রেউড়ি সংস্কৃতি: যে গল্পে ডান-বাম গুলিয়ে গিয়েছে

১৯৯১ পরবর্তী যুগে দিনরাত মন্ত্রের মত কানের কাছে বলে বলে যে কয়েকটি কথা আমাদের মর্মে প্রবেশ করিয়ে দেওয়া হয়েছে তার অন্যতম হল, কোনও পরিষেবা বা পণ্য বাজার থেকে পয়সা দিয়ে না কিনে পাচ্ছে মানেই সেটা দান।

আমি কোন পথে যে চলি, কোন কথা যে বলি
তোমায় সামনে পেয়েও খুঁজে বেড়াই মনের চোরা গলি।

এই প্রকল্প বারবার বিরোধীদের ফাঁপরে ফেলতে সমর্থ হয়। এমন গতিতে এমন এক লেংথে পিচ পড়ে মোদি সরকারের সিদ্ধান্তগুলো, যাতে ব্যাকফুটে যাব না ফ্রন্টফুটে খেলব ঠিক করতে করতেই বিরোধীদের ব্যাট-প্যাডের ফাঁক দিয়ে বল গলে গিয়ে উইকেট ভেঙে দেয়। এই মুহূর্তে যেমন কল্যাণমূলক রাষ্ট্রের যে শেষ চিহ্নটুকু ভারত রাষ্ট্রের মধ্যে রয়েছে, সেটুকুও মুছে ফেলতে সাঁড়াশি আক্রমণ শুরু হয়েছে।

প্রাক্তন বিজেপি মুখপাত্র অশ্বিনী উপাধ্যায় সুপ্রিম কোর্টে জনস্বার্থ মামলা দায়ের করেছেন নির্বাচনী প্রচারে যেসব রাজনৈতিক দল ভোটারদের আকর্ষণ করতে “freebies” দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেয়, তাদের নির্বাচনী প্রতীক ফ্রিজ করে দেওয়া এবং রেজিস্ট্রেশন বাতিল করার দাবিতে। পিটিশনার বলেছেন “irrational freebies” অর্থাৎ মুফতে অযৌক্তিক সুযোগসুবিধা বিলোবার আগে তার অর্থনৈতিক প্রভাব আলোচনা করতে হবে। এই মামলার শুনানিতে ১১ আগস্ট মহামান্য প্রধান বিচারপতি এন ভি রামান্না বলে বসলেন, অর্থনীতির ক্ষতি আর মানুষের কল্যাণের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা দরকার। অবশ্য তিনি যোগ করেছেন “আমি রেজিস্ট্রেশন বাতিল করার দিকটা দেখতে চাই না। সেটা অগণতান্ত্রিক। হাজার হোক, ভারত তো একটা গণতন্ত্র।” তার আগেই ৩ আগস্ট বিচারকরা বলেছিলেন, ব্যাপারটা গুরুতর। অতএব নীতি আয়োগ, অর্থ কমিশন, আইন কমিশন, রিজার্ভ ব্যাঙ্ক এবং শাসক ও বিরোধী দলগুলোর প্রতিনিধিদের নিয়ে একটা কমিটি তৈরি হোক মুফতের সুযোগসুবিধার নানা দিক নিয়ে আলোচনা করতে। ১৭ আগস্ট ছিল এ যাবৎ এই মামলার শেষ শুনানি, আগামী সপ্তাহে ফের শুনানি হওয়ার কথা। মজার ব্যাপার, ১১ তারিখ প্রধান বিচারপতি নিজেই সন্দেহ প্রকাশ করেছিলেন, এ বিষয়ে আদালতের হস্তক্ষেপ করার কতটুকু অধিকার আছে তা নিয়ে। অথচ সেই যুক্তিতে পিটিশন বাতিল করে দেননি।

এই মামলার শুনানিতে দেশের সলিসিটর জেনারেল তুষার মেহতার কিছু মন্তব্য একবার দেখে নেওয়া যাক। “এই ফ্রিবি কালচারটাকে এখন শিল্পের পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে আর নির্বাচন এখন এই নিয়ে লড়া হয়। ফ্রিবিগুলোকে যদি জনকল্যাণ বলে ধরা হয়, তাহলে বিপর্যয় ঘটবে। এটাই যদি নর্ম হয়ে দাঁড়ায়, তাহলে মাননীয় বিচারকরা নর্মগুলো ঠিক করে দিন। আইনসভা যতক্ষণ না কিছু করছে, মাননীয় বিচারকরা কিছু নর্ম ঠিক করে দিতেই পারেন।”

এই বিতর্কে দুটো জিনিস বিশেষভাবে লক্ষ করার মত। প্রথমত, ফ্রিবি বলতে স্পষ্টতই বোঝানো হচ্ছে সরকার সাধারণ মানুষকে যেসব সুযোগসুবিধা দেয় সেগুলোকে। কারণ প্রধান বিচারপতি বলেছেন অর্থনীতির ক্ষতি (“economy losing money”) আর মানুষের কল্যাণ (“welfare of the people”)— দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য রাখা দরকার। অর্থাৎ বলেই দেওয়া হল অর্থনীতির কাজ মানুষের কল্যাণ করা নয়। দ্বিতীয়ত, কেন্দ্রীয় সরকারের প্রতিনিধি তুষার ইঙ্গিত দিয়েছেন আইনসভা ফ্রিবি সম্পর্কে কিছু করবে। অর্থাৎ কোনও আইন প্রণয়ন করবে। সে করতেই পারে। লোকসভায় যে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা আছে বিজেপির, তাকে ব্যবহার করে এবং রাজ্যসভায় বিল পাশ করাতে অসুবিধা হলে বিরোধী সাংসদদের সাসপেন্ড করে দিয়ে যে কোনও আইনই কেন্দ্রীয় সরকার করে ফেলতে পারে। কিন্তু দেখা যাচ্ছে সরকারের সে পর্যন্তও তর সইছে না। তুষার চাইছেন তার আগেই আদালত কিছু নিয়মকানুন ঘোষণা করুক।

এই জনস্বার্থ মামলা এত গুরুত্বপূর্ণ কেন? কারণ এই মামলা দায়ের হওয়ার কিছুদিন আগেই, গত মাসের শেষদিকে, উত্তরপ্রদেশে বুন্দেলখণ্ড এক্সপ্রেসওয়ে উদ্বোধন করতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেছিলেন, দেশে “রেউড়ি কালচার” চালু হয়েছে। রেউড়ি, অর্থাৎ মিষ্টি, বিতরণ করে ভোট কিনে নেওয়ার চেষ্টা হচ্ছে। দেশের পক্ষে এই সংস্কৃতি খুব বিপজ্জনক। দেশের মানুষকে, বিশেষ করে যুবসমাজকে, এই কালচার সম্পর্কে সতর্ক থাকতে হবে। রেউড়ি কালচারের লোকেরা এক্সপ্রেসওয়ে, বিমানবন্দর বা ডিফেন্স করিডোর বানাতে পারবে না।

রেউড়ি মন্তব্যের পিছনের ছকটা খুব পরিষ্কার। প্রধানমন্ত্রীর উন্নয়নের সংজ্ঞা ঘোর নব্য-উদারবাদী। কর্মসংস্থান, শিক্ষা, স্বাস্থ্য— এসবের উন্নতি হল কি হল না তা নিয়ে তাঁর বিন্দুমাত্র মাথাব্যথা নেই। উন্নয়ন বলতে তিনি বোঝেন এক্সপ্রেসওয়ে, বিমানবন্দর, ডিফেন্স করিডোর। নব্য উদারবাদী অর্থনীতিতে ভর্তুকি যেমন একটি অশ্লীল শব্দ, তেমনই ভারতের বিভিন্ন রাজ্যের সরকারগুলো গরিব নাগরিকদের জন্য যেসব আর্থিক সাহায্যের ব্যবস্থা করেছে বা বিভিন্ন পরিষেবার মূল্যে বিশেষ ছাড় দিয়ে থাকে— সেগুলোও ক্ষতিকর, অবান্তর। তাই ওগুলোকে রেউড়ি বলা। মতাদর্শগতভাবেই মোদি সরকার ওসবের বিরোধী। সেটা বুঝতে অবশ্য কারও বাকি নেই। ২০১৪ সালের পর থেকে মহাত্মা গান্ধি ন্যাশনাল রুরাল এমপ্লয়মেন্ট গ্যারান্টি স্কিমকে যেরকম হেলাছেদ্দা করা হয়েছে সেদিকে নজর রাখলেই বোঝা যায়। নতুন কথাটা হল, এবার অন্য দলগুলোর সরকার ও পথে হাঁটতে না চাইলে আইন করে, পারলে আদালতের নির্দেশকে শিখণ্ডী করে তাদের শায়েস্তা করা হবে। এক দেশ, এক অর্থনীতি কায়েম করতে চাইছে মোদি সরকার। সে দেশে রেউড়ি জাতীয় প্রকল্পের কোনো স্থান নেই।

