গ্রোক বাবাজি মোটেই কোনো সত্যান্বেষী নয়। সে আজ যে উত্তরগুলো দিচ্ছে তাতে নতুন তথ্য তো নেই-ই, উপরন্তু তার তথ্যের ভিত্তি হল এত বছর ধরে চাকরির ঝুঁকি নিয়ে, জীবনের ঝুঁকি নিয়ে যেসব সাংবাদিক খবর বার করে এনেছেন তাঁদের কাজকর্ম। কিন্তু এসব মনে রাখার দরকার নেই। সাংবাদিক ফালতু, গ্রোককে মাথায় তুলে নাচো।
ভয়েস অফ আমেরিকা নামটা সংবাদ জগতের সঙ্গে যুক্ত না থাকা বাঙালির অপরিচিত মনে হতে পারে। তবে যাঁরা কবীর সুমনের ভক্ত, কদিন আগেই তাঁর জন্মদিন উপলক্ষে খুশিয়াল হয়ে উঠেছিলেন, তাঁরা নিশ্চয়ই জানেন এই মার্কিনি আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের কথা। কারণ বাংলা গানে পুরোপুরি আত্মনিয়োগ করার আগে একসময় সুমন ভয়েস অফ আমেরিকায় সাংবাদিকের চাকরি করতেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ে মার্কিন সরকারের আনুকূল্যে তৈরি এই সংবাদমাধ্যম ইংরিজি সমেত মোট ৪৯ খানা ভাষায় সারা বিশ্বে পরিষেবা দিয়ে থাকে। সম্ভবত শিগগির বলতে হবে – দিত। কারণ গত রবিবার (১৬ মার্চ) ডোনাল্ড ট্রাম্পের সরকার ভয়েস অফ আমেরিকা এবং অন্যান্য সরকারপোষিত সংবাদমাধ্যমগুলোতে গণ ছাঁটাই আরম্ভ করেছে। আজকাল সারা পৃথিবীর কর্পোরেট চাকরিতে ইদানীং যা দস্তুর, সেই অনুযায়ী রাতারাতি ইমেল করে কর্মরত সাংবাদিক ও অন্যান্য কর্মীদের জানানো হয়েছে – কেটে পড়ো।
ট্রাম্প (অনেকে বলছে বকলমে ইলন মাস্ক) ক্ষমতায় আসার পর থেকে একের পর এক ‘এক্সিকিউটিভ অর্ডার’ দিয়ে মার্কিন সরকারের নানা দফতরের হাজার হাজার কর্মচারীর চাকরি ইতিমধ্যেই খেয়েছেন। সরকারের আস্ত বিভাগ তুলে দেওয়া হচ্ছে। নেহাত ওদেশের জজসাহেবদের সাক্ষাৎকার দেওয়ার উৎসাহ কম, সাংবিধানিক অধিকার রক্ষা করার উৎসাহ বেশি। তাই অনেকের এখনো সেসব চাকরি ফিরে পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। প্রায় রোজ কোনো না কোনো আদালতের বিচারক ট্রাম্পের কোনো ছাঁটাইয়ের আদেশকে অসাংবিধানিক বলে বাতিল করে দিচ্ছেন। এই দড়ি টানাটানিতে শেষমেশ কে জিতবে এখনো বলা যাচ্ছে না, তবে ভাবগতিক দেখে মনে হচ্ছে, সম্ভব হলে ট্রাম্প-মাস্ক সরকারটাই তুলে দিতে চান খরচ কমানোর নাম করে। সে কাজের অঙ্গ হিসাবেই যে ভয়েস অফ আমেরিকার উপর খড়্গহস্ত হয়েছেন তা বোঝা যাচ্ছে। কেবল ভয়েস অফ আমেরিকা তো নয়, রেডিও ফ্রি ইউরোপ, রেডিও ফ্রি এশিয়া, ফারসি ভাষার রেডিও ফারদা, আরবি ভাষার আলহুরা – এই সমস্ত সরকারপোষিত মিডিয়ার কর্মীদেরই টা টা বাই বাই করা হচ্ছে।
ব্যাপারটাকে স্রেফ অন্য দফতরের কর্মচারীদের ছাঁটাইয়ের সঙ্গে এক করে দেখলে সবটা দেখা হবে না। কারণ মার্কিন গণতন্ত্রের হাজার দোষ থাকলেও, অস্বীকার করার উপায় নেই যে আলাদা আলাদা গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বাধীনতা ভারতীয় গণতন্ত্রের চেয়ে অনেক বেশি। এখানে আধা-সরকারি সংবাদমাধ্যম কী লিখতে/বলতে পারে বা পারে না তা কোনোদিনই সম্পূর্ণ সরকারের নিয়ন্ত্রণের বাইরে ছিল না। বলা বাহুল্য, ইদানীং সে নিয়ন্ত্রণ গলার ফাঁসে পরিণত হয়েছে। কিন্তু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ভয়েস অফ আমেরিকার মত প্রতিষ্ঠান সরকারি অর্থে পুষ্ট হলেও তাকে পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা অতীতের রাষ্ট্রপতিদের ছিল না। ট্রাম্প প্রশাসন মোটেই গোপন করছে না যে ওই ব্যাপারটা মোটেই তাদের পছন্দ নয়। ধনকুবের ট্রাম্প-মাস্ক সরকার শুধু বলতে বাকি রেখেছে যে নুন খাবে আর গুণ গাবে না, তা হবে না। ছাঁটাইয়ের খবর প্রকাশ করে সোল্লাসে হোয়াইট হাউস থেকে বলা হয়েছে – এর ফলে মার্কিন করদাতাদের আর দেশের প্রোপাগান্ডার পিছনে টাকা খরচ করতে হবে না। একথা ঠিক যে পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলের জন্যে তৈরি এই সংবাদমাধ্যমগুলো তৈরি করার উদ্দেশ্য ছিল এমন সব দেশে মার্কিনি দৃষ্টিভঙ্গি প্রচার করা, যেখানে মার্কিন সরকারের সঙ্গে সদ্ভাব নেই এমন সরকার রয়েছে। যেমন ঠান্ডা যুদ্ধকালীন পূর্ব ইউরোপ, চীন, ৯/১১ পরবর্তী মুসলমান-প্রধান দেশগুলো। যে কারণে ভয়েস অফ আমেরিকার মৃত্যুঘন্টা বেজেছে জেনে ট্রাম্পের ঘোষিত শত্রু চীনের সরকার নিয়ন্ত্রিত সংবাদমাধ্যম উল্লাস প্রকাশ করেছে। কিন্তু তেমন প্রোপাগান্ডায় ট্রাম্প সরকারের উৎসাহ নেই – একথা কি বিশ্বাসযোগ্য? মোটেই না। কারণ ট্রাম্প হলেন প্রোপাগান্ডার রাজা। তাঁর উত্থানের পিছনে ভারতের গোদি মিডিয়ার মত আমেরিকার সহিংস, দক্ষিণপন্থী মিডিয়ার যথেষ্ট বড় ভূমিকা আছে। সুতরাং তিনি কেন প্রোপাগান্ডায় করদাতার টাকা খরচ হচ্ছে ভেবে মায়া করতে যাবেন? আসল কথা ট্রাম্প এর আগের চার বছরের শাসনকালেই দেখে নিয়েছেন যে ভয়েস অফ আমেরিকাকে তিনি ফক্স নিউজ বানাতে পারবেন না। তারা তাঁর কথায় ওঠবোস করবে না। অতএব ওটা তাঁর কাছে বাজে খরচ। যে সাংবাদিক চাটুকার নয়, তাকে নিয়ে ট্রাম্প কী করবেন?
লক্ষণীয়, মাস্ক টুইটার (অধুনা এক্স) কিনে নেওয়ার পর ২০২২ সালের নভেম্বর মাসে টুইট করেছিলেন যে এখন থেকে টুইটারে ‘সিটিজেন জার্নালিজম’-কে প্রাধান্য দেওয়া হবে এবং ‘মিডিয়া এলিট’ তা আটকানোর আপ্রাণ চেষ্টা করবে। তদ্দিনে তিনি টুইটারে সত্যাসত্য বিচার করা, ঘৃণা ভাষণ আটকানোর যেসব বিভাগ ছিল সেগুলোকে লাটে তুলে দিয়েছেন। অর্থাৎ বুঝতে অসুবিধা হয় না যে তিনি বোঝাতে চাইছিলেন, এবার থেকে যার যা প্রাণে চায় তাই তথ্য বলে চালিয়ে দিতে পারবে। কে না জানে সোশাল মিডিয়ার ক্ষমতা আজকের দিনে কতখানি? অনেক মানুষই যে খবরের জন্যে সংবাদমাধ্যমের চেয়ে সোশাল মিডিয়ার উপর বেশি নির্ভর করেন, সোশাল মিডিয়া থেকে যা জানা গেছে তার সত্যাসত্য যাচাই করার কথা ভুলেও ভাবেন না – এ তো কোনো গোপন কথা নয়। এমনকি সমস্ত সংবাদমাধ্যমকেও সোশাল মিডিয়া ব্যবহার করতে হয়, খবরের জন্যে সেদিকে নজরও রাখতে হয়। যারা আরও এককাঠি সরেস, তারা তো সাধারণ মানুষের মতই সোশাল মিডিয়ার তথ্য যাচাই না করেই খবর হিসাবে চালিয়ে দেয়। তা এহেন সোশাল মিডিয়ার মালিকরা যার প্রাণের বন্ধু, তার আর প্রোপাগান্ডা চালানোর জন্যে পেশাদার সাংবাদিকের দরকার হবে কেন? এবারে ট্রাম্পের শপথ গ্রহণের আগেই তো মেটার (অর্থাৎ ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, হোয়াটস্যাপের) মালিক মার্ক জুকেরবার্গ ভিডিও বার্তা প্রকাশ করে জানিয়ে দিয়েছিলেন যে এখন থেকে ফেসবুকও যাকে যা খুশি বলার ব্যাপারে অনেক বেশি স্বাধীনতা দেবে। মাস্ক তো টুইটারের মালিকানা হাতে পেয়েই আজীবন নিষিদ্ধ হয়ে যাওয়া ট্রাম্পকে ফেরত এনেছিলেন। তারপর ট্রাম্পের হয়ে রীতিমত প্রচার করেন। কী আশায় করেন তা এখন আমেরিকানরা হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছেন। উপরন্তু ট্রাম্পের নিজের কোম্পানিও একখানা সোশাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম খুলে ফেলেছে। কানার নাম পদ্মলোচন রাখার মত তার নাম রাখা হয়েছে ট্রুথ। এমতাবস্থায় সাংবাদিকরা মার্কিন সরকারের কাছে কেবল উদ্বৃত্ত নয়, রীতিমত বালাই। গেলে বাঁচা যায়।
বস্তুত, সর্বত্রই সাংবাদিকরা তাই। প্রণয় রায় আর রাধিকার রায় নাকি কীসব আর্থিক গোলমাল করেছেন – এই অভিযোগে তাঁদের নামে কত মামলা মোকদ্দমা হল নরেন্দ্র মোদী ক্ষমতায় আসার পর থেকে। কতবার তাঁদের পাসপোর্ট কেড়ে নেওয়া হল, এনডিটিভির দফতরে কত কেন্দ্রীয় এজেন্সির কত হানা হল। শেষমেশ প্রায় দেউলে অবস্থায় ওঁদের হাত থেকে এনডিটিভি কিনে ফেললেন পৃথিবীর সবচেয়ে ধনী ব্যক্তিদের একজন – গৌতম আদানি। ও মা! এবছর জানুয়ারি মাসে সিবিআই আদালতে জানিয়ে দিল, রায় দম্পতির বিরুদ্ধে অভিযোগগুলোর কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি! অতএব ‘যাও সবে নিজ নিজ কাজে’। সাত বছর ধরে চলা তদন্তের ফলটা তাহলে কী? সরকারবিরোধী সাংবাদিকতার জন্যে প্রসিদ্ধ এনডিটিভির সরকারের মুখপাত্রে পরিণত হওয়া; রায় দম্পতির হাত থেকে লাগাম বেরিয়ে যাওয়ায় রবীশ কুমার, অনিন্দ্য চক্রবর্তীর মত সাংবাদিকদের প্রথমে কর্মহীন হওয়া; পরে নিজের ব্লগ বা ইউটিউব চ্যানেল খুলে সীমিত পরিসরে সাংবাদিকতা করতে বাধ্য হওয়া। দেশজুড়ে কত সাংবাদিক যে জেল খেটেছেন এবং খাটছেন সেকথা লিখতে বসলে তো আলাদা ওয়েবসাইট তৈরি হয়ে যাবে। কোনো সাংবাদিক আরও বাড়াবাড়ি করলে অবশ্য জেল নয়, গৌরী লঙ্কেশ বা মুকেশ চন্দ্রকর করে দেওয়ার ব্যবস্থা হয়েছে।
ভাবছেন কেবল দুষ্টু লোক, দুষ্টু সরকারই সাংবাদিকদের সরিয়ে ফেলছে? মোটেই তা নয়। দুষ্টু লোকেদের বিরোধীরাও আহ্লাদে আটখানা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে। মাস্কের গ্রোককে মোদীজি বা বিজেপি সম্পর্কে প্রশ্ন করলেই সে টপাটপ এমন সব উত্তর দিচ্ছে যে সব কুকীর্তি বেরিয়ে আসছে। মোদীবিরোধীদের ধারণা, এই অস্ত্রেই ফ্যাসিবাদী বধ হবে। তাঁরা ভুলেই গেছেন যে গ্রোক বাবাজি মোটেই কোনো সত্যান্বেষী নয়। সে আজ যে উত্তরগুলো দিচ্ছে তাতে নতুন তথ্য তো নেই-ই, উপরন্তু তার তথ্যের ভিত্তি হল এত বছর ধরে চাকরির ঝুঁকি নিয়ে, জীবনের ঝুঁকি নিয়ে যেসব সাংবাদিক খবর বার করে এনেছেন তাঁদের কাজকর্ম। কিন্তু এসব মনে রাখার দরকার নেই। সাংবাদিক ফালতু, গ্রোককে মাথায় তুলে নাচো।
অতএব যারা এখনো সাংবাদিক হওয়ার স্বপ্ন দেখছে তাদের বলি – আর যেখানে যাও না রে ভাই সপ্তসাগর পার/জার্নালিজম ক্লাসের কাছে যেও না খবরদার।
যেহেতু সাংবাদিকরা আকাশ থেকে পড়েন না, আর সকলের মত তাঁরাও একটা আর্থসামাজিক ব্যবস্থা এবং রাষ্ট্রব্যবস্থার উৎপাদন, সেহেতু গৌরীর খুনে অভিযুক্তদের সাম্প্রতিক জামিন এবং মালা পরিয়ে বরণের দৃশ্যও আমাকে অবাক করেনি। মুচকি হেসে স্ক্রোল করে অন্য খবরে চলে যেতে আমার অসুবিধা হয়নি।
৬ সেপ্টেম্বর ২০১৭। বক্তা পঞ্চাশের বেশি সংস্করণবিশিষ্ট একটি ভারতীয় ইংরিজি কাগজের একাধিক সংস্করণের একজন সম্পাদক। ঠিক তার আগের দিন গৌরী নিজের বাড়ির সামনে গুলিতে ঝাঁঝরা হয়ে গেছেন। কথাগুলো ভদ্রলোক বলছিলেন একঝাঁক অতি তরুণ সাংবাদিককে, যারা সদ্য কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণ্ডি পেরিয়ে সাংবাদিকতায় পা রেখেছে। স্বাধীনতার ৭০ বছর পরে কলকাতার যে শীতাতপনিয়ন্ত্রিত অফিসে দাঁড়িয়ে নিজের পদের সুযোগ নিয়ে উনি কথাগুলো বলছিলেন, পরাধীন দেশে নীলকর সাহেবদের বিরুদ্ধে লিখে লিখে মরে যাওয়া হিন্দু প্যাট্রিয়ট কাগজের সম্পাদক হরিশ্চন্দ্র মুখোপাধ্যায়ের নামাঙ্কিত রাস্তাটা সেখান থেকে কিলোমিটার দেড়েক। এমনকি যে অফিসে দাঁড়িয়ে তিনি কথা বলছিলেন, সেই অফিসের সামনের রাস্তার নামকরণ হয়েছিল সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের নামে। হরিশ তবু সরকারি কর্মচারী ছিলেন, দলীয় রাজনীতি করতেন না। সুরেন বাঁড়ুজ্জে রীতিমত কংগ্রেস সভাপতি ছিলেন। সেইসঙ্গে দ্য বেঙ্গলি নামের কাগজ সম্পাদনা করতেন। সম্ভবত তিনিই প্রথম ভারতীয় সাংবাদিক, যাঁকে কাগজের একটি লেখার জন্যে কারাদণ্ডে দণ্ডিত হতে হয়। আরও পিছিয়ে গেলে এই কলকাতাতেই রামমোহন রায় বলে একজন সাংবাদিকের নাম পাওয়া যাবে। রামমোহনের কলমের জোরে ইংরেজ আমলের সুপ্রিম কোর্টকেও গেঁয়ো রায়তের চাবুক খেয়ে মৃত্যুর ঘটনায় জেলা জজের কৈফিয়ত তলব করতে হয়েছিল। সেই শহরে বসে একজন শীর্ষস্থানীয় সম্পাদক গৌরীর মৃত্যুর পরদিনই বলতে পেরেছিলেন যে গৌরী সাংবাদিক ছিলেন না, কারণ তিনি অ্যাক্টিভিস্ট ছিলেন।
দৃশ্যটা দেখেছিলাম এবং কথাগুলো শুনেছিলাম ফুটখানেক দূর থেকে। চুপ করে থাকতে হয়েছিল, কারণ ওই যে বললাম – আমি তখন কর্পোরেট ক্রীতদাস। ক্রীতদাসের প্রতিবাদ করার অধিকার থাকে না, সাহসও থাকে না। তবে আমাদের পায়ের তলার জমি যে সরছে সেটা সেদিনই পরিষ্কার হয়ে গিয়েছিল আমার কাছে। যে দেশে একজন সাংবাদিক খুন হলে অন্য সাংবাদিকরা বলে – ও সাংবাদিক নয় কারণ ও অ্যাক্টিভিস্ট, সে দেশে কোনো সাংবাদিকের জীবনেরই যে দাম থাকবে না অদূর ভবিষ্যতে, চাকরি থাকা দূর অস্ত, তা বুঝতে আমার অসুবিধা হয়নি। আমার অনুমান নির্ভুল প্রমাণ করে বছর তিনেকের মধ্যেই অতিমারীর অজুহাতে ভারতের মিডিয়ায় ব্যাপক সাংবাদিক ছাঁটাই শুরু হয়। যেহেতু সাংবাদিকরা আকাশ থেকে পড়েন না, আর সকলের মত তাঁরাও একটা আর্থসামাজিক ব্যবস্থা এবং রাষ্ট্রব্যবস্থার উৎপাদন, সেহেতু গৌরীর খুনে অভিযুক্তদের সাম্প্রতিক জামিন এবং মালা পরিয়ে বরণের দৃশ্যও আমাকে অবাক করেনি। মুচকি হেসে স্ক্রোল করে অন্য খবরে চলে যেতে আমার অসুবিধা হয়নি। কারণ সাংবাদিক হত্যা আর সাংবাদিক ছাঁটাইয়ের উদ্দেশ্য একই – ক্ষমতাশালীর সমালোচনা বন্ধ করা, ক্ষমতার দিকে আঙুল তোলা বন্ধ করা, ক্ষমতাহীনের কণ্ঠ সকলের কানে পৌঁছবার ব্যবস্থা নষ্ট করা।
লজ্জাজনক হলেও স্বীকার না করে উপায় নেই, যে খুন হওয়ার আগে পর্যন্ত গৌরী আমার কাছে খুব পরিচিত ছিলেন না। দু-একবার নাম শুনেছিলাম। কিন্তু দ্য টাইমস অফ ইন্ডিয়া, সানডে পত্রিকা, ইনাড়ু টিভি চ্যানেলের মত বড় বড় কর্পোরেট সংবাদমাধ্যমে দেড় দশক কাজ করলেও গৌরীকে আমরা যেসব কাজের জন্য আজও মনে রেখেছি সেসব তিনি করেছেন মাতৃভাষা কন্নড়ে, মূলত তাঁর বাবা পলিয়া লঙ্কেশের মৃত্যুর পর তাঁরই প্রতিষ্ঠিত কাগজ লঙ্কেশ পত্রিকে (পরবর্তীকালে গৌরী লঙ্কেশ পত্রিকে)-র দায়িত্ব নিয়ে। আমরা বাঙালিরা আমেরিকায় কী হচ্ছে খবর রাখি, ইউরোপের সাংবাদিকতার হাল হকিকতও জানি। কিন্তু বিভিন্ন ভারতীয় ভাষার সাংবাদিকদের খবর জানি না। বড়জোর হিন্দি ভাষার রবীশ কুমারদের আমরা চিনি। তাও তাঁরা কর্পোরেট টিভি চ্যানেলে তারকা হয়ে উঠেছিলেন বলে। গৌরীর মত বিভিন্ন ভারতীয় ভাষার সংবাদমাধ্যমে যাঁরা মরণপণ সাংবাদিকতা করেন তাঁদের খবর আমরা পাই কোথায়? হয়ত চাই না বলেই পাই না। তাই আমাদের নিজেদের বিকল্প সাংবাদিকতা হয়ে দাঁড়ায় শিকড়হীন, কোনো কোনো ক্ষেত্রে সুবিধাবাদীও। লিটল ম্যাগাজিনের দীর্ঘ ঐতিহ্য থাকলেও বাংলায় বিকল্প সংবাদমাধ্যম সম্ভবত তৈরিই হত না মূলধারার সংবাদমাধ্যমে সাংবাদিকতার পরিসর ক্রমশ সংকীর্ণ হয়ে না গেলে। অন্যদের দোষ দেব না, আমারও তো দিব্যি চলে যাচ্ছিল দেড় দশক কর্পোরেট ক্রীতদাস হয়ে মাসান্তে মোটা মাইনে পকেটস্থ করে। গৌরীর হত্যা নাড়া দিলেও, নড়াতে তো পারেনি। বিকল্প হওয়ার জ্বালা যে অনেক। যা পাওয়া যায় তার চেয়ে ছাড়তে হয় অনেক বেশি।
আসলে গৌরীর মৃত্যু কেবল তাদেরই নড়াতে পেরেছে, গৌরী যাদের জন্য নিজের কলমকে হাতিয়ারের মত ব্যবহার করেছিলেন। নইলে নিজের বাড়ির সামনে খুন হওয়ার সাতবছর পরেও, কারা সম্ভাব্য খুনি তার মোটামুটি হদিশ থাকা সত্ত্বেও গৌরীর হত্যাকারীরা শাস্তি পাবে না কেন? মনে রাখা ভাল, গৌরী হিন্দুত্ববাদীদের দীর্ঘদিনের শত্রু হলেও তাঁকে যখন খুন করা হয় তখন কর্ণাটকে ছিল সিদ্দারামাইয়ার নেতৃত্বাধীন কংগ্রেস সরকার। সেই সরকারের পুলিসও অপরাধীদের শাস্তি দেওয়ার কাজে তেমন এগোয়নি। ইতিমধ্যে একাধিকবার সরকার বদল হয়ে গতবছর গৌরীর রাজ্যে আবার ক্ষমতায় এসেছে কংগ্রেস, আবার মুখ্যমন্ত্রী হয়েছেন সিদ্দারামাইয়া। বহু রাজনৈতিক বিশ্লেষকের মতে কংগ্রেসের কর্ণাটক জয়ের অন্যতম কারণ রাহুল গান্ধীর ভারত জোড়ো যাত্রা এবং হিন্দুত্ববাদের বিরুদ্ধে সোচ্চার অবস্থান। তবু কিন্তু হিন্দুত্ববাদের আমৃত্যু প্রতিপক্ষ গৌরীর হত্যার অভিযোগে গ্রেফতার হওয়া ১৭ জনের মধ্যে ১১ জন ইতিমধ্যেই জামিনে মুক্ত। রাহুলের মহব্বতের দোকানে গৌরীর জন্যে কি তবে কিছুই নেই? যেমন চারবছর ধরে বিনা বিচারে আটক সেই উমর খালিদের জন্য তাঁর দোকানে নেই একটা শব্দও, যাঁকে গৌরী নিজের ছেলে বলতেন?
