সংবাদ ও সংবাদমাধ্যমে যা দেখি নতুন লাগে

“ধর্ম যার যার উৎসব সবার” বলার মধ্যে ভদ্রলোকি ভণ্ডামি আছে নিশ্চিত। কারণ ঈদকে হিন্দু বাঙালি একই যুক্তিতে উৎসব হিসাবে পালন করে না। তা বলে একটা উৎসবকে যে যা খুশি নামে ডাকতে পারবে না, যেমনভাবে খুশি পালন করতে পারবে না— এরকম রাষ্ট্রীয় নির্দেশ নেহাত গা-জোয়ারি।

সংবাদমাধ্যমে

একদা এক বিখ্যাত সাংবাদিকের অধীনে কাজ করতাম, ধরা যাক তাঁর নাম লোকুবাবু। লোকুবাবুর একটা অদ্ভুত অভ্যাস ছিল। তিনি হঠাৎ হঠাৎ রাগের মাথায় একেকটা শব্দ নিষিদ্ধ করে দিতেন। মানে ধরুন, তাঁর মনে হল comeback শব্দটা বড্ড বেশি ব্যবহার করা হচ্ছে সেই কাগজের শিরোনামে। অমনি একদিন অফিসের ছাদ ফাটিয়ে ঘোষণা করতেন “Comeback is banned.” এমন করতে করতে হয়ত কোনোদিন দেখা যেত win কথাটা নিষিদ্ধ, মানে লেখা বারণ। খবরের কাগজের খেলার পাতায় সে কী বিপত্তি!

পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর ‘শারদোৎসব’ শব্দটা নিষিদ্ধ করে দেওয়া দেখে তাই স্মৃতিমেদুর হয়ে পড়লাম। স্মৃতিমেদুরতা খুব বিপজ্জনক জিনিস। স্মৃতিমেদুরতার চশমা পরে দেখলে অ্যাডলফ হিটলারকেও উত্তমকুমার অভিনীত ভালো ছেলেদের মত মনে হয় অনেকসময়। উপরন্তু স্বৈরাচার বা ফ্যাসিবাদের সঙ্গে সময়ের দূরত্ব তৈরি হলে তাকে আর তত ভয়ঙ্কর লাগে না, বরং “কেমন কড়া লোক ছিল” বলে প্রশংসা করতেও মন চায় অনেকের। অতএব চারপাশটা স্মৃতিমেদুরতার চশমা খুলেই দেখা ভালো। সেভাবে দেখলে লোকুবাবুর এই খুঁতখুঁতেমি আর মজাদার লাগে না, স্বৈরাচার বলে স্পষ্ট চেনা যায়। কারণ একটা ভাষা তৈরি হয় বহু প্রজন্ম ধরে কয়েক কোটি মানুষের যৌথ প্রয়াসে। সেই ভাষার বহুল ব্যবহৃত একটা শব্দকে কোনো ব্যক্তি, তিনি যত ক্ষমতাবানই হোন না কেন, হঠাৎ এক ঘোষণায় নিষিদ্ধ করে দিতে পারেন না। ক্ষমতার চোখরাঙানিতে ভয় পেয়ে যদি বা মানুষ লেখা বন্ধ রাখে, মুখে মুখে শব্দটা চালু থাকবেই। ঠেকায় কার সাধ্যি? এ আসলে কেবল একটা ভাষার উপর সন্ত্রাস নয়, সেই ভাষাভাষী মানুষের সংস্কৃতির উপর আক্রমণ। লোকুবাবুর সমর্থনে তবু বলা যেতে পারে— কাগজের পাতার শিরোনামে একই শব্দের বারবার ব্যবহার আটকানো তাঁর কর্তব্য। কিন্তু যখন কোনো নির্দিষ্ট শব্দকে নিষিদ্ধ করার কাজটা করেন রাজ্যের প্রশাসনিক প্রধান, আর যে শব্দটা নিষিদ্ধ করেছেন সেটা এমন এক উৎসবের নাম যেটা আবেগের দিক থেকে তো বটেই, অর্থনৈতিকভাবেও পশ্চিমবঙ্গের বাঙালির সবচেয়ে বড় উৎসব; তখন এ কাজের পক্ষে যে কোনো যুক্তিই কুযুক্তি। দুর্গাপুজোকে শারদোৎসব বলে, তারপর “ধর্ম যার যার উৎসব সবার” বলার মধ্যে ভদ্রলোকি ভণ্ডামি আছে নিশ্চিত। কারণ ঈদকে হিন্দু বাঙালি একই যুক্তিতে উৎসব হিসাবে পালন করে না। তা বলে একটা উৎসবকে যে যা খুশি নামে ডাকতে পারবে না, যেমনভাবে খুশি পালন করতে পারবে না— এরকম রাষ্ট্রীয় নির্দেশ নেহাত গা-জোয়ারি।

ভাগ্যিস দুর্গাপুজো অর্থনৈতিকভাবে পশ্চিমবঙ্গে অতি গুরুত্বপূর্ণ, নইলে সংবাদমাধ্যমে মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্য নিয়ে হইচই কতটা হত কে জানে! শনিবার (১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬) সকালের গণশক্তি-র এক প্রতিবেদন বলছে, কুমোরটুলিতে গতবার সাড়ে ছয় হাজার প্রতিমার বরাত এসেছিল, এবারে বায়না হয়েছে সাড়ে পাঁচ হাজার। যদি খবরটা ঠিক হয়, তাহলে এখানেই তো এক হাজার পুজো কমে যাওয়ার ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। রাজ্যের অন্যান্য জায়গার অবস্থা তাহলে সহজেই অনুমেয়। মানে পুজো কেমন হতে হবে তা নিয়ে একাধিক রাজনৈতিক ও ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব (যত দোষ সবই বাগেশ্বর বাবাকে দিলে তো চলবে না) যেসব মন্তব্য করেছেন, তার হাতেনাতে ফল হয়েছে। এর ধাক্কা যে অর্থনীতির উপর পড়বে তা বলাই বাহুল্য। হয়ত সেই কারণেই পশ্চিমবঙ্গের প্রায় সব সংবাদমাধ্যম মৃদু বা সোচ্চার প্রতিবাদ সহ বড় করে তুলে ধরেছে মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্য (আনন্দবাজার পত্রিকা আবার রবীন্দ্রনাথের লেখা থেকে উদ্ধৃতি সমেত)। নইলে খোদ কলকাতার বুকে যে একটা আস্ত পাড়াকে তিন মাসের বেশি সময় ধরে জলহীন করে রাখা হয়েছে স্রেফ বাসিন্দাদের ধর্মবিশ্বাসের কারণে, এত বড় খবরটা রাজ্যের কোন মূলধারার সংবাদমাধ্যম কতবার তুলে ধরেছে গত একমাসে? বরং সর্বভারতীয় বিকল্প সংবাদমাধ্যম সে কাজ করছে বেশি।

