যায় না। ফলে ময়ূখ-মেদুরতা এবং প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করার ভাবনা ছেড়ে পশ্চিমবঙ্গের ধর্মীয় মেরুকরণে নেমে পড়া মিডিয়াকে বয়কট করার সময় এসে গেছে। বিভিন্ন দলের নেতারা ওসব চ্যানেলে গিয়ে বৈধতা না দিলেই সমর্থকদের চোখেও ওদের বিশ্বাসযোগ্যতা কমবে। তার প্রতিফলন ভোটবাক্সে পড়বে কিনা জানি না, ক্রমশ বারুদের স্তূপ হয়ে ওঠা সমাজে অবশ্যই পড়বে। রবীশ কুমার এমনি এমনি বলেন না – টিভিতে খবর দেখা বন্ধ করুন।

পুনশ্চ: রিপাবলিক টিভি আর কলকাতার টিভির দুই তারকার চেয়ে ভদ্র আচরণ করেন। তাহলেও এবিপি আনন্দের সুমনের কথাবার্তা কোন দিকে গড়ায় সেদিকে সতর্ক দৃষ্টি রাখা দরকার আমাদের সকলের। মনে রাখা ভাল, তিনি পুঁচকে দল ইন্ডিয়ান সেকুলার ফ্রন্টের আব্বাস সিদ্দিকীকে বলতে পারেন ‘আব্বাস, আপনি বিজেপির ভোট কাটুয়া।’ কিন্তু অমিত শাহের সাক্ষাৎকার নেওয়ার সময়ে জিজ্ঞেস করে উঠতে পারেন না – তৃণমূল থেকে বিজেপিতে আর বিজেপি থেকে তৃণমূলে অবাধ যাতায়াত চলে কী করে? উপরন্তু, বাংলাদেশের বিদ্রোহকে হাতিয়ার করে সাম্প্রদায়িক হাওয়া তোলার চেষ্টা সুমনের শো থেকেও কম হয়নি। আর সাম্প্রতিক যাদবপুর কাণ্ডে তিনি আপ্রাণ চেষ্টা করছিলেন প্রমাণ করতে যে ইন্দ্রানুজ রায়ের উপর দিয়ে মন্ত্রীর গাড়ি চলে যাওয়ার ছবিটা ভুয়ো। প্রমাণ হিসাবে কী যুক্তি দিচ্ছিলেন? না ছবিটা গণশক্তি ছাড়া কোথাও বেরোয়নি। এই যুক্তিতে দুনিয়ার সব সংবাদমাধ্যমের সব এক্সক্লুসিভই ভুয়ো। কারণ সেই খবর অন্য কোথাও বেরোয় না।

ভাবতে অবাক লাগে, জরুরি অবস্থার সময়ে পশ্চিমবাংলার একাধিক সম্পাদককে জেল খাটতে হয়েছিল সরকারের সামনে মাথা নোয়াননি বলে। সেই গৌরকিশোর ঘোষ, বরুণ সেনগুপ্তরা জীবিত নেই। কিন্তু তাঁদের শিষ্যরা অনেকে আছেন। সেই শিষ্যদের আজও অনেক সাংবাদিক আদর্শ বলে মনে করেন, বহু পাঠক/দর্শক তাঁদের মতামতকে গুরুত্ব দেন। সেই অনির্বাণ চট্টোপাধ্যায়, জয়ন্ত ঘোষাল, অশোক দাশগুপ্তরা এখনো হয় কাগজে নয় সোশাল মিডিয়ায় যথেষ্ট সক্রিয়। এই ‘গ্র্যান্ড ওল্ড ম্যান’-রা কেউ কি সোচ্চারে বলেছেন, বাংলার টিভি চ্যানেলগুলো যা করছে তা সাংবাদিকতা নয়? কারোর জানা থাকলে খবর দেবেন।

নাগরিক ডট নেট ওয়েবসাইটে প্রকাশিত

বাঙালির অরাজনৈতিক নিরপেক্ষতার নিচে চাপা পড়ছে ছাত্রছাত্রীরা

গণতন্ত্র-ফন্ত্র কে চায়? বিশেষ করে শিক্ষাঙ্গনে গণতন্ত্র তো বাবা-মায়েরা মোটেই চান না। ছেলেমেয়ে কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে যাবে লেখাপড়া করতে। ওটা রাজনীতি করার জায়গা নাকি?

ক্রিকেটের ধারাভাষ্যকাররা প্রায়ই বলেন – ক্রিকেট হল মিলিমিটারের খেলা। মানে কয়েক মিলিমিটার এদিক-ওদিক হলে নট আউটটা আউট হয়ে যেতে পারে, ছয়টা চার হয়ে যেতে পারে, ফলে জয়টা পরাজয়ে বদলে যেতে পারে। ব্রাত্য বসু আর তাঁর গাড়ির চালক বোধহয় ক্রিকেট দেখেন না। পশ্চিমবঙ্গের লেখাপড়া, নাটক, সিনেমা – এত কিছু সামলে কি আর সময় পাওয়া যায়? নইলে ইন্দ্রানুজ রায়ের গায়ে উঠে পড়ার কয়েক মিলিমিটার আগেই গাড়ির ব্রেক কষে ফেলতেন। তাহলেই কোনো সমস্যা থাকত না। কোনো চ্যানেল তাদের সাংবাদিককে পাঠিয়ে দিত ক্যাম্পাসে পড়ে থাকা মদের বোতল আর কন্ডোম গুনতে, কোনো চ্যানেল অতীতে ছড়িয়ে লাট করা কোনো প্রাক্তন উপাচার্যকে ডেকে এনে বোঝাত যাদবপুরে কোনো ‘ডিসিপ্লিন’ নেই এবং ‘ডিসিপ্লিন’ প্রতিষ্ঠা করতে গেলে কী করতে হবে। কোনো তথাকথিত স্বাধীন সাংবাদিক নিশ্চিন্তে তাঁর ইউটিউব চ্যানেলে বলে দিতে পারতেন ব্যাপারটা স্রেফ শিক্ষাক্ষেত্রে নৈরাজ্য তৈরি করার জন্যে সিপিএমের চক্রান্ত, কে কে বামপন্থী ছাত্র সংগঠনগুলোকে পৃথিবীর কোথা থেকে কত টাকা চাঁদা দিয়েছে তার এক্সেল শীট বানিয়ে ‘বিগ এক্সপোজে’ বলে প্রকাশ করতে পারতেন। আর জি কর আন্দোলনে যেসব বামপন্থীরা কর্পোরেট হাসপাতালের চক্রান্ত, স্বাস্থ্যসাথী প্রকল্প বানচাল করার ষড়যন্ত্র, বিজেপিকে ক্ষমতায় আনার পরিকল্পনা দেখতে পাচ্ছিলেন তাঁরাও নিশ্চিন্তে শিক্ষার বেসরকারিকরণের চক্রান্ত, কন্যাশ্রী প্রকল্প বানচাল করার ষড়যন্ত্র, ২০২৬ সালে বিজেপিকে ক্ষমতায় আনার পরিকল্পনা নিয়ে সোশাল মিডিয়ায় লম্ফঝম্প করতে পারতেন। নিজেদের ছাত্রজীবনে মুখে চোখে বিপ্লবের স্বপ্ন মেখে যথেষ্ট অশান্ত ছাত্র আন্দোলন করে, এখন পুলিসের সত্যবাদিতায় এবং শিক্ষামন্ত্রীর সম্ভ্রম রক্ষায় দারুণ বিশ্বাসী হয়ে যাওয়া অনাবাসী ফেসবুক ইনফ্লুয়েন্সার সদগুরুরাও দীর্ঘ পোস্ট লিখতে পারতেন – যাদবপুরের চ্যাংড়ারা ছাত্র সংসদের নির্বাচন ইত্যাদি দাবি করে ক্যাম্পাসে যে ফ্যাসিবাদ প্রবেশের রাস্তা খুলে দিচ্ছে – এই মর্মে। এমনকি সাংস্কৃতিক কর্মী ব্রাত্যবাবুর নাটক, সিনেমার বন্ধুরাও টিভি ক্যামেরাকে বড় মুখ করে বলতে পারতেন ‘কোনো রাজনীতির মধ্যে না গিয়ে বলছি – একজন শিক্ষিত, রুচিবান মানুষ, যিনি আবার মাস্টারমশাইও, তাঁর উপরে এই আক্রমণ নিন্দাযোগ্য।’ এই জাতীয় কিছু। সব বানচাল করে দিল ওই মিলিমিটার।

একটা জলজ্যান্ত ছেলের উপর দিয়ে গাড়ি চালিয়ে দেওয়া হয়েছে। সেই দৃশ্য ভাইরাল হয়ে গেছে, অস্বীকার করা যাবে না। ফলে অরূপ বিশ্বাস বা দেবাংশু ভট্টাচার্যের মত সরাসরি তৃণমূল কংগ্রেস করেন না যাঁরা, তাঁদের এখন ঢোঁক গিলে মানবিকতা দেখাতেই হচ্ছে। নইলে ভবিষ্যতে নিরপেক্ষতা (সংবাদমাধ্যমের), ফ্যাসিবাদবিরোধিতা (বামপন্থী ও উদারপন্থীদের) ইত্যাদি ভাল ভাল জিনিস করি বলে দাবি করা যাবে না। না, মানে করতে কে আর আটকাত? কিন্তু নিজেদেরই একটু বিবেকে লাগত বোধহয়। তাই ওঁদের এই মহানুভবতা। বোধহয় অনেকের মহানুভবতার কারণ এটাও যে ইন্দ্রানুজ রাজ্যের কোনো বিরোধী রাজনৈতিক দলের ছাত্র সংগঠনের সদস্য নয়। সেটা হলে সংবাদমাধ্যম তো বটেই, বিকল্প বামেরাও অনেকে শিক্ষামন্ত্রীকে ঘিরে ধরা, তাঁর গাড়ির কাচ ভাঙা ইত্যাদির নিন্দা করতেন এবং একে ওই বিরোধী রাজনৈতিক দলটার ক্ষমতা দখলের ঘৃণ্য চেষ্টা বলে সাংবাদিক সম্মেলন করতেন। যেমনটা আর জি কর আন্দোলনের শেষ পর্বে আমরা দেখেছি।

