অসংসদীয় শব্দ: মুখ বুজে বাঁচা অভ্যাস করতে হবে

“কথা বোলো না কেউ শব্দ কোরো না 
ভগবান নিদ্রা গিয়েছেন 
গোলযোগ সইতে পারেন না।”

মনোজ মিত্রের নরক গুলজার নাটকের এই গান গত শতকের একটা অংশে রীতিমত জনপ্রিয় ছিল। আমাদের এঁদো মফস্বলে কলকাতার গ্রুপ থিয়েটার দেখার অভ্যাস খুব বেশি লোকের ছিল না। তৎসত্ত্বেও নব্বইয়ের দশকে অন্তত দুবার শখের অভিনেতাদের পাড়ার মঞ্চে এই নাটক করতে দেখেছি আর নারদের চরিত্রে যে-ই থাকুক, তার গলায় সুর থাক বা না থাক, এ গান গাওয়া মাত্রই দর্শকদের মজে যেতে দেখেছি। পিতামহ ব্রহ্মা টেনে ঘুমোচ্ছেন, দেবর্ষি নারদ নেচে নেচে এই গান গাইছেন – এই হল দৃশ্য। নাটকটি আগাগোড়া সরস। এখানে ব্রহ্মা একজন মানুষকে পুনর্জন্ম দেওয়ার জন্য ঘুষ নিতে যান, চিত্রগুপ্ত দেখে ফেলে আর্তনাদ করে ওঠে “উৎকোচ”। ব্রহ্মা ট্যাঁকে টাকা গুঁজতে গুঁজতে বলেন “মেলা ফাজলামি কোরো না। উৎকোচ ছাড়া আমাদের ইনকামটা কী, অ্যাঁ? আমরা কি খাটি, না এগ্রিকালচার করি, না মেশিন বানাই? অতবড় স্বর্গপুরীর এস্ট্যাবলিশমেন্ট কস্ট আসবে কোত্থেকে, অ্যাঁ?” তাছাড়া এই নাটকে একজন বাবাজি আছেন, যিনি ব্রহ্মার কৃপায় কল্পতরু থলি পাওয়া মাত্রই রম্ভাকে চেয়ে বসেন। কিন্তু থলিতে হাত ঢোকালে হাতে উঠে আসে একটি মর্তমান কলা।

আর বেশি লিখব না, কারণ বৃদ্ধ বয়সে মনোজ মিত্রকে হাজতবাস করানো আমার উদ্দেশ্য নয়। কথা হল বিশ-পঁচিশ বছর আগে একশো শতাংশ হিন্দু (নব্বই শতাংশ উচ্চবর্ণ) অভিনেতাদের দ্বারা অভিনীত এই নাটক দেখেছি, আর একশো শতাংশ হিন্দু দর্শককুলকে নাটক দেখে হেসে গড়াগড়ি খেতে দেখেছি। কিন্তু বিস্তর ধস্তাধস্তির পর মহম্মদ জুবের আজ দিল্লি পুলিসের দায়ের করা মামলাতেও জামিন না পেলে এবং জজসাহেব তাঁর রায়ে বাকস্বাধীনতা যে সাংবিধানিক অধিকার সেটি ষোড়শোপচারে মনে করিয়ে না দিলে সাহস করে এই লেখা লিখতে বসতাম না। কারণ কী লেখা যাবে, কোনটা বলা যাবে সে ব্যাপারে আজকাল আর সংবিধান চূড়ান্ত নয়, সরকারের বকলমে পুলিস চূড়ান্ত। পুলিসের অধিকারের সীমাও বেড়ে গেছে অনেক। একদা পুলিসের হাত এত ছোট ছিল, যে আশিতে আসিও না ছবিতে ভানু বন্দ্যোপাধ্যায় জলে নেমে পড়ে বলেছিলেন তাঁকে আর ধরা যাবে না, কারণ তিনি তখন জলপুলিসের আন্ডারে। আর এ যুগে আসাম পুলিসের হাত গুজরাট পর্যন্ত লম্বা, পশ্চিমবঙ্গ পুলিসের হাত গোয়া পর্যন্ত পৌঁছে যায়। দেশটা যে প্রেতপুরীতে পরিণত হয়েছে, এই বোধহয় তার সর্বোত্তম প্রমাণ। কারণ ছোটবেলায় জ্যাঠা-জেঠিদের মুখে কলকাতায় মেসে থেকে চাকরি করা এক গ্রাম্য ভদ্রলোকের গল্প শুনেছিলাম। তিনি বহুকাল পরে বাড়ি গিয়ে খেতে বসেছেন, ডালের সাথে মেখে খাবেন বলে দুটি পাতিলেবুর আবদার করেছেন। করেই দেখেন বউয়ের হাতদুটো ইয়া লম্বা হয়ে নিজের বাড়ির সীমানা পেরিয়ে পাশের বাড়ির গাছ থেকে লেবু পেড়ে নিয়ে এল। আসলে ওলাউঠার মহামারীতে গ্রাম সাফ হয়ে গিয়েছিল। ঘৃণার মহামারীতে আমাদের দেশ সাফ হয়ে গেছে। গল্পের ভদ্রলোক শহরে পালিয়ে বেঁচেছিলেন, আমরা কোথায় পালিয়ে বাঁচব জানি না। ভারত জোড়া ফাঁদ পেতেছ, কেমনে দিই ফাঁকি? আধেক ধরা পড়েছি গো, আধেক আছে বাকি।

