বাংলা বলে কোনো ভাষা নেই, বাঙালি বলে কোনো জাতি নেই?

আজ থেকে বছর তিরিশেক আগেই বাংলা ভাষা কোনটা, বাঙালি কারা – সে বোধ ভদ্রলোক শ্রেণি হারিয়েছে। ফলে আজ যে বাঙালি সাহিত্যিক, অধ্যাপকদের দেখা যাচ্ছে ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়াররা আক্রান্ত না হলে বাংলা ভাষার উপর আক্রমণ হচ্ছে তা বিশ্বাস না করতে, বা বাঙালি প্রবাসী শ্রমিকদের উপর আক্রমণকে বাঙালিদের উপর আক্রমণ বলে না ধরতে – তাতে অবাক হওয়ার কিছু নেই।

ঠিক এক দশক আগের কথা। সদ্য রাজকাহিনী বেরিয়েছে (অবন ঠাকুরের নয়, সৃজিত মুখার্জির)। ইংরিজি জানা বাঙালি ভদ্রলোক, ভদ্রমহিলারা আপ্লুত হয়ে একটা গান শেয়ার করতে লাগলেন সোশাল মিডিয়ায়। কী গান? ওই যে গানটা আমাদের জাতীয় স্তোত্র। কিন্তু এত আপ্লুত হওয়ার কারণ কী? কারণ রবীন্দ্রনাথের লেখা গানটা আসলে অনেক বড়, অত বড় জাতীয় স্তোত্র রাখা যায় না ব্যবহারিক অসুবিধার কারণেই। তাই আমাদের জাতীয় স্তোত্র হিসাবে ব্যবহৃত হয় শুরুর দিকের খানিকটা অংশ। ওই ছবিতে সৃজিতবাবু গোটা গানটাই ব্যবহার করেছিলেন। এই নিয়ে আপ্লুত হওয়া অন্যায় নয়। কিন্তু মুশকিল হল, দেখা গেল যাঁরা শেয়ার করছেন তাঁদের অনেকেই লিখছেন ‘লিসন টু দ্য বেঙ্গলি ভার্শন অফ আওয়ার ন্যাশনাল অ্যান্থেম। ইট’স বিউটিফুল’ – এই জাতীয় কথাবার্তা। সাধারণত সোশাল মিডিয়ায় কারোর কোনো ভুল ধরলে তিনি প্রবল খেপে গিয়ে যিনি ভুল ধরেছেন তাঁকে অপমান করেন। এক্ষেত্রে যেসব বাঙালি মান-অপমানের তোয়াক্কা না করে ওইসব পোস্টে মন্তব্য করেছিলেন বা নিজে পোস্ট করেছিলেন যে গানটা তো বাংলাতেই লিখেছিলেন রবিবাবু, তার আবার বাংলা ভার্শন কী – তাঁদের ‘আঁতেল’, ‘সবজান্তা’ ইত্যাদি বিশেষণ দেওয়া হচ্ছিল। তবে ভারতবর্ষে ইংরিজি জানা মূর্খদের আত্মবিশ্বাস বেশি। তাই সেই মূর্খরা কেউ কেউ আবার যিনি শুধরে দেওয়ার চেষ্টা করছেন তাঁকেই ভুল প্রমাণ করার চেষ্টা করছিল। ব্যাপার দেখে হাসা উচিত না কাঁদা উচিত তা বুঝতে না পারলেও, এটুকু বুঝে গিয়েছিলাম যে বাঙালি সংস্কৃতির ধারক ও বাহক যে ভদ্রলোক শ্রেণি, তাদের ভবিষ্যৎ ঝরঝরে হয়ে গেছে। আজ অমিত মালব্যকে যতই গালাগালি দিন, একথা নিশ্চিত হয়ে বলার উপায় নেই যে তাঁর ওই গণ্ডমূর্খ পোস্টের যুক্তিগুলো কোনো ইংরিজি শিক্ষিত বাঙালি ভদ্রলোকেরই জুগিয়ে দেওয়া নয়।

এই ভদ্রলোক-ভদ্রমহিলাদের অতি পছন্দের একখানা ধর্মীয় সংগঠন আছে, যাকে তাঁরা ধর্মনিরপেক্ষ সংগঠন বলে ভাবতে ভালবাসেন (মানে আমড়াকে আম বলে ভাবতে ভালবাসেন) – রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশন। রাজকাহিনীর গান নিয়ে ভদ্রলোক শ্রেণির রাজবোকামির দেড় দশক আগে ওই সংগঠন পরিচালিত একটা কলেজের পড়ুয়া ছিলাম। আমার সহপাঠী ছিল মঠের ভিতরেই গড়ে ওঠা, সন্ন্যাসীদের দ্বারা পরিচালিত বেদ বিদ্যালয়ে ছোট থেকে লেখাপড়া করে আসা কয়েকজন ছাত্র। তারা জনগণমন গাইত সংস্কৃত উচ্চারণে। আমরা কয়েকজন ছাত্র মিলে একদিন তাদের জিজ্ঞেস করলাম ‘ওরকম উচ্চারণে গাস কেন?’ তারা অত্যন্ত গর্বের সঙ্গে জানাল, ওটা ছোট থেকে শিখেছে। ওটাই শুদ্ধ সংস্কৃত উচ্চারণ। আমরা জিজ্ঞেস করলাম ‘বাংলা গানের উচ্চারণ সংস্কৃতের মত হবে কেন?’ তারা কিছুতেই মানতে রাজি হল না যে গানটা বাংলায় লেখা। নির্ঘাত তারা আজও জাতীয় স্তোত্র গাওয়ার প্রয়োজন হলে ‘শুদ্ধ সংস্কৃত’ উচ্চারণেই গায়। এরা কেউ কিন্তু প্রান্তিক পরিবারের সন্তান নয়, হিন্দিভাষীও নয়। গ্রাম, শহর – দুরকম জায়গার ছেলেই ছিল সেই দলে। সত্যি কথা বলতে, কেবল এরা নয়। আইসিএসই বা সিবিএসই স্কুলে পড়ে আসা বাঙালি সহপাঠীদেরও দেখেছি সংস্কৃত উচ্চারণে জনগণমন গাইতে। অর্থাৎ আজ থেকে বছর তিরিশেক আগেই বাংলা ভাষা কোনটা, বাঙালি কারা – সে বোধ ভদ্রলোক শ্রেণি হারিয়েছে। ফলে আজ যে বাঙালি সাহিত্যিক, অধ্যাপকদের দেখা যাচ্ছে ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়াররা আক্রান্ত না হলে বাংলা ভাষার উপর আক্রমণ হচ্ছে তা বিশ্বাস না করতে, বা বাঙালি প্রবাসী শ্রমিকদের উপর আক্রমণকে বাঙালিদের উপর আক্রমণ বলে না ধরতে – তাতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। এটাই অনিবার্য ছিল।

এখন কথা হচ্ছে, এমনটা হল কেন? বাংলা ভাষা, সংস্কৃতির লাগাম তো চিরকালই এই ভদ্রলোকদের হাতেই থেকেছে। দুই বাংলা ভাগ হওয়ার পরে তো আরওই। বাংলা সিনেমার যত বিখ্যাত অভিনেতা, অভিনেত্রীর নাম মনে করতে পারেন তাদের কজন হিন্দু নিম্নবর্গীয় বা মুসলমান? পাকিস্তান ভেঙে বাংলাদেশ হওয়ার পরে দু-চারজন মুসলমান অভিনেতা, অভিনেত্রী পশ্চিমবঙ্গে অভিনয় করেছেন বটে, কিন্তু মুসলমান চরিত্র কটা এপারের বাংলা সিনেমায়? মুসলমান সমাজের গল্পই বা কটা? পশ্চিমবঙ্গের বাংলা পত্রপত্রিকার সম্পাদক, সাহিত্যিকদের মধ্যে খুঁজতে গেলেও ঘুরে ফিরে সেই প্রাক-স্বাধীনতা যুগের মীর মোশাররফ হোসেন, কাজী নজরুল ইসলাম, জসীমউদ্দিন, সৈয়দ মুজতবা আলী, এস ওয়াজেদ আলী বা একটু পরের সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজের নাম আসবে। কিছু নিবিষ্ট পাঠক হয়ত আবুল বাশার বা আফসার আহমেদের নাম মনে করতে পারবেন। জনপ্রিয় গাইয়ে, বাজিয়েদের মধ্যেও সেই ইংরিজি শিক্ষিত বামুন, কায়েত, বদ্যিরাই বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ। শিক্ষক, অধ্যাপক, ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, উকিল, সাংবাদিক, রাজনীতিবিদ – যেদিকে তাকাবেন সেদিকই তো ভদ্রলোকরা আলো করে আছেন। তাহলে এ অবস্থা হল কেন? স্পষ্টতই পূর্বসুরিরা পতাকা যাদের হাতে দিয়েছেন তাদের বহিবার শকতি দেননি। কিন্তু কেন দেননি, বা দিতে পারেননি?

বামফ্রন্ট সরকার প্রাথমিক স্কুল থেকে ইংরিজি তুলে দেওয়ার জন্যে ভদ্রলোকেরা বেসরকারি ইংরিজি মাধ্যম স্কুলে ছেলেমেয়েদের ভর্তি করতে বাধ্য হন আর তা থেকেই শিক্ষিত বাঙালির সঙ্গে বাংলা ভাষার বিযুক্তি শুরু, কারণ ইংরিজিটা তো শিখতেই হবে। নইলে কাজকর্ম পাওয়া যায় কী করে? ওটাই তো কাজের ভাষা।

এরকম একটা তত্ত্ব প্রায়শই খাড়া করা হয়। এই তত্ত্ব নজর করার মত। শিক্ষা মাতৃভাষাতেই হওয়া উচিত – একথা আমাদের রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, সত্যেন্দ্রনাথ বসু থেকে শুরু করে গোটা দুনিয়ার অনেক বড় বড় পণ্ডিত বলেছেন। আবার বিপক্ষেও যুক্তি আছে। সে বিতর্কে না গিয়ে একথা মেনে নেওয়া যাক যে, কোনো ভাষা কাজের ভাষা হয়ে না থাকলে গুরুত্ব হারায়। বামফ্রন্ট সরকার মাতৃভাষার উপর জোর দিলেও বাংলাকে গোটা রাজ্যের কাজের ভাষা করে তোলার পর্যাপ্ত উদ্যোগ নেয়নি। পাশাপাশি ভারতের মত বহুভাষিক দেশে ইংরিজির গুরুত্ব বিশ্বায়নের সঙ্গে সঙ্গে বেড়েছে এবং ভদ্রলোকরা বাংলা ভাষাকে ক্রমশ ত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছেন – একথা তর্কের খাতিরে নাহয় মেনে নেওয়া গেল। কিন্তু কথা হচ্ছে, বাঙালি ভদ্রলোকদের ছেলেমেয়েরা তো ইংরিজি মাধ্যম স্কুলে পড়ছে বিংশ শতাব্দীর গোড়া থেকেই। যাঁর বই ছেলেমেয়ের হাতে তুলে না দিলে আজও এমনকি অনাবাসী বাঙালিদেরও ‘বাংলার সংস্কৃতি শেখাচ্ছি না’ ভেবে অপরাধবোধ হয়, সেই লীলা মজুমদার নিজেই কনভেন্টের ছাত্রী ছিলেন। তা ইংরিজি মাধ্যম স্কুলে ভর্তি করলেই ছেলেমেয়েকে বাংলা বইপত্তর পড়ানো, বাংলা গান শোনানো, সিনেমা দেখানো, নাটক দেখানো তুলে দিতে হবে – এ নিয়ম কি বামফ্রন্ট সরকারের তৈরি? আগেকার বাঙালির অমন করার দরকার পড়েনি, হঠাৎ বামফ্রন্ট সরকার প্রাথমিক শিক্ষা থেকে ইংরিজি তুলে দিতেই দরকার পড়ল?

সত্যি কথা বলতে, সিপিএম ক্রমশ ভদ্রলোকদের পার্টি হয়ে যাওয়ায় বামফ্রন্টও মেহনতি মানুষের সরকার থেকে ভদ্রলোকদের সরকারেই পরিণত হয়েছিল নয়ের দশকের শেষার্ধে। তাই ভদ্রলোকদের ইংরিজি নিয়ে হাহুতাশের প্রভাবে এই সহস্রাব্দের গোড়ায় কিন্তু প্রাথমিকে ইংরিজি ফিরিয়েও এনেছিল। তারপর কি ভদ্রলোকেরা ছেলেমেয়েদের সরকারি প্রাথমিক স্কুলে ফিরিয়ে এনেছিলেন? মোটেই না। উলটে মাধ্যমিক স্তরেও বেসরকারি স্কুলে ভর্তি করার ঝোঁক বেড়ে গিয়েছিল। এখন নাহয় এসএসসি কেলেঙ্কারি ইত্যাদি যুক্তি দিয়ে বলা যায় সরকারি স্কুলগুলো পড়াশোনার অনুপযুক্ত হয়ে গেছে। বাম আমলে তো প্রতিবছর এসএসসি পরীক্ষা হত, রাজ্যের আনাচে কানাচে গজিয়ে ওঠা ইংরিজি মাধ্যমের স্কুলগুলোর মাস্টারদের চেয়ে অনেক কঠিন প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষা দিয়ে মাস্টারমশাই, দিদিমণিরা সরকারি বাংলা মাধ্যম স্কুলগুলোতে যোগও দিতেন। ত্রুটি থাকলেও স্কুলের পরিকাঠামো নিয়ে, পড়াশোনা নিয়ে তখনকার সরকারের আগ্রহ যে বর্তমান সরকারের চেয়ে বেশি ছিল – তা আজকাল অনেক তৃণমূল কংগ্রেস সমর্থকও স্বীকার করেন। তাহলে?

এই প্রশ্নের উত্তর দিতে গেলে আসলে বাঙালি ভদ্রলোকের অভদ্রতা প্রকাশ হয়ে পড়বে। বহু ভদ্রলোকের কাছেই আপত্তিকর ছিল বাম আমলে মুটে, মজুর, রিকশাওয়ালা, বাড়ির কাজের লোক, মুচি, মেথরের ছেলেমেয়েদের তাদের ছেলেমেয়েদের সঙ্গে একই স্কুলে ঢুকে পড়া। আরও বেশি গায়ে লাগত যখন তারা কেউ নিজের ছেলেমেয়ের চেয়ে পরীক্ষায় বেশি নম্বর পেয়ে যেত। পরীক্ষার ফল বেরোবার পর আমাদের অনেককেই বকুনি খেতে হয়েছে ‘তোর লজ্জা করে না? অমুকের বাড়িতে কোনোদিন কেউ স্কুলের গণ্ডি পেরোয়নি, আর ও অঙ্কে ৮৫ পেয়ে গেল। তুই মাস্টারের ছেলে হয়ে ৫৫? ছিঃ!’ মাস্টারের ছেলে বড় হয়ে মাস্টার; ডাক্তারের ছেলেমেয়ে তো বটেই, ছেলের বউ আর জামাইও ডাক্তার; উকিলের ছেলেমেয়ে উকিল; মুদির ছেলে মুদি, তার মেয়ে অন্য ছোট ব্যবসায়ীর গৃহবধূ; রিকশাওয়ালার ছেলে সবজিওয়ালা – এই সামাজিক স্থিতাবস্থায়, গোবলয়ের লোক বলে বাঙালি ভদ্রলোক যাদের দিকে তাকিয়ে নাক সিঁটকোয়, তাদের মত নিজেরাও অভ্যস্ত ছিল। সেই স্থিতাবস্থা ঘেঁটে যাওয়ার সামান্য সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল বাম আমলে। ওটুকুই ভদ্রলোকদের পক্ষে শিশুর আত্মার উপর নরকের দুঃস্বপ্নের মত হয়ে দাঁড়িয়েছিল। এই দুঃস্বপ্ন থেকে মুক্তি পাওয়ার পথ তারা খুঁজে পায় অনেক টাকা মাইনের বেসরকারি স্কুলে। নয়ের দশক থেকে মনমোহনী অর্থনীতির জোরে বাঙালি ভদ্রলোকের জীবনে আমূল পরিবর্তন এসে যায়। তাদের হাতে এসে গেল খরচ করার মত অতিরিক্ত টাকা। ফলে ছোটলোকের ছেলেপুলের সঙ্গে এক স্কুলে পড়ানোর আর দরকার রইল না। পাঠিয়ে দাও ফেলো কড়ি মাখো তেল স্কুলে। এমনকি বামফ্রন্ট সরকারের বদান্যতায় উচ্চমধ্যবিত্ত হয়ে ওঠা সরকারি স্কুলের মাস্টারমশাই, দিদিমণিরাও নিজেদের ছেলেমেয়েকে ইংরিজি মাধ্যম স্কুলে পাঠানো শুরু করেন তখনই। সংখ্যাটা অবশ্যই এখন অনেক বেড়েছে, তার পিছনে বর্তমান সরকারের শিক্ষাজগৎ নিয়ে ছেলেখেলার অবদান কম নয়। কিন্তু আসল কথা হল, ‘ইংরিজি শিখতে হবে বলে ইংরিজি মাধ্যম স্কুলে পড়াচ্ছি’ – এটা স্রেফ অজুহাত। দুর্বল অজুহাত। সেটা বুঝতে পেরেই যুক্তি জোরদার হবে মনে করে নয়ের দশকে অনেক বাবা-মা বলতেন ‘ইংরিজি বলা শিখতে হবে। নইলে কম্পিটিশনে দাঁড়াতে পারবে না। তাই ইংলিশ মিডিয়ামে দিয়েছি।’ এও ভারি মজার কথা। স্কুলটা কি তাহলে ‘স্পোকেন ইংলিশ’ শেখার জায়গা? ওটা জানলেই চাকরিবাকরি পাওয়া যায়? চোস্ত ইংরিজি বলতে পারলেই অঙ্ক, বিজ্ঞান, ভূগোল, ইতিহাস – সব শেখা হয়ে যাবে? অধিকাংশ বাঙালি ভদ্রলোক কিন্তু তেমনই মনে করে আজও। কথা বললেই টের পাওয়া যায়। তবে আজকাল একটা নতুন ব্যাপার ঘটেছে। ইংরেজ আমলে বাঙালি ভদ্রলোকের জীবনের লক্ষ্য ছিল যতটা সম্ভব ইংরেজ হওয়া, স্বাধীনতার পর থেকে – অনাবাসী ভারতীয় হওয়া। আজকের বাঙালি ভদ্রলোকের জীবনে একটা নতুন লক্ষ্য যোগ হয়েছে – মাড়োয়ারি বা গুজরাটি হওয়া। তাই ছেলেপুলেকে ইংরিজি মাধ্যমে পড়িয়ে ইংরিজি বলা শিখিয়েই সে খুশি নয়, দ্বিতীয় ভাষা হিসাবে হিন্দিও গুঁজে দিচ্ছে। সুতরাং বাংলা মাঠের বাইরে। গল্পের বই পড়ার এবং পড়ানোর চল বাঙালি ভদ্রলোক বাড়ি থেকে উঠে গেছে বহুকাল, এখন আবার বাবা-মায়েরা খেয়াল রাখেন, ছেলেমেয়ে যেন বাংলা সিরিয়াল বা সিনেমা দেখে না ফেলে।

