‘আমার ইচ্ছে করে শূন্যে উঠে মেঘের ওপর দিয়ে হাঁটি’ – বাংলা ছবির গানে এই লাইন লেখা হয়েছিল ৫০ বছরেরও কম সময় আগে। সেই ছবি দর্শক হল ভরিয়ে দেখেছিল, গৌরীপ্রসন্ন মজুমদার রচিত এই গান এবং তার গায়ক মান্না দে-কে মাথায় করে রেখেছিল। বাংলা সিনেমার সেই জমজমাট আসর মাটি হয়ে গেছে। কোন শশীকান্ত কবে কীভাবে মাটি করল তা নিয়ে ইদানীং কিছু কথাবার্তা হয়, নিঃসন্দেহে আরও হওয়া দরকার। তবে শিল্পসুষমার স্বাদ নেওয়ার অধিকার সব দেশে, সব কালেই দর্শককে অর্জন করতে হয়। সে অধিকার না থাকলে শিল্পের সমস্ত আয়োজন ‘অরসিকেষু রস নিবেদনম্’ হয়ে দাঁড়ায়। ‘বাংলায় শিল্প নেই, শিক্ষা নেই, চাকরি নেই, আইনশৃঙ্খলা নেই’-এর মত ‘ভাল সিনেমা নেই’ কথাটাও বহু আলোচিত। মানিকবাবুর মেঘ দেখার পর সন্দেহ হতে বাধ্য – সত্যিই কি আমাদের ভাল সিনেমা নেই, নাকি ভাল সিনেমার দর্শক নেই? গত এক যুগেই পশ্চিমবঙ্গে অন্তত গোটা আষ্টেক বেশি ছবি হয়েছে যেগুলো রহস্য রোমাঞ্চ, সম্পর্কের টানাপোড়েন বা প্রেম-ঢিসুম ঢিসুম-মধুরেণ সমাপয়েৎ ফর্মুলার বাইরে গিয়ে রসোত্তীর্ণ শিল্প হতে চেষ্টা করেছে। ভূতের ভবিষ্যৎ (২০১২), বল্লভপুরের রূপকথা (২০২২)-র মত দু-একটা ব্যতিক্রম বাদ দিলে সেই প্রয়াসগুলো কিন্তু দর্শকের দাক্ষিণ্য পায়নি। বাকিটা ব্যক্তিগত (২০১৩) বা আসা যাওয়ার মাঝে (২০১৪) তত দর্শক পায়নি, যত দর্শক পেয়েছে যেমন তেমনভাবে নির্মিত ব্যোমকেশের ছবিগুলো। পুনরাবৃত্তিমূলক ফেলুদা বা কাকাবাবুর গল্প নিয়ে নির্মিত ছবিগুলোর অর্ধেক দর্শকও মায়ার জঞ্জাল (২০২০) ঝিল্লি (২০২১), ভটভটি (২০২২), নীহারিকা (২০২৩) ভূতপরী (২০২৪) বা অথৈ (২০২৪) দেখেননি। সম্ভবত সেই কারণেই ২০২১ সাল থেকে পৃথিবীর বিভিন্ন ফিল্মোৎসবে পুরস্কৃত মানিকবাবুর মেঘকে পশ্চিমবঙ্গে সাধারণ দর্শকের জন্য মুক্তি পেতে অপেক্ষা করতে হল ২০২৪ সাল পর্যন্ত। অনির্বাণ ভট্টাচার্যের মত বিখ্যাত শিল্পী এ ছবির নিবেদক না হলে এবং ছবির একখানা গান না গাইলে হয়ত এরপরেও ছবিটা নিয়ে বিশেষ আলোচনা হত না।
