শ্রদ্ধেয়

আরেকজন কবির সঙ্গে আমার পরিচয় অত সহজে হয়নি। মূলত তাঁকে একজন পন্ডিত মানুষ বলে ভাবতাম। রবীন্দ্রবিশেষজ্ঞ, কৃতী অধ্যাপক, রাজনৈতিকভাবে সরব একজন বুদ্ধিজীবী বলে চিনতাম। এবং ছোট থেকেই পন্ডিতদের সম্পর্কে আমার যে সহজাত ভয়, সেই ভয়ে এঁর লেখাপত্র এড়িয়েই চলতাম। তারপর এক মাস্টারমশাইয়ের পাল্লায় পড়লাম যিনি সেই কবির ছাত্র এবং মাঝে মাঝেই বলতেন “বাংলায় রবীন্দ্রনাথ আর জীবনানন্দ বাদ দিলে আড়াইজন কবি — শঙ্খ ঘোষ, শঙ্খ ঘোষ আর হাফ শঙ্খ ঘোষ”

gulzar

নাইন কি টেনে পড়ার সময়ে একবার বাবার কাছে প্রচন্ড বকা খেয়েছিলাম একজন বাজে লোককে প্রণাম করার জন্যে। আসলে কোন এক গুরুজন আমাকে তার কিছুদিন আগেই বলেছিলেন “বয়সে বড় কারোর সাথে আলাপ হলে প্রণাম করবে।” বাবা একজনের সাথে আলাপ করানোয় আমি সেটাই করেছিলাম।

বাবা বাড়ি ফিরে বলেছিল “ঢিপ ঢিপ করে প্রণাম করা স্বভাবটা আবার তোর কবে হল? জানিস না শুনিস না, একটা অত্যন্ত নোংরা লোককে প্রণাম করলি আজকে। আলাপ না করিয়ে উপায় ছিল না তাই করিয়েছি। তা বলে প্রণাম করতে হবে? কক্ষনো প্রণামের যোগ্য কিনা না জেনে কাউকে প্রণাম করবি না।”

লৌকিকতার খাতিরে বাবার এই নির্দেশটা অনেকসময়ই মেনে উঠতে পারিনি, আজও পারি না। এই ভেবে নিজেকে সান্ত্বনা দিই যে সত্যিই প্রণাম করতে ইচ্ছা করে এমন অনেককে তো আবার প্রণাম করে উঠতে পারি না তাঁদের কাছে পৌঁছনোর যোগ্যতা নেই বলে, অতএব ব্যাপারটা হরে দরে একই হয়ে যায়।

তা সেরকমই একজন লোক গুলজার। যে বয়সে নিজে নিজে কবিতা পড়তে শিখেছি তার আগে থেকেই ফিল্মের গানের মধ্যে দিয়ে গুলজারের লেখা কানে ঢুকেছে। তখুনি মরমে পশেছে বললে বাড়াবাড়ি হয়ে যাবে, তবে বরাবরই অন্য ফিল্মের গানের চেয়ে আলাদা কিছু যে শুনছি সেটা বোধ করতাম। সম্ভবত সেটা আমার বাবারই কৃতিত্ব। ছোটবেলায় আমাদের বাড়িতে দাদুর আমলের একটা রেকর্ড প্লেয়ার ছিল। তখন আমাদের যা সামর্থ তাতে পুজোর সময়ে জামাকাপড়ের সঙ্গে দু একখানা এল পি রেকর্ড কেনা হত, তার বেশি নয়। বাবা যার বাড়িতেই যেত, পছন্দের রেকর্ড দেখতে পেলে কদিনের জন্য চেয়ে আনত। “দো নয়না ঔর এক কহানি” আমার সেখান থেকেই পাওয়া। মনে আছে বাবা ঐ রেকর্ডটা শোনার সময়ে বলেছিল “মন দিয়ে শোন। কি আশ্চর্য কথা! তুঝ সে নারাজ নহি জিন্দগি, হৈরান হুঁ ম্যায়। একটা লোক জীবনের সঙ্গে কথা বলছে।” যত বড় হয়েছি, আরো গান শুনেছি, আরো কবিতা পড়েছি তত গুলজারের দাম আমার কাছে বেড়ে গেছে, ওঁকে আরো অন্তরঙ্গ মনে হয়েছে। ২০১২-তে যখন একটা চাকরি ছেড়ে অন্যটায় যোগ দিতে যাচ্ছি তখন অনুজ সহকর্মীরা ভালবেসে গুলজারের ‘Selected Poems’ আর ‘Neglected Poems’ আমার ঝুলিতে ফেলে দিল। সেই থেকে গুলজার আমার আরো আপন।

