মমতা যা করেছেন তাতে তিনি জিতলেও হিন্দুত্ববাদ হারবে না পশ্চিমবঙ্গে

সারা ভারতে হিন্দুত্ববাদী নেতারা মুসলমানদের যে কুৎসিত ভাষায় আক্রমণ করেন তাঁদের ভাষণে, তারই অন্য পিঠে আছে মমতার ‘যে গরু দুধ দেয় তার লাথি খাওয়া উচিত’ মন্তব্য। ইসলাম ধর্মাবলম্বী মানুষকে মনুষ্যেতর প্রাণির সঙ্গে তুলনা করাই ওই মন্তব্যের একমাত্র খারাপ দিক নয়। ওতে বিজেপির এই প্রোপাগান্ডাতেও সিলমোহর দেওয়া হয়েছে যে মুসলমানরা মমতার দলকে ভোট দেয় বলে তারা যা ইচ্ছে তাই করতে পারে এই রাজ্যে।

ললিপপ বনাম আমলকী। যে ভূখণ্ডে রাজনীতি করেছেন এবং বক্তৃতা দিয়েছেন সুরেন্দ্রনাথ ব্যানার্জি, চিত্তরঞ্জন দাশ, সুভাষচন্দ্র বসু, ফজলুল হক, শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জি, যোগেন মন্ডল, জ্যোতি বসু, হীরেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়, মওলানা ভাসানী, তাজউদ্দীন, মুজিবুর রহমানরা – সেই ভূখণ্ডের রাজনৈতিক বিতর্ক হয়ে দাঁড়িয়েছে ললিপপ বনাম আমলকীর বিতর্ক।

নিজেদের দূরদৃষ্টিহীন বিদেশনীতির চক্করে পড়ে যাওয়া ভারত সরকার শেষপর্যন্ত শীর্ষস্থানীয় কূটনীতিবিদদের মাধ্যমে বাংলাদেশের তদারকি সরকারের সঙ্গে আলোচনার পরিবেশ তৈরি করতে সফল হয়েছে। সেই বৈঠকে উত্তেজনার পারদ নেমেছে। ভারত সরকারের পক্ষ থেকে সংখ্যালঘুদের উপর নির্যাতনের প্রতিকার করতে যেমন বলা হয়েছে, বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকেও জানানো হয়েছে কী কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে এবং হবে। অথচ পশ্চিমবঙ্গে উত্তেজনা কমার নাম নেই। তাতে ধুয়ো দিচ্ছেন স্বয়ং মুখ্যমন্ত্রী, যাঁর এ বিষয়ে গরম গরম কথা বলার কোনো প্রয়োজন ছিল না, সাংবিধানিক এক্তিয়ারও নেই। পশ্চিমবঙ্গ বিজেপির নেতা, কর্মীরা লোকসভা নির্বাচনে এবং সদ্যসমাপ্ত উপনির্বাচনে পর্যুদস্ত হওয়ার পর ভেসে যেতে যেতে খড়কুটোর খোঁজ করছিলেন, চট্টগ্রামের অশান্তি তাঁদের পাড়ে তুলে দিয়েছে। ফলে তাঁরা যে দায়িত্বজ্ঞানহীন মন্তব্য করে, ওপারের হিন্দুদের প্রতি প্রবল প্রীতি প্রদর্শন করে এপারের হিন্দু ভোট একত্রিত করতে চাইবেন তা প্রত্যাশিত। তবলার বাঁয়ার মত যুদ্ধবাজ এবং টিআরপিবাজ মিডিয়ার সাংবাদিকরাও যে যা মুখে আসে তাই বলবেন তাও জানা কথা। কিন্তু মমতা ব্যানার্জির কী প্রয়োজন ছিল বাংলাদেশি সেনার কিছু অবসরপ্রাপ্ত আধিকারিক আর বাংলাদেশ ন্যাশনালিস্ট পার্টির (বিএনপি) একজন নেতা, যাঁরা বাংলাদেশ সরকারের কেউ নন, তাঁদের মন্তব্যের জবাবে খোদ বিধানসভায় দাঁড়িয়ে বলার ‘এত বড় হিম্মত, আপনাদের কেন, কারো নেই যে বাংলা, বিহার, উড়িষ্যা সব নিয়ে নেবেন আর আমরা বসে বসে ললিপপ খাব’?

এর জবাবে আবার বিএনপির ওই নেতা, রুহুল কবীর রিজভি, বলেছেন ‘আপনারা যদি চট্টগ্রামের দিকে তাকান, তাহলে আমরা কি আমলকী মুখে চুষব?’

মানে দুই দেশের সরকার – যাদের হাতে বিদেশনীতি এবং প্রতিরক্ষা – তারা কেউ কারোর এলাকা দখল করার হুমকি দেয়নি। পশ্চিমবঙ্গের কিছু বিজেপি নেতা আর বিজেপি প্রোপাগান্ডার প্রচারক (নামে সাংবাদিক) বাংলাদেশের বিরুদ্ধে আক্রমণাত্মক মন্তব্য করলেন। তার জবাবে বাংলাদেশের কিছু লোক, যাঁদের কোনো ক্ষমতাই নেই, তাঁরা পালটা গা গরম করা মন্তব্য করলেন। পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী সেই মন্তব্যের ততোধিক অর্থহীন জবাব দেওয়ার জন্য বেছে নিলেন রাজ্যের আইনসভাকে। কেন? বাংলাদেশের অবসরপ্রাপ্ত সেনা অফিসারদের আর বিএনপি নেতার মেজাজ কেন বিগড়ে গেল, সে ভাবনা ওঁদের দেশের মানুষের উপর ছেড়ে দিয়ে আমরা বরং আমাদের মুখ্যমন্ত্রীর উত্তেজনার কারণ অনুসন্ধান করি।

বাংলাদেশের ঘটনাবলীতে প্রথম থেকেই মনে হচ্ছে মমতা যেন কত কট্টরপন্থী প্রতিক্রিয়া দিতে পারেন তার প্রতিযোগিতায় নেমেছেন বিজেপির সঙ্গে। ললিপপের বদলে আমলকীর হাস্যকর মন্তব্য করার সময়ে রিজভি এমন একটা কথা বলেছেন যা প্রণিধানযোগ্য। বলেছেন মমতাকে ওঁরা ধর্মনিরপেক্ষ, অসাম্প্রদায়িক বলে ভাবতেন। কিন্তু বাংলাদেশে সম্মিলিত জাতিপুঞ্জের শান্তিরক্ষী বাহিনী পাঠানোর কথা বলে মমতা নাকি প্রমাণ করে দিয়েছেন যে তিনিও আসলে কট্টরপন্থী হিন্দু। মমতার ওই প্রস্তাবে সত্যিই তা প্রমাণ হয় কিনা তা তর্কসাপেক্ষ, কিন্তু একথা অস্বীকার করার উপায় নেই যে ওই মন্তব্য বিজেপির চেয়েও চরমপন্থী। নরেন্দ্র মোদীর সরকার সেই জওহরলাল নেহরুর আমল থেকে চলে আসা সর্বসম্মত বিদেশনীতি ত্যাগ করে বহু ক্ষেত্রে আমূল পরিবর্তন ঘটিয়েছে। যেমন প্যালেস্তাইনের প্রতি মিত্রতার নীতি ত্যাগ করে ইজরায়েলের বন্ধু হয়ে উঠেছে। কিন্তু একটা ব্যাপারে এখনো চিরকালীন নীতি বজায় রাখা হয়েছে, তা হল অন্য দেশের সঙ্গে ভারত সরকারের গোলমালকে দ্বিপাক্ষিক বিষয় হিসাবে দেখা। এমনকি কাশ্মীর সমস্যাকেও অতীতের কংগ্রেস এবং যুক্তফ্রন্ট সরকারগুলোর মতই মোদী সরকার ভারত-পাকিস্তানের দ্বিপাক্ষিক সমস্যা হিসাবেই দেখে। কোনো তৃতীয় পক্ষের হস্তক্ষেপ চায় না। অথচ মমতা সটান একটা সার্বভৌম প্রতিবেশী রাষ্ট্র, যেখানকার সংখ্যালঘুরা আক্রান্ত হলে ভারতের স্বার্থও বিঘ্নিত হতে পারে, তাদের আভ্যন্তরীণ গোলমালে সম্মিলিত জাতিপুঞ্জের শান্তিবাহিনী পাঠানোর দাবি করে বসলেন!

