‘আজ কমিউনিস্টরা সলিল, ঋত্বিককে জনসংযোগের জন্যে ব্যবহার করে’

ঋত্বিকের একটা অসমাপ্ত জাতীয় বিপ্লবের ধারণা ছিল। কোমল গান্ধার ছবিতে দেখবে অনসূয়া ভৃগুকে একটা ডায়রি দেয়। ওটা তো আসলে রূপক। তখন পি সি যোশীর আমল। ভাবা হয়েছিল যে অসমাপ্ত জাতীয় বিপ্লব সমাপ্ত করার দায়িত্ব ইতিহাস নিয়তির মত এসে কমিউনিস্ট পার্টিকে দেবে। সেই স্বপ্ন সফল হয়নি। সলিল ভেবেছিলেন তিনি প্রাচ্য আর পাশ্চাত্যের মিলন ঘটিয়ে ভারতীয় সঙ্গীতের যে আধুনিকীকরণ করছিলেন তা ক্রমশ এগিয়ে যাবে। গানকে ক্রমশ সরল হতে হবে, গানকে মানুষের হাতে তুলে দিতে হবে।

এ মাসের ‘সঞ্জয় উবাচ’ অন্যরকম, কারণ এই মাসটাই অন্যরকম। বাঙালির সর্বকালের অন্যতম সেরা দুই শিল্পী – ঋত্বিক ঘটক আর সলিল চৌধুরী – এ মাসে শতবর্ষে পা দিলেন। তাই নাগরিক ডট নেট মনে করেছে সঞ্জয় মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে কথোপকথন চালালে ওই দুই কিংবদন্তি সম্পর্কে এমন অনেক কথা উঠে আসতে পারে আলোচনায়, যা প্রতি মাসের নিয়মমাফিক কলামের পরিসরে ধরা মুশকিল। এই দীর্ঘ আলোচনা তাই আজ ছুটির দিনে শেষও হবে না। চলবে।

প্রথমেই আপনাকে জিজ্ঞেস করতে চাই, ঋত্বিক ঘটকের জীবদ্দশায় তাঁর কাজকে বাঙালি সমাজ যেভাবে দেখেছে আর এখন যেভাবে দেখে, তার মধ্যে আপনি নিশ্চয়ই একটা তফাত দেখতে পান? সেই তফাতটাকে কীভাবে ব্যাখ্যা করেন? প্রশ্নটা করছি, তার কারণ ঋত্বিককে তো একেকটা ছবি বানাতে বহু কষ্ট করতে হয়েছে। তারপর ছবিগুলো দর্শকের আনুকূল্য পায়নি বললেই হয়। আর আজ সোশাল মিডিয়া খুললেই ঋত্বিক পুজো দেখা যায় তাঁর প্রত্যেক জন্মদিনের আশপাশে। ‘তুমি গেছ। স্পর্ধা গেছে, বিনয় এসেছে’ লিখে তাঁর ছবি মুড়ি মুড়কির মত শেয়ার করে তরুণ প্রজন্ম। তাঁর লেখা বা তাঁর ছবির সংলাপ থেকে কথায় কথায় ভুল উদ্ধৃতি দিতেও দেখা যায় অনেককে। ঋত্বিককে ঘিরে এই আবেগের বিস্ফোরণ কীভাবে এবং কেন ঘটতে শুরু করল?

তোমার প্রশ্নটা শুনেই আমার মনে হল, তুমি একটা স্বখাতসলিলে নিমজ্জমান জাতির কথা বলছ, যারা বাঙালি নামে পরিচিত। তারা এখন কেবল ঋত্বিক নয়, বা সলিল নয়, যে কাউকে নিয়েই মেতে উঠতে চায় এবং পারে। আমার সোশাল মিডিয়া হ্যান্ডেল না থাকলেও চোখ তো রাখি। যা দেখতে পাই তা থেকে সোশাল মিডিয়ায় জানানো শ্রদ্ধার প্রতি আমার এক ধরনের তাচ্ছিল্য তৈরি হয়েছে। কারণ, কাউকে ছোট না করেই বলছি, ওখানে দেখেছি নীরেন্দ্রনাথ আর রবীন্দ্রনাথকে প্রায় একই ভাষায় শ্রদ্ধা জানানো হয়। আসলে ওটা গুগলের প্রতি দায়িত্বপালন। গুগল সকলকে মনে করিয়ে দেয় যে আজ অমুকের জন্মদিন। সুতরাং দল বেঁধে স্মরণ করা শুরু হয়ে যায়। আর বাংলায় তো এখন নস্ট্যালজিয়া ইন্ডাস্ট্রি ছাড়া কোনো ইন্ডাস্ট্রি নেই, তা এই ইন্ডাস্ট্রির জন্যে ঋত্বিক, সলিল – এঁরা অতি লোভনীয় কাঁচামাল। আজকের বাঙালি মনে করে যে এঁরা এক ধরনের প্রত্যাখ্যানের মাতৃভাষা। ঋত্বিকের সঙ্গে সলিলের একটা পার্থক্য হল সলিল জনপ্রিয় ছিলেন। যা-ই হোক, এই দুজনকে, এখনকার বাঙালি ইংরিজিতে যাকে appropriate করা বলে সেটা যে করতে পারছে তাতে বোধহয় এক ধরনের আত্মশ্লাঘা বোধ করে।

দুজনের মধ্যে জীবদ্দশায় জনপ্রিয়তার ফারাকের কথা আপনি বললেন। এখন তাঁদের যেভাবে দেখা হয় তাতে কোনো মিল দেখতে পান কি?

দেখো, প্রথমেই বলতে হবে যে ঋত্বিক জনপ্রিয়তা পাননি আর সলিল দারুণ জনপ্রিয় – এরকম হওয়া সত্ত্বেও আমি দেখেছি যে এঁরা অতি ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন। সলিল নিজে খুব বিনীত মানুষ ছিলেন। কিন্তু ঋত্বিক সম্পর্কে স্পষ্টই বলতেন যে ভবা (ঋত্বিককে যে নামে ডাকতেন) অসম্ভব এক জিনিয়াস। যেমন ম্যাক্সমুলার ভবনে তিতাস একটি নদীর নাম (১৯৭৩) দেখে এসে সলিল বলেছিলেন, কী মিউজিক! আমাকে কলকাতার কিছু লোক বলেছিল যে ভবার সেই টাচ আর নেই। আমি তো ছবিটা দেখে ভাবলাম, এরা কারা? এরা কোনোদিন গান-টান শুনেছে? এরা মিউজিক কাকে বলে জানে? ভবার সঙ্গে কারোর তুলনা হয় না।

এবার ওই মিলের প্রসঙ্গে বলি। দুজনেই নিজের শিল্পমাধ্যমকে এবং শিল্পের বিষয়কে নানা প্রশ্নের মুখে ফেলেছেন। অনেকসময় দুজনে একসঙ্গে কাজও করেছেন। যেমন বাড়ি থেকে পালিয়ে (১৯৫৮) ছবিতে, কোমল গান্ধার (১৯৬১) ছবিতে। সেসব নিয়ে আজকাল যে হইচই করা হয় তার মধ্যে কোনো মৌলিক জিজ্ঞাসা নেই। যা আছে তা নিতান্ত বাইরের কথাবার্তা। অনেকটা বিয়েবাড়ির মত। যেন একটু সাজুগুজু করে ঋত্বিক চর্চা করা, কেননা তাতে বিকল্প সংস্কৃতি চর্চার বড়াই করা যায়। সলিলকে নিয়ে চর্চা করলেও বেশ প্রমাণ করা যায় যে আমরা গান-টান বুঝি। কিন্তু ধরো, আমার মত একজন লোক যে পাশ্চাত্য সঙ্গীত, ভারতীয় মার্গসঙ্গীত বিশেষ বোঝে না; সে যদি আজকের সঙ্গীতকার যাঁরা, সিনেমায় কাজ করেন যাঁরা, তাঁদের জিজ্ঞেস করে যে সলিল একজন প্রতিভাবান সঙ্গীতশিল্পী – একথা কেন মানব? সঙ্গীতে সলিলের মৌলিক অবদানটা কী? তাহলে দেখেছি, গুছিয়ে কিছু বলতে পারেন না। আড্ডাচ্ছলে কিছু উদাহরণ তুলে ধরে কিছু কথা বলেন তাঁরা। কিন্তু ভারতীয় বা আন্তর্জাতিক সঙ্গীতের ইতিহাসে যদি সলিলের স্থান চিহ্নিত করতে চাই, তার উপায়টা কী? এই প্রশ্নের কোনো সদুত্তর এঁদের কাছ থেকে পাই না।

একই ব্যাপার ঋত্বিককে নিয়েও হয়। তিনি খুব বড় চলচ্চিত্রকার ছিলেন, তাঁকে তাঁর জীবদ্দশায় আমরা ঠিক বুঝতে পারিনি – এমন হতেই পারে। শিল্পের ইতিহাসে বহু শিল্পীর ক্ষেত্রেই এমন হয়েছে। কিন্তু আজ যে বুঝতে পারছি তার কারণ কী? এই প্রশ্ন নিয়ে কাউকে আলোচনা করতে আমি তো দেখি না। আমি যদিও সোশাল মিডিয়ায় নেই, তবু কিছুটা খেয়াল করি। নামকরা বাঙালি, সাধারণ বাঙালি – সকলেই ঋত্বিককে নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে আবেগে ভেসে যায় এবং বাঙালির ধারণা, আবেগ হল ঋত্বিককে বোঝার পাসওয়ার্ড। কিন্তু দেখাই তো যাচ্ছে যে কেবল আবেগে কিছু হয় না। স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে রামমোহন রায়, মাইকেল মধুসূদন দত্ত, রবীন্দ্রনাথের উত্তরসূরিরা কোন অতল চোরাবালিতে পড়েছে। এখান থেকে শুধু আবেগ দিয়ে উদ্ধার পাওয়া যাবে না।

ঋত্বিক তো বহুকাল আগেই লিখেছিলেন যে তিনি একটা ইতরের দেশে বাস করেন, যেখানে বণিকরা লেখক উদ্ভাবন করে এবং লেখকরা উদ্ভাবিত হন। তিনি যদি দেখতেন যে সোশাল মিডিয়া কেবল লেখক নয়, সঙ্গীতশিল্পী, অভিনেতা, নেতা – সবই উদ্ভাবন করছে; আবার অনেক শিল্পী সম্পর্কে নিদানও দিচ্ছে যে অমুক ওই বিষয়ে কথা বলেনি বা এক লাইনও লেখেনি বলে ও কোনো শিল্পীই নয়, তমুককে সাহিত্যিক বলে মনেই করি না, তাহলে ঋত্বিকের প্রতিক্রিয়া কেমন হত বলে মনে হয়? তিনি যে একবার বলেছিলেন সিনেমার থেকে ভাল কোনো মাধ্যম পেলে সিনেমাকে লাথি মেরে দিয়ে চলে যাবেন, এখন কি তিনি সেই কাজটাই করে অন্য কোনো মাধ্যমের খোঁজ করতেন?

যথেষ্ট সম্ভাবনা আছে যে ঋত্বিক ডিজিটাল মাধ্যমকে আয়ত্ত করতেন নিজের মত করে। অন্তত তিনি যে কোথাও আটকে থাকার লোক নন তা তাঁর মাত্র আটটা ফিচার ফিল্মেই পরিষ্কার হয়ে গেছে। ওটুকুতেই তিনি বুঝিয়ে দিয়েছেন যে তিনি কতখানি পাল্টাতে পারেন এবং সিনেমায় কতখানি উদ্ভাবনী শক্তির পরিচয় দিতে পারেন বিষয় এবং বক্তব্যে। তবে আমার এও মনে হয় যে আজকের নরকযাত্রার মধ্যে তিনি হয়ত রাজা লিয়রের মত হয়ে যেতেন। সম্পূর্ণ উন্মাদ, একজন unaccommodated man। তাঁকে যুক্তি তক্কো আর গপ্পো (১৯৭৪) তৈরি করার সময়ে আমি দেখেছিলাম, ক্রমশই কলকাতার বুদ্ধিজীবী মহল থেকে বিচ্ছিন্ন হচ্ছিলেন। এমন তো নয় যে ঋত্বিককে কলকাতার সাংস্কৃতিক গ্রহ, জ্যোতিষ্করা চিনতেন না; তিনিও তাদের চিনতেন। তাদের বৃত্তে তিনি আমন্ত্রিত হতেই পারতেন। কিন্তু তিনি নিজেকে আলাদা করে নিচ্ছিলেন। তার বদলে তিনি মিশতেন এমন লোকেদের সঙ্গে যাদের আমরা করুণার চোখে দেখি। তেমন তথাকথিত অশিক্ষিত লোকেদের সঙ্গে মেলামেশা করা, মদ খাওয়া তাঁর রোজকার জীবনের অঙ্গ হয়ে গিয়েছিল। আর মিশতেন আমাদের মত অখ্যাত, অনামী ছোটদের সঙ্গে। তিনি ছোটদের বিশ্বাস করতেন।

ওই ছবিতে যে তিনি নীলকণ্ঠ বাগচী হয়ে নকশালপন্থীদের সঙ্গে রাত কাটান বীরভূমের জঙ্গলে, তা কিন্তু নকশালপন্থীদের প্রতি তাঁর সমর্থন ছিল বলে নয়। ওখানে ঋত্বিকের ভাবনাটা এরকম যে একটা গোটা প্রজন্ম বিশ্বাসঘাতকতা করেছে। তারপর তোমাদের প্রজন্ম তবু নতুন করে কিছু একটা ভাবছে। আর আমি মাতাল হতে পারি, লোক ঠকিয়ে মদের বোতল জোগাড় করতে পারি। ব্যর্থ চলচ্চিত্রকারও হতে পারি, কিন্তু ভোরের আলোয় সত্যের মুখটা একবার দেখতে চাই। সত্যের জন্যে তাঁর এই আকুতিটা খাঁটি ছিল। এখন যা চলছে তা হল টুর্নামেন্ট। একটা ক্রিকেট টুর্নামেন্টের সঙ্গে এই কালচারাল টুর্নামেন্টের কোনো তফাত নেই। মানে বাংলায় এখন একটা কালচার ইন্ডাস্ট্রি চলছে। আমি তোমার পিঠ চাপড়ে দেব, তুমি রামের পিঠ চাপড়ে দেবে, রাম নবীনার পিঠ চাপড়ে দেবে, নবীনা মৃদুলার পিঠ চাপড়ে দেবে – এইভাবে চলতে থাকবে। ওইজন্যেই বললাম যে স্মরণ করার ভঙ্গিতেও নীরেন্দ্রনাথ আর রবীন্দ্রনাথের মধ্যে কোনো তফাত করা হয় না। ভাষাটা একই থাকে। ওটা আসলে জনসংযোগের ভাষা। আমরা কোনো টেলি সার্ভিসে ফোন করলে এই করতে হলে ১ টিপুন, ওই করতে হলে ২ টিপুন – এগুলো যেরকম যান্ত্রিকভাবে বলা হয়, বাঙালির গুণী মানুষদের নিয়ে আলোচনাও তেমনই যান্ত্রিক বা প্রোগ্রামড হয়ে গেছে। কতকগুলো গতে বাঁধা কথাই বলা হয়, সে জীবনানন্দ দাশ সম্পর্কেই বলা হোক আর মুকুন্দ দাস সম্পর্কেই বলা হোক।

এবার একটু সলিল চৌধুরীর প্রসঙ্গে আসি। সলিল আর ঋত্বিক দুজনেই ভারতীয় গণনাট্য সঙ্ঘের সঙ্গে দীর্ঘদিন যুক্ত ছিলেন এবং কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য ছিলেন। কিন্তু দুজনের কেউই একটা সময়ের পরে পার্টিতে টিকতে পারেননি। আজ এতদিন পরে তাঁদের সঙ্গে কমিউনিস্ট পার্টি বা বামপন্থার সম্পর্ককে আপনি কীভাবে দেখেন? পার্টির সঙ্গে বিচ্ছেদ কি শিল্পী হিসাবে তাঁদের উপর কোনো প্রভাব ফেলেছিল?