আরেকজন কবির সঙ্গে আমার পরিচয় অত সহজে হয়নি। মূলত তাঁকে একজন পন্ডিত মানুষ বলে ভাবতাম। রবীন্দ্রবিশেষজ্ঞ, কৃতী অধ্যাপক, রাজনৈতিকভাবে সরব একজন বুদ্ধিজীবী বলে চিনতাম। এবং ছোট থেকেই পন্ডিতদের সম্পর্কে আমার যে সহজাত ভয়, সেই ভয়ে এঁর লেখাপত্র এড়িয়েই চলতাম। তারপর এক মাস্টারমশাইয়ের পাল্লায় পড়লাম যিনি সেই কবির ছাত্র এবং মাঝে মাঝেই বলতেন “বাংলায় রবীন্দ্রনাথ আর জীবনানন্দ বাদ দিলে আড়াইজন কবি — শঙ্খ ঘোষ, শঙ্খ ঘোষ আর হাফ শঙ্খ ঘোষ।” ফলে শঙ্খ ঘোষের কবিতা না পড়ে আর উপায় রইল না। কিন্তু তবুও বেশি পড়লাম ওঁর গদ্য। সমৃদ্ধ হলাম, কিন্তু তেমন টান তৈরি হল তা নয়। সেটা হল এই কয়েক বছর আগে, অগ্রজ সাংবাদিক অম্লানদার সাথে কথাবার্তায় আমার প্রিয় কবি জয় গোস্বামী বনাম ওর মতে “last of the great Bengali poets” শঙ্খ ঘোষ — এরকম একটা আবহাওয়া তৈরি হওয়ায়। এবারে তাঁর পান্ডিত্য ভেদ করে শঙ্খ ঘোষ একেবারে বুকে এসে বিঁধলেন। তবে হ্যাঁ, কোন সন্দেহ নেই যে মানুষটা শুধুই কবি নন। তার চেয়ে অনেক বেশি কিছু। তিরাশি বছর বয়সেও নিরপেক্ষ মনীষী হয়ে না থেকে জ্ঞানপীঠ পুরস্কার নিতে গিয়ে যে বক্তৃতাটা তিনি দিয়েছেন, সেটাই প্রমাণ করে তিনি প্রণম্য।

এই দুই প্রণম্যকে এক মঞ্চে কলকাতায় পাওয়া যাবে জানতে পেরেছিলাম ফেসবুকের দৌলতেই। ভাগ্যিস শনিবার — আমার কর্পোরেট দাসত্ব থেকে সাপ্তাহিক বিরতির দিন, নইলে এমন একটা অভিজ্ঞতা থেকে বঞ্চিতই থাকতে হত। উপলক্ষ বাংলায় গুলজারের প্রথম বই প্রকাশ। একটা বাঙালিদের সাথে ওঁর কাজ করার অভিজ্ঞতা নিয়ে স্মৃতিচারণ — পান্তাভাতে। অন্যটা তাঁর কবিতার বাংলা অনুবাদ — প্লুটো।