আমরা ভারতীয়, আমরা মেনে নিতে জানি। যা যা বলা বারণ, লেখা বারণ সেগুলো মেনে নিয়ে চলব বলেই ঠিক করেছিলাম। কিন্তু দেখলাম অবাক কাণ্ড! কেবল আমরা মানিয়ে নিলে চলবে না, হাজার ভণ্ডামি ও নোংরামি সত্ত্বেও যে সংসদের দিকে আমরা তাকিয়ে থাকি তার সদস্যদের জন্যেও তালিকা তৈরি হয়েছে। ভগবান, থুড়ি সরকার, যাতে নিশ্চিন্তে নিদ্রা যেতে পারেন, কেউ গোল করতে না পারে তার নিশ্ছিদ্র ব্যবস্থা করতে কোন কোন শব্দ উচ্চারণ করা যাবে না, অর্থাৎ কোনগুলো অসংসদীয়, তার নতুন ফর্দ প্রকাশিত হয়েছে সংসদের মৌসুমি অধিবেশনের প্রাক্কালে। সেখানেই শেষ নয়, আরও বলা হয়েছে, সংসদ চত্বরে কোনো “ডেমনস্ট্রেশন”, ধর্না, ধর্মঘট করা যাবে না। এমনকি অনশন বা কোনো ধর্মীয় অনুষ্ঠানও করা যাবে না। অর্থাৎ সমস্ত শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদই গণতন্ত্রের মন্দিরে বারণ। এ হল সেই মন্দির, যেখানে প্রথমবার প্রবেশ করার সময়ে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ঘটা করে সিঁড়িতে মাথা ঠেকিয়ে প্রণাম করেছিলেন। ধর্মীয় অনুষ্ঠান করা যাবে না – এই দারুণ ধর্মনিরপেক্ষ আদেশের কারণ অবশ্য দুর্বোধ্য। কারণ মাত্র কয়েকদিন আগে নতুন সংসদ ভবনে দন্তবিকশিত সিংহের মূর্তি স্থাপন করার সময়ে প্রধানমন্ত্রী নিজে পুজো-আচ্চা করেছেন। তাহলে বক্তব্যটি কি এই, যে পুরনো মন্দিরে পুজো চলবে না, নতুন মন্দিরে চলবে? গণতন্ত্রের মন্দিরে শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ নিষিদ্ধ করার অর্থই বা কী? তাহলে কি শান্তিভঙ্গ করে যেসব প্রতিবাদ প্রণালী, সেগুলোর পথ পরিষ্কার করা হচ্ছে? মোদীজির বন্ধু ডোনাল্ড ট্রাম্প মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রপতি পদ থেকে অপসারিত হওয়ার পর ক্যাপিটল হিলে যেরকম প্রতিবাদ দেখে সারা বিশ্ব শিউরে উঠেছিল, তেমন প্রতিবাদ ছাড়া কি এ দেশে আর কোনো প্রতিবাদ করতে দেওয়া হবে না? করলেই বুলডোজার চালানো হবে? প্রতিবাদের চেহারা অবশ্য বিচিত্র। পার্শ্ববর্তী শ্রীলঙ্কায় আরেক ধরনের প্রতিবাদ হচ্ছে। প্রতিবাদের ধরনধারণ, সীমানা নির্দিষ্ট করে দেওয়া আজ পর্যন্ত কোনো দেশের কোনো শাসকের পক্ষে সম্ভব হয়নি। অবশ্য মোদীজি বালক বয়সে খালি হাতে কুমিরের মুখ থেকে ক্রিকেট বল এবং কুমিরছানা নিয়ে এসেছেন। তাঁর অসাধ্য কী?

