হোমবাউন্ড: ফিরব বললে ফেরা যায় নাকি?

হিন্দু উচ্চবর্গীয়দের পারিবারিক আড্ডা থেকে হোয়াটস্যাপ গ্রুপ হয়ে এখন সরকারি নীতি নির্ধারণেও এরাই দেশের যত নষ্টের গোড়া হিসাবে স্বীকৃত। শোয়েবদের যাওয়ার জন্যে তো গোটা পঞ্চাশেক দেশ আছে। তবু যে তারা কেন এদেশে পড়ে থাকে তা উচ্চবর্গীয় শিক্ষিত মানুষ বুঝেই উঠতে পারেন না। আর সরকার তো চন্দনদের জন্যেই সবকিছু করে, ওদের আর চিন্তা কী?

আলো আঁধারিতে ঢাকা একফালি জায়গা, তার এদিক থেকে ওদিকে হেঁটে যাচ্ছে ছোট ছোট পিঁপড়ে। প্রথম চোটে তাই মনে হয় বটে, তবে কয়েক সেকেন্ড কাটতে না কাটতেই বোঝা যায় – জায়গাটা আসলে গাড়িঘোড়াহীন ফ্লাইওভার। যারা হেঁটে যাচ্ছে তারা নিরুপায়, শ্রান্ত মানুষ। প্রতীক শাহের ক্যামেরায় লকডাউনে ঘরে ফিরতে চাওয়া প্রবাসী শ্রমিকদের এভাবেই দেখিয়েছেন হোমবাউন্ড ছবির পরিচালক নীরজ ঘেওয়ান। মাল্টিপ্লেক্সের ঠান্ডা ঘরে বসে মনে হয়, যেন ধরে ফেলেছেন আমরা আসলে কীভাবে দেখি ওই মানুষগুলোকে, রাষ্ট্র কীভাবে দেখে। ধরে ফেলেছেন বলেই ছবি শুরুর আগের, স্পষ্টতই সেন্সরের চাপে লিখিত, দীর্ঘ ‘ডিসক্লেমার’ দ্বিগুণ হাস্যকর মনে হয় ছবি শেষ হওয়ার পর। তার চেয়ে অনেক বেশি বিশ্বাসযোগ্য মনে হয় ডিসক্লেমারের পরেই পর্দায় ভেসে ওঠা সম্পূর্ণ বিপরীতার্থক শব্দবন্ধ, যার অর্থ – সত্য ঘটনা অবলম্বনে।

নীরজ, বরুণ গ্রোভার এবং শ্রীধর দুবে লিখিত এই ছবির সংলাপে করুণ মুহূর্তে নানা সূক্ষ্ম ও স্থূল রসিকতা থাকলেও, হোমবাউন্ড যে হাস্যরস উৎপাদন করে তার গায়ে ভিড়ে ঠাসাঠাসি প্যাসেঞ্জার ট্রেনের যাত্রীদের মত করে লেগে থাকে চোখের জল। ইদানীং এদেশে ঘর ছেড়ে কাজের খোঁজে অন্যত্র যাওয়া মানুষ সর্বত্র খলনায়ক। এই ছবির দুই প্রধান চরিত্র মহম্মদ শোয়েব (ঈশান খট্টর) আর চন্দন কুমার বাল্মীকি (বিশাল জেঠওয়া) আবার সেই শ্রেণিতে পড়ে, যারা সবচেয়ে বেশি ঘৃণার – অর্থাৎ সাদা কলারের কর্মী নয়, একেবারে গায়ে গতরে খেটে খাওয়া মানুষ। অবশ্য শ্রমজীবী না হলেও হয়ত বিশেষ তফাত হত না, কারণ নামেই প্রমাণ – প্রথম জন মুসলমান, দ্বিতীয় জন দলিত। হিন্দু উচ্চবর্গীয়দের পারিবারিক আড্ডা থেকে হোয়াটস্যাপ গ্রুপ হয়ে এখন সরকারি নীতি নির্ধারণেও এরাই দেশের যত নষ্টের গোড়া হিসাবে স্বীকৃত। শোয়েবদের যাওয়ার জন্যে তো গোটা পঞ্চাশেক দেশ আছে। তবু যে তারা কেন এদেশে পড়ে থাকে তা উচ্চবর্গীয় শিক্ষিত মানুষ বুঝেই উঠতে পারেন না। আর সরকার তো চন্দনদের জন্যেই সবকিছু করে, ওদের আর চিন্তা কী? যেমনটা এক সরকারি অফিসার তাকে বলেছে। এই ছবির লেখক দল – বরুণ, বশারত পীর, সুমিত রায় এবং নীরজ স্বয়ং – স্লোগানধর্মিতার দিকে না গিয়েও বুঝিয়ে দিতে পেরেছেন শোয়েবরা কেন সুযোগ পেলেও দুবাই যেতে চায় না। চন্দনদের বিড়ম্বনাও দেখিয়ে দিয়েছেন। আসল পদবি লিখলে লোকে নিচু নজরে দেখে আর না লিখলে নিজের চোখে ছোট হয়ে যেতে হয়। সরকারি চাকরির পরীক্ষার ফর্মে পদবি লিখব কি লিখব না, ‘সংরক্ষিত’ লেখা বাক্সে টিক দেব কি দেব না – নিজের সঙ্গে এই লড়াইটা লড়তে লড়তেই বয়স বেড়ে যায়।

ন্যাকা লাগছে ব্যাপারগুলো? লাগারই কথা। মানুষের চোখে পিঁপড়ের জীবনসংগ্রাম তো ন্যাকাই লাগে। ‘গেটেড কমিউনিটি’-র মধ্যে কাটানো নিশ্চিন্ত জীবন আর সাহারা মরুভূমি সংলগ্ন আফ্রিকার সমান দারিদ্র্যে ক্রমশ বিভাজিত হতে থাকা এই দেশে হোমবাউন্ডের পাত্রপাত্রীদের জীবন মাল্টিপ্লেক্সের দর্শকদের চোখে অলীক, অবাস্তব মনে হওয়াই স্বাভাবিক। এ তো সেই রাজ কাপুরের আমল নয় যে সিনেমার পর্দায় চালচুলোহীন শ্রী ৪২০-এর সঙ্গে প্রেম হয়ে যাবে বস্তির বাচ্চাদের লিখতে পড়তে শেখানো সুন্দরী নার্গিসের, আর তা দেখে মোহিত হবে আসমুদ্রহিমাচল হিন্দি সিনেমার দর্শক। নতুন ভারতের মহানগরে শ্রী ৪২০ হয়ে থাকাই যাবে না, আধার কার্ড দেখাতে হবে। শোয়েবের মত মুসলমান হলে সামান্য চাপরাশির চাকরি পাকা করতে কেবল নিজের আধার কার্ড নয়, বাবা-মায়ের আধার কার্ডও দেখাতে হবে। আজকের হিন্দি সিনেমায় বস্তিবাসী কি ফুটপাথবাসী তো দূরের কথা, শোয়েব আর চন্দনের মত গাঁয়ের লোকদেরও দেখা যায় না চট করে। সেই নয়ের দশক থেকে, প্রাসাদোপম বাড়ির মালিক ব্যবসায়ী আর অনাবাসী ভারতীয়রাই তো নায়ক, নায়িকা। ইদানীং আবার প্রাচীন ও অপ্রাচীন যোদ্ধা এবং ধর্মযোদ্ধারা নায়ক, নায়িকা হচ্ছেন। নীরজ উলটো পথের পথিক। এক দশক আগে নিজের প্রথম ছবি মসান-এ তিনি দেখিয়েছিলেন বারাণসীর ডোম পরিবারের ছেলের সঙ্গে উচ্চবর্ণের মেয়ের প্রেমের স্বপ্ন এবং স্বপ্নভঙ্গ। প্রশ্ন তুলেছিলেন – এই দুঃখ কিছুতেই শেষ হয় না কেন? সেই প্রশ্নেরই যেন এবার উত্তর খুঁজেছেন দুই গ্রামের ছেলের কাহিনিতে।

দুঃখ শেষ হয় না, কারণ চন্দনের মায়ের রান্না যতই ভালো হোক, সে মিড ডে মিল রাঁধলে বাবা-মায়েরা স্কুলে পাঠাবেন না ছেলেমেয়েদের। চন্দনের দিদি স্কুলের বাচ্চাদের হেগো পোঁদ ধুইয়ে দেবে – ওই পর্যন্ত ঠিক আছে। ব্যতিক্রমী হেডমাস্টার যতই আইনের ভয় দেখান, তাতে কাজ হবে না। বাবাসাহেব আম্বেদকর দলিতদের বাড়ির বিয়েতে গৌতম বুদ্ধের পাশে যতই পূজিত হোন, সংবিধান বা আইন মানা হবে কিনা, কোথায় কতটুকু মানা হবে, তা ঠিক করবেন উচ্চবর্গীয়রাই। দুঃখ শেষ হয় না, কারণ শোয়েবের মা যতই সুস্বাদু হালুয়া রাঁধুন আর শোয়েবের বিপণন ক্ষমতা যতই অসাধারণ হোক, শেষ কথা হল সে ভারত-পাকিস্তান ম্যাচে কাকে সমর্থন করে এবং সে নিজে যা-ই মনে করুক, সবাই নিশ্চিত যে পাকিস্তান হারলে সে দুঃখ পায়। দুঃখ শেষ হয় না, কারণ পথে অসুস্থ হয়ে পড়া প্রবাসী শ্রমিককে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার জন্যে পুলিশ প্রশাসনের টিকি পাওয়া যায় না। কিন্তু মারা যাওয়ার পর মর্গে নিয়ে যেতে পত্রপাঠ সবাই হাজির। চারতলা পায়ের তলায় রাখবে তিনতলাকে, তিনতলা পায়ের তলায় রাখবে দোতলাকে, দোতলা পায়ের তলায় রাখবে একতলাকে – হাজার হাজার বছরের এই সুবিন্যস্ত শোষণব্যবস্থাকে কোনোরকম তত্ত্ব না কপচিয়ে সিনেমায় তুলে এনেছেন নীরজ। দুই প্রাণের বন্ধুর একজন চাকরির পরীক্ষায় পাশ করল, অন্যজন করল না। অমনি কিন্তু সম্পর্ক চিড় খেল, একে অপরের ধর্মীয় পরিচয় এবং জাতি পরিচয় উল্লেখ করে দাঁত নখ বের করে ফেলল। আবার হতদরিদ্র চন্দনের পরিবার সর্বস্ব পণ করে লেখাপড়ার ব্যবস্থা করে যায় চন্দনের জন্যে, তার দিদির জন্যে নয়। দলিত মেয়ে সুধা ভারতী যতই প্রেমে পড়ুক, সে অন্তত গ্র্যাজুয়েট নয় এমন ছেলেকে – পুলিশের কনস্টেবলকে – বিয়ে করতে রাজি নয়। কারণ বাবার সরকারি চাকরির কল্যাণে সুধার জাত না বদলাক, শ্রেণি বদলে গেছে। এই হল নীরজের ভারত, আমাদের ভারত।

আরও পড়ুন তালিবান শাসন: ঘর হতে শুধু দুই পা ফেলিয়া

অভিনেতার কাজই হল তিনি যে লোক নন সেই লোক হয়ে ওঠা। তবু হয়ত চারপাশের পরিস্থিতির কারণেই ঈশানকে মিতভাষী, অপমান বুকে চেপে রাখা গরিব মুসলমান যুবকের চরিত্রে এত বিশ্বাসযোগ্য অভিনয় করতে দেখে একটু বেশিই ভালো লাগে। নীরবে অপমানিত হওয়ার দৃশ্যগুলোতে ঈশান সবচেয়ে বাঙ্ময়। ছবির শেষ প্রান্তে চরম অসহায়তার মুহূর্তে তিনি সবচেয়ে শক্তিশালী অভিনয় করেন। তবে চমকে দেন চন্দনের চরিত্রে বিশাল। তাঁর চেহারার সবচেয়ে চোখে পড়ার মত জিনিস হল অস্বাভাবিক কটা চোখ। ওই চোখদুটোকে তিনি মরদানি ২ ছবিতে ব্যবহার করেছিলেন নারীবিদ্বেষী সাইকোপ্যাথের হিংস্রতা ফুটিয়ে তুলতে। এখানে প্রায় ম্যাজিকের মত ব্যবহার করেছেন দলিতের গ্লানিকে মুখরতা দিতে। পছন্দের নারীর সামনে প্রেমিকের চিরকালীন ক্যাবলামি করতে করতে, ভেঙে পড়া বন্ধুকে কাঁদার জন্যে কাঁধ এগিয়ে দিতে দিতে ছবি যত এগিয়েছে, বিশাল বিশালতর হয়েছেন।

নীরজের ছবির নায়িকার গ্ল্যামার থাকে না, সুধারও নেই। সেই চরিত্রে জাহ্নবী কাপুর যথাযথ। তবে বিশালের সঙ্গে ঈশানের রসায়ন যত নিখুঁত, জাহ্নবী আর বিশালের রসায়ন ততটা জমেনি। পর্দায় বেশিক্ষণ না থাকলেও মনে থেকে যায় চন্দনের মায়ের চরিত্রে শালিনী বৎস্যা আর ঈশানের বসের চরিত্রে শ্রীধরের অভিনয়। বরুণ অতীতে বহু ছবিতে একবার শুনলে কানে লেগে থাকার মত গান লিখেছেন। যাঁরা তাঁর কবিতার কথা জানেন, তাঁকে ঋজু বিদূষক হিসাবেও চেনেন, তাঁরা আরও ভালো করে জানেন তাঁর ভাষার উপর প্রশ্নাতীত দখলের কথা। সব মিলিয়ে যে প্রত্যাশা তৈরি হয়, অমিত ত্রিবেদী সুরারোপিত, জাভেদ আলি আর পাপোনের গাওয়া এই ছবির ‘ইয়ার মেরে’ সেই প্রত্যাশা পূরণ করে না।

ছবি শেষ হওয়ার পরেও চোখে লেগে থাকার মত দৃশ্যের অবশ্য শেষ নেই। তেমনই একটা দৃশ্য দিয়ে এই লেখা শুরু করেছিলাম। পরের দিকে শিশি ভর্তি আচারের, বন্ধুদের সঙ্গে কাড়াকাড়ি করে খাওয়ার জিনিস থেকে বেঁচে থাকার শেষ সম্বল হয়ে পড়ার দৃশ্যও অবিস্মরণীয়। কে জানে সে জন্যেই সচেতনভাবে নীরজ ওই করুণ দৃশ্যে ফ্রেমের মাঝখানে ‘সব ইয়াদ রখখা জায়গা’ কবিতার রচয়িতা আমির আজিজকে রেখেছেন কিনা! এই আলোচককে অবশ্য ছবি দেখার সপ্তাহখানেক পরেও তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে দুখানা ফাটা পা আর এক জোড়া নতুন চটি। এইসব কারণে নীতিন বৈদের সম্পাদনার কথাও আলাদা করে বলতেই হবে।