মমতা প্রবীণ রাজনীতিবিদ, মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার আগে একাধিকবার কেন্দ্রীয় মন্ত্রীও ছিলেন। ফলে তাঁর এত চরমপন্থী অবস্থানের রাজনৈতিক প্রভাব সম্পর্কে তিনি সচেতন নন এমন ভাবার কারণ নেই। যা হওয়ার তাই হয়েছে, পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রীর এহেন আচরণে বাংলাদেশে প্রতিক্রিয়া হয়েছে। শান্তিবাহিনীর কথা বলায় খোদ বাংলাদেশ সরকার অসন্তোষ প্রকাশ করেছে। মহম্মদ ইউনুসের প্রেস সচিব শফিকুল আলম বলেছেন ‘আমরা অবাক হয়েছি ওঁর মন্তব্যে। এক জন মুখ্যমন্ত্রীর তো কথার ওজন থাকবে? তা ছাড়া এখানে যাঁরা পড়তে বা কোনও কাজে এসেছেন, সেই ভারতীয়রা নিরাপত্তার অভাব বোধ করছেন, এমন কোনও খবর আমাদের কাছে নেই।’ এরপরেও মমতা সুর নরম করেননি। ললিপপ-আমলকীর যুদ্ধে এসে পৌঁছেছেন। এর একটাই অর্থ হয়। কোনো বিষয়ে আন্দোলন করে রাজ্য সরকারকে ফ্যাসাদে ফেলতে অক্ষম বঙ্গ বিজেপি বাংলাদেশে হিন্দুদের উপর নির্যাতনকে যেভাবে আঁকড়ে ধরেছে, তাতে মমতা হিন্দু ভোট হারানোর আশঙ্কা করছেন। আশঙ্কা সত্যি হলে ক্ষমতা হাতছাড়া হতে পারে। তাই আর বছর দেড়েক পরের বিধানসভা নির্বাচনের কথা মাথায় রেখে তিনি যে বিজেপির চেয়েও বড় হিন্দু তা প্রমাণ করতে উঠে পড়ে লেগেছেন। তাতে প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষতি হল কি না হল তা ভেবে দেখার সময় নেই।

বিজেপিকে আটকানোর তাড়নায় এবং বামপন্থীদের দুর্বলতায় পশ্চিমবঙ্গের ধর্মীয় সংখ্যালঘু ভোটারদের কাছে একমাত্র পছন্দ হয়ে দাঁড়িয়েছে তৃণমূল কংগ্রেস। তার সুযোগ নিয়ে মমতা বাংলার মুসলমানদের প্রতি যথেচ্ছ অন্যায় করে চলেছেন। মমতার শাসনে এ রাজ্যের মুসলমানদের বলার মত আর্থসামাজিক উন্নয়নের কোনো দৃষ্টান্ত নেই। অথচ সারা ভারতে হিন্দুত্ববাদী নেতারা মুসলমানদের যে কুৎসিত ভাষায় আক্রমণ করেন তাঁদের ভাষণে, তারই অন্য পিঠে আছে মমতার ‘যে গরু দুধ দেয় তার লাথি খাওয়া উচিত’ মন্তব্য। ইসলাম ধর্মাবলম্বী মানুষকে মনুষ্যেতর প্রাণির সঙ্গে তুলনা করাই ওই মন্তব্যের একমাত্র খারাপ দিক নয়। ওতে বিজেপির এই প্রোপাগান্ডাতেও সিলমোহর দেওয়া হয়েছে যে মুসলমানরা মমতার দলকে ভোট দেয় বলে তারা যা ইচ্ছে তাই করতে পারে এই রাজ্যে। রেড রোডে ঈদের নমাজে গিয়ে নির্বাচনী কথাবার্তা বলেও তিনি রাজ্যের মুসলমানদের বিপদ বাড়িয়েছেন। রাজ্যের হিন্দুদের মধ্যে যতজন ইমাম, মোয়াজ্জেমদের সরকারি ভাতা দেওয়া সংখ্যালঘু তোষণ বলে মনে করেন, তার অর্ধেকও বোধহয় পুরোহিত ভাতার কথা মনে রাখেননি। দুর্গাপুজো করতে সরকারের টাকা দেওয়াও যে হিন্দু তোষণ, তা তিন শতাংশে নেমে আসা বামপন্থী ভোটারও মানতেই চান না। মমতা এসব ভালই বোঝেন। তাই সম্ভবত তিনি ঠিক করেছেন, ২০১১ সাল থেকে চালিয়ে আসা নরম হিন্দুত্ববাদ আর যথেষ্ট নয়। এবার একেবারে কট্টর হিন্দুত্ববাদী হয়ে উঠতে হবে।

অযোধ্যায় যেখানে বাবরি মসজিদ ছিল ঠিক সেখানেই সুবিশাল রামমন্দির বানিয়ে দেখিয়ে দিয়েছেন মোদী। ২০২৪ লোকসভা নির্বাচনের আগেই কাজ শেষ না হওয়া সত্ত্বেও সেই মন্দির উদ্বোধন করেছেন। তাতে নির্বাচনী লাভ হয়েছে কি হয়নি তা অন্য আলোচনার বিষয়। কিন্তু ২০২৬ বিধানসভার অনেক আগেই মমতাও দীঘায় জগন্নাথধাম বানিয়ে, বাংলা খবরের চ্যানেলের ভাষায়, ‘পালটা দিলেন’। বাংলাদেশে যে ইস্কন এই মুহূর্তে আক্রান্ত বলে অভিযোগ, সেই সংগঠনের সাধুদের পাশে নিয়েই মমতা বুধবার ঘোষণা করলেন যে আগামী অক্ষয় তৃতীয়ায় ওই মন্দিরের উদ্বোধন হবে।

কে জানে মোদীর মত মমতাও প্রাণপ্রতিষ্ঠা ইত্যাদি দায়িত্ব নিজেই পালন করবেন কিনা। তাঁর প্রগতিশীল সমর্থকরা যতই তাঁর উপর সাবল্টার্নত্ব আরোপ করুন, মুখ্যমন্ত্রী যে সাক্ষাৎ ব্রাহ্মণসন্তান তাতে তো ভুল নেই। সুতরাং করতেই পারেন। প্রধানমন্ত্রী ও জিনিস করায় আমরা বিস্তর চেঁচামেচি করেছিলাম রাষ্ট্রের সঙ্গে ধর্মের দূরত্ব ঘুচিয়ে দিয়ে ধর্মনিরপেক্ষ সংবিধানের শ্রাদ্ধ করা হল অভিযোগ তুলে। কিন্তু সরকারি টাকায় জগন্নাথের মন্দির বানালেও যে একই কাজ হয় সেকথা আমরা বলিনি, বলবও না। কারণ আমরা বাঙালি প্রগতিশীলরা জানি, মমতার সিদ্ধান্তে তৈরি মন্দির হল ধর্মনিরপেক্ষ মন্দির। আর তিনি যদি নিজে হাতে প্রাণপ্রতিষ্ঠা করেন তাহলে তা দেখে বিজেপির ভোটাররাও তৃণমূলকে ভোট দিয়ে দেবেন। সুতরাং সেটা হবে হিন্দুত্ববাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে ধর্মনিরপেক্ষতার জয়।

শুভেন্দু সম্ভবত সেই আশঙ্কাতেই চেঁচামেচি আরম্ভ করেছেন। তিনি হঠাৎ রাষ্ট্র আর ধর্মের পৃথকীকরণ সম্পর্কে ভারি সচেতন হয়ে বলে উঠেছেন ‘সরকারি টাকায় কোনো মন্দির, মসজিদ, গির্জা, গুরদোয়ারা করা যায় না…আমরা রামমন্দির বানিয়েছি হিন্দুদের টাকায়, সরকারের টাকায় নয়’। আরও বলেছেন, মমতা যা বানিয়েছেন ওটা নাকি মন্দিরই নয়। তিনি কাদের যেন মেদিনীপুরে নিয়ে এসে ধর্মসম্মেলন করে প্রমাণ করে দেবেন যে ওটা মন্দির নয়, ফলে মমতার ভণ্ডামি ফাঁস হয়ে যাবে। আরেক নেতা তরুণজ্যোতি তিওয়ারি আবার টিভি স্টুডিওতে বসে হুগলী আর মালদা জেলার দুটো মসজিদকে আসলে মন্দির বলে দাবি করে সেখানে পুজো দেওয়া যাবে কিনা সে প্রশ্ন খুঁচিয়ে তুলেছেন।

মোদ্দাকথা, ক্রমশ পরিষ্কার হয়ে যাচ্ছে যে ২০২১ সালের মত ২০২৬ সালের নির্বাচনও তৃণমূল সরকার পাঁচ বছরে কতটা কী কাজ করল না করল, তা নিয়ে হবে না। সরকারি দল এবং সরকারের দুষ্কর্ম বা দুর্নীতি নিয়েও নয়। কারণ কেবল সরকার নয়, রাজ্যের প্রধান বিরোধী দলও তা চায় না। আর জি কর কাণ্ড নিয়ে আন্দোলনে তারা কোনো ভূমিকা নিতে পারেনি বলে ও ব্যাপারটা সকলে ভুলে গেলেই তারা খুশি হত। ঠিক সেটাই হয়েছে। আন্দোলনকারীরা মিইয়ে গেছেন তো বটেই; মৃতার জন্যে ন্যায়বিচার চাই, কিন্তু ডাক্তাররা ধান্দাবাজ ও দুর্নীতিগ্রস্ত – এই যুক্তিতে যাঁরা আর জি কর আন্দোলনের প্রাণপণ বিরোধিতা করেছিলেন, তাঁরাও আর খবর রাখছেন না যে সরকারি কর্মচারী সন্দীপ ঘোষের বিরুদ্ধে চার্জশিট দিতে গেলে রাজ্য সরকারের যে অনুমতি প্রয়োজন সেটা সরকার দিচ্ছে না। তা নিয়ে তাঁরা সরকারের কৈফিয়ত তলব করছেন না, টুঁ শব্দটিও করছেন না। বরং অনেকে বলছেন, সন্দীপ ছাড়া কি আর কোনো দুর্নীতিগ্রস্ত ডাক্তার নেই রাজ্যে? একা ওকেই কেন শাস্তি পেতে হবে? সত্যিই তো। বেচারা সন্দীপ! যা নিয়ে টানা আড়াই মাস আন্দোলন চলল, মাস চারেক যেতেই যখন সে ব্যাপারটা এরকম দাঁড়িয়েছে, তখন আগামী দেড় বছরে সরকার যা-ই করুক না কেন, সেগুলো ভুলতেও সময় লাগবে না।