মেঘের কথা হচ্ছিল। বাংলা সিনেমার মেঘের উপর দিয়ে হাঁটার ইচ্ছাশক্তি খর্ব হতে হতে কী করে গেটেড কমিউনিটির কোনো একটা টাওয়ারের বিলাসবহুল ফ্ল্যাটের ঘরে নেমে এল – তার ইতিহাস হয়ত কোনোদিন লেখা হবে। এই ছবির পরিচালক অভিনন্দন ব্যানার্জি কিন্তু আমাদের সেই আর্থসামাজিক সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছেন। কথাসর্বস্ব বাংলা ছবির যুগে তিনি এমন এক ছবি বানিয়েছেন যেখানে ক্যামেরার প্রত্যেকটা ফ্রেম কথা বলে, চরিত্রগুলো কথা বলে যতটুকু দরকার ততটুকুই। তেমনই এক মুখর ফ্রেমে পরিচালক ধরেছেন এক রিয়েল এস্টেট কোম্পানির হোর্ডিং। সেই বিজ্ঞাপন সম্ভাব্য ক্রেতাকে লোভ দেখাচ্ছে – আসুন, মেঘেদের সঙ্গে বাস করুন। অথচ তখন ক্রয়ক্ষমতাহীন মানিকবাবু – এ ছবির প্রধান চরিত্র – একখানা ছাদওয়ালা বাড়ি খুঁজছেন তাঁর গাছগুলোর জন্যে। বন্ধুর কাছে মুখঝামটা শুনছেন – নিজের মাথা গোঁজার ঠাঁই হয় না, বৃক্ষরোপণের শখ!
ক্রমশ গরম বেড়ে চলা, বৃষ্টিবিরল কলকাতা শহরের এক নিঃসঙ্গ বাসিন্দার এই সাদাকালো বাস্তবতা পর্দায় তুলে আনা, একইসঙ্গে রোম্যান্টিক থাকার সাহসের জন্য পরিচালককে অভিনন্দন না জানিয়ে উপায় নেই। না, মানিকবাবু মানে এখানে সত্যজিৎ রায় নন। এ ছবি সত্যজিতের জীবনের কোনো সফল বা বিফল মুহূর্ত নিয়ে নয়, তাঁর কোনো কাজের অনুপ্রেরণাও এখানে চোখে পড়ে না। বরং অতি সামান্য চাকরি করার পাশাপাশি ছোটদের আবৃত্তির টিউশনি করা এই মানিকবাবু শেখান সুকুমার রায়ের ‘মেঘ মুলুকে ঝাপসা রাতে,/রামধনুকের আবছায়াতে,/তাল বেতালে খেয়াল সুরে,/তান ধরেছি কণ্ঠ পুরে।/হেথায় নিষেধ নাইরে দাদা,/নাইরে বাঁধন নাইরে বাধা।/হেথায় রঙিন আকাশতলে/স্বপন দোলা হাওয়ায় দোলে,/সুরের নেশায় ঝরনা ছোটে,/আকাশ কুসুম আপনি ফোটে, রঙিয়ে আকাশ, রঙিয়ে মন/চমক জাগে ক্ষণে ক্ষণ!’ দূষিত বাতাসে ঢেকে যাওয়া কংক্রিটের জঙ্গল একবিংশ শতকের কলকাতা শহরে সুকুমারের এই রোম্যান্স যিনি ছুঁতে পারেন তিনি ছাড়া আর কে-ই বা মরা গাছেও রোজ জল দেবে, বাবার মৃত্যুর দিনেও রুটি কিনে আনবে রাস্তার কুকুরের জন্যে, অদেখা প্রেমিকার সঙ্গে ভাগ করে খাবে ডালভাত আর ঢ্যাঁড়শ ভাজা? হ্যাঁ, এটা প্রেমের ছবি। আর সব ব্যাপারে অত্যন্ত সাধারণ মানিকবাবু, দালালকে কোনো লেখাপড়া ছাড়াই টাকা দিয়ে সর্বস্বান্ত হওয়ার মত বোকা মানিকবাবু, একজন দুরারোগ্য রোম্যান্টিক। আজকের কলকাতার পক্ষে বেমানান রোম্যান্টিক, যেমন বেমানান ছিলেন সে যুগের ইউরোপে সেরভান্তেসের ‘রোম্যান্টিক’ নায়ক দন কিহোতে। এ ছবির সমাপ্তি যেভাবে ঘটিয়েছেন অভিনন্দন, তা একেবারেই সুকুমারীয় – যে সুকুমারকে শিশুসাহিত্যের আড়ালখানা ভেদ করে আমরা দেখতে পাই না।
