Where is the hosh?

আমাদের এলাকায় পাড়ার লোকেরা মিলে অপেশাদার যাত্রা করেন বহুকাল থেকে। ছোটবেলায় চোখ বড় বড় করে দেখতাম মঞ্চের উপর যুদ্ধ হত, রাজা মন্ত্রী সৈনিক মরত, তারপর যেই আলো নিভে যেত অমনি তড়াক করে উঠে মঞ্চ থেকে চলে যেত। আমার বাবাও অভিনয় করতেন বলে যাত্রা শেষ হওয়ার পরে গ্রীনরুমে আমার অবাধ যাতায়াত ছিল। মৃত অভিনেতারা অন্ধকারের মধ্যে উঠে চলে যেতেন বলে শিশু বয়সে আমার কিন্তু সন্দেহ রয়েই যেত, লোকটা সত্যি বেঁচে আছে কিনা। গ্রীনরুমে গিয়ে পাড়াতুতো কাকু, জেঠু বা দাদুকে মেক আপ তুলতে দেখে চক্ষুকর্ণের বিবাদ ভঞ্জন করা অব্দি আমার বুক দুরদুর করত। একটু বড় হওয়ার পর সেকথা মনে করে নিজের কাছেই বিস্তর লজ্জা পেয়েছি। তবে এখন বুঝতে পারি লজ্জা পাওয়ার কোন কারণ ছিল না। ধেড়ে ধেড়ে লোকেরা যখন সত্যিকারের যুদ্ধ, সত্যিকারের সৈনিকদের জীবনকে যাত্রার মতই নেহাত খেলা মনে করে, তখন বছর পাঁচেকের ছেলের যাত্রাকে সত্যি ভাবা কী আর এমন দোষের?
কাল পুলওয়ামায় বিয়াল্লিশ জনের মৃত্যুর পর থেকে অনলাইন এবং অফলাইনে লোকের যা প্রতিক্রিয়া দেখছি তাতে মনে হচ্ছে যুদ্ধ নেহাত যাত্রা বৈ তো নয়। তাও ভাল, উরির পরে পাকিস্তানে পরমাণু বোমা ফেলার প্রস্তাব দিচ্ছিল অনেকে, এবারে শুধু আরেকখানা সার্জিক্যাল স্ট্রাইকের আবদার করেই ক্ষান্ত আছে। চারিদিকে বেশ একটা যুদ্ধ যুদ্ধ ভাব। বিজেপি মুখপাত্র রাম মাধব দেখলাম টিভিতে বলছেন পাকিস্তানকে এমন জবাব দেব, ওরা ভুলতে পারবে না ইত্যাদি। ডি ডি ইন্ডিয়াতে আবার দেখলাম এক পলিতকেশ ভদ্রলোক বলছেন পাকিস্তান এটা করেছে নির্বাচনে বিরোধীদের সুবিধা পাইয়ে দেওয়ার জন্যে। অর্থাৎ সম্ভবত, এখন থেকে ঘটনার তদন্ত এবং যাদের গাফিলতির ফলে এতগুলো মানুষের নিরুপায় মৃত্যু হল তাদের শাস্তিবিধানের চেয়ে সরকার যে ব্যাপারটায় গুরুত্ব দেবে সেটা হল যারা সরকারকে প্রশ্ন করবে তাদের দেশদ্রোহী বলে দেগে দেওয়া (কে জানে হয়ত জেলে দেওয়া বা গণপিটুনি দেওয়াও)। মাধববাবু যেমন বুম ধরা সাংবাদিকটিকে ধমকে বলেই দিলেন “আপনার কমিউনিটির যারা পাকিস্তানকে সাপোর্ট করে তাদের বিচ্ছিন্ন করার সময় এসে গেছে।“
কিছু করার নেই, মেনে নিতে হবে। দেশে এখন দেশপ্রেমিক সরকার। আই এস আই চিহ্নিত। পাকিস্তানের নয়, প্রশান্ত মহলানবীশের।
২০১৪ লোকসভা নির্বাচনের কয়েক মাস যখন বাকি তখন এক দীর্ঘ ট্রেনযাত্রায় এক মিত্রকে বলছিলাম কেন আমি মোদী ক্ষমতায় আসুন চাই না। সে প্রায় সবটাই মেনে নিয়েও বলল “মোদী ক্ষমতায় এলে আর কিছু না হোক, পাকিস্তানকে একটু ঠুকে দেওয়া যাবে।“ যে দেশটাকে মোদীজির ঠুকে দেওয়ার কথা ছিল, হঠাৎ সে দেশের প্রধানমন্ত্রীর নাতনির বিয়েতে গিয়ে কোলাকুলি করেছেন। ওটা নাকি স্টেটসম্যানসুলভ কাজ। তারপর হল পাঠানকোটে হামলা। অতঃপর পাকিস্তানের আই এস আইকে আদর করে ডেকে এনে (বিরিয়ানি খাওয়ানো হয়েছিল কিনা উজ্জ্বল নিকম জানতে পারেন) ভারতের সেনা ছাউনি পরিদর্শন করতে দেওয়া হল। ওটা বোধহয় নিউ ইয়র্ক টাইমসসুলভ ছিল। তারপর হল সার্জিক্যাল স্ট্রাইক। এবং তা নিয়ে সিনেমা। এছাড়াও হয়েছে। অবসরপ্রাপ্ত সৈনিকরা ওয়ান র‍্যাঙ্ক ওয়ান পেনশন পাননি বলে দিল্লীর যন্তর মন্তরে অনশন করছিলেন, তাঁদের কলার ধরে স্থানচ্যুত করা হয়েছে। বি এস এফ, সি আর পি এফ জওয়ানরা ঠিকমত খেতে পান না, অফিসাররা অন্যায় ব্যবহার করেন — এই অভিযোগ করে সোশাল মিডিয়ায় ভিডিও আপলোড করেছিলেন। প্রতিকার পাননি, গলাধাক্কা পেয়েছেন। আর সন্ত্রাসবাদী কার্যকলাপ কিরকম কমে গেছে সে তো দেখাই যাচ্ছে পাঁচ বছর ধরে। সার্জিক্যাল স্ট্রাইকের ফলে নাকি সব তছনছ হয়ে গেছে শোনা যাচ্ছিল। এখন দেখা যাচ্ছে সে গুড়েও বালি। নোটবন্দির ফলে সন্ত্রাসবাদী কার্যকলাপ উঠে যাবে কথা ছিল, তাও হল না। এরপরেও এখনো দেখছি অনেকের অনেক আশা মোদীবাবুর উপরে। কোন কোন বাঙালির দেশপ্রেমের ভার বাংলা ভাষা বইতে পারছে না। তাই হিন্দিতে স্ট্যাটাস দিচ্ছেন “মোদীজি সব কুছ রোক দো, বাস পাকিস্তান কো ঠোক দো।”
পাকিস্তান একটি সেনা আর মৌলবাদী দ্বারা নিয়ন্ত্রিত রাষ্ট্র, যার ভারতে অশান্তি সৃষ্টি করা ছাড়া প্রায় কোন কাজ নেই। তাদের সাহায্যপ্রাপ্ত সন্ত্রাসবাদীদের কার্যকলাপে এতজন সি আর পি এফ জওয়ানের প্রাণ গেল। ফলে রাগ, দুঃখ সবই বৈধ। কিন্তু এই যে প্রতিশোধ ইত্যাদি শব্দগুলো বুড়িমার চকলেট বোমের মত ব্যবহার করছি আমরা — এই প্রতিশোধ নিতে যাবেটা কে? আমি, আপনি তো নয়ই, রাম মাধব আর ভিকি কৌশল পর্যন্ত যাবেন না। যাবেন স্বাস্থ্যবান নিম্নবিত্ত বা মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তানরা, যাঁরা এই দেড়শো কোটির দেশের বিপুল কর্মসংস্থানের সমস্যার অন্যতম শিকার। তা এই প্রশ্ন কবে তুলবেন যে আমাদের নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা ঐ মানুষগুলোকে এরকম জালনিবদ্ধ রোহিতের মত মরতে হয় কেন? কাশ্মীরের মত বিপদসংকুল এলাকায় আটাত্তরটা গাড়ির বিরাট কনভয় আড়াই হাজার জওয়ানকে নিয়ে একত্রে চলাচল করে কোন দুঃখে? বিশেষত যেখানে গোয়েন্দা বিভাগ আগেই আক্রমণের সম্ভাবনা জানিয়েছিল? পাকিস্তানের সেনা, সরকার, সন্ত্রাসবাদী — কেউই তো আপনার হাতে নেই। যে সরকারটা আপনার হাতে তাকে এই প্রশ্নগুলো করবেন না?
অবশ্য এমনটা বললে অন্যায় হবে যে এই সরকারের আমলেই প্রথম এত কিছু ঘটল। কক্ষনো না। মহান লিবারাল নেতা অটলবিহারী বাজপেয়ীর আমলে সন্ত্রাসবাদীরা ভারতের মাটি থেকে বিমান হাইজ্যাক করে আফগানিস্তানে চলে যায়নি? সে কি নরেন্দ্র মোদীর দোষ? কার্গিলে অনুপ্রবেশকারীরা ঢুকে পড়েনি? সে কি মোদীর দোষে? মৃত সৈনিকদের কফিন নিয়ে কেলেঙ্কারি হয়নি? তার জন্যেও কি মোদী দায়ী? খোদ সংসদ ভবনে আক্রমণ হয়েছে। সেটাও কি বেচারা মোদীর ঘাড়ে চাপাব এখন?
আসলে আগমার্কা দেশপ্রেমিকদের আছে টনটনে মান আর বিপুল জোশ। কিন্তু রামকৃষ্ণ আবার বলেছিলেন “যার মান আর হুঁশ আছে সে-ই মানুষ।” মান আর জোশ তো অর্ধমানবেরও থাকে। সেটা একবার স্বয়ং বিবেকানন্দ টের পেয়েছিলেন।

বিঃ দ্রঃ দয়া করে “ছিঃ! সৈনিকের মৃত্যু নিয়ে রাজনীতি করছেন?” জাতীয় মন্তব্য করবেন না। পৃথিবীর কোথাও সশস্ত্রবাহিনীর মানুষ অরাজনৈতিক কারণে নিহত হন না। মানুষকে মানুষের বিরুদ্ধে লড়ানো একটি ঘোরতর রাজনৈতিক ক্রিয়া।

Published by

Pratik

Blogger and poet. Isn't that enough?

Leave a Reply