সাংবাদিক? ওদের আবার কী দরকার?

গ্রোক বাবাজি মোটেই কোনো সত্যান্বেষী নয়। সে আজ যে উত্তরগুলো দিচ্ছে তাতে নতুন তথ্য তো নেই-ই, উপরন্তু তার তথ্যের ভিত্তি হল এত বছর ধরে চাকরির ঝুঁকি নিয়ে, জীবনের ঝুঁকি নিয়ে যেসব সাংবাদিক খবর বার করে এনেছেন তাঁদের কাজকর্ম। কিন্তু এসব মনে রাখার দরকার নেই। সাংবাদিক ফালতু, গ্রোককে মাথায় তুলে নাচো।

ভয়েস অফ আমেরিকা নামটা সংবাদ জগতের সঙ্গে যুক্ত না থাকা বাঙালির অপরিচিত মনে হতে পারে। তবে যাঁরা কবীর সুমনের ভক্ত, কদিন আগেই তাঁর জন্মদিন উপলক্ষে খুশিয়াল হয়ে উঠেছিলেন, তাঁরা নিশ্চয়ই জানেন এই মার্কিনি আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের কথা। কারণ বাংলা গানে পুরোপুরি আত্মনিয়োগ করার আগে একসময় সুমন ভয়েস অফ আমেরিকায় সাংবাদিকের চাকরি করতেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ে মার্কিন সরকারের আনুকূল্যে তৈরি এই সংবাদমাধ্যম ইংরিজি সমেত মোট ৪৯ খানা ভাষায় সারা বিশ্বে পরিষেবা দিয়ে থাকে। সম্ভবত শিগগির বলতে হবে – দিত। কারণ গত রবিবার (১৬ মার্চ) ডোনাল্ড ট্রাম্পের সরকার ভয়েস অফ আমেরিকা এবং অন্যান্য সরকারপোষিত সংবাদমাধ্যমগুলোতে গণ ছাঁটাই আরম্ভ করেছে। আজকাল সারা পৃথিবীর কর্পোরেট চাকরিতে ইদানীং যা দস্তুর, সেই অনুযায়ী রাতারাতি ইমেল করে কর্মরত সাংবাদিক ও অন্যান্য কর্মীদের জানানো হয়েছে – কেটে পড়ো।

ট্রাম্প (অনেকে বলছে বকলমে ইলন মাস্ক) ক্ষমতায় আসার পর থেকে একের পর এক ‘এক্সিকিউটিভ অর্ডার’ দিয়ে মার্কিন সরকারের নানা দফতরের হাজার হাজার কর্মচারীর চাকরি ইতিমধ্যেই খেয়েছেন। সরকারের আস্ত বিভাগ তুলে দেওয়া হচ্ছে। নেহাত ওদেশের জজসাহেবদের সাক্ষাৎকার দেওয়ার উৎসাহ কম, সাংবিধানিক অধিকার রক্ষা করার উৎসাহ বেশি। তাই অনেকের এখনো সেসব চাকরি ফিরে পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। প্রায় রোজ কোনো না কোনো আদালতের বিচারক ট্রাম্পের কোনো ছাঁটাইয়ের আদেশকে অসাংবিধানিক বলে বাতিল করে দিচ্ছেন। এই দড়ি টানাটানিতে শেষমেশ কে জিতবে এখনো বলা যাচ্ছে না, তবে ভাবগতিক দেখে মনে হচ্ছে, সম্ভব হলে ট্রাম্প-মাস্ক সরকারটাই তুলে দিতে চান খরচ কমানোর নাম করে। সে কাজের অঙ্গ হিসাবেই যে ভয়েস অফ আমেরিকার উপর খড়্গহস্ত হয়েছেন তা বোঝা যাচ্ছে। কেবল ভয়েস অফ আমেরিকা তো নয়, রেডিও ফ্রি ইউরোপ, রেডিও ফ্রি এশিয়া, ফারসি ভাষার রেডিও ফারদা, আরবি ভাষার আলহুরা – এই সমস্ত সরকারপোষিত মিডিয়ার কর্মীদেরই টা টা বাই বাই করা হচ্ছে।

ব্যাপারটাকে স্রেফ অন্য দফতরের কর্মচারীদের ছাঁটাইয়ের সঙ্গে এক করে দেখলে সবটা দেখা হবে না। কারণ মার্কিন গণতন্ত্রের হাজার দোষ থাকলেও, অস্বীকার করার উপায় নেই যে আলাদা আলাদা গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বাধীনতা ভারতীয় গণতন্ত্রের চেয়ে অনেক বেশি। এখানে আধা-সরকারি সংবাদমাধ্যম কী লিখতে/বলতে পারে বা পারে না তা কোনোদিনই সম্পূর্ণ সরকারের নিয়ন্ত্রণের বাইরে ছিল না। বলা বাহুল্য, ইদানীং সে নিয়ন্ত্রণ গলার ফাঁসে পরিণত হয়েছে। কিন্তু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ভয়েস অফ আমেরিকার মত প্রতিষ্ঠান সরকারি অর্থে পুষ্ট হলেও তাকে পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা অতীতের রাষ্ট্রপতিদের ছিল না। ট্রাম্প প্রশাসন মোটেই গোপন করছে না যে ওই ব্যাপারটা মোটেই তাদের পছন্দ নয়। ধনকুবের ট্রাম্প-মাস্ক সরকার শুধু বলতে বাকি রেখেছে যে নুন খাবে আর গুণ গাবে না, তা হবে না। ছাঁটাইয়ের খবর প্রকাশ করে সোল্লাসে হোয়াইট হাউস থেকে বলা হয়েছে – এর ফলে মার্কিন করদাতাদের আর দেশের প্রোপাগান্ডার পিছনে টাকা খরচ করতে হবে না। একথা ঠিক যে পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলের জন্যে তৈরি এই সংবাদমাধ্যমগুলো তৈরি করার উদ্দেশ্য ছিল এমন সব দেশে মার্কিনি দৃষ্টিভঙ্গি প্রচার করা, যেখানে মার্কিন সরকারের সঙ্গে সদ্ভাব নেই এমন সরকার রয়েছে। যেমন ঠান্ডা যুদ্ধকালীন পূর্ব ইউরোপ, চীন, ৯/১১ পরবর্তী মুসলমান-প্রধান দেশগুলো। যে কারণে ভয়েস অফ আমেরিকার মৃত্যুঘন্টা বেজেছে জেনে ট্রাম্পের ঘোষিত শত্রু চীনের সরকার নিয়ন্ত্রিত সংবাদমাধ্যম উল্লাস প্রকাশ করেছে। কিন্তু তেমন প্রোপাগান্ডায় ট্রাম্প সরকারের উৎসাহ নেই – একথা কি বিশ্বাসযোগ্য? মোটেই না। কারণ ট্রাম্প হলেন প্রোপাগান্ডার রাজা। তাঁর উত্থানের পিছনে ভারতের গোদি মিডিয়ার মত আমেরিকার সহিংস, দক্ষিণপন্থী মিডিয়ার যথেষ্ট বড় ভূমিকা আছে। সুতরাং তিনি কেন প্রোপাগান্ডায় করদাতার টাকা খরচ হচ্ছে ভেবে মায়া করতে যাবেন? আসল কথা ট্রাম্প এর আগের চার বছরের শাসনকালেই দেখে নিয়েছেন যে ভয়েস অফ আমেরিকাকে তিনি ফক্স নিউজ বানাতে পারবেন না। তারা তাঁর কথায় ওঠবোস করবে না। অতএব ওটা তাঁর কাছে বাজে খরচ। যে সাংবাদিক চাটুকার নয়, তাকে নিয়ে ট্রাম্প কী করবেন?

আরও পড়ুন এবার মোদীর পথের চেয়েও কঠিন গোদি মিডিয়ার পথ

লক্ষণীয়, মাস্ক টুইটার (অধুনা এক্স) কিনে নেওয়ার পর ২০২২ সালের নভেম্বর মাসে টুইট করেছিলেন যে এখন থেকে টুইটারে ‘সিটিজেন জার্নালিজম’-কে প্রাধান্য দেওয়া হবে এবং ‘মিডিয়া এলিট’ তা আটকানোর আপ্রাণ চেষ্টা করবে। তদ্দিনে তিনি টুইটারে সত্যাসত্য বিচার করা, ঘৃণা ভাষণ আটকানোর যেসব বিভাগ ছিল সেগুলোকে লাটে তুলে দিয়েছেন। অর্থাৎ বুঝতে অসুবিধা হয় না যে তিনি বোঝাতে চাইছিলেন, এবার থেকে যার যা প্রাণে চায় তাই তথ্য বলে চালিয়ে দিতে পারবে। কে না জানে সোশাল মিডিয়ার ক্ষমতা আজকের দিনে কতখানি? অনেক মানুষই যে খবরের জন্যে সংবাদমাধ্যমের চেয়ে সোশাল মিডিয়ার উপর বেশি নির্ভর করেন, সোশাল মিডিয়া থেকে যা জানা গেছে তার সত্যাসত্য যাচাই করার কথা ভুলেও ভাবেন না – এ তো কোনো গোপন কথা নয়। এমনকি সমস্ত সংবাদমাধ্যমকেও সোশাল মিডিয়া ব্যবহার করতে হয়, খবরের জন্যে সেদিকে নজরও রাখতে হয়। যারা আরও এককাঠি সরেস, তারা তো সাধারণ মানুষের মতই সোশাল মিডিয়ার তথ্য যাচাই না করেই খবর হিসাবে চালিয়ে দেয়। তা এহেন সোশাল মিডিয়ার মালিকরা যার প্রাণের বন্ধু, তার আর প্রোপাগান্ডা চালানোর জন্যে পেশাদার সাংবাদিকের দরকার হবে কেন? এবারে ট্রাম্পের শপথ গ্রহণের আগেই তো মেটার (অর্থাৎ ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, হোয়াটস্যাপের) মালিক মার্ক জুকেরবার্গ ভিডিও বার্তা প্রকাশ করে জানিয়ে দিয়েছিলেন যে এখন থেকে ফেসবুকও যাকে যা খুশি বলার ব্যাপারে অনেক বেশি স্বাধীনতা দেবে। মাস্ক তো টুইটারের মালিকানা হাতে পেয়েই আজীবন নিষিদ্ধ হয়ে যাওয়া ট্রাম্পকে ফেরত এনেছিলেন। তারপর ট্রাম্পের হয়ে রীতিমত প্রচার করেন। কী আশায় করেন তা এখন আমেরিকানরা হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছেন। উপরন্তু ট্রাম্পের নিজের কোম্পানিও একখানা সোশাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম খুলে ফেলেছে। কানার নাম পদ্মলোচন রাখার মত তার নাম রাখা হয়েছে ট্রুথ। এমতাবস্থায় সাংবাদিকরা মার্কিন সরকারের কাছে কেবল উদ্বৃত্ত নয়, রীতিমত বালাই। গেলে বাঁচা যায়।

বস্তুত, সর্বত্রই সাংবাদিকরা তাই। প্রণয় রায় আর রাধিকার রায় নাকি কীসব আর্থিক গোলমাল করেছেন – এই অভিযোগে তাঁদের নামে কত মামলা মোকদ্দমা হল নরেন্দ্র মোদী ক্ষমতায় আসার পর থেকে। কতবার তাঁদের পাসপোর্ট কেড়ে নেওয়া হল, এনডিটিভির দফতরে কত কেন্দ্রীয় এজেন্সির কত হানা হল। শেষমেশ প্রায় দেউলে অবস্থায় ওঁদের হাত থেকে এনডিটিভি কিনে ফেললেন পৃথিবীর সবচেয়ে ধনী ব্যক্তিদের একজন – গৌতম আদানি। ও মা! এবছর জানুয়ারি মাসে সিবিআই আদালতে জানিয়ে দিল, রায় দম্পতির বিরুদ্ধে অভিযোগগুলোর কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি! অতএব ‘যাও সবে নিজ নিজ কাজে’। সাত বছর ধরে চলা তদন্তের ফলটা তাহলে কী? সরকারবিরোধী সাংবাদিকতার জন্যে প্রসিদ্ধ এনডিটিভির সরকারের মুখপাত্রে পরিণত হওয়া; রায় দম্পতির হাত থেকে লাগাম বেরিয়ে যাওয়ায় রবীশ কুমার, অনিন্দ্য চক্রবর্তীর মত সাংবাদিকদের প্রথমে কর্মহীন হওয়া; পরে নিজের ব্লগ বা ইউটিউব চ্যানেল খুলে সীমিত পরিসরে সাংবাদিকতা করতে বাধ্য হওয়া। দেশজুড়ে কত সাংবাদিক যে জেল খেটেছেন এবং খাটছেন সেকথা লিখতে বসলে তো আলাদা ওয়েবসাইট তৈরি হয়ে যাবে। কোনো সাংবাদিক আরও বাড়াবাড়ি করলে অবশ্য জেল নয়, গৌরী লঙ্কেশ বা মুকেশ চন্দ্রকর করে দেওয়ার ব্যবস্থা হয়েছে।

ভাবছেন কেবল দুষ্টু লোক, দুষ্টু সরকারই সাংবাদিকদের সরিয়ে ফেলছে? মোটেই তা নয়। দুষ্টু লোকেদের বিরোধীরাও আহ্লাদে আটখানা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে। মাস্কের গ্রোককে মোদীজি বা বিজেপি সম্পর্কে প্রশ্ন করলেই সে টপাটপ এমন সব উত্তর দিচ্ছে যে সব কুকীর্তি বেরিয়ে আসছে। মোদীবিরোধীদের ধারণা, এই অস্ত্রেই ফ্যাসিবাদী বধ হবে। তাঁরা ভুলেই গেছেন যে গ্রোক বাবাজি মোটেই কোনো সত্যান্বেষী নয়। সে আজ যে উত্তরগুলো দিচ্ছে তাতে নতুন তথ্য তো নেই-ই, উপরন্তু তার তথ্যের ভিত্তি হল এত বছর ধরে চাকরির ঝুঁকি নিয়ে, জীবনের ঝুঁকি নিয়ে যেসব সাংবাদিক খবর বার করে এনেছেন তাঁদের কাজকর্ম। কিন্তু এসব মনে রাখার দরকার নেই। সাংবাদিক ফালতু, গ্রোককে মাথায় তুলে নাচো।

অতএব যারা এখনো সাংবাদিক হওয়ার স্বপ্ন দেখছে তাদের বলি – আর যেখানে যাও না রে ভাই সপ্তসাগর পার/জার্নালিজম ক্লাসের কাছে যেও না খবরদার।

রোববার ডট ইন ওয়েবসাইটে প্রকাশিত

গৌরী লঙ্কেশ এখন অবান্তর স্মৃতি

যেহেতু সাংবাদিকরা আকাশ থেকে পড়েন না, আর সকলের মত তাঁরাও একটা আর্থসামাজিক ব্যবস্থা এবং রাষ্ট্রব্যবস্থার উৎপাদন, সেহেতু গৌরীর খুনে অভিযুক্তদের সাম্প্রতিক জামিন এবং মালা পরিয়ে বরণের দৃশ্যও আমাকে অবাক করেনি। মুচকি হেসে স্ক্রোল করে অন্য খবরে চলে যেতে আমার অসুবিধা হয়নি।

“বাট গৌরী লঙ্কেশ ওয়াজ নট আ জার্নালিস্ট। শি ওয়াজ অ্যান অ্যাক্টিভিস্ট।”

৬ সেপ্টেম্বর ২০১৭। বক্তা পঞ্চাশের বেশি সংস্করণবিশিষ্ট একটি ভারতীয় ইংরিজি কাগজের একাধিক সংস্করণের একজন সম্পাদক। ঠিক তার আগের দিন গৌরী নিজের বাড়ির সামনে গুলিতে ঝাঁঝরা হয়ে গেছেন। কথাগুলো ভদ্রলোক বলছিলেন একঝাঁক অতি তরুণ সাংবাদিককে, যারা সদ্য কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণ্ডি পেরিয়ে সাংবাদিকতায় পা রেখেছে। স্বাধীনতার ৭০ বছর পরে কলকাতার যে শীতাতপনিয়ন্ত্রিত অফিসে দাঁড়িয়ে নিজের পদের সুযোগ নিয়ে উনি কথাগুলো বলছিলেন, পরাধীন দেশে নীলকর সাহেবদের বিরুদ্ধে লিখে লিখে মরে যাওয়া হিন্দু প্যাট্রিয়ট কাগজের সম্পাদক হরিশ্চন্দ্র মুখোপাধ্যায়ের নামাঙ্কিত রাস্তাটা সেখান থেকে কিলোমিটার দেড়েক। এমনকি যে অফিসে দাঁড়িয়ে তিনি কথা বলছিলেন, সেই অফিসের সামনের রাস্তার নামকরণ হয়েছিল সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের নামে। হরিশ তবু সরকারি কর্মচারী ছিলেন, দলীয় রাজনীতি করতেন না। সুরেন বাঁড়ুজ্জে রীতিমত কংগ্রেস সভাপতি ছিলেন। সেইসঙ্গে দ্য বেঙ্গলি নামের কাগজ সম্পাদনা করতেন। সম্ভবত তিনিই প্রথম ভারতীয় সাংবাদিক, যাঁকে কাগজের একটি লেখার জন্যে কারাদণ্ডে দণ্ডিত হতে হয়। আরও পিছিয়ে গেলে এই কলকাতাতেই রামমোহন রায় বলে একজন সাংবাদিকের নাম পাওয়া যাবে। রামমোহনের কলমের জোরে ইংরেজ আমলের সুপ্রিম কোর্টকেও গেঁয়ো রায়তের চাবুক খেয়ে মৃত্যুর ঘটনায় জেলা জজের কৈফিয়ত তলব করতে হয়েছিল। সেই শহরে বসে একজন শীর্ষস্থানীয় সম্পাদক গৌরীর মৃত্যুর পরদিনই বলতে পেরেছিলেন যে গৌরী সাংবাদিক ছিলেন না, কারণ তিনি অ্যাক্টিভিস্ট ছিলেন।

দৃশ্যটা দেখেছিলাম এবং কথাগুলো শুনেছিলাম ফুটখানেক দূর থেকে। চুপ করে থাকতে হয়েছিল, কারণ ওই যে বললাম – আমি তখন কর্পোরেট ক্রীতদাস। ক্রীতদাসের প্রতিবাদ করার অধিকার থাকে না, সাহসও থাকে না। তবে আমাদের পায়ের তলার জমি যে সরছে সেটা সেদিনই পরিষ্কার হয়ে গিয়েছিল আমার কাছে। যে দেশে একজন সাংবাদিক খুন হলে অন্য সাংবাদিকরা বলে – ও সাংবাদিক নয় কারণ ও অ্যাক্টিভিস্ট, সে দেশে কোনো সাংবাদিকের জীবনেরই যে দাম থাকবে না অদূর ভবিষ্যতে, চাকরি থাকা দূর অস্ত, তা বুঝতে আমার অসুবিধা হয়নি। আমার অনুমান নির্ভুল প্রমাণ করে বছর তিনেকের মধ্যেই অতিমারীর অজুহাতে ভারতের মিডিয়ায় ব্যাপক সাংবাদিক ছাঁটাই শুরু হয়। যেহেতু সাংবাদিকরা আকাশ থেকে পড়েন না, আর সকলের মত তাঁরাও একটা আর্থসামাজিক ব্যবস্থা এবং রাষ্ট্রব্যবস্থার উৎপাদন, সেহেতু গৌরীর খুনে অভিযুক্তদের সাম্প্রতিক জামিন এবং মালা পরিয়ে বরণের দৃশ্যও আমাকে অবাক করেনি। মুচকি হেসে স্ক্রোল করে অন্য খবরে চলে যেতে আমার অসুবিধা হয়নি। কারণ সাংবাদিক হত্যা আর সাংবাদিক ছাঁটাইয়ের উদ্দেশ্য একই – ক্ষমতাশালীর সমালোচনা বন্ধ করা, ক্ষমতার দিকে আঙুল তোলা বন্ধ করা, ক্ষমতাহীনের কণ্ঠ সকলের কানে পৌঁছবার ব্যবস্থা নষ্ট করা।

আরও পড়ুন তালিবান শাসন: ঘর হতে শুধু দুই পা ফেলিয়া

লজ্জাজনক হলেও স্বীকার না করে উপায় নেই, যে খুন হওয়ার আগে পর্যন্ত গৌরী আমার কাছে খুব পরিচিত ছিলেন না। দু-একবার নাম শুনেছিলাম। কিন্তু দ্য টাইমস অফ ইন্ডিয়া, সানডে পত্রিকা, ইনাড়ু টিভি চ্যানেলের মত বড় বড় কর্পোরেট সংবাদমাধ্যমে দেড় দশক কাজ করলেও গৌরীকে আমরা যেসব কাজের জন্য আজও মনে রেখেছি সেসব তিনি করেছেন মাতৃভাষা কন্নড়ে, মূলত তাঁর বাবা পলিয়া লঙ্কেশের মৃত্যুর পর তাঁরই প্রতিষ্ঠিত কাগজ লঙ্কেশ পত্রিকে (পরবর্তীকালে গৌরী লঙ্কেশ পত্রিকে)-র দায়িত্ব নিয়ে। আমরা বাঙালিরা আমেরিকায় কী হচ্ছে খবর রাখি, ইউরোপের সাংবাদিকতার হাল হকিকতও জানি। কিন্তু বিভিন্ন ভারতীয় ভাষার সাংবাদিকদের খবর জানি না। বড়জোর হিন্দি ভাষার রবীশ কুমারদের আমরা চিনি। তাও তাঁরা কর্পোরেট টিভি চ্যানেলে তারকা হয়ে উঠেছিলেন বলে। গৌরীর মত বিভিন্ন ভারতীয় ভাষার সংবাদমাধ্যমে যাঁরা মরণপণ সাংবাদিকতা করেন তাঁদের খবর আমরা পাই কোথায়? হয়ত চাই না বলেই পাই না। তাই আমাদের নিজেদের বিকল্প সাংবাদিকতা হয়ে দাঁড়ায় শিকড়হীন, কোনো কোনো ক্ষেত্রে সুবিধাবাদীও। লিটল ম্যাগাজিনের দীর্ঘ ঐতিহ্য থাকলেও বাংলায় বিকল্প সংবাদমাধ্যম সম্ভবত তৈরিই হত না মূলধারার সংবাদমাধ্যমে সাংবাদিকতার পরিসর ক্রমশ সংকীর্ণ হয়ে না গেলে। অন্যদের দোষ দেব না, আমারও তো দিব্যি চলে যাচ্ছিল দেড় দশক কর্পোরেট ক্রীতদাস হয়ে মাসান্তে মোটা মাইনে পকেটস্থ করে। গৌরীর হত্যা নাড়া দিলেও, নড়াতে তো পারেনি। বিকল্প হওয়ার জ্বালা যে অনেক। যা পাওয়া যায় তার চেয়ে ছাড়তে হয় অনেক বেশি।

আসলে গৌরীর মৃত্যু কেবল তাদেরই নড়াতে পেরেছে, গৌরী যাদের জন্য নিজের কলমকে হাতিয়ারের মত ব্যবহার করেছিলেন। নইলে নিজের বাড়ির সামনে খুন হওয়ার সাতবছর পরেও, কারা সম্ভাব্য খুনি তার মোটামুটি হদিশ থাকা সত্ত্বেও গৌরীর হত্যাকারীরা শাস্তি পাবে না কেন? মনে রাখা ভাল, গৌরী হিন্দুত্ববাদীদের দীর্ঘদিনের শত্রু হলেও তাঁকে যখন খুন করা হয় তখন কর্ণাটকে ছিল সিদ্দারামাইয়ার নেতৃত্বাধীন কংগ্রেস সরকার। সেই সরকারের পুলিসও অপরাধীদের শাস্তি দেওয়ার কাজে তেমন এগোয়নি। ইতিমধ্যে একাধিকবার সরকার বদল হয়ে গতবছর গৌরীর রাজ্যে আবার ক্ষমতায় এসেছে কংগ্রেস, আবার মুখ্যমন্ত্রী হয়েছেন সিদ্দারামাইয়া। বহু রাজনৈতিক বিশ্লেষকের মতে কংগ্রেসের কর্ণাটক জয়ের অন্যতম কারণ রাহুল গান্ধীর ভারত জোড়ো যাত্রা এবং হিন্দুত্ববাদের বিরুদ্ধে সোচ্চার অবস্থান। তবু কিন্তু হিন্দুত্ববাদের আমৃত্যু প্রতিপক্ষ গৌরীর হত্যার অভিযোগে গ্রেফতার হওয়া ১৭ জনের মধ্যে ১১ জন ইতিমধ্যেই জামিনে মুক্ত। রাহুলের মহব্বতের দোকানে গৌরীর জন্যে কি তবে কিছুই নেই? যেমন চারবছর ধরে বিনা বিচারে আটক সেই উমর খালিদের জন্য তাঁর দোকানে নেই একটা শব্দও, যাঁকে গৌরী নিজের ছেলে বলতেন?

আসলে বোবার যেমন শত্রু নেই, তেমনি যথার্থ সাংবাদিকের শত্রুর অভাব নেই। গৌরীরও ছিল না। কর্ণাটকের আজকের উপমুখ্যমন্ত্রী ডি কে শিবকুমারের বিরুদ্ধেও গৌরী একসময় লেখালিখি করেছিলেন। এমনকি সিদ্দারামাইয়া সরকারের টিপু সুলতান জয়ন্তী পালন করার সিদ্ধান্তকেও তিনি ভাল চোখে দেখেননি। তিনি ওই সিদ্ধান্তকে ‘নরম সাম্প্রদায়িকতা’ আখ্যা দিয়েছিলেন। এমন একজনের হত্যাকারীরা শাস্তি পেল কি পেল না, তা নিয়ে কেনই বা মাথা ঘামাতে যাবে কোনো দল বা তার নেতৃত্ব? যে ভারতে প্রয়োজনীয় অর্ণব গোস্বামী, নাভিকা কুমার, মৌপিয়া নন্দীর মত সরকারি তোতাপাখিরা; সেখানে গৌরী যে অপ্রয়োজনীয় তা বলাই বাহুল্য।

গৌরীর মৃত্যুর পর তাঁর আমৃত্যু বন্ধু এবং প্রাক্তন স্বামী সাংবাদিক চিদানন্দ রাজঘাট্টা এক দীর্ঘ ফেসবুক পোস্ট করেছিলেন, যা একান্ত ব্যক্তিগত অথচ গৌরী লঙ্কেশের শত্রু কারা এবং কেন – তা বোঝার সবচেয়ে ভাল উপায়। সেই পোস্ট পড়ে হয়ত বাঙালি বদভ্যাসেই আমার মনে পড়েছিল শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের সেইসব লাইন ‘অবান্তর স্মৃতির ভিতর আছে/তোমার মুখ অশ্রু-ঝলোমলো/লিখিও, উহা ফিরৎ চাহো কিনা?’ আজ সাতবছর পরে মনে হচ্ছে, ব্যাপারটা আর কাব্যে আটকে নেই। গৌরী এই দেশের কাছে ব্যবহারিকভাবেও অবান্তর স্মৃতিই হয়ে গেছেন।

রোববার.ইন ওয়েবসাইটে প্রকাশিত

সাংবাদিকদের অকালমৃত্যু যা যা শেখায়

আমার দ্বিতীয় চাকরিতে যিনি আমার বস ছিলেন, তিনি এক বিরল প্রজাতির ভদ্রলোক। একটুর জন্যে সতীশ হতে হতে বেঁচে গিয়েছিলেন।

লোকসভা নির্বাচনের বাজারে একটা মৃত্যু প্রায় সকলের নজর এড়িয়ে গেছে, কারণ বাংলা সংবাদমাধ্যমে তা নিয়ে এক লাইনও লেখা হয়নি। মূলধারার সংবাদমাধ্যমে অবশ্য সেই মৃত্যু নিয়ে লেখালিখি হওয়ার সম্ভাবনাও ছিল না। নিজের অপরাধ সকলেই ধামাচাপা দেয়। মূলধারার বাইরে আছি বলেই আমার লেখার সুযোগ ছিল। কিন্তু নির্বাচন সংক্রান্ত লেখালিখিতে মেতে গিয়ে আমিও সেই বর্ষীয়ান সাংবাদিকের মৃত্যুকে অগ্রাহ্য করার দোষে দুষ্ট হয়েছি। এই লেখা বস্তুত পাপস্খালনের চেষ্টা।

ভদ্রলোকের নাম সতীশ নন্দগাঁওকর। তিনি সর্বভারতীয় এবং স্বনামধন্য খবরের কাগজ হিন্দুস্তান টাইমস-এর মুম্বাই সংস্করণের মুম্বাই-থানে ব্যুরোর প্রধান ছিলেন। যাঁরা খবরের কাগজের কার্যপদ্ধতি সম্পর্কে ওয়াকিবহাল, তাঁরা জানেন যে পদটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই ধরনের পদগুলোতে সাধারণত থাকেন অত্যন্ত অভিজ্ঞ রিপোর্টাররা। তাঁদের অধীনে কাজ করেন অন্যরা। এই ব্যুরো প্রধানদের কাজের সময় বলে কিছু থাকে না, থাকা সম্ভব নয়। হয়ত অফিস থেকে বাড়ি চলে গেলেন রাত নটায়, কিন্তু দুটোর সময়ে ফোন আসতে পারে যে অমুক জায়গায় তমুক ঘটনা ঘটেছে। তখন নিজে না গেলেও, তাঁরই দায়িত্ব অন্য কোনো রিপোর্টারকে জানিয়ে খবরটা যেন পরদিন কাগজে বেরোয় তা নিশ্চিত করা। অফিসে নাইট ডিউটিতে থাকেন যে রিপোর্টার, তিনিও কোনো সিদ্ধান্ত নিতে অপারগ হলে যত রাতই হোক ব্যুরো প্রধানকে ঘুম থেকে তোলেন। এটাই দস্তুর। আবার কোনো খবর হাতছাড়া হয়ে গেলে, বা ভুল খবর বেরিয়ে গেলে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে জবাবদিহির দায়িত্বও প্রথমে ব্যুরো প্রধানের। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে অত বড় কাগজের ব্যুরো প্রধানরা নিজেরাও নামকরা সাংবাদিক হন। ফলে কাগজের উপর রাজনৈতিক/অরাজনৈতিক যেসব চাপ আসে বাইরে থেকে, তার অনেকটাও তাঁদেরই সামলাতে হয়। তার উপর রিপোর্টাররা অনেক ক্ষেত্রে অপাঠ্য, দুর্বোধ্য কপি লেখেন। সেই কপিকে বোধ্য করে তুলে তবে সম্পাদনার ডেস্কে পাঠানোও ব্যুরো প্রধানের দায়িত্ব।

এইরকম প্রচণ্ড চাপের একটা কাজ করতেন সতীশ। সঙ্গে আরও বেশকিছু অতিরিক্ত কাজ তাঁকে করতে হত। তিনি গত ২৮ ফেব্রুয়ারি মুম্বাইয়ে অফিসের কাছেই এক ওষুধের দোকানে ব্যথার ওষুধ কিনতে গিয়ে হৃদরোগে আক্রান্ত হন। নিকটবর্তী হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলে চিকিৎসকরা বলেন সতীশ মারা গেছেন। এমন মৃত্যু নেহাত বিরল নয়। আমার আপনার অনেক পরিচিতই এরকম হঠাৎ হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান আজকাল। তাহলে সতীশকে নিয়ে লিখছি কেন? কারণ তাঁর মৃত্যুর পর কিছু অভূতপূর্ব ঘটনা ঘটেছে।

গত ১৩ মার্চ মুম্বাই প্রেস ক্লাবে সতীশের স্মরণসভায় তাঁর স্ত্রী অঞ্জলি অম্বেকর বলেন, ‘সাংবাদিক না হলে সতীশ একটা সুন্দর জীবন কাটাতে পারত।’ কথাটা নেহাত একজন অকালমৃতের স্ত্রীর বিলাপ বলে উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। কারণ তিনি হিন্দুস্তান টাইমসের মুম্বাই সংস্করণের রেসিডেন্ট এডিটর মীনা বাঘেলের বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন এডিটর্স গিল্ড অফ ইন্ডিয়া, প্রেস কাউন্সিল এবং মুম্বাই প্রেস ক্লাবে। তাঁর অভিযোগ, মীনা অনবরত অন্য সাংবাদিকদের সামনে সতীশকে অপমান করতেন, যা তাঁর মত সংবেদনশীল মানুষকে প্রবল আঘাত করত। মারা যাওয়ার খানিকক্ষণ আগে, শীতাতপনিয়ন্ত্রিত ঘরে বসে কুলকুল করে ঘামতে ঘামতে সতীশ বলেছিলেন যে তিনি পরদিনই পদত্যাগ করবেন। কারণ সেদিনও খানিক আগেই মীনা একই আচরণ করেছিলেন এবং এই আচরণ দীর্ঘদিন ধরে চলছিল। অঞ্জলির অভিযোগের ভিত্তিতে মুম্বাই প্রেস ক্লাব প্রাথমিক তদন্ত চালিয়ে রিপোর্ট তৈরি করেছে। তাতে বলা হয়েছে, যদিও সতীশের মৃত্যু আর মীনার ব্যবহারের মধ্যে কোনো সরাসরি সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করা যায়নি, তবু একথা সত্যি যে মীনা তাঁকে প্রচণ্ড মানসিক চাপে রাখতেন এবং নিয়মিত অপমান করতেন। এসব ‘কার্ডিয়াক এপিসোড’-এর কারণ হয়ে থাকতেই পারে।

এডিটর্স গিল্ডও এক বিবৃতিতে হিন্দুস্তান টাইমস কর্তৃপক্ষকে এই মৃত্যুর যথাযথ ও স্বচ্ছ তদন্ত করতে অনুরোধ করেছে। এর বেশি কিছু করার ক্ষমতা প্রেস ক্লাব বা গিল্ডের আইনত নেই, কারণ এগুলো সাংবাদিকদের সংগঠন মাত্র। ট্রেড ইউনিয়ন পর্যন্ত নয়। সত্যি কথা বলতে, ভারতের কর্পোরেট সংবাদমাধ্যমে বছর তিরিশেক হল সাংবাদিকদের ট্রেড ইউনিয়ন করা বন্ধ হয়ে গেছে। নয়ের দশকে উদারীকরণের সময়ে সংবাদমাধ্যমগুলো কর্মচারীদের চাকরিগুলোকে চুক্তিভিত্তিক করে ফেলার চেষ্টা শুরু করে। সংবাদমাধ্যমে যাঁরা শ্রমজীবী, অর্থাৎ ছাপার মেশিন চালানোর কাজ করেন বা অফিসগুলোতে পিওনের কাজ ইত্যাদি করতেন, তাঁদের মধ্যে এর বিরুদ্ধে কিছুটা প্রতিরোধ তৈরি হয়েছিল। তাই তাঁদের চুক্তিভিত্তিক কর্মচারী করে ফেলা সহজ হয়নি, অনেকে পুরনো ওয়েজ বোর্ডের অধীনেই রয়ে গিয়েছিলেন। তাঁদের যখন তখন তাড়ানো যায় না; যেমন ইচ্ছে ইনক্রিমেন্ট না দেওয়া বা মাইনে কমিয়ে দেওয়াও যায় না। অর্থাৎ নানা ঝামেলা পোয়াতে হয় মালিককে। অত টাকা দিতে পারব না, ব্যবসার অবস্থা ভাল না – এসব ওজর নিয়ে কোটিপতি কাগজগুলোর মালিকরা বিভিন্ন সময়ে আদালতে পর্যন্ত গেছেন ওই ধরনের কর্মচারীদের বিরুদ্ধে। কর্মচারীরাও গেছেন। অধিকাংশ ক্ষেত্রে কর্মচারীদেরই জয় হয়েছে।

কিন্তু যাঁরা নিজেদের বুদ্ধিজীবী মনে করেন, সেই সাংবাদিকরা, পাকা চাকরি থেকে চুক্তিভিত্তিক চাকরিতে চলে যেতে বিশেষ আপত্তি করেননি। কারণ তাঁদের সামনে মহার্ঘ প্যাকেজের গাজর ঝোলানো হয়েছিল। ফলে সাংবাদিকদের মধ্যে থেকে ইউনিয়ন তুলে দিতে মালিকদের বিশেষ কসরত করতে হয়নি। কিন্তু কেবল শ্রমজীবীদের মধ্যে ইউনিয়ন থাকতে থাকতে ক্রমশ দুর্বল হয়ে পড়ে; মালিকরা যে দুর্বল করে দিতে সক্রিয় ছিল তা বলাই বাহুল্য। যত পুরনো কর্মী অবসর নিয়েছেন, তত চুক্তিভিত্তিক কর্মী বেড়েছে, ইউনিয়ন ততই সাইন বোর্ডে পরিণত হয়েছে। সেই ৩০-৩৫ বছর আগে শুরু হওয়া প্রক্রিয়ার ফল এই, যে আজ সতীশরা কারণে-অকারণে গালমন্দ সহ্য করে কাজ করতে বাধ্য হন। পরিণামে জীবনটা পর্যন্ত চলে যায় অনেক সময়।

শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত হিন্দুস্তান টাইমস সতীশের বস মীনার বিরুদ্ধে কোনো তদন্ত করছে না। করলেও সতীশের মৃত্যুতে তাঁকে দায়ী করার মত কোনো প্রমাণ যে পাওয়া যাবে না তা বলাই বাহুল্য। আত্মহত্যায় প্ররোচনার অভিযোগই আদালতে প্রমাণ করা যথেষ্ট দুরূহ, আর এ তো ডাক্তারি পরিভাষায় স্বাভাবিক মৃত্যু। কিন্তু গত কয়েক বছরে সাংবাদিকদের মধ্যে ৫০-৬০ বছর বয়সে মৃত্যু কীভাবে বেড়েছে তার যদি কোনো সমীক্ষা করা যায়, তাহলে যে চোখ কপালে তোলার মত একটা সংখ্যা পাওয়া যাবে তা নিয়ে আমার কোনো সন্দেহ নেই। কেন সন্দেহ নেই?

কারণ যে পরিস্থিতিতে পড়ে সতীশের হৃদপিণ্ড কাজ বন্ধ করে দিয়েছে, তেমন পরিস্থিতিতে খবরের কাগজের দেড় দশকের কর্মজীবনে আমি নিজেও পড়েছি, অগ্রজ সহকর্মীদেরও পড়তে দেখেছি। হয়ত বয়স কম ছিল বলে আমার শরীর লড়ে গেছে। কিন্তু অগ্রজদের চল্লিশ না পেরোতেই নানারকম ছোট বড় রোগে আক্রান্ত হতে দেখেছি। সাংবাদিকদের মধ্যে ডায়বেটিস, হাইপার টেনশন, হৃদরোগ আজকাল জলভাত। আমার শেষ চাকরির এক অনুজ হঠাৎ একদিন রাতে সিলিং ফ্যান থেকে ঝুলে পড়েছিল। অন্য বিভাগের কর্মী হওয়ায় তার সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা ছিল না আমার। কিন্তু তার মৃত্যুর পরে তারই বিভাগের সাংবাদিকদের থেকে জেনেছিলাম, ওই ঝুলে পড়া মোটেই আকস্মিক নয়। তার কাজের সময় উদ্ভট হওয়ায় বৈবাহিক জীবনে অশান্তি চলছিল বেশ কিছুদিন ধরে। সে তার সুরাহা করার জন্যে বসের কাছে সামান্য পেশাদারি সাহায্য চেয়েছিল – কাজের সময়টা যদি অন্তত কিছুদিনের জন্য বদল করা যায়। তাকে প্রতিশ্রুতি দিয়েও সে বদল করা হয়নি। স্ত্রীর সঙ্গে অশান্তিও মেটেনি। ছেলেটি খুব বলিয়ে কইয়ে ছিল না। যাওয়ার সময়ে সুইসাইড নোট লেখার নাটকীয়তাটুকুও করেনি। এই মৃত্যুর দায়িত্ব কে নেবে? কেউ না। বেচারির তো অভিযোগ করারও কেউ ছিল না।

আমার দ্বিতীয় চাকরিতে যিনি আমার বস ছিলেন, তিনি এক বিরল প্রজাতির ভদ্রলোক। একটুর জন্যে সতীশ হতে হতে বেঁচে গিয়েছিলেন। আমি ওই কাগজের খেলার পাতায় যোগ দিয়েই শুনি, ক্রীড়া সম্পাদকের কয়েকদিন আগেই গুরুতর স্ট্রোক হয়েছে। তাই তিনি হাসপাতালে ভর্তি। মাস দেড়েক পরে যখন কাজে যোগ দিলেন, দেখলাম নিপাট ভালমানুষ এবং অফিসে অসম্ভব জনপ্রিয়। শুধু কাগজের সম্পাদক ভদ্রমহিলা, যিনি অত্যন্ত দক্ষ সহ-সম্পাদককেও ভরা নিউজরুমে হাঁটুর বয়সী ছেলেমেয়েদের সামনে অপদস্থ করতে ছাড়েন না, তিনিই আমাদের ক্রীড়া সম্পাদকের উপর খড়্গহস্ত। কোনো নির্দিষ্ট কারণ ছাড়াই। তাঁর সব কাজেই উনি ভুল ধরেন। মজার কথা, কাজ বলতে যা বোঝায় তা ওই ভদ্রমহিলাকে একদিনও করতে দেখিনি। আমি যে আট মাস ওই কাগজে ছিলাম, তার মধ্যে একদিনও সম্পাদক এক লাইন লেখেননি কাগজে। সম্পাদকীয় পর্যন্ত লিখতেন না। সারাদিন বসে বসে এর তার উপর চেঁচানো আর কয়েকটা পাতায় চোখ বোলানো ছাড়া তাঁর কাজ বলতে ছিল ম্যাড়মেড়ে ইংরিজিতে একে তাকে অপ্রয়োজনীয় ইমেল পাঠানো। কোনোদিন প্রথম পাতায় একটা শিরোনাম পর্যন্ত দিতে দেখিনি। অথচ তিনিই ওই কাগজের দণ্ডমুণ্ডের কর্তা। সদ্য মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে আসা আমার বসকে দেখতাম – সম্পাদকের চিৎকার শুরু হলেই হাত কাঁপছে। এর অনিবার্য ফল যা, একদিন ঠিক তাই ঘটল। সকালবেলা খবর পেলাম, আমাদের ক্রীড়া সম্পাদকের আবার হার্ট অ্যাটাক হয়েছে। তিনি ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিটে ভর্তি। আমি আর আমার এক সহকর্মী হাসপাতালে দেখতে গিয়ে ক্রীড়া সম্পাদকের স্ত্রীর মুখে যা শুনেছিলাম, তার সঙ্গে সতীশের স্ত্রীর বয়ানের শিউরে ওঠার মত মিল। সুখের কথা, তিনি কিছুদিন পরেই অবসর নেন। হয়ত সে কারণেই এখনো সুস্থ শরীরে জীবিত।

আরও পড়ুন টুইটার, বাইজু’স আঁধারে ছাঁটাই সম্পর্কে কয়েকটি কথা

এসব কথা লিখছি কেন? সব কর্পোরেট চাকুরেরই তো অল্পবিস্তর একইরকম অভিজ্ঞতা হয়। তাই তো আজকাল কাউকে জিজ্ঞেস করলে শোনা যায় না যে সে নিজের চাকরিতে সুখী। তাহলে সাংবাদিকরাই বা ব্যতিক্রম হবেন কেন? তাঁদের নিয়ে আলাদা করে লেখার কী আছে? সঙ্গত প্রশ্ন। আসলে ভারতের মূলধারার সাংবাদিকতা যে অতল খাদের মধ্যে পড়েছে গত এক দশকে, তাকে বুঝতে গেলে সাংবাদিকরা কোন অবস্থার মধ্যে কাজ করেন তা জানা দরকার। নইলে অন্ধের হস্তিদর্শন হয়।

শিক্ষকতার ব্যাপারে অনেকে বলে থাকেন, প্রচণ্ড মারধর করে সেইসব শিক্ষকরাই, যারা ভাল করে পড়াতে পারে না। সাংবাদিকতার ব্যাপারেও বললে ভুল হবে না যে অধস্তনদের উপর নিত্য চোটপাট চালানো, গালিগালাজ, অপমান করা অযোগ্য সাংবাদিকের লক্ষণ। ওই আচরণের পিছনে নিজের যোগ্যতার অভাবজনিত নিরাপত্তাহীনতার বড় ভূমিকা থাকে। বেশি যোগ্যতাসম্পন্ন কেউ তাকে অতিক্রম করে যাবে – এই উৎকণ্ঠা থেকে অধস্তনদের আত্মবিশ্বাস নষ্ট করে দেওয়ার প্রচেষ্টা থাকে। এর অজস্র উদাহরণ আছে। কিন্তু নাম করলে আইনি ঝামেলায় পড়তে হবে। কে না জানে, রাজনৈতিক নেতাদের পরেই সবচেয়ে লম্বা হাত বড় মিডিয়ার বড় সাংবাদিকদের? তাঁরা ক্ষমতাকে প্রশ্ন করতে না পারুন, কোটিপতি মালিকের মদতে এবং রাজনৈতিক ক্ষমতাবানদের সঙ্গে দহরমের সুবাদে ক্ষমতাহীনকে মাটিতে মিশিয়ে দিতে সিদ্ধহস্ত। দুঃখের বিষয়, নয়ের দশক থেকে মিডিয়ার দখল সম্পাদকদের হাত থেকে সরাসরি মালিকদের হাতে চলে যাওয়ায় এই ধরনের অযোগ্য অথচ বশংবদ সাংবাদিকদেরই তাঁরা উঁচু পদগুলোতে বসিয়েছেন। কারণ যোগ্য সাংবাদিক মালিককেও প্রশ্ন করবেন, মালিকের ব্যবসায়িক উদ্দেশ্য পালন করতে অস্বীকার করতেও পারেন। এরই ফলশ্রুতিতে সতীশের মত দশা হচ্ছে বহু সাংবাদিকের। তার চেয়েও বেশি সাংবাদিকের চাকরি যাচ্ছে করোনা অতিমারী বা কোম্পানির আর্থিক ক্ষতির অজুহাতে। ফলে মিডিয়া ভরে যাচ্ছে অশিক্ষিত, অর্ধশিক্ষিত সাংবাদিকে। তারাই হয়ে উঠছে সংবাদমাধ্যমগুলোর নীতি নির্ধারক। রবীশ কুমাররা সরে যাচ্ছেন ইউটিউবে, টিভি চ্যানেলে জাঁকিয়ে বসছেন অর্ণব গোস্বামীরা। নাম করা চ্যানেলে হোয়াটস্যাপে ফরোয়ার্ড হওয়া ভুয়ো খবর ঘটা করে প্রচারিত হচ্ছে। কোথাও সাম্প্রদায়িকতার বিষ ছড়াচ্ছেন অঞ্জনা ওম কাশ্যপ, কোথাও বিতর্ক আয়োজনের ভান করে এক পক্ষকে মৌপিয়া নন্দী ধমকাচ্ছেন ‘কে তুমি?’

এসবে তিতিবিরক্ত মানুষ ইদানীং ঝুঁকছেন বিকল্প সংবাদমাধ্যমের দিকে। তবে ভাবলে ভুল হবে যে এসব বালাই সেখানে একেবারেই নেই। তেমনটা হওয়া সম্ভবও নয়। কারণ বিকল্প সংবাদমাধ্যম আকাশ থেকে পড়েনি। যাঁরা এই মঞ্চগুলো গড়ে তুলেছেন বা তুলছেন, তাঁদের হাতেখড়ি হয়েছিল মূলধারাতেই। সকলেই যে আদর্শের কারণে অন্য পথে এসেছেন এমন নয়। অনেকে সেখানে যোগ্যতা প্রমাণ করতে না পেরেও বিকল্প পথে এসেছেন। তাঁরা হতে চান মূলধারার মহীরুহদের মতই। আসলে তাঁরাই এদের আদর্শ। অধস্তনদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার না করলে, যিনি টাকা জোগাচ্ছেন তাঁর পায়ে তৈলমর্দন না করলে, ক্ষমতাবানদের দাদা দিদি বানাতে না পারলে বড় সাংবাদিক হওয়া যায় না – এ ধারণা বিকল্প মাধ্যমের অনেকের মধ্যেও বদ্ধমূল। এই মনোভাবের ফল কাজে পড়তে বাধ্য। মূলধারার সংবাদমাধ্যমের কাজে পড়েছে, বিকল্প মাধ্যমেও অবশ্যই পড়বে। সত্যি কথা বলতে, এ দেশের বিকল্প সংবাদমাধ্যম এখনো বিকল্প ব্যবসায়িক মডেল হিসাবে সম্পূর্ণ বিকশিত হয়নি। অর্থাৎ মূলধারায় কাজ করে যতখানি রোজগার করা যায়, বিকল্পে এখনো যায় না। যশও এখনো মূলধারায় বেশি। বিকল্পে একই পরিমাণ যশলাভে পরিশ্রম অনেক বেশি। কোনোদিন ওগুলো মূলধারার সমান হয়ে গেলে বিকল্প মাধ্যমের সাংবাদিকদের আদর্শবাদের যথার্থ পরীক্ষা হবে। আমরা অনেকেই তো আসলে সুযোগের অভাবে চরিত্রবান।

ডুলুং পত্রিকার আষাঢ়-শ্রাবণ ১৪৩১ সংখ্যায় প্রকাশিত