ছবি শেষ হওয়ার পরেও চোখে লেগে থাকার মত দৃশ্যের অবশ্য শেষ নেই। তেমনই একটা দৃশ্য দিয়ে এই লেখা শুরু করেছিলাম। পরের দিকে শিশি ভর্তি আচারের, বন্ধুদের সঙ্গে কাড়াকাড়ি করে খাওয়ার জিনিস থেকে বেঁচে থাকার শেষ সম্বল হয়ে পড়ার দৃশ্যও অবিস্মরণীয়। কে জানে সে জন্যেই সচেতনভাবে নীরজ ওই করুণ দৃশ্যে ফ্রেমের মাঝখানে ‘সব ইয়াদ রখখা জায়গা’ কবিতার রচয়িতা আমির আজিজকে রেখেছেন কিনা! এই আলোচককে অবশ্য ছবি দেখার সপ্তাহখানেক পরেও তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে দুখানা ফাটা পা আর এক জোড়া নতুন চটি। এইসব কারণে নীতিন বৈদের সম্পাদনার কথাও আলাদা করে বলতেই হবে।

নীরজ একজন আশ্চর্য পরিচালক। তিনি গোটা ছবিতে মানুষের শঠতা, অত্যাচার, অনাচার, অবিচার, দুঃখকষ্ট দেখান। তারপরেও এক চিলতে আশায় ছবি শেষ করেন। মসান ছবিতে শ্মশানের বামুনের মেয়ে দেবী পাঠক (রিচা চাড্ডা) আর ডোমের ছেলে দীপক চৌধুরীর (ভিকি কৌশল) সমান্তরালভাবে চলতে থাকা জীবন একসাথে বয়ে গিয়েছিল সঙ্গমের দিকে। এখানেও শেষমেশ দুরকমভাবে ঘরে ফিরেছে দুই বন্ধু। নীরজ শেষপর্যন্ত এমন এক দেশের স্বপ্ন জিইয়ে রেখেছেন, যেখানে হিন্দু বন্ধুর গৃহপ্রবেশে দরজা ফুল দিয়ে সাজায় মুসলমান বন্ধু। এ দৃশ্যই এদেশে স্বাভাবিক ছিল, ক্রমশ অস্বাভাবিক হয়ে দাঁড়াচ্ছে। অভিযোগ উঠেছে – মুসলমান রোগী দেখেন বলে হিন্দু ডাক্তারের চেম্বার বন্ধ করিয়ে দেওয়া হয়েছে খোদ পশ্চিমবঙ্গে। তাই বুক দুরুদুরু করে। পরিচালককে প্রশ্ন করতে সাধ হয় ‘ফিরব বললে ফেরা যায় নাকি/হারিয়েছ দেশ কাল জানো না কি?’

অবশ্য হয়ত নীরজই ঠিক, আমরা যারা আশঙ্কিত, তারাই ভুল। সংখ্যাগুরুবাদীদের গত কয়েক বছরের আপ্রাণ চেষ্টার পরেও, প্রধানমন্ত্রী নিজে প্রচার চালানোর পরেও, হিন্দি সিনেমার দর্শকরা ঘৃণা ছড়ানো সিনেমাকে বাতিল করে দিলেন তো। তাছাড়া ধর্মা প্রোডাকশনসের মত বলিউডের বিরাট প্রযোজনা সংস্থা এ ছবির দায়িত্ব নিল তো। যতই মার্টিন স্করসেসি এক্সিকিউটিভ প্রোডিউসার হোন, অত বড় ব্যানারের ছায়া না থাকলে যে এ ছবি দর্শকের মুখ দেখত না, তা সাম্প্রতিক কিছু উদাহরণ খেয়াল করলেই বোঝা যায়। অতএব হয়ত এখনো আশা করা অযৌক্তিক নয় যে, ক্রিকেট খেলতে খেলতে মুসলমান বন্ধুকে কেউ তার ধর্ম তুলে ‘নিজেদের এলাকায় গিয়ে খেল গে যা’ বললে হিন্দু বন্ধুর মারপিট করতে যাওয়ার দিন এদেশে ফুরোবে না। এ যুগের কোনো কবিকে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের মত ছোটবেলার বন্ধু আনোয়ারকে স্মরণ করে লিখতে হবে না ‘বন্ধু হারালে দুনিয়াটা খাঁ খাঁ করে/ভেঙে যায় গ্রাম, নদীও শুকনো ধূ ধূ/খেলার বয়েস পেরোলেও একা ঘরে/বার বার দেখি বন্ধুরই মুখ শুধু।’

নাগরিক ডট নেট ওয়েবসাইটে প্রকাশিত

অপর আর বিজ্ঞানের চিরকালীন ট্র্যাজেডির মঞ্চায়ন ফ্র্যাঙ্কেনস্টাইন

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার গডফাদার বলা হয় যাঁকে, সেই নোবেল পুরস্কার জয়ী বিজ্ঞানী জিওফ্রে হিন্টনও এখন এআই কোথায় গিয়ে পৌঁছবে তা নিয়ে দুশ্চিন্তাগ্রস্ত। তিনি ভয় পাচ্ছেন যে ‘এআই টেকওভার’ হয়ে যেতে পারে যে কোনোদিন। তাঁর কথাবার্তা শুনলে মনে হয় তিনিই এ যুগের ফ্র্যাঙ্কেনস্টাইন।

‘তোমার নাম কী?’
‘জানি না। ও তো কোনো নাম দেয়নি আমায়।’

  • ফ্র্যাঙ্কেনস্টাইন, মেরি শেলি (অনুবাদ – সিদ্ধার্থ বিশ্বাস; লেখনী প্রকাশন, প্রথম প্রকাশ: জানুয়ারি ১৯৯৬)

স্রষ্টা ভিক্টর ফ্র্যাঙ্কেনস্টাইনের মৃতদেহ কাঁধে নিয়ে উত্তর মেরুর বরফের মধ্যে অদৃশ্য হওয়ার আগে উপন্যাসে এই ছিল দানবের শেষ সংলাপ। অথচ কী ট্র্যাজেডি! এই উপন্যাস প্রকাশের (১৮১৮) দুশো বছর পেরিয়ে যাওয়ার পরেও ফ্র্যাঙ্কেনস্টাইন শব্দটা আমরা ব্যবহার করি স্রষ্টার ভুলে দানব হয়ে ওঠা মানুষকে বোঝাতে। আসলে স্রষ্টা, ক্ষমতাবান বা সংখ্যাগুরুর বয়ানই প্রতিষ্ঠা পায় সব যুগে। সে-ই নাম করে। তার অপছন্দের পক্ষের হয় বদনাম। নয়ত নামটা স্রেফ হারিয়ে যায়, অথবা যা খুশি একটা নাম চাপিয়ে দেয় ক্ষমতাশালী পক্ষ। আজ যেমন সোশাল মিডিয়ায় সব মুসলমান পুরুষই আবদুল, বহুকাল ধরে বাঙালিদের কাছে সব নেপালিই বাহাদুর।

এই নামহীন দুর্নামই হল ‘অপর’-এর জীবনের, দাসের জীবনের একমাত্র প্রাপ্তি। এর যন্ত্রণা অনুভব করা, যে কখনো অপরত্ব অনুভব করেনি তার পক্ষে বোঝা প্রায় অসম্ভব। রিডলি স্কটের ব্লেড রানার (১৯৮২) ছবিতে যেমন মৃত্যুবরণ করার আগে দাসত্ব কী তা রিক ডেকার্ডকে (হ্যারিসন ফোর্ড) হাতেনাতে দেখিয়ে দেয় কৃত্রিম উপায়ে তৈরি মানুষ – ছবির ভাষায় ‘রেপ্লিক্যান্ট’ – র‍য় ব্যাটি (রাইটজার হাওয়ার)। তবু কেন ডেকার্ডকে নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচিয়ে ব্যাটি নিজে নীরবে মৃত্যুবরণ করল শেষপর্যন্ত, তা ডেকার্ডের বোধগম্য হয় না। দাসের বা অপরের, জীবনের প্রতি মমত্ব, তার ভালবাসা, আমরা বুঝে উঠতে পারি না কিছুতেই। অপরকে দানব বা খুনি ভেবে যে স্বস্তি পাই, তা তাকে অনুভূতিসম্পন্ন মানুষ ভেবে পাই না।

নামহীন অপরের এই ট্র্যাজেডি কলকাতার মঞ্চে জীবন্ত করে তুলেছে থিয়েটার ফাউন্ডেশন পরিবর্তক ও ক্যান্টিন আর্ট স্পেস ইনিশিয়েটিভের নাটক ‘ফ্র্যাঙ্কেনস্টাইন’। শ্রাবন্তীর পরিচালনায় মেরির উপন্যাসে উত্থিত মৌলিক প্রশ্নগুলো – সৃষ্টির অনিশ্চয়তা, স্রষ্টার দায়, মনুষ্যত্বের সংজ্ঞা, বিশ্বাসের বাস্তবকে প্রভাবিত করার ক্ষমতা – সবই মূর্ত হয়ে উঠেছে। বিজ্ঞান তথা মানবসভ্যতা এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতে আজও হিমশিম খাচ্ছে। ফ্র্যাঙ্কেনস্টাইন ঈশ্বর হয়ে ওঠার দুর্দম লোভে, প্রকৃতির রহস্য ভেদ করার প্রবল উত্তেজনায় আবিষ্কারের পরিণাম ভেবে দেখেনি। ফলে ছারখার হয়ে গেছে নিজের, তার প্রিয়জনদের এবং তার সৃষ্টির জীবন। তেমনি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার গডফাদার বলা হয় যাঁকে, সেই নোবেল পুরস্কার জয়ী বিজ্ঞানী জিওফ্রে হিন্টনও এখন এআই কোথায় গিয়ে পৌঁছবে তা নিয়ে দুশ্চিন্তাগ্রস্ত। তিনি ভয় পাচ্ছেন যে ‘এআই টেকওভার’ হয়ে যেতে পারে যে কোনোদিন, ব্যাংকিং ব্যবস্থা সম্পূর্ণ বেদখল হয়ে যেতে পারে তার ফলে। তাই তিনি নিজের টাকাপয়সা তিনটে ব্যাংকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রাখছেন। তাঁর কথাবার্তা শুনলে মনে হয় তিনিই এ যুগের ফ্র্যাঙ্কেনস্টাইন।

এই দ্বিধা, দ্বন্দ্ব, আতঙ্ক অতি জটিল সংলাপ রচনা না করেও সফলভাবে সাধারণ দর্শকের সামনে উপস্থাপনার কৃতিত্ব শ্রাবন্তীর। পাশাপাশি যার অনুভূতি আছে, যে ভালবাসতে চায়, তাকে মানুষ বলে গণ্য করা যাবে না কেন – সে প্রশ্নও তুলে দেয় এই নাটক। স্কটের ছবিতে ‘রেপ্লিক্যান্ট’ প্রিস (ড্যারিল হানা) দার্শনিক রেনে দেকার্তের বিখ্যাত উক্তি ব্যবহার করে বলেছিল ‘আই থিংক দেয়ারফোর আই একজিস্ট’। শ্রাবন্তীর ‘ক্রিচার’ যেন বলতে চায় ‘আমি অনুভব করি, আমি ভালবাসি। এটাই আমার মনুষ্যত্বের প্রমাণ।’ কিন্তু মানুষের সঙ্গে অন্য প্রাণির বড় তফাত তো এই যে সে ঠান্ডা মাথায় অমানুষ হয়ে উঠতে পারে, মিথ্যে বলতে পারে। তার সৃষ্টিকেও সেই প্রতিহিংসা, সেই শঠতা শিখে নিতেই হয়। ক্রিচারও শিখে ফেলে, স্রষ্টা ফ্র্যাঙ্কেনস্টাইনের উপর প্রয়োগও করে।

মেরির উনবিংশ শতাব্দীতে লেখা উপন্যাসের এই সৃজনান্তর (adaptation) অনায়াসে সমসাময়িক হয়ে উঠেছে ক্রিচারের প্রতি ফ্র্যাঙ্কেনস্টাইনের সন্দেহকে ব্যবহার করে। তার বোন উইলিকে ক্রিচারই হত্যা করেছে – এমন প্রমাণ না থাকা সত্ত্বেও ফ্র্যাঙ্কেনস্টাইন তাকেই সরাসরি অভিযুক্ত করে। কোনো সংশয় থাকে না তার কণ্ঠে। তখনই ক্রিচার (জয়রাজ ভট্টাচার্য) ছুড়ে দেয় সেই সংলাপ, যা সংবেদনশীল পাঠককে নিজের অবস্থান সম্পর্কেও ভাবিয়ে তুলবে – ‘আমি হত্যা করেছি এটা তোমার বিশ্বাস’। এরকম নিঃসংশয় বিশ্বাসে কত মানুষকে আমরা অভিযুক্ত করে চলেছি রোজ! পথে ঘাটে, অফিস কাছারিতে, স্কুল কলেজে, ঘরোয়া আড্ডায় আর সোশাল মিডিয়ায়। অপরাধ না করেও নিরন্তর অবিশ্বাসের শিকার হওয়া, ঘৃণার পাত্র হওয়া মানুষকে সত্যি সত্যি দানব করে তোলার ক্ষমতা ধরে। ফ্র্যাঙ্কেনস্টাইন সেই ট্র্যাজেডির মঞ্চায়ন।

এই নাটকে প্রথম থেকে শেষপর্যন্ত যিনি অভিনয় দিয়ে দর্শককে চুম্বকের মত টেনে রাখেন, তিনি জয়রাজ। নাটকের শুরুতেই প্রাপ্তবয়স্ক শিশুর মত মরণ থেকে জেগে ওঠার সময়ে সারা গায়ে অসংখ্য নল জড়িয়ে থাকা অবস্থায় তাঁর শরীরী অভিনয় এবং জন্ম পরবর্তী আশ্চর্য আর্তনাদ অলৌকিক মুহূর্ত তৈরি করে। জন্মের অব্যবহিত পরে তাঁর ভাল করে হাঁটতে না শেখা শিশুর মত নড়াচড়া, সদ্যোজাতের মতই মুখ দিয়ে অর্থহীন আওয়াজ করা থেকে ক্রমশ দৃষ্টিহীন বৃদ্ধ ডি ল্যাসির সাহায্যে একটু একটু করে কথা বলতে শেখা, হাঁটাচলা স্বাভাবিক হয়ে আসা – একজন অভিনেতার ধাপে ধাপে এই প্রক্রিয়া পেরনো চোখের সামনে দেখা এক আশ্চর্য অভিজ্ঞতা। বৃদ্ধের সঙ্গে দৃশ্যগুলোতে জয়রাজ যে শিশুসুলভ সারল্য দেখিয়েছেন, গাছের পাতা ঝরা বা বরফ পড়ার দৃশ্যে যে অপাপবিদ্ধ আনন্দ দেখা দিয়েছে তাঁর চোখেমুখে, তা বজায় রেখেই ফ্র্যাঙ্কেনস্টাইনের সঙ্গে বৌদ্ধিক ঠোকাঠুকির দৃশ্যগুলোতে বুদ্ধিমত্তার পরিচয় এবং দার্শনিক প্রশ্ন তোলা এই অভিনয়কে স্মরণীয় করে রাখে। কেবল ওই অভিনয় দেখার লোভেই এ নাটক একাধিকবার দেখা যেতে পারে।

