এনডিটিভি বিসর্জন: শোক নিষ্প্রয়োজন, উল্লাস অন্যায়

এনডিটিভি প্রথম নেটওয়ার্ক নয় যা সরকারের মুখপত্র হতে চলেছে, শেষ নেটওয়ার্ক। বিপদটা সেইখানে।

এনডিটিভির দখল এশিয়ার সবচেয়ে বড় ধনী গৌতম আদানির হাতে চলে যাওয়া নিয়ে আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে। প্রণয়-রাধিকার হাত থেকে লাগাম ছুটে যাওয়া মাত্রই পদত্যাগ করেছেন ম্যাগসাসে পুরস্কার জয়ী সাংবাদিক রবীশ কুমার। এই খবরটা আরও বেশি পীড়া দিচ্ছে অনেককে। কারণটা শুধুমাত্র কিছু মানুষের প্রিয় টিভি নেটওয়ার্ক অপ্রিয় লোকের হাতে চলে যাওয়া বা সেখান থেকে প্রিয় অ্যাঙ্করের প্রস্থান নয়। এনডিটিভির আদানিকরণ নিয়ে সারা পৃথিবীতে আলোচনা হচ্ছে। বিশ্বের সবচেয়ে ধনী ব্যক্তিদের তালিকায় থাকা লোকেদের হাতে কোনো সংবাদমাধ্যম বা সোশাল মিডিয়ার মালিকানা চলে যাওয়া যে গণতন্ত্রের পক্ষে ক্ষতিকর, বাকস্বাধীনতার বারোটা বাজানোর পক্ষে যথেষ্ট, তা সারা পৃথিবীর গণতন্ত্রপ্রেমী মানুষ বুঝে ফেলেছেন। উপরন্তু আদানি এনডিটিভিকে নিয়ে কী করবেন তা নিয়েও কোনো সংশয় রাখেননি। তিনি ফাইন্যানশিয়াল টাইমসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন “স্বাধীনতা মানে হল সরকার ভুল কিছু করলে তা বলার স্বাধীনতা। কিন্তু একইসঙ্গে সরকার যখন রোজ ঠিক কাজ করে তখন সেটা বলার সাহসও থাকা উচিত। সেটাও আপনাকে বলতে হবে।” পৃথিবীর সবচেয়ে জনদরদী সরকারও যে রোজ ঠিক কাজ করে না তা বোঝার জন্য নোবেল পুরস্কার প্রাপকদের মত বুদ্ধিমান হওয়ার দরকার নেই আর আদানির মত সফল ব্যবসায়ী নির্বোধও নন। ফলে তিনি যে আসলে বলতে চাইছেন সরকারের বিরুদ্ধে কথা বলা সংবাদমাধ্যমের কাজ নয় – তা স্পষ্ট। একটা সাড়ে তিন দশকের পুরনো মিডিয়া নেটওয়ার্কের মালিকানা এমন লোকের হাতে চলে যাওয়া নিঃসন্দেহে উদ্বেগজনক।

কিন্তু এনডিটিভি কি প্রথম চ্যানেল যা শাসকের মুখপাত্র হতে বসেছে? নাকি এনডিটিভি ছিল বলে ভারতের গণতন্ত্র জীবন্ত ছিল, আর আদানির নিয়ন্ত্রণে চলে গেলেই নিমেষে তার মৃত্যু হবে? যদি দুটো প্রশ্নের উত্তরই ‘না’ হয়, তাহলে এত কান্নাকাটির কী আছে? নাগরিক ডট নেটের মত একটা বিকল্প সংবাদমাধ্যমে আমারই বা এ নিয়ে প্রবন্ধ ফেঁদে বসার কী আছে? রবীশ কিছুদিন আগেই, সম্ভবত কী হতে চলেছে জেনে, নিজের ইউটিউব চ্যানেল খুলেছেন। সাবস্ক্রাইবারের যথারীতি অভাব হয়নি, তাঁর পদত্যাগের কথা চাউর হওয়ার পর সংখ্যা লাফিয়ে বেড়েছে। সুতরাং সেই চ্যানেল থেকে যে বিস্তর আয় হবে তাতে সন্দেহ নেই। রবীশের সে আয়ের ভাগ তো আমি পাব না, নাগরিক ডট নেটও পাবে না। তাহলে দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের মত “কিসের শোক করিস ভাই/আবার তোরা মানুষ হ” বলে অন্য কাজে লেগে পড়লেই তো হয়। কী দরকার এ বিষয়ে ভাবনাচিন্তার?

