স্খলনের শাস্তি

যৌনতা হল ছেনি, হাতুড়ির মত। ভাস্করের হাতে পড়লে মিকেলাঞ্জেলোর ডেভিড আর মন্দ লোকের হাতে পড়লে ধর্ষক, এমনকি শিশুধর্ষক গোলিয়াথ

broken-toy

বয়ঃসন্ধিতে বা প্রথম যৌবনে খবরের কাগজের যেসব ছবি আমরা লুকিয়ে লুকিয়ে দেখতাম তার চেয়েও রগরগে ছবি এবং লেখা এখনকার যে কোন জিনিসের বিজ্ঞাপনে।
যেসব ছবি স্কুল, কলেজ পালিয়ে কোন এলাকার এককোণে পড়ে থাকা ছারপোকাময়, দুর্গন্ধ সিনেমা হলে চলত সেসব এখন শীতাতপনিয়ন্ত্রিত হলে পপকর্ন খেতে খেতে সামাজিক সম্মান না খুইয়েই দেখা যায়। সাধারণ বলিউডি ছবির আইটেম সং, যা বাবা, মা, কাকা, পিসী, মাসি, মামা সবার সঙ্গে বসেই দেখা যায় আজকাল সেগুলোতে কিভাবে নারীকে শুধু ভোগ্যবস্তু হিসাবে দেখানো হয় তা নিয়েও অনেক লেখালিখি হয়েছে।
বেশ মনে আছে, আমরা যখন স্কুলের শেষ ধাপে তখন কোন সহপাঠী ব্লু ফিল্ম দেখেছে বললে বাকিরা এমন করে তার দিকে তাকাত যেন সে মঙ্গলগ্রহ থেকে এইমাত্র পৃথিবীতে ল্যান্ড করল। এই রেলাটা নেওয়ার অভিলাষে কেউ কেউ না দেখে থাকলেও বলত দেখেছে। অথচ শূন্য দশকের শুরু থেকেই দেখছি ক্লাস ফাইভ-সিক্স থেকেই ছেলেমেয়েদের হাতে মোবাইল, অতএব ইন্টারনেট, অতএব দেদার পর্ন।
বিদেশী পর্নোছবির এক নায়িকা আমাদের দেশে এসে রিয়েলিটি শো আর সফট পর্নে অভিনয় করে প্রায় ফেমিনিস্ট আইকন হয়ে গেলেন। অথচ নিজের দেশে, যেখানে পর্ন নিয়ে ঢাকঢাক গুড়গুড় নেই, পর্নোছবির অভিনেত্রীকে কেউ খারাপ মেয়ে বলেও ভাবে না, সেখানেও ওঁকে কেউ বিদ্রোহী, বিপ্লবী ভাবত এরকমটা শুনিনি।
সেদিন দেখলাম ‘দুপুর ঠাকুরপো’ বলে একটা বাংলা ওয়েব সিরিজ হয়েছে যার ট্রেলার অনেকেই ফেসবুকে শেয়ার করছে। বিষয়বস্তু কী? না নির্জন বউদির সাথে পাড়াতুতো ঠাকুরপোদের পরকীয়া। ট্রেলারটা দেখলেই বোঝা যায় পরকীয়া মানে এখানে কোন সূক্ষ্ম সম্পর্ক, নষ্টনীড়সুলভ প্রেম, অভিমান ইত্যাদি বোঝানো হচ্ছে না। যা বোঝানো হচ্ছে তা হল হ্যাংলা যৌনতা।
যৌন ক্ষিদে বাড়িয়ে তোলার এতরকম উপায় এবং যৌনবিকৃতির এহেন মূলধারায় অন্তর্ভুক্তির পাশাপাশি আমাদের দেশে কামনা সুস্থভাবে চরিতার্থ করার সোজা পথ এখনো সোজা নয়। আর সবাইকে নাহয় বাদই দিলাম, এখনো যে কত বিবাহিত দম্পতিকে বাড়িতে লোক এলে আলাদা শুতে হয় (নাহলে “সবাই কী ভাববে”), সপরিবারে সিনেমা দেখতে গেলে পাশাপাশি বসা চলে না (পাশাপাশি বসায় যে যৌনতার য ও নেই সেটা অনেককেই বোঝানো বেশ শক্ত) তার তালিকা তৈরি করলে ভোটার তালিকার চেয়ে ছোট হবে না।
যৌনতা হল ছেনি, হাতুড়ির মত। ভাস্করের হাতে পড়লে মিকেলাঞ্জেলোর ডেভিড আর মন্দ লোকের হাতে পড়লে ধর্ষক, এমনকি শিশুধর্ষক গোলিয়াথ। এই মহামূল্যবান জিনিসটাকে বিক্রয়যোগ্য, শস্তা পণ্য করে দেওয়ার বিরুদ্ধে প্রতিবাদকে প্রায়শই পিতৃতান্ত্রিকতা, সাংস্কৃতিক মৌলবাদ — এসব বলে ধমকে চুপ করিয়ে দেওয়া হয়। এর ফলে এদেশের পুরুষতান্ত্রিক সমাজে বিকৃত পুরুষদেরই হয়েছে সুবিধা। রাস্তাঘাটে কোন মহিলাকে দেখে কামনায় হিলহিল করা দিব্য ফ্যাশনেবল হয়ে গেছে। আগে বদ লোকেরা কোন মহিলার দিকে তাকাতে গেলেও ভাবত কেউ দেখতে পেলে কী ভাববে। এখন আর ও নিয়ে লজ্জা পাওয়ার বিশেষ কিছু থাকছে না।
অর্থাৎ বিকৃতিকে উস্কে দেওয়ার মত উপাদান চতুর্দিকে ঢালাও বিক্রি হচ্ছে। বিক্রির পক্ষে নানান যুক্তিও তৈরি হয়ে গেছে। মুশকিল হল সেসব কিনে নেওয়ার পরে কার বিকৃতি কতদূর যাবে তার সীমা বেঁধে দেওয়ার কোন উপায় নেই। মেয়েদের তো ছাড়ছেই না, যে শিশু মেয়ে হয়ে ওঠেনি আদৌ, তাকেও ছাড়ছে না।
এই ঘটনাক্রম আমরা নিজেদের চারপাশে দেখি, এবং অস্বীকার করি। এই যে কারণ নির্দেশ করার চেষ্টা করছি, এর জন্যে নির্ঘাৎ কয়েকজন তেড়ে এসে বলবেন অজুহাত দিচ্ছি। ধর্ষকদের ওকালতি করছি বললেও অবাক হব না। তাঁদেরকে আমার একটা কথাই বলার আছে। জঞ্জাল, আবর্জনা, জমা জল — এগুলো কি ডেঙ্গুর কারণ না অজুহাত? যদি আপনি মশার জন্মের রাস্তা বন্ধ করতে আগ্রহী না হন তাহলে মশাঘটিত রোগগুলো বারবার হবেই। যে বলবে ওগুলোর জন্যই ডেঙ্গু হচ্ছে তাকে যদি মশার হয়ে ওকালতি করছে বলেন তাহলে ক্ষতি আপনারই। মশা কেন কামড়াল তা নিয়ে রাগারাগি করে লাভ হবে কী?
হ্যাঁ, শিক্ষকের হাতে ছাত্রী ধর্ষিতা হলে আমাদের বেশি অসহায় লাগবে নিশ্চয়ই কিন্তু শিক্ষকরা তো আকাশ থেকে পড়েন না। আমাদের বাবা-মায়েরা যে শিক্ষকদের চোখ বুজে ভরসা করতেন তাঁরা তাঁদের সময়ের উৎপাদন, এখনকার শিক্ষকরা বর্তমান সময়ের। তাছাড়া আর সবকিছুর মত শিক্ষাও যে একটা পণ্য, শিক্ষকরা বিক্রেতা আর আমরা ক্রেতা — সে তো কবেই মেনে নিয়েছেন। তা দোকানে গিয়ে কি আপনি আশা করেন দোকানদার ভালবেসে ভাল জিনিস দেবে আপনাকে? করেন না। তাহলে শিক্ষককে বা স্কুলকেই বা একজন দোকানদারের চেয়ে বেশি বিশ্বাস করতে যাবেন কেন? পাকা ক্রেতার মত ছেলেমেয়েকে ভর্তি করার আগেই দেখে নিন যে স্কুলে ভর্তি করছেন সেখানে ছেলেমেয়ে কতটা নিরাপদ, কী কী ব্যবস্থা আছে।
আরেকটা কথাও না বলে পারছি না। জি ডি বিড়লা স্কুলের মেয়েটার ধর্ষকদের দেখে রাগে আমার গা যতটা ঘিনঘিন করছে ততটাই ঘেন্না করে যখন দেখি পাড়ার পুজোয় ধুনুচি নৃত্য প্রতিযোগিতার জায়গা নিয়েছে বুগিউগি আর সেখানে চার, পাঁচ, ছয় বছরের মেয়েরা হিন্দি আইটেম সং এ ছবির আইটেম গার্লের মতই সাজপোশাক পরে, তেমনই ভুরু নাচিয়ে, কোমর দুলিয়ে নাচছে, পুরস্কার পাচ্ছে। হাততালি দিচ্ছে তার বাবা, পাড়াতুতো কাকু, জেঠুরা। টিভির লিটল চ্যাম্পমার্কা অনুষ্ঠানে নিজের মেয়েকে প্রতিযোগী করে পাঠিয়ে এইসব নাচ নাচিয়ে গর্বিত হন যে বাবা-মায়েরা তাঁদের দেখেও আমার বমি করতে ইচ্ছা করে। জি ডি বিড়লার ঐ দুই শিক্ষককে খুব বর্বর কোন শাস্তি দেওয়া হোক, সঙ্গে এইসব বাবা-মায়েদেরও।

Author: Pratik

সাংবাদিক, লেখক। কাজ করেছেন দ্য টাইমস অফ ইন্ডিয়া, ডেকান ক্রনিকল, দ্য টেলিগ্রাফ, দ্য স্টেটসম্যান এবং অধুনালুপ্ত দ্য বেঙ্গল পোস্টে। বর্তমানে বিভিন্ন ওয়েবসাইট ও কাগজে লেখালিখি করেন। প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা ছয়।

Leave a Reply

Discover more from amarlikhon

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading