বাকস্বাধীনতা এখন রীতিমতো কমেডি

পাটনার আন্দোলনে এক যুবক উপস্থিত পুলিশকর্মীকে জিজ্ঞেস করছেন “কাঁদানে গ্যাস, জলকামানের ব্যবস্থা করেছেন?” উত্তরে তিনি না বলায় বলছেন “এ কে ৪৭?” তাতেও না বলায়, যেন ভারি হতাশ হয়ে বলছেন “কিছুরই ব্যবস্থা করেননি?”

দেশ স্বাধীন হতে না হতেই কমিউনিস্টরা স্লোগান তুললেন “ইয়ে আজাদি ঝুঠা হ্যায়”;অর্থাৎ এই স্বাধীনতা মিথ্যা। তাঁদের বক্তব্য— এ কেবল রাজনৈতিক স্বাধীনতা, দেশের গরিব নিপীড়িত মানুষ অর্থনৈতিকভাবে স্বাধীন না হলে সেটা স্বাধীনতাই নয়। কেবল স্লোগান তুললে তো রাজনীতি হয় না,যে কোনো পার্টিকেই তার বার্তা উদ্দিষ্ট মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার একাধিক পথ বের করতে হয়। আজকের রিলের যুগে যেমন, সে যুগেও তেমন গানের মাধ্যমে বার্তা দিলে অনেক সহজে অনেক বেশি মানুষের কাছে পৌঁছত। বিশেষ করে গান একেবারে লেখাপড়া না জানা মানুষের কাছেও বার্তা পৌঁছে দিতে পারে,যা অনেকসময় বক্তৃতা বা প্যামফ্লেট পারে না। তাই অবিভক্ত কমিউনিস্ট পার্টির সাংস্কৃতিক শাখা,ভারতীয় গণনাট্য সঙ্ঘের সদস্যরা ১৯৪৮ সালে গান বাঁধলেন—মাউন্টব্যাটেন মঙ্গলকাব্য। বাংলার প্রাচীন মঙ্গলকাব্যের প্রকরণ মেনে তাতে ভারতের স্বাধীনতাকে তুলে ধরা হল স্রেফ ক্ষমতা হস্তান্তর হিসাবে। “মাউন্টব্যাটন সাহেব ও/তোমার সাধের ব্যাটন/কার হাতে থুইয়া গেলায়ো।” সেই গানে মাউন্টব্যাটেনের স্থলাভিষিক্ত গভর্নর জেনারেল চক্রবর্তী রাজাগোপালাচারী নয়, প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু এবং বল্লভভাই প্যাটেল, মৌলানা আবুল কালাম আজাদের মত মন্ত্রিসভার অন্য সদস্যদের নিয়েও একেবারে নাম করে প্রচণ্ড ব্যঙ্গ করা হয়। সে গান নিষিদ্ধ করেনি ভারত সরকার বা পশ্চিমবঙ্গ সরকার। সেই গান যাতে ছড়াতে না পারে তার ব্যবস্থা করেছিল বলেও জানা যায় না। কমিউনিস্ট পার্টি ওই ১৯৪৮ সালেই নিষিদ্ধ হয়েছিল, কিন্তু সেটা ওই গানের জন্যে নয়।

বছর চল্লিশেক এগিয়ে আসা যাক। ১৯৮৯ লোকসভা নির্বাচনের আগে বিদায়ী প্রধানমন্ত্রী সম্পর্কে বিরোধীরা স্লোগান তোলেন “গলি গলি মে শোর হ্যায়/রাজীব গান্ধী চোর হ্যায়।” কারণ তার কিছুদিন আগেই অভিযোগ উঠেছে— ভারতীয় সেনাবাহিনীর জন্য সুইডেনের অস্ত্র নির্মাণ কোম্পানি বোফর্সের কাছ থেকে অস্ত্র কেনায় প্রায় ১,৪০০ কোটি টাকার দুর্নীতি হয়েছে এবং স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী ঘুষ খেয়েছেন। গোটা নির্বাচন পর্ব এই স্লোগান চলে,আমরা দেখতাম দেয়াল জুড়ে এই স্লোগান লেখা হচ্ছে পাড়ায় পাড়ায়। রাজীব তথা কংগ্রেস আগাগোড়া এই অভিযোগ অস্বীকার করে, কিন্তু নির্বাচনে কংগ্রেস জনসমর্থন হারায়। একদা রাজীবের মন্ত্রিসভার সদস্য বিশ্বনাথ প্রতাপ সিং প্রধানমন্ত্রী হন। কিন্তু একবারের জন্যও রাজীব নিজে বা কংগ্রেস বলেনি যে প্রধানমন্ত্রী চেয়ারটা সাংবিধানিক, তাঁকে চোর বলা মারাত্মক পাপ। অথবা যারা তাঁকে চোর বলছে তারা দেশদ্রোহী, বা তাদের পাকিস্তানে চলে যাওয়া উচিত। ফলে আজ আরও প্রায় ৪০ বছর পরে যখন প্রধানমন্ত্রীকে ঠাট্টার পাত্র বানিয়ে ফেলার জন্যে ছাত্রছাত্রীদের গ্রেফতার করা হচ্ছে; ১৫ বছরের মেয়ের বাড়িতে ঢুকে পড়ে তাকে এবং তার মাকে এমন ভয় দেখানো হচ্ছে যে তাঁরা বাড়ি ছেড়ে দিতে বাধ্য হচ্ছেন; যারা প্রধানমন্ত্রীকে হাসি ঠাট্টা, কার্টুনের বিষয়বস্তু বানিয়ে ফেলেছেন তাঁদের বিরুদ্ধে এফআইআর হচ্ছে এবং উন্মত্ত জনতা তাঁদের বাড়ি পৌঁছে যাচ্ছে, তখন সত্যিই প্রশ্ন করতে ইচ্ছে হয় “ইয়ে আজাদী সচ হ্যায় ইয়া ঝুঠা হ্যায়?”এই স্বাধীনতা সত্য না মিথ্যা?

যে দেশে প্রকাশ্যে কিছু বলতে গেলে বা লিখতে গেলে শতবার ভাবতে হয়— বাড়িতে পুলিশ অথবা গুন্ডাবাহিনী আসবে কিনা, সে দেশে বাকস্বাধীনতা যে ঘোর বিপদে তা নিয়ে সন্দেহের অবকাশ নেই। তবু যে আমাদের ৮০তম স্বাধীনতা দিবসে দাঁড়িয়ে নিজেদের শেষ বিচারে স্বাধীন দেশের নাগরিক বলেই মনে হচ্ছে, তার কৃতিত্ব কিন্তু সরকার বা আদালতের নয়। কৃতিত্ব দেশের নাগরিকদের। যাবতীয় হুমকি,পুলিশের পেরেক বসানো লাঠি, এ কে ৪৭, জলকামান,কাঁদানে গ্যাস,বুলডোজার সহ্য ও অগ্রাহ্য করে এদেশের সবুজ, অবুঝ,কাঁচা নাগরিকরা দেখিয়ে দিয়েছেন— বাঁধন যত শক্ত হবে তত বাঁধন টুটিয়ে দেওয়ার সাহস তাঁদের আছে। নিজেদের মর্ত্যে আগত ভগবান মনে করা যে নেতাদের চিরাচরিত প্রতিবাদের ভাষা দিয়ে মাটিতে নামিয়ে আনা যাচ্ছিল না, তাঁদের দম ফাটানো হাসি দিয়ে ফুৎকারে উড়িয়ে দিয়েছেন নাগরিকরা। প্রধানমন্ত্রী নিজের ৫৬ ইঞ্চির ছাতি নিয়ে গর্ব করেছিলেন, এখন সেই ৫৬ ইঞ্চিকেই ব্যুমেরাং করে তাঁর দিকে ছুড়ে দিয়েছে তরুণ প্রজন্ম। কী করে বাঁচবেন তার আঘাত থেকে? ভাবতে গিয়ে রাতে না ঘুম হচ্ছে প্রধানমন্ত্রীর, না তাঁর কোটি কোটি টাকা মাইনের জনসংযোগের দায়িত্বে থাকা মানুষজনের। এক্স আর মেটাকে বলে সব অপছন্দের ভিডিও মোছানোর ব্যবস্থা করছে সরকার। নরেন্দ্র মোদী সরকারের এক মন্ত্রী নীতিন গড়করি তো সোজা আদালতে চলে গেছেন তাঁর সম্পর্কে পোস্ট মোছানোর জন্যে। কিন্তু কত মোছা হবে? যা ছড়িয়ে গেছে তা তো ছড়িয়েই গেছে,মানুষের মন থেকে মুছে দেওয়ার তো কোনো উপায় নেই। তার উপর সোশাল মিডিয়া এমন এক গ্যাঁড়াকল যে যত পোস্ট মোছা হয়, তত নতুন পোস্ট এসে পড়ে। এই যৌবন জলতরঙ্গ রুধিবে কে? ক্ষমতাশালীর ভাবমূর্তি ধূলিসাৎ,প্রেস্টিজে গ্যামাক্সিন।

এখন দেশের প্রধান বিরোধী দল কংগ্রেসও সংসদ চত্বরেই প্রধানমন্ত্রীকে বাঁদর বলছে,তাঁর যাকে তাকে জড়িয়ে ধরার অভ্যাস নিয়ে ঠাট্টা করছেন লোকসভার বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধী।

এমন নয় যে কংগ্রেস যতদিন সরকারে ছিল ততদিন ভারত বাকস্বাধীনতার স্বর্গ ছিল আর বিজেপি ক্ষমতায় আসতেই নরক হয়ে গেছে। রাহুলের ঠাকুমা ইন্দিরার আমলেই ভারতে জরুরি অবস্থা ঘোষিত হয়। তখন খবরের কাগজের অফিসে সরকারি অফিসার এসে বসে থাকতেন কোথায় কী ছাপা হচ্ছে না হচ্ছে দেখতে। বাবু দেখে মাথা দোলাবেন, তবে ছাপা হবে। তার প্রতিবাদে সেইসময় কোনো কাগজ সম্পাদকীয় স্তম্ভ খালি রেখেছিল, কেউ বা কাটা চিহ্ন ছেপে দিয়েছিল। অবাধ্য সাংবাদিকদের ব্যাপক গ্রেফতারি তো ছিলই,অবাধ্য হওয়ায় কিশোরকুমারের গান বাজানো বন্ধ করে দিয়েছিল অল ইন্ডিয়া রেডিও। এমনকী ইন্দিরার সঙ্গে নায়িকার চরিত্রের মিল আছে— এই অলিখিত অভিযোগে নিষিদ্ধ করে দেওয়া হয়েছিল সুচিত্রা সেন ও সঞ্জীবকুমার অভিনীত, গুলজারের ছবি আন্ধী। খোদ পশ্চিমবঙ্গে প্রয়াত সুব্রত মুখোপাধ্যায়ের উদ্যোগে রবীন্দ্রনাথের ‘চিত্ত যেথা ভয়শূন্য’ নিষিদ্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। মৃত্যুর আগে পর্যন্তও তা নিয়ে তাঁর কোনো আক্ষেপ ছিল না।