আসলে বোবার যেমন শত্রু নেই, তেমনি যথার্থ সাংবাদিকের শত্রুর অভাব নেই। গৌরীরও ছিল না। কর্ণাটকের আজকের উপমুখ্যমন্ত্রী ডি কে শিবকুমারের বিরুদ্ধেও গৌরী একসময় লেখালিখি করেছিলেন। এমনকি সিদ্দারামাইয়া সরকারের টিপু সুলতান জয়ন্তী পালন করার সিদ্ধান্তকেও তিনি ভাল চোখে দেখেননি। তিনি ওই সিদ্ধান্তকে ‘নরম সাম্প্রদায়িকতা’ আখ্যা দিয়েছিলেন। এমন একজনের হত্যাকারীরা শাস্তি পেল কি পেল না, তা নিয়ে কেনই বা মাথা ঘামাতে যাবে কোনো দল বা তার নেতৃত্ব? যে ভারতে প্রয়োজনীয় অর্ণব গোস্বামী, নাভিকা কুমার, মৌপিয়া নন্দীর মত সরকারি তোতাপাখিরা; সেখানে গৌরী যে অপ্রয়োজনীয় তা বলাই বাহুল্য।
গৌরীর মৃত্যুর পর তাঁর আমৃত্যু বন্ধু এবং প্রাক্তন স্বামী সাংবাদিক চিদানন্দ রাজঘাট্টা এক দীর্ঘ ফেসবুক পোস্ট করেছিলেন, যা একান্ত ব্যক্তিগত অথচ গৌরী লঙ্কেশের শত্রু কারা এবং কেন – তা বোঝার সবচেয়ে ভাল উপায়। সেই পোস্ট পড়ে হয়ত বাঙালি বদভ্যাসেই আমার মনে পড়েছিল শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের সেইসব লাইন ‘অবান্তর স্মৃতির ভিতর আছে/তোমার মুখ অশ্রু-ঝলোমলো/লিখিও, উহা ফিরৎ চাহো কিনা?’ আজ সাতবছর পরে মনে হচ্ছে, ব্যাপারটা আর কাব্যে আটকে নেই। গৌরী এই দেশের কাছে ব্যবহারিকভাবেও অবান্তর স্মৃতিই হয়ে গেছেন।
সাংবাদিকতা করা মানেই হল, সজাগ দৃষ্টিতে যে ক্ষমতাশালী – সে সরকার হতে পারে, ব্যবসায়ী হতে পারে, মাস্টার হতে পারে, ডাক্তার হতে পারে, উকিল হতে পারে – তার দোষত্রুটি খেয়াল করা এবং সকলের চোখের সামনে সত্য উদ্ঘাটিত করা।
দক্ষিণ দিনাজপুরের বুনিয়াদপুর মহাবিদ্যালয়ের সংস্কৃত বিভাগের আমন্ত্রণে গত ১৫ মার্চ ২০২৩ (বুধবার) ছাত্রছাত্রীদের জন্য ‘সাহিত্য ও সাংবাদিকতা’ বিষয়ে এই ভাষণ দেওয়া হয়েছিল।
শিক্ষক-শিক্ষিকাদের আমার প্রণাম, প্রিয় ছাত্রছাত্রীদের ভালবাসা। আমাকে আজ বলতে ডাকার জন্যে কলেজ কর্তৃপক্ষ এবং সংস্কৃত বিভাগকে ধন্যবাদ। তোমাদের যে মাস্টারমশাইরা আমার আগে বললেন, তাঁরা আমার উপরে একটা গুরুভার চাপিয়ে দিয়েছেন। তাঁরা আশা করেছেন যে আমার বক্তৃতা থেকে তোমরা একটা পেশাগত দিশা পাবে। এখন আমি নিশ্চিত নই সেটা পাবে কিনা। তোমরা শুনে দ্যাখো।
জীবন সবাইকে দ্বিতীয় সুযোগ দেয় না, আমাকে দিয়েছে। ইংরেজি অনার্সের ছাত্র হিসাবে যখন বিএ পরীক্ষা দিয়েছিলাম, তখন একটা পেপারে আমাদের ৪০ নম্বরের প্রবন্ধ লিখতে হত। সেবার সবাই বলেছিল একটা প্রবন্ধ আসবেই। টেস্ট পরীক্ষায় এসেছিলও বটে। আমি অনেক বই-টই ঘেঁটে প্রস্তুতি নিয়েছিলাম, টেস্ট পরীক্ষার খাতা দেখানোর সময়ে মাস্টারমশাই “চমৎকার হয়েছে” বলে পিঠও চাপড়ে দিয়েছিলেন। কিন্তু ফাইনাল পরীক্ষা দিতে বসে দেখি, সে প্রবন্ধ আসেনি। এসেছে আজকের বিষয়টা – সাহিত্য ও সাংবাদিকতা। যেহেতু প্রস্তুতি ছিল না, সেহেতু সেদিন কীরকম লিখেছিলাম শুনেই বুঝতে পারছ। নম্বরও পেয়েছিলাম তেমনই। আমার সেই সময়কার সহপাঠী এবং তোমাদের মাস্টারমশাই ডঃ শান্তিগোপাল দাসের কল্যাণে আমি আজ দ্বিতীয় সুযোগ পেয়েছি। আজকের পরীক্ষকরা, মানে তোমরা, নিশ্চয়ই অত কড়া পরীক্ষক নও। দ্যাখো আজ পাস করতে পারি কিনা।
এই বক্তৃতার আয়োজক যেহেতু এই কলেজের সংস্কৃত বিভাগ, বিশেষ করে সেই কারণেই ধরে নিচ্ছি, রাজা বিক্রমাদিত্য আর কালিদাস – এই নাম দুটো কারোর অজানা নয়। বিক্রমাদিত্যের নবরত্নসভা নিয়ে অনেক গল্প প্রচলিত আছে। তার মধ্যে একটা গল্প শুধু সংস্কৃত কেন, প্রায় যে কোনো বিভাগের লোকেরই জানা। সেই গল্পটা দিয়েই আজকের আলোচনা শুরু করব। নবরত্নসভায় কালিদাস ছাড়াও আরেকজন কবি ছিলেন, তাঁর নাম বররুচি। তাঁর একটু অভিমান বা ক্ষোভ ছিল, যে রাজা তাঁর চেয়ে কালিদাসকে বেশি গুরুত্ব দেন, যদিও কবি হিসাবে তিনি কালিদাসের চেয়ে কোনো অংশে কম যান না। এই ক্ষোভের কথা রাজা জানতেন। তা তিনি ঠিক করলেন একদিন প্রমাণ করে দেবেন কালিদাস মহত্তর কবি। কীভাবে করলেন? একদিন সভাসদদের নিয়ে ঘুরতে বেরিয়েছেন, সামনে একটা মরা গাছ পড়ে আছে। রাজা ওই গাছটা দেখিয়ে বররুচিকে বললেন “কবিবর, এ নিয়ে এক লাইন হয়ে যাক?” কবি বললেন “শুষ্কং কাষ্ঠং তিষ্ঠত্যগ্রে।” তারপর রাজা কালিদাসকে বলতে বললেন। তিনি বললেন “নীরসতরুবরঃ পুরতো ভাতি।” আর কোনো সংশয় রইল না। যিনি শুকিয়ে যাওয়া গাছেও রসসঞ্চার করতে পারেন তাঁর চেয়ে বড় কবি আর কে আছে?
বাংলা ভাষার সম্ভবত সর্বকালের সেরা সাহিত্য সমালোচক বুদ্ধদেব বসু অবশ্য মেঘদূতম অনুবাদ করে তার ভূমিকায় লিখেছেন, প্রচলিত ধারণাটা ভুল। আসলে বররুচির শ্লোকটাই সাহিত্য হিসাবে উন্নততর। কিন্তু সে বিতর্কে যাব না, কারণ আমার এই গল্পটা বলার উদ্দেশ্য আলাদা। কথা হল, সাহিত্য হিসাবে কালিদাস যা বলেছেন তা হয়ত মহত্তর, কিন্তু সাংবাদিকতার দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে বররুচি যা বলেছেন সেটাকেই এগিয়ে রাখতে হবে। কোনোরকম অলঙ্করণ বাদ দিয়ে সত্যকে তুলে ধরা – এই যদি সাংবাদিকতার কাজ হয়, তাহলে মানতেই হবে বররুচি বেশি সফল।
কিন্তু সাংবাদিকতার কাজ কি এটাই? অলঙ্করণ বাদ দিয়ে সত্যকে তুলে ধরা? অলঙ্করণ করলে কি সাংবাদিকতা আর সাংবাদিকতা থাকে না? আরও প্রশ্ন আছে। সত্য বলা কি শুধু সাংবাদিকতারই কাজ, সাহিত্যের কাজ নয়? সাহিত্য মানে কি স্রেফ কতকগুলো বানানো কথা? সংস্কৃত, বাংলা, ইংরেজি বা অন্য যে কোনো ভাষার সাহিত্য নিয়ে যাঁরা চর্চা করেন তাঁরা সকলেই বোধহয় মানবেন যে কবিতাই হল সাহিত্যের সবচেয়ে বিমূর্ত ধারা। কারণ কবিতার প্রকরণ এবং বিষয়বস্তু – দুটোতেই কল্পনার আধিপত্য। তা বাংলা ভাষার শ্রেষ্ঠ কবিদের একজন, শঙ্খ ঘোষ, আজ থেকে প্রায় ৬০ বছর আগেই তাঁর শ্রেষ্ঠ কবিতার ভূমিকায় লিখে দিয়েছেন “সত্যি বলা ছাড়া আর কোনো কাজ নেই কবিতার। কিন্তু জীবিকাবশে শ্রেণীবশে এতই আমরা মিথ্যায় জড়িয়ে আছি দিনরাত যে একটি কবিতার জন্যেও কখনো-কখনো অনেকদিন থেমে থাকতে হয়।” এরপর তো আর সত্য বলা সাহিত্যের কাজ নয়, এ কথা বলার অবকাশ নেই। তাহলে?
আমরা বরং আগে ভেবে দেখি যে সাংবাদিকতা আসলে কী? ইংরেজি সাহিত্যের মাস্টারমশাই, দিদিমণি এবং ছাত্রছাত্রীরা জর্জ অরওয়েলের কথা জানেন। অরওয়েল বলেছিলেন সাংবাদিকতা হল তাই, যা কেউ না কেউ প্রকাশিত হতে দিতে চায় না। বাকি সবই হল জনসংযোগ, মানে পাবলিক রিলেশন বা সংক্ষেপে পি আর। যা অরওয়েলের সময়ে না হলেও, আমাদের সময়ে একটা আস্ত পেশা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তোমাদের মধ্যে যারা ভবিষ্যতে কোথাও কোনো গণমাধ্যমের পাঠক্রমে ভর্তি হবে, তারা দেখতে পাবে একইসঙ্গে সাংবাদিকতা এবং পাবলিক রিলেশন পড়ানো হয়। কিন্তু অরওয়েলের কথাটা শুনলেই বোঝা যাচ্ছে, দুটো আসলে পরস্পরবিরোধী বিষয়।
ব্যাপারটা কীরকম? ধরা যাক, তোমাদের কলেজে সাংবাদিকতা বিভাগ চালু করা হচ্ছে। কলেজ কর্তৃপক্ষ খবরটা স্থানীয় কাগজের সম্পাদকদের কাছে পাঠালেন, তারাও ছেপে দিল। এটা প্রয়োজনীয় কাজ হল, কারণ এলাকার সাংবাদিকতা পড়তে আগ্রহী ছেলেমেয়েরা জানতে পারল এবং তাদের অভিভাবকরা জানতে পারলেন। কিন্তু এটা জনসংযোগ হল, সাংবাদিকতা হল না। এবার ধরা যাক, কোনো কলেজে সাংবাদিকতা বিভাগ আছে, সেখানে ছেলেমেয়েরা ভর্তিও হয়েছে। অথচ সেখানে অধিকাংশ ক্লাস হয় না, সময়ে পরীক্ষা হয় না। কারণ বেশিরভাগ অধ্যাপক বহুদিন হল কলেজেই আসেন না। এই খবরটা কোনো কাগজে কি ওয়েবসাইটে প্রকাশিত হল বা কোনো খবরের চ্যানেলে দেখানো হল। এইটা সাংবাদিকতা হল। কারণ এ খবর বাইরে যাক তা কলেজ কর্তৃপক্ষ চাইবেন না। আবার এমনও হতে পারে যে তাঁরা চাইছিলেন খবরটা প্রকাশিত হোক, হইচই হোক। কারণ এই অচলাবস্থা দীর্ঘদিন ধরে চলছে, কর্তৃপক্ষ প্রতিকার করতে চেয়েও পারেননি উপরতলার চাপে বা অবজ্ঞায়। সেক্ষেত্রে আবার এ খবর প্রকাশিত হোক সেটা উপরতলা চাইবে না।
তাহলে নিশ্চয়ই বুঝতে পারা যাচ্ছে, সাংবাদিকতা বলে রোজ যা চলছে আমাদের চারপাশে, তার অধিকাংশই আসলে পি আর। মোটেই সাংবাদিকতা নয়। রাত্রিবেলা স্টুডিওতে বসে গলা ফাটিয়ে “দ্য নেশন ওয়ান্টস টু নো” বলা সাংবাদিকতা নয়। কিন্তু এরকম হচ্ছে তো। কেন হচ্ছে? সে আবার একটা আলাদা আলোচনার বিষয়। এই বক্তৃতাতেও শেষদিকে খানিকটা সে আলোচনায় আসব, কারণ তোমাদের শান্তিগোপাল স্যার আমাকে পইপই করে বলে দিয়েছেন, কী করে সাংবাদিক হতে হয় সেটা যেন বলি। সেকথা বলতে গেলে ওই আলোচনায় ঢুকতেই হবে। কিন্তু আপাতত আমরা দেখব, যে সাহিত্য আর সাংবাদিকতা নিয়ে একত্রে আলোচনা কেন দরকার? সাংবাদিকতা আর সাহিত্যে কোথায় মিল, কোথায় অমিল? দুটোর মধ্যে কি আদৌ কোনো সীমারেখা আছে? সে রেখা কি সবসময় বজায় থাকে? না থাকলে কোথায় মুছে যায়?
