প্রশান্ত বুদবুদ ফেটে যাওয়ায় প্রশ্ন: গণতন্ত্র চালাচ্ছে মার্কেট রিসার্চ?

রাজনৈতিক দলের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে এখন দলের কর্মীদের লড়তে হচ্ছে মার্কেট রিসার্চ কোম্পানির সঙ্গে? গরিব মানুষের গণতন্ত্র ভারতের জন্য এটা কি ভালো লক্ষণ?

অতি সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে প্রশান্ত কিশোর বলেছেন, ২০২৪ লোকসভা নির্বাচনে কংগ্রেস এমন কিছু উন্নতি করেনি। কারণ দেশের ২০% মানুষ সংখ্যালঘু – ১৮% মুসলমান আর অন্যান্য সংখ্যালঘু আরও ২%। তারা কংগ্রেসের ‘ফ্রি ভোটব্যাংক’, আর কংগ্রেস পেয়েছে ২৩ শতাংশ ভোট। অর্থাৎ সংখ্যালঘু বাদে মাত্র ৩% ভোটারের ভোট আদায় করতে পেরেছে রাহুল গান্ধির দল। এই তত্ত্বের আগাগোড়া সবটাই ভুল তথ্যের উপর দাঁড়িয়ে আছে। যেহেতু তথ্যগুলোই ভুল, সেহেতু তত্ত্বটির একমাত্র ঠিকানা বাজে কাগজের ঝুড়ি।

প্রথমত, কংগ্রেস পেয়েছে ২১.১৯% ভোট (২০১৯ সালে পেয়েছিল ১৯.৪৬%)। দ্বিতীয়ত, সর্বশেষ আদমশুমারি অনুসারে মুসলমানরা এদেশের জনসংখ্যার ১৪.২%। তার সঙ্গে খ্রিস্টান, শিখ, বৌদ্ধ, জৈন, আরও ছোট ছোট ধর্মের মানুষ এবং যাঁরা নিজেদের কোনও ধর্মের সঙ্গে যুক্ত বলেননি তাঁদের যোগ করলে তবে হয় ২০.২%। কিন্তু সংখ্যালঘুরা গোটা দেশে কংগ্রেস ছাড়া কাউকে ভোট দেন না – একথা একেবারে ভুল। পশ্চিমবঙ্গেই যেমন সেই ২০১১ সাল থেকে বেশিরভাগ সংখ্যালঘু মানুষ ভোট দিয়ে আসছেন তৃণমূল কংগ্রেসকে, তার আগে দিতেন বামফ্রন্টকে। তামিলনাডু সহ অনেক রাজ্যেই আঞ্চলিক দলগুলো বেশিরভাগ সংখ্যালঘুর ভোট পেয়ে থাকে। এবারেও পেয়েছে।

সবচেয়ে বড় কথা, জনসংখ্যার সকলেই ভোটার নাকি? শিশুরাও ভোট দেয়? তার উপর কংগ্রেস এবার লড়েছে ৩২৮ আসনে, কিন্তু ২০১৯ সালে লড়েছিল ৪২৩ আসনে। প্রায় একশো কম আসনে লড়ে কংগ্রেস ভোট বাড়িয়েছে প্রায় ২ শতাংশ। আসন যে প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে তা বলাই বাহুল্য। অতএব এটা ফেলে দেওয়ার মতো সাফল্য নয়।

এখন কথা হল, প্রশান্তের তত্ত্বটি যখন নেহাত আবর্জনা, তখন লেখার শুরুতেই এতগুলো শব্দ তা নিয়ে খরচ করলাম কেন? কারণ প্রশান্তকে যে ভারতীয় রাজনীতির একজন বিশেষজ্ঞ বলে মনে করা হয়, করণ থাপারের হাতে ল্যাজেগোবরে হওয়ার পরেও যে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম তাঁর সাক্ষাৎকার নিতে এখনও উদ্গ্রীব, তার কারণ ভোট কুশলী হিসাবে তাঁর কীর্তি। ২০১৪ সালে নরেন্দ্র মোদি ক্ষমতায় আসার সঙ্গে সঙ্গে সারা দেশে প্রশান্ত বিখ্যাত হয়েছিলেন। সংবাদমাধ্যম জানিয়েছিল, ওই জয়ের কারিগর তিনিই। প্রশান্তের খ্যাতির সূত্রে ভারতীয় রাজনীতিতে প্রতিষ্ঠা পেয়েছিল এক নতুন পেশা, যার নাম ইংরেজিতে ‘ইলেকশন স্ট্র্যাটেজিস্ট’। বাংলায় ভোট কুশলী বলতে পারি।

ভোট কুশলী ব্যাপারটা দেখতে শুনতে এত ভালো যে বঙ্গে দিশেহারা বামপন্থীদের মধ্যেও কথাবার্তা শুরু হয়েছে – একজন প্রশান্ত বা সুনীল কানুগোলু (কংগ্রেসের ভোট কুশলী সংস্থা মাইন্ডশেয়ার অ্যানালিটিক্সের কর্ণধার) দরকার। পশ্চিমবঙ্গ, বিহার, তামিলনাডু, উত্তরপ্রদেশের মতো যথেষ্ট সংখ্যালঘু থাকা রাজ্যে কাজ করা সংস্থার একদা কর্ণধার প্রশান্তের মূর্খামি দেখে সেই বামপন্থীরা কী বুঝবেন জানি না, আমি যা বুঝলাম বলি।

হয় প্রশান্ত এতটাই কংগ্রেসবিদ্বেষী ও মুসলমানবিদ্বেষী যে বিদ্বেষে তাঁর বুদ্ধিসুদ্ধি লোপ পেয়েছে। নয় তাঁর সাফল্যের পিছনে ১০০% কৃতিত্ব আইপ্যাকের সেইসব কর্মীদের, যাঁদের নাম কেউ জানে না। তিনি শুধু মাইনে করা কর্মীদের পরিশ্রম আত্মসাৎ করে নাম কিনেছেন। কিন্তু কর্পোরেট দুনিয়ায় এ তো প্রায় নিয়ম। ফলে তেমন হয়ে থাকলে রাজনীতির দিক থেকে ভাবনার কিছু নেই। তৃতীয় একটা সম্ভাবনা আছে, যা বেশি চিন্তার।

ব্যাপারটা কি আসলে এরকম, যে এই সংস্থাগুলো যা করে তা আসলে বিজ্ঞাপন জগতে যাকে ‘মার্কেট রিসার্চ’ বলে তার বেশি কিছুই নয়? লক্ষণীয়, আইপ্যাক বা মাইন্ডশেয়ার সেইসব মক্কেলকেই জেতাতে পেরেছে যারা জেতার অবস্থায় ছিল। ২০১৪ লোকসভা নির্বাচন বিজেপি জিততই, কারণ ইউপিএ সরকারের প্রতি বিপুল অসন্তোষ তৈরি হয়েছিল। ২০২১ পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচন বিজেপি জিতে যাবে বলে যতই হাওয়া তৈরি হয়ে থাক, বিজেপির না ছিল সংগঠন, না ছিল মমতার সমতুল্য কোনও মুখ।

২০০৫ সালে বিহারের মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পর থেকে নীতীশ কুমারের সরকার যে অনেক কাজ করেছিল তা তাঁর অতি বড় শত্রুও অস্বীকার করে না। ফলে ২০১৫ সালে জেডিইউ-আরজেডি জোটের জয়ও এমন কিছু অত্যাশ্চর্য ব্যাপার ছিল না, খিঁচ ছিল নীতীশ মহাগঠবন্ধনে যোগ দেওয়ায়। তামিলনাডুর মানুষ পরপর দু’বার একই দলকে জেতান না। ১৯৮৪ সাল থেকে চলে আসা সেই ধারা ভেঙে এমনিতেই ২০১৬ সালে এআইএডিএমকে পরপর দু’বার জিতে গিয়েছিল। সুতরাং ২০২১ সালে ডিএমকের জয় প্রায় অনিবার্য ছিল। ২০১৭ সালের উত্তরপ্রদেশ বিধানসভা নির্বাচনে কিন্তু সংগঠনহীন, কর্মসূচিহীন কংগ্রেস আইপ্যাকের সাহায্য নিয়েও সাতটার বেশি আসন জেতেনি। সুনীলও কি কংগ্রেসকে তেলেঙ্গানা জেতাতে পারতেন সংগঠন এবং রেবন্ত রেড্ডির মতো আক্রমণাত্মক নেতা না থাকলে? কর্ণাটক জেতা হত সিদ্দারামাইয়া আর ডিকে শিবকুমার ছাড়া?

আরও পড়ুন কানহাইয়ার কেরিয়ার আর কমিউনিস্ট আদর্শবাদ: তার ছিঁড়ে গেছে কবে

অনেকে অবশ্য স্বীকার করেন যে এই সংস্থাগুলো বা তাদের কর্ণধাররা জাদুকর নন। কিন্তু তাঁদের মতে, এরা ‘ভ্যালু অ্যাড করে’। সে ভ্যালু কি পরিমাপযোগ্য? হলে প্রশান্তের মতো মহাপণ্ডিত কি ভ্যালু অ্যাড করেন? যদি পরিমাপযোগ্য না হয়, তাহলে কীসের ভিত্তিতে রাজনৈতিক দলগুলো কোটি কোটি টাকা খরচ করছে এদের পিছনে? দলগুলোর টাকা মানে তো আসলে নাগরিকদেরই টাকা। কর্পোরেটগুলো পিছন দরজা দিয়ে যে চাঁদা দলগুলোকে দেয় (নির্বাচনি বন্ডেই হোক আর নগদেই হোক) সে টাকাও তো তারা উশুল করে নেয় নাগরিকদের পকেট থেকেই। শুধু তাই নয়, এই সংস্থাগুলোর পরামর্শেই তো আজকাল ক্ষমতাসীন দলগুলোর, অর্থাৎ রাষ্ট্রের নীতি নির্ধারণ হচ্ছে। তাহলে কি কতকগুলো মার্কেট রিসার্চ কোম্পানি নির্ধারণ করছে আমাদের গণতন্ত্রের অভিমুখ?

এদের কাজের সীমা কতটুকু? কেউ বলেন, এরাই নাকি দলের প্রার্থীতালিকা থেকে নির্বাচনি প্রচার – সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করে। আবার কিছুদিন আগে মমতা এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, আইপ্যাকের ভূমিকা নেহাতই সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রচার চালানো। এসব গোপনীয় ব্যাপার, ফলে সম্যক জানা অসম্ভব। কিন্তু একটা ব্যাপারে সকলেই একমত। ভোট কুশলী সংস্থার আবশ্যিক কাজ হল মক্কেল পার্টির জন্য ভোটারদের সম্পর্কে পুঙ্খানুপুঙ্খ তথ্য সংগ্রহ এবং বিশ্লেষণ। তথ্য কাটাছেঁড়া করেই তারা দলগুলোকে পরামর্শ দেয় – এটা বলুন, ওটা বলবেন না। অমুক প্রকল্প চালু করুন, তমুক কাজে পার্টির ভাবমূর্তি নষ্ট হচ্ছে।

সন্দেহ নেই, তথ্যপ্রযুক্তির যুগে রাজনীতিতে সাফল্য পেতে গেলে তথ্য আর প্রযুক্তিকে কাজে লাগাতে হবে। সে কারণেই তো আইপ্যাকের প্রস্থানের পর ডিএমকে ভোট কুশলী হিসাবে নিযুক্ত করেছে পপুলাস এমপাওয়ারমেন্ট নেটওয়ার্ক (পেন)-কে। তবে আইপ্যাক বা মাইন্ডশেয়ারের সঙ্গে পেনের তফাত আছে। পেনের কর্ণধার এমকে স্ট্যালিনের জামাই ভি সবরীসন। এখনও পর্যন্ত পেন অন্য কোনও দলের হয়ে কাজ করেনি। তারা মূলত পার্টি এবং ডিএমকে সরকারের বার্তা ডিজিটাল উপায়ে সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার কাজ করে। সেই লক্ষ্যে স্ট্যালিনের মোবাইল অ্যাপ বানিয়েছে তারা এবং মুখ্যমন্ত্রীর নিয়মিত পডকাস্ট চালু করেছে। কীভাবে মানুষের কাছ থেকে ডিজিটাল পদ্ধতিতে তথ্য সংগ্রহ করে রাজনৈতিক কাজে লাগানো যায়, তা নিয়ে প্রশিক্ষণও দেয় ডিএমকে কর্মীদের। কিন্তু ডিএমকের রাজনীতি তারাই নিয়ন্ত্রণ করছে, এমন অভিযোগ বা প্রশংসা এখনও অবধি শোনা যায়নি। অথচ তৃণমূল কংগ্রেসের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত আইপ্যাক নিচ্ছে – এমন অভিযোগ উঠেছে প্রশান্ত ছেড়ে যাওয়ার আগে ও পরে।

আবার মধ্যপ্রদেশ, ছত্তিশগড়, রাজস্থানের নির্বাচনে সুনীল কাজ করুন – এমনটা নাকি সেখানকার কংগ্রেস নেতারা চাননি। তাহলে রাজনৈতিক দলের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে এখন দলের কর্মীদের লড়তে হচ্ছে মার্কেট রিসার্চ কোম্পানির সঙ্গে? গরিব মানুষের গণতন্ত্র ভারতের জন্য এটা কি ভালো লক্ষণ?

উত্তরবঙ্গ সংবাদে প্রকাশিত

যারা বিজেপিতে ভিজেছিল

১৯৯২ সালে বাবরি মসজিদ ভাঙার পর থেকে বদলের হাওয়া বুঝে ভারতের গুরুত্বপূর্ণ রাজ্যগুলোতে বেশকিছু রাজনৈতিক দল বিজেপির সঙ্গে গলাগলি বা ঈষৎ আশনাই করেছে। সেই দলগুলোর আজকের অবস্থা খেয়াল করলে ওই কথাই মনে হবে – বুঝতে পারি না ওর বিষনজরে থাকা বেশি খারাপ, নাকি সুনজরে?

