এমন দেশ বা জাতি নাই, যাহাতে ভগবান তাহাদের জন্য কোনো ধর্মগুরুকে পাঠান নাই।
হিন্দুস্থান কে দো পয়গম্বর, রাম ঔর কৃষ্ণ।
হিন্দুদের কোনো ধর্মগ্রন্থে আছে কথাগুলো? নাকি কোনো হিন্দু ধর্মগুরু বলেছেন?
কোনোটাই নয়। প্রথম বাক্যটা আছে কোরান শরীফে, আর ওই বাক্যকে আশ্রয় করেই দ্বিতীয় বাক্যটা উচ্চারণ করেছিলেন নিজামুদ্দীন আউলিয়ার দরগার হাফিজ হুসেন নিজামী।
উদার, ধর্মনিরপেক্ষ, শিক্ষিত হিন্দুদের আড্ডাতেও বারবারই উঠে আসে একটা কথা – হিন্দুধর্ম অনেক উদার, ইসলামে কড়াকড়ি অনেক বেশি। তাই মুসলমানদের অনেকে উদার হলেও, ওদের মধ্যে গোঁড়ামি বেশি। হিন্দু পরিবারে জন্মে একথা বারবার শুনতে শুনতে দুরকম প্রতিক্রিয়া হওয়া সম্ভব। এক, বদ্ধমূল ধারণা হয়ে যাওয়া যে কথাটা ঠিক। দুই, কথাটা ঠিক কিনা খুঁজে দেখার ইচ্ছা তৈরি হওয়া। দ্বিতীয় প্রতিক্রিয়া হলেও ব্যাপারটা নেহাত সহজ নয়। হিন্দুধর্মের কোনো একমেবাদ্বিতীয়ম পবিত্র গ্রন্থ নেই, আব্রাহামের সন্তানদের ধর্মগুলোর (জুডাইজম, খ্রিস্টধর্ম, ইসলাম) ক্ষেত্রে সে সুবিধা আছে। কিন্তু কেবল কোরান পড়লেই ইসলামের সব জানা হয়ে যায় না (এবং হাদিশ পড়লেও নয়), কেবল বাইবেল পড়লেই খ্রিস্টধর্মের আদ্যোপান্ত আয়ত্ত হয় না। পৃথিবীর যে কোনো ধর্মের আগাপাশতলা জানতে পড়তে হয় প্রচুর বইপত্র, লেগে যায় গোটা জীবন। আমাদের অনেকের জীবনেরই আর বড়জোর অর্ধেক বাকি আছে। তাহলে আজকের সর্বগ্রাসী বিদ্বেষ, ভুয়ো ইতিহাস, ভুয়ো খবরের যুগে সত্য যাচাইয়ের উপায় কী? ভারতের প্রধান দুটো ধর্মীয় সম্প্রদায় – হিন্দু আর মুসলমান। তাদের মধ্যে সংঘাতের যে অনস্বীকার্য দীর্ঘ ইতিহাস, তার মূল একেবারে ভাবনার জায়গাতেই কিনা, তা জানার উপায় কী? পাঠ্য ইতিহাসে যেটুকু পড়েছিলাম আমরা, সেটুকু তো পরীক্ষার খাতায় উগরে দেওয়ার জন্যে মুখস্থ করা। ফলে পরীক্ষা দেওয়ার পাট চুকে যাওয়া মাত্রই বেমালুম ভুলে গেছি। এমতাবস্থায় আমার মত অপণ্ডিতদের একটাই উপায় – যাঁরা আজীবন এই প্রচেষ্টা চালিয়েছেন তাঁদের শরণাপন্ন হওয়া। ক্ষিতিমোহন সেন তেমনই একজন। তাঁর ভারতে হিন্দু-মুসলমানের যুক্ত সাধনা বইটার নাম শুনেছি অনেক, কিন্তু চোখে দেখিনি আগে। যাঁদের লেখায় এই বইয়ের উল্লেখ পেয়েছি তাঁরা অনেক দূরের মানুষ। ফলে ধারণা ছিল, নির্ঘাত ওটা ইয়া মোটা একখানা বই এবং অমন একজন পণ্ডিতের লেখা যখন, তখন পড়তে গেলে মাথা চুলকেই দিন কেটে যাবে। ফলে এবারের কলকাতা বইমেলায় যখন ন্যাশনাল বুক এজেন্সির স্টলে ঢুকে আবিষ্কার করলাম বইটা দু আঙুলেই তুলে ফেলা যায়, পাতার সংখ্যা মাত্র ১১১, তখন কিনে ফেলতে দেরি করিনি।
পড়লাম, মনের অনেক অন্ধকার দূর হল। কিন্তু এত প্রসিদ্ধ ইতিহাস বিষয়ক বইয়ের আলোচনা আমার লেখা উচিত হবে কিনা, তা নিয়ে দ্বিধায় ছিলাম। দ্বিধা কাটল এই বইয়ের প্রকাশকালের সঙ্গে আমার কালের মিল উপলব্ধি করে। ভ্রাতৃঘাতী দাঙ্গার মধ্যে ১৯৪৭ সালে ভারত দ্বিখণ্ডিত এবং স্বাধীন হয়, ১৯৪৮ সালে নাথুরাম গডসের গুলিতে খুন হন মহাত্মা গান্ধী আর ১৯৪৯ সালে স্বাধীন ভারত হিন্দুরাষ্ট্র না হয়ে ধর্মনিরপেক্ষ সংবিধান গ্রহণ করে। সেবছরই প্রকাশিত হয় এই বই। বস্তুত, পরিশিষ্টের ‘মহাবীর ভীষ্ম’ শীর্ষক লেখার উপরে ছোট অক্ষরে লেখা আছে:
মহাত্মা গান্ধীর মৃত্যুসংবাদ পাইবার অব্যবহিত পরে লেখা। যে ছাত্রটি দুঃসংবাদ বহন করিয়া লেখককে সঙ্গে করিয়া আশ্রম-কেন্দ্র, গৌর-প্রাঙ্গণে লইয়া গিয়াছিলেন, অল্প কয়েক বৎসরের মধ্যে তিনিও এক উন্মত্ত আততায়ী দলের হস্তে নিহত হন। ছাত্রটি তখন দূর দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের নবনিযুক্ত অধ্যাপক।
