ফেসবুককে আন্দোলনের হাতিয়ার বলে বহু মানুষ চিনেছিলেন কায়রোর তাহরীর স্কোয়ার থেকে আরম্ভ হওয়া মিশরের আন্দোলন থেকে। তাহরীর স্কোয়ারের আন্দোলনের পর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অক্যুপাই ওয়াল স্ট্রিট – দুটো আন্দোলনেই ফেসবুকের সাহায্য নিয়েছিলেন আন্দোলনকারীরা। দুটোই ২০১১ সালের ব্যাপার। তারপর এক যুগ কেটে গেছে, হোয়াটস্যাপ আর ইনস্টাগ্রামও ফেসবুকের করতলগত হয়েছে। মানে ফেসবুক মোটা হয়েছে আর নাম বদলে মেটা হয়েছে। ব্লুমবার্গ বিলিয়নেয়ার্স ইনডেক্স বলছে মেটার মালিক মার্ক জুকেরবার্গ অ্যামাজনের মালিক জেফ বেজোসকে পিছনে ফেলে বিশ্বের দ্বিতীয় ধনীতম ব্যক্তি হয়ে উঠেছেন। কিন্তু ফেসবুক আন্দোলনের হাতিয়ার – এমন কথা আজ বললে ঘোড়ায় হাসবে।
গুগল আর ফেসবুক – এই দুই প্রযুক্তি দানব নিজ নিজ ক্ষেত্রে একচেটিয়া ব্যবসা করে। দুই পক্ষের বিরুদ্ধেই প্রাইভেসি লঙ্ঘন করা, মানুষের হাতের ফোন থেকে তারই অজান্তে ব্যক্তিগত তথ্য হাতিয়ে নেওয়ার সুনির্দিষ্ট অভিযোগ আছে। গুগল সিইও সুন্দর পিচাই আর জুকেরবার্গ – দুজনকেই আমেরিকা ও ইউরোপে আইনপ্রণেতাদের জিজ্ঞাসাবাদের মুখোমুখি হতে হয়েছে। দুজনের কেউই অভিযোগগুলোকে সম্পূর্ণ অপ্রমাণ করতে পারেননি। আপনাকে জানতে হবে অমুকটা অফ করে রাখা যায়, তমুকটা অফ করে রাখতে হয় – এই সব বলে আত্মরক্ষা করেছেন। তবে ফেসবুকের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রাইভেসি লঙ্ঘনেই সীমাবদ্ধ নয়।
যেমন ২০২১ সালের মে মাসে ফেসবুকের প্রোডাক্ট ম্যানেজার ফ্রান্সেস হগেন পদত্যাগ করেন এবং পাতার পর পাতা আভ্যন্তরীণ নথি ফাঁস করে দেন। তা থেকে দেখা যায় যে ফেসবুক জেনেশুনে কিশোর-কিশোরীদের মানসিক স্বাস্থ্যের ক্ষতি হয় এমন পোস্ট চলতে দিয়েছে, ইথিওপিয়ার মত দেশে জাতিদাঙ্গায় উস্কানি দেওয়া আটকায়নি। সেবছর ৬ জানুয়ারি ক্যাপিটল হিলে যে দাঙ্গা করে মার্কিনী দক্ষিণপন্থীরা, তার আগে ভুয়ো তথ্য ছড়ানো আটকাতেও কোনো ব্যবস্থা নেয়নি ফেসবুক। হগেন বলেছিলেন যে ফেসবুকে চাকরি করার সময়ে তিনি দেখতে পান, বিশেষত আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্যে ফেসবুক মানুষ পাচারকারী এবং সশস্ত্র বাহিনীগুলোর অস্ত্র। ফেসবুক তা নিয়ে ভাবিতই নয়, কারণ তাদের লক্ষ্য কেবল মুনাফা করা। মানুষের যা ক্ষতি হয় হোক।
