বাঙালির ফেসবুক: চণ্ডীমণ্ডপ নেই বলে পরনিন্দা পরচর্চা করব না?

আজকাল তো ভারতের আদালতে বিচারকরাও পুলিসকে হোয়াটস্যাপ গ্রুপ তৈরি করার পরামর্শ দেন। আমরা বাঙালিরা আরও অসহায়। ফেসবুকে না থাকলে কাঞ্চন মল্লিকের বাবা হওয়া বা ইন্দ্রাণী হালদারের মোটা হওয়া নিয়ে আলোচনা করা হবে না।

ফেসবুককে আন্দোলনের হাতিয়ার বলে বহু মানুষ চিনেছিলেন কায়রোর তাহরীর স্কোয়ার থেকে আরম্ভ হওয়া মিশরের আন্দোলন থেকে। তাহরীর স্কোয়ারের আন্দোলনের পর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অক্যুপাই ওয়াল স্ট্রিট – দুটো আন্দোলনেই ফেসবুকের সাহায্য নিয়েছিলেন আন্দোলনকারীরা। দুটোই ২০১১ সালের ব্যাপার। তারপর এক যুগ কেটে গেছে, হোয়াটস্যাপ আর ইনস্টাগ্রামও ফেসবুকের করতলগত হয়েছে। মানে ফেসবুক মোটা হয়েছে আর নাম বদলে মেটা হয়েছে। ব্লুমবার্গ বিলিয়নেয়ার্স ইনডেক্স বলছে মেটার মালিক মার্ক জুকেরবার্গ অ্যামাজনের মালিক জেফ বেজোসকে পিছনে ফেলে বিশ্বের দ্বিতীয় ধনীতম ব্যক্তি হয়ে উঠেছেন। কিন্তু ফেসবুক আন্দোলনের হাতিয়ার – এমন কথা আজ বললে ঘোড়ায় হাসবে।

গুগল আর ফেসবুক – এই দুই প্রযুক্তি দানব নিজ নিজ ক্ষেত্রে একচেটিয়া ব্যবসা করে। দুই পক্ষের বিরুদ্ধেই প্রাইভেসি লঙ্ঘন করা, মানুষের হাতের ফোন থেকে তারই অজান্তে ব্যক্তিগত তথ্য হাতিয়ে নেওয়ার সুনির্দিষ্ট অভিযোগ আছে। গুগল সিইও সুন্দর পিচাই আর জুকেরবার্গ – দুজনকেই আমেরিকা ও ইউরোপে আইনপ্রণেতাদের জিজ্ঞাসাবাদের মুখোমুখি হতে হয়েছে। দুজনের কেউই অভিযোগগুলোকে সম্পূর্ণ অপ্রমাণ করতে পারেননি। আপনাকে জানতে হবে অমুকটা অফ করে রাখা যায়, তমুকটা অফ করে রাখতে হয় – এই সব বলে আত্মরক্ষা করেছেন। তবে ফেসবুকের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রাইভেসি লঙ্ঘনেই সীমাবদ্ধ নয়।

যেমন ২০২১ সালের মে মাসে ফেসবুকের প্রোডাক্ট ম্যানেজার ফ্রান্সেস হগেন পদত্যাগ করেন এবং পাতার পর পাতা আভ্যন্তরীণ নথি ফাঁস করে দেন। তা থেকে দেখা যায় যে ফেসবুক জেনেশুনে কিশোর-কিশোরীদের মানসিক স্বাস্থ্যের ক্ষতি হয় এমন পোস্ট চলতে দিয়েছে, ইথিওপিয়ার মত দেশে জাতিদাঙ্গায় উস্কানি দেওয়া আটকায়নি। সেবছর ৬ জানুয়ারি ক্যাপিটল হিলে যে দাঙ্গা করে মার্কিনী দক্ষিণপন্থীরা, তার আগে ভুয়ো তথ্য ছড়ানো আটকাতেও কোনো ব্যবস্থা নেয়নি ফেসবুক। হগেন বলেছিলেন যে ফেসবুকে চাকরি করার সময়ে তিনি দেখতে পান, বিশেষত আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্যে ফেসবুক মানুষ পাচারকারী এবং সশস্ত্র বাহিনীগুলোর অস্ত্র। ফেসবুক তা নিয়ে ভাবিতই নয়, কারণ তাদের লক্ষ্য কেবল মুনাফা করা। মানুষের যা ক্ষতি হয় হোক।

এমন অভিযোগ একা হগেনই করেননি, সারা বিশ্বে ফেসবুকের কার্যকলাপ নিয়ে বিস্তর গবেষণা হয়েছে। ভারতেও পরঞ্জয় গুহঠাকুরতা, সিরিল স্যামরা লেখালিখি করেছেন। ওঁদের লেখার অনুবাদ বাংলা ভাষায় সাংবাদিক অর্ক দেবের সম্পাদনায় ‘ফেসবুক: মুখ ও মুখোশ’ নামে বইতে প্রকাশিতও হয়েছে। বিজেপি, তৃণমূল সমেত ভারতের রাজনৈতিক দলগুলো কীভাবে নির্বাচনের সময়ে ফেসবুকে বিজ্ঞাপন দিতে বিপুল টাকা খরচ করে তাও প্রকাশিত তথ্য। তা বাদে বেনামি প্রোফাইল খুলে অন্য দলের নেতা-সদস্য-সমর্থকদের হয়রানি, হুমকি; ইদানীং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে তাদের নামে প্রোফাইল বানিয়ে পোস্ট করা – এসব তো আছেই। ফেসবুক গোড়ার দিকে বাকস্বাধীনতার যুক্তি দিয়ে পার পেয়ে যাওয়ার চেষ্টা করত। হগেনের মত হুইসল ব্লোয়ার এবং বিশ্বব্যাপী বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম ও সাধারণ মানুষের চাপে সাম্প্রতিককালে আরেক জনপ্রিয় সোশাল মিডিয়া টুইটারের (অধুনা এক্স) মতই কোনো পোস্টে হিংসা সম্পর্কে সতর্কবাণী দেওয়া, কোনো পোস্টে ভুয়ো হতে পারে বলে নোট দেওয়া – এসব চালু করেছে। কিন্তু অনেকসময় দেখা যায় অ্যালগোরিদম এমনভাবে সাজানো যে প্রতিবাদকে বিপজ্জনক বলে দাগানো হয় বা মুছে দেওয়া হয়, অন্যায়কে তোল্লাই দেওয়া হয়।

ফেসবুক এভাবেই চলে, এভাবেই চলবে। কারণ এটা বিলিয়ন ডলারের ব্যবসা, আর ব্যবসায়ী কখনো বিপ্লবী হয় না। সে সর্বত্রই সংখ্যাগুরুর, ক্ষমতাসীনের পক্ষে। নরেন্দ্র মোদী কী পরম স্নেহে জুকেরবার্গকে ‘মার্ক’ বলে ডাকেন তা কি আমরা দেখিনি? নাকি ভারতে ফেসবুক যাঁরা চালান তাঁদের সঙ্গে বিজেপির সখ্যের কাহিনি আমাদের চোখে পড়েনি? ভারতের একাধিক সংবাদমাধ্যম তো বটেই, বিশ্ববিখ্যাত ‘টাইম’ ম্যাগাজিন পর্যন্ত ভারতে ফেসবুক কীভাবে হিন্দুত্ববাদী ঘৃণা ভাষণকে প্রশ্রয় দেয় তা নিয়ে ২০২০ সালে দীর্ঘ প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিল। তথ্যের খাতিরে বলা প্রয়োজন – এই সমস্ত অভিযোগই টুইটারের বিরুদ্ধেও আছে এবং ডোনাল্ড ট্রাম্পের স্যাঙাত ইলন মাস্ক মালিক হওয়ার পর অভিযোগের সংখ্যা আরও বেড়েছে।

আরও পড়ুন হিন্দিভাষী ইউটিউবার যা করলেন, বাঙালিরা যা করলেন না

এত কিছু সত্ত্বেও বাঙালির ফেসবুকের প্রতি অচলা ভক্তি যায়নি। বাঙালি মাত্রেই কবি এবং কবি মাত্রেই ফেসবুকে লেখেন। নামকরা কবিরা আবার ট্রেন্ডিং বিষয় নিয়ে ফেসবুকে কবিতা লেখেন। আজ অমুকের জন্মদিন, কাল তমুকের মৃত্যুদিন, পরশু অমুক নারকীয় ঘটনা ঘটেছে, তরশু অমুক অলিম্পিকে পদক জিতেছে – বাঙালির প্রিয় কবি সঙ্গে সঙ্গে লেখেন। সম্প্রতি আবার কপিল শর্মার কমেডি শোতে রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে হাসাহাসি করা হয়েছে বলে আহত হয়ে পোস্ট দিয়েছেন, আইনি ব্যবস্থার নেওয়ার হুমকিও দিয়েছেন। মাঝেমাঝে ভয় হয়, ফেসবুক না থাকলে বাঙালির কবিতা লেখাই বোধহয় বন্ধ হয়ে যাবে।

শুধু সাহিত্যচর্চা করলেও কথা ছিল, বাঙালি এখনো আন্দোলনের ডাক দেয় ফেসবুকে। মানুষ তাতে সাড়া দেন এবং দলীয়, অদলীয় সব ধরনের আন্দোলনকারীরই ধারণা হয়েছে যে ফেসবুকে ডাক না দিলে সাড়া পাওয়া যাবে না। তাই রাত দখল, ভোর দখল, দুপুর দখল, রাস্তা দখল – সব ডাকই ফেসবুকেই দেওয়া হয়। এর দাপটে ভোটের সময়ে বাড়ি বাড়ি গিয়ে প্রচার করাও পশ্চিমবঙ্গের বিরোধীরা কমিয়ে ফেলেছেন। বাড়ির সামনের রাস্তা দিয়ে প্রার্থী যাবেন, ফেসবুক লাইভ হবে, তাতে কয়েক লক্ষ লাইক পড়বে। সেই লাইক গুনে বিরোধীরা ভাববেন অমুক কেন্দ্রে আমরা জিতছিই, তমুক কেন্দ্রে দারুণ লড়ব, তারপর ফল বেরোলে দেখা যাবে ভাঁড়ে মা ভবানী, কারণ আপামর মানুষের সঙ্গে কোনো যোগ স্থাপনই হয়নি – এটাই পশ্চিমবঙ্গের নিয়ম হয়ে গেছে। ফলে রাজ্যটা প্রায় একদলীয় শাসনে পরিণত হয়েছে। অদলীয় এবং দলীয় রাজনীতিবিদরা খেয়াল করেন না যে সারা পৃথিবীতে ফেসবুক (ব্যাপকার্থে সোশাল মিডিয়া) এই কাণ্ডটাই ঘটিয়েছে। ফলে দক্ষিণপন্থী রাজনীতিকে অপরাজেয় মনে হচ্ছে। ট্রাম্প, বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু, মোদী, মমতা – সকলেই যে এই ফেসবুক সর্বস্বতায় লাভবান হচ্ছেন তা কিন্তু অন্যত্র অনেকে বুঝে ফেলেছেন। ফলে ২০২১ সালে হগেন মুখ খোলার পর বিশ্বজুড়ে ফেসবুক ছেড়েছেন অনেক মানুষ। ‘দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট’ আস্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিল ফেসবুক ছাড়লে আর কী কী সোশাল মিডিয়া বিকল্প আছে তা নিয়ে। অনেকেই ফেসবুক, টুইটার ছেড়ে বা এগুলোতে সময় খরচ কমিয়ে ফেডিভার্সে চলে গেছেন। সেটা কী? নিজে খুঁজে দেখুন।