এসব কথা অনেকেই বলাবলি করছেন। আরও বলাবলি হচ্ছে, এনডিটিভির ভারতীয় সাংবাদিকতায় এমন কিছু অবদান নেই যে তাদের জন্য চোখের জল ফেলতে হবে। তারাও আর পাঁচটা সংবাদমাধ্যমের চেয়ে আলাদা কিছু নয়। যাঁরা মনে করছেন এনডিটিভি ক্ষমতাকে প্রশ্ন করা শেষ চ্যানেল ছিল, তাঁদের মনে করিয়ে দেওয়া হচ্ছে, এনডিটিভি কেন্দ্রের শাসককে প্রশ্ন করলেও বহু রাজ্যের শাসককে ছাড় দিয়েছে। পশ্চিমবঙ্গের তৃণমূল সরকারই সম্ভবত তার সবচেয়ে বড় উদাহরণ। সুতরাং শোকার্ত হয়ে পড়ার কোনো প্রয়োজন নেই। আবার কংগ্রেসের অনেক সদস্য, সমর্থক এনডিটিভির উপর চটে আছেন অন্য কারণে। তাঁদের বক্তব্য এরা বিজেপিকে যত প্রশ্ন করেছে, বিরোধী আসনে থাকা সত্ত্বেও কংগ্রেসকে তার চেয়ে বেশি প্রশ্ন করেছে। নরেন্দ্র মোদীর চেয়ে বেশি আক্রমণ করেছে রাহুল গান্ধীকে। কংগ্রেসের অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র নিয়ে দিনরাত আলোচনা করেছে, বিজেপির অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র নিয়ে উচ্চবাচ্য নেই।

উপরের সবকটা অভিযোগেরই কিছু না কিছু সারবত্তা আছে। ঠিক সেজন্যেই এনডিটিভির আদানিকরণ নিয়ে আলোচনা অপরিহার্য।

প্রথমেই বলে নেওয়া দরকার, অনেকেই একটা কথা ভুল বুঝেছেন। এনডিটিভির নিয়ন্ত্রণ এখনো প্রণয় রায় ও তাঁর স্ত্রী রাধিকা রায়ের হাত থেকে বেরিয়ে যায়নি। তাঁরা এখনো এনডিটিভির বোর্ড অফ ডিরেক্টর্সে আছেন, থাকতে বাধাও নেই। কারণ দুজনের হাতেই এনডিটিভির বেশকিছু শেয়ার রয়েছে।

কিন্তু এনডিটিভির প্রোমোটার হল আরআরপিআর হোল্ডিং নামক সংস্থা। তাঁরা পদত্যাগ করেছেন সেই সংস্থার ডিরেক্টরের পদ থেকে, কারণ আরআরপিআরের দখল অগাস্ট মাসেই আদানি গ্রুপের হাতে চলে গেছে, ফলে এনডিটিভির ২৯.১৮% শেয়ারও এখন আদানি গ্রুপেরই হাতে। এনডিটিভির আরও ২৬% শেয়ার দখল করার জন্য গৌতম আদানি ২২ নভেম্বর এক ওপেন অফার লঞ্চ করেছেন, যার মেয়াদ শেষ হচ্ছে আজ। আদানির লক্ষ্যপূরণ হলে এনডিটিভির বেশিরভাগ শেয়ার চলে যাবে আদানি গ্রুপের হাতে। পূরণ না হলেও অন্য যারা শেয়ার কিনে নেবে তাদের শেয়ারগুলো আরও বেশি দামে কিনে নেওয়ার রেস্ত আদানির আছে, রায় দম্পতির নেই। ফলে আদানির এনডিটিভির ম্যানেজমেন্টের সম্পূর্ণ দখল নিয়ে নেওয়া এখন সময়ের অপেক্ষা। ইতিমধ্যেই আদানি গ্রুপের চিফ টেকনোলজি অফিসার সুদীপ্ত ভট্টাচার্য, সাংবাদিক সঞ্জয় পুগলিয়া ও সেন্থিল চেঙ্গলবরায়ন আরআরপিআরের ডিরেক্টর নিযুক্ত হয়েছেন। প্রণয়-রাধিকার এনডিটিভি থেকে বিদায় অনিবার্য – একথাও বলাই যায়। কারণ আদানির চেয়ে বেশি টাকা দিয়ে ওপেন অফারে যারা শেয়ার কিনেছে তাদের শেয়ারগুলো ফের কিনে নেওয়ার অবস্থা রায় দম্পতির থাকলে এই পরিস্থিতির সৃষ্টিই হত না। তাঁরা ২০০৯-১০ সালে বিশ্বপ্রধান কমার্শিয়াল প্রাইভেট লিমিটেড নামে এক সংস্থা থেকে ৪০৩ কোটি টাকা ধার নিয়েছিলেন। সে ঋণের শর্তই ছিল, ঋণ শোধ করতে না পারলে আরআরপিআরের ৯৯.৯% শেয়ার বিশ্বপ্রধান দখল করে নিতে পারবে। আদানি প্রথমে ওই বিশ্বপ্রধানেরই প্রধান হয়ে বসেন টাকার জোরে, তারপর অনাদায়ী ঋণের দায়ে এনডিটিভির দখল নেওয়ার কাজ শুরু করেন।