এ পর্যন্ত আমাদের আলোচনা থেকে যা উঠে এসেছে, তার মধ্যে দুটো জিনিস আলাদা করে চিহ্নিত করা দরকার। ১) সাংবাদিকতা আর সাহিত্য – দুয়ের কাজই সত্য বলা, ২) সাংবাদিকতার কাজ অপ্রিয় সত্য প্রকাশ করা। এই দ্বিতীয় কাজটার উল্লেখে সাংবাদিকতার সঙ্গে সাহিত্যের একটা তফাতের আভাস পাওয়া যায়। কারণ প্রাথমিকভাবে আমরা সাহিত্যের কাছে কেন যাই? আরও সহজ করে যদি বলি – গল্পের বই, কবিতার বই, নাটক বা প্রবন্ধের বই পড়তে চাই কেন? আনন্দ পাব বলে। তাহলে সাহিত্য পড়ার মূল উদ্দেশ্য নিশ্চয়ই আনন্দ পাওয়া? এমনটা শুধু যে আমাদের মত সাধারণ মানুষেরই মত তা নয়, স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ সাহিত্যের পথে বইয়ের তথ্য ও সত্য প্রবন্ধে লিখেছেন “যে প্রকাশচেষ্টার মুখ্য উদ্দেশ্য হচ্ছে, আপন প্রয়োজনের রূপকে নয়, বিশুদ্ধ আনন্দরূপকে ব্যক্ত করা, সেই চেষ্টারই সাহিত্যগত ফলকে আমি রসসাহিত্য নাম দিয়েছি।” প্রবন্ধের নামটা খেয়াল করো। আজকের বিষয়ের সঙ্গে মিল আছে। সাংবাদিকতা ও সাহিত্য নিয়ে আলোচনা করছি; প্রবন্ধের নাম ‘তথ্য ও সত্য’। রবীন্দ্রনাথ যা বলেছেন তা যদি ঠিক হয়, তাহলে মানতে হবে যে সত্য প্রকাশ করা সাংবাদিকতার মত সাহিত্যেরও কাজ বটে, কিন্তু অপ্রিয় সত্য নয়। তোমাদের শান্তিগোপাল স্যারের পাশে বসে যখন সংস্কৃত ক্লাস করতাম, তখন শিখেছিলাম প্রাচীন হিন্দুশাস্ত্রেও উপদেশ দেওয়া হয়েছে “সত্যম অপ্রিয়ম মা বদ”। মানে অপ্রিয় সত্য বোলো না। এটাই তাহলে সাহিত্যে পালনীয়, তাই না?
কিন্তু এই যুক্তি মানলে বিশ্বসাহিত্যের সেরা সৃষ্টির অনেকগুলোকেই যে আর সাহিত্য বলে মানা যাবে না! ইংরেজ কবি পিবি শেলি ‘টু আ স্কাইলার্ক’ কবিতায় লিখেই দিয়েছেন “Our sincerest laughter/With some pain is fraught/Our sweetest songs are those that tell of saddest thought.” মানে আমরা যখন সবচেয়ে জোরে হাসি, তার মধ্যেও কিছুটা বেদনা মিশে থাকে। আমাদের সবচেয়ে মিষ্টি গান সেগুলোই, যেগুলোতে সবচেয়ে কষ্টের কথা বলা আছে। কথাগুলো গানের ক্ষেত্রে যতটা সত্যি, সাহিত্যের ক্ষেত্রেও ততটাই সত্যি। ধরো বাংলা সাহিত্যে রবীন্দ্রনাথের যে স্থান, ইংরেজি সাহিত্যে তো সে স্থান উইলিয়াম শেক্সপিয়রের। তিনি ১৬১৬ সালে মারা গেছেন, আজ ৪০০ বছর পরেও তাঁর কোন নাটকগুলো বারবার পড়া হয়, মঞ্চে অভিনীত হয়, বারবার নানা রূপে সিনেমার পর্দায় নিয়ে যাওয়া হয়? কমেডিগুলো নয়, ট্র্যাজেডিগুলো। ম্যাকবেথ, হ্যামলেট, ওথেলো, জুলিয়াস সিজার, রোমিও অ্যান্ড জুলিয়েট। সারা পৃথিবীর সাহিত্য সমালোচকরা মানেন, এগুলোই শেক্সপিয়রের সেরা কাজ। অথচ এগুলো যে শুধু বিয়োগান্ত তা নয়, প্রথম চারটে নাটকের কেন্দ্রে আছে চারটে খুন। পঞ্চমটায় দুই নিরপরাধ যুবক-যুবতীর মৃত্যু ঘটে। উপরন্তু শত্রুতা, বিশ্বাসঘাতকতা, অন্তর্ঘাত, অবৈধ প্রেম এসবে ভর্তি এই নাটকগুলো। ওগুলোর বিজ্ঞাপনে অনায়াসে লেখা যেত “লাশ কা মাউন্টেন, খুন কা ফাউন্টেন। ডেঞ্জার! ডেঞ্জার! ডেঞ্জার!” কথাটা ম্যাকবেথ, ওথেলো আর হ্যামলেট অবলম্বনে বিশাল ভরদ্বাজের মকবুল, ওমকারা আর হায়দার ছবিগুলো যারা দেখেছে তারা পরিষ্কার বুঝতে পারবে।
শেক্সপিয়র তবু অনেক আধুনিক দৃষ্টান্ত। একেবারে রামায়ণ, মহাভারতে চলে যাই। রাম-সীতা আর লক্ষ্মণকে বনবাসে যেতে হল কেন? রামের সৎ মা কৈকেয়ী আর দাসী মন্থরার ষড়যন্ত্রে। রাম-রাবণের যুদ্ধই বা লাগল কেন? রাবণ অন্যের বউকে অপহরণ করলেন বলে। পাশ্চাত্য জগতের পুরাণ হোমারের ইলিয়াড, তারও কেন্দ্রে একজন নারীর উপর কর্তৃত্ব কায়েম করা নিয়ে যুদ্ধ – সেই নারী হলেন হেলেন অফ ট্রয়। আর মহাভারতে কতগুলো অপ্রিয় সত্য আছে সেকথা তো গুনতে শুরু করলে শেষ হবে না। আজকের ভারতের আইনকানুন, নীতি নৈতিকতা যা দাঁড়িয়েছে, তাতে এখন মহাভারত লিখলে প্রথমে বইটা নিষিদ্ধ হয়ে যেত, তারপর ব্যাসদেবের বাড়িতে ঢিল পড়ত, শেষমেশ পুলিস এসে হিড়হিড় করে টানতে টানতে নিয়ে গিয়ে জেলে ঢুকিয়ে দিত। সবচেয়ে বড় কথা, রামায়ণ, মহাভারত, ইলিয়াড – সবই শেষপর্যন্ত যুদ্ধের গল্প। রামায়ণে তবু উত্তরকাণ্ড বলে একটা ব্যাপার আছে। মহাভারত তো যুদ্ধের পর কার কী হল সে গল্প দিয়েই শেষ। যুদ্ধে যে আসলে কেউ জেতে না – একথা শান্তিপর্বে ব্যাসদেব যেভাবে দেখিয়েছেন তাতে মহাভারতকে যদি পৃথিবীর প্রাচীনতম যুদ্ধবিরোধী সাহিত্যকর্ম বলে চিহ্নিত করি তাহলে ভুল হবে না।
সুতরাং বোঝাই যাচ্ছে, সাংবাদিকতার মত সাহিত্যেরও একটা বড় কাজ অপ্রিয় সত্য প্রকাশ করা। অবশ্য রবীন্দ্রনাথের “বিশুদ্ধ আনন্দরূপ” কথাটার বিস্তার আমরা আনন্দ বলতে যা বুঝি তার চেয়ে অনেক বেশি এবং তার মধ্যে এইসব মহান সাহিত্য অনায়াসে এঁটে যায়। কারণ আমাদের দেশের প্রাচীন নন্দনতত্ত্বে নবরসের কথা বলা হয়েছে। যে কোনো মহান সাহিত্য ওই নটার এক বা একাধিক রসের সন্ধান দেয়। যে কোনো রসেই রয়েছে বিশুদ্ধ আনন্দরূপ। যাকে ট্র্যাজেডি বলা হয়, তাতে শেষে পাওয়া যায় করুণরস। সে রসে যে বিশুদ্ধ আনন্দরূপ রয়েছে সে ব্যাপারে এমনকি পাশ্চাত্যের প্রাচীন নন্দনতত্ত্বের গুরু অ্যারিস্টটলও একমত। ওই আনন্দরূপ আবিষ্কার করে যে অনুভূতি হয় তিনি তার নাম দিয়েছেন catharsis।
এখন ঘটনা হল, যত দিন গেছে, সাহিত্যে অপ্রিয় সত্যের ভাগ কিন্তু তত বেড়েছে। ফলে সাহিত্যের আজ যে চেহারা দাঁড়িয়েছে তার সবটা আমরা নবরসের ধারণা দিয়ে বা অ্যারিস্টটল, রবীন্দ্রনাথের ধারণা দিয়ে ব্যাখ্যা করতে পারব না। দু-দুটো বিশ্বযুদ্ধের প্রভাব সারা পৃথিবীর মানুষের উপর এবং স্বভাবতই সাহিত্যের উপর পড়েছে। আমাদের দেশে, বিশেষ করে বাংলায়, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালীন দুর্ভিক্ষ, দেশভাগ, পরবর্তীকালে নকশাল আন্দোলন, তারপর ১৯৯১ সালে শুরু হওয়া অর্থনৈতিক উদারীকরণের প্রভাবও পড়েছে সাহিত্যে। ফলে অপ্রিয় সত্যের পরিমাণ বেড়েই চলেছে, এখনো বাড়ছে। পাশাপাশি সাংবাদিকতার পরিমাণ ও বিস্তার বেড়েছে। সাংবাদিকতার সঙ্গে সাহিত্যের সীমারেখাও অস্পষ্ট হয়েছে। এটা কাকতালীয় নয়, যে বিংশ শতাব্দীর বহু বিখ্যাত সাহিত্যিক জীবনের কোনো পর্বে বা সারাজীবন পেশায় সাংবাদিক ছিলেন। নোবেল পুরস্কার বিজয়ী স্প্যানিশ ভাষার সাহিত্যিক গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজ থেকে শুরু করে বাংলার প্রমথনাথ বিশী, দীপেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়, মতি নন্দী, রাঘব বন্দ্যোপাধ্যায় বা আজকের প্রচেত গুপ্ত – তালিকা তৈরি করলে কয়েক মাইল লম্বা হবে। পৃথিবীর যেসব জায়গায় মানুষ বেশি কষ্টে আছে, জীবনযুদ্ধ যেখানে বেশি প্রবল, সেখানে সাহিত্য আর সাংবাদিকতার তফাত আরও কমে এসেছে। এর সবচেয়ে দগদগে উদাহরণ প্যালেস্তাইনের কবি, পেশায় সাংবাদিক রাফীফ জিয়াদার একখানা কবিতা। তোমরা ইউটিউবে গিয়েই সার্চ করলে স্বচক্ষে দেখতে পাবে রাফীফ কীভাবে সমস্ত শরীর, মন দিয়ে কবিতাটা আবৃত্তি করেছেন।
কয়েক বছর আগে সেই ভিডিও দেখে ইংরিজিতে লিখিত এই কবিতার বাংলা ভাষান্তর করেছিলাম। তোমরা শুনে দ্যাখো, ইজরায়েলি হানাদারির মুখে বেঁচে থাকা প্যালেস্তিনীয়দের কথা কীভাবে রাফীফের কলমে উঠে এসেছে। এটা কি সাহিত্য, নাকি সাংবাদিকতা? নাকি দুটোই। তোমরাই বিচার করো।
আজ আমার শরীরটা মুখরোচক বুলেটিন সাউন্ড বাইট আর শব্দসংখ্যায় বাঁধা, পরিসংখ্যানে ভারি, সব প্রশ্নের মাপা উত্তর দিতে তৈরি। আমার ইংরিজিটা ঘষেমেজে, জাতিপুঞ্জের সনদগুলো ঝালিয়ে নিয়ে এসেছি। তবু সে আমায় জিজ্ঞেস করল: “মিস জিয়াদা, তোমার মনে হয়না সব মিটে যাবে যদি তোমরা শিশুদের হিংসার পথ দেখানো বন্ধ করো?” আমি শান্ত হওয়ার শক্তি খুঁজলাম, কিন্তু শান্তি তো আমার জিভের ডগায় নেই। গাজায় বোমাবৃষ্টি দেখতে দেখতে শান্তি এইমাত্র কেটে পড়ল। আমরা বাঁচতে শেখাই, ভাই (রাফীফ, হাসতে থাকো), আমরা বাঁচতে শেখাই। আমরা প্যালেস্তিনীয়রা বাঁচতে শেখাই ওরা শেষ আকাশের টুকরোটা দখল করে নেওয়ার পরেও, শেষ আকাশপারে পাঁচিল তোলার পরেও, আমরা বাঁচতে শেখাই।
কিন্তু আজ আমার শরীরটা মুখরোচক বুলেটিন সাউন্ড বাইট আর শব্দসংখ্যায় বাঁধা।
