কুণাল, যাঁর কৌতুক আজ কামড়ায়

‘পরেরবার যদি রাজনৈতিক কৌতুক করি, তাহলে এত ব্যাকফুটে থাকার দরকার নেই। সোজা মোদী, অমিত শাহ, আম্বানি, আদানি – যা প্রাণে চায় বলে দেওয়াই ভাল। কারণ যা-ই করো, গালি তো খেতেই হবে। সুতরাং অল আউট খেলাই ভাল। অত ভাবার দরকার নেই যে লোকে অমুক জোকের যুক্তিটা নিয়ে বলবে…ইন্টারনেটে দুই ধরনের লোক আছে। এক ধরনের লোক শাসক দলের ভক্ত, আরেক ধরনের লোক শাসক দলকে রীতিমত ঘৃণা করে। অতএব…আমাকে অনেকেই বলেছে, এত ফেন্স সিটিং করছ কেন? সুতরাং ঠিক করে নিয়েছি…সেরা কমেডি হয় ক্ষমতার বিরুদ্ধে কথা বললে, তাই না? পাঞ্চ ডাউন করার চেয়ে পাঞ্চ আপ করা ভাল, আর সেটা যদি করতেই হয় তাহলে পাঞ্চটা জোরে মারাই ভাল। সুতরাং এখন যদি আমি রাজনৈতিক কৌতুক করি, তাহলে সেটা অনেক বেশি তীক্ষ্ণ হবে।’

গাম্ভীর্য নির্বোধের মুখোশ। কথাটা অনেককাল আগে বলেছিলেন এক মাস্টারমশাই। মোটেই বিশ্বাস করিনি, কারণ ততদিনে একাধিক জায়গা থেকে জেনেছি যে রাজশেখর বসু অত সরস সব গল্প লিখলেও, খুব গম্ভীর মানুষ ছিলেন। তারাপদ রায়ের সঙ্গে আলাপ ছিল এরকম একজনের মুখ থেকেও একইরকম কথা শুনেছিলাম। কিন্তু মাস্টারমশাই যে নেহাত ভুল বলেননি তার প্রমাণ গত কয়েক দিনে পাওয়া গেছে। ঋজু বিদূষক কুণাল কামরার কমেডি শো যে হলে হয়েছিল, মুম্বইয়ের সেই দ্য হ্যাবিট্যাট -এর মালিক আর কর্মচারীদের জিজ্ঞেস করলে তাঁরা নির্ঘাত বলবেন – হাড়ে হাড়ে টের পাওয়া গেছে। তবে নির্বোধ মানেই কিন্তু নিরীহ নয়। সুকুমার রায়ের রামগরুড়ের ছানাদের হাসতে মানা; একনাথ শিন্ডে, দেবেন্দ্র ফড়নবীশের দলবল আরও এককাঠি সরেস। তারা নিজেরা না হেসেই খুশি নয়, অন্যদেরও হাসতে মানা করে ভাংচুর করে।

অবশ্য এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। হাসাহাসি করলে ফ্যাসিবাদী হওয়া যায় না। তাছাড়া শিবসেনার জন্মই হয়েছিল ঠ্যাঙাড়ে বাহিনি হিসাবে, মুম্বই ও সংলগ্ন শিল্পাঞ্চলে অত্যন্ত শক্তিশালী বামপন্থী ট্রেড ইউনিয়নগুলোকে ভাঙার জন্যে (দুর্জনে বলে কংগ্রেসের উদ্যোগে)। কুণাল কামরার কমেডি শো নিয়ে শিবসেনার গুন্ডামি দেখে অনেকে খেয়াল করিয়ে দিচ্ছেন, শিবসেনার আদিপুরুষ বালাসাহেব ঠাকরে নিজে কার্টুনিস্ট ছিলেন, ইন্দিরা গান্ধীর ব্যঙ্গচিত্রও এঁকেছেন ইত্যাদি। কিন্তু ওসব কথা বলে লাভ নেই। বাল ঠাকরে শিবসেনার নেতা হিসাবে মোটেই কোনো গণতান্ত্রিক ব্যক্তি ছিলেন না। শিবসেনা কীভাবে মুম্বই চালাত সেকথা সে যুগের মুম্বই তথা মহারাষ্ট্রের বাসিন্দারা প্রত্যেকেই জানেন। নয়ের দশকের মুম্বই দাঙ্গায় শিবসেনার ভূমিকাও কোনো গোপন তথ্য নয়। আজ যে সারা ভারতে সুনির্দিষ্ট পরধর্মবিদ্বেষী এবং/অথবা পরজাতিবিদ্বেষী গুন্ডামি চালু করেছে সংঘ পরিবার, তার সূচনা অনেক আগেই বালাসাহেব করে দিয়েছিলেন মহারাষ্ট্রে। মুসলমান তো বটেই, সেইসময় শিবসেনার আক্রমণের বড় লক্ষ্য ছিলেন দক্ষিণ ভারতীয় শ্রমজীবী মানুষজন। ফলে কুণালের শো নিয়ে গুন্ডামি করে এক অর্থে একনাথরা প্রমাণ করে দিলেন যে তাঁরাই বাল ঠাকরের যথার্থ উত্তরাধিকারী, উদ্ধব ঠাকরেরা নন। চলচ্চিত্র পরিচালক হনসল মেহতা ২৪ মার্চ তাঁর এক্স হ্যান্ডেলে এক পোস্টে মনে করিয়ে দিয়েছেন যে আজ থেকে ২৫ বছর আগে তাঁর একখানা ছবির একটামাত্র সংলাপের জন্যে শিবসৈনিকরা তাঁর অফিসে ঢুকে তাণ্ডব চালিয়েছিল। তাঁকে মারধোর করা হয়, মুখে কালি লেপে দেওয়া হয়, তারপর জনা বিশেক রাজনৈতিক নেতা এবং হাজার দশেক লোকের সামনে এক বৃদ্ধার পা ধরে ক্ষমা চাওয়ানো হয়। মুম্বই পুলিস দ্য হ্যাবিট্যাট ভাংচুরে দর্শকের ভূমিকা পালন করেছে, সেদিনও তাই করেছিল। শিবসেনা কেমনভাবে চলত তা বোঝার জন্যে একথাও মনে করা দরকার যে বালাসাহেব ঠাকরের মৃত্যুর পর গোটা মহারাষ্ট্রে প্রায় বনধ করে দেওয়ার সমালোচনা করে সোশাল মিডিয়ায় পোস্ট করার জন্যে শিবসৈনিকরা পালঘরের দুই নিরীহ মেয়ের পিছনে লেগেছিল। তাদের পুলিস গ্রেফতার করে এবং একজনের আত্মীয়ের দোকান ভাংচুর করে শিবসৈনিকরা।

তবুও এবারের ঘটনা আর বাল ঠাকরের আমলের বিবিধ গুন্ডামিতে বিলক্ষণ তফাত আছে। তখন শিবসেনা ছিল রাষ্ট্রকেও তোয়াক্কা না করা অথবা রাষ্ট্রশক্তিকে নিজের ইচ্ছা মত চলতে বাধ্য করা শক্তি। আজ একনাথের শিবসেনা রাষ্ট্রের অংশ। স্রেফ তাঁর চ্যালাদের গুন্ডামিতে ব্যাপারটা থেমে থাকেনি, খোদ বৃহন্মুম্বই মিউনিসিপাল কর্পোরেশনের আধিকারিকরা গিয়ে দ্য হ্যাবিট্যাট ভেঙে এসেছেন। উপরন্তু মহারাষ্ট্রের মুখ্যমন্ত্রী ফড়নবীশ বলেছেন, কুণালকে ক্ষমা চাইতে হবে। তিনি যা খুশি তাই বলতে পারেন না। বাকস্বাধীনতার সীমা আছে ইত্যাদি। বালাসাহেব আইনের পথে যেতেন না, নিজের পথ নিজে কেটে নিতেন। কুণালের বিরুদ্ধে কিন্তু একাধিক এফআইআর ফাইল করা হয়েছে। যারা দ্য হ্যাবিট্যাট ভেঙে দিয়ে এসেছে, তারাই থানায় গিয়ে এফআইআর করেছে কুণালের নামে। অথচ তাদের বিরুদ্ধে কোনো মামলা মোকদ্দমা হওয়ার খবর নেই এখন পর্যন্ত। এখানেই সাধারণ গুন্ডামি আর ফ্যাসিবাদী হিংসার তফাত। এর বিরুদ্ধে শিরদাঁড়া সোজা করে দাঁড়াতে গেলে দুটো জিনিস অবশ্য প্রয়োজনীয় – সাহস আর কৌশল। কুণালের দুটোই আছে। কীরকম? দেখা যাক।

নায়কোচিত সাহস

দ্য হ্যাবিট্যাটের শোয়ের পর থেকে যা যা ঘটেছে তাতে কুণাল নায়ক হয়ে গেছেন – এতে অনেক আরএসএসবিরোধীকেও অসন্তুষ্ট হতে দেখছি। তাঁদের মধ্যে কারোর নায়ক ব্যাপারটাতেই আপত্তি, কারোর আবার আপত্তি কুণাল শোয়ের শেষে ভারতের সংবিধান তুলে ধরে নিজের অধিকারের কথা জানান দিয়েছিলেন বলে। আজ দেশের যা অবস্থা, সুপ্রিম কোর্টের আদেশেরও তোয়াক্কা না করে যেভাবে সংঘবিরোধীদের বাড়িঘর দোকানপাট বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়া চলছে, অপছন্দের লোক হলেই যা ইচ্ছা অভিযোগ দায়ের করে কারাবন্দি করে রাখা চলছে – তাতে কুণালের মত প্রকাশ্যে নাম করে ক্ষমতাসীন লোকেদের নিয়ে যিনি খিল্লি করবেন তিনি তো বহু মানুষের চোখে নায়ক হয়ে যাবেনই। আটকাবেন কী করে? আটকাতে হবেই বা কেন? পৃথিবীর কোন দেশে কোন বিদ্রোহ, কোন বিপ্লব আবার নায়ক ছাড়া হয়েছে? আমাদের স্বাধীনতা আন্দোলনেও তো অনেক নায়ক। সকলে আবার একই মত, একই পথেরও নন। ক্ষুদিরাম বসু নায়ক, মাস্টারদা সূর্য সেন নায়ক, ভগৎ সিং নায়ক, নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু নায়ক; আবার জওহরলাল নেহরু, মৌলানা আবুল কালাম আজাদ, মহাত্মা গান্ধীও নায়ক। শিল্পী সাহিত্যিকদের মধ্যে কাজী নজরুল ইসলাম নায়ক, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় নায়ক, আবার পীতাম্বর দাসও নায়ক। তাঁর নাম আজ প্রায় কারোর মনে নেই, কিন্তু তাঁর রচনা করা ‘একবার বিদায় দে মা ঘুরে আসি’ গানটা রয়ে গেছে। একটা সময় পর্যন্ত অল্লামা ইকবালও আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামের নায়ক ছিলেন। উর্দু, হিন্দি ভাষা নিয়ে অ্যালার্জি না থাকলে ‘সারে জহাঁ সে অচ্ছা’ গানটা আজও যে কোনো দেশপ্রেমিক মানুষের প্রিয় হবে, দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের ‘ধনধান্য পুষ্প ভরা’-র মতই। এঁরাও সকলে এক মতের লোক নন। যিনি আমার লড়াইটাই লড়ছেন কিন্তু একই মতের লোক নন, তাঁর সাহসকে সেলাম জানাতে না পারলে আমারই ক্ষুদ্রতা প্রকাশ পায়। তাঁর নয়।