এখানে একটা গল্প বলতেই হবে। একবার যাদবপুরে একটা সেমিনারে আমি যুক্তি, তক্কো আর গপ্পো নিয়ে আলোচনা করছিলাম। ঘটনাচক্রে সেখানে শ্রোতাদের মধ্যে কবি ভারভারা রাও ছিলেন। আমার যা বক্তব্য ছিল তা নিয়ে তিনি কিছু বলেননি, কিন্তু পরে চা চক্র চলাকালীন বললেন, আচ্ছা, এই ছবিটা পাওয়া যায়? আমি তো ভাবতেই পারছি না যে উনি ওই সময়ে এইসব ভেবেছিলেন! ভারতের সমাজ এবং রাজনীতি তো ঠিক এরকমই! এত জ্যান্ত করে কী করে ভাবলেন উনি!

গল্পটা বললাম এইজন্যে যে ঋত্বিকের গুরুত্ব বামপন্থীরা সেইসময় পুরোপুরি বোঝেননি। তাঁরা ঋত্বিককে একজন সমকালীন সমাজবাস্তবের রূপকার ভেবেছিলেন। আর মনে করেছিলেন, যে উদ্বাস্তু সমস্যা নিয়ে কেউ কথা বলে না, ঋত্বিক সেই কাজটা করছেন, নিচুতলার মানুষকে পর্দায় তুলে আনছেন। বামপন্থীরা তলিয়ে দেখেননি যে এই নিচুতলার মানুষ বলতে আজাদগড় উদ্বাস্তু কলোনির মানুষ আর ওরাওঁ পল্লীর মানুষ এক কিনা। ঋত্বিক ঠিক কী বলতে চাইছেন? যদি শুধু উদ্বাস্তু সমস্যার কথা বলতেন, তাহলে কিন্তু তাঁর গুরুত্ব এতদিনে ফুরিয়ে যেত। ওই সমস্যার দিনগুলো তো অনেক দূরে চলে গেছে। কিন্তু উনি যে আসলে মানুষের আত্মচ্যুতি, শিকড়চ্যুতির কথা বলছিলেন এবং বলতে বলতে একটা দার্শনিক জায়গায় পৌঁছচ্ছিলেন; সলিলের গানেও গণসঙ্গীত বা বিদ্রোহের সঙ্গীত লেবেল লাগিয়ে যে লাভ নেই এবং তাঁর আধুনিক গান বা বম্বের সিনেমার গানকেও তুচ্ছ করে যে লাভ নেই – সে উপলব্ধি কমিউনিস্ট পার্টির হয়নি।

এমনকি আমি বলব যে আমাদের মেধাচর্চার জগতেও সলিলকে নিয়ে কোনো মৌলিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিচয় আমি প্রায় দেখিনি। দু-একজন কখনো কখনো আত্মপক্ষ সমর্থন করার জন্য সলিলকে ব্যবহার করেছেন। কিন্তু সলিলের মহত্ত্ব ঠিক কোথায় – এ নিয়ে আমি অন্তত কোনো গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা দেখিনি। আর ঋত্বিককে নিয়ে, আমার মনে হয় বাঙালিদের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা শুরু করেছিলেন বিষ্ণু দে। কিন্তু সেই স্তরের আলোচনাকে পরে কেউ অনুসরণ করেননি। তারপর হয়েছিল আবেগের বিচ্ছুরণ। বরং ঋত্বিকের মৃত্যুর পর থেকে তরুণতর প্রজন্মের যাঁরা তাঁকে নিয়ে আলোচনা করতে শুরু করেন, আমি বলব তাঁরা অনেকটা চেষ্টা করেছেন এবং করছেন। ঋত্বিককে নিয়ে এই চেষ্টা সারা বিশ্বেই হচ্ছে।

সলিলকে নিয়ে আলোচনায় মৌলিক দৃষ্টিভঙ্গির যে অভাবের কথা বলছেন, সেটা একটু বুঝিয়ে বলুন না।

ধরো, আজকাল তো বাংলায় থিওডোর অ্যাডর্নো ইত্যাদি বড় বড় নামের চর্চা চলে। কিন্তু অ্যাডর্নো বেঠোফেনকে নিয়ে যেরকম আলোচনা করেছেন সেরকম কিছু কিন্তু বাংলায় সলিলকে নিয়ে হচ্ছে না। আমিই অনেকদিন আগে একটা লেখায় লিখেছিলাম যে বাংলা আধুনিক সঙ্গীত মানে মূলত রামপ্রসাদ সেন, রবীন্দ্রনাথ আর সলিল। যদি বলো, কেন? আমি আমার মত একটা উত্তর দিতে পারি। কিন্তু আমি তো সঙ্গীত বিশেষজ্ঞ নই। সঙ্গীত বিশেষজ্ঞরা এ নিয়ে তাত্ত্বিক আলোচনা করলেন কোথায়? ঋত্বিককে নিয়েও কিন্তু যত সিরিয়াস আলোচনা হয় প্রায় সবই বাংলার বাইরে এবং দেশের বাইরে। বাঙালিদের এতসব করার সময় নেই। এমনকি কমিউনিস্টরাও এঁদের অনেকটা জনসংযোগের জন্য ব্যবহার করে আর সাধারণ মধ্যবিত্ত বাঙালি তাদের আবেগবিধুরতায় এঁদের ছুঁয়ে থাকে।

অনেকদিন আগে আপনার আর সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের একটা কথোপকথন শুনেছিলাম। সেখানে আপনি বলেছিলেন যে ঋত্বিক আদ্যন্ত বামপন্থী হলেও মনে করতেন তিনি মূলত একজন শিল্পী। তাঁকে রাজনীতিটাও শিল্পের মধ্যে দিয়েই করতে হবে। সলিলও তো আজীবন তাঁর সঙ্গীতের মধ্যে রাজনীতি বাঁচিয়ে রেখেছেন। সেক্ষেত্রে ইদানীং পশ্চিমবঙ্গে শিল্পীদের দলীয় রাজনীতিতে যোগ দেওয়া, ভোটে দাঁড়ানো, কিছুদিন পরে বেরিয়ে যাওয়া বা আর জি করের ঘটনার মত বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে কারো কারো পথে নামা – এগুলোকে আপনি কী চোখে দেখেন? এই শিল্পীদের কাজে তো আমরা ডান, বাম, মধ্য – কোনো রাজনীতিরই ছাপ দেখি না। মানে অধিকাংশ বাংলা সিনেমায় বা গানে বা নাটকে তো আটপৌরে জীবনটাই দেখতে পাই না। তার রাজনীতি দূরের কথা।

দেখো আজকাল বেশিরভাগ সময়েই আমি হয়ত খুব তেতোভাবে কথা বলি। কিন্তু জানি না আজকের শিল্পীরা যে রাজনীতিটা করছেন সেটার সম্পর্কে কী করে এর চেয়ে নরম করে বলা সম্ভব। আমার মনে হয়, আগে কলকাতা ফুটবলে যেমন দলবদল হত বা এখন যেমন আইপিএলের নিলাম হয়, নীতা আম্বানির মত ধনকুবেররা ক্রিকেটার কেনাবেচা করেন, আজকাল রাজনীতি তেমনই হয়ে গেছে। যদি আরেকটু সিরিয়াস ভাষায় বলি, তাহলে যা চলছে সেটাকে সোজাসুজি ওয়াল্টার বেঞ্জামিনের ভাষায় বলা উচিত aestheticization of politics – একেবারে আদর্শ ফ্যাসিবাদী শাসনে যা হয়ে থাকে। রাজনীতিকে এক ধরনের শিল্প, মানে spectacle, বানিয়ে দাও। আজ যদি পশ্চিমবঙ্গের দিকে তাকাও, তাহলে দেখবে সমস্ত রাজনৈতিক ঘটনা নিয়েই কবিতা লেখা হচ্ছে। সেসব খুব ভাববিহ্বল কবিতা। তাতে কুঠারকে কুঠার বলার চেষ্টা খুব কম। ফলে সাহিত্যে, শিল্পে ওই প্রতিবাদে শাসকের কিছু এসে যাবে না।

এবার ঋত্বিক আর সলিলের শিল্পকর্মের কথা যদি ভাবি, তাহলে দেখব যে তাঁরা ফর্ম আর বিষয়, দুটোরই এমনভাবে রাজনীতিকরণ করেছিলেন যে তাকে বলা যায় এক ধরনের দার্শনিক হস্তক্ষেপ। সেই কারণেই এঁরা নিজের সময়ের মুখপাত্র হয়ে উঠেছেন। ঋত্বিক আসলে কী করেছিলেন? দেশভাগ একটা উপলক্ষ মাত্র। আসলে মানুষের ছিন্নমূল হওয়া তার একটা অন্তর্গত সমস্যা। এই সমস্যাকে তিনি কোথায় রাখবেন – প্রকৃতপক্ষে এই নিয়েই ঋত্বিকের কাজ। অনেকেরই ধারণা মেঘে ঢাকা তারা (১৯৬০), কোমল গান্ধার (১৯৬১) আর সুবর্ণরেখা (১৯৬৫)- ই তাঁর উদ্বাস্তু সমস্যা নিয়ে ছবি। কিন্তু ঋত্বিকের প্রথম ছবি নাগরিক (১৯৫২, মুক্তি ১৯৭৭) দেখলেও একটা ছোট্ট দৃশ্য দেখা যাবে। কলকাতায় দুর্গা প্রতিমা প্রবেশ করছে এবং এক ভাড়াটে পরিবার বাড়ি থেকে উচ্ছেদ হচ্ছে। বাড়ি থেকে পালিয়ে ছবিতেও এই জিনিস দেখতে পাব। আমার তো তাই মাঝে মাঝে মনে হয় ওটা আসলে বাচ্চাদের ছবিই নয়। ওই ছবির কাঞ্চন যে বাড়ি থেকে পালিয়ে কলকাতা শহরে আসে এবং ওয়াইড অ্যাঙ্গলের প্রভু ঋত্বিক এক্সট্রিম ওয়াইড অ্যাঙ্গলে যেভাবে কলকাতা শহরকে দেখেন, সে এক বিশেষ দেখা। ওখানে বাড়িছাড়া হওয়ার আরেকটা স্তর দেখা যায়, তা হল পথেঘাটে থাকতে হওয়া। যেসব মানুষকে কাঞ্চন দেখে তারা কেবল উদ্বাস্তু নয়, তারা হল যাকে বলে underclass। এমনকি তিতাস একটি নদীর নাম ছবিতেও কিন্তু এই ব্যাপারটা ফিরে আসে, কারণ ভারতে প্রথমবার সভ্যতার স্থানচ্যুতি হয়েছিল সিন্ধু নদ গতিপথ পরিবর্তন করায়। সুতরাং তিতাসের শুকিয়ে যাওয়ার সঙ্গে এখানে ঋত্বিক সিন্ধুনদের ইতিহাসকে যুক্ত করছেন। যুক্তি তক্কো আর গপ্পো তো বলাই বাহুল্য, এক উন্মাদের বুড়ো আংলা হওয়ার প্রয়াস। নীলকণ্ঠের বাড়ি থেকে বেরিয়ে গ্রামের দিকে চলে যাওয়া, ছৌ নাচ, লোকাচার, মানে একেবারে people’s art বলতে যা বোঝায় – এসবের সঙ্গে আমাদের মধ্যবিত্ত শিল্পের সম্পর্ককেই ঋত্বিক প্রশ্ন করেন।

আমরা জানি যে গণসঙ্গীতে সলিল যখন পাশ্চাত্য সুরের প্রয়োগ শুরু করেন, তা নিয়ে গণনাট্য সঙ্ঘের মধ্যে বিতর্ক হয়েছিল। হেমাঙ্গ বিশ্বাসের মত মানুষ মনে করতেন যে বিদেশি সুর এদেশের একেবারে নিচের তলার মানুষ, যাঁরা গণসঙ্গীতের মূল লক্ষ্য, তাঁদের ছুঁতে পারবে না। কিন্তু সলিল এই যুক্তি মানতে চাননি। অন্যদিকে আমরা ঋত্বিকের ছবিতে দেখেছি দেশজ সংস্কৃতি একেবারে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে আছে। তিনি অযান্ত্রিক (১৯৫৮) ছবিতে ওরাওঁদের নাচ দেখান। বিশেষত ‘পার্টিশন ট্রিলজি’-তে পুরাণ বা এদেশের প্রাচীন কিংবদন্তিগুলোকে ব্যবহার করেন। সত্যজিৎ রায়ও একবার বলেছিলেন যে ঋত্বিকের মত একেবারে পাশ্চাত্য প্রভাবমুক্ত ভারতীয় চলচ্চিত্র নির্মাতা বিরল। আবার জীবনের শেষ ছবি যুক্তি, তক্কো আর গপ্পো, যে ছবি প্রায় আত্মজীবনী এবং যখন তিনি আর কমিউনিস্ট পার্টির সদস্যও নন, সেখানে ছৌ নাচ আসে। চরিত্রগুলোর নামও দুর্গা, নচিকেতা – এইরকম। তাই জানতে ইচ্ছা করছে যে সলিল আর ঋত্বিক কি ওই বিতর্কে দুটো আলাদা মতের লোক? নাকি এগুলোকে সেই সময়কার কমিউনিস্টরা অতিসরলীকৃত বাইনারিতে দেখতেন বলে ওই বিতর্ক তৈরি হয়েছিল?

আমি সম্প্রতি জ্যোতিরিন্দ্র মৈত্রের গান বা পি সি যোশীর সাংস্কৃতিক নীতি সম্বন্ধে বলতে বলতে এই ব্যাপারটাই ভাবছিলাম। লোকসংস্কৃতি আর আমাদের উচ্চবর্গীয় আধুনিকতা কীভাবে মিলতে পারে – এটা খুব গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। বস্তুত সলিল আর ঋত্বিক শুধু যে সমবয়স্ক ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন তা নয়, দুজনেই এই দুটো ধারাকে কীভাবে ব্যবহার করা যায় তা নিয়ে ভাবছিলেন। আসলে একটা স্বরের বদলে বহু স্বরে কথা বলা, দৈনন্দিনতাকে মহাকাব্যের স্তরে পৌঁছে দেওয়া দুজনেরই লক্ষ্য ছিল। কমিউনিস্ট পার্টির ওই বিতর্কের মূল্যায়ন করতে গেলে আমি মনে করিয়ে দেব, সলিল ১৯৬০-এর দশকের শুরুর দিকে যে গানগুলো রচনা করেছেন…জনপ্রিয় গান, আজও প্যান্ডেলে প্যান্ডেলে বাজে… সেগুলো এখন শুনলে এক অন্যরকম চিন্তা মাথায় আসে। কী গান? যেমন ধরো ‘পথ হারাব বলেই এবার পথে নেমেছি/সোজা পথের ধাঁধায় আমি অনেক ধেঁধেছি’ বা ‘নিষেধের পাহারাতে ছিলেম রেখে ঢেকে/সে কখন গেছে ফিরে আমায় ডেকে ডেকে’। এগুলো কি কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে তাঁর সংলাপ নয়? যে সরলরৈখিক আখ্যান পার্টির মত একটা প্রতিষ্ঠান তৈরি করে, সেটা ঠিক না-ও হতে পারে। ফলে পথ হারাব বলে পথে নামা সলিলের ক্ষেত্রে যেমন সত্যি, ঋত্বিকের ক্ষেত্রেও তেমন সত্যি।

এটা কেন বলছেন?

ধরো, সলিলদা একটা একান্ত ব্যক্তিগত মুহূর্তে আমাকে বলেছিলেন, যে কোমল গান্ধারে ব্যবহার করার জন্যে ঋত্বিকের অনুরোধে উনি একটা প্রেমের গান লিখেছিলেন। সেটা শেষপর্যন্ত ছবিতে রাখা হয়নি। কোন গান? ‘আমি ঝড়ের কাছে রেখে গেলাম আমার ঠিকানা’। এটা আলাদা করে আধুনিক গান হিসাবে প্রকাশ পেয়ে প্রবল জনপ্রিয় হয়। তা গানটাকে তলিয়ে দেখলে দেখা যাবে যে এটা এক ধরনের আত্মবিবরণী। ‘ওগো ঝরাপাতা, যদি আবার কখনো ডাকো’। এই লাইনটা শুনলেই আমার মনে পড়ে যে ঋত্বিক সুরমা ঘটককে একটা চিঠিতে লিখেছেন, পি সি যোশী গতকাল আমাকে জড়িয়ে ধরে বললেন, ‘ঋত্বিক, ইউ আর দি ওনলি পিপলস আর্টিস্ট ইন ইন্ডিয়া।’ এর থেকে বেশি কিছু চাই না। তাহলে কমিউনিস্ট পার্টি আবার কখনো ফিরে ডাকবে, এই ভাবনাই কি কাজ করছিল মনের মধ্যে? দুজনেরই? আমার তো এই কথাগুলোকে খেয়াল করলে সেরকমই মনে হয়। সে ডাক যে কখনো আসবে না তা হয়ত দুজনেই বুঝতেন। তবু…এ যেন এক রাজনৈতিক সংলাপ।

আর সলিল যা করছিলেন, সেটা তো আসলে ভারতীয় সঙ্গীতের এক বিরাট আধুনিকীকরণের চেষ্টা। কীরকম? এই যে আমি একটু আগে রামপ্রসাদ, রবীন্দ্রনাথ আর সলিলকে বাংলা আধুনিক গানের তিনটে মাইলস্টোন বলে চিহ্নিত করলাম। সেটা কেন? কারণ রামপ্রসাদের গানের যে আধ্যাত্মিক দিক সেটা বাদ দিয়েও যদি শুধু ভাষার দিকে নজর দিই, তাহলে দেখব যে উনি বাংলা গানের ভাষার ঝুঁটি ধরে দিক বদলে দিচ্ছেন। খাজাঞ্চিখানায় কাজ করতেন। ফলে তাঁর গানে অজস্র ফারসি শব্দ চলে আসছে, যেমন ‘দে মা আমায় তবিলদারী/আমি নিমকহারাম নই শঙ্করী’। রূপক আনছেন কৃষিকার্য থেকে, যেমন ‘এমন মানবজমিন রইল পতিত/আবাদ করলে ফলত সোনা’। এ তো বৈপ্লবিক। রামপ্রসাদ গানকে একেবারে সাধারণ মানুষের জিনিস করে তুলছেন। এমনিতে তো ভারতীয় মার্গসঙ্গীত সাধারণ মানুষের সমতলে নামতে পারে না। পণ্ডিত ভীমসেন যোশী বা ওস্তাদ আমির খাঁ, ওস্তাদ ফৈয়াজ খাঁদের সঙ্গীত উচ্চতায় মহাকাশে পৌঁছে যায়, কিন্তু তা দিয়ে তো বাজারের পোকাকাটা জিনিসের কেনাকাটা করা মানুষের মনের খিদে মেটে না সাধারণত। ভারতের লোকসঙ্গীত, যা হাবিব তনবীর বা ঋত্বিকের কাজে এসে পড়েছে, তার সঙ্গে উচ্চবর্গীয়দের সঙ্গীতের একটা বিরোধ থেকে গেছে। অথচ রাগ হংসধ্বনির সঙ্গে ‘কান্দিয়া আকুল হইলাম ভবনদীর পাড়ে’-তে তেমন বিরোধ নেই।

রবীন্দ্রনাথও ১৮৮১ সালে একটা প্রবন্ধে লিখেছেন যে ওস্তাদরা ‘গানের কথার উপরে সুরকে দাঁড় করাইতে চান, আমি গানের কথাগুলিকে সুরের উপরে দাঁড় করাইতে চাই। তাঁহারা কথা বসাইয়া যান সুর বাহির করিবার জন্য, আমি সুর বসাইয়া যাই কথা বাহির করিবার জন্য।’ এইজন্যেই আমার মনে হয় রবীন্দ্রনাথ ভারতীয় সঙ্গীতের সম্প্রসারণ ঘটিয়েছেন। আর সলিল কী করলেন? তিনি প্রাচ্য সঙ্গীত আর পাশ্চাত্য সঙ্গীতের মূল ভেদটা বুঝতেন। বুঝে কী করলেন? আপাতভাবে খাপ খায় না, যা contrapuntal, এমন জিনিসকে সফলভাবে মিলিয়ে দিলেন। গণসঙ্গীতের ক্ষেত্রে তো বটেই। আমি তোমাকে একেবারে সিনেমার গান থেকে উদাহরণ দিচ্ছি। হিন্দি ছবিতে সলিলের সুরারোপিত প্রথম জনপ্রিয় গান হল ‘আ যা রে পরদেশী…ম্যায় তো কব সে খড়ি ইস পার’।

বিমল রায়ের মধুমতী (১৯৫৮) ছবির গান, যে ছবির আবার চিত্রনাট্যকারদের একজন ঋত্বিক। সলিলদা নিজেই বলেছিলেন যে ওই গানে আসামের বিহু, পাঞ্জাবের ভাংড়া মেশানো হয়েছে। আবার ইন্টারল্যুডে মোজার্ট ঢোকানো হয়েছে। অথচ গানটা শুনলে কিন্তু সম্পূর্ণ দেশি গান বলেই মনে হয়। আর সারা দেশেই লতা মঙ্গেশকরের গলায় এটা আজও জনপ্রিয়।

সুতরাং ভারতীয় সংস্কৃতির আধুনিকীকরণের প্রয়োজন যে ছিল তা অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই। নাটকে এই কাজটা সেইসময় হাবিব তনবীর করছিলেন, সিনেমায় ঋত্বিক, সঙ্গীতে সলিল – এরকম আরও অনেকে। বস্তুত ভারতীয় গণনাট্য সঙ্ঘ সংগঠন হিসাবেই সচেতনভাবে এই কাজটা করছিল। ওই প্রয়াস সম্পর্কেই অশোক মিত্র একটু আলগা সুরে বলেছিলেন, ভারতীয় গণনাট্য সঙ্ঘ ১৯৪০-এর দশকে আমাদের দ্বিতীয় সাংস্কৃতিক রেনেসাঁ ঘটাচ্ছিল।

মানে আপনি বলছেন ঋত্বিক, সলিল দুজনেই শিল্পী হিসাবে একই লক্ষ্যে এগোচ্ছিলেন, কমিউনিস্ট পার্টির বাইরে চলে যাওয়ার পরেও?

আমার মনে হয় পি সি যোশীর নেতৃত্বে ভারতীয় গণনাট্য সঙ্ঘ যেটা করতে চেয়েছিল – নাটকে নবান্ন (১৯৪৪) দিয়ে, সাহিত্যে মাণিক বন্দ্যোপাধ্যায় যা করছিলেন ‘দুঃশাসনীয়’ বা ‘ছোট বকুলপুরের যাত্রী’-র মত গল্পের মধ্যে দিয়ে, কবিতায় সুভাষ মুখোপাধ্যায় বা সুকান্ত ভট্টাচার্য – সেটা হল উনবিংশ শতকের তথাকথিত রেনেসাঁয় যা হয়নি, সেই কাজটা করা। অর্থাৎ সংস্কৃতিকে একেবারে নিম্নবর্গীয় মানুষের কাছে নিয়ে যাওয়া। সলিল আর ঋত্বিক সঙ্গীতে এবং সিনেমায় সেটাই চেষ্টা করছিলেন। সিনেমার মত একটা যন্ত্রভিত্তিক মাধ্যমে এটা কিন্তু দুঃসাহসিক কাজ। কারণ আমরা সাধারণভাবে যন্ত্রকে সন্দেহই করি। আজও বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে রবীন্দ্রনাথের মুক্তধারা আর রক্তকরবী এত জনপ্রিয় কেন? বা মহাত্মা গান্ধীর আমেদাবাদ টেক্সটাইল সম্পর্কে বক্তৃতাগুলোর আজও আবেদন রয়েছে কেন? কারণ গান্ধী আর রবীন্দ্রনাথ – দুজনেই খেয়াল করেছেন যে যন্ত্রের দাঁতে অনেক রক্ত লেগে আছে। যন্ত্রের আগমন তো স্রেফ শিল্পবিপ্লবের ফলাফল নয়। যন্ত্রকে এদেশে এনেছে ঔপনিবেশিক শক্তি। এর সঙ্গে পুঁজি আর মুনাফার সরাসরি যোগ রয়েছে। তার ফলে ঢাকার মসলিন নষ্ট হয়েছে, বহু কুটির শিল্প উঠে গেছে, জমি জায়গার ব্যাপক দখলদারি করে রেললাইন পাতা হয়েছে। এসবে হয়ত জাতিরাষ্ট্র গঠনে সুবিধা হয়েছে, কিন্তু আমাদের সমাজের তন্তুজাল ছিন্নভিন্ন হয়ে গিয়েছিল।

তা ঋত্বিক দেখলেন যে এটা খুব জটিল একটা বিষয়। কারণ এই যুগে তো আর যন্ত্রের সাহায্য ছাড়াই বাঁচব – একথা বলা যায় না। ওরাওঁদের কারোর যদি হার্ট অ্যাটাক হয় তাহলে তাদেরও তো ইসিজি, বাইপাস সার্জারি ইত্যাদি করতেই হবে। তন্ত্র মন্ত্র, তুকতাকে তো আমরা থেমে থাকব না। কারণ মানুষের উপকারে যন্ত্রের ব্যবহার এখন সম্ভব হয়েছে আর আমরা তো চাইও এমন একটা সমাজ যেখানে ওরাওঁদের কাউকে এই সুবিধাগুলো থেকে বঞ্চিত হতে হবে না। কিন্তু এই দুয়ের সমন্বয় হবে কী করে? সেটা ঘটাতে গেলে অযান্ত্রিক করতে হবে। সুবোধ ঘোষের মূল গল্পে কিন্তু ওরাওঁদের নামগন্ধ ছিল না। তাহলে ঋত্বিক তাদের আনলেন কেন? আসলে এটা মনে করিয়ে দেওয়ার জন্যে যে আমাদের দেশে প্রাচীনকাল থেকে বৈজ্ঞানিক পরীক্ষানিরীক্ষা কখনো অনাদৃত থাকেনি। মহেঞ্জাদারো বা পাটলিপুত্রেও তার চিহ্ন আছে। সুতরাং যন্ত্র জিনিসটাকেই ভারতীয় হলে প্রত্যাখ্যান করতে হবে তা নয়। কিন্তু সেই যন্ত্র কাদের হাতে, কারা তাকে কীভাবে ব্যবহার করছে সেগুলো গুরুত্বপূর্ণ।

সলিলের কাজে এই জিনিসটা কীভাবে হয়েছে যদি একটু উদাহরণ দিয়ে বলেন…

একসময় ফ্র্যাঙ্কফুর্ট স্কুলের অ্যাডর্নো, ওয়াল্টার বেঞ্জামিনকে উদ্ধৃত করে বলেছিলেন যে দৃশ্যকলা যেমন বস্তুকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করে, তেমনি এমন গানও আছে যা পাখিদের গানকে নশ্বরতা থেকে উদ্ধার করে। এটা কী করে করা যায় সে প্রশ্ন খুব গুরুত্বপূর্ণ। সবসময় যে লোকসঙ্গীতকে অনুসরণ করলেই তা করা যাবে এমন নয়। বরং ১৯৫৯ সালে লতার গাওয়া ‘যা রে উড়ে যা রে পাখি’ গানটায় দেখো, কীভাবে শব্দকে নশ্বরতার হাত থেকে মুক্তি দেওয়া হচ্ছে। ‘যা ফিরে আপন নীড়ে’ বলা হচ্ছে, অথচ সুরটা কিন্তু রুট কর্ডে ফিরছে না। আবার ‘রানার’ গানটার কথা যদি ভাবি। রানার ক্ষুধার ক্লান্তিতে ক্ষয়ে যাচ্ছে, সলিল সুরটাকে ছবার রুট কর্ডে ফিরিয়েছেন। হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের মত শিল্পীও বলে ফেলেছিলেন, সলিল, এ গান গাওয়া খুব মুশকিল। কিন্তু গানটাতে শুধু শ্রমজীবী মানুষের সংগ্রাম তুলে ধরার জন্যে সলিল কী অসাধ্য স্বরলিপি তৈরি করেছিলেন! তার জন্যে পাশ্চাত্য সঙ্গীতের সাহায্য নিয়েছেন। তাতে তো দোষের কিছু নেই। পল রবসন ১৯৩৪ সালে বলেছিলেন যে যিশুখ্রিস্ট সাদা চামড়ার মানুষের কাছে এক ধরনের বিমূর্ত অনুভূতি। তারা তাঁকে চার্চে খুঁজে পায়। কিন্তু কালো মানুষদের কাছে যিশু স্পর্শযোগ্য বিষয়। সেই অনুভূতি থেকে কালো মানুষদের কথ্য ভাষায় যেসব গান রচিত হয়েছিল সেগুলোকে রবসন মার্কিন মূলধারার সংস্কৃতিতে নিয়ে আসার চেষ্টা করেছিলেন।

আরও পড়ুন সলিল চৌধুরী স্মরণে একটি মনোমুগ্ধকর সন্ধ্যা

আচ্ছা, এবার একটু অন্য প্রসঙ্গে যাই। রাজনৈতিক মতাদর্শের সঙ্গে সম্পৃক্ত শিল্পীকেও তো ঘর সংসার চালাতে হয়। সকলে ঋত্বিকের মত সারাজীবন নিজের মত করে শিল্প করতে পারলে করব, নইলে করবই না – এই সঙ্কল্প নিয়ে চলতে পারেন না। ঋত্বিক বিমল রায়ের মধুমতী-র মত হিট ছবির চিত্রনাট্য লেখার মত দু-একটা কাজই করেছেন। সিনেমা শেখানোর সরকারি চাকরিও বেশিদিন করেননি। সলিল আবার প্রচুর সিনেমার কাজ করেছেন, বাংলা আধুনিক গান রচনা এবং সুর দেওয়ার কাজ করেছেন। তাতেও বহু উৎকৃষ্ট শিল্প সৃষ্টি হয়েছে। কিন্তু এই যে আমাদের একটা প্রবণতা আছে, আমরা কেউ বাণিজ্যিক পরিসরে করা কাজগুলোকে কম গুরুত্ব দিই, আবার কেউ ‘ঘুমভাঙার গান’ নামে পরিচিত সলিলের সরাসরি রাজনৈতিক কাজগুলোকে পাত্তা দিতে চাই না। এটা কি ঠিক? মানে গরিব শিল্পীর শিল্পই সৎ শিল্প, বাকি সব স্রেফ আপোস – এরকম ভাবে কি শিল্পকে দেখা যায়?

একদমই যায় না। ওভাবে দেখলে তো বলতে হবে যে শিল্পীর গান কেউ শোনে না সে-ই সবচেয়ে বড় শিল্পী। ওটা একেবারেই ভুল চিন্তা পদ্ধতি। আসলে ঋত্বিকও কিন্তু চাইতেন লোকে তাঁর ছবি দেখুক। দেখে না বলে যথেষ্ট কষ্টও পেতেন। আমি যদি এখন পিয়ানো বাজাই, একটা লোকও শুনবে না। তাতে কি প্রমাণ হয় আমি বেঠোফেন? ধরো, আমি যদি সাহিত্যের কথা বলি। সাহিত্য শব্দটাই তো ‘সহিত’ থেকে এসেছে। অর্থাৎ অন্যের সঙ্গে যোগাযোগ, সমাজের সঙ্গে যোগাযোগ – এটাই তো সাহিত্য এবং শিল্পের কাছে মানুষের চাহিদা। যেমন প্রাচীন কবিরা কিন্তু ছন্দের উত্তম ব্যবহার করেছেন বলে কবি নন। তাঁরা সমাজের কথা বলতেন, সেই জন্যে কবি। মহাকাব্যগুলো তো সেভাবেই তৈরি হয়েছে। রামায়ণ, মহাভারত, ইলিয়াড, ওডিসি – সবই তো কবিতা। কিন্তু সেগুলো একেকটা জাতির অলিখিত ইতিহাস। সেইখানেই মহাকাব্যের মহত্ত্ব। সুতরাং শিল্পের জনপ্রিয় হওয়া বা শিল্পীর লক্ষ্মীলাভ মোটেই খারাপ নয়। কিন্তু আমাদের সময়ে আমরা ব্যাপারটাকে সন্দেহ করতে শুরু করেছি কেন?

কারণ পুঁজিবাদ যে কোনো জিনিসকেই বিক্রয়যোগ্য পণ্য হিসাবে দেখে। শার্ল বোদলেয়ার বা জীবনানন্দ দাশ তার কাছে স্রেফ বিক্রয়যোগ্য বস্তু। সেইজন্যেই পুঁজিবাদ মনে করে যে আরও বিক্রি করতে গেলে শুধু জীবনানন্দের কবিতা বিক্রি করলে চলবে না। তাঁকে star বানাতে হবে। যেমন পাবলো পিকাসো বলতেন যে লোকে আমার ছবি নিয়ে মাথা ঘামায় না, অথচ আমি যে চুল কাটতে ভয় পাই সেটা নিয়ে বিস্তর আলোচনা করে। উনি কিন্তু সত্যিই চুল কাটার ব্যাপারে কুসংস্কারাচ্ছন্ন ছিলেন। মনে করতেন চুলের মধ্যেই ওঁর প্রতিভা রয়েছে। ফলে ওই টাক মাথায় যে কটা চুল আছে সেগুলো কাটতেও খুব গাঁইগুঁই করতেন। এখন বুর্জোয়া প্রচারযন্ত্র ওই কুসংস্কারটারই বিপুল প্রচার করত। মানে ওটাকেও বিক্রি করা হত। জীবনানন্দের ক্ষেত্রেও দেখবে একই ব্যাপার হয়। তিনি কোনো আত্মীয়ার প্রতি অনুরক্ত ছিলেন কিনা আসলে তো তা দিয়ে কিছু এসে যায় না, তিনি তো মহান তাঁর কবিতার জন্য। বিশেষ করে সাতটি তারার তিমির থেকে তিনি যখন পাল্টে গেলেন, কলকাতার জরায়ু এবং দুর্গত মানুষের কথা লিখতে শুরু করলেন, সেগুলো নিয়ে লোকে তত কথা বলে না। বেশি কথা হয় বনলতা সেন আসলে কে – এই নিয়ে। শিল্পের বনলতা সেন যে আসলে কোনো বাস্তব রমণী নন, ওই কল্পনার পিছনে কোন মহিলা ছিলেন তা নিয়ে ভেবে যে লাভ নেই – একথা পুঁজিবাদ তোমাকে ভুলিয়ে দেয়।

রবীন্দ্রনাথের কবিতা বা গানের মালবিকা, মালিনী বা নলিনীদের নিয়েও এমনই করা হয়। ওই নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করে বড়জোর কোনো নির্দিষ্ট মহিলাকে চিহ্নিত করা যেতে পারে। তাতে এটুকুই প্রমাণিত হবে যে রবীন্দ্রনাথ ভালবাসতে জানতেন। সে আর বেশি কথা কী? ভালবাসতে না জানলে ওরকম কবিতা লেখা যায়? কিন্তু রবীন্দ্রনাথের কাব্য নিয়ে না ভেবে তিনি কবে কোন বিদেশিনী সম্পর্কে কতটা আগ্রহী হয়েছিলেন এবং সেই আগ্রহে কতটা যৌন ইশারা ছিল তা নিয়ে আমরা যত গবেষণা করি, তাঁর লেখা নিয়ে তত মাথা ঘামানো হয় না। এইটাই পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় শিল্প, সাহিত্য জনপ্রিয় হওয়ার বিপদ।

কিন্তু উল্টোটাও তো করা হয়। যেমন বিশেষ করে বামপন্থীরা, শিল্পের রাজনৈতিক দিকটা পছন্দ না হলেই সেটাকে অবজ্ঞা করতে চান।

সেটাও নিঃসন্দেহে আরেক ধরনের ভ্রান্তি। ধরো, ফ্রান্সে রোম্যান্টিসিজমের জনক থিওফিল গোতিয়ে বলেছিলেন যে একজন নগ্ন রূপসী বা রাফায়েলের একটা আসল পেন্টিং দেখতে পাওয়া গেলে আমি আমার ফরাসি নাগরিক অধিকারও ছেড়ে দিতে রাজি আছি। এটাকেই কলাকৈবল্যবাদ বা art for art’s sake বলে। সাধারণ মার্কসবাদীরা এই মনোভাবকে কিন্তু প্রবল আক্রমণ করবেন। বলবেন, সে কী! ফরাসি নাগরিক আদর্শ – সাম্য, মৈত্রী, স্বাধীনতা – তার অধিকার তো আধুনিক বিশ্বের সবচেয়ে বড় অধিকার! যে শিল্পী একজন নগ্ন সুন্দরী বা রাফায়েলের আঁকা ছবি দেখার জন্যে এটাকে বর্জন করার কথা বলে, সে তো প্রতিক্রিয়াশীল! কিন্তু রুশ দেশে মার্কসবাদের যিনি বিরাট এক স্তম্ভ, যাঁর কথা আমরা ভুলে গেছি, এমনকি বিপ্লবের পর যিনি মেনশেভিক হওয়া সত্ত্বেও লেনিন বলেছিলেন যে ওঁর প্রতি যেন অন্যায় ব্যবহার না হয়, সেই জর্জি প্লেখানভ আর্ট অ্যান্ড সোশাল লাইফ (১৯১২) বইতে দেখিয়েছিলেন যে এটাই শিল্পীর স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া। যখন সর্বস্ব যায় বস্তুকামী ঘৃধ্নুতায় নানাবিধ কাজে, তখন এই সৌন্দর্য চর্চাই বিপ্লব। বঙ্কিমচন্দ্র যখন দুর্গেশনন্দিনী (১৮৬৫) উপন্যাসে আয়েষার মুখে বসালেন ‘বন্দী আমার প্রাণেশ্বর’, সেটা স্রেফ একটা রোম্যান্টিক উক্তি নয়। সেটা আমাদের দেশে নারী স্বাধীনতার প্রথম উচ্চারণ।

আসলে আমার মনে হয় আমাদের মার্কসবাদী চিন্তানায়করা, বিশেষত বাঙালিরা, অকল্পনীয় ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছেন শিল্পের ব্যাখ্যায়। নিজেদের সাংবাদিকদের সঙ্গে মিলিয়ে ফেলেছেন এবং কেবল ঘটনার বিবরণ দিয়ে গেছেন। স্বয়ং কার্ল মার্কস লিখেছেন যে উইলিয়ম শেক্সপিয়র ষোড়শ শতকের অন্যান্য সমাজতাত্ত্বিকদের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। হ্যামলেট নাটকটা মার্কসের বিশেষ পছন্দ ছিল। গোটা দাস কাপিটাল জুড়ে শেক্সপিয়র ভজনা রয়েছে। এ থেকে বোঝা যায় যে মার্কসের দেখার মধ্যে বিশালতা রয়েছে। আর আমাদের এখানকার মার্কসবাদীদের দেখা অত্যন্ত সংকীর্ণ দেখা। এই মুহূর্তের কর্পোরেট পুঁজিবাদও এই দেখাকে প্রশ্রয় দিচ্ছে। তাই মধুসূদন দত্ত আর সুবল দত্তের মধ্যে তফাত করা হচ্ছে না।

এখান থেকে একটা অনিবার্য সমসাময়িক প্রশ্ন এসে পড়ে। আমরা দেখতে পাচ্ছি স্বাধীনতার পর থেকে জওহরলাল নেহরুর মডেলে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় শিল্প সৃষ্টির যে ধারা ভারতে ছিল সেটা দ্রুত তুলে দেওয়া হচ্ছে। ন্যাশনাল ফিল্ম আর্কাইভ তুলে দেওয়া হচ্ছে, ন্যাশনাল ফিল্ম ডেভেলপমেন্ট কর্পোরেশনের মত সংস্থাগুলোর প্রযোজনায় ছবি আর আমাদের চোখে পড়ে না। কিন্তু এর বিপরীতে অন্য এক ধরনের সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা দেখছি। সেটা হল, তুমি সরকারি দলের হয়ে প্রোপাগান্ডা ফিল্ম বানাও, খোদ প্রধানমন্ত্রী তোমার ফিল্মের প্রোমোশন করবেন। কাশ্মীর ফাইলস, কেরালা ফাইলস, সবরমতী এক্সপ্রেস – এরকম প্রচুর ছবি হচ্ছে। এর মধ্যেও যাঁরা কোনোভাবে সরকারের বা সংখ্যাগুরুর অপছন্দের ছবি করতে যাচ্ছেন তাঁদের হাতে এবং ভাতে মারা হচ্ছে। ধরুন, সঞ্জয় লীলা বনশালির সেট ভাংচুর করা হয়েছিল পদ্মাবত ছবির শুটিংয়ের সময়ে। আবার নেটফ্লিক্স দিবাকর ব্যানার্জির তীস ছবিটা করাল, কিন্তু ঝামেলা হতে পারে এই আশঙ্কায় মুক্তি পেতে দিল না। এরকম একটা পরিবেশে ঋত্বিকের মত করে ছবি করা কি সম্ভব হত বলে আপনার মনে হয়? মানে ছবিটা না হয় ঘটিবাটি বেচে বানালাম। কিন্তু মুক্তি পাওয়ার নিশ্চয়তাটুকু তো থাকতে হবে? আবার ধরুন, কলকাতার ইন্ডাস্ট্রিতে আমরা দেখছি যে নির্দেশকরা একজোট হয়ে বলছেন – শাসক দলের খবরদারি, তোলাবাজি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে ছবি করাই ঝকমারি হয়ে দাঁড়াচ্ছে। এইরকম পরিস্থিতিতে কি ঋত্বিকের পক্ষেও তখনকার মত ঋজু থেকে ছবি করা সম্ভব হত বলে আপনার মনে হয়?

খুবই কঠিন হত। কারণ একজন কবি বা ঔপন্যাসিক বা চিত্রশিল্পী এই যুগেও কাগজ, কলম, তুলি বা কম্পিউটার কিনে নিজের মর্জি মত শিল্প সৃষ্টি করে যেতে পারেন। কিন্তু সিনেমা তো ওভাবে করা যায় না, সিনেমা করতে আরও অনেককিছুর সঙ্গে কয়েক কোটি টাকাও লাগে। এই পরিস্থিতিতে সেই ক্ষতিস্বীকার করতে যাবে কে? ফলে ঋত্বিকের মত করে এই যুগে ছবি করা সত্যিই খুব শক্ত হত এবং সেই লড়াইটা শেষপর্যন্ত হয়ত রাজনৈতিক সংগ্রামে পর্যবসিত হত।

এই প্রশ্নটা শুনে আমার মনে পড়ে গেল ঋত্বিক শেষ যে ছবিটা করতে চেয়েছিলেন সেইটার কথা। সেটা আশ্চর্যভাবে আর জি করের ঘটনাটার সঙ্গে মিলে যায়। আর জি করের নৃশংস ঘটনার পরে যে জনরোষ আমরা দেখলাম তা নিয়ে কোনোদিন কোনো ছবি-টবি হবে কিনা আমার খুব সন্দেহ আছে, তার কারণ তুমি যা বললে। তো ঋত্বিকের শেষ কাজ ছিল সেই বিষ্ণুপ্রিয়া নামে একটা চিত্রনাট্য। সেটা কী ব্যাপার? না জরুরি অবস্থা চলাকালীন নবদ্বীপ শহরে একটি মেয়ের অগ্নিদগ্ধ মৃতদেহ পাওয়া যায়। পুলিস যথারীতি প্রথমে ওটাকে নিতান্ত দুর্ঘটনা বলে চালানোর চেষ্টা করেছিল, পরে দেখা যায়, একেবারে জ্যামিতির উপপাদ্যের মতই, আসলে নবদ্বীপের কিছু দুষ্কৃতী মেয়েটিকে ধর্ষণ করে খুন করেছে। এই খবর কানে যাওয়ার পরেই ঋত্বিক ওই চিত্রনাট্য লিখে ফেলেন। তাতে একটা গান ছিল, যার বক্তব্য হল – যিনি ত্রেতায় সীতা, দ্বাপরে দ্রৌপদী, তিনিই এখন বিষ্ণুপ্রিয়া। নবদ্বীপে একটি মেয়ের ধর্ষণ এবং হত্যার কথা শুনেই ওঁর চৈতন্যদেবের স্ত্রী বিষ্ণুপ্রিয়ার কথা মাথায় আসে।

বুঝতেই পারছ ছবিটা কী দাঁড়াত। কিন্তু ও জিনিস কি আদৌ করতে দেওয়া হত? কে ফান্ডিং করত? রাষ্ট্র তো করত না, কারণ রাষ্ট্রীয় অপরাধ নিয়েই ছবিটা। আর আজ যা অবস্থা, তাতে কোনো ব্যক্তি বা সংস্থা করতে চাইলেও তাকে হাজারবার ভাবতে হবে যে অন্য কাজ কারবারের জন্যে তাকে রাষ্ট্রের সঙ্গে সমঝোতা করে চলতেই হবে। রাষ্ট্র সরাসরি বারণ করে দিলে তো আর সম্ভবই নয়। যেমন নাজি জার্মানিতে ব্রেশটের পক্ষে নাটক করা সম্ভব ছিল না। একসময় পর্যন্ত পেরেছিলেন। তারপর আর করা যায়নি। করলেও এমনভাবে করতে হয় যে শাসক যেন ধরতেই না পারে কী করা হল। যেমন জঁ পল সার্ত্র লিখেছিলেন আই অ্যাম মাই ওন ফ্রিডম । ফ্যাসিবাদীরা বুঝতেই পারেনি যে ওতে গ্রীক পুরাণের আশ্রয়ে যা বলা আছে তা আসলে নাগরিক স্বাধীনতার পক্ষে একটা বয়ান। তারপর নাজিরা প্যারিস দখল করার ঠিক আগেই জঁ রেনোয়া ল্য রেগলে দ্য জু (১৯৩৯) বলে যে ছবিটা করেন, সেই ছবি দেখলে কিন্তু আপাতদৃষ্টিতে মনে হবে বড়লোকরা এ ওর বউয়ের দিকে হাত বাড়াচ্ছে, সে তার বউয়ের সঙ্গে পরকীয়া করছে – এইসব নিয়েই ছবি। অনেকটা আজকাল বড় কাগজের প্রকাশ করা শারদ পত্রিকায় যেসব গল্প, উপন্যাস ছাপা হয় সেগুলোর বাঁধা বিষয়বস্তুর মত। ওগুলো শুধু যে অরাজনৈতিক তা নয়, ওগুলো আসলে মানুষকে একটা বৃত্তের মধ্যে আটকে রাখা। কিন্তু বড় শিল্পী ওর মধ্যেও অন্তর্ঘাত ঘটিয়ে দিতে পারেন। রেনোয়াঁ তাই করেছিলেন।

রেনোয়া

ব্রেশটও করেছেন। তাঁর নাটকে অনেক রগরগে শব্দ আছে, অনেক জনপ্রিয় থিম আছে। কিন্তু তার মধ্যে দিয়েই তিনি অন্য বয়ান উপস্থাপন করেন। এমনকি শেক্সপিয়রও এটা করেছেন। প্রোটেস্ট্যান্ট রানি এলিজাবেথের আমলে রোমান ক্যাথলিক শেক্সপিয়র তাঁর নাটকে যা সব নাশকতামূলক কাণ্ড করেছেন তা দেখে আজও অবাক হতে হয়।

কিন্তু আজকের অবস্থা যে খুব জটিল তা মানতেই হবে। ইরানে আব্বাস কিয়ারোস্তামি বা মোহসেন মাখমলবফকে তো অনেকটাই প্রবাসে কাজ করতে হয়েছে, জাফর পানাহিকে বারবার কারাবাস করতে হয়েছে। ফলে এখানকার শিল্পীরা আজ কী করে কী করবেন তা তাঁদেরই ঠিক করতে হবে। এর কোনো বাঁধা ফর্মুলা নেই।

কিন্তু আমাদের দুর্ভাগ্য হল, আমাদের শিল্পীদের চিন্তা করার অভ্যাস চলে গেছে। তাঁরা শিল্পকে স্রেফ পেশা হিসাবে দেখছেন। যে কোনো পেশাতেই যেমন আয়কর দিতে হয়, এটা ওটা নিয়ম মানতে হয়, সেসব মেনেই তাঁরা চলছেন। ফলে ওইসব প্রোপাগান্ডা ছবি তৈরি হচ্ছে। সেগুলোতে চিত্রভাষা বা আঙ্গিকের দিক থেকেও কোনো বলার মত জিনিস নেই।

যদি বাংলা সিনেমার আলোচনা করি, তাহলে দেখব যে বাংলা ছবি দীর্ঘকাল ধরে দর্শককে কিছুই দিতে পারছে না। একেবারে সাধারণ দর্শক যা চায় সেটুকু দেওয়ার কথাই বলছি। কিন্তু লোকে তাই নিয়েই চলছে। পিটুলি গোলা খেয়ে ভাবছে পায়েস খাচ্ছে। এই সমস্যার সমাধান কীভাবে হবে আমি জানি না। তবে ক্রমশই আমার মনে হচ্ছে যে এই সাংস্কৃতিক সমস্যা আসলে একটা রাজনৈতিক সমাধান দাবি করে। এখন সেটা দলীয় রাজনীতি দিতে পারবে কিনা তা আমি বলতে পারব না। আজকের বাংলায় তো এমন কোনো রাজনৈতিক দল দেখি না যারা এককভাবে অথবা একাধিক দল মিলে একটা সাংস্কৃতিক রূপান্তর ঘটাতে পারবে। ফলে এই নরকযাত্রা থামিয়ে আমরা কীভাবে আবার রবীন্দ্রনাথ, জীবনানন্দের উত্তরাধিকার ফের অর্জন করতে পারব তা আমি সত্যিই জানি না।

ঋত্বিক, সলিলের শতবর্ষে আপনি কি তাহলে বাঙালি সংস্কৃতির জন্যে কোনো আশার আলো দেখতে পাচ্ছেন না?

দেখো, ঋত্বিকের একটা অসমাপ্ত জাতীয় বিপ্লবের ধারণা ছিল। কোমল গান্ধার ছবিতে দেখবে অনসূয়া ভৃগুকে একটা ডায়রি দেয়। ওটা তো আসলে রূপক। তখন পি সি যোশীর আমল। ভাবা হয়েছিল যে অসমাপ্ত জাতীয় বিপ্লব সমাপ্ত করার দায়িত্ব ইতিহাস নিয়তির মত এসে কমিউনিস্ট পার্টিকে দেবে। সেই স্বপ্ন সফল হয়নি। সলিল ভেবেছিলেন তিনি প্রাচ্য আর পাশ্চাত্যের মিলন ঘটিয়ে ভারতীয় সঙ্গীতের যে আধুনিকীকরণ করছিলেন তা ক্রমশ এগিয়ে যাবে। গানকে ক্রমশ সরল হতে হবে, গানকে মানুষের হাতে তুলে দিতে হবে। এই ধারণাটা গুপি গাইন বাঘা বাইন (১৯৬৯) ছবিতেও সেই রাজসভায় গানের দৃশ্যে পাওয়া যায়। কালোয়াতি গান শুনে রাজা ঘুমিয়ে পড়ছিল। তখন গুপি আর বাঘা, দুটো চাষাভুষো মার্কা লোক, এসে এমন গান গাইল যার ‘ভাষা এমন কথা বলে/বোঝে রে সকলে’। বিজন ভট্টাচার্য, হেমাঙ্গ বিশ্বাস, জ্যোতিরিন্দ্র মৈত্র, সলিল চৌধুরী, ঋত্বিক ঘটক, উৎপল দত্ত অথবা মাণিক বন্দ্যোপাধ্যায় – এঁরা সেই উনিশ শতকের তথাকথিত নবজাগরণের দিকপালদের স্তরের ছিলেন কিনা সেই আলোচনায় আমি যাচ্ছি না। কিন্তু এই দ্বিতীয় নবজাগরণের একেবারে হাসিম শেখ, রামা কৈবর্তের কাছে পৌঁছবার চেষ্টা ছিল। ইতিহাসকে তলা থেকে লেখার একটা প্রয়াস ছিল। সে প্রয়াস তো বিফল হয়েছে। এখন আর কীভাবে তা করা যাবে আমি জানি না। কিন্তু সলিল আর ঋত্বিকের শতবর্ষে তাঁদের কাজকে ঐতিহাসিক ও দার্শনিক প্রেক্ষিতে বিচার করলে কিছু সুবিধা হতে পারে। এঁরা কত দক্ষ শিল্পী তা নিয়ে ভেবে খুব একটা উপকার হবে না বলেই আমার মনে হয়।

নাগরিক ডট নেট ওয়েবসাইটে প্রকাশিত

‘রাজ, দিলীপ, দেব: যুগের স্বপ্ন সাফল্য ব্যর্থতার ধারক’

এখনকার অক্ষয় কুমার ইত্যাদিদের ছবি থেকে তো ভারতবর্ষের দারিদ্র্যের ইতিহাসটাকেই মুছে দেওয়া হয়েছে। কুষ্ঠরোগীর সঙ্গে যেমন এককালে মানুষ অস্পৃশ্যের মত ব্যবহার করত, এখনকার হিন্দি সিনেমা দরিদ্রের প্রতি সেই মনোভাব নিয়েছে।

আজ রাজ কাপুরের জন্মদিন, তাঁর শতবর্ষ হবে ২০২৪ সালে। গত রবিবার শতবর্ষে পড়লেন দিলীপকুমার। দেব আনন্দও শতবর্ষ পূর্ণ করবেন বছর ঘুরলে। স্বাধীনোত্তর ভারতে হিন্দি ছবির বিপুল জনপ্রিয়তার পিছনে এই তিনজনের অবদান অতুলনীয়। আজ আসমুদ্রহিমাচলে বলিউড নামে পরিচিত মুম্বাই ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির ভূমিকা যেখানে এসে পৌঁছেছে, তাতে ওই ত্রয়ীর কাজকে ফিরে দেখা প্রয়োজন মনে করে নাগরিক ডট নেট সঞ্জয় মুখোপাধ্যায়ের দ্বারস্থ হয়েছিল। তিনি যাবতীয় প্রশ্নের উত্তর তো দিলেনই, উপরন্তু আলোচনায় এসে পড়লেন উত্তমকুমার, এল দিলওয়ালে দুলহনিয়া লে যায়েঙ্গে। যেমন ঢুকে পড়লেন ইউরি গ্যাগারিন, তেমনি এসে গেল কহো না পেয়ার হ্যায়। নাগরিকের পক্ষ থেকে কথা বলেছেন প্রতীক

রাজ

স্বাধীনতার পর থেকে হিন্দি সিনেমার যে বিপুল জনপ্রিয়তা, হিন্দিভাষী নন এমন মানুষকেও যেভাবে তা প্রভাবিত করেছে তাতে এই তিনজনেরই তো অনস্বীকার্য প্রভাব। আজকের জনপ্রিয় হিন্দি ছবি যে পথে চলেছে তার সাপেক্ষে ওঁদের কীভাবে দেখেন?

প্রশ্নটা খুব আকর্ষণীয় এবং কিছুটা দূরপ্রসারী। যে মুহূর্তে ভারতীয় চলচ্চিত্রে রাজ কাপুর, দিলীপকুমার এবং দেব আনন্দ প্রবেশ করছেন তখন যে ধরনের সাংস্কৃতিক বাতাবরণ ছিল, একটা সদ্য স্বাধীন দেশে যে ধরনের গঠন প্রক্রিয়া চলছিল এবং আমাদের রাজনীতি যেভাবে আবর্তিত হচ্ছিল, তার সমস্তটাই জনপ্রিয়তার আবরণ সরিয়ে দিলে দিলীপকুমার, দেব আনন্দ এবং রাজ কাপুরের মধ্যে দেখা যায়। একথা অনস্বীকার্য যে পাঁচের দশকে মেলোড্রামার পৃথিবীতে একইসঙ্গে পশ্চিমে দিলীপকুমার, রাজ কাপুর ও দেব আনন্দ; দক্ষিণে শিবাজী গণেশন এবং পূর্বে উত্তমকুমার যে মায়াবী সাম্রাজ্য গড়ে তোলেন তার কোনো পুনরাবৃত্তি ভারতীয় সিনেমায় আর হবে না সম্ভবত।

মুম্বাইয়ের ত্রয়ীর মধ্যে দিলীপকুমার অবশ্য একটু আলাদা, কারণ রাজ আর দেব প্রোডাকশন হাউসের মালিক হয়ে উঠেছিলেন। দিলীপকুমারের তেমন কোনো ঠিকানা ছিল না। কিন্তু মোদ্দা ব্যাপারটা এইরকম যে যা ছিল রানীর কণ্ঠহার, মানে ‘কুইন’স গোল্ডেন নেকলেস’, তা ওই সময়ে অস্তমায়ায় করুণ রঙিন; উপনিবেশের স্মৃতি ক্রমশ আবছা হয়ে জেগে উঠছে নির্বাচিত সাধারণতন্ত্র; বিদায় নিচ্ছেন অশোককুমার, বলরাজ সাহনিরা। এই সময়ে তাঁদের নায়কোচিত অবস্থানে এসে পড়লেন দিলীপকুমার; সঙ্গে সঙ্গে রাজ কাপুর আর দেব আনন্দ। কিন্তু ব্যাপারটা যে শুধুই ঘটনা হিসাবে গুরুত্বপূর্ণ তা নয়। সমাজতাত্ত্বিক দিক থেকে দেখলেও সে সময় ক্রমশ গ্রাম এসে শহরে ভিড় করছে। নানারকম অবসিত পল্লী শহরের আনাচে কানাচে। তখন আমাদের অজান্তেই জাতি গঠনের রূপকথা নানারকম বাঁক নিচ্ছিল। মনে রাখতে হবে, সত্যজিৎ রায়ের অপূর্ব কুমার রায় যখন কলকাতায় প্রবেশ করে নবীন নাগরিক হওয়ার প্রতিশ্রুতি নিয়ে, প্রায় তখনই শাপমোচন ছবির নায়ক উত্তমকুমার গ্রাম থেকে কলকাতায় চলে আসেন। এই স্থানান্তর উপলক্ষে উত্তমকুমার জনসাধারণের মন লুঠ করে নেন।

আপনি বলছেন একই ব্যাপার রাজ কাপুরদের ক্ষেত্রেও হিন্দি ছবিতে ঘটেছিল?

ঠিক তাই। কলকাতার মতই তৎকালীন বম্বে শহরের মধ্যেও এক অলীক গ্রাম তৈরি হয় সিনেমার পর্দায়। উত্তমকুমারের মতই রাজ কাপুর এবং দিলীপকুমার শহুরে লোকগাথার অবিসংবাদী সম্রাট হয়ে উঠেছিলেন। এই হল মেলোড্রামার আদর্শ মুহূর্ত, যেখানে বুর্জোয়া সভ্যতার ট্র্যাজিক দৃষ্টিভঙ্গিকে কিছু বাধ্যতামূলক নৈতিকতা দিয়ে প্রতিস্থাপন করা হয়। বস্তুত দেশভাগ, গ্রাম-শহরের দ্বন্দ্ব, নগরায়নের দোলাচল কিছু আধিক্য তৈরি করে, অতিশয়োক্তিই প্রয়োজনীয় হয়ে ওঠে। আমার মতে সেই অতিশয়োক্তির আদর্শ দৃষ্টান্ত দিলীপকুমার।

রাজ কাপুর তাহলে কী? বলা যায় উনি সরকারি সিলমোহর। প্রায় শাস্ত্রানুমোদিত, নেহরু যুগের জাতি গঠনের স্মারক। অন্যদিকে দেব আনন্দ স্বাধীনোত্তর লাগামছাড়া যৌবনের দূত। রাজকে দেখলে আমরা বুঝতে পারি যে একদিকে যখন সাহিত্যসমর্পিত বাস্তববাদ চলচ্চিত্রের জন্য একটি মানচিত্র তৈরি করতে ব্যস্ত, তখন তিনি মেলোড্রামার আদলে গ্রাম থেকে শহরে আসার অভিজ্ঞতা ও রাষ্ট্রীয় বিধিসমূহ পরীক্ষা করে চলেছেন সেলুলয়েডে। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরুর গণতান্ত্রিক সমাজবাদ ও মিশ্র অর্থনীতির ধারণায় এক ধরনের জাতি গঠনের প্রয়াস মূর্ত হয়ে উঠেছিল। আওয়ারা (১৯৫১), বুট পলিশ (১৯৫৪), শ্রী ৪২০ (১৯৫৫) এবং জিস দেশ মে গঙ্গা বহতি হ্যায় (১৯৬০) উত্তর-স্বাধীনতা পর্বে ভারতীয় জনজীবনে আধুনিকতার নিশ্চিত দলিল হিসাবে চিহ্নিত হতে পারে। আরেকটু তলিয়ে ভাবলে, প্রমথেশ বড়ুয়ার অধিকার সেই ১৯৩৯ সালে তথাকথিত অবৈধ সন্তানের উত্তরাধিকার নিয়ে যে প্রশ্ন তুলেছিল রাজ কাপুর সেই উত্তরাধিকার কৃতজ্ঞ চিত্তে বহন করে নেন আওয়ারাতে। অথচ তিনিই আবার সামাজিক প্রসঙ্গ আড়াল করে সিক্ত যূথীর গন্ধবেদনে আখ্যানের গহনে চলে যান শ্রী ৪২০ ছবিতে। শাড়ির অন্তরালে একটি ছাতার তলায় নার্গিস ও নিজেকে অমর করে দেন সঙ্গীতের চরণে, ‘পেয়ার হুয়া ইকরার হুয়া’ মেলডিতে। নিজেকে জীবনের যাবতীয় বাসনার আড়ালে রেখে জানান, ওই রজনীতে ঝড় বয়ে যাবে রজনীগন্ধা বনে।

ওখান থেকেই তো ওই জুটি অন্য মাত্রা পেল?

হ্যাঁ, এরপর কিংবদন্তী হয়ে গেলেন রাজ-নার্গিস যুগল। রিচার্ড বার্টন-এলিজাবেথ টেলরের সম্পর্ক যদি গবেষণার বিষয় হয়ে থাকে, তাহলে রুপোলি পর্দায় তার পরিশিষ্টে রাজ কাপুর-নার্গিসের জীবনকথাও নক্ষত্রলোকের জিনিস। বম্বেভিত্তিক হিন্দি ছায়াছবির জগৎ গত শতকের নয়ের দশক থেকে বলিউড নামে চিহ্নিত হয়। সেখানে সবচেয়ে শক্তিশালী কাপুর পরিবারের মধ্যমণি রাজ, যেন রামায়ণে ইক্ষ্বাকু বংশের শ্রীরামচন্দ্র। অবিভক্ত ভারতের উত্তর-পশ্চিম সীমান্তে পেশোয়ার শহরে তাঁর জন্ম। বাবা পৃথ্বীরাজ জীবিকার কারণে বম্বে শহরে চলে আসেন। ভারতীয় গণনাট্য সঙ্ঘের প্রথম সারির এই নেতা শুধু যে সপরিবারে ভারতের নানা শহরে আস্তানা গেড়েছিলেন তাই নয়, নিজের সন্তানদের মধ্যেও সংক্রমিত করেছিলেন গরীব ও নিচুতলার মানুষকে খোলা চোখে দেখার ঘরানা। এই সুবাদে কিছুদিন কলকাতাতেও ছিলেন বালক রাজ কাপুর। ছোটবেলা থেকেই যে বাংলা ভাষার উত্তম ব্যবহার জানতেন তার কারণও এই শহরের মায়াবী স্মৃতি।

এই কলকাতার সংযোগটা আরেকটু খুলে বলবেন?

এটা সবিস্তারে বলার মত ব্যাপারই বটে। একটা মজার তথ্য অনেকেই হয়ত জানেন না। রাজের প্রথম ছবির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে কলকাতা। ছবিটার নাম ইনকিলাব (১৯৩৫)। সেখানে তাঁর আবির্ভাব হয় শিশুশিল্পী হিসাবে। সে ছবির পরিচালক দেবকী বসু আর প্রযোজনা নিউ থিয়েটার্স স্টুডিওর। যদিও ডানা মেলতে রাজ সময় নিয়েছেন আরও অনেকদিন। ইনকিলাবের এক যুগ পরে নীলকমল (১৯৪৭) ছবিতে মধুবালার বিপরীতে নায়ক হিসাবে তাঁর আত্মপ্রকাশ। কিন্তু ১৯৪৯ সালের অন্দাজ ছবিতে যে মেলোড্রামার কথা এত করে বলছি তা এক বিশেষ স্তরে উন্নীত হয়। তবে সেখানেও রাজ আর দিলীপ একত্রে ছিলেন। রাজ প্রথম মেঘমুক্ত হলেন আওয়ারার সাফল্যে। ভারতবর্ষ তো বটেই, তখনকার সোভিয়েত ভূমিও প্লাবিত হয়েছিল আওয়ারা হুঁ গানে। এতটাই যে মানুষের প্রথম মহাকাশ যাত্রায় ইউরি গ্যাগারিনের মহাকাশযানে এই গান গুঁজে দেওয়া হয়।

সোভিয়েত ইউনিয়নে তো রাজ কাপুরের অনেক ছবিই প্রবল জনপ্রিয় হয়েছিল। এই প্রসঙ্গ যখন এসেই গেল তখন জিজ্ঞেস করতে ইচ্ছে করছে, রাজ কাপুরের ছবির যে রাজনীতি সেটাই কি ভারতের মত কমিউনিস্ট রাশিয়াতেও জনপ্রিয় হওয়ার কারণ?

শুধু তা হয়ত নয়। আওয়ারা ছবিতে নারী ও শিশুর সঙ্গে আদালত এবং আইনের যে সংঘর্ষ পরবর্তী বুট পলিশ ছবি (যাকে টাইম ম্যাগাজিন ‘ক্ষুদ্রাকার মহাকাব্য’ বলেছিল) বা শ্রী ৪২০ ছবিতেও দেখা যায়, তা থেকে বোঝা যায় রাজ কাপুর একটি দেশের গ্রাম থেকে শহরে রূপান্তরের পথে যে উত্থান পতন, যে রাজনৈতিক সংঘর্ষ, যে অশ্বখুরের ধ্বনি, সেগুলোকে এক ধরনের রূপকথার আঙ্গিকে প্রকাশ করছেন। তিনি সমাজের কথা বলছেন, কিন্তু প্রেম আর গান সেখানে যেভাবে জড়িয়ে থাকছে তাতে অনেকসময়েই একরকম ব্যালাডের রূপ নিচ্ছে। যেমন মেরা জুতা হ্যায় জাপানি গানটা একসময় প্রায় জাতীয় সঙ্গীতের মর্যাদা পেয়ে গিয়েছিল। তার পিছনে আবার রাজনীতি অন্যতম কারণ, যেহেতু তখন ভারত পঞ্চশীল রাজনীতির চর্চা শুরু করেছিল। সুতরাং রাজ কাপুরের রাজনীতি ব্যালাডের রূপ ধরে পর্দায় আসে বলেই সত্যজিতের অপরাজিত (১৯৫৬) ছবির চেয়ে অনেক বেশি জনচিত্তহারী হতে পেরেছিল সর্বত্রই। মেহবুব খানের মাদার ইন্ডিয়া (১৯৫৭) ছবির মতই রাজের জিস দেশ মে গঙ্গা বহতি হ্যায় উত্তর ভারতের সম্পন্ন চাষির চোখ দিয়ে ভারতীয় নব্য জীবনগাথা প্রতিষ্ঠার চেষ্টা।

আপনি সম্প্রতি এক জায়গায় বলেছেনদিলীপকুমারের উত্থান নেহরুজাত সমাজতান্ত্রিক যুগের সূচক আর শাহরুখ খানের উত্থান মনমোহনী বাজার অর্থনীতির সূচক। দিলীপকুমার থেকে শাহরুখ অব্দি পৌঁছতে গিয়ে হিন্দি সিনেমা তো ভোল পালটে অনেক বেশি করে উত্তর ভারতীয় এবং অনাবাসী ভারতীয়কেন্দ্রিক হয়ে পড়লযেখানে বাঙালি বা তামিল চরিত্র শুধুমাত্র হাস্যরস উৎপাদন করে। এমনটা তো বরাবর ছিল না। স্বয়ং অমিতাভ বচ্চনের প্রথম হিট ছবি তো আনন্দ, যেখানে কথকের চরিত্রটাই একজন বাঙালি ডাক্তারের। এই সারা ভারতকে অন্তর্ভুক্ত করার সংস্কৃতি যে হিন্দি ছবিতে আর রইল না, এটাকে আপনি কীভাবে ব্যাখ্যা করেন?

এখানেই আসতে চাইছিলাম। এই যে আমরা দিলীপকুমারের কথা বলছি। তিনি তো একজন আর্কিটাইপাল বিরহী এবং অতিনাটক তাঁর কাছে শকুন্তলার হাতের আংটির মত। কিন্তু দিলীপকুমার কেন কিংবদন্তী? কারণ নবীন ভারতীয় প্রজাতন্ত্র যে সমস্ত মিথ জনসাধারণের জন্য ছড়িয়েছিল, সেগুলো দিলীপকুমার আশ্চর্যভাবে নিজের শরীরে মুদ্রিত করতে পারতেন। যেমন বড়ে গোলাম আলি খাঁ সাহেবের কণ্ঠমাধুর্যে ভেসে যেতে যেতে যে প্রেম পথের মধ্যে পেতেছিল নিজের সিংহাসন, তা দর্শককুলকে স্বপ্নপুরীতে নিয়ে যায়। সে দ্যাখে সকরুণ দীর্ঘশ্বাসে দিলীপকুমারের যন্ত্রণাতাড়িত মুখ। পাঁচের দশকে দেবদাস হয়ে তিনি মদের পেয়ালায় ঠোঁট ছোঁয়ালে তা একটা আস্ত প্রজন্মের অশ্রুলিপি হয়ে ওঠে। অর্থাৎ দিলীপকুমার নক্ষত্রলোকে সময়ের আশ্চর্য মুখপাত্র। ধরো আমরা যখন মধুমতী (১৯৫৮) দেখি বা অন্দাজে রাজ কাপুরের বিপরীতে দিলীপকুমারকে দেখি, তখন বুঝি যে এই নায়করা “assure the passage from awe to charm”। কথাটা আমার নয়, রলাঁ বার্থের। কথাটা এঁদের প্রসঙ্গে খাটে। এঁদের সময় সম্পর্কে আগেই যা বললাম – একদিকে যুগ যুগ ধরে জমে থাকা মাটির টান, অন্যদিকে শাসক প্ররোচিত শিল্পসভ্যতার দায়ে বদলে যাওয়ার সমস্ত ক্ষতচিহ্ন উৎকীর্ণ হয়ে আছে নাগরিক সভ্যতার গায়ে। ফলে দিলীপকুমারের সমকালীন যুবসমাজ ফলের বাগিচা এবং লেদ মেশিনের আর্তনাদের মধ্যে ছিন্নভিন্ন হতে হতে যে উন্মাদনা এবং প্রতিস্থাপনকে খেয়াল করে, তা যদি অপরাজিত বা জলসাঘর (১৯৫৮) চিত্রিত বাস্তবতার ইশতেহারকে পরিহার করে, তবে তাতে এক ধরনের মাত্রাছাড়া ঢেউ থাকবেই। ফলে বলা যেতে পারে দিলীপকুমার, রাজ কাপুর আর দেব আনন্দ ইতিহাসের একরকম সরলীকৃত ব্যাখ্যার মূর্ত রূপ।

এবার শাহরুখের কথা বলি। আমাদের ওই ত্রয়ীর সকলেই, চলতি কথায় যাকে বলে ‘সুদর্শন’। তাঁরা যুবতীদের হৃদয় হরণ করতেন। পুরুষরাও তাঁদের দেখে এক মায়াবী লাবণ্য অনুভব করেন। শাহরুখকে আমরা যখন দেখতে পেলাম ততদিনে কিন্তু আমাদের ধর্মনিরপেক্ষতা অপসৃয়মান, নবীনের সঙ্গে প্রাচীনের দ্বন্দ্বও অনেক বদলে গেছে। নেহরু যুগের অবসানে আমরা বুঝতে পারছি সাবেকি সমাজতন্ত্রের পতাকা পথপ্রান্তে লুটোপুটি খাচ্ছে। এ দেশে যেমন নেহরুর অর্থনীতি বাতিল হয়ে যাচ্ছে, তেমনি বিশ্ব রাজনীতিতে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনও আসন্ন। ফলে শাহরুখ আসেন এক সাধারণ ‘অপর’-এর প্রতিনিধি হয়ে। তিনি আমাদের জয় করলেন কিন্তু কোনো মতাদর্শগত বার্তা দিয়ে নয়, যে বার্তা রাজ বা দিলীপের চরিত্রগুলো দিতে পারত। শাহরুখ এই কারণেই বিশ শতকের শেষ বড় নায়ক হয়ে উঠলেন যে তিনি আর পাঁচজনের মতই এবং তিনি কোনো বৃহত্তর স্বপ্নের ফেরিওয়ালা নন। ফলে এই শতাব্দীতে পৌঁছে ওম শান্তি ওম (২০০৭) ছবিতে তিনি মুম্বাইয়ের ছবির প্রায় গোটা ইতিহাসটারই নতুন রকম ব্যাখ্যা করে নিজেকে তার কেন্দ্রে স্থাপন করেন, খানিকটা ব্যঙ্গই করেন। অর্থাৎ এখানে কিন্তু তাঁর একটা পাল্টা রাজনীতি উঠে এল।

রাজ কাপুরের একটা দিক নিয়ে আমার কৌতূহল নিরসন করতে চাই। উনি ১৯৫৬ সালে জাগতে রহো ছবিতে অভিনয় করেছেন, যেখানে গ্রামের একজন তৃষ্ণার্ত কৃষক শহরে এসে একটু জল পাচ্ছে না কারোর কাছে, উল্টে চোর সন্দেহে তাড়া খাচ্ছে। এই ছবির পরিচালক শম্ভু মিত্র, অমিত মৈত্র। সঙ্গীত পরিচালক সলিল চৌধুরী অর্থাৎ ভারতীয় গণনাট্য সঙ্ঘের সাথে যুক্ত লোকেরা। পরে যখন রাজ কাপুর আর কে ফিল্মসের ব্যানারে নাচে গানে ভরপুর ছবি করছেনতখনো জাগতে রহোর প্রভাব যেন থেকেই যাচ্ছে। সেই কপর্দকশূন্য মানুষযাকে চার্লি চ্যাপলিনের ছবির আলোচনায় আমরা ট্র‍্যাম্প বলিসে জাগতে রহোর আগেই মুক্তি পাওয়া শ্রী ৪২০-এ তো প্রায় চ্যাপলিনের চেহারাতেই ছিল, কিন্তু বহু পরে ১৯৭০ সালে যখন রাজ মেরা নাম জোকার করেন, তখনো সেই ট্র্যাম্পসুলভ একটা চরিত্রই কেন্দ্রে। ১৯৬৬ সালে বাসু ভট্টাচার্য পরিচালিত তিসরি কসম এমনিতে একটা প্রেমের ছবি। কিন্তু সে ছবির রাজ অভিনীত চরিত্র, গাড়োয়ান হীরামন, সেও প্রায় সব হারানো একজন মানুষ। বারবার এইরকম চরিত্র রাজের কাজে ফিরে আসত কি স্রেফ চার্লি চ্যাপলিন তাঁর প্রিয় শিল্পী ছিলেন বলে, নাকি ভারতীয় গণনাট্য সঙ্ঘের কোনো স্থায়ী প্রভাব ওঁর উপর রয়ে গিয়েছিল বলা যায়?

মেরা নাম জোকার, তারপর ববি (১৯৭৩) বা রাম তেরি গঙ্গা ময়লি (১৯৮৫)-র সময়ে রাজ কাপুর এমন এক বাণিজ্যিক সিনেমা উৎপাদন করছেন যেখানে লক্ষ্মী আর সরস্বতীর মধ্যে প্রথমজনের দিকেই পাল্লা ভারি। মজার কথা, ববির চিত্রনাট্যকারদের একজন, খাজা আহমেদ আব্বাস ছিলেন ১৯৪৬ সালে তৈরি ধরতি কে লাল ছবির পরিচালক। সে ছবির প্রেরণা বিজন ভট্টাচার্যের নবান্ন। অর্থাৎ সেই লোক এই যুগে ববির চিত্রনাট্যকার হয়ে গেছেন। তেমনি রাজ কাপুরও ববিতে আপাতভাবে শ্রেণিবৈষম্যের কথা বলছেন বটে, কিন্তু আসলে রজার ভাদিম যেভাবে ফরাসী নবতরঙ্গে ব্রিজিত বারদোকে ব্যবহার করেন সেইভাবে ডিম্পল কাপাডিয়াকে প্রদর্শনযোগ্য নারীত্বের মডেল হিসাবে ব্যবহার করছেন। একই ঘটনা ঘটাচ্ছেন জিনত অমনকে নিয়ে সত্যম শিবম সুন্দরম (১৯৭৮) আর মন্দাকিনীকে নিয়ে রাম তেরি গঙ্গা রাম তেরি গঙ্গা ময়লি ছবিতে।

তবে তা সত্ত্বেও এটা ঠিকই, তিনি যে গণনাট্য সঙ্ঘের আদর্শ নিয়ে শুরু করেছিলেন, তার ছাপ শেষদিকেও দেখা যায়। মেরা নাম জোকারে এসে তাঁর উপর নব বাস্তববাদের প্রভাব দেখা যায়। ফলে শুধু চ্যাপলিনকে পছন্দ করতেন বলেই যে ট্র্যাম্প বারবার ফিরে এসেছে তাঁর কাজে, তা বোধহয় নয়। যদিও রাজের চ্যাপলিন প্রীতি সর্বজনবিদিত। কিন্তু শুধু কাজ নয়, রাজের ব্যক্তিগত জীবনের দিকে তাকালে প্রশস্তি না করেও বলা যায়, তাঁর মধ্যে সেই গণনাট্য সঙ্ঘের আমলের লোকেদের সারল্য কিছুটা রয়ে গিয়েছিল। যেমন একবার ইরানের এক বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে সাম্মানিক পিএইচডি দিয়েছিল। তখন তিনি বলেছিলেন, আমি তো কখনো বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকিনি, এখানে এই কালো পোশাক পরে অধ্যাপকদের মধ্যে দাঁড়িয়ে মনে হচ্ছে কত বড় হয়ে গেছি! অত বড় তারকার এত সরল কথা বলা হয়ত বামপন্থী বাবার প্রভাবই হবে। তাঁর সব ছবিতেই কিন্তু রাজ এক ধরনের সারল্যের প্ররোচনা দিয়েছেন। ফলে মনস্তাত্ত্বিকভাবে একেবারে ছাপোষা ভারতীয়ের সঙ্গে তিনি সংযোগ স্থাপন করতে পারতেন। ববির মত ছবিতেও দারিদ্র্যকে একটু অলঙ্কার পরিয়ে দেওয়া তাঁর স্বধর্মে পর্যবসিত হয়েছিল। আমার ধারণা এটা চ্যাপলিনের প্রভাব নয়, গণনাট্য সঙ্ঘে আদি যুগ কাটানোরই ফল।

এবার একটা প্রশ্ন করব যেটা হয়ত অযৌক্তিক, কিন্তু লোভ সামলাতে পারছি না। রাজ কাপুর, দিলীপকুমারের ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির ক্রমশ অক্ষয় কুমারের ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি হয়ে যাওয়া – এর পিছনে কমিউনিস্ট পার্টি ভাগ, তার ফলে মূলধারার শিল্প থেকে গণনাট্য সঙ্ঘের প্রভাব ক্রমে অপসৃত হওয়াকে কতটা দায়ী করা যায়? কারণ প্রভাবটা তো সে আমলে নেহাত কম ছিল না। জাগতে রহো বা বিমল রায়ের দো বিঘা জমিন তো বিষয়বস্তুর দিক থেকেই অন্যরকম, কিন্তু মধুমতীর মত তথাকথিত রোম্যান্টিক ছবির চিত্রনাট্যও তো ঋত্বিক ঘটকের লেখা। সে জিনিস যে বন্ধ হয়ে গেল, তাতে কি বামপন্থীদের একেবারে সাধারণ মানুষের সঙ্গে সাংস্কৃতিক সংযোগ তৈরি করার কাজটার ক্ষতি হল? ঘটনাচক্রে আজ আবার হেমাঙ্গ বিশ্বাসেরও জন্মদিন। যিনি একেবারে সাধারণ মানুষের চেনা আঙ্গিকে বামপন্থী রাজনৈতিক আখ্যান সৃষ্টি করতে পারতেন। যেমন মাউন্টব্যাটেন মঙ্গলকাব্য তৈরি করেছিলেন। 

এতে কোনো সন্দেহ নেই যে আধুনিক বলিউডে হিন্দি-হিন্দু-হিন্দুস্তানের দর্পিত পদক্ষেপ ঘটেছে। সেখানে শুধুই শপিং মল সংস্কৃতি রয়েছে, যেখানে গরীবকেও সাজিয়ে গুছিয়ে দেখানো হয়। সিনেমার এমন হয়ে যাওয়া সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পরে সুনিশ্চিত হয়ে যায় একমেরু পৃথিবীতে। বলিউড তখন আমাদের বোঝাতে শুরু করে যে আমরাই শুধু হলিউডের নকল করি না, ওরাও আমাদের ‘ছম্মা ছম্মা’ গান নেয় (নিকোল কিডম্যান অভিনীত মুলাঁ রুজ ছবিতে)। মানে অর্থনৈতিক উদারীকরণের নতুন প্রতিশ্রুতি নিয়ে বলিউড আমাদের সামনে হাজির হয়। এটা ক্ষতি তো বটেই। কিন্তু এতে আমাদের একটা উপকার হয়েছে। সেটা হল এককালে হিন্দি ছবির যেসব বাড়াবাড়ি নিয়ে আমরা হাসাহাসি করতাম, যেমন বড়লোকের ছেলের সঙ্গে গরীবের মেয়ের প্রেম বা উল্টোটা, সেগুলোরও যে দরকার ছিল তা আমরা উপলব্ধি করতে পারলাম।

আরও পড়ুন শ্রদ্ধেয়

কেন এরকম বলছেন?

আচ্ছা দিলীপকুমারের শতবর্ষ তো, তাঁর মেলোড্রামার উদাহরণ দিয়েই বলি। তিনি কী আশ্চর্য দক্ষতায় বাঙালি বিরহী দেবদাস আর মোগল যুবরাজ সেলিম – দুটো ভূমিকাই পালন করেছেন। এই দুটো চরিত্রের দূরত্ব কতটা? একবার দিলীপ হালকা মেজাজে বলেছিলেন – ৫০ ফুট। কারণ আসলে আন্ধেরির মোহন স্টুডিওতে এই দুটো ছবির সেট পড়েছিল মুখোমুখি। ফলে দিলীপ মাত্র কয়েক গজ হেঁটে ব্যথিত মাতাল থেকে গর্বোদ্ধত যুবরাজ হয়ে যেতেন। এই যে বিমল রায়ের পরামর্শে দেবদাস চরিত্রটার সঙ্গে হাড়ে মজ্জায় মিশে যাওয়া… কী মর্মান্তিকভাবে বলেছিলেন সেই সংলাপ ‘কৌন কমবখত হ্যায় জো বরদাশ্ৎ করনে কে লিয়ে পীতা হ্যায়?’ এ তো এক অবাস্তব জগৎ তৈরি করছিলেন। মুঘল-এ-আজমে যখন ‘যব পেয়ার কিয়া তো ডরনা কেয়া’ গানের মুহূর্ত তৈরি হচ্ছে, তখনো ভারত এক অসম প্রেমকে স্বীকৃতি দিচ্ছে। যা বাস্তবে ঘটে না, ঘটা সম্ভব নয়। বলা চলে এসব গরীবের আকাশকুসুম কল্পনাকে প্রশ্রয় দেওয়া। কিন্তু এখন তো ছবি থেকে গরীব উধাও হয়ে গেছে।

এখনকার অক্ষয় কুমার ইত্যাদিদের ছবি থেকে তো ভারতবর্ষের দারিদ্র্যের ইতিহাসটাকেই মুছে দেওয়া হয়েছে। কুষ্ঠরোগীর সঙ্গে যেমন এককালে মানুষ অস্পৃশ্যের মত ব্যবহার করত, এখনকার হিন্দি সিনেমা দরিদ্রের প্রতি সেই মনোভাব নিয়েছে। ওটাকে ঢেকে দেওয়া হয়। আমেদাবাদে যেমন বিদেশি নেতারা এলে গরীবদের পাড়ার সামনে পাঁচিল তুলে দেওয়া হয়, অনেকটা সেইরকম। এখন দরিদ্র হওয়া অপরাধ। সেই কহো না পেয়ার হ্যায় (২০০০) আমল থেকে খেয়াল করলে দেখা যাবে, এখনকার ছবিতে ভিখারিরাও যেন সাজানো গোছানো, ব্র্যান্ডেড। অথচ শোলে (১৯৭৩) পর্যন্তও সমাজের সর্বস্তরের মানুষকে পর্দায় দেখতে পাওয়া যেত। নিয়মমাফিক মুসলমানের উপস্থিতি, শিখের উপস্থিতি থাকত। আমাদের জাতীয় সঙ্গীতে যে প্রজাতন্ত্রের কথা বলা হয়, প্রায় তারই চেহারা দেখা যেত মুম্বাইয়ের হিন্দি ছবিতে।

আজ তার ঠিক উল্টো ঘটছে, এক ধরনের কেন্দ্রীকরণ চলছে। যেমন বিয়ে – একটা সামাজিক মিলনোৎসব। সেই দিলওয়ালে দুলহনিয়া লে যায়েঙ্গে (১৯৯৫) থেকে পাঞ্জাবি বিয়েই ভারতীয় বিয়ে হয়ে উঠল। ভারতের অন্যান্য প্রান্তে অন্য কোনোরকম বিয়ে হয় কিনা সেকথা আমরা যেন ভুলেই গেছি। হিন্দি ছবি গোটা দেশটার একটা সিন্থেটিক কোডিফিকেশন করেছে। যেন কম্পিউটার, যেখানে ক্লিক করলেই মুশকিল আসান।

সেইজন্যেই বলছি, অল্প বয়সে আমরা তথাকথিত আর্ট সিনেমার পাল্লায় পড়ে রাজ কাপুর, দিলীপকুমার, দেব আনন্দদের নিয়ে ঠাট্টা ইয়ার্কি করতাম। আজ মনে হয় তাঁরা একটা যুগের স্বপ্ন, সাফল্য এবং ব্যর্থতাকে ধারণ করার চেষ্টা তো অন্তত চালিয়েছিলেন। যোগ্যতার আলোচনায় যাবই না, কারণ দিলীপকুমারের মত অভিনয় প্রতিভা, রাজ কাপুরের মত জাদুকর বা দেব আনন্দের মত রোম্যান্টিক অভিনয় করার ক্ষমতাসম্পন্ন নায়ক যে আজকের বলিউডে নেই তা বুঝতে কোনো মেধা লাগে না।

কিন্তু আসল কথা হল তাঁদের নিজের কাজের প্রতি যে বিশ্বাস, যে অধ্যবসায় ছিল সেটাই আজ লুপ্তপ্রায়। বিশেষ করে বাঙালি ছবির সমালোচকরা, যাঁরা জনপ্রিয় সিনেমা নিয়ে আলোচনা করা একেবারেই অপছন্দ করেন, তাঁদের হিন্দি ছবির ওই ত্রয়ীকে প্রাপ্য সম্মান জানানো দরকার। সেটা করা হয়নি, কারণ মনে করা হত জনপ্রিয় সিনেমার আলোচনায় ঢুকে পড়া উত্তর কলকাতার একটি কুখ্যাত পাড়ায় ঢুকে পড়ার সমান। এই উন্নাসিকতার ফল ভোগ করছে আজকের টলিউড, যেখানে আর অজয় কর বা নির্মল দে-র মত পরিচালক নেই।

নাগরিক ডট নেটে প্রকাশিত

‘ন্যাশনাল আর্কাইভের অবলুপ্তি দেশটাকে শপিং মল বানানোর চক্রান্ত’

ন্যাশনাল ফিল্ম আর্কাইভ অফ ইন্ডিয়াতে এমন বহু ছবি আছে যা আর কোত্থাও পাওয়া যায় না। সেগুলো কিন্তু বিনোদনের জন্য নয়, ইতিহাস বলেই রেখে দেওয়া হয়েছে।

সঞ্জয় মুখোপাধ্যায়। ছবি ইন্টারনেট থেকে

ভারত সরকারের তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রক সম্প্রতি ঘোষণা করেছে যে আগামী মাসেই ফিল্মস ডিভিশনের সমস্ত শাখা, ন্যাশনাল ফিল্ম আর্কাইভ অফ ইন্ডিয়া এবং চিলড্রেন্স ফিল্ম সোসাইটি অফ ইন্ডিয়াকে ন্যাশনাল ফিল্ম ডেভেলপমেন্ট কর্পোরেশনের সাথে জুড়ে দেওয়া হবে। নাসিরুদ্দিন শাহ, নন্দিতা দাস সহ প্রায় ৯০০ শিল্পী ও কলাকুশলী এই সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করার দাবি জানিয়ে সরকারকে চিঠি দিয়েছেন। কেন এই সিদ্ধান্ত, কেনই বা প্রত্যাহারের দাবি? নাগরিক ডট নেটকে বিশদে বললেন সঞ্জয় মুখোপাধ্যায়

কেন্দ্রীয় সরকার ফিল্মস ডিভিশন, ন্যাশনাল ফিল্ম আর্কাইভ অফ ইন্ডিয়া এবং চিলড্রেন্স ফিল্ম সোসাইটি অফ ইন্ডিয়াকে ন্যাশনাল ফিল্ম ডেভেলপমেন্ট কর্পোরেশনের সাথে মিলিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। প্রায় ৯০০ জন শিল্পী, কলাকুশলী এর প্রতিবাদ করেছেন। এই সংস্থাগুলোকে মিলিয়ে দেওয়ার তাৎপর্য যদি একটু বুঝিয়ে বলেন। মানে সিনেমা জগতের লোকেরা কেন এর প্রতিবাদ করছেন?

প্রতিবাদ করার কারণ হল এটা শুধু নির্বুদ্ধিতা নয়, এটা রীতিমত চক্রান্ত — গোটা দেশটাকেই শপিং মল বানাবার চক্রান্ত। দেশে অ্যাকাডেমিক চর্চা বা মননে সরকার আর গুরুত্ব দিতে রাজি নয়। সরকার মানে এখন বড়বাজার। ফিল্মস ডিভিশন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে যে সমস্ত ছবি বানিয়েছিল — পল জিলস, হরিসাধন দাশগুপ্তরা বানিয়েছিলেন — সেগুলো আমাদের ইতিহাসের অনেকখানি জুড়ে আছে। এক অর্থে বলা যায় আমাদের ইতিহাস অনেকটাই ফিল্মস ডিভিশনের ইতিহাস। তথ্যচিত্র বাণিজ্যলক্ষ্মীর প্রসাদ পায় না, ফলে তার সরকারি সাহায্য লাগবেই। এই কথাটা ইংরেজরা বুঝত তাদের দেশের ওয়ার টাইম ডকুমেন্টারি ফিল্ম ইত্যাদির কারণে। স্বাধীনতার পরে ভারত সরকারও বুঝতে পেরেছিল। ফলে অনেক অমূল্য রত্ন তৈরি হয়েছিল, যা আমাদের ইতিহাসকে চেনাতে সাহায্য করেছে। কিন্তু আজকের শাসক ইতিহাসে বিশ্বাস করে না, প্রমোদে বিশ্বাস করে। এমন প্রমোদ যা সহজলভ্য এবং সহজপাচ্য। তাই তার ফিল্মস ডিভিশনের দরকারও নেই। সত্যজিৎ রায়ের শতবর্ষে এই আলোচনা করতে গিয়ে ভেবে দুঃখ হয়, এই ফিল্মস ডিভিশনের হয়েই সত্যজিৎ দি ইনার আই তথ্যচিত্র তৈরি করেছিলেন।

ন্যাশনাল ফিল্ম আর্কাইভ কতটা গুরুত্বপূর্ণ?

ওটা তো প্রকৃতপক্ষে জাতির ইতিহাস সংরক্ষণের জায়গা। এরপর তো শুনব কলকাতার ইন্ডিয়ান মিউজিয়াম তুলে দেওয়া হয়েছে। কারণ অনেকটা জমি আছে, সেখানে একটা বিরাট দোকান করা যেতে পারে। একইভাবে ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালও তুলে দেওয়া যেতে পারে। আমাদের দেশে সেই হীরালাল সেনের সময় থেকে শত শত ছবি হয়েছে। অথচ আমাদের দুর্ভাগ্য, ১৯৩১ সাল পর্যন্ত হওয়া ছবিগুলো প্রায় খুঁজেই পাওয়া যায় না। অতি কষ্টে ফিল্ম আর্কাইভে পি কে নায়ার সাহেব থাকায় দাদাসাহেব ফালকের ছবি উদ্ধার করা গিয়েছিল। এখন বিল্বমঙ্গল, দেবদাস — এইসব ছবিও পাওয়া যাচ্ছে। এই ছবিগুলোর ঐতিহাসিক গুরুত্ব যে বোঝে না তাকে তো বোঝানো সম্ভব নয়। সারা বিশ্বে সিনেমাকে বর্তমান যুগের সবচেয়ে বড় দলিল বলে মনে করা হয়। তাকে সমাজতাত্ত্বিক, দার্শনিক, সাহিত্যিক — সকলেই গুরুত্ব দেন। তাই পৃথিবীর সমস্ত দেশে ফিল্ম আর্কাইভ আছে।

আর এখানে বলা হচ্ছে ফিল্মস ডিভিশন, ফিল্ম আর্কাইভে কর্মী ছাঁটাই করে সব এক ছাতার তলায় আনা হবে। যেন হকার্স কর্নার। আসলে এরপর আস্তে আস্তে ওগুলোর বেসরকারিকরণ করা হবে। সেটা করলে যা হবে, তা হচ্ছে দেশে একমাত্র বলিউডি ছবিই থাকবে। আঞ্চলিক ফিল্ম বা অন্যরকম ফিল্মের অস্তিত্ব মুছে যাবে। এ এক প্রবল দুর্যোগ। কর্মী সংকোচন হওয়ার ফলে বহু মানুষ যে কর্মহীন হয়ে পড়বেন সেটা তো দুর্যোগ বটেই, সঙ্গে এটাও বুঝতে হবে যে দেশের ইতিহাসের উপর এত বড় আঘাত প্রায় নিঃশব্দে নেমে এসেছে।

পুনের ন্যাশনাল ফিল্ম আর্কাইভ অফ ইন্ডিয়াতে এমন বহু ছবি আছে যা আর কোত্থাও পাওয়া যায় না। সেগুলো কিন্তু বিনোদনের জন্য নয়, ইতিহাস বলেই রেখে দেওয়া হয়েছে। এসব জিনিস তো বেসরকারি হাতে ছেড়ে দেওয়া যায় না। বেসরকারি সংস্থা তো যা কিছু বাণিজ্যের প্রয়োজনে লাগে না, সেসব বাঁচিয়ে রাখবে না। সে তো বারীন সাহা, ঋত্বিক ঘটকের ছবি নিয়ে চিন্তা করবে না। এমনকি সত্যজিতের ছবি নিয়েও ভাববে না। সে কেবল কিছু তারকাখচিত ছবির যত্ন নেবে। তা-ও পুরনো হয়ে গেলে ফেলে দেবে, বড়জোর ডিজিটাল ফরম্যাটে দেখাবে। সেলুলয়েডে তোলা মূল ছবিগুলো আর পাওয়াই যাবে না।

আমাদের দেশে তো এগুলো তৈরি করা হয়েছিল রাষ্ট্রের সুস্থ সংস্কৃতির পৃষ্ঠপোষকতা করা উচিত — এই ধারণা থেকে। তার পাশে আজকের এই সিদ্ধান্তগুলোকে কীভাবে দেখছেন?

এগুলো করা হয়েছিল অনেকটা সোভিয়েত মডেলে। যেমন ১৯১৯ সালে লেনিনের প্রত্যক্ষ উৎসাহে সোভিয়েত রাশিয়ায় পৃথিবীর প্রথম ফিল্ম শিক্ষায়তন প্রতিষ্ঠা হয়েছিল। আমাদের দেশে শুধু ফিল্মস ডিভিশন বা ফিল্ম আর্কাইভ নয়, ললিতকলা অ্যাকাডেমি বা সাহিত্য অ্যাকাডেমি তৈরি করার পিছনেও ছিল একই ভাবনা, যে এগুলোর সরকারি সাহায্য দরকার। ব্যবসায়ীরা এতে উৎসাহ দেবে না। কারণ, শাড়ির ব্যবসাকে ছোট না করেই বলছি, শাড়ির ব্যবসা আর রামকিঙ্কর বেইজের স্থাপত্য এক নয়। কিন্তু রিজার্ভ ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়ায় রামকিঙ্করকে ডেকে যক্ষ আর যক্ষিণীর মূর্তি তৈরি করানোর ভাবনা সরকারের মাথাতেই আসতে পারে, কোনো বেসরকারি সংস্থার নয়। ভারতের প্রথম সরকারের এক ধরনের সমাজতান্ত্রিক ধারণা এবং রুচিবোধ ছিল বলেই ওসব হতে পেরেছিল। আজ সবকিছুই ন্যক্কারজনক হয়ে দাঁড়িয়েছে। সুতরাং যদি দেখি দেশটা ভাস্কর্যবিহীন কিছু পুতুলের দেশে পরিণত হয়েছে, তাহলে অবাক হব না। যা কিছু প্রাচীন তা-ই তো নষ্ট করে দেওয়া হচ্ছে। সংসদ ভবনটাকে বাতিল করে নতুন সংসদ ভবন হচ্ছে। কারণ একটা আলো ঝলমলে, চকচকে কিছু না করলে চলবে না। নবরূপায়ণ বলে একটা শব্দ তৈরি করা হয়েছে। হয়ত রামায়ণ, মহাভারতেরও নবরূপায়ণ করা হবে। ভাগ্যিস হরপ্পা, মহেঞ্জোদরো ভারতে নেই! থাকলে জালিয়ানওয়ালাবাগের মত তারও নবরূপায়ণ হত বোধহয়।

কিন্তু সিনেমা সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা পেলে তো মতপ্রকাশের স্বাধীনতা বিঘ্নিতও হতে পারে?

নিশ্চয়ই পারে, কারণ সরকার শেষপর্যন্ত একটা প্রতিষ্ঠান। কিন্তু যে কথা বারবার বলা দরকার, তা হল সরকার যে ধরনের কাজকে মদত দিয়েছে সেগুলো অন্য কোনোভাবে পুষ্ট হতে পারত না। ভারত সরকার কিন্তু সিনেমার জাতীয়করণ করেনি। সিনেমা শিল্প নিজের মতই চলেছে। উত্তম-সুচিত্রা, দিলীপকুমার-মধুবালার ছবিও তৈরি হয়েছে আবার সত্যজিৎ রায়দের ছবিও হয়েছে। কিন্তু ধরো, সরকার না থাকলে তথ্যচিত্রের দায়িত্ব কে নিত? তাছাড়া অনেক ক্ষেত্রে অনেক পরিচালক একটা বিশেষ ধরনের ছবি করার সুযোগও পেয়েছেন সরকারের জন্যেই। যেমন ধরো, রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে তথ্যচিত্র বানাবেন সত্যজিৎ — এ তো ভারতীয় বণিকদের কল্পনাতেও আসত না। এ দেশে কোনোদিন শিল্পবিপ্লব হয়নি, ফলে এ দেশের শিল্পপতিদের সেই রুচিবোধও নেই। একমাত্র টাটারাই শিল্প, সাহিত্যের ব্যাপারে কিছুটা উৎসাহ দেখিয়েছেন। কিন্তু তাঁরাও এত বড় নিয়োগকর্তা নন যে এত গভীরে মাথা ঘামাবেন। তাঁদের অগ্রাধিকার নিশ্চয়ই বাণিজ্য; হওয়াও উচিত তাই। কিন্তু সরকার যেহেতু জনগণের করের টাকায় চলে, সেহেতু সরকার পারে এমন শিল্পীকে সুযোগ দিতে, যার শিল্পের তেমন বাজার নেই। ধরা যাক একটা স্টিল প্ল্যান্ট বানালে সরকারের যা আর্থিক লাভ হবে, রবীন্দ্রনাথের কবিতার বইয়ের পৃষ্ঠপোষকতা করলে তা হবে না। কিন্তু একটা দেশের তো রবীন্দ্রনাথের বই দরকার। তার পিছনে খরচ করা সরকারের কল্যাণমূলক কাজের মধ্যেই পড়ে।

ব্যাপারটা বোঝার জন্যে শিক্ষার দিকে তাকালেই হয়। শিক্ষার বেসরকারিকরণ করলে যা হয়, তা হচ্ছে যেসব বিষয় ব্যবসা বাণিজ্যে কাজে লাগে না সেগুলোকে পাঠ্যের বাইরে ঠেলে দেওয়া হয়। হয়ত সিদ্ধান্ত হবে ব্যাঙ্কের হিসাবপত্রে যেটুকু অঙ্ক লাগে, তার বেশি পড়ানোর দরকার নেই। তাত্ত্বিক পদার্থবিদ্যা পড়ানোর দরকার নেই, কারণ ও দিয়ে ব্যবসার কোনো সুবিধা হবে না।

সুতরাং সরকার কোন ক্ষেত্রে বদান্যতা দেখাবে, কোথায় দেখাবে না — তা বিবেচনার বিষয়, কিন্তু বাতিল করে দেওয়ার বিষয় নয়। সরকারি নিয়ন্ত্রণ যাতে মাত্রাতিরিক্ত না হয়ে যায়, সে কথা ভেবেই তো সাহিত্য অ্যাকাডেমিকে পুরোপুরি সরকারি সংস্থা না করে সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় আধা-সরকারি সংস্থা হিসাবে গড়ে তোলা হয়েছিল। সাহিত্য অ্যাকাডেমি ছিল বলে কিন্তু ভারতের আঞ্চলিক ভাষাগুলো পুষ্ট হয়েছে। যেমন অ্যাকাডেমির প্রথম সভাপতি সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়ের উদ্যোগেই রাজস্থানি ভাষা যে হিন্দি নয়, আলাদা ভাষা, তা নির্ণীত হয়েছিল এবং সরকারি স্বীকৃতি পেয়েছিল। মানে ফিল্মস ডিভিশন বা সাহিত্য অ্যাকাডেমি জাতীয় সংহতির জন্যেও জরুরি। মুখে জাতীয় সংহতির কথা বলব আর কাজে দেশের একটা অঞ্চলের একটা ভাষা, একটা সংস্কৃতিকেই জায়গা দেব — এ হতে পারে না।

সম্প্রতি সিনেমার সেটে উগ্র মতাবলম্বী লোকেদের আক্রমণ, ওয়েব সিরিজের নির্মাতাদের বিরুদ্ধে কেস ফাইল হওয়া — এগুলোকে কি সরকারের এই সিদ্ধান্তগুলোর সঙ্গে মিলিয়ে দেখা উচিত, নাকি এগুলোকে নিছকই বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসাবে দেখব?

একেবারেই বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। বলা যেতে পারে সরকার দূরদর্শিতার পরিচয় দিয়ে এক দিকে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলো তুলে দিচ্ছে, অন্য দিকে সামাজিক চাপ তৈরি করার জন্যে অন্য একদল লোককে দিয়ে সিনেমার লোকেদের উপর আক্রমণ চালাচ্ছে। আসলে সব সরকার এবং সরকারি দলই চায় নিরঙ্কুশ মতপ্রকাশের অধিকার কেবল তাদেরই থাকুক, আর কারোর যেন না থাকে। এইভাবেই গণতন্ত্রের গাছটিকে একেবারে উপড়ে ফেলার চেষ্টা চলছে। সে চেষ্টা সফল হবে কিনা ইতিহাস বলবে, তবে নরকের দিকে এরকম ধীর, নিশ্চিত পদক্ষেপ আগে কখনো দেখা যায়নি।

এক দিকে সরকার সিনেমাকে যেটুকু সাহায্য করত সেটুকুও আর করতে চাইছে না, অন্য দিকে ফিল্ম সার্টিফিকেশনের আইনে বদল আনতে চাইছে। এই অবস্থায় ভারতীয় সিনেমার ভবিষ্যৎ কেমন বুঝছেন?

মনে রাখা ভাল, এ দেশে সরকার কিন্তু সিনেমার ভাগ্যনিয়ন্তা ছিল না কোনোদিন। বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে কোনো রাজ্য সরকার কিছু ছবির পৃষ্ঠপোষকতা করেছে। যেমন পশ্চিমবঙ্গ সরকার পথের পাঁচালী প্রযোজনা করেছিল। ঋত্বিকও এই সুযোগ পেয়েছেন; পরবর্তীকালে গৌতম ঘোষ, বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত পেয়েছেন। সেটা উচিত কি অনুচিত তা নিয়ে বিতর্ক হতেই পারে। কিন্তু সিনেমা শিল্প নিজের মত করেই চলেছে, সরকারের মুখাপেক্ষী হয়ে নয়। তা সত্ত্বেও যে বর্তমান সরকার এই সমস্ত কাজ করছে তা থেকে এটাই প্রমাণ হয়, যে সরকার ফিল্মস ডিভিশন, আর্কাইভ, চিলড্রেন্স ফিল্ম সোসাইটি — এসব তুলেই দিতে চায়। ভারতে শুধুমাত্র নাচগান, আজগুবি গল্পওলা সিনেমাই চলবে। আর কখনো ইতিহাস ধরে রাখার চেষ্টা করে হবে না।

সার্টিফিকেশনের আইন বদল করতে চাওয়ার অর্থ হল ইংরেজরা যাকে “no humiliation to Christ” নীতি বলত, সেই নীতি অবলম্বন করা হবে। সরকার যে ছবিকে ধর্মীয় রীতিনীতির উপযুক্ত মনে করে, সে ছবিই শুধু থাকবে, বাকি সব নিষিদ্ধ হবে। এ এক শ্বাসরোধকারী অবস্থা। দুঃখের বিষয়, পশ্চিমবাংলার শিল্পীরা যে এ নিয়ে চিন্তিত এমন কোনো লক্ষণ দেখছি না। পশ্চিমবাংলার মিডিয়াতেও এ নিয়ে তেমন চর্চা নেই। বাঙালির এইসব ব্যাপারে এমন নিষ্ক্রিয়তা কবে দেখেছি মনে করতে পারছি না।

https://nagorik.net এ প্রকাশিত