বাকস্বাধীনতায় সরকারি হস্তক্ষেপের আরও অজস্র দৃষ্টান্ত আছে স্বাধীন ভারতে। রাজীবের প্রধানমন্ত্রিত্বেই সলমন রুশদির স্যাটানিক ভার্সেস নিষিদ্ধ করে দেওয়া হয়েছিল মুসলমান মৌলবাদীদের চাপে। পশ্চিমবঙ্গে বামফ্রন্ট আমলে তসলিমা নাসরিনের দ্বিখণ্ডিত নিষিদ্ধ করার ইতিহাস আছে,মৌলবাদীদের সামান্য গণ্ডগোলের ভয়ে তসলিমাকে কলকাতা থেকে বিদেয় করে দেওয়ার ইতিহাসও আছে। একবার তো কলকাতা ফিল্মোৎসবে আসা একখানা ছবিতে (টরাস) লেনিনকে যেভাবে দেখানো হয়েছে তা রাজ্য সরকারের পছন্দ হয়নি বলে চলতে দেওয়া হয়নি— এমন অভিযোগও উঠেছিল। ফলে শিল্প,সাহিত্যের বাকস্বাধীনতা রক্ষায় ভারতের কোনো রাজনৈতিক শক্তির ভূমিকাই ধারাবাহিকভাবে ভালো নয়। কিন্তু গত এক যুগে মোদী সরকারের আমলে বা ডবল ইঞ্জিন সরকারগুলোর শাসনে যা হয়েছে তার মধ্যে বিলক্ষণ নতুনত্ব আছে।

এর আগে বিভিন্ন মতকে বিভিন্ন সময়ে দমন করার চেষ্টা হয়েছে; কিন্তু সিনেমা, সাহিত্য, নাটক, শিল্পকলা, এমনকী ইতিহাস রচনাতেও একটাই বয়ান সর্বত্র সবার উপরে চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা হয়নি। উপরন্তু, ইন্দিরার ঘোষিত জরুরি অবস্থার বছর দুয়েক (১৯৭৫-৭৭) বাদ দিলে, যাবতীয় সংবাদমাধ্যমের গলা টিপে ধরে তাকে দিয়ে সরকারি বয়ান বলিয়ে নেওয়ার চেষ্টা হিমাচল থেকে কন্যাকুমারী পর্যন্ত বিরল। মোদী সরকারের আমলে কিন্তু সব মিডিয়ার এক রা,জরুরি অবস্থার ঘোষণা ছাড়াই। যে কারণে গোদি মিডিয়া কথাটার উদ্ভব হয়েছে। ভারত জুড়ে এত সাংবাদিকের গ্রেফতার ও হত্যার খতিয়ানও কোনো রাজ্যে পাওয়া যাবে না। স্বভাবতই আন্তর্জাতিক প্রেস ফ্রিডম ইনডেক্সে আমাদের দেশের অবস্থা দেখে বাস কন্ডাক্টরদের মত বলতে হয় “পেছন দিকে এগিয়ে যান।”

আরও পড়ুন কুণাল, যাঁর কৌতুক আজ কামড়ায়

তবে মানুষ এত অদ্ভুত জীব, ভারত এমন আশ্চর্য দেশ যে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে ফেললেও কোথাও কোনো বিদ্রোহ মাথাচাড়া দেবে না— এমনটা বেশিদিন হয় না। যেমন রাজনীতিতে হয় না, তেমনি বাকস্বাধীনতার ক্ষেত্রেও হয় না। এখন যে ঠাট্টার স্রোতে স্বয়ং মোদী টালমাটাল এবং রাহুল যাকে রাজনীতির ভাষা করে তুলছেন,সেটা কিন্তু শুরু করেছিলেন ঋজু বিদূষকরা। সাম্প্রতিক জেন জি আন্দোলনের এক ভাইরাল ভিডিওতে দেখা গেছে,পাটনার আন্দোলনে এক যুবক উপস্থিত পুলিশকর্মীকে জিজ্ঞেস করছেন “কাঁদানে গ্যাস, জলকামানের ব্যবস্থা করেছেন?” উত্তরে তিনি না বলায় বলছেন “এ কে ৪৭?” তাতেও না বলায়, যেন ভারি হতাশ হয়ে বলছেন “কিছুরই ব্যবস্থা করেননি?” ক্ষমতাকে এইভাবে খেলো করে দেওয়ার পথ কিন্তু দেখিয়েছেন ঋজু বিদূষকরা। কুণাল কামরার ২০১৯ সালের এক ভিডিওতে দেখা যায়,তিনি বলছেন— প্রত্যেকবার রামনবমীতে নেতারা তলোয়ার হাতে এসে বলেন, মন্দির ইয়হি বনায়েঙ্গে। তলোয়ার দেখেই মুড খারাপ হয়ে যায়। এত ট্যাক্স দিই, তাও এই ব্যাকডেটেড ওয়েপন! রকেট লঞ্চার-টঞ্চার আনুন, যাতে পাবলিকেরও আস্থা থাকে যে নেতা ঠিকঠাক এগোচ্ছেন। প্রায় এই ভাষাই উঠে এসেছে পাটনার ওই যুবকের মুখে।