শোধ দিতে পারবেন না এমন ঋণ নিলেন কেন, তা-ও আবার ২০০৮ সালে তৈরি হওয়া বিশ্বপ্রধানের মত এক গোলমেলে ‘হোলসেল ট্রেডিং ফার্ম’ থেকে, যার মালিকানা হাত বদলাতেই থাকে, যার মালিকানা একসময় ছিল রিলায়েন্স ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের হাতে, পরে মুকেশ আম্বানিরই ঘনিষ্ঠ মহেন্দ্র নাহাতার হাতে চলে যায়? এসব প্রশ্ন তুলে এনডিটিভির আজকের অবস্থার জন্য রায় দম্পতিকে দায়ী করাই যায়। এমনকি সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ বোর্ড অফ ইন্ডিয়া (সেবি)-ও এ নিয়ে প্রণয়-রাধিকাকে শোকজ করেছিল। এনডিটিভিতে কাজ করেই বিখ্যাত হওয়া বরখা দত্তের মত কেউ কেউ এখন পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে তির্যক ভাষায় টুইট করতে লেগেছেন, এনডিটিভি আগে আম্বানির হাতে ছিল। তখন যদি স্বাধীন থেকে থাকে, এখন আদানির হাতে গেলেই পরাধীন হবে কেন? আসলে ইস্যুটা হল টিভির রেভিনিউ মডেলটাই ভেঙে পড়েছে।

AM CONFUSED. WHEN MUKESH AMBANI OWNED 30% OF NDTV IT WAS FREE AND WHEN GAUTAM ADANI PURCHASES THAT 30% ITS OBITUARY TIME? PRAY, HOW? SO MUCH POLITICKING & HUMBUG IN THE DISCOURSE BOTH FOR OR AGAINST, BOTH NARRATIVES IGNORE THE ELEPHANT IN THE ROOM- REVENUE MODEL OF TV IS BROKEN.— barkha dutt (@BDUTT) December 1, 2022

এতদ্বারা বরখা আম্বানিকে গণতান্ত্রিক বললেন, নাকি আদানিকে গণতান্ত্রিক বললেন? নাকি দুজনের কেউই বাকস্বাধীনতার পক্ষে বিপজ্জনক নন বললেন? বোঝা কঠিন। কিন্তু ঘটনা হল কর্পোরেট মিডিয়ার রেভিনিউ মডেল যে গোলমেলে তা কোনো নতুন কথা নয়। আয়ের জন্যে বিজ্ঞাপন নির্ভরতা এবং বিজ্ঞাপনের জন্য টিআরপি নির্ভরতা বহুকালের সত্য। বরখা যখন স্বয়ং কর্পোরেট মিডিয়ার হর্তাকর্তা ছিলেন তখনো তাই ছিল। ভারতে অর্থনৈতিক উদারীকরণের পর সংবাদমাধ্যমে, বিশেষত ইংরেজি ভাষার সংবাদমাধ্যমে, দুটো জিনিস ক্রমান্বয়ে ঘটেছিল। এক, সংবাদমাধ্যমে চুক্তিভিত্তিক চাকরি চালু হওয়া আর সাংবাদিকদের পারিশ্রমিক অনেকখানি বেড়ে যাওয়া। এককথায় অন্যদের ঘাড়ে পা দিয়ে সাংবাদিকদের স্বর্গারোহণ আরম্ভ হয়। যে সাংবাদিক যত উপরে আছেন তাঁর মাইনে তত বাড়ে। রাজস্ব বেড়েছে কিনা, এত মাইনের টাকা আসবে কোথা থেকে – এসব প্রশ্ন তখন বরখার মত শীর্ষস্থানীয়রা করেননি। ২০০৮-০৯ বা ২০১০, অর্থাৎ যে সময়ে প্রণয়-রাধিকা ওই বিপুল পরিমাণ ঋণ নিয়েছিলেন, ঠিক সেই সময়টাতে এই মাইনে বাড়ার হার চরমে পৌঁছয় সারা দেশের সংবাদমাধ্যমে। কেবল টিভি চ্যানেলগুলোতে নয়, খবরের কাগজেও।

আমার নিজের অভিজ্ঞতাই বলি। ২০০৭ সালের নভেম্বর মাসে কলকাতার ধুঁকতে থাকা দ্য স্টেটসম্যান কাগজের চাকরি ছেড়ে পাড়ি দিই হায়দরাবাদে, ২৮,০০০ টাকা মাস মাইনেয়। সেখানে যে কাগজে যোগ দিই, সেখানে কয়েক মাসের মধ্যেই কোনো অজ্ঞাত কারণে বেতন কাঠামোর পুনর্বিন্যাস হয়। নিউজরুমের বড়, মেজ, সেজ, ছোট সকলেরই বেতনের বিপুল বৃদ্ধি হয়। যাদের পদোন্নতি হয়নি তাদেরও বেতন প্রায় দ্বিগুণ হয়। আমার মত যাদের পদোন্নতি হয়েছিল তাদের বৃদ্ধি হয় চোখ কপালে তোলার মত। আমার বেতন গিয়ে দাঁড়িয়েছিল মাসিক ৭০,০০০ টাকায়। আমি তখন নেহাতই মাঝের স্তরের সাংবাদিক, সবে সিনিয়র সাব-এডিটর থেকে চিফ সাব হয়েছি। অ্যাসিস্ট্যান্ট এডিটর, এক্সিকিউটিভ এডিটর বা এডিটরদের মাইনে কোথায় পৌঁছেছিল তা কেবল কল্পনাই করতে পারি। আমরা কেউ কি খোঁজ নিতে গিয়েছিলাম কাগজের আয় বেড়েছে কিনা? অথচ সকলেই জানতাম কাগজের বিক্রি কিন্তু রাতারাতি বাড়েনি।

সেটা ২০০৮ সালের কথা। তখন সারা ভারতের ইংরেজি সংবাদমাধ্যমে প্রতিযোগিতা চলছে সাংবাদিকদের মাইনে বাড়ানোর। আবার ২০১০ সালে পশ্চিমবঙ্গে সারদা গ্রুপের বাংলা কাগজ চালু হওয়ার সময়ে একইরকম জিনিস দেখা গিয়েছিল। সে কাগজ বছর দুয়েকের বেশি না চললেও বাংলা ভাষার সাংবাদিকদের সঙ্গে ইংরেজির সাংবাদিকদের পারিশ্রমিকের যে লজ্জাজনক ব্যবধান ছিল, তা কমাতে ঘটনাটা কিছুটা সাহায্য করেছিল।

এখন কথা হল, টিআরপির খোঁজে বহুকাল ধরেই ভূত পেত্নী দত্যি দানো তাবিজ কবচ দেখায় বহু হিন্দি চ্যানেল। সে কাজ রবীশরা কখনো করেননি। ২০১২-১৩ সাল থেকে ওসবের সঙ্গে হিন্দি, ইংরেজি সব চ্যানেলেই যুক্ত হয়েছে প্রায় আঁচড়ে কামড়ে দেওয়ার মত সান্ধ্য মজলিশ, মুসলমান বিদ্বেষ ছড়ানো, উদারনৈতিক ব্যক্তি এবং প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে লোক ক্ষ্যাপানো, সব ধরনের বামপন্থীদের দেশদ্রোহী বলে দেগে দেওয়া, ভুয়ো খবর প্রচার, বিজেপির অলিখিত মুখপত্রের কাজ করা। এনডিটিভি এগুলোর কোনোটাই করেনি। অথচ প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে গেলে বাজারের চলতি হারের কমে মাইনে দেওয়া চলে না। উপরন্তু সাংবাদিকদের মাইনে একটা সংবাদমাধ্যমের খরচের একটা অংশ মাত্র। তথ্যপ্রমাণ বলছে খুব বড় অংশও নয়। তার চেয়ে খবর সংগ্রহ করা এবং টিভির ক্ষেত্রে যন্ত্রপাতি ও প্রযুক্তির ক্রমোন্নয়নের খরচ অনেক বেশি। সেখানেও প্রতিযোগীদের সঙ্গে তাল মেলাতে টাকার প্রয়োজন হয়। আমরা যারা স্বাধীন সংবাদমাধ্যম চাই, ক্ষমতাকে প্রশ্ন করে এমন সংবাদমাধ্যম চাই, তারা কি টিআরপি বাড়িয়ে বেশি বিজ্ঞাপন পাওয়ার দিকে মন না দিয়ে যেনতেনপ্রকারেণ ঋণ নিয়ে টিকে থাকার চেষ্টাকে বেশি অপরাধ বলে গণ্য করব? বরখার টুইটসূত্রে খেয়াল করলেই দেখা যাবে, এনডিটিভির শেয়ার হোল্ডাররা মন্তব্য করছেন, ওটা বাজে কোম্পানি। আমাদের কী করে ডিভিডেন্ড দেওয়া যায় তার দিকে কোনোদিন নজর দেয়নি। একটা সংবাদমাধ্যমকে স্রেফ কোম্পানি হিসাবে দেখার এই দৃষ্টিভঙ্গিই কি আমাদের মূল্যায়নের মাপকাঠি হওয়া উচিত? ভেবে দেখা প্রয়োজন। আমরা তো কোম্পানির শেয়ার হোল্ডার নই। আমরা বরং, পুঁজিবাদী লবজে, স্বাধীন সংবাদমাধ্যমের স্টেক হোল্ডার।

এনডিটিভি প্রথম নেটওয়ার্ক নয় যা সরকারের মুখপত্র হতে চলেছে, শেষ নেটওয়ার্ক। বিপদটা সেইখানে। ভারতে যতগুলো বড় বড় টিভি নেটওয়ার্ক আছে তার প্রায় সবকটাই ইতিমধ্যেই শাসক দলের গর্ভে চলে গেছে। বাকি ছিল এনডিটিভি। বলতে দ্বিধা নেই, এনডিটিভিও একটি পুঁজিবাদী সংস্থা। সে পুঁজিবাদের নিয়মেই চলেছে। এমন নয় যে সারা ভারতের সংবাদমাধ্যমে যখন ছাঁটাই চলেছে, এনডিটিভি তখন সমস্ত কর্মচারীর স্বার্থরক্ষা করেছে। কিন্তু রায় দম্পতি কখনো কারাত দম্পতির মত নিজেদের বিপ্লবী বলে দাবি করেছেন বলে তো মনে পড়ে না। তাঁরাও ব্যবসাই করছিলেন। ব্যবসা প্রায় তিন দশক ক্রমশ বড় হয়েছে, সংবাদমাধ্যমের যা কাজ তা করতে নিতান্ত ব্যর্থ হয়নি, দায়িত্ব অস্বীকারও করেনি। কোনো সন্দেহ নেই, সব ইস্যুতেই এনডিটিভির অবস্থান ন্যায়ের পক্ষে বা দুর্বলের পক্ষে ছিল না। থাকার কথাও নয়। অন্তত বামপন্থীদের বুঝতে অসুবিধা হওয়ার কথা নয়, যে সংবাদমাধ্যম শেষপর্যন্ত মালিকের শ্রেণিস্বার্থেরই প্রতিভূ। এনডিটিভি তার চেয়ে আলাদা হবে এরকম প্রত্যাশা ছিল কি? থাকলে কেন ছিল? তবে এই একটি নেটওয়ার্কে কিন্তু বুলডোজার দিয়ে দিল্লি, উত্তরপ্রদেশ বা আসামে প্রতিবাদীদের ঘর ভেঙে দেওয়ার জন্যে বিজেপি নেতাদের দিকে আঙুল তোলা চলত। উমর খালিদ, ভারভারা রাও, স্ট্যান স্বামী, জি এন সাইবাবা, গৌতম নওলাখারা যে খলনায়ক নন সেটা বলা চলত। বিহার বিধানসভা নির্বাচনের আগে পরে লিবারেশন নেতা দীপঙ্কর ভট্টাচার্যকে যথেষ্ট গুরুত্ব দেওয়া হত। মূল্যবৃদ্ধি, বেকারত্ব, দারিদ্র্য নিয়ে কথা হত। আজ দেশের যা অবস্থা, তাতে এমন একটা মঞ্চের গুরুত্ব কম নয়। এই মঞ্চের অবলুপ্তিতে শোকাহত না হলেও উল্লসিত হওয়া বুদ্ধিমানের কাজ নয়।

ভারতীয় সাংবাদিকতায় এনডিটিভির অবদান কী, সে সম্পর্কে সম্ভবত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কথাটা বলেছেন অনিন্দ্য চক্রবর্তী। এনডিটিভি নেটওয়ার্কের দু-দুটো চ্যানেলের একদা ম্যানেজিং এডিটর এই সাংবাদিক রায় দম্পতির আরও অনেক অবদানের কথা লেখার সঙ্গে সঙ্গে লিখেছেন, ভারতের আর সব প্রতিষ্ঠানের মতই এনডিটিভিতেও বিলক্ষণ লুটিয়েন্স এলিটসুলভ ব্যাপার-স্যাপার আছে। কিন্তু অন্য কোনো সংবাদ প্রতিষ্ঠান একজন রবীশ তৈরি করতে পারেনি। কারণ একজন হিন্দি ভাষার সাংবাদিককে অতখানি জায়গা এবং কাজের স্বাধীনতাই কেউ দেয়নি।