তাহলে কোন প্রশ্নে ভোট হবে? বাংলাদেশ নিয়ে হাওয়া গরম করে রাজ্য বিজেপি এইটুকু নিশ্চিত করতে পেরেছে যে মমতাকেও হিন্দু ভোটের জন্যে ঝাঁপাতে হবে। অর্থাৎ সংখ্যালঘুদের ভোটার হিসাবে অপ্রাসঙ্গিক করে দেওয়ার যে কাজ সঙ্ঘ পরিবার সারা ভারতে করতে চায় এবং অনেকটা করেও ফেলেছে, তৃণমূল সরকারের ১৫ বছরের মাথায় সে কাজ মোটামুটি সম্পূর্ণ হয়েছে পশ্চিমবঙ্গে। ২০২১ সালে বিজেপিকে আটকাতে হবে – এই প্রশ্নে ভোট হয়েছিল। তাই বহু ধর্মনিরপেক্ষ মানুষ তৃণমূলের কাজকর্মে বিরক্ত হওয়া সত্ত্বেও মমতাকেই ভোট দিয়েছিলেন। এবার মমতাও কে বড় হিন্দু – সেই প্রশ্নের দিকেই নির্বাচনকে নিয়ে যাচ্ছেন। হিন্দুদের মধ্যে যাঁরা নিজেদের ধর্মনিরপেক্ষ বলে এতদিন দাবি করতেন, তাঁদের অনেকের গত একমাসে যে চেহারা বেরিয়ে পড়েছে তাতে বিজেপিকে আটকাতে তাঁরা সকলে আর আগ্রহী কিনা তাতে সন্দেহ আছে। হিন্দুত্ববাদের এর চেয়ে বড় সাফল্য আর কী হতে পারত? এরপর মমতা হারলে হিন্দুত্ববাদ জিতবে তো বটেই, মমতা জিতলেও হিন্দুত্ববাদ হারবে না।

অবশ্য মমতা হারবেন কেন? শুভেন্দু যতই লাফালাফি করুন, মোহন ভাগবত কি আর শুভেন্দুর মত কোনো মন্দিরকে ‘কালচারাল সেন্টার’ বলে হেলাফেলা করতে রাজি হবেন? বাংলাদেশ সম্পর্কে মমতা যা যা বলেছেন, সেগুলো কি মোদী বা অমিত শাহেরও মন কি বাত নয়? নেহাত প্রধানমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর মত পদে থাকলে ওসব কথা বলা যায় না তাই। অন্য কেউ বলে দিলে মন্দ কী? যা নিয়ে কথা বললে মোদী, শাহদের পছন্দ না-ও হতে পারে তা নিয়ে তো মমতা বা তাঁর দল কিছু বলছে না। সংসদের শীতকালীন অধিবেশন শুরু হওয়ার পর থেকে তো মনে হচ্ছে মহুয়া মৈত্র কংগ্রেস সাংসদ বা নির্দল। কারণ গৌতম আদানি নিয়ে আলোচনা চেয়ে রাহুল গান্ধীরা যে হল্লা করছেন তাতে মমতার দল যোগ দিতে চাইছে না। একা মহুয়াই সোশাল মিডিয়ায় আদানি নিয়ে গলা ফাটিয়ে যাচ্ছিলেন। তৃণমূল বলেছে ওটা নাকি সাধারণ মানুষের ইস্যু নয়, যদিও আদানি গ্রুপে শুধু স্টেট ব্যাংক আর এলআইসির মাধ্যমে মধ্যবিত্তের টাকা আটকে আছে তা নয়। বিদ্যুৎ বিতরণের ব্যবসা থেকে শুরু করে ভোজ্য তেলের ব্যবসা পর্যন্ত সবেতে আদানি গ্রুপ থাকায় তাদের হাতে লুণ্ঠিত হচ্ছেন গরিব মানুষও। আবার এই যে চতুর্দিকে মসজিদের নিচে, মাজারের নিচে মন্দির ছিল দাবি করে মামলা ঠুকছে হিন্দুত্ববাদীরা – তা নিয়েও ধর্মনিরপেক্ষ চূড়ামণি মমতা একটি শব্দ উচ্চারণ করেননি। কংগ্রেস হরিয়ানা, মহারাষ্ট্রে হারের সম্মুখীন হতেই ইন্ডিয়া জোটের নেতৃত্ব মমতার হাতেই তুলে দেওয়া উচিত – এই মর্মে বয়ান দিতে শুরু করেছেন তৃণমূলের মুখপাত্ররা; সমর্থন করছেন অখিলেশ যাদব, শরদ পাওয়ার, লালুপ্রসাদ প্রমুখ। অথচ এইসব জাতীয় স্তরের ব্যাপার বা অখিলেশের রাজ্যের সম্ভলের সাম্প্রদায়িক হিংসা নিয়ে এক লাইন প্রতিক্রিয়া দেননি নেত্রী।

একমাত্র রাজ্যসভার চেয়ারম্যান হিসাবে জগদীপ ধনখড়ের বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রস্তাবে কংগ্রেসের সঙ্গে একমত হয়েছে তৃণমূল। কিন্তু লোকসভা নির্বাচনের আগে শেষ অধিবেশনে অন্য দলের মত মমতার দলের সাংসদদেরও ধনখড় সাসপেন্ড না করলে কি সেটুকুও করা হত? সন্দেহ করতেই হচ্ছে, কারণ পশ্চিমবঙ্গের রাজ্যপাল পদে ধনখড়ের উত্তরসূরি সি ভি আনন্দ বোসের সঙ্গে প্রায় সব বিষয়ে ‘কাম অন ফাইট, কাম অন ফাইট’ করার পরে, এমনকি তাঁর বিরুদ্ধে রাজভবনের এক মহিলা কর্মীকে যৌন হয়রানি করার মত গুরুতর অভিযোগ ওঠার প্রেক্ষিতে বৈঠক করতে পর্যন্ত রাজ্যপালের কাছে যাবেন না বলার পরে হঠাৎ গত সোমবার কোন দেবতা সে, কার পরিহাসে, দুজনের ভাব হয়ে গেছে। ধনখড়ের বেলাতেও একটুখানি আড়ি আর সারাজীবন ভাব হয়েছিল। রাজ্যপাল পদে যাঁকে ঘোর অপছন্দ ছিল, উপরাষ্ট্রপতি পদে তাঁর বিরুদ্ধে বিরোধীদের প্রার্থী মার্গারেট আলভাকে সমর্থন করেনি তৃণমূল।

এভাবে একে অন্যকে বিপদে না ফেলে এবং নিঃশব্দে বিরোধ মিটিয়ে ফেলে যদি দিন চলে যায়, তাহলে আর মমতাকে হারানোর জন্যে বিজেপির উতলা হবার দরকার কী? তবে এখানে একটা বিধিসম্মত সতর্কীকরণ দিয়ে রাখা দরকার – পাশেই ওড়িশায় এমনই সাতে পাঁচে না থাকা, দীর্ঘদিনের নিরঙ্কুশ বিজয়ী নবীন পট্টনায়ককে এবছর বিজেপির কাছে মসনদ খোয়াতে হয়েছে।

আরো পড়ুন ভীরুদের হাতে ভারতের গণতন্ত্র রক্ষার ভার, তাই বিরোধী জোট নড়বড়ে

লেখাটা এখানেই শেষ করা যেত। কিন্তু ভারতের অন্য রাজ্যের সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গের তফাত আছে। অন্যত্র শাসক, বিরোধী – দুই পক্ষের সমালোচনা করলে মিটে যায়। কিন্তু এ রাজ্যে সেখানেই থেমে গেলে চলে না। প্রকৃত বিরোধীর অভাব এবং তেমন একটা শক্তির জন্যে মানুষের হাহাকার এমন জায়গায় পৌঁছেছে যে গায়ক, নায়ক, কবি – সকলের থেকেই তাঁরা বিরোধিতা দাবি করেন এবং দাবি পূরণ না হলে গাল দেন। ইদানীং লক্ষ করছি, আমাদের মত চুনোপুঁটি সাংবাদিকের লেখা পড়েও অনেকে মন্তব্য করছেন ‘অল্টারনেটিভটা কী’ বা ‘করণীয় কী’? অনেকে আরও এক ধাপ এগিয়ে বলে দিচ্ছেন যে বিকল্প না বলতে পারলে কিছু লেখাই উচিত নয়। যেন প্রশ্ন তোলা নয়, সব প্রশ্নের উত্তর দেওয়াই সংবাদমাধ্যমের কাজ। আবার কেউ কেউ ঘোষণা করে দিচ্ছেন, বিকল্প বলছে না মানে ও আসলে অমুক পক্ষে বা তমুক পক্ষে। সংবাদমাধ্যম সম্পর্কে এই ভুল ধারণা তৈরি হওয়ার জন্যে অবশ্য সাংবাদিকরাই দায়ী। আসলে যে নিরপেক্ষতা বলে কিছু হয় না, বিশেষত আজকের পৃথিবীতে সাংবাদিকের নৈর্ব্যক্তিকতার ধারণাও বদলে ফেলা দরকার, তা নিয়ে বিস্তর লেখালিখি আছে। আগ্রহীরা উদাহরণ হিসাবে এই লেখাটা পড়ে দেখতে পারেন। তা সত্ত্বেও একথা ঠিকই যে সাংবাদিকরা তাঁদের উদ্দেশ্যকে সন্দেহ করার একাধিক কারণ রোজ জুগিয়ে চলেছেন।

ঠিক তেমনই পশ্চিমবঙ্গের মানুষের রাজনীতির বাইরের লোকের মধ্যে বিরোধী খোঁজা এবং না পেলে ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠার জন্যেও বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোই দায়ী। বিজেপি আর তৃণমূল যে মুদ্রার এ পিঠ ও পিঠ সেকথা কেউ না-ও মানতে পারেন, কিন্তু বিজেপি যে বিধানসভার ভিতরে বা বাইরে সাধারণ মানুষের দাবিদাওয়া নিয়ে আন্দোলন করে না তা সাদা চোখেই দেখা যায়। কংগ্রেস তো বামফ্রন্ট আমলেই প্রান্তিক শক্তি হয়ে গিয়েছিল, রইল বাকি বামপন্থীরা।

রাজ্যের বৃহত্তম বামপন্থী দল বিরোধিতা করবে কী; ইদানীং বুঝেই উঠতে পারে না তারা কোনো পার্টি, নাকি এনজিও, নাকি কোম্পানি। তাই কখনো কিছুটা জনপ্রিয় হয়ে ওঠা যুবনেত্রী মীনাক্ষী মুখার্জিকে পাহাড় থেকে সাগর হাঁটিয়ে ভাবে ভোট পাওয়া যাবে, কখনো মনে করে অতিমারীতে বা অন্য সময়ে অসুস্থ মানুষের শুশ্রূষা করে বা অক্সিজেন সিলিন্ডার পৌঁছে দিয়ে ভোট পাওয়া যাবে, কখনো পতাকা বাদ দিয়ে কোনো আন্দোলনে ঢুকে পড়ে জনসমর্থন ফেরত আসবে মনে করে, কখনো আবার পেশাদার লোক দিয়ে কিছু হিসাবনিকাশ করালেই সব ঠিক হয়ে যাবে মনে করে। নির্বাচনের ফল বেরোলে কোনোটাই কাজে লাগল না দেখে সদস্য, সমর্থকরা অভিমান করেন আর সোশাল মিডিয়ায় — নেতৃত্বের বারণ অমান্য করে – সরকারি প্রকল্পে উপকৃত গরিব মানুষকে গালাগালি দেন। এই ‘বাহির-পানে চোখ মেলেছি, আমার হৃদয়-পানে চাই নি’ অবস্থা কাটিয়ে উঠতে না পারলে তৃণমূল, বিজেপিকে পরাস্ত করার জায়গায় পৌঁছনো শক্ত। নবীন ইন্ডিয়ান সেকুলার ফ্রন্ট না পুরনো নকশাল, নাকি প্রাচীন কংগ্রেস – কাদের সঙ্গে জোট করলে ভোট ফেরত আসবে তা ভাবতেই দিন যাবে।

সিপিএম বা বামফ্রন্টের বাইরেও কিছু বামপন্থী আছেন পশ্চিমবঙ্গে। কিন্তু তাঁরা সিপিএমের শূন্যস্থান পূরণ করার কোনো সম্ভাবনা তৈরি করতে পারেননি সিপিএম হীনবল হয়ে যাওয়ার পরেও।

সুতরাং হতাশাজনক হলেও, সত্যি কথাটা হল, ফ্যাসিবাদ বা হিন্দুত্ববাদকে পরাজিত করেছি বলে যে উল্লাস পশ্চিমবঙ্গবাসী ২০২১ এবং ২০২৪ সালের নির্বাচনের ফল বেরোবার পর করেছিলেন তা যে অকারণ ছিল সেকথা স্বীকার করার সময় এসে গেছে। এখন ‘আমাদের ডান পাশে ধ্বস/আমাদের বাঁয়ে গিরিখাত…।’

নাগরিক ডট নেট ওয়েবসাইটে প্রকাশিত

ভারত বনাম ইন্ডিয়া: আমাদের সেই তাহার নামটি

মোহন ভাগবত বলেছিলেন ধর্ষণের মত অপরাধ ভারতে প্রায় ঘটেই না, ওসব হয় ইন্ডিয়ায়। কারণ ভারত প্রাচীন দিশি মূল্যবোধে চলে, ইন্ডিয়া চলে পাশ্চাত্য শিক্ষা অনুযায়ী। সেটাই ধর্ষণের কারণ। দেশের নাম ইংরিজিতেও ইন্ডিয়া থেকে ভারত করে দেওয়ার প্রয়াসকে এই আলোয় দেখতে হবে।

যা রটে তার কিছু

যেদিন বিজেপিবিরোধী জোটের নামকরণ হল ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল ডেভেলপমেন্টাল ইনক্লুসিভ অ্যালায়েন্স, সংক্ষেপে ইন্ডিয়া, সেদিন সঙ্ঘ পরিবারের প্রবল বিরোধী এক অগ্রজ বন্ধু বলেছিলেন “সবই ভাল, কিন্তু সেই অ্যাংলোফাইল নামটাই ধরে থাকতে হল? ইন্ডিয়া না করে কোনোভাবে ভারত করা গেল না নামটা?” তিনিও অবশ্য স্বীকার করেছিলেন, গত এক দশকে ভারতীয় রাজনীতিতে যেভাবে বিজেপিই ঠিক করে দিয়েছে ইস্যু কোনটা আর বিরোধীরা কেবল তার বিরোধিতা করে গেছে, সেই ধারা উলটে দিয়েছে ওই নাম। পরিষ্কার দেখা যাচ্ছিল, সরকারি দলের মুখপাত্র এবং তাদের কুখ্যাত আই টি সেল হিমশিম খাচ্ছে। কারণ রাজনৈতিক আলোচনার যে মানদণ্ড তারাই তৈরি করেছে, তাতে ইন্ডিয়া নামধারী কাউকে ‘অ্যান্টি-ন্যাশনাল’ বলা চলে না। বললেই পালটা আক্রমণ হবে “তার মানে আপনি অ্যান্টি-ইন্ডিয়া?” নাম যে সবকিছু নয়, চরম দেশদ্রোহী কোনো দলও নিজের নামের সঙ্গে দেশের নাম জুড়তেই পারে – এই যুক্তির বাজার বিজেপি নিজেই বন্ধ করে দিয়েছে বহুকাল হল। বিজেপিশাসিত উত্তরপ্রদেশে এলাহাবাদের নাম বদলে প্রয়াগরাজ রাখা হয়েছে, মোগলসরাই হয়ে গেছে দীনদয়াল উপাধ্যায় নগর। এগুলো তো প্রাচীন জায়গা, সাম্প্রতিককালে ঝাঁ চকচকে শহর হয়ে ওঠা গুরগাঁওয়ের নাম পর্যন্ত বদলে গুরুগ্রাম করে দেওয়া হয়েছে। দিল্লির ঔরঙ্গজেব রোডেরও নাম বদলে গেছে। কারণ বিজেপি তথা সঙ্ঘ পরিবার মনে করে নাম ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ। এখন প্যাঁচে পড়ে শেক্সপিয়র সাহেবের মত নামে কী আসে যায় বললে নিজেদের সমর্থকরাই শুনবে না। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর মুখনিঃসৃত বাণী সমর্থকদের কাছে অমৃতসমান। তাই তিনি সন্ত্রাসবাদী সংগঠনের নামেও ইন্ডিয়া থাকে বলে খেলা ঘুরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। লাভ হল না দেখে শেষ চেষ্টা ছিল ইন্ডিয়ার সঙ্গে মিলিয়ে ‘ঘমন্ডিয়া’ বলা। কিন্তু দেখা গেল, ওটা ‘মিত্রোঁ’ বা ‘ভাইয়োঁ ঔর বহনোঁ’-র অর্ধেক জনপ্রিয়তাও অর্জন করতে পারল না। ফলে নামের লড়াইটা তখনকার মত ইন্ডিয়া জোট জিতেই গিয়েছিল।