এই হাস্যরস যে বিরোধী রাজনীতিবিদদের সমান বিপজ্জনক তা বুঝতে পেরে এই বিদূষকদের উপর বহুদিন ধরেই খড়্গহস্ত ডবল ইঞ্জিন সরকারগুলো। কুণাল, মুনাওয়ার ফারুকি সমেত অনেকের বিরুদ্ধে বারবার মামলা মোকদ্দমা হয়েছে; উন্মত্ত জনতার আক্রমণ হয়েছে; তাঁদের শো করার অপরাধে হল ভেঙে দেওয়া হয়েছে। সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মুনাওয়ারকে তো কারাবাস পর্যন্ত করতে হয়েছে। এমনকী এসব নিয়েও ঠাট্টা করেছেন বরুণ গ্রোভার,যাঁকে কুণালরা ওঁদের গুরু বলে মানেন। বরুণ তাঁর ‘নাথিং মেকস সেন্স’ শীর্ষক শোয়ের শুরুতেই বলেন— এমন হতে পারে যে কিছুদিন পরে আপনাদের পুলিশ স্টেশন থেকে ডাক এল। ভয় পাবেন না,শুধু তিনটে প্রশ্নের উত্তর মনে রাখবেন। প্রথমত, শো কোথায় দেখেছেন? বলবেন,অ্যান্টিলায়। দ্বিতীয়ত,কমেডিয়ান কে ছিল?বলবেন,সময় রায়না। তৃতীয়ত,জোক কাকে নিয়ে ছিল?বলবেন,রাহুল গান্ধী।

তাহলে ভারতে এখন বাকস্বাধীনতার অবস্থা কি ভালো, না খারাপ? উত্তরটাও বরুণের কথাতেই দেওয়া যাক।

“ভারতে এখন কমেডি করা খুব শক্ত কাজ, কারণ কমেডির সরাসরি প্রতিযোগিতা বাস্তবের সঙ্গে।”

সত্যি কথা। নইলে সরকার বদলের পর অ্যাকাডেমি অফ ফাইন আর্টসের টিকিট কাউন্টারের রং গেরুয়া করে দিল কর্তৃপক্ষ, আজ এক দল শিল্পী গিয়ে সাদা করে দিলেন, আবার কাল আরেক দল শিল্পী এসে গেরুয়া রং করলেন লাল রং নিয়ে আপত্তি জানিয়ে— এ কি সম্ভব?

a2onuswor.com ওয়েবসাইটে প্রকাশিত

হিংসার রাজনীতির মোকাবিলায় বামপন্থীরা কোথায়?

ওরা আসে গেরুয়া ঝান্ডা নিয়ে, কমিউনিস্টরা লাল ঝান্ডা নিয়ে নামতে পারে। তাতে দুটো জিনিস হবে। এক, দাঙ্গাবাজরা একটু হলেও ভয় পাবে। জানবে, প্রশাসন নিষ্ক্রিয় থাকলেও দাঙ্গা আটকানোর লোক আছে। আর দুই, সাধারণ মানুষ দেখবেন কারা দাঙ্গা আটকাতে নেমেছে।

রামের নাম করে গত কয়েকদিন পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন জায়গায় যে রাবণসুলভ আচরণ চলেছে, খবর পেলাম, তার জেরে আমার দুই খুদে আত্মীয়ার স্কুলের পরীক্ষা পিছিয়ে গেছে। এতদ্বারা সময় জানান দিল যে, আমাদের পরবর্তী প্রজন্মের জন্যে আমরা কোনও উন্নততর ভারতবর্ষ তৈরি করতে পারিনি। কারণ, তিন দশক আগে একইভাবে আমার স্কুলের পরীক্ষাও পিছিয়ে গিয়েছিল। বস্তুত, আমার সময় এর চেয়ে ভালই ছিল বলতে হবে। কারণ, রিষড়া এলাকায় তখন যে অশান্তি দেখা দিয়েছিল তার কারণটা ছিল বিরাট— বাবরি মসজিদ ধ্বংস। সেই ঘটনা ভারতের সামাজিক, রাজনৈতিক ইতিহাসকেই বদলে দেওয়ার ক্ষমতা রাখত, বদলে দিয়েছিলও। কিন্তু আজকের কচিকাঁচাদের পরীক্ষা বাতিল হল এক স্থানীয় গোলমালে, রামনবমী মিটে যাওয়ার পরেও মিছিল বার করে হিংসা ছড়ানোর প্রচেষ্টায়। অর্থাৎ এ রাজ্যে গত শতকের নয়ের দশকে যে অশান্তি সৃষ্টি করতে হলে জাতীয় স্তরে কোনও ঐতিহাসিক কাণ্ড ঘটাতে হত, এখন স্থানীয় স্তরে খানিকটা গুণ্ডামি করেই তার চেয়ে বেশি ক্ষতি করা সম্ভব হচ্ছে।

