পাখির চোখ বাংলাদেশের হিন্দুর নিরাপত্তা, না পশ্চিমবঙ্গের হিন্দুর ভোট?

তথাগত রায়, তরুণজ্যোতি তিওয়ারি প্রমুখের সোশাল মিডিয়া হ্যান্ডেলে যেসব কথোপকথন চলে সেগুলোতে চোখ রাখুন। তাঁরা কিন্তু সজলবাবুর মতো আবেগপ্রবণ হয়ে বাংলাদেশ আক্রমণ করার কথা-টথা বলেন না। বরং বিপন্ন হিন্দুদের এ-দেশে জায়গা দেওয়ার কথা উঠলেই তাঁরা এবং তাঁদের সাঙ্গপাঙ্গরা বলতে শুরু করেন— ভারতবর্ষ ধর্মশালা নয়।

একটা দেশের সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সরকারের দায়িত্ব।

এই কথাটা বলামাত্র সেই ২০১২-১৩ সাল থেকে যেসব আত্মীয়-বন্ধু-সহপাঠী-সহকর্মী রেগে-আগুন তেলেবেগুন হয়েছেন, সম্পর্ক তুলে দিয়েছেন (বা আমিই তুলে দিয়ে বেঁচেছি), হঠাৎ সেদিন আবিষ্কার করলাম তাঁরা সকলে ঠিক ওই কথাটাই বলছেন। দেখে অ্যাইসা ফুর্তি হল যে লতা মঙ্গেশকরের মতো মিহি গলায় শতবর্ষে পা দেওয়া সলিল চৌধুরী রচিত ও সুরারোপিত ‘হঠাৎ ভীষণ ভাল লাগছে’ গানটা গাইতে শুরু করলাম। কিন্তু কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে নিজের কানই জানিয়ে দিল যে আমার গলার সঙ্গে লতার গলার তফাত বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে মহাত্মা গান্ধির মতো। ফলে চুপ করে গেলাম। ফুর্তিটাকেও কান ধরে টেনে নামিয়ে আনন্দের বেঞ্চে বসিয়ে দিলাম। একটু আনন্দ তো করাই উচিত। কারণ কবি বলেছেন— কেবল রাত্রির অবসান হলে প্রভাত হয় না। চিত্ত জাগলেও প্রভাত হয়। তা চারপাশে এত মানুষের চিত্ত জেগেছে মানে প্রভাত হয়েছে, অচিরেই প্রভাতফেরি বেরোবে, তার আওয়াজের ঠ্যালাতেই বাকি অন্ধকার দূরীভূত হবে— এরকম ভাবছিলাম আর কি। কিন্তু সে আনন্দও দিন দুয়েকের বেশি টেকানো গেল না। কেন? সে-কথাই বলব।

গোঁফ গজানোর বয়সে আমরা মাধুরী দীক্ষিত বলতে পাগল ছিলাম। যেহেতু বলিউডের হাত অনেক লম্বা, সেহেতু কেবল ভারতে নয়, গোটা উপমহাদেশেই তখন মাধুরী অধরা বলে নানা বয়সের পুরুষদের হৃদয় দাউদাউ করে জ্বলে। এতটাই, যে কাগজে পড়েছিলাম, পাকিস্তানিরা নাকি সকৌতুকে বলত ‘তোমরা মাধুরী আর শচীন তেন্ডুলকরকে দিয়ে দাও, আমরা কাশ্মিরের দাবি ছেড়ে দেব।’ তা সেই মাধুরী নেপালে এক অনুষ্ঠানে গিয়ে একখানা কেলেঙ্কারি করে বসেছিলেন। আদর-আপ্যায়নে আহ্লাদিত হয়ে বলে বসেছিলেন— নেপাল তো ভারতেই ছিল… ইত্যাদি। সে অবশ্য ১৯৯৮-৯৯ সালের কথা। তখন ভারত সরকারের সঙ্গে নেপাল সরকারের সম্পর্ক মন্দ ছিল না, ফলে নায়িকা ক্ষমা-টমা চাওয়াতেই ব্যাপারটা মিটে গিয়েছিল। মুশকিল হল, বাংলাদেশের ব্যাপারে পশ্চিমবঙ্গীয় বাঙালিরা অনেকে এখনও মাধুরী হয়ে আছেন। ১৯৪৭ সালে দেশভাগ তথা বাংলা ভাগ হয়েছে। পরে ১৯৭১ সালে পূর্ব পাকিস্তান মুক্তিযুদ্ধের মধ্যে দিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশ হয়ে গেছে। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের অনেকেই এখনও ওটাকে আলাদা দেশ বলে মেনে নিতে পারেন না। আরও সমস্যার কথা হল, যেহেতু বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পাশে দাঁড়িয়ে ভারত পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছিল, তাই আমাদের অনেকেরই ধারণা— বাংলাদেশের যে-কোনও ব্যাপারে ভারতের ছড়ি ঘোরানোর অধিকার আছে। দুটো দেশের সরকার এবং মানুষের মধ্যে আন্তর্জাতিক রীতিনীতি অনুসারে যেমন সম্পর্ক কাঙ্ক্ষিত, তার বদলে বাংলাদেশের সঙ্গে বড়দাসুলভ ব্যবহার করা উচিত— এমনটাই মনে করেন আমাদের ভাই-বেরাদররা অনেকে। ফলে যে যে-দলেরই সমর্থক হোন, বাংলাদেশে কোনও গোলমাল শুরু হলেই একযোগে আশ্চর্য সব দাবি করতে শুরু করেন এঁরা। যেমন এই মুহূর্তে কলকাতা কর্পোরেশনের বিজেপি কাউন্সিলর সজল ঘোষের মতো অনেক সিপিএম সমর্থককেও ভারতীয় সেনাবাহিনিকে দিয়ে বাংলাদেশ আক্রমণের দাবি তুলতে দেখা যাচ্ছে।

এমনিতে সজলবাবুকে যত গুরুত্ব পশ্চিমবঙ্গের সংবাদমাধ্যম দেয় তত গুরুত্ব তাঁর নিজের দলের নেতা অমিত শাহও দেন না। দিলে সজলবাবুর আপ্রাণ চেষ্টা সত্ত্বেও কলকাতায় এসে আরজিকর-কাণ্ডে মৃতার বাবা-মায়ের সঙ্গে দেখা না করেই চলে যেতেন না। সুতরাং সজলবাবুর ওই চ্যানেল গরম করা মন্তব্যে যে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শাহ, বিদেশমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর, প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং বা প্রধানমন্ত্রী মোদি কানই দেবেন না তা বলাই বাহুল্য। কিন্তু দলমতনির্বিশেষে বাঙালিরা যে এই দাবিকে ন্যায্য বলে মনে করছেন— তা যথেষ্ট উদ্বেগজনক। একে তো অন্য একটা দেশ সম্পর্কে এত প্রবল অধিকারবোধ মনের মধ্যে পুষে রেখেছে কয়েক লক্ষ লোক— এই ব্যাপারটাই ভয়ঙ্কর। তার উপর দেখা যাচ্ছে বাম দলগুলোর সমর্থকরাও দাবি করছেন— এখানকার বামপন্থীদের বাংলাদেশের হিন্দুদের জন্যে পথে নামতে হবে, তৃণমূল সমর্থকরা দাবি করছেন তাঁদের দলকেও পথে নামতে হবে। অবশ্য বামেরা যেহেতু ক্ষমতায় নেই, সেহেতু তাঁরা যেমন প্যালেস্তাইনের মানুষের উপর ইজরায়েলি গণহত্যার বিরুদ্ধে মিছিল করেন তেমন বাংলাদেশে হিন্দুদের উপর আক্রমণের বিরুদ্ধেও মিছিল করা যেতে পারে (যদিও এখন পর্যন্ত প্যালেস্তাইনে ইজরায়েল যা চালাচ্ছে তার সঙ্গে বাংলাদেশের পরিস্থিতির পরিমাণগত বা গুণগত কোনও মিল নেই), তবে দুই মিছিলেরই গুরুত্ব প্রতীকী। কিন্তু বাংলাদেশের ঘটনা নিয়ে পশ্চিমবঙ্গের শাসক দলকে পথে নামতে হবে— এ আবার কী আবদার? যে-কোনও দলের সরকারকেই ভারতের সংবিধান মেনে চলতে হয় আর সংবিধান অনুসারে বিদেশনীতি কেন্দ্রীয় সরকারের কাজের তালিকাভুক্ত। নেহাত বাংলাদেশ প্রায় এক শতাব্দী আগে একই প্রদেশ ছিল এবং দুই জায়গার ভাষা অভিন্ন, দুইপারে রক্তের সম্পর্কে জড়িয়ে থাকা বহু পরিবার রয়েছে, তাই পশ্চিমবঙ্গ সরকার সম্পূর্ণ উদাসীন থাকতে পারে না। সেই কারণে মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি একখানা বিবৃতি দিয়েছেন। কিন্তু তিনি পথে নামতে যাবেন কেন? সত্যিই তো এ-ব্যাপারে কেন্দ্রীয় সরকার যা সিদ্ধান্ত নেবে তা মেনে নিতে তিনি বাধ্য। অথচ এই দাবি কেবল আইনকানুনের ধারণাবিহীন সাধারণ মানুষ সোশাল মিডিয়ায় তুলছেন তা নয়। এবিপি আনন্দের মতো জনপ্রিয় চ্যানেলে বসে রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক বিশ্বনাথ চক্রবর্তীও এই কিম্ভূত দাবি তুলে ফেলেছেন।