“আরে আমাদের একটা গল্প চাই, একটা মানবিক গল্প, রাজনৈতিক খবর-টবর নয়। আমরা লোককে তোমার, তোমার দেশের লোকের ব্যাপারে জানাতে চাই। “বৈষম্য”, “দখলদারী” এইসব শব্দ চলবে না, এটা রাজনৈতিক ব্যাপার নয়। সাংবাদিক হিসাবে আমাদের বল তোমার কথা, মানে যা রাজনৈতিক নয়, এমন কিছু।”
আজ আমার শরীরটা মুখরোচক বুলেটিন।
“ধরো গাজার একজন মহিলার গল্প যার চিকিৎসা দরকার, বা তোমার কথাই বল না।আচ্ছা তোমার কটা হাড় ভাঙা? এতগুলো কি যে সূর্য ঢেকে যাবে? আমাকে তোমাদের মৃতদেহগুলো দাও না, আর নামের তালিকা, বারোশো শব্দের মধ্যে।
আজ আমার শরীরটা মুখরোচক বুলেটিন সাউন্ড বাইট আর শব্দসংখ্যায় বাঁধা, এমনভাবে যাতে সন্ত্রাসবাদীদের রক্ত দেখে যাদের মন গলে না তাদেরও নাড়িয়ে দেওয়া যায়।
কিন্তু ওরা ব্যথা পেয়েছে, গাজার গরু-ছাগলগুলোর জন্য ওরা সত্যিই খুব ব্যথিত। তাই আমি ওদের জাতিপুঞ্জের সনদগুলো দিলাম, আর বললাম আমরা নিন্দা করি, ঘেন্না করি, প্রত্যাখ্যান করি ওগুলো। এটা সমানে-সমানে লড়াই নয়: দখলদার আর ভিটেমাটি চাটি হওয়া লোকজন, আর একশো, দুশো, এক হাজার মৃতদেহের কথা বলছি। তা ছাড়া যুদ্ধাপরাধ আর গণহত্যার কথা বলছি। বলতে বলতে হাসি, হেসে বলি “সন্ত্রাসবাদীদের কথা বলছি না কিন্তু”। আমি আবার গুনি, বারবার গুনি – একশো, দুশো, এক হাজার মৃতদেহ। কেউ আছেন? কেউ শুনছেন? আহা, ঐ মড়াগুলোর উপর হুমড়ি খেয়ে পড়ে যদি হাউ হাউ করে কাঁদতে পারতাম, যদি সব উদ্বাস্তু শিবিরে খালি পায়ে দৌড়ে যেতে পারতাম, আর সব শিশুর কান চেপে রাখতে পারতাম, যাতে ওদের বোমার আওয়াজ শুনতে না হয় বাকি জীবন আমার মত!
আজ আমার শরীর মুখরোচক বুলেটিন। আর শোনো ভাই, তোমার জাতিপুঞ্জের সনদ কস্মিনকালেও এ ব্যাপারে কিস্যু করেনি। আর কোনো সাউন্ড বাইট, কোনো সাউন্ড বাইট, সে যতই নিখুঁত হোক না কেন, আমার ইংরিজি যতই ঝরঝরে হোক না কেন, কোনো সাউন্ড বাইট সে জীবনগুলো ফিরিয়ে দিতে পারবে না। কোনো সাউন্ড বাইট পারবে না এসব মেটাতে।
আমরা বাঁচতে শেখাই ভাই, আমরা বাঁচতে শেখাই।
আমরা প্যালেস্তিনীয়রা রোজ সকালে জেগে উঠি বাকি দুনিয়াকে বাঁচতে শেখাব বলে।
সভ্যতার ইতিহাস যত লম্বা তার সাপেক্ষে বিচার করলে সাংবাদিকতা অত্যন্ত আধুনিক ব্যাপার, কিন্তু সাহিত্য অতি প্রাচীন। বিভিন্ন ভাষার সাহিত্যে আধুনিক যুগ বলতে বিভিন্ন সময়কে বোঝানো হয়, আধুনিকতার সংজ্ঞাও সেই অনুযায়ী বদলে যায়। এখানে আধুনিক শব্দটা আমি সাহিত্যের ইতিহাসে যে অর্থে ব্যবহার হয় একেবারেই সে অর্থে ব্যবহার করছি না। শব্দটার সবচেয়ে সংকীর্ণ যে অর্থ, মানে সাম্প্রতিককালের ব্যাপার – সে অর্থেই ব্যবহার করলাম। তাহলে এতক্ষণ ধরে সাহিত্য আর সাংবাদিকতার অমিলগুলোকে বাতিল করতে করতে এসে এতক্ষণে একটা অমিল স্বীকার করলাম। তার মানে নিশ্চয়ই সাহিত্য আর সাংবাদিকতার সীমারেখা অস্পষ্ট হয়ে গেছে বললেও কোনো একটা সীমারেখা আমি মানি?
মানি তো বটেই। কী সেটা? উদ্দেশ্যের সীমারেখা। আবার রবীন্দ্রনাথের সংজ্ঞায় ফিরে যাই। “যে প্রকাশচেষ্টার মুখ্য উদ্দেশ্য হচ্ছে, আপন প্রয়োজনের রূপকে নয়, বিশুদ্ধ আনন্দরূপকে ব্যক্ত করা, সেই চেষ্টারই সাহিত্যগত ফলকে আমি রসসাহিত্য নাম দিয়েছি।” সাহিত্যের উদ্দেশ্য নিয়ে প্রচুর বিতর্ক আবহমানকাল ধরে চলছে। রবীন্দ্রনাথের আমলেও জোরদার বিতর্ক চলছিল। সেইসময় অনেকের মত ছিল সাহিত্যের উদ্দেশ্য লোককে শিক্ষিত করা। রবীন্দ্রনাথ তাতে ঘোর আপত্তি করেছিলেন। ওই সাহিত্যের পথে বইতেই ‘বাস্তব’ নামে প্রবন্ধে তিনি লিখেছেন “লোক যদি সাহিত্য হইতে শিক্ষা পাইতে চেষ্টা করে তবে পাইতেও পারে, কিন্তু সাহিত্য লোককে শিক্ষা দিবার জন্য কোনো চিন্তাই করে না। কোনো দেশেই সাহিত্য ইস্কুল-মাস্টারির ভার লয় নাই। রামায়ণ মহাভারত দেশের সকল লোকে পড়ে তাহার কারণ এ নয় যে, তাহা কৃষাণের ভাষায় লেখা বা তাহাতে দুঃখী-কাঙালের ঘরকরনার কথা বর্ণিত। তাহাতে বড়ো বড়ো রাজা, বড়ো বড়ো রাক্ষস, বড়ো বড়ো বীর এবং বড়ো বড়ো বানরের বড়ো বড়ো লেজের কথাই আছে। আগাগোড়া সমস্তই অসাধারণ। সাধারণ লোক আপনার গরজে এই সাহিত্যকে পড়িতে শিখিয়াছে।” সাহিত্যের উদ্দেশ্য নিয়ে এতরকম পরস্পরবিরোধী মতামত আছে, যে তা থেকে কোনো মোদ্দাকথা বের করা অসম্ভব। এই হলে যতজন বসে আছেন তাঁদের প্রত্যেককে যদি জিজ্ঞেস করা হয়, কেন সাহিত্য পড়েন? আলাদা আলাদা উত্তর পাওয়া যাবে। আবার সাহিত্যিকদের যদি জিজ্ঞেস করা হয়, কেন লেখেন? তাহলেও কোনো একটা উত্তর পাওয়া যাবে না। কিন্তু একথা ঠিক, যে বিন্দুমাত্র আত্মসম্মান আছে এমন কোনো সাহিত্যিক বলবেন না “লিখতে ইচ্ছে করে না। কিন্তু লেখা আমার চাকরি, তাই লিখি।”
সাংবাদিকদের অনেককে জিজ্ঞেস করলে কিন্তু এই উত্তরটা পাওয়া যেতে পারে। অর্থাৎ সাহিত্যের মূলে আছে মানসিক প্রয়োজন বা আরেকটু তরল করে বললে, সাহিত্য হৃদয় সংক্রান্ত ব্যাপার। সাংবাদিকতার মূলে আছে ব্যবহারিক প্রয়োজন। কথাটা শুধু সাংবাদিকের দিক থেকেই সত্যি তা নয়। একজন পাঠকও যে জন্যে পয়সা দিয়ে গল্পের বই কেনেন, সেই কারণেই খবরের কাগজ কেনেন কি? যে কারণে হলে গিয়ে বা মোবাইলে সিনেমা দ্যাখো তোমরা, ঠিক সেই কারণেই টিভিতে বা মোবাইলে খবর শোনো কি? তা তো নয়। সাহিত্য পড়ো বা সিনেমা দ্যাখো উপভোগ করার জন্যে। কিছু ক্ষেত্রে হয়ত নতুন কিছু জানার জন্যে। কাগজ পড়ো বা টিভিতে কি মোবাইলে খবর পড়ো চারপাশে কী হচ্ছে জানতে চাও বলে। যা হচ্ছে তার সঙ্গে নিজের রোজকার ভালমন্দ জড়িয়ে আছে বলে। কালিদাস, রবীন্দ্রনাথ বা শেক্সপিয়রের লেখা যদি কেউ না-ই পড়ে তার কী ক্ষতি হবে? ভারতের মত দেশে বেশিরভাগ লোকই তো সাহিত্য পড়ে না। কারণ সাহিত্য পড়তে গেলে যে প্রাথমিক পড়াশোনা করা দরকার তার সুযোগই পায় না। যারা পায় তাদের অনেকের হাতেও খাওয়া, পরা, থাকার ব্যবস্থা করে এবং পাঠ্য বইয়ের ব্যবস্থা করে এতটা অতিরিক্ত পয়সা থাকে না যে সাহিত্য পাঠ করার জন্যে শখ করে বই কিনবে। কিনে পড়ার ক্ষমতা না থাকলেও মানুষ যাতে বই পড়তে পারে তার জন্যে লাইব্রেরি বা গ্রন্থাগার বলে একটা চমৎকার জিনিস মানুষ আবিষ্কার করেছিল। কিন্তু সে জিনিস তুলে দেওয়ার ব্যবস্থা আমরা করে ফেলেছি। সে যা-ই হোক, আর্থিক ক্ষমতা না থাকলেও কিন্তু মানুষ খবর সংগ্রহ করতে চেষ্টা করে। নিজে কাগজ কিনতে না পারলে দোকানে গিয়ে পড়ে, প্রতিবেশীর কাগজ চেয়ে নিয়ে পড়ে। ইদানীং অবশ্য কাগজের জনপ্রিয়তা কমছে। কিন্তু মোটামুটি সকলেই টিভিতে খবর শোনে। নিদেনপক্ষে হাতের মোবাইলে বিভিন্ন ওয়েবসাইট খুলে খবর দেখে। ফেসবুকে দেখে, হোয়াটস্যাপে দেখে। অনেকসময় ভুয়ো খবরও দেখে ফ্যালে, কিন্তু দ্যাখে। মানুষের খবরের খিদে কিছুতেই মেটে না।
সাহিত্য আর সাংবাদিকতা যাদের জন্যে, অর্থাৎ পাঠক বা দর্শক – তাঁদের উদ্দেশ্যে যখন এরকম তফাত আছে, তখন সাহিত্য আর সংবাদ উৎপাদনের উদ্দেশ্যেও তফাত থাকতে বাধ্য। সাংবাদিকতার উদ্দেশ্য মানুষকে অবগত করা। কী বিষয়ে? তা ঠিক করে সংবাদ পরিবেশকরা, চলতি কথায় সংবাদমাধ্যম। যেখানে সাংবাদিকরা চাকরি করেন। অর্থাৎ খবরের কাগজ বা চ্যানেল বা ওয়েবসাইট বা নিউজ এজেন্সি। পৃথিবীর যে কোনো দেশের খবরের কাগজ হাতে নিলে বা খবরের সাইট খুললে বা খবরের চ্যানেল দেখলে দেখা যাবে বিভাগগুলো মোটামুটি একই। রাজনীতির খবর, অর্থনীতির খবর, খেলার খবর, বিনোদন জগতের খবর। আমাদের দেশে এখনো খুব বেশি চল নেই যে দু ধরনের খবরের, সেগুলো হল পরিবেশ সম্পর্কিত খবর আর বিজ্ঞানের খবর। কিন্তু তলিয়ে দেখলে দেখা যাবে একেকটা সংবাদমাধ্যমে একেকটা বিভাগের গুরুত্ব একেকরকম। কেউ রাজনীতির খবর বেশি পরিবেশন করে, কেউ সিনেমা-টিনেমা নিয়ে বেশি মেতে থাকে, কেউ আবার খেলা নিয়ে। যারা রাজনীতির খবর বেশি দেয় তাদের মধ্যেও কেউ এ দলের খবর বেশি দেয়, কেউ ও দলের খবর বেশি দেয়। এই তফাতগুলো কেন হয়? সে প্রশ্নের উত্তর পেতে গেলে আগে অন্য একটা প্রশ্নের উত্তর পাওয়া দরকার। এই যে বললাম, মানুষকে অবগত করা। আচ্ছা, অবগত হওয়ার দরকারটা কী? এই বুনিয়াদপুরে বসে যদি না-ই জানা যায় কলকাতায় কী হচ্ছে, দিল্লিতে কী হচ্ছে, ইউক্রেনের রাজধানী কিভে কী হচ্ছে বা নিউইয়র্কে কী হচ্ছে; তাতে ক্ষতিটা কী?
