ছোটবেলা থেকে ‘কমরেড’, ‘বিপ্লব’, ‘ক্যাপিটালিজম’ ইত্যাদি শব্দগুলোর সঙ্গে ওঠাবসা করলে (কেবল ওঠাবসাই করলে) যা হয়, তা হল মাঝবয়সে এসেও শব্দগুলো শুনলেই চোখদুটো নিভু নিভু হয়ে আসে, মাথাটা একদিকে হেলে পড়ে, গালটাকে আশ্রয় দেওয়ার জন্যে হাতটা উঠে আসে সুকান্ত ভট্টাচার্যের ছবিটার মত। জয়রাজ ভট্টাচার্য নির্দেশিত ঘ্যাচাং ফু ছবিটা দেখতে শুরু করার কয়েক মিনিটের মধ্যে অন্য গালে এমন একটা চড় পড়ল যে পিঠ সোজা করে উঠে বসতে হল। ছোটবেলায় ভোর ভোর ঘুম থেকে উঠে পড়তে বসে ঝিমোলে আমার কমিউনিস্ট পার্টি করা বাবা এরকম চড় কষাতেন। জয়রাজ দেখলাম জানেন, যে এক চড়ে ঝিমুনি উধাও হয়ে যায় না। খানিক পরেই আবার ফিরে আসে। তখন কানমলা দিতে হয়। গোটা ছবি জুড়ে সে কাজটাই করে গেছেন ক্রমাগত। ফলে ঘ্যাচাং ফু দেখা মোটেই সুখকর অভিজ্ঞতা নয়, বরং বেজায় অস্বস্তিকর।
এদেশে কোনোদিন বিপ্লব হয়নি। তা বলে মুখেন মারিতং জগৎ মার্কসবাদী দেখার সুযোগ আমরা পাইনি এমন নয়। বরং মার্কসবাদীদের রাজনৈতিক কার্যকলাপ যত কমেছে, জনবিচ্ছিন্নতা যত বেড়েছে, ততই এই ছবির সুরজিৎ সেনের মত ধপধপে সাদা ধুতি পাঞ্জাবি পরা তত্ত্ব কপচানো মার্কসবাদীতে ভরে গেছে আমাদের চারপাশ। এই ছবির সবকটি চরিত্র রীতিমত বইপড়া মার্কসবাদী, বিপ্লবে নিবেদিতপ্রাণ পার্টিকর্মী। কিন্তু কেউ শ্রমজীবী নয়, সকলেই উচ্চশ্রেণিভুক্ত। দামি মদ, দামি খাবার, রবীন্দ্রসঙ্গীত (পিচ কারেক্টর সমেত) ছাড়া এদের চলে না। কিন্তু ও গান তাদের মরমে প্রবেশ করে না। রবীন্দ্রসঙ্গীতটির ইতিহাস জানা থাকলেও তারা বুঝতে পারে না কেন ওই গান ওখানে গাওয়া হল। দেখে মনে পড়ে যায় উৎপল দত্তের প্রতিবিপ্লব বইয়ে উল্লিখিত সোভিয়েত ইউনিয়নের কমিউনিস্ট পার্টির উনবিংশ পার্টি কংগ্রেসের কথা
… পার্টির ম্যাণ্ডেট কমিশন গর্ব ক’রে রিপোর্ট দিচ্ছেন:
প্রতিনিধি সংখ্যা: ১১৯২। এদের মধ্যে
৭০৯ জন বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্র্যাজুয়েট।
৮৪ জন বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষাপ্রাপ্ত।
২২৩ জন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষাপ্রাপ্ত।
১৭৬ জন আংশিক স্কুলে শিক্ষিত।
২৮২ জন ইঞ্জিনিয়ার।
৬৮ জন কৃষি বিশেষজ্ঞ।