রইল সংবিধানের কথা। পৃথিবীর কোনো সংবিধান নিখুঁত নয়, ভারতের সংবিধানও নয়। আবার যে কোনো দেশের সংবিধান খুললেই দেখা যায় অনেক ভাল ভাল কথা লেখা আছে যার প্রয়োগ নেই। কথাটা ভারতের সংবিধানের ক্ষেত্রেও সত্যি। সংবিধান প্রণেতাদের অন্যতম, বাবাসাহেব ভীমরাও আম্বেদকর, নিজেই সংবিধান সভার শেষ অধিবেশনে বলেছিলেন যে সংবিধানে সমতাবিধান করা হল, কিন্তু ভারতের সমাজ রইল অসাম্যে পরিপূর্ণ। এভাবে কতদিন ভারতে গণতন্ত্র টিকবে তা নিয়ে তিনি পরেও বারবার সন্দেহ প্রকাশ করেছেন। কিন্তু ভারতের বহু মানুষ যে এই সংবিধানের দ্বারা নানা মাত্রায় উপকৃত হয়েছে তা অস্বীকার করার উপায় নেই। ঠিক যেমন অনস্বীকার্য যে অনেক মানুষের উপর নিপীড়ন চালানো হয়েছে এবং হচ্ছে এই সংবিধানকে হাতিয়ার করেই। তা বলে যে কোটি কোটি ভারতীয় সংবিধানের উপর আস্থা রাখেন, ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে আজকের লড়াইয়ে সংবিধানকে নিজের অস্ত্র মনে করছেন তাঁদের বিরুদ্ধ পক্ষ বলে মনে করা বা তাঁদের দিকেই বাক্যবাণ ছোড়া এককথায় নির্বুদ্ধিতা। ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে নানা জন নানাভাবে লড়বে, যার যতটুকু ক্ষমতা সে ততটুকুই দিয়েই লড়বে। কেউ লোক হাসিয়ে লড়বে, কেউ গান গেয়ে লড়বে, কেউ লিখে লড়বে, কেউ রাস্তায় মিছিল, মিটিং করে লড়বে, কেউ আইনি লড়াই করবে। এখন ‘এই সংবিধান মানি না’ বলার সময় নয়, কারণ এখন যুদ্ধটা সংবিধানের বিরুদ্ধে নয়। এটুকু বুঝতে খুব অসুবিধা হওয়ার কথা নয়, যদি আপনার সোশাল মিডিয়ার বাইরে একটা সত্যিকারের লড়াই থাকে।

উপযুক্ত কৌশল

কুণালকে মুম্বই থেকে ফোনে হুমকি দিচ্ছে কিছু লোক আর কুণাল তাদের বলছেন ‘আ যা তামিলনাড়ু’ – এমন একটা অডিও ক্লিপ ভাইরাল হয়েছে। অনেক খবরের চ্যানেলেও শোনানো হয়েছে। এটা ভুয়ো বলে এখন পর্যন্ত জানা যায়নি আর ঘটনা হল, মুম্বইয়ের বাসিন্দা কুণাল কয়েক বছর হল তামিলনাড়ুতে থাকতে শুরু করেছেন। ফলে তিনি যে হলে শো করেছিলেন সেখানে ভাংচুর চালাতে পারলেও একনাথের ভক্তরা কুণালকে শারীরিকভাবে আক্রমণ করতে পারেনি। পারলে কী করত তা অনুমান করাও অসম্ভব। স্রেফ হনসলের হাল করে ছেড়ে দিত – একথা আজকের ভারতে নিশ্চিত করে বলা যায় না। মনে রাখতে হবে, বিনা বিচারে উমর খালিদকে বছরের পর বছর আটক করে রাখার আগে তাঁর দিকে গুলি চালানো হয়েছিল। কুণাল মুসলমান নন বলে তেমন সম্ভাবনা নেই – এরকম যাঁরা ভাবেন তাঁরা হয়ত ২০২০ সালে জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের মেয়েদের হোস্টেলে হামলার কথা ভুলে গেছেন। কুণাল অবশ্যই ভোলেননি। উপরন্তু অন্য এক বিদূষক মুনাওয়ার ফারুকীর শো যখন ২০২১ সালে ইন্দোরে বলপূর্বক বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল এবং যে কৌতুক তিনি করেননি তার জন্যে কারারুদ্ধ করা হয়েছিল, তখন যে বিদূষকরা মুনাওয়ারের হয়ে লড়াই লড়েছিলেন, কুণাল তাঁদের একজন। ফলে বুঝতে অসুবিধা হয় না যে কুণাল সচেতনভাবেই এমন এক রাজ্যে চলে গেছেন যে রাজ্যের সরকার সংঘ পরিবারের সঙ্গে আদর্শগত লড়াইয়ে লিপ্ত, অত্যন্ত আক্রমণাত্মক। শুধু তাই নয়, অদূর ভবিষ্যতে এম কে স্ট্যালিনের নেতৃত্বাধীন ডিএমকে ক্ষমতাচ্যুত হলেও বিজেপির তামিলনাড়ুতে ক্ষমতায় আসার কোনো সম্ভাবনা নেই (পশ্চিমবঙ্গে কিন্তু আছে)। তামিলনাড়ুতে সংঘ পরিবারের বিরুদ্ধে সামাজিক-সাংস্কৃতিক প্রতিরোধ এত তীব্র যে সম্প্রতি কেন্দ্রের তিন ভাষা নীতি নিয়ে বিতর্কের আবহে সেখানকার বিজেপি নেত্রী রঞ্জনা নাচিয়ার পার্টি থেকে পদত্যাগ করেছেন

মুম্বইতে দাঁড়িয়ে নাম করে নরেন্দ্র মোদী, অমিত শাহ, ফড়নবীশ, মুকেশ আম্বানি, তাঁর ছেলে, আনন্দ মাহিন্দ্রা, এবং নাম না করে একনাথকে নিয়ে মস্করা করার সাহসের পিছনে যে কুণাল যে রাজ্যে থাকেন তার নিরাপত্তা কাজ করেছে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু ব্যাপারটার মধ্যে কৌশল আছে বলে কুণালের সাহসকে এক বিন্দুও ছোট করা যায় না। কারণ সাম্প্রতিক অতীতে বিজেপিশাসিত রাজ্যে অভিযোগ দায়ের করে অন্য রাজ্যের লোককে গ্রেফতার করার দৃষ্টান্ত বিরল নয়। আসাম পুলিস ২০২০ সাল থেকে তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী সর্বানন্দ সোনোয়ালের নির্দেশে গর্গ চ্যাটার্জিকে গ্রেফতার করতে চাইছিল। কলকাতা পুলিস নাকি সহযোগিতা করছিল না। শেষমেশ ২০২২ সালে গৌহাটি হাইকোর্ট কলকাতার পুলিস কমিশনারকে গর্গবাবুকে গ্রেফতার করার নির্দেশ দেয়, কলকাতা পুলিসকে সে নির্দেশ মানতেই হয়। গুজরাটের বিধায়ক জিগ্নেশ মেওয়ানিকেও আসাম পুলিস গ্রেফতার করে নিয়ে গিয়েছিল। অবশ্যই গুজরাট সরকার বিজেপির হওয়ায় সুবিধা হয়েছিল। কংগ্রেস নেতা পবন খেরাকে তো স্রেফ প্রধানমন্ত্রীকে ‘নরেন্দ্র গৌতমদাস মোদী’ বলার জন্যে দিল্লি বিমানবন্দরে বিমান থেকে নামিয়ে গ্রেফতার করেছিল আসাম পুলিস। তবে সুপ্রিম কোর্টের হস্তক্ষেপে তিনি কয়েক ঘন্টার মধ্যেই জামিন পেয়ে যান।

একথা ঠিক যে কুণালের এখন যেরকম নাম হয়েছে তাতে তাঁকে গ্রেফতার করা হলে প্রশান্ত ভূষণ বা ইন্দিরা জয়সিংয়ের মত দেশের সবচেয়ে নামকরা আইনজীবীরা হয়ত তাঁর হয়ে লড়বেন। তবে মনে রাখতে হবে, কুণাল কিন্তু গর্গ, জিগ্নেশ বা পবনের মত সক্রিয় রাজনীতির লোক নন। তাঁর কাছে গ্রেফতার হওয়া অতখানি জলভাত ব্যাপার না হওয়ারই কথা। আরও বড় কথা হল, কুণাল সুপ্রিম কোর্টকে আগে থেকেই চটিয়ে রেখেছেন। ২০২১ সালে তিনি সুপ্রিম কোর্ট যে দ্রুততায় অর্ণব গোস্বামীর জামিন মঞ্জুর করেছিল, তাকে ব্যঙ্গ করে একগুচ্ছ টুইট করেন। তার জন্যে তাঁর নামে সুপ্রিম কোর্টে মামলা করে কিছু লোক, বিচারপতিরাও আদালত অবমাননার নোটিস পাঠান। কুণাল তার যে জবাব দিয়েছিলেন তাও একই সঙ্গে সাহস ও রসবোধের নিদর্শন। মোদ্দা কথা, তিনি বিচারপতিদের সামনেও মাথা নোয়াননি। শুধু কি তাই? নিজের এক শোয়ে সুপ্রিম কোর্টকে ‘ব্রাহ্মণ-বানিয়া অ্যাফেয়ার’ পর্যন্ত বলে বসে আছেন। এমন লোকের উপর কি আর বিচারপতিরা সদয় হবেন?

কুণালের পরিবর্তন

কুণাল ঋজু বিদূষক হিসাবে কাজ করছেন বছর দশেক হতে চলল। কিন্তু তিনি কি বরাবর এতটা রাজনৈতিক, এত প্রতিবাদী, এতখানি সাহসী ছিলেন? উত্তর হল – না। ২০১৬-১৭ সালে কুণালের যে ভিডিও প্রথম ভাইরাল হয় এবং তাঁর নাম ছড়িয়ে পড়ে, তার নাম ছিল প্যাট্রিয়টিজম অ্যান্ড দ্য গভমেন্ট

এখানে তিনি যেসব কৌতুক করছেন সেগুলোও রাজনৈতিক। তিনি সেইসময় যা যা নিয়ে সর্বত্র আলোচনা হত, যেমন নোটবন্দি, জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয় – সব নিয়েই কথা বলছেন। কিন্তু তাতে আরও নানারকম কৌতুক মিশে আছে। তিনি সমাজের নানা ধরনের লোককে নিয়ে মজা করছেন, সোশাল মিডিয়া ট্রেন্ডগুলো নিয়ে কথা বলছেন, নেটফ্লিক্স নিয়ে মজা করছেন। তখন তাঁর মতে সরকার ছিল ভোডাফোনের মত ‘সার্ভিস প্রোভাইডার’, আর নাগরিক উপভোক্তা। এরপর ২০১৭ সালে তাঁর যে শোয়ের ভিডিও ইউটিউবে আপলোড হয়, সেখানে কুণাল মূলত ট্যাক্সিচালকদের নিয়ে মজা করেন। বিশেষত উবের ড্রাইভারদের নিয়ে। বলেন যে উবের একটা ভাল অ্যাপ কিন্তু ভারতে সেটা কাজ করে না, কারণ এখানকার ড্রাইভাররা ওই অ্যাপের নিয়ম অনুযায়ী চলতে চান না। ২০১৮ সালে দেশ কে বুডঢে ভিডিও। এটাও রাজনৈতিক এবং বিজেপিবিরোধী। কিন্তু ব্যঙ্গের চাঁদমারি বৃদ্ধ দক্ষিণপন্থীরা।

তারপরের ভিডিও আবার অনেকটা অরাজনৈতিক। সেখানে কুণাল মূলত মুম্বই আর ইন্দোর – এই দুই শহরের নানা গোলমালকে ব্যবহার করে হাস্যরস উৎপাদন করেন। এসবের পাশাপাশি চলছিল তাঁর পডকাস্ট শাট আপ ইয়া কুণাল, যেখানে তিনি উমর খালিদ আর কানহাইয়া কুমারের সাক্ষাৎকার নেন। আবার বিজেপি নেতাদেরও সাক্ষাৎকার নেন। কিন্তু এই ২০১৮ সালে কুণালের মধ্যে একটা পরিবর্তন লক্ষ করা যায়। অ্যাবিশ ম্যাথিউ নামে একজন ঋজু বিদূষক আছেন যিনি কুণালের মত অতটা জনপ্রিয় নন। তাঁর ইউটিউব চ্যানেলে তিনি জার্নি অফ আ জোক নামে একখানা পডকাস্ট করেন। সেই পডকাস্টের এক পর্বে কুণাল আসেন সেবছর। সেখানে অ্যাবিশ কুণালের থেকে জানছিলেন প্যাট্রিয়টিজম অ্যান্ড দ্য গভমেন্ট শোয়ের কৌতুকগুলো কীভাবে তৈরি করা হয়েছিল। পর্বের শেষদিকে অ্যাবিশ জিজ্ঞেস করেন, ওই ভিডিওর যে প্রতিক্রিয়া হয়েছে তা থেকে কুণাল কী শিখলেন? উত্তরে কুণাল বলেন ‘পরেরবার যদি রাজনৈতিক কৌতুক করি, তাহলে এত ব্যাকফুটে থাকার দরকার নেই। সোজা মোদী, অমিত শাহ, আম্বানি, আদানি – যা প্রাণে চায় বলে দেওয়াই ভাল। কারণ যা-ই করো, গালি তো খেতেই হবে। সুতরাং অল আউট খেলাই ভাল। অত ভাবার দরকার নেই যে লোকে অমুক জোকের যুক্তিটা নিয়ে বলবে…ইন্টারনেটে দুই ধরনের লোক আছে। এক ধরনের লোক শাসক দলের ভক্ত, আরেক ধরনের লোক শাসক দলকে রীতিমত ঘৃণা করে। অতএব…আমাকে অনেকেই বলেছে, এত ফেন্স সিটিং করছ কেন? সুতরাং ঠিক করে নিয়েছি…সেরা কমেডি হয় ক্ষমতার বিরুদ্ধে কথা বললে, তাই না? পাঞ্চ ডাউন করার চেয়ে পাঞ্চ আপ করা ভাল, আর সেটা যদি করতেই হয় তাহলে পাঞ্চটা জোরে মারাই ভাল। সুতরাং এখন যদি আমি রাজনৈতিক কৌতুক করি, তাহলে সেটা অনেক বেশি তীক্ষ্ণ হবে।’