তাৎক্ষণিক রাজনৈতিক কারণটাও সহজবোধ্য। সাম্প্রতিককালে যে কটা রাজ্যের নির্বাচনে বিজেপিকে হারতে হয়েছে, তার প্রায় প্রত্যেকটাতেই তাদের পথ আটকে দাঁড়িয়েছে এই কল্যাণমূলক প্রকল্পগুলো, যা রেউড়ি – প্রধানমন্ত্রীর ভাষায়। আরএসএস-বিজেপির নব্য-উদারবাদী অর্থনৈতিক নীতি আর ধর্মীয় মেরুকরণের রাজনীতি মুখ থুবড়ে পড়েছে দিল্লি আর পাঞ্জাবে আম আদমি পার্টির সস্তায় বিদ্যুৎ, চাষিদের ঋণ মকুবের প্রতিশ্রুতি, স্বাস্থ্য ও শিক্ষায় ভর্তুকি এবং সরকারের সক্রিয়তায় সরকারি স্কুল ও মহল্লা ক্লিনিকের উন্নতির সামনে। পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনে তৃণমূলের জয়ের জন্য প্রায় সব বিশ্লেষকই কৃতিত্ব দিয়েছেন লক্ষ্মীর ভাণ্ডার, দুয়ারে সরকারের মত পদক্ষেপকে। কন্যাশ্রীর মত প্রকল্প তো আগে থেকেই চলছিল। স্তালিনের দল দ্রাবিড় মুন্নেত্রা কজঘমও ক্ষমতায় এলে যে গৃহবধূদের রেশন কার্ড আছে তাঁদের মাসে ১০০০ টাকা করে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। সুতরাং নির্বাচনের ময়দানেও এই একটা বাধা বিজেপি কিছুতেই টপকাতে পারছে না। ফলে বিরোধীদের হাতে পড়ে থাকা এই শেষ অস্ত্রটা কেড়ে না নিলেই নয়। তাই এই আক্রমণ।

এবার শুরুতেই যে দ্বিধার কথা বলেছিলাম, সেই আলোচনায় আসি। বিজেপি সামাজিক এবং অর্থনৈতিক, দুদিক থেকেই যে একটি দক্ষিণপন্থী দল তাতে সন্দেহ নেই। সেই কারণেই কয়েক লক্ষ কোটি টাকার কর্পোরেট কর মকুব করে দেওয়া তাদের মতে ফ্রিবি নয়। কিন্তু কর্মসংস্থানহীন বা দরিদ্র মহিলাদের হাতে সরকার মাসে মাসে নগদ টাকা দিলে অর্থনীতির ক্ষতি হয়ে যাবে, বিপর্যয় সৃষ্টি হবে বলে তাদের চিন্তা। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের বাম দলগুলো, বিধানসভায় শূন্য হলেও যাদের রাস্তাঘাটে প্রধান বিরোধী হিসাবে দেখা যাচ্ছে, তারা প্রায় মোদির সুরেই গত দশ বছর ধরে তৃণমূল সরকারের জনকল্যাণমূলক প্রকল্পগুলো সম্পর্কে কথা বলে আসছে কেন? সিপিএমের যে কোনও স্তরের সদস্য এবং সমর্থকরা কন্যাশ্রী, সবুজ সাথী, লক্ষ্মীর ভাণ্ডার ইত্যাদি প্রকল্প সম্পর্কে “খয়রাতি”, “দয়ার দান”, “টাকা দিয়ে মানুষের মুখ বন্ধ রাখছে”, “মানুষকে দয়ার পাত্র করে দিয়েছে” ইত্যাদি বাক্যবন্ধ ব্যবহার করেন। মানুষ বসে বসে টাকা পেতে ভালবাসে, তাই তৃণমূলকে ভোট দিয়ে যাচ্ছে— এতদূরও বলা হয়। গরিব মানুষ রাজনীতি বোঝেন না, ভিক্ষা পেলেই খুশি— এই জাতীয় অপমানকর মন্তব্যও প্রকাশ্যেই করা হয়। স্রেফ সোশাল মিডিয়ার বিপ্লবীরা নন, শতরূপ ঘোষের মত সংবাদমাধ্যমে দলের প্রতিনিধি হিসাবে নিয়মিত মুখ দেখানো নেতারাও সামান্য পালিশ করা ভাষায় এসব বলে থাকেন।

স্বভাবতই সাধারণ সম্পাদক সীতারাম ইয়েচুরির টুইট ছাড়া রেউড়ি বিতর্কে সিপিএমের কোনও সুসংহত বক্তব্য পাওয়া যাচ্ছে না। দুর্গাপুজোর জন্য ক্লাবগুলোকে টাকা দেওয়া আর লক্ষ্মীর ভাণ্ডারে টাকা দেওয়াকে তাঁরা এক করে দেখেন কিনা— তা নিয়ে কোনও স্পষ্ট আলোচনা সিপিএম নেতারা করেন কি? অথচ এই আলোচনা জরুরি। এ রাজ্যে জনমত বলতে যে শ্রেণির মানুষের বক্তব্যকে বোঝানো হয় সাধারণত, সেই শ্রেণির মধ্যে জনকল্যাণমূলক প্রকল্পগুলোকে দানখয়রাতি বলে ভাবার মানসিকতা কিন্তু সুদূরপ্রসারী। ভদ্রলোক শ্রেণির যেসব ভোটার তৃণমূলকে ভোট দেন, তাঁরাও “এই শ্রী, ওই শ্রী” না থাকলেই খুশি হতেন। সরকারি কর্মচারীদের ডিএ দিতে রাজ্য সরকারের যে অনীহা তার বিপরীতে ওই প্রকল্পগুলোকে রেখে আলোচনা করতে বাঙালি মধ্যবিত্ত, উচ্চবিত্তরা বিলক্ষণ ভালবাসেন। তৃণমূলের নেতা, মন্ত্রীদের দুর্নীতি ফাঁস হলে “এই টাকাগুলো দিয়ে ডিএ দেওয়া যেত না?”— এ প্রশ্ন শোনা যায়। কিন্তু কাউকে বলতে শোনা যায় না “এই টাকা দিয়ে লক্ষ্মীর ভাণ্ডারে এক হাজার টাকা করে দেওয়া যায় না?” অথচ এঁরা এমনিতে ভাল করেই জানেন পাঁচশো টাকায় আজকাল কিছুই হয় না। আসলে মনে করা হয়, ডিএ পাওয়া অধিকার কিন্তু লক্ষ্মীর ভাণ্ডার দয়ার দান।

এর কারণ ১৯৯১ পরবর্তী যুগে দিনরাত মন্ত্রের মত কানের কাছে বলে বলে যে কয়েকটি কথা আমাদের মর্মে প্রবেশ করিয়ে দেওয়া হয়েছে তার অন্যতম হল, কোনও পরিষেবা বা পণ্য বাজার থেকে পয়সা দিয়ে না কিনে পাচ্ছে মানেই সেটা দান। সরকার দিচ্ছে মানেই দান করছে। আরেকটি কথা হল, চাকুরিজীবীরা করদাতা, গরিব শ্রমজীবী মানুষ করদাতা নয়। তারা করদাতাদের টাকায় বেঁচে থাকা পরজীবী।

