আন্দোলন, ন্যায়বিচার, পুজো: একটি অরোম্যান্টিক বয়ান

একটা রাজ্যের সরকারের প্রত্যক্ষ মদতে, বা নিদেনপক্ষে অপদার্থতায়, একটা মেয়েকে ধর্ষণ করে খুন করা হয়েছে। তার বিরুদ্ধে সর্বশক্তি দিয়ে আন্দোলন করা দরকার। তা বলে সবাইকে সবকিছু থামিয়ে যারা এই অপরাধে কোনওভাবেই যুক্ত নয়, তাদের শাস্তি দিতে হবে? এ আবার কী আহ্লাদ? প্রতিবাদে পথনাটিকা হতে পারে, প্রেক্ষাগৃহে নাটকের শো করা যাবে না? হলে সিনেমা মুক্তি পেতে পারবে না? যে শিশুরা এখনও জানে না বাবা মায়ের কে হয়— তাদেরও পুজোয় মুখ ভার করে থাকতে হবে? এ তো চোরের উপর রাগ করে মাটিতে ভাত খাওয়া।

কদিন হল বৃষ্টির পরে বেশ মিঠে রোদ উঠছে। নীল আকাশে সাদা মেঘের ভেলা-টেলা ভেসে বেড়াচ্ছে। বোঝাই যাচ্ছে শরৎকাল এসে পড়ল বলে। এই সময়ে বাংলার বাঙালির মন উড়ু উড়ু হয়, আর প্রবাসী বাঙালির মন ঘুরু ঘুরু হয়। অর্থাৎ ঘুরতে ঘুরতে বাড়ি চলে আসতে ইচ্ছে করে। তা এমন দিনে যদি পশ্চিমবাংলার মুখ্যমন্ত্রী বলেন উৎসবে ফিরে আসতে – তাহাতে এ জগতে ক্ষতি কার? অন্যান্য বছরে তো কেউ গোঁসা করে না। মুখ্যমন্ত্রী চারদিনের পুজোকে টানতে টানতে এক সপ্তাহের করেছেন, লোকে সোৎসাহে মহালয়া থেকেই সপরিবারে ঠাকুর দেখতে বেরিয়ে পড়ছে, সরকারি টাকায় পুজোগুলোর বাজেট বছর বছর বাড়ছে। দুর্গাপুজোকে আন্তর্জাতিক কার্নিভাল বানিয়ে ফেলেছেন মুখ্যমন্ত্রী। কার প্যান্ডেল কত বড়, কার ঠাকুর এত লম্বা যে চাঁদ থেকে দেখা যায়— এসবের বাৎসরিক প্রতিযোগিতা হয়। বছরে একদিন রেড রোডে বসে মুসলমানরা নমাজ পড়ে বলে যাদের বাকি ৩৬৪ দিন ঘুম হয় না, তারাও রেড রোড জুড়ে দশমীর পরের কার্নিভাল হাঁ করে ইউটিউবে লাইভ দেখে। স্কুল কলেজে পুজোর ছুটি বাড়তে বাড়তে একমাস পেরিয়ে যাওয়ার উপক্রম। তা নিয়েও ছাত্রছাত্রী, অভিভাবক, শিক্ষকদের বেশিরভাগকেই উচ্চবাচ্য করতে দেখা যায় না। প্রায় দেড় দশক ধরে এই মজা পুরোদমে উপভোগ করছে যে রাজ্যের মানুষ, তারা যে এবারে পুজোর নাম শুনেই খচে বোম হবে, বেচারি মমতা ব্যানার্জি বুঝবেন কী করে? আমরা জানি তিনি উকিল, তিনি বহুভাষাবিদ, তিনি সাহিত্যিক, তিনি চিত্রশিল্পী। তা বলে তো জ্যোতিষী নন।

জননেতাদের অবশ্য অঙ্কে ভাল হতে হয়, কে কী ভাবতে পারে সেটা পাকা দাবা খেলোয়াড়দের মতো আগে থেকে হিসাব করে ফেলতে হয়। মমতা ব্যানার্জিও অঙ্কে ভালই ছিলেন অ্যাদ্দিন, নইলে এতবছর আন্দোলন করে ক্ষমতায় আসা যায় না। ক্ষমতায় টিকে থাকাও যায় না। তবে বয়স বাড়ায় বিশ্বনাথন আনন্দের ধার কমে গেছে, আর মমতার কমবে না তা কি হয়? আরজিকর-কাণ্ডের পর থেকেই নিজের চালে অন্যপক্ষের প্রতিক্রিয়া তাঁকে চমকে দিচ্ছে। আমোদগেঁড়ে বাঙালির আমোদগেঁড়েমির মাত্রাটা কেবল মমতা নয়, প্রতিবাদীরাও অনেকেই বেশি ভেবে ফেলেছিলেন। ফলে এখন মহা মুশকিল হয়েছে।

একটা জলজ্যান্ত মেয়ে ওভাবে মরেছে। এ নিয়ে বারবার নানারকম বিশ্লেষণ করতে ভালও লাগে না। নিজের উপরেই রাগ হতে থাকে। তাই চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম থেকে টুক করে লাইনে নেমে পালিয়ে যাব ভেবেছিলাম। কিন্তু টিকিট-কালেক্টর সোমেনদা যে মোবাইল চেকিং করে গ্রেফতার করবেন সেটা ঠাহর করতে পারিনি। অগত্যা বর্তমান ও অদূর ভবিষ্যৎ সম্পর্কে আমার ধারণা লিখতে গিয়ে রীতিমতো রচনা হয়ে গেল। পর্শ গাড়িতে চেপে কাউকে চাপা না দিয়েও এত বড় শাস্তি আমায় ভোগ করতে হল। অতএব পাঠককেও শাস্তির ভাগ না দিয়ে ছাড়ব না। এর যা প্রতিক্রিয়া হবে, তার দায়িত্ব সোমেনদার। সরকারি হাসপাতালে হওয়া ঘটনার দায়িত্ব যদি স্বাস্থ্যমন্ত্রী এড়াতে পারেন, আমিও আমার লেখার দায়িত্ব এড়াব।

 

আন্দোলন

অনেকে অনেকরকম প্রত্যাশা নিয়ে এই আন্দোলনে নেমেছিলেন। রাজ্যজুড়ে মানুষের মনে যে এত ক্ষোভ জমে আছে তা সরকারও ভাবেনি, যাঁরা আন্দোলন শুরু করেছিলেন তাঁরাও ভাবেননি। ফলে ১৪ আগস্ট রাতদখল কর্মসূচিকে রাজ্য সরকার বা তৃণমূল কংগ্রেস একেবারেই বাধা দেয়নি। অনেক জায়গায় পুলিশ নিজে গিয়ে দোকানদারদের বলে এসেছিল ‘আজ সারারাত দোকান খোলা রাখবি। আন্দোলন আছে।’ পশ্চিমবঙ্গে আগের আমল থেকেই যা হয়— অটোচালক, টোটোচালক ইউনিয়নগুলো সরকারি দলের অনুগত। তারাও সব চালু রেখেছিল। মানে নিজেদের ইচ্ছা ছিল না বলছি না। কিন্তু নিজেদের ইচ্ছা থাকলেও, দাদাদের ইচ্ছা না থাকলে এ কাজ করার মতো গণতান্ত্রিক পরিবেশ যদি পশ্চিমবঙ্গে থাকত, তাহলে এই আন্দোলন এত বড় হয়ে উঠত না। কেন্দ্রের শাসক দল এবং রাজ্যের বিরোধী দল বিজেপিও ভেবেছিল ‘দ্যাখ কেমন লাগে’। ফলে তাদের অধীন মেট্রো পরিষেবাও আন্দোলনকারীদের দাবিতে আন্দোলনের সুবিধার্থে সে রাতে দীর্ঘায়িত হয়েছিল। আবার কলকাতার অ্যাপ ক্যাব চালকদের মধ্যে যাদের ইউনিয়ন আছে, সেই সিপিএমের বদান্যতায় ওলা, উবেরও সারারাত চলেছিল। এরকম সার্বিক পৃষ্ঠপোষকতা কেন? উত্তরটা সহজ।

মমতার সরকার ও তাঁর দল ভেবেছিল সোশাল মিডিয়ায় ডাকা আন্দোলন, কত বড় আর হবে? লোকে খেপেছে যখন, রাস্তায় বেরিয়ে একটু চেঁচামেচি করে নিক। তাহলেই ভিতরের ক্ষোভ সব বেরিয়ে যাবে, তারপর স্বাধীনতা দিবসে ছুটি কাটিয়ে ১৬ তারিখ ঢেঁকুর তুলতে তুলতে সবাই অফিস চলে যাবে। আন্দোলন খতম। আন্দোলনের অভিমুখ নিয়েও আন্দোলনকারীরা যারপরনাই আশ্বস্ত করেছিলেন সরকারকে। আহ্বায়করা মা সারদার মতো আধ্যাত্মিক বাণী দিয়েছিলেন— কোনও দলকে এর ফায়দা তুলতে দেওয়া হবে না, কেউ কোনও দলের পক্ষ থেকে এলে তাকে ফেরত পাঠানো হবে। আন্দোলনটা তাহলে কার বিরুদ্ধে আর কার পক্ষে? এসব পার্থিব প্রশ্নের অনেক ঊর্ধ্বে ওঁরা। কোনও আহ্বায়ক আবার বেগম রোকেয়া শাখাওয়াতের স্তরের। তাঁর বক্তব্য হল তিনি ‘সিস্টেমিক চেঞ্জ’ করতে নেমেছেন, তার মধ্যে আরজিকরের মৃতা মেয়েটির জন্যে ‘জাস্টিস’ চাওয়াও আছে। ফলে সরকারের উতলা হওয়ার কিছু ছিল না। তাই মুখ্যমন্ত্রী ১৬ আগস্ট নিজেও আন্দোলনে নেমে পড়েছিলেন। কার বিরুদ্ধে জিজ্ঞাসা করিয়া লজ্জা দিবেন না, কারণ আন্দোলন ইস্যুর চেয়ে বড়।

কিন্তু হিসাবে ভুল ছিল। সকলের হিসাবেই। যাঁরা রাতদখল আন্দোলনের ডাক দিয়েছিলেন তাঁরাও বোঝেননি যে আরজিকর কেবল বন্দুকের ঘোড়া টেপার কাজটা করেছে। বহুবছর ধরে সংগঠিত গণআন্দোলনের অভাবে রাজ্যের মানুষের, বিশেষত মহিলাদের, যত ক্ষোভ পুঞ্জীভূত হয়েছিল সবটাই রাস্তায় উপচে পড়বে।

আমাদের মফস্বলের বিয়েবাড়িতে ক্যাটারিং ব্যবসার রমরমা হওয়ার আগে পাড়ার সেরা রাঁধুনিই রান্নার কাজে নিযুক্ত হতেন আর পাড়ার জোয়ানরা প্যান্টের উপর গামছা বেঁধে নিয়ে পরিবেশন করতেন। যদি তিনশো লোককে নেমন্তন্ন করা হত, রান্না করা হত আড়াইশো লোকের। কারণ জানা কথা যে জনা পঞ্চাশেক অনুপস্থিত থাকবে। শেষমেশ আসত ২৪০-৪৫ জন। যে ৫-১০ জনের রান্না বেঁচে যেত, তা দিয়ে বড় পরিবারের নিজেদেরই পরের দিনের খাওয়াদাওয়া সারা হত। ছোট পরিবার প্রতিবেশীদের মধ্যে বিলিয়ে দিত। কিন্তু কোনও কোনও বিয়েবাড়িতে একটা ঝামেলা বেধে যেত। হয়তো ২৮০-৯০ জন চলে এল। তখন দুম করে আরও ৪০-৪৫ জনের রান্না হবে কী করে? রান্না করতে গেলে অত পিস মাছ, মাংসও তো লাগবে? মিষ্টিও আনতে হবে। তখন হুলুস্থূল বেধে যেত। দেখা যেত একজন বসে থেকে থেকে পরের পদটা না পেয়ে রেগে উঠে যাচ্ছে, তাকে শান্ত করার চেষ্টায় আয়োজক বাড়ির লোকজন হয়রান। আরেক নামকরা খাইয়ে রসগোল্লার হাঁড়ি হাতে ছেলেটা তার ধারেকাছে আসছে না দেখে চেঁচামেচি করছে। ওদিকে যাকে কতজন খাচ্ছে তা দেখার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল সে বেপাত্তা। গৃহকর্তা অপমানে মুখ লাল করে রাঁধুনির উপর চোটপাট করছেন ‘এতদিন কাজ করছ, হিসাবে এত বড় ভুল কী করে হয়?’ সে বেচারা সাহস করে বলতে পারছে না ‘আপনিও তো এর আগে তিনটে ছেলেমেয়ের বিয়ে দিয়েছেন। মালমশলার হিসাব করার সময়ে আপনিও তো বলতে পারতেন, এত কমে হবে না।’

১৪ আগস্টের পর ব্যাপারটা অনেকটা সেইরকম দাঁড়াল। ফেসবুক আহ্বায়করা নিজেদের ফলোয়ারের সংখ্যা দিয়ে বিচার করেছিলেন কতজন আসবে, কারা আসবে। তাদের স্লোগান-টোগান নিজেদের সুবিধামতো সামলে নেওয়া যাবে। সরকার ভেবেছিল ব্যাপারটা প্রেশারকুকারের সেফটিভালভের মতো কাজ করবে। সমাজের ভিতরে যত রাগ জমেছে, কয়েকটা সিটি মেরে উড়ে যাবে। কিন্তু না! পরিকল্পনা ছিল কেবল ‘উই ওয়ান্ট জাস্টিস’, ‘জাস্টিস ফর আরজিকর’ ইত্যাদি স্লোগান দেওয়া হবে। কিন্তু দেখা গেল যার যা প্রাণ চায় বলছে। ইস্টবেঙ্গল-মোহনবাগান সমর্থকদের ‘এক হয়েছে বাঙাল ঘটি/ভয় পেয়েছে হাওয়াই চটি’ স্লোগানও এসে পড়েছে। আন্দোলনকারী অরাজনৈতিক (থুড়ি, অদলীয়) নেতৃত্ব বুঝলেন যে জনতা তাঁদের চেয়ে অনেক বেশি আক্রমণাত্মক। কাণ্ড দেখে মুখ্যমন্ত্রী আর তাঁর দলও বুঝলেন, লক্ষণ ভাল নয়। ফলে গত একমাসে আন্দোলনের দিকে বারবার ধেয়ে এসেছে তৃণমূলের উপর থেকে তলা পর্যন্ত নানাজনের নানাবিধ আক্রমণ। কখনও মুখ্যমন্ত্রী স্বয়ং আন্দোলনরত জুনিয়র ডাক্তারদের হুমকি দিচ্ছেন— এখনও এফআইআর ঠুকিনি, ঠুকলে কিন্তু কেরিয়ারের সাড়ে বারোটা বেজে যাবে। কখনও কোনও মন্ত্রী বলছেন আন্দোলনকারীরা সব নেশাখোর। কখনও মুখপাত্ররা বলছেন বিরোধীরা সাধারণ মানুষের আন্দোলন হাইজ্যাক করছে, কখনও স্থানীয় নেতা গিয়ে রাস্তায় লেখা আন্দোলনের স্লোগান মুছে দিচ্ছে।