দেশের রাজধানী এমনিতেই রাজনৈতিক কানাকানির কারখানা, অরবিন্দ কেজরিওয়ালের গ্রেফতারির পর তো আরও বেশি। তিনি কারান্তরালে থেকেই সরকার চালিয়ে যাচ্ছেন। কোনো সাংবিধানিক বাধা না থাকায় কেন্দ্রীয় সরকার চাইলেও কিছু করে উঠতে পারছে না। পাশাপাশি রাজনৈতিক ভয়ও আছে। এমনিতেই নাকি দিল্লির মানুষ কেজরিওয়ালের প্রতি সহানুভূতিশীল হয়ে পড়েছেন। গোদি মিডিয়ার ‘মুড অফ দ্য নেশন’ পোলে দেখা গেছে গতবারের মত দিল্লিতে লোকসভার সাতটা আসনের সাতটাই বিজেপির জেতার সম্ভাবনা প্রায় অন্তর্হিত। এখন রাষ্ট্রপতি শাসন জারি করে আম আদমি পার্টির সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করলে যদি কেজরিওয়াল আরও সহানুভূতি পেয়ে যান! তাই ও পথে এখনো যায়নি নরেন্দ্র মোদীর সরকার। কেজরিওয়ালের আপ্ত সহায়ককে বহু পুরনো মামলা দেখিয়ে বরখাস্ত করা, খালি পদে অফিসার নিয়োগ না করা, লেফটেন্যান্ট গভর্নরকে দিয়ে মন্ত্রিসভাকে ব্যতিব্যস্ত করা ইত্যাদি ঘুরপথেই হয়রান করছে। কানাকানির কারখানা বলছে, দল গঠনের সময় থেকে কেজরিওয়ালের সঙ্গে থাকা কোনো এক ওজনদার আপ নেতা নাকি দলত্যাগ করে বিজেপিতে যোগ দিতে পারেন। ইতিমধ্যেই কেজরিওয়ালের মন্ত্রিসভার এক সদস্য পদত্যাগ করেছেন। কারণ হিসাবে যা দেখিয়েছেন তা ২০২১ সালে দলে দলে তৃণমূল কংগ্রেস ছেড়ে বিজেপিতে যাওয়ার সময়ে পশ্চিমবঙ্গের অনেক নেতা যা বলেছিলেন তার কাছাকাছি। যদিও ইনি শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত বিজেপিতে যোগ দেননি। ওদিকে আপের আরেক তরুণ এবং প্রভাবশালী নেতা রাঘব চাড্ডা বহুদিন হল বেপাত্তা। বলিউড অভিনেত্রী পরিণীতি চোপড়াকে বিয়ে করার পর থেকে তিনি আমেরিকায় না ইউরোপে, কেউ জানে না। বস্তুত, দলের এই সংকট মুহূর্তে আপের দশজন রাজ্যসভার সাংসদের মধ্যে সাতজনই নীরব। কেজরিওয়ালের গ্রেফতারির পরে আপ নেত্রী আতিশী মারলেনা দাবি করেছিলেন যে কেন্দ্রীয় সরকার তাঁকে এবং আরও কয়েকজন আপ নেতাকে গ্রেফতার করার ফন্দি এঁটেছে। শুক্রবার বলেছেন, কেন্দ্রীয় সরকার দিল্লিতে রাষ্ট্রপতি শাসন জারি করার তালে আছে। বুঝতে অসুবিধা হয় না, গোটা দলটাকেই তুলে দেওয়ার অভিলাষ পোষণ করছে বিজেপি। কেবল আপ নয়। নির্বাচন যত এগিয়ে আসছে, একথা বুঝতে কারোরই কোনো অসুবিধা হচ্ছে না যে দেশে অন্য কোনো দল থাকুক তা প্রধানমন্ত্রী বা তাঁর দল চায় না।

সবচেয়ে বেশি রাজ্যে বিজেপির লড়াই কংগ্রেসের বিরুদ্ধে। তাই আয়কর বিভাগকে দিয়ে বহু পুরনো রিটার্নে অসঙ্গতি দেখিয়ে নোটিস পাঠিয়ে তাদের টাকাপয়সা খরচ করার পথ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। আইনি পথে আবেদন করে লাভ হয়নি। পরে বোধহয় ব্যাপারটা নিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রও অসন্তোষ প্রকাশ করায় সরকারের জ্ঞান হল যে এটা বাড়াবাড়ি হয়ে যাচ্ছে। তাই আপাতত আয়কর বিভাগ জানিয়েছে তারা নির্বাচন শেষ হওয়া পর্যন্ত কংগ্রেসের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেবে না। কংগ্রেসের পর বিজেপির সবচেয়ে বড় শত্রু অবশ্যই আপ। তারা দিল্লি বিধানসভা নির্বাচনে পরপর দুবার বিজেপিকে দুরমুশ করার পর পাঞ্জাবেও ক্ষমতায় এসেছে। আরও মুশকিল হল, দিল্লিতে তবু আপকে লোকসভায় বিজেপি পর্যুদস্ত করতে পেরেছিল। পাঞ্জাবে আপ অল্পদিনের মধ্যেই প্রবেশ করে ক্ষমতায় পৌঁছে গেল। ওদিকে বিজেপি বহুবছর চেষ্টা করেও এখন ভোঁ ভাঁ হয়ে গেছে। এমনকি মোদী সরকারের কৃষকবিরোধী অবস্থানের প্রতিবাদে দীর্ঘদিনের সঙ্গী পাঞ্জাবের আঞ্চলিক দল, শিরোমণি অকালি দলও বিজেপির সঙ্গ ত্যাগ করেছে। অতি বড় বিজেপি সমর্থকও জানেন, লোকসভা নির্বাচনে পাঞ্জাবে বিজেপি শূন্য ছাড়া কিছুই পাবে না। তাই আপ হল দ্বিতীয় লক্ষ্য।

আপের দুই, তিন এবং চার নম্বর নেতা মনীশ সিসোদিয়া, সত্যেন্দ্র জৈন এবং সঞ্জয় সিংকে দীর্ঘদিন বন্দি করে রাখা হয়েছে। মামলাগুলোর কোনো অগ্রগতি নেই, একটি টাকাও উদ্ধার হয়নি। সঞ্জয়কে জামিন দেওয়ার পিছনে সুপ্রিম কোর্টের বিচারকদের অন্যতম যুক্তি ছিল সেটাই। এত সবেও আপ অনড় দেখেই হয়ত একেবারে এক নম্বর নেতাকেও গ্রেফতার করা হয়েছে। আপের গুরুত্বপূর্ণ নেতা সৌরভ ভরদ্বাজ সাংবাদিক রাজদীপ সরদেশাইকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন, কেজরিওয়াল পদত্যাগ করলেই আপের বাকি নেতৃত্বকেও গ্রেফতার করা হবে। তারপর একই কায়দায় পাঞ্জাবের সরকারকেও ক্ষমতাচ্যুত করা হবে। আগেই এ চেষ্টা ঝাড়খণ্ডে করা হয়েছিল, কিন্তু সাফল্য আসেনি। এখন এভাবে দুটো রাজ্যের সরকার ফেলে দেওয়া গেলে কর্ণাটকের মুখ্যমন্ত্রী সিদ্দারামাইয়া, তেলেঙ্গানার রেবন্ত রেড্ডি, তামিলনাড়ুর এম কে স্ট্যালিন, পশ্চিমবঙ্গের মমতা ব্যানার্জির মত সমস্ত বিরোধী দলের মুখ্যমন্ত্রীদের গ্রেফতার করে সরকার ফেলে দেবে বিজেপি। অর্থাৎ এক দেশ এক নির্বাচন তো পরের কথা, ২০২৪ লোকসভাতেই এক দল এক নির্বাচন সম্ভব হবে। অতজন নেতা গ্রেফতার হয়ে গেলে নির্বাচনের প্রচার করবে কে আর সংগঠন চালাবে কে? হতোদ্যম বিরোধী দলগুলোকে দেখে ভোটই বা দেবেন কোন ভোটার? তাঁদের মধ্যেও কি আতঙ্ক কাজ করবে না?

বলা যেতেই পারে, কেজরিওয়ালের পদত্যাগ না করাকে সমর্থন করতে গিয়ে সৌরভ কষ্টকল্পিত আতঙ্ক সৃষ্টি করছেন সাধারণ মানুষের মনে। সত্যিই ওরকম একনায়কতন্ত্র মোদীর লক্ষ্য হলে আদৌ নির্বাচন করাচ্ছেন কেন? এ প্রশ্নের উত্তর কিন্তু খুব সোজা। আজকের একনায়করা কেউ একনায়ক তকমাটা পছন্দ করেন না। তাঁরা চান একনায়কের লাগামহীন ক্ষমতার সঙ্গে গণতন্ত্রের গ্ল্যামার। একজন শাসক ধর্মে মুসলমান বা রাজনীতিতে কমিউনিস্ট না হলে বাকি পৃথিবীর কাছে গণতান্ত্রিক বলে পরিচিতি পাওয়া খুব কঠিনও নয়। তাই তুরস্কের রচপ তায়িপ এর্দোগান বা রাশিয়ার ভ্লাদিমির পুতিনও নিজের দেশে নির্বাচন করান, আর বিশ্বগুরু মোদী করাবেন না?

কোনো দেশে একনায়কের জন্ম হঠাৎ করে হয় না। পরিবারে, সমাজে দীর্ঘকাল ধরে একনায়কত্বের প্রতি সমর্থন তৈরি না হলে একটা বিরাট গণতান্ত্রিক দেশের মানুষ রাষ্ট্রক্ষমতায় একনায়ককে চাইবেন কেন? কোনো সন্দেহ নেই, ভারতে পরিবার থেকে শুরু করে কর্পোরেট অফিস পর্যন্ত সর্বত্র একনায়করা বিচরণ করে। তেমন একজন বসের অধীনে কাজ করার সময়ে আমার এক তিতিবিরক্ত সহকর্মী একটা মন্তব্য করেছিলেন, যা বিজেপি-আরএসএসের ক্ষেত্রে দারুণ লাগসই। ‘বুঝতে পারি না ওর বিষনজরে থাকা বেশি খারাপ, নাকি সুনজরে?’ ১৯৯২ সালে বাবরি মসজিদ ভাঙার পর থেকে বদলের হাওয়া বুঝে ভারতের গুরুত্বপূর্ণ রাজ্যগুলোতে বেশকিছু রাজনৈতিক দল বিজেপির সঙ্গে গলাগলি বা ঈষৎ আশনাই করেছে। সেই দলগুলোর আজকের অবস্থা খেয়াল করলে ওই কথাই মনে হবে – বুঝতে পারি না ওর বিষনজরে থাকা বেশি খারাপ, নাকি সুনজরে?

সেই দলগুলোর কথা আজ স্মরণ করা জরুরি। কারণ ভারত জুড়ে হিন্দুত্ববাদী রাজনীতি রাতারাতি এতখানি শক্তি সঞ্চয় করেনি। বহু রাজ্যে তাদের রাজনৈতিক, এবং তার চেয়েও বড় কথা সামাজিক স্বীকৃতি পাইয়ে দিয়েছে এই দলগুলো। নইলে সংঘ পরিবারের নানা সামাজিক সংগঠনের ৩৬৫ দিনের কাজ সত্ত্বেও এত নির্বাচনী সাফল্য সম্ভব হত কিনা তা তর্কসাপেক্ষ। কোন দলগুলোর কথা বলছি? আসুন, একেবারে ভারতের মানচিত্রের উপর দিক থেকে শুরু করা যাক।

ন্যাশনাল কনফারেন্স, জম্মু অ্যান্ড কাশ্মীর পিপলস ডেমোক্র্যাটিক পার্টি
ন্যাশনাল কনফারেন্স কাশ্মীর উপত্যকার সুপ্রাচীন দল। কাশ্মীরের ভারতভুক্তিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল দলের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা শেখ আবদুল্লার। স্বাধীন ভারতে তিনি, তাঁর ছেলে ফারুক এবং নাতি ওমর – তিনজনেই দলের নেতা হিসাবে জম্মু ও কাশ্মীরের মুখ্যমন্ত্রী হয়েছেন। ১৯৯৬ পর্যন্ত ফারুক ছিলেন বিজেপির সোচ্চার সমালোচক। অনেক পশ্চিমবঙ্গবাসীর হয়ত মনে আছে, ১৯৯৬ সাধারণ নির্বাচনের প্রাক্কালে বামপন্থীদের উদ্যোগে কলকাতার ব্রিগেড ময়দানে কংগ্রেস ও বিজেপিবিরোধী ফ্রন্টের যে সমাবেশ হয়েছিল, তাতে ফারুক বিজেপির বিরুদ্ধে জ্বালাময়ী বক্তৃতা দিয়েছিলেন। কিন্তু পরবর্তীকালে তাঁর দল অটলবিহারী বাজপেয়ীর নেতৃত্বাধীন ন্যাশনাল ডেমোক্র্যাটিক অ্যালায়েন্স (এনডিএ) সরকারকে সমর্থন দেয়। তখন ফারুকের দল কাশ্মীরে ক্ষমতাসীন।

কাশ্মীরের রাজনীতিতে ন্যাশনাল কনফারেন্সের সবচেয়ে বড় প্রতিদ্বন্দ্বী হল মুফতি মহম্মদ সঈদ প্রতিষ্ঠিত দল জম্মু অ্যান্ড কাশ্মীর পিপলস ডেমোক্র্যাটিক পার্টি (পিডিপি)। ১৯৮৯ সালে জনতা দল নেতা ভি পি সিংয়ের নেতৃত্বে কেন্দ্রে যে সরকার হয়েছিল সেই সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ছিলেন মুফতি সাহেব (এ পর্যন্ত ভারতের একমাত্র মুসলমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী)। সেই সরকারের প্রতি বিজেপিরও সমর্থন ছিল বটে, কিন্তু সে ছিল সাড়ে বত্রিশ ভাজা সরকার। বামপন্থীরাও সেই সরকারকে সমর্থন করেছিল। উপরন্তু রামমন্দিরের দাবিতে রথযাত্রায় বেরনো লালকৃষ্ণ আদবানিকে বিহারের লালুপ্রসাদ (তখন জনতা দলেই) সরকার গ্রেফতার করলে বিজেপি ভিপির সরকারের থেকে সমর্থন প্রত্যাহার করে। এছাড়া পিডিপির কখনো বিজেপির সঙ্গে সখ্য হয়নি। বরং মুফতি নিজে সুদূর অতীতে যেমন ন্যাশনাল কনফারেন্সে ছিলেন, তেমনি কংগ্রেসেও ছিলেন। কিন্তু সেই মুফতিই ২০১৪ সালে জম্মু ও কাশ্মীরে বিজেপির সঙ্গে হাত মিলিয়ে সরকার গঠন করেন। ২০১৬ সালে মৃত্যুর আগে পর্যন্ত সেই সরকারের মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন তিনি। তারপর মুখ্যমন্ত্রী হন তাঁর মেয়ে মেহবুবা। বিজেপি সেই সরকার ফেলে দেয় ২০১৮ সালের ১৯ জুন।

তারপর থেকে কাশ্মীরের মানুষ কীরকমভাবে বেঁচে আছেন আমরা সবাই জানি। এই দুই দলের অবস্থাও তথৈবচ। ২০১৯ সালের ৫ অগাস্ট কেন্দ্রের বিজেপি সরকার সংবিধানের ৩৭০ নম্বর অনুচ্ছেদ বাতিল করে দেওয়ার পরে গোটা কাশ্মীরকে যখন জেলখানা করে তোলা হয়েছিল, তখন আবদুল্লা বা মুফতিরা বিজেপিসঙ্গের ইতিহাস থাকার জন্যে কোনো বিশেষ সুবিধা পাননি। তাঁদেরও গৃহবন্দি করে রাখা হয়। এখন ফারুক-ওমরের মত মেহবুবাও ঠুঁটো জগন্নাথ। দুই দলেরই সংগঠন দুর্বল হয়ে পড়েছে, দুই দলই ইন্ডিয়া ব্লকের মঞ্চে এসে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু নির্বাচনী জোট তৈরি করার প্রশ্নে দুপক্ষই অনড়। ফলে কাশ্মীরের চারটে লোকসভা আসনে দুই দলই প্রার্থী দিয়ে বসে আছে।

শিরোমণি অকালি দল
ভারতের প্রাচীনতম রাজনৈতিক দলগুলোর অন্যতম পাঞ্জাবের এই আঞ্চলিক দল। দীর্ঘ ইতিহাস, ধর্মীয় সংযোগ এবং পাঞ্জাব রাজ্যের গঠনেও গুরুতর ভূমিকা থাকায় এই দলের পাঞ্জাবে বিপুল সমর্থন ছিল দীর্ঘকাল। এই দলও প্রয়াত প্রকাশ সিং বাদলের নেতৃত্বে বিজেপির জোটসঙ্গী হয়েছিল সেই ১৯৯৬ সালেই, অর্থাৎ বাজপেয়ী সরকারের আমলে। পরিণতি কী?