ক্রিচারের জন্ম, একাকিত্বের যন্ত্রণা, ভালবাসা, প্রতিহিংসা ফুটিয়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছে শুভঙ্কর, রাজু ধর, বিশ্বজিৎ, প্রীতম, তারক, অক্ষয় ও সুজয়ের আলোকসম্পাত। সময়ে সময়ে, বিশেষত ক্রিচারকে যখন শেষবার দেখা যায়, সে আলো হয়ে উঠেছে অলৌকিক। অন্যান্য চরিত্রগুলোর মধ্যে অন্ধ বৃদ্ধের চরিত্রে তাপস রায় প্রশংসনীয় অভিনয় করেছেন। ফ্র্যাঙ্কেনস্টাইন চরিত্রে ঋদ্ধিবেশ ভট্টাচার্য একটু উচ্চকিত।

তবে নাটকে মঞ্চের পিছনের পর্দার সিনেম্যাটিক ব্যবহার সময়ে সময়ে বাহুল্য হয়ে দাঁড়িয়েছে, অভিনেতারা যা করছেন তাতে মনোযোগ দেওয়াও কঠিন হয়ে গেছে কোনো কোনো মুহূর্তে। যেখানে মঞ্চের উপরে পাতা ঝরানো হয়েছে বা তুষারপাত দেখানো হয়েছে, সেখানে পিছনের পর্দাতেও একই দৃশ্য দেখানোর প্রয়োজন ছিল না। প্রায় প্রত্যেক দৃশ্যে পিছনের পর্দার ছবি বদলে দেওয়ারও বোধহয় দরকার ছিল না। কোনটা ডি ল্যাসি, ফেলিক্স, আগাথাদের বাড়ি আর কোনটা জঙ্গল বা ফ্র্যাঙ্কেনস্টাইনের জেনিভার বাড়ি – তা বুঝে নিতে নাটকের দর্শকের অসুবিধা হওয়ার কথা নয়। কারণ নাটক তৈরি হয় নির্দেশক, অভিনেতা আর দর্শকের মিলিত কল্পনাশক্তির জোরেই। এই নাটকে সামান্য কয়েকটা কাঠের টুকরো, বাক্স ইত্যাদিকে ফ্র্যাঙ্কেনস্টাইনের বিয়ের রাতের শয্যা ভেবে নিতে যখন দর্শকের অসুবিধা হচ্ছে না, তখন নির্দেশক আরেকটু বেশি বিশ্বাস রাখতেই পারতেন। আর বেমানান লেগেছে ফেলিক্স-আগাথার কণ্ঠে একদা ভারতের শ্রমিক আন্দোলনে ব্যবহৃত সেই গানটা, যা কোরাস (১৯৭৪) ছবিতে মৃণাল সেন ব্যবহার করেছিলেন। কারণ ইংরিজি উপন্যাসের এই সৃজনান্তরে আর কোথাও ভারতীয়করণের চেষ্টা নেই। চরিত্রগুলোর নাম, স্থানের নাম, পোশাক আশাক – সবকিছুই ইউরোপিয় রাখা হয়েছে। এমনকি জন মিলটনের প্যারাডাইস লস্ট আবৃত্তি করে ক্রিচার তার সংকট, তার একাকিত্বকে আরও জীবন্ত করে তোলে। সেই নাটকে ওই হিন্দি গানের ব্যবহার একেবারেই খাপ খায় না।

আরও পড়ুন জনপ্রিয় বাংলা ছবির সযত্ন সন্ধানে তালমার রোমিও জুলিয়েট

কিন্তু শ্রাবন্তীর সবচেয়ে বড় সাফল্য এই যে, ফ্র্যাঙ্কেনস্টাইন আজকের নাটক হয়ে উঠেছে। বস্তুত, ঠিক এখনই এই নাটক মঞ্চস্থ হওয়া দরকার ছিল। তবে এই সৃজনান্তরকে হয়ত আরও সমসাময়িক করে ফেলার, আরও বেশি দেশি করে তোলার সুযোগ ছিল। কারণ মেরির উপন্যাসে আছে ইংগোলস্টাডে প্লেগের কথা, যা ফ্র্যাঙ্কেনস্টাইনের পক্ষে বিভিন্ন শবদেহ থেকে দেহাংশ জোগাড় করা সহজ করে দিয়েছিল। আমরাও মাত্র বছর পাঁচেক আগে পেরিয়ে এলাম একটা অতিমারী, যেখানে নদীর পাড়ে পোড়ানো হচ্ছিল শবদেহ। ঠিক কত লোক মারা গেছে তা লুকোবার আপ্রাণ চেষ্টা করছিল এদেশের সমস্ত সরকার। মরণ থেকে কাউকে জাগিয়ে তোলার সেই তো প্রকৃষ্ট সময়।

নাগরিক ডট নেট ওয়েবসাইটে প্রকাশিত

রাজ্যের করোনা সামলানো দেখে হাসছে পাশবালিশ

পশ্চিমবঙ্গের প্রশাসন অতিমারির শুরু থেকেই নিঃসন্দেহ যে করোনা সবচেয়ে বেশি ছড়ায় স্কুল, কলেজ আর লোকাল ট্রেন থেকে।

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ছবি ইন্টারনেট থেকে

২০২০ সালের মে মাসে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেছিলেন “করোনাকে পাশবালিশ করে নিন।” অর্থাৎ করোনা থাকবে, করোনাকে নিয়েই চলতে হবে। তখন করোনার প্রথম ঢেউ চলছে, ভ্যাক্সিন আবিষ্কার হয়নি, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (World Health Organisation) থেকে শুরু করে কোনো দেশের কোনো দায়িত্বশীল সংস্থাই করোনার গতিপ্রকৃতি সম্পর্কে বিস্তারিত জানে না। ফলে মুখ্যমন্ত্রীর সেই মন্তব্য অনেককেই বিস্মিত করেছিল, মন্তব্যের সমালোচনা হয়েছিল, বিলক্ষণ হাসিঠাট্টাও হয়েছিল। কেউ কেউ অবশ্য চোখের সামনে গাদা গাদা মানুষকে মরতে দেখেও দৃঢ়প্রত্যয়ী ছিলেন, যে করোনা কোনো রোগই নয়, স্রেফ চক্রান্ত। এঁদের মধ্যে যাঁরা দক্ষিণপন্থী তাঁরা বলতেন চীনের চক্রান্ত, আর বামপন্থীরা বলতেন স্বৈরাচারী শাসকদের গণতন্ত্র ধ্বংস করার চক্রান্ত। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যে অতি বিচক্ষণ বলেই পাশবালিশের পরামর্শ দিয়েছেন, এ কথা সেইসময় জোর গলায় একমাত্র ওঁরাই বলেছিলেন। পরে যখন বিজ্ঞানীরা বললেন অন্য অনেক ভাইরাসের মত করোনাও ক্রমশ শক্তি হারিয়ে ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাসের মত হয়ে যাবে কিন্তু মরবে না, তখন ওঁরা সোল্লাসে বলেছিলেন, হুঁ হুঁ বাওয়া, আমরা তখনই জানতুম। মুখ্যমন্ত্রীকে নিয়ে হাসাহাসি করা? উনি কি না জেনে কথা বলেন?