দেখুন, সত্যি কথা সোজা করে বলাই ভাল। গণতন্ত্র-ফন্ত্র কে চায়? বিশেষ করে শিক্ষাঙ্গনে গণতন্ত্র তো বাবা-মায়েরা মোটেই চান না। ছেলেমেয়ে কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে যাবে লেখাপড়া করতে। ওটা রাজনীতি করার জায়গা নাকি? বাবা-মায়েরা বিলক্ষণ জানেন যে যাদবপুরে লেখাপড়া হয় না। ওখানে কেবল ছেলেরা গাঁজা খায়, মেয়েরা ছেলেদের সঙ্গে বসে হাফপ্যান্ট পরে সিগারেট খায়। কিন্তু সেসবও মেনে নেওয়া যেত যুগের ধর্ম হিসাবে। এসবের থেকেও বড় অপরাধ যেটা করে যাদবপুরের ছেলেমেয়েরা, সেটা হল রাজনীতি করে। তাও আবার মূলত বামপন্থী রাজনীতি। এই রাজনীতির ছোঁয়াচ বাঁচাতে অর্থনৈতিকভাবে সক্ষম বাবা-মায়েরা পাঁচতারা হোটেলের মত যেসব বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় হয়েছে ছেলেমেয়েদের সেখানে পাঠাতেই বেশি স্বচ্ছন্দ বোধ করেন। যাদবপুর, প্রেসিডেন্সির মত দু-একটা জায়গা বাদে পশ্চিমবঙ্গের কোনো কলেজে যে ২০১৭ সাল থেকে ছাত্র সংসদের নির্বাচন হয় না তাতে বাবা-মায়েরা তো বটেই, অনেক ছাত্রছাত্রীও খুশি। ভোট দেব পঞ্চায়েত, পৌরসভা, বিধানসভা, লোকসভার জন্যে। পড়াশোনার জায়গায় আবার ভোট কিসের? এইসব করতে গিয়েই তো বাম আমলে পশ্চিমবঙ্গে লেখাপড়া হত না, তাই না? এদিকে ২০১১ সাল থেকে কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্রমশ ছাত্র রাজনীতি তুলে দিয়ে কীরকম দুর্দান্ত পড়াশোনা হচ্ছে তা সমস্ত ছাত্রছাত্রী এবং অভিভাবক জানেন। আরও নিদারুণভাবে জানেন মাস্টারমশাই, দিদিমণিরা। বছরের পর বছর নির্বাচন না হওয়া মানে যে একনায়কতন্ত্র – সেকথা তাঁরা দেশের রাজনীতি সম্পর্কে মানতে রাজি। পশ্চিমবঙ্গের ভোটে হিংসা, রিগিং ইত্যাদি নিয়েও অসন্তুষ্ট হন। কিন্তু কলেজ ক্যাম্পাসে তাঁরা রাজনীতি চান না, ভোট-ফোট চান না। কেন? জিজ্ঞেস করলেই উত্তর পাওয়া যাবে ‘ওতে লেখাপড়ার ক্ষতি হয়। অশান্তি হয়।’ প্রথম যুক্তিটা সত্যি হলে যাদবপুর বছরের পর বছর ইউজিসি, ন্যাক, বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মূল্যায়নে কী করে দেশের সেরা প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে থাকে, সে প্রশ্নের উত্তর কিন্তু কারোর কাছে নেই। দ্বিতীয় যুক্তিটা ঠিক হলে অন্য শান্তিপূর্ণ কলেজগুলোতে ছাত্রসংখ্যা কমছে কেন, যাদের নাম খাতায় আছে তারাও ক্লাস করতে আসে না কেন, এসব প্রশ্নও কেউ নিজেকে করে না। ছাত্র রাজনীতির প্রায় পঞ্চত্বপ্রাপ্তি হওয়া পশ্চিমবঙ্গে যাদবপুরের মত জায়গাতেও খাতা না দেখেই নম্বর দিয়ে দেওয়া হচ্ছে, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে ১২০ জনের খাতা হারিয়ে যাচ্ছে কেন?

দীর্ঘ চেষ্টায় গোটা রাজ্যের মাথায় ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছে যে ছাত্রছাত্রীরা রাজনীতি করলে লেখাপড়া হয় না আর শ্রমিকরা রাজনীতি করলে শিল্প হয় না। ২০১১ সালের পর থেকে সরকারি প্রচেষ্টায় দুটোই প্রায় তুলে দেওয়া হয়েছে সফলভাবে। অথচ না লেখাপড়া হচ্ছে, না শিল্প হচ্ছে। এসব বললে উত্তর আসবে, অত সালে অমুক কলেজে ছাত্র ইউনিয়নের নির্বাচনে হিংসায় অমুকের প্রাণ গিয়েছিল, তমুকের চোখ নষ্ট হয়েছিল। তমুক কলেজে এসএফআই বাম আমলে তোলাবাজি করেছিল, তৃণমূল নতুন কিছু করছে না। ঠিক কথা। একথাও ঠিক যে বহু কারখানায় বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠনের নেতারা (শ্রমিক ইউনিয়ন কেবল সিপিএম বা অন্য বামপন্থী দলের নেই; কংগ্রেস, তৃণমূল, এমনকি আরএসএসেরও আছে। এটা আবার এ যুগের সবজান্তারা জানেন না) মালিকপক্ষের সঙ্গে তলে তলে আপোস করে শ্রমিকদের বারোটা বাজিয়েছেন। কিন্তু তার জন্যে ইউনিয়ন, রাজনীতি, গণতন্ত্র সব তুলে দেওয়া উচিত – এই প্রত্যয় তৈরি হলে মাথায় ব্যথা হওয়া মাত্রই ব্যথার ওষুধ না খেয়ে বা দীর্ঘকালীন মাথাব্যথার কারণ সন্ধানে ডাক্তারের কাছে না গিয়ে পত্রপাঠ মাথাটা কেটে ফেলা উচিত। তাতে অচিরেই পশ্চিমবঙ্গ স্কন্ধকাটাদের রাজ্যে পরিণত হবে। ইতিমধ্যেই দু-কান কাটাদের রাজ্যে পরিণত হয়েছে। তাই চার্জশিটে যার নাম লেখা আছে সে বুক ফুলিয়ে সভায় বলতে পারে – ওটা কার নাম, নির্দিষ্ট করে বলুক। টিভি স্টুডিওর সান্ধ্য আলোচনায় গভীর জল্পনা কল্পনা চলে – নামটা কার।

এমন রাজ্যে সরকার যে নিতান্ত কোণঠাসা না হলে কোনো আন্দোলনকে গ্রাহ্য করবে না, কোনো দাবিকেই পাত্তা দেবে না তাতে আশ্চর্যের কিছু নেই। আর জি কর আন্দোলন যখন তুঙ্গে, তখন জুনিয়র ডাক্তাররা মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকে কলেজগুলোতে ছাত্র সংসদের নির্বাচন করানোর দাবি করেছিলেন। সরকারপক্ষ থেকে অমনি প্রচার করা শুরু হয় ‘এই দেখুন, এরা আসলে ক্ষমতা চায়’। সেই প্রচার অনেকের পছন্দও হয়ে যায়। মানে গণতান্ত্রিক দেশে নির্বাচন চাওয়া মহা অপরাধ। তর্কের খাতিরে যদি ধরে নেওয়া যায় তারা ক্ষমতা চায় বলেই নির্বাচন চেয়েছিল, সেটাই বা অপরাধ হবে কেন? নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতা হস্তান্তর তো গণতন্ত্রের লক্ষণ। গায়ের জোরে ক্ষমতা দখল করতে তো চায়নি। অথচ বহু বিপ্লবীও সেইসময় সরকারি দলের এই অন্যায় প্রচারের প্রতিবাদ করেননি। ব্রাত্যবাবুর গাড়ির বেপরোয়া মেজাজ তখনই তৈরি হয়েছে। এমনিতেই আমাদের দেশে গণতন্ত্র সংকুচিত হতে হতে এমন জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছে যে শাসক দলগুলোর যে কোনো অন্যায় নিয়ে প্রশ্ন তুললেই তারা বলে দেয়, কাজটা করার পরেও তারাই জিতেছে। অতএব মানুষের তাদের উপর আস্থা আছে। সুতরাং ওটা অন্যায় নয়। তার উপর লেখাপড়া জানা নাগরিকরা যদি নিজেরাই নানা ভাষায় বলতে শুরু করেন যে কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদ, স্কুলের ম্যানেজিং কমিটি বা টিচার্স কাউন্সিল, সমবায় সংস্থা ইত্যাদি ছোট ছোট পরিসরেও নির্বাচন চাওয়াই অপরাধ – তাহলে তো সোনায় সোহাগা।

অর্থাৎ ছাত্রের উপর দিয়ে শিক্ষামন্ত্রীর গাড়ি চালিয়ে দেওয়ার ঔদ্ধত্য শাসককে আমরাই উপহার দিয়েছি বললে বিশেষ ভুল হয় না। বিরোধী দলগুলো অবশ্যই দায়হীন নয়। বিধানসভার বিরোধী দল বিজেপির স্বর যে যাদবপুর বা ছাত্র রাজনীতির প্রসঙ্গ উঠলে তৃণমূলের সঙ্গে মিশে যায় তা অতীতেও দেখা গেছে, গতকাল থেকেও দেখা যাচ্ছে। এটা কাকতালীয় নয়। জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের মত যেসব প্রতিষ্ঠানের ছাত্রছাত্রীরা আজও মূলত বামপন্থী সেইসব প্রতিষ্ঠানকে তৃণমূল কংগ্রেসের মত বিজেপিও শত্রুই মনে করে এবং সেগুলোর সাড়ে বারোটা বাজাতে চেষ্টার ত্রুটি রাখে না। মতপার্থক্য যা নিয়ে হয় সেটা হল যারা বাবুল সুপ্রিয়র মাথায় চাঁটি মেরেছে বা ব্রাত্যবাবুকে আঘাত করেছে তাদের কী বলা হবে তাই নিয়ে। নকশাল, নাকি আর্বান নকশাল, নাকি দেশদ্রোহী, নাকি পাকিস্তানি ইত্যাদি প্রভৃতি। অমন মতপার্থক্য তৃণমূলের নিজের ভিতরেও তো হয়। কাল থেকে যেমন কোনো তৃণমূল নেতা বলছেন এটা সিপিএমের বদমাইশি, কেউ বলছে অতিবামদের গুন্ডামি ইত্যাদি প্রভৃতি। বিধানসভা, লোকসভায় বারবার শূন্য পেলেও যাদের হাতে নাকি এই রাজ্যের প্রগতিশীলতার ঐতিহ্য রক্ষা করার দায়িত্ব, সেই সিপিএম বা বামফ্রন্টের দলগুলোর আবার অন্য সমস্যা। বিভিন্ন ক্যাম্পাসে তাদের ছাত্রনেতারা যতটা লড়াকু, বিশেষত অন্য বামেদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে, ক্যাম্পাসের বাইরে পার্টির ততটা লড়াই দেখা যায় না। তার উপর ইদানীং আবার সিপিএম নেতারা ডিপার্টমেন্টাল স্টোর সিস্টেম চালু করেছেন। ব্রিগেডের ডাক দেয় যুব সংগঠন বা খেতমজুরদের সংগঠন। যাদবপুরে ছাত্রের উপর দিয়ে মন্ত্রীর গাড়ি চলে গেছে বলে ছাত্র ধর্মঘটের ডাক দিয়েছে ছাত্র সংগঠন। স্কুলশিক্ষার অব্যবস্থা নিয়ে আন্দোলন করতে হলে সে আন্দোলন হয় শিক্ষক সংগঠনের ব্যানারে। পার্টির নাম, পার্টির পতাকা দেখা যায় কেবল সম্মেলনে আর সাংবাদিক সম্মেলনে। পার্টির ‘নতুন মুখ’, ‘তরুণ মুখ’ বলে খ্যাত নেতৃবৃন্দকে কলকাতায় বিভিন্ন ছায়াছবির প্রিমিয়ারে আর টিভি স্টুডিওতে রোজ দেখা যায়। কিন্তু মীনাক্ষী মুখার্জি বাদ দিলে কাউকে প্রত্যন্ত এলাকার আন্দোলনে নিয়মিত দেখা যায় না। ক্ষমতাসীন তৃণমূলে এত জটিলতা নেই। একটাই বুলডোজার, সব জায়গায় চালানো হয়।