লক্ষ করে দেখলাম, সেইসময় দাঁড়িয়ে লেখা এই বইয়ের প্রথম পাতা থেকে শেষ পাতা পর্যন্ত প্রায় সবটাই আমার সময়ে উদ্ধৃতিযোগ্য। অতএব যোগ্যতর আলোচকের সন্ধানে কালক্ষেপ না করে লিখে ফেলাই কর্তব্য। এই লেখার লক্ষ্য আমার মত ইতিহাসে অদীক্ষিত পাঠকরা – ইতিহাসবোধহীন জীবনযাপন যাদের জীবনকে ক্রমশ বিপদসংকুল করে তুলছে – তাদের এই সামাজিক ও রাজনৈতিক তাৎপর্যপূর্ণ বইয়ের সন্ধান দেওয়া, বইটা পড়তে উস্কানি দেওয়া।
এই লেখার শুরুতে উদ্ধৃত লাইনগুলো ইসলাম ধর্ম এবং মুসলমানদের গোঁড়ামি সম্পর্কে বদ্ধমূল ধারণার পরিপন্থী। তবে ক্ষিতিমোহনের বইয়ের ঠিক ওই পাতাতেই আছে আরও কয়েকটি বাক্য, যা ওই ধারণার মূল ধরেই টান দেয়:
কুরান আরও বলেন, হজরতের পূর্বে যেসব মহাপুরুষ ধর্ম সম্বন্ধে যাহা কিছু উপদেশ দিয়া গিয়াছেন সেইসব সত্যও বিশ্বাস করিতে হইবে।
পূর্ববর্তী সব সত্যকে আরও দৃঢ়ভাবে ঘোষণা করাই কুরানের কাজ।
ওই অধ্যায়েই কিছু পরে ক্ষিতিমোহন লিখছেন:
নানাজনে কুরানকে নানাভাবে ব্যাখ্যা করিয়াছেন। ব্যাখ্যাতাদের ইমাম বলে। এই ব্যাখ্যানে হজরত প্রত্যেককেই প্রভূত স্বাধীনতা দিয়াছেন। তাঁহার নিজেরই কথা আছে যে, তাঁহার ধর্মে নানা যুক্তি অনুসারে তিয়াত্তরটি দল হইবে। তিনি বলিয়াছেন, আমার দলে যে মতের ভেদ হয় তাহা ভগবানেরই দয়া – ইখতিলাফু উম্মতি রহমতুন।
যে ধর্মগ্রন্থে ধর্মের প্রতিষ্ঠাতার জন্মেরও আগে অন্য যাঁরা যা উপদেশ দিয়েছেন তাও বিশ্বাস করতে বলা হয় এবং যে ধর্মের প্রতিষ্ঠাতা নিজেই মতভেদকে ঈশ্বরের আশীর্বাদ বলে আখ্যা দেন, সেই ধর্মে মৌলিকভাবেই কড়াকড়ি বা গোঁড়ামি বেশি – এমনটা যে কেবল অজ্ঞানতাবশতই বলা সম্ভব তাতে সন্দেহ কী? তবে একথা অনস্বীকার্য যে কোনো ধর্মগ্রন্থে কী লেখা আছে তা দিয়ে মানুষের – বিশেষ করে অন্য ধর্মের মানুষের – খুব একটা কিছু এসে যায় না। এসে যায় সেই ধর্মের মানুষ কীভাবে ধর্মপালন করছেন তা দিয়ে। অনেকে এই যুক্তিতেই বলবেন, কোরানে যা-ই বলা থাক আর হজরত মহম্মদ যা-ই বলে থাকুন, বাস্তবে দেখা যায় মুসলমানরা অন্য ধর্ম সম্পর্কে মোটেই সহিষ্ণু নয়। ধর্মাচরণে মোটেই উদার নয়। একথাও যে সত্য নয়, ভারতবর্ষীয় মুসলমানদের ধর্মাচরণ যে যুগে যুগে এর উল্টোটাই প্রমাণ করেছে, তা এই বই পড়লে দিনের আলোর মত স্পষ্ট হয়ে যায়। অনেকে অবশ্য কিছুটা উদারতা দেখিয়ে বলে থাকেন – ভারতীয় মুসলমানরা পৃথিবীতে অনন্য। এখানে বিশেষত সুফিদের উদ্যোগে হিন্দু-মুসলমানের সাধনা মিলেমিশে যাওয়ায় তাঁরা উদার। কিন্তু আরব মুসলমানরা এরকম নয়। এই মতেরও মূলে আছে অজ্ঞানতা। যেন সুফিবাদ আকাশ থেকে টুপ করে ভারতেই পড়েছিল। ক্ষিতিমোহন ইসলামের জন্মলগ্ন থেকে একের পর এক সাধকের উল্লেখ করে তাঁদের উদারতা দেখিয়েছেন। তার মধ্যে যাঁর কথা উদার, অনুদার নির্বিশেষে হিন্দুদের সবচেয়ে চমৎকৃত করবে এবং গোঁড়া মুসলমানদের রুষ্ট করবে, তাঁর দৃষ্টান্তই নেওয়া যাক। তাঁর নাম অবু অল আলা মু-অররীর। ইনি মোটেই ভারতীয় নন। ৯৭৩ খ্রিস্টাব্দে মরক্কোতে এঁর জন্ম। ক্ষিতিমোহন লিখছেন তিনি বলতেন
পৌত্তলিকতা ছাড়িয়াছ বলিয়া তো গর্ব কর। ভাবিয়া দেখিয়াছ কি, তুমি নিজে কত বড়ো পৌত্তলিক? বিশেষ-শাস্ত্র বিশেষ-গ্রন্থ বিশেষ-ভাষা বিশেষ-দেশ বিশেষ-দিন ও বিশেষ-দিককেই যদি একমাত্র পবিত্র মানো তবে তাহাও তো পৌত্তলিকতা। দেবপূজা ছাড়িয়া দেবালয় অর্থাৎ মসজিদেরই পূজা যদি কর তবেই বা কম পৌত্তলিকতা কি?