প্রশ্ন হল, কেন সম্ভব হচ্ছে? কী বদলেছে গত ৩০ বছরে? হিন্দুত্ববাদীদের রাজনৈতিক শক্তি বিপুল পরিমাণে বেড়ে গেছে, তারা লোকসভায় নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছে, সংসদকে নিজেদের বৈঠকখানায় পরিণত করেছে, প্রধানমন্ত্রী এবং বিভিন্ন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী পদে স্বয়ংসেবকদের বসিয়ে দিয়েছে। রাষ্ট্রপতি বিজেপির সদস্য, বিধায়ক এবং মন্ত্রী ছিলেন। উপরাষ্ট্রপতিরও আরএসএসের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার ইতিহাস রয়েছে। তা ছাড়া ভারতের সমস্ত গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানই যে নানা কৌশলে তাদের দখলে চলে গেছে— যেগুলো যায়নি সেগুলোকে দখলে আনার প্রাণপণ চেষ্টা চলছে— তা বুঝতে এখন আর কারও বাকি নেই। কিন্তু সেটাই শেষ কথা নয়। আসল কথা হল, হিন্দুত্ববাদীরা দখল করতে পেরেছে মানুষের মস্তিষ্ক।

বাঙালি হিন্দুরা শ-দুয়েক বছর ধরেই মনে করে তারা দেশের আর সকলের চেয়ে প্রগতিশীল। ইতিহাসে অবশ্য এর কোনও নৈর্ব্যক্তিক প্রমাণ পাওয়া যায় না। বাংলায় চিরকালই ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর ছিলেন, রাধাকান্ত দেবও ছিলেন। সুভাষচন্দ্র বসু ছিলেন, শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ও ছিলেন। দুর্গাপুজো এসে পড়লেই বাঙালি হিন্দুরা ফেসবুকে লিখতে শুরু করে “পুজো যার যার, উৎসব সবার।” কিন্তু ঈদ-উল-ফিতর আর ঈদুজ্জোহার তফাত জানার সাধ নেই। বড়দিনে কেক খেতে না-পারলে ভাত হজম হয় না, পার্ক স্ট্রিটে সপরিবারে নেত্য করতে যেতে হয়। কিন্তু ঈদে কেউ বিরিয়ানি বা হালিম খাচ্ছে দেখলে ফ্যাক করে হেসে ফেলে “এ মা! তুই কি মুসলমান” বলে। জিভে জল আনা খাবারের সম্ভার থাকলেও জাকারিয়া স্ট্রিটে ঈদের মরসুমে এত ভিড় হয় না, যে টিভি চ্যানেলের রিপোর্টাররা মাথায় ফেজ পরে (বড়দিনের সময়ে যেমন স্যান্টা টুপি পরেন আর কি) ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়ে ভিড়ের মধ্যে থেকে একজনকে ডেকে জিজ্ঞেস করবেন “কেমন লাগছে”। সংঘ বাঙালির এই বিভাজনরেখাটাই কাজে লাগিয়েছে। তাই এত স্থানীয় দাঙ্গা করা সম্ভব হচ্ছে।

এ দেশে যাঁরা হিন্দুত্ব রাজনীতি নিয়ে দীর্ঘকাল চর্চা করছেন তাঁরা অনেকে মনে করেন, ২০০২ সালের গুজরাতের মতো রাজ্যব্যাপী দাঙ্গার পরিকল্পনা আরএসএস ত্যাগ করেছে। কারণ শিবপুর, ডালখোলা, রিষড়ার মতো এলাকায় ছোট-ছোট দাঙ্গা করতে পারলে লাভ অনেক দীর্ঘমেয়াদি। দাঙ্গার আগুন ঘরের কাছে চলে এলে মানুষ বেশি ভয় পায়। ফলে “হিন্দু খতরে মে হ্যায়”— এ কথা মনের গভীরে প্রোথিত করা সহজ হয়। যেমন রিষড়ায় দাঙ্গা হলে ঘটনার ল্যাজা-মুড়ো না-জেনেও শ্রীরামপুর, কোন্নগর, হিন্দমোটর, উত্তরপাড়ার সংখ্যাগুরু হিন্দুরা ভাবতে শুরু করেন, তাঁরা খুব বিপদের মধ্যে আছেন। এইসব এলাকার সংখ্যালঘু মুসলমানদের মধ্যেও নিরাপত্তার অভাববোধ বাড়তে থাকে। উভয় পক্ষই ভুলে যান, কয়েক প্রজন্ম ধরে গলাগলি না-হোক, অন্তত পাশাপাশি বাস করছেন তাঁরা। বহু রামনবমী, বহু মহরম গিয়েছে। শীত বসন্ত এসেছে চক্রাকারে, অথচ কারওই কোনও খতরা হয়নি। অর্থাৎ এইসব ছোট-ছোট অল্প তীব্রতার দাঙ্গা লাগানোর উদ্দেশ্য “আমাদেরি আন্তরিকতাতে / আমাদেরি সন্দেহের ছায়াপাত টেনে এনে ব্যথা/ খুঁজে আনা।”