পশ্চিমবঙ্গে এর বাইরেও তৃণমূলবিরোধী দল আছে। কয়েকটা কোণে কংগ্রেস আছে, যাদের কথা বলাই বাহুল্য। তাছাড়া কিছু বাম দল আছে। ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে যখন বামফ্রন্ট শূন্য হয়ে গেল, তখন এক ওয়েব ম্যাগাজিনে লিখেছিলাম, তাঁদের অনেককালের অভিযোগ, সিপিএম বামপন্থার বদনাম করছে। একটিবার সুযোগ পেলেই তাঁরা দেখিয়ে দিতে পারেন আসল বামপন্থা কী, কিন্তু সিপিএম তাঁদের জায়গা ছাড়ে না। এবার সিপিএম শূন্য হয়ে গেল, সামনে ফ্যাসিবাদের বিপদ। এইবার তাঁরা সিপিএমের জায়গাটা নিন, দেখিয়ে দিন। কিন্তু ২০২৬ আসতে চলল, তাঁরা জায়গা ভরাট করতে পারলেন না। এখনো বলছেন যা ঘটছে সবই সিপিএমের দায়িত্ব। সে দায়িত্ব পালনে সিপিএম যে ব্যর্থ তা নিয়ে সন্দেহের অবকাশ নেই। কিন্তু ওটুকু বলে ওঁরা সন্তুষ্ট নন। আবার সিপিএমের উপর অভিমান করাও চাই। ‘বিজেপিকে ফ্যাসিবাদী না বলে নয়া ফ্যাসিবাদী বললি কেন? এরম কল্লে খেলব না।’ আবার সিপিএমও বলে ‘তোরা মমতাকে লেসার ইভিল বলেছিলিস না? এখন কেন?’ মানে রবীন্দ্রনাথের কাছে কথাঞ্জলি পুটে ক্ষমা চেয়ে নিয়ে ব্যাপারটাকে এরকমভাবে বলা যায় যে ‘বাম ভাবে আমি দেব/বিকল্প ভাবে আমি/নিউট্রাল ভাবে আমি দেব/হাসে ফ্যাসিনামী।’

আরও পড়ুন আন্দোলন, ন্যায়বিচার, পুজো: একটি অরোম্যান্টিক বয়ান

পশ্চিমে গুজরাট থেকে শুরু হয়ে বিজেপির বিজয়রথ পূর্বে ওড়িশা পর্যন্ত এসে পড়েছে। পশ্চিমবঙ্গে ঢুকতে পারেনি বলে আমরা অনেকেই আহ্লাদিত। সেই ২০২১ সাল থেকেই ফ্যাসিবাদকে হারিয়ে দিয়ে বেশ একটা বিপ্লবী অনুভূতি হচ্ছে। এদিকে সেবার নির্বাচন পর্ব মিটতেই তৃণমূল থেকে বিজেপিতে চলে যাওয়া নেতারা গুটিগুটি ফিরে এসেছেন, ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে লড়াকু নেত্রী মমতা ব্যানার্জি ফিরিয়েও নিয়েছেন। আসানসোল দাঙ্গায় উস্কানি দেওয়া বাবুলবাবু তো তৃণমূলে এসে মন্ত্রীও হয়ে গেছেন। মুকুল রায় বিজেপিতে আছেন, না তৃণমূলে – সে আবার এক রহস্য। রাজ্যের রাজনৈতিক বিতর্কও উন্নয়ন থেকে ধর্মে সরে গেছে। অযোধ্যার রামমন্দিরের পালটা দীঘায় জগন্নাথের মন্দির হয়েছে সরকারি টাকায়। দুর্গাপুজোয় সরকারি সাহায্য তো ছিলই, কাশীর অনুকরণে কলকাতায় গঙ্গার ঘাটে সন্ধ্যারতিও চালু হয়ে গেছে। কোথাও নির্বাচন হলে অশান্তি শুধু নয়, দেখা যাচ্ছে নির্বাচন চাইলেও অশান্তি হয়। দেশের সবচেয়ে বড় সিনেমা শিল্প বলিউডকে দখল করে ফেলেছে বিজেপি, একের পর এক হিন্দুত্ব প্রোপাগান্ডা ছবি চলছে। অথচ তৃণমূল সাংসদ, বিধায়কে ভর্তি টলিউডে কিন্তু তার পালটা প্রোপাগান্ডা ছবি হচ্ছে না। বরং প্রবল মুসলমানবিদ্বেষী বয়ানে ছবি হয়েছে, তাতে যাদবপুরের তৎকালীন তৃণমূল সাংসদ অভিনয় করেছেন। গোয়েন্দা ব্যোমকেশকে ত্রিশূলধারী শিব সাজানো ছবি হয়েছে ঘাটালের তৃণমূল সাংসদের প্রযোজনায়, শ্রেষ্ঠাংশেও তিনি। উপরন্তু ইতিমধ্যেই রুগ্ন শিল্প হয়ে যাওয়া আঞ্চলিক ভাষার এই ইন্ডাস্ট্রির অবস্থা আরও কাহিল হচ্ছে তৃণমূল নেতাদের প্রতাপে। টেকনিশিয়ানদের গিল্ড আর নির্দেশকদের দ্বন্দ্বে গতবছর জুলাই মাসে একবার বেশ কয়েকদিন শুটিং বন্ধ ছিল। তারপর অক্টোবর মাসে ২৩৩ জন পরিচালক তৃণমূলের টলিপাড়ার নেতা স্বরূপ বিশ্বাসের বিরুদ্ধে মানহানির মামলা করেন। সম্ভবত তারই প্রতিক্রিয়ায় টেকনিশিয়ানদের গিল্ড কয়েকজন পরিচালকের ছবির কাজে বাগড়া দেয়। ফলে গতমাসে পরিচালকরা কর্মবিরতি পালন শুরু করেছিলেন, তবে তাঁদের একতার অভাবে ব্যাপারটা দাঁড়ায়নি। সমস্যা কিন্তু রয়েই গেছে।

এ রাজ্যে অনেকে তো মানেন ভারতে ফ্যাসিবাদ এসে গেছে এবং ফ্যাসিবাদী বলেই আরএসএসের বিরুদ্ধে লড়াইটা আসলে সাংস্কৃতিক লড়াই। তাঁদের অনেকেই আবার বলেন তৃণমূল ফ্যাসিবাদী নয়, কারণ খুব খারাপ শক্তি হলেও তাদের কোনো আদর্শ নেই। আদর্শ না থেকেই যদি ফ্যাসিবাদ যে যে লক্ষ্য পৌঁছতে চায় সেই সেই লক্ষ্যে পৌঁছে যায় কোনো দল, তাহলেও কি সে ফ্যাসিবাদী হয় না?

কে জানে বাপু! বাঙালি তাত্ত্বিক জাতি। স্বৈরাচারী না ফ্যাসিবাদী; ফ্যাসিবাদী না নয়া ফ্যাসিবাদী? এসব তাত্ত্বিক লড়াই আমরা সারাদিন করে যেতে পারি। করছিও তাই। কাজের কাজ তো কিছু করছি না। অবশ্য করতে যাবই বা কেন? আমাদের তো অরাজনৈতিক, নিরপেক্ষ থাকতে হবে। কলকাতা থেকে প্রকাশিত বাঙালির গর্বের প্রগতিশীল খবরের কাগজ দ্য টেলিগ্রাফ-এর মত, যারা আজ যাদবপুরের খবরের শিরোনামে লিখেছে ‘Bratya, student hurt in JU clash’। ভাবুন! যার হাতে কাচ ঢুকেছে সে-ও ‘hurt’, যে গাড়ির তলায় পড়েছে, মারা যেতে পারত, সে-ও ‘hurt’। তুলনাহীন নিরপেক্ষতা।

নাগরিক ডট নেট ওয়েবসাইটে প্রকাশিত

নির্মম সরকার, অনশন এবং কিছু অস্বস্তিকর প্রশ্ন

তৃণমূল সরকার কেন, কোনো দলের সরকারই এই যুগে এই সমস্যার সমাধান করতে পারবে কিনা সন্দেহ। একজন বিশেষজ্ঞ হয়ত সরকারি কলেজের শূন্য পদে যোগ দিলে যা বেতন পাবেন, তার চেয়ে অনেক বেশি বেতন পাবেন কর্পোরেট হাসপাতালে যোগ দিলে।

হপ্তা তিনেক আগে কলকাতায় এসেছিলেন ডাঃ কাফিল খান। সেই কাফিল, যিনি আদিত্যনাথশাসিত উত্তরপ্রদেশে নিজের পেশাগত দায়িত্বের ঊর্ধ্বে উঠে পকেটের পয়সা দিয়ে মরণাপন্ন শিশুদের জন্য অক্সিজেনের ব্যবস্থা করতে গিয়েছিলেন। অথচ সেই শিশুদের মৃত্যুতে তাঁকেই অপরাধী সাজিয়ে কারাবাস করিয়েছিল উত্তরপ্রদেশ সরকার। কাফিল কলকাতায় এসে আর জি কর হাসপাতালে ঘটে যাওয়া ধর্ষণ ও খুনের ঘটনার নিন্দা করে আন্দোলনকারীদের পাশে থাকার বার্তা দিয়েছেন, ঘটনাটাকে ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টারও নিন্দা করেছেন। কিন্তু সঙ্গে আরও কিছু কথা বলেছেন, যার বাংলা তরজমা করলে এরকম দাঁড়ায় – ‘চলতি প্রতিবাদের জন্য পশ্চিমবঙ্গের মানুষের প্রশংসা প্রাপ্য, কিন্তু আমরা অস্বীকার করতে পারি না যে মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি ক্রুদ্ধ ডাক্তারদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছিলেন এবং তাঁদের দাবি মেনে নিতে রাজি হয়েছিলেন। আপনারা এখন যতই রেগে থাকুন, দয়া করে বোঝার চেষ্টা করুন যে আজও বাংলায় নিজের ক্ষোভ প্রকাশ করার, প্রতিবাদ করার পরিসর আছে। এটা উত্তরপ্রদেশ হলে সমস্ত প্রতিবাদীকে জেলে পোরা হত আর তাদের নামে ন্যাশনাল সিকিউরিটি অ্যাক্টে মামলা ঠুকে দেওয়া হত।’

কাফিলের দোষ নেই। তিনি এ রাজ্যের মানুষ নন, রাজনীতির লোকও নন। ফলে এখানকার আন্দোলনের ইতিহাস বা তৃণমূল কংগ্রেস আমলে আর কী কী ঘটেছে – সেসব জানা তাঁর থেকে প্রত্যাশিত নয়। উপরন্তু দেশের বেশিরভাগ মানুষের বাংলা না জানা এবং এ রাজ্যের ইংরিজি জানা মানুষের বিজেপি-বিরোধিতা এবং/অথবা সিপিএম-বিদ্বেষের সুযোগ নিয়ে মমতা ব্যানার্জির সরকার সফলভাবে নিজেদের যাবতীয় কুকীর্তি বাকি ভারতের কাছে ঢেকে রাখতে সমর্থ হয়েছে। ফলে কাফিলের কানে নিশ্চয়ই এ খবর পৌঁছয়নি, যে এ রাজ্যেও সরকারবিরোধীদের বাড়িঘর বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়ার দৃষ্টান্ত আছে।