নিজের এক্তিয়ারের বাইরে গিয়ে কেন এমন কাজ করতে হবে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রীকে? রাজনৈতিক বিশ্লেষক বিশ্বনাথবাবুর দর্শানো কারণটি চিত্তাকর্ষক। এতে নাকি মহম্মদ ইউনুসের সরকারের উপরে চাপ তৈরি হবে এবং বাংলাদেশের ধর্মনিরপেক্ষ মানুষজন বুকে বল পাবেন। বাংলাদেশ যত ছোট রাষ্ট্রই হোক, পশ্চিমবঙ্গের মতো একটা অঙ্গরাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী নিজের রাজ্যে বাংলাদেশের বিষয় নিয়ে মিছিল করেছেন বলে চাপে পড়বে কেন? বিশেষত ভারত সমেত পৃথিবীর কোনও বড় রাষ্ট্রই যখন এই তদারকি সরকারকে স্বীকৃতি না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়নি? আর বাংলাদেশের ধর্মনিরপেক্ষ মানুষজনই বা মমতার মিছিলে আলাদা করে সাহস কেন পাবেন? ইসলামিক মৌলবাদীরা তাঁদের আক্রমণ করলে কি মমতার পুলিশ বা অনুব্রত মণ্ডলের ঢাক তাঁদের বাঁচাতে যাবে? নাকি কেন্দ্রীয় সরকারকে না জানিয়ে, মমতা নিজের সিদ্ধান্তে তাঁদের কাউকে পশ্চিমবঙ্গে আশ্রয় দিতে পারবেন?

কিমাশ্চর্যম অতঃপরম! মমতা এই হাস্যকর দাবি মেনে নিয়ে পথে নামলেন না বটে, আরও এককাঠি সরেস কাজ করলেন। দাবি করে বসলেন যে সম্মিলিত জাতিপুঞ্জকে বাংলাদেশে শান্তিরক্ষা বাহিনি পাঠাতে হবে। তাঁর সঙ্গে প্রায় হুবহু মিলে গেল পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার বিরোধী দলনেতা এবং মমতার একদা-স্নেহভাজন শুভেন্দু অধিকারীর বয়ান ‘রাষ্ট্রপুঞ্জের কাছে আবেদন করছি, বাংলাদেশে হিন্দুদের অস্তিত্ব বাঁচানোর জন্য হস্তক্ষেপ করুক’।

বাংলাদেশে গত কয়েকদিনের নতুন অশান্তিতে ঠিক কত মানুষ নিহত, কটা পরিবার বাস্তুহারা, কোনও নারীনির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে কিনা— এসবের কোনও সুনির্দিষ্ট তথ্য কিন্তু ভারতের সংবাদমাধ্যম আমাদের জানাতে পারেনি। সজলবাবু, বিশ্বনাথবাবু, শুভেন্দুবাবু বা আমাদের মুখ্যমন্ত্রীও জানাননি। অথচ ক্রমাগত এরকম আক্রমণাত্মক মন্তব্য বেড়েই চলেছে। এসবের একটাই ফল— বাংলাদেশ নিয়ে পশ্চিমবঙ্গে উত্তেজনা বৃদ্ধি এবং তার ফলে সাম্প্রদায়িক উন্মাদনা তৈরি হওয়া। যেহেতু বাংলাদেশে শেখ হাসিনার অপসারণের পর থেকেই হিন্দুরা আক্রান্ত হচ্ছেন বলে খবরে প্রকাশ, তাই পশ্চিমবঙ্গের হিন্দু বাঙালি এখন বাংলাদেশ বলতেই মুসলমান ভাবছেন। জুলাই অভ্যুত্থানের সময় থেকেই দেখা যাচ্ছিল, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের মতোই এবারেও যে লড়াইয়ে লিপ্ত শক্তিগুলো সমসত্ত্ব নয় তা মেনে নিতে পশ্চিমবঙ্গের ভদ্রলোকদের ঘোর আপত্তি। ছাত্রনেতাদের মধ্যে হিন্দু নামগুলোর উপস্থিতিকে তাঁরা অগ্রাহ্য করে যাচ্ছেন, তাতে ধুয়ো দিয়ে যাচ্ছে পশ্চিমবঙ্গ তথা ভারতের মূলধারার সংবাদমাধ্যম। যখন বাংলাদেশের রাস্তায় সোজা বুকে গুলি চালিয়ে মানুষ মারছিল হাসিনার পুলিশ, তখনও হাসিনা না থাকলে বাংলাদেশের কী হবে তার আলোচনায় পশ্চিমবঙ্গের সংবাদমাধ্যম ব্যবহার করে যাচ্ছিল— ‘বাংলাদেশ আফগানিস্তান হওয়ার দিকে এগোচ্ছে’, ‘বাংলাদেশে তালিবানি শাসন প্রতিষ্ঠা হতে চলেছে’ ইত্যাদি শব্দবন্ধ।

পৃথিবীর ইতিহাসে বিদ্রোহ, তারপর নৈরাজ্য এবং অত্যাচারী শাসনের অজস্র উদাহরণ আছে। যেমন বলা যেতেই পারত বাংলাদেশ রোবসপিয়রের গিলোটিনের ফ্রান্স হওয়ার দিকে এগোচ্ছে। তুলনায় সাম্প্রতিক উদাহরণ দিতে চাইলে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যাওয়ার পরে পূর্ব ইউরোপের দেশগুলোর কথা বলা যেত। আরও সাম্প্রতিক উদাহরণ দেওয়ার ইচ্ছে থাকলে গৃহযুদ্ধোত্তর সিরিয়া হওয়ার দিকে এগোচ্ছে বললেও চলত। তেমন কিছু না বলে আফগানিস্তান এবং তালিবানের কথা বলার উদ্দেশ্য পরিষ্কার— মাথায় ফেজ পরা, গালে লম্বা দাড়িওয়ালা মুসলমানের ছবি তুলে ধরে আতঙ্ক ছড়ানো, যার সঙ্গে অপরিহার্যভাবে এসে পড়বে বোরখা পরা মহিলাদের ছবি। হিন্দুত্ববাদীরা মুসলমানের ঠিক যে স্টিরিওটাইপ হিন্দুদের গেলাতে চায়। অথচ তদারকি সরকারের প্রধান মহম্মদ ইউনুস কিন্তু কামানো গালের, মাথায় ফেজ না-পরা পুরুষ। তাঁর সরকারের গুরুত্বপূর্ণ সদস্যদের একজন হলেন সাঈদা রিজওয়ানা হাসান, যিনি ২৯ নভেম্বর সাংবাদিক সম্মেলনে জানিয়েছেন যে গ্রেফতার হওয়া সন্ন্যাসী চিন্ময়কৃষ্ণ দাসের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের তদন্ত হবে, কিন্তু তার জন্যে ইস্কনকে বাংলাদেশে নিষিদ্ধ করার কোনও ভাবনা তদারকি সরকারের নেই। রিজওয়ানা বোরখা পরেন না, এমনকি হিজাবও নয়।