এই দুটিই যে সর্বৈব মিথ্যা, তা বোঝানোর সবচেয়ে বড় দায়িত্ব ছিল বামপন্থীদের। কিন্তু সে দায়িত্ব তাঁরা মোটেই পালন করেননি, এখনও করেন না। ভর্তুকি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য পণ্য— একথা বলে নব্য-উদারনীতিবাদ। অন্যদিকে, যে কোনও ধরনের বামপন্থার খাতায় এগুলো অধিকার। এটুকু বুঝতে এবং বোঝাতে বামপন্থীদের অসুবিধা হওয়ার কথা নয়। কিন্তু দেখা যাচ্ছে বঙ্গ সিপিএমের এই অ আ ক খ প্রবলভাবে গুলিয়ে গেছে। ফলে বামফ্রন্টের ৩৪ বছরের সাফল্যের তালিকা দিতে গিয়ে তাঁরা দিব্যি নানা কল্যাণমূলক প্রকল্পের কথা বলেন। স্কুলের মেয়েদের সাইকেল দেওয়া যে তাঁদের আমলেই চালু হয়ে গিয়েছিল— সেকথাও বলেন। নিজেরা গরিব মানুষের জন্য কম টাকায় খাওয়ার ব্যবস্থা করতে কমিউনিটি ক্যান্টিনও চালান। কিন্তু সরকারি প্রকল্পগুলোকে বলেন দানখয়রাতি।

আমি যেমন করদাতা, আমার বাড়ির পরিচারিকাও করদাতা। তফাত হল আমি আয়কর দিই, তিনি দেন না। কারণ করের আওতায় আসার মত আয় তাঁর নেই। কিন্তু তিনি নিজের আয়ের টাকায় যা যা কেনেন সবেতেই কর দেন। আগের প্রত্যক্ষ করের যুগেও দিতেন, এখন পণ্য ও পরিষেবা করের (GST) যুগেও দেন। সুতরাং লক্ষ্মীর ভাণ্ডার থেকে যে টাকা পান বা দু টাকা কিলো চালে যে ভর্তুকি পান তাতে তাঁরও অবদান আছে, তিনি পরজীবী নন। ব্যতিক্রম বাদ দিলে এই কথাগুলো সিপিএমের সদস্য, সমর্থকরা নিজেরাই বোঝেন না বা বুঝতে অস্বীকার করেন। অন্যদের আর বোঝাবেন কী করে?

পশ্চিমবঙ্গে বাম দল বলতে অবশ্য শুধু সিপিএম বা বামফ্রন্টের দলগুলোকে বোঝায় না। কিন্তু বিকল্প বামেদের সংগঠন, অন্তত চাক্ষুষ প্রমাণে, আরও সীমিত। কিন্তু তাঁরাও যে রেউড়ি বিতর্কে খুব সোচ্চার এমন নয়। দশ বছর ধরে রাস্তায় নামার মত একাধিক ইস্যু থাকা সত্ত্বেও পথে না নামা সিপিএম অবশেষে পার্থ চ্যাটার্জি, অনুব্রত মণ্ডলের গ্রেফতারির পর বিরোধীসুলভ সক্রিয়তা দেখাচ্ছে। আর বিকল্প বামেরা সক্রিয়তা দেখাচ্ছেন ইডি-সিবিআই যেহেতু বিজেপি সরকারের হাতে, সেহেতু তৃণমূল নেতাদের বিপুল দুর্নীতি নিয়ে কেন পথে নামা উচিত নয় সেই তর্কে। উন্নয়ন মানে কী বা কী হওয়া উচিত— সে আলোচনাতেও মাঝেমধ্যে দেখা যায় ভারতীয় বামপন্থীদের। যে কারণে বেশিরভাগ বামপন্থী দলের কাছেই আজও পরিবেশ কোনও রাজনৈতিক ইস্যু নয়। নব্য-উদারবাদীদের মতই তাঁরা ভাবেন পরিবেশের সামান্য ক্ষতি করে যদি শিল্প হয়, কর্মসংস্থান হয় তাহলে তেমন ক্ষতি নেই। পৃথিবীর অন্য অনেক দেশের নানা গাঢ়ত্বের লালেরা কিন্তু এ পথে হাঁটছেন না। অর্থাৎ পথ সামনে রয়েছে, কিন্তু উত্তমকুমার অভিনীত অবিনাশের মতই আমাদের বামপন্থীরাও নিজেদের চোরাগলিতে দিশেহারা।

বামেরা কী করছেন, কী বলছেন, তা কেন গুরুত্বপূর্ণ? এই জন্যে, যে দুর্নীতিগ্রস্ত সরকার চিরকাল থাকবে না। কেন্দ্রীয় সরকারের গা জোয়ারিতেই হোক বা নাগরিকদের ভোটে, প্রাকৃতিক নিয়মেই এই সরকার একদিন চলে যাবে। তখন যে দলের সরকারই আসুক, সরকারি নীতি সম্পর্কে সাধারণ মানুষের মনে দক্ষিণপন্থী ভাবনার যে আসন তৈরি হয়েছে তা ভাঙতে না পারলে ভবিষ্যতেও মানবিক সরকার দেখতে পাব না আমরা। এই ভাঙার দাবি কাদের কাছে করা যায়? বিজেপির কাছে তো নয়। রামচন্দ্র গুহ নিজেকে বলেন “ল্যাপ্সড মার্ক্সিস্ট”। আমারও এক বয়োজ্যেষ্ঠ ল্যাপ্সড মার্ক্সিস্ট বন্ধু আছেন। তিনি সর্বদাই বলেন, বামপন্থীদের থেকে কিছু আশা করা উচিত নয়। কিন্তু বামেদের বাদ দিলে যদি পড়ে থাকে বিজেপি, তাহলে আর উপায় কী? আশা করা বেঁচে থাকার জন্য জরুরি একটা কাজ। সে কাজ তো ছাড়া যায় না।

চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম ওয়েবসাইটে প্রকাশিত

অসংসদীয় শব্দ: মুখ বুজে বাঁচা অভ্যাস করতে হবে

“কথা বোলো না কেউ শব্দ কোরো না 
ভগবান নিদ্রা গিয়েছেন 
গোলযোগ সইতে পারেন না।”

মনোজ মিত্রের নরক গুলজার নাটকের এই গান গত শতকের একটা অংশে রীতিমত জনপ্রিয় ছিল। আমাদের এঁদো মফস্বলে কলকাতার গ্রুপ থিয়েটার দেখার অভ্যাস খুব বেশি লোকের ছিল না। তৎসত্ত্বেও নব্বইয়ের দশকে অন্তত দুবার শখের অভিনেতাদের পাড়ার মঞ্চে এই নাটক করতে দেখেছি আর নারদের চরিত্রে যে-ই থাকুক, তার গলায় সুর থাক বা না থাক, এ গান গাওয়া মাত্রই দর্শকদের মজে যেতে দেখেছি। পিতামহ ব্রহ্মা টেনে ঘুমোচ্ছেন, দেবর্ষি নারদ নেচে নেচে এই গান গাইছেন – এই হল দৃশ্য। নাটকটি আগাগোড়া সরস। এখানে ব্রহ্মা একজন মানুষকে পুনর্জন্ম দেওয়ার জন্য ঘুষ নিতে যান, চিত্রগুপ্ত দেখে ফেলে আর্তনাদ করে ওঠে “উৎকোচ”। ব্রহ্মা ট্যাঁকে টাকা গুঁজতে গুঁজতে বলেন “মেলা ফাজলামি কোরো না। উৎকোচ ছাড়া আমাদের ইনকামটা কী, অ্যাঁ? আমরা কি খাটি, না এগ্রিকালচার করি, না মেশিন বানাই? অতবড় স্বর্গপুরীর এস্ট্যাবলিশমেন্ট কস্ট আসবে কোত্থেকে, অ্যাঁ?” তাছাড়া এই নাটকে একজন বাবাজি আছেন, যিনি ব্রহ্মার কৃপায় কল্পতরু থলি পাওয়া মাত্রই রম্ভাকে চেয়ে বসেন। কিন্তু থলিতে হাত ঢোকালে হাতে উঠে আসে একটি মর্তমান কলা।