মনে হয় না কাফিলকে যাঁরা কলকাতায় এনেছিলেন তাঁরা আনিস খানের কথাও জানিয়েছেন। পশ্চিমবঙ্গে কোনো দাবিতে কেউ সামান্যতম প্রতিবাদ করলেই শাসক দল সেই প্রতিবাদকে মানুষের চোখে হেয় করার চেষ্টা করে রাজনীতির জুজু দেখিয়ে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এতদিন বলা হত ‘এর পিছনে বিজেপি আছে’। যেহেতু আর জি কর আন্দোলনে বিজেপি বহু চেষ্টা করেও পা রাখতে পারেনি এবং সকলেই টিভির পর্দায় লাইভ দেখে নিয়েছেন যে অভিজিৎ গাঙ্গুলির মত বিজেপি নেতা আন্দোলনে যোগ দেওয়ার চেষ্টা করলে কীভাবে তাঁদের বিতাড়িত করেছেন আন্দোলনকারীরা; সেহেতু এখন বলা হচ্ছে, এই আন্দোলনের পিছনে সিপিএম আছে, অতিবাম শক্তি আছে। যেন এরা সব নিষিদ্ধ সংগঠন অথবা সংবিধানে লেখা আছে বিরোধীরা কোনো আন্দোলনে মদত দিতে পারবে না। কিন্তু সে বিতর্কে না গিয়ে ভাবা যাক যে আনিস তো বিজেপি, সিপিএম বা কংগ্রেস করতেন না। তবু প্রতিবাদী হওয়ার অপরাধে তাঁকে মরতে হয়েছে এবং বহু আইনি ও রাজনৈতিক লড়াই সত্ত্বেও তাঁর পরিবার আজও বিচার পায়নি। বর্তমান আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত থাকার জন্যেও পুলিস অনেককে বাড়ি গিয়ে হুমকি দিচ্ছে, ভয় দেখাচ্ছে বলে খবরে প্রকাশ। নৈহাটির মত শারীরিক আক্রমণের কথা না-ই বা বললাম। ফলে পশ্চিমবঙ্গ প্রতিবাদের মরুদ্যান – এই ধারণার কোনো ভিত্তি নেই।

মমতা প্রতিবাদীদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে এই প্রথম যাননি। ২০১৪ সালের হোক কলরব আন্দোলনও শেষ হয়েছিল তিনি শেষপর্যন্ত যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীদের সঙ্গে দেখা করে তৎকালীন উপাচার্যকে সরিয়ে দেওয়ার ঘোষণা করার পরে। ২০১৯ সালেও লোকসভা নির্বাচনের মুখে স্কুলশিক্ষকের চাকরির দাবিতে প্রেস ক্লাবের সামনে অনশনে থাকা ছেলেমেয়েদের কাছে মমতা গিয়েছিলেন আন্দোলন তুলে নেওয়ার অনুরোধ নিয়ে। কিন্তু দুবারই সেটা করেছিলেন আন্দোলন দমন করতে না পেরে, শেষে নিরুপায় হয়ে। এর কৃতিত্ব আন্দোলনকারীদের, এর জন্যে মুখ্যমন্ত্রীকে মমতাময়ী আখ্যা দিলে সত্যের অপলাপ করা হয়। এবারেও মমতা নানা টালবাহানার পরে জুনিয়র ডাক্তারদের সঙ্গে বৈঠকে বসেছিলেন অনন্যোপায় হয়ে। গত ১৬ সেপ্টেম্বরের সেই বৈঠকের পর মমতার যাবতীয় ঘোষণা এবং সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশের পরেও ডাক্তাররা একাধিক হাসপাতালে আক্রান্ত হয়েছেন। তার পরিণামেই চলতি অনশন। ইতিমধ্যে শেঠ সুখলাল কারনানি মেমোরিয়াল হাসপাতালে (এসএসকেএম) দুদল দুষ্কৃতীর মারামারিতে এক রোগীর আত্মীয়ও আহত হয়েছেন। সুতরাং এ রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী জেলে পোরেন না, আলোচনা করেন – এই সন্তোষ হাস্যকর। তেমনই হাস্যকর মুখ্যমন্ত্রীর ধূর্ততা বুঝতে না পারা। সমাধান করতে আলোচনা করা আর ধামাচাপা দিতে আলোচনা করা – দুটোই একইরকম প্রশংসাযোগ্য হতে পারে না। ২০১৯ সালে ভোট মিটলেই চাকরি হবে প্রতিশ্রুতি দিয়ে মমতা যে শিক্ষক পদপ্রার্থীদের ২৯ দিনের অনশন প্রত্যাহার করিয়েছিলেন, তাঁদের অধিকাংশ আজও যে তিমিরে সেই তিমিরেই আছেন।

বস্তুত, কোনো প্রতিবাদ, কোনো আন্দোলনকে পাত্তা না দেওয়াই তৃণমূল সরকারের ট্রেডমার্ক। আরও অনেককিছুর মত, এখানেও কেন্দ্রের বিজেপি সরকারের সঙ্গে মিল। নরেন্দ্র মোদীও ভেবেছিলেন কৃষকদের পাত্তা দেবেন না। বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে সংসদে তিনটে কৃষি আইন পাস করিয়ে নিয়েছেন, প্রয়োগ করা ঠেকায় কে? চাষাভুষোরা থাক না রাস্তায় বসে। পাত্তা না দিলেই হল। উলটে তাদের পথে ব্যারিকেড বসিয়ে দাও, কংক্রিটের দেওয়াল তুলে দাও, রাস্তায় আক্ষরিক অর্থে কাঁটা বিছিয়ে দাও। দিল্লির প্রচণ্ড ঠাণ্ডা সহ্য করতে না পেরে একসময় সুড়সুড় করে বাড়ি চলে যাবে। কিন্তু তা ঘটেনি। কৃষকরা মাঠেঘাটে কাজ করে অভ্যস্ত। পাঞ্জাবের ধনী কৃষকরাও নিজের জমিতে গায়ে গতরে খাটেন। ফলে শারীরিক কষ্ট তাঁদের অত সহজে কাবু করতে পারে না, যতটা বাঙালি ভদ্রসন্তানদের পারে। তার চেয়েও বড় কথা, সেই আন্দোলনের নেতৃত্বে ছিলেন পাকা মাথার অভিজ্ঞ আন্দোলনকারীরা। তাঁরা যেমন আক্রমণাত্মক হতে জানেন, কখন পিছিয়ে আসতে হয় তাও জানেন। ফলে সেই আন্দোলন জয়যুক্ত হয়েছিল। মোদী দিল্লি সীমান্তে গিয়ে কৃষকদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেননি বটে, কিন্তু তাঁর সরকারকে মাথা নোয়াতে হয়েছিল, আইনগুলো প্রত্যাহার করতে হয়েছিল। বিজেপির সদস্য, সমর্থক ছাড়া কেউ তার জন্যে মোদীর প্রশংসা করে না। বলে না যে আজও ভারতের নিজের ক্ষোভ প্রকাশ করার, প্রতিবাদ করার পরিসর আছে। ন্যায্য দাবির আন্দোলনকে প্রথমে পাত্তা না দিয়ে তারপর প্রতিবাদের সামনে মাথা নোয়ানোর জন্যে, কখনো বা মিথ্যা আশ্বাস দেওয়ার জন্যে শাসকের প্রশংসা করার ন্যাকা রাজনীতি পশ্চিমবঙ্গ ছাড়া ভারতের আর কোথাও চলে না।

কিন্তু যেহেতু কৃষক আন্দোলনের কথা এসে পড়ল এবং পশ্চিমবঙ্গ যেহেতু ভারতের বাইরে নয়, সেহেতু চলমান আন্দোলনের ত্রুটিগুলোর দিকেও দৃষ্টি না দিয়ে উপায় নেই। শনিবার দুপুরে মুখ্যসচিবের ফোনে অনশনকারীদের সঙ্গে মুখ্যমন্ত্রীর কথা এবং সোমবার বৈঠকের পরে হয়ত এই অনশন শিগগির উঠে যাবে। কিন্তু ভবিষ্যতের কথা ভেবে এই আলোচনা প্রয়োজন।

#

আন্দোলনরত জুনিয়র ডাক্তাররা শুক্রবার সিনিয়র ডাক্তারদের সঙ্গে বৈঠক করে ঘোষণা করেছিলেন, আগামী সোমবারের মধ্যে সরকার তাঁদের সঙ্গে আলোচনায় বসে দশ দফা দাবি পূরণ না করলে মঙ্গলবার তাঁরা সর্বাত্মক ধর্মঘট করবেন। কোনো সন্দেহ নেই, সরকার তাঁদের দাবিগুলোতে মোটেই আমল দেয়নি। আর জি করের ঘটনার পর প্রথম দিকে ঘটনাপ্রবাহকে নিজেদের পক্ষে নিয়ে আসার যে রাজনৈতিক প্রচেষ্টা দেখা গিয়েছিল তৃণমূলের তরফে (যার সবচেয়ে বড় দৃষ্টান্ত মুখ্যমন্ত্রীর বিচার চেয়ে রাস্তায় নেমে পড়া), এখন আর তাও দেখা যাচ্ছে না। প্রায় সবটাই টিভি স্টুডিও আর সোশাল মিডিয়া থেকে আন্দোলনকারী ডাক্তারদের বিরুদ্ধে কুৎসা ছড়ানোয়, হুমকি দেওয়ায় সীমাবদ্ধ। স্থানীয় স্তরেও তৃণমূল দলের কোনো কর্মসূচি নেই এই আন্দোলনকে ভ্রান্ত প্রমাণ করার জন্যে অথবা দাবিগুলোকে অসার প্রমাণ করার জন্যে। এর দুটো কারণ থাকতে পারে – ১) তৃণমূল মনে করছে এই আন্দোলন তাদের বৃহত্তম ভোটার গোষ্ঠীর মধ্যে কোনো প্রভাব ফেলছে না। অতএব ছেলেমেয়েগুলো না খেয়ে মরুক গে; কিছু এসে যায় না। ২) এই দশ দফা দাবি পূরণ করার ক্ষমতা সরকারের নেই। উদাসীনতার ভান না করলে কথাটা সর্বসমক্ষে প্রকাশ হয়ে যাবে। তাই উচ্চবাচ্য করা হচ্ছে না।

প্রথম সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়ার নয়, যতই অমানবিক হোক। ২০২৪ সালে এসেও এই সরকারের কাছে মানবিকতা আশা করার কোনো মানে হয় কি? যে সরকার বারবার ধর্ষণের মত ঘটনাকে ছোট্ট ঘটনা, প্রেম ছিল, খদ্দেরের সঙ্গে যৌনকর্মীর দরাদরি নিয়ে ঝামেলা ইত্যাদি বলে উড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছে, তারা আজ হঠাৎ মানবিক হবে কী করে? আর মানবিক নয় বলেই ডাক্তারদের আমরণ অনশনে বসার সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন তোলার অবকাশ আছে। এ হল ব্রহ্মাস্ত্র। আর কে না জানে, ব্রহ্মাস্ত্র রেখে দিতে হয়ে শেষ যুদ্ধের জন্য। যখন অন্য সব অস্ত্র ব্যর্থ হয়ে যায়, তখন তূণ থেকে বার করতে হয়। এক্ষেত্রে আন্দোলনের সেই অবস্থা হয়েছিল কি? যতদিন কর্মবিরতি চালু ছিল, ততদিন তবু শাসক দল ডাক্তারদের গণশত্রু হিসাবে দাগিয়ে দেওয়ার মত কিছু পাচ্ছিল। কারণ সরকারি হাসপাতালে গরিব মানুষ সম্পূর্ণ পরিষেবা পাচ্ছিলেন না, তার কাঠামোগত ত্রুটির কারণ আড়াল করে গোটা দোষটা ডাক্তারদের ঘাড়ে চাপিয়ে দেওয়া যাচ্ছিল। এই আন্দোলনের পিছনে বেসরকারি হাসপাতালের লবি কাজ করছে – এই ষড়যন্ত্রের তত্ত্বও বাজারে চালানো যাচ্ছিল। কিন্তু কর্মবিরতি উঠে যাওয়ার পরে তো সেসব অস্ত্র ভোঁতা হয়ে গিয়েছিল। সুপ্রিম কোর্টেও গত শুনানিতে ফের ধমক খেয়েছে রাজ্য সরকার। কেবল হাসপাতালের সুরক্ষায় নয়, সামগ্রিকভাবে সিভিক ভলান্টিয়ার নিয়োগ করা নিয়ে প্রশ্ন তুলে দিয়েছেন বিচারপতিরা। এমতাবস্থায় অনশনে বসা ছাড়া কি অন্য কোনো রাস্তা ছিল না? হ্যাঁ, একজন ডাক্তারও অনশন করতে গিয়ে মারা গেলে সরকারকে অভূতপূর্ব বিপদে পড়তে হবে। কিন্তু অপ্রিয় সত্য হল, নির্মম শাসক দল একের পর এক ডাক্তারের অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হওয়া আর অন্য কারোর অনশনে বসা দেখে বুঝে ফেলেছে যে এখানে কারোর মৃত্যুর সম্ভাবনা কম। শ্রীরামপুরের সাংসদ কল্যাণ ব্যানার্জি এ সম্পর্কে যে স্বভাবসিদ্ধ অসভ্য মন্তব্য করেছেন – তাতেই তাঁর দল এবং সরকারের এই মনোভাব পরিষ্কার। অর্থাৎ ডাক্তারদের ব্রহ্মাস্ত্র সরকার হজম করে ফেলেছে। ব্রহ্মাস্ত্রের পর যে অস্ত্রই প্রয়োগ করা হোক, তার প্রভাব কম হয়। ফলে এখন একদিনের ধর্মঘটকে সরকার কতটা গুরুত্ব দেবে বলা মুশকিল। এই ধর্মঘট অনশনের আগে ডাকা হলে ফল অন্যরকম হতে পারত।