কিন্তু হার স্বীকার করে নেওয়া বিজেপির স্বভাব নয়। হলে একাধিক রাজ্যে ভোটে না জিতেও তারা সরকার গঠন করতে পারত না। তাছাড়া সত্যোত্তর পৃথিবীর বাস্তবতা বিজেপির মত করে কেউ বোঝে না। তারা জানে, আজকের দুনিয়ায় বাস্তবে কী ঘটছে তা নিয়ন্ত্রণ করার চেয়ে বড় কাজ হল মানুষ কী জানছে এবং জেনে কী ভাবছে তা নিয়ন্ত্রণ করা। অতএব যা ভাবলে আমার সুবিধা লোককে সেটাই ভাবাতে হবে, অন্য কথা ভাবার ফুরসত দেওয়া চলবে না। সুতরাং অবিলম্বে চলে এল জল্পনা কল্পনা চালানোর মত বিষয় – এক দেশ, এক নির্বাচন। আচমকা সংসদের বিশেষ অধিবেশন বসবে ঘোষণা করা হল এবং কী নিয়ে আলোচনা হবে তা সংসদীয় প্রথায় প্রকাশ না করে গোদি মিডিয়াকে দিয়ে সম্ভাবনা হিসাবে ভাসিয়ে দেওয়া হল এক দেশ, এক নির্বাচনের কথা। এতে বিরোধীদের প্রতিক্রিয়া হওয়াই স্বাভাবিক। ফলে তারা ব্যস্ত হয়ে পড়ল এই পরিকল্পনার বিরোধিতায়, নিজেদের সরকারবিরোধী বক্তব্যগুলো আর মানুষের সামনে তুলে ধরার সময় রইল না। জনপরিসর থেকে হারিয়ে গেল মণিপুর, হরিয়ানার দাঙ্গা, মূল্যবৃদ্ধি, বেকারত্ব, বিদেশের সংবাদমাধ্যমে আদানি গ্রুপের আর্থিক দুর্নীতির নতুন প্রমাণ সামনে আসায় তাদের বিরুদ্ধে ফের ওঠা যৌথ সংসদীয় তদন্তের দাবি। এক দেশ, এক নির্বাচন নিয়ে হইচই না কাটতেই সরকারপক্ষ নিয়ে এসেছে আরেক অনন্ত জল্পনার বিষয় – দেশের নাম ইংরেজিতেও ইন্ডিয়া থেকে বদলে ভারত করে দেওয়া হবে কি?

এমনিতে বিজেপির ভোটসর্বস্বতা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। স্রেফ ভোটে জেতার জন্যে তারা করতে পারে না এমন কাজ নেই। ফলে এক দেশ, এক নির্বাচন চালু করা অথবা দেশের নাম বদলানোর দিকেও এগোতেই পারে। বিজেপির পুরনো বন্ধু এবং উত্তরপ্রদেশের রাজনীতিতে ইদানীং অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়া মায়াবতী যেভাবে সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হয়েছেন রাজনৈতিক সংগঠন বা জোটের নামে ইন্ডিয়া ও ভারত শব্দ ব্যবহার করা নিষিদ্ধ করার আবেদন নিয়ে, হাস্যকরভাবে ইন্ডিয়া জোটকে দায়ী করেছেন বিজেপিকে দেশের নাম বদলে দেওয়ার সুযোগ দেওয়ার জন্য, তাতে এই সন্দেহ জোরদার হয়। কিন্তু এহ বাহ্য। আলোচনাটা আরেকটু গভীরে গিয়ে করা দরকার।

যেখানে বাঘের ভয়

লক্ষণীয় যে এক দেশ, এক নির্বাচন এখনো স্রেফ জল্পনার বিষয় হলেও (প্রাক্তন রাষ্ট্রপতির নেতৃত্বে একটা কমিটি তৈরি করা ছাড়া আর কিছু করা হয়নি) দেশের নাম সরকারিভাবে ইন্ডিয়ার বদলে ভারত করে দেওয়ার প্রক্রিয়া কিন্তু শুরু হয়ে গেছে। ইতিমধ্যেই জি-২০ সম্মেলনে আমন্ত্রণ জানিয়ে ভারত সরকারের তরফ থেকে যে চিঠি পাঠানো হয়েছে তাতে রাষ্ট্রপতিকে ‘প্রেসিডেন্ট অফ ভারত’ লিখে দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ ব্যাপারটা স্রেফ কারোর স্বপ্নার্দ্র বিছানার জিনিস হয়ে নেই, সরকারি কাগজপত্রে লিখিত আকারে এসে পড়েছে। সুতরাং সাধারণ মানুষের এ নিয়ে আলোচনা না করে উপায় নেই। কারণ এতে আমার-আপনার – জনপ্রিয় লব্জে বললে করদাতার – টাকা জড়িয়ে আছে। মানে সমস্ত সরকারি কাগজপত্রে যদি কাল থেকে ‘গভমেন্ট অফ ইন্ডিয়া’ হয়ে দাঁড়ায় ‘গভমেন্ট অফ ভারত’, তাহলে স্রেফ লেটারহেড ছাপাতে কত কোটি টাকা খরচ হবে ভাবুন।

ইদানীং সরকার এবং তার ন্যাওটা সংবাদমাধ্যম, অর্থনীতিবিদ, রাজনৈতিক বিশ্লেষক, বিখ্যাত ক্রিকেটার, চিত্রতারকা ইত্যাদি বিশেষ অজ্ঞরা সরকারের যে কোনো কার্যকলাপের উপকারিতা প্রমাণ করতে প্রথমেই বোঝায় কাজটা করলে করদাতাদের কত টাকা বাঁচবে। ১৯৯১ সালের পর থেকে যেমন সরকার এবং তার ন্যাওটারা অহোরাত্র বোঝাত ‘বেসরকারি হলে পরিষেবা ভাল হবে’, এ খানিকটা সেইরকম। যেমন ‘এক দেশ এক নির্বাচন ভাল, কারণ করদাতাদের অনেক টাকা বাঁচবে’, ‘ভর্তুকি তুলে দেওয়া ভাল, কারণ করদাতাদের অনেক টাকা বাঁচে’। তর্কের খাতিরে যদি ধরে নেওয়া যায় ওটাই সরকারের কাজের ভালমন্দের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বা অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মানদণ্ড, তাহলে কিন্তু সর্বত্র ‘ইন্ডিয়া’ বদলে ‘ভারত’ করার পরিকল্পনাকে কোনোভাবেই ভাল বলা যাবে না। কারণ এতে করদাতাদের টাকা তো বাঁচবেই না, উলটে একগাদা টাকা খরচ হবে। টাকার কথা যখন উঠলই, তখন খেয়াল করিয়ে দেওয়া যাক – শুধু গভমেন্ট অফ ইন্ডিয়া নেই, আছে রিজার্ভ ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়াও। সেটাও কি রিজার্ভ ব্যাঙ্ক অফ ভারত হবে? হলে টাকা কি নতুন করে ছাপা হবে? সেক্ষেত্রে পুরনো নোটগুলোকে কি চলতে দেবে সরকার? নাকি আরও একচোট নোটবন্দির খাঁড়া ঝুলছে আমাদের মাথার উপরে?

কথাটাকে সোশাল মিডিয়া জোক মনে হচ্ছে? মনে রাখবেন, দেশের বর্তমান সরকার জোকারের মত সব এলোমেলো করে দিতেই ভালবাসে। তাতে মানুষের প্রাণ গেলেও কুছ পরোয়া নেই। রাজ কাপুর অভিনীত জোকার নয়, হিথ লেজার বা জোয়াকিন ফিনিক্স অভিনীত জোকার। তার অন্তত দুটো প্রমাণ আমাদের হাতে রয়েছে – নোটবন্দি আর চার ঘন্টার নোটিসে দেশব্যাপী লকডাউন।

ভারত এক খোঁজ

অবশ্যই শুধু করদাতাদের টাকা খরচ হবে বলে ভারত নাম ব্যবহারে বিরোধিতা করা চলে না। ও রাস্তায় হাঁটলে শেষমেশ অনেক ভাল কাজেরই বিরোধিতায় গিয়ে পৌঁছতে হবে। ঠিক যে রাস্তায় মোদী সরকার হাঁটছে। দেশে এত ঘন ঘন নির্বাচন হয়, তাতে করদাতাদের বিপুল টাকা খরচ হয়। অতএব গোটা দেশে একসঙ্গে লোকসভা আর বিধানসভা নির্বাচন হোক – টাকা বাঁচবে। গণতান্ত্রিক দেশে নির্বাচন কমিয়ে টাকা বাঁচানো যদি ঠিক হয়, তাহলে কিছুদিন পরে বলা যেতেই পারে, নির্বাচন ব্যাপারটারই দরকার নেই। একশো শতাংশ টাকা বেঁচে যাবে। পঞ্চায়েত, পৌরসভা, কর্পোরেশনগুলোর ব্যাপারে নিশ্চয়ই অদূর ভবিষ্যতেই তাই বলা হবে। সুতরাং অন্য যুক্তিতে আসি।

এতদিন যাঁরা জানতেন না, তাঁরাও গত কয়েকদিনের আলোচনায় নিশ্চয়ই জেনে গেছেন যে আমাদের দেশটার নাম সাংবিধানিকভাবেই ইন্ডিয়া এবং ভারত – দুটোই। সংবিধানের একেবারে প্রথম অনুচ্ছেদেই পরিষ্কার লেখা আছে “India, that is Bharat, shall be a Union of States.”