পাঞ্জাবি পরিচিতি এবং পাঞ্জাবিদের স্বার্থকে সবকিছুর ঊর্ধ্বে রাখাই যে দলের মতাদর্শ, নরেন্দ্র মোদীর আমলে তিনটে কৃষি আইন প্রত্যাহারের দাবিতে কৃষক আন্দোলনের সময়ে সেই দলের অবস্থা হয়েছিল শ্যাম রাখি না কুল রাখি। শেষমেশ তারা কুল রাখারই সিদ্ধান্ত নেয়। নেত্রী হরসিমরত কৌর বাদল কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগ করেন এবং তাঁর দল এনডিএ ছেড়ে বেরিয়ে আসে। বিজেপি কিন্তু চেয়েছিল লোকসভা নির্বাচনে আবার জোট হোক। অকালি দল পাত্তা দেয়নি। তারা বড় দেরিতে বুঝতে পেরেছে যে বিজেপি অন্য দলের ঘাড়ে পা দিয়ে উপরে ওঠায় বিশ্বাসী। বিজেপির সঙ্গে থাকায় যা হয়েছে তা হল পাঞ্জাবিদের স্বার্থরক্ষাকারী দল হিসাবে বাদল পরিবারের বিশ্বাসযোগ্যতা নষ্ট হয়ে গেছে। পাঞ্জাবের কংগ্রেস দুর্বল হয়ে পড়লেও ফাঁক ভরাট করতে ঢুকে পড়েছে আপ। এখন শিরোমণি অকালি দল ভুগছে অস্তিত্বের সংকটে।

বহুজন সমাজ পার্টি
দ্বিখণ্ডিত হওয়ার পরেও ভারতের সবচেয়ে বড় রাজ্য উত্তরপ্রদেশ, হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির পক্ষে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রাজ্যও বটে। কারণ এই রাজ্যেই অযোধ্যা, কাশী, মথুরা। রাম না থাকলে যেমন রামায়ণ লেখা হত না, তেমনি এই জায়গাগুলো না থাকলে সারা ভারতের হিন্দুদের মনে খতরার ধারণা তৈরি করাও সম্ভব হত না সংঘ পরিবারের পক্ষে। বাবরি মসজিদ বাঁচাতে সমাজবাদী পার্টির সরকার গুলি চালাল, কিছু মানুষের মৃত্যু হল – তবে না রণহুঙ্কারে পরিণত হল ‘মন্দির ওয়হি বনায়েঙ্গে’ স্লোগান? এই সংঘর্ষে মতাদর্শের দিক থেকে ভাবলে ব্রাহ্মণ্যবাদী সংঘ পরিবারের বিপক্ষেই থাকার কথা ছিল আম্বেদকরপন্থী কাঁসিরামের হাতে তৈরি বহুজন সমাজ পার্টির (বিএসপি)। কিন্তু ১৯৯৩ সাল থেকে সমাজবাদী পার্টির সঙ্গে জোট সরকার চালানোর পর কাঁসিরামের উত্তরাধিকারী মায়াবতী মুখ্যমন্ত্রী মুলায়ম সিং যাদবের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ করে ১৯৯৫ সালের ২ জুন সমর্থন প্রত্যাহার করেন। কী আশ্চর্য! ঠিক পরদিনই বিজেপির সমর্থনে সরকার গঠন করেন মায়াবতী। সেই থেকে বহুজন সমাজ পার্টির চিরশত্রু হয়ে যায় সমাজবাদী পার্টি, বিজেপি নয়। যদিও বিজেপি তাঁর সরকারকে সে বছরের অক্টোবর মাসেই ফেলে দেয়। তারপরেও তিনবার উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী হয়েছেন মায়াবতী, এমনকি ফের বিজেপির সমর্থনেও। শুধু ২০০৭-১২ একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে পুরো মেয়াদ কাটাতে পেরেছিলেন।

ভারতের আর পাঁচটা দলের মত মায়াবতীর দলের বিরুদ্ধেও বিস্তর দুর্নীতির অভিযোগ আছে। কিন্তু তাঁর মুখ্যমন্ত্রিত্বে উত্তরপ্রদেশে যে নেহাত খারাপ উন্নয়ন হয়নি তাও স্বীকার করেন অনেক বিরোধী। তবু আজ ‘বহেনজি’ উত্তরপ্রদেশের রাজনীতিতে কোণঠাসা হয়ে গেছেন। জাতপাতের সমীকরণ ভেঙে দিয়ে যে অভিন্ন হিন্দু পরিচিতি তৈরি করার রাজনীতি বাজারে এনেছে মোদী-অমিত শাহ-যোগী আদিত্যনাথের বিজেপি, তাতে মায়াবতীর চিরাচরিত নিম্নবর্গীয় হিন্দু ও মুসলমান ভোটাররা তাঁকে ছেড়ে চলে গেছেন। স্পষ্টতই বিজেপির সঙ্গে জোট করে লাভ হয়েছে বিজেপির, বিএসপির নয়। দুর্নীতির অভিযোগগুলোকে হাতিয়ার করে একদা ভারতীয় রাজনীতির দাপুটে নেত্রী মায়াবতীকে এতটাই নখদন্তহীন করে দেওয়া গেছে যে সংসদে দাঁড়িয়ে তাঁর দলের সাংসদ দানিশ আলিকে মুসলমান বলে যা খুশি গালাগালি দিয়ে গেলেন বিজেপির রমেশ বিধুরী। বহেনজি রা কাড়লেন না। স্বভাবতই দানিশ সম্প্রতি কংগ্রেসে যোগ দিয়েছেন। ২০২৪ লোকসভা নির্বাচনে মায়াবতী কী আশায় একলা লড়ছেন তা কেউ জানে না। কংগ্রেস কিন্তু তাঁকে ইন্ডিয়া ব্লকে যোগ দিতে ডেকেছিল।

তৃণমূল কংগ্রেস
উপরে উল্লিখিত কাশ্মীরের দল দুটো যদি বলে বিজেপির হাত ধরা ছাড়া তাদের কোনো উপায় ছিল না, তাহলে হেসে উড়িয়ে দেওয়া যাবে না। কারণ সেই জওহরলাল নেহরুর আমলে অন্যায়ভাবে শেখ আবদুল্লাকে কারারুদ্ধ করার সময় থেকেই দিল্লিতে যে দলের সরকারই থাক, শ্রীনগরের সরকারকে প্রকৃত স্বায়ত্তশাসন দেওয়া হয়নি (অনুচ্ছেদ ৩৭০ কাশ্মীরিদের অধিকারের চেয়ে বাকি ভারতের কাছে বদনাম দিয়েছে বেশি)। একাধিক মহলের মতে কাশ্মীরের মানুষকে সন্ত্রাসবাদের দিকে ঠেলে দিয়েছে একের পর এক কেন্দ্রীয় সরকারের কারচুপি করা নির্বাচন। শক্তি সামন্তের কাশ্মীর কি কলি (১৯৬৪) দেখে যে কাশ্মীরকে চেনা যায়, আসল কাশ্মীর যে তার চেয়ে বিশাল ভরদ্বাজের হায়দর (২০১৪) ছবিরই বেশি কাছাকাছি তা বুঝতে কয়েকশো বই পড়ার প্রয়োজন হয় না। জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়েও পড়তে হয় না। চোখ, কান আর মন খোলা রাখলেই বোঝা যায়। তাই মেহবুবা যখন সাংবাদিক সঙ্কর্ষণ ঠাকুরকে বলেন যে বিজেপির সঙ্গে জোট করার তিনি বিরোধী ছিলেন এবং বাবা মুফতি তাঁকে বলেন, এটা না করে কোনো উপায় নেই – তখন তাঁকে বিশ্বাস করা যায়। পরবর্তী ঘটনাবলী প্রমাণ করছে, মুফতি ভুল ভাবেননি। বাজপেয়ী সরকারের আমলেও কার্গিল যুদ্ধ বাদ দিলে কাশ্মীর যে মোটামুটি শান্ত ছিল সে হয়ত ন্যাশনাল কনফারেন্স ওই সরকারকে সমর্থন দিয়েছিল বলেই। অন্য দুটো দল, অর্থাৎ শিরোমণি অকালি দল আর বহুজন সমাজ পার্টি কিন্তু এই যুক্তি দিতে পারে না। তবে উভয়ের রাজনীতিরই জন্ম কংগ্রেসবিরোধিতা থেকে। ভারতের আরও অনেক রাজ্যের আঞ্চলিক দলেরই তাই। তৃণমূল কংগ্রেস এই তালিকায় সম্ভবত একমাত্র দল যাদের ইতিহাস উলটো।

এই দলের জন্ম কংগ্রেস ভেঙে এবং মূল রাজনীতি বামবিরোধিতা। নিম্নবর্গীয় মানুষের জন্য সামাজিক ন্যায়ের দাবি বা বাঙালি পরিচিতি সত্তাও তৃণমূল কংগ্রেসের জন্মের কারণ নয়। যুব কংগ্রেস নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় মনে করছিলেন কংগ্রেস যথেষ্ট বামবিরোধিতা করছে না, তাই তিনি ক্রমশ জঙ্গি আন্দোলনের পথ নেন। তা নিয়ে রাজ্য নেতৃত্বের সঙ্গে সংঘাত আর অজিত পাঁজার মত কয়েকজন বর্ষীয়ান নেতার সমর্থন লাভই তৃণমূলের জন্মের কারণ। জনশ্রুতি হল, তাতেও তৃণমূলের জন্ম হত না কেন্দ্রে ক্ষমতাসীন বিজেপির সমর্থন না থাকলে। কিন্তু জনশ্রুতির কথা থাক, যা সর্বসমক্ষে আছে তা নিয়েই আলোচনা করি। শেষপর্যন্ত মমতার যা ঘোষিত একমাত্র এজেন্ডা – বামফ্রন্ট সরকারের অপসারণ – প্রায় এক যুগ বিজেপির হাত ধরেও বাস্তবায়িত করা যায়নি। বরং সেই পর্বে তৃণমূলকে ২০০৪ লোকসভা এবং ২০০৬ বিধানসভা নির্বাচনে শোচনীয় পরাজয় বরণ করতে হয়েছিল। শেষপর্যন্ত কংগ্রেসের হাত ধরেই ২০১১ সালে মমতার লক্ষ্যপূরণ হয়।

কিন্তু মমতার সঙ্গে জোট করে বিজেপির নিঃসন্দেহে লাভ হয়েছে। কখনো পশ্চিমবঙ্গের এই কোণে, কখনো ওই কোণে একটা কি দুটো বিধানসভা আসন জেতা বিজেপি এ রাজ্য থেকে সাংসদ পেয়েছে ওই জোট তৈরি হওয়ার পর। ২০১১ সালের পর থেকে কেবল বিজেপির নয়, পশ্চিমবঙ্গে আরএসএসের সংগঠনও বেড়েছে হু হু করে। দক্ষিণবঙ্গে কংগ্রেস ক্রমশ তৃণমূলে মিশে গেছে, সরাসরি সংঘাতে বামপন্থীরাও এঁটে উঠতে পারেনি শাসক দলের সঙ্গে। এত বড় শূন্যতা ভরাট করে আজ পশ্চিমবঙ্গে প্রধান বিরোধী দল বিজেপি। এ রাজ্যের রাজনীতিতে যা বছর বিশেক আগেও অভাবনীয় ছিল, আজ ঠিক তাই ঘটছে। বহু আসনে স্রেফ ধর্মের ভিত্তিতে ভাগ হয়ে যাচ্ছেন ভোটাররা।

কেউ বলতে পারেন, বিজেপির লাভ হয়েছে না হয় বোঝা গেল। তৃণমূল কংগ্রেসের ক্ষতি হল কোথায়? বিলক্ষণ ক্ষতি হয়েছে। প্রথমত, তৃণমূল থেকে বিজেপিতে যাওয়া আর বিজেপি থেকে তৃণমূলে আসার রাজপথ তৈরি হয়ে গেছে। ফলে কখন কোন ঘটনার ভিত্তিতে, কোন প্রলোভনে বা আতঙ্কে দলটা তাসের ঘরের মত ভেঙে পড়বে তা মমতা নিজেও সম্ভবত জানেন না। ২০২১ বিধানসভা নির্বাচনের আগে যাঁরা ‘দলে থেকে কাজ করতে পারছি না’ বলে চলে গিয়েছিলেন, তাঁদের অধিকাংশই নির্বাচনে পরাজিত হয়ে ফিরে এসেছেন। তাঁদের যুক্তি না হয় বোঝা গেল। তাঁরা যে কোনো মূল্যে জয়ী দলে থাকতে চান, তৃণমূল হেরে গেলে ফিরতেন না। কিন্তু মমতা যে তাঁদের ফিরিয়ে নিলেন, এ থেকে কি প্রমাণ হয় না যে তাঁর ঘর আসলে তাসের ঘর? ক্ষমতার ঠেকনা দিয়ে খাড়া রাখা হয়েছে, সরিয়ে নিলেই হুড়মুড়িয়ে ভেঙে পড়বে? মুকুল রায় যে শ্রডিংগারের বেড়ালের মত বিজেপিতেও আছেন আবার তৃণমূলেও আছেন হয়ে থেকে গেলেন – তাও কি এটাই প্রমাণ করে না যে তৃণমূল নেতৃত্বের আশঙ্কা, একটা তাস এদিক ওদিক হলেই বাকিগুলো ভেঙে পড়বে? এমন নড়বড়ে সরকার চালাতে কি মমতা পছন্দ করেন? কোনো নেতারই কি পছন্দ করার কথা? ইডি, সিবিআই, আয়কর বিভাগের জ্বালায় ব্যতিব্যস্ত হওয়ার কথা না হয় ছেড়েই দিলাম।

বিজেপি প্রধান বিরোধী হয়ে যাওয়ায় শাসক হিসাবে তৃণমূলের কিছু সুবিধা নিশ্চয়ই হয়েছে। যেমন, বিধানসভায় কাজের বিতর্ক প্রায় হয়ই না। রাজ্য সরকারের কাজ নিয়ে বিরোধী দলনেতা যত কৈফিয়ত চান সবই বিধানসভা ভবনের বাইরে বিভিন্ন চ্যানেলের ক্যামেরার সামনে। তাছাড়া রাজ্য রাজনীতির আলোচ্য বিষয়গুলোই এমন হয়ে গেছে যাতে কাজের কাজ না করলেও চলে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান নিয়ে আলোচনা প্রায় বন্ধ। বাজেটেও কেবল চালু ভাতাগুলোর টাকার অঙ্কটা বাড়িয়ে দিলেই চলে যায়। অযোধ্যার মন্দিরের পালটা দীঘার মন্দিরের কথা হয়। ইমাম ভাতায় কেউ চটে গেলে পুরোহিত ভাতা দিলেই যথেষ্ট। রামনবমীর বিপরীতে বজরংবলী পুজো হয়। তাতেও কাজ হচ্ছে না বুঝলে রামনবমীতে সরকারি ছুটি দেওয়া হয়। তারপরেও খোঁজ করতে হয়, চিরশত্রু বামেরা কত ভোট পাবে। এত নড়বড়ে, পরনির্ভরশীল, তৃণমূল কংগ্রেস ১৯৯৬ সালেও ছিল না। এই কারণেই ইন্ডিয়া ব্লকে মমতা ছিলেন বটে, কিন্তু এখনো আছেন না নেই, তা দেবা ন জানন্তি।

এখানে একটা মজার কথা স্মর্তব্য। বামফ্রন্ট সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করতে কংগ্রেস-তৃণমূল জোট তৈরির উদ্যোগ নিয়েছিলেন প্রণব মুখার্জি। বহু বছর পরে দেখা যায়, আজীবন কংগ্রেসি হলেও আরএসএস তাঁকে রীতিমত শ্রদ্ধা করে। নিজেদের অনুষ্ঠানে বক্তা হিসাবে আমন্ত্রণ জানায়, তিনি সে আমন্ত্রণ গ্রহণ করে বক্তৃতাও দিয়ে আসেন। ২০১৯ সালে বিজেপির সরকার তাঁকে ভারতরত্ন পুরস্কারও দেয়।

জনতা দল ইউনাইটেড
বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ডে আর যা-ই ঘটে যাক না কেন, সূর্য পূর্ব দিকে উঠবেই আর নীতীশ কুমারই বিহারের মুখ্যমন্ত্রী থাকবেন। ব্যাপার কতকটা এরকমই দাঁড়িয়েছে। দাঁড়াত না, যদি মণ্ডল রাজনীতির সন্তান, লালুপ্রসাদের এক সময়কার সতীর্থ নীতীশ বারবার বিজেপির সঙ্গে ঘর না করতেন। বিহারে গত বিধানসভা নির্বাচনে জিতে আরও একবার মুখ্যমন্ত্রী হয়েও একসময় তাঁর আশঙ্কা হল, নিজের চেয়ার বাঁচাতে গিয়ে দলটা চলে যাচ্ছে বিজেপির পেটে। তাই পালটি খেয়ে পুরনো বন্ধু লালু, পুরনো শত্রু কংগ্রেস আর বামপন্থীদের সঙ্গে জোট করে মুখ্যমন্ত্রী রইলেন। সাপও মরল, লাঠিও ভাঙল না। তবে বোধহয় এবার আরও বড় স্বপ্ন ছিল। তাই উদ্যোগ নিয়ে বিজেপিবিরোধী দলগুলোকে একজোট করে ইন্ডিয়া ব্লক তৈরি করলেন। তাঁর প্রবীণতাকে সম্মান দিয়ে সকলে আহ্বায়ক হিসাবে তাঁকে মেনেও নিল। তারপর ‘কী হইতে কী হইয়া গেল’, নীতীশ হঠাৎ একদিন সকালে আবার এনডিএ-তে ফিরে গেলেন। বিকেলবেলা নতুন সরকারের মুখ্যমন্ত্রীও হয়ে গেলেন।

উপমুখ্যমন্ত্রী হিসাবে তেজস্বী বন্ধুপুত্রের তেজ সহ্য হল না, নাকি রাহুল গান্ধী যেমন বলেছেন – ইডি, সিবিআই বা আয়কর বিভাগের ভয়ে নীতীশ এমনটা করলেন, তা হয়ত ভবিষ্যতের কোনো ঐতিহাসিক খুঁজে বার করবেন। তবে সমস্ত রাজনৈতিক বিশ্লেষকই বলছেন, বিহারের মানুষের কাছে নীতীশের এবং তাঁর দলের আর কোনো বিশ্বাসযোগ্যতা অবশিষ্ট নেই। লোকসভায় যা ভোট পাবেন সে-ও মোদীর কল্যাণে, আর আগামী বিধানসভা নির্বাচনে নাকি তাঁর দলকে খুঁজে পাওয়াই মুশকিল হবে। এতদিন মুখ্যমন্ত্রী থাকাকালীন যে নীতীশ বহু ভাল কাজ করেছেন তা বিরোধীরাও অস্বীকার করেন না। কিন্তু সেসবই নাকি এখন মূল্যহীন হয়ে পড়েছে ভোটারদের কাছে। সম্ভবত নীতীশও তা জানেন, নইলে কেবলই সঙ্গী খুঁজে হয়রান হবেন কেন? একলা লড়তে ভয় পাবেন কেন?