সে কাজে সাহায্য করে নিষ্ক্রিয় প্রশাসন। অন্তর্যামী মুখ্যমন্ত্রী সাতদিন আগে থেকে একের পর এক প্রকাশ্য সভায় বলে যাচ্ছেন “ওরা রামনবমীতে ঝামেলা করবে”, অথচ তাঁরই অধীন পুলিস সে দাঙ্গা আটকাতে পারে না। ঘটনা ঘটে যাওয়ার পর মুখ্যমন্ত্রী কখনও বলেন বিনা অনুমতিতে মিছিল বার করা হয়েছে, কখনও বলেন ওরা মিছিলের রুট বদলে ফেলেছে। যে মিছিলের অনুমতি ছিল না সে মিছিল পুলিস চলতে দিল কেন— দিদিকে এ প্রশ্ন করতে বিখ্যাত সাংবাদিক ভাইটি ভুলে যান। সর্বত্রই যাঁরা স্থানীয় মানুষ, সেদিনের ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী, তাঁদের সঙ্গে কথা বললে প্রদীপ জ্বালাবার আগে সলতে পাকাবার গল্পও শোনা যাচ্ছে এবং সে গল্পে হিন্দুত্ব ব্রিগেড খলনায়কের ভূমিকায় থাকলেও রাজ্যের শাসক দল নেহাত যাত্রার বিবেকের ভূমিকায় নেই। আশার কথা এটুকুই যে, রিষড়ায় ধিকিধিকি জ্বলতে থাকা অশান্তির আগুন নিভে যাওয়ার আগেই কোন্নগর স্টেশনে দাঁড়িয়ে অপরিচিত মানুষদের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে দেখলাম— যা আশঙ্কা করেছিলাম কথাবার্তা সে পথে এগোল না। আগের দিন রাতে বাড়ি ফিরতে গিয়ে রিষড়ার গণ্ডগোলে ট্রেনে আটকে ছিলেন রাত দেড়টা-দুটো অবধি, এমন কয়েকজন আমার আর এক সাংবাদিক বন্ধুর আলোচনায় এসে যোগ দিলেন। আশঙ্কা করছিলাম দু-চার কথার পরেই কিছু অন্য ধর্মের মানুষকে দায়ী করে কিছু মন্তব্য ছুটে আসবে। তা কিন্তু হল না। যাঁরা কথা বলছিলেন তাঁরা পরস্পরের পরিচিত নন, নামধামও জানতে চাননি, ফলে ধর্মীয় পরিচয় প্রকাশিত হয়নি। কিন্তু সকলেই দেখলাম দায়ী করলেন দুটো রাজনৈতিক দলকে, কোনও সম্প্রদায়কে নয়।

যদিও তারপর যে কথা উঠে এল তাতে অস্বস্তি বাড়ল বই কমল না। একজন বললেন “আজকাল তো আমাদের এখানে যা যা হচ্ছে সবই বিশেষ এক ধরনের লোকের জন্যে হচ্ছে। কী ধরনের লোক সেটা আর বলছি না, আপনারা সবাই বুঝতে পারছেন। বিজেপি তো সারাক্ষণ হিন্দু হিন্দু করে। আমরাও তো হিন্দু, আমাদের রোজগারের কিছু সুবিধা হচ্ছে? বাঙালি হিন্দু তো কোনওমতে খেয়েপরে বাঁচছে। লালে লাল হচ্ছে কারা? তারাই তো দাঙ্গা করছে।” রিষড়ায় বরাবরই এক বড় অংশের মানুষ হিন্দিভাষী, হিন্দমোটরেও। বিশেষত যখন বিড়লাদের গাড়ি তৈরির কারখানা চালু ছিল। কিন্তু ইদানীংকালে কোন্নগর, শ্রীরামপুর ইত্যাদি এলাকাতেও দ্রুত হিন্দিভাষী মানুষের সংখ্যা বাড়ছে। সেই প্রেক্ষিতে এই ভদ্রলোকের কথা অশনি সঙ্কেত।

প্রথমত, এ কথায় অন্যের ঘাড়ে নিজের দোষ চাপিয়ে দেওয়ার চিরাচরিত বাঙালি প্রবণতা প্রকট। যেদিন উনি ও কথা বললেন, সেদিনই বিহারের মুঙ্গের থেকে পুলিস গ্রেফতার করে আনল হাওড়ার সালকিয়ার ভেতো বাঙালি সুমিত সাউকে, যাকে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের টুইটে বন্দুক হাতে দেখা গিয়েছিল, যার মা সংবাদমাধ্যমের ক্যামেরায় বলেছেন সে আগে তৃণমূল কংগ্রেসের হয়ে কাজ করত। সুতরাং অবাঙালিরা দাঙ্গা করছে, বাঙালিরা শান্তিপ্রিয় জাত— এ কথায় সত্য ততটা নেই, যতটা আছে পরজাতিবিদ্বেষ।