অর্থাৎ রাষ্ট্রের সঙ্গে ‘সাধারণ মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত’ আন্দোলনের মধুচন্দ্রিমা শেষ। আগে মুখ্যমন্ত্রী হুমকি দিয়েছিলেন, এবার সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতিও সাবধান করেছেন— জুনিয়র ডাক্তাররা কাজে না ফিরলে রাজ্য সরকারকে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া থেকে আটকাবেন না। যে কোনও আন্দোলনের বিরুদ্ধেই যে অভিযোগ তোলা হয়, জুনিয়র ডাক্তারদের আন্দোলনের বিরুদ্ধেও সেই আপত্তিই রাষ্ট্র তুলছে এবার— মানুষের অসুবিধা হচ্ছে, তাদের পরিষেবা বন্ধ করে আন্দোলন করা চলবে না। রাজ্যের কৌঁসুলি কপিল সিবাল কোত্থেকে কিছু সংখ্যাও জোগাড় করে ফেলেছেন। ইতিমধ্যেই নাকি জুনিয়র ডাক্তাররা কাজ করছেন না বলে সারা রাজ্যে ২৩ জন রোগী মারা গেছেন। এই সংখ্যার উৎস কী? মুখ্যমন্ত্রীর সাংবাদিক সম্মেলনে দেখলাম স্বাস্থ্যসচিব বলছেন— সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী। কী অপূর্ব স্বাস্থ্যমন্ত্রক! টিভি দেখে, কাগজ পড়ে জানতে পারে কতজন রোগী মারা গেছেন। যা-ই হোক, সরকার যখন বলেছে ২৩ জন, তখন অঙ্ক ঠিক মিলিয়ে দেওয়া হবে। যেমন দুর্ঘটনায় প্রবল আঘাত পাওয়া কোন্নগরের বিক্রম ভট্টাচার্যের মৃত্যু সম্পর্কে আরজিকর হাসপাতালের ডাক্তাররা যা-ই বলুন না কেন, ওটাকে জুনিয়র ডাক্তারদের কর্মবিরতির ফলে হওয়া মৃত্যু হিসাবে ধরতেই হবে। আন্দোলনরত ডাক্তাররা সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, তাঁরা বিচারপতি ডিওয়াই চন্দ্রচূড়ের কথামতো কাজে ফিরবেন না। ফলে এরপর থেকে সরকারি হাসপাতালগুলোতে হওয়া প্রত্যেকটা মৃত্যুর দায় যে তাঁদের ঘাড়েই চাপবে— এ বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া যায়। এতদিন যে কর্পোরেট সংবাদমাধ্যম স্বভাববিরুদ্ধভাবে তাঁদের আন্দোলনের পাশে দাঁড়িয়েছে, তারাও এবার ক্রমশ আন্দোলনবিরোধী হয়ে উঠবে ধরে নেওয়া যায়। কারণ এতদিন ছিল মধ্যবিত্ত দর্শক/পাঠক ধরে রাখার তাগিদ। তা বলে তো আর কর্পোরেটরা কোনও আন্দোলনের পক্ষে থাকার চিজ নয়। তার উপর এবার ক্রমশ গ্রাম, শহরের নিম্নবিত্ত দর্শককে/পাঠককে ধরে রাখার তাগিদ বড় হয়ে দেখা দেবে। কারণ?

এক জেলা হাসপাতালের জুনিয়র ডাক্তারের সঙ্গে কথা হচ্ছিল। সে বলল ‘দাদা, এই আন্দোলন এখন এলিটদের ইন্ধনে চলছে। গ্রামের লোক আমাদের উপর ক্ষিপ্ত।’ ডাক্তার ভাইটির ভয়— এরপর এই ক্ষোভকে কাজে লাগিয়ে ডাক্তারদের বিরুদ্ধে শারীরিক আক্রমণ চালাতে পারে তৃণমূল। ভয়টা যে অমূলক নয় তা তৃণমূলের অনেকের সোশাল মিডিয়ায় এসে পড়া কথাবার্তা দেখেই বোঝা যাচ্ছে। কিন্তু এই আন্দোলন যে বৈধ, কেবল ডাক্তার বা নার্স নয়, এই পচাগলা ব্যবস্থা চলতে দিলে যে হাসপাতালে ভর্তি অসুস্থ মহিলারাও ধর্ষণ, খুনের শিকার হতে পারেন— এটা কেন রোগীদের বোঝাতে পারছ না? সব হাসপাতালে তো আরজিকরের মতো নিরাপত্তা দিতে সিআইএসএফ হাজির হয়নি, হওয়া সম্ভবও নয়। এটা গ্রামাঞ্চলের রোগীদের কেন বোঝানো যাচ্ছে না? প্রশ্নের উত্তরে আমার ডাক্তার ভাই যা বলল, তা মোক্ষম।

‘আসলে আমরা খুব অসংগঠিত।’

বাইরের আন্দোলনের যে অরাজনৈতিক, সংগঠনহীনতার রোম্যান্টিকতা— তা দিয়ে ডাক্তাররা বাঁচতে পারবেন না। বাইরের আন্দোলনকারীরা ওঁদের বাঁচাতেও পারবে না। মেডিকেল কলেজগুলোতে যে হুমকি সংস্কৃতি সন্দীপ ঘোষ, বিরূপাক্ষ বিশ্বাসরা চালু করেছেন গত ১৩ বছরে (যার কিছুই আমাদের বহুমুখী প্রতিভাসম্পন্ন স্বাস্থ্যমন্ত্রী জানতেন না), তার ফলে তৃণমূল ছাত্র পরিষদ ছাড়া অন্য ছাত্র সংগঠনগুলোর অস্তিত্ব প্রায় বিলুপ্ত করে দেওয়া গিয়েছিল। তার উপর বাঙালি বাবা-মায়েরা তো ছেলেমেয়েদের এমনিতেই শিখিয়ে এসেছেন ‘কলেজে গিয়ে লেখাপড়া করবে। পলিটিক্স করার দরকার নেই।’ এখন প্রাণের দায়ে রাজনীতি করতে হচ্ছে, সংগঠিত হওয়ার প্রয়োজনীয়তা টের পাওয়া যাচ্ছে। কিন্তু ও জিনিস কি দু-একদিনে শেখা যায়? স্বাস্থ্যবিভাগের যে ভয়ঙ্কর চেহারা এখন প্রকাশিত হচ্ছে (আনন্দবাজার পত্রিকার সাংবাদিক সোমা মুখোপাধ্যায়ের ধারাবাহিক প্রতিবেদন লক্ষণীয়), তার মধ্যেও এত বছর ধরে যেসব দুঃসাহসী ছেলেমেয়ে সংগঠিত হওয়ার চেষ্টা চালিয়ে গেছে, তারাই এখন ভরসা। তাদেরই এখন ঠিক করতে হবে কী করে রোগীদের বিশ্বাস অর্জন করেও এই আন্দোলন চালিয়ে যাওয়া যায়। কারণ টালিগঞ্জের তারকারা যে যত জনপ্রিয়ই হোন, আর তথাকথিত নাগরিক সমাজের দলহীন নেতা-নেত্রীদের সোশাল মিডিয়ায় যত ফলোয়ারই থাকুক, ডাক্তাররা আন্দোলন বন্ধ করে দিলে বাইরের আন্দোলন এমনিই ঠান্ডা হয়ে যাবে। সোম থেকে শুক্র অফিস করে শনি, রবিবারে আন্দোলন করবেন— সে গুড়ে বালি। কারণ এবার গুন্ডাবাহিনি আসবে মারতে, যেমনটা নৈহাটিতে এসেছিল ৮ সেপ্টেম্বর রাতে। খান্না মোড়ের মহিলাদের মতো জবাব দিতে যাঁরা পারবেন না, তাঁদের এবার আন্দোলন গুটিয়ে ফেলা ছাড়া উপায় থাকবে না।

 

ন্যায়বিচার

শব্দটা নতুন লাগছে? অস্বাভাবিক নয়। কারণ আরজিকর নিয়ে আন্দোলনটা যেহেতু আমরা শুরু করেছি— আমরা যারা ইংরেজি বলতে পারি এবং ছেলেমেয়েকে বাংলা মাধ্যম স্কুল থেকে সবসময় হাত পঞ্চাশেক দূরে রাখি, যাদের একাধিক আত্মীয় বা বন্ধু বিদেশে আছে, তরুণ আত্মীয়রা প্রায় সবাই রাজ্যের বাইরে আছে— সেহেতু প্রথম থেকেই এই আন্দোলনে সরকার ও পুলিশের কাছে ন্যায়বিচারের দাবি না তুলে আকাশের দিকে মুখ করে #WeWantJustice, #JusticeforRGKar স্লোগান ছোড়া হচ্ছে। যার গায়ে লাগে লাগুক, আমার স্লোগান দেওয়ার আমি দিলাম, আমার বিবেক পরিষ্কার— ভাবখানা এইরকম। যদ্দিন সরকারের গায়ে লাগছিল না, তদ্দিন মাঝরাত্তিরেও মনের সুখে এই স্লোগান দিয়ে নির্বিঘ্নে বাড়ি ফেরা গেছে। এখন যে আর যাবে না সে-কথা আগেই প্রকাশ করেছি। এবার বলি, ন্যায়বিচার আদায় করতে গেলে যারা ইংরেজি জানে না, শহরে থাকে না, যাদের বাড়ির লোক রাজ্য বা দেশের বাইরে যায় কেবল শস্তার শ্রমিক হিসাবে— তাদের সমর্থন লাগবে। তার জন্যে আন্দোলনকে তাদের কাছে নিয়ে যেতে হবে। যদি ন্যায়বিচারের চেয়েও সহজ কোনও শব্দ ব্যবহার করলে তা সম্ভব হয়, তাহলে সেই শব্দটাই খুঁজে বার করতে হবে। তা করার তাগিদ অবশ্য আমাদের নেই, থাকার কথাও নয়। সে তাগিদ থাকার কথা বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর, কারণ তাদের ভোটে জিততে হবে। আমাদের এবং আমাদের মহান অরাজনৈতিক নেতানেত্রীরা ভোট-রাজনীতিকে ঘৃণা করেন, কারণ ভোট না দিলেও তাঁদের বেঁচে থাকতে বিন্দুমাত্র অসুবিধা হয় না। গরিব মানুষের হয়। গ্রামের গরিব মানুষের তো হয়ই। যদি তাঁদের বোঝানো যায় যে সন্দীপ, বিরূপাক্ষরা সরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে যেদিকে নিয়ে গেছে তার প্রতিকার করতে না পারলে আগামীদিনে বেঘোরে তাঁরাই মরবেন বেশি; একমাত্র তাহলেই জুনিয়র ডাক্তারদের কর্মবিরতিতে আজকের অসুবিধা সয়ে নিতে তাঁরা রাজি হবেন।

এটা বোঝানো শক্ত কাজ। কেবল আমার ডাক্তার ভাই যে কারণে বলেছে সে কারণে নয়। ভাইয়ের সিনিয়ররা গত ৩০-৩৫ বছর ধরে যেভাবে ডাক্তারি করেছেন তার জন্যেও। ২০১৯ সালে রাজ্যের বিভিন্ন হাসপাতালে রোগীর পরিবার-পরিজনের হাতে ডাক্তারদের নিগ্রহ বাড়াবাড়ির পর্যায়ে পৌঁছে গিয়েছিল এবং নীলরতন সরকার মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের ঘটনার পরে রাজ্যজুড়ে সরকারি হাসপাতালের ডাক্তাররা ধর্মঘট করেছিলেন। তখন একাধিক ডাক্তার আত্মীয়-বন্ধুকে বোঝানোর চেষ্টা করেছিলাম যে যতদিন না নার্সদের এবং রোগীদের ভালমন্দ সুবিধা-অসুবিধা নিয়ে ডাক্তাররা কথা বলছেন, সরকারি হাসপাতালে চাকরি করে কর্পোরেট হাসপাতালের দাসত্ব করা বন্ধ করছেন, ঢালাও নার্সিংহোম খোলা আর পাড়ায় পাড়ায় গজিয়ে ওঠা প্যাথলজিকাল সেন্টারগুলোকে টাকার বিনিময়ে সই বিলিয়ে যাওয়া বন্ধ করছেন, ততদিন রোগীরা ডাক্তারদের প্রতিপক্ষ ভাবা বন্ধ করবেন না। সেসব ব্যাপার আজও বদলায়নি।

শুধু তাই নয়। ২০১৯ সালের জুন মাসে সরকারি গোঁয়ার্তুমির চোটে পরিস্থিতি যখন হাতের বাইরে চলে গেল, ডাক্তাররা সিনিয়র জুনিয়র নির্বিশেষে দলে দলে পদত্যাগ করতে লাগলেন, তখন অবস্থা সামাল দিতে মমতা নবান্নে জুনিয়র ডাক্তারদের সঙ্গে টিভিক্যামেরার সামনে ঘটা করে এক সভা করেন এবং ছাত্রনেতাদের প্রায় সব দাবিই মেনে নেন। সুরক্ষা বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি দেন। সেদিন যা যা প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, সেগুলো সব পূরণ হয়ে থাকলে আরজিকরের মেয়েটার ধর্ষণ ও মৃত্যু হয়তো ঘটত না। ১৪ আগস্ট রাতে আরজিকরে যে তাণ্ডব চালানো হয়েছে তা তো অবশ্যই আটকানো যেত। এই নজরদারিটুকুও সিনিয়র ডাক্তাররা গত পাঁচ বছরে করেছেন কি? প্রশ্নটা কাউকে করতে দেখছি না। উত্তর বোধহয় স্বস্তিদায়ক হবে না।

এখন কথা হল, এর সঙ্গে তিলোত্তমার ন্যায়বিচারের সম্পর্ক কী?