এখানে প্রশ্ন উঠবে, সাধারণ মানুষের যে সমর্থন ধর্মতলার অনশন মঞ্চে দেখা যাচ্ছে, তা কি মিথ্যা, নাকি অপ্রাসঙ্গিক? মিথ্যা তো নয় বটেই, কিন্তু সরকার হয়ত প্রাসঙ্গিক মনে করছে না। নিশ্চিত হওয়ার জন্য সম্ভবত আসন্ন উপনির্বাচনের দিকে তাকিয়ে আছে। অপ্রিয় হলেও সত্যি, ভোট ছাড়া অন্য কিছু দিয়ে ন্যায়-অন্যায় বিচার ভারতের গণতন্ত্রে বন্ধ হয়ে গেছে। সেই কারণেই কুণাল ঘোষ বুক ফুলিয়ে বলতে পেরেছেন, বিরোধীরা নির্বাচনে জিতে প্রমাণ করুক যে মানুষ তাদের পক্ষে

যেমন ২০০২ সালের পর থেকে গুজরাটে বিজেপি হারেনি, তাই সেবছরের গণহত্যা সঠিক ছিল। ২০১১ সালের পর থেকে যত বড় বড় কেলেঙ্কারিই প্রকাশিত হয়ে থাকুক, তৃণমূল হইহই করে ভোটে জিতেছে। অতএব সব ঠিক আছে। একইভাবে উপনির্বাচনে সাতটা আসনের অধিকাংশ জিতলেই কুণালরা বলে দেবেন, আর জি করে সরকারের কোনো অন্যায় নেই। পশ্চিমবঙ্গের সরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থাতেও কোনো গোলমাল নেই। ‘সব চাঙ্গা সি’। এরকম মানসিকতার সরকারের বিরুদ্ধে আমরণ অনশনের সিদ্ধান্ত কতটা কার্যকরী?

একটা কথা সত্যি, যে ভারতবর্ষের ইতিহাসে অনশন ব্যাপারটার এমন স্থান রয়েছে যে অনশন যে-ই করুক, যে কারণেই করুক, মানুষ তার প্রতি সহানুভূতিশীল হয়ে ওঠে। গৌতম বুদ্ধ বোধিলাভের জন্য অনশন করেছিলেন, মহাত্মা গান্ধী অনশনকে রাজনৈতিক আন্দোলনের হাতিয়ার হিসাবে প্রতিষ্ঠা দেন। কারণ এতে অন্য কারোর ক্ষতি করা হয় না, নিজের ছাড়া। ফলে মানুষের বিশ্বাস জন্মাতে বাধ্য যে অনশনকারী নিজের ফায়দার জন্যে আন্দোলন করছে না। পরের কল্যাণের জন্য আত্মত্যাগ করছে। বাঙালিদের মধ্যে যাঁরা ইতিহাসসচেতন, তাঁরা নিঃসন্দেহে যতীন দাসের কথাও মনে রেখেছেন। ফলে অনশনে বসলে গরিব-বড়লোক, গেঁয়ো-শহুরে সব ধরনের মানুষের সহানুভূতিই পাওয়া যায়। মমতা স্বয়ং একসময় পেয়েছেন, আন্না হাজারের মত ভণ্ড আন্দোলনকারীও পেয়েছেন। ফলে ভাবা অমূলক নয় যে কর্মবিরতির সময়ে যত মানুষ ডাক্তারদের আন্দোলনের পক্ষে ছিলেন, তার চেয়ে বেশি মানুষ অনশন চালু হওয়ার পরে তাঁদের প্রতি নরম হয়েছেন। কিন্তু তাতে তো সরকারের কাছ থেকে দাবি আদায়ে সুবিধা হবে না। কেবল পশ্চিমবঙ্গ নয়, দুনিয়া জুড়ে উদারনৈতিক গণতন্ত্রের সাম্প্রতিক সংকট তো এটাই, যে জনগণের দ্বারা নির্বাচিত সরকার জনগণের প্রভু হয়ে দাঁড়াচ্ছে। উপরন্তু একথাও মনে রাখা দরকার, যে গান্ধীর সমালোচক অরুন্ধতী রায় বলেছেন, অহিংসা-অসহযোগ-অনশন নীতি সফল হতে পারে ‘অডিয়েন্স’ থাকলে, নচেৎ নয়। অরুন্ধতীর কথাটা প্রশ্নের ঊর্ধ্বে নয়, আবার ফেলে দেওয়ার মতও নয়। তৃণমূল সরকার যে খুব সহানুভূতিশীল ‘অডিয়েন্স’ নয়, তা কিন্তু ইতিমধ্যেই প্রমাণিত। অনশন মঞ্চের অনতিদূরে নির্বিকার কার্নিভালে প্রমাণিত, আজ মুখ্যমন্ত্রী যে সুরে ফোনে কথা বলেছেন, তাতেও প্রমাণিত।

এই আন্দোলন সম্পর্কে আরেকটা বড় প্রশ্ন হল, এটা কি শুধুই ডাক্তারদের আন্দোলন? নাকি এটা গণআন্দোলন? ৯ অগাস্টের পর থেকে যে বিপুলসংখ্যক মানুষ মৃতার ধর্ষণ ও খুনের প্রতিবাদে, রাজ্য সরকারের ঘটনা ধামাচাপা দেওয়ার প্রতিবাদে রাস্তায় নেমেছেন তাঁরা একে নিজেদের আন্দোলন করে নিয়েছেন। আর যে কোনো গণআন্দোলনই আদতে রাজনৈতিক আন্দোলন। কিন্তু এতগুলো মাস কেটে যাওয়ার পরেও এই আন্দোলনের চরিত্র সম্পর্কে জুনিয়র ডাক্তাররা নিজেরাই দ্বিধায় ভুগছেন বলে মনে হয়। নয়ত মাঝেমাঝেই গোপাল ভাঁড়ের গল্পের রাজার বিধবা পিসির লাউতে চিংড়ি আছে অভিযোগ শুনে ‘ছি, ছি, ছি’ বলে আর্তনাদ করার মত কোনো কোনো ডাক্তার নেতা ‘আমাদের আন্দোলন অরাজনৈতিক’ বলছেন কেন? কোনো সন্দেহ নেই যে সিপিএম কর্মীরা কদিন আগে ধর্মতলায় দলীয় পতাকা নিয়ে না গেলেই পারতেন। কিন্তু গেছেন বলে মঞ্চ থেকে উত্তেজিত সাফাই গাওয়ারই বা দরকার কী? যে আন্দোলন স্পষ্টত সরকারের বিরুদ্ধে এবং যা সাধারণ মানুষের হাতে চলে গেছে, সেখানে কে কোন পতাকা নিয়ে এল না এল – তার দায়িত্ব জুনিয়র ডাক্তাররা নেবেন কী করে এবং কেন? ভয় কি তৃণমূলের প্রোপাগান্ডা মেশিনারিকে? সে তো দিনরাত চলছেই। মঞ্চের সামনে পতাকা এসে পড়ার আগেও চলছিল, পরেও চলছে, না এলেও চলত। সরকার যে দলের হাতে তারা তো চাইবেই যেনতেনপ্রকারেণ এই আন্দোলনকে হেয় করতে। তা নিয়ে আন্দোলনকারীরা বিচলিত হবেন কেন, যদি তাঁদের চোখ অর্জুনের পাখির চোখ দেখার মত দশ দফা দাবিতেই নিবদ্ধ থাকে? আন্দোলন রাজনৈতিক মানেই অবৈধ – এই যুক্তিই বা তাঁরা মেনে নেবেন কেন? একথা তো অস্বীকার করা যায় না যে পৃথিবীর কোনো আন্দোলন কোনোদিন আক্ষরিক অর্থে স্বতঃস্ফূর্ত ছিল না। বিভিন্ন ছোট বড় রাজনৈতিক দল ও সংগঠন উদ্যোগ না নিলে আর জি কর আন্দোলনও যতটা ছড়িয়েছে তা ছড়াত না। ফলে ডাক্তারদের আন্দোলন এই গুরুত্ব পেত না। ব্যাপারটা বোঝার জন্যে বেশি দূরে তাকানোর দরকার নেই। এসএসসি, টেট, মাদ্রাসার চাকরিপ্রার্থীদের আন্দোলনের কথা স্মরণ করলেই বোঝা যাবে।

বলা বাহুল্য, ডাক্তারদের আন্দোলনকে এত বড় আন্দোলনের রূপ দিয়েছে যে দল এবং সংগঠনগুলো, তারা সকলেই কোনো না কোনো মতের বামপন্থী। কারণ ঘটনার দিন থেকে কয়েকদিন পর পর্যন্ত অগ্নিমিত্রা পাল, সজল ঘোষরা আর জি কর নিয়ে সক্রিয় থাকলেও মিইয়ে গেছেন বহুদিন হল। বস্তুত অদ্ভুতুড়ে সংগঠনের নামে নবান্ন অভিযানের পর থেকেই বিজেপি বুঝে উঠতে পারছে না এই আন্দোলন নিয়ে কী করিতে হইবে। কারণ একে দাঙ্গা করার অভিজ্ঞতা হিন্দুত্ববাদীদের যতখানি, তার দু আনাও আন্দোলন করার ব্যাপারে নেই। তার উপর হোয়াটস্যাপ গ্রুপগুলোতে বিস্তর বিষ ছড়িয়েও ব্যাপারটাকে কিছুতেই হিন্দু-মুসলমান বাইনারিতে ফেলা যায়নি। গোদের উপর বিষফোঁড়ার মত ডাক্তারদের অবস্থানে যোগ দিতে গিয়ে ‘গো ব্যাক’ স্লোগান শুনতে হয়েছে বিজেপি নেতাদের। ফলে কখনো শুভেন্দু অধিকারী একেবারে তৃণমূল নেতাদের সুরেই আন্দোলনকারীদের নেশাখোর বলছেন, আবার কখনো তৃণমূলবিরোধী ভাবমূর্তি ঠিক রাখতে সরকারি কার্নিভালের পালটা কার্নিভালকে সমর্থন করছেন। বিজেপির কুখ্যাত আই টি সেলের প্রধান অমিত মালব্য তাঁর এক্স হ্যান্ডেলে ৩ অক্টোবরের একখানা দুর্গার সঙ্গে আর জি কর মেলানো জগাখিচুড়ি ভিডিও পিন করে রেখেছেন। এই আন্দোলন নিয়ে মোটেই পোস্ট করছেন না। বিজেপির আইনজীবী নেতা তরুণজ্যোতি তিওয়ারি তাঁর পোস্টগুলোতে রাজ্য সরকারের চেয়ে বেশি আক্রমণ করছেন সিপিএমকে। টিভি স্টুডিওতে আসা বিজেপি মুখপাত্রদের কথাবার্তা শুনলেও বোঝা যাচ্ছে তাঁরা তৃণমূলকে কিছু সাধারণ গালাগালি দেওয়াতেই সীমাবদ্ধ থাকতে চান। কোনোভাবেই যেন ডাক্তারদের আন্দোলনের উপরে ফোকাস না চলে যায় – সে ব্যাপারে তাঁরা সতর্ক। বাকি রইল কংগ্রেস, যাদের কর্মী সমর্থক রাজ্যের খুব ছোট একটা এলাকার মধ্যেই সীমাবদ্ধ।

