মানিকবাবুর মেঘ: অনন্য রোম্যান্টিক ছবি

‘বাংলায় শিল্প নেই, শিক্ষা নেই, চাকরি নেই, আইনশৃঙ্খলা নেই’-এর মত ‘ভাল সিনেমা নেই’ কথাটাও বহু আলোচিত। মানিকবাবুর মেঘ দেখার পর সন্দেহ হতে বাধ্য – সত্যিই কি আমাদের ভাল সিনেমা নেই, নাকি ভাল সিনেমার দর্শক নেই?

‘আমার ইচ্ছে করে শূন্যে উঠে মেঘের ওপর দিয়ে হাঁটি’ – বাংলা ছবির গানে এই লাইন লেখা হয়েছিল ৫০ বছরেরও কম সময় আগে। সেই ছবি দর্শক হল ভরিয়ে দেখেছিল, গৌরীপ্রসন্ন মজুমদার রচিত এই গান এবং তার গায়ক মান্না দে-কে মাথায় করে রেখেছিল। বাংলা সিনেমার সেই জমজমাট আসর মাটি হয়ে গেছে। কোন শশীকান্ত কবে কীভাবে মাটি করল তা নিয়ে ইদানীং কিছু কথাবার্তা হয়, নিঃসন্দেহে আরও হওয়া দরকার। তবে শিল্পসুষমার স্বাদ নেওয়ার অধিকার সব দেশে, সব কালেই দর্শককে অর্জন করতে হয়। সে অধিকার না থাকলে শিল্পের সমস্ত আয়োজন ‘অরসিকেষু রস নিবেদনম্’ হয়ে দাঁড়ায়। ‘বাংলায় শিল্প নেই, শিক্ষা নেই, চাকরি নেই, আইনশৃঙ্খলা নেই’-এর মত ‘ভাল সিনেমা নেই’ কথাটাও বহু আলোচিত। মানিকবাবুর মেঘ দেখার পর সন্দেহ হতে বাধ্য – সত্যিই কি আমাদের ভাল সিনেমা নেই, নাকি ভাল সিনেমার দর্শক নেই? গত এক যুগেই পশ্চিমবঙ্গে অন্তত গোটা আষ্টেক বেশি ছবি হয়েছে যেগুলো রহস্য রোমাঞ্চ, সম্পর্কের টানাপোড়েন বা প্রেম-ঢিসুম ঢিসুম-মধুরেণ সমাপয়েৎ ফর্মুলার বাইরে গিয়ে রসোত্তীর্ণ শিল্প হতে চেষ্টা করেছে। ভূতের ভবিষ্যৎ (২০১২), বল্লভপুরের রূপকথা (২০২২)-র মত দু-একটা ব্যতিক্রম বাদ দিলে সেই প্রয়াসগুলো কিন্তু দর্শকের দাক্ষিণ্য পায়নি। বাকিটা ব্যক্তিগত (২০১৩) বা আসা যাওয়ার মাঝে (২০১৪) তত দর্শক পায়নি, যত দর্শক পেয়েছে যেমন তেমনভাবে নির্মিত ব্যোমকেশের ছবিগুলো। পুনরাবৃত্তিমূলক ফেলুদা বা কাকাবাবুর গল্প নিয়ে নির্মিত ছবিগুলোর অর্ধেক দর্শকও মায়ার  জঞ্জাল (২০২০) ঝিল্লি (২০২১), ভটভটি (২০২২), নীহারিকা (২০২৩) ভূতপরী (২০২৪) বা অথৈ (২০২৪) দেখেননি। সম্ভবত সেই কারণেই ২০২১ সাল থেকে পৃথিবীর বিভিন্ন ফিল্মোৎসবে পুরস্কৃত মানিকবাবুর মেঘকে পশ্চিমবঙ্গে সাধারণ দর্শকের জন্য মুক্তি পেতে অপেক্ষা করতে হল ২০২৪ সাল পর্যন্ত। অনির্বাণ ভট্টাচার্যের মত বিখ্যাত শিল্পী এ ছবির নিবেদক না হলে এবং ছবির একখানা গান না গাইলে হয়ত এরপরেও ছবিটা নিয়ে বিশেষ আলোচনা হত না।

মেঘের কথা হচ্ছিল। বাংলা সিনেমার মেঘের উপর দিয়ে হাঁটার ইচ্ছাশক্তি খর্ব হতে হতে কী করে গেটেড কমিউনিটির কোনো একটা টাওয়ারের বিলাসবহুল ফ্ল্যাটের ঘরে নেমে এল – তার ইতিহাস হয়ত কোনোদিন লেখা হবে। এই ছবির পরিচালক অভিনন্দন ব্যানার্জি কিন্তু আমাদের সেই আর্থসামাজিক সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছেন। কথাসর্বস্ব বাংলা ছবির যুগে তিনি এমন এক ছবি বানিয়েছেন যেখানে ক্যামেরার প্রত্যেকটা ফ্রেম কথা বলে, চরিত্রগুলো কথা বলে যতটুকু দরকার ততটুকুই। তেমনই এক মুখর ফ্রেমে পরিচালক ধরেছেন এক রিয়েল এস্টেট কোম্পানির হোর্ডিং। সেই বিজ্ঞাপন সম্ভাব্য ক্রেতাকে লোভ দেখাচ্ছে – আসুন, মেঘেদের সঙ্গে বাস করুন। অথচ তখন ক্রয়ক্ষমতাহীন মানিকবাবু – এ ছবির প্রধান চরিত্র – একখানা ছাদওয়ালা বাড়ি খুঁজছেন তাঁর গাছগুলোর জন্যে। বন্ধুর কাছে মুখঝামটা শুনছেন – নিজের মাথা গোঁজার ঠাঁই হয় না, বৃক্ষরোপণের শখ!

ক্রমশ গরম বেড়ে চলা, বৃষ্টিবিরল কলকাতা শহরের এক নিঃসঙ্গ বাসিন্দার এই সাদাকালো বাস্তবতা পর্দায় তুলে আনা, একইসঙ্গে রোম্যান্টিক থাকার সাহসের জন্য পরিচালককে অভিনন্দন না জানিয়ে উপায় নেই। না, মানিকবাবু মানে এখানে সত্যজিৎ রায় নন। এ ছবি সত্যজিতের জীবনের কোনো সফল বা বিফল মুহূর্ত নিয়ে নয়, তাঁর কোনো কাজের অনুপ্রেরণাও এখানে চোখে পড়ে না। বরং অতি সামান্য চাকরি করার পাশাপাশি ছোটদের আবৃত্তির টিউশনি করা এই মানিকবাবু শেখান সুকুমার রায়ের ‘মেঘ মুলুকে ঝাপসা রাতে,/রামধনুকের আবছায়াতে,/তাল বেতালে খেয়াল সুরে,/তান ধরেছি কণ্ঠ পুরে।/হেথায় নিষেধ নাইরে দাদা,/নাইরে বাঁধন নাইরে বাধা।/হেথায় রঙিন আকাশতলে/স্বপন দোলা হাওয়ায় দোলে,/সুরের নেশায় ঝরনা ছোটে,/আকাশ কুসুম আপনি ফোটে, রঙিয়ে আকাশ, রঙিয়ে মন/চমক জাগে ক্ষণে ক্ষণ!’ দূষিত বাতাসে ঢেকে যাওয়া কংক্রিটের জঙ্গল একবিংশ শতকের কলকাতা শহরে সুকুমারের এই রোম্যান্স যিনি ছুঁতে পারেন তিনি ছাড়া আর কে-ই বা মরা গাছেও রোজ জল দেবে, বাবার মৃত্যুর দিনেও রুটি কিনে আনবে রাস্তার কুকুরের জন্যে, অদেখা প্রেমিকার সঙ্গে ভাগ করে খাবে ডালভাত আর ঢ্যাঁড়শ ভাজা? হ্যাঁ, এটা প্রেমের ছবি। আর সব ব্যাপারে অত্যন্ত সাধারণ মানিকবাবু, দালালকে কোনো লেখাপড়া ছাড়াই টাকা দিয়ে সর্বস্বান্ত হওয়ার মত বোকা মানিকবাবু, একজন দুরারোগ্য রোম্যান্টিক। আজকের কলকাতার পক্ষে বেমানান রোম্যান্টিক, যেমন বেমানান ছিলেন সে যুগের ইউরোপে সেরভান্তেসের ‘রোম্যান্টিক’ নায়ক দন কিহোতে। এ ছবির সমাপ্তি যেভাবে ঘটিয়েছেন অভিনন্দন, তা একেবারেই সুকুমারীয় – যে সুকুমারকে শিশুসাহিত্যের আড়ালখানা ভেদ করে আমরা দেখতে পাই না।

ছবির যে কথা বলতে সংলাপ লাগে না তা যেমন আমরা ক্রমশ ভুলে যাচ্ছি, তেমনি সংলাপ না থাকলেও শব্দ যে কথা বলতে পারে তাও ভুলে যাচ্ছি। কারণ শব্দগুলোকে আলাদা করার মত নৈঃশব্দ্য ক্রমশই বিরল হচ্ছে আমাদের চারপাশে। প্রথমবার ফিল্মে কাজ করা অনুপ সিংয়ের নয়নাভিরাম ক্যামেরার সঙ্গে মুপ্পালা কিরণ কুমার, টেনি আর শুভজিৎ মুখার্জি যে শব্দ-নৈঃশব্দ্য-আবহসঙ্গীতের নকশা বুনেছেন, তা অতি পরিচিত দৃশ্য থেকে চমকে ওঠার মত ছবি উদ্ধার করে এনেছে বারবার। নইলে রাস্তার আলোর মাধ্যমে কথোপকথন সম্ভব হত না। কেবল কণ্ঠস্বর দিয়ে একটা চরিত্র হয়ে উঠতেও পারতেন না মানিকবাবুর বাড়িওয়ালি। একেবারে শয্যাশায়ী বাবাও সন্তানের জীবনে কতখানি গুরুত্বপূর্ণ, তাঁর প্রস্থানে কী বিরাট শূন্যতা তৈরি হয় তাও কেবল শব্দ আর সঙ্গীতের গুণে দেখিয়ে দেওয়া গেছে কোনো সংলাপ ছাড়াই। বোঝা গেল না? স্বাভাবিক। কারণ এই ছবি অনির্বচনীয় দৃশ্যে ভরপুর, অনির্বচনীয় কল্পনায় ঋদ্ধ। না দেখলে বোঝা যাবে না, বেশি বোঝানোর চেষ্টা করাও বাচালতা।