এ পর্যন্ত এসে পাঠক প্রশ্ন করতে পারেন, ক্ষিতিমোহন কি বেছে বেছে মুসলমানদের উদারতার দৃষ্টান্তই তুলে ধরেছেন? নাকি আমিই তাঁর বই থেকে বেছে বেছে সেগুলো তুলে ধরছি? সম্ভবত এমন প্রশ্নের মোকাবিলা ক্ষিতিমোহনকেও করতে হত। তাই ‘মিলিত সাধনা’ অধ্যায়ে তিনি লিখছেন
হিন্দু-মুসলমান সাধনা এদেশে এমন যুক্ত হইয়া গিয়াছে যে রচনা দেখিয়া লেখক হিন্দু কি মুসলমান তাহা বলা অসম্ভব। দরাফ খাঁর রচিত সংস্কৃত গঙ্গাস্তব তো অতি নিষ্ঠাবান ব্রাহ্মণেরও নিত্যপাঠ্য।
আবার তুলসী সাহেব হাথরসীর জন্ম ১৭৬০ খ্রিস্টাব্দে বেদপরায়ণ মহারাষ্ট্রীয় ব্রাহ্মণ বংশে। যৌবনেই তিনি সন্ন্যাসী হইয়া যান। তাঁহার লেখা দেখিয়া মনে হয় যেন মুসলমানেরই লেখা। একটু নমুনা দেওয়া যাউক:
রোজা নিমাজ বাংগ অংদর মাহীঁ
আশীক মাশূক মিহর দিদা সাঈঁ।।
রোজা, নামাজ, নামাজের জন্য ডাক সবই অন্তরের মধ্যে। প্রেমিক, প্রেমাস্পদ, প্রেম, প্রেমময় স্বামীর সঙ্গে প্রত্যক্ষ যোগ সবই আমাদের ভিতরে।
‘মিলিত সাধনা’ অধ্যায়ে ক্ষিতিমোহন এক নাতিদীর্ঘ তালিকা দিয়েছেন, যা হিন্দুদের উদারতার তালিকা না মুসলমানদের উদারতার তালিকা তা বলা মুশকিল। গুজরাটের খোজা কাকাপন্থী ইমামশাহী মৌল-ইসলাম মতিয়া সংঘ; রাজপুতানার মেও, মিরাশি, লবানা, সখীসরবরের উপাসকদের কথা লিখেছেন। এঁদের বৈশিষ্ট্য হল এঁরা পুরোপুরি হিন্দু হয়েও মুসলমানি সাধনার সঙ্গে যুক্ত। এঁদের বাড়িতে নানা হিন্দু আচার, রামনবমী, জন্মাষ্টমী ইত্যাদি পালিত হয়। সামসী সম্প্রদায়ের লোকেরা গীতাও মানেন, মুসলমান গুরুদেরও মানেন। রসুলসাহীরা তান্ত্রিক যোগসাধন করেন। গঞ্জামের আরুবারা, তৈলঙ্গের কাটিকরাও এইরকম। ক্ষিতিমোহন লিখছেন, বোহরারা একদা ব্রাহ্মণ ছিলেন এবং তাঁদের মধ্যে অনেক ব্রাহ্মণসুলভ আচার বিচার রয়ে গেছে। ডফালী, ঘোসীরাও আধা হিন্দু, আধা মুসলমান। এই জাতীয় ব্রাহ্মণদের বলা হয় হুসেনী ব্রাহ্মণ। এঁরা পাণ্ডার কাজ করেন। কোনো মন্দিরে নয়, আজমীরে মৈনুদ্দীন চিশতীর দরগায়। কাশীর ভর্তরীরা আবার যোগী। রীতিমত গেরুয়া ধারণ করেন, হিন্দু আচার পালন করেন। অন্তত ক্ষিতিমোহনের সময়ে হিন্দুদের ক্রিয়াকর্মের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ ছিল তাঁদের গান। অথচ ভর্তরীদের গুরু মুসলমান।
হিন্দুধর্ম বলতে যাঁরা উঁচু পাঁচিল দেওয়া একটা নির্দিষ্ট ভূমিখণ্ড জাতীয় জিনিসকে বোঝেন, ‘হিন্দুধর্মে উদারতার বাণী’ অধ্যায়ের প্রথম দুটো অনুচ্ছেদে বলা কথাগুলো তাঁদের কতটা পছন্দ হবে তা বলা শক্ত:
ধর্ম সম্বন্ধে ভারতের ইতিহাস একটু বিচিত্র। যাহা বৈদিকধর্ম তাহাই যে ঠিক হিন্দুধর্ম এ কথা সত্য নহে। প্রাচীনকাল হইতেই এদেশে অবৈদিক বহু সংস্কৃতি ও ধর্ম ছিল। সেইসব অবলম্বন করিয়াই হিন্দুধর্ম। বৈদিকধর্ম কর্মকাণ্ড প্রধান, দ্রাবিড়ধর্ম ভক্তিপ্রধান। এইসব নানা সংস্কৃতির ও ভিন্ন ভিন্ন ধর্মের পলিমাটির স্তর পড়িয়া ভারতের ধর্মভূমি গড়িয়া উঠিয়াছে…