এমতাবস্থায় বাংলা ভাষা-সংস্কৃতি কী, কোনটা তার অঙ্গ আর কোনটা নয় – তা নিয়ে স্পষ্ট ধারণা থাকবে কোন চুলোয়? সংজ্ঞাগুলো ঠিক করে দিয়েছি আমরা ভদ্রলোকরা। আমাদের সংজ্ঞায়িত বাংলা ভাষা-সংস্কৃতিকে আমরাই বাংলার বাইরে বাংলা বলে পরিচিত হতে দিইনি, ওগুলোকে আমাদের সংস্কৃতির বৃত্তে জায়গাই দিইনি। কলকাতা ও সংলগ্ন এলাকার ভাষায় লেখা গান আমাদের ‘আধুনিক গান’। বাঙাল ভাষার গানকে তখনই বাংলা গান বলে মেনেছি যখন শচীন দেববর্মণের মত রাজপুত্র গেয়েছেন। গ্রামের মানুষের নিজের গানকে লোকগীতি বলে আলাদা বাক্সে রেখেছি। পনিটেল বাঁধা শহুরে ভদ্রলোকরা গিটার বাজিয়ে ব্যান্ড বানিয়ে গাইলে তবেই সে গানের জায়গা হয়েছে প্রেসিডেন্সি, লেডি ব্র্যাবোর্ন বা যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস মোচ্ছবে। আচ্ছা তাও নাহয় মেনে নেওয়া গেল। কিন্তু নিজেরা যাকে বাংলা ভাষা, বাঙালি সংস্কৃতি বলে দেগে দিয়েছি তাকে সমাজের নিচের তলায় ছড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টাও কি করেছি? ফিল্ম সোসাইটি বানিয়ে ঋত্বিক ঘটকের উদ্বাস্তুদের নিয়ে তৈরি ছবি দেখেছি আর প্রবন্ধ লিখেছি। পরবর্তীকালে বাংলাদেশ থেকে চলে আসা উদ্বাস্তু, যারা এখানে এসে পেটের দায়ে আমাদের বাড়িতে বাসন মাজে বা ঘর ঝাঁট দেয় – তাদের দেখানোর তো চেষ্টা করিনি। সত্যজিৎ রায় বিশ্ববন্দিত পরিচালক বলে জাঁক করেছি, কিন্তু পথের পাঁচালী-র হরিহর রায়ের পরিবারের মত হতদরিদ্র বাঙালিকে ওই ছবি দেখানোর কোনো প্রয়াস তো আমাদের ছিল না। কারণ আমরা নিশ্চিত ছিলাম – ওরা ওসব বুঝবে না। ওদের জন্যে বেদের মেয়ে জ্যোৎস্না-ই ঠিক আছে। ঘটনা হল, যার দুবেলা পেট ভরে ভাত জোটে না, তারও মনের খিদে থাকে এবং সে খোরাক খুঁজে নেয়। বাংলার গরিব মানুষ, নিম্নবর্গীয় মানুষও তাই করেছে। আমাদের তৈরি সংস্কৃতি যখন তাদের পোষায়নি তখন তারা হিন্দি সিনেমা, হিন্দি গানে মজেছে। অধুনা ইউটিউব শর্টস আর ইনস্টা রিলসে। আমাদের অ্যাকাডেমি, আমাদের নন্দন নিয়ে আমরাই বুঁদ ছিলাম। ও জিনিস আজ কেউ বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দিলেই বা ওদের কী? এদিকে আমরা, বিশ্বায়িত ভদ্রলোকরাও, হিন্দি ভাষা-সংস্কৃতির দিকে ঝুঁকেছি। ইংরিজি তো ছিলই। ফলে এখন হঠাৎ আবিষ্কার করছি – হিন্দি-হিন্দু-হিন্দুস্তান তত্ত্বের প্রবক্তারা বলে দিচ্ছে বাংলা বলে আসলে কোনো ভাষা নেই, আর সেটাকেই ঠিক বলছেন বাংলা ভাষায় বইপত্তর লিখে নাম করে ফেলা লেখকরা।

নবজাগরণই বলি আর সমাজ সংস্কার আন্দোলনই বলি, উনিশ শতকে সেই প্রক্রিয়ার মধ্যে দিয়ে আলোর সন্ধান যে বাঙালি ভদ্রলোক পেয়েছিল তা অনস্বীকার্য। কিন্তু আলো বাড়াতে গেলে আলো ছড়াতে হয়। ভদ্রলোকরা কী করেছে? প্রদীপ নিজের ঘরেই রেখে দিয়েছে, হাতে নিয়ে যাদের ঘরে আলো নেই তাদের কাছে যায়নি, তারা আমাদের প্রদীপ থেকে নিজেদের প্রদীপ জ্বালিয়ে নিতে পারেনি। এখন আমাদের প্রদীপের আয়ু ফুরিয়ে এসেছে, তাই চারপাশ অন্ধকারে ডুবে যেতে বসেছে। আসলে আমাদের বাংলা ভাষা চর্চা, সংস্কৃতি চর্চা বা যে কোনো চর্চাই বহুকাল হল প্রদর্শনীতে পরিণত হয়েছে। ওর মধ্যে ঘাম ঝরানোর কোনো ব্যাপার নেই, তাই ও থেকে আমাদের কোনো অর্জনও নেই। কেন এমন হল? ভাবতে গেলে জ্যোতি ভট্টাচার্য ‘কালচার’ ও ‘সংস্কৃতি’ প্রবন্ধে যে গোলমালের কথা বলেছেন সেটাই মনে পড়ে যাচ্ছে। একবার পড়ে দেখা যাক

ইংরেজি ভাষা থেকে ‘কালচার’ শব্দটার আমরা বাংলা পরিভাষা করেছি ‘সংস্কৃতি’। ঠিক পরিভাষা কী হওয়া উচিত – ‘সংস্কৃতি’ না ‘কৃষ্টি’, তা নিয়ে বিসংবাদ হয়েছে এককালে। রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, ‘কৃষ্টি’ শব্দটা বাংলা ভাষায় কুশ্রী অপজনন। ‘তাসের দেশ’ নাটকে শব্দটা নিয়ে কৌতুকও করেছিলেন রবীন্দ্রনাথ। তারপরে ‘কৃষ্টি’ শব্দটা ক্রমে লোপ পেয়েছে, ‘সংস্কৃতি’-ই ব্যবহারসিদ্ধ লোকগ্রাহ্য শব্দ হয়ে উঠেছে।

ইংরেজরা ‘কালচার’ শব্দটা নিয়েছিল লাটিন ভাষা থেকে। লাটিন ভাষায় শব্দটার প্রধান অর্থ ছিল কৃষিকর্ম, ‘এগ্রিকালচার’ শব্দের মধ্যে সেই প্রধান অর্থ বাহিত হচ্ছে। এই কারণেই বাংলায় কেউ কেউ ‘কৃষ্টি’ বলতে চেয়েছিলেন, কর্ষণের সঙ্গে তার সম্পর্ক। কৃষিকর্মে কর্ষিত ক্ষেত্রে বীজ বপন করে নতুন শস্য উৎপাদন করা হয়…চিকিৎসাবিজ্ঞানে রোগজীবাণুর প্রতিষেধক জীবাণু ‘কালচার’ করে তৈরি করা হয়; রক্তে রোগজীবাণু বা ক্ষতিকর কোনো পদার্থ থাকলে অণুবীক্ষণে তা দেখতে হলে অনেক সময় রক্তবিন্দুর ‘কালচার’ করে তাকে বর্ধিত করতে হয়। মোট কথা ‘কালচার’ শব্দটার মধ্যে কর্ষণ বা অনুশীলনের দ্বারা নতুন বস্তু অথবা নতুন গুণ সৃষ্টি ইঙ্গিত রয়েছে, এর ঝোঁক উৎপাদনমুখী। কোনো না কোনো রকম বৃদ্ধি এর ফল।

আমাদের ‘সংস্কৃতি’ শব্দটির শব্দার্থগত ঝোঁক কিন্তু এরকম নয়। এর প্রধান অর্থ রূঢ় অবস্থা থেকে মার্জিত অবস্থায় আনয়ন, স্থূল অবস্থা থেকে বাহুল্যবর্জিত করে সূক্ষ্ম অবস্থায় আনয়ন। নতুন বস্তু সৃষ্টি, নতুন গুণ উৎপাদন, বা সংখ্যাবৃদ্ধি এর অভীপ্সিত লক্ষ্য নয়, যা আছে তাকেই একটা পরিশীলিত সংযত সুসমঞ্জস সুকুমার রূপদান এর লক্ষ্য। ‘সংস্কৃতি’ শব্দটির এই প্রধান ঝোঁক আমাদের আজকের পরিস্থিতিতে খানিকটা বাধাস্বরূপ হয়ে উঠছে – এরকম আশঙ্কা করছি।

পঞ্চাশ বছরেরও বেশি আগে লেখা এই কথাগুলো আজ আবার ভাবাচ্ছে। কারণ সংস্কৃতি শব্দের প্রধান ঝোঁক এখন আর খানিকটা বাধা নয়, গভীর কুয়োর দেওয়াল হয়ে গেছে দেখা যাচ্ছে। সেই কুয়োর ব্যাং হয়ে গেছি আমরা ভদ্রলোকরা; বাইরে রয়ে গেছে বাঙালি মুসলমান, বাঙালি নিম্নবর্গীয় হিন্দু এবং সাধারণভাবে, গরিব বাঙালি। কৃষ্টি শব্দটায় রবীন্দ্রনাথ প্রবল আপত্তি করেছিলেন বটে, তবে ভদ্রলোকদের কূপমণ্ডূকতা ধরে ফেলতে তাঁরও ভুল হয়নি। বঙ্গভঙ্গ রদের আন্দোলনে প্রথমে নেতৃত্ব দিয়েও তাই সরে গিয়েছিলেন। কারণ ফাঁকিবাজিটা ধরে ফেলেছিলেন। পরেও তাঁর লেখাপত্রে ভদ্রলোকি চালাকির আবরণ উন্মোচন করেছেন বারবার। ‘হিন্দু-মুসলমান’ প্রবন্ধে যেমন লিখেছেন

অল্পবয়সে যখন প্রথম জমিদারি সেরেস্তা দেখতে গিয়েছিলুম তখন দেখলুম, আমাদের ব্রাহ্মণ ম্যানেজার যে তক্তপোষে গদিতে বসে দরবার করেন সেখানে এক ধারে জাজিম তোলা, সেই জায়গাটা মুসলমান প্রজাদের বসবার জন্যে; আর জাজিমের উপর বসে হিন্দু প্রজারা। এইটে দেখে আমার ধিক্কার জন্মেছিল। অথচ এই ম্যানেজার আধুনিক দেশাত্মবোধী দলের। ইংরেজরাজের দরবারে ভারতীয়ের অসম্মান নিয়ে কটুভাষাব্যবহার তিনি উপভোগ করে থাকেন, তবু স্বদেশীয়কে ভদ্রোচিত সম্মান দেবার বেলা এত কৃপণ। এই কৃপণতা সমাজে ও কর্মক্ষেত্রে অনেকদূর পর্যন্ত প্রবেশ করেছে; অবশেষে এমন হয়েছে যেখানে হিন্দু সেখানে মুসলমানের দ্বার সংকীর্ণ, যেখানে মুসলমান সেখানে হিন্দুর বাধা বিস্তর।

এই ম্যানেজারই বাঙালি ভদ্রলোকের সংস্কৃতি আর কৃষ্টির তফাতের প্রমাণ। এঁর দেশাত্মবোধ হল প্রদর্শনী। ওটার নির্দিষ্ট মঞ্চ আছে, সেখানে নিজের পরিশীলিত দেশাত্মবোধ প্রমাণ করতে ওটা কাজে লাগে। কিন্তু নিজের জীবনে মেনে চলার, মুসলমানও যে তাঁর সমান ভারতীয় তা স্বীকার করার এবং অনুশীলন করার দায় নেই। এমন চরিত্রই এখন হাজারে হাজারে আমাদের চারপাশে ঘুরে বেড়াচ্ছে। রবীন্দ্রনাথ এই প্রবন্ধ লিখেছিলেন স্বাধীনতার আগে। স্বাধীনোত্তর ভারতে আবার সারা দেশের উদারপন্থী এবং বাঙালি ভদ্রলোকদের নিজেকে সংস্কৃতিবান প্রমাণ করতে ধর্মনিরপেক্ষ হওয়া আবশ্যিক হয়ে দাঁড়িয়েছিল। এখন দেশের রাজনীতি বদলে যাওয়ায়, পরিবেশ বদলে যাওয়ায় ওটা আর আবশ্যিক নয়। তাই এই ম্যানেজারবাবুর মনের কথা তিলোত্তমা মজুমদার, পবিত্র সরকারদের মুখে উঠে এসেছে, যার মর্মার্থ হল – ভদ্রলোকরাই বাঙালি। মুসলমানরা বাঙালি নয়। ভদ্রলোকদের উপর আক্রমণ হলে তবেই বলা চলে বাংলা ভাষার উপর আক্রমণ হয়েছে, মুসলমানদের উপর আক্রমণ বাংলা ভাষার উপর আক্রমণ নয়।

এ হল বাঙালি ভদ্রলোকের অন্তত দুশো বছর ধরে আপন মনের মাধুরী মিশায়ে তৈরি সত্য। এর সঙ্গে বাস্তবের কোনো সম্পর্ক নেই। এই তিলোত্তমা, এই পবিত্র, এই সঙ্গীতা বন্দ্যোপাধ্যায়রাই একুশে ফেব্রুয়ারি এসে পড়লে গদগদ উত্তর-সম্পাদকীয় প্রবন্ধ লেখেন বাংলা ভাষা নিয়ে। কিন্তু এখন বোঝা যাচ্ছে, ওগুলো সব প্রদর্শনী। আজকাল যাকে বাংলায় বলে ‘পারফরম্যান্স’। মনের কথা হল – একুশের ভাষা শহিদরা কেউ বাঙালি নয়, তারা ভদ্রলোকদের বাংলা ভাষার জন্যে প্রাণ দিয়েছিল মাত্র। ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধেও এঁরা বিস্তর লেখালিখি, বলাবলি করে চলেছেন সেই ২০১৪ সাল থেকে। কিন্তু স্পষ্টতই ওসবও পারফরম্যান্স। নইলে বিশাল বিশাল গেটওয়ালা আবাসনে থাকা এবং শীতাতপনিয়ন্ত্রিত গাড়িতে চড়া লেখক, বুদ্ধিজীবীরা কী করে বলেন যে এই বাংলায় হঠাৎ চতুর্দিকে প্রচুর নতুন লোক দেখতে পাচ্ছেন, যাদের সঙ্গে বাঙালিদের কোনো সংস্কৃতিগত মিল নেই? কোনো পরিসংখ্যানই এই সত্য প্রতিষ্ঠা করে না। এ যে নাজিদের আতঙ্ক সৃষ্টির ধ্রুপদী কৌশল, তা না জানার মত কম লেখাপড়া এঁদের নয়। উপরন্তু, যদি তর্কের খাতিরে ধরেও নেওয়া যায় চারপাশটা বাংলাদেশি এবং রোহিঙ্গায় ভরে গেছে, তাহলেই বা তাদের সঙ্গে এই ভদ্রমহিলা, ভদ্রলোকদের সংস্কৃতিগত মিলের অভাব হয় কী করে? অনেক বেশি অমিল তো হওয়ার কথা কলকাতা ও শহরতলিতে দ্রুত বেড়ে চলা বহুতলগুলোর বাসিন্দা হয়ে আসা হিন্দিভাষীদের সঙ্গে, যাদের অনেকেই আমিষের গন্ধ পেলে নাক কোঁচকায়। তাদেরই রাজ্যে কাজ করতে যাওয়া পশ্চিমবঙ্গের হিন্দু ও মুসলমান প্রবাসী শ্রমিকদের বাংলাদেশি দেগে দিয়ে কোনো আইনকানুনের তোয়াক্কা না করে, বৈধ কাগজপত্রকে পাত্তা না দিয়ে মারধোর করা হচ্ছে, পে লোডার দিয়ে বাংলাদেশে ছুড়ে ফেলা হচ্ছে।

এই তথাকথিত বুদ্ধিজীবীরা অবশ্য রোগ নন, রোগাক্রান্তের নমুনা। এই রোগে আমাদের আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধব অনেকেই আক্রান্ত। আমাদের যে কোনো একজনকে দেখলেই বোঝা যায়, বাঙালি ভদ্রলোকের কূপমণ্ডূকতা এবং নীতিহীনতা ঐতিহাসিক হলেও, গত অর্ধ দশকে বিশেষ অবনমন হয়েছে। ১৯৪৭ সালে পশ্চিমবঙ্গের ভদ্রলোকদের সংখ্যাগরিষ্ঠের মানসিকতা এরকম থাকলে বাঙালরা উদ্বাস্তু হয়ে এদেশে এসে হয় অনাগরিক বেগার শ্রমিকে পরিণত হত, বা ভিক্ষা করতে করতে অনাহারে মারা যেত। সেক্ষেত্রে ১৯৭১ সালেও পশ্চিমবঙ্গের বাঙালিরা ভারত সরকারকে বাংলাদেশের পাশে দাঁড়াতে যুদ্ধে নামার প্ররোচনা দিত না (অশোক মিত্র লিখিত আপিলা-চাপিলা দ্রষ্টব্য), সাধারণ মানুষের মধ্যে মুক্তিযুদ্ধের প্রতি আবেগ তৈরি হত না, বাঙালরা আরও এক দফা উদ্বাস্তু হওয়ার ধাক্কা সামলে এদেশে থিতু হতে পারত না।

মজার কথা, এখন ভদ্রলোকদের যে অংশের বাংলাদেশি অনুপ্রবেশের চিন্তায় রাতে ঘুম হচ্ছে না, তাদের অনেকে দ্বিতীয়, তৃতীয় বা চতুর্থ প্রজন্মের বাঙাল। এরা বুঝতে পারছে না, বা রিপাবলিক টিভি দেখে দেখে এত অন্ধ হয়ে গেছে যে বুঝতে চাইছে না, যে ভাষাকে বাংলাদেশি ভাষা বলে আজ চালাচ্ছে বিজেপি, সেই ভাষা অনেকাংশে তাদের মা-দিদিমার ভাষা। ওই ভাষাকে অস্বীকার করলেও ওই পরিচিতি যাওয়ার নয়। আগামীদিনে এ কার্ড ও কার্ড সে কার্ড – কোনো কার্ড দিয়েই নিজের নাগরিকত্ব প্রমাণ করে ওঠা যাবে না। কারণ কোনটা নাগরিকত্বের প্রমাণ সেটা ঠিক করে রাষ্ট্র। আর ভারত রাষ্ট্রের এই মুহূর্তে প্রকল্প হল বাঙালিদের অনাগরিক প্রমাণ করা।

ভদ্রলোকের ছেলেমেয়েদের স্মৃতিশক্তি তাজা করে দেওয়ার জন্যে বলি, সেই বামফ্রন্ট আমল থেকে – যখন তৃণমূল কংগ্রেস নেত্রী মমতা ব্যানার্জি প্রথম অভিযোগ তোলেন যে বাংলাদেশ থেকে লোক ঢুকিয়ে ভোটে জেতে বামেরা – বঙ্গ বিজেপির বক্তব্য ছিল, বাংলাদেশ থেকে আসা হিন্দুদের শরণার্থী ধরে নিয়ে আশ্রয় দিতে হবে এবং মুসলমানদের অনুপ্রবেশকারী ধরে নিয়ে শাস্তি দিতে হবে, ফেরত পাঠাতে হবে। অধুনা সোশাল মিডিয়ার বাইরে অপ্রাসঙ্গিক হয়ে যাওয়া তথাগত রায় যখন বঙ্গ বিজেপির সভাপতি ছিলেন, তখন তিনি একাধিক টিভি বিতর্কে বসে একথা বলেছেন। নরেন্দ্র মোদী সরকার যে নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন (সিএএ) পাশ করে ২০১৯ সালে, তার মর্মবস্তুও এটাই। সে কারণেই এ রাজ্যের হিন্দুদের, বিশেষত ভদ্রলোকদের, ওই আইন খুব পছন্দ হয়েছিল। মতুয়াদের মত বাংলাদেশ থেকে অত্যাচারিত হয়ে চলে আসা নিম্নবর্গীয় জনগোষ্ঠীর মানুষও ওই আইন পাশ হওয়ায় উল্লসিত হয়েছিলেন। কিন্তু একটা প্রশ্নের উত্তর না বিজেপি দিতে চায়, না সম্প্রতি বিজেপি সমর্থক হয়ে ওঠা পশ্চিমবঙ্গবাসী তৃতীয়-চতুর্থ প্রজন্মের বাঙাল ভদ্রলোকরা। প্রশ্নটা হল, শরণার্থীদের আশ্রয় দেওয়া এবং নাগরিকত্ব দেওয়ার মত মানবিক প্রকল্পের ‘কাট-অফ ডেট’ থাকবে কেন? সিএএ অনুযায়ী নাগরিকত্ব পাওয়ার ‘কাট-অফ ডেট’ হল ৩১ ডিসেম্বর ২০১৪। এর মানে কী? ওই তারিখের পরে কি বাংলাদেশে হিন্দু নির্যাতন বন্ধ হয়ে গেছে? নাকি ওর পরে যে হিন্দুরা নির্যাতিত হচ্ছে তারা মায়ের ভোগে যাক – এটাই হিন্দু দরদি বিজেপি এবং ভারতের নাগরিকত্ব এতদিনে অধিকারে পরিণত হয়ে গেছে বলে মনে করা বাঙাল ভদ্রলোকদের মনের কথা? এ প্রশ্ন করলেই বিজেপি নেতা তরুণজ্যোতি তিওয়ারি থেকে শুরু করে বাঙাল ভাষা বলতে না পারা সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার বাঙাল, সকলেই এক সুরে ঝাঁঝিয়ে ওঠে ‘যে আসবে তাকেই থাকতে দিতে হবে? দেশটা ধর্মশালা নাকি?’