ফেসবুক বিশ্বজোড়া এমন ফাঁদ পেতেছে যে বেরনো শক্ত। নিজেদের ওয়েবসাইট চালাতে গিয়ে দেখেছি, ফেডিভার্সে আমাদের লেখা শেয়ার করে লাভ হয় না। কারণ বাঙালি পাঠক কিছুতেই সেখানে যেতে চান না। মেসেজিংয়ের বেলাতেও একই সমস্যা। বাঙালি, অবাঙালি কোনো পরিচিতকেই টেলিগ্রাম বা সিগনাল ব্যবহার করতে উৎসাহিত করা যায় না। আজকাল তো ভারতের আদালতে বিচারকরাও পুলিসকে হোয়াটস্যাপ গ্রুপ তৈরি করার পরামর্শ দেন। আমরা বাঙালিরা আরও অসহায়। ফেসবুকে না থাকলে কাঞ্চন মল্লিকের বাবা হওয়া বা ইন্দ্রাণী হালদারের মোটা হওয়া নিয়ে আলোচনা করা হবে না। চণ্ডীমণ্ডপ নেই বলে পরনিন্দা পরচর্চা করব না?

উত্তরবঙ্গ সংবাদে প্রকাশিত

হিন্দিভাষী ইউটিউবার যা করলেন, বাঙালিরা যা করলেন না

হিন্দি বলয়ের রাজ্যগুলোর গ্রামে-মফস্সলে ছড়িয়ে আছেন আরও অনেকে, যাঁদের ফলোয়ার রবীশ, ধ্রুব, আকাশ, কুণাল, সমদীশদের চেয়ে অনেক কম। তাঁদের কারও একটা ইউটিউব চ্যানেল আছে, কারও স্রেফ একটা ফেসবুক পেজ। কিন্তু গ্রামের যে সামান্য লেখাপড়া জানা বা নিরক্ষর মানুষের কাছে ইংরেজি ভাষায় কাজ করা প্রগতিশীলরা পৌঁছতে পারেন না, তাঁদের মধ্যে বিষ ঢোকা আটকাতে বা বিষ ঝাড়তে অতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা এই অখ্যাত মানুষগুলোর।

বেঙ্গালুরু নিবাসী আমার এক বন্ধুপত্নীর অভিজ্ঞতা বলি। সে একটি বাচ্চাদের স্কুলের দিদিমণি। বছর ছয়েকের এক ছাত্রীকে তার একটু বেশি মিষ্টি লাগে, মেয়েটিরও দিদিমণিকে বেশ পছন্দ। একই রুটের বাসে তাদের বাড়ি ফেরা। ফলে দু’জনের মধ্যে স্কুলের বাইরেও কথাবার্তা হয়। সেই মেয়েটি হঠাৎ একদিন দিদিমণিকে অনুরোধ করে বসল– ‘আমার একটা ইউটিউব চ্যানেল আছে। আপনি প্লিজ সাবস্ক্রাইব করুন।’ হতচকিত দিদিমণি পরে করবেন বলে এড়িয়ে গিয়েছিলেন, কিন্তু পরদিন আবার মেয়েটি ধরল, তার পরদিন আবার। কতবার না বলা যায়? একটা ছোট মেয়েকে প্রত্যাখ্যান করতে খারাপও লাগে। কিন্তু শেষমেশ বিরক্তি জিতে গেল। দিদিমণি বলতে বাধ্য হলেন– ‘আমাকে এই অনুরোধ কোরো না।’

এমন অভিজ্ঞতা আজকাল পশ্চিমবঙ্গেও অনেকের হয়। ইউটিউব ঘাঁটলেও দেখা যায়, সারা পৃথিবীর দুধের শিশু থেকে লোলচর্ম বৃদ্ধ পর্যন্ত সকলেরই নিজস্ব ইউটিউব চ্যানেল আছে। যার চ্যানেলে যা আপলোড করা হয়, তা যতই অপ্রয়োজনীয় হোক, দেখার লোকও আছে। ব্যাপারটা স্রেফ অপ্রয়োজনীয়তায় আটকে থাকলে সমস্যা ছিল না। কিন্তু ইউটিউব এমন এক মাধ্যম হয়ে দাঁড়িয়েছে, যা দিয়ে ফেসবুক বা টুইটারের মতোই ঘৃণা ছড়ানোর কাজও করা হচ্ছে। সাংবাদিক কুণাল পুরোহিত আস্ত একখানা বই লিখেছেন, কীভাবে কিছু ইউটিউব চ্যানেল মুসলমানবিদ্বেষে পরিপূর্ণ গানের ভিডিও তৈরি করে প্রত্যন্ত এলাকাতেও অসংখ্য মানুষকে প্রতিদিন আরও হিংস্র করে তুলছে, তা নিয়ে। বইয়ের নাম ‘H-POP: THE SECRETIVE WORLD OF HINDUTVA POP STARS’। এ জিনিসটা কেবল ভারতেই হচ্ছে এমন নয়। সব দেশেই ইউটিউব ঘৃণা ছড়ানোর চমৎকার অস্ত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু সেটাই শেষ কথা নয়।

২০১৬ সালে যখন ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রথমবার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে দাঁড়িয়েছিলেন, তখন দেখা গিয়েছিল যে ইউটিউব সমেত সোশাল মিডিয়া তাঁর প্রচারে বড় অস্ত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষত ফেসবুকের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছিল, তারা বর্ণবিদ্বেষ এবং কুৎসা তো আটকাচ্ছেই না; উল্টে‌ ওসব ছড়াতে সাহায্য করছে। ফেসবুকের মালিক মেটা আর ইউটিউবের মালিক গুগল– দুই কোম্পানির বিরুদ্ধেই এই অভিযোগ আছে; যেমন আছে আড়ি পাতার অভিযোগ, ব্যবহারকারীদের অজান্তে তাদের তথ্য বিক্রি করে মুনাফা করার অভিযোগ। এসব প্রায় সবাই জানে। তবু বহু মানুষ ইউটিউবকে ব্যবহার করেই কিছু বৃহত্তর ভালো কাজ করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।