শৈব ও বৈষ্ণব প্রভৃতি ভাগবতধর্মে বৈদিক কর্মকাণ্ড বিশেষ কিছুই নাই। বেদ তিন ভাগে বিভক্ত, কর্মকাণ্ড, উপাসনাকাণ্ড ও জ্ঞানকাণ্ড, যে অংশে যজ্ঞাদি কর্মের বিধান আছে তাহা কর্মকাণ্ড। ভাগবতধর্মের প্রাণই হইল প্রেম ভক্তি ও পূজা। বাহির হইতে আগত গ্রিক হুণ শক প্রভৃতির দল বৈদিক দলে ঢুকিতে না পারিলেও ভক্তিপ্রধান ভাগবতধর্মে সকলে সাদরে গৃহীত হইয়াছেন।
অন্তত বেদকে যে অভিন্ন, অভ্রান্ত একটা জিনিস বলে ভাবব তারও জো নেই। ক্ষিতিমোহন লিখেছেন বেদ আর্য সাধনার প্রাচীনতম ভাণ্ডার, কিন্তু একই কালের বা একই দলের জিনিস নয়। বেদে বেদেও বিরোধ ছিল। মোটামুটি ঋগ্বেদই প্রাচীনতম, সামবেদ ও সামগান তুলনায় নতুন। মজার কথা
এই সামবেদকেও একদিন ঋগ্বেদ সহিতে পারে নাই। সামবেদ-গান ঋগ্বেদীয়দের কানে পেচক-শৃগাল-কুকুর-গাধার ডাকের মতোই মনে হইত।
‘সংগীত’ নামের এই অধ্যায়ে ভাগবত মুনিদের যুগের কথা এসেছে একটু পরেই। সেখানেও দেখা যায় প্রতিষ্ঠা পাওয়ার পরেই মুনিদের মধ্যে মতভেদ। ক্ষিতিমোহনের ভাষায়
এখনকার দিনেও রাজনীতিতে দেখা যায় কোনো একটা দল শক্তি ও প্রতিষ্ঠা লাভ করিলে তখন নানা দল দেখা দেয়। তখনকার দিনেও দেখা যায় সংগীতে ভাগবত-মত প্রতিষ্ঠার সঙ্গে সঙ্গে নানা মতবাদ চলিল। এমন একজন মুনি নাই যাঁহার সঙ্গে অন্যের মতভেদ না আছে।
নাসৌ মুনির্যস্য মতং ন ভিন্নম্।।
সংগীতের প্রসঙ্গেই ফিরে আসা যাক বাস্তবে ইসলাম ধর্মাবলম্বীরা কেমন আচরণ করেন সে প্রশ্নে। এই বইয়ের লেখক যেন পাঠক পড়তে পড়তে কী ভাববেন তা আগে থেকেই জানতেন। মনে প্রশ্ন ওঠামাত্রই দেখা যায় তার উত্তর হাজির
একটা কথাতে বড়োই বিস্ময় লাগে। সংগীতকলা মুসলমানশাস্ত্রে নিষিদ্ধ। অথচ বড়ো বড়ো ওস্তাদেরা তো প্রায় সকলেই মুসলমান। মুসলমানশাস্ত্রে যাহাই থাকুক মুসলমান-তীর্থে তো সংগীত খুবই প্রচলিত। আজমীরে মৈনউদ্দীন চিশতীর দরগা হইল ভারতে মুসলমানদের সর্বশ্রেষ্ঠ তীর্থ। সেখানে মূল তোরণে প্রহরে প্রহরে নহবত বাজে। ভিতরে প্রত্যেক পবিত্র স্থানে গায়ক-গায়িকারা যাত্রীদের পুণ্যার্থ সংগীত করেন ও যাত্রীরা তাহার জন্য রীতিমত দক্ষিণা দেন।
স্বভাবতই কাশীর মন্দিরে মন্দিরে মুসলমান বাদকদের সানাই ও নহবতের কথা এসেছে। নাকাড়ার বহু গৎ যে সম্রাট আকবর প্রবর্তিত সেকথাও এসেছে। ভারতীয় ধ্রুপদী সংগীতের বাজনা থেকে বিভিন্ন রাগ সৃষ্টি – সবেতেই যে মুসলমানদের বিপুল অবদান সেকথা সঙ্গীতপ্রেমী মাত্রেই জানেন। ক্ষিতিমোহন প্রত্যেকটা উদাহরণ সবিস্তারে লিখেছেন। ব্যাপারটা যে শুধু আমির খুসরো আর তানসেনের অবদানে শেষ নয়, আমাদের কালের ওস্তাদ বিসমিল্লা খানের সরস্বতীর প্রতি ভক্তি যে আকাশ থেকে পড়েনি এবং তাঁর বাড়ি মাটিতে মিশিয়ে দিয়ে তাকে মুছে দেওয়াও যাবে না – তা স্পষ্ট হয় এই অধ্যায়ে। তবে চমকে দেওয়ার মত তথ্য এগুলো নয়। চমকে উঠতে হয় যখন ক্ষিতিমোহন ঔরঙ্গজেবের সঙ্গীতপ্রীতির আলোচনায় আসেন। সেই ঔরঙ্গজেব, যিনি প্রায় সব মতের ঐতিহাসিকদের ভাষ্যেই অত্যন্ত গোঁড়া মুসলমান এবং হিন্দুদের উপর দমনপীড়নের সবচেয়ে বড় প্রতিভূ।
লেখক বলছেন ঔরঙ্গজেব হিন্দি গীত-কবিতার অনুরাগী ছিলেন, তাঁর দরবারে বড় বড় গায়কও ছিলেন। ঔরঙ্গজেবের জন্মদিনে নতুন ধ্রুপদ এবং খেয়াল রচিত হত। সেসব গান সুরক্ষিত আছে এবং ছাপার অক্ষরে প্রকাশিতও হয়েছে। রাগ টোড়ীতে রচিত এরকম একটা গানে আছে
অকবর সুত জহাঁগীর তাকে শাহজহাঁ
তাকো সুত ঔরংগজেব ভয়ো হৈ ভুর পর।
এরকম আরও অনেকগুলো গানের দৃষ্টান্ত কলাবতী-গীতসংগ্রহে পেয়েছেন বলে ক্ষিতিমোহন জানিয়েছেন। শুধু তাই নয়, ঔরঙ্গজেবের দরবারে গীত-কবি হিসাবে ব্রাহ্মণবংশীয় আলম পণ্ডিত ছিলেন বলে জানা গেছে। ঔরঙ্গজেবের নাতি আজিমুশশানকে যখন ঢাকায় পাঠিয়ে দেওয়া হয় শাসক হিসাবে, তখন তিনি প্রবাসের দুঃখ দূর করতে কবি আলমকে সঙ্গে নিয়ে যেতে চেয়েছিলেন। কিন্তু আলম তাঁর প্রেমিকাকে ছেড়ে অতদূর যেতে রাজি হননি। তখন আজিমুশশান চাইলেন আরেক কবি কলাবত কালিদাস ত্রিবেদীকে। তাঁকে আবার ঔরঙ্গজেব ছাড়তে চাইলেন না।
এসব প্রমাণ দেখে ক্ষিতিমোহনের অনুমান
ঔরংগজেব অতিশয় নিষ্ঠাবান মুসলমান ছিলেন। চরিত্রগত নীতির শৈথিল্য তিনি সহিতে পারিতেন না। গায়ক ও কলাবতদের মধ্যে নীতিগত শৈথিল্যে হয়তো তিনি রুষ্ট হইয়া থাকিবেন; তাই তাঁহাদের গানকে তিনি নিষিদ্ধ করিয়া থাকিবেন।
অবশ্য সঙ্গীত, চিত্রকলা এবং স্থাপত্যশিল্পে অবদানের জন্যে অন্য মোগল সম্রাটদের অবিমিশ্র প্রশংসা করলেও বাদশাহ আলমগীর সম্পর্কে ক্ষিতিমোহনের ভাবনায় স্ববিরোধিতা রয়েছে বলে মনে হয়। কারণ ‘স্থাপত্যশিল্প’ অধ্যায়ে তিনি লিখেছেন:
ঔরংগজেব নানা উপায়ে পিতৃসিংহাসন অধিকার করিয়াই ধর্মের নামে শিল্পকে নির্বাসিত করিলেন আর গোঁড়া মুসলমান কারিগর ছাড়া আর সব শিল্পীদের তাড়াইয়া দিলেন। ইহার পরেই মোগল দরবারে শিল্পসৃষ্টির অবসান হইয়া গেল।
চিত্রশিল্পের আলোচনায় ক্ষিতিমোহন স্পষ্ট লিখেছেন
মুসলমান ধর্মের অনুশাসনে শিল্পসাধনা নানাভাবে বদ্ধ হইয়া পড়িয়াছিল। তাহাকে সম্পূর্ণ মুক্তি দিতে না পারিলেও মোগল সম্রাটেরা বন্ধন দুঃখ অনেকটা ঘুচাইলেন। মোগল বাদশাবৃন্দের সময়ে মৃত্যুপাশ হইতে অনেক পরিমাণে মুক্ত হইয়া ভারতীয় মুসলমানদের শিল্পকলা একটু নিঃশ্বাস ফেলিয়া বাঁচিল।
এই ‘চিত্রশিল্প’ অধ্যায় অত্যন্ত চিত্তাকর্ষক এই কারণে যে লেখক জানিয়েছেন, ইউরোপিয় চিত্রশিল্পের যেসব নিদর্শন নিয়ে আমরা সাধারণত উচ্ছ্বসিত হই তার অনেকগুলো ভারতীয় শিল্পের কাছে, বিশেষত মোগল যুগের শিল্পের কাছে, বিশেষভাবে ঋণী। প্যারিসের ল্যুভর এবং লন্ডনের মিউজিয়ামে ডাচ চিত্রশিল্পী রেমব্র্যান্টের যেসব বিশ্ববিখ্যাত কীর্তি রয়েছে তার অনেকগুলোই মোগল মিনিয়েচার পেন্টিংয়ের হুবহু নকল বা তা থেকেই উদ্ভূত। এই তথ্যের উৎস হিসাবে লেখক দুই ইউরোপিয় শিল্পরসিকের কথাই উল্লেখ করেছেন। আজকের ভারতে মোগলদের মন্দির ধ্বংসকারী, হিন্দুবিরোধী যে ভাবমূর্তি জনপ্রিয় হয়েছে তাতে এই অধ্যায়ে লেখকের ইতিহাস পাঠ অতি গুরুত্বপূর্ণ। তিনি উল্লেখ করেছেন যে ভারতে পৌঁছবার আগে মোঙ্গল আক্রমণ আরব সংস্কৃতিকে ধ্বংস করে। ফলে আরবরা পারস্যের সংস্কৃতির উপরে ছশো বছর ধরে যে জগদ্দল পাথর চাপিয়ে রেখেছিল তা সরে যায়। আবার পারস্যের সাম্রাজ্যও মোঙ্গলদের হাতেই ধ্বংস হয়। দুটোই কিন্তু মুসলমানদেরই সভ্যতা। ক্ষিতিমোহনের মতে মোঙ্গলরা গথ, হুনদের মত শুধু ধ্বংস করতে করতে এগোননি। একইসঙ্গে তাঁদের হাতে শিল্প, সাহিত্যের নির্জীব বন্ধনের অবসান এবং নতুন প্রাণের সঞ্চার হয়েছে। এক ধাপ এগিয়ে তিনি লিখছেন
মনে হয়, ইউরোপে রেনাসাঁসের যুগ প্রবর্তনের প্রধান কারণই এই মোঙ্গলেরা। কারণ ইহাদেরই জন্য এতকাল খোরাসানের অন্ধকারে অবরুদ্ধ অটোমান তুর্কেরা কনস্টান্টিনোপলে আসিয়া সকলের দৃষ্টির সম্মুখে উদ্ভাসিত হইয়া উঠিলেন। ইহাদেরই জন্য বাইজ্যান্টাইন সাম্রাজ্য ধ্বংসপ্রাপ্ত হইল। ইহাদেরই জন্য গ্রিক পণ্ডিতগণ তাঁহাদের জ্ঞানের ভাণ্ডার লইয়া সারা ইউরোপে নানা স্থানে ছড়াইয়া পড়িলেন।
সেই ধারাতেই পাঠান, মোগলরা ভারতে এসে বহু সংস্কৃতি ও শিল্পশৈলীর সমন্বয় ঘটান। তাই মোগল আমলের শিল্পীদের মধ্যে হিন্দু ও মুসলমান – দুরকম শিল্পীই দেখা যায়। আকবরের আমলের চিত্রশিল্পীদের মধ্যে যাঁদের নাম পেয়েছেন তাঁদের মধ্যে দুজন মুসলমান, আর সকলেই হিন্দু। তাঁদের মধ্যে আবার কায়স্থ, চিতেরা (চিত্রকর), শিলাবত (শিলাশিল্পী), খাটি (কাঠশিল্পী), এমনকি কাহার (পালকিবাহক) জাতের মানুষও ছিলেন। অর্থাৎ উঁচু জাত, নিচু জাতের বিভাজনও সেক্ষেত্রে কাজ করেনি। ক্ষিতিমোহন জানিয়েছেন নন্দলাল বসুর থেকে মোগল আমলের শিল্পীদের নামের এক তালিকা তিনি পান। তার মধ্যে ১০৮ জন হিন্দু, ৯১ জন মুসলমান।
ভারতীয় সঙ্গীত, শিল্প, স্থাপত্যে মুসলমানদের অবদান নিয়ে আলোচনা করতে গেলে অনিবার্যভাবে এসে পড়ে তাজমহলের কথা। যদিও তাজের স্থাপত্যে যে হিন্দু-মুসলমানের মিশ্র সংস্কৃতির চিহ্ন আছে তা সচরাচর কাউকে বলতে শুনি না। পি এন ওকের তেজো মহালয়ের আষাঢ়ে গপ্প হয়ত সেই ফাঁক দিয়েই ঢুকে পড়ে। ক্ষিতিমোহন তাজমহল সম্পর্কে কী লিখেছেন দেখা যাক
তাজের ভারতীয়ত্বের একটা বড়ো প্রমাণ, তাজ পশ্চিমমুখী নহে। আর. এফ. চিজলম্ দেখাইয়াছেন তাজের চারি কোণাতে চারি মিনার, মধ্যে গম্বুজযুক্ত রচনা। এই রচনারীতি ঠিক যবদ্বীপের চণ্ডীসেবার পঞ্চরত্ন মন্দিরের নকশার সঙ্গে মেলে। হিন্দু শিল্পশাস্ত্রের পঞ্চরত্ন মন্দিরেরও এইরূপই গঠনপ্রণালী। অজন্তার চিত্রেও ঠিক তাজের নকশার নমুনা পাওয়া যায়। প্রথম গুহাচিত্রে বুদ্ধের কাছে মা ও শিশুর চিত্রে এবং অনুরাধাপুরে ও বরোবুদুরে বুদ্ধমূর্তির সঙ্গে অনুরূপ নকশা পাওয়া যায়। শুধু তাজে নহে, আকবরের সেকেন্দ্রাতেও এমনসব শৈলী দেখা যায় যাহাকে ঠিক মুসলমানি বলা চলে না। আকবর, জাহাঙ্গীর, শাহজাহান – এই তিনজনেই সংস্কৃতি হিসাবে অনেকখানি ভারতীয় ছিলেন।
তাজশিল্পের ক্রমবিকাশের ইতিহাস খুঁজিতে ভারত ছাড়িয়া পারস্য দেশে বা মধ্য এশিয়াতে ঘুরিয়া মরা বৃথা। তাজের নির্মাণে যেমন কান্দাহার, কনস্টান্টিনোপল ও সমরখন্দের কারিগর ছিলেন, তেমনি সঙ্গে সঙ্গে মুলতান লাহোরের কারিগরেরও অভাব ছিল না। দিল্লিরও বহু কারিগর ছিলেন। তাঁহাদের শিক্ষার মধ্যে ভারতীয় শৈলীই চলিত ছিল। একজন বড়ো ওস্তাদ ছিলেন চিরঞ্জীব লাল, তাঁহার অনুবর্তী ছিলেন ছোটেলাল, মন্নুলাল ও মনোহরলাল।
মুসলমানি য়ুনানী শাস্ত্র আর আয়ুর্বেদের মধ্যে কেমন দিবে আর নিবে মিলাবে মিলিবে সম্পর্ক, সম্রাট আকবরের মন্ত্রী এবং রামচরিতমানস রচয়িতা তুলসীদাসের বন্ধু আবদুর রহীম খানখানাঁ কেমন সংস্কৃত ছন্দে হিন্দি, সংস্কৃত, ফারসি ভাষা মিশিয়ে লিখেছেন (‘করোম্যেব্ দুল্ রোহীমোইহং খুদাতালাপ্রসাদতঃ/পারসিয়পদৈর্যুক্তং খেটকৌতুকজাতকম্’) – সেসব দৃষ্টান্ত দিতে থাকলে এই আলোচনা কখনো শেষ হবে না। কিন্তু ভারতে হিন্দু-মুসলমানের যুক্ত সাধনার আলোচনা অসম্পূর্ণ থেকে যাবে দুজনের কথা উল্লেখ না করলে – মালিক মহম্মদ জায়সী আর কবীর। জায়সী ক্ষিতিমোহনের কাছে এতই গুরুত্বপূর্ণ যে তাঁকে নিয়ে শান্তিনিকেতনের অধ্যাপক সম্মিলনীতে আলাদা বক্তৃতাও দিয়েছিলেন।
জায়সী হলেন সেই কবি, যাঁর ১৫৪০ খ্রিস্টাব্দের কাছাকাছি লেখা পদুমাবতী (পদ্মাবতী) কাব্য ইদানীং ইতিহাস বলে গণ্য হচ্ছে। তারই জেরে দীপিকা পাড়ুকোনকে শূর্পনখা করে দেওয়ার হুমকি দেওয়া হয়েছিল। ইনি ক্ষিতিমোহনের ভাষায় ‘সাধকশ্রেষ্ঠ’। সংস্কৃত যোগশাস্ত্র, পুরাণ, কাব্য, অলংকার, ব্যাকরণে পণ্ডিত, ফকির জায়সীর চার ঘনিষ্ঠ বন্ধুর দুজন ছিলেন হিন্দু। মারা যাওয়ার সময়ে তিনি ব্রাহ্মণ বন্ধু গন্ধর্বরাজের ছেলেদের বলেন, আমার নিজের সন্তান নেই। তোমরা যেহেতু বন্ধুর সন্তান, তোমরাই আমার সন্তান। আমার পারিবারিক মালিক উপাধি যদি তোমরা বহন করো, তাহলে উপাধিটা লুপ্ত হবে না। আমার আশীর্বাদে যতদিন এই উপাধি নিয়ে তোমরা ভগবানের গুণগান করবে, ততদিন তোমাদের বংশে সুগায়কের অভাব হবে না। এই বইয়ের রচনাকালেও উত্তরপ্রদেশের বালিয়ার হলদী ও রায়পুর এলাকার কথকরা মালিক উপাধিই ব্যবহার করতেন। আজকের ভক্তরা জায়সীর কাব্য নিয়ে যা ব্যাখ্যাই করুন না কেন, ক্ষিতিমোহন লিখেছেন পদ্মাবতী কাব্যে আসলে যোগমার্গের গভীর তত্ত্বকথা রয়েছে। জায়সীর মতে রানি পদ্মিনী জীবাত্মার প্রতীক, রাজা রতন সেন পরমাত্মার আর আলাউদ্দীন পাপের। জায়সীর সমাধিমন্দির আবার আমেথির হিন্দু রাজার তৈরি। তিনি নিঃসন্তান ছিলেন, জায়সীর আশীর্বাদ পাওয়ার পরে তাঁর ছেলে হয়। ফলে তিনি জায়সীর ভক্ত হয়ে যান।
আরও পড়ুন আখতারনামা : বিস্মৃত ইতিহাস
কবীরের অপরাধ – তিনি হিন্দু, মুসলমানকে মেলাতে চেয়েছিলেন। ফলে দুই দলই তাঁর নামে বাদশার কাছে নালিশ করে। তলব পেয়ে দরবারে পৌঁছে অভিযোগকারীদের কাঠগড়ায় মোল্লা আর পণ্ডিতদের একসঙ্গে দেখে কবীর বলেন, হায়, আমি তো এটাই চেয়েছিলাম। তাহলে তোমরা ভুল করলে কেন? বিশ্ববিধাতার সিংহাসনের নিচে মিলিত হতে ডেকেছিলাম, সেখানে জায়গায় কুলোল না, কুলোল রাজসিংহাসনের নিচে! মেলাতে চেয়েছিলাম প্রেমে-ভক্তিতে, তোমরা মিলেছ বিদ্বেষে! বিদ্বেষের চেয়ে প্রেম-ভক্তির জায়গা কি বেশি চওড়া নয়? কবীরকে যদি বলা হত সাধনা সুরক্ষিত রাখতে সম্প্রদায় দরকার, তাহলে তিনি বলতেন ‘বেহা দীনহী খেতকো বেহ্রাহী খেত খায়’। অর্থাৎ বাইরের ছাগল, গরুর ভয়ে ক্ষেতে বেড়া দিলাম। দেখি বেড়াই ক্ষেত খেয়ে উজাড় করে দিল। ক্ষিতিমোহন উদ্ধৃত কবীরের অসংখ্য সহজ সরল রচনার মধ্যে এমন চারটে লাইন রয়েছে যা পড়লে মনে হয় এই সবে লেখা হল
জো খোদায় মসজিদ বসতু হৈ
ঔর মুলুক কেহিকেরা।
তীরথ মূরত রাম নিবাসী
বাহর করে কো হেরা।।
খোদা যদি মসজিদেই বাস করেন তবে বাকি জগৎটা কাহার? তীর্থে মূর্তিতেই যদি রাম রহেন তবে বাহিরকে দেখে কে?
কেবল ইতিহাস পাঠে নয়, সমসময়ে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতায় হিন্দু-মুসলমানের যুক্ত সাধনা কীভাবে ধরা পড়েছে তাও লেখক বিবৃত করেছেন। চট্টগ্রামের সাহিত্যসেবক আবদুল করীমের কাছে পাওয়া হোরান জরিপ (কোরান শরীফের প্রাকৃত উচ্চারণ) পুথি থেকে শুরু করে বাংলার গ্রামের মুসলমান পটুয়াদের কথা, যাঁদের পটের কাহিনি হয় হিন্দু দেবদেবী, পুরাণ ইত্যাদি নিয়ে – সবই খোলা মনের পাঠকের অপেক্ষায় আছে।
খোলা মন জিনিসটা কি আজ সুলভ? বিশেষ করে ধর্মের ব্যাপারে? এখন তো ধর্ম মূলত ধ্বজা। সে সম্পর্কে ক্ষিতিমোহন মহাভারতের অনুশাসন পর্ব থেকে উদ্ধৃতি দিয়েছেন
এক এব চরেদ্ ধর্মং ন ধর্মধ্বজিরো ভবেৎ।
ধর্মবাণিজ্যকা হ্যেতে যে ধর্মমুপভূঞ্জতে।।
ধর্ম হইল আপনার জীবনটি নিয়ন্ত্রিত ও শান্ত করিবার জন্য ব্যক্তিগত ব্যাপার। তাই ধর্মকে ধ্বজার মতো ব্যবহার করিয়া কোনো বিরোধ ঘোষণা করা বা কোনো সুবিধা আদায় করার চেষ্টা অতিশয় অন্যায়।
ধর্মকে ধ্বজা হিসাবে ব্যবহার করার লোক বা তাকে রাজনৈতিক প্রয়োজনে ব্যবহার করার লোক সেই মহাভারতের যুগেও ছিল। তারপরেও কয়েক হাজার বছর ধরে মনুষ্যত্ব মরে যায়নি, ভারতে হিন্দু-মুসলমানের যুক্ত সাধনা সম্ভব হয়েছে, অতএব ভবিষ্যতেও হওয়া সম্ভব – এ বই এই ভরসাটুকু জোগায়। সেই আশায় খোলা মনের মানুষ খুঁজে যাওয়া, তার কাছে এইসব বহুযুগের ওপার হতে আসা বার্তা পৌঁছে দেওয়া ছাড়া আমাদের আর কী-ই বা করার আছে আজ?
পুনশ্চ: কপিরাইট উঠে যাওয়া এই বইয়ের যে সংস্করণ আমার হাতে এসেছে তাতে বিকট অযত্নের ছাপ রয়েছে। একই ব্যক্তির নাম, একই বইয়ের নাম একেক জায়গায় একেকরকম বানানে লেখা হয়েছে। এমনকি বইয়ের নামও প্রচ্ছদে আর পৃষ্ঠ প্রচ্ছদে আলাদা। মুদ্রণ প্রমাদ অগ্রাহ্য করলেও এই ত্রুটিগুলো এড়িয়ে যাওয়া যায় না। ভাল সংস্কৃত, আরবি, উর্দু জানা কোনো পাঠক হয়ত উদ্ধৃতিগুলোতেও কিছু ভুল ধরতে পারবেন যা আমার বোধগম্য হয়নি। বইয়ের শেষের টীকাগুলো লেখার ভিতরে চিহ্নিতকরণেও অস্পষ্টতা, অসঙ্গতি রয়েছে। পরিশিষ্টে জায়সীকে নিয়ে যে লেখা প্রকাশিত হয়েছে তা যে কী করে ৮ শ্রাবণ ১৯১২ তারিখে পঠিত হয়ে থাকতে পারে তা বোঝা অসম্ভব। ১৯১২ বঙ্গাব্দ আসতে এখনো শ পাঁচেক বছর দেরি আছে, অন্যদিকে গ্রেগরিয়ান (ইংরিজি) ক্যালেন্ডারে শ্রাবণ নামে কোনো মাস নেই। এই দুঃসময়ে এই বই সুলভে পাঠকদের হাতে তুলে দেওয়ার জন্যে সংশ্লিষ্ট প্রকাশনা সংস্থার ধন্যবাদ প্রাপ্য। কিন্তু এত মূল্যবান বইয়ের কি এই অযত্ন প্রাপ্য?
ভারতে হিন্দু-মুসলমানের যুক্ত সাধনা
লেখক: ক্ষিতিমোহন সেন
প্রকাশক: ন্যাশনাল বুক এজেন্সি
মূল্য: ১১০ টাকা
নাগরিক ডট নেটে প্রকাশিত