এখন ২০২২ সালের জানুয়ারি মাস, সারা পৃথিবীতে ভ্যাক্সিন দেওয়া চলছে। এ দেশে কেন্দ্রীয় সরকারের প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী ৩১শে ডিসেম্বর, ২০২১ তারিখের মধ্যে সকলকে বিনামূল্যে ভ্যাক্সিন দেওয়া না হয়ে থাকলেও অনেক মানুষ ভ্যাক্সিন পেয়েছেন। কোনো কোনো দেশে বুস্টার ডোজও দেওয়া হচ্ছে। ইতিমধ্যে করোনার দ্বিতীয় ঢেউ বহু প্রাণ নিয়ে চলে গেছে, ওমিক্রন ভ্যারিয়্যান্টের হাত ধরে তৃতীয় ঢেউ এসে পড়েছে। অনেক দেশে দেখা যাচ্ছে ভাইরাসটা ছড়াচ্ছে আগের চেয়েও দ্রুত, কিন্তু ক্ষতি করার শক্তি আগের চেয়ে কম। আক্রান্তদের মধ্যে হাসপাতালে ভর্তি করতে হচ্ছে এমন মানুষের সংখ্যা কম, মৃত্যুহারও কম। তবে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এখনো সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছে, কারণ তাদের মতে আমাদের হাতে ওমিক্রন সম্পর্কে এখনো যথেষ্ট তথ্য নেই।৩ কিন্তু যা নিশ্চিত, তা হল শিশুদের করোনায় আক্রান্ত হওয়া বা হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার মত অসুস্থ হওয়ার সম্ভাবনা কম। ওমিক্রন বলে নয়, অতিমারির শুরু থেকেই দেখা গেছে খুব কম শিশুকেই কোভিড-১৯ কাবু করতে পারছে। তবু পশ্চিমবঙ্গের শিশুরা স্কুলে যাওয়ার অনুমতি পাচ্ছে না। অর্থাৎ করোনাকে পাশবালিশ করে নেওয়ার ক্ষমতা যাদের সবচেয়ে বেশি, তাদেরই বেরোতে দেওয়া হচ্ছে না। মুখ্যমন্ত্রীর ভাইরোলজি সম্বন্ধে সম্যক জ্ঞান সম্পর্কে যাঁরা দু বছর আগে নিঃসন্দেহ ছিলেন, এখন দেখা যাচ্ছে তাঁরাই স্কুল কেন খোলা হল না, যেটুকু খোলা হয়েছিল সেটুকুও কেন বন্ধ করে দেওয়া হল — তা নিয়ে বিস্তর রাগারাগি করছেন।

বাকি পৃথিবীর গবেষণা যা-ই বলুক, পশ্চিমবঙ্গের প্রশাসন অতিমারির শুরু থেকেই নিঃসন্দেহ যে করোনা সবচেয়ে বেশি ছড়ায় স্কুল, কলেজ আর লোকাল ট্রেন থেকে। লোকাল ট্রেন বন্ধ রেখে বা কমিয়ে দিয়ে রাস্তাঘাটের ভিড় কমানোর ভাবনা কতটা হাস্যকর তা আলাদা করে বলে দিতে হয় না। বরং স্কুল খোলা সম্পর্কে কিছু জরুরি কথা বলা দরকার।

১ নভেম্বর ২০২১ থেকে দিল্লিতে সমস্ত ক্লাসের জন্য ৫০% হাজিরার শর্তে স্কুল খুলে গিয়েছিল, গত কয়েকদিন করোনা আবার বৃদ্ধি পাওয়ায় ফের বন্ধ করা হয়েছে। একই সময়ে কোভিড বিধি মেনে খুলে গিয়েছিল কেরালার স্কুলগুলোও।৫ কর্ণাটকে প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণির ক্লাস শুরু হয়েছিল ২৫ অক্টোবর। সম্প্রতি আক্রান্ত বাড়তে থাকায় অনেক স্কুলে বড়দিনের ছুটি বাড়ানো হয়েছে। মহারাষ্ট্রে হাইস্কুলের ছাত্রছাত্রীদের ক্লাস শুরু হয়েছিল অক্টোবর মাসের গোড়াতেই, প্রাথমিক স্তরের শিশুদের ক্লাস শুরু হয়েছে ডিসেম্বরে।৭ পাশের রাজ্য ঝাড়খন্ডে নবম থেকে দ্বাদশ শ্রেণির ক্লাস চালু হয়ে গিয়েছিল ২ আগস্টেই, দীপাবলির পর থেকে নীচু ক্লাস এবং প্রাথমিক স্কুলগুলোও খুলেছে। বলাই বাহুল্য, প্রয়োজন হলে সব রাজ্যের সরকারই ফের স্কুল বন্ধ করার নির্দেশ দেবেন। কিন্তু লক্ষণীয় ব্যাপার হল, এতগুলো রাজ্যে সমস্ত শ্রেণির ছাত্রছাত্রীদের জন্য স্কুল খুলে দেওয়া সম্ভব হয়েছে, পশ্চিমবঙ্গে বিচক্ষণ মুখ্যমন্ত্রীর উপস্থিতি সত্ত্বেও হয়নি। পশ্চিমবঙ্গে ২০২১ সালের এপ্রিল-মে মাসে বিধানসভা নির্বাচন ছিল। শিক্ষক-শিক্ষিকাদের ভোটকর্মী হতে হবে বলে অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে ভ্যাক্সিন দেওয়া হয়েছিল। যাঁরা সে যাত্রায় ভ্যাক্সিন পাননি, তাঁদেরও সরকার চাইলে সত্বর ভ্যাক্সিন দেওয়ার ব্যবস্থা করতে পারতেন। তারপর স্কুল খোলা যেতে পারত। সেসব করা হয়নি। সুতরাং মনে করা অমূলক নয় যে দিল্লির আপ সরকার, মহারাষ্ট্রের শিবসেনার নেতৃত্বাধীন জোট সরকার, ঝাড়খণ্ডের জেএমএম-কংগ্রেস সরকার, এমনকি কর্ণাটকের বিজেপি সরকারেরও স্কুলশিক্ষা নিয়ে মাথাব্যথা আছে। পশ্চিমবঙ্গের তৃণমূল সরকারের নেই।

মুখ্যমন্ত্রী যে করোনাকে পাশবালিশ করে ফেলতে বলেছিলেন, সেটা কিন্তু স্রেফ কথার কথা নয়। অন্তত পশ্চিমবঙ্গে নয়। অনেক ক্ষেত্রেই করোনাকে বুকে জড়িয়েই এগোনো হয়েছে, যেমন নির্বাচন। ২০২০ সালের মার্চের পর থেকে স্কুল, কলেজ একটানা বন্ধ থেকেছে; এই কয়েক মাসের জন্য খুলে আবার বন্ধ হয়ে গেল। রাজ্যের সবচেয়ে বড় দুটো পরীক্ষা — মাধ্যমিক আর উচ্চমাধ্যমিক— বাতিল হয়ে গেছে। কিন্তু নির্বাচন হয়েছে যথাসময়ে, ভরপুর প্রচার সমেত। কেবল বিধানসভা নয়, সামান্য দেরিতে হলেও কলকাতা কর্পোরেশনের নির্বাচন হয়েছে। রাজ্যের বাকি কর্পোরেশন এবং ছোট পৌরসভাগুলোর নির্বাচনও পাশবালিশ নিয়ে খেলতে খেলতেই হয়ে যাবে নিঃসন্দেহে। বড়দিন, নতুন বছর উদযাপন করতে যারা পার্ক স্ট্রিটে ভিড় জমিয়েছিল, তাদের পাশবালিশের অধিকারকেও সরকার সম্মান দিয়েছেন। গঙ্গাসাগরের তীর্থযাত্রীদেরও পাশবালিশের অধিকার সুরক্ষিত।