সারা পৃথিবীতেই নির্বাচনী গণতন্ত্রের সংকট চলছে, বড় বড় দেশগুলোর শাসকদের মধ্যে স্বৈরতান্ত্রিক প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। তাঁরা সংবাদমাধ্যমের কণ্ঠরোধ করছেন, ভারতের মতো দেশে সংবাদমাধ্যমগুলোও মুনাফার লোভে সরকারের মুখপত্রে পরিণত হচ্ছে। দিনরাত মিথ্যাচার এবং ঘৃণাভাষণের এই ঢেউয়ে সাধারণ মানুষের কাছে সত্য তুলে ধরার কাজে ঋজু বিদূষক এবং স্বাধীন সাংবাদিকরা ব্যবহার করছেন ইউটিউবকে। বস্তুত বিদূষক আর সাংবাদিকের সীমানা মুছে যাচ্ছে। ট্রাম্পের আমলে তাঁর অন্যতম শত্রু হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন জন অলিভার, হাসান মিনহাজ, ট্রেভর নোয়ার মতো বিদূষকরা। তাঁদের শো প্রায় নিউজ বুলেটিনই। লোক হাসাতেও তাঁরা খবরকেই ব্যবহার করেন। ২০২৪ সাধারণ নির্বাচনে ভারতেও ঠিক তাই ঘটতে দেখা গেল।

সত্যি কথা বলতে, এবারের নির্বাচনে ধ্রুব রাঠি, রবীশ কুমার, আকাশ ব্যানার্জি, কুণাল কামরারা তাঁদের চ্যানেলের মাধ্যমে যে কাজ করলেন, তা মার্কিন দেশের ইউটিউবারদের থেকে ঢের বেশি কঠিন ছিল। কারণ ও দেশে ট্রাম্পের আমলে আদালত, নির্বাচন কমিশন, সেনাবাহিনী এবং মূলধারার সংবাদমাধ্যম রামলালার সামনে মোদির সাষ্টাঙ্গ প্রণামের মতো ট্রাম্পের সামনে শুয়ে পড়েনি। ট্রাম্পকে পদে পদে প্রতিরোধের সম্মুখীন হতে হয়েছিল। ফলে বাকস্বাধীনতা এ দেশের মতো অতখানি বিপদে পড়েনি, বিদূষক বা সাংবাদিকদের পদে পদে গ্রেফতার হওয়ার ভয়ে থাকতে হয়নি। কিন্তু এদেশে কুণালের বিরুদ্ধে একাধিক মামলা হয়েছে, একাধিক বিদূষকের শো বাতিল করতে হয়েছে ক্ষমতাসীন দলের সমর্থক গুন্ডাদের আক্রমণে, নিত্য তাঁদের হুমকি সহ্য করতে হয়েছে। মুনাওয়ার ফারুকির মতো ঋজু বিদূষক গ্রেফতারও হয়েছেন। কাশ্মীর থেকে কন্যাকুমারিকা পর্যন্ত মোট কতজন সাংবাদিক গ্রেফতার হয়েছেন, খুন হয়েছেন তার তালিকা করতে বসলে রামায়ণে কুলোবে না, মহাভারত হয়ে যাবে। সিদ্দিক কাপ্পানের মতো কেউ কেউ যে প্রতিবেদন লেখাই হয়নি, তার জন্যও গ্রেফতার হয়েছেন। সাতবছর আগে খুন হওয়া গৌরী লঙ্কেশের হত্যাকারীরা আজও অধরা। রবীশের মতো সাংবাদিকদের চুপ করিয়ে দেওয়ার জন্য আস্ত চ্যানেল কিনে নিয়েছে সরকারবান্ধব পুঁজিপতিরা।

এতৎসত্ত্বেও রবীশ কেবল তাঁর চ্যানেলের গ্রাহকদের টাকায়, সামান্য সংস্থান আর ছোট্ট একটা দল নিয়ে যে সাংবাদিকতার নিদর্শন রাখলেন, তা ঐতিহাসিক। কুণাল আর আকাশ তো নির্বাচনের আগে পুরোদস্তুর সাংবাদিক হয়ে গেলেন। কুণাল দশবছর ধরে মোদি সরকার কী কী করেছে আর করেনি, তা নিয়ে রিপোর্ট কার্ড সিরিজ করলেন। পর্বগুলোর শেষে তিনি মনে করাতেন– যেভাবে দেশ চালানো হয়েছে তাতে প্রধানমন্ত্রী হিসাবে মোদির জায়গায় খালি চেয়ার রাখলেও চলবে। নতুন টেলিকম আইনে কীভাবে বিকল্প সংবাদমাধ্যম, ইউটিউবার, ইনস্টাগ্রামারদেরও কণ্ঠরোধের ব্যবস্থা করা হয়েছে, তা নিয়ে আকাশের ভিডিও ভাইরাল হয়েছিল। সেই ভাইরাল ভিডিওতে তিনি ভিপিএন (ভার্চুয়াল প্রাইভেট নেটওয়ার্ক) সম্পর্কেও দর্শকদের সচেতন করেন। তারপর ধ্রুবর প্রচণ্ড ভাইরাল ভিডিও সম্পর্কে তাঁর সাক্ষাৎকার নেন, যথার্থ সাংবাদিকের মতোই তাঁকে ব্যাখ্যা করতে বলেন– কেন তিনি বলছেন ভারত একনায়কতন্ত্রের দিকে এগোচ্ছে। আর ধ্রুব যা করেছেন, তা নিয়ে তো আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমেও আলাদা করে চর্চা হচ্ছে। বিপুল জনপ্রিয় ইউটিউবার তো অনেকেই আছেন, কিন্তু দেশের বিপদ দেখে নিজের নিশ্চিন্ত কোণ ছেড়ে বেরিয়ে এসে সরাসরি ক্ষমতাকে আক্রমণ করার ঝুঁকি কি সকলে নেয়?