নারীবাদীরা যত ইচ্ছে রাগ করুন। এটা বোঝা দরকার যে একজন নেশাড়ু হাসপাতালে ঢুকে সেখানকারই একজন ডাক্তারকে ধর্ষণ করে খুন করে দিয়েছে— ঘটনা যদি এইটুকু হত, তাহলে ন্যায়বিচার পাওয়ার জন্যে এত আন্দোলন করার দরকার হত না। ন্যায়বিচার আদৌ পাওয়া যাবে কিনা তা নিয়ে যে সংশয় তৈরি হয়েছে সকলের মনে— তাও ঘটত না। কারণ অভিযুক্ত সঞ্জয় রাইয়ের দ্রুত গ্রেফতারি প্রমাণ করছে যে তার বিরাট কোনও দাদা দিদি নেই। কিন্তু যে কলকাতা পুলিশ তাকে ঘটনার চারদিনের মধ্যেই গ্রেফতার করেছে, তারই কমিশনারের পদত্যাগ দাবি করছে ডাক্তারদের আন্দোলন। কারণ ওই পুলিশই প্রাণপণে প্রমাণ লোপাট করেছে, ময়নাতদন্তে কারচুপি করেছে, সাততাড়াতাড়ি মৃতার দেহ পুড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছে; এমনকি মেয়ের বাবা-মাকে টাকা দিয়ে মুখ বন্ধ করতে চেয়েছে বলেও অভিযোগ উঠেছে। এগুলো তো আর সঞ্জয়কে বাঁচানোর জন্যে করা হয়নি। সুতরাং এই ঘটনায় বৃহত্তর অপরাধ খুন, সে খুনের কারণ পাহাড়প্রমাণ দুর্নীতি। এতকিছু ঢাকতেই এমনভাবে প্রমাণ লোপাট করা হয়েছে, সাধারণ নিয়মকানুনও অগ্রাহ্য করা হয়েছে। যে মুখ্যমন্ত্রী সিবিআই শব্দটা শুনলেই প্রায় সিপিএম শব্দটা শোনার মতোই তেলেবেগুনে জ্বলে উঠতেন, তিনি প্রথম থেকেই সিবিআইয়ের হাতে এই মামলা তুলে দেওয়ার জন্যে উদগ্রীব ছিলেন। কলকাতা পুলিশকে সাতদিন সময় দিয়েছিলেন।

কেন সাতদিন? এখন দেখা যাচ্ছে আদালত আগেই হস্তক্ষেপ করায় যে চারদিন সময় বিনীত গোয়েলের বাহিনি পেয়েছিল, তার মধ্যেই সাক্ষ্যপ্রমাণের এমন হাল করা হয়েছে যে সিবিআই আন্তরিক তদন্ত চালালেও সত্য উদ্ঘাটিত হবে কিনা সন্দেহ। ফলে ন্যায়বিচার বিশ বাঁও জলে। সিবিআই আন্তরিক হোক বা না হোক, সুপ্রিম কোর্ট যথাযথ ভূমিকা নিক বা না নিক, সুপ্রিম কোর্টে শুনানির আগের রাতে পথে নামলে আদালত প্রভাবিত হবে— এসব যাঁরা ভাবছেন তাঁরা ভারতের বিচারব্যবস্থার ইতিহাস সম্পর্কে খবর রাখেন না। সত্যি কথা বলতে, জনমত মাথায় রেখে কাজ করা আদালতের উচিতও নয়। কারণ তা করলে আইনের শাসনের জায়গায় প্রতিষ্ঠিত হবে জনতার আবেগের শাসন, যা অনেক ক্ষেত্রেই ন্যায়বিচারের বিপরীতে দাঁড়ায়।

তাহলে ন্যায়বিচার পেতে গরিব মানুষ, বিশেষত গ্রামের মানুষের সমর্থন দরকার কেন বলছি? কারণ আরজিকরের ঘটনায় ন্যায়বিচার বলতে যা পাওয়া সম্ভব তা হল— ১) যারা এই প্রমাণ লোপাটের কাজ করেছে তাদের শাস্তি (এটা ঘটলে ধর্ষণ, খুনের রহস্যভেদ হওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যাবে); ২) ভবিষ্যতে এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তির সম্ভাবনার বিনাশ। এ দুটো সম্ভব একমাত্র ২০২৬ সালে সরকার বদল হলে, নচেৎ নয়।

আরও পড়ুন অরাজনীতির হাত থেকে কবে স্বাধীন হবে পশ্চিমবঙ্গের মানুষ?

অনেকেই এ-কথায় মহা ক্ষেপে উঠবেন। প্রশ্ন তুলবেন— সরকার বদলালেই যে দুর্নীতি আর হবে না তার গ্যারান্টি কী? এ কেবল রাজনৈতিক অভিসন্ধির প্রকাশ। ঠিক কথা। কোনও গ্যারান্টি নেই যে আবার দুর্নীতি হবে না, নতুন র‍্যাকেট গড়ে উঠবে না। কিন্তু যে বাচ্চা জন্মায়নি তাকে যেমন স্কুলে ভর্তি করা যায় না, তেমনি যে সরকার এখনও ক্ষমতায় আসেনি তাকে দুর্নীতির জন্যে শাস্তি দেওয়াও যায় না। শাস্তি যে সরকার আছে তাকেই দিতে হয় আর গণতান্ত্রিক শাস্তির দৃষ্টান্ত ১৯৭৭ সালের কংগ্রেস বা ২০১১ সালের বামফ্রন্ট। এখন যদি বলেন ‘এদের সরকারে কী হয় আগে দেখেছি, এদের বিশ্বাস করি না’ তাহলে কাজটা হয়ে দাঁড়াবে আরও কঠিন। একটা বিশ্বাসযোগ্য বিকল্প সংগঠন (অর্থাৎ রাজনৈতিক দল) গড়ে তুলতে হবে, তারপর এখন যারা সরকারে আছে তাদের হারাতে হবে। এমনও যে হয় না তা নয়। আন্দোলন থেকে দল উঠে আসার হাতেগরম ইতিহাস রয়েছে আম আদমি পার্টির। তবে দিল্লি কিন্তু রাজ্য হিসাবে ছোট্ট, পশ্চিমবঙ্গ অনেক বড় রাজ্য। যাদবপুর এইট-বি মোড়ে বা শ্যামবাজারে নাচ করা, গান গাওয়া, ছবি আঁকা বা কবিতা বলার চেয়ে অনেক কঠিন কাজ দিল্লির মতো ওইটুকু রাজ্যে একটা দল গড়ে ভোটে জেতা। পশ্চিমবঙ্গে যে কাজটা আরও বহুগুণ কঠিন তা বলাই বাহুল্য। পারলে লেগে পড়ুন আজ থেকেই, কারণ রাজনীতি করা ৩৬৫ দিনের কাজ।

অনেকে দিন গুনছেন দেখছি। ‘বিচারহীন ২৯ দিন, ৩০ দিন, ৩১ দিন…’ ইত্যাদি। ভুলেও এই ভুলটি করবেন না। দীর্ঘসূত্রিতা করলে যেমন ন্যায়বিচার হয় না, তেমন তাড়াহুড়ো করলেও ন্যায়বিচার হয় না। যত দিন গুনবেন, তত হতাশ হবেন। যত বেশি মানুষ হতাশ হবেন, তত আন্দোলনের জোর কমবে। আপনার চেয়েও বেশি তাড়া আছে রাজ্য সরকারের। তাই তড়িঘড়ি নিজেদের উদ্যোগ দেখাতে একটা অর্থহীন নতুন আইন পাশ করানো হয়েছে। এরপর কোনওমতে সঞ্জয় রাইকে দোষী প্রমাণ করে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে দিতে পারলেই কেল্লা ফতে। মমতা, অভিষেক এবং তাঁদের পারিষদরা বলবেন ‘উন্নাও, হাথরাসে শাস্তি হয়নি। বানতলা, ধানতলায় শাস্তি হলেও ফাঁসি হয়নি। আমরা অপরাধীকে ধরে ফাঁসি দিয়ে দিয়েছি। বিরোধীরা চক্রান্ত করে খামোখা আমাদের বদনাম করল।’ ইতিমধ্যে দুর্নীতির মামলায় কিছুদিন বিচারাধীন বন্দি হিসাবে হাজতবাস করে অথবা শাস্তিপ্রাপ্ত বন্দি হিসাবে কারাবাস করে সন্দীপও বেরিয়ে পড়বেন। তারপর সব যেমন চলছিল তেমনই চলবে। আমি, আপনি মাথা চুলকে ভাবব— কী হল কেসটা? তারপর একদিন সন্দীপদের ব্যবস্থার উৎপাদন কোনও এক ডাক্তার আপনার কোনও প্রিয়জনের কিডনি অপারেশন করতে গিয়ে লিভারটা কেটে বাদ দিয়ে দেবেন।

মানে ন্যায়বিচার পেতে গেলে টেস্ট ম্যাচ খেলার ধৈর্য থাকতে হবে। কিন্তু সরকার জানে আপনি আইপিএলের ভক্ত।

 

পুজো

আচ্ছা, পুজো হবে না এ-কথা পশ্চিমবঙ্গের একজন মানুষও বলেছে কি? পুজো হলেই যে উৎসব হবে তাও তো জানা কথা। তাহলে মমতা হঠাৎ উৎসবে ফেরার কথা বলতে গেলেন কেন? ওই যে শুরুতেই বলেছি, বয়স বাড়লে আনন্দেরও ভুল হয়। কিন্তু ওটাই একমাত্র কারণ নয়।

১৯৯৪ বিশ্বকাপ ফুটবল ফাইনাল সম্পর্কে এক প্রবীণ ক্রীড়া সাংবাদিক আমাকে বলেছিলেন ‘লোকে এত ব্রাজিল ব্রাজিল করে। কিন্তু ভাব, রোমারিও আর বেবেতোকে ১২০ মিনিট গোল করতে দেয়নি বুড়ো ফ্রাঙ্কো বারেসি। অথচ বারেসি তখন, প্লেয়িং এন্টায়ারলি ফ্রম মেমরি।’ মানে একজন জাত রক্ষণভাগের খেলোয়াড় স্রেফ অভিজ্ঞতার জোরে বয়সের কারণে জোয়ান স্ট্রাইকারদের চেয়ে শারীরিকভাবে পিছিয়ে থেকেও তাদের আটকে দিতে পারেন। মমতা এখন বারেসির খেলাই খেলছেন। তিনি জানেন, সোশাল মিডিয়ার যুগে সবকিছুই হুজুগ হয়ে দাঁড়ায়। এই আন্দোলনের একটা বড় অংশ যেহেতু অসংগঠিত মানুষের আন্দোলন, সেহেতু হুজুগ আছে বইকি। হোয়াটস্যাপ গ্রুপগুলোতে চোখ রাখলেই দেখা যাচ্ছে কেউ জিজ্ঞেস করছে ‘কী শাড়ি পরা উচিত বল তো? সাদা, না কালো?’ কেউ আবার ফেসবুকে প্রতিবাদী কবিতা পোস্ট করে লাইক গুনতে ব্যস্ত। মমতা জানেন, এই আন্দোলনকারীদের অন্য হুজুগে মাতিয়ে দিতে পারলেই সমস্যা অনেকটা মিটে যাবে। ইতিমধ্যে ডাক্তারদের যদি কোনওভাবে কাজে ফিরতে বাধ্য করা যায়, তাহলে তো কথাই নেই। এদের উৎসাহ আরও কমে যাবে। অতএব এই তো সময় পুজোর কথা মনে করিয়ে দেওয়ার।

তাছাড়া মমতাকে নির্ঘাত চিন্তায় ফেলেছে বহু ক্লাবের সরকারি অনুদান প্রত্যাখ্যান করার সিদ্ধান্ত। সরকার কেন একটা ধর্মের উৎসবে টাকা দেবে— এই প্রশ্ন করার সংস্কৃতি পশ্চিমবঙ্গ থেকে উঠেই গেছে। এমনকি কেউ একথাও জিজ্ঞেস করে না যে ক্লাবগুলো সরকারের থেকে টাকা পাওয়ার পরেও এলাকার লোকের থেকে চাঁদা তোলে কেন? কারণ অন্নপ্রাশন থেকে শ্রাদ্ধ— কোনওকিছুই বিরাট করে করতে না পারলে আমাদের আজকাল চলে না। সুতরাং দুর্গাপুজো যত বড় হয় তত ভাল। এমন এক গিগ-অর্থনীতিতে বাস করি আমরা, যে মানুষের ভোগ করার ইচ্ছে যত বাড়ে তত ভাল। ভোগ কমলেই সঙ্কট। রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী একটুও লজ্জা না পেয়ে সাংবাদিক সম্মেলনে বলেন, পুজোর সময়ে ঢাকিদের রোজগার হয়। বাকি বছরটা তারা কী করে সংসার চালায় সে প্রশ্ন একবার মনেও আসে না তাঁর? আজকাল পুজোগুলোর যা বাজেট হয় তার তুলনায় ঢাকিরা কতটুকু রোজগার করে সে খবর কি রাখেন মুখ্যমন্ত্রী? আসলে তাঁর দুশ্চিন্তা ওসব নিয়ে নয়। তিনি ক্লাবগুলোকে টাকা দেন যাতে সভ্যরা তাঁকে ভোট দেয়, যাদের উপর তাদের প্রভাব আছে তাদেরও দিতে বলে। বিশেষত পঞ্চায়েত বা পৌরসভার নির্বাচন যাঁরা মন দিয়ে অনুসরণ করেন, তাঁরা জানেন এই কৌশলের সাফল্য বিরাট। ফলে ক্লাবগুলো বেঁকে বসলে মুশকিল। সুতরাং উৎসবে ফিরে আসার পরামর্শ আসলে ক্লাবগুলোকে টাকা নিয়ে যেতে বলা।