ক্ষতি ছিল না, যদি আমরা একটা রাজতান্ত্রিক বা একনায়কতান্ত্রিক দেশে বাস করতাম। আমাদের অধিকার বলে কিছু থাকত না, আইনকানুন বলেও কিছু থাকত না। রাজা বা একনায়কের মুখের কথাই হত আইন, আমাদের সবাইকে মুখ বুজে সেই আইন মেনেই চলতে হত। প্রতিবাদ করলেই পুলিস মিলিটারি ইত্যাদি দিয়ে মারধোর করা হত, জেলে পুরে দেওয়া হত, গুমখুন করা হত। কিন্তু ১৯৪৭ সালের ১৫ই অগাস্ট ইংল্যান্ডের রানির শাসন থেকে স্বাধীন হওয়ার তিন বছরের মাথায়, ১৯৫০ সালের ২৬শে জানুয়ারি, আমরা, মানে ভারতের সাধারণ নাগরিকরা, একটা কাণ্ড করে বসেছি। আমরা একটা গণতান্ত্রিক সংবিধান চালু করেছি। পৃথিবীর অন্য অনেক গণতান্ত্রিক দেশের মত এই সংবিধান অনুযায়ী আমাদের কিসে ভাল, কিসে মন্দ; কোন আইনটা করা হবে আর কোন আইনটা বাতিল করা হবে, আমাদের প্রতিনিধি হয়ে কারা দেশ চালাবে – এসব ঠিক করার দায়িত্ব আমরা নিজেদের হাতে নিয়ে নিয়েছি। তা এইসব গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলো আমরা নেব কী করে যদি কোথায় কী হচ্ছে সে সম্পর্কে অবগতই না থাকি? আর অবগত থাকা মানে মূলত খারাপ কী কী হচ্ছে সে সম্পর্কে অবগত থাকা। মানে আমাদের নির্বাচিত প্রতিনিধিরা কোথায় কোথায় তাঁদের যে দায়িত্ব আমরা দিয়েছি ভোটের মাধ্যমে, তা থেকে বিচ্যুত হচ্ছেন সে সম্পর্কে অবগত থাকা। মানে ঘুষ নিচ্ছেন কি? আমাদের ভুল বুঝিয়ে বা অন্ধকারে রেখে এমন কোনো আইন তৈরি করছেন কি যাতে আমাদের ক্ষতি হতে পারে? তাঁদের হাতে যেসব যন্ত্রপাতি রয়েছে – মানে বিভিন্ন সরকারি দপ্তর, পুলিসবাহিনী, সেনাবাহিনী – সেগুলো ব্যবহার করে এমন কিছু করছেন কি, যাতে তাঁরাই যে আমাদের ভৃত্য সেই ব্যাপারটা উল্টে গিয়ে আমরা তাঁদের ভৃত্য হয়ে যাই? যেসব সরকারি পরিষেবা আমাদের পাওয়ার কথা, তা আমরা সবাই পাচ্ছি কি? এমন নয় তো, যে কলকাতায় সরকারি হাসপাতালে গেলে চিকিৎসা পাওয়া যাচ্ছে, কিন্তু বুনিয়াদপুরে পাওয়া যাচ্ছে না? বা বুনিয়াদপুরে সরকারি স্কুলে লেখাপড়া হচ্ছে, মেদিনীপুরে হচ্ছে না? বর্ধমানে মসৃণ রাস্তা হচ্ছে, কিন্তু ঔরঙ্গাবাদে হচ্ছে না? সরকার আমাদের মত সাধারণ লোকেদের মধ্যে মারদাঙ্গা লাগিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছে না তো? অন্য কোনো দেশের সরকারের সঙ্গে এমন কোনো চুক্তি করছে না তো, যাতে সরকারের আমাদের উপর নজরদারি করতে সুবিধা হয় এবং আমাদের অধিকারে হস্তক্ষেপ করা হয়? আমাদের টাকায় তৈরি সরকারি সংস্থা জলের দরে একজন, দুজন ধনী লোককে বেচে দিচ্ছে না তো?
এই সমস্ত বিষয়ে অবগত হওয়ার জন্যে একটা গণতান্ত্রিক দেশের নাগরিকরা সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারে। এমন হতেই পারে, আমার যে সিদ্ধান্তটা মনে হয় ঠিক তোমার মনে হল সেটা ঠিক নয়। কিন্তু আমার কেন মনে হয় ঠিক, আর তোমার কেন মনে হয় ঠিক নয় তা নিয়ে তর্ক হওয়া উচিত। তর্কে আমি ভুল প্রমাণিত হলে আমাকে তোমার সিদ্ধান্ত মানতে হবে, তুমি ভুল প্রমাণিত হলে তোমাকে আমার সিদ্ধান্ত মানতে হবে। এই প্রক্রিয়াতেই আমাদের প্রতিনিধিদের মধ্যে বিতর্ক চলবে পৌরসভায়, পঞ্চায়েতে, বিধানসভায়, লোকসভায়, রাজ্যসভায়। তারপর সংখ্যাগরিষ্ঠ যাতে মত দেবে তাই হবে। একেই বলে গণতন্ত্র। কিন্তু আমাদের হাতে যদি তথ্যই না থাকে, তাহলে মত দেব কিসের ভিত্তিতে? দিলে কিছুদিন পরে বোঝা যাবে এমন মত প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে যা অধিকাংশ মানুষের মত হলেও আসলে তাদের পক্ষেই ক্ষতিকর হয়েছে। এমনটা ঘটেও, কারণ মানুষ মাত্রেই ভুল করে। একা করে বলেই অনেকে মিলেও ভুল করতে পারে। ভুল শোধরাতে হলেও আগে তো বুঝতে হবে ভুল করেছি। কী করে বুঝব, যদি আমার কাছে তথ্যই না থাকে?
এই ব্যাপারগুলো শুধু সরকারের সঙ্গে নাগরিকের সম্পর্কের বেলায় নয়, যে কোনোরকম ক্ষমতায় যে আছে তার সঙ্গে যে ক্ষমতায় নেই তার সম্পর্কের বেলাতেই সত্যি। সুতরাং এবার নিশ্চয়ই বোঝা যাচ্ছে, অরওয়েল কেন বলেছিলেন, সাংবাদিকতা হচ্ছে তাই, যা কেউ না কেউ প্রকাশিত হতে দিতে চায় না? কোনো ক্ষমতাশালী তো চাইবে না তার কুকীর্তির খবর প্রকাশ পাক। যে সৎ ক্ষমতাশালী সে-ও হয়ত চাইবে না তার ভুলচুক লোকে জেনে যাক, কারণ সে ক্ষমতায় টিকে থাকতে চায়। সুতরাং সাংবাদিকতা করা মানেই হল, সজাগ দৃষ্টিতে যে ক্ষমতাশালী – সে সরকার হতে পারে, ব্যবসায়ী হতে পারে, মাস্টার হতে পারে, ডাক্তার হতে পারে, উকিল হতে পারে – তার দোষত্রুটি খেয়াল করা এবং সকলের চোখের সামনে সত্য উদ্ঘাটিত করা। আমি যখন সাংবাদিকতার ছাত্র ছিলাম, আমাদের এক মাস্টারমশাই বলেছিলেন “একশোটা শকুন মরলে একটা সাংবাদিক জন্মায়।” কথাটা কিন্তু নিন্দাসূচকভাবে বা ব্যঙ্গার্থে বলা নয়। বলার অর্থ হল, শকুনকে যেমন সারাক্ষণ ভাগাড়ের দিকে তাকিয়ে থাকতে হয়, সাংবাদিকেরও কাজ হল সারাক্ষণ কোথায় কী অন্যায় হচ্ছে খুঁজে যাওয়া। আমাদের চারপাশ পরিষ্কার রাখার জন্যে শকুন কতটা প্রয়োজনীয় প্রাণী সে সম্পর্কে পুরনো দিনের লোকেদের ধারণা ছিল, আমাদের নেই। ফলে শকুন এখন একটা লুপ্তপ্রায় প্রাণী। সাংবাদিকও লুপ্তপ্রায় প্রাণী। কারণ যুগের হাওয়ায় সংবাদ হয়ে গেছে তেল, সাবান, শ্যাম্পু, এয়ার কন্ডিশনারের মত একটা পণ্য। ফলে সাংবাদিকরা চাকরি করেন যেসব সংবাদমাধ্যমে তারা আর সাংবাদিকদের দিয়ে শকুনের কাজটা করাতে চায় না, সেলসম্যান বা সেলসগার্লের কাজ করায়। কে না জানে, ব্যবসা করতে গেলে ক্ষমতাশালীর সঙ্গে বিবাদ করা চলে না? কিছু নাছোড়বান্দা সাংবাদিক এখনো আছেন, যাঁরা কিছুতেই বিক্রেতা হয়ে যেতে রাজি নন। তাঁরা কেউ ইন্টারনেটের সুযোগ নিয়ে ইউটিউব চ্যানেল খুলছেন, ফেসবুক পেজ খুলছেন। আমরা কয়েকজন যেমন একটা ওয়েবসাইট খুলেছি। কিন্তু এইভাবে সাংবাদিকতা করার অসুবিধা হল বড় বড় সংবাদমাধ্যমের মত আমাদের বিরাট পুঁজি নেই, বিজ্ঞাপন নেওয়ার উপায় নেই। কারণ বিজ্ঞাপন নিলেই বিজ্ঞাপনদাতারা হয়ে যাবেন ক্ষমতাশালী, তখন আর তাঁরা আমাদের শকুনের কাজটা করতে দেবেন না।
এই কারণেই আজকাল বেশকিছু ক্রাউড-ফান্ডেড মিডিয়া তৈরি হয়েছে। মানে তুমি সেই সাইটে গিয়ে কোনো লেখা পড়লে বা ভিডিও দেখলে, দেখে তার জন্যে টাকা দিলে। সেই টাকাতেই যারা কাজ করছে তাদের পারিশ্রমিক দেওয়া হবে, সাইটের কাজকর্ম চলবে। তোমরা নিশ্চয়ই জানো এরকম অনেক সংবাদমাধ্যমের কথা। আমি যে সাইটের সঙ্গে যুক্ত সেটাও এরকমই একটা সাইট। কিন্তু বাংলায় এভাবে কাজ চালানো দ্বিগুণ শক্ত। কারণ সারা ভারতের সঙ্গে সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গের উপরেও হিন্দি চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা তো চলছেই, সেইসঙ্গে বাংলা যে একটা ফালতু ভাষা, সেটা বাঙালিরা নিজেরা সবচেয়ে বেশি করে বিশ্বাস করতে শুরু করেছে। এই যে আমি বক্তৃতা দিচ্ছি বাংলায়, আমাকে আমন্ত্রণ জানিয়েছে সংস্কৃত বিভাগ। অথচ এই ফ্লেক্সটা লেখা হয়েছে ইংরেজিতে। এমতাবস্থায় তোমাদের বাংলায় সাংবাদিকতা করতে বলি কী করে? আদৌ সাংবাদিক হতেই বা বলি কী করে, যা তোমাদের মাস্টারমশাইরা আমাকে বলতে বলছেন? বলার সমস্যা আছে।
পৃথিবীর কোন দেশে সাংবাদিকরা কতটা স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারেন তা নিয়ে প্রতি বছর একটা সমীক্ষা হয়। ‘রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডার্স’ বলে এক আন্তর্জাতিক সংগঠন এই সমীক্ষা করে। ২০২২ সালের সর্বশেষ সমীক্ষায় ভারতের স্থান ছিল ১৮২টা দেশের মধ্যে ১৫০ নম্বরে। গত কয়েক বছরে বেশ কয়েকজন সাংবাদিক – যাঁদের মধ্যে তোমাদের সবচেয়ে জানা নাম হয়ত গৌরী লঙ্কেশ – খুন হয়ে গেছেন। খুন হয়ে যাওয়া সাংবাদিকদের একটা লম্বা তালিকা দেওয়া সম্ভব। বক্তৃতা অতি দীর্ঘ হয়ে যাবে বলে সে তালিকা দিচ্ছি না। শুধু এইটুকু তোমাদের বলে দিই, যে খুন হয়ে যাওয়াই একমাত্র সম্ভাব্য বিপদ নয়। তোমরা হয়ত সিদ্দিক কাপ্পান বলে একজনের নাম শুনেছ। তিনি কেরালার সাংবাদিক। উত্তরপ্রদেশে একটি দলিত মেয়ে ধর্ষিত হয়, খুন হয়, তারপর অভিযোগ ওঠে যে রাজ্যের পুলিসই নাকি দেহটা তার বাবা-মাকে অন্ধকারে রেখে রাতের অন্ধকারে জ্বালিয়ে দিয়েছে। সারা পৃথিবীর লোক টিভির পর্দায় দেখে ফেলেছে ঘটনাটা। তারপর সে ঘটনা নিয়ে আরও গভীরে লিখবেন বলে কেরালা থেকে সিদ্দিক যাচ্ছিলেন হাথরাসে। তিনি পৌঁছবার আগেই, কোনো প্রতিবেদন লেখার আগেই, স্রেফ লিখতে পারেন বলেই পুলিস তাঁকে গ্রেপ্তার করে হাজতে পুরে দেয়। তারপর দুবছরের বেশি সময় কারাবাস করে সিদ্দিক এই কিছুদিন আগে জামিন পেয়েছেন। জামিন, খালাস নয় কিন্তু। মানে মামলাটা এখনো চালু আছে। অথচ পুলিস তাঁর বিরুদ্ধে যা যা অভিযোগ করেছে তার পক্ষে বিন্দুমাত্র প্রমাণ দেখাতে পারেনি।
এইরকম বিপদের মুখে আমাদের দেশের সাংবাদিকরা এখন সাংবাদিকতা করেন। তোমরা ঠিক আমার ছেলেমেয়ের বয়সী নও, কিন্তু আমার ভাইবোনের মত তো বটেই। তা আমি এগুলো জেনেশুনে কী করে তোমাদের বলি, যে সাংবাদিকতা করো? ভারত সরকার অবশ্য বলেছে যে ওই সমীক্ষাটা ভুল। মেথডোলজি ভুল, অনেক কম নমুনা পরীক্ষা করা হয়েছে ইত্যাদি। কিন্তু আমি যদি কোনো মেয়ের বাবা না হতাম, তাহলে হয়ত কায়মনোবাক্যে সরকারের কথা বিশ্বাস করে নিয়ে তোমাদের বলতে পারতাম, ঠিক আছে। সরকার একটা কথা বলেছে আর একটা সংগঠন উল্টো কথা বলেছে। তোমরা নিজেরা ময়দানে নামো, নেমে পরখ করে দ্যাখো সত্যিটা কী। কিন্তু আমি বাপু তোমাদের সে ঝুঁকি নিতে বলতে পারছি না।
এ প্রসঙ্গে বলে দিই, ইতিহাস বলছে কোনো দেশ যখন সাংবাদিকদের পক্ষে বিপজ্জনক হয়ে ওঠে, তখন সাহিত্যিকরাও শান্তিতে থাকতে পারেন না। তোমরা তেলুগু ভাষার কবি ভারভারা রাওয়ের কথা হয়ত জানো। এই অশীতিপর কবিও দীর্ঘকাল কারান্তরালে কাটিয়েছেন ওইরকমই আরেকটা অভিযোগে, যা পুলিস আজ অব্দি প্রমাণ করতে পারেনি। আপাতত জামিনে বাইরে আছেন অসুস্থ বলে। পার্শ্ববর্তী বাংলাদেশে অভিজিৎ রায়ের মত ব্লগারদের হত্যার কথাও তোমরা নিশ্চয়ই জানো। ব্লগাররা ঠিক সাহিত্যিক না হলেও সাংবাদিকতা আর সাহিত্যের মাঝামাঝি একটা জায়গায় বিচরণ করেন বলা যায়। আবার বিশ্ববিখ্যাত সলমন রুশদির উপর প্রাণঘাতী আক্রমণের কথাও নিশ্চয়ই জানো। তিনি অল্পের জন্য প্রাণে বেঁচেছেন, একটা চোখ প্রবলভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। উদাহরণ অসংখ্য, যা থেকে বোঝা যায় সারা পৃথিবীর সাংবাদিক এবং সাহিত্যিকদের জন্যে এ বড় সুখের সময় নয়, এ বড় আনন্দের সময় নয়।
কী করে সাংবাদিক হতে হয় আসলে সেটাই আমি এতক্ষণ ধরে বলেছি, যদি তোমরা বুঝে থাকো। কিন্তু কী করে সাংবাদিকতার চাকরি পেতে হয় তা বলা আমার সাধ্যের বাইরে। কারণ সমস্ত সংবাদমাধ্যম ব্যাপকভাবে সাংবাদিক ছাঁটাই করেছে গত ৫-৬ বছরে। কোভিড-১৯ আসার আগে থেকেই বহু কাগজ, টিভি চ্যানেল বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছিল। অতিমারীর সময়ে ওটাকে অজুহাত করে আরও বেশি কর্মী সংকোচন করা হয়েছে, বহু বড় বড় কাগজ তাদের অনেক জায়গার সংস্করণ তুলে দিয়েছে, যেগুলো রেখেছে সেখানেও প্রচুর সাংবাদিক এবং অন্যান্য বিভাগের কর্মীদের চাকরি গেছে। যে সাংবাদিকদের চাকরি যায়নি, তাঁরা অরওয়েলের ভাষায় পাবলিক রিলেশন করতে বাধ্য হচ্ছেন। আজকাল পাবলিক রিলেশন যেহেতু নিজেই একটা আলাদা পেশা, সেহেতু ও কাজটা করতে হলে সরাসরি তাতে যাওয়াই ভাল। কারণ তাতে সাংবাদিকদের চেয়ে বেশি মাইনে পাওয়া যায়। কোথায় শিখবে? কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়, বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয় – তিনটে জায়গাতেই সাংবাদিকতা ও গণমাধ্যম বিভাগের পাঠক্রমের অঙ্গ হিসাবেই ওটা পড়ানো হয়। যারা আরেকটু দূরে যেতে পারবে, তারা ওড়িশার ঢেঙ্কানল বা দিল্লির ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ মাস কমিউনিকেশনসে পড়তে পারো। এছাড়া আছে চেন্নাইয়ের এশিয়ান কলেজ অফ জার্নালিজম। এগুলো অনেকদিনের প্রতিষ্ঠান। এছাড়া একগুচ্ছ নতুন সরকারি, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান তৈরি হয়েছে যারা সাংবাদিকতা এবং পি আর পড়ায়। তাদের তত্ত্বতালাশ তোমরা গুগল করলেই পাবে।
যে কথাটা বলে শেষ করব সেটা হল সাহিত্য যেমন সাংবাদিকতার মত অপ্রিয় সত্য উদ্ঘাটন করে তেমন সাংবাদিকতাও দেখার গভীরতায় এবং ভাষার সৌন্দর্যে সাহিত্যে বা শিল্পে উত্তীর্ণ হতে পারে। যে কারণে শুরুতেই প্রশ্ন তুলেছিলাম, অলঙ্করণ করলে কি সাংবাদিকতা আর সাংবাদিকতা থাকে না? উত্তর হল আলবাত থাকে। বস্তুত, সঠিক অলঙ্করণ ছাড়া সাংবাদিকতা যে বার্তা দিতে চাইছে তা ব্যর্থ হয়ে যেতে পারে। পাঠকের কাছে আদৌ না পৌঁছতে পারে। সাংবাদিকতা সম্পর্কে আমরা এভাবে ভাবতে অভ্যস্ত নই, কারণ সাংবাদিক বলতেই আমরা রিপোর্টার বুঝি। কথাটার মানে আসলে সাংবাদিক নয়। রিপোর্টার মানে প্রতিবেদক, যিনি যা ঘটেছে তার প্রতিবেদনটা এনে দেন। সেটা অবশ্যই সাংবাদিকতা, কিন্তু ওই প্রতিবেদনকে যথাযথভাবে সাজিয়ে পাঠক বা দর্শকের সামনে হাজির করা ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ একটা কাজ। সেই কাজ যাঁরা করেন তাঁদের মধ্যে অনেকরকম লোক আছেন। এক দলের নাম সম্পাদক। কোন খবরটা নেব, কোনটা নেব না তা সম্পাদকরা ঠিক করেন। কোন খবরটাকে কীভাবে নেব তাও সম্পাদকরা ঠিক করেন। কোন খবরটা কাগজের প্রথম পাতায় যাবে, কোনটা ভিতরে যাবে; কোনটা প্রথম পাতায় ছবিসহ বড় করে যাবে, কোনটা ছোট করে এক কলমে যাবে – এই সমস্ত সিদ্ধান্ত, যা বাদ দিয়ে সাংবাদিকতা হয় না, সেগুলো সম্পাদকরা নেন। উপরন্তু সংবাদের অলঙ্করণ মানে শুধু সম্পাদনাও নয়। চিত্রসাংবাদিক বা ফটোগ্রাফারদের আমরা সাংবাদিক ভাবতে অভ্যস্ত নই, কিন্তু তাঁদের কাজ আসলে সাংবাদিকতার ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এমন সব ছবি তোলা সম্ভব যে ছবি নিজেই গোটা ঘটনাটা বলে দেবে, আলাদা করে প্রতিবেদন লেখার দরকারই হবে না। তার উপর কাগজ, টিভি, ওয়েবসাইট – সর্বত্রই আছেন গ্রাফিক ডিজাইনাররা। তাঁরা কোনো প্রতিবেদনের নির্যাস বা প্রতিবেদনের অতিরিক্ত কিছুও আকর্ষণীয় করে তুলে ধরতে পারেন। এতরকম অলঙ্করণ ঠিকঠাক হলে, তবে কাজটা সাংবাদিকতা হয়ে ওঠে। মানে প্রকৃত অলঙ্করণ ছাড়া সাংবাদিকতা হয় না।
এছাড়াও সাংবাদিকতার মধ্যেই প্রতিবেদন বা রিপোর্টের চেয়েও গভীরে গিয়ে লেখা হয় এবং সাহিত্যে উত্তীর্ণ হতে পারে এরকম এক স্বতন্ত্র ধারা আছে। তার নাম রিপোর্টাজ। বাংলা ভাষায় যাঁরা ভাল রিপোর্টাজ লিখেছেন তাঁদের একজন দীপেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়, যিনি আমাদের ভাষার একজন উল্লেখযোগ্য সাহিত্যিকও বটে। তাঁর একটা ছোট্ট রিপোর্টাজের নাম ‘মাটিতে এক ঋতু’। তার শেষদিকটা পড়ে এই বক্তৃতা শেষ করব। এখানে দীপেন্দ্রনাথ লখনৌয়ের উপকণ্ঠে একটা বস্তির কথা লিখছেন।
… পেছনে ভাঙা লোহার বেড়ার ওপর দিয়ে রেললাইন চলে গেছে কানপুরের দিকে। সামনেও কালো পিচের চওড়া রাস্তা। বাঁ দিকে পচা নালা, দক্ষিণে মজা নর্দমা। ধার ঘেঁষে মানুষ তার প্রতিদিনের কাজটুকু সেরে রেখেছে। জমাট দুর্গন্ধ। আর এরই মধ্যে ওদের সেই এক টুকরো পৃথিবী। যার ওপর দিয়ে অন্তত খ্রিস্ট জন্মের পরও এক হাজার ন’শো চুয়ান্নটি বসন্ত চলে গেছে।
মাথা হেঁট করে ফিরে আসছিলাম। কিন্তু, হঠাৎ থমকে দাঁড়াতে হল।
অবাক বিস্ময়ে দেখলাম একটা খুপরির দোরগোড়ায় আধহাতটাক জমি কুপিয়ে কে যেন দুটো ঝাউ আর কী একটা বুনো ফুলগাছের ডাল সযত্নে পুঁতে দিয়েছে। এত ছোট যে চোখে পড়ে কি পড়ে না। জমিটার চারপাশ সুন্দর করে নিকোনো। এত তুচ্ছ যে সহজেই দৃষ্টি এড়িয়ে যায়।
জিজ্ঞেস করলাম : কে পুঁতেছে রে?
আধডজন ছেলে কাছেই খেলা ছেড়ে অবাক হয়ে আমাদের দেখছিল। ছুটে গিয়ে সামনের অন্ধকার কুঠরিটা থেকে কানহাইয়ালালকে ধরে আনল। নাম জানতে চাইলাম। রুগ্ন বাছুরের মতো নির্বোধ আর অসহায় দৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে আস্তে আস্তে সে উত্তর দিল।
বললাম : এই ডাল তুমি পুঁতেছ এখানে?
অপরাধীর ভঙ্গিতে ঘাড় নাড়ল সে।
জিজ্ঞেস করলাম : কেন?
মিষ্টি সুরে দেহাতি ঢঙে সে উত্তর দিল : কাহে, গাছ হোবে।
গাছ হলে কী হবে?
আবার সে বিমূঢ় দৃষ্টিতে আমার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল। তারপর ফিক করে হেসে ফেলল হঠাৎ। হলদে রঙের ছোট্ট দাঁতগুলো বার করে কেমন এক সলজ্জ ভঙ্গিতে বলল : কাহে, ফুল হোবে।
বললাম : ফুল হোনেসে কেয়া হোগা কানহাইয়ালাল?
কিছু না ভেবেই ঝটপট উত্তর দিল সে : কাহে, সুন্দর হোবে।
আর প্রশ্ন করতে পারলাম না। দেখলাম ওখানকার শ্রমিকনেতা, আমাদের সঙ্গী সরফজি এক দৃষ্টিতে ছেলেটির দিকে তাকিয়ে আছেন। তাঁরও চোখে শিল্পীর দৃষ্টি। তাঁর ঠোঁটেও কী এক সার্থকতার হাসি।
তারপর কলকাতায় ফিরে এসেছি।
এখানে দৈনিক স্টেটসম্যান পড়ি, সাপ্তাহিক ‘দেশ’-এর পাতা ওলটাই। অ্যালবার্ট হলে বসে বিবর্ণ কফির স্বাদে মশগুল থেকে বন্ধু আর পরিচিতের সঙ্গে রাজনীতি নিয়ে, সাহিত্য নিয়ে তর্ক করি। আবার, ইতিহাসের নতুন মূল্যবোধকে যাচাই করার জন্য ডাক এলে ছুটে যাই ময়দানের সভায়। জীবন এখানে দ্রুত, বৈচিত্র্য আর পরস্পর-বিরোধিতার আবর্তে প্রাণ এখানে অবিরাম দোলায় দুলছে।
কিন্তু এরই মধ্যে থেকে থেকে মনে পড়ে যায় সেই দিনটা। মন্ত্রের মতো কতকগুলো কথা আর স্বপ্নের মতো গোটা দুই মুখ।
এ দেশের শাসকরা তালিবান নন। কারণ তাঁরা অনেকেই গড়গড়িয়ে ইংরেজি বলতে পারেন। উচ্চশিক্ষিত বলেই পাঠ্যের দিকে সজাগ দৃষ্টি।
খুব আতঙ্কে কাটছে আমাদের। পাশেই আফগানিস্তানে তালিবান ক্ষমতায় ফিরে এসেছে। ভীষণদর্শন বন্দুকধারীদের ছবি, মানুষের প্রাণপণ পালানোর ছবি আমরা টিভি, খবরের কাগজ অথবা সোশাল মিডিয়ার কল্যাণে দেখছি। আফগান মানেই বর্বর, অথবা মুসলমানরা ওরকমই হয় — এরকম ভাবনার লোকেরা একরকম শান্তি পাচ্ছেন। কিন্তু রবীন্দ্রনাথের ‘কাবুলিওয়ালা’ মনে পড়লে অশান্তি দ্বিগুণ। আফগানিস্তানের মানুষ, বিশেষ করে মহিলাদের কথা ভেবে ঘুম উড়েছে। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ কেবল ‘কাবুলিওয়ালা’ লেখেননি। লিখেছিলেন “বহু দিন ধরে বহু ক্রোশ দূরে/ বহু ব্যয় করি বহু দেশ ঘুরে/ দেখিতে গিয়েছি পর্বতমালা/ দেখিতে গিয়েছি সিন্ধু।/ দেখা হয়নি চক্ষু মেলিয়া/ ঘর হতে শুধু দুই পা ফেলিয়া/ একটি ধানের শিষের উপরে/ একটি শিশির বিন্দু।” এই লাইনগুলো স্মরণ থাকলে আতঙ্কিত হওয়ার জন্য আফগানিস্তান দেখার প্রয়োজন নেই। তালিবান যা যা করে থাকে তার প্রায় কোনোটাই এ দেশে ঘটতে বাকি নেই।
তারা যখন নব্বইয়ের দশকে প্রথম ক্ষমতায় আসে, তখন থেকেই এ কথা বলে অনেকে প্রবল নিন্দার মুখে পড়েছেন। বামিয়ানের বুদ্ধ মূর্তি ভেঙে ফেলা গর্হিত কাজ, কিন্তু বাবরি মসজিদ ভেঙে ফেলা ঐতিহাসিক অন্যায়ের প্রতিকার — এমন ব্যাখ্যাই চিৎকৃত প্রতিষ্ঠা পেয়েছে। কারণ তালিবান কাজটা করেছিল ক্ষমতায় এসে, বাবরি ভেঙেছিল ‘স্বতঃস্ফূর্ত জনতা’। এখন সেই স্বতঃস্ফূর্ত জনতাই দেশের ভাগ্যনিয়ন্তা। নেশন কী চায় তারাই জানে। সেই চাহিদা অনুযায়ী এডিট করা ভিডিও ক্লিপ জুগিয়ে দেয় ক্ষমতাসীন দলের আই টি সেল, পুলিস তার ভিত্তিতেই সত্য মিথ্যা যাচাই না করে মানুষকে হাজতে পুরে দেয়, সে পচতে থাকে ইউএপিএ আইনে। শরিয়তি আইনের অবিচার এর চেয়ে আর কত বেশি?
তবু এ দেশের শাসকরা তালিবান নন। কারণ তাঁরা অনেকেই গড়গড়িয়ে ইংরেজি বলতে পারেন। উচ্চশিক্ষিত বলেই পাঠ্যের দিকে সজাগ দৃষ্টি। তাই রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস নিয়ে মহাশ্বেতা দেবীর গল্প বাতিল করেন, দলিত লেখক বামা এবং সুখরথারিনিও বাতিল হন। এঁরা গান নিষিদ্ধ করে লোকসঙ্গীত গায়ককে হত্যা করেন না, অপছন্দের লেখা সরিয়ে দেন। সে কালের জার্মানির মত বই পোড়ানোও শুরু হয়ে গেছে। আমেদাবাদের বইয়ের দোকানে ঢুকে বাৎস্যায়নের ‘কামসূত্র’ পুড়িয়ে হুমকি দেওয়া হয়েছে, আবার এসব বই পাওয়া গেলে দোকানই জ্বালিয়ে দেওয়া হবে। আফগানিস্তানে তালিবরা যেটাকে ইসলাম বলে সেটাই ইসলাম। ভারতেও এখন সঙ্ঘ যাকে হিন্দুধর্ম বলে সেটাই হিন্দুধর্ম। তাই বাৎস্যায়নও হিন্দু সংস্কৃতি বিরুদ্ধ।
তালিবান নেতারা সগর্বে বলে, মেয়েদের কাজকর্ম, লেখাপড়া করতে হলে ইসলামের নির্দেশ মেনে বোরখা পরে বাইরে বেরোতে হবে। ইসলামে ঠিক কী বলা আছে তা তর্কসাপেক্ষ, কিন্তু তালিবানি শাসনে তাদের মুখের কথাই আইন। এ দেশে এখনো ১৯৫০ সালের সংবিধান চালু আছে বটে, কিন্তু মহিলাদের জীবনসঙ্গী নির্বাচন, জামাকাপড়ের মাপ, মোবাইল ফোন ব্যবহার, এমনকি চাউমিন খাওয়ার অভ্যাসেও যে সংস্কৃতির বারোটা বাজছে — তা বহুবার পরিষ্কার করে দিয়েছে সঙ্ঘ পরিবার। স্বয়ং মোহন ভাগবত প্রকাশ্যেই বলে থাকেন, মেয়েদের কাজ ঘর সামলানো। উত্তরপ্রদেশের দাসনার মন্দিরের মহন্ত যতি নরসিংহানন্দের ছাপার অযোগ্য ভাইরাল বিষোদ্গারে মহিলাদের সম্পর্কে ভাবনায় তালিবান-সঙ্ঘ ঐকমত্য পরিষ্কার। এখন বিজেপি এই ঘোর মুসলমান বিদ্বেষী লোকটিকে জিহাদি আখ্যা দিচ্ছে, কিন্তু তিনি দীর্ঘদিন ধরে কপিল মিশ্রর মত গুরুত্বপূর্ণ নেতার ঘনিষ্ঠ।
আর হত্যা? গোবিন্দ পানসারে, নরেন্দ্র দাভোলকর, গৌরী লঙ্কেশদের কথা আমাদের মনে নেই। আরও অদরকারি আখলাক আহমেদ, পেহলু খানের মত অসংখ্য গণপিটুনির শিকারদের স্মৃতি। কারণ তাঁরা গরুর অবমাননার অভিযোগে অভিযুক্ত। গত পরশু এলাহাবাদ হাইকোর্টের এক বিচারপতি তো বলেই দিয়েছেন, গরুকে জাতীয় পশু ঘোষণা করে তার মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করার জন্য আইন দরকার। গরুর কল্যাণ হলেই দেশের কল্যাণ হবে।
আশা করা যায় তালিবান সরকার শুয়োরের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করার আগেই ভারত সরকার বিচারপতির স্বপ্ন সত্যি করবেন।