ছবির যে কথা বলতে সংলাপ লাগে না তা যেমন আমরা ক্রমশ ভুলে যাচ্ছি, তেমনি সংলাপ না থাকলেও শব্দ যে কথা বলতে পারে তাও ভুলে যাচ্ছি। কারণ শব্দগুলোকে আলাদা করার মত নৈঃশব্দ্য ক্রমশই বিরল হচ্ছে আমাদের চারপাশে। প্রথমবার ফিল্মে কাজ করা অনুপ সিংয়ের নয়নাভিরাম ক্যামেরার সঙ্গে মুপ্পালা কিরণ কুমার, টেনি আর শুভজিৎ মুখার্জি যে শব্দ-নৈঃশব্দ্য-আবহসঙ্গীতের নকশা বুনেছেন, তা অতি পরিচিত দৃশ্য থেকে চমকে ওঠার মত ছবি উদ্ধার করে এনেছে বারবার। নইলে রাস্তার আলোর মাধ্যমে কথোপকথন সম্ভব হত না। কেবল কণ্ঠস্বর দিয়ে একটা চরিত্র হয়ে উঠতেও পারতেন না মানিকবাবুর বাড়িওয়ালি। একেবারে শয্যাশায়ী বাবাও সন্তানের জীবনে কতখানি গুরুত্বপূর্ণ, তাঁর প্রস্থানে কী বিরাট শূন্যতা তৈরি হয় তাও কেবল শব্দ আর সঙ্গীতের গুণে দেখিয়ে দেওয়া গেছে কোনো সংলাপ ছাড়াই। বোঝা গেল না? স্বাভাবিক। কারণ এই ছবি অনির্বচনীয় দৃশ্যে ভরপুর, অনির্বচনীয় কল্পনায় ঋদ্ধ। না দেখলে বোঝা যাবে না, বেশি বোঝানোর চেষ্টা করাও বাচালতা।
এই বাচালতা জিনিসটা এ ছবির একেবারেই নেই। একা মানুষের শোক বা তার অবদমিত কাম – কোনোটা বোঝাতেই অভিনন্দনকে বচন ব্যবহার করতে হয় না। জীবনানন্দ দাশের ভাষায় ‘বাজারের পোকাকাটা জিনিসের কেনাকাটা’ করা মানুষ মানিকবাবুর চরিত্রে চন্দন সেন এই অনির্বচনীয়তা সারা শরীরে ধারণ করায় দারুণ সফল। ছবির প্রথমার্ধের বিমর্ষ চন্দন আর দ্বিতীয়ার্ধের খুশিয়াল চন্দন কীভাবে একই ব্যক্তি থেকেও দুজন আলাদা মানুষ হয়ে যান – দেখে আশ্চর্য হয়ে যেতে হয়। মুখে যে প্রেমিক হাসি তিনি ফুটিয়েছেন, তা কেবল মনোমুগ্ধকর নয়, রোমাঞ্চকরও। যোগ্য সঙ্গত করেছেন দেবেশ রায়চৌধুরী, নিমাই ঘোষ, অরুণ গুহঠাকুরতা এবং ব্রাত্য বসু।
আরও পড়ুন হারানের নাতজামাই: স্মৃতিমেদুরতার নাটক
চন্দন যে মসৃণভাবে সিনেমার পর্দার মাঝবয়সী রোম্যান্টিক নায়ক হয়ে উঠতে পারেন, তা কি দশকের পর দশক তাঁর অভিনয়ের গুণগ্রাহী দর্শকরাও কেউ কল্পনা করেছিলেন? অভিনন্দন কিন্তু করেছেন। কল্পনাশক্তিতে, এবং সেই কারণে চিত্রনাট্যে, তিনি একশোয় একশো। অভিনন্দন কলকাতার রাজপথ, গলিপথ, ফুটপাথ, দেওয়ালগুলোকে তো বটেই; ধাপার মাঠ আর ময়দানকেও এ ছবির চরিত্র করে তুলেছেন চিত্রনাট্যের গুণে। তবে সেখানেই তাঁর নৈপুণ্য শেষ নয়। আজকের বাংলা ছবির দর্শক হিসাবে দুরুদুরু বুকে না বলে উপায় নেই যে এই পরিচালকের হাতে একখানা জাদুদণ্ড আছে বলে মনে হয়। তার ছোঁয়ায় সেকেলে বাক্স টিভির ফ্রেমের ভিতর টবে ফুল ধরে; চিত্রনাট্যের তালে তাল দেয় দেয়ালের টিকটিকি, মাকড়সা; আঁকা ছবি হয়েও রোম্যান্সে পর্দা মুড়ে দেন উত্তমকুমার আর সুচিত্রা সেন। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্য নিয়ে তাঁদের জ্যান্ত করে তুলতে হয় না। এমন জাদু বাংলা ছবিতে আমাদের বয়সের দর্শকরা অন্তত দেখেনি। প্রবীণরা বলতে পারবেন আদৌ কোনোদিন দেখা গেছে কিনা। তবে একটাই অনুযোগ – এত যত্নে নির্মিত ছবির শেষে নাম দেখানোর সময়ে দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের ‘দ্বীজেন্দ্রলাল’ হয়ে যাওয়া অনভিপ্রেত।
দুরুদুরু বুকে কেন বললাম? প্রথমত, প্রথম ছবিটাই এমন বানান যে তরুণ পরিচালক তাঁর ভবিষ্যৎ নিয়ে যুগপৎ আশা আর আশঙ্কা হয়। আমাদের মা-মাসিরা এসব ক্ষেত্রে পরিচালকের কড়ে আঙুল দাঁতে কেটে মাথায় তিনবার থুতু দিতেন। দ্বিতীয়ত, দর্শক যদি এই ছবিকে মা-মাসিদের মত করে আশীর্বাদ না করেন তাহলে অভিনন্দনকেও হয়ত পরের ছবিটা ফর্মুলায় ফেলেই বানাতে হবে। অন্য কোনো পরিচালকও হয়ত এমন কিছু করার সাহস করবেন না, কারণ এই ছবির প্রযোজক হয়ে যে ঝুঁকি বৌদ্ধায়ন মুখার্জি আর মোনালিসা মুখার্জি নিয়েছেন, সে ঝুঁকি আর কোনো প্রযোজক নেবেন না। বাংলা ছবির কোনো ভবিষ্যৎ থাকবে না, আমরা কেবল সত্যজিৎ-ঋত্বিক-মৃণালের জাবর কেটে যাব।
অনেকে বলছেন, মানিকবাবুর মেঘ আন্তর্জাতিক মানের ছবি। সেসব বোদ্ধারা জানেন। কিন্তু নিঃসন্দেহে বলা যায়, বাংলা ছবির সাধারণ দর্শকের জন্য এ ছবি এক অনন্য অভিজ্ঞতা। এই উচ্চতার রোম্যান্টিক ছবি আমরা বহুকাল দেখিনি। বারবার রোম্যান্টিক ছবি বলছি, প্রেমের ছবি বলছি। তাহলে ছবির নায়িকাকে নিয়ে কিছু বলছি না কেন? তাঁর কথা উহ্যই থাক, কারণ তিনি অনির্বচনীয়। নিজে চোখে দেখে আসুন।
নাগরিক ডট নেটে প্রকাশিত