এমন অভিযোগ একা হগেনই করেননি, সারা বিশ্বে ফেসবুকের কার্যকলাপ নিয়ে বিস্তর গবেষণা হয়েছে। ভারতেও পরঞ্জয় গুহঠাকুরতা, সিরিল স্যামরা লেখালিখি করেছেন। ওঁদের লেখার অনুবাদ বাংলা ভাষায় সাংবাদিক অর্ক দেবের সম্পাদনায় ‘ফেসবুক: মুখ ও মুখোশ’ নামে বইতে প্রকাশিতও হয়েছে। বিজেপি, তৃণমূল সমেত ভারতের রাজনৈতিক দলগুলো কীভাবে নির্বাচনের সময়ে ফেসবুকে বিজ্ঞাপন দিতে বিপুল টাকা খরচ করে তাও প্রকাশিত তথ্য। তা বাদে বেনামি প্রোফাইল খুলে অন্য দলের নেতা-সদস্য-সমর্থকদের হয়রানি, হুমকি; ইদানীং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে তাদের নামে প্রোফাইল বানিয়ে পোস্ট করা – এসব তো আছেই। ফেসবুক গোড়ার দিকে বাকস্বাধীনতার যুক্তি দিয়ে পার পেয়ে যাওয়ার চেষ্টা করত। হগেনের মত হুইসল ব্লোয়ার এবং বিশ্বব্যাপী বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম ও সাধারণ মানুষের চাপে সাম্প্রতিককালে আরেক জনপ্রিয় সোশাল মিডিয়া টুইটারের (অধুনা এক্স) মতই কোনো পোস্টে হিংসা সম্পর্কে সতর্কবাণী দেওয়া, কোনো পোস্টে ভুয়ো হতে পারে বলে নোট দেওয়া – এসব চালু করেছে। কিন্তু অনেকসময় দেখা যায় অ্যালগোরিদম এমনভাবে সাজানো যে প্রতিবাদকে বিপজ্জনক বলে দাগানো হয় বা মুছে দেওয়া হয়, অন্যায়কে তোল্লাই দেওয়া হয়।
ফেসবুক এভাবেই চলে, এভাবেই চলবে। কারণ এটা বিলিয়ন ডলারের ব্যবসা, আর ব্যবসায়ী কখনো বিপ্লবী হয় না। সে সর্বত্রই সংখ্যাগুরুর, ক্ষমতাসীনের পক্ষে। নরেন্দ্র মোদী কী পরম স্নেহে জুকেরবার্গকে ‘মার্ক’ বলে ডাকেন তা কি আমরা দেখিনি? নাকি ভারতে ফেসবুক যাঁরা চালান তাঁদের সঙ্গে বিজেপির সখ্যের কাহিনি আমাদের চোখে পড়েনি? ভারতের একাধিক সংবাদমাধ্যম তো বটেই, বিশ্ববিখ্যাত ‘টাইম’ ম্যাগাজিন পর্যন্ত ভারতে ফেসবুক কীভাবে হিন্দুত্ববাদী ঘৃণা ভাষণকে প্রশ্রয় দেয় তা নিয়ে ২০২০ সালে দীর্ঘ প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিল। তথ্যের খাতিরে বলা প্রয়োজন – এই সমস্ত অভিযোগই টুইটারের বিরুদ্ধেও আছে এবং ডোনাল্ড ট্রাম্পের স্যাঙাত ইলন মাস্ক মালিক হওয়ার পর অভিযোগের সংখ্যা আরও বেড়েছে।
আরও পড়ুন হিন্দিভাষী ইউটিউবার যা করলেন, বাঙালিরা যা করলেন না
এত কিছু সত্ত্বেও বাঙালির ফেসবুকের প্রতি অচলা ভক্তি যায়নি। বাঙালি মাত্রেই কবি এবং কবি মাত্রেই ফেসবুকে লেখেন। নামকরা কবিরা আবার ট্রেন্ডিং বিষয় নিয়ে ফেসবুকে কবিতা লেখেন। আজ অমুকের জন্মদিন, কাল তমুকের মৃত্যুদিন, পরশু অমুক নারকীয় ঘটনা ঘটেছে, তরশু অমুক অলিম্পিকে পদক জিতেছে – বাঙালির প্রিয় কবি সঙ্গে সঙ্গে লেখেন। সম্প্রতি আবার কপিল শর্মার কমেডি শোতে রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে হাসাহাসি করা হয়েছে বলে আহত হয়ে পোস্ট দিয়েছেন, আইনি ব্যবস্থার নেওয়ার হুমকিও দিয়েছেন। মাঝেমাঝে ভয় হয়, ফেসবুক না থাকলে বাঙালির কবিতা লেখাই বোধহয় বন্ধ হয়ে যাবে।