অনেকে দেখছি ছোট ব্যবসায়ীদের কী হবে তা নিয়ে খুব চিন্তিত। চিন্তা প্রকাশ করার পরের বাক্যেই বলছেন ‘পুজোর সময়ে এ রাজ্যে দেশের মধ্যে সবচেয়ে বেশি জিএসটি কালেকশন হয়। পুজো না হলে কী হবে?’ তথ্যটা সঠিক কিনা জানি না, কিন্তু তত্ত্বটা মজাদার। জিএসটি যে জমিদারি ট্যাক্স হয়ে উঠেছে তা এখন গোটা দেশের মানুষ জানেন। কেন্দ্রীয় সরকার পর্যন্ত এমন লজ্জায় পড়েছে যে জুলাই মাসে কত টাকা জিএসটি উঠেছে তা আর প্রকাশই করেনি। কারণ ধরা পড়ে যেত যে ছোট ব্যবসায়ীদের রক্ত চোষা হচ্ছে। এদিকে আমার পুজোবাদীরা জিএসটি কালেকশনকে রাজ্যের ছোট ব্যবসায়ীদের সমৃদ্ধির লক্ষণ বলে ধরছেন। গত কয়েক বছর ধরেই যে পুজোর সময়েও দোকানে তেমন ভিড় হচ্ছে না, কারণ মানুষের হাতে খরচ করার মতো পয়সা নেই— তা চোখ কান খোলা থাকলে, ছোট দোকানিদের সঙ্গে কথা বলার অভ্যাস থাকলেই জানা যায়।

কিন্তু আবার ওই প্রশ্নে ফিরে আসি। পুজো একেবারে করব না— এ-কথা কে বলেছে? কেউ না। জামাকাপড় কিনবই না— এমন ধনুর্ভঙ্গ পণ কে করেছে? কেউ না। কেনই বা করতে হবে? একটা রাজ্যের সরকারের প্রত্যক্ষ মদতে, বা নিদেনপক্ষে অপদার্থতায়, একটা মেয়েকে ধর্ষণ করে খুন করা হয়েছে। তার বিরুদ্ধে সর্বশক্তি দিয়ে আন্দোলন করা দরকার। তা বলে সবাইকে সবকিছু থামিয়ে যারা এই অপরাধে কোনওভাবেই যুক্ত নয়, তাদের শাস্তি দিতে হবে? এ আবার কী আহ্লাদ? প্রতিবাদে পথনাটিকা হতে পারে, প্রেক্ষাগৃহে নাটকের শো করা যাবে না? হলে সিনেমা মুক্তি পেতে পারবে না? যে শিশুরা এখনও জানে না বাবা মায়ের কে হয়— তাদেরও পুজোয় মুখ ভার করে থাকতে হবে? এ তো চোরের উপর রাগ করে মাটিতে ভাত খাওয়া। যদি আমরা পুজোর হুজুগে তিলোত্তমার জন্য ন্যায়বিচার ছিনিয়ে আনার কথা ভুলে না যাই, পুজোর ছুটিতে আন্দোলন থেকেও ছুটি নিয়ে না ফেলি, তাহলেই যথেষ্ট। বরং এই অবসরে পুজোর আড়ম্বর যদি একটু কমে, তাহলে অত্যধিক আলোয় চারপাশে জমে ওঠা যেসব অন্ধকার আমরা ঢেকে রাখি সেগুলো চোখে পড়বে। সরকারের পক্ষে সেটাই সবচেয়ে বিপজ্জনক। তাই হুজুগান্তরে যাওয়ার তাড়া দেওয়া। এখন আমাদেরই প্রমাণ করতে হবে— এই আন্দোলন আমাদের আরেকটা হুজুগমাত্র নয়।

চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম ওয়েবসাইটে প্রকাশিত

যারা বিজেপিতে ভিজেছিল

১৯৯২ সালে বাবরি মসজিদ ভাঙার পর থেকে বদলের হাওয়া বুঝে ভারতের গুরুত্বপূর্ণ রাজ্যগুলোতে বেশকিছু রাজনৈতিক দল বিজেপির সঙ্গে গলাগলি বা ঈষৎ আশনাই করেছে। সেই দলগুলোর আজকের অবস্থা খেয়াল করলে ওই কথাই মনে হবে – বুঝতে পারি না ওর বিষনজরে থাকা বেশি খারাপ, নাকি সুনজরে?

দেশের রাজধানী এমনিতেই রাজনৈতিক কানাকানির কারখানা, অরবিন্দ কেজরিওয়ালের গ্রেফতারির পর তো আরও বেশি। তিনি কারান্তরালে থেকেই সরকার চালিয়ে যাচ্ছেন। কোনো সাংবিধানিক বাধা না থাকায় কেন্দ্রীয় সরকার চাইলেও কিছু করে উঠতে পারছে না। পাশাপাশি রাজনৈতিক ভয়ও আছে। এমনিতেই নাকি দিল্লির মানুষ কেজরিওয়ালের প্রতি সহানুভূতিশীল হয়ে পড়েছেন। গোদি মিডিয়ার ‘মুড অফ দ্য নেশন’ পোলে দেখা গেছে গতবারের মত দিল্লিতে লোকসভার সাতটা আসনের সাতটাই বিজেপির জেতার সম্ভাবনা প্রায় অন্তর্হিত। এখন রাষ্ট্রপতি শাসন জারি করে আম আদমি পার্টির সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করলে যদি কেজরিওয়াল আরও সহানুভূতি পেয়ে যান! তাই ও পথে এখনো যায়নি নরেন্দ্র মোদীর সরকার। কেজরিওয়ালের আপ্ত সহায়ককে বহু পুরনো মামলা দেখিয়ে বরখাস্ত করা, খালি পদে অফিসার নিয়োগ না করা, লেফটেন্যান্ট গভর্নরকে দিয়ে মন্ত্রিসভাকে ব্যতিব্যস্ত করা ইত্যাদি ঘুরপথেই হয়রান করছে। কানাকানির কারখানা বলছে, দল গঠনের সময় থেকে কেজরিওয়ালের সঙ্গে থাকা কোনো এক ওজনদার আপ নেতা নাকি দলত্যাগ করে বিজেপিতে যোগ দিতে পারেন। ইতিমধ্যেই কেজরিওয়ালের মন্ত্রিসভার এক সদস্য পদত্যাগ করেছেন। কারণ হিসাবে যা দেখিয়েছেন তা ২০২১ সালে দলে দলে তৃণমূল কংগ্রেস ছেড়ে বিজেপিতে যাওয়ার সময়ে পশ্চিমবঙ্গের অনেক নেতা যা বলেছিলেন তার কাছাকাছি। যদিও ইনি শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত বিজেপিতে যোগ দেননি। ওদিকে আপের আরেক তরুণ এবং প্রভাবশালী নেতা রাঘব চাড্ডা বহুদিন হল বেপাত্তা। বলিউড অভিনেত্রী পরিণীতি চোপড়াকে বিয়ে করার পর থেকে তিনি আমেরিকায় না ইউরোপে, কেউ জানে না। বস্তুত, দলের এই সংকট মুহূর্তে আপের দশজন রাজ্যসভার সাংসদের মধ্যে সাতজনই নীরব। কেজরিওয়ালের গ্রেফতারির পরে আপ নেত্রী আতিশী মারলেনা দাবি করেছিলেন যে কেন্দ্রীয় সরকার তাঁকে এবং আরও কয়েকজন আপ নেতাকে গ্রেফতার করার ফন্দি এঁটেছে। শুক্রবার বলেছেন, কেন্দ্রীয় সরকার দিল্লিতে রাষ্ট্রপতি শাসন জারি করার তালে আছে। বুঝতে অসুবিধা হয় না, গোটা দলটাকেই তুলে দেওয়ার অভিলাষ পোষণ করছে বিজেপি। কেবল আপ নয়। নির্বাচন যত এগিয়ে আসছে, একথা বুঝতে কারোরই কোনো অসুবিধা হচ্ছে না যে দেশে অন্য কোনো দল থাকুক তা প্রধানমন্ত্রী বা তাঁর দল চায় না।

সবচেয়ে বেশি রাজ্যে বিজেপির লড়াই কংগ্রেসের বিরুদ্ধে। তাই আয়কর বিভাগকে দিয়ে বহু পুরনো রিটার্নে অসঙ্গতি দেখিয়ে নোটিস পাঠিয়ে তাদের টাকাপয়সা খরচ করার পথ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। আইনি পথে আবেদন করে লাভ হয়নি। পরে বোধহয় ব্যাপারটা নিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রও অসন্তোষ প্রকাশ করায় সরকারের জ্ঞান হল যে এটা বাড়াবাড়ি হয়ে যাচ্ছে। তাই আপাতত আয়কর বিভাগ জানিয়েছে তারা নির্বাচন শেষ হওয়া পর্যন্ত কংগ্রেসের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেবে না। কংগ্রেসের পর বিজেপির সবচেয়ে বড় শত্রু অবশ্যই আপ। তারা দিল্লি বিধানসভা নির্বাচনে পরপর দুবার বিজেপিকে দুরমুশ করার পর পাঞ্জাবেও ক্ষমতায় এসেছে। আরও মুশকিল হল, দিল্লিতে তবু আপকে লোকসভায় বিজেপি পর্যুদস্ত করতে পেরেছিল। পাঞ্জাবে আপ অল্পদিনের মধ্যেই প্রবেশ করে ক্ষমতায় পৌঁছে গেল। ওদিকে বিজেপি বহুবছর চেষ্টা করেও এখন ভোঁ ভাঁ হয়ে গেছে। এমনকি মোদী সরকারের কৃষকবিরোধী অবস্থানের প্রতিবাদে দীর্ঘদিনের সঙ্গী পাঞ্জাবের আঞ্চলিক দল, শিরোমণি অকালি দলও বিজেপির সঙ্গ ত্যাগ করেছে। অতি বড় বিজেপি সমর্থকও জানেন, লোকসভা নির্বাচনে পাঞ্জাবে বিজেপি শূন্য ছাড়া কিছুই পাবে না। তাই আপ হল দ্বিতীয় লক্ষ্য।

আপের দুই, তিন এবং চার নম্বর নেতা মনীশ সিসোদিয়া, সত্যেন্দ্র জৈন এবং সঞ্জয় সিংকে দীর্ঘদিন বন্দি করে রাখা হয়েছে। মামলাগুলোর কোনো অগ্রগতি নেই, একটি টাকাও উদ্ধার হয়নি। সঞ্জয়কে জামিন দেওয়ার পিছনে সুপ্রিম কোর্টের বিচারকদের অন্যতম যুক্তি ছিল সেটাই। এত সবেও আপ অনড় দেখেই হয়ত একেবারে এক নম্বর নেতাকেও গ্রেফতার করা হয়েছে। আপের গুরুত্বপূর্ণ নেতা সৌরভ ভরদ্বাজ সাংবাদিক রাজদীপ সরদেশাইকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন, কেজরিওয়াল পদত্যাগ করলেই আপের বাকি নেতৃত্বকেও গ্রেফতার করা হবে। তারপর একই কায়দায় পাঞ্জাবের সরকারকেও ক্ষমতাচ্যুত করা হবে। আগেই এ চেষ্টা ঝাড়খণ্ডে করা হয়েছিল, কিন্তু সাফল্য আসেনি। এখন এভাবে দুটো রাজ্যের সরকার ফেলে দেওয়া গেলে কর্ণাটকের মুখ্যমন্ত্রী সিদ্দারামাইয়া, তেলেঙ্গানার রেবন্ত রেড্ডি, তামিলনাড়ুর এম কে স্ট্যালিন, পশ্চিমবঙ্গের মমতা ব্যানার্জির মত সমস্ত বিরোধী দলের মুখ্যমন্ত্রীদের গ্রেফতার করে সরকার ফেলে দেবে বিজেপি। অর্থাৎ এক দেশ এক নির্বাচন তো পরের কথা, ২০২৪ লোকসভাতেই এক দল এক নির্বাচন সম্ভব হবে। অতজন নেতা গ্রেফতার হয়ে গেলে নির্বাচনের প্রচার করবে কে আর সংগঠন চালাবে কে? হতোদ্যম বিরোধী দলগুলোকে দেখে ভোটই বা দেবেন কোন ভোটার? তাঁদের মধ্যেও কি আতঙ্ক কাজ করবে না?

বলা যেতেই পারে, কেজরিওয়ালের পদত্যাগ না করাকে সমর্থন করতে গিয়ে সৌরভ কষ্টকল্পিত আতঙ্ক সৃষ্টি করছেন সাধারণ মানুষের মনে। সত্যিই ওরকম একনায়কতন্ত্র মোদীর লক্ষ্য হলে আদৌ নির্বাচন করাচ্ছেন কেন? এ প্রশ্নের উত্তর কিন্তু খুব সোজা। আজকের একনায়করা কেউ একনায়ক তকমাটা পছন্দ করেন না। তাঁরা চান একনায়কের লাগামহীন ক্ষমতার সঙ্গে গণতন্ত্রের গ্ল্যামার। একজন শাসক ধর্মে মুসলমান বা রাজনীতিতে কমিউনিস্ট না হলে বাকি পৃথিবীর কাছে গণতান্ত্রিক বলে পরিচিতি পাওয়া খুব কঠিনও নয়। তাই তুরস্কের রচপ তায়িপ এর্দোগান বা রাশিয়ার ভ্লাদিমির পুতিনও নিজের দেশে নির্বাচন করান, আর বিশ্বগুরু মোদী করাবেন না?

কোনো দেশে একনায়কের জন্ম হঠাৎ করে হয় না। পরিবারে, সমাজে দীর্ঘকাল ধরে একনায়কত্বের প্রতি সমর্থন তৈরি না হলে একটা বিরাট গণতান্ত্রিক দেশের মানুষ রাষ্ট্রক্ষমতায় একনায়ককে চাইবেন কেন? কোনো সন্দেহ নেই, ভারতে পরিবার থেকে শুরু করে কর্পোরেট অফিস পর্যন্ত সর্বত্র একনায়করা বিচরণ করে। তেমন একজন বসের অধীনে কাজ করার সময়ে আমার এক তিতিবিরক্ত সহকর্মী একটা মন্তব্য করেছিলেন, যা বিজেপি-আরএসএসের ক্ষেত্রে দারুণ লাগসই। ‘বুঝতে পারি না ওর বিষনজরে থাকা বেশি খারাপ, নাকি সুনজরে?’ ১৯৯২ সালে বাবরি মসজিদ ভাঙার পর থেকে বদলের হাওয়া বুঝে ভারতের গুরুত্বপূর্ণ রাজ্যগুলোতে বেশকিছু রাজনৈতিক দল বিজেপির সঙ্গে গলাগলি বা ঈষৎ আশনাই করেছে। সেই দলগুলোর আজকের অবস্থা খেয়াল করলে ওই কথাই মনে হবে – বুঝতে পারি না ওর বিষনজরে থাকা বেশি খারাপ, নাকি সুনজরে?