এখন কথা হচ্ছে, এই আজকের বাঙালদের পূর্বপুরুষরা যখন ভিটেমাটি চাটি হয়ে এপারে চলে এসেছিলেন অধুনা বাংলাদেশ থেকে, তখন কি দেশটা ধর্মশালা ছিল? তখনকার শাসকরা মনে করেছিলেন – ছিল। ভাগ্যিস করেছিলেন, তাই আজকের বাঙাল ভদ্রলোকরা কলার তুলে এই প্রশ্ন করতে পারছেন। ওঁরা অবশ্য বলবেন ‘তখনকার পরিস্থিতি আর এখনকার পরিস্থিতি কি এক নাকি? ১৯৪৭ সালে তো একটা দেশকে আনতাবড়ি কেটে ভাগ করা হয়েছিল। আমাদের পূর্বপুরুষদের এই ভাগটার উপরে ততখানিই অধিকার, যতখানি আগে থেকেই এ ভাগে থাকা লোকেদের।’ ১৯৭১ সালে কিন্তু দেশভাগ-টাগ হয়নি। তখনো বাংলাদেশ থেকে আসা উদ্বাস্তুদের এ দেশের নাগরিকত্ব দেওয়া হয়েছিল। সেকথা মনে রাখলেও মানতেই হবে, যুক্তিটা সঠিক। কিন্তু মুশকিল হল, একবার যদি বিভাজনে হাততালি দেওয়া শুরু করেন, তখন দেখবেন অনেক চেপে রাখা বিভাজন বেরিয়ে পড়ছে। বাঙালরা এপারে চলে আসায় মোটেই পশ্চিমবঙ্গীয়রা (চলতি কথায় যাদের এদেশি বা ঘটি বলা হয়) সকলে খুব আপ্লুত হয়নি। ‘বাংলাদেশ থেকে লোক ঢুকছে পিলপিল করে, রোহিঙ্গায় চারপাশ ভরে গেছে’ – এই প্রোপাগান্ডায় আপনি যত ধুয়ো দিচ্ছেন, তত সেদিনের উদ্বাস্তুদের প্রতি বিদ্বেষ চেপে রাখা পশ্চিমবঙ্গীয়দের স্মৃতি তাজা হয়ে উঠছে। পশ্চিমবঙ্গে গত কয়েক বছরে আরএসএস-বিজেপির শক্তি বাড়ার পাশাপাশি ইস্টবেঙ্গল আর মোহনবাগান সমর্থকদের মধ্যে অনলাইন পা টানাটানির ভাষা যেভাবে বদলেছে, তা খেয়াল করলেই ব্যাপারটা স্পষ্ট হয়। অতএব বাঙাল ভদ্রলোক-ভদ্রমহিলাদের বোঝা উচিত যে তারা হিন্দিভাষীদের ‘রোহিঙ্গা’, ‘বাংলাদেশি’ বলে চিৎকারে যোগ দিয়ে নিজেদের ডিটেনশন ক্যাম্পের রাস্তা বানাচ্ছে।

বাড়াবাড়ি মনে হল কথাটা? আসামে এনআরসি-র সময়েও দেখেছিলাম সেখানকার বাঙাল ভদ্রলোকরা অনেকে বলছে ‘যে আসবে তাকেই থাকতে দিতে হবে? দেশটা ধর্মশালা নাকি?’ ঠিক এই কথাটাই যে হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে বাঙালিদের সম্পর্কে জাতিবিদ্বেষী অসমিয়াদের বক্তব্য, সেকথা তাদের খেয়াল ছিল না। খেয়াল হল, যখন এনআরসি থেকে বাদ পড়ে যাওয়া ১৯ লক্ষ মানুষের মধ্যে সাড়ে ১২ লক্ষ হিন্দু বেরোল এবং তার মধ্যে তারাও পড়ে গেল। নেলি গণহত্যার ইতিহাসও ওই ভদ্রলোকরা ভুলে থাকতে চেয়েছিল, কারণ ওতে যারা মরেছিল তারা মুসলমান। এখন আসামের বিভিন্ন ডিটেনশন সেন্টারে কারা দিন কাটাচ্ছে সেটা পশ্চিমবঙ্গে চতুর্দিকে রোহিঙ্গা দেখতে পাওয়া বাঙাল ভদ্রলোকরা একটু দেখে নিতে পারেন। পশ্চিমবঙ্গে এনআরসি করার পরিকল্পনা এখনো সরকারের নেই, কিন্তু এসআইআরের পরিকল্পনা বিলক্ষণ আছে। সেটাও একটা তালিকা, তারও থাকবে ‘কাট-অফ ডেট’। এসব ভদ্রলোকরা ভালই জানেন, কিন্তু কুয়োর ব্যাং তো কুয়োর বাইরের জগতের কথা জানতে পারলেও মানতে চায় না। যেমন নির্বাচন কমিশনের বানানো আরেকটা তালিকা – ভোটার তালিকা – কেমন হয় আজকাল সেকথা রাহুল গান্ধী চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিলেও ভদ্রলোকরা চোখ বন্ধ করে থাকতে পারে।

১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গবিরোধী আন্দোলনের সময়কার ভদ্রলোকদের ফাঁকিবাজিকে রবীন্দ্রনাথ চিহ্নিত করেছিলেন, নিন্দাও করেছিলেন। তবু মানতে হবে, সেই ভদ্রলোকদের অন্য সময়ে না হলেও বিপদের সময়ে বাঙালি মুসলমানদের সঙ্গে জোট বাঁধার বুদ্ধি ছিল। এখনকার ভদ্রলোক শ্রেণির মস্তিষ্ক এত উর্বর যে বিপদের সময়ে আরও বেশি করে নিজেদের আলাদা করে নিচ্ছে। বিপন্ন বাঙালির পাশে দাঁড়ানোর বদলে ‘আমি স্নান বলি, ও গোসল বলে। অতএব ও বাঙালি না, আমি বাঙালি’ – এসব বোকা বোকা কথা বলে নিজের কুয়োটা আরও গভীর করে খুঁড়ছে। যে হিন্দি আধিপত্যবাদী হিন্দুরা কোনোদিনই বাঙালিকে আপন বলে মনে করেনি এবং করবে না, তারা নিজেদের মনোভাব স্পষ্ট ভাষায় বুঝিয়ে দিলেও ভদ্রলোক, ভদ্রমহিলারা বুক ফুলিয়ে প্রতিপন্ন করতে চাইছে – বাঙালি বলে কোনো জাতি নেই। আছে দুটো আলাদা জাতি – বাঙালি হিন্দু আর বাংলাদেশি। বাংলা বলেও কোনো ভাষা নেই। আছে দুটো আলাদা ভাষা – হিন্দুর বাংলা আর বাংলাদেশি বাংলা। এই ঐতিহাসিক মূর্খামি যে দৃশ্যের সম্ভাবনা বাড়িয়ে তুলছে তা এইরকম – ভদ্রলোকরা বাঙালি বলে মার খাচ্ছে হিন্দিভাষীদের হাতে, আর এখন যে বাঙালিদের মার খাওয়া চলছে, যাদের বাঙালি বলে স্বীকার করতেই রাজি নয় ভদ্রলোকরা, তারা দূর থেকে বলছে ‘ওমা! আপনি ভদ্রলোক? আমি ভেবেছিলাম বাঙালি।’

নাগরিক ডট নেট ওয়েবসাইটে প্রকাশিত

অ্যাংকর-বাক্যই এ-যুগের বেদবাক্য

 একদিন রাতে আমি স্বপ্ন দেখিনু—
“চেয়ে দেখো” “চেয়ে দেখো” বলে যেন বিনু।
চেয়ে দেখি, ঠোকাঠুকি বরগা-কড়িতে,
কলিকাতা চলিয়াছে নড়িতে নড়িতে।
ইঁটে-গড়া গণ্ডার বাড়িগুলো সোজা
চলিয়াছে, দুদ্দাড় জানালা দরোজা।
রাস্তা চলেছে যত অজগর সাপ,
পিঠে তার ট্রামগাড়ি পড়ে ধুপধাপ্।

আমি মনে মনে ভাবি, চিন্তা তো নাই,
কলিকাতা যাক নাকো সোজা বোম্বাই।
দিল্লী লাহোরে যাক, যাক না আগরা—
মাথায় পাগড়ি দেব পায়েতে নাগরা।

সহজ পাঠ দ্বিতীয় ভাগ প্রকাশিত হওয়ার সময়ে ভাগ্যিস স্মার্টফোন, সোশাল মিডিয়া, দিনরাতের টিভি চ্যানেল, আর তাদের চিল্লানোসরাস অ্যাংকর— এসব কিছুই ছিল না। নইলে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যদি ফেসবুকে উপরের পংক্তিগুলো লিখে ফেলতেন, তাহলে কী কেলেঙ্কারিটাই না হত! নোবেল পুরস্কারজয়ী কবি বলে কথা। কয়েক মিনিটের মধ্যেই ভাইরাল হয়ে যেত এবং ভারতের বাংলা, ইংরেজি ও হিন্দি টিভি চ্যানেলগুলো ‘ব্রেকিং নিউজ’ হিসেবে দেখাত—

মাঝরাতে উধাও কলকাতা,
প্রত্যুত্তরে করাচি ভ্যানিশ করল ভারতীয় নৌসেনা।

কোনও চ্যানেলে হয়তো পর্দায় ভেসে উঠত—

‘কলকাতাকে রাতের অন্ধকারে লাহোরে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা পাকিস্তানের’,
‘ভারতীয় মিসাইলের আক্রমণে দিল্লিতেই অভিযান শেষ

রাতে কবিতাটি পোস্ট করে রবীন্দ্রনাথ যতক্ষণে সকালে ঘুম থেকে উঠতেন, ততক্ষণে দেখতেন কলকাতা যে কলকাতাতেই আছে, সে-কথা আর কেউ বিশ্বাস করছে না। এমনকি কলকাতা হারানোয় কেউ শোকপ্রকাশও করছে না। চারপাশে লাহোর, করাচি দখলের উল্লাস দেখতে দেখতে শান্তিনিকেতনে বসে তাঁরও হয়তো দুপুরের দিকে সন্দেহ হত— ‘কলকাতা সত্যি সত্যি কলকাতাতেই আছে তো?’ স্নেহভাজন কাজী নজরুল ইসলামকে হয়তো ফোন করতেন উদ্বিগ্ন হয়ে, তারপর তাঁর মুখ থেকে কলকাতা যথাস্থানে আছে শুনে হাঁফ ছেড়ে বাঁচতেন। ততক্ষণে তাঁর কাছে প্রতিক্রিয়া চেয়ে পৌঁছে যেত বিশিষ্ট নিউজ অ্যাংকরদের জুম কল। বিশ্বকবি প্রাণপণ চেষ্টা করতেন বোঝাতে যে ওটা তাঁর কল্পনা, কলকাতা যেখানে থাকার সেখানেই আছে। একচুলও নড়েনি, নড়া সম্ভবও নয়। একখানা আস্ত শহর যাবে কোথায়? কিন্তু বিশিষ্ট অ্যাংকররা এত সহজে ছেড়ে দেওয়ার পাত্র নন। রবীন্দ্রনাথের কাছে কলকাতা অবিচল থাকার প্রমাণ চাওয়া হত নিশ্চয়ই। তিনি হয়তো বলতেন, একটু আগে নজরুলের সঙ্গে কথা হয়েছে, তিনি জানিয়েছেন যে দুশ্চিন্তার কোনও কারণ ঘটেনি। বলামাত্রই ঝাঁপিয়ে পড়তেন জাতীয়তাবাদী অ্যাংকর, ‘আর কতদিন কুসুম কুসুম কবিদের কথায় ভুলে নিজের অস্তিত্ব যে বিপন্ন সেটা গোপন করবেন? এসব সেকুলারিজমের দিন শেষ। এত সেকুলার হওয়ার ইচ্ছে হলে পাকিস্তানে চলে যান।’ সালটা ১৯৩০, ফলে রবীন্দ্রনাথ হয়তো বেচারাথেরিয়ামের মতো মুখ করে ভাবতেন— সেটা আবার কোন দেশ রে বাবা!

হাসবেন না। ব্যাপারটা মোটেই হাস্যকর নয়। ১৯৭১ সালের পর ফের ভারত-পাকিস্তানের পূরোদস্তুর যুদ্ধ লাগার উপক্রম হয়েছিল এ-মাসের গোড়ায়। সেই বাজারে দেশের টিভি চ্যানেলগুলো যে কাণ্ড করেছে, তাতে পরিষ্কার বোঝা গেছে— যুদ্ধ করার উৎসাহ ভারতীয় সেনাবাহিনীর চেয়েও তাদের বেশি এবং সে অভিলাষ চরিতার্থ করতে তারা আক্ষরিক অর্থেই দিনকে রাত আর রাতকে দিন করতে প্রস্তুত।

আরও পড়ুন এবার মোদীর পথের চেয়েও কঠিন গোদি মিডিয়ার পথ

একদিন রাতে ভিডিও গেমের দৃশ্য, লস এঞ্জেলসে বিমান ভেঙে পড়ার দৃশ্য, ইজরায়েলের চার বছরের পুরনো ভিডিও ইত্যাদি দেখিয়ে ভারতীয় টিভি চ্যানেলগুলো প্রায় গোটা পাকিস্তানই ভারতের দখলে চলে এসেছে বলে জানিয়েছিল। পরদিন কিছু চ্যানেল ভালমানুষ সেজে ভুয়ো খবর ছড়ানোর বিরুদ্ধে বাণী দিয়েছিল বটে, কিন্তু এমন চ্যানেলও আছে যারা ওসবেরও তোয়াক্কা করেনি। করতে যাবেই বা কেন? কেন্দ্রীয় শাসক দলই তো নিজেদের সোশাল মিডিয়া হ্যান্ডেল থেকে পোস্ট করে জানিয়েছে, পাকিস্তানের সঙ্গে লড়াই করতে গেলে দেশের সরকার বা সেনাবাহিনীকে নিয়ে তো বটেই, মিডিয়ার এসব কীর্তি নিয়েও হাসাহাসি করা চলবে না। কারণ অনেক খবরের মধ্যে দু-চারটে ভুল খবর দেখিয়ে দিলে এমন কিছু দোষ হয় না, কিন্তু ভুল খবরকে ভুল খবর বললে দেশের মনোবল নষ্ট হয়। যুদ্ধ মানে হল ‘ন্যারেটিভ ওয়ার’। ভুয়ো খবর চিহ্নিত করা মানে সেই যুদ্ধে নিজের দেশকে হারিয়ে দেওয়া।

ভারতীয় সংবাদমাধ্যমের ছড়ানো ভুয়ো খবরের পক্ষে দাঁড়িয়ে বুক চিতিয়ে লড়ে যাওয়া এই ভিডিওতে ভাষণ দিয়েছেন কে? টাইমস নাও নবভারতের কনসাল্টিং এডিটর সুশান্ত সিনহা। বুঝতেই পারছেন, তিনি কত বড় সাংবাদিক। অতএব, মোটেই হাসাহাসি করবেন না। নইলে কখনও দেখবেন, সরকারের সমালোচনা করার জন্য নয়, মোদিজি বা শাহজিকে নিয়ে রসিকতা করার জন্যও নয়, মিডিয়াকে নিয়ে হাসাহাসি করার জন্য অশোকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক আলি খান মাহমুদাবাদের মতো আপনিও গ্রেপ্তার হয়ে যাবেন।

অ্যাঁ, কী বললেন? উনি মুসলমান না হলে ওই পোস্টের জন্য গ্রেপ্তার হতেন না? আজ্ঞে, ঠিক ধরেছেন। কথাটা উমর খালিদের বেলায় সত্যি, গুলফিশা ফতিমার ক্ষেত্রে সত্যি, যে রিপোর্ট লেখাই হয়নি তার জন্য গ্রেপ্তার হওয়া সাংবাদিক সিদ্দিক কাপ্পানের ক্ষেত্রেও সত্যি, আরও অনেকের ক্ষেত্রেই সত্যি।

কিন্তু মাথায় রাখবেন, গুজরাতের ৯২ বছরের পুরনো জনপ্রিয় সংবাদপত্র ‘গুজরাত সমাচার’-এর দুই মালিকের অন্যতম, ৭৩ বছর বয়সী বাহুবলী শাহকে এ সপ্তাহেই গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তিনি মুসলমান নন। তাঁকে গ্রেপ্তার করেছে এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট, তবে কী অভিযোগে তা এখনও বলা হয়নি। তবে কাগজটির সরকারবিরোধী হিসেবে নাম বা বদনাম আছে। তাছাড়া, এ-ও মনে রাখবেন— ইদানীং উত্তরপ্রদেশের নেহা সিং রাঠোর, মাদ্রী কাকোটির মতো হিন্দু মহিলাদের বিরুদ্ধেও হাসিঠাট্টার জন্য এফআইআর দায়ের করা হচ্ছে।

সুতরাং, মোটেই হাসাহাসি করবেন না আমাদের লড়াকু টিভি চ্যানেল আর তাদের মহামহিম অ্যাংকরদের নিয়ে। এঁদের হাত কত লম্বা, জানেন তো? মৃত লোকও এঁদের আওতার বাইরে নন। কাশ্মিরের পুঞ্চে সীমান্তের ওপার থেকে আসা গোলায় নিহত মৌলানা মহম্মদ ইকবালকে এই মহান সাংবাদিকরা সন্ত্রাসবাদী বলে দেগে দিয়েছিলেন। অর্থাৎ, পুঞ্চ পুলিশের চেয়েও এঁরা বেশি জানেন। ভারতীয় সেনাবাহিনীর চেয়ে তো বটেই। পাকিস্তানের কিরানা হিলসে পরমাণু বোমার কেন্দ্রেও নাকি ভারতের বিমান বোম ফেলেছে বলে তাঁরা জানিয়েছিলেন। এদিকে সরকারি ব্রিফিংয়ে তা নিয়ে প্রশ্ন করা হলে, এয়ার মার্শাল একে ভারতী প্রশ্নকর্তা সাংবাদিককে বলেন, ‘আপনাকে ধন্যবাদ ওখানে পাকিস্তানের পরমাণু বোমা আছে এ-কথা আমাদের জানানোর জন্যে। আমরা কখনও বলিনি যে আমরা কিরানা হিলসে বোম ফেলেছি।

তাহলে বুঝলেন তো, সাংবাদিকদের চটালে মরেও শান্তি পাবেন না, মরার পরেও সন্ত্রাসবাদী হয়ে যেতে পারেন! বিশ্বকবিই যখন বলে গেছেন, ‘সেই সত্য যা রচিবে তুমি’, তখন নিউজ চ্যানেল আর তাদের জাতীয়তাবাদী অ্যাংকরদের নিয়ে খবরদার হাসাহাসি করবেন না। ভুয়ো খবর বলে যে কিছু হয়, তা ভুলে যান।

চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম ওয়েবসাইটে প্রকাশিত

বাংলা মাধ্যম স্কুলের পর বাংলা সিনেমা উঠে যাওয়ার পালা?