এমতাবস্থায় নিজেদের আন্দোলন রাজনৈতিক নয় বলে চেঁচামেচি করার কোনো দরকার আছে কি? আন্দোলনকারী ডাক্তাররাও তো অধিকাংশই কোনো না কোনো বামপন্থী ছাত্র সংগঠনের সদস্য।

এটা কি শুধুই ডাক্তারদের আন্দোলন? এই প্রশ্নের আরও একটা দিক আছে, যেদিক থেকে এই আন্দোলনের সমালোচনা হওয়া দরকার।

দশ দফা দাবি নিয়ে জুনিয়র ডাক্তাররা অনশনে বসার কিছুদিন আগেই এই আন্দোলনের সমালোচক এক বন্ধু বলছিলেন ‘ওটা ডাক্তারদের আন্দোলন। আর কারোর আন্দোলন নয়।’ তাঁর উষ্মা অকারণ ছিল না। সে পর্যন্ত ডাক্তাররা যা যা দাবি করছিলেন তার সবই নিজেদের নিরাপত্তা, সুযোগসুবিধা সংক্রান্ত। তিনি বলছিলেন, গত শতকের আটের দশকের ডাক্তারদের আন্দোলনের মত স্বাস্থ্যব্যবস্থার ফাঁকফোকর নিয়ে ডাক্তাররা প্রশ্ন তুলছেন না। সে কাজ না করলে এই আন্দোলন নিয়ে সাধারণ মানুষের উত্তেজিত হওয়া ভুল। নিম্নলিখিত দশ দফা দাবির পরে আর সেকথা বলা চলে না।

জুনিয়র ডাক্তার

প্রথম দাবি সম্পর্কে সরকার বলতেই পারে যে এর সুরাহা আদালতের হাতে। দ্বিতীয় দাবি সম্পর্কেও বলা যেতে পারে যে এতে রোগীদের কিছু এসে যায় না। তবে সবকটা দাবিই জরুরি এবং ন্যায্য, ২-১০ পূরণ করাও সরকারের হাতে। কিন্তু ৩-৭ একেবারেই রোগীদের স্বার্থের সঙ্গে জড়িত। পশ্চিমবঙ্গের সরকারি হাসপাতালগুলোর যা হাল তাতে এগুলোর চেয়ে প্রয়োজনীয় কিছু হতে পারে না রোগীদের পক্ষে। এই দশ দফা দাবি পশ্চিমবঙ্গের সরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থার মৌলিক সমস্যাগুলো নিয়ে প্রশ্ন তুলে দিয়েছে, যার সন্তোষজনক উত্তর দিতে হলে তৃণমূল সরকার যেসব দালাল চক্র, কুচক্রের উপর ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে সেগুলো ভাঙতে হবে। তার চেয়ে নিজের সরকার নিজে ভেঙে দিয়ে চলে যাওয়া সহজ। শুধু তাই নয়, ৩-৭ নম্বর দাবি পূরণ করলে একথা প্রকাশ্যে আসবে যে যেখানে যত ডাক্তার থাকা উচিত তত ডাক্তার নেই। যত শয্যা একটা হাসপাতালে আছে বলে দাবি করা হয়, তাও নেই। ফলে স্বাস্থ্যসাথী প্রকল্পকে সর্বরোগহর বড়ি হিসাবে দেখানো যে আসলে সরকারি ব্যবস্থার ফাঁক গোপন করতে, তাও প্রমাণিত হবে।

আরও পড়ুন পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতি: আর জি কর পেরিয়ে

ডাক্তারদের আন্দোলন চালু হওয়ার পর থেকে তৃণমূল তো বটেই, স্বঘোষিত বামেরা অনেকেও বলে চলেছেন যে এই আন্দোলনকে আসলে চালাচ্ছে কর্পোরেট হাসপাতালের মালিকরা, যাতে তাদের কাছে আরও বেশি সংখ্যক রোগী যায়। একে এই লেখার গোড়ার দিকে ষড়যন্ত্রের তত্ত্ব বলেছি। কারণ প্রথমত, একথা তথ্য দিয়ে কোনোদিন প্রমাণ করা যাবে না। যেমন প্রয়াত রতন টাটা কোনোদিন প্রমাণ করতে পারেননি যে মমতার সিঙ্গুরে কারখানা হতে না দেওয়ার আন্দোলনের পিছনে টাটার প্রতিদ্বন্দ্বী গাড়ি নির্মাণ কোম্পানিগুলোর হাত ছিল। দ্বিতীয়ত, মূলত যে শ্রেণির মানুষ আজও সরকারি হাসপাতালে যান, পশ্চিমবঙ্গের সমস্ত সরকারি হাসপাতাল বন্ধ হয়ে গেলেও তাঁরা কর্পোরেট হাসপাতালের গেট পেরিয়ে ঢুকতেই পারবেন না। অদৃষ্টের দোহাই দিয়ে বাড়িতেই মরতে দেবেন নিকটাত্মীয়কে। কারণ ওই হাসপাতালগুলোতে প্রথমবার গেলে যে ‘পেশেন্ট রেজিস্ট্রেশন’ করাতে হয় তার খরচই কোথাও হাজার টাকা, কোথাও দু হাজার টাকা। অথচ ওই শ্রেণির মানুষের অনেকের গোটা মাসের পারিবারিক আয় ১০-১২ হাজার টাকা। এখানেই শেষ নয়। ওই হাসপাতালগুলোতে মরণাপন্ন রোগীকে নিয়ে দৌড়লেও এমার্জেন্সিতে ঢুকিয়েই আগে ‘ডিপোজিট মানি’ দিতে হয়। তার অঙ্কটা ওই শ্রেণির মানুষের বাড়িঘর বেচে দিলেও আসবে কিনা সন্দেহ। ফলে সরকারি হাসপাতালের ডাক্তারদের প্রায় আড়াই মাসের আন্দোলনে কর্পোরেট হাসপাতালগুলো ফুলে ফেঁপে উঠেছে আর তার আগে কষ্টেসৃষ্টে দিন কাটাচ্ছিল – এমন আষাঢ়ে গপ্প কার্তিক মাসে একেবারেই অচল।

হঠাৎ এমন ভান করা হচ্ছে যেন পশ্চিমবঙ্গ সরকার কর্পোরেট হাসপাতালগুলোর ভীষণ বিরোধী। ব্যাপারটা সত্যি হলে চমৎকার হত। কিন্তু সেক্ষেত্রে স্বাস্থ্যসাথী প্রকল্প চালু করার দরকারই ছিল না। সম্প্রতি সংবাদ প্রতিদিন একটা প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে, যেখানে দেখানো হয়েছে যে ডাক্তারদের আন্দোলন চলাকালীন স্বাস্থ্যসাথী প্রকল্পে সরকারের খরচ বেড়ে গেছে। তা থেকে সিদ্ধান্ত করা হয়েছে যে এর কারণ এই পর্বে সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা না পেয়ে মানুষের বেসরকারি হাসপাতালে গিয়ে চিকিৎসা করানো।

সংবাদ প্রতিদিন

এখানে চেপে যাওয়া গুরুত্বপূর্ণ তথ্যটা হল, আপনার স্বাস্থ্যসাথী কার্ড না থাকলে এখন সরকারি হাসপাতালে গিয়ে চিকিৎসা পাবেন, কিন্তু বেশকিছু খরচসাপেক্ষ পরীক্ষা নিরীক্ষা করা হবে না, কোনোরকম অস্ত্রোপচারও হবে না। অর্থাৎ স্বাস্থ্যসাথী প্রকল্প থেকেই সরকারি হাসপাতালের রোগীদের পরীক্ষা নিরীক্ষা, অস্ত্রোপচারের খরচও দেওয়া হয়। অথচ এই প্রতিবেদনে কেবল সরকারের খরচ বেড়েছে বলা হয়েছে, কোন হাসপাতাল থেকে কত টাকার ‘ক্লেম’ এসেছে তা লেখা হয়নি। ফলে এই অঙ্কের সবটাই যে বেসরকারি হাসপাতালে হওয়া খরচ, তা মোটেই নিশ্চিত করে বলা যায় না। আর্থিক বর্ষের মাঝখানে, এত নির্দিষ্ট কয়েকটা দিনের সরকারি জমা, খরচের হিসাব এভাবে পাওয়া যায় কিনা, কে করল এই সমীক্ষা, সেসব প্রশ্ন না হয় ছেড়েই দেওয়া গেল।

কিন্তু যে কথা বলার, তা হল স্বাস্থ্যসাথী প্রকল্প চালু করা হয়েছে মানেই সরকার তো মেনে নিয়েছে যে তার নিজস্ব স্বাস্থ্যব্যবস্থায় রাজ্যের সব মানুষের চিকিৎসা করা সম্ভব নয়। তাই মানুষকে বেসরকারি ব্যবস্থায় চিকিৎসা করানোর খরচও সরকার জোগাচ্ছে ওই প্রকল্পের মাধ্যমে। সেক্ষেত্রে সরকার কর্পোরেট হাসপাতালে চিকিৎসার খরচ কীভাবে কমানো যায় তা দেখছে না কেন? এর উত্তর সরকারপন্থীদের ঠোঁটস্থ থাকা উচিত। ২০১৭ সালে পশ্চিমবঙ্গ সরকার ঘোষণা করেছিল যে কর্পোরেট হাসপাতালগুলোকে লাগাম পরানো হবে। সেই অনুযায়ী কলকাতায় ঘটা করে মালিকদের সঙ্গে অন-ক্যামেরা সভা করেছিলেন স্বয়ং মমতা। এমনকি জেলা সফরের সময়ে সেখানকার নার্সিংহোমগুলোর কর্তৃপক্ষের সঙ্গেও সভা করেন দফায় দফায়।