বিজু জনতা দল
বিজু পট্টনায়ক ওড়িশার প্রবাদপ্রতিম নেতা। একসময় কংগ্রেসে ছিলেন, পরে ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে সংঘাতে কংগ্রেস ছেড়ে বেরিয়ে আসেন, জনতা পার্টিতে যোগ দেন, পরবর্তীকালে জনতা দলে। ওড়িশার এই প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীর ছেলে নবীনই বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী এবং বিজুর নামাঙ্কিত দলের একমেবাদ্বিতীয়ম নেতা। তিনি বিদেশে পড়াশোনা করেছেন এবং শোনা যায় ওড়িয়া ভাষায় ভাল করে কথাও বলতে পারেন না। তবু ওড়িশা রাজ্যটাকে এই শতকের শুরু থেকে চালিয়ে যাচ্ছেন প্রায় বিরোধীশূন্য অবস্থায়। কংগ্রেস ফিকে হয়ে গেছে, বিজেপি সেই জায়গায় উঠে এসেছে। উঠে আসার পিছনে নবীন স্বয়ং। ১৯৯৭ সালে জনতা দল ভেঙে বেরিয়ে নতুন দল গঠন করেই তিনি এনডিএ-তে যোগ দেন এবং কেন্দ্রীয় মন্ত্রীও হয়ে যান। ওড়িশায় ক্ষমতা দখলও করেন বিজেপির সঙ্গে জোট বেঁধেই। ২০০৯ লোকসভা ভোটের আগে বিজেপির বিরুদ্ধে সাম্প্রদায়িকতার অভিযোগ তুলে এনডিএ ত্যাগ করলেও সংসদে বড় বড় ইস্যুতে নবীনের দলের সাংসদরা কখনো বিজেপির বিরুদ্ধাচরণ করেননি। জাতীয় রাজনীতি নিয়ে নবীন প্রায় কথাই বলেন না। বিজেপিও, কোনো অজ্ঞাত কারণে, অন্যান্য রাজ্যে ক্ষমতা দখল করার জন্যে যতখানি আক্রমণাত্মক হয়েছে, ওড়িশায় আজও হয়নি। পশ্চিমবঙ্গ বা দক্ষিণ ভারতের অন্য রাজ্যগুলোর মত কেন্দ্রীয় প্রকল্পের টাকা আটকে দিয়েছে বলেও চট করে শোনা যায় না। প্রাকৃতিক বিপর্যয় রোধে ওড়িশা সরকার আন্তর্জাতিক মানের কাজ করেছে। তবে ওড়িশায় আদিবাসীদের উচ্ছেদ করে শিল্প-টিল্প দিব্যি হয়, স্কুলে মিড ডে মিল দেওয়ার টাকা থাকে না, শিক্ষকরা উপযুক্ত পারিশ্রমিক পান না, তা নিয়ে আন্দোলনও করেন। এদিকে সরকার ভুবনেশ্বরে ঝাঁ চকচকে হকি স্টেডিয়াম বানায়, ভারতীয় হকি দলের স্পনসর হয়। অন্যান্য অবিজেপিশাসিত রাজ্যে এমন হলে গোদি মিডিয়া সে রাজ্যের সরকারকে তুলে আছাড় মারে। ওড়িশাকে কিন্তু দেখতেই পায় না। ওই রাজ্যে লোকসভার বছরেই বিধানসভা নির্বাচন হয়। ২০১৪ আর ২০১৯ – দুবারই দেখা গিয়েছিল বিধানসভায় বিজেডি হইহই করে জিতেছে আর লোকসভায় বিজেপি বেশ কয়েকটা আসন পেয়েছে।

এতদিন এই শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান চালিয়ে হঠাৎ এবার ভোটের আগে কোনো কারণে নবীন বুঝতে পেরেছেন, তাঁর অজান্তেই তাঁর রাজ্য বিজেপির গ্রাসে চলে যাচ্ছে। তাই আসন সমঝোতার কথাবার্তা চালিয়েও শেষ মুহূর্তে আলাদা লড়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তবে নেতাদের বিজেপি গমন কিন্তু ঠেকাতে পারেননি। নবীনের দলের বেশ কয়েকজন বিধায়ক এবং অন্যান্য নেতা বিজেপিতে চলে গেছেন। তার মধ্যে একজন ছবারের সাংসদ, আরেকজন পদ্মশ্রী প্রাপ্ত আদিবাসী নেত্রী। ভোটের ফল বেরোলেই বোঝা যাবে নবীন ঘর সামলাতে পারলেন, নাকি নীতীশের মত অবস্থা হল।

তেলুগু দেশম, ওয়াইএসআর কংগ্রেস
ব্রিগেডের যে সভায় ফারুক আবদুল্লা জ্বালাময়ী বক্তৃতা দিয়েছিলেন, সেই সভায় চন্দ্রবাবু নাইডুও ছিলেন। তেলুগু দেশমের জন্মও কংগ্রেসবিরোধিতার মধ্যে দিয়ে, ইন্দিরার আমলে। জন্মদাতা ছিলেন চন্দ্রবাবুর শ্বশুরমশাই, তেলুগু সিনেমার এককালের জনপ্রিয় নায়ক, এন টি রামারাও। তাঁর মতই চন্দ্রবাবুও জাতীয় স্তরে তৃতীয় শক্তির অন্যতম নেতা হয়ে উঠেছিলেন। কিন্তু ১৯৯৯ সালে কেন্দ্রে বাজপেয়ীর পাকাপোক্ত সরকার হতেই চন্দ্রবাবুর কংগ্রেসবিরোধিতা বিজেপিবিরোধিতার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়ায়। তাছাড়া তিনিও নবীনের মত ‘উন্নয়নমুখী’ মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন অবিভক্ত অন্ধ্রপ্রদেশের। অতএব কেন্দ্রের সঙ্গে সংঘাতে যাবেন কেন? বিশ্বায়নের প্রথম যুগে শহরে মাখনের মত রাস্তা আর গাদা গাদা তথ্যপ্রযুক্তি শিল্পকেই যারা উন্নয়ন মনে করে তাদের মতে দেশের সেরা মুখ্যমন্ত্রীদের একজন ছিলেন চন্দ্রবাবু। কিন্তু সে মলাট ছিঁড়তে বেশি সময় লাগেনি। অন্ধ্রের গ্রামে যে উন্নয়নের আলো বিশেষ পৌঁছয়নি তা বোঝা যায় ২০০৪ সালে তাঁর ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার মধ্যে দিয়ে। তার একবছর আগেই একটুর জন্যে প্রাণে বেঁচেছেন। পিপলস ওয়ার ল্যান্ডমাইন পেতে রেখেছিল তাঁর জন্যে।

২০১৪ সালে তেলেঙ্গানা আলাদা রাজ্য হয়ে যাওয়ার পর অন্ধ্রপ্রদেশের প্রথম নির্বাচনে বিজেপির সঙ্গে জোট বেঁধে ক্ষমতায় ফেরেন চন্দ্রবাবু। কিন্তু ২০১৮ সালে বিজেপির সঙ্গে সম্পর্ক ভেঙে যায় কেন্দ্র অন্ধ্রকে বিশেষ রাজ্যের মর্যাদা না দেওয়ায়। ২০১৯ সালে চন্দ্রবাবুর তেলুগু দেশম কংগ্রেস এবং ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে জোট করে হেরে যায় জগন্মোহন রেড্ডির নতুন দল ওয়াইএসআর কংগ্রেসের কাছে।

জগনের উত্থানও কংগ্রেসের বিরোধিতা করেই। অবিভক্ত অন্ধ্রে চন্দ্রবাবুর পরেই মুখ্যমন্ত্রী হয়েছিলেন ওয়াই এস রাজশেখর রেড্ডি। ২০০৯ সালে কপ্টার দুর্ঘটনায় তাঁর মৃত্যু হয়। জগন সোজা বাবার চেয়ারে বসতে চেয়েছিলেন। কংগ্রেস হাইকমান্ড সে গুড়ে বালি দেওয়ায় নিজেই দল খুলে ফেলেন। ইনিও কেন্দ্রের সঙ্গে সংঘাতে যাওয়ার লোক নন। তাই বিজেপির সঙ্গে জোট না থাকলেও বেশ মিষ্টিমধুর সম্পর্ক ছিল। সংসদে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিলের ভোটাভুটিতে জগনের দল সরকারের পক্ষেই ভোট দিয়ে এসেছে। অন্ধ্রে বিজেপি এখনো ক্ষমতাসীন দলকে চিন্তায় ফেলে দেওয়ার মত শক্তি নয়। সেখান থেকে তাদের কোনো সাংসদ নেই। অনেকে ভেবেছিলেন বিজেপি তুলনায় শক্তিশালী জগনকেই এনডিএ-তে চাইবে। কিন্তু সকলকে অবাক করে কদিন আগেই দুর্নীতির মামলায় হাজতবাস করা চন্দ্রবাবুকে বেছে নিয়েছে বিজেপি, সঙ্গে থাকছে জন সেনা পার্টি।

চন্দ্রবাবু এনডিএ-তে ফিরে যাওয়ার যুক্তি হিসাবে বলেছেন, জগনের অপশাসন থেকে ঘুরে দাঁড়াতে হলে রাজ্যের কেন্দ্রীয় সরকারের সাহায্য লাগবে। বিজেপি কেন জগনকে হতাশ করে তাঁকে বেছে নিল তা খোলসা করেনি। হতে পারে রাজ্য সরকার তাঁকে হাজতবাস করানোয় তিনি ভোটারদের সহানুভূতি পাবেন বলে বিজেপির বিশ্বাস। তবে এতে যা হল, তা হচ্ছে এতদিন সুসম্পর্ক বজায় রাখায় জগনের বিজেপির প্রতি আক্রমণ ভোঁতা হয়ে গেল। অন্যদিকে চন্দ্রবাবু ভাল ফল করলেও বিজেপির অবাধ্য হতে পারবেন না।

ভারত রাষ্ট্র সমিতি
তেলেঙ্গানা আলাদা রাজ্য হওয়ার পিছনে তেলেঙ্গানা রাষ্ট্র সমিতির (এখন ভারত রাষ্ট্র সমিতি) এবং তাদের সর্বোচ্চ নেতা কে চন্দ্রশেখর রাওয়ের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। সেই সুবাদে পরে তারা তেলেঙ্গানায় বিধানসভা নির্বাচন জেতে এবং কেসিআর মুখ্যমন্ত্রী হন। তবে তার আগেই ২০০৯ সালে অবিভক্ত অন্ধ্রের ভোটে তেলুগু দেশম ও বিজেপির সঙ্গে জোট করেছিল বিআরএস। যদিও রাজ্য আলাদা হওয়ার আগে দলটা বলার মত নির্বাচনী সাফল্য পায়নি। বিজেপি কিন্তু কেসিআরের হাত ধরে ঢুকে পড়তে পেরেছে ওই রাজ্যে। ২০২০ সালে রাজধানী হায়দরাবাদের পৌর নির্বাচনে বিজেপি সর্বশক্তি দিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে এবং দ্বিতীয় বৃহত্তম দল হয়। তখন মনে করা হয়েছিল তেলেঙ্গানায় বিআরএসকে ক্ষমতাচ্যুত করে বিজেপি ক্ষমতা দখল করবে। শেষপর্যন্ত তা হয়নি এবং কংগ্রেস অনেক পিছন থেকে শুরু করেও জয়ী হয়। তবে বিজেপির ভোট শতাংশ আগেরবারের চেয়ে দ্বিগুণ হয়েছে। প্রশান্ত কিশোরের মত কেউ কেউ আবার মনে করছেন, লোকসভায় তেলেঙ্গানায় দুই বা এক নম্বরে থাকবে বিজেপি। স্পষ্টত, নিজেদের রাজ্য নিয়ে ব্যস্ত থাকা, বিজেপিকে বিশেষ আক্রমণ না করার সুবিধা বিআরএস পায়নি। বিজেপিই পেয়েছে।

জনপ্রিয় সাংসদ বন্ডি সঞ্জয় কুমারকে নির্বাচনের কয়েক মাস আগে রাজ্য বিজেপির প্রধান পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া এবং ভোটের সপ্তাহখানেক আগে কংগ্রেস নেতাদের বাড়িতে ইডি হানা থেকে অনেকেরই সন্দেহ হয়েছিল যে বিজেপি বিআরএসকে ক্ষমতাচ্যুত করতে চাইছে না। চাইছে কংগ্রেসের ক্ষমতায় আসা আটকাতে। একে বিআরএসের সাময়িক লাভ বলে ভাবা যেতে পারে। তবে ‘দ্য ওয়্যার’ ওয়েবসাইটের এক প্রতিবেদন বলছে, তেলেঙ্গানা বিজেপির নেতারা চেয়েছিলেন কেসিআরের দুর্নীতির বিরুদ্ধে ব্যাপক প্রচার করা হোক। কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব তা হতে দেননি। কেসিআরের মেয়ে কে কবিতাকে দিল্লির মদ কেলেঙ্কারিতে গ্রেফতার করা হোক – এটাও তখনই তাঁদের দাবি ছিল, কান দেওয়া হয়নি। সেই গ্রেফতারি হল লোকসভা নির্বাচনের ঠিক আগে। অর্থাৎ বিআরএস এখন পুরোপুরি বিজেপির কবজায়।

শিবসেনা, ন্যাশনালিস্ট কংগ্রেস পার্টি
শোলে ছবির জয় আর বীরুর বন্ধুত্ব কোনোদিন ভেঙে যেতে পারে একথা কল্পনা করাও কঠিন। তার চেয়েও কঠিন ছিল বিজেপির সঙ্গে শিবসেনার বিচ্ছেদ কল্পনা করা। কিন্তু সেটাও হয়ে গেল মহারাষ্ট্রে গত বিধানসভা নির্বাচনের পর। সংঘ পরিবারের বাইরে বালাসাহেব ঠাকরে প্রতিষ্ঠিত এই দলটার সঙ্গেই বিজেপির সামাজিক, সাংস্কৃতিক ভাবনার মিল ছিল সবচেয়ে বেশি। ফলে রামমন্দির আন্দোলন থেকে শুরু করে অভিন্ন দেওয়ানি বিধি – সমস্ত আদর্শগত ব্যাপারেই শিবসেনার সমর্থন উপভোগ করে এসেছে বিজেপি। মহারাষ্ট্রে একসঙ্গে সরকারও চালিয়েছে। কিন্তু ঠাকরের মৃত্যুর পর দলের কর্তৃত্ব নিয়ে তাঁর ছেলে উদ্ধব আর ভাইপো রাজের মধ্যে কোন্দলে সব গোলমাল হয়ে গেল। দেখা গেল হাবভাবে, আক্রমণাত্মক কথাবার্তায় বালাসাহেবের সঙ্গে তাঁর ছেলের চেয়ে ভাইপোরই মিল বেশি। উদ্ধব তুলনায় নরম। কিন্তু বিস্তর দড়ি টানাটানির পরে উদ্ধবই কর্মীবাহিনীকে নিজের দিকে টেনে রাখতে সফল হলেন। তাই মহারাষ্ট্র নবনির্মাণ সেনা তৈরি করে রাজ এককোণে পড়ে রইলেন (এবার অবশ্য আবার তাঁর ডাক পড়েছে), বিজেপি উদ্ধবকেই আপন করে নিল।