মোদীজির সরকার কী কী পারে তা আমরা এতদিনে জেনে ফেলেছি, বিরোধীরা কী পারেন তা দেখা এখনো বাকি আছে। অসংসদীয় শব্দের তালিকার সংযোজনগুলো সেই সুযোগ এনে দিয়েছে। দু-একজন বিরোধী সাংসদ বলছেন বটে, তাঁরা নির্দেশ অগ্রাহ্য করে ওই শব্দগুলো সংসদে ব্যবহার করবেন, কিন্তু সেই ২০১৪ সাল থেকে তাঁরা যেরকম লক্ষ্মীসোনা হয়ে আছেন, তাতে না আঁচালে বিশ্বাস করা যাচ্ছে না। পালানিয়প্পম চিদম্বরমের মত দু-একজন প্রবীণ সাংসদ তো ইতিমধ্যেই টুইট করে দেখিয়েছেন, ভাষার উপর দখল থাকলেই যে শব্দগুলোকে অসংসদীয় বলে ঘোষণা করা হয়েছে সেগুলো বাদ দিয়েও সরকারের সমালোচনা করা সম্ভব। সোশাল মিডিয়ায় মস্করাও চালু হয়েছে, শশী থারুরের মত জ্যান্ত থিসরাস থাকতে আর কিসের চিন্তা? এমন সুবোধ বিরোধী থাকতে আমাদের আর কিসের চিন্তা? ইন্টারনেট জোক আর মিম সংস্কৃতি এমন গভীরে পৌঁছেছে যে সাংসদরাও গভীরে ভাবছেন না। তাঁরা বোধহয় ভেবে দেখছেন না, যে কোনো শব্দ অসংসদীয় বলে ঘোষিত হল মানে জোর করে সে শব্দ উচ্চারণ করলেও সংসদের কার্যবিবরণীতে তা নথিবদ্ধ করা হবে না। অর্থাৎ এমন ব্যবস্থা করা হয়েছে যাতে আজ থেকে পঞ্চাশ বছর পরে অন্তত সংসদের কার্যবিবরণী থেকে কোনো ইতিহাস লেখক জানতে পারবেন না যে ভারতে ‘স্নুপগেট’ বলে কিছু ঘটেছিল, কেউ ‘ডিক্টেটোরিয়াল’ ছিল বা সরকারের বিরুদ্ধে ‘তানাশাহি’-র অভিযোগ ছিল। মনোমত ইতিহাস লেখার যে ব্যবস্থা ভারতে চলছে, এ-ও যে তারই অঙ্গ, সেকথা বিরোধী দলের কেউ বুঝছেন কি? শুধু ইতিমধ্যেই লিখিত ইতিহাস বিকৃত করা নয়, এই অসংসদীয় শব্দের তালিকা যে ভবিষ্যতে যে ইতিহাস লেখা হবে তা-ও বিকৃত করার প্রচেষ্টা, তা বিরোধীরা কেউ ভেবে দেখেছেন বলে তো মনে হচ্ছে না।