২০১৭ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত কলকাতার টাউন হলের সভায় মমতা রীতিমত বকাঝকা করেছিলেন কর্পোরেট হাসপাতালগুলোর প্রতিনিধিদের। তাদের যাবতীয় অনিয়ম, আকাশছোঁয়া বিল নিয়ে সরকারের কাছে অনেক অভিযোগ আছে বলে জানা গিয়েছিল। সেসব আটকাতে কমিশন তৈরি, আইন পাস করা ইত্যাদি অনেক কাণ্ড হয়েছিল। খুব ভাল কথা। কিন্তু তাহলে সাতবছর পরেও বেসরকারি হাসপাতালগুলোর খরচ একইরকম রয়ে গেল কেন? কর্পোরেট হাসপাতালের অসাধুতা, ডাক্তারদের অসাধুতার যে অভিযোগ এখন সরকারপন্থীরা তুলছেন সেগুলোরই বা সুরাহা হল না কেন? তার মানে ওখানেও ফাঁকি? একথা সত্যি যে সরকারি হাসপাতালের শয্যাসংখ্যা যথেষ্ট না হওয়া, পর্যাপ্ত পরিমাণ ডাক্তার না থাকার সমস্যা ২০১১ সাল থেকে তৈরি হয়নি। কিন্তু ২০১১ সালে পশ্চিমবঙ্গের মানুষ তো লুডো খেলতে দেওয়ার জন্য সরকার বদলে ফেলেননি? তাহলে এতদিন এই সমস্যাগুলোর সমাধান করতে বারণ করেছিল কে? এসব প্রশ্নের উত্তর কিন্তু ডাক্তাররা এই আন্দোলনেও চাইতে পারলেন না।

এছাড়াও কিছু প্রশ্ন আছে, যার জন্যে জবাবদিহি সরকারের পাশাপাশি ডাক্তার-সমাজকেও করতে হবে। যেমন ডাক্তাররা ব্যবস্থার বিরুদ্ধে এতগুলো মৌলিক প্রশ্ন তুললেও নার্স এবং আয়াদের কথা কিন্তু তুললেন না। অথচ সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা করানো মানুষমাত্রই জানেন, রোগীর সারাদিনের পরিচর্যা থাকে ওঁদের হাতেই। সিনিয়র, জুনিয়র মিলিয়েও প্রয়োজনের তুলনায় ডাক্তার এতই অপ্রতুল যে রোগীকে সুস্থ করে তোলা এবং সুস্থ রাখার জন্যে দক্ষ শ্রমিক নার্স আর অদক্ষ শ্রমিক আয়াদের ভূমিকা বিরাট। এঁদের দাবিদাওয়া বাদ দিয়ে সরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থার যে কোনো সংস্কার অপূর্ণই থেকে যাবে।

দ্বিতীয়ত, সিভিক ভলান্টিয়ারদের দিয়ে ডাক্তার, স্বাস্থ্যকর্মী এবং রোগীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যাবে না তো বটেই; কয়েকশো পুলিস দিয়েও নিশ্চিত করা যাবে না, যদি রোগীর বাড়ির লোক আর ডাক্তারদের মধ্যে অবিশ্বাসের বাতাবরণ থাকে। এই বাতাবরণ তৈরি হওয়ার জন্যে অনেকখানি দায়ী সরকার। কারণ বহু হাসপাতালে ডাক্তার থাকলেও চিকিৎসার সরঞ্জাম থাকে না, ওষুধপত্র থাকে না। উত্তেজিত, উদ্বিগ্ন রোগীর বাড়ির লোকেরা বোঝার অবস্থায় থাকেন না যে এতে ডাক্তারের কিছু করার নেই। তাঁরা ডাক্তারকে সামনে পান বলে তাঁকেই ধরে পিটিয়ে দেন। কিন্তু এই অবিশ্বাস তৈরি হওয়ার পিছনে ডাক্তারদেরও খানিকটা দায় আছে। রোগী যখন দেখেন সিনিয়র ডাক্তাররা গুরুতর অবস্থার রোগীকেও দিনে একবার দেখতে আসেন, অথচ বাইরে চেম্বার আর নার্সিংহোম কামাই যায় না, তখন তাঁদের ভিতরে ক্ষোভ জমা হয়। সেই ক্ষোভের মার তারপর এসে পড়ে জুনিয়র ডাক্তার আর অন্য স্বাস্থ্যকর্মীদের উপর।

তৃতীয়ত, সংখ্যার বিচারে জুনিয়র ডাক্তাররা সরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থার দশ শতাংশের কম হলেও, সিনিয়রদের বাইরের ব্যস্ততার কারণে তাঁরাই এই ব্যবস্থার মেরুদণ্ড। তাঁদের বিরুদ্ধেই সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা করাতে যাওয়া মানুষের নানা অভিযোগ থাকে। ‘যত্ন করে দেখেন না’, ‘ছোট ডাক্তারবাবুর ব্যবহার খারাপ’ ইত্যাদি। আর জি করের যে জুনিয়র ডাক্তার ধর্ষিত হয়ে খুন হয়েছেন তিনি যে টানা ৩৬ ঘন্টা ডিউটি করে তারপর শুতে গিয়েছিলেন তা এখন আমরা সকলেই জানি। বস্তুত অধিকাংশ জুনিয়র ডাক্তারেরই ওটাই রুটিন। নাওয়া-খাওয়া দূরের কথা, শোয়ার সময়ও নেই। তেমন একজনের রোগীর প্রতি বা তাঁর পরিবারের প্রতি ব্যবহার ভাল হবে – এমন আশা করাই অন্যায়। যত্ন করে দেখবেন – এও প্রায় আবদারের পর্যায়ে পড়ে। বরং রোগী দেখতে গিয়ে যে রোজই ওঁরা চরম ভুলভাল করেন না তার জন্যেই প্রশংসা করা উচিত। এর সুরাহা কিন্তু অনেকটাই সিনিয়র ডাক্তারদের হাতে। তাঁরা যেভাবে আজকের আন্দোলনের পাশে দাঁড়িয়েছেন, সেভাবে যদি বছরে ৩৬৫ দিন বিভিন্ন বেসরকারি হাসপাতালে খেপ খেলা বন্ধ করে সরকারি হাসপাতালে সময় দেন, তাহলেই জুনিয়ররা অনেকটা শারীরিক ও মানসিক স্বস্তি পাবেন। রোগীর পরিবারেরও অসন্তোষ কমবে।

চতুর্থত, বহু হাসপাতালের বহু বিভাগে ডাক্তারের অভাবের একটা কারণ যেমন সরকারের উদ্দেশ্যপ্রণোদিত, প্রায়শই রাজনৈতিক কারণে, বদলি; বিজ্ঞাপন দেওয়া সত্ত্বেও আবেদনপত্র জমা না পড়াও একটা কারণ। কেন জমা পড়ে না আবেদনপত্র? সাধারণত বিশেষজ্ঞদের শূন্য পদ পূরণ করার ক্ষেত্রে এই সমস্যা দেখা দেয়। এর কারণ সামাজিক। তৃণমূল সরকার কেন, কোনো দলের সরকারই এই যুগে এই সমস্যার সমাধান করতে পারবে কিনা সন্দেহ। একজন বিশেষজ্ঞ হয়ত সরকারি কলেজের শূন্য পদে যোগ দিলে যা বেতন পাবেন, তার চেয়ে অনেক বেশি বেতন পাবেন কর্পোরেট হাসপাতালে যোগ দিলে। ১৯৮০-র দশক থেকে বাঙালি বাবা-মায়েদের মধ্যে একটা মৌলিক বদল এসেছে। তাঁরা ছেলেমেয়েদের প্রাণপণে কেবল ডাক্তার বা ইঞ্জিনিয়ার করতে চেয়েছেন। মানুষের সেবা করবে বলে নয়, অনেক টাকা কামাবে বলে। ১৯৯১ সালে অর্থনৈতিক উদারীকরণের পর থেকে তাল মিলিয়ে উচ্চাকাঙ্ক্ষা বেড়েছে সকলেরই। আজকাল অনেক শিক্ষক, অধ্যাপক, সাংবাদিকও তো নিজের চারচাকার গাড়ি না থাকলে জীবন বৃথা মনে করেন। আজ হ্যাচব্যাক হলে কাল সেডান কিনতে চান। নইলে মনখারাপ হয়। সেখানে একজন ডাক্তার উচ্চতর বেতন, বিদেশযাত্রা, শীতাতপনিয়ন্ত্রিত হাসপাতালের হাতছানি এড়িয়ে আউটডোর, ইন-পেশেন্ট মিলিয়ে দৈনিক কয়েক হাজার রোগী সামলানোর ঝামেলা ঘাড়ে নিতে সরকারি হাসপাতালে ঢুকবেন কেন?

#

অভয়ার জন্য ন্যায়বিচারের দাবি ছাড়িয়ে অনেকদূর চলে আসা হল মনে হচ্ছে তো? রাজ্য সরকারও ঠিক এই কথা বলেই এসব মৌলিক প্রশ্ন তোলার পথ বন্ধ করে দিতে চাইছে, যাতে স্থিতাবস্থা বজায় থাকে। কিন্তু নিশ্চিত থাকতে পারেন, স্থিতাবস্থা বজায় থাকলে অভয়া কাণ্ড আবার হবে। এবারে একজন ডাক্তারের উপর অমন আক্রমণ হয়েছে, কাল একজন নার্সের উপর হতে পারে, পরশু কোনো আয়ার উপর হতে পারে, তার পরদিন কোনো শয্যাশায়ী রোগীর উপরেও হতে পারে। ডাক্তাররাও কি স্থিতাবস্থাই বজায় রাখতে চান স্রেফ নিজেদের কয়েকটা নির্দিষ্ট দাবি পূরণ করে নিয়ে? নাকি আমূল পরিবর্তন চান? এই সিদ্ধান্ত তাঁদেরই নিতে হবে। লক্ষ লক্ষ মানুষ তাঁদের বিপদে পাশে দাঁড়িয়েছেন। আমূল পরিবর্তনে সেইসব মানুষের স্বার্থ জড়িত। কথাটা কিন্তু ডাক্তারদের মাথায় রাখতে হবে।

তবে এত কিছু বদলে দেওয়ার জন্যে লড়াই করার দায়িত্ব একা তাঁদের নয়। অনেকখানি দায়িত্ব সরকারের রাজনৈতিক বিরোধীদের। উপরন্তু দলমত নির্বিশেষে যত মানুষ এতদিন ধরে লড়ছেন, দায়িত্ব তাঁদেরও। ডাক্তাররা বা রাজনৈতিক নেতারা তো আকাশ থেকে পড়েন না। আমাদের সবার লোভ, লালসা বজায় থাকবে আর ডাক্তাররা নিষ্কাম কর্ম করবেন, নেতারা কেবল আমাদের কল্যাণের জন্যে কাজ করে যাবেন – এমন হয় না।

নাগরিক ডট নেট ওয়েবসাইটে প্রকাশিত

জাতের নামে বজ্জাতিতেও বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্য

মানুষ যে আজও জাতের ভিত্তিতে অন্যায়ের সম্মুখীন হন, তা বাঙালিরা অনেকে বিশ্বাসই করেন না।

চিরাগ পাসোয়ান বেজায় চটেছেন। কে তিনি? তিনি এখন কেবল রামবিলাস পাসোয়ানের ছেলে নন। রীতিমত কেন্দ্রীয় মন্ত্রী এবং এনডিএ সরকারের অন্যতম শরিক। কার উপর চটেছেন? দেশের সর্বোচ্চ আদালতের একটা রায়ের উপর। গত সপ্তাহে সুপ্রিম কোর্টের সাত বিচারপতির সাংবিধানিক বেঞ্চ রায় দিয়েছে – তফসিলি জাতি, উপজাতির মানুষের জন্য সরকারি চাকরি এবং শিক্ষায় যে সংরক্ষণের ব্যবস্থা আছে তার মধ্যে আলাদা করে বেশি পিছিয়ে থাকা শ্রেণিগুলোর জন্যে রাজ্য সরকারগুলো সংরক্ষণের ব্যবস্থা করতে পারবে।

এই রায়ে কেন চিরাগ চটে গেলেন? তিনি দলের নেতৃত্ব পেয়েছেন উত্তরাধিকার সূত্রে, কিন্তু তাঁর বাবার রাজনীতিতে উত্থান বিহারে পিছিয়ে পড়া জাতের মানুষের অধিকারের রাজনীতি করে। তাই সংবিধানে সংরক্ষণের ব্যবস্থা কেন রাখা হয়েছে তা নিয়ে চিরাগের ধারণা খুব পরিষ্কার। যে কথা এদেশের উচ্চবর্গীয় মানুষ বোঝেন না অথবা না বোঝার ভান করেন, তা হল, দেশের গরিব মানুষকে ধনী বা মধ্যবিত্ত করে তোলার জন্য সংবিধানপ্রণেতারা সংরক্ষণের ব্যবস্থা করেননি। ওই ব্যবস্থা করা হয়েছিল কয়েক হাজার বছর ধরে বর্ণাশ্রমমাফিক যাদের নিচু জাত বলে দেগে দিয়ে যাবতীয় অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে, তাদের হাতে অধিকার তুলে দিতে। স্বাধীনতার ৭৭ বছর হতে চলল, সংরক্ষণের সুফল পেয়ে কিছু মানুষ আর্থসামাজিক দিক থেকে অনেকটা অগ্রসর হয়ে থাকলেও ভারতীয় সমাজ কিন্তু এখনো বর্ণাশ্রম মেনেই চলে। বিহারে অফিসের ব্রাহ্মণ চাপরাশি দলিত কালেক্টরকে আজও এক গ্লাস জল দেয় না। কালেক্টর বিচক্ষণ ব্যক্তি হলে জল চেয়ে ঝামেলা বাড়ান না। তাই চিরাগ ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন – সাতজন বিচারপতি নিজ নিজ রায়ে এত কথা বললেন আর ‘অস্পৃশ্যতা’ শব্দটাই উচ্চারণ করলেন না!