বস্তুত সংবিধান সভার বিতর্কে নাম নিয়েও বিতর্ক হয়েছিল এবং সবাই যে ইন্ডিয়া শব্দটা ব্যবহার করা নিয়ে একমত ছিলেন তা নয়। শেষমেশ দুটো নামই থেকে যায়। এমন নয় যে ভারত নামটাকে ব্রাত্য করে দিয়ে স্রেফ বিদেশি লব্জের ইন্ডিয়াকেই দেশের সরকারি নাম করে দেওয়া হয়েছিল, যা এখন দক্ষিণপন্থীরা প্রতিপন্ন করার চেষ্টা করছে। কিন্তু প্রশ্ন হল, আদৌ ইন্ডিয়া কেন? সব ভাষাতেই ভারত নয় কেন? আমার বন্ধু যা বলেছেন সেটা কি সত্যি? ইন্ডিয়া শব্দটা কেবল ভারতের অ্যাংলোফাইলরা, অর্থাৎ ইংরেজি ভাষাসর্বস্ব উচ্চকোটির লোকেরা ব্যবহার করেন? ও নাম আপামর ভারতবাসীর পছন্দের নাম নয়?

এ প্রশ্নের উত্তর পেতে গেলে মনে রাখা ভাল, বহু ভাষাভাষী এবং ভাষার ভিত্তিতে তৈরি প্রদেশগুলো নিয়ে গঠিত দেশ ভারতে এক রাজ্যের মানুষের সঙ্গে অন্য রাজ্যের মানুষের সংযোগের ভাষা কী হওয়া উচিত, সরকারি কাজের ভাষা কী হওয়া উচিত, তা নিয়ে স্বাধীনতার আগে থেকেই বিতর্ক চলছে। এমনকি সংবিধানের ৩৪৩ নম্বর অনুচ্ছেদের ১ নম্বর ধারায় লেখা আছে দেশের সরকারি ভাষা হবে দেবনাগরী লিপিতে লেখা হিন্দি।

তারপর ২ নম্বর ধারায় বলা হয়েছে, ১ নম্বরে যা-ই লেখা থাক, এই সংবিধান চালু হওয়ার পরে ১৫ বছর দেশের সরকারি ভাষা হিসাবে ইংরিজির ব্যবহার চলতে থাকবে। আবার ৩ নম্বর ধারাতেই বলা হয়েছে, বর্তমান অনুচ্ছেদে (অর্থাৎ ৩৪৩ নম্বরে) যা-ই বলা থাক, ওই ১৫ বছর কেটে গেলে ইংরিজি ভাষার ব্যবহার চালিয়ে যাওয়ার জন্য সংসদ আইন প্রণয়ন করতে পারে। ৩৪৩-৩৫১ অনুচ্ছেদগুলো পড়লে হিন্দি ভাষার প্রতি সংবিধানের পক্ষপাত দিনের আলোর মত পরিষ্কার হয়। ৩৫১ নম্বরে তো হিন্দি ভাষার প্রসারের দায়িত্ব রাষ্ট্রের ঘাড়ে চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। শুধু তাই নয়, ওই অনুচ্ছেদের শেষাংশে একেবারে হেডমাস্টারি কায়দায় বলা হচ্ছে শব্দভাণ্ডার প্রসারিত করার প্রয়োজনে প্রধানত সংস্কৃতের কাছে হাত পাততে হবে (“…for its vocabulary, primarily on Sanskrit and secondarily on other languages”)। ঘটনা হল, ভারত শব্দটা এসেছে সংস্কৃত থেকে এবং ব্যবহার হয় মূলত হিন্দি ও উত্তর ভারতীয় ভাষাগুলোতে। ফলে বিন্ধ্য পর্বতের ওপারের মানুষের সঙ্গত কারণেই এই শব্দটাকে দেশের নাম বলে মেনে নিতে আপত্তি আছে। প্রাচীন শাস্ত্র ও পৌরাণিক সাহিত্যে যে ভারতের কথা বলা হয়েছে, তার মধ্যে কিন্তু দাক্ষিণাত্য পড়ে না। মহাভারতে কটা কথা আছে দক্ষিণ ভারত নিয়ে? বাঙালিদের মধ্যে অনেকেরই ধারণা, তামিল, মালয়ালমের সঙ্গে সংস্কৃতের অনেক মিল। অতএব ওগুলো সংস্কৃত থেকেই এসেছে। কিন্তু তামিলরা অনেকেই মনে করেন তাঁদের ভাষা সংস্কৃত থেকে আসেনি। বরং দাক্ষিণাত্যের সমস্ত ভাষার জন্ম তামিল থেকে। আর্য সভ্যতার থেকে দ্রাবিড় সভ্যতা একেবারেই পৃথক। সাম্প্রতিক অতীতে তামিলনাড়ুর শিবগঙ্গা জেলায় ২৬০০ বছরের পুরনো এক সভ্যতার খোঁজ মেলার পর তাকে ‘ভারতম’ সভ্যতা বলা হবে, নাকি ‘দ্রাবিড়ম’ – এই নিয়ে উত্তপ্ত হয়েছিল ওই রাজ্যের রাজনীতি।

অর্থাৎ আমরা বিন্ধ্য পর্বতের এপারে আছি বলেই আমাদের ভাষা, সংস্কৃতিতে ভারত শব্দটার প্রাঞ্জল উপস্থিতি। কিন্তু কাশ্মীর থেকে কন্যাকুমারী পর্যন্ত সমস্ত ভারতবাসী ভারত বলেই দেশটাকে চেনেন বা চিনতে পছন্দ করেন – এরকম ভাবনায় গলদ আছে। এমনকি বাঙালিরা সকলে ভারত শব্দটাই ভাবে – এমন ধারণাও প্রশ্নের মুখে পড়ে যাবে ১৮ জানুয়ারি ১৯৬৯ তারিখে সাপ্তাহিক কালান্তর-এ প্রকাশিত দীপেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের রিপোর্টাজ ‘আমি ইন্ডিয়া’ পড়লে

এই বয়েসে আবার উদ্বাস্তু। বন্যার তিনমাস পরেও একটা তাঁবু জোটাতে পারেন নি। সমর্থ মেয়ে-জামাই আর বছর দশেকের ছেলেটাকে নিয়ে চারদিক খোলা একটা ছাউনির তলায় খড় বিছিয়ে রাত কাটাচ্ছেন। অথচ এখনও ওঁর মাথা ছুঁয়ে পূর্ণিমার চাঁদ।

‘পাকিস্তান ছেড়ে কবে এসেছিলেন?’ আশ্চর্য উত্তর দিলেন বুধেশ্বরী। ছাউনি থেকে হাত নামিয়ে বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়ে বেশ গর্বের সঙ্গে বললেন ‘আমি ইন্ডিয়া। আমি পাকিস্তান না থাকিস।’

অমোঘ সেই অভিজ্ঞতা। পাটকাঠির চাল ছাড়িয়ে প্রায় আকাশ ছুঁয়ে যে রমণী দাঁড়িয়ে, সে বলছে সে উদ্বাস্তু নয় – ভারতবাসী। সে বলছে সে ‘ইন্ডিয়া’।

আরও বড় কথা, ভারতের কেন্দ্রস্থলের যে হিন্দিভাষী রাজ্যগুলো সবচেয়ে জনবহুল, সেখানকার গরিব-গুরবো মানুষের মধ্যেও দেশের নাম হিসাবে ভারতের চেয়ে বেশি প্রচলিত এমন একটা শব্দ যা ভারত বনাম ইন্ডিয়া বিতর্কে বিজেপিবিরোধীদেরও উল্লেখ করতে দেখছি না – হিন্দুস্তান। স্বাধীনোত্তর দেশে আসমুদ্রহিমাচল সাংস্কৃতিক প্রভাব বিস্তার করেছে (দক্ষিণ ভারতে কিছুটা কম, কিন্তু একেবারে পারেনি তা নয়) যে জিনিসটা তা যে মুম্বাইয়ে তৈরি হিন্দি ছবি – সে নিয়ে বিতর্কের অবকাশ নেই। বাংলায় সে ছবির জনপ্রিয়তাও কোনোদিন কম ছিল না। ভেবে দেখুন তো, হিন্দি সিনেমার সংলাপে বা গানে কতবার শুনেছেন ভারত বা ভারতীয় শব্দটা? বরং বারবার শোনা যায় হিন্দুস্তান এবং হিন্দুস্তানি শব্দ দুটো। হম হিন্দুস্তানী ছবির ‘ছোড়ো কল কি বাতেঁ, কল কি বাত পুরানি/নয়ে দওর মে লিখেঙ্গে/দিল পর নয়ী কহানী/হম হিন্দুস্তানী’ গানটা একসময় প্রবল জনপ্রিয় হয়েছিল। সে গানে আবার আরএসএস-বিজেপির প্রবল অপছন্দের লোক জওহরলাল নেহরুকে দেখানো হয়েছিল।