কিন্তু নীতীশ কুমারের মত উদ্ধবও ২০১৯ সালে মহারাষ্ট্র বিধানসভা নির্বাচনে জেতার পরে টের পেলেন, মোদী-শাহের বিজেপি তাঁর উপর ছড়ি ঘোরাতে চাইছে। তাই জোট ভেঙে দিয়ে কংগ্রেস আর শরদ পাওয়ারের ন্যাশনালিস্ট কংগ্রেস পার্টির হাত ধরে মুখ্যমন্ত্রী হলেন। যে কল বিজেপি বহু রাজ্যে করে থাকে, সেই কল করেই এভাবে তুলে আছাড় মারবেন উদ্ধব তা বিজেপি নেতারা ভাবেননি। কিন্তু এই অপমানের শোধ না তুলে ছেড়ে দেওয়ার লোক মোদী-শাহ নন। তাই তিন বছরের বেশি চলতে পারল না উদ্ধবের সরকার। তাঁরই দলের বেশকিছু বিধায়ককে ভাঙিয়ে নিয়ে, রাজ্যপালের বদান্যতায় একনাথ শিন্ডেকে সাক্ষী গোপাল মুখ্যমন্ত্রী করে সরকার গড়ে ফেললেন বিজেপি নেতা এবং মহারাষ্ট্রের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী দেবেন্দ্র ফড়নবিশ। সেখানেই শেষ নয়। বালাসাহেবের উত্তরাধিকারীর হাত থেকে শিবসেনার প্রতীক তীর ধনুকটা পর্যন্ত ছিনিয়ে নিয়েছে নির্বাচন কমিশন। শিন্ডেদের দলত্যাগ বিরোধী আইনে শাস্তি হওয়া দূরে থাক, আইনত তাঁরাই আসল শিবসেনা হিসাবে স্বীকৃতি পেয়ে গেছেন। উদ্ধবের ডান হাত সঞ্জয় রাউতকে বেশ কিছুদিন হাজতবাস করতে হয়েছে।

কংগ্রেসের সঙ্গে জোট করার পরে আজকাল উদ্ধবের দলেরা নেতারা এবং তাঁর ছেলে আদিত্য বেশ ধর্মনিরপেক্ষ গোছের কথাবার্তা বলেন। তাতে সততা কতটা আর অস্তিত্বের সংকট কতটা কে জানে? তবে তরুণরা শিবসেনাকে কংগ্রেসের সঙ্গে জোট করতে দেখে, এক মঞ্চে রাহুল গান্ধী আর উদ্ধবকে বক্তৃতা দিতে দেখে যতই অবাক হোন না কেন, প্রবীণদের ভুলে যাওয়ার কথা নয় যে শিবসেনার উত্থান কংগ্রেসেরই মদতে। উদ্দেশ্য ছিল মুম্বাইয়ের ট্রেড ইউনিয়নগুলোতে প্রবল শক্তিশালী বামপন্থীদের একেবারে শারীরিকভাবে শেষ করে দেওয়া। তারই অঙ্গ হিসাবে বালাসাহেব ‘মারাঠি মানুস’ তত্ত্ব খাড়া করেন অন্য রাজ্য থেকে আসা শ্রমিকদের কোণঠাসা করতে। বামপন্থীদের নিকেশ করতে সফল হয়েছিল বলেই মহারাষ্ট্রের রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছিল শিবসেনা। বিজেপিকেও দীর্ঘকাল বালাসাহেবের মর্জি মত চলতে হয়েছে। কিন্তু যে কোনো কাল্টের যা হয়, তাঁর মৃত্যুর পর শিবসেনারও তাই হয়েছে। উদ্ধবের তাই আপাতত ইন্ডিয়া ব্লকের সদস্য হয়ে প্রগতিশীল হওয়ার চেষ্টা করা ছাড়া উপায় নেই। একনাথ মুখ্যমন্ত্রীর চেয়ারটা পেয়েছেন বটে, কিন্তু প্রত্যেক অনুষ্ঠানে বা সাংবাদিক সম্মেলনেই বিজেপি টের পাইয়ে দেয় যে তিনি ঠুঁটো জগন্নাথ। মানে একদা মুম্বাই শাসন করা শিবসেনা বিজেপির ছোঁয়ায় এখন দ্বিখণ্ডিত এবং বিপন্ন।

অবশ্য উদ্ধবের চেয়েও করুণ অবস্থা মহারাষ্ট্রের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী শরদ পাওয়ারের। তিনি কেবল নিজের রাজ্যের প্রবীণতম নেতাই নন, কংগ্রেসের জাতীয় স্তরের ডাকসাইটে নেতা ছিলেন। দেশের প্রতিরক্ষা মন্ত্রী ছিলেন একসময়, লোকসভায় বিরোধী দলনেতাও। ভারতের ক্রিকেট বোর্ড এবং আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিলের শীর্ষ পদেও আসীন ছিলেন। মহারাষ্ট্রে তাঁর বিপুল সম্পত্তি এবং বিস্তীর্ণ অঞ্চলে তৃণমূল স্তরে একসময় দারুণ জনপ্রিয়তা ছিল। এমন অমিত ক্ষমতাধর শরদকে একেবারে ক্ষমতাহীন করে দিয়েছে তাঁর পুরনো সঙ্গী বিজেপি। বিজেপির সঙ্গে জোট বেঁধে মহারাষ্ট্রে সরকার চালিয়েছে পাওয়ারের দল ন্যাশনালিস্ট কংগ্রেস পার্টি (এনসিপি)। ১৯৯৯ সালে কংগ্রেস থেকে বিতাড়িত হওয়ার কারণটাও বেশ বিজেপিসুলভ। ‘বিদেশিনী’ সোনিয়া গান্ধীর নেতৃত্ব মেনে নিতে তাঁর আপত্তি ছিল। তিনি, প্রয়াত পূর্ণ সাংমা এবং তারিক আনোয়ার মিলে বহিষ্কৃত হওয়ার পর এই পার্টি গড়ে তোলেন। কথিত আছে এর পিছনে মহারাষ্ট্রের বিজেপি নেতা প্রমোদ মহাজনের হাত ছিল। তা সত্যি হোক আর না-ই হোক, ২০১৪-১৯ তাঁর দল যে মহারাষ্ট্রের বিজেপি সরকারকে সমর্থন দিয়েছিল তা তো আর মিথ্যা নয়। আসলে বরাবরই ক্ষমতা যেখানে পাওয়ার সেখানেই থাকতে চেয়েছেন। যে সোনিয়ার জন্যে কংগ্রেস ছাড়লেন তাঁর সভাপতিত্বের কংগ্রেসের নেতৃত্বাধীন ইউপিএ সরকারেই আবার মন্ত্রী হয়ে কাটিয়েছেন ২০০৪-১৪। কিন্তু ২০১৯ সালের পর থেকেই তাঁর সব হিসাব গুলিয়ে দিচ্ছে বিজেপি। তাঁর একসময়ের অনুগত নেতা ছগন ভুজবলকে টেনে নিয়েছে বিজেপি। চূড়ান্ত আঘাতটা অবশ্য এসেছে মাত্র কয়েকদিন আগে। শরদের ভাইপো অজিতকেও নিজেদের দিকে টেনে নিয়েছে বিজেপি। দুর্নীতিতে অভিযুক্ত অজিতকে একেবারে উপমুখ্যমন্ত্রী করে দেওয়া হয়েছে। মড়ার উপর খাঁড়ার ঘায়ের মত শরদের পার্টির প্রতীকও কেড়ে নিয়েছে নির্বাচন কমিশন। বলা হয়েছে অজিতের দলটাই নাকি আসল এনসিপি। তাই দলের প্রতীক অ্যালার্ম ঘড়ি তাঁরাই ব্যবহার করতে পারবেন, প্রতিষ্ঠাতা শরদের দলকে অন্য প্রতীকে লড়তে হবে।

অর্থাৎ ২০২৪ শরদের কাছেও অস্তিত্বের লড়াই। কী কুক্ষণে বিজেপির সঙ্গে ভাব করতে গিয়েছিলেন!

বিআরএসের সাময়িক লাভ বলে ভাবা যেতে পারে। তবে ‘দ্য ওয়্যার’ ওয়েবসাইটের এক প্রতিবেদন বলছে, তেলেঙ্গানা বিজেপির নেতারা চেয়েছিলেন কেসিআরের দুর্নীতির বিরুদ্ধে ব্যাপক প্রচার করা হোক। কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব তা হতে দেননি। কেসিআরের মেয়ে কে কবিতাকে দিল্লির মদ কেলেঙ্কারিতে গ্রেফতার করা হোক – এটাও তখনই তাঁদের দাবি ছিল, কান দেওয়া হয়নি। সেই গ্রেফতারি হল লোকসভা নির্বাচনের ঠিক আগে। অর্থাৎ বিআরএস এখন পুরোপুরি বিজেপির কবজায়।

ডিএমকে, এআইএডিএমকে
এই তালিকায় বিজেপির সঙ্গে সবচেয়ে কম সময়ের সম্পর্ক সম্ভবত তামিলনাড়ুর দ্রাবিড় মুন্নেত্রা কজঘমের (ডিএমকে)। তামিলনাড়ুর রাজনীতি দীর্ঘকাল ধরে আবর্তিত হচ্ছে দুই দ্রাবিড় ভাবাদর্শের দল ডিএমকে আর অল ইন্ডিয়া আন্না দ্রাবিড় মুন্নেত্রা কজঘমের (এআইএডিএমকে) মধ্যে। ১৯৯৮ সালে তৈরি হওয়া বাজপেয়ী সরকারেরও শরিক ছিল জয়ললিতার নেতৃত্বাধীন এআইএডিএমকে। কিন্তু সেই সরকার পড়ে যায় জয়ললিতা সমর্থন প্রত্যাহার করে নেওয়ায়। দাবি ছিল, তাঁর বিরুদ্ধে আয়কর সংক্রান্ত মামলাগুলো প্রত্যাহার করাতে হবে এবং তামিলনাড়ুর ডিএমকে সরকার ফেলে দিতে হবে। দাবি না মেটানোয় জয়ললিতা সরকার তো ভেঙে দিলেন বটেই, ১৯৯৯ সালের ভোটে উল্টে ডিএমকে নেতা এম করুণানিধি জোট করে ফেললেন বিজেপির সঙ্গে।

আজ করুণানিধির নাতি দয়ানিধি স্ট্যালিনের মুখে যে সনাতন ধর্মবিরোধী, বর্ণবাদবিরোধী কথাবার্তা বিজেপির গাত্রদাহের কারণ – সেগুলো নতুন কিছু নয়। ওই ভাবাদর্শই ডিএমকে-র ভিত্তি। সেদিক থেকে একেবারে বিপরীত মেরুতে দাঁড়ানো বিজেপির সঙ্গে কেন জোট করেছিলেন করুণানিধি, তা ভাবলে অবাক হতে হয়। হয়ত তিনি ভেবেছিলেন, কেন্দ্রের সরকারের সঙ্গে বিবাদ করে সরকার টিকিয়ে রাখা মুশকিল হবে। কারণ তামিলনাড়ুতে কোনো পক্ষেরই দুর্নীতি কিছু কম ছিল না। জয়ললিতা ২০০১ সালে মুখ্যমন্ত্রী হয়ে দুর্নীতির মামলায় ৭৮ বছর বয়সী করুণানিধিকে রাত দুটোর সময়ে গ্রেফতারও করিয়েছিলেন। কথিত আছে যে ২০০২ সালের গুজরাট গণহত্যার পর থেকেই ডিএমকে বিজেপির সঙ্গে জোট নিয়ে অস্বস্তিতে ভুগছিল, কারণ তাদের সমর্থকদের উল্লেখযোগ্য অংশ মুসলমান আর খ্রিস্টান। শেষমেশ ২০০৩ সালের ডিসেম্বরে ডিএমকে এনডিএ ত্যাগ করে।

এআইএডিএমকে কিন্তু বারবার বিজেপির কাছে ফিরে গেছে। ১৯৯৯ সালে জোট ভেঙে দেওয়ার পর আবার ২০০৪ সালের লোকসভা নির্বাচনেই তামিলনাড়ুতে বিজেপি-এআইএডিএমকে জোট হয়। কিন্তু সেই জোট শূন্য পায়, বিজেপি অবিলম্বে জোট ভেঙে দেয়। ২০১৬ সালে জয়ললিতার মৃত্যুর পরে যখন এআইএডিএমকে নেতৃত্ব দিশেহারা, তখন আবার বিজেপির সঙ্গে জোট বাঁধে। কিন্তু তাতেও বিজেপি শূন্যের গেরো কাটাতে পারেনি, এআইএডিএমকে জেতে মাত্র একটা আসন। তবু ২০২১ বিধানসভা নির্বাচন পর্যন্ত এই জোট বজায় ছিল। গতবছর মে মাস নাগাদ এআইএডিএমকে মনে করতে থাকে বিজেপির সঙ্গে থাকলে তাদের ক্ষতি হচ্ছে। এআইএডিএমকে নেতা সি পোন্নাইয়ান প্রকাশ্যে বলে দেন যে বিজেপি এআইএডিএমকের ক্ষতি করে নিজেদের সংগঠন বাড়াচ্ছে।

তারপরেও হয়ত জোট ভাঙত না। কিন্তু তামিলনাড়ু বিজেপির প্রধান কে আন্নামালাই গত এক বছরে পরপর এমন কিছু মন্তব্য করেছেন যা এআইএডিএমকে সহ্য করলে তামিল দল হিসাবে তাদের বিশ্বাসযোগ্যতায় আঘাত লাগত। আন্নামালাই প্রথমে এক সাক্ষাৎকারে বলেন তামিলনাড়ুর প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীরা সব আদালতের হাতে শাস্তিপ্রাপ্ত এবং রাজ্যটা ভারতের সবচেয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত রাজ্যগুলোর অন্যতম। এআইএডিএমকে তখনই জেপি নাড্ডা আর অমিত শাহকে বলেছিল আন্নামালাইকে থামাতে, কিন্তু বিজেপি কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। এরপর আন্নামালাই ডিএমকে প্রতিষ্ঠাতা সিএন আন্নাদুরাই সম্পর্কেও কিছু আপত্তিকর মন্তব্য করেন বলে অভিযোগ। শেষমেশ ২৫ সেপ্টেম্বর এআইএডিএমকে এনডিএ ত্যাগ করে।

এখন পর্যন্ত বিভিন্ন প্রাক-নির্বাচনী সমীক্ষা যা বলছে তা এআইএডিএমকে-র জন্য আশাব্যঞ্জক নয়। বিজেপি যে খাতা খুলতে পারবে তা কেউ নিশ্চিত করে বলতে না পারলেও, অনেকে বলছে তাদের ভোট শতাংশ উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে। অর্থাৎ বিজেপির সঙ্গে দীর্ঘ সম্পর্কের মাসুল এখানেও দিতে হচ্ছে আঞ্চলিক দলটাকেই। বিজেপির প্রেমে পড়েছ কি মরেছ।

আরও পড়ুন ভীরুদের হাতে ভারতের গণতন্ত্র রক্ষার ভার, তাই বিরোধী জোট নড়বড়ে

কাশ্মীর থেকে কন্যাকুমারী পর্যন্ত আলোচনা হয়েছে। এবার যেখান থেকে শুরু করেছিলাম সেখানে ফিরে আসি – আম আদমি পার্টি। আজ যেভাবে চক্রব্যূহে ফেলা হয়েছে দলটাকে, গণতন্ত্র নিয়ে বিন্দুমাত্র ভাবনা থাকলে যে কেউ তার বিরুদ্ধে কথা বলবেন। তবে তাদের আজ যে পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হয়েছে তাও কিন্তু একার্থে আরএসএস-বিজেপির সঙ্গে আশনাইয়ের পরেই। ‘ইন্ডিয়া এগেনস্ট করাপশন’ বলে যে সংগঠন থেকে আপ দলের উদ্ভব, তার পিছনে কারা ছিল তা এখন অনেকটা পরিষ্কার। রামলীলা ময়দানের সেই দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলনের গুরু হয়ে বসেছিলেন যে আন্না হাজারে, তাঁর স্বরূপও উদ্ঘাটিত হয়েছে ২০১৪ সালের পর থেকে বিজেপির বিরুদ্ধে বিরাট বিরাট স্মার্ট দুর্নীতির অভিযোগে নীরবতা এবং সম্প্রতি কেজরিওয়ালের গ্রেফতারি সমর্থন করা থেকে। কিরণ বেদির মত মানুষের আসল চেহারাও দেখা গেছে।

তবে হ্যাঁ। সংঘ পরিবারের প্রেমে নানাভাবে সিক্ত দল এবং ব্যক্তিদের ইতিহাস কাজে লাগবে তখনই, যদি ভারতের গণতন্ত্র বাঁচে। নইলে এরা তো স্বখাতসলিলে ডুববেই, এদের বিচার করার মতও কেউ থাকবে না।

পিপলস রিপোর্টারে প্রকাশিত

ভীরুদের হাতে ভারতের গণতন্ত্র রক্ষার ভার, তাই বিরোধী জোট নড়বড়ে

রামমন্দির প্রতিষ্ঠা করেও যে বিজেপি চারশো আসন পাওয়ার ব্যাপারে নিশ্চিন্ত নয় তা পরিষ্কার। বিরোধী নেতাদের ভীরুতাকে তারা হাতিয়ার করতে চাইছে। ইডি, সিবিআইয়ের খাতায় কেবল নীতীশ কুমার বা মমতার দলের নেতা মন্ত্রীদের নামেই অভিযোগ আছে তা তো নয়। কেরালায় সিপিএম নেতা, মন্ত্রীদের গ্রেফতার, জিজ্ঞাসাবাদ চলছে। তামিলনাড়ুতে ডিএমকে নেতাদের বিরুদ্ধেও কার্যকলাপ শুরু হয়েছিল।

জার্মানিতে নাজি পার্টির উত্থান ও পতন নিয়ে মার্কিন সাংবাদিক উইলিয়াম শাইরারের লেখা একখানা বই সারা বিশ্বে সমাদৃত। দ্য রাইজ অ্যান্ড ফল অফ দ্য থার্ড রাইখ নামে এই বইতে শাইরার লিখেছেন, প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর হোহেনজোলার্ন রাজতন্ত্রের অবসান ঘটিয়ে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা ছিল একটা দুর্ঘটনা (“proclaimed by accident!”)। কারণ যুদ্ধে পরাজয়ের পর কাইজার (জার্মান সম্রাট) সিংহাসন ছেড়ে দেন, ওদিকে বার্লিনে তখন জোরদার সাধারণ ধর্মঘট চলছে। রোজা লুক্সেমবার্গ আর কার্ল লিবনেখটের নেতৃত্বে বামপন্থী সমাজতন্ত্রীরা রাশিয়ার মত বিপ্লব করে ফেলতে পারে – এই ভয় চেপে ধরে সোশাল ডেমোক্র্যাট নেতা ফ্রেডরিশ এবার্ট আর ফিলিপ শাইডেমানকে, যাঁরা চ্যান্সেলর প্রিন্স ম্যাক্স অফ ব্যাডেনও পদত্যাগ করে দেওয়ায়, সেই মুহূর্তে দেশের দায়িত্বে ছিলেন। শাইরারের মতে, ওঁরা চেয়েছিলেন যেনতেনপ্রকারেণ রাজতন্ত্র বজায় থাকুক। তা হচ্ছে না দেখে বিপ্লবের আতঙ্কেই ১৯১৮ সালের ৯ নভেম্বর তড়িঘড়ি কোনিগসপ্লাৎজের সামনে জড়ো হওয়ার জনতার সামনে শাইডেমান ঘোষণা করে দেন – জার্মানি এখন থেকে ‘রিপাবলিক’। সেই রিপাবলিকের সংবিধান ঘোষণা হয় আরও একবছর পরে ওয়াইমার বলে একটা শহরে আয়োজিত অ্যাসেম্বলি থেকে। তাই তাকে ওয়াইমার রিপাবলিক বলা হয়ে থাকে। বিপ্লবের সম্ভাবনা দমন করতে যে ওয়াইমার রিপাবলিক দারুণ সফল হয়েছিল তাতে সন্দেহ নেই। এমনকি রোজা আর কার্লকেও একেবারে প্রাণে মেরে দেওয়া হয়েছিল জানুয়ারি মাসেই। কিন্তু এসব করতে গিয়ে গণতন্ত্র যেমন হওয়া উচিত তেমন করে জার্মানিকে গড়ে তোলার দিকে মোটে নজর দেওয়া হয়নি। সামন্তপ্রভু, উচ্চবর্গীয় জার্মান এবং সেনাবাহিনীর লোকজন – যাদের গণতন্ত্র ব্যাপারটা মোটেই পছন্দ ছিল না, তাদের পোষ মানানোর নরম বা গরম – কোনো চেষ্টাই করা হয়নি। ফলে তৈরি হয় এক জগাখিচুড়ি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা, যেখানে সেনাবাহিনীর যতটা প্রভাব প্রতিপত্তি থাকা উচিত তার চেয়ে বেশিই ছিল। সঙ্গে ছিল ক্ষমতাশালী শ্রেণিগুলোর দুর্নীতি। সব মিলিয়ে কেমন অবস্থা হয় সাধারণ জার্মানদের? ভাষান্তরে শাইরার বর্ণিত সেই অসহনীয় পরিস্থিতি এইরকম:

… তবে জনতা বুঝতে পারেনি যে জার্মান মুদ্রার বিপর্যয়ে বৃহৎ শিল্পপতি, সেনাবাহিনী আর রাষ্ট্র কেমন লাভবান হচ্ছিল। তারা শুধু দেখতে পাচ্ছিল যে ব্যাঙ্কে অনেক টাকা থাকলেও খানিকটা গাজর, কিছুটা আলু, কয়েক আউন্স চিনি, এক পাউন্ড ময়দা কেনা যাচ্ছিল না। প্রত্যেকটি ব্যক্তি জানত যে সে দেউলিয়া আর প্রতিদিন খিদের জ্বালা টের পেত। এই যন্ত্রণা আর আশাহীনতার মধ্যে দাঁড়িয়ে তারা যা কিছু হয়েছে তার জন্য গণতন্ত্রকে দায়ী করত।

এমন একটা সময় অ্যাডলফ হিটলারের জন্যে ছিল ঈশ্বরপ্রদত্ত।

গত সোমবার কংগ্রেসের সর্বভারতীয় সভাপতি মল্লিকার্জুন খড়্গে ভুবনেশ্বরে এক সভায় বলেছেন, কিছু নেতা এবং সাধারণ মানুষ যদি ভীরুতা অবলম্বন করেন তাহলে সংবিধান ও গণতন্ত্রের বাঁচা শক্ত। তার আগেরদিনই নীতীশ কুমার কংগ্রেস, রাষ্ট্রীয় জনতা দল এবং বাম দলগুলোর সমর্থন ছেড়ে বেরিয়ে ফের বিজেপির সঙ্গে জোট করে আরও একবার বিহারের মুখ্যমন্ত্রী হিসাবে শপথ নিয়ে ফেলেছেন। ফলে বোঝা শক্ত নয়, খড়্গের আঙুল কার দিকে ছিল। খড়্গে অবশ্য রাখঢাক করেননি, শুধু নীতীশের দিকে আঙুল তুলেও থামেননি। নীতীশ চলে যাওয়ায় ইন্ডিয়া জোট দুর্বল হবে না বলেছেন, একইসঙ্গে ওড়িশার মুখ্যমন্ত্রী নবীন পট্টনায়কেরও নিন্দা করেছেন বিজেপির বিরুদ্ধে না দাঁড়ানোর জন্যে। দেশের সংকট মুহূর্তে কিছু রাজনীতিবিদের ভীরুতার কী দাম একটা দেশকে দিতে হয় তা শাইরারের বইয়ের যে অংশ নিয়ে আলোচনা করলাম তা পড়লেই বোঝা যায়। তবে খড়্গে সঠিকভাবেই চিহ্নিত করেছেন যে বিজেপির বিরোধী রাজনৈতিক শক্তিগুলোর মধ্যে একা নীতীশই ভীরু নন।

বস্তুত, ভীরুদের প্রত্যেককে চিহ্নিত করলে ইন্ডিয়া জোট আরও দুর্বল হয়ে পড়বে, আখেরে বিজেপির বিরুদ্ধে লড়াইয়েরই ক্ষতি হবে – এই আশঙ্কাতেই সম্ভবত খড়্গে আর কারোর নাম করেননি। নইলে নিঃসন্দেহে অরবিন্দ কেজরিওয়ালের নামও করতে হত। তিনি ইন্ডিয়া জোটে আছেন, অথচ তাঁর দলের শাসনে থাকা পাঞ্জাবের মুখ্যমন্ত্রী ইতিমধ্যেই ঘোষণা করে দিয়েছেন – পাঞ্জাবে তাঁরা একাই লড়বেন, কংগ্রেসকে কোনো আসন ছাড়বেন না।

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নামও করতে হত। তাঁর দীর্ঘদিনের অভিযোগ ছিল – কংগ্রেস দাদাগিরি করে, কংগ্রেস বিজেপির বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ লড়াই করার ব্যাপারে আন্তরিক নয়। কংগ্রেস ইন্ডিয়া জোটে এল, তাঁকে জোটের মিটিংয়ে একেবারে রাহুল গান্ধীর পাশে জায়গাও দেওয়া হল। অথচ কোনো মিটিংয়ে তিনি নিজে যান না, কখনো কোনো প্রতিনিধিকেও পাঠান না, কখনো আবার সংযুক্ত ঘোষণাপত্রে তাঁর দলের স্বাক্ষর থাকে না। গত কয়েকদিনে আবার সটান বলে দিয়েছেন, ইন্ডিয়া জোটে আছেন দেশে। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গে একাই বিজেপির বিরুদ্ধে লড়বেন। ত্রিপুরা, মেঘালয়, গোয়া ইত্যাদি নির্বাচনে লড়তে গিয়ে আদৌ সুবিধা করতে না পারার পরেও তিনি রাজ্যের বাইরে নিজের শক্তি সম্পর্কে কী করে আত্মবিশ্বাসী হচ্ছেন তা বোঝা শক্ত। রাহুলের ভারত ন্যায় যাত্রা মমতার রাজ্যে ঢুকে পড়েছে, অথচ তৃণমূল কংগ্রেসের দিক থেকে তাতে সঙ্গত করার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। উলটে কংগ্রেস অভিযোগ করছে তৃণমূলই নাকি ন্যায় যাত্রার পতাকা ছিঁড়ে দিচ্ছে, রাহুলকে সরকারি গেস্ট হাউসে মধ্যাহ্নভোজন করতে দেওয়ার সৌজন্যটুকুও দেখানো হচ্ছে না। এর পিছনে ইডি, সিবিআই আতঙ্ক ছাড়া অন্য কিছু কি থাকা সম্ভব? এ যদি ভীরুতা না হয়, তাহলে তো ভাবতে হবে সিপিএম নেতারা যে তৃণমূল-বিজেপি সেটিংয়ের তত্ত্ব খাড়া করেন সেটাই সত্যি। নইলে বিজেপি যে দেশের শত্রু, গণতন্ত্রের শত্রু সেকথা তো খড়্গের মত মমতাও বলে থাকেন। তাহলে মিলেমিশে লড়তে আপত্তি থাকবে কেন? ইন্ডিয়া জোটে তাঁর চেয়ে বেশি সিপিএমকে গুরুত্ব দেওয়া হয় – এ তো অভিমানের কথা। এই কি মান-অভিমানের সময়? তাও যদি অভিমানের ভিত্তি থাকত। সিপিএমের সাংসদ সংখ্যা তৃণমূলের ধারেকাছে নয়। তাদের নেতা সীতারাম ইয়েচুরি মিটিংয়ে গুরুত্ব পেলেন কি পেলেন না তাতে কী-ই বা এসে যায়?

আরও পড়ুন মুখ্যমন্ত্রীর আরএসএস: বিশ্বাসে মিলায় বস্তু 

রামমন্দির প্রতিষ্ঠা করেও যে বিজেপি চারশো আসন পাওয়ার ব্যাপারে নিশ্চিন্ত নয় তা পরিষ্কার। বিরোধী নেতাদের ভীরুতাকে তারা হাতিয়ার করতে চাইছে। ইডি, সিবিআইয়ের খাতায় কেবল নীতীশ কুমার বা মমতার দলের নেতা মন্ত্রীদের নামেই অভিযোগ আছে তা তো নয়। কেরালায় সিপিএম নেতা, মন্ত্রীদের গ্রেফতার, জিজ্ঞাসাবাদ চলছে। তামিলনাড়ুতে ডিএমকে নেতাদের বিরুদ্ধেও কার্যকলাপ শুরু হয়েছিল। সম্ভবত স্ট্যালিনের সরকার পালটা এক ইডি অফিসারকে গ্রেফতার করায়, মাদুরাইয়ের ইডি দফতরে হানা দেওয়ায় উৎসাহে ভাঁটা পড়েছে। নীতীশ এনডিএতে ফিরে যাওয়া মাত্রই তেজস্বী যাদবকে ডেকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে, ঝাড়খণ্ডের মুখ্যমন্ত্রী হেমন্ত সোরেনকেও এক মামলায় গ্রেফতার করা হতে পারে বলে হাওয়ায় খবর ভাসছে। ইন্ডিয়া জোটের আরেক শরিক শিবসেনা। তাদের ডাকাবুকো নেতা সঞ্জয় রাউত। তাঁর নামেও মামলা আছে ইডির হাতে, ইতিপূর্বে তাঁকে গ্রেফতারও করা হয়েছিল। দরকার পড়লে শিবসেনার ভীরুতার পরীক্ষাও নিশ্চয়ই নেওয়া হবে।

এবার্ট আর শাইডেমানের ভূমিকা ভারতে কারা পালন করলেন তা তো এখনই বোঝা যাবে না, স্পষ্ট হবে আজকের ইতিহাস যখন লেখা হবে তখন। কিন্তু কৌতূহল হয়, বিরোধী দলগুলো দুর্নীতিমুক্ত হলে বিজেপিবিরোধী জোটের এমন নড়বড়ে অবস্থা হত কিনা। কোনো সন্দেহ নেই, যেসব মামলায় বিভিন্ন দলের নেতাকে অভিযুক্ত করা হচ্ছে তার অনেকগুলোরই ভিত্তি নেই। রাউতকে জামিন দেওয়ার সময়ে যেমন বিচারপতি বলেছিলেন, ওই গ্রেফতারি বেআইনি। যে কোনো দেওয়ানি গোলমালকে আর্থিক দুর্নীতির তকমা দেওয়া চলে না। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হল, গত কয়েক দশকে ভারতের প্রায় সব দলের নেতাদের এত আর্থিক কেলেঙ্কারি প্রকাশিত হয়েছে, যে কোন ক্ষেত্রে পালে সত্যিই বাঘ পড়েছে আর কোথায় স্রেফ বিরোধী শক্তিকে গ্রাস করে নিতে কেন্দ্রীয় এজেন্সি ‘চোর চোর’ বলে চেঁচাচ্ছে – তা বোঝা শক্ত। এই ধোঁয়াশার সুযোগ নিয়ে বিরোধী দলগুলোকে ভোটারদের চোখে আরও ছোট করে দেওয়া এবং সম্ভব হলে দলে টেনে আনা চলছে।