নিয়মিত নির্বাচন হচ্ছে মানেই যে একটা দেশ গণতান্ত্রিক পথে আছে তা নয়— এ-কথা বুঝতে আজকের ভারতীয়দের অন্তত কোনও অসুবিধা হওয়ার কথা নয়। দেশদ্রোহবিরোধী আইনের দোহাই দিয়ে উমর খালিদ, শার্জিল ইমাম-সহ আরও বহু মানুষকে বিনা বিচারে বন্দি করে রাখার কাজ এ-দেশের ভোটে জিতে আসা সরকারই করে চলেছে দশ বছর ধরে। রাস্তায় নেমে প্রতিবাদ করলে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ঘরবাড়ি, দোকানপাট বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়ার কাজও করছে বিভিন্ন রাজ্যের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় নির্বাচিত সরকারগুলোই। কোনও আইনকানুনের তোয়াক্কা না করে, এমনকি সুপ্রিম কোর্টের নিষেধকেও বুড়ো আঙুল দেখিয়ে জঘন্য পলাতক অপরাধীদের মতো করে প্রতিবাদীদের ছবি দেওয়ালে দেওয়ালে সেঁটে দেওয়ার কাজ করছে ভোটে জিতে ক্ষমতায় আসা উত্তরপ্রদেশের আদিত্যনাথ সরকার। গত দশ বছরে কতজন সংখ্যালঘুকে গোমাংস খাওয়ার, বিক্রি করার বা স্রেফ বহন করার ‘অপরাধে’ মেরে ফেলা হয়েছে এবং রাষ্ট্র হত্যাকারীদের শাস্তি দেওয়ার বদলে মদত দিয়েছে, তার তালিকা চিনের প্রাচীরের মতো লম্বা হবে। কদিন হল মুসলমানদের উত্যক্ত করার নতুন কায়দা চালু হয়েছে। যে-কোনও মসজিদের নিচেই মন্দির ছিল কিনা মাটি খুঁড়ে দেখার দাবিতে আদালতে মামলা ঠুকে দিচ্ছে হিন্দুত্ববাদীরা, আর আদালত পত্রপাঠ খোঁড়ার নির্দেশও দিয়ে দিচ্ছে। অথচ দেশে স্পষ্ট আইন আছে— ১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্ট দেশের যেখানে যে ধর্মস্থান ছিল সেগুলোর চরিত্র পরিবর্তন করা যাবে না। সে আইনের তোয়াক্কা করছে না এমনকি নিম্ন আদালতগুলোও। এই বেমক্কা রায়ের জেরে হিংসা ছড়িয়ে উত্তরপ্রদেশের সম্ভলে ইতিমধ্যেই কিছু মানুষের প্রাণ গেছে। এখন এমনকি প্রাচীন আজমের শরীফ নিয়েও তেমন একটা মামলা ঠোকা হয়েছে। এমন রায় দেওয়ার পথ কিন্তু খুলে দিয়ে গেছেন সুপ্রিম কোর্টের প্রাক্তন প্রধান বিচারপতি ডিওয়াই চন্দ্রচূড়, জ্ঞানবাপী মসজিদে মাটি খুঁড়ে সার্ভে করার অনুমতি দিয়ে। কিন্তু এতে কি প্রমাণ হয় যে ভারতের অধিকাংশ মানুষ, এমনকি অধিকাংশ হিন্দু ভারতীয়, সাম্প্রদায়িক? একেবারেই না।

হাসিনার আমলেও বাংলাদেশে হিন্দু হত্যা ঘটেছে। আর সব ভুলে গিয়ে থাকলেও ব্লগার অভিজিৎ রায়ের খুনের কথা আশা করি এপারের হিন্দু বা মুসলমান কোনও বাঙালিই ভোলেননি। সেইসময় হিন্দুদের পুজোআচ্চায় আক্রমণ হয়েছে, সম্পত্তি দখল করে নেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। সুতরাং ভোট হত আর হাসিনা জিততেন মানেই বাংলাদেশ দারুণ গণতান্ত্রিক ছিল— এ-কথা বলার কোনও মানে নেই। আবার সেই আমলে বা এই আমলে বাংলাদেশে হিন্দুদের উপর আক্রমণও প্রমাণ করে না যে অধিকাংশ বাংলাদেশি, এমনকি অধিকাংশ মুসলমান বাংলাদেশি, সাম্প্রদায়িক।

কিন্তু সোশাল মিডিয়া আর ভারতের মিডিয়ার কল্যাণে ঠিক উল্টো ছবিটাই গাঢ় রঙে আঁকা হয়ে গেছে পশ্চিমবঙ্গের সংখ্যাগুরু সম্প্রদায়ের বাঙালির মনে। তাই ‘একটা দেশের সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সরকারের দায়িত্ব’— এই কথাটা তাঁরা আজ যখন বলছেন, তখন বলছেন বাংলাদেশের দিকে মুখ করে। নিজের দেশের দিকে না-তাকিয়ে। তাই আমার আনন্দ টিকল না। দেখলাম বিজেপি সমর্থকরা তো বটেই, সিপিএম সমর্থকরাও গোটা উপমহাদেশে সংখ্যাগুরুবাদের প্রসারের নিন্দা করে পার্টির রাজ্য সম্পাদক মহম্মদ সেলিমের বিবৃতিতে অসন্তুষ্টি প্রকাশ করছেন। বলছেন, এসব চালাকি। বাংলাদেশের ঘটনার নিন্দা করতে গেলেই সঙ্গে এ-দেশের সংখ্যালঘুদের উপর যে আক্রমণ হচ্ছে তার কথা কেন বলতে হবে? গোদা বাংলায় তাঁদের মত হল— বাংলাদেশের সংখ্যালঘু হিন্দুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সে-দেশের সরকারের দায়িত্ব, কিন্তু এ-দেশের সংখ্যালঘু মুসলমানদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এ-দেশের সরকারের দায়িত্ব নয়।

এই তো সেদিন এ-রাজ্যের মহিলারা রাত দখল করলেন, ধর্ষকের মৃত্যুদণ্ডের দাবিতে রাস্তায় নামলেন মহিলা মুখ্যমন্ত্রীও, পরে নতুন আইনও পাশ করালেন বিধানসভায়। আন্দোলনকারীদের অনেকেরই বক্তব্য ছিল আরজিকর-কাণ্ডে দোষী একজন নয়, অনেকে। তাদের সকলের শাস্তি চাই। তা নিয়েও টানা আন্দোলন হল। অথচ আজ চিন্ময়কৃষ্ণের বিরুদ্ধে যে শিশুদের যৌন নিপীড়নের অভিযোগ আছে, সে-অভিযোগে তাঁর উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে তাঁর নিজেরই সংগঠন— তা নিয়ে আলোচনা করতে দেখছি না এমনকি মহিলাদেরও। উনি অবশ্য সেই অভিযোগে গ্রেফতার হননি। কী অভিযোগে গ্রেফতার হয়েছেন? তা নিয়েও পশ্চিমবঙ্গের মিডিয়ায় বা সোশাল মিডিয়ায় বিশেষ আলোচনা নেই। অর্থাৎ হয় এখানকার মানুষ জানার প্রয়োজন বোধ করেন না, নয়তো নিঃসংশয়ে জানেন ব্যাপারটা স্রেফ রাষ্ট্রের বদমাইশি। সেটা হওয়া অবশ্যই অসম্ভব নয়। কিন্তু একইরকম অভিযোগে উমর, শার্জিলের জামিনের তো শুনানিই হয় না এ-দেশে। তা নিয়ে কারও এত মাথাব্যথা নেই তো?