আজকের কুণালের দিকে সেদিনের কুণালের যাত্রা শুরু তখন থেকে। ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনের আগে তাঁর যে ভিডিও আপলোড হয় সেখানে কুণাল এসে দাঁড়ান একখানা কালো টি শার্ট পরে, যার উপর বড় বড় অক্ষরে লেখা WAH MODIJI WAH। মঞ্চে এসেই তিনি দর্শকদের জিজ্ঞেস করেন ‘আমার আর আম্বানিজির মধ্যে মোদীজি কী করছেন? আমি সোজা আম্বানিকে কেন ভোট দিতে পারি না?’ হাসাহাসির মধ্যে দিয়ে কুণাল একবিংশ শতকের বিশ্ব রাজনীতির এক নিদারুণ সত্য উদ্ঘাটন করে ফেলেন – আজকের রাজনীতিকে চালায় আসলে বড় বড় কর্পোরেশনগুলো। তখনো কিন্তু মোদীর সঙ্গে আম্বানি, গৌতম আদানির সম্পর্ক নিয়ে রাহুল গান্ধী সরব হননি। ডোনাল্ড ট্রাম্পের হয়ে ইলন মাস্কের লম্ফঝম্প কোনোদিন দেখতে হবে – একথাও কেউ কল্পনা করেনি। অথচ কুণাল বলেন ‘আমার মনে হয় কর্পোরেশনগুলোরই ভোটে লড়া উচিত। রতন টাটা বনাম মুকেশ আম্বানি। লড়ো ২০১৯।’ এই কৌতুককে এগিয়ে নিতে নিতেও কুণাল আমাদের এক বুনিয়াদি বিতর্কের দিকে নিয়ে যান। সেটা হল – উন্নয়ন বা বিকাশ মানে কী?

নয়া উদারনীতিবাদ আমাদের এমন মাথা খেয়েছে, এটা যে বিতর্কের বিষয় তা এদেশের মার্কসবাদের নামে শপথ নেওয়া অনেক পার্টিও এই সহস্রাব্দে ভুলেই গেছে। লক্ষ করুন, যে কুণাল আগে সরকারকে ভোডাফোনের মত একটা কোম্পানি বলেই আখ্যা দিতেন, তিনি বছর তিনেক পরেই কর্পোরেশনগুলোর মুখোশ খুলছেন হাসাতে হাসাতে। পরের পাঁচ বছরে কুণাল কী কী করলেন? একদা উবের ড্রাইভারদের আচরণ নিয়ে কৌতুক করা মানুষটি গিগ শ্রমিকদের নিয়ে তৈরি গানের ভিডিও শেয়ার করলেন নিজের ইউটিউব চ্যানেলে। দেশের গোদি মিডিয়ার মুকুটহীন সম্রাট এবং জাতীয়তাবাদের ধ্বজাধারী সাংবাদিক অর্ণবের যে নিজের স্টুডিওর স্বাচ্ছন্দ্যের বাইরে এলে গলা দিয়ে আওয়াজ বেরোয় না তা ফাঁস করে দিলেন বিস্তর ঝামেলার ঝুঁকি নিয়েও। উমর, শার্জিল ইমামের মত রাজনৈতিক বন্দিদের মুক্তির দাবিতে সভায় বক্তৃতা দিলেন। হাস্যকৌতুকের ভিডিওগুলোতেও কৃষক আন্দোলনের প্রতি সহমর্মিতা দেখালেন, পডকাস্টে পি সাইনাথের মত লোককে ডেকে আনলেন। ২০২৪ লোকসভা নির্বাচনের সময়ে পুরোদস্তুর সাংবাদিকসুলভ অধ্যবসায়ে পর্বের পর পর্বে সরকারের রিপোর্ট কার্ড বার করলেন। অতঃপর এই সাম্প্রতিকতম ভিডিও, যা মহারাষ্ট্রের বিধানসভা নির্বাচনে বিরোধীদের ভরাডুবির পর সারা দেশে ঝুলে পড়া অনেক কাঁধকে মাথা তোলার সাহস দিল।

এই ভিডিওতে কুণাল যাদের আক্রমণ করেছেন তারা বুদ্ধিমানের মত, অতি ক্ষুদ্র এক ব্যক্তি, যার নামও নেওয়া হয়নি, তাকে অপমান করা হয়েছে অভিযোগ করে হল্লা করছে। সেই হল্লায় বিরোধী পক্ষের অনেকেও ভুলছেন। তাঁরা খেয়াল করছেন না, ভারতের কোনো রাজনৈতিক নেতা এখনো যা বলেননি কুণাল প্রথমবার সেটাই বলে দিয়েছেন এই ভিডিওতে। দেশের কমিউনিস্টরা পর্যন্ত যখন ফ্যাসিবাদী শাসন চলছে না নয়া ফ্যাসিবাদী – তা নিয়ে তাত্ত্বিক তর্কে মেতে আছেন, তখন এই বিদূষক শাহরুখ খান অভিনীত বাদশা ছবির টাইটেল সংটার প্যারডি বানিয়ে মোদীকে ‘তানাশাহ’ (একনায়ক) বলে দিয়েছেন। ওঁদের লেগেছে তো আসলে ওইখানে। আজকের দিনে গণতান্ত্রিক ভড়ংটা বজায় রাখতে সব একনায়কই চায়। রচপ তায়িপ এর্দোগান, ভ্লাদিমির পুতিনও সর্বক্ষণ প্রমাণ করার চেষ্টা করেন যে তাঁদের দেশে গণতন্ত্র চলছে। মোদীও ব্যতিক্রম নন। সেখানে একজন লোক হাসানোর লোক যদি সরাসরি একনায়ক শব্দটা উচ্চারণ করে ফেলে, তা হজম করা শক্ত। হাসিকে ভয় পায় না এমন কোনো একনায়ক হয় না। কারণ মানুষের উপর তাদের নিয়ন্ত্রণ বজায় থাকে ভয়ের কারণে, আর হাসি একনায়ককে খিল্লির পাত্র করে ফেলে। তাতে ভয় কেটে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। কোনো বিরোধী নেতার মুখ থেকে এই শব্দ বেরোলে খুব বেশি লোক পাত্তা না-ও দিতে পারে। কারণ একে তো অনেকে রাজনৈতিক বক্তৃতা শোনে না, তার উপর বিরোধীরা তো ক্ষমতাসীনের নামে দু-চারটে খারাপ কথা বলবেই। কিন্তু যে লোক হাসায় তার কথা স্রেফ রাগ করার জন্যেও অনেকে শোনে। ফলে কুণালের এই ভিডিও এক মূর্তিমান বিপদ। বিজেপি আই টি সেল ইতিমধ্যেই নেমে পড়েছে কুণালের পিছনে ডীপ স্টেটের ভূমিকা আছে, মার্কসবাদীদের টাকায় কুণাল চলেন – এইসব বলে পরিস্থিতি সামলাতে। মহারাষ্ট্র পুলিস কুণালের মুম্বইয়ের বাড়িতে গিয়ে, তিনি কাদের থেকে টাকাপয়সা পেয়েছেন তা নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করার জন্য তাঁর বাবা-মায়ের কাছে শমনও দিয়ে এসেছে। মজা হল, যত এসব করা হচ্ছে তত কুণালের কৌতুকগুলোর শক্তি বেড়ে যাচ্ছে। কারণ কুণাল বহুদিন আগে থেকে নিজেই হাসি হাসি মুখে বলে থাকেন ‘কমিউনিস্ট পার্টি অফ ইন্ডিয়া নে বহত প্যায়সে দিয়ে হ্যাঁয় মেরে কো’।

একটা কথা না বলে এ আলোচনা শেষ করতে পারছি না।

ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে নিজেদের অগ্রণী সৈনিক ভাবার এক অকারণ অভ্যাস বাঙালিদের আছে। সংঘ পরিবারের গোটা ভারতের উপর হিন্দি চাপিয়ে দেওয়ার আবহে এখন আরও বেশি করে পশ্চিমবঙ্গে বেশকিছু বাংলাবাদীর উদ্ভব হয়েছে। তাঁদের অনেকে অনাবাসী ভারতীয় হয়ে বাঙালি জাতীয়তাবাদের স্বপ্ন বিক্রি করেন সোশাল মিডিয়ায়, অবিভক্ত বাংলা আলাদা রাষ্ট্র হলে কী হত না হত তা নিয়ে বাষ্পাকুল হয়ে পড়েন। অনেকে আবার পশ্চিমবঙ্গে থেকেই নিজের ছেলেমেয়েকে ইংরিজি মাধ্যম স্কুলে দ্বিতীয় ভাষা হিসাবে হিন্দি পড়িয়ে বাংলার সংস্কৃতি বাঁচাতে ব্যাকুল। কুণালের মত হিন্দিভাষীদের কাজের প্রশংসা করলেই তাঁরা ভীষণ রেগে যান। কিন্তু কী করা যাবে? বাংলায় একজনও যে আজ পর্যন্ত হিন্দিভাষী রবীশ কুমার বা কুণালের মত ঋজু হয়ে দাঁড়াতে পারলেন না ফ্যাসিবাদের সামনে। না কোনো সাংবাদিক, না কোনো ঋজু বিদূষক, না কোনো গায়ক, না কোনো কবি। সারা ভারতে জনপ্রিয় হওয়ার কথা বলছি না। তার জন্যে অবশ্যই কুণালরা হিন্দি, ইংরিজি ব্যবহার করার সুবিধা পান। কিন্তু বাংলা ভাষায় বাঙালিদের আলোড়িত করার মত আমির আজিজ সুলভ গনগনে একখানা কবিতা কোন কবি লিখেছেন মোদী সরকারের দশ বছরে? স্লোগান হয়ে ওঠা কবিতার আবশ্যিক গুণ নয়। কিন্তু বরুণ গ্রোভার রচিত ‘হম কাগজ নহি দিখায়েঙ্গে’ যেভাবে সারা দেশে স্লোগান হয়ে উঠেছিল, তেমন একখানা কবিতাই বা কে লিখেছেন বাংলায়? বাংলা ভাষার কোন সাংবাদিক (এমনকি বিকল্প মাধ্যমেরও) রবীশের মত লাগাতার লিখে যাচ্ছেন/বলে যাচ্ছেন কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে?

আরও পড়ুন হাসছি মোরা হাসছি দেখো: বীর দাসের বীরত্বে দুই ভারতের পর্দা ফাঁস

কেন্দ্রের সরকারের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর কথা বলছি, রাজ্য সরকারের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে বলছি না। কাজটা তো খুব কঠিন হওয়ার কথা নয়, কারণ কুণালের তামিলনাড়ুর মত পশ্চিমবঙ্গও তো বিজেপিবিরোধী দলের (অন্তত তাদের বয়ান অনুযায়ী) শাসনে থাকা রাজ্য। কুণালের পিছনে যদি স্ট্যালিনের বরাভয় থেকে থাকে, এখান থেকে তাঁর মত কেউ উঠে দাঁড়ালে তাঁর পিছনেও নিশ্চয়ই মমতা ব্যানার্জির বরাভয় থাকবে। তাহলে ভয় কিসের?