হিটলারের অবশ্য ইডি, সিবিআই ছিল না।

উত্তরবঙ্গ সংবাদে প্রকাশিত

মুখ্যমন্ত্রীর আরএসএস: বিশ্বাসে মিলায় বস্তু

পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী কেবল গুণী মানুষ নন, তাঁর প্রতিভা বহুমুখী। তিনি সাহিত্য রচনা করেন, ছবি আঁকেন, গান লেখেন। তার উপর রাজ্যের প্রশাসন চালাতে হয়। একজন মানুষকে এত কাজ করতে হলে কাগজ পড়ার সময়ের অভাব ঘটা খুবই স্বাভাবিক। নিশ্চয়ই প্রতিদিন কাগজ পড়ার সময় মুখ্যমন্ত্রী পান না। পেলে চোখে পড়ত কলকাতা থেকে প্রকাশিত দ্য টেলিগ্রাফ কাগজের একটা খবর, যার শিরোনাম ‘RSS yet to clear air on bombing claim affidavit’। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কংগ্রেসের মিডিয়া বিভাগের প্রধান পবন খেরা রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের (আরএসএস) এক প্রাক্তন প্রচারকের মহারাষ্ট্রের নানদেড় জেলা ও সেশনস আদালতে জমা দেওয়া হলফনামা প্রকাশ্যে এনেছেন। সেই হলফনামায় যশবন্ত শিন্ডে নামক ওই লোকটি দাবি করেছে, সংঘ পরিবারের সদস্য সংগঠনগুলো দেশের বিভিন্ন জায়গায় বোমা বিস্ফোরণ ঘটিয়ে সংবাদমাধ্যমের একাংশ এবং পুলিস প্রশাসনের সহযোগিতায় তার দোষ মুসলমান সম্প্রদায়ের ঘাড়ে চাপিয়েছে। ফলে ২০১৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে বিজেপি লাভবান হয়েছে।

খবরটা মুখ্যমন্ত্রীর চোখ এড়িয়ে গিয়ে থাকতেই পারে, কারণ এ নিয়ে কোনো চ্যানেলে কোনো বিতর্কসভা বসেনি। কলকাতার অন্যান্য তথাকথিত উদার খবরের কাগজগুলোতেও আতসকাচ দিয়ে খুঁজে দেখতে হবে এই খবর। তাছাড়া কংগ্রেস তো বানিয়েও বলতে পারে। কারণ তারা তৃণমূল কংগ্রেসকে বিজেপির প্রধান বিরোধী হয়ে উঠতে দিতে চায় না। কিন্তু মুখ্যমন্ত্রীর শক্তিশালী সোশাল মিডিয়া টিম আছে। টুইটারে তাঁর সাত মিলিয়ন ফলোয়ার, ফেসবুকে ৪.৯ মিলিয়ন। সেই সোশাল মিডিয়া টিমের সাহায্য নিলেই মুখ্যমন্ত্রী জানতে পারবেন যে ওই মর্মে হলফনামা সত্যিই ফাইল করা হয়েছে। চাইলে স্বয়ং যশবন্তের মুখ থেকেই হলফনামায় লিখিত অভিযোগগুলো সংক্ষেপে শুনে নিতেও পারবেন। মারাঠি যশবন্তের ভিডিও ইংরেজি সাবটাইটেল সমেত সোশাল মিডিয়ায় ঘুরে বেড়াচ্ছে।

যশবন্তের হলফনামার কথা প্রকাশ্যে এল বৃহস্পতিবার, কলকাতার কাগজের প্রথম পাতায় সে খবর বেরোল শুক্রবার সকালে। সেদিনই সাংবাদিক সম্মেলনে মুখ্যমন্ত্রী বললেন “আরএসএস এত খারাপ ছিল না, এবং এত খারাপ বলে আমি বিশ্বাস করি না।” মুখ্যমন্ত্রী নিশ্চয়ই খবরটা জানতে পারেননি বলেই ওরকম বলেছেন। স্বীকার্য যে যশবন্তের কথাগুলো অভিযোগ মাত্র। কিন্তু যে সংগঠনের একদা প্রচারকরা এই মুহূর্তে দেশের রাষ্ট্রপতি, উপরাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী এবং বহু রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী – তার বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ যে মারাত্মক, সে কথা না বোঝার মত রাজনীতিবিদ মমতা ব্যানার্জি নন। তাছাড়া তিনদিন হয়ে গেল, এখন পর্যন্ত আরএসএস যশবন্তকে মিথ্যাবাদী বলে কোনো বিবৃতি দেয়নি। অবশ্য জবাবদিহি না চাইলে বিবৃতি দেওয়ার প্রশ্ন ওঠে না। ২০০৬ সালের নানদেড় বিস্ফোরণ কাণ্ডে সরকারি সাক্ষী (অ্যাপ্রুভার) হতে চেয়ে আবেদন করেছিল যশবন্ত। আদালত সবেমাত্র সেই আবেদন গ্রহণ করেছে, আরএসএসকে জবাবদিহি করতে তো ডাকেনি। সাংবাদিকদেরই বা ঘাড়ে কটা মাথা, যে এ নিয়ে মোহন ভাগবতকে প্রশ্ন করবে? অতএব আরএসএসের বয়ে গেছে তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ মিথ্যা বলে ঘোষণা করতে। কথায় আছে, বিশ্বাসে মিলায় বস্তু, তর্কে বহুদূর। মুখ্যমন্ত্রী তো বিশ্বাসই করেন না আরএসএস খারাপ। ফলে যতক্ষণ তারা নিজেরা না বলছে “হ্যাঁ, আমরা খারাপ”, মুখ্যমন্ত্রী নিশ্চিন্ত। কিন্তু খটকা অন্যত্র।

“এত খারাপ ছিল না”। এত খারাপ মানে কত খারাপ? তার মানে মুখ্যমন্ত্রী জানেন যে আরএসএস একটু একটু খারাপ? সেই পরিমাণটা কি তাঁর পক্ষে সুবিধাজনক? খারাপ ছিল না মানেই বা কী? আগে যতটুকু খারাপ ছিল তাতে তাঁর আপত্তি ছিল না, এখন বেশি খারাপ হয়ে গেছে – এ কথাই কি বলতে চেয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী? তাঁর কাছে কোনটা ভাল, কোনটা খারাপ তা অবশ্য আমাদের জানা নেই। মহাত্মা গান্ধীকে হত্যা করা কি খারাপ? সে হত্যায় আরএসএস যোগ প্রত্যক্ষভাবে প্রমাণ হয়নি বটে, তবে সেই ঘটনার পরে ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লিখেছিলেন, আরএসএস নেতাদের ভাষণগুলো যে বিষ ছড়িয়েছে তারই পরিণতি গান্ধীহত্যা। তাই ভারত সরকার আরএসএসকে নিষিদ্ধ করে। কে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ছিলেন তখন? সর্দার বল্লভভাই প্যাটেল। জওহরলাল নেহরুর বদলে যিনি প্রধানমন্ত্রী হলে ভারত সোনার দেশ হত বলে আরএসএস এখন দিনরাত ঘোষণা করে। মুখ্যমন্ত্রী নানা কাজে ব্যস্ত থাকেন, তাই ধরে নিচ্ছি অতকাল আগের ব্যাপার তাঁর মনে নেই। তাই তার ভালমন্দ ভেবে দেখেননি। তবে যেহেতু তিনি একজন সাংবিধানিক পদাধিকারী এবং নিজেকে ধর্মনিরপেক্ষ বলে দাবি করেন, সেহেতু ধরে নিতে দোষ নেই যে যশবন্ত শিন্ডে তার হলফনামায় যে ধরনের কার্যকলাপের কথা লিখেছে সেগুলো আমাদের মুখ্যমন্ত্রীর চোখে খারাপই। কারণ কাজগুলো বেআইনি এবং সাম্প্রদায়িক।

এখন কথা হল, যশবন্ত যে অভিযোগ করেছে আরএসএসের বিরুদ্ধে, সে অভিযোগও কিন্তু এই প্রথম উঠল তা নয়। মুখ্যমন্ত্রী কাগজ পড়ারই সময় পান না যখন, বই পড়ার সুযোগ না পাওয়ারই কথা। তবে তাঁর তো পড়ুয়া পারিষদের অভাব নেই। তাঁরা কেউ কেউ নির্ঘাত মহারাষ্ট্র পুলিসের প্রাক্তন ইন্সপেক্টর জেনারেল এস এম মুশরিফের লেখাপত্র পড়েছেন। তাঁর লেখা আরএসএস: দেশ কা সবসে বড়া আতঙ্কবাদী সংগঠন বইতে ২০০৭ থেকে ২০০৯ পর্যন্ত মোট ১৮টা বোমা বিস্ফোরণে আরএসএস, অভিনব ভারত, জয় বন্দেমাতরম, বজরং দল এবং সনাতন সংস্থা – এই পাঁচটা হিন্দুত্ববাদী সংগঠনকে দায়ী করা হয়েছে। মুখ্যমন্ত্রীর পার্ষদরা কেন যে এসব কথা তাঁকে জানাননি! জানলে নিশ্চয়ই আরএসএস খারাপ “ছিল না” – একথা মুখ্যমন্ত্রী অতটা আত্মবিশ্বাসী হয়ে বলতেন না। অবশ্য মুশরিফ যা লিখেছেন তার সমস্তই তো স্রেফ অভিযোগ। মালেগাঁও বিস্ফোরণের প্রধান অভিযুক্ত সাধ্বী প্রজ্ঞা যেভাবে ছাড়া পেয়ে সাংসদ হয়ে গেছেন, তাতে ওসব অভিযোগকে আর আমল দেওয়া চলে কিনা সে প্রশ্ন উঠতেই পারে। তবে আরএসএসের উপর অত্যন্ত জোরালো বিশ্বাস না থাকলে এসব জেনে সংঘ পরিবারের সদস্য নয় এমন এক রাজনৈতিক দলের সর্বময় নেত্রীর কিছুটা সন্দিহান হওয়ার কথা। কিন্তু বাংলার মুখ্যমন্ত্রী নিজের বিশ্বাসে অটল।

রাজনীতিতে দুজন ব্যক্তি, দুটো সংগঠন বা একজন ব্যক্তির সঙ্গে একটা সংগঠনের সম্পর্ক চোখ বন্ধ করে ভরসা করার মত পর্যায়ে পৌঁছনো চাট্টিখানি কথা নয়। বিপদের সময়ে পাশে দাঁড়ানোর ইতিহাস না থাকলে তেমনটা হওয়া শক্ত। সেদিক থেকে মমতার আরএসএসের প্রতি এই বিশ্বাস বুঝতে অসুবিধা হয় না। আজকের মুখ্যমন্ত্রী গত শতকের শেষ দশকে যখন ভারতের প্রাচীনতম রাজনৈতিক দল থেকে বেরিয়ে আসেন, তখন এককালের স্বয়ংসেবক অটলবিহারী বাজপেয়ী আর লালকৃষ্ণ আদবানির স্নেহ না পেলে মমতার পক্ষে আস্ত একখানা রাজনৈতিক দল গড়ে তোলা সম্ভব হত কি? হলেও সদ্যোজাত দলটাই মধ্যগগনে থাকা সিপিএম তথা বামফ্রন্টের বিরোধী হয়ে ওঠার ক্ষমতা রাখে – এ বিশ্বাস কংগ্রেসের ভোটার তথা কর্মীদের মধ্যে প্রতিষ্ঠা করা যেত কি? মাত্র আটজন সাংসদ যে দলের, সেই দলের নেত্রীকে রেল মন্ত্রকের দায়িত্ব দিয়ে পশ্চিমবঙ্গের ভোটারদের প্রভাবিত করার মহার্ঘ সুযোগ দিয়েছিল বিজেপি। শুধু কি তাই? তেহেলকা কাণ্ড প্রকাশিত হওয়ার পরেই সততার প্রতীক মমতা দুর্নীতির বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে এনডিএ ত্যাগ করেন। তা সত্ত্বেও ২০০৩ সালে তাঁকে দপ্তরহীন মন্ত্রী করে ফিরিয়ে নেওয়া হয়। আরএসএস আর বিজেপি আলাদা – এই তত্ত্বে এখনো বিশ্বাস করেন যাঁরা, তাঁদের কথা আলাদা। বাকিরা নিশ্চয়ই মানবেন, এভাবে পাশে থাকার পরেও যদি মমতা আরএসএসকে বিশ্বাস না করতেন তাহলে ভারি অন্যায় হত।

আসলে মমতার আরএসএসে বিশ্বাস ততটা অসুবিধাজনক নয়। তাঁর বারংবার আরএসএস প্রীতি ঘোষণা সত্ত্বেও দেশসুদ্ধ ধর্মনিরপেক্ষ শিবিরের কেষ্টবিষ্টুদের মমতায় বিশ্বাস বরং বৃহত্তর বিপদের কারণ। গত বছর বিধানসভা নির্বাচনে যখন বিজেপির ক্ষমতায় আসা আটকানোই মূল এজেন্ডা হয়ে দাঁড়াল, তখন বামপন্থীদের মধ্যে লেগে গেল প্রবল ঝগড়া। সিপিএম নেতৃত্বাধীন বাম দলগুলো বলতে শুরু করল বিজেপি আর তৃণমূল অভিন্ন, তাই তৃণমূলকে ভোট দেওয়া আর বিজেপিকে ভোট দেওয়া একই কথা। উঠে এল একটা নতুন শব্দ – বিজেমূল। অন্যদিকে নকশালপন্থীরা বলতে লাগল, যেখানে যে প্রার্থী বিজেপির বিরুদ্ধে সবচেয়ে শক্তিশালী তাকে ভোট দিতে। বিজেমূল তত্ত্বের প্রমাণ হিসাবে সিপিএম “দলে থেকে কাজ করতে পারছি না” বলে লাইন দিয়ে তৃণমূল থেকে বিজেপিতে চলে যাওয়া শীর্ষস্থানীয় নেতা, মন্ত্রীদের দেখাতে লাগল। আর যত না তৃণমূল, তার চেয়েও বেশি করে নকশালরা তার জবাবে তালিকা দিতে থাকল, কোন ব্লক স্তরের সিপিএম নেতা বিজেপিতে গেছে, কোন জেলা স্তরের নেত্রী বিজেপিতে যোগ দিলেন। অর্থাৎ দুপক্ষের কেউই তৃণমূল কংগ্রেসের রাজনীতি কী, ধর্মনিরপেক্ষতার প্রশ্নে তাদের বিশ্বাসযোগ্যতা থাকলে কেন আছে বা না থাকলে কেন নেই – সে আলোচনায় গেল না। অথচ ঠিক তখনই ইন্ডিয়া টুডে কনক্লেভে বসে লাইভ অনুষ্ঠানে মুখ্যমন্ত্রী বলছেন “আমি সংঘ পরিবারের বিরুদ্ধে লড়ছি না। ওরা তো নির্বাচনে লড়ে না। ওরা বিজেপিকে সমর্থন করে। আমি লড়ছি বিজেপির সঙ্গে।” এই নেত্রীর দল জয়যুক্ত হল, একমাত্র বিরোধী দল হিসাবে উঠে এল বিজেপি। অর্থাৎ ঘোষিতভাবে আরএসএসের বন্ধু দুটো দলের হাতে চলে গেল বাংলার আইনসভা। অথচ পশ্চিমবঙ্গের ধর্মনিরপেক্ষ বুদ্ধিমানরা উল্লসিত হয়ে ঘোষণা করলেন, বাংলার ধর্মনিরপেক্ষ ঐতিহ্য জিতে গেল। রামমোহন, বিদ্যাসাগর, রবীন্দ্রনাথ জিতে গেলেন, ইত্যাদি।

আরও মজার কথা, নির্বাচনে গোল্লা পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই সিপিএমও পরিত্যাগ করল বিজেমূল তত্ত্ব। আরও এক ধাপ এগিয়ে এ বছর রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে দেশের একমাত্র যে নেতা সর্বদা নাম করে আরএসএসকে আক্রমণ করেন, সেই রাহুল গান্ধীর দল কংগ্রেস থেকে শুরু করে সিপিএম, লিবারেশন সমেত সমস্ত বাম দল সমর্থন করে বসল মমতার পছন্দের প্রার্থীকে। সে আরেক যশবন্ত – বিজেপি থেকে তৃণমূলে এসেছেন। এ থেকে যা প্রমাণিত হয় তা হল, মমতার মত আরএসএস-বান্ধব নয় যে রাজনৈতিক শক্তিগুলো, তারাও ব্যাপারটাকে নির্বাচনী লড়াইয়ের বেশি কিছু ভাবে না।

আরএসএসের কাছে ভারতকে হিন্দুরাষ্ট্র করে তোলা মতাদর্শগত মরণপণ লড়াই। সে লক্ষ্যে পৌঁছতে তারা সাংবিধানিক, অসাংবিধানিক – সবরকম পথই নিতে রাজি। প্রয়োজনে আদবানির মত আগুনে নেতাকে বঞ্চিত করে বাজপেয়ীর মত নরমপন্থীকে প্রধানমন্ত্রী করতে রাজি ছিল। জমি শক্ত হওয়ার পর নরেন্দ্র মোদীর মত কড়া হিন্দুত্ববাদীকে নেতা করেছে, ভবিষ্যতে তাঁকেও আস্তাকুঁড়ে নিক্ষেপ করে আরও গোঁড়া আদিত্যনাথকে সর্বোচ্চ নেতার আসনে বসাতে পারে। বিরোধীরা ওই বিস্তারে ভেবেই উঠতে পারেনি এখনো। এমনকি তথাকথিত কমিউনিস্ট দলগুলোও কেবল স্ট্র্যাটেজি সন্ধানে ব্যস্ত। কোথায় কাকে সমর্থন করলে বা কার সাথে নির্বাচনী জোট গড়লে বিজেপির ক্ষমতায় আসা আটকানো যাবে – এটুকুই তাদের চিন্তার গণ্ডি। সে কারণেই বিজেমূল শব্দটা নির্বাচনের আগে ভেসে ওঠে, পরাজয়ের পর মিলিয়ে যায়। যদি সিপিএমের পক্ষ থেকে সংঘমূল কথাটা বলা হত এবং শূন্য হয়ে যাওয়ার পরেও বলে যাওয়া হত, তাহলে জনমানসে সত্যি সত্যি প্রশ্নচিহ্ন তৈরি হতে পারত। হিন্দুরাষ্ট্র কী, তা হওয়া আটকানো কেন দরকার, আটকানোর ক্ষেত্রে মমতাকে সত্যিই প্রয়োজন, নাকি তিনি হিন্দুত্বের ট্রোজান ঘোড়া – শতকরা ৮০-৯০ জন মানুষ এই মুহূর্তে এসব নিয়ে ভাবছেন না (সোশাল মিডিয়া দেখে যা-ই মনে হোক)। সংঘ পরিবারকে সরাসরি রাজনৈতিক ভাষণে, কর্মসূচিতে আক্রমণ করা হলে ভাবতে বাধ্য হতেন।

বিহারে বিজেপিকে ক্ষমতাচ্যুত করার সুযোগ আসা মাত্রই সমস্ত বাম দল একজোট হয়ে নীতীশকুমারকে সমর্থন করেছে। কেবল লিবারেশন নয়, সিপিএমও। সে জোটে কংগ্রেসও আছে। অথচ নীতীশও মমতার মতই বিজেপির সঙ্গে ঘর করেছেন। শুধু তা-ই নয়, মমতার বিজেপির সাথে শেষ জোট ছিল ২০০৬ সালে। নীতীশ কিন্তু ২০১৬ বিধানসভা ভোটে রাষ্ট্রীয় জনতা দলের সঙ্গে লড়ে জিতেও বিশ্বাসঘাতকতা করে বিজেপির কাছে ফিরে গিয়েছিলেন। কেন নীতীশ আরএসএস-বিরোধী বাম দল এবং কংগ্রেসের কাছে গ্রহণযোগ্য আর কেন মমতা নন, তা নিয়ে কোনো আলোচনাই শুনলাম না আমরা। আলোচনাটা হল না সম্ভবত এইজন্যে, যে বামেরা বা কংগ্রেস নিজেরাই ওসব নিয়ে ভাবে না। বিজেপিকে ক্ষমতা থেকে দূরে রাখতে পারলেই খুশি, শেষমেশ আরএসএসের প্রকল্পই সফল হয়ে যাবে কিনা তা ভেবে দেখার প্রয়োজন বোধ করে না। অথবা ‘যখন হবে তখন দেখা যাবে’ নীতি নিয়ে চলছে।

আসলে কিন্তু মমতায় আর নীতীশে তফাত বড় কম নয়। নীতীশ সুযোগসন্ধানী, ক্ষমতালোভী রাজনীতিবিদ। তারই অনিবার্য ফল হিসাবে ভূতপূর্ব জনতা দলের সঙ্গে, একদা সতীর্থ লালুপ্রসাদের সাথে তাঁর বিচ্ছেদ হয়েছিল। কিন্তু তাঁর রাজনীতির সূতিকাগার হল সমাজবাদী রাজনীতি, নিম্নবর্গীয় মানুষের রাজনীতি। সে কারণেই নীতীশ কখনো বিজেপিকে পুরোপুরি বিশ্বাস করতে পারেননি, বিজেপিও পারেনি। নীতীশ কখনো মমতার মত সোচ্চার আরএসএস বন্দনাও করেননি। কারণ আরএসএস হল ব্রাহ্মণদের দ্বারা পরিচালিত, হিন্দু সমাজের উপর ব্রাহ্মণ আধিপত্য বজায় রাখার জন্য গঠিত সংস্থা। নীতীশের দলের নিম্নবর্গীয় সদস্য, সমর্থকদের সঙ্গে আরএসএসের আড়চোখে দেখার সম্পর্কটুকুই হওয়া সম্ভব। তার বেশি নয়।

অন্যদিকে মমতা ব্রাহ্মণকন্যা। তাঁকে দুর্গা বলে সম্বোধন করতে আরএসএসের কোথাও বাধে না। মমতার রাজনীতির ইতিহাস অন্য দিক থেকেও নীতীশের সঙ্গে মেলে না। বস্তুত যুগপৎ কংগ্রেস বিরোধিতা এবং কমিউনিস্ট বিরোধিতার ইতিহাস সম্ভবত মমতা ছাড়া ভারতের কোনো আঞ্চলিক দলের নেই। তামিলনাড়ুর দ্রাবিড় রাজনীতির ভিত্তিতে তৈরি দলগুলোর স্বভাবতই প্যাথোলজিকাল বাম বিরোধিতা নেই, কিন্তু ঐতিহাসিকভাবে কংগ্রেস বিরোধিতা ছিল। তেলুগু দেশম, তেলেঙ্গানা রাষ্ট্র সমিতি, জগন্মোহন রেড্ডির দল বা ওড়িশার বিজু জনতা দলের জন্ম তৃণমূলের মতই কংগ্রেস ভেঙে। কিন্তু তাদেরও বামেদের সাথে ধুন্ধুমার সংঘাতের ইতিহাস নেই। তাদের এলাকায় বামেদের দুর্বলতা তার কারণ হতে পারে, কিন্তু এ কি নেহাত সমাপতন যে বিন্ধ্য পর্বতের উত্তর দিকে আরএসএস বাদ দিলে তৃণমূলই একমাত্র রাজনৈতিক শক্তি, কমিউনিস্ট এবং কংগ্রেস, দু পক্ষই যাদের ঘোষিত শত্রু? লক্ষণীয়, ২০১১ বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূল আর কংগ্রেসের জোট গড়তে দারুণ উদ্যোগী ভূমিকা নিয়েছিলেন প্রণব মুখার্জি। তাঁর জীবনের শেষ প্রান্তে এসে দেখা গেল, তিনি আরএসএসের বিশেষ শ্রদ্ধাভাজন। সেই জোট বামফ্রন্টকে হারাতে পেরেছিল বটে, কিন্তু পশ্চিমবঙ্গে কংগ্রেসের ভাঙনের গতিও বাড়িয়ে দিয়েছিল।

তাহলে আরএসএসের সাথে সম্পর্ক মমতাকে কী কী দিয়েছে তা বোঝা গেল। এবার আরএসএস কী কী পেয়েছে সে আলোচনায় আসা যাক? রাজনীতিতে তো কেউ “আমি   নিশিদিন তোমায় ভালোবাসি,/ তুমি   অবসরমত বাসিয়ো” গায় না। আরএসএস যা যা পেয়েছে সবকটাই অমূল্য।

১) আরএসএসের দুই ঘোষিত শত্রু মুসলমান আর কমিউনিস্ট। তৃণমূলের উদ্যোগে কমিউনিস্টরা প্রথমে তাদের সবচেয়ে বড় ঘাঁটি থেকে ক্ষমতাচ্যুত, পরে ছত্রভঙ্গ হয়েছে। তার জন্যে আরএসএসের আগমার্কা কোম্পানি বিজেপিকে বিন্দুমাত্র কসরত করতে হয়নি। মুসলমানরা আগে প্রান্তিক ছিলেন, তৃণমূল আমলে বাংলার হিন্দুদের শত্রু হিসাবে চিহ্নিত হয়ে গেছেন। মমতা প্রথমবার ক্ষমতায় এসে ইমাম ভাতা চালু করলেন, বিজেপি প্রায় বিনা আয়াসেই হিন্দুদের বোঝাতে সক্ষম হল, মুসলমানরা মমতার দুধেল গাই। পরে মমতা নিজেই অনবধানবশত (নাকি সচেতনভাবেই?) সেকথা বললেনও। এখন পরিস্থিতি এমন, যে বাম আমলে মুসলমানরা বিভিন্ন এলাকায় বাড়ি ভাড়া পেতেন না, এখন খোদ সল্টলেকে হোটেলের ঘর ভাড়া পান না।

২) মুসলমান তোষণ হচ্ছে – এই প্রোপাগান্ডা হিন্দুদের একটা বড় অংশের বদ্ধমূল ধারণায় পরিণত হয়েছে তৃণমূল শাসনের ১১ বছরে। ইতিমধ্যে বেলাগাম হিন্দু তোষণ চলছে। বিজেপি আজগুবি অনলাইন প্রচার শুরু করল “পশ্চিমবঙ্গে দুর্গাপুজো করতে দেওয়া হয় না”, তৃণমূল সরকার দুর্গাপুজোগুলোকে নগদ অনুদান দিতে শুরু করল। আরএসএস শুরু করল রামনবমীতে অস্ত্র মিছিল, তৃণমূল আরম্ভ করল বজরংবলী পুজো। সুপ্রিম কোর্টের রায়ে অযোধ্যায় রামমন্দির তৈরির পথ খুলে গেল, আরএসএসের প্রতিশ্রুতি পূরণ হল। এদিকে দিদি দীঘায় জগন্নাথ মন্দির নির্মাণের পরিকল্পনা নিলেন। রাজ্যে বিজেপির সরকার থাকলেও এভাবে হিন্দুত্বকে রাজনীতির এজেন্ডায় নিয়ে আসতে পারত কিনা সন্দেহ।

৩) ভারতের একেক রাজ্যের একেকটা বিশিষ্ট গুণ আছে, যা সেই রাজ্যের মানুষের মূলধন। গুজরাটের যেমন ব্যবসা, পাঞ্জাবের কৃষিকাজ। বাংলার ছিল লেখাপড়া, গানবাজনা, সাহিত্য, সিনেমা ইত্যাদি। অন্য রাজ্যের লোকেরা যাকে কটাক্ষ করে এককথায় বলে কালচার। এই কালচার আরএসএসের হিন্দুত্বের একেবারে বিপরীত মেরুর জিনিস। তৃণমূল আমলে সবচেয়ে নির্বিঘ্নে সাড়ে সর্বনাশ ঘটানো গেছে এই কালচারের। বাংলার ছেলেমেয়েরা ফড়ফড় করে ইংরেজি বলতে না পারলেও দেশে বিদেশে গবেষক, অধ্যাপক হিসাবে তাদের দাম ছিল। এখনো সর্বভারতীয় বিজ্ঞান পুরস্কারগুলোর প্রাপকদের তালিকা মাঝে মাঝে সেকথা জানান দেয়। সে দাম ধুলোয় মিশিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা হয়েছে স্কুল, কলেজের চাকরি বিক্রি করে লেখাপড়া লাটে তুলে দিয়ে। নায়ক, নায়িকা, গায়ক, গায়িকারা কাতারে কাতারে বিধায়ক আর সাংসদ হয়ে গেছেন। লেখকরা ব্যস্ত পুষ্পাঞ্জলি দিতে আর চরণামৃত পান করতে। সিনেমার কথা না বলাই ভাল। শৈল্পিক উৎকর্ষ বাদ দিন, পারিশ্রমিকের হাল এত খারাপ যে কলকাতার শিল্পীরা স্রেফ বাংলা ছবিতে, ওয়েব সিরিজে কাজ করে টিকে থাকতে পারবেন কিনা সন্দেহ। মন্ত্রীর বান্ধবীর ফ্ল্যাট থেকে টাকার পাহাড় উদ্ধার হওয়ার ছবি দেখে প্রথম সারির অভিনেতা অনির্বাণ ভট্টাচার্য হা-হুতাশ করছেন, ওই পরিমাণ টাকার অর্ধেক পেলেও বাংলা ছবিগুলো অনেক ভাল করে করা যেত।

কিন্তু এসব গোল্লায় যাওয়ার চেয়েও বড় ক্ষতি হয়েছে। লেখাপড়া, গানবাজনা, সাহিত্য, সিনেমা মিলিয়ে যে বাঙালি মনন ছিল সেটাই নষ্ট হয়ে গেছে। আসল ক্ষতি সেটা। বাঙালি হিন্দু ভদ্রলোকের অন্তত একটা ভান ছিল, যে সে ভারতের অন্য অনেক রাজ্যের লোকেদের মত ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ি করে না। দুর্গাপুজো এলে কদিন পাগলামি করে; নিজের বাড়িতে লক্ষ্মীপুজো, সরস্বতীপুজো, সত্যনারায়ণের সিন্নি চলে। কিন্তু বাইরে সে একজন ধর্মনিরপেক্ষ মানুষ। এখন সেসব গেছে। নতুন ফ্ল্যাটবাড়ি হলে তার গায়ে খোদাই করা হচ্ছে গণেশের মুখ, শিবলিঙ্গ বা স্বস্তিকা। কলিং বেলে বেজে উঠছে “ওঁ ভূর্ভুবঃ স্বঃ”। অক্ষয় তৃতীয়ায় এখনো গণেশপুজো এবং হালখাতা হয় এমন দোকান খুঁজে পাওয়া দায়, অথচ গণেশ চতুর্থী এক দশকের মধ্যে ঘরে ঘরে পৌঁছে গেছে। শিগগির পশ্চিমবঙ্গ সরকারের অনন্ত ছুটির তালিকায় যোগ হবে নির্ঘাত। অল্পবয়সী বাঙালি কথা বলছে হিন্দি মিশিয়ে, ছোটরা স্কুলে দ্বিতীয় ভাষা হিসাবে শিখছে হিন্দি। বঙ্গভঙ্গের নাম করতেই লর্ড কার্জনের ঘুম কেড়ে নেওয়া বাঙালি নিজে নিজেই প্রায় উত্তর ভারতীয় হিন্দু হয়ে গেল তৃণমূল আমলে। এই সাংস্কৃতিক অনুপ্রবেশ তামিলনাড়ুতে কিছুতেই হয়ে উঠছে না আরএসএসের দ্বারা। কেরালায় মার খেতে হচ্ছে, এমনকি নিজেদের হাতে থাকা কর্ণাটকেও করতে গিয়ে অনবরত সংঘাত হচ্ছে। বাংলায় কিন্তু ওসবের দরকারই হচ্ছে না। বিনা রক্তপাতে বাঙালি বাঙালিয়ানা বিসর্জন দিচ্ছে।

আরও পড়ুন শাহেনশাহ ও ফ্যাসিবিরোধী ইশতেহার

এর বেশি আর কী চাইতে পারত আরএসএস? মমতা হিন্দুরাষ্ট্রের জন্য রুক্ষ, পাথুরে বাংলার মাটিতে হাল চালিয়ে নরম তুলতুলে করে দিয়েছেন। বীজ বপনও সারা। ফসল তোলার কাজটা শুধু বাকি।