নয়ের দশক থেকে কলকাতার বড় বড় সংবাদমাধ্যম যে শহুরে দরকচা মারা ছবিগুলোকে বাংলা ছবির পুনরুত্থান বলে দাগিয়ে দিল, সেগুলো বস্তুত বিভিন্ন মেজ সেজ ফেস্টিভালে পুরস্কার জেতা ছাড়া বাংলা ছবির হোমেও লাগেনি যজ্ঞেও লাগেনি।

এখনো বছরে যে দু-চারটে দিন পশ্চিমবঙ্গের বাঙালির নিজস্ব সংস্কৃতির জন্য গর্ববোধ হয় এবং সেটাকে বাঁচানো প্রয়োজন বলে মনে হয়, আজ তার মধ্যে এক দিন। আজ বাংলা সিনেমার আন্তর্জাতিকভাবে সবচেয়ে উদযাপিত পরিচালক সত্যজিৎ রায়ের জন্মদিন। মুর্শিদাবাদোত্তর, পহলগামোত্তর বাঙালি ভদ্রলোক-ভদ্রমহিলার সহসা নিজের হিন্দু সত্তা আবিষ্কার এবং দিঘার উপকূলে তাঁদের আদরের রামমোহন-বিদ্যাসাগর-রবীন্দ্রনাথ-নজরুলের প্রগতিশীলতা জগন্নাথদেবের পায়ে সঁপে দেওয়ার পর বলতে হবে, কপাল জোরে এই দিনটা পাওয়া গেছে। কেবল আজকের দিনেই বাংলা সিনেমা সম্পর্কে কখানা কথা লিখলে কেউ কেউ হয়ত গুরুত্ব দিয়ে পড়বেন। আগামীকালই আর তা হবে না। কারণ বিষয় হিসাবে কাশ্মীর-মুসলমান-পাকিস্তানের সহজ সমীকরণ বা কার বাড়িতে দিঘার মন্দিরের প্রসাদ পৌঁছল আর কোথায় পৌঁছল না, তা বাংলা সিনেমার হাল হকিকতের চেয়ে অনেক বেশি মুখরোচক।

সাংবাদিকতার সাবেকি নিয়ম মেনে সাম্প্রতিকতম ঘটনাটার উল্লেখ করেই আলোচনা শুরু করা যাক। গত বুধবার (৩০ এপ্রিল) বাংলা ছবির ছজন পরিচালক – অনির্বাণ ভট্টাচার্য, ইন্দ্রনীল রায়চৌধুরী, কিংশুক দে, পরমব্রত চট্টোপাধ্যায়, বিদুলা ভট্টাচার্য, সুদেষ্ণা রায় – একখানা মিনিট পনেরোর ভিডিও বার্তা প্রকাশ করেছেন। সে বার্তা টালিগঞ্জের কলাকুশলীদের প্রতি। ভিডিওতে বলা হয়েছে যে টালিগঞ্জ পাড়ার ফেডারেশন – যার সভাপতি পশ্চিমবঙ্গ সরকারের মন্ত্রী অরূপ বিশ্বাসের ভাই স্বরূপ বিশ্বাস – এবং এই পরিচালকরা, এখন বিবদমান। যাঁরা বাংলা কাগজগুলোর বিনোদনের পাতায় নিয়মিত চোখ বোলান, তাঁদের কাছে এটা খবর নয়। কিন্তু পরিচালকরা বলছেন – কলাকুশলীদের ফেডারেশনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে যে পরিচালকরা কলাকুশলীদের বিপক্ষে। এই ভিডিও নির্মাণের উদ্দেশ্য – সেই ‘ভুল’ ধারণা দূর করা।

ভিডিওটা না দেখে থাকলেও, এই পর্যন্ত পড়েই বুঝতে অসুবিধা হওয়ার কথা নয় যে গণ্ডগোল এতদূর গড়িয়েছে, এ রাজ্যের সমস্ত বিবাদেরই নিষ্পত্তি করে দেওয়ার ক্ষমতা ধরেন যিনি, তাঁর উপরেও ভরসা রাখতে পারেনি কোনো পক্ষই। টালিগঞ্জ মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জির বাসস্থান থেকে বেশি দূরে নয়। তার উপর ফেডারেশন সভাপতি তাঁরই মন্ত্রিসভার সদস্যের ভাই। তা সত্ত্বেও তাঁরা দিদির হস্তক্ষেপে পরিচালকদের সঙ্গে বিবাদ মিটিয়ে নেননি। নিলে পরিচালকরা এই অভিযোগ করতেন না। আবার পরিচালকরাও মুখ্যমন্ত্রীর ছত্রছায়ায় গেলেই নিজেদের অভাব অভিযোগ দূর হবে – এ বিশ্বাস রাখতে পারেননি। ফলে ভিডিও করে ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির ভিতরের বিবাদ প্রকাশ্যে এনে ফেলেছেন। পুরো ভিডিও দেখলে মালুম হয় – বাধ্য হয়েছেন।

কেন হল এরকম?

সংবাদমাধ্যমে আগে প্রকাশিত হয়েছে, এই ভিডিওতেও পরিচালকরা জানিয়েছেন যে তাঁরা মুখ্যমন্ত্রীর কাছে যাননি তা নয়। মুখ্যমন্ত্রী তাঁদের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন যে তিনি একটি কমিটি তৈরি করে দেবেন, যে কমিটি সব পক্ষের কথাবার্তা শুনে বিবাদ মেটানোর ব্যবস্থা করবে। কিন্তু সেই কমিটি গঠন করতে গেলে যে সরকারি বিজ্ঞপ্তি জারি করতে হয়, সেটাই পরবর্তী তিন মাসে হয়নি। পরিচালকরা তারপরেও এক মাস অপেক্ষা করেন। সরকার নট নড়নচড়ন। পরিচালকদের একাধিক ইমেলেরও জবাব দেওয়া হয়নি। অতঃপর তাঁরা সাংবাদিক সম্মেলন করে ফেডারেশনের কীর্তিকলাপ সম্পর্কে সর্বসমক্ষে অভিযোগ করেন। এই তাঁদের মহাপাপ। পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন প্রান্তে বিভিন্ন পেশার মানুষ জানেন, কর্মস্থলে যা অত্যাচার অবিচার হয় সেসব নিয়ে প্রকাশ্যে কথা না বলাই দস্তুর। সমাধান চাইলে যাঁরা অত্যাচার অবিচার করলেন তাঁদের কাছেই হাতজোড় করে দাঁড়ানো নিয়ম। তাঁরা সদয় না হলে খুব বড় অপরাধেও পুলিস এফআইআর নিতে চায় না। সেখানে এই পরিচালকরা একেবারে সাংবাদিক সম্মেলন করে বসলেন! ঘাড়ে কটা মাথা! ভিডিওতে পরিচালকদের অভিযোগ – এরপর থেকেই শুরু হয় সেই সাংবাদিক সম্মেলনে উপস্থিত পরিচালকদের কাজ করতে না দেওয়ার ব্যবস্থা। ওঁদের শুটিংয়ে কলাকুশলীদের কাজ করতে বারণ করা হয়। তার ফলেই নাকি তাঁরা (এই ছজন সমেত মোট ১৫ জন পরিচালক) আদালতের দ্বারস্থ হয়েছেন।

যে বাংলায় পুলিসে যাওয়াই সাধারণ মানুষের পক্ষে স্থানে স্থানে মহাপাতক, সেখানে একেবারে কলকাতা হাইকোর্টে ফেডারেশনের সর্বময় কর্তার বিরুদ্ধে মানহানির মামলা করে বসেছেন এঁরা। সে মামলার ইতিমধ্যেই দুটি শুনানি হয়েছে, সে খবর সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিতও হয়েছে। বিচারপতি অমৃতা সিনহা যে নির্দেশগুলো দিয়েছেন তাতে পরিচালকদের হাত শক্ত হয়েছে। তিনি স্পষ্ট বলেছেন, পরিচালকদের কাজে ফেডারেশন কোনো হস্তক্ষেপ করতে পারবে না। এমনকি যে ইউনিক কার্ড ফেডারেশনের তুরুপের তাস, যা না থাকলে সিনেমাপাড়ায় কাউকে কাজ করতে দেয় না তারা, সেই কার্ডকেও মূল্যহীন বলেছেন বিচারক। কিন্তু হলে হবে কী? আদালত নির্দেশ দিলেই মানব – এত সুবোধ বালকদের রাজ্য পশ্চিমবঙ্গ নয়। ওই নির্দেশের পরেও সুদেষ্ণা রায়ের ছবির শুটিং শুরু করতে গিয়ে ঠিক তাই ঘটেছে, যা রাহুল মুখার্জির ছবির শুটিং নিয়ে গতবছর জুলাই মাসে ঘটায় টলিপাড়ার সমস্ত কাজ বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। অর্থাৎ শুটিং সূচি ঘোষণা হওয়ার পরেও একজন কুশীলবও কাজ করতে আসেননি।

সেই থেকে অচলাবস্থা চলছে টালিগঞ্জে। মুখ্যমন্ত্রী হয় মেটাননি, অথবা ধরে নিতে হবে, তাঁর নির্দেশকেও অগ্রাহ্য করার মত শক্তি টলিপাড়ার দণ্ডমুণ্ডের কর্তা স্বরূপবাবুর আছে। আদালতের নির্দেশের পরেও সুদেষ্ণার ছবির কাজ বাতিল হয়ে যাওয়ায় আদালত অবমাননা হয়েছে কিনা, হয়ে থাকলে স্বরূপবাবু বা অন্য কেউ শাস্তির পাত্র কিনা, নাকি গোটা ঘটনায় তাঁর কোনো ভূমিকাই নেই – তার বিচার আদালতে হবে। কিন্তু সাড়ে ১৫ মিনিটের ভিডিওতে পরিচালকরা অভিযোগ করেছেন যে ফেডারেশনের ভয়েই কুশীলবরা নির্দিষ্ট কিছু পরিচালকের ছবিতে কাজ করতে আসছেন না। একথা সত্যি না মিথ্যা তা বলা মুশকিল, তবে হাইকোর্ট যে এই অভিযোগকে সত্যি বলেই গণ্য করেছে তার ইঙ্গিত বিচারপতির নির্দেশে রয়েছে। স্বরূপবাবু অবশ্য প্রকাশ্যে খুবই ভদ্রলোক। যতবার সংবাদমাধ্যম তাঁর কাছে এই গণ্ডগোল নিয়ে কিছু জানতে চায়, তিনি হয় বলেন আদালতে বিচারাধীন বিষয়ে কোনো মন্তব্য করবেন না, নতুবা বলেন এসব তাঁর ফেডারেশনের বিরুদ্ধে চক্রান্ত। যেমনটা বুধবারের ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পরে বলেছেন

পশ্চিমবঙ্গে এখন বিরাট বিরাট ঘটনা ঘটছে। শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মীদের নিয়োগ দুর্নীতির ফলে এক লপ্তে ২৬,০০০ মানুষের চাকরি গেছে। এদিকে মুর্শিদাবাদের দাঙ্গা এবং পহলগামের সন্ত্রাসবাদী হামলার পর সাম্প্রদায়িকতার সমস্যাও বাংলার বাসিন্দাদের এ রাজ্যে এবং ভিনরাজ্যে নানাভাবে বিপদে ফেলছে। সরকারি টাকায় মন্দির তৈরি এবং তার উদ্বোধন উপলক্ষে ঘুরপথে আমিষ খাওয়াদাওয়া বন্ধ করার চেষ্টার মত অভূতপূর্ব ঘটনাও ঘটে গেছে। এতকিছুর মধ্যে বাংলা সিনেমার জগতে কী হচ্ছে না হচ্ছে তা নিয়ে দীর্ঘ লেখা ফেঁদে বসার কী দরকার? প্রশ্নটা সঙ্গত এবং উত্তরটা জরুরি।

যা যা ঘটছে সবই রাজনৈতিক এবং সিনেমাপাড়ায় যা ঘটছে তাও মোটেই অরাজনৈতিক নয়। একেবারে গোদা অর্থে রাজনৈতিক তো বটেই, কারণ পরিচালকদের অভিযোগের তির শাসক দলের নেতা স্বরূপবাবুর দিকে। কিন্তু কেবল দলীয় রাজনীতির কথা ভাবলে চলবে না। জুলাই মাস থেকে এ পর্যন্ত ঘটনা পরম্পরা লক্ষ করলে বোঝা যায় যে টালিগঞ্জের এই ‘বিদ্রোহী’ পরিচালকরা যে অভিযোগ করছেন, তার সঙ্গে আর জি কর কাণ্ডের পর রাজ্যের বিভিন্ন মেডিকাল কলেজের ডাক্তাররা যে অভিযোগ করেছিলেন তার কোনো মৌলিক তফাত নেই। দুই ক্ষেত্রেই মূল অভিযোগ হল – হুমকি সংস্কৃতি চলছে। চোখ রাঙিয়ে, ভয় দেখিয়ে এক পক্ষ তাদের যা ইচ্ছে তাই করিয়ে নিতে চাইছে। প্রতিবাদ করলে কাজ করতে দেওয়া হচ্ছে না। ঠিক যেভাবে সেকালে গ্রামদেশে মোড়লের বিরুদ্ধাচরণ করলে ধোপা নাপিত বন্ধ করিয়ে দেওয়া হত।

আমি, আপনি কোন ছার; রুপোলি পর্দার লোকেরা, তারকারা, এরকম ভয়ের পরিবেশে কাজ করতে হচ্ছে বলে অভিযোগ করছেন। ব্যাপারটা এই রাজ্যের শুভাকাঙ্ক্ষী সকলকে ভাবিয়ে তোলার মত। শাসক দলের অনুগতরা টালিগঞ্জ পাড়ায় কলাকুশলী হিসাবে কাজ পায়, ছবিতে কাজ করতে যত লোক লাগা উচিত চাপ দিয়ে তার চেয়ে বেশি লোককে কাজ পাইয়ে দেওয়া হয় – এসব অভিযোগ যে তৃণমূল সরকারের আমলেই প্রথম উঠছে এমন নয়। কিন্তু কথা হল, স্বাস্থ্যবান মানুষের খানিকটা রক্ত মশা খেলে বিশেষ ক্ষতি হয় না। কিন্তু যে রক্তাল্পতায় ভুগছে তাকেও যদি রোজ একপাল মশা ছেঁকে ধরে, তাহলে অল্পদিনেই মৃত্যু অবশ্যম্ভাবী। ইন্ডাস্ট্রি হিসাবে বাংলা ছবি এখন সেই স্তরে পৌঁছে গেছে, অথচ ফেডারেশনের প্রতাপ কমছে না। ফলে কাজ আরও কমে যাচ্ছে। ২০২৪ সালে মাত্র ৩৬ খানা ছবি তৈরি হয়েছে, যা নাকি গত ১৫ বছরে সর্বনিম্ন। ফেডারেশনের উদ্ভট সব নিয়মের ঠ্যালায় (পড়ুন দাবির ঠ্যালায়, কারণ আইনত কোনো নিয়ম বানানোর অধিকার ফেডারেশনের নেই) বাংলা ছবির প্রযোজকের সংখ্যা কমছে, বাইরের কোনো ফিল্ম ইউনিটও আর পারতপক্ষে কলকাতায় শুটিং করতে আসছে না। বাংলা ছবির অভিনেতারা কাজের অভাবে কেউ মুম্বাই পাড়ি দিচ্ছেন, কেউ ইউটিউব চ্যানেল খুলে টক শো চালাচ্ছেন, কেউ অন্য ব্যবসাপত্র খোলার কথা ভাবছেন। বেশকিছু উল্লেখযোগ্য ছবির পরিচালক ইন্দ্রাশিস আচার্য, কেবল সিনেমা করে জীবিকা নির্বাহ করা শক্ত হয়ে দাঁড়াচ্ছে – একথা স্পষ্টাস্পষ্টি বলে গতবছর কর্পোরেট চাকরিতে যোগ দিয়েছেন। কিন্তু অভিনেতা, পরিচালকদের হাতে না হয় এসব বিকল্প রয়েছে। যাঁরা মেক আপ করেন, আলোর কাজ করেন, জুনিয়র আর্টিস্ট হিসাবে কাজ করেন অথবা স্রেফ সেটে ফাইফরমাশ খাটেন – তাঁদের তো আর নেই। এমন চললে তাঁরা যাবেন কোথায়? ফেডারেশন নিজেদের যাদের লোক বলে দাবি করছে, তাঁদেরই তো আক্ষরিক অর্থে পথে বসতে হবে। সান্ত্বনা হিসাবে তখন বড়জোর বলা যাবে ‘মনখারাপ করবেন না। আপনাদের আগে ডাক্তার আর শিক্ষকরাও পথে বসেছেন।’

গুন্ডামিই আইন হয়ে দাঁড়াবে, তার সঙ্গে আপোস করে স্রেফ নিজেরটুকু নিয়ে ভেবে তথাকথিত ‘ফার্স্ট বয়’-রা ছবি বানাবেন, বিশেষ ক্ষমতাশালী নায়কের ছবি নিয়ে বিপুল সোশাল মিডিয়া প্রচার চলবে – মাঝরাতে অমুক জায়গায় শো হাউসফুল, তমুক ছবি ব্লকবাস্টার। আর যাঁরা ইন্ডাস্ট্রির দমবন্ধ করা বর্তমান ও ভয়াবহ ভবিষ্যৎ ভেবে প্রতিবাদ করবেন তাঁদের একঘরে করা হবে। ফলে ইন্ডাস্ট্রিতে ক্রমশ কাজ কমবে। এভাবে ধুঁকতে ধুঁকতে একটা ভাষার ছবি কতদিন বেঁচে থাকতে পারে? এমনিতেই দুনিয়া জুড়ে সিনেমাশিল্পের এক ধরনের সংকট চলছে। হলিউড বা বলিউডও তার বাইরে নয়। তার উপর টলিউডের মত ছোট বাজারসম্পন্ন, আগে থেকেই দুর্বল হয়ে থাকা ইন্ডাস্ট্রিতে যদি সিনেমার বাইরের লোকেদের গা জোয়ারিই শেষ কথা হয়ে দাঁড়ায়, তাহলে বাংলা ছবি বাঁচবে কী করে?

বাঙালিদের মধ্যে এমন সিনেমাবোদ্ধার অভাব নেই, যাঁরা নাকটা আকাশের দিকে তুলে বলবেন ‘বাংলা ছবি না বাঁচলেই বা কী? যা সব ছবি বানায়…’। একথার উত্তর দেওয়ার আগে কতকগুলো তেতো কথা বলা দরকার।

প্রথমত, ফেডারেশন বনাম পরিচালকদের দ্বন্দ্ব টলিউডের যে কঙ্কালসার চেহারা তুলে ধরেছে তা দিয়ে শৈল্পিক দিক থেকে ভাল ছবি হওয়া অসম্ভব বললেই চলে। প্রয়াত অশোক মিত্রের কথা ধার করে বলতে হয়, অভাবের সংসারে ‘তেইশ বছরের আপাত-উঠতি শরীরেও, স্তন আর স্তন থাকে না, দুদিনেই তা হেলে প’ড়ে মাই হয়ে যায়।’ আজকাল বাংলা পূর্ণদৈর্ঘ্যের ছায়াছবির শুটিং হয় ১৪-১৫ দিনে। এতেই মাস্টারপিস বানাতে গেলে নির্দেশক, চিত্রগ্রাহক, সঙ্গীত পরিচালক, অভিনেতা – সকলকেই জিনিয়াস হতে হবে। একসঙ্গে এত জিনিয়াস কোনো দেশে কোনোকালেই সুলভ ছিল না।

আরও পড়ুন সিনেমার হাত ধরে ভারতীয়দের বিশ্বজয় চলছে বহুকাল ধরে 

দ্বিতীয়ত, যে তিন বাঙালি পরিচালককে জিনিয়াস গণ্য করে আজকাল আমরা বুক ফোলাই, তাঁদের কর্মজীবনে মোটেই সমস্ত ছবি হল ভরে দেখতে যায়নি বাঙালি দর্শক। গেলে ঋত্বিক ঘটক হতাশায় ক্রমশ বেশি বেশি করে মদে ডুবে যেতেন না, অকালে মারাও যেতেন না হয়ত। তাঁর মৃত্যুর পরেও কলকাতা এমন কিছু উদ্বেল হয়নি। সত্যজিৎই বাণিজ্যিক সাফল্যের মুখ দেখেছেন অনেকটা। তাও তাঁর সবচেয়ে শৈল্পিক কাজগুলোর চেয়ে বেশি জনপ্রিয় হয়েছে গুগাবাবা, হীরক রাজার দেশে আর ফেলুদার ছবিগুলো। মৃণাল সেনের ছবি তো খুব জনপ্রিয় হওয়ার কথাও নয়। তাঁর বক্তব্য আলাদা, শৈলীও আলাদা। বাংলা ছবিকে বাঁচিয়ে রেখেছিল আসলে সিনেমাবোদ্ধাদের হেলাশ্রদ্ধার পাত্র হয়ে থাকা ছবিগুলো। সেসব ছবি বানাতেন তপন সিংহ, অজয় কর, দীনেন গুপ্ত, অরবিন্দ মুখোপাধ্যায়, তরুণ মজুমদার, প্রভাত রায়, অঞ্জন চৌধুরী প্রমুখ। নিখাদ প্রেমের ছবি বা মজার ছবি, আটপৌরে সাংসারিক জটিলতার ছবি, সাধারণ মানুষের রোজকার সমস্যার ছবি – এসব দেখতে দর্শক হল ভরাত বলে শিল্পী ও কলাকুশলীদের সংসার চলত, প্রযোজকদের ঘরে টাকা আসত। তাই তাঁরা হিট হবে না ধরে নিয়েই সত্যজিৎ বা মৃণালের মত শিল্পীদের ছবিতে টাকা ঢালতে পারতেন। নয়ের দশক থেকে কলকাতার বড় বড় সংবাদমাধ্যম যে শহুরে দরকচা মারা ছবিগুলোকে বাংলা ছবির পুনরুত্থান বলে দাগিয়ে দিল, সেগুলো বস্তুত বিভিন্ন মেজ সেজ ফেস্টিভালে পুরস্কার জেতা ছাড়া বাংলা ছবির হোমেও লাগেনি যজ্ঞেও লাগেনি। এক পর্দার সিনেমা হলগুলো উঠে যাওয়ার আগে থেকেই ওইসব ছবি গ্রাম আর শহরের দর্শকের মধ্যে কাঁটাতার বসিয়ে দিয়েছে। মাল্টিপ্লেক্স এসে সর্বনাশ সম্পূর্ণ করেছে। বিপুল সংখ্যক দর্শক বাংলা ছবির হাতছাড়া হয়ে গেছেন অত টাকার টিকিট কাটার ক্ষমতা নেই বলে আর গ্রামেগঞ্জে সিনেমা হল প্রায় নেই বলে। যাঁরা আছেন, তাঁদের পক্ষে হাতে ইয়াব্বড় পপকর্নের বালতি নিয়ে বাংলা ছবি কেন, কোনো ছবির পাশেই দাঁড়ানো কঠিন। মনোযোগ স্বভাবতই ৪০০ টাকার পপকর্ন নষ্ট না হওয়ার দিকেই রাখতে হবে।