আসলে বোধহয় স্বীকার করে নেওয়া ভাল, আমাদের সে মুরোদ নেই। আমরা মুখেন (এবং ফেসবুকেন) মারিতং জগৎ। আমাদের রাজ্য সরকারও তাই। নইলে যে ডিলিমিটেশন হলে আমাদের সাড়ে সর্বনাশ, তার বিরুদ্ধে অবিজেপি মুখ্যমন্ত্রীদের বৈঠক ডাকলেন স্ট্যালিন, তাতে গেলেনই না আমাদের রাজ্য সরকারের কোনো প্রতিনিধি!

অতএব আমাদের হয়ে লড়বেও অন্যরাই। আমরা কেবল পায়ের উপর পা তুলে তাদের দোষ ধরে যাব, কেন তারা যথেষ্ট বিপ্লবী নয় তা লিখে সোশাল মিডিয়া ভরাব। যেমন এখন কুণাল সম্পর্কে ভরাচ্ছি।

নাগরিক ডট নেট ওয়েবসাইটে প্রকাশিত

শুধু মোদী নয়, আম্বানি-আদানিদের হাত থেকেও উদ্ধার পাওয়া দরকার

২০১৯ লোকসভা নির্বাচনের আগে ঋজু বিদূষক কুণাল কামরা তাঁর কমেডি রুটিনের একখানা ভিডিও প্রকাশ করেছিলেন। ততদিনে মুকেশ আম্বানি কীভাবে ভারতের অর্থনীতির উপরে একচ্ছত্র আধিপত্য কায়েম করছেন তা পরিষ্কার হয়ে গিয়েছিল, কিন্তু গৌতম আদানির নাম তখনো মুখে মুখে ফেরার পর্যায়ে পৌঁছয়নি। সেই ভিডিওর শুরুতেই কুণাল বলেন ‘আমার আর আম্বানিজির মধ্যে মোদীজি কী করছেন? আমি সোজাসুজি আম্বানিকে কেন ভোট দিতে পারব না? আমাদের আম্বানির সঙ্গে কোনো ঝামেলা আছে? বানাও না পিএম।’ তারপর বলেন ‘আমার সত্যিই মনে হয় কর্পোরেশনগুলোর ভোটে লড়া উচিত। যেমন মুকেশ আম্বানি বনাম রতন টাটা – লড়ো ২০১৯। সত্যিই দারুণ ভোট হবে। ওরা তো একটা বিষয় নিয়েই কথা বলবে – ডেভেলপমেন্ট। বিকাশ। ওরা তো আর কিছু জানেই না। ধরুন রতন টাটা তো আর উত্তরপ্রদেশে গিয়ে ঘর ভর্তি লোকের দিকে তাকিয়ে বলবে না, মন্দির ইয়হি বনেগা।’ বলা বাহুল্য কথাগুলো ঠাট্টা করে বলা, লোক হাসাতে বলা। কিন্তু ইতিহাস সাক্ষী, বিদূষকরা চিরকাল রসিকতা করতে করতে তেতো সত্যও বলে এসেছেন। তা করতে না পারলে বিদূষক হওয়ার মানে হয় না। এ প্রসঙ্গে রবীন্দ্রনাথের বিদূষক গল্প দ্রষ্টব্য। উপরন্তু আমাদের দেশে গত এক দশক ধরে কুণাল, আকাশ ব্যানার্জিরা যে কাজ করছেন তা বিদূষকের সীমায় আটকে নেই। রীতিমত সাংবাদিকতা হয়ে উঠেছে। ঠিক মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে যে কাজ জন অলিভার, হাসান মিনহাজ, ট্রেভর নোয়ারা করে থাকেন। সুতরাং কুণালের রসিকতাতেও খুঁজলে হাসির আড়ালের সত্যগুলো অনায়াসেই পাওয়া যাবে।

আসলে কুণাল ঠাট্টা করে যা বলেছিলেন তা পৃথিবী জুড়ে উদারনৈতিক গণতন্ত্রের ভালমন্দ নিয়ে যে আলোচনা চলছে তারই অঙ্গ। কোনো দেশের নির্বাচনী গণতন্ত্রই কোনোদিন অতিধনীদের প্রভাবমুক্ত ছিল না। কিন্তু একবিংশ শতাব্দীতে এসে প্রায় সব দেশের গণতন্ত্রপ্রেমী মানুষের মনেই এই সন্দেহ দেখা দিয়েছে, যে অতিধনীরাই হয়ত গণতন্ত্রের রাশ হাতে তুলে নিয়েছে। প্রকাশ্য রাষ্ট্রীয় নজরদারি ব্যবস্থা, সোশাল মিডিয়া আর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে জনমত প্রভাবিত করার উপায় এবং রাজনৈতিক দলগুলোকে বিপুল টাকা দেওয়ার ক্ষমতা মিলিয়ে বড় বড় কর্পোরেশনগুলোই কোথায় কে সরকার গড়বে আর কে সরকার চালাবে তা নিয়ন্ত্রণ করছে কিনা – এ নিয়ে সারা পৃথিবীতেই কথা হচ্ছে। কুণাল যে কাল্পনিক নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বিতার কথা বলেছিলেন তা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে তার আগেই অর্ধেক বাস্তবে পরিণত হয়েছে। কারণ ডোনাল্ড ট্রাম্প আম্বানির মতই একজন ধনকুবের। রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে দাঁড়িয়ে পড়ার আগে পর্যন্ত তাঁকে কোনোভাবেই রাজনীতিবিদদের সারিতে বসানো যেত না। আমাদের দেশে ব্যাপারটা অতদূর না গেলেও সরকারি নীতি নির্ধারণে যে কর্পোরেট শক্তি বড় ভূমিকা নিচ্ছে তার একাধিক প্রমাণ তো আমাদের চোখের সামনেই রয়েছে। যাদের সন্দেহ ছিল তারাও দেখে ফেলেছে নির্বাচনী বন্ডে কোথা থেকে কে কত টাকা পেয়েছে। কর্পোরেট স্বার্থে আইন বদলে আদিবাসীদের জমির অধিকার কেড়ে নেওয়া, কাশ্মীরে কেন্দ্রীয় শাসন কায়েম করার মত বহু ঘটনা ঘটেছে। কতগুলো বন্দর, বিমানবন্দর আদানির হাতে গেছে; আম্বানি কীভাবে খুচরো ব্যবসা থেকে শুরু করে খনিজ তেল – দেশের সমস্ত ব্যবসায় জাল বিছিয়েছেন তা-ও অনেকেরই জানা। ফলে কিছুদিন আগে অবধি ক্রোনি পুঁজিবাদ কথাটা যার শোনা ছিল না, সেও জেনে গেছে।

কোনো সন্দেহ নেই, এদেশে ক্রোনি পুঁজিবাদকে রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু করে তোলায় সবচেয়ে বেশি অবদান যাঁর, তাঁর নাম রাহুল গান্ধী। সপ্তদশ লোকসভায় বামপন্থী দলগুলোর সাংসদ ছিলেন হাতে গোনা কয়েকজন, সংসদের বাইরেও তাঁদের ক্ষমতা অত্যন্ত সীমিত। এমন অবস্থায় পুঁজিবাদ বা ক্রোনি পুঁজিবাদ নিয়ে দিনরাত আওয়াজ তোলার মত কেউ ছিলেন না। সংসদের ভিতরে তো নয়ই। রাহুলই প্রথমে সংসদের বাইরে নাম করে আম্বানি, আদানি দেশের সম্পদ কীভাবে লুটেপুটে খাচ্ছেন তা বলা শুরু করলেন। তারপর সংসদের ভিতরে আদানি আর নরেন্দ্র মোদীর একত্র ছবি এনলার্জ করে দেশের সামনে তুলে ধরলেন। মোদীর প্রাণভোমরা যে সত্যিই আরএসএস নয়, কর্পোরেটের হাতে – তা প্রমাণ হয়ে যায় কিছুদিন পরেই রাহুলকে সংসদ থেকে সাসপেন্ড করার ঘটনায়। রাহুল আদালত ঘুরে সংসদে ফিরে আসার পরেও আম্বানি, আদানিকে আক্রমণ করা ছাড়েননি। তবু এবারের নির্বাচনে ইতিহাস গড়লেন কিন্তু সেই মোদী। ক্রোনি পুঁজিবাদ নিয়ে সারা পৃথিবীতে যতই আলোচনা হোক, এত বড় গণতান্ত্রিক দেশের নির্বাচনে দুজন পুঁজিপতির নাম নির্বাচনী প্রচারে সর্বত্র আলোচিত হচ্ছে – এমন ঘটনা বিরল।

মিথ্যা বলা, সত্যকে বিকৃত করে উপস্থাপন করা এবারের নির্বাচনে জলভাত করে ফেলেছেন প্রধানমন্ত্রী। নির্বাচন শুরু হওয়ার পর থেকে কংগ্রেসের ইশতেহার সম্পর্কে বানিয়ে বানিয়ে নানা কথা বলে চলেছেন সাম্প্রদায়িক বিভাজন তৈরি করতে। অনেকেই বলছিলেন নিজের দলের ইশতেহার সম্পর্কে একটিও বাক্য খরচ না করে কেবলই কংগ্রেসের ইশতেহার সম্পর্কে অপপ্রচার আসলে প্রধানমন্ত্রীর উদ্বেগের প্রকাশ। তিনি সংসদের ভিতরে দাঁড়িয়ে প্রবল আত্মবিশ্বাসে ৪০০ আসন পার করার কথা বলেছিলেন। কিন্তু ভোটের ময়দানে যে প্রবণতার খোঁজ তিনি পাচ্ছেন তা ৫৬ ইঞ্চি বুকে ভরসা জোগাচ্ছে না। তাই সেই লালকৃষ্ণ আদবানির আমল থেকে বিজেপির যে পরীক্ষিত জয়ের ফর্মুলা, তাতেই ফিরে গেছেন – মুসলমানের ভয় দেখিয়ে হিন্দুদের ভোট কুড়াও।

এর না হয় তবু একটা ব্যাখ্যা হয়। কিন্তু তৃতীয় দফার ভোটের পরে তেলেঙ্গানার ওয়ারাঙ্গলে বক্তৃতা দিতে গিয়ে যে কথা মোদী বললেন, তার পিছনে যুক্তি কী? পাঁচ বছর ধরে কংগ্রেসের শাহজাদা সকাল থেকে মালা জপার মত আম্বানি, আদানির নাম বলতেন। ভোট ঘোষণা হতেই কেন এদের নাম বলা বন্ধ হয়ে গেল? নির্ঘাত আম্বানি, আদানির কাছ থেকে টেম্পো করে বস্তা বস্তা মাল কংগ্রেসের কাছে গেছে? শাহজাদা জবাব দিন – এই তাঁর বক্তব্য। রাজনীতিতে তো বটেই, নির্বাচনী প্রচারেও প্রত্যেকটা শব্দ মেপে খরচ করাই নিয়ম। তার উপর দশ বছর ধরে শুনে আসছি মোদী ভারতের সর্বকালের সেরা প্রধানমন্ত্রী। তিনি কি না ভেবেচিন্তে কিছু বলতে পারেন? তাহলে হঠাৎ নিজের সবচেয়ে বড় বন্ধুদের এভাবে বিরোধী দলকে গোপনে টাকা দেওয়ায় অভিযুক্ত করতে গেলেন কেন? অতীতে সংসদে রাহুল তথা বিরোধীরা আদানির সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে তাঁকে বারবার আক্রমণ করা সত্ত্বেও তিনি তো মুখ খোলেননি। তাহলে ভোটের ভরা বাজারে কেন এমন করলেন? ওই বক্তৃতার পরে বেশ কয়েকদিন কেটে গেছে। পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে, ওই কথায় বিজেপির সদস্য সমর্থকদের মধ্যে কোনো নতুন উদ্দীপনার সঞ্চার তো হয়নি বটেই, উল্টে রাহুলের ভিডিও জবাব ভাইরাল হয়ে গেছে। সমস্ত মূলধারার সংবাদমাধ্যমেও মোদীর কথার সঙ্গে সমান গুরুত্বে সেই জবাব সম্প্রচারিত হয়েছে এবং রাহুলের জবাবে রক্ষণাত্মক হওয়ার বিন্দুমাত্র প্রচেষ্টা নেই। বরং তিনি পালটা আক্রমণের রাস্তায় গিয়ে ফের ক্রোনি পুঁজিবাদ চালানোয় অভিযুক্ত করেছেন মোদী সরকারকে। বলেছেন, মোদী সরকার ২২ জন অতিধনী তৈরি করেছে, আমরা কয়েক কোটি লাখপতি বানাব। শুক্রবার উত্তরপ্রদেশে এক সভায় আরও এক ধাপ এগিয়ে বলেছেন, যখন কেউ ভয় পেয়ে যায় তখন আপন লোকেদের ডাকাডাকি করতে থাকে। মোদী হারের ভয় পেয়েছেন। তাই আম্বানি, আদানির নাম করছেন যাতে তাঁরা ওঁকে বাঁচান।