আরও পড়ুন পশ্চিমবঙ্গে নির্বাচন প্রহসনে পরিণত হলে ক্ষতি নেই বিজেপির

এত সহজে ইতিহাস থেকে সত্য মুছে ফেলা যায় কিনা সে বিতর্ক নেহাতই বিদ্যায়তনিক। তা নিয়ে মাথা না ঘামিয়ে বিরোধী দলের রাজনীতিবিদদের অধিকার হরণ শুরু হওয়া মাত্রই সর্বশক্তি দিয়ে প্রতিবাদ করা উচিত। কিন্তু আমাদের বিরোধীরা তেমন করেন না। তাঁদের মধ্যে বিদ্যাসাগর কথিত গোপালরাই দলে ভারি। মাঝেমধ্যে রাহুল গান্ধী রাখাল হয়ে ওঠেন বটে, কিন্তু কদিন না যেতেই ইউরোপে দম নিতে চলে যান। সুললিত ইংরেজি বলতে পারা থারুর বা মহুয়া মৈত্র, ডেরেক ও’ব্রায়েনরাই আজকের সংসদীয় বিরোধিতার মুখ। তাঁরা ইন্দ্রজিৎ গুপ্ত বা সোমনাথ চ্যাটার্জির মত জাঁদরেল নন, সেকালের মমতা ব্যানার্জির মত ওয়েলে নেমে গিয়ে স্পিকারের মুখে কাগজ ছুড়ে মারার মত মেঠো রাজনীতিও তাঁদের আসে না। তেমন কাজ করলেও দল যে তাঁদের পাশে দাঁড়াবেই, তার নিশ্চয়তা নেই। এমন বিরোধী পেলে যে কোনো শাসকেরই পোয়া বারো হয়। তারা কাকে রাষ্ট্রপতি পদপ্রার্থী করবে তা নিয়ে অযথা মাথা ঘামায়, শেষ লগ্নে মাথা চুলকে বলে, আগে বললে তো ওনাদের প্রার্থীকেই সমর্থন করতাম। এদিকে সরকার নিশ্চিন্তে একের পর এক অধিকার হরণ করে চলে।

অতএব আমরা, সাধারণ ভারতীয়রা, আধেক ধরা পড়ে বাকি আধেকের আশঙ্কাতেই থাকি। ভ্লাদিমির পুতিনের রাশিয়া বা রচপ তৈয়প এর্দোগানের তুরস্কে মানুষ যেমন মুখ বুজে বাঁচে, তেমনভাবে বাঁচা আমাদের শিগগির অভ্যাস করে নিতে হবে। তবে অসংসদীয় শব্দের তালিকার মত হাজতে পোরার যোগ্য শব্দেরও একটা প্রকাশ্য তালিকা থাকলে আমাদের সুবিধা হয়।

https://nagorik.net এ প্রকাশিত

চিরতরে কমিউনিস্টদের পর হয়ে যাবেন না কানহাইয়া

রাহুল গান্ধীর কংগ্রেসে ডাঙ্গের দল থেকে যাওয়া কানহাইয়ার সাথে আম্বেদকরপন্থী জিগ্নেশেরও জায়গা হয়েছে। কানহাইয়া আবার প্রায় সব বক্তৃতাতেই আম্বেদকরের কথা বলে থাকেন।

পরলোক থাকলে সেখানে হয়ত শ্রীপাদ অমৃত ডাঙ্গে মুচকি হাসছেন। কারণ দীর্ঘকাল তিনি যে পার্টির প্রবাদপ্রতিম নেতা ছিলেন এবং যে পার্টি থেকে তাঁর বহিষ্কারের অন্যতম কারণ কংগ্রেসকে ভারতীয় গণতন্ত্রের কালো দিনগুলোতে সমর্থন করা, সেই পার্টির উদীয়মান নেতা দল বদলে কংগ্রেসে যোগ দিয়েছেন