এবার বলা যাক, বাংলা ছবি না বাঁচলে কী হবে। শুধু শিল্পী আর কলাকুশলীদের রুজি রোজগার বন্ধ হবে তা নয়। পৃথিবীর বিশিষ্ট সংস্কৃতিবান জাতিগুলোর অন্যতম হিসাবে বাঙালির যে পরিচিতি, তা অনেকটাই মুছে যাবে। আজ গোটা ভারতকে এক ধর্ম, এক ভাষা, এক সংস্কৃতির দেশ করে তোলার যে আপ্রাণ লড়াই চালাচ্ছে সংঘ পরিবার, তাতে সেটা হবে তাদের গুরুত্বপূর্ণ জিত। আপনি আজ সত্যজিতের অস্কার আর ঋত্বিকের মৃত্যুর এতবছর পরে তাঁকে নিয়ে মার্টিন স্করসেসির মুগ্ধতার কথা শতমুখে বলে সম্মান পান বাংলা সিনেমা বলে একটা কিছুর অস্তিত্ব আছে বলে। না থাকলে যাকেই বলতে যাবেন, সে বলবে ‘হ্যাঁ হ্যাঁ, তোমাদের একসময় নাকি সবই ছিল। এখন কী আছে বলো?’ বাংলা মাধ্যম স্কুলগুলোকে উঠে যাওয়ার দ্বারপ্রান্তে এনে দাঁড় করিয়েছে পশ্চিমবঙ্গ সরকার। এর সঙ্গে বাংলা সিনেমাশিল্পটা তুলে দিতে পারলে সোনায় সোহাগা। পাড়ায় পাড়ায় রবীন্দ্র জয়ন্তী কমে এসেছে অনেকদিন হল, আজ থেকে ৫০ বছর পরে সত্যজিতের জন্মদিন পালন করার লোকও পাওয়া যাবে না।

ব্যাপারটা কিন্তু গভীরভাবে রাজনৈতিক। আপনি মাছি তাড়ানোর ভঙ্গিতে বলতেই পারেন ‘পরমব্রত চাটুজ্জে তো সরকারের দেউচা-পাঁচামির কমিটিতে ঢুকেছিল। এখন বুঝুক ঠ্যালা’, অথবা ‘অনির্বাণ ভটচায্যি তো আর জি করের বেলায় চুপ ছিল। এখন কেন?’, কিম্বা ‘সুদেষ্ণা রায় তো সরকারের কীসব কমিশনের মেম্বার। এদের পাত্তা না দেওয়াই উচিত।’ কিন্তু আপনি যত উদাসীন থাকবেন, আপনার ভাষা-সংস্কৃতির বারোটা বাজানোর জন্যে যে বড় রাজনীতিটা চলছে তার পথ তত পরিষ্কার হবে।

নাগরিক ডট নেট ওয়েবসাইটে প্রকাশিত

রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে ৪২ বছর

অনেকসময় দার্জিলিঙে হঠাৎ মেঘ সরে গিয়ে কাঞ্চনজঙ্ঘা যেভাবে নিজেকে উদ্ঘাটন করে, সেভাবে কোনো ঘটনায় আচমকা জলের মত পরিষ্কার হয়ে যায় রবীন্দ্রনাথের একেকটা লাইন।

মা মারা গেছেন খুব বেশিদিন হয়নি। তবু এবছর মায়ের মৃত্যুদিনটা ভুলে গিয়েছিলাম। বেলার দিকে বোন ফোন করে মনে না করালে মনে পড়ত না। আসলে ওই দিনটার চেয়ে মাকে অনেক বেশি মনে পড়ে প্রতিবছর পঁচিশে বৈশাখে। আমার মায়ের বেশ বেলা করেই ঘুম থেকে ওঠার অভ্যাস ছিল, কিন্তু বছরে ওই একটা দিন ঘুম থেকে উঠে পড়তেন খুব ভোরে। দূরদর্শনে জোড়াসাঁকো আর রবীন্দ্র সদনের কবিপ্রণাম দেখবেন বলে। বাড়িতে টিভি এসেছিল আটের দশকের শেষ দিকে। তখন থেকেই এই রুটিন চলছিল। মা যথারীতি ঈশ্বরে বিশ্বাসী, একসময় বাড়িতে ঠাকুরের আসন পেতে পুজোও করতেন। কিন্তু মহালয়ার দিন ভোর ভোর উঠতেই হবে, উঠে বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের চণ্ডীপাঠ শুনতেই হবে – ‘মহিষাসুরমর্দিনী’ নিয়ে এত গদগদ ছিলেন না। কোনোবার উঠতেন, কোনোবার উঠতেন না। কিন্তু পঁচিশে বৈশাখে ছাড়াছাড়ি নেই। খুব ইচ্ছা ছিল, একবার জোড়াসাঁকো বা রবীন্দ্র সদনের অনুষ্ঠানে গিয়ে ওখানে বসে গোটাটা দেখবেন। আমার কাছে আবদার ছিল, যখন বড় হয়ে চাকরি করব, তখন যেন নিয়ে যাই। আমি চাকরি পাওয়ার পরেও মা ১৬ বছর বেঁচেছিলেন। তখন আর মুখ ফুটে বলেননি, আমারও খেয়াল হয়নি। মুনীর নিয়াজি যথার্থই লিখেছেন “হমেশা দের কর দেতা হুঁ ম্যায়…” (সর্বদা দেরি করে ফেলি আমি)।

মা মারা গিয়েছিলেন শীতের শেষ দিকে। সেবার পঁচিশে বৈশাখে আমার ভোর ভোর ঘুম ভেঙে গেল, যদিও আমার বরাবর বেলা করে ঘুম থেকে ওঠা অভ্যাস। মা কবিপ্রণাম দেখতে উঠে পড়তেন, আমি বিছানা ছাড়তাম না। ঘুমটা পাতলা হয়ে গেলে গান, আবৃত্তি, ভাষ্যপাঠের আওয়াজ কানে ভেসে আসত। মা মারা যাওয়ার বছরের রবীন্দ্র জয়ন্তীতে তেমন আওয়াজ কানে আসতেই ধড়মড়িয়ে উঠে বসেছিলাম। কিন্তু উঠে বসতেই সে আওয়াজ মিলিয়ে গেল। না, কোথাও তো টিভি চলছে না! না আমাদের ফ্ল্যাটে, না পাশের বাড়িটায়, যেখান থেকে মেগা সিরিয়ালের সংলাপ বা ইউটিউবে চালানো হিন্দি সিনেমার গান ভেসে আসে প্রায়শই। বুঝলাম, স্বপ্ন দেখছিলাম। স্বপ্ন তো আসলে ইচ্ছাপূরণ – সিগমুন্ড ফ্রয়েড কবেই বলে গেছেন।

আমার একেবারে ছোটবেলায় বাড়িতে টিভি ছিল না, কেনার সামর্থ্য ছিল না বলে। এক নিকটাত্মীয় রঙিন টিভি কেনার সময়ে সাদাকালো টিভিটা যখন আমাদের দিয়ে দেন, তখন আমার বয়স ছয় কি সাত। তার আগে পর্যন্ত আমাদের বাড়িতে বিনোদন বলতে ছিল বই আর আমার অদেখা ঠাকুর্দার রেকর্ড প্লেয়ার। আমার হাতেখড়ির আগে থেকে টিভি আসার সময় পর্যন্ত সন্ধেবেলা আমার প্রিয় বিনোদন ছিল মায়ের মুখে সঞ্চয়িতার কোনো কবিতা পাঠ শোনা, বা মায়ের গলায় রবীন্দ্রসঙ্গীত। গীতবিতানটা খুলে রাখতেন পাশে, কিন্তু কোনোদিন দেখতে হয়েছে বলে মনে পড়ে না। শুনে শুনে বেশকিছু কবিতা আর গানের প্রতি আমার পক্ষপাত জন্মেছিল। বারবার সেগুলোই শুনতে চাইতাম।

যেমন পলাতকা কাব্যগ্রন্থের ‘নিষ্কৃতি’ কবিতাটা। কুলীন এবং নিষ্ঠুর বাপের মেয়ে মঞ্জুলিকার কষ্টের কথা পড়তে পড়তে মায়ের চোখ দিয়ে জল গড়াত, আমার চোখ দিয়েও। পথের পাঁচালী পড়েছি অনেক পরে। অপরের দুঃখে কষ্ট পাওয়ার শুরু মঞ্জুলিকার জন্যে কাঁদতে কাঁদতেই।

মায়ের নিজের বেশি প্রিয় ছিল “ডাক্তারে যা বলে বলুক নাকো,/রাখো রাখো খুলে রাখো,/শিয়রের ওই জানলা দুটো, – গায়ে লাগুক হাওয়া।/ওষুধ? আমার ফুরিয়ে গেছে ওষুধ খাওয়া।” বড় হয়ে সকৌতুকে লক্ষ করেছি, বাবার সঙ্গে ঝগড়া-টগড়া হলে এই কবিতাটা বেশি পড়তেন। মনোমালিন্য ২৪ ঘন্টার বেশি স্থায়ী হলে আবার পড়তেন ‘সাধারণ মেয়ে’।

লোডশেডিং তখন নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার ছিল, আর লোডশেডিং হয়ে গেলে হ্যারিকেন বা মোমবাতির আলোয় শুয়ে শুয়ে কবিতা পড়া যায় না। সেরকম পরিস্থিতিতে মা গান ধরতেন। আমার প্রায় ৪২ বছরের জীবনে আর কোনো অগায়কের এতগুলো রবীন্দ্রসঙ্গীত সুর সমেত মুখস্থ আছে বলে দেখিনি। অক্ষর পরিচয় হওয়ার আগেই রবীন্দ্রসঙ্গীত যে অন্য গানের চেয়ে আলাদা – এটা বুঝতে শিখেছিলাম মায়ের গান শুনে। কথাগুলোর মানে বোঝার বয়স তখন হয়নি, কিন্তু বারবার শুনে প্রায় মুখস্থ হয়ে গিয়েছিল মায়ের প্রিয় গানগুলো – “তোমার অসীমে প্রাণমন লয়ে”, “আমি রূপে তোমায় ভোলাব না”, “আমার সকল নিয়ে বসে আছি”, “সুখের মাঝে তোমায় দেখেছি”

সুচিত্রা মিত্র আর কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায়ের লং প্লেয়িং রেকর্ড বেশ কয়েকটা ছিল আমাদের। বাগবাজারে মায়ের বড়মাসির বাড়ি যাওয়া হলেই ফেরার সময়ে মেট্রোরেলের জন্যে খুঁড়ে ফেলা এবড়োখেবড়ো রাস্তা অগ্রাহ্য করে, লাইন দিয়ে যে রেকর্ডের দোকানগুলো ছিল মা সেখানে খোঁজ করতেন নতুন কী এসেছে। ঋতু গুহ আর পূর্বা দামের নাম জানতে পারি তখনই। তবে অনেক খোঁজাখুঁজির পরেও ঋতুর গলায় “তোমার  সোনার থালায় সাজাব আজ” খুঁজে পাননি মা। যে রেকর্ডটা কিনে এনেছিলেন তার দুটো গান কে জানে কী কারণে আমার খুব প্রিয় হয়ে গিয়েছিল – “এরা  পরকে আপন করে, আপনারে পর”, “পেয়েছি ছুটি বিদায় দেহ ভাই”। সেই থেকে আজ পর্যন্ত আমার কাছে বুদ্ধদেব গুহ ঋতু গুহর স্বামী। আর কিছু নন।

বাবার অতখানি রাবীন্দ্রিক হওয়ার সময় ছিল না। বছর বিশেক বয়সে মার্কসবাদী কমিউনিস্ট পার্টির সদস্যপদ পেয়েছিলেন। মৃত্যুর আড়াই মাস আগে শয্যাশায়ী হয়ে যাওয়া পর্যন্ত দিনের বেশিরভাগ সময়টা পার্টির কাজেই কাটাতেন। তার উপর আমার শৈশবে প্রশাসনিক দায়িত্বেও ছিলেন। তবু একবার বিবাহবার্ষিকীতে মাকে উপহার দিলেন একটা এলপি রেকর্ড, যার এক পিঠে কণিকা, অন্য পিঠে দেবব্রত বিশ্বাস। সুচিত্রার গান বাবার তত পছন্দ ছিল না। রেকর্ডে দেবব্রতর গলায় সম্ভবত প্রথম গানটাই ছিল ‘আকাশ ভরা সূর্য তারা’। তখন আমার বয়স সাত বা আট। শুনেই মনে হল, এ কী আশ্চর্য গান রে বাবা! এমন কথা হয় গানের! এমন গলা হয় মানুষের! সেই বিস্ময় আমার আজও কাটেনি।

পার্টি সংগঠন, প্রশাসন, পরিবার সামলেও বাবা যে সুযোগটা পারতপক্ষে ছাড়তেন না সেটা হল অপেশাদার যাত্রায়, নাটকে অভিনয় করার সুযোগ। বাবা আর তাঁর বন্ধুরা কয়েকজন মিলে যাত্রা ক্লাব খুলেছিলেন, বছরে অন্তত একটা যাত্রা হত। আজকাল যাকে ‘টল, ডার্ক অ্যান্ড হ্যানসাম’ চেহারা বলে, তেমন চেহারা থাকার সুবাদে বাবা বেশ কয়েকবার নায়কের ভূমিকায় অভিনয় করেছেন। কিন্তু চেহারা নয়, যাত্রায় অভিনয় করতে গেলে যা অপরিহার্য, তা হল শক্তিশালী কণ্ঠস্বর। সেরিবেল্লা ডিজেনারেশন নামে এক আরোগ্যহীন রোগে গলাটা নষ্ট হয়ে যাওয়ার আগে বাবার দারুণ একখানা কণ্ঠস্বরও ছিল। সেই সুবাদে বাবা চমৎকার কবিতা আবৃত্তিও করতেন। বহুকাল চর্চা না থাকলেও অনর্গল আবৃত্তি করতে পারতেন নজরুলের ‘আমার কৈফিয়ত’। বাড়িটা গমগম করত। রবীন্দ্রনাথের কবিতার মধ্যে বাবা বারবার আবৃত্তি করতেন ‘ছেলেটা’ আর ‘বাঁশি’। বাবার অনেকটা সময় বাড়িতে থাকা আমাদের দুই ভাইবোনের কাছে অনেকদিন পর্যন্ত ছিল লটারি পাওয়ার মত ব্যাপার। তেমন দিনে মনমেজাজ বিশেষ রকমের ভাল থাকলে বাবা সঞ্চয়িতা টেনে নিয়ে উদাত্ত কণ্ঠে পড়তেন “যদি  পরজন্মে পাই রে হতে/ব্রজের রাখাল বালক/তবে  নিবিয়ে দেব নিজের ঘরে/সুসভ্যতার আলোক।” মা পড়তেন ‘পুরাতন ভৃত্য’ বা ‘দুই বিঘা জমি’। বাবা মাঝে মাঝে গেয়েও উঠতেন। সবই দেবব্রতর গলায় শোনা গান – ‘আমি যখন তাঁর দুয়ারে ভিক্ষা নিতে যাই’, ‘তোরা যে যা বলিস ভাই’, ‘যেতে যেতে একলা পথে/নিবেছে মোর বাতি,’ ‘যে রাতে মোর দুয়ারগুলি’।

একসময় রেকর্ড প্লেয়ারটার দিন ফুরোল। গানহীন দীর্ঘ কয়েকটা বছরের পরে বাড়িতে এল ফিলিপসের ক্যাসেট প্লেয়ার, যাকে আমরা বলতাম টেপ রেকর্ডার। তখন উঁচু ক্লাসে পড়ি। এক ছুটির দিনে মা ঠিক করলেন, আমাদের চারজনের গলা টেপে ধরে রাখা হবে। ব্ল্যাঙ্ক ক্যাসেট ছিল না, কিন্তু যখন ঝোঁক চেপেছে তখন করতেই হবে কাজটা। উনিশ বছর বয়সী এ আর রহমানের সৃষ্টি রোজা-র সাউন্ড ট্র‍্যাকের খানিকটা ধ্বংস করে রেকর্ড করা হল – বাবার গলায় ‘বিষ্টি পড়ে টাপুর টুপুর’, মায়ের গলায় “সন্ন্যাসী উপগুপ্ত/মথুরাপুরীর প্রাচীরের তলে/একদা ছিলেন সুপ্ত – ”। ধরে রাখা হয়েছিল, কিন্তু সংরক্ষণ করা হয়নি। ক্যাসেটের যুগ চলে গেছে, ওই কণ্ঠস্বরগুলো আমাদের সন্তানদের শোনার জন্যে এ যুগের উপযোগী ফর্ম্যাটে রাখা হয়নি। আমার মায়ের আরেকটা প্রিয় গান “যা  হারিয়ে যায় তা আগলে বসে/রইব কত আর?”

গত সহস্রাব্দের শেষে প্রাপ্তবয়স্ক হলাম। জন্মদিনে বাবা-মা বরাবরই বই দিতেন, জামাকাপড় বা খেলনা নয়। আঠারোতম জন্মদিনের আগেরদিন দেখি মা রিকশা করে এসে বাড়ির সামনে নামলেন আর রিকশাকাকু একটা ইয়াব্বড় প্যাকিং বাক্স ঘরে নামিয়ে দিয়ে গেলেন। কী আছে তাতে? সেবারের জন্মদিনের উপহার – বিশ্বভারতী প্রকাশিত রবীন্দ্র রচনাবলীর প্রথম ১৫ খণ্ড। বারো তারিখের আগে মাইনে হত না বাবার। সাত-আট তারিখে অত দামি জিনিস বাড়িতে এসে পড়ায় দেখলাম বাবার ভুরু সামান্য কুঁচকে গেছে। দাম শুনে চোখ কপালে। তখনই বোধহয় ১৭০০-১৮০০ টাকা দাম ছিল। কিন্তু একটু পরেই বাবার রাগ পড়ে গেল। বললেন “যাকগে, এ জিনিস তো জীবনে একবারই কেনা। আমরা যখন থাকব না তখনো ওর কাজে লাগবে এরকম একটা জিনিস দেওয়া গেল।” পরবর্তী এক বছরে সমস্ত কবিতা পড়ে ফেলেছিলাম। তারপর ক্রমশ গল্প, উপন্যাস, নাটক। প্রবন্ধগুলো পড়তে ভারি আলস্য লাগত। সে আলস্য কাটাতে কাটাতে বাবা, মা দুজনেই বিদায় নিলেন; আমার চশমাটা বাইফোকাল হয়ে গেল। রাশিয়ার চিঠি, কালান্তর, শান্তিনিকেতন, মহাত্মা গান্ধী, ইতিহাস, ভারতবর্ষ – এসব পড়তে পড়তে এতদিন যে জিনিস যে চোখে দেখে এসেছি তা বদলে যায় আর মনে পড়ে বাবার মন্তব্য “আমরা যখন থাকব না তখনো ওর কাজে লাগবে এরকম একটা জিনিস দেওয়া গেল।”

বাবার যখন শেষ সময় – মানে অসুখটা জেনে গেছি, বাবাও টের পেয়ে গেছে, চোখে আর ভাল দেখতে পাচ্ছে না, গলা দিয়ে স্বর বেরনো একেবারেই বন্ধ হয়ে গেছে, তখনো শ্রবণেন্দ্রিয় ঠিক ছিল। একদিন সন্ধেবেলা কোনো কারণে আমি, মা, বোন বাবাকে ঘিরে বসে একসঙ্গে গাইছিলাম “আগুনের পরশমণি ছোঁয়াও প্রাণে।” “ব্যথা মোর/উঠবে জ্বলে/ঊর্ধ্ব-পানে” পংক্তিতে এসে এক অদ্ভুত অনুভূতি হল। মনে হল, জীবনটা যদি সিনেমা হত তাহলে এই শটটার পরের শটে দেখা যেত – বিছানাটা খালি, বাবা নেই। সাউন্ড ট্র্যাকে গানটা চলতে থাকত। রবীন্দ্রনাথের আর সব থেমে গেলেও গান কখনো থামে না, জীবন মরণের সীমানা ছাড়ায়ে চলতেই থাকে। সেই হাতেখড়ির আগের যুগে রান্নাঘরে আটা মাখতে মাখতে গাওয়ার মাঝে মা বলেছিলেন “জীবনের সব পরিস্থিতির জন্যেই দেখবি রবীন্দ্রনাথের একটা না একটা গান আছে।” তখন মনে হয়েছিল, এই কয়েকবছর আগেও মনে হত, মা রবীন্দ্রভক্ত বলে বাড়িয়ে বলেছেন। কিন্তু বয়স যত বাড়ছে, ততই কথাটা বিশ্বাস না করে উপায় থাকছে না। বরং এখন মনে হয় মা একটু রক্ষণশীল হয়েই কথাটা বলেছিলেন। কেবল রবীন্দ্রনাথের গান নয়, বোধহয় রবীন্দ্রনাথের কাব্যের ক্ষেত্রেও কথাটা সত্যি। কোভিড হাসপাতাল থেকে যখন মায়ের মৃতদেহ নিয়ে বাড়ি আসছিলাম, রাস্তা খুঁড়ে পৌরসভা কোনো কাজ করছিল বলে সোজা পথে না এসে ঘুরপথে আসতে হয়েছিল। তখন মা রবীন্দ্রনাথের যে কবিতা আমাকে একেবারে ছোটবেলায় আবৃত্তি করতে শিখিয়েছিলেন, তার প্রথম কয়েক লাইন মনে পড়ছিল “মনে করো যেন বিদেশ ঘুরে/মাকে নিয়ে যাচ্ছি অনেক দূরে।”