এখনও তিরিশে পা না দেওয়া ধ্রুব যদিও জার্মানিতে থাকেন, তিনি ভারতের নাগরিক। তাঁর পরিবার পরিজনও এখানে আছেন। সেক্ষেত্রে এতখানি ঝুঁকি নিয়ে সরাসরি মোদির বিরুদ্ধে রীতিমতো প্রচারাভিযান চালানো কম সাহসের কাজ নয়। ধ্রুব এমনিতে তেমন বৈপ্লবিক চিন্তাধারার লোক নন, অতীতে অনেক ব্যাপারেই তিনি বিজেপিকে সমর্থন করে ভিডিও বানিয়েছেন। সংবিধানের ৩৭০ নং অনুচ্ছেদ বাতিল করাও তিনি সমর্থন করেছিলেন। কিন্তু এই নির্বাচনে তাঁর অবদান ভোলার নয়।

পাঞ্জাবি যুবক সমদীশ ভাটিয়া ইউটিউবার হিসাবে প্রথম জনপ্রিয় হন ২০২০-’২১ সালে দিল্লি শহরকে ঘিরে কৃষক আন্দোলনের সময়ে। আন্দোলনকারীদের ভিতরে চলে গিয়ে তাঁদের কথা তিনি তুলে আনতেন। মাঝে কিছুদিন সিনেমা জগতের বিখ্যাতদের লম্বা লম্বা সাক্ষাৎকার নিচ্ছিলেন, যার জন্য তাঁর শো-তে এসে নির্দেশক দিবাকর ব্যানার্জি ঈষৎ ক্ষোভও প্রকাশ করেন। এবার নির্বাচনের মুখে সমদীশ আবার স্টুডিও ছেড়ে ক্যামেরা নিয়ে বেরিয়ে পড়েন ভারত খুঁজতে। কখনও সে ভারত দিল্লি শহরের একেবারে মাঝখানে, অথচ মানুষ সেখানে জঞ্জালের মধ্যে বেঁচে আছে। কখনও সে ভারত বিহারের এক গ্রাম, যেখানে হরিজনরা এখনও হ্যান্ড পাম্পে হাত দিলে হাঙ্গামা বেধে যায়।

এমন আরও অনেকে আছেন। হিন্দি বলয়ের রাজ্যগুলোর গ্রামে-মফস্সলে ছড়িয়ে আছেন আরও অনেকে, যাঁদের ফলোয়ার রবীশ, ধ্রুব, আকাশ, কুণাল, সমদীশদের চেয়ে অনেক কম। তাঁদের কারও একটা ইউটিউব চ্যানেল আছে, কারও স্রেফ একটা ফেসবুক পেজ। কিন্তু গ্রামের যে সামান্য লেখাপড়া জানা বা নিরক্ষর মানুষের কাছে ইংরেজি ভাষায় কাজ করা প্রগতিশীলরা পৌঁছতে পারেন না, তাঁদের মধ্যে বিষ ঢোকা আটকাতে বা বিষ ঝাড়তে অতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা এই অখ্যাত মানুষগুলোর। তাঁদের অনেকের ইউটিউবার বা সাংবাদিক তকমা নেই। কেউ কেউ দিন গুজরান করেন আসলে দিল্লি, মুম্বইয়ের বড় সংবাদমাধ্যমকে খবর সরবরাহ করার বিনিময়ে অতি সামান্য টাকা পেয়ে। সেই টাকায় সংসার চালিয়ে, তা থেকেই খরচ করে এসব করেন কোন তাগিদে, তা আমাদের মতো আলোকপ্রাপ্ত বাঙালিদের পক্ষে বোঝা প্রায় অসম্ভব।

আরও পড়ুন এনডিটিভি বিসর্জন: শোক নিষ্প্রয়োজন, উল্লাস অন্যায়

পশ্চিমবঙ্গে কি ইউটিউবার নেই? কয়েক হাজার ইউটিউবার আছেন। তবে তাঁদের অধিকাংশ হাসি-মশকরায় ব্যস্ত। কেউ ক্রমশ ছোট হয়ে আসা টালিগঞ্জ ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির কেষ্টবিষ্টুদের সাক্ষাৎকার নিয়ে ফলোয়ার বাড়ান, রোজগার করেন। বাংলার যে প্রবীণ সাংবাদিকরা ইউটিউব চ্যানেল চালান তাঁদের মধ্যেও রবীশের মতো মেরুদণ্ড এবং অধ্যবসায় বিরল। তবু সাংবাদিকদের মধ্যে আছেন দু’-একজন, কিন্তু বিশুদ্ধ ইউটিউবারদের কথা না বলাই ভালো। ফলে বাঙালির ইউটিউব চ্যানেল মানে সাধারণত রান্নার চ্যানেল বা বেড়ানোর জায়গার সুলুকসন্ধান দেওয়ার চ্যানেল। নয়তো সংস্কৃতির ঢাক তেরে কেটে তাক তাক। বাঙালি তো শিল্পী হয়েই জন্মায়। ফলে গান, নাচ, আবৃত্তিতে ইউটিউব ভরিয়ে দেয় বুকের দুধ খাওয়ার বয়সটা পার হলেই। এছাড়া যা আছে তা স্রেফ আবর্জনা। হয় অর্থহীন, নয় ঘৃণা ছড়ানোর প্রয়াস।

এমনিতেই ভারতের বিরাট অংশের মানুষের ভাষা হিন্দি। তাঁদের প্রভাবিত করতে না পারলে যে ভালো বা মন্দ কোনও কাজই এদেশে করা সম্ভব নয়, তা বলা বাহুল্য। কিন্তু সেকথা এদেশের আলোকপ্রাপ্তদের সচরাচর মনে থাকে না। অথচ গণতন্ত্র বাঁচানোর জন্যে যে শহর থেকে, সংবাদমাধ্যম থেকে সবচেয়ে দূরে থাকা মানুষটার কাছেও সত্য পৌঁছে দিতে হবে, সব ভাষার মানুষের কাছে পৌঁছতে হবে– তা রবীশ, ধ্রুবরা বুঝতে পেরেছিলেন। ফলে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে হিন্দি বাদে অন্য ভাষাতেও নিজেদের ভিডিও প্রকাশ করেছেন। আবার যে হিন্দিতে সংবাদমাধ্যমের কথাবার্তা চালানো হয়, সেই হিন্দি সকলের বোধগম্য নয় বুঝে রবীশ আলাদা করে ভোজপুরী ভাষাতেও ভিডিও প্রকাশ করেছেন।

এই সুদূরপ্রসারী চিন্তা, এই যত্ন বাংলায় কোথায়? বাঙালিরা কেবল রবীশদের বাংলা ভিডিও দেখে হিন্দি আগ্রাসনের তত্ত্ব কপচাতে পারে। নিজেরা নিজের ভাষাকে বুকনি ছাড়া আর কিছু দিতে রাজি নয়।

রোববার ডট ইন ওয়েবসাইটে প্রকাশিত

নির্বাচনের ফলে হেরে গেছে দেশের অসাধু মিডিয়া

এই লেখা যখন লিখছি, ততক্ষণে প্রমাণ হয়ে গেছে যে মোদীর গ্যারান্টিতে খুব বেশি ভারতীয় নাগরিক বিশ্বাস করেননি। হিন্দুরাষ্ট্রের স্বপ্নেও খুব বেশি মানুষের গায়ে পুলক লেগে চোখে ঘোর ঘনায়নি। একাই তিনশোর বেশি এবং জোটে সাড়ে তিনশোর বেশি আসনের কৈলাস পর্বত থেকে ভোটাররা পরমাত্মা নরেন্দ্র মোদীকে টেনে নামিয়েছেন জোট রাজনীতির মাটিতে। তবে যেহেতু বিজেপি নেতৃত্বাধীন প্রাক-নির্বাচনী জোট ন্যাশনাল ডেমোক্র্যাটিক অ্যালায়েন্স (এনডিএ) ২৭২ আসনের বেশি পাচ্ছে, তাই হয়ত ফের মোদী তাঁর প্রিয় আসনে বসতে পারবেন। অবশ্য মোদী-অমিত শাহের ভয়ে যাঁরা এতদিন এনডিএতে ছিলেন, তাঁরা ভয় কমে যেতেই যদি কেটে পড়ার তাল করেন তাহলে অনেককিছু ঘটতে পারে। তা যদি না-ও ঘটে, বিজেপিই যে একক বৃহত্তম দল হয়েছে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। তাই একে তারা জয় বলে দাবি করতেই পারে, যতই তাদের তৈরি আলেখ্য স্পষ্টত প্রত্যাখ্যাত হয়ে থাক। কিন্তু এ লেখা ২০২৪ লোকসভা নির্বাচনে যারা হেরে ভূত হয়ে গেছে তাদের কথা বলার জন্যে। মূলধারার সংবাদমাধ্যম, বিশেষত জনপ্রিয় খবরের চ্যানেলগুলোর কথা বলছি।

২০১৪ সাল থেকে কারা গোদি মিডিয়া হয়ে গেছে তা আজ কাউকে নতুন করে বলে দেওয়ার দরকার নেই। যেসব সংবাদমাধ্যমকে সচরাচর ওই তালিকায় ফেলা হয় না, আজও নিরপেক্ষ বলেই মনে করেন বিজেপিবিরোধী দর্শকরা, তারাও গত এক-দেড় বছরে ভোল বদলেছে। গোদি মিডিয়ার হত্তাকত্তারা নিউজক্লিকের দিকে, অন্য বিকল্প সংবাদমাধ্যম ও সাংবাদিকদের দিকে সিবিআই, ইডিকে লেলিয়ে দিয়েছিলেন। তাঁদের নির্যাতনে উল্লসিত হয়ে নানা ষড়যন্ত্রের তত্ত্ব প্রচার করে আহ্লাদিত হয়েছিলেন। আর তথাকথিত নিরপেক্ষ সংবাদমাধ্যম প্রবীর পুরকায়স্থের মত সাংবাদিকদের সমর্থনে টুঁ শব্দ করেনি। বাংলায় তো রিপাবলিক বাংলা ছাড়া গোদি মিডিয়া নেই বলা হয়। নিন্দুকেরা বলে এখানে দিদি মিডিয়া আছে। তা সত্যি মিথ্যা যা-ই হোক, কোনো মিডিয়াই আর পাঁচটা গ্রেফতারির খবরের মত করে সংবাদটি পাঠক/দর্শকের কাছে পৌঁছে দেওয়ার বেশি তেমন কিছু করেনি। বাংলার স্বনামধন্য (অনেকের মত কিংবদন্তি) সাংবাদিকরা নিজেদের ব্লগে বা ভ্লগে, মায় ফেসবুক পোস্টেও এর প্রতিবাদ করেননি। সংবাদমাধ্যমের উপর রাষ্ট্রীয় আগ্রাসনের কালে নীরবতা অবশ্যই সম্মতির লক্ষণ। কারা নীরব ছিলেন মনে করে দেখুন। গোদি মিডিয়া সমেত তাঁদেরও উলঙ্গ করে দিল নির্বাচনের ফল, কারণ মাত্র তিনদিন আগে তাঁদেরই চ্যানেলে চ্যানেলে বুথফেরত সমীক্ষায় ৩০০-৪০০ আসন দিয়ে জিতিয়ে দেওয়া হয়েছিল মহামতি মোদীকে।

কেবল জিতিয়ে দেওয়া হয়েছিল বললে অবশ্য কিছুই বলা হয় না। বুথফেরত সমীক্ষা আর পাঁচটা সমীক্ষার মতই একটা সমীক্ষা মাত্র। তাতে ভুল হওয়ার সম্ভাবনা থাকেই। আজ যখন ইন্ডিয়া টুডের স্টুডিওতে অ্যাক্সিস-মাই ইন্ডিয়া সংস্থার প্রধান প্রদীপ গুপ্তা এসে নিজের পাহাড়প্রমাণ ভুলের ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে কেঁদেই ফেললেন, তখন রাজদীপ সরদেশাই, রাহুল কাঁওয়ালরা পরম স্নেহে তাঁর গায়ে হাত বুলিয়ে তাঁকে বোঝাচ্ছিলেনও বটে, যে মানুষ মাত্রেই ভুল করে।

কিন্তু মুশকিল হল, এর চেয়ে অনেক ছোট ভুলে টিভি চ্যানেলে বা খবরের কাগজে একজন সাংবাদিককে বিস্তর কৈফিয়ত দিতে হয়, লিখিত শোকজের জবাব দিতে হতে পারে, চাকরি পর্যন্ত চলে যেতে পারে। ২০২০-২১ সালে ভারতের যেসব সংবাদমাধ্যম করোনা অতিমারীর দোহাই দিয়ে কয়েক হাজার সাংবাদিককে ব্যবস্থা উদ্বৃত্ত ঘোষণা করে ছাঁটাই করেছিল, তারাই টাকা খরচ করে এইসব বুথফেরত সমীক্ষা করিয়েছে এবং প্রচার করিয়েছে। যে সাংবাদিকরা ছাঁটাই হয়েছিলেন, তাঁরা কেউই কখনো অ্যাক্সিস-মাই ইন্ডিয়ার প্রদীপ বা সি-ভোটারের যশবন্ত দেশমুখের চেয়ে বড় ভুল করেননি। করলে চাকরি আগেই যেত। অবশ্য যদি গুপ্তা, দেশমুখরা সত্যিই ভুল করে থাকেন।

একসঙ্গে সমস্ত বুথফেরত সমীক্ষাকারী সংস্থাই ভুল করতে পারে, যেমন ২০০৪ সালে করেছিল। আবার সব সংস্থা এক ভুলও করতে পারে। কিন্তু সব সমীক্ষাকারী সংস্থা একসঙ্গে একই ভুল করলে সেটা কাকতালীয় ঘটনা হিসাবে বড্ড বাড়াবাড়ি হয়ে যায়। বিশেষ করে সব সমীক্ষাতেই যদি স্রেফ কোথায় কটা আসন আছে সেই তথ্যে ভুল থাকে বা কোন দল কটা আসনে লড়ছে সেই তথ্যে ভুল থাকে। গোদি মিডিয়া অবশ্য সেখানেও থামেনি। প্রাক-নির্বাচনী মতামত সমীক্ষা বা বুথফেরত সমীক্ষা যে কোনোভাবেই নির্বাচনের ফল নয়, সেকথা বারবার করে দর্শকদের বলাই দস্তুর। অথচ এবারের বুথফেরত সমীক্ষায় ইন্ডিয়া জোট তথা কংগ্রেস গোহারান হারছে দেখানোর সঙ্গে সঙ্গে মোদী তৃতীয় মেয়াদে কী কী করবেন, ভারতকে কোন উচ্চতায় নিয়ে যাবেন – এসব গভীর আলোচনাও চালানো হয়েছে ঘন্টার পর ঘন্টা ধরে। আজ তক নেটওয়ার্কের বিখ্যাত গোদি অ্যাঙ্কর অঞ্জনা ওম কাশ্যপ রীতিমত নাকের পাটা ফুলিয়ে লাইভ অনুষ্ঠানে বলেছিলেন, তাঁদের মত বড় চ্যানেলে বিরোধীদের কোনো পরিসরই দেওয়া উচিত নয়।

এই সাংবাদিকের যে সাংবাদিকতা করা উদ্দেশ্য নয়, তার এর চেয়ে বড় কোনো প্রমাণ হয় না। লোকসভায় বিরোধীদের শক্তিবৃদ্ধির পর কী করবেন অঞ্জনা? সে তিনি ভাববেন, কিন্তু আমাদের ভুললে চলবে না যে অঞ্জনা বরং সরল বা বোকা বা উদ্ধত। তাই প্রকাশ্যে ওকথা বলেছেন। তাঁর চেয়ে চালাক চতুর সাংবাদিকরাও একই উদ্দেশ্যে কাজ করেন, তবে ভান করতে জানেন। গত এক দশকে ভারতের প্রায় প্রত্যেক সংবাদমাধ্যমের মালিক এই ধরনের মেধাহীন, অর্ধশিক্ষিত সাংবাদিকদেরই দায়িত্বপূর্ণ পদে উন্নীত করেছেন। সত্যিকারের সাংবাদিকদের হয় রবীশ কুমার বা পুণ্য প্রসূন বাজপেয়ীর মত নিজস্ব ইউটিউব চ্যানেল খুলতে হয়েছে, নয় মুখ বুজে পরিবার পরিজনের কথা চিন্তা করে ফ্যাসিবাদীদের হয়ে দিনরাত মিথ্যা প্রচারের কাজই করে যেতে হয়েছে। তৎসত্ত্বেও ভয়ে ভয়ে থাকতে হয়েছে, কখন মুনাফাখোর মালিকের মনে হয় – এত সাংবাদিক আমার দরকার নেই। শেষ দফার নির্বাচনের পরে তাঁর ইউটিউব চ্যানেলে আপলোড করা ভিডিওতে রবীশ বলেছেন যে চ্যানেলগুলোতে খরচ কমাতে রিপোর্টার যত কমানো হয়েছে, তত রমরমা হয়েছে অঞ্জনা জাতীয় অ্যাঙ্করদের। অর্থাৎ খবরকে এক ধরনের অসুস্থ বিনোদনে পরিণত করে মানুষের মন বিষিয়ে দেওয়া এবং সরকারকে, মোদীকে দোষগুণের অতীত এক সত্তা হিসাবে প্রতিষ্ঠা করার কাজই করে গেছে টিভি চ্যানেলগুলো। দিনরাত মোদীকে দেখানো, বিরোধীদের প্রায় না দেখানো, দেখালেও তাদের বক্তব্য এমনভাবে বিকৃত করা যাতে মোদীর সুবিধা হয় – এইসব কৌশল ইদানীং মোদীভক্তরাও বুঝে ফেলছিলেন। পুরাণে নির্মোক নৃত্যের কথা লেখা আছে, আজকাল যাকে বলা হয় স্ট্রিপটিজ। ভারতের মূলধারার সংবাদমাধ্যমের এক দশকব্যাপী এই স্ট্রিপটিজে কোমরে যে সরু অন্তর্বাসটুকু বাকি ছিল, সেটুকুও খুলে ফেলা হল এবারের বুথফেরত সমীক্ষায়।

আসল ফল যে অন্যরকম হবে, একথা প্রায় সব সাংবাদিক জানতেন। কিন্তু নিজের সংস্থার সাংবাদিকদের অভিজ্ঞতা ও নৈপুণ্যকে পাত্তা না দিয়ে বিপুল টাকা খরচ করে (নাকি অন্য কারোর অর্থানুকূল্যে?) এই বুথফেরত সমীক্ষাগুলো করিয়ে প্রকাশ করা হয়েছিল ১ জুন ২০২৪। অঞ্জনা, সুধীর চৌধুরী বা রাহুল কাঁওয়ালের মত অন্ধ সাংবাদিক ভেকধারীদের অবশ্য অভিজ্ঞতা বা নৈপুণ্য – কোনোটাই নেই। তাঁরা অত উপরে উঠেছেন মেধাহীন বদমাইশি নির্লজ্জভাবে করতে পারেন বলেই। ৪ জুন ২০২৪ কেবল প্রদীপ বা যশবন্ত নন, কেবল গোদি সাংবাদিকরাও নন, উদোম হয়ে গেলেন তাঁদের নিয়োগকারীরা। সবার চোখে ধরা পড়ে গেল, তাঁরা আসলে কিসের ব্যবসা করেন।

আরও পড়ুন সরকারের কিছু দেশদ্রোহী দরকার, তাই নিউজক্লিক আক্রমণ

তবে ও ব্যবসায় কিন্তু কেবল মার্কামারা গোদি মিডিয়াই যুক্ত তা নয়। যদি তা হত, তাহলে গত কয়েক মাসে তৃণমূল কংগ্রেসের সবেতেই দোষ দেখা এবং বিজেপির সবেতেই গুণ দেখা অতি বুদ্ধিমান সুটবুট পরা বাঙালি বাবু সুমন দে ওই বুথফেরত সমীক্ষা নিজের চ্যানেলে নিশ্চয়ই দেখাতে দিতেন না। মনে রাখবেন, সুমন দে-র মত বিভিন্ন চ্যানেলে সর্বেসর্বা যে অ্যাঙ্কররা আছেন তাঁরা প্রায় প্রত্যেকে কোম্পানির ম্যানেজমেন্টের অংশ। সাধারণ কর্মচারী নন। রাজদীপ সরদেশাইদের প্রজন্ম মাথার সব চুল পেকে গেলেও মুশাহারদের গ্রামে চলে যান খবর করতে। আজকের রাহুল কাঁওয়াল বা সুমন দে-রা রিপোর্টিং বলতে বোঝেন ঠান্ডা ঘরে বসে অমুক নেতা, তমুক নেতার সাক্ষাৎকার নেওয়া। অনেক ক্ষেত্রে সেই সাক্ষাৎকারে বিশেষ কিছুই করার থাকে না। কারণ আগেই স্থির করা থাকে যে প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার ভান করতে করতে আসলে নেতা আপন মনে শেক্সপিয়ারের চরিত্রের মত যা খুশি বলে যাবেন, সাংবাদিক ক্লাসের ফার্স্ট বয়ের মত মুখ করে শুনে যাবেন আর মাঝে মাঝে দন্তবিকাশ করে গল্প হলেও সত্যি ছবির ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়ের মত জানান দেবেন ‘থেমো না দাদা, বলে যাও। বড় ভাল বলছ।’

এ কাজ যে যত ভাল করতে পারে, মূলধারার সংবাদমাধ্যমে এখন তার তত দাম। সংসদে বিরোধীদের শক্তি বেড়ে যাওয়ায় এবার কিন্তু এই জাতের সাংবাদিকতা বিপদে পড়বে। কারণ দর্শকদের মধ্যে ইতিমধ্যেই ক্লান্তি এসেছে। সরকারভক্ত দর্শক/পাঠকরাও ইদানীং সেই কারণেই বিকল্প সংবাদমাধ্যম – অর্থাৎ ছোট-বড় ওয়েবসাইট, ইউটিউবার, ফেসবুকারদের দিকে ঝুঁকছেন। সরকারের শক্তি কমে যাওয়ার একটা মানে হল উলটো বয়ান শুনতে চাওয়া মানুষের সংখ্যা বেড়েছে। আরেকটা মানে হল, আগামীদিনে ওই সংখ্যা আরও বাড়বে। কেবল ময়ূখ ঘোষদের নয়, সুমন দে-দেরও সাবধান হওয়ার সময় বোধহয় এসে পড়ল।

নাগরিক ডট নেটে প্রকাশিত