আরও পড়ুন নির্বাচনের ফলে হেরে গেছে দেশের অসাধু মিডিয়া

অবশ্য মুখ্যমন্ত্রী ভালোমন্দ যা-ই বলুন, তাকে লঘু করবে কে? রাবণের মত দশটা মাথা কার আছে? উপরন্তু লোকুবাবুরাই এখন সংবাদমাধ্যমের উপর থেকে নিচ পর্যন্ত বিরাজ করছেন। লোকুবাবু বিখ্যাত হয়েছিলেন বিখ্যাত খেলোয়াড়, প্রাক্তন খেলোয়াড়, আইপিএলের যুগে পেজ থ্রি সেলেবদের লম্বা লম্বা সাক্ষাৎকার নিয়ে। ফলে তাঁর অধীন সমস্ত পাতা জুড়েই ‘কী ঘটিয়াছে’-র থেকে বড় করে তুলেছিলেন ‘কে কী বলিয়াছে’-কে। সেইসময় তবু এ জিনিসের নিন্দেবান্দা করার লোক ছিল মিডিয়ায়। কিন্তু তাঁরা তখনই প্রান্তিক, এখন ভ্যানিশ। লোকুবাবুদের নাম যশ দেখে পরবর্তী প্রজন্মের ছকুবাবুরা শিখেছেন যে ওকেই সাংবাদিকতা বলে। তার উপর অমৃতকালের ভারতে মন্ত্রীসান্ত্রীরা কী বললেন সেটাকেই খবর করে না তুলে অধিকাংশ সংবাদমাধ্যমের উপায় নেই। স্রেফ অনুলিখন করো, নইলে সরকারি বিজ্ঞাপন বন্ধ। কী করলেন সেটাও ছাপা বা দেখানো যাবে, যদি কাজটা হয় ফিতে কাটা বা ট্রেনের সামনে পতাকা নাড়া, কিংবা হিমালয়ের গুহায় বসে ধ্যান করা। যা একেবারেই প্রকাশ করা চলে না ইদানীং, তা হল মন্ত্রীসান্ত্রীরা কী করলেন না। সেসব জায়গা ভরাতে কাগজে ছাপতে হলেও, ভিতরের পাতায় ছোট করে। আর টিভির সান্ধ্য কাজিয়ায় ওসবকে বিষয় করে তোলার প্রশ্নই নেই। সুতরাং বিশ্ববিদ্যালয় বিল বা নাগা সন্ন্যাসীদের নিয়ে মুখ্যমন্ত্রীর যাদবপুর অভিযান নিশ্চয়ই যথাযোগ্য সম্মান পাবে কাগজে এবং টিভি চ্যানেলে। কিন্তু রাজ্যের প্রায় প্রত্যেক পৌরসভা আর পঞ্চায়েত এলাকাতেই যে নানা কারণে জঞ্জাল সাফাই হচ্ছে না দীর্ঘদিন ধরে— সে খবর নিজ নিজ জেলার পাতায় চুপিসারে গেলেই যথেষ্ট। আবার নাগা সন্ন্যাসীদের যে ছবি সবাই দেখে ফেলেছে, সোশাল মিডিয়ায় ভাইরাল, সে ছবি কাগজে প্রায় দেখাই গেল না। জানি না এর পিছনে শ্লীলতা-অশ্লীলতার যুক্তি আছে কিনা। যদি থাকে তাহলে আবার কিঞ্চিৎ স্মৃতিমেদুরতা তৈরি হবে। কারণ যেসব কাগজ সর্বত্যাগী সাধুদের নগ্নতা দেখাতে লজ্জায় নতমুখ, কৈশোরে তাদেরই পাতায় অসংখ্য বিখ্যাত, আধাবিখ্যাত মডেল ও অভিনেত্রীর প্রায়-নগ্নতা দেখে আমাদের দাড়িগোঁফ গজানোর গতি বেড়ে গিয়েছিল। কথাটা বিশেষত ইংরিজি ভাষার কাগজগুলোর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। তখন সোশাল মিডিয়ার যুগ হলে ভাইরাল হওয়ার সমস্ত রেকর্ড ভেঙে ফেলত সেইসব কাগজের সেইসব পাতা।

অবশ্য সোশাল মিডিয়া থাকায় কিছু উপকারও হয়েছে। যেমন কাগজ খুললে বা টিভির খবর দেখলে কেবল জানা যাচ্ছে, দিল্লিতে ব্রিকস সামিটে নরেন্দ্র মোদী গোলের পর গোল দিচ্ছেন। সোশাল মিডিয়া না থাকলে জানাই যেত না যে ওদিকে দিল্লি শহরের ট্র্যাফিকের ইট খসে পড়েছে। দিল্লিবাসীরা সোশাল মিডিয়ায় অভিযোগ করছেন— রাস্তায় বেরোলে এত ডাইভার্শন, যে ঘুরে যেতে যেতে কেউ শেষে নিউ ইয়র্কও পৌঁছে যেতে পারে। যদিও বিশ্বগুরু হওয়ার গুরুত্ব যারা বোঝে না, সেইসব মূঢ়রাই এরকম অভিযোগ করে থাকে। রাস্তায় গর্ত, ট্র্যাফিক জ্যাম, সরকারি ইমারতের ছাদ ফুটো হয়ে জল পড়া বা পুর পরিষেবার গাফিলতিতে সরকারকে প্রশ্ন করা সংবাদমাধ্যমের কাজ ছিল সেই জুরাসিক যুগে। এখন তো ভারত আনন্দ আশ্রম। মিডিয়ার কাজ গেয়ে যাওয়া “পৃথিবী বদলে গেছে/যা দেখি নতুন লাগে।” প্রশ্ন করার ব্যাপারটা ছেড়ে দেওয়া হয়েছে দিমাগী নকশাল বিকল্প সংবাদমাধ্যমের হাতে।

a2onuswor.com ওয়েবসাইটে প্রকাশিত

Author: Pratik

সাংবাদিক, লেখক। কাজ করেছেন দ্য টাইমস অফ ইন্ডিয়া, ডেকান ক্রনিকল, দ্য টেলিগ্রাফ, দ্য স্টেটসম্যান এবং অধুনালুপ্ত দ্য বেঙ্গল পোস্টে। বর্তমানে বিভিন্ন ওয়েবসাইট ও কাগজে লেখালিখি করেন। প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা ছয়।

Leave a Reply