বলিউডের সর্বকালের জনপ্রিয়তম শিল্পীদের একজন অমিতাভ বচ্চন। তাঁর প্রথম ছবির নাম সাত হিন্দুস্তানী (১৯৬৯)। তিনি বুড়ো বয়সে অটলবিহারী বাজপেয়ী সরকারের আমলে তৈরি বেশকিছু খাজা জাতীয়তাবাদী ছবির একটায় অভিনয় করেছিলেন। সেই ছবির নাম হিন্দুস্তান কি কসম (১৯৯৯)। ওই একই নামে ১৯৭৩ সালেও একটা ছবি হয়েছিল। চেতন আনন্দ সেই ছবি বানিয়েছিলেন ১৯৭১ সালের ভারত-পাক যুদ্ধ নিয়ে। বর্তমানে যাঁকে বলিউডের বাদশা বলা হয়, সেই শাহরুখ খানের একটা ফ্লপ কিন্তু অন্যরকম ছবির নাম ফির ভি দিল হ্যায় হিন্দুস্তানী (২০০০)। আরও অজস্র উদাহরণ দেওয়া যায়। হিন্দিভাষী সাধারণ মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্যতা না থাকলে বলিউড হিন্দুস্তান শব্দটাকে এই প্রাধান্য দিত না। আরএসএস-বিজেপির প্রভাবে ইদানীং হয়ত বদল এসেছে, কিন্তু গত শতকের আট-নয়ের দশকে পশ্চিমবঙ্গে বিহার, উত্তরপ্রদেশ ইত্যাদি রাজ্যের যেসব শ্রমজীবী মানুষ বসবাস করতেন তাঁদের কদাচিৎ ভারত শব্দটা ব্যবহার করতে দেখা যেত। তাঁরা হিন্দুস্তানই বলতেন। যদিও হিন্দুস্তান শব্দটার আক্ষরিক অর্থ হিন্দুদের ভূমি – হিন্দু, মুসলমান সকলেই কিন্তু দেশের নাম হিসাবে এই শব্দটাই নির্দ্বিধায় ব্যবহার করে এসেছেন। আজকাল কথাগুলো লেখার প্রয়োজন পড়ছে, পড়ে সন্দেহও হচ্ছে হয়ত, কিন্তু আমাদের শৈশবে স্বাধীনতা দিবস, প্রজাতন্ত্র দিবস বা নেতাজির জন্মজয়ন্তীতে যে গানটা পাড়ায় পাড়ায় মাইকে বাজতই, সেটা হল ‘সারে জহাঁ সে আচ্ছা/হিন্দুস্তান হমারা’। সেই গানের রচয়িতা মীর ইকবাল একসময় পাকিস্তানপন্থী হয়ে যান। সম্ভবত সেই অপরাধেই, আমাদের অখেয়ালে, ওই গানটাকে বিজেপি আমলে ব্রাত্য করে দেওয়া হয়েছে। ইকবালের লেখাপত্র পাঠ্য থেকে বাদ দেওয়াও শুরু হয়েছে, কিন্তু সে অন্য আলোচনা। এই আলোচনায় এটুকুই বলার যে ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে ভারতের বিরাট অংশের মানুষ দেশকে হিন্দুস্তান নামে চিনে এসেছেন অন্তত কয়েক হাজার বছর ধরে, ভারত নামে নয়, ইন্ডিয়া নামেও নয়। ফলে ইন্ডিয়া যদি অভিজাত ভারতের লব্জ হয়, ভারতও অভিজাত ভারতেরই অন্য এক অংশের লব্জ।

‘ভারত’ আর ‘ইন্ডিয়া’ বলে অনেক আরএসএসবিরোধীও আসলে যা বোঝাতে চান তা হল দুস্তর আর্থসামাজিক ব্যবধান। ওটা অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই, প্রয়োজনও নেই। তাঁরা বলতে চান এ দেশের মধ্যে আসলে দুটো দেশ আছে। ইন্ডিয়া অংশটা লেখাপড়া শেখা, শহুরে, পেট ভরে খাওয়া দেশ। ভারত মূলত গ্রামে বাস করে, লেখাপড়া শিখবে কী, অনশনে অর্ধাশনেই তার দিন কাটে। কথাটা ঠিক, আবার ভুলও। কারণ দুটো কেন? একটু ঘোরাফেরা করলেই স্পষ্ট দেখা যায় এ দেশের মধ্যে আসলে অনেকগুলো দেশ আছে। পেশাগত কারণে এক সময় বারবার ঝাড়খণ্ড যেতাম। রাঁচি আর কলকাতা যে একই দেশের দুটো রাজ্যের রাজধানী একথা বিশ্বাস হত না কিছুতেই। কারণ প্রচণ্ড অব্যবস্থা, প্রবল অনুন্নয়ন দেখেছি। আবার সিকিম আর কেরালা বেড়াতে গিয়ে অবাক হয়ে ভেবেছি, পশ্চিমবঙ্গ এই রাজ্যগুলোর সঙ্গে একই দেশে আছে কেমন করে? এ তো গেল ভিনরাজ্যের কথা। সম্প্রতি জঙ্গলমহল ঘুরে এলাম। বুঝতে বাকি রইল না যে আমি আর কাঁকড়াঝোর বা আমলাশোলের বাসিন্দারা একই দেশে বাস করি না। কিন্তু তার সঙ্গে ইন্ডিয়া আর ভারত শব্দ দুটোর কী সম্পর্ক?

আরএসএস-বিজেপি কিন্তু ওই ফারাক বোঝাতে ইন্ডিয়া আর ভারত বলে না। তারা ওই দুটো শব্দ দিয়ে কী বোঝাতে চায় তা ২০১৩ সালে আরএসএস প্রধান মোহন ভাগবত আসামের শিলচরে যা বলেছিলেন তা খেয়াল করলেই পরিষ্কার হবে। তিনি বলেছিলেন ধর্ষণের মত অপরাধ ভারতে প্রায় ঘটেই না, ওসব হয় ইন্ডিয়ায়। কারণ ভারত প্রাচীন দিশি মূল্যবোধে চলে, ইন্ডিয়া চলে পাশ্চাত্য শিক্ষা অনুযায়ী। সেটাই ধর্ষণের কারণ। দেশের নাম ইংরিজিতেও ইন্ডিয়া থেকে ভারত করে দেওয়ার প্রয়াসকে এই আলোয় দেখতে হবে। নারী স্বাধীনতা, নারী অধিকার ইত্যাদি নিয়ে যাঁরা কাজ করেন তাঁরা জানেন ভাগবতের ওই মন্তব্য সর্বৈব মিথ্যা। আসল কথা হল গ্রামাঞ্চলে মেয়েদের বিরুদ্ধে ঘটানো অধিকাংশ অপরাধের অভিযোগই দায়ের হয় না। সুতরাং ইন্ডিয়াকে ভারত বানাতে চাওয়া মানে, হয় গোটা দেশটাকেই এমন করে ফেলা যেখানে পরম্পরাগত চিন্তায় ধর্ষিতারা আদৌ অভিযোগ দায়ের করবেন না, অথবা আরও সরল সমাধান – রাষ্ট্র বলবে ভারত প্রাচীন সংস্কার মেনে চলা দেশ। এখানে ধর্ষণ হয় না। এটা একটা উদাহরণ। আরও কী কী হওয়া সম্ভব ভারতে তার মাত্র একটা উদাহরণ।

আসল কথা

দেশকে মা বলে শুধু দক্ষিণপন্থীরাই কল্পনা করে তা তো নয়, ঋত্বিক ঘটকও করতেন। এ দেশের কোটি কোটি সাধারণ মানুষ করে থাকেন। কারণ দেশ আসলে একটা আবেগ, অর্থাৎ বিমূর্ত ধারণা। রাষ্ট্র হল সেই বিমূর্ত ভিতের উপর গেঁথে তোলা মূর্ত ইমারত। নিজের মাকে যার যা ইচ্ছা সে তাই বলে ডাকে। ওটা বেঁধে দেওয়া অসম্ভব। বাঙালিরা মা বলে, তামিলরা আম্মা বলে, গুজরাটিরা আবার বা বলে। এমনকি বাঙালিদের মধ্যেও অনেকে মামণি বলে। এক পরিবারের কথা জানি, সেখানে দুই ছেলে তাদের মাকে বৌমা বলে ডাকত। কারণ কথা বলতে শেখার বয়সে ঠাকুমাকে শুনত তাদের মাকে বৌমা বলে ডাকছেন, সেই অভ্যাস ছাড়তে পারেনি। তামিল বা গুজরাটি পরিবারগুলোর মধ্যেও খুঁজে দেখলে নির্ঘাত এরকম বিকল্প ডাকের সন্ধান পাওয়া যাবে। ও নিয়ে কোনো সমস্যা নেই, কারণ ওটা আবেগের বিষয়। সন্তানের যা বলে ডাকতে ভাল লাগে, সে তাই বলবে। কেউ ভারত বলবে, কেউ হিন্দুস্তান বলবে, কেউ ইন্ডিয়া বললেও তেড়ে যাওয়ার কিছু নেই। সংবিধানপ্রণেতারা ইন্ডিয়া আর ভারত লিখেছিলেন, কয়েক হাজার বছরের প্রাচীন নাম হওয়া সত্ত্বেও হিন্দুস্তান শব্দটা রাখেননি। হয়ত ধর্মের ভিত্তিতে সদ্য ভাগ হওয়া এবং নিজেকে ধর্মনিরপেক্ষ বলে ঘোষণা করা দেশের সরকারি নাম হিন্দুস্তান হওয়া ভাল বার্তা দেবে না মনে করা হয়েছিল। কিন্তু সে নামের ব্যবহার একেবারে নিষিদ্ধ করার জন্যেও কোনো ব্যবস্থা নেননি। ভারত রাষ্ট্র পরবর্তীকালেও সরকার ছাড়া অন্য কে কোন নাম ব্যবহার করছে তা নিয়ে মাথা ঘামায়নি। এখন ঘামাতে চায় বলেই এত কাণ্ড করছে।