এ কথার মাহাত্ম্য বোঝানো শক্ত। কারণ আমরা বাঙালি অ্যাংলোফাইলরা বুঝে উঠতে পারি না আঞ্চলিক ভাষার সাংবাদিকতার গুরুত্ব কতখানি। স্বাধীনতার পর ৭৫ বছর কেটে গেল, অথচ আজও ভারতে প্রগতিশীলতার ভাষা ইংরেজি। আমরা দ্য ওয়্যার, নিউজলন্ড্রি, ক্যারাভ্যান, অল্টনিউজ, বুম লাইভ ইত্যাদি ইংরেজি ভাষার বিকল্প সংবাদমাধ্যম পড়ি/দেখি বলে হোয়াটস্যাপ ইউনিভার্সিটির বাইরের সত্য জানতে পারি। কিন্তু এ দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ ইংরেজি পড়তে পারেন না, বলতে পারেন না, শুনে বুঝতেও পারেন না। তাঁদের কাছে উদারনৈতিক মতবাদ, ভুয়ো খবর পেরিয়ে সত্য পৌঁছে দেওয়ার দায় আমরা নিই না। আমরা কেবল তাঁদের নিয়ে ব্যঙ্গ করেই খালাস। যে কারণে বাংলায় বিকল্প সংবাদমাধ্যম তৈরি করার তেমন প্রয়াস নেই। বাংলার টিভি চ্যানেলগুলোও দুর্গাপুজোয় অ্যাঙ্করদের শাড়ি পরিয়ে, তৃণমূল-বিজেপি তরজা দেখিয়ে, শোভন-বৈশাখী কেচ্ছা দেখিয়ে চালিয়ে যাচ্ছে। যে দক্ষিণপন্থীদের আমরা ঘোর অপছন্দ করি, তারা কিন্তু আঞ্চলিক ভাষার গুরুত্ব বোঝে। তাই রিপাবলিক হিন্দি খুলে গেছে, রিপাবলিক বাংলাও চলে এসেছে। এই আবহে রবীশকে রায় দম্পতি যে স্থান দিয়েছিলেন তার গুরুত্ব অপরিসীম। আমাদের সময়ের কোনো বাঙালি সম্পাদক বাংলায় সাংবাদিকতা করে বিশ্বমানের পুরস্কার পেতে পারবেন? পুরস্কার পাওয়া অবশ্য সবচেয়ে বড় কথা নয়। কিন্তু কলকাতার যে সম্পাদকদের ইদানীং আমরা প্রবাদপ্রতিম বলে মনে করি, রবীশের মত জনগণের দুঃখ দুর্দশা সাংবাদিকতায় নিয়ে আসার ব্যাপারেও তো তাঁদের অবদান শূন্য। ফলে রবীশের মত বিস্তীর্ণ এলাকার বিপুল সংখ্যক মানুষের উপর ইতিবাচক তো নয়ই, নেতিবাচক প্রভাব ফেলার ক্ষমতাও তাঁদের নেই। এঁদের প্রভাব হাওড়া ব্রিজ পেরোলেই শেষ বললে ভুল হয় না।

তার উপর আছে ম্যানেজারি করে সম্পাদক হওয়ার ভান। যে কারণে দেবেশ রায় অশোক দাশগুপ্তের কলামের সংকলনের আলোচনা করতে গিয়ে লিখেছিলেন “এক সময় বাংলা খবরের কাগজে সম্পাদকের সক্রিয় সাংবাদিক হওয়ার বাধ্যতা ছিল। তাঁদের লিখতে হত – চাকরির কারণে নয়, নিজেদের মত দশজনকে জানানোর দরকারে ও দশজনের মত তৈরি করে তোলার দায় স্বীকার করে। রামানন্দ চট্টোপাধ্যায় থেকে সত্যেন্দ্রনাথ মজুমদার বাংলা সাংবাদিকতার সেই ইতিহাস তৈরি করেছেন। বিবেকানন্দ মুখোপাধ্যায় শেষ সম্পাদক যিনি নিজে লিখতেন। যদিও তাঁর লেখা তাঁর নামে বেরোত না, তবু পাঠক এমনই চিনত তাঁর লেখা যে সম্পাদকীয়র নৈর্ব্যক্তিকে তিনি হারিয়ে যেতেন না। তারপর বাংলা কাগজে সম্পাদকের লেখালেখি উঠে গেছে।” বাংলার টিভি চ্যানেলের সম্পাদকরা আরও কম সাংবাদিক। তাঁরা সুটেড বুটেড হয়ে সান্ধ্য বিতর্ক পরিচালনা করা আর বিশিষ্টদের সাক্ষাৎকার নেওয়া ছাড়া আর কিছুই করেন না। রবীশের মত আবর্জনার মধ্যে দাঁড়িয়ে “প্লিজ টেল মনমোহন সিং টু ওয়াচ রবীশ কি রিপোর্ট। ইংলিশ মে ওয়সে ভি ইন্ডিয়া ডেভেলপড লগতা হ্যায়” বলা এঁদের কল্পনাতীত। এই রবীশ টিভি মিডিয়ার বাইরে চলে গেলেন। এতে সত্যিই হয়ত তাঁর ক্ষতি নেই, কিন্তু টিভির দর্শকদের ক্ষতি। টিভির মাধ্যমে তিনি যত হিন্দিভাষী দর্শকের কাছে পৌঁছতে পারতেন, যত ইংরেজি না জানা মানুষকে বিষাক্ত দক্ষিণপন্থার উল্টো ছবি দেখাতে পারতেন, ইউটিউব চ্যানেল দিয়ে পারবেন কিনা তা নিয়ে সন্দেহের অবকাশ আছে। কারণ ভারতে মোবাইল ডেটার দাম আবার বাড়তে শুরু করেছে।