এতদিনে সবাই জেনে গেছেন, কানহাইয়া জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদের প্রথম প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট নন, যিনি পরবর্তীকালে কংগ্রেসে যোগদান করলেন। কিন্তু কানহাইয়া আগের সকলের থেকে আলাদা। কারণ বিশ্ববিদ্যালয়ের চৌকাঠ পেরোবার আগেই সারা দেশ তাঁকে চিনে গেছে। ইচ্ছামত এডিট করা ভিডিও ক্লিপকে হাতিয়ার করে তাঁকে কারারুদ্ধ করা হয়েছিল। হাজতবাস করে এসেই তিনি যে বক্তৃতা দেন, তা তাঁকে রাতারাতি ঘরে ঘরে পৌঁছে দিয়েছিল। অতঃপর সুবক্তা কানহাইয়া ভাইরাল হয়ে যান। ভাইরাল ভিডিওর প্রভাব এখন ভাইরাল অসুখের চেয়ে কম নয়। ফলত কানহাইয়াকে নিয়ে কেবল বামপন্থী নয়, সমস্ত বিজেপিবিরোধী মানুষেরই প্রত্যাশা আকাশচুম্বী হয়েছিল। তিনি সিপিআই ছেড়ে কংগ্রেসে যোগ দেওয়ায় স্বভাবতই নৈতিকতার প্রশ্ন উঠেছে। কিন্তু তাছাড়াও বিষয়টিকে ভারতীয় বামপন্থার সাথে কংগ্রেসের সম্পর্কের নিরিখে দেখা প্রয়োজন।

স্বাধীনতা পরবর্তী যুগে কমিউনিস্টরা কংগ্রেসকে কীভাবে দেখবেন তা নিয়ে বরাবর ধন্দে ভুগেছেন। তার অন্যতম কারণ জওহরলাল নেহরু। ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী কেবল সামাজিক চিন্তাধারার দিক দিয়ে প্রগতিশীল ছিলেন না, তাঁর অর্থনীতিও আধা-সমাজতান্ত্রিক। তার উপর তাঁর সোভিয়েত প্রীতি সর্বজনবিদিত। সোভিয়েত সরকার স্বাধীন ভারতের প্রথম দিককার উন্নয়নেও যথেষ্ট সহায়তা করেছিল। ফলত ডাঙ্গের মত নেতারা কংগ্রেসকে শত্রু বলে ভাবতে চাননি। ১৯৫৯ সালে কেরালার নাম্বুদিরিপাদ সরকারকে নেহরু অন্যায়ভাবে ভেঙে দেওয়ার পরও নয়। অনতিকাল পরেই ভারত-চীন যুদ্ধ, কংগ্রেসের পক্ষাবলম্বন নিয়ে মতভেদ অবিভক্ত কমিউনিস্ট পার্টিতে এমন পর্যায়ে পৌঁছল, যে প্রথমবার পার্টি ভাঙল। সেই ভাঙনের মাশুল ভারতের কমিউনিস্ট আন্দোলন আজও দিয়ে চলেছে। তারপর থেকে অন্য কমিউনিস্ট পার্টিগুলোর সাথে কংগ্রেসের সম্পর্ক বেশিরভাগ সময়ে আদায় কাঁচকলায় হলেও, সিপিআইয়ের সাথে অম্লমধুর। সত্তরের দশকে কেরালায় একসঙ্গে সরকার চালিয়েছে কংগ্রেস, সিপিআই। জরুরি অবস্থার সময়ে বোধহয় অনেক কংগ্রেসির চেয়েও ইন্দিরার প্রতি সিপিআইয়ের সমর্থন বেশি সোচ্চার ছিল।