সব মিলিয়ে যা বুঝলাম, ‘হঠাৎ ভীষণ ভাল লাগছে’ গানটা আমার নয়, শুভেন্দুবাবুর গাওয়া উচিত। কারণ রাজ্য বিজেপি যতই অন্তর্দ্বন্দ্বে নাজেহাল হোক, যতই লোকসভা নির্বাচনে বা উপনির্বাচনে ভোট কমুক, দেশজুড়ে মোদি-ম্যাজিক যতই ফিকে হয়ে যাক, ঘৃণার জমি এমন চমৎকার চষা হয়ে গেছে পশ্চিমবঙ্গে যে, সঙ্ঘ পরিবারের ফসল তোলা স্রেফ সময়ের অপেক্ষা। সে-ফসল ২০২৬ সালে তোলা হবে, নাকি আরও পরে— সে আলাদা কথা। নিজের মালিকানাধীন হাসপাতালে বাংলাদেশি রোগীদের চিকিৎসা বন্ধ করার ঘোষণা করে সজলবাবু আপ্রাণ চেষ্টা করছেন ২০২৬ সালেই ফসল তুলতে। অনেক ডাক্তারও সগর্বে সোশাল মিডিয়ায় ঘোষণা করছেন বাংলাদেশি রোগী দেখবেন না। বহু ঘোষিত বিজেপিবিরোধীও এই সিদ্ধান্তকে বাহবা দিচ্ছেন। কেন? না দেখা গেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভারতের পতাকার অবমাননা করা হয়েছে। ক-জন ওই কাজে লিপ্ত আর তাদের অপকর্মের দায় সমস্ত বাংলাদেশির ঘাড়ে চাপবে কেন— এই যুক্তিতর্কের পরিবেশই আর পশ্চিমবঙ্গে নেই। এ-তথ্যও প্রচারিত হচ্ছে না যে ২৮ নভেম্বরই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সংশ্লিষ্ট হলের প্রভোস্ট ‘অতীব জরুরি বিজ্ঞপ্তি’ জারি করে শিক্ষার্থীদের ওই কাজ করা থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দিয়েছেন।

যে রাজনৈতিক বিশ্লেষক বাংলাদেশের ধর্মনিরপেক্ষ মানুষকে সাহস দেওয়ার জন্যে মমতাকে মাঠে নামতে হবে বলেছেন, তিনি এই রাজ্যে এমন অমানবিক এবং ডাক্তারি নীতিবোধবিরোধী পদক্ষেপের বিরুদ্ধে মমতাকে মুখ খুলতে হবে বলে দাবি করেছেন বলে শুনিনি। রাজ্যের প্রশাসনিক প্রধান হিসাবে মমতা নিজে থেকেও বলতে পারতেন— এ-জিনিস এখানে করতে দেওয়া হবে না, করলে ওই হাসপাতালের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। বলেছেন কি? তাঁর দলের নেতা ফিরহাদ হাকিম তবু বলেছেন যে এই সিদ্ধান্ত সমর্থনযোগ্য নয়। কিন্তু ফিরহাদ নিজে মুসলমান হওয়ায় যথারীতি তাঁর বক্তব্যকে বাংলাদেশের সংখ্যাগুরুর প্রতি দরদ বলে দেখা হচ্ছে। সোশাল মিডিয়ায় গালিগালাজ করা হচ্ছে।

এসব থেকে একটা জিনিস পরিষ্কার। আমাদের রাজ্যে হিন্দুত্ববাদকে আটকাতে তৃণমূল কংগ্রেসের যাবতীয় কুকর্ম সত্ত্বেও তাদের ভোট দেওয়াই যে শুভবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষের কর্তব্য— এ-কথা যে-যুক্তিতে ২০১৯ সাল থেকে বলা হয়ে আসছে, সেই যুক্তিটাকে আর বিশ্বাস করার মানে হয় না। বিজেপি এ-রাজ্যে ক্ষমতায় আসেনি ঠিকই, কিন্তু তাতে সমাজে সঙ্ঘবাদের প্রসারে কোনও বাধা সৃষ্টি হয়নি। সঙ্ঘ একই মডেলে সর্বত্র লড়ে না। পশ্চিমবঙ্গে সম্ভবত ওড়িশা মডেল অনুসরণ করা হচ্ছে।

ওড়িশায় কংগ্রেস থেকে বেরিয়ে এসে তৈরি হওয়া বিজু জনতা দলের নেতা নবীন পট্টনায়ক কংগ্রেসকে শেষ করে বিজেপিকেই তাঁর একমাত্র বিকল্প করে তুলেছিলেন। জাতীয় রাজনীতির ইস্যুগুলোতে তিনি বিজেপিকে ঘাঁটাননি। তৃণমূল সাংসদদের মতোই নবীনের দলের সাংসদরাও বহু বিলে ভোটাভুটির সময়ে হয় ভোট দিতেন না, অথবা সরকারের পক্ষে ভোট দিতেন। ওড়িশায় বিজেপিও তাঁর দলকে হারাতে গা লাগায়নি বহুকাল, কেবল নিচুতলায় আরএসএস নিবিড় কাজ চালিয়ে গেছে। শেষমেশ ২০২৪ সালে এসে নবীনের রথ উল্টে দেওয়া হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গে কংগ্রেস তো বটেই, তার চেয়েও বড় কথা, কমিউনিস্টদের শেষ করার কাজ প্রায় শেষ করে এনেছে কংগ্রেস থেকে বেরিয়ে এসে তৈরি হওয়া তৃণমূল কংগ্রেস। নিচুতলায় আরএসএসের বাড়বাড়ন্ত ঠেকাতেও তারা কোনও ভূমিকা নিয়েছে বলে অভিযোগ নেই। এখন বাংলাদেশে হিন্দুদের উপর অত্যাচার পশ্চিমবঙ্গে আরএসএস-বিজেপির কাজ আরও সহজ করে দেবে। তারপর কবে মমতার রথ উলটানো হবে, কীভাবে হবে— সেসব সিদ্ধান্ত বোধহয় দিল্লি থেকে নেওয়া হবে।

আরো পড়ুন জাতীয় সঙ্গীত এবং নেশন: ইরান যা ভাবায়

তা শুভেন্দুবাবুরা গান-টান করুন, কেবল হিন্দুদের উদ্দেশে একটা কথা বলে যাই। বিজেপি বা সঙ্ঘ পরিবারের আসল লক্ষ্য যে পশ্চিমবঙ্গের হিন্দুদের ভোট পাওয়া, বাংলাদেশের হিন্দুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা নয়— তা বুঝতে খুব বেশি কষ্ট করার দরকার নেই। তথাগত রায়, তরুণজ্যোতি তিওয়ারি প্রমুখের সোশাল মিডিয়া হ্যান্ডেলে যেসব কথোপকথন চলে সেগুলোতে চোখ রাখলেই বোঝা যায়। তাঁরা কিন্তু সজলবাবুর মতো আবেগপ্রবণ হয়ে বাংলাদেশ আক্রমণ করার কথা-টথা বলেন না। বরং বিপন্ন হিন্দুদের এ-দেশে জায়গা দেওয়ার কথা উঠলেই তাঁরা এবং তাঁদের সাঙ্গপাঙ্গরা বলতে শুরু করেন— ভারতবর্ষ ধর্মশালা নয়। বাংলাদেশি হিন্দুদের প্রতি সত্যিই টান থাকলে এই উপমহাদেশের মুসলমান বাদে অন্য ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের নাগরিকত্ব দেওয়ার জন্য যে আইন তথাগতবাবুদের সরকার তৈরি করেছে, তাতে নির্দিষ্ট এ-দেশে আসার শেষ তারিখটা তুলে দিলেই তো হত। ৩১ ডিসেম্বর ২০১৪-র পরে বিপদে পড়া হিন্দুরা কি যথেষ্ট হিন্দু নন? আজ বাংলাদেশে যে হিন্দুরা বিপন্ন, তাঁদের জন্য তাহলে বিজেপির ভারতে কোনও জায়গা নেই? তাঁরা কেবল এ-দেশের মুসলমানদের বিরুদ্ধে ঘৃণা উৎপাদন করার খেলায় ব্যবহৃত বোড়ে?

চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম ওয়েবসাইটে প্রকাশিত

চাপা পড়া গার্ডেনরিচ খুঁড়ে যা বেরোল

বাঙালি ভদ্রলোকদের মধ্যে গার্ডেনরিচ আর রাজাবাজারকে জনান্তিকে শাসনের অযোগ্য এলাকা বলা বহুদিন ধরেই চালু। ইদানীং হিন্দুত্বের হাওয়া খেয়ে ফুরফুরে মেজাজে সেসব প্রকাশ্যে বলা আরম্ভ হয়েছে।

সংবাদমাধ্যম ভূপতিনগরে এনআইএ আধিকারিকদের আক্রান্ত হওয়া এবং স্থানীয় তৃণমূল নেতার স্ত্রীর পালটা শ্লীলতাহানির অভিযোগ (মুখ্যমন্ত্রী যে অভিযোগে সিলমোহর দিয়েছেন) নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। তা বাদে পশ্চিমবঙ্গের ৪২ লোকসভা আসনেই প্রায় সব দলের প্রার্থী ঘোষণা হয়ে গেছে, তা নিয়েও হইচই তুঙ্গে। ফলে গার্ডেনরিচে বাড়ি চাপা পড়ে যাওয়া মানুষগুলোর স্মৃতিও চাপা পড়ে গেছে। আর কে গ্রেফতার হল ওই কাণ্ডে, শেষমেশ কাউন্সিলর না কলকাতা কর্পোরেশনের মেয়র নাকি মেয়র-ইন-কাউন্সিল – কে অতগুলো মৃত্যুর দায়িত্ব স্বীকার করলেন তা আর আমরা জানতে পারছি না। সম্ভবত আর কোনোদিন পারবও না। যদি নির্বাচনের পর কলকাতায় আবার কোনো বেআইনি নির্মাণ হুড়মুড়িয়ে ভেঙে পড়ে, তাহলে আলাদা কথা। তা এই চাপা পড়ে যাওয়া গার্ডেনরিচ কাণ্ড নিয়ে কিছু কুচিন্তা কিছুতেই মন থেকে যাচ্ছে না। এই চিন্তাগুলো আসন্ন নির্বাচনে হয়ত অপ্রাসঙ্গিক (কোন বিষয়গুলোর ভিত্তিতে মানুষ ভোট দেন তা অনুমান করতে গিয়ে আজকাল তো পোড়খাওয়া ব্যক্তিদেরও ঘোল খেয়ে যেতে দেখা যায়; আমি কোন ছার), কিন্তু বাংলার মানুষের দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক ও সামাজিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে জরুরি বলেই মনে হয়।

সাধারণত তৃণমূল কংগ্রেসের কোনো নেতা, মন্ত্রীর বিরুদ্ধে কুকর্মের অভিযোগ উঠলেই দল যা করে তা হল আগেভাগে তাঁকে নির্দোষ বলে দেওয়া। গোটা ব্যাপারটাকেই চক্রান্ত বলে দেগে দেওয়া। অনুব্রত মন্ডল থেকে শাহজাহান শেখ পর্যন্ত সকলের ক্ষেত্রেই তাই করা হয়েছে। বড়জোর তৃণমূলের মুখপাত্ররা বলেন – আইন আইনের পথে চলুক। ব্যাপারটা তো প্রমাণসাপেক্ষ। কেউ দোষ করে থাকলে দল তার পাশে দাঁড়াবে না। সাম্প্রতিককালে এর ব্যতিক্রম অবশ্য ঘটেছে। বিশেষ করে নিয়োগ দুর্নীতিতে অভিযুক্ত অনেকের সঙ্গে যোগাযোগই তৃণমূল বেমালুম অস্বীকার করেছে। কিন্তু তারা সব চুনোপুঁটি। রাঘব বোয়ালদের মধ্যে একমাত্র প্রাক্তন শিক্ষামন্ত্রী পার্থ চ্যাটার্জির ক্ষেত্রেই তৃণমূল উলটো পথ নিয়েছিল। বান্ধবীর ফ্ল্যাট থেকে টাকার অযোধ্যা (পাহাড়) উদ্ধার হওয়ার অব্যবহিত পরেই তাঁকে দলের মহাসচিবের পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়, পরবর্তীকালে মন্ত্রিসভা থেকেও। এমনকি তাঁর দুর্নীতির দায়ও দল সত্বর নিজের গা থেকে ঝেড়ে ফেলেছিল। বলা হয়েছিল, তিনি যদি ঘুষ নিয়ে থাকেন তাহলে ব্যক্তিগতভাবে নিয়েছেন। দল বা মুখ্যমন্ত্রী এর বিন্দুবিসর্গ জানতেন না। পার্থ যে দলের আর পাঁচজন অভিযুক্তের মত নন, তা বারবার পরিষ্কার হয়ে গেছে। দলের বাকি যে নেতারা বিভিন্ন মামলায় অভিযুক্ত, তাদের সম্পর্কে কথা বলার সময়ে মমতা ব্যানার্জি বা অভিষেক ব্যানার্জির মূল সুরটা থাকে এইরকম, যে তারা আসলে নির্দোষ। স্রেফ তৃণমূল করে বলে বিজেপি কেন্দ্রীয় সংস্থা দিয়ে তাদের হয়রান করাচ্ছে। যেমন অনুব্রত সম্পর্কে অভিষেক দিনদুয়েক আগেও বলেছেন ‘অনুব্রতই যদি আজ বিজেপিতে চলে যেতেন, ধোয়া তুলসীপাতা হয়ে যেতেন। বিজেপিতে যাননি, তাই জেল খাটছেন।’ মুখ্যমন্ত্রী তো একাধিকবার বলেছেন ‘কেষ্ট’ যখন ফিরে আসবে তখন তাকে বীরের সম্মান দেওয়া হবে। পার্থ কিন্তু দলের এমন সমর্থন পাননি। বহুকাল হল তাঁর নাম পর্যন্ত শোনা যায় না মুখ্যমন্ত্রী বা তাঁর ভাইপোর মুখে। গার্ডেনরিচ কাণ্ডের পর দেখা গেল সেখানকার বিধায়ক তথা নগরোন্নয়ন মন্ত্রী এবং কলকাতার মেয়র ফিরহাদ (ববি) হাকিমও একলা পড়ে গেছেন।

গতমাসের তৃতীয় সপ্তাহে গার্ডেনরিচ কাণ্ড ঘটার ঠিক পরেই মমতা স্বয়ং এলাকায় গিয়েছিলেন এবং হাসপাতালে গিয়ে আহতদের সঙ্গে দেখা করেন। কিন্তু সংবাদমাধ্যমকে যা বলেন তাতে ববি হাকিমকে আড়াল করার কোনো চেষ্টা ছিল না। তৃণমূলের দু নম্বর নেতা অভিষেক তো আদৌ ওমুখো হননি। গোটা রাজ্যের সংবাদমাধ্যম এবং বিরোধীরা যখন বেআইনি নির্মাণ নিয়ে ববিকে সঙ্গত কারণেই অভিযুক্ত করছেন, তখন তৃণমূল যেভাবে অনুব্রত বা শাহজাহানের মত জেলা স্তরের নেতার ঢাল হয়ে দাঁড়িয়েছিল, সেভাবে ববির পাশে দাঁড়ায়নি। টিভি স্টুডিওতেও তৃণমূলের মুখপাত্ররা কেবল বনলতা সেনগিরি করছিলেন। অর্থাৎ বামফ্রন্ট আমলেও বেআইনি নির্মাণ হত এবং ভেঙে পড়ত (শিবালিক অ্যাপার্টমেন্টের বারংবার উল্লেখ সমেত) – এই ছিল তাঁদের সার কথা। ববি নিজে আবার ব্যস্ত ছিলেন স্থানীয় কাউন্সিলরকে বাঁচাতে। তা করতে গিয়ে কর্পোরেশনের ইঞ্জিনিয়ারদের ঘাড়ে পর্যন্ত দোষ চাপিয়েছেন। কিন্তু দলের সর্বোচ্চ নেতৃত্ব নীরব ছিলেন। তেরোজন মানুষের মৃত্যুর পরেও এই নীরবতার একটা ব্যাখ্যা অবশ্যই বিষয়টাকে যথেষ্ট গুরুত্ব না দেওয়া। কিন্তু অন্য দিক থেকে ভাবলে, দলের অতি গুরুত্বপূর্ণ একজন নেতা প্যাঁচে পড়েছেন দেখেও তাঁর পক্ষ নিয়ে সোচ্চার না হওয়ার ব্যাখ্যা কী? একটা ব্যাখ্যা অবশ্যই পার্থ আর ববির মিল থেকে পাওয়া যায়। লুকিয়ে চুরিয়ে নয়, প্রকাশ্যেই তৃণমূলের প্রবীণদের সঙ্গে অভিষেকের নেতৃত্বাধীন নবীনদের সংঘাত হয়েছিল গতবছর। পার্থ, ববি দুজনেই প্রবীণ শিবিরের লোক – অভিষেকের অপছন্দের লোক। সেই সংঘাতে প্রবীণদের একেবারে সামনের সারিতে ছিলেন ববি। অভিজ্ঞ রাজনৈতিক বিশ্লেষক হওয়ার প্রয়োজন নেই, পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতির উপর নজর রাখা যে কোনো মানুষ জানেন শাসক দলে এখন অভিষেকের অনুগামীদের পাল্লা ভারি। এতটাই ভারি যে আরেকটু হলে প্রবীণ সাংসদ সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়ের টিকিট ফস্কে যাচ্ছিল। স্বভাবতই পার্থর মত, কোণঠাসা ববির পাশেও দল দাঁড়ায়নি।

কেউ বলতেই পারেন, তাঁকে তো মেয়র পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়নি। তেমন দাবিকে পাত্তাও দেওয়া হয়নি। তাহলে দল পাশে দাঁড়ায়নি কী করে বলা যায়? প্রশ্নটা খুব বুদ্ধিমানের মত হবে না। কারণ একটা বেআইনি ফ্ল্যাটবাড়ি ভেঙে পড়েছে বলে মেয়রকে বরখাস্ত করলে প্যান্ডোরার বাক্স খুলে যেত লোকসভা নির্বাচনের মুখে। প্রথমত, বিরোধীদের কর্পোরেশনের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ স্বীকৃতি পেয়ে যেত। দ্বিতীয়ত, শিশুরাও জানে যে সত্যি সত্যি একা ববির অঙ্গুলিহেলনে কলকাতায় বেআইনি নির্মাণ, পুকুর ভরাট করে ফ্ল্যাট তৈরি ইত্যাদি চলে না। তিনি বড়জোর তাঁর দুটো বড় বড় পদাধিকার বলে ব্যাপারটায় পৌরোহিত্য করেন। সুতরাং এই সময়ে চটালে তিনি রেগেমেগে মুখ খুলে ফেলতে পারতেন, তাতে তৃণমূলের বিপদ বাড়ত বই কমত না। উপরন্তু তাঁকে ঘিরে যে চক্র, যাকে সংবাদমাধ্যমের মান্য ভাষায় বলা যায় ‘ইলেকশন মেশিনারি’, তাও তৃণমূলের হাত থেকে পিছলে যেতে পারত। গোটা রাজ্যের বেআইনি প্রোমোটিং ব্যবসায়ীদের কাছে যে বার্তা যেত সেকথা না হয় ছেড়েই দেওয়া গেল। ভোটের বাজারে টাকার জোগানের কী হত সেকথাও না হয় থাক। নির্বাচনী বন্ড তো হিমশৈলের চূড়া মাত্র। অভিষেকের ববিকে যতই অপছন্দ হোক, দলের নির্বাচনী স্বার্থ ক্ষুণ্ণ করে লবিবাজি করার মত বোকা রাজনীতিবিদ অবশ্যই মমতার ভাইপো নন। ফলে ওটাকে পাশে দাঁড়ানো বলে মনে করার কোনো কারণ নেই। পাশে দাঁড়ানো মানে সর্বোচ্চ নেতৃত্বের পক্ষ থেকে বিরোধীদের এবং জনগণকে প্রকাশ্য বার্তা দেওয়া, যে যাকে আক্রমণ করা হচ্ছে আমরা তার পাশে আছি। অনুব্রতদের ক্ষেত্রে বারবার যা করা হয়।

ববির ক্ষেত্রে তা না করা কি শুধুই দলীয় অন্তর্দ্বন্দ্বের কারণে? সেই প্রশ্নটাই আরেকটু তলিয়ে দেখা যাক। কেবল তৃণমূল নয়, গার্ডেনরিচ কাণ্ড নিয়ে বাংলার সংবাদমাধ্যম আর বিরোধী দলগুলোর প্রতিক্রিয়া নিয়েও আরেকটু কাটাছেঁড়া করা যাক। কারণ আজকের ভারতে প্রায় কোনোকিছুই কোনো লুকনো এজেন্ডা ছাড়া করা হচ্ছে না। তাই এখন ‘সকলেই আড়চোখে সকলকে দেখে’। না দেখে উপায় নেই।

গার্ডেনরিচ ছাড়া যখন বাংলা সংবাদমাধ্যমে আর কোনো খবর ছিল না, সেইসময় একদিন এবিপি আনন্দের সান্ধ্য জটলায় তৃণমূল প্রতিনিধির বনলতা সেনগিরির জবাবে সিপিএম প্রতিনিধি শতরূপ ঘোষ বলেন, যে বামফ্রন্ট আমলেও কলকাতায় বেআইনি নির্মাণ হয়েছে – একথা বলে তৃণমূল পার পেতে পারে না। কারণ সে আমলেও দীর্ঘদিন কলকাতা কর্পোরেশন তৃণমূল চালিত ছিল। উপরন্তু ২০১০ সাল থেকে টানা ১৪ বছর তৃণমূলই কর্পোরেশন চালিয়েছে। মজার ব্যাপার ঘটে এরপর। সঞ্চালক সুমন দে শতরূপকে সমর্থন করলেন, কিন্তু সেই সূত্রে তৃণমূলের আর যে নেতারা কলকাতার মেয়র ছিলেন – সুব্রত মুখার্জি বা শোভন চট্টোপাধ্যায় – তাঁদের আমলে বেআইনি নির্মাণ কতটা কী হয়েছিল সেসব তথ্য তুলে ধরলেন না। ইদানীং প্রায় সব বাংলা খবরের চ্যানেলেই কথায় কথায় রবীন্দ্রনাথের কবিতার লাইন, নজরুল বা সুকুমার রায়ের কবিতার লাগসই লাইন উদ্ধৃত করে রসবোধের পরিচয় দেন অতি বুদ্ধিমান সঞ্চালকরা। সুদূর অতীতের নানা তথ্যও তাঁদের হাতের কাছে সাজিয়ে দেয় রিসার্চ টিম। অথচ আগের দুই মেয়রের আমলে কী অবস্থা ছিল কলকাতার প্রোমোটিংয়ের – প্রায় দু সপ্তাহের বিতর্কে কোনো কাগজে বা টিভি চ্যানেলে এ নিয়ে একটি শব্দও দেখা গেল না। আশ্চর্য নয়? না সাংবাদিক, না বিরোধী দলের প্রতিনিধিরা – কেউই ওসবের মধ্যে গেলেন না। পূর্ব কলকাতার জগদ্বিখ্যাত জলাভূমির কীভাবে বারোটা বাজানো হয়েছে সে আলোচনা রোজ হয়েছে। অথচ এমনভাবে আলোচনা হয়েছে যেন সবটাই ঘটেছে বর্তমান মেয়রের আমলে। ‘জল শোভন’ বলে পরিচিত পূর্বতন মেয়রকে সবাই যেন ভুলে গেছে। অথচ তাঁর বিবাহ বহির্ভূত প্রেম নিয়ে এই সংবাদমাধ্যমই ঘন্টার পর ঘন্টা খরচ করেছে অনতি অতীতে। তিনি কি সমালোচনার ঊর্ধ্বে চলে গেছেন বিজেপিতে চলে যাওয়ায়? কদিন আগে আবার তৃণমূলে ফিরেছিলেন না? পশ্চিমবঙ্গ অবশ্য অধুনা গেছোদাদাদের রাজ্য। কে যে কখন কোথায় আছেন বলা ঝুঁকিপূর্ণ। গুগলও সবসময় সঠিক তথ্য দিতে পারে না।