শেষ প্রশ্নে আসব, অর্থাৎ এসব নিয়ে নাগরিক ডট নেট কেন ভাবছে? তার আগে সংক্ষেপে কংগ্রেসি বন্ধুদের এনডিটিভির প্রতি রাগ নিয়ে দু-চার কথা বলে নিই। এনডিটিভি যে উদারনীতির অনুশীলন করেছে সেই ‘দ্য ওয়ার্ল্ড দিস উইক’-এর সময় থেকে, তা কিন্তু আসলে নেহরুসুলভ উদারনীতি। জওহরলাল নেহরু যে গণতান্ত্রিক উদারতার ধারণায় বিশ্বাসী হয়ে বিদ্যায়তনিক ইতিহাস চর্চায় বামপন্থীদের জায়গা দিয়েছিলেন, ললিতকলা আকাদেমি বা সাহিত্য আকাদেমি নির্মাণ করেছিলেন – সেই উদারতা। ন্যাশনাল ফিল্ম অ্যান্ড টেলিভিশন ইনস্টিটিউটে ঋত্বিক ঘটকের মত ঘোর বামপন্থী, যাঁকে কমিউনিস্ট পার্টি নিজেই হজম করতে পারেনি, তিনি পড়ানোর সুযোগ পেয়েছিলেন যে উদারনৈতিক ধারাবাহিকতায়, এনডিটিভি বস্তুত তারই অনুশীলন করেছে। ফলে তা মনমোহনী অর্থনীতির পক্ষ নেয়, আবার গান্ধী পরিবারের সমালোচনাও করে। এই জাতীয় উদারবাদীদের সঙ্ঘ পরিবারের কাছে কোনো প্রত্যাশা নেই, যত প্রত্যাশা কংগ্রেসের কাছে। স্বভাবতই কংগ্রেসের সভাপতি নির্বাচন যখন দেশের অধিকাংশ মানুষের কাছে কোনো আগ্রহের বিষয়ই নয়, তখন এনডিটিভি ঘন্টার পর ঘন্টা শশী থারুর আর মল্লিকার্জুন খড়গের সাক্ষাৎকার দেখিয়ে গেছে। মোদী সারাক্ষণের রাজনীতিবিদ, রাহুলের কেন মাঝে মাঝেই ছুটির দরকার হয় – এ কথাও এনডিটিভির মঞ্চ থেকে বহুবার উঠেছে সম্ভবত এই কারণেই। কংগ্রেস এইসব সমালোচনা খোলা মনে নিতে পারলে তাদেরই লাভ হত। সমর্থকরা না নিলেও, রাহুল স্বয়ং বোধহয় নিয়েছেন। ভারত জোড়ো যাত্রা দেখে অন্তত সেরকমই মনে হয়।

দীর্ঘ লেখা এবার শেষ করব কেন এত দীর্ঘ লেখা, কেন আদৌ এ লেখা – সে প্রশ্নের উত্তর দিয়ে।

এ দেশের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সবকটাকে পরিকল্পিতভাবে ধ্বংস করা চলছে। শুধু ধর্মীয় ফ্যাসিবাদী এজেন্ডা তার কারণ নয়। একুশ শতকের পুঁজিবাদ কোনো প্রতিষ্ঠান পছন্দ করে না। সবকিছুকেই কোম্পানি করে তোলাই তার উদ্দেশ্য। কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় হবে কেন্দ্রীয়ভাবে শীতাতপনিয়ন্ত্রিত বিলাসবহুল কোম্পানি – লেখাপড়া হোক আর না-ই হোক। সেটা লাভজনক থাকলে চালানো হবে, নয়ত বন্ধ করে দিতে হবে। কারণ শিক্ষা পণ্য। খবর এবং/অথবা তথ্য তো পণ্য বটেই। ফলে সংবাদমাধ্যমকেও প্রতিষ্ঠান থাকতে দেওয়া চলে না, তাকেও হতে হবে কোম্পানি। লাভজনক হলে চলবে, নইলে বন্ধ করে দেওয়া হবে। প্রতিষ্ঠানবিরোধী হওয়া ভাল, যদি প্রতিস্পর্ধী প্রতিষ্ঠান তৈরি করার দম থাকে। সেসব যখন আমাদের নেই, তখন আজকের পরিস্থিতিতে প্রতিষ্ঠান ভেঙে পড়া উদযাপন করা মূর্খামি। এতে গণতন্ত্রের পরিসরই যে সংকুচিত হচ্ছে সেকথা বুঝতে অসুবিধা হওয়ার কথা নয়।