এই বাচালতা জিনিসটা এ ছবির একেবারেই নেই। একা মানুষের শোক বা তার অবদমিত কাম – কোনোটা বোঝাতেই অভিনন্দনকে বচন ব্যবহার করতে হয় না। জীবনানন্দ দাশের ভাষায় ‘বাজারের পোকাকাটা জিনিসের কেনাকাটা’ করা মানুষ মানিকবাবুর চরিত্রে চন্দন সেন এই অনির্বচনীয়তা সারা শরীরে ধারণ করায় দারুণ সফল। ছবির প্রথমার্ধের বিমর্ষ চন্দন আর দ্বিতীয়ার্ধের খুশিয়াল চন্দন কীভাবে একই ব্যক্তি থেকেও দুজন আলাদা মানুষ হয়ে যান – দেখে আশ্চর্য হয়ে যেতে হয়। মুখে যে প্রেমিক হাসি তিনি ফুটিয়েছেন, তা কেবল মনোমুগ্ধকর নয়, রোমাঞ্চকরও। যোগ্য সঙ্গত করেছেন দেবেশ রায়চৌধুরী, নিমাই ঘোষ, অরুণ গুহঠাকুরতা এবং ব্রাত্য বসু।

আরও পড়ুন হারানের নাতজামাই: স্মৃতিমেদুরতার নাটক

চন্দন যে মসৃণভাবে সিনেমার পর্দার মাঝবয়সী রোম্যান্টিক নায়ক হয়ে উঠতে পারেন, তা কি দশকের পর দশক তাঁর অভিনয়ের গুণগ্রাহী দর্শকরাও কেউ কল্পনা করেছিলেন? অভিনন্দন কিন্তু করেছেন। কল্পনাশক্তিতে, এবং সেই কারণে চিত্রনাট্যে, তিনি একশোয় একশো। অভিনন্দন কলকাতার রাজপথ, গলিপথ, ফুটপাথ, দেওয়ালগুলোকে তো বটেই; ধাপার মাঠ আর ময়দানকেও এ ছবির চরিত্র করে তুলেছেন চিত্রনাট্যের গুণে। তবে সেখানেই তাঁর নৈপুণ্য শেষ নয়। আজকের বাংলা ছবির দর্শক হিসাবে দুরুদুরু বুকে না বলে উপায় নেই যে এই পরিচালকের হাতে একখানা জাদুদণ্ড আছে বলে মনে হয়। তার ছোঁয়ায় সেকেলে বাক্স টিভির ফ্রেমের ভিতর টবে ফুল ধরে; চিত্রনাট্যের তালে তাল দেয় দেয়ালের টিকটিকি, মাকড়সা; আঁকা ছবি হয়েও রোম্যান্সে পর্দা মুড়ে দেন উত্তমকুমার আর সুচিত্রা সেন। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্য নিয়ে তাঁদের জ্যান্ত করে তুলতে হয় না। এমন জাদু বাংলা ছবিতে আমাদের বয়সের দর্শকরা অন্তত দেখেনি। প্রবীণরা বলতে পারবেন আদৌ কোনোদিন দেখা গেছে কিনা। তবে একটাই অনুযোগ – এত যত্নে নির্মিত ছবির শেষে নাম দেখানোর সময়ে দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের ‘দ্বীজেন্দ্রলাল’ হয়ে যাওয়া অনভিপ্রেত।

দুরুদুরু বুকে কেন বললাম? প্রথমত, প্রথম ছবিটাই এমন বানান যে তরুণ পরিচালক তাঁর ভবিষ্যৎ নিয়ে যুগপৎ আশা আর আশঙ্কা হয়। আমাদের মা-মাসিরা এসব ক্ষেত্রে পরিচালকের কড়ে আঙুল দাঁতে কেটে মাথায় তিনবার থুতু দিতেন। দ্বিতীয়ত, দর্শক যদি এই ছবিকে মা-মাসিদের মত করে আশীর্বাদ না করেন তাহলে অভিনন্দনকেও হয়ত পরের ছবিটা ফর্মুলায় ফেলেই বানাতে হবে। অন্য কোনো পরিচালকও হয়ত এমন কিছু করার সাহস করবেন না, কারণ এই ছবির প্রযোজক হয়ে যে ঝুঁকি বৌদ্ধায়ন মুখার্জি আর মোনালিসা মুখার্জি নিয়েছেন, সে ঝুঁকি আর কোনো প্রযোজক নেবেন না। বাংলা ছবির কোনো ভবিষ্যৎ থাকবে না, আমরা কেবল সত্যজিৎ-ঋত্বিক-মৃণালের জাবর কেটে যাব।

অনেকে বলছেন, মানিকবাবুর মেঘ আন্তর্জাতিক মানের ছবি। সেসব বোদ্ধারা জানেন। কিন্তু নিঃসন্দেহে বলা যায়, বাংলা ছবির সাধারণ দর্শকের জন্য এ ছবি এক অনন্য অভিজ্ঞতা। এই উচ্চতার রোম্যান্টিক ছবি আমরা বহুকাল দেখিনি। বারবার রোম্যান্টিক ছবি বলছি, প্রেমের ছবি বলছি। তাহলে ছবির নায়িকাকে নিয়ে কিছু বলছি না কেন? তাঁর কথা উহ্যই থাক, কারণ তিনি অনির্বচনীয়। নিজে চোখে দেখে আসুন।

নাগরিক ডট নেটে প্রকাশিত

চাপা পড়া গার্ডেনরিচ খুঁড়ে যা বেরোল

বাঙালি ভদ্রলোকদের মধ্যে গার্ডেনরিচ আর রাজাবাজারকে জনান্তিকে শাসনের অযোগ্য এলাকা বলা বহুদিন ধরেই চালু। ইদানীং হিন্দুত্বের হাওয়া খেয়ে ফুরফুরে মেজাজে সেসব প্রকাশ্যে বলা আরম্ভ হয়েছে।

সংবাদমাধ্যম ভূপতিনগরে এনআইএ আধিকারিকদের আক্রান্ত হওয়া এবং স্থানীয় তৃণমূল নেতার স্ত্রীর পালটা শ্লীলতাহানির অভিযোগ (মুখ্যমন্ত্রী যে অভিযোগে সিলমোহর দিয়েছেন) নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। তা বাদে পশ্চিমবঙ্গের ৪২ লোকসভা আসনেই প্রায় সব দলের প্রার্থী ঘোষণা হয়ে গেছে, তা নিয়েও হইচই তুঙ্গে। ফলে গার্ডেনরিচে বাড়ি চাপা পড়ে যাওয়া মানুষগুলোর স্মৃতিও চাপা পড়ে গেছে। আর কে গ্রেফতার হল ওই কাণ্ডে, শেষমেশ কাউন্সিলর না কলকাতা কর্পোরেশনের মেয়র নাকি মেয়র-ইন-কাউন্সিল – কে অতগুলো মৃত্যুর দায়িত্ব স্বীকার করলেন তা আর আমরা জানতে পারছি না। সম্ভবত আর কোনোদিন পারবও না। যদি নির্বাচনের পর কলকাতায় আবার কোনো বেআইনি নির্মাণ হুড়মুড়িয়ে ভেঙে পড়ে, তাহলে আলাদা কথা। তা এই চাপা পড়ে যাওয়া গার্ডেনরিচ কাণ্ড নিয়ে কিছু কুচিন্তা কিছুতেই মন থেকে যাচ্ছে না। এই চিন্তাগুলো আসন্ন নির্বাচনে হয়ত অপ্রাসঙ্গিক (কোন বিষয়গুলোর ভিত্তিতে মানুষ ভোট দেন তা অনুমান করতে গিয়ে আজকাল তো পোড়খাওয়া ব্যক্তিদেরও ঘোল খেয়ে যেতে দেখা যায়; আমি কোন ছার), কিন্তু বাংলার মানুষের দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক ও সামাজিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে জরুরি বলেই মনে হয়।