স্কুল, কলেজ ফের বন্ধ করে দেওয়ায় যে ক্ষতি তার তবু কিছুটা পরিমাপ হয়েছে। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম, সমাজসেবী সংস্থার কল্যাণে এবং কিছুটা সোশাল মিডিয়ার দৌলতে আমরা জানতে পেরেছি বিশেষত গ্রামাঞ্চলে স্কুলশিক্ষার কী অপরিসীম ক্ষতি এর মধ্যেই হয়ে গিয়েছে। ক্লাসে ফার্স্ট হয় যে মেয়ে, তার বিয়ে হয়ে গেছে — এমন খবরও আমাদের অজানা নেই। কিন্তু যে ক্ষতির কোনো পরিমাপ হয়নি, হয়ত হবেও না, তা হল মাসের পর মাস লোকাল ট্রেন বন্ধ করে রাখার ক্ষতি। কেবল শহর ঘেঁষা মফস্বল নয়, দূর গ্রামেরও বিপুল সংখ্যক মানুষকে রুটিরুজির জন্য নিত্য কলকাতায় আসতে হয়। সেই আসা যাওয়ার প্রধান মাধ্যম হল হাওড়া, শিয়ালদা থেকে ছাড়া লোকাল ট্রেন। শুধু যাত্রীদের কথা বললেও সবটা বলা হয় না। এই লোকাল ট্রেনে হকারি করে দিন গুজরান হয় বহু মানুষের। লোকাল ট্রেন বন্ধ রাখা মানে তাঁদের জীবিকারও সর্বনাশ করা। মার্চ ২০২০ থেকে অক্টোবর ২০২১ পর্যন্ত কতজন লোকাল ট্রেনের হকার আত্মহত্যা করেছেন তার কোনো পরিসংখ্যান কখনো পাওয়া যাবে কিনা সন্দেহ। আর অনাহারে মৃত্যু বলে তো এ দেশে, এ রাজ্যে কিছু হয় না আজকাল। রাত দশটা অব্দি লোকাল ট্রেন চললে আশা করি হকাররা সপরিবারে অন্তত অর্ধাহারের উপযোগী রোজগার করতে পারবেন।

তা এসবের প্রতিকার কী? প্রতিকার নেই। কারণ কোনো সরকার যখন পাশবালিশের বেশি ভেবে উঠতে পারে না, তখন খাদ্য বস্ত্র বাসস্থান শিক্ষা স্বাস্থ্যের কথা বলার দায়িত্ব নিতে হয় বিরোধীদের। অধিকার কী তা যখন মানুষ ভুলে যায়, গণতন্ত্রে তা মনে করিয়ে দেওয়ার, অধিকার আদায়ের আন্দোলন করার দায়িত্ব বিরোধীদের। কিন্তু এ রাজ্যের বিরোধীরাও নিজ নিজ পাশবালিশ নিয়ে ব্যস্ত। প্রধান বিরোধী দল বিজেপির পাশবালিশ হল হিন্দুত্ব। স্কুল, কলেজ, লোকাল ট্রেন নিয়ে তাদের মাথাব্যথা নেই। উপস্থিত লোকলস্করও নেই, কারণ অনেকেই এসেছিল তবু আসে নাই। নির্বাচনের পর তৃণমূলে ফিরে গেছে। আর যে বিরোধীরা বিধানসভায় আসনের নিরিখে শূন্য হলেও এখনো কিছুটা লোকবলের অধিকারী, তাদের পাশবালিশ হল সোশাল মিডিয়া। ফেসবুক, টুইটার খুললেই সিপিএম নেতা, কর্মীদের পোস্ট দেখে জানা যাচ্ছে (১) স্কুল, কলেজ বন্ধ রাখা হীরক রাজার পাঠশালা বন্ধ করে দেওয়ার সমতুল্য এবং একই উদ্দেশ্যে করা; (২) পশ্চিমবঙ্গের গোটা গোটা প্রজন্ম নষ্ট হয়ে যাচ্ছে এর ফলে; (৩) লোকাল ট্রেন কমালে আরও বেশি ভিড় হবে, তাতে বরং সংক্রমণ ছড়ানোর সম্ভাবনা বাড়বে। আরও নানা কথা যা সকলেরই জানা আছে। বিকল্প বামেরাও ফেসবুক বিদীর্ণ করে এসব বলছেন, সঙ্গে থাকছে করোনা কীভাবে গণতন্ত্রের সর্বনাশ করেছে তার উল্লেখ।

উভয় পক্ষই যা বলছেন সঠিক বলছেন, কিন্তু মুশকিল হল সোশাল মিডিয়ায় ওসব লেখার জন্যে তো আমাদের মত অক্ষম নিষ্কর্মারা রয়েছে। বিরোধী রাজনীতির লোকেদের তো এগুলো নিয়ে রাস্তায় নামার কথা। কোথায় আইন অমান্য? কোথায় স্কুল খোলার দাবিতে নবান্ন অভিযান? কোথায় লোকাল ট্রেন যেমন চলছিল তেমন রাখার দাবি নিয়ে রাস্তায় বসে পড়া? সুজনবাবু, সেলিমবাবু, সূর্যবাবুরা মমতা ব্যানার্জির ভূমিকার নিন্দা করে এন্তার লাইক কুড়োচ্ছেন। দীপঙ্করবাবু সর্বভারতীয় নেতা, ফলে ওঁর নীরবতা নিয়ে অভিযোগ করা চলে না। উনি পশ্চিমবঙ্গ নিয়ে টুইট করার মধ্যেও যাননি গত কয়েক দিনে। নেতারা যে পথে চলেন, স্বাভাবিকভাবে কর্মীরাও সে পথেই চলবেন। ফলে সোশাল মিডিয়ায় সরকারের অগণতান্ত্রিকতা নিয়ে লেখালিখির পাশাপাশি বড়দিনে যারা ফুর্তি করতে বেরিয়েছিল তাদের নির্বুদ্ধিতা, ভোগবাদ ইত্যাদিকে আক্রমণ করা চলছে। যেন ক্ষমতা প্রয়োগ করে ফুর্তি স্থগিত করে দেওয়া সরকারের দায়িত্ব ছিল না, যেন সাধারণ মানুষ এতই অবাধ্য যে এ বছর সরকার পার্ক স্ট্রিটে সমস্ত উদযাপন বন্ধ রাখতে নির্দেশ দিলেও বৈপ্লবিক কায়দায় সান্টা ক্লসের টুপি পরে ঝাঁপিয়ে পড়ত। আরও মজার কথা, বিপ্লবীরা সেইসব দিন আনি দিন খাই লোকেদের কথা ভুলেই গেছেন, যাঁরা বছরের এই সময়টায় মানুষ ফুর্তি করতে বেরোয় বলে দুটো পয়সা রোজগার করতে পারেন।

রাজ্যের এই দুর্দশা দেখে কারোর হয়ত চোখে জল আসতে পারে, তবে হাসছে পাশবালিশ।

তথ্যসূত্র

১। https://bangla.hindustantimes.com/

২। https://timesofindia.indiatimes.com/world/rest-of-world/why-an-omicron-wave-may-not-be-as-severe-as-delta/articleshow/88498802.cms

৩। https://fortune.com/2021/12/30/omicron-less-dangerous-covid-too-soon-to-know-who-warns/

৪। https://www.livemint.com/news/india/all-schools-in-delhi-to-reopen-from-today-covid-19-guidelines-and-other-details-11635725583788.html

৫। https://timesofindia.indiatimes.com/home/education/news/kerala-schools-reopen-after-long-covid-19-break/articleshow/87463018.cms

৬। https://timesofindia.indiatimes.com/home/education/news/after-18-months-schools-reopen-across-maharashtra-for-physical-classes/articleshow/86745389.cms

৭। https://indianexpress.com/article/cities/pune/maharashtra-offline-classes-for-primary-schools-students-to-resume-december-1-7641081/

৮। https://www.indiatoday.in/education-today/news/story/jharkhand-schools-reopen-from-today-for-classes-9-to-12-1835746-2021-08-02

৯। https://www.news18.com/news/education-career/jharkhand-schools-to-open-and-close-at-8-am-and-noon-respectively-4557812.html

https://nagorik.net এ প্রকাশিত

তারুণ্যের হাড়িকাঠে বলি দেওয়া হয়নি শৈলজাকে

সংবাদমাধ্যম এবং এল ডি এফ-বিরোধী দল ও ব্যক্তিবর্গ রেগে আগুন। রাগ আবর্তিত হচ্ছে কে কে শৈলজাকে কেন্দ্র করে।