৯৮ জন অধ্যাপক।
১৮ জন অর্থনীতিবিদ।
১১ জন ডাক্তার।
৭ জন উকীল।
শ্রমিকশ্রেণীর পার্টি-কংগ্রেসে শ্রমিক ক’জন ছিলেন তার উল্লেখ করারও প্রয়োজন দেখেন নি সংশোধনবাদী নেতারা। দেখা যাচ্ছে কংগ্রেসের শতকরা ৬০ জন প্রতিনিধি এসেছেন নূতন শিক্ষিত সুবিধাভোগী শ্রেণী থেকে।
ঔতরখানভ লিখেছেন:
“এই সূত্র-অনুসারে যে কমিউনিস্ট পার্টি এককালে শ্রমিকের পার্টি বলে গর্ব করত, তা আজ ইঞ্জিনিয়ার, অধ্যাপক ও আমলাদের পার্টি হয়ে গেছে, নানা পেশায় নিযুক্ত কর্মচারীদের পার্টি হয়ে গেছে।”
এই ছবির চরিত্রেরা বাবাকে ডাকে ‘কমরেড বাবা’, স্বামী ‘ডার্লিং’ বা ‘সুইটহার্ট’ বলে ডাকলে শুনতে পায় না, শুনতে পায় ‘কমরেড’ বলে ডাকলে। তবে পেটে দু পাত্তর পড়লেই বেরিয়ে আসে আসল কথা – আমাদের কথায় সাধারণ লোকে বিশ্বাস করল কি না করল, কিছু আসে যায় না। কারণ আমরা নিজেরাই নিজেদের কথাগুলো বিশ্বাস করি না।
আদ্যন্ত নীতিহীনতা বোঝাতে সাধারণত সিনেমায় দেখানো হয় আর্থিক দুর্নীতিকে। আমার কাছে এই ছবির শ্রেষ্ঠ দিক হল নীতিহীনতা, ভণ্ডামিকে ল্যাংটো করতে আগাগোড়া যৌনতার ব্যবহার। ছবির শুরুতেই, চরিত্রগুলো কারা, কী বৃত্তান্ত তা বুঝতে পারারও আগে দেখা যায় লিফটে চোরাগোপ্তা এর হাত ওর কোমরে, কার আঙুল যেন কার প্যান্টের চেন খুলছে। পরে লম্বা টেবিলের এক প্রান্তে যখন বাকুনিন বনাম এঙ্গেলস বনাম লেনিন বনাম অমুক বনাম তমুক চলছে, তখন অন্য প্রান্তে এক কমরেড আরেক কমরেডের পাছা দেখতে ব্যস্ত থাকেন। বিপ্লবোত্তর সমাজে যৌনতার ভূমিকা কী হবে সে আলোচনাই করতে দিতে চান না যে কমরেড (সুদীপা বসু), তিনি যত্রতত্র হস্তমৈথুনে লিপ্ত হন। প্রত্যেকটা চরিত্রই অতৃপ্ত যৌনক্ষুধায় ভুগছে। তাদের যৌন অবদমনেরই প্রকাশ অন্যের উপর আধিপত্য বিস্তার করতে চাওয়ায়। কেউ কেউ যৌন তৃপ্তির রাস্তা খুঁজে নেয় – খোলা ছাদে অর্জিতে অথবা নির্জন ডাইনিং রুমে পায়ুমৈথুনে। যারা পায় না, তারা কিউয়ের মত প্রবল বিক্রমে ঘড়িগুলোকে হাতুড়ি পেটা করতে থাকে। সত্যিই তো আমাদের বহু হিংসার পিছনেই অবদমিত কাম। নইলে যে মন্ত্রীর ফ্ল্যাট থেকে নগদ ৫০ কোটি টাকা বেরোয়, তার ক্ষমতার অপব্যবহারের থেকেও ক্রমশ কেন আমাদের আলোচনার কেন্দ্রে চলে আসে অল্পবয়সী সুন্দরীর সঙ্গে তার সম্পর্ক? যে যুগে কমিউনিস্টরাও দুর্নীতি বলতে শুধু ঘুষ খাওয়া বোঝেন আর ২২ লাখ টাকার গাড়ি কেনা বৈধ বলে গলা ফাটান, যেহেতু সেটা কালো টাকায় কেনা হয়নি – সে যুগে পর্দায় যৌনতা নিংড়ে নীতিহীনতা দেখানো ঘ্যাচাং ফু পরিচালকের সবচেয়ে প্রশংসনীয় কাজ। এমনটা না করে যদি পরিচালক সরাসরি নিজের সময়টা দেখাতেন, সেই সময়ের কোনো কমিউনিস্ট কবিকে দেখাতেন, যিনি এক হাতে দক্ষিণপন্থী সরকারের বিরুদ্ধে কবিতা লেখেন আর অন্য হাতে সেই সরকারের অনুষ্ঠানে যাওয়ার আমন্ত্রণপত্রটা ফেসবুকে পোস্ট করেন – তাহলে কোনো অভিঘাতই তৈরি হত না। কারণ অমন আমরা রোজ দেখছি।
এ পর্যন্ত পড়ে অনেকেই রে রে করে তেড়ে আসবেন, বলবেন আলোচক নেহাত বদমাইশ। নিজের গায়ের ঝাল মেটাতে একটা শিল্পকর্মকে ব্যবহার করছে। পার্থ চ্যাটার্জির ফ্ল্যাট থেকে টাকা উদ্ধার হওয়া এবং শতরূপ ঘোষের গাড়ি বিতর্কের বহু আগেই ঘ্যাচাং ফু নির্মিত। তাহলে এটা সে যুগের ছবি কী করে হয়? কথা হল, যুগ মানে স্রেফ কয়েকটা বছর নয়। ছবিটা যদি নির্মাণের সময়কালটুকুর বাইরে কোনোকিছু সম্পর্কে কোনো সন্দর্ভ হয়ে উঠতে না পারত, তাহলে নির্মাণের এত বছর পরে তা নিয়ে আলোচনাই করতাম না। প্রগতির মুখোশ পরে থাকা প্রতিক্রিয়াশীলরা কোনো দেশে কোনো যুগেই ঘোষিত প্রতিক্রিয়াশীলদের চেয়ে কিছু কম বিপজ্জনক নয়। এক কাল্পনিক সময়ের বয়ানে নিজের সময়ের সেই প্রতিক্রিয়াশীলদের উলঙ্গ করতে পেরেছে বলেই ঘ্যাচাং ফু গুরুত্বপূর্ণ। এ ছবি যদি অন্য কোনো দেশে বানানো হত, তাহলে হয়ত যৌনতাকে ভণ্ডামির মাধ্যম হিসাবে ব্যবহার করা আলাদা করে প্রশংসনীয় হত না। কিন্তু দেশটা ভারতবর্ষ বলেই এ কাজ অত্যন্ত জরুরি। এ দেশেই তো কমিউনিস্টদের যৌনতা, মদ্যপান ইত্যাদি ব্যাপারে চিন্তাভাবনা দক্ষিণপন্থীদের সবচেয়ে কাছাকাছি। এই শতকের শুরুতেও এ দেশের বড় অংশের কমিউনিস্ট সমকামিতাকে মনে করতেন পুঁজিবাদী বিকৃতি। এখনো এমন মার্কসবাদী দল আছে যারা ওই ধারণাতেই অনড়। একগামিতার সূক্ষ্মতর প্রশ্ন (যা এ ছবিতে বেণীর চরিত্র তুলেছে) না হয় বাদই দেওয়া গেল।
এই ডিসটোপিয়া ঘনীভূত হয়েছে পরিচালকের ঠাট্টার গুণে। মাঝেমাঝেই তিনি এবং ক্যামেরার পিছনের অন্য কুশীলবরা কণ্ঠস্বর হয়ে ঢুকে পড়েছেন ছবিতে, মরা মানুষকে জ্যান্ত করে তোলার মত কাণ্ডও ঘটিয়েছেন। সে ঘটনার ব্যাখ্যা বস্তুবাদী হল কি হল না, তা নিয়ে জবরদস্ত রসিকতাও করা হয়েছে। শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে যে যা ঘটছে তা আসলে স্রেফ খেলা, ভিডিও গেমের মতই। ফলে শেষদিকে যখন মত্ত অবস্থায় এক বিশেষ যৌন আকাঙ্ক্ষা পূরণ হয়নি বলে কেঁদে ভাসায় একটা চরিত্র আর তার বউয়ের চরিত্রে কমলিকা শতকরা দুশো ভাগ আবেগ ঢেলে বলে ফেলেন ছবির সবচেয়ে রসিক সংলাপ, তখন টেবিলে বসা অনির্বাণ আর অরিত্রীর মত আমিও খ্যাকখ্যাক করে হেসেই ফেললাম।
আকাশে থুতু ছেটালে সে থুতু নিজের গায়েই পড়ে। এ হাসিও কি নিজের দিকেই ফিরে এল? কেন বাপু? আমি তো কমিউনিস্ট নই, পার্টিও করি না। আমি বড়জোর বিশ্বাসঘাতক। অতএব কমিউনিস্ট সাজা বুর্জোয়াদের নিয়ে কেউ হাসাহাসি করলে আমার কী এসে যায়? এসে যাওয়া উচিত নয়, কিন্তু ওই যে গোড়াতেই বললাম – কেন জানি না আগাগোড়া মনে হয় পরিচালক ধরে ধরে তাঁর উদ্দিষ্ট দর্শককে চড়াচ্ছেন, কান মুলে দিচ্ছেন। এক নাগাড়ে মারতে থাকলে খানিক পরে ব্যাপারটা সয়ে যায়, ততটা ব্যথা লাগে না। কিন্তু মারের তীব্রতা বজায় রাখতে পরিচালক কিছুটা নিষ্পাপ সারল্য মিশিয়ে দিয়েছেন। যেমন সেই বাচ্চা মেয়েটা, যে বড়দের তাত্ত্বিক ভাঁড়ামি ছেড়ে উঠে গিয়ে একা ঘুরতে ঘুরতে পেয়ে যায় ধুলো জমে যাওয়া লেনিনকে, যে ফাঁস করে দেয় নীতিবাগীশ মায়ের কামুকতার কাহিনি।
এবং অনির্বাণ, অরিত্রী। একমাত্র তাদের স্মৃতিতেই ক্যামেরা বদ্ধ ইনডোর ছেড়ে বেরিয়ে যায় ফাঁকা মাঠের নরম সকালে, পেলব আবহসঙ্গীতে। তারাই কেবল মার্কস, এঙ্গেলস হ্যানো ত্যানো কপচায় না। শুধু তাদের চোখেই আসে জল, তাদেরই রক্তপাত হয়। কিন্তু ওই পেলবতায় শেষ করা হয়নি ছবিটা। শেষের জন্যেই সবচেয়ে বড় আঘাতটা তুলে রেখেছিলেন জয়রাজ। একেবারে ঘ্যাচাং ফু।
ছবিটা কি নিখুঁত? অত বোঝার বিদ্যে আমার নেই বাপু। তবে ফ্রিজে কাটা হাতখানা না রাখলে কি কোনো তফাত হত?
বিঃ দ্রঃ ঘ্যাচাং ফু কোথায় দেখা যাবে? এ প্রশ্ন আমাকে করবেন না। অনেকেই বেছে বেছে যৌনদৃশ্যগুলো দেখেছেন। কেবল যৌনদৃশ্য দেখতে হলে ইন্টারনেটে ক্লিপ খুঁজে নেওয়াই ভাল। পুরো ছবি দেখতে চাইলে অনুসন্ধান করুন। ও দায়িত্ব নিচ্ছি না।