অনেকেই দেখছি বিকল্প সংবাদমাধ্যমের উপর যাবতীয় দায়িত্ব চাপিয়ে দিয়ে নিশ্চিন্ত হচ্ছেন। নাগরিক ডট নেটের সদস্য হিসাবে তা দেখে মন্দ লাগে না। কিন্তু মনে রাখা ভাল, ‘বিকল্প’ কথাটা অতি গুরুত্বপূর্ণ। বিকল্পের ক্ষমতা সীমিত। যাঁরা পড়বেন তাঁরাই টাকা দেবেন, বিজ্ঞাপনের পরোয়া করতে হবে না – এই বিকল্প তৈরি হয়েছে বরখা কথিত অচল রেভিনিউ মডেলের বিকল্প খুঁজতে গিয়ে। ইংরেজিতে এই মডেল (পোশাকি নাম ক্রাউড-ফান্ডেড মিডিয়া) অনেক ক্ষেত্রেই বেশ সফল, বাংলাতেও এই মডেল নিয়ে পরীক্ষা নিরীক্ষা হবে নির্ঘাত। নাগরিক ডট নেট তো করবেই, আরও অনেকে করলে ভাল। কিন্তু এই মডেলের একটা সীমাবদ্ধতা আছে। বিজ্ঞাপন মডেলের মতই এই ব্যবস্থাতেও যিনি টাকা দেবেন নির্ঘাত তাঁর নিয়ন্ত্রণ থাকবে কনটেন্টের উপর। এক্ষেত্রে যেহেতু টাকা দিচ্ছেন অনেকে, সেহেতু একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ চলবে না বলে কনটেন্টে ভারসাম্য বজায় থাকার সম্ভাবনা অনেক বেশি অবশ্য। কিন্তু যিনি একেবারেই টাকা দিতে পারবেন না, তাঁর কথা কতটা উঠে আসবে? বাজারের যে সবজি বিক্রেতা পাঁচ টাকা দিয়ে দোকানে একটা কাগজ রাখেন বা যে রিকশাচালক বাড়ির টিভিতে দিনে অন্তত একবার খবর দেখেন, তিনি কি মোবাইলে নাগরিক ডট নেট পড়বেন টাকা দিয়ে? যদি না পড়েন, নাগরিক ডট নেট কি তাঁর সুখ দুঃখ তুলে আনার পরিশ্রম করতে পারবে? শ্রমের তো মূল্য আছে। অন্তত থাকা উচিত।

এছাড়াও আছে ঝুঁকির প্রশ্ন। ভারতের সব রাজ্যেই সাংবাদিক ও তাঁর পরিবার পরিজনদের উপর আক্রমণ ক্রমশ বাড়ছে, যে কোনো সমীক্ষায় উঠে আসছে সেই তথ্য। এনডিটিভির মত মূলধারার সংবাদমাধ্যমের সাংবাদিক তবু বিপদে পড়লে সংগঠনের আইনি ও সাংগঠনিক সাহায্য পান। নাগরিক ডট নেটের কেউ বিপদে পড়লে কার সাহায্য পাবে?

বিকল্প সংবাদমাধ্যম বা স্বাধীন সংবাদমাধ্যমগুলোর মধ্যে ইতিমধ্যেই বেশ প্রতিষ্ঠিত যারা, সেই নিউজক্লিকের দপ্তরেও কারণে অকারণে সরকারি সংস্থার রেড হয়ে থাকে। মামলা ঠুকে হয়রানি চলে নিয়মিত। এই ধরনের মিডিয়ার মধ্যে সম্ভবত সবচেয়ে জনপ্রিয় দ্য ওয়্যার। তারা কিছুদিন আগে এক কেলেঙ্কারি করে বসেছিল। বিরাট খবর করছে মনে করে বিজেপির আই টি সেলের কর্তা অমিত মালব্য এবং ফেসবুককে জড়িয়ে সম্পূর্ণ ভুল খবর পরিবেশন করেছিল। সেই খবর পরে প্রত্যাহার করতে বাধ্য হয়। ন্যক্কারজনক ঘটনা, কিন্তু সাংবাদিকতার ইতিহাসে অভূতপূর্ব নয়। যে কোনো কাজ করতে গেলেই ভুল হয়, খবর করতে গেলেও। কিন্তু সরকারবিরোধী সংবাদমাধ্যম হওয়া এখন এ দেশে বিরাট অপরাধ। তাদের ভুল অমার্জনীয়। তাই কেবল দপ্তরে নয়, দ্য ওয়্যারের প্রধান সিদ্ধার্থ বরদারাজনের বাড়িতেও পুলিস হানা দিয়ে তাঁর ল্যাপটপ, ফোন ইত্যাদি বাজেয়াপ্ত করে। সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ছাড়াই। এনডিটিভি গেল তো কী হল, বিকল্প সংবাদমাধ্যম দিয়েই কাজ চলে যাবে এই স্বপ্নে যাঁরা বুঁদ হয়ে আছেন তাঁরা এগুলো খেয়াল রাখবেন দয়া করে। এখানেই শেষ নয়। তথ্যপ্রযুক্তি আইন সংশোধন করে অনলাইন কনটেন্টের উপর সরকারি নিয়ন্ত্রণের রাস্তাও পরিষ্কার করা হয়েছে।

ফলে নাগরিক ডট নেটের মত ওয়েবসাইটও খুব নিরাপদ নয়। অতএব স্বাধীন তথা বিকল্প সংবাদমাধ্যমের উপর ভরসা রাখুন, পাশে থাকুন। পকেটের পয়সা দিয়ে এবং আরও যে যে উপায়ে পারেন। কিন্তু পা মাটিতে রাখুন। কোনো মূলধারার সংবাদ প্রতিষ্ঠানের পৃথিবীর সবচেয়ে ধনী ব্যক্তিদের একজনের হাতে চলে যাওয়ার ঘটনা উড়িয়ে দেওয়ার নয়, উল্লাস করার তো নয়ই।

নাগরিক ডট নেটে প্রকাশিত

%d bloggers like this: