খেলোয়াড় মেয়েদের জয় হোক

মেয়েদের দলের সাফল্যের চেয়ে ব্যর্থতাকে বড় করে দেখানোর যে প্রবণতা এতদিন দেখা গেছে, তার ব্যাখ্যা নারীবিদ্বেষ ছাড়া অন্য কিছু দিয়ে হয় না।

‘খেলোয়াড় মেয়ে’ কথাটা প্রথম কার মুখে শুনেছিলাম মনে করতে পারছি না, কিন্তু কয়েকশোবার শুনেছি। কোনও মেয়েকে খারাপ মেয়ে বলে দেগে দিতে এই শব্দবন্ধ বেশ জনপ্রিয়। রবিবার মাঝরাতে যখন নাদিন দে ক্লার্কের ব্যাট থেকে বেরোনো উড়ন্ত বলটাকে টেনে নামিয়ে দু-হাত ছড়িয়ে উড়ান শুরু করলেন হরমনপ্রীত কৌর আর তাঁকে ধরতে দৌড়লেন স্মৃতি মান্ধনা, শেফালি বর্মা, জেমিমা রডরিগস, দীপ্তি শর্মা, অমনজ্যোত কৌর, রিচা ঘোষ, রাধা যাদব, শ্রী চরনি, ক্রান্তি গৌড়, রেণুকা সিং ঠাকুররা— ঠিক তখন, এ-যুগের সেরা ধারাভাষ্যকার ইয়ান বিশপ বলে উঠলেন ‘এই মুহূর্ত কয়েক প্রজন্মের উত্তরাধিকার তৈরি করল।’ আমার ভাবতে ইচ্ছে হল, সেই উত্তরাধিকারের জোরে খেলোয়াড় মেয়ে কথাটা আর গালাগালি থাকবে না। চারপাশ দেখে আমরা যতই হতাশ হই প্রায়শ, দুনিয়া যে বদলায় তাতে তো সন্দেহ নেই। একসময় ভালোঘরের মেয়েরা অভিনয় করে না— এই সংস্কার তো ছিল আমাদের সমাজে। সত্যিই ‘ভালো’-ঘরের মেয়েদের অভিনয় করতে দেওয়াও হত না। সেই পরিস্থিতি তো বদলেছে। মেয়ে অভিনেত্রী হলে, বিখ্যাত হলে তাকে নিয়ে তো আজ গর্ব করেন বাবা-মা, পাড়া-প্রতিবেশীরা। তেমন এমন ভবিষ্যৎও নিশ্চয়ই আসবে, এই ভারতেই আসবে, যখন একটা মেয়ের যৌন বিশুদ্ধতাই তাকে বিচার করার সবচেয়ে বড় মাপকাঠি হয়ে থাকবে না।

বাইরে আমরা যে যা-ই বলি, মেয়েরা বিশ্বখেতাব জিতেছে বলে যতই তাদের প্রশংসায় ভরিয়ে দিই এখন, সামগ্রিকভাবে কিন্তু আজও ওটাই মাপকাঠি। মান্ধাতার আমলের কথা বলছি না। মাত্র এক দশক আগে, রিও অলিম্পিকের সময়ে, এক সর্বভারতীয় ইংরেজি কাগজে কাজ করতাম। সেদিন নিউজ এজেন্সি একটা খবর পাঠিয়েছিল গেমস ভিলেজে কন্ডোমের চাহিদা সম্পর্কে। সন্ধেবেলার এডিট মিটিংয়ে অবাক হয়ে খেয়াল করলাম, উচ্চশিক্ষিত সাংবাদিকরা জানতেনই না যে গেমস ভিলেজে অ্যাথলিটদের মধ্যে যৌন সম্পর্ক হয়। কিন্তু ব্যাপারটা বিস্ময়ে সীমাবদ্ধ থাকলেও কথা ছিল। সবচেয়ে বয়োজ্যেষ্ঠ মহিলা সাংবাদিক বলে বসলেন ‘তাহলে বাপু মেয়েদের খেলতে না দেওয়াই ভালো।’ অর্থাৎ মেয়েদের ‘সতীত্ব’ বজায় রাখাই আসল। ওটা করতে না পারলে হাজার সাফল্যেও কিছু এসে যায় না। আশা করা যাক, হরমনপ্রীতদের বিশ্বজয়ের পরে অন্তত উচ্চশিক্ষিত বাবা-মায়েরা ওই সাংবাদিকের মতো ভাবা বন্ধ করবেন।

‘অনার কিলিং’-খ্যাত হরিয়ানার মেয়ে শেফালি, হিমাচল প্রদেশের ঠাকুর পরিবারের মেয়ে রেণুকা, মুম্বাইয়ের ধার্মিক খ্রিস্টান জেমিমা বা আমাদের শিলিগুড়ির রিচা— প্রায় সকলেরই ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যাচ্ছে, তাদের ক্রিকেট শুরু ছেলেদের সঙ্গে খেলতে গিয়ে। কিংবদন্তি ঝুলন গোস্বামীর শুরুটাও একইভাবে হয়েছিল চাকদায়। কারণ মাঠের দখল ছেলেদের হাতে। খেলোয়াড় জীবন তৈরি করতে হলে এ-দেশে আগে ছেলেদের সমকক্ষ হতে হয়, তাদের হারিয়ে দেখাতে হয়। ঠিক যেমন দঙ্গল (২০১৬) ছবিতে আমরা দেখেছিলাম— মহাবীর সিং ফোগতকে মেয়েদের এমনভাবে তৈরি করতে হয়েছিল যাতে তারা কুস্তিতে ছেলেদের হারাতে পারে। অস্ট্রেলিয়া, ইংল্যান্ডের মতো দেশের মেয়েদের পেশাদার খেলোয়াড় হতে হলে এমন অসম লড়াই দিয়ে শুরু করতে হয় না। ফলে রবিবারের জয় এ-দেশের নারীবাদীদের দায়িত্ব বাড়িয়ে দিল। রাতদখলের মতো মাঠদখলের আন্দোলনও তাঁদের করতে হবে। প্রাক্তন বোর্ড সভাপতি এন শ্রীনিবাসনের সোশাল মিডিয়ায় ভাইরাল পুরনো মন্তব্য থেকে নিশ্চয়ই সকলে জেনে গেছেন ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড যাঁরা চালান, তাঁরা মেয়েদের ক্রিকেটকে কী নজরে দেখেন। বর্তমান বোর্ডকর্তারাও খুব অন্যরকম ভাবেন এমন মনে করার কারণ নেই। ফাইনালের দিন মাঠে সপরিবার জয় শাহের উপস্থিতি দেখে ঠকবেন না।

প্রথমত, ভারতের জয়ে প্রকাশ্যে উল্লাস করা তাঁর বর্তমান পদের সঙ্গে মোটেই মানানসই নয়। কারণ তিনি এখন আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিলের চেয়ারম্যান, ভারতের বোর্ডের কেউ নন, যদিও বকলমে তিনিই সর্বেসর্বা। খেলাটার প্রতি গভীরে প্রোথিত অশ্রদ্ধা না থাকলে এবং নিজের পদমর্যাদা বুঝতে সম্পূর্ণ অক্ষম না হলে ওই পদের লোক অমন আচরণ করে না। অতীতে যে ভারতীয়রা আইসিসির সর্বোচ্চ পদ অলঙ্কৃত করেছেন (যেমন জগমোহন ডালমিয়া, শরদ পাওয়ার, শশাঙ্ক মনোহর) তাঁরা এই আদেখলেপনা করতেন না। দ্বিতীয়ত, জয়ের অনুগত ভারতীয় ক্রিকেট সাংবাদিকরা এখন কদিন বিস্তর প্রোপাগান্ডা চালাবেন, জয় মেয়েদের ক্রিকেটের জন্যে কত কিছু করেছেন তার ফিরিস্তি দিয়ে। ওতেও ভুলবেন না। তথ্যের আড়ালে লুকিয়ে ফেলা তথ্য জানতে এইটা পড়ে নিতে পারেন।

সত্যিই যদি বোর্ডের মেয়েদের ক্রিকেটের প্রতি দরদ থাকত, তাহলে টুর্নামেন্টের সেরা ক্রিকেটার দীপ্তি শর্মাকে মুখ ফুটে বলতে হত না— আরও বেশি ম্যাচ খেলার ব্যবস্থা হলে ভালো হয়। মনে রাখবেন, কিংবদন্তি ঝুলন গোস্বামী দুই দশকের আন্তর্জাতিক ক্রিকেটজীবনে খেলতে পেরেছিলেন মাত্র এক ডজন টেস্ট আর ২০৪ খানা একদিনের ম্যাচ। অথচ ভারতের হয়ে বছর বারো খেলেই ৯২ খানা টেস্ট আর ২০০ একদিনের ম্যাচ খেলেছিলেন জাহির খান। বিরাট কোহলি ১৩-১৪ বছরের আন্তর্জাতিক ক্রিকেট জীবনেই ১২৩ খানা টেস্ট আর তিনশোর বেশি একদিনের ম্যাচ খেলে ফেলেছেন। আজকের বিশ্বজয়ী দলের সহ-অধিনায়িকা স্মৃতি ২০১৩ সালে অভিষেকের পর থেকে খেলেছেন ১১৭ খানা একদিনের ম্যাচ আর ২০১৪ সালে টেস্ট অভিষেকের পর মাত্র সাতখানা টেস্ট। ওদিকে একই সময়ে অভিষেক হওয়া মহম্মদ শামি খেলে ফেলেছেন ৬৪ খানা টেস্ট আর ১০৮ খানা একদিনের ম্যাচ। ইচ্ছাকৃতভাবে মেয়েদের বিশ্বকাপকে যথেষ্ট গুরুত্ব না দিয়ে ছোট ছোট শহরে ম্যাচ দেওয়া, মুম্বাইয়ের তিনটে ক্রিকেট স্টেডিয়ামের মধ্যে সবচেয়ে ঐতিহ্যহীন এবং শহরের প্রান্তে থাকা স্টেডিয়ামকে সেমিফাইনাল ও ফাইনালের জন্যে বেছে নেওয়া আর বিশ্বকাপসুলভ প্রচারের ব্যবস্থা না করা তো আছেই। বোঝাই যায়, অ্যালিসা হিলির অস্ট্রেলিয়া, ন্যাট শিভার-ব্রান্টের ইংল্যান্ড বা লরা উলভার্টের দক্ষিণ আফ্রিকা খেলছিল প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে। হরমনপ্রীতের ভারত খেলছিল প্রতিপক্ষ এবং নিজেদের বোর্ডের বিরুদ্ধে। এখন দলকে এককালীন ৫১ কোটি টাকা পুরস্কার দিয়ে নারীদরদি সাজবে বোর্ড।

আরও পড়ুন আলতো ফ্লিক: ক্রিকেট নিয়ে ব্যতিক্রমী বই

অবশ্য কেবল বোর্ডই যে হরমনপ্রীতদের বিরুদ্ধে ছিল তা নয়। মেয়েদের দল এত বছরে যতবার হেরেছে, ততবার মেয়েদের দ্বারা যে ক্রিকেট হয় না, মেয়েদের দলের পিছনে টাকা খরচ করা যে অপচয়— সে-কথা আজ উদ্বাহু নৃত্য করা সাধারণ দর্শকরা তো বটেই, ক্রীড়া সাংবাদিকরাও বলে গেছেন সোশাল মিডিয়ায়। খবরের কাগজে বা টিভি চ্যানেলে যৎসামান্য জায়গা বরাদ্দ হয়েছে মেয়েদের ক্রিকেটের জন্য। এ-কথা ঠিকই যে খেলায় সাফল্য না এলে সাধারণ মানুষের আগ্রহ বাড়ে না, সংবাদমাধ্যমেও বেশি জায়গা দেওয়ার কোনও যুক্তি নেই। এখন চূড়ান্ত সাফল্য এসেছে, স্বভাবতই সব মহলের আগ্রহ বাড়বে। কিন্তু মেয়েদের দলের সাফল্যের চেয়ে ব্যর্থতাকে বড় করে দেখানোর যে প্রবণতা এতদিন দেখা গেছে, তার ব্যাখ্যা নারীবিদ্বেষ ছাড়া অন্য কিছু দিয়ে হয় না। ভারতের মেয়েরা এর আগেও দু-দুবার একদিনের ক্রিকেটের বিশ্বকাপ ফাইনালে পৌঁছেছিল। দুবারই হেরে যাওয়া মাত্রই লেখালিখি হয়েছে— এদের দিয়ে কিস্যু হবে না। এদের জন্যে এত করা হয়, তবু…। কত যে করা হয় তার সংক্ষিপ্ত বিবরণ উপরেই দিয়েছি। এদিকে ছেলেদের দল পৃথিবীর সবচেয়ে ধনী ক্রিকেট বোর্ডের বিরাট মুনাফার যাবতীয় সুবিধা পেয়ে থাকে। অথচ গত ১২ বছরে অসংখ্য সুযোগেও বিশ্বখেতাব মাত্র একটা, তাও কুড়ি-বিশের ক্রিকেটে। বরং গত দুবছরে একদিনের ম্যাচ আর টেস্ট ক্রিকেটে হারের সংখ্যা ক্রমশ বাড়ছে। কিন্তু ওই দলের ন্যূনতম সাফল্যকেও বিরাট করে দেখাতে উঠে পড়ে লাগে বোর্ড আর তার গোদি মিডিয়া। হারা সিরিজের গুরুত্বহীন ম্যাচে রোহিত শর্মা বা বিরাট শতরান করলে সেই ইনিংসকেই কাব্যিক করে তুলতে ঝাঁপিয়ে পড়েন প্রাক্তন ক্রিকেটার, সাংবাদিক আর সোশাল মিডিয়া ইনফ্লুয়েন্সাররা। অথচ ভেবে দেখুন, কতবার আপনি পড়েছেন যে, বর্তমানে মেয়েদের ক্রিকেটে বিশ্বের অন্যতম সেরা ব্যাটার হলেন স্মৃতি, আর সবচেয়ে ধারাবাহিক অলরাউন্ডারদের একজন দীপ্তি?

যা-ই হোক, হয়তো আমি পুরুষ বলেই এসব নিয়ে ভাবছি। স্মৃতি, দীপ্তি, রিচারা যেভাবে বেড়ে উঠেছেন তাতে ওঁরা জানেন যে এরকমই হওয়ার কথা ছিল, এরকমই হবে। কদিন পরেই যদি তাঁদের কারও উপরে মেয়ে বলে কোনও আক্রমণ চলে (যেমনটা বিশ্বকাপ চলাকালীন দুই অস্ট্রেলিয়া ক্রিকেটারের উপরে চলেছে), তখন আজ মাথায় তুলে নাচা ‘পাবলিক’ এবং ‘মিডিয়া’ পাশে দাঁড়াবে না। নিজের সম্মান বজায় রাখতে না পারার দোষ নিজের— এই জাতীয় কিছু বলে দেবেন কৈলাস বিজয়বর্গীয়ের মতো কোনও নেতা। বিশ্বকাপটা যে মধ্যরাতে জেতা হয়েছিল, সে-কথা ভুলে গিয়ে কোনও মহিলা মুখ্যমন্ত্রী বলে দিতে পারেন— অত রাতে বাইরে যাওয়া উচিত হয়নি। সাংবাদিকরা গসিপের খোঁজ করবেন, কেউ হয়তো লিখে দেবেন— বিশ্বকাপ জিতে ধরা কে সরা জ্ঞান করতে শুরু করেছিল এরা। তাই এই ঘটনা ঘটেছে। এরা মহা খেলোয়াড় মেয়ে।

সে যা-ই হোক, হরমনদের দৌলতে অনেকদিন পরে আস্ত একখানা প্রতিযোগিতা দেখা গেল, যেখানে প্রতিপক্ষকে আউট করে মুখের সামনে গিয়ে অসভ্যের মতো চিৎকার করলেন না ভারতীয় ক্রিকেটাররা। আউট হলে অসন্তোষ প্রকাশ করলেন না, আম্পায়ারদের সিদ্ধান্ত নিয়ে আক্রমণাত্মক বিবৃতি দিলেন না পৃথিবীর সবচেয়ে পয়সাওয়ালা বোর্ডের খেলোয়াড় হওয়ার রেলায়। নীল জার্সির গা বেয়ে উপচে পড়ল না উগ্র জাতীয়তাবাদ, গ্যালারির হিংস্র চেহারাও দেখা গেল না।

খেলোয়াড় মেয়েদের জয় হোক।

চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম ওয়েবসাইটে প্রকাশিত

রাষ্ট্রীয় ক্রিকেট-সেবক সংঘ

দেশের আর পাঁচটা গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের মত জাতীয় ক্রিকেট দলগুলোও এখন বিজেপি-আরএসএসের একটা শাখা, যার সদর দফতর আমেদাবাদের নরেন্দ্র মোদী ক্রিকেট স্টেডিয়াম।

সূর্যকুমার যাদবের প্রতিযোগী বেড়ে গেল সম্ভবত। ভবিষ্যতে বিজেপির টিকিটে সাংসদ বা বিধায়ক হওয়ার দৌড়ে ঢুকে পড়লেন হরমনপ্রীত কৌরও। ভারত আর শ্রীলঙ্কা মিলিয়ে মেয়েদের ৫০ ওভারের ক্রিকেটের বিশ্বকাপ হচ্ছে এবারে। যদি প্রবল পরাক্রমশালী অস্ট্রেলিয়া আর শক্তিশালী ইংল্যান্ডের বাধা টপকে হরমনপ্রীতরা বিশ্বকাপটা জিতে ফেলতে পারেন, তাহলে বিহার বিধানসভা নির্বাচনের আগে তাঁদের দলকে নিয়ে নির্ঘাত দেশজুড়ে বিপুল প্রচার করা হবে। পোস্টারে অপারেশন সিঁদুরের সময়ে যাঁদের সামনে আনা হয়েছিল, সেই কর্নেল সোফিয়া কুরেশি আর উইং কমান্ডার ব্যোমিকা সিংয়ের পাশেও বসিয়ে দেওয়া হতে পারে অধিনায়িকাকে। পাকিস্তানকে হারানো আর পাকিস্তানের ক্রিকেটারদের সঙ্গে করমর্দন না করা – দুটো কাজই করে ফেলেছেন হরমনপ্রীত, স্মৃতি মান্ধনা, দীপ্তি শর্মা, জেমিমা রডরিগসরা। এবার যেনতেনপ্রকারেণ বিহার বিধানসভা করায়ত্ত করার লড়াইয়ে নরেন্দ্র মোদীর দলকে সঙ্গ দিলেই নানাবিধ উপঢৌকন বাঁধা। পহলগামে যে পর্যটকরা খুন হয়েছিলেন তাঁদের হত্যাকারীদের শাস্তি প্রদান (যা ২০০৮ সালের মুম্বাই সন্ত্রাসবাদী হানার বেলায় আজমল কাসভ ও তার সঙ্গীদের ক্ষেত্রে হয়েছিল) দূর অস্ত, অপারেশন সিঁদুরে দেশ ঠিক কতটা লাভবান হয়েছে সেটাই এখনো ঠিক করে বলে উঠতে পারল না মোদী সরকার। চিফ অফ ডিফেন্স স্টাফ সেইসময় বলে ফেলেছিলেন আমাদের ক্ষতি হয়েছে, আবার এখন সেনাবাহিনির প্রধান বলছেন ওসব নাকি ছেলে-ভোলানো গল্প। মার্কিন রাষ্ট্রপতি বারবার বলেন অপারেশন সিঁদুর থেমেছিল তাঁর কথায়, ভারত সরকার প্রতিবাদ করে না। প্রধানমন্ত্রী স্বয়ং তো স্পিকটি নট, অন্য মন্ত্রীরা এবং তাঁর দলের মেজ সেজ রাঙা নেতারা বাহারি শব্দে ঢেকেঢুকে বলেন – যখন যুদ্ধ থামে তখন নাকি ভারতই জিতছিল। তাহলে যুদ্ধ থামল কেন, কে থামাল – এসবের আজও উত্তর নেই। ফলে মোদীজির লৌহপুরুষ ভাবমূর্তি ধাক্কা খাচ্ছে স্পষ্টতই। গোদের উপর বিষফোঁড়ার মত রাহুল গান্ধী ভোট চুরির অভিযোগ তুলে, রীতিমত কাগজপত্তর দেখিয়ে পরিস্থিতি ঘোরালো করে তুলেছেন। কিন্তু ভোটে যে জিততেই হবে শতবর্ষে পা দেওয়া রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের রোজগেরে সন্তান বিজেপিকে। অতএব ক্রিকেটের ডিটারজেন্ট দিয়ে ধুয়ে ফেলো যাবতীয় সরকারি অকর্মণ্যতা।

আজকের ভারতের জনতার আফিম হল ক্রিকেট, তাই ওই খেলার দলকেই হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহার করা দরকার। সুতরাং পুরুষদের এশিয়া কাপে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে খেলার সিদ্ধান্ত নিয়ে টিভি থেকে আয় হওয়া কোটি কোটি টাকা নিশ্চিত করাও চাই; আবার ম্যাচের শেষে করমর্দন না করে, অধিনায়ককে দিয়ে গরম গরম কথা বলিয়ে ভোটের প্রচার করাও চাই। তাতেও চিত্রনাট্য যথেষ্ট নাটকীয় হল না মনে করে ট্রফি হাতে তুলে দেবেন কে, তা নিয়েও গা জোয়ারি করা হল। কেবল বিহার নির্বাচনে জেতার জন্যে এতসব কাণ্ড করে এখন ফাটা বাঁশের মধ্যে পড়ে যাওয়ার মত অবস্থা। এশিয়ান ক্রিকেট কাউন্সিলের (এসিসি) কর্মকর্তা তথা পাক মন্ত্রী বলছেন, তোমাদের ট্রফি দেওয়ার জন্যে তো মঞ্চ সাজিয়ে বসাই হয়েছিল। নাওনি কেন? অফিসে রাখা আছে, এসে নিয়ে যাও।

এদিকে এখন সে কাজ করলে ধরা পড়ে যায় যে অকারণে ধুলো ওড়ানো হয়েছিল। সত্যিই তো! এসিসি সভাপতি হিসাবে বিজয়ী দলের হাতে ট্রফিটা যে মহসীন নকভিই তুলে দেবেন তা তো প্রতিযোগিতার আগে থেকেই ঠিক ছিল। ভারতীয় দল জানত না? ভারতীয় ক্রিকেটের সঙ্গে জড়িত রাম শ্যাম যদু মধু সকলেই, এমনকি বোর্ডের গোদি মিডিয়ার সাংবাদিকরাও, সগর্বে বলে থাকেন যে কেবল এশিয়া নয়, গোটা বিশ্বের ক্রিকেটকে নিয়ন্ত্রণ করে ভারতীয় ক্রিকেট কন্ট্রোল বোর্ড (বিসিসিআই)। তাদের এটুকু ক্ষমতা নেই যে কোনো পাকিস্তানির এসিসি সভাপতি হওয়া আটকায়? আগে থাকতে সে কাজটা করলেই তো আর অপছন্দের লোকের হাত থেকে ট্রফি নেওয়ার ব্যাপার থাকত না। নাকি তখন বোঝা যায়নি যে অপারেশন সিঁদুর সম্বন্ধে যাবতীয় প্রচার মুখ থুবড়ে পড়বে এবং ক্রিকেট দলকে কাজে লাগাতে হবে ভোটারদের পাকিস্তানের প্রতি ঘৃণা চাগিয়ে তুলে ভোটে জিততে? ব্যাপারটা কি এরকম, যে বিশ্ব ক্রিকেটের ভাগ্যনিয়ন্তা জয় শাহের বাবা অমিত শাহ আর নরেনজেঠু ভেবেছিলেন লোকে পুলওয়ামার মত পহলগামও ভুলে যাবে শিগগির, তারপর আবিষ্কার করলেন – নিজেদের একনিষ্ঠ ভক্তরাও পাকিস্তানের বিরুদ্ধে খেলা বয়কট করা হচ্ছে না বলে খচে বোম? এমতাবস্থায় নিজেদের খাসতালুক হিন্দি বলয়ের অন্যতম বৃহৎ রাজ্য বিহারে ভোট। বল মা তারা দাঁড়াই কোথা!

পাকিস্তানের দিকে কথায় কথায় আঙুল তুলে এতদিন পরম সন্তোষে দেশের মানুষকে নিজেদের কুকীর্তি ভুলিয়ে রেখেছেন। সেটাই যে কাল হয়ে দাঁড়াবে তা মোদী-শাহ কী করেই বা জানবেন? ফ্যাসিবাদীরা কবে আর নিজেদের ভবিষ্যৎ দেখতে পায়? অবস্থা সামলাতে ১৪ সেপ্টেম্বর সূর্যকুমারের দলকে দিয়ে ম্যাচের পর করমর্দন না করার নাটক করানো হল পৃথিবীর সমস্ত খেলার সমস্ত আদবকায়দা শিকেয় তুলে দিয়ে। ক্রিকেট দলের কাছ থেকে যদি এটুকু সেবা না পাওয়া যায়, তাহলে আর ক্ষমতায় আসার পর থেকে ক্রমশ ক্রিকেট বোর্ডের দখল নেওয়া, প্রাক্তন ও বর্তমান ক্রিকেটারদের রামমন্দিরের উদ্বোধনে নেমন্তন্ন করা, কৃষক আন্দোলনের বিরুদ্ধে বা মোদীজির জন্মদিন উপলক্ষে তাঁদের দিয়ে সোশাল মিডিয়ায় পোস্ট করানো, নিজেদের দলের প্রাক্তন সাংসদ গৌতম গম্ভীরকে দলের কোচ বানানো – এসব করা কেন? এত কাজ থোড়াই ক্রিকেটের স্বার্থে করা হয়েছে। তবে ব্যাপারটা সেখানেও থামেনি। সাংবাদিক সম্মেলনে এসে ভারত অধিনায়ক সূর্যকুমার লম্বা চওড়া বক্তৃতা দিলেন। পহলগামে ক্ষতিগ্রস্তদের পাশে আছেন, অপারেশন সিঁদুরে যুক্ত সেনাবাহিনির জওয়ানদের উদ্দেশে জয় উৎসর্গ করছেন, নিজের পারিশ্রমিক পর্যন্ত কৃতজ্ঞতা হিসাবে তাঁদের দিয়ে দেবেন ইত্যাদি।

চট করে শুনতে চমৎকার লাগে। খেলার ময়দানে কতখানি রাজনীতি ঢুকতে পারে বা ঢোকা উচিত তা নিয়ে বিতর্কে না গিয়ে যদি ধরেও নিই সূর্য যা বলেছেন বেশ করেছেন (আইসিসির ম্যাচ রেফারি রিচি রিচার্ডসন অবশ্য তা ভাবেননি, বরং আচরণ বিধি লঙ্ঘনের অপরাধে দোষী সাব্যস্ত করে ৩০% ম্যাচ ফি জরিমানা করেছেন), তাহলেও কথাগুলো নিয়ে তলিয়ে ভাবতে গেলে ফাঁকা আওয়াজ ছাড়া কিছু মনে হবে না। পহলগামে মৃত মানুষজনের পরিবারের পাশে থাকতে গেলে তো সরকারকে প্রশ্ন করতে হবে – পহলগামের আততায়ীদের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে? সূর্যকুমারের ঘাড়ে কটা মাথা যে সে প্রশ্ন করবেন? গত ২৯ জুলাই সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী দাবি করেছেন বটে, চারজন সন্ত্রাসবাদীর তিনজন সেনাবাহিনির সঙ্গে সংঘর্ষে নিহত হয়েছে। কিন্তু চতুর্থ জনকে কি মহামতি ভারত সরকার ক্ষমা করে দিয়েছেন? তাকে নিয়ে উচ্চবাচ্য নেই কেন? যে তিনজন মরেছে তারা আবার পকেটে পাকিস্তানি পরিচয়পত্র এবং পাকিস্তানি চকলেট নিয়ে ঘুরছিল। এমন সুবোধ বালক সন্ত্রাসবাদীদের কেন জীবন্ত অবস্থায় হিড়হিড় করে টানতে টানতে আদালতে, নিদেন জনসমক্ষে, নিয়ে আসা গেল না – সে প্রশ্নও সূর্যকুমার করে উঠতে পারবেন না। সেপ্টেম্বর মাসের ক্রিকেট ম্যাচে মে মাসের অপারেশনে অংশ নেওয়া সেনাবাহিনিকে টেনে আনার যে কী মানে তাও বোঝা শক্ত। পুরোদস্তুর যুদ্ধ হয়নি, সাময়িক সংঘর্ষ কয়েকদিনের মধ্যে থেমেও গিয়েছিল। তার জন্যে এতদিন পরে সেনাবাহিনিকে সম্মান জানানো! ১৯৯৯ সালে যখন বিশ্বকাপে ম্যানচেস্টারে ভারত-পাকিস্তান ম্যাচ হয়, তখন কিন্তু কার্গিলে যুদ্ধ চলছিল। ভারতে তখনো বিজেপি নেতৃত্বাধীন এনডিএ সরকার, প্রধানমন্ত্রীর নাম অটলবিহারী বাজপেয়ী। সে ম্যাচ নিয়েও দুই দেশের সমর্থকদের মধ্যে উত্তেজনা ছিল, খেলার মধ্যেও উত্তেজনার অভাব হয়নি। তবে ম্যাচের পর আলাদা করে নাটক করার দরকার হয়নি। ভারত কিন্তু সে ম্যাচও জিতেছিল। অধিনায়ক মহম্মদ আজহারউদ্দিন গুরুত্বপূর্ণ ৫৯ রান করেন, ভেঙ্কটেশ প্রসাদ পাঁচ উইকেট নেন।

আসলে তখন সরকার দেশ চালাত, ক্রিকেট চালাত ক্রিকেট বোর্ড। এখন দুটোই চালায় বিজেপি। ফলে বিজেপির নীতিই ক্রিকেট দলের নীতি। ভারত-পাকিস্তান ম্যাচকে যুদ্ধের চেহারা দেওয়ার নীতি তারা এই এশিয়া কাপে প্রথম নিল তা নয়। ২০২৩ সালে ভারতে আয়োজিত পুরুষদের ৫০ ওভারের বিশ্বকাপেই এই পরিকল্পনা পরিষ্কার হয়ে গিয়েছিল। যাঁরা চোখ বন্ধ করেছিলেন, তাঁরা দেখতে পাননি। সেই প্রথম বিশ্বকাপের কোনো উদ্বোধনী অনুষ্ঠান হল না, দুই ইনিংসের মাঝে মোচ্ছব হল আমেদাবাদে ভারত-পাকিস্তান ম্যাচে। যেন বিশ্বকাপটা গৌণ, আসল হল ভারত-পাক যুদ্ধ যুদ্ধ খেলা। বহুদিন ধরে ক্রিকেট মাঠকে বিদ্বেষ ছড়ানোর কেন্দ্রবিন্দু করে তুলেছে ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড। সলতে পাকানো শুরু হয়েছিল সেই বিরাট কোহলির আমলে। ২০১৯ সালের মার্চে অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে তাঁর দল একদিনের ম্যাচ খেলতে নামেন টিম ক্যাপের বদলে সেনাবাহিনির ক্যামোফ্লাজ ক্যাপ পরে। কেন? না পুলওয়ামার শহিদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানানো দরকার ছিল। সে এমন শ্রদ্ধা, যে ক্যাপ থেকে নাইকির লোগোটা বাদ দেওয়া হয়নি। সন্ত্রাসবাদী হানায় নিহত মানুষের স্মৃতি নিয়ে এমন নির্লজ্জ বেওসার দৃষ্টান্ত মেলা ভার। কিন্তু ততদিনে আমরা এমন অনুভূতিশূন্য নির্বোধের দেশে পরিণত হয়েছি, যে কারোর আচরণটা অন্যায় মনে হয়নি। জাতীয় দলের সামরিকীকরণ তখনই হয়ে গিয়েছিল। ম্যাচটা পাকিস্তানের সঙ্গে ছিল না বলেই করমর্দন না করার নাটকটা সেদিন করা হয়নি। তবে তখনো কিন্তু অনতিদূরে ছিল লোকসভা নির্বাচন। আজ অন্তত কারোর বুঝতে না পারার কথা নয়, যে সেদিন ভারতীয় দল আসলে বিজেপির নির্বাচনী প্রচার সারছিল। এবারেও তাই করছে।

কাজটা শুরু করা হল সূর্যকুমারদের দিয়ে, এখন হরমনপ্রীতদেরও নামিয়ে দেওয়া হয়েছে। ক্রিকেট খেলায় ভারতের টাকার গরম এতটাই যে এসব করে যাওয়া যাচ্ছে। অন্য কোনো খেলায় কিন্তু আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে এই ধাষ্টামো চলতে দেওয়া হয় না। ২১ সেপ্টেম্বর, যেদিন সূর্যকুমাররা পাকিস্তানের বিরুদ্ধে দ্বিতীয়বার খেললেন এশিয়া কাপে, কাঠমান্ডুতে সাফ অনূর্ধ্ব-১৯ ফুটবলে ভারত বনাম পাকিস্তানের খেলা ছিল। সেই ম্যাচ ভারত ৩-০ জেতে এবং প্রতিপক্ষের সঙ্গে করমর্দন করেই মাঠ ছাড়ে। কারণ ফিফার সঙ্গে আইসিসির তফাত আকাশের সূর্য আর বিজেপি সাংসদ তেজস্বী সূর্যের মত। ফুটবলে খেলার মাঠের নিয়ম না মানলে সরাসরি সাসপেন্ড করে দেওয়া হতে পারে। যথার্থ দেশপ্রেম থাকলে সেই ঝুঁকি নেওয়া উচিত। বিজেপি নেতা কল্যাণ চৌবের নেতৃত্বাধীন সর্বভারতীয় ফুটবল ফেডারেশন যে সে ঝুঁকি নেয়নি, তাতেই প্রমাণ হয় যে দেশপ্রেম-টেম বাজে কথা। আসলে এরা শক্তের ভক্ত, নরমের যম। উপরন্তু পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ক্রিকেট ম্যাচ নিয়ে গোটা নাটকটাই নির্বাচনমুখী। বিহার কেন, ভারতের কোনো রাজ্যের ভোটারেরই অনূর্ধ্ব-১৯ ফুটবল নিয়ে মাথাব্যথা নেই। অতএব ওখানে দেশপ্রেম দেখানোর আয়োজন নেই। নিজেরাই অশান্তি শুরু করে খেলার পরিবেশ নষ্ট করে দেওয়ার পর পাক ক্রিকেটাররা অসভ্যতা করলে হাত-পা ছুড়ে কান্নাকাটি করার ব্যাপার নেই। কার হাত থেকে পুরস্কার নেব সেটা ঠিক করতে চাওয়ার অন্যায় আবদারও নেই। খেতাব জিতলে প্রধানমন্ত্রী সোশাল মিডিয়ায় জ্বালাময়ী পোস্টও করবেন না, অধিনায়কও বলবেন না – সিঁদুর-স্পন্দিত ব্যাটে, মনে হয় আমিই পিএম।

আরও পড়ুন অপমানে হতে হবে মহম্মদ শামির সমান

রাজনৈতিক কারণে বহু খেলাতেই এক দেশের বিরুদ্ধে অন্য দেশ খেলতে চায় না। যেমন এই মুহূর্তে পৃথিবীর বহু দেশ দাবি করছে, আগামী বছরের ফুটবল বিশ্বকাপ থেকে যেন ইজরায়েলকে বাদ দেওয়া হয় গাজায় গণহত্যা চালানোর অপরাধে। ফিফা সভাপতি অবশ্য বলে দিয়েছেন, তাঁরা এ দাবি মানবেন না। না মানলে এবং ইজরায়েল বিশ্বকাপে খেলার যোগ্যতা অর্জন করলে, কোনো দেশ তাদের বিরুদ্ধে না খেলার সিদ্ধান্ত নিতেই পারে। তাতে তাদের পয়েন্ট কাটা যাবে। নীতিগত অবস্থান নিতে হলে এই ত্যাগ স্বীকার করতে হয়। ক্রিকেটেই এমন দৃষ্টান্ত আছে। ২০০৩ বিশ্বকাপে ইংল্যান্ড জিম্বাবোয়েতে খেলতে যায়নি রবার্ট মুগাবের বর্ণবিদ্বেষী শাসনের প্রতিবাদে, নিউজিল্যান্ড কেনিয়ায় খেলতে যায়নি নিরাপত্তা নিয়ে আতঙ্কে। ১৯৯৬ বিশ্বকাপে আবার অস্ট্রেলিয়া আর ওয়েস্ট ইন্ডিজ শ্রীলঙ্কায় খেলতে যায়নি সন্ত্রাসবাদী হানার আশঙ্কায়। সব ক্ষেত্রেই যে দেশ খেলতে যায়নি, তাদের পয়েন্ট কেটে নেওয়া হয়েছিল। পাকিস্তানকে সন্ত্রাসবাদী দেশ মনে করলে বা তাদের ক্রিকেটারদের সন্ত্রাসবাদী মনে করলে ভারতের সম্পূর্ণ অধিকার আছে তাদের সঙ্গে না খেলার। কিন্তু ভারত সরকারের সমার্থক আজকের ক্রিকেট বোর্ডের এই ‘গাছেরও খাব, তলারও কুড়োব’ মানসিকতা আর যা-ই হোক জাতীয়তাবাদ বা দেশপ্রেম নয়। পাকিস্তানের সঙ্গে খেলা হলে যে বিপুল পরিমাণ টাকা আয় হয় বিজ্ঞাপন বাবদ – তার লোভ বিসিসিআই ছাড়তে রাজি নয়। তাই ‘পাকিস্তানের বিরুদ্ধে খেলেন কেন’ জিজ্ঞেস করলেই বোর্ড কর্তা তথা বিজেপি নেতারা আমতা আমতা করতে থাকেন। ওদিকে নিজেদের উগ্র জাতীয়তাবাদ দেখাতে, ভোটারদের ‘বিকাশ’ ভুলিয়ে পাকিস্তান আর মুসলমানে ব্যস্ত রাখতে খেলাটাও আর খেলার নিয়মে হতে দিচ্ছেন না।

দেশের আর পাঁচটা গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের মত জাতীয় ক্রিকেট দলগুলোও এখন বিজেপি-আরএসএসের একটা শাখা, যার সদর দফতর আমেদাবাদের নরেন্দ্র মোদী ক্রিকেট স্টেডিয়াম। নইলে প্রত্যেকবার মাঠে মাছি তাড়ানোর লোক কম পড়লেও বারবার ওখানেই টেস্ট ম্যাচ হয়, আর ২০০১ সালের পর থেকে ইডেন উদ্যানে ভারত-অস্ট্রেলিয়া টেস্ট দেওয়া যায় না কেন?

সুনীল গাভস্কর, শচীন তেন্ডুলকরের মত মহীরুহ আগেই সংঘের কাছে নাকখত দিয়েছেন। সেখানে সূর্যকুমারের আর কী-ই বা ইয়ে বলুন? যে দেশে মনসুর আলি খান পতৌদির মত নেতার ইতিহাস মুছে ফেলা হয় আর বর্তমান ও প্রাক্তন ক্রিকেটাররা ইনিয়ে বিনিয়ে সেই সিদ্ধান্তের পাশে দাঁড়ান, সে দেশের ক্রিকেট দলের সূর্যকুমারের মত মোসাহেব নেতাই প্রাপ্য।

নাগরিক ডট নেট ওয়েবসাইটে প্রকাশিত

অলক্ষ্মী না হলে বাঁচবে না আমাদের লক্ষ্মী মেয়েরা

পুলিস যেখানে মিটিং করার অনুমতি দেয়নি ঠিক সেখানটাই পার্টিকর্মী, সমর্থকদের দিয়ে ভরিয়ে ফেলে ম্যাটাডোরের উপর দাঁড়িয়ে বলতে পারেন, মিটিং কোথায় হবে মানুষ ঠিক করবে। পুলিস ঠিক করবে না। এমন দস্যি মেয়েদেরই আমরা লক্ষ্মীছাড়া বলতে অভ্যস্ত।

লক্ষ্মীপুজো কবে? দুর্গাপুজোর পরেই তো? নাকি দিওয়ালি নাগাদ? প্রশ্নটা এই পুজোর মরসুমে রীতিমত ভাবিয়েছে। দিনকাল যেভাবে বদলাচ্ছে। হাফপ্যান্ট পরা বয়স থেকে দেখে আসছি বাঙালি গণেশপুজো করে অক্ষয় তৃতীয়ায়। কিছু দোকান হালখাতা পয়লা বৈশাখে করে না, করে সেইদিন। এখন চুল পাকতে শুরু করার পর দেখছি বাঙালির ঘরে ঘরে, ফেসবুকের ওয়ালে ওয়ালে গণেশ চতুর্থীর হিড়িক। দুর্গাপুজোর ঢাকের বাদ্যিও শুরু হয়ে যাচ্ছে অকালবোধনের একমাস আগে। পঞ্চমী তো বটেই, আমাদের আমলে জাঁদরেল বাবা-মায়েরা ষষ্ঠীর দিনও সকালে পড়তে বসাতেন, বিকেল থেকে ছুটি। এখনকার বাবা-মা মহালয়ার দিনই ছেলেমেয়েকে সাজিয়ে গুজিয়ে বাতানুকূল গাড়িতে চাপিয়ে ঠাকুর দেখতে নিয়ে যাচ্ছেন। এতকিছু যখন বদলাচ্ছে, তখন মেঝেতে সারি সারি লক্ষ্মীর পায়ের আলপনা দেওয়ার পুজো ধনতেরাসে বিলীন হতেই পারে। তাই চোখকান খোলা রাখতে হয়। আগে অবশ্য আমাদের বছরে একদিন লক্ষ্মীপুজো করে আশ মিটত না, বাড়িতে লক্ষ্মী মেয়ে তৈরি করার প্রকল্প চলত সারাবছর। শ্বশুরবাড়িতে লক্ষ্মী মেয়েদের চাহিদা এখনো কম নয়, তবে বাবা-মায়েদের কাছে আজকাল অলক্ষ্মী মেয়েদের যথেষ্ট আদর হয়েছে। ছেলের মত বা ছেলের চেয়েও বেশি করে বংশের মুখ উজ্জ্বল করতে যে অলক্ষ্মীরাই পারে, তার ভুরি ভুরি প্রমাণ পাওয়া গেছে। সুতরাং কাল পর্যন্ত যাদের অলক্ষ্মী বলা আমাদের অভ্যাস ছিল, এখন তাদেরই লক্ষ্মী মেয়ে বলে মেনে নেওয়ার দিন। যেমন

মীরাবাঈ চানু, পিভি সিন্ধু, লভলীনা বরগোহাঁই: পিটি ঊষা বা অঞ্জু ববি জর্জ মান্ধাতার আমলের মহিলা নন, কিন্তু কেরিয়ারের সেরা সময়েও তাঁদের যদি বলা হত, আর মাত্র দুই দশকের মধ্যেই কোনো অলিম্পিকে ভারতের জেতা পদকের অর্ধেক জিতবে মেয়েরা, ঊষা আর অঞ্জু নিশ্চয়ই হেসে উড়িয়ে দিতেন। কিন্তু ভারোত্তোলক চানু, ব্যাডমিন্টন খেলোয়াড় সিন্ধু আর মুষ্টিযোদ্ধা লভলীনা ঠিক সেটাই করে দেখিয়ে দিয়েছেন গত বছরের টোকিও অলিম্পিকে। একজন পেশি ফুলিয়ে লোহা তোলেন, একজন জনসমক্ষে ছোট ছোট জামাকাপড় পরে লম্ফঝম্প করে ঠাঁই ঠাঁই করে শাটল পেটান। তৃতীয় জন আরও এক কাঠি সরেস – ঘুঁষোঘুঁষি করেন। কী ভীষণ অলক্ষ্মী! আরেকটু হলে মেয়েদের হকি দলও পদক জিতে ফেলছিল। ভারতীয় মেয়েরা এখনো অলিম্পিকে সোনা জেতেননি। অলক্ষ্মীরা এভাবে দলে ভারি হতে থাকলে ২০২৪ সালে প্যারিসে সে অভাবও মিটে যেতে পারে।

দীপ্তি শর্মা, হরমনপ্রীত কৌর: ক্রিকেট খেলার জন্ম বিলেতে আর বিলেতে খেলার দেবভূমি হল লর্ডসের মাঠ। সেই মাঠে সাহেবদের জব্দ করে দিতে পারা কত বড় কাণ্ড তা আজ থেকে কুড়ি বছর আগে জামা খুলে মাথার উপর বনবন করে ঘুরিয়ে বুঝিয়ে দিয়েছিলেন ভারতের পুরুষদের ক্রিকেট দলের অধিনায়ক সৌরভ গাঙ্গুলি। কদিন আগে সেই লর্ডসেই ইতিহাসে প্রথমবার মেমদের তিনটে একদিনের ম্যাচের তিনটেতেই হারিয়ে দিল ভারতের মহিলা ক্রিকেট দল। উপরন্তু ইংরেজদের কাটা ঘায়ে ঠান্ডা মাথায় নুন ঘষে দিলেন অফস্পিনার দীপ্তি আর অধিনায়িকা হরমনপ্রীত। ইংল্যান্ড ব্যাটার চার্লি ডিন বারবার আগেভাগেই ক্রিজ ছেড়ে বেরিয়ে যাচ্ছিলেন। দীপ্তি বল করতে গিয়ে বেল ফেলে দিলেন। তৃতীয় আম্পায়ার খতিয়ে দেখে জানালেন এখন যে নিয়ম বলবৎ হয়েছে সে নিয়ম অনুযায়ী চার্লি আউট, ম্যাচ খতম। কিন্তু ব্যাপারটা কেবল ইংরেজ নয়, আরও অনেকেরই হজম হয়নি। সাহেবদের তৈরি খেলা, ফলে তারা দাবি করে আইনটাই শেষ কথা নয়, কেতাও বজায় রাখতে হবে (কেতার গালভরা নাম ‘স্পিরিট অফ ক্রিকেট’)। দীপ্তি যদি কাণ্ডটা করেও থাকেন, হরমনপ্রীতের উচিত ছিল আউটের আবেদন ফিরিয়ে নেওয়া। ক্যাপ্টেন বলে কথা। ম্যাচের শেষে টিভির প্রতিনিধি হরমনপ্রীতকে এ নিয়ে প্রশ্নও করলেন। দেখা গেল হরমনপ্রীত, ‘বসন্ত বিলাপ’ ছবির অপর্ণা সেনের মতই, ‘অত্যন্ত ইমপোলাইট’। বললেন যা করা হয়েছে আইন মেনেই হয়েছে। এরকম হলে আমি আমার বোলারকেই সমর্থন করব। ২৪ সেপ্টেম্বরের ঘটনায় ইংরেজরা মনে এত ব্যথা পেয়েছে যে পুরুষদের একদিনের দলের অধিনায়ক জস বাটলার হপ্তাখানেক পরেও বলেছেন, আমি হলে কখনো এমন হতে দিতাম না। বিশ্বকাপ ফাইনালে আমার দলের কোনো বোলার এমন করলেও আমি আউট হওয়া ব্যাটারকে ফিরিয়ে আনব।

মীনাক্ষী মুখার্জি: ইনি যাদবপুর, প্রেসিডেন্সি বা জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তনী নন, বিদেশ থেকে ডিগ্রি বা ব্র্যান্ডেড হাতব্যাগ – কোনোটাই নিয়ে আসেননি। রবীন্দ্রসঙ্গীত বা ‘বেলা চাও’ গাইতে পারেন না, ‘কৃষ্ণকলি আমি তারেই বলি’ গানে নাচতেও পারেন না। কলকাতার ভদ্রলোকেদের বাংলায় কথা বলতে পারেন না, চোস্ত ইংরেজি বলার তো প্রশ্নই ওঠে না। কী পারেন তাহলে? পুলিস লক আপে মার খেয়েও সোজা থাকতে পারেন, যেখানে তাঁর পার্টির তেমন সংগঠন নেই সেখানে দাঁড়িয়েও পুলিসকে ধমকাতে পারেন, জনতাকে উদ্বেল করতে পারেন। পুলিস যেখানে মিটিং করার অনুমতি দেয়নি ঠিক সেখানটাই পার্টিকর্মী, সমর্থকদের দিয়ে ভরিয়ে ফেলে ম্যাটাডোরের উপর দাঁড়িয়ে বলতে পারেন, মিটিং কোথায় হবে মানুষ ঠিক করবে। পুলিস ঠিক করবে না। এমন দস্যি মেয়েদেরই আমরা লক্ষ্মীছাড়া বলতে অভ্যস্ত। পশ্চিমবঙ্গের দশ বছর ধরে মিইয়ে থাকা শান্ত বিরোধী রাজনীতিতে অশান্তি হানতে পেরেছেন মীনাক্ষী। মধ্যবিত্তপ্রধান সিপিএমে গরীব ঘর থেকে উঠে আসা এই মেয়ে নূতন যৌবনের দূত। যে পথে এ রাজ্যের বামপন্থীরা আর কোনোদিন হাঁটতে পারবে না বলে মনে হচ্ছিল, সে পথের হদিশ যে পাওয়া গেছে বলে মনে হচ্ছে তাতে রাজ্য সম্পাদক মহম্মদ সেলিমের অবদান অনেকখানি, কিন্তু মীনাক্ষীর অবদানও কম নয়।

আরও পড়ুন ঝুলন সেরা বাঙালি ক্রিকেটার? মোটেই না

রিয়া কুমারী: প্রচলিত অর্থে লক্ষ্মী মেয়ে বোধহয় বিহারের মহিলা উন্নয়ন কর্পোরেশনের চেয়ারপার্সন হরজোৎ কৌর ভামরা। বহুদূর লেখাপড়া করে আইএএস পরীক্ষায় পাস করে চাকরি পায় যে মেয়ে তাকেই তো লক্ষ্মী মেয়ে বলে। কিন্তু সম্প্রতি বিহার সরকারের উদ্যোগে মেয়েদের ক্ষমতায়ন নিয়ে এক কর্মশালায় ধরা পড়ে গেছে, যে হরজোৎ মানসিকতায় একজন প্রবল পিতৃতান্ত্রিক পুরুষমানুষ। তাঁকে ধরে ফেলেছেন ১৯ বছর বয়সী ঠোঁটকাটা রিয়া কুমারী, যাঁকে কেউ লক্ষ্মী মেয়ে বলবে না হয়ত। রিয়া জানতে চেয়েছিল সরকার ২০-৩০ টাকায় স্যানিটারি ন্যাপকিনের ব্যবস্থা করতে পারে কিনা। হরজোৎ বলেছেন, এরপর তোমরা সরকারের কাছে জিনস চাইবে। তারপর সুন্দর জুতো চাইবে। তারপর কি কন্ডোমও চাইবে? রিয়া তাতে দমে যায়নি। আমলাকে মনে করিয়ে দিয়েছে, সরকার নির্বাচিত হয় নাগরিকদের ভোটে। নাগরিকদের দাবিদাওয়া থাকতেই পারে।

ভারত রাষ্ট্র যে পথে চলেছে তাতে রিয়া নয়, রাষ্ট্র্বের কাছে হরজোৎই লক্ষ্মী মেয়ে। কিন্তু ভারতীয় মেয়েদের বাঁচতে হলে রিয়ার মত অবাধ্য, অলক্ষ্মী হতে হবে। লক্ষ্মীঠাকুরে যাঁদের বিশ্বাস আছে তাঁরা বরং প্রার্থনা করতে পারেন, এ দেশের মেয়েদের যেন ইরানের মেয়েদের মত লক্ষ্মীছাড়া হয়ে উঠে প্রাণ দিতে না হয়।