আমরা রাহুলের এসব কথায় বিশ্বাস করব না। কারণ নির্বাচনী প্রচারে গরম গরম কথা বলতেই হয়, বিশেষ করে বিরোধী পক্ষের নেতা হলে। আমরা খানিকক্ষণের জন্য একথাও ভুলে যাই, যে মোদী এক্ষেত্রেও মিথ্যাভাষণ করেছেন। রাহুল মোটেই ভোটের প্রচারে আম্বানি, আদানির নাম বলা বন্ধ করে দেননি। দি ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের এই প্রতিবেদনে পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে, নির্বাচন ঘোষণা হওয়ার পর থেকে রাহুল সাতবার সাতটা বক্তৃতায় ওই দুজনের নাম করেছেন।

আমরা বরং তর্কের খাতিরে ধরে নিই, মোদী সত্যি কথাই বলছেন। আমরা ধরে নিচ্ছি টেম্পোয় করে টাকা পাঠানোর কথাটা লোকের বুঝতে সুবিধা হবে বলে মোদী বলেছেন। মোদ্দাকথা হল, আম্বানি আর আদানি কংগ্রেসকে টাকা দিচ্ছেন এই নির্বাচনে। যদি একথা সত্যি হয়, তাও কিন্তু বিজেপির পক্ষে দুঃসংবাদ। কর্পোরেটবান্ধব মোদী সরকারের মাথার উপর থেকে যদি ভারতের সবচেয়ে ধনী দুই ব্যবসায়ীর হাত সরে গিয়ে থাকে তাহলে মোদীর সমূহ বিপদ। কারণ তাহলে বুঝতে হবে, তাঁরা হাওয়া খারাপ বুঝে পরবর্তী সরকারে নির্ণায়ক শক্তি হবে যারা, তাদের তুষ্ট করবেন ঠিক করেছেন। বস্তুত, অনেকেই খেয়াল করেছেন যে মোদীর এই বক্তব্য ধামাচাপা দেওয়ার জন্যে আদানির মালিকানাধীন চ্যানেল এনডিটিভি সেদিন মাতামাতি করছিল স্যাম পিত্রোদার মন্তব্য নিয়ে, যে মন্তব্যের সঙ্গে কংগ্রেস একমত নয় বলে পত্রপাঠ জানায়। তারপর পিত্রোদাকে কংগ্রেসের বৈদেশিক শাখার কর্তার পদ ছাড়তেও বাধ্য করা হয় সেইদিনই। কিন্তু পরদিন এনডিটিভি যা করেছে তা আরও কৌতূহলোদ্দীপক। সন্দেশখালির বিজেপি নেতা গঙ্গাধর কয়ালের গোপন ক্যামেরার সামনে শুভেন্দু অধিকারীর নির্দেশে ধর্ষণের মিথ্যা অভিযোগ দায়ের করানোর চক্রান্ত যেদিন ফাঁস হল, সেদিন থেকে সমস্ত গোদি মিডিয়ার মত এনডিটিভিও খবরটা যথাসম্ভব চেপে গিয়েছিল। কিন্তু বুধবার মোদীর ওই বক্তৃতার পরে বৃহস্পতিবার যখন রেখা পাত্রের ভিডিও প্রকাশ্যে এল, সে খবর এনডিটিভি দেখিয়েছে যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়ে।

এ কিন্তু মোদীর পক্ষে অশনি সংকেত। আদানি আর আম্বানি মিলে ভারতের মূলধারার সংবাদমাধ্যমের অনেকখানি দখল করে আছেন। ক্রোনি পুঁজিবাদ ভারতের সংবাদমাধ্যমেও মোদীর আমলে কাজ করেছে পুরোদমে। নিজের চা বিক্রেতার অতীত থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রির মত বহু নড়বড়ে সত্যের উপরে মোদীর যে বিশালকায় ভাবমূর্তি নির্মিত হয়েছে তা সম্ভব হত না এতগুলো সংবাদমাধ্যমের শতকরা একশো ভাগ সমর্থন না থাকলে। সেই সমর্থন যদি সরতে শুরু করে, ওই ভাবমূর্তি ভেঙে পড়তে বিশেষ সময় লাগবে না। এখন সোশাল মিডিয়ার যুগ, সবকিছু ঘটে বড্ড তাড়াতাড়ি। নির্বাচন কমিশনের বদান্যতায় এক দীর্ঘ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এখনো চারটে দফা বাকি, প্রথম তিন দফায় বিজেপি দারুণ ফল করবে এমনটা মোদীর ভাবভঙ্গি দেখে মনে হচ্ছে না। সে ভরসা থাকলে তাঁকে মরিয়া হয়ে আম্বানি, আদানির নাম করে রাহুলকে আক্রমণ করতে হত না। এমতাবস্থায় টিভি কভারেজ কমে গেলে মোদী যাবেন কোথায়? বিশেষত জি নেটওয়ার্কের মালিক এবং মোদীর একদা ঘনিষ্ঠ সুভাষ চন্দ্র যখন আগে থেকেই চটে আছেন ফের রাজ্যসভার টিকিট না পেয়ে। তিনি ওয়ার্ল্ড প্রেস ফ্রিডম ডে উপলক্ষে বলে বসেছেন যে ভারতে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা মোটেই ভাল জায়গায় নেই। তার চেয়েও বড় কথা, গোদি মিডিয়ার অন্যতম মুখ দীপক চৌরাসিয়াকে জি নিউজ ছাড়তে বাধ্য করা হয়েছে। সুধীর চৌধুরীর মত লোকও হঠাৎই মোদীর বক্তৃতার মিথ্যা দর্শকদের সামনে উদ্ঘাটন করতে শুরু করেছেন। এ সময় আম্বানি, আদানিকে কেউ চটায়?

আরও পড়ুন এনডিটিভি বিসর্জন: শোক নিষ্প্রয়োজন, উল্লাস অন্যায়

এই যে ভারতের মত এত বড় দেশের নির্বাচনে অন্যতম ইস্যু হয়ে উঠেছেন দুজন পুঁজিপতি – এটাই প্রমাণ করে একবিংশ শতাব্দীর গণতন্ত্র পুঁজিপতিদের উপরে কতখানি নির্ভরশীল। বিজেপি মুখপাত্ররা অনেকে প্রধানমন্ত্রীর সেদিনের বক্তৃতার পক্ষে দাঁড়াতে গিয়ে বলছেন – ঠিকই বলছেন – যে রাহুল উঠতে বসতে আম্বানি-আদানির চোদ্দ পুরুষ উদ্ধার করেন, সেই রাহুলের দলের মুখ্যমন্ত্রীরাই ওই দুজনের শিল্প নিজের রাজ্যে টেনে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন। এই দ্বিচারিতা কেন? কথা হল, পুঁজিবাদ নয়া উদারবাদী অর্থনীতির সাহায্যে এই শতকে গণতন্ত্রের ঘাড়ে এমনই চেপে বসেছে যে এই দ্বিচারিতা না করে কোনো সরকারে থাকা দলের উপায় নেই। সরকারি সম্পত্তি, সরকারি শিল্পগুলোর বারোটা বাজিয়ে দেওয়া শুরু হয়েছিল ১৯৯১ সাল থেকেই। সেই প্রকল্পের দ্রুততা বাড়িয়ে মোদী সরকার প্রায় সমস্ত রাষ্ট্রীয় সম্পত্তিই তুলে দিয়েছে কর্পোরেটের হাতে। এখন যে সরকার জনকল্যাণমুখী হতে চায়, তার নিজের টাকা রোজগারের পথ এত সংকীর্ণ হয়েছে যে পুঁজিপতিদের উপরে নির্ভর করা ছাড়া উপায় নেই। অথচ তারা তা হতে দেবে না। কারণ রাষ্ট্র নাগরিকে পরিষেবা দিতে সক্ষম হলে কর্পোরেটের থেকে পরিষেবা কিনবে কে? সরকারি হাসপাতাল ঝকঝকে তকতকে হলে, ভাল চিকিৎসা শস্তায় করে দিলে বেসরকারি হাসপাতালে কে যাবে?

সুতরাং রাহুলের আসল পরীক্ষা শুরু হবে সরকারে আসতে পারলে। এখন মোদীকে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়ে কয়েক কোটি লাখপতি তৈরি করার কথা বলা সোজা। কিন্তু মোদীর চেয়ারে বসার সুযোগ পাওয়া গেলে দলের ইশতেহারে যে গুচ্ছ গুচ্ছ জনকল্যাণমুখী প্রকল্পের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে তা পূরণ করতে গেলে আম্বানি, আদানিদের সঙ্গে সরাসরি সংঘাতে যেতে হবে। চোখ বুজে বলে দেওয়া যায়, বিরোধিতা হবে তাঁর নিজের দলের ভিতর থেকেও। সেসব সামলে কি ইশতেহারের প্রতিশ্রুতি পূরণ করা সম্ভব হবে? পারলে তা গোটা পৃথিবীতে উদাহরণ হয়ে থাকবে। কারণ ক্রোনি পুঁজিবাদের হাত থেকে উদ্ধারের পথ এখন সব দেশেই খোঁজা হচ্ছে। উদারনৈতিক গণতন্ত্রের পিঠ দেয়ালে ঠেকে গেছে। ঋজু বিদূষক কুণাল তাঁর সাম্প্রতিক এক ভিডিওতে মোদীর বদলে কে – এই প্রশ্নের যে উত্তর দিয়েছেন, তা এখন অনেক দেশেরই দুর্দশাগ্রস্ত মানুষের মনের কথা – ‘খালি চেয়ারও চলবে’

পিপলস রিপোর্টারে প্রকাশিত

এনডিটিভি বিসর্জন: শোক নিষ্প্রয়োজন, উল্লাস অন্যায়

এনডিটিভি প্রথম নেটওয়ার্ক নয় যা সরকারের মুখপত্র হতে চলেছে, শেষ নেটওয়ার্ক। বিপদটা সেইখানে।

এনডিটিভির দখল এশিয়ার সবচেয়ে বড় ধনী গৌতম আদানির হাতে চলে যাওয়া নিয়ে আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে। প্রণয়-রাধিকার হাত থেকে লাগাম ছুটে যাওয়া মাত্রই পদত্যাগ করেছেন ম্যাগসাসে পুরস্কার জয়ী সাংবাদিক রবীশ কুমার। এই খবরটা আরও বেশি পীড়া দিচ্ছে অনেককে। কারণটা শুধুমাত্র কিছু মানুষের প্রিয় টিভি নেটওয়ার্ক অপ্রিয় লোকের হাতে চলে যাওয়া বা সেখান থেকে প্রিয় অ্যাঙ্করের প্রস্থান নয়। এনডিটিভির আদানিকরণ নিয়ে সারা পৃথিবীতে আলোচনা হচ্ছে। বিশ্বের সবচেয়ে ধনী ব্যক্তিদের তালিকায় থাকা লোকেদের হাতে কোনো সংবাদমাধ্যম বা সোশাল মিডিয়ার মালিকানা চলে যাওয়া যে গণতন্ত্রের পক্ষে ক্ষতিকর, বাকস্বাধীনতার বারোটা বাজানোর পক্ষে যথেষ্ট, তা সারা পৃথিবীর গণতন্ত্রপ্রেমী মানুষ বুঝে ফেলেছেন। উপরন্তু আদানি এনডিটিভিকে নিয়ে কী করবেন তা নিয়েও কোনো সংশয় রাখেননি। তিনি ফাইন্যানশিয়াল টাইমসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন “স্বাধীনতা মানে হল সরকার ভুল কিছু করলে তা বলার স্বাধীনতা। কিন্তু একইসঙ্গে সরকার যখন রোজ ঠিক কাজ করে তখন সেটা বলার সাহসও থাকা উচিত। সেটাও আপনাকে বলতে হবে।” পৃথিবীর সবচেয়ে জনদরদী সরকারও যে রোজ ঠিক কাজ করে না তা বোঝার জন্য নোবেল পুরস্কার প্রাপকদের মত বুদ্ধিমান হওয়ার দরকার নেই আর আদানির মত সফল ব্যবসায়ী নির্বোধও নন। ফলে তিনি যে আসলে বলতে চাইছেন সরকারের বিরুদ্ধে কথা বলা সংবাদমাধ্যমের কাজ নয় – তা স্পষ্ট। একটা সাড়ে তিন দশকের পুরনো মিডিয়া নেটওয়ার্কের মালিকানা এমন লোকের হাতে চলে যাওয়া নিঃসন্দেহে উদ্বেগজনক।

কিন্তু এনডিটিভি কি প্রথম চ্যানেল যা শাসকের মুখপাত্র হতে বসেছে? নাকি এনডিটিভি ছিল বলে ভারতের গণতন্ত্র জীবন্ত ছিল, আর আদানির নিয়ন্ত্রণে চলে গেলেই নিমেষে তার মৃত্যু হবে? যদি দুটো প্রশ্নের উত্তরই ‘না’ হয়, তাহলে এত কান্নাকাটির কী আছে? নাগরিক ডট নেটের মত একটা বিকল্প সংবাদমাধ্যমে আমারই বা এ নিয়ে প্রবন্ধ ফেঁদে বসার কী আছে? রবীশ কিছুদিন আগেই, সম্ভবত কী হতে চলেছে জেনে, নিজের ইউটিউব চ্যানেল খুলেছেন। সাবস্ক্রাইবারের যথারীতি অভাব হয়নি, তাঁর পদত্যাগের কথা চাউর হওয়ার পর সংখ্যা লাফিয়ে বেড়েছে। সুতরাং সেই চ্যানেল থেকে যে বিস্তর আয় হবে তাতে সন্দেহ নেই। রবীশের সে আয়ের ভাগ তো আমি পাব না, নাগরিক ডট নেটও পাবে না। তাহলে দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের মত “কিসের শোক করিস ভাই/আবার তোরা মানুষ হ” বলে অন্য কাজে লেগে পড়লেই তো হয়। কী দরকার এ বিষয়ে ভাবনাচিন্তার?

এসব কথা অনেকেই বলাবলি করছেন। আরও বলাবলি হচ্ছে, এনডিটিভির ভারতীয় সাংবাদিকতায় এমন কিছু অবদান নেই যে তাদের জন্য চোখের জল ফেলতে হবে। তারাও আর পাঁচটা সংবাদমাধ্যমের চেয়ে আলাদা কিছু নয়। যাঁরা মনে করছেন এনডিটিভি ক্ষমতাকে প্রশ্ন করা শেষ চ্যানেল ছিল, তাঁদের মনে করিয়ে দেওয়া হচ্ছে, এনডিটিভি কেন্দ্রের শাসককে প্রশ্ন করলেও বহু রাজ্যের শাসককে ছাড় দিয়েছে। পশ্চিমবঙ্গের তৃণমূল সরকারই সম্ভবত তার সবচেয়ে বড় উদাহরণ। সুতরাং শোকার্ত হয়ে পড়ার কোনো প্রয়োজন নেই। আবার কংগ্রেসের অনেক সদস্য, সমর্থক এনডিটিভির উপর চটে আছেন অন্য কারণে। তাঁদের বক্তব্য এরা বিজেপিকে যত প্রশ্ন করেছে, বিরোধী আসনে থাকা সত্ত্বেও কংগ্রেসকে তার চেয়ে বেশি প্রশ্ন করেছে। নরেন্দ্র মোদীর চেয়ে বেশি আক্রমণ করেছে রাহুল গান্ধীকে। কংগ্রেসের অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র নিয়ে দিনরাত আলোচনা করেছে, বিজেপির অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র নিয়ে উচ্চবাচ্য নেই।

উপরের সবকটা অভিযোগেরই কিছু না কিছু সারবত্তা আছে। ঠিক সেজন্যেই এনডিটিভির আদানিকরণ নিয়ে আলোচনা অপরিহার্য।

প্রথমেই বলে নেওয়া দরকার, অনেকেই একটা কথা ভুল বুঝেছেন। এনডিটিভির নিয়ন্ত্রণ এখনো প্রণয় রায় ও তাঁর স্ত্রী রাধিকা রায়ের হাত থেকে বেরিয়ে যায়নি। তাঁরা এখনো এনডিটিভির বোর্ড অফ ডিরেক্টর্সে আছেন, থাকতে বাধাও নেই। কারণ দুজনের হাতেই এনডিটিভির বেশকিছু শেয়ার রয়েছে।

কিন্তু এনডিটিভির প্রোমোটার হল আরআরপিআর হোল্ডিং নামক সংস্থা। তাঁরা পদত্যাগ করেছেন সেই সংস্থার ডিরেক্টরের পদ থেকে, কারণ আরআরপিআরের দখল অগাস্ট মাসেই আদানি গ্রুপের হাতে চলে গেছে, ফলে এনডিটিভির ২৯.১৮% শেয়ারও এখন আদানি গ্রুপেরই হাতে। এনডিটিভির আরও ২৬% শেয়ার দখল করার জন্য গৌতম আদানি ২২ নভেম্বর এক ওপেন অফার লঞ্চ করেছেন, যার মেয়াদ শেষ হচ্ছে আজ। আদানির লক্ষ্যপূরণ হলে এনডিটিভির বেশিরভাগ শেয়ার চলে যাবে আদানি গ্রুপের হাতে। পূরণ না হলেও অন্য যারা শেয়ার কিনে নেবে তাদের শেয়ারগুলো আরও বেশি দামে কিনে নেওয়ার রেস্ত আদানির আছে, রায় দম্পতির নেই। ফলে আদানির এনডিটিভির ম্যানেজমেন্টের সম্পূর্ণ দখল নিয়ে নেওয়া এখন সময়ের অপেক্ষা। ইতিমধ্যেই আদানি গ্রুপের চিফ টেকনোলজি অফিসার সুদীপ্ত ভট্টাচার্য, সাংবাদিক সঞ্জয় পুগলিয়া ও সেন্থিল চেঙ্গলবরায়ন আরআরপিআরের ডিরেক্টর নিযুক্ত হয়েছেন। প্রণয়-রাধিকার এনডিটিভি থেকে বিদায় অনিবার্য – একথাও বলাই যায়। কারণ আদানির চেয়ে বেশি টাকা দিয়ে ওপেন অফারে যারা শেয়ার কিনেছে তাদের শেয়ারগুলো ফের কিনে নেওয়ার অবস্থা রায় দম্পতির থাকলে এই পরিস্থিতির সৃষ্টিই হত না। তাঁরা ২০০৯-১০ সালে বিশ্বপ্রধান কমার্শিয়াল প্রাইভেট লিমিটেড নামে এক সংস্থা থেকে ৪০৩ কোটি টাকা ধার নিয়েছিলেন। সে ঋণের শর্তই ছিল, ঋণ শোধ করতে না পারলে আরআরপিআরের ৯৯.৯% শেয়ার বিশ্বপ্রধান দখল করে নিতে পারবে। আদানি প্রথমে ওই বিশ্বপ্রধানেরই প্রধান হয়ে বসেন টাকার জোরে, তারপর অনাদায়ী ঋণের দায়ে এনডিটিভির দখল নেওয়ার কাজ শুরু করেন।

শোধ দিতে পারবেন না এমন ঋণ নিলেন কেন, তা-ও আবার ২০০৮ সালে তৈরি হওয়া বিশ্বপ্রধানের মত এক গোলমেলে ‘হোলসেল ট্রেডিং ফার্ম’ থেকে, যার মালিকানা হাত বদলাতেই থাকে, যার মালিকানা একসময় ছিল রিলায়েন্স ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের হাতে, পরে মুকেশ আম্বানিরই ঘনিষ্ঠ মহেন্দ্র নাহাতার হাতে চলে যায়? এসব প্রশ্ন তুলে এনডিটিভির আজকের অবস্থার জন্য রায় দম্পতিকে দায়ী করাই যায়। এমনকি সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ বোর্ড অফ ইন্ডিয়া (সেবি)-ও এ নিয়ে প্রণয়-রাধিকাকে শোকজ করেছিল। এনডিটিভিতে কাজ করেই বিখ্যাত হওয়া বরখা দত্তের মত কেউ কেউ এখন পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে তির্যক ভাষায় টুইট করতে লেগেছেন, এনডিটিভি আগে আম্বানির হাতে ছিল। তখন যদি স্বাধীন থেকে থাকে, এখন আদানির হাতে গেলেই পরাধীন হবে কেন? আসলে ইস্যুটা হল টিভির রেভিনিউ মডেলটাই ভেঙে পড়েছে।

AM CONFUSED. WHEN MUKESH AMBANI OWNED 30% OF NDTV IT WAS FREE AND WHEN GAUTAM ADANI PURCHASES THAT 30% ITS OBITUARY TIME? PRAY, HOW? SO MUCH POLITICKING & HUMBUG IN THE DISCOURSE BOTH FOR OR AGAINST, BOTH NARRATIVES IGNORE THE ELEPHANT IN THE ROOM- REVENUE MODEL OF TV IS BROKEN.— barkha dutt (@BDUTT) December 1, 2022

এতদ্বারা বরখা আম্বানিকে গণতান্ত্রিক বললেন, নাকি আদানিকে গণতান্ত্রিক বললেন? নাকি দুজনের কেউই বাকস্বাধীনতার পক্ষে বিপজ্জনক নন বললেন? বোঝা কঠিন। কিন্তু ঘটনা হল কর্পোরেট মিডিয়ার রেভিনিউ মডেল যে গোলমেলে তা কোনো নতুন কথা নয়। আয়ের জন্যে বিজ্ঞাপন নির্ভরতা এবং বিজ্ঞাপনের জন্য টিআরপি নির্ভরতা বহুকালের সত্য। বরখা যখন স্বয়ং কর্পোরেট মিডিয়ার হর্তাকর্তা ছিলেন তখনো তাই ছিল। ভারতে অর্থনৈতিক উদারীকরণের পর সংবাদমাধ্যমে, বিশেষত ইংরেজি ভাষার সংবাদমাধ্যমে, দুটো জিনিস ক্রমান্বয়ে ঘটেছিল। এক, সংবাদমাধ্যমে চুক্তিভিত্তিক চাকরি চালু হওয়া আর সাংবাদিকদের পারিশ্রমিক অনেকখানি বেড়ে যাওয়া। এককথায় অন্যদের ঘাড়ে পা দিয়ে সাংবাদিকদের স্বর্গারোহণ আরম্ভ হয়। যে সাংবাদিক যত উপরে আছেন তাঁর মাইনে তত বাড়ে। রাজস্ব বেড়েছে কিনা, এত মাইনের টাকা আসবে কোথা থেকে – এসব প্রশ্ন তখন বরখার মত শীর্ষস্থানীয়রা করেননি। ২০০৮-০৯ বা ২০১০, অর্থাৎ যে সময়ে প্রণয়-রাধিকা ওই বিপুল পরিমাণ ঋণ নিয়েছিলেন, ঠিক সেই সময়টাতে এই মাইনে বাড়ার হার চরমে পৌঁছয় সারা দেশের সংবাদমাধ্যমে। কেবল টিভি চ্যানেলগুলোতে নয়, খবরের কাগজেও।

আমার নিজের অভিজ্ঞতাই বলি। ২০০৭ সালের নভেম্বর মাসে কলকাতার ধুঁকতে থাকা দ্য স্টেটসম্যান কাগজের চাকরি ছেড়ে পাড়ি দিই হায়দরাবাদে, ২৮,০০০ টাকা মাস মাইনেয়। সেখানে যে কাগজে যোগ দিই, সেখানে কয়েক মাসের মধ্যেই কোনো অজ্ঞাত কারণে বেতন কাঠামোর পুনর্বিন্যাস হয়। নিউজরুমের বড়, মেজ, সেজ, ছোট সকলেরই বেতনের বিপুল বৃদ্ধি হয়। যাদের পদোন্নতি হয়নি তাদেরও বেতন প্রায় দ্বিগুণ হয়। আমার মত যাদের পদোন্নতি হয়েছিল তাদের বৃদ্ধি হয় চোখ কপালে তোলার মত। আমার বেতন গিয়ে দাঁড়িয়েছিল মাসিক ৭০,০০০ টাকায়। আমি তখন নেহাতই মাঝের স্তরের সাংবাদিক, সবে সিনিয়র সাব-এডিটর থেকে চিফ সাব হয়েছি। অ্যাসিস্ট্যান্ট এডিটর, এক্সিকিউটিভ এডিটর বা এডিটরদের মাইনে কোথায় পৌঁছেছিল তা কেবল কল্পনাই করতে পারি। আমরা কেউ কি খোঁজ নিতে গিয়েছিলাম কাগজের আয় বেড়েছে কিনা? অথচ সকলেই জানতাম কাগজের বিক্রি কিন্তু রাতারাতি বাড়েনি।

সেটা ২০০৮ সালের কথা। তখন সারা ভারতের ইংরেজি সংবাদমাধ্যমে প্রতিযোগিতা চলছে সাংবাদিকদের মাইনে বাড়ানোর। আবার ২০১০ সালে পশ্চিমবঙ্গে সারদা গ্রুপের বাংলা কাগজ চালু হওয়ার সময়ে একইরকম জিনিস দেখা গিয়েছিল। সে কাগজ বছর দুয়েকের বেশি না চললেও বাংলা ভাষার সাংবাদিকদের সঙ্গে ইংরেজির সাংবাদিকদের পারিশ্রমিকের যে লজ্জাজনক ব্যবধান ছিল, তা কমাতে ঘটনাটা কিছুটা সাহায্য করেছিল।

এখন কথা হল, টিআরপির খোঁজে বহুকাল ধরেই ভূত পেত্নী দত্যি দানো তাবিজ কবচ দেখায় বহু হিন্দি চ্যানেল। সে কাজ রবীশরা কখনো করেননি। ২০১২-১৩ সাল থেকে ওসবের সঙ্গে হিন্দি, ইংরেজি সব চ্যানেলেই যুক্ত হয়েছে প্রায় আঁচড়ে কামড়ে দেওয়ার মত সান্ধ্য মজলিশ, মুসলমান বিদ্বেষ ছড়ানো, উদারনৈতিক ব্যক্তি এবং প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে লোক ক্ষ্যাপানো, সব ধরনের বামপন্থীদের দেশদ্রোহী বলে দেগে দেওয়া, ভুয়ো খবর প্রচার, বিজেপির অলিখিত মুখপত্রের কাজ করা। এনডিটিভি এগুলোর কোনোটাই করেনি। অথচ প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে গেলে বাজারের চলতি হারের কমে মাইনে দেওয়া চলে না। উপরন্তু সাংবাদিকদের মাইনে একটা সংবাদমাধ্যমের খরচের একটা অংশ মাত্র। তথ্যপ্রমাণ বলছে খুব বড় অংশও নয়। তার চেয়ে খবর সংগ্রহ করা এবং টিভির ক্ষেত্রে যন্ত্রপাতি ও প্রযুক্তির ক্রমোন্নয়নের খরচ অনেক বেশি। সেখানেও প্রতিযোগীদের সঙ্গে তাল মেলাতে টাকার প্রয়োজন হয়। আমরা যারা স্বাধীন সংবাদমাধ্যম চাই, ক্ষমতাকে প্রশ্ন করে এমন সংবাদমাধ্যম চাই, তারা কি টিআরপি বাড়িয়ে বেশি বিজ্ঞাপন পাওয়ার দিকে মন না দিয়ে যেনতেনপ্রকারেণ ঋণ নিয়ে টিকে থাকার চেষ্টাকে বেশি অপরাধ বলে গণ্য করব? বরখার টুইটসূত্রে খেয়াল করলেই দেখা যাবে, এনডিটিভির শেয়ার হোল্ডাররা মন্তব্য করছেন, ওটা বাজে কোম্পানি। আমাদের কী করে ডিভিডেন্ড দেওয়া যায় তার দিকে কোনোদিন নজর দেয়নি। একটা সংবাদমাধ্যমকে স্রেফ কোম্পানি হিসাবে দেখার এই দৃষ্টিভঙ্গিই কি আমাদের মূল্যায়নের মাপকাঠি হওয়া উচিত? ভেবে দেখা প্রয়োজন। আমরা তো কোম্পানির শেয়ার হোল্ডার নই। আমরা বরং, পুঁজিবাদী লবজে, স্বাধীন সংবাদমাধ্যমের স্টেক হোল্ডার।

এনডিটিভি প্রথম নেটওয়ার্ক নয় যা সরকারের মুখপত্র হতে চলেছে, শেষ নেটওয়ার্ক। বিপদটা সেইখানে। ভারতে যতগুলো বড় বড় টিভি নেটওয়ার্ক আছে তার প্রায় সবকটাই ইতিমধ্যেই শাসক দলের গর্ভে চলে গেছে। বাকি ছিল এনডিটিভি। বলতে দ্বিধা নেই, এনডিটিভিও একটি পুঁজিবাদী সংস্থা। সে পুঁজিবাদের নিয়মেই চলেছে। এমন নয় যে সারা ভারতের সংবাদমাধ্যমে যখন ছাঁটাই চলেছে, এনডিটিভি তখন সমস্ত কর্মচারীর স্বার্থরক্ষা করেছে। কিন্তু রায় দম্পতি কখনো কারাত দম্পতির মত নিজেদের বিপ্লবী বলে দাবি করেছেন বলে তো মনে পড়ে না। তাঁরাও ব্যবসাই করছিলেন। ব্যবসা প্রায় তিন দশক ক্রমশ বড় হয়েছে, সংবাদমাধ্যমের যা কাজ তা করতে নিতান্ত ব্যর্থ হয়নি, দায়িত্ব অস্বীকারও করেনি। কোনো সন্দেহ নেই, সব ইস্যুতেই এনডিটিভির অবস্থান ন্যায়ের পক্ষে বা দুর্বলের পক্ষে ছিল না। থাকার কথাও নয়। অন্তত বামপন্থীদের বুঝতে অসুবিধা হওয়ার কথা নয়, যে সংবাদমাধ্যম শেষপর্যন্ত মালিকের শ্রেণিস্বার্থেরই প্রতিভূ। এনডিটিভি তার চেয়ে আলাদা হবে এরকম প্রত্যাশা ছিল কি? থাকলে কেন ছিল? তবে এই একটি নেটওয়ার্কে কিন্তু বুলডোজার দিয়ে দিল্লি, উত্তরপ্রদেশ বা আসামে প্রতিবাদীদের ঘর ভেঙে দেওয়ার জন্যে বিজেপি নেতাদের দিকে আঙুল তোলা চলত। উমর খালিদ, ভারভারা রাও, স্ট্যান স্বামী, জি এন সাইবাবা, গৌতম নওলাখারা যে খলনায়ক নন সেটা বলা চলত। বিহার বিধানসভা নির্বাচনের আগে পরে লিবারেশন নেতা দীপঙ্কর ভট্টাচার্যকে যথেষ্ট গুরুত্ব দেওয়া হত। মূল্যবৃদ্ধি, বেকারত্ব, দারিদ্র্য নিয়ে কথা হত। আজ দেশের যা অবস্থা, তাতে এমন একটা মঞ্চের গুরুত্ব কম নয়। এই মঞ্চের অবলুপ্তিতে শোকাহত না হলেও উল্লসিত হওয়া বুদ্ধিমানের কাজ নয়।

ভারতীয় সাংবাদিকতায় এনডিটিভির অবদান কী, সে সম্পর্কে সম্ভবত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কথাটা বলেছেন অনিন্দ্য চক্রবর্তী। এনডিটিভি নেটওয়ার্কের দু-দুটো চ্যানেলের একদা ম্যানেজিং এডিটর এই সাংবাদিক রায় দম্পতির আরও অনেক অবদানের কথা লেখার সঙ্গে সঙ্গে লিখেছেন, ভারতের আর সব প্রতিষ্ঠানের মতই এনডিটিভিতেও বিলক্ষণ লুটিয়েন্স এলিটসুলভ ব্যাপার-স্যাপার আছে। কিন্তু অন্য কোনো সংবাদ প্রতিষ্ঠান একজন রবীশ তৈরি করতে পারেনি। কারণ একজন হিন্দি ভাষার সাংবাদিককে অতখানি জায়গা এবং কাজের স্বাধীনতাই কেউ দেয়নি।

এ কথার মাহাত্ম্য বোঝানো শক্ত। কারণ আমরা বাঙালি অ্যাংলোফাইলরা বুঝে উঠতে পারি না আঞ্চলিক ভাষার সাংবাদিকতার গুরুত্ব কতখানি। স্বাধীনতার পর ৭৫ বছর কেটে গেল, অথচ আজও ভারতে প্রগতিশীলতার ভাষা ইংরেজি। আমরা দ্য ওয়্যার, নিউজলন্ড্রি, ক্যারাভ্যান, অল্টনিউজ, বুম লাইভ ইত্যাদি ইংরেজি ভাষার বিকল্প সংবাদমাধ্যম পড়ি/দেখি বলে হোয়াটস্যাপ ইউনিভার্সিটির বাইরের সত্য জানতে পারি। কিন্তু এ দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ ইংরেজি পড়তে পারেন না, বলতে পারেন না, শুনে বুঝতেও পারেন না। তাঁদের কাছে উদারনৈতিক মতবাদ, ভুয়ো খবর পেরিয়ে সত্য পৌঁছে দেওয়ার দায় আমরা নিই না। আমরা কেবল তাঁদের নিয়ে ব্যঙ্গ করেই খালাস। যে কারণে বাংলায় বিকল্প সংবাদমাধ্যম তৈরি করার তেমন প্রয়াস নেই। বাংলার টিভি চ্যানেলগুলোও দুর্গাপুজোয় অ্যাঙ্করদের শাড়ি পরিয়ে, তৃণমূল-বিজেপি তরজা দেখিয়ে, শোভন-বৈশাখী কেচ্ছা দেখিয়ে চালিয়ে যাচ্ছে। যে দক্ষিণপন্থীদের আমরা ঘোর অপছন্দ করি, তারা কিন্তু আঞ্চলিক ভাষার গুরুত্ব বোঝে। তাই রিপাবলিক হিন্দি খুলে গেছে, রিপাবলিক বাংলাও চলে এসেছে। এই আবহে রবীশকে রায় দম্পতি যে স্থান দিয়েছিলেন তার গুরুত্ব অপরিসীম। আমাদের সময়ের কোনো বাঙালি সম্পাদক বাংলায় সাংবাদিকতা করে বিশ্বমানের পুরস্কার পেতে পারবেন? পুরস্কার পাওয়া অবশ্য সবচেয়ে বড় কথা নয়। কিন্তু কলকাতার যে সম্পাদকদের ইদানীং আমরা প্রবাদপ্রতিম বলে মনে করি, রবীশের মত জনগণের দুঃখ দুর্দশা সাংবাদিকতায় নিয়ে আসার ব্যাপারেও তো তাঁদের অবদান শূন্য। ফলে রবীশের মত বিস্তীর্ণ এলাকার বিপুল সংখ্যক মানুষের উপর ইতিবাচক তো নয়ই, নেতিবাচক প্রভাব ফেলার ক্ষমতাও তাঁদের নেই। এঁদের প্রভাব হাওড়া ব্রিজ পেরোলেই শেষ বললে ভুল হয় না।