সিদ্ধার্থশঙ্কর রায়ের কংগ্রেস সরকারের আগ্রাসন সিপিএম ও নকশালদের সাথে কংগ্রেসের শত্রুতাকে চিরস্থায়ী করেছে বলে মনে হত অনেকদিন পর্যন্ত। কিন্তু নব্বইয়ের দশক থেকে সিপিএমের সাথেও কংগ্রেসের সম্পর্ক বদলেছে। দিল্লিতে কংগ্রেসি প্রধানমন্ত্রীর সরকার চলছে সিপিএমের সমর্থনে — এ একসময় অকল্পনীয় ছিল। এমনকি ২০০৪-০৯ সেই সরকার চলার পরেও ভাবা যায়নি পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভায় সিপিএম, কংগ্রেস জোট বেঁধে লড়তে পারে। তা-ও সম্ভব হয়েছে। সিদ্ধার্থশঙ্করের দমননীতিতে সম্ভবত সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিলেন নকশালরা। এই মুহূর্তে সবচেয়ে বড় সংসদীয় নকশালপন্থী দলটি কিন্তু সিদ্ধার্থশঙ্করের স্নেহভাজন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে গণতন্ত্রের রক্ষাকর্তা হিসাবে দেখে। মমতার দল কংগ্রেস থেকে বেরিয়েই তৈরি এবং পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে সর্বার্থে কংগ্রেসের জায়গাই অধিকার করেছে। অতএব ব্যক্তির নৈতিকতার প্রশ্নে কানহাইয়ার দলবদল নিন্দার্হ হতে পারে, রাজনৈতিক নীতির দিক থেকে তিনি কতটা বিচ্যুত, তা তর্কসাপেক্ষ।

আরও পড়ুন কানহাইয়ার কেরিয়ার আর কমিউনিস্ট আদর্শবাদ: তার ছিঁড়ে গেছে কবে

ভারতের কমিউনিস্ট আন্দোলন যে একশো বছরেও সারা দেশে প্রভাব বিস্তার করতে পারল না, তার কারণ হিসাবে অনেকেই আম্বেদকরপন্থীদের সঙ্গে ঐক্যের চেষ্টা না করাকে দায়ী করেন। ডাঙ্গে যখন মহারাষ্ট্রের গিরনি কামগর ট্রেড ইউনিয়নের নেতা, তখন সুবর্ণ সুযোগ এসেছিল। কিন্তু আম্বেদকরের প্রস্তাব অনুযায়ী দলিত শ্রমিকদের বস্ত্রশিল্পের বয়ন বিভাগে কাজ করতে দেওয়ার দাবিকে ডাঙ্গে আন্দোলনের দাবিতে যুক্ত করতে রাজি হননি, ফলে ঐক্য হয়নি। মজার কথা, রাহুল গান্ধীর কংগ্রেসে ডাঙ্গের দল থেকে যাওয়া কানহাইয়ার সাথে আম্বেদকরপন্থী জিগ্নেশেরও জায়গা হয়েছে। কানহাইয়া আবার প্রায় সব বক্তৃতাতেই আম্বেদকরের কথা বলে থাকেন। কংগ্রেসে বাম ঘেঁষা আর্থসামাজিক চিন্তার রাহুলই শেষ কথা হয়ে উঠবেন, নাকি কপিল সিবালের মত বৃদ্ধ সিংহেরা নিজেদের মত চাপিয়ে দিতে সমর্থ হবেন — কানহাইয়ার ভবিষ্যৎ নিঃসন্দেহে অনেকটা তার উপরেও নির্ভর করবে। তবে অদূর ভবিষ্যতেই এমন দিন আসতে পারে, যখন আজ বিশ্বাসঘাতক মনে হওয়া কানহাইয়ার হয়ে তাঁর প্রাক্তন কমরেডদের প্রচারে বেরোতে হবে।

উত্তরবঙ্গ সংবাদে প্রকাশিত