সেই দলগুলোর কথা আজ স্মরণ করা জরুরি। কারণ ভারত জুড়ে হিন্দুত্ববাদী রাজনীতি রাতারাতি এতখানি শক্তি সঞ্চয় করেনি। বহু রাজ্যে তাদের রাজনৈতিক, এবং তার চেয়েও বড় কথা সামাজিক স্বীকৃতি পাইয়ে দিয়েছে এই দলগুলো। নইলে সংঘ পরিবারের নানা সামাজিক সংগঠনের ৩৬৫ দিনের কাজ সত্ত্বেও এত নির্বাচনী সাফল্য সম্ভব হত কিনা তা তর্কসাপেক্ষ। কোন দলগুলোর কথা বলছি? আসুন, একেবারে ভারতের মানচিত্রের উপর দিক থেকে শুরু করা যাক।

ন্যাশনাল কনফারেন্স, জম্মু অ্যান্ড কাশ্মীর পিপলস ডেমোক্র্যাটিক পার্টি
ন্যাশনাল কনফারেন্স কাশ্মীর উপত্যকার সুপ্রাচীন দল। কাশ্মীরের ভারতভুক্তিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল দলের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা শেখ আবদুল্লার। স্বাধীন ভারতে তিনি, তাঁর ছেলে ফারুক এবং নাতি ওমর – তিনজনেই দলের নেতা হিসাবে জম্মু ও কাশ্মীরের মুখ্যমন্ত্রী হয়েছেন। ১৯৯৬ পর্যন্ত ফারুক ছিলেন বিজেপির সোচ্চার সমালোচক। অনেক পশ্চিমবঙ্গবাসীর হয়ত মনে আছে, ১৯৯৬ সাধারণ নির্বাচনের প্রাক্কালে বামপন্থীদের উদ্যোগে কলকাতার ব্রিগেড ময়দানে কংগ্রেস ও বিজেপিবিরোধী ফ্রন্টের যে সমাবেশ হয়েছিল, তাতে ফারুক বিজেপির বিরুদ্ধে জ্বালাময়ী বক্তৃতা দিয়েছিলেন। কিন্তু পরবর্তীকালে তাঁর দল অটলবিহারী বাজপেয়ীর নেতৃত্বাধীন ন্যাশনাল ডেমোক্র্যাটিক অ্যালায়েন্স (এনডিএ) সরকারকে সমর্থন দেয়। তখন ফারুকের দল কাশ্মীরে ক্ষমতাসীন।

কাশ্মীরের রাজনীতিতে ন্যাশনাল কনফারেন্সের সবচেয়ে বড় প্রতিদ্বন্দ্বী হল মুফতি মহম্মদ সঈদ প্রতিষ্ঠিত দল জম্মু অ্যান্ড কাশ্মীর পিপলস ডেমোক্র্যাটিক পার্টি (পিডিপি)। ১৯৮৯ সালে জনতা দল নেতা ভি পি সিংয়ের নেতৃত্বে কেন্দ্রে যে সরকার হয়েছিল সেই সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ছিলেন মুফতি সাহেব (এ পর্যন্ত ভারতের একমাত্র মুসলমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী)। সেই সরকারের প্রতি বিজেপিরও সমর্থন ছিল বটে, কিন্তু সে ছিল সাড়ে বত্রিশ ভাজা সরকার। বামপন্থীরাও সেই সরকারকে সমর্থন করেছিল। উপরন্তু রামমন্দিরের দাবিতে রথযাত্রায় বেরনো লালকৃষ্ণ আদবানিকে বিহারের লালুপ্রসাদ (তখন জনতা দলেই) সরকার গ্রেফতার করলে বিজেপি ভিপির সরকারের থেকে সমর্থন প্রত্যাহার করে। এছাড়া পিডিপির কখনো বিজেপির সঙ্গে সখ্য হয়নি। বরং মুফতি নিজে সুদূর অতীতে যেমন ন্যাশনাল কনফারেন্সে ছিলেন, তেমনি কংগ্রেসেও ছিলেন। কিন্তু সেই মুফতিই ২০১৪ সালে জম্মু ও কাশ্মীরে বিজেপির সঙ্গে হাত মিলিয়ে সরকার গঠন করেন। ২০১৬ সালে মৃত্যুর আগে পর্যন্ত সেই সরকারের মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন তিনি। তারপর মুখ্যমন্ত্রী হন তাঁর মেয়ে মেহবুবা। বিজেপি সেই সরকার ফেলে দেয় ২০১৮ সালের ১৯ জুন।

তারপর থেকে কাশ্মীরের মানুষ কীরকমভাবে বেঁচে আছেন আমরা সবাই জানি। এই দুই দলের অবস্থাও তথৈবচ। ২০১৯ সালের ৫ অগাস্ট কেন্দ্রের বিজেপি সরকার সংবিধানের ৩৭০ নম্বর অনুচ্ছেদ বাতিল করে দেওয়ার পরে গোটা কাশ্মীরকে যখন জেলখানা করে তোলা হয়েছিল, তখন আবদুল্লা বা মুফতিরা বিজেপিসঙ্গের ইতিহাস থাকার জন্যে কোনো বিশেষ সুবিধা পাননি। তাঁদেরও গৃহবন্দি করে রাখা হয়। এখন ফারুক-ওমরের মত মেহবুবাও ঠুঁটো জগন্নাথ। দুই দলেরই সংগঠন দুর্বল হয়ে পড়েছে, দুই দলই ইন্ডিয়া ব্লকের মঞ্চে এসে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু নির্বাচনী জোট তৈরি করার প্রশ্নে দুপক্ষই অনড়। ফলে কাশ্মীরের চারটে লোকসভা আসনে দুই দলই প্রার্থী দিয়ে বসে আছে।

শিরোমণি অকালি দল
ভারতের প্রাচীনতম রাজনৈতিক দলগুলোর অন্যতম পাঞ্জাবের এই আঞ্চলিক দল। দীর্ঘ ইতিহাস, ধর্মীয় সংযোগ এবং পাঞ্জাব রাজ্যের গঠনেও গুরুতর ভূমিকা থাকায় এই দলের পাঞ্জাবে বিপুল সমর্থন ছিল দীর্ঘকাল। এই দলও প্রয়াত প্রকাশ সিং বাদলের নেতৃত্বে বিজেপির জোটসঙ্গী হয়েছিল সেই ১৯৯৬ সালেই, অর্থাৎ বাজপেয়ী সরকারের আমলে। পরিণতি কী?

পাঞ্জাবি পরিচিতি এবং পাঞ্জাবিদের স্বার্থকে সবকিছুর ঊর্ধ্বে রাখাই যে দলের মতাদর্শ, নরেন্দ্র মোদীর আমলে তিনটে কৃষি আইন প্রত্যাহারের দাবিতে কৃষক আন্দোলনের সময়ে সেই দলের অবস্থা হয়েছিল শ্যাম রাখি না কুল রাখি। শেষমেশ তারা কুল রাখারই সিদ্ধান্ত নেয়। নেত্রী হরসিমরত কৌর বাদল কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগ করেন এবং তাঁর দল এনডিএ ছেড়ে বেরিয়ে আসে। বিজেপি কিন্তু চেয়েছিল লোকসভা নির্বাচনে আবার জোট হোক। অকালি দল পাত্তা দেয়নি। তারা বড় দেরিতে বুঝতে পেরেছে যে বিজেপি অন্য দলের ঘাড়ে পা দিয়ে উপরে ওঠায় বিশ্বাসী। বিজেপির সঙ্গে থাকায় যা হয়েছে তা হল পাঞ্জাবিদের স্বার্থরক্ষাকারী দল হিসাবে বাদল পরিবারের বিশ্বাসযোগ্যতা নষ্ট হয়ে গেছে। পাঞ্জাবের কংগ্রেস দুর্বল হয়ে পড়লেও ফাঁক ভরাট করতে ঢুকে পড়েছে আপ। এখন শিরোমণি অকালি দল ভুগছে অস্তিত্বের সংকটে।

বহুজন সমাজ পার্টি
দ্বিখণ্ডিত হওয়ার পরেও ভারতের সবচেয়ে বড় রাজ্য উত্তরপ্রদেশ, হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির পক্ষে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রাজ্যও বটে। কারণ এই রাজ্যেই অযোধ্যা, কাশী, মথুরা। রাম না থাকলে যেমন রামায়ণ লেখা হত না, তেমনি এই জায়গাগুলো না থাকলে সারা ভারতের হিন্দুদের মনে খতরার ধারণা তৈরি করাও সম্ভব হত না সংঘ পরিবারের পক্ষে। বাবরি মসজিদ বাঁচাতে সমাজবাদী পার্টির সরকার গুলি চালাল, কিছু মানুষের মৃত্যু হল – তবে না রণহুঙ্কারে পরিণত হল ‘মন্দির ওয়হি বনায়েঙ্গে’ স্লোগান? এই সংঘর্ষে মতাদর্শের দিক থেকে ভাবলে ব্রাহ্মণ্যবাদী সংঘ পরিবারের বিপক্ষেই থাকার কথা ছিল আম্বেদকরপন্থী কাঁসিরামের হাতে তৈরি বহুজন সমাজ পার্টির (বিএসপি)। কিন্তু ১৯৯৩ সাল থেকে সমাজবাদী পার্টির সঙ্গে জোট সরকার চালানোর পর কাঁসিরামের উত্তরাধিকারী মায়াবতী মুখ্যমন্ত্রী মুলায়ম সিং যাদবের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ করে ১৯৯৫ সালের ২ জুন সমর্থন প্রত্যাহার করেন। কী আশ্চর্য! ঠিক পরদিনই বিজেপির সমর্থনে সরকার গঠন করেন মায়াবতী। সেই থেকে বহুজন সমাজ পার্টির চিরশত্রু হয়ে যায় সমাজবাদী পার্টি, বিজেপি নয়। যদিও বিজেপি তাঁর সরকারকে সে বছরের অক্টোবর মাসেই ফেলে দেয়। তারপরেও তিনবার উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী হয়েছেন মায়াবতী, এমনকি ফের বিজেপির সমর্থনেও। শুধু ২০০৭-১২ একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে পুরো মেয়াদ কাটাতে পেরেছিলেন।

ভারতের আর পাঁচটা দলের মত মায়াবতীর দলের বিরুদ্ধেও বিস্তর দুর্নীতির অভিযোগ আছে। কিন্তু তাঁর মুখ্যমন্ত্রিত্বে উত্তরপ্রদেশে যে নেহাত খারাপ উন্নয়ন হয়নি তাও স্বীকার করেন অনেক বিরোধী। তবু আজ ‘বহেনজি’ উত্তরপ্রদেশের রাজনীতিতে কোণঠাসা হয়ে গেছেন। জাতপাতের সমীকরণ ভেঙে দিয়ে যে অভিন্ন হিন্দু পরিচিতি তৈরি করার রাজনীতি বাজারে এনেছে মোদী-অমিত শাহ-যোগী আদিত্যনাথের বিজেপি, তাতে মায়াবতীর চিরাচরিত নিম্নবর্গীয় হিন্দু ও মুসলমান ভোটাররা তাঁকে ছেড়ে চলে গেছেন। স্পষ্টতই বিজেপির সঙ্গে জোট করে লাভ হয়েছে বিজেপির, বিএসপির নয়। দুর্নীতির অভিযোগগুলোকে হাতিয়ার করে একদা ভারতীয় রাজনীতির দাপুটে নেত্রী মায়াবতীকে এতটাই নখদন্তহীন করে দেওয়া গেছে যে সংসদে দাঁড়িয়ে তাঁর দলের সাংসদ দানিশ আলিকে মুসলমান বলে যা খুশি গালাগালি দিয়ে গেলেন বিজেপির রমেশ বিধুরী। বহেনজি রা কাড়লেন না। স্বভাবতই দানিশ সম্প্রতি কংগ্রেসে যোগ দিয়েছেন। ২০২৪ লোকসভা নির্বাচনে মায়াবতী কী আশায় একলা লড়ছেন তা কেউ জানে না। কংগ্রেস কিন্তু তাঁকে ইন্ডিয়া ব্লকে যোগ দিতে ডেকেছিল।

তৃণমূল কংগ্রেস
উপরে উল্লিখিত কাশ্মীরের দল দুটো যদি বলে বিজেপির হাত ধরা ছাড়া তাদের কোনো উপায় ছিল না, তাহলে হেসে উড়িয়ে দেওয়া যাবে না। কারণ সেই জওহরলাল নেহরুর আমলে অন্যায়ভাবে শেখ আবদুল্লাকে কারারুদ্ধ করার সময় থেকেই দিল্লিতে যে দলের সরকারই থাক, শ্রীনগরের সরকারকে প্রকৃত স্বায়ত্তশাসন দেওয়া হয়নি (অনুচ্ছেদ ৩৭০ কাশ্মীরিদের অধিকারের চেয়ে বাকি ভারতের কাছে বদনাম দিয়েছে বেশি)। একাধিক মহলের মতে কাশ্মীরের মানুষকে সন্ত্রাসবাদের দিকে ঠেলে দিয়েছে একের পর এক কেন্দ্রীয় সরকারের কারচুপি করা নির্বাচন। শক্তি সামন্তের কাশ্মীর কি কলি (১৯৬৪) দেখে যে কাশ্মীরকে চেনা যায়, আসল কাশ্মীর যে তার চেয়ে বিশাল ভরদ্বাজের হায়দর (২০১৪) ছবিরই বেশি কাছাকাছি তা বুঝতে কয়েকশো বই পড়ার প্রয়োজন হয় না। জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়েও পড়তে হয় না। চোখ, কান আর মন খোলা রাখলেই বোঝা যায়। তাই মেহবুবা যখন সাংবাদিক সঙ্কর্ষণ ঠাকুরকে বলেন যে বিজেপির সঙ্গে জোট করার তিনি বিরোধী ছিলেন এবং বাবা মুফতি তাঁকে বলেন, এটা না করে কোনো উপায় নেই – তখন তাঁকে বিশ্বাস করা যায়। পরবর্তী ঘটনাবলী প্রমাণ করছে, মুফতি ভুল ভাবেননি। বাজপেয়ী সরকারের আমলেও কার্গিল যুদ্ধ বাদ দিলে কাশ্মীর যে মোটামুটি শান্ত ছিল সে হয়ত ন্যাশনাল কনফারেন্স ওই সরকারকে সমর্থন দিয়েছিল বলেই। অন্য দুটো দল, অর্থাৎ শিরোমণি অকালি দল আর বহুজন সমাজ পার্টি কিন্তু এই যুক্তি দিতে পারে না। তবে উভয়ের রাজনীতিরই জন্ম কংগ্রেসবিরোধিতা থেকে। ভারতের আরও অনেক রাজ্যের আঞ্চলিক দলেরই তাই। তৃণমূল কংগ্রেস এই তালিকায় সম্ভবত একমাত্র দল যাদের ইতিহাস উলটো।