তার উপর আছে ম্যানেজারি করে সম্পাদক হওয়ার ভান। যে কারণে দেবেশ রায় অশোক দাশগুপ্তের কলামের সংকলনের আলোচনা করতে গিয়ে লিখেছিলেন “এক সময় বাংলা খবরের কাগজে সম্পাদকের সক্রিয় সাংবাদিক হওয়ার বাধ্যতা ছিল। তাঁদের লিখতে হত – চাকরির কারণে নয়, নিজেদের মত দশজনকে জানানোর দরকারে ও দশজনের মত তৈরি করে তোলার দায় স্বীকার করে। রামানন্দ চট্টোপাধ্যায় থেকে সত্যেন্দ্রনাথ মজুমদার বাংলা সাংবাদিকতার সেই ইতিহাস তৈরি করেছেন। বিবেকানন্দ মুখোপাধ্যায় শেষ সম্পাদক যিনি নিজে লিখতেন। যদিও তাঁর লেখা তাঁর নামে বেরোত না, তবু পাঠক এমনই চিনত তাঁর লেখা যে সম্পাদকীয়র নৈর্ব্যক্তিকে তিনি হারিয়ে যেতেন না। তারপর বাংলা কাগজে সম্পাদকের লেখালেখি উঠে গেছে।” বাংলার টিভি চ্যানেলের সম্পাদকরা আরও কম সাংবাদিক। তাঁরা সুটেড বুটেড হয়ে সান্ধ্য বিতর্ক পরিচালনা করা আর বিশিষ্টদের সাক্ষাৎকার নেওয়া ছাড়া আর কিছুই করেন না। রবীশের মত আবর্জনার মধ্যে দাঁড়িয়ে “প্লিজ টেল মনমোহন সিং টু ওয়াচ রবীশ কি রিপোর্ট। ইংলিশ মে ওয়সে ভি ইন্ডিয়া ডেভেলপড লগতা হ্যায়” বলা এঁদের কল্পনাতীত। এই রবীশ টিভি মিডিয়ার বাইরে চলে গেলেন। এতে সত্যিই হয়ত তাঁর ক্ষতি নেই, কিন্তু টিভির দর্শকদের ক্ষতি। টিভির মাধ্যমে তিনি যত হিন্দিভাষী দর্শকের কাছে পৌঁছতে পারতেন, যত ইংরেজি না জানা মানুষকে বিষাক্ত দক্ষিণপন্থার উল্টো ছবি দেখাতে পারতেন, ইউটিউব চ্যানেল দিয়ে পারবেন কিনা তা নিয়ে সন্দেহের অবকাশ আছে। কারণ ভারতে মোবাইল ডেটার দাম আবার বাড়তে শুরু করেছে।

শেষ প্রশ্নে আসব, অর্থাৎ এসব নিয়ে নাগরিক ডট নেট কেন ভাবছে? তার আগে সংক্ষেপে কংগ্রেসি বন্ধুদের এনডিটিভির প্রতি রাগ নিয়ে দু-চার কথা বলে নিই। এনডিটিভি যে উদারনীতির অনুশীলন করেছে সেই ‘দ্য ওয়ার্ল্ড দিস উইক’-এর সময় থেকে, তা কিন্তু আসলে নেহরুসুলভ উদারনীতি। জওহরলাল নেহরু যে গণতান্ত্রিক উদারতার ধারণায় বিশ্বাসী হয়ে বিদ্যায়তনিক ইতিহাস চর্চায় বামপন্থীদের জায়গা দিয়েছিলেন, ললিতকলা আকাদেমি বা সাহিত্য আকাদেমি নির্মাণ করেছিলেন – সেই উদারতা। ন্যাশনাল ফিল্ম অ্যান্ড টেলিভিশন ইনস্টিটিউটে ঋত্বিক ঘটকের মত ঘোর বামপন্থী, যাঁকে কমিউনিস্ট পার্টি নিজেই হজম করতে পারেনি, তিনি পড়ানোর সুযোগ পেয়েছিলেন যে উদারনৈতিক ধারাবাহিকতায়, এনডিটিভি বস্তুত তারই অনুশীলন করেছে। ফলে তা মনমোহনী অর্থনীতির পক্ষ নেয়, আবার গান্ধী পরিবারের সমালোচনাও করে। এই জাতীয় উদারবাদীদের সঙ্ঘ পরিবারের কাছে কোনো প্রত্যাশা নেই, যত প্রত্যাশা কংগ্রেসের কাছে। স্বভাবতই কংগ্রেসের সভাপতি নির্বাচন যখন দেশের অধিকাংশ মানুষের কাছে কোনো আগ্রহের বিষয়ই নয়, তখন এনডিটিভি ঘন্টার পর ঘন্টা শশী থারুর আর মল্লিকার্জুন খড়গের সাক্ষাৎকার দেখিয়ে গেছে। মোদী সারাক্ষণের রাজনীতিবিদ, রাহুলের কেন মাঝে মাঝেই ছুটির দরকার হয় – এ কথাও এনডিটিভির মঞ্চ থেকে বহুবার উঠেছে সম্ভবত এই কারণেই। কংগ্রেস এইসব সমালোচনা খোলা মনে নিতে পারলে তাদেরই লাভ হত। সমর্থকরা না নিলেও, রাহুল স্বয়ং বোধহয় নিয়েছেন। ভারত জোড়ো যাত্রা দেখে অন্তত সেরকমই মনে হয়।

দীর্ঘ লেখা এবার শেষ করব কেন এত দীর্ঘ লেখা, কেন আদৌ এ লেখা – সে প্রশ্নের উত্তর দিয়ে।

এ দেশের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সবকটাকে পরিকল্পিতভাবে ধ্বংস করা চলছে। শুধু ধর্মীয় ফ্যাসিবাদী এজেন্ডা তার কারণ নয়। একুশ শতকের পুঁজিবাদ কোনো প্রতিষ্ঠান পছন্দ করে না। সবকিছুকেই কোম্পানি করে তোলাই তার উদ্দেশ্য। কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় হবে কেন্দ্রীয়ভাবে শীতাতপনিয়ন্ত্রিত বিলাসবহুল কোম্পানি – লেখাপড়া হোক আর না-ই হোক। সেটা লাভজনক থাকলে চালানো হবে, নয়ত বন্ধ করে দিতে হবে। কারণ শিক্ষা পণ্য। খবর এবং/অথবা তথ্য তো পণ্য বটেই। ফলে সংবাদমাধ্যমকেও প্রতিষ্ঠান থাকতে দেওয়া চলে না, তাকেও হতে হবে কোম্পানি। লাভজনক হলে চলবে, নইলে বন্ধ করে দেওয়া হবে। প্রতিষ্ঠানবিরোধী হওয়া ভাল, যদি প্রতিস্পর্ধী প্রতিষ্ঠান তৈরি করার দম থাকে। সেসব যখন আমাদের নেই, তখন আজকের পরিস্থিতিতে প্রতিষ্ঠান ভেঙে পড়া উদযাপন করা মূর্খামি। এতে গণতন্ত্রের পরিসরই যে সংকুচিত হচ্ছে সেকথা বুঝতে অসুবিধা হওয়ার কথা নয়।

অনেকেই দেখছি বিকল্প সংবাদমাধ্যমের উপর যাবতীয় দায়িত্ব চাপিয়ে দিয়ে নিশ্চিন্ত হচ্ছেন। নাগরিক ডট নেটের সদস্য হিসাবে তা দেখে মন্দ লাগে না। কিন্তু মনে রাখা ভাল, ‘বিকল্প’ কথাটা অতি গুরুত্বপূর্ণ। বিকল্পের ক্ষমতা সীমিত। যাঁরা পড়বেন তাঁরাই টাকা দেবেন, বিজ্ঞাপনের পরোয়া করতে হবে না – এই বিকল্প তৈরি হয়েছে বরখা কথিত অচল রেভিনিউ মডেলের বিকল্প খুঁজতে গিয়ে। ইংরেজিতে এই মডেল (পোশাকি নাম ক্রাউড-ফান্ডেড মিডিয়া) অনেক ক্ষেত্রেই বেশ সফল, বাংলাতেও এই মডেল নিয়ে পরীক্ষা নিরীক্ষা হবে নির্ঘাত। নাগরিক ডট নেট তো করবেই, আরও অনেকে করলে ভাল। কিন্তু এই মডেলের একটা সীমাবদ্ধতা আছে। বিজ্ঞাপন মডেলের মতই এই ব্যবস্থাতেও যিনি টাকা দেবেন নির্ঘাত তাঁর নিয়ন্ত্রণ থাকবে কনটেন্টের উপর। এক্ষেত্রে যেহেতু টাকা দিচ্ছেন অনেকে, সেহেতু একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ চলবে না বলে কনটেন্টে ভারসাম্য বজায় থাকার সম্ভাবনা অনেক বেশি অবশ্য। কিন্তু যিনি একেবারেই টাকা দিতে পারবেন না, তাঁর কথা কতটা উঠে আসবে? বাজারের যে সবজি বিক্রেতা পাঁচ টাকা দিয়ে দোকানে একটা কাগজ রাখেন বা যে রিকশাচালক বাড়ির টিভিতে দিনে অন্তত একবার খবর দেখেন, তিনি কি মোবাইলে নাগরিক ডট নেট পড়বেন টাকা দিয়ে? যদি না পড়েন, নাগরিক ডট নেট কি তাঁর সুখ দুঃখ তুলে আনার পরিশ্রম করতে পারবে? শ্রমের তো মূল্য আছে। অন্তত থাকা উচিত।

এছাড়াও আছে ঝুঁকির প্রশ্ন। ভারতের সব রাজ্যেই সাংবাদিক ও তাঁর পরিবার পরিজনদের উপর আক্রমণ ক্রমশ বাড়ছে, যে কোনো সমীক্ষায় উঠে আসছে সেই তথ্য। এনডিটিভির মত মূলধারার সংবাদমাধ্যমের সাংবাদিক তবু বিপদে পড়লে সংগঠনের আইনি ও সাংগঠনিক সাহায্য পান। নাগরিক ডট নেটের কেউ বিপদে পড়লে কার সাহায্য পাবে?

বিকল্প সংবাদমাধ্যম বা স্বাধীন সংবাদমাধ্যমগুলোর মধ্যে ইতিমধ্যেই বেশ প্রতিষ্ঠিত যারা, সেই নিউজক্লিকের দপ্তরেও কারণে অকারণে সরকারি সংস্থার রেড হয়ে থাকে। মামলা ঠুকে হয়রানি চলে নিয়মিত। এই ধরনের মিডিয়ার মধ্যে সম্ভবত সবচেয়ে জনপ্রিয় দ্য ওয়্যার। তারা কিছুদিন আগে এক কেলেঙ্কারি করে বসেছিল। বিরাট খবর করছে মনে করে বিজেপির আই টি সেলের কর্তা অমিত মালব্য এবং ফেসবুককে জড়িয়ে সম্পূর্ণ ভুল খবর পরিবেশন করেছিল। সেই খবর পরে প্রত্যাহার করতে বাধ্য হয়। ন্যক্কারজনক ঘটনা, কিন্তু সাংবাদিকতার ইতিহাসে অভূতপূর্ব নয়। যে কোনো কাজ করতে গেলেই ভুল হয়, খবর করতে গেলেও। কিন্তু সরকারবিরোধী সংবাদমাধ্যম হওয়া এখন এ দেশে বিরাট অপরাধ। তাদের ভুল অমার্জনীয়। তাই কেবল দপ্তরে নয়, দ্য ওয়্যারের প্রধান সিদ্ধার্থ বরদারাজনের বাড়িতেও পুলিস হানা দিয়ে তাঁর ল্যাপটপ, ফোন ইত্যাদি বাজেয়াপ্ত করে। সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ছাড়াই। এনডিটিভি গেল তো কী হল, বিকল্প সংবাদমাধ্যম দিয়েই কাজ চলে যাবে এই স্বপ্নে যাঁরা বুঁদ হয়ে আছেন তাঁরা এগুলো খেয়াল রাখবেন দয়া করে। এখানেই শেষ নয়। তথ্যপ্রযুক্তি আইন সংশোধন করে অনলাইন কনটেন্টের উপর সরকারি নিয়ন্ত্রণের রাস্তাও পরিষ্কার করা হয়েছে।

ফলে নাগরিক ডট নেটের মত ওয়েবসাইটও খুব নিরাপদ নয়। অতএব স্বাধীন তথা বিকল্প সংবাদমাধ্যমের উপর ভরসা রাখুন, পাশে থাকুন। পকেটের পয়সা দিয়ে এবং আরও যে যে উপায়ে পারেন। কিন্তু পা মাটিতে রাখুন। কোনো মূলধারার সংবাদ প্রতিষ্ঠানের পৃথিবীর সবচেয়ে ধনী ব্যক্তিদের একজনের হাতে চলে যাওয়ার ঘটনা উড়িয়ে দেওয়ার নয়, উল্লাস করার তো নয়ই।

নাগরিক ডট নেটে প্রকাশিত