অনেককাল হল, শ্মশানে গেলেই আমার কানে বাজতে থাকে দেবব্রতর গলায় “আছে দুঃখ, আছে মৃত্যু, বিরহদহন লাগে/তবুও শান্তি, তবু আনন্দ, তবু অনন্ত জাগে।” সদ্যমৃত কোনো কাছের মানুষকে দাহ করতে শ্মশানে গিয়ে দ্বিতীয় লাইনটা অবিশ্বাস্য, অবাস্তব মনে হওয়াই স্বাভাবিক। কিন্তু আমার দিব্যি বিশ্বাসযোগ্য মনে হয়। কারণ যে বছর বাবা মারা গেলেন, সেবছরই আমার মেয়ে জন্মাল। যে বছর মা মারা গেলেন, সে বছরই আমার ভাগ্নী জন্মাল। কোনো সন্দেহ নেই – “নাহি ক্ষয়, নাহি শেষ,  নাহি নাহি দৈন্যলেশ।”

মাস দেড়েক পরেই বিয়াল্লিশে পা দেব। জীবনের কাছে এখনো যা যা প্রত্যাশা আছে তার অন্যতম হল রবীন্দ্রনাথের যেসব লাইনের অর্থ আজও বুঝিনি সেগুলোর মর্মোদ্ধার। বুঝে গেছি, সবসময় বুঝতে চেষ্টা করলেই বোঝা যায় না। অনেকসময় দার্জিলিঙে হঠাৎ মেঘ সরে গিয়ে কাঞ্চনজঙ্ঘা যেভাবে নিজেকে উদ্ঘাটন করে, সেভাবে কোনো ঘটনায় আচমকা জলের মত পরিষ্কার হয়ে যায় রবীন্দ্রনাথের একেকটা লাইন। নইলে ভেনেজুয়েলার জগদ্বিখ্যাত নেতা উগো শাভেজ, জাপানের সাংবাদিক জুনিচি কোদামা আর তার স্ত্রী রিয়েকো আসাতোর সঙ্গে ভারতের এক নগণ্য মফস্বলের ছাপোষা প্রতীক যে বিশ্বসাথে যোগে যুক্ত – তা কখনো আমার বুঝে ওঠা হত না।

চাপা পড়া গার্ডেনরিচ খুঁড়ে যা বেরোল

বাঙালি ভদ্রলোকদের মধ্যে গার্ডেনরিচ আর রাজাবাজারকে জনান্তিকে শাসনের অযোগ্য এলাকা বলা বহুদিন ধরেই চালু। ইদানীং হিন্দুত্বের হাওয়া খেয়ে ফুরফুরে মেজাজে সেসব প্রকাশ্যে বলা আরম্ভ হয়েছে।

সংবাদমাধ্যম ভূপতিনগরে এনআইএ আধিকারিকদের আক্রান্ত হওয়া এবং স্থানীয় তৃণমূল নেতার স্ত্রীর পালটা শ্লীলতাহানির অভিযোগ (মুখ্যমন্ত্রী যে অভিযোগে সিলমোহর দিয়েছেন) নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। তা বাদে পশ্চিমবঙ্গের ৪২ লোকসভা আসনেই প্রায় সব দলের প্রার্থী ঘোষণা হয়ে গেছে, তা নিয়েও হইচই তুঙ্গে। ফলে গার্ডেনরিচে বাড়ি চাপা পড়ে যাওয়া মানুষগুলোর স্মৃতিও চাপা পড়ে গেছে। আর কে গ্রেফতার হল ওই কাণ্ডে, শেষমেশ কাউন্সিলর না কলকাতা কর্পোরেশনের মেয়র নাকি মেয়র-ইন-কাউন্সিল – কে অতগুলো মৃত্যুর দায়িত্ব স্বীকার করলেন তা আর আমরা জানতে পারছি না। সম্ভবত আর কোনোদিন পারবও না। যদি নির্বাচনের পর কলকাতায় আবার কোনো বেআইনি নির্মাণ হুড়মুড়িয়ে ভেঙে পড়ে, তাহলে আলাদা কথা। তা এই চাপা পড়ে যাওয়া গার্ডেনরিচ কাণ্ড নিয়ে কিছু কুচিন্তা কিছুতেই মন থেকে যাচ্ছে না। এই চিন্তাগুলো আসন্ন নির্বাচনে হয়ত অপ্রাসঙ্গিক (কোন বিষয়গুলোর ভিত্তিতে মানুষ ভোট দেন তা অনুমান করতে গিয়ে আজকাল তো পোড়খাওয়া ব্যক্তিদেরও ঘোল খেয়ে যেতে দেখা যায়; আমি কোন ছার), কিন্তু বাংলার মানুষের দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক ও সামাজিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে জরুরি বলেই মনে হয়।

সাধারণত তৃণমূল কংগ্রেসের কোনো নেতা, মন্ত্রীর বিরুদ্ধে কুকর্মের অভিযোগ উঠলেই দল যা করে তা হল আগেভাগে তাঁকে নির্দোষ বলে দেওয়া। গোটা ব্যাপারটাকেই চক্রান্ত বলে দেগে দেওয়া। অনুব্রত মন্ডল থেকে শাহজাহান শেখ পর্যন্ত সকলের ক্ষেত্রেই তাই করা হয়েছে। বড়জোর তৃণমূলের মুখপাত্ররা বলেন – আইন আইনের পথে চলুক। ব্যাপারটা তো প্রমাণসাপেক্ষ। কেউ দোষ করে থাকলে দল তার পাশে দাঁড়াবে না। সাম্প্রতিককালে এর ব্যতিক্রম অবশ্য ঘটেছে। বিশেষ করে নিয়োগ দুর্নীতিতে অভিযুক্ত অনেকের সঙ্গে যোগাযোগই তৃণমূল বেমালুম অস্বীকার করেছে। কিন্তু তারা সব চুনোপুঁটি। রাঘব বোয়ালদের মধ্যে একমাত্র প্রাক্তন শিক্ষামন্ত্রী পার্থ চ্যাটার্জির ক্ষেত্রেই তৃণমূল উলটো পথ নিয়েছিল। বান্ধবীর ফ্ল্যাট থেকে টাকার অযোধ্যা (পাহাড়) উদ্ধার হওয়ার অব্যবহিত পরেই তাঁকে দলের মহাসচিবের পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়, পরবর্তীকালে মন্ত্রিসভা থেকেও। এমনকি তাঁর দুর্নীতির দায়ও দল সত্বর নিজের গা থেকে ঝেড়ে ফেলেছিল। বলা হয়েছিল, তিনি যদি ঘুষ নিয়ে থাকেন তাহলে ব্যক্তিগতভাবে নিয়েছেন। দল বা মুখ্যমন্ত্রী এর বিন্দুবিসর্গ জানতেন না। পার্থ যে দলের আর পাঁচজন অভিযুক্তের মত নন, তা বারবার পরিষ্কার হয়ে গেছে। দলের বাকি যে নেতারা বিভিন্ন মামলায় অভিযুক্ত, তাদের সম্পর্কে কথা বলার সময়ে মমতা ব্যানার্জি বা অভিষেক ব্যানার্জির মূল সুরটা থাকে এইরকম, যে তারা আসলে নির্দোষ। স্রেফ তৃণমূল করে বলে বিজেপি কেন্দ্রীয় সংস্থা দিয়ে তাদের হয়রান করাচ্ছে। যেমন অনুব্রত সম্পর্কে অভিষেক দিনদুয়েক আগেও বলেছেন ‘অনুব্রতই যদি আজ বিজেপিতে চলে যেতেন, ধোয়া তুলসীপাতা হয়ে যেতেন। বিজেপিতে যাননি, তাই জেল খাটছেন।’ মুখ্যমন্ত্রী তো একাধিকবার বলেছেন ‘কেষ্ট’ যখন ফিরে আসবে তখন তাকে বীরের সম্মান দেওয়া হবে। পার্থ কিন্তু দলের এমন সমর্থন পাননি। বহুকাল হল তাঁর নাম পর্যন্ত শোনা যায় না মুখ্যমন্ত্রী বা তাঁর ভাইপোর মুখে। গার্ডেনরিচ কাণ্ডের পর দেখা গেল সেখানকার বিধায়ক তথা নগরোন্নয়ন মন্ত্রী এবং কলকাতার মেয়র ফিরহাদ (ববি) হাকিমও একলা পড়ে গেছেন।

গতমাসের তৃতীয় সপ্তাহে গার্ডেনরিচ কাণ্ড ঘটার ঠিক পরেই মমতা স্বয়ং এলাকায় গিয়েছিলেন এবং হাসপাতালে গিয়ে আহতদের সঙ্গে দেখা করেন। কিন্তু সংবাদমাধ্যমকে যা বলেন তাতে ববি হাকিমকে আড়াল করার কোনো চেষ্টা ছিল না। তৃণমূলের দু নম্বর নেতা অভিষেক তো আদৌ ওমুখো হননি। গোটা রাজ্যের সংবাদমাধ্যম এবং বিরোধীরা যখন বেআইনি নির্মাণ নিয়ে ববিকে সঙ্গত কারণেই অভিযুক্ত করছেন, তখন তৃণমূল যেভাবে অনুব্রত বা শাহজাহানের মত জেলা স্তরের নেতার ঢাল হয়ে দাঁড়িয়েছিল, সেভাবে ববির পাশে দাঁড়ায়নি। টিভি স্টুডিওতেও তৃণমূলের মুখপাত্ররা কেবল বনলতা সেনগিরি করছিলেন। অর্থাৎ বামফ্রন্ট আমলেও বেআইনি নির্মাণ হত এবং ভেঙে পড়ত (শিবালিক অ্যাপার্টমেন্টের বারংবার উল্লেখ সমেত) – এই ছিল তাঁদের সার কথা। ববি নিজে আবার ব্যস্ত ছিলেন স্থানীয় কাউন্সিলরকে বাঁচাতে। তা করতে গিয়ে কর্পোরেশনের ইঞ্জিনিয়ারদের ঘাড়ে পর্যন্ত দোষ চাপিয়েছেন। কিন্তু দলের সর্বোচ্চ নেতৃত্ব নীরব ছিলেন। তেরোজন মানুষের মৃত্যুর পরেও এই নীরবতার একটা ব্যাখ্যা অবশ্যই বিষয়টাকে যথেষ্ট গুরুত্ব না দেওয়া। কিন্তু অন্য দিক থেকে ভাবলে, দলের অতি গুরুত্বপূর্ণ একজন নেতা প্যাঁচে পড়েছেন দেখেও তাঁর পক্ষ নিয়ে সোচ্চার না হওয়ার ব্যাখ্যা কী? একটা ব্যাখ্যা অবশ্যই পার্থ আর ববির মিল থেকে পাওয়া যায়। লুকিয়ে চুরিয়ে নয়, প্রকাশ্যেই তৃণমূলের প্রবীণদের সঙ্গে অভিষেকের নেতৃত্বাধীন নবীনদের সংঘাত হয়েছিল গতবছর। পার্থ, ববি দুজনেই প্রবীণ শিবিরের লোক – অভিষেকের অপছন্দের লোক। সেই সংঘাতে প্রবীণদের একেবারে সামনের সারিতে ছিলেন ববি। অভিজ্ঞ রাজনৈতিক বিশ্লেষক হওয়ার প্রয়োজন নেই, পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতির উপর নজর রাখা যে কোনো মানুষ জানেন শাসক দলে এখন অভিষেকের অনুগামীদের পাল্লা ভারি। এতটাই ভারি যে আরেকটু হলে প্রবীণ সাংসদ সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়ের টিকিট ফস্কে যাচ্ছিল। স্বভাবতই পার্থর মত, কোণঠাসা ববির পাশেও দল দাঁড়ায়নি।

কেউ বলতেই পারেন, তাঁকে তো মেয়র পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়নি। তেমন দাবিকে পাত্তাও দেওয়া হয়নি। তাহলে দল পাশে দাঁড়ায়নি কী করে বলা যায়? প্রশ্নটা খুব বুদ্ধিমানের মত হবে না। কারণ একটা বেআইনি ফ্ল্যাটবাড়ি ভেঙে পড়েছে বলে মেয়রকে বরখাস্ত করলে প্যান্ডোরার বাক্স খুলে যেত লোকসভা নির্বাচনের মুখে। প্রথমত, বিরোধীদের কর্পোরেশনের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ স্বীকৃতি পেয়ে যেত। দ্বিতীয়ত, শিশুরাও জানে যে সত্যি সত্যি একা ববির অঙ্গুলিহেলনে কলকাতায় বেআইনি নির্মাণ, পুকুর ভরাট করে ফ্ল্যাট তৈরি ইত্যাদি চলে না। তিনি বড়জোর তাঁর দুটো বড় বড় পদাধিকার বলে ব্যাপারটায় পৌরোহিত্য করেন। সুতরাং এই সময়ে চটালে তিনি রেগেমেগে মুখ খুলে ফেলতে পারতেন, তাতে তৃণমূলের বিপদ বাড়ত বই কমত না। উপরন্তু তাঁকে ঘিরে যে চক্র, যাকে সংবাদমাধ্যমের মান্য ভাষায় বলা যায় ‘ইলেকশন মেশিনারি’, তাও তৃণমূলের হাত থেকে পিছলে যেতে পারত। গোটা রাজ্যের বেআইনি প্রোমোটিং ব্যবসায়ীদের কাছে যে বার্তা যেত সেকথা না হয় ছেড়েই দেওয়া গেল। ভোটের বাজারে টাকার জোগানের কী হত সেকথাও না হয় থাক। নির্বাচনী বন্ড তো হিমশৈলের চূড়া মাত্র। অভিষেকের ববিকে যতই অপছন্দ হোক, দলের নির্বাচনী স্বার্থ ক্ষুণ্ণ করে লবিবাজি করার মত বোকা রাজনীতিবিদ অবশ্যই মমতার ভাইপো নন। ফলে ওটাকে পাশে দাঁড়ানো বলে মনে করার কোনো কারণ নেই। পাশে দাঁড়ানো মানে সর্বোচ্চ নেতৃত্বের পক্ষ থেকে বিরোধীদের এবং জনগণকে প্রকাশ্য বার্তা দেওয়া, যে যাকে আক্রমণ করা হচ্ছে আমরা তার পাশে আছি। অনুব্রতদের ক্ষেত্রে বারবার যা করা হয়।

ববির ক্ষেত্রে তা না করা কি শুধুই দলীয় অন্তর্দ্বন্দ্বের কারণে? সেই প্রশ্নটাই আরেকটু তলিয়ে দেখা যাক। কেবল তৃণমূল নয়, গার্ডেনরিচ কাণ্ড নিয়ে বাংলার সংবাদমাধ্যম আর বিরোধী দলগুলোর প্রতিক্রিয়া নিয়েও আরেকটু কাটাছেঁড়া করা যাক। কারণ আজকের ভারতে প্রায় কোনোকিছুই কোনো লুকনো এজেন্ডা ছাড়া করা হচ্ছে না। তাই এখন ‘সকলেই আড়চোখে সকলকে দেখে’। না দেখে উপায় নেই।

গার্ডেনরিচ ছাড়া যখন বাংলা সংবাদমাধ্যমে আর কোনো খবর ছিল না, সেইসময় একদিন এবিপি আনন্দের সান্ধ্য জটলায় তৃণমূল প্রতিনিধির বনলতা সেনগিরির জবাবে সিপিএম প্রতিনিধি শতরূপ ঘোষ বলেন, যে বামফ্রন্ট আমলেও কলকাতায় বেআইনি নির্মাণ হয়েছে – একথা বলে তৃণমূল পার পেতে পারে না। কারণ সে আমলেও দীর্ঘদিন কলকাতা কর্পোরেশন তৃণমূল চালিত ছিল। উপরন্তু ২০১০ সাল থেকে টানা ১৪ বছর তৃণমূলই কর্পোরেশন চালিয়েছে। মজার ব্যাপার ঘটে এরপর। সঞ্চালক সুমন দে শতরূপকে সমর্থন করলেন, কিন্তু সেই সূত্রে তৃণমূলের আর যে নেতারা কলকাতার মেয়র ছিলেন – সুব্রত মুখার্জি বা শোভন চট্টোপাধ্যায় – তাঁদের আমলে বেআইনি নির্মাণ কতটা কী হয়েছিল সেসব তথ্য তুলে ধরলেন না। ইদানীং প্রায় সব বাংলা খবরের চ্যানেলেই কথায় কথায় রবীন্দ্রনাথের কবিতার লাইন, নজরুল বা সুকুমার রায়ের কবিতার লাগসই লাইন উদ্ধৃত করে রসবোধের পরিচয় দেন অতি বুদ্ধিমান সঞ্চালকরা। সুদূর অতীতের নানা তথ্যও তাঁদের হাতের কাছে সাজিয়ে দেয় রিসার্চ টিম। অথচ আগের দুই মেয়রের আমলে কী অবস্থা ছিল কলকাতার প্রোমোটিংয়ের – প্রায় দু সপ্তাহের বিতর্কে কোনো কাগজে বা টিভি চ্যানেলে এ নিয়ে একটি শব্দও দেখা গেল না। আশ্চর্য নয়? না সাংবাদিক, না বিরোধী দলের প্রতিনিধিরা – কেউই ওসবের মধ্যে গেলেন না। পূর্ব কলকাতার জগদ্বিখ্যাত জলাভূমির কীভাবে বারোটা বাজানো হয়েছে সে আলোচনা রোজ হয়েছে। অথচ এমনভাবে আলোচনা হয়েছে যেন সবটাই ঘটেছে বর্তমান মেয়রের আমলে। ‘জল শোভন’ বলে পরিচিত পূর্বতন মেয়রকে সবাই যেন ভুলে গেছে। অথচ তাঁর বিবাহ বহির্ভূত প্রেম নিয়ে এই সংবাদমাধ্যমই ঘন্টার পর ঘন্টা খরচ করেছে অনতি অতীতে। তিনি কি সমালোচনার ঊর্ধ্বে চলে গেছেন বিজেপিতে চলে যাওয়ায়? কদিন আগে আবার তৃণমূলে ফিরেছিলেন না? পশ্চিমবঙ্গ অবশ্য অধুনা গেছোদাদাদের রাজ্য। কে যে কখন কোথায় আছেন বলা ঝুঁকিপূর্ণ। গুগলও সবসময় সঠিক তথ্য দিতে পারে না।

মোট কথা ববি কতটা দুর্নীতিগ্রস্ত, মেয়রের পদে থাকার পক্ষে তিনি কতটা অযোগ্য তা প্রমাণ করতে বিরোধী দলের প্রতিনিধিরা এবং সঞ্চালকরা চিত্তরঞ্জন দাশ, সুভাষচন্দ্র বসু পর্যন্ত চলে গেলেন আর সাম্প্রতিককালের মেয়রদের কথা মনে পড়ল না – এ তো বড় রঙ্গ। এমন রঙ্গ কেন হল তা পরিষ্কার হতে অবশ্য সময় লাগেনি। মনে রাখতে হবে, গার্ডেনরিচের ঘটনা ঘটার আগে বাংলার রাজনীতির কেন্দ্রীয় বিষয় হয়ে উঠেছিল সন্দেশখালি। সেখানে মূল অভিযুক্তের নাম শাহজাহান শেখ আর তার ভাইয়ের নাম আলমগীর। ফলে বিজেপি এবং রিপাবলিক বাংলার মত গর্বিত গোদি মিডিয়া যথেচ্ছ মুসলমানবিদ্বেষ ছড়িয়ে চলেছিল। ইতিহাসের কুখ্যাত লম্পটদের ধারা ভেঙে নিজের সম্প্রদায়ের মেয়েদের মায়ের চোখে দেখে, কেবলমাত্র হিন্দু মহিলাদের দিকেই হাত বাড়াত সন্দেশখালির তৃণমূলী দুষ্কৃতীরা – এই বয়ান ছড়িয়ে পড়েছিল। অগ্রাহ্য করা হচ্ছিল এই তথ্য, যে শাহজাহানের ডান হাত, বাঁ হাত দুজনেই হিন্দু – শিবু হাজরা আর উত্তম সর্দার।