আর বেশি লিখব না, কারণ বৃদ্ধ বয়সে মনোজ মিত্রকে হাজতবাস করানো আমার উদ্দেশ্য নয়। কথা হল বিশ-পঁচিশ বছর আগে একশো শতাংশ হিন্দু (নব্বই শতাংশ উচ্চবর্ণ) অভিনেতাদের দ্বারা অভিনীত এই নাটক দেখেছি, আর একশো শতাংশ হিন্দু দর্শককুলকে নাটক দেখে হেসে গড়াগড়ি খেতে দেখেছি। কিন্তু বিস্তর ধস্তাধস্তির পর মহম্মদ জুবের আজ দিল্লি পুলিসের দায়ের করা মামলাতেও জামিন না পেলে এবং জজসাহেব তাঁর রায়ে বাকস্বাধীনতা যে সাংবিধানিক অধিকার সেটি ষোড়শোপচারে মনে করিয়ে না দিলে সাহস করে এই লেখা লিখতে বসতাম না। কারণ কী লেখা যাবে, কোনটা বলা যাবে সে ব্যাপারে আজকাল আর সংবিধান চূড়ান্ত নয়, সরকারের বকলমে পুলিস চূড়ান্ত। পুলিসের অধিকারের সীমাও বেড়ে গেছে অনেক। একদা পুলিসের হাত এত ছোট ছিল, যে আশিতে আসিও না ছবিতে ভানু বন্দ্যোপাধ্যায় জলে নেমে পড়ে বলেছিলেন তাঁকে আর ধরা যাবে না, কারণ তিনি তখন জলপুলিসের আন্ডারে। আর এ যুগে আসাম পুলিসের হাত গুজরাট পর্যন্ত লম্বা, পশ্চিমবঙ্গ পুলিসের হাত গোয়া পর্যন্ত পৌঁছে যায়। দেশটা যে প্রেতপুরীতে পরিণত হয়েছে, এই বোধহয় তার সর্বোত্তম প্রমাণ। কারণ ছোটবেলায় জ্যাঠা-জেঠিদের মুখে কলকাতায় মেসে থেকে চাকরি করা এক গ্রাম্য ভদ্রলোকের গল্প শুনেছিলাম। তিনি বহুকাল পরে বাড়ি গিয়ে খেতে বসেছেন, ডালের সাথে মেখে খাবেন বলে দুটি পাতিলেবুর আবদার করেছেন। করেই দেখেন বউয়ের হাতদুটো ইয়া লম্বা হয়ে নিজের বাড়ির সীমানা পেরিয়ে পাশের বাড়ির গাছ থেকে লেবু পেড়ে নিয়ে এল। আসলে ওলাউঠার মহামারীতে গ্রাম সাফ হয়ে গিয়েছিল। ঘৃণার মহামারীতে আমাদের দেশ সাফ হয়ে গেছে। গল্পের ভদ্রলোক শহরে পালিয়ে বেঁচেছিলেন, আমরা কোথায় পালিয়ে বাঁচব জানি না। ভারত জোড়া ফাঁদ পেতেছ, কেমনে দিই ফাঁকি? আধেক ধরা পড়েছি গো, আধেক আছে বাকি।

আমরা ভারতীয়, আমরা মেনে নিতে জানি। যা যা বলা বারণ, লেখা বারণ সেগুলো মেনে নিয়ে চলব বলেই ঠিক করেছিলাম। কিন্তু দেখলাম অবাক কাণ্ড! কেবল আমরা মানিয়ে নিলে চলবে না, হাজার ভণ্ডামি ও নোংরামি সত্ত্বেও যে সংসদের দিকে আমরা তাকিয়ে থাকি তার সদস্যদের জন্যেও তালিকা তৈরি হয়েছে। ভগবান, থুড়ি সরকার, যাতে নিশ্চিন্তে নিদ্রা যেতে পারেন, কেউ গোল করতে না পারে তার নিশ্ছিদ্র ব্যবস্থা করতে কোন কোন শব্দ উচ্চারণ করা যাবে না, অর্থাৎ কোনগুলো অসংসদীয়, তার নতুন ফর্দ প্রকাশিত হয়েছে সংসদের মৌসুমি অধিবেশনের প্রাক্কালে। সেখানেই শেষ নয়, আরও বলা হয়েছে, সংসদ চত্বরে কোনো “ডেমনস্ট্রেশন”, ধর্না, ধর্মঘট করা যাবে না। এমনকি অনশন বা কোনো ধর্মীয় অনুষ্ঠানও করা যাবে না। অর্থাৎ সমস্ত শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদই গণতন্ত্রের মন্দিরে বারণ। এ হল সেই মন্দির, যেখানে প্রথমবার প্রবেশ করার সময়ে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ঘটা করে সিঁড়িতে মাথা ঠেকিয়ে প্রণাম করেছিলেন। ধর্মীয় অনুষ্ঠান করা যাবে না – এই দারুণ ধর্মনিরপেক্ষ আদেশের কারণ অবশ্য দুর্বোধ্য। কারণ মাত্র কয়েকদিন আগে নতুন সংসদ ভবনে দন্তবিকশিত সিংহের মূর্তি স্থাপন করার সময়ে প্রধানমন্ত্রী নিজে পুজো-আচ্চা করেছেন। তাহলে বক্তব্যটি কি এই, যে পুরনো মন্দিরে পুজো চলবে না, নতুন মন্দিরে চলবে? গণতন্ত্রের মন্দিরে শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ নিষিদ্ধ করার অর্থই বা কী? তাহলে কি শান্তিভঙ্গ করে যেসব প্রতিবাদ প্রণালী, সেগুলোর পথ পরিষ্কার করা হচ্ছে? মোদীজির বন্ধু ডোনাল্ড ট্রাম্প মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রপতি পদ থেকে অপসারিত হওয়ার পর ক্যাপিটল হিলে যেরকম প্রতিবাদ দেখে সারা বিশ্ব শিউরে উঠেছিল, তেমন প্রতিবাদ ছাড়া কি এ দেশে আর কোনো প্রতিবাদ করতে দেওয়া হবে না? করলেই বুলডোজার চালানো হবে? প্রতিবাদের চেহারা অবশ্য বিচিত্র। পার্শ্ববর্তী শ্রীলঙ্কায় আরেক ধরনের প্রতিবাদ হচ্ছে। প্রতিবাদের ধরনধারণ, সীমানা নির্দিষ্ট করে দেওয়া আজ পর্যন্ত কোনো দেশের কোনো শাসকের পক্ষে সম্ভব হয়নি। অবশ্য মোদীজি বালক বয়সে খালি হাতে কুমিরের মুখ থেকে ক্রিকেট বল এবং কুমিরছানা নিয়ে এসেছেন। তাঁর অসাধ্য কী?

মোদীজির সরকার কী কী পারে তা আমরা এতদিনে জেনে ফেলেছি, বিরোধীরা কী পারেন তা দেখা এখনো বাকি আছে। অসংসদীয় শব্দের তালিকার সংযোজনগুলো সেই সুযোগ এনে দিয়েছে। দু-একজন বিরোধী সাংসদ বলছেন বটে, তাঁরা নির্দেশ অগ্রাহ্য করে ওই শব্দগুলো সংসদে ব্যবহার করবেন, কিন্তু সেই ২০১৪ সাল থেকে তাঁরা যেরকম লক্ষ্মীসোনা হয়ে আছেন, তাতে না আঁচালে বিশ্বাস করা যাচ্ছে না। পালানিয়প্পম চিদম্বরমের মত দু-একজন প্রবীণ সাংসদ তো ইতিমধ্যেই টুইট করে দেখিয়েছেন, ভাষার উপর দখল থাকলেই যে শব্দগুলোকে অসংসদীয় বলে ঘোষণা করা হয়েছে সেগুলো বাদ দিয়েও সরকারের সমালোচনা করা সম্ভব। সোশাল মিডিয়ায় মস্করাও চালু হয়েছে, শশী থারুরের মত জ্যান্ত থিসরাস থাকতে আর কিসের চিন্তা? এমন সুবোধ বিরোধী থাকতে আমাদের আর কিসের চিন্তা? ইন্টারনেট জোক আর মিম সংস্কৃতি এমন গভীরে পৌঁছেছে যে সাংসদরাও গভীরে ভাবছেন না। তাঁরা বোধহয় ভেবে দেখছেন না, যে কোনো শব্দ অসংসদীয় বলে ঘোষিত হল মানে জোর করে সে শব্দ উচ্চারণ করলেও সংসদের কার্যবিবরণীতে তা নথিবদ্ধ করা হবে না। অর্থাৎ এমন ব্যবস্থা করা হয়েছে যাতে আজ থেকে পঞ্চাশ বছর পরে অন্তত সংসদের কার্যবিবরণী থেকে কোনো ইতিহাস লেখক জানতে পারবেন না যে ভারতে ‘স্নুপগেট’ বলে কিছু ঘটেছিল, কেউ ‘ডিক্টেটোরিয়াল’ ছিল বা সরকারের বিরুদ্ধে ‘তানাশাহি’-র অভিযোগ ছিল। মনোমত ইতিহাস লেখার যে ব্যবস্থা ভারতে চলছে, এ-ও যে তারই অঙ্গ, সেকথা বিরোধী দলের কেউ বুঝছেন কি? শুধু ইতিমধ্যেই লিখিত ইতিহাস বিকৃত করা নয়, এই অসংসদীয় শব্দের তালিকা যে ভবিষ্যতে যে ইতিহাস লেখা হবে তা-ও বিকৃত করার প্রচেষ্টা, তা বিরোধীরা কেউ ভেবে দেখেছেন বলে তো মনে হচ্ছে না।