নন্দনের বাইরে লাইন দিয়ে দাঁড়িয়ে আছি, সাদা পাজামা পাঞ্জাবী পরে প্রথমে গুলজার এলেন। এমনিতেই তিনি সেদিনের মধ্যমণি, তার উপর কবি হলেও বলিউডের তারকাচূর্ণ তাঁর সর্বাঙ্গে। সেই কারণে কলকাতার সাহিত্য আর সিনেমা জগতের তারকারা তাঁকে প্রায় এসকর্ট করে ভেতরে নিয়ে গেলেন। সেই ভিড়েও দেখলাম ঠোঁটে সেই চিরপরিচিত “আধি অধূরি” হাসি। তার কিছু পরেই এলেন বাংলা ভাষার জীবিত কবিদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ — শঙ্খ ঘোষ। তাঁকে ঘিরে কোন বলয় ছিল না। বিখ্যাত বাঙালিরা ততক্ষণে কে গুলজারের কত কাছে থাকতে পারেন সেই প্রতিযোগিতায় ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন হলের ভেতরে। সাদা ধুতি পাঞ্জাবীর মানুষটার অবশ্য আজও দেখলাম লাঠির প্রয়োজন হয় না। যাক সে কথা।

স্মরণীয় সন্ধের শুরুটা খুব সুখকর হয়নি। নন্দনের সাউন্ড সিস্টেম বোধহয় ঠিক করতে পারছিল না কোশিশের সঞ্জীব কুমার হবে না আঙ্গুরের সঞ্জীব কুমার হবে। যারপরনাই টাকা এবং সময় খরচ করে ওখানে পৌঁছনো আমরা স্বভাবতই অধৈর্য। শঙ্খ ঘোষের ধৈর্যচ্যুতি হওয়া অবশ্য বেশ শক্ত ব্যাপার। মিনিট পাঁচেক মঞ্চে ছিলেন। বললেন “দেশে বিদেশে অনেককে পেয়েছি যারা গীতাঞ্জলি ইংরেজি অনুবাদে পড়ে রবীন্দ্রনাথের প্রতি আকৃষ্ট হয়েছেন। কিন্তু ‘Gardener’ পড়ে রবীন্দ্রনাথ পড়তে আগ্রহী হয়েছেন, তারপর নিজের উদ্যোগে বাংলায় পড়েছেন, এমন মানুষ গুলজার ছাড়া আর একজনও পাইনি… অন্য ভাষায় কাজ করেও তিনি এমন একজন শিল্পী, যাঁকে আমাদের খুব কাছের লোক বলে মনে হয়।”

গোদের উপর বিষফোঁড়ার মত অনেকের দৃষ্টিপথ জুড়ে তখনো দাঁড়িয়ে আছে একগাদা টিভি ক্যামেরা এবং তার চালকেরা। শঙ্খ ঘোষের শান্ত থাকার আবেদনে আমল দেওয়া তাই বেশ শক্ত হচ্ছিল। তাতেই অবশ্য টের পাওয়া গেল গুলজারের সম্মোহনী শক্তি। বইপ্রকাশ, পান্তাভাতের কিছুটা অনুলেখিকার পাঠ করা — এসব পেরিয়ে যখন তাঁর হাতে মাইক পৌঁছল, তখনো এক ভদ্রলোক খুব বিরক্ত হয়ে চিৎকার করে কিসব বলছেন একতলার দর্শকাসন থেকে। গুলজার প্রথমেই বেশ মোলায়েম অথচ দৃঢ়ভাবে বললেন “ভাইসাব, অভি আপ চুপ হো যাইয়ে। অব মেরি বারি হ্যায়।”

গুলজার বললে কে-ই বা না শুনে থাকতে পারে!
এরপর তিনি অনেকের স্মৃতি রোমন্থন করলেন। সবচেয়ে মনে রাখার মত “মেরা কুছ সামান” গান তৈরি হওয়ার গল্পটা।