মোট কথা ববি কতটা দুর্নীতিগ্রস্ত, মেয়রের পদে থাকার পক্ষে তিনি কতটা অযোগ্য তা প্রমাণ করতে বিরোধী দলের প্রতিনিধিরা এবং সঞ্চালকরা চিত্তরঞ্জন দাশ, সুভাষচন্দ্র বসু পর্যন্ত চলে গেলেন আর সাম্প্রতিককালের মেয়রদের কথা মনে পড়ল না – এ তো বড় রঙ্গ। এমন রঙ্গ কেন হল তা পরিষ্কার হতে অবশ্য সময় লাগেনি। মনে রাখতে হবে, গার্ডেনরিচের ঘটনা ঘটার আগে বাংলার রাজনীতির কেন্দ্রীয় বিষয় হয়ে উঠেছিল সন্দেশখালি। সেখানে মূল অভিযুক্তের নাম শাহজাহান শেখ আর তার ভাইয়ের নাম আলমগীর। ফলে বিজেপি এবং রিপাবলিক বাংলার মত গর্বিত গোদি মিডিয়া যথেচ্ছ মুসলমানবিদ্বেষ ছড়িয়ে চলেছিল। ইতিহাসের কুখ্যাত লম্পটদের ধারা ভেঙে নিজের সম্প্রদায়ের মেয়েদের মায়ের চোখে দেখে, কেবলমাত্র হিন্দু মহিলাদের দিকেই হাত বাড়াত সন্দেশখালির তৃণমূলী দুষ্কৃতীরা – এই বয়ান ছড়িয়ে পড়েছিল। অগ্রাহ্য করা হচ্ছিল এই তথ্য, যে শাহজাহানের ডান হাত, বাঁ হাত দুজনেই হিন্দু – শিবু হাজরা আর উত্তম সর্দার।

ইতিমধ্যে গার্ডেনরিচে বেআইনি ফ্ল্যাটবাড়ি ভেঙে পড়ে মানুষের মৃত্যু। যারা গোদি মিডিয়া বলে পরিচিত নয়, তাদেরও মুখোশের আড়াল থেকে মুখ বেরিয়ে এল। সমস্ত আলোচনাই এমনভাবে হতে থাকল, যেন গোটা পশ্চিমবঙ্গে বা গোটা কলকাতায় একমাত্র গার্ডেনরিচেই ফ্ল্যাটের গায়ে ফ্ল্যাট লেগেছে। একমাত্র ওই এলাকার বাসিন্দারাই জেনে বুঝে পুকুর বোজানো জমিতে তৈরি হওয়া ফ্ল্যাট কেনেন, দুটো বাড়ির মাঝে যথেষ্ট জায়গা ছাড়া আছে কিনা সেসব দেখেন না। কেবল ওই এলাকার প্রোমোটাররাই যাবতীয় আইন ভাঙেন। কেন? সেকথা একদিন এক অধ্যাপক (যিনি ইদানীং রাজনৈতিক দলের মুখপাত্রদের থেকেও বেশি চেঁচামেচি করেন) বলেই দিলেন একটি চ্যানেলের অনুষ্ঠানে। বললেন, একটি বিশেষ সম্প্রদায়ের লোককে তোষণ করার জন্যে গার্ডেনরিচে যে যা খুশি আইন ভাঙলেও প্রশাসন কিচ্ছুটি বলে না। বিজেপির প্রতিনিধি দূরের কথা, স্টুডিওতে উপস্থিত বাম বা কংগ্রেস প্রতিনিধিও কথাটার প্রতিবাদ করলেন না। সুটবুট পরা বাবু সুমন দে তো বেশ জোরে জোরেই মাথা ঝাঁকালেন।

ঠিক কথা। আমরা তো জানি যে অমৃতকালের ভারতবর্ষের গার্ডেনরিচ এক ভয়ংকর অঞ্চল। সেখানে সংখ্যাগরিষ্ঠ হলেন মুসলমান সম্প্রদায়ের মানুষ। তাঁদের প্রশাসন, আইন, আদালত সকলেই হিন্দুদের চেয়ে বেশি ভালবাসে। তাই ওই সম্প্রদায়ের লোকেদের মধ্যে উচ্চশিক্ষিতের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। অধ্যাপক, ব্যারিস্টার, পুলিসকর্তা, সেনাবাহিনীর অফিসার একেবারে গিজগিজ করছে। ওঁরাই তো দেশটা চালান আর কলকাতা তো চালান বটেই। কারণ কলকাতার মেয়র স্বয়ং ওই সম্প্রদায়ের লোক, ওই এলাকারই বিধায়ক। সেই মেয়রের এত ক্ষমতা যে মুখ্যমন্ত্রী মেয়র ঘোষিত নতুন পার্কিং ফি বাতিল করে দিতে পারেন। সেকথা আবার সাংবাদিক সম্মেলন করে জানান দলের মুখপাত্র কুণাল ঘোষ, যিনি সরকার বা কর্পোরেশনের কেউ নন। কর্পোরেশনের সিদ্ধান্ত বাতিল করার সাংবিধানিক এক্তিয়ার মুখ্যমন্ত্রীর আছে কিনা সে প্রশ্নও কেউ তোলে না। মেয়রকে ঢোঁক গিলে মুখ্যমন্ত্রীর সিদ্ধান্ত হজম করতে হয়।

যা-ই হোক, এভাবে ভালই চলছিল। খবরের কাগজ এবং সোশাল মিডিয়ার দৌলতে সকলের ঠোঁটস্থ হয়ে গিয়েছিল গার্ডেনরিচ এলাকায় ঠিক কতগুলো পুকুর বোজানো হয়েছে, কতগুলো ফ্ল্যাট কত ইঞ্চি ফাঁকের মধ্যে সেঁধিয়ে গেছে। এসব প্রকাশিত হওয়ায় গোটা রাজ্যের অসাধু প্রোমোটার এবং তাদের সঙ্গে শাসক দলের যোগসাজশ নিয়ে যেরকম অন্তর্তদন্ত হওয়া উচিত ছিল, তা কিন্তু হচ্ছিল না। বিরোধীরাও সে উৎসাহ দেখাচ্ছিলেন না। শুধু সন্ধে নামলেই বিষোদ্গার হচ্ছিল, কলকাতার সমস্ত বেআইনি নির্মাণ কেন ভেঙে ফেলা হচ্ছে না। তারপর এল সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। গার্ডেনরিচ এলাকাতেই একটি বেআইনি নির্মাণ ভাঙতে গিয়ে বিরাট বাধার মুখে পড়লেন কর্পোরেশনের কর্মীরা এবং পুলিসবাহিনী। টিভির পর্দায় দেখানো হল, শেষপর্যন্ত সে বাড়ি না ভেঙেই তাঁদের ফিরে আসতে হচ্ছে। বড় বড় চোখে সুমন দে ও তাঁর অতিথিরা বিস্ময় প্রকাশ করলেন – কলকাতার এ কী ভয়ঙ্কর অবস্থা! মজার কথা, পর্দায় পরিষ্কার দেখানো হল, যিনি ভাঙতে না দেওয়ার পান্ডা, তিনি কর্পোরেশনের কর্মীদের কাছে দাবি করলেন ওই নির্মাণ অবৈধ নয়। তাঁর কাছে বৈধ কাগজপত্র আছে। কিন্তু সে কাগজ দেখালেন না। অথচ সংবাদমাধ্যমের প্রতিনিধিদের বললেন, তাঁদের ফ্ল্যাট ভেঙে দেওয়া হচ্ছে কারণ তিনি বিজেপি করেন। মেয়রের বাইটও দেখানো হল। তিনি বললেন, বেআইনি নির্মাণ ভেঙে দেব বললেই ভাঙা যায় না। অনেক সমস্যা আছে। তার একটা ঝলকই আজ দেখা গেছে। তারপরে স্টুডিওতে কর্পোরেশনের এবং মেয়রের অনেক সমালোচনা হল, কিন্তু দুঁদে সাংবাদিক সুমন দে বিজেপির প্রতিনিধিকে একবারও জিজ্ঞেস করলেন না, কী মশাই? আপনাদের লোকই তো বেআইনি নির্মাণ ভাঙতে দিচ্ছে না দেখা যাচ্ছে। এবার কী বলবেন? জানা কথা, বিজেপির প্রতিনিধি হয় ওই লোকটিকে বিজেপির প্রতিনিধি বলে স্বীকার করতেন না, নয়ত বলতেন ব্যাপারটা তো এখন আদালতের বিচারাধীন। দেখতে হবে পৌরসভা আসল দোষীদের বাড়ি বাঁচিয়ে নির্দোষ লোকের বাড়ি ভাঙছে কিনা। কিন্তু প্রশ্নটা কি সম্পাদকমশায়ের করা উচিত ছিল না? রিপাবলিক টিভির মত গর্বিত গোদি মিডিয়ার পাশে আনন্দবাজার গোষ্ঠী তো এখনো নিরপেক্ষ বলে পরিচিত। তারাও যে হাতে প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও বিজেপির প্রতিনিধিকে ছাড় দিয়ে দিল গার্ডেনরিচ কাণ্ডে, তাতে একটা জিনিসই প্রমাণ হয়।

আরও পড়ুন বাধ্যতামূলক মহানতার একাকিত্বে ইমাম রশিদি

গার্ডেনরিচ মুসলমানদের এলাকা। অতএব ওখানে কাউন্সিলর, প্রোমোটার মায় বাড়ি চাপা পড়ে মারা যাওয়া মানুষগুলো, সকলেই দুর্নীতিগ্রস্ত – এই ধারণা গেড়ে বসেছে সংবাদমাধ্যমের মনে। হয়ত আগে থেকেই বসেছিল, এখন সাহস পেয়ে প্রকাশ করা হচ্ছে। সব ব্যাটাকে ছেড়ে বেঁড়ে ব্যাটাকে ধরার মত ববি হাকিমকে আক্রমণও সেই কারণেই। স্টুডিওর জটলায় এ প্রশ্নও উঠেছে যে একই লোকের হাতে তিনটে পদ কেন? অথচ শোভন চাটুজ্জে মেয়র থাকার সময়ে এবং পরবর্তীকালে তাঁর মেয়র পদ নিয়ে যখন টানাপোড়েন চলছিল, তখন কেউ প্রশ্ন তোলেনি – উনি একইসঙ্গে বেহালার বিধায়ক আর কর্পোরেশনের মেয়র কেন? তাঁকে মেয়রের পদ থেকে সরিয়ে দেওয়ার পরেও বাংলার এই সংবাদমাধ্যমগুলোই গদগদ ছিল তাঁর আর প্রেমিকা বৈশাখী বন্দ্যোপাধ্যায়ের নাচগান, কাশ্মীর ভ্রমণ দেখাতে। দুর্নীতি নিয়ে এত আলোচনা হয়, অথচ তখন শোভনের বিপুল সম্পত্তি নিয়েও কোনো প্রশ্ন তোলা হয়নি।

আসলে বাঙালি ভদ্রলোকদের মধ্যে গার্ডেনরিচ আর রাজাবাজারকে জনান্তিকে শাসনের অযোগ্য এলাকা বলা বহুদিন ধরেই চালু। ইদানীং হিন্দুত্বের হাওয়া খেয়ে ফুরফুরে মেজাজে সেসব প্রকাশ্যে বলা আরম্ভ হয়েছে। এমন নয় যে একা সুমন দে বা আনন্দবাজার গোষ্ঠী এই দোষে দুষ্ট। ভোটের বাজারে ফ্যাসিবিরোধী সভা সমাবেশে বক্তৃতা দিয়ে বেড়ানো এক সাংবাদিক যেমন কদিন আগে এক অনলাইন বিতর্কে বললেন, রাজাবাজারের অটোওলাদের দৌরাত্ম্যের কারণেই নাকি হিন্দুদের মনে মুসলমানদের প্রতি বিতৃষ্ণা তৈরি হয় এবং বিজেপির কাজ সহজ হয়। অর্থাৎ গোটা রাজ্যের অন্য সব এলাকার হিন্দু অটোওলারা সুবোধ বালক। একমাত্র রাজাবাজারের মুসলমান অটোওলারাই ভীষণ দৌরাত্ম্য চালায় আরোহীদের উপর। ঠিক যেমন গোটা রাজ্যে আর কোথাও জলা জায়গা ভরাট করে বহুতল তৈরি হচ্ছে না, দুটো বাড়ির মধ্যে যতখানি ফাঁক থাকা উচিত তা অগ্রাহ্য করে ফ্ল্যাটবাড়ি তৈরি হচ্ছে না, যেখানে তিনতলা বানানোর অনুমতি আছে সেখানে পাঁচতলা তুলে ফেলা হচ্ছে না। যত কাণ্ড গার্ডেনরিচে।

বহুল প্রচারিত সংবাদমাধ্যম এবং প্রগতিশীল বলে পরিচিত সাংবাদিক, অধ্যাপকরাও যখন এই বয়ান প্রচার করেন আর বিজেপিবিরোধী রাজনৈতিক দলের মুখপাত্ররাও চুপচাপ বসে শোনেন, সজোরে প্রতিবাদ করেন না – তখন বোঝা যায় পশ্চিমবঙ্গে হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির শিকড় গভীরে চারিয়ে গেছে। ২০২১ বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপি শেষমেশ একশো আসনও পেল না দেখে যাঁরা উদ্বাহু নৃত্য করেছিলেন ধর্মনিরপেক্ষতা জিতে গেল বলে, তাঁরা দিবাস্বপ্নে মগ্ন ছিলেন। আসন্ন ভোটের ফল যা-ই হোক, পশ্চিমবঙ্গের এটাই বাস্তবতা। তাই বোধহয় তৃণমূলের শীর্ষ নেতৃত্বও ভোটের মুখে ববির পক্ষ নিয়ে বেশি কথাবার্তা বলে সংখ্যাগুরু ভোটারদের চক্ষুশূল হতে চাইলেন না। স্বঘোষিত প্রগতিশীলদের শত বুকনি সত্ত্বেও পশ্চিমবঙ্গ তামিলনাড়ু নয়, যেখানে বিজেপির এক নম্বর নেতা কে আন্নামালাইকেও বলতে হয় – আমাদের এখানকার ভোটে ইস্যু উন্নয়ন আর দুর্নীতি। হিন্দুত্ব নয়।

নাগরিক ডট নেটে প্রকাশিত