ইতিমধ্যে গার্ডেনরিচে বেআইনি ফ্ল্যাটবাড়ি ভেঙে পড়ে মানুষের মৃত্যু। যারা গোদি মিডিয়া বলে পরিচিত নয়, তাদেরও মুখোশের আড়াল থেকে মুখ বেরিয়ে এল। সমস্ত আলোচনাই এমনভাবে হতে থাকল, যেন গোটা পশ্চিমবঙ্গে বা গোটা কলকাতায় একমাত্র গার্ডেনরিচেই ফ্ল্যাটের গায়ে ফ্ল্যাট লেগেছে। একমাত্র ওই এলাকার বাসিন্দারাই জেনে বুঝে পুকুর বোজানো জমিতে তৈরি হওয়া ফ্ল্যাট কেনেন, দুটো বাড়ির মাঝে যথেষ্ট জায়গা ছাড়া আছে কিনা সেসব দেখেন না। কেবল ওই এলাকার প্রোমোটাররাই যাবতীয় আইন ভাঙেন। কেন? সেকথা একদিন এক অধ্যাপক (যিনি ইদানীং রাজনৈতিক দলের মুখপাত্রদের থেকেও বেশি চেঁচামেচি করেন) বলেই দিলেন একটি চ্যানেলের অনুষ্ঠানে। বললেন, একটি বিশেষ সম্প্রদায়ের লোককে তোষণ করার জন্যে গার্ডেনরিচে যে যা খুশি আইন ভাঙলেও প্রশাসন কিচ্ছুটি বলে না। বিজেপির প্রতিনিধি দূরের কথা, স্টুডিওতে উপস্থিত বাম বা কংগ্রেস প্রতিনিধিও কথাটার প্রতিবাদ করলেন না। সুটবুট পরা বাবু সুমন দে তো বেশ জোরে জোরেই মাথা ঝাঁকালেন।

ঠিক কথা। আমরা তো জানি যে অমৃতকালের ভারতবর্ষের গার্ডেনরিচ এক ভয়ংকর অঞ্চল। সেখানে সংখ্যাগরিষ্ঠ হলেন মুসলমান সম্প্রদায়ের মানুষ। তাঁদের প্রশাসন, আইন, আদালত সকলেই হিন্দুদের চেয়ে বেশি ভালবাসে। তাই ওই সম্প্রদায়ের লোকেদের মধ্যে উচ্চশিক্ষিতের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। অধ্যাপক, ব্যারিস্টার, পুলিসকর্তা, সেনাবাহিনীর অফিসার একেবারে গিজগিজ করছে। ওঁরাই তো দেশটা চালান আর কলকাতা তো চালান বটেই। কারণ কলকাতার মেয়র স্বয়ং ওই সম্প্রদায়ের লোক, ওই এলাকারই বিধায়ক। সেই মেয়রের এত ক্ষমতা যে মুখ্যমন্ত্রী মেয়র ঘোষিত নতুন পার্কিং ফি বাতিল করে দিতে পারেন। সেকথা আবার সাংবাদিক সম্মেলন করে জানান দলের মুখপাত্র কুণাল ঘোষ, যিনি সরকার বা কর্পোরেশনের কেউ নন। কর্পোরেশনের সিদ্ধান্ত বাতিল করার সাংবিধানিক এক্তিয়ার মুখ্যমন্ত্রীর আছে কিনা সে প্রশ্নও কেউ তোলে না। মেয়রকে ঢোঁক গিলে মুখ্যমন্ত্রীর সিদ্ধান্ত হজম করতে হয়।

যা-ই হোক, এভাবে ভালই চলছিল। খবরের কাগজ এবং সোশাল মিডিয়ার দৌলতে সকলের ঠোঁটস্থ হয়ে গিয়েছিল গার্ডেনরিচ এলাকায় ঠিক কতগুলো পুকুর বোজানো হয়েছে, কতগুলো ফ্ল্যাট কত ইঞ্চি ফাঁকের মধ্যে সেঁধিয়ে গেছে। এসব প্রকাশিত হওয়ায় গোটা রাজ্যের অসাধু প্রোমোটার এবং তাদের সঙ্গে শাসক দলের যোগসাজশ নিয়ে যেরকম অন্তর্তদন্ত হওয়া উচিত ছিল, তা কিন্তু হচ্ছিল না। বিরোধীরাও সে উৎসাহ দেখাচ্ছিলেন না। শুধু সন্ধে নামলেই বিষোদ্গার হচ্ছিল, কলকাতার সমস্ত বেআইনি নির্মাণ কেন ভেঙে ফেলা হচ্ছে না। তারপর এল সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। গার্ডেনরিচ এলাকাতেই একটি বেআইনি নির্মাণ ভাঙতে গিয়ে বিরাট বাধার মুখে পড়লেন কর্পোরেশনের কর্মীরা এবং পুলিসবাহিনী। টিভির পর্দায় দেখানো হল, শেষপর্যন্ত সে বাড়ি না ভেঙেই তাঁদের ফিরে আসতে হচ্ছে। বড় বড় চোখে সুমন দে ও তাঁর অতিথিরা বিস্ময় প্রকাশ করলেন – কলকাতার এ কী ভয়ঙ্কর অবস্থা! মজার কথা, পর্দায় পরিষ্কার দেখানো হল, যিনি ভাঙতে না দেওয়ার পান্ডা, তিনি কর্পোরেশনের কর্মীদের কাছে দাবি করলেন ওই নির্মাণ অবৈধ নয়। তাঁর কাছে বৈধ কাগজপত্র আছে। কিন্তু সে কাগজ দেখালেন না। অথচ সংবাদমাধ্যমের প্রতিনিধিদের বললেন, তাঁদের ফ্ল্যাট ভেঙে দেওয়া হচ্ছে কারণ তিনি বিজেপি করেন। মেয়রের বাইটও দেখানো হল। তিনি বললেন, বেআইনি নির্মাণ ভেঙে দেব বললেই ভাঙা যায় না। অনেক সমস্যা আছে। তার একটা ঝলকই আজ দেখা গেছে। তারপরে স্টুডিওতে কর্পোরেশনের এবং মেয়রের অনেক সমালোচনা হল, কিন্তু দুঁদে সাংবাদিক সুমন দে বিজেপির প্রতিনিধিকে একবারও জিজ্ঞেস করলেন না, কী মশাই? আপনাদের লোকই তো বেআইনি নির্মাণ ভাঙতে দিচ্ছে না দেখা যাচ্ছে। এবার কী বলবেন? জানা কথা, বিজেপির প্রতিনিধি হয় ওই লোকটিকে বিজেপির প্রতিনিধি বলে স্বীকার করতেন না, নয়ত বলতেন ব্যাপারটা তো এখন আদালতের বিচারাধীন। দেখতে হবে পৌরসভা আসল দোষীদের বাড়ি বাঁচিয়ে নির্দোষ লোকের বাড়ি ভাঙছে কিনা। কিন্তু প্রশ্নটা কি সম্পাদকমশায়ের করা উচিত ছিল না? রিপাবলিক টিভির মত গর্বিত গোদি মিডিয়ার পাশে আনন্দবাজার গোষ্ঠী তো এখনো নিরপেক্ষ বলে পরিচিত। তারাও যে হাতে প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও বিজেপির প্রতিনিধিকে ছাড় দিয়ে দিল গার্ডেনরিচ কাণ্ডে, তাতে একটা জিনিসই প্রমাণ হয়।

আরও পড়ুন বাধ্যতামূলক মহানতার একাকিত্বে ইমাম রশিদি

গার্ডেনরিচ মুসলমানদের এলাকা। অতএব ওখানে কাউন্সিলর, প্রোমোটার মায় বাড়ি চাপা পড়ে মারা যাওয়া মানুষগুলো, সকলেই দুর্নীতিগ্রস্ত – এই ধারণা গেড়ে বসেছে সংবাদমাধ্যমের মনে। হয়ত আগে থেকেই বসেছিল, এখন সাহস পেয়ে প্রকাশ করা হচ্ছে। সব ব্যাটাকে ছেড়ে বেঁড়ে ব্যাটাকে ধরার মত ববি হাকিমকে আক্রমণও সেই কারণেই। স্টুডিওর জটলায় এ প্রশ্নও উঠেছে যে একই লোকের হাতে তিনটে পদ কেন? অথচ শোভন চাটুজ্জে মেয়র থাকার সময়ে এবং পরবর্তীকালে তাঁর মেয়র পদ নিয়ে যখন টানাপোড়েন চলছিল, তখন কেউ প্রশ্ন তোলেনি – উনি একইসঙ্গে বেহালার বিধায়ক আর কর্পোরেশনের মেয়র কেন? তাঁকে মেয়রের পদ থেকে সরিয়ে দেওয়ার পরেও বাংলার এই সংবাদমাধ্যমগুলোই গদগদ ছিল তাঁর আর প্রেমিকা বৈশাখী বন্দ্যোপাধ্যায়ের নাচগান, কাশ্মীর ভ্রমণ দেখাতে। দুর্নীতি নিয়ে এত আলোচনা হয়, অথচ তখন শোভনের বিপুল সম্পত্তি নিয়েও কোনো প্রশ্ন তোলা হয়নি।

আসলে বাঙালি ভদ্রলোকদের মধ্যে গার্ডেনরিচ আর রাজাবাজারকে জনান্তিকে শাসনের অযোগ্য এলাকা বলা বহুদিন ধরেই চালু। ইদানীং হিন্দুত্বের হাওয়া খেয়ে ফুরফুরে মেজাজে সেসব প্রকাশ্যে বলা আরম্ভ হয়েছে। এমন নয় যে একা সুমন দে বা আনন্দবাজার গোষ্ঠী এই দোষে দুষ্ট। ভোটের বাজারে ফ্যাসিবিরোধী সভা সমাবেশে বক্তৃতা দিয়ে বেড়ানো এক সাংবাদিক যেমন কদিন আগে এক অনলাইন বিতর্কে বললেন, রাজাবাজারের অটোওলাদের দৌরাত্ম্যের কারণেই নাকি হিন্দুদের মনে মুসলমানদের প্রতি বিতৃষ্ণা তৈরি হয় এবং বিজেপির কাজ সহজ হয়। অর্থাৎ গোটা রাজ্যের অন্য সব এলাকার হিন্দু অটোওলারা সুবোধ বালক। একমাত্র রাজাবাজারের মুসলমান অটোওলারাই ভীষণ দৌরাত্ম্য চালায় আরোহীদের উপর। ঠিক যেমন গোটা রাজ্যে আর কোথাও জলা জায়গা ভরাট করে বহুতল তৈরি হচ্ছে না, দুটো বাড়ির মধ্যে যতখানি ফাঁক থাকা উচিত তা অগ্রাহ্য করে ফ্ল্যাটবাড়ি তৈরি হচ্ছে না, যেখানে তিনতলা বানানোর অনুমতি আছে সেখানে পাঁচতলা তুলে ফেলা হচ্ছে না। যত কাণ্ড গার্ডেনরিচে।

বহুল প্রচারিত সংবাদমাধ্যম এবং প্রগতিশীল বলে পরিচিত সাংবাদিক, অধ্যাপকরাও যখন এই বয়ান প্রচার করেন আর বিজেপিবিরোধী রাজনৈতিক দলের মুখপাত্ররাও চুপচাপ বসে শোনেন, সজোরে প্রতিবাদ করেন না – তখন বোঝা যায় পশ্চিমবঙ্গে হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির শিকড় গভীরে চারিয়ে গেছে। ২০২১ বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপি শেষমেশ একশো আসনও পেল না দেখে যাঁরা উদ্বাহু নৃত্য করেছিলেন ধর্মনিরপেক্ষতা জিতে গেল বলে, তাঁরা দিবাস্বপ্নে মগ্ন ছিলেন। আসন্ন ভোটের ফল যা-ই হোক, পশ্চিমবঙ্গের এটাই বাস্তবতা। তাই বোধহয় তৃণমূলের শীর্ষ নেতৃত্বও ভোটের মুখে ববির পক্ষ নিয়ে বেশি কথাবার্তা বলে সংখ্যাগুরু ভোটারদের চক্ষুশূল হতে চাইলেন না। স্বঘোষিত প্রগতিশীলদের শত বুকনি সত্ত্বেও পশ্চিমবঙ্গ তামিলনাড়ু নয়, যেখানে বিজেপির এক নম্বর নেতা কে আন্নামালাইকেও বলতে হয় – আমাদের এখানকার ভোটে ইস্যু উন্নয়ন আর দুর্নীতি। হিন্দুত্ব নয়।

নাগরিক ডট নেটে প্রকাশিত

নজরুলকে নিয়ে রহমানাতঙ্ক: বাঙালি সংস্কৃতি কারে কয়?

বাঙালির সংস্কৃতির পিণ্ডি যে বাঙালিই সবচেয়ে বেশি চটকাচ্ছে সেটা খেয়াল করুন, তার প্রতিকারের ব্যবস্থা করুন। নইলে অন্যদের আক্রমণ আটকাবেন কী করে? ভেবে দেখুন তো, পাড়ায় পাড়ায় মে-জুন মাসে রবীন্দ্র-নজরুল সন্ধ্যা (কোথাও কোথাও জুড়ে যেতেন সুকান্তও) বন্ধ হয়ে গেছে কতদিন হল?

নজরুল
ছবি পিনটারেস্ট থেকে

ক্যালেন্ডার বলছে ফেব্রুয়ারি মাস আসতে এখনো ঢের দেরি, বৈশাখ মাস তো আরও দূরে। এবার বাঙালি ভাবাবেগ (আজকাল বাঙালিরা হিন্দিভাষী নেতাদের বক্তৃতা শুনে শুনে যেটাকে ‘অস্মিতা’ বলে আর কি) মরসুম অনেক আগেই শুরু হয়ে গেছে। কোনো সন্দেহ নেই যে প্রায় এক দশক ধরে সঙ্ঘ পরিবারের হিন্দি-হিন্দু-হিন্দুস্তান প্রকল্পের প্রকাশ্য ও গোপন আক্রমণ বাঙালি জাতির উপর চলছে। ফলে সাংস্কৃতিকভাবে আক্রান্ত জাতির মধ্যে যেসব প্রতিক্রিয়া দেখা যায়, পশ্চিমবঙ্গের বাঙালির মধ্যেও সেসব দেখা যাচ্ছে। কিন্তু হিন্দি আগ্রাসনের বিরুদ্ধে লড়াই করার উৎসাহ হাতে গোনা কয়েকজন ছাড়া বিশেষ কারোর মধ্যে দেখা যায় না। না, একটু ভুল হল। সোশাল মিডিয়া খুললে মনে হয় সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালিই লড়ার জন্যে কোমর বেঁধে তৈরি। কিন্তু লড়তে গেলে ঠিক কী যে করতে হবে তার কোনো নীল নকশা কারোর কাছে নেই। যারা কিঞ্চিৎ সংগঠিত তারা ঠিক করেছে হিন্দিভাষী মানুষকে ধমকানো চমকানোই একমাত্র রাস্তা। তার বাইরে যে কয়েকজনের মাথায় দু-একটা পরিকল্পনা আছে, তাদের সঙ্গ দিতে গেলে নিজের জীবনচর্যায় বেশকিছু পরিবর্তন আনতে হবে, বেশকিছু ছোট-বড় সিদ্ধান্ত নিতে হবে। অধিকাংশ বাঙালি সেসব করতে তৈরি নয়। না করার একগুচ্ছ অজুহাতও পকেটে বা হাতব্যাগে সবসময় থাকে। বলামাত্রই বার করে ফেলে। এদিকে সোজাসুজি “পারব না বাপু বাঙালিয়ানা করতে। অনেক কাজ আছে” বলে হাত ঝেড়ে ফেলার ক্ষমতাও নেই। কারণ কতকগুলো বিগ্রহ বাড়িতে এবং/অথবা জীবনে প্রতিষ্ঠা করে গেছেন গুরুজনেরা। যেমন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, রামমোহন রায়, কাজী নজরুল ইসলাম, সত্যজিৎ রায়, মৃণাল সেন, ঋত্বিক ঘটক ইত্যাদি। বিগ্রহগুলোর নিয়মিত পুজো করতে হয়, নইলে মনে পাপবোধ তৈরি হয়। কিন্তু বিগ্রহের তো চর্চা বলে কিছু হয় না। ফলে যে সংস্কৃতি বিগ্রহনির্ভর তার চর্চা বলে কিছু থাকা সম্ভব নয়, আর যে সংস্কৃতির চর্চা নেই তাকে শেষ করতে বেশি শক্তির প্রয়োজন হয় না। তাই হিন্দি সাম্রাজ্যবাদও প্রায় ফাঁকা মাঠে জিতে যাচ্ছে। বাঙালি কী করছে? অবাঙালিদের বিরুদ্ধে বিষোদ্গার করছে। যদি বাঙালি সংস্কৃতি মানে রবীন্দ্র-নজরুল সংস্কৃতি হয়, তাহলে এই প্রবণতা সেই সংস্কৃতির ঠিক উলটো পিঠ।

হ্যাঁ, আল্লারাখা রহমান সুরারোপিত ‘কারার ওই লৌহকপাট’ গানের সূত্রেই এত কথা বলছি। প্রথম চোটে গোটা ১৫ সেকেন্ড শুনে বন্ধ করে দিয়েছিলাম ভাল লাগছিল না বলে। কিন্তু ওই গান এবং তা নিয়ে বাঙালির প্রতিক্রিয়া সংবাদ হয়ে উঠেছে আর কোনো ওয়েবসাইট যা সংবাদ তাকে এড়িয়ে যেতে পারে না। ফলে লিখতে হবে, তাই শুনতে হল। অন্য অনেকের মত আমার কানেও মোটেই সুবিধের লাগল না। রহমান মহান শিল্পী, কিন্তু তাঁর সুরারোপিত কিছু হিন্দি গান আছে যেগুলো শুনলে মনে হয় তিনি কথাগুলোকে ঠিক সামলে উঠতে পারেননি, তাই কিছু অর্থহীন ধ্বনি ঢুকিয়ে দিয়ে ছেঁড়া মশারিতে তালি মেরেছেন (স্বদেশ ছবির ‘ইয়ে যো দেস হ্যায় তেরা’, লগান ছবির ‘কোঈ হম সে জিত ন পাওয়ে’ স্মর্তব্য)। এই গান শুনেও তেমনটাই মনে হল। আরও বড় গোলমাল হল, কথা যাচ্ছে লন্ডন আর সুর যাচ্ছে টোকিও। নজরুলের গানের কথায় বিদ্রোহে উৎসাহ দেওয়া হয়েছে। ফলে প্রবল উদ্যম এবং গনগনে রাগ আছে।

কিন্তু রহমানের সুর শুনলে মনে হচ্ছে এ গান ‘ধিতাং ধিতাং বোলে’ জাতীয় আনন্দের গান। সবাই মিলে বেশ নেচেকুঁদে নেওয়া যায় এই গান শুনতে শুনতে। যাঁরা গেয়েছেন তাঁদের হাসি হাসি মুখগুলোও যেন চোখের সামনে ভেসে উঠল। ফলে জ্ঞানত এই সুরারোপকে ব্যর্থ বলা ছাড়া উপায় নেই। সুরকার এবং তাঁর গায়েনরা গানের কথাগুলো বুঝে উঠতে পারেননি বলে সন্দেহ হয়।

গান ভাল না লাগলে নিন্দা করার অধিকার মানুষের জন্মগত, ভাল লাগলে প্রশংসা করার অধিকারের মতই। সুতরাং যখন কোনো শিল্পী নিজের কাজ জনসমক্ষে নিয়ে আসেন তখন তাঁকে বিরূপ প্রতিক্রিয়ার জন্যে তৈরি থাকতে হয়। নইলে অবস্থা হয় বিবেক অগ্নিহোত্রীর মত। ছবি ফ্লপ হলে বলতে হয়, গীতার চেয়ে তো প্লেবয় বেশি বিক্রি হয়। তা বলে কি গীতাকে ফ্লপ বলব? কিন্তু অমুক গান আমার ভাল লাগেনি বলা এক জিনিস, আর অমুক গান তৈরি করাই অনুচিত হয়েছে, নজরুলকে অপমান করা হয়েছে, বাঙালি জাতিকে অপমান করা হয়েছে, অবাঙালি বলেই এমন করতে পারল, বাঙালিরা কিছু বলে না বলে… ইত্যাদি চেঁচামেচি করা আরেক জিনিস। এই কোলাহল কিছুদূর পর্যন্ত স্রেফ হাস্যকর, তারপর ক্ষতিকর। ইতিমধ্যেই এত বেশি ধুলো ওড়ানো হয়েছে যে পিপ্পা ছবির নির্মাতারা বিবৃতি দিয়ে দুঃখপ্রকাশ করেছেন। সেই বিবৃতিতে অবশ্য একটি মোক্ষম কথা বলা হয়েছে “আমাদের উদ্দেশ্য ছিল আমাদের চুক্তির শর্তাবলী অনুযায়ী গানটির সাংস্কৃতিক তাৎপর্যকে শ্রদ্ধা জানানো, যে চুক্তি আমাদের গানের কথাগুলিকে নতুন নির্মাণে ব্যবহার করার অধিকার দিয়েছিল” (Our intent was to pay homage to the cultural significance of the song while adhering to the terms set forth in our agreement, which permitted us to use the lyrics with a new composition)।

বিবৃতিতে প্রকাশ, চুক্তি স্বাক্ষর করেছিলেন নজরুলের পুত্রবধূ প্রয়াত কল্যাণী কাজী এবং পৌত্র অনির্বাণ কাজী। এখন বাঙালির আবেগের বিস্ফোরণ দেখে অনির্বাণ এবং তাঁর ভাইবোনেরা আমতা আমতা করছেন। জল্পনা চলছে ‘পরিবারেরই ভুলে কি বিকৃতি নজরুল-গীতে?’ কবির পরিবারের সদস্যরা আপ্রাণ চেষ্টা করছেন এই দায় ঝেড়ে ফেলতে। গোটা দুনিয়ার বাঙালির চোখে তাঁরা এখন অভিযুক্ত। অপরাধ কী? না নজরুলের রচিত একটি গানকে অন্য সুরে গাওয়ার অনুমতি দিয়ে ফেলেছেন। এখন নজরুলের নাতনি খিলখিল কাজীকেও বলতে হচ্ছে “যা হয়েছে তা শুধু নজরুল ইসলামকে নয়, বাংলা সংস্কৃতি, বাঙালি জাতিকে অপমান!”

কী হয়েছে? না নজরুলের একটি একদা জনপ্রিয় গানকে অন্যরকম সুরে গাওয়া হয়েছে এবং সে সুর বাঙালির পছন্দ হয়নি। এতদ্বারা বাঙালি দুনিয়াসুদ্ধ লোককে জানিয়ে দিল, নজরুলের গান বেদ, কোরান, বাইবেল বা আবেস্তার মত একটি অপরিবর্তনীয় বস্তু। এদিক ওদিক করলে মহাপাতক হয়। এ স্রেফ শিল্প নয়, যে তুমি পুনর্নির্মাণ করবে। চুক্তি-টুক্তিতে চিঁড়ে ভিজবে না। কপিরাইট আইনকে মারো গুলি। আমাদের বিগ্রহের লেখা গান আমাদের সবার সম্পত্তি। দেশের আইন যা-ই বলুক। আবেগের কাছে আইন, শিল্পের ইতিহাস – এসবের আবার কোনো দাম আছে নাকি? ঠিক যেমন ইতিহাসে রামের অস্তিত্ব থাক আর না-ই থাক, আমাদের আবেগ যখন বলছে ওখানে রাম জন্মেছিলেন, তখন মন্দির ওয়হি বনায়েঙ্গে।

নজরুলের প্রতি অন্যায় করা হল বলে যারা চোখের জল ধরে রাখতে পারছে না, তারা খেয়ালও করছে না, একজন শিল্পীর প্রতি সবচেয়ে বড় অন্যায় হল তাঁর কপিরাইটকে সম্মান না করা। স্লোগান সকলের সম্পত্তি, গান অবশ্যই শিল্পীর একার। কারণ তিনি একাই তা সৃষ্টি করেন। ‘কারার ওই লৌহকপাট’-এর মত মহান সৃষ্টির পিছনে যে পরিশ্রম এবং যন্ত্রণা থাকে তার তুলনা একমাত্র প্রসববেদনা। ও জিনিসের ভাগ হয় না। শিশুকে যে যতই আদর করুক, সে একমাত্র তার মায়ের সন্তান। মায়ের মৃত্যুর পরেও। একজন শিল্পী অন্য এক শিল্পীর কাজকে স্বীকৃতি দিয়ে তা নিয়ে নতুন পরীক্ষা নিরীক্ষা চালাতেই পারেন। সফল হলে প্রশংসা করা আর বিফল হলে নিন্দা করার বেশি অধিকার শ্রোতা, দর্শক বা পাঠকের নেই। যা করা হয়েছে তা শিল্প হিসাবে ভাল-খারাপ ছাড়িয়ে ক্ষতিকর মনে হলে অন্যকে সে কথা বলতে পারেন, পয়সা দিয়ে ও জিনিসের পৃষ্ঠপোষকতা করা থেকে নিরস্ত করার চেষ্টা করতে পারেন। ব্যাস।

এরপরেও একটা কথা আছে। সারা পৃথিবীতে প্রতিবাদী শিল্পের যে ধারা (protest art), তাতে অনেক সময় কোনো গানের রচয়িতা খুঁজে পাওয়াই দুষ্কর হয়ে পড়ে, অর্থাৎ আক্ষরিক অর্থেই সেই গানটা সকলের হয়ে যায়। সে গানের অসংখ্য সংস্করণ তৈরি হয়ে যায়। নজরুলের গানের যে পবিত্রতা নষ্ট হয়েছে বলে হাত-পা ছোড়া হচ্ছে, সেই পবিত্রতা তখন চুলোয় যায়। সেখানেই গানটার সাফল্য। এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ ‘উই শ্যাল ওভারকাম’ আর ‘বেলা চাও’। পৃথিবীর বিভিন্ন ভাষায় এই গানদুটোর নানা রূপ। সাধারণত দেখা যায় সুর এক আছে, কথা পালটে গেছে। কেবল বাংলা ভাষাতেই ‘উই শ্যাল ওভারকাম’ গানের অন্তত দুটো রূপ (‘আমরা করব জয়’, ‘একদিন সূর্যের ভোর’) পাওয়া যায়। এ যদি অন্যায় না হয়, তাহলে সুর বদল হলে মহাভারত অশুদ্ধ হবে কেন? নাকি রাগের কারণ আসলে একটা আশঙ্কা, যে নজরুলের উপর আমাদের মৌরসি পাট্টা নষ্ট হয়ে যাবে। তিনি আর কেবল বাঙালির থাকবেন না?

তার মানে! যে যেমন ইচ্ছা আমাদের সংস্কৃতির পিণ্ডি চটকাবে আর বাঙালি চুপচাপ বসে দেখবে?

তা কেন? বাঙালির সংস্কৃতির পিণ্ডি যে বাঙালিই সবচেয়ে বেশি চটকাচ্ছে সেটা খেয়াল করুন, তার প্রতিকারের ব্যবস্থা করুন। নইলে অন্যদের আক্রমণ আটকাবেন কী করে? ভেবে দেখুন তো, পাড়ায় পাড়ায় মে-জুন মাসে রবীন্দ্র-নজরুল সন্ধ্যা (কোথাও কোথাও জুড়ে যেতেন সুকান্তও) বন্ধ হয়ে গেছে কতদিন হল? ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা নজরুলের ‘ঝিঙে ফুল’ কবিতাটা জানে? বাবুদের তালপুকুরে হাবুদের ডালকুকুরে কী কেলেঙ্কারি ঘটিয়েছিল সে খবর আজকালকার কনভেন্ট শিক্ষিত, সেকেন্ড ল্যাঙ্গুয়েজ হিসাবে হিন্দি পড়া ছেলেমেয়েদের জানানোর জন্যে কী উদ্যোগ নিচ্ছে নজরুলপ্রেমী বাঙালি সমাজ? গোঁফের রেখা ওঠা ছেলেরা আর মেয়ে থেকে মহিলা হয়ে ওঠার পথে পা বাড়ানো মেয়েরা এখনো ‘বিদ্রোহী’ বা ‘আমার কৈফিয়ৎ’ পড়ছে? মেগা সিরিয়াল থেকে শুরু করে রাস্তার সিগনাল – সর্বত্র রবীন্দ্রসঙ্গীত তো বাজছে, নজরুলগীতি গাওয়া হয় কটা জায়গায়?

মেগা সিরিয়াল বলতে খেয়াল হল – কেবল আবহসঙ্গীতে নয়, মেগায় যে পরিস্থিতির সঙ্গে লাগসই আস্ত হিন্দি ছবির গান বাজানো হয় তাতে হিন্দি আগ্রাসন দেখতে পান না? কোনো প্রতিবাদ হয়? মহিলা পুরুত দিয়ে করানো প্রগতিশীল বাঙালির বিয়েতে বর-কনের শেরওয়ানি আর ঘাগরা কি বাঙালি সংস্কৃতির পিণ্ডি চটকায় না? কোন এ আর রহমান এসে বাঙালি মেয়েদের মাথায় বন্দুকে ঠেকিয়ে বিয়ের আগে মেহেন্দি অনুষ্ঠান বাধ্যতামূলক করে তুলেছেন? ধনতেরাস উপলক্ষে ঝাঁটা না কিনলে মানসম্মান থাকছে না বাঙালি সংস্কৃতির কোন ধারা অনুযায়ী?

এসব প্রশ্নের উত্তর না খুঁজে সোশাল মিডিয়ায় রে রে করে কোনো শিল্পীর দিকে তেড়ে যাওয়া অনেক সহজ। তাতে অ্যাড্রিনালিন ক্ষরণ, নিজের সংস্কৃতি বাঁচাতে লড়াই করার আনন্দ পাওয়া যায়। রবীন্দ্রনাথ বা নজরুলের ক্ষেত্রে আবার উপরি পাওনা বিগ্রহের মান বাঁচাতে লড়াই করার আনন্দ। ধর্মান্ধরা কোনোদিনই বোঝে না যে তাদের দেবতা তাদের চেয়ে অনেক বড়। তিনি নিজেকে নিজেই বাঁচাতে পারেন, চুনোপুঁটি ভক্তদের মুখাপেক্ষী নন। সাংস্কৃতিক বিগ্রহের পূজারী বাঙালিও বোঝে না, রবীন্দ্রনাথ বা নজরুল এত সামান্য শিল্পী নন যে তাঁদের বাঁচাতে হবে। ১৯৯১ সালে যখন আইন মোতাবেক রবীন্দ্রনাথের কপিরাইট উঠে যাওয়ার কথা ছিল, তখন কেবল বিশ্বভারতী নয়, প্রায় সমস্ত শিক্ষিত (ডিগ্রিধারী অর্থে) বাঙালি গেল গেল রব তুলেছিল। কপিরাইট উঠে গেলেই নাকি সর্বনাশ হয়ে যাবে। রবীন্দ্রনাথের গানের সাড়ে বারোটা বাজিয়ে দেবে লোকে, লেখাগুলোর কী যেন একটা ভয়ঙ্কর ক্ষতি হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা ছিল। সেবার এত দাপাদাপি শুরু হল যে ভারতের সংসদ দেশের আইন পরিবর্তন করে ফেলল। কপিরাইটের মেয়াদ ছিল স্রষ্টার মৃত্যুর ৫০ বছর পর পর্যন্ত। তা বাড়িয়ে করা হল ৬০ বছর পর পর্যন্ত। শেষমেশ ২০০১ সালে রবীন্দ্রনাথের লেখাপত্র কপিরাইটের আওতার বাইরে এসেছে। গত ২২ বছরে বিশ্বভারতী ছাড়া রবীন্দ্রনাথের আর কোন সৃষ্টি তিনি যেমন ছেড়ে গিয়েছিলেন তার চেয়ে নিকৃষ্ট মানের হয়ে গেছে? একথা ঠিক, আজকাল একেকজন এত বাজনা সহযোগে রবীন্দ্রসঙ্গীত গেয়ে থাকেন যে গান ছাড়া আর সবকিছু শোনা যায়। কেউ আবার কালোয়াতি করে বোঝাতে চান শাস্ত্রীয় সঙ্গীতে তিনি একজন ওস্তাদ। কেউ বা বাহাদুরি করে মাঝখান থেকে গান শুরু করেন। কিন্তু তাতে কী? যার যেমন রুচি সে তেমনই শোনে। যার যেটা ভাল লাগে না, সে সেটা শোনে না। এসবে গীতিকার রবীন্দ্রনাথের কী ক্ষতি হয়েছে?

প্রগতিশীল বাঙালিরা নিজস্ব দেবতাকুল বানিয়ে নিয়েছেন, তাতে নতুন নতুন বিগ্রহও যোগ করে যাচ্ছেন। গত বিশ বছরে যোগ হওয়া এক বিগ্রহের নাম ঋতুপর্ণ ঘোষ। তিনি কিন্তু রবীন্দ্রনাথের জন্মশতবর্ষ উপলক্ষে একটা পরীক্ষামূলক কাজ শুরু করেছিলেন টিভির জন্যে (প্রযোজকদের সঙ্গে গোলমালে নাকি সে কাজে শেষ পর্যন্ত থাকেননি)। শাশুড়ি-বউমার কোন্দল আর এক পুরুষের দুই নারী ছকের বাইরে সে ছিল এক ব্যতিক্রমী মেগা সিরিয়াল – গানের ওপারে। রবীন্দ্রনাথকে যারা বিগ্রহ বানিয়ে রাখে তাদের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের আধুনিকীকরণের দ্বন্দ্ব ছিল সেই সিরিয়ালের মূল উপজীব্য। সেখানে বেশকিছু রবীন্দ্রসঙ্গীত এমনভাবে গাওয়া হয়েছিল যা অভ্যস্ত কানে মোটেই সইবে না।

তাতে রবীন্দ্রসঙ্গীত হয়ত সমৃদ্ধ হয়নি, কিন্তু দরিদ্রতর হয়ে গিয়েছিল এমন প্রমাণ পাওয়া যায়নি। ঋতুপর্ণকেও আজ আর সে কাজের জন্যে কেউ রহমানের মত আক্রমণ করে না। তখন যারা করেছিল তারাও ক্ষমা করে দিয়েছে। সে কি তিনি বাঙালি বলে, নাকি তিনি নিজেই বিগ্রহে পরিণত হয়েছেন বলে?

আরও পড়ুন সলিল চৌধুরী স্মরণে একটি মনোমুগ্ধকর সন্ধ্যা

মজা হল, বাঙালির এই শতকের বিগ্রহরা কেউ বাংলার সঙ্গে হিন্দি, ইংরিজির মিশেল ছাড়া চলতে পারেন না। সৌরভ গাঙ্গুলির মুখের ভাষা শুনলেই টের পাওয়া যায়। বাংলা ভাষার সাংবাদিকতায় বিগ্রহ হতে চলা গৌতম ভট্টাচার্যের একটি বই প্রকাশিত হয়েছে সম্প্রতি। তার নাম আবার বিশ্বকাপ তুঝে সেলাম। এসবে তাঁদের কারোর জনপ্রিয়তায় ভাঁটা পড়ছে না, কেউ বাংলার সংস্কৃতির সর্বনাশ হয়ে যাচ্ছে বলেও অভিযোগ করছে না। যত দোষ এ আর রহমানের। যেহেতু তিনি বাঙালি নন, যেহেতু আক্রমণকারী বনাম আক্রান্তের বয়ান খাড়া করার পক্ষে ব্যাপারটা সুবিধাজনক।

ব্যর্থ শিল্পপ্রচেষ্টাকে ব্যর্থ বলে বুঝে নিয়ে অন্য জিনিসে মন দেওয়ার নির্লিপ্তি না থাকলে, শিল্পে পরীক্ষা নিরীক্ষা সম্পর্কে অনমনীয় হলে যা হয়, পশ্চিমবঙ্গে ঠিক তাই হচ্ছে। গড়ে উঠেছে পুনরাবৃত্তির সংস্কৃতি। সাহিত্য ভূতে, গোঁজামিল ইতিহাসে আর রহস্য রোমাঞ্চে ছয়লাপ। কারণ ‘ওটা পাবলিক খায়’। সিনেমার বড় অংশ জনপ্রিয় গোয়েন্দা গল্পের চলচ্চিত্রায়ন। তাও আবার একই গল্পকে একবার, দুবার, তিনবার পর্দায় আনা হচ্ছে। আরেকটা অংশ? এই শতকের প্রথম দিকে চলছিল দক্ষিণ ভারতীয় ছবির পুনরাবৃত্তি, তারপর থেকে চলছে পুরনো জনপ্রিয় বাংলা ছবির পুনরাবৃত্তি। পুনর্নির্মাণ বলা যাবে না। কারণ এসব ছবি মূল বয়ানে নতুন কিছু যোগ করে না, কোনো নতুন ব্যাখ্যা দেয় না।

এরই পিছু পিছু এসে পড়েছে জেরক্স সংস্কৃতি।

‘অপরাজিত ছবিটা দারুণ হয়েছে।’

কেন? না সত্যজিৎ রায়ের চরিত্রে যে অভিনয় করেছে তাকে দেখতে অবিকল সত্যজিতের মত। পথের পাঁচালীর দৃশ্যগুলো একেবারে পথের পাঁচালীর মত। এদিকে পরিচালক অনীক দত্ত সাহস করে চরিত্রের নামটাই সত্যজিৎ রাখতে পারেননি, সে চরিত্রের তৈরি পুরস্কৃত ছবির নামও করে দিয়েছেন পথের পদাবলী।

‘মৃণাল সেনের বায়োপিকটা দারুণ হবে।’

কেন? না টিজারে দেখা গেছে মৃণালের চরিত্রাভিনেতাকে অবিকল তাঁর মত দেখাচ্ছে।

নির্দেশকরা কেনই বা এই ছকের বাইরে যেতে যাবেন? ছক ভাঙতে গিয়ে রহমানাতঙ্কের মত কিছুর কবলে পড়ার ঝুঁকি কে নেবে বাপু?

বাঙালি সংস্কৃতিকে এই বিষচক্র থেকে এবং হিন্দি, ইংরেজি ইত্যাদি আগ্রাসন থেকে বাঁচাতে পারে একমাত্র বাঙালি। কিন্তু তা করতে হলে রহমানাতঙ্ক কাটিয়ে উঠে বাঙালি সংস্কৃতি জিনিসটা ঠিক কী সে প্রশ্ন তুলতে হবে। পশ্চিমবঙ্গ বিজেপির একদা সভাপতি তথাগত রায়, সোশাল মিডিয়ায় হিন্দি আগ্রাসনবিরোধী বাঙালির বাপ বাপান্ত করাই ইদানীং যাঁর জীবনের ব্রত, প্রায়ই মন্তব্য করেন যে বাঙালির সর্বনাশ করেছে ‘রসুন’ সংস্কৃতি। অর্থাৎ রবীন্দ্র-সুকান্ত-নজরুল। তৃতীয়জনকে নিয়ে তথাগতবাবুর আপত্তির কারণ অতি সহজবোধ্য আর বাঙালি সংস্কৃতির ধারক ও বাহক হিসাবে সুকান্ত ভট্টাচার্যের স্থান আদৌ রবীন্দ্রনাথ, নজরুলের পাশে নয়। তাই ও নিয়ে আলোচনা করা সময় নষ্ট। কিন্তু বাকি দুজন যে বাঙালি সংস্কৃতির অনেকখানি তা নিয়ে বিতর্কের অবকাশ নেই। আরএসএসের দীক্ষায় দীক্ষিত তথাগতবাবুর ওই দুজনকে প্রবল অপছন্দ প্রমাণ করে তাঁরা স্রেফ শৈল্পিক উৎকর্ষে নয়, সামাজিক-রাজনৈতিক ভাবনায় এবং কার্যকলাপেও যথার্থ মানবতাবাদী, অতএব প্রয়োজনীয়। কথা হল, ওঁদের নিয়ে আমাদের যে উথাল পাথাল আবেগ প্রকাশ পায় ক্ষণে ক্ষণে, তা কি খাঁটি? যদি খাঁটি হয়, তাহলে সন্তোষ মিত্র স্কোয়্যারে লাইন দিয়ে অযোধ্যার রামমন্দিরের আদলে তৈরি প্যান্ডেল দেখতে গিয়েছিল কারা? যারা নজরুলের অপমান নিয়ে বেজায় উত্তেজিত তাদেরই ভাই বেরাদররা তো। রহমানের বিরুদ্ধে বিবৃতি, ফেসবুক পোস্ট, আইনি ব্যবস্থার হুমকি কত কী দেওয়া হচ্ছে এখন। বিখ্যাতরাও দিচ্ছেন। তখন এত প্রতিবাদ ছিল কোথায়? নাকি রবীন্দ্রনাথ আর নজরুলের গান, কবিতাই কেবল বাঙালি সংস্কৃতির অঙ্গ; তাঁদের সামাজিক, রাজনৈতিক ভাবনা নয়, জীবনচর্যাও নয়?

নাগরিক ডট নেটে প্রকাশিত