আরও পড়ুন পশ্চিমবঙ্গে নির্বাচন প্রহসনে পরিণত হলে ক্ষতি নেই বিজেপির

এত সহজে ইতিহাস থেকে সত্য মুছে ফেলা যায় কিনা সে বিতর্ক নেহাতই বিদ্যায়তনিক। তা নিয়ে মাথা না ঘামিয়ে বিরোধী দলের রাজনীতিবিদদের অধিকার হরণ শুরু হওয়া মাত্রই সর্বশক্তি দিয়ে প্রতিবাদ করা উচিত। কিন্তু আমাদের বিরোধীরা তেমন করেন না। তাঁদের মধ্যে বিদ্যাসাগর কথিত গোপালরাই দলে ভারি। মাঝেমধ্যে রাহুল গান্ধী রাখাল হয়ে ওঠেন বটে, কিন্তু কদিন না যেতেই ইউরোপে দম নিতে চলে যান। সুললিত ইংরেজি বলতে পারা থারুর বা মহুয়া মৈত্র, ডেরেক ও’ব্রায়েনরাই আজকের সংসদীয় বিরোধিতার মুখ। তাঁরা ইন্দ্রজিৎ গুপ্ত বা সোমনাথ চ্যাটার্জির মত জাঁদরেল নন, সেকালের মমতা ব্যানার্জির মত ওয়েলে নেমে গিয়ে স্পিকারের মুখে কাগজ ছুড়ে মারার মত মেঠো রাজনীতিও তাঁদের আসে না। তেমন কাজ করলেও দল যে তাঁদের পাশে দাঁড়াবেই, তার নিশ্চয়তা নেই। এমন বিরোধী পেলে যে কোনো শাসকেরই পোয়া বারো হয়। তারা কাকে রাষ্ট্রপতি পদপ্রার্থী করবে তা নিয়ে অযথা মাথা ঘামায়, শেষ লগ্নে মাথা চুলকে বলে, আগে বললে তো ওনাদের প্রার্থীকেই সমর্থন করতাম। এদিকে সরকার নিশ্চিন্তে একের পর এক অধিকার হরণ করে চলে।

অতএব আমরা, সাধারণ ভারতীয়রা, আধেক ধরা পড়ে বাকি আধেকের আশঙ্কাতেই থাকি। ভ্লাদিমির পুতিনের রাশিয়া বা রচপ তৈয়প এর্দোগানের তুরস্কে মানুষ যেমন মুখ বুজে বাঁচে, তেমনভাবে বাঁচা আমাদের শিগগির অভ্যাস করে নিতে হবে। তবে অসংসদীয় শব্দের তালিকার মত হাজতে পোরার যোগ্য শব্দেরও একটা প্রকাশ্য তালিকা থাকলে আমাদের সুবিধা হয়।

https://nagorik.net এ প্রকাশিত

ফাদার স্ট্যান স্বামী: একটি শোকহীন মৃত্যু

স্ট্যান স্বামীর জামিনের আবেদন করার লোক কম ছিল না। বারবার আবেদন করা হয়েছে, বারবার শুনানি হয়েছে আর রাষ্ট্র আপ্রাণ চেষ্টা করেছে তিনি যেন জামিন না পান।

৬ জুলাই ছিল দলাই লামার ৮৬তম জন্মদিন। সেই উপলক্ষে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এই তিব্বতি ধর্মগুরুকে ফোন করে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন। মোদী যা করেন, সবই ইতিহাসে প্রথমবার ঘটে। দলাই লামাকে জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানানোর ব্যাপারেও নাকি তিনিই প্রথম। সে প্রথম বা চতুর্দশ যা-ই হোন, ব্যাপারটা আপত্তিকর নয়। ভারতবর্ষ সাধুসন্তদের দেশ, ধর্মভীরু মানুষের দেশ। আমাদের প্রধানমন্ত্রী ধর্মগুরুকে জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানাবেন — এ আর বেশি কথা কী? তাছাড়া দলাই লামা কেবল ধর্মগুরু নন, বহু বছর ধরে ভারতেরই বাসিন্দা এবং চীনা আগ্রাসনের বিরুদ্ধে তিব্বতি জনগণের অধিকার রক্ষার লড়াইয়ের নেতা। ভারতের মত গণতান্ত্রিক দেশের প্রধানমন্ত্রী তো তাঁর পাশেই থাকবেন। অধিকার রক্ষার লড়াই পৃথিবীর সর্বত্র, সব সরকারের আমলেই কেউ না কেউ করে চলে। তেমনই আরেকটা লড়াইয়ের সৈনিক ছিলেন স্ট্যান স্বামী — আরেকজন ধর্মযাজক। দলাই লামার চেয়ে বছর দুয়েকের ছোট এই মানুষটা দলাইয়ের জন্মদিনের আগের দিনই মারা গেলেন। ধর্মভীরু এবং মানুষের অধিকারের লড়াইয়ে সহমর্মী প্রধানমন্ত্রী শোক প্রকাশ করে টুইট করেননি।

যে মানুষটা রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে অভিযুক্ত; এমনকি সুধা ভরদ্বাজ, গৌতম নভলাখা, ভারভারা রাও, সোমা সেন, জি এন সাইবাবা, আনন্দ তেলতুম্বড়ে, হ্যানি বাবুদের সাথে মিলে নাকি প্রধানমন্ত্রীকে হত্যার ছক কষছিলেন, তাঁর মৃত্যুতে সেই প্রধানমন্ত্রীই শোক প্রকাশ করবেন! অন্যায় আবদার, তাই না? কিন্তু স্ট্যান স্বামীর বিরুদ্ধে যে অভিযোগ রয়েছে, দলাই লামার বিরুদ্ধে চীনা সরকারের অভিযোগ যে তার চেয়েও সাংঘাতিক। তিনি কেবল রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত তা নয়, রীতিমত নেতা। সেই কারণেই ১৯৫৯ সালে চীনা বাহিনীর সাথে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের পর তাঁকে ছদ্মবেশ ধারণ করে ভারতে পালিয়ে এসে আশ্রয় নিতে হয়েছিল। তখনকার প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু থেকে শুরু করে মোদীর পূর্বসুরী মনমোহন সিং পর্যন্ত সব দলের সব প্রধানমন্ত্রী দলাই লামাকে আশ্রয় দেওয়ার সিদ্ধান্তকে সমর্থন জানিয়েছেন। বিরোধী দলগুলোও এ নিয়ে কখনো সরকারকে আক্রমণ করেনি। এতে চীনের সাথে কূটনৈতিক সম্পর্কের ক্ষতি হলেও নীতি বদলানো হয়নি, কারণ ভারত সরকার তিব্বতের মানুষের অধিকারকে গুরুত্ব দিতে চেয়েছে। ভাবা যেত মোদী সেই ধারাই অনুসরণ করছেন, যদি নিজের দেশের আন্দোলনকারীদের প্রতি তাঁর সরকার সংবেদনশীল হত। অন্য অনেককিছুর মত বিচারাধীন অবস্থায় বৃদ্ধ ধর্মযাজকের মৃত্যুও বোধহয় মোদীর আমলেই প্রথম হল।