আরও পড়ুন ২০২৪ আসলে গণভোট, বহুত্ববাদী ভারতের মুখ রাহুল গান্ধী

এমনিতে নাম বদলালে কী-ই বা এসে যায়? উপরে যে ব্যবহারিক অসুবিধার কথা উল্লেখ করেছি সেটা ছাড়া? লক্ষ করে দেখছি, শেখানো বুলির মত কিছু কথা আওড়াচ্ছেন বিখ্যাতরা। সুনীল গাভস্কর প্রমুখ বলছেন, বর্মার নামও তো বদলে মায়ানমার হয়েছে। তাতে ক্ষতি কী? এর উত্তর খুঁজলেই আসল ক্ষতে চোখ পড়বে। বর্মার নাম বদলে মায়ানমার করা হয়েছিল ১৯৮৯ সালে এবং তা কোনো গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকারের কাজ ছিল না। কাজটা করেছিল জুন্টা সরকার। আসল আপত্তির জায়গাটা এইখানে। ভারত সরকার যদি সত্যিই মনে করে থাকে দেশের সরকারি নাম ইংরিজিতেও ভারত করার কোনো বিশেষ প্রয়োজন আছে, তাহলে সংসদে আলোচনা করে নিয়মকানুন মেনে সংবিধান সংশোধন করে বদলাতে পারত। কিন্তু সরকারি কাগজে চুপিসাড়ে বদল করে দেওয়া অগণতান্ত্রিক। কাজটা অবশ্য বিলক্ষণ চতুরতার। কারণ এখন সংসদের বাইরে বিজেপি মুখপাত্ররা যা-ই বলুন, সংসদে আলোচনা হলে হয়ত অমিত শাহ বলবেন, বদলাইনি তো! ভারত নামটা তো সংবিধানেই আছে।

আসলে সংগঠনের শতবর্ষে দেশটা হিন্দুরাষ্ট্র হয়ে গেল অথচ দুনিয়াসুদ্ধ লোক ইন্ডিয়া বলে ডাকছে – এ জিনিস আরএসএসের হজম হবে না। কারণ ‘ইন্ডিয়া’ নামটা এসেছে পারস্যের লোকেদের মুখের ‘হিন্দুস্তান’ ইউরোপিয় জবানে বদলে গিয়ে। ইংরেজদের এ দেশে আসতে তখনো কয়েক হাজার বছর দেরি, যীশুখ্রিস্টেরই জন্ম হয়নি। এ নাম কি সঙ্ঘ মেনে নিতে পারে? বস্তুত ‘হিন্দু’ শব্দটাও বেদ, বেদান্ত, রামায়ণ, মহাভারত – কোথাও নেই। বরং জরাথ্রুষ্টের ধর্মাবলম্বীদের পবিত্র গ্রন্থ আবেস্তা-য় আছে। সঙ্ঘ তাই পারলেই তাদের বয়ানে ‘সনাতন ধর্ম’ কথাটা গুঁজে দেয়। এমনি তো আর দয়ানিধি স্ট্যালিন সনাতন ধর্মের বিনাশের ডাক দেওয়ায় বিজেপি নেতারা রণচণ্ডী হয়ে ওঠেননি। বস্তুত যে ভাষাটার প্রতি আমাদের সংবিধানের বিশেষ পক্ষপাত, যা গত শতকের ছয়ের দশকে কেন্দ্রের কংগ্রেস সরকার গোটা দেশের উপর চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে পিছু হটতে বাধ্য হয় এবং এখন বিজেপি ফের চাপিয়ে দেওয়ার তালে আছে, সেই ‘হিন্দি’ ভাষাও আদতে ছিল হিন্দুস্তানি (আমির খুসরো বলতেন হিন্দভি) ভাষা। সুলতানি আমল থেকে দিল্লি ও তার পার্শ্ববর্তী অঞ্চলের মধ্য এশিয়া এবং ভারতের অন্যান্য অঞ্চল থেকে আসা ভাগ্যান্বেষী মানুষের মুখের ভাষার সঙ্গে স্থানীয় মানুষের ভাষা মিশে তা গড়ে উঠেছিল। এই ভাষা দেবনাগরী আর ফারসি – দুরকম লিপিতেই লেখা চলত। হিন্দি আর উর্দু – এই বিভাজন হয়েছে মাত্র শ দুয়েক বছর আগে এবং তার পিছনে ইংরেজদের ভূমিকা কম নয়।

অর্থাৎ সঙ্ঘ পরিবারের এক ভাষা, এক জাতি, এক রাষ্ট্রের স্লোগান – হিন্দি, হিন্দু, হিন্দুস্তান – গোটাটাই বিদেশি লব্জ ধার করা। অবশ্য জাতীয়তাবাদ, জাতিরাষ্ট্র ধারণাগুলোই ইউরোপিয়। কস্মিনকালে ভারতে ছিল না। আগাগোড়া ধার করা জিনিস নিয়ে চললে হীনমন্যতা আসাই স্বাভাবিক, ধারের চিহ্ন মুছে ফেলার চেষ্টাও প্রত্যাশিত।

শেষ নাহি যে

বুধেশ্বরী দীপেন্দ্রনাথকে জিজ্ঞেস করেছিলেন ‘হামারলা মরিলে কি দ্যাশ বাঁচিবে?’ দেশের মানুষ না বাঁচলে দেশ বাঁচে না। এখন আশু লড়াইটা দেশ বাঁচানোর, নাম বাঁচানোর নয়। যেহেতু দেশের মানুষের জন্য বিজেপি সরকার কিছুই করেনি, তাই দেশের মানুষকে ঝুটো গর্ব দিয়ে এবং বিরোধীদের সে গর্ব সামলানোর কাজে ব্যস্ত রেখেই তারা উতরোবার চেষ্টা করছে। যুগপৎ নিজেদের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনাও বাস্তবায়িত করছে। অর্থাৎ রথ দেখা এবং কলা বেচা। ২০২৪ নির্বাচনে হিন্দুত্ববাদীরা পুনর্নির্বাচিত হলে দেশের নাম কেন, দেশের লোকেদের নামও বদলে দিতে পারে। কেউ আটকাতে পারবে না। ফলে এখন বিরোধীদের দায়িত্ব এক দেশ এক নির্বাচন বা নাম পরিবর্তনের মত কাজের প্রকৃত উদ্দেশ্য সম্পর্কে সচেতন থেকেও সরকারের অকর্মণ্যতা এবং বিপজ্জনক কাজগুলো চোখে আঙুল দিয়ে দেখানো, বিকল্প হাজির করা। নইলে প্রতিক্রিয়ার রাজনীতির ঘূর্ণিতে ডুবে মরতে হবে। প্রধান বিরোধী দল কংগ্রেসের নেত্রী সোনিয়া গান্ধী অবশ্য নির্বাচন এবং নাম নিয়ে ডামাডোলের ঊর্ধ্বে উঠে আসন্ন বিশেষ অধিবেশনে সংসদে আলোচনার জন্য নটা বিষয় উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রীকে চিঠি লিখেছেন। কিন্তু বিজেপি যে বিনা আলোচনায় সংসদ চালাতে এবং নিজেদের পছন্দের বিল পাস করাতে সিদ্ধহস্ত তা আমরা জেনে গেছি। ইন্ডিয়া জোট তাদের একতা বাইরের মত সংসদের ভিতরেও দেখাতে পারে কিনা, দেখিয়ে বিজেপির যা ইচ্ছা তাই করা আটকাতে পারে কিনা, তার উপরে নির্ভর করছে আমরা আগামী বছর কীরকম নির্বাচন দেখব। তার চেয়েও বড় কথা, দেশের ভিতটা থাকবে কিনা। ভিত না থাকলে ইমারত টেকে না।

নাগরিক ডট নেটে প্রকাশিত