এই দলের জন্ম কংগ্রেস ভেঙে এবং মূল রাজনীতি বামবিরোধিতা। নিম্নবর্গীয় মানুষের জন্য সামাজিক ন্যায়ের দাবি বা বাঙালি পরিচিতি সত্তাও তৃণমূল কংগ্রেসের জন্মের কারণ নয়। যুব কংগ্রেস নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় মনে করছিলেন কংগ্রেস যথেষ্ট বামবিরোধিতা করছে না, তাই তিনি ক্রমশ জঙ্গি আন্দোলনের পথ নেন। তা নিয়ে রাজ্য নেতৃত্বের সঙ্গে সংঘাত আর অজিত পাঁজার মত কয়েকজন বর্ষীয়ান নেতার সমর্থন লাভই তৃণমূলের জন্মের কারণ। জনশ্রুতি হল, তাতেও তৃণমূলের জন্ম হত না কেন্দ্রে ক্ষমতাসীন বিজেপির সমর্থন না থাকলে। কিন্তু জনশ্রুতির কথা থাক, যা সর্বসমক্ষে আছে তা নিয়েই আলোচনা করি। শেষপর্যন্ত মমতার যা ঘোষিত একমাত্র এজেন্ডা – বামফ্রন্ট সরকারের অপসারণ – প্রায় এক যুগ বিজেপির হাত ধরেও বাস্তবায়িত করা যায়নি। বরং সেই পর্বে তৃণমূলকে ২০০৪ লোকসভা এবং ২০০৬ বিধানসভা নির্বাচনে শোচনীয় পরাজয় বরণ করতে হয়েছিল। শেষপর্যন্ত কংগ্রেসের হাত ধরেই ২০১১ সালে মমতার লক্ষ্যপূরণ হয়।

কিন্তু মমতার সঙ্গে জোট করে বিজেপির নিঃসন্দেহে লাভ হয়েছে। কখনো পশ্চিমবঙ্গের এই কোণে, কখনো ওই কোণে একটা কি দুটো বিধানসভা আসন জেতা বিজেপি এ রাজ্য থেকে সাংসদ পেয়েছে ওই জোট তৈরি হওয়ার পর। ২০১১ সালের পর থেকে কেবল বিজেপির নয়, পশ্চিমবঙ্গে আরএসএসের সংগঠনও বেড়েছে হু হু করে। দক্ষিণবঙ্গে কংগ্রেস ক্রমশ তৃণমূলে মিশে গেছে, সরাসরি সংঘাতে বামপন্থীরাও এঁটে উঠতে পারেনি শাসক দলের সঙ্গে। এত বড় শূন্যতা ভরাট করে আজ পশ্চিমবঙ্গে প্রধান বিরোধী দল বিজেপি। এ রাজ্যের রাজনীতিতে যা বছর বিশেক আগেও অভাবনীয় ছিল, আজ ঠিক তাই ঘটছে। বহু আসনে স্রেফ ধর্মের ভিত্তিতে ভাগ হয়ে যাচ্ছেন ভোটাররা।

কেউ বলতে পারেন, বিজেপির লাভ হয়েছে না হয় বোঝা গেল। তৃণমূল কংগ্রেসের ক্ষতি হল কোথায়? বিলক্ষণ ক্ষতি হয়েছে। প্রথমত, তৃণমূল থেকে বিজেপিতে যাওয়া আর বিজেপি থেকে তৃণমূলে আসার রাজপথ তৈরি হয়ে গেছে। ফলে কখন কোন ঘটনার ভিত্তিতে, কোন প্রলোভনে বা আতঙ্কে দলটা তাসের ঘরের মত ভেঙে পড়বে তা মমতা নিজেও সম্ভবত জানেন না। ২০২১ বিধানসভা নির্বাচনের আগে যাঁরা ‘দলে থেকে কাজ করতে পারছি না’ বলে চলে গিয়েছিলেন, তাঁদের অধিকাংশই নির্বাচনে পরাজিত হয়ে ফিরে এসেছেন। তাঁদের যুক্তি না হয় বোঝা গেল। তাঁরা যে কোনো মূল্যে জয়ী দলে থাকতে চান, তৃণমূল হেরে গেলে ফিরতেন না। কিন্তু মমতা যে তাঁদের ফিরিয়ে নিলেন, এ থেকে কি প্রমাণ হয় না যে তাঁর ঘর আসলে তাসের ঘর? ক্ষমতার ঠেকনা দিয়ে খাড়া রাখা হয়েছে, সরিয়ে নিলেই হুড়মুড়িয়ে ভেঙে পড়বে? মুকুল রায় যে শ্রডিংগারের বেড়ালের মত বিজেপিতেও আছেন আবার তৃণমূলেও আছেন হয়ে থেকে গেলেন – তাও কি এটাই প্রমাণ করে না যে তৃণমূল নেতৃত্বের আশঙ্কা, একটা তাস এদিক ওদিক হলেই বাকিগুলো ভেঙে পড়বে? এমন নড়বড়ে সরকার চালাতে কি মমতা পছন্দ করেন? কোনো নেতারই কি পছন্দ করার কথা? ইডি, সিবিআই, আয়কর বিভাগের জ্বালায় ব্যতিব্যস্ত হওয়ার কথা না হয় ছেড়েই দিলাম।

বিজেপি প্রধান বিরোধী হয়ে যাওয়ায় শাসক হিসাবে তৃণমূলের কিছু সুবিধা নিশ্চয়ই হয়েছে। যেমন, বিধানসভায় কাজের বিতর্ক প্রায় হয়ই না। রাজ্য সরকারের কাজ নিয়ে বিরোধী দলনেতা যত কৈফিয়ত চান সবই বিধানসভা ভবনের বাইরে বিভিন্ন চ্যানেলের ক্যামেরার সামনে। তাছাড়া রাজ্য রাজনীতির আলোচ্য বিষয়গুলোই এমন হয়ে গেছে যাতে কাজের কাজ না করলেও চলে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান নিয়ে আলোচনা প্রায় বন্ধ। বাজেটেও কেবল চালু ভাতাগুলোর টাকার অঙ্কটা বাড়িয়ে দিলেই চলে যায়। অযোধ্যার মন্দিরের পালটা দীঘার মন্দিরের কথা হয়। ইমাম ভাতায় কেউ চটে গেলে পুরোহিত ভাতা দিলেই যথেষ্ট। রামনবমীর বিপরীতে বজরংবলী পুজো হয়। তাতেও কাজ হচ্ছে না বুঝলে রামনবমীতে সরকারি ছুটি দেওয়া হয়। তারপরেও খোঁজ করতে হয়, চিরশত্রু বামেরা কত ভোট পাবে। এত নড়বড়ে, পরনির্ভরশীল, তৃণমূল কংগ্রেস ১৯৯৬ সালেও ছিল না। এই কারণেই ইন্ডিয়া ব্লকে মমতা ছিলেন বটে, কিন্তু এখনো আছেন না নেই, তা দেবা ন জানন্তি।

এখানে একটা মজার কথা স্মর্তব্য। বামফ্রন্ট সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করতে কংগ্রেস-তৃণমূল জোট তৈরির উদ্যোগ নিয়েছিলেন প্রণব মুখার্জি। বহু বছর পরে দেখা যায়, আজীবন কংগ্রেসি হলেও আরএসএস তাঁকে রীতিমত শ্রদ্ধা করে। নিজেদের অনুষ্ঠানে বক্তা হিসাবে আমন্ত্রণ জানায়, তিনি সে আমন্ত্রণ গ্রহণ করে বক্তৃতাও দিয়ে আসেন। ২০১৯ সালে বিজেপির সরকার তাঁকে ভারতরত্ন পুরস্কারও দেয়।

জনতা দল ইউনাইটেড
বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ডে আর যা-ই ঘটে যাক না কেন, সূর্য পূর্ব দিকে উঠবেই আর নীতীশ কুমারই বিহারের মুখ্যমন্ত্রী থাকবেন। ব্যাপার কতকটা এরকমই দাঁড়িয়েছে। দাঁড়াত না, যদি মণ্ডল রাজনীতির সন্তান, লালুপ্রসাদের এক সময়কার সতীর্থ নীতীশ বারবার বিজেপির সঙ্গে ঘর না করতেন। বিহারে গত বিধানসভা নির্বাচনে জিতে আরও একবার মুখ্যমন্ত্রী হয়েও একসময় তাঁর আশঙ্কা হল, নিজের চেয়ার বাঁচাতে গিয়ে দলটা চলে যাচ্ছে বিজেপির পেটে। তাই পালটি খেয়ে পুরনো বন্ধু লালু, পুরনো শত্রু কংগ্রেস আর বামপন্থীদের সঙ্গে জোট করে মুখ্যমন্ত্রী রইলেন। সাপও মরল, লাঠিও ভাঙল না। তবে বোধহয় এবার আরও বড় স্বপ্ন ছিল। তাই উদ্যোগ নিয়ে বিজেপিবিরোধী দলগুলোকে একজোট করে ইন্ডিয়া ব্লক তৈরি করলেন। তাঁর প্রবীণতাকে সম্মান দিয়ে সকলে আহ্বায়ক হিসাবে তাঁকে মেনেও নিল। তারপর ‘কী হইতে কী হইয়া গেল’, নীতীশ হঠাৎ একদিন সকালে আবার এনডিএ-তে ফিরে গেলেন। বিকেলবেলা নতুন সরকারের মুখ্যমন্ত্রীও হয়ে গেলেন।

উপমুখ্যমন্ত্রী হিসাবে তেজস্বী বন্ধুপুত্রের তেজ সহ্য হল না, নাকি রাহুল গান্ধী যেমন বলেছেন – ইডি, সিবিআই বা আয়কর বিভাগের ভয়ে নীতীশ এমনটা করলেন, তা হয়ত ভবিষ্যতের কোনো ঐতিহাসিক খুঁজে বার করবেন। তবে সমস্ত রাজনৈতিক বিশ্লেষকই বলছেন, বিহারের মানুষের কাছে নীতীশের এবং তাঁর দলের আর কোনো বিশ্বাসযোগ্যতা অবশিষ্ট নেই। লোকসভায় যা ভোট পাবেন সে-ও মোদীর কল্যাণে, আর আগামী বিধানসভা নির্বাচনে নাকি তাঁর দলকে খুঁজে পাওয়াই মুশকিল হবে। এতদিন মুখ্যমন্ত্রী থাকাকালীন যে নীতীশ বহু ভাল কাজ করেছেন তা বিরোধীরাও অস্বীকার করেন না। কিন্তু সেসবই নাকি এখন মূল্যহীন হয়ে পড়েছে ভোটারদের কাছে। সম্ভবত নীতীশও তা জানেন, নইলে কেবলই সঙ্গী খুঁজে হয়রান হবেন কেন? একলা লড়তে ভয় পাবেন কেন?

বিজু জনতা দল
বিজু পট্টনায়ক ওড়িশার প্রবাদপ্রতিম নেতা। একসময় কংগ্রেসে ছিলেন, পরে ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে সংঘাতে কংগ্রেস ছেড়ে বেরিয়ে আসেন, জনতা পার্টিতে যোগ দেন, পরবর্তীকালে জনতা দলে। ওড়িশার এই প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীর ছেলে নবীনই বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী এবং বিজুর নামাঙ্কিত দলের একমেবাদ্বিতীয়ম নেতা। তিনি বিদেশে পড়াশোনা করেছেন এবং শোনা যায় ওড়িয়া ভাষায় ভাল করে কথাও বলতে পারেন না। তবু ওড়িশা রাজ্যটাকে এই শতকের শুরু থেকে চালিয়ে যাচ্ছেন প্রায় বিরোধীশূন্য অবস্থায়। কংগ্রেস ফিকে হয়ে গেছে, বিজেপি সেই জায়গায় উঠে এসেছে। উঠে আসার পিছনে নবীন স্বয়ং। ১৯৯৭ সালে জনতা দল ভেঙে বেরিয়ে নতুন দল গঠন করেই তিনি এনডিএ-তে যোগ দেন এবং কেন্দ্রীয় মন্ত্রীও হয়ে যান। ওড়িশায় ক্ষমতা দখলও করেন বিজেপির সঙ্গে জোট বেঁধেই। ২০০৯ লোকসভা ভোটের আগে বিজেপির বিরুদ্ধে সাম্প্রদায়িকতার অভিযোগ তুলে এনডিএ ত্যাগ করলেও সংসদে বড় বড় ইস্যুতে নবীনের দলের সাংসদরা কখনো বিজেপির বিরুদ্ধাচরণ করেননি। জাতীয় রাজনীতি নিয়ে নবীন প্রায় কথাই বলেন না। বিজেপিও, কোনো অজ্ঞাত কারণে, অন্যান্য রাজ্যে ক্ষমতা দখল করার জন্যে যতখানি আক্রমণাত্মক হয়েছে, ওড়িশায় আজও হয়নি। পশ্চিমবঙ্গ বা দক্ষিণ ভারতের অন্য রাজ্যগুলোর মত কেন্দ্রীয় প্রকল্পের টাকা আটকে দিয়েছে বলেও চট করে শোনা যায় না। প্রাকৃতিক বিপর্যয় রোধে ওড়িশা সরকার আন্তর্জাতিক মানের কাজ করেছে। তবে ওড়িশায় আদিবাসীদের উচ্ছেদ করে শিল্প-টিল্প দিব্যি হয়, স্কুলে মিড ডে মিল দেওয়ার টাকা থাকে না, শিক্ষকরা উপযুক্ত পারিশ্রমিক পান না, তা নিয়ে আন্দোলনও করেন। এদিকে সরকার ভুবনেশ্বরে ঝাঁ চকচকে হকি স্টেডিয়াম বানায়, ভারতীয় হকি দলের স্পনসর হয়। অন্যান্য অবিজেপিশাসিত রাজ্যে এমন হলে গোদি মিডিয়া সে রাজ্যের সরকারকে তুলে আছাড় মারে। ওড়িশাকে কিন্তু দেখতেই পায় না। ওই রাজ্যে লোকসভার বছরেই বিধানসভা নির্বাচন হয়। ২০১৪ আর ২০১৯ – দুবারই দেখা গিয়েছিল বিধানসভায় বিজেডি হইহই করে জিতেছে আর লোকসভায় বিজেপি বেশ কয়েকটা আসন পেয়েছে।