এমনিতে ভারতে বিনা বিচারে পুলিশ বা বিচারবিভাগীয় হেফাজতে বছরের পর বছর আটকে থাকা নতুন কিছু নয়। নানা সমীক্ষায় দেখা যায় দলিত, আদিবাসী, ধর্মীয় সংখ্যালঘু মানুষের কপালে এই দুর্ভোগ সহজেই জোটে। ট্যাঁকের জোর না থাকলে বা লোকলস্কর না থাকলে মাত্র কয়েকশো টাকা চুরি করা বাচ্চা ছেলেকেও বিনা বিচারে বহু বছর কারাবাস করতে হয়। মৃত্যুও অস্বাভাবিক নয়। এমনই এক মৃত্যুর ঘটনায় মঙ্গলবার সারাদিন উত্তপ্ত ছিল বর্ধমান জেলার বরাকর। কিন্তু স্ট্যান স্বামীর জামিনের আবেদন করার লোক কম ছিল না। বারবার আবেদন করা হয়েছে, বারবার শুনানি হয়েছে আর রাষ্ট্র আপ্রাণ চেষ্টা করেছে তিনি যেন জামিন না পান। কেবল জামিন নয়, পার্কিনসন্স অসুখে ভোগা এই মানুষটা যাতে জল খাওয়ার জন্য একটা স্ট্র পর্যন্ত না পান তার জন্য প্রাণপণ আইনি লড়াই করেছে মোদী সরকার। দেশদ্রোহীদের এমনটাই হওয়া উচিত — এই মত অনেকেরই। মুশকিল হল, ফাদারের দেশদ্রোহের এক বিন্দু প্রমাণ দিতে পারেনি তদন্তকারী সংস্থা। দিল্লি দাঙ্গার জন্য এই একই আইনে অভিযুক্ত উমর খালিদের মত স্ট্যান, ভারভারা, গৌতম, সুধা, সোমাদের বিরুদ্ধেও এখন পর্যন্ত কোন প্রমাণ নেই। প্রমাণ বলতে যা জমা দেওয়া হয়েছে, তা বড়জোর কিছু বইপত্র বা লিফলেট।

ফাদার স্ট্যান সম্বন্ধে যা জানা যায়নি, তা বাদ দিয়ে যা জানা আছে সেগুলো আলোচনা করে দেখা যাক তিনি কেমন ভয়ঙ্কর লোক ছিলেন। তিনি এমন ঘোর সন্ত্রাসবাদী যে মাওবাদী সন্দেহে গ্রেপ্তার হওয়া আদিবাসীদের পরিবার পরিজনের হাতে অস্ত্র তুলে না দিয়ে ন্যায়বিচারের দাবিতে জনস্বার্থ মামলা করতেন। সংবিধানের পঞ্চম তফসিল অনুযায়ী কেন আদিবাসী এলাকায় ট্রাইব অ্যাডভাইসরি কাউন্সিল গড়া হয়নি, সে প্রশ্ন তুলতেন। খনিজ পদার্থের জন্য বা শিল্প গড়তে আদিবাসীদের জল-জঙ্গল-জমির অধিকার কেড়ে নেওয়ার বিরুদ্ধে বোমা, বন্দুক, গুলিবিহীন আন্দোলন করতেন।

আরও পড়ুন বাধ্যতামূলক মহানতার একাকিত্বে ইমাম রশিদি

আসলে প্রমাণের দরকার নেই, আটক করে রাখার ইচ্ছাই যথেষ্ট। Unlawful Activities (Prevention) Act বা ইউএপিএ এমন এক আইন, যে আইনে জামিন হল ব্যতিক্রম, অভিযুক্তকে আটক করে রাখাই নিয়ম। অন্য সব আইনের সাথে এই আইনের এখানেই তফাত। মনে রাখা ভাল, ১৯৬৭ সালে চালু হওয়া এই আইনকে ২০০৪ সালে ইউপিএ সরকার সংশোধনী এনে আরো কঠোর করে তোলে। বিপুল অপব্যবহারের অভিযোগে Prevention of Terrorism Act বা পোটা বাতিল করতে হওয়ায়, সেই আইনের বহু আপত্তিকর ধারা এই সংশোধনীর মাধ্যমে ইউএপিএ-তে ঢুকিয়ে দেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী পি চিদম্বরম। কোন দল প্রতিবাদে মুখর হয়নি। চার্জশিট ছাড়াই গ্রেপ্তারির ব্যবস্থা, জামিন পাওয়ার বিষয়ে নানা শর্ত আরোপ করা এবং “সন্ত্রাসবাদী কার্যকলাপ”-এর অস্পষ্ট সংজ্ঞার আওতা বৃদ্ধি — সবই ইউপিএ আমলেই করা হয়েছিল, ২০০৮ ও ২০১২ সালে আরো দুটো সংশোধনীর মাধ্যমে। বিজেপি সরকার ২০১৯ সালের সংশোধনীর মাধ্যমে ব্যক্তিকে সন্ত্রাসবাদী হিসাবে দেগে দেওয়ার ব্যবস্থা করে, আগে কেবল কোনো সংগঠনকে সন্ত্রাসবাদী গণ্য করা যেত। রাজ্যসভায় বাম দলগুলো, তৃণমূল কংগ্রেস, ডিএমকে, এমডিএমকে, আরজেডি এবং এআইএমআইএমের মত কয়েকটা ছোট পার্টি ছাড়া সেই সংশোধনীর বিরুদ্ধে কেউ ভোট দেয়নি। লোকসভায় এআইএমআইএম, বিএসপি, আইইউএমএল, ন্যাশনাল কনফারেন্স এবং এইউডিএফ দলের মোট আটজন সাংসদ সংশোধনীর বিরুদ্ধে ভোট দেন। কংগ্রেস ভোটাভুটির সময় ওয়াক আউট করলেও রাজ্যসভায় পক্ষে ভোট দিয়েছিল।

বরাবরই ইউএপিএ-কে আরো শক্তিশালী করার পক্ষে সন্ত্রাসবাদের জুজু দেখানো হয়েছে, কিন্তু কার্যক্ষেত্রে এই আইন প্রয়োগ করা হয়েছে সরকারবিরোধী মানুষের উপর। পশ্চিমবঙ্গে বাম আমলে এই আইনে রাজনৈতিক কর্মী, সমাজকর্মীদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তৃণমূল সরকারের আমলেও সেই ট্র্যাডিশন সমানে চলেছে। তবে যেহেতু এ দেশে বিজেপি বিরোধী শুভবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি, তাই এই আইনে গ্রেপ্তার হওয়া মানুষের সংখ্যা এখন কয়েকশোতে পৌঁছেছে।

আসলে ফাদার স্ট্যান স্বামীর মৃত্যু আমাদের সকলকেই আয়নার সামনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। শুধু রাজনৈতিক দলগুলো নয়, আমরা সাধারণ নাগরিকরাও সন্ত্রাসবাদের নাম করলেই যে কোন সরকারি দমনপীড়নকে বৈধ বলে মেনে নিয়ে থাকি। তাই এমন সব একুশে আইন দেখে ক্ষেপে ওঠার বদলে খুশি হই। আমাদের মধ্যে অনেকে নিশ্চয়ই স্ট্যান স্বামীর মৃত্যুতেও “বেশ হয়েছে” মনে করছে। কারণ আমাদের সাধু সন্তদের প্রতি ভক্তির সীমা বাবা রামদেব অব্দি। কোন ফাদারের কাজকর্মের কারণে তাঁর প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়ার যুগ আমরা পেরিয়ে এসেছি। এক্ষেত্রে কিন্তু মানুষটাকে শ্রদ্ধা করার প্রয়োজন নেই। এটুকু বোঝা দরকার যে কোন কারণে সরকারের (এমনকি স্রেফ পুলিশের) চক্ষুশূল হলেই বিনা প্রমাণে এইভাবে আমাকে, আপনাকেও দিনের পর দিন কারাগারে ফেলে রাখা সম্ভব। গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় এমনকি জল খাওয়ার পথে বাধা সৃষ্টি করে তিলে তিলে মেরে ফেলা সম্ভব। আইন মেনেই।

উত্তরবঙ্গ সংবাদে প্রকাশিত

বিবি বিদায় নিলেও বদলাবে না ইজরায়েল

বিবি লঙ্কা প্রতিষ্ঠা করে গেছেন, এখন সেখানে যে যাবে সে-ই হবে রাবণ।

“… সরে যাওয়ার পর তাঁর উত্তরাধিকার বলতে আরও সুরক্ষিত একটা দেশ থাকবে না, থাকবে একটা গভীরভাবে বিভাজিত সমাজ, যা দেওয়ালের আড়ালে বাস করে।” কথাগুলো লিখেছিলেন একজন প্রধানমন্ত্রীর জীবনীকার, ২০১৮ সালে প্রকাশিত জীবনীতে। দেশটা নানা ভাষা নানা মতের দেশ ভারত নয়। নেতার নাম নরেন্দ্র মোদী নয়। দেশটার নাম ইজরায়েল, নেতার নাম বেনইয়ামিন নেতানিয়াহু, বইটার নাম বিবি, লেখক ইজরায়েলি সাংবাদিক আনশেল ফেফার। একটানা বারো বছর, সব মিলিয়ে ১৫ বছর, ক্ষমতায় থাকার পর আমাদের প্রধানমন্ত্রীর প্রিয় বন্ধু বিবি সম্প্রতি পদচ্যুত হলেন।