দীর্ঘ কবিতাটা লিখে নিয়ে গুলজার গেছিলেন রাহুল দেববর্মনের কাছে, সুর করে দেওয়ার অনুরোধ নিয়ে। রাহুল দৈর্ঘ্যটা দেখেই উড়িয়ে দেন “এত বড় গান হয়! এরপরে কোনদিন টাইমস অফ ইন্ডিয়া নিয়ে এসে বলবে এটায় সুর দিয়ে দে।” তারপর কাগজটা টেনে নিয়ে পড়েন আশা এবং আপন মনে একটা সুর দিয়ে “লওটা দো” গেয়ে ওঠেন। সেটাই রাহুলকে উৎসাহিত করে হঠাৎ এবং কোলবালিশ আর হারমোনিয়াম টেনে নিয়ে খানিকক্ষণের মধ্যেই তৈরি হয়ে যায় এদেশের শ্রেষ্ঠ মনখারাপ করা প্রেমের গানগুলোর একটা।

এইসব কথাবার্তার মাঝে নন্দনের সাউন্ড সিস্টেম কখন গুলজারের বাধ্য হয়ে উঠেছে। তারপর সন্ধে যত এগোল, গুলজার ঝমঝমে দিনের ময়ূরের মত পেখম মেলতে শুরু করলেন। রবীন্দ্রনাথ অনুবাদ করতে গিয়ে তাঁর অনুভবের কথা বললেন, কেন অকিঞ্চিৎকর প্লুটো তাঁর কবিতার বইয়ের নাম হয়ে উঠল সেকথা বললেন। এবং অবশ্যই কবিতা। এখন কীভাবে সব ছেড়ে কবিতা নিয়ে পড়ে আছেন সেকথা বললেন।

দেশের ৩২টা ভাষার ২৭৫ জন কবির কবিতা এ পর্যন্ত অনুবাদ করে সংকলিত করে ফেলেছেন, সংখ্যাটা আরো বাড়বে। এঁরা সবাই গুলজারের জীবনকালের মধ্যে লিখেছেন, এমন কবি। এখনো লিখছেন, এমন কবি। চুরাশি বছরের লব্ধপ্রতিষ্ঠ মানুষটা বললেন “এই সংকলনটা করতে গিয়ে আমি অনেক জানলাম, শিখলাম।” কী শিখলেন?

প্রথমত, মারাঠি, মালয়ালম আর বাংলা ছাড়া কোনো ভারতীয় ভাষায় এই মুহূর্তে ছোটদের জন্য কবিতা লেখা হচ্ছে না। দ্বিতীয়ত, দেশের সেরা কবিতাগুলো লেখা হচ্ছে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের ভাষাগুলোয়। আর “কমপার্টমেন্ট মে জীনে কি আদত হো গয়ি হ্যায় ইস দেশ মে হামলোগোঁ কো। আসাম মে কুছ হোগা তো সির্ফ আসাম কে লোগ হি লিখেঙ্গে উস পর। সাউথ সে কোঈ নহি লিখেগা। দিল্লী সে কোঈ নহি লিখেগা।”

তবে সন্ধ্যের সেরা সময়টা এল আরো পরে, যখন গুলজার নিজের কবিতা পড়তে শুরু করলেন। প্লুটো নামের যে বইটা প্রকাশ হল, তাতে মূল কবিতার বাংলা অনুবাদগুলো বাঙালিদের লজ্জায় ফেলে দেওয়ার মত। গোটা দুয়েক পড়া হতেই ব্যাপারটা বুঝে গুলজার অনুবাদককে আর পড়ার সুযোগ দিলেন না। তারপর শুধু গুলজার আর তাঁর গুণমুগ্ধরা ছিলেন সেখানে। অনুপুঙ্খ বিবরণ অবশ্য বলবে বাংলার এক কবি, প্লুটোর অনুবাদক, পান্তাভাতের অনুলেখিকা, বলিউডের এক জনপ্রিয় সুরকার — এঁরাও উপস্থিত ছিলেন।
শুধু ‘সরহদ’ এর মত পরিচিত এবং গ্রন্থিত কবিতা নয়, সুদূর ব্যালকনি থেকে দেখলাম কাগজে লেখা টাটকা কিছু কবিতাও গুলজার আমাদের উপহার দিলেন। ভাবছেন বুঝি চারিদিকের নানা সংকট থেকে বিযুক্ত হয়ে গুলজার আর আমরা কয়েক ঘন্টার জন্যে পলাতক হয়ে গেছিলাম? তাহলে একেবারে শেষদিকে পড়া একটা কবিতা উদ্ধৃত করি:

উসনে জানে কিঁউ অপনে দাঁয়ে কন্ধে পর

নীল গায় কা ইক ট্যাটু গুদওয়া থা

মর জাতা কল দঙ্গোঁ মে,

অচ্ছে লোগ থে…

গায় দেখকে ছোড় দিয়া!!

এই অবিস্মরণীয় সন্ধ্যায় আমার আর গিন্নী তুলিরেখার এক পাশে ছিল স্নেহভাজন অর্ণব আর স্বাগতা, অন্য পাশে সস্ত্রীক প্রিয় মাস্টারমশাই শামিমবাবু। এমন দিনের বন্ধুদের ভোলা যায়!

নির্বোধ আর বুদ্ধিমান

এই যারা হাসাহাসি করছে তাদের নিজেদের বুদ্ধিবৃত্তির উপরে আস্থা দেখে যে আমার হাসি পাচ্ছে। এরা অনেকেই তো কদিন আগে নিজেরাও বিশ্বাস করেছিল যে দু হাজার টাকার নোটের মধ্যে জিপিএস চিপ বসানো আছে, তাই মাটির নীচে পুঁতে রাখলেও আয়কর দপ্তর জানতে পারবে কোথায় আছে। এরাই তো গলা ফাটিয়ে বলে বেড়াচ্ছিল বিমুদ্রাকরণের ফলে নাকি আইএস ও ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এরাই তো হোয়াটস্যাপ ফরোয়ার্ডকে বেদবাক্য বলে মনে করে

রাজধানী কলকাতার অধিবাসীদের চেয়ে এ রাজ্যের গ্রাম বা মফঃস্বলের বাসিন্দারা যে নিকৃষ্টতর জীব, এ রকম একটা ধারণা অনেকদিন ধরে চালু আছে। বহুকাল শুনে এসেছি মাধ্যমিকে জেলার ছাত্রছাত্রীরা স্ট্যান্ড করে না, করিয়ে দেওয়া হয়। অর্থাৎ এমন হতেই পারে না যে জেলার ছেলেমেয়েরা পরীক্ষায় কলকাতার বাসিন্দাদের চেয়ে ভাল ফল করবে। ইদানীং কলকাতার অধিকাংশ ছেলেমেয়ে আইসিএসই বা সিবিএসই স্কুলে চলে গেছে বলেই বোধহয় এই অভিযোগটা আর তত শোনা যায় না।
বামফ্রন্ট যখন একের পর এক নির্বাচনে জিতত, যখন সেই জয়গুলোকে রিগিং এর ফল বলে এক কথায় উড়িয়ে দেওয়ার জায়গাটা তৈরি হয়নি, তখনো দেখতাম শহুরে উচ্চবিত্ত, মধ্যবিত্তরা বলতেন “ও তো গ্রামের ভোটে জেতে।” মানে গ্রামের ভোটগুলো ফাউ। শহরের একেকটা ভোটের মূল্য গ্রামের ভোটের থেকে বেশি হওয়া উচিৎ ছিল, তাহলে এই অনর্থ ঘটতে পারত না। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের জয় নিয়েও দেখেছি একই কথা বলা হয়। অথচ কলকাতা কর্পোরেশন, বিধাননগর পুরসভা তৃণমূলের দখলে; কলকাতার অধিকাংশ বিধায়ক মমতার পার্টির।
মজা হচ্ছে, কলকাতার লোকেদের মনেই থাকে না যে বাঙালি যাঁদের নিয়ে গর্ব করে, রামমোহন রায় থেকে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় পর্যন্ত, তাঁদের অনেকেরই জন্ম, বেড়ে ওঠা কলকাতার বাইরে।
যাক গে। যেজন্যে এত কথা বলছি এবারে সেটা বলি। ভাঙড়ে পাওয়ার গ্রিড বসানোর বিরুদ্ধে একটা আন্দোলন চলছে। গত কয়েকদিনে যা জানা গেছে তাতে এটা স্পষ্ট যে এলাকার মানুষের ক্ষোভ আসলে পাওয়ার গ্রিড নিয়ে ততটা নয় যতটা বলপূর্বক বা ঠকিয়ে জমি দখল করা নিয়ে। এই আন্দোলনের পেছনে নকশাল বা অন্য বিরোধীদের প্রেরণা (বা প্ররোচনা) থাকুক আর না-ই থাকুক, দিদির ভাইয়েরা যে শুধু আইনকানুন মেনেই জমি নিয়েছেন ওখানে তা নয় — এটা বেশ বোঝা যাচ্ছে। পাওয়ার গ্রিড ওখানে বসলে ঐ এলাকার মানুষের কী সুবিধা হবে, আদৌ কোন সুবিধা হবে কিনা এসব বোঝানোর জন্য সরকার সময় ব্যয় করেননি। অতএব এটা গা জোয়ারি, যেমন গা জোয়ারি সিঙ্গুরে করা হয়েছিল, নন্দীগ্রামে করা শুরু হয়েছিল। কিন্তু মুশকিল হল, বন্ধুবান্ধব, প্রতিবেশী, সহকর্মী অনেকের কাছেই দেখছি ভাঙড় নিয়ে আলোচনায় মুখ্য বিষয় এগুলো নয়। মুখ্য হল এক স্থানীয় মহিলার বাইট, যেখানে তিনি বলেছেন ওখানে পাওয়ার গ্রিড হলে “আমাদের আর বাচ্চা হবে না।”
গ্রামের মানুষরা কত অজ্ঞ, কত অশিক্ষিত তা নিয়েই হাসাহাসি, রসালো আলোচনা ইত্যাদি চলছে। বিজ্ঞানে আমি বরাবরই অজ্ঞান। ইলেকট্রিক আর ইলেকট্রনিকের পার্থক্য বুঝিয়ে দেওয়ার যোগ্যতাও আমার নেই সুতরাং ইলেকট্রোম্যাগনেটিক ফিল্ড মানুষের শরীরে কী প্রভাব ফ্যালে বা আদৌ ফ্যালে কিনা তা নিয়ে আমার কোন ধারণা নেই। আমার পদার্থবিদ বন্ধুদের অনুরোধ করব আলোকপাত করতে।
কিন্তু এই যারা হাসাহাসি করছে তাদের নিজেদের বুদ্ধিবৃত্তির উপরে আস্থা দেখে যে আমার হাসি পাচ্ছে। এরা অনেকেই তো কদিন আগে নিজেরাও বিশ্বাস করেছিল যে দু হাজার টাকার নোটের মধ্যে জিপিএস চিপ বসানো আছে, তাই মাটির নীচে পুঁতে রাখলেও আয়কর দপ্তর জানতে পারবে কোথায় আছে। এরাই তো গলা ফাটিয়ে বলে বেড়াচ্ছিল বিমুদ্রাকরণের ফলে নাকি আইএস ও ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এরাই তো হোয়াটস্যাপ ফরোয়ার্ডকে বেদবাক্য বলে মনে করে। ঐ গ্রাম্য মহিলা, যিনি হয়ত শুধু নিজের নামটুকু সই করতে পারেন, তার সাথে এই ইংরিজি জানা, স্মার্টফোন ব্যবহার করতে পারা লোকেদের পার্থক্য কোথায়? শহরে বাস করে, ডিগ্রিধারী হয়ে কী তফাত হল? এবার থেকে শঙখ ঘোষকে মনে রাখবেন:

‘হাওড়া ব্রিজের চূড়োয় উঠুন,
নীচে তাকান, ঊর্ধ্বে চান —
দুটোই মাত্র সম্প্রদায়
নির্বোধ আর বুদ্ধিমান।’