সাধারণত তৃণমূল কংগ্রেসের কোনো নেতা, মন্ত্রীর বিরুদ্ধে কুকর্মের অভিযোগ উঠলেই দল যা করে তা হল আগেভাগে তাঁকে নির্দোষ বলে দেওয়া। গোটা ব্যাপারটাকেই চক্রান্ত বলে দেগে দেওয়া। অনুব্রত মন্ডল থেকে শাহজাহান শেখ পর্যন্ত সকলের ক্ষেত্রেই তাই করা হয়েছে। বড়জোর তৃণমূলের মুখপাত্ররা বলেন – আইন আইনের পথে চলুক। ব্যাপারটা তো প্রমাণসাপেক্ষ। কেউ দোষ করে থাকলে দল তার পাশে দাঁড়াবে না। সাম্প্রতিককালে এর ব্যতিক্রম অবশ্য ঘটেছে। বিশেষ করে নিয়োগ দুর্নীতিতে অভিযুক্ত অনেকের সঙ্গে যোগাযোগই তৃণমূল বেমালুম অস্বীকার করেছে। কিন্তু তারা সব চুনোপুঁটি। রাঘব বোয়ালদের মধ্যে একমাত্র প্রাক্তন শিক্ষামন্ত্রী পার্থ চ্যাটার্জির ক্ষেত্রেই তৃণমূল উলটো পথ নিয়েছিল। বান্ধবীর ফ্ল্যাট থেকে টাকার অযোধ্যা (পাহাড়) উদ্ধার হওয়ার অব্যবহিত পরেই তাঁকে দলের মহাসচিবের পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়, পরবর্তীকালে মন্ত্রিসভা থেকেও। এমনকি তাঁর দুর্নীতির দায়ও দল সত্বর নিজের গা থেকে ঝেড়ে ফেলেছিল। বলা হয়েছিল, তিনি যদি ঘুষ নিয়ে থাকেন তাহলে ব্যক্তিগতভাবে নিয়েছেন। দল বা মুখ্যমন্ত্রী এর বিন্দুবিসর্গ জানতেন না। পার্থ যে দলের আর পাঁচজন অভিযুক্তের মত নন, তা বারবার পরিষ্কার হয়ে গেছে। দলের বাকি যে নেতারা বিভিন্ন মামলায় অভিযুক্ত, তাদের সম্পর্কে কথা বলার সময়ে মমতা ব্যানার্জি বা অভিষেক ব্যানার্জির মূল সুরটা থাকে এইরকম, যে তারা আসলে নির্দোষ। স্রেফ তৃণমূল করে বলে বিজেপি কেন্দ্রীয় সংস্থা দিয়ে তাদের হয়রান করাচ্ছে। যেমন অনুব্রত সম্পর্কে অভিষেক দিনদুয়েক আগেও বলেছেন ‘অনুব্রতই যদি আজ বিজেপিতে চলে যেতেন, ধোয়া তুলসীপাতা হয়ে যেতেন। বিজেপিতে যাননি, তাই জেল খাটছেন।’ মুখ্যমন্ত্রী তো একাধিকবার বলেছেন ‘কেষ্ট’ যখন ফিরে আসবে তখন তাকে বীরের সম্মান দেওয়া হবে। পার্থ কিন্তু দলের এমন সমর্থন পাননি। বহুকাল হল তাঁর নাম পর্যন্ত শোনা যায় না মুখ্যমন্ত্রী বা তাঁর ভাইপোর মুখে। গার্ডেনরিচ কাণ্ডের পর দেখা গেল সেখানকার বিধায়ক তথা নগরোন্নয়ন মন্ত্রী এবং কলকাতার মেয়র ফিরহাদ (ববি) হাকিমও একলা পড়ে গেছেন।

গতমাসের তৃতীয় সপ্তাহে গার্ডেনরিচ কাণ্ড ঘটার ঠিক পরেই মমতা স্বয়ং এলাকায় গিয়েছিলেন এবং হাসপাতালে গিয়ে আহতদের সঙ্গে দেখা করেন। কিন্তু সংবাদমাধ্যমকে যা বলেন তাতে ববি হাকিমকে আড়াল করার কোনো চেষ্টা ছিল না। তৃণমূলের দু নম্বর নেতা অভিষেক তো আদৌ ওমুখো হননি। গোটা রাজ্যের সংবাদমাধ্যম এবং বিরোধীরা যখন বেআইনি নির্মাণ নিয়ে ববিকে সঙ্গত কারণেই অভিযুক্ত করছেন, তখন তৃণমূল যেভাবে অনুব্রত বা শাহজাহানের মত জেলা স্তরের নেতার ঢাল হয়ে দাঁড়িয়েছিল, সেভাবে ববির পাশে দাঁড়ায়নি। টিভি স্টুডিওতেও তৃণমূলের মুখপাত্ররা কেবল বনলতা সেনগিরি করছিলেন। অর্থাৎ বামফ্রন্ট আমলেও বেআইনি নির্মাণ হত এবং ভেঙে পড়ত (শিবালিক অ্যাপার্টমেন্টের বারংবার উল্লেখ সমেত) – এই ছিল তাঁদের সার কথা। ববি নিজে আবার ব্যস্ত ছিলেন স্থানীয় কাউন্সিলরকে বাঁচাতে। তা করতে গিয়ে কর্পোরেশনের ইঞ্জিনিয়ারদের ঘাড়ে পর্যন্ত দোষ চাপিয়েছেন। কিন্তু দলের সর্বোচ্চ নেতৃত্ব নীরব ছিলেন। তেরোজন মানুষের মৃত্যুর পরেও এই নীরবতার একটা ব্যাখ্যা অবশ্যই বিষয়টাকে যথেষ্ট গুরুত্ব না দেওয়া। কিন্তু অন্য দিক থেকে ভাবলে, দলের অতি গুরুত্বপূর্ণ একজন নেতা প্যাঁচে পড়েছেন দেখেও তাঁর পক্ষ নিয়ে সোচ্চার না হওয়ার ব্যাখ্যা কী? একটা ব্যাখ্যা অবশ্যই পার্থ আর ববির মিল থেকে পাওয়া যায়। লুকিয়ে চুরিয়ে নয়, প্রকাশ্যেই তৃণমূলের প্রবীণদের সঙ্গে অভিষেকের নেতৃত্বাধীন নবীনদের সংঘাত হয়েছিল গতবছর। পার্থ, ববি দুজনেই প্রবীণ শিবিরের লোক – অভিষেকের অপছন্দের লোক। সেই সংঘাতে প্রবীণদের একেবারে সামনের সারিতে ছিলেন ববি। অভিজ্ঞ রাজনৈতিক বিশ্লেষক হওয়ার প্রয়োজন নেই, পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতির উপর নজর রাখা যে কোনো মানুষ জানেন শাসক দলে এখন অভিষেকের অনুগামীদের পাল্লা ভারি। এতটাই ভারি যে আরেকটু হলে প্রবীণ সাংসদ সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়ের টিকিট ফস্কে যাচ্ছিল। স্বভাবতই পার্থর মত, কোণঠাসা ববির পাশেও দল দাঁড়ায়নি।

কেউ বলতেই পারেন, তাঁকে তো মেয়র পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়নি। তেমন দাবিকে পাত্তাও দেওয়া হয়নি। তাহলে দল পাশে দাঁড়ায়নি কী করে বলা যায়? প্রশ্নটা খুব বুদ্ধিমানের মত হবে না। কারণ একটা বেআইনি ফ্ল্যাটবাড়ি ভেঙে পড়েছে বলে মেয়রকে বরখাস্ত করলে প্যান্ডোরার বাক্স খুলে যেত লোকসভা নির্বাচনের মুখে। প্রথমত, বিরোধীদের কর্পোরেশনের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ স্বীকৃতি পেয়ে যেত। দ্বিতীয়ত, শিশুরাও জানে যে সত্যি সত্যি একা ববির অঙ্গুলিহেলনে কলকাতায় বেআইনি নির্মাণ, পুকুর ভরাট করে ফ্ল্যাট তৈরি ইত্যাদি চলে না। তিনি বড়জোর তাঁর দুটো বড় বড় পদাধিকার বলে ব্যাপারটায় পৌরোহিত্য করেন। সুতরাং এই সময়ে চটালে তিনি রেগেমেগে মুখ খুলে ফেলতে পারতেন, তাতে তৃণমূলের বিপদ বাড়ত বই কমত না। উপরন্তু তাঁকে ঘিরে যে চক্র, যাকে সংবাদমাধ্যমের মান্য ভাষায় বলা যায় ‘ইলেকশন মেশিনারি’, তাও তৃণমূলের হাত থেকে পিছলে যেতে পারত। গোটা রাজ্যের বেআইনি প্রোমোটিং ব্যবসায়ীদের কাছে যে বার্তা যেত সেকথা না হয় ছেড়েই দেওয়া গেল। ভোটের বাজারে টাকার জোগানের কী হত সেকথাও না হয় থাক। নির্বাচনী বন্ড তো হিমশৈলের চূড়া মাত্র। অভিষেকের ববিকে যতই অপছন্দ হোক, দলের নির্বাচনী স্বার্থ ক্ষুণ্ণ করে লবিবাজি করার মত বোকা রাজনীতিবিদ অবশ্যই মমতার ভাইপো নন। ফলে ওটাকে পাশে দাঁড়ানো বলে মনে করার কোনো কারণ নেই। পাশে দাঁড়ানো মানে সর্বোচ্চ নেতৃত্বের পক্ষ থেকে বিরোধীদের এবং জনগণকে প্রকাশ্য বার্তা দেওয়া, যে যাকে আক্রমণ করা হচ্ছে আমরা তার পাশে আছি। অনুব্রতদের ক্ষেত্রে বারবার যা করা হয়।

ববির ক্ষেত্রে তা না করা কি শুধুই দলীয় অন্তর্দ্বন্দ্বের কারণে? সেই প্রশ্নটাই আরেকটু তলিয়ে দেখা যাক। কেবল তৃণমূল নয়, গার্ডেনরিচ কাণ্ড নিয়ে বাংলার সংবাদমাধ্যম আর বিরোধী দলগুলোর প্রতিক্রিয়া নিয়েও আরেকটু কাটাছেঁড়া করা যাক। কারণ আজকের ভারতে প্রায় কোনোকিছুই কোনো লুকনো এজেন্ডা ছাড়া করা হচ্ছে না। তাই এখন ‘সকলেই আড়চোখে সকলকে দেখে’। না দেখে উপায় নেই।

গার্ডেনরিচ ছাড়া যখন বাংলা সংবাদমাধ্যমে আর কোনো খবর ছিল না, সেইসময় একদিন এবিপি আনন্দের সান্ধ্য জটলায় তৃণমূল প্রতিনিধির বনলতা সেনগিরির জবাবে সিপিএম প্রতিনিধি শতরূপ ঘোষ বলেন, যে বামফ্রন্ট আমলেও কলকাতায় বেআইনি নির্মাণ হয়েছে – একথা বলে তৃণমূল পার পেতে পারে না। কারণ সে আমলেও দীর্ঘদিন কলকাতা কর্পোরেশন তৃণমূল চালিত ছিল। উপরন্তু ২০১০ সাল থেকে টানা ১৪ বছর তৃণমূলই কর্পোরেশন চালিয়েছে। মজার ব্যাপার ঘটে এরপর। সঞ্চালক সুমন দে শতরূপকে সমর্থন করলেন, কিন্তু সেই সূত্রে তৃণমূলের আর যে নেতারা কলকাতার মেয়র ছিলেন – সুব্রত মুখার্জি বা শোভন চট্টোপাধ্যায় – তাঁদের আমলে বেআইনি নির্মাণ কতটা কী হয়েছিল সেসব তথ্য তুলে ধরলেন না। ইদানীং প্রায় সব বাংলা খবরের চ্যানেলেই কথায় কথায় রবীন্দ্রনাথের কবিতার লাইন, নজরুল বা সুকুমার রায়ের কবিতার লাগসই লাইন উদ্ধৃত করে রসবোধের পরিচয় দেন অতি বুদ্ধিমান সঞ্চালকরা। সুদূর অতীতের নানা তথ্যও তাঁদের হাতের কাছে সাজিয়ে দেয় রিসার্চ টিম। অথচ আগের দুই মেয়রের আমলে কী অবস্থা ছিল কলকাতার প্রোমোটিংয়ের – প্রায় দু সপ্তাহের বিতর্কে কোনো কাগজে বা টিভি চ্যানেলে এ নিয়ে একটি শব্দও দেখা গেল না। আশ্চর্য নয়? না সাংবাদিক, না বিরোধী দলের প্রতিনিধিরা – কেউই ওসবের মধ্যে গেলেন না। পূর্ব কলকাতার জগদ্বিখ্যাত জলাভূমির কীভাবে বারোটা বাজানো হয়েছে সে আলোচনা রোজ হয়েছে। অথচ এমনভাবে আলোচনা হয়েছে যেন সবটাই ঘটেছে বর্তমান মেয়রের আমলে। ‘জল শোভন’ বলে পরিচিত পূর্বতন মেয়রকে সবাই যেন ভুলে গেছে। অথচ তাঁর বিবাহ বহির্ভূত প্রেম নিয়ে এই সংবাদমাধ্যমই ঘন্টার পর ঘন্টা খরচ করেছে অনতি অতীতে। তিনি কি সমালোচনার ঊর্ধ্বে চলে গেছেন বিজেপিতে চলে যাওয়ায়? কদিন আগে আবার তৃণমূলে ফিরেছিলেন না? পশ্চিমবঙ্গ অবশ্য অধুনা গেছোদাদাদের রাজ্য। কে যে কখন কোথায় আছেন বলা ঝুঁকিপূর্ণ। গুগলও সবসময় সঠিক তথ্য দিতে পারে না।

মোট কথা ববি কতটা দুর্নীতিগ্রস্ত, মেয়রের পদে থাকার পক্ষে তিনি কতটা অযোগ্য তা প্রমাণ করতে বিরোধী দলের প্রতিনিধিরা এবং সঞ্চালকরা চিত্তরঞ্জন দাশ, সুভাষচন্দ্র বসু পর্যন্ত চলে গেলেন আর সাম্প্রতিককালের মেয়রদের কথা মনে পড়ল না – এ তো বড় রঙ্গ। এমন রঙ্গ কেন হল তা পরিষ্কার হতে অবশ্য সময় লাগেনি। মনে রাখতে হবে, গার্ডেনরিচের ঘটনা ঘটার আগে বাংলার রাজনীতির কেন্দ্রীয় বিষয় হয়ে উঠেছিল সন্দেশখালি। সেখানে মূল অভিযুক্তের নাম শাহজাহান শেখ আর তার ভাইয়ের নাম আলমগীর। ফলে বিজেপি এবং রিপাবলিক বাংলার মত গর্বিত গোদি মিডিয়া যথেচ্ছ মুসলমানবিদ্বেষ ছড়িয়ে চলেছিল। ইতিহাসের কুখ্যাত লম্পটদের ধারা ভেঙে নিজের সম্প্রদায়ের মেয়েদের মায়ের চোখে দেখে, কেবলমাত্র হিন্দু মহিলাদের দিকেই হাত বাড়াত সন্দেশখালির তৃণমূলী দুষ্কৃতীরা – এই বয়ান ছড়িয়ে পড়েছিল। অগ্রাহ্য করা হচ্ছিল এই তথ্য, যে শাহজাহানের ডান হাত, বাঁ হাত দুজনেই হিন্দু – শিবু হাজরা আর উত্তম সর্দার।

ইতিমধ্যে গার্ডেনরিচে বেআইনি ফ্ল্যাটবাড়ি ভেঙে পড়ে মানুষের মৃত্যু। যারা গোদি মিডিয়া বলে পরিচিত নয়, তাদেরও মুখোশের আড়াল থেকে মুখ বেরিয়ে এল। সমস্ত আলোচনাই এমনভাবে হতে থাকল, যেন গোটা পশ্চিমবঙ্গে বা গোটা কলকাতায় একমাত্র গার্ডেনরিচেই ফ্ল্যাটের গায়ে ফ্ল্যাট লেগেছে। একমাত্র ওই এলাকার বাসিন্দারাই জেনে বুঝে পুকুর বোজানো জমিতে তৈরি হওয়া ফ্ল্যাট কেনেন, দুটো বাড়ির মাঝে যথেষ্ট জায়গা ছাড়া আছে কিনা সেসব দেখেন না। কেবল ওই এলাকার প্রোমোটাররাই যাবতীয় আইন ভাঙেন। কেন? সেকথা একদিন এক অধ্যাপক (যিনি ইদানীং রাজনৈতিক দলের মুখপাত্রদের থেকেও বেশি চেঁচামেচি করেন) বলেই দিলেন একটি চ্যানেলের অনুষ্ঠানে। বললেন, একটি বিশেষ সম্প্রদায়ের লোককে তোষণ করার জন্যে গার্ডেনরিচে যে যা খুশি আইন ভাঙলেও প্রশাসন কিচ্ছুটি বলে না। বিজেপির প্রতিনিধি দূরের কথা, স্টুডিওতে উপস্থিত বাম বা কংগ্রেস প্রতিনিধিও কথাটার প্রতিবাদ করলেন না। সুটবুট পরা বাবু সুমন দে তো বেশ জোরে জোরেই মাথা ঝাঁকালেন।

ঠিক কথা। আমরা তো জানি যে অমৃতকালের ভারতবর্ষের গার্ডেনরিচ এক ভয়ংকর অঞ্চল। সেখানে সংখ্যাগরিষ্ঠ হলেন মুসলমান সম্প্রদায়ের মানুষ। তাঁদের প্রশাসন, আইন, আদালত সকলেই হিন্দুদের চেয়ে বেশি ভালবাসে। তাই ওই সম্প্রদায়ের লোকেদের মধ্যে উচ্চশিক্ষিতের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। অধ্যাপক, ব্যারিস্টার, পুলিসকর্তা, সেনাবাহিনীর অফিসার একেবারে গিজগিজ করছে। ওঁরাই তো দেশটা চালান আর কলকাতা তো চালান বটেই। কারণ কলকাতার মেয়র স্বয়ং ওই সম্প্রদায়ের লোক, ওই এলাকারই বিধায়ক। সেই মেয়রের এত ক্ষমতা যে মুখ্যমন্ত্রী মেয়র ঘোষিত নতুন পার্কিং ফি বাতিল করে দিতে পারেন। সেকথা আবার সাংবাদিক সম্মেলন করে জানান দলের মুখপাত্র কুণাল ঘোষ, যিনি সরকার বা কর্পোরেশনের কেউ নন। কর্পোরেশনের সিদ্ধান্ত বাতিল করার সাংবিধানিক এক্তিয়ার মুখ্যমন্ত্রীর আছে কিনা সে প্রশ্নও কেউ তোলে না। মেয়রকে ঢোঁক গিলে মুখ্যমন্ত্রীর সিদ্ধান্ত হজম করতে হয়।

যা-ই হোক, এভাবে ভালই চলছিল। খবরের কাগজ এবং সোশাল মিডিয়ার দৌলতে সকলের ঠোঁটস্থ হয়ে গিয়েছিল গার্ডেনরিচ এলাকায় ঠিক কতগুলো পুকুর বোজানো হয়েছে, কতগুলো ফ্ল্যাট কত ইঞ্চি ফাঁকের মধ্যে সেঁধিয়ে গেছে। এসব প্রকাশিত হওয়ায় গোটা রাজ্যের অসাধু প্রোমোটার এবং তাদের সঙ্গে শাসক দলের যোগসাজশ নিয়ে যেরকম অন্তর্তদন্ত হওয়া উচিত ছিল, তা কিন্তু হচ্ছিল না। বিরোধীরাও সে উৎসাহ দেখাচ্ছিলেন না। শুধু সন্ধে নামলেই বিষোদ্গার হচ্ছিল, কলকাতার সমস্ত বেআইনি নির্মাণ কেন ভেঙে ফেলা হচ্ছে না। তারপর এল সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। গার্ডেনরিচ এলাকাতেই একটি বেআইনি নির্মাণ ভাঙতে গিয়ে বিরাট বাধার মুখে পড়লেন কর্পোরেশনের কর্মীরা এবং পুলিসবাহিনী। টিভির পর্দায় দেখানো হল, শেষপর্যন্ত সে বাড়ি না ভেঙেই তাঁদের ফিরে আসতে হচ্ছে। বড় বড় চোখে সুমন দে ও তাঁর অতিথিরা বিস্ময় প্রকাশ করলেন – কলকাতার এ কী ভয়ঙ্কর অবস্থা! মজার কথা, পর্দায় পরিষ্কার দেখানো হল, যিনি ভাঙতে না দেওয়ার পান্ডা, তিনি কর্পোরেশনের কর্মীদের কাছে দাবি করলেন ওই নির্মাণ অবৈধ নয়। তাঁর কাছে বৈধ কাগজপত্র আছে। কিন্তু সে কাগজ দেখালেন না। অথচ সংবাদমাধ্যমের প্রতিনিধিদের বললেন, তাঁদের ফ্ল্যাট ভেঙে দেওয়া হচ্ছে কারণ তিনি বিজেপি করেন। মেয়রের বাইটও দেখানো হল। তিনি বললেন, বেআইনি নির্মাণ ভেঙে দেব বললেই ভাঙা যায় না। অনেক সমস্যা আছে। তার একটা ঝলকই আজ দেখা গেছে। তারপরে স্টুডিওতে কর্পোরেশনের এবং মেয়রের অনেক সমালোচনা হল, কিন্তু দুঁদে সাংবাদিক সুমন দে বিজেপির প্রতিনিধিকে একবারও জিজ্ঞেস করলেন না, কী মশাই? আপনাদের লোকই তো বেআইনি নির্মাণ ভাঙতে দিচ্ছে না দেখা যাচ্ছে। এবার কী বলবেন? জানা কথা, বিজেপির প্রতিনিধি হয় ওই লোকটিকে বিজেপির প্রতিনিধি বলে স্বীকার করতেন না, নয়ত বলতেন ব্যাপারটা তো এখন আদালতের বিচারাধীন। দেখতে হবে পৌরসভা আসল দোষীদের বাড়ি বাঁচিয়ে নির্দোষ লোকের বাড়ি ভাঙছে কিনা। কিন্তু প্রশ্নটা কি সম্পাদকমশায়ের করা উচিত ছিল না? রিপাবলিক টিভির মত গর্বিত গোদি মিডিয়ার পাশে আনন্দবাজার গোষ্ঠী তো এখনো নিরপেক্ষ বলে পরিচিত। তারাও যে হাতে প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও বিজেপির প্রতিনিধিকে ছাড় দিয়ে দিল গার্ডেনরিচ কাণ্ডে, তাতে একটা জিনিসই প্রমাণ হয়।

আরও পড়ুন বাধ্যতামূলক মহানতার একাকিত্বে ইমাম রশিদি

গার্ডেনরিচ মুসলমানদের এলাকা। অতএব ওখানে কাউন্সিলর, প্রোমোটার মায় বাড়ি চাপা পড়ে মারা যাওয়া মানুষগুলো, সকলেই দুর্নীতিগ্রস্ত – এই ধারণা গেড়ে বসেছে সংবাদমাধ্যমের মনে। হয়ত আগে থেকেই বসেছিল, এখন সাহস পেয়ে প্রকাশ করা হচ্ছে। সব ব্যাটাকে ছেড়ে বেঁড়ে ব্যাটাকে ধরার মত ববি হাকিমকে আক্রমণও সেই কারণেই। স্টুডিওর জটলায় এ প্রশ্নও উঠেছে যে একই লোকের হাতে তিনটে পদ কেন? অথচ শোভন চাটুজ্জে মেয়র থাকার সময়ে এবং পরবর্তীকালে তাঁর মেয়র পদ নিয়ে যখন টানাপোড়েন চলছিল, তখন কেউ প্রশ্ন তোলেনি – উনি একইসঙ্গে বেহালার বিধায়ক আর কর্পোরেশনের মেয়র কেন? তাঁকে মেয়রের পদ থেকে সরিয়ে দেওয়ার পরেও বাংলার এই সংবাদমাধ্যমগুলোই গদগদ ছিল তাঁর আর প্রেমিকা বৈশাখী বন্দ্যোপাধ্যায়ের নাচগান, কাশ্মীর ভ্রমণ দেখাতে। দুর্নীতি নিয়ে এত আলোচনা হয়, অথচ তখন শোভনের বিপুল সম্পত্তি নিয়েও কোনো প্রশ্ন তোলা হয়নি।

আসলে বাঙালি ভদ্রলোকদের মধ্যে গার্ডেনরিচ আর রাজাবাজারকে জনান্তিকে শাসনের অযোগ্য এলাকা বলা বহুদিন ধরেই চালু। ইদানীং হিন্দুত্বের হাওয়া খেয়ে ফুরফুরে মেজাজে সেসব প্রকাশ্যে বলা আরম্ভ হয়েছে। এমন নয় যে একা সুমন দে বা আনন্দবাজার গোষ্ঠী এই দোষে দুষ্ট। ভোটের বাজারে ফ্যাসিবিরোধী সভা সমাবেশে বক্তৃতা দিয়ে বেড়ানো এক সাংবাদিক যেমন কদিন আগে এক অনলাইন বিতর্কে বললেন, রাজাবাজারের অটোওলাদের দৌরাত্ম্যের কারণেই নাকি হিন্দুদের মনে মুসলমানদের প্রতি বিতৃষ্ণা তৈরি হয় এবং বিজেপির কাজ সহজ হয়। অর্থাৎ গোটা রাজ্যের অন্য সব এলাকার হিন্দু অটোওলারা সুবোধ বালক। একমাত্র রাজাবাজারের মুসলমান অটোওলারাই ভীষণ দৌরাত্ম্য চালায় আরোহীদের উপর। ঠিক যেমন গোটা রাজ্যে আর কোথাও জলা জায়গা ভরাট করে বহুতল তৈরি হচ্ছে না, দুটো বাড়ির মধ্যে যতখানি ফাঁক থাকা উচিত তা অগ্রাহ্য করে ফ্ল্যাটবাড়ি তৈরি হচ্ছে না, যেখানে তিনতলা বানানোর অনুমতি আছে সেখানে পাঁচতলা তুলে ফেলা হচ্ছে না। যত কাণ্ড গার্ডেনরিচে।

বহুল প্রচারিত সংবাদমাধ্যম এবং প্রগতিশীল বলে পরিচিত সাংবাদিক, অধ্যাপকরাও যখন এই বয়ান প্রচার করেন আর বিজেপিবিরোধী রাজনৈতিক দলের মুখপাত্ররাও চুপচাপ বসে শোনেন, সজোরে প্রতিবাদ করেন না – তখন বোঝা যায় পশ্চিমবঙ্গে হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির শিকড় গভীরে চারিয়ে গেছে। ২০২১ বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপি শেষমেশ একশো আসনও পেল না দেখে যাঁরা উদ্বাহু নৃত্য করেছিলেন ধর্মনিরপেক্ষতা জিতে গেল বলে, তাঁরা দিবাস্বপ্নে মগ্ন ছিলেন। আসন্ন ভোটের ফল যা-ই হোক, পশ্চিমবঙ্গের এটাই বাস্তবতা। তাই বোধহয় তৃণমূলের শীর্ষ নেতৃত্বও ভোটের মুখে ববির পক্ষ নিয়ে বেশি কথাবার্তা বলে সংখ্যাগুরু ভোটারদের চক্ষুশূল হতে চাইলেন না। স্বঘোষিত প্রগতিশীলদের শত বুকনি সত্ত্বেও পশ্চিমবঙ্গ তামিলনাড়ু নয়, যেখানে বিজেপির এক নম্বর নেতা কে আন্নামালাইকেও বলতে হয় – আমাদের এখানকার ভোটে ইস্যু উন্নয়ন আর দুর্নীতি। হিন্দুত্ব নয়।

নাগরিক ডট নেটে প্রকাশিত

পঞ্চায়েত নির্বাচন: আমাকে ভাবায় শাহরুখ আর সুকুমার রায়

এমনি এমনি কি আর কবীর সুমন সুকুমারকে প্রফেট বলেছেন? তিনি লাগসই করে সবই লিখে রেখে গেছেন, এক-আধটা শব্দ এদিক ওদিক করে দিলেই আজকের জন্যে আর নতুন করে কবিতা লিখতে হয় না।

পশ্চিমবঙ্গে আমার মত ভদ্রলোকেদের কাজ হচ্ছে ভোটের দিন মারামারি খুনোখুনি হলে “কোথায় চলেছি আমরা!”, “এই হিংসার কি কোনো শেষ নেই?”, “এই মৃত্যুগুলোর দায়িত্ব সব দলকে নিতে হবে”, “এতগুলো মায়ের কোল খালি হয়ে যাওয়ার দায়িত্ব নেবে কে?”, “এভাবে ভোট করার কী দরকার?”, “দলহীন পঞ্চায়েত ব্যবস্থা চালু করা উচিত”, “আর কোনো রাজ্যে এভাবে ভোট হয় না। দেশের কাছে পশ্চিমবঙ্গের মাথা হেঁট হয়ে গেল” ইত্যাদি বিশুদ্ধ বাংলা বাক্য ব্যবহার করা। শেক্সপিয়র আর শঙ্খ ঘোষ উদ্ধৃত করা। সম্পূর্ণ ভদ্রলোকচালিত বাংলার সংবাদমাধ্যম স্বভাবতই একই কাজ করে। কিন্তু ভোটের ফল বেরিয়ে গেলেই আমাদের বাংলার শব্দভাণ্ডার নেহাত অপর্যাপ্ত বোধ হয়। তখন আমাদের ছেলেবেলার আমীর খানের হিট ছবির শরণ নিতে হয় – জো জিতা উয়ো হি সিকন্দর। এমনটাই চিরকাল দেখে আসছি। তবে এবার ভোটগণনার দিনে যা দেখলাম, তাতে বিনীতভাবে সকলকে অনুরোধ করছি, নিজেদের একটু আপডেট করুন।

আমীর ইতিমধ্যে বুড়িয়ে গেছেন। পুরনো লোকেরা এখনো গল্প শোনান, বাহাত্তরের ভোট কীরকম ভয়ঙ্কর হয়েছিল। অর্ধশতাব্দী পেরিয়ে গেল সদ্য, এখনো অত পুরনো কাসুন্দি ঘাঁটলে হবে? বাঙালিদের অতীতচারী জাতি হিসাবে বিস্তর বদনাম। সে বদনাম ঘোচানোর সুযোগ এবারের নির্বাচন পর্ব আমাদের দিয়েছে। এবারের ভোটের ফলকে বর্ণনা করুন বাজিগর ছবির সেই বিখ্যাত সংলাপ দিয়ে “হার কর জিতনেওয়ালে কো বাজিগর কহতে হ্যাঁয়।” রাজ্যের প্রাক্তন ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসাডর শাহরুখ খানের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে দেখুন চারদিকে বাজিগরের ছড়াছড়ি। বিরোধী দলের প্রার্থীরা জিতেও হেরে যাচ্ছেন, শাসক দলের প্রার্থীরা হেরেও জিতে যাচ্ছেন। টিভি খুলে চ্যানেল ঘুরিয়ে গেলে দেখা যাচ্ছে কোথাও জয়ী প্রার্থী জয়ের শংসাপত্র নিতে গেলে তাঁকে বলা হচ্ছে “আপনি তো হেরে গেছেন”; কোথাও আবার শাসক দলের প্রার্থী হেরে যাচ্ছেন দেখে তাঁর এজেন্ট গণনাকেন্দ্র থেকে ব্যালট তুলে নিয়ে সোজা চম্পট দিচ্ছেন। কোথাও আবার কয়েক ভোটে হেরে যাওয়া প্রার্থী বিপক্ষের ভোট পাওয়া কিছু ব্যালট তুলে নিয়ে কচমচিয়ে খেয়ে ফেলে ফের গণনা করাচ্ছেন। গণনার তত্ত্বাবধানে থাকা আধিকারিকরা সে গণনা হতেও দিচ্ছেন, তারপর জেতা প্রার্থী হেরে যাচ্ছেন, হারা প্রার্থী জিতে যাচ্ছেন। কোথাও আবার বিরোধীদের ভোট পাওয়া ব্যালটের ডানা গজাচ্ছে। তারা জানলা দিয়ে গণনাকেন্দ্রের বাইরে এসে পড়ে এদিকে ওদিকে নালা নর্দমায় ভিড় জমাচ্ছে। পশ্চিমবঙ্গের বিরোধী দলগুলো যে একেবারে রুচিহীন এবং তাদের যারা ভোট দেয় তারাও যে রুচিহীন তার এর চেয়ে বড় প্রমাণ হয় না। উড়ে গিয়ে জুড়ে বসার কি আর জায়গা নেই? নর্দমায় বসতে হবে? এর প্রতিবাদে কোনো শিল্পীর একটা কাক সিরিজ আঁকা উচিত, যেখানে দেখা যাবে কাকেরা ব্যালট খেয়ে পরিবেশ পরিষ্কার রাখছে।

খাওয়া বলতে মনে পড়ল। সুকুমার রায় ‘খাই খাই’ বলে অত লম্বা একখানা কবিতা লিখলেন, তাতে নানাবিধ খাওয়ার মধ্যে যুদ্ধে যে গুলি খায় তার কথা পর্যন্ত লিখলেন, ব্যালট খাওয়ার কথাটাই লিখলেন না? তাঁর সময়ে কি ব্যালট খাওয়া চালু ছিল না? সত্যজিৎ রায় ধরণীর বাসিন্দা সুকুমারের পৌত্র সন্দীপের থেকে এ বিষয়ে অবিলম্বে বাইট নেওয়া উচিত কোনো চ্যানেলের। সুকুমার যদি নাও লিখে থাকেন, অবিলম্বে সম্পাদনা করে ব্যাপারটা ঢুকিয়ে দেওয়া উচিত। উন্নয়নের ধাক্কায় ইতিহাস বদলে যেতে পারে, দক্ষিণেশ্বর মন্দিরের রাশ রানি রাসমণির হাত থেকে বেরিয়ে যেতে পারে, আর কবিতার কটা লাইন বদলাতে পারে না? আমাদের কবি মুখ্যমন্ত্রীর অনুপ্রেরণায় লিখে দিলেই হয়

খাই খাই কর কেন, এস বস আহারে –
খাওয়াব ব্যালট খাওয়া, ভোট কয় যাহারে।

এমনি এমনি কি আর কবীর সুমন সুকুমারকে প্রফেট বলেছেন? তিনি লাগসই করে সবই লিখে রেখে গেছেন, এক-আধটা শব্দ এদিক ওদিক করে দিলেই আজকের জন্যে আর নতুন করে কবিতা লিখতে হয় না। এই সুবিধাটা আজকের সদাব্যস্ত কবিরা কেন নেন না বুঝি না। তাঁরা তো সুকুমারের মত নিষ্কর্মা নন, তাঁদের তো অনেক দায়িত্ব। এই কমিটি সেই কমিটির দায়িত্ব সামলানো, নতুন নতুন পুরস্কার তৈরি করা, সিনেমার গান লেখা, সিনেমায় অভিনয় করা, সিনেমা বানানো, সকালে ঘুম থেকে উঠে ফেসবুকে কোন ঘটনাটা (অবশ্যই ‘অরাজনৈতিক’ ঘটনা) ট্রেন্ডিং তা খেয়াল করে সেই নিয়ে পোস্ট করা, প্রয়াত বিখ্যাতদের কবে কার জন্মদিন আর কে কবে মারা গেলেন সেসব খেয়াল রাখা – এতসব কাজ করে নতুন কবিতা লেখা কি কম ঝক্কির? তার চেয়ে সুকুমারকে ব্যবহার করলেই হয়। না, এতে আমার কোনো স্বার্থ নেই। কবিতা এবং কবিরা আমার খুব পছন্দের, অনেক বাঙালিরই পছন্দের। ছোটবেলায় কবি হতে চায়নি এমন ভদ্রলোক বাঙালি কজনই বা আছে? তাই কবিদের ভার লাঘব করতে পারলে নিজেকে কৃতার্থ মনে করব। সেই উদ্দেশ্যে বললাম আর কি।

আরও পড়ুন পশ্চিমবঙ্গে নির্বাচন প্রহসনে পরিণত হলে ক্ষতি নেই বিজেপির

এমনিতে আর পাঁচজন ভদ্রলোকের মত আমিও নেহাতই ছাপোষা নিরীহ লোক। আমিও উন্নয়নের পক্ষে। আমার মোটা চশমা দেখে কেউ কেউ ভুল করে মাস্টারমশাই বলে বটে, কিন্তু আমি তো আর সত্যি সত্যি মাস্টারমশাই নই। সুতরাং আমাকে কারোর বলে দিতে হবে না “আপনি কিন্তু কিছুই দেখেননি, মাস্টারমশাই।” আমি এমনিতেই চারপাশে যা হয় তার অনেককিছু দেখতে পাই না। চোখের পাতা আছে বন্ধ করার জন্যে, নইলে তো সৃষ্টিকর্তা ও জিনিসটা মানুষকে দিতেনই না। আমি সেটার পূর্ণ সদ্ব্যবহার করে থাকি। তবে কিনা ভোটে রিগিং-টিগিং হলে চোখ বন্ধ করে নেওয়ার অভ্যাস ছিল, গণনার দিনও যে অনেককিছু দেখতে নেই সেটা জানা হয়নি এই ধেড়ে বয়সেও। তাই কিছু কিছু জিনিস চোখে পড়ে গেছে। সে কি আর আমার দোষ? সে হল চোখের দোষ। অন্যের চোখ হলে গেলে দিতাম একেবারে। উন্নয়ন না দেখে কেবল শকুনের মত ভাগাড় দেখা! অমন চোখ থাকার থেকে না থাকা ভাল।

একটাই অসুবিধা। হচ্ছে কী, এত আবর্জনা জমে গিয়ে এত বড় এলাকা জুড়ে গেছে যে উঁচু করে ফেন্সিং দিলেও চোখে পড়ে যাচ্ছে। কেউ কিছু মনে করবেন না। সবটাই অভ্যাসের ব্যাপার। এও ঠিক অভ্যাস হয়ে যাবে। লেখাপড়া জানা ভদ্রলোক বলে কথা, আমাকে জব্দ করা অত সোজা নয়। অভ্যাস করে উঠতে পারে না গণ্ডগ্রামের অশিক্ষিত লোকগুলো, তাই তারা লড়ালড়ি করতে গিয়ে মরে। বাড়িতে চোর ঢুকলে চেঁচামেচি না করে ঘুমের ভান করে পড়ে থাকাই যে সঠিক পথ সেটা ওই গোঁয়ারদের বোঝাবে কে? যা নিবি নিয়ে যা বাপু, মারামারিতে কাজ নেই। কারণ যুগ যতই বদলাক, সার কথাটি বদলায় না। সেটি কিন্তু ওই “জো জিতা উয়ো হি সিকন্দর”।

নাগরিক ডট নেটে প্রকাশিত

হাসছি মোরা হাসছি দেখো: বীর দাসের বীরত্বে দুই ভারতের পর্দা ফাঁস

দুটো ভারতের কথাই বিদূষক বীর দাস মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কেনেডি সেন্টারে দাঁড়িয়ে হলভর্তি দর্শকের সামনে বলেছেন। বস্তুত, তিনি কোনো রসিকতা করেননি। কোনো চুটকি বলেননি। কেবল ভারতে ঘটে যাওয়া কতকগুলো ঘটনা পরপর আউড়ে গেছেন। তাতেই এক ভারত এফআইআর করে ফেলেছে, অন্য ভারত উঠে দাঁড়িয়ে হাততালি দিচ্ছে।

কিসে আমাদের হাসি পায়? এ প্রশ্নের উত্তরের মধ্যেই লুকিয়ে আছে আমরা কারা — সে প্রশ্নের উত্তর। হাসি যে এভাবে মানুষ চেনায় তা ২০১৪ পরবর্তী ‘স্বাধীন’ ভারতে বাস না করলে বোধহয় বোঝা হত না। এখন হোয়াটস্যাপ, ফেসবুক, টুইটারে অনবরত হাসির উপাদান আসে। চাইলেই এমন ব্যবস্থা করা সম্ভব যাতে সারাদিন মোবাইলে কেবল চুটকিই আসতে থাকবে। কদিন পরে গুগল যখন বুঝবে আপনি হাসবেন বলেই বাঁচেন, তখন আপনাকে খবর হিসাবেও নানারকম চুটকি, মিম আর হাস্যকর ভিডিও পাঠাতে থাকবে।
 

আমরা সবাই হাসছি, গোটা দেশ হাসছে। সবাই, সবকিছুই হাসির পাত্র। একজন নিরস্ত্র লোককে গুলি করে মেরে ফেলেছে পুলিস, এক উল্লসিত মানুষ লাফিয়ে উঠে তার বুকে লাথি মারছে। তেমন হোয়াটস্যাপ গ্রুপে থাকলে এ নিয়েও একাধিক চুটকি পড়তে পারবেন। একটা মিছিলের লোকেদের পিছন থেকে এসে পিষে দিয়ে চলে গেছে একটা গাড়ি। পিষে যাওয়া লোকগুলোকে নিয়েও কৌতুক করা সম্ভব। তাছাড়া মহিলারা কত বোকা তা নিয়ে, একইসঙ্গে তারা পুরুষদের কেমন দাঁতের উপর রাখে তা নিয়েও অজস্র কৌতুক বিতরণ হয় আজকাল। মুসলমানদের রক্ষণশীলতা, পুরুষদের দাড়ি আর মহিলাদের বোরখা নিয়েও দারুণ বুদ্ধিমান এবং প্রবল শিক্ষিত লোকেরা মাথা খাটিয়ে হাজার হাজার জোক ও মিম তৈরি করছেন। আজকাল হাসির প্রয়োজনীয়তা এত প্রবল, যে নাচগানের অনুষ্ঠানেও লোক না হাসালে টিআরপি পাওয়া যায় না। আর হাসাতে হলে যে জাতিবিদ্বেষপূর্ণ বিদ্রুপ করতেই হবে তা স্বতঃসিদ্ধ। কদিন আগেই নাচের অনুষ্ঠানের এক সঞ্চালক গৌহাটির এক শিশুশিল্পীকে দর্শকদের সামনে হাজির করেছেন “চাইনিজ”, “মোমো”, “চিং চং” বলে। এসব দেখেও আমাদের হাসি পায়। রসিকতাটাকে জাতিবিদ্বেষপূর্ণ বললে আরও বেশি হাসি পায়। কারণ জাতিবিদ্বেষও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা বলে ভাবতে আমরা অভ্যস্ত, যতক্ষণ না বিদ্বেষটা আমাদের জাতির প্রতি ধেয়ে আসে।

কিসে আমাদের হাসি পায় না? এর উত্তরও বলে দেবে আমরা কারা। পেট্রোল, ডিজেলের লাগামছাড়া দাম নিয়ে রসিকতা করলে আমাদের হাসি পায় না। প্রধানমন্ত্রীকে নিয়ে রসিকতা করলে আমাদের হাসি পায় না। দেবদেবীদের নিয়ে, পৌরাণিক চরিত্রদের নিয়ে রসিকতা করলেও আমাদের হাসি পায় না। দেশের দোষত্রুটি, দুর্নীতি নিয়ে রসিকতা করলে আমাদের হাসি পায় না। শুধু হাসি পায় না তা-ই নয়, ওসব নিয়ে রসিকতা করলে আমরা বেজায় চটে যাই। চটে গিয়ে মতপ্রকাশের স্বাধীনতার কথা আর মনে থাকে না। তখুনি আমরা তেড়ে গাল পাড়ি, রসিকতা করা বিদূষক বা কার্টুনিস্টকে পাকিস্তানে চলে যেতে বলি। আমাদের মধ্যে যারা উদ্যোগী, তারা এফআইআর পর্যন্ত করি। কিন্তু এই আমরাই সব নই। আমাদের আরেক দল আছে।

এই আমাদেরও হাসি পায়। আমরা মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে হাসাহাসি করি। ভারত ১৯৪৭ সালে নয়, ২০১৪ সালে স্বাধীন হয়েছে শুনে হাসাহাসি করি। যারা এসব বলে তাদের মধ্যে স্বাধীনতা সংগ্রামীর সংখ্যা যে শূন্য, তা নিয়ে হাসাহাসি করি। প্রধানমন্ত্রীর দাড়ি আর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ভুঁড়ি নিয়ে রসিকতায় হাসি। আমরা লক্ষ্মণের শক্তিশেল পড়ে হাসি, যানে ভি দো ইয়ারোঁ ছবির শেষ দৃশ্য দেখে হেসে গড়িয়ে পড়ি। আর কিসে আমাদের হাসি পায়? প্রধানমন্ত্রী সমেত দেশের সবচেয়ে দায়িত্বপূর্ণ লোকেদের কার্যকলাপ এবং অবলীলাক্রমে দিনকে রাত, রাতকে দিন করার ক্ষমতা দেখে হাসি পায়। পেঁয়াজের দাম এত বাড়ছে কেন জিজ্ঞেস করলে অর্থমন্ত্রী যখন বলেন “আমি পেঁয়াজ খাই না”, তখন আমাদের হাসি পায়। চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য আলেকজান্ডারকে না হওয়া যুদ্ধে হারিয়েছিলেন শুনে আমাদের হাসি পায়। গুজরাটে পথের ধারে আমিষ খাবার বিক্রি করতে দেওয়া হবে না শুনেও হাসি পায়, কারণ আমরা নিরুপায়। আমরা কেবল হাসতে পারি, আর কিছুই করতে পারি না। মানুষ তো কেবল মজা পেয়ে হাসে না, চরম দুর্দশাতেও হাসে। আমাদের এখন সেই অবস্থা। দেশের প্রধান নিরাপত্তা উপদেষ্টা যখন বলেন নাগরিক সমাজের সাথেও লড়তে হবে, তখনো আমাদের হাসি পায়। কিন্তু ভয়ে হেসে উঠতে পারি না। যখন দেশের সেনাবাহিনীর প্রধান গণপিটুনিকে বৈধ ঘোষণা করেন, তখনো হাসতে পারলে আমরা খুশি হতাম। কিন্তু সাহস হয় না, কারণ আমাদের গায়ে ‘দেশদ্রোহী’ ছাপ দিনরাত পড়ে। ‘সন্ত্রাসবাদী’ ছাপ পড়তে কতক্ষণ?

এই দুই আমরা — ভারতের বাসিন্দা। দুটো ভারত। এই দুটো ভারতের কথাই বিদূষক বীর দাস মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কেনেডি সেন্টারে দাঁড়িয়ে হলভর্তি দর্শকের সামনে বলেছেন। বস্তুত, তিনি কোনো রসিকতা করেননি। কোনো চুটকি বলেননি। কেবল ভারতে ঘটে যাওয়া কতকগুলো ঘটনা পরপর আউড়ে গেছেন। তাতেই এক ভারত এফআইআর করে ফেলেছে, অন্য ভারত উঠে দাঁড়িয়ে হাততালি দিচ্ছে। কারণ বীর দাস যে কথাগুলো সহজ ভাষায় বলেছেন, সেগুলো দেশের কোনো বিরোধী নেতা এখন পর্যন্ত বলেননি। প্রথিতযশা সাংবাদিকদের অধিকাংশ হয় মিথ্যে বলার শিল্পে দড় হয়ে উঠেছেন, নয় নিরপেক্ষতার অজুহাতকে ঢাল করে ফেলেছেন। এখনো সত্য খোঁজার, সত্য লেখার, সত্য দেখানোর সাহস যাঁদের আছে তাঁরা সিদ্দিক কাপ্পানের মত কারাগারে পচছেন। অবিনাশ ঝায়ের মত খুন হচ্ছেন। সমৃদ্ধি সকুনিয়া আর স্বর্ণা ঝায়ের মত আটক হচ্ছেন।

হয়ত বীরও কোনোদিন আটক হবেন অথবা তাঁর পেশার বারোটা বাজিয়ে দেওয়া হবে, যেমনটা মুনাওয়ার ফারুকির ক্ষেত্রে করা হল। হয়ত বীর, কুণাল কামরা, বরুণ গ্রোভাররা মুসলমান নন বলেই কিছুটা বেশি সুযোগ পাচ্ছেন। কিন্তু সেই সুযোগের সদ্ব্যবহার করে বীর বুঝিয়ে দিলেন তিনি কোন ভারতের সঙ্গে আছেন। তিনি সার্থকনামা।

আরো পড়ুন বাংলার কূপমণ্ডূক হাসি

আমাদের বাংলায় হবে সেই ছেলে কবে? এখানে আপাতত পদ্মলোচন নামের কানা ছেলেদের ছড়াছড়ি। কেবল অরাজনৈতিক, মোটা দাগের যৌন রসিকতার উদযাপন চলছে। যে দেশের সাংবাদিকরা বিকিয়ে যায় সে দেশ নিশ্চয়ই দুর্ভাগা, কিন্তু যে জাতির বিদূষকরা সুবিধাবাদী — তাদের দুর্দশা আরও বেশি। বাঙালি এখন সেই জাতি। ইন্টারনেট ঘাঁটলেই হিন্দি বলয়ের অনেকের ভিডিও দেখা যায়, যাঁরা বীর বা কুণালদের মত বিখ্যাত না হলেও যোগী আদিত্যনাথের মত ভয়ঙ্কর লোককে নিয়েও রসিকতা করতে ভয় পান না। বাংলায় তেমন কেউ কই? ভাবলে অবাক লাগে, এই ভাষারই একজন কবি লিখেছিলেন সেই পংক্তিগুলো, যা বীরকে ভুল প্রমাণ করতে উঠে পড়ে লাগা ভারতীয়দের মনের ভাব প্রকাশ করেছে নিখুঁতভাবে

অভয় দিচ্ছি, শুনছ না যে? ধরব নাকি ঠ্যাং দুটা?
বসলে তোমার মুণ্ডু চেপে বুঝবে তখন কাণ্ডটা!
আমি আছি, গিন্নি আছেন, আছেন আমার নয় ছেলে —
সবাই মিলে কামড়ে দেব মিথ্যে অমন ভয় পেলে।

নাগরিক ডট নেট ওয়েবসাইটে প্রকাশিত

বাংলার কূপমণ্ডূক হাসি

বাঙালি বিদূষকদের সেই মেধা নেই, সেই সাহস নেই — যা থাকলে ভাঁড় মোসাহেব হয়ে থাকেন না, বিদূষক হয়ে ওঠেন।

দুটো বিপরীতার্থক শব্দ নিয়ে বাঙালির দুই আইকন বিস্তর ভাবনা চিন্তা করেছেন। রবীন্দ্রনাথ “বিশ্বনাগরিক” শব্দটা আমাদের দিয়েছেন, আর সত্যজিৎ রায় তাঁর সারাজীবনের কাজে সিধু জ্যাঠা, প্রফেসর শঙ্কুর মত বিশ্বনাগরিককে আঁকার পর শেষ ছবি ‘আগন্তুক’-এ পর্যটক মনমোহনের মাধ্যমে “কূপমণ্ডূক” হতে বারণ করেছেন। বাঙালি নিজেকে বিশ্বনাগরিক বলে পরিচয় দিতে বিলক্ষণ ভালবাসে। কিন্তু দুঃখের বিষয় যত দিন যাচ্ছে, তার মধ্যে কূপমণ্ডূকতার লক্ষণগুলোই প্রকট হতে দেখা যাচ্ছে। বাঙালির সংস্কৃতি নিয়েও গর্বের শেষ নেই। সংস্কৃতি প্রায় নির্বাচনী ইস্যু হয়ে দাঁড়িয়েছে, অনেকের ধারণা কালচার শব্দটা বাংলাই। সেই কালচারেই আপাদমস্তক কূপমণ্ডূকতা দেখা যাচ্ছে। গোপালকৃষ্ণ গোখেল দেড়শো বছর আগে বলেছিলেন আজ বাংলা যা ভাবে, কাল ভারত তাই ভাবে। তা নিয়ে আমরা আজও গর্ব করি। অথচ এখন শিল্প, সাহিত্য, সিনেমা — সবেতেই ভারত আজ যা ভাবছে, বাংলা আগামী পরশুও ভেবে উঠতে পারবে বলে ভরসা হচ্ছে না।

গুরুগম্ভীর ব্যাপার বাদ দিয়ে হাসি তামাশা নিয়েই আলোচনা করা যাক। হাতে হাতে স্মার্টফোন আর শস্তা ইন্টারনেটের কারণে এখন অ্যামাজন, নেটফ্লিক্সের মত ওটিটি প্ল্যাটফর্ম আর ইউটিউবের রমরমা। এসবে বিনোদন বলতে শুধু সিনেমা আর ওয়েব সিরিজ বোঝায় না, স্ট্যান্ড আপ কমেডিও বোঝায়। মানে একজন শিল্পী মাইক হাতে লোক হাসান। ব্যাপারটা কিছুটা বক্তৃতা, কিছুটা অভিনয়। কিন্তু উদ্দেশ্য লোক হাসানো। সারা পৃথিবীতেই ব্যাপারটা এখন দারুণ জনপ্রিয়। তবে এই স্ট্যান্ড আপ কমেডিয়ানরা শুধু লোক হাসানোয় থেমে নেই। সারা পৃথিবীতে গত কয়েক বছরে গণতন্ত্রের সঙ্কটে এঁরা প্রতিবাদী স্বর। এই বিদূষকদের পিচকিরি থেকে ছুটে আসা রসিকতার রঙে ডোনাল্ড ট্রাম্প, ভ্লাদিমির পুতিন, জেয়ার বলসোনারো, নরেন্দ্র মোদী, অ্যাঞ্জেলা মেরকেল, জাস্টিন ট্রুডো — সকলের কাপড় চোপড় নষ্ট হচ্ছে। ট্রেভর নোয়া, হাসান মিনহাজরা রীতিমত তারকা হয়ে উঠেছেন অল্প সময়েই। ব্রিটিশ কমেডিয়ান জন অলিভার হাসানোর শিল্পকে অন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছেন। তাঁর শো লাস্ট উইক টুনাইট রীতিমত খবরের বুলেটিন। শুধু পরিবেশনের আঙ্গিকে নয়, বিষয় নির্বাচন আর গবেষণার গভীরতাতেও। সারা পৃথিবীর শাসক, ক্ষমতাশালী, অতি ধনীরা তাঁর রসিক বুলেটিনের চাঁদমারি।

ইউরোপ, আমেরিকার বিদূষকদের সুবিধা এই, যে তাঁদের বিরুদ্ধে গণ আক্রমণ বা রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস হয়নি এখনো। ভারতে হয়েছে, হচ্ছে। কুণাল কামরা শো করতে গিয়ে বাধা পেয়েছেন একাধিক জায়গায়, অনলাইন হুমকি তো পেয়েই থাকেন। আরেক বিদূষক বরুণ গ্রোভার তো একটা শোতে হাসতে হাসতে বলেছিলেন “আমাকে অনেকে জিজ্ঞেস করে ‘এত যে হুমকি পান, ভয় করে না?’ আমি বলি আমার আগে তো কামরার নম্বর আছে। ওর ভাল মন্দ কিছু একটা হয়ে যাক, তারপর ভয় পাব।” এসবের ফলে যা হয়েছে, তা হল ভারতে বিদূষকরা হয়ে দাঁড়িয়েছেন প্রতিবাদের মুখ। ক্ষমতা যত টুঁটি টিপে ধরছে, এঁরা তত বেপরোয়া হচ্ছেন। কুণালের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টকে অবমাননার অভিযোগ আনা হয়, তিনি ক্ষমা চাইতে অস্বীকার করেন। তার কয়েক মাস আগেই জনপ্রিয় দক্ষিণপন্থী সংবাদ পরিবেশককে তাঁরই কায়দায় প্রশ্ন করার “অপরাধে” কুণালের বিমানে চড়ার অধিকার কেড়ে নেওয়া হয় ছ মাসের জন্য। তবে সবকিছু ছাপিয়ে গেছে মুনাওয়ার ফারুকির উপর আক্রমণ। শোতে ঢুকে পড়ে তিনি কী বলতে পারেন (বলেননি কিন্তু), তা ধরে নিয়ে গ্রেপ্তারি এবং দিনের পর দিন বিনা জামিনে হাজতবাস করানো হয়েছে দিনের পর দিন। স্বাধীন ভারতে দলীয় রাজনীতির বাইরে থাকা কোন মানুষের সাথে রাষ্ট্রের এরকম ব্যবহার বিরল। কুণাল মুনাওয়ারের পাশে দাঁড়িয়েছেন, আইনি লড়াইয়ে সবরকম সাহায্য করেছেন।

দেশ বিদেশের বিদূষকরা যখন এরকম ধুন্ধুমার কাণ্ড করে বেড়াচ্ছেন, তখন বাংলার বিদূষকদের দেখুন। বিভিন্ন বাংলা চ্যানেলে লাফটার চ্যালেঞ্জ মার্কা একাধিক অনুষ্ঠান দেখা যায়। তার উপর আছে ফেসবুক, ইউটিউব চ্যানেল। এতজন হাস্যরস উৎপাদন করছেন অথচ কারোর রসিকতা কোন নেতা নেত্রী আমলা ব্যবসায়ীর গায়ে লাগছে না। কারণ লোক হাসাতে বাঙালি বিদূষকরা কেবল বেঁটে লোককে বেঁটে, মোটা লোককে মোটা বলছেন আর অতি স্থূল, নারীবিদ্বেষী যৌন রসিকতা করছেন। নিজস্ব কুয়োয় নিরাপদ হাসি চলছে। অথচ এমন নয় যে বাংলার রাজনীতি বৈকাল হ্রদের মত নির্মল আর ডেড সি-র মত শান্ত। গত এক-দেড় দশকে জানা গেছে এখানে একজন রাজনীতিবিদ আছেন, যিনি প্রতিপক্ষকে খুনের হুমকি দেন কারণ তাঁর মস্তিষ্কে ঠিকমত অক্সিজেন যায় না। আরেকজন আছেন, যিনি সাংবাদিকের পশ্চাদ্দেশে পিন ফোটাতে চান। আরো একজন আছেন, যিনি গরুর দুধ থেকে নিষ্কাশন করতে পারেন। অতি সম্প্রতি আবার এক দম্পতিকে পাওয়া গেছে, যাঁদের বৈবাহিক জীবনের সবকিছুই রাজনীতির স্বার্থে প্রকাশ্য। তার উপর আছে দলবদলান্তে ভোল বদল। এক কথায় বাংলার জমি এখন হাসি তামাশার পক্ষে অতি উর্বর। কুণাল কামরার ভাষায় বলতে গেলে “কাঁহা মিলেগা ইতনা কনটেন্ট?” এমনও বলা যায় না যে সাধারণ দর্শক এসব নিয়ে হাসি তামাশা পছন্দ করেন না। হোয়াটস্যাপ, ফেসবুকে তাঁরা বাংলার রাজনীতি নিয়ে অনর্গল রসিকতা করছেন, রসিকতা শেয়ার করছেন। আসলে বাঙালি বিদূষকদের সেই মেধা নেই, সেই সাহস নেই — যা থাকলে ভাঁড় মোসাহেব হয়ে থাকেন না, বিদূষক হয়ে ওঠেন।

আরও পড়ুন হাসছি মোরা হাসছি দেখো: বীর দাসের বীরত্বে দুই ভারতের পর্দা ফাঁস

হাস্যরস উৎপাদনে বাঙালির এই কূপমণ্ডূকতা দ্বিগুণ দুঃখজনক, কারণ উনবিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধে হুতোম প্যাঁচার নকশার প্রবল শ্লেষ থেকে শুরু করে শরচ্চন্দ্র পণ্ডিত, সুকুমার রায়, রাজশেখর বসু হয়ে সদ্য শতবর্ষ পার করা ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়, জহর রায়, রবি ঘোষ যে হাস্যরসের পরম্পরা প্রতিষ্ঠা করেছেন বাঙালির সাহিত্যে, সিনেমায়, মঞ্চে দাঁড়িয়ে হাস্যকৌতুক বলায় — তা কখনো সমকালীন সমাজ, রাজনীতিকে পাশ কাটিয়ে যায়নি। উদাহরণের তালিকা দীর্ঘ না করে শুধু এইটুকু বলা থাক, ভানুবাবুর ‘নবরামায়ণ’ যদি এ যুগে অ্যামাজন বা নেটফ্লিক্সের জন্য তৈরি করা হত, তাহলে ক্ষমতাসীনরা প্রবল তাণ্ডব করতেন। হয়ত ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি থেকে নির্বাসনের ব্যবস্থাও করে দেওয়া হত। উনি অবশ্য পিছু হটতেন বলে মনে হয় না। সে যুগে বামপন্থী সংগঠন করার জন্য টালিগঞ্জে কাজ না পেয়ে ডোন্ট কেয়ার মনোভাব নিয়ে যাত্রা করতে চলে গিয়েছিলেন। এ যুগে হয়ত বলতেন “তগো ইন্ডাস্ট্রি নিয়া তোরা থাক। আমাগো ইউটিউব চ্যানেলে আমি ড্যাং ড্যাং কইরা অভিনয় করুম।”

উত্তরবঙ্গে সংবাদে প্রকাশিত