বিবির বন্ধু, শত্রু উভয়েই বলেন পদ আঁকড়ে থাকায় তাঁর জুড়ি নেই। বহুদিন থেকেই গদি টলোমলো। দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে, ২০১৯ সালে প্রথম ক্ষমতাসীন ইজরায়েলি নেতা হিসাবে ফৌজদারি মামলায় অভিযুক্ত হয়েছেন। অভিযোগ তিনি কোটিপতিদের কাছ থেকে দামি উপহার নিয়েছেন, তার বদলে সংবাদমাধ্যম ও টেলিকম কোম্পানির মালিকদের অন্যায় সুযোগ সুবিধা দিয়েছেন। বিবির বন্ধুর দেশে এসব কোনও অভিযোগই নয়। যারা অভিযোগ করছে তাদের পাপ্পু, দেশদ্রোহী, আর্বান নকশাল ইত্যাদি বলে দিলেই ঝামেলা চুকে যায়। কিন্তু ইজরায়েলে তা হবার জো নেই। অতিমারীর মধ্যেও বিরাট মিছিল হয়েছে বিবিকে সরানোর দাবিতে। কিন্তু বিবির অমিত শাহ না থাকলেও কৌশল আছে। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা বলছেন কৌশলের জোরেই তিনি বিরোধীদের দ্বিধাবিভক্ত করে রেখে এতদিন ক্ষমতায় টিকে গেলেন। শেষমেশ তাঁরই প্রাক্তন চিফ অফ স্টাফ, প্যালেস্তাইন সম্বন্ধে তাঁরই মত গোঁড়া মানসিকতার নাফতালি বেনেত্তে থেকে শুরু করে আরব ইসলামিস্ট পর্যন্ত সকলে হাত মিলিয়ে নেতানিয়াহুকে পদচ্যুত করতে পারলেন।

যা যা অভিযোগ আছে তাতে বছর দশেক কারাবাসের সম্ভাবনা প্রবল। কিন্তু বিবি সফলভাবে ইজরায়েলকে প্রবলভাবে যুযুধান দেশে পরিণত করেছেন। তিনি যখন ক্ষমতায় আসেন তখন প্যালেস্তাইন সমস্যার শান্তিপূর্ণ সমাধানের যেটুকু সম্ভাবনা ছিল, এখন আর তা-ও নেই বলে মনে করা হচ্ছে। পিটিয়ে সবকিছুই ঠান্ডা করে দেওয়া যায় — এই মানসিকতা দেশের রাজনীতিতে প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে। উত্তরসূরী বেনেত্তের সাথে নেতানিয়াহুর মতাদর্শগত তফাত নেই। অর্থাৎ বিবি লঙ্কা প্রতিষ্ঠা করে গেছেন, এখন সেখানে যে যাবে সে-ই হবে রাবণ।

আরও পড়ুন বিবিসিকে বাদ দিয়ে বিশ্বগুরু থাকতে পারবেন মোদী?

ইজরায়েল অবশ্য রাষ্ট্র হিসাবে বিবির আগে থেকেই আধিপত্যবাদী। তবে বিবির মত বুক ফুলিয়ে আধিপত্যবাদকে আদর্শ হিসাবে খাড়া করতে সকলে পারে না। ১০ই জুলাই ১৯৯৬ তারিখে মার্কিন কংগ্রেসে প্রথম বক্তৃতাতেই তিনি বলেছিলেন হিব্রু ধর্মশাস্ত্রে লেখা আছে, ঈশ্বর তাঁর ভক্তদের শক্তি দেবেন এবং শান্তি দিয়ে আশীর্বাদ করবেন। অতএব শক্তি থেকেই যে শান্তি আসে — এটাই সত্য। গোদা বাংলায় বললে, সবই ব্যাদে আছে এবং ব্যাদে যা আছে তা-ই শেষ সত্য। বোঝা শক্ত নয়, কেন বিবি আর মোদী সাহেবের গলাগলি হয়েছিল। কেনই বা স্বাধীনতার পর থেকে সব সরকারের অনুসৃত বিদেশনীতি থেকে সরে এসে ইজরায়েলের দিকে ঝুঁকে পড়ল মোদী সরকার, কেন ভারতের আন্দোলনকারীদের মোবাইল ফোনে পেগ্যাসাসের মত ইজরায়েলি সফটওয়্যারের উঁকি ঝুঁকি শুরু হল।

মোদীর মতাদর্শগত শিক্ষা রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘের হাতে আর সেই সঙ্ঘের গুরু গোলওয়ালকর ছিলেন নাজি ভক্ত। ‘উই, অর আওয়ার নেশনহুড ডিফাইনড’ বইতে ইহুদী নিধনের জন্য তিনি জার্মানির ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। তা সত্ত্বেও মোদী কী করে ইজরায়েলের সাথে গা মাখামাখি করেন, তা নিয়ে বিজেপি-বিরোধীদের প্রায়ই বিস্ময় প্রকাশ বা কটাক্ষ করতে দেখা যায়। তাঁরা আসলে এখনও হলোকস্টের যুগে পড়ে আছেন, মোদী আর বিবি এগিয়ে গেছেন। দুজনেই জানেন এ যুগে আর এক লপ্তে গণহত্যা করে ‘শত্রু’ জনগোষ্ঠীকে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়া সম্ভব নয়। শক্তি প্রদর্শন করে ক্রমশ প্রান্তিক করে দেওয়াই পথ। সে কাজ করতে পারলে কে ক্ষমতায়, তাতে কিছু এসে যায় না। ভারতকে ইজরায়েলের মত লঙ্কায় পরিণত করতে বিবির সাহায্য প্রয়োজন ছিল। মোদীর পরে যে দলের যিনিই আসুন, তিনি যেন বেনেত্তির মতই ধারাবাহিকতা রক্ষা করেন তা নিশ্চিত করতে হবে তো।

উত্তরবঙ্গ সংবাদে প্রকাশিত

এক যে ছিল সংসদ

বিনা বিতর্কে পছন্দের কাজগুলো হয়ে যাক – এটা এদেশে কে না চায়? যে কোনো বড় শহরের জনবহুল মোড়ে দাঁড়িয়ে যাদের ভদ্রলোক-ভদ্রমহিলা বলে মনে হয় তাদের জিজ্ঞেস করে দেখুন। কতজন যে বলবে “গণতন্ত্রের সীমা থাকা উচিৎ”, “মিলিটারি রুল হচ্ছে বেস্ট”!

সে এক সংসদ ছিল। প্রধানমন্ত্রীর আসনে বসতেন জহরলাল নেহরু বলে একজন। সাহিত্যিক ই এম ফর্স্টারের ধারণা ছিল, ফরাসী দার্শনিক ভলতেয়ারের যদি পুনর্জন্ম হয় আর তিনি বিশ্ব পরিস্থিতি নিয়ে একটা চিঠি লিখবেন ঠিক করেন, তাহলে একমাত্র যে রাষ্ট্রনেতা সেটা পাওয়ার যোগ্য, তিনি নেহরু। আর বিরোধী দলনেতার আসনে বসতেন অসামান্য বাগ্মী এবং পণ্ডিত, অবিভক্ত কমিউনিস্ট পার্টির নেতা হীরেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়। একটু দূরেই ছিলেন হিন্দু মহাসভার শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়। তিনিও কম বড় বক্তা নন। একবার শ্যামাপ্রসাদ বক্তৃতা দিচ্ছেন, নেহরু উঠে বললেন “What nonsense are you talking?” শ্যামাপ্রসাদ জবাব দিলেন “There’s no monopoly of yours in talking nonsense, sir.”

ঘটনাটা শুনেছিলাম হাওড়ার এক সময়কার সিপিএম সাংসদ প্রয়াত সুশান্ত চক্রবর্তীর মুখে। তিনি আরও একটা সংসদীয় বিতর্কের গল্প শুনিয়েছিলেন। সেটা ওরকম মান্ধাতার আমলের ঘটনা নয়, আমাদের সময়ের অনেক কাছাকাছি। কংগ্রেস নেতা এ আর আন্তুলের বিরুদ্ধে সিমেন্ট নিয়ে দুর্নীতির অভিযোগ। তা নিয়ে বিরোধীরা সংসদে জোর চেপে ধরেছেন সরকারকে। বিতর্কে এক মন্ত্রী দীর্ঘ বক্তৃতা দিলেন, তারপর বিশ্বনাথ প্রতাপ সিং বলতে উঠেছেন। শুরুতেই বললেন “The minister spoke at length, trying to cement his argument. But failed.”

এই গল্পগুলো শুনি ২০০০ সাল নাগাদ। তখন ক্লাস টুয়েলভে পড়ি, রাষ্ট্রবিজ্ঞানের তরুণ মাস্টারমশাই বিশ্বনাথ চক্রবর্তী ঠিক করলেন আমাদের দিয়ে মক পার্লামেন্ট করাবেন। যেদিন অনুষ্ঠানটা হল সেদিন অতিথি হিসাবে এসে সুশান্তবাবু শুনিয়েছিলেন গল্পগুলো। ওগুলো অবশ্য লোকসভা, রাজ্যসভার অধিবেশনের সরাসরি টিভি সম্প্রচার শুরু হওয়ার আগের ঘটনা। আমি যে প্রজন্মের লোক, তারাই প্রথম টিভিতে ওসব দেখতে পায়। তখনো কিন্তু সংসদের বিতর্কগুলোর একটা ন্যূনতম মান ছিল।

আমরা ট্রেজারি বেঞ্চে অটলবিহারী বাজপেয়ীর কথার চেয়ে লম্বা বিরামযুক্ত বক্তৃতা শুনেছি, সাথে তাঁর স্বরচিত কবিতা। যেগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি মনে আছে আস্থাভোটে জয়যুক্ত হওয়ার আগে বলা “কর্তব্য পথ পর / ইয়ে ভি সহি, উয়ো ভি সহি।” আমরা লালকৃষ্ণ আদবানির সংস্কৃতাশ্রয়ী হিন্দি বক্তৃতা শুনেছি, বিরোধী আসন থেকে জলদগম্ভীর সোমনাথ চ্যাটার্জিকে শুনেছি, পূর্ণ সাংমাকে মনে আছে, ভোজপুরী হিন্দি আর টুকরো রসিকতায় গুরু বিষয়কে লঘু করে বলতে পারার ক্ষমতাসম্পন্ন লালুপ্রসাদকেও মনে আছে। আরও পরে সরকারপক্ষের পি চিদম্বরম, কপিল সিবাল আর বিরোধীপক্ষের অরুণ জেটলি, সুষমা স্বরাজ, সীতারাম ইয়েচুরির বক্তব্যও কান পেতে শোনার মত ছিল। তার চেয়েও বড় কথা ওয়াক আউট, বিলের প্রিন্ট আউট ছেঁড়া, ওয়েলে নেমে স্লোগান দেওয়া — এসব সত্ত্বেও খুব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোতে বিতর্ক হত। তাতে সব পক্ষের প্রধান নেতারা অংশগ্রহণও করতেন। বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রী বক্তৃতা দেবেন না, এটা কল্পনাতীত ছিল।

তারপর আচ্ছে দিন এল। কার জানি না, তবে সংসদীয় গণতন্ত্রের যে নয় তা বেশ বোঝা যাচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী প্রথম দিন সংসদ ভবনে ঢোকার সময় সিঁড়িতে মাথা ঠেকিয়ে প্রণাম করেছিলেন, বলেছিলেন “এটাই তো আমার মন্দির।” এবং তারপর থেকেই ক্রমশ সংসদের অধিবেশন বসার দিন কমেছে, মন্দিরের প্রধান সেবায়েতের উপস্থিতিও কমেছে। অনেক দেশদ্রোহী বলে উনি সংসদ এড়িয়ে যান কারণ মেঠো বক্তৃতায় হাত-পা নেড়ে, চোখের জল ফেলে উতরে গেলেও সংসদে জোরালো বক্তৃতা দেওয়া ওঁর কম্ম নয়। তবে আমি একথা বিশ্বাস করি না। এটা নেহাতই কুৎসা। আসলে ভদ্রলোক দিনে মোটে চার ঘন্টা ঘুমোন তো। আমার ধারণা সেই চার ঘন্টা হল দুপুর বারোটা থেকে চারটে। তা ঐ সময়টা কি সংসদে বসে নষ্ট করা যায়? ওটুকু না ঘুমোলে মানুষটা অসুস্থ হয়ে পড়বে না?

কিন্তু দেশদ্রোহীরা তো এসব শুনবে না, তারা উল্টোপাল্টা বলবেই। সেটা বন্ধ করতে সরকার ভাল বুদ্ধি বার করেছেন – কোনো বিতর্ক হওয়ারই দরকার নেই সংসদে। এই প্রবণতা শুরু থেকেই অল্প অল্প দেখা যাচ্ছিল। বিমুদ্রাকরণের মত বড় বিষয় নিয়েও বিরোধীরা চেঁচামেচি করার পর সরকার আলোচনায় রাজি হয়েছিল। তাও চেয়েছিল যেন সংক্ষিপ্ত আলোচনা হয়, ভোটাভুটির ব্যাপার না থাকে। এবং যেভাবেই আলোচনা হোক না কেন, প্রধানমন্ত্রী কিন্তু বক্তব্য রাখবেন না।

এবারে আরেক কাঠি সরেস। একটা লোক দেশের এত টাকা মেরে দিয়ে পালিয়ে গেল যে এখনো ঠিক বোঝা যাচ্ছে না কত টাকা, অথচ সরকারের মনেই হল না এটা নিয়ে সংসদে আলোচনার প্রয়োজন আছে। বিরোধীরা আলোচনার দাবীতে বিস্তর চেঁচামেচি করছেন (বেশ করছেন), এখন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানাচ্ছেন সরকার সবকিছু নিয়ে আলোচনায় রাজি। কিন্তু একথা বলছেন কবে? না বিনা বিতর্কে অর্থ বিল পাশ হয়ে যাওয়ার পরে। যা যা ছিল তাতে তার মধ্যে রাজনৈতিক দলগুলোর বিদেশের টাকায় পুষ্ট হওয়াকে আইনসম্মত করে নেওয়াও আছে। এতবড় কান্ড হয়ে গেল কোনো বিতর্ক ছাড়াই। সরকারের যেন কোনো দায় নেই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এনে সংসদ সচল করার। ফ্লোর ম্যানেজমেন্ট কথাটার যেন কোনো অস্তিত্বই নেই।

আসলে বিনা বিতর্কে পছন্দের কাজগুলো হয়ে যাক – এটা এদেশে কে না চায়? যে কোনো বড় শহরের জনবহুল মোড়ে দাঁড়িয়ে যাদের ভদ্রলোক-ভদ্রমহিলা বলে মনে হয় তাদের জিজ্ঞেস করে দেখুন। কতজন যে বলবে “গণতন্ত্রের সীমা থাকা উচিত”, “মিলিটারি রুল হচ্ছে বেস্ট”!

আরও পড়ুন কী ঢাকছে সরকারি চোলি? কেনই বা ঢাকছে?

যাঁরা মনে করেন কথাগুলো ঠিকই, তাঁদের জন্যে একটা ঐতিহাসিক ঘটনা বলে শেষ করি। ঘটনাটার সাথে আমাদের দেশের কোন ঘটনার মিল আছে কিনা আপনারাই ভেবে দেখুন।

ঘটনাটা ঘটে ২১ মার্চ, ১৯৩৩ তারিখে। সেদিন নাজি পার্টির নেতা হিটলার পটসডাম গ্যারিসন চার্চের বাইরে তদানীন্তন জার্মান রাষ্ট্রপতি পল ফান হিন্ডেনবার্গকে হাঁটু মুড়ে অভিবাদন জানায় এবং করমর্দন করে। উপলক্ষটা ছিল নব নির্বাচিত রাইখস্ট্যাগের (জার্মান সংসদ আর কি) প্রথম অধিবেশন। যেহেতু হিন্ডেনবার্গ রাষ্ট্রপ্রধান আর দিনটা হল রাইখস্ট্যাগের অধিবেশন শুরুর দিন, তাই অনেকে মনে করেছিল হিটলার জার্মান সংবিধান ইত্যাদির প্রতি নিজের আনুগত্য প্রকাশ করল। এর পরের বারো বছর প্রমাণ করেছে তাদের ভাবনাটা সঠিক ছিল কিনা।