ভারতে প্রবীণ মানে প্রাজ্ঞ ভাবাই রীতি, কিন্তু সম্প্রতি তরুণদের সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ায় রাজনীতিতে যৌবনই অধিক প্রার্থিত। সেই ধারা মেনে কমিউনিস্ট নেতৃত্ব থেকে জীর্ণ, পুরাতন যাক ভেসে যাক — এই দাবি উঠেছে। পশ্চিমবঙ্গে বাম প্রার্থী তালিকায় নতুন মুখের ভিড় প্রশংসিত হয়েছে, কোন আসনে না জিতলেও তরুণ প্রার্থীরা নিজ নিজ কেন্দ্রে পার্টির ভোট বাড়াতে পেরেছেন। কিন্তু কেরালার ৭৫ বছর বয়সী সিপিএম মুখ্যমন্ত্রী পিনারাই বিজয়ন তরুণ মন্ত্রিসভা তৈরি করে সমালোচিত হচ্ছেন।

বিজয়নের ২১ জনের মন্ত্রিসভায় দশজন প্রথমবারের বিধায়ক, বেশিরভাগ আগে কখনো মন্ত্রী হননি। এ নিয়ে সংবাদমাধ্যম এবং এল ডি এফ-বিরোধী দল ও ব্যক্তিবর্গ রেগে আগুন। রাগ আবর্তিত হচ্ছে কে কে শৈলজাকে কেন্দ্র করে। স্বাস্থ্যমন্ত্রী হিসাবে অতিমারীর সময় তাঁর কাজ আন্তর্জাতিকভাবে প্রশংসিত। কেন তাঁকে বাদ দেওয়া হল? সিপিএমের ব্যাখ্যা — শৈলজার ব্যাপারে আলাদা কোন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি, তারুণ্যকে গুরুত্ব দেওয়ার সামগ্রিক সিদ্ধান্তের অঙ্গ হিসাবেই তিনি বাদ। কিন্তু বাতাসে নানাবিধ অভিযোগ ভেসে বেড়াচ্ছে। প্রথমত, কেরালার কমিউনিস্টরা নারীবিদ্বেষী। দ্বিতীয়ত, বিজয়ন শৈলজাকে মুখ্যমন্ত্রী পদের দাবিদার মনে করছিলেন। তাই পথের কাঁটা সরিয়ে দিলেন। তৃতীয়ত, তারুণ্যের অজুহাতে তিনি স্বজনপোষণ করছেন। তাঁর জামাই মন্ত্রিসভার সদস্য হলেন অথচ শৈলজার জায়গা হল না?

প্রথম অভিযোগটা নিয়ে কদিন বহু নারীবাদী সোশাল মিডিয়ায় বিস্তর লড়েছেন। কিন্তু মন্ত্রিসভা শপথ নেওয়ার পর দেখা গেল সেখানে তিনজন মহিলা রয়েছেন, যা কেরালায় সচরাচর হয় না। উপরন্তু শৈলজার দপ্তরের দায়িত্বও দেওয়া হয়েছে একজন মহিলাকে। সেই বীণা জর্জ অনভিজ্ঞ, কিন্তু পাঁচ বছর আগে শৈলজাও অনভিজ্ঞ ছিলেন।

দ্বিতীয় অভিযোগের মুশকিল হল, জয়ী দলের মধ্যে মুখ্যমন্ত্রী বদলানোর কোন দাবি উঠেছিল — এমন ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে না। শৈলজাকে মন্ত্রিসভায় রেখে দেওয়া হোক — রাজ্য কমিটির অন্তত সাতজন এমনটা চেয়েছিলেন বলে এক সংবাদপত্র জানিয়েছে। কিন্তু নেতৃত্ব বদলের দাবির খবর নেই। তাহলে বিজয়ন চ্যালেঞ্জের আশঙ্কা করলেন কখন এবং কেন? কেরালা সিপিএম পরপর দুবার কাউকে মন্ত্রী না করার নীতি ঘোষণা করেছে। সেই অনুযায়ী ২০২৬-এ এল ডি এফ ফের জিতলেও বিজয়ন মুখ্যমন্ত্রী হতে পারবেন না। তাহলে কার পথ, কে-ই বা কাঁটা? পরবর্তীকালে দলের নিয়ম স্রেফ বিজয়নের জন্য ভাঙা হলে তা নিশ্চয়ই নিন্দাযোগ্য। কিন্তু তার জন্য পাঁচটা বছর অপেক্ষা করতে হবে। ইতিমধ্যে শৈলজাকে বিধানসভায় পার্টির হুইপ করা হয়েছে। মন্ত্রিত্ব যাদের মোক্ষ, তাদের কাছে এটা অবশ্যই পদাবনতি। শৈলজার মনোভাব অদূর ভবিষ্যতেই বোঝা যাবে।

বিজয়নের জামাই মহম্মদ রিয়াজ কি স্রেফ জামাই বলেই মন্ত্রী হয়েছেন? তাহলে বিজয়ন অবশ্যই ‘ডাইনেস্টি’ প্রতিষ্ঠা করছেন। রিয়াজ স্কুলে পড়ার সময় থেকে সিপিএমের ছাত্র সংগঠনের সাথে যুক্ত, ইউনিট কমিটি থেকে রাজনীতি করা শুরু করেছেন, পার্টি সদস্য ১৯৯৩ থেকে। বিজয়ন কন্যার সাথে বিয়ে হয়েছে ২০২০-তে। এ যদি ডাইনেস্টি হয়, তাহলে ডাইনেস্টির সংজ্ঞা নিয়ে আলোচনা দরকার।

আরও পড়ুন কংগ্রেস-সিপিএম জোট নিয়ে সীতারামায়ণ

পশ্চিমবঙ্গে বাম শাসনের ৩৪ বছরে এই আলোচনার দরকার পড়েনি। সংসদীয় রাজনীতিতে কোন কমিউনিস্ট দলের এত দীর্ঘ শাসনকাল যেমন বিরল, তেমনি নির্বাচনে ক্ষমতা হারানোর পর বারবার ফিরে আসাও পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল। জার্মানি, ইতালি বা স্পেনে একদা কমিউনিস্ট দলগুলো যথেষ্ট জনপ্রিয় ছিল। গত শতাব্দীর দ্বিতীয় ভাগ থেকে ক্ষমতার বৃত্তের বাইরে থাকতে থাকতে ক্রমশ ক্ষয়প্রাপ্ত হয় (অনেকটা বঙ্গ সিপিএমের মত)। পরবর্তীকালে অন্য চেহারায় অন্য নামে, সমাজবাদী বা কোন মধ্যপন্থী দলের সাথে মিলে কমিউনিস্টরা ক্ষমতায় ফিরেছে। কমিউনিস্ট পরিচয়ে নয়। সুতরাং কেরালাও বিশ্বের কমিউনিস্ট আন্দোলনের ইতিহাসে বিরল দৃষ্টান্ত। এহেন দৃষ্টান্ত স্থাপন করে কেরালার কমিউনিস্টরা যে মন্ত্রিসভা বানালেন, তার ফল ক্রমশ বোঝা যাবে। তবে যে দেশে কোন রাজ্যে দাগী আসামী মুখ্যমন্ত্রী হয়, কোথাও বা মন্ত্রীদের গ্রেপ্তারি আটকাতে মুখ্যমন্ত্রীকে নিজের গ্রেপ্তারি চাইতে হয় — সে দেশে এক রাজ্যের মন্ত্রিসভায় কেন একজন কর্মঠ মন্ত্রীর পুনর্বার জায়গা হল না, তা নিয়ে বিতর্ক ভারতীয় গণতন্ত্রের স্বাস্থ্য নিয়ে কিঞ্চিৎ আশার আলো দেখায়।

উত্তরবঙ্গ সংবাদে প্রকাশিত