এতদিন এই শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান চালিয়ে হঠাৎ এবার ভোটের আগে কোনো কারণে নবীন বুঝতে পেরেছেন, তাঁর অজান্তেই তাঁর রাজ্য বিজেপির গ্রাসে চলে যাচ্ছে। তাই আসন সমঝোতার কথাবার্তা চালিয়েও শেষ মুহূর্তে আলাদা লড়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তবে নেতাদের বিজেপি গমন কিন্তু ঠেকাতে পারেননি। নবীনের দলের বেশ কয়েকজন বিধায়ক এবং অন্যান্য নেতা বিজেপিতে চলে গেছেন। তার মধ্যে একজন ছবারের সাংসদ, আরেকজন পদ্মশ্রী প্রাপ্ত আদিবাসী নেত্রী। ভোটের ফল বেরোলেই বোঝা যাবে নবীন ঘর সামলাতে পারলেন, নাকি নীতীশের মত অবস্থা হল।

তেলুগু দেশম, ওয়াইএসআর কংগ্রেস
ব্রিগেডের যে সভায় ফারুক আবদুল্লা জ্বালাময়ী বক্তৃতা দিয়েছিলেন, সেই সভায় চন্দ্রবাবু নাইডুও ছিলেন। তেলুগু দেশমের জন্মও কংগ্রেসবিরোধিতার মধ্যে দিয়ে, ইন্দিরার আমলে। জন্মদাতা ছিলেন চন্দ্রবাবুর শ্বশুরমশাই, তেলুগু সিনেমার এককালের জনপ্রিয় নায়ক, এন টি রামারাও। তাঁর মতই চন্দ্রবাবুও জাতীয় স্তরে তৃতীয় শক্তির অন্যতম নেতা হয়ে উঠেছিলেন। কিন্তু ১৯৯৯ সালে কেন্দ্রে বাজপেয়ীর পাকাপোক্ত সরকার হতেই চন্দ্রবাবুর কংগ্রেসবিরোধিতা বিজেপিবিরোধিতার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়ায়। তাছাড়া তিনিও নবীনের মত ‘উন্নয়নমুখী’ মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন অবিভক্ত অন্ধ্রপ্রদেশের। অতএব কেন্দ্রের সঙ্গে সংঘাতে যাবেন কেন? বিশ্বায়নের প্রথম যুগে শহরে মাখনের মত রাস্তা আর গাদা গাদা তথ্যপ্রযুক্তি শিল্পকেই যারা উন্নয়ন মনে করে তাদের মতে দেশের সেরা মুখ্যমন্ত্রীদের একজন ছিলেন চন্দ্রবাবু। কিন্তু সে মলাট ছিঁড়তে বেশি সময় লাগেনি। অন্ধ্রের গ্রামে যে উন্নয়নের আলো বিশেষ পৌঁছয়নি তা বোঝা যায় ২০০৪ সালে তাঁর ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার মধ্যে দিয়ে। তার একবছর আগেই একটুর জন্যে প্রাণে বেঁচেছেন। পিপলস ওয়ার ল্যান্ডমাইন পেতে রেখেছিল তাঁর জন্যে।

২০১৪ সালে তেলেঙ্গানা আলাদা রাজ্য হয়ে যাওয়ার পর অন্ধ্রপ্রদেশের প্রথম নির্বাচনে বিজেপির সঙ্গে জোট বেঁধে ক্ষমতায় ফেরেন চন্দ্রবাবু। কিন্তু ২০১৮ সালে বিজেপির সঙ্গে সম্পর্ক ভেঙে যায় কেন্দ্র অন্ধ্রকে বিশেষ রাজ্যের মর্যাদা না দেওয়ায়। ২০১৯ সালে চন্দ্রবাবুর তেলুগু দেশম কংগ্রেস এবং ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে জোট করে হেরে যায় জগন্মোহন রেড্ডির নতুন দল ওয়াইএসআর কংগ্রেসের কাছে।

জগনের উত্থানও কংগ্রেসের বিরোধিতা করেই। অবিভক্ত অন্ধ্রে চন্দ্রবাবুর পরেই মুখ্যমন্ত্রী হয়েছিলেন ওয়াই এস রাজশেখর রেড্ডি। ২০০৯ সালে কপ্টার দুর্ঘটনায় তাঁর মৃত্যু হয়। জগন সোজা বাবার চেয়ারে বসতে চেয়েছিলেন। কংগ্রেস হাইকমান্ড সে গুড়ে বালি দেওয়ায় নিজেই দল খুলে ফেলেন। ইনিও কেন্দ্রের সঙ্গে সংঘাতে যাওয়ার লোক নন। তাই বিজেপির সঙ্গে জোট না থাকলেও বেশ মিষ্টিমধুর সম্পর্ক ছিল। সংসদে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিলের ভোটাভুটিতে জগনের দল সরকারের পক্ষেই ভোট দিয়ে এসেছে। অন্ধ্রে বিজেপি এখনো ক্ষমতাসীন দলকে চিন্তায় ফেলে দেওয়ার মত শক্তি নয়। সেখান থেকে তাদের কোনো সাংসদ নেই। অনেকে ভেবেছিলেন বিজেপি তুলনায় শক্তিশালী জগনকেই এনডিএ-তে চাইবে। কিন্তু সকলকে অবাক করে কদিন আগেই দুর্নীতির মামলায় হাজতবাস করা চন্দ্রবাবুকে বেছে নিয়েছে বিজেপি, সঙ্গে থাকছে জন সেনা পার্টি।

চন্দ্রবাবু এনডিএ-তে ফিরে যাওয়ার যুক্তি হিসাবে বলেছেন, জগনের অপশাসন থেকে ঘুরে দাঁড়াতে হলে রাজ্যের কেন্দ্রীয় সরকারের সাহায্য লাগবে। বিজেপি কেন জগনকে হতাশ করে তাঁকে বেছে নিল তা খোলসা করেনি। হতে পারে রাজ্য সরকার তাঁকে হাজতবাস করানোয় তিনি ভোটারদের সহানুভূতি পাবেন বলে বিজেপির বিশ্বাস। তবে এতে যা হল, তা হচ্ছে এতদিন সুসম্পর্ক বজায় রাখায় জগনের বিজেপির প্রতি আক্রমণ ভোঁতা হয়ে গেল। অন্যদিকে চন্দ্রবাবু ভাল ফল করলেও বিজেপির অবাধ্য হতে পারবেন না।

ভারত রাষ্ট্র সমিতি
তেলেঙ্গানা আলাদা রাজ্য হওয়ার পিছনে তেলেঙ্গানা রাষ্ট্র সমিতির (এখন ভারত রাষ্ট্র সমিতি) এবং তাদের সর্বোচ্চ নেতা কে চন্দ্রশেখর রাওয়ের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। সেই সুবাদে পরে তারা তেলেঙ্গানায় বিধানসভা নির্বাচন জেতে এবং কেসিআর মুখ্যমন্ত্রী হন। তবে তার আগেই ২০০৯ সালে অবিভক্ত অন্ধ্রের ভোটে তেলুগু দেশম ও বিজেপির সঙ্গে জোট করেছিল বিআরএস। যদিও রাজ্য আলাদা হওয়ার আগে দলটা বলার মত নির্বাচনী সাফল্য পায়নি। বিজেপি কিন্তু কেসিআরের হাত ধরে ঢুকে পড়তে পেরেছে ওই রাজ্যে। ২০২০ সালে রাজধানী হায়দরাবাদের পৌর নির্বাচনে বিজেপি সর্বশক্তি দিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে এবং দ্বিতীয় বৃহত্তম দল হয়। তখন মনে করা হয়েছিল তেলেঙ্গানায় বিআরএসকে ক্ষমতাচ্যুত করে বিজেপি ক্ষমতা দখল করবে। শেষপর্যন্ত তা হয়নি এবং কংগ্রেস অনেক পিছন থেকে শুরু করেও জয়ী হয়। তবে বিজেপির ভোট শতাংশ আগেরবারের চেয়ে দ্বিগুণ হয়েছে। প্রশান্ত কিশোরের মত কেউ কেউ আবার মনে করছেন, লোকসভায় তেলেঙ্গানায় দুই বা এক নম্বরে থাকবে বিজেপি। স্পষ্টত, নিজেদের রাজ্য নিয়ে ব্যস্ত থাকা, বিজেপিকে বিশেষ আক্রমণ না করার সুবিধা বিআরএস পায়নি। বিজেপিই পেয়েছে।

জনপ্রিয় সাংসদ বন্ডি সঞ্জয় কুমারকে নির্বাচনের কয়েক মাস আগে রাজ্য বিজেপির প্রধান পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া এবং ভোটের সপ্তাহখানেক আগে কংগ্রেস নেতাদের বাড়িতে ইডি হানা থেকে অনেকেরই সন্দেহ হয়েছিল যে বিজেপি বিআরএসকে ক্ষমতাচ্যুত করতে চাইছে না। চাইছে কংগ্রেসের ক্ষমতায় আসা আটকাতে। একে বিআরএসের সাময়িক লাভ বলে ভাবা যেতে পারে। তবে ‘দ্য ওয়্যার’ ওয়েবসাইটের এক প্রতিবেদন বলছে, তেলেঙ্গানা বিজেপির নেতারা চেয়েছিলেন কেসিআরের দুর্নীতির বিরুদ্ধে ব্যাপক প্রচার করা হোক। কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব তা হতে দেননি। কেসিআরের মেয়ে কে কবিতাকে দিল্লির মদ কেলেঙ্কারিতে গ্রেফতার করা হোক – এটাও তখনই তাঁদের দাবি ছিল, কান দেওয়া হয়নি। সেই গ্রেফতারি হল লোকসভা নির্বাচনের ঠিক আগে। অর্থাৎ বিআরএস এখন পুরোপুরি বিজেপির কবজায়।

শিবসেনা, ন্যাশনালিস্ট কংগ্রেস পার্টি
শোলে ছবির জয় আর বীরুর বন্ধুত্ব কোনোদিন ভেঙে যেতে পারে একথা কল্পনা করাও কঠিন। তার চেয়েও কঠিন ছিল বিজেপির সঙ্গে শিবসেনার বিচ্ছেদ কল্পনা করা। কিন্তু সেটাও হয়ে গেল মহারাষ্ট্রে গত বিধানসভা নির্বাচনের পর। সংঘ পরিবারের বাইরে বালাসাহেব ঠাকরে প্রতিষ্ঠিত এই দলটার সঙ্গেই বিজেপির সামাজিক, সাংস্কৃতিক ভাবনার মিল ছিল সবচেয়ে বেশি। ফলে রামমন্দির আন্দোলন থেকে শুরু করে অভিন্ন দেওয়ানি বিধি – সমস্ত আদর্শগত ব্যাপারেই শিবসেনার সমর্থন উপভোগ করে এসেছে বিজেপি। মহারাষ্ট্রে একসঙ্গে সরকারও চালিয়েছে। কিন্তু ঠাকরের মৃত্যুর পর দলের কর্তৃত্ব নিয়ে তাঁর ছেলে উদ্ধব আর ভাইপো রাজের মধ্যে কোন্দলে সব গোলমাল হয়ে গেল। দেখা গেল হাবভাবে, আক্রমণাত্মক কথাবার্তায় বালাসাহেবের সঙ্গে তাঁর ছেলের চেয়ে ভাইপোরই মিল বেশি। উদ্ধব তুলনায় নরম। কিন্তু বিস্তর দড়ি টানাটানির পরে উদ্ধবই কর্মীবাহিনীকে নিজের দিকে টেনে রাখতে সফল হলেন। তাই মহারাষ্ট্র নবনির্মাণ সেনা তৈরি করে রাজ এককোণে পড়ে রইলেন (এবার অবশ্য আবার তাঁর ডাক পড়েছে), বিজেপি উদ্ধবকেই আপন করে নিল।

কিন্তু নীতীশ কুমারের মত উদ্ধবও ২০১৯ সালে মহারাষ্ট্র বিধানসভা নির্বাচনে জেতার পরে টের পেলেন, মোদী-শাহের বিজেপি তাঁর উপর ছড়ি ঘোরাতে চাইছে। তাই জোট ভেঙে দিয়ে কংগ্রেস আর শরদ পাওয়ারের ন্যাশনালিস্ট কংগ্রেস পার্টির হাত ধরে মুখ্যমন্ত্রী হলেন। যে কল বিজেপি বহু রাজ্যে করে থাকে, সেই কল করেই এভাবে তুলে আছাড় মারবেন উদ্ধব তা বিজেপি নেতারা ভাবেননি। কিন্তু এই অপমানের শোধ না তুলে ছেড়ে দেওয়ার লোক মোদী-শাহ নন। তাই তিন বছরের বেশি চলতে পারল না উদ্ধবের সরকার। তাঁরই দলের বেশকিছু বিধায়ককে ভাঙিয়ে নিয়ে, রাজ্যপালের বদান্যতায় একনাথ শিন্ডেকে সাক্ষী গোপাল মুখ্যমন্ত্রী করে সরকার গড়ে ফেললেন বিজেপি নেতা এবং মহারাষ্ট্রের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী দেবেন্দ্র ফড়নবিশ। সেখানেই শেষ নয়। বালাসাহেবের উত্তরাধিকারীর হাত থেকে শিবসেনার প্রতীক তীর ধনুকটা পর্যন্ত ছিনিয়ে নিয়েছে নির্বাচন কমিশন। শিন্ডেদের দলত্যাগ বিরোধী আইনে শাস্তি হওয়া দূরে থাক, আইনত তাঁরাই আসল শিবসেনা হিসাবে স্বীকৃতি পেয়ে গেছেন। উদ্ধবের ডান হাত সঞ্জয় রাউতকে বেশ কিছুদিন হাজতবাস করতে হয়েছে।

কংগ্রেসের সঙ্গে জোট করার পরে আজকাল উদ্ধবের দলেরা নেতারা এবং তাঁর ছেলে আদিত্য বেশ ধর্মনিরপেক্ষ গোছের কথাবার্তা বলেন। তাতে সততা কতটা আর অস্তিত্বের সংকট কতটা কে জানে? তবে তরুণরা শিবসেনাকে কংগ্রেসের সঙ্গে জোট করতে দেখে, এক মঞ্চে রাহুল গান্ধী আর উদ্ধবকে বক্তৃতা দিতে দেখে যতই অবাক হোন না কেন, প্রবীণদের ভুলে যাওয়ার কথা নয় যে শিবসেনার উত্থান কংগ্রেসেরই মদতে। উদ্দেশ্য ছিল মুম্বাইয়ের ট্রেড ইউনিয়নগুলোতে প্রবল শক্তিশালী বামপন্থীদের একেবারে শারীরিকভাবে শেষ করে দেওয়া। তারই অঙ্গ হিসাবে বালাসাহেব ‘মারাঠি মানুস’ তত্ত্ব খাড়া করেন অন্য রাজ্য থেকে আসা শ্রমিকদের কোণঠাসা করতে। বামপন্থীদের নিকেশ করতে সফল হয়েছিল বলেই মহারাষ্ট্রের রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছিল শিবসেনা। বিজেপিকেও দীর্ঘকাল বালাসাহেবের মর্জি মত চলতে হয়েছে। কিন্তু যে কোনো কাল্টের যা হয়, তাঁর মৃত্যুর পর শিবসেনারও তাই হয়েছে। উদ্ধবের তাই আপাতত ইন্ডিয়া ব্লকের সদস্য হয়ে প্রগতিশীল হওয়ার চেষ্টা করা ছাড়া উপায় নেই। একনাথ মুখ্যমন্ত্রীর চেয়ারটা পেয়েছেন বটে, কিন্তু প্রত্যেক অনুষ্ঠানে বা সাংবাদিক সম্মেলনেই বিজেপি টের পাইয়ে দেয় যে তিনি ঠুঁটো জগন্নাথ। মানে একদা মুম্বাই শাসন করা শিবসেনা বিজেপির ছোঁয়ায় এখন দ্বিখণ্ডিত এবং বিপন্ন।

অবশ্য উদ্ধবের চেয়েও করুণ অবস্থা মহারাষ্ট্রের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী শরদ পাওয়ারের। তিনি কেবল নিজের রাজ্যের প্রবীণতম নেতাই নন, কংগ্রেসের জাতীয় স্তরের ডাকসাইটে নেতা ছিলেন। দেশের প্রতিরক্ষা মন্ত্রী ছিলেন একসময়, লোকসভায় বিরোধী দলনেতাও। ভারতের ক্রিকেট বোর্ড এবং আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিলের শীর্ষ পদেও আসীন ছিলেন। মহারাষ্ট্রে তাঁর বিপুল সম্পত্তি এবং বিস্তীর্ণ অঞ্চলে তৃণমূল স্তরে একসময় দারুণ জনপ্রিয়তা ছিল। এমন অমিত ক্ষমতাধর শরদকে একেবারে ক্ষমতাহীন করে দিয়েছে তাঁর পুরনো সঙ্গী বিজেপি। বিজেপির সঙ্গে জোট বেঁধে মহারাষ্ট্রে সরকার চালিয়েছে পাওয়ারের দল ন্যাশনালিস্ট কংগ্রেস পার্টি (এনসিপি)। ১৯৯৯ সালে কংগ্রেস থেকে বিতাড়িত হওয়ার কারণটাও বেশ বিজেপিসুলভ। ‘বিদেশিনী’ সোনিয়া গান্ধীর নেতৃত্ব মেনে নিতে তাঁর আপত্তি ছিল। তিনি, প্রয়াত পূর্ণ সাংমা এবং তারিক আনোয়ার মিলে বহিষ্কৃত হওয়ার পর এই পার্টি গড়ে তোলেন। কথিত আছে এর পিছনে মহারাষ্ট্রের বিজেপি নেতা প্রমোদ মহাজনের হাত ছিল। তা সত্যি হোক আর না-ই হোক, ২০১৪-১৯ তাঁর দল যে মহারাষ্ট্রের বিজেপি সরকারকে সমর্থন দিয়েছিল তা তো আর মিথ্যা নয়। আসলে বরাবরই ক্ষমতা যেখানে পাওয়ার সেখানেই থাকতে চেয়েছেন। যে সোনিয়ার জন্যে কংগ্রেস ছাড়লেন তাঁর সভাপতিত্বের কংগ্রেসের নেতৃত্বাধীন ইউপিএ সরকারেই আবার মন্ত্রী হয়ে কাটিয়েছেন ২০০৪-১৪। কিন্তু ২০১৯ সালের পর থেকেই তাঁর সব হিসাব গুলিয়ে দিচ্ছে বিজেপি। তাঁর একসময়ের অনুগত নেতা ছগন ভুজবলকে টেনে নিয়েছে বিজেপি। চূড়ান্ত আঘাতটা অবশ্য এসেছে মাত্র কয়েকদিন আগে। শরদের ভাইপো অজিতকেও নিজেদের দিকে টেনে নিয়েছে বিজেপি। দুর্নীতিতে অভিযুক্ত অজিতকে একেবারে উপমুখ্যমন্ত্রী করে দেওয়া হয়েছে। মড়ার উপর খাঁড়ার ঘায়ের মত শরদের পার্টির প্রতীকও কেড়ে নিয়েছে নির্বাচন কমিশন। বলা হয়েছে অজিতের দলটাই নাকি আসল এনসিপি। তাই দলের প্রতীক অ্যালার্ম ঘড়ি তাঁরাই ব্যবহার করতে পারবেন, প্রতিষ্ঠাতা শরদের দলকে অন্য প্রতীকে লড়তে হবে।

অর্থাৎ ২০২৪ শরদের কাছেও অস্তিত্বের লড়াই। কী কুক্ষণে বিজেপির সঙ্গে ভাব করতে গিয়েছিলেন!

বিআরএসের সাময়িক লাভ বলে ভাবা যেতে পারে। তবে ‘দ্য ওয়্যার’ ওয়েবসাইটের এক প্রতিবেদন বলছে, তেলেঙ্গানা বিজেপির নেতারা চেয়েছিলেন কেসিআরের দুর্নীতির বিরুদ্ধে ব্যাপক প্রচার করা হোক। কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব তা হতে দেননি। কেসিআরের মেয়ে কে কবিতাকে দিল্লির মদ কেলেঙ্কারিতে গ্রেফতার করা হোক – এটাও তখনই তাঁদের দাবি ছিল, কান দেওয়া হয়নি। সেই গ্রেফতারি হল লোকসভা নির্বাচনের ঠিক আগে। অর্থাৎ বিআরএস এখন পুরোপুরি বিজেপির কবজায়।

ডিএমকে, এআইএডিএমকে
এই তালিকায় বিজেপির সঙ্গে সবচেয়ে কম সময়ের সম্পর্ক সম্ভবত তামিলনাড়ুর দ্রাবিড় মুন্নেত্রা কজঘমের (ডিএমকে)। তামিলনাড়ুর রাজনীতি দীর্ঘকাল ধরে আবর্তিত হচ্ছে দুই দ্রাবিড় ভাবাদর্শের দল ডিএমকে আর অল ইন্ডিয়া আন্না দ্রাবিড় মুন্নেত্রা কজঘমের (এআইএডিএমকে) মধ্যে। ১৯৯৮ সালে তৈরি হওয়া বাজপেয়ী সরকারেরও শরিক ছিল জয়ললিতার নেতৃত্বাধীন এআইএডিএমকে। কিন্তু সেই সরকার পড়ে যায় জয়ললিতা সমর্থন প্রত্যাহার করে নেওয়ায়। দাবি ছিল, তাঁর বিরুদ্ধে আয়কর সংক্রান্ত মামলাগুলো প্রত্যাহার করাতে হবে এবং তামিলনাড়ুর ডিএমকে সরকার ফেলে দিতে হবে। দাবি না মেটানোয় জয়ললিতা সরকার তো ভেঙে দিলেন বটেই, ১৯৯৯ সালের ভোটে উল্টে ডিএমকে নেতা এম করুণানিধি জোট করে ফেললেন বিজেপির সঙ্গে।

আজ করুণানিধির নাতি দয়ানিধি স্ট্যালিনের মুখে যে সনাতন ধর্মবিরোধী, বর্ণবাদবিরোধী কথাবার্তা বিজেপির গাত্রদাহের কারণ – সেগুলো নতুন কিছু নয়। ওই ভাবাদর্শই ডিএমকে-র ভিত্তি। সেদিক থেকে একেবারে বিপরীত মেরুতে দাঁড়ানো বিজেপির সঙ্গে কেন জোট করেছিলেন করুণানিধি, তা ভাবলে অবাক হতে হয়। হয়ত তিনি ভেবেছিলেন, কেন্দ্রের সরকারের সঙ্গে বিবাদ করে সরকার টিকিয়ে রাখা মুশকিল হবে। কারণ তামিলনাড়ুতে কোনো পক্ষেরই দুর্নীতি কিছু কম ছিল না। জয়ললিতা ২০০১ সালে মুখ্যমন্ত্রী হয়ে দুর্নীতির মামলায় ৭৮ বছর বয়সী করুণানিধিকে রাত দুটোর সময়ে গ্রেফতারও করিয়েছিলেন। কথিত আছে যে ২০০২ সালের গুজরাট গণহত্যার পর থেকেই ডিএমকে বিজেপির সঙ্গে জোট নিয়ে অস্বস্তিতে ভুগছিল, কারণ তাদের সমর্থকদের উল্লেখযোগ্য অংশ মুসলমান আর খ্রিস্টান। শেষমেশ ২০০৩ সালের ডিসেম্বরে ডিএমকে এনডিএ ত্যাগ করে।

এআইএডিএমকে কিন্তু বারবার বিজেপির কাছে ফিরে গেছে। ১৯৯৯ সালে জোট ভেঙে দেওয়ার পর আবার ২০০৪ সালের লোকসভা নির্বাচনেই তামিলনাড়ুতে বিজেপি-এআইএডিএমকে জোট হয়। কিন্তু সেই জোট শূন্য পায়, বিজেপি অবিলম্বে জোট ভেঙে দেয়। ২০১৬ সালে জয়ললিতার মৃত্যুর পরে যখন এআইএডিএমকে নেতৃত্ব দিশেহারা, তখন আবার বিজেপির সঙ্গে জোট বাঁধে। কিন্তু তাতেও বিজেপি শূন্যের গেরো কাটাতে পারেনি, এআইএডিএমকে জেতে মাত্র একটা আসন। তবু ২০২১ বিধানসভা নির্বাচন পর্যন্ত এই জোট বজায় ছিল। গতবছর মে মাস নাগাদ এআইএডিএমকে মনে করতে থাকে বিজেপির সঙ্গে থাকলে তাদের ক্ষতি হচ্ছে। এআইএডিএমকে নেতা সি পোন্নাইয়ান প্রকাশ্যে বলে দেন যে বিজেপি এআইএডিএমকের ক্ষতি করে নিজেদের সংগঠন বাড়াচ্ছে।

তারপরেও হয়ত জোট ভাঙত না। কিন্তু তামিলনাড়ু বিজেপির প্রধান কে আন্নামালাই গত এক বছরে পরপর এমন কিছু মন্তব্য করেছেন যা এআইএডিএমকে সহ্য করলে তামিল দল হিসাবে তাদের বিশ্বাসযোগ্যতায় আঘাত লাগত। আন্নামালাই প্রথমে এক সাক্ষাৎকারে বলেন তামিলনাড়ুর প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীরা সব আদালতের হাতে শাস্তিপ্রাপ্ত এবং রাজ্যটা ভারতের সবচেয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত রাজ্যগুলোর অন্যতম। এআইএডিএমকে তখনই জেপি নাড্ডা আর অমিত শাহকে বলেছিল আন্নামালাইকে থামাতে, কিন্তু বিজেপি কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। এরপর আন্নামালাই ডিএমকে প্রতিষ্ঠাতা সিএন আন্নাদুরাই সম্পর্কেও কিছু আপত্তিকর মন্তব্য করেন বলে অভিযোগ। শেষমেশ ২৫ সেপ্টেম্বর এআইএডিএমকে এনডিএ ত্যাগ করে।

এখন পর্যন্ত বিভিন্ন প্রাক-নির্বাচনী সমীক্ষা যা বলছে তা এআইএডিএমকে-র জন্য আশাব্যঞ্জক নয়। বিজেপি যে খাতা খুলতে পারবে তা কেউ নিশ্চিত করে বলতে না পারলেও, অনেকে বলছে তাদের ভোট শতাংশ উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে। অর্থাৎ বিজেপির সঙ্গে দীর্ঘ সম্পর্কের মাসুল এখানেও দিতে হচ্ছে আঞ্চলিক দলটাকেই। বিজেপির প্রেমে পড়েছ কি মরেছ।

আরও পড়ুন ভীরুদের হাতে ভারতের গণতন্ত্র রক্ষার ভার, তাই বিরোধী জোট নড়বড়ে

কাশ্মীর থেকে কন্যাকুমারী পর্যন্ত আলোচনা হয়েছে। এবার যেখান থেকে শুরু করেছিলাম সেখানে ফিরে আসি – আম আদমি পার্টি। আজ যেভাবে চক্রব্যূহে ফেলা হয়েছে দলটাকে, গণতন্ত্র নিয়ে বিন্দুমাত্র ভাবনা থাকলে যে কেউ তার বিরুদ্ধে কথা বলবেন। তবে তাদের আজ যে পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হয়েছে তাও কিন্তু একার্থে আরএসএস-বিজেপির সঙ্গে আশনাইয়ের পরেই। ‘ইন্ডিয়া এগেনস্ট করাপশন’ বলে যে সংগঠন থেকে আপ দলের উদ্ভব, তার পিছনে কারা ছিল তা এখন অনেকটা পরিষ্কার। রামলীলা ময়দানের সেই দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলনের গুরু হয়ে বসেছিলেন যে আন্না হাজারে, তাঁর স্বরূপও উদ্ঘাটিত হয়েছে ২০১৪ সালের পর থেকে বিজেপির বিরুদ্ধে বিরাট বিরাট স্মার্ট দুর্নীতির অভিযোগে নীরবতা এবং সম্প্রতি কেজরিওয়ালের গ্রেফতারি সমর্থন করা থেকে। কিরণ বেদির মত মানুষের আসল চেহারাও দেখা গেছে।

তবে হ্যাঁ। সংঘ পরিবারের প্রেমে নানাভাবে সিক্ত দল এবং ব্যক্তিদের ইতিহাস কাজে লাগবে তখনই, যদি ভারতের গণতন্ত্র বাঁচে। নইলে এরা তো স্বখাতসলিলে ডুববেই, এদের বিচার করার মতও কেউ থাকবে না।

পিপলস রিপোর্টারে প্রকাশিত