শুধু সাহিত্যচর্চা করলেও কথা ছিল, বাঙালি এখনো আন্দোলনের ডাক দেয় ফেসবুকে। মানুষ তাতে সাড়া দেন এবং দলীয়, অদলীয় সব ধরনের আন্দোলনকারীরই ধারণা হয়েছে যে ফেসবুকে ডাক না দিলে সাড়া পাওয়া যাবে না। তাই রাত দখল, ভোর দখল, দুপুর দখল, রাস্তা দখল – সব ডাকই ফেসবুকেই দেওয়া হয়। এর দাপটে ভোটের সময়ে বাড়ি বাড়ি গিয়ে প্রচার করাও পশ্চিমবঙ্গের বিরোধীরা কমিয়ে ফেলেছেন। বাড়ির সামনের রাস্তা দিয়ে প্রার্থী যাবেন, ফেসবুক লাইভ হবে, তাতে কয়েক লক্ষ লাইক পড়বে। সেই লাইক গুনে বিরোধীরা ভাববেন অমুক কেন্দ্রে আমরা জিতছিই, তমুক কেন্দ্রে দারুণ লড়ব, তারপর ফল বেরোলে দেখা যাবে ভাঁড়ে মা ভবানী, কারণ আপামর মানুষের সঙ্গে কোনো যোগ স্থাপনই হয়নি – এটাই পশ্চিমবঙ্গের নিয়ম হয়ে গেছে। ফলে রাজ্যটা প্রায় একদলীয় শাসনে পরিণত হয়েছে। অদলীয় এবং দলীয় রাজনীতিবিদরা খেয়াল করেন না যে সারা পৃথিবীতে ফেসবুক (ব্যাপকার্থে সোশাল মিডিয়া) এই কাণ্ডটাই ঘটিয়েছে। ফলে দক্ষিণপন্থী রাজনীতিকে অপরাজেয় মনে হচ্ছে। ট্রাম্প, বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু, মোদী, মমতা – সকলেই যে এই ফেসবুক সর্বস্বতায় লাভবান হচ্ছেন তা কিন্তু অন্যত্র অনেকে বুঝে ফেলেছেন। ফলে ২০২১ সালে হগেন মুখ খোলার পর বিশ্বজুড়ে ফেসবুক ছেড়েছেন অনেক মানুষ। ‘দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট’ আস্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিল ফেসবুক ছাড়লে আর কী কী সোশাল মিডিয়া বিকল্প আছে তা নিয়ে। অনেকেই ফেসবুক, টুইটার ছেড়ে বা এগুলোতে সময় খরচ কমিয়ে ফেডিভার্সে চলে গেছেন। সেটা কী? নিজে খুঁজে দেখুন।
ফেসবুক বিশ্বজোড়া এমন ফাঁদ পেতেছে যে বেরনো শক্ত। নিজেদের ওয়েবসাইট চালাতে গিয়ে দেখেছি, ফেডিভার্সে আমাদের লেখা শেয়ার করে লাভ হয় না। কারণ বাঙালি পাঠক কিছুতেই সেখানে যেতে চান না। মেসেজিংয়ের বেলাতেও একই সমস্যা। বাঙালি, অবাঙালি কোনো পরিচিতকেই টেলিগ্রাম বা সিগনাল ব্যবহার করতে উৎসাহিত করা যায় না। আজকাল তো ভারতের আদালতে বিচারকরাও পুলিসকে হোয়াটস্যাপ গ্রুপ তৈরি করার পরামর্শ দেন। আমরা বাঙালিরা আরও অসহায়। ফেসবুকে না থাকলে কাঞ্চন মল্লিকের বাবা হওয়া বা ইন্দ্রাণী হালদারের মোটা হওয়া নিয়ে আলোচনা করা হবে না। চণ্ডীমণ্ডপ নেই বলে পরনিন্দা পরচর্চা করব না?
উত্তরবঙ্গ সংবাদে প্রকাশিত