দ্বিতীয়ত, বোঝাই যাচ্ছে এ তল্লাটে বাঙালি বনাম অবাঙালি সংঘাতের পটভূমি তৈরি হচ্ছে। যেভাবে ভারতের প্রায় ৮০ শতাংশ হিন্দুকে বিশ্বাস করানো হয়েছে ২০-২২ শতাংশ মুসলমান তাদের জন্য বিপদ, প্রায় সেভাবেই হুগলি জেলার শহর-মফস্বলের সংখ্যাগুরু বাঙালি ক্রমশ বিশ্বাস করতে শুরু করেছে যে, তারা হিন্দিভাষীদের কারণে কোণঠাসা হচ্ছে। বিশেষত মধ্যবিত্ত, উচ্চবিত্তদের বিশ্রম্ভালাপে আজকাল অন্যতম জনপ্রিয় বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে কীভাবে “ওরা চারিদিকে ছেয়ে যাচ্ছে”। এর পিছনে স্থানীয় হিন্দিভাষীদের ব্যবহার যে একেবারেই দায়ী নয় তা-ও বলা যাবে না। শুধু এখানে কেন, পশ্চিমবঙ্গের বহু জায়গাতেই এমন অনেক আবাসন গড়ে উঠছে যেখানকার সংখ্যাগুরু হিন্দিভাষী ফ্ল্যাটমালিকরা নিয়ম করে দিচ্ছেন, আমিষাশী হলে তাকে ফ্ল্যাট ভাড়া দেওয়া যাবে না। বাজারঘাটে বিক্রেতা বা অন্য লোকেদের হিন্দিতে কথা বলতে বাধ্য করা, না-বললে বাংলা না-বোঝার ভান করার মতো ঘটনাও দেখা যাচ্ছে। এ রাজ্যের বামপন্থীরা তো অর্থনৈতিক সমস্যা ছাড়া সব সমস্যাকেই মনে করেন নজর ঘুরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা। তাই যেমন হিন্দু-মুসলমান দাঙ্গা থামানোর কাজে তাঁদের দেখা যাচ্ছে না, তেমন এইসব ক্রমবর্ধমান সামাজিক দ্বন্দ্বের নিরসনেও তাঁদের পাত্তা পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে ঢুকে পড়ছে বাংলাপক্ষের মতো দক্ষিণপন্থী সংগঠন। এখন যেমন হিন্দু-মুসলমানে লাঠালাঠি লাগিয়ে রাজনৈতিক ফায়দা তোলার চেষ্টায় রয়েছে তৃণমূল, বিজেপি; আগামীদিনে নগরায়নে ভোল বদলে ফেলা এলাকাগুলোতে তেমনই বাঙালি বনাম অবাঙালি বাইনারি সৃষ্টি করে একই খেলা চলতে থাকবে বলে আশঙ্কা হয়। গত বিধানসভা নির্বাচনেই তার লক্ষণ দেখা গেছে। তৃণমূল বিজেপির হিন্দুত্বকে যতখানি আক্রমণ করেছিল তার চেয়ে বেশি করে বলেছিল বিজেপি বহিরাগতদের পার্টি। ‘বাংলা নিজের মেয়েকেই চায়’ স্লোগানেও প্রচ্ছন্ন ছিল এই ইঙ্গিত। এদিকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকার ছটপুজোয় সরকারি ছুটি দেয়, হিন্দি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করে। পাশাপাশি বাংলা মাধ্যম স্কুলগুলোকে লাটে তুলে দেওয়ার ব্যবস্থা করে।

কোনও না-কোনও কাল্পনিক বাইনারি তৈরি করে আমাদের নিয়ে শাটল ককের মতো খেলে চলেছে দুটো রাজনৈতিক শক্তি। এ জিনিস আটকাতে দরকার এমন এক তৃতীয় পক্ষ, যারা স্রেফ কেন্দ্র আর রাজ্য সরকারের কর্মসূচি এবং দুর্নীতিকে নয়, আক্রমণ করে আদর্শকে। অথচ এ রাজ্যের বামপন্থীরা কিছুতেই সিবিআই, ইডি, ডিএ, নিয়োগ দুর্নীতির বাইরে কোনওকিছু নিয়ে আক্রমণাত্মক হতে রাজি নন। দাঙ্গা কেন হচ্ছে, তার ব্যাখ্যা দিয়েই তাঁরা ক্ষান্ত। এমন নয় যে ভুল ব্যাখ্যা দিচ্ছেন, কিন্তু সেখানেই তাঁদের কাজ শেষ হয় কী করে? কার্ল মার্কস তো বলেছিলেন, দার্শনিকরা পৃথিবীটাকে নানাভাবে ব্যাখ্যা করেছেন। কিন্তু কাজ হল পৃথিবীটাকে বদলানো। কমরেডরা সে কথা ভুলে গেলেন নাকি? এ রাজ্যে যে বামপন্থী দলগুলোর উপস্থিতি আছে তাদের সদস্য-সমর্থকদের কথা শুনলে দুঃখে হাসি পায়।

সিপিএমের লোকেরা বারবার শুনিয়ে যান সরকারে থাকার সময়ে তাঁদের দল কীভাবে দাঙ্গা আটকাত আর তৃণমূল সরকার তার সাপেক্ষে কতখানি ব্যর্থ। মার্কসবাদে দেবতা নেই জানি, অপদেবতা আছে কিনা জানি না। এঁদের কথা শুনলে মনে হয় আশা করে আছেন জ্যোতি বসুর ভূত এসে দাঙ্গাবাজদের ঘাড় মটকে দিয়ে যাবে, এঁদের স্বহস্তে কিছু করার প্রয়োজন নেই। তাঁরা কী করছেন, এ প্রশ্ন তুললে আবার কেউ কেউ খাঁটি আমলাতান্ত্রিক ঢঙে বলেন “দাঙ্গা আটকানো সরকারের দায়িত্ব।” কেউ বা বলেন “পুলিশ মিছিল করার অনুমতি দিচ্ছে না। কী করব?” জ্যোতি বসু, মহম্মদ ইসমাইল, বিনয় চৌধুরীরা এত লক্ষ্মী ছেলে হলে সিপিএম কোনওদিন ক্ষমতায় আসত বলে মনে হয় না। এঁরাও সে আমলে কীভাবে দাঙ্গা আটকানো হত, তা নিয়ে জাঁক করার সুযোগ পেতেন না।

