ফ্যাসিবাদের মানবজমিন

ভারতে ফ্যাসিবাদের জন্য জমি কেমন উর্বর এবং নরেন্দ্র মোদীর মত লোককে উপড়ে ফেলা কেন শক্ত সেটা বোঝা খুব সোজা। এর কারণটা হল এখানে ফ্যাসিবাদের অনেকগুলো মাথা। মোদী বা অমিত শাহ বা কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে খবর করার জন্য সম্পাদকের চাকরি যাওয়া, সাংবাদিকদের খুন বা ধর্ষণের হুমকি পাওয়া, সাধারণ মানুষ বা বিখ্যাত কেউ সরকারের কোনরকম সমালোচনা করলেই অনলাইন বা অফলাইনে গালাগাল, তাকে ভাতে মারার চেষ্টা — এসব গত কয়েকবছরে জলভাত হয়ে দাঁড়িয়েছে। পরিস্থিতি এমন যে এটা যে ঘটছে তাও আপনি বলতে পারবেন না। বললেই “পাকিস্তান চলে যাও” ইত্যাদি। আজও কানহাইয়া কুমারকে এক জায়গায় মেরেধরে নীরব করে দেওয়ার চেষ্টা হয়েছে।
কিন্তু সমস্যাটা যত ব্যাপক ভাবছেন তার চেয়েও অনেক বড় কারণ প্রাক-দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালীন জার্মানিতে একটাই দল এভাবে বিরোধীদের গলা টিপে ধরত কিন্তু ভারতে শুধু সঙ্ঘ পরিবার এমন করছে তা নয়, ফলে এসব যে অন্যায় এটুকুই অনেক মানুষকে বোঝানো শক্ত। এমনিতেই শাশ্বত ভারতীয় পরিবার এমন এক প্রতিষ্ঠান যেখানে একনায়কত্ব স্বীকৃত এবং প্রার্থিত। বাবা কি জেঠু কি দাদু — কেউ একজন যা সিদ্ধান্ত নেবেন সেটাই চূড়ান্ত। এই মডেলটা যৌথ পরিবারের বিলুপ্তির সঙ্গে সঙ্গে কিছুটা ক্ষয়প্রাপ্ত হলেও ডোডোপাখি হয়ে গেছে বলে যদি কেউ ভাবেন তাহলে তিনি নিজের চারপাশে ভাল করে তাকিয়ে দেখছেন না। শুধু পরিবার নয়, ক্রমশ ছোট হয়ে আসা অফিসগুলোর তস্য ছোট ডিপার্টমেন্টগুলোয় উঁকি মেরে দেখুন। যিনি মোটে তিনজনের বস তিনিও বাকি দুজনের শ্বাস প্রশ্বাসের উপর মালিকানা দাবী করেন। সুতরাং যার ক্ষমতা কম বা নেই তাকে কথা বলতে না দেওয়া আমাদের সংস্কৃতি আর সেই সংস্কৃতির সবচেয়ে নির্লজ্জ ব্যবহার করেন আমাদের রাজনৈতিক নেতা-নেত্রীরা। না, শুধু বিজেপি নয়।
কয়েকদিন আগেই তামিলনাডুর কার্টুনিস্ট জি বালাকে হাজতবাস করতে হল। তাঁর অপরাধ তিনি মুখ্যমন্ত্রী, পুলিশ কমিশনার আর ডিস্ট্রিক্ট কালেকটরকে নগ্ন দেখিয়েছেন তাঁর এক কার্টুনে। অতএব প্রশাসন ভীষণ সক্রিয় হয়ে ব্যবস্থা নিয়ে নিল ঝটপট।
মনে রাখবেন তামিলনাড়ু এমন রাজ্য যেখানে কিছুদিন আগে প্রবল প্রাকৃতিক দুর্যোগে প্রশাসনের টিকি পাওয়া যায়নি দীর্ঘদিন। জয়ললিতা মারা যাওয়ার পর থেকে কে কার পক্ষে, কে জয়ললিতার বড় ভক্ত তা নিয়ে ডামাডোলে বেশ কিছুদিন কোন মুখ্যমন্ত্রীই ছিল না। অথচ যেই কার্টুনিস্টকে গ্রেপ্তার করার কথা এল, প্রশাসন যন্ত্রের মত দ্রুত কাজ করল। দুর্নীতিগ্রস্ত ক্ষমতাশালীদের ল্যাংটো করে দেওয়াই যে কার্টুনিস্টের কাজ সেকথা আর শুনছে কে?
আরো ঘরের কাছে আসুন। ডেঙ্গু হয়েছে কি হয়নি তাই নিয়ে আমরা সাধারণ মানুষ আর সরকারের মধ্যে তর্কাতর্কি চলতে চলতে কতগুলো প্রাণ চলে গেল, প্রশাসন চলছিল গদাই লস্করী চালে এবং ডেঙ্গুর চেয়ে বড় শত্রু ঠাউরেছিল ডেঙ্গুর খবরকে। যেই না এক ডাক্তারবাবু ফেসবুকে পোস্ট করলেন ডেঙ্গু নিয়ে, অমনি দারুণ দ্রুততায় তিনি সাসপেন্ড হয়ে গেলেন। অম্বিকেশ, শিলাদিত্য ইত্যাদি পুরনো নামগুলো আর নাহয় না-ই বললাম।
আমি হাসপাতাল থেকে ফিরে ডেঙ্গু নিয়ে একটা পোস্ট দেওয়ার পরে এক শুভাকাঙ্ক্ষী অগ্রজ সাংবাদিক ফোন করে সতর্ক করেছিলেন “খুব সাবধান। তুমি যা লিখেছ তার চেয়েও নিরীহ কথা লিখে কিন্তু এরাজ্যে লোকে গ্রেপ্তার হয়েছে।” ডাক্তার দত্তচৌধুরীর হাল থেকে স্পষ্ট যে সতর্কবার্তাটি অত্যন্ত সঙ্গত।
তা এই দেশে আর আপনি লোককে বোঝাবেন কী করে যে বিজেপি সরকার যা করছে তা এমার্জেন্সিরই নামান্তর! পঁচাত্তর থেকে সাতাত্তর পর্যন্ত গণতন্ত্রকে গণধর্ষণ করার পরেও তো আজও অনেক শিক্ষিত লোক ইন্দিরাকে ভারতের সেরা প্রধানমন্ত্রী বলেন। স্বাভাবিকভাবেই মোদীবাবু তাঁকেও ছাড়িয়ে যাবেন। ওনার আমল নিয়ে হয়ত বইটই লেখা হবে। তবে মমতার সাথে যতই শত্রুতা করুন, একনায়কত্বের ইতিহাসে অন্তত কয়েকটা পাতা পাওয়ার থেকে আমাদের দিদিকে উনি বঞ্চিত করতে পারবেন না।

Advertisements

Published by

Pratik

Blogger and poet. Isn't that enough?

Leave a Reply