চাপরাশি-কালেক্টরের ব্যাপারটা বিশ্বাস না-ও হতে পারে, কারণ এইভাবে অস্পৃশ্যতার অনুশীলন পশ্চিমবঙ্গে সাধারণত দেখা যায় না। বাঙালি ভদ্রলোকদের অস্পৃশ্যতা অনুশীলন বাড়িতে মুসলমান অতিথি এলে তাঁর ব্যবহৃত কাপ প্লেট আলাদা করে সরিয়ে রেখে মেজে নেওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ। অতিথি দেখতে পান না বলে প্রগতিশীলতা আর জাত – দুটোই বজায় থাকে। তাই মানুষ যে আজও জাতের ভিত্তিতে অন্যায়ের সম্মুখীন হন, তা বাঙালিরা অনেকে বিশ্বাসই করেন না। অতএব নামধাম সমেত ঘটনা তুলে ধরা আবশ্যক।

জুলাই ২০১৫। উত্তরপ্রদেশের রেহুয়া লালগঞ্জের এক দলিত পরিবারের রাজু সরোজ আর ব্রিজেশ সরোজ নামে দুই ভাই আইআইটির প্রবেশিকা পরীক্ষায় পাস করেছিলেন বলে গ্রামের উচ্চবর্ণের লোকেরা তাঁদের বাড়িতে ঢিল পাটকেল ছুড়েছিল। তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী অখিলেশ যাদব রাজু আর সরোজকে সংবর্ধনা দেওয়ার পরে গ্রামের লোকের ব্যবহারে পরিবর্তন আসে। কিন্তু এক সর্বভারতীয় দৈনিকের প্রতিবেদককে তাঁরা জানিয়েছিলেন, ছোটবেলা থেকেই পড়াশোনায় নিরুৎসাহ করত গ্রামের লোকেরা। বলা হত, দলিতদের দ্বারা লেখাপড়া হয় না। আইআইটির প্রবেশিকা পরীক্ষার কয়েক সপ্তাহ আগে গ্রামের লোকেরা তাঁদের বাড়ির জলের লাইন পর্যন্ত কেটে দিয়েছিল। ২০২০ সালে হাথরসে উচ্চবর্গীয় ছেলেরা একটা দলিত মেয়েকে ধর্ষণ করে খুন করে দিয়েছিল। আজও কারোর শাস্তি তো হয়নি বটেই, মেয়েটার পরিবারই গৃহবন্দি হয়ে আছে। সেকথা এই কাগজেই ২০২৪ লোকসভা নির্বাচন পর্বে প্রকাশিত হয়েছে। এছাড়া অমুক জায়গায় দলিত বর ঘোড়ার পিঠে চেপে বিয়ে করতে যাচ্ছিল বলে তাকে উচ্চবর্গীয়রা পিটিয়েছে (যেমন ফেব্রুয়ারি ২০২৪), তমুক জায়গায় একজন দলিতের মুখে এক উচ্চবর্ণ কুলাঙ্গার পেচ্ছাপ করে দিয়েছে (যেমন জুন ২০২৪) – এসব সংবাদ তো কদিন অন্তরই আসতে থাকে।

মহামান্য বিচারপতিরা হয়ত এসব জানতে পারেন না। তাই তাঁদের বিচার্য মামলার বিষয় না হওয়া সত্ত্বেও কয়েকজন বিচারপতি স্বপ্নের মত সব কথা লিখেছেন রায়ে। যেমন ওই বেঞ্চের একমাত্র দলিত বিচারপতি বি আর গাওয়াই লিখেছেন ‘ক্রিমি লেয়ার’-এর কথা। অর্থাৎ তফসিলি জাতি, উপজাতিভুক্ত মানুষের মধ্যে যেসব পরিবার আর্থিকভাবে সচ্ছল হয়ে গেছে কয়েক প্রজন্ম ধরে সংরক্ষণের সুবিধা পেয়ে, তাদের সংরক্ষণের সুবিধা থেকে বাদ দেওয়া উচিত। বিচারপতি পঙ্কজ মিথাল আবার লিখেছেন, সংরক্ষণের সুবিধা কোনো পরিবারকে এক প্রজন্মের বেশি দেওয়া উচিত নয়।

এই দুই বিচারপতির কথার পিছনে যে ভাবনা কাজ করছে, তা হল সংরক্ষণ আর্থিক উত্তরণের এক উপায় মাত্র। সামাজিক বৈষম্যের প্রতিষেধক নয়। মোদী সরকারের মন্ত্রী চিরাগ তাই বলেছেন, জাতভিত্তিক বৈষম্য আপনি আর্থিকভাবে কত উপরে উঠেছেন বা কত বড় পদে আছেন তার উপর নির্ভর করে না। চূড়ান্ত সফল হলেও এই বৈষম্যের মুখোমুখি হতে হয়। তিনি যে ১০০% ঠিক কথা বলেছেন তা কয়েকদিন আগেই প্রমাণ করে দিয়েছেন মন্ত্রিসভায় চিরাগের সহকর্মী অনুরাগ ঠাকুর। তিনি বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধীর বর্ণভিত্তিক জনগণনার দাবিকে নস্যাৎ করার যুক্তি হিসাবে বলেছেন – যার নিজের জাতের ঠিক নেই সে আবার জাতভিত্তিক জনগণনার দাবি করে। বস্তুত ভারতের উঁচু জাতের লোকেরা নিচু জাতের লোকেদের সঙ্গে পেরে না উঠলে এই ভাষাতেই কথা বলে থাকে। নরেন্দ্র মোদীর নেতৃত্বে অমৃতকাল চলছে বলে সংসদের ভিতরেও এভাবে বলা গেল। এই দেশে ‘ক্রিমি লেয়ার’ কী? দেবা ন জানন্তি। বিচারপতি মিথাল তো আবার শ্রীমদ্ভগবদগীতা উদ্ধৃত করে বলেছেন প্রাচীন ভারতে বর্ণভিত্তিক অসাম্য ছিলই না। তাহলে মনুস্মৃতি বোধহয় কোনো ইংরেজের লেখা।

আরও পড়ুন বিহারের লালু: যে শত্রুকে মোদী ভোলেন না

তবে এসবের জন্য বিচারপতিদের ‘দক্ষিণপন্থী’, ‘কাউ বেল্টের লোক’ – এসব আখ্যা দিলে কিন্তু অন্যায় হবে। বাংলাদেশের চলতি হাসিনা সরকার-বিরোধী আন্দোলন নিয়ে প্রগতিশীল, বামপন্থী ভদ্রলোক শ্রেণির অনেক বাঙালি সোশাল মিডিয়ায় যা পোস্ট করেছেন তা থেকে স্পষ্ট বোঝা যায় – তাঁরা বাংলাদেশের সংরক্ষণ নীতি আর ভারতের সংরক্ষণ নীতির তফাত বোঝেননি এবং তাঁদের মনোভাব উক্ত বিচারপতিদের থেকে কিছুমাত্র আলাদা নয়। শুধু কি কয়েকজন ব্যক্তিরই এহেন মতামত? পশ্চিমবঙ্গে ৩৪ বছর বামপন্থী সরকারে নেতৃত্বকারী মার্কসবাদী দলটার মুখপত্রের সম্পাদকীয় এই রায় সম্পর্কে বলেছে ‘এটা ঠিক দারিদ্র্য দূরীকরণ, সমাজের সব অংশের কাছে উন্নয়নের সুফল সমানভাবে পৌঁছে দেবার ক্ষেত্রে সংরক্ষণ ব্যবস্থা অন্তর্বর্তীকালীন পদক্ষেপ হতে পারে কিন্তু স্থায়ী ব্যবস্থা নয়। তাই এই ব্যবস্থা অনন্তকাল চলতে পারে না। তেমনি সময়ের সাথে সাথে বিভিন্ন জাতি গোষ্ঠীর মধ্যে আর্থ-সামাজিক পরিবর্তন হয়। আজ যারা পশ্চাদপদ কাল তারা পশ্চাদপদ নাও থাকতে পারে। তেমনি শুধু জাতির পরিচয়ে কোনও অংশ প্রজন্মের পর প্রজন্ম সুবিধা ভোগ করে যেতে পারে না।’ অনিল বিশ্বাস এই পার্টিরই রাজ্য সম্পাদক তথা সর্বময় নেতা ছিলেন দীর্ঘকাল। বামফ্রন্ট সরকারের গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রী ছিলেন কান্তি বিশ্বাস। তারপরেও সংরক্ষণ সম্পর্কে এরকম ভ্রান্ত, বামনাই ভাবনা যখন এ রাজ্যের এককালীন শাসক দলের রয়ে গেছে, তখন পশ্চিমবঙ্গে জাতভিত্তিক বৈষম্য যে দিব্যি খেয়ে পরে বেঁচে আছে তা আর বলে দিতে হয় না।

অবশ্য এতে আশ্চর্যের কিছু নেই। যোগেন মণ্ডলকে তো বাংলার রাজনীতিতে কেউ স্মরণ করে না, চুনী কোটালকে স্মরণ করা হয় কেবল সিপিএমকে গাল দেওয়ার দরকার হলে। আর বিশ্ববিদ্যালয়ের দিদিমণি মেরুনা মুর্মুকে সোশাল মিডিয়ায় আজও উচ্চবর্ণ কন্যাসমা ছাত্রী গাল দেয় ‘কোটায় চাকরি পেয়েছেন’ বলে। এসবের বোধহয় একটাই সমাধান। বিহারের মত জাতভিত্তিক জনগণনা এ রাজ্যেও হয়ে যাক। দেখা যাক, সোনার চাঁদ আর সোনার টুকরো বলে যাদের কটাক্ষ করা হয় তারাই সব চাকরি-বাকরি নিয়ে বসে আছে আর বেচারা বামুন কায়েতরা সবার পিছে সবার নিচে পড়ে আছে কিনা।

উত্তরবঙ্গ সংবাদে প্রকাশিত