অন্যদিকে লিবারেশনের নেতা-কর্মীরা আন্তরিক প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন দাঙ্গার দায় যেন সবটাই বিজেপির ঘাড়ে চাপে। তৃণমূল সরকারের গায়ে ছিটেফোঁটা কাদা লাগলেও ফ্যাসিবিরোধী লড়াই দুর্বল হয়ে যাবে। অথচ তাঁদেরই পার্টির উত্তরপাড়া আঞ্চলিক কমিটির প্রাথমিক তথ্যানুসন্ধান রিপোর্ট রিষড়ার ঘটনা সম্পর্কে বলছে “যেখানে গত বছর মসজিদের সামনে দিয়ে মিছিল যাওয়ার সময়ে রীতিমতো রাস্তার ধারে ব্যারিকেড করে মিছিল পার করা হয়েছিল সেখানে এ-বছর তেমন কিছু ছিল না এবং অল্পসংখ্যক কয়েকজন পুলিশকর্মী মসজিদের সামনে মোতায়েন ছিলেন, যাদের অধিকাংশই গণ্ডগোলের সময়ে রীতিমত আহত হন।”

আরও বামদিকে যেসব দল আছে, যাদের কোনও নির্বাচনী স্বার্থ নেই, তারা ঠিক কী করছে জানি না। এনআরসি-সিএএ বিরোধী আন্দোলনে কিন্তু তাদের উজ্জ্বল উপস্থিতি ছিল। স্বীকার্য যে, তারপর থেকে তাদের উপরে রাষ্ট্রীয় আক্রমণ (রাজ্য সরকারের দিক থেকেও) বেড়েছে। তা ছাড়া পশ্চিমবঙ্গের অধিকাংশ জায়গায়, বিশেষত রিষড়া বা শিবপুরের মতো নগরায়িত এলাকায় তাদের ক্ষমতাও নগণ্য।

ভারতের কমিউনিস্টদের দাঙ্গার সময়ে রাস্তায় নেমে দাঙ্গা আটকানোর ইতিহাস আছে বলেই তাঁদের কাছে আশা করা। ক্ষমতাসর্বস্ব তৃণমূল আর পশ্চিমবঙ্গের অধিকাংশ অঞ্চল থেকে উধাও কংগ্রেসের কাছে আশা করতে যাবে কোন আহাম্মক?

আরও পড়ুন পশ্চিমবঙ্গে নির্বাচন প্রহসনে পরিণত হলে ক্ষতি নেই বিজেপির

এসব নিয়ে এক মার্কসবাদী দলের কর্মী বন্ধুর কাছে দুঃখ করছিলাম। সে যা বলল সেটাই বোধহয় সার কথা। তার বক্তব্য, সংসদীয় এবং সংসদ-বহির্ভূত— সব ধরনের কমিউনিস্ট মিলিয়ে বিজেপি শাসনের আট বছরে হাজার খানেক সেমিনার ও সভা করে ফেলেছে, যার বিষয় ভারতে ধর্মীয় ফ্যাসিবাদের উত্থান এবং তাকে আটকানোর উপায়সমূহ। তারপরেও শিবপুর, ডালখোলা বা রিষড়া ঘটেই চলেছে। ঘটে যাওয়ার পর কমিউনিস্টরা কিছু শান্তি মিছিল, মিটিং, পোস্টারিং ইত্যাদি করছে। কিন্তু দাঙ্গা আটকাতে পারছে না। এর কারণ হল, হিন্দুত্ববাদীরা এবং তাদের স্যাঙাত দলগুলো দাঙ্গা লাগানোকে একটা রাজনৈতিক প্রকল্প হিসেবে দেখে। তার জন্যে রীতিমত পরিকল্পনা করে, সেই পরিকল্পনাই রাস্তায় নেমে প্রয়োগ করে। কিন্তু কমিউনিস্টরা দাঙ্গা আটকানোকে প্রকল্প হিসেবে দেখছে না কিছুতেই। দাঙ্গাবাজদের বিরাট দল থাকতে পারে, কমিউনিস্টদের তো অন্তত ছোটখাটো দল আছে নানা জায়গাতেই। সেই কটা লোককে একত্র করেও তো পাল্টা রাস্তায় নামা যায়। ওরা আসে গেরুয়া ঝান্ডা নিয়ে, কমিউনিস্টরা লাল ঝান্ডা নিয়ে নামতে পারে। তাতে দুটো জিনিস হবে। এক, দাঙ্গাবাজরা একটু হলেও ভয় পাবে। জানবে, প্রশাসন নিষ্ক্রিয় থাকলেও দাঙ্গা আটকানোর লোক আছে। আর দুই, সাধারণ মানুষ দেখবেন কারা দাঙ্গা আটকাতে নেমেছে। ফলে বাইনারি যদি তৈরি হয়ও, তা ভেঙে যাবে।

নিশ্চয়ই আমার বন্ধুটি একমাত্র লোক নয় যে এভাবে ভাবছে। কিন্তু এরকম ভাবনার লোকেরা সম্ভবত সব দলেই সংখ্যালঘু। ফলে দোকানপাট পুড়লে, মাথা ফাটলে, হাত-পা ভাঙলে, পরীক্ষা পেছোলে আমরা এই ভেবে সান্ত্বনা পাব যে, কেউ মারা যায়নি, কেউ ধর্ষিত হয়নি। রামনবমীর পর হনুমান জয়ন্তী নিয়ে তটস্থ হয়ে থাকব। সেটা মিটলে ক্যালেন্ডারে খুঁজব, আবার কবে কোন পুজো আছে। সেদিন বাড়ি থেকে না-বেরোলে চলে কিনা।

সত্যিই, কী চমৎকার ভারতবর্ষ সাজিয়েছি ছোটদের জন্যে!

চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম ওয়েবসাইটে প্রকাশিত